২৪. জারের গুপ্তধন

চ্যাপ্টার

সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার তখনও নামেনি।
অল্প আগে ম্যালেনকভের গাড়ি বিখ্যাত স্মলেনস্ক শহর অতিক্রম করে এসেছে।
গাড়ি প্রবেশ করছে ‘দনপর’ নদীর ব্রীজে। এখানে সড়ক ও রেলপথ পাশাপাশি। দু’টো ব্রীজও প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। রেলওয়ে ব্রীজে তখন একটি রেলগাড়ি। প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে।
ম্যালেনকভের গাড়ির মধ্যে থেকেও আহমদ মুসা রেলের শব্দের মধ্যে যেন ডুবে গিয়েছিল।
হঠাৎ গাড়ির নিচে থেকেই আরেকটা প্রচণ্ড শব্দ উঠল। সেই সাথে হঠাৎ দেবে গেল গাড়ির পেছনটা প্রচণ্ড ঝাঁকি দিয়ে।
ঠিক পর মুহূর্তেই গুলির শব্দ। ঝন ঝন করে ভেঙে পড়ল গাড়ির কাঁচের জানালা। আর্তচিৎকার করে উঠল পেছন থেকে ম্যালেনকভের কণ্ঠ।
প্রথম গুলির পরপরই গর্জে উঠেছিল আরেকটা গুলির শব্দ। সেই সাথেই শোনা গেল ড্রাইভারের কণ্ঠে মরণপণ চিৎকার।
ততক্ষণে গাড়ি গিয়ে ব্রীজের প্রবেশ মুখে ব্রীজের রেলিং-এ গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে।
আহমদ মুসা প্রথমটায় কিছু বিমূঢ় হয়ে পড়লেও পরক্ষণেই তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ম্যালেনকভদের গাড়ি আক্রান্ত হয়েছে।
প্রথম গুলির পরেই আহমদ মুসা গাড়ির প্রবল ঝাঁকুনিতে প্রথমে পেছনে, তারপর সামনে ঝুঁকে পড়া বিমূঢ় জোসেফ ও নিকোর মধ্যে নিকোর হাত থেকে নিজের হাতে স্টেনগান তুলে নিয়ে তার পাঁজরে গুঁতো চালিয়ে দু’হাতে স্টেনগানের দু’প্রান্ত ধরে তীব্রভাবে আঘাত করল জোসেফের ঘাড়ে।
দু’জনেই কুঁকড়ে পড়ে গেল সিটের উপর।
আহমদ মুসা স্টেনগান নিয়েই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসা দেখেছিল, ম্যালেনকভের গাড়িতে গুলি বর্ষণকারী গাড়িটি একটা জীপ এবং দ্রুত সামনে চলে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেরিয়েই সামনে তাকাল। জীপের কোন চিহ্নই দেখল না। তাকাল পেছনে। দেখল, একটি ট্যাক্সি এসে ব্রীজের মুখে দাঁড়াল। দূরত্ব কয়েক গজ মাত্র। তখনও সন্ধ্যার অন্ধকার নামেনি। আহমদ মুসা ট্যাক্সির দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো, ওটা তারই ট্যাক্সি, পুশকভ থেকে নিয়ে এসেছিল।
পরক্ষণেই আহমদ মুসা দেখল, ট্যাক্সি থেকে মুখ বাড়িয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার তাকে ডাকছে।
হঠাৎ সন্দেহের এক প্রবল ধাক্কা লাগল আহমদ মুসার মনে। তার ট্যাক্সিটি ম্যালেনকভের গাড়ির পেছনে কেন? ট্যাক্সি ড্রাইভার গ্রেট বিয়ারের লোক নয়তো?
আহমদ মুসা স্টেনগানের ট্রিগারে তর্জনী চেপে দ্রুত এগোলো ট্যাক্সির কাছে। বলল ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি এখানে কেন?’
‘স্যার, গাড়িতে উঠুন। সব বলছি। এখান থেকে আগে আমরা পালাই। পুলিশ কিংবা কোন বিপদ এসে পড়তে পারে।’ বলল ড্রাইভার দ্রুত কণ্ঠে।
আহমদ মুসা চকিতে গাড়ির ভেতরটায় চোখ বোলাল, না, গাড়ির সিটে বা ফ্লোরে কেউ লুকিয়ে নেই। আহমদ মুসার ব্যাগটি পড়ে আছে পেছনের সিটে।
আহমদ মুসা স্টেনগান নিয়েই গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসল।
সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি স্টার্ট দিল ড্রাইভার।
ম্যালেনকভের গাড়িকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত সামনে এগোলো ট্যাক্সি।
ব্রীজ পেরিয়ে বেশ কিছুদূর এসে গাড়ির গতি কিছুটা স্লো করে প্রথমেই মুখ খুলল ট্যাক্সি ড্রাইভার। বলল, ‘স্যার, আমাকে ভাড়া দিয়েছেন মস্কো পর্যন্ত। আপনাকে ওরা ধরে নিয়ে গেলে আপনার ব্যাগ রয়ে গেল আমার গাড়িতে। আমি মনে করলাম, মস্কো পর্যন্ত যাওয়া উচিত আপনাকে অনুসরণ করে। আপনাকে না পেলে আপনাকে কোথায় নিয়ে যায় দেখে অন্তত তা আমি রিপোর্ট করতে পারবো মিঃ বরিসভকে। ব্যাগও তাকে দিতে পারবো।’
‘ধন্যবাদ ড্রাইভার। তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করছি। অথচ হঠাৎ এখানে দেখে আমি তোমাকে ওদের লোক বলে সন্দেহ করেছিলাম।’
‘ওরা কারা স্যার?’
‘গ্রেট বিয়ারকে চেন?’
‘চিনি স্যার। ওরা রাশিয়ায় ডিক্টেটরশীপ কায়েম করতে চায়।’
‘ঠিক বলেছ তুমি। এরা সেই দল।’
ড্রাইভার আর কোন কথা বলল না। কিছুক্ষণ নীরবতা।
আহমদ মুসাই আবার বলল, ‘জিজ্ঞেস করলে না আমি কে?’
‘স্যার, এত কথা কি ড্রাইভারের জন্যে মানায়?’
‘নিছক ড্রাইভার হলে মানায়।’
চকিতে মুখ ঘুরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল ড্রাইভার। তার আগেই আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘এসব কথা থাক। আসল কথা বল ড্রাইভার। গাড়িতে গুলি করল কে? তুমি কিছু জান?’
‘না স্যার। আমি তিনটা গুলির শব্দ শুনেছি। আমি যখন ব্রীজের মুখে এসে দাঁড়ালাম, তখন তো শুধু আপনাকেই দেখলাম। আমার প্রথমে মনে হয়েছিল, বোধ হয় আপনিই ভেতর থেকে গুলি করে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু চাকায় গুলি দেখে তা আবার মনে হয়নি।’
‘একটা গাড়ি থেকে গুলি হয়েছে। গাড়িটা দ্রুত সামনে চলে গেছে।’
‘স্যার, গাড়িটা কি জীপ?’
‘হ্যাঁ, জীপ।’
‘স্যার, গুলির দু’মিনিট আগে একটা নতুন জীপ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আমাকে ওভারটেক করেছে। হতে পারে ঐ জীপ। কিন্তু জীপটিতে কোন আরোহী ছিল না। মনে হলো, একজন তরুণী জীপটিকে ড্রাইভ করছিল।’
‘তরুণী?’
‘হ্যাঁ, আমার তা-ই মনে হয়েছে।’
ড্রাইভারের শেষ কথাটায় চিন্তার অথৈ পানিতে পড়ে গেল আহমদ মুসা। এ ধরনের উদ্ধার অভিযান তার স্ত্রী তরুণী ডোনা জোসেফাইনের জন্যে মানায়। কিন্তু সে নয়। তার ট্যাক্সি অনেক সামনে চলে গেছে। তাছাড়া তাকে ধরার জন্যে তাকে ফলো করছে গ্রেট বিয়ারের জীপ এবং জীপটি নতুন নয়। সুতরাং কোনভাবে ডোনা জীপটি ছিনিয়ে এ অভিযান করেছে, এটাও নয়। ম্যালেনকভের গাড়ির উপর হামলা চালায় তাহলে কে? গ্রেট বিয়ারের তৃতীয় কোন শত্রু? কিংবা রুশ সরকারের কেউ? সন্দেহ নেই, গ্রেট বিয়ারের সাথে লড়াই-এ আহমদ মুসাকে জেতানোর মধ্যে সরকারের লাভ আছে। কারণ, তাতে প্রিন্সেস ক্যাথারিন উদ্ধার হয়ে যায় এবং তার মাধ্যমে সরকার জারের ধনভাণ্ডারও পেয়ে যায়। তাহলে এটা সরকারেরই কাজ। অর্থাৎ সরকারী লোক কি তাহলে তাকে অনুসরণ করছে? মনে মনে খুশি হলো আহমদ মুসা। সরকারী লোক অনুসরণ করলে ডোনা জোসেফাইনের নিরাপত্তাও হয়ে যায়। আহমদ মুসার মন উদ্বিগ্ন গ্রেট বিয়ারের জীপ ডোনার ট্যাক্সিকে অনুসরণ করার পর থেকেই।
আহমদ মুসা বলল, ‘গ্রেট বিয়ারের একটা জীপ আমার স্ত্রীর ট্যাক্সি অনুসরণ করেছে, তা দেখেছ তো?’
‘দেখেছি স্যার, ট্যাক্সির ড্রাইভার রোসা খুব চালাক এবং এক্সপার্ট স্যার। সে নিশ্চয় ব্যাপারটা বুঝবে এবং গ্রেট বিয়ারের জীপকে ঘোল খাইয়ে ছাড়বে স্যার।’
‘তুমি এতটা আশাবাদী কেমন করে?’
‘মিঃ বরিসভ সেভাবেই সিলেক্ট করেছেন স্যার। রোসাকে আমি ভালো করে জানি।’
‘তোমার কথা সত্য হোক ড্রাইভার। আমি এখন আমার স্ত্রীর সন্ধান করতে চাই। তুমি আমাকে কিভাবে সাহায্য করবে? সামনে আর কোন অসুবিধা আছে বলে মনে কর?’
‘মস্কো পর্যন্ত সামনে আর দু’টো বড় শহর আছে। ভাজমা এবং গ্যাগরিন।’
‘আমার তো মনে হয়, গ্রেট বিয়ার তার শিকার পেয়ে গেছে, এ ঘোষণা তাদের সব ক্ষেত্রে পৌঁছে গেছে এবং এ দু’টি শহরে মোতায়েন গ্রেট বিয়ারের লোকেরা ম্যালেনকভের গাড়ির অপেক্ষা করছে। অন্য কোন দিকে তাদের নজর যাবার কথা নয়।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। সামনে কোন অসুবিধা আর হবে না।’
‘আল্লাহ তা-ই করুন, তা-ই হোক ড্রাইভার। এস ড্রাইভার, এখন আমরা ভাবি, আমার স্ত্রীর গাড়ি আর সেই জীপটির কথা।’
‘মস্কো পৌঁছে রোসার সন্ধান আমি পাব স্যার। উভয়ে মস্কো পৌঁছার পর একটা জায়গায় আমাদের সাক্ষাৎ হবে, এই কথাই আমাদের আছে। অতএব, খবর আমরা পাচ্ছিই।’
‘ড্রাইভার, সত্যিই তোমাদের বুদ্ধিতে আমি চমৎকৃত হচ্ছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’
তখন তীব্র বেগে এগিয়ে চলছে আহমদ মুসার গাড়ি। ভাজমা শহর অতিক্রমের সময় গাড়ির গতি স্লো হলো। কিন্তু কেউ গাড়ি আটকাতে এলো না, জিজ্ঞাসাবাদ করল না।
খুশি হলো আহমদ মুসা। তার অনুমান ঠিক।
ভাজমা শহর পার হবার পর আবার আহমদ মুসার গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটল মস্কোর উদ্দেশ্যে।
আহমদ মুসা তার সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে। তার শূন্য দৃষ্টি বাইরে সন্ধ্যার আলো-আঁধারীর বুকে নিবদ্ধ।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ডোনা জোসেফাইনের অতুলনীয় সুন্দর নিষ্পাপ মুখটি। এ মুখটি ঘিরেই আহমদ মুসার আজ নতুন স্বপ্ন, নতুন জীবন। জীবনে অনেক স্বপ্নই আহমদ মুসার ভেঙে গেছে। তাই যেন উদ্বেগের অপ্রতিরোধ্য এক যন্ত্রণা তার হৃদয়কে আজ দুমড়ে-মুচড়ে দিতে চাচ্ছে।
সিটে হেলান দেয়া আহমদ মুসার চোখ দু’টি আস্তে আস্তে বুজে গেল। তার মুখ থেকে সাহসের এক প্রার্থনা বেরিয়ে এল, ‘হাসবুনাল্লাহ, ওয়া নেয়মাল ওয়াকিল, নেয়মাল মাওলা ওয়া নেয়মান নাসির।’

ড্রাইভার রোসা উদ্বিগ্ন চোখে বার বার রিয়ারভিউ-এর দিকে তাকাচ্ছে।
হঠাৎ সে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। স্পীডোমিটারের কাঁটা সত্তর কিলোমিটার থেকে লাফিয়ে উঠল একশ’ দশে।
‘কি ব্যাপার মিস রোসা, হঠাৎ গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলেন যে!’
‘ওরসায় যে জীপটা আমাদের গতিরোধ করেছিল, সেই জীপটা আমাদের দিকে ছুটে আসছে।’
‘সেই জীপটা? চিনতে পেরেছেন?’
‘আমার সন্দেহ নেই, সেই জীপটাই।’
‘আমাদের লক্ষ্যে ছুটে আসছে কি করে বোঝা গেল?’ ডোনা জোসেফাইনের কণ্ঠে কিছুটা উদ্বেগ।
‘এই যে আমি গাড়ির গতি বাড়ালাম, সঙ্গে সঙ্গে জীপটির গতিও বেড়ে গেছে।’
‘এর অর্থ কি মিস রোসা?’
‘আপনি কি মনে করছেন ম্যাডাম?’
‘আমাদের দিকে ছুটে আসার অর্থ আমাকে সন্দেহ করেছে বা আমার পরিচয় জেনেছে। আর এর অর্থ, আমার স্বামীর পরিচয় ওদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়েছে এবং সম্ভবত উনি ওদের হাতে পড়েছেন।’ বলতে গিয়ে গলা কাঁপল ডোনা জোসেফাইনের।
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে ম্যাডাম।’
বলে একটু থেমেই রোসা আবার বলল, ‘বলুন, এখন কি করণীয়?’
আহমদ মুসার চিন্তায় ডোনা জোসেফাইনের হৃদয় কেঁপে উঠেছিল। আহমদ মুসা ওদের হাতে পড়ার কথা ভাবতেই শ্বাসরুদ্ধ একটা যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়েছিল তার গোটা হৃদয়জুড়ে।
কিন্তু ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সম্বরণ করল ডোনা জোসেফাইন। একটু সময় নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুলে রোসার প্রশ্নের জবাবে ডোনা জোসেফাইন বলল, ‘আমার স্বামী ওদের হাতে পড়ার পর এই খবর নিশ্চয় তারা সব জায়গায় দিয়েছে। সুতরাং পাহারা তুলে নেয়াই স্বাভাবিক। আর যদি আমার কথা ওদের জানিয়ে থাকে, তাহলে পাহারা থাকবে।’
বলে একটু থামল। তারপর আবার শুরু করল, ‘দ্বিতীয়টি যদি সত্য হয়, তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, কোন অবস্থাতেই আমরা গাড়ি দাঁড় করাবো না। গাড়ি দাঁড়ানোর ভান করে, সঙ্গে সঙ্গেই আবার লাফ দিয়ে পালাতে হবে। যাতে তারা আমাদের গাড়িতে গুলি করার মত সময় হাতে না পায়। পারবেন না মিস রোসা? ভয় করলে অনুরোধ করব ড্রাইভিংটা আমাকে দিতে।’
রোসার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। বলল, ‘পালানোর ট্রেনিং ড্রাইভারদের একটা বেসিক ট্রেনিং। দেখুন আমি কতটা পারি।’
‘ধন্যবাদ। আমি আপনাকে আরেকটু সাহায্য করব। আমি এস্টোনীয় যুবকের পোশাক নিচ্ছি। দেখা যাবে, আমাদের কেউ সন্দেহ করছে না।’
‘সুন্দর আইডিয়া।’ বলল হেসে রোসা।
ডোনা এস্টোনীয় যুবকের পোশাক পরল। মাথায় চুল ও মুখে স্কিন প্লাস্টিকের মুখোশ লাগানোর পর স্বয়ং রোসা চিৎকার করে উঠল, ‘মনে হয় ম্যাডাম, আপনার স্বামী দেখলেও এস্টোনীয় যুবক ভেবে আপনার সাথে হ্যান্ডশেক করবে।’
‘ধন্যবাদ মিস রোসা।’
রোসার কথাই ঠিক। ভাজমা শহরের প্রবেশমুখে গ্রেট বিয়ারের পাহারা ছিল। কিন্তু গাড়ির ভেতরে একবার তাকিয়েই গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ি তারপর তীর বেগে ছুটেছে আবার। পেছনের জীপটা প্রায় কোয়ার্টার মাইলের মত পিছিয়ে পড়েছিল। পুরানো জীপ নতুন ট্যাক্সির সাথে পারছিল না। কিন্তু ডোনা জোসেফাইনের গাড়ি ভাজমা থামায় জীপটা প্রায় দেড়শ’ গজের মধ্যে এসে পড়েছিল। সেখান থেকে অবশ্য চিৎকার করে কিছু বলে বাঁধা দেয়ার পর্যায়ে জীপটি ছিল না
ভাজমা পার হয়ে এসে কিছু রিল্যাক্সড হয়ে রোসা বলল, ‘সামনে গ্যাগরিন, একটা শহর, তারপরেই মস্কো।
‘বোঝা গেল, গ্যাগরিনেও পাহারা থাকবে।’ বলল ডোনা জোসেফাইন।
‘গ্যাগরিনকে পাশ কাটাবার মত ডান বাম দু’দিকেই বাইপাস সড়ক আছে। যদি বলেন আমরা বাইপাস রুট নিতে পারি।’
‘পেছনে শত্রুর তাড়া রেখে সাইডে অপ্রশস্ত রোডে ঢোকা ঠিক হবে না।’
‘ঠিক বলেছেন।’
বলে রোসা পেছনে তাকিয়ে গাড়ির স্পীড আবার বাড়িয়ে দিল।
পেছনের জীপ আপ্রাণ চেষ্টা করছে ডোনা জোসেফাইনের জীপ ধরার জন্যে। কিন্তু গতির শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
সামনের স্কাই লাইনে গ্যাগরিন শহরের আলোকমালা সজ্জিত দৃশ্য খুব সামনে এসে গেছে।
হঠাৎ আঁৎকে উঠল রোসা, ‘দেখুন, আসার রাস্তা বাদ দিয়ে তাদের যাওয়ার রাস্তা ধরে চারটি হেডলাইট ছুটে আসছে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে।’
কথাটা রোসা ডোনা জোসেফাইনকে বলতেই ডোনা চিৎকার করে উঠল, ‘নিশ্চয় ওগুলো শত্রুর গাড়ি। সামনে থেকে আমাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।’
‘তাহলে বলুন ম্যাডাম, সামনেই ফ্লাইওভার আছে ডাইনের বাইপাসে যাবার।’ চিৎকার করে বলল রোসা।
‘তা-ই কর রোসা।’ দ্রুত বলল ডোনা জোসেফাইন।
ফ্লাইওভারটি তখন বলা যায় নাকের উপর। এক্সপার্ট ড্রাইভার রোসা বোঁ করে ঘুরিয়ে গাড়িকে তুলে আনল ফ্লাইওভারে।
ফ্লাইওভার থেকে ডোনার গাড়ি গিয়ে পড়ল ডাইনের বাইপাস সড়কে।
সড়কটি গ্যাগরিন শহর পাশে রেখে কয়েকটি লোকালয় স্পর্শ করে এগিয়ে গেছে মস্কোর দিকে।
বাইপাস সড়ক ধরে তীব্র বেগে ছুটে চলল ডোনা জোসেফাইনের গাড়ি।
‘মিস রোসা, পেছনে ছয়টি হেডলাইট মানে তিনটি গাড়ি আমাদের পিছু নিয়েছে।’
‘পেছনেরটি জীপ। সামনের দু’টিই মাইক্রো। সুতরাং স্পীডের দিক দিয়ে আমরা এখনও সুবিধাজনক অবস্থায় আছি।’ রোসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলল ডোনা জোসেফাইন।
‘কি বললেন ওটা ম্যাডাম?’
‘ওটা একটা প্রার্থনা।’
‘আপনারা খুব ঈশ্বর মানেন, তাই না?’
‘সৃষ্টি করেছেন, তাই স্রষ্টাকে তো মানতেই হবে।’
‘না মানলে?’
‘না মানলে স্রষ্টার কোন ক্ষতি নেই, ক্ষতি নিজের।’
‘কেমন?’
‘কি কি করলে মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র সুস্থ থাকবে, সুশৃঙ্খল থাকবে, শান্তিতে থাকবে, সেগুলোই স্রষ্টা মানুষকে করতে বলেছেন। এগুলো করলে মানুষ এবং তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরই লাভ। না করলে ক্ষতি আকারে আসবে অসুস্থতা, বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি।’
‘অবাক কথা শোনালেন আপনি। ঈশ্বরের দেয়া কাজগুলোর কথা বললেন, সেগুলো তো রাষ্ট্রের সংবিধান এবং আইনের কাজ। কোন ধর্ম এসব বলে নাকি!’
‘বিশ্বে মানুষের জীবন ও চাহিদা সব সময় এক রকম ছিল না, তাই খোদায়ী ধর্মের ব্যবহারিক বিধান সব সময় এক রকম হয়নি। মানুষের জন্যে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত যে ধর্ম আল্লাহ দিয়েছেন, তাতে মানুষের জীবন পরিচালনার ‍পূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে।’
‘সে ধর্ম কোনটি?’
‘ইসলাম।’
‘ও, মুসলমানদের ধর্ম।’
‘না, ইসলাম মুসলমানদের ধর্ম নয়। ইসলাম মানুষের ধর্ম। যখন মানুষ ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করে, তখন তাকে বলা হয় মুসলমান। ‘মুসলমান’ অর্থ শান্তির পথ গ্রহণকারী, আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণকারী ইত্যাদি।’
‘মানুষের জীবন পরিচালনার পূর্ণ দিকনির্দেশনা অন্য কোন ধর্মে নেই? যেমন, আমাদের খৃস্টান ধর্ম।’
‘নেই।’
‘কারণ কি? কারণ কি এটাই যে, যা আপনি বললেন, মানুষের জীবন ও চাহিদার সে রকম দাবি ছিল না?’
‘হ্যাঁ, তা-ই।’
‘বিষয়টা আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।’
‘যেমন, বৈঠায় যখন প্রয়োজন পূরণ হয়েছে, তখন পাল আসেনি। যখন পালে প্রয়োজন চলেছে, তখন ইঞ্জিন আসেনি। যখন ইঞ্জিনের নৌকা বা ইঞ্জিনের গাড়িতে প্রয়োজন শেষ হয়েছে, তখন উড়োজাহাজ হয়নি, ইত্যাদি। আরেকটা উদাহরণ দেয়া যায়। রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন প্রয়োজনের তাগিদেই ক্রমপরিবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণতার দিকে চলে। খোদায়ী ধর্মের ব্যবহারিক বিধানের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।’
‘ধন্যবাদ। বুঝলাম আমি। এর দ্বারা কিন্তু আরেকটা জিনিস প্রমাণ হয়ে যায়, আগের খোদায়ী ধর্মগুলো বাতিল, সর্বশেষ খোদায়ী ধর্মটাই শুধু অনুসরণযোগ্য। সত্যিই কি তাই?’
‘ধন্যবাদ। ঠিক বুঝেছেন আপনি।’
‘এটা কিন্তু খুব বড় কথা। আগের ধর্মগুলো এটা মানবে না।’
‘মানছে না বলেই তো সমস্যা। তা না হলে গোটা পৃথিবীতে আজ শান্তির রাজত্ব কায়েম হয়ে যেত।’
‘আমি ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝেছি। আমি মনে করি, এই স্বাভাবিক, সংগত ও যৌক্তিক বিষয়টি সকলেরই মানা উচিত।’
বলে একটু থেমে একটা ঢোক গিলেই আবার বলল, ‘ম্যাডাম, আপনি ফরাসী। শুধু তা-ই নয়, আরও যেটুকু শুনেছি, আপনি ফ্রান্সের মহামান্যা রাজকুমারী এবং অবশ্যই খৃস্টান ছিলেন। আপনি ইসলামের বিষয় এত গভীরভাবে জানলেন কি করে এবং বুঝতে পারলেন কি করে?’
রোসার মুখে নিজের পরিচয় শুনে চমকে উঠল ডোনা জোসেফাইন। মিঃ বরিসভ দায়িত্বের কারণে জেনেছেন। কিন্তু ট্যাক্সি ড্রাইভার রোসার তো জানার কথা নয়। জানলো কি করে? মিঃ বরিসভ তো এসব কথা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলে দেবার কথা নয়।
ডোনা জোসেফাইন উত্তর দিতে একটু সময় নিল। কিন্তু তার মনের কৌতুহলটা চেপে গিয়ে রোসার প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘আমি ইসলাম শিখেছি আমার স্বামীকে দেখে, তার কাছে শুনে এবং পড়াশোনা করে।’
‘ম্যাডাম, আপনি কিন্তু সুন্দর বলতে পারেন। আমি ইসলাম সম্পর্কে পড়িওনি, তেমন কিছু শুনিওনি। কিন্তু আপনার কাছ থেকে এতটুকু শুনে আমার মনে হচ্ছে, আমার সব শোনা শেষ। আমি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছি। ইসলাম গ্রহণ করতে হলে কি করতে হয়?’
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলে ডোনা জোসেফাইন বিষয়টা রোসাকে বুঝিয়ে দিল।
‘বাহ, চমৎকার। খুব সোজা। একটা ঘোষণা মাত্র।’
তাদের এই আলোচনা আরও চলল।
রোসা আলোচনায় শরীক থাকলেও তার চোখ সামনের রাস্তা ও রিয়ারভিউ থেকে মুহূর্তের জন্যেও বিচ্ছিন্ন হয়নি।
মস্কো আর বেশি দূরে নয়।
মস্কোর উজ্জ্বল স্কাইলাইন চোখে লাগছে।
বাইপাস সড়কটি এখন আর বাইপাস সড়ক নেই, প্রসারতার দিক দিয়ে হাইওয়ের রূপ নিয়েছে। যাওয়ার সড়কটিতে চারটি লেন। মাঝখানে প্রশস্ত ডিভাইডার। ওপারে আসার সড়কেও চারটি লেইন।
পেছন থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ডোনা জোসেফাইন রোসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘একটা ব্যাপার মিস রোসা, পেছনের পিছু নেয়া তিনটি গাড়ি ইতোপূর্বে সচেষ্ট ছিল আমাদের ধরার জন্যে। কিন্তু এখন সে চেষ্টা তাদের দেখছি না। ওরা একই গতিতে আমাদের পেছনে ছুটে আসছে।’
‘ইয়েস ম্যাডাম, আমিও এটা লক্ষ্য করেছি। বুঝতে পারছি না, এদের এই মত পরিবর্তন কেন?’
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না ডোনা জোসেফাইন। চিন্তা করছিল সে। এক পর্যায়ে ডোনা জোসেফাইনের চোখে-মুখে চাঞ্চল্য দেখা দিল। সে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘রোসা, তাহলে কি ওরা নিশ্চিত হয়েছে যে, আমাদের ধরার জন্যে ওদের ওমন প্রাণপণ ছোটার প্রয়োজন নেই, সামনে থেকে ওদের সাহায্য আসছে? অথবা আমাদের এভাবে তাড়িয়ে নিয়ে কি সামনে কোন ফাঁদে আটকাবার পরিকল্পনা করেছে?’
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ম্যাডাম। আপনি ঠিক চিন্তা করেছেন। এ না হলে ওদের মনোভাব পরিবর্তনের আর কোন যুক্তি নেই।’
‘তাহলে রোসা? এভাবে চলে ওদের ফাঁদে তো পড়া যাবে না।’
‘ম্যাডাম, আমরা যে সড়ক দিয়ে চলছি, সামনে তা বেঁকে গিয়ে উঠেছে লেনিন হাইওয়েতে। ঐ হাইওয়েটি মস্কোভা নদীর ‍পূর্ব পাশ দিয়ে গিয়ে পড়েছে মস্কোর সাদোভায়া রিং রোডে। হতে পারে ঐ হাইওয়ে দিয়েই ওদের কোন সাহায্য আসছে। আমরা বাঁ পাশের কোন এক্সিট রোড (ভিন্ন দিকে বেরুবার পথ) ধরে কমসোমল হাইওয়েতে গিয়ে উঠতে পারি। ঐ হাইওয়েটিও মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি ও লেনিন হিলস-এর পাশ দিয়ে মস্কোভা নদী অতিক্রম করে গিয়ে পড়েছে সাদোভায়া রিংরোডে।
‘মিস রোসা, আপনি ঠিক চিন্তা করেছেন। সবচেয়ে কাছের এক্সিট রোড দিয়ে চলুন আমরা এ রোড থেকে সরে পড়ি।’
‘ইয়েস ম্যাডাম।’ বলে মাথা নাড়ল রোসা।
একটু সামনে এগিয়েই রোসা যে এক্সিট রোড দিয়ে বামে এগোলো, সেটা অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু অধিত্যকার মত এলাকায় উঠে গেছে।
অধিত্যকা ধরে তীব্র বেগে ডোনা জোসেফাইনের গাড়ি এগোচ্ছিল।
উদ্বিগ্ন ডোনা তাকিয়ে ছিল পেছনে। পেছনের শত্রু গাড়িগুলোর দিকে। তাকিয়ে থেকেই চিৎকার করে উঠল ডোনা জোসেফাইন, ‘রোসা, আমরা যে সড়কটি ছেড়ে এলাম, সেই সড়ক ধরে উত্তর দিক থেকে ছুটে এল একটা গাড়ি। সেই গাড়ি এবং পেছনের তিনটি গাড়ি এখন ছুটে আসছে এই এক্সিট রোড ধরে।’
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, অল্পের জন্যে আমরা বেঁচে গেছি। দুই দিকের চাপে এতক্ষণ আমাদের চিড়ে-চ্যাপ্টা হতে হতো। সামনের ঐ গাড়িটারই তারা অপেক্ষা করছিল।’
‘এখন তো চারটা গাড়ি ছুটে আসছে পেছন থেকে। আমরা এভাবে কতক্ষণ আত্মরক্ষা করতে পারবো?’
‘সামনে থেকে আসা নতুন গাড়িটা কি গাড়ি মনে হচ্ছে?’
‘সামনের হেড লাইটের অবস্থান এবং পেছনের লাইটের সাথে দূরত্ব দেখে মনে হয়েছে গাড়িটা মাইক্রো।’
‘তবু রক্ষা, রাশিয়ান এ মাইক্রোগুলো তাদের স্পীড দিয়ে অন্তত আমার ট্যাক্সিকে ধরতে পারবে না। আর এই অধিত্যকায় তাদের আরও অসুবিধা হবে।’
কিছু বলল না ডোনা জোসেফাইন। তার দৃষ্টি তখনও পেছনের দিকে নিবদ্ধ।
ডোনা জোসেফাইনের গাড়ি উঠে এল কমসোমল হাইওয়েতে। ছুটে চলল তারপর তীর বেগে।
হাইওয়ের সে জংশনটি চোখের আড়াল হওয়ার আগেই ডোনা জোসেফাইন দেখল, পিছু নেয়া শত্রুর চারটি গাড়িই উঠে এসেছে হাইওয়েতে।
শত্রুর সে গাড়িগুলো বেশ পেছনে থাকলেও দুর্ভাবনা এসে ঘিরে ধরেছে ডোনা জোসেফাইনকে। সে শত্রুর কৌশল বুঝে ফেলেছে। ওয়্যারলেসে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদেরকে সামনে ও পেছন থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। হতে পারে দু’পাশ থেকে শত্রু আসতে পারে। ডোনা জোসেফাইন নিশ্চিত, কমসোমল হাইওয়েতে তারা উঠেছে, এটা শত্রুমহলে জানাজানি হয়ে গেছে। নিশ্চয় শত্রু পেছন থেকে যেমন, তেমনি সামনে থেকেও এখন ছুটে আসছে। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ডোনা জোসেফাইন। সে তো আহমদ মুসা নয়, কিভাবে শত্রুর চতুর্মুখী এ হামলার মোকাবিলা করবে?
গাড়ি তখন ‘লেনিন হিলস’ এলাকায় পৌঁছে গেছে।
ডোনা জোসেফাইন মনস্থির করে রোসার দিকে চেয়ে বলল, ‘রোসা, আর সামনে এগোনো যাবে না। ডানে কিংবা বামে কোনদিকে গাড়ি সরিয়ে নাও।’
‘আর এগোনোই যাবে না ম্যাডাম। চেয়ে দেখুন।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল রোসা।
ডোনা জোসেফাইন চমকে উঠে সামনে তাকিয়ে দেখল, সামনেই একটা রোড জংশন, যেখানে ফ্লাইওভারের মুখে হাইওয়ের একাংশ জুড়ে একটা কার এবং একটা জীপ দাঁড়িয়ে আছে আলো নিভিয়ে এদিকে মুখ করে।
কিছু বলতে যাচ্ছিল ডোনা জোসেফাইন। কিন্তু গাড়ির আকস্মিক ঝাঁকুনিতে মুখ থেকে কথা বেরুল না, কাত হয়ে পড়ে গেল সে সিটের উপর।
‘সংকীর্ণ হলেও একটা এক্সিট পেয়ে গেছি। মনে হচ্ছে, সরে পড়ার এটাই শেষ সুযোগ। গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম।’ বলল রোসা।
ডোনা জোসেফাইন উঠে বসে বলল, ‘ঠিক করেছ রোসা। আমিও এটাই বলেছিলাম।’
বলেই দ্রুত পেছনে সেই রোড জংশনের দিকে তাকাল ডোনা জোসেফাইন। দেখল, চারটা হেডলাইট এ এক্সিট রোডের দিকে ছুটে আসছে। এভাবে উল্টো দিকে আসতে দেখে ডোনা নিশ্চিত হলো, হেড লাইট নিভিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি দু’টি তাহলে শত্রুরই ছিল এবং তারা এখন ছুটে আসছে ডোনাদের গাড়ির লক্ষ্যে। ডোনা জোসেফাইন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। অল্পখানেকের মধ্যে তৃতীয় সম্মুখ বিপদ থেকে বাঁচার আল্লাহ সুযোগ দিলেন।
ডোনা বলল আবার রোসাকে, ‘দাঁড়ানো গাড়ি দু’টি শত্রুরই। ওরা এখন ছুটে আসছে এদিকে।’
‘ম্যাডাম, এ রাস্তা দিয়ে বোধ হয় বেশি এগোনো যাবে না। মনে হচ্ছে, এটা একটা প্রাইভেট রোড। কোন অফিস বা কোন বাড়িতে গিয়ে এটা শেষ হয়েছে।’
একটা পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তাটা একেঁ বেঁকে উপরে উঠে গেছে। যেখানে পাহাড়ের গা’টা সমতল, সেখানে রাস্তায় কোন সাইড রেলিং নেই। আবার যেখানেই পাহাড়টা খাড়া হয়ে নিচে গেছে, সেখানেই সাইড রেলিং বা পিলার দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রোসাই আবার কথা বলল, ‘ম্যাডাম, উপায় নেই, গাড়ি আমাদের ত্যাগ করতে হবে। উপরে বাসা বা অফিস যা-ই থাক, সেখানে আমরা নিরাপদ হবো না। সেখানে ওদের ছ’টি বহর গিয়ে হানা দেবে।’
‘আমি তোমার সাথে একমত রোসা।’ স্থির কণ্ঠে বলল ডোনা জোসেফাইন।
রাস্তা দু’পাশ জুড়েই ঘন ঝোপ-ঝাড়।
পাহাড়ের অনেক উপরে উঠে এসেছে তখন গাড়ি।
পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরে রোসা বলল, ‘ম্যাডাম, সামনে যেখানেই সমতল পাব, সেখানেই গাড়ি স্লো করবো। আপনাকে সেখানে নেমে যেতে হবে। তৈরি থাকুন।’
‘তারপর?’
‘তারপর আমি পরবর্তী খাড়া এলাকায় পৌঁছে রেলিং-এর একাংশ ভেঙে গাড়ি নিচে ফেলে দেব। আমি সরে পড়ব। আর গাড়ি নিচে পড়ে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। শত্রুরা ভাববে, আমরা অ্যাক্সিডেন্ট করে গাড়িসমেত ধ্বংস হয়ে গেছি। পরে আমরা দু’জন দু’জনকে খুঁজে নেব।’
‘ধন্যবাদ রোসা।’
‘ওয়েলকাম ম্যাডাম।’
ডোনা জোসেফাইন হাতের ব্যাগটাকে পিঠে ঝুলিয়ে নিল। আগে থেকেই পুরুষের পোশাক পরা ছিল, খুশি হলো, এতে সুবিধাই হবে।
উপত্যকার মত একটু সমতল জায়গায় এসে রোসা গাড়ি স্লো করল এবং সুইচ টিপে খুলে দিল দরজা।
ডোনা খোলা দরজা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ল।
গাড়িটা প্রায় ডেড স্লো হয়ে পড়েছিল, তবু একটা পা অসমান জায়গায় পড়ায় ঘুরে পড়ে গেল ডোনা পাশের ঝোপের উপর।
আসলে ঝোপটা ছিল রাস্তার সাইড রেলিংকে কেন্দ্র করে গজিয়ে উঠা নতুন লতা-পাতার ঘন আবরণ।
এই লতা-পাতার আবরণের কারণে রোসা রেলিং দেখতে পায়নি। অন্যদিকে উপত্যকার মত বলে একে সমতল ভূমি বলেই মনে করেছিল রোসা। আসলে সমতল নয়। পাহাড়ের সাংঘাতিক এক ঢালু এলাকা এটা।
ডোনা জোসেফাইনের দেহ নতুন গজানো হালকা লতা-পাতার উপর পড়ে রেলিং-এর ফাঁক গলিয়ে আছড়ে পড়ল পাহাড়ের ঢালে। ঢালের উপর পড়েই ডোনা জোসেফাইনের দেহ ওলট-পালট খেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল নিচে।
পাহাড়ের এ ঢালটায় ছিল গা ভর্তি ঘাস এবং ছোট ছোট লতাগুল্ম। দেহটা আটকে যাবার মত কিংবা ধরে পতন রোধ করার মত গাছ-গাছড়া বা কোন অবলম্বন ছিল না। তার উপর মাঝে মাঝে ছিল পাথরের মত শক্ত মাটির ঢেলা এবং গাছের পুরানো মুথা। এ সবের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলো ডোনা জোসেফাইনের দেহ।
কি ঘটতে যাচ্ছে ডোনা জোসেফাইন বুঝতে পেরেছিল। সে চেষ্টা করছিল কোন অবলম্বন ধরে নিজের পতন রোধ করতে। কিন্তু পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত ডোনা জোসেফাইন চেষ্টা করেছিল নিজের সংজ্ঞা ধরে রাখতে, যাতে কোন প্রতিকূল অবস্থায় আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু তাও পারল না ডোনা। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল ডোনা জোসেফাইন।

আহমদ মুসার গাড়ি কুটুজোভস্কি হাইওয়ে দিয়ে মস্কো শহরে প্রবেশ করল। এই হাইওয়ে দিয়ে মিনিট কুড়ি এগোবার পর গাড়ি ডান দিকে টার্ন নিল।
আহমদ মুসা ড্রাইভারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘পাভলভ, কোথায় যাচ্ছ?’
‘স্যার, ফরেন মিনিস্ট্রি রোডে ঢুকলাম। এখান হয়ে সাদোভায়া রিং রোডে পড়ব। তারপর পূর্বদিকে এগিয়ে টলস্টয় পার্কে প্রবেশ করব। সেখানে টলস্টয়ের বাড়ির সামনে দর্শনার্থী গ্যালারিতে রোসার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবার কথা।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু পাভলভ, আমি জানতাম, টলস্টয়ের বাড়িটা গোটা দক্ষিণ মস্কোর গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টার।’
‘চিন্তার কিছু নেই স্যার। সে সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই, সে কেজিবিও নেই।’
আধা ঘণ্টার মধ্যে আহমদ মুসার গাড়ি প্রবেশ করল টলস্টয় পার্কে।
টলস্টয় পার্ক মস্কোর সবচেয়ে বড় পার্ক। যেমন বড়, তেমনি মনোরম এ পার্ক। ইংরেজী বর্ণ ‘ইউ’-এর আকারে মস্কোভা নদী তিন দিক দিয়ে ঘিরে আছে পার্ককে। পার্কের দক্ষিণ পাশে লেনিন হিলস্‌। কমসোমল হাইওয়েটি লেনিন হিলস ও টলস্টয় পার্কের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে পড়েছে গিয়ে সাদোভায়া রিং রোডে।
টলস্টয়ের বাড়িতে দর্শক গ্যালারিতে আহমদ মুসা এবং পাভলভ অপেক্ষা করল রাত এগারটা পর্যন্ত। কিন্তু রোসার সাক্ষাৎ মিলল না।
কপাল কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। ডোনা জোসেফাইন মস্কো পৌঁছার পর ট্যাক্সি আটকে রাখার কথা নয়।
পাভলভও ভাবনায় পড়ল। বলল, ‘যার বাড়িতে ম্যাডাম উঠবেন, সে বাড়ি খোঁজার জন্যে কি খুব বেশি দেরি হওয়ার কথা?’
‘অবশ্যই না। যার বাড়িতে উঠার কথা, তার সাথে কথা বলা হয়েছে পুশকভ থেকে। পরিষ্কার লোকেশন পাওয়া গেছে। চিনতে সামান্য অসুবিধা হওয়ারও কথা নয়।’
দু’জনের কেউই আর কথা বলল না।
আহমদ মুসা টেলিফোন করল সেই বাড়িতে পাবলিক বুথ থেকে। না, সেখানে ডোনা জোসেফাইন পৌঁছেনি। তাহলে কি রাস্তাতেই কোন কারণে তাদের দেরি হচ্ছে? না কোন বিপদে পড়েছে তারা?
এবার শংকা এসে ঘিরে ধরল আহমদ মুসাকে।
রাত এগারটার পর আহমদ মুসা ও পাভলভ ফিরে এল টলস্টয় পার্ক থেকে।
আবার পরদিন সেই অপেক্ষার পালা। অনিশ্চিত অপেক্ষা খুবই কষ্টকর।
আহমদ মুসা ও পাভলভ দু’জনই উদ্বিগ্ন।
তখন বেলা দশটা।
অস্থিরভাবে ঘুরছিল পাভলভ পার্কিং এরিয়ায়। কাছেই আহমদ মুসা একটা রেলিং-এ হেলান দিয়ে তাকিয়েছিল টলস্টয় হাউজ সংলগ্ন সুন্দর বাগানটার দিকে।
একটা ট্যাক্সি এসে থামল। পাভলভ ও আহমদ মুসা দু’জনেই শব্দ শুনে আগ্রহের সাথে তাকাল সেদিকে।
কিন্তু গাড়ির নাম্বারের দিকে তাকিয়ে দু’জনেই হতাশ হলো। না, ওটা রোসার গাড়ি নয়।
চোখ সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। কিন্তু দেখল, ট্যাক্সি থেকে লাফ দিয়ে নামল রোসা।
রোসার দৃষ্টি পাভলভের দিকে। পাভলভও তাকে দেখতে পেয়েছে। ছুটে গেল পাভলভ রোসার দিকে।
কিন্তু রোসা খুব ঠাণ্ডা। সে পাভলভের একটা হাত ধরল মাত্র। কিন্তু উচ্ছ্বাস নেই। মুখ মলিন।
অজানা এক আশংকায় কেঁপে উঠল আহমদ মুসার মন।
পাভলভের চোখে-মুখে উদ্বেগজড়িত বিস্ময়।
আহমদ মুসা এগোলো রোসার দিকে।
আহমদ মুসার পরনে শিখ ট্যুরিস্টের পোশাক। রোসা চিনতে পারেনি আহমদ মুসাকে। একজন শিখ ট্যুরিস্টকে তার দিকে আসতে দেখে রোসা প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তুলেছিল আহমদ মুসার দিকে।
হাসল পাভলভ। বলল, ‘রোসা, স্যারকে চিনতে পারনি? তাহলে সার্থক স্যারের ছদ্মবেশ।’
এতক্ষণে বুঝল রোসা। হাসল সেও। বলল, ‘সত্যি নিখুঁত ছদ্মবেশ।’
পরক্ষণেই হাসি মিলিয়ে গেল রোসার মুখ থেকে। ভারি ও মলিন হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘স্যার, ম্যাডামকে আমি পৌঁছাতে পারিনি। হারিয়ে ফেলেছি তাকে।’ অবরুদ্ধ এক আবেগের উচ্ছ্বাসে শেষের কথাগুলো তার ভেঙে পড়ল।
আহমদ মুসার বুকটা ধড়াস করে উঠল উদ্বেগের ধাক্কায়।
নিজেকে সামলে নিল আহমদ মুসা। কি কথা বলবে সে! হৃদয় কাঁপল তার কথা বলতে। রোসার কাছ থেকে পরবর্তী কি কথা সে শুনবে এই ভয়ে।
একটু সময় নিয়েই আহমদ মুসা শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘বলুন, কি ঘটেছে?’
রোসা আহমদ মুসার আরও কাছে সরে এল। তারপর ধীরে ধীরে বলল সব ঘটনা। সামনে ও পেছন থেকে অব্যাহত তাড়া খেয়ে কিভাবে অবশেষে লেনিন হিলস-এর সংকীর্ণ রাস্তায় এসে পড়ল তারা, সে বিবরণ রোসা দিল। পরিশেষে বলল, ‘পেছন থেকে ছ’টা গাড়ি ছুটে আসছিল। এক সেকেন্ড নষ্ট করার সময় ছিল না। আমি উপত্যকা ধরনের সমতল জায়গা দেখে গাড়ি স্লো করেছিলাম। ম্যাডামও তৈরি ছিলেন। উনি লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিলেন গাড়ি থেকে। পাহাড়ের আরও শীর্ষে উঠে গাড়ি পাহাড়ের নিচে ফেলে দিয়ে আমি লুকিয়ে পড়েছিলাম। ওদের ছ’টি গাড়ি এসেছিল, ওরা দেখেছিল নিচে পড়ে গিয়ে বিধ্বস্ত হওয়া প্রজ্জ্বলিত আমাদের গাড়ির দিকে। ওদের কথায় বুঝেছিলাম, ওরা বিশ্বাস করেছে অ্যাকসিডেন্টের শিকার হয়ে গাড়ির সাথে আমরাও পড়ে গেছি। এরপর ওরা সকলেই ছুটে গিয়েছিল পাহাড়ের নিচে বিষয়টা পরখ করে নিশ্চিত হবার জন্যে। ওরা চলে গেলে আমি ছুটে গিয়েছিলাম ম্যাডামকে যেখানে নামিয়ে দিয়েছিলাম সেখানে। কথা ছিল, আমরা দু’জন দু’জনকে খুঁজে নেব। কিন্তু আমি তাকে সেখানে পেলাম না। সেখানে রাস্তার আশ-পাশ পরখ করে আমি আঁৎকে উঠলাম। যাকে সমতল মনে করেছিলাম, সেটা সমতল নয়। সংকীর্ণ রাস্তার দু’পাশে লতা-পাতার আড়ালে লুকানো রেলিং ছিল এবং তার নিচেই অত্যন্ত ঢালু পাহাড়ের গা। সেদিন রাতে এবং আজ সকালে আমি জায়গাটা পরীক্ষা করে বুঝলাম, কোনও ভাবে তিনি লুকানো রেলিং-এর ফাঁক গলিয়ে পড়ে গেছেন। কিন্তু আজ সকালে পাহাড়ের সে ঢাল এবং নিচটা খোঁজাখুঁজি করে তাকে আমি পাইনি। যে জায়গায় তার গড়িয়ে পড়ার কথা, তার পাশ দিয়েই সড়ক। সড়কটি মস্কোভা নদীর একটা নৌ-বন্দর থেকে বেরিয়ে লেনিন হিলস-এর পাদদেশ দিয়ে চলে গেছে দক্ষিণ দিকে।
থামল রোসা।
‘ঐ সড়ক দিয়ে কি যেখানে আপনার গাড়ি ভেঙে পড়েছে, সেখানেও যাওয়া যায়?’ বলল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ, ওটাই একমাত্র পথ। তবে গাড়ি যেখানে পড়েছে, সে জায়গাটা একটা গভীর খাদ। সড়ক থেকে বিশ-পঁচিশ গজ দূরে।’ রোসা বলল।
ম্লান হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার মুখ। একটু ভাবল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘আমরা কি ঐ এলাকায় যেতে পারি?’
‘অবশ্যই। এখনি যেতে পারি।’
‘ধন্যবাদ।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল পাভলভের দিকে। বলল, ‘তুমি কি বল?’
‘স্যার, এখনি যেতে পারি।’
কথা শেষ করেই পাভলভ হাঁটা দিল তার ট্যাক্সির লক্ষ্যে।
ড্রাইভিং সিটে বসল পাভলভ। তার পাশে রোসা। পেছনের সিটে আহমদ মুসা।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ডোনা জোসেফাইনের যেখানে গড়িয়ে পড়ার কথা সেখানে পৌঁছল আহমদ মুসারা।
গাড়ি সড়কের পাশে পার্ক করে জায়গাটার দিকে এগোলো তারা।
পাহাড়ের ঢাল বরাবর সড়কের পাশ দিয়ে এক ফুট, দেড় ফুট উঁচু রক্ষা প্রাচীর। এরপর ঢালু হয়ে উপরে উঠে গেছে পাহাড়ের গা।
রোসা একটু সামনে এগিয়ে একটা এলাকা চিহ্নিত করে বলল, ‘আমি উপর থেকে কয়েকটা ভারি পাথর ফেলে দেখেছি, কোনটাই এই এলাকার বাইরে যায়নি। সুতরাং ম্যাডামের দেহ এর বাইরে যেতে পারে না।’
আহমদ মুসা কিছুটা ঝুঁকে পড়ে গভীরভাবে চোখ বোলাতে লাগল জায়গাটার উপর। আহমদ মুসা ভাবছে, এত উঁচু থেকে গড়িয়ে পড়ার পরে আহত হবার কথা। ঘাসে রক্তের দাগ থাকতে পারে। কিন্তু আহমদ মুসা তেমন কিছুই পেল না।
এলাকার এক জায়গায় অনেকখানি জায়গা জুড়ে ঘাস একইভাবে নিচের দিকে হেলে পড়া। অনেকগুলো ঘাসের ডগা ছেঁড়া আছে, দু’একটা ঘাস উপড়ে যাওয়াও রয়েছে।
আহমদ মুসা কি যেন ভাবল, তারপর নাক ঘাসের কাছাকাছি নিয়ে ঘ্রাণ নিল।
চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। ডোনার ব্যবহৃত বিশেষ সেন্ট-এর গন্ধ পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা মাথা তুলে বলল, ‘সন্দেহ নেই রোসা, ডোনা জোসেফাইনের দেহ সর্বশেষ এখানে এসেই স্থির হয়েছিল।’
‘কি করে বোঝা গেল?’
‘দেখুন এই জায়গাটার ঘাসের অবস্থা। আর এখানে আলাদা একটা গন্ধ আছে।’
রোসা ও পাভলভ দু’জনেই এগিয়ে এসে পরখ করে বলল, ‘ঠিক বলেছেন।’
আহমদ মুসা রাস্তায় নেমে এল। ওরা দু’জনও।
আহমদ মুসা আবার চারদিকে নজর বোলাল। বলল, ‘আমার বিশ্বাস, আহত বা সংজ্ঞাহীন ডোনা জোসেফাইনকে কেউ তুলে নিয়ে গেছে।’
রোসা ও পাভলভ দু’জনেই শুকনো মুখে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। কথা বলল না।
আহমদ মুসাই আবার বলল রোসাকে লক্ষ্য করে, ‘আপনি এখানে কখন এসেছিলেন?’
‘প্রায় দেড় ঘণ্টা পর।’
‘তার আগে তো এখান দিয়েই ঐ ছয়টি গাড়ি আপনাদের গাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়েছিল?’
‘এদিক দিয়েই তো যাওয়ার পথ। কিন্তু তারা গিয়েছিল কিনা জানি না। আমি এসে কাউকে দেখতে পাইনি।’
‘ওরা গাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে আসবে বলেই তো নেমে এসেছিল।’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে ধরে নিতে হচ্ছে, আপনার আসার আগেই ওরা এদিক দিয়ে গেছে।’
‘সম্ভবত এটাই ঘটেছে।’ বলে একটা ঢোক গিলেই রোসা আবার বলল, ‘তাহলে কি ম্যাডাম ওদের হাতেই পড়েছে আপনি মনে করেন?’ কাঁপা কণ্ঠ রোসার।
আহমদ মুসার বুকটাও কেঁপে উঠল তার কথা শুনে। গোটা দেহটাই যেন তার যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। তার সমগ্র সত্তা যেন বলে উঠল, ডোনা জোসেফাইনের মত নিষ্পাপ একটি ফুল ওদের হাতে পড়তে পারে না, পড়া উচিত নয়।
কিন্তু ঘটনা ঘটে থাকলে, সেই ঘটনা অস্বীকার করবে কে?
‘কি ঘটতে পারে আমি সেটাই বলছি রোসা। ঘটেছে তা আমি বলতে পারি না।’ আহমদ মুসা থামল।
ওরাও নীরব।
অল্পক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙে আহমদ মুসা বলল, ‘গাড়ি যেখানে পড়েছিল, সেটা আর কতদূর?’
‘বেশি দূর নয়।’ বলল রোসা।
‘চলুন, যাওয়া যাক।’
সবাই গাড়িতে উঠে সামনে এগোলো।
পাহাড়ের দ্বিতীয় বাঁকটি পার হবার সময় রোসা বলল, ‘এই বাঁকের পরেই জায়গাটা।’
বাঁকটি পার হয়েই আহমদ মুসার গাড়ি আরেকটি গাড়ির প্রায় মুখোমুখি গিয়ে পড়ল। অল্পের জন্যে অ্যাক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে গেল। দু’গাড়ির কোনটিই হর্ন ব্যবহার করেনি।
রাস্তায় ডিভাইডার দিয়ে আসা-যাওয়ার লেন আলাদা করা না থাকলেও লাল রেখা দিয়ে দু’টি লেন আলাদা করা রয়েছে। সামনের গাড়িটা রং লাইন দিয়ে আসছিল।
সামনের সেই গাড়িটিতে ড্রাইভারসহ চারজন আরোহী। দু’জন সামনে, পেছনে দু’জন।
গাড়িটার ড্রাইভার তার অন্যায় কাজের জন্য সামান্য ‘স্যরি’ শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করল না। গাড়িটিকে পাশ কাটিয়ে নিয়ে চলে গেল।
আহমদ মুসার মনটা তেতো হয়ে গেল তাদের আচরণে। দুর্বিনীত লোকদের ভালো করে দেখার জন্যে আহমদ মুসা গাড়িটার দিকে ভালো করে তাকাল।
ডোনাদের গাড়ি যে গভীর খাদে ভেঙে পড়েছে, সেই বরাবর এসে আহমদ মুসার গাড়ি থামল।
গাড়ি থেকে নেমে সামনে তাকাতেই আহমদ মুসার দৃষ্টি একটা বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হলো।
আহমদ মুসার গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়েছে তার সামনেই গাড়ির চারটি চাকার আঁকা-বাঁকা চিহ্ন। দাগগুলো তাজা। মনে হয়, একটি গাড়ি এখানে দাঁড়িয়েছিল। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আবার পেছন দিকে চলে গেছে। সামনের দিকে রাস্তায় গাড়ির চাকার কোন চিহ্ন নেই। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, রাতের পর সকালে এ পথে আর কোন গাড়ি চলেনি।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে ঝড়ের মত চিন্তাটা এল, তাহলে তো এই মাত্র চলে যাওয়া গাড়িই সেই গাড়ি, যে গাড়ি এখানে দাঁড়িয়েছিল। আর এখানে দাঁড়ানোর অর্থ, তারা ডোনা জোসেফাইনের ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়িটিই দেখতে এসেছিল। গাড়িটির আরোহীরা কেউ তো পুলিশ নয়। তাহলে ওরা কারা? নিশ্চয় গত রাতে ওরাই ডোনা জোসেফাইনের গাড়ি অনুসরণ করেছিল এবং ওরাই সম্ভবত ডোনা জোসেফাইনকে তুলে নিয়ে গেছে সংজ্ঞাহীন অবস্থায়। গত রাতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়িটা পরীক্ষা করতে পারেনি। আজ সকালে এসেছিল সেই কাজে।
আহমদ মুসা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতই খুশি হয়ে উঠল। শয়তানদের ফলো করতে হবে। ওরাই এখন ডোনা জোসেফাইনকে উদ্ধার, প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার ও মিঃ প্লাতিনিকে উদ্ধারের সংযোগ সূত্র।
আহমদ মুসা গাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘পাভলভ গাড়িতে উঠো, মিস রোসা গাড়িতে উঠুন।’
বলে আহমদ মুসা দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। ওরা দু’জনও দ্রুত ফিরে এল গাড়িতে। বলল পাভলভ, ‘কি হলো স্যার?’
‘পাভলভ, যে গাড়িটা এখনি চলে গেল, যেভাবেই হোক তাকে ধরতে হবে।’ মনের উত্তেজনা আহমদ মুসার কণ্ঠে ধরা পড়ল।
পাভলভ ও রোসা দু’জনেই পেছন ফিরে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। তাদের চোখে বিস্ময়। তাদের ভাবনা, ছোট-খাট কোন ব্যাপারে আহমদ মুসার মত ব্যক্তিত্ব এমন উত্তেজিত হয়ে পড়ার কথা নয়। বলল রোসা বিনীতভাবে, ‘জানতে পারি কি আমরা, কি ঘটেছে?’
রোসার প্রশ্নের ধরনে আহমদ মুসা হেসে উঠল। বলল, ‘অবশ্যই।’
বলে একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল আহমদ মুসা. ‘আমি মনে করছি, ঐ গাড়ি বা ঐ গাড়ির আরোহীরাই গত রাতে আপনাদের গাড়ি অনুসরণ করেছিল এবং পরে এরাই সম্ভবত ডোনা জোসেফাইনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছে।’
অপার বিস্ময় ফুটে উঠল রোসা ও পাভলভের চোখে। বলল পাভলভ, ‘কিন্তু বোঝা গেল কিভাবে?’
আহমদ মুসা তাদেরকে সড়কে গাড়ির দাগের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল।
রোসা ও পাভলভের চোখে নতুন বিস্ময়। রোসা বলল, ‘ঠিক ধরেছেন। কিন্তু এত ছোট বিষয় এভাবে আপনার নজরে পড়ে?’
‘এসব বিষয় ছোট কোথায়? চোখে পড়ার মত যথেষ্ট বড়।’
‘কিন্তু আমাদের চোখে পড়েনি।’ বলল পাভলভ।
‘এসব কথা থাক পাভলভ। স্পীড আরও বাড়াতে পারো না?’
‘পাহাড়ী রাস্তা তো। চেষ্টা করছি স্যার।’ স্পীড বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল পাভলভ।
কিন্তু এতসব চেষ্টার পরেও কমসোমল হাইওয়েতে উঠার আগে সামনের গাড়িটিকে নজরেই আনতে পারলো না। পাহাড়ের শেষ বাঁকটা ঘুরে আহমদ মুসার গাড়ি যখন কমসোমল রোডের মুখোমুখি হলো, তখন তারা দেখল, সামনের গাড়িটি কমসোমল হাইওয়েতে গিয়ে উঠল।
আহমদ মুসার গাড়ি যখন কমসোমল হাইওয়েতে উঠল, সামনের গাড়িটি তখন প্রায় দেড়শ’ গজ সামনে।
হাইওয়েতে তখন প্রচণ্ড ভিড়। খুব চেষ্টা করেও আহমদ মুসার গাড়ি সামনের সেই গাড়িটার খুব বেশি নিকটবর্তী হতে পারল না।
‘ঠিক আছে পাভলভ। এখন অনুসরণ করা ছাড়া আর করার কিছু নেই।’
কমসোমল হাইওয়ে লেনিন হিলস এর উত্তর প্রান্তে এসে মস্কোভা নদীর ব্রীজে প্রবেশ করেছে। সামনের গাড়িটা ব্রীজের কাছাকাছি গিয়ে বাম দিকের একটা এক্সিট রোড ধরে মস্কোভা নদীর তীর বরাবর পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল।
এ রাস্তায় ভিড় অপেক্ষাকৃত কম।
পাভলভ তার গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল। খান তিনেক গাড়ি ওভারটেক করে আহমদ মুসার গাড়ি যখন ঐ গাড়িটার কাছে পৌঁছল, ঠিক তখনই গাড়িটা বাম দিকে টার্ন নিয়ে একটা প্রাইভেট রোডে প্রবেশ করল। আহমদ মুসার গাড়ি একটু সামনে এগিয়ে একটা গাছের নিচে পার্ক করল।
আহমদ মুসা পেছন ফিরে গাড়ির দিকে চোখ রেখেছিল। দেখল, যে প্রাইভেট রোডে গাড়িটি প্রবেশ করেছিল, তা দক্ষিণ দিকে কয়েক গজ এগিয়ে একটা বিশাল বাড়ির বিরাট গেটে গিয়ে শেষ হয়েছে। গাড়িটি সেই গেট দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
বাড়িটার গেট বন্ধ ছিল। গাড়িটা বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়াতেই গেট খুলে গিয়েছিল।
দুর্গ সদৃশ বাড়ির বিশাল গেটের বিরাট সাইনবোর্ডের সব লেখাই পরিষ্কার পড়তে পারছে আহমদ মুসা। সাইনবোর্ড অনুসারে বাড়িটি হলো ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচয়ে বলা হয়েছে, ‘সোশ্যাল রিসার্চ সেন্টার ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ (জাতীয় সংহতির সামাজিক গবেষণা কেন্দ্র)।
‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ সংস্থাটি সরকারী না বেসরকারী বুঝতে পারল না আহমদ মুসা। আর ওরাই বা এ বাড়িতে ঢুকল কেন, এ বিষয়টাও বিস্ময় জাগাল আহমদ মুসার মনে।
অবশ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচয় থেকে আহমদ মুসার মনে হলো, এর সাথে রাজনীতির যোগ আছে। আর এমন ফাউন্ডেশনের সাথে দুর্গ সদৃশ এই বাড়িকেও বেমানান লাগলো আহমদ মুসার কাছে।
পল পল করে পঁচিশ মিনিট পার হয়ে গেল।
এ ধরনের অপেক্ষা খুবই কষ্টকর।
আহমদ মুসা বাড়িটার গেটের দিকে চোখ রেখেই পাভলভকে লক্ষ্য করে বলল, ‘পাভলভ, তোমাদের সাথে আমার একটা আলাপ হওয়া প্রয়োজন।’
‘বলুন স্যার।’ বলল পাভলভ।
‘তোমাদের সাথে চুক্তি ছিল আমাদেরকে মস্কো পৌঁছে দেয়া। পৌঁছে দিয়েছ। তারপরও আজ এই সময় পর্যন্ত তোমার গাড়ি ব্যবহার করেছি। তোমাকে আর কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না। বাকি ভাড়াটা নিয়ে তুমি চলে যাও। আর মিস রোসা সম্ভবত চুক্তি অনুসারে মস্কো পৌঁছার টাকা পাননি। তার উপর তার গাড়ি নষ্ট হয়েছে আমাদের কারণেই। আমি ঐ ভাড়া ও গাড়ির দাম দিয়ে দিচ্ছি।’
পাভলভ ও মিস রোসা পরস্পরের দিকে চাইল। তাদের মুখ গম্ভীর।
একটু পর পাভলভ বলল, ‘ঠিক বলেছেন স্যার। আমরা ড্রাইভার। ভাড়ায় গাড়ি খাটাই। যে চুক্তিতে এসেছিলাম, সে চুক্তি শেষ। আমাদের চলে যাওয়াই উচিত। কিন্তু স্যার, মস্কোতে আপনার গাড়ি লাগবে। ভাড়াতেই গাড়ি নেবেন। তাহলে আমাদের নেবেন না কেন? আপনিই বলুন, অন্য ড্রাইভারের চেয়ে আমাদের কাছে ভালো সার্ভিস পাবেন কিনা?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘যুক্তিতে আমাকে বেঁধে ফেলেছ পাভলভ। কিন্তু একটা বড় ফাঁক রয়ে গেছে।’
‘স্যার সেটা কি?’
‘সব সময় আমি গাড়ি ব্যবহার করবো না। এমনও হতে পারে, দু’তিন দিন গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাব না। এই অবস্থায় আমার পেছনে গাড়ি খাটানো তোমার জন্য লাভজনক হবে না।’
‘সে চিন্তা আমার স্যার। অন্য জায়গায় গাড়ি খাটাতে আপনার নিশ্চয় কোন নিষেধ থাকবে না।’
হাসল আহমদ মুসা। কিছু বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় দেখল, সেই গেট দিয়ে আগের সেই গাড়িটিই বেরিয়ে এল। কিন্তু এবার গাড়িতে চারজন নয়। দু’জন। একজন ড্রাইভার এবং একজন আরোহী। আহমদ মুসার চিনতে অসুবিধা হলো না, এরা সেই চারজনেরই দু’জন।
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে পাভলভকে বলল, ‘গাড়ি ঘুরিয়ে পিছু নাও গাড়িটার।’
সামনের গাড়িটা কমসোমল রোডে উঠে মস্কোভা নদীর ব্রীজ পার হয়ে এগিয়ে চলল। কিন্তু টলস্টয় পার্কের প্রান্তে এসে কমসোমল রোড ছেড়ে দিয়ে গাড়িটা বাঁ দিকে টার্ন নিয়ে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল। মস্কোর বিখ্যাত ন্যাশনাল স্টেডিয়াম (সাবেক লেনিন স্টেডিয়াম) ও লুরানিকি স্পোর্টস কমপ্লেক্স বাঁয়ে রেখে স্পোর্টস রোড ধরে গাড়িটি সামনে এগোলো। কিন্তু শীঘ্রই আবার ডান দিকে টার্ন নিয়ে নেভিডিভিচ কনভেল্টের পুব পাশ দিয়ে টলস্টয় এভেনিউ ধরে উত্তরে এগিয়ে চলল। এই এভেনিউটি টলস্টয় পার্কের ভেতর দিয়ে টলস্টয়ের বাড়ির পাশ ঘেঁষে গিয়ে সাদোভায়া রিং রোডে উঠেছে।
টলস্টয় এভেনিউ মস্কোর সবচেয়ে নির্জন রাস্তা। আজ সোমবার প্রথম কার্যদিবস বলে মনে হচ্ছে আরও নির্জন।
এই নির্জন রোডে সামনের গাড়িটা হঠাৎ হার্ড ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা কি করবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবার আগেই তাদের গাড়ি সামনের গাড়ির কাছাকাছি এসে গেল।
সামনের গাড়িটি দাঁড়িয়েই আড়াআড়ি হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসাদের গাড়িকে দাঁড়াতেই হলো এই অবস্থায়।
আহমদ মুসাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামনের গাড়ির দু’পাশ থেকে দু’জন স্টেনগান নিয়ে বেরিয়ে এল। একজন চিৎকার করে বলল আহমদ মুসাদের গাড়িকে লক্ষ্য করে, ‘তোমরা বেরিয়ে এসো গাড়ি থেকে।’
রোসা ও পাভলভ দু’পাশ দিয়ে দু’জন গাড়ি থেকে বেরুল।
আহমদ মুসা রিভলভার ধরা ডান হাতটা পেছনে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আগের সেই লোকটিই চিৎকার করে বলে উঠল, ‘শিখ বেটা, তুই কেন গিয়েছিলি মস্কো হিলস (‘লেনিন হিলস’ নাম পরিবর্তন করে ‘মস্কো হিলস’ করা হয়েছে)-এর ঐ এলাকায়? আবার ফলোও করছিলি আমাদের। তোর জান নেয়ার আগে তোর পরিচয় নেয়া দরকার। তুই আয় আমাদের গাড়িতে।’
একটু থেমেই রোসাকে লক্ষ্য করে আবার বলল, ‘ছুঁড়ি, তুইও আয়, মউজ করার মত সুন্দরী তুই।’
বলেই লোকটি স্টেনগান তুলল পাভলভকে লক্ষ্য করে।
পাভলভকে লক্ষ্য করে স্টেনগান উঁচাতে দেখেই আহমদ মুসা বুঝে নিয়েছিল কি ঘটতে যাচ্ছে। আহমদ মুসা তাকে স্টেনগানের ট্রিগার চাপার সুযোগ দিল না। আহমদ মুসা বিদ্যুৎ বেগে তার ডান হাতটি সামনে নিয়ে এসেই পর পর দু’টি গুলি করল।
গাড়ির দু’পাশের দুই স্টেনগানধারী মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে।
ঠিক এই সময়েই পেছনে অট্টহাসি শুনল।
চমকে ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। দেখল, তাদের গাড়ির কয়েক গজ পেছনে আরেকটা কার এসে দাঁড়িয়েছে। আহমদ মুসা ভাবল, সামনের পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ থাকার কারণে পেছনের এই গাড়ির আগমন তারা টের পায়নি।
সামনের গাড়ির মতই পেছনের গাড়ির দু’পাশে দু’জন দাঁড়িয়ে। তাদের দু’জনের হাতে দু’টি মেশিন রিভলভার। তাদের দু’জনেরই রিভলভারের নল স্থির নিবদ্ধ আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়ালে অট্টহাসি হাসা লোকটি এবার শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘দারুণ হাত দেখিয়েছ তুমি। তুমি শুধু শিখ ড্রাইভার নও।’
বলে চোখের দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর স্থির রেখেই তার সাথীকে নির্দেশ দিল, ‘গিয়ে ওর রিভলভার নিয়ে নাও। আর ওকে বেঁধে নিয়ে এস।’
আহমদ মুসার রিভলভার ধরা হাতটি তখন নিচু। উপরে তোলার সময় হয়নি।
নির্দেশ পেয়ে দ্বিতীয় লোকটি এগিয়ে আসতে শুরু করেছিল আহমদ মুসার দিকে।
পিনপতন নীরবতা তখন।
এই সময় সেই নীরবতা ভেঙে পড়ল গুলির শব্দে। পর পর দু’টি গুলি।
গুলির উৎস লক্ষ্যে আহমদ মুসার চোখ দ্রুত ছুটে গিয়েছিল দক্ষিণে।
একজন কাউকে গাছের আড়াল দিয়ে রাস্তার দিকে ছুটে যেতে দেখল। তারপরেই একটা ইঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার শব্দ।
অদৃশ্য থেকে আসা গুলির দু’জনেই শিকার হলো। যে লোকটি আহমদ মুসার দিকে আসছিল, তার দেহটি পড়ে গেল আহমদ মুসার থেকে কয়েক ফুট দূরে। আর যে লোকটি মেশিন রিভলভার বাগিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার দেহটি প্রথমে আছড়ে পড়ল গাড়ির উপর। তারপর গাড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ল নিচে।
আহমদ মুসার কাছে আসল পাভলভ। তার পেছনে পেছনে রোসাও।
‘স্যার, আমি দেখতে পেয়েছি, ওটা সেই জীপ।’
‘আমারও তা-ই মনে হচ্ছে।’
আহমদ মুসার চোখে-মুখে গভীর চিন্তার রেখা। এটা সেই জীপ হলে, নিশ্চয় এ দুটো গুলি সেই মেয়েটির রিভলভার থেকেই এসেছে। কে এই মহিলা? আহমদ মুসাকে বাঁচাচ্ছে কেন? বিপদের চরম মুহূর্তে কোত্থেকে, কিভাবে সে আবির্ভূত হচ্ছে!
ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আমাদের সরে পড়া দরকার। পুলিশ এলে আমরা ঝামেলায় পড়ব।’ বলল পাভলভ।
‘হ্যাঁ, চল।’ বলে আহমদ মুসা গাড়িতে উঠার আগে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নিল।
রোসা ও পাভলভও উঠল। বলল পাভলভ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে, ‘কোথায় যাব স্যার?’
‘সামনে এগিয়ে সাদোভায়া রিং রোডে ওঠো।’
চলতে শুরু করল গাড়ি।
‘স্যার, আপনি আমাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।’ বলল পাভলভ বিনীত কণ্ঠে।
পাভলভ থামতেই রোসা বলল, ‘আমরা চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব স্যার।’
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। রোসাকে বলল, ‘জীবন পাভলভের, আপনি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন কেন?’
রোসার মুখ লাল হয়ে উঠল লজ্জায়। সে প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে বলল, ‘আমাকে ‘আপনি’ না বলে ‘তুমি’ বলার জন্যে অনুরোধ করছি স্যার। পাভলভকে ‘তুমি’ বলেন। আমার খুব ভালো লাগে।’
‘ঠিক আছে। আমার প্রশ্নের উত্তরটা দাও।’
মুখ নিচু করল রোসা। মুখে সলাজ হাসি।
‘ও অনুগ্রহ করে বিয়ের কনসেন্ট দিয়েছে স্যার।’ পাভলভের ঠোঁটে হাসি।
কৃত্রিম রাগ ফুটে উঠল রোসার রাঙা মুখে। পাভলভের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার ওটা ভাষা হলো!’
পাভলভ হাসল। বলল, ‘ঠিক আছে, ‘অনুগ্রহ’ শব্দ কেটে দিলাম।’
রোসা হাসল।
‘তোমাদের আগাম শুভেচ্ছা। আর শোন, তোমরা এ খুনোখুনির মধ্যে থেকো না, পুশকভে ফিরে যাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না স্যার। এবারই প্রথম একটা সাহসের কাজ নিয়েছি বলে মনে করে রোসা। এ সুযোগ থেকে আমাকে ছাঁটাই করবেন না।’
সাদোভায়া রিং রোডে উঠে পড়েছে গাড়ি।
‘এবার কোন দিকে স্যার?’ বলল পাভলভ।
‘বিল্ডিং আরকাইভস-এ চল।’
‘বিল্ডিং আরকাইভস-এ কেন স্যার?’
‘‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’-এর ইতিবৃত্ত আমি জানতে চাই।’
‘আপনি কিছু সন্দেহ করেন?’ বলল রোসা।
‘সন্দেহ করার সংগত কারণ আছে। যে চারজনকে লেনিন হিলস থেকে ফলো করেছিলাম, ওরা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশ করে। তাদের দু’জন বেরিয়ে আসে প্রথম গাড়িতে করে। পেছনের গাড়িতে আসা যে দু’জন মারা পড়ল, তারা ঐ চারজনের অবশিষ্ট দু’জন নয়। তার মানে, ঐ চারজনের দু’জন সেখানে রয়ে গেছে, তার বদলে সেখান থেকে এসেছে অন্য দু’জন। এর অর্থ, ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এই ব্যাপারের সাথে জড়িত।’
‘পেছনের গাড়িটিও হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে এসেছে মনে করেন?’ রোসা বলল।
‘অবশ্যই। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে বসেই পরিকল্পনা করা হয়েছে আমাদেরকে ফাঁদে ফেলে ধরার।’
‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশনও কি এর সাথে জড়িত তাহলে?’
‘এটা বলা মুশকিল। কেউ হেরিটেজ ফাউন্ডেশনকে ব্যবহার করতে পারে। এ জন্যেই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এবং ঐ বিল্ডিং সম্পর্কে জানতে চাই।’
‘বুঝেছি স্যার।’ বলল পাভলভ।
গাড়ি ছুটে চলল আরকাইভস-এর উদ্দেশ্যে।
মস্কোর ইনার রিং-এর ভেতরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে বিল্ডিং আরকাইভস।
সংরক্ষিত এলাকার প্রবেশপথেই আটকে গেল আহমদ মুসার গাড়ি। প্রহরী বলল, ‘বিশেষ বিভাগের অনুমতি লাগবে।’
পাভলভ গাড়ি ফিরিয়ে আনল পার্কিং-এ।
‘বিশেষ বিভাগ বলতে কি বুঝিয়েছে পাভলভ?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘গোয়েন্দা বিভাগের সিকিউরিটি শাখা স্যার।’
গাড়ি পার্ক করে পাভলভ গাড়ি থেকে নেমে বলল, ‘স্যার, একটু বসুন। আমি অনুমতির ব্যাপারটা একটু দেখে আসি স্যার।’
আহমদ মুসা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘তুমি কি বলবে তাদের?’
পাভলভ একটু ভাবল। হাসল। তারপর বলল, ‘আপনার বেশ এবার নিখাদ ইহুদির মত। আমি বলব, একজন ইহুদি নগর পরিকল্পনা গবেষক আরকাইভস পরিদর্শন করতে চান।’
‘এতটুকুতে হবে?’
‘দেখি স্যার।’
বলে চলে গেল পাভলভ।
ফিরে এল পনের মিনিট পর হাসিমুখে।
সেদিকে তাকিয়ে রোসা বলে উঠল, ‘বলেছি না স্যার, নিশ্চয় অনুমতি হবে। অনুমতি না হলে ওর মুখে হাসি থাকতো না।’
পাভলভ এসে গাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘অনুমতি দিয়েছে স্যার।’
আপনাতেই ভ্রু দু’টি কোঁচকাল আহমদ মুসার। একজন ড্রাইভার পাভলভ কি করে এত তাড়াতাড়ি বিশেষ বিভাগ থেকে বিশেষ অনুমতি বের করে আনল! রোসা আগাম নিশ্চিত করে তা বললই বা কি করে? আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে পাভলভ বলল, ‘নগদ নারায়ণের সবাই বশ স্যার। বিশেষ করে আমাদের রাশিয়ায়।’
‘কিন্তু নগদ খরচ করার অনুমতি আমার কাছ থেকে নাওনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মাফ চাই স্যার। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করেছি। অনুমতির সময় হয়নি।’ বলল পাভলভ বিনীত কণ্ঠে।
আহমদ মুসার মনের খুঁতখুঁতি গেল না। কিন্তু কিছু বলল না আর।
আরকাইভস-এ প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং ওরা দু’জন। আরকাইভস-এ প্রবেশের জন্যে বড় ধরনের প্রবেশ ফি দিতে হলো।
আরকাইভস-এর করিডোর দিয়ে চলতে চলতে আহমদ মুসা বলল পাভলভকে, ‘কোন বিল্ডিং-এর কম্পিউটার ডিস্কের যদি একটা প্রিন্ট নিতে চাই?’
‘আইনত পারা যাবে না। কিন্তু পয়সা দিলে সব হয় স্যার।’
‘এত কথা তুমি জান কি করে?’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না পাভলভ। এরপর হেসে বলল, ‘আমি কি রাশিয়ার ছেলে নই স্যার? আর ড্রাইভাররা তো অনেক কিছুই দেখে, জানে।’
আরকাইভস-এর ডিজাইন ডিস্ক কাউন্টারে গেল প্রথমে আহমদ মুসারা।
কাউন্টারের ভদ্রলোকটি ঋজু শরীরের গম্ভীর এক বৃদ্ধ।
আহমদ মুসা নিজের নতুন পরিচয়টা দিয়ে প্রয়োজনের কথা বলল।
ভদ্রলোক কোন কথা না বলে পাশের কম্পিউটারটির নব টিপে ডিজাইন ডিস্কের ক্যাটালগ পর্দায় নিয়ে এল। একের পর এক পর্দায় এল ডিস্কের ক্যাটালগ।
এক সময় পর্দায় স্থির হলো বৃদ্ধের চোখ। স্থির হবার পরক্ষণেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। অস্বস্তিতে ভরে গেল তার মুখ। সে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘দুঃখিত, ডিস্কটা আমরা দেখাতে অপারগ।’
‘কিন্তু আমি তো উপযুক্ত ফি দেব।’
বৃদ্ধটি একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘কিছু দিন আগে ডিস্কটি চুরি গেছে। আমরা নতুন ডিস্ক করতে পারিনি।’
চুরির সংবাদে আহমদ মুসা বিস্মিত এবং কিছুটা হতাশ হলো। বলল, ‘আমি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?’
‘অবশ্যই।’ বৃদ্ধ বলল।
‘এ ধরনের চুরি কি অতীতে আর কখনও হয়েছে?’
‘জানি না। তবে আমার পঁচিশ বছরের আরকাইভস জীবনে এই প্রথম।’
‘আরেকটা কথা। আমার প্রয়োজন পূরণের বিকল্প কোন পথ আছে?’
‘আপনি ইতিহাস সেকশনে যান। সেখানে ইতিহাস সম্বলিত ডিস্ক আছে। তাতে ইতিহাসও পাবেন, ডিজাইনও পাবেন।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসারা বেরিয়ে এল।
ইতিহাস সেকশনের লোকটি প্রাণবন্ত একজন যুবক।
আহমদ মুসা তাকে প্রয়োজনের কথা জানালে যুবকটি ভ্রু কুঞ্চিত করল।
চোখ নিচু করে মুহূর্ত সে ভাবল। তারপর বলল, ‘দুর্ভাগ্য স্যার, বিল্ডিংটি নতুনভাবে লীজে বরাদ্দ হবার পর বিল্ডিংটির উপর তৈরি সবগুলো ডিস্ক চুরি গেছে।’
চুরি যাওয়ার এই দ্বিতীয় সংবাদে আহমদ মুসা আর বিস্মিত হলো না। বরং খুশিই হলো সে। তার সন্দেহ ঠিক প্রমাণ হচ্ছে। বলল, ‘একটা সাহায্য করতে পারেন? কারা লিজ নিয়েছে বিল্ডিংটা?’
‘স্মৃতিশক্তি অত তীক্ষ্ণ, অত শক্তিশালী হলে কি এই আরকাইভস কাউন্টারে বসতাম?’
‘আর কোন সাহায্য করতে পারেন?’
যুবকটি একটু চিন্তা করে বলল, ‘অনুরূপ ডিস্ক গোয়েন্দা বিভাগের ‘হোম জিওগ্রাফি’ সেকশনে পাবেন।’
যুবকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসারা।
আরকাইভস থেকে বেরিয়ে এসে পাভলভ তার ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলল, ‘স্যার, আপনি যদি বলেন, তাহলে গোয়েন্দা বিভাগের ‘হোম জিওগ্রাফি’ বিভাগ থেকে ডিস্কের একটা কপি আনার চেষ্টা করতে পারি।’
‘ওয়েলকাম পাভলভ। ডিস্কটা খুবই জরুরী দরকার আমার। কিন্তু পারবে তুমি?’
‘আমার পরিচিত লোক আছে স্যার। চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘ঠিক আছে।’
‘ডিস্কটা এত জরুরী কেন স্যার?’ জিজ্ঞেস করল রোসা।
‘এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত যে, তোমার ম্যাডাম (ডোনা জোসেফাইন) ওদের হাতেই পড়েছে। সুতরাং তাকে উদ্ধারের প্রস্তুতিতে এক মুহূর্তও দেরি করা যায় না। প্রতি সেকেন্ড আমার কাছে মনে হচ্ছে একটা যুগের মতন।’ আহমদ মুসার ম্লান কণ্ঠস্বর।
রোসা ও পাভলভ দু’জনেরই মুখ ম্লান হয়ে গেল। একটু পর পাভলভ ধীরে ধীরে বলল, ‘স্যার, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনকে সত্যিই সন্দেহ হলে, সেখানে তো এখনই অনুসন্ধান চালানো যায়।’
‘আমি সফল হতে চাই পাভলভ। তাই আরেকটু জেনে অগ্রসর হতে চাই।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। হঠকারী কোন পদক্ষেপে ম্যাডামের উদ্ধার না হয়ে তার আরও ক্ষতি হতে পারে।’ বলল রোসা।
রোসার কথা একটা যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিল আহমদ মুসার গোটা দেহে। তার ডোনা জোসেফাইনের কোন ক্ষতি হতে পারে, এমন আশংকার কথা সে ভুলে থাকতে চায়।
‘স্যার, আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা দফতরে যাচ্ছি। আপনারা গাড়িতে থাকবেন। আমি ভেতরে গিয়ে চেষ্টা করে দেখি।’ বলল পাভলভ।
‘ঠিক আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
আনমনা হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। পাভলভের কথায় সম্বিত ফিরে এল তার। কিন্তু আবারও নানা চিন্তা এসে ঘিরে ধরল তাকে।
রোসা ঠিকই বলেছে। তাকে খুব সাবধানে এগোতে হবে। শুধু তো এখন প্রিন্স ক্যাথারিন, মিঃ প্লাতিনি উদ্ধার নয়, তার ‘রানী’কেও উদ্ধারের প্রশ্ন এবার।
এভাবে চিন্তা করতে গিয়েও আহমদ মুসার মন এক সময় প্রবলভাবে মাথা নাড়ল। তার ডোনা জোসেফাইন ঐ জঘন্য শত্রুর হাতে পড়বে কেন, কোন পাপে!
আহত মনের এই অসহায় জিজ্ঞাসার কোন জবাব দিতে পারল না আহমদ মুসা। তার মুখ থেকে পরম নির্ভরতার এক দোয়া বেরিয়ে এল, ‘হাসবুনাল্লাহ…।’

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সেই হলরুম। হলের পঁচিশটি আসনে পঁচিশজন বসে। প্রথম সারির প্রথম চেয়ারে গ্রেট বিয়ারের গোয়েন্দা প্রধান মাজুরভ। দ্বিতীয় সিটে অপারেশন ফরচুন প্রজেক্ট-এর প্রধান ভ্লাদিমির খিরভ। এবং তৃতীয় চেয়ারে অপারেশন ফরচুন প্রজেক্ট-এর কমান্ডার জেনারেল নিকোলাস বুখারিন।
হলের সামনে পাঁচ ফুট উঁচু সেই রহস্যময় মঞ্চের বুক ফুঁড়ে উঠে এল সেই সোনালী সিংহাসনে আসীন সেই সোনালী মূর্তি।
চেয়ারে আসীন সকলের মাথা নিচু। যেন কোন নির্দেশের অপেক্ষায়।
অখণ্ড নীরবতার মধ্যে বজ্রপাতের মত কণ্ঠ ধ্বনিত হলো সোনালী চেয়ার থেকে। বলা হলো, ‘জেনারেল নিকোলাস বুখারিন, তোমার কিছু বক্তব্য আছে?’
মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল বুখারিন। বলল, ‘মহামান্য আইভান, আহমদ মুসাকে আমরা গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছি, কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি। এ ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের এই ব্যর্থতা তৃতীয় পক্ষের কারণে। তৃতীয় কেউ তাকে পালাতে সাহায্য করেছে, অনুসন্ধানে এটা প্রমাণিত হয়েছে। মহামান্য আইভান, আমরা সব রকম চেষ্টা করে এবং ছ’টি গাড়ির বহর দিয়ে তাড়া করেও মিসেস আহমদ মুসাকে ধরতে পারিনি। আমরা মনে করেছিলাম, গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে ড্রাইভার ও মিসেস আহমদ মুসার মৃত্যু ঘটেছে। পরবর্তী পরীক্ষায় এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যর্থতা স্বীকার করছি যে, মহিলাকে হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়েও তাকে আমরা হারিয়েছি। কেবলমাত্র পাহাড়ের একটা ঢালে লেডিস সাইজ একটা হ্যাট এবং এক জোড়া লেডিস জুতা পেয়েছি। জুতাটি একটা ফরাসী কোম্পানীর। আমরা মনে করছি, হ্যাট ও জুতা মিসেস আহমদ মুসার হতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে মিসেস আহমদ মুসা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। যতদূর সম্ভব আশেপাশের সব ক্লিনিক ও হাসপাতালে আমরা খোঁজ নিয়েছি কোন ফরাসী মহিলা চিকিৎসা নিতে গেছে কিনা। কিন্তু সন্ধান পাওয়া যায়নি। সবশেষে আমাদের পিছু নেয়া এবং আমাদের হেডকোয়ার্টারের পাশ পর্যন্ত জনৈক শিখকে, যাকে এখন আহমদ মুসা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, ফাঁদে ফেলেও আমরা তাকে আটকাতে পারিনি। উপরন্তু আমাদের চারজন লোক প্রাণ দিয়েছে। আমাদের একজনের মৃত্যুকালীন জবানবন্দীতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এখানেও একটি তৃতীয় পক্ষ রক্ষা করেছে আহমদ মুসাকে। তবু এটা আমাদের ব্যর্থতা। যতটা সতর্ক ও যতটা প্রস্তুত আমাদের হওয়া উচিত ছিল, তা আমরা হতে পারিনি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তবে মহামান্য আইভান, এ ব্যর্থতার জন্যে আমার কোন গ্লানি নেই। যোগ্য ফাইট দেয়ার পর আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’
থামল নিকোলাস বুখারিন।
সেই বজ্রকণ্ঠ আবার ধ্বনিত হলো, ‘ভ্লাদিমির খিরভ, এবার তুমি বল।’
মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল খিরভ। বলল, ‘মিঃ বুখারিন শেষ দু’টি বাক্যে ঠিক বলেননি। আহমদ মুসা অজেয় নয়। আমরাই তাকে জয় করার যোগ্যতা দেখাতে পারিনি।’ থামল ভ্লাদিমির খিরভ।
‘তারপর।’ গর্জন করে উঠল সোনালী চেয়ারের কণ্ঠ।
‘মহামান্য আইভান, আপনার নির্দেশ।’ মাথা নুইয়ে বাউ করে বলল খিরভ।
খিরভ থামার সাথে সাথে দেখা গেল, চেয়ারের হাতলে রাখা নিকোলাস বুখারিনের দু’টি হাত হাতল থেকে উঠে আসা দু’টি হ্যান্ডকাফে আটকা পড়ে গেল এবং চেয়ারের দু’পাশে বেরিয়ে আসা দু’টি লোহার বাহুতে চেয়ারের সাথে বাঁধা পড়ে গেল নিকোলাস বুখারিনের দেহ। সেই সাথে দেখা গেল, চেয়ারের পায়া মেঝের ইস্পাতের বাঁধন থেকে আপনিই খুলে গেছে এবং চার পায়ার চার চাকাই সচল হয়ে উঠেছে।
চেয়ার গড়িয়ে হল থেকে বেরুবার ওয়াকিং করিডোরে গিয়ে থেমে গেল।
সোনালী চেয়ার থেকে ধ্বনিত হলো সেই বজ্রকণ্ঠ। বলল, ‘মিস ক্যাথারিনরা তিনজন যেখানে বন্দী আছে, সেখানে আরও দু’টি কক্ষ আছে। একটি আহমদ মুসার জন্যে, অন্যটিতে নিয়ে রাখ বুখারিনকে। তার বিচার আহমদ মুসার সাথে একবারেই করব। আহমদ মুসা যে অজেয় নয়, তা দেখেই তার মৃত্যুবরণ করা উচিত। নিকোলাস বুখারিনের মত একজন রুশ সন্তানকে ভুল ধারণা নিয়ে মরতে দিতে পারি না।’
একটু থামল বজ্রকণ্ঠ। তারপর আবার শুরু করল, ‘আহমদ মুসাকে আমাদের হাতের মুঠোয় আনার জন্যে আমরা আহমদ মুসার দোরগোড়ায় পৌঁছব, এটাই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আহমদ মুসাই তার লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সাফল্যজনকভাবে আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। সে প্রমাণ করেছে, সে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত, অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। এ কারণেই তার কাছে আমাদের এক ধরনের পরাজয় ইতোমধ্যেই ঘটেছে। এরপরও অবিশ্বাস্য দ্রুত সে সামনে এগোচ্ছে। মাজুরভ, তোমার কাছে খবর আছে নিশ্চয়।’
মাজুরভ উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল, ‘হ্যাঁ, মহামান্য আইভান। আমরা যে সব খবর সংগ্রহ করেছি, তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে, আহমদ মুসা বিল্ডিং আরকাইভস-এ গিয়েছিল আমাদের এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশন-এর ইতিহাস ও ডিজাইন সংগ্রহের জন্যে। আমাদের ভাগ্য ভালো, ইতিহাস ও ডিজাইনের গোটা কম্পিউটার ফাইল চুরি যাওয়ায় এগুলো তার হাতে পড়েনি। আহমদ মুসা এই বিল্ডিং-এর ইতিহাস ও ডিজাইন অনুসন্ধান করতে যাওয়ায় এটা প্রমাণ হয়েছে, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের আসল পরিচয় সে পায়নি। চেষ্টা করছে পাওয়ার।’ থামল মাজুরভ।
‘তোমার কথায় সান্ত্বনা আছে মাজুরভ। সান্ত্বনা দিয়ে পরাজয়ের বেদনা মোছা যায়, কিন্তু বিজয়ের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ জ্বালানো যায় না।’
মুহূর্তের জন্যে থামল বজ্রকণ্ঠ। মুহূর্ত পরেই আবার শুরু করল, ‘আহমদ মুসার হেরিটেজ ফাউন্ডেশন-এর ইতিহাস ও ডিজাইন সন্ধান ছিল একটা বাড়তি ব্যবস্থা। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনকে যদি সন্দেহ করেই থাকে, তাহলে এখানে প্রবেশের জন্যে কোন ইতিহাস বা ডিজাইনের দরকার তার হবে না। বুঝতে পেরেছ মাজুরভ?’
‘বুঝতে পেরেছি মহামান্য আইভান।’
‘কি বুঝেছ?’
‘আহমদ মুসা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ইতিহাস ও ডিজাইন পায়নি বলে আমাদের আনন্দিত হবার কিছু নেই।’
সোনালী চেয়ারের সেই বজ্রকণ্ঠ আবার বলল, ‘আমার অনুমান ভুল না হলে তোমরা তার কাছে পৌঁছার আগে সেই-ই তোমাদের কাছে আসছে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনেই।’
‘মহামান্য আইভান, এর মধ্যে একটা আমাদের ব্যর্থতা আছে, কিন্তু আহমদ মুসার জন্যে আছে চরম দুর্ভাগ্য।’
‘হ্যাঁ, রাশিয়ার প্রিয় সন্তানরা, চরম দুর্ভাগ্যই যেন তার হয়।’
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সোনালী চেয়ারটি চোখের পলকে মঞ্চের ভেতরে ঢুকে গেল।
আইভান চলে গেলেও হলের চেয়ারে বসা অবস্থা থেকে কেউ উঠল না।
শুধু উঠল ভ্লাদিমির খিরভ। তারপর নিকোলাস বুখারিনকে নিয়ে দাঁড়ানো চেয়ার ঠেলে হলের দরজার দিকে এগিয়ে চলল সে।
হল থেকে বেরুবার পর চেয়ারসহ নিকোলাস বুখারিনকে নিয়ে লিফটে উঠল খিরভ। লিফট থেকে নেমে চলল নিচে।
লিফট উঠা-নামার লাইট ইনডিকেটরটি একদম বটম বোতামে পৌঁছতেই লিফট স্থির হয়ে দাঁড়াল।
লিফটের দরজা খুলে গেল।
লিফটের বাইরে বেশ প্রশস্ত চারকোণা একটা চত্বর। চত্বরটি প্রলম্বিত করিডোরের একটি গ্রন্থি। চত্বর এবং করিডোর সবই সাদা পুরু কার্পেটে মোড়া। দেয়াল ও ছাদও তাই।
লিফট-এর বিপরীত দিকে চত্বরের ওপাশে গার্ডরুম। লিফট এসে পৌঁছার সাথে সাথে লিফট-এর দরজা খোলার আগেই গার্ডরুম থেকে চার স্টেনগানধারী বেরিয়ে এসে তাক করেছে লিফট রুমকে।
লিফট রুমের দরজা খুলে যেতেই ভ্লাদিমির খিরভ মুখোমুখি হলো তাদের।
খিরভ দুই হাত তুলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দু’হাতের কয়েকটি আঙুল নাড়ল কয়েকবার।
এটা আঙুলের ভাষায় কথা বলা। যাতে বলা হলো, ‘আইভান দি টেরিবল জিন্দাবাদ’। যে বা যারাই এ লিফট দিয়ে নামুক, তাকে আঙুল দিয়ে এ কথা বলতে হয়। ব্যর্থ হলে স্টেনগানের ব্রাশফায়ার তার জন্যে নির্দিষ্ট।
খিরভের আঙুল স্থির হতেই চারজনের স্টেনগানের ব্যারেল নিচে নেমে গেল। চার পাথরের মূর্তি পিছু হটে ঢুকে গেল গার্ডরুমে। বন্ধ হয়ে গেল গার্ডরুমের দরজা।
খিরভ নিকোলাস বুখারিনের চেয়ার ঠেলে সেই চারকোণা চত্বরে প্রবেশ করল।
চত্বর থেকে পুবদিকের করিডোর ধরে এগোলো সামনে।
চত্বর থেকে করিডোরটি পশ্চিম দিকে বেশি দূর এগোয়নি। মাত্র কয়েক গজ। যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে দেয়াল জোড়া একটা পেইন্টিং। পেইন্টিংটি ইতিহাসের ‘আইভান দি টেরিবল’-এর একটা আবক্ষ চিত্র।
বুখারিনের চেয়ার ঠেলে নিয়ে চলছিল খিরভ। করিডোরের দু’পাশে সারিবদ্ধ ঘর।
এক স্থানে এসে করিডোরটি উত্তর-দক্ষিণে প্রশস্ত একটি করিডোরে এসে পড়ল। প্রশস্ত সে করিডোরের ‍পুব পাশ দিয়ে বড় ধরনের পৃথক পৃথক পাঁচটি ঘর।
খিরভ প্রশস্ত করিডোরটিতে নেমে বুখারিনের চেয়ার ঠেলে সোজা পুব পাশের রুমটির দরজার সামনে গিয়ে থামল।
ঘরটির দক্ষিণ পাশে পর পর তিনটি কক্ষ। আর উত্তর পাশে একটি।
ঘরে ডিজিটাল লক।
কয়েকটা অংকে টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল।
চেয়ার ঠেলে বুখারিনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল ভ্লাদিমির খিরভ।
এতক্ষণ খিরভ ও বুখারিন পরস্পর একটি কথাও বলেনি।
চেয়ারসমেত বুখারিনকে ঘরে ঢুকিয়ে খিরভ প্রথমবারের মত বুখারিনের চোখে চোখ রাখল। বলল, ‘বুখারিন, আমরা সবাই রাশিয়ার সন্তান, রাশিয়ার সেবক। রাশিয়ার স্বার্থে আমাদের সবকিছুই মেনে নেয়া উচিত।’
নিকোলাস বুখারিনের মুখ পাথরের মত অচঞ্চল। তাতে ভয়ের লেশমাত্র নেই। খিরভের কথা শুনে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। বিদ্রূপ মিশ্রিত হাসি। বলল, ‘মিঃ ভ্লাদিমির খিরভ, আমি সৈনিক। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। দেশের জন্যে জীবন দিতে আমি সদা প্রস্তুত। কিন্তু তোমাদের ‘মহামান্য আইভান’ আর আমার দেশ রাশিয়া এক নয়।’
‘তুমি মিথ্যা বলছ। এটা নিছক একটা প্রতিক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।’ প্রতিবাদ করল খিরভ।
‘আপনি আমাকে মিথ্যা বলুন আপত্তি নেই। কিন্তু শুনে রাখুন, দেশের শ্লোগান দিয়ে কোন ব্যক্তি বা কোন গ্রুপের ভাগ্য গড়া দেশপ্রেম নয়। দেশপ্রেম ও জাতিপ্রেমের সাথে গণতন্ত্র নিষ্ঠার কোন পার্থক্য নেই। স্বেচ্ছাচারী হয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। এটা আমি বুঝেছি, আপনারাও বুঝবেন।’
একটা প্রবল ভয় নেমে এল খিরভের চোখে-মুখে। দ্রুত বলল, ‘তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মহামান্য আইভান সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
‘আপনাকে এই অফিসিয়াল কথাগুলো অবশ্যই বলতে হবে মিঃ খিরভ। কিন্তু আপনি জানেন, এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিল্ডিং লাখো মানুষের বধ্যভূমি লুবিয়াংকার অংশ ছিল। গণতান্ত্রিক রাশিয়া একে উদ্ধার করে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু আপনার মহামান্য আইভান একে আবার লুবিয়াংকায় পরিণত করেছে। লেনিন-স্টালিনের স্বেচ্ছাচারিতা সোভিয়েত ইউনিয়নে টিকেনি, আইভানের স্বেচ্ছাচারিতাও রাশিয়ায় টিকবে না।’ দৃঢ় কণ্ঠে বলল বুখারিন।
‘আপনার এই পদস্খলনের জন্যে দুঃখ হয় মিঃ বুখারিন।’
বলে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এল খিরভ।
তার চোখে-মুখে বুখারিনের উপর কোন ক্রোধ নয়, ভয়ের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন।
সে দ্রুত পা বাড়াল লিফটের দিকে।