২১. কঙ্গোর কালো বুকে

চ্যাপ্টার

ইয়েউন্ডি থেকে ইয়াউন্ডি-বাতুয়া-বাতুরি হাইওয়ে ধরে পূর্ব দিকে ছুটে চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে আহমদ মুসা। পরনে তার পর্যটকের পোশাক। মাথায় স্পোর্টস হ্যাট, কপালের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নামানো।
পেছনের সিটে ব্ল্যাক বুল। অগাস্টিন ওকোচাকে সাথে নেয়ার কথা ছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে আহমদ মুসা। ওকোচা কিন্তু জেদ ধরেছিল। তার পিতাও বলেছিল, আফ্রিকার বোমাসা অঞ্চলের জন্যে ওকোচা উপকারী হতে পারে। ওকোচার মা এবং স্ত্রী দু’জনেই সায় দিয়েছে তার কথায়। কিন্তু আহমদ মুসা মিষ্টি হেসে বলেছে, ওকে সাথে নিয়ে যতখানি উপকৃত হবো, তার চেয়ে বেশী উপকৃত হবো যদি সে তার এই নতুন নীড়কে আরও সুন্দর করে তোলে।
ব্ল্যাক বুলের পরনে গাইডের পোশাক। তার হ্যাটের শীর্ষে এবং ইউনিফর্মের বুকে গাইডের মনোগ্রাম জ্বল জ্বল করছে। তার মুখ ভরা ফ্রেন্স কাট দাড়ী। ব্ল্যাক বুলকে চেনার কোন উপায় নেই। দাড়ী-গোঁফ, হ্যাট এবং পশ্চিমী ধাচের গাইডের পোশাক পরে সে সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে গেছে।
ব্ল্যাক বুলের সিটের পেছনে তার প্রিয় কুকুর দু’টো। শান্ত বালকের মত পাশাপাশি তারা বসে আছে সামনে তাকিয়ে।
ব্ল্যাক বুলের অনুরোধেই আহমদ মুসা কুকুর দু’টিকে সাথে নিয়েছে। ব্ল্যাক বুল বলেছে, দু’টি কুকুর দু’জন মানুষের চেয়ে উপকারী হবে শুধু নয়, মানুষ পারে না এমন কিছু কাজ কুকুর দু’টি পারবে।
গাড়ি ছুটে চলেছে আহমদ মুসার।
সামনে যে শহরটি তার নাম এ্যাবং এমব্যাংগ। তীরের মত সোজা রাস্তা। আহমদ মুসার হাত দু’টি স্টেয়ারিং-এ স্থির হয়ে আছে। ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে গাড়ি।
আহমদ মুসার চোখ দু’টি স্থির নিবন্ধ সামনে। হঠাৎ অলস মনের এক কোণে ডোনার অশ্রু সজল মুখটি ভেসে উঠল তার।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা কি অবিচার করল ডোনার উপর। বিয়ের আসন থেকে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।
কিন্তু আহমদ মুসার কোন দোষ নেই। সে তো ডোনার উপরই সব ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিল আহমদ মুসা, ‘সব শুনেছ, এখন কি করা যায় বল’। বেদনার একটা হাসি ফুটে উঠেছিল ডোনার ঠোঁটে। বলেছিল, ‘আমাকে বুঝি খুব দুর্বল মনে কর?’
‘না, তা কেন?’
‘তাহলে আমার সাথে আলোচনাকে সিদ্ধান্তের শর্ত বানিয়েছ কেন?’
‘তোমার অধিকার আমি অস্বীকার করতে পারি?’
‘এই সময়ে আমার অধিকার নিয়ে ভাবছ?’
‘এই সময়েই বেশী ভাবা দরকার’।
‘কোন সময়ের কথা বলছ?’ ডোনার ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল লজ্জাজড়িত হাসি।
‘আমি বলব না’।
ডোনা মুখ নিচু করেছিল। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল তার মুখ।
মুহুর্ত কয়েক মুখ না তুলে বলেছিল, ‘বল কি বলবে?’
‘তুমিই তো বলবে’।
‘আমি জানি তুমি সবদিক না ভেবে সিদ্ধান্ত নাও না। সুতরাং আমার আলাদা কোন বক্তব্য নেই’।
‘কথাটা তুমি খুব সহজে বলে ফেললে। আমার কিন্তু খুব খারাপ লাগছে’।
‘আমার জন্যে, তাই না?’
‘সত্যটা আমি ভুলব কি করে যে, তুমি রাজকুমারী মারিয়া জোসেফাইন লুই এক শান্তির ও নিরুপদ্রব জীবন থেকে ছিটকে পড়েছ আগুনের মধ্যে!’ আহমদ মুসার কন্ঠ ভারি শোনাচ্ছিল।
ডোনা চকিতে আহমদ মুসার মুখের দিকে চোখ তুলে চেয়েছিল। তারপর চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে তার দু’চোখ থেকে গড়িয়ে পড়েছিল দু’ফোটা অশ্রু। বলেছিল, ‘ডোনাকে না বুঝে এভাবেই বুঝি তুমি কষ্ট পাও! তোমাকে কেমন করে বুঝাব যে, তথাকথিত রাজকুমারীর মরুময় জীবন আজ কূল উপচানো সুখ আর প্রশান্তির বাগান। তুমি যাকে আগুন বলছ, তার মত দুনিয়া জোড়া আগুনও এ প্রশান্তির স্পর্শে নিভে যায়’।
‘ধন্যবাদ ডোনা। আমার সৌভাগ্যের জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি’।
‘কোন সৌভাগ্য?’
‘এমন তোমাকে পাওয়ার সৌভাগ্য’।
ডোনা কথা বলেনি। একরাশ লজ্জা এসে তার মুখ রাঙা করে দিয়েছিল। তার বেদনাক্লিষ্ট শুল্ক ঠোঁট ভরে উঠেছিল উজ্জ্বল এক টুকরো হাসিতে। বলেছিল একটু সময় নিয়ে, ‘তোমার সৌভাগ্যের চেয়ে আমার সৌভাগ্য অনেক বড়’।
বলে একটু দম নিয়েই আবার শুরু করল, ‘একটা কথা বলব, সাহস পাচ্ছি না’।
‘কি কথা?’
‘মেইলিগুলি আপা মানে আমিনা আপা এমনি এক অভিযানে তার ‘মা-চু’কে তোমার সাথে দিয়েছিলেন। আমার তো কেউ নেই। আমি তোমার সাথী হতে পারি না?’ কান্নায় বুজে এসেছিল ডোনার কন্ঠ।
‘ডোনা, তুমি বুঝি আমিনার কথা ভুলতে পার না?’ শান্ত, ভারি কন্ঠ ছিল আহমদ মুসার।
‘আমার তো বড় আপা। আপা কি ডোনার মত? তুমি কি তাকে ভুলতে পার?’
‘ডোনা, তুমি তাকে ভালোবেসে তার গোটা আসনটাই তুমি দখল করে নিয়েছ’।
‘না, ঠিক নয়। আমি তার পাশে একটু স্থান ভিক্ষা পেয়েছি মাত্র’। ডোনার চোখে ছিল অশ্রু, ঠোঁটে হাসি।
‘ডোনা, তুমি অনেক বড়। আবার বলছি আমি ভাগ্যবান’।
ডোনা চোখ মুছে বলেছিল, ‘থাক ওসব কথা। আমার কথার জবাব তুমি দাওনি’।
আহমদ মুসা গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, ‘আমার সাথে দেবার তোমার ‘কেউ’ নেই তা ঠিক নয়’।
‘কে আছে?’ চোখ ছানাবড়া করে বলল ডোনা।
‘কেন আল্লাহ। আল্লাহ কি যথেষ্ট নয়?’
শোনার সঙ্গে সঙ্গে ডোনা ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলে দু’হাতে মুখ ঢেকেছিল আনন্দের উচ্ছ্বাসটা ঢেকে ফেলার জন্যে। তারপর মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে উজ্জ্বল চোখ দু’টি আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলেছিল, ‘ধন্যবাদ আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে। আমার তরফ থেকে আল্লাহ তোমার নেগাহবান’।
‘আলহামদুলিল্লাহ। দোয়া করো’।
বলে আহমদ মুসা একটু থেমেছিল। বলেছিল তারপর, ‘তাহলে আসি। ওঁরা অপেক্ষা করছে’।
‘এসো’। বলেছিল ডোনা ম্লান হেসে।
কিন্তু বিদায়ের সময় কেঁদেছিল ডোনা। চোখের অশ্রু আড়াল করার চেষ্টা করেও সে পারেনি।
ডোনার সেই অশ্রু সিক্ত মুখটাই এখন ভেসে উঠছে আহমদ মুসার মানস-চোখে।
আহমদ মুসার চোখের কোণটাও সিক্ত হয়ে উঠেছিল। আহমদ মুসা স্টেয়ারিং থেকে বাম হাতটা সরিয়ে সিটের উপর থেকে রুমালটা তুলে নিয়ে চোখ ভালো করে মুছে নিল।
গাড়ি ছুটে চলছে তীরের বেগে।
‘আবদুল্লাহ (ব্ল্যাক বুল) তোমার বাড়ি বারবারেতি থেকে কতদুর?’ পেছনে ব্ল্যাক বুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘যা দেখেছি ম্যাপে, বাস্তব কিছু জ্ঞান নেই। হবে হয়তো একশ’ দেড়শ’ কিলোমিটার’।
‘আমরা তো বোমাসায় যাব ঐ দিক দিয়েই’।
‘খুব মজার হবে। আমার আবাল্য একটা সাধ এতে পূরণ হবে’।
‘কিন্তু এলাকার মাটি, গাছ ইত্যাদি ছাড়া আর কি দেখতে পাবে?’
‘তবু গ্রামটাকে চোখ ভরে দেখব।’
‘আল্লাহ তোমার আশা পূরণ করুক।’
‘আমরা যখন বোমাসাতেই যাচ্ছি, তখন বাববারেতি না গিয়ে আমরা সামনে কাদেলি হয়ে স্টিম বোটে সংঘ নদী দিয়ে বোমাসা যেতে পারতাম।’
‘তা পারতাম, কিন্তু ঘটনার কেন্দ্র বাবরারেতি অবশ্যয় যাওয়া প্রয়োজন। পণবন্দীদের ওরা কোথায় রাখতে পারে তা জানার সব রকম চেষ্টা আমাদের করা উচিত।’
‘কোথায় রাখতে পারে?’
‘বলা মুস্কিল। কিন্তু আমি ভাবছি আমার আত্নসমর্পণের স্থান ওরা বোমাসায় নির্ধারণ করল কেন?’
‘দুর্গম বলেই হয়তো। সভ্যতার আলো তেকে অনেক দূরে ঐ এলাকা। রেল, বাস ইত্যাদি ঐ এলাকার মানুষ চোখেই দেখেনি এখনও।’
‘কিন্তু একা একজন মানুষকে ধরার জন্যে তাকে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাবার প্রয়োজন কি?’
‘আমি জানি না জনাব। ব্যাারটা অস্বাভাবিক বটে।’
‘অস্বাভাবিক যখন, তখন এর তাতপর্য নিয়ে বাবা উচিত।
কথা শেষ করেই ডানে তাকাল আহমদ মুসা। সামনেই ডানে বাতেরী শহর।
শহরের একেবারে উত্তর পাশ ঘেঁষে হাইওয়েটি। আর সীমান্তের কাছাকাছি ক্যামেরুনের শেষ শহর বারতুয়া অতিক্রম করেছে হাইওয়েটি শহরের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে।
আহমদ মুসার গাড়ি বারতুয়া পার হওয়ার পর দু’কিলোমিটারের মাথায় একটা বিপত্তিতে পড়ল।
আহমদ মুসার গাড়ির সামনে প্রাইভেট পরবহান কোম্পানীর একটা ট্যাক্সি চলছিল। হঠাত ট্যাক্সিটি তার পথ চেড়ে বেঁকে গিয়ে আহমদ মুসার গাড়ির সামনে এসে পড়ল।
ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আহমদ মুসা তার গাড়ি পুরো নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ পেল না। আহমদ মুসার গাড়ির মাথা সোজা গিয়ে আঘাত করল বেঁকে আসা ট্যাক্সির সামনের দরজায় কৌণিকভাবে।
ট্যাক্সিটি কিছুটা ছিটকে পড়ে থেমে গেল। আহমদ মুসার গাড়িও থেমে গিয়েছিল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে ছুটল ট্যাক্সিটির দিকে।
ট্যাক্সির সামনের দরজার দুমড়ে গিয়ে কিচুটা ভেতরের দিকে বসে গিয়েছিল।
ট্যাক্সিটিতে ছিল একজন আরোহী এবং একজন ড্রাইভার।
আরোহী মাঝ বয়সী একজন কৃষ্ণাঙ্গ। ড্রাইভারও তাই। আরোহীর মাথার এক পাশের অল্প্ একটু জায়গা থেঁতলে গেছে। আর ড্রাইভারের কপাল অনেকখানি কেটে গেছে বিয়ারিং হুইলে ধাক্কা খেয়ে।
দু’জনেই গাড়ি থকে বের করল আহমদ মুসা।
আরোহীটির মাথার থেঁতলানো জায়গা এবং ড্রাইভারের কাটা কাপাল দিয়ে রক্ত ঝরছিল। ক্ল্যাক বুল ফাস্ট এইড বক্স সহই গাড়ি থেকে নেমেছিল।
আহমদ মুসা তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ওদের আহত স্থান ব্যান্ডেজ করে দিল। ফাস্ট এইডের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে আহমদ মুসা বলল, ‘শেষ মুহূর্তে আমি আমার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি, আমি দু:খিত।’
‘কি বলেন আপনি। আপনাকেই আমাদের হাজার বার ধন্যবাদ দেয়া উচিত। আপনি গাড়ি যতটুকু সামলিয়ে ছিলেন, ততটুকু না সামলালে গাড়ি চিড়া চেপ্টা হয়ে যেত। আপনি আমাদের বাঁচিয়েছেন।’ বলল ড্রাইভার লোকটি বিনয়ের সাথে।
‘ঠিক বলেছ ড্রাইভার। কিন্তু এমন হলো কেন? গাড়িতে কি তোমার ক্রুটি আছে?’ বলল আরোহীটি।
‘না কোন ক্রুটি নেই। হঠাত ব্রেকফেল এমন কোন দিনই হয়নি।’
‘আপনারা কোথায় যাচ্ছিলেন?’ বলল আহমদ মুসা।
আরোহীটিকে ইংগিত করে ড্রাইভার বলল, ‘উনি যাবেন বারবারেতি। আমি সীমান্ত পর্যন্ত ওকেঁ পেৌছে দিচ্ছিলাম।’
বারবারেতির নাম মুনে চমকে উঠল আহমদমুসা। অজান্তেই তার দৃষ্টি আরোহীটির উপর গিয়ে পড়ল। মনটা আহমদ মুসার খুশীই হলো্ অন্তত বারবারেতির অবস্থা কিছুটা জানা যেতে পারে তার কাছ থেকে। বলর, আহমদমুসা,’ আপনাদের তো ভীষণ অসুবিধা হলো।’
‘আমার কিছু ক্ষতি হলো্ কিন্তু অসুবিধা হলো আমার আরোহীর। আমি কোনভাবে ফিরতে চাই্ উনি সীমান্তে পৌছবেন কি করে। এ সময় ভাড়া গাড়িও মিলবে না্ আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমরা বারবারেতি যাচ্ছি। উনি ইচ্ছা করলে আমাদের সাথে যেতে পারেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি এ সাহায্য করবেন! কি যে উপকার হবে আমার্ ঈশ্বর আপনাকে কৃপা করুক।’ বলল আরোহী লোকটি আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা্ ট্যাক্সির ড্রাইভার উঠে গিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন পরীক্ষা করে এসে বলল, ‘সব ঠিক আছে। এখন অনুমতি দিলে আমি যেতে পারি।’
‘ট্যাক্সিটা কার?’ আহমদ মুসা বলল।
‘প্রাইভেট কোম্পানীর।’
‘আপনার শেয়ার আছে তাতে?’
‘নেই।’
গাড়ি মেরামতের ব্যয় কে বহন করবে?’
‘অর্ধেক বহন করতে হবে আমাকে।’
‘কষ্ঠ হবে না আপনার?’
‘এ প্রশ্ন করছেন কেন?’
‘আমার গাড়ির ধাক্কায় আপনার গাড়ির ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি মেরামতে আমি অংশ নিতে চাই্’
বলে আহমদ মুসা পকেট তেকে এক হাজার ফ্রাংকের পাঁচটি নোট বের করে ড্রাইভারের দিকে তুলে ধরল।
ড্রাইভার টাকা নিতে দ্বিধা করে বলল, ‘আপনি বিদেশী পর্যটক, আমাদের মেহমান। এ টাকা নেয়া অন্যায় হবে।’
আহমদ মুসা টাকাটাতার পকেটে গুজেঁ দিয়ে বলল, ‘গাড়ি অন্যের না হলে এ টাকা আপনাকে দিতাম না্’
কথা না বলে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকল ড্রাইভার্ যখন মাথা তুলল তার চোখ দু’টি ছল ছল করছে। বলল, ‘ আমার মা জটিল অসুখে ভুগছেন। তার চিকিতসার জন্যে কিচু টাকা জমিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে গাড়ি ঠিক করব ভেবেছিলাম। আপনার টাকা মা’র চিকিতসা সম্ভব করে তুলবে। প্রভু স্রষ্টা আপনার মঙ্গল করুন।’
‘ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনার মাকে সুস্থ করে তুলুক।’ বলে আহমদ মুসা নিজের গাড়ির দিকে এগুলো সেই আরোহী লোকটাকে তার সাথে আসতে বেল।
আহমদ মুসা আরোহীটিকে তার পাশের সিটে বসাল।
‘বারবারেতি বাড়ি বললেন? নাম কি আপনার?’বলল আহমদ মুসা।
‘নাম ডেনিয়েল। বারবারেতি থাকি।’ একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল।
আহমদ মুসা চকিতে তার মুখের দিকে একবার তাকাল।
আহমদ মুসা আর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করার আগেই সে প্রশ্ন করল, ‘ আপনি তো পর্যটক। বারবারেতি কি আপনার কাছে আকর্ষনীয়?’
পর্যটক হলে প্রশ্নটার উত্তর কিছু না ভেবেই দিতে পারত আহমদ মুসা। কিন্তু আহমদ মুসা তা নয়। সুতরাং মুহূর্ত কয়েক ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘নতুন দেশ নতুন স্থান দেখার মধ্যেই আমার আগ্রহ। আফ্রিকার প্রকৃতিই আমাকে আকর্ষণ করে বেশী।’
‘আফ্রিকার সত্যিকার প্রকৃতি দেখতে হলে যেতে হবে বোমাসা এবং আরও দক্ষিণে।’
‘আমি সব চিনি না। প্রথম সফর তো!’
‘বারবারেতি খারাপ নয়। তবে আধুনিক হয়ে উঠছে তো। বাইরের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ হারচ্ছে। তার উপর ..’
কথা শেষ না করেই থেমে গেল ডেনিয়েল নামের লোকটি।
‘তার উপর কি?’ একটু মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘এই সেদিন বারবারেতিতে সাংঘাতিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল তো। বাইরের অনেকেই সেখানে আসতে দ্বিধা করছে।’
আহমদ মুসা মনোযোগী হলো ডেনিয়েলের প্রতি। কিন্তু তার দিকে না তাকিয়ে নিরাসক্তভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘দ্বিধা করছেন কেন? কোন ভয় আচে? দুর্ঘটনা সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানিনা।’
‘উল্লেখযোগ্য কিছু বিদেশীসহ অনেক লোক মারা গেছে দুর্ঘটনায়। বাইরের চাপ আছে। তদন্ত চলছে। একটা আতংক আর কি।’
‘তদন্ত চলছে। আবার বাইরের চাপ আছে। তাহলে তো বড় ঘটনা্ আসল ব্যাপার কি বলুন তো?’
‘আমরা সকলে একে একটা বড় দুর্ঘটনা বলেই জানি। অবশ্য কেউ কেউ বলে ওটা একটা লাগানো আগুন। আবার অনেকে মনে করেন, সম্মেলনের উদ্যোক্তারা কোন কারণে কিচু বিস্ফোরক হয়তো ভেতরে রেখেছিলেন। তা থেকেই আত্নঘাতি ঘটনা ঘটেছে।’
‘সম্মেলন স্থানে আগুন লাগাতে যাবে, এমন কোন শত্রু কি সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের ছিল?’
‘নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। তবে মধ্য আফ্রিকার সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলে মুসলমানদের নতুন শক্তিবৃদ্ধির চেষ্টা অনেকেই ভালো চোখে নাও দেখতে পারে।’
‘অনেকে বলতে কাদের বুঝাচ্ছেন? সাধারণ জনগণ?
কাউকেই নির্দিষ্ট আমি করিনি। আমার ধারণা বলেছি মাত্র।
আহমদ মুসার মনে হলো ডেনিয়েল লোকটা জানে অনেক কিছু। কথার ধরনে তাকে খুব চালাক বলে মনে হলো আহমদ মুসার। কে লোকটি? লোকটির চেহারায় ভদ্রতার কাটিং আছে। তার আডালে একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, কর্কশ একটা রূপ তার আছে। আর তার ভাষায় আঞ্চলিক টান নেই। অর্থাৎ বাঁটু ভাষা বললেও বাঁটু সে নয়।
মধ্যে আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের কোন এলাকায় আপনার বাডি? জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা
আমার বাডি তানজানিয়ায়। তবে এখানে বহুদিন থেকেই। আবার এসেছি।
কেন জানি হটাত আহমদ মুসার মনে পডল যে বারবারেতির বিস্ফোরণ সম্পর্কিত ব্ল্যাক ক্রসের বিজ্ঞপ্তিটির একটা ঠিকানা স্মরণ করতে পারলো না।
সীমান্তের চেক পোষ্ট এসে গেছে। গাডি থামাতে হলো আহমদ মুসাকে। খুশী হলো আহামদ মুসা সীমান্তের চেক পোষ্টে তেমন কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই, শুধু পাসপোর্ট দেখে তাকে একটা ভিসায় সিল দিয়েই খালাস। তাও আবার গাডি থেকে নামতে হয় না। গাডিতে এসে পুলিশ পাসপোর্ট চেক করে।
সীমান্ত অতিক্রমের পর আবার আগিয়ে চলল গাডি সোজা পূর্ব দিকে বারবারেতি লক্ক্যে।
সীমান্ত থেকে ২৫ কিলো মিটার দূরে বারবারেতি পথে আরেকটি ছোত্র শহর। নাম গাম্বুলা।
আহমদ মুসার গাডি। গাম্বুলা শহর অতিক্রম করছিল। শহরের ধক্ষিন পাশ ঘেসে রাস্তি, আর রাস্তার দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটা ছোট নদী। শহর অতিক্রম করার আগেই ছোট নদীটি বাক নিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। তার সাতে বারবারেতির হাইওয়ে থেকে একটা সডক বের হয়ে ছোট নদীটির তীর বরাবর দক্ষিণে চলে গেছে।
বেলা তখন আডাইটার মত।
ছোট শহর তার উপর অফিস ও স্কুল – কলেজ ছুটির পরবর্তী ভাটির সময়। রাস্তা ঘাটে লোকজন। গাডি ঘোডা খুবই কম।
রাস্তাটিও তীরের মত সোজা
দু হাত স্তেয়ারিং এ রেখে দু টি চোখ সামনে ছুডে দিয়ে বলা যায় সিটে গা এলিয়ে দিয়েছিল একটা জীপ গাডি।
সামনেই চলছিল একটা জীপ গাডি।
সামনেই নদীটি দক্ষিণ দিকে বাক নিয়েছে এবং হাইওয়ে থেকে সেই সডকটিও বেরিয়ে গেছে দক্ষিণের দিকে।
জিপটির পেছনের দক্ষিন দিকের রেড লাইট জ্বলে উঠল। সিগনাল দিতে শুরু করল। জিপটা দক্ষিনের সডকে নেমে যাবে জিপটি টার্ন নিতে গিয়ে কয়েকবার হর্ন দিল।
হর্ন শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা।
জিপটি ব্ল্যাক ক্রস এর কোডে হর্ন দিচ্ছে কেন? জিপটি তাহলে কি ব্ল্যাক ক্রস এর।
দ্রত চিন্তা করছিল আহমদ মুসা।
ব্ল্যাক ক্রসকে এত কাছে পেয়ে তেদের তো সে ছেডে দিতে পারে না, দক্ষিণ দিকেই। ব্ল্যাক ক্রসের গাডি কোথায় যাচ্ছে? বোমাসা এখান থেকে দক্ষিণ দিকেই, ব্ল্যাক ক্রস এর গাডি আনুসরন করে সে ওদের কোন ঘাটি বা ঠিকানা অথবা ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে মুসলিম পনবন্দিদেরও খোজ সে পেয়ে যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল আহমদ মুসা।
ড্যানিয়েলকে উদ্ধেশ্য করে বলল মিঃ ডেনিয়েল এখানে থেকে বারবারেতি যাবার ট্রান্সপোর্ট পাওয়ায় কোন আসুবিধা আছে?
না এ কথা কেন বলছেন?
আমরা এখানে থেকে একটু বাম দিকে যেতে চাই, আপনার আসুবিধা হয় কিনা তাই বললাম।
আমার কোন আসুবিধা হবে না। কিন্তু আপনারা কি বারবারেতি যাচ্ছেন না?
আপাতত নয়।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করলে দেখতে পেত। ডেনিয়েল নামক লোকটির চোখে মুখে মুহূর্তের জন্যে বিস্ময় ফুটে উঠছে, তারপরেই সেখানে বিস্ময়ের বদলে অর্থপূর্ণ এক আনুসদ্ধান ভাব ফুটে উঠল। যেন এই প্রথম বারের মত সে গভীর দৃষ্টতে পর্যবেক্ষণ করছে আহমদ মুসাকে। ধীরে ধীরে সে বলল এখানেই তো আপনাদের বামে ঘুরতে হবে, মোডটার উপর আমাকে নামিয়ে দিন।
আমরা দুঃখিত মিঃ ডেনিয়াল। বলল আহমদ মুসা।
না ধন্যবাদ। পর্যটকদের প্রোগ্রাম ঠিক থাকে না আমি জানি মিঃ ডেনিয়ালের কথাগুলো যত সরল তার মুখের হাসি ততটা সরল নয়।
মোডে নেমে গেল মি;ডেনিয়াল।
আহমদ মুসার গাডি ছুটল নদীর তীর বরাবর দক্ষিণ গামী সডক ধরে ব্ল্যাক ক্রস এর জীপটির পিছু পিছু।
গাডি থেকে নেমেই ডেনিয়াল চারদিকে চাইল ট্যাক্সির সন্ধানে।
ডেনিয়ালের মাথায় চিন্তাটা তখন গুছিয়ে আসেছে। ব্ল্যাক ক্রস এর গাডির হর্ন সেও শুনেছে। সে নিশ্চিত এই হর্ন শুনেই পর্যটক তার গন্তব্য পাল্টেছে এবং ব্ল্যাক ক্রস এর জীপটাকে সে আনুসরন করছে।
কিন্তু কেন? কে এই পর্যটক? কেন ব্ল্যাক ক্রস এর গাডি সে আনুসরন করল। ব্ল্যাক ক্রস এর কোড সে জানল কি করে?
ছোট শহর গাডি পাওয়া মুস্কিল।
একটু ভাবল ডেনিয়েল। তারপর সে অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার বের করল পকেট থেকে। ছোট সিগারেট লাইটারের মত।
ডেনিয়েল জানে না ব্ল্যাক ক্রস এর জিপে কে যাচ্ছে। তার কাছে অয়্যারলেস আছে কিনা। তবু ডেনিয়েল ব্ল্যাক ক্রস এর মাস্টের চ্যানেলে মেসেজ থ্রো করল। বলল ছোট কাদেলীয় সডকে ব্ল্যাক ক্রস এর জীপটিকে একজন পর্যটক আনুসরন করছে।
ব্ল্যাক ক্রস এর অয়্যারলেস নেটওয়ার্কের মাস্টার চ্যানেল একটা গোপন ও জরুরী লাইন। চ্যানেলে ব্ল্যাক ক্রস এর সব পয়েন্টে মেসেজ পৌছানো যায়।
মেসেজ পাঠানোর পর মুহূর্তেই জবাব পেয়ে গেল ডেনিয়েল অয়্যারলেসে ভেসে আশা কণ্ঠ বলল ধন্যবাদ মেসেজের জন্য আমি নজর রাখছি। কিন্তু পর্যটকের মতলব কি?
আমি জানি না তবে লোকটা খুব সহজ হবে না। আপনার সাথে কে আছে?
স্ত্রী এবং ছেলে। আমি যাচ্ছি সলো। চিন্তা করো না লডাই করার মত অস্ত্র আমার আছে। গাডি খুজছি আসছি আমি।
কথা শেষ করতেই গাডি পেয়ে গেল ডানিয়েল। গাডি তার ছুটল আহমদ মুসার গাডির পিছু পিছু।

সাম্নের গাডি একই গতিতে চলছে কোথাও দাডায়নি, গতি কমবেশিও হয়নি।
আহমদ মুসা ভাবল ব্ল্যাক ক্রস এর গাডিটি পেছনে সম্ভবত চোখ রাখেনি। কেউ আনুসরন করছে সন্দেহ নিরসনের জন্যে কিছু পরিক্ষা নীরিক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু সামনের গাডিটি তেমন কিছুই করেনি।
আহমদ মুসা খুশী হলো। ওকে সন্দেহ মুক্ত রাখলে ওদের ঠিকানায় পৌছা সহজ হবে।
আহমদ মুসা সামনে মানচিত্রের দিকে চেয়ে দেখল ছোট কাদেলী নদী সংঘ নদীর কাছাকাছি গিয়ে বড কাদেলী নদীতে মিশেছে। তারপর পডেছে গিয়ে সংঘ নদীতে, ঠিক সেই ভাবে রাস্তাটিও গিয়ে পডেছে সংঘ নদীর তীর বরাবর প্রলম্বিত সডক।
সংঘ নদীতে বরাবর দক্ষিনে আগিয়ে সডকটি শেষ হয়েছে ছোট গ্রাম বন্দর সলোতে।
তোমার দাদার গ্রামের নাম জান কি? ব্ল্যাক বুলকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা
সলো। বলল ব্ল্যাক বুল।
আমরা তো ধীরে ধীরে সলো এর দিকেই যাচ্ছি দেখছি।
তাই মনে হচ্ছে।
কি জানি বারবারেতি যাওয়া বোধ হয় হলো না।
সলো র দিকে যাচ্ছি বলে আমি কিন্তু খুব খুশী
সেই সলো কি আছে।
সেই মাটি আছে। সেই সংঘ আছে অনেক পুরানো গাছও আছে হয়তো সেদিনের সাক্ষী আছে।
তা আছে।
আহমদ মুসা আর কোন কথা না বলে সামনের দিকটা একবার দেখে নিয়ে ড্যাস বোর্ডের উপর রাখা মানচিত্রের দিকে আবার মনোযোগ দিল।
শুরুর দিকে রাস্তা তীরের মত সোজা ছিল। কিন্তু তার পরেই নদীর সমান্তরালে আকা বাকা হয়ে আগিয়ে গেছে রাস্তাটি। দু ধারেই ঘন বন কাছেই নদী কিন্তু দেখা যায় না।
খুবই ভালো লাগছে নিঝুম পরিবেসে বন ছায়া ঘেরা পথে ড্রাইভ করতে। আহমদ মুসা ভাবল যতই দক্ষিণে আগুনো যাবে বন জংগলের নিবিডতা ততই বাডবে, আফ্রিকার বিখ্যাত রেইন ফরেস্ট এলাকার চিহ এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কঙ্গো নদী ও তার অসংখ্য শাখা ও উপনদী স্নাত কঙ্গোর মধ্যে দক্ষিণ অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বনাঞ্চল, বোমাসা থেকে এই এলাকার শুরু।
ড্রাইভ করতে ভাল লাগলেও মুস্কিল হয়েছে সামনের গাড়িটাকে চোখে রাখার ব্যাপারটা। আঁকা বাঁকা এবং জংগলের দেয়ালে ঘেরা রাস্তায় অধিকাংশ সময়ই গাড়িটা চোখের আড়ালে থাকছে, যদিও দূরত্ব এখন দু’শ গজের বেশী নেই।
এ ধরনের রাস্তায় শত্রুর অনুসরণ আহমদ মুসার একদম নতুন অভিজ্ঞতা। সামনে-পেছনে দু’দিকটাই তার কাছে এখন অরক্ষিত মনে হচ্ছে। গাড়ির রিয়ারভিউ এখন আর কাজ দিচ্ছে না, সামনেও বনের দেয়ালে চোখ ধাক্কা খাচ্ছে। আহমদ মুসার মনে হচ্ছে, পরিস্থিতির উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, এক অমোঘ ব্যবস্থা যেন তাকে এগিয়ে নিচ্ছে, সে চলছে ঠিক অন্ধের মতই।
অন্ধত্ব ঘুচে গেল, যখন আহমদ মুসা তার নাকের ডগার উপর দেখল, কাদেলী সড়কটি সামনেই বারবারেতি-সলো সড়কের সাথে গিয়ে মিশেছে এবং মোড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে দু’টি জীপ এবং তাতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চারজন লোক। তাদের হাতে রিভলবার।
বিস্ময় কাটিয়ে উঠবার আগেই পেছনে শব্দ শুনে মুখ ফিরাল। দেখল, একটি গাড়ি পেছন থেকে প্রায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে ডেনিয়েল। তার হাতেও রিভলবার।
সবই বুঝল আহমদ মুসা। সে ফাঁদে পড়ে গেছে। কিন্তু কি করে? বুঝা যাচ্ছে, ডেনিয়েল ব্ল্যাক ক্রসের লোক। এবং এরা সবাই তাই। কিন্তু আহমদ মুসাকে চিনেছে কি ওরা? ডেনিয়েলের সাথে কথা বলে তো তা মনে হয়নি!
আহমদ মুসা কিছু চিন্তা করার আগেই ডেনিয়েল রিভলবার বাগিয়ে জীপ থেকে নেমে এল।
আহমদ মুসার কাছে এসে রিভলবার বাগিয়ে বলল, ‘মিঃ পর্যটক চলুন, ওরা আপনাকে স্বাগত জানাবার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল।
ব্লাক বুলও নামতে যাচ্ছিল। ডেনিয়েল ধমক দিয়ে বলল, ‘চুপচাপ বসে থাক গাইডের বাচ্চা। আসলটাকে দেখি, তারপর দরকার হলে…
বলে রিভলবার নাচিয়ে আবার বলল, ‘চলুন পর্যটক সাহেব।’
আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল। তার দু’টি হাত জ্যাকেটের দুই পকেটে।
রিভলবার বাগিয়ে পেছনে পেছনে হাঁটছিল ডেনিয়েল।
দু’টি গাড়ি দাঁড়িয়েছিল সড়কের ওপ্রান্ত অর্থাৎ পুব প্রান্তে ঘেঁসে। গাড়িতে ঠেস দেয়ে ওরা চারজন দাঁড়িয়েছিল নির্বিকভাবে।
ওদের চার গজের মধ্যে গিয়ে আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে পড়ল।
চারজনের একজন বলল, ‘মিঃ ডেনিয়েল এঁর পকেটগুলো দেখুন।’
ডেনিয়েল পেছন থেকেই ডান হাতে রিভলবার ধরে রেখে বাম হাত দিয়ে জ্যাকেট এবং প্যান্টের পকেট সার্চ করল। জ্যাকেটের পকেটে একটা রিভলবার পেল মাত্র।
গাড়িতে ঠেস দেয়া যে লোকটি পকেট সার্চের নির্দেশ দিয়েছিল, সেই আবার বলে উঠল, ‘কে তুমি? আমাদের পিছু নিয়েছিলে কেন?’
‘আমি ব্ল্যাক-ক্রস-এর সন্ধান করছি।’
‘ব্ল্যাক-ক্রস-এর কোড তুমি জান কি কওে?’
‘ব্ল্যাক-ক্রস আমার পুরনো বন্ধু।’ আহমদ মুসার ঠেটে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি।
‘পাঁচটা রিভলবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসছ, জোক করছ? কে তুমি?’
‘ব্ল্যাক-ক্রস-এর পুরানো বন্ধু।’
কথা বলছিল যে লোকটি সে আহমদ মুসার দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘তোমার সাথে রসিকতা করার জন্যে আমরা এখানে বসে নেই। কে তুমি, কেন আমাদের পিছু নিয়েছিলে?’
‘একজন এশিয়ান আমি। ফ্রান্স থেকে আমি এসেছি। দেখতেই পাচ্ছেন আমি পর্যটক।’
পর্যটক হিসেবে তুমি আমাদের অনুসরণ করনি। কে তুমি? কেন তুমি ব্ল্যাক ক্রস-এর সন্ধান করছ?
‘পিয়েরে পল আমার পুরানো বন্ধু কিনা।’
ওরা চারজন একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখ নাচল। সম্ভবত ক্রোধ এবং বিস্ময়ে। বিস্ময়ের কারণ তাদের মুঠোয় আসা অপরিচিত একজন লোকের ঔদ্ধত্য। আর ক্রোধের কারণ নিহত পিয়েরে পলকে লোকটি বিদ্রুপ করছে।
কথা বলছিল যে লোকটি, সে তার সাথের রিভলবারধারী একজনকে লক্ষ করে বলল, ‘মুখটা ওর ভেঙে দাও। বুঝিয়ে দাও আমরা রসালাপ করতে আসিনি।’
হুকুম পেয়ে লোকটা ছুটে গেল আহমদ মুসার দিকে। রিভলবারের বাঁট দিয়ে আহমদ মুসার মুখে, ঘাড়ে, মাথায় আঘাত করল।
আহমদ মুসার কপাল ও মুখের কয়েক জায়গা ফেটে সেখান থেকে রক্ত গড়াতে লাগল।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়েছিল পাথরের মত। ভাবলেশহীন তার মুখ। কিন্তু সে এই ধরনের আক্রমন আশা করেনি। আহমদ মুসা তার কথার দ্বারা ব্ল্যাক ক্রসের লোকদের রাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। রাগলেই মানুষ ভুল করে।
‘এতক্ষণ তোমার মাথার খুলি উড়ে যেত, কিন্তু তা আমরা কারনি। তোমাকে জানতে হবে আমাদের। আমরা এক এশিয়ানকে খুঁজছি।’ রক্তাক্ত আহমদ মুসার দিকে চেয়ে ক্রুর হেসে বলল সেই লোকটি।
সে থামতেই যে লোকটি আহমদ মুসাকে আঘাত করেছিল, সে চিৎকার করে বলল, ‘বল এবার, তুমি কে? দেরী করলে এখন প্রথম তোমার নাক ভাঙব, তারপর হাত-পা ভাঙা শুরু করব।’
‘কষ্ট করে বলার দরকার নেই। ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছ এসব তোমরা পার।’
‘আবার বিদ্রুপ।’ বলে আহমদ মুসার সামনে দাঁড়ানো রিভলবারধারী লোকটা আবার তার রিভলবারের বাঁট তুলল আহমদ মুসার নাক লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা এবার এ্যাকশনে যাবার সিন্ধান্ত নিল। সে তার মাথাটা বিদ্যুৎ গতিতে সরিয়ে নিয়ে ডান হাত দিয়ে রিভলবার কেড়ে নিয়ে লোকটার সামনে ঝুঁকে আসা তলপেট লক্ষে প্রচন্ড একটা কিক চালাল। এবং তার সাথে সাথে চোখের পলকে হাতের রিভলবারটা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে গুলী করল পেছনে দাঁড়ানো ডেনিয়েলকে লক্ষ্য করে।
ঘটনার আকস্মিকতা হকটকিয়ে দিয়েছিল ডেনিয়েলকে। সি কিছু সিন্ধান্ত নেবার আগেই গুলী খেয়ে পড়ে গেল রাস্তার উপর।
গুলী করেই আহমদ মুসা তার রিভলবার সামনে ঘুরিয়ে নিল।
সামনের লাথি খাওয়া লোকটি তখন টলতে সটলতে পড়ে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তার মাথার উপর দিয়ে দুইটি গুলী ছুড়ল পর পর। গুলী করেই নিজের দেহটা ছুড়ে দিল রাস্তার উপর। দ্বিতীয় গাড়ির কাছে দাঁড়ানো তৃতীয় লোকটি রিভলবার তুলেছিল গুলী করার জন্যে।
তলপেটে আহমদ মুসার লাথি খাওয়া লোকটা পড়ে যাবার মুখেও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল।
তৃতীয় লোকটির গুলী এসে তার মাথায় বিদ্ধ করল পেছন দিক থেকে।
আহমদ মুসা মাটিতে পড়েই তার রিভলবার তৃতীয় লোকটিকে তাক করেছিল। কিন্তু তার গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল তৃতীয় লোকটির রিভলবার ধরা হাতে। রিভলবার পড়ে গিয়েছিল তার হাত থেকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
তৃতীয় লোকটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হাত থেকে পড়ে যাওয়া রিভলবারটি তুলে নেয়ার জন্যে। কিন্তু সে রিভলবার তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবার আগেই আহমদ মুসার রিভলবার তার লক্ষ্যে উঠে গিয়েছিল। আহমদ মুসার তর্জনি রিভলবারের ট্রিগারে চেপে বসছিল।
ঠিক এ সময় গাড়ির আড়াল থেকে একটি শিশু ছুটে তৃতীয় লোকটির সামনে এসে তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘আমার আব্বুকে মের না।’
আরেকটা মহিলাও গাড়ির ওপাশে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখে-মুখে মৃত্যুর আতংক।
শিশুটির বয়স পাঁচ ছয় বছর হবে।
শিশুটির আকুল আর্তি এবং ব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে আহমদ মসার হৃদয় কেঁপে উঠেছিল এক বেদনায়। তার তর্জনি সরে এসেছিল ট্রিগার থেকে। নেমে যাচ্ছিল রিভলবার সমেত তার হাত।
শিশুর আড়ালে দাঁড়ানো তৃতীয় লোকটি রিভলবার হতে ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই সে গুলী করল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
ত্বরিৎ এক পাশে সরে মাথা ও বুক বাঁচাতে পালেও হাত বাঁচাতে পাড়ল না। গুলী এসে আহমদ মুসার একটা আঙুলসহ হাতের রিভলবারে বিদ্ধ হলো। হাত থেকে পড়ে গেল রিভলবার। আহমদ মুসা তার রিভলবার তুলে নিতে যাচ্ছিল।
শিশুর আড়ালে দাঁড়ানো সেই তৃতীয় লোকটি চিৎকার করে উঠল, ‘রিভলবার তুলে নিতে চেষ্টা করলে মাথা গুড়ো হয়ে যাবে।’
এ সময় পাশ এবং পেছন দিক থেকে গুলী বর্ষণ ও গাড়ির শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা। তাকিয়ে দেখতে পেল, বারবারেতি সড়ক দিয়ে এবং কাদেলা নদীর পথে দুইটি গাড়ি ছুটে আসছে গুলী করতে করতে। আহমদ মুসা দেখল, স্ট্রেনগানের গুলীতে তার জীপের উপরের কভার ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কেঁপে উঠল আহমদ মুসা। ব্ল্যাক বুল কি বাঁচতে পেরেছে?
পেছন থেকে চোখ ফেরাবার আগেই আহমদ মুসা তার মাথায় শক্ত কিছুর স্পর্শ অনুভব করল। বুঝল, সেই তুতীয় লোকটির রিভলবার।
অন্যদিকে নতুন আসা দুটি গাড়ি থেকে আরও চারজন নেমে তাদের স্টেনগান ও রিভলবার বাগিয়ে তাকে এসে ঘিরে ফেলল।
নতুন আসা চারজনের একজন আহমদ মুসার মাথায় রিভলবার তাককারী সেই তৃতীয় লোকটিকে লক্ষ্য করে বলল, স্যার এ সব কি দেখছি?
এঁর পরিচয় এখনও পাইনি। তবে ভয়ানক কেউ হবে। মাত্র ৫ সেকেন্ডে আমাদের চারজন লোককে খুন করেছে। বেঁধে ফেল একে। এঁর ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত। বলল, আহমদ মুসার মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে দাঁড়ানো তৃতীয় লোকটি।
সেই তৃতীয় লোকটি শুরু থেকে আহমদ মুসার সাথে কথা বলছিল। সেই নির্দেশ করছিল তার সাথীদের এবং সেই আগন্তুকদের নির্দেশ দিল তাকে বাঁধার জন্য আহমদ মুসা বুঝল এদের মধ্যে এরই পদ মর্যাদা সবার উপরে। নিশ্চয় নেতা গোছের কেউ হবে। শিশুটির পিতা সে। নিশ্চয় মেয়েটি তার স্ত্রী হবে। আহমদ মুসা এদের গাড়িকে অনুসরন করে এসেছে।
আহমদ মুসাকে ওরা বেঁধে ফেলল।
বাঁধা হয়ে গেল নেতা লোকটি বলল, ‘বন্দীসহ আমার গাড়ির পেছনে উঠ একজন। আর তিনজন তিনটা গাড়ী নিয়ে এস।
সন্ধ্যা তখন প্রায় আসন্ন।
জীপের পেছনে জীপের মেঝেতে বন্দী আহমদ মুসাকে ফেলে রাখা হলো। স্টেনগান হাতে একজন পেছনের সিটে বসে আহমদ মুসার উপর চোখ রাখল।
জীপটির ড্রাভিংসিটে বসল নেতা গোছের সেই লোকটি। তার পাশের সিটে বসল সেই মহিলা এবং শিশুটি।
মহিলার বয়স ত্রিশের কম হবে। শিশু এবং মহিলা দু’জনেরই মুখ গম্ভীর। সিটে বসেই মহিলাটি একবার পেছনে আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
গাড়ী স্টার্ট নিচ্ছিল।
আহমদ মুসা মাথাটা একটু তুলে বলল, তোমরা আমার লোককে কি করলে?
জাহান্নামে গেছে। এখন তোমার কথা ভাব। বলল, ড্রাইভিং সিট থেকে নেতা গোছের লোকটি।
‘বন্দীর নিজের কথা ভাববার কি আছে। আমার কথা ভাববে এবার তোমরা। বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি মানুষটা কি বুঝলাম না। তোমার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছ। তোমার ভয় করছে না?
‘ভয় করলে কি হবে? তোমরা আমাকে ছেড়ে দেবে?
তা কখনও কেউ পারে?
তাহলে ভয় করে লাভ?
‘আচ্ছা মানুষ তো তুমি! লাভের জন্যে কেউ কি ভয় করে? ভয় আসে অপ্রতিরোধ্যভাবে, ভেতর থেকে এবং তা আসে ক্ষতির ভয়ে, জীবনের ভয়ে।
যাদের ক্ষতির ভয় নেই কিংবা জীবনেরও ভয় নেই, তাদের ভয় আসবে কোথা থেকে?
তুমি জীবনের ভয় কর না?
করি না। কারণ মৃত্যু ঠিক সময়ের আগেও আসবে না, পরেও আসবে না।
বাঃ দারুণ দার্শনিক কথা বলেছ। কিন্তু লাভ নেই। মৃত্যু তোমার আসছে। আমাদের চারজনকে তুমি খুন করেছ।
‘চারজন নয়, তিনজন।
‘চতুর্থজনও তোমার কারণেই মরেছে।
সুন্দর যুক্তি। কিন্তু একজনকে মেরে কি চারজনের শোধ উঠবে?
তুমি মানুষ না পাথর? রক্তাক্ত অবস্থায়ও তোমার মুখে বিদ্রুপ আসে? কে তুমি?
যার জীবন নেই বেশীক্ষণ, তার পরিচয়ের কি দরকার?
বাজে বকো না, পরিচয় তোমার আমরা বের করবই।
তা অবশ্যই বের করবে।
‘তোমার কপাল সত্যিই মন্দ। তুমি আমাদের মনে হয় ঠিক চেন না। তাই বিদ্রুপ রসিকতা তোমার মুখ থেকে যাচ্ছে না। খুব শীঘ্রই এর ফল তুমি দেখবে।
বলে সে নড়ে চড়ে বসে সামনের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলো।
মৃত্যুর দৃশ্য সামনের আসার পর আর কিছু দেখবার বাকি থাকে কি?
মহিলাটি দু’পক্ষের এ বাক-বিনিময় শুনছিল। অবশেষে আহমদ মুসাকে বলল উদ্দেশ্য করে বলল, দেখুন অনেক সময় কথা বলার চেয়ে না বলাই ভাল।
আহমদ মুসা তাৎক্ষণাৎ কোন জবাব দিল না।
মনে মনে বলল জানি ম্যাডাম। কিন্তু এ সময়টা সে সময় নয়। এ সময় আপনাদের বেশী বেশী জানার এবং পরিমাপ করার। এবং আমি তা কিছুটা পেরেছিও। তোমরা আমাকে চিননি, না চেনা পর্যন্ত তোমরা কিছু করতেও পারবে না। তোমরা ব্ল্যক ক্রসের উর্ধতন কেউ নও। কোন স্বাধীন সিদ্ধান্ত তোমাদের হাতে নেই। তোমাদের তুচ্ছ করে মানসিকভাবে তোমাদের দূর্বল করার মধ্যে আমার লাভ।
একটু সময় নিয়ে আহমদ মুসা বলল, স্বাধীনতা খুব মূল্যবান। কথা বলার স্বাধীনতাটুকু এখনও বাকি আছে। তাই তার একটু বেশীই ব্যবহার করছি।
মহিলাটির মুখে একটা বিস্ময়ের ছায়া নামল।
ড্রাইভিং সিটে বসা নেতা গোছের সেই লোকটি মুখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার বকবকি বন্ধ কর, না হলে মুখের মানচিত্র কিন্তু আরও বেশী পাল্টে যাবে।
আহমদ মুসা হাসল, কোন কথা বলল না।
আহমদ মুসাকে নিয়ে গাড়িটাই আগে চলছিল। তার পেছনে আরও তিনটি গাড়ি।
চলছে গাড়িগুলো সলো’র পথ ধরে।
ব্ল্যাক বুল এবং তার দু’টি কুকুর ঠিক সময়ে গাড়ির মেঝেতে শুয়ে পড়ায় বেচে গেছে। কিন্তু গাড়ি বাঁচেনি। রিজার্ভ টায়ারসহ পেছনের দু’টি টায়ার একদম ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
দুই কুকুর টম ও টমিকে দুই বগলে নিয়ে ব্ল্যাক বুল গাড়ি থেকে নামল। সাথে নিল আহমদ মুসার ব্যাগ এবং তার নিজের ব্যাগ।
আহমদ মুসাকে বহনকারী গাড়ির বহরের শব্দ মিলিয়ে যাবার পর গাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
বেরিয়ে এসে অসহায় দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল ব্ল্যাক বুল। জংগলের সমুদ্রে নিজেকে এক ভাসমান মানুষ মনে হলো ব্ল্যাক বুলের। সড়ক আছে বটে কিন্তু কোন যানবাহনের দেখা নেই।
সড়কে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক বুল সূর্যের দিক বিচার করে বুঝল, আহমদ মুসাকে নিয়ে গাড়িগুলো সলো’র দিকে গেছে। সলো তার পিতৃ পুরুষের গ্রাম, এখন নাকি ছোট-খাট একটা নদী বন্দর।
ব্ল্যাক বুল কিছুক্ষণ এদিক সেদিক করে নিরুপায়ভাবে দু’টি কুকুরের চেন ধরে সলো’র পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
সড়কটি সংঘ নদীর পূর্ব তীর বরাবর দক্ষিণে এগিয়ে গেছে।
সড়কের দুই ধারেই ঘন বন। সড়ক থেকে সংঘ নদী খুবই কাছে।কিন্তু মাঝখানে বন এতই ঘন যে মনেই হয় না আশেপাশে কোথাও নদী আছে।
সন্ধ্যা আসছে নেমে। রাতের কথা ভাবতেই গাকাঁটা দিয়ে উঠল ব্ল্যাক বুলের। এই এলাকায় সে কোন দিন আসে নি, কিন্তু জানে সে এলাকার খবর। মধ্য আফ্রিকা প্রজানন্ত্রের এই দক্ষিণাঞ্চল থেকেই কঙ্গো অববাহিকা ও গ্যাবনের দূর্ভেদ্যতম বনাঞ্চলের শুরু। এই জংগলে গরিলা, সিংহ, বাঘ সব ধরনেরই হিংস্র জানোয়ার আছে। তার উপর আছে বান্টুদের শত্রু কোকুইদের ছড়ানো আতংক। ওরা অঞ্চল বিশেষে গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায়। বান্টুদের কাউকে একাকি পেলে ফাঁদে ফেলে ধরে নিয়ে যায় তাদের দেবতার কাছে। তার পর বলি দেয়।
অন্ধকার নেমে এল চারদিকে।
যতক্ষণ দিন ছিল ততক্ষণ সাহস কিছু ছিল। রাত নামার সাথে সাথে সে সাহসটুকুও অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
ব্ল্যাক বুল শক্ত হাতে ধরল টম ও টমির চেন এবং আরেক হাতে বাগিয়ে ধরল রিভলবার। টম ও টমিকে এখন তার মনে হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় বিপদেরও কারণ। কুকুরের গন্ধ শোঁকার শক্তি তার জন্যে এখন এ্যাসেট। হিংস্র বন্য জন্তু কিংবা শ্ত্রু মানুষ ইত্যাদি যাই হোক বেশ দূরে থাকতেই বাতাসে গন্ধ নিয়ে তাকে সাবধান করতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো, কুকুরের লোভনীয় গন্ধ আবার হিংস্র পশুদের আমন্ত্রন জানাতে পারে।
পশু ও মানুষের নজর এড়াবার জন্যে ব্ল্যাক বুল সড়কের ধার দিয়ে, বনের পাশ ঘেঁষে এগিয়ে চলছিল।
ব্ল্যাক বুল যেমন চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি মেলে পথ চলছিল, তেমনি সব সময় কুকুর দু’টির প্রতিক্রিয়ার দিকেও চোখ রাখছিল।
হঠাৎ এক সময় ব্ল্যাক বুলের হাতের চেনে টান পড়ল। ফিরে তাকিয়ে দেখল কুকুর দু’টি বসে গেছে।
ব্ল্যাক বুল চেন ধরে ওদের টানল, কিন্তু এক ইঞ্চিও নড়ল না।
ব্ল্যাক বুল হাতের চেনে ঢিল দিল। সংগে সংগেই কুকুর দু’টি পেছনে চলার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল।
শিক্ষিত কুকুর দু’টির ইংগিত বুঝল ব্ল্যাক বুল। নিশ্চয় সামনে বাঘ, সিংহ, গেরিলা ধরনের হিংস্র কোন জন্তু আছে।
কি করবে এখন ব্ল্যাক বুল? চিন্তারও সময় নেই। ইতিমধ্যেই তাদের দেখতে না পেয়ে থাক তবেই রক্ষা। গন্ধ নিশ্চয় পেয়েছে, যেমন কুকুর পেয়েছে।
ব্ল্যাক বুল ডানে জঙ্গলের দিকে তাকাল।দেখল,কাছেই বিশাল কান্ড বিশিষ্ট বড় একটি গাছ।ব্ল্যাক বুলের গাছে উঠার অভ্যাস আছে।কিন্তু এই গাছে উঠা তার পক্ষে অসম্ভব।হতাশ হয়ে আশেপাশে তাকাল।আনন্দের সাথে দেখল,বড় গাছটি থেকে কয়েক গজ দূরে আরেকটি স্বল্প বেড়ের তরুণ গাছ।তীরের মত বড় গাছটির ডালপালা ভেদ করে উপরে উঠে গেছে।এ গাছটি দিয়ে বড় গাছের ডালে উঠা যায়।
ব্ল্যাক বুল সময় নষ্ট করল না।কুকুর দু’টিকে টেনে নিয়ে ছুটল সে গাছের দিকে।সমস্যায় পড়ল কুকুর দু’টিকে নিয়ে।ও দু’টিকে কাঁধে নিয়ে গাছ বেয়ে উঠা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল।আহমদ মুসার ব্যাগে সে সিল্কের কর্ড দেখেছে।ওটাই যথেষ্ট হবে।
ব্ল্যাক বুল তাড়াতাড়ি কর্ড বের করে তার দুই প্রান্ত দুই কুকুরের চেনের সাথে শক্ত করে বেঁধে কর্ডের মাঝ বরাবর জায়গাটা নিজের বেল্টের সাথে গিট দিয়ে নিল।তারপর কুকুর দু’টি কে শান্তভাবে থাকতে বলে গাছে উঠতে শুরু করল।বিশ ফুটের মত উঠেছে এই সময় বোমা ফাটার মত ভীষণ শব্দে চারদিকটা কেঁপে উঠল।প্রবল্ভাবে চমকে উঠে হাত-পা ফসকে পড়ে যাচ্ছিল ব্ল্যাক বুল।শেষ মুহুর্তে প্রাণপণে হাত-পা দিয়ে গাছ আঁকড়ে ধরে রক্ষা পেল সে।
নিজেকে সামলে নিয়েই ব্ল্যাক বুল নিচের দিকে তাকাল।তার ভুল হয়নি বুঝতে যে ওটা বোমা ফাটার শব্দ নয়।সিংহের গর্জন ওটা।সিংহটা নিশ্চয় তাকে অথবা কুকুর দু’টিকে দেখতে পেয়েছে।দেখতে পেয়েই সে গর্জন করে উঠেছে শিকারকে ভীত করে তোলার জন্যে।লাফ দিয়ে শিকার ধরার দূরত্বে সিংহটি এসে গেছে।
তাড়াতাড়ি ব্ল্যাক বুল উপরে তাকাল।দেখল, মাত্র ফুট তিনেক উপরে বড় গাছটার একটা মোটা ডাল ব্ল্যাক বুলের গাছটার গা ঘেঁষে এগিয়ে গেছে।ব্ল্যাক বুল দ্রুত উঠতে লাগল।কুকুর দু’টি কে তুলে নিতে হলে তার বসার মত একটা আশ্রয় দরকার।
কিন্তু গাছের মোটা ডাল হাতে পাওয়ার আগেই সেই গর্জন আবার শুনতে পেল ব্ল্যাক বুল।সেই সাথে হাতের কর্ডে টান পড়ল।চমকে উঠে থেমে গেল ব্ল্যাক বুল।সিংহটা কি তার কুকুরের প্রতি চড়াও হয়েছে, না কুকুর দুটি পালাবার চেষ্টা করছে?
ব্ল্যাক বুল দুই পা এবং বাম হাতে গাছকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে ডান হাত দিয়ে কর্ড ধরে কুকুর দু’টিকে টেনে তোলার চেষ্টা শুরু করল।
এক হাতে টেনে তোলা অসম্ভব।বাম হাতের সাহায্য নিল।কিন্তু বাম হাতের পক্ষে শরীরের ভার নিয়ে গাছ আঁকড়ে থাকা এবং দুইটি বাঘা কুকুরের ভার ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন।কিন্তু কঠিন তা অনুভব করার সময় ও নেই।পাগলের মত টেনে তুলতে লাগল কুকুর দুটিকে।কুকুর দু’টি যে ভীষণ ভারী আজই তা প্রথম মনে হলো ব্ল্যাক বুলের।মনে হচ্ছে সে ভার তাকে টেনে নামিয়ে নিয়ে যাবে গাছের তলায়।
কিছুদূর উঠেছে কুকুর দুটি,এমন সময় প্রাণ কাঁপানো এক হুংকার এবং সেই সাথে গাছের গোড়ায় ভারী কিছু পড়ার শব্দ হলো।
নিজের অজান্তেই কখন যেন কাঁপতে শুরু করেছে ব্ল্যাক বুল।কুকুরকে উপরে তোলা বন্দ হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে ফিরে পেল ব্ল্যাক বুল।
শুধু বাম হাতে পারছে না।দাঁত দিয়ে ব্ল্যাক বুল কামড়ে ধরল সিল্কের কর্ড।তারপর ডান হাত নিচে নামিয়ে কুকুর দু’টি কে আরও এক ফুট উপরে নিয়ে এল।খুশী হলো সে সিংহ কুকুরের কোন অংশের নাগাল পেলে সিংহের কাছ থেকে কুকুর দু’টিকে ছাড়িয়ে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হতো না।সে কুকুরকে যথেষ্ট উপরে তুলতে পেরেছে,যেখানে লাফ দিয়ে নাগাল পাওয়া সিংহের পক্ষে সম্ভব নয়।
কুকুরকে যখন ব্ল্যাক বুল এইভাবে তুলছে,গাছের গোড়ায় তখন লংকা কান্ড। নিচের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।কিন্তু বুঝা যাচ্ছে প্রায় হাতের মুঠো থেকে শিকার হাত ছাড়া হওয়ায় পশুরাজ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।মাটি কাঁপছে তার গর্জনে।কাঁপছে যেন গাছটিও।
কুকুর দু’টিকে সিংহের আওতার বাইরে আনতে পারায় ব্ল্যাক বুল খুশী।কিন্তু এই খুশী ধরে রাখা তার জন্যে সংকটজনক হয়ে দাঁড়াল।ঝুলন্ত কুকুর দু’টিকে যেখানে ধরে রাখাই কঠিন,সেখানে এই ভার নিয়ে উপরে উঠবে কেমন করে!আবার এইভাবে থাকাও সম্ভব নয়।
আবার উপরের দিকে চাইল ব্ল্যাক বুল।মাত্র ফুট খানেক উপরে ডালটা।কিন্তু ওখানে পৌঁছাবে কি করে!কুকুর দু’টিকে ধরে রাখতে গিয়ে তার ডান হাত বন্ধ।শুধু বাম হাত দিয়ে এত ভার টেনে গাছ বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়।যে কোনভাবেই ডান হাতকে কার্যকরী করতে হবে।
ব্ল্যাক বুল ভাবল,ডান হাতের কর্ডটিকে যদি কোন ক্রমে কাঁধে এনে পেচানো যেত,তাহলে ডান হাতকে মুক্ত করা সম্ভব হতো।কিন্তু ওকাজটা প্রায় অসম্ভব।
হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে ব্ল্যাক বুলের মাথায় একটা চিন্তার উদয় হলো।কর্ড বাহুতে পেচিয়ে কুকুর দু’টির ভার কাঁধের কাছাকাছি আনতে পারে।
চিন্তার সংগে সংগেই সে কর্ড প্রথমে হাতে,তারপর বাহুতে পেঁচানো শুরু করে দিল।হ্যাঁ পেচানো যাচ্ছে শুধু নয়,কর্ডটা হাতে থাকতে শযে ভারটা কষ্টকর মনে হচ্ছিল কর্ড বাহুতে আসার পর তা অনেকটা সহনীয় হয়ে গেল।কিন্তু কর্ডকে কনুই পার করে আনা খুবই কষ্টকর হয়ে গেল।আর চেষ্টা করল না ব্ল্যাক বুল।
এবার সে ইঞ্চি ইঞ্চি করে উপরে উঠা শুরু করল।
ইতিমধ্যে এক কষ্ট গিয়ে আরেক কষ্ট দেখা দিল।ভার বহনটা আগের চেয়ে অনেক স্বস্তিকর হলেও সিল্কের সরু কর্ড ভারের চাপে বাজুতে বসে যাচ্ছিল।যেন বাজুর পেশি কেটে দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে তার।চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল তার।তবু দাঁতে দাঁত চেপে সে গাছ বেয়ে উপরে উঠছিল।
যখন ব্ল্যাক বুল গাছটি আঁকড়ে ধরে ডালটিতে ঘোড়ার মত উঠে বসল,তখন তার মনে হলো ের চেয়ে বড় বিজয় তার জীবনে আসেনি।এর চেয়ে বড় সাহায্য আল্লাহ তাকে আর কোনদিন করেননি।
কুকুর দু’টি কে তুলে সে ডালে বসিয়ে দিল।উপরে উঠে যাওয়া গাচটির সাথে শক্ত করে বাঁধল কুকুর দু’টির চেন।
বেশ মোটা ডাল।আরামেই বসা গেল।
ঘামে সে গোসল করে ফেলেছিল,পিঠে ঝুলানো ব্যাগ দুটি নামিয়ে রাখলে আরাম পাওয়া যেত।কিন্তু ব্যাগ দু’টি কে বিচ্ছিন্ন করতে চাইল না।একটি ব্যাগ আহমদ মুসার।যা মহামুল্যবান আমানত তার কাছে।
সিংহটি তখনও নীচে ক্রোধে গোঁ গোঁ করছিল।শব্দ শুনেই বুঝা যাচ্ছিল গাছের চারদিকে চক্কর দিচ্ছে সে।
এই সময় খুব কাছে প্রায় এক সাথে দুইটি মাটি ফাটানো গর্জন শুনতে পেল ব্ল্যাক বুল।বুকটা আবার নতুন করে কেঁপে উঠল ব্ল্যাক বুলের।ভয়ে ভয়ে নীচে তাকাল সে।
নিচে এখন একটির জায়গায় সিংহ তিন্টি।আরও আসবে নাকি?
ব্ল্যাক বুলের রাতটা কেটে গেল নির্ঘুম এবং আতংকের মধ্যে দিয়ে।ফর্সা হয়ে গেলে চারটা সিংহ প্রায় এক সংগেই চলে গেল।রোষ কষায়িত চোখে ওদের ওপরে তাকানো এবং রাজ যাত্রার মত ওদের ভারিক্কি চালে চলে যাওয়া চেয়ে চেয়ে দেখল ব্ল্যাক বুল।
পুবদিকে একটু দূরে রাস্তার দিকে তাকালে বুঝা যাচ্ছে সূর্য বেশ উপরে উঠেছে।কিন্তু গাছ থেকে নামতে সাহস পেল না।কিন্তু পরক্ষণেই তার শিক্ষিত দুই কুকুরের কথা মনে পড়ল।ভাবল,ওরাই তো তার ব্যরোমিটার।ওদের আচরণ থেকেই বুঝা যাবে আশেপাশে শ্ত্রু আছে কিনা।
‘টম, টমি দেখবি সব ঠিক আছে কিনা।’বলে ব্ল্যাক বুল কুকুর দু’টিকে নামিয়ে দিল মাটিতে।ব্ল্যাক বুলের টম ও টমি মাটিতে নেমে চারদিকে গড়াগড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে আনন্দ প্রকাশ করল।
ব্ল্যাক বুল নিশ্চিন্তে নেমে এল মাটিতে।
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সড়কের ধারে বসে ব্ল্যাক বুল ব্যাগ থেকে খাবার বের করে কিছু নিজে খেল, কিছু তার টম টমিকে খাওয়াল।
তারপর তৈরী হয়ে তাকাল পথের দিকে।সলো পৌছতে আরও সত্তর-আশি কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হবে।কিভাবে?
বারবারেতি ও সলো’-এর মধ্যে বাস সার্ভিস হয়তো আছে।কিন্তু কি করে জানবে তার সময়টা।বাসের জন্যে অনিশ্চিত বসে থেকে আরেকটি রাতের মুখোমুখি সে হতে চায় না।ব্যক্তিগত গাড়িও যাতায়াত করে ে পথে।সেটা আরও অনিশ্চিত।
নদীর কথাও ভাবল ব্ল্যাক বুল।এ অঞ্চলে নদী পথেই বেশী যাতায়াত হয়।ব্যক্তিগত নৌকা,ভাড়া নৌকা,ব্যবসায়ের নৌকা ইত্যাদি অনেক ধরণের নৌকা রয়েছে।তাছাড়া নদী পথে কাঠের ভেলার রয়েছে ব্যাপক প্রচলন।শহরের বাইরের এলাকার মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাঠের ভেলাই ব্যবহার করে থাকে।
হেঁটে অনেক পথ চলল।কত বার আকুলভাবে পেছনে তাকাল,গাড়ির কোন চিহ্ন নেই।
গাড়ির কথা এক সময় ভুলেই গিয়েছিল ব্ল্যাক বুল।হঠাৎ ইঞ্জিনের পরিচিত শব্দে পেছন ফিরে তাকাল সে।
দেখল একটা মাইক্রোবাস আসছে।কাছে এলে দেখল দু’একজন কৃষ্ণাঙ্গ আছে,আর সবাই শ্বেতাংগ।তারা সরকারের উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হবে,নয়তো হবে পর্যটক।
আশায় বুক বেধে ব্ল্যাক বুল হাত তুলল ওদের থামাবার জন্যে।কিন্তু শ্বেতাংগ ড্রাইভার একবার চোখ তুলে তাকিয়ে বেপরোয়াভাবে চলে গেল।
যেটুকু আশার আলো জ্বলে উঠেছিল ব্ল্যাক বুলের মনে তা আবার দপ করে নিভে গেল।
আবার সেই চলা শুরু হলো তার।
আবার গাড়ির শব্দে পেছনে ফিরে তাকাল ব্ল্যাক বুল।
দেখল একটা জীপ আসছে।
কাছে এলে দেখল পুলিশের জীপ।
পুলিশে কোন ভেজালে যেতে চায় না ব্ল্যাক বুল। তাই ঠিক করল জীপটির কোন সাহায্য চাইবে না ব্ল্যাক বুল।
কিন্তু ব্ল্যাক বুলকে বিস্মিত করে দিয়ে পুলিশের জীপটি এসে ব্ল্যাক বুলের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
মনটা ধক করে উঠল ব্ল্যাক বুলের। ঘটনা তো পুলিশ নিশ্চয়ই টের পেয়েছে, লাশগুলো তো ওখানেই পড়ে আছে। তাকে পুলিশ সন্দেহ করছে নাকি। আচ্ছা আমি কোত্থেকে এলাম, এ অবস্থা কেন, এসব জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দেব?
পুলিশের গাড়ি দাঁড়াবার সাথে সাথে ব্ল্যাক বুলও দাঁড়িয়ে গেছে।
লাফ দিয়ে নামল একজন পুলিশ অফিসার। জীপে একমাত্র সেই।
অবশ্য ড্রাইভিং সিটে যে আছে সেও পুলিশের ইউনিফরম পরা। অর্থাৎ গের পুলিশ।
পুলিশ অফিসারটি কৃষাংগ। তার দৃষ্টি কুকুর দু’টির দিকে। লোভে তার চোখ দু’টি চক চক করছে। পুলিশের চোখ না চেনার কথা নয়। কুকুর দু’টির চাহনি দেখেই বুঝতে পেরেছে ও দু’টি সোনার টুকরা। দুর্লভ জাতের শিকারী কুকুর।
‘কে তুই?’ পুলিশ এমনভাবে কথাটি জিজ্ঞেস করল যেন ব্ল্যাক বুল কোন বড় আসামী।
‘আমি………’
ব্ল্যাক বুলকে কথা শেষ করতে না দিয়ে পুলিশ অফিসারটিই আবার বলল, ‘কুকুর দু’টি কোথায় পেলি?’
‘আমার। আমি ……..’
ব্ল্যাক বুলকে থামিয়ে দিয়ে বলল পুলিশ অফিসারটি, ‘বুঝেছি রহস্য একটা আছেই। সেটা আমরা দেখব। কুকুর দু’টি আমাকে দিয়ে দে।’
বলে পুলিশ অফিসারটি ব্ল্যাক বুলের হাত থেকে কুকুর দু’টির চেন কেড়ে নিতে গেল।
ব্ল্যাক বুল একটু পিছনে সরে গেল। বলল, ‘না দেব না।’
‘দিবি না?’ বলে পুলিশ অফিসার বেল্টের খাপ থেকে রিভলবার বের করে ব্ল্যাক বুলের বুক বরাবর তুলে ধরল।
মুহূর্তে ঘটে গেল ঘটনা।
হঠাৎ কুকুর দু’টি, টম ও টমি, পুলিশ অফিসারটির দু’পাশ বেয়ে দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাঘের গর্জন করে উঠল। তাদের মুখের বিশাল হা দেখে মনে হলো এই বুঝি তারা কামড়ে ধরবে পুলিশ অফিসারটির গলা।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল পুলিশ অফিসারটি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের রিভলবারটি ফেলে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে তোদের প্রভুকে কিছু বলব না।’
ডরভলবার ফেলে দেয়ার সংগে সংগেই কুকুর দু’টি পুলিশ অফিসারটিকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াল এবং ফেলে দেয়া রিভলবারটি মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে টম ও টমি দু’টিই গিয়ে ব্ল্যাক বুলের কাছে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল পুলিশ অফিসারটি। তারপর হেসে উঠল। বলল, ‘কংগ্রাচুলেশন তোমাকে। তোমার কুকুর দু’টি খুবই ভালো।’
‘আমি দু”খিত, আপনার প্রতি বেয়াদবি করেছে টম ও টমি।’ বলে ব্ল্যাক বুল টমের মুখ থেকে রিভলবারটি নিয়ে কাপড়ে মুছে তা ফেরত দিল পুলিশ অফিসারকে।
‘না, ওটা বেয়াদবি নয়। প্রভুর পক্ষে যা করা দরকার তাই ওরা করেছে। সত্যি আমি মুগ্ধ।’
‘ধন্যবাদ। আপনি বুঝি পশুদের খুব ভালোবাসেন?’
‘বুদ্ধিমান পশুদের আমার খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে শিকারী কুকুর। ওরা মানুষের চেয়ে হাজার গুণ বেশী বিশ্বস্ত ও উপকারী।’
বলে একটু থেমে আবার জিজ্ঞাসা করল পুলিশ অফিসারটি, ‘কে তুমি? কোথায় যাচ্ছ এভাবে?’
সমস্যায় পড়ল ব্ল্যাক বুল। তার মুসলিম নামটা প্রকাশ করা ঠিক হবে না। আবার ব্ল্যাক বুল নামটা কাউকে বলার মত নয়, এ ধরনের নাম কোন আফ্রিকান স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে না।
হঠাৎ ব্ল্যাক বুলের মনে পড়ল তার দাদার নাম। ‘কমন্ড কাল্লা’, তার দাদা, সংঘ নদী তীরের ‘সলো’ গ্রাম (যা আজ বন্দর) থেকে হারিয় গিয়েছিল দাস ব্যবসায়ীদের হাতে ধরা পড়ে। সেই কমন্ড কাল্লা যদি আজ ‘সলো’তে ফিরে যায় কেমন হয়?
ব্ল্যাক বুল বলল, ‘আমার নাম ‘কমন্ড কাল্লা’। যাচ্ছি ‘সলো’।
‘কি নাম ‘কমন্ড কাল্লা?’ পুলিশ অফিসারটি যেন বিস্মিত হলো নামটায়। যেন নামটা তার কাছে পরিচিত।
‘জি।’ বলল ব্ল্যাক বুল।
পুলিশ অফিসারটি তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না। যেন সে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল।
কয়েক মুহূর্ত পরে মুখে হাসি টেনে বলল, ‘নামটা সুন্দর। আসছো তোত্থেকে এভাবে?’
‘ইয়াউন্ডি থেকে। গাড়ি অচল হয়ে পড়ায়। গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাঁটছি এবং গাড়ি খোঁজ করছি সলো যাবার।’
পুলিশ অফিসারটির চোখ হঠাৎ তীক্ষè হয়ে উঠল। বলল, ‘গাড়িটা কোথায় নষ্ট হয়েছে?’
‘কাদেলীর তীরে।’
‘কবে?’
‘গতকাল।’
‘কাল থেকে হাঁটছো?’
‘হ্যাঁ।’
‘রাতে কোথায় ছিলে?’
‘গাছে।’
একটু ভাবল পুলিশ অফিসারটি। তারপর বলল, আমি ‘সলো’ যাচ্ছি। আমার সাথে যেতে পার।’
‘ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ।’ ব্ল্যাক বুলের কথার মধ্যে হৃদয় নিঃসৃত কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ল, ‘ওয়েলকাম। উঠে পড়ো গাড়িতে।’
বলে পুলিশ অফিসারটি ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে উঠল।
পুলিশ অফিসারটি ‘সলো’র পুলিশ সুপার। সেখানকার সর্বোচ্চ পুলিশ অফিসার। নাম জাগুয়াস ম্যাকা।
ব্ল্যাক বুল জীপের পেছনের সিটে উঠে বসল তার টম ও টমিকে নিয়ে।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
চলতে শুরু করল জীপটি।
‘তুমি সলোতে কোথায় যাবে?’
‘কোন হোটেলে উঠব।’
উত্তরে জাগুয়াস ম্যাকা কিছু বলল না। তার দৃষ্টি প্রসারিত হলো সামনে।