২৪. জারের গুপ্তধন

চ্যাপ্টার

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার লাল পতাকা নাড়ছে।
আহমদ মুসা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল সামনের পরিস্থিতিটা।
বড় একটি পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। তার সমান্তরালে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে একটা পুলিশ জীপ। একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বসে আছে জীপে। পুলিশ ভ্যান, জীপ ও রাস্তায় দাঁড়ানো মোট পুলিশ দশ-বারো জন।
আহমদ মুসা গাড়ি নিয়ে দাঁড় করাল জীপটির সামনে রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর। জীপ এবং পুলিশ ভ্যান দুটোই তার ডান পাশে থাকল।
আহমদ মুসার গাড়ি থামতেই ছুটে এল জীপে বসা পুলিশ অফিসারটি। ড্রাইভিং উইনডো’তে এসে পুলিশ অফিসারটি বলল, ‘সিংজী, আপনি কোত্থেকে আসছেন?’
‘তাল্লিন।’
‘সাথে ওরা কে?’
‘একটা শিখ দম্পতি।’
‘কোথায় যাবেন?’
‘তারতু।’
‘একটু থানা হয়ে যেতে হবে সিংজী।’
‘কেন?’
‘নির্দেশ হয়েছে, সব বিদেশীকেই থানার সাথে কথা বলে যেতে হবে। সার্চ করা ও কথা বলার পর চলে যাবেন।’
‘কিন্তু আমি তো এক মিনিট সময়ও দিতে পারবো না।’
‘পারতে হবে সিংজী, এটা নির্দেশ।’
‘এটা অন্যায়।’
‘দুঃখিত সিংজী।’ বলে পুলিশ অফিসারটি পাশে দাঁড়ানো পুলিশের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি সিংজীকে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে থানায় চল। আমি সিংজীকে নিয়ে আসছি।’
আহমদ মুসা বলল, ‘ঠিক আছে অফিসার, যাচ্ছি থানায়। চলুন।’ বলে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল।
‘ধন্যবাদ।’ বলে পুলিশ অফিসারটি পাশের পুলিশকে ইংগিতে আহমদ মুসার পাশের সিটে উঠতে নির্দেশ দিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগোলো। আর পুলিশটি গাড়ির পেছন ঘুরে আহমদ মুসার পাশে উঠার জন্যে এগোলো।
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাম হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে ডান হাত দিয়ে পকেট থেকে রিভলভার বের করে বিদ্যুৎ বেগে তা উপরে তুলে পর পর দু’টি গুলি ছুঁড়ল। একটি গুলি জীপের সামনের চাকা, অন্যটি পুলিশ ভ্যানের সামনের চাকা গুঁড়িয়ে দিল।
আর গুলির সাথে সাথেই আহমদ মুসার গাড়ি বিদ্যুৎ বেগে ছুটে চলল সামনের দিকে।
কি ঘটে গেল বুঝে উঠতে উঠতে আহমদ মুসার গাড়ি লক্ষ্যে বন্দুক তোলার আগেই গাড়ি তাদের নাগালের বাইরে চলে এল।
শহরে প্রবেশ করল আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসা পেছন দিকে তাকিয়ে কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘কোন আড়াল পাওয়া যাবে গাড়ির নেমপ্লেট পাল্টাবার?’
‘একটু সামনে বাঁ দিকে যাবার একটা রাস্তা পাওয়া যাবে, সেটা একটা পার্কের পাশ দিয়ে গেছে।’
‘ধন্যবাদ।’
পার্ক পাওয়া গেল। পার্কে গাড়ি একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড় করিয়েই আহমদ মুসা লাফ দিয়ে নেমে সামনের নেমপ্লেটটা ‍উল্টে দেবার কাজে লেগে গেল। আর কেলা এলভা পেছনের নেমপ্লেটটা উল্টিয়ে লাগিয়ে দিল।
আহমদ মুসা শিখের দাড়ি ও পাগড়ী খুলে ছুঁড়ে দিল ডোনার কাছে এবং কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি এবার দাড়ি-পাগড়ী খুলে কেলা এলভা সেজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসুন।’
‘ধন্যবাদ। আমি আর পারছি না দাড়ি আর পাগড়ী পরে থাকতে। চুলকাতে শুরু করেছে।’
বলে কেলা এলভা ওগুলো খুলে ডোনাকে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। বলল, ‘খুবই মজার হবে। এখন ‘পেদে’ এবং সামনের রাস্তার পুলিশরা শিখ ড্রাইভারের শিখ দম্পতির গাড়ি খুঁজে মরবে। আমরা আরাম করে এগিয়ে যাব।’
কেলা এলভার গাড়ি অন্য আরেকটা পথ দিয়ে প্রধান সড়কে উঠে ছুটে চলল পুব দিকে।
রাস্তায় পুলিশের গাড়ির ছুটোছুটি। কয়েক জায়গায় কেলা এলভার গাড়ি থামাল। কিন্তু থামিয়েই তারা বলে উঠল, ‘না, এ গাড়ি নয়। শিখ ড্রাইভারের সে গাড়িতে আছে একজন শিখ পুরুষ এবং একজন মহিলা।’
গাড়ি বেরিয়ে এল ‘পেদে’ শহর থেকে।
আহমদ মুসা বলল, ‘সামনেই তো পোলি শহর। পোলি থেকে ‘ভিলিজান’ ঘুরে কি আমরা ‘তারতু’তে ঢুকব?’
‘দরকার নেই। তারতু আমার নিজের শহর। এবার আমার উপর সবকিছু ছেড়ে দিন। পুলিশ এখন বিভ্রান্ত। আর ভয় নেই।’
‘নিজের শহর মানে? তারতু আপনার জন্মস্থান?’ বলল ডোনা।
‘হ্যাঁ, আমার জন্মস্থান।’
‘কিন্তু আপনি থাকেন তো তাল্লিনে।’
‘তাল্লিন আমার চাকরী কেন্দ্র। কিন্তু বাড়ি আমার তারতু’তে।’
‘আপনার মিস্টার কোথায় থাকেন?’
মুহূর্তে মুখটা ম্লান হয়ে গেল কেলা এলভার। বেদনার একটা উচ্ছ্বাস উপচে উঠল সে মুখে।
সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না কেলা এলভা। গাড়ি নিয়ে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল।
একটু পর কেলা এলভা মুখে হাসি টেনে বলল, ‘মিঃ আহমদ মুসা, অদ্বিতীয় আপনার পরিস্থিতি পর্যালোচনার ক্ষমতা। গাড়ির নাম্বার আর বেশ না পাল্টালে হয়তো বিপদে পড়তে হতো। কিন্তু এ চিন্তাটা আপনার মাথায় এল কি করে? আমি সহকর্মী গোয়েন্দা ইন্সপেক্টরকে যে কাহিনী বলেছি, সে কাহিনী বলেই সামনে এগোবার চেষ্টা করতাম।’
‘চিন্তাটা খুবই সাধারণ। আপনার বলা কাহিনীতে যথেষ্ট ফাঁক ছিল। ছাড়া পাওয়ার পর আপনার প্রথম দায়িত্ব ছিল হেডকোয়ার্টারে খবর দেয়া বা সেখানে হাজির হওয়া, কাউকে লিফট দেয়া নয়। সুতরাং আপনার পরিচয় নিয়ে আপনি ‘পেদে’ ঢুকলে আপনাকে অবশ্যই সেখানকার পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তাল্লিনের সাথে কথা বলতে হতো। সেখানকার পুলিশরাও আপনার কাছে এটাই চাইতো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়ান্ডারফুল! আপনার প্রত্যেকটা কথা সত্য। কিন্তু এমন চিন্তা আমার মাথায় আসেনি। সামনের শহর পোলি’তে এ বিপদ নেই?’
‘নেই। এখন শিখ ড্রাইভার ও শিখ দম্পতির বিষয়টা সামনে এসেছে। আপনাকে দেখলে সবাই এখন বুঝবে, আপনি বাড়িতে যাচ্ছেন।’
‘ঠিক বলেছেন।’
কথা শেষ করেই কেলা এলভা কিছু একটা বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। তার আগেই ডোনা কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘মাফ করবেন, একটা জিজ্ঞাসা আমি ধরে রাখতে পারছি না।’
‘আমাকে?’
‘হ্যাঁ।’
মুখটা পেছনে ডোনার দিকে একটু ঘুরিয়ে হেসে বলল, ‘বলুন গ্রেট লেডি।’
‘গ্রেট লেডি! আমাকে বলছেন?’
‘আর কাকে বলব। আপনার মত মহা সৌভাগ্যবতী আর দ্বিতীয় নেই।’
‘আমি বিদ্রূপ বলে ধরে নেব।’
‘বিদ্রূপ বলে ধরে নেবেন? মিঃ আহমদ মুসাকে আপনি বিপ্লবের বিশ্বনায়ক মানেন না?’
‘তাতে কি?’
‘আহমদ মুসা বিশ্বনায়ক হলে বিশ্বনায়িকার মুকুট আপনার মাথায় ওঠে না?’
‘ও এই কথা!’ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল ডোনার মুখ।
‘আপনাকে আপনি বুঝবেন না ম্যাডাম। বুঝবে আমার মত লাখো মেয়েরা।’ মুখে হাসি টেনেই বলল কেলা এলভা।
কথা শেষ করেই কেলা এলভা বলল, ‘দুঃখিত অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্যে। আপনার জিজ্ঞাসা বলুন।’
গম্ভীর হলো ডোনা। বলল কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে, ‘কিছু মনে করবেন না তো? ব্যাক্তিগত প্রশ্ন।’
মুখে সপ্রতিভ একটা হাসি টেনে কেলা এলভা বলল, ‘কি ব্যক্তিগত প্রশ্ন! বলুন?’
‘আমার মনে হয়েছে, আপনি মিস না মিসেস, আপনার মিস্টার কোথায়- এই দুই প্রশ্নের জবাব আপনি এড়িয়ে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, প্রশ্ন দু’টিতে আপনি কষ্ট পেয়েছেন।’
আবার ম্লান হয়ে গেল কেলা এলভার মুখ। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে কান্নার মত করুণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
অনেকক্ষণ পর বলল, ‘দুঃখিত মিসেস মারিয়া।’
বলেই একটু থামল। তারপর শুরু করল, ‘প্রত্যেকেরই জীবনে একটা ব্যক্তিগত অংশ থাকে যা তার একান্ত নিজস্ব। সেখানকার হাসি-কান্না হৃদয়ের কথার মতই সংগোপন। তবু বলছি আমি।’ থামল কেলা এলভা।
একটু পরে আবার মুখ খুলল।
সূক্ষ্ম কম্পন দেখা দিল তার ঠোঁটে। ঠোঁটের কম্পন তার বেড়ে গেল। ঠোঁট ফেঁড়ে তার কথা বেরিয়ে এল, ‘আমার স্বামী নেই- একথা বলতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, আবার আছে তাও বলতে পারছি না।’
কেলা এলভার শেষের কথাগুলো ভেঙে পড়ল কান্নার চাপা উদ্দামে।
দু’চোখ থেকে তার নেমে এল দু’টি অশ্রুর ধারা।
ডোনা এবং আহমদ মুসা দু’জনেই স্তম্ভিত, বিব্রত।
পেছন থেকে ডোনা ধীরে ধীরে কেলা এলভার কাঁধে হাত রাখল। বলল, ‘আমি দুঃখিত কেলা এলভা। আমি বুঝতে পারিনি।’
কেলা এলভা ডান হাত স্টিয়ারিং-এ রেখে বাম হাত দিয়ে কাঁধে রাখা ডোনার হাত চেপে ধরল। বলল, ‘না মিসেস ডোনা। আপনি আমার উপকার করেছেন। আমার কাঁদা দরকার। না কাঁদলে আমি বাঁচব না, বুক ফেটে যাবে আমার।’
বলে কেলা এলভা কান্নায় লুটিয়ে পড়ল স্টিয়ারিং-এর উপর।
গাড়ির ব্রেক কষেছে সে। দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়ি।
ডোনা সিট থেকে উঠে কেলা এলভার মাথায় হাত রাখল। সান্ত্বনা দিল।
আহমদ মুসা বিমূঢ়। কর্তব্যপরায়ণ আনন্দ-উচ্ছল মেয়েটার বুকে দুঃখের এতবড় সমুদ্র লুকিয়ে আছে! দুঃখটা তার আসলে কি? স্বামী তার নেই বলেই মনে হয়। পশ্চিমী সমাজে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হওয়াকে খুব বড় ঘটনা বলে দেখা হয় না। কেলা এলভার স্বামী না থাকার মধ্যে এতবড় দুঃখটা কিসের! ভেবে কোনই কূল পেল না আহমদ মুসা।
অল্প পরেই স্টিয়ারিং থেকে মাথা তুলে রুমাল বের করে চোখ মুছে পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ মিসেস আহমদ মুসা। আমি দুঃখিত।’
বলে সোজা হয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। ছুটে চলল আবার গাড়ি।
কেলা এলভাই কথা শুরু করল। বলল, ‘স্যরি, খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।’ থামল কেলা এলভা।
শুরু করল আবার, ‘জানতে চেয়েছেন আমি মিস না মিসেস, আমার স্বামী কোথায়! তিনি এস্টোনিয়া কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর অপারেশন চীফ। অত্যন্ত প্রতিভাবান হিসেবে তরুণ বয়সেই তিনি এ দায়িত্ব পেয়ে যান। আজ ছ’মাস আমরা বিয়ে করেছি।’ থামল কেলা এলভা।
‘তারপর?’ বলল ডোনা।
‘বিয়ের পর দিনই তাকে একটা অপারেশনে বের হতে হয়। সে আর ফিরে আসেনি।’ শেষের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল কেলা এলভার।
থামল কেলা এলভা।
ডোনারাও তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। কিছুক্ষণ নীরবতা।
নীরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘সত্যিই এ এক মর্মান্তিক ঘটনা ম্যাডাম। আমার একটা প্রশ্ন, এই নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে এস্টোনীয় গোয়েন্দা বিভাগ কি তথ্য জোগাড় করেছে?’
‘তাদের রিপোর্টে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্যই নেই যা নিয়ে সামনে এগোনো যায়।’
‘তার ঐ অপারেশনটা কোন পক্ষ বা কোন দেশের বিরুদ্ধে ছিল?’
‘এ ব্যাপারে কোনই তথ্য নেই ঐ রিপোর্টে।’
‘রিপোর্টের সুপারিশেও কিছু নেই?’
‘কোন দেশকেই অভিযুক্ত করা হয়নি।’
‘দুঃখিত মিসেস এলভা, ঐ রিপোর্টটা ভুয়া।’
চট করে মুখ ঘুরিয়ে কেলা এলভা আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। বলল, ‘অল্প জেনেই একদম প্রান্তিক মন্তব্য করে ফেলেছেন। অন্য কেউ এ কথা বললে আমি হাসতাম। কিন্তু আপনার কথা আমাকে হাসার বদলে আতংকিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, কেন আপনি এই রিপোর্টকে ভুয়া বলছেন?’
‘একটা দেশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট যখন তার সাধারণ শত্রুও চিহ্নিত না করতে পারে, তখন বুঝতে হবে তার মধ্যে গণ্ডগোল আছে।’
‘সাধারণ শত্রু চিহ্নিত করা এবং একটি মারাত্মক অভ্যন্তরীণ ঘটনার জন্যে কোন দেশকে দায়ী করা কি এক জিনিস?’
‘এক জিনিস নয়। কিন্তু একটা দেশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের চীফ যখন কোন গুরুতর অপারেশনে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন অবশ্যই বিশেষ শত্রু দেশটির উপর গিয়ে নজর পড়তে হবে। রিপোর্টে এই ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়াই রিপোর্টটি ভুয়া হওয়ার প্রমাণ।’
কেলা এলভার মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আহমদ মুসা থামতেই সে বলে উঠল, ‘প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই দায়ী করা যায়, এমন শত্রু দেশ কি এস্টোনিয়ার আছে?’
‘এ প্রশ্ন তো আমিই আপনাকে করব।’
‘মাফ করবেন, আমি মিলিয়ে নিতে চাচ্ছি।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সুইডেন, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, জার্মানী, রাশিয়া- সবাই এস্টোনিয়ার শত্রুর তালিকায় পড়ে। কিন্তু আজ এস্টোনিয়ার অস্তিত্বের শত্রু একটাই। সে হলো রাশিয়া।’
‘কেন?’
‘একমাত্র রাশিয়া ছাড়া ঐ দেশগুলোর কারোরই এই মুহূর্তে ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের কোন লক্ষ্য নেই। রাশিয়া বিশেষ করে রাশিয়ার একটি বিশেষ ক্ষমতাধর মহল সোভিয়েত ইউনিয়নের আকার ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল কেলা এলভা।
কথা শেষ করেই বলে উঠল, ‘রাশিয়ার সেই ক্ষমতাধর মহলটি কে? সরকার? না বাইরের কেউ?’
‘আপাতত সরকার নয়।’
‘তাহলে?’
‘কারণ, সেখানে সরকারের মধ্যে সরকার আছে, সরকারের বাইরেও ছায়া সরকার আছে। কারা করেছে ব্যাপারটা বলা মুশকিল।’
‘ছায়া সরকার বলতে কি আপনি ‘গ্রেট বিয়ারকে’ ইংগিত করছেন?’
‘হ্যাঁ, তারা লেনিনীয় পন্থায় ক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছে। ঠিক লেনিন ১৯১৭ সালে যেভাবে মেনশেভিখদের কাছ থেকে ক্ষমতা হাইজ্যাক করেছিল, ঠিক সেভাবেই।’
‘বুঝেছি। তাহলে কি আপনি নিশ্চিত, রাশিয়ারই কারও হাতে পড়েছিল আমার স্বামী?’
‘আপনার স্বামীর অপারেশন অভিযানের পথ সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছিলেন?’
‘তার গাড়িটি শেষবারের মত লোকেট করা হয় সামনের ‘তারতু’ থেকে উত্তরে।’
‘আমি নিশ্চিত ম্যাডাম। আপনার স্বামী রুশদের হাতেই পড়েছিল।’
উত্তরে কেলা এলভা কোন কথা বলল না। স্টিয়ারিং-এ রাখা তার ডান হাতটি শুধু মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। তার অচঞ্চল দৃষ্টি প্রসারিত সামনের রাস্তার উপর। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘আপনারও তো লড়াই রুশদের বিরুদ্ধে?’
‘রুশদের বিরুদ্ধে নয়, সেখানকার এক রুশ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।’
‘একই কথা। গ্রেট বিয়ার এখন লেনিনের প্রতিভূ, আইভান দি টেরিবলের মত জারদেরও প্রতিভূ। এক কথায়, সমগ্র রুশ মানসের প্রতিভূ।’
‘ঠিক। তবু তারা রাশিয়ার একটা গ্রুপ মাত্র।’
‘আপনার সাথে তর্কে যাবো না। রাশিয়ার সেই ষড়যন্ত্রকারী পক্ষ, আমি দেখছি, আমাদের কমন এনিমি। আপনি আমাকে সাহায্য করবেন, না আমি আপনাকে সাহায্য করব?’
‘দু’টোই প্রয়োজন।’
বলেই আহমদ মুসা কেলা এলভাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনার ‘পোলে’ শহর এসে গেল।’
‘কোন চিন্তা নেই। আমার উপর সবকিছু ছেড়ে দিন।’
কথা শেষ করেই নড়ে-চড়ে বসল কেলা এলভা। তার গাড়ির স্পীড বেড়ে গেল।

মস্কোভা নদী তীরের গ্রেট বিয়ারের সেই হেডকোয়ার্টার। পঁচিশ চেয়ারের সেই হলরুম। পঁচিশটি চেয়ারে পঁচিশ জন মানুষ। তাদের সামনে সাত ফুট উঁচু পাঁচ বর্গফুটের সেই মঞ্চ।
মঞ্চ ফুঁড়ে উঠে এল সেই সোনালী সিংহাসন। সোনালী সিংহাসনে বসা সোনালী বর্মে আপাদমস্তক ঢাকা সেই সোনালী মূর্তির মুখ থেকে নিঃসৃত হলো গমগমে এক আওয়াজ, ‘মহান রাশিয়ার সন্তানগণ, মাথা তোল।’
সামনের মঞ্চে সোনালী সিংহাসন উদয় হবার সংগে সংগে হলের পঁচিশজন মানুষ সবাই ‘মহামান্য আইভান’ বলে মাথা নিচু করেছিল।
তারা মাথা তুলল সবাই।
ধ্বনিত হলো সোনালী ছায়ামূর্তির কণ্ঠ। বলল, ‘নিকোলাস বুখারিন, প্রথমবার এবং শেষবারের মত তোমার ব্যর্থতাকে মাফ করে দেয়া হয়েছে এই বিবেচনায় যে, আহমদ মুসার কাছে তোমার পরাজয়ের কারণ আহমদ মুসার চেয়ে পেছনের গাড়িটার কৃতিত্বই বেশি, যার উপর তোমার কোন হাত ছিল না।’
নিকোলাস বুখারিনের মুখ ছিল ফাঁসির আসামীর মত। সোনালী ছায়ামূর্তি ‘আইভান দি টেরিবল’-এর ঘোষণা ধ্বনিত হবার সাথে সাথে তার উদ্দেশ্যে আভূমি নত হয়ে গেল নিকোলাস বুখারিনের মাথা।
আবার ধ্বনিত হলো ছায়ামূর্তির কণ্ঠ, ‘নিকোলাস বুখারিন, পরের বক্তব্য তুমি সবার অবগতির জন্যে বল।’
‘মহামান্য আইভান, পরের বক্তব্যও ব্যর্থতার এক করুণ কাহিনী’, কান্নার মত করুণ কণ্ঠে বলতে শুরু করল নিকোলাস বুখারিন, ‘গোটা এস্টোনিয়ায় তার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার আবেদনের পর এস্টোনিয়া সরকার ত্বরিৎ যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যথোপযুক্তই ছিল। আহমদ মুসার হাত থেকে কেলা এলভাকে উদ্ধার করার মধ্যে তাদেরও স্বার্থ ছিল। কিন্তু সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েও আহমদ মুসার দেখা পাওয়া যায়নি। কেলা এলভাকে রাস্তায় ছেড়ে সে কোথাও সটকে পড়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, যে শিখ ড্রাইভার ও শিখ দম্পতির সাথে পুলিশের সংঘাত হয়েছে, তাদের একজন আহমদ মুসা হতে পারেন। এই ঘটনার পর শিখ ড্রাইভার ও শিখ দম্পতিও হাওয়া হয়ে যায়। এই ঘটনার পর এস্টোনীয় পুলিশ কোন রাস্তাতেই সন্দেহজনক আর কিছু পায়নি। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার, আহমদ মুসা লেক ‘পাইপাস’-এর দিকে এসেছে।’
‘মাজুরভ, তোমার গোয়েন্দা রিপোর্ট কি বলে?’
মাজুরভ উঠে দাঁড়িয়ে আভূমি একটা বাউ করে বলল, ‘মহামান্য আইভান, আমরা মনে করছি, কেলা এলভার গাড়িতে যে দম্পতি ছিল, সেটা আহমদ মুসা দম্পতি। কেলা এলভা বুলেটের মুখে মিথ্যা কথা বলেছে। আবার কেলা এলভা এবং আহমদ মুসা দম্পতিই শিখ ড্রাইভার ও শিখ দম্পতি সেজেছিল। পোলে ও তারতু শহরে প্রবেশের সময় কেলা এলভা এবং আহমদ মুসাদের কোন ছদ্মবেশ ছিল না। কিন্তু এস্টোনীয় পুলিশ তাদের কোন সন্দেহ করেনি। আহমদ মুসা কেলা এলভাকে পুতুলের মত ব্যবহার করেছে। কিন্তু তারতু প্রবেশের পর তারা নিখোঁজ হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কেলা এলভা তার বাড়িতে যায়নি। সন্দেহ করা হচ্ছে, আহমদ মুসা লেক পাইপাসের পথে রাশিয়া প্রবেশ করেছে। পুশকভ শহর থেকে উত্তরে লেক পুশকভের পূর্ব তীরের অল্প পানিতে দু’টি গামবুট এবং একটি ডুবে যাওয়া নৌকা পাওয়া গেছে। মনে করা হচ্ছে, আহমদ মুসা দম্পতি এগুলো ব্যবহার করেছে। আহমদ মুসা পুশকভ থেকে মস্কো কিংবা সেইন্ট পিটার্সবার্গের দিকে যেতে পারে। আমরা এ দু’শহরগামী সব পথের উপর চোখ রেখেছি।’ থামল মাজুরভ।
সে থামতেই সোনালী ছায়ামূর্তির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘মাজুরভ, তুমি যে মহাকাব্য পাঠ করলে, তার মহানায়ক দেখা যাচ্ছে আহমদ মুসা। যে রাশিয়ার বীর সন্তান জেনারেল বোরিস ও যুবরাজ পিটারসহ অসংখ্য রুশ-সন্তানের হত্যাকারী রাশিয়ার নাম্বার ওয়ান শত্রু। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তোমার বর্ণনায় সে অপ্রতিরোধ্য। লজ্জা করল না তোমার এসব কথা বলতে?’ থামল ছায়ামূর্তি আইভান দি টেরিবল।
মাজুরভ কোন কথা বলল না। অসহায়ের মত বাউ করল সোনালী মূর্তি আইভানকে।
মাজুরভ গ্রেট বিয়ারের গোয়েন্দা প্রধান।
এবার সোনালী মূর্তি আইভানের কণ্ঠ ধ্বনিত হলো ভ্লাদিমির খিরভকে লক্ষ্য করে। খিরভ গ্রেট বিয়ারের অপারেশন ফরচুন প্রজেক্ট-এর প্রধান। অপারেশন ফরচুন প্রজেক্ট-এর লক্ষ্য, আহমদ মুসাকে হাতের মুঠোয় এনে রাজকীয় আংটি ও রাজকীয় ডায়েরী হাত করা এবং একই সাথে জারদের ধনভাণ্ডার কুক্ষিগত করা ও জারদের যুবরাজ্ঞী ক্যাথারিনকে হত্যা করে রুশ সরকারের নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে উত্তরণের উদ্যোগ বানচাল করে দেয়া।
আইভানের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘এবার খিরভ, তুমি ব্যর্থতার কোন মহাকাব্য শোনাবে?’
খিরভ উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত বুকে রেখে বাউ করে বলল, ‘মহামান্য আইভান, আমরা নিশ্চিত, আহমদ মুসাকে আমাদের হাতের মুঠোয় আসতে হবে। তার মিশন হলো, ক্যাথারিনকে উদ্ধার করে রাজকীয় আংটি ও ডায়েরী তার হাতে বুঝে দেয়া। তার এ মিশনের দাবিই হলো, তাকে আক্রমণাত্মক হতে হবে এবং ক্যাথারিনকে উদ্ধারের জন্যে আমাদের খাঁচায় তাকে ঢুকতে হবে।’
একটু থামল খিরভ। তারপর আবার শুরু করল, ‘মহামান্য আইভান, ক্যাথারিনকে আমরা যেখানে রেখেছি, সেখানে শত্রু শুধু ঢুকতেই পারে, বেরুতে পারে না। সুতরাং অধৈর্য্য না হয়ে আমাদের অপেক্ষা করা দরকার, আহমদ মুসা আমাদের বড়শী কখন গিলছে। তারপরেই আমরা ডাঙায় টেনে তুলব।’
‘খিরভ, তুমি একজন জেনারেলের মত অংক কষলে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের জেনারেলদের জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু আহমদ মুসা বন্দুক নির্ভর কোন জেনারেল নয়। সে একজন মাথাওয়ালা অতিসতর্ক বিপ্লবী । সে যদি জেনেই ফেলে ক্যাথারিন কোথায় আছে, তাহলে সেতো সরকারী সাহায্য নিয়েও অগ্রসর হতে পারে। তোমার জিন্দানখানা রাষ্ট্রশক্তি মোকাবিলা করার মত অবশ্যই নয়। এ সম্ভাবনার বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ তুমি নেবে?’ ধ্বনিত হলো সোনালী মূর্তি আইভানের কণ্ঠে।
‘মহামান্য আইভান, আহমদ মুসার সাথে রুশ সরকারের যোগাযোগ হওয়া এবং সমন্বিত একটা অভিযানের ব্যবস্থা হওয়া খুব বড় ঘটনা। আমরা তা অবশ্যই জানতে পারব এবং ক্যাথারিনকে উদ্ধারের প্রয়াস তাদের বানচাল হয়ে যাবে। সেই সাথে প্রমাণ হবে, একটা লোকহিতকর জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহ করে তারা অন্যায় করেছে।’
‘তোমার আত্মরক্ষামূলক মনোভাব সম্পর্কে তুমি সতর্ক হও খিরভ। আমরা চাই না আমাদের শত্রু কিংবা সরকার আমাদের কোন আঙিনায় পা রাখার সুযোগ পাক।’ গর্জে উঠল আইভানের কণ্ঠ। গম গম করে বেজে উঠল সমগ্র হলঘর।
ভয় ছড়িয়ে পড়ল সবার চোখে-মুখে। চুপসে গেল ভ্লাদিমির খিরভের মুখ।
আইভানের গলাই আবার ঝনঝন করে উঠল। বলল, ‘বুঝেছ আমার নির্দেশ?’
‘বুঝেছি মহামান্য আইভান। শত্রু আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার আগেই তাকে কাবু করতে হবে।’ বলল খিরভ।
‘আর এর অর্থ কি?’ ধ্বনিত হলো আইভানের কণ্ঠ।
‘আমাদের এখন প্রতি মুহূর্তের চেষ্টা হবে আহমদ মুসাকে আমাদের হাতের মুঠোয় আনা।’
‘শোন, আহমদ মুসার চেয়ে তার নববধূ কম মূল্যবান নয়। আহমদ মুসাকে কথা বলানো কঠিন। কিন্তু তার সুন্দরী নববধূকে যদি হাতে পাও, তাহলে আহমদ মুসা পাকা ফলের মত এসে হাতে পড়বে এবং পুতুলের মতই নাচানো যাবে আহমদ মুসাকে।’ বলল আইভান।
‘ধন্যবাদ, মহামান্য আইভান, আপনার এ নির্দেশ আমরা বাস্তবায়ন করব।’ বলল খিরভ মাথা নত করে।
‘সরকার কি করছে মাজুরভ?’ আইভানের লক্ষ্য এবার মাজুরভের দিকে।
মাজুরভ বলল, ‘মহামান্য আইভান, সরকার তার গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিয়েছে এবং সকল চেকপোস্টকে সতর্ক করেছে। তাদের লক্ষ্য, আহমদ মুসাকে খুঁজে পাওয়া এবং তাকে সব সময় চোখে চোখে রাখা। তার যোগাযোগ ও অবস্থানের প্রতিটি স্থানকে চিহ্নিত করা। ক্যাথারিন উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তারা আহমদ মুসাকে গ্রেফতার করবে না। তারা মনে করে, ক্যাথারিন উদ্ধারে আহমদ মুসা সরকারের সবচেয়ে উপকারী অস্ত্র।’ থামল মাজুরভ।
‘আহমদ মুসাকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারী এ উদ্যোগ থেকেও তোমরা সাহায্য পেতে পার।’ বলল আইভান।
‘অবশ্যই, মহামান্য আইভান।’ বলল খিরভ।
খিরভের কথা শেষ হতেই ঝন ঝন করে বেজে উঠল গোটা হলঘর। শোনা গেল, আইভানের ভারি ও উচ্চকণ্ঠ, ‘রাশিয়ার ঈশ্বর রাশিয়ার সহায় হোন। শোন রুশ সন্তানরা, কোন ব্যর্থতা আর বরদাশত করা হবে না।’
কথার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় সাত ফুট উঁচু বেদি থেকে সোনালী মূর্তি আইভানের অন্তর্ধান ঘটল।
জ্বলে উঠল হলঘরে আলো। এতক্ষণে সবার মুখে ফুটে উঠল স্বাচ্ছন্দ্য এবং কারও কারও মুখে হাসি।
সবাই হলঘর থেকে বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়াল।
হলঘর থেকে বেরুবার পর ফিস-ফাস কথা শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে।
পাশাপাশি হাঁটছিল মাজুরভ, খিরভ ও নিকোলাস বুখারিন।
নিকোলাসের দু’হাতে ব্যান্ডেজ। একটি পা আহত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল সে।
মাজুরভ নিকোলাস বুখারিনের দিকে চেয়ে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না বুখারিন, আহমদ মুসা বাঁচালো কেন তোমাকে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে?’
বুখারিনের মুখে ফুটে উঠল একরাশ ঘৃণা। বলল, ‘আমি কিন্তু সংগে সংগেই বলে দিয়েছি, তার কোন অনুগ্রহ আমি চাইনি। সুযোগ পেলেই তাকে আমি হত্যা করব।’
‘এটা তো তোমার কথা বুখারিন। আমি জিজ্ঞেস করছি, সে তোমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এল কেন নিজের জীবন বিপন্ন করে?’
‘শত্রুকে হাত করার একটা কৌশল বা তার এটা একটা ফ্যাশন।’
‘যে শত্রু মরে যাচ্ছে তাকে হাত করার প্রয়োজন কি?’
‘যা-ই বলুন, ব্যাটা ধড়িবাজ। এসব করেই নাম কিনেছে। তার কিন্তু এবার রক্ষা নেই।’
‘বুখারিন, আবেগ দিয়ে আহমদ মুসার মত শত্রুর মোকাবিলা করতে পারবে না। তাকে কাবু করতে হলে তাকে জানতে হবে। বিপদগ্রস্থ শত্রুর উপর আহমদ মুসা কখনও হাত তোলেনি, বরং তাকে সাহায্য করেছে। এটা আহমদ মুসার চরিত্রের একটা দিক। এটা জানা থাকলে এর সুযোগ তুমি নিতে পার।’ বলল ভ্লাদিমির খিরভ।
‘এটা তার বড়ত্ব জাহিরের একটা অহমিকা।’ বলল বুখারিন।
‘কিন্তু এ ধরনের বড়ত্ব জাহিরের জন্যে বড় মন ও বড় সাহস দরকার।’ বলল খিরভ।
‘এর দ্বারা আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?’ বলল আবার বুখারিন।
‘বলতে চাচ্ছি, আহমদ মুসা অনেক বড় শত্রু। এ পর্যন্ত সে লক্ষ্য অর্জনে কোথাও ব্যর্থ হয়নি। সুতরাং তাকে ছোট করে নয়, বড় করে দেখেই তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের এ বারের ব্যর্থতা শুধু আমাদের নয়, রাশিয়ার ভবিষ্যতকেই ধ্বংস করবে।’
সবার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তাদের সামনে ভেসে উঠেছিল আইভানের আজকের শেষ কথা, ‘কোন ব্যর্থতাই আর বরদাশত করা হবে না।’
কিছুক্ষণ নীরবতা তাদের মধ্যে।
নীরবতা ভাঙল খিরভ। বলল, ‘আহমদ মুসার লক্ষ্য কি সেইন্ট পিটার্সবার্গ না মস্কো?’
‘আহমদ মুসা সময় নষ্ট করার পাত্র নয়। ক্যাথারিন যেখানে বন্দী আছে মনে করবে সেখানেই সে যাবে।’ বলল মাজুরভ।
‘আহমদ মুসা কি ভাবছে, সেটাই প্রশ্ন। গ্রেট বিয়ারের পুরানো হেডকোয়ার্টার সেইন্ট পিটার্সবার্গে। তাছাড়া সেখানে গ্রেট বিয়ারের তৎপরতাও বেশি। সুতরাং আহমদ মুসা সেইন্ট পিটার্সবার্গকে ক্যাথারিনকে লুকিয়ে রাখার স্থান হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। মস্কোতে গ্রেট বিয়ারের নতুন হেডকোয়ার্টারের সন্ধান তার জানার কথা নয়। এরপরও রাজধানী মস্কোতেও সে আসতে পারে।’ বলল খিরভ।
‘এস্টোনিয়া দিয়ে তার প্রবেশ থেকে মনে হয়, সেইন্ট পিটার্সবার্গ হয়ে সে মস্কো আসবে।’ বলল মাজুরভ।
কিন্তু কথা শেষ করেই মাজুরভ আবার বলল, ‘পুশকভ দিয়ে সে রাশিয়ায় প্রবেশ করায় সেইন্ট পিটার্সবার্গে তার প্রথম যাওয়ার ব্যাপারটা অন্তত অর্ধেক পরিমাণে কমে গেছে।’
‘যা-ই হোক, সবদিকেই আমাদের সমান নজর দিতে হবে। একটা খুশির কথা এই, আহমদ মুসাকে চিহ্নিত করা এবার অনেক সহজ হবে। তার সাথে রয়েছে তার ফরাসী স্ত্রী।’ বলল খিরভ।
‘ঠিক বলেছেন। এটা বড় একটা প্লাস পয়েন্ট আমাদের জন্যে।’ বলল মাজুরভ।
‘স্ত্রী সাথে নিয়ে আহমদ মুসার অভিযান এই প্রথম। এটা তার হবে বড় একটা দুর্বল দিক।’ খিরভ বলল।
‘মহামান্য আইভান যা বলেছেন, আহমদ মুসার স্ত্রীকে হাতের মুঠোয় পেলে সত্যি আহমদ মুসাকে পুতুলের মত নাচানো যাবে। নববধূর স্বার্থ সে সব স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখবে।’ বলল বুখারিন।
‘দেখ বুখারিন, তোমার চোখে কিন্তু লোভের চিহ্ন দেখছি।’ বলল খিরভ।
‘তার ফরাসী স্ত্রী দেখলে আপনারও লোভ হবে।’ বুখারিন বলল।
‘সাবধান বুখারিন। নিজের জীবনের কথা প্রথম ভেবো।’
লিফটের মুখে এসে পড়েছে ওরা তিনজন। দাঁড়ালো ওরা।
উঠে আসছে লিফট।

দক্ষিণ পুশকভের আবাসিক এলাকার ছোট বিলাসবহুল একটি বাংলো। বাংলোটির দু’তলার দক্ষিণ প্রান্তের একটি কক্ষে আহমদ মুসা ও ডোনা পাশাপাশি একটা সোফায় বসে।
বাড়িটা কেলা এলভার খালুর।
কেলা এলভার খালু বরিসভ একজন রুশ কাস্টমস অফিসার। পুশকভে সে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। কেলা এলভার খালার সাথে তার বিয়ে হয় প্রেম করে তাল্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। বরিসভ আসলে হাফ রাশিয়ান। তার মা ছিলেন এস্টোনীয়।
তারতু থেকে আসার সময় কেলা এলভা আহমদ মুসা ও ডোনাকে বার বার বলে দিয়েছিল, তারা পুশকভ কিংবা রাশিয়ার কোথাও যেন কোন হোটেল বা রেস্টহাউসে না ওঠে। উঠলেই তারা ধরা পড়ে যাবে। কারণ, গ্রেট বিয়ার এবং রুশ সরকার অবশ্যই তাদের প্রত্যেকটি হোটেল ও রেস্টহাউসে পাহারা বসিয়েছে।
কেলা এলভার অনুরোধেই আহমদ মুসা ও ডোনা কেলা এলভার চিঠি নিয়ে তার খালুর এ বাড়িতে এসে উঠেছে।
আহমদ মুসাদের সামনে বিছানো ছিল পশ্চিম রাশিয়ার একটা মানচিত্র।
আহমদ মুসা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে মানচিত্রটি। কিন্তু ডোনার মনোযোগ সেদিকে নেই। ডোনা তার ডান হাত দিয়ে আহমদ মুসার গলা পেঁচিয়ে ধরে মাথাটা তার কাঁধে ঠেস দিয়ে বলল, ‘দেখ, কেলা এলভা আমাদের উপকার করেছে, তার স্বামীর সন্ধান কিন্তু করতেই হবে।’
আহমদ মুসা মানচিত্র থেকে মুখ তুলল। বলল, ‘ঠিক বলেছ। তার সাথে দেখা হওয়ায় অন্যদিক দিয়েও উপকৃত হয়েছি। সে যে বিশ্ববিখ্যাত এস্টোনীয় লেখক এমাস্তে এলভার নাতনি, এটা আমার জন্যে একটা বড় আবিষ্কার।’
‘দেখ মেয়েটা কত ভাল। একটুও আত্মপ্রচার নেই। তার বাড়িতে গিয়ে এমাস্তে এলভার পারিবারিক ছবি না দেখলে জানাই যেত না তার পরিচয়।’
‘সত্যিই ডোনা, ওর ঋণ শোধ হবার নয়। ‘পোলে’ ও ‘তারতু’তে তার বুদ্ধিমত্তার কারণেই আমরা ধরা পড়া থেকে বেঁচে গেছি। এমনকি তার বাড়িতেও আমরা ধরা পড়ে যেতাম। গ্রেট বিয়ার আগেই সেখানে পাহারা বসিয়েছিল। সে যদি গোপন পথে তার বাড়িতে নেয়ার ব্যবস্থা না করতো, যদি তাদের অবস্থানকে সবদিক থেকে গোপন না রাখতো এবং গোপনে যদি বের করে না আনতো তার বাড়ি এবং তারতু থেকে, তাহলে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়তে হতো আমাদের।’
‘একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না। তার বাড়িতে আমরা তিনদিন ছিলাম। তার সাথে সকল আলোচনায় আমার মনে হয়েছিল, স্বামীর সন্ধান করার জন্যে রাশিয়ায় সেও আমাদের সঙ্গী হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে এ বিষয়ে কিছুই বলল না, কিছুই করল না।’
‘ধন্যবাদ ডোনা। আমিও এ রকমই ভেবেছি।’
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপরেই আবার বলল, ‘সে তো সরকারী চাকুরে। চাইলেই যা ইচ্ছা তা করতে পারে না।’
‘তা-ই হবে।’ বলল ডোনাও।
আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে ডোনার মুখ একটু উঁচু করে তুলে ধরল। ঘনিষ্ঠভাবে চোখ রাখল ডোনার মুখে।
ডোনার মুখ রাঙা হয়ে উঠল লজ্জায়। বলল, ‘এভাবে দেখছ কেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এই যে বাড়ি, এমন একটা শান্তির নীড়ে তোমাকে মানায় বেশি।’
‘এমন কথা বলছ কেন?’
‘সুন্দর এই বাংলোতে তিনদিন আমাদের ভালোভাবে কাটল, তাই।’
‘ও, অভিযানের কথা ভাবছ। এই নরম শরীর নিয়ে আমি তোমার অভিযানে শরীক হতে পারবো না ভয় করছ?’
‘ভয় করছি না। সব ব্যাপারে আল্লাহর উপর ভরসা করি। তবু ভাবনা তো হয়ই। যাকে নিয়ে যত আশা, যত স্বপ্ন, তাকে নিয়ে তত উদ্বেগ তো হবেই।’
ডোনা তার মুখ আহমদ মুসার কাঁধে জোরে চেপে বলল, ‘আল্লাহই আমাকে এ পথে এনেছেন। তিনিই ভরসা।’ ভারি হয়ে উঠেছে ডোনার কণ্ঠ।
আহমদ মুসা ডোনার পিঠে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে বলল, ‘তুমি প্রস্তুত তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘দু’টো গাড়ি ডাকতে বলেছি। ইনশাআল্লাহ, ক’মিনিটের মধ্যেই আমরা বেরুব।’
‘দু’টো গাড়ি কেন?’
‘তোমার জন্যে একটা, আমার জন্যে একটা।’
‘আমরা ভিন্ন দুই পথে যাব?’ ম্লান হয়ে উঠেছে ডোনার মুখ, তার কণ্ঠ শুষ্ক।
‘না, পথ আমাদের একটাই। যা তোমাকে বলেছি, পুশকভ থেকে বেরিয়ে দক্ষিণমুখী রোড ধরে ‘ওরসা’। ‘ওরসা’ থেকে পূর্বমুখী রোড ধরে সোজা মস্কো।’
‘সেটা জানি, কিন্তু তাহলে দুই গাড়ি কেন?’
‘অনেক কারণে। এক, আহমদ মুসাকে চিহ্নিত করার জন্যে শত্রুর কাছে আজ এক সহজ অস্ত্র হলো, আহমদ মুসা তার ফরাসী স্ত্রী নিয়ে পথ চলছে। আলাদা চলে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করা। দুই, আমার বিপদ হলেও তোমার বিপদ যেন না আসে। অথবা দু’জন যেন একসাথে বিপদে না পড়ি। তিন, বিপদে যাতে একে অপরকে সাহায্য করার সুযোগ হয়।’
‘অবশ্যই, এদিকগুলোর প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভিন্ন চলতে গিয়ে আমরা যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই?’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় দরজায় নক হলো।
পর মুহূর্তেই ঘরে প্রবেশ করল কেলা এলভার খালু মিঃ বরিসভ।
মিঃ বরিসভ পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘দু’টো গাড়ি ঠিক হয়েছে, এসে গেছে। একটার পুরুষ, অন্যটার মেয়ে ড্রাইভার।’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ। মহিলা আরোহীর জন্যে মহিলা ড্রাইভার ভালই হবে। মস্কো পর্যন্ত চুক্তি তো?’
‘একজন দক্ষ লোককেই পাঠিয়েছিলাম। যে দু’টো গাড়ি এনেছে, তার ড্রাইভার আমার পরিচিত ও বিশ্বস্ত।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’
মিঃ বরিসভের ঠোঁটে অল্প এক টুকরো হাসি। চোখে-মুখে কি একটা দ্বিধা ভাব। দ্বিধা ঠেলে বলল অবশেষে, ‘আপনারা আমার স্নেহ প্রতিম কেলা এলভার বন্ধু। কিছু না মনে করলে একটা কথা বলি।’
আহমদ মুসা মিঃ বরিসভের দিকে একবার চোখ তুলে চেয়ে বলল, ‘অবশ্যই। বলুন।’
‘কেলা এলভা গোপন করলেও প্রথম দিনেই আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি আহমদ মুসা। কারণ, আপনি আসার একদিন আগেই আমাদের অফিসে আপনার ছবি পৌঁছে যায়।’
আহমদ মুসা সামান্যও চমকাল না। বিস্মিতও হলো না। বলল, ‘ছবি কার তরফ থেকে পৌঁছে?’
‘গ্রেট বিয়ার এবং সরকার-উভয়ের তরফ থেকেই।’
‘ছবির সাথে কি নির্দেশ ছিল?’
‘সরকারী নির্দেশ, আহমদ মুসাকে দেখা পেলেই সে বিষয়টা সংগে সংগেই থানায় জানানো। আর গ্রেট বিয়ারের নির্দেশ, আহমদ মুসা চিহ্নিত হবার সাথে সাথে একটা টেলিফোন নাম্বারে তা জানিয়ে দিতে হবে।’
কথা শেষ করে একটা ঢোক গিলে আবার বলতে শুরু করল, ‘আপনার সামনে এগোনো অত্যন্ত কঠিন হবে। মস্কো ও সেইন্ট পিটার্সবার্গগামী যত পথ আছে, তাতে নিশ্ছিদ্র পাহারা বসানো হয়েছে। প্রত্যেক রেল স্টেশনে প্রত্যেকটা বগি সার্চ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আপনি যে রুট বেছে নিয়েছেন, তা কিছুটা নিরাপদ হবে। কিন্তু প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আপনি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে পারেন।’
ডোনার মুখ মলিন হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা নির্বিকার। বলল, ‘ধন্যবাদ জনাব, এই ইনফরমেশনের জন্যে।’
আহমদ মুসা থামতেই মিঃ বরিসভ বলল, ‘আপনাদের দু’জনের আলাদা যাওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই চমৎকার হয়েছে। হতে পারে, এই একটা কারণে আপনি নিরাপদে মস্কো পৌঁছে যাবেন।’
‘এতটা নিশ্চিতভাবে বলছেন কিভাবে?’
‘আহমদ মুসা তার ফরাসী স্ত্রীসহ সফর করছে, এই খবর সব জায়গায় এসেছে। সব পাহারাদারদের চিন্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বিষয়টির দিকেই ঘুরপাক খাবে।’
‘আপনার চিন্তা সত্য হোক।’ সহাস্যে বলল আহমদ মুসা।
‘তবে আপনাদের কিছু ছদ্মবেশ নেয়া প্রয়োজন।’
‘কি ধরনের?’
‘আপনি ফরাসী ট্যুরিস্ট অ্যাক্সোবেটদের ছদ্মবেশ নিতে পারেন। মস্কোয় কয়েকটা থিয়েটারে এখন যাত্রা চলছে। মনে হবে, আপনি সেখানে যাচ্ছেন। আপনার স্লিম শরীরে অ্যাক্সোবেট ছদ্মবেশ মানাবে ভালো।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধন্যবাদ। কিন্তু পাবো কোথায় ঐ পোশাক?’
হাসল বরিসভও। বলল, ‘আমি জোগাড় করে রেখেছি।’
‘আমি কৃতজ্ঞ। এতটা স্নেহের চোখে দেখছেন আপনি আমাদের।’ ভারি কণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘আমারও স্বার্থ আছে বৎস।’
‘কি সেটা?’
‘কেলা এলভা লিখেছে, সে যদি আপনার সাহায্য পায়, সে নিশ্চিত, তার স্বামীর সন্ধান সে করতে পারবে। আমিও এটা মনে করি।’
আহমদ মুসা একটু ভাবল। বলল, ‘বলুন তো, কেলা এলভার স্বামীকে রুশরা কেন আটক করে রাখবে?’
‘আমি ঠিক জানি না। তবে আমার অনুমান হয়, কেলা এলভার স্বামী অত্যন্ত প্রতিভাবান গোয়েন্দা অফিসার লেনার্ট লার এস্টোনিয়ার আত্মরক্ষার সাথে জড়িত রাজনৈতিক ও সামরিক বহু কিছুই জানেন। তাছাড়া পশ্চিমী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অনেক কিছুই সে জানত, যার সাথে রাশিয়ার স্বার্থও জড়িত থাকতে পারে।’
‘বুঝেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ!’ বলে বরিসভ পোশাক আনার জন্যে বেরিয়ে গেল।
নিখুঁত একজন অ্যাক্সোবেটের পোশাকে আহমদ মুসা তার গাড়ির দিকে এগোলো।
ডোনা তার পাশাপাশি চলতে চলতে বলল, ‘শেষ নির্দেশ কি আমার জন্যে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘একাই তোমাকে মস্কো পৌঁছতে হবে, এভাবে মন তৈরি করে রাখ। আমার কথা ভেব না। তেমন কিছু যদি ঘটেই যায়, আমি তোমাকে খুঁজে নেব। ফি আমানিল্লাহ।’
বলে আহমদ মুসা তার গাড়িতে উঠে বসল।
ডোনার গাড়ি আরেকটু সামনে।
‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে ডোনাও কয়েক পা হেঁটে গিয়ে তার গাড়িতে উঠল। ডোনার গাড়ি আগে। আহমদ মুসার গাড়ি পেছনে। দুই গাড়ি একই সাথে স্টার্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করল।
গাড়িতে উঠেই আহমদ মুসা গাড়ির মস্কো পর্যন্ত ভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার রুবল বুঝিয়ে দিল ড্রাইভারকে।
ড্রাইভার ভাড়ার চেয়ে আড়াই হাজার রুবল বেশি পেয়ে একটা লম্বা স্যালুট করল আহমদ মুসাকে।
‘রাস্তায় কখন কি ঘটে বলা যায় না তো, তাই ভাড়াটা আগেই দিয়ে দিলাম।’ ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার অনুগ্রহ স্যার।’ আবার স্যালুট করে বলল ড্রাইভার।
ছুটে চলছে দু’টি গাড়ি ওরসার উদ্দেশ্যে। ডোনার গাড়ি ও আহমদ মুসার গাড়ির মধ্যে দূরত্ব সিকি মাইলের মত।
আহমদ মুসা সিটে হেলান দিয়ে ভাবছিল তার মিশনের কথা। কোথায় রেখেছে ওরা ক্যাথারিনকে? কোথায় রেখেছে ডোনার আব্বা মিঃ প্লাতিনিকে! নিশ্চয় সে জায়গা এতটাই নিরাপদ, যেখানে সরকারেরও চোখ পড়বে না বা সরকার তা খুঁজে পাবে না। আহমদ মুসা কিভাবে তার সন্ধান করবে। সবচেয়ে সহজ পথ ওদের হাতে পড়া, তাহলেই জানা যাবে ক্যাথারিন কোথায়। কিন্তু সে মস্কো পৌঁছে সবটা বুঝে নেয়ার আগে এত তাড়াতাড়ি ওদের হাতে পড়তে চায় না।
নড়েচড়ে বসল আহমদ মুসা।
মনে পড়ল ডোনার কথা। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার। বেচারী খুব মনমরা হয়ে পড়েছে। এটাই প্রথম তার বড় ধরনের একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া। ডোনার বিদায়কালীন শুকনো ঠোঁট এবং নরম হয়ে ওঠা দৃষ্টির কথা মনে পড়তেই আহমদ মুসার মনও খারাপ হয়ে গেল। সংগে সংগেই তার মন থেকে প্রার্থনার বাণী উচ্চারিত হলো, আল্লাহ তার সহায় হোন। তার সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ রক্ষা করুন।
আহমদ মুসা হাতঘড়ির দিকে চেয়ে ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘‘ওরসা’ খুব সামনেই না?’
‘জ্বি, হ্যাঁ। আর দু’মাইল।’
‘দেখো, আগের মতই কোন চেকপোস্ট থাকলে আমার স্ত্রীর গাড়ি তা ক্রস না করা পর্যন্ত তুমি চেকপোস্টের মুখোমুখি হবে না।’
‘মনে আছে স্যার।’
আহমদ মুসা আবার গা এলিয়ে দিল গাড়ির সিটে।

ওরসার উপকণ্ঠ।
রাস্তার একটা তেমাথা।
পুশকভ থেকে যে রাস্তাটা এসেছে তা সোজা দক্ষিণে এগিয়ে শহরে ঢুকে গেছে। আর এখান থেকেই আরেকটা রাস্তা বেরিয়ে এগিয়ে গেছে পশ্চিমে।
তেমাথার উত্তর পাশে পুশকভ রোডের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। স্টোরের সামনে প্রায় রাস্তার উপর একটা জীপ এবং একটা ছোট মাইক্রো দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার দু’পাশে দু’জন স্টেনগানধারী। জীপের উপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন। একজনের হাতে লম্বা অ্যান্টেনার ওয়্যারলেস।
পুশকভ হাইওয়ে দিয়ে ওরসা অভিমুখে একটা ট্যাক্সি আসতে দেখে দু’জন স্টেনগানধারী স্টেনগান তুলে সতর্ক হয়ে দাঁড়াল। ওয়্যারলেসধারীসহ যে দু’জন জীপে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা সোজা হয়ে উঠল।
‘দেখ জুকভ, গাড়িটার রেজিস্ট্রেশন একেবারে পুশকভের। থামাও গাড়ি। শিকার মিলতে পারে।’
‘ইয়েস বস।’ বলে জুকভ নামের লোকটি হাত তুলে ঠিক জীপের পাশেই ট্যাক্সিটি দাঁড় করাল।
ওয়্যারলেসধারী গাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে মুখ তেতো করে বিড় বিড় করে বলল, ‘দুর্ভাগ্য, একজন মাত্র ভদ্রমহিলা। আমরা তো খুঁজছি একটা সুন্দর জোড়াকে।’ তারপর ওয়্যারলেস মুখের কাছে এনে কণ্ঠ উঁচু করে বলল, ‘মস্কো জিবি এইচ কিউ স্যার?’
ওপার থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠে জবাব এল, ‘হ্যাঁ।’
‘আমি ওরসা থেকে বলছি স্যার।’
‘কি খবর?’
‘একটা ট্যাক্সি। একজন ফরাসী ট্যুরিস্ট মহিলা। রুশ মহিলা ড্রাইভার।’
‘দেবার আর খবর পেলে না। এক ফরাসী মহিলা দিয়ে কি করব? আমরা চাই জোড়া। ছেড়ে দাও।’
‘জ্বি, স্যার।’
বলে ওয়্যারলেস অফ করে দিয়ে জুকভকে ট্যাক্সির সামনে থেকে সরে যাবার ইংগিত করে বলল, ‘ক্লিয়ার।’
‘ক্লিয়ার’ বলার সাথে সাথে ট্যাক্সিতে বসা ফরাসী ট্যুরিস্ট মহিলাবেশী ডোনা জোসেফাইন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সেই সাথে আবার বুঝল, পৃথকভাবে চলার আহমদ মুসার সিদ্ধান্ত কত সঠিক হয়েছে।
চেকপোস্ট পেরিয়ে গাড়ি ফুলস্পীডে উঠার পর ডোনা ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মিস রোসা, তোমার রিয়ারভিউতে পেছনের গাড়ি দেখা যায়?’
‘জ্বি, না।’ বলল ড্রাইভার।
‘তাহলে নিশ্চয় গাড়ির গতি স্লো করেছে। তা না হলে যতক্ষণ আমাদের সময় গেছে, এখানে তাতে গাড়ি দেখা যাবার কথা।’
‘তা-ই হবে।’
ডোনার গাড়ি তখন ওরসা শহরের বুক চিরে তীব্র বেগে এগোচ্ছে মস্কো হাইওয়েতে ওঠার জন্যে।
এদিকে পেছনের চেকপোস্টে তখন ভিন্ন এক দৃশ্য।
ফরাসী অ্যাক্সোবেটের ছদ্মবেশধারী আহমদ মুসার ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে চেকপোস্টে জীপের পাশে রাস্তার উপর। ট্যাক্সির দু’পাশে দুই স্টেনগানধারী। সামনে সেই জুকভ হাত তুলে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সিটিকে থামিয়ে রেখেছে। আর ওয়্যারলেসধারী ম্যালেনকভ কথা বলছে ওয়্যারলেসে।
‘ইয়েস স্যার। একজন আরোহী। ফরাসী অ্যাক্সোবেটের পোশাকে। তবে তাকে ফরাসী মনে হয় না।’
‘কি মনে হয়?’
‘এশিয়ান ধরনের।’
‘কি বললে? এশিয়ান?’
‘হ্যাঁ।’
‘এই যে একটা মেয়েকে ছেড়ে দিলে সে ফরাসী ছিল না?’
‘হ্যাঁ, ফরাসী।’
‘হ্যাঁ, মিলে যাচ্ছে। পর পর, আগে এবং পিছে। শোনো।’ উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ওয়্যারলেসের ওপার থেকে।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো ওয়্যারলেসধারী ম্যালেনকভ। বলল, ‘ইয়েস স্যার।’
‘অ্যাক্সোবেটকে পাকড়াও করো। আর দেখ, গোঁফটা নকল কিনা। মিলাও আহমদ মুসার ছবির সাথে।’
শোনার সাথে সাথে হুংকার দিয়ে উঠল ম্যালেনকভ। চিৎকার করে উঠল, ‘বেরিয়ে এসো অ্যাক্সোবেট।’
বলে নিজেই গাড়ির দরজা খুলে হাত ধরে টেনে নামাল আহমদ মুসাকে। লাল ধরনের লম্বা গোঁফে মারল এক টান। খসে গেল নকল গোঁফ। চিৎকার করে উঠল আবার ম্যালেনকভ, ‘এই তো আহমদ মুসা। মিলে যাচ্ছে ছবির সাথে।’
দু’জন স্টেনগানধারী ছুটে এসে আহমদ মুসার দু’পাশে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দুই পাঁজরে স্টেনগানের দুই নল। আরও দু’জন স্টেনগানধারী নেমে এসেছে মাইক্রো থেকে।
ওয়্যারলেসে মুখ লাগিয়ে ম্যালেনকভ তখন চিৎকার করছে, ‘হ্যাঁ স্যার, জ্বি স্যার, আহমদ মুসাই। একেবারে ছবির সাথে মিলে গেছে।’
‘শোন, চিৎকার করো না। মাথা ঠাণ্ডা কর। তোমার জীপটা এখনি পাঠিয়ে দাও সেই ফরাসী মহিলার সন্ধানে। ঐ মহিলাই আহমদ মুসার স্ত্রী। তাকে যে কোন মূল্যে পাকড়াও করতেই হবে। জীপের ড্রাইভারের সাথে যাবে জুকভ এবং দুই স্টেনগানধারী। আর তুমি আহমদ মুসাকে মাইক্রোবাসে তোল। তার দু’পাশে দু’জন স্টেনগানধারীকে বসাও। তুমি আহমদ মুসার পেছনে বসো তোমার রিভলভার তার মাথায় ঠেকিয়ে। দেখ, অন্যথা না হয়। যত দ্রুত সম্ভব চলে এস মস্কোতে। তোমাদের এগিয়ে নেবার জন্যে আমরাও এগোচ্ছি। পথেই দেখা হয়ে যাবে। খুব সাবধান।’ বলল মস্কো থেকে।
‘জ্বি স্যার। অবশ্যই স্যার।’ বলে ম্যালেনকভ ওয়্যারলেস অফ করে দিয়ে চিৎকার করে উঠল জুকভের দিকে চেয়ে, ‘তুমি, মেদভ ও শেখভ জীপ নিয়ে এখনি ছোটো যে ফরাসী মহিলা গেল তাকে ধরার জন্যে। যেখানে পাও, যেভাবেই পার, তাকে ধরতেই হবে।’
বলেই জীপের ড্রাইভারের দিকে চেয়ে খেঁকিয়ে উঠল, ‘হা করে কি দেখছ। এখনও জীপে স্টার্ট দাওনি কেন?’
ড্রাইভার চমকে উঠে জীপে স্টার্ট দিল। জুকভ লাফ দিয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে উঠল। আর দু’জন স্টেনগানধারী মেদভ ও শেখভ জীপের পেছনে উঠে বসল।
জীপ লাফ দিয়ে স্টার্ট নিয়ে ছুটে চলল তীর বেগে ডোনা জোসেফাইনের ট্যাক্সির উদ্দেশ্যে।
জীপ চলে যেতেই ম্যালেনকভ চিৎকার করে বলল, ‘জোসেফ, নিকো, তোমরা মেহমানের পকেট সার্চ করো। তারপর নিয়ে তোল মাইক্রোতে।’
দুই স্টেনগানধারীর নাম জোসেফ ও নিকো। তাদের একজন পকেট সার্চ করল আহমদ মুসার। পেল একটা রিভলভার।
ম্যালেনকভ জোসেফের কাছ থেকে রিভলভারটি নিতে নিতে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে সোৎসাহে বলল, ‘তুমি আহমদ মুসা নও, কোন যুক্তি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?’
‘আমার কিছুই বলার নেই।’ বলল আহমদ মুসা নির্বিকার কণ্ঠে।
‘জান তো, তোমাকে যেতে হচ্ছে মস্কোতে আমাদের সাথে?’
‘জানি।’
‘কি ব্যাপার, মনে হচ্ছে তোমার কিছুই হয়নি, তুমি বুঝতে পারছ তো সব কিছু?’
‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। তোমার আনন্দে আমার খুব আনন্দ লাগছে।’
‘কেন?’
‘আহমদ মুসাকে ধরার জন্যে বড় রকম পুরষ্কার পাবে তুমি।’
‘পুরষ্কারের কথা জানি না। দেশের জন্যে কাজ করছি। আমাদের রাজত্ব এলে বড় দায়িত্ব অবশ্যই পাব।’
‘তোমাদের রাজত্ব কত দূরে?’
‘তোমাকে হাতে পাওয়া মানেই তো রাজত্ব পাওয়া।’
‘এই জন্যেই এত আনন্দ?’
‘অবশ্যই।’ বলে ম্যালেনকভ স্টেনগানধারী দু’জনকে নির্দেশ দিল আহমদ মুসাকে মাইক্রোতে তুলতে।
জোসেফ ও নিকো দু’জনে স্টেনগানের ব্যারেল দিয়ে ঠেলে আহমদ মুসাকে মাইক্রোতে তুলল। আহমদ মুসাকে মধ্যের সিটে বসিয়ে দু’পাশের সিটে দু’জন বসল আহমদ মুসার দিকে স্টেনগান তাক করে। আহমদ মুসার ঠিক পেছনের সিটে এসে বসল ম্যালেনকভ। তার হাতে রিভলভার। তাক করা আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসাই করল ওদের, সতর্কতার মধ্যে ওদের কোন ত্রুটি নেই।
ড্রাইভার বসেই ছিল তার সিটে। ম্যালেনকভ এসে বসার সাথে সাথে গাড়ি স্টার্ট দিল ড্রাইভার।
‘মস্কোতে আমাকে কোথায় নেবে তোমরা, জেলখানায়?’ আহমদ মুসা মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল ম্যালেনকভকে।
‘জেলখানায় কেন? আমরা কি সরকারের চাকর নাকি? বললাম না, আমাদের রাজত্বের জন্যে আমরা কাজ করছি।’
‘সেটা আবার কোন রাজত্ব?’
‘চল, সবই জানতে পারবে।’
‘কোথায় যেতে হবে, তোমাদের হেডকোয়ার্টারে?’
‘তাইতো যাবে।’
আহমদ মুসা খুশি হলো। তার টার্গেট, গ্রেট বিয়ারের মূল হেডকোয়ার্টার মস্কোতে না সেইন্ট পিটার্সবার্গে তা জানা। সম্ভবত মূল হেডকোয়ার্টারেই গ্রেট বিয়ার তাদের সবচেয়ে মূল্যবান বন্দী প্রিন্সেস ক্যাথারিন ও মিঃ প্লাতিনিকে আটক করে রেখেছে।
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে চেন?’
‘চিনব না কেন?’ বলল ম্যালেনকভ।
‘তাকে নাকি তোমাদের সরকার ক্ষমতায় বসাচ্ছে?’
‘ছো…।’ বলে হো হো করে হেসে উঠল ম্যালেনকভ। বলল, ‘বামন হয়ে চাঁদে হাত। প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে পাবে কোথায়?’
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিন কোথায়?’
‘তুমি তো সাংঘাতিক লোক দেখি। কোর্টের মত জেরা শুরু করেছ। আর কোন কথা নয়। চল, সবই জানতে পারবে।’
বলে চুপ করল ম্যালেনকভ। আহমদ মুসা বুঝল, আর কোন কথাই ওর কাছ থেকে বের করা যাবে না। তবে আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, গেলে সে ‘সবই জানতে পারবে’ অর্থ ক্যাথারিনের বিষয়ও জানতে পারবে। তার মানে, প্রিন্সেস ক্যাথারিনের বিষয় সেখানে আলোচনা হবে, অথবা প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে সে দেখতে পাবে।
বন্দী হওয়ায় যেটুকু উদ্বিগ্ন হয়েছিল আহমদ মুসা, এসব চিন্তা তাকে তার মিশনের ব্যাপারে আশান্বিত করলো। কিন্তু পরক্ষণেই মনটা উদ্বেগে ভরে গেল ডোনা জোসেফাইনের চিন্তায়। শয়তানদের হাতে ও ধরা পড়ে যাবে না তো!
ওরসা শহরের মধ্যে দিয়ে তখন ম্যালেনকভের গাড়ি তীব্র বেগে এগিয়ে চলেছে মস্কোর উদ্দেশ্যে।

ওদিকে আহমদ মুসাকে নিয়ে ম্যালেনকভের গাড়ি ছেড়ে দিতেই সক্রিয় হয়ে উঠল আহমদ মুসার ট্যাক্সির ড্রাইভার।
আহমদ মুসার সিটে আহমদ মুসার ব্যাগ পড়েছিল। ব্যাগটির দিকে চেয়ে ড্রাইভার ভাবল, মস্কো পর্যন্ত ভাড়া সে তো পেয়েই গেছে। সে মস্কো পর্যন্ত বন্দী আহমদ মুসার গাড়ি অনুসরণ করতে পারে। ব্যাগটি যদি ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ হয়, ফিরিয়ে দেবে। না হলে ব্যাগটি ফিরে এসে পৌঁছে দেবে বরিসভকে। কোথায় ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাও তার জানা হয়ে যাবে। কোন সাহায্য বরিসভ তাকে করতেও পারে।
এই চিন্তার পর আহমদ মুসার ট্যাক্সি ড্রাইভার তার গাড়ি নিয়ে ছুটে চলল ম্যালেনকভের গাড়ি অনুসরণ করে।
দেখা গেল, ট্যাক্সি ড্রাইভারের গাড়ি চলা শুরু করার পর কিছু দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একটা নতুন জীপও ছুটতে শুরু করল। জীপের ড্রাইভিং সিটে একজন তরুণী।