১৬. মধ্য এশিয়ায় কালো মেঘ

চ্যাপ্টার

যা ঘটে আসছে, এবার ও তাই ঘটল। গ্রেট বিয়ারের কাউকে এবারও জীবন্ত ধরা গেল না। পাওয়া গেল ছয়টি লাশ।
তবে ডকুমেন্ট কিছু পাওয়া গেল। কম্পিউটারে পাওয়া গেল গ্রেট বিয়ারের পরিকল্পনা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কর্মসূচী, সেই দলিলই পাওয়া গেল না। যা পাওয়া যায়নি তার জন্য আহমদ মুসার কোন দুঃখ নেই। তার মতে পরিকল্পনা কম পাওয়া নয়। এতে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ও লোকেশান জানা গেছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া পাওয়া গেছে বেশ কিছু টেলিফোন নাম্বার। যার মধ্যে আছে আলমা আতা, ফ্রুঞ্জ দুশনবে, আশখাবাদ ইত্যাদির মত গুরুত্বপূর্ণ স্থানের টেলিফোন নাম্বার।
আহমদ মুসা অফিস থেকে বেরিয়ে যখন মনে মনে এই হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত তখন তাতিয়ানা বলল, ‘আমি এখন যেতে চাই।’
আহমদ মুসা তাকালো তাতিয়ানার দিকে। বলল, ‘তোমার পেছনে থেকে যাওয়াকে তোমার আব্বা এবং তোমার আব্বার সংগঠন কি চোখে দেখবে?’
‘আপনি ভাবছেন এ নিয়ে?’ বলল তাতিয়ানা।
‘ভাবাইতো স্বাভাবিক।’
‘ধন্যবাদ।’
‘আমার জিজ্ঞাসার জবাব দাওনি।’
‘আমি আমার আব্বার একমাত্র সন্তান। তাছাড়া তিনি কোন দিনই জানতে পারবেন না ডিনামাইটের ভাগ্যে কি ঘটেছিল।’
‘কিন্তু তার জিজ্ঞাসার জবাব তো তোমাকে দিতে হবে।’
‘প্রশ্ন শুনেই আমি জবাব ঠিক করে নিব।’
‘তোমার চলে যাবার জন্যে অনুমতির কোন প্রয়োজন নেই তাতিয়ানা।’
‘জানি। আমি অনুমতি চাইনি। আমি ইনফরমেশন দিয়েছি।’ কন্ঠ কিছুটা ভারি তাতিয়ানার।
‘ধন্যবাদ, তাতিয়ানা।’
‘বিদায় দিচ্ছেন আমাকে, কিছু জিজ্ঞাসার নেই।’
‘কোন বিষয়ে?’
‘কেন আমি গ্রেট বিয়ারের মধ্য এশীয় প্রধান আলেকজেন্ডার পিটারের মেয়ে। আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসার নেই? আমি বুঝেছি, গ্রেট বিয়ারের কোন লোককে জীবন্ত ধরার জন্য উদগ্রীব আপনারা। আমি তো তাদেরই একজন।’
‘তোমাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব না, কারণ তুমি আমাদের বন্দিনী নও। তাছাড়া তুমি গ্রেট বিয়ারের একজন নও।’
‘কিন্তু আমার সম্বন্ধে তো আপনি কিছুই জানেন না।’
‘জানার মাধ্যম শুধু মুখের কথা কিংবা লেখাই নয় তাতিয়ানা।’
চমকে মুখ তুলল তাতিয়ানা। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বুঝলাম না।’
‘মানুষের কাজ এবং মানুষের গোটা দেহই একটা জীবন্ত ইনফরমেশন ।’
‘ধন্যবাদ কিন্তু শত্রুর মেয়ে সম্পর্কে এমন সু-ধারনা ঠিক নয়।’
‘কেউ আমাদের শত্রু নয় তাতিয়ানা।’
‘কেন আলেকজেন্ডার পিটার শত্রু নয়?’
‘তিনি আমাদের শত্রু নন, আমরা তাঁর শত্রু।’
‘একই কথা। আপনারা তাঁর শত্রু হলে তিনিও আপনাদের শত্রু হয়ে যান।’
‘এক কথা নয় তাতিয়ানা। তিনি এবং তারা আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন, চেষ্টা করছেন আমাদের জাতির সর্বনাশ ঘটাতে। কিন্তু আমরা তাঁর বা তাদের কোন ক্ষতি করার চেষ্টা করছি না। আমরা আত্মরক্ষার চেষ্টা করছি মাত্র।’
‘ধন্যবাদ। সব পক্ষের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এমন হতো, তাহলে দুনিয়াতে শত্রুতা ও অশান্তি থাকতো না।’
‘আমরা মুসলমানরা এমন একটা শান্তির দুনিয়া চাই তাতিয়ানা।’
‘এই চাওয়াটা শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমিত করছেন কেন? সব মানুষই তো শান্তি চায়।’
‘চায় বটে, কিন্তু সবার কাছে এই শান্তির কর্মসূচি নেই।’
‘কেন আমরা খ্রিস্টানরাও তো শান্তির কথা বলি। যিশু তো শান্তির প্রতীক ।’
‘বল। কিন্তু সেটা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কথাকে কাজে পরিণত করে শান্তির সমাজ বিনির্মাণের কোন কর্মসূচি তোমাদের বাইবেল দেয় না। আর কোরআন নাজিলই হয়েছে মানুষেকে শান্তির পথ প্রদর্শনের জন্যে, শান্তির সমাজ গঠনের জন্যে।’
‘কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজ কি একথার সাক্ষ্য দেয়?’
‘দেয় না। কারণ অধিকাংশ মুসলমান ও তাদের সমাজ ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত নেই।’
‘তাহলে খ্রিস্টানদের দোষ দিয়ে লাভ কি? মুসলমান ও খ্রিস্টানতো সমানই হয়ে গেলো।’
‘সমান হয় না। মুসলমানদের সঞ্চয় আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই, অন্যদিকে খ্রিস্টানদের সঞ্চয়ও নেই, ব্যবহারও নেই। এই মৌলিক পার্থক্য নিয়ে দুই জাতি এক হতে পারে না।’
‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনাকে বিপ্লবী হিসেবে জানতাম। আজ দেখছি, আপনি আপনার ধর্মের প্রচারকও।’
‘তোমার শেষের জানাটাই আসল।’
‘কিন্তু জগতের সবাই জানে, বিপ্লবই আপনার মুখ্য কাজ।’
‘তোমার কথা সত্য হলে ব্যাপারটা এই দাড়ায় যে, আমার আদর্শের প্রচার বিপ্লবের স্বার্থে। কিন্তু তা নয়। আমার বিপ্লব আমার আদর্শের স্বার্থে।’
‘একই কথা হল না?’
‘না এক কথা নয়। আদর্শকে যদি বিপ্লবের স্বার্থে ব্যবহার করা হয় এবং বিপ্লবই যদি হয় লক্ষ্য, তাহলে সে বিপ্লব ডেকে আনে স্বেচ্ছাচারিতা। আর বিপ্লব যদি হয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, তাহলে সে বিপ্লব নিয়ে আসে শান্তি ও কল্যাণ। এজন্যই মুসলমানদের উপর খোদায়ী হুকুম তাদের বিপ্লব ও পরিবর্তনের সংগ্রামসহ সব কাজ হতে হবে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর জন্য’। ‘আল্লাহর জন্য’ অর্থ আল্লাহর দেওয়া আদর্শের মাধ্যমে মানুষের শান্তি, কল্যাণ ও প্রগতির জন্যে।’
আহমদ মুসার ওপর নিবদ্ধ তাতিয়ানার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘আপনি বিপ্লবী নন। বিপ্লবীরা এমন চরিত্রের হয় না।’
‘ঠিক বলেছ, লেনিন, স্টালিন, মাওসেতুং-রা বিপ্লবী হলে, আমি বিপ্লবী নই।’
‘কিন্তু ওরা তো বিপ্লবী ছিলেন।’
‘হ্যাঁ, এই অর্থে ছিলেন যে, ওরা শক্তি, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের জোরে জনগণের ঘাড়ে বিপ্লব চাপিয়েছিলেন। এই বিপ্লব চাপিয়ে দেবার কাজে শুধু প্রথম পর্যায়েই লেনিন হত্যা করেছিলেন পঞ্চাশ লাখ কৃষককে এবং মাওসেতুং হত্যা করেছিলেন বিশ লাখ। পরবর্তী পর্যায়ের হিসাব এর থেকেও ভয়াবহ।’
‘বিপ্লব হলে হত্যাকাণ্ড কমবেশি কিছু একটা তো হয়ই।’
‘ইসলামের বিপ্লবে তা হয় না। ইসলামের বিপ্লব হয় মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষকে হত্যার জন্য নয়। এমনকি মুসলিম বিজয়ের যে ইতিহাস রয়েছে, সেখানেও দেখবে কোন হত্যাকাণ্ড নেই। খ্রিস্টানরা যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন সত্তর হাজার মুসলমানকে তারা হত্যা করেছিলো। কিন্তু এই জেরুজালেম মুসলমানরা যখন আবার জয় করলো, তখন একজন খ্রিস্টানের গায়েও তারা হাত দেয়নি। মুসলমানরা যখন স্পেন জয় করেছিল, তখন খ্রিস্টানদেরকে মুসলিম শাসকরা মুসলিম প্রজাদের থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু খ্রিস্টানরা যখন স্পেন জয় করল, তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্মূল অভিযান চালিয়ে মুসলিমশুন্য করেছিল স্পেনকে।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি কথার জাদু জানেন। কিন্তু আপনার আর সময় নষ্ট করব না। চলি।’
বলে তাতিয়ানা ঘুরে দাড়িয়ে সামনে পা বাড়াতে গিয়ে আবার ফিরে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলে একটু ম্লান হেসে বলল, ‘গ্রেট বিয়ার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন নি। জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কিছু বলতে পারতাম না। আমি ঐ ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম না, কান ও দিতাম না।’
‘তোমাকে ধন্যবাদ এ সহযোগিতার জন্য।’
‘কি সহযোগিতা করলাম।’
‘জানতে ইচ্ছে করছিল খুব যে, গ্রেট বিয়ারের তুমি কিছু জান কি না।’
‘জিজ্ঞাসা করেন নি কেন? উত্তর দেব না তাই?’ হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল তাতিয়ানার কণ্ঠ।
‘তা নয় তাতিয়ানা। না চাইতেই তুমি খুব বড় সহযোগিতা করেছো। তাই সব কিছু তোমার ইচ্ছের উপর ছেড়ে দেয়াই ঠিক মনে করেছি।’
‘ধন্যবাদ। বিস্ময় লাগছে, কঠিন ও নিষ্ঠুর গুলি-গোলা নিয়ে যার কাজ, তার হৃদয়বৃত্তি এত গভীর হলো কি করে।’
‘তাতিয়ানা তোমার জন্য গাড়ি রেডি। পৌঁছে দিয়ে আসবে।’
‘গ্রেট বিয়ারের আরেকটা আস্তানা চিনতে চান বুঝি?’ মাথা একটু ঘুরিয়ে ঈষৎ হেসে বলল তাতিয়ানা।
‘তাই যদি বল, তাহলে গাড়ি নিও না। তবে জেনে রাখ তোমাকে ফলো করার ইচ্ছে আমাদের নেই।’
দাড়িয়ে গেল তাতিয়ানা। ঘুরে দাঁড়ালো। হেসে বলল, ‘ফলো করেও কোন লাভ হবে না। আমি কোথায় যাব জানি না। আব্বারা কোথায় তা বলতে পারব না।’
একটু থামল। তারপর বলল, ‘এই জন্যই আমি গাড়ি নিতে চাচ্ছি না। আপাতত ঠিকানাবিহীন আমাকে কোথাও পৌঁছে দেবে গাড়ি।’
‘যদি ওদের খুঁজে না পাও, তাহলে যোগাযোগ করবে, আমরা তোমাকে পৌঁছে দেব রাশিয়ায়।’
‘ধন্যবাদ’ বলে তাতিয়ানা ঘুরে দাড়িয়ে পা চালাল সামনে।

আহমদ মুসাদের গাড়ি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এক এক করে সবাই এসে গাড়িতে উঠল। গ্রেট বিয়ারের ছয়টা লাশ এবং গ্রেট বিয়ারের হেড কোয়ার্টারটি পুলিশের হাওলা করে দেওয়া হয়েছে।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠতে উঠতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। আহমদ মুসার পাশে আজিমভ।
ছুটে চলল গাড়ি পশ্চিম তাসখন্দে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট ভবনের উদ্দেশ্যে।
সৈনিক থেকে শুরু করে অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকলেই খুশী। খুশীর সবচেয়ে বড় কারণ তারা আহমদ মুসাকে ফিরে পেয়েছে। কথা মোতাবেক ভোরের মধ্যে আহমদ মুসা অভিযান থেকে না ফেরায় তার খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কায় সবাই উদ্বেগাকুল হয়ে পরেছিল। তাদের খুশীর দ্বিতীয় কারণ হলো, তারা প্রথমবারের মত গ্রেট বিয়ারের একটা ঘাটিতে সফল অভিযান চালাতে পেরেছে।
যা আবার হেডকোয়ার্টারও।
বেলা তখন আটটা। প্রেসিডেন্ট ভবনের চত্বরে পৌঁছল আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামতেই সেনাবাহিনীর প্রধান সিদ্দিকভ ছুটে এল। আহমদ মুসার পাশে আজমভকে একটা স্যালুট করে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শুভ সংবাদ স্যার।’
‘কি?’ আহমদ মুসা ও আজমভ একসাথেই বলে উঠল।
‘ওদের একটা সসার প্লেন ধরা পড়েছে।’
‘ধরা পড়েছে? কখন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আজ ভোর সাড়ে চারটায়।’
‘প্লেন এর সাথে আর কি পেয়েছি আমরা?’
‘তিন জন রুশ ধরা পড়েছে। আর কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার।’
‘আল হামদুলিল্লাহ।’ আহমদ মুসা ও আজিমভ দুইজনেই বলে উঠল।
পরে আহমদ মুসা উদগ্রীব কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো, ‘সসার প্লেন এর গায়ে, সিলিন্ডারের গায়ে, ইত্যাদিতে আমরা কি এমন কোন চিহ্ন পেয়েছি যা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে ওইগুলো রাশিয়ার?’
‘জি, সে রকম প্রমাণ আছে। সবগুলোর গায়ে গ্রেট বিয়ারের মনোগ্রাম আছে, আর আছে সেগুলোর বিস্তারিত নির্মাণ তথ্য। যেমন, কোথায় তৈরী, কবে তৈরী, ব্যবহার শুরু করার তারিখ, ইত্যাদি।’
‘রাশিয়ার আকাশ থেকে সসার প্লেনটি মধ্য এশিয়ায় প্রবেশ করছে এ ছবি তোমরা তুলতে পেরেছ?’ জিজ্ঞাসা করল আজিমভ।
‘এ ধরনের অনেকগুলো ছবি আমাদের হাতে স্যার।’
‘ধন্যবাদ সিদ্দিকভ।’ বলল আজিমভ।
‘সিলিন্ডারের গ্যাসগুলো তোমরা দেখেছ?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদের কেমিকেল এক্সপার্ট প্রাথমিক একটা পরীক্ষা করেছে। তাতে প্রমাণ হয়েছে ওগুলো অত্যন্ত ধীরক্রিয়া সম্পন্ন রেডিয়েশন পয়জন।’
‘ধরা পড়া সেই তিন জন লোক কোথায়?’
‘সেনা হেড কোয়ার্টারের সিকুরিটি সেলে রাখা হয়েছে।’
আহমদ মুসা আজিমভের দিকে চেয়ে বলল, ‘চল লোকগুলোকে দেখা যাক।’
‘আমিও তাই মনে করছি।’ আজিমভ বলল।
আবার তারা গাড়িতে উঠে বসল। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল সিদ্দিকভও তাঁর গাড়িতে উঠল।
সেনা হেড কোয়ার্টারে নিরাপত্তা তোড়জোড় আজ সাংঘাতিক রকমের বেশি। আহমদ মুসা ও আজিমভকেও আজ নতুন করে প্রবেশ পাস নেয়ার পর ঢুকতে দেয়া হলো।
খুশি হলো আহমদ মুসা। পাশা-পাশি হাঁটতে হাঁটতে সিদ্দিকভকে বলল, ‘তোমার দূর-দৃষ্টির প্রশংসা করছি সিদ্দিকভ। আমরা যে রকম শক্তিশালী ও ভয়ানক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছি, তাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এ ধরনের কড়াকড়ি প্রয়োজন।’
‘হ্যাঁ, মুসা ভাই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত উন্নত হচ্ছে, ষড়যন্ত্রও তত আধুনিকায়ন হচ্ছে। সুতরাং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রতিদিনই আমাদের সামনে এগুতে হবে।’
গল্প করতে করতে তারা সেনা হেড কোয়ার্টারে প্রবেশ করল।
সেনা সদর দফতরে সিকুরিটি প্রধান আবুবকর আলিয়েভ এবং তাঁর সহকারী ওসমান খোদায়েভ সর্বশেষ নিরাপত্তা গেটে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসাদেরকে খোশ আমদেদ জানানোর জন্যে।
আহমদ মুসা ওদের সাথে হ্যান্ডশেক করল। খোদায়েভের সাথে হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে হঠাৎ আহমদ মুসার কপালটা কুঞ্চিত হলো এবং মনেরও কোথায় যেন খচ করে উঠল।
অল্প কিছু এগিয়ে আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। তাঁর সাথে সাথে দাঁড়াল আজিমভ এবং সিদিকভও।
আহমদ মুসা মাথা নিচু করে ভাবছিল। হঠাৎ মাথা তুলে সিদ্দিকভকে বলল, ওসমান খোদায়েভ সম্পর্কে তোমার মত কি?
‘কোন ব্যাপারে?’
‘বিশ্বস্ততা।’
‘আপনি জানেন, সে আমাদের বিপ্লব সময়ের সাথী। সে একজন ত্যাগী কর্মী। সকল সন্দেহের উর্ধে সে।’ বলল সিদ্দিকভ।
‘আমার সাথে দু’একবার দেখা হয়েছে, কিন্তু ঘনিষ্ঠ কোন আলাপ হয়নি। বলতে পার, তাঁর হাতে ঠিক কব্জির নিচেই কোন ‘উলকি’ আছে?’
না আমাদের মধ্য এশিয়ায় মুসলমানদের মধ্যে উলকির প্রচলন একেবারেই নেই।
আবার চোখ বুজল আহমদ মুসা। পরক্ষণেই সিদ্দিকভের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই মুহুর্তে ওসমান খোদায়েভকে গ্রেপ্তার করো।’
‘ওসমান খোদায়েভকে গ্রেপ্তার?’ একই কন্ঠে উচ্চারণ করল আজিমভ এবং সিদ্দিকভ। তাদের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফোরিত।
‘হ্যাঁ, সময় নষ্ট কর না।’ আহমদ মুসার কন্ঠে স্থির নির্দেশের সুর।
সঙ্গে সঙ্গেই হুকুম তামিল করল জেনারেল সিদ্দিকভ। ঘুরে দাঁড়াল সে। চলতে শুরু করল সেই নিরাপত্তা গেটের দিকে যেখানে দাঁড়িয়ে খোদায়েভরা আহমদ মুসাদের স্বাগত জানিয়েছিল।
আহমদ মুসা এবং আজিমভও সিদ্দিকভের পেছনে পেছনে চলল।
দেখা গেল সেই গেটে দাঁড়িয়ে সিকুরিটি প্রধান আবুবকর আলীয়েভ একজন অফিসারকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে। ও সময় খোদায়েভ সেখানে নেই।
জেনারেল সিদ্দিকভ এবং আহমদ মুসা ও আজিমভকে গেটের দিকে আসতে দেখে আবুবকর আলীয়েভ অফিসারটিকে বিদায় দিয়ে এল সিদ্দিকভের দিকে। সম্ভবত সিদ্দিকভের মুখের পরিবর্তন দেখে আলীয়েভ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। বলল, ‘স্যার, কিছু বলবেন?’
‘খোদায়েভ কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করল সিদ্দিকভ।
‘এই মাত্র ভেতরের দিকে গেল, তাকে প্রয়োজন স্যার?’
‘চল দেখি কোথায়?’ বলে বাম দিকের করিডোর দিয়ে ভেতর দিকে অগ্রসর হলো সিদ্দিকভ।
সাথে চলল আবুবকর আলীয়েভ। তাদের পেছনে আহমদ মুসা এবং আজিমভ।
সেনা সদর দফতর একটি ১১ তলা ভবন। নিচের তলায় সিকুরিটির লোকরা থাকে। ভু-গর্ভে আরও দু’টি তলা আছে। এর প্রথমটি একটা মিনি অস্ত্রাগার। আর সর্বশেষের তলাটি বন্দীখানা, নিরাপত্তা বন্দীদের এখানেই রাখা হয়। এরই একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে সসার প্লেন থেকে বন্দী করে আনা তিনজন রুশকে। যারা নিঃসন্দেহে গ্রেট বিয়ারের লোক। ডান দিকের যে করিডোরের শেষ প্রান্তে একটা লিফট আছে। সে লিফট দিয়ে নামতে হয় বন্দী খানায়। আর বাম দিকের যে করিডোর দিয়ে সিদ্দিকভ এবং আহমদ মুসারা চলছে তার মধ্যবর্তী স্থানের লিফট দিয়ে মিনি অস্ত্রাগারে নামা যায়।
জেনারেল সিদ্দিকভ ও আলীয়েভ বিভিন্ন ঘর সন্ধান করে সামনে এগুচ্ছিল। করিডোরের একটা ক্রসিং পয়েন্টে এসে আলীয়েভ সেখানে দাঁড়ানো একজন সিকুরিটিকে জিজ্ঞাসা করল খোদায়েভের কথা। সে মধ্যবর্তী করিডোর দেখিয়ে বলল, ‘উনি এদিকে গেছে স্যার।’
সেই করিডোর দিয়ে সামনে এগোল তারা।
এই সময় হঠাৎ ডান দিকে একটা কক্ষ থেকে বের হয়ে এল খোদায়েভ।
কক্ষটি সেনা সদর দফতরের প্রায় মধ্যবর্তী স্থান এবং এ কক্ষই ভু-গর্ভস্থ অস্ত্রাগারে নামার লিফট রুম।
খোদায়েভের একদম মুখোমুখি হয়ে পড়ল আহমদ মুসারা। সিদ্দিকভ ও আলীয়েভ সবার আগে পাশাপাশি যাচ্ছে। তাদের পেছনেই আহমদ মুসা এবং আজিমভ।
এইভাবে মুখমুখি হয়ে পড়ায় খোদায়েভ প্রথমটায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল, তাঁর মুখটা হঠাৎ যেন কালো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়ে স্যালুট দিল।
‘খোদায়েভ তোমাকে গ্রেফতার করা হলো। আলীয়েভ খোদায়েভকে গ্রেফতার…’
সিদ্দিকভের কথা শেষ হবার আগেই খোদায়েভ বিদ্যুৎ গতিতে মেশিন রিভলবারটি তুলে নিল তার কোমরের হোলস্টার থেকে। দু’পা পিছিয়ে দুই হাতে রিভলবারটি তুলে ধরল সে। রিভলবারের ট্রিগারে তার শাহাদাত আঙুলটি বসে গেছে।
বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে আবুবকর আলীয়েভ ঝাঁপিয়ে পড়ল খোদায়েভের হাতের ওপর।
গর্জে উঠল খোদায়েভের রিভলবারটি।
গুলিবিদ্ধ আলীয়েভ লুটিয়ে পড়ল করিডোরের ওপর। সেই সাথে খোদায়েভের রিভলবার সমেত হাতটা নিচে নেমে গিয়েছিল আলীয়েভের দেহের ধাক্কায়।
খোদায়েভ তার রিভলবারসহ হাত উপরে তুলছিল। কিন্তু তার হাতটা উঠে আসার আগেই আহমদ মুসার রিভলবার গুলি বর্ষণ করল এবং তা নিখুতভাবে বিদ্ধ করল খোদায়েভের রিভলবার ধরে রাখা ডান হাতের কব্জীকে।
রিভলবার পড়ে গেল খোদায়েভের হাত থেকে। রিভলবার হাত থেকে পড়ে যাবার সঙ্গে সংগেই খোদায়েভ তার বাম হাতের অনামিকা আঙুলের আংটি কামড়ে ধরল। আহমদ মুসা খোদায়েভের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত তার মুখ থেকে কেড়ে নিল। কিন্তু লাভ হলো না। খোদায়েভের দেহ ঝরে পড়ল করিডোরে। মুহূর্তেই প্রাণহীন হয়ে গেল তার দেহ।
খোদায়েভের দেহটি পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘পারলাম না আজিমভ। গ্রেট বিয়ারের আরেকজনকে হাতের মুঠোতে পেয়েও গ্রেপ্তার করা গেল না।’
‘খোদায়েভ গ্রেট বিয়ারের লোক?’ এক সঙ্গে প্রায় চিৎকার করে উঠল আজিমভ এবং সিদ্দিকভ।
‘বলছি সব কথা। তার আগে আলীয়েভকে হাসপাতালে পাঠাও, তার কাধটা গুড়ো হয়ে গেছে গুলিতে। আর খোদায়েভের লাশ হিমাগারে পাঠাও, পরে তার দেহটা পরীক্ষা করতে হবে। আর চল লিফট রুম এবং অস্ত্রাগার পরীক্ষা করি কেন সে এই অসময়ে এখানে এসেছিল।’
সিকুরিটির লোকরা এসে জমা হয়েছিল। তাদের সবার চোখে বিস্ময়। নির্দেশ অনুসারে তারা খোদায়েভের লাশ নিয়ে গেল। স্ট্রেচারে তুলে নিল তারা আলীয়েভের দেহ।
স্ট্রেচারে উঠে আলীয়েভ ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘আহমদ মুসা ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার কষ্টের চেয়ে মনে কষ্ট পাচ্ছি বেশি খোদায়েভের ব্যাপারটির জন্য। তাকে গ্রেপ্তার করতে চাইলেন কেন, কেন সে রিভলবার বের করল আমাদের মারার জন্যে এবং কেনই বা সে অবশেষে পটাসিয়াম সাইনাইডের আংটি চুষে আত্মহত্যা করল?’
আহমদ মুসারা লিফট রুমের দিকে চলল। সবার আগে আহমদ মুসা।
আজিমভ এবং সিদ্দিকভ তাকে অনুসরণ করছে। দ’জনেরই চোখ-মুখ উদ্বেগে ভরা। সিদ্দিকভ তো একেবারে নির্বাক হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে যা ঘটল সবই যেন কোন ফিল্মের একটা দৃশ্য। আহমদ মুসা খোদায়েভকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছির, তা সে পালন করতে এসেছিল বটে, কিন্তু তার মন তা যেন মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু খোদায়েভের রিভলবার বের করা এবং শেষে তার আত্মহত্যা থেকে সে বুঝতে পারল, আহমদ মুসার সিদ্ধান্ত কত নিখুঁত ছিল। কেমন করে তিনি খোদায়েভকে সন্দেহ করলেন? আহমদ মুসার প্রতি শ্রদ্ধায় তার হৃদয়টা নুয়ে এল। আজিমভের মনেও এই ধরনের ভাবনা। আহমদ মুসার দৃষ্টি, চিন্তা, অনুভূতি কোনটারই তুলনা বোধ হয় কোথাও নেই।
নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘সিদ্দিকভ, তুমি রিভলবার বের না করে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিবে তা আমি ভাবিনি। আলীয়েভ ঝুঁকি না নিলে আরও বড় কিছু ঘটতে পারতো।’
‘দু:খিত মুসা ভাই। আমার ভুলের কারন হলো, আমি ভাবতেই পারিনি, খোদায়েভ এই ক্ষেত্রে রিভলবার বের করতে পারে।’ বলল সিদ্দিকভ।
‘ভুলটা তোমাদের না, আমার। আমার আগেই বলা উচিত ছিল যে, সে ওসমান খোদায়েভ নয়। গ্রেট বিয়ারের একজনকে প্লাস্টিক সার্জারি করে খোদায়েভ বানিয়ে খোদায়েভের জায়গায় বসানো হয়েছে। আর আসল খোদায়েভ নিহত হয়েছে, অথবা কোথাও বন্দী রয়েছে।’
‘কিন্তু এই সাংঘাতিক বিষয়টা এত তাড়াতাড়ি আপনার নজরে পড়ল কি করে?’ জিজ্ঞাসা করল সিদ্ধিকভ।
‘সে যে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়, সে দৃষ্টিকে আমার কাছে খোদায়েভ বলে মনে হয়নি। তার দৃষ্টিতে ছিল প্রথম দেখার মত একটা বিস্ময় এবং আমাকে পরিমাপ করার একটা অনুসন্ধিৎসা। তাছাড়া তোমাদের সেনাবাহিনীর জুতার ফিতা বাঁধার যে বিশেষ ধরণ আছে, তার জুতার ফিতা সে ভাবে বাঁধা ছিল না। সব শেষে তার ডান হাতের কব্জীতে একটা উলকি দেখতে পাই যা মধ্য এশয়ার মুসলিম পরিবারে স্বাভাবিক নয়।’
‘কিন্তু আমাদের চোখে তো কিছুই ধরা পড়েনি।’
‘মনে হয় সে দু’একদিন হল এসেছে। বলতে পার দু’একদিনের মধ্যে খোদায়েভ কোথাও গিয়েছিল কি না?’
‘গিয়েছিল। অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিন দিন তাকে সামরিক হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। গতকাল সে যোগদান করেছে।’ বলল সিদ্দিকভ।
‘তাহলে মানুষ বদলের কাজ গতকালই হয়েছে। আজিমভ তুমি তোমার লোকদের নির্দেশ দাও, খোদায়েভের হাসপাতালে যাওয়া থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত প্রতিটি মিনিটের এক হিসাব তৈরী করতে, তাহলে বুঝা যাবে কোন সময় দুর্ঘটনাটা ঘটেছে এবং খোদায়েভের সন্ধান পাওয়ারও পথ এর দ্বারা বের হতে পারে।’
‘আচ্ছা! কিন্তু মুসা ভাই হঠাৎ করে তো এটা হয়নি, প্লাস্টিক সার্জারিতে অনেক সময় নেয়।’
‘অবশ্যই অনেক সময়, অনেক প্রস্তুতি লাগে। খোদায়েভের ফটো তারা যোগাড় করেছে, তারপর খোদায়েভের উঠা-বসা, আচার-আচরণ সম্পর্কে যোগাযোগ, বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজন, প্রভৃতি সবকিছুই তারা জানার চেষ্টা করেছে নিখুঁতভাবে। এমনভাবে একজন লোক প্ল্যান্ট করা খুবই কঠিন। এ কাজ যে তারা করেছে, এ থেকে বুঝা যাচ্ছে ওরা সাংঘাতিকভাবে আমাদের পেছনে লেগেছে।’
‘এত কিছু তারা করেছে! আমার মনে হচ্ছে খোদায়েভের কোন আত্নীয়-স্বজনের সাথে তারা একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।’ বলল আজিমভ।
‘ঠিক বলেছ আজিমভ। তুমি সন্ধান নাও। আর শোন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরু দায়িত্বে যারা রয়েছে, তাদের একবার তুমি যাচাই কর। তারা যখন একটা করেছে, তখন দশটাও করতে পারে।’
‘আল হামদুলিল্লাহ। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা নির্দেশ দিয়েছেন মুসা ভাই। আমি আজই প্রথমত সকলের দৈহিক আইডেনটিফিকেশন চিহ্নগুলো পরীক্ষা করার নির্দেশ দিচ্ছি। তারপর একে একে অন্য সবকিছু।’ আজিমভ বলল।
লিফট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল। আজিমভের কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা লিফট রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করল লিফট রুমে।
লিফটে প্রবেশ করতেই আহমদ মুসার ‘বিস্ফোরক স্পর্শকাতর’ ঘড়ির পরমাণু ডায়ালটি কাঁপতে শুরু করল এবং একটানা একটা সংকেত দিয়ে চলল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা।
ততক্ষণে আজিমভ এবং জেনারেল সিদ্দিকভ ঘরে ঢুকেছিল।
আহমদ মুসা শিকারী বাজের মত সতর্ক দৃষ্টিতে ঘরের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করছিল। উদ্বেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল তার সারা মুখ।
আজিমভ এবং সিদ্দিকভ আহমদ মুসার দিকে চেয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি হয়েছে মুসা ভাই?’
‘এই ঘরে অবশ্যই পরমাণু জাতীয় কোন বিস্ফোরক আছে।’
আঁৎকে উঠল আজিমভ এবং সিদ্দিকভ দু’জনেই। মুহুর্তেই উৎকণ্ঠায় অন্ধকার হয়ে গেল দু’জনের মুখ।
ঘরটাকে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করল আহমদ মুসা, কিন্তু কোথাও কিছু নেই। লিফট রুমে একটি মাত্র কুশন চেয়ার। সে চেয়ার সরিয়েও দেখা হলো। না কিছু নেই কোথাও।
‘কি সন্দেহ করছেন মুসা ভাই?’ বলল আজিমভ।
‘নকল খোদায়েভ এদিকে এসেছিল, এ কক্ষে এবং সম্ভবত নীচের কক্ষেও গিয়েছিল। আমরা এ বিল্ডিং-এ আসার পর এ দিকে আসা তার বিনা কারণে ছিল না। এখন মনে হচ্ছে সে সাংঘাতিক কিছু করেছে।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা চেয়ারটা হাত দিয়ে উঁচুতে তুলে ধরে উল্টিয়ে ফেলল। উল্টিয়েই চোখ দু’টি ছানা-বড়া হয়ে গেল তার। এমনকি কেঁপে উঠল তার বুক। দেখতে পেল কুশনের তলায় টেপ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে বর্গাকৃতির একটা বাক্স। প্লাস্টিক কভারে ঢাকা। প্লাস্টিক কভারের এক জায়গায় আয়তাকার একটা স্ক্রীনে জ্বল জ্বল করছে ডিজিটাল টাইম মিটার। সময় তখন সেখানে সাতান্ন সেকেন্ড। চোখের পলক ফেলতেই তা নেমে এল ছাপ্পান্ন সেকেন্ডে।
‘পারমাণবিক ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটতে আর সময় আছে ৫৬ সেকেন্ড।’ চিৎকার করে উঠল আহমদ মুসার কণ্ঠ।
কেঁপে উঠল আজিমভ এবং সিদ্দিকভ দু’জনেই। তারা জানে এই সাইজের একটা পারমাণবিক ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটলে শুধু এ বিল্ডিং নয়, আশে-পাশের বিল্ডিংও ধুলো হয়ে যাবে।
টাইম মিটারে সময় জিরো আওয়ারে পৌঁছবার সাথে সাথেই ঘটবে সেই মহা-বিস্ফোরণ। সময়ের কাঁটার সাথে যুক্ত নিউট্রন বুলেট। এক সেকেন্ড করে সময়ের কাটা পিছু হটছে, আর এক সেকেন্ড দূরত্ব এগিয়ে যাচ্ছে নিউট্রন বুলেট ডিনামাইটের স্পশকাতর নার্ভের দিকে। সময়ের কাঁটা জিরো আওয়ারে পৌঁছার সাথে সাথে নিউট্রন বুলেট জিরো দূরত্বে পৌছে যাবে এবং নিউট্রন বুলেটটি চুম্বকের মহাটানে বিদ্ধ করবে ডিনামাইটের নার্ভকে। সংগে সংগেই ঘটবে প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ। এ বিস্ফোরণ ঠেকাবার একমাত্র পথ টাইম মিটারে সময়ের কাটা আটকে দেয়া ইলেকট্রিক ম্যাকানিজম অফ করার মাধ্যমে।
আহমদ মুসা ডিনামাইটের প্লাস্টিক কভার ভালো করে পরীক্ষা করে বুঝল ওপর অংশের প্লাস্টিক কভার খুললে টাইম মিটারের সাথে ডিনামাইটের ইলেকট্রিকের সংযোগ ম্যাকানিজমটা পাওয়া যাবে।
পঞ্চাশ সেকেন্ড নেমে এসেছে তখন সময়।
আহমদ মুসা তার চাকুর তীক্ষ্ন অগ্রভাগ দিয়ে প্লাস্টিক কভারের স্ক্রু খুলতে খুলতে বলল দ্রুতকণ্ঠে, ‘সিদ্দিকভ ইমারজেন্সী সাইরেন বাজিয়ে দাও। যতটা পারা যায় আমাদের সাবধান হওয়া উচিত।’
‘মুসা ভাই, আমরা আপনার জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারিনা। চলুন আমরা বেরিযে যাই, ডিনামাইটটাকেও বিল্ডিং-এর বাইরে ফেলতে পারব।’
কাজের হাতকে বিন্দু মাত্র স্লো না করে আহমদ মুসা বলল, ‘এ ডিনামাইটের কার্যকারিতার ক্ষেত্র দেখা যাচ্ছে চারশ বর্গগজ। কতটুকু সরাতে পারবে ডিনামাইটটাকে।’
‘না, মুসা ভাই আপনি সরুন, আপনাকে সরতে হবে।’ প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠল আজিমভ।
‘এই বিল্ডিং-এর প্রায় এক হাজার স্টাফ, আশে-পাশের ভবনে হবে আরও কয়েক’শ- এদের কয়জনকে তুমি সরাতে পারবে আজিমভ?’
‘আপনার সাথে তো তাদের তুলনা হয়না।’
‘তুলনা হয় না বলেই তো তাদের রেখে আমি সরতে পারি না।’
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, ‘কেন চিন্তা করছ এভাবে আজিমভ? এত অল্পতেই তুমি আল্লাহর সাহায্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পার?’
কোন জবাব দিল না আজিমভ। তবে তার চোখের আতংকটা একটু কমল। দোয়া পড়ল সে, ‘লা-হাওলা ওয়ালা-কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ।’
দ্রুত লিফট রুমে প্রবেশ করল সিদ্দিকভ। বিপদ ঘন্টা বাজাবার নির্দেশ দিয়ে সে ফিরে এল। তার সাথে দু’জন লোক।
বলল সিদ্দিকভ, ‘দু’জন বিস্ফোরক এক্সপার্টকে এনেছি মুসা ভাই’
‘ওদের জিজ্ঞাসা কর এ ধরনের নিউক্লিয়ার ডিনামাইটকে ডিফিউজ করার সবচেয়ে সহজ পথ কি?’
‘টাইম মিটারকে ডিনামাইট থেকে বিচ্ছিন্ন করা।’ এক্সপার্টদের একজন বলল।
ডিনামাইটের ওপরের অংশের প্লাষ্টিক কভার খুলে ফেলা হয়ে গেল আহমদ মুসার। টাইম মিটারে সময় তখন ত্রিশ সেকেন্ড।
ভেতরটা দেখে স্তম্ভিত হলো আহমদ মুসা। ডিনামাইটটা দেখা যাচ্ছে বিশেষ ডিজাইনে তৈরী। মুল ডিনামাইটের সাথে টাইম মিটারের সংযোগ একটা, দুইটা তারের মাধ্যমে নন। একগুচ্ছ সূক্ষ্ম তার টাইম মিটার ও ডিনামাইটকে সংযুক্ত করেছে। তারগুলোর দুই প্রাপ্ত দুই পাশের (টাইম মিটার ও ডিনামাইটের) কোর্ডে ঢুকানো। অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেকটি তারের রং ভিন্ন ভিন্ন। আহমদ মুসার বুঝতে বাঁকি রইল না ক্যামোফ্রেজ সৃষ্টির জন্যেই এ তারের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এই গুচ্ছের একটি তার আছে যা টাইম মিটার ও ডিনামাইটের নিউট্রন বুলেটকে সংযুক্ত করেছে। সেই তারটিই তাদের প্রয়োজন।
কপাল থেকে দুই গন্ড বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে আহমদ মুসার। এক গুচ্ছ তারের ক্যামোফ্রেজের কাছে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করল সে। হৃদয়ে তার উচ্চারিত হলো- ‘লা-হাওলা ওয়ালা-কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ।’
চিন্তায় অনেকটা সময় চলে গেল। সময় বাকি তখন মাত্র পনর সেকেন্ড। কারও মুখে কোন কথা নেই নিঃশ্বাসও যেন পড়ছে না কারও। অনেক তারের ক্যামোফ্রেজ দেখে বিস্ফোরক এক্সপার্টদের মাথাও ঘুরে গেল। তারা ভাবতেই পারল না আসল তারটা এর থেকে বের করা যাবে কিভাবে!
‘কেটে ফেলুন সব তার।’ বলল আজিমভ।
‘এতে আগাম বিষ্ফোরণ ঘটার ঝুকি শতকরা নব্বই ভাগ স্যার।’ বলল একজন এক্সপার্ট।
দোয়াটা পড়া শেষ করে তারের ওপর চোখ বুলাতেই আহমদ মুসার মনে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল, ‘মৃত্যুর প্রতীক কি?’ মন থেকেই উত্তর এল, ‘সাদা।’
পাওয়ার আনন্দে দেহটা যেন শিউরে উঠল আহমদ মুসার। সময় তখন ৮ সেকেন্ড।
‘বিসমিল্লাহ’ বলে আহমদ মুসা তারের গুচ্ছ থেকে সাতা তারটা পৃথক করে দিল এবং ডিনামাইটের দিকের প্রান্তটা আস্তে খুলে দিল।
সংগে সংগেই থেমে গেল টাইম মিটার। পাঁচ সেকেন্ডের সময় সংকেতটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল টাইম মিটার-স্ক্রীনে।
আজিমভ এবং সিদ্দিকভ সংগে সংগে সিজদায় পড়ে গেল। দুই হাত উপরে উঠল আহমদ মুসার। এবার তার দু’গন্ড বেয়ে নেমে এল ঘামের বদলে অশ্রু।
বিপদমুক্তির ঘন্টা বেজে উঠল সেনা বন্দর দপ্তরে। মাত্র চারটি লিফট দিয়ে এ পর্যন্ত শতখানিক লোক বেরুতে পেরেছিল।
সবার মুখে হাসি ফুটল। যারা বের হয়েছিল তারা ফিরে এল।
সবাই লিফট রুম থেকে বেরুল।
একজন বিস্ফোরক এক্সপার্টের হাতে ডিনামাইটটা।
করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন বিস্ফোরক এক্সপার্ট সবিনয়ে আহমদ মুসাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার ঠিক তারটি আপনি কিভাবে নির্দিষ্ট করলেন?’
‘আমাদেরও এই একই প্রশ্ন।’ একই সাথে উচ্চারণ করল আজিমভ এবং সিদ্দিকভ।
‘আল্লাহর এ এক অসীম দয়া। আমার মনে উদয় হয়েছিল, সাদা মৃত্যুর প্রতীক আর ডিনামাইটও মৃত্যুর প্রতীক। তাই সাদা তারটিই আমি বেছে নিয়েছিলাম।’
‘আল হামদুলিল্লাহ।’ আজিমভ এবং সিদ্দিকভ দু’জনেই উচ্চারণ করল।
হাঁটতে হাঁটতে সিদ্দিকভ বলল আহমদ মুসাকে, ‘আপনারা তো এখন প্রেসিডেন্ট ভবনে যাবেন মুসা ভাই?’
‘কেন তোমার অফিসে নেবে না?’
‘বলতে সাহস পাচ্ছি না।’
‘বলতে হবে না, আমরা দু’জায়গার কোথাও যাব না। আমাদের আসল কাজই তো হয়নি। আমরা এসেছিলাম সসার প্লেনের সেই তিনজন রুশের সাথে কথা বলতে। ওটা খুব জরুরী। ওখানে যাব। চল আজিমভ।’
সবশেষ নিরাপত্তা গেট থেকে ডান দিকে যে করিডোর গেছে তার প্রান্তের লিফটা দিয়ে নামতে হয় ভূ-গর্ভস্থ সিকুরিটি প্রিজনারস সেলে।
আহমদ মুসা, আজিমভ এবং সিদ্দিকভ তিনজনেই সেই করিডোর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল সেই লিফটের দিকে।
লিফট দিয়ে তারা নামল ভূ-গর্ভস্থ কক্ষের সর্বশেষ তলায়।
ভূ-গর্ভস্থ তলার প্রবেশ পথেই এসে থামে লিফট। কিন্তু লিফটের দরজা খুললেই ভূ-গর্ভস্থ তলায় প্রবেশের দরজা খুলে যায় না। লিফটের দরজা খুলে গেলে প্রবেশ পথের দরজা সামনে এসে যায়। দরজা থাকে তালাবদ্ধ। দরজা খুলে প্রবেশ করতে হয় বন্দী খানায়।
লিফটের দরজা খুলে গেলে বন্দী খানায় প্রবেশের দরজার মুখোমুখি দাঁড়াল আহমদ মুসারা।
জেনারেল সিদ্দিকভ পকেট থেকে চাবি বের করে দু’ধাপ এগিয়ে কি হোসে ঢুকিয়ে দিল চাবি। চাবি ঘুরিয়েই চোখ ছানা-বড়া করে পেছনে তাকাল। বলল, ‘তালা খোলা।’
‘তালা খোলা? তাহলে এ তিনজনকেও আমরা হারালাম সিদ্দিকভ!’ হতাশ কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘কি বলছেন মুসা ভাই?’
‘হ্যাঁ সিদ্দিকভ। নকল খোদায়েভ নিশ্চয় এখানে এসেছিল। হয় ওদের সে পালিয়ে যেতে দিয়েছে, নয়তো হত্যা করেছে।’
সিদ্দিকভ বিহব্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথা সত্য হলে তাদের অত্যন্ত মূল্যবান তিনজন বন্দীকে তারা হারাল।
আজিমভ এগিয়ে গিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলল।
চোখের সামনে উন্মুক্ত হলো বন্দী খানার প্রথম কক্ষটি। মেঝের ওপর এলো মেলো পড়ে থাকতে দেখা গেল তিনটি দেহ। রক্তে ভাসছে দেহ তিনটি। গুলি করে মারা হয়েছে ওদের।
আহমদ মুসা এগিয়ে গিয়ে একটি দেহে হাত রাখল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এদের এখানে কটায় ঢুকিয়েছ তোমরা?’
‘সকাল সাতটায়।’ বলল জেনারেল সিদ্দিকভ।
‘তাহলে তোমরা এদের রেখে চলে যাবার পর পরই এদের হত্যা করা হয়েছে।’
‘এ কাজ তো নকল খোদায়েভের।’
‘হ্যাঁ। তুমি হেডকোয়ার্টার থেকে কটায় গেছ?’
‘সোয়া সাতটার দিকে।’
‘তখন নকল খোদায়েভ কোথায় ছিল।’
‘হেড কোয়ার্টারেই দেখে গেছি।’
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চল এখানে আর কোন কাজ নেই।’
বলে লিফটে ফিরে এল আহমদ মুসা। তার সাথে সাথে আজিমভ এবং সিদ্দিকভও।
ভূ-গর্ভ বন্দীখানা থেকে উঠে এসে বেরিয়ে আসার জন্যে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা বলল, ‘আজিমভ তুমি নকল খোদায়েভসহ ওদের চারজনের পোষ্টমর্টেমের ব্যবস্থা কর। নকল খোদায়েভের রিভলবারে দেখবে চারটি বুলেট কম আছে। তার তিনটি পাবে তিন বন্দীর দেহে, আর একটি আবুবকর আলীয়েভের কাঁধে। পিস্তল ও বুলেটের নাম্বার, তৈরী হওয়ার স্থান সহ একটা রিপোর্ট তৈরী কর। এগুলো সবই পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে।’
‘তাহলে হৈ চৈ পড়ে যাবে না?’ বলল আজিমভ
‘উপায় নেই। আজিমভ, নকল খোদায়েভের ষ্টোরিসহ ওদের নিহত হওয়ার খবর যদি পত্রিকায় না দেই, তাহলে যদি রাশিয়া ওরা কোথায় তা জানার দাবী করে বসে?’
‘জানবে কি করে?’
‘তোমরা সসার প্লেন আটক করেছ মানে ওদেরও গ্রেফতার করেছ।’
‘আমরা তো বলিনি যে, আমরা ওদের সসার প্লেন ধরেছি।’
‘বলনি, কিন্তু আজ বলতে হবে।’
‘কেন?’
‘না বললে যে কারণে আমরা ধরেছি, সেই উদ্দেশ্যটাই তো হাসিল হবে না। আমরা গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে চাই রাশিয়ার গ্রেট বিয়ারের ষড়যন্ত্রের কথা। আমরা সসার প্লেনের এবং গ্যাস কনটেইনারের ছবি পত্রিকায় দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই কি করে তারা এই সসার প্লেনে করে মধ্য এশিয়ায় ঢুকে আমাদের শস্যক্ষেত ও পশু সম্পদ ধ্বংস করছে। এর সাথে আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরী থেকে পরীক্ষা করে আনা জীবন বিধ্বংসী গ্যাসের বিবরণও থাকবে।’
‘মহা হৈ চৈ পড়ে যাবে দুনিয়ায়। এ সসার প্লেন এবং গ্যাস দু’টই নতুন একটা বিষয় হবে শুধু সাধারণ মানুষের জন্যে নয়, বিজ্ঞানীদের জন্যেও।’
‘যত হৈ চৈ হয়, ততই আমাদের লাভ। রাশিয়ার ওপর প্রচন্ড চাপ না পড়লে গ্রেট বিয়ারের ষড়যন্ত্র বন্ধ হবে না।’
‘শুধু চাপ নয়, মানবতা ও পরিবেশের বিরুদ্ধে এই ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র করার কারণে গ্রেট বিয়ার এবং তার সাথে রাশিয়াকেও দোষী সাব্যস্ত করা হবে।’
‘সেটাই তো আমাদের লক্ষ্য। ঐ ধরণের শক্তিশালী চাপ না হলে রাশিয়া এগিয়ে যাবে না এবং গ্রেট বিয়ারের তৎপরতা বন্ধ হবে না।’
‘কিন্তু আজকে প্রকাশ উপযোগী করে সব কিছু ঠিক করা যাবে না মুসা ভাই।’
‘ঠিক আছে আজ না হলে কাল হবে। তুমি কুতায়বার সাথে আলোচনা করে একটা সাংবাদিক সম্মেলন ডাক। সেখানেই সব ব্যাপার প্রকাশ করে দেয়া হবে।’
‘চলুন, আপনিও প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করবেন।’
জেনারেল সিদ্দিকভের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজিমভ ও আহমদ মুসা এসে গাড়িতে চড়ল।
ছুটে চলল গাড়ি প্রেসিডেন্ট ভবনের উদ্দেশ্যে।
প্রেসিডেন্ট ভবনের চত্তরে এসে গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা।
প্রেসিডেন্ট কর্ণেল কুতায়বা দাঁড়িয়েছিল প্রেসিডেন্ট ভবনের গেটে। আহমদ মুসাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে কুতায়বা নেমে এল চত্তরে। এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘রাত থেকে এ পর্যন্ত যা ঘটেছে সব শুনেছি মুসা ভাই। আজ আমাদের এক বিরাট বিজয় এবং বিপদ মুক্তির দিন। আর এ বিজয়ের নায়ক হিসাবে আল্লাহ আপনাকে পাঠিয়েছেন।’
‘বিজয় এখনও আসেনি কুতায়বা এবং বিপদ এখনও সামনে। গ্রেট বিয়ার এখন হবে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত। অথচ তাদের প্রতিরোধের জন্যে যা আমাদের জানা প্রয়োজন তা আমরা পাচ্ছি না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন ওদের পরিকল্পনা এবং কিছু টেলিফোন নাম্বার তো পেয়েছেন।’
‘পরিকল্পনাটা ওদের ষড়যন্ত্র জানার জন্যে ভাল ডকুমেন্ট, কিন্তু এ দিয়ে ওদের গায়ে হাত দেবার কোন পথ হচ্ছে না। আর টেলিফোন নাম্বার দিয়ে কি ফল হবে আমি এখনও বলতে পারছি না, গ্রেট বিয়ার সত্যি একটা সাংঘাতিক দল। ওদের উদ্দেশ্য সাধনে অন্তত আন্তরিক ওরা। ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’- এর জীবন্ত প্রতিমূর্তি ওরা। ওদের অনেককেই হাতে পাওয়া গেছে, কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকেই বন্দী করা যায়নি।’
‘কেন সসার প্লেন থেকে তিনজনকে তো বন্দী করা হয়েছিল।’
‘ঠিক। কিন্তু ওরা গ্রেট বিয়ারের যোদ্ধা বাহিনীর সদস্য ছিল না। ওরা ছিল টেকনিশিয়ান।’
‘কেমন করে বুঝলেন?’
‘ওদের গায়ে গ্রেট বিয়ারের যুদ্ধ-পোশাক ছিল না। গ্রেট বিয়ারের কেউ যখনই কোন অপারেশনে বের হয় তখন তাদের গায়ে যে পোশাকই থাক, তাতে আঁকা থাকবে ভল্লুকের মুখ। সবচেয়ে বড় কথা হলো ওদের হাতে পটাশিয়াম সায়ানাইডের আংটি দেখিনি, যা গ্রেট বিয়ারের সবার হাতে থাকে।’
আহমদ মুসার কথা শুনে প্রেসিডেন্ট কুতায়বার চোখে চিন্তার একটা ছায়া ফুটে উঠল।
আহমদ মুসা তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘প্রেসিডেন্টকে এত তাড়াতাড়ি মুখ কালো করলে চলবে কেন কুতায়বা! যে কোন বিপদে তোমাকে হাসতে হবে। তোমার এ হাসি মানুষকে শক্তি যোগাবে।’
‘মুসা ভাই আপনি জোর করে আমাকে এ আসনে বসিয়েছেন।’
‘ইসলামে নেতৃত্ব এভাবে চাপিয়েই দেয়া হয়। দেখ নির্বাচনেও জনগণ তোমাকে ভোট দিয়েছে। আমাকে দোষ দিতে পারো না।’
‘চলুন মুসা ভাই। আপনার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। আপনার জন্য নাস্তা রেডি। তারপর আপনাকে লম্বা বিশ্রাম নিতে হবে।’ বলল প্রেসিডেন্ট কুতায়বা।
‘চল’ বলে আহমদ মুসা হাঁটতে হাঁটতে আজিমভের দিকে ফিরে বলল, ‘আজিমভ নাস্তার পরেই এ টেলিফোন নাম্বারগুলো নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। এখন দশটা। সব জায়গায় খবর পৌঁছার আগে হানা দিতে না পারলে কোনই লাভ হবে না।’
‘মুসা ভাই, বিশ্রাম নেবার অনুরোধের বুঝি জবাব এটা?’ বলল প্রেসিডেন্ট কুতায়বা।
‘যুদ্ধক্ষেত্রে কি কোন বিশ্রাম আছে কুতায়বা! এমনও দৃষ্টান্ত আছে, তিনদিন ধরে যুদ্ধ চলছে। মুসলিম সৈনিকরা দাঁড়িয়েই শুকনো খাবার খেয়েছে, নামাজ পড়েছে। তাদের মত অত বড় বিপদ আল্লাহ আমাদের দেননি। এর পরও কাজের সময় আমরা যদি বিশ্রামের সন্ধান করি, তাহলে আল্লাহর কাছে জবাব দেয়ার কিছু কি থাকবে?’ বলতে বলতে কন্ঠ ভারী হয়ে এল আহমদ মুসার।
‘ঠিক বলেছেন। তবে সুযোগ থাকলে ক্লান্ত শরীরের দাবী অবশ্যই পূরণ করা উচিত। আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও বিশ্রামের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এশার নামাজের পর কাজ, এমনকি কথা বলাকেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।’
‘ঠিক আছে কুতায়বা, তোমার পরামর্শের দিকে নজর দেব। আল্লাহর রাসূলের এ সিস্টেম কল্যাণের জন্যই। যদি আমরা পালন করতে পারতাম!’
আর কেউ কথা বলল না।
সবাই পাশাপাশি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলল প্রেসিডেন্ট ভবনের ভেতরে।

আহমদ মুসা গ্রেট বিয়ারের তাসখন্দ ঘাঁটি থেকে যে টেলিফোন নাম্বারগুলো সংগ্রহ করেছিল, তার প্রত্যেকটি ঠিকানায় ঐ দিন বেলা ১২ টার মধ্যে অভিযান চালানো হলো। বিস্ময়ের ব্যাপার, একই খবর এল সব জায়গা থেকে। খবরটা হলো, ঠিকানায় গিয়ে ধ্বংসস্তুপ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। আশে-পাশের লোকরা বলেছে, সকাল সাতটার দিকে বিরাট বিষ্ফোরণ ঘটে, মানুষ ছুটে গিয়ে ইট-কনক্রিটের খন্ড-বিখন্ড টুকরা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি। সব জায়গায় একই সময়ে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এই ঘটনা স্তম্ভিত করল আহমদ মুসা সহ সবাইকে। সবাই স্বীকার করল, গ্রেট বিয়ারের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত। আর দায়িত্ব পালনে তাদের লোকরা একদম অংকের মতই এ্যাকিউরেট।
গ্রেট বিয়ার সম্পর্কে আবার অন্ধকারে পড়ে গেল আহমদ মুসা। যে আলোর সন্ধানে আহমদ মুসা তাসখন্দে এসেছিল এবং গ্রেট বিয়ারের হেড কোয়ার্টারের সন্ধান করছিল, সে আলো আহমদ মুসা পায়নি। লাভের মধ্যে একটাই হয়েছে যে, তাদের পরিকল্পনা পাওয়া গেছে।
একমাত্র সম্বল গ্রেট বিয়ারের পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগুতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। পরিকল্পনা অনুসারে যা গ্রেট বিয়ার করতে চায় এবং যা ওরা করেছে তার একটা হিসাব কষে আহমদ মুসা দেখল, বুকিনুর মহাশূণ্য উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের শীর্ষ বিজ্ঞানী নূরভ বর্তমান অবস্থায় তাদের প্রথম টার্গেট। বিজ্ঞানী নূরভকে সার্বক্ষিণিক পাহারা দেয়ার এবং তাকে চোখে চোখে রাখার হুকুম দিয়েছিল আহমদ মুসা। কিন্তু এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেও ওদের ষড়যন্ত্র রোধ করা যায়নি। একদিন মহাশূণ্য কেন্দ্রের উৎক্ষেপণ পরিদর্শন শেষে মহাশূণ্য কেন্দ্র সংলগ্ন বাসায় ফেরার পথে একটি দশটনি ট্রাক তার গাড়ি এবং তাকে অনুসরণকারী নিরাপত্তা কর্মীদের গাড়ি একেবারে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দিয়ে যায়। বিজ্ঞানী নূরভ ও তার ড্রাইভারের সংগে সংগেই মৃত্যু ঘটে এবং মারাত্মকভাবে আহত নিরাপত্তা অফিসার তিনজন মারা যায় হাসপাতালে। গ্রেট বিয়ারের পরিকল্পনায় বুকিনুরের বিজ্ঞানী নূরভের নামের পরেই ছিল তাজিকিস্তানের বখশ নদীর রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নাম।
বিজ্ঞানী নূরভ নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর আহমদ মুসা সেদিন বিষন্ন মনে রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে কি করা যায় ভাবছিল। সেই সময় ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকল আজিমভ।
সালাম আজিমভ। সালাম নিয়ে আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল, ‘কোন খবর আছে না কি, এত ব্যস্ত দেখছি তোমাকে?’
‘হ্যাঁ, খবর আছে। আমাদের গোয়েন্দা সদর দফরে আজ একটা টেলিফোন এসেছিল।’
‘কে টেলিফোন করেছিল?’
‘একজন মহিলা!’
‘কি বলেছিলো?’
‘বখশ নদীর রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র আগামী ২১ তারিখে ধ্বংস করা হবে।’
‘২১ তারিখে ধ্বংস করা হবে? মেয়েটি কে?’
‘পরিচয় দেয়নি। বলেই টেলিফোন রেখে দিয়েছে।’
আহমদ মুসা একটুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘সে যেই হোক, খবর ঠিকই দিয়েছে। তারিখ ঠিক কিনা বলতে পারবো না।’
‘মেয়েটি কে? কেন আমাদের খবরটা জানাল? পথভ্রষ্ট করার জন্যেও তো হতে পারে!’
‘তা হতে পারে। কিন্তু তা হয়নি। গ্রেট বিয়ারকে যতদূর জেনেছি, তারা এ কাজ করবে না। কারণ এ কাজ করার তাদের প্রয়োজন দেখি না। আমরা যদি কোন তারিখ জানতাম, তাহলে আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্যে এ তারিখ তারা দিতে পারতো। তাছাড়া আমরা যদি তাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের দৃষ্টি একটি দিনের দিকে নিবদ্ধ রেখে অন্য কোন দিনে তাদের ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে তারা চেষ্টা করতো। কিন্তু ঘটনা তা নয়।’
‘তাহলে মুসা ভাই টেলিফোন কি আমাদের সঠিক সংবাদ দিয়েছে?’
‘আমি নিশ্চিত আজিমভ।’
‘আমার বিস্ময় লাগছে মুসা ভাই, কে, কেন টেলিফোন করল? নিশ্চয় গ্রেট বিয়ারের কেউ নয়!’
‘আমার উপলব্ধি যদি মিথ্যা না হয় তাহলে আমি বলব টেলিফোনের সে কণ্ঠটা তাতিয়ানার।’
‘তাতিয়ানার?’
‘কেন বিস্মিত হচ্ছ?’
‘বিস্মিতই বটে। সেদিন যে সহযোগিতা সে করেছে সেটা ছিল আপনাকে বাঁচানোর জন্য। কাজটা গ্রেট বিয়ারের বিপক্ষে গেছে, কিন্তু তাতিয়ানা গ্রেট বিয়ারের বিরোধী হিসাবে সে কাজটা করেনি।’
‘ঠিক বলেছ আজিমভ। তবু বলছি টেলিফোনটা তাতিয়ানারই হবে।’
‘এখন আমাদের কি করণীয় মুসা ভাই ?’
‘আজ উনিশ তারিখ, চল আজিমভ জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাই।’
‘খুব ভালো হয় মুসা ভাই। দূর থেকে নির্দেশ দিয়ে কোন কাজ হবে না।’
‘আজই যাবার ব্যবস্থা কর আজিমভ।’
সালাম জানিয়ে আজিমভ চলে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে ডেকে বলল, ‘যাওয়ার কি ব্যবস্থা করবে বলে ভাবছ?’
‘হেলিকপ্টার। একদম গিয়ে রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নামা যাবে না হেলিকপ্টার?’
‘হেলিকপ্টার নিয়ে ওখানে নামার অর্থ সবাইকে জানিয়ে দেয়া যে রাজধানী থেকে বড় কেউ রুগুনে এল। আমরা কিংবা বড় কেউ রাজধানী থেকে রুগুনে যাচ্ছে একথা আমরা শত্রুদের জানতে দিতে চাই না।’
‘এ দিকটা চিন্তা করিনি মুসা ভাই। আপনাকে ধন্যবাদ।’
একটু থামল আজিমভ। তারপর বলল, ‘তাহলে কোন পথটা আমাদের জন্যে ভালো হবে মুসা ভাই?’
‘কার নিতে পার, জীপও নিতে পার।’
‘ঠিক আছে।’ বলে আজিমভ বেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যার পরপরই আহমদ মুসা ও আজিমভ রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌছল ।
রুগুনে জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটা ছোট জনপদ । রুগুনে মাত্র একটা আবাসিক হোটেল এবং একটি সরকারী রেস্ট হাউজ। আবাসিক হোটেলটি প্রায় সব সময় পর্যটকে ঠাসা থাকে । সরকারী লোক ও রাষ্ট্রীয় মেহমান কেউ এলে তারা উঠে সরকারী রেস্ট হাউজ।
কিন্তু আহমদ মুসারা গিয়ে উঠল রুগুন জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অফিস ও আবাসিক এলাকার ভেতরে জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিজস্ব গেস্ট হাউজে।
আহমদ মুসাদের অভ্যর্থনা জানাল জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রশাসক চীফ ইঞ্জিনিয়ার আলী ইব্রাহিমভ এবং চীফ সিকুরিটি অফিসার আবু জাফরভ।
ওরা সকলে গিয়ে বসল গেস্ট হাউজের ড্রইং রুমে।
আহমদ মুসা জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রশাসক চীফ ইঞ্জিনিয়ার আলী ইব্রাহিমভ এবং চীফ সিকুরিটি অফিসার আবু জাফরভের দিকে চেয়ে বলল, ‘খুশী হলাম, আপনাদের দু’জনকেই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন।’
আলী ইব্রাহিমভ এবং আবু জাফরভ দু’জনেই উঠে দাঁড়াল। দু’জনেই বলে উঠল এক সাথে, ‘জনাব আমাদের কে আপনি বলে সম্বোধন করলে খুব দুঃখ পাব, আমরা আপনার কর্মী । তাছাড়া ……’
আলী ইব্রাহিমভ বয়সে আহমদ মুসার চেয়ে বড় কিন্তু সাইমুমের কর্মী সে। কাজাখ অঞ্চলে সে কাজ করতো। তাঁকে আহমদ মুসা এর আগে দেখেনি। আর আবু জাফরভের নাম শুনেনি আহমদ মুসা। বয়সে আহমদ মুসার মতই।
‘তাছাড়া কি?’ ওদেরকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল আহমদ মুসা ।
‘আমি শাহীন সুরাইয়ার স্বামী আর আবু জাফরভ বিয়ে করেছে ফায়জাভাকে।’ বলল ইব্রাহিমভ ।
‘কোন শাহিন সুরাইয়া, কোন ফায়জাভা?’ এই প্রশ্ন আহমদ মুসার মুখ থেকে যেন ঝড়ের মত বেরিয়ে এল। আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসেছে সোফায়। তার দুই চোখে বিস্ময় ও বেদনার উজ্জ্বল্য।
ওরা উত্তর দেবার আগে আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, ‘তুঘরীল তুগানের মেয়ে ফায়জাভা আর শাহীন সুরাইয়া রশীদভের বোন?’
পশ্চিম উজবেকিস্তানের বিখ্যাত সারাকায়া গ্রামের রশিদভ পশ্চিম উজেবেকিস্তানের প্রথম শহীদ। সে ছিল বিপ্লবেরএকটা স্ফুলিংগ, যে স্ফুলিংগের সমাহার পুড়িয়ে ছারখার করেছিল মধ্যে এশিয়ার কম্যুনিস্ট শাসনকে। আর তুঘরীল তুগান ঐ সারাকায়া অঞ্চলের একজন বিখ্যাত কম্যুনিস্ট কর্মকর্তা। রশিদভরা তার চোখ খুলে দেয় এবং বিদ্রোহী হিসাবে তুঘরীল তুগান কম্যুনিস্ট সরকারের হাতে শাহাদাত বরণ করে। এইভাবে ফায়জাভা হারায় তার পিতা-মাতা, বাড়ি-ঘর। পরে জীবন সাথী হিসাবে বেছে নেয় রশিদভকে। আর রশিদভের বোন শাহীন সুরাইয়া কম্যুনিস্ট সরকারের একজন গোয়েন্দা অফিসার এবং সাইমুমের কর্মী।
‘জি, হ্যাঁ।’ আহমদ মুসার প্রশ্নের জবাবে আলী ইব্রাহিমভ, আবু আজিমভ এক সাথে বলে উঠল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দু’জনকে এক সাথে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘ওঁরা দুই মহান শহীদের স্মৃতি চিহ্ন। কোটি জনতার ভীড় থেকে ওদের এইভাবে আবার সন্ধান পাব ভাবিনি, তোমাদের খোশ আমদেদ জানাচ্ছি।’
আহমদ মুসা তার আসনে ফিরে এল। তার চোখের দুই কোণায় দুই ফোটা অশ্রু । কে জানে এই অশ্রু আনন্দের না বেদনার।
‘ওরা কেমন আছে?’ ইব্রাহিমভ ও জাফরভের দিখে চেয়ে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
আনন্দ ও আবেগের আতিশয্যে অশ্রু গড়াচ্ছিল ইব্রাহিমভ ও জাফরভের চোখ দিয়ে।
‘ভালো আছে। ওরা এখানে এসেছে মুসা ভাই।’
‘কোথায়?’
‘পাশের রুমে। আপনি আসছেন শোনার পর ওদের বাধা দিয়ে আর রাখা যায়নি।’
ড্রইংরুমের পাশেই আরেকটা রুম। ওটা মেয়েদের ড্রইংরুম। মাঝখানের দরজায় ঝুলছে একটা পর্দা।
পর্দার ওপারেই দাঁড়িয়েছিল শাহীন সুরাইয়া এবং ফায়জাভা। আনন্দে–বেদনায় তাদেরও গন্ড ভেসে যাচ্ছে অশ্রুতে। অতীত যেন তাদের সামনে জীবন্ত রূপ নিয়ে হাজির । রক্তে গোসল করা শহীদ রশিদভ ও তুঘরীল তুগানদের তারা দেখতে পাচ্ছে যেন সামনে দুই চোখ দিয়ে।
চোখ মুছে সামলে নিয়ে শাহীন সুরাইয়া আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি আমার এবং ফায়জাভার সালাম নিন।’
সালাম গ্রহণ করে আহমদ মুসা বলল, ‘খুশী হলাম বোন তোমাদের সন্ধান পেয়ে, তোমাদের সব খবর জেনে।’
‘ভাবী মেইলিগুলির মর্মান্তিক খবর আমাদের সকলকে কাঁদিয়েছে। আল হামদুলিল্লাহ, আল্লাহ্‌ আপনাকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিয়েছেন।’ বলল শাহীন সুরাইয়াই।
‘শুকরিয়া বোন। তুমি এখন কি করছ?’
‘তাজিকিস্তানের প্রাদেশিক মহিলা গোয়েন্দা ইউনিটে আছি।’
‘কোন দায়িত্বে আছ?’
‘ডাইরেক্টর অপারেশন।’ জবাব দিল গোয়েন্দা চীফ আজিমভ ।
‘খুশী হলাম। ফায়জাভা, সারাকায়ায় তুমি যাও? সব ফেরত পেয়েছ নিশ্চয়।’
‘জি পেয়েছি। কিন্তু আমি কোন দিন সারাকায়ায় যাইনি। ভয় করে আমার অতীতের মুখামুখি ……’
কান্নায় কথা বন্ধ হয়ে গেল ফায়জাভার।
আহমদ মুসাও হঠাৎ কোন কথা বলতে পারল না। কি বলবে ভেবে পেল না।
ওদিকে দু’হাতে মুখ গুঁজে কাঁদছিল ফায়জাভা। তার মাথায় হাত বুলাচ্ছিল শাহীন সুরাইয়া।
‘কেঁদ না বোন। তুঘরীল তুগান ও রশিদভদের রক্ত আর তোমার আর সুরাইয়ার মত শত মেয়ে, শত বোন, শত স্ত্রী ও শত মায়ের অশ্রু দিয়েই তো গড়া আজকের স্বাধীন মুসলিম আবাসভূমি মধ্যে এশিয়া মুসলিম প্রজাতন্ত্র। সতরাং আর কান্না নয়।’
এই সময় ড্রইংরুমে প্রবেশ করল গেস্ট হাউজের ইনচার্জ আমিনর। বলল, ‘টেবিলে নাস্তা রেডি জনাব।’
কয়েক’শ মাইল ড্রাইভ করে এসে ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিল আহমদ মুসাদের। নাস্তার কথা শুনেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘সুরাইয়া-ফায়জাভাদের নাস্তা দিয়েছ?’
‘ধন্যবাদ, আমরাও পেয়েছি জনাব।’ পর্দার ওপার থেকে বলল শাহীন সুরাইয়া।
আহমদ মুসার সাথে সাথে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চলল ডাইনিং রুমের দিকে।
নাস্তা শেষে আহমদ মুসা, আজিমভ, ইব্রাহিমভ এবং জাফরভ এসে বসল আহমদ মুসার কক্ষে, যা তার থাকার জন্য বরাদ্দ হয়েছে।
‘এখন কাজের কথা শুরু করা যাক। প্রথমে তোমরা বল, ‘এই রুগুন পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তার কি ব্যবস্থা তোমরা করেছ?’ বসতে বসতেই আহমদ মুসা বলে উঠল।
চীফ ইঞ্জিনিয়ার আলী ইব্রাহিমভ জাফরভের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমিইতো তত্ত্বাবধান করছ সবকিছু। প্রথমে তুমি বললেই ভাল হয় জাফরভ।’
জাফরভ নড়ে চড়ে বসল। আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলতে শুরু করল, ‘রুগুন ড্যাম (বাঁধ) এলাকায় আমাদের যে স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, তাতেই ড্যাম ও ড্যাম এলাকায় কোন লোক পাশ ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না। পর্যটকদেরকে পরিদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়, কিন্তু পুরোপুরি চেকিং এর পর। চারটা শিফটে সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়া হয় ড্যাম এলাকা। বিশেষ জরুরী ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে ড্যাম এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ড্যাম-এর দুই প্রান্তে দুটি সিকুরিটি পোস্ট বসানো হয়েছে। ড্যামের নিচে নদীর দু’ধারে নদীর পানি স্তর বরাবর অনেকগুলো গার্ড-পোস্ট বসানো হয়েছে। ড্যাম-এর দু’পাশেই নদীর অনেকটা স্থান বরাবর এই গার্ড পোস্টগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এই সব গার্ড পোস্ট ও সিকুরিটি পোস্টের বাইরের এলাকায় ড্যাম-এর চারদিক জুড়ে বৃত্তাকারে দৃষ্টির অগোচরে ইলেকট্রনিক তার পাতা হয়েছে কয়েকসারি। ইঁদুরও যদি তারগুলো অতিক্রম করে, তাহলে আমরা জানতে পারব। ইলেকট্রনিক ফাঁদ এলাকার বাইরে চারদিকে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমাদের প্রহরীরা বিভিন্ন ছদ্মবেশে। এই এলাকায় নতুন লোক প্রবেশ করলেই তাকে অনুসরণ এবং দরকার হলে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয়া আছে।’
থামল জাফরভ।
‘নদী পথের দিকটা তোমরা ভাবনি?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘জি। বলতে ভুলে গেছি। নদী পথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও করা হয়েছে। ড্যাম-এর দুই পারে নদীতে আধা মাইলের মধ্যে দুটি নৌ-ফাঁড়ি খোলা হয়েছে। ফাঁড়ির প্রত্যেকটিতে অর্ধ-ডজন করে স্পীড বোট। পরিচিত ও অপরিচিত কোন নৌ-যানই ফাঁড়ি অতিক্রম করে ড্যাম-এর দিকে যেতে পারবেনা, এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফাঁড়ির স্পীড বোটগুলো ফাঁড়ি থেকে ড্যাম পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে ঘোরা-ফেরা করছে।’
কথা শেষ করল জাফরভ।
নিরাপত্তা বর্ননা শুনে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হলো আহমদ মুসার। খুশী হল সে। বলল, ‘যে ব্যবস্থা তোমরা করেছ তাঁকে নিশ্ছিদ্রই মনে হচ্ছে।’
বলে চোখ বন্ধ করল আহমদ মুসা। মুহুর্তকাল পরে চোখ খুলে বলল, ‘কবে থেকে এই ব্যবস্থা তোমরা গ্রহন করেছ?’
‘আজ দশ দিন।’ বলল আলী ইব্রাহিমভ।
‘দশ দিন। কিন্তু আজ সকালে আমরা জানতে পেরেছি রুগুন ড্যাম ধ্বংসের দিন হলো একুশ তারিখ।’
একুশ তারিখ উচ্চারণ করতেই ইব্রাহিমভ ও জাফরভের মুখের ওপর একটা কালোছায়া নামল।
‘আমি মনে করি’ বলে চলল আহমদ মুসা, ‘এই একুশ তারিখটা নির্ধারণ করেছে তারা দশ দিন আগে নয়, পরে। অর্থাৎ তোমরা জরুরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের পরও তারা নিশ্চিত যে তারা ড্যাম ধ্বংস করতে পারবে। অথবা এমনও হতে পারে দশ দিন আগেই তারা ড্যাম ধ্বংসের সময় একুশ তারিখ নির্ধারণ করেছে। তোমরা জরুরী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরও তারা এই তারিখ পরিবর্তনের কোন চিন্তা করেনি। কারণ লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে তারা নিশ্চিত।’
‘কিন্তু কিভাবে? আপনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা তো শুনলেন।’ বলল আলী ইব্রাহিমভ শুকনো কন্ঠে।
‘সেটাই তো সমস্যা। এসমস্যার সমাধান হলে তো আর কোন কথাই ছিল না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আবার আমাদের মুল্যায়ন করতে হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা করা হয়েছে তাতে কোন ফাঁক আছে কিনা।’ বলল আজিমভ।
‘যাদের নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তারা সবাই ঠিক আছে কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। হেড কোয়ার্টারে নির্দেশ পাবার পর আমরা সবাইকে পরীক্ষা করেছি।’ বলল ইব্রাহিমভ।
‘তাছাড়া আমরা এখানে একটা নিয়ম অনুসরণ করছি। যেই এখান থেকে বাইরে যাক, তাকে সিকুরিটির একজন লোক অনুসরণ করে থাকে। সে কোথায় যায়, কার সাথে দেখা করে, এ রেকর্ড আমরা রাখি।’ বল জাফরভ।
‘বাঃ চমৎকার। বর্তমান জরুরী পরিস্থিতিতে এটা খুবই দরকার। ড্যাম-এর মত স্পর্শকাতর জায়গায় যারা কর্মরত, তাদের ক্ষেত্রে এটুকু খোঁজ বোধ হয় রাখা দরকার। তবে সাধারনভাবে এ ধরনের খোঁজ-খবর নেয়া ঠিক নয়। এতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়, তার মৌলিক অধিকার লংঘিত হয়। সব সময় মানুষকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা, খুঁজে খুঁজে কারও দোষ বের করা, ইত্যাদির মত কাজকে ইসলাম অনুমোদন দেয় না।’
‘সমস্যার তো সমাধান হলো না মুসা ভাই, ওরা তাহলে কোন ভরসায় একুশ তারিখকে ড্যাম ধ্বংসের তারিখ ঠিক করল?’ বলল আজিমভ।
‘সেটাইতো প্রশ্ন, এখানে যদি সব ঠিকই থাকে,তাহলে ওরা এতবড় আশা করছে কিসের ভিত্তিতে!’
আহমদ মুসা থামল।
কেউ কোন কথা বলল না।
সবাই নিরব। ভাবছে সবাই।
অনেক্ষণ পর মুখ খুলল আহমদ মুসাই। বলল, ‘আজ আর কোন কথা নয়। ভাব সবাই। কালকে ভোরে আমি ড্যাম এলাকা দেখব। ইব্রাহিমভ তুমি আমাকে ড্যাম ও ড্যাম এলাকার ছবি ও মানচিত্র দিয়ে যাবে।’
আহমদ মুসা বাদে সবাই উঠে দাঁড়াল।
পরদিন ফজর নামাজের পর আহমদ মুসা সবাইকে নিয়ে ড্যাম এলাকা ঘুরে ফিরে দেখল। দেখে খুশী হলো সে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোন ফাঁক দেখতে পেল না।
প্রায় সারাদিন চিন্তা করে এবং চারদিক ঘুরে কাটিয়ে দিল আহমদ মুসা। ড্যাম এবং চারদিকের এলাকার প্রতি ইঞ্চি জায়গা তারা সন্ধানী চোখ দিয়ে দেখেছে। কিন্তু সন্দেহের কোথাও কিছু পায়নি। রুগুন ড্যাম প্রকল্প শুধু নয়, রুগুন জনপদটিতে যারা বাস করছে, তাদের তালিকা এবং পরিচয়ও আহমদ মুসা পরীক্ষা করেছে, কিন্তু তাদের কারও পরিচয়ের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু পায়নি।
তখন পড়ন্ত বিকেল। আহমদ মুসা, আজিমভ, ইব্রাহিমভ ও জাফরভ দাঁড়িয়েছিল ড্যামের ওপর।
বখশ নদী সেখানে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত।
ড্যামের দক্ষিণ দিকে আটকে থাকে পানি সৃষ্টি করেছে বহু মাইল বিস্তৃত হ্রদের। দেখে মনেই হয় না এটা কোন নদী। ড্যামের এই দক্ষিণ পারে পানির স্তর প্রায় ত্রিশ ফুট নিচুতে। আর উত্তর পারে নদীতে পানির স্তরও ত্রিশ ফুট নিচে।
আহমদ মুসা ড্যাম-এর রেলিং-এ দুই কনুইয়ের ঠেস দিয়ে একটু ঝুকে পড়ে দক্ষিণের বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিল।
আহমদ মুসার মনে চিন্তার ঝড়। বাঁধ ভেঙ্গে গেলে এ ধরণের বাঁধ তৈরী করতে লাগবে হজার হাজার কোটি টাকা। বাঁধে আটকে থাকা পানি ফ্লাস ফ্লাড আকারে অবিশ্বাস্য গতিতে অগ্রসর হয়ে শতজনপদ ও শস্যক্ষেত নিশ্চিহ্ন করবে। বাঁধের উজানের সেচ-প্রকল্পের আওতাধীন লাখ লাখ একর জমি বিরাণভুমিতে পরিণত হবে। সেই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হবার ফলে অন্ধকারে ডুবে যাবে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কেমেনিস্তানের একটা অংশ। সদ্যজাত মধ্য এশিয়া মুসলিম প্রজাতন্ত্রের এই ক্ষতিই করতে চাচ্ছে গ্রেট বিয়ার। এইভাবেই অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিতে চায় এ মুসলিম প্রজাতন্ত্রটিকে। ইতিমধ্যেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
উদ্বেগে ভরে গেল আহমদ মুসার মন। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়। রাত বারটার পরই শুরু হবে একুশ তারিখ। তারা যদি তাদের সময় রক্ষার ব্যাপারে সিরিয়াস হয়, তাহলে রাত বারটার পর যে কোন সময় তারা আঘাত হানবে। গ্রেট বিয়ারকে সে এ পর্যন্ত যতটা জেনেছে, তাতে বুঝেছে ওরা যা বলবে তা জীবন দিয়ে করার চেষ্টা করবে। সুতরাং তারা এই রুগুন ড্যাম-ধ্বংস করার জন্যে অগ্রসর হবেই। ওরা যেমন শক্তিশালী ও সাহসী, তেমনি বিজ্ঞান ও কারিগরী দিক দিয়ে অনেক বেশী উন্নত।
বেদনায় ভরে গেল আহমদ মুসার হৃদয়। তাহলে কি চোখের সামনে এই রুগুন ড্যাম-এর ধ্বংস তাদেরকে দেখতে হবে!
বখশ নদীর নীল অথৈ পানির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল আহমদ মুসার।
হঠাৎ আহমদ মুসা দৃষ্টির প্রান্তসীমায় নদীর বুকে কয়েকটা বিশাল বুদবুদ উঠল। বুদবুদগুলো ভেঙ্গে মিশে গেল পানির সাথে। মনে হলো বিশাল কোন তিমি তার বুক ভরা নিঃশ্বাস ছুড়ে দিল ওপরে, পানির বাইরে। আহমদ মুসার হঠাৎ মনে হলো, পানির নীচে শুধু তিমি কিংবা মাছই থাকে না, থাকতে পারে, যেতে পারে আরও অনেক কিছু। পানির ভেতরটা স্বতন্ত্র একটা জগৎ। এই যে ড্যাম যার ওপর সে দাঁড়িয়ে আছে, তা যেমন রয়েছে পানির ওপরে, তেমনি পানির নিচেও এর বড় একটা অংশ রয়েছে।
একটা অংশ রয়েছে। সংগে সংগেই আহমদ মুসার মনে ঝড়ের বেগে এসে প্রবেশ করল, পানির ওপরের এলাকা তো তারা তন্ন তন্ন করে দেখেছে, কিন্তু পানির তলার কথা তো তাদের মনে হয়নি!
কথাটা মনে হবার সাথে সাথে আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা গভীর চিন্তায় ডুবে আছে, এটা আজিমভ, ইব্রাহিমভ, জাফরভ সবাই খেয়াল করেছিল। কথা বলতে চেয়েছিল জাফরভ, ইশারায় আজিমভ তাকে নিষেধ করেছিল।
আহমদ মুসা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াতেই সবাই তাকাল তার দিকে।
‘আলী ইব্রাহিমভ তোমাদের এখানে ডুবুরীর কমপ্লিট সেট আছে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘আছে।’ বলল ইব্রাহিমভ।
‘চল এখন যাই। ঠিক মাগরিবের পর আমি নামবো নদীতে।’ বলে আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল।
‘ষড়যন্ত্র পানির নিচে পরিব্যাপ্ত হতে পারে বলে কি আপনি মনে করছেন মুসা ভাই?’ জিজ্ঞাসা করল আজিমভ।
‘এটা খুবই সম্ভব আজিমভ। পানির নিচটা না দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।’
কথাটা শেষ করেই জাফরভের দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাদের সংগ্রহে কি ‘New world of Explosives’ বইটা আছে?’
‘জি জনাব।’
‘বইটা এখনি আমি চাই জাফরভ।’
‘ঠিক আছে, আমি নিয়ে আসছি এখনি।’ বলে দৌড় দিল জাফরভ।
মাগরিবের নামাজের পর আহমদ মুসাসহ ওরা চারজন নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। তারপর স্পীড বোটে চড়ে নদীর মাঝ বরাবর চলে এল। প্রয়োজনীয় যা পরামর্শ দেবার আগেই দিয়েছিল। ডুবুরীর পোশাকে সজ্জিত হয়ে নদীতে নেমে পড়ল আহমদ মুসা।
নদীর বুকে তখন অন্ধকার। ড্যামে যে সার্চ লাইট রয়েছে তার আলো এ পর্যন্ত পৌঁছেনি।
নদীর যে স্থানে বিকেলে বুদ্‌বুদ উঠতে দেখেছিল, সেখানেই নামল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার অবচেতন মনে শুরুতেই একটা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছিল যে, বিশাল ঐ বুদ্‌বুদ মাছ বা জলজ কোন প্রাণী থেকে উৎপন্ন হয়নি কিংবা নদী-তলার কোন গ্যাসীয় ক্রিয়াকান্ড নয়। কিন্তু এর কোন পরিস্কার ধারণা আহমদ মুসার কাছে ছিল না। কিন্তু ‘New world of Explosives’ বইটা বিকেলে পড়তে গিয়ে তার মনে পড়েছে সর্বাধুনিক এক ধরনের ডুবুরীর পোশাক আছে যা থেকে নিঃশ্বাস বুদ্‌বুদের আকারে সরাসরি ওপরে উঠে যায় না। একটা প্লাস্টিক টিউব এর মধ্যে দিয়ে তা দূরের একটি গ্যাস-মশকে গিয়ে জমা হয়। এই গ্যাস-মশক তার ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বায়ু মাঝে মাঝে ছেড়ে দেয় যা বুদ্‌বদ আকারে ওপরে উঠে যায় এবং সেটা ঘটে প্রতি তিন ঘন্টা পরপর। আর এ বুদ্‌বদ উঠার ধরনটা এমন যা থেকে আঁচ করা যাবে না যে, এটা কোন ডুবুরীর নিঃশ্বাস। মনে হবে ব্যাপারটা নদীতলা বা সমুদ্রতলের কোন গ্যাস ম্যাকানিজম- এর ফল। এসব জানার পর আহমদ মুসা এখন নিশ্চিত যে পানির তলায় শত্রু পক্ষের আগমন ঘটেছে।

পানিতে নামার পর আহমদ মুসা সোজা নেমে গেল নদীর তলায়। অন্ধকার পানির তলায় ডুবুরীরা যে ওয়াটার টর্চ ব্যবহার করে, আহমদ মুসা সে ওয়াটার টর্চ জ্বালায়নি। শত্রুদের নজর এড়াবার জন্যেই আহমদ মুসা এই কৌশল অবলম্বন করেছে। ওয়াটার টর্চের বদলে আহমদ মুসা ব্যবহার করছে অন্ধকার পানির তলায় ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ ধরনের ইনফ্রারেড ওয়াটার গগলস। এই গগলস অন্ধকার পানির তলাকে দিনের মতই স্বচ্ছ করে তোলে।
নদীর তলা পর্যন্ত নেমে সবে আহমদ মুসা চারদিকে নজর বুলাতে শুরু করেছে, এমন সময় দেখল, বাঁধের দিক থেকে দুটো অগ্নি গোলক একটু এঁকে বেঁকে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। দেখেই আহমদ মুসা বুঝল ও দু’টো ডুবুরীর টর্চ।
ধক্‌ করে উঠল আহমদ মুসার বুকটা। ওরা কি দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসা দ্রুত সরে গেল নদীর পশ্চিম কিনারায়। পেয়ে গেল দু’টো বড় বড় পাথর। পাথরের আড়ালে দেহটা লুকিয়ে ফেলে তাকিয়ে রইল মাঝ নদীর দিকে। দেখতে পেল, ঠিকই অগ্নি গোলক দু’টি দুইজন ডুবুরীর হাতের দু’টি টর্চ।
আহমদ মুসা কিছুক্ষণ আগে মাঝ নদীতে যেখানে নেমেছিল ডুবুরী দুক’জন সে জায়গাটা অতিক্রম করে আরও দক্ষিণে চলে গেল। আহমদ মুসা দেখল, তাদের ডুবুরী-পোশাক বিশেষ ধরনের যার পেছনে রয়েছে গ্যাস-মশক।
হাফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। ওরা দেখতে পায়নি তাকে। তার চোখে ইনফ্রারেড গগলস ছিল বলেই আলো দু’টোকে অত কাছে মনে হয়েছিল। আসলে ওদের ঐ টর্চের আলো অত দূরে আসার কথা নয়।
আহমদ মুসা যেমন খুশী হলো ওরা দেখতে না পাওয়ায়, তেমনি আবার উদ্বেগে ভরে গেল তার মন। শত্রুরা পানি পথেই তাদের রুগুন ড্যাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছে।
ডুবুরী দু’জন চলে গেলে আহমদ মুসা ভাবল, ওরা কি ওদের কাজ শেষ করে চলে গেল? নদীর পানিতে সেই বড় বুদ্‌বুদটা দেখেছে সে বেলা পাঁচ টায়। এখন রাত সাড়ে সাতটা। যদি ধরা যায় তারা ঐ পাঁচটার সময়ই এসেছিল এখানে, তাহলে আড়াই ঘন্টা সময় তারা এখানে ছিল। এই আড়াই ঘন্টা সময়ে কি ড্যাম ধ্বংসের ব্যবস্থাপনা শেষ করল এবং তারপর চলে গেল? কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবল ড্যাম ধ্বংসের ব্যবস্থাপনা শেষ না করেই কি তারা ড্যাম ধ্বংসের তারিখ ঘোষণা করেছিল? ব্যবস্থা যদি তারা আগেই করে থাকে, তাহলে তারা আজ পাঁচ টায় এসেছিল কেন এবং এতক্ষণ এখানে কি করল?
প্রশ্নগুলোর সমাধান এই মুহূর্তে আহমদ মুসার কাছে নেই।
আহমদ মুসা নদী তীরের কাছাকাছি এসে ধীরে ধীরে এগুলো ড্যামের দিকে।
নদীর যেখানে নেমেছিল, সেখান থেকে ড্যামের দূরত্ব প্রায় তিন’শ গজ।
এই তিন’শ গজ অতিক্রম করতে আহমদ মুসার সময় লাগল ১০ মিনিট।
আহমদ মুসা ড্যামের গোড়ায় পৌছে পরীক্ষার জন্যে প্রথমে ড্যামের মাঝের মূল পিলারটাকে বেছে নিল। পিলারের শীর্ষদেশ থেকে পিলারের গায়ে সতর্ক নজর বুলিয়ে নামতে থাকল নিচের দিকে।
একদম পিলারের গোড়ায় গিয়ে আহমদ মুসা পেয়ে গেল তার আকাঙ্খিত বস্তুটা। পিলার এবং ড্যামের যে কৌণিক মিলন কেন্দ্রটা রয়েছে সেখানে পিলারের বেদির ওপর পাতা রয়েছে বিশাল আকারের ভয়াবহ এক প্লাস্টিক ডিনামাইট। ওজন পাঁচ কেজির কম হবে না। এ ধরনের একটি ডিনামাইট দিয়ে কয়েকটি ড্যামকে একসাথে ধুলায় পরিণত করা যায়।
বুকটা কেঁপে উঠল আহমদ মুসার।
ডিনামাইটের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে চারদিকে চাইতে গিয়েই দেখতে পেল সেই দু’জন ডুবুরী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের দু’হাতে দু’টি টর্চ, অন্য হাত দু’টিতে ওয়াটার গান।
আহমদ মুসা সংগে সংগেই নিজের দেহটাকে পিলারের দরজার কৌণিক ভাঁজটার দিকে ছুঁড়ে দিল। আর সাথে সাথেই বুকের ওপর ঝুলে থাকা টেনিস বলের মত ব্ল্যাক স্পোক বোমা টান দিয়ে ছিড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলল।
এক সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিকটা।
ঠিক এই সময়েই মনে হয় ফিট খানেক দূরে স্টীলের দরজার গা থেকে ধাতব শব্দ ভেসে এল। আহমদ মুসা বুঝল, ওদের ওয়াটার গান থেকে আসা গুলির শব্দ ওটা।
‘ব্ল্যাক স্পোক বোমা’ ওদের টর্চ, চোখ সব কিছুকেই অকেজো করে দিয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসা ‘ইনফ্রারেড গগলস’- এর জন্যে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়নি।
আহমদ মুসা নিঃশব্দে এগিয়ে গেল।
ওরা ব্ল্যাক স্পোক বোমার আওতা থেকে বেরিয়ে যাবার জন্যে দ্রুত পিছু হটছিল।
আহমদ মুসা ওদের কাছাকাছি গিয়ে ওয়াটার গান তাক করে বলল, ‘তোমরা গান… …’
আর এগুতে পারল না আহমদ মুসার কথা।
আহমদ মুসার মুখ থেকে শব্দ বের হবার সাথে সাথেই তাদের কান খাড়া হলো, তার সাথেই শব্দ লক্ষ্যে ওদের বন্দুক উঠে এল এবং গুলি বর্ষিত হলো।
অবিশ্বাস্য দ্রুততা এবং অদ্ভুত নিশানা ওদের। আহমদ মুসা দু’পায়ে পানি টেনে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করছিল, আর দু’হাতে তাক করেছিল বন্দুক। কথা বলা অবস্থাতেই তার দেহটা বামদিকে একটু সরে গিয়েছিল। এই সরাটাই বাঁচিয়ে দিল আহমদ মুসাকে। তবু একটা গুলি গিয়ে আঘাত করল ডান বাহুর গোড়ার পেশিতে। পেশির একটা অংশকে যেন গুলিটা খাবলা দিয়ে তুলে নিয়ে গেল। আরেকটা গুলি তার মাথা ও বুকের নিচ দিয়ে ছুটে গিয়ে পায়ের সাথে লাগানো ডুবুরী পোশাকের লেজটার একটা অংশ ছিড়ে নিয়ে গেল। চিন চিন করে উঠল ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল। গুলি আহত করেছে আঙুলটাকে।
ওদের অকল্পনীয় ক্ষ্রিপ্রতা এবং শব্দ লক্ষ্যে তাদের অবিশ্বাস্য নিশানা দেখে আহমদ মুসা সত্যিই বিস্মিত হলো। পানির ভেতরেই যদি ওরা এরকম তাহলে ডাঙ্গায় ওরা কেমন!
কিন্তু ওরা দ্বিতীয় গুলি করার সুযোগ পেল না । আহমদ মুসার ওয়াটার গান থেকে পরপর দু’টি গুলি নিক্ষিপ্ত হল। গুলি দু’টি দু’জনের মাথা গুড়িয়ে দিল। ওদের হাত থেকে টর্চ এবং বন্দুক খসে পড়ল। ধীরে ধীরে ওদের দেহও নেমে যেতে লাগল নিচে, নদীর তলায়।
আহমদ মুসা কিছুক্ষণ ওদের দিকে চেয়ে থেকে তারপর নিশ্চিত হয়ে এগুলো ড্যামের সেই পিলারের দিকে যেখানে পাতা রয়েছে প্লাস্টিক ডিনামাইট ।
যেতে যেতে আহমদ মুসা আহত ডান বাহুতে হাত বুলাল এবং মনে মনে বলল, ওদেরকে আগে গুলি করতে দেয়া ঠিক হয়নি।
প্রথমেই সে তাদেরকে আঘাত না করে ভুল করেছে। কিন্তু আবার ভাবল, শত্রু কে শান্তির একটা সুযোগ না দিয়ে আঘাত করা বা হত্যা করা ইসলামের মৌল নীতিমালার সাথে মিলে না। আহমদ মুসা তাদেরকে সেই সুযোগই দিতে গিয়েছিলেন। সুতরাং আহমদ মুসা অন্যায় করেনি। মন থেকে আবার পাল্টা জবাব উঠল, যুদ্ধ ক্ষেত্রে কিন্তু এ নিয়ম খাটে না। মন আবার বলল, খাটে না একথা ঠিক তবে মানুষকে একবার শেষ সুযোগ দেয়ার মধ্যে আল্লাহর বাড়তি অনুগ্রহ আশা করা যায়।
আহমদ মুসা গিয়ে পৌঁছল ডিনামাইটটির কাছে।
আবার সে পরিপূর্ণভাবে তাকাল ডিনামাইটটির দিকে। চরম এক বিস্ময় এসে তাকে আচ্ছন্ন করল, এত বড় প্লাস্টিক ডিনামাইট সে এর আগে কোথাও দেখেনি।
আহমদ মুসা ডিনামাইটটি পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, ডিনামাইটটি দূর নিয়ন্ত্রিত নয়। ডিনামাইট এর ঘড়িতে তখন ৩টা ৩০ মিনিট, এসে দেখেছিল ৩টা ৩৩মিনিট । আহমদ মুসা নিজের ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল ৮টা ৩১মিনিট। এই হিসাবে ডিনামাইট এর ঘড়িতে ‘জিরো’ আওয়ারে অর্থাৎ ঠিক ১২টা ১মিনিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে ডিনামাইটটির । ডিনামাইট টি দূর নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় খুশী হল আহমদ মুসা। দূর নিয়ন্ত্রিত হলে ইচ্চামত যে কোন সময় ওরা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারত।
কিন্তু আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল , ডিনামাইটটি স্বয়ংক্রিয়, তাহলে শত্রু পক্ষের ওরা দু’জন এখানে কি করছিল? জবাব পরক্ষণেই পেয়ে গেল। ডিনামাইট ঠিকমত আছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাহারা দিয়ে ওরা এটাই নিশ্চিত হতে চেয়েছিল।
আহত ডান হাত ভারী মনে হচ্ছে। সেই সাথে একটা যন্ত্রণাও ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেহে। এই অবস্থায় ডিনামাইটকে ‘ডিফিউজ’ করার চেষ্টা না করে এটাকে আস্ত তুলে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সে। সময় যেহেতু বেশ আছে, তাই অসুবিধা নেই এতে।
পিলারের বেদিতে ড্রিল করে তাতে পেরেক বসিয়ে পেরেকগুলোর সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল ডিনামাইটকে।
আহমদ মুসা বাঁধন কাটতে গিয়ে ভাবল, তার আগে সবগুলো পিলার এবং জায়গা সার্চ করে দেখা দরকার আর ডিনামাইট তারা পেতেছে কিনা । আহমদ মুসা তাই করল। ড্যাম এর প্রতিটি পিলার, প্রতিটি দরজা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে গিয়ে ড্যামের সিলিং এ আর দুটি ডিনামাইট পেল। এ ডিনামাইট গুলো এমন কৌশলে পাতা হয়েছিল যে সাধারন অনুসন্ধানে তা কিছুতেই চোখে পড়ার মত নয়। এক প্রকারের জল শ্যাওলার আড়ালে তা লুকানো ছিল। এ ডিনামাইট গুলোও স্বয়ংক্রিয়।
আহমদ মুসা আল্লাহ্‌র অশেষ শুকরিয়া আদায় করল আর দুটি ডিনামাইট খুঁজে পাওয়ার জন্য। আল্লাহ্‌ই তাকে আর অনুসন্ধানের পথে ঠেলে দিয়েছিলেন, তা না হলে প্রথম ডিনামাইটটি নিয়ে তার উঠে যাবার কথা।
তিনটি ডিনামাইট খুলে নিয়ে তার একার পক্ষে ওপরে উঠে যাওয়া সম্ভব নয়, নিরাপদ ও নয়। সুতরাং ওপর থেকে সাহায্য আনতে হবে।

এদিকে ড্যামের সামনের এলাকায় নদীতে স্পীড বোটে অস্থির ভাবে বেড়াচ্ছে আজিমভ , ইব্রাহিমভ এবং জাফরভ । দেড় ঘণ্টা হল আহমদ মুসা নেমেছে পানিতে, এখনও তার কোন খবর নেই। অনুসন্ধান কাজে এতটা সময় লাগার কথা নয় । কিছু ঘটেছে কি নিচে।
‘আর অপেক্ষা করা যায় না, আমাদের উচিত নিচে।’ বলল জাফরভ।
‘আমাদের নামাটা ভালও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। আহমদ মুসা ভাই এর সংকেত এখন আমরা পাইনি। তার পরিকল্পনার বাইরে আমাদের না যাওয়াই ভাল জাফরভ।’
‘তারও তো বিপদ হতে পারে?’ বলল ইব্রাহিমভ।
‘তবুও তার দেয়া সময় সীমা রাত ৯টার আগে আমরা নামবো না।’
‘তিনি নেতা, তিনি কেন প্রথমেই এসব ঝুকি নিতে এগিয়ে যান?’ বলল জাফরভ।
‘তিনি সত্যিকারের নেতা বলেই। বুদ্ধি ও শক্তির চূড়ান্ত লড়াইকালে তিনি কোন সময় কোন কর্মীকে সামনে এগিয়ে যেতে দেন না।’
ঠিক এই সময় তাদের বোট থেকে অল্প একটু দূরে ছোট ছোট দুটি রেডিয়াম বেলুন ভেসে উঠল । একটা শ্বেতাভ সবুজ, আরেকটা গাঁড় কমলা।
বেলুন দু’টির ওপর চোখ পড়তেই বোটের ওরা তিন জনেই আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে উঠল। আহমদ মুসার পাঠানও সংকেত তারা পেয়েছে। এই সংকেতেরই তারা অপেক্ষা করছিল চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে।
তারা বেশি খুশী হয়েছে সংকেতের ধরন দেখে। শ্বেতাভ সবুজ সঙ্কেতটি তাদের বিজয়ের প্রতীক। অর্থাৎ শত্রুর ওপর তারা বিজয় লাভ করেছে। আর কমলা রংয়ের সংকেতটির অর্থ হল বিস্ফোরক সংক্রান্ত বিপদ আছে, সাহায্য দরকার।
সংকেত দেখেই জাফরভ নদীর তীরে বোট অপেক্ষমান সিকুরিটি বিভাগের বিস্ফোরক কর্মীদের উদ্দেশ্য সংকেত দিল । সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এল ওরা ।
‘আলি ইব্রাহিমভ তুমি এখান অপেক্ষা কর। ওদের চারজনকে নিয়ে আমি এবং জাফরভ নেমে যাচ্ছি।’
বলে আজিমভ নেমে পড়ল নদীত । তার সাথে সাথে ওরা চারজন এবং জাফরভ।
পানিতে ডুব দেবার পরেই আজিমভ ডুবুরির পোশাক এর সাথে যুক্ত ওয়াটার-ওয়্যারলেস চালু করল। বলল, ‘মুসা ভাই, আমরা এসেছি আপনি কোথায়?’
‘ধন্যবাদ আজিমভ, ড্যাম এর গোঁড়ায় চলে এস।’ ভেসে এল আহমদ মুসার কণ্ঠ। আজিমভরা দ্রুত নেমে গেল ড্যাম-এর গোঁড়ায়।
দেখা হল আহমদ মুসার সাথে ।
আজিমভদের সালাম নিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আজিমভ তিনটি প্লাস্টিক ডিনামাইট পাতা হয়েছে। এস তোমাদের দেখিয়ে দেই। এগুলো এখানেই অকেজো করে দিতে হবে অথবা এখনি তুলে নিয়ে যেতে হবে।’
আহমদ মুসা তিনটি ডিনামাইট দেখিয়ে দিল। কাজে লেগে গেল নিরাপত্তা বিভাগের বিস্ফোরক এক্সপার্টরা ।
আজিমভ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল, আহমদ মুসার ওয়াটার গানটা তার বাম হাতে, যা সাধারনত দেখা যায় না । তাছাড়া আহমদ মুসার দান হাতটা প্রায় নড়ছেই না । ভালো করে দেখতে গিয়ে আজিমভ দেখল, আহমদ মুসার কাঁধ এবং দান বাহুর সন্ধিস্থলের পোশাকটা ছেড়া এবং রক্তাক্ত । আশে-পাশের পানির রং লাল।
বুকে ভীষণ ধাক্কা খেল আজিমভ। মুসা ভাই তাহলে আহত! কতক্ষণ আগে আহত হয়েছে ? কতটা আহত হয়েছে? কতটা রক্তপাত হয়েছে? ইত্যাদি প্রশ্ন আজিমভের মনকে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলল। বলল, ‘আপনি আহত বলেননি তো মুসা ভাই। কতটা আহত আপনি?’
‘ওটা পড়ে শুনলেও হবে। তোমরা এস।’ বলে আহমদ মুসা এগিয়ে গিয়ে দু’টি লাশ দেখিয়ে বলল, ‘এদের তুলে নেবার ব্যবস্থা কর।’
‘এদের আমরা দু’জন তুলে নিচ্ছি মুসা ভাই। আপনি ওপরে চলুন।’ বলল আজিমভ।
‘ডিনামাইট তুলে না নেয়া পর্যন্ত আমি আছি। তুমি ওপরে গিয়ে পানির তলায় এখানে সার্বক্ষণিক পাহারা বসাবার ব্যবস্থা কর। বিশেষ করে আজ রাতে এই এলাকার গোটা নদীতল পাহারা দিতে হবে । আর ড্যামের ওপারের অংশে সন্ধানী দল পাঠাবার ব্যবস্থা কর। ড্যামের প্রতি ইঞ্চি অংশ তাদের পরীক্ষা করতে হবে। ওপারের নদীর তলায় সার্বক্ষণিক পাহারা বসাবে।’
‘জি আচ্ছা।’ বলে আজিমভ জাফরভ লাশ দু’টি তুলে নিয়ে ওপরে উঠে গেল। ওরা চলে গেলে আমদ মুসা ডিনামাইট পাতা তিনটি স্থানেই ঘুরে ঘুরে বিস্ফোরক কর্মীদের কাজ দেখল। তিনটি ডিনামাইট নিষ্ক্রিয় করা হয়ে গেল। আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। ইতিমধ্যে ড্যাম ও নদীতল পাহারা দেবার জন্য নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়ে পৌঁছে গেল জাফরভ।
‘ওপারটা চেক করার ব্যবস্থা করেছ?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘জি হ্যাঁ।’ উত্তর দিল জাফরভ।
‘ঠিক আছে, ছয় ঘন্টা পর এদের ডিউটি পরিবর্তনের ব্যবস্থা করেছ তো?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘মনে রেখ, আজকের রাত এবং আগামী কাল দিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
‘জি হ্যাঁ। দোয়া করবেন। আপনি তাড়াতাড়ি উপরে যান মুসা ভাই। সবাই উদ্বিগ্ন।’
‘ধন্যবাদ জাফরভ।’ বলে আহমদ মুসা ওপরে উঠতে শুরু করল। তার সাথে তিনটি ডিনামাইট নিয়ে ওরা চারজনও উঠতে লাগল।
আহমদ মুসা বোটের কাছে আসতেই আজিমভ, আলী ইব্রাহিমভ তাকে টেনে তুলল বোটে। বোটে তোলার পর তাড়াতাড়ি আহমদ মুসার গা থেকে ডুবুরীর পোশাক খুলে ফেলা হলো। পোশাক খুলে আঁৎকে উঠল ওরা সবাই।
‘আপনার পায়েও গুলি লেগেছে, অথচ এ কথাও আপনি বলেন নি মুসা ভাই।’ ভারী কন্ঠে বলল আজিমভ।
‘ভুলেই গিয়েছিলাম।’
‘তাহলে দু’টি গুলি লেগেছিল আপনার?’
‘হ্যাঁ, ওদের দুজনের বন্দুক থেকে ওরা একই সাথে দু’টি গুলি করেছিল।’
আহমদ মুসাকে তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে আসা হলো গেস্ট হাউজে তার কক্ষে। সেখানেই তার আহত দু’টি জায়গায় ডাক্তার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। ডাক্তার বলল, ‘অনেক রক্ত গেছে। রক্ত দেয়ার প্রয়োজন নেই, তবে কয়েকদিন রেস্ট নিতে হবে।’
‘দোয়া কর ডাক্তার, আগামী কালের মধ্যে যাতে আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেন। পরশু দিন আমাকে তাসখন্দ যেতেই হবে।’
‘অসম্ভব’ বলল ডাক্তার।
ডাক্তারের কথার দিকে কান না দিয়ে আহমদ মুসা আজিমভকে বলল, ‘তুমি তাসখন্দকে জানিয়ে দিয়েছ যে, আমাদের প্রতিটি ড্যাম ও সেচ প্রকল্পে আজ রাত থেকেই পানির তলায় পাহারা বসাতে হবে?’
‘জানিয়ে দিয়েছি মুসা ভাই। কিন্তু আজ রাত থেকেই করতে হবে জানাইনি।’
‘তাহলে এখনি জানাও। এখানকার ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করবে ওরা।’
‘ঠিক বলেছেন। আমি এখনি জানাচ্ছি।’
একটু থামল আজিমভ। তারপর বলল, ‘প্রেসিডেন্ট কুতায়বা আপনাকে সালাম দিয়েছিলেন। আপনার গুলিবিদ্ধ হবার কথা শুনে উনি ঘাবড়ে গেছেন। উনি আসতে চাচ্ছিলেন। আমি বহু কষ্টে তাঁকে বিরত রেখেছি।’
‘তোমরা পাগল হয়েছো, সব আহতদের নিয়ে কি তোমরা এমন ব্যতিব্যস্ত হও?’
‘আহমদ মুসা তো একজনই মুসা ভাই! তার বিকল্প তো আল্লাহ এখনও আমাদের দেননি। আপনাকে আপনার হয়তো প্রয়োজন নেই, কিন্তু জাতির যে খুব বেশি প্রয়োজন।’
আজমভের কথাগুলো ভারি হয়ে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। তৎক্ষণাৎ আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না। একটু পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘তোমরা এভাবে কথা বলো না আজিমভ। তোমাদের এই ভালোবাসাকে খুব ভয় করি আমি।’ আহমদ মুসার কন্ঠ ভারি শোনাল।
‘খাবার এসে গেছে।’ পর্দার ওপার থেকে কথা বলে উঠল শাহীন সুরাইয়া।
‘খাবার এসে গেছে মুসা ভাই।’ বলল ইব্রাহিমভ।
‘কোত্থেকে? কি খাবার?’
‘কেন আপনি ভুলে গেছেন, শাহীন সুরাইয়া ও ফায়জাভার যৌথ দাওয়াত ছিল আজ জাফরভের বাড়িতে?’ বলল আজিমভ।
‘একদম ভুলে গেছি তো! কিন্তু ওরা কষ্ট করে আবার খাবার আনল কেন? আমি তো যেতে পারতাম।’
‘না ওরাই রাজি হয়নি। খাবার নিয়ে এসেছে ওরা।’ আজিমভ বলল।
আহমদ মুসা উঠে বসল। বলল, ‘চল খেয়ে নেই, সত্যি খুব ক্ষুধা লেগেছে।’
সকলে উঠে খাবারের ঘরের দিকে চলল।

আহমদ মুসা যা বলেছিল তাই হলো। একদিন পরেই আহমদ মুসা বিদায় নিল রুগুন ড্যাম থেকে।
বিদায় দিতে গিয়ে আলী ইব্রাহিমভ ও জাফরভ কেঁদে ফেলল।
বলল, ‘আপনার কাছ থেকে দেড় দিনে আমরা দেড় যুগের শিক্ষা লাভ করেছি। রুগুন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আপনি না এলে এ ড্যাম বাঁচত না।’
আহমদ মুসা বলল, ‘এভাবে কথা বললে যিনি আমাদেরকে এ সংকট থেকে বাঁচালেন তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।’
‘আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আপনার বিদায় আমাদের মনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।’ বলল ইব্রাহিমভ।
‘পৃথিবীটা আগমন-নির্গমনের এক পান্থশালা। এখানে আগমন-নির্গমন কোনটাকেই বড় করে দেখা ঠিক নয়। অন্তত মুসলমানদের জন্য এ দুর্বলতা সাজে না।’
‘কেন মুসা ভাই, জন্মস্থান মক্কা ছেড়ে যাবার সময় মহানবী (সঃ)-এর চোখ থেকেও তো অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল।’ বলল জাফরভ।
‘এ ভালোবাসা আল্লাহর এক পবিত্র দান তাঁর বান্দার জন্যে। কিন্তু ভালোবাসা আর মনকে বিপর্যস্ত করে ফেলা এক জিনিস নয় জাফরভ।’
‘ধন্যবাদ মুসা ভাই, আপনি একজন মহান শিক্ষক।’
‘ধন্যবাদ’ বলে সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে গাড়িতে উঠল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার পাশে উঠল আজিমভ। আর সামনের ড্রাইভিং সিটে বসল রুগুন নিরাপত্তা বিভাগের একজন ড্রাইভার।
গাড়ি স্টার্ট দিল ড্রাইভার।
কিন্তু গাড়ির সামনে একটা পাঁচ বছরের শিশু বসে আছে, ড্রাইভার হর্ন বাজাল তবুও তার উঠার নাম নেই। জাফরভ এসে তাকে সরাতে চাইল, সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শিশুটি কেঁদে উঠল।
ঘটনাটা লক্ষ্য করে আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে। শিশুটির কাছে এসে সে শিশুটির দু’চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, ‘গাড়ি যেতে দেবে না তুমি?’
‘আমি যাব।’
‘তুমি যাবে, কোথায়?’
‘ঐ শহরে।’
‘কেন?’
‘আমি আহমদ মুসা হবো।’
‘আহমদ মুসা হবে কেন?’
‘আমি লড়াই করব দৈত্যের সাথে।’
‘আহমদ মুসা কি দৈত্যের সাথে লড়াই করে?’
‘হ্যাঁ, অনেক দৈত্যের সাথে।’
‘কে বলেছে?’
‘কেন মা, দাদু সবাই তো বলে, তুমি জান না?’
এই সময় একজন লোক ছুটে এল। বলল, ‘স্যার মাফ করবেন। ছেলেটা আমার ভীষণ জেদী, আমরা অস্থির একে নিয়ে।’ বলে ছেলেটিকে নিয়ে যাবার জন্যে তার হাত ধরল।
আহমদ মুসা তাকে নিষেধ করল। তারপর আবার ছেলেটির দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, ‘আমি কে বলত?’
শিশুটি আহমদ মুসার দিকে একবার মুখ তুলে বলল, ‘তুমি মানুষ।’
‘আমার নাম কি?’
‘জানি না।’
‘যদি বলি আমি আহমদ মুসা।’
ছেলেটি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আহমদ মুসার দিকে চেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তুমি মানুষ, আহমদ মুসা ই-য়া বড়। তোমার বন্দুকও নেই, বোমাও নেই।’
আহমদ মুসা হাসল। শিশুটিকে একটু আদর করে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, ‘তোমার এখন কি চাই বলত?’
‘বন্দুক, বন্দুক দিয়ে দৈত্য মারব।’
আহমদ মুসা পকেট থেকে কলম বের করে বলল, ‘আমার কাছে বন্দুক নেই, এই কলম তোমাকে দিলাম। আহমদ মুসা যদি হতে চাও তাহলে এই কলম তোমার লাগবে।’
শিশুটি কলম হাতে নিয়ে কৌতুহলী চোখ মেলে বলল, ‘সত্যি?’
‘একদম সত্যি। আহমদ মুসাও আগে কলম হাতে নিয়েছিল, তারপর বন্দুক।’
‘তুমি তাকে চেন বুঝি?’
‘হ্যাঁ চিনি।’
‘কতবড় আহমদ মুসা?’
‘আমার মত।’
আবার চোখ তুলল শিশুটি আহমদ মুসার দিকে। তার চোখ ভরা সন্দেহ, অবিশ্বাস।
আহমদ মুসা হেসে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ঠিক আছে, আহমদ মুসা ই-য়া বড়।’
ছুটে আসা সেই লোকটি শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। বলল, ‘স্যার আমি প্রকল্প অফিসের একজন সুইপার। আমার ছেলেটিকে দোয়া করবেন।’
‘ফি আমানিল্লাহ। আপনার ছেলেটি খুব ভাল, খুব চালাক।’ বলে আহমদ মুসা ফিরে এল আবার গাড়িতে।
গড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
দু’পাশে জমেছিল অনেক মানুষের ভীড়।
শত মুগ্ধ দৃষ্টির মাঝে নিজেকে খুবই বিব্রত বোধ করল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা মানুষের চোখের অশ্রু যতটুকু সইতে পারে, প্রশংসা-দৃষ্টি ততটুকু সইতে পারে না।
গাড়ি রুগুন ড্যাম কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়ল।
আহমদ মুসা সিটে গা এলিয়ে চোখ বুঝেছিল। আজিমভও হেলান দিয়েছে সিটে, কিন্তু তার সতর্ক দৃষ্টি সামনে।
প্রায় নিঃশব্দে গাড়ি এগিয়ে চলল সামনে তাসখন্দের উদ্দেশ্যে।