১০. বলকানের কান্না

চ্যাপ্টার

কসভো হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছিল ট্যাক্সিটি। উঁচু-নিচু পথ। কখনো পাহার উঁচু-নিচু ভুমি, কখনও নিচু-উপত্যকা, কখনও বা আবার প্রান্তরের সমভুমি ধরে এগিয়ে চলছিল ট্যাক্সিটি।
কসভো নামটা বড় প্রিয় আহমদ মুসার কাছে। এই কসভোরই কোন এক স্থানে যুদ্ধ হয়েছিল তুরস্কের সুলতান মুরাদের সাথে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের মিলিত বাহিনীর। এই যুদ্ধে মুরাদের বিজয় ইউরোপের দরজা খুলে দিয়েছিল ইসলামের জন্য।
নিরব প্রান্তরের ভিতর দিয়ে গাড়ি ছুটে চলার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর শব্দ নেই কোথাও। প্রথম নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ধন্যবাদ ড্রাইভার, খুব সুন্দর গাড়ি চালাও তুমি।
ড্রাইভারের মুখ উজ্জ্বল হলো। সে ঘাড়টা পেছনের দিকে একটু ফিরিয়ে বলল, ধন্যবাদ।
আবার নিরবতা। নিরবতার এক প্রান্তে এসে আহমদ মুসা বলল, ড্রাইভার তোমার নাম কি?
–দিমিত্রি।
–বাড়ী কোথায় তোমার?
–প্রিজরীন।
–আমি মনে করেছিলাম প্রিষ্টিনায় হবে।
–কতদিন ধরে গাড়ি চালাও?
–এক বছর।
একটু চুপ করে থেকে আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি খৃষ্টান নিশ্চয়।
জবাব দিল না দিমিত্রি। মুখটা তার বিষন্ন হল যেন।
আবার প্রশ্ন আহমদ মুসার, ও তুমি তাহলে ধর্ম-টর্ম মাননা-কম্যুনিষ্ট।
–আমি এসব কোন কিছু নিয়েই ভাবি না। গম্ভীর কন্ঠে বলল দিমিত্রি।
–ভাবনা কেন? হেসে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
–শুধু গন্ডগোল আর হানাহানি দেখে।
–তাই বলে তোমার কোন মত থাকবে না?
আবার নিরব হলো ড্রাইভার। উত্তর দিলনা। নিরবতা আবার।
অনেকক্ষণ পর ড্রাইভারই মুখ খুলল। বলল, স্যাররা তো খৃষ্টান?
–তোমার কি মনে হয়? হেসে বলল আহমদ মুসা।
–আমি বুঝতে পারিনি।
–আমরা মুসলমান।
ড্রাইভার চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। স্টিয়ারিং হুইলের উপর তার নিয়ন্ত্রণ মুহূর্তের জন্যে শিথিল হয়ে পড়েছিল। বেঁকে গিয়েছিল গাড়ির গতি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সামলে নিয়েছিল দিমিত্রি। শক্ত হাতে ধরেছিল স্টিয়ারিং হুইল। ঝাঁকি খেয়ে গাড়ি আবার তার জায়গায় ফিরে এসেছিল।
দিমিত্রির এই পরিবর্তন আহমদ মুসার নজর এড়ায়নি। দিমিত্রি এভাবে চমকে উঠলো কেন? মুসলমান পরিচয়টাকে সে এভাবে গ্রহণ করল কেন? সন্দেহের একটা কালো মেঘ আহমদ মুসার মনে উঁকি দিতে চাইল। সেটাকে খুব একটা আমল না নিয়ে সে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল, ভয় পেলে দিমিত্রি?
–না স্যার।
–তবে যে চমকে উঠলে?
–চমকে উঠিনি স্যার, বিস্মিত হয়েছি।
–কেন?
–মুসলিম পরিচয় এভাবে এখানে কেউ দেয় না তাই।
–কেন দেয় না? ঠোঁটে হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
–ভয়ে। জীবনের ভয় এবং অনেক রকমের ভয়ে, যেমন পদে পদে লাঞ্ছনা ও অসহযোগিতার ভয়।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। এই সময় সামনে থেকে প্রচন্ড, কর্কশ এক ধাতব শব্দ ভেসে এল। একটা এ্যাকসিডেন্ট। একটা দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কায় একটা ট্যাক্সি খেলনার মত ছিটকে পড়েছে রাস্তার পাশে।
একটা বিশাল প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে তখন চলছিল গাড়ি।
ঘাতক ট্রাকটি পাগলা দৈত্যের মত পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল।
আহমদ মুসাদের গাড়ি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এ্যাকসিডেন্টের জায়গায় আসল। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ি না থামিয়ে চলে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা ড্রাইভারের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, গাড়ি থামাও ড্রাইভার। শক্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল। তার ঘাড় ফিরিয়ে বলল,স্যার এদেশে এ ধরনের ঝামেলায় কেউ সাধারণত পড়তে চায় না।
আহমদ মুসা দ্রুত গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, এটা ঝামেলা নয়,দিমিত্রি, এটা মানুষের পবিত্র দায়িত্ব।
বলে আহমদ মুসা দ্রুত ছুটল দূর্ঘটনার শিকার রাস্তার পাশে ছিটকে পড়া গাড়ির দিকে। তার পেছনে পেছনে ছুটল হাসান সেনজিক। ড্রাইভার দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ তার গাড়ির কাছে। তারপর সেও ধীরে ধীরে এগুলো।
ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, এ্যাকসিডেন্টের পর গাড়িটি ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি খেলেও শেষ পর্যন্ত গাড়িটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাছে গিয়ে আহমদ মুসারা দেখল, গাড়িটি মুখোমুখি ধাক্কা খায়নি। ট্রাকের ধাক্কাটি ট্যাক্সির ডান হেডলাইটের কোণায় লেগে পিছলে বেরিয়ে গেছে। ডান হেডলাইট সমেত ডান পাশটা দুমড়ে গেছে। ডান দরজাটাও বেঁকে গেছে। ছিটকে পড়ে গড়াগড়ির ফলে গাড়ির ছাদ এবং বাম পাশটাও দুমড়ে গেছে। গাড়ির ইঞ্জিনের দিক থেকে ধোঁয়া বেরুছিল। কিন্তু আহমদ মুসারা গাড়ির কাছে পৌঁছতে পৌঁছতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে একজন যুবক। সে সিটের উপর পড়ে আছে। অজ্ঞান মনে হয়। রক্তে ভিজে যাচ্ছে গাড়ির সিট। ড্রাইভিং সিটের পাশে একজন তরুণী। তার মুখও রক্তে ভেজা। সে সিট থেকে উঠে বসতে চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে প্রথমে ড্রাইভং সিটের দরজা খুলতে চেষ্টা করল। দরজা খোলা গেলনা। দরজাটি ভেঙে চ্যাপ্টা হয়ে বডির সাথে কোথায় যেন আটকে গেছে।
আহমদ মুসা ছুটে ওপাশের দরজায় গেল। দরজা ভেতর থেকে লক করা। লাথি দিয়ে দরজার কাঁচ ভেঙে ফেলে দরজাটি আনলক করে দিল কিন্তু দরজাটি তবু খুলল না। দরজাটি বেঁকে কোথায় আটকে আছে।
কিন্তু এক মুহূর্তও বিলম্বের উপায় নেই। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে। এখনই কেবিনে আগুন এসে পড়বে। ভেতরে মেয়েটি পাগলের মত চিৎকার শুরু করেছে।
পেছনে হাসান সেনজিকের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত বলল,এস ধর।
তারপর দু’জনে মিলে বিসমিল্লাহ বলে হ্যাচকা একটা টান দিল।
দরজা খুলে গেল।
হাত ধরে প্রথমে মেয়েটিকে বের করে আনল আহমদ মুসা। তারপর ভেতরে ঢুকে গিয়ে সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে দু’হাতে টেনে আনল গাড়ির দরজায়।
গাড়ির কেবিন তখন ধোঁয়ায় ভরে গেছে। আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির কাছ থেকে সরে গেল।
আহমদ মুসা যখন যুবকটিকে রাস্তায় ঘাসের উপরে শুইয়ে দিল, তখন গোটা গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। সবাই একবার সেদিকে চাইল। মেয়েটির চোখে আতংক।
আহমদ মুসা ঝুকে পড়ে যুবকটির নিঃশ্বাস পরীক্ষা করল। নাড়ী দেখল। নাড়ী সবল আছে।
মেয়েটিও এগিয়ে এসেছিল যুবকটির কাছে। তার চোখে একরাশ উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা।
আহমদ মুসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় নেই বোন, নাড়ী ভাল আছে। কিন্তু এখনই এর রক্ত বন্ধ করা দরকার।
বলেই আহমদ মুসা পাশে দাঁড়ানো ড্রাইভারের দিকে চেয়ে বলল, এখান থেকে নিকটবর্তী হাসপাতাল বা ডিসপেনসারী কতদূর।
–প্রিস্টিনা ছাড়া এ সুযোগ পথে আর কোথাও নেই। প্রিস্টিনা এখান থেকে দু’শ মাইল। বলল ড্রাইভার।
হতাশার একটা ছায়া নামল আহমদ মুসার চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা ঝুকে পড়ে যুবকটির ক্ষত আবার পরীক্ষা করল। দু’টো বড় ক্ষত, একটা সামনের কপালে, আরেকটা কান ও কপালের সন্ধিস্থলে। সিট বেল্ট বাঁধা থাকায় আরও বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে।
পাশে দাঁড়ানো হাসান সেনজিকের দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, ফাস্ট এইড ব্যাগটা নিয়ে এস।
হাসান সেনজিক চলে গেল গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটির আহত স্থান পরীক্ষা করল। মুখের কয়েক স্থানে ছোট কাটা, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোর আঘাতে ওগুলো হয়েছে। চোখের উপর একটাই বড় কাটা। ওটা দিয়ে রক্ত ঝরছে এখনও।
আহমদ মুসা মেয়েটিকে জিজ্ঞাস করল, যুবকটি তোমার কে বোন?
–আমার স্বামী। স্পষ্ট কণ্ঠে বলল মেয়েটি।
মেয়েটির পরনে লাল স্কার্ট, গায়ে সাদা জামা। তার উপর ব্লু কোট। মেয়েটির বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা।
আর ছেলেটির পরনে ব্লু স্যুট। স্বাস্থ্যবান ব্যায়াম পুষ্ট শরীর। কিন্তু মুখের চেহারায় একটা কর্কশ ভাব।
–তোমার আর কোথাও কোন আসুবিধা নেই তো? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
–আর কোথাও লাগেনি আমার।
একটু থেমে একটা ঢোক গিলে মেয়েটি আবার শুরু করল, আপনি ওকে দেখুন, খুব ব্লিডিং হচ্ছে ওর। মেয়েটির কণ্ঠে কান্না ঝরে পড়ল।
হাসান সেনজিক ‘ফাস্ট এইড কিট’ নিয়ে পৌঁছল।
আহমদ মুসার ‘ফাস্ট এইড কিটে তুলা, ব্যান্ডেজ, আয়োডিন, পেইন কিলার ট্যাবলেট, ছোট কাঁচি-সবই আছে।
আহমদ মুসা গা থেকে কোর্ট খুলে ফেলল। তারপর জামার হাতা গুটিয়ে তুলা ও আয়োডিনের শিশি নিয়ে যুবকটির মাথার কাছে বসে গেল।
ক্ষতস্থানে তুলা চাপা দিয়ে ব্লিডিং কমিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।
আহমদ মুসা তুলা আয়োডিনে ভিজিয়ে যুবকটির কপালে ও কানের কাছের ক্ষতস্থানটি প্রথমে পরিষ্কার করল। তারপর পরিষ্কার তুলা দিয়ে ক্ষতস্থান দু’টো চাপা দিল এবং হাসান সেনজিককে ক্ষতস্থান দু’টি দুহাতে চেপে রাখতে বলল।
এরপর আহমদ মুসা যুবকটির মুখ-মণ্ডল থেকে তুলা দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করল। পরে আয়োডিনের তুলা ক’য়েকবার পাল্টাতে হলো। ধীরে ধীরে কমে এল ব্লিডিং।
ইতিমধ্যে আহমদ মুসা যুবকটির জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা শুরু করেছে। আঘাতের ধরন দেখে আহমদ মুসার নিশ্চিত বিশ্বাস হয়েছে, তার মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অতএব জ্ঞান তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে। ছোট একটা ড্রাম ফাইলে কিছু স্পিরিট ছিল। সেটাই যুবকটির জিহ্ববায় কয়েক ফোটা ফেলে এবং নাকে ধরে রেখে তার মাথার স্নায়ুতন্ত্রীকে সজীব ও সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষন চেষ্টার পর যুবকটির চোখ মেলল। চোখ মেলেই আতংকে উঠে বসতে চেষ্টা করল।
আহমদ মুসা তাকে জোর করে শুইয়ে দিয়ে বলল, মাথা একটুও নড়াবেন না, ব্লিডিং শুরু হয়ে যেতে পারে। আপনি নিরাপদ আছেন, আপনার স্ত্রী ভাল আছেন। চিন্তা করবেন না। বলে আহমেদ মুসা যুবকটির মাথার পেছন দিকে দাঁড়ানো সেই মেয়েটির দিকে চেয়ে বলল, তুমি এর সামনে এসো বোন, যাতে তোমাকে দেখতে পান। মেয়েটি সরে এসে যুবকটির মুখের কাছে ঝুকে পড়ে বলল, চিন্তা করোনা, আমি ভাল আছি, তোমারও আর কোন ভয় নেই। এরা গাড়ি থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন। যুবকটি মেয়েটির একটি হাত ধরল। তারপর শান্তভাবে চোখ বুজল। আহমেদ মুসা যুবকটির মাথার পেছনে বসে ব্যান্ডেজ বাঁধছিল। বলল, তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে বোন, প্রিস্টিনা?
–হ্যাঁ। বলল মেয়েটি।
— প্রিস্টিনায় তোমাদের বাড়ী কি?
–হ্যাঁ।
ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেলে আহমেদ মুসা যুবকটিকে জিজ্ঞাস করল, এখন কেমন বোধ করছেন? যুবকটি চোখ খুলল। বলল, ভাল।
–মাথায় কোন যন্ত্রণা আছে?
–নাই
–খুব ভারী বোধ হচ্ছে কি মাথা?
–না। শুধু ব্যাথা বোধ হচ্ছে। আহমেদ মুসা খুশি হয়ে বলল, আর কোন বিপদ নেই।
একটু থেমে আহমেদ মুসাই বলল। এখন তা হলে আমরা যাত্রা করতে পারি।
বলে আহমেদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলতে গেল গাড়িতে নেয়ার জন্য।
যুবকটি হেসে বলল, ধন্যবাদ ভাই, আমি হাটতে পারব।
বলে যুবকটি ধীরে ধীরে উঠে বসল।
আহমেদ মুসা তাকে ধরে দাঁড় করাল।
যুবকটি দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে গাড়ির দিকে চাইল। গাড়িটি তখনও জ্বলছিল আগুনে।
মেয়েটিও তাকিয়েছিল সেদিকে। ধীরে ধীরে বলল মেয়েটি, মাজুভ, ওরা আমাদের গাড়ির দরজা ভেঙে বের না করলে আমাদের দেহ এতক্ষণ ছাই হয়ে যেত।
যুবকটি আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, শুধু ধন্যবাদ দিয়ে এ ঋণ আমি শোধ করতে চাই না। নতুন জীবন দিয়েছেন আপনারা আমাদের।
–কোন মানুষ কোন মানুষকে জীবন দিতে পারে না ভাই। বলল আহমদ মুসা।
মেয়েটি বলল, আমাদের তো পরিচয় এখনও হয়নি।
পরিচয়ের কথা উঠতেই যুবকটির চোখ গিয়ে পড়ল আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক উভয়ের দিকেই। হাসান সেনজিকের দিকে তাকিয়ে যুবকটির চোখ দু’টি কেমন যেন চঞ্চল হলো।
মেয়েটি কথা বলছিল। সে যুবকটিকে দেখিয়ে বলল, এ হলো লাজার মাজুভ, আর আমি নাতাশা। আমি কলেজে পড়াই, আর ও সেনাবাহিনী থেকে আগাম অবসর নিয়ে ব্যবসা করছে।
আহমদ মুসা কি পরিচয় দেবে তা নিয়ে ভাবল। পাসপোর্টের ছদ্মনাম বলতে তার মন কিছুতেই সায় দিলনা। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে সে বলল, আমি আহমদ মুসা, আর ও হাসান সেনজিক। আমরা আসছি আর্মেনিয়া থেকে।
মেয়েটা সংগে সংগেই বলল, আপনারা মুসলমান?
–হ্যাঁ বোন। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা খেয়াল করলে দেখতে পেত তাদের নাম বলার সাথে সাথে যুবকটি অর্থাৎ লাজার মাজুভের মুখে একটা গভীর বিষন্নতা নেমে এসেছিল, আর ড্রাইভারের মুখে ফুটে উঠেছিল একটা বিস্ময় মেশানো আনন্দ।
আহমদ মুসা মাজুভকে হাত ধরে এনে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিল। নাতাশাকে সে বলল মাজুভের মাথার কাছে বসতে।
মাজুভ শোয়া থেকে উঠে বলল, আপনারা দু’জন কোথায় বসবেন?
–সামনের সিটে আমরা দু’জন বসব। বলল আহমদ মুসা।
–অসুবিধা হবে, বসতে পারবেন না। তার চেয়ে আমার পাশে আসুন। আমি বসেই যেতে পারব।
–আপনার কিছুতেই বসে যাওয়া হবে না, গাড়ির ঝাকুনিতে এখনই আবার ব্লিডিং শুর হবে।
–কিন্তু আপনাদের কষ্ট হবে ঐ ছোট্ট এক সিটে দু’জন বসে যেতে।
–কষ্টটা অনেকটা মনের ব্যাপার, কষ্ট মনে না করলে আর কষ্ট থাকেনা।
আবার এমনও কষ্ট আছে যা আনন্দদায়ক।
–আনন্দদায়ক কষ্টটা কি?
–মানুষ মানুষের জন্য যে কষ্ট করে সেটা আনন্দদায়ক।
–কিন্তু তার জন্যে তো শর্ত মানুষ মানুষকে ভালবাসবে।
–এই ভালোবাসাই তো স্বাভাবিক, এর উল্টোটা ব্যতিক্রম।
–এই ব্যতিক্রমটাকেই তো আমরা সাধারণ হিসেবে দেখছি।
–তা ঠিক। এটা মানুষের ক্রটি, মানবতা কিন্তু এর দ্বারা কলুষিত হয়নি।
–আপনি দর্শন চর্চা করেন বুঝি? বলল নাতাশা।
–এটা দর্শনের কথা নয় নাতাশা, খুব পরিচিত মানব-প্রকৃতির কথা। বলে আহমদ মুসা গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে সামনের সিটে হাসান সেনজিকের পাশে বসল।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। গাড়ি ছুটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা একটু মাথা ঘুরিয়ে বলল,নাতাশা মিঃ মাজুভের মাথাটা একটু উঁচুতে থাকা দরকার যাতে মাথায় রক্তের চাপ কম হয়।
নাতাশা কোন উত্তর দিল না। ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। নিরবে সে মাজুভের মাথা তার উরুর উপর তুলে নিল।
মাজুভ আগের চেয়ে অনেক আরাম বোধ করল। সে নড়ে-চড়ে শুয়ে স্বগত কণ্ঠে বলল, আশ্চর্য সাবধানি উনি,ওর চোখ থেকে কোন ছোট জিনিসও দেখছি এড়ায়না।
নাতাশা মাজুভের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ঠিক বলেছ, সব মিলিয়ে উনি সাধারণের মধ্যে পড়েন না।
মিঃ মাজুভ কোন কথা আর বলল না। আবার সেই গভীর বিষন্নতা তার মুখে দেখা দিল। গম্ভীর হলো মিঃ মাজুভ। গাম্ভীর্যের সাথে একটা যন্ত্রণার ভাবও তার মুখে ফুটে উঠল।
ছুটে চলছিল গাড়ি।
প্রায় পৌনে একশ’ কিলোমিটার চলার পর গাড়ি ‘স্টিমলে’ নামক স্থানে এসে পৌছল। স্টিমলে একটা ছোট্ট বাজার। রাস্তার দু’পাশের কিছু দোকান নিয়ে এই বাজার। পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট নদী প্রবাহিত। বাজার সংলগ্ন নদীর ঘাটে বেশ কিছু নৌকাও রয়েছে।
রাস্তার ধার ঘেঁষেই দোকানগুলো।
আহমদ মুসা ড্রাইভারকে একটা কনফেকশনারী দেখে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। পেছন ফিরে মিঃ মাজুভকে লক্ষ্য করে বলল, মিঃ মাজুভ, আপনার পানি ধরণের তরল কিছু খাওয়া দরকার।
একটা কনফেকশনারীর পাশে গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল। আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলল, তুমি আপেল বা কোন ফলের কয়েকটা জুস নিয়ে এস।
হাসান সেনজিক নেমে গেল গাড়ি থেকে। আহমদ মুসা গা এলিয়ে আরাম করে সিটে বসল। তার উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি গাড়ির জানালা দিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে ফিরছে।
মিঃ মাজুভও উঠে বসেছে।
হাসান সেনজিক পাশের দোকানেই গিয়েছিল জুস কিনতে। আহমদ মুসার দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরে সেই দোকানের উপর নিবদ্ধ হলো।
একজন মাত্র দোকানি। একমাত্র খদ্দের হাসান সেনজিক তার সাথে কথা বলছিল আর একজন লোক দোকানের অন্য পাশে দাঁড়িয়েছিল। তার দৃষ্টিটা হাসান সেনজিকের উপর নিবদ্ধ। সে ধীরে ধীরে এসে হাসান সেনজিকের পাশে দাঁড়াল।
হাসান সেনজিক একটা প্লাস্টিক ব্যাগে জুসের টিনগুলো নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। আহমদ মুসা দেখল লোকটিও হাসান সেনজিকের পেছনে পেছনে আসছে। লোকটির হাবভাব ও হাটা আহমদ মুসার কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না হাসান সেনজিক গাড়ির কাছে এসে পড়েছে।
আহমদ মুসা দরজা খুলে গাড়ি থেকে বেরুল।
হাসান সেনজিক গাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিল। হঠাৎ সেই পেছন পেছন আসা লোকটি তার হাত চেপে ধরে বলল,আপনাকে আমার সাথে একটু যেতে হবে।
হাসান সেনজিক পেছনে ফিরে বলল, কেন? কোথায়?
‘এই এইখানে কাছেই’ বলল লোকটি।
‘কেন’ আবার জিজ্ঞেস করল হাসান সেনজিক।
লোকটি অসহিষ্ণুভাবে হাসান সেনজিকের হাত ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বলল, সব কিছু বলব, চলুন।
আহমদ মুসা নিরবে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
এবার সে দু’পা এগিয়ে লোকটির মুখোমুখি হয়ে শান্ত-কঠোর কণ্ঠে বলল, হাত ছেড়ে দাও।
লোকটি আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েই পকেট থেকে পিস্তল বের করল। আহমদ মুসার দিকে পিস্তল তাক করে বলল, সরে যাও, বাঁচতে চাইলে।
বলে লোকটি আবার হাসান সেনজিকের হাত ধরে ফেলল।
হাসান সেনজিকের হাত ধরার জন্যে যখন লোকটি মনোযোগ দিয়েছে সেই ক্ষণের সুযোগ গ্রহণ করল আহমদ মুসা। লোকটির কব্জিতে আঘাত করতেই তার হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেল।
হাত থেকে পিস্তল পড়ে যেতেই লোকটি হাসান সেনজিকের হাত ছেড়ে দিয়ে ডান হাতের এক প্রচন্ড ঘুষি ছুটল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
পিস্তল হারাবার পর এ ধরণের ঘুষিই যে তার কাছ থেকে আসবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল আহমদ মুসা। চকিতে মাথা একদিকে সরিয়ে নিয়ে ঘুষি এড়িয়ে গেল সে।
লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়েছিল। সে সোজা হয়ে উঠার সংগে সংগেই আহমদ মুসা ডান হাতের একটা কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ে, ডান পাশে একেবারে কানের নিচেই।
টলতে টলতে লোকটি গোড়া কাটা গাছের মত আছড়ে পড়ল মাটিতে।
আহমদ মুসা পিস্তলটি কুড়িয়ে নিয়ে লোকটির পকেটে গুজে দিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এল।
হাসান সেনজিক গাড়িতে ঢুকে গিয়েছিল। আহমদ মুসা উঠে বসেই গাড়ি ছাড়তে বলল।
গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল গাড়ি।
সিনেমার একটা দৃশ্যের মতই ঘটে গেল ঘটনাটা।
ড্রাইভার ও নাতাশার চোখে আতংক। কিন্তু মিঃ মাজুভ বসেছিল পাথরের মত। তার মুখে ভয় উদ্বেগের কোন চিহ্ন নেই, আছে এক প্রকারের কাঠিন্য এবং সেই বিষন্নতা।
গাড়ি তখন ফুল স্পীডে চলতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসা আপেল জুসের দু’টো টিন পেছনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, মিঃ মাজুভ আপনি এবং নাতাশা খেয়ে নিন।
মিঃ মাজুভ হাত বাড়ালো না, হাত বাড়াল নাতাশা।
নাতাশা জুস নিতে নিতে বলল আমার গা এখনও কাঁপছে। কি সাংঘাতিক। দিনে-দুপুরে এইভাবে হাইজ্যাক। ঠিক শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু যদি গুলি করত?
আহমদ মুসা ভাবছিল মিলেশ বাহিনীর কথা। আশ্চর্য, ওদের জাল দেখছি সর্বত্র। মনে হয় ওদের প্রতিটি ইউনিট, প্রতিটি লোকের কাছেই হাসান সেনজিকের ফটো পৌঁছেছে, নির্দেশও পৌঁছেছে তাকে ধরার। হাসান সেনজিককে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখাই এখন দেখছি সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নাতাশার কথা হাসান সেনজিকের চিন্তাকে আর আগাতে দিল না। আহমদ মুসা বলল, জীবন-মৃত্যু একদম পাশাপাশি বিরাজ করছে নাতাশা, এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।
‘আপনার খুব সাহস’, বলল নাতাশা।
–এ সাহস সবার আছে নাতাশা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এ সাহস আপনাতেই এসে হাজির হয়।
–কিন্তু আপনি পিস্তলটা ওর পকেটে দিয়ে এলেন কেন?
–বাইরে পড়ে থাকলে কেউ নিয়ে নিতে পারত, তাই।
–সেটা ভালই তো হতো।
–হতো হয়তো, কিন্তু ভাবলাম যার জিনিস তারই থাক।
–আশ্চর্য মানুষ আপনি, শক্রুর জন্যে এমন করে কেউ ভাবে?
–জানি না। তবে সে যতটুকু শত্রুতা করেছে,ততটুকু উত্তর আমি দিয়েছি। এর বেশি কোন ক্ষতি তার আমি চাইনি।
–কি জানি, আমি এসব বুঝি না। শত্রু শত্রুই। কথায় আছে শত্রুর শেষ রাখতে নাই।
–আমিতো এই শত্রুকে চিনি না। কি কারণে,কোন অবস্থায় সে একাজ করতে এসেছে তা আমি জানি না। সুতারাং তাকে ঐভাবে শত্রু ভাবা ঠিক নয়।
–আপনার এ কথাটা একজন প্রতিপক্ষের নয়,বরং একজন বিচারকের। একটি পক্ষ এবং একজন বিচারকের ভূমিকা এক হতে পারে না।
–পারে। পারা উচিত। পক্ষগুলো যদি বিচারকের বিচার বুদ্ধি দ্বারা সজ্জিত হয়,তাহলে পক্ষগুলোর পার্থক্য ও বিরোধ দূর হবে এবং তাতে হানাহানি দূর হয়ে সমাজ, পৃথিবীতে শান্তি আসবে।
–আপনি দার্শনিক ও সংস্কারকের সুরে কথা বলছেন,আমি পারবো না আপনার সাথে কথায়।
মাজুভ একটা কথাও বলেনি। সে এক বিষন্ন গভীরতা নিয়ে এইকথাগুলো শুনছিলো। শুনতে শুনতে সেই বিষন্নতার মধ্যে তার চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ফুটে উঠেছিলো।
নাতাশা আর কথা বলেনি। জুসের একটা টিন খুলে সে মাজুভের দিকে তুলে ধরল। মাজুভ নাতাশার হাত থেকে জুস নিয়ে নিরবে খেতে শুরু করল।
মাজুভের নিরবতা ও গাম্ভীর্য নাতাশার চোখ এড়ায়নি। এতবড় ঘটনা ঘটে গেল,সে একটা কথাও বলল না। এতে তার খারাপই লাগছিল। ব্যাপারটা তার কাছে দৃষ্টি কটুও মনে হয়েছে। আবার সে উদ্বিগ্নও হয়ে উঠেছে। তার শরীর খারাপ করছে নাতো। নাতাশা বলল,তোমার কি খুব খারাপ লাগছে মাজুভ? কষ্ট হচ্ছে?
মাজুভ হাসতে চেষ্টা করে বলল, না নাতাশা আমি ভাল আছি।
আহমদ মুসা সিটের উপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল,মিঃ মাজুভ,আপনার ব্রেনের নার্ভগুলোর রেষ্ট দরকার খুব বেশী। আপনার বসে থাকা চলবে না।
মাজুভ আগের মতই হাসতে চেষ্টা করে বলল, ধন্যবাদ। বলে মাজুভ শুয়ে পড়ল আগের মতই নাতাশার উরুতে মাথা রেখে।
নাতাশা মাজুভের চুলে হাত বুলাতে লাগল। এক সময় মাথা নিচু করে মুখটা মাজুভের কানের কাছে এনে নাতাশা ফিসফিসিয়ে বলল,গাড়ি কিংবা লাগেজের জন্য কি খারাপ লাগছে তোমার?
মাজুভ নাতাশার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,আমরা বেঁচেছি,তোমাকে এতটা সুস্থ পেয়েছি,এটাই এখন আমার কাছে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাওয়া নাতাশা।
নাতাশা আর কিছু বলল না।
আরেকটু জোরে নাতাশা আকড়ে ধরল মাজুভের হাত।
তীব্র বেগে ছুটে চলছে তখন গাড়ি প্রিষ্টিনার দিকে।

প্রিষ্টিনা প্রাদেশিক রাজধানী শহর। বেশ বড়। প্রিষ্টিনার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত সিটনিক নদী। সিটনিকের স্বচ্ছ পানি,দু’তীর বরাবর সুদৃশ্য এভেনিউ, সিটনিকের বুকে ভাসমান নানা বর্ণের বোটের সারি প্রিষ্টিনাকে দিয়েছে অপরুপ এক সাজ।
সিটনিকের দু’পাশের এভেনিউ বরাবর গড়ে উঠেছে প্রিষ্টিনার অভিজাত এলাকা।
সিটনিকের পশ্চিম তীর বরাবর যে এভেনিউ তার নাম,’লাজারাস এভেনিউ’। ‘লাজারাস’ ষ্টিফেন পরিবারের সেই রাজা ষ্টিফেনের পিতা রাজা লাজারাস। কসভো প্রান্তরে ১৩৮৯ সালে এই লাজারাসের সাথেই যুদ্ধ হয়েছিল তুরস্কের সুলতান মুরাদের।
এই লাজারাস এভেনিউকে সামনে রেখেই লাজার মাজুভের সুন্দর বাড়ীটি। লাজার মাজুভের পিতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট টিটোর প্রিয়পাত্র যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। উত্তরাধিকার সূত্রেই সে এই বাড়ীর মালিক হয়েছে। অবশ্য লাজার মাজুভও সেনাবাহিনীর একজন কৃতি সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। কর্নেল র‍্যাঙ্কে থাকাকালে তিনি অবসর নিয়েছেন।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক মাজুভের বাড়ীতে এসে উঠেছে। নাতাশার অনুরোধ তারা এড়াতে পারেনি।
প্রিষ্টিনায় ঢুকে গাড়ি নিয়ে তারা সোজা মাজুভের বাড়ীতেই এসেছিল। মাজুভদের নামিয়ে দেয়ার পর সংগে সংগেই তারা চলে যেতে চেয়েছিল।
মাজুভকে নিয়ে নাতাশা যখন ভেতরে চলে গিয়েছিল,আহমদ মুসা তখন ড্রাইভারকে তার ভাড়া চুকিয়ে দেবার জন্যে দু’শো যুগোশ্লাভ দিনার তার হাতে গুঁজে দিয়েছিলো। প্রিজরীন থেকে প্রিষ্টিনা পর্যন্ত ভাড়া ঠিক হয়েছিলো দেড়শ’ দিনার।
ড্রাইভার টাকার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলেছিল,ভাড়া তো দেড়শ’দিনার, পঞ্চাশ দিনার বেশী এসেছে।
‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশী সময় তুমি দিয়েছ,তাছাড়া আমাদের আরেকটু এগিয়ে দেবে বাস ষ্ট্যান্ড পর্যন্ত’, বলেছিল আহমদ মুসা।
ড্রাইভার ছেলেটি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। সে যখন মাথা তুলেছিল,তখন তার চোখের কোণটি ভিজা। সে তার হাতের দু’শ দিনার সবটাই আহমদ মুসার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবো না।
কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ থেকে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল।
আহমদ মুসা তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলেছিল,কাঁদছ তুমি?
ড্রাইভার ছেলেটি দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠে বলেছিল আমি মিথ্যা বলেছি, আমি মুসলমান।
–তুমি মুসলমান?
–হ্যাঁ। আমার নাম দরবেশ জুরজেভিক।
–মিথ্যা কথা বলেছিলে কেন?
–সব সময় ঐ মিথ্যা পরিচয়ই দেই। মুসলিম পরিচয়ে কাজ পাওয়া যায় না,তাছাড়া জীবনেরও ভয় আছে। আপনারা মুসলিম জানলে আমি মিথ্যা পরিচয় দিতাম না।
চোখ মুছে কথাগুলো বলেছিল দিমিত্রি।
আহমদ মুসা দু’পা এগিয়ে এসে দিমিত্রিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,তুমি আমার ভাই খুব খুশি হয়েছি তোমার এই পরিচয় পেয়ে।
দিমিত্রির চোখে পানি। কিন্তু মুখ তার আনন্দে উজ্জ্বল।
আহমদ মুসা তাকে আলিংগন থেকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল,ভাইয়ের একটা কথা কিন্তু মানতে হবে।
‘কি কথা’ বলেছিল দিমিত্রি।
আহমদ মুসা পকেট থেকে এক হাজার দিনারের একটা নোট বের করে দিমিত্রির হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,ভাইয়ের কাছ থেকে ভাইকে উপহার।
দিমিত্রি নোটের দিকে একবার তাকিয়ে বলেছিল,কিন্তু এ টাকা আপনার কাছ থেকে নিলে আমি চিরদিন কষ্ট পাব।
আহমদ মুসা দিমিত্রির পিঠ চাপড়ে বলেছিল,আমি তোমাকে কাজের বিনিময় দিচ্ছি না ভাইকে ভাইয়ের উপহার ওটা।
কয়েক মুহুর্ত মাথা নিচু করে থেকে দিমিত্রি টাকা পকেটে রেখে বলেছিল,আপনারা ওদের কাছে সত্য পরিচয় দিয়ে ঠিক করেননি। ওদের কাউকে বিশ্বাস নেই।
–তাই কি? বলেছিল আহমদ মুসা।
–আমার পরিচয় পেলে আমাকে এভাবে ওরা গাড়ি চালাতে দেবে না। গাড়িটাও কেড়ে নেবে। একটু থেমেই আবার বলেছিল,চলুন স্যার।
আহমদ মুসা গাড়ির দিকে এগুতে এগুতে বলেছিল,স্যার নয় ভাই।
এই সময় ছুটে বেরিয়ে এসেছিল নাতাশা বাড়ী থেকে। ছুটে এসে আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,আমার ভুল হয়েছিল,আমি ওকে নিয়ে চলে গেছি। আপনাদের কিছু বলে যেতে পারিনি। আপনাদের যাওয়া হবে না,আমি যেতে দেব না। শিশুর মত জেদ নাতাশার কন্ঠে ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসা হেসে বলেছিল,কোন ভুল হয়নি বোন। তোমার এই আমন্ত্রনের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ,কিন্তু আমরা প্রিষ্টিনায় দেরি করতে পারবো না,বেলগ্রেড যাব আমরা। এখন বাস ষ্ট্যান্ডে যাচ্ছি।
নাতাশা দু’হাত মেলে আরও শক্ত করে দাঁড়িয়ে বলেছিল,আমি কোন কথা শুনব না। আপনাদের যাওয়া হবে না। মাজুভ আপনাদের কিছু বলতে পারেনি আমি ওর হয়ে মাফ চাচ্ছি।
–এভাবে কথা বললে দুঃখ পাব বোন। বলেছি তো তোমাদের কোন ভুল হয়নি। তোমারা দু’জনেই অসুস্থ। মাজুভের জন্য এখনই তোমাকে ডাক্তার ডাকতে হবে। অযথা ঝামেলা বাড়িয়ো না। আর আমাদের জরুরি কাজ, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। বলেছিল আহমদ মুসা।
–দেখুন কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না, আমি যেতে দেব না, আমি বলেছি। একটা নিখাঁদ আন্তরিকতার সুর নাতাশার কথায়।
নাতাশার এই অনুরোধ উপেক্ষা করে চলে যাওয়া আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
পুরো দুই দিন হলো তারা নাতাশার বাড়িতে। এর মধ্যে যাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নাতাশা যেতে দেয়নি। গত দুই দিনে আত্মীয়-স্বজনের স্রোত এসেছে নাতাশার। আহমদ মুসারাই যে তাদের জীবন রক্ষা করেছে, না হলে গাড়ির সাথে পড়ে যে ছাই হয়ে যেতে হতো, এ কথাটা সবার কাছে বার বার বলেছে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে নতুন জীবনদাতা হিসেবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কারো কাছেই নাতাশা, আহমদ মুসাদের মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করেনি। এর কারণ হিসেবে আহমদ মুসাকে নাতাশা বলেছে, অহেতুক প্রশ্ন সৃষ্টি করে, আর পরিবেশ খারাপ করে লাভ কি। মুসলিম পরিচয় যে এখানে কত অগ্রহণযোগ্য, কত বিপদের কারণ আহমদ মুসা তা এ থেকে আরও বেশি বুঝেছে। এ জন্যেই দিমিত্রি মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল।
নাতাশা এবং বাড়ির অন্যান্যদের আন্তরিক ব্যবহার আহমদ মুসাদের মুগ্ধ করেছে, বরং যত্নের আতিশয্যে তারা বিব্রতই বোধ করেছে। কিন্তু একটা বিষয় আহমদ মুসা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে, মিঃ মাজুভ যেন তাদের কাছে সহজ হতে পারছে না। সে কথা বলে, কিন্তু তার সাথে যেন অন্তরের কোন যোগ নেই। একটা জমাট গাম্ভীর্য, একটা বিষন্নতা যেন সব সময় তাকে ঘিরে থাকে। আহমদ মুসা লক্ষ্য করেছে, নাতাশাও অনেক সময় এতে বিব্রত বোধ করেছে। মাজুভের এই আচরণের কোন ব্যাখ্যা আহমদ মুসা খুজেঁ পায়নি।
এই ব্যাখ্যা নাতাশাও খুজেঁ পায়নি। সেই গাড়ি থেকেই মাজুভের এই গাম্ভীর্য, এ বিষন্নতা নাতাশা লক্ষ্য করছে। অথচ মাজুভ এমন নয়। সে অত্যন্ত হাসি-খুশি এবং অতিথিপরায়ণ। কেন সে হঠাৎ এমন হয়ে গেল। এটা তার মাথায় আঘাত লাগার কোন প্রতিক্রিয়া কি! এই চিন্তা মনে আসলেই নাতাশা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
সেদিন রাত ১১টা। নাতাশা এসে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু মাজুভ শুতে আসেনি। নাতাশা বিছানা থেকে উঠল।
এগুলো স্টাডি রুমের দিকে। দেখল, মাজুভ চেয়ারে গা এলিয়ে ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখ-মুখ গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন। সেই বিষন্নতার একটা প্রলেপ সারা মুখে।
নাতাশা ধীরে ধীরে গিয়ে মাজুভের ঘাড়ে হাত রাখল। মাজুভের তাতে কোন ভাবান্তর হলো না। সে ঐভাবেই উপর দিকে চেয়ে রইল।
উদ্বেগে আকূল হয়ে উঠল নাতাশার বুক।
নাতাশা তার মাথাটি ধীরে ধীরে মাজুভের কাঁধে রেখে বলল, ওগো তোমার কি হয়েছে, তোমাকে এত গম্ভীর, এত বিষন্ন, এত চিন্তান্বিত তো আর কোন সময় দেখিনি।
বলতে বলতে নাতাশা কেঁদে ফেলল।
মাজুভ ঐভাবে থেকেই নাতাশার একটা হাত টেনে নিল নিজের হাতের মধ্যে। বলল, বুঝতে পারছি নাতাশা তুমি কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু আমিও যে খুব কষ্টে আছি। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আমার হৃদয় যে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে।
–আমাকে বলতে পার না সেটা কি? কোন দিন তো তুমি কিছু গোপন করনি।
–শুনলে তুমিও কষ্ট পাবে, নাতাশা।
–এ কথা কেন ভাবছ তুমি, তোমার কষ্টের শেয়ার আমার তো প্রাপ্য।
–বিষয়টা আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিককে নিয়ে। আমি ভয়ানক উভয় সংকটে পড়েছি।
চমকে উঠল নাতাশা স্বামীর কথায়। ওদের নিয়ে আবার সংকট কি! বলল, বল ওদের নিয়ে কি সে সংকট। ওরা তো অত্যন্ত ভাল লোক।
–ভাল বলেই তো সংকট বেড়েছে, নাতাশা।
–তোমার কথা আমি কিছুই বুঝছি না।
–যে লোকটাকে আমরা হন্যে হয়ে খুঁজছি, যে লোকটিকে ধরার জন্যে হাজার হাজার ডলার খরচ হচ্ছে, যে লোকটি আজ বলকানের খৃস্টান সমাজের লক্ষ্যবস্তু, হাসান সেনজিক সেই লোক।
–এই হাসান সেনজিক সেই হাসান সেনজিক?
–হ্যাঁ
–আর যে ভয়ংকর লোকটি হাসান সেনজিককে হোয়াইট ওলফের হাত থেকে উদ্ধার করেছে, যে ভয়ংকর লোকটি তিরানার জেমস জেংগার মত দুর্ধর্ষ লোককে পরাভূত ও নিহত করে হাসান সেনজিককে মুক্ত করেছে, যে ভয়ংকর লোকটি কাকেজীর ব্ল্যাক ক্যাটের দখল থেকে পুনরায় হাসান সেনজিককে তুলে এনেছে, যে ভয়ংকর লোকটি ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া এবং ককেশাস বিপ্লবের নায়ক, সেই ভয়ংকর লোকটিই হলো আহমদ মুসা।
নাতাশা কোন কথা বলতে পারলো না। প্রায় কাঁপতে কাঁপতে সে গিয়ে মাজুভের পাশের চেয়ারে বসল। বহুক্ষণ সে দু’হাতে মাথা ধরে টেবিলে কনুই ভর দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকল। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যেন সে।
মাজুভ ধীরে ধীরে নাতাশার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, বলেছি না নাতাশা, যে তুমি কষ্ট পাবে শুনলে, আমার চেয়ে বেশি কষ্ট।
অনেকক্ষণ পরে মুখ তুলল নাতাশা। উদ্বেগ ও আতংকে বিধ্বস্ত তার মুখ। বলল, মাজুভ সত্যই চিনেছ তাঁদের তুমি?
‘আ‍‌মার জ্ঞান ফিরে আসার পর হাসান সেনজিককে একনজর দেখেই আমি চিনতে পেরেছি, তার ফটো আমার বহুল পরিচিত। তারপর তাঁদের নাম শুনে কোন সন্দেহই আমার আর রইলনা। আর স্টিমলে’তে যে ঘটনা ঘটল তাতে তো প্রমাণই হয়ে গেল এরাই তাঁরা। স্টিমলে’তে যে লোকটি হাসান সেনজিককে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, সে লোকটিকে আমি চিনি আমাদের মিলেশ বাহিনীর লোক।’ বলল মাজুভ।
আবার অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল নাতাশা। তারপর বলল, কিন্তু পরিচয় ওদের যাই হোক, তুমি ওদের কেমন দেখলে বলত?
‘সেখানেই তো হয়েছে মুস্কিল, নাতাশা’ বলতে শুরু করল মাজুভ, ‘আমি যে পরিচয় ওদের জানি, তার সাথে যেমন ওদের দেখছি তা মিলছে না। বিপদে-আপদে সাহায্য চোর-ডাকাতরাও করতে পারে, কিন্তু যে আন্তরিকতা তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি, তা দুষ্ট প্রকৃতির কারও কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে না। আর স্টিমলে’তে একজন শত্রুর সাথে যে আচরণ আহমদ মুসা করল, তা অতি উদার ও মহৎ হৃদয়ের কাজ। এছাড়া যে ধরণের কথা তাদের কাছ থেকে শুনে আসছি, যে আচরণ আমরা পেয়ে আসছি, তা উন্নত মানব প্রকৃতির দ্বারাই শুধু সম্ভব।’
মাজুভ থামলে নাতাশা বলল, ‘আর দেখ না, ওদের নামটা ওরা যেভাবে প্রকাশ করে দিল, আমরা হলেও তা করতাম না।’
–ঠিক বলেছ, নাতাশা, আমি ওদের মুখ থেকে ওদের নাম শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। অথচ ওরা ভাল করেই জানে ওদের চারপাশের বিপদের কথা। ওদের এই আচরণের ব্যাখ্যা দু’টো হতে পারেঃ এক, ওরা নিজেদের শক্তির উপর এতটাই আস্থাশীল যে, এসবকে তারা পরোয়া করে না, দুই. ওরা ওদের আল্লাহর উপর এতটাই নির্ভর যে, দুনিয়ার আর কাউকেই তাঁরা ভয় করে না। ব্যাখ্যা যেটাই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁদের উন্নত চরিত্রবলের প্রমাণ হয়। বলল মাজুভ।
–আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছ, ওদের ব্যবহার কত শালীন ও সংযত। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা কোন সময় কথা বলেনি। মাটির পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে, তা আমি কোনদিন ভাবিনি। আর দেখ, দু’দিন ওদেরকে আমরা প্রায় জোর করেই রেখেছি। কি যে দ্বিধা-সংকোচের মধ্যে দিয়ে ওরা এই দু’টো দিন আছে। অতি উন্নত ও রুচির মানুষ না হলে এমন হতে পারে না।
–নাতাশা, মুশকিল তো এখানেই। তারা আমাদের মত সাধারণ মানুষ হলেও কখন ওদের মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দিতাম। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওদের মহত্ব, অপরূপ চরিত্র। অন্যদিকে জাতির একজন হিসেবে, মিলেশ বাহিনীর একজন হিসেবে আমার কর্তব্য ওদেরকে ধরিয়ে দেওয়া। কর্তব্য ও মানবিক নীতিবোধের দ্বিমুখী এই সংঘাতে আমি ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি নাতাশা।
নাতাশা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে থাকল। তারপর মাথা তুলে বলল. ওদেরকে ধরিয়ে দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না, ওরা আমাদের কাছে কোন অন্যায় করেনি। আর ওরা অন্যায় করার মত লোক বলে আমরা বিশ্বাসও করি না।
মাজুভ হাসল। বলল. ওরা অপরাধ করেছে, একথা কেউ বলছে না, নাতাশা, অপরাধ উত্তরাধিকার সূত্রে এসে ওদের ঘাড়ে বর্তেছে।
–ব্যাপারটা কি হাস্যকর নয়? দুনিয়ার কোন আইনে এটা বৈধ?
–এসব কথা আর কারো বিবেচ্য নয়, স্টিফেন বিশ্বাসঘাতক, জাতিদ্রোহী, তার উত্তরাধিকারীদেরকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ব করতে হবে।
একটু থামল মাজুভ তারপর বলল, জাতির একজন সদস্য আমি নাতাশা। জাতির সাথে আমি বিশ্বাস- ঘাতকতা করব কি করে? আমি উভয় সংকটে।
নাতাশা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, সংকট কিছু নয় মাজুভ, ওরা চলে যাবে। তুমিও ব্যাপারটা কাউকে জানাবে না, তা’হলেই হলো।
‘কিন্তু নাতাশা’ বলল মাজুভ, ‘আমার শপথ আছে, আমি শপথ ভাঙব কি করে?’
নাতাশা একটু চিন্তা করে হাসি মুখে বলল, ঠিক আছে সব আমার উপড় ছেড়ে দাও। তোমাকে শপথ ভাঙতে হবেনা। চল এখন শুব, চল।
ওরা শোবার ঘরে চলে এল। শুয়ে পড়ল দু’জনে।
সকালে যখন মাজুভের ঘুম ভাঙল, দেখল নাতাশা মুখ ভার করে পাশে বসে আছে। চিন্তায় কপালটা কুঞ্চিত তার। বিস্মিত হলো মাজুভ। নাতাশা তো এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠেনা মাজুভ উঠে অনেক ডাকা ডাকি করে নাতাশাকে জাগায়।
মাজুভ তাড়াতাড়ি উঠে বসে বলল, কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছ, আবার বসে আছ মুখ ভার করে!
নাতাশা মুখ নিচু করে বলল, আমি ব্যর্থ হয়েছি মাজুভ।
–কি ব্যর্থ হয়েছ, বুঝলামনা।
–কাল রাতে তোমাকে বলালম না, তোমার শপথ ভাঙতে হবেনা, আমার উপর ছেড়ে দাও সব।
–হাঁ বলেছিলে, তার কি হয়েছে?
–আমি সেটা পারিনি মাজুভ।
–কি পারনি?
–আমি পরিকল্পনা করেছিলাম, তোমার অজান্তে সব বলে ওদের পালিয়ে যেতে দিব। আমি তা পারিনি।
চমকে উঠল মাজুভ। এতক্ষণে ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হলো। নাতাশার এ ধরনের একক উদ্যোগে সে বিস্মত হলো, আবার মজাও পেল। বলল, পারনি কেন? কে বাধা দিল তোমার ষড়যন্ত্রে?
–হ্যাঁ, ষড়যন্ত্রই বলতে পার। ষড়যন্ত্র করে দুই কুল রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না।
নাতাশার মুখ গম্ভীর, কন্ঠটা তার ভারি হয়ে উঠল।
–পারনি? কেন বলনি তাদের?
–বলেছি।
–তাহলে?
–ওরা এভাবে যেতে রাজী হননি। এভাবে পালাতে চান না তারা।
–কি বলছ তুমি! তুমি জানিয়েছ যে, আমি মিলেশ বাহিনীর লোক। ওদের সব পরিচয় আমি জানি।
–বলেছি। এও বলেছি যে, তোমার অজান্তে তাদের পালাবার সুযোগ করে দিচ্ছি।
–কেন পালাল না তারা। কি বলেছে?
–তারা বলেছে, এভাবে পালিয়ে তারা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি কিংবা বিরোধ সৃষ্টি করতে চায়না।
–এ কথা বলেছে তারা!
মাজুভের চোখে-মুখে অপার এক বিস্ময় ফুটে উঠল। মাজুভের মন নাতাশার এই কথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছে না। স্বামী-স্ত্রীর একটা বিরোধের দিক বিবেচনা করে মানুষ কেমন করে এত বড় বিপদ মাথায় তুলে নিতে পারে।
মাজুভ উঠে দাঁড়াল। বলল, চল নাতাশা আমি ওদের সাথে কথা বলব।
–কি বলবে তুমি?
–ভয় করো না নাতাশা, তোমার স্বামী মানুষ!
মাজুভ এবং নাতাশা এল আহমদ মূসা এবং হাসান সেনজিক যে ঘরে রয়েছে সেই ঘরে।
হাসান সেনজিক তার খাটে শুয়েছিল। আর আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে ছিল জানালায় বাইরের দিকে মুখ করে।
দরজায় নক করে মাজুভ ঘরে ঢুকল।
আহমদ মুসা দূরে দাঁড়িয়েছিল।
মাজুভকে দেখে আহমদ মুসা হেসে দু’পা এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল মাজুভের দিকে। বলল, মিঃ মাজুভ আমি আপনার কথাই ভাবছিলাম।
–কি ভাবছিলেন আমার কথা? ম্লান হেসে বলল মাজুভ।
হাসান সেনজিক শোয়া থেকে উঠে বসেছিল।
আহমদ মুসা মাজুভ এবং নাতাশেকে বসার অনুরোধ করে আরেকটা সোফায় নিজে বসতে বসতে বলল, বিদায় নিতে চাই আপনার কাছ থেকে। থাকলাম তো দু’দিন রাজার হালে।
–বিদায় যদি না দিতে চাই?
–তবু বিদায় দিতে হয়ই। হেসে বলল আহমদ মুসা!
–আমি কে জানেন তো?
–জানতাম না, নাতাশা বলেছে।
–এখন যদি মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দেই?
–আমরা নিষেধ করবনা।
–কেন?
–এটা না করাই আপনার জন্য অস্বাভাবিক!
–নাতাশা বলার পর কেন আপনারা নিরাপদে যাবার সুযোগ ছেড়ে দিলেন?
–আমাদের জন্য কেউ অসুবিধায় বা বিপদে পড়ুক তা আমরা চাইনা।
–এভাবে আপনারা ধরা দিতে চাচ্ছেন কেন?
–না, আমরা ধরা দিতে চাইনা।
–তাহলে আপনি কি মনে করেন, আমি চাইলেও মিলেশ বাহিনীর হাতে আপনাদের ধরিয়ে দিতে পারব না?
–আমি তা বলিনি, আমি বলেছি আমরা ধরা দিতে চাইনা। হেসে বলল আহমদ মুসা।
–ধরা দিতে চান না,কিন্তু ধরা তো দিয়েছেন। আপনারা এখন আমার হাতে। মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারি আপনাদের।
–আপনি চেষ্টা করবেন ওদের হাতে তুলে দিতে, আমরা চেষ্টা করব ধরা না পড়তে। ফল কি হবে আমরা জানিনা।
মাজুভ কোন জবাব দিলনা। মূহুর্ত কয়েক চুপ করে থেকে বলল, বুঝতে পারছি নিজের শক্তির উপর অসীম আস্থা আপনাদের।
–না, আমরা নির্ভর করি আল্লাহর সাহায্যের উপর, কারণ আমরা ন্যায়ের উপর রয়েছি।
–এ দাবী তো আমাদেরও, ন্যায়ের উপর আছি।
–ন্যায় তো দু’টি হতে পারেনা?
–ঠিক।
–এখন বলুন হাসান সেনজিক কি অন্যায় করেছে, কোন ক্ষতি করেছে আপনাদের কারো?
–না।
–তাহলে বিনা অপরাধে সে যখন জুলুম –নির্যাতনের শিকার, তখন আমরাই ন্যায়ের পক্ষে।
–হাসান সেনজিক প্রত্যক্ষ কোন অপরাধ করেনি, কিন্তু তার পূর্ব-পুরুষ রাজা স্টিফেনের পাপের ভার তার উপরও এসে বর্তেছে, তাকে পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে হবে।
–আপনার বিচার-বুদ্ধি কি এতে সায় দেয়?
–সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা তো ঠিক, রাজা স্টিফেন বিশ্বাসঘাতক, জাতির দুশমন।
–রাজা স্টিফেন আর যাই হোন বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না। বলল হাসান সেনজিক।
এতক্ষন সে চুপ করে বসে আলোচনা শুনছিল। এবার সে আলোচনায় যোগ দিল।
–বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না বলছেন? বলল মাজুভ।
–হ্যাঁ, বরং তিনি বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মর্যদা রক্ষা করতে গিয়েই সুলতান বায়েজিদের পক্ষে খৃস্টান-মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন।
–ইতিহাসকে ইচ্ছে মত সাজালে হবেনা বন্ধু।
–না মিঃ মাজুভ আমি ইতিহাসের কথাই বলছি।
দৃঢ়তার সাথে বলল হাসান সেনজিক।
একটু দম নিয়েই সে আবার শুরু করল, ১৩৮৯ সালের ২৭শে আগষ্ট কসভোর ভয়াবহ যুদ্ধে স্টিফেনের পিতা লাজারাস তুরস্কের সুলতান মুরাদের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করেছিলেন। লাজারাস পরাজিত ও নিহত হলেন। এই সময় বুলগেরিয়ার রাজা সিসভেনও পরাজিত হন এবং তার রাজ্য তুর্কি-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। এই বলকান অঞ্চলের রাজা ও জনগণ গ্রীক চার্চের অন্তর্ভক্ত খৃস্টান বলে তাদের এই দুর্দিনে হাংগেরী, জার্মানী, ইতালি অর্থাৎ ক্যাথলিক খৃস্টান ধর্মমতের অনুসারী পশ্চিম ইউরোপ তাদের সাহায্যে আসেনি। বুলগেরিয়া তুর্কি-সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যাবার পর লাজারাসের পুত্র স্টিফেন তার রাজ্য সার্ভিয়াকে রক্ষার জন্য সুলতান বায়েজিদের সাথে সন্ধি করেন। এ সন্ধির মাধ্যমে তিনি তার রাজ্য রক্ষা করেন। স্টিফেনের অপরাধ এই সন্ধির প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি সন্ধি ভংগ করতে রাজী হননি। যে ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপ এবং ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের যে ধর্মগুরু পোপ নবম বেনিফেস সার্ভিয়ার দুর্দিনে টু শব্দটিও করেননি, সেই তারা তাদের স্বার্থে ১৩৯৪ সালে এসে স্টিফেনকে বলল সন্ধি ভংগ করার জন্যে। কিন্তু রাজা স্টিফেন এই সুবিধাবাদী লোকদের পরামর্শে সন্ধি ভংগ করে দেশকে, জাতিকে বিপদগ্রস্ত করতে রাজী হননি। আপনি রাজা স্টিফেনকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলছেন, কিন্তু সার্ভিয়া, বোসনিয়া অর্থাৎ আজকের যুগোশ্লাভিয়ার কোন লোক তাঁকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলতেই পারেন না। বরং তাদের উচিত ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের কু-পরামর্শের শিকার হয়ে তিনি দেশ ও জাতিকে ধ্বংস ও পরাধীনতার দিকে ঠেলে দেন নি এ জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।
থামল হাসান সেনজিক।
কথাগুলো খুব আগ্রহের সাথে শুনছিল মাজুভ। নাতাশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
হাসান সেনজিক থামলেও মাজুভ বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল না। ভাবছিল সে। বলল বেশ কিছু পর, মিঃ হাসান সেনজিক আপনি একটা নতুন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন। ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের সাথে গ্রীক অর্থোডক্স বালকান অঞ্চলের এই পার্থক্যের কথা আমি কোন সময় ভাবিনি। আর পোপ নবম বেনফেস ঘোষিত যে ক্যাথলিক ক্রুসেডে শামিল হবার জন্যে রাজা স্টিফেনকে সন্ধি ভংগ করতে বলেছিল সেটা সার্ভিয়ার মানুষের স্বার্থের অনুকূলে ছিল কি না তাও কোনো দিন ভেবে দেখিনি। এদিকটা থাক। একটা কথা বলুন, রাজা স্টিফেন সন্ধি শর্ত ভংগ করলেন না ঠিক আছে, কিন্তু নিকোপলিসের ভয়ানক যুদ্ধে রাজা স্টিফেন কেন ইউরোপীয় খৃষ্টান শক্তির বিরুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ দিলেন? সবাই আমরা জানি, রাজা স্টিফেন সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ না দিলে সম্ভবত খৃষ্টান শক্তিরই জয় হত।
হাসান সেনজিক হাসলো। বলল, এখানেও রাজা স্টিফেন বিন্দুমাত্র অন্যায় করেন নি। দু’টো কারণে রাজা স্টিফেন নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথম কারণ, সার্ভিয়ার জনগণের উপর ক্যাথলিক ক্রুসেডারদের অত্যাচার। রাজা স্টিফেন সন্ধি ভংগ করতে রাজী না হলে ক্যাথলিকদের মিলিত বাহিনী সার্ভিয়ার জনপদে নিষ্ঠুর লুন্ঠন চালায় এবং এর শস্য-জনপদ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। এ ছাড়া এই ক্যাথলিক খৃষ্টান বাহিনী সার্ভিয়ার দানিয়ুব সীমান্তের ভাদিন এলাকা এবং আর্সোভা দুর্গ দখল করে নেয়। এরপর সার্ভিয়ার রাকো দুর্গে যে হত্যাকান্ড তারা চালায় তার নজির ইউরোপে খুব কমই আছে। দুর্গের সৈন্যেরা অস্ত্রত্যাগ ও আত্মসমর্পণ করে তাদের আশ্রয় প্রর্থণা করলেও রাকো দুর্গের সব সৈন্যকে তারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এরপরই রাজা স্টিফেন নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগদান করেন। দেশ ও জনগণের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল রাজা স্টিফেনকে। এছাড়া সন্ধির শর্ত অনুসারে সুলতান বায়েজিদ আইনত রাজা স্টিফেনকে সাহায্যের জন্য ডাকতেও পারতেন। সুতরাং নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগদান করে রাজা স্টিফেন কোন দিক দিয়েই অন্যায় করেন নি।
থামলো হাসান সেনজিক।
গভীর মনোযোগের সাথে হাসান সেনজিকের কথা শুনছিল মাজুভ। তার মুখের মলিন গাম্ভীর্য দূর হয়ে সেখানে আনন্দের উজ্জ্বলতা এসেছিল।
হাসান সেনজিক থামলে মাজুভ বলল, ধন্যবাদ মিঃ হাসান সেনজিক, আপনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন, রাজা স্টিফেনের উপর মিলেশ বাহিনী বিশেষ ক্ষুব্ধ এই কারণে যে, তিনি তার বোন ডেসপিনাকে সুলতান বায়েজিদের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?
হাসান সেনজিক বলল, এটাও কোন কারণ আসলে নয়। এটাই যদি কারণ হয়, তাহলে গ্রীক সম্রাট ক্যান্টাকুজেনী, যিনি তার কন্যা থিয়োডরাকে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমানের পুত্র অর্থানের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, এবং বুলগেরিয়ার রাজা ক্রাল সিসভেন, যিনি সুলতান মুরাদকে তার কন্যাদান করেছিলেন, প্রমুখের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ওঠেনা কেন?
মাজুভ হাসল। বলল, স্টিফেন পরিবারের বিরুদ্ধে আরেকটা অভিযোগ হলো, সুলতান বায়েজিদের বেগম লেডি ডেসপিনার মাধ্যমে স্টিফেন পরিবার শুধু ইসলাম গ্রহণ-ই করেনি, গোটা বলকানে ইসলামের বাণী ছড়াবারও সব ব্যবস্থা করে।
মাজুভ থামার সংগে সংগেই হাসান সেনজিক উৎসাহের সাথে জবাব দিলো, এ অভিযোগ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। বলকানে ইসলাম প্রচারের ব্যবস্থা করে স্টিফেন পরিবার অন্যায় করেনি। সকলেরই নিজ নিজ ধর্ম প্রচারের অধিকার রয়েছে। ধর্ম প্রচার করা যদি স্টিফেন পরিবারের দোষ হয়, তাহলে এ দোষে ক্যাথলিকরাও মহাদোষী। কারণ গ্রীক-অর্থোডক্স খৃষ্টান অধ্যুষিত বলকানে তারা জুলুম অত্যাচারের মাধ্যমে ক্যাথলিক ধর্মমত প্রচার করেছে, স্টিফেন পরিবার এ জুলুম অত্যাচার অন্তত কারো উপর করেনি।
হাসান সেনজিকের কথা শেষ হবার সাথে সাথে মাজুভ উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে হাসান সেনজিককে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ঠিক বলেছেন মিঃ হাসান সেনজিক, ক্যাথলিকরা তাদের ধর্মমত বলকানের উপর চাপিয়ে দেবার জন্য যে জুলুম-অত্যাচার ও নৃশংশতা করেছে, তার এক আনাও ইসলাম করেনি।
তারপর সোফায় ফিরে গিয়ে মাজুভ বলল, আমি খুবই আনন্দ বোধ করছি। আমার প্রিয় মাতৃভূমি সার্ভিয়ার ইতিহাসকে এমন স্বচ্ছভাবে কোন সময় আর দেখিনি।
মাজুভ থামলে হাসান সেনজিক শুরু করল। বলল, আমার মনে হয় কি জানেন মিঃ মাজুভ, মিলেশ বাহিনীর নেতা ক্যাথলিক কনস্টানটাইন স্টিফেন পরিবারের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে এই কারণে যে, রাজা স্টিফেন ক্যাথলিকদের বিরোধিতা করেছিল। একই সাথে কনস্টানটাইন এদেশে ক্যাথলিক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা এবং স্টিফেন পরিবারকে নির্মুল করার আড়ালে বলকান থেকে ইসলামকে নির্মূল করতে চায়। এতে গ্রীক-অর্থোডক্স ধর্মমত এবং ইসলাম দু’ই শেষ হয়ে যাবে। অতএব স্টিফেন পরিবারের কোনো অপরাধ নয়, বরং ক্যাথলিক স্বার্থ চরিতার্থই…..
‘থামুন মিঃ হাসান সেনজিক’ হাসান সেনজিককে বাধা দিয়ে বলতে শুরু করলো মাজুভ,’কি বললেন মিলেশ বাহিনী বলকানে ক্যাথলিক খৃষ্টানদের স্বার্থ রক্ষা করছে? তাই কি?
বলে মাজুভ নিরব হলো মুহূর্তের জন্যে। তারপর সোফায় গা এলিয়ে অনেকটা স্বগত কণ্ঠেই বলল,’মিলেশ বাহিনী ক্যাথলিক স্বার্থের প্রতিভূ বলেই কি মিলেশ বাহিনীর নেতা কনস্টানটাইনের অফিসে তার মাথার উপর সম্রাট সার্লেম্যানের পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি টাঙানো? এই সম্রাট সার্লেম্যানকেই তো ক্যাথলিক পোপ রোম সম্রাটের মুকুট পরিয়েছিলেন।’
অনেকটা আনমনাভাবেই বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল মাজুভ। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে পা বাড়াল সে।
নাতাশাও উঠে দাঁড়াল। তার মুখে মিস্টি হাসি। আহমদ মুসাদের লক্ষ্য করে বলল, আপনারা নাস্তা করতে আসুন।

পরদিন সকাল ৮ টা। লাজার মাজুভ পায়চারি করছিল বাগান সংলগ্ন খোলা বারান্দায়।
তার মুখ প্রসন্ন। মুখ থেকে তার সেই বিষন্নতার মেঘ, মনের সেই উভয় সংকটের সংঘাত কেটে গেছে। আহমদ মুসাদের প্রতি তার মনটা আগেই ঝুঁকে পড়েছিল। বাকি ছিল কিছু জিজ্ঞাসার দেয়াল এবং জাতির প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রশ্ন। কিন্তু হাসান সেনজিকের সেদিনের কথাগুলো এবং তাদের সাথে আলোচনার পর সে জিজ্ঞাসার সবই উবে গেছে। এবং যাকে সে জাতির প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য বলে মনে করেছিল, তাকে এখন তার কান্ডহীনতাই শুধু নয়, জাতির জন্যে ক্ষতিকর বলেই মনে হচ্ছে। তার এ বিশ্বাস এখন দৃঢ় যে, রাজা স্টিফেন কোনো অন্যায় করেনি, বরং নীতি ও ওয়াদার প্রতি বিশ্বস্ততা এবং জাতির প্রতি দায়িত্ববোধেরই পরিচয় দিয়েছে। সুতরাং মাজুভ মিলেশ বাহিনীর সাথে তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সে আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রীক-অর্থোডক্স চার্চের হাজার হাজার সদস্যকে ক্যাথলিক মিলেশ বাহিনীর খপ্পর থেকে ছাড়িয়ে আনবে। মিলেশ বাহিনীর আন্দোলন বলকানের স্বার্থে নয়, পশ্চিম ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চের স্বার্থে। এ ষড়যন্ত্র রুখতে হবে।
মাজুভের পরনে বাইরে বেরুবার পোশাক।
আহমদ মুসা এবং হাসান সেনজিকও বাইরে বেরুবার পোশাক পরে বারান্দায় বেরিয়ে এলো।
পেছনে পায়ের শব্দ শুনে পায়চারি বন্ধ করে থমকে দাঁড়াল মাজুভ।
মাজুভ আহমদ মুসাদের দিকে ফিরে দাঁড়াতেই আহমদ মুসা বলল, কোথায় আমরা যাচ্ছি বললেন না তো?
–খুব ভালো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। বলল মাজুভ। তার মুখে হাসি।
এই সময়ে নাতাশাও প্রস্তুত হয়ে বারান্দায় তাদের পাশে এসে দাঁড়াল। আজ নাতাশার পরনে গোলাপী ঢিলা একটা স্কার্টের উপরে গোলাপী ঢিলা একটা জামা। আর প্রথম বারের মতো মাথায় একটা রুমাল বেধেছে, গোলাপী রং এর।
বলকানের অনেক মুসলিম পরিবারের মেয়েরা মুসলিম ঐতিহ্য হিসেবে বাইরে বেরুবার সময় এখনও মাথায় রুমাল বাধে।
নাতাশার মাথায় রুমাল বাধা দেখে বিস্মিতই আহমদ মুসা। বলল, ধন্যবাদ বোন।
নাতাশা হেসে বলল, মাথায় রুমাল বেধে আমার কি যে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, আমি যেন উচ্চতর কোনো অভিজাত পর্যায়ে উন্নীত হলাম।
‘স্বাভাবিক বোন’ বলল আহমদ মুসা, ‘মানব প্রকৃতির সাথে এর মিল আছে। মানুষের স্রষ্টা মেয়েদেরকে মাথায় ও গায়ে চাদর রাখতে বলেছেন। এটা তাদেরকে শোভন, সুন্দর এবং উন্নততর আচরণে অভ্যস্ত করে।’
বলে আহমদ মুসা মাজুভের কথার দিকে মনোযোগ দিলো। বলল, আমি যে কথা বলছিলাম, আমরা যাচ্ছি সেই ভালো জায়গাটা কি?
‘ভয় করছে নাকি?’ বলল মাজুভ। হাসল। তারপর আহমদ মুসাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, আমি আপনাদেরকে কসভোর সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাব যেখানে রাজা লাজারাস ও সুলতান মুরাদের ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যে যুদ্ধে সুলতান মুরাদের বিজয় দানিয়ুবের দেশে ইসলামের বিস্তারকে নিশ্চিত করে তুলেছিল।
কসভো প্রান্তরের নাম শুনে আহমদ মুসার হৃদয় রোমাঞ্চিত হলো। বলল, কোথায় সেই কসভো প্রান্তর?
–এখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পুর্বে মনাস্তিরের দক্ষিণে। এই সিটনিক নদী সে কসভো প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে গেছে। বলল মাজুভ।
বারান্দার নিচেই চার সিটের একটা জীপ দাঁড়িয়েছিল। বারান্দার গা থেকে শুরু হয়ে একটা লাল সুরকীর রাস্তা বাগান পেরিয়ে লাজারাস এভেনিউতে গিয়ে পড়েছে।
–ধন্যবাদ মাজুভ, খুব খুশী হয়েছি আপনার এই ‘সাইট’ সিলেকশনে। বলল আহমদ মুসা।
–ধন্যবাদ। আমি মনে করি সেখানে গিয়ে আপনারা আরও খুশী হবেন।
সবাই বারান্দা থেকে নেমে এল।
ড্রাইভিং সিটে বসল মাজুভ। তার পাশে নাতাশা। আর পেছনের দু’সিটে আহমদ মুসা এবং হাসান সেনজিক।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
গাড়ি বাগান পেরিয়ে এসে পড়ল লাজারাস এভেনিউতে। ছুটতে শুরু করল লাজারাস এভেনিউ ধরে।
মাজুভের দু’টি হাত স্টিয়ারিং হুইলের উপর। দৃষ্টি তার সামনে প্রসারিত। বলল, মিঃ আহমদ মুসা, আমার নতুন জীবন শুরু হলো। এর আগে কসভো’র যুদ্ধক্ষত্রে গেছি সুলতান মুরাদকে হত্যাকারী বলকানের জাতীয় বীর ‘মিলেশ কবি লোভিশ’ এর বেদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে মিলেশ বাহিনীর জন্যে নতুন শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে। আর আজ যাচ্ছি ‘মিলেশ কবি লোভিশ’ এর বেদেহী আত্মাকে এ কথা বলতে যে, মিলেশ বাহিনী বলকানের মানুষের স্বার্থে নয়, সম্রাট সার্লেম্যানের ক্যাথলিক সাম্রাজ্য কায়েমের জন্যে চেস্টা করছে। আমার প্রতিটি পদক্ষেপ হবে এখন তাদের বিরুদ্ধে। থামল মাজুভ।
আহমদ মুসা বলল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামের এ নতুন পথে আমরা আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি মিঃ মাজুভ।
‘ধন্যবাদ মিঃ আহমদ মুসা’ বলতে শুরু করল মাজুভ, ‘হাসান সেনজিকের কাছে আমি শুনেছি ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্যএশিয়ে, সিংকিয়াং এবং ককেশাশের ন্যায়ের সংগ্রামে আপনার সুমহান কৃতির কথা। আমি প্রার্থনা করি, আপনার শুভ পদার্পণ ‘দানিয়ুবের দেশে’ নিয়ে আসুক অশান্তির বদলে শান্তি, হানাহানির বদলে প্রীতি-মৈত্রী, বিভক্তির বদলে ঐক্য এবং চুর্ণ করে দিক দানিয়ুবের দেশে জেঁকে বসা ষড়যন্ত্রের সৌধ। থামল মাজুভ।
আর কথা বলল না কেউ।
সবার দৃষ্টি সামনে- সামনের অনাগত পথের দিকে।
মাজুভের প্রার্থনার অবিনশ্বর শব্দগুলো বাতাসের ইথারে মিশে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে — ধাবমান হলো উপরে– উর্ধ্বাকাশে –আরশুল আজিমের দিকে।
আর তার নিচে মাটির বুক কামড়ে ছুটে চলছে মাজুভের গাড়ি লাজারাস এভেনিউ ধরে কসভোর পথে।

পরবর্তী বই

দানিয়ুবের দেশে