১৪. গোয়াদেলকুইভারে নতুন স্রোত

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

রাত তিনটা পঁয়তাল্লিশ। ঘুমিয়ে আছে মাদ্রিদের ফার্ডিন্যান্ড এভেনিউ। পুলিশের অথবা নাইট ক্লাব ফেরত দু’একটা গাড়ী মাঝে মাঝে এই ঘুমে কিছুটা বিরক্তি উৎপাদন করছে মাত্র।
ফার্ডিন্যান্ড এভেনিউ-এর ওপর দাঁড়ানো কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যানের বিশাল পাঁচ তলা অফিসটিও জেগে জেগে অবশেষে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’একটি ঘরের জানালা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু বড় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওগুলোকে। যেন ওগুলোর চোখেও ঘুমের ঝিমুনি।
কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যান হেড কোয়ার্টারটি ফার্ডিন্যান্ড এভেনিউ-এর পশ্চিম পাশে। এভেনিউটি উত্তর-দক্ষিণ প্রসারিত। আর কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টারটি প্রসারিত পূর্ব -পশ্চিমে। পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত হেড কোয়ার্টারের গেটটি ফার্ডিন্যান্ড এভেনিউ-এর গা ছুঁয়ে দাঁড়ানো। লোহার ফোল্ডিং গেট। গেটের ভেতরে লিফট রুম ও সিঁড়ির মাঝখানে দু’জন প্রহরী চেয়ারে বসে তাদের কাঁধে স্টেনগান ঝুলছে। প্রহরী দু’জনও ঝিমুচ্ছে।
বিল্ডিং-এর বাইরে আর কোন প্রহরী নেই। ভেতরে প্রত্যেক ফ্লোরে একজন করে সশস্ত্র প্রহরী রয়েছে।
সব মিলিয়ে নিরাপত্তার মিনিমাম ব্যবস্থা। এর কারণ, যে বাঘ সব সময় শিকার ধরতেই অভ্যস্ত, সে কাউকে শিকার হওয়ার ভয় করে না। কু- ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান সবার ঘরে ঢুকে, সবাইকে তাড়া করে, তার ঘরে আবার ঢুকবে কে। এমন সাহস কারও আছে বলে তারা মনে করে না।
পূর্ব পশ্চিম লম্বা অফিস বিল্ডিং এর তৃতীয় তলার একদম পশ্চিমের রুমটি ভাসকুয়েজের। এই তলাতেই মিনাত্রা সেন্ডোর স্থলাভিসিক্ত কু-ক্লাস্ক-ক্ল্যানের নতুন অপারেশন কমান্ডার জুরি জুরিটার অফিস। তবে তার একটি বিশ্রাম কক্ষ চারতলায়। কাজের অবসরে সে এখানে বিশ্রাম নেয়, রাত বেশী হলে সেখানে মাঝে মাঝে রাত যপিনও করে। আজও যেমন সে বাড়ি যায়নি-তার বিশ্রাম কক্ষেই সে রাত কাটাচ্ছে। রাত আড়াইটায় সে ফিরে এসেছে পাহারার তদারকি থেকে।
রাত ঠিক তিনটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে আহমদ মুসার গাড়ী সাপের মত নিঃশব্দে এসে থামল কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যান বিল্ডিং-এর পশ্চিম দিকে একটা ঝাউ গাছের পাশে।
কু-ক্লাস্ক-ক্ল্যান হেড কোয়ার্টারের পশ্চিম পাশে আরেকটা অফিস। সেটাও পাঁচ তলা। দুই বিল্ডিং-এর মাঝখানে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। সম্ভবতঃ পার্কিং প্লেস হিসেবে ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দু’টি ঝাউগাছ থাকায় জায়গাটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী অন্ধকার।
আহমদ মুসা একটা ঝাউ গাছ ঘেঁষে তার গাড়ীটি দাঁড় করিয়ে নিঃশব্দে গাড়ী থেকে নেমে এল।
তারপর আশ-পাশটা ঘুরে দেখল কোন প্রহরী কোথাও নেই।
আহমদ মুসা ওপর দিকে তাকিয়ে ভাসকুয়েজের অফিস রুমটা একবার দেখে নিল। ভেতর থেকে আলোর কোন রেশ কোন দিক থেকে আসছে না।
পিঠের ব্যাগ থেকে আহমদ মুসা হুক লাগানো নাইলন কর্ড বের করে নিল।
হুকটা ছুড়ে মারল তিন তলার কার্নিশে। নিখুঁত নিশানা। হুকটা গিয়ে আটকে গেল তিন তলার কার্নিশে।
আহমদ মুসা চারদিকে একবার চেয়ে নিয়ে দড়ি বেয়ে তর তর করে উঠে তিন তলার কার্নিশে গিয়ে বসল।
উত্তর দক্ষিণে বিলম্বিত বিশাল কক্ষ ভাসকুয়েজের। পশ্চিম দিকে তিনটি জানালা। আহমদ মুসা মাঝখানে জানালার মুখোমুখি উঠে বসেছে।
জানালা পুরু লোহার গরাদে ঢাকা।
‘জানালা কি ভেতর থেকে লক করা?’ ভাবল আহমদ মুসা।
জানালার গরাদে হাত দিতে গিয়েও হাত টেনে নিল আহমদ মুসা। ভাবল, ভাসকুয়েজ জানালাকে বিদ্যুতায়িত করে রাখতে পারে।
পকেট থেকে ডিক্টেটর স্ক্রুড্রাইভার বের করে পরীক্ষা করল গরাদ। না, জানালা বিদ্যুতায়িত নয়।
গরাদ ভেতর থেকে লক করা আছে কি না তা দেখার জন্যে আহমদ মুসা স্ক্রুড্রাইভারের ধারাল অগ্রভাগ গরাদের নিচে ঢুকিয়ে ওপরের দিকে একটা চাপ দিল।
গরাদটি নিঃশব্দে নড়ে উঠে সিকি ইঞ্চি পরিমাণ ওপরে উঠে গেল। মুখে হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার। ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ভাসকুয়েজ। তার কক্ষের নিরাপত্তার সাধারণ ব্যবস্থাটুকুও রাখেনি।
গরাদের দু’প্রান্তে দু’হাত লাগিয়ে এক টানে ওপরে উঠিয়ে ফেলল গরাদটি।
লোহার গরাদের পর জানালার কাঁচের আরো একটি গরাদ। একই ভাবে সেটিও তুলে ফেলল আহমদ মুসা।
ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার।
আহমদ মুসা স্মরণ করল, মাঝের এই জানালাটি পুব দিক থেকে অর্থাৎ ভেতর থেকে ঘরে ঢুকার একমাত্র দরজা বরাবর এবং জানালার সামনে ভেতরটা ফাঁকা।
আহমদ মুসা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে সন্তর্পনে পা রাখল কার্পেটের ওপর।
কার্পেটের ওপর কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরের অন্ধকারকে গা সহা করে নিল।
আহমদ মুসার লক্ষ্য ছিল ভাসকুয়েজের টেবিল। ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে এক খন্ড জমাট অন্ধকারের মত ভেসে উঠল ভাসকুয়েজের টেবিলটা। ভাসকুয়েজের টেবিলের ওপাশে কম্পিউটারের সাদা পর্দা অন্ধকারের বুকে ধোয়াটে সাদা চোখের মত মনে হলো তার কাছে।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে এগুলো কম্পিউটারের দিকে।
অতি সন্তর্পনে টেবিল ঘুরে আহমদ মুসা গিয়ে দাঁড়াল কম্পিউটারের সামনে।
এই কম্পিউটারের জন্যেই ভাসকুয়েজের অফিসে এসেছে আহমদ মুসা। তার বিশ্বাস, মাদ্রিদের মসজিদ কমপ্লেক্স এবং অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিক স্থান গুলোতে তেজস্ক্রিয় পাতার পরিকল্পণা ভাসকুয়েজ নিশ্চয় তার রেকর্ডে রেখেছে। সে রেকর্ড ভাসকুয়েজ যেখানে যেখানে রাখতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় স্থান হলো তার কম্পিউটার মেমোরী। আহমদ মুসা তাই ভাসকুয়েজের কম্পিউটারে মেমোরী সন্ধান করে দেখার জন্যেই তার অফিসে ছুটে এসেছে।
কম্পিউটারের সামনে চেয়ারে বসে পড়ল আহমদ মুসা। অন্ধকার, কিছুই ঠাহর করতে পারল না।
আহমদ মুসার পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বের করে প্রথমে দেখে নিল বিদ্যুত কানেকশন ঠিক আছে কি না। তার পর দেখল কম্পিউটার স্টার্ট নেয় কি না। বোতাম টিপে দেখল ঠিক আছে। খুশী হলো আহমদ মুসা।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সর্বশেষ মডেলের কম্পিউটারে গোপন লক সিস্টেম আছে, যা দিয়ে কম্পুটারের মেমোরী ফাইল লক করে রাখা যায়। কোড না জানলে তা আনলক করা যায় না। যিনি লক করেন তিনি যে কোডে লক করেছেন, সেই কোডেই শুধু আনলক করা যাবে।
আহমদ মুসা দুরুদুরু বুকে বাম হাতে টর্চ ধরে, ডান হাতে মেমোরী উইনডো স্থাপন করার জন্যে নির্দিষ্ট বোতামটিতে চাপ দিল।
মিষ্টি একটা টক্ শব্দ উঠলো সুইচের। কম্পিউটারের পর্দায় স্থির ছিল আহমদ মুসার দৃষ্টি। আনন্দে নেচে উঠল আহমদ মুসার চোখ। দেখল, সুইচ টেপার সাথে সাথেই কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠল মেমোরী উইনডো। প্রশ্ন ভেসে উঠল, জানতে চাইল পরবর্তী নির্দেশ কি?
আহমদ মুসা হাপ ছেড়ে বাঁচল, মেমোরি লক করা নেই। ভাসকুয়েজ লক করার প্রয়োজন মনে করেনি। তাঁর প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস যে, কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের গুহায় হানা দেয়া তো দূরে থাক-এ চিন্তাও স্পেনে কেউ করতে পারে না। মনে মনে আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল, ভাসকুয়েজের এই আত্মবিশ্বাস তাকে সাহায্য করেছে।
আহমদ মুসা চিন্তা করতে লাগল কম্পিউটারকে পরবর্তী নির্দেশ তিনি কি দেবেন? মেমোরির ফাইল ডাইরেক্টরী সে চাইতে পারে, ভাবল আহমদ মুসা। ফাইল ডাইরেক্টরীতে নিশ্চয় কোন ফোল্ডার থাকবে যেখানে রেকর্ড করা আছে স্পেনে মুসলমানদের ঐতিহাসিক স্থান সমূহ ধ্বংসের সেই ঐতিহাসিক পরিকল্পনা।
আহমদ মুসা বোতাম টিপে কম্পিউটারকে মেমোরি ফাইল ডাইরেক্টরী জ্ঞাপন করতে নির্দেশ দিল।
সংগে সংগে কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠল একটা স্বতন্ত্র উইনডো। উইনডোর বুকে ভেসে উঠল বোড়া বর্ণমালার দীর্ঘ তালিকা। ওদিকে তাকিয়ে হতাশ হলো আহমদ মুসা। ফাইল বা ফোল্ডার গুলোর নাম সাংকেতিক ভাবে লেখা। দু’টি করে বর্ণ দু’টি শব্দের প্রতিনিধিত্ব করে না একটি শব্দের, তাও বোঝা মুশকিল। তালিকার শীর্ষের ফাইলটির নাম PL বর্ণে লেখা। তার পরেরটি ON এই ভাবে দশটি ফাইলের তালিকা ফাইল ডাইরেক্টরীতে রয়েছে। কোড ভাঙার জন্যে আহমদ মুসা প্রত্যেকটি ফাইলের সাংকেতিক বর্ণমালা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করল। শেষ দু’টি নামে এসে আহমদ মুসার চোখ আটকে গেল। একটির সাংকেতিক নাম EP আহমদ মুসা এর অর্থ করল Enemy Personal. আর সর্বশেষটির নাম OF সে এর অর্থ বের করল Operation Final. যেহেতু কু-ক্লাস্ক-ক্ল্যান স্পেনে কোন মুসলিম ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করেনি, টার্গেট করেছে মুসলমানদের ঐতিহাসিক সম্পদকে এবং এটা স্পেন থেকে মুসলমানদের চিহ্ন মুছে ফেলারই চক্রান্ত। তাই যথাযথভাবেই এটা Operation Final হতে পারে।
খুশি হল আহমদ মুসা। সেই সাথে আশাবাদের একটা প্রচন্ড শিহরণ খেলে গেল তার দেহে। অবশেষে সে দুর্লভ পরিকল্পনাটি পেতে যাচ্ছে। নিশ্চয় পরিকল্পনার সাথে ডায়াগ্রামও থাকবে।
আনন্দ কম্পিত হাতে বোতাম টিপে OF ফাইলটি নিয়ে এল আহমদ মুসা।
ফাইলটি ভেসে উঠল কম্পুটারের স্ক্রীনে।
স্ক্রীনের ওপর চোখ পড়তেই ম্লান হয়ে গেল আহমদ মুসার মুখ।
স্ক্রীনে ভেসে ওঠা উইনডোতে একটি মাত্র বাক্য লিখা, ‘সাইট গুলোতে রেডিয়েশন বক্স সাফল্যজনক ভাবে স্থাপিত, ডকুমেন্ট ‘ELDER’ -এর কাছে নিরাপদ।’
আহমদ মুসার হতাশ চোখ দু’টি কম্পিউটারের স্ক্রীনে যেন আঠার মত লেগে আছে কিংবা চোখ সরাতে ভুলে গেছে যেন।
হঠাৎ করে ঘিরে ধরা হতাশার আঘাত হজম করছে আহমদ মুসা।
ঠিক এই সময়ই দরজার নব ঘুরাবার মত ‘ক্লিক’ করে একটা শব্দ হলো। শব্দটা এল তার পেছন থেকে-দরজার দিক থেকে।
এক ঝটকায় মুখ ফিরিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। ঠিক সেই সময় ঘরের আলো জ্বলে উঠল, উজ্জ্বল আলোতে ভরে গেল ঘর।
আহমদ মুসা দেখল, স্টেনগান হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে একজন লোক। ছুরির ফলার মত তীক্ষ্ণ তার দৃষ্টি, স্থির চোখে তাকিয়ে আছে সে আহমদ মুসার দিকে। মুখে তার বিজয়ের হাসি। তার স্টেনগানের নল আহমদ মুসার বুক লক্ষ্যে হা করে আছে।
খোলা দরজা পথে আরও চারজন ঘরে প্রবেশ করল। তাদের হাতেও উদ্যত স্টেনগান।
ঘর ফাটানো শব্দে হো হো করে হেসে উঠল দরজায় দাঁড়ানো সেই লোকটি। বলল, আমাদের খুব ভুগিয়েছ আহমদ মুসা। আমাদের জাল গলিয়ে তুমি কেমন করে মাদ্রিদে ঢুকলে?
থামল লোকটি। উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার শুরু করল, ভালই হলো, শিকার নিজ পায়ে হেটে এসে ফাঁদে পড়েছে।
বলেই লোকটি পাশেই দাঁড়ানো চার জনের একজনকে বলল, ‘জন ওর পিঠ থেকে ব্যাগ নিয়ে ওকে একটু হালকা কর। আর পকেট আর শোল্ডার হোল্ডারও খালি কর।’
জন লোকটি গিয়ে আহমদ মুসার পিঠ থেকে ব্যাগটি নামিয়ে নিল। রিভলবার, রুমাল, চাবির রিং, এমনকি কলম হাতিয়ে নিয়ে আহমদ মুসার পকেট ও শূন্য করল।
জন ফিরে এলো ওসব নিয়ে।
সেই হেড়ে গলায় আবার হেসে উঠল লোকটি। বলল, ‘আমি শুনেছিলাম তুমি খুব চালাক, কিন্তু তুমি এই বোকামিটা কি করে করলে যে, মিষ্টার ভাসকুয়েজের ঘর মানে, কু-ক্লাস্ক-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টরের কেন্দ্র বিন্দুটা এতই অরক্ষিত। তুমি বুঝতে পারোনি, এই ঘরে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ, এমনকি তোমার চোখের পলক পড়া পর্যন্ত নিখুঁত রিপোর্ট হয়েছে ইনফ্লারেড টেলিভিশন ক্যামেরার মাধ্যমে। আমাদের কনট্রোল রুমের সিকুরিটি এটেনডেন্ট মাঝখানে সামান্য ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে একটু দেরি হয়ে গেছে আমাদের।’
আহমদ মুসা অবাক হলোনা। সেও আগেই একথা বুঝতে পেরেছিল, কোন সংকেত পেয়েই ওরা এসেছে। লোকটির কথা শেষ হবার সাথে সাথে আহমদ মুসার দৃষ্টি চারদিক একবার ঘুরে এল।
ক্যামেরা খুঁজছো বুঝি? লোকটির মুখে বিদ্রুপের হাসি।
‘ঠিকই বলেছেন।’ বোকা বোকা কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
হেসে উঠল লোকটি। বলল, ‘উপরে দেখ ছাদের মাঝখানে একটা তিলক চিহ্ন। ওটা ক্রংক্রিটের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা শক্তিশালী একটা ইনফ্রারেড ক্যামেরার চোখ।’
‘আমার বুদ্ধির কি দোষ বলুন, অন্ধকার ঘরে তো ওটা দেখতে পাওয়ার কথা নয়।’ ঠোটে হাসি টেনে বলল, আহমদ মুসা।
‘কিন্তু বুঝতে পারার তো কথা। কু-ক্লাস্ক-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টারের এত অরক্ষিত থাকার কথা নয়।’
‘ঠিক আছে, আমারতো হার হয়েছে।’
‘এবার নিয়ে তিনবার তুমি আমাদের হাতে এলে। দু’বার জাল কেটে পালিয়েছো, আর সে সুযোগ তুমি পাবেনা।’
‘সুযোগ সব সময় আসেনা এটাই তো স্বাভাবিক।’
‘এমন ভাবে কথা বলছো, মনে হচ্ছে যেন তুমি শ্বশুর বাড়ী এসেছো। জান তোমার অপরাধ কত, কি শাস্তি অপেক্ষা করছে জন্য?’
‘অপরাধের কথা জানি, কিন্তু শাস্তির কথা জানিনা।’
‘কি শাস্তি হওয়া প্রয়োজন বলে তুমি মনে কর?’
‘আপনাদের যে শাস্তি হওয়া উচিত, তার থেকে অনেক কম।’
চোখ দু’টি জলে উঠল লোকটির। বলল, ‘খুব বেশী সাহস দেখাচ্ছ তুমি। জান আমি কে?’
‘না জানিনা।’ ঠোটে হাসি টেনে বলল, আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ঠোটে হাসি দেখে লোকটির মুখ ক্রোধে আরও বিকৃত হয়ে গেল। সে দু’ধাপ এগিয়ে এল এবং ভাসকুয়েজের টেবিল থেকে পেপার ওয়েট তুলে ছুড়ে মারলো আহমদ মুসাকে লক্ষ করে।
ক্রিকেট বলের মত ছুটে আসা পেপার ওয়েট আহমদ মুসার বুকে আঘাত করত, কিন্তু আহমদ মুসা চকিতে এক পাশে সরে দাড়ানোর কারনে লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে পেপার ওয়েট টি আঘাত করলো কম্পিউটারের স্ক্রীনে। কম্পিউটারের স্ক্রীন ফেটে গেল, তার একটা অংশ ফুটো হয়ে গেল।
মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত ভাব দেখা দিল লোকটির চেহারায়। পরক্ষনেই হুংকার দিয়ে উঠল। ক্রোধে কাঁপছে সে। ষ্টেনগানধারী চারজনের দিকে চেয়ে নির্দেশ দিল, একে নিয়ে চল।
ষ্টেনগানধারী চারজনের দু’জন এসে আহমদ মুসার দু’হাত দু’দিক থেকে চেপে ধরে টেনে নিয়ে চলল দরজার দিকে। অন্য দু’জন ষ্টেনগানধারী আহমদ মুসার পেছনে। তাদের ষ্টেনগানের নল আহমদ মুসার পিঠ লক্ষ্যে উদ্যত। সবার পেছনে লোকটি।
ভাসকুয়েজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে লম্বা-লম্বি করিডোর দিয়ে এগুলো তারা।
করিডোরের মাঝখানে এসে তারা লিফটে প্রবেশ করলো।
নামতে শুরু করল লিফট।
থামল এক জায়গায় এসে। আহমদ মুসা অনুভব করল তারা ইতিমধ্যেই চারতলা পরিমান স্পেস পেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ তাকে ভূগর্ভস্থ কোন কক্ষে আনা হল।
লিফটের দরজা খুলে গেল।
আহমদ মুসাকে নামতে সুযোগ না দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে দিল কক্ষের মধ্যে। ধাক্কা দিয়েছিল স্টেনগানধারীরা নয়, সেই লোকটি। তার রাগ এখনও কমেনি।
আহমদ মুসা এমনকিছু ঘটবে তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে ছিটকে পড়ে গেল ঘরের মেঝেতে উপুড় হয়ে।
শেষ মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়া থেকে রক্ষা পেতে চেষ্টা করেছিল আহমদ মুসা। কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। কপালের বাম পাশটা ঠুকে গেল কংক্রিটের মেঝের সাথে। বাম চোখের ওপরটা ফেটে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। মুখ ভেসে গেল সে রক্তে।
আহমদ মুসা উঠে বসল।
হো হো করে হেসে উঠল সেই লোকটি। তার চোখে ক্রুর দৃষ্টি। বলল, মিনাত্রা সেন্ডোকে তুমি চিনতে। আমি জুবি জুরিটা তার জায়গায়, এখন অপারেশন কমান্ডার। সেন্ডোকে হত্যা করেছ, সে হত্যার প্রতিশোধ আমরা নেব। সব হত্যারই প্রতিশোধ আমরা নেব তিল তিল করে।
আহমদ মুসা উঠে বসেছিল। সে কোটের হাতা দিয়ে চোখের ওপর আসা রক্ত মুছে নিয়ে বলল, ‘মিঃ জুবি জুরিটা আমার প্রতি রুঢ় না হয়ে আপনার কৃতজ্ঞ হওয়া দরকার। সেন্ডো বেঁচে থাকলে আপনার এ পদ জুটতোনা।’
‘ফের বিদ্রুপ করছ। দেখ এতক্ষণে তোমাকে কুকুরের মত গুলি করে মারতাম। কিন্তু কি করব, বস কথা দিয়েছেন আমেরিকার কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানকে তাদের হাতে তোমাকে তুলে দেবার। কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা তো’।
‘এই না বললেন বিচার আপনারাই করবেন তিলে তিলে?’
‘তা বটে, আমরা ওদের হাতে একটা সজীব কংকাল তুলে দেব মাত্র। আমাদের শাস্তি আমরা দিয়ে নেব।’
‘ঈশ্বরের যে নাম নিলেনা। কথায় আছে না, মানুষ ভাবে একটা, আল্লাহ করেন আরেকটা।’
‘ঈশ্বরের আর খেয়ে কাজ নেই, এখানে আসবেন নাক গলাতে। দু’বার পালিয়েছ, আর সে আশা করোনা। যেখানে রেখে গেলাম, তার পাথরের দেয়ালে মাথা ঠুকে মরতে পার, কিন্তু রেরুতে পারবে না।’
‘মাথা ঠুকে মরার কোন ইচ্ছা আমার নেই।’
‘তুমি মরলে তো আমাদের ক্ষতি। শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে, আবার আমাদের ব্যবসাও মাঠে মারা যাবে। তবে তোমাকে এখানে বেশী দিন থাকতে হবে না, ভাসকুয়েজ আসা পর্যন্তই। জরুরী কাজে আজই গেল সানফ্রান্সিসকো, খবর পেলে কাল সকালেই এসে হাজির হবে। খুব বেশী হলে সন্ধ্যাতক সময় লাগবে।
জুবি জুরিটা উঠে যাবার জন্যে লিফটের বোতামের দিকে হাত বাড়িয়েও আবার হাত টেনে নিল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, শুন, রোবট ‘ডেভিল’ তোমাকে খাবার দিয়ে যাবে। দেখ ওর সাথে বেয়াদবির কোন চিন্তাও যেন করোনা। ও চোখের দৃষ্টি দেখেই চিন্তা ধরে ফেলতে পারে। ওর দশ চোখ, ওকে ফাকি দেবার কোন উপায় নেই। আর ও আসার পর হাত কখনও ওপরে তুলবেনা। কোন হাত যখন তার লক্ষ্যে ওপরে ওঠে, তখন সে পাগল হয়ে যায়। ও তখন তুলাধুনো করে ছাড়বে মনে রেখ। ও কাউকে প্রাণে মারেনা, কিন্তু কেউ ওর হাতে পড়লে তাকে ছয় মাস হাসপাতালে থাকতে হয়, জীবনের মত পঙ্গু হয়ে যায় সে।’
বলে জুবি জুরিটা মুখ ফিরিয়ে লিফটের বোতামে চাপ দিল। বন্ধ হয়ে গেল লিফটের দরজা, সেই সাথে কক্ষের দরজাও।
আহমদ মুসা কোটের হাতা দিয়ে বাম চোখের পাশে জমে ওঠা রক্ত আবার মুছে নিল। তারপর ঘরের চারদিকে নজর বুলাল। সত্যই অন্ধকূপ একটা। চারদিকেই পাথরের দেয়াল। লিফটের দরজা ছাড়া কোন দরজা জানালা নেই। ওপরে ছাদের মাখানে ক্রিকেট বলের মত গোলাকার একটা জায়গায় স্টিলের একটা জাল লাগানো। আহমদ মুসা বুঝল, ঐ পথ দিয়ে ঘরের শীততাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, হয়তো ক্যামেরাও ওখানে সেট করা থাকতে পারে। তবে ভাসকুয়েজের ঘরের মত কোন কাল চোখ আহমদ মুসা সেখানে দেখল না।
আহমদ মুসা উঠে গিয়ে লিফটের দরজা পরীক্ষা করল। টোকা দিয়ে দেখল, পুরো স্টিলের দরজা। লিফটের সাথে এ দরজা খোলে ও বন্ধ হয়। এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা লিফটে।
আহমদ মুসা দরজা থেকে ফিরে এসে মেঝের মাঝখানে বসল। এই অন্ধকূপের মধ্যে দুনিয়াটাকে খুব সংকীর্ণ মনে হল আহমদ মুসার। মনের দরজায় এসে উদ্বেগ উকি দিল, এ অন্ধকূপ থেকে মুক্তির উপায় কি?
আহমদ মুসা তাড়িয়ে দিল উদ্বেগটাকে মনের দুয়ার থেকে। বলল, এ চিন্তার সময় পাওয়া যাবে, ভাসকুয়েজ আসতে কমপক্ষে ২৪ ঘন্টা দেরী আছে। এখন একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। মেঝেয় টান হয়ে শুয়ে পড়ল আহমদ মুসা। শীঘ্রই তার দু’চোখ জুড়ে নেমে এল ঘুম।

মারিয়া গ্রাউন্ড ফ্লোরের ড্রইং রুমের দরজায় উদ্বিগ্ন ভাবে দাঁড়িয়েছিল। দৃষ্টি বাইরে লনের ওপর। লনের মাঝখান দিয়ে একটা কংক্রিটের রাস্তা বন্ধ গেটে গিয়ে স্পর্শ করেছে। মারিয়ার দৃষ্টি বন্ধ গেটের ওপর গিয়ে বার বার আছড়ে পড়ছে।
মারিয়ার বাইরের চেয়ে ভেতরটা বেশী চঞ্চল। একটা অশুভ আশংকা এসে তার হৃদয়ে বার বার উকি দিচ্ছে। বড় কিছু ঘটেনি তো আহমদ মুসার? ভাবতে গিয়ে হৃদয় কেঁপে উঠল মারিয়ার। আহমদ মুসা যে মিশন নিয়ে কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টারে গেছে, তাতে বেশী সময় লাগার কথা নয়। বেশ রাত থাকতে এজন্যেই তিনি বেরিয়েছেন যাতে রাত শেষ হবার আগেই ফিরতে পারেন। রাত সাড়ে তিনটায় বেরোনা দেখে মারিয়া এটাই বুঝেছে। তিনি বার বারই বলেছেন, একটা বিষয় অনুসন্ধানের জন্যেই তিনি যাচ্ছেন, কোন সংঘাতে জড়াতে নয়। তাই তিনি যেমন রাতের আঁধারে গেছেন, তেমনি কাউকে সাথেও নিতে চাননি। কিন্তু এত দেরী হচ্ছে কেন? তিনি কি আর কোথাও গেলেন? না তা কেন হবে? যে বিষয়ের সন্ধানে তিনি গেছেন, সে জন্যে যদি কোথাও যেতে হয়, তাহলে ফিরে এসে সবাইকে বলে যাবেন সেটাই স্বাভাবিক। আবার সেই কাল উদ্বেগটা এসে জেঁকে বসল মারিয়ার হদয়ে। আর চিন্তা করতে পারেনা মারিয়া। হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে একটা বেদনা গুমরে উঠছে।
সিঁড়ি দিয়ে উপর থেকে নেমে এল, সুমানো। সুমানো মারিয়ার আত্মীয় এবং বান্ধবী। বেড়াতে এসেছে গতকাল।
সুমানো এসে দাঁড়াল মারিয়ার পেছনে। ধীরে ধীরে হাত রাখল মারিয়ার কাঁধে।
মারিয়া একটা হাত তুলে ধীরে ধীরে সুমানোর হাতটা ধরল। মুখ ফিরালোনা, চোখও তার ফিরালোনা পথের ওপর থেকে।
‘ওপরে চল, খাবে। ফুফু আম্মা অপেক্ষা করছেন।’ বলল সুমানো।
মারিয়া কিছু বলল না।
সুমানো মারিয়ার ঘাড়ে চাপ দিল। বলল, ‘মারিয়া চল।’
‘আমি ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।’ না তাকিয়ে নিবির্কার কন্ঠে বলল মারিয়া।
‘সত্যিই ভাইয়ার জন্য?’ সুমানোর ঠোঁটের কোণে হাসি।
মারিয়া মুখ ফিরাল সুমানোর দিকে। অন্য সময় হলে মারিয়া হাসত কিংবা শাসন মূলক কোন কথা ছুড়ে দিত সুমানোর দিকে। কিন্তু এখন তেমন কিছুই করল না মারিয়া। একটা খবরের জন্য অপেক্ষা করছি।’
শুকনো কন্ঠস্বর মারিয়ার। চেহারাও তার পাংশু।
সুমানোর ঠোটের হাসি মিলিয়ে গেল। গম্ভীর হল সুমানো। বলল, ‘ফুফু আম্মার কাছে কিছু শুনলাম। তিনি কে মারিয়া? মারিয়া এমন উদ্বিগ্ন হয়ে কারো পথ চেয়ে থাকতে পারে ভাবতে আমার বিস্ময় লাগছে।’
‘তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন সুমানো।’
সুমানো মারিয়ার গলা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘শুধু সে জন্যই কি মারিয়া? আমিও তোমার মত মেয়ে, তোমার চোখ যে কথা বলছে তাতো আমি পড়ছি মারিয়া। সে জন্যই জানতে চেয়েছিলাম, কে তিনি? তিনি অবশ্যই সাধারণ মানুষ হবেন না।’
‘সত্যিই সুমানো আমার চোখে তা তুমি দেখছ! কিন্তু আমি তো চাইনি আমার চোখে তা আসুক। এ আমার ব্যর্থতা সুমানো।’ মারিয়ার কন্ঠ কান্নার মতই করুণ।
‘কেন মারিয়া, লুকানোর এ প্রয়াস কেন তোমার?’
‘থাক সুমানো।’
থামলো মারিয়া। পরক্ষণেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, ‘ঐযে ভাইয়ার গাড়ী, ভাইয়া আসছেন।’
গাড়ী ধীর গতিতে এসে গাড়ী বারাসায় দাড়াঁল।
মারিয়ার চোখ ছুটে গেল গাড়ীর ভেতরে। ড্রাইভিং সিটে একজনই মানুষ-মারিয়ার ভাই ফিলিপ। ধক্ করে উঠল মারিয়ার বুকটা। তার ভাইজান কি খবর নিয়ে আসছে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসতে চাইল মারিয়ার।
গাড়ী থেকে নামল ফিলিপ। তার সুন্দর চেহারার উপর একটি কাল মেঘ।
গাড়ী থেকে নেমেই দরজায় দাঁড়ানো বোনের দিকে তাকাল। বোনের স্লান মুখ ও চোখের শংকিত দৃষ্টির দিকে চোখ পড়তেই তার বুকের বেদনাটা আরও চিন্ চিন্ করে উঠল।
ঠোঁটের কোণে একটু হাসি টেনে এগুলো দরজার দিকে ফিলিপ। কিন্তু তার ঠোঁটের এই হাসিটা কান্নার মত করুণ মনে হলো।
মারিয়ার পাশে সুমানো নিবার্ক দাড়িঁয়েছিল। ফিলিপকে দেখে সেও একটা খারাপ খবর আঁচ করেছে।
দরজায় হেলান দিয়ে স্থানুর মত দাড়িঁয়ে থাকা বোনের একটা হাত ধরে ফিলিপ বলল, ‘চল বসি।’
সোফায় এসে বসল তারা। বসে সোফায় হেলান দিয়ে মুহূর্ত কয়েক মাথা নিচু করে থেকে বলল, ‘আমাদের আশংকা ঠিক মারিয়া, উনি আটকা পড়েছেন।’
মারিয়ার মুখে একটা কাল ছায়া নেমে এল।
‘ফিলিপ থেমেছিল।’ একটা বাক্য উচ্চারণ করে, একটু দম নিয়ে সে শুরু করল, ‘বুট পালিশ কারীর ছদ্মবেশে একজন লোক পাঠিয়েছিলাম ওদের হেড কোয়ার্টারে। তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি ভেতরে। গেটের প্রহরী বলেছে, ‘আজ অফিস বন্ধ। অফিসের লোক ছাড়া অন্য সকলের ঢোকা নিষিদ্ধ।’
‘কেন? কেন? জিঞ্জেস করেছিল আমার লোক।
‘রাতে বড়কর্তার ঘরে লোক ঢুকেছিল ধরা পড়েছে।’
‘তো কি হয়েছে, এমনতো কতই হচ্ছে। পুলিশে দিলেই তো ঝামেলা যায়।’
‘বড় কর্তার অফিস ঘরে চোর ঢুকবে নাকি, এটা অন্য ব্যাপার। যাও ভাগ।’
ফিলিপ থামল।
কিছুক্ষণ পর ধীর কন্ঠে মারিয়া বলল, ‘ভাইয়া এ নিয়ে উনি তিনবার ওদের হাতে পড়লেন। আর ট্রিয়স্টের ব্যাপার নিয়ে ওরা ওঁর ওপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। আমার……’
কথা শেষ করতে পারলোনা মারিয়া। কন্ঠ তার রুদ্ধ হয়ে এল।
‘তুমি যে আশংকা করছ, ওমন কিছু ঘটেনি মারিয়া।’
একটু থামল ফিলিপ। তারপর আবার শুরু করল।
‘লোকটি ফিরে এলে একটা সাপ্লায়ার কোম্পানীর এজেন্ট ছদ্মবেশে আমি গিয়েছিলাম ওদের হেড কোয়ার্টারে। আমাকে রিসেপশন পর্যন্ত যেতে দিয়েছিল। রিসেপশনের লোকটিও আমাকে ঐ কথায় বলেছিল। শুনে আমি বলেছিলাম, এ নিয়ে এত রাখ-ঢাক কেন, পুলিশে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়।’
রিসিপশনিস্ট লোকটি বলেছিল,‘পুলিশে দেব কেন? আমরা পুলিশের বাবা। ও রকম কত লোককে আমরা হজম করেছি।’
‘তাহলে আর সমস্যা কি?’ বলেছিলাম আমি।
‘সমস্যা হলো বড় কর্তা নেই। আমেরিকা গেছেন। তার নির্দেশ ছাড়া কিছুই এখানে হয় না।’
‘ও বুঝেছি, তিনি না ফেরা পযর্ন্ত চোরকে রাখতে হবে, তাই এই সতর্কতা।’
‘আঃ কি বললেন, ও ব্যাটা চোর না। চোর না হলে কি কোন মাথা ব্যাথা হতো।’ তাহলে?
‘সাংঘাতিক এক লোক সে। কি মুসা যেন নাম। আমাদের বহু লোককে খুন করেছে। বড় কর্তা এবার ওকে চিবিয়ে খাবে।’
‘সাংঘতিক লোক তো তাহলে, পালাবে না তো? আপনাদের কড়াকড়ি ঠিকই হয়েছে।’
‘দু’বার ও পালিয়েছিল। আর নয়। এবার মাটির নিচে অন্ধকুপে রাখা হয়েছে। স্বয়ং শয়তান এলেও উদ্ধার করতে পারবে না।’
‘অন্ধকূপ? সে আবার কি জিনিস? কোথায়?’
প্রশ্ন করেই ভেবেছিলাম এমন খোলামেলা প্রশ্ন বোধ হয় ঠিক হয়নি। আমার মতলব সে ধরে ফেলতে পারে।
কিন্তু সে পারেনি ধরতে, গল্প তাকে পেয়ে বসেছিল। সে যে অফিসের খুব গুরুত্বপূর্ণ লোক, তা প্রকাশের একটা সুযোগ পাওয়ায় সে খুশী হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘অন্ধকূপ সাংঘাতিক শত্রুর জন্য কয়েদ খানা। এই অফিসের মাটির নিচেই।’
এই সময় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম। কে যেন নামছে। আমি চলে এলাম।’
‘সুতরাং,’ বলতে শুরু করল ফিলিপ। ‘মুসা ভাইয়ের ক্ষতি হয়নি নিশ্চিত, ভাসকুয়েজ না আসা পযর্ন্ত,তার কোন ক্ষতি হবারও সম্ভাবনা নেই।’
‘খবর পেলে ভাসকুয়েজ দেখো কালই চলে আসবে।’ম্লান কন্ঠে বলল মারিয়া।
‘জানি।কিন্তু কাল আসার আগেই আমারা কাজ সেরে ফেলব। আমি ওদের হেড কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে যিয়াদের ওখানে গেছিলাম। সব আলোচনা হয়েছে। আজ রাতেই আমারা হানা দেব।
মারিয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার চোখে ভেসে উঠল আহমদ মুসার চেহারা। সেই সাথে মনে পড়ল আহমদ মুসার সাথে নির্জন তার সময় গুলোর কথা। একজন মানুষ যে অমন অবিশ্বাস্য পবিত্র চরিত্রের হতে পারে, তা না দেখলে মারিয়ার কোন দিনই বিশ্বাস হতো না। তার হৃদয়ের এক গহীন প্রান্ত থেকে একটি পরিচিত বেদনা চিন চিন করে উঠল। কেঁপে উঠল মারিয়া। এই বেদনাকে সে প্রাণপণে চেপে রাখতে চায়।
ফিলিপ তাকিয়েছিল বোনের দিকে। ফিলিপ সব জানে। কিন্তু কোন দিন কিছু বলেনি অতি আদরের ছোট বোনটিকে। মারিয়া নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে এটা ফিলিপ জানে।
নিরবতা সুমানো। সে মারিয়ার পাশে বসেছিল। বলল, ‘ভাইয়া লোকটি দেখছি মারিয়াকে নিঃশেষ করেছে, তোমাকে ও পাগল করেছে। আবার অন্ধকুপে তার বন্দি হবার ভয়ানক সংবাদও তুমি দিলে। কে এই সাংঘাতিক লোকটি ভাইয়া?’
‘তুমি মারিয়ার কাছে শোন। আমার কাজ আছে যাই।’ বলে ফিলিপ উঠে দাঁড়াল।
‘মারিয়া মুখ খুলছেনা। জান ভাইয়া, মারিয়া এখন পর্যন্ত কিছু খায়নি, নিচে থেকে উপরে উঠেনি।’
ফিলিপ চলে যাচ্ছিল। থমকে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়াল মারিয়ার দিকে।
মারিয়া মুখ নিচু করে আছে।
ফিলিপ দু’ধাপ এগিয়ে গেল মারিয়ার দিকে। নরম কণ্ঠে বলল, ‘বোন মারিয়া উনি শুনলে ভীষণ রাগ করবেন। চিন্তার কি আছে? তুমি তো জান, এর চেয়ে কত বড় বড় বিপদের তিনি মোকাবেলা করেছেন।’
বলে ফিলিপ আবার ঘুরে দাঁড়াল। চলতে শুরু করল সে।
ফিলিপের কথা শেষ না হতেই মারিয়া দু’হাতে মুখ ঢেকেছিল।
সুমানো ফিলিপের সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়েছিল। ফিলিপ চলে গেলে সুমালো মারিয়ার পাশে বসল।
ফিলিপের কথার প্রথম বাক্যটি মারিয়ার হৃদয়ের গহীনে লুকানো বেদনাকেই গিয়ে আঘাত করল। ‘তিনি ভীষণ রাগ করবেন’ কথাটা মারিয়াকে গত রাতের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল। ঐ রাতে সিড়ির গোড়ায় মারিয়াকে একা দাঁড়িয়ে থাকাকে আহমদ মুসা অন্য ভাবে নিয়েছিল। তার মনের এই ভাবটা কণ্ঠের কঠোরতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশও পেয়েছিল। কোন কথা না বলে কান্না চেপে মারিয়া ছুটে ওপরে উঠে গিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ল। অনেক কান্দলো মারিয়া। এখন ফিলিপের কথায় মারিয়ার সেই কান্না উথলে উঠলো। তার মন যেন চিত্কার করে বলে উঠল, মারিয়ার না খেয়ে থাকার কথা শুনে ঐভাবে উনি ভুল বুঝবেন এবং রাগ করবেনই তো?
সুমানো মারিয়ার পাশে বসেই বুঝতে পারল মারিয়া কাঁদছে।
সুমানো মারিয়ার হাত দু’টি সরিয়ে নিল তার মুখ থেকে। অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে মারিয়ার মুখ।
মারিয়া তাড়াতাড়ি তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে ফেলল।
সুমানো মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিয়ে বলল, ‘আমি শুধু তোর বোন না, বয়সে কিছু বড়ও। বলবিনা কি হয়েছে তোর? কিছু বুঝিনি তা নয়, কিন্তু এ কান্নার অর্থ আমি বুঝিনা।’
সোজা হয়ে বসল মারিয়া। বলল, ‘আমাকে মাফ কর সুমানো। এ কিছু না। আমার একটা অন্যায়। একটা অন্যায়ের আগুনে আমি জ্বলছি। চল উঠি।’
উঠতে চাইল মারিয়া।
কিন্তু সুমানো তাকে ধরে রাখল। বলল, জানি, তুমি না বললে আর হ্যাঁ বলানো যাবে না। কিন্তু উনি কে তাকি জানতে পারবনা?
‘তিনি যেমন মহৎ, যেমন বিরাট, যেমন বিস্ত্মৃত, তেমনি হতভাগা। সর্বক্ষণ বিপদ তাঁকে তাড়া করে ফিরছে।’ এক ধরণের উদাস কণ্ঠ মারিয়ার।
‘মারিয়া! এটা কারো কোন পরিচয় হলো? এ পরিচয় দিয়ে কাউকে চেনা যায়?’
মারিয়া সুমানোর দিকে ফিরল। নরম কণ্ঠ বলল, ‘আহমদ মুসাকে জান তুমি?’
সুমানো চোখ বন্ধ করল। ভাবল একটু। তারপর বলল, ‘এই কিছুদিন আগে টাইম ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিন এক আহমদ মুসাকে নিয়ে কভারস্টোরী করেছিল। সেতো জগৎ কাঁপানো এক বিপ্লবী। তুমি কি তার কথা বলছ?’
‘আমি তোমার সেই জগৎ কাঁপানো বিপ্লবীর কথাই বলছি।’ মারিয়ার ঠোঁটের কোণে বেদনাময় এক হাসি।
‘কি বলছ মারিয়া, ইনি তিনি?’ সুমানোর কণ্ঠ কাঁপা এবং চোখে মুখে অপার বিস্ময়।
‘হাঁ সুমানো, ইনিই সেই তিনি।’
সুমানো কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলনা। যেন বাক রুদ্ধ হয়ে গেছে তার।
মারিয়া কিছু বলার জন্যে মুখ খুলছিল। সুমানো বাধা দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘একটু ভাবতে দাও মারিয়া আমাকে। কোথায় কিংবদন্তীর নায়ক হয়ে ওঠা সেই আহমদ মুসা; কোথায় মাদ্রিদ, কোথায় আমার বোন মারিয়া- আমি অংক মিলাতে পারছিনা। আমি স্বপ্ন দেখছিনা তো?’
‘স্বপ্ন নয়, কিন্তু স্বপ্নের চেয়েও বিস্ময়কর।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল মারিয়া।
‘কিন্তু তোমার কান্নাকে আর বিস্ময়কর মনে হচ্ছে না আমার কাছে। শুধু এখন বড় বেশি জানতে ইচ্ছে করছে- তুমি যা বলতে চাও না সেই কাহিনী, কি করে এই অসম্ভব মিলন ঘটল। সেই কাহিনী।’
বলতে শুরু করল মারিয়া। ঘাড় ফিরিয়ে সুমানোর দিকে চেয়ে বলল, ‘দুনিয়াতে যত কাহিনী সৃষ্টি হচ্ছে তার অল্পই মানুষ জানে সুমানো।’
সুমানো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মারিয়া এক দৌঁড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল।
পলায়নপর মারিয়ার দিকে চেয়ে হাসল সুমানো, কিন্তু সে হাসিতে আনন্দ নয় বেদনা ঝরে পড়ল। তার মুখ থেকে স্বগতঃ উচ্চারিত হলো, ‘বোন আমার কাছ থেকে পালালে, কিন্তু জীবন থেকে পালাতে পারবে না।’

বেশ আগে ঘুম থেকে উঠেছে আহমদ মুসা। অনুমান করে মাগরিবের নামাজটাও পড়ে নিয়েছে। এই অন্ধকুপে সময়ের বিচার একেবারেই অসম্ভব। নাস্তা ও দুপুরের খানা থেকে সময়ের একটু পরিমাপ করে নিয়েছে আহমদ মুসা। এই হিসেব থেকে সে যোহর ও আছরের নামায পড়েছে। আছরের নামাজ পড়ে সে আবার ঘুমিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে আহমদ মুসা অনুমান করেছিল দু’ঘন্টার বেশী সে ঘুমায়নি। সুতরাং সে ঘুম থেকে উঠেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিয়েছে।
সকালেও একবার ঘুমিয়েছে আহমদ মুসা। রোবটের পায়ের শব্দে তার ঘুম ভেঙেছিল। চোখ খুলেই সে দেখতে পেয়েছিল রোবটকে। লিফট থেকে বেরিয়ে হেঁটে আসছে মেঝের উপর দিয়ে। নিঃশব্দ গতি, তার মুখ দিয়ে অব্যাহতভাবে একটা শব্দ বেরুচ্ছে ‘নাস্তা নাস্তা।’ এই শব্দেই তার ঘুম ভেঙেছিল।
রোবটের হাতে ছিল একটা টিফিন বক্স। সে বক্সটি এনে আহমদ মুসার সামনে রেখেছিল। রাখার সংগে সংগেই তার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসা আগেই উঠে বসেছিল।
রোবটের উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের মত হবে, আহমদ মুসা অনুমান করে নিয়েছিল। ঠিকই বলেছিল জুবি জুরিটা, রোবটের মাথায় দশটি চোখ। দশটি চোখেই উজ্জ্বল দৃষ্টি। রোবটের হাত দুটি দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ। হাতের দিকে তাকিয়েই আহমদ মুসা বুঝেছিল, হাত দু’টি সামনে পিছনে, ডানে বামে সব দিকে সমানভাবে সক্রিয় হতে পারে। আস্থার সাথে নিখুঁতভাবে পা ফেলে সে। সবই ঠিক আছে, শুধু মুখ দেখেই বলা যায় তার ‘ডেভিল’ নাম স্বার্থক। কুৎসিত এবং ভয়ংকর তার মুখ। ঐ মুখ নিয়ে যখন সে এগিয়ে আসে মনে হয় খুন করতেই আসছে।
টিফিন বক্স রেখে রোবট দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা বুঝেছিল, সে খেলে টিফিন বক্সটি ফেরত পাবে, তার পরেই রোবট যাবে।
টিফিন বক্সটি বিরাট। তার মধ্যে নাস্তা পানি সবই আছে।
বক্সটি খুলল আহমদ মুসা।
রোবট সম্পর্কে সাবধান হওয়ার ব্যাপারে জুবি জুরিটার কথা আহমদ মুসার মনে ছিল কিন্তু হঠাৎ এক সময় মাথা চুলকাবার জন্যে তার ডান হাত উপরে উঠে গেল। আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা, এই বুঝি কি ঘটে যায়। কিন্তু কিছুই ঘটল না। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। পরক্ষণেই ভাবল, হাতটা বিশেষ ভংগিতে না উঠলে সম্ভবতঃ রোবট প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেনা। সে বিশেষ ভংগিটা কি, অনুমান করতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। নিশ্চয় হাত রোবটের দিকে টার্গেট হতে হবে এবং চোখও বোধ হয় রোবটের দিকে নিবদ্ধ হতে হবে। কাউকে আক্রমণের সময় মানুষের চোখ ও হাতের এমন অবস্থানই হয়ে থাকে। এমন ভাবে চিন্তা করতে পারায় আহমদ মুসা খুশী হলো। তার এই চিন্তা সঠিক কি না দুপুর বেলা আহমদ মুসা পরীক্ষা করল।
সকালে যেমন রোবট লিফটে করে একা এসেছিল দুপুরেও তাই এলো। আহমদ মুসা বুঝল রোবট লিফট চালাতেও জানে।
রোবট খাবারের বক্স ঘরের ঠিক মাঝখানে রেখে দাঁড়িয়েছিল।
রোবট যখন ঢোকে, তখন আহমদ মুসা ঘরে পায়চারি করছিল।
রোবট খাবারের বাক্স রেখে দাঁড়ালে আহমদ মুসাও খাবারের বাক্সের কাছে এসে দাঁড়ালো। তারপর সে দু’হাত তুলে গা থেকে কোট খুলে হাতে নিয়ে বসে পড়ল। এ সময় আহমদ মুসার চোখ ছিল নিচু। কি ঘটে সেই চিন্তায় তার দেহের প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রী টান টান হয়ে উঠল।
না, কিছুই ঘটলনা। রোবট হাত নিচু রেখে যেমন দাঁড়িয়েছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে থাকল। আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়ে গেল, তার চিন্তা ঠিক। হাত ও চোখ এক সাথে রোবটের দিকে টার্গেটেড না হলে রোবট সক্রিয় হবে না, শত্রুতা করবেনা। আহমদ মুসা জানে, রোবটের চোখ গুলো হলো দূরনিয়ন্ত্রিত টিভি ক্যামেরা অথবা এ চোখ গুলোর সাথে রোবটের ভেতরের কমান্ডসেল যুক্ত রয়েছে। চোখগুলো দিয়ে দেখেই কমান্ডসেল রোবটকে নির্দেশ দেয়।
এই চিন্তা সামনে রেখে আহমদ মুসা একটা পরিকল্পনা আঁটলো। রোবট খাবার বক্স নিয়ে চলে যাবার পর অন্ধকূপের মেঝেতে শুয়ে শুয়ে আহমদ মুসা তার পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিল। এবং স্থির করল, আল্লাহর ওপর ভরসা করে রাতেই সে তার পরিকল্পনা কার্যকর করার উদ্যোগ নেবে।
মাগরিবের নামাজের পর আহমদ মুসা ঘণ্টা খানেক ধরে হালকা ব্যায়াম করল। তারপর ঘরময় সে পায়চারি করতে থাকে।
কতক্ষণ পায়চারি করেছে, কত রাত হয়েছে কে জানে। তবে রাতের খাবার সময় পার হয়ে যায়নি, কারণ রোবট খাবার নিয়ে আসেনি। ঠিক খাবারের সময়েই রোবট খাবার নিয়ে আসবে। মনে মনে আহমদ মুসা জুবি জুরিটার প্রশংসা করল। অন্ততঃ খাবারটা সে ঠিকমত দিচ্ছে। শিকারকে খাইয়ে দাইয়ে সম্ভবতঃ মোটা তাজা করে নিতে চায় জুবি জুরিটা।
খুট করে একটা শব্দ হলো লিফটের দরজায়। খুলে গেল লিফটের দরজা ধীরে ধীরে। খোলা দরজা দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে এল রোবট। আগের দু’বারের মত রোবট খাবারের বক্সটি এনে মেঝের ঠিক মাঝখানে রাখল।
আহমদ মুসা বিপরীত দিকের দেয়ালের কাছে তখন। লিফটের দরজা খোলার সাথে সাথে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
রোবট খাবারের বক্সটি মেঝেতে নামিয়ে রাখার পর আহমদ মুসা ধীরে ধীরে সেদিকে এগুলো। আহমদ মুসার দৃষ্টি রোবটের দিকে নয়, খাবারের বক্সে দিকে। আহমদ মুসা যতই খাবারের বক্সে কাছাকাছি হচ্ছে, ততই তার স্নায়ুতন্ত্রীর উত্তেজনার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আল্লাহ তাকে সফল করবেন তো? আহমদ মুসার হিসেব যদি ঠিক না হয়ে থাকে, যা সে চিন্তা করেছে তার চেয়ে ভিন্ন ধরণের যদি হয় রোবটের প্রকৃতি। আহমদ মুসা জীবনে বার বার ঝুঁকি নিয়েছে, কিন্তু এমন অনিশ্চিয়তার মুখোমুখি সে কোন দিন হয়নি।
রোবট খাবার বক্স থেকে এক গজেরও কম দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসা খাবারের বক্সের এক ফুটের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। তার নিম্নমুখী চোখ রোবটের পা দেখতে পাচ্ছে। সে ঠিক দুপুরের মতই চোখ নিচু রেখে হাত দু’টি তুলে কোট খুলতে লাগল। কোট খুলে দু’হাত দিয়ে ধরে সামনে নিয়ে এল। তারপর ঠিক ভাজ করার জন্যে কাপড় যেভাবে মানুষ টান করে ধরে -ঠিক সেভাবে দু’হাতে কোট টান করে সামনে ধরল। এর পরেই চোখের পলকে ঘটে গেল ঘটনাটা। আহমদ মুসা বিদ্যুত বেগে দু’হাতে ধরা কোটটি আর একটু ওপরে তুলে ছুড়ে দিল রোবটের মাথায়।
নিখুঁত টার্গেট। প্রসারিত কোটটি গিয়ে রোবটের মাথার গোটাটাই ঢেকে দিল।
কোট ছুঁড়ে দিয়েই ছুটল সে খোলা লিফটের দিকে।
লিফটে গিয়ে উঠল আহমদ মুসা।
লিফটের দরজা ক্লোজ করার বোতামে টিপ দেবার আগে আহমদ মুসা রোবটের দিকে তাকিয়ে দেখল, রোবট ঘুরছে, উথাল পাথাল করছে, কিন্তু হাতে দুটি তাঁর মাথা থেকে কোট সরাতে পারছে না। কারন চোখ বন্ধ থাকায় এ ধরনের কাজের কমান্ড সে পাচ্ছে না। রোবটের চোখ বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথে ভেতরের কমান্ড সেলও অন্ধ হয়ে গেছে। রোবট বুঝতেই পারলনা আহমদ মুসা লিফটের চলে গেছে।
লিফটকে ক্লোজ করার বোতাম টিপে দিল আহমদ মুসা। কোন তলায় গিয়ে লিফট থেকে নামবে, সেটা ঠিক করতে গিয়ে সুইচ প্যানেলে দেখল, একতলা ও দোতলায় কোন স্টপেজ নেই। স্টপেজ আছে তিন, চার ও পাঁচ তলায়। আহমদ মুসা বুঝল, এটা বিশেষ লিফট, এ লিফট দিয়ে বাইরে বেরুনো যাবে না।
আন্ডার গ্রাউন্ড সেলে নামানো হয়েছিল। আহমদ মুসা তিন নম্বর বোতামটিই টিপে দিল। তিন তলায় নামবে সে।
তিন তলায় এসে লিফট থেমে গেল।
আহমদ মুসার মনে আছে, যাবার সময় লিফটের এ দরজায় একজন প্রহরী দেখেছিল। তাঁর হাতে তখন স্টেনগান ছিল। লিফটের দরজা ধীরে ধীরে খুলছে। আহমদ মুসা ভাবল, প্রহরী নিশ্চয় মনে করছে রোবট নামবে লিফট থেকে। অথবা যদি রোবট তিন তলায় নামার ব্যাপার নয়, তাহলে মনে করতে পারে কোন অফিসার আসছেন। অথবা এ সময় এখানে যদিও কারও নামার কোন ব্যাপার না হয়, তাহলে প্রহরী সন্দেহ করতে পারে। আহমদ মুসা যে কোন অবস্থার জন্য নিজেকে তৈরি করল।
লিফটের দরজা অর্ধেকটা খোলা হতেই আহমদ মুসা লিফট থেকে এক লাফে করিডোরে পড়ল।
প্রহরী দরজার এক পাশে স্টেনগান হাতে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসা গিয়ে একদম তাঁর মুখের সামনেই পড়ল।
ভুত দেখার মত আঁতকে উঠল প্রহরী। পরক্ষনেই সে নিজেকে সামলে নিল। মনে হলো সে চিনতে পেরেছে আহমদ মুসাকে। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রহরী তাঁর স্টেনগান তুলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সে সুযোগ আর পেল না। আহমদ মুসার ডান হাতের প্রচণ্ড এক কারাতে গিয়ে পড়ল তাঁর বাম কানের নিচে ঘাড়টায়। সঙ্গে সঙ্গেই সে সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তাকে তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে টেনে লিফটে নিয়ে এল। তারপর লিফট ক্লোজ করে আন্ডার গ্রাউন্ড বোতাম টিপে দ্রুত বেরিয়ে এল। তারপর পড়ে থাকা স্টেনগান টি করিডোরে থেকে তুলে নিয়ে মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল, কোন দিকে যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। করিডোরে একদম ফাকা। প্রহরী শ্রেণী ছাড়া অফিসে রাতে সাধারণ কর্মচারীরা কেও থাকে না।
করিডোরের পূর্ব প্রান্তে বেরিয়ে যাবার লিফট ও সিঁড়ি। নিশ্চয় রাতে বাইরে বেরুবার গেট বন্ধ, তাঁর উপর সেখানে আছে দু জন প্রহরী। তাছাড়া তাঁর পালাবার খবর প্রকাশ হতে দেরী হবে না। সে ক্ষেত্রে প্রথমে সবাই গেটের দিকেই ছুটবে। করিডোরটি পশ্চিমে গিয়ে ভাস্কুয়েজের কক্ষে শেষ হয়েছে।
আহমদ মুসা ভাস্কুয়েজের কক্ষের দিকেই ছুটল। তাকে খোঁজার জন্য। প্রথম দিকে অবশ্যই কেও এদিকে আসবেনা।
ভাস্কুয়েজের বন্ধ দরজার সামনে দাড়িয়ে আহমদ মুসা দ্রুত জুতার গোড়ালি থেকে ল্যাসার নাইফ বের করে নিল। তারপর ল্যাসার বিম দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে এর গলিয়ে ফেলল লোক।
আহমদ মুসা ভাস্কুয়েজের ঘরে ঢুকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। মেঝেয় পা বারাতে গিয়ে, ছাঁদ থেকে তাকিয়ে থাকা ইনফারেড ক্যামেরা এর কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল বটে, কিন্তু বিকল্প সন্ধানে এর তখন কোন সময় ছিল না। তাছাড়া করিডোরেও তো ক্যামেরা থাকতে পারে। সুতরাং তাঁর গতি বিধি ধরা পড়ে যাবেই। যতক্ষণ সুযোগ আছে, তাঁর দ্রুত সদ্ব্যবহার করতে হবে।
আহমদ মুসা দৌড় দিল জানালা লক্ষ্য। দৌড় দেয়ার জন্য পা তলার পরেই তাঁর ডান পা টি কিসের সাথে ধাক্কা খেল। থেমে ঝুকে হাত দিয়েই বুঝতে পারল তাঁর ব্যগ। আহমদ মুসা র মনে পড়ল তাঁর কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে একজন প্রহরী দরজার সামনে ডান পাশটায় রেখে দিয়েছিল। ব্যাগটা ওখানই আছে। ওরা নিয়ে যায়নি, রেখে দিয়েছে ভাস্কুয়েজের জন্য। অথবা তারা ভুলেই গেছে ব্যাগের কথা, আহমদ মুসাকে পাওয়ার আনন্দে।
খুশী হল আহমদ মুসা ব্যাগটি পেয়ে। ব্যাগ হাতে তুলে আবার ছুটল আগের সেই জানালার দিকে।
জানালার গরাদ পরীক্ষা করে খুশী হল। আজকেও জানালার গরাদ লক করা নেই। আহমদ মুসা ধরা পড়ার পর এর প্রয়োজন বোধ হয় তারা মনে করেনি।
আহমদ মুসা জানালার গরাদ উঠিয়ে সংকীর্ণ কার্নিশটি তে নেমে এল। কার্নিশে দাড়িয়ে নিচে তাকিয়ে হতাশ হল আহমদ মুসা। সেদিন যেমন এ পাশটা অন্ধকার ছিল, আজ অন্ধকার নয়। এ পাশে নতুন একটা লাইট পোস্ট বসানো হয়েছে। তবে আহমদ মুসা খুশী হল, ছোট ঝাউ গাছটার ওপাশে তাঁর গাড়িটা সে যেখানে রেখে গিয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। নিচটা ভাল করে দেখতে গিয়ে আরও হতাশ হল আহমদ মুসা। তাঁর সোজাসুজি নিছের জায়গাটা থেকে গজ তিনেক দক্ষিণে স্টেনগান হাতে একজন প্রহরী দাড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। তবে ভাগ্যটা এখনও এই টুকু ভাল যে, লোকটা এদিকে তাকিয়ে নেই। দক্ষিন মুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিন দিকে অল্প দূরে দাঁড়ানো একটা বিল্ডিং থেকে পিয়ানোর সুন্দর সুর ভেসে আসছে। প্রহরী ওদিকে চেয়ে সম্ভবত সে সুরেই শুনছে।
আহমদ মুসা মুহূর্ত কয়েক অপেক্ষা করে সিল্কের কর্ডের হুকটি জানালায় লাগিয়ে নিল এবং বিসমিল্লাহ বলে নিঃশব্দে কর্ডে ঝুলে পড়ল। এই ঝুঁকি নেয়া ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। অপেক্ষা করার উপায় নেই। সময় যত যাবে, বিপদ ততই বাড়বে।
স্টেনগান দাঁতে কামড়ে দ্রুত নামছে আহমদ মুসা। অর্ধেক পথ নেমেছে এমন সময় কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান হেড কোয়ার্টার এর ভেতর থেকে সাইরেন বেজে উঠল। আহমদ মুসার গোটা দেহে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। সে পালিয়েছে একথা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রহরীদের সতর্ক করা হচ্ছে।
আহমদ মুসা নিচে একবার তাকিয়ে কর্ড ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে পড়ল। একটু দখিনে দাঁড়ানো প্রহরী সাইরেন এর শব্দ শুনে সতর্ক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে তাকাচ্ছিল পূর্ব দিকে – বিল্ডিং এর যেদিকে গেট। আহমদ মুসার লাফিয়ে পড়ার শব্দ হল।
চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল প্রহরী। দেখতে পেল আহমদ মুসা, সেই সাথে ঝুলে থাকা কর্ডটি। শত্রুকে চিনতে তাঁর দেরী হল না। হাতের স্টেনগান টি তুলতে গেল সে।
আহমদ মুসা লাফিয়ে পড়েই স্টেনগান তুলতে গেল আহমদ মুসাকে গুলি করার জন্য, তখন আহমদ মুসাকে ট্রিগার টিপতেই হল। আহমদ মুসার স্টেনগান থেকে বেরিয়ে গেল এক পশলা গুলি।
প্রহরী যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেখানেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
আহমদ মুসা ছুটল ঝাউ গাছের ওপাশে গাড়ির কাছে। গাড়ি খোলাই রেখেছিল আহমদ মুসা, চাবিও রেখে গিয়েছিল কি হলে। চাবি কি হলে ঠিক সেভাবেই রয়ে গেছে। সে কিছুটা বিস্মিত হল। ওরা কি এদিকে কোন খোঁজ করেনি। কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের মত সংগঠনের জন্য এটা অস্বাভাবিক মনে হল তাঁর কাছে।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি যখন বেরিয়ে আসছিল লন থেকে, তখন ঝাউ গাছের ওপাশে শোর-গোল শুনতে পেল। স্টেনগান বাগিয়ে কয়েকজন ছুটে এল ঝাউ গাছের এ পাশে। তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটে এল অনেক দূরে।
ওদের জেদ দেখে হাশ্ল সে।
আহমদ মুসা এ গলি সে গলি ঘুরে অবশেষে ফারদিনান্দ এভেনিউতে উঠে এল।
রাতের রাস্তা, গাড়ি চলাচল অপেক্ষাকৃত কম। তীব্র গতিতে ছুটছে আহমদ মুসার গাড়ি। সারাদিন পর মনে পড়ল মারিয়ার কথা, ফিলিপের কথা। নিশ্চয় ওরা উদ্বেগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফিলিপ নিশ্চয় তাঁর খোঁজে এদিকে এসেছে। সে তো বসে থাকার ছেলে নয়। মারিয়া যে তাকে একা আসতে না দেবার জেদ ধরেছিল, তাও মনে পড়ল আহমদ মুসার। মারিয়ার সে আশংকাই সত্য হল। নিশ্চয় মারিয়া অনেক কথা বলবে। কেন বলবে? কেন তাকে নিয়ে মারিয়ার এত আশংকা? একথা ভাবতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। ভুল পথে চলেছে মারিয়া। এ ভুল পথ থেকে মারিয়াকে ফেরাতে হবে। ভোরে মারিয়াকে ঐ ভাবে শক্ত কথা বলা যদিও খারাপ হয়েছে, মারিয়া এতে নিশ্চিত কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু মারিয়াকে শোধরাতে হলে এমন কঠোরতার প্রয়াজন আছে। আহমদ মুসার মন থেকে তৎক্ষণাৎ কে যেন বলে উঠল, মারিয়াকে এই কষ্ট দেয়া হবে, তাঁর অপরাধ কি? মারিয়ার যে বিষয়কে ভুল বলা হচ্ছে, তাঁর জন্য মারিয়া কতটুকু দায়ী ? আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ এর কোন জবাব দিতে পারলনা। মারিয়া ভুল পথে চলছে বলা যায়, কিন্তু তাকে তো অপরাধী বলা যায় না। মেইলিগুলিকে তো আমি অপরাধী বলিনি বরং তাকে তো আপন করে নিয়েছি। আর মারিয়া যে ভুল পথে চলছে, তাঁর জন্য ও মারিয়া তো প্রকৃত পক্ষে দায়ী নয়, সে পরিস্থিতির শিকার। আমার সাথে তাঁর দেখা, তাঁর পরিচয়, তাঁর আলাপ কোনটাই তাঁর সৃষ্ট নয়, আর আমিও এর জন্য দায়ী নই। আমিও ছিলাম অবস্থার শিকার, যে জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ আল্লাহ্‌ আমাকে দিয়েছেন তাঁর নির্দেশে আমি কাজ করছি। আমি জ্ঞানত কোন সীমা লঙ্ঘন করিনি। আবার কে যেন অন্তর থেকে বলে উঠল, মারিয়া কোন অন্যায় না করার পরও মারিয়ার প্রতি তুমি কঠোর হয়েছ এবং তাকে ভুল পথে চলার কথা বলছ তোমার স্বার্থ সামনে রেখেই। আসল কথা হল, মেইলিগুলিকে যা দিয়েছ, তাঁর অংশ তুমি কাওকে দিতে চাও না। এই কথায় আহমদ মুসা নিজেকে খুব দুর্বল অনুভব করল, তাঁর চিন্তা ঝাপসা হয়ে এল। বলল সে, আমি যা পারিনা তা না পারা কি অন্যায় ?
এই সময় আহমদ মুসার গাড়ি এসে মারিয়াদের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াল। চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল তাঁর।
হর্ন না বাজিয়ে গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা। গেট খোলার কৌশল সে জানে। বাইরে থেকে সুইচ টিপে গেট খোলা যায়, আবার সুইচ টিপে বন্ধ করা যায়।
একটি বিশেষ স্থান দিয়ে হাত দিয়ে সুইচ টিপল। খুলে গেল দরজা। গাড়ি নিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে।
দরজা খোলাই থাকল। মনে করল, পরে এসে বন্ধ করে দিয়ে যাবে।
আহমদ মুসার গাড়ী, গাড়ী বারান্দায় প্রবেশের আগেই ফিলিপকে ছুটে আসতে দেখল।
গাড়ী বারান্দায় প্রবেশ করল আহমদ মুসার গাড়ী।
গাড়ী দাঁড়াতেই পাশে পাশে ছুটে আসা ফিলিপ গাড়ীর দরজা খুলে ফেলল।
বলল, ‘মুসাভাই আপনি ভাল আছেন তো?’
আহমদ মুসা গাড়ী থেকে নামতে নামতে বলল, ‘ভাল আছি ফিলিপ। তোমাদের সব ভালতো?’
গাড়ী থেকে নেমেই আহমদ মুসা দেখতে পেল মারিয়াকে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার শান্ত দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে নিবদ্ধ।
‘সব ভাল, তবে মারিয়া আজ সারাদিন এই দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।’ বলল ফিলিপ।
‘ভাইয়া তুমি সত্য বলছ না।’ প্রতিবাদ করল মারিয়া।
‘ঠিক আছে, খাবার জন্যে একবার ‌ওপরে উঠে গিয়েছিলি, তারপর দরজা থেকে মাঝে মাঝে গিয়ে ড্রইংরুমে বসেছিস, হলো তো? সত্য কথাই বললাম।’
মারিয়া আর কিছু বলল না।
ফিলিপ আহমদ মুসার একটা হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে চলল। মারিয়া আগেই ঢুকে গিয়েছিল ড্রইং রুমে।
আহমদ মুসার বাম ভ্রুর ওপর রক্ত শুকিয়ে থাকা ক্ষতচিহ্ন এবং মুখে শুকিয়ে থাকা রক্ত প্রথম দেখতে পেল মারিয়া। দেখেই বলে উঠল, ‘ভাইয়া তুমি দেখ, উনি আহত।’ আর্তনাদের মত শোনাল মারিয়ার কন্ঠ।
শুনেই ফিলিপ মুখ তুলল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ইস্ খুশিতে এদিকে খেয়ালই হয়নি। কপালটা সাংঘাতিক ফেটে গেছে। আসুন।’
বলে টেনে আহমদ মুসাকে ড্রইংরুমের শোফায় নিয়ে বসাল।
ক্ষতটা পরীক্ষা করে ফিলিপ বলল, মারিয়া তুই যা ফাষ্টএইড বক্স নিয়ে আয়, একটু পরে ডাক্তার ডাকব।
মারিয়া এক দৌঁড়ে ওপরে উঠে গেল।
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ফিরে এল মারিয়া, এক হাতে ফাষ্ট এইড বক্স, অন্য হাতে একটা পাত্র, তাতে পানি।
সিঁড়ি থেকে নেমে বাইরের দরজা বরাবর এসে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে ‘ভাইয়া’ বলে চিৎকার করে উঠল মারিয়া। মরিয়া দেখল গাড়ী বারান্দা থেকে শিকারী বিড়ালের মত পা টিপে টিপে দরজার দিকে উঠে আসছে একজন লোক। তার হাতে উদ্যত রিভলভার।
আহমদ মুসা সোফায় বসেছিল। পাশের সোফায় বসে ফিলিপ মারিয়ার অপেক্ষা করছিল, আর কথা বলছিল আহমদ মুসার সাথে।
মারিয়ার চিৎকারে দু’জনই চমকে উঠে মারিয়ার দিকে চোখ ফেরাল। তারপর তাদের চোখ গিয়ে পড়ল দরজার ওপর। দরজায় উদ্যত রিভলভার হাতে দাঁড়ানো একজন লোক। ফেল্টহ্যাটে কপালটা ঢাকা থাকলেও জুবি জুরিটাকে চিনতে আহমদ মুসার অসুবিধা হলোনা।
দরজায় রিভলভার হাতে লোক দেখেই ফিলিপ বিদ্যুত গতিতে তার রিভলভার বের করল।
ফিলিপের হাতে রিভলভার উঠতে দেখে জুবি জুরিটার রিভলভার ধরা হাতটি একটু নড়ে স্থির হলো আহমদ মুসার লক্ষ্যে।
কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে একটুও কষ্ট হলো না মারিয়ার। সে হাত থেকে ফাষ্টএইড বক্স ও পানির পাত্র ছেড়ে দিয়ে পাগলের মত ছুটে গিয়ে আহমদ মুসাকে আড়াল করে দাঁড়াল। আর ঠিক সে সময়েই জুবি জুরিটার রিভলভার অগ্নি উৎগিরণ করল। গুলি গিয়ে বিদ্ধ হলো মারিয়ার বুকে। মারিয়া বুক চেপে ধরে উল্টে পড়ে গেল ঠিক আহমদ মুসার পায়ের ওপর।
জুবি জুরিটার রিভলভার গর্জন করার সাথে সাথেই ফিলিপের রিভলভার গর্জন করে উঠল। ফিলিপের গুলি গিয়ে বিদ্ধ করল জুবি জুরিটার বুক। জুবি জুরিটাও উল্টে পড়ে গেল দরজার ওপর।
ফিলিপ গুলি করার পরই উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মুসা ভাই আপনি মারিয়াকে দেখুন। আমি বাইরেটা একটু দেখি, আরও কেউ থাকতে পারে।’
ফিলিপ ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আহমদ মুসা সোফা থেকে নেমে মারিয়ার মাথা তুলে নিল। মারিয়ার চোখ তখন বোজা।
‘মারিয়া, মারিয়া।’ আহমদ মুসা ডাকল।
মারিয়া চোখ খুলল। তার চোখে আতংক নেই, সেখানে একটা প্রশান্তি।
ধীরে ধীরে বলল, ‘আপনি ভাল আছেন, আপনার গুলি লাগেনিতো?’
‘তুমি এ কি করলে, আমাকে বাঁচাতে গিয়ে…?’
কথা শেষ করতে পারলনা আহমদ মুসা। তার বাক রুদ্ধ হয়ে গেল।
ওপর থেকে সুমানো ও অন্যান্যরা এবং বাইরে থেকে ফিলিপ এসে মারিয়ার পাশে বসল। আতংক, উদ্বেগ, আকষ্মিকতায় কথা বলতেও সবাই যেন ভুলে গেছে।
মারিয়া তখন আহমদ মুসাকে বলছিল, ‘এমন সুখের মৃত্যু, এমন তৃপ্তির মৃত্যু পৃথিবীতে কদাচিৎ দু’একজনের ভাগ্যে জোটে জনাব।’
মারিয়ার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। আহমদ মুসা দ্রুত ফিলিপকে বলল, ‘চল একে হাসপাতালে নিতে হবে।’
ফিলিপ উঠে দাঁড়াল।
মারিয়া আবার চোখ খুলল। ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘ভাইয়া তুমি আমার পাশে বস। আমার সময় বেশী নেই।’
কেঁদে উঠল ফিলিপ।
কেঁদে উঠল সবাই, আহমদ মুসা ছাড়া।
বসল ফিলিপ মারিয়ার পাশে। বলল, ‘এ কি হলো বোন তোর?’
মারিয়া চোখ টেনে টেনে ফিলিপের দিকে তাকাল, বাম হাতটা তুলতে চেষ্টা করল, পারলনা। ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘ভাইয়া তুমি সব সময় তোমার আদরের বোনের সুখ দেখতে চেয়েছ না? আজ আমার চেয়ে সুখি আর কেউ নেই। সমগ্র দুনিয়া তুমি দিলেও এত সুখ আমাকে দিতে পারতে না। তুমি হাস ভাইয়া, তোমার হাসি দেখে যেতে চাই।’
কান্নায় আবার ভেঙে পড়ল ফিলিপ।
মারিয়া তার মুখের কাছে বসা সুমানোর দিকে চোখ তুলে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ‘দেখ সুমানো আমি আর কাঁদছিনা, হাসছি তাই তোমার প্রশ্নের জবাবের আর কোন প্রয়োজন নেই।’ আরও ক্ষীণ হয়ে উঠল মারিয়ার কন্ঠ।
তখনও আহমদ মুসার কোলে মারিয়ার মাথা।
মারিয়া চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। টেনে টেনে ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘মুসলমান কি ভাবে হতে হয়?’
“এক আল্লাহকে স্বীকার করা এবং মুহাম্মদ (সঃ) কে শেষ রসূল হিসেবে মেনে নেয়া।’
‘আমি স্বীকার করছি আল্লাহ এক, মুহাম্মদ তার রসূল।’ ক্ষীণ কন্ঠে কাঁপা গলায় বলল মারিয়া।
এতক্ষণে আহমদ মুসার দু’চোখ থেকে নেমে এল দু’ফোটা অশ্রু। বলল, ‘আমি আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দিব মারিয়া শেষ বিচারের সেই দিনে, তুমি আল্লাহর সত্য দ্বীন গ্রহণ করেছ।’
আবার ঠোঁট নড়ে উঠল মারিয়ার। তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘সেখানে আপনার সাথে দেখা হবে কি আমার?’
‘আশা করা যায়।’ কাঁপা গলায় বলল আহমদ মুসা।
চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মারিয়ার। প্রশান্তিতে চোখ বুজল। আবার চোখ খুলল মারিয়া। আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল-
‘আমার পক্ষ থেকে মেইলিগুলি আপাকে একটা কথা বলবেন?’ আহমদ মুসার চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ অনুনয় জানাল মারিয়া।
‘বল, কি কথা?’
‘বলবেন, আমি খুব ভালোবেসেছি তাঁকে, জগতের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী নারী তিনি।’
আহমদ মুসার চোখের অশ্রু আবার সজীব হয়ে উঠল। বলল, ‘বলব।’
একটু থেমে, একটা ঢোক গিলে আহমদ মুসা বলল, ‘আমাকে তুমি মাফ করে দিও মারিয়া, আমি তোমার প্রতি কঠোর হয়েছিলাম।’
‘না কঠোরতা নয়, আপনি ঠিক করেছিলেন। এ না করলে অন্যায় দাবির কাছে পরাজিতের মত আপনি সাধারণ হয়ে যেতেন। তাহলে আজকের জগতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিকে ভালোবাসার বুক ভরা গৌরব নিয়ে আমি মরতে পারতাম না।’
মারিয়ার শেষ কথা গুলো টেনে টেনে বেরিয়ে এল, ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল। সেই সাথে চোখ বুজে গেল তার। যেন গভীর এক প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল সে। যে ঘুম কোনদিন ভাঙবেনা।
আহমদ মুসা ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়ে মাথাটা অতি আস্তে নামিয়ে রাখল কার্পেটে।
ফিলিপ, সুমানো কেঁদে উঠে আছড়ে পড়ল মারিয়ার দেহের ওপর।
সুমানো চিৎকার করে বলল, আজ দুপুরে বলেছিলাম, জীবন থেকে তুই পালাতে পারবিনা। কিন্তু একদিনও তুই পার হতে দিলিনা। পালিয়ে গেলি এমন করে।
ফিলিপ শান্ত হলে আহমদ মুসা বলল, ‘ফিলিপ আমি যখন ওদের অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে আসি, কোন গাড়ী অবশ্যই আমাকে ফলো করেনি। তাহলে জুবি জুরিটা এখানে এল কি করে?’
বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, চলো তো গাড়ীটা একটু পরীক্ষা করি, আমার মনে হচ্ছে ওরা গাড়ীতে কোন ফাঁদ পেতে রেখেছিল।’
আহমদ মুসা ও ফিলিপ গিয়ে আহমদ মুসার গাড়ীর ভেতর বাহির তন্ন তন্ন করে খুজে দেখল। পেল তারা। গাড়ীর নিচে চেসিসের সাথে টেপ দিয়ে বাঁধা একটি স্বয়ংক্রিয় অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার। সেটাই সংকেত দিয়ে ডেকে এনেছে জুবি জুরিটাকে।
অয়্যারলেসটাকে গাড়ী থেকে খুলে নিয়ে আহমদ মুসা ওটা বন্ধ করে দিল। বলল, গাড়ীটা যথাস্থানে থাকাটা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু তখন এ নিয়ে ভাবার খেয়ালও হয়নি, সুযোগও ছিলনা। আসলে জুবি জুরিটা আমাদের ঠিকানা চিহ্নিত করার জন্যেই গাড়ীতে অয়্যারলেস পেতে রেখেছিল। সে নিশ্চিত ছিল আমার খোঁজে কেউ না কেউ যাবে এবং গাড়িটা পেয়ে গেলে নিয়ে আসবে। এ থেকে আরও একটা জিনিস বুঝা যায়, শুধু আমাকে নয়, আমার সাথে আরও যারা আছে তাদেরকেও তারা খুঁজে পেতে চায়।’
‘কিন্তু জুবি জুরিটা একা এল কেন, আরও কেউ এখানে আসবে বলে মনে করেন?’ চিন্তিত কন্ঠে বলল ফিলিপ।
‘আমার মনে হয় জুবি জুরিটা প্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে, খবর পেয়ে সম্ভবতঃ অফিস থেকে আসেনি। একারণেই তার সাথে কেউ আসতে পারেনি। আর তার এ মিশনের খবর অফিস অবশ্যই জানেনা। জানলে এতক্ষণ একটা দল এসে পড়ত। আর অয়্যারলেসের সংকেতের ব্যাপারটা মনে হয় জুবি জুরিটাই জানত শুধু। সুতরাং আর কেউ এখানে আসবে বলে মনে করিনা।’
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার বলল, ‘জুবি জুরিটার লাশটা সরিয়ে ফেলতে হবে। চল ওকে ওর হেডকোয়ার্টারের সামনেই রেখে আসি।’
‘ঠিক বলেছেন।’ বলে উঠল ফিলিপ।
জুবি জুরিটার লাশ রেখে যখন আহমদ মুসা ও ফিলিপ ফিরে এল, তখন রাত এগারটা। এসে দেখল, যিয়াদ বিন তারিক তার লোকজন সহ এসে গেছে। পরিকল্পনা ছিল রাত ১২টায় ভাসকুয়েজের হেডকোয়ার্টারে তারা যাবে, রাত তিনটায় তারা হানা দেবে। ফিলিপের লোকরা আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ১২টার পর ওখানে জমায়েত হবে। আহমদ মুসার মুক্তি ও জুবি জুরিটার নিহত হওয়া যিয়াদের যে আনন্দ দিতে পারতো, মারিয়ার মৃত্যু তা হতে দিল না। সবাই বিষন্ন।
সবাই গোল হয়ে বসেছিল ড্রইংরুমে।
ফিলিপ বলল, ‘মারিয়ার সৎকার কিভাবে হবে মুসা ভাই, সে তো মুসলমান হয়েছে।’
‘তুমি আপত্তি না করলে মুসলিম হিসেবে তার দাফন হওয়া উচিত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপত্তির প্রশ্নই ওঠেনা, মারিয়ার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।’
‘কিন্তু মারিয়ার কবর কিভাবে হবে। স্পেনে তো প্রকাশ্যে এটা হতে পারেনা, মাদ্রিদে তো নয়ই।’
‘কিছু ভাববেন না মুসা ভাই, মারিয়া আমার এবং আমার পরিবারের সবচেয়ে আদরের। ওর কবর লা গ্রীনজায় আমার বাড়ীতে হবে। ও যাতে সব সময় আমার চোখের সামনে থাকে।’
অশ্রু গড়িয়ে এল ফিলিপের চোখ থেকে।
ফিলিপ কথা শেষ করেনি, বলছিল, ‘জেরামা হ্রদের তীরে লা গ্রীনজা পার্বত্য নগরীকে মারিয়া অত্যন্ত ভালবাসত। সবচেয়ে ভালোবাসত লা-গ্রীনজার আমাদের বাড়ীটাকে। মারিয়া ওখানেই ঘুমিয়ে থাকবে।’
‘ধন্যবাদ ফিলিপ, কিন্তু খৃষ্টান বাড়ীতে মুসলিম কবর নিয়ে কেউ কথা তুলবেনা তো?’
হাসল ফিলিপ। হাসিটা কান্নার মত। বলল, ‘মারিয়া আমার আদরের বোন, চিন্তার সাথীও। কেউ আমরা কোন কথা গোপন করতাম না। আমার মনের কথাই মারিয়া আমার আগে বলে গেছে। আমার আর মারিয়ার পথ আলাদা নয়।’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ফিলিপকে। বলল, ‘বলনি তো এতদিন ফিলিপ।’
‘মারিয়ার নিষেধ ছিল। ও বলেছিল একটা উপযুক্ত সময়ে দু’ভাই বোন মিলে আপনাকে ‘সারপ্রাইজ’ দেয়া হবে।’
‘সে কথা রেখেছে ফিলিপ।’ আহমদ মুসার কন্ঠ খুব ভারি শোনাল।
এই সময় ফিলিপের সহকারী আবদুর রহমান এবং বাস্ক গেরিলাদের অন্য কয়েকজন নেতা প্রবেশ করল ড্রইং রুমে।
ফিলিপ আহমদ মুসার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আবদুর রহমানকে প্রশ্ন করল, লা –গ্রীনজায় যাত্রার সব রেডি হয়েছে কি না।
আবদুর রহমান মাথা নেড়ে বলল, ‘সব রেডি।’
ফিলিপ আহমদ মুসার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনি হুকুম দিন ভাইয়া, আমরা যাত্রা করি।’
‘চল’ বলল আহমদ মুসা।
সবাই উঠে দাঁড়াল।

মাদ্রিদের সেন্টপল গীর্জার দক্ষিণ পাশের বাগান। বাগানের একদম দক্ষিণ পাশে একটা গোলাপ ঝোপের আড়ালে একটা বেঞ্চিতে একা বসে আছে জেন। নির্জন এবং অন্ধকার জায়গাটা।
সূর্য ডুবে মাত্র অল্পক্ষণই হয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন অনেক রাত। চারদিকের গাছপালা এবং ঝোপঝাড়ই সেখানে বাড়তি অন্ধকার সৃষ্টি করেছে।
অন্ধকারে জেনকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। কাল স্কার্টের ওপর কাল কোট পরেছে জেন। অন্ধকারের মধ্যে গোটা দেহটাই তার হারিয়ে গেছে শুধু শ্বেত স্বর্ণাভ মুখটি ছাড়া। কিন্তু মুখটি তার বড় বিষন্ন। ঠোঁট তার শুকনো। চোখ থেকে রাজ্যের উদ্বেগ যেন ঠিকরে পড়ছে।
মাদ্রিদের সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় গীর্জা সেন্ট পল। গীর্জার চারদিক ঘেরা বিশাল বাগান। বাগানটাকে পার্ক বলাই ভালো। বাগানের মধ্যে জালের মত বিছানো রাস্তা। মাঝে মাঝে বেঞ্চি। বাগানে বেড়ানো যায়,বিশ্রাম করা যায়। যারা গীর্জায় প্রার্থনার জন্যে আসেন, যারা গীর্জার সান্নিধ্যে সময় কাটাতে চান কিংবা যারা দেখতে আসেন গীর্জা, তাদের জন্যেই এই ব্যবস্থা। গীর্জার গেট বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সবার জন্যে খোলা থাকে এই বাগান। গীর্জার বাগান, তাই বোধহয় লোকজন সব সময় কম থাকে, একমাত্র রোববার ছাড়া।
সন্ধ্যার পর বাগানে সেদিন লোকজন নেই বললেই চলে। বিশেষ করে গীর্জার পেছনের অংশ-দক্ষিণ অংশে কেউ নেই একমাত্র জেন ছাড়া।
জেন বেঞ্চি থেকে মাঝে মাঝে উঠে পায়চারি করছে। আর বেঞ্চির পাশ দিয়ে উত্তরে এগিয়ে যাওয়া পথের দিকে তাকাচ্ছে বার বার।
জেন অপেক্ষা করছে জোয়ানের।
ইতালির ট্রিয়েস্ত থেকে আসার পর জেন-জোয়ানের মধ্যে আর দেখা হয়নি। জোয়ানের দেখা করতে আসার তো প্রশ্নই ওঠে না, জেনও ভয়ে জোয়ানের ওদিকে পা তুলতে পারেনি। ইতালি থেকে আসার পর জেন ভয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায় মুষড়ে পড়েছে। তার উদ্বেগ জোয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে, দুশ্চিন্তা জোয়ানদের ভবিষ্যত নিয়ে।
হান্নার মাধ্যমে জোয়ানের এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছে জেন। জায়গাটা জেনেরই সিলেকশন।
পায়চারি থামিয়ে হঠাৎ রাস্তার ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াল জেন। গাছ ও ঝোপ-ঝাড়ের পাশ গলিয়ে একটা ছায়ামূর্তি এদিকে এগিয়ে আসছে। মুহূর্ত খানেক ওদিকে চেয়ে জেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, জোয়ান আসছে।
জোয়ান এলো।
জেন দু’ধাপ সামনে এগিয়ে জোয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘উঃ এলে! পথ চেয়ে অপেক্ষা করা যে কত কঠিন।’
জেনের সাথে হ্যান্ডশেক না করে জোয়ান বলল, ‘মাফ কর জেন, আমি এখন শুধু জোয়ান নই, মুসা আবদুল্লাহ। আমি মেয়েদের সাথে হ্যান্ডশেক করিনা এবং পারতপক্ষে মেয়েদের সাথে আগের মত মেলামেশাও করি না।’
‘মাফ কর জোয়ান, আমি ভুলে গিয়েছিলাম।’ বলল জেন।
‘এস বসি’ বলে জেন গিয়ে বেঞ্চিতে বসল।
জোয়ান গিয়ে বসল তার পাশে।
‘অনেকক্ষণ থেকে বুঝি অপেক্ষা করছ তুমি? কষ্ট পেয়েছ না?’
‘এমন কষ্টের সুযোগ যদি প্রতিদিন পেতাম!’ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল জেন।
‘কেমন আছ?’ জোয়ান বলল।
‘কেমন আছি বলে তুমি মনে কর?’
জোয়ান তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ।
‘জেন?’ মুহূর্ত কয়েক পরে ডাকল জোয়ান।
‘বল’।
‘তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার সুযোগ আমার হয়নি’।
‘কিসের কৃতজ্ঞতা?’
‘তুমি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছ।’
‘তুমি একথা বলতে পার? তুমি না মুসলমান? জীবন মৃত্যু কি এককভাবে স্রষ্টা-আল্লাহর হাতে নয়?’
‘ঠিক বলেছ জেন, কিন্তু নিজের জীবন বিপন্ন করে যে অবিশ্বাস্য কাজ তুমি করেছ………।’ কথা শেষ না করে থেমে গেল জোয়ান। তার কন্ঠ ভারি হয়ে উঠল।
‘বড় কিছু কি করেছি? তুমি হলে আমার জন্যে এটা করতে না?’
জবাব দিলনা জোয়ান। একটু নিরব থেকে বলল, ‘তোমাকে নিয়ে আমার খুব ভাবনা হয় জেন?’
‘কি ভাবনা?’
‘চরম বিপদগ্রস্ত এবং অনিশ্চিত একটা জীবনের সাথে তুমি নিজেকে জড়িয়েছ।’
‘হান্নাও একথা আমাকে বলে। কিন্তু আমার কি করার ছিল। তুমি ছিলে আমার চির প্রতিদ্বন্দ্বি। কিন্তু আমি কি জানতাম অজান্তে প্রতিদ্বন্দ্বির কাছে আমার সবকিছু হারিয়ে বসে আছি। যখন তোমার বিপদ এল, আমার অজানার অর্গল ভেঙে গেল। তারপর প্রবল স্রোতের এক ঘূর্ণি আমার জীবনকে মিশিয়ে দিল তোমার জীবনের সাথে।’ ভারী গলায় বলল জেন।
‘কিন্তু এর পরিণতি কি?’
‘পরিণতির চিন্তা আমি করিনা। ওটা আল্লাহর কাজ। আমি শুধু জানি, আমি কোন অন্যায় করিনি, কোন পাপ চিন্তাও কোনদিন আমার মধ্যে জাগেনি।’ আবেগ কম্পিত কন্ঠে বলল জেন।
জোয়ান কোন কথা বলল না।
জেন একটু থেকে আবার শুরু করল, ‘কেন তোমাকে ডেকেছি জান?’
‘জানি না’।
‘একটা অনুরোধ করার জন্যে’।
‘কি অনুরোধ?’
̒’আমার প্রথম অনুরোধ তুমি প্রকাশ্যে চলাফেরা করো না, দ্বিতীয় অনুরোধ, তুমি আপাতত মাদ্রিদ থেকে দূরে কোথাও সরে থাক।’
‘কেন?’
‘কেন বলছি তুমি জান। ট্রিয়েষ্টের হত্যাকান্ডের জন্যে, যাবতীয় তৎপরতার জন্য তোমাকে মধ্যমনি ভাবা হচ্ছে। সেই থেকে ওরা তোমার উপর ভীষন ক্ষেপে আছে। এই সেদিন কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান অফিসে আহমদ মুসার হানা এবং কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের অপারেশন কমান্ডার জুবিজুরিটার হত্যাকান্ডের জন্য তোমাকে কেন্দ্রবিন্দু ভাবা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আহমদ মুসা যদিও তাদের এক নাম্বার টার্গেট, তবু তুমি এদেশীয় বলে তোমার উপর রাগ তাদের শতগুণ বেশী। যেমন করেই হোক তোমাকে ওরা ধরবে। অতএব তোমাকে সরে থাকতেই হবে।’
‘জেন তুমি বল, মুসা ভাই ও অন্যান্যদের মাঠে রেখে আমি জীবনের ভয়ে সরে থাকতে পারি?’
‘জানি আমি-তুমি একথা বলবে। কিন্তু আমার কথা হলো, তুমি একাজের লোক নও, তুমি বিজ্ঞানী, তুমি ভিন্ন জগতের মানুষ।’
‘জোয়ান বিজ্ঞানী কিন্তু মুসা আবদুল্লাহ বিজ্ঞানী নয়।’
‘তুমি তর্ক করবে জানি। কিন্তু আবার বলছি তোমাকে ছোটবেলা থেকে আমি জানি। তুমি মারামারি করা ও গোলাগুলি চালানোর লোক নও।
‘হতে পারিনা? জেন তুমি জাননা, একজন মুসলমানকে একই সাথে গৃহী, পুলিশ ও সৈনিকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন মুসলমান যেমন সার্বক্ষণিক গৃহী, তেমনি সার্বক্ষণিক পুলিশ এবং সৈনিকও।’
‘জোয়ান সবাই কি এক ফ্রণ্টে কাজ করে, কাজের বিভাগ কি থাকে না?’
‘থাকতে পারে কিন্তু সে কার্য বিভাগের দায়িত্ব তো আমার নয়।’
‘যদি এ বিষয়টা আমি আহমদ মুসা ভাইকে বলি ?’
‘বলার আগে জেন তুমি কি আমার দিকটা চিন্তা করবেনা, শুধু মাত্র জীবন বাঁচানোর জন্যে সংগ্রামের ক্ষেত্র থেকে আমি চলে যেতে পারি? তুমি কি চলে যেতে পারতে?’
‘জেন কোন উত্তর দিল না। কিন্তু চোখ ফেটে কান্না এলো। একটু পরে কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, তোমার কি বিপদ তোমাকে বোঝাতে পারবোনা। ওদের কাছে তোমার ব্যাপারটা অন্যদের থেকে আলাদা।’
‘জানি জেন। তোমার কথা আমি বুঝেছি। তোমার কথার গুরুত্ব দিচ্ছিনা তাও না। কিন্তু ওঁদের রেখে যে আমি যেতে পারি না। তুমি জান আমার জাতির ওপর কতবড় বিপদ। ওরা সকল মুসলিম ঐতিহাসিক স্থান এবং সকল গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও সম্পদ ধ্বংসের জন্য গোপনে মাটির তলায় তেজস্ক্রিয় স্থাপন করেছে। এর ফলে মুসলিম ঐতিহাসিক স্থান ও কেন্দ্রগুলো আপনাতেই ধ্বসে পড়ার এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মুসলমানরাও ঐ তেজস্ক্রিয়ের প্রভাবে চিরতরে পঙ্গু,তারপর ধ্বংস হয়ে যাবে। এ তেজস্ক্রিয়ের কোন প্রতিষেধক নেই। একমাত্র উপায় ঐ তেজস্ক্রিয় গুলো তুলে ফেলা। কিন্তু তেজস্ক্রিয় গুলো ডিটেক্ট করা সম্ভব নয়। সুতরাং তেজস্ক্রিয় স্থাপনের যে প্ল্যান ও মানচিত্র কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের কাছে আছে তা উদ্বার করা গেলেই শুধু তেজস্ক্রিয় গুলো তুলে ফেলা যাবে। ট্রিয়েষ্ট থেকে ফিরে আহমেদ মুসা পাগলের মত খুঁজে ফিরছে সেই প্ল্যান ও মানচিত্র। সেদিন ভাসকুয়েজের অফিসে আহমদ মুসা হানা দিয়েছিল ঐ দু’টি দলিলের সন্ধানেই। তুমি জান সেই অভিযানে আহমদ মুসা ধরা পড়েছিল, আহত হয়েছিল এবং পরে মারিয়া জীবন দিয়েছে আহমদ মুসাকে রক্ষা করতে গিয়ে। যে গুলিটা আহমদ মুসার মাথা গুড়ো করত, সেই গুলি মারিয়ার বক্ষ বিদ্ধ করেছে। এই অবস্থায় বল জেন -তুমি চাইতে পার আমি কাপুরুষের মত মাঠ থেকে চলে যাই!’
জোয়ান কথা শেষ করার পরও জেন অনেকক্ষণ কথা বলল না। সব শুনে তার মুখ দিয়ে কথা সরছেনা। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘আমাকে মাফ কর জোয়ান, এত কিছু আমি জানতাম না, এত বড় জঘন্য ও ভয়াবহ ষড়যন্ত্র তারা করছে। এ ষড়যন্ত্র মুসলমানের বিরুদ্বে নয়, স্পেনের স্বার্থের বিরুদ্ধেও।’
একটু থামল জেন, তারপর আবার শুরু করল, ‘তাহলে জোয়ান, আমার প্রথম অনুরোধের কথা বলছি, তুমি প্রকাশ্যে চলাফেরা করোনা। তুমি যদি ধরাই পড়ে যাও তাহলে কাজ করবে কি করে।’
‘গোপনেই তো এখন চলাফেরা করছি।’
‘আরেকটা অনুরোধ।’
‘কি?’
‘প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে না পারার কারণে তোমার যা করতে অসুবিধা হয়, সে দায়িত্ব তুমি আমাকে দেবে এবং আরও যা করা দরকার তা আমাকে নির্দশ দিবে।’
‘তুমি করবে?’ জোয়ানের চোখে মুখে আনন্দ।
‘কেন তোমার কাজ কি আমার কাজ নয়?’
‘যতখানি আমার কথা ভাব,তার একাংশ কি ভাব নিজের কথা?’
‘ভাবি বলেই তো এত সাবধানতা। কোথায় এসে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করি দেখনা। আমি ভাবেছিলাম কি জান, এই রাতে এই নির্জনে তুমি আসতেই চাইবে না।’
‘চাইতাম না তুমি ছাড়া অন্য কেউ হলে।’
‘ধন্যবাদ।’
‘উঠতে বলছো?’
‘কেন উঠতে মন চাইছে না?’
‘তোমার চাইছে?’
‘আবার দেখা হবে?’
‘সেটা তোমার হাতে। আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দিচ্ছ তো আমাকে।’
‘ঠিক আছে আমার হাতেই থাকল। কিন্তু কথা রইল তুমি প্রকাশ্যে কোথাও বেরুবে না।’
‘আহমদ মুসা ভাইয়ের জন্য কিছু বলবে না? জান ট্রিয়েষ্টে আমার রুমের দরজায় তুমি দু’জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করে আমাকে বাঁচালে, তখন মুসা ভাই বলেছিলেন, এ কাজ একমাত্র জেনই করতে পারে।’
‘কি করে উনি বললেন?’ জেনের চোখ ভরা বিস্ময়।
‘আমি জানি না, মনে হয় তার তৃতীয় একটা চোখ আছে, সেটা দিয়ে তিনি অদৃশ্য সবকিছু দেখতে পান।’
‘জোয়ান, আমরা তাঁকে যত বড় বলে মনে করি, তার চেয়েও তিনি বড়।’
‘সেই সাথে সকলের মত স্পর্শকাতর একটা মন তাঁর আছে।’
‘কেন একথা বলছ?’
‘মারিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর মনটা খুব ভারি দেখছি।’
‘স্বাভাবিক, মারিয়া তাঁর জন্যে জীবন দিয়েছে।’
‘আরও কথা আছে।’
‘কি কথা?’
‘না, থাক জেন, অহেতুক আলোচনা এখন এটা।’
‘মারিয়ার কথা বলতে চেয়েছিলে তো। আমি জানি মারিয়া একটা ভুল করেছিল। এই ভুল আহমদ মুসাকে কষ্ট দিয়েছে।’
‘তুমি জানলে কি করে?’
‘লা-গ্রীনজায় আমাদের পার্বত্য নিবাসটা ওদের পাশের টিলায়। ছোটবেলা থেকে ওর সাথে আমার পরিচয়। মাদ্রিদে এলে ও আমার সাথে দেখা করেই।’
‘তাহলে তো সব জানই। কিন্তু বলত মারিয়ার ভুল কি স্বাভাবিক ছিল না?’
‘ওদের পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল, সেখানে অস্বাভাবিকটাও স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে তোমাদের ইসলামী মূল্যবোধে এতবড় ভুলের কোন সুযোগ নেই, সেখানে আবেগের সাথে অবগতিও একটা শর্ত।’
‘এ শর্ত কি তুমি আমার ক্ষেত্রে মেনেছিলে?’
‘পুরোপুরি জানতাম তোমাকে আমি।’
‘আমি মরিস্ক তা তো জানতে না।’
‘তুমিও জানতে না।’
‘যখন জানলে…?’
‘তখন আর করার কিছু ছিল না।’
‘কতকটা তোমার ভুলের মতই ছিল মারিয়ার ভুল।’
‘রাত অনেক হয়েছে। তোমার সাথে তর্ক করার এখন আর নেই। তবে সমগ্র অন্তর দিয়ে আমি কামনা করি, মারিয়ার মত অমন পরম মৃত্যুর সুযোগ যদি আমারও হতো।’ কন্ঠ ভারি শোনাল জেনের।
‘যাও বাজে বকো না। চল উঠি।’
‘বলে জোয়ান উঠে দাঁড়াল। তার সাথে জেনও।

জেনের আব্বা জেমেনিজ ডে সিসনারোসার লাইব্রেরী কক্ষ।
একটা বিশাল কক্ষের চারদিকে ঘোরানো র‌্যাকে ঠাসা বই। সব ধরনের বইয়ের একটি সুনির্ধারিত সংগ্রহ এ লাইব্রেরী।
জেন এবং জেনের আব্বা জেমেনিজ পাশাপাশি চেয়ারে বসে। জেনের সামনে খোলা বিজ্ঞান ম্যগাজিন ‘নিউ ফিজিক্স’-এর সর্বশেষ সংখ্যা, আর জেমেনিজ পড়ছে চলতি সপ্তাহের ‘টাইম ইন্টারন্যাশনাল’।
লাইব্রেরীটি এই কার্ডিনাল পরিবারের একটি মিলন কেন্দ্র। ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের সবাই মোটামুটি পড়ুয়া। তারা ড্রইংরুমে বসে গাল-গল্পে সময় কাটানোর চাইতে লাইব্রেরীতে বসে বই পড়তে ভালবাসে। এমনকি পারিবারিক গল্প-গুজব বেশিরভাগই তাদের লাইব্রেরীতে বসেই হয়।
জেমেনিজ ডে সিসনারোসা পড়তে পড়তে পত্রিকা থেকে মুখ তুলল। জেনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, এ সংখ্যা টাইম দেখেছ?’
‘না,আব্বা।’ বই থেকে মুখ তুলে বলল জেন।
‘ট্রিয়েষ্টের ঘটনার ওপর মজার একটা স্টোরি করেছে।’
‘ট্রিয়েষ্টের ঘটনার ওপর? কি লিখেছে?’ জেনের চেহারা ম্লান হয়ে উঠল।
‘স্টোরির দুইটা অংশ। প্রথম অংশে পুলিশ এবং গবেষণাকেন্দ্রের সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিয়োরিটিক্যাল ফিজিক্স’গবেষণা কেন্দ্রটি একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণের অর্ডার পায়। যেদিন এ পরীক্ষণটি সম্পূর্ণ হয়, সেদিনই পরীক্ষণটি হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করেই পরীক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক নিহত হন এবং অন্যান্য হত্যাকান্ড ঘটে। পুলিশের মতে দুই পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই হত্যাকান্ড সমূহ ঘটেছে। পরীক্ষণের বিষয় কি ছিল তাও পুলিশ উদ্বার করতে পারেনি। কারণ স্যাম্পুল, পরীক্ষণ রেজাল্ট ও কম্পিউটার ডিস্ক সবই চুরি হয়ে যায়। মনে করা হচ্ছে, পরীক্ষণের সাথে সংশিস্নষ্ট বৈজ্ঞানিকের যোগসাজশেই চুরির ঘটনা ঘটে। প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি পক্ষ পরীক্ষণের ফল হাত করতে গিয়েই ঐ হত্যাকান্ড সমূহ সংঘটিত হয়। যারা পরীক্ষণের অর্ডার দিয়েছিল, তাদের ও পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের ঠিকানা যা গবেষণাকেন্দ্রে লিপিবদ্ব আছে তা ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে।
ষ্টোরির দ্বিতীয় অংশটাই মজার। অপ্রকাশযোগ্য বিশেষ সুত্রের বরাত দিয়ে এ অংশে বলা হয়েছে, ট্রিয়েষ্টে যা ঘটেছে তার গোড়া স্পেনে। স্পেন ঘিরে একটা ষড়যন্ত্র দানা বেঁধে উঠেছে। এই ষড়যন্ত্রের মধ্যমনি হিসাবে কাজ করছেন আহমদ মুসা। মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যায়ের কৃতি ছাত্র জোয়ান ফার্ডিন্যান্ড এবং স্পেনের মরিস্করা তার সহযোগী হিসাবে কাজ করছে।’
জেনের মনে ভয় ও শংকার চেয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি হলো বেশী। এ ধরনের উল্টো ষ্টোরি টাইম ইন্টারন্যাশনালে’র মত একটা পত্রিকা করতে পারল। কারা ষড়যন্ত্র করছে, আর ষড়যন্ত্রের দায় চাপাচ্ছে কার ঘাড়ে।
জেন তার আব্বা বলা শেষ করলে বলল, ‘কিন্তু আব্বা তুমিও জান, আমিও জানি, জোয়ান একজন পিওর একাডেমিশিয়ান। ছোটবেলা থেকেই পড়া শুনার বাইরে আর কোন কিছুতে আগ্রহ নেই। দেশের বিরুদ্ধে সে কোন ষড়যন্ত্র করতে পারে তুমি বিশ্বাস কর?’
‘তুমি আগের জোয়ানের কথা বলছ মা। এখনকার জোয়ান আর আগের সেই জোয়ান এক নয়। নিজের মরিস্ক পরিচয় জানার পর সে ভিন্ন মানুষ হয়ে গেছে। মুসলমানদের তুমি জান না। সময় বদলায়, মুসলমানরা বদলায় না। মুসলমানরা তাদের ঈমান নষ্ট করে না।’
‘কিন্তু আব্বা স্পেনে মরিস্কদের পূর্ব পুরুষ মুসলমান ছিল। এখন মুসমানিত্বের কি অবশিষ্ট আছে তাদের? নামটাও তো নেই।’
‘বাইরে থেকে দেখলে এমনই মনে হয় মা। কিন্তু ওদের মনে উঁকি দিলে দেখবে, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে ওরা মুসলমানই রয়ে গেছে।’
‘কেউ যদি মনে মনে তার বিশ্বাস লালন করতে চায়, তাহলে ক্ষতি কি? স্পেনে মরিস্করা কয়জন? ওরা যদি পুরোপুরি মুসলিম হিসাবেও জিন্দেগী যাপন করে, তাহলে কি আর ক্ষতি করতে পারবে স্পেনের?’
‘ইসলাম সংক্রামক ব্যাধি, আর মুসলমান সে ব্যাধির দক্ষ জীবানুবাহী। ওদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে অল্প দিনেই দেশের সকল মানুষকে মুসলমান বানিয়ে ছাড়বে।’
‘কি ভাবে?’
‘বললাম না ইসলাম সংক্রামক ব্যাধির মত। ওদের একটা সম্মোহনী শক্তি আছে, তার ওপর স্পেনের সাধারণ লোকদের মধ্যে স্পেনের মুসলিম শাসনকালের প্রতি একটা বিরাট মোহ আছে। তারা মনে করে, স্পেন থেকে মুসলিম শাসন চলে যাবার পরই, স্পেন ইউরোপে তার নেতৃত্ব হারিয়েছে। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সভ্যতা, কৃষি, বাণিজ্য সবদিক দিয়েই স্পেন পিছিয়ে গেছে। মুসলিম শাসন ছিল স্পেনের সৌভাগ্যের প্রতীক।’
‘কথাটা কি মিথ্যা? আব্বা?
‘মিথ্যা নয় বলেই তো মুসলমানদের নাম আমরা স্পেনে রাখতে চাই না।’
‘তাহলে বল দোষটা জোয়ানের ওপর চাপাচ্ছ কেন ষড়যন্ত্র তো তাহলে ওরা করছে না?’
‘না মা ষড়যন্ত্র ওরা করছে। না হলে আহমদ মুসা স্পেনে এসেছে কেন? তাঁর মত লোক, কোন বড় মিশন না নিয়ে কোথাও যায়না।’
‘কি ধরনের ষড়যন্ত্র তারা করছে বলে মনে কর আব্বা?’
‘ঐতো, তাদের মতলব কি, ষড়যন্ত্রের স্বরম্নপ কি, সেটারই তো আমরা সন্ধান করছি।’
‘ষড়যন্ত্রই যখন এখনও চিহ্নিত হয়নি, তখন ওদেরকে ষড়যন্ত্রকারী বলে ফেলা কি ঠিক আব্বা?’
‘অনেক ব্যাপার আছে, তুমি সব বুঝবে না।’
‘আব্বা, পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস ভূলে গিয়ে দেশের মানুষ আমরা সবাই কি এক হতে পারি না? কেউ যদি দেশের আইনের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করে, তাকে দেশের হাতে সোপর্দ করতে পারি।’
‘তুমি ছোট, সব জান না। যেমন তুমি সরল, দুনিয়াটা তেমন সরল নয় মা!’
‘ঠিক এই সময়ই পাশের ইন্টারকম কথা বলে উঠল। রিসেপশন থেকে কথা বলছে। বলল, ‘মিঃ ভাসকুয়েজ এসেছেন।’
জেমেনিজ চট করে ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘ভুলেই গিয়েছিলাম ভাসকুয়েজ আসার কথা।’
তারপর জেমেনিজ রিসেপশনকে বলল, ‘লাইব্রেরীতে পাঠিযে দাও।’
আধ মিনিটের মধ্যেই ভাসকুয়েজ ‘শুভ বিকেল’ জানাল জেমেনিজকে।
‘শুভ বিকেল’ কেমন আছেন মিঃ ভাসকুয়েজ?’
জেনও উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাল মিঃ ভাসকুয়েজকে।
জেমেনিজও উঠে দাঁড়িয়েছিল।
ভাসকুয়েজের সাথে হ্যান্ডশেক করে জেমেনিজ ঘরের ওপাশে একটা টেবিল দেখিয়ে বলল, ‘চল আমরা ঘরের ওখানে বসি।’
জেমেনিজ ও ভাসকুয়েজ অল্প দূরে বিপরীত দিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসল।
লাইব্রেরী ঘরের পাশেই জেমেনিজের খাস বৈঠক খানা। সম্ভবত জেমেনিজ লাইব্রেরীতে বসেছিল বলে সেখান থেকে আর বেরুতে চাইল না।’
জেমেনিজ সামনের চেয়ারে আসন নেয়ার পর, ভাসকুয়েজ বাঁকা চোখে একবার জেনের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুরু করল, ‘জরুরী একটা ব্যাপার নিয়ে এসেছি।’
ভাসকুয়েজকে নিয়ে তার আব্বাকে এ ঘরেই বসতে দেখে জেন অস্বাভাবিক বোধ করছিল। চলে যাবে কি না ভাবছিল, এই সময় ভাসকুয়েজের ‘জরুরী একটা ব্যাপার নিয়ে এসেছি’ কথাটা কানে গেল জেনের। জরুরী কথাটা কি? জোয়ানদের কথা নয়তো? জেন আগ্রহী হয়ে উঠল।
চোখটা ম্যাগাজিনের পাতায় নিবদ্ধ রেখে কানটাকে উৎকর্ণ রাখল জেন ভাসকুয়েজের দিকে।
‘জরুরী তাতো বুঝতেই পারছি।’ ভাসকুয়েজের কথার উত্তরে বলল জেমেনিজ।
একটু থেমে জেমেনিজই আবার প্রশ্ন করল, ‘জুবিজুরিটাকে কোথায় হত্যা করল জানা গেছে?’
‘না জানা যায় নি।’
‘জুবি জারিটার গড়ীর সন্ধান পাওয়া যায়নি?’
‘পাওয়া গেছে একটা নাইট ক্লাবের সামনে।’
‘গাড়ীতে জুবিজুরিটি ছাড়া আর কারো হাতের ছাপ আছে?’
‘না।’
‘নাইট ক্লাব অর্থাৎ নারী ঘটিত কোন ব্যাপার নেইতো জুবিজুরিটার হত্যার পেছনে?’
‘না স্যার।’ প্রবল ভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ভাসকুয়েজ। আরো বলল সে, ‘অফিস থেকে টেলিফোন পেয়ে সে বেরিয়েছে। অফিসকে সে জানিয়েছে, আমি ওকে ফলো করছি, পালাতে পারবে না। আমি তোমাদের জানাব। সুতরাং নির্ঘাত আহমদ মুসাকেই সে ফলো করেছিল।’
‘আছা বলত, ডেভিলের মত রোবটকে ফাঁকি দিয়ে আহমদ মুসা পালাল কি করে?’
‘সে ধড়িবাজের শিরোমনি স্যার, তার বুদ্ধির শেষ নেই।’
‘আচ্ছা শাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স পাহারা দিয়ে সব কটিকেই তো ধরা যায়।’
‘পাহারা বসিয়েছি কিন্তু কোন কাক পক্ষী ওদিকে যায়নি।’
‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুলের ব্যাপারটা ওদের কাছে ধরা পড়ল কি করে? অত্যন্ত সুপার সিক্রেট ব্যাপার ছিল এটা। কোনও ভাবে এটা ডিটেকটেবলও নয়। জানল কেমন করে ওরা?’ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি তো?’
‘না স্যার সেরকম কিছু সম্ভব নয়। শীর্ষ পর্যায়ের আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কেই জানে না। যে ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে আমরা তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল গুলো পেতেছি, সেও জানে না। সে জানত ওগুলো প্রত্নতাত্বিক গবেষনার কোন ব্যাপার। তাছাড়া সে ইঞ্জিনিয়ার বেঁচে নেই।’
‘তাহলে ওদের জানার রহস্য কি?’
‘স্যার আহমদ মুসা সব পারে, সে যাদু জানে।’
‘যাদু জানে বলছ কি তুমি?’
যাদুর মতই ব্যাপারটা স্যার। যুগোশস্লাভিয়া, ককেশাস ও মধ্য এশিয়া থেকে আমরা খবর নিয়েছি তার ভিন্ন একটা চোখ আছে। যা আমরা দেখি না, তাও সে দেখে।’
‘ভাসকুয়েজ আমি পড়েছি, সব খাঁটি মুসলমানরাই নাকি ওরকম। অনেক অলৈাকিক কাজ তারা করতে পারে। ওটাকে ওরা বলে আল্লাহর সাহায্য।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার, চরম বিপদের মধ্যেও তারা হাসতে পারে নাকি এই কারণেই। আমারও না দেখলে বিশ্বাস হতো না। আহমদ মুসা বন্দী হলো কয়েকবার আমাদের হাতে। মৃত্যুর মুখোমুখি তাকে দাড়াতে হয়েছে। কিন্তু তাকে সামান্য চিন্তিত হতেও দেখা যায় নি।’
‘এখানেই তো আমাদের বিপদ ভাসকুয়েজ, সব মুসলমান যদি যদি খাঁটি মুসলমান হয়ে যায়, তাহলে জগতের কোন শক্তিই তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।’
‘এটা যাতে না ঘটে তারই তো চেষ্টা হচ্ছে স্যার সব জায়গায়। স্পেন থেকে ওদের আমরা নিশ্চি‎‎হ্ন করবই।’
‘এখন বল তোমার নিশ্চি‎হ্ন করার কাজ কতদূর? তোমার আজকের জরুরী বিষয়টা কি?’
‘বলছি স্যার’ শুরু করল ভাসকুয়েজ, ‘স্যার ওরা হন্যে হয়ে খুজছে তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল স্থাপনের প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম। আহমদ মুসা সেদিন আমার অফিসে হানা দিয়েছিল এর খোঁজে।’
‘তাই কি করে বুঝলে?’ চোখ দুটি বড় করে নড়ে চড়ে বসে প্রশ্ন করল জেমেনিজ।
‘কম্পিউটার পরীক্ষা করে জানা গেছে। কম্পিউটারের সাবজেক্ট ফাইল থেকে সে ঐ সংক্রান্ত ফাইলটিই বের করেছে।’
কি করে জানলো অমন ফাইল ওখানে আছে?
‘বলেছি না স্যার আহমদ মুসা বাতাস থেকে গন্ধ পায়!’
‘কিন্তু ভাসকুয়েজ, এবার সে বাতাস থেকে গন্ধ পায়নি। এবার সে ব্যর্থ হয়েছে।’
‘একেবারে ব্যর্থ সে হয়নি। কম্প্যুটারের সে ফাইলে তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল স্থাপনের প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম ছিল না বটে, কিন্তু কোথায় থাকতে পারে তার একটা ক্লু সে পেয়ে গেছে। এই বিষয়টাই আমি আপনাকে জানাতে এসেছি স্যার।’
‘কি বলছ তুমি?’
‘জি স্যার, ফাইলে বলা আছে ‘ডকুমেন্ট ‘Elder’ এর কাছে নিরাপদ।’
‘Elder’ থেকে তারা কি বুঝবে’
‘কি বুঝবে বলা মুশকিল, তবে ‘Elder’ এর সন্ধান তারা করবে এটা নিশ্চিত।’
‘আমাদের করণীয় সম্পর্কে কি বলতে চাচ্ছ?’
‘আপনার এখন সাবধান হওয়া দরকার।’
‘কেমন সাবধান, চলা পেরার ব্যাপারে?’
‘সেটা বোধহয় দরকার হবে না। একটা প্রশংসা ওদের করতে হয়। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হলে শত্রকে ওরা চোরাগোপ্তা হামলা করে না।’
‘তাহলে কি সাবধানের কথা বলছ?’
‘আপনার বাসার নিরাপত্তার কথা ভাবছি, এখানে পাহারার জন্যে লোক বসাব কিনা চিন্তা করছি।’
‘ও বুঝেছি ঐ কারণে।’ বলে একটু থামল জেমেনিজ। তারপর আবার শুরু করল, ‘তার চেয়ে ভাসকুয়েজ ডকুমেন্টটা আমার বাসা থেকে সরিয়ে নাও না’।
ম্যাগাজিনে জেনের চোখটা আটকা থাকলেও সমস্ত মনযোগ একত্রিত করে উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল তাঁর আব্বার সাথে ভাসকুয়েজের আলাপ। ‘ডকুমেন্টটা আমার বাসা থেকে সরিয়ে নাও না’ কথাটা জেনের কানে পৌছাতেই বিদ্যুত চমকিত হলো তার শরীর। যে ডকুমেন্টটা আহমদ সুসা জোয়ানরা পাগলের মত খুঁজছে সেটা তাদের বাসায়। আনন্দ উত্তেজনা- শংকায় জেনের বুকে যেন কাঁপন ধরে গেল। কিন্তু কান সে পেতে রাখল সেই কথোপকথনের দিকে।
‘কোথায় নেব, অফিস আর নিরাপদ নয়। আমাদের বাসা তো ওদের শ্যোন দৃষ্টির মধ্যে।’ জেমেনিজের প্রস্তাবের উত্তরে বলল ভাসকুয়েজ।
‘ওগুলোর কাজ তো শেষ। এখন পুড়িয়ে ফেললে হয় না ওগুলো?’
‘না, স্যার ওগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরী। টার্গেট ধ্বংসের কাজ যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন ওগুলোকে তুলে ফেলতে হবে। না হলে ওর কার্যকারিতা চলতেই থাকবে, যা ছড়িয়ে পড়বে গোটা এলাকায়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় যা পাবে তাকেই ঠেলে দেবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে।’
‘সাংঘাতিক, তাহলে তো ওগুলো ভীষণ জরুরী।’
‘ঠিক স্যার।’
‘তাহলে?’
‘কার্ডিনাল পরিবারের আশ্রয়ের চেয়ে নিরাপদ স্থান স্পেনে আর নেই স্যার।’
‘এই প্রশংসায় খুশি হলো জেমেনিজ। তার পূর্ব পুরুষ কার্ডিনাল ফ্রান্সিস জেমেনিজ ডে সিসনারোসা ছিলেন স্পেনের প্রতিষ্ঠাতা রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং রাণী ইসাবেলার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শুরু। স্পেনে খৃষ্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তার সংহত করণে তার অমূল্য অবদান রয়েছে। এই জন্যে কার্ডিনাল পরিবার এখনও গোটা স্পেনের খৃষ্টান মহলে অত্যন্ত সম্মানিত। এই পরিবারের মত সম্মান স্পেনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরাও পান না। এখনও রাস্তা-ঘাটে বাজারে কার্ডিনাল পরিবারের কাউকে দেখলে মানুষ দাঁড়িয়ে যায়।
প্রশংসায় মুগ্ধ জেমেনিজ বলল, ‘ঠিক আছে ভাসকুয়েজ, তাহলে এটা এখানে থাক।’
‘চিন্তা নেই স্যার, ওগুলো আপনার এখানে একটা নিরাপদ ব্যবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া আপনাদের ভূগর্ভস্থ কক্ষ। নিজেই সিন্ধুকের মত দুর্ভেদ্য। তার ওপর আমরা চোখ রাখব। কারও চোখ এদিকে পড়বে বলে মনে করি না।’
‘না ভাসকুয়েজ, কোন প্রহরী আমি চাই না। মানুষ কি বরবে। কার্ডিনাল পরিবারের নিরাপত্তার জন্যে কোন সময়ই প্রহরী বসান হয়নি।’
‘ঠিক আছে স্যার। তাহলে এখন উঠি।’
‘ওদিকে জেনের ভেতরটা থর থর করে কাঁপছে। তাদের ভূগর্ভস্থ কক্ষে আছে ঐ ডকুমেন্ট!
ভাসকুয়েজের উঠার কথায় শংকিত হয়ে উঠল জেন। ওকে বিদায় দিতে হবে, তার আব্বার সাথে কথা বলতে হবে। জেনের মুখ দেখলে নিশ্চয় ওদের অভিজ্ঞ চোখ সবকিছু ধরে ফেলবে। কিছুতেই মনকে সে স্বাভাবিক করতে পারছে না।
অপ্রত্যাশিত ভাবে একটি সুযোগ জেনের জুটে গেল।
ভাসকুয়েজের উঠার কথায় জেমেনিজ বলল, মুখে কিছু না দিয়ে যাবে কি করে? বলে জেমেনিজ উঠে ইন্টারকমের দিকে এগিয়ে এল। এই সময় জেন তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে বলল, ‘আমি যাচ্ছি আব্বা, পাঠিয়ে দিচ্ছি নাস্তা।’
বলে জেন মুখ নিচু রেখেই ছুটল।
বাইরে বেরিয়ে গেল জেন। আল্লার শুকরিয়া আদায় করল সে। আল্লাহ তাকে একটা নাজুক অবস্থার থেকে উদ্ধার করেছেন।

অনেক ভেবেই জেন সিন্ধান্ত নিয়েছে, বিষয়টা জোয়ানদের জানাবে না। ওরা যদি বিষয়টার সাথে জড়িত হয়, ডকুমেন্ট উদ্ধারের জন্যে ওরা জেনদের বাড়ীতে অভিযান চালায় বাইরে থেকে এসে, তাহলে তাদের বাড়ীতে বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তার চেয়ে জেন একাই চেষ্টা করবে। সফল না হবার কোন কারণ সে দেখে না। তার নিজের বাড়ীর একটা জিনিস সে সরিয়ে ফেলতে পারবে না কেন?
এই সিন্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার পিতার দিকটা এবং পরিবারের দায়িত্বের প্রশ্ন তাকে কিছুটা দোটানায় ফেলে দিল। সে কার্ডিনাল পরিবারের মেয়ে। আজ তার দেশ স্পেন যে রাষ্ট্রীয় বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে, সে বুনিয়াদ তার পূর্ব পুরুষের হাতে গড়া। তার ওপর এই বুনিয়াদকে পাকাপোক্ত করার জন্যে সে সংগঠন কাজ করছে সেই কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যান –এর উপদেষ্টা তার আব্বা। সুতরাং তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল স্থাপনের প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম জোয়ানদের হাতে পাচার করে তাদের সাহায্য করার অর্থ হবে তার পিতা, তার পরিবার এবং রাষ্টীয় বুনিয়াদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
কিন্তু এই যুক্তি জেনের মনে বেশীক্ষণ টিকেনি। জেনের বিবেক এই যুক্তির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে বলেছে, কোন অন্যায় সে করছে না, বরং অতি জঘন্য ও সর্বনাশা এক অন্যায়ের প্রতিবিধানই করতে যাচ্ছে। তার পিতা এবং তার পিতার সংগঠন একটা জাতি শুধু নয়, তার দেশের ঐতিহাসিক সম্পদের বিরুদ্ধেও এক হিংসাত্মক ও ধ্বসাত্মক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। এর প্রতিবাদ করা, একে বানচাল করার চেষ্টা করা মানুষ হিসেবেও তার নৈতিক দায়িত্ব। তাছাড়া সে শুধু মানুষ নয়, সে জেন। জোয়ানকে সে সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছে।
সিদ্ধান্ত নেবার পর জেন একটা অসুবিধা অনুভব করতে লাগল। সর্বক্ষণ তার মনে হতে লাগল এই বুঝি তার মনের কথা সবাই জেনে ফেলল, ধরা পড়ে গেল বুঝি সে। বাপ, মা সহ বাড়ীর লোকদের চোখের দিকে তাকাতে তার ভয় হতে লাগল। তার মনে হতে লাগল তার চোখ দেখে সবাই তাকে বুঝে ফেলবে। আগের মত সবার সাথে সে মন খুলে কথা বলতে পারে না। মনে হয় তাদের সাথে তার কত ব্যবধান। এই অবস্থায় শুয়ে শুয়ে অথবা পড়ার টেবিলে বসে সময় কাটাতে লাগল সে।
সেদিন শুয়ে আছে জেন। বাম হাতটা তার কপালে। চোখ দু’টি তার বোজা।
জেনের মা ঘরে ঢুকল। জেনের খাটের পাশে এসে কিছুক্ষণ দাড়াল। তার চোধ দু’টি নিবদ্ধ জেনের মুখে। জেনের মুখ ম্লান, ঠোঁট শুকনো। জেনের মা চিন্তিত মুখেই জেনের ঘরে প্রবেশ করেছে। তার চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ।
ধীরে ধীরে গিয়ে জেনের মা জেনের মাথার পাশে বসল।
সাড়া পেয়েই চোখ খুলল জেন।
‘আম্মা তুমি’ বলে সে উঠে বসতে গেল।
তার মা তাক হাত দিয়ে আটকে আবার শুইয়ে দিল। বলল, ‘শুয়ে থাক মা, আমি মাথায় হাত বলিয়ে দেই।’
‘আহা, আম্মা আমি ছোট নাকি যে, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে ঘুমিয়ে দেবে?’
‘খুব বড় হয়েছ না? তাই বুঝি মাকে কোন কথা কোন চিন্তার ভাগ দাওনা?’
মায়ের কথায় চমকে উঠল জেন। মা সব বুঝে ফেলল নাকি। মায়ের দিকে না তাকিয়েই একটু শাস্ত গলায় বলল, ‘তুমি কি বলছ আম্মা, আমি কোন চিন্তার ভাগ দেইনা?’
জেনের মা তার মাথায় হাত বুলাচ্ছিল। বলল, ‘মায়ের চোখ ফাঁকি দেয়া যায় না জেন। অনেক দিন থেকে বিশেষ করে গত কয়েকদিন থেকে তোমাকে অত্যন্ত মন মরা দেখছি। সেই হাসি নেই, উচ্ছলতা নেই। কথাও তেমন বল না কারো সাথে। দেখলে মনে হয় পালিয়ে বেড়াচ্ছ। ক’দিন থেকেই বুঝছি, বড় একটা কিছু হয়েছে বা ঘটেছে। কি ঘটেছে মা?’
মনে মনে শংকিত হলো জেন। মায়ের আদরে, স্নেহ মাখা নরম কথায় তার মনটা ভিজে উঠল। জেন বলল, ‘সত্যি আমার তেমন কিছু ঘটেনি মা। এমনি শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।’
‘জেন তোমার অসুখ হলে মুখ দেখলেই আমি বুঝি, তোমার শরীর খারাপ হয়নি। আমি তোমার মন খারাপ দেখছি।’
জেনের মা থামল।’
জেন নিরব। কি উত্তর দেবে মায়ের কথার। সত্যিই মায়ের চোখ ফাকি দেয়া যায় না। পাকি সে দিতে পারেনি। এখন মাকে সে কি বলে বোছাবে। কোন কথাই তার মুখে এল না। চোখ বুজল সে।
জেনের মা একটু মাথা নিচু করল। তার কপালে চুমু খেল। বলল, মা জেন তুমি আমার একমাত্র সন্তান। তোমার মলিন মুখ যে আমি সইতে পারি না। আমি বুঝতে পারছি তুমি কষ্ট পাচ্ছ। তোমার এ কষ্ট যে আমাকে কষ্ট দেয় তোমার চেয়ে বেশী।
জেনের চোখ ফেটে অশ্রু নেমে এল। মাথা তুলে মায়ের কোলে মুখ গুজল। বলল, আম্মাগো, তুমি চিন্তা করো না, কষ্ট পেয়ো না। আমি মানুষ, মানুষের জীবনে কিছু চিন্তা ভাবনা, দুঃখ কষ্ট থাকেই।
তার মা তৎক্ষনাৎ কিছু বলল না। জেনের মাথায় তখনও তার মা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দৃষ্টিটা তার উদাস। তার উদাস, শূণ্য দৃষ্টিটা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। এক সময় সে ধীরে ধীরে বলল, তুমি তোমার বাপের মত হয়েছ। একটা কথা বললে তা থেকে আর নড় চড় নেই।’
একটু থামল জেনের মা। থেমেই আবার শুরু করলো, ‘সোনার টুকরো ছেলে জোয়ান। তোদের দু’জন কে ঘিরে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। সে স্বপ্ন নির্মম ভাবে ভেঙে গেল।’
জেন মুখ তুলে মায়ের দিকে একবার চাইল। দেখল মায়ের বেদনা পাংশু মুখ এবং শূণ্য দৃষ্টি। জেনের ভিতরের বিস্ময় ও আনন্দের একটা শিহরন। তার মাও ভেবেছে তাদের নিয়ে।
মায়ের কোলে আবার মাথা রেখে জেন বলল, ‘মাগো, তুমি সত্যিকার মা। কিন্তু আম্মা, স্বপ্নটা ভেঙে গেল কেন?’
‘সব স্বপ্ন সব সময় সফল হয় না, চাওয়ার সাথে পাওয়া সব সময় মেলে না’।
‘এই না মেলানোর অংকটা যদি গায়ের জোরে হয়, চাপিয়ে দেয়া হয়, অন্যায় হয়, তাহলেও কি সান্তনা নিতে হবে?’
‘অনেক সময় নিতে হয় মা। সবাইকে নিয়ে সমাজকে নিয়েই তো আমরা!’
‘অনেক নিতে পারে, কিন্তু সবাই তা নাও পারে।’
জেনের মা তার শূন্য চোখটা ফিরিয়ে আনলো বাইরে থেকে। তাকাল জেনের দিকে। জেনের মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘মা আমার, এমন কথা বল না। অনেক অংক আছে, কোনদিনই মেলানো যায়না।’
জেন কোন কথা বলল না।
জেনের মা জেনের মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে নিল। বলল, ‘ক’দিন থেকে তোমার মুখে হাসি দেখিনি। একটু হাস মা।’
জেন হাসতে চেষ্টা করল। হাসিটা তার কান্নার চেয়েও করুণ দেখাল।
জেনের মা মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। বলল, ‘এত ব্যথা তোর বুকে, অথচ আমাকে কেন জানাস নি এতদিন?’ ভারি কাঁপা কণ্ঠস্বর জেনের মার।
জেনের চোখ ভরে উঠেছিল অশ্রুতে। তাড়াতাড়ি মুছে বলল, ‘আম্মা তুমি চিন্তা করো না, কষ্ট পেয়ো না আম্মা। আমাকে তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।’
‘কোন বাপ মা তা পারে বুঝি! যখন মা হবে…’
এই সময় পরিচারিকা দড়জায় এসে দাঁড়াল। বলল, ‘সাহেবের টেলিফোন মেম সাব।’
জেনের মা জেনের কপালে চুমু খেয়ে তাকে কোল থেকে নামিয়ে রেখে বলল, আসি মা, দেখি ওদিকে।
চলে গেল জেনের মা।
মায়ের সাথে কথা বলে, মাকে কিছু কথা বলতে পেরে অনেকটা হালকা অনুভব করছে জেন। ভালোই হলো, জোয়ানের সাথে তার ব্যাপারটা অন্তত তার মা জানে।
মন হালকা হওয়ার সাথে জেন আশংকাও অনুভব করল। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে, বেশি দেরী করা ঠিক হবে না, কখন কি ঘটে বলা যায় না। আম্মা যেমন উদ্বিগ্ন হয়ে ঊঠেছে তাতে যদি বলে বসে যে, যাও কিছুদিন বেড়িয়ে এস। আম্মা কিছু বললে তাঁকে ঠেকানো যায় না, কান্নাকাটি শুরু করেন।
সবদিক চিন্তা করে জেন ঠিক করল, আজ রাতেই সে তার মিশনে হাত দেবে।
জেন তার মিশন নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক চিন্তা ভাবনা করেছে।
তাদের ভূগর্ভস্থ কক্ষ তাদের বাড়ীর পেছন অংশে। আব্বা আম্মা ও তার শয়ন ঘর এবং কিচেনের নিচে বিস্মৃত জায়গা নিয়ে বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষটি।
ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামার দু’টি পথ। একটি সিড়ির গোড়ায়, অন্যটি তার আব্বার ঘরের মধ্য দিয়ে। সিড়িরগোড়ায় ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামার যে পথ আছে, তা বিশাল এক লোহার পাল্লা দিয়ে বন্ধ। লোহার পাল্লাটি দেড় ইঞ্চি পুরু। দরজাটি স্বয়ংক্রিয়, এর সুইচ আছে জেনের আব্বার ঘরে দেয়ালের এক কেবিনে লুকানো সুইচ বোর্ডে। আরেকটি দরজা দেয়ালের সাথে তৈরী একটা আলমারির মধ্যে দিয়ে।
আলমারিটি খুললেই নিচে নামার সিড়ি বেরিয়ে পড়ে। এই পথ দিয়েই সাধারণ বা প্রাত্যহিক প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামা হয়। আর সিঁড়ির দরজাটি কোন বিপদকালীন সময়ে পরিবারের সকলের এক সাথে ব্যাবহারের জন্যে। সিঁড়ির দরজা দিয়ে নামা যাবেনা কোন ক্রমেই। সিঁড়ির দরজা খোলার যে সুইচ জেনের আব্বার ঘরে আছে তা অন করলে সংগে সংগে বাড়ির সব প্রান্তে ছড়িয়ে পরার মত একটা সাইরেন বেজে উঠে। অতএব ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামার একটাই পথ খোলা। সেটা তার আব্বার ঘরের সেই আলমারির মধ্য দিয়ে।
জেন ঠিক করল তার আব্বার ঘরের এই পথই ব্যবহার করবে। আই পথ দিয়ে নামার অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। বিভিন্ন কারনে কখনও একা, কখনও অন্যের সাথে বহুবার সে ভূগর্ভস্থ কক্ষে এ দরজা দিয়ে নেমেছে।
কিন্তু কখন নামবে? তার আব্বার সামনে দিয়ে ভূগর্ভস্থ কক্ষে যাওয়া যাবেনা। অহেতুক কৌতুহলী হয়ে উঠতে পারেন অথবা সাথে তিনিও নামতে পারেন। সুতরাং নামতে হবে তার আব্বা যখন বাড়ী না থাকেন তখন এবং সব দিক দিয়ে সেই উপযুক্ত সময় সন্ধ্যারাত। জেনের আব্বা প্রায় সন্ধ্যারাতে বাইরে থাকেন। হয় কোন মিটিং এ যান, নয়তো ক্লাবে।
কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান এখনও জেন করতে পারেনি। তেজস্ক্রিয় পাতার প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম ভূগর্ভস্থ কক্ষের কোথায় খুঁজে পাবে সে। এই প্রশ্নের সমাধান তখনও সে করতে পারেনি।
রাত তখন ৮টা।
তার ঘরে শুয়ে ছিল জেন।
তার আব্বা-আম্মা মার্কেটে যাচ্ছে। জেনকেও বলেছিল যেতে, কিন্তু জেন রাজী হয়নি। খুব খুশী হয়েছে জেন। তার আব্বা-আম্মা একসাথে যাওয়ায় তার দারুন সুবিধা হবে। নিরাপদে কাজ সারতে পারবে। জেন তার আব্বা-আম্মাদের যাওয়া টের পেয়ে উঠে দাঁড়াল।
এক পা, দু’পা করে দরজার দিকে পা বাড়াল, বুকটা তার কেঁপে উঠল। কেমন একটা আড়ষ্টতা ও ভয় এসে তাঁকে ঘিরে ধরল। মন বলল, যা সে করতে যাচ্ছে, তা প্রকাশ হওয়ার পর কিংবা ধরা পড়লে তার কি হবে।
কিন্তু ভয় ও পরিণতির কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলল সে। জোয়ানকে সাহায্য করার, আহমদ মুসাকে সাহায্যে করার, মজলুমদের সাহায্য করার এর চেয়ে বড় সূযোগ আর সে পাবে না।
জেন প্রস্তুত হয়ে তার আব্বার ঘরের দরজার নব ঘুরিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। প্রতিদিন শতবার করে এ ঘরে প্রবেশ করে কিন্তু আজকের প্রবেশটা তার সেরকম নয়। বুঝতে পারছে তার হার্ট বিট বেড়ে গেছে। গোটা দেহে অপরাধী সুলভ একটা আড়ষ্টতা।
মেঝেটা পার হয়ে ওয়াল আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল জেন।
হাতল ধরে টেনে দেখল আলমারি বন্ধ।
আলমারির কন্বিনেশন লকের কোড সে জানে। লক ঘুরিয়ে কম্বিনেশন মিলিয়ে সে খুলে ফেলল আলমারি। আলমারিতে প্রবেশ করল জেন। আলমারির পর নিচে নামার সিঁড়ির মুখে আরেকটা দরজা। দরজাটি পুরো স্টিলের, বোমায় ভাঙবে না এমন। সে দরজাতেও কম্বিনেশন লক। কিন্তু লক করা নেই দরজা।
জেন ভারি দরজা টেনে খুলে সিঁড়িতে নামল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল জেন। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে আবার উঠে এল জেন ওপরে সিঁরির দরজায়। সিঁড়ির মুখের দরজা লাগিয়ে হুড়কো এটে দিল দরজায়। সে ভেতরে থাকা অবস্থায় কেউ যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্যেই এই ব্যবস্থা।
দরজা বন্ধ করে ভূগর্ভস্থ কক্ষে নেমে এল জেন।
বিশাল কক্ষ।
শুধু মূল্যবান জিনিসের স্টোর হিসাবে নয়, আপাতকালীন আশ্রয়স্থল হিসাবেও এই ভূগভস্থ কক্ষ তৈরী হয়েছে। বিশাল কক্ষটিতে ছয়টি শয্যাপাতা আছে। খাদ্য সংরক্ষণের জন্যে রয়েছে অনেক গুলো বিরাট রিফ্রেজারেটর। কাপড়-চোপড় রাখার জন্যে রয়েছে কয়েকটি আলমারি। কয়েকটি র‍্যাকে রাখা আছে বিভিন্ন তৈজসপত্র। র‍্যাক, আলমারি, রিফ্রেজারেটর সবগুলোই কক্ষের দেয়ালে নির্মিত কেবিনে রাখা।
কোথায় রাখা আছে ডকুমেন্টগুলো? কোথেকে খোঁজা শুরু করবে সে। হঠাৎ কক্ষের নিরাপত্তা-সিন্দুকের কথা মনে পড়ল জেনের। পরিবারের সকল মূল্যবান দলিল এবং দ্রব্য সেই নিরাপত্তা সিন্দুকে রাখা আছা। জেনের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল, সন্দেহ নেই তেজস্ক্রিয় পাতার সেই অতিমূল্যবান ডকুমেন্ট ঐ নিরাপত্তা সিন্দুকেই থাকবে। খুশীতে তুড়ি বাজাতে গিয়ে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল জেনের মুখ। এ নিরাপত্তা সিন্দুক কোথায় আছে, কিভাবে খুলতে হয় জানা নেই জেনের। এতক্ষনে তার মনে হল বিরাট ভূল করেছে সে। কিন্তু ফিরতেও আর মন চাইল না। সে আজ যে সূযোগ পেয়েছে, এ সূযোগ দু’চারদিনের মধ্যে আবার যে পাবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
সুতরাং এসে পড়েছে যখন তখন যে দায়িত্ব সে পালণ করতে চেয়েছে, তা সম্পূর্ন সে করবেই।
হঠাৎ তার মাথায় এলো, ওপরে সিঁড়ির গোড়ার ভূগর্ভস্থ কক্ষের দরজা খোলার ব্যবস্থা তো স্বয়ংক্রিয়। অন্য এক জায়গায় রক্ষিত একটা সুইচ টিপলেই সেই দরজা খুলে যায়। নিশ্চয় নিরাপত্তা সিন্দুক খোলার জন্যে সে রকম কোন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাই থাকবে। নিরাপত্তা সিন্দুকের সুইচ এ ঘরেরই কোথাও রয়েছে। তাকে এখন সে সুইচ খুঁজে বের করতে হবে।
কোথায় থাকতে পারে সে সুইচ? ঘরের দেয়ালে কোথাও সুইচ বক্স আছে কি? তৈজস পত্রের র‍্যাক থেকে একটা ছোট্ট হাতুড়ি নিয়া জেন হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দেওয়াল পরীক্ষা করতে লাগল। ফাঁপা শব্দ কোথাও থেকে আসে কি না। সুইচ বাক্স খুঁজতে গিয়ে নিরাপত্তা সিন্দুকের সন্ধান সে পেল। নিরাপত্তা সিন্দুকের পাল্লার রং দেয়ালের মত হলেও হাতুড়ির ঘা পড়ায় তা ঠন্‌ ঠন্‌ করে উঠল। নিরাপত্তা সিন্দুকের আকার হবে চারফিট বাই দুই ফিটের মত। ভূগর্ভস্থ কক্ষের চার দেওয়াল জেন তন্ন তন্ন করে দেখল, কোথাও সুইচ বক্স পেল না। তারপর সে কক্ষের মেঝেতে পাতা শয্যাগুলোর তলাসহ মেঝের প্রতিইঞ্চি হাতুড়ি পিটিয়ে পরীক্ষা করল সেখানে কোন সুইচ বাক্স আছে কিনা। হতাশ হল জেন, মেঝেতে কোন সুইচ বক্স নেই।
পরিশ্রম ও উত্তেজনায় ইয়ার কন্ডিশন ঘরেও ঘেমে উঠেছে জেন। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল অনেক সময় খরচ হয়েছে। সময় নষ্ট করা যায় না। আবার লেগে গেল সুইচ বক্স তালাশে। এবার তৈজস্পত্রের র‍্যাক, কাপড় চোপড়ের আলমারি, একনকি বড় বড় রিফ্রেজারেটরের আশ-পাশ পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজল। না কোথাও কোন সুইচের নাম গন্ধ নেই।
ক্লান্ত জেন একটা বিছানায় এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। হতাশা এসে তাকে ঘিরে ধরল। ঘরে কোন জায়গাই খুঁজতে সে বাকি রাখেনি। বহু সময় সে নষ্ট করেছে। তাঁর আব্বা আম্মা বাড়ী ফিরলে তাঁর মিশন পন্ড হয়ে যাবে। উদ্বেগ বোধ করল সে। তাহলে সে কি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে!
জেন যে বিছানায় শুয়েছিল তার পাশেই নিরাপত্তা সিন্দুকের দেয়ালটি। জেন হতাশ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকাল। আহমদ মুসা হলে নিশ্চয় এটা খোলার বিকল্প কোন ব্যবস্থা করতে পারতো। কিন্তু তাঁর মাথায় তো কিছু আসছে না। পিটিয়ে তো পুরু ষ্টিলের নিরাপত্তা সিন্দুক ভাঙা যাবে না। একবার জেনের মনে হলো নিরাপত্তা সিন্দুকের সুইচ তাঁর আব্বার ঘরের কোথাও তো লুকানো থাকতে পারে! এ সম্ভাবনা জেন উড়িয়ে দিতে পারলো না। কিন্তু তাঁর আব্বার ঘর খুজে সুইচ বের করে সিন্দুক খোলার মত সময় আর নেই। তাহলে তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হবে? আবার কবে সুযোগ পাবে সে!
অস্থির ও ভাঙা মন নিয়ে শোয়া থেকে উঠল জেন। ধীর পায়ে আবার গিয়ে দাঁড়াল নিরাপত্তা সিন্দুকের সামনে। আবার তীক্ষভাবে নজর বুলাল সে নিরাপত্তা সিন্দুকের গায়ে। মেঝের দুই ইঞ্চি ওপর থেকে শুরু হয়েছে নিরাপত্তা-সিন্দুক ও মেঝের মাঝখানে দুই ইঞ্চি পরিমান জায়গার এক স্থান জুড়ে আঙুলের শীর্ষ ভাগের একটা ছবি দেখতে পেল জেন। কেও যেন সূক্ষ্ম পেন্সিল স্কেচে বুড়ো আঙুলের নখ এঁকে রেখেছে। ভালো করে বুঝা যায় না, দেখতে কতকটা ছায়ার মত।
জেন বসে পড়ল মেঝেয়। আরো ভাল করে নজর বুলালো স্কেচের ওপর। দেখল, অলস হাতের বিশৃঙ্খল আচড়ে কেউ বুড়ো আঙুলের শীর্ষ ভাগের স্কেচটি এঁকেছে। খুব যত্ন ও পরিষ্কার ছাপ এতে নেই। দেখলে মনে হয় খেয়ালি কেউ বসে বসে এই কাজ করেছে। হাত দিলেই যেন ওটা মুছে যাবে।
জেন স্কেচটার ওপর আঙুল দিয়ে ঘষা দিল। না মুছল না। পাকা কালির পারমানেন্ট একটা ছবি ওটা।
কেন এই ছবিটি আঁকা এখানে? এমনি এমনি কি কেউ এঁকে রেখেছে এটা এখানে? কেন?
হঠাৎ জেনের মনে হলো এটা কোন ইংগিত হতে পারে না কি? হাতের চাপ দেওয়ার কাজ একটু বড় হলে মানুষ বুড়ো আঙুল দিয়েইতো করে। আনন্দের একটা শিহরণ কেহ্লে গেল জেনের দেহে।
বুড়ো আঙুলের স্কেচের শীর্ষ ভাগ ওপরের দিকে। জেন তার বাম হাতের বুড়ো আঙুল ঠিক স্কেচের ওপর সেট করে প্রচন্ড এক চাপ দিল চোখ বন্ধ করে। উত্তেজনায় তার বুক টিপ টিপ করে উঠল।
আনন্দের সাথে চোখ খুলল জেন। দেখল, নিরাপত্তা সিন্দুকের সামনের পাল্লাটা পাশের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে। বেরিয়ে পড়েছে নিরাপত্তা সিন্দুক। নিরাপত্তা সিন্দুক বহু কক্ষ বিশিষ্ট একটি আলমারি। কক্ষ গুলির কোনটায় কি আছে তাঁর সংকেত দেয়া নেই।
জেন ঘেমে উঠেছে। যার জন্যে তার এত চেষ্টা তাকি আসলেই এখানে আছে! পাবে কি সে!
নিরাপত্তা সিন্দুকের কক্ষগুলোর কোনটাই বন্ধ নয়। একে একে খুলতে লাগল জেন। কোনটাতে অলংকার, কোনটাতে স্বর্ণ, কোনটাতে টাকা ভর্তি। জেন খুজছে কাগজ, এসব নয়। মাঝখানে কয়েকটি কেবিনে কাগজপত্র পেল। সেগুলো জেনের আব্বার কোম্পানীর ও নানা ধরনের দলিলপত্র।
অবশেষে পেল জেন তেজস্ক্রিয় পাতার সেই প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম। একটা কেবিনে বড় খামের মধ্যে পেল ডকুমেন্ট গুলো।
ডকুমেন্টগুলো আবার খামে ভরে ভাজ করে পকেটে পুরে উঠে দাঁড়াল জেন। ঠিক এই সময়ই তাঁর আব্বার ঘরের সাথে সংলগ্ন সিড়ি মুখের ষ্টিলের দরজায় ধাক্কা দেয়ার শব্দ হলো।
চমকে উঠলো জেন।
ধাক্কা অব্যাহত ভাবে হতে লাগল।
জেন বুঝল তার আব্বা এসেছে। কিন্তু বুঝতে পারলো না, এত তাড়াতাড়ি তাঁর তো বুঝার কথা নয়। সে আসার সময় আলমারি বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। কেউ ভেতরে ঢুকেছে এটা তার বুঝার কথা নয়। কিন্তু আসার সংগে সংগে তিনি বুঝলেন কি করে।
হঠাৎ জেনের মনে পড়ল, নিরাপত্তা সিন্দুকের ওপেনিং সিষ্টেমের সাথে অনেক ক্ষেত্রে সাইরেন যুক্ত থাকে যা চোর ডাকাতদের ধরতে সাহায্য করে। এখানেও নিশ্চয় তাহলে সাইরেন যুক্ত আছে। সুইচ টেপার সংগে সংগেই তা বেজে উঠেছে। তাঁর প্রবেশ ধরা পড়ার এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা।
সিঁড়ি মুখের দরজায় এখন হাতুড়ী পেটার প্রচন্ড শব্দ হতে শুরু করেছে।
জেন সিদ্ধান্ত নিল এই ডকুমেন্ট সহ তাকে ধরা পড়া চলবেনা। আর ডকুমেন্ট সরাবার এই সু্যোগ ব্যর্থ হলে একে আর উদ্ধার করাও যাবে না। সুতরাং যে মিশনে সে এসেছে সেখান থেকে পিছপা হবে না।
কিন্তু কিভাবে বেরুবে সে এখান থেকে। তাঁর বেরুবার পথ বন্ধ। হঠাৎ জেনের মনে পড়ল, এই কক্ষের ছাদের পেছন দিকের প্রান্তে কক্ষ থেকে বেরুবার জরুরী দরজা আছে। সেটা ভেতর থেকে হুড়কো দিয়ে বন্ধ। এ দরজা দিয়ে বেরুলে তাদের বাড়ীর পেছন দিকের একটা করিডোরে পৌঁছা যায়।
বের হবার এ বিকল্প পথের কথা মনে হবার সাথে সাথে জেন সিদ্ধান্ত নিল এ পথেই সে বেরুবে। একবার তাঁর মনে হলো এ পথে যদি সে চোরের মত পালিয়ে যায়, তাহলে আবার সে ফিরবে কি করে! সে যে এখানে প্রবেশ করেছে তা ইতিমধ্যে প্রকাশ না হয়ে থাকলে প্রকাশ হয়ে পড়বেই। এছাড়া তার মনে হলো, বিকল্প পথে বেরুবার পথ বন্ধ করতেও কেউ আসতে পারে। কিন্তু জেন আবার ভাবল, হয়তো আসতে পারে, কিন্তু এছাড়া তো তার বেরুবার আর কোন পথ নেই। আবার তার মনে খোঁচার মত বিধল, সে এভাবে পালালে আবার ফিরবে কি করে? কিন্তু পরক্ষনে এ চিন্তা ঝেড়ে ফেলে জেন ভাবল পরিণতির চিন্তা আমি করি না। ট্রিয়েষ্টে জোয়ানকে বাঁচাবার জন্যে যখন পিস্তল হাতে বেরিয়েছিলাম, তখন মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়েই বেরিয়েছিলাম। আমি যদি জীবন দিয়েও ওদের উপকার করতে পারি, আমার পরিবারের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি, সেটাই হবে আমার জীবনের সার্থকতা।
সিদ্ধান্ত নিয়েই জেন সিঁড়ির গোড়ার দরজা দিয়ে এ কক্ষের প্রবেশের দ্বিতীয় দরজাটি হুড়কো দিয়ে বন্ধ করে কক্ষ থেকে বেরুবার জন্যে জরুরী দরজার দিকে ছুটল। যাবার সময় একটু আলমারি থেকে ওভারকোট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নীল।
কক্ষের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটা সংকীর্ণ সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে বেরুবার জরুরী দরজা পর্যন্ত। সিঁড়ি বেয়ে উঠে জেন হুড়কো খুলে নিচে ফেলে দিল।
জরুরী দরজাটা বর্গাকার। এখানেও স্টিলের পাল্লা, একদম এয়ার টাইট। জেন সিড়িতে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে পাল্লা আলগা করার চেষ্টা করল। কিছুই হলো না। পরে জেন সিড়ির আরও এক ধাপ উঠে ঘাড় বাঁকিয়ে মাথা নিচু করে কাঁধ লাগাল দরজার পাল্লায়। তারপর সর্বশক্তি লাগিয়ে কাঁধ দিয়ে ঠেলল দরজা। কাঁধ ব্যাথায় টন টন করে উঠল, কিন্তু দরজা সরা দূরে থাক সামান্য নড়লও না।
জেন সিড়ির একধাপ নিচে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ভাবল, দরজা মরিচা বা অন্য কোন ভাবে আপনা আপনি আটকে যাবার কথা নয়। নিশ্চয় হুড়কো ছাড়াও আর কিছু বাড়তি ব্যবস্থা আছে দরজা বন্ধ রাখার।
জেন দ্রুত নজর বুলাল বর্গাকার দরজা এবং তার দেয়ালের চারপাশে। অত্যন্ত শ্যেন দৃষ্টি জেনে যাতে তিল পরিমান কোন অস্বাভাবিকতাও তার নজর না এড়ায়। দরজার দেয়ালে একটি বালিকার ছোট্ট মুখাবয়বের ওপর গিয়ে জেনের চোখ আটকে গেল। এ মুখাবয়বটিও পেন্সিল স্কেচে করা মনে হল। মুখবয়বটির কপালে লাল একটি ফোঁটা। স্কেচের আয়তন অনুসারে ফোঁটাটা বেশ বড়।
ফোঁটাটির দিকে তাকিয়ে জেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চটকরেই তার মনে হল লাল, ফোটা বা বোতাম টিকে ক্যামফ্লেজ করার জন্যেই মুখায়বটি আঁকা হয়েছে।
চিন্তার সাথে সাথেই জেন তার ডান হাতের তর্জনি দিয়ে লাল বোতামটির ওপর চাপ দিল। সংগে সংগেই অস্পষ্ট একটা শিষ দিয়ে উঠে স্টিলের বর্গাকার দরজাটা সরে গেল তার মাথার ওপর থেকে।
প্রথমে একটু মাথা তুলে জেন দেখল চার দিকটা। না কেউ কোথাও নেই। করিডোর একদম ফাকা।
এই সময় জেনদের বাড়ীর ভেতরের অংশ থেকে, একটা পায়ের শব্দ এলো কেউ যেন এদিকে এগিয়ে আসছে।
জেন লাফ দিয়ে করিডোরে উঠে এল।
যে করিডোরে জেন এসে দাঁড়াল তার একটি মাথা দক্ষিণ দিকে জেনদের বাগানের দিকে চলে গেছে। অন্য মাথাটি বাড়ীর পূবদিকে ঘুরে গাড়ী বারান্দা অর্থাৎ উত্তরের লনে গিয়ে শেষ হয়েছে।
জেন করিডোরে উঠে ওভার কোট দিয়ে গা মাথা ভাল করে ঢেকে নিয়ে দৌড় দিল গাড়ী বারান্দার দিকে।
জেন কিছুটা এগিয়েছে, এই সময় বেছন থেকে চিৎকার উঠল, কে কে?
জেন চিনতে পারল তার আব্বার কণ্ঠস্বর।
জেন দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল।
পেছন থেকে পায়ের শব্দ এল। জেন বুঝতে পারল তার আব্বাও ছুটছে তার পেছনে।
জেন শেষ মুহুর্তে ধরা পড়তে চায় না। খোয়াতে চায় না ডকুমেন্ট।
জেন করিডোরের মুখে পৌঁছে দেখল তার গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে সামনেই। জেন ছুটল গাড়ীর দিকে।
জেন গাড়ীর দরজা খুলেছে। এক পা ঢুকিয়েছে গাড়ীর ভেতরে, সেই সাথে মাথাটাও। একটা পা তখনও বাইরে।
এই সময় করিডোরের মুখ থেকে চিৎকার এল, পালাল, পালা। সেই সাথে এল গুলির শব্দ।
জেন তার বাইরের পাটি তুলতে যাচ্ছিল এই সময় গুলি এসে বিদ্ধ করল সে পা। গুলি লাগল হাটুর ঠিক নিচেই।
জেনের দেহ কেঁপে উঠলো। একটা চিৎকার বেরুল মুখ থেকে। কিন্ত তার পরেই জেন নিজেকে সামলে নিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাত দিয়ে পাটা তুলে নীল গাড়ীর ভেতরে। তারপর ডান হাত দিয়ে টেনে দরজা বন্ধ করে দিল গাড়ীর।
কম্পিত দেহটাকে জেন গাড়ীর সিটের সাথে সেঁটে রেখে গাড়ী স্টার্ট দিল।
জেনের নজরে এল সামনেই দারোয়ান বোবার মত দাঁড়িয়ে আছে। তার দু’টি চোখ ভয়ে বিস্ফারিত।
দারোয়ানের পাশ দিয়ে তীর বেগে জেনের গাড়ী খোলা গেট দিয়ে গিয়ে পড়ল রাস্তায়।

চিৎকার কানে যেতেই জেনের আব্বা জেমেনিজ থমকে দাঁড়িয়েছিল। চিৎকার সে চিনতে পেরেছে।
পিস্তল ধরা হাতটি তার স্থির হয়ে গেল, পা দু’টি তার যেন মাটিতে আটকে গেল। চোখে বোবা দৃষ্টি।
জেনের যেখানে গুলি লেগেছে, সেখানে এক থোক রক্ত গড়াচ্ছে তখনও।
পাথরের মূর্তির মত স্থির পা চালিয়ে জেমেনিজ এসে দাঁড়াল লাল তাজা সেই রক্তের সামনে। তার চোখ সেই রক্তের উপর পাথরের মত স্থির।
জেনের মা ছুটে এল বাড়ীর ভেতর থেকে। গুলির শব্দ সেও শুনেছে।
‘ওগো শুনেছ, জেন তো ঘরে নেই’ বলতে বলতে জেনের মা এসে দাঁড়াল জেমেনিজের কাছে সেই রক্তের সামনে।
রক্তের সামনে জেমেনিজকে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ ভরা উদ্বেগ নিয়ে জেনের মা একবার রক্তের দিকে, একবার জেমেনিজের দিকে তাকাতে লাগল।
তারপর আর্ত কন্ঠে বলল, ‘তোমার কি হয়েছে, এ রক্ত কার? শুনেছ, জেনকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
মূর্তির মত দাঁড়ানো জেমেনিজের হাত থেকে খসে পড়ল পিস্তল।
জেনের মা ছুটে এসে জেমেনিজের একটা হাত ধরে ঝাঁকানি দিয়ে বলল, ‘বল, এ রক্ত কার? কথা বলছ না কেন?’
জেমেনিজ রক্তের দিকে তাকিয়ে মূর্তির মত দাঁড়িয়েই রইল।
অল্পদূরে বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়েছিল দারোয়ান। জেনের মা ছুটে গেল তার কাছে। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, ‘কি হয়েছে, কি দেখেছ তুমি, এ রক্ত কার? জেন কোথায়?’
দারোয়ান দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল। হাউ মাউ করে উঠে কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, ‘খুকু মনির রক্ত, গুলি লেগেছে…।’ কথা শেষ করতে পারল না দারোয়ান। একটা চিৎকার করে জেনের মা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তখন অনেক রাত।
দূরে গীর্জার কোন পেটা ঘড়িতে ১২ টা বাজার শব্দ ভেসে এল।
জেনের ঘরে মেয়ের বিছানায় পড়ে বিছানা আঁকড়ে ধরে কাঁদছে তার মা।
বাইরের ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে জেমেনিজ। তার পাশের সোফায় ভাসকুয়েজ।
ভাসকুয়েজ কথা বলছিল, ‘আপনি শান্ত হোন স্যার। আপনি দেশের গৌরব। আপনি সন্তানকেও রেহাই দেননি। জেনকে আপনি গুলি করেছেন- আপনার এ জাতি প্রেম সবাইকে অভিভূত করার মত।’
একটু থামল ভাসকুয়েজ। তারপর বলল, ‘জোয়ান ছেলেটাই শয়তানির মূল। সেই মা জেনের মাথা খারাপ করেছে। আমাদের এখন প্রথম কাজ আহত জেন এবং ডকুমেন্ট গুলোকে উদ্ধার করা। তারপর শয়তান জোয়ান এবং আহমদ মুসাদের পাকড়াও করা। আহত জেন নিশ্চয় কোন হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে উঠবে। আমরা মাদ্রিদের সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আমাদের লোকদের সতর্ক করে দিয়েছি। আমাদের শত শত কর্মী গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের পাকড়াও করার জন্যে। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগেরও সাহায্য কামনা করেছি আমি। আমি তাদের বলেছি, আপনার মেয়েকে আহত করে কিডন্যাপ করেছে আহমদ মুসার দল। এই সংবাদে সরকারের উচ্চ মহল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ পূর্ণ উদ্যমে কাজে নেমেছে। চিন্তা করবেন না স্যার ধরা তাদের পড়তেই হবে।’
জেমেনিজ শুকনো মুখে বসে ছিল। তার চোখটা ভাসকুয়েজের দিকে নিবদ্ধ ছিল বটে, কিন্তু মনটা ছুটে বেড়াচ্ছে অন্য কোথাও। ভাসকুয়েজের সব কথা কানে গিয়েছে বলে মনে হলো না। কিন্তু ভাসকুয়েজের শষ কথায় জেমেনিজ নড়ে চড়ে বসল। বলল, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। আমি ভয় করছি, ঘটনা না প্রকাশ হয়ে পড়ে। আমি চাই না, জেন কিডন্যাপ হওয়ার কাহিনী প্রচার হোক।’ শুষ্ক ও নিরুত্তাপ কন্ঠে বলল জেমেনিজ।
‘না স্যার, সে ব্যবস্থা নিয়েছি। হোম মিনিস্টার, পুলিশ প্রধান ও আমি ছাড়া ঘটনা কেউ জানে না। অন্যদের শুধু ফটো সরবরাহ করে বলা হয়েছে, খুঁজে বের করে সসম্মানে পৌঁছে দিতে। হারিয়েছে, পালিয়েছে না কিডন্যাপ হয়েছে। কিছুই বলা হয়নি এবং জেনের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি।’
‘ধন্যবাদ ভাসকুয়েজ।’
একটু থামল জেমেনিজ। তারপর আবার বলল, ‘ডকুমেন্ট গুলো যদি ওদের হাতে যায় ভাসকুয়েজ?’
‘প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম পেয়ে ওরা যা করতে পারে তা হলো, তেজস্ক্রীয় ক্যাপসুলগুলো ওরা তুলে ফেলার চেষ্টা করবে। কিন্তু সে সাধ্য তাদের হবে না। কাজে নামলেই ওদের টিপে টিপে মারবো আমরা।’
কথা শেষ করেই ভাসকুয়েজ বলল, ‘এখন উঠতে পারি স্যার? ওদিকে অনেক কাজ আছে।’
‘ঠিক আছে ভাসকুয়েজ, কোন খবর পেলেই আমাকে জানিও। জেনের মা একদম ভেঙে পড়েছে। কোন সান্ত্বনাই মানছে না। সবকিছুর জন্যে সে আমাকে দায়ী করছে। আমার রাজনীতিই নাকি জেনের এই অবস্থার জন্যে দায়ী।’ জেমেনিজের শুকনো কন্ঠ শেষের দিকে ভারি হয়ে উঠল।
‘মায়ের মন তো, একটু ভিন্ন রকম হবেই। ধৈর্য ধরতে বলুন স্যার, আমরা জেনকে বের করেই ফেলবো।’ বলে ভাসকুয়েজ উঠে দাঁড়াল।
জেমেনিজও উঠে দাঁড়িয়ে ভাসকুয়েজের সাথে হ্যান্ডশেক করে ভেতরের দিকে পা বাড়াল।

ফিলিপের বাড়ির নিচতলার ড্রয়িংরুম।
আহমদ মুসা, ফিলিপ, জোয়ান, যিয়াদ, আবদুর রহমান বসে আছে সোফায়।
কথা বলছিল তখন আহমদ মুসা। বলছিল, ‘Elder’ সমস্যার সমাধান না করতে পারলে আমরা এক ইঞ্চিও এগুতে পারছি না।’
‘Elder’ অর্থ মুরুব্বী, অভিভাবক। ‘কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের মুরুব্বী বা অভিভাবক কে?’ বলল ফিলিপ।
‘এই মুরুব্বী কোন সংগঠনও হতে পারে, যারা স্পেনীয় কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের অভিভাবকত্ব করছে।’ বলল জোয়ান।
‘তা হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় তেজস্ক্রীয় পাতার যে প্ল্যান ও ডায়াগ্রাম তা আমি মনে করি তারা কাছেই রাখবে, দেশের বাইরে রাখার কিংবা অন্য সংগঠনের হাতে দেবার তাদের প্রয়োজন কি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক মুসা ভাই। স্পেনের কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান নিজেদের এত দুর্বল মনে করে না যে ডকুমেন্ট তারা নিরাপত্তার জন্যে অন্য সংগঠন বা দেশের বাইরে রাখবে।’ বলল ফিলিপ।
‘কিন্তু নিরাপত্তা হীনতার কারণেই তো তারা ডকুমেন্টগুলো তাদের হেড কোয়ার্টারে রাখার সাহস করেনি।’ বলল জোয়ান।
‘একথা ঠিক মুরুব্বী বলা হয়েছে এমন এক আশ্রয়কে যা তাদের হেড কোয়ার্টারের চেয়ে নিরাপদ।’ বলল যিয়াদ।
‘একথা আমি বুঝতে পারছি না তেজস্ক্রীয় পাতার ডকুমেন্ট ‘Elder’-এর কাছে এ কথা ভাসকুয়েজের পারসোনাল কম্প্যুটার রেকর্ড করার প্রয়োজন হলো কেন? রেকর্ড করা যখন হলোই তখন নামটাকে আড়াল করা হলো কেন?’ বলল ফিলিপ।
‘এর উত্তর সম্ভবত এটাই যে, ডকুমেন্টগুলো কার কাছে আছে এটা শুধু ভাসকুয়েজই জানে। ভাসকুয়েজের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলেও যাতে তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি জানতে পারে সে তথ্য এজন্যেই তার পারসোনাল কম্প্যুটারে তা রেকর্ড করা হয়েছে। আর ‘Elder’ এর নাম না থাকার কারণ তাকে ‘Elder’ নামেই কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের দায়িত্বশীলরা সবাই জানে।’
‘Elder’ নাম রেকর্ড থাকলে তা অন্যের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে বলেই এটা উহ্য রাখা হয়েছে।’ বলল যিয়াদ।
‘বিষয়টি নিয়ে আমিও ভেবেছি, কিন্তু সমাধান খুঁজে পাইনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এর জবাব হয়তো পরেও পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন সামনে এগুবার পথ কি?’ বলল ফিলিপ।
আহমদ মুসার মুখে চিন্তার একটা ছায়া নেমে এল। বলল, ‘প্রতিটা দিন যাচ্ছে আর স্পেনে আমাদের কর্ডোভা, আল হামরা, গ্রানাডা, মাদ্রিদের মসজিদ কমপ্লেক্স প্রভৃতির জীবন থেকে একটা অংশ খসে পড়ছে। একবার ওগুলো তেজস্ক্রীয় দুষ্ট হয়ে পড়লে সেগুলো মেরামতের আর কোন উপায় থাকবে না। ওগুলো মুছে যাবে স্পেনের বুক থেকে, সেই সাথে মুছে যাবে স্পেন থেকে মুসলমানদের নাম নিশানা।’
থামল আহমদ মুসা। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘স্পেনে খৃষ্টান কিংবা শ্বেতকায়দের মুরুব্বী বা অভিভাবক বলে সাধারণ ভাবে মনে করা হয় এমন কেউ কি আছে?’
‘কার্ডিনাল পরিবারকে একবাক্যে সে ধরনের পরিবার বলা যায়।’
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আশ্চর্য, ক’দিনে একবারও এ পরিবারের কথা আমার মনে হয়নি। তুমি ঠিকই বলেছ জোয়ান, স্পেনের খৃস্টানদের শীর্ষ অভিভাবক পরিবার এটি। আর এ পরিবারের সাথে কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। ঐতিহাসিক কার্ডিনাল হাউজের একটা অংশ কু-ক্ল্যাস্ক-ক্ল্যানকে দেয়াই তার প্রমাণ। কিন্তু জেনের আব্বা জেমেনিজ ডে সিসনারোসা কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের ‘Elder’ কি না সেটাই জানার বিষয়।’
‘হ্যাঁ মুসা ভাই, এটাই জানার বিষয়।’ বলল জোয়ান।
‘মি: জেমেনিজ আমাদের প্রতিবেশী বলা যায়। লা-গ্রীনজায় আমাদের পাশেই তাদের স্বাস্থ্য নিবাসটা। ছোট বেলা থেকেই ওদের সবাইকে জানি। মি: জেমেনিজ অত্যন্ত সাধারণ ভাবে চলেন। বাড়িতে তেমন রাখ ঢাক নেই। কোন পাহারাও বাড়ীতে কখনও রাখেননি। মাদ্রিদের বাড়িও তাই। জোয়ান এটা আরও ভাল জানে। এমন লোক কিংবা এমন বাড়ী কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের মূল্যবান দলিলের নিরাপদাশ্রয় হতে পারে বলে মন বলছে না।’ বলল ফিলিপ।
‘তোমার কথা ঠিক হওয়ার যুক্তি আছে। তবে সম্ভাবনাই আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এখন বল, কার্ডিনাল পরিবারের মত অথবা জেমেনিজের মত আর কাকে কাকে আমরা এমন সম্ভাবনার তালিকায় ফেলতে পারি।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা বলার জন্য ফিলিপ মুখ তুলেছে এমন সময়, প্রহরী ছুটে এসে ডয়িং রুমে প্রবেশ করল। দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘একটা গাড়ী ভেতরে ঢুকতে চায়, গাড়ী দিয়ে গেট ধাক্কাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলে কোন কথা বলছে না। আমরা কি করব?’
সংগে সংগে আহমদ মুসা উঠে দাড়াল। ফিলিপও সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মুসা ভাই আপনি এবং জোয়ান থাকুন। আমরা দেখে আসি।’
‘না ফিলিপ, এটা কোন শত্রুর গাড়ি নয়। শত্রুর গাড়ি এমন হয়না, এমন করে না।’ বলতে বলতেই আহমদ মুসা চলতে শুরু করেছে।
সবাই পিছু নিল আহমদ মুসার।
আহমদ মুসারা গেটের সামনে গিয়ে দেখল গাড়িটি অবিরাম হর্ণ দেয়া ছাড়াও গেট ধাক্কাচ্ছে গাড়ী দিয়ে।
আমদ মুসা গেটের সিকিউরিটি উইনডো দিয়ে গাড়টির দিকে এক নজর তাকাল। দেখল গাড়ীতে একজন মাত্রই আরোহী।
আহমদ মুসা সুইচ টিপল। গেটের দু’টি পাল্লা সরে গেল দু’দিকে। গেটের সামনে জোয়ান ফিলিপ এবং অন্যান্যরা।
গেট খুলে যেতেই গাড়ী ঢুকে গেল ভেতরে। সেই সাথে গাড়ীর ভেতর থেকে এটা কণ্ঠ উচ্চারিত হল, ‘আমি জেন।’ কণ্ঠটা একটা দুর্বল চিৎকারের মত শোনাল।
ভেতরে প্রবেশ করেই গাড়িটা শা করে ছুটে গেল গাড়ী বারান্দার দিকে। গাড়ীর গতিটা বিশৃঙ্খল।
গাড়ীটা গাড়ী বারান্দায় স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ালোনা। বারান্দায় গিয়ে ধাক্কা খেল।
জোয়ান জেনের নাম শুনতে পেয়েছিল এবং তার কণ্ঠও চিনতে পেরেছিল। কিন্তু জেনের এই আগমন এবং চিৎকার তাকে বিস্মিত করেছিল।
জোয়ান চুটছিল গাড়ীর পেছনে।
গাড়ী দাঁড়াতেই জোয়ান গাড়ীর জানাল দিয়ে ভেতরে এক ঝলক তাকিয়েই উদ্বিগ্নভাবে এক টানে দরজা খুলে ফেলল গাড়ীর।
গাড়ী খুলেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল জোয়ানের। সিটের ওপর এলিয়ে পড়েছে জেন। গাড়ী ভেসে যাচ্ছে রক্তে।
‘জোয়ান তুমি এখানে! তোমাকেই খুব আশা করছিলাম। আমার গুলি লেগেছে।’ দুর্বল কণ্ঠে বলল জেন।
এ কি করে হলো জেন? আর্তকণ্ঠে বলল জোয়ান।
আহমদ মুসা, ফিলিপ সবাই পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা জোয়ানকে একটু পাশে ঠেলে ঝুকে পড়ে গুলিবিদ্ধ স্থানটি পরীক্ষা করল। দেখল, হাটুর নিচে মাংসল হিপটায় বিরাট ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। গুলি এক পাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
‘জোয়ান, ফিলিপ তোমাদের কোন বিশ্বস্ত ক্লিনিক আছে? জেনকে ক্লিনিকে নিতে হবে।’ সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল আহমদ মুসা।
জেন ধীরে ধীরে না সূচক মাথা নাড়ল। বলল, না কোন ক্লিনিক নয়, হাসাপাতাল নয়। ওরা এতক্ষনে মাদ্রিদের সব ক্লিনিক হাসপাতালে লোক পাঠিয়েছে আস্তে আস্তে দুর্বল কণ্ঠে বলল জেন।
‘মুসা ভাই, বাসাতে সব ব্যবস্থা করা যাবে।’ বলল ফিলিপ।
‘ঠিক আছে, জোয়ান জেনকে ভেতরে নাও।’ আহমদ মুসা বলল।
সরে এল গাড়ির দরজা থেকে আহমদ মুসা।
ফিলিপ ছুটে গেল ভেতরে।
জেনের গায়ে কোট, পরনে হাটুর নিচু পর্যন্ত নামানো স্কার্ট। ডান হাতের ওপর ঠেস দিয়ে একটা কাত হয়ে সিটের ওপর গা এলিয়ে পড়েছিল জেন।
জোয়ান তাকে তুলে নেয়ার জন্যে এগুলো।
জেন স্টিয়ারিং হুইল ধরে সোজা হতে চেষ্টা করল। চাপ পড়ল তার গুলিবিদ্ধ বাম পা টায়। কঁকিয়ে উঠল জেন।
‘তোমাকে উঠতে হবে না জেন, তুমি উঠো না।’ বলে জোয়ান এগিয়ে গিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল জেনকে।
চোখ বন্ধ করে জেন নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে জোয়ানের হাতের ওপর।
জোয়ান হাটতে হাটতে প্রশ্ন করল, কিছুই বুঝতে পারছিনা জেন, কোথায় কি করে এটা ঘটল?
জেন চোখ খুলল। তাকাল জোয়ানের দিকে। জেনের চোখে হাসির অস্পষ্ট প্রলেপ। বলল, ‘সব শুনবে। বলেছিলাম না আমি, তোমার কিছু কাজ আমাকে দিও’।
‘কিছু করতে গিয়েছিলে নাকি?’ জোয়ানের চোখে বিস্ময়।
‘বলব’। চোখ বন্ধ করে বলল জোন।
নিচের ড্রইং রুমের সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল ফিলিপ। জেনকে নিয়ে জোয়ান ঢুকতেই বলল তিন তলায় নিয়ে চল জোয়ান। আম্মার পাশে মারিয়ার ঘরটায় ওর জন্যে ব্যবস্থা করেছি।
দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল ফিলিপের আম্মা।
মারিয়ার বান্ধবী জেনকে ছোটবেলা থেকেই চেনে ফিলিপের আম্মা।
জেনকে দেখেই কেঁদে উঠল, ‘আমার মারিয়া গেল, তোমারও এই অবস্থা?’
‘জেন চোখ খুলে মারিয়ার মা’র দিকে চেয়ে বলল, ‘মারিয়ার মত করে আমি যেতে পারলাম না খালাম্মা।’
‘ওকথা বলোনা মা, তুমি বেঁচে থাক।’ জেনের মাথায় হাত রেখে চলতে চলতে বলল মারিয়ার মা।
জেনকে নিয়ে জোয়ান এবং অন্যান্য সকলে প্রবেশ করল ঘরে।
বেশ বড় ঘর। তক তকে চক চকে ঘর। জেন মারিয়ার কাছে এ ঘরে এসেছে।
খাটে সাদা ধবধবে নতুন বিছানা পাতা। চাদরের ওপর গোটা খাট জুড়ে একটা রাবার সিট বিছানো।
জোয়ান জেনকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
মারিয়ার মা বসল জেনের মাথার কাছে। হাত বুলিয়ে দিতে লাগল জেনের মাথায়।
আমার এক সার্জেন বন্ধুকে বলেছি, এখনই এসে পড়বেন। ফিলিপ বলল।
ফিলিপ, তাড়াতাড়ি কিছু দুধ খাইয়ে দিতে হবে জেনকে। আহমদ মুসা বলল।
‘ফিলিপের মা উঠে বলল, আমার খেয়ালই হয়নি। যাই বাবা আসছি।
বলে ফিলিপের মা বেরিয়ে গেল। জেনের গুলিবিদ্ধ ক্ষতের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ক্ষত বাধার কাপড়টা বদলে দিতে হবে, ওটা রক্তে ভিজে গেছে।
গাড়ীতেই জেন তার মাথার স্কার্ট দিয়ে ক্ষতটা বেধে নিয়েছিল। তারপর গাড়ী বারান্দায় আহমদ মুসা সেটা পাল্টে তার রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থানটা বেধে দেয়।
‘ডাক্তার এই এসে পড়ল বলে মুসা ভাই।’ বলল ফিলিপ।
জোয়ান জেনের পাশে বসেছিল।
বিছানায় শোয়ার পর চোখ বন্ধ করে ছিল জেন। একটু রেস্ট নেবার পর সে চোখ খুলল।
কোর্টের পকেট থেকে ধীরে ধীরে বের করল সেই ইনভেলাপ। কাঁপা হাতে সেটা জোয়ানের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘মুসা ভাইকে দাও।’
জোয়ান বিস্ময়ের সাথে ইনভেলাপটি হাতে নিয়ে সেটা তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসার চোখেও কৌতুহল্‌
সে ইনভেলাপটি হাতে নিয়ে বলল, ‘কি আছে বোন এতে?’
জেন চোখ বুজেছিল। আবার চোখ খুলে বলল, ‘দেখুন, বলব না।’ জেনের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি।
‘আহমদ মুসা ইনভেলাপের ভেতর থেকে কাগজগুলো বের করল। কাগজগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়েই ‘আল্লাহু আকবার’ বলে আহমদ মুসা সিজদায় পড়ে গলে মেঝের ওপর।
জোয়ান, ফিলিপ, আবদুর রহমানের চোখে মুখে বিস্ময়্‌
ডপলিপ কাগজুরো তুলে নিল আহমদ মুসার হাতের পাশ থেকে।
চোখ বুলিয়েই চিৎকার কওে উঠল, ‘জোয়ান এতো মুসরিম ঐতিহাসিক স্থান ও মাদ্রিদের মসজিদ কমপ্লেক্সে তেজস্ক্রিয় পাতার পরিকল্পনা ও ডায়াগ্রাম।’
‘বিস্ময়ে পাথর হয়ে যাওয়া জোয়ান ফিলিপের হাত তেকে কাগজগুলো নিয়ে ওগুলোর ওপর চোখ স্থাপন করল। আবদুর রহমানও এগিয়ে এল জোয়ানের কাছে। তারও চোখ কাগজগুলোতে।
জোয়ান, ফিলিপ, আবদুর রহমান নত মুখে কোন কথা নেই। যেন গভীর কোন স্বপ্নে নিমজ্জিত।
অনেক্ষণ পর সিজদা থেকে মাথা তুলর আহমদ মুসা। গন্ড দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে তার চোখের পানি, ধীরে ধীরে বলল, ‘আমরা যা আশা করতে পারিনি, তার চেয়েও বেশী সাহায্য করেছেন আল্লাহ আমাদেরকে।’
জেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবি করুক বোন। আর মানুষ যা আশা করতে পারেনা, তার চেয়েও বড় পুরস্কার আল্লাহ তোমাকে দিন, যখন ওটা মানুষের জন্যে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হবে।’
আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল আহমদ মুসার।
জেনের চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। শুকনো লাল ঠোঁট তার কাঁপছিল। আহমদ মুসার সিজদা, তার কথা, জোয়ানদের সপ্রশংস বিস্ময়, জেনের ছোট্ট হৃদয়টা ভরে দিয়েছে অসীম আনন্দ আর আবেগে। তারও মুখে কথা সরছে না।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, ‘আমার জীবনে আজকের মত এত খুশি কোন দিন হইনি বোন।’
জেনের দিকে চেয়ে কথাগুলো বলল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার বলল জেনকে, ‘তাহলে কু-ক্ল্যাক্স- ক্ল্যানের ‘elder’ তোমার আব্বা, তাই না?’
‘জি হ্যাঁ।’ চোখ মুছে বলল জেন।
‘তোমার আব্বার গুলিতেই তুমি আহত হয়েছ, তাই না?’
‘জি, হ্যাঁ। আপনি কি করে জানলেন ভাইয়া?’ জেনের কন্ঠে বিস্ময়!
‘ব্যাপারটা খুবই সহজ। তোমার গুলি লেগেছে হাঁটুর নিচে। ভাসকুয়েজ অথবা কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের কেউ এই অবস্থায় গুলি করলে সেটা করত তারা তোমার বুকে, পিঠে অথবা মাথায়।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা কাগজগুলো ফিলিপের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘এগুলো ভালো করে রাখ তুমি।’
তারপর আব্দুর রহমানের দিকে ফিরে বলল, ‘তুমি এবং জিয়াদ বের হও বাইরে। কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের তৎপরতা সম্পর্কে খোঁজ নাও। ওরা কিন্তু এখন ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে যাবে। আর আমি নিচে যাচ্ছি, দেখি জেনের গাড়ীটা পরিষ্কার হলো কি না। গাড়ীর নাম্বার ব্লু-বুক সবই পাল্টে দিতে হবে।’
সবশেষে জোয়ানের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি এখানে বস।’
জোয়ান ছাড়া সবাই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
জোয়ান বিস্ময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিল। জেন তার আব্বা, তার পরিবার, তার জাতির বিরুদ্ধে গিয়ে ডকুমেন্টগুলো উদ্ধার করেছে! তার আব্বার পিস্তলে সে গুলী খেয়েছে! জেনের এই রূপ, এই বিশালতা জোয়ানের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিস্ময়ের ঘোর যেন তার কাটছে না।
আহমদ মুসা বেরিয়ে গেলে জোয়ান তার মুখটা নিচু করেছিল। তার মনে হলো আহমদ মুসা যেন ইচ্ছা করেই তাকে এবং জেনকে এভাবে একা রেখে গেল। তা নাও হতে পারে। এটা তার একটা অমূলক চিন্তা হতে পারে। কিন্তু এই চিন্তা তাকে কিছুটা আড়ষ্ট করেছিল। জোয়ান এবং জেনের ব্যাপারটা কারো কাছেই অপ্রকাশ্য থাকলো না।
জেন তাকিয়ে ছিল জোয়ানের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘কথা বলছ না যে?’
জোয়ান মুখ তুলল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল জেনের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘ট্রিয়েস্টে তুমি আমাকে জীবন বিপন্ন করে বাঁচিয়ে ছিলে, তখনও পরো তোমাকে আমি চিনতে পারি নি। সত্যি আমার চোখ এত কম দেখে। আজ তোমাকে চিনতে পেরেছি জেন।’
বলতে বলতে জোয়ানের কন্ঠ ভারী হয়ে এল। চোখ ফেটে নেমে এল অশ্রু।
জেনের ঠোঁটে হাসি। বলল, ‘এই চিনতে না পারা তোমার দোষ নয় জোয়ান। তুমি বিজ্ঞানী। তুমি বস্তুর গভীরে বিচরণে ব্যস্ত, মানুষের মনে প্রবেশের তোমার সময় কোথায়?’
থেমে একটু দম নিল জেন। তারপর বলল, ‘আজ কতটা চিনতে পেরেছে বলত জোয়ান। তাহলে বুঝব, বিজ্ঞানী সাহেবের চিনার মধ্যে কোন ফাঁক আছে কি না?’
জেনের চোখের ওপর চোখ রেখে জোয়ান বলল, ‘না বলব না। এটা বলার জিনিস নয়। হৃদয় দিয়ে অনুভব করার জিনিস এটা।’ জোয়ানের কন্ঠ তখনও ভারী। চোখে তখন পানি।
জেনের মুখ লাল হয়ে উঠল। কাঁপছে আবেগে তার পাতলা শুকনো ঠোঁট। বলল সে, ‘একটু কাছে আসবে জোয়ান? অন্যায় না হলে তোমার চোখের পানিটা আমি আমার হাত দিয়ে মুছে দিতে চাই’।
‘তোমার পক্ষ থেকে আমিই মুছছি।’ বলে জোয়ান হেসে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের পানি মুছে নিয়ে রুমালটা জেনকে দিল।
জেন জোয়ানের রুমাল দু’হাত ভরে নিয়ে, সে দু’হাতের মধ্যে নিজের মুখট গুজলো।
এই সময় ফিলিপের মা দুধ নিয়ে প্রবেশ করল। তার প্রায় সাথে সাথেই ডাক্তার সহ আহমদ মুসা ও ফিলিপ ঘরে এসে ঢুকল। ডাক্তার ফিলিপের বাস্ক সম্প্রদায়েরই একজন। ডাক্তারের সাথে একজন নার্সও এসেছে।
ডাক্তার ক্ষতটি পরীক্ষা করে বলল, ‘ক্ষতটি বড়, কিন্তু বুলেট বেরিয়ে যাওয়ায় এখন আর তেমন জটিলতা নেই। কিন্তু প্রচুর রক্ত গেছে ইতিমধ্যেই, রক্ত দিতে পারলে ভাল হতো।’
‘সমস্যা আছে তুমি তো জান। অপরিহার্য হলে সে ব্যবস্থা এখানেই করতে হবে।’
ডাক্তার আরও পরীক্ষা করে বলল, ‘প্রয়োজন আছে যদিও, কিন্তু প্রয়োজনটা অপরিহার্য নয়। দু’এক দিনেই ঠিক হয়ে যাবে।’
জেন দুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল।
ডাক্তার নার্সকে ইশারা করল, ব্যাগ খুলে প্রয়োজনীয় সব বের করার জন্যে।
নার্স কাজে লেগে গেল।
ডাক্তার এপ্রোনটি পরে নিয়ে হাতে গ্লাভস লাগিয়ে তৈরী হলো।
হাঁটু পর্যন্ত চাঁদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হল জেনকে।
ডাক্তার ফিলিপের মাকে বলল, ‘খালাম্মা এর মাথার কাছে একটু বসেন।’
আহমদ মুসা, ফিলিপ, জোয়ান সবাই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ডাক্তার জেনকে বলল, ‘তোমাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে, একটু কষ্ট হবে বোন।’ বলে জেনকে একটা ইনজেকশন দিয়ে তুলা কাঁচি ইত্যাদি নিয়ে জেনের বুলেট বিদ্ধ ক্ষতের দিকে এগুলো।
জেন দাঁতে দাঁতে চেপে চোখ বন্ধ করল।

পরের দিন সকাল।
নামাজ পড়েই তারা আলোচনায় বসল।
আহমদ মুসা জেনের ডকুমেন্ট উদ্ধারের কাহিনী শুনিয়ে বলল, ‘জেন আজকের ত্যাগ ও সাহসের একটা দৃষ্টান্ত। সে আমাদের জন্যে আল্লাহর পত্যক্ষ সাহায্য। জেনের আজ বেশ জ্বর উঠেছে। সবাই দোয়া কর, আল্লাহ জেনকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তুলুন।’
একটু থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার শুরু করল, ‘এখন কাজের কথায় আসি। যে ডকুমেন্টের জন্যে এতদিন আমরা উন্মুখ হয়েছিলাম, আল্লাহ সেটা আমাদের জুটিয়ে দিয়েছেন। এখন বল আমরা কোন পথে এগুবো?’
‘আমাদের কাছে তো একটাই পথ। ডায়াগ্রাম অনুসারে খুঁড়ে তেজস্ক্রিয়গুলো তুলে ফেলতে হবে।’ বলল যিয়াদ বিন তারিক।
ফিলিপ, জোয়ান, আব্দুর রহমান সবাই তাকে সমর্থন করল।
‘কিন্তু এভাবে,’ বলতে শুরু করল আহমদ মুসা, ‘তুলে ফেলা কি সম্ভব? প্রথম কথা হলো ঐতিহাসিক স্থান গুলো সরকারের নজরে রয়েছে, তারা এভাবে খুড়তে দেবে কেন? সব চেয়ে বড় কথা হলো, তেজস্ক্রিয় পাতার ডকুমেন্টগুলো হারাবার পর কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এখন নজর রাখবে মাদ্রিদের শাহ ফয়সাল মসজিদ সহ কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা, প্রভৃতি সবগুলো মুসলিম ঐতিহাসিক স্থানের উপর। কাজ করতে গেলেই ওদের হাতে ধরা পড়তে হবে অথবা সংঘাত বাঁধবে। এসবের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারবো না।’ কথা শেষ করল আহমদ মুসা।
ফিলিপ, জোয়ান, যিয়াদ, আব্দুর রহমান সকলেরই মুখ মলিন হয়ে উঠল। হতাশা দেখা দিল তাদের চোখে মুখে।
ফিলিপ বলল, ‘আপনি ঠিক বলেছেন মুসা ভাই। আমরা এ দিকটা চিন্তা করিনি। ওদের চোখ এড়িয়ে তেজস্ক্রিয় তুলে ফেলার কাজ কিছুতেই সম্ভব নয়।’
‘উপায় কি তাহলে এখন?’ বলল যিয়াদ।
‘ডকুমেন্ট পরীক্ষার করার পর গত রাত থেকে আমি ভিন্ন একটা চিন্তা করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কি সেটা?’ তিন জন এক সাথে বলে উঠল।
‘আমি ভাবছি, ডকুমেন্ট গুলো আন্তর্জাতিক একটি নিউজ মিডিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের সংবাদপত্র গুলোর কাছে পাচার করে দেব’।
‘তার পর।’ বলল ফিলিপ।
‘আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের সংবাদপত্র গুলো এখবর লুফে নেবে বলে আমি মনে করি।’
‘তাতে আমাদের কি লাভ? আমাদের উদ্দেশ্য তো তাতে সিদ্ধ হবে না। তেজস্ক্রিয় গুলো তো উঠবে না।’ বলল যিয়াদ।
‘বল কি! আমরা একটা নয়, তখন তিনটা উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারবো।’
তিনজনই বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
‘প্রথম লাভ হলো, শুরু করল আহমদ মুসা, কু-ক্ল্যাক্স- ক্ল্যানের ভীষন বদনাম হবে, তার উপর সব দিক থেকে চাপ পড়বে এবং তাতে সংগঠনটাই দূর্বল হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় লাভ মুসলিম জাতি সম্পর্কে স্পেনীয় দৃষ্টিভংগি বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে, তার ফলে স্পেন সরকারের উপর প্রচন্ড চাপ পড়বে। তাছাড়া ঐতিহাসিক স্থান গুলো ধ্বংস হলে প্রতি বছর কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে বঞ্চিত হবে স্পেন। স্পেন প্রতি বছর পর্যটন খাত থেকে আয় করে ১৬ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলার আসে মুসলিম ঐতিহাসিক স্থান গুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট পর্যটকদের কাছ থেকে। সুতরাং বদনাম ও চাপ থেকে রক্ষা পাওয়া অন্য দিকে দেশের আর্থিক স্বার্থ রক্ষার জন্যেই স্পেন সরকার সরকারী ভাবে তেজস্ক্রিয় গুলো তুলার ব্যবস্থা করবে। তৃতীয় লাভ হলো, স্পেনীয় মুসলমানদের সম্পর্কে এই সচেতনতার সুযোগে স্পেনের মুসলমানরা তাদের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করে নেবার সুযোগ পেতে পারে।
থামল আহমদ মুসা।
ফিলিপদের চোখে তখন বিস্ময় ও আনন্দ ঠিকরে পড়ছে।
‘আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন।’ আপনি ক’টি কথায় একটা সোনালী স্বপ্ন ফুটিয়ে তুলেছেন আমাদের সামনে। আপনার প্রতিটি কথা সত্য হোক।’ আবেগের সাথে বলল যিয়াদ।
‘যিয়াদ স্বপ্ন বলেছে, কিন্তু আমার কাছে আপনার প্রতিটি কথা বাস্তব মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন, কু-ক্ল্যাক্স- ক্ল্যান বা স্পেনের উপর চাপ আসবে কেন? মুসলমানদের সে রকম বন্ধু কোথায়?’ ফিলিপ বলল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমার কথা ঠিক কিন্তু তোমরা জান, প্রত্যেক জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিধান আছে। এরই অংশ হিসেবে ইউনেস্কো পৃথিবীব্যাপী জাতি সমূহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি রক্ষার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক এ বিধি, নিয়ম ও মনোভাবের সাহায্য আমরা পাব। কর্ডোভা ও গ্রানাডার অমন কীর্তিসমূহ এবং আল-হামরার মত অতুলনীয় স্থাপত্য কীর্তি ধ্বংস হোক দুনিয়ার মানুষ তা চাইবে না। সুতরাং চারদিক থেকে চাপ আসবেই।’
‘কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে তো চাই ব্যাপক প্রচার এবং প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজনমত গঠন। এটা কি সম্ভব হবে?’ বলল ফিলিপ।
‘কতখানি সম্ভব হবে জানিনা। তবে চেষ্টা আমাদের করতে হবে। আজ ভোরেই আমি ফিলিস্তিন, মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্র ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলচনা করেছি। আমি তাঁদের ইংগিত দিয়েছি মুসলিম বিশ্বের কাগজ গুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ডকুমেন্ট ছাপার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে অনুরোধ করেছি কোনও ভাবে EWNA(EURO WORLD NEWS AGENCY)-এর সাথে যোগাযোগ করে ডকুমেন্টটি তাদের মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করতে। তারা কাজ শুরু করে দিয়েছে। ১০টার দিকে তাদের কাছ থেকে জানতে পারবো কতদূর তারা এগুলো। মনে রেখো তোমরা, আজ সকাল ১০টায় যিয়াদকে সেন্টপল গীর্জার গেটের পশ্চিম পাশে দাঁড়ানো ৭৮৬৭৮৬ নং গাড়িতে গিয়ে উঠতে হবে। সেই গাড়ী কোন এক জায়গায় মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে তাকে দেখা করিয়ে দেবে। ডকুমেন্ট গুলো তাকে দিতে হবে, সেই সাথে আমার চিঠি। আর তিনি যে খবর দেবেন তা আনতে হবে।’
থামল আহমদ মুসা।
‘আল হামদুলিল্লাহ, আপনি তো অনেক দূর এগিয়েছেন মুসা ভাই।’ বলল আবদুর রহমান।
‘অনেক দূর কোথায়, সবে তো শুরু।’
‘যোগাযোগের কাজটা তো হয়েছে, এই কাজেই তো আমাদের লাগতো দিনের পর দিন।’
‘তা হয়েছে।’
‘মুসা ভাই, বলতে শুরু করল জোয়ান, আমি একটা কথা ভাবছি, ডকুমেন্ট গুলো দিয়ে কি আমরা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করতে পারবো যে, তেজস্ক্রিয় দিয়ে মুসলিম ঐতিহাসিক স্থানগুলো ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রটি কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের? আর ডকুমেন্ট গুলো দিয়ে কি প্রমাণ করা যাবে যে, সেটা এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র? যদি তা যায়, তা’হলে আমি মনে করি বিশ্বের নিউজ মিডিয়ায় তা ভাল কভারেজ পাবে, দুনিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে।’ বলল জোয়ান।
‘তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলেছ জোয়ান। ডকুমেন্টগুলোর নির্ভরযোগ্যতাই কিন্তু আমাদের মূলধন। এ বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তা করেছি। পরিকল্পনা আমরা যেটা পেয়েছি, তাতে তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুলের কার্যকারিতার প্রকৃতি, কার্যকারিতার মেয়াদ, বিল্ডিং ও স্থাপনার প্রকৃতি ও থাকার আয়তন অনুসারে লক্ষ্য অর্জনের মেয়াদের বিভিন্নতা, কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা, মাদ্রিদ শাহ্‌ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্স, প্রভৃতি থেকে তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল তুলে নেবার সময় নির্দিষ্ট, না তুললে এলাকার কি কি ক্ষতি হবে, ইত্যাদির বিবরণ সুষ্ঠভাবে দেয়া আছে। আর ডায়াগ্রামে রয়েছে কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা, প্রভৃতির ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর কোন কোন স্থানে তেজস্ক্রিয় পুঁতে রাখা হয়েছে তার নিখুঁত মানচিত্র।…’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে ফিলিপ বলে উঠল, ‘আচ্ছা পরিকল্পনা ও ডায়াগ্রামে কর্ডোভা, গ্রানাডা প্রভৃতিকে কি তাদের নামেই উল্লেখ করা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এখন বাকি থাকল,’ আহমদ মুসা শুরু করল আবার, ‘কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এটা করেছে কি না তা প্রমাণ করা, এই তো? সেটাও সহজে প্রমাণ করার মত দলিল আমরা পেয়েছি। প্ল্যান ও ডায়াগ্রামের সাথে আদেশ দান সুলভ একটা চিঠি আছে। চিঠিতে কোন পটভূমিতে কি উদ্দেশ্যে কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এর নির্বাহী কমিটি এ সিদ্ধান্ত নেয় তার উল্লেখ করে প্ল্যান কার্যকর করার নির্দেশ জারী করা হয়েছে। শেষে স্বাক্ষর রয়েছে ভাসকুয়েজের। আমি মনে করি, তেজস্ক্রিয় ষড়যন্ত্রের সাথে কু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের সম্পর্ক প্রমাণের জন্যে এ চিঠিই যথেষ্ট।’
ফিলিপদের মুখ খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ফিলিপ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন, নাস্তা রেডি।’
সবাই উঠে দাঁড়াল।
রাত তখন দশটা।
ফিলিপের তিনতলার ড্রইংরুমে বসেছিল আহমদ মুসা, ফিলিপ ও জোয়ান।
খুশীতে মুখ উজ্জ্বল করে বাইরের দরজা দিয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল যিয়াদ ও আবদুর রহমান।
ওদের সাথে মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাতের সময় ছিল রাত ৮টায়। ডকুমেন্ট গুলো বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচারের কি ব্যবস্থা হয়েছে সে বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের যিয়াদদেরকে জানাবার কথা এ সময়।
ওদের হাসি মুখ দেখে খুশী হল আহমদ মুসারা।