২৪. জারের গুপ্তধন

চ্যাপ্টার

তাল্লিন বিমানবন্দর। তাল্লিন এস্টোনিয়ার রাজধানী।
ফিন উপসাগরের তীরে দাঁড়ানো তাল্লিন একগুচ্ছ সাদা গোলাপের মত সুন্দর ও স্নিগ্ধ শহর।
লাউঞ্জের জানালা দিয়ে ফিন উপসাগরের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা পেত্রভ বলল, ‘এই তাল্লিন আবার রাশিয়ার হবে শেখভ। রাশিয়ার কু-সন্তানরা এদের স্বাধীনতা দেয়ার নামে রাশিয়ার অঙ্গচ্ছেদ করেছে।’
‘যদি আমাদের আইভান দি টেরিবল ক্ষমতায় আসে তাহলেই।’ বলল শেখভ।
‘তাতো বটেই। কেরনস্কীর উত্তরসূরী কেরনস্কী জুনিয়রদের গণতন্ত্র শুধু রাশিয়াকে ধ্বংস করার জন্যেই। রুশ সাম্রাজ্য থেকে পনেরটি অংশ আগেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে। চেচনিয়াও গেল। তারপর আরও যাবে। সুতরাং…।’
কথা শেষ না করেই থেমে গেল পেত্রভ। হেলসিংকি থেকে আসা একটা বিমান ল্যান্ড করছিল তাল্লিন বিমানবন্দরে। সে দিকেই চোখ গিয়েছিল তার।
পেত্রভ এবং শেখভ দু’জনেই গ্রেট বিয়ারের গোয়েন্দা অফিসার। ওরা মোতায়েন ছিল তাল্লিনে। মস্কোর গ্রেট বিয়ার হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে ওরা দু’জনেই যাচ্ছে মিনস্কে। মিনস্ক থেকে পেত্রভ যাবে ব্রাডনো এবং শেখভ যাবে বিরেস্টে। দু’টিই পোল্যান্ড বর্ডারে রাশিয়ার সীমান্ত শহর। যতগুলো রেল ও সড়ক পথে আহমদ মুসা রাশিয়া প্রবেশের চিন্তা করতে পারে, তার মধ্যে এ দু’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে মস্কো পৌঁছবার এ দু’টিই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। গ্রেট বিয়ার কর্তৃপক্ষ এ দু’টি প্রবেশ পথে তাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্যেই তাদেরকে সেখানে পাঠাচ্ছে।
সময়ের ঘণ্টা দুয়েক আগে তারা বিমানবন্দরে এসেছে তাদের সামরিক বসকে অভ্যর্থনা জানাতে। গ্রেট বিয়ারের শীর্ষ অপারেশন চীফ নিকোলাস বুখারিন আসছে হেলসিংকি থেকে তাল্লিনে এস্টোনিয়ার গোয়েন্দা চীফের সাথে কথা বলার জন্যে। গ্রেট বিয়ার এস্টোনিয়ার গোয়েন্দা বিভাগের সহযোগিতা চায় আহমদ মুসার উপর চোখ রাখার জন্যে। পেত্রভ ও শেখভ বুখারিনকে স্বাগত জানাবার পর তারা মিনস্ক যাত্রা করবে।
যাত্রীরা ইমিগ্রেশন এরিয়া থেকে ডিপারচার লাউঞ্জে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
বেরিয়ে এল নিকোলাস বুখারিন।
পেত্রভ ও শেখভ এগিয়ে গিয়ে স্যালুট দিল বুখারিনকে। বলল, ‘ওয়েলকাম জেনারেল।’
‘আপনাদের প্লেনের কত দেরি?’ জিজ্ঞেস করল বুখারিন।
‘অনেক সময় আছে। এখনও দেড় ঘণ্টার মত বাকি।’ বলল পেত্রভ।
‘চল, আমরা একটু বসি। কথা আছে।’ বলে বুখারিন লাউঞ্জের একটা সোফার দিকে এগোলো।
বুখারিন ও শেখভ আগেই গিয়ে বসেছিল সোফায়। পেত্রভও বসল বুখারিনের পাশে। বসে সামনের দিকে চাইতেই একজন যাত্রীকে দেখে তার উপর তার চোখটা আঠার মত আটকে গেল। মুহূর্ত কয়েক চেয়েই ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠল পেত্রভ। সে দেখল, ছোট্ট একটি ব্রিফকেস হাতে আহমদ মুসা তাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে ডিপারচার ডোরের দিকে।
বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে কখন যেন উঠে দাঁড়িয়েছিল পেত্রভ।
বুখারিন ও শেখভ অবাক হয়ে পেত্রভের দিকে তাকাল। বলল, ‘কি ব্যাপার, পেত্রভ?’
ধপ করে বসে পড়ল পেত্রভ সোফায়। ওদের দু’জনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘ঐ যে আহমদ মুসা যায়।’
বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করল একজন যাত্রীর প্রতি।
শেখভ ও বুখারিন দু’জনই শক খাওয়া মানুষের মত চমকে উঠে তাকাল লোকটির দিকে। তার উপর নজর পড়তেই তারা দু’জন বিস্ময়ে ‘থ’ হয়ে গেল। যাকে ধরার জন্যে রাশিয়ার গোটা সীমান্ত অঞ্চল তারা চষে বেড়াচ্ছে, সেই আহমদ মুসা এত কাছে!
‘ঠিক বলেছ পেত্রভ। ছবির সাথে ঠিক মিলে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই, এ আহমদ মুসাই।’ চাপা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল নিকোলাস বুখারিন।
‘ঠিক। চলুন ওকে পাকড়াও করি।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল শেখভ।
‘না, এখানে নয়। চল ওকে ফলো করি। লাউঞ্জ থেকে বেরোনোর পর ওকে পাকড়াও করতে হবে। গাড়ি রেডি তো?’
‘রেডি।’
তিনজনেই উঠল। যাত্রীদের সাথে মিশে আহমদ মুসার তিন দিক ঘিরে ওরা চলতে লাগল।
লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসা সবে তার হাতের ব্রিফকেসটা মাটিতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরতে গেছে, অমনি পেত্রভ ও শেখভ দু’পাশ থেকে দু’জন তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রিভলভারের নল পাঁজরে চেপে ধরল। পেত্রভ দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘সামনে এগোও আহমদ মুসা, কোন চালাকির চেষ্টা করো না।’
আহমদ মুসা তাদের দিকে তাকালোও না। বললো, ‘নিজেদের আস্থা এত দুর্বল কেন? দুই পাঁজরে দুই রিভলভারের পাহারা নিয়ে কোন চালাকি করা যায় না।’ আহমদ মুসার কণ্ঠ একদম স্বাভাবিক এবং ঠোঁটে হাসি।
নিকোলাস বুখারিন পাশেই দাঁড়িয়েছিল। সে বিস্মিত হয়ে তাকাল আহমদ মুসার মুখের দিকে। ভাবল সে, পাগল নাকি লোকটা! তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, বিপদটা যেন তার নয়, আমাদের।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছে।
গাড়িতে উঠল ওরা।
আগে থেকেই ড্রাইভিং সিটে বসা ছিল একজন। নিকোলাস বুখারিন উঠে বসল সামনের সিটে, ড্রাইভিং সিটের পাশে। আর পেছনের সিটে আহমদ মুসাকে মধ্যে বসিয়ে দু’পাশে বসল পেত্রভ ও শেখভ। তাদের দু’টি রিভলভার আহমদ মুসার দিকে তাক করা।
গাড়িতে বসেই ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল নিকোলাস বুখারিন, ‘সোজা সেইন্ট পিটার্সবার্গ (লেনিনগ্রাড) হয়ে মস্কো।’
গাড়ি স্টার্ট নিল।
‘কেমন লাগছে আহমদ মুসা? তুমি যে ছদ্মবেশ নাওনি, এজন্যে ধন্যবাদ।’ পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল নিকোলাস বুখারিন।
‘ছদ্মবেশ নিলে আপনাদের হাতে বন্দী হওয়ার সুযোগ কি করে পেতাম?’ খুব সহজ কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো নিকোলাস বুখারিনের। মুখ ফিরিয়ে সে আহমদ মুসার দিকে একবার চাইল। তারপর বলল, ‘তার মানে ইচ্ছা করেই আমাদের হাতে ধরা দিয়েছ?’
‘অর্থ তা-ই দাঁড়ায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু কেন?’
‘আপনাদের কোথায় খুঁজতাম, কি করে খুঁজে পেতাম?’
‘ঠিক বলনি। তোমার নার্ভ খুব শক্ত। কথা সাজাচ্ছ তুমি।’
‘যদি তা-ই হয়, ছদ্মবেশ না নেয়ার কি কারণ থাকতে পারে বলুন?’
‘কিন্তু আমাদের সাক্ষাৎ পেয়ে ধরা তো পড়লে। জান তো গ্রেট বিয়ার শত্রুদের কি করে, বিশেষ করে তোমার মত শত্রুদের?’
‘প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শত্রুর দু’জনই জেতে না। জেতে যে কোন একজন। এবার তোমরা জিতেছ।’
‘তারপর?’
‘সেটা ভবিষ্যতই বলবে।’
‘না, আমরা বলব।’
বলে নিকোলাস বুখারিন তার রিভলভারটা আহমদ মুসার দিকে তাক করে বলল, ‘এখনই এ রিভলভার কথা বলতে পারে এবং তোমার জীবন এখানেই সাঙ্গ হয়ে যেতে পারে।’
‘না, তোমার রিভলভার কথা বলতে পারে না। আমাকে হত্যা করার ক্ষমতা তোমার নেই, তোমাদের কারও নেই এই মুহূর্তে। আমাকে হত্যা করার চেয়ে রাজকীয় আংটি ও রাজকীয় ডায়েরী তোমাদের বেশি প্রয়োজনীয়।’
নিকোলাস বুখারিনের মুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। একটা জ্বলন্ত সত্য তার সামনে এসে দাঁড়াল। রাজকীয় আংটি এবং রাজকীয় ডায়েরী তাদের কাছে যতটা মূল্যবান, ততটা মূল্যবান এখন আহমদ মুসার জীবন তাদের কাছে। ও দু’টি জিনিস পাওয়ার আগে আহমদ মুসাকে তারা মরতে দিতে পারে না। বলল নিকোলাস বুখারিন, ‘এটাই তাহলে এখন তোমার শক্তির উৎস?’
‘হ্যাঁ, বলটা আমার কোর্টে। খেলাটা আমার এখতিয়ারে।’
‘কিন্তু তুমি আমাদের বন্দী। রাজকীয় আংটি এবং রাজকীয় ডায়েরী এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। একদিকে তোমার জীবন রক্ষা, অন্যদিকে ও দু’টো জিনিস আমাদের হাতে তুলে দেয়া- এ দু’টির মধ্যে তুমি তোমার জীবনটাকেই বেছে নেবে নিশ্চয়। সুতরাং বলটা আমাদের কোর্টেই।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আর আমি যদি একটা নয়, দু’টোকেই বেছে নেই?’
‘তার মানে তুমি বেঁচে যাবে এবং রাজকীয় আংটি ও ডায়েরীও দেবে না?’
‘হ্যাঁ, তা-ই।’
হাসল নিকোলাস বুখারিন। বলল, ‘কিছু সাফল্যের ঘটনা তোমাকে অতি আশাবাদীই শুধু নয়, অহংকারীও করে তুলেছে।’
‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই-এ বিজয়ের চিন্তা অহংকার নয়, খুবই স্বাভাবিক একটা মানবিক চিন্তা।’
‘অন্যায় তুমিই করেছ। আমাদের নিজেদের ব্যাপারে তুমি নাক গলিয়েছ।’
‘হাস্যকর কথা বলছ তুমি। তোমরা এবং গোটা রাশিয়া জানে, তাতিয়ানা ছিলেন ক্রাউন প্রিন্সেস। ক্রাউন প্রিন্সেস হিসেবে তিনি যে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন, সেটা পালনে আমাকে বাঁধা দিয়ে তোমরা অন্যায় করছ। এবং সেটা তোমরা করেছ কোন জাতীয় বা জনগণের স্বার্থে নয়, জঘন্য ধরনের লোভের বশবর্তী হয়ে।’
গাড়িটি অনেকক্ষণ এস্টোনিয়ার রাজধানী তাল্লিন নগরী পেরিয়ে এসেছে। চলছে এখন উঁচু-নিচু টিলায় ভরা প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে। টিলাগুলোতে পরিকল্পিত ফলের বাগান এবং মাঠে সবুজ ফসল।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই জ্বলে উঠেছিল নিকোলাস বুখারিনের চোখ। উত্তেজনায় কাঁপছিল তার ঠোঁট। আহমদ মুসার কথার তৎক্ষণাৎ সে জবাব দিল না।
গাড়ির কিছুটা পেছনে একটা হর্ন বেজে উঠল।
হর্ন শুনেই উৎকর্ণ হয়ে উঠল আহমদ মুসা। তার চোখে-মুখে আনন্দের একটা বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল।
নিকোলাস বুখারিনের ক্রুদ্ধ কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘তোমার অহংকার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আহমদ মুসা। ঠিকই বলেছ, তোমাকে হত্যা করতে পারি না, কিন্তু তোমাকে ল্যাংড়া, নুলো তো করতে পারি।’
বলে নিকোলাস তার রিভলভার ঘুরিয়ে নিচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে।
ঠিক এ সময়েই ঘনতালে তিনটি হর্ন ভেসে এল পেছন থেকে।
সাথে সাথেই আহমদ মুসার দু’টি হাত শক্ত হয়ে উঠল।
পেছনের শেষ হর্নটির শব্দ মিলিয়ে যাবার সাথে সাথেই পেছন থেকে একটা গুলির শব্দ হলো এবং সামনের টায়ার বার্স্ট হয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল গাড়িটি।
ট্রিগার টিপেছিল নিকোলাস বুখারিন। কিন্তু টায়ারে গুলি খেয়ে গাড়ির পেছনটা লাফিয়ে উঠলে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তা বিদ্ধ করেছিল পেত্রভকে।
আর গাড়ি উল্টে যাওয়ার আগেই আহমদ মুসা হুমড়ি খেয়ে পড়া শেখভের হাতের রিভলভার ছিনিয়ে নিয়েছিল।

তাল্লিন বিমানবন্দরে লাউঞ্জের যাত্রী সারিতে ডোনা জোসেফাইন আহমদ মুসার পেছনে ছিল। মাঝখানে কয়েকজন যাত্রী।
এটা ছিল আহমদ মুসারই পরিকল্পনা। প্যারিস থেকে বের হবার পর আহমদ মুসা ও ডোনা পাশাপাশি চলেনি, হোটেলের এক কক্ষে থাকেনি। চলার সময় আহমদ মুসা আগে থেকেছে। ডোনা জোসেফাইন বেশ পেছনে পেছনে চলেছে। হোটেলেও পাশাপাশি কক্ষে তারা ঘুমিয়েছে। এর দ্বারা আহমদ মুসা দু’টো জিনিস চেয়েছে। এক. ডোনা জোসেফাইনকে সন্দেহের বাইরে রাখতে এবং দুই. ডোনা জোসেফাইনকে দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে ব্যবহার করতে।
ডোনা জোসেফাইন পেছন থেকে চোখ রেখেছিল আহমদ মুসার উপর। হঠাৎ তিনজন রুশকে আহমদ মুসার পেছনে এসে অবস্থান নিতে এবং তাদের চোখ-মুখের ভাব দেখে ডোনার মনে আশংকার সৃষ্টি হলো। তারপর যখন আহমদ মুসা ওদের দ্বারা ঘেরাও, তখন ডোনার বুঝতে বাকি রইল না যে, নিশ্চয় ঐ তিনজন রুশ গ্রেট বিয়ার কিংবা রুশ সরকারের লোক।
আহমদ মুসাকে ওরা গাড়িতে তোলার পর ডোনা ছুটোছুটি করল গাড়ির জন্যে। রেডি কোন গাড়ি হাতের কাছে পেল না। যা ছিল যাত্রীরা নিয়ে নিয়েছে। এখন হয় দু’এক মিনিট ওয়েইট করতে হয়, নয়তো পার্কিং-এ গিয়ে গাড়ি জোগাড় করতে হবে। কিন্তু সে সময় তার হাতে নেই।
এ সময় আল্লাহর রহমতের মত একটা গাড়ি এসে তার সামনেই পার্ক করল। মহিলা ড্রাইভার। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। এস্টোনীয়।
‘যাবে?’ জিজ্ঞেস করলো ডোনা।
‘হ্যাঁ। কোথায়?’
‘বলছি।’ বলে ডোনা তার ব্যাগটি গাড়ির পেছনের সিটে তুলে দিয়ে সামনে উঠে বসল। বলল, ‘ঐ যে সামনে ৩৮২০৯০ গাড়িটা যাচ্ছে, তাকে অনুসরণ করুন। ঐ গাড়িতে আমার স্বামী আছেন।’
ড্রাইভার মেয়েটি খুব সুন্দরী। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। চঞ্চল চোখ। গায়ে দামি পোশাক। সে একবার ডোনার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়েই গাড়ি স্টার্ট দিল।
কিছুদূর চলার পর মেয়েটি বলল, ‘গাড়িটা বেশ জোরে চলছে। ধরব কি গাড়িটাকে?’
‘না। পেছনে থাকুন এমনভাবে যাতে সন্দেহ না করে যে, আমরা পেছনে আছি।’
আবার মেয়েটি ডোনার দিকে তাকাল। বলল, ‘আপনার স্বামী কি বিপদে পড়েছেন?’
‘একথা বলছেন কেন? ডোনা তার বিস্মিত দৃষ্টি মেয়েটির দিকে তুলে বলল।
‘ম্যাডাম, আপনার চোখে-মুখে উদ্বেগ দেখছি তাই বললাম। আবার আপনি গাড়িটাকে অনুসরণ করবেন, অথচ ধরতে চাইছেন না গাড়িটাকে। তাছাড়া গাড়িটাতে যেহেতু আপনার স্বামী রয়েছেন, তাই গাড়িটা স্বাভাবিক ভাবেই আপনার জন্যে অপেক্ষা করবে, কিন্তু তা করছে না।’
ম্লান হাসল ডোনা। বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। অনেক চিন্তা করেছেন আপনি।’
বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন আপনি। আমার স্বামী বিপদগ্রস্থ। তিনি কিডন্যাপড হয়েছেন।’
‘আপনার স্বামী কি রাশিয়ান?’
‘না।’
‘ওকে রাশিয়ানরা কিডন্যাপ করল কেন?’
‘কেমন করে বুঝলেন, রাশিয়ানরা কিডন্যাপ করেছে?’
‘রাশিয়ান ছাড়া ঐ ধরনের রাফ ড্রাইভিং কোন এস্টোনিয়ান করে না।’
‘সব রাশিয়ান কি এক রকম?’
‘তা জানি না। কিন্তু যে রাশিয়ানদের আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে চিনেছি, তারা সব শয়তানের বাচ্চা।’
একটু থামল মেয়েটি। পরক্ষণেই বলল, ‘কেন ওরা আপনার স্বামীকে কিডন্যাপ করেছে? পুলিশে জানিয়েছেন আপনি?’
‘না, পুলিশকে জানাইনি।’
‘পুলিশে এখনি বলতে পারি টেলিফোনে। বলব?’
‘না, এখন দরকার নেই।’
মেয়েটি আবার মুখ ঘুরিয়ে ডোনার দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়! বলল, ‘তাহলে আপনার পরিকল্পনা কি? শুধু কি অনুসরণ?’
গাড়ি তাল্লিন নগরীর বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বাগান শোভিত টিলা এবং ফসলের প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে গাড়ি।
‘আপাতত অনুসরণ।’ বলে একটু থামল ডোনা। বলল, ‘আমাকে ড্রাইভিং-এ বসার অনুমিত দেবেন?’
মেয়েটি বিস্মিত হয়ে তাকাল ডোনার দিকে। বলল, ‘অবশ্যই, যদি আপনার কোন উপকার হয়।’
গাড়ি থামিয়ে মেয়েটি বলল, ‘আসুন।’
মেয়েটি এসে ডোনার সিটে বসল। আর ডোনা গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে।
গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ডোনা বলল, ‘আমি ডোনা জোসেফাইন। আপনাকে কি বলব?’
‘ড্রাইভার বলাই কি যথেষ্ট নয়?’
‘ড্রাইভার হলে ড্রাইভারের এ সিট আমাকে দিতেন না।’
‘তাহলে আমি কি?’
‘তা আমি জানি না। কিন্তু নিছক ভাড়ায় খাটা ট্যাক্সি চালক আপনি নন।’
হাসল মেয়েটি। বলল, ‘আমি ‘কেলা এলভা’।’
গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল ডোনা। অকারণেই হর্ন দিল।
ব্যাপারটার দিকে মনোযোগ দিয়ে কেলা এলভা বলল, ‘আপনার হর্নের ধরনটা কিন্তু খুবই সুন্দর।’
ডোনা ঠোঁটে হাসি টেনে কেলা এলভার দিকে তাকাল। বলল, ‘আমি সামনের গাড়িটাকে থামিয়ে দিতে চাই।’
‘কিন্তু কিভাবে?’
ডোনা তার কোটের পকেট থেকে রিভলভার বের করল।
চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল কেলা এলভার। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘টায়ারে গুলি করবেন?’
‘তাছাড়া উপায় কি?’
‘কিন্তু তারপর?’
‘বলা ‍মুশকিল। আশা করি, আমরাই জিতব। আপনার কোন ভয় নেই। ওরা অ্যাকশানে আসার আগে দরকার হলে গাড়ি নিয়ে সরে পড়ার অনেক সময় থাকবে।’
‘আমি ভয়ের কথা বলিনি। জানতে চাচ্ছি আপনার পরিকল্পনা।’
‘ধন্যবাদ।’
বলে ডোনা বাঁ হাত স্টিয়ারিং হুইলে রেখে ডান হাতে রিভলভার তাক করল গাড়ির দিকে।
খুব সামনেই রাস্তাটা ‘L’ টাইপ একটা শার্প বাঁক নিয়েছে।
এমন একটা বাঁকই সর্বান্তকরণে চাচ্ছিল ডোনা। যাতে সামনের গাড়িটার সামনের টায়ার তাক করা এবং সহজে গুলিও করা যায়।
গুলি করল ডোনা।
সশব্দে টায়ার বার্স্ট করল দ্রুতগামী গাড়িটার। আর পরক্ষণেই গাড়ির পেছনটা শূন্যে উঠল এবং উল্টে গেল গাড়িটা। গড়াগড়ি খেল কয়েকটা।
ইতোমধ্যে ডোনার গাড়ি গাড়িটার কাছাকাছি এসে পড়েছিল।
গাড়ি থামাল ডোনা। পকেট থেকে পঞ্চাশ ডলার বের করে কেলা এলভার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ কো-অপারেশনের জন্যে। এই টাকাটা রাখুন। আপনি এখন গাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।’
বলে ডোনা রিভলভার হাতে নিয়েই দ্রুত গাড়ি থেকে নামল।
কেলা এলভা টাকা হাতে নেয়নি। টাকা সিটের উপরে পড়েছিল ডোনার হাত থেকে।
দ্রুত কেলা এলভাও গাড়ি থেকে নামল। তার হাতেও রিভলভার।
গাড়ি থেকে বেরিয়েই রিভলভার তাক করল ডোনার দিকে। বলল, ‘যে গাড়ির টায়ার ফুটো করে থামিয়ে দিয়েছেন, সেটা আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের গাড়ি। নিশ্চয় আপনার স্বামী আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে। কেন আমি আপনাকে আমাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করব?’
‘এস্টোনিয়ার গোয়েন্দা বিভাগে কি রুশরা চাকুরী করে?’
‘অবশ্যই না।’
‘ঐ গাড়িটা তিনজন রুশ নিয়ে যাচ্ছে।’
‘আমি বিশ্বাস করি না। গাড়িটা আমাদের।’
‘যদি গাড়িতে তিনজন রুশ থাকে?’
‘যদি থাকে এবং তারা আমাদের পক্ষের না হয়, তাহলে আমার কোন বৈরিতা থাকবে না আপনার প্রতি।’
এই সময় উল্টে যাওয়া গাড়ি থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল।
ডোনা দ্রুত বলল, ‘আসুন দেখবেন।’ বলে ডোনা দ্রুত গাড়ির দিকে ছুটল।
ডোনার দিকে রিভলভার বাগিয়ে ছুটল কেলা এলভাও।
ডোনা গাড়ির কাছে ছুটে গিয়ে উবু হয়ে থাকা গাড়ির উঁচু হয়ে উঠা জানালা দিয়ে ভেতরে তাকাল।
গাড়ি উল্টে এক পাক খেয়ে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক দিকের জানালা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
ডোনা দেখল, আহমদ মুসা একজন রুশের কাছ থেকে রিভলভার কেড়ে নিল। লোকটিও আহত। তাদের পাশেই দু’জন রুশের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে।
কেলা এলভাও এসে দাঁড়িয়েছে ডোনার পাশে।
গাড়ির ইঞ্জিন দিয়ে ধোঁয়া উঠছে।
রিভলভার কেড়ে নিয়েই আহমদ মুসা সেই রিভলভার দিয়ে গুলি করে গাড়ির উইন্ডশীল্ড ভেঙে দিল।
গাড়ির ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ডোনা।
ইঞ্জিন গাড়ির পেছনে। পেছনে থাকায় গাড়ির সামনেটা যতখানি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, পেছনে তা হয়নি। কিন্তু পুরানো গাড়ি হওয়ায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পেছনের কভার টপটি যেমন উঠে গেছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্থ কয়েলে আগুন ধরে গেছে। ফুয়েল ট্যাংকার থেকে তেল গড়িয়ে এসেছে। বাড়ছে ধোঁয়া। আগুন ফুয়েল ট্যাংকারে গেলে গোটা গাড়িই বিস্ফোরণে উড়ে যাবে।
ডোনা চিৎকার করে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বেরিয়ে এস তাড়াতাড়ি। সময় নেই।’
কিন্তু আহত নিকোলাস বুখারিন এবং আহত এস্টোনীয় ড্রাইভার আটকা পড়েছিল। আহমদ মুসা গুলি করে উইন্ডস্ক্রীন ভেঙে ফেলার পর আটকে পড়া ড্রাইভারকে বের করার চেষ্টায় তৎপর হয়ে উঠেছিল।
ডোনার পেছনে দাঁড়িয়ে কেলা এলভাও দেখছিল ব্যাপারটা।
ডোনা ছুটে এসেছিল আহমদ মুসাকে সাহায্য করার জন্যে।
আহমদ মুসা ড্রাইভারকে ভাঙা উইন্ডস্ক্রীনের পথে ডোনার হাতে ঠেলে দিয়ে এগোলো নিকোলাস বুখারিনের দিকে।
ডোনা ড্রাইভারকে বের করছে দেখে আহমদ মুসা চিৎকার করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি করো, গাড়িতে আগুন ধরে যাচ্ছে।’
কেলা এলভা পেছন থেকে এসে ডোনার সাথে লেগে গেল ড্রাইভারকে টেনে বের করার কাজে। সেও চিৎকার করে বলল, ‘সময় বেশি নেই, তাড়াতাড়ি করুন।’
গাড়ির সিট ও গাড়ির চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া বডির মাঝখানে আটকা পড়েছিল নিকোলাস বুখারিনের একটা পা।
আহমদ মুসা উবু হয়ে থাকা জানালা গুলি করে ভেঙে ফেলল।
ভাগ্য ভাল জানালার লক ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। আহমদ মুসা জানালা আনলক করে দু’পায়ে লাথি চালালো দরজায়।
দরজা আধা পরিমাণ খুলে গেল। ছাড়া পেয়ে গেল বুখারিনের পা।
মাথা ফেটে গিয়েছিল এবং বাম হাতটা ভেঙে গিয়েছিল বুখারিনের। তার ডান হাতে রিভলভার ধরা ছিল। সেটা দিয়েই দ্বিতীয় গুলি করতে যাচ্ছিল আহমদ মুসাকে। কিন্তু তার আগেই রিভলভার কেড়ে নিয়েছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা যখন তাকে টেনে বের করছিল, তখন নিকোলাস বুখারিন চিৎকার করে বলছিল, ‘আমি তোমার অনুগ্রহ চাইনি। বেঁচে থাকলে তোমাকে আমি ছাড়বো না।’
আহমদ মুসা নিকোলাস বুখারিনকে বাইরে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘আমি কোন মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী নই।’
আহমদ মুসা বাইরে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সমগ্র গাড়িটি একটা অগ্নিপিণ্ডের রূপ নিল।
অল্প দূরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা সেই কুণ্ডলী পাকানো আগুনের দিকেই তাকিয়েছিল।
ডোনা এবং কেলা এলভা এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়ালো।
‘দু’জন মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু যে দু’জন মানুষ আগুনে ছাই হয়ে গেল, তাদের হত্যা আপনিই করেছেন।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে কেলা এলভা বলল।
আহমদ মুসা কেলা এলভার দিকে তাকাল। হাসল। বলল, ‘ওয়েলকাম। দু’জনের একজনের হত্যা সেমসাইডের ব্যাপার। দ্বিতীয়জনের গুলি থেকে বাঁচার জন্যেই তাকে আমি গুলি করেছি।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আহত দু’জনের ব্যবস্থা করতে হয়। আপনি নিশ্চয় সাহায্য করবেন।’
‘ওরা আপনাকে কিডন্যাপ করেছিল। আপনার তাড়া কিসের? না কিডন্যাপের কাহিনীটা সাজানো?’ বলল কেলা এলভা।
‘আপনি কি কোন গোয়েন্দা কর্মী?’
‘আপনিও কোন গোয়েন্দার কেউ?’
‘কেন?’
‘না হলে এটা ধরলেন কি করে?’
‘না, গোয়েন্দা নই। নিজ স্বার্থে কারও পক্ষে আমি কাজ করছি না।’
‘তাহলে এসব গণ্ডগোলে কেন? না নিজেই কোন পক্ষ?’
‘না। মানুষ হিসেবে মানুষের জন্যে কাজ করছি।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বলল, ‘আহত দু’জনের কথা আমি বলেছিলাম।’
‘কিন্তু শত্রুর অবস্থা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?’
‘যুদ্ধ শেষে আহত সৈন্যরা আর শত্রু থাকে না, তারা মানুষ হয়ে যায়।’
তৃতীয়বার অবাক হলো কেলা এলভা। প্রথম অবাক হয়েছিল ডোনার কিছু কথায়। গাড়িতে আটকা পড়া শত্রুকে উদ্ধারের আকুলতা দেখে সে দ্বিতীয়বার অবাক হয়েছিল।
‘লড়াই তো শেষ হয়নি। দেখুন ওর চোখে আগুন জ্বলছে। রিভলভার কাছে থাকলে এখুনি গুলি করতো। কিংবা কাছে পেলে আপনাকে চিবিয়ে খাবে।’ নিকোলাস বুখারিনের দিকে ইংগিত করে বলল কেলা এলভা।
‘তবু তো শত্রু নিরস্ত্র, অসহায়।’
‘এমন মানবতাবাদী কেউ খুনোখুনির মত ঘটনায় যেতে পারে কি করে?’
‘মানবতাকে রক্ষার জন্যেই মানুষ নামের অমানুষদের অনেক সময় সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন।’
‘আপনি আদর্শবাদীদের মত কথা বলছেন। যাক, ঐ দেখুন, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স আসছে।’
‘আপনি জানিয়েছিলেন বুঝি?’
‘ঠিক ধরেছেন। তবে পুলিশ আপনাদের গ্রেফতার করবে না।’
‘কেন করবে না?’
‘আমি একটা অ্যাকসিডেন্টের কথা জানিয়েছি।’
অ্যাম্বুলেন্স এল। তার সাথে পুলিশের একটা গাড়ি। ড্রাইভারসহ অ্যাম্বুলেন্স কর্মী তিনজন এবং পুলিশ তিনজন।
পুলিশ তিনজন নেমে স্যালুট করল কেলা এলভাকে।
আহমদ মুসা বুঝল, মেয়েটি নিশ্চয় পুলিশ বা গোয়েন্দা অফিসার।
অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা প্রথমে ড্রাইভারকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিকোলাস বুখারিনের দিকে এগোলো।
আহমদ মুসা, কেলা এলভা এবং ডোনা কাছেই পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল।
অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা বুখারিনকে অ্যাম্বুলেন্সে নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইতোমধ্যে পুলিশ অফিসার বুখারিনের মচকে যাওয়া পা দেখে তারপর মাথার আঘাত পরীক্ষা করার জন্যে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।
হঠাৎ বুখারিন পুলিশ অফিসারের কোমরে ঝুলন্ত খাপ থেকে রিভলভার তুলে নিয়েই গুলি করল আহমদ মুসাকে।
সৌভাগ্যই বলতে হবে আহমদ মুসার। সে বুখারিনের দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসারের কাজ দেখছিল। বুখারিনকে রিভলভার কেড়ে নিতে দেখেই নিজেকে মাটির উপর ছুঁড়ে দিয়েছিল আহমদ মুসা এবং মাটিতে পড়েই গুলি করেছিল বুখারিনের হাতে।
আহমদ মুসা নিজেকে সরাতে না পারলে বুখারিনের গুলি তার উরুদেশ বিদ্ধ করতো। যথাসময়ে সরে পড়ায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো বুখারিনের গুলি। উল্টো বুখারিনের রিভলভার ধরা ডান হাত আহমদ মুসার গুলিতে বিধ্বস্ত হলো।
বিধ্বস্ত হাতের দিকে কিন্তু কোন খেয়াল নেই বুখারিনের। সে সমানে চিৎকার করতে শুরু করেছে, ‘তোমরা সবাই এ ক্রিমিন্যালকে পাকড়াও করো। এ হলো সেই কুখ্যাত আহমদ মুসা। এই মাত্র আমার দু’জন সাথীকে সে হত্যা করেছে। এর পর্বতপ্রমাণ অপরাধের সাথে সাথে সে আমাদের যুবরাণী রাজকুমারী তাতিয়ানার হত্যাকারীও। একে ধরে দিলে আমরা গ্রেট বিয়ারের পক্ষ থেকে লক্ষ ডলার পুরস্কার দেব’, ইত্যাদি।
তার কথা শুনে পুলিশ অফিসার, তিনজন পুলিশ, দু’জন অ্যাম্বুলেন্স কর্মী এবং কেলা এলভা সকলেই চমকে উঠেছিল। মুহূর্তের জন্যে তাদের মধ্যে একটা বিমূঢ় ভাবও সৃষ্টি হয়েছিল।
তাদের বিমূঢ় ভাব কেটে যেতেই দ্রুত পুলিশ অফিসারটি তার রিভলভারটি কুড়িয়ে নিল। তা দেখে অন্য দু’জন পুলিশও তাদের রিভলভারের দিকে হাত বাড়াল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে রিভলভার হাতে।
চট করে সে দু’ধাপ সরে কেলা এলভার পেছনে এসে তার মাথা বরাবর রিভলভার তাক করলো। পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘রিভলভার ফেলে দিন এবং অন্য দু’জন পুলিশকেও ফেলে দিতে বলুন।’
তিনজন পুলিশ তাদের হাত থেকে রিভলভার ফেলে দিল।
ডোনা এগিয়ে গিয়ে রিভলভারগুলো তুলে নিল। ফিরে আসছিল ডোনা।
আহমদ মুসা বলল, ‘পুলিশ অফিসারটির কাছে ওয়্যারলেস সেট আছে ডোনা।’
বলেই পুলিশ অফিসারটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ফেলে দিন ওয়্যারলেস সেটটি।’
পুলিশ অফিসারটি একবার কেলা এলভার দিকে তাকাল। তারপর পকেট থেকে বের করে ছুঁড়ে দিল ওয়্যারলেস সেটটি।
ডোনা ওয়্যারলেস সেটটি কুড়িয়ে ফিরে এল আহমদ মুসার কাছে।
‘ধন্যবাদ।’ ডোনাকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা। তারপর বলল কেলা এলভাকে, ‘চলুন ম্যাডাম আপনার গাড়িতে।’
কেলা এলভা একবার মুখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। এবং হাঁটতে শুরু করল গাড়ির দিকে।
কেলা এলভা এবং ডোনাকে পেছনের সিটে বসাল। আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসার আগে গুলি করে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ির একটি করে টায়ার নষ্ট করে দিল।
কেলা এলভা সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘আহতদের হাসপাতালে নেবার পথ বন্ধ করে দিলেন?’
‘না, দেরি করালাম মাত্র। বাড়তি টায়ার লাগিয়ে অল্পক্ষণ পরেই যাত্রা করতে পারবে।’
‘কেন দেরি করালেন?’
‘আমি চাই না তারা পিছু নিক।’
‘বুঝেছি।’ কেলা এলভার চোখে সপ্রশংস দৃষ্টি।
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দেবার আগে পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে পেছন দিকে তাকিয়ে ছুঁড়ে দিল কেলা এলভার কোলে। বলল, ‘আপনার রিভলভার।’
রিভলভারের দিকে একবার তাকিয়ে কেলা এলভা নিজের পকেটে হাত দিল। রিভলভার পেল না। বিস্ময় ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘আমার পকেট থেকে রিভলভার কিভাবে আপনার কাছে গেল?’
‘যখন আমি আপনার পেছন থেকে রিভলভার তাক করি আপনার মাথায়, তখনই আপনার পকেট থেকে রিভলভার তুলে নেই। আপনি খেয়াল করেননি, মনোযোগ অন্যদিকে থাকার কারণে।’
‘নেয়ার পর রিভলভার আবার ফেরত দিচ্ছেন কেন?’
‘অন্যদের নেয়া হয়েছে, তাই আপনারও নেয়া হয়েছিল। অন্যরা এখানে নেই, তাই আপনারটা ফেরত দেয়া হলো।’
‘তার মানে আমাকে আপনাদের কোন ভয় নেই! কেন?’
‘ভয় নেই তা নয়, তবে বিদেশে যখন এসেছি, তখন কোথাও না কোথাও একটা আস্থার স্থান আমরা অবশ্যই খুঁজে পেতে চাইব।’
‘রিভলভার উঁচিয়ে কি এ আস্থা কেউ অর্জন করতে পারে?’
‘সে জন্যেই তো আপনার রিভলভার ফেরত দিলাম।’ ঈষৎ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘আমার ধারণার চেয়েও আপনি বুদ্ধিমান। কিন্তু আমার লোকদের হেনস্থা করে, আমাকে রিভলভারের মুখে ধরে এনে আপনি কোন সাহায্যের আশা করতে পারেন না। নিকোলাস বুখারিন বললেই কি আমরা আপনাকে গ্রেফতার করতাম মনে করেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আপনারা আমার কোন ক্ষতি করবেন বলে আমি রিভলভার, ওয়্যারলেস সেট কেড়ে নিয়ে ও গাড়ির টায়ার নষ্ট করে এবং আপনাকে ধরে এনে আপনাদের কষ্ট দিতে চাইনি। আসলে আপনাদেরকে একটা বিপদ থেকে আমি বাঁচিয়েছি।’
‘কেমন?’ কেলা এলভার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘আমি যদি কিছু না করতাম, তাহলে আমাদেরকে গ্রেফতার করতে হতো আপনাদের।’
‘কেন?’
‘গ্রেফতার না করলে আমাদের ছেড়ে দেয়ার দায়ে আপনারা অভিযুক্ত হতেন। গ্রেট বিয়ার, এমনকি রুশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ আসতো আপনাদের উপর। সুতরাং, আমি যা করেছি, তাতে আপনারাও বেঁচেছেন, আমরাও বেঁচেছি।’
‘বুঝতে পারছি মিঃ আহমদ মুসা, কেন আপনি অজেয়। কিন্তু আপনারা বেঁচে গেছেন মনে করবেন না। আপনি পুলিশ অফিসারের ওয়াকিটকি নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আসল ওয়্যারলেস তার পকেটেই রয়ে গেছে।’
‘ধন্যবাদ এই মূল্যবান ইনফরমেশনের জন্যে। আপনি আমাদের পাশে থাকা পর্যন্ত আমাদের কোন চিন্তা নেই।’ বলল আহমদ মুসা গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিতে দিতে।
‘আমি কি আপনাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি?’ বলল কেলা এলভা অনেকটা শক্ত কণ্ঠে।
‘প্রতিশ্রুতি দেননি। কিন্তু আমরা আপনার সাহায্য পাব।’
আহমদ মুসা তার গাড়ির স্পীড বাড়ানোর সাথে সাথে গাড়িটি একেবারে অ্যাবাউট টার্ন করে পুব দিকে যাওয়া শুরু করল।
‘কি ব্যাপার, কোথায় যাচ্ছেন?’
‘পূর্ব দিকে।’
‘সেতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আপাতত তারতু, তারপর কালান্তি।’
‘তারপর লেকের পথে রাশিয়ায় প্রবেশ?’ বলল কেলা এলভা।
‘ঠিক বলেছেন।’
চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে কেলা এলভার। আহমদ মুসার ক্ষমতা সম্পর্কে সে অবহিত। কিন্তু একটি ভিনদেশের মানচিত্র সম্পর্কে তার এত স্বচ্ছ ধারণা এবং এমন দ্রুত এমন একটি রুটের সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে! অনেক এস্টোনীয় নাগরিকই জানে না যে, রাশিয়ায় অবৈধ প্রবেশের এটাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। লেক ‘পাইপাস’ অনেকটাই নির্জন। পশ্চিম তীরের উত্তরাংশের একটা অংশ ছাড়া লেক পাইপাসের গোটা তীরই সাধারণ ব্যবহারের অযোগ্য। রুশ পূর্ব তীরে কোন নগর-নগরী তো দূরে থাক, রাস্তাঘাটও গড়ে উঠতে পারেনি।
‘সত্যিই আমি চমৎকৃত। রাশিয়ায় অবৈধ প্রবেশের সবচেয়ে উত্তম পথ বেছে নিয়েছেন। লেক ‘পাইপাসে’ জেলেদের নৌকা ভাড়া করে আপনি একদম নির্বিবাদে রাশিয়ার লেক পুশকভে প্রবেশ করতে পারেন। তারপর লেক পুশকভের তীরে উঠে বা পুশকভ নগরী হয়ে রাশিয়ার যেথা ইচ্ছা যেতে পারেন।’
একটু থামল কেলা এলভা। তারপর বলল, ‘আমার প্রশ্ন দু’টি, এক, এই গোপন পথের কথা আপনি জানলেন কি করে? দুই, আপনার মত আদর্শবাদী লোক অবৈধ প্রবেশের মত দুর্বল ভিত্তি নিয়ে রাশিয়ায় যাচ্ছেন কেন?’
আহমদ মুসা হাসল। স্টিয়ারিং-এ দু’টি হাত এবং চোখ সামনে প্রসারিত রেখেই ধীরে ধীরে বলল, ‘সাইবেরিয়ার রুশ বন্দী শিবির থেকে পলাতক এস্টোনীয় লেখক এমাস্তে এলভার লেখা ‘দি লং নাইট’-এর ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি। তাতে এই পথের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এই পথেই এমাস্তে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়েছিলেন।’
কেলা এলভার চোখে আনন্দের স্ফূরণ। বলল, ‘আপনি এমাস্তে এলভার বই পড়েছেন! ভালো লেগেছে আপনার?’
‘সব মানুষেরই ভালো লাগার কথা। চিরন্তন এক কাহিনী।’
‘বইটির কোন দিক আপনার ভালো লেগেছে?’
‘এস্টোনীয় জনসংখ্যার এক-দশমাংশ মানুষ সাইবেরিয়ার সোভিয়েত বন্দী শিবিরে কিভাবে হারিয়ে গেল, তার এক মর্মন্তুদ চিত্র গ্রন্থটি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে একজন পরাধীন দেশপ্রেমিকের অন্তর্জ্বালার দিকটি।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। ক্ষুদ্র এক জাতির সাহিত্য আপনি এইভাবে পড়েছেন?’
‘সংখ্যার কারণে কোন জাতি ক্ষুদ্র হয় না। হৃদয়ের কারণে ক্ষুদ্র জনসংখ্যার জাতিও বিশ্বে বড় আসন পেতে পারে।’
‘সব জাতির ক্ষেত্রেই কি আপনার এই কথা প্রযোজ্য?’
‘হৃদয়বৃ্ত্তি একটা মানবিক ধর্ম, যদি তা প্রবৃত্তির অমানবিক কোন চাহিদা দ্বারা কলুষিত না হয়। এই মানবধর্ম স্রষ্টার দেয়া একটা নিয়ামাত। এর কোন দেশ-কাল-পাত্র নেই।’
‘আপনি দেখছি পরম মানবতাবাদী, উদার। কিন্তু শুনেছি যে, চরম সাম্প্রদায়িক আপনি?’
‘তারা ঠিকই বলেছে, স্রষ্টা যতটুকু সাম্প্রদায়িক, আমি ততটা সাম্প্রদায়িক অবশ্যই।’
হাসল কেলা এলভা। বলল, ‘কথাটা মজার, কিন্তু বুঝলাম না।’
‘স্রষ্টা তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে রেখেছেন। কারও পক্ষে এই নিয়মের অন্যথা করার সুযোগ নেই। কোন উপায় নেই অসাম্প্রদায়িক বা ‘আনলফুল’ হবার। সুতরাং স্রষ্টা অসাম্প্রদায়িক নন, আমিও নই।’
‘কিন্তু মিঃ আহমদ মুসা, স্রষ্টার সেই আইন বা প্রকৃতিগত দেহতাত্ত্বিক ও বস্তুগত চরিত্র নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ কোথাও নেই। অভিযোগ এসেছে মানুষের স্বাধীন জীবন পরিচালনার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ নিয়ে।’
‘আচ্ছা বলুন তো, নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয় কোথায়?’
‘যেখানে আইন ভংগের সম্ভাবনা থাকে, ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, কোন ধরনের সংকটের সম্ভাবনা থাকে, ইত্যাদি।’
‘তাহলে মানুষের জীবন পরিচালনায় এসব কিছুই আছে কিনা?’
‘আছে, অবশ্যই। এ জন্যেই তো রাষ্ট্র, আইন, সংবিধান- এসব কিছু।’
‘রাষ্ট্র, আইন ও সংবিধানের নিয়ন্ত্রণ স্থান, কাল ও পাত্রের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। এ নিয়ন্ত্রণ সংকীর্ণ গণ্ডীর ও সীমাবদ্ধ বুদ্ধির বলেই এই পরিবর্তন ঘটে। অথচ মানুষের জীবন একটা অব্যাহত বিষয়। এর জন্যে একটা কালোত্তীর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে কিনা?’
‘সত্যিই কি প্রয়োজন আছে?’
‘জীবের বিশেষ করে মানুষেরও বস্তুগত দিক নিয়মের অধীন বলে, তার জীবন পরিচালনা একটা স্থায়ী নিয়মের অধীন হবে না কেন?’
‘মানুষের দেহগত দিকের মত তার জীবন পরিচালনাকে তাহলে একটা অলংঘনীয় বা স্থায়ী নিয়মের অধীন করে দেয়া হয়নি কেন?’
‘মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি দেয়া হয়েছে বলেই এবং তাকে ভালো-মন্দ পার্থক্য করার বিচারবুদ্ধি দেয়া হয়েছে বলেই।’
‘যদি তা-ই হয়, তাহলে মানুষের জীবন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ তার বিবেক ও বিচারবুদ্ধির উপর ছেড়ে দেয়াই তো উচিত। খোদায়ী নিয়ন্ত্রণের আবার ব্যবস্থা কেন?’
‘মানুষ অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে খুব অল্পই জানে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছুই জানে না। মানুষের এই সীমিত জ্ঞান নির্ভর বিচারবুদ্ধির পক্ষে নিজেদের জীবনকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে কল্যাণ ও মুক্তির পথে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সমুদের দিক নির্ণয়ের জন্যে যেমন আকাশের তারা, কম্পাস ও বাতিঘরের প্রয়োজন, স্থলপথে যেমন ম্যাপ ও রোড সাইনের প্রয়োজন হয়, তেমনি মানুষের আদর্শ, সৃষ্টি ও লক্ষ্যগত জীবন পরিচালনার জন্যে দিক-নির্দেশিকার প্রয়োজন আছে, যার অভাবে মানুষ লক্ষ্যচ্যুত হয়ে অশান্তি-অবিচার, জুলুম-অত্যাচারের ধ্বংসকরী পাঁকে নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারে। এই দিক-নির্দেশিকারই নাম খোদায়ী জীবন বিধান।’
‘মিঃ আহমদ মুসা, জানতাম আপনি বিপ্লবী, কিন্তু এখন দেখছি আপনি দার্শনিক বা মিশনারীও।’
একথা বলে একটা দম নিয়েই বলল কেলা এলভা, ‘খোদায়ী জীবন বিধান যাকে বলছেন, তাদের মধ্যেই কি ঝগড়া কম! এর কি করবেন?’
‘মানুষের বিচারবুদ্ধি যদি স্বাধীনভাবে কাজ করে, তাহলে এ ঝগড়া বাঁধতে পারে না।’
‘কেমন করে?’
‘খোদায়ী জীবন-পদ্ধতি হওয়ার দাবিদার ধর্মগুলোর মধ্যে বিচারবুদ্ধির রায় অনুসারে একমাত্র ইসলাম ছাড়া অন্য কোনটাই আজকের মানুষের জীবন পদ্ধতি হওয়ার উপযুক্ত নয়।’
‘এটা তো আপনার কথা।’
‘আমার নয়, বিচারবুদ্ধির রায়ের কথা। কি বল মারিয়া জোসেফাইন?’ সমর্থনের জন্যে আহমদ মুসা চাইল ডোনার দিকে।
‘স্ত্রী তো স্বামীকে সমর্থন করবেই।’ হেসে বলল কেলা এলভা।
‘ও শুধু স্ত্রী নয়। ও একজন সচেতন ইউরোপীয়।’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ খুলল ডোনা। বলল, ‘আমার নিজের কথা বলব না, আজকের পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের নিরাপত্তা ও বিজয় সর্ম্পকে বলতে গিয়ে উল্লেখ করছেন, আধুনিক যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব দেয়া ও আধুনিক মানুষের প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের নেই।’
‘যেহেতু এ বিষয়ের উপর আমার পড়াশোনা নেই, তাই আমি কিছু বলব না। তবে আমি একটা বিষয়ে খুশি, আহমদ মুসা লেনিন, মাও সেতুং, হো চি মিন, চে গুয়েভারা, ক্যাস্ট্রো প্রমুখ বিপ্লবীর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। যিনি ভয়ের বদলে আশার উদ্রেক করেন, যিনি রহস্যময় পূজ্য ব্যক্তিত্ব হবার বদলে বন্ধু হতে পারেন।’
কথা শেষ করেই কেলা এলভা সামনে একটা গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিঃ আহমদ মুসা, মনে হয় সামনে বিপদ আছে।’
‘কেন একথা বলছেন?’
‘সামনে যে গাড়িটা আসছে, ওটা এস্টোনীয় গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ পেট্রোল কার। বিশেষ মিশন ছাড়া এ গাড়িগুলোকে রাস্তায় ছাড়া হয় না।’
‘তাহলে?’
কেলা এলভা উঠে দাঁড়িয়ে স্টিয়ারিং হুইলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আপনি পাশের সিটে, তারপর পেছনে চলে আসুন। আমি ড্রাইভিং-এ বসছি।’
কেলা এলভা ড্রাইভিং সিটে বসে হাসতে হাসতে বলল, ‘এভাবে ড্রাইভিং সিট ছেড়ে দেয়া কি ঠিক হলো মিঃ আহমদ মুসা?’
‘ড্রাইভিং সিট ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু আপনার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেইনি।’ বলল আহমদ মুসাও হাসতে হাসতে।
সামনের গাড়িটি এসে পড়েছে। হর্ন বেজে উঠল সামনের গাড়ি থেকে।
সংগে সংগে কেলা এলভাও হর্ন বাজাল একই নিয়মে, ঠিক আগের হর্নের আক্ষরিক অনুসরণ।
হর্ন বাজিয়েই থামিয়ে দিয়েছিল গাড়ি কেলা এলভা।
সামনের গাড়িটারও ড্রাইভিং উইনডো কেলা এলভার পাশাপাশি এসে দাঁড়াল।
সামনে থেকে গাড়ির ড্রাইভার হাত তুলে এস্টোনীয় ভাষায় বলল, ‘আমি সার্কেল ইন্সপেক্টর কেভিন।’
‘আমি সেন্ট্রাল ইন্সপেক্টর কেলা এলভা।’
চমকে উঠল ইন্সপেক্টর কেভিন। বলল, ‘এই যে খবর এল, আহমদ মুসা আপনাকে পণবন্দী করে পালিয়েছে? নির্দেশ এসেছে সবগুলো রাস্তা ক্লোজ করার।’
‘পালিয়েছে আহমদ মুসা। খুঁজছি আমিও তাকে।’
‘তাহলে জানিয়ে দিন এ খবরটা।’
‘আমার তো ওয়্যারলেস নেই।’
‘বুঝেছি। আমি জানিয়ে দিচ্ছি। ওরা কারা পেছনে?’
‘ফরাসী দম্পতি। আমার বন্ধু।’
বলে কেলা এলভা গাড়িতে স্টার্ট দিল।
স্যালুট দিল হাত তুলে ইন্সপেক্টর কেভিন।
ছুটে চলল কেলা এলভার গাড়ি।
‘ধন্যবাদ আপনাকে।’ পেছন থেকে কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ দরকার নেই। এবার কি করব বলুন।’ বলল কেলা এলভা।
‘কিন্তু তার আগে বলুন, অবস্থা কি দাঁড়াল। আমরা আপনাকে ফেলে পালিয়েছি এবং আপনি একটি ফরাসী দম্পতিকে পথ থেকে কুড়িয়ে আমাদের অনুসরণ করছেন, এই তো?’
‘জ্বি, হ্যাঁ।’
‘কিন্তু আপনাকে ফেলে আপনার গাড়ি নিয়ে আমার পালানোর কথা। আপনি গাড়ি পেলেন কি করে?’
‘এটা একটা প্রশ্ন বটে।’ একটু চিন্তা করল কেলা এলভা। তারপর বলল, ‘আমার গাড়ি লক করে চাবি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এই ফরাসী দম্পতির অধিকতর দ্রুতগামী নতুন গাড়ি নিয়ে আপনি পালিয়েছেন। চাবি খুঁজে পেতে বিলম্ব হয়। তারপর আপনাকে আমরা অনুসরণ করছি।’
‘ধন্যবাদ। আপনার কাহিনী সুন্দর। আর একটা কথা, ফরাসী দম্পতির গাড়ির কি পার্টিকুলারস পুলিশকে দেবেন?’
‘অযথা এই প্রশ্ন তুলছেন। পুলিশের কাছে জওয়াবদিহির পর্যায়ে অবশ্যই আমি নিজেকে নিয়ে যাবো না।’
কথা শেষ করেই কেলা এলভা আবার সেই পুরানো প্রশ্ন করল। বলল, ‘বলুন এখন কি করণীয়। সামনে শহরের প্রবেশমুখে পুলিশ সদলবলে আছে নিশ্চয়।’
‘আপনার কাহিনী দ্বিতীয় জায়গায় বলা আর ঠিক মনে করছি না। আপনার গাড়ির নেমপ্লেট উল্টে দিলে কেমন হয়?’
কেলা এলভা হাসল। বলল, ‘উল্টো দিকে একটা ভুয়া নাম্বার আছে।’
‘আল্লাহকে ধন্যবাদ। গাড়ি তাহলে থামান মিস…।’
বলতে গিয়ে থেমে গেল আহমদ মুসা। বলল পরক্ষণেই, ‘মাফ করবেন, আপনি মিস না মিসেস?’
কেলা এলভার হাস্যোজ্জ্বল মুখ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল।
গাড়ি থামাল সে। বলল, ‘ও প্রশ্ন থাক। গাড়ির নেমপ্লেট পাল্টে দেব?’ কেলা এলভার কণ্ঠস্বর হঠাৎ যেন ভিজে গেছে।
আহমদ মুসা এবং ডোনা কারোরই ব্যাপারটা দৃষ্টি এড়াল না।
কেলা এলভা গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে।
আহমদ মুসাও নামল। বলল, ‘নেমপ্লেট আমিই পাল্টে দিচ্ছি, আপনি বসুন।’
ভারি হয়ে ওঠা মুখে হাসি টানার চেষ্টা করে বলল কেলা এলভা, ‘আমার গাড়ি, কাজটা আমিই দ্রুত পারব।’ বলে কাজে লেগে গেল কেলা এলভা।
আহমদ মুসাও গাড়ির পেছনের নেমপ্লেট উল্টে দেয়ার কাজে লেগে গেল।
কাজ শেষে কেলা এলভা আহমদ মুসার সামনে এসে বলল, ‘এবার?’ কেলা এলভার মুখে হাসি। অনেকখানি সহজ হয়ে উঠেছে সে।
‘আপনি পেছনে ডোনার পাশে বসুন। আমি ড্রাইভিং-এ বসব।’
‘কিন্তু…।’
তাকে বাঁধা দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘এখনি সব বুঝবেন। আপনি বসুন।’
বলে আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
কেলা এলভাও পেছনের সিটে গিয়ে বসল।
‘ডোনা, ব্যাগ থেকে পাগড়ি ও শিখের দাড়িটা দাও।’
ডোনা ব্যাগ থেকে শিখের পাগড়ী ও দাড়ি বের করে আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিল।
আহমদ মুসা এগুলো নিয়ে পরতে পরতে বলল, ‘ডোনা, ওকে তোমার পাগড়ী ও দাড়িটা বের করে পরিয়ে দাও।’
পাগড়ী ও দাড়ি পরতে গিয়ে কেলা এলভা হাসতে হাসতে বলল, ‘বুঝেছি এবার। আমি ও মিসেস ডোনা হলাম শিখ দম্পতি। আর আহমদ মুসা সাহেব হলেন শিখ ড্রাইভার। কিন্তু আমাদের দেশে শিখ ড্রাইভার তো নেই বললেই চলে।’
‘তা ঠিক। তবে জন দশেক তো আছে।’
চোখ কপালে তুলে কেলা এলভা বলল, ‘জানেন আপনি এ তথ্যও?’
‘এটা কি খুব বড় তথ্য? হেলসিংকিতেই এটা আমি পেয়েছি।’
‘ঠিক তাই। আপনি যে আহমদ মুসা, একথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।’
কেলা এলভার কথা এড়িয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘এই ছদ্মবেশ কোন কাজ দেবে বলে মনে করেন?’
‘না দেবার কারণ দেখি না। তবে পুলিশকে প্রকৃতপক্ষে কি নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমি জানি না।’
গাড়ি আহমদ মুসার ছুটে চলল।
খুব সামনেই ‘পেদে’ নামের একটা বড় শহর।