১৩. আন্দালুসিয়ার প্রান্তরে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

গ্রানাডা থেকে দু’মাইল দূরে ‘মুরের শেষ দীর্ঘশ্বাস’ পাহাড়, স্প্যানিশ ভাষায় ‘Eultimo suspiro del Moro’। স্প্যানিশরা একে এই নামেই ডেকে থাকে স্পেনের শেষ মুসলিম সুলতান আবু আব্দুল্লাহর শেষ বিলাপকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য। পরাজিত ও আত্ম – সমর্পিত সুলতান আবু আব্দুল্লাহ গ্রানাডা নগরীর চাবি বিজয়ী ফার্ডিন্যান্ডের হাতে তুলে দেয়ার পর নিঃস্ব হয়ে নগরী ত্যাগ করে চলে আসেন। এই পাহাড়ে এসে ফিরে দাঁড়ান তিনি অতি সাধের গ্রানাডা কে শেষ বারের মত এক নজর দেখার জন্য। যে কান্না, যে অশ্রুকে সুলতান এই পর্যন্ত রোধ করে রেখেছিলেন, গ্রানাডার উপর শেষ নজরটি পড়ার পর তা আর কোন বাধ মানল না। শিশুর মত অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষণ করতে লাগলেন তিনি। আর তিনি বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহু আকবর, আমার মত দুর্ভাগ্য কার!’ এই ঘটনা থেকে মুসলিমরা এই পাহাড়ের নাম দেয়, ‘ফেজ আল্লাহু আকবর।’ আর স্পেনীয় খ্রিষ্টানরা বলেন, ‘মুরের শেষ দীর্ঘশ্বাস।’
মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ের আহমদ মুসা যখন পৌঁছেছিল, তখন সাড়ে তিনটা। আসরের নামাযের তখনও অনেক দেরি। শোয়া চারটায় আসরের নামায এখানে।
আহমদ মুসা নামেনি গ্রানাডায়, সোজা চলে এসেছে মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ে।
কর্ডোভা থেকে যে আন্দালুসিয়ান হাইওয়ে বেরিয়ে এসেছে, সেটা গ্রানাডার বুকের উপর দিয়ে মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ের গিরিপথটি অতিক্রম করে চলে গেছে দক্ষিণে জিব্রালটার প্রণালীর দিকে। গ্রানাডা প্রবেশের অনেক আগেই আহমদ মুসা সিয়েরা নিবেদা পাহাড়ের পাদদেশে, দাঁড়ানো ‘আল হামরার দৃষ্টি মনোহর লাল প্রাসাদের একটা অংশ এবং তার ১২টি অভ্রভেদী চুড়ার একটির একটা ভাঙ্গা অংশ দেখতে পেয়েছিল। বুকে একটা প্রচন্ড খোঁচা লেগেছিল আহমদ মুসার। চোখের সামনে ভীড় করে উঠেছিল অতীতের হাজারো দৃশ্য এবং বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল হাজারো কথা।
ভারী হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার চোখ। হঠাৎ নিরব হয়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা। গ্রানাডায় পৌঁছে রবার্তো একবার বলেছিল আহমদ মুসা ভাই, গ্রানাডায় আমরা কি দাঁড়াব?
কোন উত্তর আসেনি আহমদ মুসার কাছ থেকে। রবার্টও পেছনে ফিরে আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কোন প্রশ্ন করেনি।
মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ের শীর্ষদেশের নিচেই প্রশস্ত একটা চত্বর আছে এখানে দাঁড়িয়েই স্পেনের শেষ মুসলিম সুলতান আবু আবদুল্লাহ, তার পরিবার এবং তার সাথীরা গ্রানাডাকে শেষবারের মত দেখেছিল। এই জায়গাটা স্প্যানিশ খ্রিস্টানদের জন্যে গৌরবের জায়গা। প্রতিবছর ২রা জানুয়ারী যখন খ্রিস্টানরা গ্রানাডা বিজয়ের উৎসব করে, তখন এখানে তারা আবু আবদুল্লাহর দু’শ পুত্তলিকা দাঁড় করিয়ে তার চোখে একটা পানির নল লাগিয়ে দেয় যেখান থেকে অঝোর ধারায় ঝরতে থাকে পানি। আর এই জায়গাটা মুসলিমদের জন্য কাঁদার জায়গা।
আহমদ মুসা মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ে উঠে এই চত্বরটিতে এসে দাঁড়াল।
মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়টি গ্রানাডার সোজা দক্ষিণে। তার চত্বরটি থেকে ভেগা প্রান্তরে দাঁড়ানো গ্রানাডা নগরীকে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। দেখা যায়, গ্রানাডার গা ছুয়ে সেনিল নদী সবুজ ভেগা প্রান্তরের বুক চিরে রুপালী ফিতার মত এগিয়ে গেছে।
চত্বরটিতে উঠে উত্তর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল গ্রানাডা। কিন্তু লাল পাথরের নিরাভরণ আলহামরা (যাকে সারাজিনী নাইডু বলেছেন তাজমহলের চেয়ে অধিকতর অনিন্দসুন্দর এবং ঐতিহাসিক স্যার আমীর আলী যার সম্পর্কে বলেছেন আলহামরার দৃশ্য বর্ণনা অত্যন্ত শক্তিশালী কলমের দ্বারাই শুধু সম্ভব) যেন বৈধব্যের পোষাক পরে মুখভার করে দাড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসা চোখ সরাতে পারলো না গ্রানাডার উপর থেকে। ধীরে ধীরে আজকের গ্রানাডার দৃশ্য সরে গিয়ে তার চোখে ভেসে উঠছে আরেক গ্রানাডার দৃশ্য। যে দৃশ্যে আহমদ মুসা দেখল হৃদয় বিদারক এক নাটকঃ
১৪৯১ সালের ২রা জানুয়ারী। সূর্য উঠতে তখন ও অনেক দেরী। আত্মসমর্পিত গ্রানাডার মুসলিম অধিবাসীরা তখনও ঘুম থেকে জাগেনি। আত্মসমর্পণ এর শর্ত অনুসারে গ্রানাডা ত্যাগের জন্য সুলতান আবু আবদুল্লাহ তার পরিজন ও সাথী সহ আল-হামরা প্রাসাদের পশ্চাতের এক দুয়ার দিয়ে বের হলেন এবং নগরীর সবচেয়ে জনহীন অংশ দিয়ে গ্রানাডা ত্যাগ করলেন। সুলতানের চোখে অশ্রু নেই, কিন্তু সুলতানের হেরেমের মহিলারা আত্ম-সংযম করতে পারলো না, তারা সকলেই রোদন করছিল। সুলতান চাইছিলেন, বিদ্রুপ- কঠোর তাদের এ দৃশ্য যেন না হাসে, আর শত্রু তাদের দেখে যেন জয়োল্লাস না করে, এই জন্যই এই গোপন বাবস্থা। সুলতানের এই ছোট কাফেলাটি গ্রানাডা থেকে বেরিয়ে ভেগা প্রান্তরে সেনিল নদী অতিক্রম করে আল-পুজারিশ পাহাড় পাড়ি দিয়ে এক গ্রামে এসে দাঁড়ালেন।
………ওদিকে বিজয়ী খ্রিস্টান সম্রাট ফার্ডিন্যান্ড এবং রানী ইসাবেলার বাহিনী সেনিল নদীর তীরে শহীদ পাহাড়ের কাছে এক ক্ষুদ্র মসজিদের কাছে এসে উপস্থিত হল। সুলতান আবু আবদুল্লাহ তার কয়েকজন সাথী সমেত খ্রিস্টান রাজ-দম্পতির সামনে এলেন। রাজ-দম্পতির সামনে বশ্যতা স্বীকার এর চিহ্ন ঘোড়া থেকে নামতে উদ্যত হলেন। কিন্তু ফার্ডিন্যান্ড তাকে নিষেধ করলেন। অধীনতা জ্ঞাপনের জন্য সুলতান তখন সম্রাট এর হাতে চুম্বন করতে অগ্রসর হলেন। ফার্ডিন্যান্ড তাও করতে দিলেন না। অবশেষে আবু আবদুল্লাহ নত ফার্ডিন্যান্ড এর ডান হাতকে সালাম করলেন। অতঃপর সুলতান আবু আবদুল্লাহ প্রাসাদের চাবি সম্রাট ফার্ডিন্যান্ডের হাতে তুলে দিলেন এবং বললেন, ‘এই চাবি স্পেনের মুসলিম শাসনের শেষ নিদর্শন। রাজন, আমাদের রাজ্য, আমাদের ধন-সম্পদ, আমাদের প্রাণ পর্যন্ত আপনার করায়ত্ব। আপনি অঙ্গিকার করেছেন, আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। আমরা আপনার সেই দয়া-ই প্রত্যাশা করি।’ …..ঠিক এই সময় আল-হামরার দূর্গ শীর্ষ থেকে মুসলিম শাসনের অর্ধচন্দ্র পতাকা ভূ-লুণ্ঠিত হল, আর তার স্থানে সকালের সোনালি সূর্য কিরণে রৌপ্য নির্মিত প্রকাণ্ড ক্রস ঝলমল করে উঠল। ক্রসটি এখানে স্থাপন করলেন একজন বিশপ। পরে সেখানে উত্তোলিত হল রাজকীয় পতাকা, উত্তোলন করলেন ফৌজের প্রধান পতাকাবাহী।
আহমদ মুসার পলকহীন চোখ থেকে দু’টি অশ্রু ধারা নামছিল তার দু’গন্ড বেয়ে। একসময় গ্রানাডার উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে তাকাল জোয়ানের দিকে, রবার্তোর দিকে।
গ্রানাডার দিকে নিবন্ধ– দৃষ্টি আহমদ মুসার চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে দেখে জোয়ান এবং রবার্তো অভিভূত হয়ে পড়েছিল।
আহমদ মুসা ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, জোয়ান, রবার্তো, শত শত বছর আগের গ্রানাডার ছবি দেখলাম।
‘কি ছবি?’ বলল জোয়ান।
‘ছবিটা মুসলিম গ্রানাডার অন্তিম দৃশ্য।
দেখলাম সেই দৃশ্য, কিভাবে শেষ সুলতান আবু আবদুল্লাহ আল-হামরা থেকে, গ্রানাডা থেকে বেরিয়ে এলেন, কিভাবে কি কথা বলে নগরীর চাবি তুলে দিলেন ফার্ডিন্যান্ডের হাতে, কিভাবে গ্রানাডার দূর্গশীর্ষ থেকে মুসলমানদের অর্ধচন্দ্র পতাকা ভূ-লুণ্ঠিত হল এবং তার জায়গায় উঠে এল ক্রস।’
‘আপনার চোখের অশ্রু কি এই দৃশ্য দেখে?’ বলল রবার্তো।
‘ঠিক শুধু এই দৃশ্য দেখেই নয়, সুলতান আবু আবদুল্লাহকে ফার্ডিন্যান্ডের হাতে নগরীর চাবি তুলে দিয়ে তার সামনে মাথা নত করে নিরাপত্তা ও ক্ষমা–ভিক্ষা করতে আমি যখন দেখছিলাম, তখন গ্রানাডার আরেক সিংহ–দিল তরুনের কথা আমার মনে পড়েছিল। তিনি তরুণ সেনাধ্যক্ষ মুসা। সুলতান আবু আব্দুল্লাহর আত্ন-সমর্পণের বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, যখন দরবারে আমির-উমরাহ ও উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিক আত্নসমর্পণের পক্ষে মত দিচ্ছিল, তখন প্রতিবাদের জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে এই তরুন সেনাধ্যক্ষ বলল, ‘শেষ পর্যন্ত শত্রুর সঙ্গে লড়াই করা হোক। দরকার হয়, তাদের বর্ষার মুখে গিয়ে আমরা আত্মহত্যা করব। যেখানে শত্রু সবচেয়ে প্রবল, সৈনিকদের সেখানে নিয়ে যেতে আমি প্রস্তুত। যারা বেঁচে থেকে গ্রানাডা নগরীকে শত্রু হস্তে অর্পণ করবে, তাদের মধ্যে গণ্য হওয়ার চেয়ে যারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন-পাত করবে, তাদের মধ্যে গন্য হওয়াকে আমি গৌরবের মনে করি।’ কিন্তু এই তরুণের প্রতিবাদ কোন কাজে আসেনি। সুলতান এবং দরবার আত্নসমর্পণেরই সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার পর গোটা দরবার শিশুর মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শুধু কান্না ছিল না ওই তরুণ সেনাধ্যক্ষের চোখে। সে কান্নার রোলের মধ্যে উঠে দাঁড়াল সেই তরুণ আবার। উচ্চ কন্ঠে বলল, ‘জাতির প্রবীণ সর্দারবৃন্দ, অর্থহীন রোদন আর বিলাপ ছেলেদের ও অবলা নারীদের জন্যে রেখে দিন। আমরা পুরুষ। আমাদের অন্তর অশ্রু বর্ষণের জন্যে সৃষ্টি হয়নি, রক্ত বর্ষণের জন্যে সৃষ্টি হয়েছে। আসুন আমরা স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করতে করতে বীরের মত আত্নবিসর্জন করি। গ্রানাডার উপর যে অন্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রতিকারার্থে মৃত্যুকে বরণ করি। আমাদের মৃত দেহকে আচ্ছাদিত করার জন্যে যদি এক মুঠো মাটিও না জোটে, উদার অন্তহীন আকাশের কখনও অভাব হবে না।’ তরুণ সেনাধ্যক্ষ কথা শেষ করে থামল। সমগ্র দরবার নিরব, নিস্পন্দ। সুলতান আবু আবদুল্লাহ আগ্রহ ভরে দরবারের মুখগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। সাহস, শৌর্য ও আগ্রহের একটি কথাও বিশাল দরবারে একটি কন্ঠ থেকেও উচ্চারিত হল না। দূর্বল চিত্ত সুলতান আবু আবদুল্লাহ কাতর কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আল্লাহু আকবর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তকদীরের বিধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে লাভ নেই। তকদীরের ফলকে অতিস্পষ্টভাবেই লেখা আছে, আমার জীবন হতভাগ্যের জীবনেই পর্যবসিত হবে। সাম্রাজ্য আমার শাসনকালেই বিলুপ্ত হবে।’ অবশেষে আত্নসমর্পণের সিদ্ধান্ত যখন দরবারে চুড়ান্ত হয়ে গেল, আত্নসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষরের জন্যে সুলতানের কলম উত্তোলিত হলো, তখন তরুণ সেনাধ্যক্ষ মুসা ক্রোধ-কম্পিত কন্ঠে শেষবারের মত চিৎকার করে উঠল, ‘আপনারা নিজেদের প্রতারিত করবেন না। মনে ভাববেন না যে, খৃষ্টানেরা তাদের অঙ্গীকার পালন করবে। যে লাঞ্ছনা এবং বিপদ আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি, তার তুলনায় মৃত্যু তুচ্ছ ব্যাপার। আমাদেরই চোখের সামনে আমাদের এই প্রিয় নগরী লুন্ঠিত হবে, আমাদের মসজিদ, এবাদতগৃহ নিগৃহীত, অপমানিত হবে, আমাদের গৃহ-সংসার বিধ্বস্ত হবে, আমাদের স্ত্রী-কন্যারা উৎপীড়িত-ধর্ষিতা হবে। নিষ্ঠুর অত্যাচার, হৃদয়হীন অসহিষ্ণুতা, চাবুক এবং শৃঙ্খল, অন্ধকার কারাগৃহ, মৃত্যুর অগ্নিকুন্ড, ফাঁসির কাষ্ট, এ সবই আমাদের ভাগ্যে জুটবে, মৃত্যুর অগ্নিকুন্ড, ফাঁসির কাষ্ট, এ সবই আমাদের ভাগ্যে জুটবে, এ সবই আমাদের দেখতে হবে, এ সবই আমাদের সহ্য করতে হবে। অন্ততঃ এই সব হতভাগ্য কাপুরুষেরা এসব দেখবে- এখন যারা সম্মানজনক মৃত্যুকে বরণ করতে কুন্ঠিত। আমি নিজের কথা বলতে পারি, ইনশাআল্লাহ, আমার চোখ দিয়ে এসব কখনও দেখবে না।’ তরুণ সেনাধ্যক্ষ মুসা কথা শেষ করে বেরিয় এল দরবার থেকে। সে নেমে এল রাজপথে। কারও সাথে কথা বলল না, কারও দিকে তাকালোও না সে। ঘরে গিয়ে অস্ত্রে-শস্ত্রে নিজেকে সজ্জিত করল, আরোহন করল নিজের প্রিয় অশ্বে। তারপর গ্রানাডা নগরীর ‘এলভিরা’ নামক সিংহদ্বার অতিক্রম করে দৃঢ় পদক্ষেপে যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে চলল।’
থামল আহমদ মুসা। শেষ দিকে তার কন্ঠ ভারি হয়ে উঠেছিল কান্নায়।
জোয়ান ও রবার্তো রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল অভূতপূর্ব কথাগুলো। তাদের চোখ, বিস্ফারিত, উজ্জ্বল।
‘তারপর।’ আহমদ মুসা থামার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল জোয়ান।
‘তারপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। ঘোড় সওয়ার মুসা ফার্ডিন্যান্ডের একটি সেনাদলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। আমৃত্যু লড়েছিল সে। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়েছিল তার দেহ। ভারি বর্ম আচ্ছাদিত মুমূর্ষ দেহ তার ডুবে গিয়েছিল সেনিলের পানিতে।’
আহমদ মুসা থামল। থেমেই আবার শুরু করল, গ্রানাডার দিকে তাকিয়ে সুলতান আবু আবদুল্লাহর আত্ম-সমর্পণ দৃশ্যের পাশাপাশি এই তরুণ সেনাধ্যক্ষের আত্ম-বিসর্জনের দৃশ্যই আমাকে বেশী অভিভূত করে।
আহমদ মুসা মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ের যে চত্তরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, সে চত্তরের এক পাশে পাহাড়ের শীর্ষ চূড়া, অন্য পাশে ছোট বড় চূড়ার দীর্ঘ সারি এগিয়ে গেছে পূর্ব দিকে। চত্তরের পাশেই দু’টি ছোট চূড়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। চূড়া দু’টির মাঝখানে দিয়ে সংকীর্ণ একটা পথ। সে পথটির মাথায় পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে দু’জন যুবক। ওরা চত্তরেই দাঁড়িয়েছিল, তিনজন অপরিচিত যুবক অর্থাৎ আহমদ মুসাদের চূড়ায় উঠতে দেখে তারা পাথরের আড়ালে সরে গেছে।
দু’জন যুবকের কারও বয়সই বাইশের বেশী নয়। চেহারা ও দেহের গড়ন আরবীয় কিন্তু দেহের রং ইউরোপীয়দের মত সাদা, চুল ও চোখ এশীয়দের মত কাল। যুবকদের একজনের চেহারা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, শরীরটাও অত্যন্ত সুগঠিত। নিষ্পাপ হাসিমাখা মুখ, কিন্তু দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা বাজপাখীর মত। এই তরুণের নাম যিয়াদ বিন তারিক। কার্ডোভার বৃদ্ধ একেই স্পেনের নতুন ফ্যাল্কন নামে অভিহিত করেছে। তার সাথের যুবক আবদুল্লাহ তার সর্বক্ষণের সাথী।
যিয়াদ বিন তারিক গ্রানাডার এক পার্বত্য গ্রামের সর্দারের ছেলে। গ্রানাডার দক্ষিণ-পূর্বে সিয়েরা নিবেদা পর্বত শ্রেণীর দক্ষিণ ঢালে পশ্চিমে গোয়াদেল ফো এবং পূর্বে গোয়াদেলজ নদীর মাঝখানে বিশাল এক বনাঞ্চল। এই বিশাল এবং গভীর বনাঞ্চলেরই একটা গ্রামে বাস করে যিয়াদ বিন তারিকের পরিবার। দুর্গম বনাঞ্চলে এই জনবসতি গড়ে উঠার একটা ইতিহাস আছে। গ্রানাডার পতনের পর মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। জোর করে তাদের খৃষ্টান করা হয়, অথবা দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়। বেশীর ভাগ বাঁচার জন্যে খৃষ্টান হওয়ার মহড়া দিল, অনেকে স্পেন থেকে পালিয়ে গেল। কিন্তু অনেকে খৃষ্টানও হলো না এবং স্পেন থেকে পালিয়েও গেল না। গ্রানাডা অঞ্চলের এরাই এসে আশ্রয় নিয়েছিল সিয়েরা নিবেদা দক্ষিণ ঢালের এই দুর্গম বনাঞ্চলে। যিয়াদ বিন তারিকের পরিবার তাদের উত্তরসুরীদেরই একটা অংশ। যিয়াদ বিন তারিক খৃষ্টান ছদ্মনাম নিয়ে গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েছে। সবে সে বেরিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কালেই যিয়াদ বিন তারিক ‘ব্রাদার্স ফর ক্রিসেন্ট’ নামে তরুণদের একটা গ্রুপ গঠন করে। প্রথম দিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছদ্মবেশী মুসলিম তরুণরাই এর সদস্য ছিল। এর সদস্যপদ এখন ছাত্র-তরুণদের বাইরেও বিস্তৃত করা হয়েছে। ‘ব্রাদার্স ফর ক্রিসেন্ট’ এর সদস্যদের নিবেদা পার্বত্যঞ্চলে নিয়ে ট্রেনিং দেয়া হয়।
পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে যিয়াদ বিন তারিক এবং আবদুল্লাহ চত্তরে উঠে আসা নতুন আগন্তুক আহমদ মুসাদের উপর চোখ রেখেছিল। যিয়াদরা প্রথমে মনে করেছিল, আগন্তুকরা কোন খৃষ্টান ভ্রমনকারী হবে, তারা মুরের দীর্ঘশ্বাস পাহাড় এবং ‘দীর্ঘশ্বাস’ এর ঐতিহাসিক চত্তরটা দেখে আনন্দ করতে এসছে। কিন্তু আহমদ মুসার এশীয় চেহারা এবং মুখভাব দেখে তাদের চিন্তা প্রথম হোঁচট খায়। তারা দেখে আগন্তুকদের মুখে হাসি নেই, বরং গম্ভীর বেদনার্ত তাদের মুখ। তাদের মুখে কথাও নেই। কিন্তু তাদের হোঁচট খাওয়া চিন্তা বিস্ময়ে রূপান্ত্মরিত হয় যখন গ্রানাডার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা আহমদ মুসার চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে তারা দেখে। তারপর যখন জোয়ানের সাথে আহমদ মুসার কথা শুরু হলো, যখন আহমদ মুসার কন্ঠ থেকে ফার্ডিন্যান্ডের কাছে আবু আবদুল্লাহর আত্মসমর্পণের বিষাদ -ছবি বেরিয়ে এল, যখন আহমদ মুসা তরুণ সেনাধ্যক্ষ মুসার বিরত্ব ও আত্মবিসর্জনের অভূতপূর্ব মর্মস্পর্শী কাহিনী বর্ণনা করল, তখন অভিভূত যিয়াদ বিন তারিক এবং আবদুল্লাহ আর অশ্রু রোধ করতে পারেনি। তাদের চোখ থেকে নেমে আসে অশ্রু অঝোর ধারায়। পবিত্র, জ্যোতির্ময় মুখের আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে যিয়াদ বিন তারিক কাঁদতে কাঁদতেই আব্দুল্লাহকে বলে, আবদুল্লাহ স্পেনের মুসলমানদের জন্যে এত দরদ তো কারও কন্ঠে শুনিনি, এত অশ্রু তো কারও চোখে দেখেনি, হতভাগ্য সেনাধ্যক্ষের এই কাহিনী তো কেউ কোনদিন এমনভাবে বলেনি। কে এই বিস্ময়কর বিদেশী যুবক আবদুল্লাহ। উঠ, চল যাই। এরপর লুকিয়ে থাকা পাপ হবে।’
বলে যিয়াদ বিন তারিক উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল আব্দুল্লাহ। তারা গিরীপথের দূরত্বটুকু অতিক্রম করে চত্তরের উপর দিয়ে এগোয়। তাদের দু’জনেরই চোখে অশ্রু, অশ্রুতে গন্ড ভেজা।
আহমদ মুসা ওদের দেখতে পেল। দেখতে পেল তাদের চোখের অশ্রুও। বিস্মিত আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই যিয়াদ বিন তারিক সোজা এসে আহমদ মুসাকে বলল, ‘কে আপনি বিদেশী ভাই?’
আহমদ মুসা তাকে নরম কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুমি কে ভাই।’
‘আমি যিয়াদ বিন তারিক।’ বলল আগন্তুক যুবকটি।
‘তুমি যিয়াদ বিন তারিক।’ বলে আহমদ মুসা জড়িয়ে ধরল যিয়াদকে। বলল, ‘আমি তোমার খোঁজেই এখানে এসেছি।’
‘আপনি কে তা কিন্তু বলেননি? আপনার পরিচয়ের জন্যেই আমরা আড়াল থেকে ছুটে এসেছি।’ বলল যিয়াদ।
এগিয়ে এল রবার্তো। আহমদ মুসা ও যিয়াদ বিন তারিকের সামনে এসে যিয়াদকে বলল, ‘যার পরিচয় লাভের জন্যে ছুটে এসেছেন, তিনি আহমদ মুসা।
‘আহমদ মুসা!’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল যিয়াদ।
‘হ্যাঁ, সেই বহু বিপ্লবের নেতা আহমদ মুসা।’
মুখ দিয়ে কোন কথা সরলো না যিয়াদ বিন বিন তারিকের। সে এবং আবদুল্লাহ বিস্ময়-বিস্ফারিত অপলক চোখে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। তারা মুর্তির মত স্থির হয়ে গেছে। কিন্তু অন্তরে তাদের ঝড় বইছে। যাকে নিয়ে তাদের আকাশ স্পর্শী গর্ব, যাকে ঘিরে তাদের হাজারো স্বপ্ন, যিনি কিংবদন্তীর মত মুখে মুখে উচ্চারিত, সেই আহমদ মুসা তাদের সামনে!
আহমদ মুসা যিয়াদ বিন তারিকের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘বিস্মিত হচ্ছ? কেন আমি আসতে পারি না? এক দেশ থেকে আরেক দেশে মানুষ যায় না?’
যিয়াদ আহমদ মুসাকে গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘চোখকে যে বিশ্বাস হচ্ছে না! আল্লাহ আপনাকে স্পেনে আনবেন, এইভাবে আপনাকে পাওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হবে, এ যে আকাশ-কুসুম কল্পনা আমাদের জন্যে। বিশ্বের মুসলমানরা যে আমাদের কথা ভুলেই গেছে, আমাদের তারা বাদ দিয়ে রেখেছে তাদের তালিকা থেকে।’
আহমদ মুসা যিয়াদের পিঠ চাপড়ে বলল, ‘না বিশ্বের মুসলমানরা তোমাদের ভোলেনি। মাদ্রিদের শাহ ফয়সাল মসজিদ কমপ্লেক্স- এর কথা ভুলে যাচ্ছ কেন?’
এই দান এসেছে শত শত বছর পরে। বলল যিয়াদ।
তোমার কথা ঠিক যিয়াদ কিন্তু তোমাকে একটা বিষয় স্বীকার করতে হবে। ইসলামী বিশ্বের দূর্ভাগ্য শুরু হবার পর স্পেনের দূর্ভাগ্যের সূত্রপাত। সমগ্র উত্তর আফ্রিকা তখন খন্ড-বিখন্ড এবং পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত। সুতরাং সাহায্য যেখান থেকে সবচেয়ে সহজে আসতে পারতো, সেখান থেকে আসতে পারেনি। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে তখন তুর্কি সাম্রাজ্য শক্তিশালী, কিন্তু সাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে পৌছা তার সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
জানি জনাব, আমি স্পেনের দূর্ভাগা মুসলমানদের একটা আবেগের কথা বলেছি। তাদের কেউ সাহায্য করতে না পারুক, তাদের উপর শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে যা ঘটে আসছে, তার কোন প্রতিবাদও মুসলিম বিশ্বের কোথাও থেকে উত্থিত হয়নি। কারও চোখ থেকে অশ্রুও ঝরেনি। বলল, যিয়াদ।
এই আবেগকে আমি শ্রদ্ধা করি যিয়াদ এবং মুসলিম শক্তিগুলোর ব্যর্থতাকেও আমি স্বীকার করি। তুর্কি সাম্রাজ্যে খৃষ্টান প্রাজারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে বেশী সুবিধা ভোগ করছে, কিন্তু তারপরও তুর্কি সাম্রাজ্যের খৃষ্টান প্রজাদের কাল্পনিক দুঃখ-দুর্দশার শ্লোগান তুলে ইউরোপীয় খৃস্টান শক্তিগুলো চিৎকার করেছে, কিন্তু মুসলিম শক্তিগুলো মুসলমানদের উপর জলজ্যান্ত খৃস্টান নির্যাতনের বিরুদ্ধে টু-শব্দটিও করেনি। এর জন্যে আফসোস করে কোন লাভ নেই। সে সময় প্রকৃত অর্থে অনেক জায়গায় মুসলমানরা ক্ষমতায় থাকলেও ইসলাম ক্ষমতায় ছিল না। আহমদ মুসা থামল।
ধন্যবাদ জনাব। অতীতের জন্য কোন ক্ষোভ নেই, কোন দুঃখ নেই এখন আর। আজ আপনাকে পেয়ে সব যেন শেষ হয়ে গেছে, সব ক্ষতির পূরণ হয়েছে।
একটু থামল যিয়াদ। রুমাল দিয়ে চোখটা ভালো করে মুছে নিয়ে বলল, এখনও আমার কাছে স্বপ্নই মনে হচ্ছে যে, আমি আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে। ভয় হচ্ছে স্বপ্ন না ভেঙ্গে যায়। কিভাবে আপনি হঠাৎ এখানে হাজির হলেন? যিয়াদের কথাগুলো শেষের দিকে আবেগে ভারি হয়ে উঠেছিল।
হঠাৎ নয় অনেক ঘটনা পাড়ি দিয়ে আমি তোমার এখানে পৌঁছেছি। ইতোমধ্যে দু’বার আমি ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এর হাতে পড়েছি, অনেক ঘটনা ঘটেছে।
ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এর হাতে দু’বার বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল যিয়াদ।
তোমাদের মাদ্রিদ বিমান বন্দরে পা দিয়েই প্রথমবার।
তারপর?
বলব সব কাহিনী।
আমরা খুব খুশী হবো। আচ্ছা বলুন, আমার নাম জানলেন কি করে, আর আমাদের খোঁজে এই স্থানেই বা এলেন কি করে?
আহমদ মুসা কর্ডোভার গোয়াদেল কুইভার ব্রীজের সেই বৃদ্ধের সব কাহিনী শোনাল।
সব শুনে যিয়াদ বলল, হ্যাঁ, বৃদ্ধ আমার সব কথা জানে। ছাত্র জীবন থেকেই এই বৃদ্ধকে আমি দেখছি, তখন থেকেই তার সাথে আমার পরিচয়। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ আজ হতাশ বটে, কিন্তু তার ভেতরে আগুন আছে, সে আগুন আমার পথকেও অনেক খানি আলোকিত করেছে।
বৃদ্ধ আমার কাছে মুসলিম স্পেনের প্রতিকৃতি।
একটু ভেবে যিয়াদ বলল, ঠিক বলেছেন। স্পেনের মুসলমানরা সর্বস্ব হারিয়েছে, সেও। স্পেনের মুসলমানরা যেমন হতাশ, বৃদ্ধও তেমনি। লাঞ্ছনা-গঞ্জনা যেমন স্পেনের মুসলমানদের প্রতিদিনের সাথী, তেমনি তারও।
আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, নামাজ সেরে নিয়ে আমরা ফিরতে পারি। বলল, যিয়াদের সাথী আব্দুল্লাহ।
যিয়াদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক বলেছ। নামাজের সময়ও হয়ে গেছে।
নামাজের জন্য সবাই প্রস্তুত হলো।
আহমদ মুসা ইমামের জায়গায় যিয়াদকে ঠেলে দিল। যিয়াদ দ্রুত পেছনে সরে এসে বলল, অসম্ভব, আমি ঐ জায়গায় দাঁড়াতে পারিনা। আপনি আমাদের ইমাম সব ক্ষেত্রের জন্যেই।
নামাজ শেষে আহমদ মুসা ফিরে বসল। যিয়াদ বলল, এখান থেকে দুই মাইল পূর্বে পাহাড়ের এক গুহায় আমাদের একটা আস্তানা। ওটা আমাদের একটা বিশ্রাম কেন্দ্র। কিন্তু আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে চাই সিয়েরা নিবেদার বনাঞ্চলে আমাদের আসল ঘাঁটিতে। এই ঐতিহাসিক বনাঞ্চলই ছিল ফ্যালকন অব স্পেন বশীর বিন মুগীরার কর্মক্ষেত্র।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, খুব আনন্দের হবে এই সফর, তোমাদের ব্যবস্থাদিও দেখতে পাব। কিন্তু যিয়াদ, খুব বেশী সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। আমি যে বড় কাজটি নিয়ে এখানে এসেছি তাতে এখনও হাত দেয়াই হয়নি।
কি সেটা? সাগ্রহে প্রশ্ন করল যিয়াদ।
বলব তোমাকে? ভয়াবহ ষড়যন্ত্র এঁটেছে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান।
চোখে-মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল যিয়াদের এবং সকলের। যে ষড়যন্ত্রকে স্বয়ং আহমদ মুসা ভয়াবহ বলে এবং যার জন্যে সে নিজে স্পেনে এসেছে সেটা নিশ্চয় খুব বড় ব্যাপার তা সকলেই হৃদয় নিয়ে অনুভব করল। সকলেই গম্ভীর হয়ে গেল।
‘বন্দর নগরী মিত্রালীতেও আমাদের একটা ঘাঁটি আছে। ওখানেই আমরা আপাততঃ যেতে পারতাম, তারপর কোন সুযোগে না হয় নিবেদায় যেতাম। কিন্তু আমাদের এক কর্মীর সামান্য এক ভুলের কারণে ঘাঁটিটি সরকারের চোখে পড়ে গেছে। আজ সকালে খবর পেয়েছি ব্যাপারটা ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানও জেনে ফেলেছে। গত সন্ধ্যা থেকেই মাথা মুন্ডিত কে একজন বাড়িটার উপর চোখ রেখেছে। আমার আম্মা অসুস্থ। আমার আম্মা ও স্ত্রী ওখানেই আছেন। আমি সকালেই জানিয়ে দিয়েছি তাদেরকে সকালের মধ্যেই নিবেদায় নিয়ে যেতে। সুতরাং সেখানে আমাদের যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বলল, যিয়াদ।
আমি তোমাদের নিবেদায় যাব, তুমি নিষেধ করলেও আমাকে যেতেই হবে বদর বিন মুগীরা আর যিয়াদ বিন তারিকের স্বাধীন সাম্রাজ্যে। কিন্তু যিয়াদ আমি ভাবছি ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের নজরে যদি পড়েই থাকে তোমাদের ঘাঁটি, তাহলে কি তোমার পরিবার নিরাপদে সরতে পারবে?
দিনের বেলা, লোকজনও আমাদের আছে। অসুবিধা হবে না জনাব। বলল যিয়াদ।
আহমদ মুসার মন থেকে অস্বস্থি গেল না। উঠে দাঁড়াল সে। বলল, আমরা তাহলে এখন যাত্রা শুরু করতে পারি।
উঠে দাঁড়াল সকলে।
আহমদ মুসা যাবার আগে আরেকবার গ্রানাডার দিকে তাকাল। তার পাশে যিয়াদ।
আহমদ মুসা আনমনা হয়ে গিয়েছিল গ্রানাডার দিকে তাকিয়ে।
যিয়াদও তাকিয়েছিল গ্রানাডার দিকে। গ্রানাডা যিয়াদের আবাল্য পরিচিত। কিন্তু আহমদ মুসার পাশে দাঁড়িয়ে গ্রানাডাকে তার আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম লাগছে। মনে হচ্ছে এ তার পরিচিত গ্রানাডা নয়, ইসলামের, মুসলমানদের, তাহলে কি তিনি এই সাম্রাজ্যের চাবী ঐভাবে ফার্ডিন্যান্ডের হাতে তুলে দিতে পারতেন? পারতেন না। পেরেছেন কারণ, সাম্রাজ্যটা তার ব্যক্তিগত ছিল, ইসলামের নয়, মুসলমানদের নয়। অন্যদিকে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা এই সাম্রাজ্য দখল করেছিল তাদের ধর্মের নামে, সৈন্যেরা যুদ্ধও করেছিল তাদের ধর্মের জন্য। গ্রানাডার দূর্গশীর্ষে প্রথম উঠেছিল ক্রস। এই ক্রস উত্তোলিত করেছিলেন তাদের দেশের ধর্মগুরু। ক্রসের পর উত্তোলিত হয়েছিল রাজার পতাকা। যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে গ্রানাডার নিকটে ভেগা প্রান্তরে রানী ইসাবেলার নির্দেশে একটি সুন্দর নগরী নির্মিত হয়। সকলে বলেছিল এ নগরীর নাম ইসাবেলা রাখা হোক। কিন্তু রানী তা করেননি। ঐতিহাসিক আন্টিনিও আগানিতা বলেছেন, ধর্মপ্রাণ দেশবাসী যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই নগরীর সৃষ্টি সেই উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রাখবার জন্যে নগরীর নাম সান্টা ফে অর্থাৎ পবিত্র ধর্মের নগরী রাখলেন। এই ধরনের গভীর ধর্মনিষ্ট মানসিকতা সুলতান আবু আব্দুল্লাহর ছিল না, তার বাহিনীর ছিল না এবং তখনকার গ্রানাডাবাসীরও ছিল না। অর্থাৎ তুমি বলতে পার যিয়াদ, ৭১১ খৃস্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদ এবং মুসা বিন নুসায়ের ইসলামের যে পতাকা নিয়ে স্পেন জয় করেছিলেন, সেই পতাকা পরে ভূ-লন্ঠিত হয় এবং তার জায়গায় ওঠে ব্যক্তির পতাকা, গোষ্ঠীর পতাকা। তুমি হয়তো জান যিয়াদ, স্পেনে তৃতীয় আব্দুর রহমানের মত হুসিয়ারী লোকও তাঁর পাশে মহিষী জোহরার নাম অক্ষয় করে রাখার জন্য কর্ডোভার পাশে আজ-জোহরা নামক এক উপনগরী নির্মাণে এমনই মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যে, পরপর তিন শুক্রবার তিনি জুম্মার জামায়াতে হাজির হতে পারেননি, যার জন্য প্রচন্ড ধমক খেতে হয়েছিল তাকে ইমামের কাছে।’
শত শত বছর আগের আবু আব্দুল্লাহর গ্রানাডা যেন জীবন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যিয়াদের মুখ ফেটেই যেন একটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল, ‘গ্রানাডার কেন পতন হয়েছিল, আপনার উল্লেখিত সেই সেনাধ্যক্ষ মুসার আবেদন কেন কন কাজে আসেনি, কেন পরাজিত হয়েছিলো মুসলমানরা মুসা ভাই?’
আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। পরে একটু ম্লান হাসল। তারপর ধীর কন্ঠে শুরু করল, ‘এই চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে গ্রানাডার দিকে তাকিয়ে সুলতান আবু আবদুল্লাহ যখন শিশুর মত কাঁদছিল, তখন সুলতানের মা বীর নারী আয়েশাতুল হুররা কি বলেছিলেন জান? বলেছিলেন, ‘যে রাজ্য পুরুষের মত তুমি রক্ষা করতে পারনি, তার জন্যে নারীর মত অশ্রু বিসর্জন তোমারই শোভা পায়।’ অন্য দিকে আল হামরা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে আবু আবদুল্লাহ খৃষ্টান সেনাপতিকে যখন প্রাসাদে ঢুকার পথ করে দিয়েছিলেন, দূর্গশীর্ষে পতাকা উত্তোলনের জন্যে, তখন তিনি অর্থাৎ আবু আবদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘সেনাপতি যান, দূর্গ আপনি হস্তগত করুন। এ বৈভব আল্লাহ আপনার শক্তিশালী প্রভূকে অর্পণ করেছেন মুরদের পাপের শাস্তির জন্যে।’ এই দুই উক্তির মধ্যে তিনটি কারণ আমরা দেখি, এক, রাজ্য রক্ষাই তখন শাসকদের কাছে ছিল মুখ্য, মুসলিম কিংবা মুসলমানদের ধর্ম রক্ষা নয়। দুই, রাজ্য রক্ষার মত পৌরুষ শাসকদের ছিল না। তিন, পরাজয় ছিল শাসকদের পাপের শাস্তি। প্রথম কারণটিই মূল কারণ। মূল কারণ থেকে শেষের দু’টি কারণ সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের রক্ষা ইসলাম রক্ষা যদি শাসকদের লক্ষ্য হতো, তাহলে তাদের মধ্যে বিভেদ ষড়যন্ত্রের জায়গায় ঐক্য এবং দূর্বলতার বদলে পৌরুষ সৃষ্টি হতো, ভোগ সর্বস্বতা ও পাপাচার দূরে সরে যেত এবং তাদের পরাজয় ঘটত না। ভেবে দেখ যিয়াদ, সুলতান আবু আবদুল্লাহ যদি মনে করতেন এই গ্রানাডা, এই কর্ডোভা, এই সাম্রাজ্য তার নয়।’
থামল আহমদ মুসা।
তারপর আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, আমরা তো চলতে পারি।
‘আহমদ মুসা ভাই, সুলতান আবু আবদুল্লাহ তাহলে ঠিকই বলেছিল, খৃষ্টান ফার্ডিন্যান্ড ও রানী ইসাবেলার কাছে মুসলিম স্পেনের আত্মসমর্পণ মুরদের পাপেরই কথা।’ বলল যিয়াদ।
বলতে বলতে সামনে পা বাড়াল যিয়াদ বিন তারিক। আহমদ মুসাও হাঁটতে শুরু করেছিল। বলল, ‘অবশ্যই। তবে এই পাপ স্পেনের জনতার ছিল না, মুসা, বদর বিন মুগীরা, প্রমুখ ছিলেন এঁদেরই প্রতিনিধি। কিন্তু দায়ী তারা না হলেও পাপের মাশুল তাদেরকেই দিতে হয়েছে ষোল আনা।’
‘কেন মুসা ভাই, এমনটি হলো কেন, শাসকদের পাপের জন্যে নিরপরাধ মুসলমানরা মার খেল কেন?’ বলল জোয়ান।
‘এটাই নিয়ম জোয়ান। পাইলটের দোষে প্লেন ক্রাশ হলে নিরপরাধ যাত্রীরাও বাঁচে না। স্পেনের মুসলিম প্রজাদের দায়িত্ব শুধু খাজনা দেয়া ছিল না, রাজাকে সংশোধন করা, ঠিক পথে চালনা করা, রাজার সমালোচনা করা, ইত্যাদি তাদেরই দায়িত্ব ছিল। তারা সে দায়িত্ব পালন করেনি।’
‘দুনিয়ার অনেক দেশের মুসলমানরা এমন দোষে দোষী, কিন্তু স্পেনের মুসলমানদের ভুলের মাশুল হয়েছে অত্যন্ত ভয়াবহ।’ ভারী কন্ঠে বলল রবার্তো।
‘ঠিক বলেছ ভাই।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আহমদ মুসা।
চত্ত্বর থেকে তারা নেমে এল পাহাড়ের গায়ে। তারা পাঁচজন পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে লাগল ধীরে ধীরে।
পাঁচজনের এ মিছিলের সারিতে প্রথমে আহমদ মুসা, তারপর যিয়াদ বিন তারিক। পরে ওরা তিনজন- আবদুল্লাহ, জোয়ান ও রবার্তো।

আহমদ মুসার গাড়ী ছুটছে গ্রানাডা হাইওয়ে ধরে দক্ষিণে মিত্রালীর দিকে। ড্রাইভিং সিটে যিয়াদ বিন তারিক।
কিন্তু গন্তব্যস্থল তাদের মিত্রালী নয়।
গ্রানাডা হাইওয়ে যেখানে গোয়াদেলফো নদী অতিক্রম করে মিত্রালীর দিকে এগিয়ে গেছে, সেখানে গোয়াদেলা নামে ছোট শহর গড়ে উঠেছে। এখান থেকে যিয়াদ বিন তারিকদেরকে নদী পথে যেতে হবে তাদের প্রধান ঘাঁটিতে নিবেদার জংগলে যেতে হলে। এই শহরকে লক্ষ্য করেই ছুটছে মুসার গাড়ি।
ড্রাইভিং সিটে যিয়াদ বিন তারিক। আহমদ মুসা তার পাশের সিটে। আর ওরা তিনজন বসেছে পেছনের সিটে।
দু’পাশে পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা। এর মধ্যে দিয়েই এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে গ্রানাডা হাইওয়ে।
মাঝারি গতিতে এগিয়ে চলছিল যিয়াদের গাড়ি।
কথা বলে উঠল যিয়াদ। বলল, ‘মোটামুটি আপনার সব খবরই পত্রিকায় আসে। আপনি আর্মেনিয়ায় এসেছেন, আর্মেনিয়া থেকে বলকানে গেছেন তাও আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু আপনার স্পেনে আসার খবর এখনও প্রকাশ হয়নি।’
‘সরকার ও সাংবাদিকরা এখনও জানার কথা নয়। প্রথমবার যখন ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের হাতে পড়ি, ওরা আমাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু দ্বিতীয়বার বন্দী হবার পর ভাসকুয়েজ আমাকে চিনতে পারে। মনে হয় তারা সাংবাদিকদের জানায়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনাকে চেনার পর ওরা তো সাংঘাতিক ক্ষেপে যাবার কথা।’ বলল যিয়াদ।
‘আমি যে রাতে বেরিয়ে আসি, তারপর দিন সকালেই আমাকে হত্যা করা কিংবা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ছিল।’
‘বিক্রি করা, কোথায়?’
‘ওরা এক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে আমাকে আমেরিকান ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের কাছে বিক্রি করেছিল। সেদিন সকালেই আমাকে আমেরিকার পথে আকাশে উড়তে হতো।’
‘আল্লাহর হাজার শোকরিয়ে যে তা হয়নি। আপনাকে কোথায় রেখেছিল? কিভাবে বেরুলেন? এটা প্রচলিত আছে যে, ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের হাতে পড়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া।’
‘সে অনেক কাহিনী, পরে বলব।’
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার বলল, ‘মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া সরকার অনেক দূরে, ফিলিস্তিন সরকারের সাথে কোন সময় তোমরা যোগাযোগ করনি? তারা তো আনন্দের সাথেই তোমাদের সাহায্য করতো।’
‘দূতাবাসের সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের একটা ডেলিগেশনকে আমন্ত্রণ করেছে। কিন্তু কিভাবে যাওয়া হবে এটা ঠিক হয়নি এখনও। তবে সৌদি দূতাবাস এই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিয়েছে।’
‘মুসলমানদের বিভিন্ন ব্যাপারে সৌদি আরব তো সাহায্য করে থাকে।’
‘আমরা যোগাযোগটা খুব সম্প্রতি করেছি। মানবিক সাহায্য আমরা পেয়েছি। মসজিদ ও মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার, নির্মাণ, ব্যবহার এখনও এখানে নিষিদ্ধ। সৌদি সরকার চেষ্টা করছে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়ে নেবার জন্যে। সেটা সম্ভব হলে একটা বড় কাজ হবে।’
কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ আহমদ মুসা থেমে গেল, উৎকর্ণ হয়ে উঠল।
সামনে দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল। ঐ গাড়ি থেকেই হর্ন শোনা গেছে।
আহমদ মুসাকে উৎকর্ণ হতে দেখে যিয়াদও সতর্ক হয়ে উঠেছিল।
‘সামনের গাড়িটা ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের যিয়াদ।’ বলল আহমদ মুসা।
সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার তখন চারদিকে। সূর্য বেশ আগে ডুবেছে। কিন্তু উন্মুক্ত প্রান্তর বলেই
অন্ধকারটা গাঢ় হয়নি।
বলতে বলতেই গাড়িটা সামনে এসে গেল। গাড়িটা মাইক্রোবাস।
আহমদ মুসা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল। লক্ষ্য নাম্বারটা দেখে নেয়া।
ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের গাড়িটা চলে গেল।
‘আপনি কি করে জানলেন ওটা ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের গাড়ি?’ বলল যিয়াদ।
‘ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যান কয়েকটা নির্দিষ্ট কোডে হর্ন বাজায়।’
সামনে আরেকটা হেড লাইট তীব্র বেগে এগিয়ে আসছে। যিয়াদ সেদিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন
কন্ঠে বলল, ‘মুসা ভাই, ওটা ‘ব্রাদার্স ফর ক্রিসেন্ট’-এর গাড়ি। কিন্তু এ সময় এ দিকে কেন?’
ভ্রু কুঁচকে গেল আহমদ মুসার। তার মনের সুপ্ত সন্দেহটা এবার শতকণ্ঠে কথা বলে উঠল। আহমদ মুসা দ্রুত কন্ঠে বলল, গাড়ি ঘুরিয়ে নাও যিয়াদ।
যিয়াদ একবার অবাক ও উদ্বিগ্ন চোখে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তার নির্দেশ পালন করল। এ সময় সামনের গাড়িটাও এসে পড়ল। আগেই সংকেত দিয়েছিল যিয়াদ। গাড়িটা এসে দাঁড়াল যিয়াদের পাশে।
গাড়ি থেকে নামল যিয়াদের ছোট ভাই জায়েদ। কেঁদে উঠল। বলল, আম্মা ও ভাবীকে কিডন্যাপ করেছে।
যিয়াদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাধা দিয়ে বলল, ‘যিয়াদ আমি সব বুঝেছি, তুমি এ সিটে এস, আমাকে ড্রাইভিং সিট দাও।’
বিনা বাক্যব্যয়ে যিয়াদ সরে এল, আহমদ মুসা গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। আহমদ মুসা জানালা দিয়ে জায়েদকে লক্ষ্য করে বলল, আমাদেরকে যদি হারিয়ে ফেল, তাহলে গ্রানাডার দক্ষিন গেটে দাঁড়াবে।
বলে আহমদ মুসা স্টার্ট দিল গাড়িতে। দেখতে দেখতে গাড়ির গতি ১৩৯ কি.মি. তে গিয়ে উঠল। ঝড়ের বেগে চলছে গাড়ি। গতির চাপে গাড়ি থর থর করে কাঁপছে।
যিয়াদের উদ্বিগ্ন চোখ আহমদ মুসার দিকে। আঁকা-বাঁকা রাস্তায়, তার উপর রাতের বেলায় এই গতি বেগ। কিন্তু যিয়াদ দেখল, আহমদ মুসা খেলনার মত ঘুরিয়ে নিচ্ছে গাড়ি প্রতিটি বাঁকে। গাড়ি যেন নিজেই প্রান পেয়েছে, নিজেই পথ দেখে নিখুঁত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল যিয়াদের মন, চোখটাও তার ভারি হয়ে উঠল। আজ এই মুহূর্তে এমন গতিবেগই তো দরকার। আহমদ মুসা সন্দেহ করেছে ঐ মাইক্রোবাসকে। ওটা তো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যিয়াদের চোখের সামনে ভেসে উঠল অসুস্থ মা আর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী’র ছবি। হৃদয় তার বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পাঠ করল সে, ‘আল্লাহই যথেষ্ঠ, তিনিই অভিভাবক এবং তিনিই সাহায্যদাতা।’ তারপর সে চোখ তুলল আহমদ মুসার দিকে। দেখল, তার মুখ প্রশান্ত, সেখানে কোন উদ্বেগের চিহ্ন নেই। মনে অনেক সান্ত্বনা পেল যিয়াদ। আজ তার ভীষণ বিপদের দিনে আল্লাহর বান্দাহদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিটি তার পাশে রয়েছে।
গাড়ি স্টার্ট দেয়ার পর আহমদ মুসা একটি কথাও বলেনি। মাঝখানে সে একবার ঘড়ি দেখেছে। আরেকবার ঘড়ির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, এই গ্রনাডা হাইওয়ে ছাড়া গ্রানাডায় পোঁছার বিকল্প কোন পথ আছে যিয়াদ?
‘জি না, নেই।’
‘হিসেব অনুযায়ী আমরা গাড়ি স্টার্ট দেয়ার সময় মাইক্রোবাস থেকে ১৬ মিনিট পেছনে ছিলাম। ১২ মিনিট এসেছি। মাইক্রোবাস যদি রাস্তা না বদলায়, কিংবা স্পিড যদি না বাড়িয়ে থাকে, তাহলে আর চার মিনিট পড় মাইক্রোবাসের পেছনের আলো আমরা দেখতে পাব।’
যিয়াদ, আবদুল্লাহ, জোয়ান, রবার্তো সকলেই আহমদ মুসার হিসেব শুনে বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
‘আমরা কোথায় এসেছি যিয়াদ?’
‘ফেজ আল্লাহু আকবর পাহাড় আমরা পার হয়ে এসেছি মুসা ভাই।’
‘তাহলে গ্রানাডা আর পাঁচ মাইল?’
‘জি।’
‘তাহলে মনে হচ্ছে গ্রানাডার গেটের মাইল খানেকের মধ্যে ওদের সাক্ষাৎ আমরা পাব।’
‘যায়েদদের গাড়ি দেখতে পাও আবদুল্লাহ?’ পেছন ফিরে জিজ্ঞাসা করল যিয়াদ।
‘না, পাঁচ মিনিট পর থেকে ওদের আর দেখা যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে অনেক পেছনে পড়েছে।’ বলল আবদুল্লাহ।
গ্রানাডার দক্ষিন গেট তখন আহমদ মুসার গাড়ি থেকে সিকি মাইলেরও কম। এই সময় একটি গাড়ির পেছনের পেছনের দু’টি লাল আলো আহমদ মুসাদের চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে উঠল। আহমদ মুসা আরও কিছুটা এগুনোর পর বলল, এটাই সেই মাইক্রোবাস। যখন গ্রানাডার গেটে মাইক্রোবাসটি, তখন তার নাম্বার স্পষ্ট হয়ে উঠল। আহমদ মুসা বলল, এবার নিশ্চিত কন্ঠে, ‘নাম্বারও মিলে গেছে যিয়াদ। আমরা ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের গাড়িটা পেয়ে গেছি।’
মাইক্রোবাসটি নগরীর ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসার গাড়ি তাকে অনুসরণ করল।
সন্ধ্যা তখন ৭টা।
দু’পাশে ব্যস্ত বিপনী। মাঝখানে প্রশস্ত রাস্তা। গ্রানাডার নতুন অংশ এটা।
গাড়ির স্পিড অনেক কমে গেছে। গজ দশেক দূর থেকে মাইক্রোবাসটিকে অনুসরণ করছে আহমদ মুসা। রাস্তায় ভীড় কম।
নগরীতে ঢোকার পর একই রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছিল তারা। যিয়াদ জানাল, এ রাস্তার নামের অর্থ ডি-টেন্ডেলা সার্কুলার রোড। ফার্ডিন্যান্ডের সেনাপতি অধিকৃত গ্রানাডার প্রথম গভর্নরের নাম অনুসারেই এ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। এ রাস্তাটি নগরীর সবচেয়ে বড় রাস্তা, গোটা গ্রানাডাকে চক্রাকারে বেষ্টন করে আছে।
রাস্তা নগরীর একদম পশ্চিম প্রান্তে। মাইক্রোবাসটি ডি-টেন্ডেলা সার্কুলার রোড থেকে নেমে প্রাচীর ঘেরা দু’তলা একটা বাড়ির গেটে গিয়ে তাঁগাল। দাঁড়িয়ে হর্ন দেয়ার কয়েক মুহূর্ত পরে গেটটি খুলে গেল। মাইক্রোবাসটি ভেতরে ঢুকে গেল। রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসারা দেখল এটা।
মাইক্রোবাসটি যখন ভেতরে ঢুকে গেল এবং গেটটি আবার বন্ধ হয়ে গেল বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল যিয়াদের। এক অশুভ আশংকায় গোটা গা কাঁটা দিয়ে উঠল তার।
আহমদ মুসা বোধ হয় টের পেল ব্যাপারটা। যিয়াদের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার স্বরে বলল, ‘ভেব না যিয়াদ, আল্লাহ আছেন।’
যিয়াদ মুখ ফিরিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। ভেতর থেকে একটা উচ্ছ্বাস উঠে মুহূর্তের জন্যে তার কন্ঠকে রুদ্ধ করে দিল। তার ঠোঁট কাঁপল।
আহমদ মুসা যিয়াদের চিন্তার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেবার জন্যে বলল, ‘শহরের এই এলাকা তুমি চেন যিয়াদ?’
‘জি হ্যাঁ।’ গলা পরিষ্কার করে বলল যিয়াদ।
‘কমার্শিয়াল এলাকা মনে হচ্ছে, তাই কি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু লোকজন কম কেন?’
‘মাগরিবের পর থেকেই এখানে মার্কেটে লোক কমতে থাকে, এটাই গ্রানাডার নিয়ম।’
আহমদ মুসা মাইক্রোবাসটি যে বাড়িতে ঢুকল, সেদিকে চেয়ে বলল, বাড়িটিতে কোন সাইনবোর্ড
নেই, একে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের অফিস মনে কর?’
‘অফিস এবং বাসা দুই-ই হতে পারে।’
আহমদ মুসা পেছন দিকে ফিরে জোয়ানকে বলল, ‘তোমর পিস্তলটা আমাকে ধার দাও জোয়ান।’
বলে আহমদ মুসা নিজের পিস্তলটা বের করল। পরীক্ষা করল ছয়টি গুলিই আছে।
জোয়ান তার পিস্তলটি বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল। আহমদ মুসা সে পিস্তলটি পরীক্ষা করে
হাঁটুর নীচে প্লাস্টিক টেপ দিয়ে বেঁধে রাখল।
তারপর যিয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কাছে পিস্তল আছে নিশ্চয়?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘আমরা, মানে আমি আর তুমি, এখন এ বাড়িতে প্রবেশ করব। তুমি রেডি?’
‘জি হ্যাঁ।’ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল যিয়াদের। যিয়াদের দুর্বলতা কেটে গেছে দেখে খুশী হলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা পেছন দিকে আবদুল্লাহর দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি এসে ড্রাইভিং সিটে বস। আমরা না ফেরা পর্যন্ত এ ক্ষুদ্র দলটির নেতা তুমি।’
আহমদ মুসা ‘বিসমিল্লাহ’ বলে নামল গাড়ি থেকে। ওদিকে যিয়াদও নেমে পড়ল।
শুকনো মুখে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল আবদুল্লাহ। জোয়ান ও রবার্তোর মুখ উদ্বেগ-উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে।
মেইন রোড এবং ঐ বাড়িটির মাঝখানের এই জায়গায় কোন আলো নেই। বাড়িটির গেটের আলোও শেডে ঢাকা। সুতরাং মধ্যবর্তী স্থানটি বেশ অন্ধকার।
বাড়িটিও অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। গেটের শেডে ঢাকা আলোটি ছাড়া প্রাচীরের আর কোথাও আলো নেই।
বাড়ির চারদিক ঘুরে দেখলো আহমদ মুসা ও যিয়াদ। ছোট্ট একটা টিলার উপর বাড়িটা। পাচীরের ভেতর গাছ-গাছড়া আছে। প্রাচীরটাও ৭ ফুটের বেশী উঁচু হবে না। আহমদ মুসা লাফ দিয়ে উঠে প্রাচীরের মাথাটাও পরীক্ষা করলো, না বিদ্যূতায়িত করার মত কোন তারের ব্যবস্থাও নেই। অনেকটা বিস্ময়ের সাথেই আহমদ মুসা বলল, ‘অফিসের নিরাপত্তার ব্যপারে খুব তো চিন্তা করেনি ক্লু-ক্ল্যাক্স- ক্ল্যান?’
‘ওদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারে এটা ওরা মনে করে না মুসা ভাই, অন্ততঃ কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল সহ আন্দালুসিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে ওদের এটা বদ্ধমুল ধারণা।’
‘শত্রুর অতিরিক্ত আত্ন-বিশ্বাস থাকাটা ভাল।’
বাড়ির পেছন দিকে প্রাচীরের অন্ধকার মত এক জায়গায় এসে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বাড়ির পেছনে প্রাচীরের ভেতর এলাকায় মাত্র দু’টি আলো।
দাঁড়ানোর পর আহমদ মুসা যিয়াদকে বলল, ‘তুমি আমার কাঁধে উঠে ভেতরটা দেখ।’
বলে আহমদ মুসা বসে পড়ল।
যিয়াদ দ্বিধা করতে লাগল আহমদ মুসার কাঁধে পা রেখে উঠতে।
‘আমার নির্দেশ যিয়াদ, দেরী করো না।’ দৃঢ় কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গে যিয়াদ নির্দেশ পালন করল।
ভেতরটা দেখে আহমদ মুসার কাঁধে বসে ফিসফিস করে বলল, ঠিক আমাদের সোজা প্রাচীরের নিচে দু’জন প্রহরী একটা পাথরে বসে গল্প করছে। স্টেনগান তাদের পাশে রাখা।
‘তুমি প্রাচীরের মাথা ধরে ঝুলে থাক। আমি প্রাচীরে উঠার পর তুমি উঠবে।’ বলল আহমদ মুসা।
যিয়াদ আহমদ মুসার কাঁধ থেকে প্রাচীরে ঝুলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা একটু দৌড় দিয়ে এসে প্রাচীরের গায়ে লাফ দিয়ে উঠে প্রাচীরের মাথা ধরে তাতে উঠে বসল এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রাচীর থেকে গজ দু’য়েক দূরে পাথরের উপর বসে গল্পরত দু’জন প্রহরীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শেষে মুহুর্তে প্রহরী দু’জন টের পেয়েছিল কি ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের সাবধান হবার সুযোগ দিল না।
আহমদ মুসা পাখির মত দু’হাত মেলে ঝাপটে ধরার মত করে ওদের ঘাড়ের উপর পড়ল। বসা অবস্থায়ই দু’জন প্রহরী মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
পড়েই আহমদ মুসা পিস্তল বের করে নিয়েছে হাতে। প্রহরী দু’জন ভূমি শয্যা থেকে উঠার চেষ্টা করছিল। আহমদ মুসা উঠে বসে ওদের দিকে পিস্তল তুলে বলল, যেমন আছ তেমন থাক, উঠার চেষ্টা করলে মাথা গুড়িয়ে দেব।
প্রহরী দু’জন মিট মিট করে আহমদ মুসার দিকে চাইল, উঠার আর চেষ্টা করল না।
যিয়াদও লাফিয়ে পড়ল আহমদ মুসার পাশেই। আহমদ মুসা যিয়াদকে বলল, ওদের জামা ছিঁড়ে ওদের মুখে পুরে দাও, পিছমোড়া করে ওদের হাত-পা বেঁধে ফেল।’
বলে সে পকেট থেকে সরু প্লাস্টিক কর্ড বের করে দিল।
বাঁধা হয়ে গেলে আহমদ মুসা ও যিয়াদ দু’জনে ওদেরকে টেনে নিয়ে পাশেই গাছের নিচে অন্ধকারে রেখে দিল।
বাড়িটির পেছনের এ অংশটায় অনেকগুলো গাছ।
আহমদ মুসা ও যিয়াদ গাছের ছায়া ধরে গুটি গুটি বাড়ির দিকে এগুলো।
বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তারা। শেষ গাছটার যে অন্ধকার তারা অতিক্রম করেছে, তা পার হলেই তারা বিল্ডিং এর গোড়ায় পৌঁছে যাবে। এ সময় পেছনে পায়ের শব্দ শুনে বিদ্যুৎ বেগে ফিরল আহমদ মুসা। তার চোখে পড়ল তাদের উপর দু’টি দেহ ঝাঁপিয়ে পড়ছে গাছ থেকে ফল পড়ার মত করে আহমদ মুসা টুপ করে বসে পড়ল।
ঝাঁপিয়ে পড়া লোকটি আহমদ মুসার মাথার উপর দিয়ে মাটির উপর আছড়ে পড়ল। লোকটির দুই উরু এসে আঘাত করেছিল আহমদ মুসার মাথায়। আহমদ মুসাও পড়ে গিয়েছিল। লোকটির দুই পা আহমদ মুসা তার দুই কাঁধের উপর পেল।
আহমদ মুসা পা দু’টি শক্ত হাতে ধরে মোচড় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মোচড়ের ফলে লোকটি উপুড় হওয়া থেকে চিৎ হতে পারল। লোকটি তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া পিস্তল তুলে নেবার জন্যে মাটি হাতড়াচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে সে সুযোগ না দিয়ে দুই পা ধরে জোরে ঘুরাতে শুরু করল। কয়েকটা ঘুরান দিয়ে পাশের গাছের গুড়ির উপর আঁছড়ে ফেলে দিল। একটুও নড়লনা। জ্ঞান হারিয়েছে লোকটি। তারপর আহমদ মুসা পিস্তল কুড়িয়ে নিয়ে মনোযোগ দিল যিয়াদের দিকে। দেখল, যিয়াদ ও অন্য লোকটি তখনও একে অপরকে কাবু করার চেষ্টা করছে। যিয়াদ শেষ পর্যন্ত লোকটি বুকে উঠে বসে তাঁর গলা টিপে ধরল , কিন্তু লোকটি পাশে পড়ে থাকা পিস্তলটি হাতে পেয়ে গেল।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে তার হাতের উপর পা চাপা দিয়ে পিস্তলটি কেড়ে নিল। তারপর বলল , যিয়াদ তুমি ওকে ছেড়ে দাও।
ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকটি স্প্রিং এর মত উঠে দাঁড়িয়ে কোমর থেকে একটা ছুরি বের করল।
আহমদ মুসা বিদ্যুৎ বেগে বাঁ হাত দিয়ে ছুরি সমেত তাঁর হাতটা ধরে ফেলে ডান হাতে বাঁট দিয়ে আঘাত করল তাঁর কানের পাশে নরম জায়গাটায়। লোকটি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।
লোকটির হাত থেকে কেড়ে নেয়া পিস্তলটি যিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে আহমদ মুসা বলল , আল্লাহর হাজার শোকর যে গোলাগুলি এখনও হয়নি , ভেতরে শত্রুরা তাহলে সতর্ক হয়ে যেত।
বিল্ডিংটির গোড়ায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা দেখল, নিচের সবগুলো জানালা বন্ধ। শুধু একটা জানালার ফোকর দিয়ে আলোর রেশ পাওয়া যাচ্ছে। আর উপরে দু’তলায় দু’টি জানালা খোলা। আলো জ্বলছে ঘরে। একাধিক মানুষের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে ঘর থেকে।
নিচের যে জানালা থেকে আলোর রেশ পাওয়া যাচ্ছে , ধীরে ধীরে এসে জানালার কাছে দাঁড়াল দু’জন। কাঠের জানালা ভেতর থেকে বন্ধ। দু’জনে কান পাতল জানালায়। ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের কান্না শুনতে পেল তারা, সেই সাথে ভারী কন্ঠস্বরঃ ‘চল সুন্দরী, উপরে সবাই অপেক্ষা করছে , সেখানে তোমাকে নিয়ে মহোৎসব। চল ম্যাডাম সাহেবা, তুমি দেখবে চল’।
কথা বন্ধ হলো। ভেতর থেকে চিৎকার শুনা গেল।
আহমদ মুসা যিয়াদের কাঁধে হাত রেখে বলল, এ সময় তোমাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে যিয়াদ। ওদেরকে উপরে নিয়ে যাচ্ছে। চল, আর দেরী করা যায়না।
বাড়ির সামনেটা পশ্চিম দিকে। আহমদ মুসারা বাড়ির দক্ষিণ পাশ ঘুরে বাড়ির সামনের দক্ষিণ-উত্তর প্রসারিত বারান্দার দক্ষিণ প্রান্তে এসে দাঁড়াল।
বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ফুলের বাগান। দক্ষিণ দিক থেকেও গ্রাউন্ড ফ্লোরের বারান্দায় উঠার সিঁড়ি আছে।
বারান্দার এ প্রান্ত থেকে দোতালায় উঠার সিঁড়ির দূরত্ব দশ গজের বেশী হবেনা। সিঁড়িতে উঠার মুখে স্টেনগানধারী প্রহরী।
আহমদ মুসা ও যিয়াদকে বারান্দায় দেখে ভ্রু কুঁচকালো প্রহরী।
আহমদ মুসা যেন বেড়াতে এসেছে। এমন ভঙ্গিতে তর তর করে বারান্দার সিড়ি দিয়ে উঠে বারান্দা দিয়ে চলতে লাগল। তার ডান হাতটি প্যান্টের পকেটে। আহমদ মুসার পেছনে যিয়াদ।
আহমদ মুসাদের অগ্রসর হতে দেখে স্টেনগান তুলল প্রহরী। বলল, তোমরা যেই হও আর এক পা’ এগুলে……
প্রহরীর কথা শেষ হতে পারলো না। আহমদ মুসার পকেট থেকে বেরিয়ে এল রিভিলবার চোখের পলকে। গুলী করল আহমদ মুসা। প্রহরীর কপাল গুড়ো করে দিল গুলিটা।
গুলী করেই ছুটল আহমদ মুসা। তুলে নিল প্রহরীর স্টেনগান। তারপর এক দৌড়ে লাফিয়ে উপরে উঠল সিঁড়ি দিয়ে। তিন লাফে সে দোতালার বারান্দায় উঠে গেল। যিয়াদও তার পেছনে পেছনে উঠে এসেছে।
দোতালার মাঝখানের ঘরে দু’টি জানালা দিয়ে আলো দেখেছে আহমদ মুসা। কথাও শোনা গেছে সেখান থেকে। আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখল- সিঁড়ির বাঁ পাশে একটা বদ্ধ দরজার পরেই একটা দরজা খোলা দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা স্টেনগান বাগিয়ে ছুটল দরজার দিকে। অর্ধেক পথটা গেছে এমন সময় দু’জন লোক দরজায় বেরিয়ে এল। তাদের হাতেও স্টেনগান, কিন্তু ব্যারেল নামানো। আহমদ মুসাকে দেখেই ওরা ত্বড়িৎ গতিতে ভেতরে ঢুকে গেল।
দরজায় গিয়ে আহমদ মুসা একটু উঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। তার সাথে যিয়াদও।
তারা ঘরে ঢুকতেই হো হো করে হেসে উঠল ছ’ফুট লম্বা একজন লোক। সে যিয়েদের মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে। তার রিভলবারের নলটা যিয়াদের মায়ের মাথায় ঠেসে আছে।
ঘরে আরও চারজন লোক, তারা ঐ লোকটির পেছনে দাঁড়িয়ে। যিয়াদের স্ত্রী জোহরা যিয়াদের মা’র হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁপছে সে। যিয়াদের মা’র মুখ ফ্যাকাশে।
লোকটি হাসি থামিয়ে বলল, জানতাম যিয়াদ তুমি আসবে। শুন তোমরা , আমি তিন পর্যন্ত গুনব। এর মধ্যে যদি তোমরা হাত থেকে স্টেনগান ফেলে হাত তুলে না দাঁড়াও, তাহলে প্রথমে মরবে তোমার মা, পরে তোমার স্ত্রী। আর শুন যিয়াদ, গ্রানাডার ক্লু-ক্ল্যাক্স -ক্ল্যান চীফ আলফনসো এক কথা দুই বার বলে না।
গুনতে শুরু করল লোকটি। দুই পর্যন্ত যেতেই আহমদ মুসা স্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াল। তারপর যিয়াদের দিকে মুখ ফিরিয়ে আহমদ মুসা একটু বড় করেই বলল, ‘ফেলে দাও যিয়াদ আমরা হেরে গেছি।’
যিয়াদের মুখ রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু আহমদ মুসার মুখে কোনই ভাবান্তর নেই, তার মুখ দেখে মনে হলো কিছুই ঘটেনি।
যিয়াদ স্টেনগান ফেলে দিয়ে দু’হাত উপরে তুলল।
এবার আলফনসো রিভলবার বাগিয়ে যিয়াদের মা’র আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তার রিভলবারের নল যিয়াদ ও আহমদ মুসার দিকে। হো হো করে উৎকট শব্দে হেসে উঠল আলফনসো। বলল, এই গর্দভরা, এই কুকুর দু’টোর পকেটে কি আছে দেখে বের করে নে। দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসারা। স্টেনগান বাগিয়ে দু’জন ছুটে এল। তারা পকেট সার্চ করে আহমদ মুসার পকেট থেকে দু’টো রিভলবার এবং যিয়াদের পকেট থেকে একটি পিস্তল বের করল।
‘ওদের নিয়ে আয় ঘরের মাঝখানে। নাটক এখনি শুরু করব।’ বলল আলফনসো।
আহমদ মুসাদের নিয়ে যেতে হল না। আহমদ মুসাই যিয়াদকে হাত ধরে নিয়ে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের চারদিক ঘিরেই সোফা সাজানো।
ঘরের পশ্চিম পাশে সোফা ও দেয়ালের মাঝখান দিয়ে যাতায়াত প্যাসেজ। চারজন স্টেনগানধারী সেই প্যাসেজে গিয়ে দাঁড়াল। চারজনেরই স্টেনগান আহমদ মুসার দিকে উদ্যত।
আবার আলফনসোর সেই হাসি। হাসির হো হো রবে গম গম করে উঠল ঘর। চিৎকার করেই সে বলল, যিয়াদ তুমি শুধু নও, তোমার মা শুধু নয়, তোমার স্ত্রীও আমার হাতের মুঠোয়। আজ আমাদের মহোৎসব। আর নিবেদায় তোমরা যে খেলা শুরু করেছ তার আজ ইতি। তুমি প্রথমে দু’চোখ মেলে দেখবে তোমার স্ত্রীর ভাগ্য। নব বধু, ভালই জমবে মহোৎসবটা। তারপর তোমাদের টুকরো টুকরো করে নিবেদার জংগলে ছড়িয়ে আসা হবে।
থামল আলফনসো। সে দাঁড়িয়ে আছে উত্তর পাশের বিশাল সোফাটার সামনে।
আহমদ মুসা ও যিয়াদ এসে দাঁড়িয়েছে উত্তর মুখী হয়ে মেঝের ঠিক মাঝখানে। তাদের পুব পাশে মেঝের উপর বসেছিল যিয়াদের মা ও তার স্ত্রী।
যিয়াদরা ঘরের মাঝখানে আসার পর যিয়াদের মা ও যিয়াদের স্ত্রী এসে জড়িয়ে ধরেছে যিয়াদকে। এটা দেখেই আকাশ ফাটা হাসি হেসে আলফনসো ঐ কথাগুলো বলল।
আলফনসো থামার পর আহমদ মুসা বলল, দেখ আলফনসো তুমি নিরস্ত্র নারীর আড়ালে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষা করেছ, বীরত্ব তোমার মুখে শোভা পায় না।
‘কথা বলছ তুমি কে? আলফনসোকে বীরত্ব শেখাতে এসেছ ?’
‘নারীকে যারা কিডন্যাপ করে, বীরত্ব তাদেরকে শেখাতেই হবে আলফনসো।’ আহমদ মুসার মুখে বিদ্রুপের হাসি।
যিয়াদ, যিয়াদের মা এবং জোহরার দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। তার ভাবনাহীন মুখ, ঐ ধরনের কঠোর উক্তি এবং মুখে এক ধরনের হাসি দেখে তাদের মুখে ভয়, বিস্ময় দুই-ই ফুটে উঠল।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই গর্জে উঠল আলফনসো। ছুটে এল সে আহমদ মুসার সামনে। রিভলবারের বাঁট দিয়ে সে আঘাত করল আহমদ মুসার মাথায়।
আহমদ মুসা প্রস্তুত ছিল এর জন্যে। সে মাথা দ্রুত সরিয়ে নিল একদিকে হেলে। তবু কপালের এক পাশে আঘাতের একটা অংশ এসে পড়লই। কেটে গেল কপালের বাঁ পাশটা। ঝরঝর করে রক্ত বেরিয়ে এল। মুখের বাঁ পাশটা রক্তে ধুয়ে গেল।
রক্ত দেখে সম্ভবত খুশী হল আলফনসো। পশ্চিম দিকে দেয়াল বরাবর প্যাসেজে দাঁড়ানো স্টেনগানধারীদের কিছু নির্দেশ দেয়ার জন্যে ওদিকে ফিরল আলফনসো। সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা পশ্চিম দিকে এক ধাপ এগিয়ে বাঁ হাত দিয়ে গলা পেঁচিয়ে বুকের সাথে প্রচন্ড শক্তিতে চেপে ধরল আলফনসোকে , আর একই সময়ে ডান হাত দিয়ে আলফনসোর হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিল আহমদ মুসা। রিভলবার কেড়ে নিয়েই আহমদ মুসা পরপর চারটা গুলী করল। স্টেনগান ধারী চারজন পাকা ফলের মত পরপর টপ টপ করে ফ্লোরে পড়ে গেল।
গোটা ঘটনা ঘটতে পাঁচ সেকেন্ডের বেশী লাগল না। আলফনসো ও স্টেনগানধারীরা ব্যাপারটা বুঝে উঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
চারটি গুলী শেষ করার পর আহমদ মুসা ধাক্কা দিয়ে আলফনসোকে ফেলে দিল। পড়ে গিয়েই আলফনসো টলতে টলতে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। তার হাতে রিভলবার। এর মধ্যেই সে পকেট থেকে একটি রিভলবার বের করে নিয়েছে। উপরে উঠছিল তার রিভলবার সমেত হাত।
আহমদ মুসা তাকে আর সুযোগ দিল না। রিভলবার তুলে গুলী করল তার উঠে দাঁড়ানো মাথা লক্ষ্য করে।
আলফনসো গোড়া কাটা গাছের মত হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মেঝেতে। লাল কার্পেট তার লাল রক্তে ডুবে গেল।
যিয়াদ, যিয়াদের মা ও তার স্ত্রী ঘটনা দেখে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। চিন্তার চেয়ে দ্রুত ঘটে গেল ঘটনা। ঘটনা ঘটনার চেয়ে তা বুঝতেই তাদের দেরী হচ্ছে যেন।
আহমদ মুসা আলফনসো গুলী করার পর যিয়াদের দিকে ফিরল।
যিয়াদ বোবা বিস্ময় নিয়ে আহমদ মুসার দিকে একবার চেয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। আনন্দে কেঁদে ফেলল যিয়াদ। আনন্দের অশ্রু যিয়াদের মা এবং জোহরার চোখেও।
‘সব প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যিয়াদ। চল আমাদের দ্রুত বেরুতে হবে।’ যিয়াদের পিঠ চাপড়ে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসারা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামল বারান্দায়। সিঁড়ির গোড়ায় প্রহরীটি পড়ে আছে, বারান্দা তার রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
আহমদ মুসারা বারান্দা থেকে নেমে এল গাড়ি বারান্দায়।
গাড়ি বারান্দায় সেই মাইক্রোবাসটি তখনও দাঁড়িয়ে।
গাড়ির দরজা খোলা গাড়ির চাবীটি তার কি হোলে লাগানো।
আহমদ মুসা যিয়াদকে বলল, তুমি ওঁদের নিয়ে পেছনে উঠো , আমি ড্রাইভিং সিটে বসছি।
আহমদ মুসা গেট নিয়ে ভাবছিল। সেখান থেকে কোন প্রতিরোধ আসবে নাকি। স্টেনগানটা পাশে রেখেছে আহমদ মুসা। গাড়ি পৌঁছল গেটে, কিন্তু কেউ বেরুল না। গাড়ি দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসা নামল স্টেনগান নিয়ে। গেট রুমে গিয়ে দেখল, গেট রুম শুন্য। পালিয়েছে তাহলে গেটম্যান।
গেটরুমের দেয়ালে সুইচ বোর্ড দেখল আহমদ মুসা। ‘OPEN’ চিহ্নিত সুইচ টিপে দিয়ে গাড়িতে ফিরে এল আহমদ মুসা।
খোলা দরজা পথে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। এসে দাঁড়াল অপেক্ষমান তাদের গাড়িটির কাছে। সঙ্গে সঙ্গে ও গাড়ি থেকে নেমে এল আবদুল্লাহ, জোয়ান এবং রবার্তো। নামল আহমদ মুসা এবং যিয়াদ।
আহমদ মুসার গোটা মুখমন্ডল, রক্তাক্ত দেখে আৎকে উঠল জোয়ান, রবার্তো এবং আবদুল্লাহ। জোয়ান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, আপনি ভালো আছেন তো মুসা ভাই? ওরা ভাল আছেন ?
আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘চিন্তা করো না, আল্লাহর অপার সাহায্য আমরা পেয়েছি। সবাই আমরা ভালো আছি।’
একটা দম নিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘রবার্তো তুমি ড্রাইভ করবে যিয়াদের গাড়িটা, উঠো। আর আবদুল্লাহ তুমি মাইক্রোবাস ড্রাইভ করবে। আমি ও জোয়ান তোমার সাথে মাইক্রোবাসে উঠছি।’
সবাই গাড়িতে উঠার পর দুই গাড়ি একসাথে যাত্রা করল। আগে যিয়াদের গাড়ি , পেছনে মাইক্রোবাসটি।
গাড়ি চলছে, আহমদ মুসা সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে। পাশে জোয়ান , সে উশখুশ করছিল। শেষে সে জিজ্ঞেস করেই বসল, ‘কি ঘটল মুসা ভাই ?’
‘বুঝেছি, তোমার তর সইছে না, কিন্তু এখন নয়, চল ধীরে সুস্থে বলব। ছয় ছয়টা মানুষকে মারতে হয়েছে, বড় খারাপ লাগছে। কি করব, উপায় ছিল না।’
‘ছয়জন!’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল জোয়ান।
‘যিয়াদ ভাইয়ের মনটাও বড় নরম, প্রানহানী তিনিও সইতে পারে না।’ বলল আবদুল্লাহ।
‘তবু সইতে হয় ভাইয়া, অশান্তি, অন্যায়ের রাজত্ব-পিড়িত পৃথিবীতে এটাই এখন নিয়ম।’
ওদিকে যিয়াদের গাড়িতে যিয়াদের মা জোহরার উরুতে মাথা রেখে গাড়ির সিটে শুয়ে পড়েছে। আর জোহরা গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে মাথাটা যিয়াদের কাঁধে রেখে নিরবে অশ্রুপাত করছে, আনন্দের অশ্রু, ভয়ানক এক দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচার অশ্রু, নতুন জীবন লাভের অশ্রু।
ধীরে ধীরে মাথাটা একটু তুলে যিয়াদের মা বলল, ‘যিয়াদ, ও ছেলেটা কে? আল্লাহর ফেরেস্তার মত কোত্থেকে এল ও? এমন নির্ভয়, এমন দু:সাহসী, বাজের মত এমন ক্ষীপ্র, কুশলী আমাদের কেউ আছে যিয়াদ?’
‘আছে আম্মা, উনি গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের গর্ব, যেখানেই মুসলমানদের বিপদ সেখানেই তিনি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহই তাঁকে পাঠিয়েছেন। চলুন আম্মা, বলব সব।’‘
রাত মাত্র ৮টার মত তখন। কিন্তু গ্রানাডার পথ প্রায় জনশূন্য। বিপনী কেন্দ্রগুলোর দরজা বন্ধ।
ফাঁকা পথ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসাদের দু’টি গাড়ি পাশাপাশি।

মাদ্রিদের শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স এবং স্পেনের মুসলমানদের ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্নগুলো ধীর তেজস্ক্রিয়তার মাধ্যমে ধ্বংস করার যে জঘন্য ষড়যন্ত্র ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এঁটেছে, তার বিবরণ শেষ করে আহমদ মুসা থামল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করলেও কেউ কোন কথা বলল না। যিয়াদ বিন তারিক, যিয়াদেও সহকারী আহমদ আব্দুল্লাহ, জোয়ান ও রবার্তো কারও মুখেই কোন কথা নেই। বিস্ময় ও উদ্বেগ তাদের সকলকেই আচ্ছন্ন করেছে।
‘ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান সরকারের যোগ সাজসে এটা করছে বলে কি আপনি মনে করেন মুসা ভাই?’ যিয়াদই প্রথম মুখ খুলল।
‘এ প্রশ্ন নিয়ে আমি চিন্তা করেছি, কিন্তু সরকারের যোগসাজস থাকতে পারে বলে আমার মনে হয়নি দু’টো কারণে। এক, নতুন শাসনতন্ত্রের অধীনে সরকার কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশেষ বৈরীতা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করছে, দুই, স্পেনের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটা প্রধান অবলম্বন হলো পর্যটন। আর পর্যটন খাতের আয়ের সিংহ ভাগ আসে মুসলিম ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে। এগুলো নষ্ট হলে স্পেন প্রতিবছর কোটি কোটি ডলারের আয় থেকে বঞ্চিত হবে। সুতরাং উভয় কারণেই আমার বিশ্বাস স্পেন সরকার এ ষড়যন্ত্রের সাথে থাকতে পারে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তবে এ রকম একটা কিছু হলে ক্ষতি নেই, এ ধরনের লোকের সংখ্যাই প্রশাসনে বেশী। আর এই ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের সাথে সহযোগীতা করতে পারে, এমন লোকও প্রশাসনে কম নেই।’ বলল রবার্তো।
‘সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা লাভের কোন আশা নেই। উপরন্তু যারা সরকারকে এ ব্যাপারে বলবে, তাদের কন্ঠরুদ্ধ হবার সম্ভাবনা ষোল আনা।’ বলল জোয়ান।
‘ঠিক বলেছ জোয়ান, সরকারকে বললে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আমরা নিজেরাই এগুতে চাই। তার আগে জোয়ান তোমার কি মত, ষড়যন্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে, তুমি তো বিজ্ঞানী।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বিল্ডিং ধ্বংসের বিস্ফোরক তো বানানোই হয়েছে। তাত্বিকভাবে তেজস্ক্রিয় বানানোও সম্ভব যা নিরবে ধীরে ধীরে কোন বিল্ডিংকে ভেতর থেকে শেষ করে দেবে। নিশ্চয় রুশরা এমন অস্ত্র গোপনে তৈরী করেছে শ্যাবোটাজ কাজের জন্যে।’ বলল জোয়ান।
‘এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা লড়াই কিভাবে করব? রিমেডী তোমার মতে কি আছে এর?’
‘প্রথমে তেজস্ক্রিয়কে চিহ্নিত করতে হবে, তারপর প্রয়োজন এর বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণের পর এর এ্যান্টিডোট পাওয়া যাবে মুসা ভাই। যদি তেজস্ক্রিয় আণবিক হয়, যদি এর কোন আণবিক এ্যান্টিডোটের পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে এ্যান্টিম্যাটার এ্যান্টিডোটের প্রয়োজন হবে।’
‘শুনেছি, তোমার মৌলিক গবেষণা আছে এ্যান্টিম্যাটার বিজ্ঞানের উপর। তোমার ইউরোপীয় বিজ্ঞান একাডেমির পুরস্কারও এই গবেষণার উপর। বলত, এ্যান্টিম্যাটার গবেষণা কতটা এগিয়েছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘থিয়োরিটিক্যাল গবেষণার উল্লেখযোগ্য কিছু বাকি নেই। এখন গবেষণা চলছে এর বহুবিধ ব্যবহার নিয়ে। ছোট ছোট বিষয়ে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছিল আমার গবেষণার বিষয়।’
‘কি রেজাল্ট পেয়েছ জোয়ান আমি জানি না।।’
‘নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে পরমানুর মত সবক্ষেত্রেই একে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু ফল পাওয়া যাবে পরমানুর চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বেশী।’
‘ষড়যন্ত্র যদি সত্যি হয়, তাহলে জোয়ান তোমার কাজ অনেক বেড়ে যাবে। তোমার মত বিজ্ঞানীকে পেয়ে আমরা খুশী জোয়ান।’
‘মুসা ভাই, আগের জোয়ানের সবকিছু আমি ত্যাগ করেছিলাম। বই-পুস্তক, সার্টিফিকেট নোট, সব আমি পুড়িয়ে ফেলেছি। আমি ভেবেছিলাম, স্পেনে একজন মরিস্কোর জীবনে এ সবের কোনই মূল্য নেই, কোনই কাজে আসবে না। এখন যেন আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, জোয়ান তার অতীতকে কাজে লাগাতে পারে, তার অতীতের কিছু মূল্য আছে। আমার সব শক্তি সব মেধা আমি আমার জাতির জন্যে বিলিয়ে দেব মুসা ভাই।’ জোয়ানের শেষের কথাগুলো আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল।
আহমদ মুসা জোয়ানের কাছে এগিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, আমরা তোমার প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেব না জোয়ান। এই স্পেন মুসলিম বিজ্ঞানীদের চারণ ক্ষেত্র ছিল। তারা অন্ধকার ইউরোপকে পথ দেখিয়েছে, শিক্ষিত করেছে, তাদের জীবনে রেনেসাঁ এনেছে। তারপর আমাদের হাতের সে আলো নিভে গিয়েছিল। আমরা চাই, তোমার হাতে সে আলো আবার জ্বলে উঠুক।
জোয়ান আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলে উঠল, ‘স্পেনে আমাদের সেদিন কি আসবে মুসা ভাই?’
আহমদ মুসা ঘরের জানালা দিয়ে আসা উদীয়মান সূর্যের সোনালী বর্ণচ্ছটার দিকে চেয়ে বলল, ইতিহাসের মোড় ঘুরছে জোয়ান। বহু শতাব্দী আমরা, ঔপনিবেশিক শাসনে নিস্পিষ্ট হয়েছি, মার খেয়েছি চূড়ান্ত। মার খেতে খেতে মৃত্যুভয় আমাদের চলে গেছে। সেই সাথে আমরা ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা নিচ্ছি যে, আমাদের শক্তির উৎস আমাদের আদর্শ- ইসলাম। সেখান থেকে আমাদের বিচ্যুতিই রাজনৈতিকভাবে আমাদের দুর্বল করেছিল, সাংস্কৃতিকভাবে অন্তঃসারশূণ্য করে তুলেছিল, যার ফলে স্বাধীনতা আমাদের হাত থেকে খসে পড়েছিল। এই দুর্ভাগ্যজনক ইতিহাসের মোড় ঘুরছে আজ। তুমি জোয়ান, রবার্তো, যিয়াদ ও তার সাথীরা এবং তোমাদের মত বিশ্বের আরো লাখো তরুণ ইতিহাসের মোড় ঘুরানোর কাজে রত আজ। সকালের এই সূর্যের মতই আমি নিশ্চিত, ইতিহাস মানবতার জন্যে সুদিন নিয়ে আসছে।
এই সময় বাইরে একাধিক লোকের কন্ঠ শোনা গেল। যিয়াদ চট করে বাইরে চলে গেল।
মিনিটখানেক পরে ফিরে এসে বলল, আমাদের জংগল সীমান্তের দু’টি চৌকিতে দু’জন লোক ধরা পড়েছে। তাদের কাছে পিস্তল পাওয়া গেছে।
‘এমন ঘটনা আগে ঘটেছে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘ঘটেনি।’
আহমদ মুসা ভ্রু কুঞ্চিত করল। বলল, ‘নিয়ে এস তো দু’জনকে।’
চোখ বাঁধা দু’জন লোককে ঘরে নিয়ে আসা হলো।
‘চোখ খুলে দেবে না?’ যিয়াদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘চোখ না খুলাই এখানকার নিয়ম মুসা ভাই, বন্দীখানায় ঢুকানোর পরই শুধু ওদের চোখ খুলে দেয়া হবে।’
‘ভাল ব্যবস্থা যিয়াদ।’
একটু থেমে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় ধরা পড়েছে এরা?’
‘জংগল সীমান্তের দু’চৌকিতে দু’জন ধরা পড়েছে।’ বলল যিয়াদ।
‘দু’চৌকিতে দু’জন? এক চৌকিতে নয়?’
‘জি না।’
আহমদ মুসা পাশ থেকে ছড়ি তুলে নিয়ে চোখ বাধা লোক দু’টির গায়ে খোঁচা দিয়ে বলল, তোমাদের আর সাথীরা কোথায়?
‘আর কেউ নেই।’ তাদের দু’জনের একজন বলল।
আহমদ মুসা যিয়াদের কানে কানে কথা বলল। যিয়াদ উঠে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর একটা ম্যাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল। তারপর জংগল সীমান্তে চৌকি দু’টির অবস্থান দেখিয়ে দিল।
আহমদ মুসা ম্যাপটার দিকে একবার ভাল করে নজর করে মুখ ফেরাল লোক দু’টির দিকে। তাদের শরীরে সেই আগের মত ছড়ির খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, মিথ্যা কথা বলছ তোমরা, তোমাদের আরও ছয়জন সাথী আছে। কোথায় তারা?
‘না কেউ আর নেই।’ আগের মত উত্তর দিল ওদের একজন।
‘দেখ মিথ্যা কথা আমরা পছন্দ করি না, ওদের পেলে কিন্তু তোমাদের প্রাণদন্ড হবে।’ কঠোর কণ্ঠে উচ্চারণ করলল আহমদ মুসা।
ওরা কোন জবাব দিল না।
‘শুধু মুখের কথায় ওদের কথা বের হবে না। ওদরে নিয়ে যেতে বল যিয়াদ। আপাদমস্তক ওদের সার্চ করতে বল, জুতা পর্যন্ত।’
চোখ বাধা দু’জনকে নিয়ে গেল যিয়াদের দু’জন লোক।
ওরা বেরিয়ে যেতেই আহমদ মুসা বলল, ‘যিয়াদ আমারদ অনুমান মিথ্যা না হলে আরও ছয়জন লোক জংগলে প্রবেশ করেছে, খুঁজে বের করার নির্দেশ দাও।’
‘মুসা ভাই, জংগলে এমনভাবে পাহারা বসানো যে, কেউ জংগলে ঢুকলে ধরা পড়বেই। তবু একবার তাগিদ দিয়ে আসছি ভাল ভাবে খোঁজ করার জন্য।’ বলে যিয়াদ বেরিয়ে গেল।
যিয়াদ যখন ফিরে এল, তখন তার সাথে ঘরে ঢুকল যারা চোখ বাঁধা দু’জনকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের একজন। সে সার্চ করে পাওয়া জিনিসগুলো আহমদ মুসার সামনে রাখল। ওদের কাছ থেকে পাওয়া মানিব্যাগ, কলম, চাবীর রিং, লাইটার ইত্যাদির মধ্যে লাইটার আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
লাইটারটি হাতে তুলে নিতেই লাইটারের এক পাশে মাছের চোখের মত ছোট স্বচ্ছ, উজ্জ্বল একটা জ্বলজ্বলে চোখ আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ভাল করে দেখার জন্যে কাছে নিয়ে আসতেই অষ্পষ্ট ব্লিৎস ব্লিৎস শব্দ তার কানে গেল। আহমদ মুসা চমকে উঠল লাইটারটা কি তাহলে অটোমেটিক মুভি ক্যামেরা ও ট্রান্সমিটার দুই ভুমিকাতেই কাজ করছে।’ অন্য লাইটারটাও দেখল আহমদ মুসা। একই লাইটার একই ব্যবস্থা। আরও ভালভাবে উল্টে-পাল্টে দেখল আহমদ মুসা। অত্যন্ত পাওয়ারফুল ট্রান্সমিটার আহমদ মুসা তা দেখেই বুঝতে পেরেছে।
আহমদ মুসা ট্রান্সমিটার দু’টি জোয়ানের হাতে তুলে দিয়ে বলল, জোয়ান ক্যামেরা এবং ট্রান্সমিটার দেখ। এখনও মেসেজ রিলে করছে।
ঘরের সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিস্মিত চোখে জোয়ান হাতে তুলে নিল লাইটারটি।
আহমদ মুসা হেলান দিয়ে চোখ বুজল। চিন্তা করছে সে। ট্রান্সমিটারটা অন কেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কি মেসেজ সে রিলে করছে? দুই ট্রান্সমিটারের একই অবস্থা। তাহলে এই ট্রান্সমিটারের এটাই সিস্টেম। বাহকের কাছে এটা সব সময় খোলা থাকবে কিন্তু কেন? কি মেসেজ এরা ট্রান্সমিট করে? হঠাৎ আহমদ মুসার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এ সময় জোয়ান বলল, এর ব্লিৎস, এর সাইজ ও গ্লাভেটি থেকে বুঝা যাচ্ছে কমপক্ষে ১০০ বর্গমাইল সীমার পথে এ সংকেত পাঠাতে পারে।
এ সময় দ্রুত ঘরে ঢুকল আব্দুল্লাহ। বলল, অয়ারলেসে খবর এসেছে, আরও ছয়জন ধরা পড়েছে। ওদের নিয়ে আসছে।
সবাই স্তম্ভিত চোখে তাকাল- আব্দুল্লাহর দিকে নয়, আহমদ মুসার দিকে। মনে তাদের একটা প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে, ছয়জনের কথা আহমদ মুসা কি করে বলল।
‘আহমদ মুসা ভাই, ওদের সাথী আরও থাকতে পারে অনুমান করলেন ঠিক আছে, কিন্তু সংখ্যাটা কি করে বললেন?’ বলল যিয়াদ।
‘মুসা তখন অন্য চিন্তায় ব্যস্ত। তার কপাল কুঞ্চিত। মুখটা শক্ত। যিয়াদের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘গোয়াদেল ফো তীরের তোমাদের এ ঘাটিটা সরবরাহ ঘাটি তাই না? মূল ঘাটিটা এখান থেকে আরও কতদূরে?
‘হ্যাঁ মুসা ভাই, এটা আমাদরে সরবরাহ ঘাটি। মূল ঘাটিটা আরও পুবে, বনের আরও গভীরে, ৪০ মাইল দূরে তো হবেই। কিন্তু কেন জিজ্ঞাসা করছেন মুসা ভাই?’ যিয়াদের কণ্ঠে কিছুটা উদ্বেগ।
‘আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয়, বলল আহমদ মুসা, ‘তাহলে আটজন অনুপ্রবেশকারী চর এখানে একত্রিত হবার কয়েক ঘন্টার মধ্যে অথবা রাতের অন্ধকারে এই ঘাটি আক্রান্ত হবে। আকাশ পথে আসতে পারে, নদী পথে আসতে পারে, বোমা ফেলতে পারে, ছত্রীও নামতে পারে। এখানে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের বিমান আছে যিয়াদ?’
‘ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের নেই, চার্চের আছে বিমান এবং হেলিকপ্টার দুই-ই।’
‘ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এবং চার্চের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, তাই না?’
‘জি।’ বলল যিয়াদ।
‘তাহলে শুন, অনুপ্রবেশকারী ছয়জনকে এখানে নিয়ে এস। আর তোমাদের লোক-জন, মাল-সামান সব মূল ঘাটিতে স্থানান্তরিত কর এখনি।’
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার শুরু কলল, ঐ ছয়জন এলে, ওদের কাছেও ছয়টি ট্রান্সমিটার পাওয়া যাবে, মোট ৮টি ট্রান্সমিটার হবে। এই ৮টি ট্রান্সমিটার ঘাটিতে রেখ, ৮ জন অনুপ্রবেশকারীকেও অন্য কোথায় নিয়ে আটকে রাখতে পার।’
‘৮টি ট্রান্সমিটার এখানে থাকবে কেন মুসা ভাই?’ বলল যিয়াদ।
‘ওরাই তো সংকেত দাতা, ওরাই পথ বাতলাচ্ছে। ওদের যদি সাথে নাও, তাহলে যেখানে, নিয়ে যাবে, সেখানেই যাবে ওদের আক্রমণ।’
‘৮টি ট্রান্সমিটার একত্র হওয়া আক্রমণের শর্ত কেন?’ বলল জোয়অন।
‘ওদের পরিকল্পনা হলো, ৮জন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ে তোমাদের ঘাটিতে আসবে, অথবা ধরা না পড়লে ওরাই তোমার ঘাটি খুঁজে নেবে। উভয় ক্ষেত্রেই তারা একত্রিত হচ্ছে। এক অবস্থান থেকে ৮টি ট্রান্সমিটারের সংকেত যখন ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্যানের কাছে যাবে, তখন ওরা বুঝবে এটাই যিয়াদের ঘাটি। যেখানে যিয়াদ ও তার লোকজন আছে এবং আছে আহমদ মুসা। এরপরেই তাদের আক্রমণ।’
যিয়াদ, জোয়ান, রবার্তো, আহমদ আব্দুল্লাহ সবার বিস্মিত দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। তাদের সবার মুখ হা হয়ে গেছে। এতক্ষণে ব্যাপারটা তাদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। তাদের কারও মুখে কোন কথা নেই।’
কথা বলল প্রথম জোয়ান। বলল, বুঝেছি মুসা ভাই, ট্রান্সমিটারগুলো আসলে ‘পথ ইন্ডিকটের’ বা ‘পথ নির্দেশক’। ওরা যে পথ দিয়ে যাবে, সে পথটা অংকিত হয়ে যাবে রিসিভিং স্ক্রীনে। সব পথ অবস্থানে এসে একত্রি হবে, সেটাকেই ওরা ধরে নেবে ঘাটি। এ জন্যেই বিভিন্ন পথ দিয়ে ওরা পাঠিয়েছে ওদের এজেন্টদের। কিন্তু মুসা ভাই আপনি দয়া করে বলুন, দু’জন অনুচরকে দেখে আপনি কেমন করে বুঝলেন আরও আছে এবং তারা ছয়জন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘খুবই সোজা ব্যাপারটা। স্বাভাবিক নিয়মে অনুপ্রবেশকারীরা যে ক’জনই আসুক, এক সাথে আসার কথা। কিন্তু দু’জনকে পাওয়া গেল একটা ব্যবধানে। তখনই আমার মনে হলো, অনুরূপ ব্যবধানে আরও অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে। ম্যাপে ঐ অঞ্চলের বন-প্রান্তের অবশিষ্ট অংশটা পরিমাপ করে দেখলাম আরও ছয়জনের জায়গা আছে। এ থেকেই আমি ছয়জনের ব্যাপারটা অনুমান করেছি।’
‘ধন্যবাদ মুসা ভাই, এই জন্যেই আপনি আহমদ মুসা। আল্লাহ তার অশেষ নেয়ামতকে আপনার উপর ঢেলে দিয়েছেন। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া।’ বলে যিয়াদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বেশি কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। বলল, এক ঘন্টার মধ্যেই এ ঘাটি ভ্যাকেন্ট করা হবে মুসা ভাই, আর আপনারাও আধা ঘন্টার মধ্যেই রওনা হচ্ছেন। তবে মুসা ভাই, এই ঘাটিকে আমরা ওদের জন্যে, মরণ ফাঁদ বানাতে চাই, আপনার মত কি?’
আহমদ মুসা একটু ভেবে বলল, তোমার পরিকল্পনা কি?
‘আমরা ঘাটি খালি করে ওদের আসার সুযোগ করে দিতে চাই, তারপর ওদের চারদিক থেকে আক্রমণ করব। কাউকে পালাতে দেব না।’ বলল যিয়াদ।
আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ কথা বলল না। তার কপাল কঞ্চিত। ভাবছে সে। বলল, ‘যিয়াদ শত্রুর উপর আঘাত হানার এটা একটা লোভনীয় সুযোগ সন্দেহ নেই। কিন্তু যুদ্ধটা নিজের মাটিতে যতটা এড়ানো যায়, তত ভাল। এতবড় ঘটনা যদি এখানে ঘটে, তাহলে শুধু ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান নয় সরকারও গোটা জংগল এলাকাকে টার্গেট করবে। গোটা জংগল এলাকাকে বিধ্বস্ত করতে এগিয়ে আসবে। আর এখানকার হত্যাকান্ডকে গোটা দুনিয়ার কছে সে অজুহাত হিসেবে পেশ করবে। আমাদের এ আশ্রয়টা এ ধরণের বিপর্যয়ের স্বীকার হোক আমরা তা চাই না।
যিয়াদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, আপনাকে ধন্যবাদ মুসা ভাই, আপনি ঠিক বলেছেন। আমরা এভাবে চিন্তা করিনি। এখন আমরা কি করব? অনুপ্রবেশকারীদের এখানে না আনলেই ভাল হতো না?
‘দু’জন তো আগে এসেই গেছে। জায়গাটা ওদের কাছে ডিটেক্টেড হয়ে গেছে। এখন যদি ওদের মেরে ও ফেল, তাহলেও ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এখানে আসবে ওদের সন্ধানে। সুতরাং দু’জন যখন এসে গেছে, তখন সবাইকে এখানে আনাই ভাল। এতে ওরা বুঝবে গোটা জংগলে এটাই তোমাদের একমাত্র ঘাটি। আরেকটা কথা, ওরা যখন ঐ ভাবে জংগলে সার্বিক অনুসন্ধান শুরু করেছে, তখন তোমাদের ঘাটির সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত ওরা সন্ধান চালাবেই। সুতরাং একটা ঘাটির পতন ঘটিয়ে যদি ওদের অনুসন্ধান বন্ধ করা যায় এবং অন্যসব ঘাটি রক্ষা করা যায় সেটাই ভাল।’
‘তাহলে এখন আমাদের কি করণীয় মুসা ভাই?’ বলল যিয়াদ।
‘বন্দীরা কি জানতে পেরেছে, আমরা ঘাটি খালি করছি?’
‘যেখানে ওদের রাখা হয়েছে, কিছুই জানা ওদের পক্ষে সম্ভব নয়।’
‘ঠিক আছে। তাহলে ওদের এটা বুঝতে দাও যে তোমাদের পরিবার-পরিজন তোমরা বন্দর-নগর মিত্রালীতে ট্রান্সফার করছ। আচ্ছা শত্রুরা কোন পথ দিয়ে কখন আসছে তা জানার কি ব্যবস্থা রেখেছ?’
‘ওরা আকাশ, জল, স্থল, যেদিক দিয়েই আসুক, আমাদের এলাকার সীমান্ত অতিক্রম করলেই আমরা জানতে পারব।’
‘তাহলে চিন্তা নেই, আমরা যখন দেখব ওরা ঘাটির দিকে এগুচ্ছে, তখন আমরা অবশিষ্টরা ঘাটি ছেড়ে চলে যাব। বন্দীদের আমরা বুঝতে দেব যে, ঘাটিতে আক্রমণ আসছে এ জন্যে আমরা সরে পড়ছি।’
‘কেন বন্দীদের আমরা শেষ করে যাব না?’ বলল আহমদ আব্দুল্লাহ, যিয়াদের সহকারী।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ’আত্মসমর্পণকারীদের মুসলমানরা হত্যা করে না এবং তাদের উপর নির্যাতনও করে না। ওদের সরিয়ে নিয়ে আমরা বন্দী করে রাখতে পারি। কিন্তু তার চেয়ে ওদের ঐভাবে চলে যাবার সুযোগ দেয়ার মধ্যেই কল্যাণ আছে। ওরা বুঝবে, বন্দীদের রাখার উপযুক্ত জায়গা আমাদের নেই।’
‘শত্রুরা আমাদের কি দুর্বল ভাববে না?’ বলল রবার্তো।
‘আমরা যে পর্যায়ে আছে, সে সময় শত্রু আমাদের সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝিতে থাকা ভাল। আমি চাই, এই জংগলে ‘ব্রাদার্স ফর ক্রিসেন্ট’ (বি এফ সি) এর শক্তি সম্পর্কে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান নিরুদ্বেগ বোধ করুক। তাতে তোমাদের আসল যে কাজ তাতে সুবিধা হবে। ‘থামল আহমদ মুসা।
যিয়াদ, আহমদ আব্দুল্লাহ, জোয়ান, রবার্তো সকলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
যিয়াদ জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, মুসা ভাই, মুসলমানদের জন্যে আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন। আজ আপনি আমাদের মাঝে না থাকলে শত শত বছর ধরে যে জংগল এলাকাকে আমরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলেছি, তা এবং তার সাথে আমরাও বিপর্যয়ের মুখে পড়তাম।’
আহমদ মুসা যিয়াদের পিঠ চাপড়ে বলল, যখন যেখানে যা করার আল্লাহই করেন, শুধু প্রয়োজন তার বান্দারা যার যখন যেটা দায়িত্ব তা আন্তরিকতার সাথে পালন করা।
আহমদ মুসা, যিয়াদসহ সবাই উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে এল তারা ঘর থেকে। হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা বলল, ’আর কতক্ষণে ঐ ছয়জন এসে পৌছবে?’
‘আরও কয়েক ঘন্টা লাগবে।’ বলল যিয়াদ।
‘সবদিক বিচারে রাত ছাড়া বোধ হয় ওরা আসছে না।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথাই ঠিক।
রাতে আসল ওরা। রাত বারটায়।
ঠিক রাত বারটায় কয়েকটা ক্ষুদ্রাকার শব্দহীন পরিবহন বিমানে করে ছত্রীসেনা নামানো হলো। ওরা তিন দিক থেকে ঘাটিটাকে ঘিরে ফেলল। সামনে থাকল নদী।
আরো আধা ঘন্টা পর ঠিক রাত সাড়ে বারটার দিকে তিনটা গানবোট নিঃশব্দে ভিড়ল ঘাটির ঘাটে এসে। গানবোটের কামানের নলগুলো ঘাটির দিকে তাক করা।
এমন শব্দহীন পরিবহন বিমান এবং গানবোট স্পেনীয় ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের নেই। আমেরিকার ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এসব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তাদের স্বার্থ আহমদ মুসা কে হাতে পাওয়া, আর স্পেনীয় ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের স্বার্থ তাদের সহযোগীতার এই সুযোগ নিয়ে ‘ব্রাদারস ফর ক্রিসেন্ট’ এর ঘাটি ধ্বংস করা। এই অপারেশন পরিচালনার জন্যে মাদ্রিদ থেকে স্বয়ং ভাসকুয়েজ এসেছে এবং তিনি পরিচালনা করছেন এই অভিযান।
গান বোটের অপারেশন কক্ষে বসে ভাস্কুয়েজ। তার হাতে ওয়াকিটকি। ঘাটির তিন দিক ঘিরে পূর্বেই মোতায়েন হওয়া ছত্রীসেনাদের সাথে কথা বলছে ভাসকুয়েজ। কথা শেষ করে ওয়াকিটকির এন্টেনা গুটিয়ে নিয়ে পাশে বসা সিনাত্রা সেন্ডোকে বলল, বুঝলে সেন্ডো, একটা কাকপক্ষিও পালাতে পারেনি। পালাবে কি করে! পরিকল্পনা দেখতে হবে তো! ওরা আমাদের আটজন লোককে ধরে নিশ্চয় আনন্দে বগল বাজাচ্ছে, কিন্তু ব্যাটারা জানেনা, ওরা তো টোপ, ধরা পড়ার জন্যেই পাঠানো হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা হান্ড্রেড পারসেন্ট সফল।’
‘কিন্তু ওরা কেউ সাড়া দিচ্ছে না।পাহারা নিশ্চয় থাকার কথা। তারা কিছু বলছে না কেন? শিকার…।’ কথা শেষ করতে পারলো না সেন্ডো। তার কথার মাঝখানেই ভাসকুয়েজ বলে উঠল, ’রাখ তোমার কথা। খবর দিয়েছে, এক নম্বর, দুই নম্বরসহ সবাই ঘাটিতে আছে।’
মিঃ ভাসকুয়েজ থামল। একটা সিগারেট ধরাল। তারপর আবার শুরু করল, আমার সৈন্যেরা তিন দিক দিয়ে ক্লোজ হয়ে ঘাটির দিকে আসছে। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা ঘাটিতে ঢুকে পড়বে। সব ব্যাটাকে মরতে হবে, নয় তো ধরা দিতে হবে। এবার আহমদ মুসাকে হাতে পাওয়ার পর আর দেরী নয়, সঙ্গে সঙ্গে ভোঁ আমেরিকায়।’
‘আহমদ মুসা ভীষণ ধড়িবাজ স্যার, কার্ডিনাল হাউজের মরণপুরী থেকে কি করে পালাল দেখেছেন তো স্যার?’ বলল সেন্ডো।
কার্ডিনাল হাউজ থেকে আহমদ মুসার পালাতে পারার ঘটনা ভাসকুয়েজের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার মত বেদনাদায়ক। এই অপমান ও পরাজয় সহ্য করতে পারে না সে। সেন্ডোর কথায় ভাসকুয়েজ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। বলল, ’তোমার মত গর্দভের চিন্তা সব সময় নিচের দিকে, কোন বড় চিন্তা তো তোমার নেই।’
‘ইয়েস স্যার, ঘাটিটা এত চুপচাপ কিনা তাই বলছিলাম ওরা ভীষণ ধড়িবাজ…।’ কথা শেষ না করেই থামল সেন্ডো।
‘তুমি কোন খবরই রাখ না সেন্ডো, ওরা সকলে শেষ রাতে উঠে নামায পড়ে, তাই ওরা একটু আগেই ঘুমায়।’
ভাসকুয়েজের ওয়াকিটকি কথা বলে উঠল, স্যার, ঘাটি খালি, কাউকেই দেখছি না। একটা ঘরে বন্দী অবস্থায় আমাদের আটজনকে পাওয়া গেছে।’
ভাসকুয়েজের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
‘স্যার আমি একটু দেখি, বলে উঠে দাঁড়াল সেন্ডো। সে গান বোট থেকে ঘাটিতে নেমে গেল। তার দু’পাশে দু’জন প্রহরী উদ্যত স্টেনগান হাতে।
আধা ঘন্টা পরে সেন্ডো তাদের বন্দী আটজন লোক সহ ফিরে এল। ভাসকুয়েয এক দৃষ্টিতে তাকাল তাদের সেই আটজনের দিকে। হুংকার দিয়ে বলল, তোমরা কি খবর পাওনি যে, আহমদ মুসা, যিয়াদ সহ সবাই আছে?’
আটজনের একজন বলল, ’জি স্যার আমি খবর দিয়েছিলাম সন্ধ্যায়। তখন ওরা ছিল। সন্ধ্যার পর ওরা বেরিয়ে গেছে। সে খবর আমরা জানিয়েছি গ্রানাডা অফিসে।’
‘কোথায় গেছে ওরা?’ বলল ভাসকুয়েজ।
‘ওদের কথাবার্তায় শুনেছিলাম, সকালের দিকে ওরা পরিবার পরিজন মিত্রালীতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যার পর ওরাও মিত্রালীর দিকে গেছে বলেই আমাদের মনে হয়েছে।’ বলল সেই লোকটি।
এদের কথা ঠিক। এদেরকে এই ইম্প্রেশন দেবার জন্যেই আহমদ মুসারা মটর বোট চালিয়ে প্রথমে পশ্চিম দিকে চলে যায়।পরে ইঞ্জিন বন্ধ করে বৈঠা টেনে তারা ফিরে আসে এবং পুব দিকে ৪০ মেইল দুরের গভীর জংলের ঘাটির দিকে চলে যায়।
‘তোমাদের নিয়ে গেল না?’ বলল সেন্ডো।
‘চলে যাবার সময় আমাদের এসে বলেছে, আরও কয়েক ঘন্টা তোমরা থাক, তোমাদের বন্ধুরা আসছে, তোমাদের নিয়ে যাবে।’ আটজনের অন্য একজন জানাল।
‘ওরা জানলো কি করে যে আমরা আসছি ?’ হুংকার দিয়ে উঠল ভাসকুয়েজর গলা।
‘আমরা কেউই জানতামনা যে আপনারা আসছেন।’ বলল আটজনের একজন।
ভাসকুয়েজ ক্রদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সেন্ডোর দিকে। সেন্ডো বলল, ‘স্যার আমারও একই প্রশ্ন ওরা এই তথ্য জানলো কি করে ?’
‘আমাদের গ্রানাডা অফিসটা অপদার্থ। ওখানেই কোন মরিসকো লুকিয়ে আছে মনে হয়। চল ফিরে চলো গ্রানাডা। জাহান্নামে পাঠাবো সবাইকে।’
ভাসকুয়েজ অন্য কক্ষে চলে যাবার জন্য পা বড়াতে বাড়াতে বলল, গোটা ঘাটি ভাল করে সার্চ করো সেন্ডো। কিছু পাও কিনা দেখ তারপর জ্বালিয়ে দাও শয়তানের আড্ডাটা।
ভাসকুয়েজ ঢুকে গেল তার বিশ্রাম কক্ষে। বন্ধ হয়ে গেল তার কক্ষের দরজা।
সেন্ডো উঠে দাঁড়াল। সবাইকে নিয়ে এগুলো গানবোট থেকে ঘাটিতে নামার জন্যে।

পরদিন সকাল।
বিধ্বস্ত ঘাটি থেকে ৪০ মাইল পূবে সিয়েরা নিবেদার পাদদেশে একটি পুরানো গ্রাম, পুরানো জনপদ। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিয়েরা নিবেদার একটি ঝরনা। ঝরনাটা মাইল খানেক গিয়েই পড়েছে গোয়াদালেজ নদীতে।
এই পুরানো গ্রামের মাঝখানে একটা টিলার উপর কাঠের দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটা যিয়াদ বিন তারিকের। এটাই ‘ব্রাদারস ফর ক্রিসেন্টে’ এর প্রধান দফতর। বাড়িটা ঘিরেই গড়ে উঠেছে সুন্দর জনবহুল একটা গ্রাম।
যিয়াদের বাড়িটা সবুজ জলপাই কুঞ্জে ঢাকা। টিলার গা বেয়ে দ্রাক্ষার বাগান।
বাড়িটার সামনে টিলায় এক প্রান্তে মসজিদ। মসজিদে কোন মিনার নেই। উড়োজাহাজের নজর থেকে গোপন রাখার জন্যই এই ব্যাবস্থা। মিনারের বদলে ছাদে উঠে আজান দেয়া হয়।
ভোরের নামাজ শেষে আহমদ মুসা মসজিদের ছাদে উঠেছিল। তার সাথে যিয়াদও।
চারদিকের নৈস্বর্গিক দৃশ্যে অভিভূত হয়েছিল আহমদ মুসা। তার পাশে দাঁড়িয়ে যিয়াদ। তাদের সামনে ঝরনা। ঝরনার ওপারে পাহাড়, পাহাড়ের ওপারে একটা দুর্গম উপত্যকা।
যিয়াদ ওদিকে তাকিয়ে বলেছিল, ওই পাহাড়ের পারে ঐ যে উপত্যকা ওটাই ফ্যালকন অব স্পেন বশির বিন মুগীরার শেষ রণক্ষেত্র। গ্রানাডা পতনের পর বিদ্রহী মুসলমানরা এই পাহাড়, এই বনাঞ্চলেই সংঘবদ্ধ হয়েছিল বশির বিন মুগীরার নেতৃত্বে। বেশ কয়েকটা যুদ্ধে ফার্ডিল্যান্ডের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল বশির বিন মুগীরার কাছে। বশীর বিন মুগীরার শেষ রণাঙ্গন ছিল এই উপত্যকা। এই যুদ্ধে মারাত্নকভাবে আহত হন বশির বিন মুগীরা। তাকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে আনা হয়েছিল ঐ পাহাড়ের পাদদেশের একটা গ্রামে। মুসলিম স্পেনের শেষ মুজাহিদকে ওই গ্রামেই সমাহিত করা হয়। তাঁর আকাঙ্খা ছিলো, তাঁর শেষ শয্যা যেন রণক্ষেত্রেই হয়। আজও স্পেনের সব মুসলমানের গৌরবের তীর্থ ক্ষেত্র তাঁর কবর গাহ। যাবেন না মুসা ভাই আপনি সেখানে?
আহমদ মুসার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল। বলল সে, ওখানে আহমদ মুসা যাবে না তো কে যাবে যিয়াদ। তিনি শুধু আমার প্রেরণা নন, তিনি আমার কাছে গৌরবজনক দৃষ্টান্ত।
যিয়াদ তারপর দক্ষিণ মুখি হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। দূরবীনটা আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলেছিল, দেখুন গোয়াদেলেজ নদী যেখানে সাগরে পড়েছে, সেখানে দেখুন ছোট্ট একটা নগরী, আদ্রা। সে সময় এখানে কোন নগরী ছিলো না। ছিল জংগল ঘেরা একটা ঘাটি। বশির বিন মুগীরার পরিবারের অসহায় কয়েকজন নারী অশ্রু জলে ভেসে নৌকায় উঠে স্পেন ত্যাগ করেছিল। জাবালুত তারিক আমাদের গৌরবের, কিন্তু এই সাগরতীর আমাদের কাছে কান্নার। ওখানে দাঁড়ালে উপকূলে আছড়ে পড়া স্বচ্ছজলকে মনে হয় সেই অসহায়া নারীদের উপছে পড়া চোখের জল। বিষাদের ঐ তীরটায় আমরা কেউই যায় না মুসা ভাই। ঐ তীর আমাদের লাঞ্ছনার প্রতীক, অযোগ্যতার প্রতীক, সব হারানোর প্রতীক।
কাঁদছিল যিয়াদ।
চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল আহমদ মুসারও। মসজিদের ছাদ থেকে নেমে আহমদ মুসা এবং যিয়াদ, পেছনে পেছনে জোয়ান এবং রবার্তো, সেই ঝরনা পাড়ি দিয়ে সেই পাহাড় ডিঙিয়ে গিয়েছিল সেই উপত্যকায় এবং সেই গ্রামে।
বশির বিন মুগীরার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রান্তরের দিকে চোখ তুলে আহমদ মুসার মনে হয়েছিল, সে যেন দেখতে পাচ্ছে বশির বিন মুগীরাকে। পরাজয় যখন আসন্ন, নিশ্চিত, সাথীরা যখন বিধ্বস্ত- বিশৃঙ্খল, যখন ঘোড়ার লাগাম টেনে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে পেছনের দিকে ছোটার কথা, তখন বশির বিন মুগীরার ঘোড়া শত্রু ব্যুহ ভেঙে ঢুকে যাচ্ছে শত্রুর ভেতরে। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত বশীর জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ছে ঘোড়ার পিঠ থেকে।
বশীর বিন মুগীরার কবরটি সাধারণ। সবুজ মাটির উপর কবর। চারদিকে পাথর পুতে একটা সীমারেখা দাঁড় করানো হয়েছে মাত্র। কবরের শিয়রে একটা মিনার তুলেছিল মুসলমানেরা। স্পেনের খৃষ্টান বাদশাহ দ্বিতীয় ফিলিপ সেটা ভেঙে দেয়। এখনও সে মিনার ভাঙা ভিতটি দাঁড়িয়ে। ভিতের পাথরটির গায়ে একটা খোদাই করে লেখা এখনও জ্বল জ্বল করছে, ‘মুসলিম স্পেনের আশার শেষ প্রদীপটি এখানে ঘুমিয়ে।’
আহমদ মুসার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল। সত্যিই শেষ প্রদীপটি এখানে শান্তিতে ঘুমিয়ে। বশীর বিন মুগীরার কবরটি ঘন ঝোপে ঢাকা। প্রকৃতির নিবিড় স্নিগ্ধ পরশে ঘুমিয়ে আছে শহীদ।
হাত তুলেছিল আহমদ মসা। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছিল আল্লাহর কাছে, ’একদিন এই প্রান্তরে যে পতাকা ভূ-লুন্ঠিত হয়েছিল, তা কি আবার বীরদর্পে উড়বে না স্পেনের আকাশে? আল্লাহ সে সুদিন দাও স্পেনের জন্যে।’
যিয়াদ, জোয়ান ও রবার্তো পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমিন।
ঘন্টা তিনেকের মধ্যেই ওরা ফিরে এসেছিল যিয়াদের বাড়িতে।
আজ ওরা মাদ্রিদ যাচ্ছে।
এবার জোয়ান ও রবার্তোর মত যিয়াদও আহমদ মুসার সাথী হচ্ছে।
যেহেতু যিয়াদরা বিপদে তাই আহমদ মুসা তাকে সাথে নিতে চায়নি। কিন্তু যিয়াদ তা মানতে রাজী হয়নি, এমনকি যিয়াদের মা চেয়েছে যিয়াদ আহমদ মুসার সাথী হোক।
আহমদ মুসা এবং জোয়ান ও রবার্তো প্রস্তুত হয়ে বসে আছে যিয়াদের পারিবারিক ড্রয়িং রুমে, বাড়ির ভেতরের অংশে।
যিয়াদ ড্রয়িং রুমে ঢুকে বলল, আম্মা এসেছেন মুসা ভাই।
ড্রয়িং রুম ও ভেতরের ঘরের মধ্যে তখন ভারী পর্দা। পর্দার ওপারে চেয়ারে এসে বসেছে যিয়াদের মা ফাতিমা এবং যিয়াদের স্ত্রী জোহরা। যিয়াদের মা’র দীর্ঘাঙ্গী আরবীয় লাল চেহারা, জোহরাও তাই।
‘আম্মা, আমরা বিদায় চাচ্ছি, আমরা এখনি মাদ্রিদ যাত্রা করছি।’
পর্দার দিকে তাকিয়ে বলল আহমদ মুসা।
যিয়াদের মা বলল, ‘যিয়াদের কাছে সব শুনেছি বাবা। আমি তোমাকে নিষেধ করতে পারবো না। কিন্তু খুব খুশি হতাম যদি তুমি আরও কটা দিন আমাদের মাঝে থাকতে।’
‘আমিও খুশি হতাম আম্মা, মহান স্মৃতি বিজড়িত এখানকার বন ও পাহাড়ের এলাকা আমাকে যেমনটা আকর্ষণ করেছে, তেমনটা স্পেনের আর কিছুই আমাকে করেনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বাবা, ফিরে আসবে না তুমি আবার ?’ বলল যিয়াদের মা।
‘বলতে পারবো না আম্মা, ঘটনা আমাকে কোথায় নিয়ে যায় বলতে পারি না।’
‘কোরআন শরীফে আছে, ঈমানের উপর মানুষ যখন অটলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আল্লাহ মুমিনদের সাহায্যের জন্যে ফেরেশতা পাঠান। তুমি ফেরেশতার মতই আমাদের মাঝে এসেছ। তুমি আমার ছেলের মত। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বে তুমি আমাদের নেতা। তোমাকে কি জিজ্ঞাসা করতে পারি না, আমাদের অন্ধকার রাতের অবসান কবে হবে ? আমাদের পলাতক জিন্দেগীর ইতি কবে ঘটবে ?’ বলল যিয়াদের মা আবেগ জড়িত কন্ঠে।
‘এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, স্পেনের মুসলমানদের জীবনে একটা পরিবর্তন আসছে। আগের জায়গা পৌঁছাতে হলে আমাদের আবার শূন্য থেকে কাজ শুরু করতে হবে।’
‘এই কাজে তুমি থাকবে না বাবা?
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না আম্মা। কোন ডাকে আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে বলতে পারি না।’
‘আমি যিয়াদের কাছে সব শুনেছি। এমন অনিশ্চিত জীবন তো হতে পারে না বাছা, কোন ঠিকানায় তো তোমাকে দাঁড়াতে হবে।’
‘গোটা দুনিয়ার মুসলমানরা এখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে অবস্থান করছে। চারিদিকে তাদের হাহাকার, আর্তনাদ, আর মুক্তির আকুলতা। এই যুদ্ধ ক্ষেত্রে দাঁড়াবার অবকাশ কোথায় আম্মা?’
যিয়াদের আম্মা কেঁদে উঠল। বলল, ’আচ্ছা ! দুনিয়ার সব মুসলমান যদি এভাবে ভাবতো ! আল্লাহ তোমাকে, শতায়ু করুন বাবা।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, সব মুসলিম মা যদি আপনার মত হত , তাহলে ঘরে ঘরে জন্ম হতো তারিক বিন যিয়াদদের, ঘুচে যেত আমাদের দুঃখের অমানিশা।’
থামল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার বলল, ‘আমাদের এবার যেতে দিন আম্মা।’
‘সম্মানিত ভাইজান , আপনার কাছে আমাদের ঋণ শোধ হবার মত নয়। দোয়া ছাড়া আমাদের দেবার কিছু নেই।’ ‘ কথা বলল জোহরা , যিয়াদ এর স্ত্রী।
‘বোন , মুসলমানরা কাজ করে আল্লাহর জন্য, ঋণ যদি দেয় সেটা তাকেই দেয়। মুসলমানদের মধ্যে কোন ঋণের বাঁধন নেই। আসি বোন, আসি আম্মা।’ ‘ বলে আহমদ মুসা সামনে বা বাড়াল।
তার সাথে জোয়ান ও রবার্টও।
পরে বের হয়ে এল যিয়াদ। চারজন বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। বাড়ির সামনে চত্বরে দাঁড়িয়ে চারটি ঘোড়া। ওরা এগুলো ঘোড়ার দিকে। জোয়ান হাঁটছিল আহমদ মুসার পাশাপাশি।
‘মুসা ভাই , আপনি যে বললেন স্পেনে শূন্য থেকে কাজ শুরু করতে ববে, সত্যিই কি ?’ বলল জোয়ান।
‘কেন হতাশ হচ্ছ ?’
‘হতাশ নয় , ভাবছি দীর্ঘ পথের কথা।’ ‘
‘ইসলামে বিজয়ের কোন সংক্ষিপ্ত পথ নেই জোয়ান। ইসলাম প্রথমে বিপ্লব আনে মানুষের মনে। ব্যক্তির মানসিক বিপ্লব , মনের পরিবর্তন ছাড়িয়ে পড়ে তার কাজ -কর্মে , পাল্টে দেয় তার জীবন পদ্ধতি। ব্যক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ইসলাম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লব সংঘটিত করে। এই বিপ্লবের পথটা অবশ্যই দীর্ঘ হতে বাধ্য। ‘
‘স্পেনের জন্য এই পথটা হবে কষ্টের।’ ‘ বলল যিয়াদ।
‘মহানবী (সঃ) – এর পথ -পরিক্রমার চেয়ে কষ্টের নয় নিশ্চয় যিয়াদ।’ ‘
‘ঠিক বলেছেন মুসা ভাই, আমার ভুল বুঝতে পারছি।’ ‘
ঘোড়ার কাছে পৌঁছে গেল সবাই।
চলতে শুরু করল চারটি ঘোড়া।
তাদের গন্তব্য পশ্চিমে গ্রানাডা -মিত্রালি হাইওয়ের পাশে অলিভা শহর। ওখানে আছে রবার্তোর গাড়ি।
পশ্চিমে ঢলে পড়েছে সূর্য।
সন্ধ্যার মধ্যে ৬০ মাইল দূরে অলিভায় তাদের পৌছতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি পথ।
চার ঘোড়া সওয়ার তাদের চলার গতি বাড়িয়ে দিল।

আহমদ মুসা গাড়ি শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স-এর বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়াতেই গেট রুম থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে গেট খুলে দিল।
বিরাট লোহার গেট , এ গেটের পাশ দিয়ে ছোট একটি দরজা। পায়ে চলা লোকেরা ও পথে যাতায়াত করে। গেট এর মাথাটা মিনারাকৃতি, পাথরের তৈরি। মিনারাকৃতির মাঝখানে পাথরের প্লেটে খোদায় করে আরবি ভাষায় , লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ লেখা। গেটের ষ্টীলের নীল পাল্লায় অর্ধ চন্দ্র আঁকা।
উত্তর মাদ্রিদে ছোট একটা সবুজ টিলার উপর তৈরি শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সটি উঁচু প্রাচীর ঘেরা। একটাই গেট। গেট দিয়ে আহমদ মুসাদের গাড়ি প্রবেশ করল মসজিদ কমপ্লেক্সে।
লাল ইটের সুন্দর রাস্তা এগিয়ে গেছে কমপ্লেক্সর গাড়ি বারান্দার দিকে। রাস্তার দু’পাশে ফুলের বাগান। মসজিদ কমপ্লেক্স -বিল্ডিং এর চারিদিকে ঘিরে টিলা জুড়েই ফুলের বাগান। চারিদিকে বাগানের মধ্যে অনেকগুলো ছোট ছোট বাংলো সাইজের বাড়ি। ও গুলোতে প্রধান ইমাম, সহকারী ইমামগণ , মুয়াজ্জিনগণ এবং কমপ্লেক্সের কর্মচারীরা থাকেন।
টিলার শীর্ষ দেশে মূল্যবান সফেদ পাথরে তৈরি বাগান ঘেরা মসজিদ কমপ্লেক্সটির দৃশ্য অপরুপ। সৌদি সরকার স্পেন সরকারের অনুমতি নিয়ে টিলাটি কিনে মসজিদ কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছেন। খরচ হয়েছে ৫০ মিলিয়ন ডলার। সর্ব প্রথম বাদশাহ ফয়সল আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে এ ধরনের একটি মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের। কিন্তু তিনি তার জীবদ্দশায় এ অনুমতি পাননি। পরবর্তীকালে তার স্বপ্ন সফল হয় এবং সৌদি সরকার বাদশাহ ফয়সলের নামেই এ মসজিদ কমপ্লেক্স এর নামকরণ করেন।
লাল ইটের রাস্তা ধরে আহমদ মুসাদের গাড়ি দিয়ে দাঁড়াল গাড়ি বারান্দায়। মসজিদের বিশাল প্রশস্ত সিঁড়ির নিচে গাড়ি বারান্দা। সিঁড়ি উঠে গেছে দু’তলার লাইব্রারিতে এবং তিনতলায় অবস্থিত মসজিদে। গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে বিশাল হল ঘর। দু’হাজার আসন বিশিষ্ট এই হল ঘর শুধু মাদ্রিদ নয়, স্পেনের মধ্যে সর্ববৃহৎ। হলের সামনে এবং দু’পাশে কমপ্লেক্সের অফিস কক্ষ সমূহ। এখানেই প্রধান ইমাম, সহকারী ইমামগণ, মুয়াজ্জিনদেরও অফিস। দু’তলার একপাশে লাইব্রারি এবং অন্য পাশে ইসলামিক স্কুল। এই স্কুলে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার যেমন ব্যবস্থা আছে, তেমনি কোরান , হাদিস, এবং ফেকাহ-এর উপর উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানকার শিক্ষকদের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসীজ এডুকেশন ফান্ড থেকে বেতন দেয়া হয়। লক্ষাধিক গ্রন্থ সম্বলিত লাইব্রেরীটিও স্পেনের একটি শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরীতে রূপান্তরিত। অঢেল পয়সা খরচ করে স্পেনসহ গোটা দুনিয়া থেকে দুর্লভ ও মূল্যবান বই জোগাড় করে এই লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয়েছে। তৃতীয় তলা জুড়ে বিশাল মসজিদ , ৫ হাজার লোক এক সাথে এখানে নামায পড়তে পারে। তবে দুর্ভাগ্য , কয়েক শ’র বেশি লোক জুম্মার দিনেও এখানে হয় না। একে তো মুসলমান নেই বললেই চলে, অপরদিকে যাও আছে তারাও চিহ্নিত হবার ভয়ে মসজিদে আসে না। মসজিদকে কেন্দ্র করে যে ছোট মুসলিম কম্যুনিটি গড়ে উঠেছে তারাই এখানে নামায পড়ে। মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যাই বেশি। শুক্রবারের জামায়াতে মুসলিম দেশের কূটনীতিকরা আসেন। আর সব দিনই বিদেশী মুসলিম পর্যটকরা কিছু কিছু থাকেন। মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রাচীরের বাইরে দিয়ে মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। এই মার্কেট মসজিদের স্থায়ী আয়ের উৎসই শুধু নয়, শ’খানেক মুসলিম পরিবারের জীবিকার ব্যবস্থাও হয়েছে এর মাধ্যমে।
গাড়ি দাঁড়ালে প্রথমে নামল আহমদ মুসা। তারপর একে একে নামল যিয়াদ, জোয়ান এবং রবার্টও।
গাড়ি বারান্দার পরেই একটি করিডোর। করিডোরের বাঁ পাশে কাঁচের দেয়াল ঘেরা রিসেপশন কক্ষ। কক্ষে অনেকগুলো সোফা পাতা। একপাশে একজন লোক একটা ছোট টেবিলের পাশে বসে।
আহমদ মুসারা ঘরে প্রবেশ করতেই টেবিলে বসা লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল।
আহমদ মুসা সালাম গ্রহন করে তার দিকে এগুলো। রিসেপশনিস্ট দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, কি খেদমত করতে পারি আপনাদের?
‘শাইখুল ইসলামের সাথে আমাদের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে ৫ টায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অ্যাপয়েন্টমেন্টটা কে নিয়েছিলেন ?’
‘যিয়াদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার একটু বসুন , আমি দেখছি।’ ‘ ঘড়ির দিকে চেয়ে টেলিফোন হাতে তুলে নিতে নিতে বলল রিসেপশনিস্ট। ঘড়িতে পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।
টেলিফোনে কথা শেষ করে রিসেপশনিস্ট বলল, ‘স্যার শাইখুল ইসলাম স্যার তার অফিসে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তার পি, এস ছুটিতে আছেন, চলুন আমি পৌঁছে দেব।’
বলে রিসেপশনিস্ট ছেলেটি উঠে দাঁড়াল।
রিসেপশনিস্ট ছেলেটি আগে আগে চলল, পেছনে আহমদ মুসা, যিয়াদ , জোয়ান এবং রাবার্তো।
আঁকা-বাঁকা করিডোর ধরে আহমদ মুসারা এগিয়ে চলছিল। দু’পাশেই অফিস ঘর। গোটা কমপ্লেক্সে অফিস এই এক স্থানে। কিন্তু কোন অফিসে কোন লোক নেই। রিসেপশনিস্ট জানাল, অফিস সময় সকাল ৭টা থেকে ১ টা পর্যন্ত। ‘
আহমদ মুসা দেখল, সামনে একটা খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে একজন লোক তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে সে দাঁড়িয়ে যেন তাদেরই অপেক্ষা করছে।
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘একজন মুয়াজ্জিন।’ ‘
‘কয়জন মুয়াজ্জিন?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘তিনজন।’
রিসেপশনিস্ট ছেলেটা সামনে ছিল।
সেই সালাম দিল মুয়াজ্জিন সাহেবকে।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল, সালামের জবাব সুস্পষ্ট ভাবে শোনা যায় এমনভাবে উচ্চারিত হল না, মুয়াজ্জিন সাহেবের সব মনোযোগ যেন মেহমানদের দেখার কাজেই ব্যস্ত ছিল। আহমদ মুসা মনে মনে ভাবল, বেচারা এরা, বাইরের লোকের দেখা খুব কম পায় কিনা!
শাইখুল ইসলামের অফিসে তারা পৌঁছল।
আহমদ মুসারা বাইরে দাঁড়াল।
রিসেপশনিষ্ট দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে খোদ শাইখুল ইসলাম উঠে এসে দরজায় আহমদ মুসাদের স্বাগত জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল।
শাইখুল ইসলাম দীর্ঘদেহী মানুষ। মাথায় সাদা পাগড়ী। গায়ে সাদা জামার উপর সোনালী রঙয়ের আরবীয় আলখেল্লা জড়ানো। লাল গায়ের রং। বয়স ৪০ থেকে ৫০ এর মাঝখানে হবে। সুন্দর বিন্যস্ত কালো দাঁড়ি। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। চোখে-মুখে তারুণ্যের একটা তেজ।
নাম শাইখুল ইসলাম ডঃ আবদুর রহমান আন্দালুসী। সেভিলের এক অখ্যাত শহরতলীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাদের পরিবারটি বাস করত উত্তরে পিরেনিজের পার্বত্য এলাকায়। উত্তর আফ্রিকায় হিজরতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাদের পরিবার ক্রমে দক্ষিণে এগুতে থাকে। পরিবারটি সেভিলে এসে যখন বাস করছিল সেই সময় আবদুর রহমানের জন্ম হয়। ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুযোগ হওয়ায় এবং জীবন-যাত্রা অনেকটা নিরাপদ দেখায় অবশেষে পরিবারটি সেভিলেই থেকে যায়। কিন্তু ছেলের মেধা দেখে আবদুর রহমানের পিতা আবদুর রহমানকে ১২ বছর বয়সে গোপনে মরক্কো পাঠিয়ে দেয়। প্রাথমিক শিক্ষা আবদুর রহমান মরক্কোয় লাভ করে। অত্যন্ত মেধাবী প্রমাণিত হওয়ায় মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে সেখানে পড়ার তার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আল-আজহার থেকে তিনি তাফসীর ও ফেকাহ শাস্ত্রে এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী ভাষায় উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। তারপর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি হাদীস শাস্ত্র ও দাওয়া বিষয়ে অধ্যায়ন করেন। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকূল্যে তিনি অক্সফোর্ড থেকে ‘কনটেমপোরারী মিশনারী এ্যাকটিভিটিজ’ এর উপর ডক্টরেট লাভ করেন। মাদ্রিদে শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স তৈরী হবার পর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লেক্সটি পরিচালনার সর্বময় দায়িত্ব দিয়ে তাকে মাদ্রিদে পাঠায়।
শাইখুল ইসলাম ডঃ আবদুর রহমান আন্দালুসী মেহমানদের বসিয়ে নিজে আসন গ্রহণ করে বললেন, ‘আগে পরিচয়টা হয়ে যাওয়া দরকার। যিয়াদ কে?’
‘আমি যিয়াদ বিন তারিক।’ বলল যিয়াদ।
‘সান অব দি গ্রেট তারিক বিন যিয়াদ।’ হেসে বলল শাইখুল ইসলাম।
সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল যিয়াদের মুখে।
‘এক অর্থে সবাই তো আমরা পূর্বসুরীদের সন্তান।’ বলল আহমদ মুসা।
শাইখুল ইসলাম তাকাল আহমদ মুসার দিকে। পবিত্রতা ও অসাধারণ প্রত্যয়ের দীপ্তিতে উজ্জ্বল তার মুখে শাইখুল ইসলামের চোখ দু’টি যেন আটকে গেল মুহূর্তের জন্যে। বলল শাইখুল ইসলাম আহমদ মুসার মুখে চোখ রেখেই, ‘সন্তান বটে, যোগ্য সন্তান নই।’
‘যোগ্য সন্তানের জন্যে যোগ্য পিতাও চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক ইয়ংম্যান, কিন্তু সন্তানের কি কোন দোষ নেই?’
‘আছে, সেটা কর্তব্য না করার। কিন্তু সর্বব্যাপি যে দুর্ভাগ্য তাদের ঘিরে ধরেছে এর জন্যে তারা দায়ী নয়।’
শাইখুল ইসলামের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ ইয়ংম্যান, আসুন আমরা পরিচিত হই, তারপর আপনাদের কথা শুনব।’
যিয়াদ টেবিলের এক প্রান্তে বসেছিল। সেই-ই প্রথম পরিচয় দিতে এল। বলল, ‘আমি যিয়াদ বিন তারিক, আগেই জেনেছেন। আমি থাকি সিয়েরা নিবেদার পাহাড়ে। আমরা………’
যিয়াদকে থামিয়ে দিয়ে শাইখুল ইসলাম বললেন, ‘আপনি সেই যিয়াদ? ‘ব্রাদার্স ফর ক্রিসেন্ট’ এর যিয়াদ?’
‘জি, হ্যাঁ।’ বলল যিয়াদ।
শাইখুল ইসলামের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়াল যিয়াদের দিকে। আবার উষ্ণ হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া, তিনি আমার এক আশা আজ পূর্ণ করলেন। আমি আপনাকে কত যে খুঁজেছি। দুইবার লোক পাঠিয়েছি গ্রানাডায়, কিন্তু কোন সন্ধান তারা পায়নি।’
থামল শাইখুল ইসলাম। থেমেই আবার বলল, ‘জানেন, আপনাকে ‘ফ্যালকন’ বলে ডাকা হয়?’
‘জানি, তারা আমার উপর অনেক আশা করে, কিন্তু উপযুক্ত আমি নই।’
‘বশীর বিন মুগীরার পর আপনিই মানুষের মনে আশার আলো জ্বেলেছেন। কিছু করা যায়, এ চিন্তাও মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল। আপনি হতাশার এই অন্ধকারে সাহসের একটা আলো প্রজ্বলিত করেছেন, যত ক্ষুদ্রই তা হোক।’
‘ধন্যবাদ শাইখ’ বলে যিয়াদের পাশে উপবিষ্ট জোয়ানের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘ইনি জোয়ান ফার্ডিন্যান্ড। মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ বিজ্ঞানী। মুসলিম নাম ‘মুসা আবদুল্লাহ’।’
‘না, পরিচয় সম্পূর্ণ হলো না, ইউরোপীয় বিজ্ঞান পদক লাভ করেছে, এবার অনার্সে প্রথম না হয়ে দ্বিতীয় হয়েছে, মরিস্ক বলে’ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে, বসত বাটিও হারাতে হয়েছে, সেই জোয়ান তো?’ গম্ভীর কন্ঠে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘শাইখ দেখছি সবই জানেন।’ বলল যিয়াদ।
‘কোন সাহায্য কাউকে না করতে পারি, এটুকু খোঁজ না রাখলে আল্লাহর কাছে জি জবাব দেব?’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে শাইখুল ইসলাম হাত বাড়িয়ে দিল জোয়ানের দিকে। জোয়ানের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল, ‘তোমার আমি সন্ধান করেছি বৎস, কিন্তু নতুন ঠিকানা জানতে পারিনি। সন্ধান এখনও চলছে। খুব খুশী হলাম তোমার দেখা পেয়ে।’
‘ধন্যবাদ স্যার, আমাদের মত হতভাগ্যের কেউ এভাবে খোঁজ করতে পারে ভাবিনি। খুশী হলাম স্যার।’ বলল জোয়ান।
জোয়ানের পরেই বসে ছিল আহমদ মুসা।
যিয়াদ বলল, ‘শাইখুল ইসলাম স্যার, এবার আপনার সাথে এমন ব্যক্তির পরিচয় করিয়ে দেব যে, আপনি খুশী হবেন, খুব খুশী হবেন।’
‘কেন আপনাদের সাথে পরিচয়ে খুশী হইনি বুঝি!’ হেসে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘জি না, শাইখ, এ খুশী ভিন্ন স্বাদের। এমন খুশীর মুহূর্ত কচিত কারো ভাগ্যে জোটে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, বলুন মিঃ যিয়াদ।’ আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘ইনি আমাদের সম্মানিত ভাই, বিশ্বের মজলুম মুসলমানদের মহান বন্ধু, মহান নেতা আহমদ মুসা।’
শাইখুল ইসলামের চোখে-মুখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিস্ময়ের একটা প্রচন্ড জোয়ার গিয়ে তার চোখে-মুখে আছড়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত সে কথা বলতে পারলো না। রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপরেই সে লাফিয়ে উঠল আসন থেকে। বলল, ‘আহমদ মুসা! আহমদ মুসা!!
মিলে যাচ্ছে, আমি ফটোতে দেখেছি, থিক মিলে যাচ্ছে।’ বলে আসন থেকে ছুটে এল শাইখুল ইসলাম।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল।
শাইখুল ইসলাম এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘আমার কি সৌভাগ্য! যাঁকে মদীনায় কাছে পেয়েও দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তাঁকে এভাবে এখানে দেখতে পাব, তা অসম্ভব একটা আশা। আল্লাহর অশেষ করুণা।’
আনন্দে আবেগে শাইখুল ইসলামের চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে লাগল।
শাইখুল ইসলাম আহমদ মুসাকে অনেক্ষণ বুকে জড়িয়ে রাখলেন। তার এই আবেগের কাছে আহমদ মুসা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, কি বলবে বুঝতে পারছিল না।
তারপর আহমদ মুসাকে বসিয়ে আসনে ফিরে গেল শাইখুল ইসলাম। বসে রুমালে চোখ মুছে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘জনাব, আপনি ফিলিস্তিন থেকে মিন্দানাওয়ের দিকে যাবার পথে মদিনা শরিফ গিয়েছিলেন। আমরা আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম, একটা সম্বর্ধনার আয়োজন করেছিলাম, কিন্তু সময় কম হওয়ায় সেটা বাতিল হয়ে যায়। আপনার দর্শন লাভের সৌভাগ্য আর হয়নি।’
‘আপনি বয়সে বড়, শিক্ষক তুল্য। এভাবে কথা বললে আমি বিব্রত বোধ করি জনাব।’ নরম কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘বয়স এবং পেটভরা নিস্ক্রিয় বিদ্যার কোন মূল্য আল্লাহর কাছে নেই জনাব আহমদ মুসা। মুজাহিদ হওয়া মুমিনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এই মুমিনরা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী।’
‘কলম দিয়েও জিহাদ হয়, জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমেও জিহাদ হয়। আপনি সে জিহাদ করছেন।’
‘যখন চারদিক থেকে মজলুমের কান্না ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়, তখন সেটা কলমের জিহাদ আর জ্ঞান বিতরণের জিহাদের সময় নয় জনাব।’
‘ঠিক, তবে সুযোগ একটা বড় শর্ত। সুযোগ এলে আমি মনে করি কলমের যুদ্ধ যারা করছেন, তারা কলম নিয়ে বসে থাকবেন না অবশ্যই।’
‘এটাই আমাদের সান্ত্বনা জনাব, কিন্তু ভয় হয় এই সান্ত্বনায় থেকে আমরা পরকালীন মুক্তি পাব কিনা। থাক, আপনি বলুন, আপনি স্পেনে কিভাবে, কবে এসেছেন? গোটা বিষয়টা আমার কাছে এখনও স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে।’
প্রশ্নের উত্তর দিল জোয়ান।
সে সংক্ষেপে আহমদ মুসার মাদ্রিদ বিমান বন্দরে নামার পর মারিয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে যিঅদের মা ও স্ত্রীকে উদ্ধার পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল।
শাইখুল ইসলাম ডঃ আবদুর রহমান আন্দালুসী মুর্তির মত বসে গোগ্রাসে গিলছিল কথাগুলো।
জোয়ানের কথঅ শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষন কথা বলল না শাইখুল ইসলাম। যেন কথাগুলো হজম করা এখনও তার শেষ হয়নি।
অবশেষে ধীরে ধীরে মুখ খুলল। বলল, ‘ইতিমধ্যেই এত কিছূ ঘটে গেছে! ইতিমধ্যেই দু’দুবার ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের বন্দীখানায় গেছেন তিনি?’
একটু থামল। গলাটা একটু পরিষ্কার করল শাইখুল ইসলাম। তারপর আবার শুরু করল, ‘জনাব আহমদ মুসা, দেখুন আপনি ক’দিন হলো এসেছেন, এর মধ্যেই পুরো সংঘাত শুরু হয়েছে শত্রুদের সাথে আপনার। কিন্তু আমি আজ দশ বছর এখানে, কেউ আমার গায়ে হাত দেয়নি। এর অর্থ কি? সত্যিই কি আমি পুরোপুরি ইসলামের উপর আছি?’
‘আপনার এই আবেগকে’, বলল আহমদ মুসা, ‘আমি শ্রদ্ধা করি জনাব। কিন্তু একটা জিনিস আপনাকে দেখতে হবে, আপনি যা করছেন সেই দায়িত্ব নিয়েই আপনি মাদ্রিদে এসেছেন আর আমি যে ধরনের কাজ নিয়ে এসেছি, সেই ধরনের কাজেই আমি জড়িয়ে পড়েছি।’
‘আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছে একজন মানুষ বা একটি সংস্থা। কিন্তু মুমিন হিসেবে আল্লাহর দেয়া কোন দায়িত্ব কি আমার উপর নেই?’
‘আছে।’ বলল আহমদ মুসা।, ‘কিন্তু সে দায়িত্ব বলে না খালি হাতে একা শত্রুর ব্যুহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে, বরং বলে শত্রুর উপর বিজয়ী হবার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে।’
শাইখুল ইসলাম হাসল। বলল, ‘আপনার সাথে পারবো না আমি, আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশী জানেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে রহম করুন, আল্লাহ আপনাকে আরও বরকত দিন। এখন বলুন, আপনি কি কাজ নিয়ে স্পেনে এসছেন, যে কাজের কথা আপনি বললেন।’
‘জনাব সেটা বলার জন্যেই এসেছি।’ বলে আহমদ মুসা একটু থামল। তারপর যুগোশ্লাভিয়ায় পাওয়া ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের দলিলে তেজষ্ক্রিয়ের মাধ্যমে শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্সসহ স্পেনের সকল মুসলিম পূরাকৃর্তী ধ্বংস করার যে পরিকল্পনা রয়েছে তার বিবরণ দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আমি এখানে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় তাদের সাথে কথায় নিশ্চিত হয়েছি, এ ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে।’
শুনতে শুনতে শাইখুল ইসলামের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। কপাল কুঞ্চিত হলো, তার সজীব ঠোঁট শুকিয়ে উঠল।
‘অর্থাৎ তারা স্পেন থেকে মুসলমানদের সকল স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে চায়।’ শুকনো কন্ঠে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘জি হ্যাঁ, তাই। স্পেন থেকে সকল মুসলিম স্মৃতিচিহ্ন তারা মুছে ফেলতে চায়, সেই সাথে মুসলমানরো যেন স্পেনে আর কিছু না করতে এগিয়ে আসে, সে কথাও বলে দিতে চায়।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামল। আর কেউ কিছু বলল না। সবাই নিরব।
‘ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন’, উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলতে শুরু করল শাইখুল ইসলাম, ‘যদি শুরু হয়ে থাকে, তাহলে এই শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্সসহ সবগুলো মুসলিম স্মৃতি সৌধে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের কাজ শুরু হেয় গেছে। আইম তো মনে করি মানুষও এখানে নিরাপদ নয়।’
‘জি হ্যাঁ, আমি যে কথা বলিনি। এই তেজষ্ক্রিয়ের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট এবং আশে-পাশের লোকদের বংশ-বৃদ্ধি লেআপ পেয়ে যাবে এবং কালক্রমে নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মুসলিম কম্যুনিটি।’
বিস্ফোরিত হয়ে উঠল শাইখুল ইসলামের চোখ। বলল, ‘এত গভীর, এত জঘন্য ষড়যন্ত্র?’
একটু থামল। ঢোক গিলল। তারপর আবার বলল, ‘এখন এই অদৃশ্য শত্রুর মোকাবিলা কিভাবে সম্ভব?’
‘এই পরামর্শের জন্যেই এসেছি জনাব। আমাদের জোয়ান পদার্থ বিজ্ঞানী। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের উপরই তার গবেষণা। সে বলছে, এই বিশেষ ধরনের তেজষ্ক্রিয় ডিটেক্টরে ধরা পড়ে না। এই ডিটেকশনের জন্যে দরকার ‘ম্যাটেরিয়াল এ্যানালঅইসিস’। কিন্তু স্পেনে এটা পারা যাবে না। মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যবস্থা কিছু আছে, কিন্তু ওখান থেকে কোন সহযোগিতা নেয়া নিরাপদ নয়। তাই ঠিক করেছি জোয়ানকে ইটালীয় ট্রিয়েষ্টে ডঃ আবদুস সালামের প্রতিষ্ঠিত গবেষনাগারে পাঠাব। আমি ফিলিস্তিনের মাহমুদ কে বলে দিলে সে ট্রিয়েষ্টে যোগাযোগ করে সহযোগিতা পাওয়ার ব্যবস্থা করবে। আমরা গ্রানাডা, কর্ডোভা, মালাগা থেকে স্যাম্পল পেলেই জোয়ানকে ট্রিয়েষ্টে পাঠাতে পারি।’
থামল আহমদ মুসা।
‘ডিটেকশন হওয়ার পর কি হবে?’ জিজ্ঞাসা করল শাইখুল ইসলাম।
‘তেজষ্ক্রিয়ের প্রকার-প্রকৃতি চিহ্নিত হবার পর এর প্রতিষেধক যোগাড় করতে হবে। এ ব্যাপারেও আমরা ট্রিয়েষ্টের সাহায্য পাব আশা করছি।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। কোত্থেকে স্যাম্পল আপনারা নেবেন, নেবার ব্যবস্থা করুন।’
‘ভিত্তি অংশ থেকে একটুকরো এবং বিল্ডিং এর উপরের অংশ থেকে এক টুকরো কংক্রিট হলেই চলবে। বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে শাইখুল ইসলাম ইন্টারকমে একজনকে নির্দেশ দিল আশফাক আমিনকে পাঠাও, সেই সাথে বলল, নাস্তা রেডী কিনা। ‘শুকরান’ বলে টেলিফোন রেখে দিল। ‘আশফাক আমিন কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি অফিসার। তাকে বলে দিচ্ছি, এখনি দুই খন্ড কংক্রিট যোগাড় করে দেবে।’
‘ষড়যন্ত্রের বিষয়টা এবং আমাদের পরিচয় অন্য কাউকে এই মুহূর্তে আমরা জানতে দিতে চাই না জনাব।’ বলল আহমদ মুসা
‘এটাই ঠিক।’
ঘরে প্রবেশ করল সুঠাম দেহী এক যুবক।
‘আশফাক এস, কেমন আছ তুমি?’ স্নেহের স্বরে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘ভাল আছি স্যার।’ বিনীত কন্ঠ আশফাকের।
‘তোমাকে একটু কষ্ট করতে হবে আশফাক। আমাদের বিল্ডিং এর ভিতের অংশ এবং বিল্ডিং এর উপরের কোন জায়গা থেকে এক খন্ড করে কংক্রিটের টুকরো যোগাড় করে দিতে হবে। পারবে না?’
‘পারব স্যার।’
‘ঠিক আছে আমরা নাস্তায় যাচ্ছি, তুমি ইতিমধ্যে চেষ্টা কর।
‘ঠিক আছে স্যার।’ বলে আশফাক পা বাড়াল যাবার জন্যে।
‘জনাব, আমি আশফাকের সাথে যেতে চাই।’ বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু নাস্তা..।’
‘ওঁদের নিয়ে আপনি যান, আমি এসে নাস্তা করব।’
শাইখুল ইসলাম ভাবল, আহমদ মুসার মত লোক বিনা প্রয়োজনে, বিনা কারনে কিছু করে না। বলল আশফাককে উদ্দেশ্য করে, ‘ইনি আমাদের অত্যন্ত সম্মানিত মেহমান, তুমি নিয়ে যাও সাথে। তোমাকে সাহায্য করবেন।’
আহমদ মুসা ও আশফাক শাইখুল ইসলামের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
আগে চলছিল আশফাক, পেছনে আহমদ মুসা। আহমদ মুসা দেখল, যে পথ দিয়ে এ কক্ষে তারা এসেছিল সে কক্ষ দিয়েই তারা এগুচ্ছে।
সেই মুয়াজ্জিন সাহেবের দরজার সামনে দিয়ে এগুচ্ছিল আহমদ মুসারা। আহমদ মুসা দেখল, এবারও মুয়াজ্জিন সাহেব দরজায় দাঁড়িয়ে। দরজা বরাবর আসতেই মুয়াজ্জিন সাহেবই এবার সালাম দিল মনে হল, তাদেরই জন্যে সে দরজায় অপেক্ষা করছিল। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, আহমদ মুসারা আসছে তা সে জানল কি করে!
দুই টুকরো কংক্রিট যোগাড় করে ফিরছিল আহমদ মুসা এবং আশফাক আমিন রিসেপশন রুমের সামনে দিয়ে।
রিসেপশনিস্ট কান থেকে টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, একটা ফোন স্যার, আপনাদের, খুব জরুরী।
‘টেলিফোন’ আমাদের নামে এখানে! মনে মনে চমকে উঠল আহমদ মুসা তবু ছুটল টেলিফোন ধরার জন্যে।
‘হ্যালো’ রিসিভার তুলে নিয়ে বলল আহমদ মুসা।
‘আমি জোয়ানের বন্ধু’।’ ওপার থেকে ইংরেজী ভাষায় উত্তর এল। কন্ঠ শুনেই চিনতে পারলো জেনের গলা। বুঝতে পারল নাম গোপন রাখতে চাচ্ছে। আহমদ মুসাও বলল, আমিও জোয়ানের বন্ধু, তোমাকে চিনতে পেরেছি। জরুরী কিছু?
‘খুবই জরুরী’, ওখান থেকে আপনাদের কথা ওদেরকে কেউ জানিয়েছে, ওরা যাচ্ছে।’
‘অসংখ্য ধন্যবাদ বোন, চিন্তা করোনা। রাখি।’ বলে টেলিফোন রেখে দিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। তার মুখ গম্ভীর, চিন্তা করছে। এখান থেকে আমাদের কথা কে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানকে জানাল! এই কথা শোনার সময় থেকেই বার বার তার সামনে ভেসে উঠছে ঐ মুয়াজ্জিনের মুখ।
‘কোন খারাপ খবর স্যার?’ বলল আশফাক আমিন।
আহমদ মুসা হেসে আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি যদি তোমাকে একটা হুকুম দেই পালন করবে?’
‘জি স্যার।’
‘চল, বলে আগে চলল আহমদ মুসা। পেছনে আশফাক।
সেই মুয়াজ্জিনের ঘরের সামনে দাঁড়াল আহমদ মুসা। আশফাকও তার পাশে এসে দাঁড়াল। ‘মুয়াজ্জিন সাহেব কি এখনো ঘরে?’ আশফাকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘দেখতে হবে।’ বলে আশফাক দরজায় নক করতে গেল।
আহমদ মুসা হাত তুলে তাকে নিষেধ করে বলল, ‘কি করতে হবে আগে শুন।’
‘কি করতে হবে, বলুন।’
‘মুয়াজ্জিন সাহেবের ঘর সার্চ করতে হবে।’
‘সার্চ করতে হবে, কেন?’ চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করল আশফাক।
এই সময় নাস্তা সেরে ফিরছিল শাইখুল ইসলাম এবং যিয়াদরা।
আশফাক ছুটে গেল শায়খুল ইসলামের কাছে। তাকে জানাল আহমদ মুসার কথা। শুনে শায়খুল ইসলামের চোখও বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। ইশারায় ডাকল আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা গেল।
‘কিছু ঘটেছে?’ জিজ্ঞাসা করল শাইখুল ইসলাম আহমদ মুসাকে।
‘ঘটেছে। বলব। মুয়াজ্জিন সাহেবের ঘরে কোন টেলিফোন আছে?’
‘না, নেই।’ বলল শাইখুল ইসলাম।
‘রিসেপশান ছাড়া নিচের তলায় আর কোথায় টেলিফোন আছে?’
‘আমার পি, এস, এর রুমে আছে এবং আমার রুমে আছে।’
‘আমার মনে হয়, মুয়াজ্জিন সাহেবের রুমে ওয়্যারলেস সেট আছে।’ এখনই সার্চ হওয়া দরকার।’
মুহুর্ত কয়েক আহমদ মুসার দিকে বিস্ময়ের সাথে চেয়ে থেকে আশফাককে বলল, ‘যাও উনি যা বলেছেন তা কর।’
আশফাক মুয়াজ্জিনের ঘরের দিকে চলে গেল।
সবাই ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। ওখান থেকে মুয়াজ্জিন সাহেবের ঘরের দরজা দেখা যায়।
আশফাক মুয়াজ্জিনের ঘরে ঢুকার কয়েক মুহূর্ত পরেই কথা কাটাকাটির শব্দ পাওয়া গেল। তার পরেই দেখা গেল আশফাককে হাত উপরে তুলে পিছু হটে বাইরে আসতে। মুয়াজ্জিনের হাতে পিস্তল, উদ্যত আশফাকের বুক বরাবর।
মুয়াজ্জিন সাহেব বাইরে বেরিয়েই দেখতে পেল শায়খুল ইসলাম এবং আহমদ মুসাদের। দেখতে পেয়েই ডান হাতের পিস্তলটা আশফাকের দিকে উদ্যত রেখেই বাম হাতটা সে চোখের পলকে পকেটে ঢুকাল।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল, মুয়াজ্জিন নিশ্চয় দ্বিতীয় রিভলবার বের করতে যাচ্ছে, অথবা গ্রেনেড, নয়তো আরও বড় কিছু।
আহমদ মুসা আগেই রিভলবার বের করে নিয়েছিল। রিভলবার মুয়াজ্জিনের দিকে তুলে ধরে বলল, পকেট থেকে হাত বের করবেন না। মাথাগুড়ো হয়ে …
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই মুয়াজ্জিনের পিস্তল আশফাকের দিক থেকে বিদ্যুৎ গতিতে ঘুরে এল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসাও তার কথা মুখে রেখেই রিভলবারের ট্রিগারে রাখা আঙুলে চাপ দিল। ছুটে যাওয়া গুলি গিয়ে মুয়াজ্জিনের ডান হাতটা বিদ্ধ করল, তার বিধ্বস্ত হাত থেকে পিস্তল খসে পড়ল। কিন্তু তার বাম হাত তবু পকেট থেকে বেরোলই। আশফাক তার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুয়াজ্জিন অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে পাশে দু’ধাপ সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই বাম হাতটি উপরে তুলল। তার হাতে গ্রেনেড। কিন্তু হাত নিচে নেমে আসার আগেই আহমদ মুসার দ্বিতীয় গুলি তার বাম বাহু ভেদ করল। গ্রেনেডটি তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল। কিন্তু বিস্ফোরিত হল না। সম্ভবতঃ পিন তখনও খোলা হয়নি।
মুয়াজ্জিন বসে পড়েছে।
বসে পড়েই সে তার বাম বাজুতে কাপড়ে ঢাকা কি একটা কামড়ে ধরেছে।
আঁতকে উঠল আহমদ মুসা। ছুটে গেল তার কাছে, কিন্তু ততক্ষনে ঢলে পড়েছে মুয়াজ্জিনের দেহ।’
আহমদ মুসা দেখল, প্রান নেই মুয়াজ্জিন সাহেবের দেহে। বাম বাহুর যে জিনিসটি সে কামড়ে ধরেছিল, সেটা পরীক্ষা করে দেখল, সায়নাইড ক্যাপসুল।
শায়খুল ইসলাম এবং অন্যান্যরাও এসে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসার পেছনে।
‘ধরা পড়তে না হয় এ জন্যে পটাসিয়াম সাইনাইডের ব্যবস্থাও রেখেছিল? তাহলে সে ‘সুইসাইড স্কোয়াডের’ লোক!’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল শায়খুল ইসলাম। একটা আতংক এসে তার মুখ ছেয়ে ফেলেছে।
‘জি জনাব, এ নিশ্চিতভাবেই ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্লানের সুইসাড স্কোয়াডের এজেন্ট।’ উঠে দাঁড়িয়ে বলল আহমদ মুসা।
শায়খুল ইসলাম কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে চোখে রাজ্যের আতংক ও উদ্বেগ নিয়ে।
‘আসুন জনাব মুয়াজ্জিন সাহেবের ঘরে আরও কিছু পাওয়া যাবে, বলে আহমদ মুসা পা বাড়াল মুয়াজ্জিন সাহেবের ঘরের দিকে।
পেছনে পেছনে শায়খুল ইসলাম সহ সবাই।
ঘরে বালিশের তলায় পাওয়া গেল ক্ষুদ্র অয়্যারলেস সেট। দেখেই বুঝল আহমদ মুসা, অয়্যারলেস সেট ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু পাওয়ারফুল। হাতে নিয়ে সেটটির এ্যান্টেনা টেনে লম্বা করে বলল , শাইখুল ইসলাম এই ওয়্যারলেসটির মাধ্যমেই সে আমাদের আগমনের খবর বাইরে পাঠিয়েছে।’
মুয়াজ্জিন সাহেবের খাটিয়ার নিচে পাওয়া গেল একটি রেডিও রেকর্ডার। রেকর্ডার টি বিশেষ ধরনের। ২৪ ঘন্টা রেকর্ডার চললেও ভেতরের একটা ক্যাসেটই তা কভার করতে পারে।
আহমদ মুসা রেকর্ডার হাতে নিয়ে বিস্মিত হলো, রেকর্ডারটি তখনও চলছে।
‘কি রেকর্ড করছে রেকর্ডার?’ নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
‘রেকর্ডার চলছে, কিছু রেকর্ড করছে জনাব।’ শাইখুল ইসলামের দিকে কথা কয়টি বলে আহমদ মুসা রেকর্ডারটির ‘রিভার্স’ বোতামটি টিপে দিল। কিছুদূর ব্যাকে নিয়ে প্লেয়ার স্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
কিছুটা ফাঁকা, তারপরই শুরু হলো কথা। প্রথমেই কন্ঠস্বর শাইখুল ইসলামের। তিনি বলছেন, ‘আগে পরিচয়টা হয়ে যাওয়া দরকার, যিয়াদকে?’ তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলতে লাগল শাইখুল ইসলাম ও আহমদ মুসাদের মধ্যেকার কথোপকথনের রেকর্ড। মাঝখানে প্লেয়ার বন্ধ করে দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘চলুন আপনার টেবিলে কোথাও রেডিও ট্রান্সমিটার পাতা আছে।’
শাইখুল ইসলামের টেবিলে পরীক্ষা করে দেখা গেল টেবিলের পেন স্ট্যান্ডের পেন হোল্ডারের মেটালিক বোর্ডটাই একটি রেডিও ট্রান্সমিটার। আহমদ মুসা কলম স্ট্যান্ডটি ভেঙে ট্রান্সমিটারটি বের করে আনল। বলল, এই ট্রান্সমিটারের সাহায্যে শাইখুল ইসলামের অফিসের যাবতীয় কথা মুয়াজ্জিন রুপী ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের এজেন্টটি রেকর্ড করতো এবং প্রয়োজনীয় সব তথ্য সে পাঠিয়ে দিত ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের কাছে। আজকে আমাদের পরিচয়টা সে ওদের কাছে পাঠিয়েছে, জানিনা আমাদের সব কথা সে পাঠিয়েছে কিনা।
হতবুদ্ধি ও বিহব্বল হয়ে পড়েছিল শাইখুল ইসলাম। তার ভাবনা, এত বড় শত্রুকে পাশে নিয়ে সে চলেছে। তার সব কথা শত্রুরা জেনে ফেলেছে। এই মুয়াজ্জিন স্পেনের মিসরীয় দুতাবাসে আরবী অনুবাদকের কাজ করত তার আরবী জ্ঞান, কেরায়াত দেখে এবং মিসরীয় দুতাবাসের সুপারিশে তাকে মুয়াজ্জিন পদে নিয়োগ দেয়া হয়। শাইখুল ইসলামের মন বেদনায় ভরে গেল, কমপ্লেক্সের এতগুলো লোক এত দিনেও তার ষড়যন্ত্রের কিছুই ধরতে পারেনি, সামান্য সন্দেহও কারও মনে জাগেনি। সেই সাথে শ্রদ্ধায় নুয়ে গেল তার মন, আহমদ মুসা কমপ্লেক্সে পা দেবার সংগে সংগেই সে ধরা পড়ে গেল। মুখ একটু উপরে তুলে বলল শাইখুল ইসলাম আহমদ মুসার দিকে চেয়ে, আল্লাহর হাজার শুকরিয়া, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন। আল্লাহ আপনাকে বিস্ময়কর চোখ আর বিস্ময়কর বুদ্ধি দিয়েছেন। যাকে আমরা এক দশকেও ধরতে পারিনি, তাকে আপনি একবার দেখেই ধরে ফেললেন!’ বলবেন কি দয়া করে, কি দেখে আপনার সন্দেহ হয়েছিল?’
‘এখানে আসার পর ওর সাথে দু’বার ওর সাথে দেখা হয়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য ওর অপেক্ষা করা এবং তার দৃষ্টিকে আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। তার সম্পর্কে মনে একটা সন্দেহর সৃষ্টি হয়েছিল। তার উপর আশফাকের সাথে ফেরার পথে রিসিপশনে জোয়ানের সহপাঠি জেনের কাছ থেকে টেলিফোন পেলাম যে, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান আমাদের এখানে আসার খবর জানতে পেরেছে এবং এখানে ওরা আসছে, তখন আমি নিশ্চিত হলাম, ঐ মুয়াজ্জিনই খবর দিয়েছে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানকে।
‘ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান কি কমপ্লেক্সে আসছে ?’ মুখ কালো করে জিজ্ঞাসা করল শাইখুল ইসলাম।
‘আমি নিশ্চিত ওরা আসছে।’
‘পুলিশকে কি খবর দেব ?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল শাইখুল ইসলাম।
‘জানিনা, পুলিশ কি আপনাকে সাহায্য করবে, না ওদের সাহায্য করবে ? তাছাড়া মুয়াজ্জিন আহত হওয়া, মারা যাওয়ার কি ব্যাখ্যা দেবেন পুলিশকে। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এই ঘটনা থেকে ফায়দা উঠানোর সুযোগ গ্রহন করবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে ?’ অসহায় কন্ঠ শাইখুল ইসলামের।
‘কমপ্লেক্সের ভিতরে কিছু ঘটুক আমরা চাইনা জনাব, আমরা চলে যাচ্ছি।’
একটু ম্লান হাসল শাইখুল ইসলাম। বলল, জনাব, আমি কমপ্লেক্স নিয়ে ভাবছি না, আপনাদের নিরাপত্তাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় এখন।’
একটু থামল শাইখুল ইসলাম। আবার বলল, ‘আপনারা চলে যাবেন কেমন করে, ওরা নিশ্চয় এতক্ষণে বে্রুবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।’
‘পথে পা দিলেই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আল্লাহর সাহায্য আসবে।’
‘একটা পথ আছে, মুখ উজ্জল করে বলল শাইখুল ইসলাম, ‘আমাদের পশ্চিম প্রচীরের মার্কেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের যে ষ্টোর আছে, তার সাথের প্রাচীরের ওপারের মার্কেট অফিসের যোগাযোগের জন্যে প্রচীরে একটা দরজা আছে। বাইরের থেকে সে দরজা দেখা যায় না। ঐ পথ দিয়ে গেলে কাকপক্ষিও টের পাবে না।’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। বলল, ‘ঠিক আছে, যিয়াদ, জোয়ন এবং রবার্তো তোমরা ঐ পথে চলে যাও।’
‘আপনি ?’ বলল জোয়ান।
‘আমাকে সদর দরজা দিয়েই বের হতে হবে ?’
‘কেন ?’ বলল শাইখুল ইসলাম।
‘আমি ওদের টার্গেট, আমাকে বের হতে না দেখলে ওরা ভেতরে ঢুকে আমাকে খোঁজার জন্যে গোটা কমপ্লেক্স তছনছ করবে এবং আমার সাথে কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের যোগসাজস আছে বলে ধরে নেবে। এতে কমপ্লেক্সের ক্ষতি হবে।’
‘তাহলে আমরা সবাই একসাথে সদর গেট দিয়ে বেরোব।, বলল যিয়াদ।
‘যখন পথ আছে, তখন সবাই এক সাথে বিপদগ্রস্থ হয়ে লাভ নেই। তাছড়া এখানে কারা আমার সাথী, এটা আমি তাদের জানতে দিতে চাই না। কাজের এতে সুবিধা হবে।’
‘আপনার যুক্তি ঠিক, ’ বলল শাইখুল ইসলাম, ‘কিন্তু শত্রুর শক্তি সম্পর্কে না জেনে একা তাদের মুখোমুখি হওয়া কি ঠিক হবে ?’
‘বেশী পরিমাণ লোক দেখলে ওরা বেশী পরিমাণ সতর্ক ও আক্রমনাত্নক হবে। আর একা একজনকে দেখলে ওদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই একটা ‘অতি আত্নবিশ্বাসের’ ভাব সৃষ্টি হবে যা আমাকে সাহায্য করবে।’
বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। শাইখুল ইসলামকে লক্ষ করে বলল, ‘জনাব ওদের যাবার ব্যবস্থা করুন। আমি এখুনি এখান থেকে বেরুতে চাই।’
শাইখুল ইসলাম সহ যিয়াদ, জোয়ান, রবার্তো সবাই উঠে দাঁড়াল। যিয়াদ, জোয়ান, রবার্তোর মুখ ভার। বুঝাই যাচ্ছে, আহমদ মুসার সিদ্ধান্তে ওরা সন্ত্মুষ্ট হয়নি।
আহমদ মুসা তার দু’হাত যিয়াদ ও জোয়ানের কাঁধে রেখে বলল ‘তোমরা মন খারাপ করো না। আমার কথা তোমরা নিশ্চয়ই বুঝেছ। আর চিন্তার কিছু নেই। ওরা জানে যে, ওদের ওঁৎ পেতে থাকার ব্যাপারটা আমরা জানি না, সুতরাং অপ্রস্তুত অবস্থায় ফাঁদে পা দেব কিন্তু আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় যাচ্ছি না। অতএব ঘটনার নিয়ন্ত্রণটা আমার হাতে থাকবে।
শাইখুল ইসলাম আনন্দ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। তার মনে বিস্ময়, প্রতিটি বিষয়ের দিকে আহমদ মুসার এত সূক্ষ্ণ দৃষ্টি। সাথীদের প্রতি তার এত দরদ এবং তাদের নিরাপত্তা্র প্রতি তাঁর এত সতর্কতা। পরিস্থিতির এমন চুলচেরা বিশ্লেষণ সে করে।
আহমদ মুসার কথা শেষ হলে শাইখুল ইসলাম বলল, ‘আল্লাহ আপনার সহায় হোন। এঁদের আমি নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি বলুন, ‘আপনার সাথে আবার কবে দেখা হবে কিংবা কিভাবে যোগাযোগ হবে। আমাদেরকে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাতে হবে।’
‘সমানভাবে আমরাও উদ্বিগ্ন জনাব, আমরাই যোগাযোগ করব।’
বলে আহমদ মুসা সালাম দিয়ে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েই আবার ফিরল সে। শাইখুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের লোকেরা অবশ্যই আসবে, আপনাদের বিরক্ত করতে চাইবে। তাদের বলে দেবেন, আমরা এসেছিলাম, চলে গেছি, আমাদের কোন খোঁজ আপনারা জানেন না। বহু পর্যটক এমন আসে। তাদের খোঁজ রাখা আপনাদের দায়িত্ব নয়। আর ওরা ঐ মুয়াজ্জিনের খোঁজ অবশ্যই করবে। আপনি ওদের বলে দেবেন, আমি মুয়াজ্জিন সাহেবের সাথে একান্তে কি বলেছি, তারপর থেকে মুয়াজ্জিন সাহেব আর নেই। বলবেন, আমার সাথের লোকেরা দেয়াল টপকে পালিয়েছে, তারাই সম্ভবতঃ মুয়াজ্জিন সাহেবকে সাথে নিয়ে গেছে। ওরা বেশী ঝামেলা করলে, পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে বিষয়টা জানাবেন। আপনাদের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব সরকারের।’
শাইখুল ইসলামের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। মনে হয় নিরাপত্তার এদিকটার কথা এতক্ষণে মাথায় আসেনি।
আহমদ মুসা আবার সালাম দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
শাইখুল ইসলাম আশফাক আমিনকে বলল, ‘তুমি ওঁর সাথে অন্ততঃ গেট পর্যন্ত যাও। কিছুর প্রয়োজন হলে তুমি দেখ।’
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার সাথে আশফাক আমিনও।
সাথে চলতে চলতে আশফাক আমিন বলল, ‘জনাব জীবনে কখনও কোন বড় কাজ করিনি, আমি কি আপনার সাথী হতে পারি না?
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমার কাঁধে যে দায়িত্ব সেটা তো ছোট কোন কাজের দায়িত্ব নয়।’ তারপর একটু থেমে গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘ওদের সাথে যত কম লোককে জড়িয়ে পারা যায়, যত কম লোককে ওদের সামনে হাজির করা যায়, ততই মংগল। এ ছাড়া তোমাকে সাথে নেয়ার ক্ষেত্রে আর কোন আপত্তি নেই।’
আশফাক আমিনের মুখ ম্লান হলো। তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সে ক্ষুণ্ন হয়েছে বুঝা গেল।
আহমদ মুসা আশফাক আমিনের পিঠ চাপড়ে বলল, ‘দেখ আমার মত তোমরা বিদেশী নও। তোমাদেরকে স্পেনে থাকতে হবে সুতরাং অপরিহার্য কোন প্রয়োজন ছাড়া ওদের কাছে চিহ্নিত হওয়া বোকামী বুঝলে। এই বোকামী আমি এড়াতে চাই।’
আশফাক আমিনের মুখ এবার উজ্জল হয়ে উঠল। বলল, ‘বুঝেছি জনাব। কিন্তু আপনি এতটা সামনে দেখে সিদ্ধান্ত নেন।’
গাড়িতে ওঠার আগে আশফাক আমিনের সাথে হ্যান্ডশেক করল আহমদ মুসা। আশফাক আমিনের মুখ শুকনো। সে আহমদ মুসার হাত না ছেড়ে বলল ‘জনাব এভাবে ভয়ংকর এবং শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি হতে আপনার ভয় করে না?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘মৃত্যুর সেই সময় না এলে কেউ কাউকে বাঁচাতে পারে না, আর মৃত্যুর সময় না এলে কেউ কাউকে মারতে পারে বলে কি তুমি মনে কর?’
‘না, জনাব।’
‘তাহলে আর ভয় কিসের?’
বলে, আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট্ দিল।
আহমদ মুসার গাড়ি গেটের কাছে পৌঁছতেই গেট খুলে গেল।
খোলা গেট পেরিয়ে আহমদ মুসার গাড়ি একবার লাফিয়ে উঠে তীব্র বেগে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসা হিসাব আগেই কষেছিল। গেট থেকে সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনুর দূরত্ব প্রায় দু’শ গজ। সবটা বিচার-বিবেচনা করে আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়েছে, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এই দু’শ গজকেই তাদের অভিযানের জায়গা হিসাবে বেছে নিবে। তাদের ফাঁদটা কেমন হবে, সে কথাও ভেবেছে আহমদ মুসা। সে লা-গ্রীনজা থেকে মাদ্রিদে ফেরার পথে তাকে যেভাবে বন্দী করা হয়েছিল, আহমদ মুসার তা মনে পড়েছিল। সেই কৌশল ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এবারও গ্রহন করতে পারে বলে আহমদ মুসার মনে হয়েছে। গেট পেরিয়ে আহমদ মুসার গাড়ি যখন নিশ্চিন্তে সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনুর দিকে এগুবে, তখন হঠাৎ তারা চারদিক থেকে আহমদ মুসাকে ঘিরে ফেলবে।
আহমদ মুসার গাড়ি এগুচ্ছিল ঝড়ের বেগে।
সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনুতে পৌঁছার দুই-তৃতীয়াংশ পথ যখন এগিয়েছে, তখন আহমদ মুসা দেখতে পেল তার ডান, বাম ও সামনের দিক থেকে তিনটে গাড়ি তার দিকে ছুটে আসছে। ডান ও বাম দিকের গাড়ি দু’টো একটু পিছিয়ে পড়ার কারণে ওগুলো পেছন থেকে কোনাকুনি তার দিকে এগিয়ে আসছে। সম্ভবতঃ আহমদ মুসা এমন দ্রুত এগিয়ে আসার কারণেই তারা পিছিয়ে পড়েছে। আহমদ মুসার গাড়ি এমন পাগলা গতিতে তীব্র বেগে ছুটবে গেট থেকে বের হয়েই তা তারা ভাবতে পারেনি।
আহমদ মুসা বাম হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে ডান হাত দিয়ে পকেট থেকে পিং পং বলের মত দু’টা বস্তু বের করে ছুড়ে মারল তার গাড়ির পাশেই।
তারপর টেনিস বলের মত আরেকটা গোলাকার বস্তু পকেট থেকে বের করে একবার পেছনে তাকাল। দেখল. পেছনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘন কালো ধোয়ার দেয়াল পেছনে অমাবস্যার রাত ডেকে এনেছে।
আহমদ মুসা সামনে তাকিয়ে দেখল গজ বিশেক দূরে সামনের গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়েছে। আহমদ মুসা গাড়ির গতি বিন্দুমাত্র না কমিয়ে, আরও কয়েক গজ এগিয়ে ডান হাতের টেনিস সাইজের বলটা সামনের মাইক্রোবাসটার লক্ষ্যে ছুঁড়ে মেরেই বাম হাতে স্টিয়ারিং ঘুড়িয়ে গাড়ি রাস্তা থেকে ডান’ দিকে নামিয়ে নিল এবং উঁচু-নিচু মাটির উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে তীব্র বেগে সামনে এগিয়ে চলল। পাশ দিয়ে মাইক্রোবাসটি যখন অতিক্রম করছিল, দেখল বিশেষ ধরনের পাওয়ারফুল গ্রেনেডের বিস্ফোরণ মাইক্রোবাসটিকে টুকরো টুকরো করে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছে। শিউরে উঠল আহমদ মুসা। এই গ্রেনেডটাই মুয়াজ্জিন সাহেব ছুড়তে যাচ্ছিল শাইখুল ইসলাম ও আহমদ মুসাদের লক্ষ্য করে। তার ইচ্ছা পূরণ হলে শুধু তারাই নয়, আশে-পাশের ঘরগুলোও উড়ে যেত।
আহমদ মুসার গাড়ি এসে সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনুতে উঠল। আহমদ মুসা চোখ ফিরিয়ে দেখল, স্মোক বোম্বের কাল ধোয়া গাড়ি বিস্ফোরণের জায়গা পর্য্ন্ত এসে পৌঁছেছে। গোটা এলাকাটাই কাল অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। মসজিদ কমপ্লেক্সের গেট পর্য্ন্ত দেখা যাচ্ছে না।
আহমদ মুসার গাড়ি সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনু ধরে চলতে লাগল উত্তরে। তার লক্ষ্য সারিয়ার ভাই ফিডেল ফিলিপের বাড়ি।
আহমদ মুসারা মাদ্রিদে এসে এবার উঠেছিল রাবার্তোর ছোট বাড়িটাতে। কিন্তু জায়গাটা নিরাপদ মনে না করায় তারা গিয়ে ওঠে জোয়ানের বাড়িতে। ইচ্ছা করেই তারা গিয়ে ওঠে জোয়ানের বাড়িতে। ইচ্ছা করেই তারা এবার হোটেলে ওঠেনি। প্রত্যেক আবাসিক হোটেলেই ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এবং সরকারের লোকরা ঘুর ঘুর করে। পরে ফিডেল ফিলিপ জানতে পেরে আহমদ মুসাকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। বাড়িটা বড় নিরাপদ। তার উপর টেলিফোন থাকায় আহমদ মুসা খুব আপত্তি না করেই চলে এসেছে। কিন্তু জোয়ান যিয়াদকে আসতে দেয়নি। কিন্তু তারা চারজন তিন জায়গায় থাকলেও প্রতিদিন সকালে ফিডেল ফিলিপের বাসায় এসে তারা সকলে নাস্তা করে। তারপর শলা-পরামর্শ্ করে দিনের কাজ ঠিক করে।
কিছুদূর এগোনোর পর আহমদ মুসা পেছন ফিরে দেখল কেউ অনুসরণ করছে কিনা। না, পেছনে কোন গাড়ি নেই নিশ্চিত হলো আহমদ মুসা। ভাবল, গাড়ি দু’টা নিশ্চয় বিস্ফোরিত গাড়িটা নিয়ে ব্যস্ত। কয়জন লোক ছিল গাড়িটাতে? নিশ্চয় কেউ বেঁচে নেই। ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। ষড়যন্ত্রকারীদের জিঘাংসা আগুনে পুড়ে কত লোক এইভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সামনে প্রসারিত চোখ দু’টি আহমদ মুসার বেদনায় ভারি হয়ে উঠল।
গাড়িটি তখন সেক্রেটারিয়েট এভ্যুনু পেছনে ফেলে ফিলিপ স্কোয়ার ধরে ছুটে চলছিল।

ইটালীর ক্ষুদ্র নগরী ট্রিয়েষ্টে পৌঁছে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ডঃ আবদুস সালামের পৃথিবী খ্যাত বিজ্ঞান গবেষণাগার ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না জোয়ানের। গবেষণাগারটি দাঁড়িয়ে আছে আড্রিয়াটিক সাগরের শান্ত কূলে। দক্ষিণ মুখী গবেষণাগারটির সর্ব্ দক্ষিনে বহিঃপ্রাচীর ঘেষে দাঁড়ানো ছোট্ট মসজিদটির জায়গায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত আড্রিয়াটিকের অবারিত বুক।
ট্রিয়েষ্ট শহরটাই অদ্ভুত সুন্দর লেগেছে জোয়ানের। যুগোশ্লাভ সীমান্তের গা ঘেষে দাঁড়ানো ট্রিয়েষ্টের তিন পাশই সাগরে ঘেরা। আড্রিয়াটিকের নীল জ্বলে ভাসমান ট্রিয়েস্টের তিন পাশই সাগরে ঘেরা। আড্রিয়াটিকের নীল জ্বলে ভাসমান ট্রিয়েষ্ট যেন একটা সফেদ রাজ হংস। জোয়ান ভাবল, বিজ্ঞানী আবদুস সালাম শুধু জটিল পদার্থ্ বিজ্ঞান নিয়েই চর্চা করতেন না, তিনি মনে মনে কবিও ছিলেন। না হলে ইটালির সব বাদ দিয়ে প্রায় যুগোশ্লাভ সীমান্তে এসে সাগর-বাসী ট্রিয়েষ্টকে তিনি বাছাই করলেন কেন।
জোয়ান ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ এর মসজিদের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল। দুনিয়ার একটি শ্রেষ্ঠ পদার্থ্ বিজ্ঞান গবেষণাগারের সাথে মসজিদ দেখে জোয়ান বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিল। জোয়ান এর আগে ট্রিয়েষ্টে আসেনি, ইউরোপের অন্যান্য জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞান-গবেষনাগারে ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু কোথাও গীর্জা দেখেনি, মসজিদ দেখেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে তার বিস্ময় কেটে গেছে। তাঁর মনে হয়েছে, নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ডঃ আবদুস সালাম শুধু তো দুনিয়ার একজন শীর্ষ্ বিজ্ঞানী নন, তিনি মুসলমানও। এবং নামে মাত্র মুসলমান তিনি নন। তিনি ইসলামের বিধান সমূহ নিষ্ঠার সাথে পালন করেন এবং ভালোবাসেন তিনি ইসলামকে, মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে। তিনি চান ইসলাম ও মুসলামদের গৌরবময় যুগ আবার ফিরে আসুক। পশ্চিমের বিজ্ঞানের যে দান, সে দান মুসলামনরা ভিক্ষুকের মত হাত পেতে গ্রহণ করায় বিজ্ঞানী আবদুস সালাম দারুণভাবে বেদনা বোধ করেন, অপমান বোধ করেন। জোয়ানের মনে পড়ল ডঃ আবদুস সালামের একটা বিখ্যাত বক্তৃতার কথা সে বক্তৃতার উপসংহারে বিজ্ঞানী আবদুস সালাম বলেছেন-
‘জ্ঞান সৃষ্টির এই অভিযানে আমাদের অংশ গ্রহণ করা সম্বন্ধে আমি যে এই আবেগ পূর্ণভাবে সুপারিশ করছি তার কারণ কি? এটা কেবল এ জন্য নয় যে, জানবার আগ্রহ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এটা এ জন্যও নয় যে আজকের অবস্থায় জ্ঞানই শক্তি এবং প্রয়োগিক বিজ্ঞানে তা বস্তুগত উন্নতির প্রধান অস্ত্র; বরং এটা এজন্যে যে, আন্তর্জাতিক সমাজের সদস্য হিসাবে যারা জ্ঞান সৃষ্টি করেন তারা আমাদের জন্যে- অব্যক্ত কিন্তু তবু অস্তিত্বশীল- যে ঘৃণার চাবুক রেখে দেন তা আমি অনুভব করি।
আমার এখনো মনে আছে কয়েক বছর আগে কোনো ইউরোপীয় দেশের পদার্থ্ বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী একজন বিজ্ঞানী আমাকে বলেছিলেন, ‘সালাম, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, ঐ সব জাতিকে রক্ষা করা, সাহায্য করা এবং বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য, সে দেশ যারা মানুষের জ্ঞান ভান্ডারে বিন্দুমাত্র কিছু সৃষ্টি করেনি বা দেয়নি?’ এবং যদিও সে বিজ্ঞানী এ কথা বলেননি তবু যখনই আমি কোন হাসপাতালে প্রবেশ করি তখনই আমার আত্মমর্যাদা বিরাটভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়। এটা দেখে যে, আজকের প্রায় প্রতিটি শক্তিশালী জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সৃষ্টি হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের অথবা আরব দেশের অথবা ইসলামী দেশের আমাদের কারো কোন অবদান ছাড়াই।……………… আমরা সংখ্যায় কম, পৃথকভাবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু, আমরা সকলে উম্মত উল ইলমে একত্রিত হলে তা আর হবে না। চুড়ান্ত বিচারে এ ধরণের একটি সত্যিকারের ইসলামী কমনওয়েলথ তৈরি করা এবং সেখানে বিজ্ঞানের পূনর্জাগরণ সম্ভব করা আমাদের উপরেই নির্ভর করে। আমি আপনাদের কাছে জামাল আব্দুন নাসের যা বলেছিলেন তার পূনরাবৃত্তি করছি, ‘অহংকারের সঙ্গে এবং আত্ম-মর্যাদার সঙ্গে উঠে দাঁড়ান। ১৯৪৬ সালে কেম্ব্রিজে আমি যখন এক ছাত্র হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, তখন আমার সমসাময়িক বৃটিশ ছাত্রদের চেয়ে আমার বয়স বেশী ছিল, তাদের চেয়ে আমি বেশী বিজ্ঞান জানতাম। কিন্তু, নিউটন, ম্যাক্সওয়েল, ডারউইন, ডিরাকের জাতির অংশ হওয়ায় তাদের এক ধরণের অহংকার ছিল। আপনারা মনে করুন যে আপনাদের অতীতে ইবনে হাইথাম, ইবনে সীনার মত কতো মানুষ ছিল। ……………… আপনারা যৌথ ইসলামী বিজ্ঞান কমনওয়েলথের জন্য আপনাদের প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প ও কর্মসুচীর সাহসিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করুন……।
ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি এমন দরদ যে বিজ্ঞানীর, তার বিজ্ঞান-গবেষণাগারে মসজিদ থাকবেই, উপসংহার টানল জোয়ান।
মসজিদের ছায়ায় বসে জোয়ান অপেক্ষা করছিল আব্দুল্লাহ জুবায়েরের। ডঃ আব্দুল্লাহ জুবায়ের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও কারিগরি মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারী। তিনি ইন্টার ন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিক্যাল ফিজিক্স (আই সি টি পি)- এর উপদেষ্টা পরিষদের একজন প্রভাবশালী সদস্য। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তার বিজ্ঞান বাজেটের প্রায় এক চতুর্থাংশ চাদা হিসেবে দেয় ডঃ সালামের এই বিজ্ঞান কেন্দ্র আই সিটিপি’কে। আই সিটিপি’র এখন সবচেয়ে বড় ডোনার দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। জোয়ান যাতে আই সিটিপি থেকে তার কাজ ভালভাবে করে নিতে পারে এ জন্য ফিলিস্তিন সরকার খোদ আব্দুল্লাহ জুবায়েরকে পাঠিয়েছে ট্রিয়েস্টে।
আহমদ মুসা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মাহমুদকে বলে আগেই এসব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রেখেছেন।
সেদিন শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স থেকে ফিরেই আহমদ মুসা যিয়াদ ও জোয়ানকে নিয়ে মাদ্রিদস্থ ফিলিস্তিন দূতাবাসে গিয়েছিল।
স্পেনের মাদ্রিদে যে ফিলিস্তিন দূতাবাস আছে, আহমদ মুসার সে কথাটা মনে হয়নি। শাহ ফয়সাল কমপ্লেক্স থেকে ফিডেল ফিলিপের বাসায় ফিরে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের সাথে জরুরী যোগাযোগের কথা ভাবছিল। কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। টেলিফোনে কথা বলতে গেলে সব কথা স্পেন সরকার শুধু নয়, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের কানেও কথাটা পৌঁছে যাবে। সমস্যার সমাধান হিসেবে ফিডেল ফিলিপই কথাটা প্রথম স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, আপনার এ্যামবেসী মানে ফিলিস্তিন এ্যামবেসী মাদ্রিদে থাকতে আপনি এত চিন্তা করছেন।
সংগে সংগেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার মুখ। গাইড থেকে টেলিফোন নাম্বার খুঁজে নিয়েছিল ফিলিপ।
টেলিফোনে রাষ্ট্রদূতকে পেয়ে তার কাছে আহমদ মুসা নিজের পরিচয় দিতেই সে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিল। তারপর সে কিছুক্ষণ আবেগের আতিশয্যে কথা বলতে পারেনি। অনেকক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিল, জনাব, আমি আবু সাবের, আপনার একজন নগন্য কর্মী।
আহমদ মুসা আবু সাবেরকে চিনতে পেরেছিল। সংগ্রামকালে প্রচার বিভাগের কর্মী ছিল সে।
কোন কথা শুনেনি, সংগে সংগেই গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছিল আবু সাবের। সে গাড়িতে চড়েই আহমদ মুসা, যিয়াদ ও জোয়ান ফিলিস্তিন এ্যামবেসিতে গিয়েছিল।
এ্যামবেসীর অয়্যারলেসে আহমদ মুসা কথা বলেছিল ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট তার প্রিয় সহকর্মী মাহমুদের সাথে। মাহমুদও আবু সাবেরের সঙ্গী আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিল এবং সেই সাথে তুলেছিল একরাশ অভিযোগ। বলেছিল, আপনি কোনই যোগাযোগ রাখছেন না। আমরা শুধুই আপনার পিছনে ছুটছি, ধরতে পারছি না। আমরা খোজ পাওয়ার পর ককেশাসে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম আপনি বলকানে। বলকানে আপনার খোঁজ যখন পেলাম, তখন আপনি পাড়ি জমিয়েছেন স্পেনে, স্পেনের দূতাবাসকে নির্দেশ দিলাম আপনাকে খুঁজে বের করার জন্য। অবশেষে আজ পেলাম আপনাকে। আপনার কাছে কোন অপরাধ করেছি মুসা ভাই যে, আপনার সাথে সম্পর্ক রাখার অধিকার আমাদের থাকবে না?
মাহমুদের শেষ কথাগুলো অভিমানে ভারী হয়ে উঠেছিল।
আহমদ মুসার ঠোঁটে স্নেহের হাসি ফুটে উঠেছিল। উত্তরে বলেছিল, ভাইটি, আজ কিন্তু আমি নিজে খোজ করে তোমার দূতাবাসে এসেছি। প্রয়োজন হলে এক মুহুর্তও যে দেরী করব না তোমাদের কাছে আসতে সে পরিচয় তো তুমি পেলে। আর শোন ঘটনার শ্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, ইচ্ছা করলেও পারি না তোমাদের খোজ নিতে। তোমার এমিলিয়া কেমন আছে?
‘তাঁকেই জিজ্ঞাসা করুন, মুসা ভাই’। বলে মাহমুদ টেলিফোন দিয়েছিল এমিলিয়াকে।
এমিলিয়া কেঁদে ফেলেছিল। কথা বলতে পারেনি অনেকক্ষণ। শেষে বলেছিল, আপনি নিরুদ্দেশ হয়ে থাকতে পারেন, এমন করে বোনদের ভুলে থাকতে পারেন ভাবিনি। তাই কষ্ট লাগে। আয়েশা আলিয়েভার কাছে সব শুনেছি। বড় কষ্ট লাগে ভাবীর জন্য। আপনি শুধু মানুষকে কষ্ট দিতে পারেন। দায়িত্বের কাছে হৃদয় বৃত্তির কি কোনই মুল্য নেই?
আহমদ মুসা এমিলিয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছিল, ‘এমিলিয়া, আমি অব্যাহত এক যুদ্ধে জড়িয়ে আছি। যুদ্ধক্ষেত্রের ধর্ম অনুসারে অনেক স্বাভাবিক দাবী এখানে অস্বাভাবিকভাবে পদদলিত হয়।’
এমিলিয়াকে সান্তনা দিয়ে আহমদ মুসা কথা বলেছিল মাহমুদের সাথে। বলেছিল স্পেনে মুসলমানদের নতুন বিপদের কথা, বলেছিল ডঃ সালামের বিজ্ঞান গবেষণাগারের সাহায্যের প্রয়োজনের কথা। মাহমুদ বলেছিল, স্পেনের ভাইদের এই প্রয়োজন পূরণকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। আব্দুল্লাহ জুবায়েরকে আপনি জানেন। ওকেই আমি পাঠাচ্ছি ট্রিয়েস্টে যাতে কোন সমস্যা না হয়। তারপর খুঁটি-নাটি ব্যাপার নিয়ে মাহমুদের সাথে আহমদ মুসার আরো অনেক আলাপ হয়েছিল। একঘন্টা আলোচনার পর কথা শেষ করতে গিয়ে মাহমুদ কেঁদে ফেলেছিল। দু’টি কথা শেষে বলেছিল, ‘ এক; আপনার একটু বিশ্রামের জন্য আমি আপনার কাছে দরখাস্ত করছি, দুই; ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আপনার, আপনার কোন কাজে যদি এ রাষ্ট্র না লাগে তাহলে কষ্ট পাই।’
মাহমুদের কথার জবাব দিতে গিয়ে আহমদ মুসা গম্ভীর কন্ঠে বলেছিল, বিশ্রামের কথা বলছ মাহমুদ! তুমি জান মুসলমানরা একটা মিশনারী জাতি এবং তারা একটা বিপ্লবী কর্মী দল। গোটা দুনিয়ার মানুষকে পথ দেখানো দূরে থাক, আমরা নিজেরাই আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। এই যখন অবস্থা, তখন বিশ্রামের চিন্তা তুমি আমি করতে পারি কি করে মাহমুদ। কথা সেদিন শেষ হয়েছিল এভাবেই।
জোয়ান ট্রিয়েস্টে গিয়ে কিভাবে আব্দুল্লাহ জাবেরের দেখা পাবে তার দিন, ক্ষণ, স্থান সব ঠিক করে দিয়েছিল ফিলিস্তিন এ্যামবেসীই।
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই জোয়ান মসজিদের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল।
জোয়ান তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকাল। দেখল, বেলা ১১টা বাজতে যাচ্ছে।
চঞ্চল হয়ে উঠল জোয়ান। ঠিক ১১ টায় তার আসার কথা।
হাত ঘড়ির দিকে তাকাল জোয়ান।
ঠিক এগারটা বাজে।
উৎসুক চোখ জোয়ান মেলে ধরল সামনে। চোখ তুলতেই তার চোখ গিয়ে পড়ল এগিয়ে আসা দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী লোকের উপর। ধোপদুরস্ত ইউরোপীয় পোশাক, কিন্তু লাল আরবী চেহারা। সেই যে আব্দুল্লাহ জাবের কিছু মাত্র সন্দেহ রইল না জোয়ানের।
বেশ দূরে থাকতেই হাসিমুখে সালাম দিল লোকটি।
জোয়ান সালাম গ্রহণ করেই বলল, নিশ্চয় জনাব আব্দুল্লাহ জাবের।
‘হ্যাঁ, আপনি নিশ্চয় ভাই জোয়ান ওরফে মুসা আব্দুল্লাহ।’
হ্যান্ডশেক করে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরল।
‘মুসা ভাই কেমন আছেন?’ বলল জোয়ান।
‘কতদিন তাঁর কথা শুনিনি। আপনার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনব।’
‘আহমদ মুসা ভাইকে আপনারা এত ভালবাসেন?’ সেদিন দেখলাম, দূতাবাসের সবাই তাঁর জন্যে পাগল। কেন এত ভালবাসা?’
‘আপনার সাথে তার পরিচয় কতদিন?’
‘মাস হয়নি।’
‘আপনি তাকে ভালবাসেন না?’
‘অবশ্যই।’
‘কেন তাকে ভালবাসেন?’
জোয়ান একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘মানুষের প্রতি তার অপূর্ব ভালবাসা, সাথীদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাস্য মমতা দেখে।’
‘তাঁর সাথে যারা মিশেছেন, সবাই এই একই জবাব দেবেন। তিনি এমন এক নেতা, যাঁর সাথে কেউ দু’দিন কাটালে সারাজীবন তাঁর সাথে থাকতে চাইবে। সাথীদের সুখ-সুবিধা, নিরাপত্তার দিকে তাঁর যত নজর, তার একাংশও নিজের জন্যে তিনি করেন না। সাথীদের তিনি নিরাপদ পক্ষপুটে রেখে সব বিপদ, সব ঝুঁকি তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। এমন নেতার জন্যেই তো জীবন দেয়া যায়। তাই তো পাগল সবাই তাঁর জন্যে।’
‘এমন বিস্ময়কর চরিত্র কি করে সৃষ্টি হলো?’
‘ইসলামে নেতার চরিত্র এটাই। ইসলামের স্বর্ণযুগে এটাই ছিল নেতার চরিত্র। শুধু স্বর্ণযুগে কেন, চরিত্র, মানুষের প্রতি ভালবাসা দিয়েই তো ইসলাম জগত জয় করেছে।’
‘মাফ করবেন হিংস্রতার ইতিহাসও তো আছে।’
‘আপনি পরবর্তীকালের কিছু নাম মাত্র খলীফা, রাজা-বাদশাহদের কথা বলছেন। কিন্তু তাঁদের ইতিহাস ইসলামের ইতিহাস নয়। এ কথা ঠিক মুসলিম সাম্রাজ্য তারা সংহত করেছেন, সংরক্ষণ করেছেন, শাসন করেছেন, কিন্তু তাঁদের দেখে মানুষ ইসলাম গ্রহন করেনি। মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি, শাহ মখদুম, শাহ জালালের মত মুজাহিদ মিশনারীদের দেখে। যাঁরা ছিলেন মানুষের কাছে মোমের মত কোমল, আর অত্যাচারের মূলোতপাটনে ছিলেন সিংহের মত সংগ্রামী।’ থামল আব্দুল্লাহ জাবের। থেমেই বলল, ‘চলুন ওঁরা অপেক্ষা করছেন।’ তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
চলল তারা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই, সি, টি, পি’র গেটের দিকে।
আই সি টি পি’র (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স)-এর পরিচালক ডঃ নূর আব্দুল্লাহর অফিস।
রাত তখন নয়টা। ডঃ নূর আবদুল্লাহ তার টেবিলে তার রিভলভিং চেয়ারে বসে। তার চোখ-মুখ লাল, উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাকে।
ডঃ নূর আবদুল্লাহ আফগান বংশোদ্ভুত। দুই পুরুষ ধরে ইতালীর নাগরিক। একজন কৃতি পদার্থ বিজ্ঞানী সে। যত নিষ্ঠা ও মমতা দিয়ে ডঃ আবদুস সালাম এই পদার্থ বিজ্ঞান গবেষনাগার গড়ে তুলেছিলেন তৃতীয় বিশ্বের অবহেলিত বিজ্ঞানীদের জন্যে, ডঃ নূর আবদুল্লাহ আজ ততটা মমতা ও নিষ্ঠা দিয়েই কেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন। তার পরিচালনায় কেন্দ্রটি আজ তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞানী বিশেষ করে মুসলিম বিজ্ঞানীদের জন্যে এক ‘স্বর্গভূমি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডঃ আবদুল্লাহ জাবের ধীর পায়ে ডঃ নূর আবদুল্লাহর অফিসে প্রবেশ করল।
ডঃ আবদুল্লাহ জাবেরকে দেখেই ডঃ নূর আবদুল্লাহ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল এবং উত্তেজিত কন্ঠে বলল, ডঃ জাবের সর্বনাশ হয়ে গেছে, স্যাম্পুলগুলোর তেজস্ক্রিয় বিশ্লেষণের রিপোর্ট এবং স্যাম্পুল ল্যাবরেটরী থেকে হারিয়ে গেছে।
‘হারিয়ে গেছে?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল ডঃ আবদুল্লাহ জাবের।
‘হারিয়ে গেছে মানে টেবিল থেকে উধাও হয়েছে। মাগরিব নামাযের ব্রেকে বিজ্ঞানী তৌফিক আল বিশারা বাইরে এসেছে। ফিরে গিয়ে রিপোর্ট এবং স্যাম্পুল কিছুই পায়নি।’
‘অবিশ্বাস্য ঘটনা।’
‘তুমি অবিশ্বাস্য বলছ, আমি তো আতংক বোধ করছি।’ মুখ কালো করে বলল ডঃ নূর আবদুল্লাহ।
‘রিপোর্ট ও স্যাম্পুল উধাও হয়েছে, কিন্তু কম্পিউটারে তো সবই আছে। অন্ততঃ এই ক্ষতিটা থেকে বাঁচা যাবে।’
শুকনো হাসি ফুটে উঠল ডঃ নূর আবদুল্লাহর ঠোঁটে। বলল, ‘বিজ্ঞ চোর সে দরজাও বন্ধ করে গেছে। কম্পিউটারের সে ডিস্ক একদম সাদা, সব মুছে দিয়ে গেছে। অথবা ডিক্স বদলে আসলটা নিয়ে গেছে।’
ডঃ আবদুল্লাহ জাবের ধপ করে বসে পড়ল চেয়ারে। তার চোখে নেমে এলো অন্ধকার। তার চোখে ভেসে উঠল আহমদ মুসার মুখ। আহমদ মুসা তাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিল, সে দায়িত্ব সে পালন করতে পারলো না। মানসিক দিক দিয়ে মুষড়ে পড়ল ডঃ আবদুল্লাহ জাবের।
ডঃ নূর আবদুল্লাহও তার চেয়ারে বসে পড়ল। মলিন এবং বিস্ময় তার চেহারা। বলল সে, দুঃখিত ডঃ জাবের, এ ধরনের ঘটনা আমাদের গবেষণা কেন্দ্রে এই প্রথম। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
‘কাউকে সন্দেহ করেন, যে এই কাজ করতে পারে?’
‘কাকে সন্দেহ করব, সবাই তো আমরা এখানে এক।’
‘ঘটনা যখন ঘটেছে, কেউ অবশ্যই তা ঘটিয়েছে। অনুসন্ধানে তা বেরোবেই। দরকার হলে গোয়েন্দা ফার্মের সাহায্য নিতে হবে। সেটা পরে হবে। কিন্তু রিপোর্ট যে জরুরী, এর জন্যে তো অপেক্ষা করা যাবে না।’
‘মিঃ জোয়ানের কাছে কি বাড়তি কোন স্যাম্পুল আছে?’
‘জানি না। ওর কাছে তাহলে যেতে হয়, তাছাড়া ঘটনাও তার জানা দরকার।’
দু’জনেই উঠল।
বেরুল অফিস থেকে।
চলল দু’জন জোয়ান যেখানে থাকে সেদিকে। জোয়ান থাকছে আই সি টি পি’র রেস্ট হাউজে, গবেষণা কমপ্লেক্সের বাইরে সাগরের তীরে।
রেস্ট হাউজ এক তলা সাগর থেকে উঠে আসা উঁচু এক টিলার উপর নির্মিত। চারদিকে ফুলের বাগান। মাঝখানে সুন্দর ছবির মত রেস্ট হাউজটি।
রাত তখন ৮টা ৩০ মিনিট।
জোয়ানের সাথে কথা বলছিল ডঃ আবদুল্লাহ জাবের এবং ডঃ নূর আবদুল্লাহ।
রিপোর্ট এবং স্যাম্পুল হারানোর কথা শুনে জোয়ানের মুখ কাগজের মত সাদা হয়ে গেল। বলল, বাড়তি কোন স্যাম্পুল আমার কাছে নেই।
ডঃ আবদুল্লাহ জাবের এবং ডঃ নুর আবদুল্লাহর তখন বিব্রতকর অবস্থা। তাদের কারও মুখে কোন কথা নেই।
কথা বলল জোয়ানই আবার। বলল, মাদ্রিদের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে একদল ছাত্র-শিক্ষক এসেছে স্টাডি ট্যুরে। ওরাই এটা ঘটিয়েছে।
ডঃ নুর আবদুল্লাহ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। বলল, ওরা? কেন করবে? জানবে কি করে ওরা?
‘ওরা এসেই জানতে পেরেছে আমি এসেছি। ওদের কেউ একজন এখানে আছে। সেই সব জানিয়েছে।’ বলল জোয়ান।
‘এসব কথা আপনি কি করে জানলেন মিঃ জোয়ান?’ বলল ডঃ আবদুল্লাহ জাবের।
‘সন্ধ্যায় এসে আমার ঘরে একটা চিঠি পেয়েছি। ঐ স্টাডি টিমে আমার এক বান্ধবী আছেন, তিনিই আমাকে জানিয়েছেন।’
বলে জোয়ানের বালিশের তলা থেকে চিঠি বের করল। পড়ল চিঠিটিঃ
জোয়ান,
‘মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্টাডি ট্যুরে এসেছে একদল ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক। সব ওরা জানতে পেরেছে। তোমাদের পরিকল্পনা ওরা ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র এঁটেছে। তুমিও ওদের টার্গেট। আমি চিন্তিত। সাবধানে থেকো, রাতে কোথাও সরে থাকতে চেষ্টা কর। তোমার সাথে দেখা করা নিরাপদ নয়। কিছু জানলে এইভাবে চিঠি দিয়ে জানাব। গবেষনা কেন্দ্রে এবং বাইরেও ওদের লোক আছে। খুব শক্তিশালী এরা। আবার বলছি, সাবধানে থেকো।
তোমার – ‘জেন’
চিঠি শুনতে শুনতে ডঃ নুর আবদুল্লাহর চোখে-মুখে উদ্বেগ-আতংক ফুটে উঠল। চিঠি পড়া শেষ হলে সে বলল, ‘গবেষণা কেন্দ্রের কেউ তাদের সাথে থাকবে কেন? কি সম্পর্ক তাদের সাথে? বিদেশী ওরা, দু’একদিনের স্ট্যাডি ট্যুরে এসেছে মাত্র।’
‘স্ট্যাডি ট্যুরে কোন শিক্ষক এসেছে, তা জেন লিখেনি। লিখলে বুঝতে পারতাম। তবে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের কেউ অবশ্যই আছে এবং তিনি সব কলকাঠি নাড়ছেন। ইটালিতে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান আছে। ট্রিয়েষ্টেও অবশ্যই থাকবে এবং তাদের কাউকে তারা আই সি টি পি’তে রাখবে সেটাও স্বাভাবিক।’ বলল জোয়ান।
চোখ বুজে আছে ডঃ নুর আব্দুল্লাহ। ভাবছে সে।
জোয়ান থামলেও কিছুক্ষন কথা বলল না ডঃ নুর আবদুল্লাহ। পরে ধীরে ধীরে চোখ খুলে বলল, ‘ভেবে পাচ্ছি না, আমার গবেষণা কেন্দ্রে এমন কে আছে যে গবেষণা কেন্দ্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে?’
ডঃ আবদুল্লাহ জাবের কিছু বলার জন্যে মুখ খুলছিল। এই সময় দরজার ওপর শব্দ হলো।
ডঃ আবদুল্লাহ জাবেরের আর কথা বলা হলো না প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল জোয়ানের দিকে। জোয়ানের পড়া চিঠির কথা তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল।
জোয়ানের মুখ শুকনো। সে কোন কথা বলতে পারছে না।
আবার নক হলো দরজায়।
ডঃ নুর আবদুল্লাহ উঠল। বলল, জোয়ান তুমি একটু আড়ালে দাঁড়াও। আমি দেখছি কে ওখানে।
ডঃ নুর আবদুল্লাহকে আর এগুতে হলো না। দরজায় এসে দাঁড়ালো কালো ফেল্ট হ্যাট ও কালো ওভার কোটে আবৃত একজন আগন্তুক।
‘কে আপনি?’ জিজ্ঞাসা করল ডঃ নুর আবদুল্লাহ।
দরজা দিয়ে এক ঝলক আলো গিয়ে পড়েছিল আগন্তুকের উপর।
আগন্তুক ডঃ নুর আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাঁর মাথার ফেল্ট হ্যাটটি খুলে ফেলল।
এবার আগন্তুকের পুরো মুখটার উপর নজর পড়ার সাথে সাথে ডঃ আবদুল্লাহ জাবের ‘মুসা ভাই’ বলে চিৎকার করে উঠে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আগন্তুককে।
ডঃ আবদুল্লাহ জাবের আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরেই ঘরে নিয়ে এল এবং ডঃ নুর আবদুল্লাহকে দেখিয়ে বলল, ইনি ডঃ নুর আবদুল্লাহ আই সি টি পি’র পরিচালক।
আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক করল ডঃ নুর আবদুল্লাহর সাথে।
আড়াল থেকে বেরিয়ে জোয়ান আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে এইভাবে আবির্ভুত হতে দেখে বিস্ময়ে তার নির্বাক অবস্থা।
জোয়ানের দিকে চোখ পড়তেই আহমদ মুসা তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, খুব অবাক হয়েছ না?
‘শুধু অবাক নয়, আমার চোখকে এখনও বিশ্বাস করতে মন চাইছে না।’ বলল জোয়ান।
সবাই বসল।
আহমদ মুসা ও জোয়ান পাশাপাশি।
তাদের মুখ দরজার দিকে
তাদের পাশের সোফায় বসল ডঃ আবদুল্লাহ জাবের এবং ডঃ নুর আবদুল্লাহ।
‘তোমার এখানে যাত্রা করার একদিন পর’, বলতে শুরু করল আহমদ মুসা, ‘জেনের কাছ থেকে একটা চিরকুট পেলাম। চিরকুটটিতে লেখা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্যাডি-ট্যুর ট্রিয়েস্টে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই আমাকে যেতে হচ্ছে। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত বলে আগে কাউকে জানাতে পারিনি। বাসায় জোয়ানকেও পাইনি, খালাম্মাকেও পাইনি। শুনলাম জোয়ান মাদ্রিদের বাইরে। তাকে কিছুই বলা হলো না। আপনি দয়া করে তাকে জানাবেন।’ জেনের চিরকুটটি পড়েই আমার মনে হলো ট্রিয়েস্টে কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ভাবলাম, সব ক্রোধের শিকার হবে তুমি। সংগে সংগেই আমি ফিলিপকে বললাম আমি ট্রিয়েস্টে যাব। কিন্তু সোজা পথে তো আমার আসার উপায় ছিল না। ফিডেল ফিলিপের সাথে পিরেনিজ পার হলাম তারপর বাসক এলাকার মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সের পোর্ট ভেন্ড্রেস হয়ে ট্রিয়েস্ট এলাম।’
একটু থামল আহমদ মুসা।
সোফায় একটু নড়ে-চড়ে বসে আবার মুখ খুলতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা।
এই সময় দু’টি ছায়া মুর্তি বিড়ালের মত নিঃশব্দে এসে খোলা দরজায় দাঁড়াল। তাদের হাতে উদ্যত স্টেনগান। একটি স্টেনগানের নল জোয়ানের বুক বরাব