২৪. জারের গুপ্তধন

চ্যাপ্টার

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ভূ-গর্ভস্থ গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভিআইপি লিফট থেকে নামল এক মুখোশধারী। তার পেছনে সামরিক পোশাক পরা দু’জন প্রহরী। তাদের হাতে লেটেস্ট মডেলের ক্ষুদ্রাকৃতি মেশিনগান। এ বহুমুখী মেশিনগান এক মিনিটে পাঁচশ গুলি বর্ষণ করতে পারে।
মুখোশধারীর পরনে রাজকীয় পোশাক। জাররা যে পোশাক পরতো সেই পোশাক। পায়েও সেই রাজকীয় জুতা।
লিফট থেকে নেমে পেছনে না তাকিয়েই মাথা সোজা রেখে নির্দেশ দিল, ‘লিফট লক করা হয়েছে?’
কথা হুংকারের মত শোনাল।
পেছনের প্রহরীদের একজন বাউ করে বলল, ‘মহামান্য প্রভু আইভান, আমি নিজ হাতে লক করেছি।’
‘এটাও লক করে দাও।’
বলে সামনে পা বাড়াল মুখোশধারী। তার হাঁটার স্টাইলও রাজকীয়।
তার পেছনে পেছনে দু’জন নিরাপত্তা গার্ড। হ্যান্ড মেশিনগানের ট্রিগারে তাদের হাত। একজন হাঁটছে সামনে তাকিয়ে আর একজন পেছন ফিরে।
মুখোশধারী যাচ্ছে প্রিন্সেস ক্যাথারিনরা যেদিকে আছে, সেদিকে। সে গিয়ে প্রবেশ করল ক্যাথারিনদের করিডোরে। দাঁড়াল গিয়ে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের দরজায়।
দরজার ডিজিটাল লকের নির্দিষ্ট বোতামে নক করল মুখোশধারী। খুলে গেল দরজা।
ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে বই পড়ছিল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। দরজা খুলে যাওয়া দেখে সোজা হয়ে বসেছে সে।
প্রথমেই তার চোখ গিয়ে পড়ল মুখোশধারীর উপর। মুখের সোনালী মুখোশ ছাড়া সবটা পোশাকই ‘আইভান দি টেরিবল’ মানে জার চতুর্থ আইভানের মত।
চমকে উঠল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। এই কি তাহলে গ্রেট বিয়ারের প্রধান! যে ‘আইভান দি টেরিবল’ সেজে বসেছে!
মুখোশধারীর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘ক্যাথারিন, বেরিয়ে এস।’
বিস্মিত হলো ক্যাথারিন, কথা বলার স্টাইল জারদের মত। যেন কোন যাত্রা গানে কেউ জারের অভিনয় করছে।
ধীরে ধীরে বিস্ময়ের স্থান ক্রোধ এসে দখল করল। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রিন্সেস ক্যাথারিন বলল, ‘শিষ্টতা বজায় রেখে কথা বললে খুশি হবো।’
মুখোশধারীর কণ্ঠে আগের মতই ধ্বনিত হলো, ‘ক্যাথারিন, বেরিয়ে এস।’
‘ভালো ভাবে কথা বলুন। আমি জনৈক ক্যাথারিন নই, ক্রাউন প্রিন্সেস ক্যাথারিন।’
‘আমি আইভান, আমি নিজে ডাকছি, এটাই যথেষ্ট।’
‘শৃগাল সিংহের মুখোশ পরলেই সিংহ হয় না। সে শৃগালই থাকে।’
হুংকার দিয়ে উঠল মুখোশধারী আইভান। যেন পাওয়ারফুল লাউডস্পীকারে কেউ চিৎকার করে উঠল। বলল, ‘আমার সাথের এরা তোমার গায়ে হাত দিতে পারলে খুশি হবে। সেটাই করবো, তুমি বেরিয়ে না আসলে।’
‘কোথায় বেরুবো?’
‘তোমার গুরুজন প্লাতিনির ঘরে। কিছু কথা বলব তোমাদের দু’জনকে।’
প্রিন্সেস ক্যাথারিন রাজকীয় পদক্ষেপে বেরিয়ে এল।
ইতোমধ্যে আইভান মিঃ প্লাতিনির ঘর আনলক করেছিল।
মিঃ প্লাতিনি সোফায় বসেছিল। চমকে উঠল মুখোশধারী রাজবেশের আইভানকে দেখে।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন গিয়ে বসল মিঃ প্লাতিনির পাশে।
আইভান ঘরে প্রবেশ করে প্লাতিনির পড়ার টেবিলের উপর বসল চেয়ারের উপর পা রেখে। যেন ওটাই তার সিংহাসন। সে কথা বলল আবার সেই লাউডস্পীকার মার্কা যান্ত্রিক সুরে।
বলল, ‘প্লাতিনি, তোমার সাথে আইভানের মহান রাশিয়ার কোন বিরোধ নেই। লড়াই আমাদের আহমদ মুসার সাথে। তোমার মেয়ে তাকে বিয়ে করে সেও উচ্ছন্নে গেছে। আহমদ মুসা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। প্যারিসে সে আমাদের কয়েক ডজন লোককে হত্যা করেছে। রাশিয়াতেও এ ক’দিনে আমাদের প্রায় ডজনখানেক লোক তার হাতে প্রাণ দিয়েছে। আমরা আর এক মুহূর্তও ক্ষেপণ করতে চাই না।’
বলে আইভান একটা কাগজ এগিয়ে দিল প্লাতিনির দিকে।
কাগজটি হাত পেতে নিয়ে তাতে নজর বোলাতে লাগল প্লাতিনি, পড়ল সেঃ
“বাবা আহমদ মুসা। আমি মৃত্যুর মুখোমুখি। আজ সন্ধ্যার মধ্যে যদি তুমি মস্কোর বেসরকারী রেডিওতে তোমার আত্মসমর্পণের ঘোষণা না দাও এবং রাতের মধ্যে যদি আত্মসমর্পণ না কর, তাহলে ওরা আমাকে হত্যা করবে। অনেক চেষ্টা করেছ, আমাকে মুক্ত করতে পারনি। শত ডজন হত্যা করেও আমাকে মুক্ত করতে পারবে না। সুতরাং সন্ধ্যার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নাও, তুমি কি করবে।”
পড়া শেষ করে মুখ তুলল প্লাতিনি।
আইভানের কণ্ঠ যান্ত্রিক স্বরে বলল, ‘আমার বন্দীখানার সব ঘরেই ভিডিও রেকর্ডের ব্যবস্থা চালু আছে। তুমি কাগজের লেখাগুলো পড়ে যাও প্লাতিনি। তোমার কথা রেকর্ড হয়ে যাবে এবং আধা ঘণ্টা পরে মস্কোর বেসরকারী টিভি চ্যানেলে তা প্রচারিত হবে বার বার।’
‘আমি এটা পড়ব না।’
‘আমি দ্বিতীয় বার আদেশ করব না।’
বলে গ্লাভস ঢাকা হাত দিয়ে পকেট থেকে বের করল অস্বাভাবিক আকৃতির একটা রিভলভার। বলল, ‘এটা থেকে গুলি বের হয় না প্লাতিনি। বের হয় ভয়ানক শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্যাপসুল। এ ক্যাপসুল লোহার বর্মও ভেদ করে, কিন্তু শরীরের চামড়া ভেদ করে না, বরং তাকে কামড়ে ধরে থাকে। যতক্ষণ কামড়ে ধরে থাকবে, শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ বইবে। মৃত্যু যন্ত্রণা বোধ হবে, কিন্তু মৃত্যু হবে না।’
বলে আইভান রিভলভার তুলল প্লাতিনিকে লক্ষ্য করে।
প্রিন্সেস ক্যাথারিন আইভানকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘নামাও রিভলভারের নল।’
তারপর প্লাতিনির দিকে ফিরে তার হাত দু’টি চেপে ধরে বলল, ‘চাচাজান, আপনি বিবৃতিটি পড়ে ফেলুন।’
‘না মা, আহমদ মুসাকে এদের হাতে তুলে দেব না। আমার বেঁচে থাকার কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু মজলুম মানুষের স্বার্থে তাকে বাঁচতে হবে।’
‘চাচাজান, আপনি একটা বিবৃতি পড়ছেন, আহমদ মুসাকে এদের হাতে তুলে দিচ্ছেন না। আমি আহমদ মুসাকে যতটুকু দেখেছি, তাতে জানি, আপনার এ বিবৃতি তার অ্যাকশনকে জোরদার করবে, তাকে তার পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।’
প্লাতিনি তাকাল প্রিন্সেস ক্যাথারিনের দিকে। প্লাতিনির মুখ তখন সহজ হয়ে উঠেছে।
তারপর সে চোখ ফেরাল আইভানের দিকে। বলল, ‘আচ্ছা, পড়ছি তোমার বিবৃতি।’
বলে প্লাতিনি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বিবৃতিটি পাঠ করল।
‘ধন্যবাদ প্লাতিনি।’ পাঠ শেষ হলে প্লাতিনিকে লক্ষ্য করে বলল আইভান।
কথা শেষ করেই আইভান, আর একটি কাগজ তুলে ধরল প্রিন্সেস ক্যাথারিনের সামনে।
কাগজটি হাতে নিল ক্যাথারিন।
কাগজে লেখা আছে পড়ল প্রিন্সেস ক্যাথারিনঃ
“আমি ক্রাউন প্রিন্সেস ক্যাথারিন রুশ জাতির নতুন ত্রাতা আইভানের কাছে স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছি। কেরনস্কী জুনিয়রের সরকার শাসনতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের নামে রাজপরিবারকেও বিদেশী শক্তির লেজুড় করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার সাথে আমি নেই। কেরনস্কী সরকার বিদেশী এজেন্ট ও ক্রাউন প্রিন্সেস তাতিয়ানাকে হত্যাকারী এবং অতি মূল্যবান রাজ-সম্পদ দখলকারী আহমদ মুসাকে লেলিয়ে দিয়েছে আমার পেছনেও। আমাকে সিংহাসনে বসানোর অজুহাতে জারদের শত শত বছরের ধনভাণ্ডার আত্মসাৎ করতে চায় সরকারের গুটিকতক লোক। এই ষড়যন্ত্র বানচাল করার জন্যে আমি রুশ জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।”
পড়া শেষ হলে মুখ তুলল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। তার মুখমণ্ডল শক্ত এবং চোখে আগুন। বলল, ‘ভণ্ড আইভান, মনে করেছ জনগণের উদ্দেশ্যে আমি এটা পড়ব, তাই না?’
‘অবশ্যই তুমি এটা পড়বে এবং এখনি।’
‘তুমি ভণ্ড আইভান সেজেছ, অভিনয় করছ জারদের। কিন্তু তুমি রাজপরিবারকে আসলেই চেন না।’
‘চিনি কিনা দেখাচ্ছি।’ বলে আইভান তার রিভলভারের নল স্থির করল প্রিন্সেস ক্যাথারিন লক্ষ্যে।
প্লাতিনি চোখের পলকে উঠে প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে আড়াল করে বলল, ‘আমি বেঁচে থাকতে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’
হো হো করে হেসে উঠল আইভান। বলল, ‘আরো ভালো হলো। ক্যাথারিনের চেয়ে তোমার গায়ে বিদ্যুৎ চালালেই ক্যাথারিনকে দ্রুত রাজি করানো যাবে।’
বলে আইভান আবার তার রিভলভারের নল তুলল প্লাতিনিকে লক্ষ্য করে। আইভানের তর্জনী যাচ্ছিল রিভলভারের ট্রিগার স্পর্শ করতে।
চিৎকার করে উঠল প্রিন্সেস ক্যাথারিন। কিছু বলতে যাচ্ছিল ক্যাথারিন চিৎকার করে। ঠিক এই সময়েই মেশিনগান গর্জন করে উঠল বাইরে। আকস্মিক সেই শব্দে চমকে উঠল ঘরের সবাই। আইভানও।
সে লাফ দিয়ে মেঝেতে নামল। বিড়ালের মত এগোতে লাগল দরজার দিকে।

নিকোলাস বুখারিন তার বন্দী কক্ষে প্রথম কয়েক দিন ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। আইভানের হুমকি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাই করেনি। বরং আহমদ মুসাকে বন্দী করার পর দু’জনকে একসাথে শাস্তি দেবে, এই ঘোষণায় খুশি হয়েছে নিকোলাস বুখারিন। এখন আর আহমদ মুসাকে তার শত্রু মনে হয় না। মনে হয়, আহমদ মুসাই ন্যায়ের পক্ষে রয়েছে। আহমদ মুসা যদি রাজকীয় আংটি এবং রাজকীয় ডায়েরী প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ক্যাথারিনের মাধ্যমে যদি রাশিয়ায় শাসনতান্ত্রিক রাজতন্ত্র কায়েম হয়, তাহলে তাতেই রাশিয়ার কল্যাণ হবে।
এই মানবিক পরিবর্তনের পর নিকোলাস বুখারিন নতুন করে ভাবতে শুরু করল, তাকে বাঁচতে হবে এবং তাকে এখান থেকে বেরুতে হবে। কিন্তু কিভাবে? এই পথ সন্ধানই তার এখন সর্বক্ষণের চিন্তা হয়ে দাঁড়াল।
সেই যে দরজা বন্ধ হয়েছে আর খোলা হয়নি। খাবার আসে দরজার স্লাইডিং উইন্ডো দিয়ে।
বুখারিন জানে, এই কক্ষের সব কথা, সব দৃশ্য টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে রেকর্ড হচ্ছে।
নিকোলাস বুখারিন টিভি ক্যামেরার চোখ খুঁজে পেয়েছে। ইচ্ছে করলে সে ক্যামেরার চোখে এখন কাগজ লাগিয়ে টিভি ক্যামেরার ছবি ও সাউন্ডের রিলে বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু নিকোলাস বুখারিন চিন্তা করেছে, শত্রুপক্ষকে হঠাৎ হুঁশিয়ার করায় লাভ নেই। প্রয়োজনে এই কৌশল কাজে লাগানো যাবে।
নিকোলাস বুখারিন জানে, বন্দীখানার কথা রেকর্ড হয়ে যেমন বাইরে যায়, তেমনি বাইরের বিভিন্ন রুমের কথা বন্দীখানায় আসতে পারে। মাত্র একটা সুইচ অন করতে হয় এবং সে সুইচটি কক্ষের কোন না কোন জায়গায় রয়েছে।
নিকোলাস সে সুইচ অনেক খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি।
আজ নাস্তার পর নতুন এক দফা খুঁজতে শুরু করল সে।
খুঁজতে খুঁজতে দরজার ডিজিটাল কী-বোর্ডের পাশে কালো চৌকাঠে একটা কালো বোতামের সন্ধান পেল। এর অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, দরজার ডিজিটাল কী-বোর্ডের সাথে চৌকাঠের এই কালো বোতামটির সম্পর্ক নেই।
তাহলে এ বোতামটি কি?
বোতামে চাপ দিল নিকোলাস বুখারিন।
চাপ দেয়ার সংগে সংগেই ছাদের দিক থেকে কথা ভেসে আসতে শুরু করল।
নিকোলাস বুখারিন চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল ছাদের দিকে। আশ্বস্ত হলো, টেলিভিশন ক্যামেরার সাথে রাখা নীরব স্পীকার এখন সরব হয়ে উঠেছে।
আর নিকোলাস বুখারিনের চমকে উঠার কারণ, যে কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে সে কণ্ঠটি আইভান দি টেরিবলের।
আইভানের প্রথম যে কথা নিকোলাস বুখারিন শুনতে পেল তাতে আইভান প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে বলছে।
মুখোশধারী সোনালী মোড়কের কাল শয়তান আইভান কি এখানে এসেছে? প্রিন্সেসকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
নিকোলাস বুখারিন উৎকর্ণ হলো স্পীকারের দিকে।
শুনতে লাগল আইভান ও ক্যাথারিনের মধ্যেকার উত্তপ্ত কথোপকথন।
ক্যাথারিন ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া, ক্যাথারিনকে প্লাতিনির ঘরে নিয়ে যাওয়া, প্লাতিনিকে অনিচ্ছাকৃত বিবৃতি দিতে বাধ্য করা- এ পর্যন্ত শুনতেই নিকোলাস বুখারিনের সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল ক্রোধে। এই আইভানকে আর এক ইঞ্চিও এগোতে দেয়া যায় না। কিন্তু ঘর থেকে বেরুবে কেমন করে?
হঠাৎ নিকোলাস বুখারিনের মনে পড়ল, সেদিন বন্দীখানায় নিয়ে আসার আগে সার্চ করা হয়নি তাকে। কোন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেই হলে প্রবেশ বৈধ নয়। এ কারণেই তাকে সার্চ করার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু সেদিন তার পকেটে সদ্য সংগ্রহ করা কলমাকৃতির সুপার ম্যাগনেটিক টর্চ ছিল। এই টর্চ অন করলে অর্থাৎ সুইচ টিপে কলমের মাথা থেকে প্লাস্টিক কভার সরিয়ে নিলে যে ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন হয়, তা একটি নির্দিষ্ট আওতার মধ্যে যে কোন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। নিকোলাস বুখারিন ভাবল, সুপার ম্যাগনেটিক টর্চ ডিজিটাল লকের ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার অর্থ লকিং সিস্টেম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া অর্থাৎ আনলক হয়ে যাওয়া।
আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল নিকোলাস বুখারিনের।
ঠিক এ সময় আইভান প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে ‍হুমকি দিয়ে বলছিল, ‘অবশ্যই তুমি এটা পড়বে এবং এখনি।’
নিকোলাস দ্রুত গিয়ে পকেট থেকে সুপার ম্যাগনেটিক টর্চ বের করে আনল এবং টর্চটি অন করে এগোলো দরজার ডিজিটাল লকের দিকে।
সুপার ম্যাগনেটিক টর্চ ডিজিটাল লকের উপর সেট করার পর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। দরজা কিঞ্চিত কেঁপে উঠে ঢিলা হয়ে গেল।
অতি সন্তর্পণে দরজা খুলল নিকোলাস বুখারিন। কিন্তু এরপরও শব্দ হয়েছিল বোধ হয়।
নিকোলাস বুখারিন সামনে চোখ পড়তেই দেখল, পশ্চিম দিক থেকে যে করিডোরটি তাদের সামনের উত্তর-দক্ষিণ করিডোরে এসে পড়েছে, তার মুখে পশ্চিমমুখী হয়ে ওঁৎ পেতে থাকা হ্যান্ডমেশিনগানধারী একজন বোঁ করে ঘুরে দাঁড়াল এবং তার মেশিনগানটি বিদ্যুৎ বেগে উঠে এল বুখারিনের লক্ষ্যে।
নিকোলাস বুখারিন জানে, কোমরে ব্ল্যাক বেল্ট এবং মাথায় কাল হেলমেট পরা সামরিক পোশাকের এ লোকেরা আইভানের পার্সোনাল স্কোয়াডের লোক। মারা এবং মরা ছাড়া আর কোন শিক্ষা এদের নেই।
নিকোলাস বুখারিন তার সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে দেখতে পেল। সৈনিক সে, মৃত্যুকে ভয় করে না। কিন্তু আফসোস, ভণ্ড আইভানকে শাস্তি দেয়া হলো না।
হ্যান্ড মেশিনে শব্দ হলো সামনে থেকে।
নিজেকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো নিকোলাস বুখারিন।

মস্কোর ভোর রাত। লেনিন হিলস-এর পাদদেশ।
এখানে এসে মস্কোভা নদী ‘ইউ’ টার্ন নিয়েছে।
‘ইউ’-এর দুই বাহুর ঠিক মধ্যতলায় হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ঠিক নাম বরাবর সামনে মস্কোভা নদীর কূল ঘেঁষে একটা ওয়াটার প্ল্যান্ট।
এই ওয়াটার প্ল্যান্টটি এক সময় তৈরি হয়েছিল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন অর্থাৎ সাবেক লুবিয়াংকা কারাগারের এই অংশটিতে পানি সরবরাহের জন্যে। মস্কোতে পানি সরবরাহের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা হওয়ার পর এই প্ল্যান্ট বন্ধ রাখা হয়েছে।
জাগরণ ক্লান্ত নগরী যেন এ সময় একেবারেই অচেতন। মস্কোভা নদীর দক্ষিণ বরাবর রাস্তাটিতে একটি গাড়িও চোখে পড়ছে না।
মস্কোভা নদীর বুকেও কোন কম্পন নেই। বরফে সাদা হয়ে আছে মস্কোভার বুক।
মস্কোভা নদীর কমসোমল ব্রীজের গোড়ায় আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল।
পাভলভের সাথে হ্যান্ডশেক করে পাভলভ ও রোসা দু’জনকেই লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমাদের আপাতত কোন কাজ নেই।’
‘মাফ করবেন স্যার, আপনার প্রোগ্রাম কি?’ বলল পাভলভ।
‘গ্রেট বিয়ারের ঘাঁটিতে প্রবেশ ছাড়া আর কিছু আমার মাথায় নেই। সেখানে প্রিন্সেস ক্যাথারিন আছে, মিঃ প্লাতিনি আছে, এটা আমি জানি না। আমার এই প্রবেশ বলতে পার অনুসন্ধানমূলক।’
‘আমাদের প্রতি কোন নির্দেশ স্যার?’
‘তোমরা ব্রীজের উত্তর গোড়ায় অপেক্ষা করতে পার।’
বলে আহমদ মুসা পাভলভের সাথে আবার হ্যান্ডশেক করে পা বাড়াল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের রাস্তার দিকে।
পাভলভ ও রোসা দু’জনেই আহমদ মুসার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। আহমদ মুসা দৃষ্টির আড়াল হতেই রোসা বলল, ‘সত্যি পাভলভ, একে যতই দেখছি, অতীতের ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। একজন বিপ্লবী এত মানবিক, এত হৃদয়বান হতে পারেন!’
‘পারেন রোসা, যদি তিনি স্রষ্টার হয়ে কাজ করেন। স্রষ্টা সকলের বলে তিনিও সকলের হয়ে যান।’
‘আমাদের সৌভাগ্য পাভলভ।’
‘অবশ্যই।’
‘এ ধরনের লোকের জন্যে এবং তার নির্দেশে হাসিমুখে জীবন দেয়া যায়।’
‘এ কারণেই তো আহমদ মুসার বাহিনী অজেয়।’
‘এখানে যে উনি একা?’
‘একা কোথায়? গোটা মধ্য এশিয়া ওর। রাশিয়াতেই যত মুসলমান আছে, সব তার কর্মী। প্রয়োজন এখনও হয়নি বলে কারও সাহায্য উনি নেননি।’
‘এখন বল আমরা কি করব? সরকারী দায়িত্ব অবশ্যই আমাদের পালন করতে হবে।’
‘অবশ্যই।’
বলে পাভলভ পকেট থেকে সিগারেট লাইটারের মত ক্ষুদ্র ওয়্যারলেস সেট বের করল। সেটটি অন করে মুখের কাছে নিয়ে বলল, ‘আমি পাভলভ। বরিসভ ইউনিট।’
একটু থামল। ওপারের কথা শুনল। তারপর বলল, ‘খবর আছে স্যার। আহমদ মুসা গ্রেট বিয়ারের হেডকোয়ার্টার হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশ করেছে।’
একটু থেমে ওপারের কথা শুনে বলল, ‘ঠিক আছে।’
পাভলভ ওয়্যারলেস অফ করে দিয়ে বলল, ‘কি করণীয়, পরে জানাচ্ছে। বস বললেন, এটা দারুণ খবর। এ খবর যাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে, সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট কেরনস্কী জুনিয়রের কাছে, তারপর সিদ্ধান্ত আসবে।’
চারদিক ফর্সা হয়ে গেছে। পুব দিগন্ত লাল হয়ে উঠেছে।
পাভলভ গাড়ি ড্রাইভ করে কমসোমল ব্রীজটির উত্তর গোড়ায় গিয়ে পার্ক করলো।
রোসা সিটে গা এলিয়ে বলল, ‘খুব খারাপ লাগছে পাভলভ, আমরা যে সরকারী গোয়েন্দা- এটা আহমদ মুসাকে না জানিয়ে আমরা তার সাথে প্রতারণা করছি।’
‘আমরা প্রতারণা করছি না, সরকার করছে। আমরা হুকুমের চাকর।’
‘আহমদ মুসা কি কিছুই বুঝতে পারেনি?’
‘তিনি বুঝতে পারেননি, একথা বলা মুশকিল। কিন্তু বুঝেছেন, এমন কিছু প্রমাণ তিনি দেননি।’
পাভলভের ওয়্যারলেস হাত ঘড়ির সময় জ্ঞাপনের মত দু’বার শব্দ করে উঠল।
আহমদ মুসার অ্যাসাইনমেন্টে আসার পর পাভলভ ও রোসা এই প্রথম সরকারী কল পেল। বরিসভ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পাভলভ ও রোসাই শুধু কল করবে, কোন কল তাদের কাছে আসবে না।
পাভলভ ওয়্যারলেস তুলে নিল কানের কাছে। শুনল ওপারের নির্দেশ এক মিনিট ধরে। তারপর ‘গুডবাই, স্যার’ বলে ওয়্যারলেস অফ করে দিল।
রোসা উন্মুখ হয়ে উঠেছিল ওপারের নির্দেশ শোনার জন্যে।
পাভলভ ওয়্যারলেস পকেটে রেখে বলল, ‘প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিয়েছেন, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন পুলিশকে ঘেরাও করে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশের জন্যে।’
রোসার মুখ ম্লান হয়ে গেল। বলল, ‘আহমদ মুসার ক্ষতি হবে না এতে?’
পাভলভের মুখও ম্লান হয়ে গেল। বলল, ‘আমি জানি না সরকারী এই অভিযানের টার্গেট কি কি!’
‘আমার খুব খারাপ লাগছে পাভলভ। সরকার আহমদ মুসাকে কি দৃষ্টিতে দেখে, বল তো?’
‘সরকার প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধারে আহমদ মুসার সহযোগিতা চায়। উদ্ধারের পর তার প্রতি সরকারের মনোভাব কি দাঁড়াবে, তা বলা মুশকিল।’ পাভলভ থামল।
রোসা কোন কথা বলল না।
পাভলভ রোসার ভারি মুখের দিকে চেয়ে তার একটা হাত হাতে নিয়ে বলল, ‘রোসা, আহমদ মুসাকে ছোট করে দেখো না। উনি গ্রেট বিয়ারকেও চেনেন, সরকারকেও চেনেন।’
রোসা মুখে ম্লান হাসি টেনে বলল, ‘তা-ই যেন হয় পাভলভ। প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধার করতে এসে তিনি যেন বিপদে না পড়েন।’
ওদিকে আহমদ মুসা পাভলভ ও রোসার কাছে বিদায় নিয়ে মস্কোভা নদী তীরের রাস্তা ধরে এগোলো হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দিকে।
কিছুটা এগোবার পর আহমদ মুসা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে নেমে গেল নদীর কিনারে।
হাতের প্যাকেট থেকে গামবুট বের করে তাতে দু’পা ঢুকিয়ে নিয়ে নদী-কিনারের বরফের উপর দিয়ে হেঁটে চলল আহমদ মুসা।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সামনের ওয়াটার প্ল্যান্টের বরাবর এসে সে এক মুহূর্ত দাঁড়াল, তারপর নদীর কিনার ধরে আরও পশ্চিমে এগিয়ে গেল।
অল্প কিছু যাওয়ার পর নদীর কিনার থেকে ক্রলিং করে তীরে উঠল। তীরে রাস্তার উত্তর পাশ ঘেঁষে একটা ছোট মাইক্রো দাঁড়িয়েছিল। মাইক্রোটির জানালায় হালকা শেডের কাঁচ।
আহমদ মুসা গাড়ি আনলক করে ড্রাইভিং সিটে উঠে সব ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে আবার গাড়ি লক করে নেমে গেল নদীর কিনারে। ফিরে চলল আবার ওয়াটার প্ল্যান্টের দিকে।
দাঁড়াল কিছুক্ষণ ওয়াটার প্ল্যান্টের পাইপ ঘেঁষে।
ওয়াটার প্ল্যান্টের মোটা স্টীলের পাইপ এখনও আগের মতই ওয়াটার প্ল্যান্ট থেকে বেরিয়ে নদীতে ডুবে আছে।
ওয়াটার প্ল্যান্টের পাথরের তৈরি ঘরটি বেশ বড়। তবে এ ঘরে যন্ত্রপাতি কিছুই নেই। ঘরটি ব্যবহৃত হতো ওয়ার্কিং অফিস হিসেবে। যন্ত্রপাতির মূল এস্টাবলিশমেন্ট রয়েছে ভূগর্ভে।
কিন্তু বিল্ডিং-এর ইতিহাস ও ডিজাইন পরীক্ষা করে আহমদ মুসা জেনেছে, ওয়াটার প্ল্যান্টের কভারে এটা হলো গোপন প্যাসেজ যা দিয়ে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ভূগর্ভস্থ অংশ দিয়ে ঐখানে যাতায়াত করা যায়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশন যখন লুবিয়াংকার অংশ ছিল, এ গোপন প্যাসেজ দিয়ে মারাত্মক সব রাজবন্দীদের কারাগারে নেয়া হতো, আবার বের করা হতো।
কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর এবং সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার পর লুবিয়াংকা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং লুবিয়াংকার এ অংশ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে লীজ দেয়া হয়। সে সময় ভূগর্ভস্থ এই প্যাসেজ সীল করে দেয়া হয়।
আহমদ মুসা এই পথেই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পথে গিয়ে প্রথমেই পাওয়া যাবে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বন্দীখানা যেখানে প্রিন্সেস ক্যাথারিন এবং মিঃ প্লাতিনি বন্দী থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ওয়াটার প্ল্যান্টের অফিস কক্ষের এক পাশ দিয়ে ভূগর্ভস্থ যন্ত্রপাতির কক্ষে নামার সিঁড়ি আছে। কিন্তু এ কক্ষের সাথে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে ঢোকার আন্ডারগ্রাউন্ড প্যাসেজের কোন সম্পর্ক নেই।
ওয়াটার প্ল্যান্টের যে মোটা পাইপটা নদীতে নেমে গেছে, তার নিচ দিয়ে তিন ফুট প্রশস্ত পাথর বিছানো একটা প্লেট ওয়াটার প্ল্যান্টের পাইপের গোড়া থেকে পানি পর্যন্ত ধাপে ধাপে নেমে গেছে।
পাইপের গোড়ায় যেখান থেকে পাথর বিছানো প্লেট বের হয়েছে, সেখানে বিল্ডিং –এর ডিজাইনে আহমদ মুসা দেখেছে দুই বর্গফুটের একটা উইন্ডো। এটাই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশের সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ।
আহমদ মুসা পাইপের নিচ দিয়ে একটু উবু হয়ে পাথর বাঁধানো ধাপ বেয়ে পাইপের গোড়ায় গিয়ে বসল। দেখল, প্যাসেজের সেই মুখ, দুই বর্গফুটের উইন্ডোটি, কনক্রিট ওয়াল দিয়ে বন্ধ করা।
আহমদ মুসা পরীক্ষা করল এই ওয়াল অরিজিন্যাল কিনা। কিংবা পরবর্তীকালে এই দেয়াল তুলে প্যাসেজ বন্ধ করা হয়েছে কিনা। এবং এই প্যাসেজ বা সুড়ঙ্গ পথটি যখন চালু ছিল, তখন এটা কি দিয়ে বা কিভাবে বন্ধ রাখা হতো, এ বিষয়টাও আহমদ মুসা বুঝতে চেষ্টা করল।
টর্চের আলো ফেলে গভীরভাবে পরীক্ষা করে আহমদ মুসা বুঝল, এই দেয়াল পরবর্তীকালে তৈরি করা নয়। যখন প্যাসেজ ও আশপাশের দেয়াল তৈরি হয়েছে, তখনই তৈরি এই দেয়াল।
আর দেয়ালটির চারপাশ পরীক্ষা করে দেখল, দেয়ালটির দুই পাশ ও উপরের প্রান্তের সাথে তার পাশের দেয়ালের স্পষ্ট বিচ্ছেদ রেখা রয়েছে। কিন্তু তলার প্রান্তে সেই বিচ্ছেদ রেখা নেই। মনে হয় যেন দেয়ালটি মেঝের অভ্যন্তর থেকে উঠে এসেছে।
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে নিশ্চিত হলো, এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে, যে ব্যবস্থায় প্রয়োজনে দেয়ালটি মেঝের ভেতরে ঢুকে যায়, আবার বন্ধও করা যায়। এবং এই ব্যবস্থা দেয়ালের এপারে-ওপারে দু’দিকেই থাকা স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা শেডের আড়াল দেয়া এলাকায় টর্চের আলো ফেলে তিল তিল করে খুঁজল আশপাশ, উপর-নিচে গোটা দেয়াল। কিন্তু সন্দেহ করার মত কোথাও কিছু পেল না।
হতাশ হলো আহমদ মুসা।
দেয়ালের উপরের অংশে চোখ বোলাতে গিয়ে পাইপের গোড়ায় চোখ গেল আহমদ মুসার।
স্টীল পাইপের গোড়ার এক ফুট পরিমাণ অংশ কালো রং করা। পানি পর্যন্ত অবশিষ্ট অংশের রং সাদা।
পাইপের এই ব্যতিক্রমটা প্রথম আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
এই কালো অংশে চোখ বোলাতে গিয়ে আহমদ মুসা দেখল, পাইপ যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে সেই দেয়াল থেকে এক ফুট পর্যন্ত পাইপের নিচের অংশ স্ফীত হয়ে উঠেছে। দেখলে মনে হয়, তৈরির সময় বাড়তি লোহার একটা স্তুপ সেখানে জমে গেছে। অথবা কোন কারণে পুরু করে সিমেন্ট লাগিয়ে দেয়া হয়েছে পাইপে।
পাইপের স্ফীত অংশ বেশ এবড়ো-থেবড়ো। এর উপর আহমদ মুসা অনেকটা অলসভাবেই চোখ বোলাচ্ছিল।
আহমদ মুসার চোখে পড়ল একটা বড় ধরনের স্ক্রু। তারও রং কালো। আহমদ মুসার মনে হলো, স্ক্রুটা পাইপের স্ফীত অংশকে পাইপের সাথে আটকে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। স্ক্রুর মাথা একটু বেরিয়ে আছে। যেন সবটা ভেতরে বসানো হয়নি। স্ক্রুটা লুজ হয়ে আছে কিনা তা দেখার জন্যেই আহমদ মুসা স্ক্রুর মাথায় তর্জনী দিয়ে চাপ দিল।
চাপ দেয়ার সংগে সংগেই স্ক্রুটি স্প্রিং এর মত নিচে বসে গেল। আর সেই সাথেই আহমদ মুসা বিস্ময় ও আনন্দের সাথে দেখল, প্যাসেজের বন্ধ দরজাটা খুলে গেছে।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল এবং গ্যাস মাস্ক পরে ঢুকে গেল প্যাসেজটিতে।
প্যাসেজের মুখ ছোট হলেও ভেতরটা বেশ প্রশস্ত। দাঁড়ানো যায়।
প্যাসেজের মেঝে এবং দেয়াল, ছাদ সবই পাথরের। ভেতরটা অন্ধকার।
আহমদ মুসা টর্চ জ্বেলে প্যাসেজের মুখ বন্ধ করার সুইচ খুঁজল। এটা পেতে বিলম্ব হলো না।
মুখের পাশেই প্যাসেজের দেয়ালে পাথর রং-এর ছোট চারকোণা একটা জায়গা। দেয়ালের লেভেল থেকে অপেক্ষাকৃত নিচু।
আহমদ মুসা আঙুল দিয়ে তার উপর চাপ দিতেই পাথর রং-এর প্লাস্টিক প্লেটটি দেয়ালের ভেতর সরে গেল। বেরিয়ে পড়ল একটা সুইচ। সুইচটা অফ করতেই প্যাসেজের মুখ বন্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ডিজাইন বের করে আর একবার দেখল। প্যাসেজটা একেবারে সোজা এগিয়ে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ভূগর্ভস্থ বটম ফ্লোরের উত্তর দেয়ালের পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে।
আহমদ মুসা সেই প্রান্তে গিয়ে পৌঁছল।
প্যাসেজের মুখে আগের মতই একটি দেয়াল।
দেয়ালটি অরিজিন্যাল, না পরে তৈরি, রং দেখে তা ঠিক করতে পারলো না আহমদ মুসা। তবে বুঝল, পরে তৈরি হলে এমন মসৃণ হতো না। অবশেষে আরেকটা জিনিস চোখে পড়ায় আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, দেয়ালটি অরিজিন্যাল এবং আগের দরজার মতই নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
দেয়ালের শীর্ষ অংশে দেয়ালের লেভেল থেকে অল্প নিচু চারকোণা দেয়াল রংয়ের একটা প্লাস্টিক বোর্ড। আগেরটার মতই বোর্ডের নিচে সুইচ আছে, আহমদ মুসা মনে করল।
দু’আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে বোর্ড সরিয়ে ফেলল আহমদ মুসা। কিন্তু ভেতরটা দেখে হতাশ হলো সে। সুইচের বদলে সেখানে কম্বিনেশন লক। তিন সারিতে তিনটি করে নয় পর্যন্ত নাম্বার চিহ্নিত নব রয়েছে। প্রত্যেকটির পাশে একটি করে ঘর খালি। অর্থাৎ বোর্ডে মোট আঠারোটি ঘর রয়েছে। এই আঠারোটি ঘরেই নাম্বার চিহ্নিত নবকে ঘোরানো যায়।
সাংঘাতিক জটিল এই কম্বিনেশন লক। একটি সারিতে তিনটি নাম্বার মিললেও দরজা খুলতে পারে। আবার দু’লাইন বা তিন লাইন মেলানোরও প্রয়োজন হতে পারে। তাছাড়া কম্বিনেশন হরাইজেন্টাল অথবা ভার্টিক্যালও হতে পারে।
গোলকধাঁধাঁয় পড়ে গেল আহমদ মুসা। ঘড়িতে দেখল, সকাল সাতটা।
আহমদ মুসার ইচ্ছা, ভোরের দিকে বন্দীখানায় সে প্রবেশ করবে। এ সময় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হতে পারে।
আহমদ মুসা বসে পড়ল প্যাসেজের মেঝেতে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। কিন্তু কোন কূলকিনারা পেল না।
বসে থেকেই আহমদ মুসা টর্চ জ্বালিয়ে এলোপাথাড়ি আলো ফেলছিল প্যাসেজে এবং প্যাসেজের মুখের দেয়ালে।
হঠাৎ আহমদ মুসার চোখে পড়ল, প্যাসেজ-মুখের দেয়ালে পাশাপাশি তিনটি তারকা। দেয়াল রং-এর কারণে দেয়ালের সাথে প্রায় মিশে আছে।
তিনটি তারকার একটি মজার ব্যাপার আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তিন তারকার প্রথমটির মাথা চারটি, দ্বিতীয়টির পাঁচটি এবং তৃতীয়টির ছয়টি।
এখানে এমনভাবে তিনটি তারা কেন? না হয় থাকল। কিন্তু তিন তারকা তিন রকম কেন? হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে প্রবেশের মুখে দাঁড়ানো এই দেয়ালের এই তিন তারা কি পরিকল্পিত? কোন কিছুর ইংগিত দিচ্ছে কি এই তারা?
লাফ দিয়ে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালো। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
আহমদ মুসা দাঁড়ালো গিয়ে কম্বিনেশন লকের সামনে। পাশাপাশি তিনটি অংকের প্রথমে নিয়ে এল চার, দ্বিতীয় অংকে নিয়ে এল পাঁচ এবং তৃতীয় অংকের স্থানে নিয়ে এল ছয়।
তিনটি অংক পাশাপাশি সম্পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সুড়ঙ্গ মুখের দেয়াল সরে গেল।
আহমদ মুসা মনে করছিল, কনক্রিটের প্রলেপ দেয়া দু’ইঞ্চি স্টীলের এই দেয়াল সরে যাবার পর কনক্রিটের আরেকটা স্তুপ থাকবে। কিন্তু আহমদ মুসা বিস্মিত হলো, স্টীলের দেয়াল সরে যাবার পর সাদা কার্পেট মোড়া করিডোর পাওয়া গেল। তার অর্থ সুড়ঙ্গ পথ শেষ। সে এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বন্দীখানায়।
আহমদ মুসা নিজেকেই প্রশ্ন করল, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ইতিহাসে আছে, লুবিয়াংকা বন্ধ করে দিয়ে যখন একে বেসরকারী হাতে লীজ দেয়া হয়, তখন সুড়ঙ্গ পথ সীল করে দেয়া হয়, এর অর্থ তাহলে কি? ভাবল আহমদ মুসা আবার, তাহলে কি গোপন প্যাসেজ বা সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ ও বের হওয়ার নির্দেশিকা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং একেই কি সীল করে দেয়া বোঝানো হয়েছে! হতে পারে।
আহমদ মুসা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে পা রাখল আলোকোজ্জ্বল করিডোরে।
আহমদ মুসা এই বন্দীখানার ডিজাইন এতবার দেখেছে যে, সবটা তার চোখের সামনে ভাসছে। বন্দীখানার ভিআইপি অংশ একেবারে পুবে।
সেদিকেই আহমদ মুসা এগোলো।
কোথাও কোন প্রহরী দেখলো না।
আহমদ মুসা ভাবল, অতি আত্মবিশ্বাসী গ্রেট বিয়ার সুরক্ষিত বন্দীখানায় তাহলে প্রহরী রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
আহমদ মুসা এগোবার সময় দু’পাশে বন্ধ কক্ষ দেখল। বাম পাশে লিফট রুমও দেখল। তার বিপরীত বন্ধ ঘরটিও দেখল।
আরও পুবে এগোলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা লিফট রুমের চত্বরটি পার হয়ে সামনে এগোবার সঙ্গে সঙ্গে লিফট রুমের বিপরীত দিকের কক্ষটির দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। বিড়ালের মত বেরিয়ে এল একসাথে চারজন প্রহরী। তাদের প্রত্যেকের হাত স্টেনগানের ট্রিগারে।
চারজনের চোখ-মুখ থেকে বিস্ময়-বিমূঢ় ভাব কাটেনি। সম্ভবত তারা বিস্মিত হয়েছিল লিফট দিয়ে না এসে অকল্পনীয় এক দিক থেকে আহমদ মুসাকে আবির্ভূত হতে দেখে।
সতর্ক আহমদ মুসা অবশেষে পেছনের পদশব্দ টের পেল। ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখল, চারটি স্টেনগানের মুখে দাঁড়িয়ে সে।
চার স্টেনগানধারীর দূরত্ব আহমদ মুসা থেকে চার গজের মত।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। বন্দীখানায় প্রহরী থাকতে পারে, এটা সত্যিই সে মনে আনেনি।
চার স্টেনগানধারী পাথরের মত।
আহমদ মুসা বুঝল, নির্দেশ পালন ছাড়া অন্য কোন বিবেচনা ওদের কাছে নেই।
ওদের চারজনের তর্জনী স্টেনগানের ট্রিগারে। ওদের মুখভাবের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। দৃঢ় হচ্ছে তাদের মুখের মাংসপেশী এবং কঠোর হয়ে উঠছে তাদের চোখ।
আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার, এটা গুলি করার পূর্ব মুহূর্ত।
এ সময় আহমদ মুসা করিডোরের পশ্চিম প্রান্তে কালো কাপড়ে আবৃত এক ছায়ামূর্তিকে এগিয়ে আসতে দেখল। তার হাতে হ্যান্ড মেশিনগান।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল না, কালো মূর্তিটি শত্রু না মিত্র!
আহমদ মুসার ভাবনা শেষ হবার আগেই কালো কাপড়ের ছায়ামূর্তি তার ডান হাত তুলে ইশারায় আহমদ মুসাকে শুয়ে পড়তে বলল।
আহমদ মুসা পেছন দিকে এই ইশারার প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল।
চার স্টেনগানধারী সম্ভবত এ বিষয়টি টের পেয়ে পেছনে কেউ এসেছে এই চিন্তায় তাদের চকিত দৃষ্টি পেছন দিকে ফিরে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা সুযোগ নষ্ট করেনি।
নিজের দেহটাকে এই সুযোগে ছুঁড়ে দিয়েছিল মাটিতে।
ওদিকে ছায়ামূর্তি এরই অপেক্ষা করছিল। তার হ্যান্ড মেশিনগান সঙ্গে সঙ্গেই অগ্নি বৃষ্টি করল।
চার স্টেনগানধারী মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা শরীর নিয়ে আছড়ে পড়ল মাটিতে।

রুশ সরকারের পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রধানের নেতৃত্বে প্রায় শ’খানেক পুলিশ এসে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ঘেরাও করে ফেলল।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গেট বন্ধ।
পুলিশপ্রধান নির্দেশ দিল কামান দেগে গেট ভেংগে ফেলতে। তা-ই করা হলো।
ধ্বসে পড়া গেট দিয়ে পুলিশের একটা দল ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল।
কিন্তু মেশিনগানের গুলি বৃষ্টি তাদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল।
গুলি করতে করতে পুলিশের দলটি পিছু হটে এল।
এই সময় হেরিটেজ ফাউন্ডেশনকে ঘিরে দাঁড়ানো পুলিশের উপর গুলি বর্ষণ শুরু হলো বিল্ডিং-এর এক তলা, দু’তলা ও তিন তলার ঘুলঘুলি ধরনের জানালা দিয়ে।
আকস্মিক এ আক্রমণে ক্ষতি হলো পুলিশের। উন্মুক্ত ময়দানে দাঁড়ানো পুলিশরা শেল্টার নেবার কোন জায়গা পেল না। বাধ্য হয়ে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের চারধারে দাঁড়ানো পুলিশকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হলো।
অভিজ্ঞ পুলিশপ্রধান পুলিশের আর্টিলারী ইউনিটকে নির্দেশ দিল, বিল্ডিং-এর চারদিকের দেয়ালে চারটা সুড়ঙ্গ সৃষ্টি করতে।
নির্দেশ অনুসারে কামান দেগে বিল্ডিং-এর চার পাশের চার দেয়ালে চারটি সুড়ঙ্গ সৃষ্টি করা হলো। তারপর কামানের অগ্নিবৃষ্টির আড়ালে পুলিশরা সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করল বিল্ডিং-এ।
এরপর মূল গেটে গ্রেট বিয়ারের প্রতিরোধ অনেকটা কমে এল।
গুলিবৃষ্টির আড়াল নিয়ে মূল গেট দিয়েও পুলিশ প্রবেশ করল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই গোটা বিল্ডিং-এ ছড়িয়ে পড়ল সংঘর্ষ।
ঘণ্টা দুই পর গোলাগুলির শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
পুলিশ গোটা বিল্ডিং-এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।
পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডার ভেরনভ একের পর এক কক্ষ দেখছেন। তৈরি হচ্ছে আহত-নিহতের তালিকা।
গোটা বিল্ডিং পরিদর্শনের পর হতাশ হলো পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডার। প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে তো নয়, তার কোন আলামতও কোথাও পাওয়া গেল না। আহমদ মুসারও চিহ্ন কোথাও নেই।
আহত অবস্থায় অনেকেই ধরা পড়েছে। তার মধ্যে রয়েছে গ্রেট বিয়ারের গোয়েন্দা প্রধান মাজুরভ এবং অপারেশন ফরচুন প্রজেক্ট-এর প্রধান ভ্লাদিমির খিরভ।
এ দু’জনকে পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডারের কাছে আনা হলো।
আলেকজান্ডার তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে যাবেন, এমন সময় একজন গোয়েন্দা অফিসার এসে পুলিশপ্রধানের কানে কানে বলল, ‘ভূগর্ভে আরও দু’টি ফ্লোর আছে। সেখানেই প্রিন্সেস ক্যাথারিন এবং ফ্রান্স থেকে ধরে আনা মিঃ প্লাতিনিকে পাওয়া যাবে। জানা গেল, গ্রেট বিয়ারের প্রধান আইভানও সেখানে প্রবেশ করেছেন।’
শুনেই পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডার প্রবল উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল। মাজুরভ ও খিরভের মুখোমুখি হয়ে পুলিশপ্রধান মাজুরভকে ধীর, কিন্তু অত্যন্ত কঠোর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ভূগর্ভে নামার পথ কোথায় মাজুরভ?’
প্রশ্ন শুনে একটু চুপ থাকল মাজুরভ।
তারপর পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল পুলিশপ্রধানের দিকে। তারপর আরও একটু ভাবল এবং বলল, ‘ভূগর্ভে যাওয়ার দু’টি লিফটই নিচে নিয়ে লক করেছেন আমাদের নেতা মহামান্য আইভান।’
‘কখন গেছেন তিনি?’
‘আমরা জানতে পারিনি। পরে জেনেছি তিনি নিচে নেমেছেন, এইটুকু।’
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিন কোথায়?’
‘ভূগর্ভস্থ বন্দীখানায়।’
মাজুরভের কথা শেষ হতেই পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডার বলল, ‘এদের নিয়ে চল, লিফট রুম আমাদের দেখিয়ে দেবেন।’
লিফট রুমের সামনে পৌঁছল তারা। লিফট রুম বন্ধ।
একজন পুলিশ নন-ফায়ার ধরনের প্রচণ্ড শক্তির গ্যাসীয় প্রেসার বম্ব চার্জ করে লিফট কক্ষের দরজা ভেঙে ফেলল।
উন্মুক্ত দরজা দিয়ে লিফট-সুড়ঙ্গে বিশ-পঁচিশ ফুট নিচে লক করে রাখা লিফট দেখা গেল।
পুলিশপ্রধানের নির্দেশে লিফটের উপর গ্যাসীয় প্রেসার বম্ব নিক্ষেপ করা হলো। লিফট মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে নিচে নামার পথ উন্মুক্ত করে দিল।
সঙ্গে সঙ্গেই গোটা পাঁচেক সিল্কের কর্ড নামিয়ে দেয়া হলো এবং দড়ি বেয়ে গেরিলা ইউনিটের পাঁচজন পুলিশ নিচে নেমে গেল।
তারা নিচে নেমে পজিশন নেয়ার পর ইংগিত করলে পুলিশপ্রধান আরও কয়েকজন অফিসারকে নিয়ে কর্ড বেয়ে নিচে নামল।
নিচে নেমে পুলিশপ্রধান আলেকজান্ডার সামনে তাকাতেই দেখতে পেল, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া চারটি লাশ করিডোরে পড়ে আছে।
উদ্বেগে বিবর্ণ হয়ে উঠল পুলিশপ্রধানের মুখমণ্ডল। অসহনীয় এই দুশ্চিন্তা তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল যে, প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কিছু হয়নি তো!

‘কাউন্সিল অব মুসলিম, মস্কো’ (সিএমএম)-এর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সভা শেষ হলো বেলা সাড়ে ন’টায়।
আহমদ মুসার বিষয় নিয়ে এই পরামর্শ সভার আয়োজন হয়েছিল ওলগার উদ্যোগে। খবর পেয়ে এ মিটিং-এ শরীক হয়েছিল মধ্য এশিয়া সরকারের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান আহমদ মুসার একজন শীর্ষ সহকর্মী যুবায়েরভ।
আহমদ মুসার খবর পেয়ে সবকিছু ফেলে ছুটে আসে সে মস্কোতে। পরামর্শ সভায় সে জানাল, আহমদ মুসা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সে মস্কোতে থাকবে।
পরামর্শ সভায় আহমদ মুসাকে উদ্ধারের সার্বিক কার্যক্রমের দায়িত্ব দেয়া হয় সিএমএম-এর তরুণ প্রধান এবং মস্কোর ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’-এর অধ্যাপক আসিফ আজিমের উপর। আর অভিযান কার্যক্রমের দায়িত্ব নিয়েছে যুবায়েরভ নিজে।
এই পরামর্শ সভায় মেয়েরাও অংশগ্রহণ করে। মহিলা ও পুরুষের বসার স্থান আলাদা করা হয়েছিল। চোখের প্রান্ত পর্যন্ত নামিয়ে দেয়া চাদরে জড়ানো মেয়েরা পরামর্শ সভায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডোনা জোসেফাইন ছিল এ মিটিং-এর মধ্যমণি। সে ছিল সবার কাছে আকাশের চাঁদের মত।
ডোনা জোসেফাইনের আগমন শুধু মস্কোতে নয়, সাড়া ফেলেছে গোটা মধ্য এশিয়ায়। মধ্য এশিয়া বিপ্লবের ছাত্রী-কর্মী, যেমন সুফিয়া সভেৎলানা, খোদেজায়েভা,কুলসুম ত্রিফোনভা, রইছা নভোস্কায়া, তাহেরভা তাতিয়ানা এবং মধ্য এশিয়া মুসলিম প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট কুতাইবার স্ত্রী শিরিন শবনম ও যুবায়েরভের স্ত্রী রোকাইয়েভা সকলেই দাবি তুলেছে, হয় ডোনা জোসেফাইনকে মধ্য এশিয়া যেতে হবে, নয়তো তারা সকলেই মস্কো আসবে। এরা সকলেই ছিল ফাতিমা ফারহানার সহযোদ্ধা ও বন্ধু।
ডোনা জোসেফাইনও খুশি হয়েছে এই প্রস্তাবে। বলেছে, ফাতিমা ফারহানার বন্ধু তারও বন্ধু। তাদের সাথে দেখা করতে পারলে সে খুশি হবে।
পরামর্শ সভা থেকে বেরিয়ে ওলগা ও ডোনা জোসেফাইন এগোচ্ছিল গাড়ির দিকে। ওলগা ও ডোনা জোসেফাইন পাশাপাশি।
ওলগার বাম পাশে একটু দূরে হাঁটছে আসিফ আজিম।
‘যুবায়েরভ ভাই যে কথা বলেছিলেন, একটা গাড়ি তোমাদের সাথে গেলে ভাল হতো না?’ ওলগাকে লক্ষ্য করে বলল আসিফ আজিম।
‘আজ একটা গাড়ি সাথে দিচ্ছ, কালও কি দিতে পারবে?’ বলল ওলগা।
‘প্রয়োজনে তাও করতে হবে।’
‘ভাল চিন্তা, তবে বাস্তব নয়।’
‘প্রয়োজন অনেক সময় অবাস্তবেরও পথ ধরে।’
‘আমাদের ক্ষেত্রে এমনটা না করলেও চলবে।’
‘চিন্তা তোমাকে নিয়ে নয়, ভাবীকে নিয়ে।’
‘আমাকে নিয়ে বুঝি কোন চিন্তা নেই?’ ওলগার ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।
আসিফ আজিমের চোখে-মুখে লজ্জা এবং সেই সাথে বিব্রত ভাব ফুটে উঠল। বলল, ‘না, মানে আমি বলছি বর্তমান সংকটের কথা।’
ডোনা জোসেফাইনের ঠোঁটেও এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে।
‘ঠিক আছে। আমি বুঝেছি।’ ওলগার ঠোঁটে সেই হাসি তখনও।
একটু থেমেই আবার বলল ওলগা, ‘আমরা আসি। সুন্দর আয়োজনের জন্যে ধন্যবাদ।’ বলে গাড়িতে উঠতে গেল ওলগা।
মিটিংটা আসিফ আজিমের বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হয়। যুবায়েরভও তার অতিথি হয়ে আছেন।
কমিউনিস্ট আমলের শেষের দিকে স্ট্যালিন এভেনিউ-এর এ বাড়িটা ছিল মুসলিম মধ্য এশিয়ার মুক্তি আন্দোলন ‘সাইমুম’-এর একটা নিরাপদ আশ্রয়।
আসিফ আজিম-এর পিতা ‘ফেদর বেলিকভ’ ছিলেন কমিউনিস্ট সোভিয়েত সরকারের একজন রাষ্ট্রদূত। আর আসিফ আজিম-এর মা ছিল একজন কাজাখ মেয়ে। কাজাখ স্ত্রীর প্রভাবেই ফেদর বেলিকভ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তিনি এটা গোপন রেখে চলেন। তিনি একসময় ‘সাইমুম’-এর মস্কো অঞ্চলের প্রধান উপদেষ্টায় পরিণত হন।
আসিফ আজিম পিতা-মাতার সে ঐতিহ্য শুধু বজায় রাখা নয়, এখন মস্কোর মুসলিম কাউন্সিলের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছে।
গাড়িতে উঠে বসেছে ডোনা জোসেফাইন এবং ওলগা।
ওলগা গাড়ি ড্রাইভ করছে এবং পাশের সিটে ডোনা জোসেফাইন।
ছুটে চলল গাড়ি।
ডোনা জোসেফাইন হাত বাড়িয়ে ওলগার পাঁজরে একটা চিমটি কাটল এবং বলল, ‘তোমার ‘তাকে’ খুঁজে পেয়েছি ওলগা।’
‘কাকে?’
‘যাকে খুঁজে বের করতে আমাকে বলেছিলে?’
কথা বলল না ওলগা। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। একটু পর বলল, ‘ভাবী, তাকে কি পাওয়া গেছে?’
‘নামও কি বলব?’
‘কিন্তু কি প্রমাণ তুমি পেয়েছ ভাবী?’
‘প্রমাণ তুমি নিজে। বল দেখি, আসিফ আজিম তোমার কেউ না।’
কথা বলল না ওলগা।
‘কেউ নয় বল।’ হেসে বলল ডোনা জোসেফাইন।
ওলগার চোখ-মুখে তখন ঝরে পড়ছে অনুরাগের একটা বিচ্ছুরণ।
ওলগা ডান হাত স্টিয়ারিং-এ রেখে বাম হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল ডোনা জোসেফাইনের হাত। বলল, ‘কথা বলতে বলো না ভাবী।’
‘ঠিক আছে বলব না। খালাম্মা তো নিশ্চয় জানেন?’
‘আম্মার সাথেই তো ওর যোগাযোগ বেশি।’
‘তোমার সাথে বুঝি নেই?’
‘জান ভাবী, ও খুব আইডিয়ালিস্ট।’
‘এটা কি সৌভাগ্য নয়?’
‘অবশ্যই।’
‘আমি কনগ্রাচুলেট করছি ওলগা।’
ওলগা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
ডোনা জোসেফাইন বাঁধা দিয়ে বলল, ‘ওলগা, ওদিকে শোন, কিসের শব্দ?’
উৎকর্ণ হলো ওলগা।
ডোনা জোসেফাইনই কথা বলল, ‘কামানের শব্দ ওলগা।’
‘ঐ তো, তার সাথে মেশিনগানের শব্দও শোনা যাচ্ছে।’
ডোনা জোসেফাইন কিছুক্ষণ উৎকর্ণ থেকে বলল, ‘রীতিমত যুদ্ধ ওলগা।’
‘মনে হচ্ছে, নদীর ওপারেই রাস্তার পাশে।’
ওলগার গাড়ি চলছিল তখন কমসোমল হাইওয়ে ধরে। পার হচ্ছিল টলস্টয় পার্ক। সামনেই কমসোমল হাইওয়ের উপর মস্কোভা ব্রীজ।
গাড়ির গতি স্লো করে দিয়েছিল ওলগা।
‘ব্রীজের ওপারেই গণ্ডগোলটা ওলগা। আমার মনে হয়, ব্রীজের গোড়ায় গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের রাস্তা দিয়ে আমরা যেতে পারি।’
‘ঠিক বলেছ ভাবী।’
ওলগা ব্রীজের গোড়ায় গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল।
ওলগার গাড়ি কমসোমল হাইওয়ে পার হয়ে স্টেডিয়াম রোডে পড়তে যাচ্ছিল।
হঠাৎ ব্রীজের গোড়ায় কমসোমল হাইওয়ে এবং স্টেডিয়াম রোডের সংযোগস্থলে একটা ট্যাক্সিতে ঠেস দেয়া অবস্থায় রোসা ও পাভলভকে দেখতে পেল ডোনা জোসেফাইন।
‘গাড়ি বাম পাশে দাঁড় করাও ওলগা।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল ডোনা জোসেফাইন। প্রবল উত্তেজনা ডোনা জোসেফাইনের চোখে-মুখে। পাভলভের কাছে আহমদ মুসার প্রকৃত খবর পাওয়া যাবে, কি হতে পারে সেই খবর, এসব চিন্তা ডোনা জোসেফাইনকে নতুনভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলল।
ওলগা ডোনা জোসেফাইনের দিকে একবার তাকিয়ে গাড়ি রাস্তার পাশে নিতে নিতে বলল, ‘কি ব্যাপার ভাবী?’
‘যে দুই গাড়িতে আমি ও আহমদ মুসা পুশকভ থেকে এসেছিলাম, সে দুই গাড়ির ড্রাইভারকে ঐখানে দাঁড়ানো দেখছি। ড্রাইভার পাভলভের কাছে আহমদ মুসার প্রকৃত খবর পাওয়া যাবে।’
‘কিন্তু ভাবী, ওদের সাথে তোমার সাক্ষাৎ নিরাপদ হবে কিনা?’
‘না ওলগা, রোসা বিশ্বস্ত।’
‘আর ড্রাইভার পাভলভ?’
‘আমার ধারণা, দু’জন ভিন্ন নয়।’
ওলগা তার গাড়ি রোসা ও পাভলভের গাড়ির কাছাকাছি এনে দাঁড় করাল।
‘তুমি বস ওলগা, আমি কথা বলে আসি।’
‘না ভাবী, তোমার নামার দরকার নেই। তুমি ‘রোসা’ মেয়েটাকে ডাক।’
‘পাভলভকেও তো দরকার।’
‘রোসাই পাভলভকে ডাকবে।’
‘ঠিক বলেছ ওলগা, আমি সত্যিই খুব অস্থির হয়ে পড়েছি। আমাদের সতর্ক হওয়ার দরকার আছে।’
কথা শেষ করেই ডোনা জোসেফাইন গাড়ির দরজা খুলে দু’হাতে দরজা ধরে খোলা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তারপর নাম ধরে ডাকল ‘রোসা’কে।
রোসারা দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র গজ পাঁচেক দূরে।
ডাক শুনে চমকে ফিরে তাকাল রোসা ডোনা জোসেফাইনের দিকে।
ডোনা জোসেফাইনকে চিনতে পারেনি রোসা।
ডোনা তার মুখের স্কিন মাস্ক খুলে ফেলল এবং ডাকল রোসাকে আবার।
এবার রোসা দ্রুত পাভলভকে কিছু বলেই ছুটে এল ডোনা জোসেফাইনের কাছে।
এসেই ডোনা জোসেফাইনের একটা হাত নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, খবর আছে।’
রোসার কণ্ঠ দ্রুত। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।
এটা লক্ষ্য করে ডোনা দ্রুত বলল, ‘কি খবর? তোমার কি হয়েছে?’
‘স্যার গ্রেট বিয়ারের ঘাঁটিতে ঢুকেছেন।’
‘কোন স্যার? আহমদ মুসা?’ ডোনা জোসেফাইনের কণ্ঠেও উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
‘জ্বি ম্যাডাম।’
‘গ্রেট বিয়ারের ঘাঁটি কোথায়?’
‘নদীর ওপারে। গোলা-গুলির শব্দ ওখান থেকেই আসছে।’
‘কামান ও মেশিনগানের শব্দ যেখান থেকে আসছে?’ উদ্বেগ-আতংকে রুদ্ধপ্রায় ডোনা জোসেফাইনের গলা।
‘জ্বি ম্যাডাম।’
ডোনা জোসেফাইন কথা বলতে পারলো না। কাঁপছে তার ভেতরটা। একা ঢুকেছে আহমদ মুসা! এত কামান, মেশিনগানের শব্দ কেন? কি হচ্ছে সেখানে? একেবারে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো ডোনার।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে ওলগা। সেও এসে দাঁড়িয়েছে ডোনার পাশে। সে বলল রোসাকে লক্ষ্য করে, ‘আহমদ মুসা গ্রেট বিয়ারের হাতে পুশকভ থেকে আসার পথে বন্দী হননি?’
‘হয়েছিলেন। কিন্তু কোন এক মহিলার সাহায্যে পথেই তিনি মুক্ত হয়ে যান।’
‘কে সে মহিলা?’ কম্পিত গলায় ডোনার প্রশ্ন।
‘মহিলার পরিচয় পাওয়া যায়নি। স্যারও তাকে দেখেননি। টলস্টয় পার্কে গ্রেট বিয়ারের সাথে সংঘর্ষের সময় স্যারকে আরও একদিন সেই মহিলা বাঁচিয়েছেন। এদিনও আড়ালে থেকে।’
রোসা থামতেই ওলগা বলল, ‘আহমদ মুসা কখন ঢুকেছেন গ্রেট বিয়ারের ঘাঁটিতে? গোলা-গুলি কখন থেকে শুরু হয়েছে?’
‘আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে ম্যাডাম। আহমদ মুসা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন অর্থাৎ গ্রেট বিয়ারের ঘাঁটিতে ঢুকেছেন ভোর বেলা। পুলিশপ্রধানের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী এসে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ঘেরাও করেছে আধঘণ্টা আগে। কামান দেগেছে পুলিশ। মেশিনগানের শব্দ দুই পক্ষের।’
ডোনা জোসেফাইন ও ওলগা দু’জনের কারও মুখ থেকেই কোন কথা সরছে না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাহাড় এসে তাদের ঘিরে ধরেছে। আহমদ মুসা ভোর বেলা ঢুকেছেন, এখন বেলা দশটা। কি হচ্ছে সেখানে? কি অবস্থায় আছে আহমদ মুসা? কামান-মেশিনগানের যুদ্ধে সেতো একা এক মানুষ!
নীরবতা ভাঙল ওলগা। বলল, ‘আপনারা ওদিকে গেছেন?’
‘না, স্যার আমাদেরকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলেছেন।’
‘তিনি বলেছেন?’
বলে ডোনা জোসেফাইন জড়িয়ে ধরল রোসাকে। কেঁদে ফেলল সে। আবার বলল, ‘ওর সাথে কখন দেখা হলো, কিভাবে দেখা হলো তোমাদের?’
‘আমরা একসাথেই আছি। আমরাই ভোরবেলা ওকে ব্রীজের দক্ষিণ গোড়ায় নামিয়ে দিয়েছি।’
‘তোমরা? বল তো আবার, কি বলেছেন উনি?’ চোখ মুছে বলল ডোনা জোসেফাইন।
‘আমরা ওকে নামিয়ে দিয়ে আমাদের প্রতি তার নির্দেশ জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাদেরকে ব্রীজের উত্তর গোড়ায় অপেক্ষা করতে বলেছেন।’
ডোনা জোসেফাইন ওলগার দিকে তাকাল। বলল, ‘আমরা অপেক্ষা করব ওলগা।’
‘অবশ্যই।’ বলল ওলগা দৃঢ়কণ্ঠে।
‘রোসা, তুমি গাড়ির ভেতরে এস।’
বলে গাড়ির সামনের দরজা বন্ধ করে পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ডোনা।
রোসা দ্বিধা করছিল ভেতরে ঢুকতে ও ডোনার পাশে বসতে।
ডোনা তাকে হাত ধরে টানল।
রোসা পাভলভের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি গাড়িতে গিয়ে বস।’
বলে ভেতরে ঢুকে সিটের পাশে গাড়ির ফ্লোরের উপর বসে পড়ল রোসা।
ডোনা বাঁধা দিলে হাত জোড় করল রোসা। বলল, ‘এভাবে বসলেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব ম্যাডাম। আপনি বাঁধা দেবেন না।’
ওলগা গিয়ে বসল তার ড্রাইভিং সিটে।
‘তোমরা তো এ পর্যন্ত ওর সাথে ছিলে?’
‘জ্বি ম্যাডাম।’
‘বল ওর এই কয় দিনের সব কথা।’
রোসা শুরু করল। শুনছিল ডোনা জোসেফাইন ও ওলগা।
শুনছিল বটে ডোনা জোসেফাইন। কিন্তু চোখ ও মন তার পড়েছিল ব্রীজ পেরিয়ে আসা কমসোমল হাইওয়ের উপর। কখন আসবেন তিনি, তার প্রিয়তম!
একটি করে মুহূর্তকে তার কাছে মনে হচ্ছে একটা করে যুগের মত। যন্ত্রণাদায়ক এক অপেক্ষা এটা। কিন্তু মনে হচ্ছে, এই অপেক্ষায় গোটা জীবন তার শেষ হলেও ক্লান্তি আসবে না।

সাইমুম সিরিজের পরবর্তী বই
আটলান্টিকের ওপারে