১০. বলকানের কান্না

চ্যাপ্টার

বেলা দশটা নাগাদ আহমদ মুসারা সকুদ্রা শহরে গিয়ে পৌছল।
পর্যটক তাদের পরিচয়। আর্মেনীয় পাসপোর্ট। আহমদ মুসার নাম জ্যাকব জেসিম এবং হাসান সেনজিকের নাম মিখাইল সেনভ। আলবেনিয়ায় যুগোশ্লাভ দূতাবাস থেকে তারা ভিসা নিয়েছে।
আহমদ মুসা নিশ্চিত, জেমস জেংগার ঘটনা এ তিন দিনে শুধু যুগোশ্লভিয়া নয়, গোটা বলকানে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা অবশ্যই ধরে নিয়েছে, আমরা এবার যুগোশ্লাভিয়ায় প্রবেশ করব। সুতরাং সড়ক ও বিমান দুই পথের উপরই শ্যেন দৃষ্টি রাখবে। তবে আমরা ভিসা নিয়ে আইন সঙ্গতভাবে প্রবেশ করব তারা তা নিশ্চয় মনে করবে না। তাদের এ ভাবনাই স্বাভাবিক যে আমরা সীমান্ত প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে যুগোশ্লাভিয়ায় প্রবেশ করব।
তিরানা বিমান বন্দরে হাসান সেনজিকের ধরা পড়া থেকে আরও একটা জিনিস পরিস্কার হয়ে গেছে যে, হাসান সেনজিকের ফটো সর্বত্রই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
মোস্তাফার গাড়ির কাঁচ শেড দেয়া। তাতে সুবিধা হয়েছে বাইরে থেকে গাড়ির আরোহীদের দেখা যাচ্ছে না।
হাসান সেনজিক বসেছে পেছনের সিটে। পেছনের সিটের দুইটি জানালাই বন্ধ।
সুতরাং বাইরে থেকে হাসান সেনজিক কারো নজরে পড়ার সম্ভাবনা নেই।

সকুদ্রায় পৌছে আহমদ মুসারা কোন দেরী করল না। শুধু কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পৌছে দু’জনে বোতল থেকে পানি পান করল। তারপর আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল পিউকা-কাকেজী রোডে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে।
সকুদ্রা থেকে যে সড়কটি পূর্ব দিকে এগিয়ে আলবেনিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে যুগোশ্লাভিয়ার কসভো প্রদেশে প্রবেশ করেছে, তার দু’টি শহর হলো পিউকা ও কাকেজী।
তিরানা-সকুদ্রা সড়কের চেয়ে পিউকা-কাকেজী সড়ক অনেক খারাপ। কাকেজী পৌছতে আহমদ মুসাদের ঠিক দুপুর হয়ে গেল।
কাকেজী যুগোশ্লাভ সীমান্তের নিকটবর্তী একটি সুন্দর আলবেনীয় শহর শহরটির পাশ দিয়ে দ্রিনি নদী প্রবাহিত।
প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে আহমদ মুসাদের।
বাজার এলাকার মত দেখতে একটা সুন্দর মোড়ে এসে আহমদ মুসা তার গাড়ি দাঁড় করাল। মোড়ের মাঝখানে একটা সুন্দর আইল্যান্ডে আলেবনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট এনভার হোজার একটা মার্বেল মূর্তি। মূর্তিটির বেজে উৎকীর্ণ নাম ‘কাকেজী সেন্ট্রাল স্কোয়ার’। আর রোডটির নাম কাকেজী এ্যাভেনিউ সেটা আগেই দেখেছে। এই এভেনিউটিই দ্রিনি সমান্তরালে অগ্রসর হয়ে আলবেনিয়া সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
স্কোয়ারের এক পাশে আহমদ মুসা তার গাড়ি দাঁড় করাল।
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে। কাউকে জিজ্ঞাসা করে হোটেলের অবস্থান জেনে নেবে এই ছিল তার লক্ষ্য।
গাড়ি থেকে নেমেই আহমদ মুসা একজনকে সামনে পেয়ে গেল। দীর্ঘ শক্ত সমর্থ চেহারা, কিন্তু মানিচিত্রের মত এবড়ো – থেবড়ো মুখ। হন হন করে হাটছিল।
আহমদ মুসা তার মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করল, মাফ করবেন, আশে পাশে কোন ভাল হোটেল …….
আহমদ মুসা কথা শেষ না করতেই সে তার পেছনে মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে ইংগিত করে বলল, আর একটু সামনে এগুলে রাস্তার এ পাশেই একদম রাস্তার উপরেই ‘কাকেজী ইন্টারন্যাশনাল’।
কথা শেষ করে একটা দম নিয়ে সে বলল, আপনারা নিশ্চয় এ শহরে নতুন, কোত্থেকে আসা হচ্ছে?
–তিরানা থেকে আসছি।
লোকটা আহমদ মুসার আপাদ মস্তকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, মহাশয়ের দেশ কোথায়?
আহমদ মুসা ভাঙা আলবেনীয় ভাষায় কথা বলছিল। সুতারাং তাকে বিদেশী বলে চেনা খুব সহজ।
প্রশ্নটি আহমদ মুসাকে বিব্রত করল। মুহূর্তকাল দ্বিধা করে আহমদ মুসা সত্য কথাটাই বলল। জানাল যে, তারা আর্মেনিয়া থেকে আসছে।
লোকটির পাথুরে মুখে আহমদ মুসা কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করল না।
আহমদ মুসা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে তার গাড়িতে ফিরে এল।
গাড়ি এগিয়ে চলল সামনে। আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল লোকটি যেমন যাচ্ছিল, তেমনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে গতিটা খুবই মন্থর।
‘কাকেজী ইন্টারন্যাশনাল’ সত্যিই বড় হোটেল। কিন্তু খাওয়ার হল ঘর একেবারে পূর্ণ। দুপুরের খাবার সময়ের এটা পিক আওয়ার বলেই এই অবস্থা। অফিস ও কল-কারখানায় যারা চাকুরী করে, তাদেরকে টিফিন আওয়ারের এক ঘন্টার মধ্যেই তাদের খাবারের কাজ করতে হয়। এ কারণে এ নির্দিষ্ট সময়ে হোটেল- রেস্তোরাঁয় ভীড় খুব বেশী হয়। অবশ্য নিম্ন বেতনের চাকুরেদের হোটেল-রেস্তোরাঁয় আসার সৌভাগ্য হয় না, তবু যারা আসে তাতেই হোটেলগুলো উপচে পড়ে।
আহমদ মুসা ডাইনিং হলের চারদিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখল, এক কোনায় দু’টো সিট খালি আছে।
আহমদ মুসা টেবিলের কাছে গেল। টেবিলের অপর দু’টো সিটে একজন যুবক ও একজন যুবতী বসে। সম্ভবত এক দম্পতি ওরা।
আহমদ মুসা সে টেবিলে গিয়ে দু’টো শুন্য সিটে বসার অনুমতি চাইল, টারকিস শব্দ মিশ্রিত ভাঙ্গা আলবেনীয় ভাষায়।
যুবক-যুবতী দু’জনেই মুখ তুলে চাইল আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের দিকে। ওরা মাথা নেড়ে অনুমতি দিল টেবিলে বসার জন্য।
ওয়েটার এলে আহমদ মুসা জিজ্ঞাস করল, হালাল জবাই করা গোশত পাওয়া যাবে?
ওয়েটার কথাটা বুঝতে পারলনা। হালালা জবাই অর্থ তার জানা নেই। মুহূর্ত কয়েক বিমূঢ় থাকার পর বলল, স্যার গরু, মেষ, শুকর সব ধরনের গোশতই আছে।
দম্পতির একজন যুবতী মেয়েটি ওয়েটারের কথা শুনে হেসে ফেলল। সে তার আঞ্চলিক ভাষায় ওয়েটারকে সম্ভবত হালাল জবাই কাকে বলে বুঝাল। তারপর সে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, আলবেনিয়ার কোন হোটেল-রেষ্টুরেন্টেই হালালা জবাই করা গোশত পাওয়া যায় না।
একটু থেকে মেয়েটি বলল, আপনারা নিশ্চিয় মুসলমান, কোত্থেকে এসেছেন?
আহমদ মুসা ভেজিটেবলস, সালাদ ও রুটির অর্ডার দিয়ে মেয়েটির প্রশ্নের জবাব দিল। বলল, আমরা আর্মেনিয়া থেকে এখানে এসেছি।
–হালাল জবাই করা না হলে কি মুসলমানেরা সে গোশত খেতে পারে না?
–না।
–হালাল জবাই করা গোশত যদি না পাওয়া যায়।
–তাহলে আলবেনীয় মুসলমানরা তো গোশতই খেতে পাবে না। কিন্তু এটা কি সম্ভব?
–সম্ভব নয়, একথা ঠিক। কিন্তু মুসলমানদেরকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে যখন এটা সম্ভব হচ্ছে না, তখন মুসলমানদের ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করতে হবে হালাল গোশত সংগ্রহের।
–কিন্তু এই চেষ্টা যদি অপরাধ হয়, যদি এ জন্য জুলুম নির্যাতন নেমে আসে?
–মুসলমানদেরকে তা মোকাবিলা করতে হবে। প্রকাশ্যে না পারলে গোপনে ঈমানের দাবী পূরণ করতে হবে। তা না হলে জাতীয় অস্তিত্ব বৈশিষ্টই একদিন বিলীন হয়ে যাবে।
দম্পতি দু’জন উত্তরে কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল তারা আহমদ মুসার দিকে। খাওয়া তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। গোশতের প্লেট তারা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। মুখে তাদের চিন্তা ও বিষাদের ছায়া।
আহমদ মুসা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপানাদের এসব প্রশ্ন থেকে মনে করছি আপনারা মুসলমান। আমার অনুমান কি মিথ্যা?
–মিথ্যা নয় এই অর্থে যে আমরা মুসলিম পিতা মাতার সন্তান, আবার মিথ্যা এই অর্থে যে, মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেবার আমাদের কিছুই নেই।
–কিন্তু হালাল-হারামসহ অনেক বিষয়ই আপনারা জানেন বলে মনে হচ্ছে।
–আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকুরী করি। তাই বাইরে যাবার সুযোগ হয়েছে অনেক বার।
প্রশ্নের উত্তর দিয়েই যুবকটি বলল, আমাদের বাড়ী এই কাকেজীতেই। আপনারা কবে এসেছেন, ক’দিন থাকবেন কাকেজীতে?
–এইমাত্র এসে পৌছালাম, আবার খাবার পরেই চলে যাব।
–কোথায় যাবেন?
–যুগোশ্লাভিয়া।
এই সময় হাসান সেনজিক আহমদ মুসার কানে কানে কি যেন বলল।
কথা শুনেই আহমদ মুসা ডাইনিং হলের দরজার দিকে তাকাল। দেখল, মানচিত্রের মত এবড়ো-থেবড়ো মুখওয়ালা সেই লোকটি দরজায় দাঁড়িয়ে। তার সাথে আরও একজন। এদিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তের জন্য আনমনা হলো আহমদ মুসা। তখনই লোকটাকে দেখে তার ভালো মনে হয়নি। জাত ক্রিমিনালের মত চেহারা। প্রশ্ন হলো, মিলেশ বাহিনীর কেউ, না তাদের কোন এজন্টে।
আহমদ মুসার দরজার দিকে তাকানো এবং ভাবান্তর দম্পতির দৃষ্টি এড়ালো না। যুবকটি বললো, কিছু ঘটেছে?
আহমদ মুসা যুবকটির দিকে মুহূর্তকাল চেয়ে বলল, মুসলমানরা মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু সত্য কথাও যে এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।
যুবকটি খুশী হলো। বলল, ঠিক আছে বলতে হবে না। আপনার একটা দুঃশ্চিন্তার প্রকাশ দেখছিলাম তো তাই বলছিলাম। আপনাদের কোন অসুবিধা করতে চাই না।
–ধন্যবাদ। এই অসুবিধার ভয়ই আমরা করছি। আমরা প্রবল এক অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পথ চলছি।
মেয়েটি অনেকক্ষণ কথা বলেনি। সে এবার মুখ খুলল বলল, আমি আপনাদের ট্যুরিষ্ট মনে করেছিলাম।
–ট্যুর তো বটেই, কিন্ত একটা বিপজ্জনক ট্যুর। হেসে বলল আহমদ মুসা।
–জানার লোভ কিন্তু বাড়ছে। বিপজ্জনক ট্যুর কথাটির মধ্যে একটা এ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ আছে। হেসে বলল মেয়েটি।
–এ্যাডভেঞ্চার কথাটির মধ্যে একটা সৌখিনতা আছে এবং সেখানকার বিপদগুলো ঘটনার প্রবাহের নগদ সৃষ্টি। আমাদের এ্যাডভেঞ্চার সৌখিনতা নয় একটা অপরিহার্য প্রয়োজন। আর এখানকার বিপদগুলো সুপরিকল্পিত।
–তাহলে আমরা বলতে পারি, আপনারা একটা বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বেরিয়েছেন, আর সে উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে আপনারা মোকাবিলা করছেন এক প্রবল শত্রুকে। এবার কথা বলল যুবকটি।
তখন ২টা বাজতে মিনিট দশেকের মত বাকি। ডাইনিং হল প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। আহমদ মুসার টেবিলের দম্পতিটিও খাওয়া শেষ করেছিল। তারা গোশত থেকে সেই যে হাত তুলেছিল, আর খায়নি।
আহমদ মুসা যুবকটির কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে একটা প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো। সে শব্দে ডাইনিং হলে চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত নড়ে উঠল।
বাইরে ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেছে।
ডাইনিং হলে যে, দু’চারজন ছিল তারা হোটেল কাউন্টারে টাকা ফেলে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসাসহ তার টেবিলের তারা চারজনই উঠে দাঁড়িয়েছে।
দম্পতির যুবক-যুবতির মুখে উদ্বেগ। যুবকটি বলল উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে, খুব শক্তিশালী একটা বিষ্ফোরণের শব্দ এটা।
আহমদ মুসা ম্লান হেসে বলল, আমার অনুমান মিথ্যা না হলে আমদের গাড়িটিই বিষ্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
আহমদ মুসার কথার সাথে সাথে যুবক-যুবতীর চোখে-মুখে একটা আতংক নেমে এল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করে ধীরে ধীরে হোটেল কাউন্টারের দিকে এগুলো। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ-আশংকা কিছুই নেই।
দম্পতির যুবকটির নাম এভরেন রমিজ এবং যুবতীটির নাম লায়লা লিডিয়া। আশংকাকুল তারা। আহমদ মুসার স্বাভাবিক-স্বচ্ছন্দ মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো। যদি তাঁর কথা সত্য হয়, তাহলে এই পরিস্থিতিতে উনি এমন স্বাভাবিক থাকেন কি করে?
একটা হ্যান্ড ব্যাগ হাতে হাসান সেনজিক আহমদ মুসার পিছু পিছু চলছিল। রমিজ এবং লায়লাও তাদের পিছু পিছু চলল।
ধীরে সুস্থে আহমদ মুসা কাউন্টারে খাওয়ার পয়সা চুকিয়ে হোটেলের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। হোটেল কম্পাউন্ডে তখন দু’চারটি গাড়ি ছিল। আহমদ মুসার গাড়ি ফাঁকা একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। বিস্ফোরণে গাড়িটি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। আহমদ মুসা বেরিয়ে ঐ আগুনের দিকে চেয়ে রইল।

রমিজ ও লায়লা আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। রমিজ দগ্ধ গাড়ির দিকে চেয়ে বলল, আপনাদের সবকিছুই তো পুড়ে গেল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, আলহামদুলিল্লাহ আমরা আছি।
–পুলিশকে জানানো দরকার নয় কি? বলল রমিজ।
–ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। কেউ না জানুক কার গাড়ি পুড়ল। আহমদ মুসা হেসে বলল।
–বিপদটা গাড়ির উপর দিয়েই গেল মনে করেন?
আহমদ মুসা চারদিকে দেখছিল। সেই এবড়ো থেবড়ো মুখওয়ালা লোক এবং তার সাথীকে কোথাও দেখলনা। গাড়ি ধ্বংস করে কোথায় গেল তারা? তারা তো চলে যাবে না, তাদের অপারেশনই তো বাকি। কোন ফাঁদ পেতেছে তারা? হতে পারে।
–না, গাড়ি ধ্বংস ভূমিকা মাত্র। আসল বিপদটা সামনে। বলল আহমদ মুসা।
রজিম এবং লায়লার চোখে আশংকা ও উদ্বেগের অন্ধকার আরও গভীর হলো।
–আপনারা এখন কি করবেন? বলল রমিজ।
–যুগোশ্লাভ সীমান্তে পৌঁছা যায়, এমন বাস বা গাড়ি কোথায় পাওয়া যাবে?
–কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে।
–কোথায়, কতদূর টার্মিনাল?
–আমাদের গাড়ি আছে, চলুন পৌঁছে দেব। বলল রমিজ।
রমিজের গাড়ি হোটেলের পাশেই একটা ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরের লনে দাঁড়িয়েছিল তারা আসলে এসেছিল বাজার করতে। খাওয়ার সময় হয়ে যাওয়ায় তারা হোটেলে খেয়ে নিল।
রমিজ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। তার পাশের সিটে লায়লা লিডিয়া। পেছনের সিটে আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক বসল।
গাড়িতে উঠে সেনজিক জিজ্ঞেস করল, বাস টার্মিনাল কতদূর?
–প্রায় ৪ মাইল হবে, দ্রিনি ব্রীজের ওপারে একদম শহরের পূর্ব প্রান্তে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সবাই চুপচাপ।
আহমদ মুসার শান্ত দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। কিন্তু সে শান্ত দৃষ্টির অন্তরালে চিন্তার এক ঝড় বইছে। ওরা গাড়ি ধ্বংস করে সরে পড়ল কেন? হোটেলের যে পরিবেশ ছিল সেখানে তো তারা অভিযান চালাতে পারতো হাসান সেনজিককে ধরার জন্যে। কিন্ত সেটা তারা করল না কেন? এর একটা ব্যাখ্যা এই হতে পারে, আহমদ মুসা ভাবল, যে তারা প্রকাশ্যে এ ধরণের অভিযান চালাতে ভয় পাচ্ছে। এর অর্থ এই যে, তারা পুলিশের কাছে প্রকাশ হতে চায় না। এসব চিন্তা থেকে আহমদ মুসা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে, এরা মিলেশ বাহিনীর লোক হোক কিংবা তাদের কোন এজেন্ট, পুলিশকে ভয় করার মত ক্রিমিনাল এরা। গোপনে এরা কাজ সারতে চায়। গাড়ি ধ্বংস করে আমাদের বিপদে ফেলার পর তারা নিশ্চয় ওঁৎ পেতে আছে নিরাপদ কোন জায়গায়। একটা বিষয় ভেবে আহমদ মুসা খুব খুশী হলো, ক্রিমিনালরা মনের দিক দিয়ে খুব দুর্বল হয়।
–আপনাদের নাম জিজ্ঞাসা করা হয়নি।
গাড়ি ড্রাইভরত এভরেন রমিজ সামনে দৃষ্টি রেখে অনেকটা স্বগত কণ্ঠেই বলল।
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, আমিও ভুলে গেছি আমার নাম বলতে। আমার নাম আহমদ মুসা, আর এর নাম হাসান সেনজিক।
–আপনাদের সামনে দাঁড়ানো এই প্রবল শত্রুকে আমরা কি জানতে পরি? বলল লায়লা।
–আপনারা মিলেশ বাহিনীর নাম শুনেছেন?
–শুনেছি। ছেলেটি অর্থাৎ এভরেন রমিজ জবাব দিল।
–স্টিফেন পরিবারকে চিনেন, যুগোশ্লাভিয়ার স্টিফেন পরিবারের নাম শুনেছেন?
–শুনেছি। বিখ্যাত পরিবার। যুবকটিই বলল।
–এটুকু আমরা শুনেছি যে, এই পরিবারের পুরুষ সন্তানরা অব্যাহতভাবে গুপ্ত হত্যার শিকার হয়ে আসছে। আর কিছু জানি না। লায়লা লিডিয়া বলল।
–এই হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে খৃস্টান মিলেশ বাহিনী। বলল আহমদ মুসা।
–এই বাহিনী তো বলকান অঞ্চল থেকে মুসলমানদের নির্মুল করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বলল এভরেন রমিজ।
–ঠিক বলেছেন, এদের বিশেষ রাগ স্টিফেন পরিবারের উপর।
–জি, সেটাও জানি। সার্বিয়ার স্টিফেন রাজ সুলতান বায়েজিদের সাথে বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন এবং খৃস্টানদের মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সুলতানকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। বলকান অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে প্রভূত সাহায্য করেছে এই পরিবার। বলল এভরেন রমিজ।
–হাসান সেনজিক স্টিফেন পরিবারের প্রত্যক্ষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ উত্তরসূরী।
লায়লা লিডিয়া এবং এভরেন রমিজ দু’জনেই একযোগে পেছনে তাকাল। তাদের দৃষ্টি হাসান সেনজিকের দিকে।
আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের সব কাহিনী সংক্ষেপে বলে উপসংহার টানল, জানিনা হিংস্র, রক্তপায়ী মিলেশ বাহিনীর উদ্যত খড়গের মধ্যে দিয়ে আমরা হাসান সেনজিকের মা’র কাছে পৌছতে পারবো কিনা। আহমদ মুসা থামল।
আহমদ মুসা থামার কিছুক্ষণ পর লায়লা বলল, খুব খুশী হয়েছি। আপনাদের সাফল্য কামনা করি।
আহমদ মুসাদের গাড়ি মাঝারি গতিতে চলছিল। অনেক গাড়ি এ গাড়িকে ডিঙিয়ে গেল। অবশ্য গাড়ির ভীড় এখন খুব কম। এ সময়টা অফিস, মিল কারখানা, দোকান সব কিছুর ওয়ার্কিং আওয়ার।
গাড়ি দ্রিনি ব্রীজের সামনে এসে পড়লো। এদিকে গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। কাকেজী শহরের পূর্ব প্রান্তে এ ব্রীজটি। গাড়িটি দ্রিনি ব্রীজের উপর উঠল। দ্রিনি ব্রীজ জনশুণ্য, গাড়ি-ঘোড়া কিছু নেই।
আহমদ মুসাদের গাড়ি ব্রীজের মাঝ বরাবর এসেছে। এমন সময় বিপরীত দিক থেকে একটা জীপ বিপজ্জনক গতিতে আহমদ মুসাদের গাড়ির ঠিক নাক বরাবর ছুটে আসছে দেখা গেল।
আহমদ মুসাদের গাড়ির চালক এভরেন রমিজ পাগলা জীপটিকে পাশ কাটানোর জন্য শেষ মুহূর্তে ডান দিকে মোড় নিয়েছিল। কিন্তু পাগলা জীপটিও মোড় নিয়ে আহমদ মুসাদের গাড়ির পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে গেল।
জীপটি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দু’জন লোক পিস্তল বাগিয়ে লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে পড়ল। তাদের টার্গেট আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক। ছুটে এল তারা তাদের দিকে।
হাসান সেনজিক পেছনের সিটে তাদের সামনেই বসে ছিল।
পিস্তল বাগিয়ে দু’জন গাড়ির পেছনের দরজার সামনে এসেই একজন গাড়ির দরজা খুলে হাসান সেনজিককে টেনে বের করে নিল।
আরেকজন আহমদ মুসার দিকে পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা লোকটির চোখে চোখ রেখে নিরীহ মানুষের মত আর্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, আপনারা কে? কি দোষে তাকে আপনারা এভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন?
বলতে বলতে আহমদ মুসা গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
লোকটি মাত্র দেড় গজ দূরে আহমদ মুসার কপাল বরাবর পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালে লোকটি বলল, কোন চালাকি করার চেষ্টা করলে মাথা গুড়িয়ে দেব।
আহমদ মুসা সারেন্ডারের ভংগীতে দু’হাত উপরে তুলতে তুলতে সামনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে উঠল।
পিস্তলধারী লোকটি চমকে উঠে কি ঘটেছে তা দেখার জন্য চোখটা একটু পেছনের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিল।
সংগে সংগে আহমদ মুসা বাজের মত ছোঁ দিয়ে পিস্তলটি কেড়ে নিয়ে ডান পা দিয়ে প্রচন্ড এক লাথি মারল লোকটির তলপেটে।
মুখে “কোৎ” করে শব্দ তুলে লোকটি বাকা হয়ে বসে পড়লো মাটিতে।
লোকটিকে দম নেবার সুযোগ না দিয়ে আহমদ মুসা ডান পায়ের আরেকটি লাথির নিম্নচাপ ছুড়ে দিল লোকটির হাটুর লক্ষ্যে। বোধহয় হাটুটি ভেঙে গেল।
এবার লোকটি একটা প্রচন্ড আর্তনাদ করে মাটিতে শুয়ে পড়লো।
যে লোকটি হাসান সেনজিককে টেনে গাড়িতে তুলছিল সে শব্দ শুনে পেছনে ফিরে তাকিয়ে ছিল। ফিরে তাকিয়েই সে হাসান সেনজিককে ছেড়ে দিয়ে হাতের পিস্তল ঘুরিয়ে নিচ্ছিল।
এই সুযোগে মুহূ্র্তেই হাসান সেনজিক পেছনদিক থেকে পিস্তলধারী লোকটিকে জাপটে ধরল। কিন্তু লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই উন্মুক্ত ডান হাতের কনুই দিয়ে প্রচন্ড এক গুতো মারল হাসান সেনজিকের পাজরে।
হাসান সেনজিক মুখে যন্ত্রণাদায়ক এক চিৎকার তুলে পড়ে গেল। কিন্তু লোকটি হাসান সেনজিকের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে আর পিস্তল তোলার সময় পেল না। আহমদ মুসা তার উপর তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে তাকে জাপটে ধরে ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটির দিকে ছুড়ে ফেলে দিল। লোকটি তার প্রাথমিক বিমুঢ়তা কাটিয়ে ছুরি বাগিয়ে এগিয়ে আসছিল আহমদ মুসার দিকে।
মাটিতে আছড়ে পড়েই আবার তারা উঠে দাঁড়াচ্ছিল। আহমদ মুসা এবার দু’হাতে দুই পিস্তল নিয়ে ওদেরকে বলল, বেয়াদবি করার চেষ্টা করলে আর জানে বাঁচিয়ে রাখব না।
ওরা দু’জনেই দু’হাত উপরে তুলে উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা বলল, তোমরা মিলেশ বাহিনীর লোক?
–না। তাদের একজন বলল।
–তাহলে, তোমরা তাদের দালাল?
–হাঁ।
–কত টাকা বন্দোবস্ত?
–৫ হাজার মার্কিন ডলার।
–তোমরা কি শাস্তি চাও? তারা কথা বলল না।
–তোমরা সাঁতরাতে জান?
–জানি।
–তাহলে ঠিক আছে, তোমরা ব্রীজের রেলিং এ উঠে নদীতে ঝাপিয়ে পড়।
তারা দ্বিধা করছিল।
আহমদ মুসা পিস্তল নাচিয়ে বলল, এক মুহু্র্ত দেরী করলে গুলি করবো।
তারা আহমদ মুসার হুকুম তামিল করল। এক সাথেই দু’জন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ব্রীজ থেকে নদীর দূরত্ব খুব বেশী নয়। ভরা নদী। তবে প্রবল স্রোত আছে। বেশ ভাসতে হবে তাদের।
ওদের তৃতীয় জনও খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আহমদ মুসা ওকে কিন্তু এ নির্দেশ দেয়নি। প্রাণের ভয়েই সে করেছে।
আহমদ মুসা এভরেন রমিজের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, তৃতীয় শ্রেণীর ক্রিমিনাল এরা।
এভরেন রমিজ এবং লায়লা লিডিয়া এতক্ষণ ভয়ে-আতংকে কাঠ হয়ে বসেছিল। আহমদ মুসার কথা শুনে তারা যেন জেগে উঠল।
গাড়ির দরজা খুলে এভরেন রমিজ বেরিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
আহমদ মুসা বলল, অভিনন্দন পরে হবে। চলুন এখান থেকে সরে যাই।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক জীপে উঠল। তারপর দুই গাড়ি মাইল খানেক সামনে এগিয়ে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়াল।
সবাই গাড়ি থেকে নামল। পাশেই বাস টার্মিনাল। আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, বাস টার্মিনাল শহর থেকে এতটা বাইরে কেন?
–সাবেক কম্যুনিস্ট সরকারের এ আর এক খামখেয়ালি। কম্যুনিস্ট পার্টির কাউকে তো আর বাসে চড়তে হয় না। বলল রমিজ।
আহমদ মুসা বলল, আমরা তো সীমান্তে এই জীপ নিয়েই পৌঁছতে পারি?
–হ্যাঁ, অসুবিধা নেই। গাড়ির কাগজপত্র তো গাড়িতে আছেই। বলল রমিজ।
–ড্রাইভিং লাইসেন্স?
–বিদেশী ট্যুরিস্টদের জন্যে এটা প্রয়োজন হয়না নতুন আইনে।
–ধন্যবাদ।
–আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। আহমদ মুসাকে বলল লায়লা লিডিয়া।
–করুন। বলল আহমদ মুসা।
–আমি এক আহমদ মুসার কথা জানি। তার সাথে আপনার কোন সম্পর্ক আছে?
–এ প্রশ্ন কেন?
–আমি ব্রীজের ঘটনায় আপনার যে অবিশ্বাস্য ভূমিকা দেখলাম তা সাধারণ নয়, এর সাথে আহমদ মুসার সাদৃশ্য আছে।
–কোথায় জেনেছেন আপনি আহমদ মুসার সম্পর্কে?
–কূটনীতিকরা তো অনেক কিছুই জানে। সেভাবেই জেনেছি।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই হাসান সেনজিক বলল, আপনার অনুমান ঠিক। ইনিই সেই আমদ মুসা।
এভরেন রমিজ এবং লায়লা লিডিয়া কেউই সংগে সংগে কোন কথা বলতে পারলনা। তারা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে।
শেষে কথা বলল এভরেন রমিজ। বলল, আমরা কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে চাকুরী করতে গিয়ে ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া ও চীনে আহমদ মুসার ভূমিকা সম্পর্কে অনেক পেপার পড়েছি। কিন্তু কোন দিন ভাবিনি, এ বিস্ময়কর মানুষটির মুখোমুখি কোন দিন হব!
–আমি বিস্ময়কর নয়, মজলুম মুসলমানদের একজন সামান্য খাদেম।
–শুধু মুসলমানদের কেন? কেন সব মুসলমানের নন? একটু হেসে বলল লায়লা।
–মজলুমের জাতভেদ করে ভাবা ঠিক নয়, কিন্তু যখন জাতভেদে মানুষ জুলুমের শিকার হয়, তখন জাত ভেদ করে ভাবা ছাড়া আর উপায় থাকেনা। যেমন আপনাদের বলকান অঞ্চল। এখানে মুসলমানরা জাতিগত নির্যাতন ও নির্মুল ষড়যন্ত্রের শিকার। এখানে মুসলমানদের কথাই আমাকে ভাবতে হবে।
–আর কোন কারণ নেই? লায়লাই বলল আবার।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, আছে সুপথ ও বিপথের প্রশ্ন। বিপথের মোকাবিলায় সুপথের পথিক যারা তাদের প্রতি একটা পক্ষ-পাতিত্ব থাকবেই। আসলে এটা পক্ষপাতিত্ব নয়, ন্যায়ের প্রতি সমর্থন। বিপথকে যদি সুপথে পরিণত করতে হয়, সুপথকে তাহলে শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করতেই হবে। ইসলাম মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ।
সুতরাং এর পক্ষে সমর্থনের অর্থ হলো, মানবতার কল্যাণ করা। সুতরাং ইসলামের পক্ষে কাজ আমি করব, সেটাই স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা থামলে লায়লা লিডিয়া বলল, প্রশ্নগুলো আমার নয়, আমি এক কমেন্ট্রিতে পড়েছি যে, আহমদ মুসা একজন গোঁড়া কম্যুনাল লিডার।
–সত্যকে ভালবাসা, নিষ্ঠার সাথে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো যদি কম্যুনালিজম হয়, তাহলে আমি একশ’ বার কম্যুনাল। আর বাইরের সব দিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া যদি কম্যুনালিজম হয়, আমি কম্যুনাল নই, কোন মুসলমান কম্যুনাল হতে পারেনা।
–দরজা বন্ধ করে দেয়ার অর্থ কি?
–যেমন ইহুদিদের চিন্তা বনি ইসরাইল কেন্দ্রিক। বাইরের গোটা দুনিয়া তাদের কাছে অনাত্মীয়। বাইরের দুনিয়ার লোকেরা তাদের অধীনতা ও আনুগত্য স্বীকারই করতে পারে মাত্র, তাদের জাতির একজন সম্মানিত সদস্যের আসন পেতে পারেনা। হিন্দু ধর্মের ব্যাপারটাও তাই। জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় না হলে অন্য কেউ এ আসন লাভ করতে পারেনা। একেই বলে দরজা বন্ধ করা। প্রকৃতপক্ষে একেই বলে কম্যুউনালিটি। ইসলাম এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম চায় গোটা বিশ্বকে জড়িয়ে ধরতে। কাফ্রী ক্রীতদাসও এখানে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে।
–উৎকট জাতীয়তাবোধ কি এক ধরনের কম্যুনালিটি বা সাম্প্রদায়িকতা নয়?
–কেউ যদি বলে আমার জাতি ন্যায় করুক অন্যায় করুক আমার জাতিই ঠিক কিংবা নিজ জাতির সমৃদ্ধির জন্যে অন্য জাতির মাথায় অন্যায়ভাবে বাড়ি দেয়া যদি বৈধ করে নেয়, তাহলে তা এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা হবে বৈকি। কিন্তু এ ধরনের কাজকে ইসলাম অবৈধ ঘোষনা করেছে। ইসলামের আইন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য। সাধারণ একজন অমুসলিম নাগরিকের অভিযোগে স্বয়ং খলিফা হযরত আলী (রাঃ) আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় এসেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আদালতের রায়কে তিনি মেনে নিয়েছেন। ইসলামের সোনালী যুগে যুদ্ধ অনেক হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের বৈধ রীতি-নীতির বাইরে পররাজ্য বা পরসম্পদ লুণ্ঠন আত্মসাতের কোন অভিযোগ ইসলামের বিরুদ্ধে নেই।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, জোহরের সময় হয়েছে, নামাজ পড়ে নিতে হয়।
পাশেই ছোট একটা জলাশয়।
এভরেন রমিজ ও লায়লা লিডিয়া একটা বড় পাথরের উপর বসে রইল।
আহমদ মুসা এ হাসান সেনজিক গেল অজু করতে।
–অজু করাও একটা নিয়ম আছে নাকি? বলল লায়লা লিডিয়া।
–শুনেছি আছে।
–কেমন মনে হচ্ছে তোমার আহমদ মুসাকে?
–যেমন ভাবতাম, তার চেয়ে অনেক ভালো।
–কেমন?
–আমি ভাবতাম, চে-গুয়েভারা, হো-চি-মিন, অতবা ক্যাস্ট্রোর মত অস্বাভাবিক চেহারা হবে তাঁর। চুল বড় বড় হবে, চোখ হবে লাল, গায়ে মোষমার্কা মোটা কাপরের জামা কাপড়। তার সাথে থাকবে স্বৈরাচারী অহমিকা। তার বদলে তাঁকে দেখলাম অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন একজন ভদ্রলোক হিসেবে। স্বৈর-চরিত্রের কাঠিন্য বর্জিত সরল এবং পবিত্র চেহারা। সাধারণ, কিন্তু অসাধারণ।
–একই ধরনের বিপ্লবী তাঁরা, কিন্তু কেন এই পার্থক্য বলতে পার?
–একই ধরনের বিপ্লবী তারা তো নন।
–বিপ্লবের মত একই কাজ তো তারা করছেন।
–না একই কাজ তারা করেননি।
ভিয়েতনামে হো-চি-মিন, কিউবায় ক্যাষ্ট্রো ও চে-গুয়েভারা, রাশিয়ায় লেনিন এবং চীনে মাও সেতুং কম্যুনিষ্ট বিপ্লব—করেছেন যেখানে স্বৈরচরিত্র ছিল অত্যাবশ্যক, যেখানে মিথ্যাচার, হিংসা, সন্ত্রাস, শঠতা, হত্যা ইত্যাদি ছিল সাফল্যের সোপান। আলবেনিয়ায় এসব আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। কিন্তু আহমদ মুসা কাজ করছেন ইসলামী বিপ্লবের জন্যে। যেখানে বিপ্লবের স্বার্থেও কোন অন্যায়, অত্যাচার ও অসততাকে বৈধ করা হয়নি।
–ঠিক বলেছ, এ পার্থক্যের কথা আমি চিন্তা করিনি। বিপ্লবকেই আমি কাজ মনে করেছিলাম।
আহমদ মুসা এবং হাসান সেনজিক নামাজ পড়ছিল।
সবুজ গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্তর। সবুজ ঘাসের চাদরে দাঁড়িয়ে কাবামূখী হয়ে নামাজ পড়ছিল আহমদ মুসা এবং হাসান সেনজিক। পাশেই এক পাথরে বসে এভরেন রমিজ ও লায়লা লিডিয়া দু’চোখ মেলে তাদের নামাজ পড়া দেখছিল। নামাজীদের মত পবিত্র একটা ভাব তাদের মৌন মুখেও সুষ্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
নামাজ শেষে গাড়ির দিকে আসতে লাগল আহমদ মুসা।
এভরেন রমিজ তাকে পাথরে এসে বসতে অনুরোধ করল।
বড় পাথর। আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের বসতে অসুবিধা হলো না।
আহমদ মুসারা বসার পর লায়লা লিডিয়াই সর্বপ্রথম কথা বললঃ নামাজ না পড়লে কি ক্ষতি হয়?
আহমদ মুসা হাসল; বলল, নামাজ এবং মুসলমান অবিচ্ছেদ্য। নামাজ বাদ দিলে মুসলমান আর মুসলমান থাকেনা।
এভরেন রমিজ ও লায়লা লিডিয়া দু’জনের মুখটা মলিন হয়ে গেল এইকথা শুনে।
–তাহলে আমাদের কি হবে? বলল এভরেন রমিজ।
–আপনারা একটা পরিস্থিতির শিকার যা আপনাদের মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠার সুযোগ দেয়নি। আপনাদের নতুন যাত্রা শুরু করতে হবে।
–আমি একটা কথা বলব?
–কি? বলল আহমদ মুসা।
–কা’বা শরিফ আপনি দেখেছেন?
–দেখেছি। কয়েকবার হজ্জ করেছি।
–আমার খুব ইচ্ছা কা’বা শরিফ দেখার। কা’বা ও হজ্জের ইতিহাস আমি পড়েছি। আল্লাহর এ ঘর দেখার খুব ইচ্ছা আমার।
–শুধু দেখা কেন হজ্জ করার নিয়ত করুন, আল্লাহ অবশ্যই তা পূরণ করবেন।
–করবেন, আমি যে মুসলমানদের কিছুই করি না?
–এখন থেকে করুন।
–আরেকটা কথা বলব? লায়লা লিডিয়াই বলল।
–বলুন।
–কা’বা বা মক্কার কোন চিহ্ণ আপনার কাছে আছে?
লায়লা লিডিয়ার মুখে সংকোচের একটা ভাব এবং কথার শেষ দিকে কণ্ঠটা ভারি হযে উঠেছিল।
আহমেদ মুসা চোখ তুলে লায়লা লিডিয়ার দিকে তাকাল। একটু ভাবল। তারপর বলল, একটা তসবিহ আছে। মক্কার পাহাড়ে এক সুগন্ধ কাঠ হয় নাম জানি না। সে সুগন্ধ কাঠের তৈরী তসবিহটি। দেড় বছর আগে ফিলিস্তিন থেকে আসার পথে উমরাহ করি। সে সময় কা’বার সম্মানিত ইমাম তসবিহটি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তোমাকে এটা দিতে পারি।
বলে আহমদ মুসা পকেট থেকে বের করে তসবিহটি লায়লা লিডিয়র দিকে বাড়িয়ে ধরল।
লায়লা লিডিয়া কম্পিত হাতে তসবিহটি নিল। তারপর অপলক চোখে চেয়ে রইল তসবিহটির দিকে। একসময় দু’হাতে তুলে ধরে তসবিহটি চুমু খেল । তার চোখ থেকে তখন গড়িয়ে আসছিলো অশ্রু। তার চোখে মুখে এক অপরূপ ভাবাবেগ।
আহমদ মুসা, এভরেন রমিজ এবং হাসান সেনজিক তিন জনের কারো মুখেই কোন কথা ছিলনা। লায়লার এই আবেগ, এই পরিবর্তন তাদের বিস্মিত করেছে।
লায়লা তার চোখের পানি মুছল না। সে-ই কথা বলল। বলল, মক্কায় কোন দিনে যেতে পারবো কিনা , কা’বা কোনদিন স্পর্শ করতে পারবো কিনা, জানি না। মক্কার মাটির স্পর্শ পেয়েছে এমন জিনিস তো পেলাম। আপনারা বুঝবেন না এ কত অমূল্য আমার কাছে।
আহমদ মুসা আনমনা হয়ে গিয়েছিল, ভাবছিলো অন্য কথা। অনেক দশক থেকে আলবেনিয়া নিরীশ্বরবাদী রাষ্ট্র। ধর্মকে উৎখাতের কোন উপায়ই এখানে বাদ রাখা হয়নি, বিশেষ করে লায়লাদের মত নতুন প্রজন্ম ইসলামরে সাথে পরিচয় লাভেরও কোন সুযোগ পায়নি। তারপরও লিডিয়ার মধ্যে ঈমানের বীজ কি করে প্রবেশ করল! লিডিয়ার চোখে অশ্রু তার হৃদয়ের গোপন কুঠরীতে লালন করা তার ঈমানেরই এক গলিতরুপ। কম্যুনিজম তার দীর্ঘ শাসনকালে শক্তির জোরে মুসলমানদের ঈমানের প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে, তাদের ঈমানকে ধ্বংস করতে পারেনি।
–কি ভাবছেন? বলল এভরেন রমিজ আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসা মুখ তুলল। বলল, ভাবছি কম্যুনিজমের নিদারুন ব্যর্থতার কথা। ওরা মুসলমানদের জীবন থেকে অনেকটা বছর কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তাদের ঈমান কেড়ে নিতে পারেনি।
লায়লার অশ্রু তার ঈমানেরই প্রকাশ। কা’বার প্রতি তার ভালবাসা কা’বার মালিকের প্রতি ভালবাসা থেকেই এসেছে। আমি স্বাগত জানাচ্ছি রমিজ তোমাকে, লায়লাকে।
বলেই আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, আমাদের এখন যাত্রা করতে হয়, রমিজ।
–না আজকে যাবেন না ভাইয়া। বলল লায়লা লিডিয়া।
–না লায়লা, তা হয় না, অযথা সময় নষ্ট করা কেন? বলল আহমদ মুসা ।
–অযথা নয় ভাইয়া। আমাদের অন্তত নামাজ শেখাতে হবে আপনার। আপনি তো বলেছেন, নামাজ না পড়লে কোন মুসলমান মুসলমান থাকেনা।
–লায়লা ঠিকই বলেছে ভাইয়া। না হলে নামাজ আমরা কোথায় শিখব? বলল এভরেন রমিজ।
–নামাজ ছাড়াও ইসলাম সম্পর্কে আরও কিছু জানার আছে। যা জানলে আমরাও আমাদের সমাজে দায়িত্ব পালন করতে পারব। বলল লায়লা লিডিয়া।
আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের দিকে চেয়ে বলল, এ দাবী আমি উপেক্ষা করতে পারি না হাসান। হোক একটা দিন দেরী।
আনন্দে উল্লাস করে উঠল এভরেন রমিজ ও লায়লা লিডিয়া দু’জনেই।
–জীপটি কি আমরা সাথে নিব? বলল আহমদ মুসা।
–সাথে নিয়ে ঝামেলার আশংকা বাড়িয়ে লাভ নেই। বলল এভরেন রমিজ।
জীপ আমরা বাস টার্মিনালের গেষ্ট গ্যারেজে রেখে যেতে পারি। কাল ওখান থেকে নিয়ে নিব।
–না, ও জীপের আর দরকার নেই। বেচারা টাকা হারাল, জীপটা অন্তত থাকুক। ওরা জীপটা গ্যারেজ থেকে খুঁজে নিতে পারবে।
–মুসা ভাই আপনি দুর্বৃত্তদের সুবিধা দেখছেন, তাদের চেয়ে আপনার সুবিধার মূল্য কি বেশী নয়?
–কিন্তু জীপটা তো ওদের। আর ভেবে দেখলাম ওরা প্রকৃতই আমাদের শত্রু নয়।
–মুসা ভাই, আপনি বিপ্লবী না হয়ে মিশনারী হওয়া উচিত ছিল। এমন দয়ার শরীর হলে চলবে কি করে? বলল লায়লা লিডিয়া।
–লায়লা, ইসলামে বিপ্লবী ও মিশনারী চরিত্র আলাদা নয়। এখানে বিপ্লবীকে মিশনারী হতে হয়, আবার মিশনারীকে বিপ্লবী হতে হয়। একজন মুসলমান একই সাথে গৃহী, ধর্মপ্রচারক, সৈনিক এবং পুলিশ।
–কিন্তু এ চরিত্র তাদের কোথায়? বলল লায়লা লিডিয়া।
–নেই বলেই তো মুসলমানদের পতন, মুসলমানরা পরাধীন হয়েছে। যখন মুসলমানরা ভোগবাদী গৃহীতে পরিণত হলো, অন্য সব বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করলো তখনই এল পতন। তোমাদের আলবেনিয়ার শতকরা ৭৫ জন মুসলমান। মুসলমান হিসেবে তাদের সব বৈশিষ্ট থাকলে তারা তাদের স্বাধীনতা হারাতো না, বরং অবশিষ্টদের মুসলমান বানাতে পারতো।
এভরেন রমিজ জীপে গিয়ে উঠেছিল। সে বলল, মুসা ভাই আমি জীপটি বাস টার্মিনালে রেখে আসছি। বলে সে জীপটি নিয়ে চলে গেল।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক গিয়ে এভরেন রমীজের গাড়ির পেছনের সিটে বসল। লায়লা লিডিয়া ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসতে বসতে বলল, মুসা ভাই, আমাদের বাসা কিন্তু ভালো লাগবে না, একেবারে পায়রার খোপ। আমরা তো কম্যুনিষ্ট পার্টির সদস্য ছিলাম না, তাই দু’জন চাকুরে হওয়ার পরও ভালো বাসা মেলেনি।
–আমরা বাসা ভাল নয়, মানুষ ভাল চাই। বলল আহমদ মুসা।
এই সময় এভরেন রমিজ এসে পৌছল। এসে বসল ড্রাইভং সিটে। একবার পেছন ফিরে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে এভরেন রমিজ গাড়ি ছেড়ে দিল।

যুগোশ্লাভ সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে বাস দ্রুতবেগে এগিয়ে চলছিল পূবে প্রিজরীন শহরের দিকে। প্রিজরীন যুগোশ্লাভিয়ার কসভো প্রদেশের পশ্চিম সীমান্তের ছোট সীমান্ত শহর। কসভো হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলছিল বাসটি।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক পেয়েছিল দরজার ঠিক পেছনের দু’টো সিট।
সীমান্ত ক্রস করতে তাদের কোন অসুবিধা হয়নি। এভরেন রমিজ ও লায়লা লিডিয়া সীমান্ত পর্যন্ত সাথে এসেছিল। যুগোশ্লাভ সীমান্ত ফাঁড়িতেও তারা এসেছিল। সুতরাং তাদের কোন ঝামেলাই পোহাতে হয়নি। বরং আলবেনীয় ও যুগোশ্লাভ সীমান্ত ফাঁড়িতে তারা যথেষ্ঠ খাতির-যত্ন লাভ করে। সকাল ৮টার বাসে কোন সিট খালি ছিলনা। সিটও তারা লাভ করে যুগোশ্লাভ ফাঁড়ি অফিসারদের সৌজন্যেই।
শুভযাত্রা দেখে আহমদ মুসার মনটা খুব প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু যাত্রার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আহমদ মুসা দু’জন লোককে সীমান্তু ফাঁড়ির অফিসারদের সাথে আলাপ করতে দেখে। ওরা বার বার আহমদ মুসার দিকে তাকাচ্ছিল। এই দৃষ্টিপাতকে আহমদ মুসার ভালো মনে হয়নি। একটি অস্বস্তি নিয়েই আহমদ মুসা বাসে উঠেছিল। আহমদ মুসার এই অস্বস্তি উদ্বেগে রূপান্তরিত হোল যখন সে দেখল সেই দু’জন লোক ড্রাইভারের পিছনের সিট দুটো থেকে দু’জন লোক নামিয়ে দিয়ে সেখানে এসে বসল।
ওরা সিটে বসে মাথা ঘুরিয়ে চকিতে একবার আহমদ মুসাদের দেখে নিয়েছিল।
লোক দু’জনের পরনে কালো স্যুট। মাথায় বাদামী হ্যাট। নাকের নিচে হিটলারি ধাঁচের গোঁফ।
কসভো হাইওয়ে বেশ প্রশস্ত। প্রায় জনশূন্য রাজপথ। গাড়িরও কোন দেখা নেই। তীব্র বেগে এগিয়ে চলছিল বাসটি। নতুন বাস। সম্ভবত নতুন অকম্যুনিস্ট সরকারের নতুন ব্যবস্থার ফল।
আহমদ মুসা ভাবছিল লোক দু’টি কে? মিলেশ বাহিনীর লোক? না আগের মত তাদের লেলিয়ে দেয়া কোন ক্রিমিনাল? যেই হোক তারা, আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসা করল মিলেশ বাহিনীর। ওদের নেটওয়ার্ক ভালো। সব দিকেই ওরা চোখ রেখেছে। ওদের চোখ ফাঁকি দেয়া যাচ্ছেনা। বুঝা যাচ্ছে, হাসান সেনজিকের ফটো ওরা ব্যাপক ভাবে ছড়িয়েছে। সেই সাথে হাত করেছে স্থানীয় ক্রিমিনালদের। যদি তাই হয় তাহলে সামনেও তাদের যাত্রা নিরাপদ নয়, প্রতি পদেই বাধা পেতে হবে।
সকাল দশটায় প্রীজরীন শহরের বাস স্ট্যান্ডে গাড়ি গিয়ে থামল।
গাড়ি গিয়ে থামতেই আহমদ মুসা হাসান সেনজিককে ইশারা করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। নেমে কন্ডাক্টর ছোকরাকে বলল, শহরে কাজ আছে আমরা আর যাচ্ছি না।
কথা শুনে ছোকরাটার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নতুন যাত্রী নিয়ে বাড়তি আয় করতে পারবে এই আশায়।
প্রীজরীন বাস স্ট্যান্ডটি একেবারেই ছোট নয়। গোটা তিনেক বাস দাঁড়িয়ে আছে। আরো কয়েকটা ভাঙা বাস বাসস্ট্যান্ডের এক পাশে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছিল। বাসস্ট্যান্ডের এক প্রান্তে অফিস ভবন। আরেক প্রান্তে মোটামুটি বড় একটা ওয়ার্কশপ।
আহমদ মুসা খুশীতে উজ্জ্বল হওয়া কন্ডাক্টর ছোকরাকে জিজ্ঞেষ করল, বাস ছাড়া প্রিষ্টিনা যাওয়ার আর কি ব্যাবস্থা আছে?
প্রিষ্টিনা বেলগ্রেডগামী কসভো হাইওয়ের পরবর্তী বড় শহর এবং কসভোর রাজধানী।
কন্ডাক্টর ছোকরাটি বলল, আছে। প্রাইভেট ট্যাক্সি সার্ভিস। আগে ছিল না। অকম্যুনিষ্ট সরকার ক্ষমতায় আশার পর কম্যুনিষ্ট পার্টি সদস্যদের দখলে রাখা সরকারী গাড়িগুলো কেড়ে নিয়ে এই প্রাইভেট সার্ভিস চালু করেছে।
আহমদ মুসা চারদিকে চেয়ে দেখল, বাসস্ট্যান্ডের পাশের রোডটির ওপারেই একটা মার্কেট। আহমদ মুসা দ্রুত মার্কেটের দিকেই চলল। চলতে চলতে বলল, বাসটি স্টার্ট নেয়ার আগে পর্যন্ত ফেউ দু’জন সন্দেহ করবে না যে, আমরা কেটে পড়েছি। কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিলেই সে বুঝতে পারবে। তখনি বুঝা যাবে তার আসল পরিচয়।
মার্কেটের সামনে কার-পার্কিং লন।
তারা দ্রুত কার-পার্কিং লন পার হয়ে মার্কেটের ভেতর ঢুকে গেল। তারপর আড়ালে দাঁড়িয়ে তারা বাসটির দিকে নজর রাখল।
দুই মিনিটও গেল না। আহমদ মুসা দেখল সেই ফেউ দু’জন বাস থেকে নেমে এসেছে। আহমদ মুসার ধারণা মিথ্যা হলোনা। বাস ছাড়ার আগেই ওরা সন্দেহ করেছে, তাই খোঁজ নেবার জন্যে তারা বাস থেকে নেমে এসেছে।
বাস থেকে নেমে লোক দু’জন বাসের পেছন দিকে দাঁড়িয়ে নতুন যাত্রীর সন্ধানরত কন্ডাক্টর ছোকরাকে কি যেন জিজ্ঞেস করল। ছোকরাটার সাথে কথা বলার পরই লোক দু’জন চঞ্চল হয়ে উঠল। তারা প্রথমেই ছুটে গেল বাস টার্মিনালের অফিসের দিকে। কয়েক মুহূর্ত পরে সেখান থেকে ফিরে এসে দাঁড়িয়ে থাকা বাসগুলো দেখল। তারপর গেল ওয়ার্কশপের দিকে।
আহমদ মুসা বুঝল, ওয়ার্কশপ দেখা শেষ হলেই সে আসবে নিশ্চয়ই এই মার্কেটের দিকে।
আহমদ মুসা ভাবল, মার্কেট থেকে তাদের সরে যাওয়ারই চেষ্টা করতে হবে। ওদের মুখোমুখি হয়ে কোন ঘটনা সে সৃষ্টি করতে চায় না। ঘটনা যত এড়িয়ে চলা যায় ততই ভাল।
আহমদ মুসা দ্রুত মার্কেটের ভেতর দিয়ে মার্কেটের পূর্ব-প্রান্তের দিকে চলল।
মার্কেটের পূর্ব-প্রান্তে পৌঁছে আহমদ মুসা দেখল, কার পার্কটি ঘুরে পূর্ব দিকে এসেছে। সে আরও খুশী হলো সেখানে একটি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কিন্তু হতাশ হলো গাড়িতে ড্রাইভার না দেখে।
আহমদ মুসা লোক দুটি কোন দিকে যায় তা দেখার জন্যে উত্তর দিকে আরও সরে এল। সে মার্কেটের প্রান্তে এসে উকি দিয়ে দেখল, লোক দুটি দ্রুত রাস্তা পার হয়ে মার্কেটের দিকে আসছে। আরও দেখল সেই বাসটি চলে গেছে। অর্থাৎ লোক দু’টি গেল না। আর সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, আহমদ মুসারাই তাদের টার্গেট।
এই সময় হাসান সেনজিক আহমদ মুসার পিঠে টোকা দিয়ে বলল, ট্যাক্সিটির ড্রাইভার এসেছে।
সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা ঘুরে দাড়িয়ে দ্রুত ট্যাক্সিটির কাছে গেল।
ট্যাক্সি ড্রাইভারটির সাদা-সিদা চেহারা ও সরল মুখ দেখে খুব খুশী হল। এ ধরনের লোকরা ক্রিমিনাল হয় না। আহমদ মুসা তাকে জিজ্ঞেস করল যে, সে প্রিষ্টিনা যাবে কিনা।
ড্রাইভারটি খুশী হয়ে বলল, যাব।
–তুমি প্রস্তুত? আহমদ মুসা বলল।
–জি, আমি প্রস্তুত। বিনয়ের সাথে বলল ড্রাইভারটি। তারপর ভাড়া চুকিয়ে আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক গাড়িতে উঠে বসল।
সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি স্টার্ট নিল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে ড্রাইভারটি বলল, স্যাররা কি বিদেশী? কোত্থেকে আসছেন?
আহমদ মুসা জবাবে তারা আর্মেনিয়া থেকে আসছে জানাল।
গাড়ি তখন চলতে শুরু করেছে।
গাড়ি এসে রাস্তায় পড়ে যখন পূবমুখী হয়ে প্রিষ্টিনার দিকে চলতে শুরু করেছে, তখন আহমদ মুসা ডানদিকে চোখ ফিরিয়ে দেখল লোক দু’টি পূবের কার পার্কটি হতে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাদের চোখ গাড়ির দিকে নয়।
আহমদ মুসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। প্রিষ্টিনার দিকে ছুটে চলেছে তখন গাড়ি।