১০. বলকানের কান্না

চ্যাপ্টার

নতুন বেলগ্রেডের এক অভিজাত এলাকা। রাত তখন ৮ টা।
প্রশস্ত রাজপথ। তুষার পড়ছে। কনকনে শীত। রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া বেশ কম।
তবু ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে বেশ ভিড় জমে উঠেছে। নীল সিগন্যালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়ির এক লম্বা সারি।
মাথায় কালো হ্যাট এবং গায়ে কালো ওভার কোট জড়ানো একজন লোক এই সুযোগে দ্রুত গাড়ি গুলোর ড্রাইভিং সিটের খোলা জানালাগুলো দিয়ে কি কাগজ দিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির লম্বা লাইনটির প্রায় পেছনের প্রান্তে মাঝারি সাইজের একটা মাইক্রোবাস। ঐ গাড়ির ড্রাইভারটিও তার জানালা দিয়ে ঐ কাগজটি পেল।
কাগজটির উপর এক পলক নজর বুলিয়েই পেছনে তাকিয়ে বলল,জর্জ তোমরা শয়তানটাকে পাকড়াও করো।
পেছনে সিটে ওরা তিনজন বসেছিল।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই দরজার সামনে বসা লোকটি দরজা খুলে লাফিয়ে পড়ল নিচে, তার সাথে আরেকজন।
কাগজ বিলি করা কালো ওভার কোট জড়ানো সেই লোকটি তখন ফুটপাতে উঠে গেছে।
গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া দু’জন লোক অদ্ভুত দ্রুততার সাথে সেই লোকটিকে প্রায় ছোঁ মেরে ধরে এনে গাড়িতে তুলল। লোকটি চিৎকার করারও সুযোগ পায়নি। বুঝে উঠার আগেই সে গাড়ির ভেতরে এসে আছড়ে পড়েছে।
হাইজাকের এই তৎপরতা দেখে মনে হয় এরা এই কাজে অত্যন্ত দক্ষ। যেমন গায়ের শক্তি, তেমনি কৌশলও রপ্ত।
মাইক্রোবাসটি দানিয়ুব এভেনিউ এর মাঝামাঝি জায়গায় একটা বড় লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি দাঁড়াবার শব্দ পেয়ে গেট রুমের ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে এল। মাইক্রোবাসটির দিকে একবার নজর বুলিয়ে সরে গেল জানালা থেকে। পরক্ষণেই লোহার গেটটি আস্তে আস্তে খুলে গেল।
মাইক্রোবাসটি ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে একটি বিরাট বাগান। ফুলের বাগান। বাগানের মাঝখানে পানির একটা ফোয়ারা। ফোয়ারার ঠিক মাঝখানে শ্বেত পাথরের একটা মূর্তি। মূর্তিটি বলকান অঞ্চলের জাতীয় বীর বলে কথিত ‘মিলেশ’ এর। বিশেষ করে ‘মিলেশ বাহিনী’র খৃষ্টান জাতীয়তাবাদিরা ‘মিলেশ’কে গুরু হিসেবে বরণ করে নিয়েছে।
১৩৮৯ সালে কসভোর যুদ্ধে তুরস্কের সুলতান মুরাদ দক্ষিণ ইউরোপের খৃষ্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। কিন্তু যুদ্ধের পর পরই খৃষ্টান পক্ষের একজন সৈনিক ‘মিলেশ’ গোপনে মুরাদকে আক্রমন করে ও আহত করে এবং আহত সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রেই মৃত্যুবরণ করেন। সেই থেকে ‘মিলেশ’ ইউরোপের খৃষ্টানদের কাছে শক্তি ও সাহসের প্রতীক হয়ে আছে।
মাইক্রোবাসটি বাগান পেরিয়ে একটি বড় বহুতল গাড়ির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে সবাই নামল। মোট চারজন। সকলে নামার পর সেই ওভার কোট পরা লোকটিকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল গাড়ি থেকে। ঐভাবে টেনে নামানোর ফলে লোকটি পড়ে গেল।
যে লোকটি ড্রাইভিং সিট থেকে নামল সে সঙ্গে সঙ্গে লোকটির পাঁজরে লাথি মেরে বলল, ব্যাটা, হিদেন, উঠ।
লোকটি উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াতেই একজন সামনের দিকে লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে বলল চল মজা দেখবি, ইস হ্যান্ডবিল ছড়ানো হচ্ছে।
গ্রাউন্ড ফ্লোরের এক কোনে একটা অন্ধকার ঘরে লোকটিকে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে ওরা চারজন উপরে উঠে গেল।
ঘণ্টা তিনেক পরে ওরা দশ বারোজন ফিরে এল। দরজা খুলে ওরা প্রবেশ করল রুমে।
আলো জ্বালাল।
লোকটি কার্পেটের উপর বসেছিল।
ঘরের মেঝেতে কার্পেট ছাড়া ঘরে আর বসার কিছু নেই।
ওরা ঘরে ঢোকার পর লোকটি উঠে দাঁড়াল। লোকটির মাথায় সেই হ্যাট।
ঘরে প্রবেশ করা লোকদের মধ্যে দীর্ঘ ও স্থুলদেহী একজন একটু এগিয়ে লোকটির মাথা থেকে হ্যাটটি টেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ইয়েলেস্কু সেই হ্যান্ডবিলটি কোথায়, দাও তো দেখি।
ইয়েলেস্কু এগিয়ে এল। এই লোকটিই মাইক্রোবাস ড্রাইভ করছিল।
সে এগিয়ে এসে দীর্ঘ সেই লোকটির হাতে হ্যান্ডবিলটি তুলে দিতে দিতে বলল, স্যার সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়কে এরা এদের সুদিন মনে করে দারুণ বাড়বাড়ি শুরু করেছে।
এই ‘স্যার’ লোকটি বিল কনষ্টাইনটাইন, বলকানের ‘মিলেশ বাহিনীর’ নেতা। নিজেকে সে ইউরোপের ধর্মসম্রাজের অধিনায়ক সম্রাট সার্লেম্যানের বংশধর বলে প্রচার করে।
‘পিপিলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে, কিছু ভেবনা ইয়েলেস্কু’ বলে কনষ্টানটাইন হ্যান্ডবিলটি নিয়ে ধরে আনা সেই লোকটির দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
লোকটি বয়সে যুবক। মাথায় ঘন কালো চুল। কিন্তু গায়ের রং সাদা, স্লাভদের মতই অর্থাৎ তার দেহে তুর্কি ও স্লাভ দুই রক্তধারাই রয়েছে।
যুবকটির চেহারা বুদ্ধিদীপ্ত। ভাবলেশহীন তার দৃষ্টি। সেখানে ভয়ের কোন চিহ্ন নেই। যেন অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটেনি তার।
বিল কনষ্টানটাইন যুবকটির দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার নাম কি? যুবকটি দেরী না করে বিনা দ্বিধায় বলল, সালেহ বাহমন।
নামের উচ্চারণ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে কনষ্টানটাইনের প্রচন্ড থাপ্পড় গিয়ে পড়ল যুবকটির গালে। বলল, কুত্তা ঐ নাম আমি শুনতে চাইনি, যুগোশ্লাভিয়ার নাগরিক হিসেবে তোর নাম কি তাই বল।
আকস্মিক থাপ্পড়ে যুবকটি মুহূর্তের জন্যে চমকে উঠেছিল মাত্র। কিন্তু শীঘ্রই নিজেকে সামলে নিল। বলল, আমার এখন এই একটাই না……।
এবার কথা শেষ হলো না। কনষ্টানটাইনের আরেকটি থাপ্পড় গিয়ে পড়ল যুবকটির অন্য গালটিতে। সেই সাথে সে চিৎকার করে উঠল, চুপ শয়তানের বাচ্চা। তোর নাম বল।
যুবকটি এবার আর চমকে উঠেনি। স্পষ্ট কণ্ঠে সে বলল, মুসলিম নাম গ্রহণ এখন আর বেআইনি নয়। এ অধিকার মুসলমানদের দেয়া হয়েছে।
–আইনের নিকুচি করি। গোলযোগ-অবস্থা ও সরকারের দূর্বলতার সুযোগে তোরা এটা আদায় করে নিয়েছিস। কেউ মানেনা এটা। যুগোশ্লাভ নাম তোকে বলতে হবে। বল বলছি।
–বলেছি, আমার নাম সালেহ বাহমন।
কনষ্টানটাইনের চোখ দু’টি জ্বলে উঠল।
সে ইয়েলেস্কুর দিকে চেয়ে বলল, চাবুক লাগাও ইয়েলেস্কু। হারামজাদা পাকা শয়তান।
‘ইয়েলেস্কু চাবুক নিয়ে এসে সালেহ বাহমনের গা থেকে ওভার’ কোট খুলে ফেলে দিল।
চামড়ার চাবুক।
ইয়েলেস্কু সালেহ বাহমনকে টেনে নিয়ে দেয়ালে বুক ঠেকিয়ে দাঁড় করাল।
ইয়েলেস্কুই চাবুক মারা শুরু করল সালেহ বাহমনের পিঠে।
এক-দুই-তিন……পাঁচটি চাবুক লাগাল এক নিঃশ্বাসে।
চাবুকের নির্দয় ছোবলে প্রথমে কেঁপে উঠেছিল বাহমন। পরে সে স্থির হয়ে গিয়েছিল। তাজা লাল রক্তে ভিজে উঠেছিল পিঠের সাদা সার্ট। দু’হাত ও মাথা দেয়ালে ঠেকিয়ে স্থির দাঁড়িয়েছিল সালেহ বাহমন।
পাঁচটি চাবুক শেষ করে ইয়েলেস্কু থামল।
কনষ্টানটাইন তার হাতের হ্যান্ডবিলটি ইয়েলেস্কুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ওকে পড়তে দাও।
ইয়েলেস্কু সালেহ বাহমনকে ঘুরিয়ে নেবার জন্য হাত ধরে টান দিল। সালেহ বাহমন ঘুরে দাঁড়াল, কিন্তু কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল। ইয়েলেস্কু সালেহ বাহমনের পাঁজরে একটি লাথি দিয়ে বলল, এখনি এই অবস্থা।
বলে ইয়েলেস্কু হ্যান্ডবিলটি সালেহ বাহমনের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, কি লিখেছিস পড়। তোর মুখেই আমরা শুনব।
সালেহ বাহমনের চোখে-মুখে প্রচণ্ড ক্লান্তি। হাতি পেটানো চাবুকের আঘাতে সে উঃ আঃ করেনি সত্য, কিন্তু বেদনা চাপতে গিয়ে বেদনায় জর্জরিত হয়েছে সে। চোখে-মুখে তার প্রকাশ স্পষ্ট।
প্রথমটায় সালেহ বাহমন হ্যান্ডবিলটি হাতে নিলনা। পড়ে গেল তা কার্পেটের উপরে।কিন্তু পরক্ষণেই হ্যান্ডবিলটি কুড়িয়ে নিয়ে সে বলল, আমাদের কথা আমি অবশ্যই পড়ব। বলে সে হ্যান্ডবিলটি চোখের সামনে তুলে ধরল। হ্যান্ডবিলটির শিরনামঃ ‘যুগোশ্লাভ সর্ব সাধারণের কাছে মজলুম মুসলিমদের আবেদন’।
‘মুসলমানরা যুগোশ্লাভিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতি গোষ্ঠি। যুগোশ্লাভিয়ার অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মত তারাও সমান অধিকার ভোগ করার কথা। কিন্তু বহু বছরের স্বৈরশাসন আমলে সুপরিকল্পিতভাবে এক এক করে তাদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এমনকি অবশেষে মুসলিম নাম রাখার অধিকারও হরণ করা হয়। স্বৈরাচারের ভিত্তি ধ্বসে পড়ার পর অনেক দাবীর পর মুসলিম নাম রাখার অধিকার টুকু ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু আর সব অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত। ক্ষুদ্র একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য লাখো মুসলমানের স্বার্থ নিয়ে ফুটবল খেলা………
পড়ায় বাধা দিয়ে চিৎকার করে কনষ্টানটাইন, ‘চুপ কর কুত্তার বাচ্চা।’
বলেই ইয়েলেঙ্কুর হাত থেকে চাবুকটি নিয়ে গায়ের সব শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড এক আঘাত করল সালেহ বাহমনকে। চাবুকটি গিয়ে বাম কাঁধ ও পিঠে যেন কেটে বসে গেল। কেঁপে উঠল সালেহ বাহমনের দেহ।
চাবুকটি টেনে নিল কনষ্টানটাইন। সংগে সংগে কাঁধের জামা ভিজে উঠল রক্তে।
দ্বিতীয় আঘাতের জন্যে কনষ্টানটাইন চাবুকটি মাথার উপরে তুলেছিল, কিন্তু কি ভেবে চাবুকটি নামিয়ে নিয়ে সালেহ বাহমানকে লক্ষ্য করে বলল, তোর সাথে আর কারা আছে, কারা এ হ্যান্ডবিল ছেপেছে, কোত্থেকে ছেপেছে, আমাদের বলতে হবে তোকে। মিথ্যা বলবি না।
–মুসলমানরা মিথ্যা কথা বলে না। কনষ্টানটাইনের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল সালেহ বাহমন।
–ঐ জাতের বড়াই করবি না আর, চাবুকে পিঠের ছাল তুলে দেব। একটু থেমেই কনষ্টানটাইন আবার শুরু করল, যে প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেছি তার উত্তর দে।
–প্রশ্নগুলোর উত্তর আমি দেব না। দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল সালেহ বাহমন।
–কি বললি উত্তর দিবি না? মূহূর্তকাল সালেহ বাহমনের দিকে তাকিয়ে থেকে কনষ্টানটাইন বলল, জানিস তোর এ কথার পরিণতি কি? তোর জীবনের ভয় নেই?
–জীবনকে যে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, পরকাল যাদের জন্যে ভীতির, তারাই মৃত্যুকে ভয় করে।
চোখ দু’টি জ্বলে উঠল কনষ্টানটাইনের। বলল, আবার সেই বড়াই? অমন বড়াই অনেক দেখেছি।
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কনষ্টানটাইনের চাবুক উপরে উঠল, তারপর নির্মম গতিতে তা গিয়ে আঘাত করল সালেহ বাহমনের পিঠে।
একটার পর আরেকটা, চলতেই থাকল একের পর এক। কনষ্টানটাইন যেন পাগল হয়ে গেছে।
সালেহ বাহমনের রক্তাক্ত দেহ ঢলে পড়ে গেল কার্পেটের উপর। জ্ঞান হারিয়েছে সে।
থামল কনষ্টানটাইন। রক্তাভ চোখ দু’টি তার।
সে ইয়েলেস্কুর হাতে চাবুকটি দিল এবং বলল, একে দানিয়ুবে ফেলে দিয়ে এস ইয়েলেস্কু, পানিতে ডুবে মরুক।
বলে কনষ্টানটাইন ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অন্যরা সবাই বের হয়ে গিয়েছিল আগেই। শুধু ইয়েলেস্কুর সাথে জর্জ নামের লোকটি দাঁড়িয়েছিল। ইয়েলেস্কু মিলেশ বাহিনীর এই হেডকোয়ার্টারে যে, ‘নির্মূল স্কোয়াড’ গুলো রয়েছে তার প্রধান। জর্জ তার দক্ষিণ হস্ত।
কনষ্টানটাইন বেরিয়ে গেলে ইয়েলেস্কু এবং জর্জ দু’জনে ধরাধরি করে সংজ্ঞাহীন সালেহ বাহমনকে একটা খোলা জীপে তুলে নিল।
রাত তখন সাড়ে এগারটা। তীব্র শীতের রাত।
রাস্তায় গাড়ি ও যান চলাচল নেই বললেই চলে। দানিয়ুব এভিনিউ উত্তর পূর্বে দানিয়ুব নদী পর্যন্ত এগিয়ে গেছে।
সুন্দর, সুপ্রশস্ত দানিয়ুব এভিনিউ বেলগ্রড নগরীর উত্তর-পূর্ব প্রান্ত ছুয়ে পুর্ব-দক্ষিণে এগিয়ে গেছে।
জীপটি তীর গতিতে এগিয়ে চলছিল দানিয়ুব নদীর দিকে।
শহর পেরুলেই দানিয়ুব। সুন্দর, সুপ্রশস্ত ব্রীজ দানিয়ুবের উপর দিয়ে।
এলাকাটি নির্জন।
মাঝে মাঝে দু’একটি গাড়ি তীব্র গতিতে আসছে, যাচ্ছে।
ইয়েলেস্কু গাড়ি চালাচ্ছিল। পেছনে জর্জ এবং তার পাশে সালেহ বাহমনের সংজ্ঞাহীন দেহ।
জীপটি দানিয়ুব ব্রীজে উঠে মাঝ বরাবর এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফুটপাতের একেবারে গা ঘেষে।
সংগে সংগে জর্জ সালেহ বাহমনকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। দ্রুত এগুলো সে রেলিং এর দিকে। সালেহ বাহমনকে রেলিং এর উপরে তুলে একটু দম নিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে নিচে অন্ধকার নদী বক্ষের দিকে একবার তাকিয়ে সালেহ বাহমনের দেহ হাত থেকে ছেড়ে দিল।
তারপর দেরী না করেই ঘুরে দাঁড়িয়ে উঠে এল জীপে।
ইয়েলেস্কু জীপ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। জর্জ উঠে বসতেই জীপ ছেড়ে দিল। ফিরে চলল তারা নগরীর দিকে।

দানিয়ুবের কাল বুক চিরে একটা ইঞ্জিন বোট এগিয়ে যাচ্ছিল। বেশ বড় বোট।
বোটের ডেকে অনেকগুলো প্লাস্টিক বস্তা। বস্তাগুলো শুকনো কাপড়ে ঠাসা।
বোটের পেছনে ইঞ্জিনের পাশে ছোট্ট একটা ইস্পাতের ষ্ট্যান্ডে একটা নেমপ্লেট। কালো প্লেট সাদা অক্ষরে লেখা ‘মেসার্স দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস’ প্রোপ্রাইটর কালহান ফিহার নং ১৯।
নতুন সরকার বেসরকারী খাতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। মেসার্স দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস সে ধরনেরই একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান।
বোটে দু’জন মানুষ।
একজন ইঞ্জিনের কাছে বসে আছে। হ্যাটে তার কপাল পর্যন্ত ঢাকা। গায়ে ওভারকোট জড়ানো।
আরেকজন বসে আছে বোটের মাঝখানে। তার মাথায় সাদা উলের হেড কভার, গায়ে ওভার কোট।
ইঞ্জিনের কাছে ডেক চেয়ারে যে লোকটি বসে আছে তারই নাম কালহান ফিহার। দানিয়ুব লন্ড্রী হাউসের মালিক।
বোটের নেমপ্লেটে তার নাম কালহান ফিহার লেখা থাকলেও তার আসল নাম ওমর বিগোভিক।
ওমর বিগোভিক বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের একজন কৃতি অধ্যাপক। প্রায় ২৫ বছর চাকুরী করার পর ক’য়েকমাস আগে সে চাকুরী হারিয়েছে। তার সুপারিশে ভর্তি হওয়া দুজন মুসলিম ছাত্র সাম্প্রদায়িক অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে জেলে যায়। তাদের অপরাধের সাথে ওমর বিগোভিককেও জড়ানো হয়। তবে তাকে এইটুকু দয়া করা হয়েছে যে, তাকে জেলে না পাঠিয়ে চাকরীচ্যুত করা হয়েছে। আর যেহেতু সে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের যোগ্যতা হারিয়েছে অতএব কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আর তার চাকুরী হবে না।
চাকুরী হারিয়ে ওমর বিগোভিক একেবারে পথে বসে।
অনেক চিন্তা করে ব্যবসায় ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখে না। অলঙ্কারাদি, কিছু আসবাবপত্র বিক্রি করে তার সাথে সঞ্চয়ের কিছু টাকা যোগ করেও মূলধন যথেষ্ট হয় না। অবশেষে দ্বারস্থ হতে হয় বন্ধু-বান্ধবদের। এভাবে সে মূলধন যোগাড় করে দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস চালু করে। দানিয়ুবের তীরে একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিয়ে এই ব্যবসায় তার শুরু হয়েছে। ব্যবসায় করতে গিয়ে তাকে তার মুসলিম নাম পাল্টিয়ে যুগোশ্লাভ খৃষ্টান নাম গ্রহণ করতে হয়। মুসলিম নাম নিয়ে ব্যবসায় করতে পদে পদে বাধা-বিপত্তি, অসহযোগিতা এবং সমস্যা-সংকটের ভয় আছে।
ওমর বিগোভিকের ইঞ্জিন বোট তখন দানিয়ুব ব্রীজের কাছাকাছি এসে পড়েছে। এমন সময় বিশ্রী এক শব্দ তুলে বোটের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল।
ওমর বিগোভিক ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।
বোটটি ধীরে ধীরে চলতে চলতে ব্রীজের তলায় এসে দাঁড়ালো।
ওমর বিগোভিক মুখ তুলে বোটের মাঝখানে বসে থাকা দ্বিতীয়জনকে লক্ষ্য করে বলল, মা নাদিয়া ব্রীজের থামের সাথে বোট বেঁধে দাও, স্রোতে বোট ভেসে যাবে। ইঞ্জিন খুলে দেখতে হবে কোথায় গন্ডগোল
নাদিয়া ওমর বিগোভিকের মেয়ে। নাম নাদিয়া নূর।
নাদিয়া নূর কাপড়ের বস্তা থেকে নেমে বোটের সামনের গলুইয়ে গিয়ে ছোট বৈঠা দিয়ে বোটকে ব্রীজের থামের কাছে টেনে নিলো। তারপর ব্রীজের হুকের সাথে নৌকা বেঁধে ফেলল।
দড়ি বাঁধা নৌকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দুলতে লাগল।
ওমর বিগোভিক বোটের ইমারজেন্সি বক্স থেকে টর্চ বের করে ইঞ্জিনের দিকে এগুলো।
আর নাদিয়া নৌকার গলুই থেকে তার আগের জায়গায় ফিরে আসার জন‌্যে পা বাড়াল।
ঠিক এই সময়েই উপর থেকে ভারি কিছু নৌকার মাঝখানে বস্তার উপর এসে পড়লো।
নৌকা প্রচন্ডভাবে দুলে উঠলো।
নাদিয়া নৌকা থেকে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল। ওমর বিগোভিক ডেকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বালল দেখার জন্যে কি পড়ল বোটের উপর।
টর্চ জ্বেলেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওমর বিগোভিকের। নাদিয়া নূরও এগিয়ে এসেছিল। সে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো।
বস্তার উপর একজন যুবকের সংজ্ঞাহীন দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার শরীর।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি যুবকটির পাশে বসে তার হাত তুলে নিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করলো। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, না- যুবকটি মরে যায়নি।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে বোটের সমতল ডেকে শুইয়ে দিলো। বলল, মা নাদিয়া একটু পানি দাওতো। নাদিয়া তাড়াতাড়ি ফ্লাক্স থেকে একটি পট নিয়ে নদী থেকে পানি তুলে আনলো।
ওমর বিগোভিক অল্পকিছু পানি তার মুখে ছিটিয়ে দিলো এবং বলল, মা ছেলেটি এখনও বেঁচে আছে।
–কিন্তু এখানে কোত্থেকে, কিভাবে এল? বলল নাদিয়া।
–মনে হয় ছেলেটির কোনো শত্রু ছেলেটিকে মারার পর মরেছে মনে করে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। ছেলেটির ভাগ্য নৌকার উপর এসে পড়েছে।
ক’য়েক মিনিট গেল, ছেলেটির জ্ঞান ফিরে এলো না।
ওমর বিগোভিক ভাবলো, আঘাত নিশ্চয় খুব মারাত্মক। কোথায় আঘাত দেখার জন্যে ওমর বিগোভিক বুক ও পিঠের জামা উঠিয়ে বীভৎস দৃশ্য দেখে কেঁপে উঠলো।
টর্চ ধরেছিল নাদিয়া। সে আরেক দফা আর্তনাদ করে উঠলো।
বুক, পিঠ গোটাটাই ফেটে ক্ষত-বিক্ষত। রক্ত ঝরছে এখনও সেগুলো থেকে।
ছেলেটিকে চীৎ করে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল বিগোভিক
নাদিয়ার টর্চ ছেলেটির মুখের উপর গিয়ে পড়েছে।
সুন্দর নিষ্পাপ চেহারা ছেলেটির। চোখ নীল, কিন্তু চুলগুলো কালো। অথচ স্লাভদের মতো সাদা চেহারা। তবে এই সাদার মধ্যে একটা সোনালী রং আছে।
–ছেলেটি কোনো ক্রিমিনাল নয়, ক্রিমিনালের চেহারা এ রকম হয় না। বলল ওমর বিগোভিক।
পিওর স্লাভ নয়। বলল নাদিয়া।
–ঠিক বলেছ। কিন্তু এখন কি করি বলত, দ্রুত চিকিৎসা দরকার ছেলেটির।
আমাদের ইঞ্জিন নষ্ট। কি করতে পারি। ঠিক এই সময় দক্ষিণ দিকে একটা হেডলাইট ছুটে আসছে দেখা গেল।
আশান্বিত হলো ওমর বিগোভিক। নিশ্চয় কোনো লঞ্চ অথবা মোটর বোট হবে।
হেডলাইটটি কাছে চলে এল। ছোট একটা মোটর লঞ্চ।
ওমর বিগোভিক টর্চ জ্বেলে বোটের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মোটর লঞ্চটি কাছাকাছি হতেই ওমর বিগোভিক বলল, আমার বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে।
আহত মূমুর্ষ একজন আমার বোটে। সাহায্য করলে বাধিত হবো।
লঞ্চের গতি কমে গেল।
লঞ্চ থেকে হেড লাইটের আলো এসে বোটের উপর পড়ল। আলোর বন্যায় ভেসে গেল বোট।
নাদিয়া আহত যুবকটির পাশে উত্তরমুখী হয়ে বসে ছিল। তার মুখে আলো পড়লো না।
লঞ্চটি ধীরে ধীরে বোটের পাশে চলে এলো। লঞ্চটিকে দু’তলায় বলা যায়। তবে দু’তলায় উন্মুক্ত ডেকের মাঝখানে একটা কেবিন মাত্র।
লঞ্চ থেকে কে একজন বলল, কোথায় যাবেন?
–টিটো পোর্টে পৌঁছতে পারলেই হবে। বলল ওমর বিগোভিক।
–আপনার নাম কি?
–কালহান ফিহার।
লঞ্চের লোকটি কয়েক মুহূর্ত কথা বলল না। মনে হয় কারো সাথে পরামর্শ করছে।
একটু পরেই বলল, ঠিক আছে, আপনার বোট লঞ্চের পাশে বেঁধে নিন।
ওমর বিগোভিক দ্রুত সামনের গলুইয়ে গিয়ে দড়িটা পিলারের হুক থেকে খুলে নিয়ে লঞ্চের পাশের আংটার সাথে বেঁধে নিল।
লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল। তার সাথে বোটটিও।
লঞ্চে দড়ি বাঁধার সময় এক তলার খুলে দেয়া জানালা দিয়ে ওমর বিগোভিকের নজর গিয়েছিল ভেতরে। ভেতরে নজর পড়তেই আঁৎকে উঠলো ওমর বিগোভিক।
জানালার পাশেই একটা শ্বেত পাথরের টেবিল। টেবিলে তখন কেউ নেই। টেবিলটির মাঝখানে ফনা তোলা একটা কালো সাপের মাথা। ফনার উপরটা ঘিরে অর্ধ চন্দ্রাকারে লেখা ‘মিলেশ’। অর্থাৎ মিলেশ বাহিনীর লঞ্চ।
ওমর বিগোভিক নাদিয়ার কাছে এসে নিচু গলায় বলল, এটা মিলেশ বাহিনীর লঞ্চ, সাবধান থাকতে হবে। পরিচয় প্রকাশ না হয়। তুমি ঐ পেছনটায় ইঞ্জিনের কাছে গিয়ে বসে থাক, কথা বলবে না।
নাদিয়া বুঝল। সে জানে মিলেশ বাহিনী বর্বর। সে পিতার হ্যাটটি মাথায় দিয়ে নৌকার পেছনে গিয়ে বসল।
লঞ্চের সেই আগের লোকটি আবার দু’তলায় কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে ডেকের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার আহত লোকটা কেমন?
–এখনও জ্ঞান ফিরেনি, বলল ওমর বিগোভিক।
–আমাদের ডাক্তার আছে, পাঠাব নাকি?
–খুব ভাল হয়।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার নেমে এল নৌকায়। একটা ব্যাগ তার হাতে।
ডাক্তার যুবকটির শরীরে একবার নজর বুলিয়েই বলল, এগুলো চাবুকের ক্ষত।
বুক, নিশ্বাস, ইত্যাদি পরীক্ষা করে বলল, অমানুষিক মেরেছে, আর অল্প হলেই মারা যেত। জীবনী শক্তি শেষ প্রান্তে পৌঁছেছিল।
একটু থেমে বলল, এখনি জ্ঞান ফিরে আসবে। তবে এর যে ড্রেসিং দরকার তা আমার কাছে নেই। হাসপাতালেই নিতে হবে।
বলে ডাক্তার ব্যাগ খুলে তুলার কিছু এলকোহল ঢেলে যুবকটির নাকে ধরল।
লঞ্চের ডেক থেকে আসা আলো নৌকাকেও আলোকিত করছিল।
ডাক্তার বসেছিল যুবকটির মাথার কাছে। ওমর বিগোভিক বসেছিল যুবকটির উত্তর পাশে ডেকের উপর। নাদিয়া একটু দূরে নৌকার গলুইয়ে বসে সব কিছু দেখতে পাচ্ছিল।
–এর এ অবস্থা হলো কেন? কে তাকে অত্যাচার করল। জিজ্ঞাসা করল ডাক্তার।
মুস্কিলে পড়ে গেল ওমর বিগোভিক। নিজের লোক বলে পরিচয় দেওয়াও মুস্কিল। তাহলে বলতে হবে কি করে ঘটনা ঘটল এবং ঘটনার জড়িয়ে যেতে হবে। তাছড়া যুবকটির জ্ঞান ফিরলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে যে, সে চেনা নয়। আবার নিজের লোক না বললে বলতে হবে কোথায় পেলাম, কি করে পেলাম। নৌকার উপর এসে পড়েছে, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না।
ওমর বিগোভিক চিন্তা-ভাবনা করে দেখল, শেষের পন্থাটিই ঠিক এবং সত্য কথা বলারই সিদ্ধান্ত নিল।
–ইঞ্জিন নষ্ট হবার পর আমাদের নৌকা ব্রীজের তলায় বাধা ছিল। যুবকটি ব্রীজের উপর থেকে এসে আমার নৌকায় পড়েছে। সম্ভবতঃ কেউ মেরে ফেলে দিতে চেয়েছিল। বলল ওমর বিগোভিক।
অবাক দৃষ্টিতে ডাক্তার ওমর বিগোভিকের দিকে তাকাল। সে অবিশ্বাস করল মনে হল না।
–অলৌকিক ভাবে যুবকটি বেঁচে গেছে। পানিতে পড়লে সলিল সমাধি হতো। বলল ডাক্তার।
এই সময় যুবকটির হাত-পা নড়ে উঠল ঈষৎ। যুবকটি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
চোখে কোন চাঞ্চল্য নেই, কোন উদ্বেগ নেই। শান্ত চোখে একবার সে চারদিক চোখ বুলাল। বোধহয় বুঝে নিতে চেষ্টা করল সে কোথায়। তারপর চোখটি তার আবার অর্ধ নীপিলিত হয়ে গেল। কোন কথা সে বলল না।
অবাক হলো ওমর বিগোভিক। মনে হয় আবাক হয়েছে ডাক্তার এবং নাদিয়াও। এরকম একটা পরিস্থিতিতে আহত-মুমুর্ষ একজনের কাছ থেকে নানা জিজ্ঞাসা আসবে ও উদ্বেগ প্রকাশ পাবে, সেটাই স্বাভাবিক।
সবাই নিরব।
নিরবতা ভাঙল ডাক্তার।
বলল, আপনি কে, নাম কি?
–আমি সালেহ বাহমন, একজন ছাত্র। বলল আহত যুবকটি।
নাম শুনে চমকে উঠল ডাক্তার, চমকে উঠল ওমর বিগোভিক, নাদিয়াও।
কিন্তু ডাক্তারের চমকে উঠার মধ্যে ছিল দু’চোখ ভরা ঘৃণা। আর ওমর বিগোভিক ও নাদিয়ার মধ্যে ছিল উদ্বেগ।
ডাক্তার মুখ বাঁকা করে উঠে দাঁড়াল। বলল, পণ্ডশ্রম করলাম মিঃ কালহান। এ হিদেন ব্যাটা নিশ্চয় কোন ধাড়ি শয়তান হবে। এর মরাই উচিত। বলে ডাক্তার লঞ্চে উঠে গেল।
ওমর বিগোভিকের মুখে কোন কথা যোগাল না।
এরপর কি ঘটে সেই চিন্তায় তার মন দুরু দুরু করতে লাগল। মিলেশ বাহিনী হিটলারের নাজী বাহিনীর একটা প্রতিরূপ। মুসলমানদের অস্তিত্ব এদের কাছে অসহ্য। মুসলমানদের উপর আঘাত হানার কোন সুযোগই এরা হাত ছাড়া করে না। বলকানে এ বাহিনী গঠিত হয়েছে। মুসলমানদের এবং তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্মূল করার জন্যই।
নিরবতা ভাঙল লঞ্চের ডেকের উপর থেকে আসা একটা আওয়াজে। ডেকের উপর দাঁড়িয়ে সেই আগের লোকটি বলল, লোকটির পরিচয় তো পেয়েছেন মিঃ কালহান। আমাদের জাত শত্রু, কাল সাপ। নদীতে ফেলে দিন। ডুবে মরুক। আমরা ওকে কোন সাহায্য করতে পারব না।
লোকটি ডেক থেকে চলে গেল।
পর মুহূর্তেই লঞ্চের সাথে বোট বেঁধে রাখা দড়িটি খুলে দিল।
ওমর বিগোভিক একটুও দুঃখিত হলো না। বরং আল্লাহ্‌র লাখো শুকরিয়া আদায় করল এই বলে যে, তারা নিজেরা যুবকটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে যায়নি।
ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। বলল, মা নাদিয়া তুমি এখানে ছেলেটির কাছে বস। আমি বৈঠা ধরি। নৌকা ভেসে যাবে।
বলেই ওমর বিগোভিক আবার যুবকটির মাথার কাছে ঝুকে পড়ে বলল, বাবা আল্লাহ্‌ তোমাকে বাঁচিয়েছে, তুমি এখন নিরাপদ।
একটু থেমে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?
যুবকটি চোখ খুলল। দুর্বল কণ্ঠে বলল, এর চেয়েও বড় কষ্ট আছে। সেই সব বড় কষ্টের তুলনায় এসব কোন কষ্টই নয়।
নাদিয়া এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল। যুবকটির কথা শুনে ওমর বিগোভিকের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিস্ময়ও জাগলো মনে, এ কোন সাধারণ যুবকের কথা নয়!
‘আলহামদুলিল্লাহ্‌’ বলে ওমর বিগোভিক নৌকার গলুই এর দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু’ধাপ গিয়েই আবার ফিরে দাঁড়াল।
হঠাৎ তার খেয়াল হল যুবকটি যে শুধু সার্ট গায়ে দিয়ে, শীতে জমে যাচ্ছে এটা তার চোখেই পড়েনি। ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি বোটের ডেকের নিচ থেকে একটা কম্বল বের করল, আর নিজের সার্টটা খুলে ফেলল।
তখন বোটটি স্রোতের টানে ঘুরতে শুরু করেছে।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি কম্বল ও সার্ট নাদিয়ার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ওর জামাটা পাল্টিয়ে গায়ে কম্বল দিয়ে দাও।
বলে ওমর বিগোভিক বোটের গলুইয়ে গিয়ে বৈঠা ধরল। প্রথমে সে বোটটা নদীর কিনারে টেনে নিল, তারপর বৈঠা চালিয়ে এগুতে শুরু করল। কিনারায় স্রোত কম। এগুতে খুব অসুবিধা হলো না।
নাদিয়া জামা নিয়ে সালেহ বাহমনের পাশে বসল। তারপর বাম হাতে তার মাথা মৃদু স্পর্শ করে বলল, শুনুন, আপনার জামা পাল্টাতে হবে, রক্তে ভিজে গেছে।
সালেহ বাহমন চোখ খুলল।
তারপর উঠে বসার জন্য সে মাথা তুলল। নাদিয়া তাড়াতাড়ি মাথা ধরে তাকে তুলে বসাল।
বসতে গিয়ে ককিয়ে উঠল সালেহ বাহমন।
এই প্রথম তার একটি আর্তনাদ।
নাদিয়া ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে কি?
সালেহ বাহমন তখন নিজেকে সামলে নিয়েছে। বলল, না।
বলে সালেহ বাহমন গা থেকে জামা খুলতে গিয়ে বেদনায় ককিয়ে উঠল আবার।
কোন কোন জায়গায় রক্ত শুকিয়ে জামা আটকে গেছে।
দ্বিতীয়বার জামা খুলতে গিয়ে আবার সেই রকম আর্তনাদ করে উঠল সালেহ বাহমন। টলতে লাগল সে।
নাদিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, আব্বা তুমি এস।
বৈঠা ফেলে ছুটে এল ওমর বিগোভিক।
সে এসে সালেহকে ধরল। বলল, মা দেখ, ডেকের ড্রয়ারে কাঁচি আছে। ছুটে গিয়ে কাঁচি নিয়ে এল নাদিয়া।
ওমর বিগোভিক কাঁচি নিয়ে কেটে জামা খুলে ফেলল। কয়েকটা অংশ গায়ের সাথে থেকে গেল। তারপর জামা পড়িয়ে দিয়ে শুইয়ে দিল সালেহ বাহমনকে। কম্বল দিয়ে গোটা গা ঢেকে দিল।
নাদিয়া তাঁর নিজের উলের হেডকভার সালেহ বহমানের মাথায় লাগিয়ে দিল।
বোট ততক্ষণে অনেকটা ভাটিতে ভেসে এসেছে।
ওমর বিগোভিক গিয়ে আবার বৈঠা ধরল।
নাদিয়া সালেহ বাহমনের পাশে বসে রইল। তাঁর মনে খচ খচ করে বিধছিল একটা কথা বার বার, মিলেশরা এত অমানুষ কেন? একজন ডাক্তার এত জঘন্য চরিত্রের হতে পারে কেমন করে? কেমন করে তারা একজন আহত-অসুস্থ মানুষকে নদীতে ফেলে দিতে চায়, মুসলমানরা কি দোষ করেছে? মুসলমানরা শুধু যুগোশ্লাভিয়ায় নয়, গোটা বলকানের শান্তিপ্রিয় নাগরিক। তারা কোন হাঙামায় নেই। একটাই তাদের অপরাধ। সেটা হল মুসলমান হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যা করণীয় তা তারা করতে পারছে না, এটা তারা চায়। খৃষ্টান স্লাভ, বুলগার,গ্রীক সবাই চাচ্ছে মুসলমানরা তাদের মুসলমানিত্ব পরিত্যাগ করে তাদের সাথে মিশে যাক। মুসলমানরা রাজী হচ্ছেনা, এটাই তাদের অপরাধ। এ অপরাধ থেকে মুক্তির তাদের উপায় নেই। সালেহ বাহমন এ অপরাধেই অপরাধী। কারা তাকে নির্যাতন করল, কারা তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল? নাদিয়ার আরও মনে হলো, সালেহ বাহমন সাধারণ শ্রেণীর কেউ নন, তা তাঁর কথা, নার্ভ-শক্তি থেকেই বুঝা যাচ্ছে।
নাদিয়া বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের একজন ছাত্রী। শীতের রাত। নিরব চারদিক। নদীর বুকে ঘন অন্ধকার। এই অন্ধকারের মধ্যে গাড় একটা ছায়ার মত এগিয়ে যাচ্ছে বোটটি। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোচ্ছে টিটো পোর্টের দিকে।