১০. বলকানের কান্না

চ্যাপ্টার

তিরানা বন্দরে বিমানটা ল্যান্ড করল ঠিক বেলা সাড়ে এগারটায়।
তিরানা আলবেনিয়ার রাজধানী। বহু বছর আলবেনিয়া কম্যুনিষ্ট শাসনের লৌহ শাসনে বন্দী ছিল। সেই বাঁধন এখন নেই,কিন্তু তার রেশ এখনও যায়নি। পুরানো একটা অভ্যাস থেকে নতুন অভ্যাসে রূপান্তর রাতারাতি হয়না।
বিমান থেকে আহমদ মুসা চোখ ভরে দেখল তিরানা শহরকে। হাসান সেনজিকও দেখছিল। তার কাছেও সব নতুন।
–কেমন লাগছে হাসান সেনজিক? জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
–ভাল লাগছে,অনিশ্চয়তার একটা রোমাঞ্চ আছে। বলল হাসান সেনজিক।
–ভয় করছে না?
–না মুসা ভাই,আপনার সাথে দেখা হবার পর ভয় যেন কোথায় চলে গেছে।
আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের পিঠ চাপড়ে বলল,সাবাস হাসান সেনজিক। সাহস না হারালে কোন অনিশ্চয়তাই অনিশ্চয়তা নয়,কোন বিপদই বিপদ নয়।
টারমাকে প্রবেশ করল বিমান।
বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আহমদ মুসা ভাবল,যতটা অনিশ্চয়তা নিয়ে সে তিরানায় নামছে,ততটা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি কখনও সে আর হয়নি। যে দেশে তারা নামছে তার কিছুই চেনা নেই,কেউ চেনা নয়।
চেকিং এর ঝামেলা শেষ করে বেরিয়ে এসে যখন ওয়েটিং লাউঞ্জে বসল তখন বেলা সাড়ে এগারটা।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক কেউই লক্ষ্য করেনি তারা যখন চেকিং এরিয়া থেকে লাউঞ্জে বেরিয়ে আসছিল,তখন গেটের পাশে দাঁড়ানো দু’জন লোক হাসান সেনজিকের দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠেছিল।
লোক দু’টির শক্ত-সমর্থ চেহারা ও পেটানো স্বাস্থ্য,গায়ে টি শার্ট,চোখে সানগ্লাস। আলবেনীয়।
আহমদ মুসারা লাউঞ্জে এসে বসলে তারা দূরে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের উপর চোখ রাখল। এক সময় দু’জনকে পরামর্শ করতে দেখা গেল,তারপর একজন বেরিয়ে গেল। অন্যজন তাদের উপর নজর রাখল।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক আলোচনা করছিল তাদের এখনকার গন্তব্য নিয়ে। আহমদ মুসা বলল, প্রথমে একটা হোটেলে উঠা যাক। তারপর ঠিক করা যাবে আমরা কিভাবে এগুবো।
লাউঞ্জের এক পাশে একটা বুক ষ্টল দেখে আহমদ মুসা খুশী হয়ে উঠল। ওখানে তো ট্যুরিষ্ট গাইড ও ম্যাপও পাওয়া যেতে পারে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, উঠ হাসান সেনজিক,আমরা ঐ বুক ষ্টলটা হয়ে বেরিয়ে যাব।
দূরে দাঁড়ানো লোকটিও নড়ে উঠল।
আহমদ মুসারা বই কিনে যখন লাউঞ্জ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল, লোকটিও পিছে পিছে লেগে থাকল। সে এবার আগের চেয়ে অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
লাউঞ্জ থেকে বেরুলেই একটা প্রশস্ত ফুটপাত। ফুটপাতের পরেই দীর্ঘ-প্রশস্ত গাড়ি বারান্দা। কিন্তু ভাড়া গাড়ি পেতে হলে গাড়ি বারান্দার পূর্ব-দিকে বিশাল পার্কিং এ নেমে যেতে হ্য়।
আহমদ মুসারা ফুটপাতে বেরুতেই গাড়ি বারান্দায় একজন লোক এগিয়ে এল এবং বলল,স্যার গাড়ি লাগবে?
লোকটা ড্রাইভার গোছেরই । আধা ইংরেজী আধা আলবেনীয় ভাষায় কথা বলল সে। তার মিশ্র ভাষা শুনে আহমদ মুসার হাসিই পেল।
তার দিকে চাইল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ট্যুরিষ্ট গাইড থেকে তিরানার কয়েকটা হোটেলের নাম জেনে নিয়েছিল।
কঠোর কম্যুনিষ্ট শাসনের অধীন আলবেনিয়া দীর্ঘ দিন রুদ্ধদ্বার নীতি অনুসরণের ফলে বাইরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন সুযোগ-সুবিধাটা এখানে গড়ে উঠতে পারেনি। পাঁচতারা তিনতারা স্টাইলের কোন পশ্চিমা হোটেল তিরানায় নেই।
গাইডে প্রথম শ্রেণীর হোটেলগুলোর একটির নাম ‘এল-ফজর’, তিরানার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও নয়। এ রকম একটা লোকেশনই আহমদ মুসার পছন্দ। তাছাড়া হোটেলটির নামটাও তাকে আকর্ষণ করেছে। সে বিস্মিত হলো,চার-পাঁচ দশকের কঠোর কম্যুনিষ্ট দলনেও আরবী শব্দ,আরবী নাম এখনও টিকে আছে আলবেনিয়ায়? আবার ভাবল, থাকবেনা কেন মুসলমানরা আলবেনিয়ায় বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ,শাসকরা কম্যুনিষ্ট হলেও তাদের পরিচয় মুসলমানই ছিল। ইসলামী কালচারকে তারা চাইলেও সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করতে পারেনি। হৃদয়ের গভীর থেকে যার উৎসরণ তাকে গলা টিপে মারা যায় না।
–এল-ফজর হোটেল এখান থেকে কতদূর? ড্রাইভার লোকটাকে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
–এই চার-পাঁচ মাইলের বেশী নয় স্যার। দশ মিনিটেই পৌছে যাব স্যার।
কিছু না বলে আহমদ মুসা হাটতে শুরু করল কার পার্কের দিকে। ড্রাইভার লোকটিও সাথে সাথে চলল।
যে লোকটি আহমদ মুসাদের অনুসরণ করছিল। সে এই সময় তার পাশ কাটিয়ে দ্রুত কার পার্কের দিকে চলে গেল। তার ঠোঁটে এক টুকরো বাঁকা হাসি।
কার পার্কে তখন গোটা তিনেক ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। বিমান তো বেশ আগে ল্যান্ড করেছে, যাত্রীরা চলে গেছে।
কার পার্কের মাঝখানে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। অন্য দু’টো দু’পাশে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে।
সাথের ড্রাইভার লোকটি মাঝের ট্যাক্সির এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ির অন্য পাশে আহমদ মুসাদের উপর চোখ রাখা সেই দু’জন লোকও দাঁড়িয়ে আছে। তারা ড্রাইভারের সাথে আহমদ মুসার কথা শুনছে।
আহমদ মুসা মনে করল, ওরাও দু’টো গাড়ির ড্রাইভার। সম্ভবতঃ দর কষাকষি তারা শুনতে এসেছে। সুযোগ পেলে তারা নিজেদের গাড়ির দিকে টানবে। এয়ারপোর্টে এরকমটাই ঘটে অনেক জায়গায়।
গাড়ির কাছে পৌঁছে আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ৫ মাইল রাস্তা কত ভাড়া চাও, তোমাদের রেট কি?
–স্যার রেট তো দশ ডলার, এখন শেষ সময় আপনি দয়া করে যা দেন। বলে ড্রাইভার ট্যাক্সির চারটা দরজা খুলে তোয়ালে দিয়ে সিটগুলো ঝাড়া মোছা করে নিয়ে বলল, স্যারদের কি দেরী হবে, কিছু কাজ আছে আর?
–না, ড্রাইভার। বলে আহমদ মুসা হাসান সেনজিককে গাড়িতে উঠতে বলল।
হাসান সেনজিক খোলা দরজা দিয়ে পেছনের সিটে উঠে বসল।
ড্রাইভার তখন তার সিটে বসে ষ্টিয়ারিং হুইল মুছছিল তোয়ালে দিয়ে।
আহমদ মুসা স্যুটকেসটি হাতে নিয়ে বলছিল, ড্রাইভার স্যুটকেসটি…
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না,বিদ্যুতবেগেই যেন ঘটনাটা ঘটল।
ট্যাক্সির ওপাশে দাঁড়ানো লোক দু’জন চোখের পলকে খোলা দরজা দিয়ে একজন সামনের সিটে অন্যজন পেছনের সিটে উঠে বসেছে। সংগে সংগেই গাড়ির দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল, গাড়ি লাফিয়ে স্টার্ট দিয়ে তীর বেগে ছুটে চলল সামনে।
হাসান সেনজিকের পাশের দরজা খোলাই ছিল। কি ঘটেছে আহমদ মুসা যখন বুঝল, তখন সে দরজা ধরতে চেষ্টা করল কিন্তু পারলনা। হাত ফসকে বেরিয়ে গেল।
হাসান সেনজিকের চিৎকার শুনতে পেল আহমদ মুসা। কার পার্ক পার হবার আগেই হাসান সেনজিকের পাশের দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেল।
গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা কয়েক মুহূর্ত অভিভূতের মত দাঁড়িয়ে রইল।
তার সমস্ত মুখটি বেদনা ও বিষাদে ভরে গেছে।
সম্বিত ফিরে পেয়ে আহমদ মুসা পাশের ট্যাক্সির দিকে তাকাল। দেখল, ট্যাক্সির ড্রাইভিং সিট থেকে একজন তরুণী বেরিয়ে এল। তার পরনে ফুল প্যান্ট,গায়ে টি সার্ট।
আহমদ মুসা তার দিকে এগিয়ে বলল, আমাকে সাহায্য করুন, আমার সাথীকে ঐ গাড়িতে কিডন্যাপ করা হয়েছে। আমি ফলো করতে চাই। তরুণীও ঘটনাটা দেখছিল। সে আপত্তি করল না। বলল, আসুন।
বলে সে পেছনের দরজা খুলে ধরল।
আহমদ মুসা বলল, আপনি অনুমতি দিলে আমি ড্রাইভিং এ বসতে চাই। তরুণীটি মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
আহমদ মুসার শান্ত দৃষ্টি এবং পবিত্র-সরল চেহারার দিকে একবার নজর ফেলেই একটু হেসে তরুণীটি ড্রাইভিং এর পাশের সিটে গিয়ে বসল।
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, কত পরিমাণ স্পিডে অসুবিধা হবে না?
–নতুন গাড়ি। ফুল স্পিডেও অসুবিধা নেই যদি…………… হেসে কথা শেষ না করেই থামল।
–ঠিক আছে, গাড়ির ও আমাদের নিরাপত্তা প্রথম শর্ত।
তীর বেগে আহমদ মুসার গাড়ি কারপার্ক থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এল। গাড়ির নাম্বার
আহমদ মুসার চোখে তখনও জ্বল জ্বল করছেঃ ৮৩১১।
গাড়ি রাস্তায় বেরুতেই তরুণীটি বলল, সামনে দু’টো রাস্তা, একটা শহরে গেছে, অন্যটা উত্তরে দূরের ছোট্ট শহর ভেরার দিকে এগিয়েছে।
–ভেরা নয়, শহরের দিকে আমরা যাব। বলল আহমদ মুসা।
–তাহলে ডাইনে মোড় নিন।
মোড়ের উপর গাড়ি তখন এসে পড়েছে।
গাড়ি ডান দিকে টার্ন নিয়ে ছুটে চলল শহরের দিকে।
–শহর পর্যন্ত সাইড কোন রাস্তা নেই আর। বলল তরুণীটি।
তীরের ফলার মত এগিয়ে চলছে গাড়ি। গাড়ির বেগ ১২০ কিলোমিটারে,যা এই রাস্তায় জন্য অস্বাভাবিক। কিন্তু তরুণীটি সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল,অদ্ভুত দক্ষ হাত,অদ্ভুত পরিমিতি বোধ। একটার পর একটা গাড়ি ওভারটেক করছে,কিন্তু তা অপরূপ সুন্দরভাবে। গাড়ি চালনাও যে একটা শিল্প তরুণীটি আজ তা প্রথম অনুভব করল।
তাকাল তরুণীটি আহমদ মুসার দিকে। শান্ত মুখ। চোখ দু’টি পাথরের মত সামনে চেয়ে আছে।
হঠাৎ আহমদ মুসার চোখ দু’টি খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তরুণীটি সামনের দিকে চেয়ে দেখল একটি ট্যাক্সি। বলল, ওটাই কি সেই ট্যাক্সি?
–জি হ্যাঁ।
গাড়ি দু’টির মাধ্যে ব্যবধান দ্রুত কমছে।
আর দু’মিনিট তাহলেই সে গাড়িটাকে ধরে ফেলবে।
হঠাৎ আহমদ মুসার মুখে অন্ধকার নেমে এল। সামনেই জ্বলজ্বল করছে লাল ট্র্যাফিক সিগন্যাল। শহরের মুখে রাস্তায় একটা ক্রসিং। লাল সিগন্যাল থামিয়ে-দিয়েছে এ রস্তার গাড়ি। কিন্তু ঐ গাড়িটি অল্পের জন্য বেরিয়ে যেতে পেরেছে।
আহমদ মুসার গাড়ি এসে থেমে গেল সিগন্যালের সামনে।
হাতাশভাবে আহমদ মুসা তার মাথা ছেড়ে দিল ষ্টেয়ারিং হুইলের উপর। হৃদয়ে কাঁটার মত বিধতে লাগল একটা কথা, নিরীহ, সরল তরুণ হাসান সেনজিক ওদের হাতেই পড়ে গেল।
তরুণীটিও ভীষণ দুঃখিত হয়েছিল।
আহমদ মুসার দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে বলল, দুঃখিত আমি,লোকটি কে আপনার? কোত্থেকে আপনারা আসছেন?
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকিয়েই বলল,আমার এক হতভাগা বন্ধু।
আবার নীল সিগন্যাল জ্বলে উঠল।
আহমদ মুসার গাড়িটাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল, আর ফলো করে আমরা পারবো না। শহরের শত পথে আমরা ওদের খুঁজে পাব না।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল,আপনি তো এখন এয়ারপোর্টে ফিরে যাবেন।
হ্যাঁ, সেখানেই আমার ভাইয়া আছেন। একটা কাজে তিনি সেখানে গেছেন।
কেন জিজ্ঞেস করছেন?
–আমাকে তিরানা সিটি কারপোরেশন অফিসে যেতে হবে।
কেন?
ওই গাড়িটা কার তা সন্ধান নিতে হবে।
তরুণীটি আহমদ মুসার বুদ্ধি দেখে আবাক হলো। ওখান থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে যে একজন গাড়ি মালিককে খুঁজে বের করা যায় একথা কোন দিন সে ভাবেওনি।
–আপনি কখনও তিরানায় এসেছেন? কেউ পরিচিত আপনার এখানে?
–তিরানায় এই প্রথম আসা। কেউ আমার পরিচিত নেই এখানে।
–তাহলে সিটি কারপোরেশন অফিসে তাড়াতাড়ি কাজ উদ্ধার আপনার কঠিন হবে।
কেন?
কম্যুনিজম গেছে,কিন্তু কমিউনিষ্ট আমলাতন্ত্র এখনও যায়নি।
তরুণীটি একটু থেমেই আবার বলল, আপনি এখনি যেতে চান?
–জি, এখনকার প্রতিটি সেকেন্ড আমার কাছে একটা বছরের চেয়েও মূল্যবান।
–পুলিশকে বললে হয় না?
হাসল আহমদ মুসা। বলল,আপনাদের পুলিশের কথা জানিনা। তবে যে অভিজ্ঞতা আছে সেটা হলো, পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার অর্থ হলো বিষয়টাকে কোল্ড স্টোরেজে পাঠানো। আজ যে কাজ চাই,তা দশদিন বা দশমাস পরে পেতেও পারি।
তরুনীটিও হাসল। বলল,আমাদের পুলিশের অবস্থাও এই রকম,বিশেষ করে বেসরকারী অভিযোগের তদন্তে তারা গা করতেই চায় না।
–শহরের একটা মানচিত্র আমার কাছে আছে আমি খুঁজে নেব। আমি এখানেই নেমে যেতে চাই। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তরুনীটি গম্ভীর হলো। বলল,আপনি এ শহরে নতুন,আপনি বিদেশী,আপনি বিপদগ্রস্থ। চলুন আপনাকে সিটি কর্পোরেশনের অফিসে নিয়ে যাব। আপনি এ সিটে আসুন।
–আপনার ভাই তো বিপদে পড়বেন। তিনি তো চিন্তা করবেন।
–বিপদে পড়বেন না, খুব চিন্তাও করবেন না। তাঁর বোন সম্পর্কে তার এ আস্থা আছে যে,আমি কোন জরুরী কাজ ছাড়া সেখান থেকে আসিনি। আর সিটি কর্পোরেশনে আমার এক আত্মীয় আছেন। আপনার কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এল। তরুনীটিও বেড়িয়ে এল। সিট বদল করল তারা।
–গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে তরুনীটি বলল, আপনার যে ড্রাইভ দেখলাম,সে ড্রাইভের কথা আমি কল্পনাও করিনি। আমি কোন রকমে কাজ চালাতে পারি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, সিটি কর্পোরেশন এখান থেকে কতদূর?
‘চার মাইলের বেশী হবে না।’ বলল তরুনীটি।
আহমদ মুসা উত্তরে আর কিছু বলল না। চার দিকটায় সে চোখ বুলাতে লাগল। সেই সাথে তার মাথায় চিন্তার জট। একটা অনিশ্চতের পথে সে পা বাড়িয়েছে,পারবেন কি লক্ষ্যে পৌছতে? পারতেই যে হবে তাকে।
তরুনীটি ভাবছিল আহমদ মুসার কথা। এ ধরনের একটা ভয়ানক বিপদে সাধারণ যে কেউ মুশড়ে পড়ার কথা, প্রথমেই তার পুলিশের স্মরণাপন্ন হবার কথা। কিন্তু তা না করে যে নিজেই পাল্টা আক্রমনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়,সে তো সাধারণ নার্ভ,সাধারণ বুদ্ধি কিংবা সাধারণ শক্তির কেউ নয়।
তরুনীটি চাইল আহমদ মুসার দিকে। শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে সে।
তরুনীটি ভাবল,এমন সরল পবিত্র মুখচ্ছবি যার সে যেই হোক আবাঞ্ছিত কেউ হতে পারে না।
সিটি কর্পোরেশন অফিসে ওরা পৌঁছল।
এডমিনিস্ট্রেটিভ সেকশনের গেট রুমে আহমদ মুসাকে বসিয়ে তরুনীটি সেক্রেটারীর কক্ষে চলে গেল। সিটি কর্পোরেশনের সেক্রেটারী তরুনীটির চাচা।
আধা ঘন্টা পর ফিরে এল তরুনীটি। তার মুখে হাসি।
সে এসে সোফায় আহমদ মুসার পাশে বসতে বসতে বলল,নাম পাওয়া গেছে। ট্যাক্সিটি পারসোনাল।
তারপর ঠিকানা লেখা চিরকুটটি আহমদ মুসার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, কিন্তু সমস্যা হলো চাচার কাছে শুনলাম ঠিকানার লোকটা সাংঘাতিক। সে ক্রিমিন্যাল অথচ তার গায়ে হাত দেয়া যায় না। খুন করে পাখি শিকারের মত,কিন্তু তাকে পাকড়াও করার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দেশের সীমান্ত পেরিয়েও তার নাম।
–ধন্যবাদ,আমি তাই আশা করছিলাম। মুখে হাসি আহমদ মুসার।
বিস্মিত চোখে তরুনীটি বলল,আপনার মুখে হাসি,আমি মনে করেছিলাম চিন্তিত হয়ে পড়বেন আপনি।
–হাসছি কারণ, ঠিক ঠিকানাটা আমরা পেয়ে গেছি। এ ঠিকানাটা যদি কোন ভাল লোকের হতো, তাহলে চিন্তায় পড়তাম ঠিক ঠিকানা আমরা পাইনি।
বিস্ময়, বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তরুনীটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, আপনি অসাধারণ, এমন চিন্তা আমার আসেইনি।
দু’জনেই বেরিয়ে এল সিটি কর্পোরেশনের অফিস থেকে।
লনে এসে দাঁড়াল আহমদ মুসা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা ১টা।
তিরানার ম্যাপের দিকে চোখ বুলিয়ে আহমদ মুসা বলল, ঠিকানার এই ‘জগু রোডটি’ কোথায়?
জগু রোড মানে আহমদ বেগ জগু রোড। বলল তরুণীটি।
তরুণীটি ম্যাপে রোডটি দেখিয়ে দিল। বলল, এটা তিরানা নগরীর পুরানো এলাকা। ১৯১২ সালে আলবেনিয়া স্বাধীন হলে ১৯২৮ সালে আহমদ বেগ জগু শাসন ব্যবস্থাকে রাজতন্ত্রে পরিণত করেন। তাঁরই নামানুসারে এই রাস্তার নামকরণ করা হয়। সে সময় নগরীর সিটি কর্পোরেশনের অফিস এই রাস্তার উপরেই ছিল।
জগু রোডে পৌছার পর পথগুলোর দিকে একবার নজর বুলিয়ে আহমদ মুসা বলল, অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে বোন।
‘বোন’ সম্বোধন শুনে তরুণীটি অনেক্ষণ তাকিয়ে থকল আহমদ মুসার দিকে। তারপর বলল, আপনি কোথাও যেতে চান?
–হ্যাঁ এই ঠিকানায় যাব।
–আপনি একা ঐ ঠিকানায়?
–আমাকে যেতে হবে বোন।
অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠস্বর আহমদ মুসার। তরুণীটি মুহুর্তের জন্যে আহমদ মুসার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, এখনি যেতে চান?
–হাঁ বোন,ঐ ক্রিমিনালদের আমি কোন সুযোগ দিতে চাই না।
–কিন্তু তার আগে আপনার খেয়ে নিতে হবে,বেলা ১টা বাজে। চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে ঐ ঠিকানায় পৌছে দেব।
–তুমি? না না,তোমার বাড়ি যাওয়ার দরকার। বাড়িতে সবাই…..
তরুণীটি বাধা দিয়ে হেসে বলল, আমি ভাইয়ের সাথে টেলিফোনে আলাপ করেছি। ভাইয়াও আসছেন, এখনি এসে পড়বেন।
সিটি কর্পোরেশনের পাশেই একটা হোটেল।
হোটেলের দিকে যেতে যেতে তরুণীটি বলল,আমার খুব আনন্দ লাগছে,রহস্য,এ্যডভেঞ্চার আমার খুব ভাল লাগে। আমার ভাইয়ারও। আমার ভাইয়া তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক,কিন্তু খেলা-ধূলা-সমাজসেবা নিয়েই বেশী মেতে থাকেন।
খাওয়া শেষে হোটেল থেকে বেড়িয়ে আহমদ মুসা বলল,বোন আমি নামাজ পড়তে চাই,কোথায় পড়তে পারি?
কথাটা শুনে চমকে উঠে তরুণীটি আহমদ মুসার দিকে তাকাল। তার চোখে বিস্ময়। বলল আপনি মুসলমান?
–হাঁ বোন মুসলমানদের সাথে তোমার পরিচয় আছে?
তরুণীটি কোন জবাব দিল না। একটা বিষন্নতা,একটা বিব্রতকর ভাব তার মুখে ফুটে উঠল।
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল,নামাজ ঐ পার্কে পড়া যাবে?
সিটি কর্পোরেশন ও হোটেলের সামনেটা জুড়ে একটা সুন্দর পার্ক।
সেদিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল,হ্যাঁ অসুবিধা হবে না।
হোটেলে অজু করে নিয়েছিল।
নামাজ পড়ার জন্যে পার্কে চলে গেল আহমদ মুসা। পেছনে পেছনে চলল তরুণীটিও।
কেবলামুখী হয়ে ঘাসের উপর নামাজে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
পাশেই দাঁড়িয়েছিল তরুণীটি।
অপরূপ এক তন্ময়তার সাথে নামাজ পড়ছিল আহমদ মুসা। তার হাত বেঁধে নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা, রুকু করা,সিজদা দেখে মনে হচ্ছিল এক মহা শক্তির সামনে ভয় ভক্তিতে আপ্লুত একজন মানুষ। যেন গোটা জগৎকেই সে ভুলে গেছে,মহাশক্তিমান প্রভু ছাড়া তার সামনে আর কাউকেই সে দেখছে না।
তরুণীটি চোখ ভরে পলকহীন দৃষ্টিতে দেখছিল এই অপরূপ দৃশ্য। তার মুখে বিস্ময়ের সাথে একটা আনন্দের ষ্ফুরণও আছে।
এই সময় একটি যুবক এসে তার পাশে দাঁড়ালো।
তরুণীটি মুখ ঘুরিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,ভাইয়া তুমি এসেছ?
যুবকটির দৃষ্টি তখন নামাজরত আহমদ মুসার দিকে। বলল,এ কি সেই?
–হ্যাঁ ভাইয়া।
–উনি মুসলমান?
–তাই তো দেখছি।
যুবকটিও দেখতে লাগল নামাজ।
এক সময় আহমদ মুসার দিকে চোখ রেখেই বলল,আমাদের মুসলিম বোর্ড অফিসের মসজিদে নামাজ দেখেছি। কিন্তু এত সুন্দর নামাজ তো দেখিনি?
–ভাইয়া এর সব কিছুই আমি সুন্দর দেখছি,অসাধারণ দেখছি। বুদ্ধি,সাহস,দক্ষতার অপরূপ সমাবেশ তার মধ্যে। এখন দেখছি,ধর্মভীরুতাতেও সে সবাইকে ছাড়িয়ে।
–কে ইনি?
–আমি জানি না,জিজ্ঞেস করিনি। যিনিই হোন অসাধারণ কেউ।
নামাজ শেষে আহমদ মুসা মুনাজাত করল।
মুনাজাতের সময় তার চোখে-মুখে অপুর্ব এক আবেগ। এক সময় তার চোখ থেকে নেমে এল দু’ফোটা অশ্রু। তরুণীটি অভিভূতা। ঐ অশ্রু যেন তার চোখকেও ভারি করে তুলল। হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে একটা তোলপাড় উঠল তার।
যুবকটি দৃষ্টি বিস্ময়-বিমুগ্ধ।
আহমদ মুসা নামাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
ঘুরে দাঁড়াল সে আসার জন্য।
তরুণী এবং তার সাথে যুবকটিও আহমদ মুসার দিকে এগুলো।
কাছাকাছি পৌছে তরুণীটি তার ভাইয়ের দিকে ইংগিত করে বলল,আমার ভাইয়া,মোস্তফা মারলিকা ক্রিয়া।
–মোস্তফা ক্রিয়া? মানে তোমরা মুসলমান? বিস্ময়ে-আনন্দে চোখ কপালে তুলে বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই যুবকটিকে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসা।
মোস্তফা মারলিকা ক্রিয়াকে ছেড়ে আহমদ মুসা তরুণীটিকে বলল,বোন তুমি তো বলনি,তোমরা মুসলমান? তোমার নাম কি বোন?
–সালমা সারাকায়া।
–বলনি কেন যে তোমরা মুসলমান?
সালমা গম্ভীর হলো। বলল,যখন বলব ভেবেছি,তখন লজ্জাবোধ হয়েছে বলতে।
–কেন?
–এক নামের চিহ্ন ছাড়া,মুসলমানিত্বের আর কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নেই আমাদের।
একটু থেমে ঢোক গিলে নিয়ে আবার শুরু করল,নামাজের নাম শুনেছি,আজ প্রথম দেখলাম নামাজ।
আহমদ মুসাও গম্ভীর হলো। বলল,এর জন্যে তোমরা দায়ী নও বোন। নামের যে চিহ্নটুকু সেটা কম কি! কি পরিমাণ খুশী হয়েছি তোমাকে বুঝাতে পারবো না।
–আপনার দেশ কোথায়? প্রশ্ন করল মোস্তফা ক্রিয়া।
–আমি আসছি আর্মেনিয়া থেকে। আমার দেশ কোনটি,এ প্রশ্ন আমার জন্যে খুব কঠিন মোস্তফা।
যে লোকটি কিডন্যাপ হয়েছে সে লোকটি কে? প্রশ্ন করল সালমা সারাকায়া।
–ওর নাম হাসান সেনজিক।
–ওকি যুগোশ্লাভ? কথাটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল মোস্তফা ক্রিয়া।
–হা,যুগোশ্লাভ।
–ওকে কিডন্যাপ করল কে? কেন? প্রশ্ন করল সালমা সারাকায়া।
–সে এক বিরাট কাহিনী,এক কথায় বলা যাবে না। তাহলে এস একটু বসি এখানে।
বলে আহমদ মুসা বসে পড়ল।
গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসে ঢাকা জায়গাটা ছিল মনোরম। মোস্তফা এবং সালমা তার সামনে বসে পড়লো।
‘হাসান সেনজিক এক হতভাগ্য পরিবারের এক হতভাগ্য সন্তান’ বলে আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের কাহিনী শুরু করল। আহমদ মুসা বলল,কি করে হাসান সেনজিককে আর্মেনিয়ায় হোয়াইট ওলফের বন্দীখানায় খুঁজে পেল। তারপর বলল যুগোশ্লাভিয়ার স্টিফেন পরিবারের দুর্ভাগ্যের মর্মান্তিক কাহিনী এবং কি করে হাসান সেনজিক পালিয়ে মানুষ হয়েছে,কি করে মুমূর্ষ মা’কে দেখতে আসার পথে বন্দী হয়,কি করে মিলেশ বাহিনী তাকে ধরার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে।
থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামলেও মোস্তফা এবং সালমা কেউ কোন কথ বলল না। তারা যেন নির্বাক হয়ে গেছে। সালমা সারাকায়া এবং মোস্তফা ক্রিয়া দু’জনের চোখে মুখে গভীর বেদনার ছাপ।
অনেক্ষণ পর ধীরে ধীরে মুখ তুলল মোস্তফা ক্রিয়া। বলল,আমাদের পাশে যুগোশ্লাভিয়ায় মুসলমানদের উপর এই ভয়াবহ জুলুম চলছে,অথচ আমরা তার কিছুই জানি না।
–ভাইয়া,এ জুলুম আমাদের দেশেও চলছে,আমরা কি তা জানি? না আমরা তার খোঁজ রাখি? বলল সালমা সারাকায়া।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল,কিন্তু তার আগেই আবার শুরু করল সালমা সারকায়া। বলল,আমি খবরে পড়েছি,আমার মনে আছে। কোরআন ছাপার জন্য এক ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, ছাপাখানা মালিকের হয়েছিল কারাদন্ড।
–আলবেনিয়া শাসনতান্ত্রিকভাবে নিরীশ্বরবাদী দেশ, এখানে ধর্ম অবলুপ্ত ঘোষিত। সুতরাং এখানে তো এসব ঘটবেই। কিন্তু মুসলমান নামের লোকদের এইভাবে হত্যার মাধ্যমে নির্মূল করার সুসংবদ্ধ কর্মসূচীর কথা আলবেনিয়ায় ছিল বা আছে বলে আমার জানা নেই। বলল মোস্তফা ক্রিয়া।
–ভাইয়া, আলবেনিয়ার প্রায় সবাই মুসলমান বলেই এমনটা ঘটতে পারেনি সম্ভবত। থামল সালমা সারাকায়া।
থেমেই সালমা সারাকায়া আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, হাসান সেনজিককে মিলেশ বাহিনীই কি কিডন্যাপ করেছে বলে আপনি বিশ্বাস করেন?
–আমার অনুমান সত্য হলে মিলেশ বাহিনী নয়, তার পক্ষে কেউ কিডন্যাপ করেছে।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, এ কারণেই আমি তাড়াতাড়ি ওখানে পৌঁছতে চাই যাতে মিলেশ বাহিনীর হাতে পড়ার আগেই হাসান সেনজিককে উদ্ধার করা যায়।
–কিন্তু জেমস জেংগার ঐ আস্তানা বড় ভয়ংকর জায়গা। পুলিশের সাহায্য না নিয়ে ওখানে যাওয়া কি ঠিক হবে? বলল মোস্তফা ক্রিয়া।
–পুলিশকে বললে হয়ত বিপরীত হতে পারে।
ব্যাপারটা ছোট নয়, আন্তঃদেশ ষড়যন্ত্রের একটা অংশ। এ ব্যাপারে জেমস জেংগা পুলিশের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে।
আহমদ মুসার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল মোস্তফা ক্রিয়া এবং সালমা সারাকায়া দু’জনেই। মোস্তফা ক্রিয়া বলল, ঠিক বলেছেন, জেমস জেংগার এ ইতিহাস আছে। বহু ঘটনায় সে স্বার্থের ভাগাভাগি করেছে পুলিশের সাথে।
–কিন্তু এ অনুমানটা কি করে করলেন মুসা ভাই, আপনি তো এদেশের কিছুই জানেন না? বলল সালমা।
–এ কিছু নয় সালমা। জেমস জেংগা সম্পর্কে তোমার কাছে যে কয়টা কথা শুনেছি, তাতেই তার সম্পর্কে আমার একটা ধারণা হয়ে গেছে।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা উঠতে উঠতে বলল, এবার যেতে হয়।
মোস্তফা ক্রিয়া এবং সালমা সারাকায়াও উঠে দাড়াল।
আহমদ মুসা মোস্তফা ক্রিয়ার দিকে চেয়ে বলল, আপনি আর কিছু জানেন জেমস জেংগা সম্পর্কে?
–প্রাচীর ঘেরা বিশাল এলাকা নিয়ে তার বাড়ি। ঘেরা এলাকার মাঝখানে তার তিনতলা প্রাসাদ। বাড়ির সামনে দক্ষিণ দিকে একটা বড় পুকুর। তার নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আছে। সে পেশাদার ক্রিমিনাল, কিন্তু উপরের পরিচয়ে সে রাজনীতিক, সরকারের সহযোগী।
–সে কখনও জেল খেটেছে, কিংবা আহত হয়েছে কোনদিন?
–না। সবাই জানে সে বড় বড় ক্রাইমের সাথে জড়িত, কিন্তু কোন ক্রাইম তার ধরা পড়েনি। গভীর পানির রাঘব বোয়াল সে।
–ধন্যবাদ মোস্তফা, আর দরকার নেই। হেসে বলল আহমদ মুসা।
–আপনি এখন যাবেন সেখানে?
–হাঁ, এখনই।
–আমরাও যাব।
–না মোস্তফা, এরকম একটা জায়গায় আমি তোমাদের নিতে পারি না।
–একা আমরা আপনাকে ছাড়বো না।
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, সঙ্গে নিতে পারি একটা শর্তে। সেটা হল আমি যা বলব তোমাদের তা মানতে হবে।
দু’জনে বলে উঠল, আমরা মানব।
তারা পার্ক থেকে বেরিয়ে এল।
গাড়িতে উঠে আহমদ মুসা সুটকেস খুলে কালো রংয়ের ছোট্ট ল্যাসার বীম পিস্তলটা তার ডানপায়ের মোজায় গুজে রাখল। তার সাদা পিস্তলটাও সে নিল। আরও কয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিস সে পকেটে পুরল।
সামনের সিট দু’টোতে বসেছিল ওরা দুই ভাই বোন। কিছু দেখতে পেলনা তারা।
ড্রাইভিং সিটে মোস্তফা ক্রিয়া।
জনাকীর্ণ রাজপথ দিয়ে মাঝারী গতিতে চলছিল গাড়ি।
গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল আহমদ মুসা। হাতের সময়টুকু সে নিজেকে বিশ্রামের কোলে সঁপে দিতে চায়।
সালমা সারাকায়া একবার পেছন ফিরে দেখল চোখবন্ধ আহমদ মুসা গাড়ির সিটে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে। শান্ত মুখচ্ছবিতে দুঃশ্চিন্তা ও উদ্বেগের সামান্য চিহ্নও নেই। সালমা ভাবল, নার্ভ কত শক্ত হলে সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ এমন নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। তার বুকতো এখনই তোলপাড় করতে শুরু করছে।
গাড়ি এসে পড়ল জগু রোডে।
জগু রোডের মাঝামাঝি জায়গায় জেমস জেংগার বাড়ী।
ঠিক মেইন রোডের উপর বাড়ী নয়। মেইন রোড থেকে পূর্ব দিকে একটু ভেতরে।
জেমস জেংগার যেখানে বাড়ী তার ঠিক বিপরীতে অর্থাৎ পশ্চিম পার্শে জগু রোডের উপর তিরানা সিটি কর্পোরেশনের পুরানো অফিস। এখন এটা পুরানা এলাকার শাখা কর্পোরেশন হিসাবে ব্যবহার হয়।
মোস্তফা ক্রিয়ার গাড়ি করপোরেশন অফিসের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলল, আমরা এসে গেছি মুসা ভাই।
তারপর মোস্তফা ক্রিয়া পূর্ব দিকে ইংগিত করে বলল, ঐ যে বড় লোহার গেট দেখা যায় ওটাই জেংগার বাড়ী।
আহমদ মুসা ওদিকে তাকাল।
মেইন রোড থেকে একটা প্রশস্ত রাস্তা বেরিয়ে গেটে গিয়ে ঠেকেছে। গেটের দু’পাশ দিয়ে উঁচু প্রাচীর উত্তর ও দক্ষিণে এগিয়ে গেছে। গেটের দু’পাশ ফাঁকা। আর প্রাচীরের পাশ দিয়ে বিলম্বিত খালি জায়গা। তবে মেইন রোড থেকে ঢুকতেই দু’পাশে বড় বড় দু’টো বিল্ডিং। সেগুলোতে বড় বড় তালা ঝুলছে। সম্ভবত ব্যাংক কিংবা কোন কোম্পানীর গোডাউন হবে।
এলাকাটা বলা যায় নির্জন।
আহমদ মুসা বেরুবার জন্য তৈরী হল।
তৈরী হয়ে বলল, মোস্তফা তুমি পারলে তোমার গাড়ির নাম্বার কিছু পরিবর্তন করে নাও। কিছু মনে করোনা আমি তোমাকে তুমি বলেছি।
মোস্তফা ক্রিয়া বলল, না মুসা ভাই, আমি খুশি হয়েছি, এতক্ষনে মনে হচ্ছে আমি আপনার ছোট ভাই হলাম।
আহমদ মুসা আবার বলল, তোমরা এখানে আধা ঘন্টার বেশী দেরী করবে না। আমি যদি আধা ঘন্টার মধ্যে না ফিরি তোমরা চলে যাবে।
সালমা সারাকায়া কোন কথা বলছে না। তার মুখ বিষন্ন, সেখানে উদ্বেগও। আহমদ মুসার শেষ কথায় তার চোখ দু’টি ছল ছল করে উঠল।
একটা আবেগ এসে মোস্তফাকেও ঘিরে ফেলেছে। আহমদ মুসার কথার পর সেও কথা বলতে পারল না।
সালমা সারাকায়া এবং মোস্তফা ক্রিয়া দু’জনে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আহমদ মুসা হাসল। তাদের সান্তনা দিয়ে বলল, তোমরা ভেবনা, আমার সাথে দ্বিতীয় একজন আছেন, তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহ।
বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেরিয়ে জগু রোড অতিক্রম করে গেটের দিকে এগিয়ে চলল। আহমদ মুসার শান্ত মুখ, ঠোঁটে সুখী মনের এক টুকরো অস্পষ্ট হাসি।
সালমা সারাকায়া এবং মোস্তফা ক্রিয়া সম্মোহিতের মত সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাদের হৃদয়ে বেদনা ও বিস্ময়ের যুগপত আলোড়ন।
তারা দেখল, আহমদ মুসা গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড় গেটের পাশে ছোট আর একটি গেট। লোকদের আসা যাওয়ার জন্য। তার পাশেই গেট ম্যানের ঘর।
তারা দেখতে পেল, আহমদ মুসা গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই গেটম্যানের কক্ষের জানালা দিয়ে একটা মাথাকে উঁকি দিতে দেখা গেল।
তার কিছুক্ষন পরেই ছোট গেটটি খুলে গেল। গেট দিয়ে একজন লোক বেরিয়ে এল। তার হাতের পিস্তল আহমদ মুসার দিকে তাক করা। তার সাথে আহমদ মুসা ঢুকে গেল ভেতরে।
ছোট গেটটি বন্ধ হয়ে গেল।
ভয় ও আতংকে সালমা ও মোস্তফা ক্রিয়া যেন কাঠ হয়ে গেছে। সালমা সারাকায়ার চোখের কোণায় জমে ওঠা অশ্রু যেন উত্তাপে শুকিয়ে গেছে।
তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই।
মোস্তফা ক্রিয়া তার হাত ঘড়ির দিকে তাকাল, বেলা ২টা ২৫ মিনিট।

আহমদ মুসার অনুমান মিথ্যা হয়নি। গেটে এমন একটা ব্যবস্থা থাকবে সেটাই সে আশা করেছিল।
যে লোকটি পিস্তল বাগিয়ে গেটের বাইরে এসেছিল, তাকে দেখেই আহমদ মুসা চিনতে পারল। বিমান বন্দরে গাড়ির ড্রাইভার বাদে আরও যে দু’জন গাড়ির ওপাশে দাঁড়িয়েছিল তাদেরই একজন সে।
আহমদ মুসা খুশী হলো এই ভেবে, তার মিশনকে আল্লাহ প্রথমেই সাফল্যের মুখ দেখালেন। ঠিক জায়গায় সে এসেছে। তার মনে একটা ক্ষীন সন্দেহ ছিল, গাড়িটি জেমস জেংগার হলেও হাসান সেনজিককে তারা জেংগার বাড়ীতেই তুলবে তার কোন কথা নেই। কিন্তু এখন সে নিশ্চিত হাসান সেনজিককে তারা জেংগার বাড়িতেই এনেছে।
আহমদ মুসা আগেই ঠিক করে নিয়েছিল, তাদের হাতে ধরা পড়ার মাধ্যমে সে দ্রুত এবং সহজে জেংগা কিংবা হাসান সেনজিকের কাছে পৌছতে পারবে যা তার জন্য খুবই জরুরী।
–আমি হাসান সেনজিকের বন্ধু। তার ব্যাপারে আমি তার সাথে কথা বলব।
জেংগার কাছে সে আছে তা তোমাকে কে বলেছে?
আহমদ মুসা চমকে উঠল। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হবার কথা তো চিন্তা করেনি। তাড়াতাড়ি কথা স্থির করে নিল। বলল, কেউ বলেনি, আমি জেনেছি। কেমন করে জেনেছি তা জেংগাকেই বলব।
তারা গেট রুমে এসে পড়েছে।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই পিস্তলধারী লোকটি তার পিস্তলের বাট দিয়ে আহমদ মুসার ঘাড়ে একটা বাড়ি দিয়ে বলল, তুমি খুব সেয়ানা লোক দেখছি, চল জেংগার কাছেই। মজাটা ওখানেই হবে।
বলে লোকটি টেলিফোন হাতে নিল।
আরেকজন লোক, মনে হলো সেই আসল গেটম্যান, পিস্তল বাগিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে।
সম্ভবত লোকটি টেলিফোনে জেংগার সাথে কথা বলল।
কথা শেষ করে বলল, চল জেংগা তোমাকে স্বাগত জানাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন।
বলে পিস্তলের নল আহমদ মুসার ঘাড়ে ঠেকিয়ে সামনের দিকে ধাক্কা দিল।
জেমস জেংগার তিনতলা বাড়ী। গেট থেকে একটা ফুটবল মাঠের মত ফাঁকা জায়গা। পুকুরের উত্তর ধারে দক্ষিণমুখী হয়ে দাঁড়ানো বাড়ীটি। গেট থেকে বেরিয়ে লাল ইটের একটা সুন্দর রাস্তা পুকুরের পাড় দিয়ে বিল্ডিং এর সিঁড়িতে গিয়ে ঠেকেছে।
পুরানো বাড়ী। একতলাটাই মাটি থেকে বেশ উঁচু। সিঁড়ির চারটা ধাপ ভেঙে এক তলার বারান্দায় উঠতে হয়। উঠার পরেই দোতলায় উঠার সিঁড়ি।
পিস্তল ধারী আহমদ মুসাকে দু’তালায় হল ঘরে নিয়ে এল।
আহমদ মুসা বুঝল জেমস জেংগার এটাই সাধারণ বৈঠকখানা। ঘরের তিন দিকে সোফা সাজানো। উত্তর দিকটায় জেমস জেংগার সিংহাসন আকারের এক আসন। তার আশে পাশে কোন চেয়ার নেই। অর্থাৎ জেমস জেংগার সহকারী কেউ নেই। সবাই তার হুকুম তামিলকারী। জেমস জেংগার মত আধা ক্রিমিনাল আধা পলিটিশিয়ানদের ক্ষেত্রে এটাই হয়। এরা হয় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সবাইকে ব্যবহার করে, মর্যাদা দেয় না কাউকেই।

গোটা কক্ষ লাল কার্পেটে ঢাকা। সোফাগুলো কিন্তু সাদা, জেংগার সিংহাসনটাও। কনট্রাষ্টটা খুবই চোখে লাগছিল। কালার কম্বিনেশন থেকে আহমদ মুসা মনে করল, জেমস জেংগার বুদ্ধি স্থূল, কিন্তু নার্ভ খু্বই শক্তিশালী।
জেমস জেংগার দিকে তাকিয়েও আহমদ মুসা এরই সমর্থন পেল । তার দেহের তুলনায় তার মাথাটা ছোট ।
আহমদ মুসাকে দেখেই জেমস জেংগা হেড়ে গলায় বলে উঠল, ফেউ তো দেখি খাসা, সে কি বলেরে টমাস?
–হাসান সেনজিকের ব্যাপারে সে আপনার সাথে কথা বলতে চায়।
–জানল কি করে যে হাসান সেনজিকের খবর আমার কাছে আছে?
–সেটাও সে নাকি আপনার কাছেই বলবে।
–বেশ জিজ্ঞাসা কর, আমার কথা তাকে কে বলেছে।
টমাস তাকে জিজ্ঞাসা করার আগেই আহমদ মুসা বলল, সিটি করপোরেশনের অফিসে গিয়ে গাড়ির নাম্বার থেকে নাম সংগ্রহ করেছি।
মিথ্যা কথা বলার চেয়ে সত্য কথা বলার মধ্যে ঝামেলা কম দেখছিল আহমদ মুসা। সত্য কথাই সে বলল।
টমাস নামের লোকটি পাশে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার দিকে পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসার কথা শোনার পর জেমস জেংগার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। সে বলল, টমাস ফেউটাকে সার্চ করেছ?
–না। বলল টমাস।
পাশ থেকে পিস্তলটা হাতে তুলে নিয়ে জেমস জেংগা চিৎকার করে উঠল গর্দভ কোথাকার । তোমরা কি ঘাস খাও নাকি?
টমাস দ্রুত এসে আহমদ মুসার কোট ও প্যান্টের পকেট সার্চ করল। সাদা একটা পিস্তল ছাড়া আর কিছুই পেল না।
টমাস পিস্তলটি নিয়ে জেমস জেংগার পাশের টিপয়টিতে রেখে দিল।
আহমদ মুসার পকেট থেকে পিস্তল বের হবার পর জেমস জেংগার গম্ভীর মুখের দু’পাশে তার চোখ ক্রোধে জ্বলে উঠেছিল।
টমাস সরে এসে তার জায়গায় দাঁড়ানোর পর জেমস জেংগা তার সিংহাসন থেকে উঠল । ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আহমদ মুসার দিকে।
এসে দাঁড়াল আহমদ মুসার সামনে। জ্বলছিল তার চোখ দু’টি। বলল, সিটি করপোরেশন আমার নামটা নিয়ে তোমার জন্যে বোধ হয় বসেছিল? মিথ্যা বলার যায়গা পাওনি।
বলে জেমস জেংগা অকস্মাৎ এক ঘুষি চালাল আহমদ মুসার মুখ লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা এটা আশা করেন নি। শেষ মুহুর্তে মুখ সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অদ্ভুত ক্ষিপ্র জেমস জেংগা। ঘুষিটা তার পূর্ণ ওজন নিয়ে আঘাত করল বাম চোখের উপরটায়।
আহমদ মুসা পড়ে যেতে যেতে আবার দাঁড়িয়ে গেল।
আহমদ মুসার মনে হল তার কপালের হাড়টা যেন ভেঙ্গে গেছে। জেমস জেংগার আঙ্গুলে বোধ হয় আংটি ছিল। মনে হল ওটা কপালে বুলেটের মত বসে গেছে। কপাল থেকে চোখের পাশ দিয়ে কিছু নেমে এল। আহমদ মুসা বুঝল কপাল কেটে গেছে।
আহমদ মুসা স্থির হয়ে দাঁড়াতেই জেমস জেংগা আবার চিৎকার করে উঠল, বল কুত্তা কে বলেছে আমার নাম, না বললে টুকরো টুকরো করে তোকে কুত্তাকে খাওয়াব।
–আমি সত্য কথাই বলেছি, বলল আহমদ মুসা। আবার সেই কথা, বলেই জেমস জেংগা আহমদ মুসার মুখ লক্ষ্য করে দ্বিতীয় ঘুষি চালাল। এবার বাম হাতে। প্রচন্ড ঘুষিটা এবার ডান চোখের ভ্রু’র উপর পড়ল। মনে হলো ডান হাতের চেয়ে বাম হাতের ঘুষিই বেশী মারাত্মক।
এবার পড়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা। বোঁ করে মাথা ঘুরে গিয়েছিল। বুঝা গেল, জেংগা প্রচন্ড শক্তি রাখে।
ভ্রু কেটে গিয়ে আহমদ মুসার কপাল থেকে ঝরঝর করে নেমে এল রক্ত । মুখ বেয়ে তা ঝরে পড়ল বুকের ওপর।
আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, হাসান সেনজিকের দেখা পাওয়ার আগে সে আক্রমনে যাবে না।
আহমদ মুসার রক্তপ্লূত দেখে জেমস জেংগার রাগ যেন কিছুটা শীতল হল।
সে আহমদ মুসার কাছ থেকে কিছুটা সরে দাঁড়িয়ে বলল, জেংগার নাম যে-ই তোমাকে বলুক, জেংগার পরিচয় সে দেয়নি। এখন পাবে সে পরিচয়। ছারপোকার মত মারব তোমাকে। হাসান সেনজিকের খবর নিতে এসেছ তুমি জেংগার গুহায়। বলে হো হো করে হেসে উঠল জেংগা। হাসি থামলে টমাসকে লক্ষ্য করে বলল, গেসিচকে বলো হাসান সেনজিককে এখানে আনতে। দেখুক সে তার উদ্ধারকারী বন্ধুর পরিণতি। টমাস বেরিয়ে গেল।জেমস জেংগা তার পিস্তল হাতে পায়চারী করতে লাগল।
অল্পক্ষণ পরেই টমাস ফিরে এল। টমাস ফিরে এলে বলল জেংগা, নিচে রাকিচরা নেই?
–ওদের তো ‘মিলেশ’ এর ‘মিলেনকো’র কাছে পাঠিয়েছেন?
–ও ভুলে গেছিলাম।
আহমদ মুসা বুঝল, এদের একাধিক লোককে মিলেশ বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়েছে। কেন? হাসান সেনজিককে হস্তান্তরের জন্যে? ওরা কি এসে পড়বে নাকি?
সচেতন হয়ে উঠল আহমদ মুসা।
বেশী দেরী করা যাবে না। এদের কথায় আরও বুঝা গেল, এদের কেউ কেউ ঘাটিতে এখন হাজির নেই। লোকজন যে এখন কম আছে, আসার সময় তা বুঝা গেছে।
হাসান সেনজিককে নিয়ে প্রবেশ করল গেসিচ নামের লোকটা। তার হাতেও রিভলভার।
হাসান সেনজিক ঘরে প্রবেশ করে আহমদ মুসাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার করে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে।
জেমস জেংগা কাছেই ছিল। ক্রুর হাসি ফুটে উঠেছে তার মুখে।
একটু এগিয়ে সে একটা হ্যাচকা টানে হাসান সেনজিককে ছুড়ে ফেলে দিল মেঝের উপর। হাসান সেনজিককে ছুড়ে ফেলে আহমদ মুসার দিকে ফিরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সময় আহমদ মুসা চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জেমস জেংগার পেছন থেকে বাম হাত দিয়ে সাঁড়াসির মত তার গলা পেঁচিয়ে ধরল এবং ডান হাত দিয়ে জেমস জেংগার হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিল। পিস্তলটি হাতে নিয়েই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টমাসের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করল।
টমাস ব্যাপারটা বুঝে উঠে তার পিস্তল তুলে ধরার আগেই গুলি খেয়ে সে ঢলে পড়ল মেঝের কার্পেটের উপর।
জেমস জেংগা প্রচন্ড শক্তি রাখে। সে আহমদ মুসার হাতের বেড়ি থেকে খসে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু যতই সে চেষ্টা করছিল, ততই আহমদ মুসার হাত সাঁড়াশির মত চেপে বসছিল তার গলায়।
আহমদ মুসা টমাসকে গুলি করেই তার পিস্তল তাক করেছিল নবাগত গেসিচকে।
গেসিচ আগেই পিস্তল তুলেছিল, কিন্তু জেমস জেংগার বিরাট বপুর পেছনে দাঁড়ানো মুসাকে গুলি করার কোন পথ পাচ্ছিল না।
আহমদ মুসা পিস্তল তুলে ধরে কঠোর কন্ঠে বলল, পিস্তল ফেলে দাও গেসিচ, না হলে এক্ষণি মাথা উড়ে যাবে।
গেসিচ একবার আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে পিস্তল হাত থেকে ফেলে দিল।
হাসান সেনজিক তখনও পড়ে ছিল মেঝের উপর। সে এবার তাড়াতাড়ি উঠে গেসিচের পিস্তলটি কুড়িয়ে নিল।
জেমস জেংগারে নড়াচড়া বন্ধ হয়ে ছিল। তার দেহটি শিথিল। এবার আহমদ মুসা তার হাত শিথিল করতেই জেমস জেংগার দেহ ঝরে পড়ল মাটিতে। তার দেহে প্রাণ নেই।
গেসিচ ভয়ে কাঁপছিল।
আহমদ মুসা বলল, ভয় নেই, বিনা কারণে আমরা কাউকে হত্যা করিনা।
আহমদ মুসা হাসান সেনজিককে নিয়ে ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে এল। দরজার লকের সাথে চাবি ঝুলতে দেখে খুশী হলো আহমদ মুসা। দরজা লক করে চাবিটি ছুড়ে ফেলে দিল মাঠের দিকে।
তারপর দ্রুত নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে নিচে। সিঁড়ির মুখে একটা জীপ দেখে গিয়েছিল, দেখল সেটা এখনও আছে।
হাসান সেনজিককে গাড়িতে উঠতে বলে সে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। ছুটে চলল গেটের দিকে। বাড়ীর আশে-পাশে কাউকে দেখলনা।
জেমস জেংগার পরিবার থাকে তিন তলায়, তারা কিছুই জানতে পারল না।
তিন তলার দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসা। হৃদয়ে এক প্রচন্ড খোঁচা লাগল আহমদ মুসার। পৃথিবীতে এত মায়া, এত মমতা, তবু এত হানাহানি কেন?
জীপটি গেটের কাছাকাছি আসতেই গেটম্যান গেট রুম থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু জীপের দিকে চোখ পড়তেই আবার ফিরে গেল গেট রুমে।
রুম থেকে এবার সে গুলি করতে করেতেই বেরিয়ে এল। গুলির মুখে পড়ে গেল জীপ। গুলি বৃষ্টির আড়ালে দাঁড়ানো গেটম্যান।
গুলিতে জীপের উইন্ড শীল্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা জীপ থেকে নেমে ঘুরে জীপের পিছনে চলে গেল। তারপর জীপের পূর্ব-উত্তর কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। গুলির প্রধান টার্গেট সামনের সিট।
আহমদ মুসা পিস্তল বাগিয়ে ট্রিগারে আঙ্গুল চেপে মুখটা পলকের জন্য বাইরে নিয়ে গুলি করল। প্রথম গুলিটা ব্যর্থ হলো।
কিন্তু গুলির শব্দে গেটম্যান চমকে উঠেছিল এবং এদিক ওদিক তাকিয়েছিল। মুহূর্তে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল তার ষ্টেনগান। এই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করল আহমদ মুসা।
এবার গুলি অব্যর্থ। গুলি খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল লোকটি ষ্টেনগানের ওপর।
আহমদ মুসা দ্রুত হাসান সেনজিককে নিয়ে বেরিয়ে এল সেই ছোট গেট খুলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ২ টা ৫০ মিনিট।
মোস্তফা ও সালমা সারাকায়া অসীম উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে ছিল গেটের দিকে। গোলা গুলির শব্দ তারাও শুনতে পাচ্ছিল। মোস্তফার হাত ছিল ষ্টেয়ারিং হুইলেই।
আহমদ মুসাকে গেট দিয়ে বেরুতে দেখেই মোস্তফা তার গাড়ি তীর বেগে গেটে নিয়ে গেল। গাড়ি দাঁড়াতেই সালমা সারাকায়া দরজা খুলে দিল। গাড়িতে উঠে বসল ওরা দু’জন। গাড়ি ছেড়ে দিল।
আহমদ মুসার রক্তাক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে মোস্তফা ও সালমা দুজনেই উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগে এতটুকু হয়ে গিয়েছিল।
পেছনের সিটে বসেছিল আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক।
সামনের সিট থেকে তাকিয়ে ছিল সালমা আহমদ মুসার দিকে। কথা বলতে পারছিল না। তার দিকে চেয়ে আহমদ মুসাই বলল, ভয় নেই বোন। আমি ভাল আছি।
তারপর মোস্তফাকে লক্ষ্য করে বলল, গাড়ির নাম্বার পাল্টেছ?
–জি হ্যাঁ, বলল, মোস্তফা।
–তাহলে আরো সামনে গিয়ে গাড়িটা কোন নিরিবিলি জায়গায় দাঁড় করিয়ে আসল নাম্বারটা এবার লাগিয়ে দাও।
মোস্তফা ক্রিয়া এবার বুঝতে পারল আহমদ মুসা কেন তাকে গাড়ির নাম্বার পাল্টাতে বলেছিল। জেংগার ওখান থেকে যারা গাড়ি আসতে দেখবে, তারা যাতে গাড়ির আসল নাম্বার চিহ্নিত করতে না পারে সে জন্যেই এই ব্যবস্থা। আহমদ মুসার দূরদর্শিতায় বিস্মিত হলো মোস্তফা ক্রিয়া। পরক্ষণেই আবার ভাবলো, হবে না কেন এমন দূরদর্শী, জেংগার ঘাটিতে একা এভাবে ঢুকতে পারে কোন সাধারণ লোক! জেংগার ঘাটিতে ঢুকে তার সাথে লড়াই করে আহমদ মুসা হাসান সেনজিক কে উদ্ধার করে নিয়ে এল, এটা এখনও তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
সালমা সারাকায়ার বুকের কাঁপুনি ক্রমে থেমে আসছে। যে ঘটনাকে তারা ফেলে এল, তা তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতই ভয়াবহ। আহমদ মুসাকে মনে হচ্ছে তার জীবন্ত রক রবিন-হুড। একা এক মানুষ শত্রু পুরীতে ঢুকে যুদ্ধজয় করে বেরিয়ে এল। সালমা সারাকায়ার বিস্ময় ক্রমশ বাড়ছেই, কে এই মানুষটি। বিদেশ বিভূঁইয়ে এসেও যে একা প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে এমন লড়াই করতে পারে! প্রথমেই জেংগার গেটে পিস্তলধারীর হাতে ধরা পড়ার পর আহমদ মুসা জেংগার আস্তানা থেকে ফিরে আসতে পারবে, এ আশা সে ছেড়েই দিয়েছিল। কেমন করে এ অসম্ভবকে সম্ভব করল। মনে পড়ল জেংগার ঘাটিতে যাবার সময়কার আহমদ মুসার শেষ কথা, তোমরা ভেব না, আমাদের সাথে দ্বিতীয় একজন আছেন, তিনি সর্ব শক্তিমান আল্লাহ। আল্লাহর কথা আসতেই এক খোঁচা লাগলো সালমা সারাকায়ার মনে। সে নামে মুসলিম বটে, কিন্তু এই আল্লাহকে তো সে চেনে না। রাষ্ট্র নিরীশ্বরবাদী, সুতরাং শিক্ষা ও সমাজের কোথাও ধর্মের চিহ্ন রাখা হয়নি। মনে পড়ে তার দাদীমার কথা। কুরআন শরীফ সালমা দাদীর কাছে দেখেছিল। দাদী তা লুকিয়ে রাখতেন সকলের ধরা-ছোয়ার বাইরে বাক্সের মধ্যে। পবিত্র না হয়ে ওতে হাত দেয়া যায় না। ভোরে এবং রাতে তিনি কুরআন শরীফ পড়তেন আর কাঁদতেন। সালমা একদিন দাদীর গা ঘেঁষে বসে জিজ্ঞেস করেছিল, দাদী তুমি কাঁদ কেন?
দাদী চোখ মুছে বলেছিলেন, কুরআন না পড়লে বুঝবি না।
–তাহলে পড়ি, দাও। সালমা বলেছিল।
–তুইতো পড়তে শিখিসনি।
–তাহলে আমাকে শিখাও।
–তোর আব্বা শিখতে দেবে না।
সালমা তার আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিল, দাদী বলেছে, তুমি নাকি কুরআন শিখতে দেবে না?
আব্বা সালমাকে আদর করে বলেছিল, ওর কোন দরকার নেই মা, কেন সময় নষ্ট করবে?
মনে পড়ে সালমার, আব্বার কথা সেদিন তার ভাল লাগেনি। ভাল না লাগলেও আব্বার কথাই মানতে হয়েছে।
সালমা ছোট বেলা সেই যে দাদীর নামাজ পড়া দেখেছিল, তারপর প্রায় এক যুগ পর আজ আহমদ মুসার নামাজ দেখল।
একশ দশ বছর বয়সে দাদী মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর কুরআন এবং জায়নামাজ তার আম্মা দাদীর বাক্সে সেই যে তুলে রেখেছেন, তা আর বের করা হয়নি। তার আব্বা মাঝে মাঝে সব ফেলে দিয়ে বাক্স সাফ করতে চেয়েছেন, কিন্তু সালমার মা রাজী হননি। বলেছেন, আমি ঐ জিনিসগুলির মধ্যে শাশুড়ী আম্মাকে দেখতে পাই। আমি পারব না তাঁর কোন জিনিসের অবমাননা করতে। সালমার আম্মার এ কথায় তার আব্বাও নিরব হয়ে যেতেন।
সালমা সারাকায়ার খুবই গর্ব হচ্ছে, তার দাদীর সেই আল্লাহই আহমদ মুসার আল্লাহ। সালমা আল্লাহকে চিনে না,কিন্তু তার দাদীতো চিনতো।
গাড়িতে স্পিড কমে গিয়ে এক সময় দাঁড়িয়ে গেল। সালমা সারাকায়া চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, তারা তিরানার পুরানো এলাকার শিশু পার্কে এসে প্রবেশ করেছে।
তখন তিনটা পনের মিনিট। শিশু পার্ক ফাঁকা।
এ সময় শিশুরা থাকে না, আরও পরে আসবে।
একটা ঝোঁপের পাশে নির্জন জায়গায় এসে গাড়ি দাঁড়িয়েছে।
গাড়ি দাঁড়াতেই মোস্তফা গাড়ি থেকে নামল। নামতে নামতে বলল, সালমা ফাস্ট এইড বাক্সে দেখ গজ তুলা আয়োডিন আছে। নিয়ে এস এগুলো।
মোস্তফা ক্রিয়া প্রথমেই গিয়ে গাড়ির নাম্বার প্লেটের লাগানো ভূয়া নাম্বারের কাগজটি তুলে ফেলল।
আর সালমা গজ তুলা আয়োডিন নিয়ে আহমদ মুসার সামনে গিয়ে বসল।
আহমদ মুসার মুখে গড়িয়ে আসা রক্ত তখনও কাঁচা, শুকিয়ে যায়নি।
সালমা তুলে নিয়ে রক্ত মুছে দেয়ার জন্য আহমদ মুসার দিকে এগুতেই আহমদ মুসা হেসে বলল, তুলা আমাকে দাও বোন। বলে আহমদ মুসা তার দিকে হাত বাড়াল।
সালমা সারাকায়া একবার চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে তুলার বান্ডিল আহমদ মুসার হাতে দিয়ে দিল।
সালমা সারাকায়া গম্ভীর হলো। তার চোখে মুখে একটা অভিমানের ছায়া নামল।
ব্যাপারটা আহমদ মুসার দৃষ্টি এড়াল না।
এ সময় মোস্তফা এসে পড়েছে।
সে আহমদ মুসার হাত থেকে তুলার বান্ডিল নিয়ে বলল, মুসা ভাই আমার ফাস্ট এইড ট্রেনিং আছে। অবশ্য সালমা আমার চেয়েও দক্ষ।
মোস্তাফা আহমদ মুসার মুখ ও গলা থেকে রক্ত পরিস্কার করে কপালের দু’পাশের কাটা ও থেতলে যাওয়া জায়গায় আয়োডিন দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।
ব্যান্ডেজ শেষ করে মোস্তাফা বলল, কি করে আহত হলেন মুসা ভাই?
পাশেই বসে ছিল সালমা সারকায়া। তার চোখ-মুখ ভারি।
–তোমার জেমস জেংগার পুরস্কার মোস্তাফা। বলল আহমদ মুসা।
–মানে?
–কপালের কাটা দু’টো জেংগার হাতুড়ি মার্কা ঘুষির চিহ্ন।
–জেংগা কোথায়?
–জেংগার কেমন খবর পেলে তোমরা খুশী হও?
–সে বেঁচে থাকলে বিপদ হবে।
–বিপদ ঘটাবার জন্য তোমাদের জেংগা আর বেঁচে নেই।
–মরেছে সে? চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করল মোস্তাফা।
–হ্যাঁ তার সাথী সহ সে নিহত হয়েছে।
অপার বিস্ময় নিয়ে মোস্তাফা ও সালমা তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর প্রশ্ন করল মোস্তাফা। বলল,আপনি খালি হাতে……
দেখলাম একজন পিস্তলধারী আপনাকে গেট থেকে ধরে নিয়ে গেল………..
প্রশ্ন শেষ না করেই থেমে গেল মোস্তাফা।
আহমদ মুসা হেসে বলল, এ কাহিনী পরে বলব। এখন বল, আমরা কোথায় যাব?
–কেন, আমাদের বাড়ীতে! আসুবিধা হবে আপনার?
–এ প্রশ্নটা তো আমিই তোমাকে করার কথা।
‘প্রশ্ন আর করতে হবে না,তাহলে উঠুন’ বলে মোস্তাফা উঠে দাঁড়াল। সবাই গাড়িতে উঠল।
সালমা আর একটা কথাও বলেনি। নিরবে সে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
এ সময় হাসান সেনজিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,মিলেশ বাহিনীর বেচারা লোকেরা
এতক্ষণে জেংগার শূন্য আস্তানা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।
–কয়টায় ওদের আসার কথা ছিল? জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
–তিনটায়? আহ্! আগে যদি বলতে।
–ঠিক হয়েছে না বলে, আপনার এখন বিশ্রাম প্রয়োজন। বলল মোস্তাফা।
গাড়ী তখন চলতে শুরু করেছে। মোস্তাফাদের নতুন তিরানা নগরীর অভিজাত এলাকায়।
প্রায় দশ মাইলের পথ।

সালমা সারকায়াদের বিশাল বাড়ী। সালমার আব্বা আলবেনিয়া সরকারের একজন বড় আমলা ছিলেন।
কম্যুনিষ্ট শাসনে আলবেনিয়ায় জনগণের কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। কিন্তু আমলারা জনগণের কাতারে পড়ে না। আমলা এবং কম্যুনিষ্ট পার্টি জনগনের শাসক। তাই জনগণের আইন তাদের উপর প্রযোজ্য নয়। তাই আমলা ও কম্যুনিষ্ট পার্টির লোকদের বাড়ী-গাড়ি সবই থাকতে পারে। একথাগুলো স্পষ্টবাদী মোস্তাফা ক্রিয়াই আহমদ মুসাকে বলেছিল।
মোস্তাফা ক্রিয়ার বাড়ীতে তিন দিন কেটেছে আহমদ মুসার। এই তিনদিনে আমূল বদলে গেছে বাড়ীর দৃশ্য।
সালমা সারকায়ার অভিমানের মধ্যে আহমদ মুসা বিপদের যে মেঘ দেখেছিল,তা কেটে গেছে সেই দিনই। হাসান সেনজিক আহমদ মুসার সব কথা বলে দেয় তাদেরকে সেদিন বিকেলেই।
সেদিনই সন্ধ্যায় সালমাকে আহমদ মুসা সম্পূর্ণ ভিন্ন সাজে দেখে। গায়ে ঢিলা জামা,গাউন,মাথায় ওড়না।
–ধন্যবাদ সালমা,মুসলিম মেয়ের মত মনে হচ্ছে তোমাকে। বলেছিল আহমদ মুসা।
–আপনি আমাকে মাফ করুন,আপনি আমার ভাইয়া।
–কেন একথা বলছ।
–আপনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আমি আহত বোধ করেছিলাম। আমি অন্যায় করেছিলাম।
আহমদ মুসার মনে পড়েছিল ফার্ষ্ট এইড নিয়ে যা ঘটেছিল সে কথা।
–তুমি কোন অন্যায় করনি সালমা। যে সংস্কৃতি তোমাকে গড়ে তুলেছে,সেদিক থেকে ওটাই স্বাভাবিক ছিল।
–নারী-পুরুষের এ সম্পর্ককে ইসলামী সংস্কৃতি কি দৃষ্টিতে দেখে ভাইয়া?
–ইসলামী সংস্কৃতি নারী-পুরুষের মেলামেশা ও মননের কতকগুলো সীমা নির্দেশ করেছে,নারী-পুরুষের এ সম্পর্ক যখন এ সীমার অধীনে অবস্থান করে তখন ইসলাম সেখানে হস্তক্ষেপ করতে যায় না।
–এ সীমানাটা কি ভাইয়া।
–এক কথায় এর উত্তর দেয়া যাবে না, একটা সোস্যাল সিস্টেমের এটা একটা অংশ। কোরআন-হাদিস পড়লে সব জানতে পারবে।
কোরআনের নাম শুনেই সালমা লাফিয়ে উঠেছিল। বলেছিল, আমার দাদীর একটা কোরআন ছিল ভাইয়া,১২ বছর হলো সেটা এখনও তাঁর বাক্সেই বন্ধ আছে। আপনি বের করে দিন ভাইয়া। আম্মাকে বলে আসি,বলে সালমা দৌড়ে ভেতরে চলে গিয়েছিল।
এই সময় মোস্তফা ক্রিয়া আহমদ মুসার ঘরে আসে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ফিরে এসেছিল সালমা। মোস্তাফা ক্রিয়াকেও আহমদ মুসার কাছে দেখে সে আরও উৎসাহিত হলো। প্রায় চিৎকার করে বলেছিল, আম্মা খুব খুশী হয়েছেন, দাদীর কোরআন বের করতে অনুমতি দিয়েছেন আম্মা। মুসা ভাইয়া এখনি চলুন, আম্মা বাক্স পরিষ্কার করছেন।
–কোরআন হাতে নিতে অজু করতে হয়। হেসে বলেছিল আহমদ মুসা।
–অজু করুন তাহলে, আমাদেরও শিখিয়ে দিন। দ্রুত বলেছিল সালমা।
তারা আহমদ মুসার সাথে বাথরুমে গিয়ে উৎসাহের সাথে অজু শিখেছিল। অজু করতে করতে সালমা বলেছিল,আমাদের নামাজও শিখাবেন মুসা ভাই। সেদিনই এশার সময় তারা নামাজ শিখেছিল। আহমদ মুসা ইমামের আসনে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছিল হাসান সেনজিক,মোস্তাফা ক্রিয়া এবং তাদের পেছনে দাঁড়িয়েছিল সালমা সারকায়া এবং তার আম্মা। নামাজ শেষে কি যে আনন্দ তাদের!
অজু শেষে আহমদ মুসা, সালমা এবং মোস্তাফা ক্রিয়ার পেছনে পেছনে গিয়ে হাজির হয়েছিল তাদের দাদীর ঘরে।
বাক্সের ভেতরে সাদা লিনেনের কাপড়ে বাঁধা ছিল কোরআন শরীফ।
আহমদ মুসা কোরআন শরীফটি হাতে তুলে নেয়।
সবাই নিরব। গম্ভীর সবার মুখ। যেন কোরআন শরীফের এক অশরীরি প্রভাব সকলকে অভিভূত করে তুলেছিল।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে কোরআনের কাপড় খুলতে শুরু করে।
‘শাশুড়ি আম্মার বাঁধা,আজ বারো বছর হলো’—বলেছিল সালমার আম্মা। তাঁর কন্ঠ আবেগে কাঁপছিল।
সবাই তাঁর দিকে তাকিয়েছিল। আহমদ মুসাও। সালমার আম্মার চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠেছিল।
কাপড়ের বাঁধন থেকে কোরআন শরীফ বের করে আহমদ মুসা পরম শ্রদ্ধায় তাতে চুমু খেল।
১২ বছর পর আবার মানুষের স্পর্শ পেয়েছিল কোরআন টি। সালমা সারকায়া বলেছিল,আমিও চুমু খাব ভাইয়া। সালমা চুমু খেয়েছিল,তার সাথে মোস্তাফা ক্রিয়া এবং সালমার মাও।
আবেগে আহমদ মুসার চোখও অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠেছিল।
সকলেই পরম শ্রদ্ধা ও ভয়ের সাথে কোরআন শরীফকে দেখছিল।
কথা বলেছিল সালমা সারকায়া। বলেছিল, ভাইয়া আমাদের পড়ে শোনান কিছু।
–ঠিক আছে,চল বাইরে গিয়ে বসা যাক। বলেছিল আহমদ মুসা।
সবাই ভেতরের ফ্যামিলি ড্রইং রুমে গিয়ে বসেছিল। হাসান সেনজিকও এসেছিল।
আহমদ মুসা সোফায় বসে সামনে টেবিলে কোরআন শরীফ মেলে ধরেছিল।
কোরআন পাঠ শুরুর আগে আহমদ মুসা নবীর(সঃ) আগমন,তাঁর উপর ওহী নাজিলের ধরণ,কোরআন নাজিলের উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করেছিল। তারপর কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেছিল,প্রথমে সুরা ফাতিহা,পরে সুরা বাকারার প্রথম রুকু।
অদ্ভুত সুন্দর তেলওয়াত আহমদ মুসার।
তার উচ্চ কন্ঠ মর্মস্পর্শী তেলাওয়াত অপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা করেছিল। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার চোখ থেকে।
তেলাওয়াতের পর পঠিত আয়াতগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যাও করছিল আহমদ মুসা।
কোরআন পাঠ শেষ হওয়ার পরও অনেক্ষণ কেউ কথা বলেনি। সবারই মাথা নিচু।
অনেকক্ষণ পর কথা বলেছিল সালমাই প্রথম। বলেছিল, ভাইয়া আমরা কি মুসলমান আছি?
–মুসলিম চরিত্র কতকগুলো গুণের সমষ্টি, কিছু গুণ তোমাদের আছে, অবশিষ্ট গুণগুলো অর্জন করতে হবে। বলছিল আহমদ মুসা।
তারপর গত তিন দিন ধরেই সে কোরআনের দারস দিয়ে আসছে, কোরআন পাঠ শিখিয়ে আসছে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই আহমদ মুসার নেতৃত্বে জামায়াতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সালমাদের আত্মীয় ও বন্ধু পরিবারগুলোতেও একথা ছড়িয়ে পড়েছিল। সকলের উৎসাহ ও আবেগ দেখে অবাক হয়েছে আহমদ মুসা। কোরআন শরীফ পাঠ ও নামাজ শিখার জন্যে তারা পাগল। কিন্তু কোথায় শিক্ষক। আহমদ মুসা সালমা ও মোস্তফা ক্রিয়াকে বলেছিল, তাদেরকেই এ মহান দ্বায়িত্ব নিতে হবে।
তারা দু’ভাই বোন খুবই মেধাবী। তারা তিন দিনে তিন মাসের শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছে। আরবী পড়ার কায়দা-কৌশল তারা ধরে ফেলেছে। সমস্যা দাঁড়িয়েছে কোরআন শরীফ নেই, একটা দিয়ে আর কতটা চলতে পারে।
বেলগ্রেড যাবার জন্যে আহমদ মুসা প্রস্তুত। কিন্তু যতবারই কথা তুলেছে তারা আমল দেয়নি। বলেছে, আমাদের হাতে আলো তুলে দিয়েছেন, পথে তুলে না দিলে আমরা পথ খুঁজে পাবো না।
তৃতীয় দিন রাতে শোবার আগে আহমদ মুসা সালমা, মোস্তফা ক্রিয়া, এবং তার মাকে জানাল কাল সকালেই আমাদের যাত্রা করতে হবে।
সকালে উঠেই আহমদ মুসা যাবার জন্যে তৈরী হলো।
যে পোশাকে আহমদ মুসা আলবেনিয়ায় এসেছিল, সেই পোশাক পরেছে। হাসান সেনজিকও রেডি।
মোস্তফা ক্রিয়া, সালমা সারাকায়া, এবং তাদের মা সবাই এসে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
–গাড়ি রেডি ভাইয়া। বলল মোস্তফা ক্রিয়া।
আহমদ মুসা বিস্মিত চোখে মোস্তফার দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়ি কেন মোস্তফা?
–কেন, আপনি তো গাড়িতে যাবেন।
–তোমার গাড়ি নিয়ে?
–কেন অসুবিধা কি?
হাসল আহমদ মুসা। বলল, মোস্তফা আমরা প্রবেশ করছি অনিশ্চিত এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে। কোথায় কখন যাব, কোথায় থাকব কিছুরই ঠিক নেই। গাড়ি রাখব কোথায়?
–কোন পথে যাবেন আপনি?
–এখান থেকে সকুদ্রা। সেখান থেকে পূর্ব দিকে কসভো হয়ে বেলগ্রেড।
–এ পথে কেন? সকুদ্রা থেকে টিটোগ্রাদ ও টিটোভা হয়ে বেলগ্রেড তো সহজ ও আরামদায়ক পথ।
–ঠিক আছে, এ পথে যেতে হলে আপনাকে গাড়ি নিতেই হবে। এ পথে যানবাহন অনিয়মিত এবং বিদেশীদের জন্য ভাল নয়।
একটু থেমেই মোস্তফা আবার শুরু করল, গাড়ি নিয়ে অসুবিধা নেই ভাইয়া, যুগোশ্লাভিয়ার সরকারী গ্যারেজগুলোতে ভাড়ায় গাড়ি রাখা যায়।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, তিন দিন তোমাদের আদরে থেকে শরীরটা বড় আরামপ্রিয় হয়ে উঠেছে, গাড়ি যদি দাও তাহলে আরামপ্রিয়তা আরও বাড়বে।
–শরীরটাকে কখনও বিশ্রাম দিয়েছেন ভাইয়া? বলল সালমা সারাকায়া।
–দেইনি, একথা বলার উপায় আছে? যদি হিসেব করি দেখব, জীবনের যে সময়টা অতীত হয়েছে তার তিনভাগের কমপক্ষে একভাগ ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।
–ঘুম পেলেই কি শরীরের দাবী শেষ হয়ে যায়! তাহলে মানুষের কর্মঘন্টা সীমিত করা হয়েছে কেন?
–তোমার যুক্তি ঠিক আছে, কিন্তু তা শান্তিপূর্ণ সময়ের জন্য। অশান্তির সময়ে যখন মানুষ জুলুম- অত্যাচারে- জর্জরিত হতে থাকে, তখন শান্তির সময়ের যুক্তি আর চলেনা। আজ দুনিয়ার মুসলমানরা শোষণ ও জুলুম অত্যাচারে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে, এ সময় কোন সচেতন মুসলমানই বিশ্রাম- বিনোদনের কথা ভাবতে পারে না।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এবার উঠতে হয়।
মোস্তফা ইতিমধ্যেই স্যুটকেশ গাড়িতে তুলে দিয়ে এসেছে।
কথাবার্তা বলতে বলতে তারা গাড়ির দিকে এল।
সালমার আম্মা আহমদ মুসাদের দোয়া করে বলল, বাবা তোমাদের আয়ু শতবর্ষ হোক, জাতির খেদমতের জন্যে আরও শক্তি আল্লাহ তোমাদের দিন।
সালমা সারাকায়া ও মোস্তফার চোখ-মুখ ভারী হয়ে উঠেছে।
সালমা সারাকায়া তার ওড়নার এক প্রান্ত মুখে চেপে বলল, স্বপ্নের এ তিনটা দিন জীবনে আর কোন দিন ফিরে পাবো না। আনন্দের চেয়ে এ বেদনাই বেশী দেবে।
সালমার চোখে অশ্রু।
আহমদ মুসা একটু ঘুরে সালমা সারাকায়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, সালমা বিদায় সবচেয়ে বেদনাদায়ক, কিন্তু বিদায় এ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আমি শিশুকালকে বিদায় দিয়েছি, বাল্য-কৈশোরকে বিদায় দিয়েছি, বিদায় দিয়েছি আমার বাবা-মা প্রিয়জনদের, বিদায় নিয়েছে পরিচিত শতমুখ। সুতরাং বিষয়টা নতুন নয়। এই বাস্তবতাকে বড় করে দেখলে বেদনার ভারটা কমে যায়।
–এই বেদনাই বাস্তবতা ভাইয়া, আমাদের মহানবী (সঃ) তার জন্মভূমি মক্কা থেকে বিদায় নেবার সময় কেঁদেছিলেন।
–ঠিক বলেছ সালমা, কিন্তু মহানবী (সঃ) বিদায়ের যখন প্রয়োজন হল তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব করেননি। মুখ টিপে হেসে বলল আহমদ মুসা।
হাসান সেনজিক গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে গিয়ে বসল।
সবাইকে সালাম জানিয়ে গাড়ির দরজার দিকে এগুলো আহমদ মুসা।
–আবার কবে দেখা হবে ভাইয়া? বলল সালমা সারাকায়া।
আহমদ মুসা গাড়ির দরজায় হাত দিয়েছিল। সালমার কথা শুনে ফিরে দাঁড়াল। ম্লান হেসে সে ধীরে ধীরে বলল, বহুবার বহু জায়গায় আমি এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি বোন, কাউকেই এর জবাব দিতে পারিনি। তোমাকেও পারলামনা। প্রয়োজনের স্রোতে আমি ভাসছি। বলে আহমদ মুসা আবার ঘুরে দাঁড়াল।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল আহমদ মুসা।
গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল গাড়ি।
জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একবার পেছনে তাকাল আহমদ মুসা। হাত নাড়ছে সবাই চোখ মুছছে মোস্তফা ও সালমা সারাকায়া।
আহমদ মুসা হাত নেড়ে চোখ ফিরিয়ে নিল সামনে। হৃদয়ের কোথায় যেন খচ করে উঠল। সালমা ঠিকই বলেছে, বিদায়ের মত বেদনাও বোধ হয় একটা চিরন্তন বাস্তবতা। যুক্তির বিচরণ হৃদয়ের যেখানে, মনে হয় প্রেম-প্রীতি, মায়া-মমতার অবস্থান তার চেয়েও আরও গভীরে।