২৬. ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে

চ্যাপ্টার

সেদিন সকাল আটটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ঢুকছিল শিলা সুসান। পেছন থেকে জিনা ক্রিষ্টোফারের ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়াল সে।
অপেক্ষা করল জিনা ক্রিষ্টোফারের জন্যে।
জিনা ক্রিষ্টোফার কাছাকাছি হয়েই দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘শুনেছিস?’
‘কি?’
‘সান ওয়াকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘কি বলছিস তুই? খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?’
‘হ্যাঁ, গতকাল দুপুর থেকে তার কোন সন্ধান নেই। দুপুরে খেতে সে হলে যায় নি। রাতেও হলে ফেরেনি।’
মনটা ধক করে উঠল শিলা সুসানের। হার্টবিট বেড়ে গেল তার উদ্বেগে। তবু সে বলার চেষ্টা করল, তাঁকে খুঁজে না পাওয়ার প্রশ্ন উঠছে কেন? হঠাৎ কোথাও তো সে যেতেও পারে?’
‘সে রকম মনে হচ্ছে না। লাইব্রেরীতে যেখানে বসে সে গতকাল দুপুরের আগে পড়ছিল, সেখানে তার নোট ফাইল খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার কলমও খোলা সেখানে ছিল। তার হ্যান্ড ব্যাগটাও ছিল টেবিলে। টয়লেটে কিংবা কারো সাথে কথা বলতে পাশে কোথাও গেলে যেমন থাকে, সে অবস্থায় তার সবকিছু পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় তাকে খুঁজে না পাওয়া অস্বাভাবিক।’
উদ্বেগের ছায়া নামল এবার শিলা সুসানের চোখে-মুখে। বলল, ‘মেরী রোজ কিছু জানে?’
‘মেরী রোজও নাকি কিছু বলতে পারছে না। সে খুব ভেঙে পড়েছে। খুব কাঁদছে। খুব খারাপ লাগছে বলে আমি দেখা করতে যাইনি। লাইব্রেরীতে একটা কাজ সেরে আমি যাব মনে করছি।’
শিলা সুসান তৎক্ষণাৎ নিজের হাতের ফাইলটা জিনাকে দিয়ে বলল, ‘তুই এটা রাখ। আমি মেরী রোজ এর ওখান থেকে একটু ঘুরে আসি।’
বলে জিনার হাতে ফাইলটা গুজে দিয়েই ছুটল সুসান প্রায় পাগলের মত।
শিলা সুসান ফ্ল্যাটেই পেল মেরী রোজকে। সেই তাকে দরজা খুলে দিয়েছিল।
শুকনো, বিধ্বস্ত চেহারা মেরী রোজের।
ঘরে প্রবেশ করেই শিলা সুসান জড়িয়ে ধরল মেরী রোজকে। বলল, ‘এই মাত্র আমি জিনা ক্রিষ্টোফারের কাছে শুনলাম ঘটনাটা। শুনেই ছুটে এসেছি তোর কাছে।’
কেঁদে উঠল মেরী রোজ। বলল, ‘আমি আজ সকালে জানতে পেরেছি। নিশ্চয় বড় কিছু ঘটেছে সুসান। নোট, ব্যাগ, কলম ইত্যাদি ফেলে লাইব্রেরীর বাইরে কোথাও সে যেতে পারে না।’
‘আমিও তাই মনে করি।’
বলে সুসান মেরী রোজকে টেনে এনে বসাল সোফায়। বলল সুসান, ‘পুলিশকে জানানো হয়েছে?’
‘হল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টও টেলিফোন করেছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।
শিলা সুসান মেরী রোজ এর একটি হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘তোর কথা ঠিক রোজ, একটা খুব বড় ঘটনা ঘটেছে।’
চোখ মুছে রোজ বলল, ‘কি ঘটনা সেটা তুই জানিস? ষ্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতারাই কি এটা ঘটিয়েছে?’
‘আমার মনে হয় তারা আছে এবং তার সাথে আরও বড় কোন চক্রান্ত রয়েছে।’
‘কে তারা? সান ওয়াকার লেখাপড়া ছাড়া সক্রিয় কোন রাজনীতিতে ছিল না।’
‘সক্রিয় রাজনীতিতে না থাকলেও রেডইন্ডিয়ানদের জাতীয় রাজনীতি থেকে সে বিচ্ছিন্ন অবশ্যই নয়। এর সাথে রয়েছে তোর সাথে সম্পর্কের ব্যাপার। আমার মনে হয় তার সবচেয়ে বড় অপরাধ একজন রেডইন্ডিয়ান হয়েও দেশের শীর্ষ বিজ্ঞান প্রতিভা হতে যাচ্ছে।’
‘ঠিক বলেছিস। সব মিলিয়েই তার উপর বিপদ এসেছে। এখন কি হবে?’ বলে দুহাত দিয়ে কান্না রোধের জন্যে মুখ ঢাকল সে।
শিলা সুসান তাকে কাছে টেনে নিয়ে সান্ত¦না দিয়ে বলল, ‘আমি তোর পাশে আছি রোজ। আমি কিছুই না, কিন্তু এই চক্রকে আমি চিনি। সব কথা আজ তোকে আমি বলব না। তবে এটুকু জেনে রাখ, ঈশ্বর সহায় হলে সান ওয়াকারের কিছু হবে না। কিন্তু এই ঘটনা আমেরিকায় বড় ঘটনার জন্ম দেবে।’
‘ধন্যবাদ সুসান। তুই যদি চক্রটিকে চিনিস। তাহলে আমরা প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়ে কাজ করতে পারি।’
‘এদিকটাও আমি চিন্তা করছি। তবে ভাবছি, প্রাইভেট ডিটেকটিভরা ওদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পাবে কিনা? তবে কথা দিচ্ছি কিছু করার একটা সুযোগ আছে। আমি দেখব।’
‘ধন্যবাদ সুসান। তোর সাথে কথা বলে আমার শক্তি ফিরে আসছে। সানকে উদ্ধারের জন্যে যা করা দরকার তাই করব।’
থামল রোজ। থেমেই আবার বলল, ‘আমেরিকায় বড় ঘটনা ঘটার কথা বললি, সেটা কি?’
‘আমেরিকায় ইন্ডিয়ানদের মুভমেন্ট এখন খুবই সংহত। তার সাথে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার মুসলিম ও ব্ল্যাকদের শক্তি। হোয়াইট ঈগল-এর বর্ণবাদী আচরণের কারণে এই শক্তি আরও সংহত ও শক্তিশালী হবে। সানকে কিডন্যাপ করার ঘটনা এই সংঘাতকে একটা সিদ্ধান্তকারী দিকে নিয়ে যেতে পারে।’
‘হোয়াইট ঈগল’ এর নাম শুনেছি। ওরা তো অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপজ্জনক সংস্থা। ওরা কি এসবের সাথে যুক্ত আছে?’
একটু ভাবল সুসান। তারপর বলল, ‘দ্বিতীয় কাউকে বলবি না এই শর্তে বলছি, আমার বিশ্বাস ওরাই কিডন্যাপ করেছে সানকে।’
‘কি বলছিস তুই?’ আর্তনাদ করে উঠল মেরী রোজ এর কণ্ঠ। উদ্বেগ-আতংকে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে মেরী রোজ এর চোখ-মুখ।
শিলা সুসান মেরী রোজের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ভয় করিস না রোজ। ঈশ্বর বড় এবং ঈশ্বরের সাহায্যও বড়।’ বলে উঠে দাঁড়াল সুসান।
‘এখনি যাবি?’ বলল রোজ হতাশ কণ্ঠে।
শিলা সুসান বলল, ‘আমাকে অনেক খোঁজ-খবর নিতে হবে রোজ, আমি যাই। ভাবিস না, এটাই আমার এখন প্রধান কাজ।’
বলে সুসান বেরিয়ে এল রোজ এর ঘর থেকে।
ছুটল আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর দিকে। অনেক কথা বলতে হবে তাকে জিনা ক্রিষ্টোফারের সাথে। তার মাধ্যমে পৌছতে হবে হোয়াইট ঈগল’দের কাছে, জানতে হবে হোয়াইট ঈগল এর প্রধান আস্তানার খবর।

যখন জ্ঞান ফিরল আহমদ দেখল সে নরম একটি সুন্দর বিছানায় শুয়ে।
চোখ মেলে দেখল সে তার চারদিক।
ঠিক জেলখানার সেল জাতীয় নয়, তার চেয়ে বেশ বড় ঘর। এখানে আসার আগে আরও দু’জায়গায় সে থেকেছে। সে সব থেকে এ ঘরটা বেশ আলাদা।
বাহামার এক হাসপাতালে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বন্দী হবার পর এ পর্যন্ত তার তিনবার সংজ্ঞা ফিরেছে। দু’বার ভিন্ন দু’টি সেলে তার সংজ্ঞা ফিরেছে। সে দু’টি সেলই এর চেয়ে অনেক ছোট। তখন হাত পা বাঁধা অবস্থায় মেঝের কার্পেটের উপর তাকে পড়ে থাকতে হয়েছে।
ঐ দু’জায়গাতেই যখনই তার সংজ্ঞা ফিরেছে, তখনি তাকে আবার ইনজেকশন দিয়ে সংজ্ঞাহীন করে ফেলা হয়েছে।
আজ নরম বিছানা এবং গায়ে কম্বল দেখে অবাক হলো আহমদ মুসা। প্রথম অনুভুতির সময়ই তার মন খুশী হয়েছিল, সেকি কোন নিরাপদ আশ্রয়ে? মুক্ত করেছে কি কেউ তাকে কোন প্রকারে?
কিন্তু চারদিকে চাওয়ার পর তার ভুল ভেঙে যায়। বিছানা সুন্দর বটে, কিন্তু ঘরটা নিরেট বন্দীখানা। একটা মাত্র দরজা। জানালা একটিও নেই। অনেক উঁচুতে ছাদ। ঘরটি এয়ারকন্ডিশনড। কিন্তু এয়ারকন্ডিশনের যন্ত্রের কোথাও দেখতে পেল না। ভাবল আহমদ মুসা, গোটা বিল্ডিংটা হয়তো সেন্ট্রালী এয়ারকন্ডিশনড।
ঘরে তার শোবার ষ্টিলের খাট ছাড়া দ্বিতীয় কোন আসবাবপত্র নেই।
ঘরের সাথে এ্যাটাচট একটা টয়লেট আছে। টয়লেটে দরজা নেই। শুয়ে থেকেই আহমদ মুসা দেখতে পাচ্ছে টয়লেটে একটা বেসিন, একটা পানির টেপ এবং প্লাষ্টিকের একটা মগ ছাড়া আর কিছু নেই।
আহমদ মুসা ভাবল, নিশ্চয় এ ঘরের সাথে অডিও ও ভিডিও সংযুক্ত আছে। তার অর্থ আহমদ মুসার প্রতিটি মুভমেন্ট এবং কথাবার্তা মনিটর করা হচ্ছে। এই যে সে সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে, এটাও এতক্ষণে তাদের জানা হয়ে গেছে।
আবার কি তাকে ইনজেকশন দিয়ে সংজ্ঞাহীন করে রাখা হবে? তবে যাই হোক, বর্তমান শত্রু ভদ্রবেশী ভয়ানক কেউ হবে। ভদ্র আয়োজন দেখে তা বুঝা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল না কোথায় সে এখন। দু’বার স্থান পরিবর্তন করে সে তৃতীয় স্থানে এসেছে। এ জায়গাটা কোথায়?
বাইরে পায়ের শব্দে তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। পায়ের শব্দ দরজার বাইরে এসে স্থির হলো। দরজা খুলবে কি?
কারা ওরা?
আহমদ মুসা উঠে বসল।

সাইমুম সিরিজের পরবর্তী বই
মিসিসিপির তীরে