২৪. জারের গুপ্তধন

চ্যাপ্টার

লেনিন হিলস-এর পশ্চিমে মস্কোর বিখ্যাত মুভি স্টুডিও’র একটা অনুষ্ঠানে শরীক হয়ে বাড়িতে ফিরছে ডঃ নাতালোভা।
ডঃ নাতালোভা মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর।
ডঃ নাতালোভা বসা ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। ড্রাইভ করছে তারই মেয়ে ওলগা। ওলগা মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন তরুণী অধ্যাপিকা।
তারা ফিরছে লেনিন হিলস-উপত্যকার সড়ক পথে। তখন রাত বেশ হয়েছে। তারা তখন পাহাড়ের একটা ঢালের প্রান্ত দিয়ে চলছে। হঠাৎ উপর থেকে ভারি কিছু গড়িয়ে পড়ার শব্দ পেল।
সেদিকে তাকিয়ে ডঃ নাতালোভা ও ওলগা দু’জনেই দেখল, রাস্তার একেবারে পাশেই একটা কিছু গড়িয়ে পড়ে স্থির হলো।
কোন পাথর নয় তারা নিশ্চিত।
ওলগা গাড়ি থামিয়ে ফেলেছে।
ডঃ নাতালোভা টর্চের আলো ফেলল গড়িয়ে পড়া বস্তুটির উপর। বলল, ‘ওলগা, এতো মানুষ!’
ডঃ নাতালোভা ও ওলগা দু’জনেই দ্রুত গাড়ি থেকে নামল। দ্রুত তারা পৌঁছল গড়িয়ে পড়া দেহটির পাশে।
টর্চের আলোতে দেখল আহত, রক্তাক্ত একটি যুবক। ডঃ নাতালোভা পরীক্ষা করে বলল, ‘যুবকটি বেঁচে আছে, সংজ্ঞা হারিয়েছে মাত্র।’
‘তাহলে আম্মা?’ বলল ওলগা।
‘চলো গাড়িতে তুলে নেই, কোন ক্লিনিকে নিতে হবে।’ ডঃ নাতালোভা বলল।
‘অবশ্যই। নাও এস।’
বলে ওলগা সংজ্ঞাহীন যুবকটির মাথার দিকে গিয়ে তুলে নেবার উদ্যোগ নিল। ওলগার মা ডঃ নাতালোভা পেছন দিকটা ধরল। গাড়িতে তুলে নিল তারা যুবকটিকে।
‘আম্মা, তুমি দেখ ওর সংজ্ঞা ফেরাতে পার নাকি। তাড়াতাড়ি তাকে ক্লিনিকে নিতে হবে।’
ওলগা তার ড্রাইভিং সিটে ফিরে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। ছুটে চলল গাড়ি উপত্যকার পথ ধরে।
জ্ঞান ফেরাবার জন্যে যুবকটির দেহ নাড়া-চাড়া করতে গিয়ে চমকে উঠল ডঃ নাতালোভা, এতো ছেলে নয়। তার মাথার চুলও উঠে এসেছে হাতের সাথে এবং বেরিয়ে পড়েছে কালো চুলের বদলে মেয়েলি কাটের সুন্দর স্বর্ণাভ চুল।
চিৎকার করে উঠল ডঃ নাতালোভা, ‘ওলগা, পুরুষের ছদ্মবেশে এতো মেয়ে!’
‘আম্মা তা-ই?’ বিস্ময় ওলগার চোখে-মুখেও।
ডঃ নাতালোভা চেষ্টা করল। কিন্তু জ্ঞান ফেরার কোন লক্ষণ নেই।
ডঃ নাতালোভা সংজ্ঞাহীন মেয়েটির পিঠ থেকে ব্যাগটি সরিয়ে নিয়েছিল। ব্যাগ খুলে চেক করল ডঃ নাতালোভা। ব্যাগে ছোট-খাট কিছু প্যাকেট আছে। পোশাক আছে। মেয়েদের পোশাক।
পকেট সার্চ করতে গিয়ে আবার তার চমকে উঠার পালা। পকেটে পেল লোডেড একটি রিভলভার। কোমরের বেল্টের সাথে আটকানো থলিতে পেল পাসপোর্ট, মানিব্যাগ ইত্যাদি।
এ সময় ওলগা বলল, ‘আম্মা, ওর পুরুষ বেশ, গড়িয়ে পড়ে আহত হওয়া এই সব খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমার অনুমান ভুল না হলে, আমাদের এ রাস্তার উপরে পাহাড়ের গা বেয়ে যে রাস্তা সিকিউরিটি ব্যারাকের দিকে গেছে, সেই রাস্তায় কিছু একটা ঘটেছে। এর এভাবে গড়িয়ে পড়া তার রেজাল্ট হতে পারে।’
ডঃ নাতালোভা দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘আরও আছে ওলগা, ব্যাগে রিভলভার পাওয়া গেছে। পাসপোর্টের নামটা ফরাসী বলে মনে হচ্ছে।’
‘রিভলবার? কি নাম?’
‘মারিয়া জোসেফাইন লুই।’
‘ঠিক, ফরাসী নাম আম্মা। রিভলভারের ব্যাখ্যা কি করা যায় আম্মা?’
‘এটা বড় কথা নয়। আত্মরক্ষার মত প্রয়োজনেও মানুষের রিভলভার থাকতে পারে।’
মাইলকয়েক দক্ষিণে লেনিন হিলস-এর দক্ষিণ প্রান্তে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসেই ভিসি’র বাংলো। এখানেই ডঃ নাতালোভা এবং ওলগা থাকেন।
গাড়ি প্রবেশ করল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে।
‘জ্ঞান তো এখনও ফিরল না। কোথায় নেবে ওলগা একে?’
‘আমাদের ক্যাম্পাস ক্লিনিক যথেষ্ট হবে আম্মা। মাথায় কিংবা দেহে বড় কোন আঘাত নেই। কিন্তু উঁচু থেকে গড়িয়ে পড়তে গিয়ে অব্যাহত আঘাতে ওর সংজ্ঞা লুপ্ত হয়েছে।’
তখন বেশ রাত। আলো-আধাঁরী ঘেরা ক্লিনিক যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
গাড়ির ইমারজেন্সী লাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে আসছিল ওলগার গাড়ি।
ক্লিনিকের গাড়ি বারান্দায় গাড়ি এসে দাঁড়াতেই ছুটে এল তিনজন একটা ট্রলি নিয়ে।
গাড়িতে ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ নাতালোভাকে দেখে চমকে উঠে লম্বা স্যালুট দিল তারা।
দ্রুত তারা মারিয়া জোসেফাইনকে ট্রলিতে শুইয়ে ছুটল ইমারজেন্সীর দিকে।
ওলগা মারিয়ার ব্যাগটা হাতে নিয়ে ডঃ নাতালোভার সাথে এগোলো সিঁড়ির দিকে।
রিসেপশনের সামনে দিয়ে একটু সামনে এগোলে ইমারজেন্সীতে ঢোকার বিশেষ গেট।
রিসেপশনের সামনে দিয়ে সেদিকেই এগোচ্ছিল ওলগারা।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটি টেলিফোনে কথা বলছিল। সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ডঃ নাতালোভাকে দেখে।
হঠাৎ রিসেপশনিস্ট মেয়েটি ওলগার দিকে হাত তুলে বলল, ‘মাফ করবেন ম্যাডাম, রোগীটি কে?’
একটু ভেবে ওলগা উত্তর দিল, ‘আমার খালাতো বোন।’
‘ঈশ্বর তাকে সাহায্য করুন।’ বলে বসে পড়ল রিসেপশনিষ্ট মেয়েটি।
মারিয়া জোসেফাইনের জ্ঞান ফিরলে ডঃ নাতালোভা বাসায় ফেরে রাত এগারটার দিকে। ওলগা বাসায় ফেরেনি।
মারিয়া জোসেফাইনকে ভাইস-চ্যান্সেলরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে ভিআইপি বেড দেয়া হয়েছিল। ওলগা মারিয়া জোসেফাইনের পাশের বেডে শুয়েছিল।
দু’চারটা কথা বলেই ওলগা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে মারিয়া জোসেফাইনের। অসুস্থ মারিয়া জোসেফাইনকে একা ফেলে সে বাসায় ফিরতে রাজি হয়নি।
ওলগাদের বাড়ি থেকেই ওলগা ও মারিয়া জোসেফাইনের জন্যে ব্রেকফাস্ট এসেছিল সকালে।
সকাল নয়টার দিকে ওলগাদের ভিআইপি রুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল সেই রিসেপশনিস্ট।
দরজা খোলা ছিল।
রিসেপশনিস্ট দাঁড়াল। ওলগাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ম্যাডাম, সিকিউরিটির একজন কিছুক্ষণ আগে টেলিফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, রোগীর নাম কি, কেমন দেখতে, ইত্যাদি।’
মারিয়া জোসেফাইনও তার বেডে শুয়ে রিসেপশনিস্ট-এর কথা শুনছিল। তার কথা কানে যেতেই বুকটা কেঁপে উঠল মারিয়া জোসেফাইনের। ওরা ক্লিনিকে হামলা করবে নাকি?
ওলগা বলল, ‘কেন জানতে চেয়েছে? আপনি কি বললেন?’
‘ওরা দু’বার টেলিফোন করেছিল। প্রথমবার জিজ্ঞেস করল, ‘গত রাত বা আজ সকালে কোন অসুস্থ বা আহত মহিলা ক্লিনিকে এসেছে কিনা। আমি ‘এসেছে’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে ‘ধন্যবাদ’ বলে টেলিফোন রেখে দিল। এক মিনিট পরেই আবার টেলিফোন এল। জিজ্ঞেস করল, ‘মহিলাটি পরিচিত কিনা? নাম কি? বিদেশী কিনা? দেখতে কেমন? ইত্যাদি।’ আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘শুনুন, মহিলাটি আমাদের ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ নাতালোভার বোনের মেয়ে।’ আমার একথা শোনার পর লোকটি বিরক্ত করার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, ‘এক ভয়ংকর মহিলাকে আমরা খুঁজছি। দেশের স্বার্থে তাকে আমাদের পাওয়া প্রয়োজন।’
‘ধন্যবাদ।’ ওলগা রিসেপশনিস্টকে লক্ষ্য করে বলল।
রিসেপশনিস্ট চলে গেল।
ওলগা হাসিমুখে তাকাল মারিয়া জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘সিকিউরিটির লোকরা আপনাকেই খুঁজছে।’
‘ওরা সিকিউরিটির লোক নয়।’
‘নয়? কারা ওরা?’
‘রাশিয়ার একটি গোপন সংগঠন।’
‘কোন সংগঠন জানতে পারি?’
মারিয়া জোসেফাইন ওলগার দিকে একবার তাকাল। তারপর বলল, ‘অবশ্যই। ‘গ্রেট বিয়ার’।’
‘গ্রেট বিয়ার?’
‘নিশ্চয় চেনেন সংগঠনটিকে?’
ওলগার চোখে-মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছিল। বলল, ‘অবশ্যই চিনি।’
একটু থেমেই ওলগা আবার বলল, ‘তাদের সাথে আপনার ঝগড়া কেন?’
‘আমার কোন ঝগড়া নেই, আমাকে হাতে পাওয়ার মধ্যে তাদের কোন স্বার্থ আছে।’
ওলগা আবার মুখ খুলতে গিয়েও চুপ করল। ভাবল, এসব প্রশ্ন জেরার মত হয়ে যাবে।
একটু পর মারিয়া জোসেফাইনই বলল, ‘মিস ওলগা, আমার হাঁটার মত শক্তি হয়েছে। আমি চলে যেতে চাই। আমি সত্যিই বিপদে আছি। আমার স্বামী ওদের হাতে বন্দী।’
ওলগা তাকাল মারিয়া জোসেফাইনের দিকে। বলল ধীরে ধীরে, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু আম্মা এ অবস্থায় কিছুতেই আপনাকে যেতে দিতে রাজি হবেন না। চলুন, আপনাকে আমরা বাসায় নিয়ে যাব। ওখানে কোন বিপদের ভয় নেই। সুস্থ হবার পর চলে যাবেন।’
বলে ওলগা হাতের মোবাইল টেলিফোনে ডায়াল করা শুরু করল।
মারিয়া জোসেফাইন তাকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘আমাকে আপনারা চেনেন না। সব জেনে এইভাবে আপনারা আমাকে আশ্রয় দেবেন কেন? তার উপর শুনলেন, আমি এক ভয়ংকর মহিলা।’
‘এসব কথা আমার আম্মাকে বলবেন। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, গ্রেট বিয়ারের কথাকে আমরা সার্টিফিকেট বলে মনে করি না।’
বলে ওলগা তার মা’কে টেলিফোন করে বলল, ‘আম্মা, সব কথা এসে বলব। আমি মিসেস মারিয়া জোসেফাইনকে বাসায় নিয়ে আসছি।’
ওপার থেকে ওর মায়ের কথা শুনে হাসিতে ভরে গেল মুখ, ‘ধন্যবাদ আম্মা, আমরা আসছি।’
কথা শেষ করেই বাইরে গিয়ে অ্যাটেনডেন্টকে সবকিছু গোছাতে বলে চলে গেল ক্লিনিকের অফিসে।
মিনিট পাঁচেক পরে ফিরে এসে বলল, ‘চলুন, সব কমপ্লিট।’
মারিয়া জোসেফাইন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
দু’জন এসে উঠল গাড়িতে। ওলগা গাড়ি ড্রাইভ করল।
গাড়িতে উঠে বসে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল মারিয়া জোসেফাইন। যখন সে চরম অসহায়, তখন আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিলেন মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলরের বাড়িতে।
ওলগার পাশের কক্ষেই মারিয়া জোসেফাইনের থাকার ব্যবস্থা হলো।
বাসায় আসার পর পরই মারিয়া জোসেফাইনের জ্বর আসে। সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার মারিয়া জোসেফাইনকে কমপ্লিট বেডরেস্টের জন্যে বলে। হাঁটা, চলা-ফেরা একদম নিষিদ্ধ করা হয়।
দু’দিন থেকে জ্বর আসেনি। শরীরের ভেতরের ব্যথা-বেদনাও কমে গেছে।
ডাক্তার আনা পাভলোভা শরীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওলগাকে বলল, ‘হ্যাঁ ওলগা, এখন তোমার বোন কিছু হাঁটতে পারে। এঘর-সেঘর যেতে পারে।
এ সময় ডঃ নাতালোভা প্রবেশ করল ঘরে। বলল, ‘ডাঃ আনা, কেমন আছে আমার মেয়েটি?’
ডাঃ উঠে দাঁড়াল। ডঃ নাতালোভা সোফায় বসল।
ডাক্তার তার চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে ম্যাডাম। মাথায় এবং শরীরে যে ধরনের আঘাত, তাতে মাসখানেকের আগে উঠে দাঁড়াবার কথা নয়। মাথায় তো অপারেশনের দরকার ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে মস্তিষ্কের ব্লাড সার্কুলেশন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। দেহের এই ধরনের বৈশিষ্ট্য বিরল। ওর রক্তও অসাধারণ গ্রুপের। আর দু’চার দিনের মধ্যে উনি ঘোড়ায় চড়ার মত অবস্থা ফিরে পাবেন।’
ডাক্তার তার যন্ত্রপাতি গুটিয়ে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ওলগা ডাক্তার আনা পাভলোভাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল।
ডঃ নাতালোভা কথা বলছিল। বলছিল, ‘ডাঃ আনা ঠিকই বলেছে, তোমার মুখের দিকে চাইলে সত্যিই চোখ ফেরানো যায় না। কি এক অসাধারণ আভিজাত্য ছড়িয়ে রয়েছে তোমার মুখে। আসলে তুমি কে মা?’
মুহূর্তকাল চুপ করে থেকে মারিয়া জোসেফাইন বলল, ‘আমার নাম তো জানেন খালাম্মা। আমি ফ্রান্সের ‘লুই’ বংশের মেয়ে।’
‘‘লুই’ মানে ‘বুরবন’ রাজবংশের মেয়ে?’ ডঃ নাতালোভার কণ্ঠে বিস্ময়ের ছাপ।
‘জ্বি।’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘তার মানে তুমি ফ্রান্সের রাজকন্যা?’ বিস্ময়-বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলল ওলগা।
‘ফ্রান্সে কোন রাজবংশ নেই এখন। লুই’রা এখন আর রাজপরিবার নয়।’ ম্লান হেসে মারিয়া জোসেফাইন বলল।
‘রাজত্ব গেলেও রাজবংশ থাকে। আমাদের জারদের রাজত্ব নেই, কিন্তু জাররা আছেন এবং নামমাত্র হলেও তাদের আবার সিংহাসন ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে।’
‘সত্যি সিংহাসন তারা পাচ্ছে?’
‘অবশ্যই। আর মাত্র কয়েকদিন। তার পরেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র চালু হচ্ছে।’
‘কে বসছেন সিংহাসনে?’
‘প্রিন্সেস তাতিয়ানার বসার কথা। কিন্তু গুজব শোনা যাচ্ছে, উনি নিহত হয়েছেন সুইজারল্যান্ডে। এখন শোনা যাচ্ছে, প্রিন্সেস ক্যাথারিন সিংহাসনে বসতে যাচ্ছেন।’
‘কিন্তু প্রিন্সেস ক্যাথারিন কি সিংহাসনে বসতে পারবেন?’
‘কেন পারবেন না? তুমি কিছু জান?’ বলল ডঃ নাতালোভা।
‘কিছু জানি। প্রিন্সেস ক্যাথারিন এখন গ্রেট বিয়ারের হাতে বন্দী।’
‘কেন গ্রেট বিয়ার তাকে বন্দী করেছে?’ বলল ডঃ নাতালোভা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে।
‘গ্রেট বিয়ার নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র চালুর প্রচেষ্টা বানচাল করতে চায়। দ্বিতীয়ত, জারের গোপন ধনভাণ্ডার কুক্ষিগত করতে চায়। দুই কাজের জন্যেই প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে তারা হাতের মুঠোয় রাখতে চায়।’
ডঃ নাতালোভা এবং ওলগা দু’জনের মুখই ম্লান হয়ে গেছে। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগের চিহ্ন।
‘তুমি এসব জানলে কেমন করে?’ বলল ডঃ নাতালোভা।
‘আমার স্বামী প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন এবং সে জন্যেই তিনি রাশিয়ায় এসেছেন। এই তার অপরাধ। আমার স্বামী যেমন ওদের হাতে বন্দী, তেমনি আমার পিতাও। আমাকেও ওরা আটক করতে চায়।’
‘তোমার পিতা কেন বন্দী? তোমাকে কেন ওরা ধরতে এমন মরিয়া? আসল লোক তো ওদের হাতে রয়েছেই।’
‘আমার স্বামীর কাছ থেকে দু’টো জিনিস উদ্ধার করতে চায়, যা না পেলে জারের ধনভাণ্ডার কোনদিনই উদ্ধার করা যাবে না। আমার স্বামীর উপর চাপ সৃষ্টির জন্যেই আমাকে ওরা বন্দী করতে চায়।’
‘বুঝলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি না, তোমার স্বামী প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার করতে আসবেন কেন? জারের গোপন ধনভাণ্ডারের সাথে তিনি জড়িয়ে পড়বেন কেন?’
ডঃ নাতালোভার কথা শেষ হতেই একটা প্যাকেট নিয়ে পরিচারিকা ঘরে প্রবেশ করল। সে ডঃ নাতালোভার হাতে প্যাকেটটি তুলে দিয়ে বলল, ‘লাইব্রেরী থেকে দিয়ে গেল।’
বড় এনভেলাপে একটা মোটা বই।
ডঃ নাতালোভা সেদিকে একবার তাকিয়ে এনভেলাপে একটা চুমু খেয়ে বইটি বের করল।
বইটি কোরআন শরীফ।
কোরআন শরীফ বের করে হাতে নিয়ে আবার চুমু খেল ডঃ নাতালোভা।
সেদিকে তাকিয়ে আছে মারিয়া জোসেফাইন। তার দু’চোখ প্রায় ছানাবড়া হয়ে যাবার জোগাড়।
ডঃ নাতালোভা মারিয়া জোসেফাইনের দিকে চাইল। তার অবস্থা দেখে বলল, ‘কি দেখছ, এটা কোন আজব জিনিস নয়, একটি ধর্মগ্রন্থ, কোরআন শরীফ।’
‘কোরআন শরীফে আপনি চুমু খেলেন, আপনি কি মুসলিম?’ বলল মারিয়া জোসেফাইন চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে।
‘এবং আপনি?’ ওলগার দিকে চেয়ে দ্রুত কণ্ঠে বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘আমি আম্মার চেয়ে সিনিয়র মুসলমান।’ বলল ওলগা হাসিমুখে।
শোনার সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া জোসেফাইন ‘আল্লাহু আকবর’ বলে দু’হাতে মুখ ঢাকল।
ওলগা লাফ দিয়ে মারিয়া জোসেফাইনের কাছে উঠে এল। মারিয়া জোসেফাইনের মুখ থেকে তার দুই হাত সরিয়ে নিল।
দেখা গেল, মারিয়া জোসেফাইনের ঠোঁটে আনন্দের হাসি। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। আনন্দের অশ্রুতে ভেসে গেছে তার দুই গণ্ড।
‘আপনি মুসলমান?’ বলল ওলগা মারিয়া জোসেফাইনকে।
‘আলহামদুলিল্লাহ’। বলল মারিয়া জোসেফাইন।
শুনে পাগলের মত জড়িয়ে ধরল ওলগা মারিয়া জোসেফাইনকে। মারিয়া জোসেফাইনও জড়িয়ে ধরল ওলগাকে।
জড়িয়ে রেখেই ওলগা বলল, ‘ফরাসী রাজকুমারী মুসলমান হয়েছে, ইউরোপের জন্যে এটা একটা বড় খবর।’
মারিয়া জোসেফাইন ওলগার হাতের বাঁধন মুক্ত হয়ে বলল, ‘মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর এবং তার অধ্যাপিকা কন্যা মুসলমান, এটা তার চেয়ে অনেক বড় খবর।’
বলে খাট থেকে নামল মারিয়া জোসেফাইন। নেমে এগোলো ডঃ নাতালোভার দিকে।
ডঃ নাতালোভাও উঠে দাঁড়িয়ে এগোলো মারিয়া জোসেফাইনের দিকে এবং তাকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে বার বার চুমু খেল। বলল, ‘এ কারণেই প্রথম যখন দেখলাম, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল একান্ত আপন কেউ।’ বলে পাশের সোফায় বসাল মারিয়া জোসেফাইনকে।
ওলগা গিয়ে মারিয়া জোসেফাইনের সোফায় বসল ঠাসাঠাসি করে এবং গলা জড়িয়ে ধরল মারিয়া জোসেফাইনের।
‘ওলগা, মুসলমান হিসেবে খালাম্মার চেয়ে সিনিয়র হলে কেমন করে বুঝতে পারলাম না।’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘আম্মার আগে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আম্মা আমার কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছে।’
‘আর তুমি কার কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছ?’
প্রশ্ন শুনেই মুখটা মলিন হয়ে গেল ওলগার। মারিয়া জোসেফাইনের গলা থেকে তার হাতটা খসে পড়ল।
‘কি হলো তোমার ওলগা?’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘মারিয়া, তুমি ওলগাকে এমন একজনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছ যার কথা স্মরণ হলে সে ভেঙে পড়ে।’
‘কে সে?’
‘মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি মেয়ে। ওলগার সাথে পড়তো। তার কাছেই ওলগা ইসলাম শেখে।’ বলল ডঃ নাতালোভা।
‘শুধু ইসলাম শেখা নয়। আম্মা যখন সোভিয়েত কারাগারে, আমার সামনে যখন সমগ্র জগৎ অন্ধকার, যখন জীবন আমার কাছে থাকা না থাকা সমান, সেদিন মাত্র তার কাছে আমি বেঁচে থাকার প্রেরণা পাই, সামনের জমাট অন্ধকারে আশার আলো জ্বলে উঠে, জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পাই আমি।’১
‘তিনি কোথায়? তার কথা স্মরণ হলে ভেঙে পড়ার কারণ?’
‘সে একজন উজবেক মেয়ে। মধ্য এশিয়া স্বাধীন হলে সে দেশে ফিরে যায়। বাড়িতে থাকাকালেই সে রাশিয়ার এক কু-সন্তান জেনারেল বরিসের দলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়।’
জেনারেল বরিসের নাম শুনে মারিয়া জোসেফাইন চমকে উঠল। এই লোকটা তো ছিল আহমদ মুসার কট্টর দুশমনদের একজন এবং তার হাতেই নিহত হয়েছে মেইলিগুলি, আহমদ মুসার প্রথম প্রিয়তমা স্ত্রী।
‘জেনারেল বরিসের কথা আমি শুনেছি। কিন্তু এই জেনারেল বরিস একজন উজবেক মেয়েকে মারতে যাবে কেন?’
‘তার অপরাধ ছিল, তিনি ছিলেন বহু বিপ্লবের নায়ক আহমদ মুসার বাগদত্তা। তাকে হত্যা করে আহমদ মুসার উপর একটা প্রতিশোধ নেয় জেনারেল বরিস।’ বলল ডঃ নাতালোভা।
চমকে উঠল মারিয়া জোসেফাইন। বলল দ্রুত কণ্ঠে, ‘আপনি ফাতিমা ফারহানার কথা বলছেন? আপনারা আহমদ মুসাকে চেনেন?’
‘আমরা আহমদ মুসাকে চিনব না! মধ্য এশিয়ায় তার বিপ্লব রুশ জনগণের স্বাধীনতাকেও ত্বরান্বিত করেছে। তুমি ফাতিমা ফারহানার নাম জান কি করে? তুমিও কি আহমদ মুসাকে চেন?’ বলল ওলগা।
মারিয়া জোসেফাইন তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। তারপর মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বলল, ‘তিনি আমার স্বামী। তার কাছেই আমি ফাতিমা ফারহানার কথা শুনেছি।’
‘আম্মা’ বলে চিৎকার করে দাঁড়িয়ে পড়ল ওলগা। তার বিস্ময়-বিমূঢ় দৃষ্টি মারিয়া জোসেফাইনের মুখের উপর নিবদ্ধ। ডঃ নাতালোভারও বিমুগ্ধ দৃষ্টি মারিয়া জোসেফাইনের উপর।
মারিয়া জোসেফাইন বিমূঢ়ভাবে দাঁড়ানো ওলগাকে হাত ধরে টেনে পাশে বসালো। ওলগা পাগলের মত আবার জড়িয়ে ধরল মারিয়া জোসেফাইনকে। বলল, ‘আমাদের কি সৌভাগ্য, আল্লাহর কি দয়া যে, আহমদ মুসার স্ত্রীকে আমরা এত কাছে পেয়েছি। নিশ্চয় আহমদ মুসাকে দেখার সৌভাগ্যও আল্লাহ দেবেন।’
ডঃ নাতালোভা পাশের সোফাতে বসেছিল। সে মারিয়া জোসেফাইনের একটা হাত টেনে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, ‘এতক্ষণ তুমি ‘মা’ ছিলে, এখন তুমি আমাদের মাথার মণি হয়ে দাঁড়ালে। আহমদ মুসা আমাদের পরম শ্রদ্ধার, পরম সম্মানের, পরম আদরের।’
মারিয়া জোসেফাইন সোফা থেকে হঠাৎ ডঃ নাতালোভার পায়ের কাছে বসে পড়ল। দু’হাতে ডঃ নাতালোভার দু’হাঁটু পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে তার উরুতে মুখ গুঁজে বলল, ‘না, আমি আপনার মেয়ে থাকতে চাই। আহমদ মুসা অনেক অনেক বড়, কিন্তু আমি খুব সামান্য।’
ডঃ নাতালোভা মারিয়া জোসেফাইনকে বুকে টেনে নিল। বলল, ‘না, তুমি সামান্য নও। সামান্য কেউ আহমদ মুসার সঙ্গী হতে পারে না। তিনি মুকুটহীন রাজা। রাজকন্যাই তার প্রাপ্য। আলহামদুলিল্লাহ, একজন নিখাদ রাজকন্যাই তিনি পেয়েছেন।’
লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা মারিয়া জোসেফাইনকে ওলগা মায়ের কোল থেকে তুলে খাটে নিয়ে বসল। বলল, ‘আর বোন নয়, ভাবী। বোন তবু আমার আছে, ভাবী নেই। ভাবী পেলাম এবার।’
সলাজ হেসে বলল, ‘আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমার যত ননদ হবে, তাদের সামাল দেব কি করে!’
ওলগা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার মা ডঃ নাতালোভা তাকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘ওলগা, ভাবী তোমার থাকছে, পরে বলো।’ বলে ডঃ নাতালোভা মারিয়া জোসেফাইনের দিকে তাকাল এবং উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘তুমি যা বলেছ তাতে আহমদ মুসা এখন গ্রেট বিয়ারের হাতে বন্দী।’
‘আমি তা-ই মনে করছি।’
‘মনে করা কেন, নিশ্চিত জান না?’
‘নিশ্চিত জানি না, কার্যকারণ থেকে মনে করছি।’
‘ঘটনাটা খুলে বলবে মা? তোমার ঐ দশা কেন হয়েছিল, তাও কিন্তু আমরা জিজ্ঞেস করিনি।’
‘ঐ ঘটনা বললে তাতেই সব এসে যাবে খালাম্মা।’ বলে মারিয়া জোসেফাইন পুশকভ থেকে আহমদ মুসা ও মারিয়া জোসেফাইনের যাত্রা থেকে শুরু করে তার লেনিন হিলস-এ পৌঁছা পর্যন্ত সব কাহিনী খুলে বলল।
ডঃ নাতালোভা ও ওলগা বিস্ময় ও উদ্বেগ ভরা চোখে মারিয়া জোসেফাইনের কথা শুনল। তার কথা শেষ হলেও ডঃ নাতালোভা ও ওলগা কয়েক মুহূর্ত যেন কথা বলতে পারল না।
নীরবতা ভাঙল ডঃ নাতালোভা। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তার খাস রহমত দিয়ে তোমাকে রক্ষা করেছেন। আর তুমি ঠিকই বলেছ, কার্যকারণ থেকে আহমদ মুসা ওদের হাতে পড়াই বোঝায়।’
বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘আল্লাহ তাকে সাহায্য করুন। তাদের হাতে পড়া শেষ কথা নয়। আহমদ মুসার জন্যে এটা নতুন ঘটনাও নয়। এখন বল, আহমদ মুসা ক্যাথারিনের ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়লেন কেন? তার কাছে কি এমন জিনিস আছে যা পাবার জন্যে গ্রেট বিয়ার মরিয়া হয়ে উঠেছে?’
‘সে অনেক কথা খালাম্মা।’ বলে মারিয়া জোসেফাইন প্রিন্সেস তাতিয়ানার সাথে আহমদ মুসার পরিচয়ের কথা, সুইজারল্যান্ডের ঘটনা, সেখানে প্রিন্সেস তাতিয়ানার মর্মান্তিক মৃত্যু, তাতিয়ানা কর্তৃক রাজকীয় আংটি ও ডায়েরী প্রিন্সেস ক্যাথারিনের হাতে পৌঁছানোর দায়িত্ব আহমদ মুসাকে দেয়া, তার ফ্রান্সে আগমন ও গ্রেট বিয়ারের সাথে সংঘাত শুরু হওয়া, প্রভৃতি সব কথা ডঃ নাতালোভাকে খুলে বলল।
মারিয়া জোসেফাইন কাহিনী বলা শেষ করলেও ডঃ নাতালোভা ও ওলগা অনেকক্ষণ কথা বলল না। বিস্ময়-বিমুগ্ধ তাদের দৃষ্টি। ধীরে ধীরে তাদের বিস্ময়-বিমুগ্ধ চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এল। বলল ওলগা, ‘ভাবী, আমি একজন দেশপ্রেমিক রাশিয়ান। কিন্তু তবু আমি বলব, একটা দায়িত্ব পালনের জন্যে পর্বতপ্রমাণ ঝুঁকি নেয়া তার ঠিক হয়নি। উনি কোন ‘লা-ওয়ারিশ’ মাল নন যে, ইচ্ছেমত যে সে তাকে ব্যবহার করবে।’
ওলগা কথা শেষ করার আগেই মারিয়া জোসেফাইন তার তর্জনী ওলগার ঠোঁটে চাপা দিয়ে বলল, ‘প্রিন্সেস তাতিয়ানাকে ‘যে’ ‘সে’র দলে ফেল না ওলগা। তাতিয়ানা মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের বিপদে নিজের পিতাকে পর্যন্ত কুরবানী দিয়ে যে সাহায্য করেছে, কোন কিছু দিয়েই তার মূল্য আদায় হবে না।১ সে আহমদ মুসাকে নিজেকে নিঃশেষ করে ভালোবেসেছে, কিন্তু কোন দাবি নিয়ে সে আহমদ মুসার কাছে দাঁড়ায়নি। সবশেষে যে গুলিটা আমার বুক বিদ্ধ করতো, সে গুলিটা প্রিন্সেস তাতিয়ানা নিজের বুকে নিয়ে তার ভাষায় ‘আহমদ মুসার প্রিয়তমা’কে রক্ষা করে তার ভালোবাসা কত বড় তার প্রমাণ দিয়েছে। সেই প্রিন্সেস তাতিয়ানার দেয়া দায়িত্ব পালন করতে কোন ত্যাগকেই আমাদের বড় করে দেখা উচিত নয়।’
‘বুঝলাম ভাবী। এ কাহিনী তোমার কাছে আরও শুনতে চাই।’
‘আমাদের প্রিন্সেস তাতিয়ানার জন্যে আমার গর্ব হচ্ছে। আহমদ মুসা তাতিয়ানাকে কি এই দৃষ্টিতে দেখে!’
‘অবশ্যই খালাম্মা। তাতিয়ানার মৃত্যুর পর নীরব অশ্রুতে তাকে ভাসতে দেখেছি। বলেছেন, ‘তাতিয়ানা শুধু দিয়েই গেল, নিল না কিছু।’’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘এখন আমাদের কি করণীয় আছে ভাবী? আহমদ মুসা ভাই শত্রুর হাতে পড়েছেন, এটা ধরে নিয়েই আমাদের কিছু করা দরকার কিনা?’ বলল ওলগা।
‘আমরা যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, তাহলে কি করব, এ ব্যাপারে আমার প্রতি তার নির্দেশ ছিল, আমি যেন নির্দিষ্ট ঠিকানায় থাকি। তিনিই আমাকে খুঁজে নেবেন।’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘নির্দিষ্ট ঠিকানাটা কি?’ বলল ওলগা।
‘আমাদের এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে মস্কোর একটা ঠিকানা আমরা নিয়ে এসেছি। সে ঠিকানাতেই আমার ওঠার কথা।’
‘টেলিফোন নাম্বার আছে?’
‘আছে।’
‘টেলিফোন করে আপনার মস্কো উপস্থিতির কথা তাদের বলে রাখা যায়।’
‘দু’দিন আগে এ উদ্দেশ্যে আমি সেখানে টেলিফোন করেছিলাম। পাইনি। রেকর্ডেড রিপ্লাই থেকে জানলাম, কি এক কাজে হঠাৎ মস্কোর বাইরে যেতে হয়েছে ওদের।’
‘তাহলে?’
‘দু’একদিনের মধ্যে মস্কোর ফরাসী দূতাবাসে গিয়ে খোঁজ নেব। আহমদ মুসা ওখানেও কোন মেসেজ রাখতে পারে।’
ওলগা ও ডঃ নাতালোভা দু’জনেই মাথা নাড়ল। ডঃ নাতালোভা বলল, ‘ঠিক মা, এটাই এখন প্রথম করণীয়।’
বলে একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘কিন্তু মা, তোমার চলাফেরা নিরাপদ নয়। গ্রেট বিয়ারের লোকরা পাগলা কুকুরের মত হয়ে আছে।’
‘ঠিক বলেছেন খালাম্মা।’
‘আমিও সাথে যাব মা। একটু ছদ্মবেশ নিতে হবে ভাবীকে। অসুবিধা হবে না, সুপার প্লাস্টিকের স্কিন মাস্ক ভাবীর রয়েছে।’ বলল ওলগা।
‘ঠিক বলেছে ওলগা। কোন অসুবিধা হবে না।’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
ডঃ নাতালোভা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘যাই, স্টাডি রুমে একটু কাজ আছে।’
একটু থেমে ওলগাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি মারিয়াকে নিয়ে বাগানের দিক থেকে একটু বেড়িয়ে এস।’
‘তার আগে আম্মা আমি আয়েশা আলিয়েভা আপাকে টেলিফোন করতে চাই।’
‘বেশ।’ বলে ডঃ নাতালোভা ঘরের দরজার দিকে পা বাড়াল।
‘আয়েশা আলিয়েভা কে ওলগা?’
‘হাসান তারিকের স্ত্রী। হাসান তারিককে চেন?’
‘নাম শুনেছি। ফিলিস্তিন বিপ্লবে আহমদ মুসার দক্ষিণ হস্ত ছিলেন।’
একটু থেমেই আবার বলল, ‘নাম শুনে মনে হচ্ছে, আয়েশা আলিয়েভা সোভিয়েত মেয়ে। কি করে বিয়ে হলো?’
‘আয়েশা আলিয়েভা উজবেক মেয়ে এবং অত্যন্ত প্রতিভাবান গোয়েন্দা অফিসার ছিলেন। হাসান তারিক সোভিয়েতদের হাতে বন্দী হয়ে আসেন ফিলিস্তিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে। আয়েশা আলিয়েভার উপর ভার পড়ে হাসান তারিককে সংশোধন অথবা জয় করে নেবার। কিন্তু আয়েশা তার প্রেমে পড়ে যান এবং ব্যর্থ হন। ব্যর্থতার দায়ে বন্দীশিবিরে পাঠানো হয় আয়েশা আলিয়েভাকে।’ থামল ওলগা।
‘তোমার সাথে পরিচয় কিভাবে?’
‘আমার আম্মা যে বন্দীশিবিরের যে সেকশনে ছিলেন, সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় আয়েশা আলিয়েভা ও রোকাইয়েভা নামে আরেক মেয়েকে। তারপর অনেক কথা। আরেক দিন বলব। সংক্ষেপে ঘটনা হলো, আয়েশা আলিয়েভা ও রোকাইয়েভা আম্মার পরামর্শে সেখান থেকে পালান এবং আমাদের কাছে ছিলেন ফাতিমা ফারহানা আপা তাদের সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত।’১
‘সে সময় আহমদ মুসার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি?’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘আহমদ মুসার মূল কেন্দ্র তখন মধ্য এশিয়া। রাশিয়াতেও এসেছেন। কিন্তু তার সাথে দেখা হওয়ার মত ততটা বড় কিংবা সৌভাগ্যবান আমরা ছিলাম না।’
‘তোমার এ কথাগুলো আহমদ মুসাকে আমি বলব। এখন চল, আয়েশা আলিয়েভাকে টেলিফোন করবে। এ দিকের খবরটা হাসান তারিকের জানা দরকার। মধ্য এশিয়ায় সাইমুম সহযোগিতায় আসতে পারে।’
ওলগা তার মায়ের রেখে যাওয়া মোবাইল টেলিফোন হাতে তুলে নিল।
মস্কোর ফরাসী দূতাবাসে মারিয়া জোসেফাইন তার আইডেন্টিটি কার্ড দেখাতেই তথ্য অফিসারটি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বাউ করল তাকে এবং তৎক্ষণাৎ সে ইন্টারকমে কথা বলল রাষ্ট্রদূতের সাথে।
কথা শেষ করেই বলল, ‘চলুন সম্মানিতা রাজকুমারী। রাষ্ট্রদূত আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
তথ্য অফিসারটি মারিয়া জোসেফাইন ও ওলগাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলল।
রাষ্ট্রদূতের অফিসে পৌঁছার পর দেখা গেল, রাষ্ট্রদূতের পিএস দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে।
রাষ্ট্রদূতের পিএস মারিয়া জোসেফাইনদের স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রদূতের কক্ষের দরজা খুলে দিল।
মারিয়া জোসেফাইন এবং ওলগা প্রবেশ করল ঘরে।
রাষ্ট্রদূত উঠে দাঁড়িয়ে তাদের স্বাগত জানাল।
বসার পর কুশল জিজ্ঞাসা হলো রাষ্ট্রদূত ও মারিয়া জোসেফাইনের মধ্যে।
তারপর মারিয়া জোসেফাইন সরাসরি প্রশ্ন করল রাষ্ট্রদূতকে, ‘সম্মানিত রাষ্ট্রদূত, আমার জন্যে কোন মেসেজ আছে কিনা?’
রাষ্ট্রদূত উত্তর দেবার আগে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একবার ওলগা আরেকবার মারিয়া জোসেফাইনের দিকে তাকাল।
বুঝতে পেরে মারিয়া জোসেফাইন বলল, ‘সম্মানিত রাষ্ট্রদূত, এ ওলগা নাতালোভা। ও আমার বোন, বন্ধুর মত। আমাদের কোন কিছু গোপন নেই ওর কাছে। আপনি সব কথাই বলতে পারেন।’
‘ধন্যবাদ, সম্মানিতা প্রিন্সেস ডোনা জোসেফাইন। আপনার আব্বার কাছ থেকে একটা মেসেজ পেয়েছি আমরা।’
বলে একটা চিরকুট মারিয়া জোসেফাইনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি পড়ুন সম্মানিতা প্রিন্সেস। তারপর কথা আছে, বলব।’
মারিয়া জোসেফাইনের চোখে-মুখে উদ্বেগ।
দ্রুত সে চিরকুটটির উপর চোখ বোলাল। তাতে লেখা, ‘মা ডোনা, বাবা আহমদ মুসা, খুব খারাপ অবস্থায় এরা রাখেনি। তবু এ জীবন অসহনীয়। একটা করে মুহূর্ত একটা যুগের মত। কবে এর ইতি হবে, কিংবা হবে না, কিছুই জানি না। সোভিয়েতরা সবচেয়ে বেশি অর্থের কাঙাল। এরই সুযোগ নিয়ে আমার বন্দীখানায় একজন উঁচু পর্যায়ের কর্মচারীকে, যে বাইরে যাতায়াত করে, আমার হীরের আংটি দিয়ে বশ করেছি। তার মাধ্যমেই চিঠিটি পাঠালাম। এখন থেকে প্রতি সোমবার বেলা এগারটায় টলস্টয় পার্কের টলস্টয় এভেনিউ-এর মাঝামাঝি ২১নং কালভার্টটির রেলিং-এ লাল জ্যাকেট ও নীল ফুলপ্যান্ট পরা একজন লোককে বসে থাকতে দেখবে। আর কালভার্টের দক্ষিণ গোড়ায় দক্ষিণমুখী হয়ে একটা ছোট নীল মাইক্রোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে। ঐ মাইক্রোতে উঠে বসলে লাল জ্যাকেটওয়ালা লোকটিও মাইক্রোতে উঠে বসবে। তার কাছেই প্রয়োজনীয় সব কথা শুনবে। পরে সে তোমাকে বা তোমাদের নেভিডিভিচ কনভেন্টের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে আসবে।’
চিরকুটের লেখা শেষে দস্তখত। দস্তখতটি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেও কোন ত্রুটি পেল না মারিয়া জোসেফাইন। এটা আব্বারই দস্তখত।
চিরকুটটি পড়ার পর তা ওলগার হাতে তুলে দিয়ে তাকাল রাষ্ট্রদূতের দিকে। বলল, ‘চিঠি পড়লাম, বলুন এখন সম্মানিত রাষ্ট্রদূত।’
‘দস্তখত সম্পর্কে বলুন সম্মানিত প্রিন্সেস।’
‘দস্তখত আমার আব্বার।’
‘আমরা এ মেসেজ পাবার পর ফ্যাক্সে তা আপনার প্যারিসের বাড়িতে পাঠিয়েছি। এ ছাড়া আমরা এ মেসেজ পাবার পর দু’টি সোমবার পেয়েছি। একটি মেসেজ পাওয়ার পরদিন, আরেকটা ছিল গতকাল। দু’দিনই আমরা আমাদের গোয়েন্দা এজেন্টদের পাঠিয়েছি রাস্তার দু’দিক থেকে ঠিক এগারটায় ঐ ২১নং কালভার্ট অতিক্রম করার জন্যে। যাতে তারা লাল জ্যাকেটওয়ালা লোকটি এবং তার গাড়িকে দেখতে পায়। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, যদি তারা দেখতে পায়, তাহলে অনেক দূর থেকে তাকে অনুসরণ করে ওদের ঘাঁটিকে চিহ্নিত করবে। কিন্তু দু’দিনের একদিনও পাওয়া যায়নি সেই লোক এবং সেই গাড়ি। আমরা মনে করছি, আহমদ মুসা এবং আপনি গেলেই শুধু ঐ তাকে এবং সেই গাড়িকে ঐ অবস্থায় পাওয়া যাবে।’
মারিয়া জোসেফাইন তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না। ভাবল অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘আহমদ মুসা নেই এ সময়। আমিই শুধু আছি। বলুন কি করণীয়।’
‘আমাদের লক্ষ্য সম্মানিত প্রিন্স প্লাতিনিকে উদ্ধার। এই উদ্ধারের জন্যে প্রয়োজন ওদের ঘাঁটি চিহ্নিত হওয়া। গোয়েন্দা লাগিয়ে আমরা সেটাই চেয়েছিলাম। হয়নি। এখন আমরা মনে করছি, সম্মানিতা প্রিন্সেস যদি যান, তাহলে ওরা থাকে কি না দেখা যেত। ওদের দেখা পেলেই তাদের অনুসরণ করার একটা সুযোগ হতো।’
‘আপনার কথা বুঝেছি। চিঠিরও দাবি এটাই। কিন্তু আমি যাব কিনা সিদ্ধান্ত নেবার আগে একটা বিষয় জানা দরকার। সেটা হলো, আপনাদের গোয়েন্দা দল চিঠির বক্তব্য অনুসারে লাল জ্যাকেটওয়ালা এবং তার গাড়ির দেখা পেল না কেন?’
‘সেটাই তো আমরা বুঝতে পারছি না। অবশেষে আমরা মনে করছি, সম্মানিত প্রিন্সেস গেলে চিঠির বক্তব্য সত্য হতে পারে।’
‘কিন্তু গোয়েন্দা দল গেলে তা সত্য হলো না কেন? এ প্রশ্নের সমাধান না করে ওদিকে পা বাড়ানো আমি মনে করি বিপজ্জনক হবে।’
‘কেন?’
‘আপনার গোয়েন্দারা লাল জ্যাকেটওয়ালা ও তার গাড়িকে না পাবার তিনটি কারণ হতে পারে। এক, লাল জ্যাকেটওয়ালা ঐ দু’দিন কোন কারণে আসেনি। দুই, আপনার গোয়েন্দা দল ঠিক রিপোর্ট দেয়নি। এবং তিন, লাল জ্যাকেটওয়ালা এসেছিল, কিন্তু আপনার গোয়েন্দা দলের উপস্থিতি টের পেয়ে সরে পড়েছে। এখন দেখা দরকার, এ তিনটি কারণের কোনটি সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি হতে পারে।’
‘ধন্যবাদ সম্মানিতা প্রিন্সেস। আমি আপনার সাথে একমত। কিন্তু এ তিনটি কারণের কোনটি সত্যের কাছাকাছি হতে পারে? প্রথমটি সত্য হওয়া স্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয়টির সাথে সত্যের কোন দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। এ দিক থেকে তৃতীয় কারণটি অপেক্ষাকৃত সত্যের কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গোয়েন্দা দলের উপস্থিতি লাল জ্যাকেটওয়ালা টের পাবে কি করে?’
‘টলস্টয় এভেনিউ-এর দুই প্রবেশ (অন্তত পার্কে) পথে পাহারা বসানো থাকলে টের পাওয়া কঠিন নয়।’
‘এটা যদি সত্য হয়, তাহলে বলা যায় চিঠির মাধ্যমে ফাঁদ পাতা হয়েছে।’
‘তা জানি না। কিন্তু এ রকম ধারণা করা অসংগত নয়।’
‘ধন্যবাদ সম্মানিতা প্রিন্সেস। আপনি ঠিক বলেছেন।’
বলে মুহূর্তকাল থামল রাষ্ট্রদূত। তারপর বলল, ‘তাহলে এখন কি করণীয় আমাদের?’
একটু ভাবল মারিয়া জোসেফাইন। বলল, ‘আগামী সোমবার সকাল আটটা-ন’টার দিকে টলস্টয় এভেনিউ-এর দু’প্রান্তে পাহারা বসাতে পারেন। যাদের দায়িত্ব হবে লাল জ্যাকেটওয়ালা লোক যখনই তার ছোট মাইক্রো নিয়ে টলস্টয় এভেনিউ-এর সেই কালভার্ট-এর দিকে যাবে, তখন দু’প্রান্ত থেকে তাকে ক্লোজ করে ধরে ফেলা অথবা তাকে অনুসরণ করা।’
মারিয়া জোসেফাইন থামতেই আনন্দে রাষ্ট্রদূত উঠে দাঁড়াল এবং হাসিমুখে মারিয়া জোসেফাইনকে বাউ করে বলল, ‘আমি আপনাকে অভিনন্দিত করছি সম্মানিতা প্রিন্সেস। আমাদের বুরবন রাজকুমারীর জন্যে আমি গৌরববোধ করছি। এই বুদ্ধিটা আমার এবং আমাদের গোয়েন্দাদের মাথায় আসেনি।’
‘ধন্যবাদ সম্মানিত রাষ্ট্রদূত।’
বলে একটু থামল। শুরু করল আবার, ‘আমাদের ধরে নিতে হবে, লাল জ্যাকেটওয়ালা যখন তার মাইক্রো নিয়ে টলস্টয় এভেনিউতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের তরফ থেকেও এভেনিউ-এর দুই প্রান্তে পাহারা বসানো হবে। তাদের মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি আমাদের থাকতে হবে। তবে আমার মতে, লাল জ্যাকেটওয়ালা টলস্টয় এভেনিউতে প্রবেশের সাথে সাথেই যদি তাকে দুই প্রান্ত থেকে ক্লোজ করা হয়, তাহলে ওদের পাহারায় মোতায়েন লোকরা সাহায্যে আসার সুযোগ পাবে না।’
‘সম্মানিতা প্রিন্সেস, আপনার পরামর্শ আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আপনি সবদিক চিন্তা করেছেন। আমার মন বলছে, আমরা সফল হবো। ঈশ্বর সাহায্য করুন।’
‘আমিন। আমরা এবার উঠতে পারি?’ বলল মারিয়া জোসেফাইন।
‘সম্মানিতা প্রিন্সেসের ঠিকানাটা…।’ কথা সমাপ্ত না করেই থেমে গেল রাষ্ট্রদূত।
মারিয়া জোসেফাইন উঠে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনার গোয়েন্দারা তো অনুসরণ করবেই।’
রাষ্ট্রদূতও উঠে দাঁড়িয়েছে। অপ্রতিভ কণ্ঠে সে বলল, ‘মাফ করবেন সম্মানিতা রাজকুমারী। আমরা ঠিক মনে না করলেও দায়িত্ব হিসেবে অনেক কাজ করতে হয়।’
‘ধন্যবাদ। গোয়েন্দা পাঠানোর দরকার নেই।’
বলে একটা চিরকুট রাষ্ট্রদূতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই মোবাইল নাম্বারে খোঁজ করলে আমাকে পাবেন। শুধু আপনার ব্যবহারের জন্যে এটা।’
চিরকুটটি হাতে নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ সম্মানিতা প্রিন্সেস।’
তারপর ওলগার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ এই ভিজিটের জন্যে। আশা করি আসবেন আবার।’
‘ওয়েলকাম সম্মানিত রাষ্ট্রদূত। অনেক কিছু শিখেছি আপনাদের আলোচনায়।’
মারিয়া জোসেফাইন ও ওলগা দু’জনেই রাষ্ট্রদূতের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রাষ্ট্রদূত দূতাবাসের ভেতরের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত এসে তাদেরকে বিদায় জানালো।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল ওলগা। পাশের সিটে মারিয়া জোসেফাইন। গাড়িতে উঠেই মারিয়া জোসেফাইন সুপার প্লাস্টিকের স্কিন মুখোশটি পরে নিয়েছে।
গাড়ি বেরিয়ে এল দূতাবাসের গেট দিয়ে।
চলতে শুরু করল ওলগার গাড়ি।
‘ভাবী, আহমদ মুসা ভাইয়ের পছন্দকে আমি মোবারকবাদ জানাচ্ছি। তোমার কথা শুনে মনে হলো, তুমি আর এক আহমদ মুসা।’
‘তুমি সূর্যের সাথে মাটির প্রদীপের তুলনা করছ ওলগা।’
‘মাটির প্রদীপের সাথে সূর্যের কখনও মিলন হয় না ভাবী। আল্লাহ তা করেন না।’
‘থাক এসব কথা, এস সমস্যা নিয়ে ভাবি।’
‘তোমার ঠিকানা তুমি দূতাবাসে রাখলে না কেন? যে মোবাইলের নাম্বার তুমি দিলে, তা একটি সাংকেতিক নামে নেয়া এবং এর কোন গ্রাউন্ড অ্যাড্রেস নেই।’
‘শোন, দূতাবাসগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটা করে চিড়িয়াখানা। সবাই এখানে আমার বন্ধু নাও হতে পারে। এখানে রুশ সরকারের লোক যেমন থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে গ্রেট বিয়ারের লোকও। তাদের হাতে আমার ঠিকানা যাওয়া কি ঠিক?’
‘ধন্যবাদ ভাবী। আমি এ দিকটা ভাবতেই পারিনি।’
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘আচ্ছা ভাবী, রাষ্ট্রদূত তোমাকে ‘ডোনা জোসেফাইন’ বলল কেন?’
হাসল মারিয়া জোসেফাইন। বলল, ‘আমার প্রকৃত নাম ‘মারিয়া জোসেফাইন লুই’ বটে, কিন্তু আমার ডাক নাম ‘ডোনা’। তাই সবাই আমাকে ‘ডোনা জোসেফাইন’ হিসেবেই জানে। আর রাজকীয় নাম ‘মারিয়া জোসেফাইন লুই’-এর চাইতে সাধারণ নাম ‘ডোনা জোসেফাইন’ আমার ভালো লাগে।’
‘কিন্তু ‘মারিয়া জোসেফাইন’ নাম হাজার গুণ বেশি ভালো লাগছে আমার কাছে।’
‘আহমদ মুসাও তা-ই বলেন।’
‘তুমি এখন কি বল?’
‘আমারও ভালো লাগতে শুরু করেছে।’ হেসে বলল ডোনা।
‘তোমার ডাক নামও ‘মারিয়া’ অথবা ‘জোসেফাইন’ হওয়া উচিত।’
‘কারণ?’
‘ডোনা নামটা হালকা, স্কুল ছাত্রীর জন্যে মানায়।’
‘ঠিক আছে, কোন নামেই আমার আপত্তি নেই।’
বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘এবার এস, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি।’
‘সোমবারে তো গোয়েন্দাদের রাষ্ট্রদূত সাহেব পাঠাচ্ছেন। আমাদের কি কিছু করণীয় আছে?’
‘চল আমরা টলস্টয় এভেনিউ দিয়ে ফিরি। দেখে যাই জায়গাটা। কিছু করার আছে কিনা বোঝা যাবে।’
‘ঠিক আছে।’
ছুটে চলল ওলগার গাড়ি।

পরবর্তী সোমবার।
সকাল দশটা।
সাদোভায়া রিং রোড-এর একটি মোটরসাইকেল ভাড়ার শপ থেকে একটা মোটরসাইকেল টলস্টয় পার্কে প্রবেশ করল। ছুটে চলল পার্কের অভ্যন্তরে।
কমিউনিস্ট আমলে পার্কে মোটরসাইকেল ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। এখন সে আইন অনেকখানি শিথিল করা হয়েছে। এখন মহিলাদের জন্যে কিংবা মহিলা বা শিশু সাথে পুরুষদের জন্যে পার্কে মোটরসাইকেল ব্যবহার বৈধ করা হয়েছে।
মোটরসাইকেলটি পার্কের মাঝামাঝি জায়গায় টলস্টয় এভেনিউ থেকে একশ’ গজ পরিমাণ পশ্চিমে বৃত্তাকার ফুলগাছ থেকে সৃষ্ট ঝোপের পাশে এসে থামল।
মোটরসাইকেল থেকে প্রথমে নামল ডোনা। সে পেছনের সিটে ছিল। তারপর নামল ওলগা। সেই চালাচ্ছিল মোটরসাইকেল।
নামার পর ওলগা মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে ফুলগাছের বৃত্তের মধ্যে রাখল। লক করল গাড়ি।
দু’জনের মাথায় মোটরসাইকেলের হেলমেট। হেলমেট খুলে ওরা মোটরসাইকেলে রেখে দিল।
ডোনা কিংবা ওলগা কাউকেই চেনার কোন উপায় নেই। দু’জনের মুখেই স্কিন মুখোশ। দু’জনেই খেলোয়াড়ী চেহারার আধা সুন্দরী চৌকস মহিলাতে পরিণত হয়েছে।
যে ঝোপে তারা মোটরসাইকেল রাখল, সেখান থেকে আরও কিছু পুবে আরেকটি ঝোপ দেখা যাচ্ছে। ঠিক ওটা ঝোপ নয়। বৃত্তাকার ঝাউগাছের সারি।
ডোনা ও ওলগা গুটি মেরে দ্রুত ঝাউগাছের সেই ঝোপের দিকে চলল।
উঁচু বৃক্ষের মোটা মোটা কাণ্ডের আড়াল নিয়ে নিয়ে তারা চলল।
ঝাউ গাছের আড়ালে পৌঁছে তারা দেখল, টলস্টয় এভেনিউ-এর ২১ নম্বর কালভার্ট ত্রিশ গজের মত দূরে। মাঝখানে কয়েকটা উঁচু বৃক্ষ। গাছের শাখা-প্রশাখা অনেক উপরে। তাই কয়েকটা মোটা কাণ্ড ছাড়া দৃষ্টিপথকে বাঁধা দেবার আর কিছু নেই।
ডোনা ও ওলগা কালভার্টের উপর চোখ রেখে ঝোপের আড়ালে অবস্থান নিল।
একুশ নম্বর কালভার্টটির মত আরও চল্লিশটি কালভার্ট আছে পার্কের মধ্য দিয়ে প্রলম্বিত টলস্টয় এভেনিউতে। কোনটারই প্রস্থ পঁচিশ-তিরিশ ফুটের বেশি নয়। কালভার্টগুলো আসলে ফ্লাইওভারের মত। পার্কে বেড়ানো মানুষদের রাস্তা ক্রস করতে না হয়, সে জন্যই এগুলি তৈরি হয়েছে। কালভার্টের নিচ দিয়ে পার্কের পায়ে চলা পথ, পাথর বিছানো।
ডোনা ও ওলগা যখন সেই ঝোপে ওঁৎ পেতে বসল, তখন বেলা সাড়ে দশটা।
ঠিক যখন বেলা ১০টা ৪০ মিনিট, তখন বিস্ময়ের সাথে ডোনা ও ওলগা লক্ষ্য করলো, টলস্টয় এভেনিউ দিয়ে চলমান একটা জীপ থেকে দু’জন লোক গড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। তারপর রাস্তা থেকে নেমে এল পার্কে।
কালভার্ট থেকে সাত-আট গজ দূরের পাশাপাশি প্রায় দু’টি গাছের মোটা কাণ্ডের আড়ালে এসে তারা ঘাপটি মেরে বসল।
‘ওরা কি গ্রেট বিয়ারের পক্ষ, না আমাদের পক্ষ?’ বলল ওলগা ডোনার কানে কানে।
‘নিশ্চিত, ওরা আমাদের পক্ষ নয়।’
‘তাহলে তো দেখা যাচ্ছে, শত্রুপক্ষ রাস্তার দু’প্রান্তে পাহারা বসানো ছাড়াও বাড়তি লোক আজ নিয়োগ করেছে।’
‘বোঝা মুশকিল, গত দু’দিনও হয়তো ওরা ছিল এই ভাবে গাছের আড়ালে।’
‘হতেও পারে।’
আর কোন কথা না বলে হাতের ব্যাগ থেকে বন্দুকের কিছু পার্টস বের করল এবং সংযোজন করতে লেগে গেল।
সংযোজন শেষ হলে দেখা গেল, খাট ব্যারেলের একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল।
রাইফেলটি তাক করলো ডোনা ২১নং ব্রীজের দিকে।
ঠিক সকাল সাড়ে দশটায় একটা নীল মাইক্রোকে দক্ষিণ দিক থেকে একুশ নাম্বার কালভার্টের দিকে আসতে দেখা গেল। তার পঞ্চাশ গজ পেছনেই আর একটা জীপ।
মাইক্রো একুশ নাম্বার কালভার্টের গোড়ায় পৌঁছল, তখন উত্তর দিক থেকে আরেকটা জীপ তার প্রায় পঞ্চাশ গজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ডোনা ফিস ফিস করে ওলগাকে বলল, ‘আমাদের গোয়েন্দাদের টাইমিং চমৎকার। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় মাইক্রোকে ঘিরে ফেলেছে।
‘ঐ দু’দিন ঐ নীল মাইক্রো এল না, আজ আসার ব্যাখ্যা কি?’ বলল ওলগা।
‘মাইক্রোটিকে যদি এইভাবে সংগে সংগে ফলো না করে সেই এগারটার নির্ধারিত সময়ে দু’দিক থেকে দুটো গাড়ি একুশ নাম্বার কালভার্টের দিকে আসত, তাহলে মাইক্রোটিকে এইভাবে পেত না।’
‘কোথায় যেত?’
‘এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয় ওলগা।’
ডোনা ও ওলগা কথা বলছিল কিন্তু তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল মাইক্রোটির দিকে।
মাইক্রোটি দাঁড়িয়ে পড়েছে একুশ নাম্বার কালভার্টের দক্ষিণ গোড়ায়।
দু’দিক থেকে দু’টি জীপ এভেনিউ-এর একই লেন ধরে মাইক্রোর দিকে আসছিল।
এতক্ষণে মাইক্রো তার বিপদ টের পেয়ে গেছে।
মাইক্রোটির মাথা বোঁ করে পশ্চিম দিকে ঘুরে গেল এবং দ্রুত এভেনিউ থেকে কালভার্টের গোড়া ঘেঁষে পশ্চিমপাশে পার্কে নেমে এল।
পার্কের পৃষ্ঠদেশ থেকে এভেনিউ উঁচু প্রায় পাঁচ ফুট, তবে কালভার্টের জায়গায় উচ্চতা প্রায় সাত ‍ফুটের মত।
পার্কের মাটিতে নেমেই মাইক্রোটি আবার পুব দিকে ঘুরে কালভার্টের নিচে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল।
ডোনা দ্রুত বলল, ‘ওলগা, তোমার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে। আগের দুই সোমবার মাইক্রোটি শত্রুর গতিবিধির খবর পেয়ে এইভাবে কালভার্টের তলায় লুকিয়ে ছিল।’
‘ঠিক বলেছেন ভাবী।’
মাইক্রোটি পুব দিকে টার্ন নিতেই দক্ষিণ দিক থেকে আসা জীপ থেকে একটা গুলি মাইক্রোর সামনের চাকা গুঁড়িয়ে দিল।’
মাইক্রোটি আর এক ইঞ্চিও সামনে না এগিয়ে বসে পড়ল।
দু’দিক থেকে দুই জীপই তখন কালভার্টটির দু’পাশের গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।
টায়ার ফুটো হওয়া মাইক্রোবাসটি বসে পড়তেই মাইক্রোর ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে গেল। লাল জ্যাকেটওয়ালা একজন লোক ড্রাইভিং সিট থেকে লাফিয়ে পড়েই উবু হয়ে দৌঁড় দিল এবং এসে আশ্রয় নিল সেই দু’টি গাছের আড়ালে।
রিভলভার হাতে নেমে পড়েছিল দুই জীপ থেকে চারজন।
তারা গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে গাছের আড়ালে পুব থেকে লুকানো লোক দু’টি ব্রাশফায়ার করল সেদিক লক্ষ্য করে।
জীপ থেকে নামা লোক চারজন সংগে সংগে জীপে উঠে গেল।
ঠিক এই সময়ই টলস্টয় এভেনিউ-এর দু’দিক থেকে দু’টি মাইক্রো ছুটে এল।
জীপ দু’টির কাছাকাছি এসে ওরা ব্রাশফায়ার করল জীপ দু’টিকে লক্ষ্য করে।
জীপ দু’টি থেকে কোন পাল্টা গুলি হলো না।
ডোনা বলল, ‘গোয়েন্দা চারজন আত্মরক্ষার কৌশল নিয়েছে। মনে হয় তাদের কাছে রিভলভার ছাড়া কোন অস্ত্র নেই।’
মাইক্রো দু’টি থেকে দু’জন দু’জন করে চারজন লোক নেমে এল। ওদের হাতে স্টেনগান।
নেমেই স্টেনগানধারী চারজনের দু’জন পকেটে হাত দিয়ে বের করল ক্রিকেট বলের মত গোলাকৃতি একটা কাল বস্তু।
আঁৎকে উঠল ডোনা। বলল, ‘সর্বনাশ, ওরা গ্রেনেড চার্জ করতে যাচ্ছে জীপে। জীপসমেত চারজন গোয়েন্দাই ধ্বংস হয়ে যাবে।’
সময় নষ্ট করেনি ডোনা। কথা বলতে বলতেই রাইফেল তাক করল প্রথমে দক্ষিণের জনকে। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে প্রথম গুলি ছুঁড়েই দ্রুত ব্যারেল উত্তরের লোকটির দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আরেকটা গুলি ছুঁড়ল।
গ্রেনেডধারী দু’জনের হাত গ্রেনেডসহ মাথা পর্যন্ত উঠেছিল জীপ দু’টি লক্ষ্যে। সে পর্যন্তই। হাত দু’টি আর এগোতে পারল না। দু’জনের মাথাই গুঁড়ো হয়ে গেল দু’টি গুলিতে।
তাদের সাথী দু’জন স্টেনগানধারী পশ্চিম দিকে একবার তাকিয়েই দ্রুত উঠে গেল গাড়িতে এবং গাড়ির কভার নিয়ে স্টেনগান তুলল। ফায়ার করল লক্ষ্যহীনভাবে।
এদিকে পেছন থেকে গুলির শব্দ শুনেই গাছের আড়ালে দাঁড়ানো তিনজন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল আতংকিত ও বিমূঢ় ভাব। তারা যেন গুলির ঠিক লোকেশনটা চিহ্নিত করতে পারছিল না। তাদের সামনেও অনেকগুলো গাছ এবং তারপর ঝাউ-এর ঝোপ।
দ্বিতীয় গুলিটি করেই ডোনা রাইফেলের ব্যারেল ঘুরিয়ে নিয়েছিল এই তিনজন লোকের দিকে। তিনজনের মুহূর্তকালের সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগ গ্রহণ করলো ডোনা। পর পর গুলি করল দু’টি দুই স্টেনগানধারীর লক্ষ্যে। বসা অবস্থাতেই দু’জন বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ল গাছের পাশে।
লাল জ্যাকেটধারী উঠে দৌঁড় দিয়ে পালাচ্ছিল। ডোনা তার পায়ে গুলি করল তাকে জীবন্ত ধরতে হবে এই লক্ষ্যে।
গুলি খেয়ে লোকটি পা চেপে ধরে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
এ সময় রিভলভারের দু’টি গুলির শব্দ শুনল মাইক্রো দু’টির দিক থেকে।
ওদিকে তাকাল ডোনা ও ওলগা। দেখল, মাইক্রোর খোলা দরজা দিয়ে লাফিয়ে পড়ছে অবশিষ্ট স্টেনগানধারী দু’জন। তাদের হাতে স্টেনগান নেই।
উত্তরের জন লাফিয়ে পড়ার সাথে সাথেই হ্যান্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হলো। উড়ে গেল তার দেহ।
আর দক্ষিণের জন নিচে লাফিয়ে পড়ে বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে দৌঁড় দিচ্ছিল পালাবার জন্যে। মাইক্রোর আড়াল থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা দু’জন গোয়েন্দা তাকে ধরে ফেলল এবং টেনে তাকে জীপে তুলল।
তিনজন গোয়েন্দা ছুটে এল আহত হয়ে পড়ে থাকা লাল জ্যাকেটওয়ালার কাছ।
ডোনা এবং ওলগাও বেরিয়ে এসেছিল ঝোপের আড়াল থেকে। কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে গোয়েন্দাদের লক্ষ্য করে ফরাসী ভাষায় বলল, ‘ধরা পড়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ও নিশ্চয় পটাসিয়াম সায়ানাইড জাতীয় কিছু খেয়েছে। আপনারা তাড়াতাড়ি যান। দেখুন ঐ বন্দীর যাতে এই একই পরিণতি না হয়।’
কথা শুনেই দু’জন ছুটল গাড়ির দিকে। একজন দাঁড়িয়ে থাকল। তার মাথা নিচু। ডোনার দিকে একটা বাউ করে বিনীত কণ্ঠে বলল, ‘মহামান্যা প্রিন্সেস, আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের চারজনের জীবন আপনি রক্ষা করেছেন।’
‘আপনি এ কথা চিনে বলছেন, না না-চিনে বলছেন?’
‘আমাদের বুরবন প্রিন্সেস পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চি লম্বা এবং তার ফরাসী উচ্চারণ সম্রাজ্ঞী জোসেফাইনের মত।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে ডোনা ওলগার দিকে চেয়ে বলল, ‘চল, আমরা ফিরি মোটরসাইকেলের স্থানে।’
ডোনা হাঁটতে শুরু করেছে। ওলগাও।
হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘বুঝলাম না, গোয়েন্দা অফিসার ‘বুরবন প্রিন্সেস’ বলল কেন?’
‘আমাদের রাজবংশকে ‘হাউজ বুরবন’ বলা হয়।’
‘আর সম্রাজ্ঞী জোসেফাইন নেপোলিয়নের স্ত্রী, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
টলস্টয় পার্ক পার হয়ে ওলগা মোটরসাইকেল ছেড়ে যখন সাদোভায়া রিং রোডে পার্ক করা নিজেদের গাড়িতে উঠল, তখন ওলগা বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ‘এতক্ষণে স্বস্তি বোধ করছি। মনে হচ্ছে, মায়ের মুখ তাহলে দেখতে পাব।’
‘কেন, আর কারও মুখ দেখতে ইচ্ছে হয় না?’
‘ওটা বিজ্ঞাপন দিয়ে বলার মত নয় ভাবী।’
‘তাহলে আছে নাকি?’
‘বলব না। তোমাকে আমার সাথে থাকতে হবে এবং তা আবিষ্কার করতে হবে।’
‘চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।’
‘ঠিক আছে।’ ওলগার মুখে দুষ্টু হাসি।