২০. অন্ধকার আফ্রিকায়

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসা যখন ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসকে মুক্ত করে মুখোশধারীর সাথে মিলিত হলো আগের সেই কক্ষে, তখন কেবিন মাইক্রোফোনে ঘোষনা হচ্ছিল, ‘আহমদ মুসা তুমি ফাদার বাইককে কতক্ষন আটকে রাখবে, তোমার বের হবার পথ বন্ধ। কিছু লোক মেরেছ, কিন্তু এখানে যত লোক আছে তার ১০ ভাগ মারার মত বুলেট তোমার কাছে নেই। আমাদের নেতাকে সসস্মানে ছেড়ে দিলে এবং আত্মসমর্পন করলে তোমার প্রতি সদয় ব্যবহার করা হবে। তোমাকে ১০ মিনিট সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে সারেন্ডার না করলে আমরা এমন পদক্ষেপ নেব যে তুমি বুঝতেই পারবে না তুমি কখন আমাদের হাতে এসেছ। তুমি পিয়েরে পলকে হত্যা করেছ। এর প্রতিশোধ শুধু তোমার উপর নয়, যত জায়গায় পারি যেভাবে পারি এর প্রতিশোধ তোমাদের উপর নেয়া হবে।’
থেমে গেল মাইক্রোফোনের কন্ঠ।
‘ঠিকই বলেছে ওরা আহমদ মুসা। তুমি অনেক দূর এগিয়েছ। আর এগোবার পথ তোমার জন্যে বন্ধ। গোটা বিল্ডিং-এর মধ্যে এই জায়গাটা আমাদের জন্যে নিরাপদ। এই নিরাপদ জায়গায় কোন শত্রু যখন পৌঁছে, তখন তার জন্যে এটা হয়ে দাঁড়ায় সাংঘাতিক আপদ। সেই আপদ তোমাদের ঘিরে ফেলেছে।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক অনেকটা ব্যাঙ্গ করে।
আহমদ মুসা কথা বলার জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার আগেই মুখোশধারী ফ্রান্সিস বাইকের দিকে এগুলো।
আহমদ মুসা দেখল, মুখোশধারী তার পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে ফ্রান্সিস বাইকের নাকে চেপে ধরল।
আহমদ মুসা বুঝল। ফ্রান্সিস বাইককে ক্লোরোফরম করা হলো।
আহমদ মুসা রহস্যময় লোকটির দিকে বিস্ময় দৃষ্টি মেলে তাকাল। কিন্তু তার কাজে বাধা দিল না। কারন, এ পর্যন্ত রহস্যময় লোকটি দুইটি কাজ করেছে, দুইটিই ছিল অপরিহার্য প্রয়োজন।
ফ্রান্সিস বাইক সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল। সংগে সংগেই মুখ থেকে মুখোশ খুলে ফেলল মুখোশধারী।
‘ওকোচা তুমি?’ বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল আহমদ মুসা।
ওকোচা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইংগিত করে ফিসফিসে কন্ঠে বলল, ‘আস্তে, আমার নাম করবেন না।’
‘ও, তুমি ফ্রান্সিস বাইকদের কাছে তোমার পরিচয় গোপন করার জন্য মুখোশ পরেছিলে?’
ওকোচা মাথা নাড়ল।
‘তাহলে তুমি চেন এঁদের? এঁরা চেনে তোমাকে?’
ওকোচা নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘আসুন আমার সাথে।’
বলে হাঁটা শুরু করল।
‘কোথায়? কোন পথে?’
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ওকোচা বলল, ‘আসুন আমার সাথে।’
বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।
আহমেদ মুসা ফ্রান্সিস বাইককে দেখিয়ে বলল, ‘একে আমি সাথে নিতে চাই।’ বলে আহমেদ মুসা নিচু হয়ে কাঁধে তুলে নিতে গেল ফ্রান্সিস বাইককে।
ওকোচা ছুটে গেন এবং আহমেদ মুসাকে বাধা দিয়ে নিজেই ফ্রান্সিস বাইককে কাঁধে তুলে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।
আহমেদ মুসারাও শুরু করল ওকোচার পেছেনে হাঁটতে। আহমেদ মুসা আন্দাজ করল, ওকোচা হয় এদের লোক, না হলে এদের ঘনিষ্ঠ কেউ। এখান থেকে বেরুবার কোন গোপন পথ তার জানা আছে।
সম্ভবত গোপন পথেই সে এখানে এসেছে। এ কারণেই ওকোচাকে প্রথমে ঘরের ভেতর দিকের দরজায় দেখা গেছে।
প্রথমে হাঁটছিল ওকোচা ফ্রান্সিস বাইককে কাঁধে নিয়ে। তার পেছনে ড. ডিফরজিস এবং ওমর বায়া। সবার পেছনে আহমেদ মুসা।
সিড়ি ভেঙে যখন সুড়ঙ্গ নামছিল তারা তখন উৎসুক হয়ে উঠল আহমেদ মুসার মন। বলল, ‘এ গোপন পথেন সন্ধান তুমি জান কি করে?’
এবার কথা বলল ওকোচা। বলল, ‘ভাইয়া ওদের ঘরে ভয়েস রেকর্ডার আছে। তাই আমি কথা বলিনি। আমার গলা চিনতে পারলে আমাদের সর্বনাশ।’
বলে একটু থেমে ওকোচা বলল, ‘ভাইয়া আমাদের গোটা পরিবার ‘কোক’-এর কার্যক্রমের সাথে জড়িত। আর এ গোপন সুড়ঙ্গের কথা জানতে পেরেছি আমার বন্ধুর কাছে। সে এই সুড়ঙ্গের বাইরের মুখের একজন পাহারাদার।’
গোটা ব্যাপারটা আহমেদ মুসার কাছে এখন পরিষ্কার হয়ে গেল।
‘আমার আটকা পড়ার খবর তুমি জানলে কি করে?’
‘সে অনেক কথা পরে বলব, ফাদারকে কাঁধে নিয়ে বলা যাবে না।’
‘এ বিপদজনক কাজে তোমার আব্বা তোমাকে একা ছেড়েছেন?’
‘তিনি এবং পরিবারের কেউ জানে না আমি এসেছি।’
‘জানালে কি হত?’
‘আমার আব্বা আপনার মুক্তির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন, কিন্তু ওকুয়া’র বিরুদ্ধেতিনি কিছু করতে পারবেন না। আর আব্বা মনে করেন, আপনার মুক্তির জন্য কিছু না করা আমানবিক হবে। তবে এজন্য আমি বিপদে পড়ি তিনি তা চান না।’
হাসল আহমেদ মুসা। বলল, ‘তুমি বুদ্ধিমান এবং বিবেচক।’
সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসে সেই কেয়ারটেকারের ঘরের কাছে পৌঁছে ওকোচা টয়লেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘আমার বন্ধুটি এখনে সংজ্ঞাহীন ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে।’
‘আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ ওকোচা।’ বলল, আহমেদ মুসা।
‘আহমেদ মুসা ওকোচাকে কৃতজ্ঞাতা জানানো কি শোভন হয়।’
কথা শেষ করেই ওকোচা বলল, ‘আপনারা এখানে একটু দাঁড়ান, আমি গেটটা দেখে আসি।’
বলে সে বাইরে চলে গেল।
কিছুক্ষন পর ফিরে এসে বলল, ‘সব ঠিক আছে চলুন।’
গাড়িতে উঠতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল আহমেদ মুসা। বলল, ‘ওকোচা গাড়ী ঠিক আছে তো?’
‘তার মানে? গাড়ীতে কেউ কিছু পেতে রেখেছে কিনা।’
‘সে রকমই।’
‘ওকোয়া কিংবা ‘কোক’ সেক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু করতে পারে না।’
‘তারা আসত ডাইরেক্ট এ্যাকশনে। তারা যদি এ গাড়ীকে সন্দেহ করত, তাহলে এতক্ষনে শুধু গাড়ী নয়, আমরা তদের হাতে গিয়ে পড়তাম, নয়তো বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যেতো আমাদের দেহ।’
গাড়িতে উঠে বসল সবাই।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
ড্রাইভিং সিটে ওকোচা। তার পাশে আহমেদ মুসা। পেছনের সিটে ড. ডিফরজিস ও ওমর বায়া। আর গাড়ির মেঝেতে রাখা হয়েছে হাত-পা বাঁধা ফ্রান্সিস বাইককে।
গাড়ি চলছে।
আহমেদ মুসার মন আজ খুব হালকা হতে পারত। ওমার বায়া এবং ড. ডিফরজিস মুক্ত। সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে বড় শত্রু পিয়েরে পল নিহত এবং ‘ওকুয়া’ ও ‘কোক’ -এর প্রধান হাতের মুঠোয়।
কিন্তু এরপরও আহমেদ মুসার মনে দুঃসহ এক ভার। ওমর বায়া মুক্ত হয়েছে, মুক্ত হয়েছে ড. ডিফরজিস, কিন্তু ক্যামেরুনের লাখো মানুষের মক্তি এখনও আসেনি।
একাজে তাকে এখনি ব্রতী হতে হবে।
আহমেদ মুসার মনে পড়ল কেবিন মাইক্রোফোনে দেয়া হুমকির কথা, ওরা প্রতিশোধ নেবে।
আহমেদ মুসার সমস্ত হৃদয় উথলে উঠেছে ক্যামেরুনের মুসলমানদের অন্ধকার জীবনে আগামী সুর্যোদয় দেখার জন্য।

সাইমুম সিরিজের পরবর্তী বই
কঙ্গোর কালো বুকে