২৬. ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে

চ্যাপ্টার

সন্ধ্যার আলো-আধারীতে আহমদ মুসা এসেছে ‘ক্যারিবিয়ান ওয়েলফেয়ার সিন্ডিকেট’-এর চত্বরে।
চত্বর থেকে যে রাস্তাটি পূর্বদিকে বেরিয়ে গেছে, সে রাস্তার উপরে বিখ্যাত ম্যাকডোনাল্ডের একটা ফাষ্ট ফুডের দোকান। সেখান থেকে ক্যারিবিয়ান ওয়েলফেয়ার সিন্ডিকেট অফিসের সিঁড়িসহ আশপাশের সবকিছুই দেখা যায়।
গত তিনদিন ধরেই আহমদ মুসা বিভিন্ন ছদ্মবেশে এখানে আসছে। অনেক তথ্যই সে যোগাড় করেছে। ফার্ডিন্যানেডর বাড়ি অফিসের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষেই। দুয়ের মাঝে ফোল্ডিং করিডোরের একটি সংযোগ আছে। তিন দিনের চেষ্টায় ওদের লোকদের সাথে কথায় কথায় এটুকু জানতে পেরেছে যে, একজন মহিলা বন্দী আছে।
ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ি ও অফিসের মধ্যে যে সংযোগ করিডোরের কথা শুনেছিল, তা হঠাৎ করে তার চোখেও পড়ে গেল।
আহমদ মুসা ম্যাগডোনাল্ডের বাইরের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস জুস খাচ্ছিল। তার চোখটা ফার্ডিন্যান্ডের অফিস বিল্ডিং-এর দিকে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল তিন তলা বরাবর সেই সংযোগ করিডোর। করিডোরটা আলোকিত। আহমদ মুসা দেখল তিনজন লোক ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ির দিক থেকে অফিস বিল্ডিং-এর দিকে যাচ্ছে। ফার্ডিন্যান্ড কি? না হলে এ করিডোর অন্যের জন্যে লাগবে মনে হয় না।
আহমদ মুসা জুস খাওয়া শেষ করে ধীরে ধীরে এগুলো ক্যারিবিয়ান ওয়েলফেয়ার সিন্ডিকেট নামধারী ‘হোয়াইট ঈগল’-এর অফিসের দিকে।
আজ আহমদ মুসার গায়ে রেড ইন্ডিয়ান যুবকের ছদ্মবেশ। হাতে একটা দুর্লভ ডিজাইনের সেতার। সেতারটা আসলে একটা মিনি আকারের হ্যান্ড মেশিনগান।
হাতের সেতারটা ঝুলাতে ঝুলাতে একেবারে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে সিঁড়িতে উঠতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা।
সিঁড়ির পুবপাশে সিঁড়ির সাথে লাগানো একটি কক্ষ। গেটম্যানের কক্ষ ওটা। আসলে ওটা অফিসের সিক্যুরিটি রুম। সেখানে দু’চারজন লোক সব সময়ই থাকে।
ওদের একজন ছুটে এল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা বলল, ‘মিঃ ফার্ডিন্যান্ডের সাথে দেখা করতে এসেছি।’
‘ঠিক আছে টেলিফোন করে দেখি।’
‘দেখুন, দুই দিন আগে আমি তাঁর সাথে দেখা করে গেছি। তিনি আমার গানও শুনেছিলেন।’
আহমদ মুসার একথা সত্য। আহমদ মুসা নিজে দেখেছে, দু’দিন আগে একজন রেড ইন্ডিয়ান গায়ক ফার্ডিন্যান্ডের সাথে দেখা করে গেছে। তারও হাতে এ রকম সেতার ছিল। সেটা দেখেই আহমদ মুসা এ ছদ্মবেশ নিয়েছে।
প্রহরী লোকটি টেলিফোন করার জন্যে গেট রুমের দিকে কয়েক ধাপ এগিয়েও থেমে গেল। তারও মনে পড়ল একজন রেডইন্ডিয়ান যুবক দু’দিন আগে এসেছিল।
সে ফিরে দাঁড়াল। বলল, ‘ঠিক আছে যাও।’
‘আবার কেউ আটকাবে নাতো?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না। ঠিক আছে, একটা পাশ নাও।’
বলে প্রহরীটি পকেট থেকে একটা গেট পাশ বের করে আহমদ মুসাকে দিল।
আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল তর তর করে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সোজা সামনে রিসেপশন কক্ষ। আর বামে তিন তলায় উঠার সিঁড়ি এবং ডান পাশে এক তলায় নামার সিঁড়ির মুখ। আজ এ সিঁড়ি মুখটি সে খোলা দেখল। কিন্তু গতকাল যখন উপরে উঠেছিল নিউজ পেপার হকারের ছদ্মবেশে, তখন এ সিঁড়িমুখ লোহার ডবল ফোল্ডিং দরজা দ্বারা বন্ধ দেখেছিল।
আহমদ মুসা সোজা চলে গেল রিসেপশন রুমে। চটপটে এক শ্বেতাংগ তরুণ বসে আছে রিসেপশন টেবিলে।
‘আমি মিঃ ফার্ডিন্যান্ডের সাথে দেখা করব। দু’দিন আগে এসেছিলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তিনি আসতে বলেছিলেন?’ বলল রিসেপশনিষ্ট ছেলেটি।
‘বলেছিলেন। সুযোগ মত আসার কথা ছিল।’
‘তাহলে বাইরে আপনি বসুন। উনি গ্রাউন্ড ফ্লোরে গেছেন।’
‘গ্রাউন্ড ফ্লোরেও আপনাদের অফিস?’
‘ঠিক অফিস নয়। ষ্টোর আছে, মেহমানখানা আছে?’
ষ্টোর এলাকায় মেহমানখানা! শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। এই অসংগতিটা ছোট নয়। এই মেহমানখানা কি বন্দীখানা? তাহলে ফার্ডিন্যান্ড কি বন্দীখানাতেই গেছে!
‘মেহমানের সাথে সাক্ষাত করতে গেছেন? তাহলে তো দেরী হবে।’ আরও কিছু জানার লক্ষ্যে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
রিসেপশনিষ্ট ছেলেটির মুখে যেন একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘দেরী হতে পারে। ওঁর সাথে একজন ‘গরিলা-মানুষ’কে যেতে দেখলাম।’
‘গরিলা-মানুষ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাঁর কি কাজ?’
‘একটাই তার কাজ বেয়াড়া মানুষকে সোজা করা।’
চমকে উঠল আহমদ মুসা। এ বন্দীখানায় কি মার্গারেট আছে?’
মনে মনে চমকে উঠলেও ঠোঁটে হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল ‘মেহমানখানায় বেয়াড়া কোত্থেকে পেলেন?’
‘কি বলেন, কত রকমের মেহমান আছে। এবার জুটেছে একজন মহিলা মেহমান। কিন্তু পুরুষের বাপ। তাকেই ঠিক করার জন্যে গরিলা মানুষ কিনা জানি না।’
এ আলোচনায় রিসেপশনিষ্ট যেন আনন্দ পাচ্ছে। তার মুখে রসাত্মক হাসি। কিন্তু আহমদ মুসারও মন তখন উদ্বেগে চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
‘তাহলে স্যার, ওদিকে বসি।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল।
‘কিন্তু আমাকে একদিন গান শুনাতে হবে।’
‘আচ্ছা।’ বলে আহমদ মুসা চলে এল রিসেপশন রুম থেকে।
আহমদ মুসার মুখ শক্ত হয়ে উঠেছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, তাকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে হবে এবং তা এখনই।
আহমদ মুসা দেখল, গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামার সিঁড়ি মুখে একজন প্রহরী। খালি হাত। কিন্তু তার পকেটে রিভলবার আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
ফোল্ডিং দরজাটা আধা পরিমাণ খোলা। খোলা অংশেরই এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রহরী।
আহমদ মুসা রিসেপশন রুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত গিয়ে দাঁড়াল প্রহরীটির কাছে। তাকে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘আমি ফার্ডিন্যান্ডের কাছে এসেছি। তাকে জরুরী একটা খবর পৌছাতে হবে। রিসেপশনে বলে এসেছি। আমি তার কাছে যাচ্ছি।’
বলে আহমদ মুসা দরজা পার হয়ে গেল।
প্রহরীটি দেখেছিল আহমদ মুসাকে রিসেপশন রুম থেকে বের হয়ে আসতে।
প্রহরীটি বিশ্বাস করল আহমদ মুসা রিসেপশনে বলেছে। টেলিফোনে হয়তো অনুমতিও নিয়েছে। তাছাড়া আহমদ মুসার দ্বিধাহীন কথাবার্তা ও ভেতরে প্রবেশ দেখেও মনে করল অনুমতি সে অবশ্যই পেয়েছে।
প্রহরী আহমদ মুসাকে বাধা দিল না।
আহমদ মুসা ভেতরে প্রবেশের প্রধান দু’টি বাধা বিনা বাধায় অতিক্রম করতে পারায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। গেটেই গোলা-গুলী হলে তার কাজ কঠিন হয়ে যেত।
আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নিচে। কিন্তু করিডোরে নেমে বিপদে পড়ে গেল আহমদ মুসা। এখন কোন দিকে যাবে সে।
সিঁড়ি থেকে নেমে ডানদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে বড় একটা ষ্টিলের দরজা। দেখেই বুঝল এটাই একদিন এ অফিস থেকে বাইরে বেরুবার প্রধান গেট ছিল। পরে গেটটি ষ্টিল চৌকাঠের সাথে ওয়েল্ডিং করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং দোতলায় উঠার বাইরের সিঁড়িটা পরে তৈরি করা হয়েছে।
আহমদ মুসা পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম দিকে চেয়ে দেখল তিনদিকেই তিনটা করিডোর এগিয়ে গেছে। কোনদিকে যাবে সে?
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করে অফিস বিল্ডিংটার অবয়ব সামনে নিয়ে এল। দেখল সে অফিসের বৃহত্তর অংশ সিঁড়ি থেকে পশ্চিম দিকে। সিঁড়ি থেকে পূর্ব ও উত্তর দিকে বড় জোর দু’তিনটি কক্ষ পাওয়া যাবে।
সুতরাং আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমের করিডোর ধরে এগুবার জন্যে।
আহমদ মুসা তার হাতের সেতার বন্দুকের মত ধরে বিড়ালের মত নিঃশব্দে, কিন্তু স্বাভাবিক হেঁটে সামনে এগুলো।
তিনটা কক্ষের দরজা পার হতেই সে দেখল সামনেই উত্তর-দক্ষিণ একটা করিডোর। আহমদ মুসা অনুমান করলো এই এলাকাটা অফিস বিল্ডিং-এর মাঝামাঝি স্থান হবে।
আর দু’পা এগুতেই আহমদ মুসা দু’জন প্রহরীর মুখোমুখি হয়ে গেল। তারা দক্ষিণ করিডোর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
দু’পক্ষই চমকে উঠল।
আহমদ মুসার ডান হাতের তর্জনি ছেতারের মাঝ বরাবরে গর্ত দিয়ে সাইলেন্সার লাগানো মিনি ষ্টেনগানের ট্রিগার স্পর্শ করেছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সে সেতারের তার স্পর্শ করেছে। এখনি বাজানো সে শুরু করবে।
চমকে ওঠা অবস্থা দূর হওয়ার পর ষ্টেনগান ধারী প্রহরী দু’জনের একজন বলল, ‘কি হে, এখানে তুমি কি করছ? এটা কি গানের জায়গা? এলে কি করে?’
‘ফার্ডিন্যান্ড এখানে, তাই এখানেই দেখা করতে এলাম। কোথায় সে?’
ঠিক এই সময়েই নারী কণ্ঠের কাকুতি-মিনতি ও ক্ষীণ চিৎকার ভেসে আসতে লাগল।
আহমদ মুসার কথা শুনে ওরা কপাল কুঞ্চিত করেছিল। তাদের ষ্টেনগানের নল উপরে তুলেছিল আহমদ মুসার লক্ষ্যে। তাদের একজন কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল।
কিন্তু আহমদ মুসা তাদেরকে সময় দিল না।
আহমদ মুসার তর্জনি অস্থিরভাবে চেপে ধরল ট্রিগারে। নিঃশব্দে এক ঝাক গুলী বেরিয়ে গেল সেতার রূপী মিনি ষ্টেনগান থেকে।
শব্দ করারও সময় পেল না প্রহরী দু’জন। ঝাঁঝরা দেহ নিয়ে ঢলে পড়ে গেল করিডোরের উপর।
নারী কণ্ঠের চিৎকার কোন দিক থেকে আসছে তা ঠিক করার জন্যে একটু উৎকর্ণ হয়েই আহমদ মুসা ছুটল দক্ষিণ দিকে। তার আগে দু’জনের দু’টি ষ্টেনগান আহমদ মুসা কাঁধে তুলে নিয়েছে।
দক্ষিণ করিডোরের পশ্চিম পাশে প্রথম ঘরটি থেকেই আসছিল শব্দ।
আহমদ মুসা দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
এখানে কম্পুটারাইজড এ্যালফাবেটিক্যাল লক।
খুশী হলো আহমদ মুসা। নিশ্চয় লক খোলার কোডও ঐ একই হবে।
আহমদ মুসা ডান হাতে ষ্টেনগান বাগিয়ে বাম হাতে ‘EGLE’ কম্পিউট করল।
ঠিক এই সময়ই মার্গারেট চিৎকার করছিল, ‘আল্লাহ আমাকে রক্ষা কর,’ আল্লাহ আমাকে রক্ষা কর’ বলে।
আর তার জবাবে আরেকটি লোক হো হো করে হেসে উঠল, ‘তোমার আল্লাহ যেখানেই থাক, এখানে আসতে পারবে না। এখনও বল, এশীয় লোকটি কোথায়, তার কি পরিচয়, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দিতে বলি।’
‘না আমি বলব না। কিছুতেই বলব না। আমাকে মেরে ফেল।’ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল মার্গারেট।
‘না, সুন্দরী, তোমাকে মারলে তো তুমি বেঁচে যাবে। তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেই এভাবে তোমাকে প্রতিদিন মারতে চাই।’
কথা শেষ করেই চিৎকার করে উঠল লোকটি, ‘শয়তানি শুনবে না। তোমার কাজ শুরু কর।’
সংগে সংগেই ‘আল্লাহ তুমি কোথায়’ বলে বুক ফাটা চিৎকার করে উঠল মার্গারেট।
আহমদ মুসার ‘EGLE’ কম্পিউট শেষ হয়েছে। শেষ করেই সে রিভলবার তুলে নিয়েছে বাম হাতে। আর ডান হাতে ষ্টেনগান।
‘EGLE’ কম্পিউট শেষ হবার সাথে সাথে চোখের পলকে দরজার পাল্লা দেয়ালে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসার চোখ ছুটে গেল ঘরের ভেতর। প্রায় নগ্ন মার্গারেট মাটিতে পড়ে আছে। দৈত্যাকার একজন লোক মার্গারেটের বুকে পা দিয়ে তাকে চেপে রেখে কাপড় খুলছে। আর পাশেই দাঁড়িয়ে আরেকজন শ্বেতাংগ আমেরিকান।
ষ্টেনগানের ট্রিগারে হাত ছিলই আহমদ মুসার। তর্জনি চাপল ট্রিগারে। দৈত্যাকার লোকটিকে ঝাঁঝরা করল এক ঝাঁক বুলেট গিয়ে।
আহমদ মুসার এইভাবে উপস্থিতি এবং দৈত্যসদৃশ তার পাহলোয়ানের উপর ব্রাশ ফায়ারে মুহূর্তের জন্যে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল ফার্ডিন্যান্ড। সম্বিত ফিরে পেয়ে যখন সে পকেট থেকে রিভলবার বের করল, তখন তা দিয়ে আর কোন কাজ হলো না। আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবারের একটা গুলী তার রিভলবার ধরা হাতকে চৌচির করে দিয়ে গেল। তার হাত থেকে বেশ দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল রিভলবার।
‘বাঁচতে চাইলে দু’হাত তুলে দেয়ালের দিক মুখ করে দাঁড়াও।’ নির্দেশ দিল ফার্ডিন্যান্ডকে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা প্রথমে এক ঝলক মাত্র তাকিয়েছিল মার্গারেটের দিকে। তারপর তার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে রেখেছিল।
ফার্ডিন্যান্ড গিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে আহমদ মুসা ষ্টেনগানগুলো রেখে নিজের জ্যাকেট খুলে মার্গারেটকে দিয়ে ওদিকে না তাকিয়েই তা ছুড়ে দিল মার্গারেটকে। বলল, ‘পরে নাও।’
মার্গারেটকে ধরে আনার সময় তার গায়ে ছিল নাইট গাউন। সেটাই আজ পর্যন্ত তার পরেনে ছিল। কিন্তু সেটা আজ শত ছিন্ন হয়েছে ওদের হাতে। মার্গারেট জ্যাকেট কুড়িয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি পরে নিল।
তারপর আহমদ মুসা এগুলো ফার্ডিন্যান্ডের দিকে। পায়ে একটি লাথি মেরে ফার্ডিন্যান্ডকে ফেলে দিল মাটিতে। বলল, ‘প্যান্টটা খুলে দাও ফার্ডিন্যান্ড।’
বলেই মার্গারেটকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তুমি ভিন্ন দিকে ঘুরে দাঁড়াও মার্গারেট।’
আন্ডার ওয়্যার পরা ফার্ডিন্যান্ড সংগে সংগেই প্যান্ট খুলে হুকুম তামিল করেছে।
আহমদ মুসা প্যান্টটা মার্গারেটের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি পরে নাও।’
আহমদ মুসা তার সেতার ষ্টেনগানটি কাঁধে ঝুলিয়ে দু’হাতে দুই ষ্টেনগান নিয়ে বলল, ‘চল মার্গারেট।’
দরজায় এসে আহমদ মুসা ফার্ডিন্যান্ডকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কাপুরুষ ফার্ডিন্যান্ড, এশীয়টির গায়ে হাত দিতে না পেরে একজন মহিলাকে ধরে আনার বীরত্ব দেখিয়েছিলে। তোমাকে হত্যা করলাম না। আরও প্রায়শ্চিত্য করার জন্যে বাঁচিয়ে রাখলাম।’
বলে আহমদ মুসা বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি এঁটে বন্ধ করে দিল। ভিন্ন কোডে কম্পুটার লক বন্ধ করা যাবে কিনা এই ভেবে সেটা ব্যবহার করল না আহমদ মুসা।
সিঁড়ির কাছাকাছি এসে আহমদ মুসা মার্গারেটকে বলল, ‘অফিসের সবার জানার ও প্রস্তুত হওয়ার আগেই আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে। গেটে মাত্র ছয় সাত জন প্রহরী আছে, অসুবিধা হবে না। তুমি আমার পেছনে থাকবে সব সময়। ভয় নেই।’
মার্গারেট কোন কথা বলল না। তার দু’চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়েছে অশ্রু। কিন্তু মন তার বলল, আপনার পাশে থেকে এখন আমার মৃত্যু, আমার সবচেয়ে বড় কাম্য বস্তু।
সিঁড়ির গোড়ায় পৌছে আহমদ মুসা দেখল, সিঁড়ি মুখের দরজার বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রহরী, তার হাতে ষ্টেনগান ঝুলছে।
আহমদ মুসা দ্রুত উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে। পায়েল শব্দে ঘুরে দাঁড়াল প্রহরী গেটম্যান। আহমদ মুসাকে ঐভাবে দেখে তার চক্ষু চড়ক গাছ। আহমদ মুসার বাম হাতের ষ্টেনগান এক পশলা গুলী ছাড়ল। গেটের উপরই ঢলে পড়ল প্রহরীর দেহ।
একজনকে মারার জন্যে এত গুলীর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আহমদ মুসা তা ছুড়ল এই কারণে যে, ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনে নিচের গেট রুম থেকে সবাই ছুটে আসবে উপরে। তাদের সবাইকে আহমদ মুসা এক সাথে পেতে চায়।
আহমদ মুসা দু‘তলার সিঁড়ি মুখ পার হয়েই দেখল, রিসেপশন রুম থেকে দু’জন বেরিয়ে এসেছে।
আহমদ মুসার ডান হাতের ষ্টেনগান আবার এক ঝাঁক গুলী বৃষ্টি করল রিসেপশন রুম লক্ষ্যে।
গুলী করেই আহমদ মুসা দু’ধাপ এগিয়ে অফিস থেকে নিচে লনে নামার সিঁড়ির দিকে তাকাল। দেখল ছয় সাত জন ছুটে আসছে ষ্টেনগান বাগিয়ে উপরের দিকে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে।
আহমদ মুসা আরও দু’ধাপ এগুলো সামনে। ওরাও তখন দেখতে পেয়েছে রেডইন্ডিয়ান যুবকবেশী আহমদ মুসাকে।
ওরাও ষ্টেনগান ঘুরাচ্ছে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু ওদের লক্ষ্যে উদ্যত আহমদ মুসার দু’তর্জনি ছিল দু’ষ্টেনগানের ট্রিগারে প্রস্তুত। তার দুই হাতের দু ষ্টেনগান এক সাথে গুলী বৃষ্টি করল ওদের উপর। ওরা সাতজনই ঢলে পড়ল সিঁড়ির উপর।
গুলী বৃষ্টি করতে করতেই ‘মার্গারেট এসো’ বলে ছুটল আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে।
ডা: মার্গারেট নির্দেশ মত আহমদ মুসার পেছনেই দাঁড়িয়েছিল। সেও ছুটল আহমদ মুসার পেছনে পেছনে তার ছায়ার মত।
আহমদ মুসা প্রায় সিঁড়ির গোড়ায় নেমে এসেছে। এমন সময় সে দেখল সিঁড়ির গোড়ায় গড়িয়ে পড়া রক্তাক্ত একজন রিভলবার তাক করেছে আহমদ মুসার লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা দ্রুত মাথা নিচু করে ডান পাশে সরে গেল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। রিভলবারের নিক্ষিপ্ত গুলীটা এসে বিদ্ধ হলো আহমদ মুসার বাম কাঁধ সংলগ্ন বাহুর পেশিতে।
আহমদ মুসার বাম হাত থেকে ষ্টেনগান পড়ে গেল।
আহমদ মুসা তার ডান হাতের ষ্টেনগানটা ঘুরিয়ে লোকটির দিকে গুলী করে আবার ছুটল লন ধরে। তার পেছনে পেছনে মার্গারেট। আহমদ মুসার আহত হাত থেকে পড়ে যাওয়া ষ্টেনগানটা তুলে নিয়েছিল ডা: মার্গারেট।
আহমদ মুসার গুলী বিদ্ধ হওয়া দেখে আতংকিত হয়ে পড়েছিল মার্গারেট। কিন্তু আতংকের মধ্যেও সে আশ্বস্ত হলো এই ভেবে যে, গুলীটা বিপজ্জনক জায়গায় লাগেনি।
আহমদ মুসা লন থেকে রাস্তায় উঠে পেছনে তাকাল। দেখল, পেছন থেকে এখনও কেউ তাড়া করে আসেনি।
আহমদ মুসা রাস্তার দিকে তাকাল। দেখল, রাস্তা ফাঁকা। আতংকিত মানুষ বিভিন্ন দিকে সরে গেছে।
আবার দু’জন ছুটল রাস্তা ধরে।
এ সময় আহমদ মুসার মনে হলো কার্লোসের কথা। কার্লোস গাড়ি নিয়ে থাকলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু কার্লোসকে গতকাল হঠাৎ করে যেতে হয়েছে প্রায় সোয়া শ’ কিলোমিটার পশ্চিমে আর্থার টাউনে। গতকালই ফেরার কথা ছিল। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারেনি।
একটা সুদৃশ্য নতুন টয়োটা কার আসছিল সামনের দিক থেকে।
আহমদ মুসার মাথায় একটা চিন্তা এসে গেল। সংগে সংগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল সে।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ষ্টেনগান উচিয়ে গাড়িটা থামিয়ে দিল সে।
গাড়ি থামার সংগে সংগেই আহমদ মুসা গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রাইভিং সিটে একজন তরুণী।
আহমদ মুসা তার দিকে ষ্টেনগান তাক করে বলল, ‘দরজা খুলে দাও, না হলে ভেঙ্গে ফেলব।’
সংগে সংগে তরুণীটি গাড়ির দরজা খুলে দিল। তরুণীটির চোখে-মুখে বিস্ময় এবং ভয় দুইই।
আহমদ মুসা খোলা দরজা পথে পেছনের দরজা আনলক করে দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, ‘ডা: মার্গারেট তাড়াতাড়ি উঠে বস।’
বলার সাথে সাথেই মার্গারেট গাড়িতে উঠে বসল।
আহমদ মুসা তরুণীটির দিকে ষ্টেনগান তাক করে বলল, ‘পাশের সিটে গিয়ে বসুন।’
ভয়ে পাংশু হয়ে উঠেছিল তরুণীটির মুখ। বিনাবাক্যব্যয়ে মেয়েটি ড্রাইভিং সিট ছেড়ে পাশের সিটে সরে গেল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসতে যাচ্ছে এ সময় লনের দিক থেকে গোলমাল ও ষ্টেনগানের শব্দ ভেসে এল। দু’একটা গুলী এসে আশপাশে পড়ল।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে চোখের পলকে গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটল সামনের দিকে।
গাড়ির তরুণীটি শিলা সুসান। ফার্ডিন্যান্ডের মেয়ে। একজন বান্ধবীকে বিদায় দিয়ে সে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছিল।
প্রথমে সে আহমদ মুসাদেরকে হাইজ্যাকার, কিডন্যাপারে ভেবেছিল। কিন্তু আহমদ মুসার গুলী বিদ্ধ বাম বাহু থেকে অব্যাহত রক্তপাত এবং মার্গারেটের বিধ্বস্ত ও রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বুঝল কোন বিপদ ও সংঘাত থেকে এরা ফিরছে। পরে যখন হোয়াইট ঈগল-এর অফিসের দিক থেকে হৈ চৈ ও ষ্টেনগানের গুলীর ঝাঁক ছুটে এল, তখন বুঝতে পারল এরা হোয়াইট ঈগল-এর অফিস থেকে মারামারি করে ফিরছে এবং তার গাড়ির সাহায্য নিয়ে এরা পালাবার চেষ্টা করছে।
এসব চিন্তা করার পর শিলা সুসানের ভয় অনেকটা কেটে গেল। তার জায়গায় তার মনে প্রশ্ন জাগল, এরা কারা? মেয়েটির পরনে অদ্ভুত পোশাক কেন? বুঝাই যাচ্ছে তার গায়ের জ্যাকেটটি তার নয়, কোন ছেলের। আর তার পরনের একদম বেঢম প্যান্টটি কোন পুরুষের। কোন মেয়ের এমন পোশাক জীবনে সে এই প্রথম দেখল।
বেশ কিছুটা পথ চলে এসেছে।
আহমদ মুসা পাশের তরুণীটির দিকে মুহূর্তের জন্যে চোখ তুলে বলল, ‘আমাদের এই ব্যবহার ও আপনার অসুবিধা হওয়ার জন্যে আমি দু:খিত।’
আহমদ মুসার এ কথায় শিলা সুসান আহমদ মুসার দিকে তাকাল। আহমদ মুসার নরম ও ভদ্র সুর শুনে গম্ভীরভাবে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনারা কারা?’
‘হঠাৎ করে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া মুষ্কিল। এটাই এখন আমাদের বড় পরিচয় যে আমরা জুলুমের শিকার।’
‘জালেম কে? মনে হচ্ছে আপনারা লড়াই করে এসেছেন।’
‘জালেমদের পরিচয়ও হঠাৎ দেয়া মুষ্কিল। লড়াই করতে আমরা যাইনি। ডা: মার্গারেট বন্দী ছিলেন, ওকে উদ্ধার করতে যেয়ে লড়াই হয়েছে।’
আহমদ মুসা পরিচয় না দিলেও শিলা সুসান বুঝল হোয়াইট ঈগলকেই জালেম বলা হচ্ছে। তাহলে এ মেয়েটি ‘হোয়াইট ঈগল’-এর কাছে বন্দী ছিল। কেন বন্দী ছিল? বিষয়টা তার মনে কষ্ট দিলেও সে জানে ‘হোয়াইট ঈগল’ শ্বেতাংগ স্বার্থের একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মেয়েটি তো নিরেট শ্বেতাংগ, তাহলে এভাবে বন্দী হলো কেন? আর একজন অশ্বেতাংগ তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাচ্ছে কেন? এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়ে শিলা সুসান প্রশ্ন করল, ‘কোথায় বাড়ি আপনাদের?’
‘ডা: মার্গারেটের বাড়ি গ্র্যান্ড টার্কস-এ।’
গ্রান্ডস টার্কস-এর নাম শুনে চমকে উঠলে শিলা সুসান। তার আব্বাদের আলোচনায় সে জেনেছে হোয়াইট ঈগলের কয়েকটা অভিযান সেখানে মার খেয়েছে। হোয়াইট ঈগল-এর দেড়শ’ থেকে দু’শ লোক সেখানে নিহত হয়েছে। এসব ঘটনার কার্যকরণ থেকেই কি মেয়েটিকে বন্দী করা হয়েছিল? আর ড্রাইভ করছে এ লোকটি কে? ডা: মার্গারেটের বাড়ি বলল গ্রান্ড টার্কস-এ, কিন্তু এঁর বাড়ি কোথায় তা তো বলল না! এ তো অশ্বেতাংগ। এশিয়ান কি? এ প্রশ্ন মনে জাগতেই তার পিতাদের আলোচনা থেকে শোনা জনৈক এশিয়ানের কথা তার মনে পড়ল। তার পিতাদের সেই এশিয়ানই নাকি ‘হোয়াইট ঈগল’ এর সব বিপর্যয়ের হোতা। এই এশিয়ানই কি সেই এশিয়ান?
এই শেষ প্রশ্নটা মনে উদয় হতেই একটা ভয়ার্ত শিহরণ এসে তাকে ঘিরে ধরল। সে নিশ্চিত হলো, এ সেই এশিয়ানই হবে। হোয়াইট ঈগল ঘাটি থেকে একজন বন্দী উদ্ধার এইভাবে আর কে করতে পারে!
হঠাৎ আহমদ মুসা তার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। তরুণীটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, ওরা পিছু নিয়েছে।’
এ খবরে শিলা সুসান আনন্দিত হবার বদলে উৎকণ্ঠিত হলো। সানসালভাদরের এ কলম্বাস দ্বীপটা খুব বড় নয়। লুকানোর জায়গা তেমন নেই। চারদিক থেকে হোয়াইট ঈগলরা আসলে এ গাড়ি পালাবার জায়গা পাবে না। তার গাড়ি ওখানকার সবাই চেনে। সুতরাং নম্বার এতক্ষণ তারা পুলিশকে বা হোয়াইট ঈগলকে দিয়ে দিয়েছে। সুতরাং যে দিক দিয়েই পালাবার চেষ্টা করা হোক, তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। কিন্তু সুসানের মনে এই বিষয়টাই অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। তার মন বলছে, এই মেয়েটির হোয়াইট ঈগল-এর বন্দীখানায় ফেরা আর ঠিক নয়।
‘কয়টি গাড়ি পিছু নিয়েছে?’ বলল শিলা সুসান।
‘একটা গাড়ি দেখতে পাচ্ছি। মনে হয় একটাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে আরও গাড়ি অন্য দিক দিয়ে আসছে।’
‘কি করে বুঝলেন?’ বিস্মিত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা শিলা সুসানের দিকে তাকিয়ে।
‘যেখান থেকে আপনারা এলেন, সেটা আমাদের বাড়ির পাশেই। ওদের জানি আমি। পিছু যখন নিতে পেরেছে, তখন একটি নয় অনেকগুলো গাড়ি পিছু নেবার কথা। তাই আমার মনে হচ্ছে, একটি যখন পেছন দিক থেকে পিছু নিয়েছে তখন আরও গাড়ি অন্যদিক দিয়ে আসছে। কলম্বাস কমপ্লেক্স একটা গ্রন্থি। ওখান থেকে অনেক রাস্তা বিভিন্ন দিকে গেছে।’
‘তাহলে এটা আপনার জন্যে খুশীর, আর আমাদের জন্যে খুব দু:খের খবর।’ বলল কথাগুলো আহমদ মুসা হাসি মুখে।
তারপর আহমদ মুসা তার গাড়ির গতি স্লো করে দিল।
গাড়ি তখন সবে বন্দর শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে। চলছিল তখন এক এবড়ো-থেবড়ো জংলা এলাকার মধ্যে দিয়ে।
বিস্মিত হলো শিলা সুসান। বলল, ‘কি ব্যাপার গাড়ি থামিয়ে দিলেন যে?’
‘সব গাড়ির মাঝে পড়ে লড়াই করার চেয়ে শুরুতে একটার সাথে লড়াই করে দেখি।’ বলল আহমদ মুসা নির্বিকার কণ্ঠে। তার ঠোঁটে হাসি।
আরও বিস্মিত হলো শিলা সুসান আহমদ মুসার এই হাসি দেখে। এমন বিপদে পড়ে কেউ হাসতে পারে জীবনে সে এই প্রথম দেখল। পাগল হয়ে গেল নাকি লোকটা বিপদে পড়ে? দ্রুত কণ্ঠে শিলা সুসান বলল, ‘দেখুন আমার খুশী-অখুশী আমার ব্যাপার। কিন্তু আমি চাই না এই মেয়েটি আবার ওদের হাতে বন্দী হোক।’
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টিতে তাকাল শিলা সুসানের দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ, তাহলে কি আমি ডাঃ মার্গারেটকে আপনার হেফাজতে দিতে পারি? আপনি তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌছানোর ব্যবস্থা করবেন।’
‘হ্যাঁ পারেন।’ বলল দৃঢ় কণ্ঠে শিলা সুসান।
‘তাহলে এখনি আপনি মার্গারেটকে নিয়ে পাশের ঝোপে নেমে যান। একটু পর তাকে নিরাপদ কোথাও পৌছানোর ব্যবস্থা করবেন।’
‘আর আপনি?’
‘পেছনে মানে উত্তর দিকে চেয়ে দেখুন, একটি নয় দু’টি গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ওরা অপেক্ষা করছে সামনের গাড়ির। দেখুন দক্ষিণ দিক থেকে চারটা হেডলাইট এদিকে এগিয়ে আসছে। আর পূর্ব দিক থেকে যে হেড লাইট এগিয়ে আসতে দেখছি, ওটাও ওদেরই গাড়ি মনে করছি। সবারই লক্ষ্য এই গাড়ি। আমার মনে হচ্ছে, আপনার গাড়ির কোথাও ট্রান্সমিটার লাগানো আছে। যে ট্রান্সমিটারের মেসেজ অনুসরণ করে ওরা নিখুঁতভাবে ঘিরে ফেলতে আসছে এ গাড়িকে। আপনারা এখানে নামুন। আমি গাড়ি নিয়ে চলে যাই। ওদের লক্ষ্য আমার দিকে চলে যাবে। পরে আপনি ওকে নিয়ে সরে পড়বেন।’
‘কিন্তু আপনার কি হবে?’ বলল ভারী কণ্ঠে ডাঃ মার্গারেট।
‘আমি ওদের ফাঁদ থেকে বেরুতে পারলে বেঁচে যাব।’
‘বেরুতে না পারলে?’ বলল শিলা সুসান।
‘বেরুতে না পারলে ধরা পড়ব। তাতে অন্তত একজন রক্ষা পাবে। আপনিও জানেন মার্গারেট ধরা পড়া ঠিক নয়।’
বলে আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বেরিয়ে ওপাশে গিয়ে শিলা সুসান ও মার্গারেটের দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি নেমে পড়–ন।’
‘আপনাকে এভাবে ফেলে আমি যাব না।’ বলে মার্গারেট ফুফিয়ে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা মার্গারেটকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মার্গারেট এটা আমার নির্দেশ। নেমে এসো।’
কাঁদতে কাঁদতে মার্গারেট নেমে এল গাড়ি থেকে।
গাড়ি থেকে নেমে এসেছে শিলা সুসানও। অনেক বিস্ময়, অনেক প্রশ্নের ভীড়ে সে নির্বাক। তার সামনের এশীয়টিকে মনে হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত কোন সিনেমার নায়ক। আর তার সামনে নায়ক-নায়িকার মধ্যে অকল্পনীয় এক ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে।
আহমদ মুসা গাড়ির দুই দরজা বন্ধ করে দিয়ে পকেট থেকে একটা ইনভেলাপ বের করে শিলা সুসানের হাতে তুল দিয়ে বলল, ‘এতে কিছু ডলার আছে। ওঁর প্রয়োজন হতে পারে।’
একটু দম নিয়েই আহমদ মুসা বলল আবার সুসানকে, ‘আপনার নাম জানতে পারি এবং ঠিকানা?’
‘আমি শিলা সুসান। আমার টেলিফোন ‘নব্বই হাজার নয়’।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা মার্গারেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখা হবে।’
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে তীব্র বেগে গাড়ি ছাড়ল সামনের দিকে।
আহমদ মুসার গাড়ি ষ্টার্ট দেবার সঙ্গে সঙ্গে পেছনের গাড়ি দু’টিও ষ্টার্ট নিল।
শিলা সুসান ডাঃ মার্গারেটকে টেনে নিয়ে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে বসল। সামনে ঝোপ থাকায় রাস্তা থেকে তাদের দেখা যাবে না। কিন্তু তারা উত্তর-দক্ষিণে বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে।
আহমদ মুসার গাড়িকে অনুসরণ করে পেছনের গাড়িটা শিলা সুসানদের পাশ দিয়ে ছুটে গেল সামনে।
আহমদ মুসার সামনে থেকে যে গাড়ি দু’টি আসছিল, আহমদ মুসার গাড়িকে তীব্র গতিতে ছুটতে দেখে তা থেমে গেছে। তাদের চারটি হেড লাইট পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা আহমদ মুসার চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার অপেক্ষা করছে।
পূর্ব দিকে যে গাড়িটা আসছিল, সেটাও গতি পরিবর্তন করে ছুটছে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
আর পেছন থেকে দু’টি গাড়ি।
আহমদ মুসার গাড়ির রিয়ার লাইট জ্বালানো নেই। মাঝে মাঝে তার গাড়ির হেড লাইটের আলো দেখা যাওয়ায় বুঝা যাচ্ছিল তার গাড়ির লোকেশান।
কিন্তু আহমদ মুসার উপর সামনের দু’টি গাড়ির হেড লাইটের আলো পড়ার পর তার গাড়ির অবয়ব পরিষ্কার হয়ে উঠল
আহমদ মুসার গাড়ি এগুচ্ছে ঐ দু’গাড়ির দিকে পাগলের মত।
প্রায় মুখোমুখি হয়ে পড়েছে আহমদ মুসার গাড়ি এবং ঐ দু’গাড়ি।
ডাঃ মার্গারেটের উদ্বেগ ও আর্তকে তখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। আর শিলা সুসানের চোখে-মুখে অবাক বিস্ময়।
এ সময় ঐ গাড়িগুলোর দিক থেকে ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ ভেসে এল। এক সাথে দু’টি ষ্টেনগানের।
ডাঃ মার্গারেট এবং শিলা সুসানের বিস্ফোরিত চোখ সেদিকে চেয়ে আছে। দু’জনের চোখেই প্রশ্ন, গুলী কোন গাড়ি থেকে হলো। সব গাড়ীর হেড লাইট তখন নিভানো। সব একাকার হয়ে যাওয়ায় কিছুই বুঝা যাচ্ছে না সেখানকার অবস্থা।
হঠাৎ সেখানে দু’টি বিস্ফোরণের শব্দ এবং পরক্ষণেই সেখানে দেখা গেল আগুনের কুন্ডলী।
ডাঃ মার্গারেট আর্তনাদ করে শিলা সুসানের একটা হাত চেপে ধরল। শিলা সুসানেরও দু’টি উদ্বিগ্ন চোখ সেদিকে নিবদ্ধ। বলল, ‘ডাঃ মার্গারেট দেখেছেন, আগুনের আলোয় একটা গাড়িকে সচল এবং দক্ষিণ দিকে যেতে দেখা গেল।’
‘কিন্তু গাড়িটি কার, কোন পক্ষের কেমন করে বলা যাবে?’ ভাঙা কণ্ঠে বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘তা বলা মুষ্কিল।’ বলল শিলা সুসান হতাশভাবে।
দেখা গেল উত্তর দিকে যাওয়া ও পুবদিক থেকে আসা গাড়ি তিনটিও তাদের সব লাইট নিভিয়ে দিয়েছে। লাইট নিভিয়ে তারা এগুচ্ছে। সুতরাং ওদিকের কোন কিছুই এখন আর বোঝা যাচ্ছে না।
‘ডাঃ মার্গারেট চলুন, আর অপেক্ষা করা কি হবে না। অনেকখানি হাঁটতে হবে আমাদের।’ বলল শিলা সুসান।
‘কিন্তু ওঁর কোন খবর?’ সেই ভাঙ্গা কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘ঘটনাস্থলে যাওয়া কি সম্ভব আমাদের?’ বলল শিলা সুসান।
‘তা সম্ভব নয়, কিন্তু……।’ কথা শেষ করতে পারলো না ডাঃ মার্গারেট। কান্নায় বুজে গেল তার কথা। একটা কথা বার বারই তার বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সে জীবন বিপন্ন করে আমাকে উদ্ধার করল, আমি তো ওঁর বিপদে কিছুই করতে পারছি না।
‘কিন্তু কি ডাঃ মার্গারেট?’
‘অতবড় একজন মানুষ কি অসহায়ভাবে শেষ হয়ে যাবে?’ বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেলল ডাঃ মার্গারেট।
শিলা সুসান ডাঃ মার্গারেটের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ওঁর বিপদ হয়েছে তা আমরা জানি না, বিপদ হয়নি তাও আমরা জানি না। তাঁর উপর বড় কিছু ঘটেছে আমরা বলতে পারছি না, ঘটেনি তাও বলতে পারছি না। সুতরাং আসুন সব ব্যাপার ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দেই। তাঁকে যতটুকু আমি দেখেছি, তাতে তিনি পরোপকারী এবং সুবিবেচক। ঈশ্বর এমন লোকদের সাহায্য করেন।’
ডাঃ মার্গারেট চোখ মুছে বলল, ‘আপনার কথা সত্য হোক।’
‘আসুন, চলি।’ বলে হাঁটতে শুরু করল শিলা সুসান।
ডাঃ মার্গারেটও হাঁটতে শুরু করেছে।
হাঁটতে গিয়ে পিঠে কিছু চেপে আছে মনে হলো ডাঃ মার্গারেটের। না শুধু পিঠে কেন? কাঁধ থেকে পিঠ পর্যন্ত। হাত দিয়ে দেখল আহমদ মুসার ব্যাগ।
চমকে উঠল ডাঃ মার্গারেট। কখন দিল আহমদ মুসা এ ব্যাগ তাকে! নিশ্চয় যাবার সময় কথা বলার ফাঁকে সে ব্যাগটি মার্গারেটের পিঠে ঝুলিয়ে দিয়েছে। মনের অবস্থার কারণে সে খেয়াল করেনি।
ব্যাগটা তার কাছে আসায় একটা অশুভ চিন্তায় মনটা কেঁপে উঠল মার্গারেটের। সব সময় এ ব্যাগটি আহমদ মুসার কাছে থাকে। এ ব্যাগটি মার্গারেটের কাছে রেখে যাবার অর্থ কি এটাই যে আহমদ মুসা নিজের ব্যাপারে খুবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল! অশুভ চিন্তায় আবার কেঁপে উঠল মার্গারেটের মন।
দু’জন পাশাপাশি চলছে।
হাঁটতে হাঁটতে শিলা সুসান বলল, ‘তিনি অন্যের ব্যাপারে যত সতর্ক দেখলাম, এমন লোক নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক হবেন। তিনি তো অবশ্যই সাধারণ কেউ নন।’
হাঁটতে শুরু করে ডাঃ মার্গারেটের মনে নতুন চিন্তার উদয় হয়েছিল, ‘কোথায় যাচ্ছে সে? মেয়েটাকে কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
শিলা সুসানের কথা শেষ হলে ডাঃ মার্গারেট বলল, ‘মিস সুসান, উনি মনে করেন ওঁর জীবনটা পরের জন্যে। তাই নিজের ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা করেন না।’ ভারী গলায় কথা শেষ করেই একটা ঢোক গিলে ডাঃ মার্গারেট আবার বলল, ‘আমরা কতদূরে কোথায় যাচ্ছি মিস সুসান?’
শিলা সুসান সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘ঠিক বিষয়টা আপনাকে বলা হয়নি।’ বলে একটু থেমে আবার সে শুরু করল। বলল, ‘যেখান থেকে আপনারা গাড়িতে চড়েছেন, তার কয়েক গজ সামনেই আমার বাড়ি। আমার বাড়িতে আপনাকে নিচ্ছি না। অসুবিধার কথা আমি পরে বলব। আমরা যাচ্ছি আমার খালার বাড়িতে। খালা ও এক খালাতো বোন ছাড়া বাড়িতে এমন কেউ নেই। সেখানে আপনি ভাল থাকবেন এবং নিরাপদে থাকবেন।’
‘সত্যি লজ্জা করছে এই পোশাকে।’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘না, এই পোশাকে যাবেন কেন? সামনেই মার্কেট আছে কাপড় কিনে নেব। উনি তো টাকা দিয়েই গেছেন।’
বলে থামল। কিন্তু থেমেই আবার বলল, ‘সত্যি উনি বোধ হয় সবজান্তা।’ আমার পকেটের খবর পেয়েই বোধ হয় উনি তার মানিব্যাগটা দিয়ে গেছেন। সত্যি এমন কোনদিন হয়নি। বিমান বন্দরে যাবার সময় আমার পার্স নিতে আমি ভুলে গেছি। আমার কাছে এখন একটা পয়সাও নেই।’
‘সব জান্তা উনি অবশ্যই নন। কিন্তু সব দিকে নজর তাঁর থাকে। বিশেষ করে অন্যের অসুবিধা দূর করার দিকে।’ ভারি কণ্ঠস্বর ডাঃ মার্গারেটের।
‘ডাঃ মার্গারেট, ওঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেও অশরীরী মনে হয় কিছু আছে। ক’মিনিটের দেখা ওঁর সাথে। কিন্তু মনে হচ্ছে জানেন, উনি যেন পর কেউ নন। উনি যখন আপনাকে আমার হেফাজতে দিতে চাইলেন তখন আমার কি মনে হয়েছিল জানেন, আমার ঘনিষ্ঠ কেউ যেন আমাকে কথাটা বলছেন যা আমি অস্বীকার করতে পারি না। আমি অবাক হয়েছি দেখে, ওঁর গুলীবিদ্ধ বাহু থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। কিন্তু কোন সময়ই তাকে একবারও ওদিকে তাকাতে পর্যন্ত দেখিনি।’
‘এটাই ওঁর প্রকৃত রূপ মিস সুসান। সবার প্রয়োজন শেষেই শুধু তিনি নিজের প্রয়োজন নিয়ে ভাবেন।’ বলল ডাঃ মার্গারেট উদাস কণ্ঠে।
‘ওঁরা দুর্লভ। কিন্তু এরা আছেন বলেই দুনিয়া আছে।’ বলল প্রায় স্বগত কণ্ঠে শিলা সুসান।
কথা তাদের চলছে। হাঁটছেও তারা অবিরাম।

শিলা সুসানের খালা আম্মার বাড়িটা একটা সুন্দর বাংলো। ছবির মত। মানুষ থাকেন মাত্র দু’জন। সুসানের খালাম্মা এবং তার খালাতো বোন। তাও খুব কম সময়ই তারা এ বাড়িতে থাকেন। সুসানের খালু বাহামা সরকারের একজন কূটনৈতিক অফিসার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাহামা দূতাবাসের নিউইয়র্ক শাখায় তিনি কর্মরত। সুসানের খালা, খালাতো বোন সেখানেই অধিকাংশ সময় থাকেন।
সুসানের খালা ও খালাতো বোন মার্কেটিং-এ গেছে। ডাঃ মার্গারেট একাই বাসায়। ডাঃ মার্গারেট কোন সময়ই বাইরে বের হয় না। খালা ও খালাতো বোনকে মার্গারেটের বিপদের কথা বলে তাকে বাইরে বেরুতে দিতে নিষেধ করে গেছে শিলা সুসান। তাই তারাও কখনও তাকে বাইরে নিতে চায় না।
ডাঃ মার্গারেট ড্রইং রুমে বসে গালে হাত দিয়ে আহমদ মুসার কথাই ভাবছিল। ঘটনার পর দু’দিন পার হয়েছে, আহমদ মুসার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিনই ঘটনাস্থলে শিলা সুসান গিয়েছিল, কিন্তু তার গাড়ির কোন ধ্বংসাবশেষ সে পায়নি। তার মানে আহমদ মুসা প্রতিপক্ষের গাড়ি দু’টি ধ্বংস করে অবশেষে সরে পড়তে পেরেছিল। বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া সুসানের গাড়ি পরে এক জায়গায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসার কোন সন্ধান নেই। তিনি ভাল আছেন? অন্য কোথাও আছেন? থাকলে যোগাযোগ করবেন না কেন? না শিলা সুসানের উপর মার্গারেটকে বাড়িতে পৌছানোর দায়িত্ব দিয়ে উনি দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু এ রকম তিনি নন। কিন্তু তাঁর এ নীরবতার ব্যাখ্যা কি?
কলিংবেলের শব্দ হলো। বাইরে কেউ কলিংবেল বাজাচ্ছে? ওরা মার্কেটিং করে ফিরে এল এত তাড়াতাড়ি? না, তাতো হয় না।
দরজার আইহোল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শিলা সুসানকে দেখতে পেল ডাঃ মার্গারেট।
ডাঃ মার্গারেট তাড়াতাড়ি খুলে দিল দরজা। শিলা সুসান প্রবেশ করল ভেতরে। তার মুখ ম্লান।
সদাহাস্যোজ্জ্বল সুসানকে গম্ভীর ও ম্লান মুখে দেখে উদ্বিগ্ন হলো ডাঃ মার্গারেট। বলল, ‘কি ব্যাপার সুসান কিছু ঘটেছে? তোমাকে বিষণœ দেখাচ্ছে।’
শিলা সুসান ম্লান হেসে বলল, ‘খালারা নেই ভালই হলো, চলুন কথা আছে।’
বসল দু’জন গিয়ে সোফায় পাশাপাশি। বসেই ডাঃ মার্গারেট বলল, ‘প্রোগ্রাম ঠিক আছে? তোমার ওয়াশিংটন আর আমার গ্রান্ড টার্কস-এ যাওয়ার?’
‘বিশ্ববিদ্যালয় কাল খুলছে। যেতেই হবে। তবে আপনি দু’একদিন থেকে যেতে পারেন। জর্জ আপনাকে এসে নিয়ে যাবে, সেটাই বরং ভাল।’ বলল শিলা সুসান।
‘তুমি চলে গেলে আমার থাকার কোন অর্থ নেই।’
‘ঠিক আছে, এটা দেখা যাবে। বলে একটু থেমে শিলা সুসান বলল, ‘একটা প্রশ্ন আপনি বার বার পাশ কাটিয়ে গেছেন। বলুন, ঐ এশীয় আপনার কে?’
ম্লান হলো ডাঃ মার্গারেটের মুখ। একটু চুপ করে থাকল। তারপর হেসে বলল, ‘আমার কেউ নন। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি আমার সব। কোনটা ঠিক আমি ভেবে দেখিনি। তবে এ কথায় সন্দেহ নেই, আমি তাঁর কেউ নই।’
‘তিনি কে, আপনি জানেন?’
চমকে উঠল ডাঃ মার্গারেট। উত্তর দিল না।
‘বুঝেছি, তিনি কে আপনি তাহলে জানেন।’
‘তুমি জান?’
‘আমি জানতাম না, আব্বার কাছে শুনলাম।’
‘তোমার আব্বা মানে মিঃ ফার্ডিন্যান্ড?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি নিশ্চয় আমাদের এসব কাহিনী তাঁকে বলনি। তাহলে কেন তিনি বলতে এলেন তাঁর সম্পর্কে তোমাকে?’
সংগে সংগেই উত্তর দিল না সুসান। তাঁর চোখে মুখে দ্বিধাগ্রস্থতা ও বিষণœ ভাব। একটু সময় নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল সুসান, ‘আপা তিনি ধরা পড়েছেন।’
‘ধরা পড়েছেন?’
বিদ্যুত স্পৃষ্ট হওয়ার মত কেঁপে উঠল ডাঃ মার্গারেট। তারপর হঠাৎ যেন পাথরের মত হয়ে গেল সে।
‘হ্যাঁ। ধরা পড়েছেন। আবার কাঁধে গুলী বিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। রক্তক্ষরণে তিনি দুর্বল হয়ে নিশ্চয় পড়েছিলেন। দু’জন পথচারী হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঐ হাসপাতালে হোয়াইট ঈগল-এর আহত কয়েকজনের চিকিৎসা হচ্ছিল। আহমদ মুসাকে দেখে তারা চিনতে পারে। খবর পেয়ে আব্বা ছুটে যান এবং তাকে আটক করে নিয়ে আসেন।’
‘কোথায় আছেন তিনি?’ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘সেটা আমি অনুসন্ধান করেছি। খবরটা আব্বার কাছ থেকে জানার পরেই হোয়াইট ঈগল-এর কলম্বাস কমপ্লেক্সের বন্দীখানা এবং ককবার্ন দ্বীপের মূল বন্দীখানায় সন্ধান করি গোপনে। তাঁকে এসব বন্দী খানায় রাখা হয়নি। পরে আব্বাকে জিজ্ঞেস করেই জানতে পারি, তাঁকে আমেরিকায় হোয়াইট ঈগল-এর হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
‘হোয়াইট ঈগল-এর হেডকোয়ার্টার কোথায়?’
‘হয়তো ওয়াশিংটনে। আমি ঠিক জানি না। তবে জেনে নেব।’
বলে একটু থামল শিলা সুসান। তারপর শুকনো কণ্ঠে বলল, ‘ভয়াবহ সব কথা শুনলাম আব্বার কাছে। তিনি জানালেন, দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ এখন আহমদ মুসা। তাকে যদি হোয়াইট ঈগল ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান-এর হাতে তুলে দেয়, তাহলে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলার দেয়া হবে বলে তাদের নেতা ফেজাসিস জানিয়েছেন। আবার ‘ডব্লিউ আর এফ’ নামের একটি বামপন্থী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনও নাকি তাঁকে এর চেয়ে বেশি মূল্যে কিনতে চাচ্ছে।’
আনমনা হয়ে পড়েছিল ডাঃ মার্গারেট। শিলা সুসান-এর কোন কথাই ডাঃ মার্গারেটের কানে যাচ্ছিল না।
এটা লক্ষ্য করে সুসান বলল, ‘কি ভাবছেন আপা?’
‘ভাবছি, আমার দুর্ভাগ্যের কথা। আমাকে উদ্ধার করতে আসার ফলেই এতবড় সর্বনাশ ঘটে গেছে। আমার কি মূল্য? আমার মত শত শত মার্গারেট মারা গেলে দুনিয়ার কারো কোন ক্ষতি হতো না। কিন্তু তিনি না থাকলে পৃথিবীর সারা দিগন্ত জুড়ে যে অশ্রু ঝরবে, রক্ত ঝরবে!’
‘আপনি জানেন আপা, ফার্ডিন্যান্ড আমার আব্বা, কিন্তু হোয়াইট ঈগল-এর রাজনীতি আমার ভাল লাগে না। আহমদ মুসা বাহামায় থাকলে তাকে উদ্ধার করার জন্যে আমি সব কিছু করতাম। আমেরিকায় কিছু করতে পারলে করব। আহমদ মুসার মত এমন মানুষ আমি দেখিনি। জানেন আরেকটা মজার ঘটনা ঘটেছে। আমার গাড়ি উদ্ধারের পর গাড়ির ব্লু বুকের মধ্যে দু’হাজার আমেরিকান ডলার পাওয়া গেছে। টাকার সাথে একটা স্লিপে লেখা, ‘গাড়ির ক্ষতি হওয়ার জন্যে দুঃখিত। আমার কাছে যা ছিল গাড়ি রিপিয়ারের জন্যে রেখে দিলাম।’
‘টাকা পাওয়ার পর আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। আব্বাকে বলেছিলাম, এই ধরনের লোককে কষ্ট দেয়া ঈশ্বর অবশ্যই পছন্দ করবেন না।’
আব্বা বলেছিলেন, ‘সে কেমন মানুষ সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়, সে কি করেছে, করছে সেটাই বিবেচ্য। তাকে সহ¯্রবার হত্যা করলেও আমাদের ক্ষতিপূরণ হবে না। সেই জন্যে হত্যা নয়, তাকে আমরা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের কয়েক বছরের বাজেটের টাকা এর থেকে আমরা পেয়ে যাব।’ থামল সুসান।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ডাঃ মার্গারেট। বলল, ‘সুসান, জর্জকে টেলিফোন করতে চাই।’
ডাঃ মার্গারেট আহমদ মুসার খবর জর্জকে জানালে জর্জ ও জেনিফার দু’জনেই কেঁদে ফেলে। তারা টেলিফোনে আর কথা বলতেই পারেনি।
কয়েক মিনিট পরেই টেলিফোন এল জর্জের। জর্জ এবং জেনিফার দু’জনেই জানাল, তারা আমেরিকা যেতে চায়।
টেলিফোনে কথা বলার পর ডঃ মার্গারেট শিলা সুসানের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করল। বলল, ‘আমিও ওদের সাথে আমেরিকা যেতে চাই।’
শিলা সুসান বলল, ‘যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত। তবে গেলেই কোন লাভ হবে তা নয়। হোয়াইট ঈগলকে আমি জানি। আপনাদেরকে ওরা পেলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। আহমদ মুসাকে ওরা বাঁচিয়ে রেখেছে টাকার লোভে, কিন্তু আপনাদেরকে এক মুহূর্তও বাঁচতে দেবে না। সুতরাং বিচার বিবেচনা না করে আপনারা বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়লে কোন লাভ হবে না। আমাকে আপনারা বিশ্বাস করুন, জে.জি ফার্ডিন্যান্ড আমার আব্বা, কিন্তু আব্বার অন্যায়ের ভার লাঘবের জন্যেই আমি আহমদ মুসাকে সাহায্য করব। কিভাবে করব আমি জানি না। যদি জানতে পারি, আপনাদের জানাব। ততদিন আপনাদের অপেক্ষা করা উচিত।’
‘তাহলে জর্জের সাথে আমি আলোচনা করি, ফিরে যাই গ্রান্ড টার্কস-এ। আমরা তোমার অপেক্ষা করব, যদি অপেক্ষা করার জন্যে বেঁচে থাকি।’
‘এ কথা বলছেন কেন? কেন বেঁচে থাকবেন না?’
‘আহমদ মুসা আমাদের জন্যে বাঁচার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি এখন নেই, মাথার উপর আমাদের ঢালও নেই।’ ভারী কণ্ঠ মার্গারেটের।
শিলা সুসান একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, ‘কিন্তু যতটুকু জানি, ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল, বিশেষ করে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের বিপদ কেটে গেছে। জাতিসংঘ ও বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও চাপের ফলে বৃটিশ সরকার সাংঘাতিক তৎপর হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণাংগ তথা মুসলমানদের সামান্য অভিযোগও আজ সংবাদ মাধ্যমে চলে যাচ্ছে এবং বৃটিশ সরকার এবং ক্যারিবিয়ান সরকারগুলো তার প্রতিকারে দ্রুত এগিয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট ঈগল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তার সকল কার্যক্রম স্থগিত করেছে। তারা বিব্রত হয়ে পড়েছে যে, ভিন্ন কোন কারণে ভিন্ন কারও দ্বারা একজন মুসলমান বা কৃষ্ণাংগ মারা গেলে দায়ী করা হচ্ছে হোয়াইট ঈগলকে। টার্কস দ্বীপপুঞ্জ সহ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের পরিস্থিতি ভাল হোক এটা হোয়াইট ঈগলও চাচ্ছে। সুতরাং যে ভয় করছেন সে ভয়ের কোন কারণ নেই। আহমদ মুসা সেখানে নেই বটে কিন্তু যা তিনি করেছেন তা ফসল দিয়ে চলবে বহু বছর।’
‘কিন্তু ওদের সমস্ত রাগ আজ গিয়ে পড়েছে আহমদ মুসার উপর এবং তিনি ওদের হাতে বন্দী।’ কান্নায় ভারী হয়ে উঠল ডাঃ মার্গারেটের কণ্ঠ।
শিলা সুসানের মুখও মলিন হয়ে উঠেছে। তারও চোখে মুখে বেদনার চিহ্ন। ধীরে ধীরে বলল সে, ‘এটা ট্রাজেডি এবং সকলের জন্যে। তিনি মুক্ত হোন চাই। কিন্তু কিভাবে আপনি জানেন না, আমিও জানি না।’ ভারী কণ্ঠস্বর শিলা সুসানের।
ডাঃ মার্গারেটের দু’চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার দুগন্ড দিয়ে।