২৩. রাজচক্র

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

বন্ধ গেটটির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হর্ণ দিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার গায়ে ফরাসি মেট্টো পলিটান পুলিশ ইন্সপেক্টরের পোশাক।
গেটম্যান বন্ধ গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে তাকাল।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে মুখ বের করে বলল, ‘দরজা খুলে দাও। ম্যাডামের সাথে কথা বলতে হবে।’
গেটম্যান পা ঠুকে আহমদ মুসাকে একটা স্যালুট দিয়ে বলল, ‘ইয়েস স্যার।’
গেট খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল আহমদ মুসার গাড়ি। বেশ বড় বাড়ি। চারদিকে প্রাচীর ঘেরা। উঁচু প্রাচীর।
শিন নদীর রয়্যাল ব্রীজ থেকে যে প্যালেস দক্ষিণ দিকে উঠে গেছে, তার দক্ষিণ প্রান্তের দিকে এ বাড়িটি। লুইদের প্রাসাদ অর্থাৎ ডোনাদের বাড়ি এ প্যালেস রোডের মুখে অর্থাৎ নদীর তীরেই।
বাড়িতে থাকত ক্যাথারিন, তার মা এবং ক্যাথারিনের নানা। ক্যাথারিন কিডন্যাপ হওয়ার পর তার মা এবং নানা রয়েছে বাড়িতে।
আহমদ মুসা প্যারিসে আসার পর ক্যাথারিনের বিষয় জানার জন্যে ক্যাথারিনের মা’র সাথে চেষ্টা করেও দেখা করতে পারেনি। প্রতিবার চেষ্টায় একই জবাব পেয়েছে, কারও সাথে উনি কথা বলবেন না। কারও কিছু জানার বা বলার থাকলে তিনি পুলিশের সাথে যোগাযোগ করুন।
কিন্তু ক্যাথারিনের মা’র সাথে দেখা আহমদ মুসাকে করতেই হবে। অবশেষে আজ পুলিশ বেশে আহমদ মুসা প্রবেশ করল ক্যাথারিনের বাড়িতে।
গাড়ি বারান্দায় গাড়ি থামতেই একজন বেয়ারা ছুটে এসে গাড়ির দরজা খুলে ধরল।
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে।
‘আসুন, মহামান্য ডমেস অপেক্ষা করছেন ড্রইংরুমে।’ বলল বেয়ারা, সামনে চলার পথের দিকে ইংগিত করে।
বেয়ারা পুলিশ রূপী আহমদ মুসাকে পৌঁছে দিল ড্রইংরুমে।
ড্রইংরুমে প্রবেশ করে আহমদ মুসা দেখল ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের একজন বৃদ্ধা সোফায় বসে আছে। রাজকীয় চেহারা। বসে আছেনও রাজকীয় কায়দায়।
এ বৃদ্ধাই তাতিয়ানার দাদী এবং ক্যাথারিনের মা। নাম গ্রান্ড ডমেস লিওনিদা জিভনা।
আহমদ মুসা প্রবেশ করতেই ক্যাথারিনের মা বলল, ‘ওয়েলকাম, ইন্সপেক্টর।’
তারপর সোফার দিকে ইংগিত করে বলল, ‘বসুন।’
আহমদ মুসা বসল।
আহমদ মুসা বসতেই ক্যাথারিনের মা লিওনিদা বলে উঠল, ‘মিঃ ইন্সপেক্টর, বলুন আমি কি সাহায্য করতে পারি। কালকেও তো আবার জানিয়েছি, যা বলেছি তার বাইরে কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
‘ইয়োর হাইনেস, আপনি কি আমাকে মাফ করবেন যদি আমি বলি আমি পুলিশের বেশ ধরে এসেছি, কিন্তু আমি পুলিশ নই।’ বলল আহমদ মুসা খুব নরম কন্ঠে।
কথাটা শুনেই বিস্ময়ের একটা ছায়া খেলে গেল ক্যাথারিনের মা লিওনিদার মুখের উপর দিয়ে। তার চোখ দু’টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বলল, ‘তাহলে আপনি কে? ক্যাথারিনকে কিডন্যাপকারীদের কেউ?’
‘আমি পুলিশেরও কেউ নই, কিডন্যাপকারীদেরও কেউ নই। আমি ক্যাথারিনের শুভাকাঙ্খী। আমি চাই সত্বর তিনি উদ্ধার পান।’
‘ক্যাথারিনের বন্ধু তুমি? কিন্ত ক্যাথারিনের বন্ধু ছিল বলে তো জানি না।’
‘আমি ক্যাথারিনের বন্ধু নই। তাঁর সাথে কোনদিন দেখাও হয়নি। আমি তাঁর একজন শুভাকাঙ্খী।’
‘কারণ?’ ক্যাথারিনের মা লিওনিদার চোখে তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা।
আহমদ মুসা দ্বিধায় পড়ে গেল। সে তাতিয়ানার সাথে সম্পর্কের কথা এখন বলতে চায় না।
আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ কোন জবাব দিতে পারল না।
‘উদ্দেশ্যই সবচেয়ে বড় জিনিস। তুমি যখন উদ্দেশ্যটাই বলতে পারলে না, তখন তোমার বিশ্বাসযোগ্যতা আর থাকল কোথায়?’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে সব সত্য সব সময় প্রমাণ করা যায় না। সব কথা সব সময় বলাও যায় না।’
‘তা যায় না, কিন্ত কেন তুমি আমাদের সাহায্য করতে চাও, এটুকু তো তোমার বলা উচিত।’
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘অবশ্যই বলা উচিত। কিন্ত বলতে পারছি না। অবিশ্বাস করে যতটুকু বলা যায় ততটুকু কি আমাকে বলতে পারেন না?’
ক্যাথারিনের মা লিওনিদা হাসল। বলল, ‘বলতাম। তোমাকে অবিশ্বাস করলে বলতাম। কিন্তু তুমি সত্য লুকাওনি। তোমাকে খুবই ভালো ছেলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া তুমি এশিয়ান, তোমার এতটা পর্যন্ত পৌঁছা প্রমাণ করছে আর দশ জনের মত সাধারণও তুমি নও। যেহেতু আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, তাই আমি চাই, তুমিও আমাকে বিশ্বাস করো।’
আহমদ মুসা ভাবছিল। জবাব তৎক্ষণাৎ দিতে পারল না। ক্যাথারিনের মা’র আন্তরিকতাপূর্ণ কথাগুলো তার হৃদয় স্পর্শ করেছে। কিন্তু সব কথা খুলে বলতে সে ভরসা পাচ্ছে না। বিশেষ করে তাতিয়ানার মৃত্যুর খবর, আংটি ও ডায়েরীর কথা।
উত্তর দিতে আহমদ মুসার দেরী হলো।
কথা বলল আবার ক্যাথারিনের মা’ই। বলল, ‘ঠিক আছে। বলো, কি জানতে তুমি।’ অসন্তুষ্টির ছাপ তার চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা উঠে গিয়ে লিওনিদার পায়ের কাছে কার্পেটের উপর বসল। বলল, ‘আপনি আমার মায়ের মত। আপনি অসন্তুষ্ট হলে আমি কষ্ট পাব। সবই আপনি জানতে পারবেন, কিন্তু আজ নয়।’
লিওনিদা হাসল। বলল, ‘পাগল ছেলে। যাও উঠে বস। তোমার মুখ দেখে যা বুঝেছি, ঠিক তেমন তুমি। বলত কি বিষয় তুমি জানতে চাও?’
‘ক্যাথারিনের কিডন্যাপ হওয়ার পূর্বাপর অবস্থা ও কারণ সম্পর্কে কিছু তথ্য।’
‘এসব তথ্য নিয়ে কি করতে চাও তুমি?’
‘আমি তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা করব।’
লিওনিদা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘মনে হয় বাজে কথা তোমার মুখে মানায় না। তুমি কি বুঝে কথা বলছ বাছা? আমরা এক কঠিন সংকটে পড়েছি। কিন্তু তাই বলে এই নিয়ে কোন প্রকার বিদ্রুপ আমরা পছন্দ করবো না।’
আহমদ মুসার ঠোঁটে সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠল।
তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘ইয়োর হাইনেস, আমি সামান্য মানুষ। শক্তি সেই রকম ক্ষুদ্র। কিন্তু তাই বলে কাউকে এমন ছোট করে দেখা কি ঠিক?’
হাসল লিওনিদা। সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘বাহ তুমি বেশ কথা জান। আমি তোমাকে ছোট করে দেখিনি। তবে তোমার কথাটা অসম্ভব, কিছু মনে হওয়ায় ওভাবে তার প্রকাশ করেছি। যাক, তোমার দৃঢ়তাকে মোবারকবাদ দিচ্ছি বাছা। বল, তুমি কি জানতে চাও।’
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিন কিডন্যাপ কেন কার দ্বারা হলো, এ ব্যাপারে আপনার চিন্তা আমাকে বলুন।’
লিওনিদার চোখে সামান্য বিস্ময়ের একটা রেখা ফুটে উঠল। বলল, ‘আমি কি জানি, তা জিজ্ঞাসা না করে আমার চিন্তা জানতে চাচ্ছ কেন?’
‘মানুষ অনেক কিছু না জানতে পারে, কিন্তু অনেক কিছু সে চিন্তা করতে পারে। আর চিন্তার মধ্যে জানা বিষয়ও থাকে, চিন্তাও থাকে।’
‘ব্রাভো, ব্রাভো! তুমি আমাকে অবাক করেছ বৎস। পুলিশ কিন্তু সব সময় জানতে চেয়েছে আমি কি জানি।’
বলে একটু থামল লিওনিদা। তারপর ধীরে ধীরে শুরু করল, ‘পুলিশকে আমি কিছুই বলিনি। কারণ কারা কেন কিডন্যাপ করল কিছুই জানি না। তবে তুমি চিন্তার কথা বলছ। চিন্তা আমার তো কিছু হয়ই।’
আবার থামল।
সোফায় গা এলিয়ে দিল। বলতে লাগল, ‘যখন বুঝলাম, ক্যাথারিন কিডন্যাপ হয়েছে, সংগে সংগে আমার মনে হলো, ‘বহু বছর পর রাশিয়ার রাজ পরিবারের সৌভাগ্য সূর্যের উদয় কি তাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল? এটাই ছিল আমার প্রথম চিন্তা।’
থামল ডমেস লিওনিদা।
‘সৌভাগ্য সূর্যের উদয়টা কি?’
‘বলছি।’
বলে একটু দম নিল তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া এবং কম্যুনিজমের পতনের পর রুশ দূতাবাসের কাছে আমাদের পরিচয় আর গোপন রাখিনি। ক’মাস আগে নতুন রুশ সরকারের একজন মন্ত্রী বেসরকারী সফরে ফ্রান্সে এসে আমাদের সাথে দেখা করলেন। তিনি জানালেন, সরকার চিন্তা করছেন রাজ পরিবারের সব সদস্যকে রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেবেন যথাযথ মর্যাদার সাথে। সরকার ক্রাউন প্রিন্সেস তাতিয়ানাসহ রাজ পরিবারের সকল সদস্যের মতামত জানতে চান। এর কিছু দিন পর রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত এসে গোপনে আমার সাথে দেখা করলেন এবং বললেন, সরকার সংবিধান সংশোধন করে গণতন্ত্রের সাথে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করতে চাচ্ছেন। প্রেসিডেন্টের বদলে থাকবেন রাজা বা রাণী। আর প্রধানমন্ত্রী হবেন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান। সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী তাতিয়ানা এবং দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী হবেন তৃতীয় ক্যাথারিন। এ ব্যাপারে রুশ সরকার রাজপরিবারের সম্মতি ও সহযোগিতা প্রার্থনা করেছেন।
দ্বিতীয় এই ঘটনার ঠিক দু’মাসের মাথায় ক্যাথারিন কিডন্যাপ হলো এবং পনের দিন হলো তাতিয়ানারও কোন খোঁজ জানি না। ক্যাথারিন ঠিকানাহীন ভবঘুরে হয়ে পড়লেও সাত দিনে সে একবার আমাদের খোঁজ নেবেই। আমি তার জন্যেও উদ্বিগ্ন।’ থামল লিওনিদা।
‘এ ব্যাপারে আর কিছু আপনার চিন্তায় আছে?’
‘রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত দু’টো জিনিস সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল। সেটা হলো, রুশ সম্রাটদের উত্তরাধিকার বিষয়ক মূল্যবান দু’টি ডকুমেন্ট। আমি বলেছিলাম, রাজ পরিবারের নিয়ম অনুসারে প্রথম উত্তরাধিকারী তাতিয়ানার এ বিষয়টা জানার কথা। অতৎপর এ ব্যাপারে তারা আর কিছু বলেনি।’
‘সে দ’টি ডকুমেন্ট কি?’
‘তারা বলেনি। আমিও জানি না।’
‘এখন কিডন্যাপকারীদের সম্পর্কে আপনার চিন্তা বলুন।’
‘এ ব্যাপারটায় আমি একদম অন্ধকারে।’
‘আপনার মনে কোন কথাই কি জাগে না?’
‘কোন চিন্তাই আমার মনে স্থায়ী হয়নি। কখনও ভেবেছি, ক্যাথারিনের প্রতি আসক্ত কেউ এটা করেছে। কিন্তু নিজেকে এটা বিশ্বাস করাতে পারিনি। মনে হয়েছে, কোন কারণে ক্যাথারিনের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে কেউ এটা করতে পারে। কিন্তু চারদিকের সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ক্যাথারিনের কোন শত্রু আছে বলে মনে করি না।’
‘রুশ সরকার কি কিছু করতে পারে?’
‘এমন চিন্তাও মাথায় এসেছে। কিন্তু তা টেকেনি। রুশ সরকারের যে পরিকল্পনা তার সাথে এই চিন্তা মেলে না। তাছাড়া ক্যাথারিন কিডন্যাপ হওয়ার পর তাদের প্রতিক্রিয়া এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখেও আমার তা মনে হয়নি।’ থামল লিওনিদা।
আহমদ মুসা ভাবছিল। তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না সে। একটু পর বলল, ‘যে দু’টি গোপন ডকুমেন্টের তারা খোঁজ করছে, সেটি আপনি জানেন না। কিন্তু আপনাদের রাজ পরিবারের এ রকম কোন ডকুমেন্টের কথা কি আপনি জানেন?’
‘না জানি না। রাজ পরিবারের কিছু গোপন জিনিস আছে, যা শুধু জানেন রাজা বা সম্রাট। তাঁর অবর্তমানে জানেন যুবরাজ বা যুবরাজ্ঞী। আরেকটা ব্যাপার, যারা ক্যাথারিনকে কিডন্যাপ করেছে, তারা সারা বাড়ি কি যেন খুঁজেছে। কোন ড্রয়ার কোন বাক্স তারা আস্ত রাখেনি। অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, তারা পাগলের মত মহামূল্যবান কিছু খুঁজেছে।’
‘স্বর্ণালংকার?’
‘না সে সব তারা নেয়নি।’
‘এ সবের চেয়ে মূল্যবান কি থাকতে পারে?’
‘জানি না।’
‘সেই দু’টি ডকুমেন্ট কি?’
‘জানি না।’
‘ধন্যবাদ। যে ঘর থেকে ক্যাথারিন কিডন্যাপ হয়েছে এবং যে পথ দিয়ে কিডন্যাপকারীরা এসেছে গেছে সেটা কি আমি দেখতে পারি?’
‘অবশ্যই বাছা।’ বলে পাশের টিপয়ে রাখা কম্পিউটার প্যানেলের একটা সুইচে চাপ দিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একজন রুশ বালক এসে হাজির হলো।
‘আলেক্সি, মেহমানকে ক্যাথারিন-এর ঘর এবং কিডন্যাপারদের আসা-যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দাও।’
বালকটি মাথা নুইয়ে বাউ করে বলল, ‘তথাস্ত।’
আহমদ মুসা বালকটির সাথে হাঁটতে শুরু করলে লিওনিদা বলল, ‘তোমার নাম বলনি বাছা। আর তুমি কি করছ তা কি জানার আমার সুযোগ হবে?’
‘গেট যদি বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়, তাহলে অবশ্যই সে সুযোগ আপনার হবে।’
পাশের টিপয়ে রাখা একটা সোনালী কেস থেকে একটা ক্ষুদ্রাকার সোনালী কার্ড বের করে আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলল, ‘এটা প্রাইভেট নাম্বার। যখন আসতে চাও তার আগে এই নাম্বারে একটা রিং করো। ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন।’
‘এই ‘আমাদের’ মধ্যে কি আমি আছি?’
‘অবশ্যই বাছা। তুমি খুব ভাল ছেলে। খুব সহজেই তুমি মা’দের হৃদয় জয় করতে পার।’ বলে সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজল লিওনিদা।
আহমদ মুসা আলেক্সির পিছ পিছ চলল ক্যাথারিনের শোবার ঘরের দিকে।
সবকিছু দেখার পর বালকটি প্রধান গেট পর্যন্ত এসে আহমদ মুসাকে বিদায় দিয়ে গেল।
আহমদ মুসার গাড়ি বেরিয়ে এল ক্যাথারিনের বাড়ি থেকে।
কিছু দূর চলার পর রিয়ারভিউ-এর পর্যবেক্ষণ থেকে তার মনে হলো, কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
আহমদ মুসা গাড়ির গতি দ্রুত করল।
সে পুলিশের পোশাক পরে কারও সাথে লড়াই-এ অবতীর্ণ হতে চায় না। ক্যাথারিনের বাড়ির গেট থেকে যে বা যারা তাকে অনুসরণ করছে, তারা গোয়েন্দা বিভাগের লোক হতে পারে। তার পুলিশ হওয়া সম্পর্কে তাদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। কারণ তার গায়ে পুলিশের পোশাক থাকলেও গাড়িটা পুলিশ বিভাগের নয়।
আহমদ মুসা গাড়ির জানালায় শেড দেয়া কাঁচ তুলে পুলিশের পোশাকটা খুলে ফেলল গাড়ি চালাতে চালাতেই। পরল সৌখিন পর্যটকের পোশাক।
শিন এলাকার পুলিশ অফিসের দিকে চলল আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসা ভাবল, অনুসরণকারী যদি গোয়েন্দা বিভাগের লোক হয়, তাহলে সেও পুলিশ অফিসে ঢুকবে। আর যদি অন্য কেউ হয়, তাহলে ঢুকবে না। আহমদ মুসা যে নিশ্চিতই পুলিশের লোক, এটা নিঃসন্দেহ হয়ে ফিরে যাবে।
আহমদ মুসা দ্রুত পুলিশ অফিসের প্রবেশ গেট দিয়ে ঢুকে অপর প্রান্তের বাইরে বের হওয়ার গেট দিয়ে বেরিয়ে এল।
সে লক্ষ্য করল অনুসরণকারী গাড়িকে আর দেখল না।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো অনুসরণকারী তাহলে ক্যাথারিনকে কিডন্যাপকারীদের কেউ ছিল এবং ওরা তদন্তকারী পুলিশের গতিবিধির উপর চোখ রাখছে।
ওরা কারা হতে পারে? রুশ সরকার হতে পারে? কিংবা রুশ সরকারের কোন পক্ষ? রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বললে কিছু বুঝা যেত? কিন্তু এ আলোচনা তার সাথে করা যাবে কোন উপলক্ষে?
সামনেই ডিপ্লোম্যাটিক জোন।
ডিপ্লোম্যাটিক জোনের দিকে চলতে শুরু করল আহমদ মুসার গাড়ি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বিকেল ৫টা বাজে।
আহমদ মুসা ভাবল, রাষ্ট্রদূত এ সময় নিশ্চয় তাঁর বাসায় আছেন।
আহমদ মুসা ডিপ্লোম্যাটিক গাইডটি বের করে দেথে নিল ডিপ্লোম্যাটিক জোনের রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় রুশ রাষ্ট্রদূতের বাড়ির লোকেশানটা।
রাষ্ট্রদূতের বাড়ির দিকে চলতে চলতে আহমদ মুসা পরিকল্পনা করে নিল কি বলবে সেখানে? ভালই হয়েছে ডমেস লিওনিদার সাগে আগে কথা বলে। এখন ক্যাথারিনের বন্ধু বলে পরিচয় দেয়ার আর কোন সমস্যা নেই।
রাষ্ট্রদূতের গেটে গিয়ে দাঁড়াতেই গেট বক্স থেকে একজন পুলিশ বেরিয়ে এল। স্যালুট দিয়ে বলল, ‘স্যার, আদেশ করুন।’
‘আপনি রাষ্ট্রদূতকে বলুন, একটা জরুরী প্রয়োজনে আমি তাঁর সাথে দেখা করব।’
‘আপনার নাম পরিচয় বলন।’
‘তেমন নাম পরিচয় আমার নেই, যা উনি চিনবেন। আমি গিয়েই ওকে পরিচয় দেব।’
পুলিশ তার গার্ড বক্সের কাছে ফিরে গিয়ে কিছু বলল ভেতরের লোককে।
অল্পক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, ‘নাম, পরিচয় এবং প্রয়োজন বলন। না হলে দেখা হবে না।’
আহমদ মুসা গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘ওঁকে বলুন, আমার জরুরী প্রয়োজন। অনুমতি না দিলেও আমি প্রবেশ করব। আমাকে গুলি করবেন কিনা তার অনুমতি নিন।’
পুলিশ চোখ ছানাবড়া করে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপর ফিরে গেল আবার।
এবার দু’জন পুলিশ বেরিয়ে এল গেট বক্স থেকে। একজন গেটে দাঁড়াল, অন্যজন এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘অনুমতি মিলেছে। আসুন, নিক আপনাকে নিয়ে যাবে।’
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল গেটের দিকে।
গেটে পৌঁছতেই গেট বক্স থেকে বেরিয়ে এল লম্বা-চওড়া ষ্টিলবডির একজন রুশ। কিছু না বলেই সে হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা বুঝল এই লোকই নিক।
তার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল আহমদ মুসা।
বাড়িতে ঢুকে এ করিডোর সে করিডোর ঘুরে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াল নিক।
নক করতে হলো না দরজায়।
একটা কণ্ঠ ধ্বনিত হলো ঠিক মাথার উপরেই, ‘ভেতরে এস।’
আহমদ মুসা বুঝল, বাড়ির সবখানেই টিভি ক্যামেরার চোখ পাতা আছে। কথাটা হলো ভেতর থেকে মাইক্রোফোনে।
ভেতরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং নিক।
রাষ্ট্রদূত বসেছিল সোফায়। উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর মুখে একবার আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘নিক তুমি যাও। ধন্যবাদ।’
তারপর আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বস ইয়ংম্যান। ছেলের বয়সের বলে ‘তুমি’ বললাম কিছু মনে করনি তো?’
রাষ্ট্রদূত চল্লিশোর্ধ। উন্নত কপাল ও পরিচ্ছন্ন চেহারার মানুষ।
‘ধন্যবাদ। ‘তুমি’ সম্বোধন আমাকে আনন্দিত করেছে।’ বলে আহমদ মুসা রাষ্ট্রদূতের বিপরীত দিকের একটা সোফায় বসল।
তোমার কথা আমাকে চমৎকৃত করেছে। এভাবে কথা খুব কম লোকই বলতে পারে।’
বলে একটু নড়ে-চড়ে বসে রাষ্ট্রদূত বলল, ‘কি নাম তোমার? পরিচয় কি? ফ্রান্সে একজন এশিয়ানের কি জরুরী কাজ থাকতে পারে আমার সাথে?’
‘আমি ক্যাথারিনের বন্ধু। আমি তার খোঁজ চাই।’
রাষ্ট্রদূতের চোখে-মুখে নেমে এল বিস্ময়। তার চোখ দু’টি আঠার মত লেগে থাকল আহমদ মুসার মুখে স্থিরভাবে। এক সময় ধীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘তুমি বন্ধু না শত্রু প্রমাণ কি?’
‘প্রমাণ ক্যাথারিন করবে। তার মা ডমেস লিওনিদাও বলতে পারেন।’
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিনের খোঁজ আমার কাছে চাচ্ছ, তাহলে প্রিন্সেস কোথায় আছে বলে মনে কর?’
‘কোথায় আছে জানি না। তবে তিনি রুশ রাজ পরিবারের মেয়ে। রুশ সরকারের স্বার্থ তার সাথে সংশ্লিষ্ট আছে। সুতরাং হয় সে রুশ সরকারের হাতে, নয়তো রুশ সরকার জেনেছেন বা জানার চেষ্টা করছেন তিনি কোথায়?’
‘ম্যাডাম লিওনিদা কি বলেন?’
‘এক্সিলেন্সী, তার বক্তব্য আমি বলতে পারি না।’
‘ক্যাথারিনের খোঁজ তোমার কেন চাই? তার আর কোন বন্ধু বা আত্মীয় তো আমার কাছে এভাবে আসেনি?’
‘সবাই সব জিনিসকে একইভাবে নেয় না, দেখে না।’
‘তোমার দেখার কারণ কি? কি সে কারণ যার জন্যে তুমি জোর করে আমার বাড়িতে ঢুকতে চাও আমার সাথে দেখা করার জন্যে?’
‘আমি তার পরিবারকে সাহায্য করতে চাই।’
‘আর কিছু?’
‘আর কিছু’ বলতে যদি বিশেষ সম্পর্ক বুঝতে চান তাহলে বলছি, সে ধরণের কোন সম্পর্ক নেই।’
‘আমি যদি বলি ক্যাথারিনকে তোমার মত করেই আমরা খুঁজছি, তুমি বিশ্বাস করবে?’
‘বিশ্বাস করব। কারণ আমার কাছে মিথ্যা বলার আপনার প্রয়োজন নেই।’
রাষ্ট্রদূত হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ। তুমি সাহসী এবং বুদ্ধিমান দুই-ই।’
বলে একটু থেমেই আবার সে বলল, ‘আমার উত্তর শুনলে। এখন তুমি কি করবে?’
‘আমার আরও প্রশ্ন আছে।’
‘কি?’
‘তাকে কে বা কারা কিডন্যাপ করতে পারে?’
রাষ্ট্রদূত তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না।
একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বিষয়টাকে আমরা সুনির্দিষ্ট করিনি। তবে আমার মনে হয়, কিডন্যাপের ব্যাপারটা অপরাধ না হয়ে রাজনৈতিক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
‘তার মানে, রাজ পরিবারকে রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেয়া হোক, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি সেখানে চালু হোক এটা চায় না কোন পক্ষ?’
‘তুমি এসব জান?’
‘এটুকুই জানি। আমার প্রশ্নের জবাব কি দয়া করে দেবেন?’
‘ঐ ধরনের কোন পক্ষকে আমি জানি না।’
‘তাহলে ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক বলছেন কোন কারণে?’
‘ঘটনার পেছনে ক্রিমিনাল কোন কারণ খুঁজে পাই না, রাজনৈতিক কারণ তবু কিছু থাকতে পারে।’
‘কেন রাজ পরিবারের সাথে কোন অর্থ যোগ থাকতে পারে না?’
‘তেমন কিছু নেই। জারদের কিছু গোল্ড ছিল পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি সরকারের কাছে। রাজ পরিবার এতদিন এর উপরই চলেছে। সে সঞ্চয় নিঃশেষ বলে আমরা জেনেছি।’
‘আপনারা কি করছেন তাকে উদ্ধারের জন্যে?’
‘আমরা চেষ্টা করছি, ফরাসি পুলিশ চেষ্টা করছে।
একটু থামল রাষ্ট্রদূত। তারপর বলল, ‘আমাদের সরকার খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ক্রাউন প্রিন্সেস ক্যাথারিন অপহৃত হয়েছে। আজই সরকারের যে মেসেজ পেলাম, তাতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকারের গোটা পরিকল্পনাই শুধু বানচাল হওয়া নয়, অপূরণীয় ক্ষতি হবে যদি এ দু’জনকে পাওয়া না যায়। সুতরাং যে কোন মূল্যে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।’
থামল রাষ্ট্রদূত মিখাইল পাভেল। কিছু ভাবল। তারপর বলল, ‘এসব কথা তোমাকে বলছি। কারণ তোমার সাহস আমাকে চমৎকৃত করেছে। তুমি আমাদের সাহায্য করতে পার।’
আহমদ মুসা সেদিকে কান না দিয়ে বলল, ‘সরকারের পরিকল্পনা বানচালের কথা বুঝলাম, কিন্ত অপূরণীয় ক্ষতিটা কি?’
‘আমিও জানি না ইয়ংম্যান।’
‘সেটা কি কোন মূল্যবান ডকুমেন্ট?’
রাষ্ট্রদূত পাভেলের চোখ বিস্ময়ে নেচে উঠল। বলল, ‘ডকুমেন্টের কথাও তুমি জান? ম্যাডাম বলেছেন?’
‘শুধু ‘ডকুমেন্ট’ শব্দ টুকুই জানি। আর কিছু না।’
রাষ্ট্রদূত সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজে ছিল। ঐ অবস্থাতেই বলল, ‘অপূরণীয় ক্ষতির কারণ সে মূল্যবান ডকুমেন্ট হতে পারে, আমি জানি না।’
‘ধন্যবাদ, তাহলে উঠি।’ আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল।
রাষ্ট্রদূত পাভেল সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘আমার প্রস্তাবের জবাব দিলে না?’
‘প্রস্তাবের তো প্রয়োজন নেই। বন্ধু ক্যাথারিনের সন্ধানে আজ যেমন এখানে ছুটে এসেছি। তেমনি আরও ছুটব।’
‘ধন্যবাদ। যতটুকু পারি আমার সাহায্য পাবে।’
বলে একটা প্রাইভেট নেম কার্ড আহমদ মুসসার দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ‘এতে আমার বিশেষ টেলিফোন নাম্বার আছে। তুমি যে কোন সময় টেলিফোন করতে পার।’
আহমদ মুসা এগিয়ে গিয়ে কার্ড নিয়ে হ্যান্ডশেক করে চলে আসার জন্য পা বাড়াল।
‘একটু দাঁড়াও। বাইরে দেখছি আমার স্ত্রী ও মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই।’ দরজার উপরে দেয়ালের একটা স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
কথা শেষ করেই সে বলল হাতের মিনি সাইজের কম্প্যুটারের দিকে তাকিয়ে, ‘এস তোমরা এলিয়েদা।’
ঘরে ঢুকল একজন মধ্য বয়সী মহিলা এবং একজন তরুণী।
তারা ঘরে ঢুকে আহমদ মুসার উপর নজর পড়তেই তরুণীটি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল,‘আপনি? এখানে?’
‘তাই তো, কেমন আছেন আপনি?’ বলল মধ্য বয়সী মহিলাও আহমদ মুসার দিকে সহাস্যে তাকিয়ে।
আহমদ মুসার চোখে-মুখেও বিস্ময় ওদের দেখে।
‘কি ব্যাপার, একে তোমরা চেন?’ স্ত্রী ও মেয়ের দিকে তাকিয়ে রাষ্ট্রদূত পাভেল বলল।
তরণীটি রাষ্ট্রদূতের মেয়ে। নাম ওলগা। আর মধ্য বয়সী মহিলা স্ত্রী। নাম এলিয়েদা।
‘আব্বা, ইনিই তো সেদিন আমাদের বাঁচিয়ে ছিলেন।’ বলল ওলগা।
‘মানে সেদিন উইক এন্ড থেকে ফেরার পথের ঘটনায়?’
‘হ্যাঁ।’ বলল রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এলিয়েদা।
‘ও! ব্রাভো!’ বলে রাষ্ট্রদূত কয়েক পা এগিয়ে এসে আহমদ মুসার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘ইয়ংম্যান, আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। তুমি আমাদের পরিবারকে একটা বিপযর্য় থেকে বাঁচিয়েছ, অপূরণীয় উপকার করেছো আমাদের।’
আহমদ মুসা বিব্রত বোধ করল। বলল,‘ধন্যবাদ। কিন্তু সেটা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। যে কেউ ওখানে থাকলে, আমি যা করেছি সে তাই করত।’
‘কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা প্রহরীরা তা পারেনি।’ বলল রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এলিয়েদা।
‘বোধহয় পারেনি তা নয়। ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘যাই হোক ইয়ংম্যান, এখন তোমার যাওয়া হচ্ছে না। বসতেই হবে। রুশরা খুব অকৃতজ্ঞ, এ কথা কেউ বলে না। মিষ্টি মুখ না করে তুমি যেতে পার না।’ রাষ্ট্রদূত পাভেল বলল।
‘ঠিক। তোমার নাম যেন কি?’
‘আব্দুল্লাহ।’
‘মুসলিম আপনি?’ ওলগার চোখে বিস্ময়।
‘আমার বিস্ময় আরও বাড়ল যুবক। একজন মুসলিম যুবক অথোর্ডক্স খৃস্টান ক্যাথারিনের বন্ধু হতে পারে কি করে?’
‘আপনি প্রিন্সেস ক্যাথারিনের বন্ধু?’ চোখে আরও বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল ওলগা।
‘থাক এ বিতর্ক চল ভেতরে।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল এলিয়েদা।
আহমদ মুসা হাত জোড় করে বলল, ‘মাফ করুন। আজ নয়। আরেকদিন আসব।’
বলেই আহমদ মুসা সবাইকে গুডবাই জানিয়ে বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়াল।
‘তোমার সম্পর্কে আমার অনুমান মিথ্যা না হলে বলব তুমি সময় নষ্ট করার মত ছেলে নও। ঠিক আছে। এসো তুমি। আমরা তোমার আবার আসার অপেক্ষা করব।’
বলে রাষ্ট্রদূত পাভেল এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ধরে আহমদ মুসাকে বিদায় জানাল এবং দরজার ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা প্রহরীটিকে আহমদ মুসাকে গেট পর্ন্ত পৌঁছে দিতে বলল।
আহমদ মুসাকে বিদায় দিয়ে ফিরে আসতেই এলিয়েদা বলল,‘সত্যিই ছেলেটা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের বন্ধু?’
‘ও বলেছে। আমিও অবিশ্বাস করিনি।’
‘মনে হয় অবিশ্বাস করার মত মানুষ উনি নন।’ বলল ওলগা।
‘আমারও তাই মনে হয়।’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
‘আমি প্রশ্নটা অবিশ্বাস থেকে করিনি, বিস্ময় থেকে বলেছি।’ বলল এলিয়েদা।
‘ঠিকই বলেছ আম্মা। আমারও মনে বিস্ময়। আমরা রাজ পরিবারকে অতি মানুষ হিসাবে দেখি। মানুষ হিসেবে দেখলে বোধ হয় এ বিস্ময় আমাদের হতো না।’ বলল ওলগা।
‘ধন্যবাদ ওলগা। কিন্তু রাজ পরিবার রাজ পরিবারই। স্বাতন্ত্র না থাকলে রাজ পরিবার হতো না।’ বলল এলিয়েদা।
‘ধন্যবাদ আম্মা। এই স্বাতন্ত্রটাও বোধহয় আমরা আমাদের বিশ্বাস থেকে সৃষ্টি করেছি।’ ওলগা বলল।
‘তুমি বলতে চাচ্ছ, বিশেষ কোন মান ও যোগ্যতা ওদের নেই? তাহলে সিংহাসনে ওদের আমরা ফিরিয়ে আনছি কেন?’ বলল এলিয়েদা।
‘ওঁদের বিশেষ মান ও যোগ্যতা নেই বলছি না। ওঁদের রয়েছে ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার সম্ভার। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের আস্থা ও ভালোবাসা এবং তাঁদের হাতে পাওয়া শক্তি ও সুযোগই তাদের রাজা বানায়।’
‘ব্রাভো ব্রাভো! আমাদের মা ওলগা চমৎকার বলেছে।’
হাঁটতে শুরু করে রাষ্ট্রদূত পাভেল বলল, ‘এস। মা ও মেয়ে দু’জনেই জিতেছ।’
আহমদ মুসা রাষ্ট্রদূত পাভেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অকূল সমুদ্রে পড়ল। সে আশা করেছিল, একটা আশার আলো সে দেখতে পাবে। কিন্তু কিছুই হলো না। বুঝলো, সেদিন ক্যাথারিনের বাড়ি থেকে বেরুবার পর তাকে অনুসরণ করেছিল রুশ সরকারের কেউ নয়, অন্য কোন শক্তি এবং তারাই সম্ভবত কিডন্যাপ করেছে ক্যাথারিনকে।
তবে রুশ রাষ্ট্রদূত পাভেলের কাছে আসা অর্হীন হয়নি। বুঝা গেল, তারাও ক্যাথারিনকে খুঁজছে। তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
কিন্ত এখন এগুবে কোন পথে?
ক্যাথারিনের বাড়ির উপর ওরা চোখ রাখছে? তাহলে ওর বাড়িতে গেলে ওদের দেখা পাওয়ার একটা পথ হতে পারে।
পরদিন আহমদ মুসা ক্যাথারিনের বাড়িতে গেল। চলে এল। কিন্তু কেউ তাকে অনুসরণ করল না। গাড়ির রিয়ারভিউতে বার বার চোখ ফেলল। কিন্তু তার গাড়ির প্রায় গা ঘেঁষে আসা বেঢপ আকৃতির একটা হোম সাপ্লাই-এর গাড়ি ছাড়া কোন গাড়িকেই আহমদ মুসা তার পেছনে স্থির হতে দেখলো না। হতাশ হলো আহমদ মুসা।
হতাশ মনেই গাড়ি চালিয়ে আহমদ মুসা এসে প্রবেশ করল শিন নদী তীরের একটা ট্যুরিস্ট স্পটে।
ট্যুরিস্ট স্পট শূন্য। সকাল দশটার মত ব্যস্ত ওয়ারকিং আওয়ারে ট্যুরিস্ট স্পটে কোন লোক থাকার কথা নয়।
আহমদ মুসা একদম নদীর কিনারে একটা বেঞ্চিতে বসে গা এলিয়ে দিল।
চোখ বুজে গিয়েছিল তার।
চারদিকের অন্ধকারে পথ খুঁজছিল আহমদ মুসা।
কেউ তার গা ঘেঁষে বসার স্পর্শে চমকে উঠে চোখ খুলল।
দেখল, তার গা ঘেঁষে বসেছে একজন মুখোশধারী লোক।
আহমদ মুসা একটু সরে বসল। তার মনে প্রশ্ন, কৌতুককারী কেউ, কিংবা মানসিক অসুস্থ কেউ, না অদৃশ্য কোন… চিন্তা আহমদ মুসার শেষ হলো না। মুখোশধারী লোকটি পকেটে রাখা তার ডান হাতটি বের করল। হাতে রুমাল।
মুখোশধারী লোকটি পকেট থেকে হাত বের করেই বিদ্যুত গতিতে রুমালটি চেপে ধরল আহমদ মুসার নাকে।
কিন্তু রুমালটি নাক স্পর্শ করার সংগে সংগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি ছিল না রুমালটি ক্লোরোফরম ভিজানো এবং মুখোশধারীর মতলব কি?
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েই তার বাম হাতের কারাত চালাল লোকটির ডান কানের উপরের প্রান্ত ঘেষে।
মুখোশধারী উঠে দাঁড়াতে গিয়েও টলে পড়ে গেল বেঞ্চিতে।
আহমদ মুসা পেছনে পায়ের শব্দ পেল।
তড়াক করে পেছনে ফিরল। দেখল, দু’জন লোক তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদেরও মুখে মুখোশ।
লোক দু’টি তার উপর এসে পড়েছে। সরে দাঁড়াবারও সময় নেই।
আহমদ মুসা শরীরটা বেঁকিয়ে উবু হয়ে বসে পড়ল গাছ থেকে ফল পড়ার মত দ্রুত।
ওরা দু’জন আহমদ মুসার উপর দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ওরা দু’জনও উঠে দাঁড়াচ্ছিল।
ওদের একজন দাঁড়ানো অবস্থাতেই ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা তাকে দু’হাত দিয়ে ঠেকাবার চেষ্টা করে বা পায়ের একটা কিক চালালো লোকটির তলপেটে।
লোকটি তলপেট চেপে ধরে বসে পড়ল।
দ্বিতীয় লোকটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে বসে পড়া লোকটির উপর দিয়ে একটা অশ্রাব্য গালি উচ্চারণ করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা বাম পাশে একটু সরে তার ডান বাহুটা লৌহ দন্ডের মত চালাল ছুটে আসা লোকটির গলা লক্ষ্যে।
প্রচন্ড ঘা খেয়ে লোকটির চলন্ত দেহ চরকির মত ঘুরে গেল এবং চিৎ হয়ে পড়ে গেল বসে পড়া লোকটির উপর।
‘কে তোমরা’ বলে আবার আহমদ মুসা এগুচ্ছিল ওদের দিকে। এ সময় পেছনে কিছুর শব্দ পেয়ে পেছনে তাকাল। দেখল, একটা জাল নেমে আসছে তার উপর। একজন মুখোশধারী দাঁড়িয়ে আছে ক’ গজ পেছনে।
আহমদ মুসা বুঝল সে জালের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। নাইলনের বিশেষ জালে সে জড়িয়ে পড়ল।
একটু দূরে দাঁড়ানো লোকটিই ফাঁদ ছুড়েছিল। ফাঁদের নিয়ন্ত্রণী রশিটি ছিল তার হাতে।
ফাঁদে জড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই পড়ে গেল আহমদ মুসা।
ফাঁদের নিয়ন্ত্রণী রশি টেনে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে লোকটি।
আহমদ মুসা বন্দী হয়ে গেল। পশুরাজ সিংহ জালে আটকা পড়ে যেভাবে অসহায় হয়ে যায় সেভাবেই।
ফাঁদ গুটিয়ে নেবার পর ফাঁদের জালে আহমদ মুসার দেহ গুটি-শুটি খেয়ে গোলাকার হয়ে গেল।
মার খেয়ে ভূলুন্ঠিত তিনজন তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। ওরা গরজাতে গরজাতে এগিয়ে এল আহমদ মুসার দিকে। একজন জালে জড়ানো আহমদ মুসার পাজরে লাথি মেরে বলল, ‘শালা গলাটা ভেংগেই দিয়েছে।’
অন্য দু’জনও আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল।
ফাঁদের রশি হাতে দাঁড়ানো লোকটি হাত তুলে ওদের নিষেধ করে বলল, ‘বীরত্ব আর দেখাতে হবে না। একটি থাপ্পড়ে সব কুপোকাত। নাম ডুবালে তোমরা।’
‘বস, আমাদের দোষ নেই। ব্যাটার হাত বোধহয় লোহার তৈরি। বিশ্বাস না হলে পরখ করে দেখতে পার।’ বলল তিনজনের একজন।
‘পরখ করে দেখার সময় হবে।’ বলে একজন ইংগিত করে বলল,‘তাড়াতাড়ি একে নিয়ে গাড়িতে তোল, কেউ এসে পড়বে।’
একজন এসে জালে জড়ানো আহমদ মুসাকে কাঁধে তুলে নিল। হাঁটতে শুরু করে সে বলল, ‘সত্যি উস্তাদ এর শরীরে লোহা আছে। না হলে এমন হালকা-পাতলা এশিয়ান এত ভারি হবে কেন?’
‘কথা বল না, দৌঁড়াও।’ বলল বস গোছের সেই লোকটি।
গাড়িটা দাঁড়ানো ছিল ট্যুরিস্ট স্পটটার অনেকখানি ভেতরে। খোলাই ছিল গাড়ির দরজা।
খোলা দরজা পথে লোকটি আহমদ মুসার দেহটা ছুঁড়ে মারল গাড়ির স্টিলের মেঝের উপর।
আহমদ মুসা দম বন্ধ করেছিল।
তার ভাগ্য ভাল পাঁজর গিয়ে পড়েছিল ফ্লোরে। মাথা টোকা খেলে ফেটে যেত নির্ঘাত। পাঁজরটার আঘাতও কম হলো না। তার মনে হলো, পাজরের তিনটি হাড় যেন তার ভেঙে গেল।
কিন্তু আঘাতের মধ্যেও গাড়ি দেখে তার মনে সৃষ্টি হওয়া বিস্ময় দূর করতে পারলো না। তার গাড়ির পিছে পিছে আসা হোম সাপ্লাই-এর গাড়িই শেষ পর্যন্ত শত্রু হলো। গাড়িটা গোটা পথ তার পিছে পিছে এলেও গাড়ির প্রতি তার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ জাগেনি।
মনে মনে আহমদ মুসা তাদের ছদ্মবেশের প্রশংসা করল। সে বুঝল, তারা পরিকল্পিতভাবেই তাকে অনুসরণ করেছে। নিশ্চয় তারা চোখ রেখেছিল ক্যাথারিনের বাড়ির উপর। নিশ্চয় এরা ক্যাথারিনকে কিডন্যাপকারীরাই হবে।
খুশী হলো আহমদ মুসা। কিডন্যাপকারীদের মুখোমুখি হবার তার সুযোগ হলো।
কিন্তু এরা কারা? ভাষা প্রমাণ করছে ওরা রুশ। ওরা রাশিয়ার কোন পক্ষ? কোন ক্রিমিনাল গ্রুপ? না রুশ সরকারেরই গোপন কোন পক্ষ?
ওদের একজন উঠে এল গাড়িতে, আহমদ মুসার কাছে। একটা রুমাল চেপে ধরল আহমদদ মুসার নাকে। ক্লোরোফরম ভেজানো রুমাল।
অন্য সময় হলে আহমদ মুসা দম বন্ধ করে প্রতিরোধের চেষ্টা করত। কিন্তু এখন আহমদ মুসা সে রকম কিছু করল না। আহমদ মুসা যেতে চায় ওদের ঘাটিতে।
আহমদ মুসা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।

সংজ্ঞা ফিরে পেলে আহমদ মুসা দেখল সে একটা ঘরের মেঝেয় কার্পেটের উপর পড়ে আছে। তার হাত পা বাঁধা। হাত দু’টি এমন ভাবে পিছ মোড়া করে বাঁধা যে, কষ্ট হচ্ছে। সম্ভবত এই কষ্টের কারণেই তাড়াতাড়ি সে সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে।
কষ্ট হলেও আহমদ মুসা অন্ধকার মেঝেয় গড়াগড়ি দিয়ে শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করে নিল। কিন্তু শরীরকে চাঙ্গা করতে গিয়ে প্রচন্ড ক্ষুধা অনুভূত হলো তার।
সময় এখন কত? ঘড়িটা তারা খুলে নেয়নি। হাতে আছে। কিন্তু পিছ মোড়া করে বাঁধা থাকায় ঘড়িটা দেখে সময় জানার তার কোন সুযোগ নেই।
এখন রাত হবে নিশ্চয়। দিন হলে ঘরে অন্ধকার এত গাঢ় হতো না। অথবা হতে পারে ঘরটি আন্ডার গ্রাউন্ড।
ক্ষুধার চিন্তা মাথা থেকে উবে গিয়ে এবার মাথায় এসে চাপল আরেক চিন্তা। কেন ওরা ধরে আনল তাকে। পথের বাঁধা দূর করতে চাইলে তারা তো খুন করতে পারতো। ধরে আনল কেন? দু’টো কারণ হতে পারে। এক, আমি কে তা তাদের জানা প্রয়োজন, যাতে তারা তাদের আরো বাঁধাকে চিহ্নিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা হয়তো অন্য কিছু জানতে চায়। ক্যাথারিনের বাড়িতে পাহারা বসানোর ব্যাপারটা শুধু তাদের শত্রু পক্ষের উপর চোখ রাখার জন্যে হয়তো নয়। তারা হয়তো আরও কিছু খোঁজ করছে।
শব্দ হলো দরজা খোলার। খুলে গেল দরজা। সলিড ইস্পাতের তৈরি দরজা।
দরজা খোলার সংগে সংগে ঘরের আলোও জ্বলে উঠল।
দেয়ালের অনেক উঁচুতে ভেন্টিলেটর ছাড়া কোন জানালা নেই। ঘরটি দেয়াল জুড়ে শুধু তাক আর তাক।
আহমদ মুসা দেখেই বুঝল ঘরটি একটা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোর।
দু’জন লোক ঘরে ঢুকল। তাদের মুখ আগের লোকদের মতই মুখোশে ঢাকা।
‘তুমি তো বেশ শেয়ানা হে। সময়ের আগেই সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছ।’ বলল দু’জনের মধ্যে নেতা গোছের লোকটি।
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না।
সেই নেতা গোছের লোকটাই আবার বলল, ‘কে তুমি? একবার প্রিন্সেস ক্যাথারিনের বাড়ি, আরেকবার রুশ রাষ্ট্রদূতের বাড়ি ঘুর ঘুর করছ। পুলিশের লোক তুমি?’
‘তোমরা সে খোঁজ না নিয়েই আমাকে ধরে এনেছ?’
‘প্রশ্ন আমি করেছি। জানা আমাদের প্রয়োজন।’ বলল সেই নেতা গোছের লোকটি।
‘জানা আমারও প্রয়োজন।’
‘কি জানতে চাও?’
‘তোমরা কে? কেন আমাকে ধরে এনেছ?’
‘এ জেনে তোমার কাজ কি?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব না দিলে তোমাদের কোন প্রশ্নের জবাব আমি দেব না। আমার কাছে জানাই তোমাদের গরজ বেশি নিশ্চয়?’
‘দেখ আমরা তোমার উপর নির্ভরশীল নই, তুমি আমাদের উপর নির্ভরশীল। কথা কিভাবে বের করতে হয় আমরা জানি।’
বলেই সে পাশের লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টমকে যন্ত্রসহ ডাক।’
লোকটি বেরিয়ে গেল।
মিনিট খানেক পরেই ভীমাকৃতি এক লোককে নিয়ে সে ফিরে এল। ভীমাকৃতি লোকটির হাতে চামড়ার একটা চাবুক।
নেতা গোছের লোকটি টমকে লক্ষ্য করে বলল, ‘টম তোমার ম্যাজিক দেখাও তো। কথা বলাবার জন্যে তোমার কয় ঘা প্রয়োজন হবে মনে করো?’
‘কয়টি আর স্যার। আট-দশটা ঘা’র পর তো সংজ্ঞাই থাকবে না।’
‘বেশ শুরু কর।’
চাবুকধারী লোকটির ভয়াল চাবুকটি বিদ্যুত বেগে উপরে উঠল।
এ সময় দু’জন লোক ঘরে প্রবেশ করল। তাদের সামনের জন টমকে লক্ষ্য করে বলল, ‘দাঁড়াও।’
তাদের দু’জনের ঘরে প্রবেশের সংগে সংগে নেতা গোছের লোকটিসহ তিনজনেই জড়-সড় হয়ে গেল। একটু সরে দাঁড়াল।
চাবুকধারীকে থামতে বলে কক্ষে প্রবেশকারী সামনের লোকটির দিকে চেয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার টমের অস্ত্র প্রয়োগ করছ কেন?’
নেতা গোছের লোকটি বলল, ‘স্যার লোকটি বড় সেয়ানা, পরিচয় সম্পর্কে কোন কথা আদায় করা যাচ্ছে না। উল্টো আমাদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করছে। বলছে, আমাদের পরিচয় না পেলে কোন কথাই সে বলবে না।’
‘ও তাই? আমি দেখছি।’
বলে সে সাথের লোকটির দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি যাও ওলোর্ভ। আমি আসছি।’
‘ঠিক আছে মায়োভস্কি।’ বলে তার সাথের লোকটি চলে গেল।
মায়োভস্কি আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে গেল। তার মুখে কোন মুখোশ নেই, সাথে আসা লোকটিরও ছিল না। তাদের দু’জনেরই নিরেট রুশ চেহারা।
আহমদ মুসার কাছাকাছি গিয়ে ঘরের একপাশে দাঁড়ানো সেই নেতা গোছের লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এর বাঁধন খুলে দাও প্লেখভ।’
আহমদ মুসার বাঁধন খুলে দিল প্লেখভ নামের লোকটি।
‘আমাদের পরিচয় আপনার কেন প্রয়োজন?’ বলল মায়োভস্কি।
‘কাকে সহযোগিতা করব জানা প্রয়োজন নয় কি?’
মায়োভস্কি হাসল। বলল, ‘আমরা আপনার সহযোগিতা চাই না। আমরা আপনাকে জানতে চাই।’
‘সেটাও একটা সহযোগিতা। এ সহযোগিতা আমি নাও করতে পারি।’
‘যদি আমরা আদায় করি?’
‘সব সময় সব কিছু আদায় করা যায় না।’
‘এসব কথা থাক। আমাদের পরিচয় প্রকাশে কোন আপত্তি নেই। তবে আমরা ভয় করি রাশিয়ার কেজিবি’কে। আমরা একটা মহৎ কাজ করছি। আমরা রুশ রাজ পরিবারের শুভাকাঙ্খী। রুশ সরকার নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে প্রিন্সেস তাতিয়ানা ও প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে হাত করে ফায়দা লুটতে চায়। আমরা রাজ পরিবারের অপমান হতে দেব না।’
‘তাহলে আমাকে গ্রেফতার করেছেন কেন?’
‘আমরা নিঃসন্দেহ যেন, আপনি রুশ সরকারের গুপ্তচর। তাদের পক্ষ থেকে আপনি রাজ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করছেন।’
আহমদ মুসা বুঝল, ওরা রুশ দূতাবাসের সাথে তার যোগাযোগের খবর জানে। তবু বলল, ‘আপনাদের একথা সত্য নয়, প্রিন্সে ক্যাথারিন আমার বন্ধু। সে কারণেই তাদের সহযোগিতার জন্যে তাদের বাড়িতে গেছি।’
মায়োভস্কি হাসল। বলল, ‘বটে! সেটা দেখা যাবে। কিন্তু তাতেও আপনি রুশ সরকারের গুপ্তচর নন তা প্রমাণ হয় না। থাক এ প্রসংগ। এখন বলুন, প্রিন্সেস তাতিয়ানা কোথায়?’
মনে মনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। এরা কি সব জানে? কিন্তু প্রকাশ্যে বলল, ‘এ প্রশ্ন আমাকে কেন?’
‘কারণ আপনি রাজ পরিবারের অনেক কিছুই জানেন। আর প্রিন্সেস ক্যাথারিনের অন্তর্ধান হবার পর আপনার উদয় ঘটেছে। নিশ্চয় প্রিন্সেস তাতিয়ানাকে খোঁজার প্রয়োজন নেই, তাই প্রিন্সেস ক্যাথারিনের খোঁজে আপনার আবির্ভাব।’
‘আপনার ধারণার গোটা ভিত্তিটাই ভুল।’
আহমদ মুসা থামলেও সংগে সংগে উত্তর দিল না মায়োভস্কি। স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর কণ্ঠে বলল, ‘দেখুন, যেকোন মূল্যে তথ্যটা আমাদের চাই। রুশ সরকার আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। প্রিন্সেস ক্যাথারিনের সাথে দেখা করার সুযোগ আমরা দিচ্ছি। তার সাথে কথা বলুন। তিনি যদি আপনার বন্ধু হন, তাহলে তাঁর স্বার্থে তথ্যটি আমাদেরকে দিতে হবে আপনার।’
মুখে কৃত্রিম বিস্ময় এনে আহমদ মুসা বলল, ‘প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে আপনারা কিডন্যাপ করেছেন?’
‘কিডন্যাপ নয়, রুশ সরকারের এক চক্রের হাত থেকে আমরা তাঁকে সরিয়ে এনেছি। তাঁর নিরাপত্তার জন্যেই নিরাপদ স্থানে তাঁকে রাখা হয়েছে। আপনিও গিয়ে দেখবেন, তাঁকে প্রিন্সেস-এর মর্যাদায় রাখা হয়েছে।’
আহমদ মুসা মনে মনে খুশী হলো হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতই। কিন্তু ভাবল, এত সহজে তাকে তারা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে কেন? তাতিয়ানার সন্ধান লাভকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? তাতিয়ানা কোথায়, এ তথ্য প্রিন্সেস ক্যাথারিনই তো তাদের দিতে পারে। ক্যাথারিন নিশ্চয় তাদের সহযোগিতা করেনি। অর্থাৎ এদের পরিচয় সম্পর্কে এরা যা বলেছে সবটাই মিথ্যা।
‘আসুন, প্রিন্সেসের সাথে কথা বলবেন।’ বলে মায়োভস্কি নামক লোকটি হাঁটতে শুরু করল দরজার দিকে।
আহমদ মুসাও তার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। তার পিছু নিল সেই নেতা গোছের লোকসহ আরও একজন। তাদের হাতে পিস্তল। ট্রিগারে আঙুল।
একটা আশংকা আহমদ মুসার মনে জাগল, প্রিন্সেস ক্যাথারিন যদি বলে ফেলে আমি তার বন্ধু নই, সে আমাকে চেনে না!
একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মায়োভস্কি নামের লোকটি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জন প্রহরী। তাদের হাতে স্টেনগান। মায়োভস্কিকে দেখেই তারা দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল।
মায়োভস্কি দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে নক করল দরজায়।
মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই দরজার লুকিং হোল থেকে ধাতব শাটার সরে যাবার নরম একটা শব্দ হলো। তারপরই খুলে গেল দরজা।
মায়োভস্কি দরজায় দাঁড়িয়ে প্রিন্সেসকে একটা বাউ করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। আহমদ মুসাও।
প্রহরী কয়েকজন দাঁড়াল দরজায়।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মায়োভস্কি বলল, ‘ইয়োর হাইনেস, এই যুবককে নিশ্চয় চিনেন।’
আহমদ মুসা হাঁটছিল মায়োভস্কির পেছনে পেছনে।
মায়োভস্কি কথাটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে বিরক্তি ও অনাগ্রহের চোখে প্রিন্সেস ক্যাথারিন আহমদ মুসার চোখে চোখ রাখল।
বিপদ বুঝল আহমদ মুসা।
দ্রুত আহমদ মুসা তার ডান হাতের তর্জনি ঠোঁটে ঠেকিয়ে প্রিন্সেসকে সাবধান করতে চাইল।
কিন্তু আহমদ মুসা বুঝতে পারল না প্রিন্সেস এই ইংগিত কতটা গ্রহণ করবেন।
তবে আহমদ মুসা ক্যাথারিনের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই বুঝল প্রিন্সেস ক্যাথারিন তাতিয়ানার মতই শার্প। তার সারা মুখমন্ডলে তাতিয়ানার মতই রাজকীয় ব্যক্তিত্ব। অবশ্য তার চোখে নেই তাতিয়ানার চোখের সেই সাগরের গভীরতা এবং নেই তার মুখে তাতিয়ানার মুখের সেই ফুলের নরম লাবণ্য। প্রিন্সেস ক্যাথারিনের মুখে শাসকের ছবি, কিন্তু তাতিয়ানার মুখে ছিল শাসকের ছবির সাথে শিল্পীর মমতা।
আহমদ মুসার ইংগিত থেকে ক্যাথারিন যা-ই বুঝুক, তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং তার মুখমন্ডলে সচেতন হয়ে ওঠার আলেখ্য নেমে এসেছিল।
কোন কথা না বলে চোখ ঘুরিয়ে ক্যাথারিন তাকিয়েছিল মায়োভস্কির দিকে।
‘আপনি নিখোঁজ হবার পর আপনার এই বন্ধু প্যারিসে এসেছে এবং আপনার খোঁজে নেমে পড়েছে। আমাদের বিশ্বাস, প্রিন্সেস তাতিয়ানার খবর সে জানে। কিন্তু আমাদের বলেনি। বার বার আমরা বলছি, আমরা রাজ পরিবারের শুভাকাঙ্খী। আমরা সরকারের চক্রান্ত থেকে দুই রাজকুমারী এবং রাজ পরিবারের সবকিছুকে রক্ষা করতে চাই। আমাদের অনুরোধ, আপিন তাঁকে বুঝান। আমরা পরে আসব।’
বলে মায়োভস্কি কোন জবাবের অপেক্ষা না করে দীর্ঘ একটা বাউ করে দরজার দিকে ঘুরে চলতে শুরু করল।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর ফিরে এল তার সিংহাসন সদৃশ চেয়ারে। সামনের একটা কুশন চেয়ারে বসতে বলল আহমদ মুসাকে।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন গভীরভাবে নিরীক্ষা করছিল আহমদ মুসাকে। বলল, আপনি মিথ্যা পরিচয় কেন দিয়েছেন? কেনই বা এভাবে এদের হাতে পড়লেন? কে আপনি?’
‘মাননীয় প্রিন্সেস, এতটুকু বলাই কি যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার এক শুভাকাঙ্খী? বিশ্বাস করতে পারেন তা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের আপনাকে ধরে আনা এটা প্রমাণ করেছে।’ নিরেট কণ্ঠে জবাব দিল প্রিন্সেস ক্যাথারিন।
একটু থেমেই ক্যাথারিন আবার বলল, ‘আমার সব প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি।’
‘মিথ্যা পরিচয় না দিলে আপনার সাথে হয়তো দেখা করতে পারতাম না।’
‘কেন আমার সাথে দেখা করতে চান? আমার শুভাকাঙ্খী হওয়ার কারণ কি?’
‘আপনার সাথে দেখা করা আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু জানলাম, আপনি নিখোঁজ হয়েছেন। তারপর আপনাকে মুক্ত করা আমার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াল।’
ম্লান হাসল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্যে কুঞ্চিত হয়ে উঠল তার কপাল। বলল, ‘দায়িত্ব? কে এই দায়িত্ব দিয়েছে? রুশ সরকার?’
‘না রুশ সরকার নয়। তাতিয়ানা।’
‘তাতিয়ানা?’ বিস্ময়ে ফেটে পড়ল যেন ক্যাথারিনের কণ্ঠ।
সে স্তম্ভিতভাবে অপলক চোখে চেয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে কিছুক্ষণ। বলল অনেকক্ষণ পর, ‘তাঁর কোন চিঠি আছে?’
‘নেই।’
এবার উদ্বেগ নেমে এল প্রিন্সেস ক্যাথারিনের চোখে-মুখে। ধীর-শুষ্ক কণ্ঠে সে বলল, ‘তাহলে কি তাতিয়ানা নেই?’ শেষ শব্দটা ক্যাথারিনের রুদ্ধ কণ্ঠ থেকে খুব কষ্টে বেরুল।
‘আপনি এ কথা বলছেন কেন?’ বিস্মিত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন বলল, ‘সে টেলিফোনে কিছু বলবে না, চিঠি দেবে না, অথচ একজন অপরিচিত লোককে দায়িত্ব দেবে আমার সাথে দেখা করার জন্যে এটা অসম্ভব।’
একটু থেমে একটা ঢোক গিলে ভাঙা গলায় বলল, ‘বলুন আপনি কি ঘটেছে?’
আহমদ মুসা নরম কণ্ঠে ধীর স্বরে বলল, ‘আপনার অনুমান ঠিক। তাতিয়ানা নেই।’
‘কেন কেমন করে কি ঘটেছে তার?’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল ক্যাথারিন।
আহমদ মুসা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ভাবল একটু কাঁদা উচিত প্রিন্সেস ক্যাথারিনের।
শান্ত হলো ক্যাথারিন। নিজেকে সামলে নিয়েছে। রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলল, বলুন কি ঘটেছিল? আমি এই সেদিন তার সাথে কথা বলেছি। কোন দিনই তার কোন বড় অসুখ-বিসুখ ছিল না।’
‘আপনি মুক্ত হবার আগে আমি আর কিছুই বলবো না। বলা উচিত হবে না।’
‘কিন্তু তাহলে আমি আপনাকে বিশ্বাস করব কেমন করে? আমাকে অবশ্যই জানতে হবে তাতিয়ানা আপনাকে কি দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে।’
‘এখন আমাকে অবিশ্বাস করলেও এ ভুল আপনার ভেঙে যাবে। আমি মনে করি, বন্দী অবস্থায় আপনি যত বেশি জানবেন, ততই আপনার কষ্ট বাড়বে।’
‘কিন্তু আপনি না বললেও আমি জানি। দু’টি বিশেষ জিনিস বহনের দায়িত্ব তাতিয়ানা আপনাকে দিতে পারেন।’
‘বলেছি, কোন কিছুই আমি বলব না।’
রাজ পরিবারের দায়িত্ব মনে হচ্ছে যেন আপনারই বেশি!’ প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কণ্ঠে কিছুটা উষ্মা ঝরে পড়ল।
‘মাফ করবেন প্রিন্সেস। রাজ পরিবারের দায়িত্ব আমার নয়, কিন্তু তাতিয়ানার দেয়া দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হবে।’
‘কিন্তু এদেরকে তো বলবেন। এর বিকল্প মৃত্যুকে অবশ্যই আপনি চাইবেন না।’
আহমদ মুসা হাসল। কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় দরজায় নক হলো।
থেমে গেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাই গিয়ে এবার দরজা খুলে দিল।
আগের মত মায়োভস্কি এসে বাউ করে প্রবেশ করল এবং আগের মত চারজন প্রহরী দরজায় দাঁড়াল।
‘ইয়োর হাইনেস, সব কথা হয়েছে নিশ্চয়। আশা করি, তাতিয়ানার খবর ইনি আমাদের জানাতে আপত্তি করবেন না।’ প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে লক্ষ্য করে বলল মায়োভস্কি।
বলে কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘চল।’
চলতে শুরু করে মায়োভস্কি পেছনে ফিরে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার শেষ কথাটা আমি শুনেছি। মুখ না খুললে মৃত্যুই বিকল্প। আর সে মৃত্যু আপনার সামনেই এর হবে।’
বলে মায়োভস্কি বাউ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল। চারজন প্রহরী নিয়ে চলল আহমদ মুসাকে।

আহমদ মুসার গায়ে কোট নেই। শার্ট রক্তাক্ত। আহমদ মুসা পড়ে আছে মেঝেতে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে টম চামড়ার চাবুক হাতে।
মায়োভস্কি ঘরে প্রবেশ করল।
‘স্যার এ ব্যাটা মানুষ নয়। হাতিকে এভাবে পেটালে হাতিও কথা বলতো। কিন্তু এঁকে কথা বলানো যায়নি।’ বলল টম নামের ভীমাকৃতি সেই লোকটি।
‘প্লেখভ কোথায়?’
‘এইমাত্র গেলেন। পাশের রুমে রেস্ট নিচ্ছেন।’
মায়োভস্কি চেয়ার টেনে আহমদ মুসার পাশে বসল। পড়ে থাকা আহমদ মুসার দিকে মাথাটা ঝুকিয়ে বলল, ‘প্লেখভ ও টমের হাতে তোমাকে ছেড়ে দিতে চাইনি। কিন্তু তুমি আমার সব কথা, সব অনুরোধ ব্যর্থ করে দিয়েছ। তাতিয়ানা সম্পর্কে কোন তথ্যই দাওনি।’
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে উঠে বসল। কোন কথা বলল না।
‘শোন, কথা না বলে তুমি বাঁচবে না, তাতিয়ানাকে বাঁচাতে পারবে না, ক্যাথারিনকেও নয়।’
হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। বলল, ‘আপনারা নাকি রাজ পরিবারের শুভাকাঙ্খী, ক্যাথারিন ও তাতিয়ানার শুভাকাঙ্খী?’
সংগে সংগে উত্তর দিল না মায়োভস্কি। কিছু সময় নিয়ে বলল, ‘তুমি তো মরতে যাচ্ছ। মরার আগে তাহলে শোন। রাজ পরিবার আবার সিংহাসন ফিরে পাক, এ ব্যাপারে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। বরং সরকার সিংহাসন ফিরিয়ে দেয়ার নামে তাতিয়ানা ও ক্যাথারিনকে হাত করে রাজ পরিবারের গুপ্তধন ভান্ডার হাত করতে চায়। আমরা তা হতে দেব না। আমরা হাত করতে চাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সে গুপ্তধন ভান্ডার।’
‘রাজ পরিবারের গুপ্তধন হাত করার জন্যে এত কিছুর প্রয়োজন কি। নিশ্চয় প্রিন্সেস ক্যাথারিন ও তাতিয়ানা সাথে নিয়ে বসে নেই সেই ধন ভান্ডার?’
‘তাতিয়ানাকে আমাদের প্রয়োজন। কারণ তার হাতেই রয়েছে রয়্যাল আংটি এবং তারই কাছে রাজকীয় ডাইরীও আছে। ও দু’টি আমাদের প্রয়োজন।’
চমকে উঠল আহমদ মুসা আংটি এবং ডায়েরীর কথা শুনে। একটু সময় নিয়ে বলল,‘ও দু’টি দিয়ে কি কাজ?’
হাসল মায়োভস্কি। বলল, ‘আংটির মধ্যে রয়েছে গুপ্তধনের নক্সা এবং ডায়েরীতে পাওয়া যাবে রাজ পরিবারের কে কোথায় রয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ।’
‘আপনারা রাজ পরিবারের লোকদের চান, না ঐ দু’টি জিনিস চান, আমি বুঝতে পারছি না।’
আবার হাসল মায়োভস্কি। বলল, ‘আমরা জিনিস দু’টিও চাই, লোকদেরও চাই। আমরা গুপ্তধন দখল করব, কিন্তু ওদের বাঁচিয়ে রাখলে সব কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে। সুতরাং যখন গুপ্তধন দখল করব, তখন ওরা কেউ দুনিয়াতে থাকবে না।’
বলেই মায়োভস্কি উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘এখনও সময় আছে, আমাদের সহযোগিতা কর। তাহলে তোমার শুধু জীবনই বাঁচবে না, লাভবানও হবে।’
‘আমি চাইলেই বাঁচতে পারি না, আপনি চাইলেই আমাকে মারতে পারেন না।’
‘টম একে নিয়ে চল।’ বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল মায়োভস্কি।
টম টেনে দাঁড় করাল আহমদ মুসাকে। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল তাকে।
দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল চার স্টেনগানধারী। তারাও পেছনে পেছনে চলল।
একটা প্রশস্ত করিডোরে ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে এল।
করিডোরটা একটা মিটিং প্লেসের মত। আহমদ মুসা চারদিকে চেয়ে দেখল। বিভিন্ন দিক থেকে কয়েকটি করিডোর এসে মিশেছে প্রশস্ত এ চত্বরে। উপরের ছাদটি তিন তলার মত উঁচুতে। উপরে দু’টি ফ্লোরেরই ব্যালকনি প্রশস্ত করিডোরটির চারদিকে ঘুরানো।
করিডোরে প্রবেশ করতেই আহমদ মুসা দেখতে পেয়েছে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে। দোতলার ব্যালকনিতে এনে বসানো হয়েছে তাঁকে।
আহমদ মুসার রক্তাক্ত জামা-কাপড়ের দিকে চেয়ে চমকে উঠেছিল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। ধীরে ধীরে তার মুখটি উদ্বেগ ও বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
মায়োভস্কি আহমদ মুসাকে ব্যালকনির সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। প্রিন্সেসকে লক্ষ্য করে কিছু বলতে যাচ্ছিল মায়োভস্কি।
হঠাৎ তার হাতের টেলিফোন বিপ বিপ সংকেত দিয়ে উঠল।
‘মাফ করবেন ইয়োর হাইনেস। টেলিফোনে কথাটা বলে নেই।’
একটু আড়ালে চলে গেল মায়োভস্কি টেলিফোনে কথা বলার জন্যে। মিনিট খানেক পরে ফিরে এল।
‘প্লেখভ, শফরোভিচকে ডাক। জরুরী কল এসেছে। আমাকে এখুনি যেতে হবে।’
প্লেখভ দ্রুত চলে গেল।
মায়োভস্কি প্রিন্সেসের দিকে চেয়ে বলল, ‘ইয়োর হাইনেস, আপনার বন্ধু যুবকটি একেবারেই নির্বোধ বেয়াড়া। আমাদের সহযোগিতাই সে করেনি। মৃত্যুর জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। আপনার সামনে এবার তার মৃত্যুদন্ড কার্যকরী করার নাটকই অনুষ্ঠিত হবে।’
একটু থামল মায়োভস্কি। একটা ঢোক গিলে আবার শুরু করল, ‘একটা শেষ সুযোগ।’ আপনাকে দিচ্ছি ইয়োর হাইনেস। আপনি তাকে বলে দেখতে পারেন, প্রিন্সেস তাতিয়ানা এবং তার সেই দু’টি জিনিস কোথায় আছে সে বলুক।’
মায়োভস্কি কথা শেষ করতেই প্লেখভ শফরোভিচকে নিয়ে হাজির হলো।
‘মিঃ শফরোভিচ, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হচ্ছে। টেলিফোন এসেছে। আপনি এদিকটা দেখুন। সবই আপনি জানেন। হার হাইনেস প্রিন্সেসকে অনুরোধ করেছি শেষ চেষ্টা করার জন্যে। ব্যর্থ হলে যেভাবে কথা আছে, সেভাবে হত্যা করবেন। যাতে সে দৃষ্টান্ত অন্যদের মুখ খুলতে সাহায্য করে।’
বলে মায়োভস্কি প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে একটা ছোট্ট বাউ করে বেরিয়ে গেল করিডোর থেকে।
শফরোভিচ প্রিন্সেসকে ছোট্ট একটা বাউ করে বলল,‘ইয়োর হাইনেস আপনি কি বলবেন, না আমরা কাজ শুরু করে দেব।’
‘প্রিন্সেসের কিছু বলার নেই। তিনি নিজেই তোমাদের বন্দী। বন্দী আরেক বন্দীকে কোন নির্দেশ দিতে পারেন না, অনুরোধও নয়। এখন তিনি যা বলবেন সেটা তাঁর কথা নয়, তোমাদের কথা।’
প্রিন্সেস ক্যাথারিনের ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার কথা শুনে। অপার বিস্ময় ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। সে ভাবতেই পারছে না, রাজ পরিববারের সাথে সম্পর্কহীন একজন নিপীড়িত রক্তাক্ত যুবক মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে রাজ পরিবারের স্বার্থে এইভাবে কথা বলতে পারে কেমন করে! কে এই যুবক! একজন এশিয়ানের মধ্যে এই তেজ!
কোন কথা বলতে পারল না প্রিন্সেস। কি বলবে সে! যুবক যা বলেছে, সেটাই তো সত্য।
শফরোভিচ ক্রুদ্ধ চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপর টম এর দিকে তাকিয়ে বলল,‘তোমার আয়োজন প্রস্তুত?’
‘হ্যাঁ।’ বলে টম কয়েক পা এগিয়ে এসে করিডোরের ঠিক মাঝখানে মানুষ পরিমাণ উঁচু কোন কিছুর উপর ছড়িয়ে রাখা কালো পর্দা তুলে ফেলল।
দেখা গেল বিরাট একটা বোর্ড। তাতে মানুষ পরিমাণ ক্রুশ আঁকা।
হেঁসে উঠল শফরোভিচ। বলল,‘ইয়োর হাইনেস, এই ক্রুশে চড়ানো হবে আপনার এই দুর্বিনীত বন্ধুকে। তারপর যিশু খৃস্টের মত করেই পেরেক দিয়ে তার দেহকে গেঁথে দেয়া হবে বোর্ডের সাথে। তারপর কুকুর লেলিয়ে দেয়া হবে। কুকুরটি সাত ফিট উপর পর্যন্ত লাফিয়ে উঠে শিকারের গোশত ছিঁড়ে আনতে পারে।’
মুহূর্তে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের চেহারা পাংশু পান্ডুর হয়ে গেল। মুখে যেন তার এক ফোঁটাও রক্ত নেই।
‘মৃত্যুকে এখন দেখতে পাচ্ছ শয়তান?’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল শফরোভিচ।
‘না আমি দেখতে পাচ্ছি না। তুমি নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছ?’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতে না হতেই শফরোভিচের একটা প্রচন্ড ঘুষি গিয়ে পড়ল আহমদ মুসার মুখে। মুখ সরিয়ে নেবারও সময় পেল না সে।
ঠোঁট ফেটে দর দর করে রক্ত নেমে এল।
ঘুষি দিয়েই শফরোভিচ বলল,‘তোমরা এ শয়তানকে নিয়ে যাও ক্রুশে। মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছে না, দেখতে দাও মৃত্যুকে।’
আচানক ঘুষি খেয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা।
দু’জন স্টেনগানধারী এগিয়ে গিয়ে দু’জন দু’দিক থেকে এক হাতে স্টেনগান ধরে, অন্য হাতে আহমদ মুসাকে তুলে দাঁড় করিয়ে ক্রুশ বোর্ডের দিকে নিয়ে চলল।
অন্য দুই স্টেনগানধারী এবং প্লেখভ, টম এবং শফরোভিচ সবাই ক্রুশ বোর্ডের সামনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে-মুখে উৎসবের আমেজ।
প্রিন্সেস ক্যাথারিনের চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেছে। উদ্বেগ-আতংকে তার ঠোঁট দু’টি কাঁপতে শুরু করেছে। এর মধ্যেও তার মনে অপার বিস্ময়, যার পরিণতির কথা ভেবে সে উদ্বেগ-আতংকে মরে যাচ্ছে, তার মুখে-চোখে কিন্তু ভয়ের লেশ মাত্র নেই। কে এই অদ্ভুত যুবক!
দু’জন স্টেনগানধারী আহমদ মুসার দেহকে ক্রুশ বোর্ডের সাথে শেঁটে দেবার জন্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে স্টেনগান দুই হাঁটুর মাঝখানে চেপে রেখে ক্রুশ বোর্ডের লকে আহমদ মুসার হাত-পাকে আটকাতে যাচ্ছিল।
ক্রুশ বোর্ডে ঠেশ দেয়ার সময় আহমদ মুসার দেহ হঠাৎ স্প্রিং-এর মত ছিটকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার সামনে দাঁড়ানো তার উপর ঝুঁকে পড়া দু’জন ছিটকে পড়ে গেল। তারা পড়ে যাবার আগেই তাদের একজনের স্টেনগান তুলে নিয়ে আহমদ মুসা ট্রিগার চেপে অর্ধচন্দ্রাকারে ঘুরিয়ে নিল সামনে।
সামনে দাঁড়ানো ওরা চারজন চোখের পলকে লাশ পড়ে গেল।
আহমদ মুসার সামনে পড়ে যাওয়া দু’জন উঠে ছুটে পালাচ্ছিল। ওরাও স্টেনগানের খোরাকে পরিণত হলো।
আহমদ মুসা তাকাল প্রিন্সেসের দিকে। দেখল সে উঠে দাঁড়িয়েছে চেয়ার থেকে। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ, বিস্ময়, উত্তেজনা ঠিকরে পড়ছে।
আহমদ মুসা চারদিক তাকিয়ে দোতলায় উঠটার কোন পথ দেখতে পেল না।
আহমদ মুসাকে এ করিডোরে আনা হয়েছিল ভূগর্ভস্থ কোন কক্ষ থেকে। আগের দিন প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কক্ষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অনেক ঘর, দরজা ও করিডোর ঘুরিয়ে।
আবার আহমদ মুসা তাকাল প্রিন্সেস ক্যাথারিনের দিকে।
তাকিয়েই আহমদদ মুসা নিজের দেহটাকে এক পাশে মেঝের উপর ছুড়ে দিল। আর সংগে সংগেই একটা গুলী ক্রুশ বোর্ডকে এসে বিদ্ধ করল। আহমদ মুসা সরে না দাঁড়ালে গুলীটা তার মাথা গুড়ো করে দিত।
আহমদ মুসা মাটিতে পড়েই শরীরটাকে গড়িয়ে ক্রুশ বোর্ডের আড়ালে নিয়ে গেল।
ওদিক থেকে আরও কয়েকটি গুলী বর্ষণ হলো। সবগুলো এসে আঘাত করলো ক্রুশ বোর্ডকে।
আহমদ মুসা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের দিকে দ্বিতীয়বার তাকিয়েই দেখতে পেয়েছিল, একজন লোক রিভলবার বাগিয়ে ঘরের ভেতর থেকে ব্যালকনিতে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা ক্রুশ বোর্ডের পাশ দিয়ে উঁকি দিল ব্যালকোনির দিকে। দেখল, রিভলবারধারী লোকটি প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে সামনে রেখে আহমদ মুসার খোঁজ করছে।
আহমদ মুসা মুখ বের করতেই লোকটি রিভলবার ঘুরিয়ে গুলী করল।
আহমদ মুসা মাথা সরিয়ে নিয়েছিল। গুলীটা ক্রুশ বোর্ডের পাশ ঘেঁষে চলে গেল। অব্যর্থ নিশানা।
ব্যালকোনি থেকে লোকটি কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল, ‘বেরিয়ে এস আড়াল থেকে অস্ত্র ফেলে দিয়ে। না হলে গুলী করব প্রিন্সেসকে। বেরিয়ে এসে ৫ গোনার মধ্যে।’
‘প্রিন্সেসকে গুলী করার ক্ষমতা তোমার নেই।’
এ সময় পেছনে কোথাও অনেকগুলো পায়ের শব্দ হলো।
আহমদ মুসা দ্রুত ক্রুশ বোর্ডটি ঠেলে প্রিন্সেস ক্যাথারিন এবং রিভলবারধারী লোকটি পশ্চিমের যে ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার নিচে চলে গেল এবং বোর্ডের আড়ালে ওঁত পেতে বসল।
সেখান থেকে পূর্ব দিকের করিডোর আহমদ মুসা দেখতে পাচ্ছে। পশ্চিম দিকের করিডোরটি একদম তার বাম হাতের পাশেই। দক্ষিণ দিকের করিডোরটিও তার চোখের সামনে। উত্তর পাশে কোন করিডোর নেই।
পুব দিকের করিডোর দিয়ে যারা ছুটে আসছিল তারা প্রায় করিডোরের মুখে এসে পড়েছিল। ব্যালকোনি থেকে সেই লোকটি চিৎকার করে উঠল, ‘সাবধান এদিকে বোর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে শত্রু।’
ওদিকে পায়ের শব্দ থেমে গেল। তার বদলে ছুটে এল গুলী বৃষ্টি।
অধিকাংশ গুলী এসে বিদ্ধ করল ক্রুশ বোর্ড।
ক্রুশ বোর্ডটি আসলে কোন বড় গেটের দরজা। দেড় ইঞ্চি পুরু কাঠের পাল্লার এক পাশে ইস্পাতের প্লেট বসানো।
অব্যাহত গুলী বৃষ্টির মুখে আহমদ মুসা করিডোরটির দিকে স্টেনগান তাক করতে পারছিল না। এ সময় পশ্চিমদিকের করিডোরেও ছুটে আসা পায়ের শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা। প্রমাদ গুণল আহমদ মুসা।
পশ্চিম করিডোর দিয়ে যারা আসছে তাদের গুলীর মুখে পড়ে যাবে সে। ওদেরকেও টার্গেট করা যাবে না এখান থেকে। ওদের ঠেকাতে গেলে পুব দিক থেকে ওরা এগিয়ে আসবে, আবার পুব দিকে নজর দিলে পশ্চিম দিকের ওরা তাকে টার্গেট করার সুযোগ পেয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা ক্রুশ বোর্ডের আড়াল থেকে বের হবার তার কোন সুযোগ নেই। এই অবস্থায় দক্ষিণ দিকের করিডোর দিয়ে যদি কেউ প্রবেশ করে, তাহলে সে সরাসরি তাদের গুলীর মুখে পড়ে যাবে।
আহমদ মুসা দ্রুত চারদিকে তাকাল। পেছনেই দেয়ালে একটা দরজা। কিন্তু বন্ধ। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল আহমদ মুসা।
ক্রুশ বোর্ডের কভার নিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত দক্ষিণ দিকের করিডোরের দিকে ছুটল।
পেছনে গুলী ছুটে এল পুব দিক থেকে। তারপর পশ্চিম দিক থেকেও।
বোর্ডে আঘাত করা ছাড়াও আহমদদ মুসার দু’পাশ দিয়ে ব্রষ্টির মত গুলী বেরিয়ে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা বুঝল ওরা গুলী করতে করতে ছুটে আসছে।
আহমদ মমুসা করিডোরে প্রবেশ করে ছুটল করিডোর দিয়ে। অল্প যাওয়ার পরই সে দেখল, করিডোরের দু’পাশ থেকে দু’টি সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। আর সিঁড়ি দু’টির পাশ দিয়ে করিডোরটি দু’ভাগ হয়ে একটা পশ্চিমে, অন্যটা পুবদিকে চলে গেছে।
আহমদ মুসা কোন দিকেই এগুলো না।
পশ্চিমমুখী করিডোরের মুখে স্টেনগান বাগিয়ে দেয়ালের আড়ালে শুয়ে পড়ল। শত্রুকে বিভ্রান্তিতে ফেলে মোকাবিলা করার একে একটা উপযুক্ত জায়গা বলে আহমদ মুসা মনে করল।
আহমদ মুসা বুঝল ওরা করিডোরে প্রবেশ করেছে। ওরা গুলী বৃষ্টি থামায়নি। আহমদ মুসা ক্রুশ বোর্ডটি সিঁড়ি বরাবর ফেলে রেখে দেয়ালের আড়ালে পজিশন নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ওদের ধারণা দেয়া যে আহমদ মুসা উপরের দিকে পালিয়েছে। এইভাবে ওদের সেখানে থামতে বাধ্য করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন তাদের সামনের দিকে গুলী বর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে।
ওদের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতি উৎকর্ণ আহমদ মুসা স্টেনগানের ট্রিগারে হাত রেখে অপেক্ষা করছে।
আহমদ মুসার পরিকল্পনা সফল হলো। সত্যিই ওরা সিঁড়ি বরাবর এসে মুহূর্তের জন্যে থেমে গেল। বিভিন্ন দিকে যাবার জন্যে ভাগ হবার সময় তাদের গুলী বর্ষণও মুহূর্তের জন্যে থেমে গিয়েছিল।
এমন একটা মুহূর্তেরই অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ট্রিগারে হাত রেখে। তারপর ট্রিগার চেপে স্টেনগান ঘুরিয়ে নিল অর্ধচন্দ্রাকারে।
ওরা ছুটে এসেছিল পাঁচজন। পাঁচজনই লাশ হয়ে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা পা পা করে চত্ববরের প্রান্তে ফিরে এল আবার। দেখল, প্রিন্সেস ক্যাথারিন আগের মতই চেয়ারে বসে আছে। একা।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। প্রিন্সেস একা কেন? দু’পা এগুলো সে ক্যাথারিনের দিকে।
ঠিক এ সময়েই প্রিন্সেস ক্যাথারিন তার তর্জনী তুলে ধরল। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।
আহমদ মুসা ভূত দেখার মতই চমকে উঠে মেঝের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরটাকে গুটিয়ে নিয়ে বলের মত দ্রুত গড়িয়ে চলল পুবের করিডোরের দিকে।
আহমদ মুসা মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সংগে সংগেই তার মাথার উপর দিয়ে একটা রিভলবারের গুলী চলে গেল।
এরপর আরও গুলী তাকে ফলো করল। কিন্তু আহমদ মুসা তীব্র গতির বলের মত গড়িয়ে পুবে করিডোরে ঢুকে গেল।
করিডোর লক্ষ্যে তখনও গুলী আসছিল।
আহমদ মুসা করিডোর থেকে একটা স্টেনগান কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
পশ্চিমের করিডোর থেকে গুলীর আওয়াজ শুনল আহমদ মুসা। সেই সাথে শুনল বেশ কিছু পায়ের শব্দ। এ করিডোর লক্ষ্যেই গুলী আসছে।
আহমদ মুসা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কাছে পৌঁছা এবং তাকে উদ্ধারের চিন্তা বাদ দিল।
সে ছুটল বেরুবার জন্যে করিডোর ধরে পুব দিকে।
সামনে গিয়েই উত্তর-দক্ষিণ একটা করিডোর পেয়ে গেল আহমদ মুসা। দেখল, করিডোরটি দিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে আসছে একজন।
একেবারে তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। তার তর্জনি ট্রিগারে প্রস্তুত ছিল। তর্জনি ট্রিগারে চেপে ধরতেই এক ঝাক গুলী গিয়ে ঘিরে ধরল লোকটিকে।
লোকটির দেহ দক্ষিণ দিকে ছিটকে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা অনুভব করল, এ করিডোরে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাস। দক্ষিন দিক থেকে আসছে। বুঝল আহমদ মুসা, গেটটা দক্ষিণ দিকে এবং কাছেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে লাশটি ডিঙিয়ে ছুটল দক্ষিণ দিকে।
কিছুদূর এগিয়েই একটা কক্ষের বড় দরজায় গিয়ে শেস হলো করিডোরটি।
দরজাটি খোলা।
পেছনে করিডোরের ওপ্রান্ত থেকে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারের শব্দ সে শুনতে পেল।
আহমদ মুসা দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিল।
দেখল, সোজা সামনেই ঘরের বিপরীত দিকে আরেকটা বড় দরজা। দরজার উপরের দিকটা জানালা। খোলা। দরজা বন্ধ।
দরজা খুলে আহমদ মুসা দেখল, সামনে একটা ছোট চত্বর। তারপরেই বাইরে বেরুবার গেট।
আহমদ মুসা স্টেনগানটি ঘরে ফেলে দিয়ে হাতের গ্লাভসটি খুলে পকেটে ফেলে বেরিয়ে এল গেট দিয়ে। তারপর ছুটল পাবলিক কল অফিসের সন্ধানে।
বাড়িটার পাশেই মোড়ের উপর পেয়েগেল একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ।
টেলিফোন করল রুশ রাষ্ট্রদূত মিখাইল পাভেলের কাছে। পেয়ে গেল তাকে। বলল, ‘জোয়ান অব আর্ক অ্যাভেনিউ-এর ৭১ নম্বর বাড়িতে এই মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিন্সেস ক্যাথারিন বন্দী আছেন। অবিলম্বে বাড়িটি সার্চ করতে পারলে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার করা যেতে পারে।’
‘তুমি কোথায়?’
‘বাড়িটার পাশ থেকে টেলিফোন করছি। আমাকে আটকে রেখেছিল সেখানে। আমি বেরুতে পেরেছি।’
‘প্রিন্সেস ঠিক আছেন?’
‘ভাল আছেন।’
‘ওকে পুলিশকে জানিয়ে আমি এখুনি আসছি।’
আহমদ মুসা টেলিফোন রেখে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে বন্দী করে রাখা সেই বাড়িটার সামনে এসে একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
ওদিকে যারা আহমদ মুসাকে তাড়া করে এসেছিল গেট পর্যন্ত, তারা ফিরে গেল প্রিন্সেস ক্যাথারিন যেখানে বসেছিল সেই ব্যালকোনির সামনে। তাদের মধ্যে একজন ব্যালকোনিতে রিভলবার হাতে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের পাশে দাঁড়ানো লোকটির দিকে চেয়ে বলল, ‘মিঃ উস্তিনভ, শয়তানটা পালিয়েছে।’
‘খবরটা বলতে লজ্জা করছে না? তোমরা কয়েক ডজন মানুষ তাকে আটকাতে পারলে না, মারতেও পারলে না।’ বলল উস্তিনভ।
কোন কথা বলতে পারলো না নিচে দাঁড়ানো লোকটা। নিরুত্তর লোকটি মাথা নত করল।
‘কতজন মারা গেছে আমাদের?’
‘এগার জন স্যার।’
‘যাও এখন আন্ডার গ্রাউন্ড প্যাসেজে জমায়েত হও।’
বলে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের দিকে চেয়ে একটা ছোট্ট বাউ করে বলল, ‘চলুন মহামান্য প্রিন্সেস। লোকটি বড় এক ক্রিমিনাল। নিশ্চয় কোন বড় গ্যাং-এর সদস্য। আপনাকে পণবন্দী করে টাকা আদায় ওদের লক্ষ্য। আমরা চেষ্টা করেছিলাম, প্রিন্সেস তাতিয়ানা ওদের কবলে পড়েছে কি না তা জানতে।’
প্রিন্সেস ক্যাথারিন উঠে দাঁড়াল। মনে মনে হাসল তার কাহিনী সাজানোর বহর দেখে। বলল মনে মনে, যারা টাকার লোভে কিছু করে, তারা টাকার চেয়ে জীবনকে বড় করে দেখে। সুতরাং তারা এক পাশে টাকা, অন্যপাশে জীবন থাকলে জীবনকেই বেছে নেয়। কিন্তু লোকটি তো তা নেয়নি। জীবন দিতে সে রাজী হয়েছিল, তবু কোন কথাই সে প্রকাশ করতে রাজী হয়নি। তার রক্তাক্ত দেহটা প্রমাণ করেছে কি অকথ্য নির্যাতন সে সহ্য করেছে। টাকার জন্যে কেউ এত কষ্ট সহ্য করে না, বরং টাকার বিনিময়ে সে নির্যাতন থেকে বাঁচতে চায়, কথাও প্রকাশ করে দেয় বাঁচার জন্যে।’
প্রিন্সেস হাঁটতে হাঁটতে আরও ভাবল, লোকটির সাথে তার আরও ভাল ব্যবহার করা উচিত ছিল। বলা উচিত ছিল তার জানা অনেক কথা। নিশ্চয় লোকটি তাকে সাহায্য করতেই এসেছিল। এদেরও সন্দেহ এবং লোকটির কথায় পরিষ্কার হয়ে গেছে, তাতিয়ানা সম্পর্কে সব তথ্য সে জানে।
খুবই আপসোস হলো প্রিন্সেস ক্যাথারিনের লোকটিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পারার জন্যে।
কিন্তু আবার ভাবল, তার দোষ কি! একজন এশিয়ান রুশ প্রিন্সেসদের সাহায্য করতে আসবে, একথা তো স্বাভাবিক নয়।
আসলে কে লোকটি! যেই হোক সে অসাধারণ। এমন লোকের মুখোমুখি সে জীবনে হয়নি। শুধু এগারজন লোককে মেরে পালাতে পেরেছে বলে নয়, একজন রুশ প্রিন্সেসের সাথে তার কথা বলার সময় ঋজুতা তার মধ্যে দেখা গেছে। সেটাও ক্যাথারিনের কাছে নতুন।
আনমনা হয়ে ক্যাথারিনের চলা ধীর হয়ে পড়েছিল।
‘মহামান্য প্রিন্সেস একটু দ্রুত চলতে হবে, আমাদের তাড়া আছে।’
বলল উস্তিনভ।
‘আপনারা বলছেন, আপনারা আমাদের সাহায্য করার জন্যেই সবকিছু করছেন। কিন্তু আমরা তো এই খুনোখুনি চাইনি। চাই না।’
উস্তিনভের কঠিন ঠোঁটে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘প্রয়োজনেই এসব হচ্ছে। আমরা তো শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না, আপনাকে তাদের হাতে তো তুলে দিতে পারি না।’
‘কিন্তু লোকটিকে তো আপনারাই ধরে এনেছিলেন, সে তো চড়াও হতে আসেনি!’
‘ম্যাডাম প্রিন্সেস, মাফ করবেন। আপনার এসব প্রশ্নের জবাব দেয়ার দায়িত্ব আমার নয়।’
বলে দ্রুত চলার জন্যে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে আবার তাড়া দিল উস্তিনভ।

রুশ রাষ্ট্রদূত পাভেলের ফ্যামিলি ড্রইং রুমে আহমদ মুসা দুই হাত ছড়িয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসে। জীবন্ত একটা হতাশা খচ খচ করছে তার অন্তরে।
প্রায় মুঠোর মধ্যে পেয়েও প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে সে উদ্ধার করতে পারলো না। তাঁকে রেখেই তাকে পালিয়ে আসতে হলো।
আহমদ মুসা টেলিফোন করার ৫ মিনিটের মধ্যেই একটা অগ্রবর্তী পুলিশ দল সেখানে পৌঁছেছিল। তারা ঘিরে ফেলেছিল বাড়িটিকে। সাত মিনিটের মধ্যে রাষ্ট্রদূত পাভেল সেখানে পৌঁছে। আরও পুলিশও পৌঁছেছিল।
কিন্তু বাড়িতে কিছুই পাওয়া যায়নি। পাওয়া গিয়েছিল শুধু এগারটি লাশ।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন যে ঘরে ছিল, সে ঘরেও আহমদ মুসা তাদের নিয়ে গিয়েছিল। সে ঘরে তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও কাপড়াদি পাওয়া গেছে। সে সবে তাঁর ফিংগারপ্রিন্টও পাওয়া গেছে।
আহমদ মুসারা পৌঁছার আগেই ওরা পালিয়েছে প্রিন্সেসকে নিয়ে। পালাবার পথও খুঁজে পাওয়া গেছে। বাড়ির আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে একটা টানেল বাইরে বেরিয়ে গেছে। সে পথেই তারা পালিয়েছে।
আহমদ মুসার সামনে অন্ধকার। কোন পথে এগুবে তার কোন ইংগিত তার কাছে নেই। এমনকি প্রিন্সেসকে কিডন্যাপকারী ঐ লোকদের দলের বা গ্রুপের নাম-পরিচয় পর্যন্ত জানা হয়নি।
আহমদ মুসার চেয়েও হতাশ বেশী রুশ রাষ্ট্রদূত পাভেল। খবরটি মস্কোকে জানাবার পর সে ভয়ানক বকুনি খেয়েছে সেখান থেকে। পাভেলই ডেকে এনেছে আহমদ মুসাকে সামনে এগুবার কোন পথ বের করা যায় কিনা তা আলোচনার জন্যে।
পাভেলও হাত কপালে রেখে গা এলিয়ে দিয়েছিল সোফায়।
একসময় সে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘তোমাকে মোবারকবাদ ইয়ংম্যান, তুমি প্রিন্সেসের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলে এবং তাকে উদ্ধারের চেষ্টাও করেছ। এখন কি করা যায়, ঐ ধরনের সুযোগ আবার কি করে সৃষ্টি করা যায়?’
আহমদ মুসাও সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘ওঁকে যারা কিডন্যাপ করেছে তারা রাশিয়ান। আপনাদের গোয়েন্দা বিভাগ তাঁকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমার মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’
‘হ্যাঁ তার পারে। কিন্তু এখনও কিছুই পারেনি।’
‘ফ্রান্সে বিশেষ করে প্যারিসে রুশ কম্যুনিটির খোঁজ খবর তো আপনারা অবশ্যই রাখেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কম্যুনিস্ট সরকারের আমলে এটা রুশ দূতাবাসের একটা প্রধান দায়িত্ব ছিল। কিন্তু এখন ঐভাবে খোঁজ-খবর রাখা হয় না।’
একটু থামল। থেমেই আবার শুরু করল রাষ্ট্রদূত পাভেল, ‘তবে একটা যোগাযোগের ব্যবস্থা সবার সাথেই আছে। তারাও দূতাবাসে আসে। আমরাও তাদের আমন্ত্রণে তাদের আয়োজন-অনুষ্ঠানে গিয়ে থাকি।’
‘এসব আয়োজন ও আয়োজকদের ফটো এ্যালবাম আপনারা সংরক্ষণ করেন না?’
‘হ্যাঁ, কিছু কিছু আমরা করি। দেখতে চাও এ্যালবাম?’
‘দেখালে বাধিত হবো।’
‘অল রাইট’ বলে রাষ্ট্রদূত পাভেল টেলিফোন তুলে নিল হাতে। ডায়াল করল। বলল, ‘ওলগা মা, আমার কম্প্যুটারে দেখ প্যারিসের রুশ কম্যুনিটির একটা ফাইল আছে। ফাইলের একটা প্রিন্ট নিয়ে এস তো মা।’
‘এত বড় ফাইলের কেন দরকার পড়ল? তোমার সাথে ওখানে কে আব্বা?’ ওপার থেকে বলল তার মেয়ে ওলগা।
‘কেন তোমাদের সেই সেভিয়ার, এশিয়ান ইয়ংম্যান।’
‘ও, নাইস, আসছি আব্বা।’
ক’মিনিটের মধ্যেই ওলগা এসে প্রবেশ করল ড্রইং রুমে।
প্রবেশ করেই আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মিঃ আব্দুল্লাহ, আপনাকে অভিনন্দন। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ ও ফরাসি পুলিশ যা করতে পারেনি, আপনি তাই পেরেছেন। প্রিন্সেস উদ্ধার হয়নি বটে, কিন্তু জানা গেল তিনি কি অবস্থায় আছেন।’
‘ওয়েলকাম মিস ওলগা। উদ্ধার আসল কাজ, সেটাই তো হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাঁর কাছে পৌঁছতে পারা, তার অবস্থার কথা জানা, এটাও ছোট খবর নয়।’
মুহূর্তের জন্যে থামল ওলগা। আবার শুরু করল। ‘আপনার শরীর এখন কেমন? মুখের আহত জায়গা সম্পূর্ণ সারেনি দেখছি।’
‘কিছু অসুবিধা আছে। কিন্তু আমি সুস্থ।’
‘মা, ফাইলটা দাও’ আহমদ মুসার দিকে ইংগিত করে বলল রাষ্ট্রদূত।
আহমদ মুসা ফাইলটি ওলগার হাত থেকে নিল। ফাইলে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা।
‘আসছি আব্বা, আসছি মিঃ আব্দুল্লাহ’ বলে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল ওলগা।
ফাইলে অনেক ফটো। কোনটি গ্রুপ, কোনটি সিংগেল। ফটোর ক্যাপশনে প্রত্যেকের পরিচয় লেখা আছে।
আহমদ মুসা শুধু ফটোগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে চলল। দরকার হলে ক্যাপশন দেখে নেয়া যাবে।
দু’টো ফাইল। প্রথমটিতে প্যারিসের রুশ কম্যুনিটির লোকদের নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের ছবি। আর দ্বিতীয় ফাইলে রয়েছে দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছবি ও তাদের পরিচয়।
প্রথম ফাইলে সন্দেহ করারর মত কাউকেই পেল না। হাতে তুলে নিল দ্বিতীয় ফাইল-দূতাবাস কমকর্তা সচিত্র ডসিয়ার।
‘ও ফাইলে কিছু পেলে না, না? তাহলে ক্রিমিনালরা আরও অপরিচিত কেউ।’
আহমদ মুসা দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফটো ডসিয়ারটা বন্ধ করে টিপয়ের
উপর রাখতে যাচ্ছিল। রাষ্ট্রদূত পাভেল বলল, ‘ডসিয়ারটা দেখ। আমাদের সবাইকে তো চেননা। চেনা থাকলে উপকার হতে পারে তোমার আমাদের সকলেরই।’
আহমদ মুসা আবার হাতে তুলে নিল ফটো ডসিয়ারটা।
রাষ্ট্রদূত পাভেল একটা খবরের কাগজের পাতায় মনোযোগ দিয়েছিল। আর আহমদ মুসা একের পর এক পাতা উল্টিয়ে দেখে যাচ্ছিল ডসিয়ারটা।
হঠাৎ একটা ফটোর উপর চোখ পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। আবার চট করে তাকাল রাষ্ট্রদূত পাভেলের দিকে। দেখল, তার চোখ দু’টি কাগজে নিবদ্ধ।
আহমদ মুসা ছবিটির পাশের পরিচিতি পড়ল। পড়ে আরেক দফা চমকে উঠল সে। মায়োভস্কি ফ্রান্সের রুশ দূতাবাসের কেজিবি প্রধান?
ছবিটি মায়োভস্কির। প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে যারা বন্দী করে রেখেছে, মায়োভস্কি তাদেরই একজন। আহমদ মুসাকে ক্যাথারিনের বন্দীখানায় ইন্টারোগেট করেছে, নির্যাতন করেছে এই মায়োভস্কিই।
গোটা দেহে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল আহমদ মুসার। গোটা দূতাবাস কি প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কিডন্যাপের সাথে জড়িত? রাষ্ট্রদূত পাভেল কি তার সাথে অভিনয় করছেন? খেলছেন কি তিনি আহমদ মুসার সাথে? এই খেলা, এই অভিনয়ের উদ্দেশ্য কি? এই আশংকার পাশেই আবার ভাবল সে, সরকারের মধ্যেও সরকার থাকে। হতে পারে, মায়োভস্কি এবং তার সাথীরা দূতাবাসের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় কাজ করে যাচ্ছে।
কিন্তু কোনটা সত্যি তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। কূটনীতিকদেরকে নিখুঁত অভিনয়ও জানতে হয়। সুতরাং হঠাৎ করে তাদের স্বরূপ সন্ধান মুশকিল।
‘কি ভাবছ তুমি? মনে হচ্ছে তুমি বিমূঢ় হয়ে পঢ়েছ।’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
আহমদ মুসা হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘ঠিকই বলেছেন। চারদিকে অন্ধকার দেখছি। বুঝতে পারছি না কোন পথে এগুব।’
‘আমারও তো একই অবস্থা। কিন্তু এ নিয়ে তো ভেংগে পড়ার দরকার নেই।’
‘আপনাদের এখানকার গোয়েন্দা দফতরে কি এ এলাকার ক্রিমিনালদের কোন তালিকা আছে?’
‘আছে। কিন্তু তা দিয়ে কি হবে? কাউকে সন্দেহ করলে না তার সন্ধান করবে ছবিতে। প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কিডন্যাপকারী যাদের তুমি দেখেছ, তাদের সন্ধান করতে চাচ্ছ?’
আহমদ মুসা মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল, ‘ওরা আপনার এ্যালবামে থাকবে না।’
ভ্রু-কুঞ্চিত করল রাষ্ট্রদূত পাভেল। প্রশ্ন করল, ‘তার অর্থ?’
“অর্থ হলো, আপনি দেখেছেন কিডন্যাপকারীদের সবগুলো লাশ রুশ। এর অর্থ প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে কিডন্যাপ করার সাথে রুশদের কোন গ্রুপ জড়িত। তাদের ফটো নিশ্চয় আপনার এ্যালবামে থাকবে না। নিশ্চয় আপনারা রীতি হিসাবে ফরাসি ও প্রতিপক্ষ ও অপরাধীদের উপরই শুধু চোখ রাখেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক বলেছ। কিন্তু প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কিডন্যাপের সাথে শুধু রুশরা জড়িত থাকলে ফরাসি ক্রিমিনালদের ছবি দেখতে চাচ্ছ কেন?’
‘ক্রিমিনালরা অনেক সময় সাহায্যও করে।’
ক্রিমিনালদের ফটো ফাইল দেখল আহমদ মুসা। আসলে ফটো দেখা নয়, ক্রিমিনাল এরিয়ার লোকেশান সম্পর্কে একটা আইডিয়া নেয়াই তার উদ্দেশ্য। আহমদ মুসার বিশ্বাস, প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে যদি প্যারিসে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে অপরাধ জগতের কোন বলয়ের প্রশ্রয়েই তাকে রাখা হবে। ক্যাথারিনের কাছে পৌঁছার বিশ্বস্ততম সূত্র তার কাছে এখন মায়োভস্কি। আহমদ মুসা যেখানে পৌঁছবে সেই সম্পর্কে আগাম একটা ধারণা পেতে চায়।
মায়োভস্কির কথা মনে হতেই আহমদ মুসার মনে আরেকটা প্রশ্নের সৃষ্টি হলো। প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কিডন্যাপের সাথে মায়োভস্কির জড়িত থাকার ব্যাপার যদি রাষ্ট্রদূত পাভেল জানতেন কিংবা তিনি নিজেও জড়িত থাকেন ঘটনার সাথে, তাহলে এমন অভিনয় কি সম্ভব? আহমদ মুসার অন্তর্ভেদী চোখেও মিঃ পাভেলের কোন অস্বাভাবিকতা তার চোখ-মুখ থেকে ধরা পড়ছে না।
পুনরায় আগের চিন্তাই আহমদ মুসার মনে আবার ফিরে এল, কূটনীতিকরা চলচ্চিত্রের অভিনেতাদের চেয়েও সিরিয়াসস অভিনেতা হয়ে থাকে। আহমদ মুসাকেও অভিনয় করতে হবে। রাষ্ট্রদূত পাভেলের বাসায় না এলে তো মায়োভস্কির পরিচয় ও ঠিকানা জানা যেত না। মায়োভস্কি আহমদ মুসার কাছে এখন সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি।
আহমদ মুসার মন চঞ্চল হয়ে উঠল। মায়োভস্কির বাসা কোথায়? ওর উপর চোখ রাখলেই নিশ্চিত ক্যাথারিনের কাছে পৌঁছা যাবে।
‘অনুমতি দিন, আমি উঠতে চাই।’ একটু সময় নিয়ে আহমদ মুসাই আবার বলল।
‘তাহলে কি ঠিক হলো? কি ভাবছ তুমি এখন?’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
‘চিন্তা করছি। আপনার গোয়েন্দা বিভাগ আজকের ঘটনার সূত্র ধরে কি করছে সেটাও দেখুন।’ উঠতে উঠতে বলল আহমদ মুসা। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাষ্ট্রদূত পাভেলের চোখের উপর নিবদ্ধ। প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চায় আহমদ মুসা।
‘মায়োভস্কিদের সাথে কথা বলেছি। তারা চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি আশাবাদী নই।’
‘কিন্তু আমার মতে আশাবাদী বেশী হবার কথা। রুশ ক্রিমিনালদের সম্পর্কে সবকিছুই কেজিবি’র জানার কথা।’
‘রুশরা জড়িত থাকার ব্যাপারটা এই প্রথম জানা গেল। এখন এ বিষয়টাকে তারা সিরিয়াসলি দেখবে। তবু আমি খুব আশাবাদী নই।’
‘কারণ?’
একটা ঢোক গিলল রাষ্ট্রদূত পাভেল। বলল, ‘তুমি যে কেজিবি’কে চেন, সে কেজিবি এখন নেই। এখন আমরা অফেনসিভ নই, ডিফেনসিভ। কোন মিশন না থাকলে এমন ডিফেনসিভ হয়ে পড়তে হয়।’
‘ঠিকই বলেছেন।’ বলে আহমদ মুসা হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়াল পাভেলের দিকে।
আহমদ মুসা রাষ্ট্রদূত পাভেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল, পাভেলের শেষ কথাটা একটা সত্যের প্রকাশ, না ক্ষোভের বিস্ফোরণ! ক্ষোভের বিস্ফোরণ হলে সে এবং মায়োভস্কি এক পক্ষের লোক হতে পারে।

রাষ্ট্রদূত পাভেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আহমদ মুসা খুবই একাকিত্ব বোধ করছিল। সে নিশ্চিত হয়েছিল, রাষ্ট্রদূত পাভেলের কোন কথার উপর বিশ্বাস করা তার ঠিক হবে না। মায়োভস্কি এবং পাভেল যে আলাদা তা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস করা যাবে না।
মায়েভস্কির উপর চোখ রাখছিল আহমদ মুসা।
সেদিন মেঘ না চাইতেই পানি।
রুশ দূতাবাসের বিপরীত দিকের কার পার্কে তার গাড়িতে বসে আহমদ মুসা দেখল, মায়োভস্কি এবং তার সাথে একজন লোক গাড়িতে উঠছে। দ্বিতীয় লোকটিকে আহমদ মুসা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের সেই বন্দী খানায় দেখেছিল মায়োভস্কির সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময়। খুশী হলো আহমদ মুসা, তারা দু’জন এক সাথে গাড়িতে উঠার অর্থ তারা কোন মিশনে যাচ্ছে।
প্রথমে গাড়িতে উঠল দ্বিতীয় লোকটি। তারপর মায়োভস্কি হাত ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উটে বসল।
ছুটে চলল ওদের গাড়ি।
আহমদ মুসার গাড়ি ফলো করল তাদের।
শুরুতেই মায়োভস্কিদের গাড়ি লাফিয়ে উঠে তীব্র গতিতে চলতে শুরু করেছে। মায়োভস্কির হাত ঘড়ি দেখা এবং শুরু থেকেই তাদের গাড়ির এমন গতি থেকে আহমদ মুসা বুঝল, সুনির্দিষ্ট সময়ের কোন সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রামে ওরা যাচ্ছে। দেরী হওয়ায় সময় কভার করতে চাচ্ছে জোরে গাড়ি চালিয়ে। একান্ত গরজে না পড়লে প্যারিসের রাস্তায় এভাবে কেউ গাড়ি চালায় না।
একই গতিতে চলছিল আহমদ মুসা ওদের পেছনে নিরাপদ একটা ব্যবধান রেখে।
সময়টা বিকেল। শহরের উপকণ্ঠে চলে এসেছে তাদের গাড়ি।
মায়োভস্কির গাড়ির গতি আরও বেড়েছে। ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলছে তার গাড়ি।
হঠাৎ মায়োভস্কির গাড়ি ওভারটেক করার জন্যে ভিন্ন লেনে টার্ন নিতে গিয়ে সামনের একটি পিকআপের সাথে একসিডেন্ট করে বসল।
মায়োভস্কির গাড়ি পিকআপটিকে পেছন থেকে ঠুকে দিয়ে সামনে বেরিয়ে গিয়েছিল। পিকআপটি ছিটকে গিয়ে কাত হয়ে পড়েছিল।
মায়োভস্কির গাড়ি চলে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা স্পটটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে দেখল, একটি বালক গাড়ি থেকে ছিটকে মুখ থুবড়ে পড়েছে মাটির উপর। রক্তে লাল হয়ে উঠেছে মাটি।
আহমদ মুসা ভুলে গেল মায়োভস্কিকে অনুসরণ করার কথা।
আহমদ মুসা তার গাড়ি রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে ছুটল বালকটির দিকে। বালকটিকে কোলে তুলে নিয়ে তার গাড়ির দিকে আসার জন্যে পা বাড়িয়ে তাকাল পিকআপটির দিকে। দেখল, একটি মেয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে আসছে। সেও আহত।
আহমদ মুসা তার দিকে এগিয়ে বলল, ‘আসুন আমার গাড়িতে।’
বালকটিকে গাড়ির সিটে শুইয়ে দিল আহমদ মুসা। মেয়েটি উঠে বসল তার পাশে।
মেয়েটির বয়স চব্বিশ-পঁচিশ বছর। তীক্ষ্ণ চোখ। স্লীম শরীর, স্পোর্টসম্যান ফিগার। লাবণ্য ভরা মিষ্টি চেহারা।
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দেবার আগে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার পরিচিত কোন ক্লিনিক…।’
‘আমাদের বাড়ির দিকে সোজা সামনে চলুন।’
আহমদ মুসার গাড়ি তীর বেগে এগিয়ে চলল সামনে। মায়োভস্কির গাড়িও এ পথেই গেছে।
আমরা কি কোন ক্লিনিকে যাচ্ছি?’ ঘাড়টা ঈষৎ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আমাদের ফ্যামেলি ক্লিনিকে সব ব্যবস্থা আছে। পিটার দেখা যাচ্ছে জ্ঞান হারায়নি।’
‘ছেলেটার নাম পিটার?’
‘হ্যাঁ, পিটার পাওয়েল। আর আমি জাহরা ইভানোভা।’
‘ওয়েলকাম। দু’টোই সুন্দর নাম।’
গাড়ির চলার বেগটা আরও বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল আহমদ মুসা।

প্যারিস উপকণ্ঠে একটা সবুজ গ্রাম। একটা সবুজ টিলার উপর দূর্গ সদৃশ বাড়ি।
বাড়িটা থেকে একটা সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে এসেছে উপত্যকায়। আর একটা গাড়ির রাস্তা টিলার গা বেয়ে এঁকেবেঁকে উঠে গেছে বাড়িটার বিশাল গেটে।
গেটের সামনে লম্বা আকৃতির একটা বাগান। তার একদিকের রাস্তা দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করে, অপরদিকেরটা দিয়ে গাড়ি বেরিয়ে যায়।
বাড়িটার কেন্দ্রবিন্দু বরাবর ভুগর্ভস্থ একটা বিশাল কক্ষ। কক্ষের মধ্যখানে একটা টেবিলের তিন দিকে বসে গ্রেগরিংকো, উস্তিনভ এবং মায়োভস্কি। গ্রেগরিংকো রাশিয়ার ‘গ্রেট বিয়ার’-এর হোম এ্যাফেয়ার্সের প্রধান। উস্তিনভ ‘গ্রেট বিয়ার’-এর ‘অপারেশন রাজচক্র’কে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর মায়োভস্কি প্যারিসস্থ রুশ দূতাবাসের কেজিবি প্রধান এবং অপারেশন রাজচক্র-এর ইউরোপীয় ইউনিটের প্রধান।
‘এশিয়ান লোকটি কে? এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা সে ঘটাল, বিশ্বাস করতে বল?’ কথা বলছিল গ্রেগরিংকো। তার চেহারায় প্রবল বিরক্তির ছাপ।
‘অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে আমার কাছেও। জরুরী কল পেয়ে আমাকে যখন চলে আসতে হয়, তখন তাকে ক্রুশ বোর্ডে সেট করা শুধু বাকি ছিল। চারটি স্টেনগান ও একটা রিভলবারেরর বেষ্টনির মধ্যে ছিল সে। এই অবস্থায় এত কিছু ঘটা কিভাবে সম্ভব আমি বুঝতে পারছি না।’ বলল মায়োভস্কি শুকনো কণ্ঠে।
‘যে বিবরণ শুনলাম, তাতে তোমার পাঁচজন কি করবে। মুক্ত অবস্থায় শতজনের কাছেও সে ভয়ংকর। কে এই লোক।’ বলল গ্রেগরিংকো।
‘জানা যায়নি। তবে কেউ তাকে নিয়োগ করেছে।’ বলল উস্তিনভ।
‘কেন, কি উদ্দেশ্যে? ক্যাথারিনকে উদ্ধার করার জন্যে?’ বলল গ্রেগরিংকো।
‘এ বিষয়টা তো পরিষ্কার হয়ে গেছে। মুক্ত হবার পর সে পুলিশ নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছিল। রুশ রাষ্ট্রদূতও সেখানে গিয়েছিল।’
‘তাহলে আমাদের রুশ সরকার কি তাকে নিয়োগ করেছে বলে আমরা ধরে নেব?’
‘ঘটনাচক্র তাই বলে। কিন্তু ব্যাপারটা সত্য নয়। রুশ সরকারের সংশ্লিষ্টতা থাকলে অবশ্যই আমি জানতাম। তাছাড়া এই কাজে একজন এশিয়ানকে নিয়োগ করার মত অসহায় অবস্থায় রুশ সরকার নিশ্চয় পৌঁছেনি।’ বলল মায়োভস্কি।
‘তোমার কথায় যুক্তি আছে মায়োভস্কি, কিন্তু তাহলে তার পরিচয় কি, এল কোত্থেকে?’ প্রশ্ন তুলল গ্রেগরিংকো।
সেটাই প্রশ্ন। প্যারিসে হঠাৎ করেই উদয় হয়েছে তার। মনে হয় তার উদয়ের সাথে তাতিয়ানার কোন সম্পর্ক আছে।’ বললো উস্তিনভ।
‘তাহলে তো ব্যাপারটা আরও সাংঘাতিক। আমরা তো তাতিয়ানার সাথে যুদ্ধে নামিনি, তাহলে তার লোকের সাথে আমাদের যুদ্ধ কেন? আমরা ক্যাথারিনের মত তাতিয়ানাকেও হাতে পেতে চাই।’ বলল গ্রেগরিংকো।
‘তার সাথে তাতিয়ানার সংশ্লিষ্টতার বিষয় স্পষ্ট নয়।’ বলল মায়োভস্কি।
‘সে কেন প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার করতে চায়, কেন তার পক্ষে সে কাজ করছে, এ বিষয়টা পরিষ্কার হলেই ও ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’ বলল উস্তিনভ।
গ্রেগরিংকো নড়ে-চড়ে বসে কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল এ সময় সামনের দেয়ালে সেট করা কম্পিউটারে রেড সিগন্যাল জ্বলে উঠল, সেই সাথে বিপ বিপ শব্দ।
ওরা তিনজনই মুখ তুলে সে দিকে দৃষ্টি ফেরাল। তিনজনই ওরা এ্যাটেনশন হয়ে বসল। ওদের চোখে-মুখে প্রবল ভয় ও ভক্তির ছাপ।
ওদের সামনে দেয়ালে টিভি স্ক্রিন। ওদের তিন জোড়া চোখ সে স্ক্রিনের উপর নিবদ্ধ।
টিভি স্ক্রিনে ধীরে ধীরে মুখোশ ঢাকা একটা মুখ ভেসে উঠল।
ওরা তিনজনই মাথা নুইয়ে তাকে বাউ করল। মুখে উচ্চারণ করল ‘মহামান্য আইভান দি টেরিবল, আমরা আপনার খেদমতে।’
গ্রেট বিয়ারের বর্তমান নেতা ‘আইভান দি টেরিবল’ নাম গ্রহণ করেছে। রুশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় পিটার দি গ্রেটের পর সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করেন আইভান দি টেরিবল। অতি নিষ্ঠুর এই শাসকের সময়েই সাইবেরিয়া এবং ভলগা নদী পর্যন্ত ভূখন্ড রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। রুশ রাজধানী হিসেবে মস্কোর পত্তন তিনিই করেন।
আইভান দি টেরিবলের অনুসরণে গ্রেট বিয়ার রুশদের জন্যে উৎকট ধরনের পুঁজিবাদী ডিক্টেটরশীপ কায়েম করতে চায়। রুশ সরকার নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অধীনে রাশিয়ায় যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তারও বিরোধী এরা।
মুখোশধারীর মুখ নড়ে উঠল। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো,‘রাশিয়ার প্রিয় সন্তানগণ, রাশিয়ার বার জন মহান সন্তান নিহত হওয়ার ঘটনায় আমি যারপরনাই দুঃখিত ও বিস্মিত। বিস্ময় এজন্যে যে তোমাদেরকে কারো হাতে পরাজয় বরণের জন্যে পাঠানো হয়নি। বিস্ময় আরও এজন্যে যে, হত্যাকারীকে এখনও তোমরা ধরতে পারনি, সে এখনও জীবিত। তোমাদের এই ব্যর্থতার কারণে আমাদের গোপন পরিকল্পনা বাইরে প্রকাশ হওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে, এটা ক্ষমার যোগ্য নয়।’ থামল মুখোশধারী।
এদের তিনজনেরই মুখ তখন ভয়ে ফ্যাকাশে। আবার কণ্ঠ ধ্বনিত হলো মুখোশধারীর। বলল, ‘আমি তোমাদের আরও কিছু সময় দিচ্ছি। মনে রেখ তার এক মুহূর্ত জীবিত থাকার অধিকার নেই। সে জীবিত থাকলে তোমরা বেঁচে থাকার অধিকার হারাবে। সব ঘটনার পর্যালোচনায় বুঝতে পারছি, প্রিন্সেস ক্যাথারিন তাতিয়ানার খবর জানে না এবং আংটি ও ডায়েরীর খবরও তার জানা নেই। তাতিয়ানাকে হাতে পাওয়াই আমাদের এখন প্রধান কাজ। তাতিয়ানাকে খুঁজতে হবে তোমাদেরকেই। ইন্টারনেট-এর সাহায্য নিয়ে তোমরা গত ছয় মাসের ইউরোপীয় সব বিমান বন্দরের যাত্রী তালিকা নাও। বের কর সর্বশেষ তাতিয়ানা কোথায় ল্যান্ড করেছে। লোকেশন চিহ্নিত করার পর সেখানে জালের ছাঁকুনি দাও। পেতেই হবে তাতিয়ানাকে। প্রথমে গুপ্তধন উদ্ধার তারপর ওদের দেখে নেব। দীর্ঘজীবী হোক রাশিয়া এবং রাশিয়ার সন্তানরা।’ থামমল মুখোশধারী। তার ছবিও সরে গেল স্ক্রীন থেকে।
ওরা তিনজন তখনও পাথরের মূর্তির মত বসে আছে।
নীরবতা ভাঙলো গ্রেগরিংকো। বলল, ‘উস্তিনভ তুমি তোমার সর্বশক্তি নিয়ে তাতিয়ানার খোঁজে লেগে যাও। ইউরোপের ছয় মাসের যাত্রী চার্ট যোগাড় করো আজ, কাল দু’দিনের মধ্যেই। আর মায়োভস্কি, তোমার দায়িত্ব হলো এশিয়ান যুবককে জন্মের মত শিক্ষা দেওয়া। তাকে হত্যা কর যেখানে পাও।’
মায়োভস্কি কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু তার আগেই কথা বলে উঠল ইন্টারকম। বলল, ‘মহামান্য গ্রেগরিংকো, জাহরা ইভানোভা এবং পিটার পাওয়েল এ্যাকসিডেন্ট করেছে। পিটার সাংঘাতিক আহত, ইভাও ছোট-খাট আঘাত পেয়েছে।’
জাহরা ইভানোভা এবং পিটার পাওয়েল বাড়িটার মালিক নিকিতা স্ট্যালিনের দুই সন্তান। নিকিতা ফ্রান্সে আশ্রয় গ্রহণকারী একজন ধনাঢ্য রুশ। সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন ভিন্নমতালম্বী বিদ্রোহী হিসেবে সে ফ্রান্সে আশ্রয় পায়। কিন্তু কার্যত সে ছিল কেজিবি’র হার্ডকোর লবীর একজন প্রতিভাবান এজেন্ট। সে এখন ফ্রান্সে গ্রেট বিয়ারের প্রধান অবলম্বন। কোটিপতি নিকিতা এখন গ্রেট বিয়ারের গড ফাদারের ভূমিকা পালন করছে। তার মেয়ে জাহরা ইভানোভাও গ্রেট বিয়ারের একজন কর্মী।
‘ও গড! মিঃ নিকিতাকে জানান হয়েছে?’
‘তিনি এখন লন্ডনে। জানানো হচ্ছে।’
‘ডাঃ জ্যাকভ আছেন?’
‘তাকে টেলিফোন করা হয়েছে, আসছেন তিনি।’
‘অল রাইট, আমরা আসব।’
টেলিফোন রেখে গ্রেগরিংকো বলল, ‘ইভানোভা ও পিটার এ্যাকসিডেন্ট করেছে, চল দেখি।’
বলে গ্রেগরিংকো উঠে দাঁড়াল।
তার সাথে অপর দু’জনও।

বাড়ির কাছাকাছি হয়েই ইভানোভা গাড়িরর ইমার্জেন্সী সাইরেনের সুইচ অন করে দিয়েছিল।
গাড়ি নিয়ে আহমদ মুসা ক্লিনিকের বারান্দায় দাঁড়াল।
গ্রামীণ পরিবেশে টিলার উপরে নির্মিত বাড়িটি মুগ্ধ করল আহমদ মুসাকে।
বাড়ির ক্লিনিক অংশটি বাড়ির এক প্রান্তে। বাড়ির সম্মুখস্থ মূল চত্বর অতিক্রম করেই ওখানে যেতে হয়।
গাড়ি দাঁড়াবার সাথে সাথেই অপেক্ষমান দু’জন এ্যাটেনড্যান্ট ছুটে এলে।
ইভানোভা হেঁটেই ক্লিনিকে প্রবেশ করল। পিটার পাওয়েলকে নেয়া হলো স্ট্রেচারে।
কিন্তু সার্বক্ষনিক ডাক্তার তখন ক্লিনিকে হাজির নেই। জরুরী কল পেয়ে কোথাও গেছেন। বিকল্প এখনও এসে পৌঁছেনি।
অপেক্ষা করার সময় ছিল না।
আহমদ মুসাই পিটার পাওয়েল এবং ইভানোভার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। রক্ত পড়া বন্ধ হলো পাওয়েলের। দু’টি দাঁত ভাঙা ও চোখের নিচটায় বড় একটা ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া ছাড়া বড় কোন ক্ষতি তার হয়নি। ইভানোভার কপালের একপাশ থেতলে ও কেটে গেছে। আরও কয়েক জায়গায় ছোট খাট আঘাত পেয়েছে ইভানোভা।
ব্যান্ডেজ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইভানোভা বলল, ‘আপনি কি ডাক্তার?’
‘না।’
‘ও তাহলে কোথাও কাজ করেছেন বুঝি?’
‘না তাও নয়।’
বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল ইভানোভার চোখে মুখে। ভাবল, ফাস্ট এইড-এর কাজ অনেকেই জানে, কিন্তু এমন নিখুঁত হাতের কাজ প্রোফেশনাল ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
কিছু বলতে যাচ্ছিল ইভানোভা। একজন এ্যাটেনডেন্ট ছুটে এসে বলল, ‘মিঃ গ্রেগরিংকো আসছেন।’

তার কথা শেষ না হতেই দরজা ঠেলে প্রবেশ করল উল্লেখিত গ্রেগরিংকোরা।
আহমদ মুসা, ইভানোভা ও সাথের অন্যান্যরা তখন ইমার্জেন্সী হল রুমে।
আহমদ মুসা গ্রেগরিংকোদের দিকে তাকিয়েই ভূত দেখার মত চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সকলের পেছনে এসে মুহূর্ত কয়েক দাঁড়াল। তারপর হাঁটা দিল বিপরীত দিকের দরজার দিকে।
গ্রেগরিংকা, উস্তিনভ ও মায়োভস্কি এক সংগে প্রবেশ করেছে হল ঘরে।
ইভানোভা তাদের স্বাগত জানিয়ে ঘটনার বিবরণ দিল। তারপর আহমদ মুসাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে পেছন দিকে চাইল। পেছনে তাকে দেখতে না পেয়ে বিস্মিত হলো ইভানোভা। ইভানোভা মনে করেছিল, অপরিচিত বলেই বোধহয় সামনে থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। এখন পেছনে আহমদ মুসাকে না দেখে বলা যায় চমকেই উঠল ইভানোভা। গ্রেট বিয়ারের কর্মী হিসেবে এর মধ্যে প্রবল একটা অস্বাভাবিকতা আঁচ করল। কিন্তু ব্যাপারটা গ্রেগরিংকোদের কাছে প্রকাশ করতে চাইল না।
তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,‘সম্ভবত উনি টয়লেটে গেছেন পরিষ্কার হবার জন্যে। অনেক পরিশ্রম হয়েছে ওর। চলুন পাওয়েলকে দেখবেন।’
বলে গ্রেগরিংকোদের নিয়ে ইভানোভা পাওয়েলের কক্ষের দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘ভদ্রলোকের নাম কি? কোথায় থাকেন?’ বলল উস্তিনভ।
ইভানোভা ঘুরে দাঁড়িয়ে সলজ্জ হেসে বলল,‘স্যরি, তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনটাই জানার সুযোগ হয়নি।’
এই সময় ডাক্তারও এসে পৌঁছল।
ডাক্তারসহ সবাই পিটার পাওয়েলের কক্ষে প্রবেশ করল।
পিটার পাওয়েলকে দেখে ওরা চলে গেল। গাড়িতে ওদের বিদায় দিয়ে ইভানোভা ফিরে এল পাওয়েলের কক্ষে। দেখল, পাওয়েলকে নিয়ে ডাক্তার এবং নার্সরা অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করেছে।
ইভানোভা আবার চারদিকে চাইল। আশেপাশে খোঁজ করল। কিন্তু আহমদ মুসাকে কোথাও পেল না।
ইভানোভার মনে প্রশ্নের অন্ত নেই। লোকটিকে যতটুকু সে বুঝেছে, তাতে এরকম কান্ড ঘটাবার লোক সে নয়। অত্যন্ত সপ্রতিভ, সতেচন, বুদ্ধিমান, স্পষ্ট, ঋজু ও সংবেদনশীল প্রকৃতির লোক সে। কিন্তু ওভাবে সে সরে পড়ল কেন? এখন ইভানোভার স্পষ্ট মনে হচ্ছে, গ্রেগরিংকোদের দেখার পরেই সে পেছনে সরে যায়। তাহলে কি সে গ্রেগরিংকোদের চেনা? কিন্তু চেনা হলেই সরবে কেন! চমকে উঠল ইভানোভা। তাহলে কি লোকটির পরিচয় এমন যে গ্রেগরিংকোদের সামনে পড়লে তার অসুবিধা হতো! কি সেই অসুবিধা যে তাকে অসৌজন্যমূলকভাবে পালাতে হলো? বড় ধরনের কোন ব্যাপার না হলে এমনটা ঘটতে পারে না।
এসব চিন্তা ভয়ানক উৎসুক করে তুলল ইভানোভাকে আহমদ মুসার ব্যাপারে।
ইভানোভা ছুটল আহমদ মুসার গাড়ি যেখানে পার্ক করা ছিল সেখানে। না, গাড়ি ঠিকই আছে। তাহলে নিশ্চয় সে চলে যায়নি। কিন্তু কোথায় সে?
ইভানোভা ছুটল গেটে। জিজ্ঞেস করল গেটম্যানকে চেহারা ও পোশাক আশাকের বিবরণ দিয়ে।
গেটম্যান তার কম্প্যুটারে গেটের টিভি ক্যামেরার কয়েক ঘন্টার ছবি সামনে নিয়ে এসে দেখাল। না, লোকটি গেট দিয়ে বের হয়নি, স্বগত উচ্চারণ করল ইভানোভা।
গেট ছাড়া অন্যদিক দিয়ে বের হওয়া কঠিন। বাড়ির চারদিকের প্রাচীর বরাবর টিভি ক্যামেরার পাহারা রয়েছে। রয়েছে ঝটিকা পাহারাদারদের ক্যাম্প। যারা সন্দেহজনক কাউকে দেখলে পর মুহূর্তেই তাকে পাকড়াও করবে।
সুতরাং লোকটি ভেতরেই আছে, এই সিদ্ধান্তে স্থির হলো ইভানোভা।
ইভানোভা দ্রুত ফিরে এল। গিয়ে প্রবেশ করল পিতার কনট্রোল রুমে।
বিশাল বাড়িটার ঠিক মাঝ বরাবর স্বতন্ত্র একটা ব্লক নিয়ে তাদের বাড়ি। বাড়ির অবশিষ্ট অংশ গ্রেট বিয়ারের গোপন ঘাটি হিসেবে ব্যবহার হয়। তবে ইভানোভাদের ব্লকের সাথে গোটা বাড়ির সংযোগ রয়েছে গোপন সুড়ঙ্গ পথের মাধ্যমে। আবার গোটা বাড়ির উপর নজর রাখার জন্যে টিভি ক্যামেরার একটা স্বতন্ত্র নেটওয়ার্ক-এর নিয়ন্ত্রণ হয় ইভানোভার আব্বার কনট্রোল রুম থেকে। ঘাটি এলাকার জন্যে ঘাটির একটা নিজস্ব নেটওয়ার্ক আছে যা গ্রেট বিয়ার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ঘাটির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে।
ইভানোভা টিভি প্যানেলের সামনে বসে কনট্রোল সুইচ এক এক করে টিপে চলল। একটি সুইচ টেপার সাথে সাথেই একটি কক্ষ বা করিডোরের চিত্র ভেসে উঠেছে।
এক সময় একটা সুইচ টিপতেই একটা ঘরের বন্ধ দরজায় আহমদ মুসাকে দাঁড়ানো দেখলো ইভানোভা।
চমকে উঠে ইভানোভা ঝুকে পড়ল টিভির উপর। সে দেখল, ল্যাসার বিম দিয়ে দরজার লক গলিয়ে আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের চারদিকটা দ্রুত দেখল সে। তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে একইভাবে পাশের ঘরে প্রবেশ করল। ঐভাবেই সারা ঘরে সে নজর বুলিয়ে চলল।
শিউরে উঠল ইভানোভা। ভাবল সে, লোকটা নিশ্চয় শত্রু পক্ষের সাংঘাতিক কেউ হবে। কিছু খুঁজছে সে? কি খুঁজছে? তাঁর টার্গেট কি গ্রেট বিয়ারের এ ঘাটির কনট্রোল রুম?
ইভানোভার গোটা শরীর শক্ত হয়ে উঠল উৎকণ্ঠায়। সে টিভি স্ক্রিনে চোখ রেখে টেলিফোন তুলে নিল হাতে। পেল ডিউটি অফিসারকে। বলল,‘মিঃ গ্রেগরিংকোকে এখনি জানান, আপনাদের ঘাটিতে সন্দেহজনক কেউ ঢুকেছে।’
কথা বলা অবস্থায়ও ইভানোভা সুইচ টিপে আহমদ মুসাকে অনুসরণ করছিল।
টেলিফোন করার পর ইভানোভার মনে কোথাও যেন একটা খোঁচা লাগল। যেই হোক লোকটা তার উপকার করেছে। ইভানোভা ও পিটার তার কাছে অনেক ঋণী। তাছাড়া অপরাধ প্রবণ মানুষকে সে চেনে। লোকটিকে দেখে চোখ, মুখ, কথা, আচরণ, হাসি-কোনদিক দিয়েই অপরাধী বলে মনে হয়নি।
মনটা অস্বস্তিতে ভরে গেল ইভানোভার। গ্রেগরিংকোদের হাতে পড়লে লোকটা নির্ঘাত মারা পড়বে।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, এমন শত্রুপুরিতে যে একা ঢুকতে পারে, অত্যাধুনিক লেসার বীম যার অস্ত্র সে সাধারণ শত্রু নয়। এমন শত্রুর শাস্তি হতেই হবে।
টিভি স্ক্রীনে ইভানোভার চোখ ফলো করছিল আহমদ মুসাকে। হঠাৎ এক সময় দেখল, আহমদ মুসা একটা কক্ষ সার্চ শেষে দরজা বন্ধ করে প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে গেল দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে।
ইভানোভা দেখেই বুঝতে পারল, ওটা মুসলমানদের নামায।
আহমদ মুসার এই মুসলিম পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথেই ইভানোভার মনে হঠাৎ করেই একটা বিস্ময়-বিমূঢ়তা নেমে এল। লোকটি তাহলে মুসলমান।
এই পরিচয় পাওয়ার সংগে সংগে ইভানোভার হৃদয়ের একটা বন্ধ দুয়ার যেন খুলে গেল। স্মৃতির দিগন্তে কিছু স্মৃতি ভীড় করে উঠল।
কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল ইভানোভা।
পরক্ষণেই সতর্ক হয়ে উঠল। কিন্তু দেখল, সে ঘরটিতে আহমদ মুসা নেই।
পরে পেয়ে গেল তাকে করিডোরে।
আহমদ মুসা একের পর এক ঘর সার্চ করে চলল, আর ইভানোভার চোখ তাকে অনুসরণ করল। ইভানোভা উদ্বেগের সাথে সাথে লক্ষ্য করলো, আহমদ মুসা ঘাটির কেন্দ্রীয় কনট্রোল রুমের কাছে এসে পড়েছে। সে কি এই কনট্রোল রুমেরই খোঁজ করছে? কে এই লোকটি? বিপজ্জনক লোক তো?
ইভানোভার মোবাইল টেলিফোন বেজে উঠল।
ইভানোভা তুলে নিল টেলিফোন।
গ্রেগরিংকোর টেলিফোন। বলল, ‘ধন্যবাদ মা, আমরা এসেছি। লোকটাকে আমরা লোকেট করেছি। সে আমাদের কনট্রোল রুমে ঢোকার চেষ্টা করছে। সব দিক থেকে আমরা ভেতরে প্রবেশ করছি।’
একটু থেমে গ্রেগরিংকো আবার শুরু করল,‘তুমি খবর দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। তুমি কেমন করে বুঝতে পেরেছিলে যে, কেউ প্রবেশ করেছে?’
‘আমাদের যে লোকটি পৌঁছে দিয়েছিল, তাকে যখন কোথাও খুঁজে পেলাম না, যখন দেখলাম তার গাড়িও আছে এবং গেটে জানলাম যে, সে গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়নি, তখন হঠাৎ করেই আমার মনে হলো, সে আমাদের ঘাটিতে প্রবেশ করতে পারে।’
ইভানোভা ইচ্ছা করেই সত্য গোপন করল। সত্য গোপনের আরেকটা কারণ, ঘাটি পর্যবেক্ষণ করার আলাদা টিভি ক্যামেরার নেটওয়ার্ক যে তার আব্বার আছে এটা গোপন বিষয়।
‘তোমাকে আবার ধন্যবাদ। তোমার অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়েছে। লোকটা বিপজ্জনক।’ বলল গ্রেগরিংকো ইভানোভা থামার সাথে সাথেই।
‘চেনেন তাকে?’
‘আমি চিনি না, কিন্তু উস্তিনভ ও মায়োভস্কি ওকে দেখেছে। এই লোকটিই সেদিন আমাদের ডজন খানেক লোক হত্যা করে আমাদের প্যারিসের ঘাটি থেকে পালায়।’
শুনে বিস্ময়-বিস্ফারিত হয়ে উঠল ইভানোভার চোখ।
কিছু বলতে যাচ্ছিল ইভানোভা। কিন্তু ওপার থেকে গ্রেগরিংকো বলে উঠল,‘এখন রাখি মা। ওরা এগুচ্ছে, আমিও উঠি।’
টেলিফোন রেখে দিয়ে ইভানোভা টিভি স্ক্রীনের উপর ঝুঁকে পড়ে খুঁটে খুঁটে দেখল আহমদ মুসাকে। না, নিষ্পাপ একটি মুখ। চোখে-মুখে একটা উৎকণ্ঠা। কিন্তু সে উৎকণ্ঠায় কোন অপরাধের ছবি নেই। তার উৎকণ্ঠা বলছে, কোন হারানো জিনিস যেন সে খুঁজে পাচ্ছে না।
অন্য একটা টিভি স্ক্রীনের নব ঘুরিয়ে ইভানোভা দেখল, গ্রেগরিংকোর দল চারদিক থেকে ছুটে আসছে আহমদ মুসার দিকে।
হঠাৎ একটা উদ্বেগে ছেয়ে গেল ইভানোভার মন। প্রায় দেড় ডজন স্টেনগান ঘিরে ফেলেছে লোকটিকে। লোকটিকে হয় মরতে হবে, নয়তো আত্মসমর্পণ করতে হবে। কিন্তু তার সম্পর্কে যেটুকু জানল তাতে মনে হয়, সে আত্মসমর্পণ করার বদলে শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। কারণ সে জানে, গ্রেট বিয়ারের ডজনখানেক লোক হত্যার শাস্তি তার কি হতে পারে। সুতরাং আত্মসমর্পণের তার প্রশ্নই ওঠে না।
তাহলে সে মরবে?
কথাটা মনে হতেই হৃদয়ের কোথায় যেন যন্ত্রণা অনুভব করল। লোকটি তার এবং পিটারের উপকার বলেছে বলে নয়, কোন মুসলমানকে দেখলে এক ধরনের আবেগ অনুভব করে সে। এই আবেগ থেকেই এই যন্ত্রণা। মুসলিম লোকটি এমন বেঘোরে প্রাণ হারাবে তা তার হৃদয় মেনে নিতে পারছে না। অন্যদিকে আহমদ মুসাকে ক্রিমিনাল বলেও মনে করতে পারছে না।
প্রবল দ্বিধার মধ্যে পড়েছিল ইভানোভা।

এর মধ্যেই সে দেখল, গ্রেগরিংকোরা ঘিরে ফেলেছে আহমদ মুসাকে। গ্রেগরিংকোর হাতে হ্যান্ড মাইক। সে মাইক মুখের সামনে তুলে ধরল। ইভানোভা বুঝল, কিছু বলছে সে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
সংগে সংগেই সে দেখল, ভূ-গভর্স্থ কনট্রোল রুমে নামার সিঁড়ি মুখের দরজায় দাঁড়ানো আহমদ মুসা সোল্ডার গোলস্টার থেকে ভয়ানক এম-১০ মেশিন রিভলবার হাতে তুলে নিয়েছে। তার মনে হলো, মুহূতে আহমদ মুসার দেহ যেন ইস্পাতের মত শক্ত হয়ে গেল। যুদ্ধের জন্যে সে প্রস্তুত।
এ যুদ্ধের ফল কি হবে তা বুঝতে বাকি রইল না ইভানোভার। তার মনে তখন ঝড় বইছে।
এক সময় তার দেহটাও শক্ত হয়ে উঠল একটা সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায়। সে সিদ্ধান্ত নিল, আহমদ মুসার পরিচয় না জেনে সে তাকে মরতে দিবে না।
সিদ্ধান্ত নেবার পর ইভানোভা দ্রুত ভূ-গভর্স্থ সিঁড়ি মুখের দরজায় আহমদ মুসার লোকেশন আবার দেখে নিয়ে ছুটল পাশের দেয়ালে।
দেয়ালের একটা স্থানে চাপ দিতেই দেয়াল রংয়ের একটা ইস্পাতের প্লেট সরে গেল। বেরিয়ে পড়ল একটা সুইচ বোর্ড। বোর্ডে পাশাপাশি দু’টি সুইচ।
দু’টি সুইচের একটি ঘাটির বিদ্যুত ট্রান্সমিটার, আরেকটা জেনারেটরের সাথে যুক্ত। সুইচ দু’টি ডেটনেটরের কাজ করে। অন করলেই জেনারেটর ও ট্রান্সমিটারের বিশেস টিউবে রক্ষিত বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটায়। তার ফলে অন্ধকারে ঢেকে যাবে ঘাটি।
ইভানোভা সুইচ দু’টি অন করে দিয়ে ছুটল টর্চ হাতে ভূ-গর্ভস্থ টানেলে নামার গোপন সিঁড়ি মুখের দিকে। ভূ-গর্ভস্থ এই টানেলটি গিয়ে উঠেছে ঘাটির কনট্রোল রুমে।
ট্যানেল দিয়ে দ্রুত এগিয়ে ইভানোভা গিয়ে উঠল সেই কনট্রোল কক্ষে। এই কনট্রোল রুম থেকেই কিছুক্ষণ আগে গ্রেগরিংকো, উস্তিনভ এবং মায়োভস্কিদের কথা বলতে দেখা গেছে।
ইভানোভার এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে রিভলবার।
কনট্রোল রুমে ঢুকে প্রথমেই ইভানোভা ডেটোনেটিং সুইচ দু’টি অন করে দিল গ্লাভস পরা হাত দিয়ে, যাতে বুঝা না যায় এই সুইচ অন করেই ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল।
তারপর ইভানোভা এগুলো বাইরে বেরুবার সিঁড়ি মুখের দরজার দিকে। এই দরজার ওপারেই আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে। দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ। কিন্তু ভেতরের নব ঘুরালেই দরজা খুলে যাবে।
নব ঘুরাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল ইভানোভা। টর্চ জ্বালিয়ে দরজা খোলা যাবে না। টর্চের আলো দরজায় দাঁড়ানো আহমদ মুসা এবং গ্রেগরিংকোদের লোক দু’পক্ষেরই টার্গেট হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভাবল, আহমদ মুসার নাম সে জানে না, কিভাবে ডাকবে? নিজের পরিচয় দিয়ে ডাকাও সে নিরাপদ মনে করলো না, গ্রেগরিংকোর লোকেরা কত কাছে এসেছে কে জানে। তৃতীয়ত, আহমদ মুসা দরজার সামনেই আছে কিনা। এই তৃতীয় বিষয়ে ইভানোভা নিশ্চিত যে, আহমদ মুসা দরজা ছেড়ে যায়ন্ িকারণ সে বাবছে আলো নিভিয়ে দেয়া শত্রু পক্ষের কাজ। নিশ্চয় অন্ধকারের মধ্যে তাকে ঘেরাও করে এগিয়ে এসে বন্দী করাই শত্রু পক্ষের লক্ষ্য। আর জায়গাটা আহমদ মুসার জন্যে অপরিচিত। তাই সে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শত্রুর অপেক্ষা করাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করবে।
শত্রুর জন্যে অপেক্ষমান আহমদ মুসার এম-১০ এর টার্গেট ইভানোভাকে না হতে হয়, এ ভয় ইভানোভা করল।
কিন্তু নষ্ট করার মত সময় হাতে নেই ইভানোভার। গ্রেগরিংকোর লোকেরা নিশ্চয় এগিয়ে আসছে। তারা বিকল্প আলোরও ব্যবস্থা করতে পারে। তার আগেই আহমদ মুসাকে সরিয়ে নিতে হবে।
ইভানোভা ঠিক করল, নব ঘুরিয়ে দরজা একটু ফাঁক করেই সে ফিস ফিস কণ্ঠে নিজের নাম জানিয়ে বলবে সে সাহায্য করতে এসেছে।
এর পরেও দ্বিধা থাকল ইভানোভার মনে। কাকে সাহায্য করতে এসেছে না বললে সে কি বিশ্বাস করবে!
কিন্তু বিকল্প নেই।
ইভানোভা খুব সন্তর্পণে নব ঘুরাল। মৃদু ধাতব এক শব্দ তুলে দরজা আনলক হয়ে গেল। দরজাও নড়ে উঠেছিল সেই সাথে।
ইভানোভা ধীরে ধীরে দরজা টানতে যাচ্ছিল। এই সময় দরজার আকস্মিক তীব্র ধাক্কায় ইভানোভা ছিটকে পড়ে গেল এবং সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল সিঁড়ির গোড়ায় কনট্রোল রুমের মেঝেতে।
পড়ে গিয়েও ইভানোভা তার হাতের টর্চ ছাড়েনি। পড়ে গিয়ে মাথার এক পাশের খানিকটা জায়গা থেতলে গেছে। কপালের কাটাটায় আবার আঘাত লেগেছে।
কিন্তু আঘাতের কথা ভুলে গেল ইভানোভা। ব্রাশ ফায়ার ছুটে আসার আগে তাকে কিছু করতে হবে। মাথায় বুদ্ধি এসে গেল।
ইভানোভা তাড়াতাড়ি টর্চ জ্বেলে নিজের মুখে ধরল। উদ্দেশ্য, আহমদ মুসাকে তার পরিচয় দেয়া এবং এ ধারণা দেয়া যে, সে শত্রু নয়।
না, ব্রাশ ফায়ার এলো না। তার বদলে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ এবং একটি ফিসফিসে কণ্ঠ কানে এল,‘জাহরা ইভানোভা আপনি?’
জাহরা ইভানোভা উঠে বসল এবং বলল,‘সিঁড়ি মুখের দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসুন নিঃশব্দে।’

আহদ মুসা একবার পিছন দিকে তাকিয়ে দ্রুত উপরে উঠে সিঁড়ি মুখের দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিচে নেমে এল।
ইভানোভা উঠে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা এসে তার সামনে দাঁড়াতেই টর্চের আলো আহমদ মুসার মুখে একবার ফেলে আহমদ মুসার একটা হাত ধরে চলতে শুরু করে বলল,‘আমার সাথে আসুন।’
‘কিন্তু জাহরা ইভানোভা, আপনি এখানে কিভাবে? কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
‘সব দেখবেন। এখন আসুন। ওরা আলোর বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে এবং ওরা এই ঘরে নিশ্চয় আসবে।’
বলে টর্চ জ্বেলে কক্ষের ফাঁক হয়ে থাকা দেয়ালের সুড়ঙ্গ পথের দিকে ছুটল ইভানোভা। আহমদ মুসাও।
দেয়াল পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে ইভানোভা পেছন ফিরে টর্চ জ্বেলে সুড়ঙ্গের ছাদের বিশেষ একটা স্থানে চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের সুড়ঙ্গ পথ বন্ধ হয়ে গেল।
এ সুড়ঙ্গ পথ শুধু এপার থেকেই খোলা যায়।
এবার ইভানোভা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা চলল তার পেছনে পেছনে।
সুড়ঙ্গ পথ শেস করে ইভানোভা প্রবেশ করল তার পিতার কনট্রোল কক্ষে।
আহমদ মুসাও।
ইভানোভা ফিরে দাঁড়িয়েছিল সুইচ টিপে সুড়ঙ্গ পথের মুখ বন্ধ করার জন্যে।
আলো প্লাবিত কক্ষে ইভানোভার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল, ইভানোভার কপাল ও মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আগের কেটে যাওয়া জায়গা থেকে আবার রক্ত ঝরছে। দেখল, মাথার বাম পাশের এক জায়গাও থেতলে গেছে। রক্তে চুল ভিজে উঠেছে। বলল আহমদ মুসা,‘ইস আপনি মারাত্মকভাবে আহত, কিছু বলেননি তো? আর কোথাও লেগেছে?’
দেয়ালের একটা কক্ষের সুইচ অফ করে দিচ্ছিল ইভানোভা।
সুইচ অফ করার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁক হয়ে থাকা দেয়ালটা বুজে গেল। বন্ধ হয়ে গেল সুড়ঙ্গের মুখ।
ইভানোভা ঘুরে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আপনার ব্রাশ ফায়ার থেকে বেঁচে গেছি।’
একটা বেদনার ছায়া নামল আহমদ মুসার মুখে। বলল,‘ঠিকই বলেছেন, সে সময় টর্চের আলোতে যদি আপনার মুখ না দেখতে পেতাম, তাহলে ব্রাশ ফায়ার হতো। ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিলাম।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ব্যস্ত হয়ে উঠে বলল,‘চলুন ক্লিনিকে, আগের চেয়ে এ আঘাত আপনার অনেক মারাত্মক।’
ইভানোভা ঠোঁটে আঙুল ছেকিয়ে বলল, ‘ক্লিনিকের নাম বলবেন না। ওখানে গেরে ধরা পড়ে যাবো। আপনি তো ওদিকে যেতেই পারবেন না।’
‘তাহলে…।’ আহমদ মুসার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘আমাদের ফাস্ট এইড বক্সে যা আছে তাতেই চলবে।’ বলে ইভানোভা ফাস্ট এইড বক্স বের করে এনে বলল, ‘নার্সকে ডাকব?’
‘যে কারনে আপনি ক্লিনিকে যাচ্ছেন না, সে কারণে কি এ ক্ষেত্রেও নেই। আর মনে হয়, ড্রেসিং আমি খারাপ করি না।’
‘ধন্যবাদ। আহত স্থান দু’টো শুধু আপনি ড্রেসিং করুন। বাকি কাজ আমি করব।’
বলে ইজি চেয়ারে বসল ইভানোভা।
আহমদ মুসা ড্রেসিং শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এসে দেখল ইভানোভা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তুলা ভিজিয়ে মুখ-গলা পরিষ্কার করছে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে ছিল।
ইভানোভা কাজ শেষ করে আহমদ মুসার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। গম্ভরি কণ্ঠে বলল,‘আপনি কে?’
আহমদ মুসাও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল,‘তার আগে বলুন গ্রেট বিয়ারের সাথে আপনার সম্পর্ক কি?’
ম্লান হাসল ইভানোভা। বলল,‘আমি গ্রেট বিয়ারের একজন কর্মী।’
ভ্রু-কুঞ্চিত করলো আহমদ মুসা। একটু সময় নিয়ে বলল,‘আমাকে বাঁচিয়ে ঋণ শোধ করলেন বুঝি। কিন্তু আমি তো আপনাকে বাঁচাইনি, বাড়ি পৌঁছে দেয়ার সামান্য কাজ করেছি মাত্র।’
‘আমি আপনার কাছে ঋণী বলে কি আপনি মনে করেন?’
‘পেছন থেকে গুলী করার বদলে মুক্তির দ্বার কেন উন্মুক্ত করে দিলেন, এ থেকেই কথাটা এসে যায়।’
‘আপনার প্রশ্নের উত্তর পরে দেব, আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’
‘আমি প্রিন্সেস তাতিয়ানার বন্ধু। আমি এসেছি প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার করতে।’
অপার বিস্ময় নিযে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে রইল ইভানোভা কিছুক্ষণ। তারপর বলল,‘আপনি কে?’
সংগে সংগেই আহমদ মুসা উত্তর দিল না। দ্বিধার মধ্যে পড়ল।
‘অসুবিধা থাকলে দরকার নেই। আমি প্রশ্নটা প্রত্যাহার করছি।’ ম্লান হেসে বলল ইভানোভা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল,‘অবিশ্বাসের অসুবিধা না থাকলে আর কোন ভয় থাকে না।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখমন্ডল। বলল,‘আমার নাম আহমদ মুসা।’
আহমদ মুসা নাম শোনার সাথে সাথে শক খাওয়ার মত চমকে উঠেছিল ইভানোভা। কিন্তু সামলে নিয়েছিল নিজেকে পরক্ষণেই। তার চোখ দু’টি কিন্তু আঠার মত আটকে আছে আহমদ মুসার মুখে।
ইভানোভার ঠোঁটে একটা শক্ত হাসি ফুটে ইঠল। বলল,‘তাহলে আমি কম্যুনিস্ট আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ওয়ার্ল্ড রেড ফোর্সেস (WRF) এবং মধ্য এশিয়ার গ্রেট বিয়ার-এর ধ্বংসকারী এবং WRF নেতা জেনারেল বোরিস এবং গ্রেট বিয়ার নেতা ও তাতিয়ানার আব্বা………….. হত্যাকারীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি?’
‘আমার দুর্ভাগ্য যে, এই অপ্রীতিকর কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমার এখন কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না যে, তাতিয়ানা আপনার বন্ধু এবং ক্যাথারিনকে মুক্ত করতে চান।’
‘আপনাকে বিশ্বাস করবার জন্যে এখন যা বলতে হয়, তা বলার সময় আমার নেই। সুতরাং বিশ্বাস করতে আমি আপনাকে বলব না।’
‘সময় নেই মানে আপনি কি চলে যেতে চান? আপনার পরিচয় পাওয়ার পর আমি আপনাকে ছেড়ে দিতে পারি?’ বলর ইভানোভা মুখ গম্ভীর করে।
‘আহমদ মুসাকে আপনি আটকাতে পারবেন না, এটা আপনিও জানেন।’
‘আমার বিস্ময় এখনও যায়নি। আমার ধারণা ছিল আহমদ মুসা হবে ছয় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা আর হবে তার হারকিউলিসের মত শরীর। আপনার মত ভদ্র সন্তান বলে তাকে আমি ভাবিনি।’
‘আমাকে আহমদ মুসা না ভাবলেই তো আমার মুক্তি ত্বরান্বিত হতে পারে।’
‘অবশ্যই না। বিশ্বাস না হলেও সন্দেহ করে ধরে রাখা যায়।’
কথা শেষ করে দুই পকেট থেকে দু’টি মিনি রিভলবার বের করে সোফার উপর রাখতে রাখতে বলল,‘দেখুন এ দু’টি রিভলবারের একটির ক্লোরোফরম স্মোক স্প্রে করে সেকেন্ডের মধ্যে আপনাকে ঘুমিয়ে দিতে পারি। তারপর গিয়ে পড়বেন গ্রেট বিয়ারের হাতে।’
‘না, তা পারবেন না। ক্লোরোফরম স্মোক স্প্রে করার পর সংজ্ঞা হারিয়ে ঢলে পড়ব ঠিকই, কিন্তু আপনাকে বিমূঢ় করে দিয়ে পরক্ষণেই আমি উঠে দাঁড়াব এবং আমি পালিয়েও যাব।’
‘কিভাবে এটা সম্ভব হবে?’ বলল ইভানোভা।
‘ক্লোরোফরম বোমার কার্যকারিতা দুই মিনিট। এই দুই মিনিট আমি সংজ্ঞাহীনের ভান করে দম বন্ধ করে পড়ে থাকব। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আপনার অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে আপনাকে রিভলবারের টার্গেটে রেখে নিরাপদে সরে যাব।’
ইভানোভা মুগ্ধ চোখে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ইভানোভার মোবাইল টেলিফোন বেজে উঠল।
টেলিফোন তুলে নিল ইভানোভা। কথা বলল। বলতে গিয়ে তার চোখে-মুখে ম্লান ছায়া নেমে এল।
টেলিফোন রেখে দিয়ে সে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। বলল,‘গ্রেগরিংকোর টেলিফোন। বলছে, ‘শত্রুকে ঘাটির কোথাও পাওয়া যায়নি। দুর্বোধ্য কারণে একই সাথে বিদ্যুত ট্রান্সমিটার ও জেনারেটর নষ্ট হওয়ায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সে পালিয়েছে। তবে আমাদের বাড়ির বাইরে যেতে পারেনি। মনে হয় কোন দিক দিয়ে সে আপনাদের বাড়িতে গিয়ে লুকাতে পারে। আমরা খোঁজ করে দেখতে চাই।’
ইভানোভা কথা শেষ করতেই আবার তার টেলিফোন বেজে উঠল।
টেলিফোনে কথা বলতে বলতে চঞ্চল হয়ে উঠল ইভানোভা।
টেলিফোন রেখে দিয়েই সে বলল,‘আব্বা এসেছেন। শিঘ্রী উঠুন, পালাতে হবে আপনাকে।’
বলে ইভানোভা উঠে দাঁড়ালো। বলল,‘বাইরে আব্বা গ্রেগরিংকোদের সাথে কথা বলছেন। এখনি ওরা এসে পড়বেন।’
কথা বলতে বলতেই দ্রুত হাঁটা শুরু করেছে ইভানোভা।
কনট্রোল রুমের দরজার পাশে গিয়ে সুইচ বোর্ডের উপরের দেয়ালের এক জায়গায় বাম হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিল।
সংগে সংগে পাশের দেয়াল সরে গেল এবং বেরিয়ে পড়ল নিচে নামার সিঁড়ি।
আহমদ মুসাকে দ্রুত আসার ইশারা করে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দৌড়েই নামতে শুরু করল ইভানোভা।
আহমদ মুসা বুঝল, ইভানোভা সত্যিই উদ্বেগ বোধ করছে। আহমদ মুসাকে সরিয়ে দিতে পারলে সে বেঁচে যায়।
আহমদ মুসা ছুটে চলল ইভানোভার পেছনে।
আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোর পেরিয়ে ইভানোভা প্রবেশ করল একটা সুড়ঙ্গে।
‘এই সুড়ঙ্গ নিয়ে যাবে টিলার একদম গোড়ায় ডাম্প হাউজের সাথে যুক্ত একটা ছোট কক্ষে। ঘরটির বন্দ দরজা নব ঘুরালেই খুলে যাবে। ঐ পর্যন্ত পাহারা নেই। সুতরাং…..।’
কথা শেষ করার প্রয়োজন বোধ করল না ইভানোভা। দ্রুত হাঁটছিল সে।
এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল ইভানোভা।
পেছনে একবার তাকিয়ে বলল,‘এসে গেছি। সামনের স্টিলের দরজাটা পেরুলেই ডাম্প হাউজের সেই ঘর।’
বলে ইভানোভা স্টিরের দরজার গায়ে মিশে থাকা ক্ষুদ্র একটা বোতামে চাপ দিতেই দরজাটা খুলে গেল।
ইভানোভা দরজার এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে বলল,‘যান। আই উইশ ইউ গুড লাক।’
আহমদ মুসা একটু নড়ে-চড়ে দাঁড়াল। মুখ একবার নিচু করল। দ্বিধা করল। তারপর বলল,‘শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?’
‘অবশ্যই, বলুন।’
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে গ্রেট বিয়ার কোথায় রেখেছে?’
হাসল ইভানোভা। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে উঠল সে। বলল,‘ওটুকু পারবো না। বিশ্বাসঘাতকতার ওটুকু বাকি থাক।’ ইভানোভার কণ্ঠে বেদনার সুর।
আহমদ মুসার মুখেও লজ্জার একটা ছায়া নামল। বলল, ‘স্যরি। আমার অনুরোধ প্রত্যাহার করলাম।’
একটু থেমে আবার বলল,‘কিন্তু বিশ্বাসঘাতক তো আপনি হয়েই গেছেন।’
‘ওটুকুর জন্যে আমার কাছে জবাব আছে। যার ফলে নিজের কাছে অন্তত অপরাধী নই।’ ম্লান হাসি ফুটে উঠেছিল ইভানোভার ঠোঁটে।
‘প্রশ্নটা শুরুতেই আমি করেছিলাম। জবাব দেননি। জানতে পারি কি, পিতা ও দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে একজন শত্রুকে বাঁচাবার কারণটা কি?’
হাসল ইভানোভা। বলল,‘বলার এখন সময় নেই। সময় কখনও এলে জানবেন।’
বলেই ইভানোভা ফেরার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল। বলল,‘আব্বা এসে পড়বে, আমি যাই।’

ইভানোভার আব্বা নিকিতা স্ট্যালিনের খাস ড্রইং রুমেই কথা হচ্ছিল দারুণভাবে উত্তেজিত চিন্তিত গ্রেগরিংকো, উস্তিনভ, মায়োভস্কির মধ্যে। তাদের বৈঠকে নিকিতা স্ট্যালিনও হাজির ছিলেন।
কথা বলছিল গ্রেগরিংকো, ‘একজন মাত্র লোক, তাও এশিয়ান, আমাদের সব কাজ ওলট-পালট করে দিল।’
‘যে কোন মূল্যে তাকে ধরতে হবে, নয়তো শেষ করে দিতে হবে।’ বলল উস্তিনভ।
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, সে পালাল কিভাবে?’ বলল নিকিতা স্ট্যালিন।
‘আমার মনে হয়, সে সব রকম প্রস্তুতি নিয়েই ঘাটিতে প্রবেশ করেছিল। ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরে বিস্ফোরণ তারই প্রমাণ। তার কাছে অবশ্যই ইনফ্রারেড গগলস ছিল। যার দ্বারা সে আমাদের বোকা বানিয়ে আমাদের সকলের পাশ দিয়েই চলে গেছে। পাহারাদারদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।’
‘এ রকম একটা কিছুই ঘটেছে। কিন্তু আমরা এখন কি করব। এ খবর পৌঁছার পর মহামান্য আইভানের যে কি মূর্তি হবে, কলিগরা নিশ্চয় তা অনুভব করেছেন।’
আইভানের নাম উচ্চারিত হবার সাথে সাথে সকলের চোখে-মুখে ভয় ও চিন্তার চিহ্ন ফুটে উঠল।
কারো মুখে কোন কথা নেই। নীরব সবাই।
এই মুহূর্তে এ বাড়ি এবং ঘাটি পরিত্যাগ করতে হবে, এ অনুমতিও তোমাদেরকে আইভানের কাছ থেকে নিতে হবে।
‘জি, ঠিকই বলেছেন।’ বলল গ্রেগরিংকো।
আর এক দফা সকলের মুখ মলিন হয়ে গেল। পর পর এই বিপর্যয়কে কোন যুক্তি দিয়েই যৌক্তিক প্রতিপন্ন করা যাবে না। এই একই চিন্তা সবার মনকে পীড়া দিচ্ছে।
‘আমাদের এত বড় সর্বনাশ যে করল তার কি হবে? তাকে কোথায আমরা পাব? তাকে ধ্বংস করতে পারলে আমাদের সব ক্ষতি পূরণ হয়ে যাবে।’ বলল মায়োভস্কি চোখ লাল করে।
‘এ দায়িত্ব মায়োভস্কি তোমার। আমরা প্রিন্সেস তাতিয়ানার বিষয়টা দেখছি।’
মায়োভস্কি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। বলল,‘সমস্যা হলো প্রিন্সেস ক্যাথারিনের বাড়ি ছাড়া তাকে লোকেট করার আর কোন জায়গার কথা আমাদের জানা নেই।’
‘লোকটির গাড়ি থেকে কোন ক্লু পাওয়া যায়নি?’ বলল নিকিতা স্ট্যালিন।
‘গাড়ির নাম্বার এবং কাগজপত্র সবই ভূয়া।’ বলল মায়োভস্কি।
কারো মুখে কোন কথা নেই। নীরবতা।
নিকিতা স্ট্যালিন উঠে দাঁড়াল। বলল,‘গুড নাইট।’

তাড়াহুড়ো করে বেরুচ্ছিল আহমদ মুসা। দরজাতেই মুখোমুখি হলো ডোনার সাথে।
ডোনা থাকে তার পিতার সাথে তাদের রয়্যাল প্যালেসে। আহমদ মুসাকেও সেখানে থাকার অনুরোধ করেছিল ডোনার আব্বা মিঃ প্লাতিনি। কিন্তু আহমদ মুসা রাজী হয়নি। যুক্তি দিয়ে বলেছিল, আহমদ মুসাকে খুবই ব্যস্ত থাকতে হবে। তাই স্বাধীনভাবে থাকার একটা জায়গা তার দরকার। তাছাড়া সবচেয়ে গুরুত্ব যে বিষয়চির উপর দিয়েছিল, তাহলো, এবার তাকে কি ধরনের শত্রুর মুখোমুখি হতে হবে তা বলা যাচ্ছে না। ডোনাদের বাড়িটা তাদের নজরে আনা ঠিক হবে না। এই শেষ যুক্তিটায় ডোনার আব্বা রাজী হয়ে যায় আহমদ মুসার সাথে। তবে আহমদ মুসার থাকার ব্যবস্থা ডোনার আব্বাই করে দেয় তাদের সদ্য কেনা একটা বাংলোতে।
সালাম বিনিময়ের পর আহমদ মুসা ডোনাকে রক্ষ্য করে বলল,‘কি ব্যাপার ডোনা, অকস্মাত?’ আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়।
‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাবার পথে উঠলাম। কেন আসতে নেই?’ বলল ডোনা।
ডোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তার শেষ পরীক্ষা দেবার জন্যে তৈরি হচ্ছে। সামনেই তার পরীক্ষা।
‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেলিফোন করেছিলে। কিন্তু বলনি তো তুমি আসবে।’
‘তখন ভাবিনি, কিন্তু আসার পথে হঠাৎ মনে হলো কি করছ একটু শুনে যাই। সেই সাথে একটা সারপ্রাইজ দেয়াও হলো।’
‘কিন্তু দেখা নাও পেতে পারতে। দু’এক মিনিট পরে এলে আর দেখা পেতে না।’
‘যাক, সব সময়ই ভাগ্য আমার পক্ষে থাকে। এখন বল, তাড়াহুড়ো করে কোথায় বেরুচ্ছ?’
‘রুশ দূতাবাসে।’
গম্ভীর হলো ডোনা। বলল,‘আমি উদ্বিগ্ন। কে শত্রু কে মিত্র আমি বুঝতে পারছি না। তুমি তো চূড়ান্ত কথা বলে দিয়েছ এসব নিয়ে আমি যেন চিন্তা না করি। নাক না গলাই।কিন্তু তা কি পারা যায়? বল, ঘটনা কোন দিকে গড়াচ্ছে? কি তোমার প্ল্যান? না হলে কিন্তু তোমার পিছু নেব আমি।’
‘দোহাই আল্লাহর। তুমি তা পার। তোমার সব রকম দুঃসাহস আছে। তুমি কিন্তু তা করো না। সেদিন তো সব বলেছি। নতুন তেমন কিছু বলার নেই। আজ সকালে প্যারিস উপকণ্ঠের সেই রহস্যপূর্ণ বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাড়িটা খালি। সাইনবোর্ড টাঙানো ‘বাড়িটি সংস্কারের জন্যে নির্দিষ্ট।’ হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি।
‘কি আশা নিয়ে গিয়েছিলে সে বাড়িটিতে?’
‘জাহরা ইভানোভার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ কিছু সাহায্য পাওয়া যেতো। তাছাড়া ঐ বাড়ির লোকদের উপর নজর রেখে ওদের নতুন কোন ঘাটির নাগাল পাওয়া যেতো।’
‘জাহরার পিতার নাম কি বলেছিলে?’
‘নিকিতা স্ট্যালিন।’
‘রুশ দূতাবাসে কি জন্যে যাচ্ছ?’
‘যাবার কোন জায়গা নেই বলে। তাছাড়া তিনি টেলিফোন করেছিলেন দেখা করার জন্যে।’
‘ঠিক আছে। ফিরে এসে আমাকে টেলিফোন করো। তোমার দেরি করে ফেললাম, আসি।’
সালাম দিয়ে ডোনা বিদায় নিল।
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিল রুশ দূতাবাসের উদ্দেশ্যে।
আহমদ মুসা রুশ রাষ্ট্রদূত পাভেলের ঘরে ঢুকতেই রাষ্ট্রদূত উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে বলল,‘এস এস, তোমার অপেক্ষা করছি।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল,‘বলুন।’
‘বলব কি, আমি বড় বিপদে। প্রচন্ড চাপ আমাদের সরকারের তরফ থেকে। ক্যাথারিনকে উদ্ধার করা যায়নি, অন্যদিকে তাতিয়ানাও নিখোঁজ। অথচ আমাদের জাতীয় দিবস ঘনিয়ে আসছে। ঐ দিনই শাসনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে রাশিয়ার নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করার সবকিছু ঠিক-ঠাক হয়ে গেছে।’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
‘একটা কথা বলুন তো, রাশিয়ার ভীষণ অর্থনৈতিক দুর্দিন চলছে, এর মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে একটা বড় খরচ মাথায় তুলে নিচ্ছে কেন?’
বসল পাভেল। বলল,‘রাজ পরিবারের কাছে যে অর্থ রয়েছে তা দিয়ে রাশিয়া এক যুগ চলতে পারে।’
‘কি বলছেন আপনি, ওরা তো যাযাবর। রাশিয়ায় ওদের কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। বিদেশেও তারা অধিকাংশ ভাড়া বাড়িতে থাকে।’ কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি কিছু জাননা দেখছি। বলশেভিক কম্যুনিস্টরা নিকোলাশ (দ্বিতীয়) এবং তার স্ত্রী পুত্র কন্যাদের হত্যা করেছিল বটে, কিন্তু তাদের ধনভান্ডারের এককণাও তারা পায়নি। সবই জমা রয়ে গেছে রাজ পরিবারের গুপ্ত ধনভান্ডারে।’
‘সেটা কোথায়?’
‘রাশিয়ায়।’
‘তাহলে সেটা তো আপনাদের দখলে।’
‘না। ধন ভান্ডার রাশিয়ায় বটে, কিন্তু কেউ তার সন্ধান জানে না। পৌনে একশ বছর কম্যুনিস্ট সরকার চেষ্টা করেও সে ধন ভান্ডারের সন্ধান পায়নি। আজকের রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী সরকারও খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। আগের রাজধানী পিটার্সবার্গে (পরে নাম হয়েছে স্ট্যালিনগ্রাদ) অথবা তার আশেপাশে কোথাও লুকানো আছে সেই শত শত বছরের সঞ্চিত বিস্ময়কর ধন ভান্ডার।’
‘সেই ধনের লোভেই কি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ব্যবস্থার প্রবর্তন?’
আবারও হাসল পাভেল। বলল, ‘রাশিয়া তার এই দুর্দিনে সেই ধন পেলে বেঁচে যায়, কিন্তু ধনের জন্যে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। রাশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যেই একটা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ব্যবস্থার প্রয়োজন।’
‘রাশিয়ার এই প্রয়োজন যতখানি, ততখানি কিন্তু চেষ্টা হচ্ছে না প্রিন্সেস ক্যাথারিনের উদ্ধারের জন্যে।’
‘না, তুমি ঠিক বলনি। আমাদের চেষ্টা ছাড়াও আমরা ফরাশি পুলিশ ও ইন্টারপোলের সাহায্য চেয়েছি। তবে একথা ঠিক যে, কোন কাজেই কোন ফল দেয়নি।’
‘নিকিতা স্ট্যালিন নামে কাউকে চেনেন?’
রাষ্ট্রদূত একটু চিন্তা করে বলল, ‘ঐ নামে উল্লেখযোগ্য কেউ রুশ কমিউনিটিতে নেই।’
‘কিন্তু লোকটা বিখ্যাত ধনাঢ্য ব্যক্তি। বহুদিন প্যারিসে বাস করছেন।’
‘নামটি হয় নকল, নয়তো কোন নকল নামে সে পরিচিত।’
‘জাহরা ইভানোভা নামে তার একটা তরুণী মেয়ে আছে।’
রাষ্ট্রদূত পাভেলের কপাল কুঁচকালো। চিন্তা করে বলল,‘তারও এই নাম নকল হতে পারে, অথবা নকল নামে সে সমাজে পরিচিত।’
আহমদ মুসা কখনও এদিকটা চিন্তা করেনি। সে মিঃ পাভেলের কথার যৌক্তিকতা স্বীকার করল। তবে আহমদ মুসার মনে হলো, সে আসল নামই শুনেছে। তাদের ভিন্ন অফিসিয়াল নাম থাকতে পারে। যে নামে তারা বাইরেও পরিচিত।
রাষ্ট্রদূত পাভেলের ইন্টারকম কথা বলে উঠলঃ স্যার,‘ভ্লাদিমির মায়োভস্কি এসেছেন।’
‘হ্যাঁ, পাঠিয়ে দাও।’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
আহমদ মুসা ‘মায়োভস্কি’ নাম শুনে চমকে উঠল। কিন্তু তার সাথে ভ্লাদিমির যুক্ত থাকায় মনটা আবার ঠিক হয়ে গেল।
দরজায় দু’বার সক হলো।
‘এসো।’ বলল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
দরজা ঠেলে প্রবেশ করল ভ্লাদিমির মায়োভস্কি।
তার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। গোটা শরীরে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল তার।
মায়োভস্কির চোখেও মুহূর্তের জন্যে আঠার মত লেগে গিয়েছিল আহমদ মুসার মুখের উপর। সেই সাথে তার চোখ দু’টি জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু সংগে সংগেই সে সামলে নিল নিজেকে।
রাষ্ট্রদূত পাভেল মায়োভস্কিকে এসো বলেই মনোযোগ দিয়েছিল দিনের কর্মসূচীর দিকে।
চোখ সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে একবার মায়োভস্কির দিকে চেয়ে আহমদ মুসার দিকে মুখ ঘুরিয়ে মায়োভস্কিকে দেখিয়ে বলল,‘ইনি ভ্লাদিমির মায়োভস্কি। এখানে সিকিউরিটি চীফের দায়িত্ব পালন করছেন।’ তারপর মায়োভস্কিকে বলল আহমদ মুসার দিকে ইংগিত করে,‘ইনি মিঃ আবদুল্লাহ। খুব সাহসী ও পরোপকারী ছেলে। প্রিন্সেস ক্যাথারিনের পরিবারের বন্ধু। ক্যাথারিনকে উদ্ধারের ব্যাপারে তার সাহায্য আমরা পেতে পারি।’
আহমদ মুসা ও মায়োভস্কি কারো ঠোঁটেই তখন শুভেচ্ছার হাসি ফুটে ওঠেনি। তবু তারা একে অপরকে হাত তুলে স্বাগত জানাল।
রাষ্ট্রদূত পাভেল মায়োভস্কিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই সময় তার লাল টেলিফোনটি বেজে ওঠায় বলা হলো না। টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিল রাষ্ট্রদূত পাভেল। টেলিফোনে কিছু একটা শুনেই সে বলে উঠল, ‘না লাইন দেবার দরকার নেই। হোল্ড করো। আমিই আসছি ওয়্যারলেসে।’
টেলিফোন রেখে দ্রুত মায়োভস্কির দিকে চেয়ে বলল,‘তোমাকে খোঁজ করছিলাম একটা কথা বলার জন্যে। ওলগা, তার মা ও অন্যান্যরা গেছে সাঁজেলিঁজে’র সান্ধ্য মেলায়। ওলগা আবার অন্য প্রোগ্রামে যাবে। সুতরাং একা পড়বে ওরা। দিন কাল ভাল নয়। তোমার লোকদের ওদিকে খেয়াল করতে বলো।’
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল রাষ্ট্রদূত পাভেল এবং আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল,‘আমি একটা জরুরী কাজে যাচ্ছি। তোমার নাস্তা খেয়ে তারপর যাবে। আর তোমার সাথে কথা শেষ হলো না। তোমাকে আবার ডাকব।’
রাষ্ট্রদূত কথা শেষ করতেই মায়োভস্কি বলে উঠল,‘আমি আসি স্যার?’
‘এসো।’ বলল রাষ্ট্রদূত।
বেরিয়ে গেল মায়োভস্কি।
রাষ্ট্রদূত পাভেলও এগুচ্ছিল দরজার দিকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,‘আমিও আর বসছি না জনাব।’
‘না। নাস্তা না খেয়ে গেলে মনে করব অসৌজন্যমূলকভাবে আমি চলে গেলাম বলে তুমি অসৌজন্য প্রদর্শন করলে।’ বলল মুখ ঘুরিয়ে রাষ্ট্রদূত পাভেল।
‘ঠিক আছে।’ বলে বসল আহমদ মুসা।
ভালই হলো। আহমদ মুসা নিরিবিলি চিন্তা করার একটু সময়ও চায়।
তার মাথায় তখন চিন্তার ঝড়।
মায়োভস্কি এখানকার কেজিবি (রুশ গোয়েন্দা সংস্থা) প্রধান এবং সেই প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে কিডন্যাপকারীদের একজন। রাষ্ট্রদূত কি তাদের এ ষড়যন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন! বিচ্ছিন্ন তার প্রমাণ কি? মায়োভস্কির সাথে জড়িত নেই তাও যেমন প্রমাণ করা মুস্কিল, তেমনি জড়িত আছে, সেটাও প্রমাণিত নয়। তবে একটা বিষয়, ভাবল আহমদ মুসা, রাষ্ট্রদূত মায়োভস্কিকে আহমদ মুসার সামনে ডাকা কিছুটা প্রমাণ করে রাষ্ট্রদূত ষড়যন্ত্রের সাথে নেই। ডাকলেও আহমদ মুসাকে মুক্ত অবস্থায় বাইরে আসার সুযোগ দিত না।
দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই আহমদ মুসা নাস্তা সেরে বাইরে বেরিয়ে এল।
গাড়ির দিকে এগুতেই হঠাৎ একটা শঙ্কা ঝড়ের বেগে এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসার মনে। তার মনে হলো, মায়োভস্কি আহমদ মুসাকে এখান থেকে মুক্ত মানুষ হয়ে যেতে দেবে তা স্বাভাবিক নয়। আহমদ মুসাকে যেতে দেয়ার অর্থ তাদের নাম-ঠিকানা ফরাসি পুলিশ ও রুশ সরকারের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়া। তাছাড়া তাদের দু’টি বড় বিপর্যয়ের প্রতিশোধের প্রশ্ন তো আছেই।
আহমদ মুসা গাড়ির দিকে এগুতে এগুতেই চারদিকে একবার তাকাল। না, সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেল না।
আহমদ মুসা গাড়ির কাছে গিয়ে গাড়ির চারদিক ঘুরে ভেতরটা ভালো করে দেখে নিয়ে গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। প্রথমেই বিস্ফোরক ডিটেকটরের সুইচ অন করে দেখে নিল গাড়িতে কোন বিস্ফোরক পাতা নেই।
গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা। চলতে শুরু করল গাড়ি।
আহমদ মুসার মন থেকে খুঁত খুঁতে ভাবটা গেল না। তার মনে হচ্ছে, শত্রুর চোখের অস্বস্তিকর ছায়ায় যেন সে দাঁড়িয়ে।
রিয়ারভিউতে চোখ রেখেছিল আহমদ মুসা, কিন্তু অনেক গাড়ির ভীড়ে বুঝা যাচ্ছিল না কিছুই।
রুশ দূতাবাস থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বিরাট একটা মোড়। বিভিন্ন দিক থেকে আসা ছয়টি রাস্তার মোহনা এটা।
মোড়ের মুখে এসে গাড়িগুলো বিভিন্ন দিকে যাবার জন্য নির্দিষ্ট লেন দিয়ে এগিয়ে বিভিন্ন ফ্লাই ওভারে ও গ্রাউন্ড ওয়েতে বিভক্ত হয়ে যায়।
ঠিক এই জায়গায় এসে আহমদ মুসা গাড়ির গতি কিঞ্চিত স্লো করে লেন চেঞ্জ করছিল।
হঠাৎ গাড়ির পাঁজরে প্রচন্ড এক আঘাত। সেই আঘাতের সাথে দেহটাও যেন তার চ্যাপ্টা হয়ে গেল, মনে হলো আহমদ মুসার। ছুটে আসা ভাঙা কাঁচের টুকরায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল তার মুখ।
এই আঘাত সামলে উঠার আগেই গাড়ির বাম পাঁজরে আরও একটা ধাক্কা এসে পড়ল। চ্যাপ্টা হয়ে গেল গাড়ি।
প্রায় সাথে সাথেই সামনের উইন্ডস্ক্রীন ভেঙে একজন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল ভেতরে। প্রায় সংজ্ঞাহারা আহমদ মুসাকে টেনে বের করে নিয়ে গেল লোকটি।
এ সব কিছুই ঘটল ওলগার চোখের সামনে।
আহমদ মুসার গাড়িকে আর একটি গাড়ি যখন প্রথম আঘাত করল, তখন ওলগার গাড়ি এর সমান্তরালে বিপরীত প্রান্তের লেনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার অনিচ্ছাতেই যেন তার গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় গাড়িটি যখন আঘাত করল আক্রান্ত গাড়িটাকে, তখন ওলগার হঠাৎ করে মনে হলো ব্যাপারটা দুর্ঘটনা নয়। গাড়ির আরোহীর হত্যা করাই কি আক্রমণকারীদের টার্গেট? হঠাৎ মায়োভস্কিকে ছুটে এসে উইন্ড শিল্ড ভেঙে ভেতরের লোকটিকে বের করতে দেখে খুশী হলো ওলগা। ভাবল, যাক আক্রান্তের পর উদ্ধার হওয়ার একটা পথ হলো।
মায়োভস্কি যখন আহমদ মুসাকে বের করে নিয়ে আসছিল, তখন মুখটা তার দেখতে পেল ওলগা। চমকে উঠল সে। এ যে মিঃ আবদুল্লাহ! তাকে কে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেছিল?
মায়োভস্কি আহমদ মুসাকে নিয়ে দ্রুত তার গাড়িতে তুলল এবং সংগে সংগেই গাড়ি স্টার্ট দিল।
ওলগা ভাবল মিঃ আবদুল্লাহকে মায়োভস্কি নিশ্চয় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। ওলগাও সিদ্ধান্ত নিল হাসপাতালে যাবার। আবদুল্লাহ একদিন তার নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঁচিয়েছিল তাকে এবং তার মাকে। তার দুর্দিনে তার পাশে দাঁড়াতে পারলে ভালই হবে।
ওলগা তার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলল মায়োভস্কির গাড়ির পেছনে। মায়োভস্কির গাড়ি অসাধারণ লাল রংয়ের। তাই অনেক পেছনে পড়েও তার পিছু নেয়া কঠিন হলো না ওলগার।
অনেক ক্লিনিক, হাসপাতাল পেরুল, কিন্তু থামার নাম নেই মায়োভস্কির গাড়ির। তাহলে আব্দুল্লাহকে কি কোন নির্দিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে? হতে পারে।
প্রায় ২০ মিনিট চলার পর মায়োভস্কির গাড়ি একটা সংকীর্ণ গলিতে ঢুকে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়েই হর্ণ দিল মায়োভস্কি। সংগে সংগেই বাড়ির সামনের গেটটি উপরে উঠে গিয়ে গাড়ি ঢুকতে পারে এই পরিমাণ উপরে উঠে স্থির হলো।
মায়োভস্কির গাড়ি দৌড় দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরটা এক ঝলক দেখতে পেল ওলগা। বিস্মিত হলো ওলগা, ভেতরে যে কয়জন লোক তার নজরে পড়ল সবার হাতে স্টেনগান।
আরও একটা জিনিস ওলগার নজর এড়ালো না। সেটা হলো, মায়োভস্কির গাড়ি রুশ দূতাবাসের কূটনীতিকের গাড়ি নয়।
অনেক প্রশ্ন এসে ভীড় জমাল ওলগার মনে। কারা আবদুল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করল, হঠাৎ মায়োভস্কি কোত্থেকে এল, উইন্ডশিল্ড ভেঙে তাড়াহুড়ো করে উদ্ধারের জন্যে এগুলো কেন, হাসপাতালে না নিয়ে তাকে অস্ত্রধারীদের আড্ডায় আনল কেন, কেন মায়োভস্কি কূটনীতিকের গাড়ি ব্যবহার করেনি। কোন প্রশ্নেরই সদুত্তর খুঁজে পেল না ওলগা।
বাড়িটার পাশেই কয়েকটা গাড়ির আড়ালে গাড়ি পার্ক করে ওলগা নজর রাখছিল বাড়িটার গেটের উপর।
মিনিট দশেক পরেই মায়োভস্কির গাড়ি বেরিয়ে এল। গাড়ির পিছে পিছে পকেটে হাত ঢুকানো দু’জন লোকও বেরিয়ে এসেছে। লোক দু’টি রুশ।
গেট পেরুবার পর গাড়ি রোডের উপর নেবার আগে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লোক দু’টিকে লক্ষ্য করে বলল,‘দেখো, সাবধান থেকো। দু’বার কিন্তু জাল কেটে পালিয়েছিল।’
বলেই তীর গতিতে গাড়ি ছাড়ল।
একটু সময় নিয়ে ওলগাও তার গাড়ি ছেড়ে দিল।
মায়োভস্কির শেষ কথাটা কানে আসার সাথে সাথে মুখ ম্লান হয়ে গেল ওলগার। শেষ ঐ কথাটা শোনার পর ওলগার বিন্দু মাত্র সন্দেহ রইল না যে, আবদুল্লাহ লোকটি বন্দী মায়োভস্কিদের হাতে। তাহলে নিশ্চয় মায়োভস্কিরাই সেই এ্যাকসিডেন্টটা ঘটিয়েছিল।
কিন্তু কেন? এই প্রশ্নটি ক্ষতবিক্ষত করল ওলগাকে। আবদুল্লাহর মত বিদেশী লোকের সাথে মায়োভস্কির কি শত্রুতা থাকতে পারে? মায়োভস্কির কথায় মনে হয় আরও দু’বার তারা আবদুল্লাহকে ধরেছিল।
বাড়িতে পৌঁছেও ওলগা আহমদ মুসার চিন্তাটা তার মাথা থেকে দূর করতে পারলো না।
একবার তার মনে হলো, ব্যাপারটা তার আব্বাকে (রাষ্ট্রদূত পাভেল) জানানো উচিত। কিন্তু তার মনে শংকা দেখা দিল, যদি ব্যাপারটার সাথে তার আব্বা অর্থাৎ দূতাবাস জড়িত না থাকে, আর যদি মায়োভস্কির কাজটা বেআইনি হয়, মায়োভস্কির ক্ষতি হবে। এই ক্ষতি ওলগা সহ্য করতে পারবে না।
ওলগা ও মায়োভস্কি পরস্পরকে ভালবাসে।
এই চিন্তা থেকেই ওলগা ব্যাপারটা তার আব্বাকে জানানো ঠিক মনে করল না। অথচ সে জানে, মায়োভস্কির এই কাজের সাথে যদি তার আব্বা অর্থাৎ দূতাবাস যদি জড়িত না থাকে, তাহলে আবদুল্লাহকে বাঁচানোর এটাই সবচেয়ে সহজ পথ।
পরিশেষে সিদ্ধান্ত নিল, ওলগা নিজে গিয়ে মায়োভস্কিকে অনুরোধ করবে আবদুল্লাহকে ছেড়ে দেবার জন্যে। যদি দেখা যায় দূতাবাস এই ঘটনার সাথে জড়িত এবং তার আব্বার অনুমতি ছাড়া মায়োভস্কি তাকে ছাড়তে পারছে না, তাহলে সে তার আব্বাকে অনুরোধ করবে।
সন্ধ্যা ৭ টায় টেলিফোনে কথা বলার পর ওলগা গিয়ে হাজির হলো মায়োভস্কির বাড়িতে।
ওলগা প্রবেশ করতেই মায়োভস্কি উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘ওলগা কিছু হয়নি তো?’ মায়োভস্কির চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘কেন বলছ একথা?’ বলল ওলগা।‘তোমাকে টেলিফোন করে আনরা যায় না, সেখানে তুমি টেলিফোন করে আসবে, সেটা কল্পনাও করতে পারছি না।’
‘এটা কি অবাক হওয়ার মত কাজ?’
‘তোমার ক্ষেত্রে অবশ্যই। অন্যদের চেয়ে তোমার নৈতিকতাটা ভিন্ন।’
‘একে খারাপ মনে কর?’
‘আমার জন্যে আনন্দের, কিন্তু কষ্টকর।’
ওলগা মায়োভস্কির পাশে বসতে বসতে বলল,‘একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি।’
‘অনুরোধ নয়, আদেশ কর।’
গম্ভীর হলো ওলগা। একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল,‘আজকে একটা ঘটনা ঘটেছে না?’
‘কি ঘটনা?’
‘তোমরা একজন আহত লোককে নিয়ে গেছ না?’
চমকে উঠল মায়োভস্কি।
স্থির দৃষ্টিতে তাকাল ওলগার দিকে। বলল, ‘তুমি কি করে জান?’
‘কেন আমি দেখেছি। আমি সাঁজেলিঁজে থেকে ফিরছিলাম। আমার গাড়ি তখন ওখানে এসে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিল।’
‘কি দেখেছ তুমি?’
‘তোমরা আহত মিঃ আবদুল্লাহকে তুলে নিয়ে গেলে?’ থামল ওলগা।
‘আর কি দেখেছ?’
‘তোমরা তাকে হাসপাতালে না নিয়ে একটা বাড়িতে তুলেছ।’
মায়োভস্কির চোখে-মুখে দেখা দিল উদ্বেগ-আতংকের ছাপ। বলল, ‘তুমি সেখানে গিয়েছিলে কেন?’
‘মনে করলাম মিঃ আবদুল্লাহকে তোমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছ, তাই তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।’
মায়োভস্কি মুখ নিচু করেছে। তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে ভয় ও উদ্বেগের ছাপ। কিছুক্ষণ সে নির্বাক থাকল। তারপর বলল,‘তুমি কি বলতে এসেছ?’
‘আমার মনে হচ্ছে, মিঃ আবদুল্লাহকে তোমরা আটক করেছ কোন কারণে। তাকে ছেড়ে দেবার জন্যে অনুরোধ করতে এসেছি। সে একদিন আমাদের জীবন বাঁচিয়েছিল।’
‘আব্বাকে কিছু বলিনি। ভাবলাম, তোমাকে বললে যদি কাজ হয়, আব্বাকে আর বলবো না।’
মায়োভস্বির মুখ থেকে উদ্বেগের ভাবটা একটু দূর হলো। বলল,‘ঠিক করেছ। ভিষয়টা ভিন্ন ধরনের একটা ব্যাপার। তোমার আব্বার জানা উচিত নয়।’
‘ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু বল, আমার অনুরোধ রাখবে?’
মায়োভস্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,‘তুমি কি মনে কর নিরপরাধ কোন লোককে আমরা আটকাতে পারি?’
‘না পার না।’
‘জান, লোকটি যে অপরাধ করেছে তাতে তাকে এক মুহূর্ত বাঁচিয়ে রাখা যায় না।’
‘কি অপরাধ করেছে সে?’
‘সব কিছু তোমার জানা ঠিক নয়। তুমি আমাকে বিশ্বাস কর না?’ মায়োভস্কি ওলগাকে কোলে টেনে নিয়ে বলল।
ওলগা এক হাতে মায়োভস্কির গলা পেঁচিয়ে ধরে বলল,‘তোমাকে বিশ্বাস না করলে দুনিয়ায় আর কাকে বিশ্বাস করব বল?’
‘তাহলে শোন, লোকটি ভয়ংকর। বাইরে ভাল মানুষী চেহারা দেখে তার কিছুই বুঝবে না। দেশ ও জাতির স্বার্থে অনেক কিছুই সবার অলক্ষ্যে করতে হয়। এ বিষয়টাও সেই রকম। বুঝেছ তুমি?’
মায়োভস্কির কোল থেকে মাথা তুলতে তুলতে ওলগা বলল,‘বুছেছি। কিন্তু………।’
‘কোন কিন্তু নয়, সে তোমাদের জীবন বাঁচিয়েছিল, সেটা তার একটা রাজনীতি ছিল।’
‘হতে পারে, কিন্তু…………।’
‘আর কোন কিন্তু নয়।’ বলে মায়োভস্কি তাকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল।

শুয়ে ঘুম আসছিল না মায়োভস্কির। এপাশ ওপাশ করছিল অবিরাম।
একটা প্রচন্ড অপরাধ বোধ তাকে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। সে ভাবছিল, ওলগার প্রতি তার ভালোবাসা গ্রেট বিয়ারের সুনির্দিষ্ট বিধান ভংগ করতে তাকে বাধ্য করেছে। গ্রেট বিয়ারের নির্দেশ হলো, গ্রেট বিয়ারের সদস্য নয় এমন কেউ গ্রেট বিয়ারের কোন লোক বা গ্রেট বিয়ারের কোন ঘাটি দেখে ফেললে তাকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ওলগা মায়োভস্কিকে গ্রেট বিয়ারের লোক হিসেবে চিনতে পারা শুধু নয়, গ্রেট বিয়ারের একটা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি দেখে ফেলেছে। এরপরও মায়োভস্তি তাকে জীবন্ত ছেড়ে দিয়েছে। এত বড় ঘটনা আইভান দি টেরিবলের অবশ্যই অজানা থাকবে না। নিশ্চয় তার এই বাড়ি আইভানের নজরের বাইরে নয়। তার এবং ওলগার কথোপকথন কে জানে এতক্ষণ তার কাছে পৌঁছে গেছে কিনা। কেঁপে উঠল মায়োভস্কি। শয্যা তার কাছে কাঁটা বলে মনে হতে লাগলো।
তাড়াতাড়ি উঠে বসল মায়োভস্কি।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। গ্রেট বিয়ারের দাবীর কাছে তার ভালোবাসার কোন মূল্য নেই। উপায় নেই তার, কোরবানী দিতে হবে তার ভালোবাসাকে।
দ্রুত উঠে গিয়ে টিপয় থেকে মোবাইল টেলিফোন তুলে নিল। ডায়াল করে বলল,‘পেট্রভ তুমি তৈরি হয়ে এখনি এসো।’
টেলিফোন রেখে দিয়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে লাগল মায়োভস্কি।
মিনিট দশেকের মধ্যে ডার্ক ছাই রংয়ের পোশাকে ঢাকা দীর্ঘদেহী একজন প্রবেশ করল মায়োভস্কির কক্ষে।
মায়োভস্কি ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। তারপর একটা কাগজ লোকটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,‘পেট্রভ বুঝতে পারো কিনা দেখ।’
পেট্রভ নামক লোকটি কাগজটির উপর চোখ বুলিয়ে বলল,‘রাষ্ট্রদূত পাভেলের বাসার ভেতরের স্কেচ। আমাকে ঢুকতে হবে মিস ওলগার কক্ষে। হাতে নিডল গান। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আমাকে তার কক্ষ ছাড়তে হবে।’
মায়োভস্কির মুখের চেহারা পাথরের মত। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল,‘ধন্যবাদ পেট্রভ। পেট্রভ মনে রেখ তোমাকে সফল হতে হবে।’
‘বুঝেছি।’
মায়োভস্কি সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে বলল,‘যাও, তোমার ফেরা পর্যন্ত আমি এখানে বসে অপেক্ষা করবো।’
পেট্রভ বেরুবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েও থমকে দাঁড়াল,‘স্যার, তাকে যদি কক্ষে না পাওয়া যায়?’
‘তোমার উপর দায়িত্ব তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া, যেখানে পাবে সেখানে।’ কঠোর কণ্ঠে বলল কথাগুলো মায়োভস্কি। কিন্তু বড্ড শুষ্ক শুনাল তার কণ্ঠ।
পেট্রভ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ওদিকে ওলগারও ঘুম আসছিল না। তার ভেতরে অসহ্য এক টানাপোড়েন। মায়োভস্কিকে সে ভালোবাসে। তার কথা সে বিশ্বাস করেছে। যতক্ষণ তার কাছে ওলগা ছিল, ভালই ছিল। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, ভেতরের এক টানাপোড়েন তাকে পীড়িত করছে। আহমদ মুসার যে ভয়ংকর রূপ মায়োভস্কি ওলগার কাছে তুলে ধরেছে, সেটা মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। ক্রিমিনালরা যতই তার অপরাধকে ভদ্র পোশাক আর ভদ্র কথার আড়ালে চাপা দিক, তার চোখ ও চেহারার আয়নায় তার যে আসল রূপ প্রকাশ পায় তা সে ঢাকতে পারে না কিছুতেই। আহমদ মুসার কোন কিছুই প্রমাণ করে না যে সে ক্রিমিনাল। আরও একটা কথাকে সে কিছুতেই মিলাতে পারছিল না। আহদ মুসা যদি রাশিয়ার শত্রু কিংবা রাশিয়ার বিবেচনায় কোন ক্রিমিনালই হবে, তাহলে রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে সে বিষয়টা গোপন রাখা হবে কেন? তাঁরই প্রথম জানার কথা। এ গোপনীয়তার অর্থ, কাজটা এমন যা রাষ্ট্রদূতের জানা ঠিক নয়, তিনি এটা পছন্দ করবেন না। এর অর্থ কাজটা বৈধ নয়।
এসব চিন্তার দ্বিমুখী টানাপোড়েনে অস্থির হয়ে উঠেছিল ওলগা। ঘুম ধরছিল না তার চোখে।
ঘর অন্ধকার।
দেয়াল বরাবর পর্দা টানা থাকায় এবং জানালায় গরাদ লাগানো থাকায় যেটুকু আলো আসতে পারতো তাও আসছে না।
হঠাৎ ধাতব ঘর্ষণের একটা অস্পষ্ট টানা শব্দ তার কানে এল। উৎকর্ণ হলো ওলগা উৎসের দিকে।
আবার শব্দ হলো তেমনি অস্পষ্ট। ওলগার বুঝতে বাকি রইল না যে, কেউ জানালার গরাদ এবং কাঁচের জানালা তুলল।
মুহূর্তেই উদ্বেগ ও আতংকের একটা ঢেউ খেলে গেল তার গোটা শরীরে।
পরক্ষণেই সতর্কতায় শক্ত হয়ে উঠল তার দেহ। বালিশের তলা থেকে রিভলবার এবং ক্ষুদ্র একটা টর্চ বের করে নিল। তার ডান হাতের রিভলবার স্থির তুলে ধরল শব্দের উৎস লক্ষ্যে। বাম হাতে তার টর্চ।
শব্দের উৎসের দিকে স্থির নিবদ্ধ তার দু’চোখ দেখল, অন্ধকার নড়ে উঠল এবং এক খন্ড সাদা আলো ফুটে উঠল অন্ধকারের বুকে।
ওলগা বুঝল, গরাদ ও কাঁচের জানালা খুলে কেউ প্রবেশ করছে তার ঘরে।
পর্দা আরও ফাঁক হলো। সেখানে আবির্ভূত হলো এক কালো ছায়ামূর্তি। ওলগা রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি রেখে টর্চের সুইচ অন করল ছায়ামূর্তিকে লক্ষ্য করে।
ঘটনার আকস্মিকতায়ও বিমূঢ় হলো না ছায়ামূর্তি।
টর্চের আলো জ্বলে উঠার সংগে সংগে ছায়ামূর্তি ডান হাত তুলে ধরেছিল। হাতে তার নিডল গান।
নিডল গান থেকে আলপিনের অগ্রভাগের মত এক ঝাঁক গুলী বের হয়। গুলী গুলোর অগ্রভাগ ভয়ংকর বিষাক্ত। বিষাক্ত নিডল কারও চামড়া ভেদ করে রক্ত স্পর্শ করার সাথে সাথে তার মৃত্যু ঘটে। আর এ নিডলগুলো এত শক্তি ও গতি সম্পন্ন যে, একমাত্র লোহার বর্ম ছাড়া সব রকম পোশাকই ভেদ করতে পারে।
ছায়ামূর্তি নিডল গান সমেত তার হাত তুলে স্থির হবার আগেই ওলগার রিভলবার গুলী বর্ষণ করল।
গুলীটি ছায়ামূর্তির বক্ষ ভেদ করল।
ছায়ামূর্তিটি বার কয়েক চক্কর খেয়ে আছড়ে পড়ল মেঝের উপর।
ওলগা টর্চ নিভাল, কিন্তু রিভলবার নামাল না। ছায়ামূর্তির সাথে আরও কেউ থাকতে পারে।
ওলগার রিভলবারের গুলী বর্ষিত হবার পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রাষ্ট্রদূত পাভেল সহ বাড়ির সবাই ছুটে এল ওলগার ঘরে।
রাষ্ট্রদূত পাভেলই ঘরে আলো জ্বালল। দেখল রিভলবার হাতে ওলগাকে এবং রক্তাক্ত লাশটাকে।
রাষ্ট্রদূত ওলগার তাছে ঘটনা শোনার পর পুলিশে টেলিফোন করে ছায়ামূর্তিটির লাশের দিকে এগুতে এগুতে বলল,‘কে এই লোক?’
মূর্তিটি ভালো করে দেখে বলল,‘লোকটি রুশ কিন্তু অপরিচিত।’
তারপর লোকটির হাতে ধরে রাথা নিডল গান ভালো করে নিরীক্ষণ করে চমকে উঠল রাষ্ট্রদূত। নিডল গানটি যে শুধু রাশিয়াতেই তৈরি তা নয়, নিডল গানে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র নতুন সংকেত চিহ্ন উৎকীর্ণ রয়েছে যা অন্যকেউ না বুঝলেও তিনি দেখেই বুঝলেন।
কেজিবির নিডল গান লোকটির হাতে দেখে তার চোখ-মুখ উদ্বেগে ছেয়ে গেল।
সে তাড়াতাড়ি হাতে গ্লাভস পড়ে লোকটির পকেট সার্চ করল। লোকটির বুক পকেটে প্রথমেই পেয়ে গেল একটি ছোট কাগজ। কাগজটি তার বাড়ির ইন্টরন্যাল ডায়াগ্রাম। যাতে দেখানো হয়েছে ওলগার ঘরে আসার পথ। ডায়াগ্রামের সাথে হাতের লেখার প্রতি নজর পড়তেই ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠল রাষ্ট্রদূত পাভেল। হস্তাক্ষর দেখার সাথে সাথেই চিনতে পারলো ওটা মায়োভস্কির হাতের লেখা। তাহলে তো মায়োভস্কিই লোক পাঠিয়েছে ওলগাকে খুন করার জন্যে! কিন্তু কেন? ওলগা ও মায়োভস্কির ঘনিষ্টতা আছে বলেই তো তারা জানে। এর মধ্যে তাহলে এমন কিছু কি ঘটেছে যার জন্যে ওলগাকে তার খুন করার প্রয়োজন পড়েছে? বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হলো তার কাছে। আরও বড় কিছু কি আছে এর পেছনে?
ওলগা তার আব্বার ভাবান্তর দেখে বলল, ‘ও কাগজে কি কিছু পাওয়া গেছে আব্বা?’
রাষ্ট্রদূত পাভেল ওলগার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে বলল,‘মায়োভস্কির সাথে তোমার বড় ধরনের কোন গন্ডগোল হয়েছে?’
ওলগা বিস্ময়ে চোখ দু’টো কপালে তুলে বলল,‘এ সময়ে এ প্রশ্ন কেন আব্বা?’
রাষ্ট্রদূত পাভেল তার স্ত্রী ছাড়া অন্য সবাইকে বাইরে যেতে ইংগিত করল এবং বলল ওলগাকে,‘মায়োভস্কি তোমাকে খুন করার জন্যে এই লোককে পাঠিয়েছিল।’
শুনে ওলগার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না ওলগা।
‘কিছু ঘটেছে তোমার সাথে তার?’ বলল ওলগার আব্বাই।
‘আমার সাথে কিছু ঘটেনি। তবে….।’
বলে একটু থামল ওলগা। তারপর বলল,‘মায়োভস্কি ও তার লোকরা মিঃ আবদুল্লাহকে আহত করে কিডন্যাপ করেছে। আমি তাকে অনুরোধ করতে গিয়েছিলাম তাকে ছেড়ে দেবার জন্যে।’
‘কেন আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করেছে? কেমন করে তুমি জানতে পারলে? কেন আমাকে জানাওনি?’ এইভাবে এক সাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
ওলগা সব কথা, সব বিবরণ তার আব্বাকে খুলে বলল।
ওলগার কথা শেষ হতেই রাষ্ট্রদূত উঠে দাঁড়াল। দ্রুত গিয়ে টেলিফোন তুলে নিল। নিরাপত্তা বিভাগকে নির্দেশ দিল, এখনি মায়োভস্কিকে আটক করতে এবং বলল,‘পুলিশের সাথে কথা বলে আমি আসছি।’
কিন্তু মায়োভস্কির বাড়ি শূন্য। তাকে পাওয়া গেল না।
তারপর লাষ্ট্রদূত পাভেল পুলিশকে বলে ছুটল আহমদ মুসাকে উদ্ধারের জন্যে। সেখানেও মায়োভস্কিকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রদূত পাভেল তখনও বুঝেনি, মায়োভস্কির এই ভীমরতির কারণ কি!

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর।
আহমদ মুসা সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে চোখ মেলল। কিছুই দেখতে পেল না। তার কি ঘটেছে মনে করার চেষ্টা করল।
তার গাড়ির এ্যাকসিডেন্টে সে আহত হয়েছিল। কিন্তু সে জ্ঞান হারায়নি। তারপর মায়োভস্কি তাকে টেনে বের করল। গাড়িতে তুলল। তারপর ক্লোরোফরম ভেজা একটা রুমাল তার নাকে চেপে ধরল। কিছু মনে নেই এরপর।
বুঝা যাচ্ছে, এ্যাকসিডেন্টটা ছিল গ্রেট বিয়ারের পরিকল্পিত। মায়োভস্কি রাষ্ট্রদূতের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর যে সময়টুকু পেয়েছিল তা সে এই পরিকল্পনায় ব্যয় করেছে। একটা কিছু সে করবে, রাষ্ট্রদূতের কক্ষ থেকে বেরুবার পর আহমদ মুসারও মনে হয়েছিল। কিন্তু কি করবে সেটা ভাবতে পারেনি।
তাহলে সে এখন গ্রেট বিয়ারের হাতে।
ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। সর্বাঙ্গে ব্যথা।
এর মধ্যেও এই ভেবে খুশী হলো যে, তার হাত পা বাঁধা নেই। সম্ভবত তারা সংজ্ঞাহীন লোককে বাঁধার প্রয়োজন অনুভব করেনি।
চারদিকে হাত বুলিয়ে মেঝের কার্পেট ছাড়া আর কিছুই পেল না আহমদ মুসা।
এ সময় পায়ের শব্দ শুনতে পেল সে।
কয়েকজনের পায়ের সেই শব্দ থেমে গেল হঠাৎ।
ওরা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কি? দরজা খুলবে ওরা?
এই জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার মনে উদয় হওয়ার সংগে সংগেই যেভাবে সে মেঝের উপর কার্পেটে পড়েছিল সেইভাবে আবার শুয়ে পড়ল সংজ্ঞাহীনের মত।
খুলে গেল ঘরের দরজা। জ্বলে উঠল ঘরের আলো।
ঘরে প্রবেশ করল স্বয়ং গ্রেগরিংকো, উস্তিনভ এবং আরও দু’জন।
তাদের ঘরে ঢোকার পর পরই একটা ছোট ভ্যানে করে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে সেখানে আনা হলো।
প্রিন্সেস ঘরে ঢুকেই দেখতে পেল সংজ্ঞাহীনভাবে পড়ে থাকা রক্তাক্ত আহমদ মুসাকে। আঁৎকে উঠল সে আহমদ মুসার এই অবস্থা দেখে। একটা প্রবল যন্ত্রণা অনুভব করল সে তার হৃদয়ে। বলল সে গ্রেগরিংকোর দিকে তাকিয়ে,‘মিঃ গ্রেগরিংকো, এই লোকটি তো রাজ পরিবারের কেউ নয়, রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কিতও নয়। তাহলে কেন বার বার এইভাবে একে নির্যাতন করছেন?’
‘সম্মানিতা প্রিন্সেস, এ রাজ পরিবারের কেউ না হয়েও সে আমাদের পেছনে লেগেছে। সে এ পর্যন্ত আমাদের যে ক্ষতি করেছে, আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার কোন নজীর নেই। এর জন্যে আমাদের দু’টি মূল্যবান ঘাটি ছাড়তে হয়েছে, কয়েক ডজন লোককে হারাতে হয়েছে। একে শতবার হত্যা করলেও আমাদের প্রতিহিংসা মিটবে না। কিন্তু আমরা তাকে হত্যা করিনি। আমরা শুধু তার কাছে জানতে চাই, কেন সে আমাদের পিছু লেগেছে। তাতিয়ানা সম্পর্কে সে কি জানে?’
বলে একটু থেমেই সে উস্তিনভকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এর তো জ্ঞান এখনও ফেরেনি। তাহলে একটু পরেই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে, কেমন?’
‘ঠিক বলেছেন।’ বলল উস্তিনভ।
গ্রেগরিংকো ভ্যানের ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,‘সম্মানিতা প্রিন্সেসকে তাঁর ফ্লাটে নিয়ে যাও।’
সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
কক্ষ থেকে বেরুতে বেরুতে গ্রেগরিংকো উস্তিনভকে বলল, ‘একটু পর তোমরা এসে একে বেঁধে ছোট ভ্যানে করে নিয়ে যাবে। আমিও যাব প্রিন্সেসের ওখানে। শেষ নাটক ওখানেই হবে।’
কক্ষের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আবার সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার।
আহমদ মুসা আবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মুখ মাথা ব্যথায় টন টন করছে। শরীরের হাড়গোড়ও যেন গুড়ো হয়ে গেছে।
উঠে বসতেই মাথাটা ঘুরে গেল। মাটিতে দু’হাতের হেলান দিয়ে শরীরটাকে স্থির রাখল সে। এ সময় তাকে দুর্বল হলে চলবে না। প্রবল মানসিক শক্তি দিয়ে দেহের সব শক্তিকে একত্রিত করতে চাইল সে।
ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। অন্ধকার ঘরে পায়চারী করল। আহত শরীরকে চাঙ্গা করতে চেষ্টা করল। ব্যথা জ্বর জ্বর শরীরের বিভিন্ন অংশের স্টিফনেস দূর করতে গিয়ে নতুন ব্যথায় তার মুখ ফুঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল, নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরল সে।
দরজার দিকে পা করে যেভাবে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল, সেভাবেই আবার শুয়ে পড়েছে।
শুয়ে শুয়ে আহমদ মুসা অপেক্ষা করছে আবার সেই পরিচিত পদশব্দের।
অবশেষে সে পদশব্দ শোনা গেল দরজার বাইরে।
দরজা খুলে গেল।
উস্তিনভ, চারজন স্টেনগানধারী এবং একটি ছোট ভ্যান নিয়ে একজন ড্রাইভার-এই ছয়জন প্রবেশ করল ঘরে।
আহমদ মুসাকে একইভাবে সংজ্ঞাহীনের মত পড়ে থাকতে দেখে উস্তিনভ স্টেনগানধারী একজনকে বলল,‘দেখ তো নাড়া দিয়ে, সংজ্ঞাহীন না সে ঘুমুচ্ছে।’
স্টেনগানধারী একজন এগিয়ে বাম হাতে স্টেনগান নিয়ে ডান হাতে আহমদ মুসাকে পরীক্ষা করার জন্যে ঝুকে পড়ল। তার স্টেনগান ধরা বাম হাত খানাও আহমদ মুসার বুকের প্রায় কাছাকাছি।
আহমদ মুসা এমন একটা সময়েরই অপেক্ষা করছিল।
মাটিতে নেতিয়ে পড়ে থাকা আহমদ মুসার দু’টি হাত চোখের পলকে উঠে এল। ছিনিয়ে নিল ঝুকে পড়া লোকটির বাম হাত থেকে স্টেনগান এবং শুয়ে থেকেই গুলী বৃষ্টি করল ওদের লক্ষ্য করে।
উস্তিনভরা বোঝার আগেই সব শেষ। ছয়টি রক্তাক্ত লাশ পড়ল কার্পেটের উপর।
আহমদ মুসা আরেকটি স্টেনগান কুড়িয়ে কাঁধে ফেলে হাতের স্টেনগান বাগিয়ে ধরে ছুটল দরজা পেরিয়ে করিডোর ধরে।
করিডোরের একটা বাঁক ঘুরতেই আহমদ মুসা মুখোমুখি হয়ে গেল মায়োভস্কির। মায়োভস্কির সাথে আরও চারজন। ওদের হাতে স্টেনগান, মায়োভস্কির হাতে রিভলবার।
আহমদ মুসা মুহূর্ত মাত্রও নষ্ট করেনি। মায়োভস্কিদের উপর চোখ পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার স্টেনগান গর্জে উঠল। এক ঝাঁক গুলী গিয়ে ঘিরে ধরল ওদেরকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল পাঁচটি লাশ করিডোরের উপর। আহমদ মুসা লাফ দিয়ে লাশগুলো ডিঙিয়ে ছুটল সামনে।
করিডোর দিয়ে ছুটতে গিয়ে উপরের তলায় উঠার সিঁড়ি পেয়ে গেল।
প্রশস্ত সিঁড়ি।
আহমদ মুসা নিঃসন্দেহ যে, প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উপরের কোন তলায় কোথাও রাখা হয়েছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। শরীর টেনে নিয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছিল।
কয়েক ধাপ উঠতেই উপরের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেল।
সেদিকে চাইতেই দেখল আহমদ মুসা, তিনজন দ্রুত নামছে সিঁড়ি দিয়ে। ওদের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল।
আহমদ মুসার স্টেনগান তখন ডান হাতে ঝুলানো। তোলার সময় নেই।
আহমদ মুসা লাফিয়ে পড়ল নিচে করিডোরে। প্রচন্ড ব্যথা পেল। শরীরের হাড়-গোড় যেন ভেংগে গেল তার। কিন্তু সেদিকে মনোযোগ দেয়ার সময় নেই। করিডোরে লাফিয়ে পড়ে শোয়া অবস্থাতেই গুলী বৃষ্টি করল উপরের সিঁড়ি লক্ষ্যে। ওদিক থেকেও গুলি বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ওরা আর নামেনি, সিঁড়ির যেখানে ছিল, সেখান থেকেই গুলী বৃষ্টি করছে। সিঁড়ির বাঁক কোন পক্ষের গুলীকেই লক্ষ্যে পৌঁছতে দিচ্ছে না।
গুলী বৃষ্টি অব্যাহত রেখেই আহমদ মুসা গড়িয়ে সরে এল দেয়ালের আড়ালে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছুটল সামনের দিকে।
অল্প এগুতেই একটা বড় দরজা পেয়ে গেল। আর করিডোরটি বাঁক নিয়ে ডান ও বাম দু’দিকে চলে গেছে।
আহমদ মুসা খোলা দরজা পথে ঘরের বিপরীত দিকের দরজা দিয়ে লনে একটা গাড়ি দাঁড়ানো দেখতে পেল। বুঝল এটাই বাইরে বেরুবার পথ।
দরজা পথে ছুটল আহমদ মুসা গাড়ির দিকে। পেছনে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ ছুটে আসছে। কয়েকটি গুলী এসে পেছনে ফেলে আসা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে।
আহমদ মুসা লনে একটি স্টেনগান ফেলে দিয়ে অন্যটি হাতে নিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। গাড়ির চাবি গাড়ির কি হোলে ঝুলছিল।
আহমদ মুসার গাড়ি যখন রাস্তায় নেমে ছুটতে শুরু করেছে, তখন আহমদ মুসাকে ধাওয়া করে আসা স্টেনগানধারীরা লনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ছুটছে আহমদ মুসার গাড়ি। কোথায় ছুটছে, তার কোন চিন্তা আহমদ মুসার মাথায় নেই।
মাথাটা তার ঝিম ঝিম করছে। স্টেয়ারিং হুইলে রাখা তার হাত দু’টি শিথিল হয়ে আসছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে তার। দেহের সব শক্তি একত্রিত করে হাত দু’টি সবল এবং চোখ দু’টি তার খোলা রাখতে চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসার ভাগ্য ভালো যে, তখন রাতের শেষ প্রহর। রাস্তায় গাড়ি তেমন নেই বললেই চলে। তাই নিরাপদে চলতে পারলো অনেক দূর। ছোট ছোট ট্রাফিক বিধি লংঘন হলেও বড় কিছু ঘটলো না।
আহমদ মুসার গাড়ি তখন চলে এসেছে শিন নদীর তীর অঞ্চলে।
হাত দু’টি আর স্টেয়ারিং হুইলে থাকছে না আহমদ মুসার। চোখের সামনে তার সবকিছু ঘুরছে। আহমদ মুসা বুঝল, আর পারবে না সে এগুতে। দেহের সব শক্তি তার নিঃশেষ। শেষ মুহূর্তে আহমদ মুসা তার পা চেপে গাড়ি দাঁড় করাতে চেষ্টা করলো। পারলো না। গাড়িটা একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেল এবং আপনাতেই দাঁড়িয়ে পড়লো।
আহমদ মুসার দেহটা গড়িয়ে পড়ল সিটের উপর।

টেলিফোন পাশে রেখে দু’হাতে মুখ ঢাকলো ডোনা।
উস্কো-খুস্কো তার চেহারা। রাতে ভালো ঘুম হয়নি তার। রাতে বার বার টেলিফোন করে জানতে চেষ্টা করেছে আহমদ মুসা ফিরেছে কিনা। তারপর সকাল থেকে প্রতি ঘন্টায় টেলিফোন করেছে। না, আহমদ মুসা ফেরেনি। এখন বেলা দশটা।
পাশের সোফায় বসে ডোনার আব্বা মিঃ প্লাতিনি খবরের কাগজ পড়ছিল।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাগজ পাশে রেখে বলল, ‘কোন খবর মা?’
হাত দু’টি মুখ থেকে সরিয়ে শুকনো কণ্ঠে বলল,‘না আব্বা ফেরেনি। কোনও খবরও নেই।’
মিঃ প্লাতিনি রাতে মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়েছে বার বার এই বলে যে, নিশ্চয় কোন কাজে জড়িয়ে পড়েছে। দেরী হচ্ছে। এসে পড়বে। আহমদ মুসার জীবনে এমন ঘটনা অহরহই ঘটে। কিন্তু সকাল থেকে এ সান্ত্বনার বাণী প্লাতিনির মুথেও আর আসছে না। উদ্বেগ তাকেও আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
একটু সময় নিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল,‘প্যারিসের বাইরে কোথাও তো যেতে পারে সে।’
‘কোন প্রকার প্রোগ্রাম-পরিকল্পনা ছাড়াই তিনি রুশ দূতাবাসে গিয়েছেন।’
‘সেখানে গিয়েও তো কোন প্রোগ্রাম হতে পারে?’
‘তাহলে দূতাবাসে টেলিফোন করব?’
‘করতে পার। কিন্তু পরিচয় না দিলে তো কোন ইনফরমেশন সেখান থেকে পাবে না।’
‘পরিচয় দেব।’
‘সেটা আহমদ মুসা পছন্দ করবে কিনা।’
‘আব্বা, তার অনুপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব আমাদের। আমি আমার নাম বলব, বন্ধু পরিচয় দেব। ঠিকানা বলার প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না।’
‘ঠিক আছে, টেলিফোন করতে পার।’
ডোনা টেলিফোন করল দূতাবাসে। পেল রাষ্ট্রদূতকে। ডোনা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল,‘আমি ডোনা জোসেফাইন। মিঃ আবদুল্লাহ আমার বন্ধু।’
‘মিঃ আবদুল্লাহর বন্ধু?’
একটু থামল রাষ্ট্রদূতের কণ্ঠ। কয়েক মুহূর্ত সময় য়ে সে বলল, মিঃ আবদুল্লাহ কোথায় সেটাই বুঝি জানতে চান?’
‘না। সেটা আপনি নাও জানতে পারেন। আমি শুধু জানতে চাই আপনার ওখানে যাবার পর মিঃ আবদুল্লাহর কি ঘটেছে। তিনি এ পর্যন্ত বাসায় ফেরেননি।’
‘ধন্যবাদ মিস ডোনা জোসেফাইন। আপনি বুদ্ধিমতী, মিঃ আবদুল্লাহর উপযুক্ত বন্ধু। কিন্তু আপনাকে আমি কোন সুখবর দিতে পারবো না।’
বলে থামল রাষ্ট্রদূত পাভেল।
এদিকে ডোনার বুকটা থর থর করে কেঁপে উঠল। দ্রুত বলল,‘বলুন কি খবর?’ গলা কেঁপে উঠেছিল ডোনার।
‘আমি দুঃখিত মিস। আমরা চেষ্টা করেও কোন সাহায্য তাঁকে করতে পারিনি।’
অস্থির হয়ে উঠেছে ডোনা। উত্তেজনায় উদ্বেগে কাঁপছে তার শরীর। বলল,‘বলুন আপনি দয়া করে।’
রাষ্ট্রদূত পাভেল বিকেলে আহমদ মুসার রাষ্ট্রদূতের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর পরিকল্পিত মোটর দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে তার বন্দী হওয়া, বন্দী খানায় রাষ্ট্রদূতদের অভিযানের বিবরণ দিয়ে বলল,‘যদিও মিঃ আবদুল্লাহকে আমরা পাইনি, তবু আমার কথা হলো সেখানে আমরা ১১টা লাশ পেয়েছি, সবই শত্রুদের। এর অর্থ আহমদ মুসার হাতেই তারা নিহত হয়েছে।’
‘তাহলে কি আবারও বন্দী হয়েছেন।’ ভাঙা গলায় বলল ডোনা।
‘বলা মুস্কিল, তবে আমার মনে হয় মিঃ আবদুল্লাহ বন্দী হলে শত্রুরা ঘাটি খালি করে পালাতো না।’
‘দয়া করে বলবেন কি, আপনারা কটায় গিয়ে শত্রুদের ঐ ঘাটি খালি দেখেন?’
‘তখন রাত সাড়ে ৪টা হবে।’
সময়টা শুনে হতাশা বাড়ল ডোনার। যেটুকু আশার আলো মনে জ্বলে উঠেছিল তাও নিভে যেতে চাইল। কথা বলতে পারল না ডোনা।
ওপার থেকে রাষ্ট্রদূতই বলল,‘কোন খারাপ কিছু চিন্তা করো না মা। ঈশ্বর তার সহায়। সে খুব ভাল ছেলে।’
‘থ্যাংকস। ঠিক আছে। গুড ডে জনাব।’
বলে ডোনা টেলিফোন রেখে দিয়ে তার আব্বার দিকে তাকিয়ে বলল,‘আব্বা ওঁর গাড়ি এ্যাকসিডেন্টে ফেলে ওকে আহত অবস্থায় কিডন্যাপ করা হয়েছে। যেখানে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, সেখানে পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে শত্রুদের ১১টি লাশ।’ কান্না জড়িত গলায় বলল ডোনা।
বলে ডোনা তার হাতের রুমালে মুখ ঢাকল।
ডোনার আব্বা এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,‘আল্লাহর উপর ভরসা কর মা। আমার মনে হয় সে সরে পড়তে পেরেছে।’
‘কিন্তু এতটা সময় তাহলে উনি কোথায়? এই পরিস্থিতিতে তিনি অবশ্যই টেলিফোনে তাঁর খবর জানাতেন।’
‘সেটাও নির্ভর করে সুযোগের উপর।’
ডোনা চোখ মুছে বলল,‘এখন কি করণীয় আব্বা?’
‘এস আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করে অপেক্ষা করি।’
বলে একটু থেমেই আবার বলল,‘রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলে তোমার কি মনে হলো?’
‘আমার মনে হয়েছে তিনি সত্য কথাই বলেছেন।’
ডোনার আব্বা কোন কথা বলল না।
ডোনাও নয়।
একটু পরে নীরবতা ভেঙে ডোনার আব্বা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,‘সাইমুমের টেলিফোন নাম্বারটা দাও, ওদের সাথে যোগাযোগ করে দেখি।’
হঠাৎ কিছু পাওয়ার আনন্দে ডোনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ওদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম আব্বা। যাই নিয়ে আসি ওদের নাম্বার।’
বলে ডোনা ছুটল উপরে ইঠার সিঁড়ির উদ্দেশ্যে।
ডোনার আব্বা সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজটা আবার তুলে নিল হাতে।

সকাল ৮টা। শিন নদীর তীর এলাকা তখনও গভীর কুয়াশায় ঢাকা।
ফাতমা ও তার আব্বা আবু আমের আবদুল্লাহ মোটর কারে যাচ্ছিলেন নদীর তীর বরাবর রাস্তা ধরে।
নদী তীরের এই জায়গাটা খুবই মনোরম। রাস্তা থেকে নদীর পানি পর্যন্ত নেমে গেছে পরিকল্পিত সাজানো গাছের সারি। গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসার জায়গা। প্যারিসে এটা পিকনিকের একটা পপুলার স্পট।
ড্রাইভ করছিল ফাতমা।
তার চোখে পড়ল একটা গাড়ি গাছের গোড়ার সাথে আটকে আছে।
ফাতমা প্রথমে মনে করেছিল, কোন গাড়ি পার্ক করা আছে। কিন্তু পরে দেখল, গাড়িটা গাছের সাথে এ্যাকসিডেন্ট করেছে। গাড়ির সামনের কিছুটা অংশ দুমড়ে গেছে।
‘আব্বা, মনে হয় একটা গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট করেছে। আটকে আছে একটা গাছের গোড়ায়।’ বলল ফাতমা।
ফাতমার আব্বা কিছু বলার আগেই ফাতমা গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে।
‘ঠিক আছে। চল দেখি। পুলিশ নিশ্চয় জানতে পারেনি।’ বলল ফাতমার আব্বা আবু আমের আবদুল্লাহ।
দু’জনেই নামল গাড়ি থেকে।
ফাতমাই আগে আগে চলল।
ড্রাইভিং সাইডের জানালা দিয়েই ভেতরে তাকাল ফাতমা। কিছু বুঝতে পারলো না। কুয়াশা সিক্ত জানালার কাঁচ দিয়ে সিটের উপর একজন লোক পড়ে থাকার আবছা দৃশ্য দেখতে পেল সে।

দরজা নিশ্চয় ভেতর থেকে লক করা। তবু ফাতমা দরজা টানল। সংগে সংগে খুলে গেল দরজা। দরজা পথে মুখ বাড়িয়ে দেখল, রক্তাক্ত একজন সিটের উপর পড়ে আছে।
‘আব্বা, মারাত্মক আহত একজন সিটের উপর পড়ে আছে।’ বলল ফাতমা।
‘বেঁচে আছে তো?’
সিটে পড়ে থাকা লোকটির মাথা ছিল ভেতরের দিকে। একটা হাত ঝুলে ছিল সিটের নিচে।
ফাতমা হাত তুলে নিয়ে পরীক্ষা করল। বলল,‘আব্বা, লোকটি বেঁচে আছে। লোকটি এশিয়ান আব্বা।’
‘এশিয়ান? আহা! চল দেখি বের করে আনি।’
দু’জনে ধরাধরি ধরে বের করে আনল গাড়ি থেকে লোকটিকে।
বের করে শুইয়ে দিয়ে মুখের দিকে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠল ফাতমা,‘আব্বা, আহমদ মুসা।’
‘তাইতো মা, আহমদ মুসাই তো।’ আর্তনাদ করে উঠল আবু আমেরের কণ্ঠও।
‘আব্বা, সময় নষ্ট করা যাবে না, কোথায় নেব এঁকে?’
‘চল কাছেই একটা ভাল ক্লিনিক আছে।’
‘না, আব্বা, এঁকে অপরিচিত কোন ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।’
‘ঠিক বলেছ, আমাদের ক্রিসেন্ট ক্লিনিকেই চল নিয়ে যাই।’
আহমদ মুসাকে আবার তারা নিজেদের গাড়িতে তুলল।
ফাতমা বলল,‘আব্বা লক্ষ্য করেছেন, এঁর চোখ, মুখ, মাথার আঘাত কোনটাই তাজা নয়। সব রক্তই শুকনো।’
‘হ্যাঁ তাই তো দেখছি। এর অর্থ কি? গাড়ি এ্যাকসিডেন্টে সে আহত হয়নি?’
ফাতমা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসতে বসতে বলল,‘আমার মনে হয় উনি আহত হয়েছেন অন্য কোন ঘটনায় এবং তা নিশ্চয় আট দশ ঘন্টা আগে। গাড়িতে তাঁর পাশে স্টেনগান পড়েছিল। আমার বিশ্বাস কোন সংঘর্ষের পর আহত অবস্থায় সরে আসার পথে তিনি এ্যাকসিডেন্ট করেছেন।’
গাড়ি তখন ঝড়ের গতিতে চলতে শুরু করেছে।
সকালের রাস্তা প্রায় গাড়ি শূন্য বলা যায়। ২০ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি প্যারিস ক্রিসেন্ট ক্লিনিকে এসে পৌঁছল।
জরুরী অবস্থা ঘোষিত হলো প্যারিস ক্রিসেন্ট ক্লিনিকে। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই সিনিয়র-জুনিয়র সব ডাক্তার এসে হাজির হলো।
প্রাথমিক পরীক্ষা করে ক্লিনিকের প্রধান সার্জন ডাঃ ওমর ফ্লেমিং অপেক্ষমান উদ্বিগ্ন সকলকে জানাল, ‘ভয়ের বোধহয় কিছু নেই। বাইরে বড় ধরনের কোন আঘাত নেই। দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রচুর রক্ত ক্ষরণের ফলেই ইনি সংজ্ঞা হারিয়েছেন। তবে আভ্যন্তরীণ পরীক্ষার পরেই বলা যাবে প্রকৃত অবস্থা কি।’
‘সে সব পরীক্ষায় কতক্ষণ লাগবে?’ বলল আবু আমের আবদুল্লাহ।
‘রক্ত লাগবে। সেলাই দিতে হবে। জ্ঞান ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান কাজ।’
সংগে সংগে চারদিক থেকে শতজন বলে উঠল,‘রক্তের গ্রুপ বলুন, যত রক্ত লাগে দেব।’
‘ধন্যবাদ। আমিও আপনাদের সাথে আছি।’
বলে ডাঃ ফ্লেমিং ইমারজেন্সী অপারেশন হলের ভেতরে ঢুকে গেল।
ঘন্টা দু’য়েক পরে ডাঃ যুবায়ের, ফাতমার ভাই বের হয়ে ডাঃ ফ্লেমিং-এর পক্ষ থেকে উদ্বিগ্ন ও অপেক্ষমানদের উদ্দেশ্য করে বলল,‘আমাদের মহান ভাই আহমদ মুসাকে ইনটেনসিভ কেয়ারে নেয়া হয়েছে। কোন মেজর অপারেশনের দরকার হয়নি। তবে জ্ঞান এখনও ফেরেনি।’
‘তাঁর আঘাতের ব্যাপারে আপনারা কি ধারণা করেছেন ভাইয়া।’ বলল ফাতমা।
‘তাঁর মাথা ও মুখের আঘাতের মধ্যে কিছু কিছু ভাঙা কাঁচ পাওয়া গেছে। তাঁর মাথা ও পাঁজরে প্রবল চাপ জনিত আঘাত। আমরা মনে করছি, ষোল সতের ঘন্টা আগে আরও একটা কার এক্সিডেন্টে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়। দ্বিতীয় এক্সিডেন্টে তাঁর নতুন কোন ক্ষতি হয়নি।’
‘তাহলে জ্ঞান হারালেন কি করে?’
‘এটা তাঁর দ্বিতীয় বার সংজ্ঞা হারানো।’
‘কেমন করে জানলেন?’
‘প্রথম এক্সিডেন্টের পর সংজ্ঞা না হারালে অন্তত মুখে রক্তের দাগ এভাবে থাকতো না। আঘাত কিংবা যে কোন কারণেই হোক রক্তের দাগ শুকানোর পর সে সংজ্ঞা ফিরে পায়।’
কথা শেষ করেই ডাঃ যুবায়ের ফাতমাকে কাছে ডাকল। কানে কানে বলল, ‘প্রিন্সেস মারিয়া জোসেফাইনকে ব্যাপারটা তো এখন জানানো হয়নি!’
‘ঠিক বলেছ ভাইয়া, কথাটা আমার মনেই আসেনি। এখনই জানাচ্ছি।’
বলেই ফাতমা ছুটল টেলিফোনের দিকে। কিন্তু ওপার থেকে টেলিফোন উঠাল না। বার বার নো রিপ্লাই হলো।
‘ওটা তোমার কোন বাড়ির নাম্বার? ওঁদের কয়েকটা বাড়ি আছে।’ বলল ডাঃ যুবায়ের।
‘আমি তা জানি না ভাইয়া। এ নাম্বারে কয়েকবার তার সাথে কথা বলেছি।’
‘ঠিক আছে। আল্লাহ ভরসা।’
বলে ডাঃ যুবায়ের ভেতরে চলে গেল।
বেলা তখন ১২টা।
আহমদ মুসার সংজ্ঞা ফিরেছে বেলা দশটার পর পরই।
আহমদ মুসাকে এনে রাখা হয়েছে তার জন্যে বিশেষভাবে সাজানো ক্লিনিকের বিশেষ একটি কক্ষে। কারও দ্বারা কখনও ব্যবহৃত হয়নি এমন বিছানা-পত্র, আসবাবপত্র তার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘরটির আশেপাশের ঘরে ডাঃ ফ্লেমিং ডাঃ যুবায়েরসহ ডজন খানেক ডাক্তার ও নিরাপত্তা কর্মীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তখন আহমদ মুসার কাছে বসে আবু আমের আব্দুল্লাহ, ডাঃ ফ্লেমিং, ডাঃ যুবায়ের, প্যারিসের মুসলিম কমুনিটির অন্যতম নেতা ও প্যারিসস্থ সাইমুম ইউনিটের উপদেষ্টা আবু বকর শিরাক এবং আরও কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। পর্দার আড়ালে রয়েছে ফাতমা সহ প্যারিসের মহিলা নেত্রীরা।
ঘটনা ঘটার পর উদ্বিগ্ন সকলে চেপে ধরেছিল আহমদ মুসাকে।
যতটা বলা যায়, ততটা বলে থামল আহমদ মুসা।
কারো মুখে কোন কথা নেই। পিনপতন নীরবতা।
‘আমার একটা প্রবল কৌতুহল জনাব, আমরা এখানকার মুসলিম কমুনিটি ঘটনাক্রমে আপনাকে এখানে পেয়েছি। কিন্তু আপনার মিশনে এসে আপনি বাস করছেন অন্য কোথাও। আপনি যার মেহমান, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটিকে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে।’ বলল ‘ইয়ুথ সোসাইটি অব ইউরোপিয়ান রেনেসাঁ’- এর নতুন সেক্রেটারি জেনারেল হুয়ারী হাবিব বেনগাজি।
ডাঃ যুবায়ের কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে হেসে বলল, ‘তাঁদের একজন এখানে আসবেন। না শুনে চোখেই দেখবেন।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, শত্রুরা তোমাকে জীবন্ত ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু তা তারা পারেনি। এটা আল্লাহর একটা সাহায্য।’ বলল আবু আমের আবদুল্লাহ, ডাঃ যুবায়েরের আব্বা।
‘সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আপনি যে শত্রুর হাতে পড়েননি, এটাও আল্লাহর বড় একটা সাহায্য।’ বলল ডাঃ ফ্লেমিং।
‘অবশ্যই।’ বলল আহমদ মুসা।
এইভাবে প্রশ্নোত্তরর চলার এক পর্যায়ে হুয়ারী হাবিব বলে উঠল, ‘মাফ করবেন সকলে, একটু উঠতে হচ্ছে। এখনি ফিরে আসব’
‘আসুন।’ বলল আহমদ মুসা।
হুয়ারী হাবিব বের হয়ে গেল।
প্রায় সংগে সংগেই আহমদ মুসা ডাঃ যুবায়েরকে কাছে ডেকে কানে কানে বলল, ‘তুমি তোমার লোককে হুয়ারী হাবিবকে ফলো করতে বল। কোথায় কি করে কি বলে তার রিপোর্ট চাই।’
ডাঃ যুবায়েরের মুখে প্রবল বিস্ময়ের প্রকাশ ঘটল। কিন্তু কিছু বলল না।
সে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত বের হয়ে গেল।
মিনিট পনের পরে ফিরে এসে আহমদ মুসার কানে কানে বলল, ‘হুয়ারী ঔষধ কিনতে গিয়েছিল। ফিরে আসে এখন টয়লেটে ঢুকেছে।’
আহমদ মুসার ভ্রু মুহূর্তের কুঞ্চিত হয়ে আবার মিলিইয়ে গেল। বলল, ‘যে লোককে পাঠিয়েছিলে তাকে ডাকো।’
লোকটি এসে আহমদ মুসার শয্যার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল।
আহমদ মুসা ফিসফিসে কণ্ঠে বলল, ‘উনি সোজা দোকানে গিয়ে ঔষধ কিনে আনেন?’
‘না, উনি ঔষধ বের করতে বলে ভেতরে গিয়েছিলেন।’
‘কেন?’
‘টেলিফোন করার জন্যে।’
‘আপনি দেখেছেন টেলিফোন করতে?’
‘না দেখিনি। উনি দোকানীকে বলেছিলেন যে তিনি একটা টেলিফোন করবেন।’
‘ঠিক আছে। যান আপনি।’
লোকটি চলে গেলে আহমদ মুসা ডাঃ যুবায়েরকে ডেকে বলল, ‘একটা গাড়ির ব্যবস্থা কর। আমি এখনি যাব।’
ডাঃ যুবায়েরের মুখ কালো হয়ে গেল উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায়। কিন্তু আহমদ মুসার মুখের দিকে চেয়ে কোন প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
আহমদ মুসা যুবায়েরকে কথা বলা শেষ করেই উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি দুঃখিত, জরুরী প্রয়োজনে আমাকে এখনই চলে যেতে হবে। আপনারা আমার জন্য দোয়া করুন। আপনাদের ভালবাসার জন্যে ধন্যবাদ।’
সকলেই এক বাক্যে বলল, ‘এই শরীর নিয়ে! না এটা হতে পারে না।’
ডাঃ ফ্লেমিং বলল, ‘আমি ডাক্তার, ডাক্তার হিসেবে এমন রুগী আমি ছাড়তে পারি না।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘জনাব আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ডাক্তার হলে এ কথাই বলতাম। কিন্তু এখনকার কাজ বিশ্রামের চেয়ে বড়।’
বলে আহমদ মুসা ধীরে ধীরে উথে বসল।
ডাঃ যুবায়ের বাইরে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল, ‘গাড়ি রেডি।’
লিফটে ফাতমা বলল, ‘জনাব, ডোনা আপা আসার জন্যে তৈরি হচ্ছেন। দু’এক মিনিটের মধ্যেই যাত্রা করবেন।’
‘তুমি তাকে আসতে নিষেধ করে দাও।’
‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি? তার ওখানে?’
‘না। কোথায় যাচ্ছি, সেটা আপাতত থাক।’
‘বাবা, আমাদের কোন অপরাধ হয়েছে? এভাবে আকস্মিক চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন?’ বলল বৃদ্ধ আমের আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনারা সব বুঝতে পারবেন। পরে আমি সব বলব এখন নয়।’
লিফট থেকে বের হয়ে আহমদ মুসা এগুলো গাড়ির দিকে। সাথে আবু আমের আবদুল্লাহ, ডাঃ ফ্লেমিং, ডাঃ যুবায়ের, হুয়ারী হাবিবসহ সকলেই।
সবাই তখনও প্রতিবাদ করছে আহমদ মুসার সিধান্তের। বিশেষ করে হুয়ারী হাবিব ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আহমদ মুসাকে বাধা দেয়ার জন্যে।
আহমদ মুসা গাড়ির কাছাকাছি হলে ডাঃ যুবায়ের চাবি হাতে গাড়ির সামনে দাঁড়ানো একটি যুবককে দেখিয়ে বলল, ‘এ আমার ড্রাইভার, ড্রাইভ করবে।’
‘প্রয়োজন নেই। আমি ড্রাইভ করতে পারব।’
‘কেন? … অসম্ভব!’ বলল ডাঃ যুবায়ের।
‘ঠিক বলেছে যুবায়ের, বাবা।’ বলল আমের আবদুল্লাহ।
‘আমার উপর আপনাদের কোন আস্থা নেই?’
ডাঃ যুবায়ের এগিয়ে এসে আহমদ মুসার হাত চেপে ধরে আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘আস্থা-অনাস্থার প্রশ্ন এখানে নয়। আমরা বলছিলাম, এইভাবে এই অবস্থায় নিরুদ্ধেশ যাওয়াটা আমরা সহ্য করতে পারছি না।’
‘ধন্যবাদ তমাদের ভালবাসার জন্যে। সকলকে ধন্যবাদ, আসসালামু আলাইকুম।’
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উথে বসল আহমদ মুসা।
বসাটা একটু জোরে হয়েছিল। মাথা ও গোটা শরীর চিন চিন করে উঠল।
মাথাটা সিটে আস্তে করে ন্যস্ত করে গাড়িতে স্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
গাড়ি বারান্দা থেকে রাস্তায় নেমে এল আহমদ মুসার গাড়ি।
রাস্তায় নেমেই তিব্র গতিতে চলতে শুরু করল গাড়ি।
যতক্ষন গাড়ি দেখা গেল, তারা সবাই দাঁড়িয়ে থাকল। গাড়ি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবার পর সকলে ঘুরে দাঁড়াল।
আকস্মিক যা ঘটে গেল সবাই বিক্ষিপ্ত ভাবে আলোচনা করছিল। কেউ চলে যাবার, কেউ ক্লিনিকের ভেতরে যাবার উদ্যোগ নিয়েছে, এই সময় ঝড়ের গতিতে পর পর তিনটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়াল ক্লিনিকের গাড়ি বারান্দায়।
গাড়ি থেকে প্রায় দু’ডজন মানুষ নামল। তাঁদের কারও হাতে রিভলবার, কারও হাতে স্টেনগান।
তারা নেমেই কয়েকজন ক্লিনিকের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকজন গাড়ি বারান্দায় স্টেনগান বাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। অবশিষ্টরা ক্লিনিকে ঢোকার জন্যে ক্লিনিকের বারান্দায় উঠল।
যে লোক সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছিল, ডাঃ ফ্লেমিং তার মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘আমি ডাঃ ফ্লেমিং। ক্লিনিকের ডক্টর ইনচার্জ। আপনারা এসব কি করছেন, বুঝতে পারছি না।’
লোকটি ক্রুর হেসে বলল, ‘আপনাকেই তো বেশি দরকার। ভালই হলো।’
একটু থামল লোকটি। তারপর চোখে আগুন বর্ষণ করে বলল, ‘চলুন, আহমদ মুসা কোথায় আমাদের দেখিয়ে দিন।’
প্রথমটায় তার কথায় বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল ডাঃ ফ্লেমিং। তা মুহূর্তের জন্যে। মুহূর্তেই তার কাছে সব পরিস্কার হয়ে গেল। পরিস্কার হয়ে গেল কেন আহমদ মুসা এইভাবে চলে গেল। হৃদয়টা তার দারুণভাবে কেঁপে উঠল। যদি সে থাকতো, তাহলে কি হতো! তার মন ভরে গেল শ্রদ্ধায় আহমদ মুসার প্রতি।
‘আহমদ মুসা? যে আহত লোকটি আজ সকালে ভর্তি হয়েছিল, সেই এশিয়ান লোক?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। কোথায় সে, চলুন।’
‘কিন্তু সে তো এই ক’মিনিট হলো চলে গেছে?’
‘চলে গেছে? মিথ্যা কথা।’
‘মিথ্যা নয়, দেখুন এখানে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করুন’
‘না বিশ্বাস করি না। চলুন সার্চ করব।’
‘ঠিক আছে, চলুন।’
ডাঃ ফ্লেমিংকে নিয়ে একদল অস্ত্রধারী ঢুকে গেল ক্লিনিকের ভেতরে।
গাড়ি বারান্দায় লনের উপর তখনও স্তম্ভিতের মত দাঁড়িয়ে আবু আমের আবদুল্লাহ, ডাঃ যুবায়ের ও ফাতমা।
‘আল্লাহ আহমদ মুসাকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু অবাক হচ্ছি, বুঝল কি করে সে যে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে?’ ফিসফিসে কণ্ঠে বলল আবু আমের আবদুল্লাহ।
‘ভাইয়া নিশ্চয় কিছু জানেন?’ বলল ফাতমা।
কথা তাঁদের শেষ হলো না চিৎকার করতে করতে সদলবলে নেমে এল অস্ত্রধারীরা।
ডাক্তার ও অন্যান্য যারা ছিল সবাইকে ডেকে বলল, ‘ডাক্তার ফ্লেমিং কথা গোপন করছে। মুমূর্ষু প্রায় একজন লোক একা গাড়ি ড্রাইভ করে চলে যেতে পারে? আমরা এটা বিশ্বাস করি না।’
বৃদ্ধ আবু আমের বক্তা লোকটির দিকে এগিয়ে গেল। বলল, ‘ডাঃ ফ্লেমিং ঠিকই বলেছেন। আমিই সকালে লোকটিকে সংজ্ঞাহীন মুমূর্ষু দেখে আমার গাড়িতে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। আবার আমার চোখের সামনেই সে নিজে ড্রাইভ করে চলে গেল। আমার কাছেও এটা মিরাকল, কিন্তু ঘটেছে এটা।’
একটু থেমে দূরে দাঁড়ানো একজনকে কাছে ডেকে তাকে দেখিয়ে বলল, ‘এই হল গাড়ির ড্রাইভার। ড্রাইভারকে সে নেয়নি।’
‘গাড়িটার নাম্বার কত?’ চিৎকার করে উঠল অস্ত্রধারী লোকটি।
ড্রাইভার লোকটি গাড়িটার নাম্বার তাকে জানাল।
সংগে সংগেই অস্ত্রধারী লোকটি পাশের একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গোটা প্যারিসে আমাদের সবাইকে নাম্বারটি জানিয়ে দাও। পুলিশকেও জানিয়ে তাঁদের সাহায্য চাও। যাবে কোথায় সে?’
অস্ত্রধারীরা চলে গেল।
ক্রিসেন্ট ক্লিনিকের সামনে লনে তখনও কয়েকজন দাঁড়িয়ে। আহমদ মুসাকে কেন্দ্র করে যারা এসেছিল, তারাও প্রায় সকলেই চলে গেছে। হুয়ারী হাবিবও।
লনে দাঁড়ানো সবার মুখে তখনও একটা দুঃস্বপ্নের ছাপ। সবাই মৌন।
মৌনতা ভেংগে কথা বলল প্রথমে আবু আমের। বলল সে, ‘চল উপরে একটু বসি।’ কথায় তার ক্লান্তির ছাপ।
সবাই উপরে উথে এল। বসল গিয়ে ডাঃ ফ্লেমিং-এর কক্ষে।
‘এরা কারা এসেছিল বুঝলে কিছু ডাক্তার?’ বসেই মুখ খুলল প্রথমে আবু আমের। বললেন ডাক্তার ফ্লেমিংকে লক্ষ্য করে।
‘বুঝতে পারিনি। তবে আহমদ মুসার কাছে যাদের কথা শুনলাম, সেই গ্রেট বিয়ারের ভাড়া করা লোক হতে পারে এরা।’ বলল ডাঃ ফ্লেমিং।
‘কিন্তু এরা তো রুশ নয়, ফরাসি।’ বলল ডাঃ যুবায়ের।
‘গ্রেট বিয়ারের ভাড়া করা লোকও তো হতে পারে।’ বলল ফাতেমা।
‘তা হতে পারে এবং আমার মনে হয় এটাই ঘটনা।’ বলল ডাঃ যুবায়ের।
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, এত তাড়াতাড়ি জানল কি করে এবং এদের জেনে ফেলার ব্যাপারটা আহমদ মুসা জানল কি করে। এখন তো আমাদের কাছে পরিস্কার কেন তিনি তাড়াহুড়া করা চলে গেলেন।’ বলল ডাঃ ফ্লেমিং।
‘আল্লাহর হাজার শোকর যে তিনি চলে গেছেন। তিনি আমাদের অনুরোধ শুনলে যে কি হতো!’ বলল আবু আমের আবদুল্লাহ।
‘কিন্তু এমন কিছু ঘটবে তিনি তা আমাদের জানালেন না কেন?’ বলল ডাঃ ফ্লেমিং।
কথা শেষ করেই আবার সে শুরু করল, ‘ডাঃ যুবায়ের তুমি কিছু জান মনে হয়। তোমাকে কিছু তো বলেছেন তিনি।’
‘আমাকে এই বিষয়টা কিছুই জানাননি।’ বলে থামল ডাঃ যুবায়ের। তারপর চারদিক চেয়ে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে এসে বলল, ‘তিনি আমাকে বলেছিলেন হুয়ারী হাবিবকে ফলো করার জন্যে লোক পাঠাতে। উনি কোথায় কি করেন তা দেখার জন্যে। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, হুয়ারী ঔষধ কিনতে গিয়ে টেলিফোন করেছেন। তখনই তিনি চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আমার মনে হচ্ছে।’
‘তার মানে আমাদের হুয়ারী হাবিব টেলিফোনে আহমদ মুসার খবর শত্রুকে জানিয়েছেন!’ আর্তকণ্ঠে বলল ডাঃ ফ্লেমিং।
‘ঘটনা তো এটাই দাঁড়াচ্ছে।’ বলল আবু আমের আবদুল্লাহ।
‘কিন্তু বুঝতে পারছি না, হুয়ারী হাবিব সাহেবকে সন্দেহ করার হেতু কি?’ বলল ফাতমা।
‘শুনেছি, কোন অস্বাভাবিক জিনিসই আহমদ মুসার নজর এড়ায় না। নিশ্চয় আহমদ মুসা ভাই হুয়ারী হাবিবের কথা ও আচরনে অস্বাভাবিক কিছু টের পেয়েছিলেন।’
‘আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি আহমদ মুসাকে এই দৃষ্টি দিয়েছেন। আমরা তো কিছুই বুঝিনি।’ বলল আবু আমের।
‘আর একটি ব্যাপার। আহমদ মুসা ড্রাইভার সাথে নিল না কেন?’ বলল ডাক্তার ফ্লেমিং।
‘আমাদের কাছেও এটা বিস্ময়ের!’ বলল উপস্থিত সবাই।
একটুক্ষণ নীরব সবাই।
নীরবতা ভাঙল ডাঃ ফ্লেমিং। বলল, ‘হুয়ারী হাবিব সম্পর্কে আমরা কি ভাববো?’
‘বিশ্বাসঘাতক ছাড়া আর কি!’ বলল ফাতমা।
ডাঃ ফ্লেমিং-এর টেলিফোন বিপ বিপ শব্দ করে উঠল।
ডাঃ ফ্লেমিং টেলিফোন ধরেই ডাঃ যুবায়েরের হাতে তুলে দিল। বলল, ‘তোমার টেলিফোন।’
টেলিফোন ধরেই বলল, ‘জি, আমি ডাঃ যুবায়ের। ঠিক আছে দিন তাকে।’
ওপারের কথা শুনেই আনন্দে চোখ-মুখ নেচে উঠল ডাঃ যুবায়েরের। স্পিকারে হাত চাপা দিয়ে সকলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আহমদ মুসা ভাই।’
সবার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল নড়ে-চড়ে বসল সবাই।
ডাঃ যুবায়ের কথা বলল আহমদ মুসার সাথে। অস্ত্রধারীদের আসার কথা, হুয়ারী হাবিব ও ড্রাইভারের কথা – সবই বলল সে।
টেলিফোনে কথা শেষ করে টেলিফোন রাখতেই সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠে ‘কেমন আছেন উনি, কি বললেন তিনি’, ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন করে বসল।
ডাঃ যুবায়ের বলল, ‘উনি ভাল আছেন। গাড়ি আজ বেলা তিনটায় শিন নদীর ১১ নাম্বার ব্রীজের দক্ষিণ প্রান্তে থাকবে, তবে তা পুলিশের হাতে পড়াই ভাল……।’
যুবায়েরকে বাধা দিয়ে তার আব্বা আবু আমের বলল, ‘থাক তোমার গাড়ির কথা, হুয়ারী হাবিবের কথা কি বলল, সেটা বল।’
‘বলছি। হুয়ারী হাবিবের চেহারা, তার কথা ও আচরণ দেখে আহমদ মুসার সন্দেহ হয়। তাকে ফলো করে সন্দেহটা প্রমাণিত হয়। আহমদ মুসার মতে যে কোন কারনেই হোক হুয়ারী হাবিব ফরাসি পুলিশের পুতুল হিসেবে কাজ করছে। তিনিই পুলিশকে খবর দেন, পুলিশের একটা মহল জানায় তা গ্রেট বিয়ারকে। তবে আহমদ মুসা বলেছেন, এ বিষয়টা নিয়ে ফ্রান্সের মুসলিম কমুনিটিতে আলোচনা না হওয়া উচিত। কমুনিটির ঐক্য কোন ভাবেই নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। নীরবে চেষ্টা করতে হবে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে।’
একটু থেমে ডাঃ যুবায়ের আবার শুরু করল, ‘ড্রাইভারকে তিনি নেননি, কারণ ড্রাইভার তাতে বিপদে পড়ত। তাকে আহমদ মুসার ঠিকানা পুলিশ অথবা গ্রেট বিয়ারকে জানাতে বাধ্য হতে হতো। সকলকে তিনি সালাম জানিয়েছেন।’
ডাঃ যুবায়ের থামল।
‘আল্লাহ তাকে আরও দীর্ঘজীবী করুন। প্যারিসের মুসলিম কম্যুনিটির ভবিষ্যৎ ভেবে যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেটাই ঠিক। বিশ্বাসঘাতক আমার মনে হয় শুধু হুয়ারী হাবিবি নন। আরও যারা আছেন, তাদের নীরবে চিহ্নিত করতে হবে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, আহমদ মুসা আমাদের দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন। আমরা সাবধান হতে পারব।’
বলে আবু আমের আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমরা চলি। ডাঃ ফ্লেমিং তোমাদের সময় আর নষ্ট করব না।’
ফাতমাও উঠে দাঁড়াল।
সালাম দিয়ে তারা পা বাড়াল দরজার দিকে।

সুস্থ হয়ে উঠেছে আহমদ মুসা।
শরীরের উপর দিয়ে তার এবার বড় একটা ধকল গেছে। অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা অনেক ঔষধ-পাতি খেতে হয়েছে তাকে। ‘সাইমুম’ – এর লোকেরা সেবা-শুশ্রূষা করেছে, বাড়ির চাকর-বাকর তো আছেই। ডোনাকে ইচ্ছা করেই আহমদ মুসা দূরে রাখতে চেষ্টা করেছে। একদিকে তার ইউনিভার্সিটির ফাইনাল পরীক্ষা, অন্যদিকে নিরুপায় অবস্থায় পর্দার সীমা লঙ্ঘিত হলেও এই স্বাভাবিক অবস্থায় আহমদ মুসা এই সীমা রক্ষা করতে চেয়েছে। ডোনাও সেটা মেনে নিয়েছে।
অসুখ অবস্থায় শুয়ে শুয়ে আহমদ মুসা যে পীড়া খুব বেশি অনুভব করেছে, সেটা হলো, প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে অনুসন্ধানের কোন ক্লুই এখন তার কাছে নেই।
সুস্থ হবার পর এ বিষয়টা তাকে আরও বেশি পীড়া দিয়েছে।
রুশ দুতাবাস ছিল গ্রেট বিয়ারের সাথে লিংকের একটা উৎস। কিন্তু মায়োভস্কির মৃত্যুর পর এ লিংক কি এখন আছে? এখনও কি ওরা রুশ দূতাবাসের উপর চোখ রাখে?
এই বিষয়টি পরখ করা এবং রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলার জন্যে আহমদ মুসা গিয়েছিল রুশ রাষ্ট্রদূতের বাসায়।
তার এই উদ্যোগকে সফল বলেই আহমদ মুসা মনে করছে।
রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলার পর আহমদ মুসার সফল আলাপ হয়েছিল ওলগার সাথেও।
মায়োভস্কির সাথে ঐ ঘটনার পর ওলগা খুবই মুষড়ে পড়েছে। অনেকটা নীরব হয়ে গেছে সে।
তবু আহমদ মুসার আসার কথা শুনে সে এসেছিল তার সাথে দেখা করতে।
আহমদ মুসা শুরুতেই শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে বলেছিল, আপনার সাহায্যের জন্যে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। সব আমি শুনেছি। সেই সাথে আপনার বিপর্যয়ের জন্যে আমি দুঃখিত।
ম্লান হেসেছিল ওলগা। মুখ নিচু করেছিল। বলেছিল, ‘ধন্যবাদ। কতটুকু আর সহযোগিতা করতে পেরেছি। আমাদের সাহায্য পৌঁছার আগেই নিজেকে আপনি মুক্ত করতে পেরেছিলেন। কনগ্রাচুলেশন আপনাকে।’
‘বাঁচার চেষ্টা সকলেই করে। থাক এসব কথা। মায়োভস্কি সম্পর্কে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি আমি?’ খুব নরম কণ্ঠে বলেছিল আহমদ মুসা।
চকিতে একবার মুখ তুলেছিল ওলগা আহমদ মুসার দিকে। আবারও ম্লান হেসেছিল। বলেছিল, ‘অবশ্যই।’
‘তাঁর সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন?’
‘তাকে আমি ভালবাসতাম। তাঁর পারিবারিক ও পেশাগত সব খবরই আমি জানি। তবে গ্রেট বিয়ারের সাথে তার সম্পর্কের ব্যাপারটা সেদিন রাতেই জানলাম।’
‘তিনি কূটনৈতিক দায়িত্বের বাইরে যাতায়াত করতেন, এমন কোন জায়গার সন্ধান কি আপনি জানেন?’
‘প্রতিদিন দেখা আমাদের খুবই কম হতো। সেই জন্যে এ ধরনের অভ্যাস সম্পর্কে বলা কঠিন। তবে একটা জায়গার কথা মনে পড়ছে। সাঁজেলিজে’র অভিজাত ‘পার্ল রেস্টুরেন্টে’ তিনি এক সময় নিয়মিত যেতেন। কিন্তু গত এক বছর ধরে ওমুখো আর হন না। আমি অনেক বলেও তাকে নিয়ে যেতে পারিনি।’
‘ওখানে কি তিনি বিশেষ কারো সাথে মিশতেন?’
‘হ্যাঁ, রেস্টুরেন্টের রেসিডেন্ট পরিচালক মিস লিন্ডা মাঝে মধ্যেই তার টেবিলে এসে বসতেন। মায়োভস্কিও তাঁর কক্ষে যেতেন।’
‘আর কারো সাথে?’
‘এমন কাউকে আমি জানি না।’
‘ধন্যবাদ। মিস লিন্ডাকে আপনার কেমন মনে হয়েছে।’
‘ক্রিমিনাল মনে হয়েছে। মায়োভস্কির সাথে তার মেশা পছন্দ করতাম না, যদিও রেস্টুরেন্টটা আমার খুব পছন্দের ছিল।’
‘পার্ল রেস্টুরেন্টে তার না যাওয়াটা আপনার কাছে কেমন মনে হয়েছে?’
‘আমাকে অবাক করত। পার্ল রেস্টুরেন্টের কথা বললেই তিনি বিমর্ষ হতেন।’
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি চলি।’
‘ওয়েলকাম।’
ওলগার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠেছিল আহমদ মুসা। খুশি হয়েছিল আহমদ মুসা ওলগার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে। পার্ল রেস্টুরেন্টের সাথে মায়োভস্কির সম্পর্কের মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ রয়েছে।
গাড়ি চলতে শুরু করেছিল। খুবই রিল্যাক্স মুডে গাড়ি চালাচ্ছিল সে। সর্বান্তকরণে সে প্রাথর্না করেছে, গ্রেট বিয়ারের লোকেরা তার পিছু নিক। তাহলে তাদের সন্ধান পাওয়ার একটা পথ হবে।
তার গাড়ি মাইল দুই যাবার পর গাড়ির রিয়ারভিউ লাইটে একটা গাড়িকে বেশ কিছুক্ষন ধরে আহমদ মুসার পিছু আসতে দেখে। তাকে ফলো করছে কি?
মনে মনে খুশি হয়েছিল আহমদ মুসা। তাকে গ্রেট বিয়ারের লোকেরা অনুসরণ করুক এটাই সে চাচ্ছিল।
এরপর রাস্তার প্রতিটি মোড়ে সে অপেক্ষা করেছিল তিন বা চারদিক থেকে আগের মতই গ্রেট বিয়ারের গাড়ি তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আহমদ মুসা এই আঘাত থেকে আত্মরক্ষা করবে। পারলে তাদের অনুসরণ করবে অথবে সংজ্ঞা হারাবার ভান করে তাদের বন্দী হিসাবে তাদের আড্ডায় ঢুকবে।
কিন্তু না, কোন মোড়েই তার গাড়ি আক্রান্ত হলো না। পেছনের গাড়ি তাকে একইভাবে অনুসরণ করেছিল। বাড়ির এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল আহমদ মুসা। বাড়ি আর বেশি দূরে নয়।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হয়েছিল গ্রেট বিয়ার তার ঠিকানা উদ্ধার করতে চাচ্ছে।
এই চিন্তা মাথায় আসার সংগে সংগেই আহমদ মুসা তার প্ল্যান পালটে ফেলেছিল। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সামনের মোড়ে গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে অনুসরণ করবে পেছনের গাড়িটাকে। শত্রু ধরতে পারলে ভাল, অনুসরণ করে শত্রুর ঘাটির সন্ধান পেলে আরও ভাল।
মোড়ে পৌঁছে আহমদ মুসা গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে অনুসরণকারী গাড়িটির পিছু নিয়েছিল।
আহমদ মুসার আশংকা হয়েছিল, সে গাড়িটিও ঘুরে আহমদ মুসার পিছু নেয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু তা হলো না। গাড়িটি স্বাভাবিক গতিতেই সামনে চলতে লাগল।
খুশিই হয়েছিল আহমদ মুসা শত্রুর গাড়িটিকে অনুসরণ করার সুযোগ পেয়ে।
কিন্তু অল্প কিছুদুর যেতেই ঘটনাটি ঘটেছিল।
একটা গাড়ি পাশাপাশি আসতে দেখে আহমদ মুসা সেদিকে অভ্যাস বসেই তাকিয়েছিল। তাকিয়েই দেখতে পেয়েছিল একটা রিভলবার উঠে আসছে। রিভলবারের নল জানালার দিকে।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা মাথে নুইয়ে স্টেয়ারিং হুইলের উপর ঝুঁকে পড়েছিল।
আর তার সাথে সাথেই একটা গুলি জানালার কাঁচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বিপরীত দিকের জানালা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসা মাথা না নোয়ালে গুলির আঘাতে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত।
আহমদ মুসার গাড়ির গতি বেঁকে গিয়েছিল। ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল পাশের লেনের গাড়িকে। মাথা নিচু রেখেই আহমদ মুসা সামলে নিয়েছিল গাড়িকে।
আহমদ মুসা একটু মাথা তুলে দেখছিল, গুলি বর্ষণকারী গাড়িটি বেশ একটু সামনে এগিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা নিজের গাড়িটিকে সামনের ঐ গাড়ির লেনে নিয়ে তার পিছু নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল আহমদ মুসা।
পরক্ষণেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয়েছিল আহমদ মুসার গাড়ির সামনের চাকায়।
হুমড়ি খেয়ে পড়ে গাড়িটা উলতে গেল।
গাড়ির ভীড় জমে গিয়েছিল। পুলিশ এসেছিল।
পুলিশই উল্টে যাওয়া গাড়ি থেকে বের করেছিল আহমদ মুসাকে।
কে একজন আহমদ মুসার গাড়িতে গুলি বর্ষণকারী গাড়ির নাম্বার পুলিশকে জানাল। পুলিশ নাম্বারটি টুকে নিতে নিতে বলেছিল, ‘ক্রিমিনালদের নাম্বার সব সময় ভুয়াই হয়ে থাকে।’
পুলিশ জিজ্ঞেস করেছিল আহমদ মুসাকে সে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে কিছু জানে কিনা। ‘না’ জবাব দিয়েছিল আহমদ মুসা।
ভ্রুর উপরে কপালের একটা জায়গা কেটে যাওয়া ছাড়া আর কোন ক্ষতি হয়নি আহমদ মুসার।
পুলিশই একটা ট্যাক্সি ডেকে আহমদ মুসাকে তুলে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘মনে হয় ওদের মতলব হত্যা করা অথবা কিডন্যাপ করা দু’টোই ছিল। কিন্তু গাড়ির ভীড় এবং পুলিশ দেখে কিছুতা এগুনর পর আবার পিছিয়ে গেছে।’
অন্যদিকে গ্রেট বিয়ারকে খুঁজে পাবার আরেকটি উদ্যোগ আহমদ মুসার ব্যর্থ হয়েছিল।
রাত ১১টায় বাসায় ফিরেছিল আহমদ মুসা। গেটে ঢুকতেই ছুটে এল দারোয়ান তার কাছে। ভীত কণ্ঠে বলল, ‘স্যার পুলিশ এসেছিল, বাড়ি সার্চ করেছে।’
‘পুলিশ এসেছিল? বাড়ি সার্চ করেছে?’
‘জি হ্যাঁ।’ বলল দারোয়ান।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়েছিল বাড়ির ভেতরে।
দেখে, বাড়ির সুটকেস, আলমারি, ড্রয়ার প্রভৃতি কোন জিনিসই আস্ত নেই। মনে হয় আতিপাতি করে তারা কি যেন খুঁজেছে।
স্তম্ভিত হয়ে আহমদ মুসা সোফায় বসে পড়েছিল। পুলিশ তার বাসায় এভাবে আসবে! আসতে পারে, কিন্তু এভাবে কি খুঁজছে তারা! আহমদ মুসার পরিচয়মূলক কোন কাগজ? হতেও পারে।
দারোয়ান, এটেনন্ডেন্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোন হদিস পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বুকের নেমপ্লেটে তাদের নাম দেখা তো দূরের কথা, পুলিশদের মুখও তারা দেখতে পায়নি। ফেল্ট হ্যাটে মুখ নাকি ঢাকা ছিল।
রাতে ভাল ঘুম হয়নি আহমদ মুসার। পুলিশ কি তাহলে তার পরিচয় জেনে ফেলেছে?
সকালে উঠেই ভীষণ একটা দুঃসংবাদ পেল আহমদ মুসা।
টেলিফোন ডোনার। কান্নায় ভেঙ্গে পড়া তার কণ্ঠ।
বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আব্বাকে কারা কিডন্যাপ করেছে।
‘কিডন্যাপ করেছে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল আহমদ মুসা।
‘আমাকেও কিডন্যাপ করতে ওরা এসেছিল। কিন্তু আমার গুলিতে ওরা চারজন মারা গেছে।’
‘চারজন মারা গেছে। ওদের লাশ?’
‘এই মাত্র পুলিশ নিয়ে গেল।’
‘পুলিশ কখন এসেছিল?’
‘ঘটনার পরপরই, টেলিফোন পেয়ে। খোদ পুলিশ কমিশনার এসেছিলেন।’
‘যারা মরেছে, তাদের চেহারা?’
‘তারা চারজনই রুশ।’
‘রুশ?’ আহমদ মুসার কণ্ঠে সীমাহীন বিস্ময়।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ডোনার বাসার দিকে ছুটল।
বাসাই গিয়ে আহমদ মুসা দেখল সেই একই দৃশ্য। ঘরের সব কিছু লন্ড-ভন্ড। পাগল হয়ে কি যেন খুঁজছে তারা।
কি খুঁজছে তারা? কে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল ডোনাকে? কেন কিডন্যাপ করেছে তার বৃদ্ধ আব্বাকে?
সোফায় বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে এসব কথাই ভাবছিল আহমদ মুসা।
সামনের সোফায় বসে রুমাল দিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছছিল ডোনা।
মোবাইল টেলিফোনটি বেজে উঠল আহমদ মুসার।
টেলিফোন ধরল।
জেনেভা থেকে মিঃ গটেফের টেলিফোন।
‘আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন মিঃ গটেফ, আপনারা?’ কথা শুরু করল আহমদ মুসা।
‘সবাই আমরা ভাল। গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে। গতকাল থেকে আপনাকে ধরার চেষ্টা করছি। পাইনি।’
‘কি খবর বলুন। দ্রুত জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।’
‘সম্ভবত ৭ দিন আগে কয়েকটি কাগজে একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম। বিজ্ঞাপনটি প্রচার করেছেন প্রিন্সেস তাতিয়ানার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রিন্সেস ক্যাথারিন। বিজ্ঞাপনে তাতিয়ানাকে জরুরী প্রয়োজনে অবিলম্বে একটি পোস্ট বক্স নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। গতকাল বিকেলে আমি ভয়াবহ খবর পেলাম। প্রিন্সেস ক্যথারিনের ঐ পক্ষ ব্লাক ক্রস ও জেনেভা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে প্রিন্সেস তাতিয়ানা নিহত হয়ার সময়ের গোটা ভিডিও টেপ হস্তগত করেছে। ব্লাক ক্রস – এর ষড়যন্ত্র ও অপরাধ আড়াল করাক জন্যে তারা এই খবর সংবাদপত্রে যেতে দেয়নি।’
খবরটা চমকে দিল আহমদ মুসাকে। একটি ঢোক গিলে সে বলল, ‘আপনাদের কোন সমস্যা হয়নি তো? কোন বিপদ হয়নি তো আপনাদের?’
‘ও ভিডিওতে আমাদের পাবে না। আমরা ভাবছি আপনার কথা। ভিডিও তো সব প্রকাশ করে দিল।’
আহমদ মুসা মিঃ গটেফের সাথে কথা শেষ করে টেলিফোনটা সোফায় ছুড়ে দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বলল, ‘রহস্যের জট খুলেছে ডোনা জোসেফাইন।’
চোখ মুছে সোফায় সোজা হয়ে বসে ডোনা বলল, ‘কোন রহস্য?’
‘আমার বাসায় ও তোমাদের বাসায় গত রাতে এসেছিল গ্রেট বিয়ারের লোকেরা। হতে পারে তাদের সহযোগী রূপে এসেছিল ব্লাক ক্রসেরও কেউ।’
‘তারা কেন আসবে আমাদের বাড়িতে?’
‘তাতিয়ানার আংটি এবং তার ডায়েরীর সন্ধানে।’
‘কেন ভাববে তারা যে ওগুলো এখানে পাওয়া যাবে?’
‘যে ঘরে আমি বন্দী ছিলাম, যে ঘরে তাতিয়ানা নিহত হয়, সে ঘরের সবকিছু ভিডিও হয়েছে ব্লাক ক্রসের গোপন ক্যামেরায় এবং সেটা পুলিশের হাতে পড়ে। পুলিশের কাছ থেকেই উদ্ধার করেছে গ্রেট বিয়ার। সে ভিডিওতে তুমি আছ এবং সব কথাই আছে।’
‘ও আল্লাহ! তাহলে আংটি