২৬. ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি সাগরে যাবার সময় ঘাটে যাদের দেখেছিলে, ফিরে এসেও আবার তাদেরই দেখলে?’
‘জ্বি হ্যাঁ।’ বলল আলী ওরমা।
আলী ওরমা ওকারী গ্রামের জেলে।
আহমদ মুসা তাকে নিয়োগ করেছিল দক্ষিণের মৎস্য ঘাটের উপর নজর রাখার জন্যে।
‘তুমি কটায় নৌকা নিয়ে সাগরে নেমেছিলে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘তিনটায়।’
‘তখন ঐ দু’জনকে কি অবস্থায় দেখেছিলে?’
‘ওরা জেটিতে একটা নৌকায় বসে শশা চিবুচ্ছিল।’
‘নৌকাটা কার?’
‘আমার।’
‘তোমার নৌকায় ওরা বসেছিল?’
‘জ্বি হ্যাঁ।’
‘তারপর?’
‘আমি যখন নৌকার কাছে গেলাম। ওরা যখন বুঝল নৌকা আমার, তখন ওরা নেমে এল। বলল, সাগরে নামবেন বুঝি? ঠিক আছে। আমরা এখানে বসে একটা বোটের অপেক্ষা করছিলাম। আপনাদের বাড়ি কোথায়? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেন, নরফোকে। বলে ওদের একজন।’
নরফোক টার্কো দ্বীপের মধ্যাঞ্চলের একটি গ্রাম। উত্তর প্রান্তের টার্কো বন্দর থেকে যে সড়কটি দক্ষিণে চলে এসেছে, গ্রামটি তার পাশেই।
গ্রামটি চেনে আলী ওরমা। গ্রামের সবাই কৃষ্ণাংগ। গ্রামের অধিকাংশ লোক আফ্রিকী ধরনের স্থানীয় ধর্মের অনুসারী। অবশিষ্টদের কিছু খৃষ্টান, কিছু মুসলমান। গ্রামে শ্বেতাংগ খৃষ্টান মিশনারীরা একটি গীর্জা ও একটি ক্লিনিক তৈরি করছে।
‘ঘাটে আসা লোক দু’টি কৃষ্ণাংগ। কার বোট? কে আসবে? আমি ওদের জিজ্ঞেস করি। মাছ আসবে। আমাদের একটা আয়োজন আছে। জবাব দেয় ওদের একজন।’
‘তারপর?’ জিজ্ঞেস করল আলী ওরমাকে আহমদ মুসা।
‘আমি নৌকা নিয়ে চলে যাই সাগরে। একটু আড়ালে গিয়ে আমি নজর রাখি কোন নৌকা বা বোট ঘাটের দিকে যায় কিনা। কিন্তু সন্ধ্যার আগে আমি ফেরা পর্যন্ত কোন বোট ঘাটের দিকে আসেনি।’ থামল আলী।
‘বলে যাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি ঘাটে ফিরে দেখলাম লোক দু’টি নেই। ভাবলাম অপেক্ষা করে চলে গেছে। ঘাটের আশপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে চিন্তা করলাম নিকটের কোন গ্রামে মাগরিবের নামায আদায় করে আবার চলে আসব। এই উদ্দেশ্যে ঘাট থেকে উঠে অল্প কিছু দূর আসতেই দেখলাম, নরফোক গ্রামের ঐ দু’জন ঘাটের দিকে আসছে। অবাক হলাম তারা আমাকে দেখে যেন চমকে উঠল। কিছুটা বিব্রত কণ্ঠে কৈফিয়তের সুরে বলল, এদিকটা একটু ঘুরে এলাম। দেখি বোটটা এসেছে কিনা। আমি কিছু বললাম না। ওরা চলে গেল। তবে আমি একটা গাছের আড়ালে এসে একটু দাঁড়ালাম। দেখলাম, আড়াল হবার পর ওরা আর এগুলো না। রাস্তার পাশেই একটু উঁচু টিলা ছিল। তারা ওখানে উঠে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হলো। আমি আর অপেক্ষা না করে চলে এসেছি।’
আলী থামলেও আহমদ মুসা কোন কথা বলল না।
ভাবছিল আহমদ মুসা।
বলল একটু পর, ‘এ ধরনের ঘটনা আর তো ঘটেনি?’
‘জ্বি তাই।’ বলল আলী।
‘মাছের নৌকার জন্যে এত দূর আসবে, এইভাবে অপেক্ষা করবে এটাও বাস্তব নয়।’
‘জ্বি।’
‘ওদের আচরণ ও কথার মধ্যে সঙ্গতি নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমারও তাই মনে হয়েছে স্যার।’
আবার ভাবনায় ডুবে গেল আহমদ মুসা।
অল্প পরে মুখ তুলে জর্জের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল, আমরা ক’জন সেখানে যাই। লোক দু’জন যদি এখনও থাকে, তাহলে ওদের ধরলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
মিটিং মুলতুবি করে উঠল সবাই।
জর্জ, ইসহাক আব্দুল্লাহ ও আবু বকরকে নিয়ে আহমদ মুসা এগুলো ঘাটের দিকে। পায়ে হেঁটে। সাথে থাকল আলী।
কিন্তু সেই উঁচু টিলায়, যেখানে আলী নরফোকের দু’জন লোককে দেখে গিয়েছিল, কাউকে পাওয়া গেল না।
অন্ধকারে চুপি চুপি তারা ঘাট পর্যন্ত গেল, এদিক ওদিক খুঁজল। কিন্তু কাউকে পেল না। ফিরল তারা।
সেই টিলা পার হয়ে কিছুটা পথ এসে আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। সবাউ দাঁড়াল আহমদ মুসাকে ঘিরে।
আহমদ মুসা কাছে টেনে নিল আলীকে। ফিসফিস করে তাকে বলল, ‘তোমাকে এখানে থেকে যেতে হবে। তুমি এখানে যে কোন স্থানে আত্মগোপন করে থেকে চারদিকে নজর রাখবে। সেই দু’জন কিংবা অন্য কাউকে পাও কিনা, সেটা খোঁজ করতে হবে। রাস্তা নয়, রাস্তার বাইরে দুর থেকে সব দিকে নজর রাখবে।’
বলে পকেট থেকে একটা গগলস বের করে আলীর হাতে দিল। বলল, ‘এটা বিশেষ ধরনের গগলস। এ দিয়ে অন্ধকারেও বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। সত্যিই তুমি যদি কাউকে দেখতে পাও, তাহলে তার পিছে পিছে থাকবে, চোখের বাইরে যেতে দেবে না। রাত দশটা পর্যন্ত তুমি যদি মসজিদে না ফের, তাহলে বুঝা যাবে তুমি কারো সন্ধান পেয়েছ। রাত সাড়ে দশটার দিকে আবু বকর সবাইকে খবর দিয়ে তোমার সন্ধানে আসবে। প্রশ্ন হলো তোমাকে তারা পাবে কি করে?
আহমদ মুসা একটু থেমে বলল, ‘রাত সাড়ে দশটায় আবু বকর এই গাছ তলায় গাছের আড়ালে বসবে, তোমাকেও গোপনে এখানে আসতে হবে।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসারা চলে না যাওয়া পর্যন্ত আলীকে গাছ তলার অন্ধকারে অপেক্ষা করতে বলে সবাই হাঁটা শুরু করল।
আহমদমুসাকে বাম, ডান ও পেছন থেকে বেষ্টন করে অগ্রসল হচ্ছিল অন্যরা।
পাশে হাঁটতে হাঁটতে জর্জ বলল, ‘আলীকে রেখে যাওয়ার কি দরকার ছিল?’
‘হ্যাঁ জর্জ, একবার সন্দেহের সৃষ্টি হলে তার শেষ পর্যন্ত দেখা উচিত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কাউকেই তো পাওয়া গেল না।’
‘হতে পারে ঘটনা কিছুই না। সত্যিই হয়তো মাছের নৌকার জন্যে অপেক্ষা করে তারা চলে গেছে। কিন্তু এমনও হতে পারে, তারা যায়নি। আমরা তাদের দেখতে পাইনি।’
‘কি হতে পারে ব্যাপারটা তাহলে?’ বলল জর্জ।
‘বলা মুষ্কিল। তবে এই ছোট্ট ঘাটটা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুনছো তো, অপরিচিত লোকজন গত সপ্তাহ দেড়-দুই ধরে সাউথ টার্কো দ্বীপে, বিশেষ করে এই অঞ্চলে বেশ দেখা গেছে। হতে পারে শত্রুর কেউ ওরা। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, ঐ ৩০ জন মানুষের কিভাবে কি হলো এবং কারা ঘটাল এই ঘটনা ইত্যাদি জানতে চায় তারা। এই মাছের ঘাটকে শত্রুরা আগেও ব্যবহার করেছে, আবারও করতে পারে।’
বলে আহমদ মুসা ইসহাক আব্দুল্লাহর দিকে তাকাল। বলল, আমি ও জর্জ এখন সিডি কাকেম যাচ্ছি। আবু বকর এখানে থাকল। তোমরা সাবধান থাকবে। রাত দশটার দিকে তোমরা একত্রিত হবে মসজিদ চত্বরে। তারপর আবু বকর এগুবে আলীর খোঁজে। তোমরা পেছনে থাকবে গোপনে।’
‘আমরা কতজন একত্র হবো?’ বলল ইসহাক আব্দুল্লাহ।
‘রাত দশটার মধ্যে যদি আলীর খবর না পাও, তাহলে সব শক্তি একত্র করবে। আমাকেও জানাবে টেলিফোনে।’
মসজিদ চত্বরে তখন পৌছে গেছে তারা। ওখানে একটা অটো হুইলার অপেক্ষা করছিল। সেই অটো হুইলারে উঠল আহমদ মুসা ও জর্জ। অটো হুইলার চলতে শুরু করল সিডি কাকেম গ্রামের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি চলতে শুরু করলে আহমদ মুসার হঠাৎ যেন মনে হতে লাগল, কি কাজ যেন অসম্পূর্ণ থাকল। তার মনে হলো, আলীর সাথে দেখা হবার পর আবু বকর ও ইসহাক আব্দুল্লাহরা কি করবে সে বিষয়ে তো কিছু বলা হয়নি।
পরক্ষণেই আবার তার মনে হলো, কিছু বলারও তো ছিল না। তারপর আহমদ মুসা মনের এলোমেলো চিন্তা বিদায় করে সামনের আলো অন্ধকারে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।
চলছে অটো হুইলার।

লায়লা জেনিফার সবার হাতে চায়ের পেয়ালা তুলে দিয়ে নিজের পেয়ালা নিয়ে সোফায় তার আসনে এসে বসেছিল।
গল্প চলছিল।
সুরাইয়া মাকোনি এবং সারা উইলিয়ামও আজই এসেছে জেনিফারদের বাড়িতে। মার্গারেট এসে পৌছেছে রাত আটটার দিকে। সারা উইলিয়াম ও সুরাইয়া মাকোনি এসেছে তার এক ঘণ্টা আগে। সুরাইয়া মাকোনী চায়ের পিয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমি ভাবতে পারছি না জেনিফার, সেই এশিয়ানটা পরিস্থিতি এমন ওলাট-পালট করে দিল কি করে? আমি তো ভেবেছিলাম, সে ওদের হাতে মারা পড়েছে।’
‘না, মাকোনি। মারা যাওয়ার কথা অমন করে মুখে এনো না।’ বলল জেনিফার ত্বড়িৎ গতিতে।
বলে একটা দম নিয়ে জেনিফার বলল, ‘আল্লাহ ওঁকে বাঁচিয়েছেন। আর বাঁচাবার জন্যে কাজ করেছেন জর্জ এবং মার্গারেট আপা। জর্জ তাঁকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়েছিল।’
লায়লা জেনিফারের কথা শেষ হতেই সারা উইলিয়াম বলল, ‘কিরে জেনিফার। এশীয় সম্পর্কে ‘মরার’ কথা শুনে অমন আঁৎকে উঠলি কেন? হৃদয় ঘটিত কোন ঘটনা সংঘটিত হয়েছে নাকি?’
এ কথার পর সারা উইলিয়াম ও সুরাইয়া মাকোনি দু’জনেই হেসে উঠল। ডাঃ মার্গারেটের মুখ একটু ম্লান হলো। আর গম্ভীর হয়ে উঠল লায়লা জেনিফারের মুখ।
কথা বলে উঠল লায়লা জেনিফার। বলল, ‘সারা তুমি ওঁকে দেখনি, ওঁকে জাননা, তাই এ কথা বলতে পারলে।’ গম্ভীর কণ্ঠ জেনিফারের।
ডাঃ মার্গারেট তাকাল জেনিফারের দিকে। তার চোখে একটা সন্ধানী দৃষ্টি। পরে ধীরে ধীরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি জেনিফারের সাথে একমত। তিনি ভিন্ন এক মানুষ। যতই তাঁকে দেখা যায় আনন্দ ও বিস্ময় শুধু বাড়েই।’
‘ঠিক বলেছেন ডাঃ মার্গারেট আপা। তিনি মাত্র অল্পক্ষণ আমার সামনে কথা বলেছেন। আমার মনে হয়েছিল, আমি নতুন এক পরিবেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষের সাথে কথা বলছি। আমি যেন সাম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। উনি উঠে গেলে আমি যেন বাধ্য হয়েছিলাম ওঁর সন্ধানে উঠে যেতে।’
বাইরের দরজায় নক হলো এ সময়।
‘উনি এসেছেন।’ বলে উৎকর্ণ হলো জেনিফার।
সংগে সংগে সবাই সচকিত হয়ে উঠল।
বলল সারাহ উইলিয়াম, ‘তুমি বুঝলে কি করে, জেনিফার? ওঁর গন্ধও চিনে ফেলেছ নাকি?’ হাসল সারা উইলিয়াম।
‘বলেছি, এভাবে কথা বলো না সারা। ওঁকে তুমি জান না। জান না তুমি, ওঁর সব কাজে শৃঙ্খলা আছে। দরজায় উনি নকও করেন একই নিয়মে।
বলে জেনিফার উঠে দাঁড়াল।
সবাই উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। জেনিফার বলল, ‘না উনি বৈঠকখানায় আসবেন না। সোজা উনি ওঁনার ঘরেই যাবেন।’
জেনিফার পা বাড়াল ড্রইং রুমের ভেতরের দরজার দিকে।
দরজার কাছে যেতেই দরজায় এসে দাঁড়াল পরিচারিকা। বলল, ‘স্যার তাঁর রুমে গেছেন। আরেকজন এসেছেন। ড্রইং রুমে আসতে চাচ্ছেন।’
জেনিফার ‘কে’ বলে মুখ বাড়াল দরজায়। দেখল, জর্জ দাঁড়িয়ে।
একটা রক্তিম আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল জেনিফারের মুখ। বলল, ‘এসো।’
সালাম দিয়ে ড্রইং রুমে প্রবেশ করল জর্জ। তার পেছনে পেছনে লায়লা জেনিফার।
সারা ও মাকোনি উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাল জর্জকে।
ডাঃ মার্গারেট উঠেনি।
‘কেমন আছ আপা?’ ডাঃ মার্গারেটকে লক্ষ্য করে বলল জর্জ।
‘ভাল। তুমি কেমন আছ?’
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলল জর্জ।
‘তোমার চিঠি পেেিয় সব জেনে আমি থাকতে পারলাম না। চলে এলাম। অসুবিধা হলো না তো জর্জ? উনি কিছু মনে করবেন না তো?’ ডাঃ মার্গারেট বলল।
‘না আপা। তোমরা সবাই এসেছ জেনে খুশীই হবেন।’ জর্জ বলল।
‘কোথায় উঠব? জেনিফারদের এখানেই উঠলাম। জেনিফার নিশ্চয় বেজার হয়নি।’ বলল ডাঃ মার্গারেট ঠোঁটে হাসি টেনে।
সলাজ হাসি ফুটে উঠেছিল জেনিফারের মুখে।
সেদিকে তাকিয়ে জর্জ হেসে বলল, ‘আপা তুমি জেনিফারকে নতুন মানুষ দেখবে।’
কৃত্রিম ক্ষোভে ফুসে উঠল লায়লা জেনিফার। বলল, ‘দেখ জর্জ, এতে তোমার কোন কৃতিত্ব নেই। তোমার ভাগ্য, আহমদ মুসার মত ব্যক্তি তোমার উকিল হয়েছেন।’
আহমদ মুসার নাম উচ্চারণ করে কথা শেষ করার পরেই জিহ্বায় কামড় দিল জেনিফার। সংগে সংগে ভয় ও অপরাধের চিহ ফুটে উঠল তার মুখে। সংকুচিত হয়ে পড়ল সে।
আহমদ মুসা নাম শুনে সবাই চমকে উঠেছিল। জর্জ তার চোখ দু’টি বিস্ফোরিত করে বলল, ‘আহমদ মুসা? কে আহমদ মুসা?’
বিমূঢ় লায়লা জেনিফার কিছুক্ষণের জন্যে পাথরের মত শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
জর্জের সরব প্রশ্ন উত্থিত হবার পর লায়লা জেনিফার যন্ত্রচালিতের মত ড্রইং রুমের ভেতরের দরজার দিকে এগিয়ে দরজা লক করে ফিরে এল তার সোফায়।
চারদিক থেকে সবাই ছেঁকে ধরল লায়লা জেনিফারকে। বিব্রত জেনিফার।
‘জেনিফার, আহমদ আব্দুল্লাহই কি আহমদ মুসা?’ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ডাঃ মার্গারেট।
কথা বলল না। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল জেনিফার।
ডাঃ মার্গারেট, জর্জ, মাকোনী, সারা উইলিয়াম সকলের মধ্যেই একটা স্তব্ধতা নেমে এল।
বিস্ময়, আনন্দ ও অভাবিত পাওয়ার এক প্রবল বন্যায় সকলের মধ্যেই আত্মহারা ভাব।
নীরবতা ভাঙল ডাঃ মার্গারেট। বলল, ‘তিনি আহমদ মুসা হলেই শুধু তিনি যা তার সাথে মানায়।’
‘এখন মনে হচ্ছে, তিনি আহমদ মুসা না হওয়াই অবিশ্বাস্য। কিন্তু বিশ্বাস হতে চাইছে না তিনি আমাদের মাঝে।’ বলল সারা উইলিয়াম।
‘তাঁকে প্রথম দেখেই মনে করেছিলাম তাঁর আহমদ মুসা হওয়া উচিত।’ মাকোনী বলল।
‘জেনিফার পরিচয়টা না দিলেই ভাল ছিল। এখন ভয় ও সংকোচে মনটা যে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আর লজ্জা রাখব কোথায়, তার সাথে কত কি বেয়াদবি এ কয়দিনে হয়ে গেছে!’ বলল জর্জ।
জেনিফার উঠে দাঁড়ালো। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, ‘সত্যি আমার একটা অপরাধ হয়ে গেছে। ওঁর পরিচয় কাউকে যখন উনি বলেননি, এমনকি আম্মা ও দাদিকেও নয়, তখন আমার এভাবে বলে ফেলাটা অন্যায় হয়েছে। আমার ভয় হচ্ছে, উনি একে কি চোখে দেখবেন।’ থামল একটু।
তারপর সবার দিকে চেয়ে ফিসফিস করে আবার বলল, ‘সবাইকে অনুরোধ সকলে দয়া করে বিষয়টা গোপন রাখবেন। পরিচয় দিতে চাইলে উনিই দেবেন। আমাদের কাছ থেকে তাঁর পরিচয় আর কেউ না জানুক।’
‘ঠিক বলেছ জেনিফার। কিন্তু বল, তোমার সাথে পরিচয় হলো কি করে? উনি কি তোমাকে বলেছেন তার পরিচয়?’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘না বলেননি। উনি ওকারী গ্রামে আমাকে উদ্ধার করা থেকে শুরু করে তার কাজ, কথাবার্তা, সিডি কাকেমে আসার পথে চারটি লাশ গোপন করাসহ ঘটনাবলী দেখে আমিই তাঁকে গাড়িতে বলেছিলাম তিনি আহমদ মুসা। তিনি স্বীকার করেছিলেন মাত্র।’ লায়লা জেনিফার বলল।
জেনিফার থামলে আবার নেমে এল নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙল ডাঃ মার্গারেট। অনেকটা স্বগত কণ্ঠের মত বলল, ‘এখন পরিবেশ, পরিস্থিতি সবকিছুই নতুন মনে হচ্ছে। মুহূর্তেই যেন পাল্টে গেল সব। মনে হচ্ছে, আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশটা হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
‘এই পরিবর্তন কেন? ব্যক্তি আহমদ মুসা তো আজকের আগেও আমাদের মাঝে ছিলেন।’ বলল সারা উইলিয়াম।
‘এটা বোধ হয় তাঁর নামের সাথে আল্লাহর দেয়া একটা শক্তি।’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘কিন্তু ব্যক্তির প্রভাব ও নামের শক্তি কি আলাদা হতে পারে?’
‘পারে না। নাম যে গুণগুলো বহন করে, ব্যক্তি সে কাজগুলোই করবে। কিন্তু নামের যে প্রভাব ব্যক্তি তা হঠাৎ করে সৃষ্টি করতে পারে না।’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
থামল একটু ডাঃ মার্গারেট। পরক্ষণেই আবার শুরু করল, ‘এই কারণেই আহমদ মুসার নাম আমাদের সামনে একটা নতুন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।’
‘ধন্যবাদ ডাঃ মার্গারেট, আমি অন্য একটা কথা বলতে চাচ্ছি। জেনিফারের কথা। জনাব আহমদ মুসা জর্জের উকিল হলো কি করে?’ বলল মাকোনী।
জেনিফারের মুখ লাল হয়ে উঠল।
ডাঃ মার্গারেট মুখ টিপে হাসল। কিছু বলতে যাচ্ছিল সে। এই সময় পাশে রাখা তার মোবাইল টেলিফোন বেজে উঠল। ডাঃ মার্গারেট টেলিফোন তুলে নিল। কথা বলল।
গ্র্যান্ড টার্কস থেকে তার বান্ধবীর টেলিফোন। কথা বলতে বলতে মুখ ম্লান হয়ে গেল মার্গারেটের। মুখে ফুটে উঠল ভয়ের চি‎হ্ণ।
টেলিফোন রেখেই সে শুকনো কণ্ঠে বলল, ‘খুব খারাপ খবর মনে হয়। হোয়াইট ঈগলের বিরাট বাহিনী নাকি এই সাউথ টার্কো দ্বীপে আসছে।’
জর্জ চমকে উঠল ডাঃ মার্গারেটের কথা শুনে। জিজ্ঞেস করল, ‘কে দিল এই খবর?’
‘মেরী।’
‘তাহলে বিষয়টা তো এখনই জনাব আহমদ মুসাকে জানাতে হয়।’
বলেই জর্জ ছুটল ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসার রুমের দিকে।
মিনিট খানেকের মধ্যে জর্জ ফিরে এল আহমদ মুসাকে নিয়ে।
আহমদ মুসা ড্রইং রুমে ঢুকতে গিয়ে দরজায় থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যরি, আপনারা অনেকে দেখছি এখানে আছেন। আমি বরং….।
ডাঃ মার্গারেটসহ সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল। মুহূর্তে সবার মাথায় উঠে গেছে ওড়না। পোশাকের আবরণের ভেতর সবাই সবাইকে যেন সংকুচিত করে নিয়েছে। দ্রুত ড্রইং রুমের একদিকে তারা সরে এসেছে দু’টি সিংগল সোফা খালি করে।
আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে লায়লা জেনিফার বলল, ‘না ভাইয়া আপনি বসুন। অপরিচিত দু’জন অন্য কেউ নয়। মাকোনীকে তো আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছেন। আর এ আমার মামাতো বোন সারা উইলিয়াম।’ মাকোনী ও সারা উইলিয়ামকে দেখিয়ে বলল জেনিফার।
আহমদ মুসা সকলকে সালাম দিয়ে মাকোনীর দিকে চেয়ে হেসে বলল, ‘আপনি কেন সেদিন আমাকে সহযোগিতা করতে পারেননি, সেটা আমি হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরেই বুঝেছিলাম। আরও বুঝেছিলাম, ঐভাবে খোলামেলা জিজ্ঞেস করা আমার ঠিক হয়নি।’
সংকুচিত, লজ্জিত মাকোনী বলল, ‘আমি সেদিনের ঘটনার জন্যে দুঃখিত।’
‘না বোন মাকোনী, দুঃখিত আমার হওয়া উচিত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন?’ বলল মাকোনি মুখ নিচু রেখেই।
‘সেদিন বিবেচনায় আমার বিরাট ভুল হয়েছিল। আমি এখানকার শত্রুর শক্তিকে ছোট করে দেখেছিলাম। তাই একবারও ভাবিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের উপর শত্রুরা চোখ রাখতে পারে। অন্য কারো সামনে জেনিফারের কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করা ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এ ভুল সিদ্ধান্তের শাস্তি আমি পেয়েছি।’
‘ধন্যবাদ জনাব। এভাবে আপনি নিজেকে ছোট করতে পারে বলেই হয়তো আপনি এত বড়।’ বলল মাকোনি আবেগ জড়িত কণ্ঠে।
‘বোন মাকোনি। কখনও প্রশংসা করলে শুধু আল্লাহরই করবেন।’ গম্ভীর কণ্ঠ আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার এ কণ্ঠে সবাই তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। একটা বিব্রত ভাব সকলের চোখে।
‘স্যরি।’ বলল মাকোনি।
‘ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা গিয়ে সোফায় বসল।
বসল সবাই।
আহমদ মুসা বসেই বলল, ‘ডাঃ মার্গারেট আপনাকে যে খবর দিয়েছে সে কে?’ আহমদ মুসার চোখ নিচু। মুখে ভাবনার চিহ্ণ।
ডাঃ মার্গারেট পাশের সোফায় বসে ছিল। সে মুহূর্তের জন্যে চোখ তুলে একবার আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘জানিয়েছে আমার এক বান্ধবী।’
‘কি করে জানতে পারল সে?’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বিপরীত দিকে রাস্তার ওপাশে স্বাস্থ্য দফতর পরিচালিত সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোর। সে ষ্টোরেরই সেলস ম্যানেজার আমার সেই বান্ধবী। কিছুক্ষণ আগে দু’জন লোক, যার একজন সানসালভাদরের, ঐ দোকানে ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে গিয়েছিল। তাদের তাড়াহুড়া দেখে আমার বান্ধবী কারণ জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তরে তারা জানায়, আমাদের খুব তাড়াতাড়ি সাউথ টার্কো দ্বীপে পৌছতে হবে। কেন সেখানে কোন দূর্ঘটনা…….? জিজ্ঞেস করেছিল আমার বান্ধবী। আমার বান্ধবীকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তারা বলে, না দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে সুর্ঘটনা ঘটবে সেখানে। তাহলে ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রয়োজন কেন? বলেছিল আমার বান্ধবী। সুলক্ষ্যের জন্যে যুদ্ধ কি সুঘটনার মধ্যে পড়ে না? বলেছিল তাদের একজন। তা পড়ে। কিন্তু তার জন্যে এত তাড়াহুড়া কেন? জিজ্ঞেস করে আমার বান্ধবী। আমরা অনেক লোক যাচ্ছি তো। প্রস্তুত হয়ে বের হতেও তো সময় লাগবে। তারা বলেছিল।
এসব কথা থেকেই আমার বান্ধবীর মনে হয়েছে সাউথ টার্কো দ্বীপে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সাউথ টার্কো দ্বীপে আমি এসেছি এবং সাউথ টার্কোতে এ পর্যন্ত কি ঘটেছে সে জানে। সুতরাং তার মনে সন্দেহ উদয় হবার সাথে সাথে সে টেলিফোন করেছে আমার কাছে।’ বলল মার্গারেট।
আহমদ মুসা গভীরভাবে ভাবছিল। ডাঃ মার্গারেট কথা শেষ করলেও আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না।
একটু পরেই চকিতে একবার মুখ তুলে ডাঃ মার্গারেটের দিকে চেয়ে বলল, ‘তাদের তাড়াহুড়া কেন ছিল বলুন তো?’
‘অনেক কিছু অনুমান করা যায়, কিন্তু ঠিক করে বলা মুষ্কিল।’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘অনুমান একটা এই হতে পারে যে, সাউথ টার্কো দ্বীপে তাদের মূল লোকেরা এসেছে সানসালভাদর থেকে। তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম সম্ভবত সাথে আনতে পারেনি ভুলের কারণে। তাই তাড়াহুড়া করে সংগ্রহ।’
ডাঃ মার্গারেট হাসল। বলল, ‘আমার মনে হয় এই অনুমানটা সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি।’
আবার ভাবনায় ডুব দিয়েছে আহমদ মুসা।
এবার মুখ তুলে তাকাল জর্জের দিকে। বলল, ‘জর্জ, আমরা ওকারী গ্রামে মৎস বন্দরের দু’জন সন্দেহজনক লোক সম্পর্কে যা শুনে এলাম, তার সাথে ডাঃ মার্গারেটের দেয়া তথ্য মেলালে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, সাউথ টার্কো দ্বীপে একটা বড় ধরনের অভিযান আসছে এবং তা আসছে ঐ মৎস বন্দরের পথেই।’
‘বড় ধরনের অভিযান?’ শুকনো কণ্ঠে বলল জর্জ।
শুধু জর্জ নয় আহমদ মুসার শেষ কথাটা মুহূর্তেই সকলের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। উদ্বেগ ফুটে উঠেছে সবার চোখে-মুখে।
জর্জের সভয় প্রশ্নের জবাবে আহমদ মুসা বলল, ‘হ্যাঁ অভিযানটা বড় ধরনেরই হবে। সুদূর সানসালভাদর থেকে ছোট-খাট অভিযানের জন্যে তারা আসছে না নিশ্চয়। ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ থেকে বুঝা যায়, বেপরোয়া ধরনের কোন অভিযান নিয়ে তারা আসছে।’
‘সুদূর সানসালভাদর থেকে কেন কাছে কোথাও থেকে কেন নয়? বলল জর্জ।
‘এর উত্তর জানি না। পরে খোঁজ নেয়া যাবে। আমার মনে হয় তাদের একটা বড় কেন্দ্র হতে পারে সানসালভাদর। স্থানীয় উদ্যোগ বড় ধরনের মার খাওয়ার পর ওরা আসছে যুদ্ধে জেতার জন্যে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘আমি এখন উঠব। এখনি যেতে হবে ওকারী গ্রামে।’
জর্জসহ মেয়েদের সকলের মুখ ভয় ও উদ্বেগে আচ্ছন্ন। কিন্তু আহমদ মুসার ঠোঁটের স্বাভাবিক হাসিটি তখনও মিলায়নি।
আহমদ মুসা থামতেই লায়লা জেনিফার বলল, ‘তাহলে সাউথ টার্কো দ্বীপের উপর ভয়ানক বিপদ ঘনিয়ে আসছে?’
‘ভয়ানক কিনা জানিনা, তবে একটা বিপদ তো আসছেই।’
‘আপনি ওকারী গ্রামে চলে গেলে আমাদের এখানে কি করণীয় হবে?’ লায়লা জেনিফার বলল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি জর্জকে রেখে যাচ্ছি। সে এখানকার আলী রুফাই, ওমর লাওয়াল ও রমযান ইরোহাকে নিয়ে প্রতিরক্ষার একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।’
বলে তাকাল আহমদ মুসা জর্জের দিকে। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে জর্জ?’
‘ঠিক আছে ভাইয়া। আপনার আদেশ সর্বশক্তি দিয়ে পালন করব।’ শুকনো, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল জর্জ।
আহমদ মুসা হেসে উঠল।
‘হাসছেন যে ভাইয়া?’ ম্লান কণ্ঠে বলল জর্জ।
‘হাসছি তোমার ভীত, উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শুনে।’
‘কিন্তু ভাইয়া, আপনার হাসি দেখে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা কিছুই নয়। অথচ সাংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’ বলল জেনিফার।
‘জর্জের পক্ষ নেবার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ জেনিফার। তুমি ঠিকই বলেছ, হয়তো সাংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু একে ভয় পাবার কিছু নেই।’
‘সাংঘাতিক কিছু তো অবশ্যই ভয় পাবার মত।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ভয় পেলে সাংঘাতিক বহুগুণ সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে যুদ্ধের আগেই পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায়।’
‘আপনার একটুও ভয় করছে না?’ লায়লা জেনিফার বলল।
একটা গাম্ভীর্যের ছায়া নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। তাকাল জেনিফারের দিকে। বলল, ‘ভয় কাকে করব বলত? আমি যে আল্লাহকে ভয় করি, যে আল্লাহকে আমি আমার অভিভাবক, রক্ষাকর্তা বলে মনে করি, সেই আল্লাহ তো অন্য কাউকে ভয় করতে নিষেধ করেছেন। আর ভয় আমি কেন করব বলত? সর্ব শক্তিমান আল্লাহ আমার সাথে আছেন, আমি আমাকে শত্রুর চেয়ে দুর্বল ভেবে ভীত হবো কেন?’
আহমদ মুসা কথা শেষ করলেও কেউ কোন কথা বলল না। সবার চোখে একটা বিস্ময় ও আনন্দের ঔজ্জ্বল্য।
নীরবতা ভাঙল ডাঃ মার্গারেট। বলল, ‘আমি অহেতুক ভয় করার কথা বলছি না। কিন্তু শত্রুর চেয়ে আসলেই দুর্বল হলে সে বাস্তবতা চাপা দেয়া কি ঠিক?’
‘দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত থাকা এবং ভয় করা, দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত থাকলে তবেই তো মোকাবিলার উপযুক্ত ষ্ট্রাটেজি গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু ভয় করলে মোকাবিলার আগেই অর্ধেক পরাজয় হয়ে যায়।’
‘বুঝতে পেরেছি। ধন্যবাদ।’ বলল ডাঃ মার্গারেট মুগ্ধ চোখে।
মার্গারেটের কথা শেষ হতেই সারা উইলিয়াম বলল, ‘আপনি বহুবার বন্দী হয়েছেন, বহুবার মৃত্যুর মুখে পড়েছেন, সে সময়গুলোতে আপনার কেমন মনে হতো, কি ভাবতেন আপনি?’
‘সারা?’ তীব্র কণ্ঠে বলল লায়লা জেনিফার।
সারা উইলিয়াম জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল, ‘স্যরি।’
সারা উইলিয়াম ও লায়লা জেনিফার দু’জনের দিকেই তাকাল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে তাকাতে দেখে লায়লা জেনিফার লজ্জা পেল সারাকে ঐভাবে ধমকে উঠার জন্যে। বলল সেও, ‘স্যরি।’ বিব্রত চেহারা লায়লা জেনিফারের।
বুঝল আহমদ মুসা। হাসল সে। বলল, ‘বিব্রত হওয়ার কি আছে জেনিফার। যা গোপন নেই, আমার কাছে গোপন করার প্রয়োজন কি?’
‘ভাইয়া………।’ জেনিফার কথা বলতে পারলো না। কেঁদে ফেলল জেনিফার ক্ষোভে, লজ্জায়।
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘তোমাদের কাছে আমার পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজন নেই। এখানকার শত্রু বা প্রতিপক্ষের কাছে আমার পরিচয় গোপন রাখা প্রয়োজন এ জন্যে যে, আমার পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়লে প্রতিপক্ষরা একদিকে সাবধান হবে, অন্যদিকে ওদেরকে সাহায্য করার জন্যে আমার পুরনো শত্রুদের অনেকেই ছুটে আসবে।’
লায়লা জেনিফার চোখ মুছে বলল, ‘তাহলে আমি অন্যায় করিনি ভাইয়া?’
‘অবশ্যই না।’ বলে আহমদ মুসা আবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
‘আমরা সৌভাগ্যবান, আপনাকে আমার অভিনন্দন।’ বলল ডাঃ মার্গারেট আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
‘ডাঃ মার্গারেট, অভিনন্দনটা আগামী হয়ে গেল। দোয়া করুন।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল জর্জকে, ‘চল, দেখ গাড়িতে তেল আছে কিনা। এখনি যেতে হবে।’
জর্জ উঠে দাঁড়াল।
‘একটা কথা বলতে পারি?’ বলল ডাঃ মার্গারেট আহমদ মুসাকে।
‘আহমদ মুসা চলতে শুরু করেছিল। থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘বলুন।’
‘ওরা তো অনেক ঔষধ, অনেক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। আমি একজন ডাক্তার। আমি কি আপনাদের সাথী হতে পারি?’
আহমদ মুসার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ ডাঃ মার্গারেট। অবশ্যই সাথী হতে পারেন, এক সময় সাথী হতে হবে। কিন্তু আজ আপনি গেলে, জর্জকেও যেতে হবে। কিন্তু আমি চাই, জর্জ এখানে থাকুক। সুতরাং আপনিও এখানেই থাকুন।’
‘আরেকটা কথা।’ বলল ডাঃ মার্গারেট।
‘বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সারা উইলিয়াম একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল, তার জবাব দেননি।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এ প্রশ্নের কি জবাব দেব? এই যে আজ বেরুচ্ছি, জীবন এবং মৃত্যু দুই-ই আমার সাথে। আমি এ নিয়ে কিছুই ভাবছি না। জীবন মৃত্যুর মালিক যিনি, ভাবনা তাঁর, সিদ্ধান্তও তাঁরই।’
বলে আহমদ মুসা সালাম দিয়ে পা বাড়াল বাইরে বেরুবার জন্যে।
বেরিয়ে গেল ড্রইংরুমের থেকে। তার পিছে পিছে জর্জও।
আহমদ মুসার যাত্রাপথের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল ওরা চারজন।
আহমদ মুসা বেরিয়ে গেছে, কিন্তু ওদের চোখের পলক পড়েনি, দৃষ্টি তাদের ফিরে আসেনি।
এক সময় ঠোঁট ফুঁড়েই যেন কথা বেরুল ডাঃ মার্গারেটের। বলল, ‘জেনিফার, মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের কথা শুনেছিলাম। আজ দেখলাম এক অপরূপ মৃত্যুঞ্জয়ীকে।’ ধীর এবং ভারী কণ্ঠ ডাঃ মার্গারেটের।
মার্গারেটের কণ্ঠস্বরে ওরা তিনজন ফিরে তাকাল মার্গারেটের দিকে।
ধপ করে বসে পড়ল মার্গারেট সোফায়। বসল ওরা তিনজনও।
কথা বলল মার্গারেটই আবার। বলল, ‘কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত যে ভয় আমাকে পেয়ে বসেছিল, সে ভয় এখন আর নেই আমার।’
‘সত্য বলেছেন আপা। মনের অজানা একটা দুয়ার যেন খুলে গেছে। নিজেকে অনেক সাহসী ও শক্তিশালী মনে হচ্ছে।’ বলল লায়লা জেনিফার।
‘এ জন্যেই আহমদ মুসা অমন জগৎজয়ী আহমদ মুসা হতে পেরেছে। সে ব্যক্তি মাত্র নয়, সে যেন সাধনার সেই পরশমণি। লোহাও ওঁর সান্নিধ্যে সোনা হয়ে যায়।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল মাকোনি। কিন্তু মুখ হা করেই থেমে গেল।
ড্রইং রুমে প্রবেশ করল জেনিফারের মা ও দাদী। বলল জেনিফারের মা, ‘কি ব্যাপার? কি ঘটেছে ওকারী গ্রামে? কয়েক টুকরো রুটি মুখে দিয়েই আমাদের আহমদ আব্দুল্লাহ (আহমদ মুসা) আবার ছুটে গেল ওকারী গ্রামে?’
‘আম্মা, আজ রাতেই শত্রুদের একটা বড় অভিযান আসছে আমাদের সাউথ টার্কো দ্বীপে।’ বলল লায়লা জেনিফার।
শুনে জেনিফারের মা ও দাদী দু’জনেই হতাশ ভাবে বসে পড়ল সোফায়। বলল জেনিফারের দাদী, ‘তাহলে কি টার্কো দ্বীপপুঞ্জ থেকেও আমাদের ভাত উঠল? এরপর কোথায় যাব আমরা? কে আমাদের জায়গা দেবে?’
উদ্বেগ, আতংকে ছেয়ে গেছে জেনিফারের মা ও দাদীর মুখ।
‘দোয়া করুন দাদী। বড় বিপদ ঠিকই। কিন্তু দাদী, বহু শতাব্দীর অব্যাহত পরাজয়ের পর আমরা প্রথমবার জিততে শুরু করেছি। এবার আমাদের বিজয়ের পালা।’ বলল জেনিফার আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে।
‘আল্লাহ আমাদের আহমদ আব্দুল্লাহকে সাহায্য করুন। তার হাতেই তো আমাদের বিজয় আসতে শুরু করেছে।’ বলল জেনিফারের মা।
‘আমিন।’ সকলে একযোগে বলে উঠল।

আহমদ মুসা ওকারী গ্রামের মসজিদে এসেই শুনল, আলী ওরমা রাত দশটার মধ্যে ফেরেনি। তার পরেই আবু বকর ক’জনকে নিয়ে ওদিকে চলে গেছে।
আহমদ মুসার মন চঞ্চল হয়ে উঠল। বুঝল, আলী নিশ্চয় সন্দেহজনক কারও দেখা পেয়েছে। তাহলে হোয়াইট ঈগল এই পথেই দ্বীপের মুসলিম অবস্থানের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদের পথকে এত তাড়াতাড়ি চি‎িহ্ণত করতে পারায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে রাস্তায় কথা বলতে দেখে মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল ইসহাক আব্দুল্লাহ, কলিন কামাল এবং ফরিদ নোয়ানকো।
আহমদ মুসার সামনে আসতে আসতে ইসহাক আব্দুল্লাহ বলল, ‘আবু বকর দশ মিনিট আগে তিনজনকে সাথে নিয়ে আলীর সাথে দেখা করতে গেছে।’
আহমদ মুসা তার কথার দিকে কান না দিয়ে বলল, ‘তোমার আব্বা কোথায়?’
ইসহাক আব্দুল্লাহ মুখ খুলতে যাচ্ছিল। সেই সময় তার আব্বা আব্দুর রহমান ওকারীকে আহমদ মুসার দিকে আসতে দেখা গেল।
সে আসতেই আহমদ মুসা তাকে সালাম দিয়ে বলল, ‘জনাব হোয়াইট ঈগল বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এ দ্বীপে আসছে। আজ রাতেই কোন এক সময় আক্রমণ হবে এবং মনে হচ্ছে এ ঘাটেই তারা ল্যা- করবে।’
আব্দুর রহমান ওকারীর চোখে-মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল। বলল, ‘আলী কিংবা আবু বকর কেউতো ফেরেনি। এটা জানা গেল কিভাবে?’
‘আজ সন্ধ্যায় জর্জের বোন এসেছে ‘গ্রান্ড টার্কস’ থেকে। তাকেই একজন টেলিফোন করে জানিয়েছে। তার উপর আলী দশটার মধ্যে না ফেরায় প্রমাণিত হচ্ছে সেও সন্দেহজনক কিছু দেখেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সকলের চোখে-মুখে চিন্তা ও উদ্বেগের ছায়া।
আহমদ মুসা সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার, তোমরা কি ভয় করছ?’
ম্লান হাসল ইসহাক আব্দুল্লাহ। তাড়াতাড়ি বলল, ‘না ভাইয়া, আমরা ভাবছি, আপনি পাশে থাকলে, যে কোন কিছুর মোকাবিলায় আমরা দাঁড়াতে পারি।’
‘অবশ্যই।’ বলে উঠল কলিন কামাল ও নোয়ানকো একযোগে।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের এখন দু’টি কাজ। এক, গ্রামের ট্রেনিং প্রাপ্ত সকলকে এই মসজিদ চত্বরে এনে জমা করা। দুই, কয়েকজনকে এখনি আবু বকরের সাথে যোগ দিতে হবে। ওদিকের সব অবস্থা জেনে এখানে এসে আমাদের কৌশল ঠিক করতে হবে। আমি, কলিন ও নোয়ানকো আবু বকরের ওদিকে যাই। ইসহাক আবদুল্লাহ এদিকটা দেখ।’
‘আমিও যাব।’ ইসহাক আবদুল্লাহ বলল।
‘অসুবিধা নেই। আমি অন্যদের নিয়ে এ দিকটা ম্যানেজ করবো। আমি গ্রামের দিকে বেরুচ্ছি।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহর আব্বা আবদুর রহমান ওকারী।
‘জর্জকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি সিডি কাকেম এলাকার।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার শুরু করল, ‘আমি যতদূর জানতে পেরেছি, ওরা বড় ধরনের দল নিয়ে আসছে। এ বিষয়টা কারও কাছে লুকানো ঠিক হবে না। তবে কেউ যদি ওদের মোকাবিলার প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ততা অনুভব করে, তাহলে তাকে আমাদের সাথে শামিল হতে বাধ্য করা ঠিক হবে না। নিজেদের বিশ্বাস, নিজেদের সমাজ স্বজাতি, নিজেদের মাটি রক্ষার জন্যে যারা জীবন দিতে প্রস্তুত, তাদের সংখ্যা কম হলে ক্ষতি নেই। এঁরা আল্লাহর সাহায্য পাবেন।’
আবদুর রহমান ওকারী আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাঁর চোখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল অবাক বিস্ময়।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এমন করে কেউ কোনদিন আমাদের বলেনি। এমন বিশ্বাসের কথা, এমন আবেগের কথা আমাদের জানাই ছিল না। আল্লাহর সাহায্য এভাবে পাওয়া যায়, ভাবনায়ও আসেনি কোনদিন আমাদের। এতকিছু তুমি জান, এমনভাবে তুমি বলতে পার, কে তুমি বাবা?’
আহমদ মুসা বলল, ‘আমি আপনাদের ভিনদেশী এক ভাই। আর কিছুর কি দরকার আছে?’
বলে আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে চেয়ে বলল, ‘তোমরা কি প্রস্তুত? আমরা এখনি যাত্রা করব।’
‘আমরা প্রস্তুত।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘তোমাদের তিনজনের পকেটেই কি রিভলবার আছে? আহমদ মুসা বলল।
ইসহাক আবদুল্লাহ উত্তর দিল না। তারা তিনজন পরষ্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। একটু পর ইসহাক আবদুল্লাহ বলল, ‘না ভাইয়া, আমাদের কারো পকেটেই রিভলবার নেই।’
‘চাকু বা ছোরা আছে?’
ইসহাক আবদুল্লাহ আবার অন্য দু’জনের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে বলল, ‘না নেই।’
‘তাহলে প্রস্তুত কেমন করে তোমরা?’
‘আমরা মনে করছি, কি অবস্থা তার খোঁজ নিতে যাচ্ছি, লড়াইয়ে তো যাচ্ছি না। তাই….।’
কথা শেষ না করেই থেমে গেল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘দেখ বর্তমান অবস্থায় একজন মুসলিমকে সব সময় পুলিশ ও সৈনিকের ভূমিকায় থাকতে হবে। আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি। রিভলবার ও চাকুর মত অস্ত্র সব সময় সাথে থাকতে হবে। যাও তৈরি হয়ে এসো।’
ওরা তিনজনই ছুটে চলে গেল।
আবদুর রহমান ওকারীও আহমদ মুসাকে সালাম দিয়ে ‘যাই ওদিকের ব্যবস্থা করি’ বলে হাঁটাতে শুরু করল।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওরা তিনজনই ফিরে এল।
আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে পেছনে ওরা তিনজন।
হাঁটতে হাঁটতে ইসহাক আবদুল্লাহ, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’
‘সেটাই ভাবছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন সেই গাছতলায়, যেখানে আলীর সাথে আবু বকরদের দেখা করার কথা, সেখানেই কি প্রথমে যাব না?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘সেখানেই তো যাওয়ার কথা। ভাবছি, আলী আর আবু বকরের দেখা হলো কিনা? দেখা হলে তারা সেখানে এখনও আছে কিনা। যা পরিস্থিতি, তাতে আমার মনে হচ্ছে আলীর দেখা পাওয়ার পর আবু বকর প্রস্তুতির জন্যে বা খবর দেয়ার জন্যে এতক্ষণ ফেরার কথা। কিন্তু ফিরল না কেন?’
‘তাহলে?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘তবু ওখানেই প্রথম যেতে হবে আমাদের।’ আহমদ মুসা বলল।
সেই গাছতলা ঘাটের খুব কাছাকাছি। এখান থেকে গন্তব্যস্থল এখনও বেশ দূরে। আহমদ মুসা আগে চলছিল। পেছনে ওরা তিনজন। আহমদ মুসা চারদিকে সাবধানী দৃষ্টি রেখে সামনে এগিয়ে চলছিল।
আহমদ মুসার দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ ছিল সামনে বেশ দূরে। ক্ষুদ্র একটি আলোক শিখাকে সে জ্বলে উঠেই আবার নিভে যেতে দেখেছে। সেটা দিয়াশলাই-এর কাঠি বা সিগারেট লাইটারের আলো, না দৃষ্টি বিভ্রম! এ নিয়ে আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে আনমনা হয়ে পড়েছিল।
কোন কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গেল আহমদ মুসা।
নিচের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল আহমদ মুসা। মানুষের দেহ। ঘুমন্ত না মৃত।
পেন্সিল টর্চ জ্বেলে পরীক্ষা করতেই আরেক দফা চমকে উঠল আহমদ মুসা। এতো ওকারী গ্রামের! একি আবু বকরের সাথী ছিল?
কথাটা মনে আসতেই উদ্বেগের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল আহমদ মুসার গোটা দেহে।
সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ইসহাক তাড়াতাড়ি এদিকে এস। সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে।’
বলে আহমদ মুসা সামনে ও আশেপাশে চোখ বুলাল। রাস্তার উপর পড়ে থাকা আরও তিনটি দেহ দেখতে পেল সে।
এই সময় একটা কণ্ঠ ভেসে এল সামনে মাটিতে পড়ে থাকা দেহ তিনটির দিক থেকে, ‘আহমদ আবদুল্লাহ ভাই, আমি পারিনি। সব শেষ হয়ে গেছে।’
আবু বকরের গলা! সে জীবিত কথাটা ভাবতেই আহমদ মুসা ছুটল দেহটির দিকে। ততক্ষণে আবু বকর তার ডান হাতটা বাম হাত দিয়ে চেপে ধরে উঠে বসেছে।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে বসল তার পাশে।
বসেই বলল, ‘তুমি কেমন আছ, আর কোথাও গুলী লেগেছে?’
একে একে সবাই এসে ঘিরে দাঁড়াল আবু বকরকে।
‘ভাইয়া, আবু বকরের সাথের ওরা তিনজনই মারা গেছে।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
কেঁদে উঠল আবু বকর। বলল, ‘পারিনি ওদের সাথে। ওরা ছিল তিনজন। প্রথম গুলীতে ওদের একজনকে মেরেছিলাম। দ্বিতীয় গুলী ছুড়বার আগেই গুলী খেলাম আমি। রিভলবার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল। তারপরেই এল ওদের ব্রাশ ফায়ার। আমি মাটিতে পড়েছিলাম। ওরা মনে করেছিল গুলীতে আমিও ঝাঁঝরা হয়ে গেছি। চলে যায় ওরা।’
‘ওদের মৃত লোকটিকে তো দেখছি না। কোথায় সে?’ বলল আহমদ মুসা।
রাস্তার পাশে একটা জায়গার দিকে অংগুলি সংকেত করে বলল, ‘ঐখানে পড়েছিল। ওরা যাবার সময় লাশ নিয়ে গেছে।’
আহমদ মুসা উঠে গিয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করল। অনেক জায়গা জুড়ে জমাট রক্ত।
আহমদ মুসা আঙুলের ডগা দিয়ে কিঞ্চিত রক্ত তুলে নিয়ে পরখ করে দেখল, কমপক্ষে ১৫ মিনিট আগে এ লোকটি নিহত হয়েছে। তার মানে ওরা তের চৌদ্দ মিনিট আগে এখান থেকে চলে গেছে।
আহমদ মুসা ফিরে এল আবু বকরের কাছে। বলল, ‘সংক্ষেপে বল কি ঘটেছিল?’
‘আকাশ থেকে বাজ পড়ার মত ওরা উদ্যত রিভলবার ও ষ্টেনগান হাতে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়। শুধু একটা গুলী করারই সুযোগ পেয়েছিলাম। তারপরেই সবশেষ। ’ বলল কান্না ভরা কণ্ঠে আবু বকর।
ভাবছিল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে তোমাদের অপেক্ষায় ওরা ওঁৎপেতে বসেছিল।’
‘কিন্তু জানল কি করে?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আমি নিশ্চিত আমাদের আলী হয় ওদের হাতে নিহত, নয়তো বন্দী।’
সকলেই চমকে উঠল আহমদ মুসার কথায়। আবু বকর বলল, ‘তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, বন্দী বা নিহত আলীর কাছ থেকে খবর পেয়ে বা সন্দেহ করেই তারা এখানে এসে ওঁৎপেতে বসেছিল?’
‘আমি তাই মনে করি।’ আহমদ মুসা বলল।
বলেই আহমদ মুসা কলিন কামালের দিকে চেয়ে বলে উঠল, ‘তুমি তো বলা যায় ডাক্তার। তুমি আবু বকরকে নিয়ে যাও। আমি এদিকে দেখছি।’
‘তিনটি লাশের আমরা কি করব?’ বলল কলিন কামাল।
‘ওগুলেঅ এখানেই থাকবে। গাড়ি এনে ওদের নিয়ে যেতে গেলে আমরা শত্রুর নজরে পড়ে যাব।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করল আহমদ মুসা সড়ক ধরে ঘাট লক্ষ্যে। তার পেছনে ইসহাক ও নোয়ানকে।
ভাবছিল আহমদ মুসা, শত্রু দু’জন এখন কোথায় থাকতে পারে, কি করছে এখন তারা। এভাবে বিকেল থেকে ঘাটে থাকার তাদের উদ্দেশ্য কি? হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, তারা কি হোয়াইট ঈগলের আজকের অভিযানের অগ্রবাহিনী? হতে পারে। তারা এ এলাকায় খোঁজ-খবর রাখছে যা হোয়াইট ঈগলের অভিযানের সাহায্যে আসবে।
সুতরাং তারা শত্রুর গুপ্তচর। তাদের হত্যা করলে ওদের অভিযান অনেক মূল্যবান তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে। আর যদি ওদের ধরতে পারা যায়, তাহলে অনেক মূল্যবান তথ্য আমরা পাব, ভাবল আহমদ মুসা।
ওরা এই মুহূর্তে কোথায় কি কাজ করতে পারে? আলী এবং এদেরকে হত্যা করার পর নিশ্চয় এদের খোঁজে আরও কেউ আসবে, এ নিশ্চিত আশংকা তারা করবে। সুতরাং তারা সড়কের উপর অবশ্যই চোখ রাখবে।
এ বিষয়টা চিন্তা করার সাথে সাথেই আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। তার সাথে সাথে ইসহাকরাও।
‘কিছু ঘটেছে?’ ফিস ফিস করে বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘ঘটেনি। ঘটতে পারে, সে বিষয়েই চিন্তা করছি।’
চলা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘সড়ক দিয়ে এভাবে যাওয়া আর নয়। ইসহাক তুমি আর নোয়ানকো রাস্তার পশ্চিম পাশে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকো। আমি পুব পাশে নামছি।
যে গাছ তলায় আলী ও আবু বকরদের দেখা করার কথা, সে গাছ তলা আহমদ মুসারা পার হয়ে এসেছে। সে গাছ তলায় গিয়ে আহমদ মুসা চকিতে চোখ বুলিয়েও এসেছে। না সেখানে কিছু নেই। সেখানে আসার আগেই আলীর কিছু হয়েছে নিশ্চয়।
ঘাট খুব বেশি দূরে নয়।
একটা টিলার গোড়া দিয়ে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। টিলার একাংশ কেটে রাস্তাটা তৈরি হয়েছে।
টিলা এবং রাস্তার মাঝখান দিয়ে নালা। সম্ভবত বৃষ্টির পানি সরানোর জন্যেই এ নালার সৃষ্টি।
এই নালা ধরেই দক্ষিণে ঘাটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল আহমদ মুসা।
টিলাটির গোড়ায় পৌছতেই হঠাৎ আক্রান্ত হলো আহমদ মুসা। তার মনে হলো গোটা টিলাটাই যেন তার মাথায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
হাত থেকে ষ্টেনগানটা ছিটকে পড়ল আহমদ মুসার। সে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল নালায়।
পড়ে যাবার পরক্ষণেই আহমদ মুসা বুঝতে পারল টিলা ভেঙে তার মাথায় পড়েনি। দু’জন লোক তার উপর লাফিয়ে পড়েছে টিলার উপর থেকে। নিশ্চয় এরা সেই দু’জন। এরা ওঁৎপেতে ছিল টিলার উপর। ভাবল আহমদ মুসা।
এরা দু’জন আহমদ মুসার উপর লাফিয়ে পড়েই জাঁপটে ধরেছিল আহমদ মুসাকে।
একজন টিপে ধরেছিল আহমদ মুসার গলা। অন্যজন মুখ, নাক চেপে ধরে তার শ্বাস বন্ধ করার চেষ্টা করছিল।
নালাটা খুব প্রশস্ত ছিল না।
আহমদ মুসার হাত দু’টি পড়ে গিয়েছিল তার দেহের নিচে। উপর থেকে দু’জন চেপে ধরে থাকায় হাত দু’টি বের করার উপায় ছিল না।
গলা, মুখ ও নাকে ওদের হাতের চাপ বাড়ছে। মুখ এদিক ওদিক সরিয়ে মুখ ও নাক বাঁচাবার চেষ্টা করেছিল আহমদ মুসা। কিন্তু কতক্ষণ?
শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আহমদ মুসার।
প্রদীপও নেভার আগে জ্বলে। অনেকটা যেন সে ধরনেরই ঘটনা ঘটল।
আহমদ মুসা দু’পা জোড়া করে যতটা পারা যায় ওপরে তুলে দ্রুত নিচে নামিয়ে দেহে একটা ঢেউ এর সৃষ্টি করে কটিদেশটা প্রবল বেগে উপরে তুলল। তার ফলে দেহের মধ্য অঞ্চলে একটা প্রবল ঝাঁকুনির সৃষ্টি হলো। মাথা আকস্মিক সক্রিয় হয়ে মাটির সাথে সেঁটে গেল এবং পিঠ ও কটিদেশটা বেশ তীব্র গতিতে অনেকখানি উপরে উঠল।
আকস্মিক এই প্রবল ঝাঁকুনিতে ওদের দু’জনের হাতই আহমদ মুসার গলা, মুখ ও নাক থেকে কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ল এবং আহমদ মুসার উপর চেপে বসা তাদের দেহ পাশে সরে গেল।
মুক্ত বাতাসে বুক ভরে গেল আহমদ মুসার এবং সংগে সংগেই হাত দু’টি সক্রিয় হলো তার।
আহমদ মুসা দুই হাতে ভর দিয়ে দেহের সামনের অংশকে উপর দিকে ছুঁড়ে দিল।
আগের ঝাঁকুনিতেই ওদের হাত কিছুটা ঢিলা হয়ে পড়েছিল। আহমদ মুসার পিঠ থেকে এবার দু’জন দু’পাশে ঝুলে পড়ল। তারা আহমদ মুসার গলা ও মাথা তাদের হাতের মুঠোয় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল।
আহমদ মুসা তার দুই কনুই চালাল ওদের দু’জনের পাঁজরে। গুলী খাওয়ার মতই ওরা কেঁপে উঠল। টলে উঠল তাদের দেহ। আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে ওরা নিজেদের সামলে নেবার চেষ্টা করল। কিন্তু তারা সময় নষ্ট করল না। এক হাত দিয়ে তারা পাঁজরটা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে দ্রুত রিভলবার বের করল।
ওদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আহমদ মুসাও রিভলবার বের করেছে। কিন্তু আঘাত সামলে ওরা এতটা ক্ষিপ্রতা দেখাবে, তা সে ভাবেনি। আহমদ মুসা যখন ওদের দিকে চাইল, দেখল ওদের রিভলবারের দু’টি নলই তাকে লক্ষ্য করে উঠে এসেছে। তখন আহমদ মুসা তার রিভলবার সবে হাতে নিয়েছে মাত্র।
দ্বিতীয়বার বেকায়দায় পড়ল আহমদ মুসা। ওরা দু’জনেই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তবে বেশ দূরত্ব ওদের মধ্যে। একজন দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, অন্যজন দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। দু’জনকে গুলী করতে হলে রিভলবার বেশ ঘুরিয়ে নিতে হবে। এই অবস্থায় একজনকে গুলী করার পর আরেকজনকে গুলী করার সুযোগ সে কি পাবে?
বিকল্প হিসেবে তার পুরনো কৌশলের কথা চিন্তা করল। আহমদ মুসা তার চোখ ওদের দিক থেকে সরিয়ে আরও পেছনে তাকিয়ে দ্রুত মাথা নাড়ল যেন ওদের পেছনে দাঁড়ানো কাউকে কিছু বলছে সে। কাজ হলো।
ওরা দু’জনেই চমকে উঠে চকিতের জন্যে পেছন দিকে তাকাল।
সংগে সংগেই আহমদ মুসার রিভলবার বিদ্যুত বেগে উঠে এল এবং পর পর দু’বার গর্জন করে উঠল।
ওদের দু’জনেরই মাথায় গুলী লাগল। ওদিকে ফিরে তাকানো অবস্থাতেই মাটির উপর ছিটকে পড়ল ওদের দেহ।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে গিয়ে ওদের পকেট সার্চ করল। পেয়ে গেল একজনের পকেটে বাঞ্চিত বস্তু, ইনফ্রারেড গগলস। এই গগলসটি আহমদ মুসা দিয়েছিল আলীকে। কিন্তু অন্ধকারে দেখার এই গগলস দিয়ে আলী শত্রুদের খুঁজে পায়নি, বরং শত্রুরাই সম্ভবত তাকে প্রথম চি‎িহ্ণত করে। নিশ্চয় এই গগলস দিয়েই এরা আহমদ মুসাকে দূরে থাকতেই চি‎িহ্ণত করেছিল এবং ওঁৎপেতে ছিল। তবু ভাল, ওরা প্রথমেই গুলী করেনি।
গুলীর শব্দ পেয়ে ইসহাক আবদুল্লাহ এবং নোয়ানকো রাস্তার উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে দ্রুত চলে এসেছে রাস্তার এ প্রান্তে। উদ্বেগ, আতংক ফেটে পড়ছে তাদের চোখ-মুখ থেকে।
রাস্তার প্রান্ত দিয়ে ছোট ছোট গাছ-গাছড়া। ইসহাক আবদুল্লাহ ও নোয়ানকো গাছ-গাছড়ার পাশ দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে পেল আহমদ মুসাকে।
উঠে দাঁড়িয়ে তারা ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল ইসহাক আবদুল্লাহ আনন্দের সাথে, আলহামদুলিল্লাহ, অবশিষ্ট দু’একজনকে আপনি শেষ করেছেন। এখন নিশ্চয় আমাদের লুকিয়ে এগুতে হবে না?’
আহমদ মুসা ওদিকে কান দিয়ে বলল, ‘ইসহাক, আমাদের আরেক ভাই আলী নিহত হয়েছে।’ গম্ভীর কণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘পাওয়া গেছে তার লাশ? কোথায়?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘লাশ দেখিনি। তবে সে নিহতই হয়েছে।’
বলে আহমদ মুসা হাতের গগলসটা তাদের দেখিয়ে বলল, ‘এটা আলীর কাছে ছিল। হত্যার পর নিশ্চয় আলীর কাছ থেকে এটা ওরা পেয়েছে।’
‘তাই হবে ভাইয়া।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসার মুখমন্ডল আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বলল, ‘আজ যাত্রার শুরুতেই চারজন শহীদের রক্তে স্নাত হলো আমাদের ভুখন্ড।’
‘কিন্তু ওদের মারা গেছে তো আমাদের সংখ্যার চেয়ে এগার গুণ বেশী।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ সান্ত¦নার সুরে।
‘হ্যাঁ। শত্রুর তুলনায় অংকটা আনন্দিত হবার মত। কিন্তু এই চারজন তাদের পরিবারেই শুধু নয় আমাদের এখানকার এই ছোট্ট সমাজেও ছিল অমূল্য।’
‘আল্লাহর ইচ্ছা ভাইয়া। আপনার পরিকল্পনায় কোন ত্রুটি ছিল না।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা কোন উত্তর দিল না। সে তাকাল পাশের টিলার মাথার দিকে। বলল, ‘চল টিলার উপরটা দেখি। ওখানেই ওরা দু’জন ওঁৎপেতে ছিল।’
বলেই আহমদ মুসা টিলায় উঠতে শুরু করল। ওরাও দু’জন আহমদ মুসার পেছনে পেছনে চলল।
টিলার উপরে জায়গাটা খুব প্রশস্ত নয়। ৪ বর্গগজের বেশি হবে না। শীর্ষটাও ছোট ছোট গাছ-গাছড়ায় ঢাকা।
টিলার মাথার মাঝামাঝি জায়গাটার গাছ-গাছড়াগুলো ছেটে ফেলা। সেখানে একটা তোয়ালে বিছানো।
আহমদ মুসা সেদিকে এগিয়ে গেল। দেখল, তোয়ালের ওপর একটা হ্যাট, একটা টর্চ। তার পাশে একটা সাইড ব্যাগ।
ব্যাগ হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা।
ব্যাগ খালি, মাত্র দু’ই শিট পাতলা কাগজ পেল। একটা শীট নীল, অন্যটি লাল।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল ষ্টেনগান বহনের জন্যেই ওরা এই ব্যাগ ব্যবহার করেছিল।
কাগজের একটা শিট হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা।
শিটটি হাতে তুলে নিতেই কাগজের ভাঁজ থেকে একটা ছোট্ট ইনভেলপ বেরিয়ে পড়ল।
ইনভেলপটি কুড়িয়ে নিল আহমদ মুসা। ইনভেলপটি খুলে ভাঁজ করা ছোট একটা শিট কাগজ পেল। আহমদ মুসা ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরল কাগজটি।
পর পর চারটি লাইনের মাত্র ছয়টি শব্দ।
প্রথম লাইনে ‘পর্যবেক্ষণ ও খবর সংগ্রহ’, দ্বিতীয় লাইনে ‘সংকেত’, তৃতীয় লাইনে ‘ব্রিফিং’ এবং চতুর্থ লাইনে ‘শুরু’ লিখা।
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না যে, যারা এদের নিয়োগ করেছে, তাদের তরফ থেকেই এই চিরকুট। অর্থাৎ যারা অভিযানে আসছে তাদেরই এ ব্রিফিং। কিন্তু ব্রিফিং সবটা খুব স্পষ্ট নয়।
ভাবল আহমদ মুসা এ বিষয়ে।
প্রথম লাইনের বক্তব্য পরিষ্কার। টর্চ ও লাল নীল কাগজ দেখে দ্বিতীয় লাইনের ‘সংকেত’-এর অর্থও মাথায় এল। বুঝতে পারল, যারা আসছে তাদেরকে সবুজ বা লাল সংকেত দিতে হবে। কখন, কোন অবস্থায় তা অবশ্য বলা হয়নি। চতুর্থ লাইনের ‘শুরু’-এর অর্থ অপারেশন শুরু ধরা যায়, তৃতীয় লাইনের ‘ব্রিফিং’ দুর্বোধ্য। ‘ব্রিফিং’ কি অপারেশন শুরুর আগে আলোচনা? আহমদ মুসা এ বিষয়ে কোন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌছতে পারল না।
আহমদ মুসা টর্চ হাতে নিয়ে ইসহাক আবদুল্লাহদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা বুঝলাম এই টর্চ দিয়ে সংকেত দিতে হবে যারা আসছে তাদেরকে। টর্চের মাথায় লাল কাগজ জড়িয়ে লাল সংকেত দেয়ার অর্থ হবে এদিকে বিপদ আছে। আসাটা বিপজ্জনক। আর নীল কাগজ জড়িয়ে নীল সংকেত দেয়ার অর্থ হবে সব ঠিক আছে, আসুন।’
কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে, এই টিলার আশে-পাশেই কোথাও আলীর লাশ পাওয়া যাবে। ওরা তিনজন এখানেই বসেছিল। এখানে বসেই রাস্তার দিকে নজর রেখেছিল এবং এখান থেকেই তারা সংকেত দিত। উভয় উদ্দেশ্যেই ওরা এই টিলা বেছে নিয়েছিল। আলী এই টিলার আশে-পাশে আসার পর আমার মতই ওদের দ্বারা আক্রান্ত হয়।’
‘তাহলে খুঁজে দেখতে হয়।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘চল দেখি।’
আহমদ মুসারা তিনজনই নেমে এল টিলা থেকে।
নিচে নেমে আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহ ও নোয়ানকোকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ইসহাক রাত ১২টা বাজতে যাচ্ছে। এক মূহূর্ত আর নষ্ট করা যাবে না। আমি আলীকে খুঁজছি। তুমি আর নোয়ানকো গ্রামে ফিরে যাও। সব অস্ত্র, সব গোলা-গুলী ও সব মানুষকে নিয়ে এস। তোমার আব্বা আসবেন না। তিনি গ্রামের নারী, শিশু ও অবশিষ্ট লোকদের নিয়ে সজাগ থাকবেন।’
‘আমি একা যাই। নোয়ানকো আপনার সাথে থাকুক।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘তোমার একা যাওয়া ঠিক মনে করছি না। আগাম সাবধানতা ভাল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আপনি তো একা থাকবেন।’ ইসহাক আবদুল্লাহ বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘জীবনের অধিকাংশ সময় একাই আমাকে পথ চলতে হয়েছে।’
বলে আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহদের সালাম দিয়ে টিলার পেছন দিক লক্ষ্যে হাঁটা শুরু করল।
ইসহাক আবদুল্লাহ ও নোয়ানকো আহমদ মুসার যাত্রা পথের দিকে মুহূর্ত কয়েক চেয়ে থেকে হাঁটতে শুরু করল গ্রাম লক্ষ্যে।
হাঁটতে হাঁটতে নোয়ানকো বলল, ‘আহম আবদুল্লাহ ভাইকে যতই দেখছি, বিস্ময় আর প্রশ্ন বাড়ছে।’
‘আমারও।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আহমদ আবদুল্লাহ নামের একজন মানুষ মাত্র তিনি নন। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কি জান, কোন ফেরেশতাকে হয়তো আল্লাহ মানুষের রূপ দিয়ে পাঠিয়েছেন আমাদের প্রত্যক্ষ সাহায্যের জন্যে। তা না হলে এত সাহস, বহুমুখী এমন দক্ষতা এবং পরার্থে উৎসর্গীত এমন জীবন হঠাৎ একজন মানুষের মধ্যে কোত্থেকে এল। এমন লোক থাকলে তার নাম অবশ্যই শোনা যেত।’ বলল নোয়ানকো।
‘নোয়ানকো তুমি সত্যই বলেছ। এই মাত্র যা ঘটল তার কথাই ধরনা! উনি তাঁর নিরাপত্তার কথা ভাবলেন না, ভাবলেন আমাদের নিরাপত্তার কথা।’ বলল ইসহাক।
‘আর ফেরেশতাই বা তাঁকে বলা যাবে কেমন করে। জর্জের কাছে শুনেছি, মদীনায় তিনি স্ত্রী রেখে এসেছেন। তাই প্রশ্নটা তীব্রতর হচ্ছে, তিনি আসলে কে?’ বলল নোয়ানকো।
‘আমরা এর কিনারা করতে পারব না। থাক আলোচনা। চল দ্রুত হাঁটি। লোকজনকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
দু’জনেই দ্রুত পা চালাল গ্রামের উদ্দেশ্যে।

ঘাটের তিনদিক ঘিরে লোকজনদের বসিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহ, নোয়ানকো ও কলিন কামালকে সাথে নিয়ে উঠে এল সেই টিলায়।
আহমদ মুসার ব্যবস্থা অনুসারে ঘাটের পূর্ব দিকে থাকবে নোয়ানকো, মধ্য অঞ্চলে থাকবে কলিন কামাল এবং পশ্চিম ঘাট থেকে আসা যাওয়ার পথ অঞ্চলে থাকবে ইসহাক আবদুল্লাহ।
সম্ভাব্য ঘটনাবলী তাদের সামনে তুলে ধরে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছে সবাইকে আহমদ মুসা।
ইসহাক আবদুল্লাহ, নোয়ানকো ও কামাল প্রত্যেকের সাথে থাকবে ১০জন লোক। সকলেই তারা ষ্টেনগান সজ্জিত।
টিলার মাথায় সবে বসেছে আহমদ মুসা এবং ওরা দু’জন। এ সময় ঘাট থেকে কিছু দূরে অন্ধকার সাগর বক্ষে হঠাৎ জ্বলে উঠল সার্চ লাইটের আলো।
আহমদ মুসাদের তিনজনের চোখই আঠার মত লেগে গেল দৃশ্যটির প্রতি।
সার্চ লাইটের আলো উত্তরমুখী অর্থাৎ ঘাটের দিকে নয়।
আহমদ মুসা বুঝল এটা ক্যামোফ্লেজ। তারা বুঝতে দিতে চায়না যে আলোটা ঘাটে আসছে।
আলোটা তিনবার নিভল, তিনবার জ্বলল। আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না যে ওরা সিগন্যাল দিচ্ছে, এবার ওরা সিগন্যাল আশা করছে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি নীল কাগজ নিয়ে টর্চের মাথা মুড়ে নিল।
ইসহাক আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘ভাইয়া, লাল সংকেত দিয়ে ওদের বিদায় দেয়া যায় না?’
আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে তাকাল। হাসল। বলল, ‘তোমার কি ভয় করছে?’
‘ভয় নয়। ওদের বোকা বানিয়ে বিদায় করা।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘বোকা বানিয়ে বিদায় করলে চালাক হয়ে আবার ফিরে আসবে। সেই ফিরে আসাটা আমাদের জন্যে আরও মারাত্মক হতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক কথা।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা টর্চ জ্বালিয়ে তিনবার নীল আলোর সংকেত দিল।
আহমদ মুসা নীল সংকেত দেয়ার পর মুহূর্তেই একটা হেড লাইট জ্বলে উঠল। হেড লাইট এগিয়ে আসতে লাগল ঘাটের দিকে।
দশ মিনিটের মধ্যেই হেড লাইটটি ঘাটে এসে পৌছল। তার পাশে জ্বলে উঠল আরও চারটি হেড লাইট।
আহমদ মুসা বুঝল, পাঁচটি বোট এসে নোঙর করেছে ঘাটে।
পাঁচটি হেড লাইটের আলোতে গোটা ঘাট আলোকিত হয়ে উঠেছে। পরে এক সাথেই পাঁচটি হেড লাইট নিভে গেল।
প্রথমে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে গেল ঘাট। পরে অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল। চাঁদ না থাকলেও কুয়াশা ও মেঘহীন আকাশের তারার আলো গাছ-গাছড়ার ছায়াহীন ঘাটকে বেশ স্বচ্ছ করে তুলেছে। বোটে মানুষের চলাফেরা বেশ দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসার চোখে ইনফ্রারেড গগলস। বেশ ক’মিনিট গেল। কোন বোট থেকেই কাউকে নামতে দেখলো না আহমদ মুসা।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো সংকেতের পর আছে ব্রিফিং। এর অর্থ কি তাহলে এই যে, ওরা ঘাটে আসার পর এদিকের অবস্থা সম্পর্কে ব্রিফিং নেবার পর তারা অভিযান শুরু করবে! তাহলে তাকে তো ঘাটে যেতে হবে।
ঠিক এই সময়েই ঘাট থেকে হ্যান্ড মাইকের অনুচ্চ শব্দ ভেসে এল। বলা হলো, ‘মিঃ ওবোটে মাইকেল, আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আমরা দেরী করতে চাই না।’
আহ্বান শোনার সাথে সাথে আহমদ মুসা বলল, ‘বুঝা গেছে, অভিযান শুরুর আগে ওরা ব্রিফিং এর অপেক্ষায় আছে। সুতরাং আমাকে ওখানে যেতে হবে।’
‘আপনি তো ওবোটে মাইকেল নন, আপনি যাবেন কি করে? বলল কলিন কামাল।
‘আমি তো ওবোটে মাইকেল এর জায়গায় অভিনয় করছি।’
‘সেটা তো অভিনয়। আপনি গেলেই ধরা পড়ে যাবেন।’ বলল নোয়ানকো।
‘কিন্তু সম্ভবত ওরা ওবোটে মাইকেলের ব্রিফিং না পেলে অভিযানেই নামবে না।’
‘তাতে আমাদের তো ক্ষতি নেই।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘অভিযানে নামবে না অর্থ অভিযান করবে না, সেটা নয়। তারা আরও কোন একটা বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়ে এগুতে পারে। সুযোগ তাদের না দিয়ে আমরা চাই আমাদের পরিকল্পনার আওতার মধ্যে এনে শত্রুদের বিনাশ করতে। ওদের চলে যাবার সুযোগ দিতে চাই না।’
‘সেটা অন্যভাবে হয় না? আমরা এখন ওদের আক্রমণ করতে পারি না?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আক্রমণের আগে ওদের সবাইকে পাঁচটি বোট থেকে মাটিতে নামাতে হবে। বোটে থাকলে বেশির ভাগ পালিয়ে যাবার সুযোগ পাবে। এ সুযোগ আমরা কাউকেই দিতে চাই না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি গেলেই কি ওরা নামবে? আপনাকে চিনে ফেললে তো উল্টো ঘটবে।’
‘তা ঘটতে পারে। ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই। আমার ধারণা, আমাকে যেতে দেখলেই ওরা ওদের বাহিনীকে ঘাটে নামাবে এবং অভিযানের প্রস্তুতি নেবে। ব্রিফিং পাওয়ার পর কিভাবে কোনদিকে যাত্রা শুরু করবে তা ঠিক করবে।’
‘বুঝলাম, কিন্তু আপনি ওখানে গেলেই তো ধরা পড়বেন।’ বলল নোয়ানকো উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘ধরা পড়ার ঝুঁকি অবশ্যই আছে। কিন্তু এমনও হতে পারে, আমি ব্রিফিং-এর জন্যে ওদের বোটে উঠার পর শত্রুদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার সুযোগ আমাদের হবে।’
‘কিভাবে?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
নোয়ানকো থাকছে পূর্ব দিকে। কলিন কামাল থাকছে মধ্য অঞ্চলে অর্থাৎ উত্তরে, ইসহাক আবদুল্লাহ থাকছে পশ্চিমে এবং দক্ষিণে।’
আহমদ মুসা থামতেই নোয়ানকো কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আর কোন কথা নয়। দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠলাম।’
বলে আহমদ মুসা মাটিতে তোয়ালের উপর পড়ে থাকা হ্যাটটা তুলে মাথায় নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, তোমরা যে যার জায়গায় চলে যাও। ঘাট থেকে যখন গুলী বর্ষণের শব্দ পাবে, তখন পরিকল্পনা অনুসারে তোমরা আক্রমণ শুরু করবে। আর আমি ঘাটে পৌছার পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে যদি ওদিক থেকে গুলীর শব্দ না পাও, তাহলে তোমরাই পরিকল্পনা অনুসারে আক্রমণ শুরু করবে এবং নিজেদের বুদ্ধিবিবেক অনুসারে কাজ করবে।’
‘ওদিক থেকে গুলীর শব্দ না পাবার অর্থ?’ শুকনো কণ্ঠে প্রশ্ন করল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আমি যদি বন্দী হয়ে যাই বিনা যুদ্ধে তাহলে গুলীর শব্দ পাবে কি করে/’
বলেই আহমদ মুসা ওদের আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সকলকে সালাম জানিয়ে টিলা থেকে ঘাটের উদ্দেশ্যে নামতে শুরু করল।
আর ইসহাক আবদুল্লাহ, কলিন কামাল ও নোয়ানকো হতবুদ্ধি হবার মত নির্বাক হয়ে আহমদ মুসার গমন পথের দিকে চেয়ে রইল।
এক সময় ঠোঁট ফেড়ে কথা বেরুল ইসহাক আবদুল্লাহ। বলল, ‘একজন মানুষ কত বড় হলে এভাবে পরার্থে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।’ আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল ইসহাক আবদুল্লাহর।
‘না উনি মানুষ নন ইসহাক ভাই, আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের সাহায্যের জন্যে ফেরেশতা পাঠিয়েছেন।’ কথা বলতে বলতে চোখ মুছল নোয়ানকো।
কলিন কামাল কিছু বলতে যাচ্ছিল। ইসহাক আবদুল্লাহ বাধা দিয়ে বলল, ভাইয়েরা, আর কোন কথা নয়। চলুন আমরা তাঁর আদেশ পালন করি। যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যাই। আর যাবার আগে এসো আমাদের তিনজনের ৬ হাত একত্র করে আল্লাহর নামে শপথ করি, আমাদের ভাই আহমদ আবদুল্লাহ যেমন মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাননি, তেমনি আমরা আমাদের একজন বেঁচে থাকা পর্যন্ত লড়াই করে যাব, পরাজয় নিয়ে কেউ ঘরে ফিরবো না।
তারা ছয় হাত একত্র করে শপথ গ্রহণ করল।
তাদের তিনজনের চোখ থেকেই অশ্রু গড়াচ্ছিল। তাদের চোখে মুখে অপার্থিক এক আলো। নতুন মানুষ যেন তারা।

‘ঐ যে ওবোটে মাইকেল আসছে।’ উচ্ছসিত কণ্ঠে বলল জন ব্ল্যাংক।
জন ব্ল্যাংক তার কমান্ড বোটের ডেক কেবিনে বসে উন্মুক্ত দরজা দিয়ে তাকিয়েছিল ঘাট থেকে যে পথটা চলে গেছে দ্বীপের অভ্যন্তরে সে পথের দিকে।
পাঁচ বোটের শতাধিকে লোক নিয়ে যে অপারেশন টিম সাউথ টার্কো দ্বীপে অভিযানে এসেছে জন ব্ল্যাংক তার অধিনায়ক।
জন ব্ল্যাংকের পাশেই আরেকটা চেয়ারে বসেছিল জিম টেইলর।
জন ব্ল্যাংকের কথা শেষ হতেই জিম টেইলর বলল, ‘কি দেখে বুঝলেন ওবোটে মাইকেল আসছে, ঐ নীল টর্চের আলো?’
‘হ্যাঁ তাই। ঐ নীল টর্চই আমাদের কূলে আসার সবুজ সংকেত দিয়েছে।’
‘পাশের বোট থেকে রবার্ট ফুটকে ডাকলে ভালো হয় না। ওবোটে মাইকেলদেরকে তো তার মাধ্যমেই এই এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল।’ বলল জিম টেইলর।
‘হ্যাঁ তাকে ডাক। সেও তো এই টার্কস দ্বীপপুঞ্জের লোক। ব্রিফিং-এর সাথে সাথে আলোচনাও সেরে নেয়া যাবে।’
জিম টেইলর চেয়ার থেকে উঠে ডেক কেবিন থেকে ডেকে বেরিয়ে গেল।
কমান্ড বোটের গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দু’পাশে দু’টি করে চারটি বোট নোঙর করা।
পাশের প্রথম বোটেই ছিল রবার্ট ফুট।
দু’মিনিটের মধ্যেই জিম টেইলর রবার্ট ফুটকে ডেকে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল।
তারা কেবিনে ঢুকতেই জন ব্ল্যাংক জিমকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জিম তুমি আমাদের সকল বোটের সবাইকে নির্দেশ দাও আর্মস-এ্যমুনিশন নিয়ে এখনি ঘাটে নামতে। ওবোটে মাইকেলের সাথে কথা বলার পর আমরা আর এক মিনিটও অপেক্ষা করবো না। যাও, কুইক।’
জিম ডেকে বেরিয়ে দেখল, ওবোটে মাইকেল তখনও ঘাট থেকে বেশ খানিকটা দূরে।
সে বোটগুলোর ক্যাপ্টেনদের ডেকে নির্দেশ জারি করল, ‘এখনি তোমরা তোমাদের লোক ও সকল আর্মস-এ্যামুনিশনসহ ঘাটে নেমে যাও এবং ফরমেশন নিয়ে দাঁড়াও।’
হুকুম জারির দু’মিনিটের মধ্যে পাঁচটি বোটের শতাধিক লোক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ঘাটে নেমে ফরমেশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
জেটির পরেই ইট-পাথর বিছানো একটা ছোট্ট চত্বর। জেলেরা বোট থেকে মাছ ও মালপত্র নামিয়ে প্রথমে এখানেই জমা করে, অনেক সময় ভাগ-বাটোয়ারা করে। গাড়িও এসে এখানেই দাঁড়ায়। এই চত্বর থেকেই একটা রাস্ত বেরিয়ে গেছে দ্বীপের অভ্যন্তরে।
এই চত্বরের উপরে ঘাসে ঢাকা অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। বোট থেকে নেমে সবাই সেই ফাঁকা জায়গাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে।
এই ফাঁকা জায়গার পর আগাছা ও ছোট ছোট গাছ-গাছালীতে পূর্ণ এবড়ো-থেবড়ো এলাকা শুরু হয়েছে।
নির্দেশ দিয়ে এসে জিম টেইলর জন ব্ল্যাংকের পাশে এসে বসল। জন ব্ল্যাংকের অন্যপাশে বসেছে রবার্ট ফুট।
‘ওবোটে মাইকেল এসেছে।’ বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল জন ব্ল্যাংক।
কথা শেষ করেই আবার বলল, ‘জিম যাও তাকে এই কেবিনে নিয়ে এস।’
জিম কেবিন থেকে বেরিয়ে কেবিনের দরজায় একপাশে দাঁড়িয়ে জন ব্ল্যাংকের পারসোনাল গার্ড জনকে ঘাটের দিকে এগিয়ে ওবোটে মাইকেলকে দেখিয়ে বলল, ‘ওঁকে এই বোটে নিয়ে এস।’
গার্ড বোট থেকে নেমে কিছুটা এগিয়ে ওবোটে মাইকেলের মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘মিঃ ওবোটে আসুন। মিঃ জন ব্ল্যাংক ঐ বোটে আছেন।’
মিঃ ওবোটের মাথার হ্যাটটা তার কপাল পর্যন্ত নেমে এসেছে। ফলে মুখের অবয়বটা স্পষ্ট নয়।
‘সিওর।’ মাত্র এই শব্দটা উচ্চারণ করে ওবোটে বোটের দিকে যাত্রা শুরু করল। পেছনে গার্ড।
বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল জিম টেইলর।
ওবোটে বোটে উঠল। গার্ড বোটের নিচে জেটিতেই দাঁড়িয়ে থাকল। ডেক থেকে ওবোটেকে ভেতরে নিয়ে যাবার দায়িত্ব জিম টেইলরের।
জিম টেইলর ওবোটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম মিঃ ওবোটে। চলুন, মিঃ ব্ল্যাংক আপনার অপেক্ষা করছেন।
‘ধন্যবাদ।’ বলে ওবোটে কেবিনের দিকে পা বাড়াবার আগে পেছন ফিরে চারদিকটা একবার দেখল। দেখল সে বোটের গলুই-এর কাছে জেটিতে দাঁড়ানো গার্ডকেও।
ওবোটে কেবিনে প্রবেশ করল।
জিম টেইলর আগেই প্রবেশ করেছিল। সে গিয়ে বসেছিল তার চেয়ারে।
ওবোটে বেশধারী আহমদ মুসা কেবিনে প্রবেশ করে কপাল পর্যন্ত নেমে যাওয়া হ্যাট কপালের উপরে তুলে দিল।
জন ব্ল্যাংক, জিম টেইলর এবং রবার্ট ফুট আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠেছিল। একজন কৃষ্ণাংগ টার্কসবাসীর বদলে দেখছে একজন কালার্ড এশিয়ানকে!
তারা তাদের বিমূঢ় ভাব কাটিয়ে উঠার আগেই আহমদ মুসা কাঁধের ষ্টেনগান হাতে নিয়ে তাদের দিকে তাক করে বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন আমি আপনাদের ওবোটে নই।’
বলেই ষ্টেনগানের ট্রিগারে হাত চেপে ওদের দিকে চেয়ে কঠোর কণ্ঠে বলল, ‘তোমাদের আজকের খেলাটা শেষ। বেঘোরে জীবন দিতে না চাইলে তোমরা অস্ত্র ফেলে দাও, তোমাদের লোকদের অস্ত্র ফেলে দিতে বল এবং আত্মসমর্পণ…….।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতে পারল না। একটা আঘাত এসে পড়ল মাথায়।
আহমদ মুসা টের পায়নি যে, গার্ড জনকে সে বোটের নিচে গলূই-এর কাছৈ দেখে এসেছিল, আহমদ মুসা ও জিম টেইলর কেবিনে ঢোকার পর সে বোটে উঠে এসে কেবিনের দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কেবিনের দরজা বন্ধ না থাকায় আহমদ মুসার সব কথাই সে শুনতে পেয়েছিল। সে বিপদটা আঁচ করতে পেরে বিড়ালের মত নিঃশব্দে আহমদ মুসার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং ষ্টেনগানের বাঁট দিয়ে আঘাত করেছিল আহমদ মুসার মাথায়।
ষ্টেনগানের বাঁটের বাড়িটা আহমদ মুসার ঠিকই লাগল। তবে কেবিনের ছাদটা নিচু হওয়ায় ষ্টেনগানের বাঁট ছাদে একটা বাড়ি খেয়ে তারপর আহমদ মুসার মাথায় গিয়ে আঘাত করে।
সুতরাং আঘাতটা যতটা ভয়াবহ হবার কথা তা হলো না। কিন্তু দেখা গেল আহমদ মুসা মাথায় আঘাত খাওয়ার সংগে সংগেই টলে উঠে একটা পাক খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেল কেবিনের মেঝেয়। ডান হাত থেকে তার ষ্টেনগান খসে পড়েছিল।
ওরা তিনজনই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘ধন্যবাদ জন, তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলে।’ বলল জন ব্ল্যাংক।
একটু থেকে ক্রুদ্ধ চোখে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে সে বলল, ‘এই তাহলে সেই শয়তান এশিয়ান যার কথা তোমরা এত বলেছ। তাই না রবার্ট ফুট।’
রবার্ট ফুট কথা বলতে যাচ্ছিল। সে কথা বলার আগেই জন ব্ল্যাংক আবার বলল, ‘জন তাড়াতাড়ি ওকে সার্চ কর। জ্ঞান ফেরার আগেই ওকে বেঁধে ফেল। ওর জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অভিযান শুরু করা যাচ্ছে না। তার কাছ থেকে কথা বের করতে হবে তারা কি জেনেছে, কতটা জেনেছে।’
আহমদ মুসার দেহটা পড়েছিল বোটের আড়াআড়ি এবং জনের বিপরীত দিকে অর্থাৎ জন ব্ল্যাংকের দিকে কাত হয়ে।
নির্দেশ পেয়ে জন ব্ল্যাংক আহমদ মুসার পেছন দিকটা ঘুরে আহমদ মুসার সামনের দিকে এগিয়ে সবে কোমর বরাবর পৌছেছে।
চোখের পলকে এই সময় আহমদ মুসার দু’টি পা বিদ্যুত বেগে উঠে এসে জনের গলা সাঁড়াশির মত চেপে ধরৈ তাকে আছড়ে ফেলল কেবিনের মেঝেতে। সেই সাথে কোটের পকেটের উপর পড়ে থাকা আহমদ মুসার বাম হাত পকেট থেকে রিভলবার বের করে তিনজনকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলী ছুঁড়ল পর পর।
ওরা তিনজন কিছু বুঝে উঠার আগেই গুলী খেয়ে ঢলে পড়ে গেল মেঝের উপর।
ওদিকে জন আহমদ মুসার দু’পায়ের সাঁড়াশিতে বন্দী হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়েও তার ডান হাত দিয়ে যখন সঁড়াশির চাপ ঢিলা করার চেষ্টা করছে, বাম হাত দিয়ে তখন সে বেল্টে গুজে রাখা রিভলবার বের করে আহমদ মুসার বুক অথবা মাথা তাক করার চেষ্টা করছে।
তিনজনকে গুলী করেই আহমদ মুসা মনোযোগ দিয়েছিল জনের দিকে। সে দেখতে পেল জনের কসরত। আহমদ মুসা সময় নষ্ট করল না। চতুর্থ গুলী করল জনকে লক্ষ্য করে।
জন একেবারে বুকে গুলী বিদ্ধ হলো।
আহমদ মুসা উঠে বসল। ভাবছিল সে, নিশ্চয় ওদের লোকেরা বোটের কেবিনে গুলীর শব্দ শুনে এদিকে ছুটে আসছে।
আহমদ মুসা উঠে বসেই ছিটকে পড়া ষ্টেনগানটা টেনে নিল কাছে।
উঠে দাঁড়াচ্ছে আহমদ মুসা। এ সময়ই ঘাটের তিন দিক থেকে প্রায় এক সাথেই অনেকগুলো ষ্টেনগান গর্জে উঠল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। এদিকে গুলীর শব্দ শুনে এরা এদিকে আসার আগেই গুলীর শব্দ পাওয়ার সাথে সাথে আহমদ মুসার লোকেরা আক্রমণ শুরু করেছে।
এদিক থেকেও গুলী বর্ষণ শুরু হয়েছে। তখন গুলী বৃষ্টির পালা চলছিল।
আহমদ মুসা কেবির দরজায় উঁকি দিল। দেখল, ডজনখানেক লোক ছুটে আসছে কেবিনের দিকে। তাদের হাতে উদ্যত ষ্টেনগান। তারা মুখ দিয়ে চিৎকার করছে, ‘স্যার, এখানে কি ঘটেছে? আপনারা আসুন। হুকুম দিন, তিনদিক থেকেই শত্রু আক্রমণ করেছে।’
আহমদ মুসা কেবিনের দরজায় এসে চিৎকার করে বলল, ‘হুকুম দেবার মত তোমাদের নেতারা কেউ বেঁচে নেই। তোমরা অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ কর।’
আহমদ মুসার কণ্ঠস্বর শোনার সাথে সাথে ওদের ডজনখানেক ষ্টেনগান নড়ে উঠল। আহমদ মুসা এর জন্যে তৈরিই ছিল। নিজের শেষ কণ্ঠস্বর বাতাসে মেলাবার আগেই তার ষ্টেনগান অগ্নি বৃষ্টি করল। এক ঝাঁক গুলী গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরল।
এদের পরিণতি দেখে বোটের দিকে আসার চেষ্টা আর কেউ করল না। তবু আহমদ মুসা তার গুলী অব্যাহত রাখল যাতে ওরা এদিকে আক্রমণে আসার বা পিছু হটে পালাবার কোন সুযোগ না পায়।
প্রায় পনের মিনিট গুলী চলার পর গুলী থেমে গেল। বোটের সামনে ঘাটের উপরে উন্মুক্ত জায়গা টুকুতে তখন লাশ আর লাশ। কেউ বাঁচেনি। চারদিক থেকে আক্রান্ত হওয়ায় কেউ পালাতেও পারেনি।
ইসহাক আবদুল্লাহর দল, কলিন কামালের দল এবং নোয়ানকোর দল প্রায় এক সাথেই ছুটে এল বোটের দিকে আহমদ মুসার কাছে।
ইসহাক, কলিন কামাল ও নোয়ানকো এসে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, ‘আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন। আপনি ভাল আছেন তো?’
আহমদ মুসা বলল, ‘আমি ভাল আছি। তোমরা সবাই ভাল তো? আমাদের লোকদের কি অবস্থা?’
‘মাত্র তিনজন আহত। তাছাড়া সবাই ভাল।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘প্রথমে এদিক থেকে চারটা গুলীর শব্দ পাওয়া গেছে। কি ঘটেছিল?’ বলল নোয়ানকো।
‘দেখবে ভেতরে এস।’
বলে আহমদ মুসা বোটের কেবিনের দিকে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসার সাথে ইসহাক আবদুল্লাহ, কলিন কামাল ও নোয়ানকো প্রবেশ করল কেবিনে।
কেবিনে পড়ে থাকা চারটি লাশের দিকে চোখ পড়তেই ইসহাক আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘তাহলে এই চারজনকে গুলী করার শব্দ আমরা পেয়েছিলাম?’
ইসহাক টর্চ জ্বেলে লাশগুলো দেখছিল।
‘হ্যাঁ। এই চারজনের ঐ তিনজন হলো নেতা। আর এ ছিল শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত গার্ড।’ লাশগুলোর দিকে ইংগিত করে বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে নেতা নেতাদের মেরেছেন কর্মীরা কর্মীদের মেরেছে।’ বলল নোয়ানকো।
‘না নোয়ানকো, তুমি খেয়াল করনি, কর্মীদের যারাই যখন বোটের দিকে আসার চেষ্টা করেছে, তারা মারা পড়েছে আহমদ আবদুল্লাহ ভাইয়ের হাতে। তিনি পেছন দিক থেকে এভাবে পাহারা না দিলে হয়তো শত্রুদের বেশির ভাগই পালিয়ে যেত। এখন সংবাদ পৌছাবার মত একজনও পালাতে পারেনি।’
‘আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই বোটে নেতাদের কাছে আসার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।’ বলল কলিন কামাল।
ইসহাক আবদুল্লাহ টর্চের আলো ঘুরাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল আহমদ মুসার মুখে। আহমদ মুসার মাথা ও মুখের ডান পাশ রক্তাক্ত দেখে আঁৎকে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ। বলল, ‘একি, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই আপনি তো আহত!’
ইসহাক আবদুল্লাহর কথার সাথে সাথেই অন্য দু’জনও ঝুকে পড়ল আহমদ মুসার দিকে।
‘আপনার কি গুলী লেগেছে আহমদ আবদুল্লাহ ভাই?’
‘তোমরা ব্যস্ত হয়ো না। গুলী লাগেনি। পেছন থেকে ঐ গার্ড চুপি চুপি এসে ষ্টেনগানের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল। মাথার ডান পাশের কিছুটা থেঁথলে গেছে।’
বলে ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘চল বাইরে, অনেক কাজ আছে।’
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল। তার সাথে ওরা তিনজনও।
‘অন্তত ফাষ্ট এইড আপনার এখনি নেয়া দরকার।’ বলল কলিন কামাল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঠিক আছে ডাঃ কলিন কামাল, প্রথম কাজটা সেরে নেই। তারপর তোমার ডাক্তারী বিদ্যা প্রদর্শনের সুযোগ দেব।’
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে চেয়ে বলল, ‘কয়েকটা জরুরী কাজ করতে হবে। এক. ওদের সমস্ত লাশ বোটে তুলে গভীর সাগরে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। দুই. ঘাটের সব রক্ত ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেলতে হবে রাতের মধ্যেই। তিন. আগের তিনটি বোটের মত এ পাঁচটি বোটকেও আমাদের সেবু নদীতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। চার. ভোর রাতেই থানায় গিয়ে ডায়েরী করতে হবে, কয়েকটি বোটে করে ডাকাত এসেছিল। আমাদের চারজন লোককে খুন ও তিনজনকে আহত করেছে। তারপর গ্রামবাসী জেগে উঠে একযোগে ধাওয়া করলে ওরা পালিয়ে গেছে। ইদানিং এই ধরনের ডাকাতের আনাগোন বেড়ে গেছে। ওকারী গ্রাম বা ওকারী ঘাট এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি বা রাত্রিকালীন পাহারা চাই। পাঁচ. কিছু পয়সা খরচ করে হলেও খবরের কাগজে ডাকাতের হানা, চারজন নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার খবর ভালো করে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এই নিউজে এই এলাকার জন্যে স্বতন্ত্র পুলিশ ফাঁড়ি ও সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা দাবী করতে হবে। ছয়. এদের কাছ থেকে পাওয়অ শতখানেক ষ্টেনগান, শতখানেক রিভলবার, বিপুল গোলাবারুদ এই রাতেই লুকিয়ে ফেলতে হবে এবং ঔষধগুলো আমারে ষ্টোরে জমা করতে হবে। সাত. আজকের এই খবর সিডি কাকেম গ্রামে এখনি পৌছতে হবে এবং জর্জকে আসতে বলতে হবে সকালের মধ্যেই। আট. অবিলম্বে আরও দু’শ যুবককে যুদ্ধ ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন দ্বীপ থেকে আস্থাভাজন দু’শ যুবক সংগ্রহ করতে হবে। নয়. আরও কয়েকটি দ্বীপে অন্তত ভিজকায়া মামুন্ড এবং গ্রান্ড টার্কস দ্বীপে আমাদের নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলতে হবে। প্রধান ঘাঁটি এখানেই থাকবে। দশ. এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ৮টি মোটর বোট সমন্বয়ে একটা নৌবহর আমাদের থাকবে। এগুলোর জন্যে তেল ও প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রাখতে হবে। যে কোন জরুরী মুহূর্তে যাতে এগুলো কাজে লাগানো যায়। এগার. আমাদের এ দ্বীপের খৃষ্টান ও অন্যধর্মী অধ্যুসিত উত্তরাংশের উপর নজর রাখা এবং অন্যান্য দ্বীপ থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের জন্য একটা গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করতে হবে।’ দীর্ঘ বক্তব্যের পর থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ ও কলিন কামাল। তারা বলল, ‘আজকের এই ঘটনার পর মহাকিছু ঘটাতে পারে শত্রুরা, এ নিয়ে আমরা আনন্দের মধ্যেও উদ্বিগ্ন ছিলাম। আপনার এই পরিকল্পনা তার জবাব দিয়েছে, যা আমরা আশা করছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি। জিন্দাবাদ, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই জিন্দাবাদ। সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আপনাকে এই জ্ঞান দিয়েছেন এবং আমাদের মধ্যে দয়া করে পাঠিয়েছেন।’
শেষের কথাগুলো তাদের আবেগে ভারি হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা এসব কথার দিকে কান না দিয়ে বলল, ‘নোয়ানকো তুমি একজন কাউকে সাথে নিয়ে গ্রামে যাও। লোকদেরকে এখানে পাঠিয়ে তুমি যাবে সিডি কাকেম গ্রামে। আর ইসহাক আবদুল্লাহ তুমি থানার জন্যে এফ আই আর লিখতে বস। আর ডাঃ কলিন তুমি দেখ আহতরা কি অবস্থায় আছে।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা বোটের সামনে চত্বরে দন্ডায়মান সাথীদের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। বলল, ‘বিজয়ী সাথী ভাইরা, তোমাদের মোবারকবা। আল্লাহ তোমাদের একটা বড় বিজয় দিয়েছেন। বিজয়ের কৃতিত্ব তোমাদের। তোমাদের যা আছে তাই নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে দাঁড়িয়েছ এবং যা সাধ্য তোমাদের, তা করেছ। এ জন্যেই আল্লাহ তোমাদের বিজয় দিয়েছেন। আমরা আনন্দিত হবো, কিন্তু গর্বিত হবো না, অলস হবো না। শত্রুদের পরাজয় শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু অনেক দীর্ঘ পথ আমাদের পাড়ি দিতে হবে। তোমাদেরকে আরও সতর্ক, আরও দক্ষ, আরও কুশলী হতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে আরও বড় বিজয় দেবেন।’ থামল আহমদ মুসা।
সামনের ওরা সমস্বরে ধ্বনি দিল, ‘আল্লাহু আকবর।’
ওদের একজন দাঁড়িয়ে থাকা সারি থেকে দু’ধাপ এগিয়ে এল। বলল, ‘নিপীড়ন, পরাজয়, আত্মসমর্পণ এবং নিশ্চি‎হ্ণ হয়ে যাওয়াকে যখন আমরা আমাদের ভাগ্য লেখা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম, তখন আপনার আগমন আমাদের নতুন জীবন দিয়েছে। আপনার উসিলায় আমরা পরাজয়ের জায়গায় বিজয় পেতে শুরু করেছি। আল্লাহর অসীম দয়া হিসেবে আপনাকে আমরা পেয়েছি। আপনি যে নির্দেশ আমাদের দেবেন, সে নির্দেশ আমরা পালন করব, জীবনের বিনিময়ে হলেও।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ ভাইয়েরা। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে। দেখল, নোয়ানকো গ্রামে যাবার জন্যে তৈরি হয়েছে। নেমে গেছে বোট থেকে।
‘খসড়ার জন্যে কাগজ তো দরকার। আমার কাছে কাগজ তো নেই।’ আহমদ মুসা তাদের দিকে মনোযোগ দিতেই বলে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা তার পিঠে ঝুলানো ব্যাগের দিকে ইংগিত করে বলল, ব্যাগের পকেটে দেখ তোমার প্রয়োজন মত কাগজ পাবে।’
কাগজ নিয়ে নিল ইসহাক আবদুল্লাহ।
এবার এগিয়ে এল কলিন কামাল আহমদ মুসার দিকে।
‘ডাঃ কলিন তুমি আগে অন্য আহতদের প্রয়োজনটা সেরে এসো।’
‘ওদের ব্যবস্থা আগেই করেছি। ওদের আঘাতগুলেঅ অপারেশনের মত গুরুতর নয়।’ বলল কলিন কামাল।
‘ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা বসল ফাষ্ট এইড নেবার জন্যে।

বাহামার সানসালভাদর।
কলম্বাস বন্দরে হোয়াইট ঈগলের সেই অফিস সংলগ্ন একটা সুন্দর বাড়ি। বাড়ির ড্রইং রুম।
সোফায় বসে আছে মাঝ বয়সের রাশভারি একজন আমেরিকান।
চেহারায় কাঠিন্য। চোখ ঠান্ডা। বিরাট শরীর।
এই ব্যক্তিটিই আমেরিকান কন্টিনেন্ট হোয়াইট ঈগল-এর চীফ। নাম ডেভিড গোল্ড ওয়াটার।
তার চোখে-মুখে কিছুটা অস্থিরতা। কারও যেন অপেক্ষা করছে সে।
এই সময় অনেকটা ঝড়ের বেগেই প্রবেশ করল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের হোয়াইট ঈগল-এর প্রধান জি,জে, ফার্ডিন্যান্ড।
ঢুকে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর সোফায় বসতে বসতে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি এসেছেন শুনে প্রথমে আমার বিশ্বাস হয়নি। এভাবে তো আপনি আসেন না। কোত্থেকে, কিভাবে বলুন, কেমন আছেন আপনি?’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে চুপ করল ফার্ডিন্যান্ড।
‘সত্যিই আমিও ভাবিনি আসব। আমার ফ্লাইট সিডিউল ছিল সোজা প্রিটোরিয়া (দক্ষিণ আফ্রিকা) থেকে ওয়াশিংটন। বিমান বন্দরে এসে শুনলাম সানসালভাদরের নতুন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দ ‘কলম্বাস’-এ বিমানটি সৌজন্য অবতরণ করবে। সুযোগ পেয়ে আমি টিকিট চেঞ্জ করলাম। ঠিক করলাম কয়েক ঘণ্টা সানসালভাদরে কাটিয়ে পরে মিয়ামী হয়ে ওয়াশিংটন যাব।’ একটু থামল।
একটা হ্যাভানা চুরুট ধরিয়ে মুখে পুরে বলল, ‘তোমার সাথে বেশ অনেক দিন দেখা নেই। ভাবলাম তোমাদের কিছু খবর নিয়ে যাই। নতুন ডেমোগ্রাফিক রিষ্ট্রাকচার প্রোগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা বিলোপ কর্মসূচী এখানে কতদূর এগুলো সরেজমিন জানতে পারলে ভালই লাগবে।’ থামল ডেভিড গোল্ড ওয়াটার।
‘ধন্যবাদ। অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক। বলা যায় আশার চেয়ে বেশি। চলতি বছর মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই অগ্রগতি রাখতে পারলে, আগামী দশ বছরের মধ্যে ১৫ বছর পর্যন্ত মুসলিম বালকের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে যাবে। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম মেয়েরা বিয়ের জন্যে মুসলিম যুবক খুঁজে পাবে না। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ মুসলিম মেয়ের বিয়ে হবে খৃষ্টান অথবা অন্য কোন ধর্মের ছেলের সাথে। এর বছর দুয়েকের মধ্যে কোন মুসলিম শিশু খুঁজে পাওয়া যাবে না ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। তারপর দুই তিন দশকের মধ্যে এই দ্বীপপুঞ্জে মুসলিম জনসংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে।’
‘ব্রাভো! ব্রাভো! ফার্ডিন্যান্ড। যদি তা হয় তাহলে বলে দিচ্ছি, নোবল পিস প্রাইজ তুমি পেয়ে যাবে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘নোবেল পিস প্রাইজ? কেমন করে?’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে ধর্ম ও জাতিগত সংঘাত থেকে মুক্ত করে শান্তি স্থাপনের জন্যে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘অশান্তির মাধ্যমে শান্তি!’ বলে হো হো করে হেসে উঠল ফার্ডিন্যান্ড।
‘কথাটা মনে হয় তুমি নতুন শুনলে! আমাদের পশ্চিমীদের রাজনীতি তো এটাই। এ রাজনীতির বিভিন্ন নাম আছে। কিন্তু লক্ষ্য একটাই পশ্চিমী আদর্শ নিয়ন্ত্রিত এক মতের, এক পথের, এক বিশ্ব।’
‘নোবেল পুরষ্কার কথা পরে। একটা সংকটের কথা বলা হয়নি আপনাকে।’
‘সংকট? কি সেটা?’
‘বলেছিলাম আপনাকে যে, গ্রান্ড টার্কস-এর চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন ছাত্রের সমীক্ষায় মুসলিম পুরুষ শিশুদের সংখ্যা হ্রাস ধরা পড়েছিল, তাদেরসহ একজন সাংবাদিককে আমরা হত্যা করেছি। কিন্তু সমীক্ষার সাথে জড়িত এক মুসলিম ছাত্রী পলাতক ছিল। তাকে ধরতে গিয়ে আমাদের চারজন লোক রহস্যজনকভাবে খুন হয়। সেই…………’
ফার্ডিন্যান্ডকে বাধা দিয়ে গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘রহস্যজনক বলছেন কেন?’
‘রহস্যজনক এই কারণে যে, হত্যাকান্ডটি এলাকার গ্রামবাসীদের দ্বারা হয়নি। হয়েছে একজন এশিয়ানের হাতে।’
‘এশিয়ান? কে সে?’
‘কে জানি না, কিন্তু লোকটি গ্রান্ড টার্কস দ্বীপে এসে প্রথমেই সেই মুসলিম মেয়েটির খোঁজ করে। আমাদের লোকেরা তাকে সন্দেহ করে তাকে মারপিট করে।’
‘তারপর?’
‘তার খোঁজ আমরা রাখিনি। খুব সাধারণ কেউ তাকে আমরা মনে করেছিলাম।’
‘আচ্ছা বল, কি বলছিলে।’
‘আমাদের চারজন লোক হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে আমরা তিরিশজন লোকের একটা শক্তিশালী দল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা হারিয়ে গেছে। তাদের জীবিত অথবা মৃত কোন চিহ্ণ আমরা খুঁজে পাইনি।’
‘কি বলছ তুমি, এটা কি সত্য?’
‘সত্য। আমরা লোক পাঠিয়ে গোটা দ্বীপ তন্ন তন্ন করে দেখেছি। কোথাও সন্দেহ করার মত কিছু পাইনি।’
‘অসম্ভব ব্যাপার। দ্বীপের কেউ কিছু বলতে পারেনি?’
‘না, পারেনি।’
‘বোটগুলো?’
‘বোটগুলোও পাওয়া যায়নি!’
কিছু বলতে যাচ্ছিল গোল্ড ওয়াটার। এ সময় ঘরে প্রবেশ করল শিলা সুসান। ফার্ডিন্যান্ডের একমাত্র মেয়ে।
ঢুকেই বলল, ‘স্যরি ড্যাডি। তোমরা গল্প করছ তাই কেউ আসতে সাহস করছে না। গ্রান্ড টার্কস থেকে দু’জন লোক এসে আপনার অপেক্ষা করছে।’
শিলা সুসান-এর হাতে রঙের তুলি। পাশেই আর্ট রুমে বসে সে আর্ট করছিল। সেখান থেকে রিসেপশন রুমের কথাবার্তা শোনা যায়। শুনেই ওদের সাহায্য করতে এসেছে।
কথা শেষ করেই শিলা সুসান গোল্ড ওয়াটারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার।’
শিলা সুসানের কথা শেষ হতেই ফার্ডিন্যান্ড সুসানের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘এ আমার মেয়ে শিলা সুসান, ওয়াশিংটনের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আর্ট ওর বিশেষ সখ।’
‘ওয়েলকাম বেটি। বস।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘ধন্যবাদ।’ বলে বসল সুসান।
ইন্টারকমে রিসেপশনে খবর পাঠিয়েছিল ফার্ডিন্যান্ড।
দু’জন লোক প্রবেশ করল ড্রইং রুমে।
তারা সম্ভাষণ বিনিময়ের পর বলল ফার্ডিন্যান্ডকে, ‘আমরা গ্রান্ড টার্কস থেকে এসেছি জরুরী খবর নিয়ে।’
ফার্ডিন্যান্ডের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ‘জন ব্ল্যাংকরা কোথায়?’
ফার্ডিন্যান্ডের কথা শেষ হতেই শিলা সুসান বলে উঠল, ‘ড্যাডি আমি যাই। যেসব মারামারির কথা চলছিল, সে রকম মারামারির কথাই আবার শুরু হবে। আমি এসব শুনতে পারব না। বলে উঠে দাঁড়াল শিলা সুসান।
শিলা সুসানের কথা শুনে হেসে উঠেছিল গোল্ড ওয়াটার। বলল, ‘যে মারামারি জীবনের জন্যে, সে মারামারিতে বিতৃষ্ণা থাকলে চলবে কেন বেটি?’
‘মারামারিটা জীবনের জন্যে অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্যে হচ্ছে কি?’ বলল শিলা সুসান।
‘অবশ্যই বেটি।’ গোল্ড ওয়াটার।
সুসান কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ফার্ডিন্যান্ড বলল সুসানকে, ‘তোমাকে আইন না পড়িয়ে ভুল করেছি মা। ভাল আইনজীবি হতে।’ হাসতে হাসতে কথা বলছিল ফার্ডিন্যান্ড।
সুসান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘ড্যাডি আজ নয়, আরেকদিন ঝগড়া করব। চলি।’
বলে সুসান ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে তার আর্ট রুম ঢুকল।
সুসান বেরিয়ে যেতেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তুলে ধরল ফার্ডিন্যান্ড গ্রান্ড টার্কস থেকে আসা লোক দু’টির দিকে।
লোক দু’টির মুখ শুকনো এবং চোখে উদ্বেগ। চারদিকের কোন কথার দিকেই তাদের মনোযোগ নেই।
ফার্ডিন্যান্ড তাদের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তুলে ধরতেই তাদের একজন বলল, ‘সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে আমাদের ওখানে।’
‘ভনিতা নয়, ঘটনা বল।’ কিছুটা শক্ত কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘সাউথ টার্কো দ্বীপে যারা অভিযানে গিয়েছিল, তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।’ বলল তাদের একজন কম্পিত কণ্ঠে।
‘কি?’ চিৎকার করে উঠল ফার্ডিন্যান্ডের কণ্ঠ। যেন বাজ পড়ল ঘরে।
চমকে উঠেছে ওরা দু’জনও। ভ্রু কুঁচকে উঠেছে গোল্ড ওয়াটারেরও।
অবিশ্বাস্য বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে ফার্ডিন্যান্ডের মুখ।
চিৎকারের শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই ফার্ডিন্যান্ড বলল, ‘ওরা ফিরে আসেনি?’
‘আসেনি।’
‘কোন খবর দেয়নি?’
‘না।’
‘তারপর?’
‘দুপুর পর্যন্ত আমরা মনে করেছি, অপারেশনের পর তারা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু দুপুরেই টেলিফোন পেলাম সাউথ টার্কো দ্বীপের আমাদের অফিস থেকে। জানাল, অভিযানের আগে যে তিনজনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর সংগ্রহের জন্যে পাঠানো হয়েছিল, কেউ ফিরেনি, অভিযানে যাদের আসার কথা তাদেরও কোন চি‎হ্ণ পাওয়া যায়নি।’
‘অভিযানে আসার কথা’ বলেছে কেন, অভিযানে ওরা যায়নি?’
‘সে কথা তারা জানে না।’
‘চিহ্ণ খুঁজে পেল না কেন? ওরা কি ওখানে গিয়েছিল?
‘সাউথ টার্কো পুলিশ ষ্টেশন থেকে বিষয়টা তারা জানতে পারে।’
‘পুলিশ ষ্টেশন থেকে?’
‘হ্যাঁ। গ্রামবাসীদের তরফ থেকে খুব সকালে থানায় কেস হয় যে, ডাকাতরা তাদের গ্রাম আক্রমণ করতে এসেছিল। পথে তিনজনকে পেয়ে ডাকাতরা তাদের হত্যা করে। পরে গ্রামবাসীরা জেগে উঠলে ওরা পালিয়ে যায় তাদের বোটে চড়ে।’
লোকটি থামলেও ফার্ডিন্যান্ড কথা বলতে পারলো না। সে স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। এ ধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনা ঐ দ্বীপে এর আগেও একবার ঘটেছে। সে ঘটনায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিল ৩০ জন লোক। কিন্তু আজকের ঘটনায় কথা বলার শক্তি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। একশ’ জনেরও বেশি সশস্ত্র লোক সেখানে নেই, ফিরেও আসেনি, তাদের নিহত হবার ঘটনাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে ওরা গেল কোথায়! এবারের ঘটনায় একটাই শুধু নতুন বিষয়, ওদের পক্ষের তিনজন লোক নিহত হয়েছে এ পক্ষের লোকদের হাতে।
‘ওদের পক্ষের যে তিনজন লোক নিহত হয়েছে, তারা কিভাবে নিহত হয়েছে?’ অনেকক্ষণ পর বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘ষ্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছে।’
‘থানা তদন্তে গিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ। আমাদেরও লোক গিয়েছিল পুলিশের সাথে। তারা গ্রাম, ঘাট এলাকা, ঘাট পর্যন্ত রাস্তা, আশপাশ এলাকা সবই তারা পুলিশের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখেছে, কিন্তু সন্দেহজনক কোথাও কিছু দেখতে পায়নি।’
‘কি চিহ্ণ তারা খুঁজেছে?’
‘কোন বড় সংঘাত-সংঘর্ষ ও রক্তারক্তি হলে তার একটা চিহ্ণ থাকবেই। সে রকম কিছু তারা পায়নি।’
লোকটি কথা শেষ করলেও ফার্ডিন্যান্ড কথা বলল না। ভাবছিল সে। বলল এক সময়, ‘থানা কি বলেছে?’
‘পুলিশরা তিনটা খুনকেই বড় করে দেখছে। তারা মনে করছে, রাতে কোন জলদস্যু গ্রামগুলোর উপর চড়াও হতে এসেছিল। গ্রামবাসীদের আবেদনে দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে দু’টি পুলিশ বক্স বসেছে এবং রাতে পুলিশ এলাকায় টহল দিচ্ছে।’
‘গ্রান্ড টার্কস-এর পুলিশকে কিংবা পুলিশে আমাদের যারা আছে তাদের কিছু বলা হয়নি?’
‘না বলা হয়নি। বললে তো সব কথাই বলতে হবে। এ সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারিনি।’
‘ঠিক করেছ। ওখানকার বৃটিশ পুলিশের মধ্যে বেয়াড়া পুলিশ অফিসার অনেক আছে যাদের কাছে ঘটনার প্রকাশ ঘটলে আমাদের ক্ষতি হবে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
বলে গোল্ড ওয়াটার তাকাল ফার্ডিন্যান্ডের দিকে এবং বলল, ‘ওর কাছ থেকে আর কিছু জানার আছে?’
‘সামান্য দু’একটা কথা।’ বলে ফার্ডিন্যান্ড লোকটিকে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ওদের কাছে অনেকগুলো মোবাইল টেলিফোন ছিল। ওদের কোন টেলিফোন পাওয়া যায়নি?’
‘না স্যার।’
‘তোমরা কি সাগরে সন্ধান করেছ?’
‘জ্বি। আমাদের কয়েকটা বোট দ্বীপটির চারদিকের গোটা সমুদ্র এলাকা তন্ন তন্ন করে দেখেছে। সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি।
লোকটি কথা শেষ করতেই ফার্ডিন্যান্ড তাকে বলল, ‘তোমরা গিয়ে রেষ্ট নাও। দরকার হলেই ডাকব তোমাদের।’
লোক দু’জন বেরিয়ে গেলে ফার্ডিন্যান্ড বিমূঢ় দৃষ্টি তুলে তাকাল গোল্ড ওয়াটারের দিকে। বলল, ‘আপনি কিছু বুঝলেন?’
‘আমি মনে করি সেখানে অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আমাদের লোকেরা হয় বন্দী হয়েছে, নয়তো সবাই নিহত হয়েছে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘এটা কি সম্ভব? সর্বোধুনিক অস্ত্রসজ্জিত আমাদের ১০০ জন লোককে ওখানকার গ্রামবাসীরা হত্যা বা বন্দী করবে কেমন করে?’
‘তা আমি জানি না। কিন্তু বন্দী বা হত্যা ছাড়া অন্য কোন ব্যাখ্যা বাস্তব নয়।’
‘বন্দী বা নিহত হওয়ার ঘটনাই বা বাস্তব হয় কি করে?’
‘আমারও এটা প্রশ্ন। কিন্তু হত্যা বা বন্দী হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর কথা আমি চিন্তাও করতে পারছি না।’
‘পাঁচটা বোট গেল কোথায়?’
‘ওরা ওগুলো সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে।’
‘কেন? এ ধরনের বোট তো তাদের জন্যে খুব লোভনীয়।’
‘শত্রুকে তুমি গেঁয়ো বললেও আমার মনে হচ্ছে ওরা খুব বুদ্ধিমান। আমাদের লোকদের ওরা হত্যা বা বন্দী করেছে এটা তারা কোনভাবেই প্রমাণ হতে দিতে চায় না। থানায় তারা ডাকাত পড়ার ইজাহার দিয়ে দারুণ বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। নিজেদের মজলুম প্রমাণ করে পুলিশকেও তারা তাদের পক্ষে নিতে চায়।’
‘কিন্তু হঠাত এ বুদ্ধি তাদের মাথায় এলো কি করে? এ গ্রামবাসীদের জানি আমরা। এরা প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক প্রতিবাদের ভাষাও জানতো না। এদের এমন সাহস, শক্তি ও বুদ্ধি আসবে কোত্থেকে?’
‘এই উত্তর আমার কাছেও নেই।’
গোল্ড ওয়াটার থামলেও ফার্ডিন্যান্ড কিছুক্ষণ কথা বলল না।
বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফার্ডিন্যান্ড বলল, ‘আমাদের জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়ার জন্যে এবং শত্রুকে আর বাড়িতে না দেবার জন্যে এখনই সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করতে হবে বলে আমি মনে করছি।’
‘না ফার্ডিন্যান্ড এ ধরনের অভিযান করে আমরা যে সংকটে পড়েছি তাকে আরও বৃদ্ধি করবে। এ পর্যন্ত দুই ঘটনায় আমাদের লোকবলের ক্ষতি হয়েছে, আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু ইমেজের ক্ষতি হয়নি। আমাদের এই আক্রমণের ঘটনা প্রকাশিত হবার সাথে সাথে আমরা সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত হবো বিশ্বের সকলের কাছে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘আমরা পুলিশের সহযোগিতা পাব। সুতরাং খুব অসুবিধা কি হবে?’
‘কিছু পুলিশের বা বেশিরভাগ পুলিশের পাবে, সব পুলিশের পাবে না। সুতরাং বিষয়টা প্রকাশ পাবে। এ নিয়ে হৈ চৈ হবে। হৈ চৈ করবে বৃটেনবাসীরাও। সুতরাং বৃটিশ পুলিশকে প্রকাশ্যে আমরা পক্ষে পাব না।’
‘ঠিক বলেছেন। প্রকাশ্য অভিযান ক্ষতিকর হবে। আগের মতই গোপনে পুনরায় একটা চেষ্টা করতে আমরা পারি।’
‘পারি। কিন্তু আগের চেয়ে তা কঠিন হবে। আগে পুলিশ পাহারা ছিল না, এখন পুলিশ আছে। তাছাড়া কিছু না জেনে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়াকে যুক্তিসঙ্গত মনে করি না।’
‘তাহলে?’
‘আমার মতে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালিয়ে কোন জনগোষ্ঠীকে দমন করা এখন বিপজ্জনক। এ বিষয়টা খুব তাড়াতাড়ি জানাজানি হয়ে যায় এবং চারদিক থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে, এমনকি বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন থেকে এর তদন্তও হয়। সুতরাং সামরিক অভিযানের পথে অগ্রসর হওয়া যাবে না। আমি মনে করি, আমরা যে পথে অর্থাৎ মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাস করার যে পথে অগ্রসর হচ্ছি, সেটা দীর্ঘ মেয়াদী হলেও এটাই নিরাপদ। এ কার্যক্রমটাই আমাদের আরও জোরদার করা দরকার।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘তাহলে সাউথ টার্কো দ্বীপে আমরা এখন কিছুই করব না? এত বড় পরাজয় মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর হবে।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘কিছুই করব না, এ কথা ঠিক নয়। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটের লোকদের সেখানে ছড়িয়ে দাও। জানতে চেষ্টা কর, সেখানে কি ঘটেছে, কারা দায়ী। যারা দায়ী, তাদের এক এক করে কিডন্যাপ কর এবং শেষ করে দাও। আমাদের লোকেরা এক সাথে হারিয়ে গেছে, আর ওরা এক এক করে হারিয়ে যাবে।’
ফার্ডিন্যান্ডের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘যিশুকে ধন্যবাদ, আমাদের লোকেরা খুশী হবে এ কর্মসূচী পেলে। আর মুসলিম পুরুষ শিশু জন্মের পরেই শেষ করে দেয়ার ব্যাপারটা আমরা জোরদার করব।‘
‘কিন্তু সাবধান, খুব গোপনে বুদ্ধিমত্তার সাথে এ কর্মসূচী এগিয়ে নিতে হবে। এটাও খুব বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে, যদি জানাজানি হয়ে যায়।’
‘আমরা খুব সাবধান এ ব্যাপারে। আমাদের বিশ্বস্ত লোকদের দিয়ে আমরা এ কাজ করাচ্ছি। চিন্তার কোন কারণ নেই।’
‘খুশী হলাম।’
‘কিন্তু মারাত্মক কিছু দু:সংবাদও শুনলেন’
‘এ রকম কিছু দু:সংবাদের জন্যে তৈরি থাকতে হয়, এক তরফা একটা কাজ হয়ে চলবে, এটা স্বাভাবিক নয় ফার্ডিন্যান্ড।’ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিতে দিতে বলল গোল্ড ওয়াটার। থামল একটু।
তারপর চায়ের কাপটা পিরিচে রাখতে রাখতে বলল, ‘এখন উঠি ফার্ডিন্যান্ড। কলম্বাস গীর্জার ফাদারের সাথে একটু কাজ আছে। সেটা সেরে রেষ্ট হাউজে ফিরব।’
বলে উঠে দাঁড়াল গোল্ড ওয়াটার।
ফার্ডিন্যান্ড তার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল, ‘ঈশ্বরই আজ আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। আপনার মূল্যবান পরামর্শ গোটা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘কাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছ, এটা তোমার কাজ, আমার কাজ শুধু নয়, সকলের কাজ।’
ফার্ডিন্যান্ড গাড়ি বারান্দায় গোল্ড ওয়াটারকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ফিরে এল। নিজের ষ্টাডি রুমে যাবার পথে ফার্ডিন্যান্ড তার মেয়ে শিলা সুসানের আর্ট রুমে উঁকি দিল। বলল, ‘স্কেচটা শেষ করতে পেরেছ সুসান?’
শিলা সুসান একটা স্কেচের দিকে তাকিয়ে গালে হাত দিয়ে বসেছিল। তার আব্বার কথা কানে যেতেই ফিরে তাকাল তার আব্বার দিকে। হাসল। বলল, ‘আর্টের একটা রঙ লাল বটে, ড্যাডি, কিন্তু মানুষের লাল রক্তের সাথে এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য।’
‘তাতো বটেই। কিন্তু তারপর কি?’ বলল সুসানের আব্বা ঠোঁটে হাসি টেনে।
‘ওপাশে তোমাদের রক্তারক্তির গল্পে আমার রঙের কাজ আমি করতে পারিনি। আমার আর্ট রুম অনেকটা ড্রইং-এর অংশ। আমার এ রুম পাল্টে দাও।’
শিলা সুসানের আব্বা ফার্ডিন্যান্ড সুসানের শেষের কথাগুলো যেন শুনতেই পায়নি। বলল, ‘পাগল মেয়ে, রক্তারক্তির গল্প কোথায় শুনলে। খবর এসেছে আমাদের একশ’ লোককে ওরা সম্ভবত হত্যা করেছে। এ বিষয় নিয়েই আমরা আলোচনা করছিলাম।’
‘একশ’ লোক হত্যা হওয়া মানে রীতিমত একটা যুদ্ধ। এটা কি রক্তারক্তি নয়? ‘ওরা’ কারা ড্যাডি?’
‘সাউথ টার্কো দ্বীপের মুসলমানরা।’
‘কিন্তু ওদের সাথে তোমাদের বিরোধ কেন? কেন একশ’ লোকের বাহিনী পাঠিয়েছিল ওদের বিরুদ্ধে?’
‘এটা অস্তিত্বের রাজনীতি। তুমি এখন ছোট, পড়াশুনা করছ। আরও বড় হও বুঝবে মা। ধন্যবাদ।’
বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার ষ্ট্যাডি রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
তার আব্বা চলে গেলেও শিলা সুসান দরজার দিকেই তাকিয়ে রইল। তার চোখের শূন্য দৃষ্টি বাইরে প্রসারিত। তার আব্বার শেষ কথাই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার আব্বার শেষ কথা থেকে সুসান এটুকু বুঝেছে, বিষয়টা বড় রাজনীতির ব্যাপার। কিন্তু রাজনীতির সাথে এই হত্যাকান্ড কেন? বিভেদের এই হানাহানি ভাল লাগে না তার। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিগ্রো ছাত্রদের ক্যান্টিন ও ক্লাসে বসার জায়গা আগে আলাদা ছিল। এখন এক হয়েছে। কিন্তু মন, সম্পর্ক ও সামাজিকতা তো হয়নি। সেই বিভেদের দেয়াল এখনও খাড়াই আছে। এ থেকে হানাহানি ও রক্তারক্তির ঘটনাও ঘটেছে। এই ক’দিন আগে একজন কৃষ্ণাংগ ছাত্রের সাথে শ্বেতাংগ ছাত্রীর প্রেম নিয়ে যে গন্ডগোল ও হানাহানি হয়েছে তা দেখে মনে হয়েছে কৃষ্ণাংগ ছাত্রটি যেন মানুষ নয়, পশু। শেষে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে। এটাকেও নিশ্চয় বলা হবে অস্তিত্বের রাজনীতি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্বতন্ত্র অস্তিত্বই আসল সমস্যা। কিন্তু স্বতন্ত্র তো একটা বাস্তবতা। এই বাস্তবতা সমস্যা হয়ে দাঁড়ালে তো বিপদ! এর সমাধান কোথায়? সকল ধর্ম, জাতীয়তা, স্বত্তা-স্বাতন্ত্রের উর্ধে ওঠা? মাথা ব্যথা বলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে?
মাথা ঘুরে গেল শিলা সুসানের। আর চিন্তা করতে পারল না।
হাতের স্কেচ এবং তুলিটা টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

ডা: মার্গারেটের চোখের সামনেই শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার মতই মৃত্যুটিকে মনে হলো ডা: মার্গারেটের কাছে।
রাজধানী গ্রান্ড টার্কস-এর একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর ছেলে এই শিশুটি।
ডা: মার্গারেট পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে শিশুটির দিকে। মৃত্যুটি তার কাছে অবিশ্বাস্য। সকালে ডিউটিতে এসেই সে পরীক্ষা করেছে শিশুটিকে। সব ঠিক আছে। তার শারীরিক অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্টও ভাল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টায় কি ঘটে গেল। মরেই গেল শিশুটি।
চিন্তার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল ডা: মার্গারেট।
ওয়ার্ডের ষ্টুয়ার্ড মেয়েটির কথায় সম্বিত ফিরে পেল ডা: মার্গারেট। সে বলছিল, ‘ম্যাডাম, ছেলেটিকে সরিয়ে ফেলতে হয়।’
ডা: মার্গারেট তাকাল ষ্টুয়ার্ডের দিকে। ভাবল অল্পক্ষণ। তারপর বলল, ‘ষ্টুয়ার্ড, আমি ছেলেটিকে মর্গে পরীক্ষা করাতে চাই।’
‘কেন?’ অস্বাভাবিক কিছু সন্দেহ করেন?’
‘ঠিক তা নয়, কিন্তু সকালে পরীক্ষার সময় একে যেমন পেয়েছি, তাতে এভাবে মরার কথা নয়। তাই কারণ জানতে চাই।’
‘ম্যাডাম, তাহলে আপনি নোট দিন। ওয়ার্ডের হেড স্যার এবং হাসপাতালের ডিজি নোট অনুমোদন করলে তবেই মর্গে এই পরীক্ষা সম্ভব।’
ডা: মার্গারেট ভাবল কিছুক্ষণ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আহমদ মুসার মনোহর অবয়বটি। আহমদ মুসার নির্দেশেই সে হাসপাতালের ইমারজেন্সী ওয়ার্ড থেকে অনেক তদবির করে বদলী নিয়ে প্রসূতি ও শিশু ওয়ার্ডে এসেছে। তাকে অনুরোধ করা হয়েছে, ওয়ার্ডের মুসলিম পুরুষ শিশুর উপর নজর রাখতে, তাদের কারো মৃত্যু হলে তার কারণ সন্ধান করতে। আহমদ মুসার এই অনুরোধ তার কাছে এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ। সে এই নির্দেশ পালন থেকে পিছাতে পারে না।
ডা: মার্গারেট মুখ তুলল ষ্টুয়ার্ডের দিকে। বলল, ‘আসুন আমি নোট দিচ্ছি।’
ডা: মার্গারেট ওয়ার্ডে তার অফিসে এসে তার প্যাডে অফিসিয়াল একটা নোট লিখে ষ্টুয়ার্ডের হাতে তুলে দিল।
নোট নিয়ে ষ্টুয়ার্ড চলে গেলে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ডা: মার্গারেট। তার এই পদক্ষেপ সাধারণ দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিক মৃত্যুর পক্ষে সুস্পষ্ট কারণ ঘটলেই শুধু এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। একমাত্র প্রমাণহীন সন্দেহ ছাড়া তার দাবীর পক্ষে আর কিছু যুক্তি নেই। তাঁর উর্ধ্বতনরা তার সুপারিশকে কি দৃষ্টিতে দেখবেন?
ডা: মার্গারেট যখন এসব ভাবনায় ডুবে আছে, তখন হন্ত-দন্ত হয়ে তার ঘরে প্রবেশ করল ডা: ওয়াভেল। প্রবেশ করেই বলল, ‘ডা: মার্গারেট আপনি কি নোট দিয়েছেন? এর কি প্রয়োজন?’
ডা: মার্গারেট উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। বলল, ‘আমি যা মনে করেছি, সেটাই আমি নোটে লিখেছি স্যার।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু আপনার যুক্তি কি?’
‘স্যার রোগীর রোগের ধরন, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট কোন কিছুই শিশুটির মৃত্যু সমর্থন করে না। এটাই অস্বাভাবিকতা। এই অস্বাভাবিকতা কেন ডাক্তার হিসেবে আমাদের জানা কর্তব্য। এই কর্তব্যবোধ থেকেই আমি এই নোট দিয়েছি।’ বলল ডা: মার্গারেট।
‘হতে পারে রোগ নতুন কোন দিকে টার্ন নেয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। যাই হোক রোগেই তার মৃত্যু ঘটেছে। এটা অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। নোট ফেরত নিন ডা: মার্গারেট।’
‘ফেরত নেবার প্রয়োজন নেই স্যার। আপনি এবং ডিজি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই তো হবে।’
‘ডা: মার্গারেট, আমরা ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি বলে মনে হয়।’
‘দু:খিত স্যার, নোট আমার হাত থেকে চলে গেছে, এটা এখন আপনাদের এক্তিয়ারে। যা ভাল মনে করছেন, তাই করুন।’
‘একটা নোট আমার কাছে পৌছার পর তা আমি ডিজিকে না দিয়ে পারি না। তাই বলছিলাম আপনি নোটটা প্রত্যাহার করলে ঝামেলা চুকে যায়।’ নরম সুরে বলল ডা: ওয়াভেল।
‘আপনি নোটে প্রয়োজন নেই লিখে দিন, তাহলেই তো হল।’
‘আমি আপনার সাথে ঝগড়ায় নামতে চাচ্ছিলাম না ডা: মার্গারেট।’
‘ঝগড়ার তো কিছু নেই। এটা মত পার্থক্যের ব্যাপার এবং এ মত পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক।’
‘এই মত পার্থক্যের প্রয়োজন কি? আমি এটা চাই না। আবার অনুরোধ করছি, নোটটা আপনি প্রত্যাহার করুন।’
স্তম্ভিত হলো ডা: মার্গারেট ডা: ওয়াভেলের এই অনুরোধে। তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হলো, ডা: ওয়াভেলের মধ্যে কাকুতি মিনতির ভাব দেখে। একটা সামান্য বিষয় নিয়ে ডা: ওয়াভেলের মত একজন অত্যন্ত সিনিয়র ডাক্তার তার মত নবীন ডাক্তারের কাছে কাকুতি মিনতির পর্যায়ে নামবে কেন? এ বিষয়টাও ডা: মার্গারেটের কাছে শিশুটির মৃত্যুর মতই অস্বাভাবিক মনে হলো। এই চিন্তার সাথেই তার মনে হলো অস্বাভাবিকতার গ্রন্থি মোচন অবশ্যই হওয়া প্রয়োজন।
অবশেষে বলল, ‘স্যার নোটের কথাই আবার বলছি, ডাক্তার হিসেবে আমাদের সকলেরই জানা দরকার কি কারণে বা কি রোগে তার মৃত্যু হলো। এতে আমরা জানতে পারবো আমাদের করণীয় কি।’
‘এটাই তাহলে আপনার শেষ কথা?’
‘আমি দু:খিত স্যার।’
‘আপনি ভাল করলেন না ডা: মার্গারেট। আমি যা বলেছি, সব আপনার ভালোর জন্যেই বলেছি।’
‘দু:খিত স্যার।’
‘দু:খিত আমি আপনার জন্যে।’ বলে উঠে দাঁড়াল ডা: ওয়াভেল।
ডা: ওয়াভেল চলে যাবার পর এলেমেলো চিন্তার মধ্যে আবার ডুবে গেল ডা: মার্গারেট। মন তার খারাপ হয়ে গেল একজন সিনিয়র ডাক্তারের অনুরোধ এভাবে প্রত্যাখ্যান করায়। ডা: ওয়াভেল এই ওয়ার্ডে আছেন ৫ বছরেরও বেশী কাল ধরে। পুরনো লোক উনি। কিন্তু ডা: মার্গারেট বুঝতে পারছে না, এমন পুরনো ও অভিজ্ঞ ডাক্তার অমন অযৌক্তিক অনুরোধ করতে পারলেন কেমন করে! তার চেয়ে বড় কথা হলো, তার অনুরোধের ধরন দেখে মনে হয়েছে আমি তার বিরুদ্ধে ক্ষতিকর যেন কিছু করেছি, যা থেকে আমিই তাকে উদ্ধার করতে পারি। আবার শেষের দিকে ‘আমি দু:খিত আপনার জন্যে’ বলে যে শক্ত কথা বললেন, সেটাও তাঁর ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি থেকে এসেছে। বিষয়টাকে এভাবে তিনি ব্যক্তিগত নিলেন কেন?
মাথার চিন্তাটাকে হাল্কা করার জন্যে ওয়ার্ডে বের হলো ডা: মার্গারেট। রোগীদের খোঁজ খবর নিতে শুরু করল।
এক সময় একজন এ্যাটেনডেন্ট ছুটে এল ডা: মার্গারেটের কাছে। বলল, ‘শীঘ্রী চলুন, ডি জি স্যারের টেলিফোন।’
নিজের অফিসে ফিরে এসে টেলিফোন ধরল ডা: মার্গারেট।
ওপার থেকে ডিজি বলল, ‘তুমি যে নোট দিয়েছ, তা ডা: ওয়াভেল সমর্থন করেননি। শিশুটির মৃত্যুর অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে তুমি কতটা নিশ্চিত?’
‘আমার দাবীর ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। শুরু থেকেই আমি শিশুটির রোগের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করছি। এবং আজ সকালেও যা দেখেছি, তাতে ঐ রোগে মৃত্যুটা একেবারেই অস্বাভাবিক।’
‘তাহলে আমি সার্বিক পরীক্ষার অর্ডার দেব?’
‘স্যার যদি আমার উপর আস্থা রাখতে পারেন।’
‘তোমার রেকর্ড আমি জানি। সে জন্যেই টেলিফোন করলাম তোমাকে। আমি ওয়ার্ড-এর ইনচার্জের মতকেই তো ও,কে করতে পারতাম।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’
‘ও.কে মাই ডটার। তোমার সাফল্য কামনা করি। ধন্যবাদ।’
টেলিফোন রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ডা: মার্গারেট।

পরদিন বিকেল।
ওয়ার্ডে ঘুরতে গিয়ে দুটি শিশুর অবস্থার আকস্মিক পরিবর্তন দেখে চমকে উঠল ডা: মার্গারেট।
এ দু’টি শিশুর উপরও ডা: মার্গারেট ঘনিষ্ঠ দৃষ্টি রেখে আসছিল, শিশু দু’টি ভূমিষ্ঠ হয়ে বেডে আসার পর থেকে। শিশু দু’টি মুসলিম পুরুষ শিশু।
গতকাল রাতে ডিউটি থেকে যাবার সময় ডা: মার্গারেট শিশু দু’টিকে দেখে গেছে। সবদিক দিয়েই ভাল ছিল। কিন্তু আজ এসে দেখছে, শিশু দু’টির প্রাণশক্তি যেন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বাইরে রোগের তেমন কোন লক্ষণ নেই, ভেতরে থাকলেও তা বলার শক্তি শিশুর নেই। অবসাদগ্রস্থতা একমাত্র লক্ষণ। ধীরে ধীরে বাড়ছে শিশু দু’টির অবসাদগ্রস্থতা। আগের শিশুটির সাথে এর দু’টি শিশুর যেটুকু পার্থক্য তা হলো, ঐ শিশুটি নীরব ঘুমের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গেছে, আর এ দু’টি শিশু ঘুম নয়, এমনিতেই নিশ্চল হয়ে পড়ছে, যেন ধীরে ধীরে মৃত্যু এসে গ্রাস করছে শিশু দু’টিকে।
ডা: মার্গারেট দ্রুত শিশু দু’টির ফাইলে তাদের প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট সুপারিশ করল এবং লাল কালিতে টপ প্রায়োরিটি লিখল।
ফাইলটি আয়ার হাতে তুলে দিয়ে ডা: মার্গারেট সহকারী ডাক্তারকে ওয়ার্ডের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি একটু হাসপাতাল লাইব্রেরীতে যাচ্ছি। কেউ খোঁজ করলে বলো।’
আধ ঘণ্টা পর ওয়ার্ডে ফিরে এল ডা: মার্গারেট। ওয়ার্ডে ঢুকতেই তার সহকারী ডাক্তার মুখ শুকনো করে বলল, ‘ডা: ওয়াভেল স্যার আপনার নোট গ্রহণ না করে নিউরো টেষ্ট রিকোসেন্ড করে শিশু দু’টিকে নিউরো বিভাগে স্থানান্তরিত করেছে।’
চমকে উঠল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘নিউরো প্রোব্লেম এখানে মূল ইস্যু নয়। নিউরো টেষ্ট দিয়ে কি হবে?’
বলে হতাশভাবে চেয়ারে বসে পড়ল ধপ করে।
আর কোন কথা না বলে ডা: মার্গারেট চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বুজল। চোখ বুজতেই শিশু দু’টির ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। শিশু দু’টির যা অবস্থা তাদের প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট দরকার। তাতে শিশু দু’টিকে বাঁচানো যেত কিনা বলা মুষ্কিল, কিন্তু রোগটা জানা যাবে, রোগের কারণ জানা যাবে, জানা যাবে কেন কেমন করে দু’টি শিশু একই সময়ে একই রোগে আক্রান্ত হলো। কিন্তু কি করবে সে! এই ছোট ব্যাপার নিয়ে সে ওয়ার্ড প্রধানকে ডিঙিয়ে ডিজি’র কাছে যেতে পারে না।
ওয়ার্ডে সেদিনের শেষ রাউন্ডটা শেষ করে ডা: মার্গারেট অফিস কক্ষে ফিরে হাত ব্যাগ নিয়ে বেরুচ্ছিল এমন সময় তার টেবিলের টেলিফোন বেজে উঠল।
টেলিফোন ধরল ডা: মার্গারেট।
‘আমি ডা: কনরাড। আমি ডা: ওয়াভেলকে না পেয়ে তোমার কাছে টেলিফোন করলাম।’ ওপার থেকে কণ্ঠ ভেসে এল।
নাম শুনেই শশব্যস্ত হয়ে উঠল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘স্যার আমি ডা: মার্গারেট।’
ডা: কনরাড নিউরোলজীর প্রফেসর। নিউরো ওয়ার্ডের প্রধান তিনি।
‘তোমাকেই চাচ্ছি আমি। যে শিশু দু’টিকে ডা: ওয়াভেল এ ওয়ার্ডে রেফার করেছিলেন, আমি ওদের দেখেছি। আমি ওদের ফেরত পাঠালাম। তোমার নোটই ঠিক। প্রোব্লেমটা আমার ধারণায় প্যাথোলজিক্যাল। তোমরা তাড়াতাড়ি দেখ ওদিকটা। খুবই সংকটাপন্ন ওদের অবস্থা।’ বলল ডা: কনরাড।
ডা: মার্গারেট খুশী হলো, উদ্বিগ্নও হলো সেই সাথে শিশু দু’টির ভবিষ্যত নিয়ে।
টেলিফোন রেখে দ্রুত ওয়ার্ডে ফিরে এল ডা: মার্গারেট। ইতিমধ্যে শিশু দু’টিকে পৌছানো হয়েছে ওয়ার্ডে।
ডা: মার্গারেট তাড়াতাড়ি ডা: কনরাড-এর রেফারেন্স দিয়ে আরেকটা নোট লিখল শিশু দু’টির ফাইলে।
নোট লেখা শেষ করেই ডা: মার্গারেট সহকারী ডাক্তারকে বলল, ‘নোট অনুসারে এদের টেষ্টের ব্যবস্থা কর। পরবর্তী ডাক্তার ডিউটিতে না আসা পর্যন্ত আমি আছি।’
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাড়ি আসার জন্যে যখন গাড়িতে উঠল ডা: মার্গারেট, তখন মনটা তার অনেক হালকা মনে হলো। শিশু দু’টির উপযুক্ত টেষ্টের ব্যবস্থা হয়েছে। মনে মনে ধন্যবাদ দিল ডা: কনরাডকে।

পরদিন হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছে ডা: মার্গারেট।
হাসপাতালে ডিউটিতে যাচ্ছে বটে, কিন্তু তার মন খারাপ। ডা: মার্গারেট শিশু বিশেষজ্ঞ না হওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে প্রসূতি ওয়ার্ড থেকে বদলীর জন্যে ডা: ওয়াভেল গতকালই এক সুপারিশ পাঠিয়েছে ডিজি ডাক্তার ক্লার্কের কাছে।
ডা: মার্গারেট শিশু বিশেষজ্ঞ নয়, এ কথা ঠিক। কিন্তু সে মেডিসিনের ডাক্তার। হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম অনুসারে প্রত্যেক ওয়ার্ডেই অন্তত একজন করে মেডিসিনের ডাক্তার থাকবে। তাছাড়া প্রসূতি ও শিশু রোগের উপর ডাক্তার মার্গারেটের একটা বিশেষ ট্রেনিং আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন মেডিকেল ইনষ্টিটিউট থেকে।
ডা: মার্গারেট কিছুতেই বুঝতে পারছে না ডা: ওয়াভেল কেন তার প্রতি বিরূপ। দু’তিন দিন আগে তিনটি শিশু নিয়ে যা ঘটেছে, তা প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিনের সাধারণ দৃশ্য। একে তার অন্যভাবে নেবার কারণ নেই। তাহলে? এই তাহলের কোন উত্তর মার্গারেটের কাছে নেই।
প্রস্তুত হয়ে হাসপাতালে যাবার জন্যে হাতব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল ডা: মার্গারেট।
টেলিফোন বেজে উঠল। যাবার জন্যে পা তুলেও আবার ফিরে দাঁড়াল ডা: মার্গারেট। টেলিফোন ধরল। টেলিফোন ধরেই সচকিত হলো ডা: মার্গারেট। ডিজি ডা: ক্লার্কের টেলিফোন।
‘স্যার আপনি। কিছু ঘটেনি তো?’ ডা: ক্লার্কের কণ্ঠ শুনেই শশব্যস্তে জিজ্ঞেস করল ডা: মার্গারেট।
‘কিছু তো ঘটেছেই। তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি মার্গারেট। এখনই ল্যাবরেটরি থেকে ডা: বিশপ জানালেন, তিনটি শিশুর রক্তেই অস্বাভাবিক ও ভয়ংকর ধরনের উপাদান পাওয়া গেছে। তিনটি শিশুর কেউ বাঁচেনি বটে, কিন্তু তারা ভয়ংকর কোন রোগের বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়ে গেল। তোমার সচেতনতার ফলেই তাড়াতাড়ি বিষয়টা জানা সম্ভব হয়েছে।’ বলল ডা: ক্লার্ক।
‘ধন্যবাদ স্যার। একজন ডাক্তারের যা করণীয় তার বেশি কিছু করিনি স্যার।’
‘ধন্যবাদ, মার্গারেট। রাখি, বাই।’
‘বাই, স্যার।’
টেলিফোন রাখল মার্গারেট।
চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মার্গারেটের। গত দু’তিন দিনের উদ্বেগ ও বিষণœতা, ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল মন থেকে। তার একটা ভয় ছিল, প্যাথেলজিক্যাল টেস্টে যদি কিছু না পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্বে ডা: ওয়াভেলের অভিযোগ আরও মজবুত হবে এবং প্রসূতি ওয়ার্ড তাকে অবশ্যই ছাড়তে হবে। তা যদি হয়, তাহলে আহমদ সুসার কাছে তার মুখ দেখাবার মত থাকবে না। আহমদ মুসা হয়তো ভাববে, আমার নির্বুদ্ধিতার কারণেই আহমদ মুসার একটা পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল।
এই দু:সহ অবস্থায় তাকে যে পড়তে হলো না এ জন্যে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। শিশু তিনটির প্যাথোলজিক্যাল টেস্টের এই রেজাল্ট পেলে আহমদ মুসা দারুণ খুশি হবে। কিভাবে মুসলিম পুরুষ শিশুগুলো মরছে তার কারণ সে চিহ্নিত করতে চায়। কারণ চিহ্নিত হলে কারণের উতস সে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবে।
এটা ভাবেত গিয়ে আহমদ মুসার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ডা:মার্গারেটের চোখে ভেসে উঠল। তার সাথে সাথে তার হৃদয় এল প্রশান্তির একটা পরশ। তার মনে হলো,হৃদয়ের ফ্রেমে এ মুখটা এভাবেই সব সময় বাঁধা থাকতো! এটা ভাবতে গিয়ে চমকে উঠল ডা:মার্গারেট। একটা অনধিকার চর্চার ভয় ও লজ্জা এসে তাকে ঘিরে ধরল।
মন থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাসপাতালে যাবার জন্যে পা বাড়াল সে।
কিন্তু সংগে সংগেই পা আবার থেমে গেল। ভাবল, আহমদ মুসাকে বিষয়টা সে তো টেলিফেনে জানাতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল হাসপাতারৈ গিয়ে রিপোর্ট দেখে বিস্তারিত জানানোই ঠিক হবে।
পা বাড়াল আবার সে হাসপাতালে যাবার জন্যে। নিজস্ব গাড়িতে করে যাচ্ছে সে হাসপাতালে।
ডা:মার্গারেটের আব্বা ছিল একজন বৃটিশ সেনা অফিসার। সুতরাং নিজেদের গাড়ি, বাড়ি নিয়ে তারা গ্রান্ড টার্কস দ্বীপের সচ্ছল পরিবারের একটি।
তাদের বাড়িকে সবাই কর্নেলের বাড়ি বলে জানে। তার আব্বা কর্নেল র‌্যাংক থেকে রিটায়ার করে। ডাক্তার মার্গারেট ও জর্জ দু’টি সন্তানই মাত্র তার।
চলছে মার্গারেটের গাড়ি। গাড়িটা সুন্দর নতুন একটা কার। রাস্তায় তেমন ভীড় নেই।
ডা:মার্গারেট তার গাড়ির রিয়ারভিউতে দেখল, পিছন থেকে একটা ট্রাক আসছে নির্ধারিত গতির চেয়ে অনেক বেশি তীব্র বেগে।
ডা: মার্গারেট সাবধানতা হিসাবে তার গাড়িটাকে রাস্তার পাশ বরাবর চাপিয়ে নিয়ে ট্রাককে বেশি জায়গা দিয়ে দিল।
পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড কি ঘটল ডা:মার্গারেট কিছুই বুঝল না। শুধু তার মনে হলো, ট্রাকটি এসে তার গাড়ির উপর পড়েছে। তারপর কিছুই মনে নেই তার। রাস্তার পাশ বরাবর ছিল রেলিং-এর পর খাল।
খালটি প্রাকৃতিক নয়, তৈরি করা। রাজধানী শহরের মধ্য দিয়ে খালটি দ্বীপের বুক চিরে সাগরে গিয়ে পড়েছে।
ট্রাকের প্রচন্ড ধাক্কায় ডা: মার্গারেটের গাড়িটা রেলিং ভেঙে ছিটকে গড়িয়ে পড়ল খালে।

হাসপাতাল বেডে জ্ঞান ফিরে পেয়ে ডা: মার্গারেট দেখতে পেল জর্জকে।
জর্জের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসি। মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির চিহ্ন।
ডা: মার্গারেটের ঠোঁটেও ফুটে উঠল ম্লান হাসি। ধীর কণ্ঠে বলল, ‘এখন সময় কতরে জর্জ?’
‘বিকেল পাঁচটা।’
উত্তরটা দিয়েই জর্জ আবার শুরু করল, ‘মাথার আঘাতটাই বড়, কিন্তু তাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। খুব অল্পের জন্যে খুব বড় ক্ষতি থেকে আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়েছেন। সবাই খুশী হয়েছে। ডা: ক্লার্ক, ডা: কনরাড দু’জনেই অপারেশনের সময় হাজির ছিলেন।’
‘ডা: ওয়াভেল ছিলেন না?’
‘উনি এসেছিলেন, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকেননি। কি কাজ থাকায় চলে যান।’
‘আর কেউ আসেনি?’
‘কেন, হাসপাতালের সব ডাক্তারই এসেছিল।’
‘আর কেউ?’ মার্গারেটের ঠোঁটে ম্লান হাসি।
জর্জ ডা: মার্গারেটের মুখের দিকে চাইল, তারপর চিন্তা করল।
পরক্ষণেই হেসে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ ভাইয়া এসেছিলেন। দু’জন এক সাথে এসেছিলাম। তোমাকে দেখে তো উনিই প্রথম বলেন, ‘আল্লাহ মার্গারেটেকে বাঁচিয়েছেন।’
ম্লান হাসল মার্গারেট। বলল, ‘উনি আছেন?’
‘না আপা। উনি তোমাকে দেখেই দুর্ঘটনার স্পটে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আবার হাসপাতালে এসেছিলেন। এসে আমার সাথে কিছু কথা বলেই আবার চলে গেছেন।’
বলে জর্জ তার গলার স্বরটা আর একটু নামাল এবং ডা: মার্গারেটের দিকে আর একটু ঝুকে পড়ে বলল, ‘শুরু থেকেই পুলিশ বলছে তোমার ওটা এ্যাকসিডেন্ট, সবাই বিশ্বাসও করেছে। কিন্তু আহমদ মুসা ভাই এ্যাকসিডেন্টের স্পট দেখে এসে আমাকে বলে গেলেন, ‘ট্রাকটি রাস্তার যেখানে এসে মার্গারেটের গাড়ির যে জায়গায় আঘাত করেছে, তাতে এই আঘাত নি:সন্দেহে পরিকল্পিত। সুতরাং এ্যাকসিডেন্ট নয়।’
ডা: মার্গারেটের মুখের আলোটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। বলল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, ‘ঠিক, আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে। ট্রাকটার তীব্র গতি দেখে আমি আমার গাড়ি রাস্তার কিনার বরাবর সরিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে এসেই ট্রাকটি আঘাত করে আমার গাড়িকে। ট্রাকটি কি এ্যাকসিডেন্টে পড়েছে?’
‘না পালিয়েছে।’
‘একমাত্র ব্রেক ফেল হলেই ট্রাকটা ঐভাবে আমাকে পাগলের মত আঘাত করতে পারতো। সে ক্ষেত্রে ট্রাকটিও এ্যাকসিডেন্টে পড়ত। তা যখন হয়নি, তখন ঠিকই ওটা এ্যাকসিডেন্ট নয়।’
‘কিন্তু আপা ওটা যদি এ্যাকসিডেন্ট না হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে কে তোমাকে ওভাবে হত্যা করতে চেয়েছিল?’
‘জানি না জর্জ। আমার কোন শত্রু আছে বলে হয় না।’
বলে একটু থেমেই ডা: মার্গারেট আবার বলল, ‘উনি কোথায় গেলেন?’
‘ভাইয়া?’
‘হ্যাঁ।’
‘যে ট্রাকটা এ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়েছে, তার খোঁজ পাওয়া যায় কিনা উনি বলেছিলেন। কিন্তু কোথায় কি কাজে গেছেন আমি জানি না।’
ডা: মার্গারেট কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলা হলো না। ঘরে প্রবেশ করলেন ডা: ক্লার্ক। তার সাথে ছিল ওয়ার্ডের ডাক্তার।
‘এই তো সেরে গেছ মার্গারেট। তুমি খুব লাকি। মাত্র দেড়-দু’ইঞ্চির জন্যে ভয়ানক পরিণতি থেকে বেঁচে গেছ।’
বলতে বলতে ডা: ক্লার্ক ডা: মার্গারেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
জর্জ উঠে আগেই পাশে সরে গেছে।
ডা: ক্লার্ক মার্গারেটের একটা হাত তুলে নিয়ে নাড়ী দেখে বলল, ‘বাঃ সবকিছুই নরমাল।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলল মার্গারেট।
‘শুনলাম, এ্যাকসিডেন্ট খুব মারাত্মক ছিল। অবশ্য তোমার কোন দোষ ছিল না। ট্রাকটাই হঠাৎ নাকি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।’ ডা: ক্লার্ক থামল।
ডা: মার্গারেট একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘স্যার মাফ করবেন, ঐ রিপোর্টগুলো আপনি পেয়েছেন?’
মার্গারেটের প্রশ্নের সাথে সাথেই ডা: ক্লার্কের মুখ মলিন হয়ে গেল। মুহূর্ত কয়েক বাকহীন হয়ে থাকার পর ডা: ক্লার্ক বলল, ‘ও তুমি ঘটনাটা এখনও জানতে পারনি। রিপোর্টগুলো এবং রিপোর্টের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছু চুরি গেছে।’
‘চুরি গেছে?’
‘হ্যাঁ। ডা: বিশপ রাতে ডিউটি থেকে যাবার সময় রিপোর্ট তার ফাইলে রেখে গিয়েছিল এবং পরীক্ষিত ব্লাড, ইউরিন ইত্যাদি রীতি অনুসারে ল্যাবেই রাখা ছিল। তোমাকে টেলিফোন করার ক’মিনিট আগে ডা: বিশপ-এর টেলিফোন পাই। টেলিফোন করেই অফিসে যান। অফিসে গিয়ে রিপোর্ট এবং ওগুলোর কিছুই পাননি।’
বিষয়টা ডা: মার্গারেটের জন্যে শ্বাসরুদ্ধকর বিস্ময়ের। কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। ডা: ক্লার্কই আবার কথা বলল বলল, ‘আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। তুমি আমার ছাত্রী এবং মেয়ের মত। বলতে বাধা নেই। বিষয়টা খুব জটিল মনে হচ্ছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
একটু থামল ডা: ক্লার্ক। দু’পাশে তাকাল। দেখল সাথের ডাক্তার ও নার্স ওদিকের টেবিলের দিকে গিয়ে ডা: মার্গারেটের ফাইল নিয়ে আলোচনা করছে।
ডাক্তার ক্লার্ক বলল, ‘চুরির খবর জানার সাথে সাথে আমি বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি এবং থানায় কেস করার সিদ্ধান্ত নেই এবং পুনরায় লাশ তিনটিকে টেষ্টের চিন্তা করি। সংগে সংগেই বিষয়টা আমি ডা: ওয়াভেল ও ডা: বিশপকে জানিয়ে দেই। মাত্র আধ ঘণ্টা পরে আমি টেলিফোন পাই। একটা ভারি কণ্ঠ যান্ত্রিক স্বরে বলে, ‘ডাক্তার সাহেব, তিনটি শিশুর প্যাথোলজিক্যাল টেষ্টের রিপোর্ট এবং আনুসঙ্গিক জিনিসগুলো হারানোর ব্যাপারে থানায় নাকি মামলা করছেন এবং লাশগুলোকে আবার নাকি পরীক্ষা করাবেন শুনলাম। শুনুন ডাক্তার, বিশেষ প্রয়োজনে ওগুলো আমরা নিয়েছি। আমরা চাই, নতুন টেষ্ট এবং থানায় মামলা করার ব্যাপারে এক ইঞ্চি এগুবেন না। এগুলে রিপোর্টগুলো যেভাবে গায়েব হয়েছে, সেভাবে আপনিও গায়েব হয়ে যাবেন।’
শুকনো কণ্ঠে কথাগুলো বলল ডা: ক্লার্ক। তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন।
‘তারপর স্যার?’ ভয় মেশানো উদগ্রীব কণ্ঠে বলল ডা: মার্গারেট।
‘ডা: ওয়াভেলের সাথে আলাপ করলাম। ডা: বিশপ-এর সাথেও। ডা: ওয়াভল এই ছোট্ট বিষয় নিয়ে কোন ঝুঁকি নেয়ার বিরোধীতা করলেন। অন্যদিকে ডা: বিশপ ভীত হয়ে পড়েন। তবে মামলা ও টেষ্টের পক্ষে তিনি। কিন্তু আবার মামলার জড়িত হয়ে বিপদ ডেকে আনতে চান না। এই অবস্থায় মামলা করা ও নতুন পরীক্ষায় সাহস পাচ্ছি না।’ বলল ডা: ক্লার্ক।
হতাশা নেমে এল ডা: মার্গারেটের চোখে মুখে। বলল, ‘তাহলে শিশু তিনটির মৃত্যুর কারণ জানার আর উপায় রইল না স্যার। তার ফলে এভাবে হয়তো শিশু মৃত্যু ঘটেই চলবে।’
‘স্যরি, মাই ডটার।’
বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ডা: ক্লার্ক বলল, ‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। ঈশ্বর আছেন মার্গারেট।’
ডা: ক্লার্ক চলে যাবার অনেক সময় পর। ডা: মার্গারেট তার বেডে শুয়ে। আহমদ মুসা তার পাশে চেয়ারে বসে। জর্জ দাড়িয়েছিল আহমদ মুসার পেছনে। ডাক্তার, নার্স, কেউ তখন ঘরে নেই।
ডাক্তার মার্গারেট গত তিনদিনের কাহিনী বলছিল আহমদ মুসাকে। বলছিল কিভাবে সেদিন প্রথম মুসলিম শিশুটির মৃত্যু হওয়ায় সন্দেহ জাগে, কিভাবে মৃত শিশুর পোষ্টমর্টেম মার্গারেট দাবী করলে ডাক্তার ওয়াভেল তার বিরোধীতা করেন, কিভাবে ডাক্তার ক্লার্কের সমর্থনে শিশুটির লাশ পোষ্টমর্টেমে যায়, কিভাবে ১দিন পরে দু’টি মুসলিম শিশু দুর্বোধ্য রোগে সংকটজনক অবস্থায় পড়ে। ডা: মার্গারেট তার প্যাথোলজিক্যাল টেষ্টের সুপারিশ করেন এবং ডাক্তার ওয়াভেলের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন, কিভাবে তাদের টেষ্ট অবশেষে হয়, কিভাবে তিনটি টেষ্টের রিপোর্ট ও পরীক্ষিত আইটেম মিসিং হয়েছে, কিভাবে তার এ্যাকসিডেন্ট হয় এবং কিছুক্ষণ আগে ডা: ক্লার্ক তার উপর হুমকি আসার বিষয়ে কি বলে গেলেন।
গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল আহমদ মুসা।
কাহিনী শেষ করে ডা: মার্গারেট থামলেও আহমদ মুসা কথা বলল না।
ভাবছিল সে। তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
বলল সে ডাক্তার মার্গারেটকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি দু’দিনে বহুদূর এগিয়েছ। শিশু তিনটির মৃত্যুর কারণ জানা গেল না, কিন্তু কারণের উৎস চিহ্নিত হয়ে গেছে। তোমাকে ধন্যবাদ মার্গারেট।’
ডা: মার্গারেটের চোখ-মুখ আনন্দের বন্যায় ভেসে গেল। আহমদ মুসা তার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে, প্রশংসা করেছে, এটুকু পাওয়ায় তার সব ব্যথা-বেদনা ভুলিয়ে দিল। দুর্বোধ্য একটা আনন্দের সুখ-শিহরণ খেলে গেল তার দেহ, মনে এবং প্রতিটি রক্ত কণিকায়।
একটু সময় নিয়ে ডাক্তার মার্গারেট বলল, ‘উৎস চিহ্নিত হয়েছে? আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘এটুকু জেনে রাখ আইসবার্গের অনেক মাথার একটা মাথা ডা: ওয়াভেল হতে পারেন।’
বিস্মিত ডা: মার্গারেট কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘ডা: ওয়াভেলের বাসা কোথায়?’
‘হাসপাতালের পাশেই ডাক্তারদের রেসিডেন্সিয়াল ব্লকে। নম্বার এফ-১৩।’
‘ওর কোন ক্লিনিক আছে?’
‘নিজস্ব ক্লিনিক নেই, কিন্তু একটা ক্লিনিকে তিনি বসেন। বাসায় আমার টেলিফোন ইনডেক্সে ঠিকানা আছে।’
‘মার্গারেট তিনটি শিশুর নাম আমার দরকার। রিপোর্টে তাদের নাম যেভাবে আছে।’
মার্গারেট তাকাল জর্জের দিকে। কাগজ কলম নিতে বলল জর্জকে। মার্গারেট নাম তিনটি বলল লিখে নিল জর্জ। নাম লেখা স্লিপটা হাতে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘ধন্যবাদ মার্গারেট।’
‘এসব নিলেন, কিছু করতে চাচ্ছেন?’ বলল মার্গারেট উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘কতটুকু কি করতে পারব জানি না। কিছু করতে তো হবেই এবং সেটা কাল সকালের আগেই।’
‘কি সেটা?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ মার্গারেটের।
‘সবই জানবে, তবে এখন নয়, এখানে নয়।’
বলে উঠে দাঁড়াচ্ছিল আহমদ মুসা।
রুমে প্রবেশ করল লায়লা জেনিফার এবং সারা উইলিয়াম। কথা না বললে ওদের চিনতেই পারতো না আহমদ মুসা। দু’জনের পরণে ছেলের পোশাক। মাথায় হ্যাটও ছেলেদের। বলা যায় নিখুঁত ছদ্মবেশ।
বাইরে বেরুলে লায়লা জেনিফারকে ছদ্মবেশ নিতে বলা হয়েছে। এটা আহমদ মুসারই নির্দেশ।
বা! তোমরা সুন্দর ছদ্মবেশ নিয়েছ।’ বলল জেনিফারদের আহমদ মুসা।
‘না ভাইয়া, এ আমি পারব না। কি লজ্জা, তার চেয়ে ভাল আমি বাইরেই বেরুব না।’ মুখ লাল করে বলল জেনিফার।
‘বেশিদিন এ কষ্ট করতে হবে না জেনিফার। দেখ তোমার তালিকায় এবার মার্গারেটও পড়েছে। আজ আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। মার্গারেটকেও সাবধান থাকতে হবে।’
বলে আহমদ মুসা মার্গারেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ’যে কয়দিন তুমি হাসপাতালে আছ, তেমন কোন ভয় নেই। কিন্তু তারপর আমার মনে হয় একটা বিপজ্জনক সময় তোমাকে পাড়ি দিতে হবে।’
‘কেমন?’ বলল মার্গারেট।
‘সামনে তুমি শত্রুর আরও বড় টার্গেট হয়ে দাঁড়াতে পার।’
‘জানি, আপনি বেশি বেশি ভয় দেখাচ্ছেন, যাতে আমি সাবধান হই।’
‘না মার্গারেট, সাউথ টার্কো দ্বীপের এক পর্যায়ের লড়াই সমাপ্ত হলো। আরেক লড়াই শুরু হয়ে গেছে।’ বলল গম্ভীর কণ্ঠে আহমদ মুসা।
থামল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘সত্যি আমি একটু স্লো হয়ে গিয়েছিলাম, বুঝতে পারিনি, আঘাতটা দ্রুত আসবে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, কিন্তু আমার অসাবধানতার জন্যে মার্গারেটের জীবন বিপন্ন হয়েছিল।’
বিষন্ন হয়ে উঠল মার্গারেটের মুখ। বলল, ‘না পরিস্থিতিটা আপনাকে জানাইনি, এটা আমারই দোষ।’
‘না মার্গারেট, আমার এখন মনে হচ্ছে, খুব একটা চিন্তা না করেই তোমাকে কঠিন এক বিপদে ঠেলে দিয়েছি। হয়তো এই কাজটা অন্যভাবে করতে পারতাম।’
ডা: মার্গারেটের মুখে ক্ষোভের চিহ্ন ফুটে উঠল। চোখের দৃষ্টি আবেগে ভারি হয়ে উঠেছে তার। বলল, ‘সব বিপদ আপনি আপনার জন্যে বরাদ্দ করে নেবেন। কেন বিপদ মোকাবিলার মন, শক্তি কিছুই বুঝি আমাদের নেই। আদেশ দিয়ে দেখুন না, আগুনেও ঝাপ দিতে পারি কিনা।’ কণ্ঠ ভারি মার্গারেটের। কথা শেষ করেই ওপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে মার্গারেট।
আহমদ মুসা হাসল। উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ মার্গারেট তোমাদের। আমি নিশ্চিত, লড়াইয়ে আমরা জিতব। ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল তোমাদের যে পেয়েছে, এ জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা ফিরল জেনিফারের দিকে। আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু আহমদ মুসার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জেনিফার বলল, ‘ভাইয়া মার্গারেট আপা’র মত সাহসীদের লক্ষ্য করে ‘তোমাদের’ শব্দ বললেন, তার মধ্যে আমি আছি কিনা?’
‘কেমন করে থাকবে? একটা ছদ্মবেশ পরার ভয়ে বাইরে বেরুতে চাচ্ছ না। তাহলে কি পারবে তুমি বল?’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে পারব না। একদিন একটা গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট করে দেখাব।’
‘এ্যাকসিডেন্ট করো, কিন্তু আহত, নিহত না হও সেটা দেখো।’
‘তাতে কার কি ক্ষতি?’
‘এ প্রশ্নের জবাব জর্জ দিতে পারবে। তবে আমার একটা ক্ষতি আছে, ঝগড়া করা ও ঝামেলা পাকাবার লোক থাকবে না।’
‘আমি ঝামেলা পাকাই?’
‘তুমি ঝামেলা পাকিয়েই তো আমাকে নিয়ে এসেছ।’
বলেই আহমদ মুসা ‘চলি’ বলে হাঁটা শুরু করল কক্ষ থেকে বেরুবার জন্যে।
জেনিফার ছুটে গিয়ে আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার তো আরও কথা আছে। যেতে দেব না।’
আহমদ মুসা তাকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘সাউথ টার্কো দ্বীপে পুলিশ প্রহরা ভালো চলছে। শত্রুদের চররা কিছুদিন সাউথ টার্কো দ্বীপে সক্রিয় ছিল, কিন্তু কোন খবর সংগ্রহ করতে না পেরে, তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে, ইত্যাদি কথা বলবে তো আমি জানি।’
আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ডা: মার্গারেট আবার এ পাশ ফিরেছে। জেনিফারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমাকে উনি এত ¯েœহ করেন তাতো জানতাম না।’
‘আর আপনাকে যে উনি আকাশে তুললেন সেটা কি?’
‘আকাশে তোলা আর কাছে টানা এক জিনিস নয়।’
কথাটা বলেই মার্গারেট বুঝতে পারল মুখ ফসকে যা বলার নয় তাই বেরিয়ে গেছে। কথাটা সংশোধন করার জন্যে মার্গারেট সংগে সংগেই আবার বলল, ‘তোমার মত অমন কাছে হতে পারা সবার জন্যেই সৌভাগ্যের।’
জেনিফার জর্জের দিকে চেয়ে একটা দুষ্টুমি হেসে ডাঃ মার্গারেটকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ডাক্তার ও নার্স ঘরে এসে প্রবেশ করায় মুখ তেতো করে নীরব হয়ে যেতে হলো জেনিফারকে।
ডাঃ মার্গারেটের কক্ষ থেকে বের হয়ে আহমদ মুসা প্রথম কাজ ঠিক করল, ডাঃ ওয়াভেল কোথায় তা জানা।
আহমদ মুসা নিঃসন্দেহ যে, হয় ডাঃ ওয়াভেল নিজে রিপোর্টগুলো চুরি করেছে, না হয় সে চুরি করতে সাহায্য করেছে। সুতরাং তাকে পাওয়া দরকার।
আহমদ মুসা ছুটল ডিউটি রুমের দিকে।
ওয়ার্ডগুলোর প্রবেশ মুখে সিঁড়ি ও লিফট রুমের পাশেই ডিউটি রুম।
ওয়ার্ডে প্রবেশের আগে ডাক্তার ও ষ্টাফরা তাদের ডিউটি কার্ড রেজিষ্টার মেশিনে ঢুকিয়ে ডেট ও টাইম এন্ট্রি করিয়ে নেয়। ডিউটি থেকে ফেরার সময়ও তাই করে।
ডিউটি রুমে ডিউটি অফিসারের চেয়ারে একটি মেয়ে। কক্ষে সেই একমাত্র লোক।
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে গুড ইভনিং জানিয়ে ডিউটি অফিসার মেয়েটিকে বলল, ‘একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্য পেতে পারি?’
‘অবশ্যই। কি করতে পারি বলুন?’ গোঁফওয়ালা আনকমন একজন যুবকের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ে বলল মেয়েটি।
‘আমি ডাঃ ওয়াভেল সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি ডিউটিতে আছেন কিনা।’
মেয়েটি বলল, ‘প্লিজ বসুন, এখনি জানাচ্ছি।’
বলে মেয়েটি তার সামনের কম্পুটারের দিকে মনোযোগ দিল। তার হাতের দুটো আঙুল কয়েকটি কম্পুটার নব-এর উপর ঘুরে এল।
কম্পুটার স্ক্রিনে ভেসে উঠল কয়েকটি শব্দ, কয়েকটি অংক। সেদিকে একবার চোখ বুলিয়েই মেয়েটি বলল, ‘ডাঃ ওয়াভেল আধ ঘণ্টা আগে রাত ৭টায় চলে গেছেন। শরীর খারাপ বলে আজ একটু আগেই চলে গেছেন।’
শরীর খারাপ হওয়ার কথা শুনে হঠাৎ আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল, এর মধ্যে কোন তাৎপর্য নেই তো!
আহমদ মুসা চট করে প্রশ্ন করল, ‘অসুস্থ ছিলেন! কিন্তু আমাকে তো আসতে বলেছিলেন!’
‘অসুস্থ ছিলেন না। হঠাৎ করেই খারাপ ফিল করে চলে গেছেন।’ বলল মেয়েটি।
‘এ রকম প্রায়ই তাঁর হয় বুঝি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না, এভাবে তার চলে যাবার দৃষ্টান্ত নেই।’
‘তাহলে তাঁকে বাড়িতে পাওয়া যেতে পারে।’
‘সম্ভবত।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে এল।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল আহমদ মুসা, ‘ডাঃ ওয়াভেল নিশ্চয় অসুস্থ নন। কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে আগেই চলে গেছেন কেন, যা তিনি কখনই করেননি। কোন জরুরী কাজে কি গেছেন? সে কাজটা কি?
আহমদ মুসা এই মুহূর্তেই ডাঃ ওয়াভেলের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
হাসপাতালের উত্তর পাশে ডাক্তারদের জন্যে নির্দিষ্ট রেসিডেন্সিয়াল ব্লকে ডাঃ ওয়াভেলের বাড়ি।
রেসিডেন্সিয়াল ব্লকের উত্তর প্রান্তের শেষ বাড়িটা ডাঃ ওয়াভেলের। এর পরেই শুরু হয়েছে আরেকটা রেসিডেন্সিয়াল ব্লক।
বাড়িটা খুবই নিরিবিলি।
আহমদ মুসা বাড়ির চারদিক দেখল। ব্লকের সব বাড়িই এক রকম। বাড়িতে ঢোকার প্রধান প্যাসেজ একটা। বাড়ির অন্য পাশে চাকর-বাকরদের জন্যে আরও একটা ছোট প্যাসেজ রয়েছে।
ডাক্তারের দর্শনার্থী একজন রোগীর মত স্বাভাবিক হেঁটে আহমদ মুসা বাড়িটার দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
রাত তখন ৮টা।
আহমদ মুসা তেমন একটা ছদ্মবেশ নেয়নি। মুখে একটা গোঁফ লাগিয়েছে মাত্র। মাথার হ্যাটটা কপালের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নামানো।
দরজায় নক করল আহমদ মুসা।
আধা মিনিটের মধ্যেই দরজা খুলে গেল।
বার-তের বছরের একটা ছেলে দরজায় দাঁড়ানো।
দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে আহমদ মুসার দৃষ্টি ছুটে গেল ভেতরে।
দরজার পরেই একটা করিডোর। করিডোরটি প্রশস্ত।
করিডোরের দক্ষিণ দেয়ালে একটা দরজা। উত্তর দেয়ালেও আরেকটা। উত্তর দরজার উপরে শিরোনাম ‘টয়লেট’। অল্প পশ্চিমে এগিয়ে করিডোরটি বড়, ফাঁকা একটা স্পেসে গিয়ে শেষ হয়েছে।
‘কে আপনি? কাকে চাই?’ ছেলেটি প্রশ্ন করল।
‘আমি ডাঃ ওয়াভেলের সাথে সাক্ষাত করতে চাই। আছেন তিনি?’
‘আছেন। কি বলব তাকে?’
‘হাসপাতালে গিয়ে ওকে পাইনি, তাই এখানে এসেছি। খুব জরুরী দরকার।’
ছেলেটি করিডোরের দক্ষিণ পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
এক মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ‘উনি এখন ব্যস্ত। আধঘণ্টা পরে আসুন, নয়তো কাল হাসপাতালে দেখা করতে বলেছেন।’
‘ঠিক আছে তুমি গিয়ে বল, আমি আধঘণ্টা দাঁড়াচ্ছি।’
ছেলেটি আবার গেল সেই কক্ষে। আহমদ মুসার মনে হলো, কক্ষটি বাইরের ড্রইং রুম, নয়তো ডাঃ ওয়াভেলের পার্সোনাল কোন ঘর। করিডোরের সামনে যে সুদৃশ্য কার্পেট মোড়া স্পেস দেখা যাচ্ছে, ওটাই মূল ড্রইং রুম।
ছেলেটি ফিরে এসে বারান্দায় চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘এখানে তাহলে বসুন।’
বলেই ছেলেটি করিডোর দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
ছেলেটি চলে যেতেই আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর পকেটে হাত দিয়ে রিভলবার স্পর্শ করে দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে ঘরটিতে প্রবেশ করল।
ঘরে তিনজন লোক। একদিকের সোফায় দু’জন, অন্যদিকে একজন।
একজন মধ্য বয়সী। অন্য দু’জন যুবক। আহমদ মুসা বুঝতে পারলো মধ্য বয়সী জনই ডাঃ ওয়াভেল। তারা মুখো-মুখি বসে। তাদের মাঝখানে টেবিলের উপর একটা ছোট ফাইল। আহমদ মুসা ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল।
আহমদ মুসাকে ঢুকতে দেখেই ডাঃ ওয়াভেল ফাইলটি টেবিল থেকে সোফায় সরিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে তীব্র দৃষ্টি। বলল, ‘কে আপনি?’
আহমদ মুসার দু’হাতই পকেটে।
ধীরে ধীরে এগুলো ওয়াভেলের দিকে।
ডাক্তার ওয়াভেলের সামনে বসা দু’জন লোক তখনও বসে। তাদের চোখ-মুখ দেখলে মনে হয় তারা ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা ডাঃ ওয়াভেলের কাছাকছি পৌছে ডাঃ ওয়াভেলকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কি চাই বলছি ডাঃ ওয়াভেল, তার আগে ঐ ফাইলটা একটু দেখে নেই।’
আহমদ মুসার কথার সাথে সাথেই ডাঃ ওয়াভেলের মুখ মরার মত পাংশু হয়ে উঠল।
সোফায় বসা যুবক দু’জনও সংগে সংগে উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘ফাইলটি দিন ডাঃ ওয়াভেল। দু’বার বললাম। আমি এক আদেশ কিন্তু দু’বার দেই না।’ চাপা কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা কথাগুলো।
ডাক্তার ওয়াভেলকে কথা বলার সময় আহমদ মুসা খেয়াল করেনি যে, যুবক দু’জন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের দু’জনেরই দুই পা তীব্র গতিতে এগুলো ভারি টিপয় লক্ষ্যে।
মুহূর্তেই টিপয় টেবিলটি উপরে উঠে তীব্র বেগে এল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা যখন টের পেল, তখন সময় ছিল না।
আহমদ মুসা টিপয়টির আঘাত খেয়ে পাশের সোফার উপর ছিটকে পড়ে গেল।
টিপয় ছুঁড়ে দেয়ার পর ওরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার ওপর। কিন্তু আহমদ মুসা টিপয়ের আড়ালে থাকায় তাকে বাগে আনা ওদের পক্ষে অসুবিধা হচ্ছিল।
ওদিকে আহমদ মুসা টিপয়ের ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেও দু’হাত দিয়ে টিপয়টি সে অবশেষে ধরতে পেরেছিল। সুতরাং তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া দু’জনকে টিপয় দিয়ে ধাক্কা মেরে তার উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল এবং পকেট থেকে রিভলবার হাতে তুলে নিল।
যুবক দু’জনও নিজেদের সামলে নেবার পর পকেট থেকে রিভলবার বের করেছিল এবং রিভলবার তুলছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
কিন্তু আহমদ মুসার রিভলবার আগেই উঠেছিল।
আহমদ মুসার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার পর পর দু’বার অগ্নি বৃষ্টি করল।
গুলী দু’টি যুবক দু’জনের রিভলবার ধরা হাত গুড়ো করে দিল।
ওদেরহাত থেকে রিভলবার ছিটকে পড়ল।
দু’জনেই আহত হাত চেপে ধরে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা ওদের দু’টি রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ডাঃ ওয়াভেলের দিকে।
ডাঃ ওয়াভেল তখন দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।
আহমদ মুসা তাঁর দিকে রিভলবার তাক করে বাম হাত বাড়াল ফাইল নেবার জন্যে।
ডাঃ ওয়াভেল আহত যুবক দু’জনের দিকে একবার তাকিয়ে কম্পিত হাতে ফাইলটি সোফার উপর থেকে নিয়ে আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল।
আহমদ মুসা তার দিকে রিভলবার তাক করে থেকেই ফাইলের উপর নজর বুলাল। দেখল, কম্পুটারে টাইপ করা চার-পাঁচ শিট কাগজ হোয়াইট ঈগল নামক সংস্থার প্যাডে। শিরোনাম দেখে চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। শিরোনামে বড় বড় অক্ষরে লিখা, ‘এ রিভিউ অব মুসলিম পপুলেশন কনট্রোল প্রজেক্ট অব ক্যারিবিয়ান রিজিওন।’
কিন্তু আহমদ মুসা ফাইলে শিশু তিনটির প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট পেল না।
ফাইল বন্ধ করে আহমদ মুসা তীব্র চোখে তাকাল ডাঃ ওয়াভেলে দিকে। বলল, ‘চুরি করে আনা তিনটি প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট কোথায়?’
কাঁপতে কাঁপতে মরার মত মুখ করে ডাঃ ওয়াভেল বলল, ‘আমি আনিনি, আমি জানিনা।’
আহমদ মুসার তর্জনি চাপ দিল রিভলবারের ট্রিগারে। বেরিয়ে গেল একটা গুলী নিঃশব্দে। গুলীটা ডাঃ ওয়াভেলের কানের উপর দিয়ে মাথার এক টুকরো চামড়া তুলে নিয়ে চলে গেল।
শক খাওয়া মানুষের মত কেঁপে উঠল ডাঃ ওয়াভেল।
আর এক মুহূর্ত দেরী করলে গুলী এবার মাথা গুড়ো করে দেবে।’ স্থির, কঠোর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগেই ডাঃ ওয়াভেল কম্পিত হাতে পকেট থেকে কাগজের কয়েকটা শিট বের করে টিপয়ের উপর রাখল।
আহমদ মুসা কাগজের শিটগুলো তুলে নিয়ে দেখল, তিনটি শিশুরই পরীক্ষাগুলোর উপাত্ত এবং ডাক্তারের ডায়াগনসিস রয়েছে।
‘ধন্যবাদ ডাঃ ওয়াভেল।’
বলে আহমদ মুসা পিছু হটে বেরুবার দরজার দিকে আসতে শুরু করল। আহত যুবকদের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’
‘মানুষ এবং চোর আর অত্যাচারীদের যম।’
আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে করিডোরে পথে বাড়ির ভেতর দিকে তাকাল। দেখল, করিডোরের মাথায় ফাঁকা স্পেসটাতে একজন বয়ষ্ক মহিলা সহ কয়েকজন ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে-মুখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। আহমদ মুসা বুঝল, ভেতরের কথা তারা কিছু জানতে পেরেছে।
পরক্ষণেই আহমদ মুসা ভাবল, ওরা কি পুলিশে খবর দিয়েছে?
এই কথা ভাবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তাকাল বাইরের দরজার দিকে। দেখল, দরজা ভেতর থেকে লক করা। অথচ আহমদ মুসা দরজা তখন লক করে যায়নি।
আহমদ মুসার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। এই সময় আহমদ মুসা বাইরে বাড়ির সামনে গাড়ির শব্দ পেল।
আহমদ মুসা দ্রুত এগুলো মহিলাদের দিকে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত বলল, ‘মিসেস ওয়াভেল এই ফাইল আপনার স্বামী হাসপাতাল থেকে চুরি করে শত্রুদের দিতে যাচ্ছিল। আমি এটা উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম। দেখুন আমার দু’হাতে গ্লাভস। এ ফাইলে এবং ভেতরের কাগজ-পত্রে আপনার স্বামীর ফিংগার প্রিন্ট আছে। পুলিশের হাতে আমি এখন ফাইলটি দিলে আপনার স্বামী দেশদ্রোহীতার অভিযোগে জেলে যাবে। বাইরে পুলিশ এসেছে, আপনি তাদের কি বলবেন ভেবে দেখুন।’
মিসেস ওয়াভেলের ভয়-কাতর মুখে উদ্বেগের ছায়া ফুটে উঠল। তার সামনে দাঁড়ানো শত্রু যুবকটির ঋজু কথাকে তার মন সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হলো। তাছাড়া তার স্বামীর কিছু অস্বাভাবিক আচরণ এবং আজ দেখা একটা ফাইলের কথা তার মনে পড়ে গেল।
বাইরে থেকে নক হতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল মিসেস ওয়াভেল। আহমদ মুসার হাতের রিভলবারও দেখল সে। তারপর এগুলো বাইরের দরজার দিকে।
দরজা খুলল মিসেস ওয়াভেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার। বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আরও দু’জন। আরেকজন পুলিশ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে তখনও।
‘গুড ইভনিং। আপনারা?’ পুলিশদের দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বিস্মিত কণ্ঠে বলল মিসেস ওয়াভেল।
‘কেন, আপনারা পুলিশকে টেলিফোন করেননি? আপনার বাসার নম্বার ১৫-এর এ নয়?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমরা তো এ ধরনের টেলিফোন করিনি?’
‘এটা কি ডাঃ ওয়াভেলের বাড়ি নয়?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমাদের তো বলা হয়েছে ডাঃ ওয়াভেল সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।’
হেসে উঠল মিসেস ওয়াভেল। বলল, ‘কেউ নিশ্চয় আপনাদের মিস গাইড করেছে। দুঃখিত।’
‘স্যরি, আপনাদের বিরক্ত করার জন্যে।’ বিষণœ কণ্ঠে বলল পুলিশ অফিসারটি।
পুলিশের গাড়ি চলে গেল।
পুলিশ চলে গেলে মিসেস ওয়াভেল ফিরে এল।
‘ধন্যবাদ মিসেস ওয়াভেল। পুলিশ চলে যাওয়ায় আমি বাড়তি ঝামেলা থেকে বাঁচলাম। আপনার স্বামীও বাঁচল। ঐ ঘরে আপনার স্বামীর সাথে দু’জন ক্রিমিনাল রয়েছে। ওদের স্বার্থেই আপনার স্বামী হাসপাতাল থেকে এই ফাইল চুরি করেছিল।’ বলে আহমদ মুসা যাবার জন্যে পা বাড়াল।
‘থামুন।’ পেছন থেকে বলল মিসেস ওয়াভেল।
ফিরে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
‘আপনি কে? আপনি হাসপাতালের লোক?’
‘আমি মিথ্যা বলব না। তাই আপনার এ প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। এটুকু জেনে রাখুন, আমি আপনাদের শত্রু নই। আপনারাও আমার শত্রু নন। এক ক্ষতিকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই আমাকে এখানে এভাবে আসতে হয়েছে।’
‘কি ষড়যন্ত্র?’
‘আমি এখন বলতে পারবো না।’
‘আমি বলি?’
চমকে উঠে আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলের মুখের দিকে তাকাল। বলল, ‘আপনি জানেন?’
‘জানি। ক্যারিবিয়ান এলাকা থেকে মুসলিম জনসংখ্যা বিনাশের ষড়যন্ত্র। একটা গোপন ফাইল হঠাৎ আমার হাতে আসায় আমি জেনেছি।’
‘ষড়যন্ত্র আপনি সমর্থন করেন?’
‘না। আমার স্বামীও করেন না। কিন্তু বাঁচতে হলে ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা না করে তাঁর উপায় নেই।’
একটু থামল মিসেস ওয়াভেল। একটা ঢোক গিলেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু আপনি এমন একটা দু’টো ফাইল উদ্ধার করে, দু’চারজনকে মেরে বা হত্যা করে এ ষড়যন্ত্রের সামান্য গতিরোধও করতে পারবেন না। এ পন্ডশ্রম হবে মাত্র।’
কৌতুহলী চোখে আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলে দিকে তাকাল। বলল, ‘তাহলে এ ষড়যন্ত্র অপ্রতিরুদ্ধ আপনি মনে করেন?’
‘তা মনে করি না। কিন্তু যে আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রতিক্রিয়া এর গতিরোধ করতে পারে, তা এখানে কারো হাতে নেই।’
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলের কথা শুনে। বলল, ‘আপনি শুধু মিসেস ওয়াভেল নন, কে আপনি?’
‘আমি মিসেস ওয়াভেল, সেই সাথে চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপিকা।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল মিসেস ওয়াভেল।
‘আপনি কেন আমাকে সহযোগিতা করলেন? ঐ ষড়যন্ত্র পছন্দ করেন না বলেই কি?’
‘সেটা তো বটেই। আরও কারণ আছে?’
‘কি সেটা?’
‘আমি টার্কস দ্বীপপুঞ্জের সকল মানুষের ঐক্য ও মিলনে বিশ্বাসী।’
‘কেন?’
‘আপনি কে না জানলে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
আহমদ মুসা গভীরভাবে দেখছিল মিসেস ওয়াভেলকে। যেন তার দৃষ্টি প্রবেশ করেছে মিসেস ওয়াভেলের অন্তরেও। বলল আহমদ মুসা, ‘আপনার উত্তরটা আমিই দেই?’
কিছুটা বিস্ময় মিসেস ওয়াভেলের চোখে। বলল, ‘বলুন।’
‘আপনি এই দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীনতা চান।’
চমকে উঠল মিসেস ওয়াভেল। তার চোখে এবার রাজ্যের বিস্ময়। বিস্ময়ের ধাক্কায় কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। একটু পর বলল, ‘কে আপনি?’ অনেক প্রশ্ন ও কৌতুহলের ভীড় তার চোখে এবং কিছুটা ভয়ও।
‘ভয় নেই। আমি সরকারী গোয়েন্দা নই।’
‘কিন্তু কে আপনি?’
‘দুঃখিত, আপনার এ প্রশ্নটার উত্তর এখন দিতে পারছি না। তবে পরিচয়টা আপনাকে দেয়া যাবে।’
‘আরেকটা প্রশ্ন, আপনি অনুমানটা কিসের ভিত্তিতে করলেন?’
‘অনুমানটা সত্যি কিনা?’
‘দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’
‘খুব সহজ উত্তর। আপনি ‘হোয়াইট ন্যাশনালিজম ষড়যন্ত্রের বিরোধী, অন্যদিকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের সব মানুষের ঐক্য চান। কেন চান? কোন স্বার্থে চান? কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য চান? এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই, আপনি ঐ দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। দ্বীপপুঞ্জের সব মানুষের ঐক্যের মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।’
বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে উঠল মিসেস ওয়াভেলের চোখ। বলল, ‘সত্যি কে আপনি? না বললে আমি উদ্বেগে থাকবো।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘উদ্বেগের কারণ নেই। আমি বৃটিশ সরকারের লোক নই। আমি মিথ্যা কথা বলি না।’
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরুবার জন্যে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল।
আহমদ মুসার চলার পথের দিকে তাকিয়ে ছিল মিসেস ওয়াভেল।
‘অদ্ভুত লোক তো আম্মা?’
‘অদ্ভুত শুধু নয়, অকল্পনীয় এক চরিত্র।’
বলেই মিসেস ওয়াভেল ছুটল বন্ধ ড্রইং রুমের দিকে যেখানে তার স্বামী বন্ধ আছে।

ফার্ডিন্যান্ড মাথা নিচু করে তিনটি মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যু নিয়ে ডাঃ মার্গারেট ও ডাঃ ওয়াভেলের কাহিনী, ডাঃ ওয়াভেল কর্তৃক প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট চুরির কথা এবং সর্বশেষ ডাক্তার ওয়াভেলের বাড়িতে একজন মাত্র যুবক এসে কিভাবে তিনজনকে আহত করে মুসলিম পপুলেশন কনট্রোল রিভিউ রিপোর্ট ও প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্টগুলো নিয়ে গেল তার কাহিনী শুনছিল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ডাঃ ওয়াভেলের ড্রইং রুম থেকে ফিরে আসা সেই দুই যুবক এবং পাশের একটি সোফায় বসেছিল অপারেশন চীফ হিসেবে নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত হের বোরম্যান।
যুবক দু’জনের কথা শেষ হলে মাথা তুলল ফার্ডিন্যান্ড। তার দুই চোখ রক্তের মত লাল। তীব্র কণ্ঠে বলল, ‘একজন লোক এসে তোমাদের জীবনের চেয়ে মূল্যবান রিপোর্ট নিয়ে তোমাদের ঘরে বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। আর তোমরা এটা জানাতে এসেছ?’
বলে ফার্ডিন্যান্ড পকেট থেকে রিভলবার বের করে যুবক দু’জনকে লক্ষ্য করে দু’টি গুলী করল। দু’জনেই বুকে গুলী খেয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেয়।
উঠে দাঁড়াল ফার্ডিন্যান্ড। বলল বোরম্যানকে লক্ষ্য করে, ‘জায়গাটা পরিষ্কার করতে বলে তুমি এস আমার অফিসে।’
অফিসে এসে নিজের চেয়ারে বসল ফার্ডিন্যান্ড। ভীষণ অস্থির সে। একের পর এক বিপর্যয়, সর্বশেষে অত্যন্ত গোপনীয় রিভিউ রিপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট হাত ছাড়া হয়ে যাওয়াকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল সে। না, তাতে করে অস্থিরতা আরও কিলবিলিয়ে উঠছে।
উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগল ফার্ডিন্যান্ড। ঘরে ঢুকল হের বোরম্যান। ফার্ডিন্যান্ড তার চেয়ারে ফিরে এল। বসল বোরম্যানও।
‘কি বুঝছ বোরম্যান?’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘আমার মনে হয় সেই এশীয় যুবকই সব অনর্থের মূল। চেহারার যে বিবরণ ওদের দু’জনের কাছে পাওয়া গেছে তাতে সেই এশীয়ই সেদিন রিপোর্টগুলো ছিনিয়ে নেবার মত অঘটন ঘটিয়েছে।’
‘কিন্তু এই এশীয় কে? তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? সে কেন আমাদের পেছনে লেগেছে? ওখানকার পুলিশ কি বলে?’
‘পুলিশের কাছে কোন এশীয় সম্পর্কে কোন রিপোর্ট নেই, তথ্যও নেই।’
‘সে থাকছে কোথায় কিংবা কাদের সাথে যোগাযোগ রাখছে তা না জানলে তো আমরা এগুতেই পারছি না।’
‘ডাঃ মার্গারেট আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর তার কক্ষে একজন এশীয়কে ঢুকতে দেখা গেছে।’
চেয়ারে সোজা হয়ে বসল ফার্ডিন্যান্ড। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘এ খবর তো আমাকে দাওনি?’
‘ওদের দু’জনের কাছ থেকে আজই তো শুনলাম।’
‘ডাঃ মার্গারেটের কক্ষে এশীয়টির যাওয়ার খবরকে তুমি কিভাবে দেখছ?’
‘পেশেন্ট হিসেবে পরিচয়ের কারণে ডাক্তারের এ্যাকসিডেন্টের খবরে তার কাছে যেতে পারে। আবার কোন সম্পর্কের সূত্র ধরেও যেতে পারে।’
‘আমি জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ভাবছ?’
‘আমার মনে হয়, সম্পর্কের সূত্র ধরেই গেছে।’
‘তোমার এই মনে হওয়ার কারণ?’
‘তিনটি মুসলিম পুরুষ শিশুর প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট করাবার যে জেদ ডাঃ মার্গারেটের এবং এ নিয়ে ডাঃ ওয়াভেলের সাথে তার যে আচরণ তা থেকে মনে হয় নিছক ডাক্তার হিসেবে নয় কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এটা তিনি করেছেন। এই সন্দেহ হওয়ার কারণেই ডাঃ ওয়াভেলের পরামর্শে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল শাখা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল।’
‘তোমাকে ধন্যবাদ বোরম্যান। তুমি অবশেষে ঠিক ভেবেছ। আসলে আমরা ভুল করছি, ডাঃ মার্গারেটকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল সন্দেহ করার সংগে সংগে আমাদের সক্রিয় হওয়া দরকার ছিল।’
‘কিন্তু টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল তো যথাসময়ে সক্রিয় হয়েছে এবং দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে ডাঃ মার্গারেটকে।’ বলল বোরম্যান।
‘এখানেই তাদের ভুল হয়েছে এবং এ ভুল আমরা শুধরে দেইনি।’
‘ভুলটা কি?’
‘ডাঃ মার্গারেটকে হত্যা করে কি হবে? ডাঃ মার্গারেট গেলে আরেক ডাক্তার মার্গারেট তৈরি হবে। আসল হলো, ডাঃ মার্গারেটকে দিয়ে এসব যে করাচ্ছে তাকে চিহ্নিত করা এবং তাকে হত্যা করা। তাহলেই ডাঃ মার্গারেট আর তৈরি হবে না।’
‘ঠিক বলেছেন।’
‘ঠিক বললাম, কিন্তু সেটা ক্ষতি হবার পর।’
‘এশীয়টা ঐ রিপোর্টগুলো নিয়ে কি করতে পারবে! মিডিয়া তো আমাদের দখলে। সরকারকে এসব জানিয়েও কোন লাভ হবে না।’
‘কি করবে, সেটা আমার কাছেও স্পষ্ট নয়। অপেক্ষা করতে হবে এ জন্যে। কিন্তু একটা ক্ষতি হয়েছে, আমাদের পরিকল্পনা আমাদের হাতের বাইরে চলে গেছে।’
ফার্ডিন্যান্ড থামলেও বোরম্যান কিছু বলল না। ভাবছিল সে।
কিছুক্ষণ পর ফার্ডিন্যান্ডই মুখ খুলল। বলল, ‘কি ভাবছ বোরম্যান?’
‘ভাবছি এখন কি করণীয়।’
‘এটা নিয়ে এত চিন্তা করতে হয়? কি করতে হবে তা কি পরিষ্কার নয়?’
‘কি সেটা স্যার?’
‘আগের ভুলের সংশোধন।’
‘কিভাবে?’
‘ডাঃ মার্গারেটকে হত্যা নয়, তাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে হবে। বের করতে হবে ঐ এশীয়টির পরিচয় তার কাছ থেকে।’
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বোরম্যানের। বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। এটাই এখন একমাত্র পথ।’
ফার্ডিন্যান্ড কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। তাকাল ইন্টারকমের দিকে। সেখানে একটা সবুজ সংকেত।
ইন্টারকমের একটা বোতামে চাপ দিল ফার্ডিন্যান্ড। ওপার থেকে তথ্য চীফ মার্ক পল-এর গলা শুনা গেল। বলল, ‘কেন্দ্র থেকে একটা ডকুমেন্ট এসেছে স্যার।’
‘নিয়ে এস।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
তথ্য চীফ মার্ক পল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘরে প্রবেশ করে একটা ইনভেলাপ তুলে দিল ফার্ডিন্যান্ডের হাতে।
হাতে নিয়েই খুলল ইনভেলাপ ফার্ডিন্যান্ড। ভেতরের কাগজের উপর চোখ পড়তেই বুঝল, হোয়াইট ঈগল-এর হেড কোয়ার্টার থেকে আসা মাসিক সিচুয়েশন রিপোর্ট। সমকালিন পরিস্থিতির উপর এই রিপোর্টে থাকে আমেরিকান মহাদেশের উপর বিগত মাসের পর্যবেক্ষণ।
ফার্ডিন্যান্ড হের বোরম্যান-এর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বস, রিপোর্টে কি আছে দেখা যাক।’
বলে রিপোর্টটা পড়তে লাগল ফার্ডিন্যান্ড,
“গত মাসে গোটা আমেরিকা বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা হেড কোয়ার্টারকে যা জানিয়েছে, তা উদ্বেগজনক কিছু পুরাতন প্রবণতা নতুন করে তীব্র হওয়া এবং আমাদের পরিকল্পনা বাচনাল করার লক্ষ্যে পরিচালিত কিছু মারাত্মক ঘটানা ঘটেছে। গত মাসের পরিস্থিতির প্রধান দিকগুলো হলো: এক. রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে মুসলিম সখ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মাসে ১০ জন রেড ইন্ডিয়ান তরুণীর সাথে মুসলিম তরুণের এবং ৮ জন মুসলিম তরুণীর সাথে রেড ইন্ডিয়ান তরুনের বিয়ে হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই রেড ইন্ডিয়ান পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছে স্বতস্ফুর্তভাবে। উদ্বেগজনক হলো, আগে মুসলিম তরুণীরা রেডইন্ডিয়ানদের ঘরে যায়নি, কিন্তু এখন যাওয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে গত এক বছরে মাত্র তিনজন রেড ইন্ডিয়ান তরুণী আমেরিকান শ্বেতাংগ তরুণের সাথে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু একজন রেডইন্ডিয়ান তরুণও শ্বেতাংগ তরুণীকে বিয়ে করেনি। আর উল্লেখিত তিনটি বিয়ের কোন রেড ইন্ডিয়ান তরুণীই খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেনি। দুই. মুসলিম রেড ইন্ডিয়ান বিয়ের ৫০ ভাগ হয়েছে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী এশীয় ও আফ্রো-আমেরিকান ব্ল্যাক মুসলমানের সাথে। আর ৫০ ভাগ চীন, কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন ও তুর্কিস্থান এলাকা থেকে সদ্য আসা আমেরিকান নাগরিকত্ব পাওয়া মুসলমানদের সাথে হয়েছে। তিন. আমেরিকানস ইন্ডিয়ানস মুভমেন্ট (AIM) নতুন করে জোরদার হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। গত মাসের ২৫ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন ষ্টেটের প্রাচীন রেডইন্ডিয়ান নগরী ‘কাহোকিয়া’তে ‘এইম’ (AIM) এর বিরাট সম্মেলন হয়েছে। সে সম্মেলনে প্রধান যে দাবী তারা তুলেছে তা হলো, মিসিসিপি ও সংলগ্ন অন্যান্য নদীর তীর বরাবর সতের শ’ রেড ইন্ডিয়ান নগরী ছিল যা ইউরোপিয়ানরা ধ্বংস করেছে, সে সব রেড ইন্ডিয়ান নগরীর পুনস্থাপন করতে হবে এবং রেড ইন্ডিয়ানদেরকে তা ফেরত দিতে হবে। দ্বিতীয় যে দাবী তারা করেছে তা হলো, ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় আগমনের সময় অর্থাৎ ১৪৯২ সালের দিকে আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা ছিল দুই কোটি যার মধ্যে ৫০ লাখ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই রেড ইন্ডিয়ান জনসংখ্যা গত ৫শ’ বছরে সাড়ে সাত কোটিতে উন্নীত হবার কথা ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় গণহত্যার শিকার হয়ে তাদের সংখ্যা বাড়ার বদলে তা ৫০ লাখ থেকে আজ ১৪ লাখে নেমে এসেছে। এই গণহত্যার বিচার তারা চাচ্ছে না, কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানদের ন্যায্য ভূখন্ডগত অধিকার রক্ষার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশে মিসিসিপি নদীর পশ্চিম ও পূর্ব এলাকায় তাদের রিজার্ভ এলাকার সংখ্যা ২৮৫ থেকে ১০০০-এ উন্নীত করতে হবে। চার. বিশেষ উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের টার্কস দ্বীপপুঞ্জে। গত মাসে এই দ্বীপাঞ্চল হোয়াইট ঈগলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমাদের দেড়শ’ লোক হারিয়ে গেছে অর্থাৎ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু যাদের দ্বারা এতবড় ঘটনা ঘটল তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। উপরন্তু ঐ অঞ্চলে এখন বৃটিশ পুলিশ এমন তৎপরতা শুরু করেছে যার ফলে আমাদের প্রতিশোধমূলক সশস্ত্র পদক্ষেপের কর্মসূচী বাদ দিতে হয়েছে। পাঁচ. গত মাসে আমেরিকায় অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক দুই পাঁচ (০.২৫) ভাগ, আর শ্বেতাংগ জনসংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ (০.০৫) ভাগ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে অশ্বেতাংগ বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক এক পাঁচ (০.১৫) ভাগ এবং শ্বেতাংগ জনসংখ্যা কমেছে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ (০.০৫) ভাগ।
উল্লেখিত এসব তথ্য প্রমাণ করছে শত শত বছরের চেষ্টায় শ্বেতাংগরা যে অধিকার অর্জন করেছে, তাতে ভাগ বসাতে আসছে অশ্বেতাংগরা। আর এ পরিস্থিতি ‘হোয়াইট ঈগল’-এর প্রয়োজনকে সর্বোচ্চে তুলে ধরেছে।’
রিপোর্ট পড়া শেষ করল ফার্ডিন্যান্ড। পড়তে পড়তেই তার মুখটা শক্ত হয়ে উঠেছিল।
পড়া শেষ করেই ফার্ডিন্যান্ড টেবিলে একটা প্রচন্ড মুষ্টাঘাত করে বলল, ‘কয়েক ঘন্ডা রেড ইন্ডিয়ানকে বাঁচিয়ে রাখার কি দরকার ছিল? দাস প্রথা উচ্ছেদের আগে বা পরে কেন আমরা ব্ল্যাকদেরকে আফ্রিকায় ঠেলে দেইনি? এরাই তো অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে আমেরিকায়। আর এরাই তো আবার ইসলাম গ্রহণ করে আমেরিকায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এদের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জাতি গোষ্ঠীতে পরিণত হতে যাচ্ছে।’
‘স্যার, রেডইন্ডিয়ানদের বাঁচিয়ে রাখা এবং ব্ল্যাকদের শুধু দেশে রাখা নয়, তাদেরকে আমরা আমেরিকায় বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন অধিকার দিয়ে মাথায় তুলেছি। আজ রেড ইন্ডিয়ানরা এত বড় দাবী তুলতে পারছে কারণ অতীতে মার্কিন সরকার রেড ইন্ডিয়ানদের এ ধরনেরই দাবী নানাভাবে মেনে নিয়েছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে হঠাৎ করে রেড ইন্ডিয়ানরা শত শত বছর আগে শ্বেতাংগদের হাতে তাদের যে জমি চলে গেছে তা উদ্ধারের জন্যে মামলা করতে শুরু করে। পাসামোকাই ও পেনরস্কট নামে দু’টি রেড ইন্ডিয়ান গোত্র মামলা করে ‘মেইন’ ষ্টেট-এর ১২ মিলিয়ন একর অর্থাৎ রাজ্যটির দুই তৃতীয়াংশের দখল দাবী করে বসে। মার্কিন সরকার অনেক অনুরোধ করে ৮২ মিলিয়ন ডলার দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে মামলা প্রত্যাহারে রাজী করে। আবার ১৯৮৭ সালের দিকে ম্যাসাচুসেটস ষ্টেটে ওয়ামপানগ রেড ইন্ডিয়ান গোত্রের অনুরূপ দাবী প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে রফা করে। এর আগের আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে। ১৯৮০ সালে মার্কিন সুপ্রীমকোর্ট ১৯৮৭ সালে সাউথ ডাকোটার রেড ইন্ডিয়ানদের যে জমি শ্বেতাংগরা জোর করে কুক্ষিগত করে তার জন্যে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে প্রায় ১২৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে মার্কিন সরকারকে বাধ্য করে। এইভাবে রেড ইন্ডিয়ানদের দাবীর যৌক্তিকতা সরকার এবং কোর্ট স্বীকার করে নিয়েছে। সন্দেহ নেই, এর উপর ভিত্তি করেই তাদের জন্যে বরাদ্দ রিজার্ভ এলাকার পরিমাণ ২৮৫ থেকে ১০০০-এ উন্নিত করার দাবী করেছে।’ বলল বোরম্যান।
‘ধন্যবাদ বোরম্যান। ঠিকই বলেছ তুমি। সরকারের আইন ও মানবতাবাদী এই সর্বনাশা চেহারা শ্বেতাংগ জনগণের কাছে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানদের ও মুসলমানদের সাথে এই দহরম-মহরমের কি করা যাবে?’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘স্যার, এটা ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটা ফল। মূলের দিকে ফিরে যাওয়া মানুষের একটা স্বভাব বা প্রবণতা। রেড ইন্ডিয়ানরা তাই করছে। রেড ইন্ডিয়ানদের পূর্ব পুরুষ এশিয়া থেকে আমেরিকায় আসে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার চীন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তুর্কিস্থান এলাকার মঙ্গোলীয় ও মিশ্র মঙ্গোলীয় জাতি-গোষ্ঠী বরফ ঢাকা বেরিং প্রণালী পথে আমেরিকায় আসে। এরাই আমেরিকার প্রথম মানুষ। রেড ইন্ডিয়ানরা এদেরই বংশধর। সুতরাং এশিয়ানদের প্রতি, এশিয়ান কালচারের প্রতি তাদের দূর্বলতা রয়েছে।’
‘কিন্তু প্রশ্নটা এশিয়ানদের নিয়ে নয়, মুসলমানদের নিয়ে।’
‘একই কথা স্যার। এশিয়ানরাই তাদের কাছে ইসলাম নিয়ে আসে। ৮ম থেকে দ্বাদশ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে মুসলিম নাবিকরা, তাদের সাথে মুসলিম পর্যটক, ব্যবসায়ী ও মিশনারীরা পৃথিবীর গোটা সমুদ্র এলাকা চষে ফিরেছে। তাদেরই অনেকে আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এবং বেরিং প্রণালী হয়ে বা ফিলিপাইন থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় আসে। এরা ছিল এশিয়ান এবং প্রশান্ত মহাসাগর পথে যারা আসে তাদের অধিকাংশই মঙ্গোলীয় জাতি গোষ্ঠীর মুসলমান, যাদের সাথে রেড ইন্ডিয়ানদের মিল রয়েছে। রেডইন্ডিয়ানরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের এশিয়ান ভাইদের বুকে জড়াবার সাথে সাথে ইসলামকেও বুকে জড়িয়ে নেয়। মুসলামানদের প্রতি রেডইন্ডিয়ানদের বিশেষ দুর্বলতার কারণ এটাই।’
‘জানি বোরম্যান। কিন্তু এটা যে সর্বনাশা প্রবণতা। রেডইন্ডিয়ানদের ঘরে শ্বেতাংগ মেয়ে যাওয়া বন্ধ হয়েছে, এটা একটা ভালো প্রবণতা। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ান ও মুসলমানদের মিলন বন্ধ করা যাবে কি করে?’
‘পথ একটাই রেড ইন্ডিয়ান ও মুসলমানদের ঘরে কোন মেয়ে দেযা যাবে না এবং তাদের মেয়ে আনাও যাবে না। উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা। মুসলমান ও রেড ইন্ডিয়ানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে অবিলম্বে। তাহলে অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্য দশমিক পাঁচের দিকে নেমে আসবে। অন্যদিকে শ্বেতাংগ জনসংখ্যা প্রতি মাসে অনুরূপ পরিমাণ বাড়াতে হবে।’
‘কিভাবে? সন্তান নেয়ার প্রতি শ্বেতাংগ মেয়েদের যে অনিহা তার মোকাবিলা তো বন্দুক দিয়ে করা যাবে না।’
‘বন্দুক দিয়ে পারা যাবে না, কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে যাবে।’
‘সে বুদ্ধিটা কি?’
‘খুব সহজ। মার্কিন মেয়েরা যে ব্রান্ডের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহার করছে, সে সব ব্রান্ডের কোম্পানীগুলোতে ঢুকতে হবে এবং শতকরা ২৫ ভাগ পিলে ভেজাল ঢুকাতে হবে। অন্য দিকে যে সব ক্লিনিক সৌখিন এ্যাবরশন করায়, তাদের ঘাড় মটকাতে হবে।’
‘ঠিক বলেছ বোরম্যান। এই কাজ এখনি আমরা শুরু করতে পারি। গোল্ড ওয়াটারকে জানাতে হবে ব্যাপারটা। এ কর্মসূচী কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রহণ করা উচিত।’
কথা শেষ করে একটু সোজা হয়ে বসে বলল, ‘এস আমাদের কথায় ফিরি। রিপোর্টে বলেছে, টার্কস দ্বীপপুঞ্জে আমাদের দেড়শ’ লোক হত্যার জন্যে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু চিহ্নিত আমরা করেছি। আমরা নিশ্চিত এশিয়ানটাই সব কিছুর মূলে রয়েছে। এই মূলকে ধরার জন্যে ডাঃ মার্গারেটকে আমরা হাতে নিয়ে আসছি। এ কথাটা গোল্ড ওয়াটারকে জানাতে হবে।’
‘জ্বি, আজকেই টেলিফোনে কথা বলা যায়।’
‘এখন ডাঃ মার্গারেটকে নিয়ে আসার ব্যাপারে কি চিন্তা করছ?’
‘স্যার, একটু ভেবে দেখি। আর গ্রান্ড টার্কস থেকে আরও কিছু জানারও প্রয়োজন আছে। তারপরে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।’
‘কিন্তু দেরী করা যাবে না। পরশু দিনের মধ্যে তাকে এখানে চাই।’
‘তাই হবে স্যার।’
ফার্ডিন্যান্ড উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল হের বোরম্যানও।

টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রেখে সোফায় এসে বসতে বসতে ডাঃ মার্গারেট জর্জকে বলল, ‘আমার অবাক লাগছে, হঠাৎ করে উনি বিশেষ এ সময়ে টিভি প্রোগ্রাম দেখতে আসতে চাইলেন কেন!’
‘আমারও অবাক লেগেছে আপা। উনি তো অনর্থক কোন কাজ করেন না।’
‘কিন্তু বল তো উনি আমাদের বাড়িতে থাকছেন না গ্রান্ড টার্কসে এসেও, এর পেছনে কি অর্থ আছে?’ বলল মার্গারেট।
‘অর্থ আছে। আমি তার সিদ্ধান্তে আপত্তি করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের পরিবারকে সন্দেহের উর্ধে রাখার মধ্যেই আমাদের লাভ। হাসপাতালের ঘটনায় ডাঃ মার্গারেট ওদের সন্দেহের তালিকায় পড়তে পারে বলে আমি আশংকা করছি। আমি বিদেশী, তোমাদের ওখানে থাকলে সন্দেহ আরও গভীরতর হবে।’ বলল জর্জ।
‘আমিও এটাই বুঝেছি। অদ্ভুত এক মানুষ। সব মাথা খালি করে সব বোঝা তিনি নিজের মাথায় নেন। কিন্তু এত করেও তিনি আমাকে সন্দেহমুক্ত রাখতে পারেননি।’
‘কি ব্যাপার?’ জর্জ বিস্ময়ের সাথে বলল।
‘গতকাল ডাঃ ওয়াভেল আমাকে বলেছেন সাবধানে থাকতে। আমি তাঁকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘যারা প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট চুরি করতে বাধ্য করেছিল, তারা তোমাকেও সন্দেহ করছে। ওরা সাংঘাতিক। ওরা না পারে এমন কিছু নেই।’
‘উনি কি তোমাকে ভয় দেখালেন, না আন্তরিকভাবে তোমাকে সাবধান হওয়ার জন্যে বললেন?’
‘না জর্জ, সেদিনের ঘটনার পর উনি বদলে গেছেন। এমনকি ওঁর (আহমদ মুসার) প্রতি কোন ক্ষোভ তাঁর নেই। বরং বলেন, সেদিনের ঘটনা তাঁর জন্যে ভালই হয়েছে। এই ঘটনার অজুহাতে ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ হয়েছে।’
‘আমি যতটা শুনেছি, ওঁর স্ত্রীর কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার পর একদিন আহমদ মুসা ভাইয়ের সাথে মিসেস ওয়াভেলের কথা হয়েছে। মিসেস ওয়াভেল তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং দেখা করার জন্যে অনুরোধ করেছেন। আহমদ মুসা ভাইয়ের মতে মিসেস ওয়াভেলের রাজনৈতিক চিন্তা আমাদের সাহায্য করতে পারে।’
‘সত্যি ওঁর উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত আছে। যে পরিবারটা তার সাংঘাতিক শত্রু হওয়ার কথা, সে পরিবার তার বন্ধু হয়ে গেল।’
‘আপা আমার বিস্ময়টা এখনও কাটেনি। সেদিন তিনি হাসপাতালের রুম থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হয়েছিলেন। এত বড় একটা অভিযানে উনি বেরুচ্ছেন তার বিন্দু মাত্র আঁচ করা যায়নি। কি করে উনি বুঝলেন ডাঃ ওয়াভেলের বাসায় অভিযান করলে চুরি যাওয়া ডকুমেন্টগুলো পাওয়া যাবে! সামান্য ভয়ও তাঁর মনে জাগেনি। কি আশ্চর্য, তিনি শুধু ডকুমেন্টগুলো উদ্ধারই করলেন না, কঠিন এক সময়ে গোটা পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেন, যার ফলে মিসেস ওয়াভেল পুলিশ ডেকেও মিথ্যা কথা বলে পুলিশকে ফেরত দেন।’
‘বোধ হয় এটাই ওঁর মৌলিকত্ব যে, তিনি যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের শক্তির চেয়ে বুদ্ধির শক্তির উপর বেশি নির্ভর করেন।’
আটটা বাজার শব্দ হলো ঘড়িতে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জর্জ বলল, ‘আহম মুসা ভাই এতক্ষণ এলেন না।’
জর্জের কথা শেষ না হতেই দরজায় নক হলো। ছুটে গেল জর্জ দরজায়। খুলে দিল দরজা। দরজায় আহমদ মুসা।
তারা সালাম বিনিময়ের পর আগে আহমদ মুসা ও পেছন পেছন জর্জ প্রবেশ করল ঘরে।
ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিল আহমদ মুসা মার্গারেটকে।
দরজা খোলার সংগে সংগেই ডাঃ মার্গারেট উঠে দাঁড়িয়েছিল। গায়ের কাপড় ঠিক-ঠাক করে মাথার ওড়নাটা টেনে দিয়েছিল কপালের উপর।
‘ওয়া আলাইকুম।’ বলে সালাম গ্রহণ করল ডাঃ মার্গারেট। মার্গারেটের চোখে-মুখে আনন্দ। তার সাথে সেখানে লজ্জার একটা পীড়ন। দুইয়ে মিলে অপরূপ লাবন্যের সৃষ্টি হয়েছে মার্গারেটের চেহারায়।
আহমদ মুসা সালাম দেয়ার সময় ডাঃ মার্গারেটের মুখের উপর একবার চোখ পড়েছিল মাত্র। চোখ নিচু করে নিয়েছিল সংগে সংগেই।
আহমদ মুসা সোফায় এসে বসল। তার পাশে এসে বসল জর্জ। আর মার্গারেট জর্জের ওপাশে আরেকটা সোফায়। টেলিভিশনটা তাদের সামনে।
আহমদ মুসা সেদিকে তাকিয়ে বলল, জর্জ, ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’ (FWTV) তে দাও।’
‘আচ্ছা, ওদের তো এখন ‘ওয়ার্ল্ড ইন এক্সক্লুসিভ’ প্রোগ্রাম রয়েছে। ঐ প্রোগ্রামের কথা আপনি বলেছেন?’
‘হ্যাঁ’ বলল আহমদ মুসা।
জর্জ উঠতে উঠতে বলল, ‘ওদের এই প্রোগ্রামটা খুব নাম করেছে ভাইয়া। দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সকল জালেম ও মজলুমের কথা কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই এরা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরে। এ কারণেই এটা এখন দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রোগ্রাম। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াচ’-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে বিশ্বের টিভি দর্শকদের শতকরা ৭০ ভাগ নিয়মিত এই প্রোগ্রাম দেখে থাকে, যা একটি প্রোগ্রামের সর্বোচ্চ রেকর্ড।’
রিমোর্ট কনট্রোলটা এনে চ্যানেল চেঞ্জ করে FWTV তে নিয়ে এল জর্জ।
ঠিক আটটা পাঁচ মিনিটে প্রোগ্রাম শুরু হলো।
একজন ঘোষক বলল, আজ আমাদের দৃশ্যপট আমেরিকান কন্টিনেন্ট, বিশেষভাবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল। তারপর সে বলল, ‘রীতি অনুসারে প্রথমে রিপোর্ট সারাংশ। তারপর ‘সরেজমিন’, যাতে থাকবে সাক্ষাতকার ও প্রমাণপঞ্জী। সবশেষে থাকবে ‘মন্তব্য’।
ঘোষণা শুনেই জর্জ বলল, ‘লায়লা জেনিফার ও অন্যান্যদের খবরটা জানানো দরকার। নিশ্চয় বিষয়টা খুব ইন্টারেষ্টিং হবে।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা সবাই জানে।’
‘জানে?’ জর্জের মুখে বিস্ময়। বলল, ‘তাহলে এ প্রোগ্রামটা নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
‘দেখে মন্তব্য করলে ভালো হবে।’ ঈষৎ হেসে বলল আহমদ মুসা।
রিপোর্ট সারাংশ তখন শুরু হয়ে গেছে।
সবারই সব মনোযোগ আছড়ে পড়ল টিভি’র উপর।
রিপোর্টে তখন বলা হচ্ছে,
‘আজ একুশ শতকে মানুষের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার যখন সবচেয়ে বড় শ্লোগান হতে যাচ্ছে, তখন ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপাঞ্চলে চরম মানবাধিকার লংঘনের খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, সেখানকার অশ্বেতাংগ বিশেষ করে মুসলিম কম্যুনিটির সদ্যজাত পুরুষ সন্তানদের অব্যাহত হত্যা এবং মুসলিশ পুরুষদের হত্যা, গুম, ইত্যাদি কর্মসূচীর মাধ্যমে সেখান থেকে মুসলিম জনসংখ্যা নির্মূলের কাজ উদ্বেগজনক গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। গ্রান্ড টার্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ষ্টুডেন্ট গ্রুপের বিশেষ সমীক্ষা এবং এই মানবাধিকার লংঘনের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ‘হোয়াইট ঈগল’ নামক গোপন সংগঠনের নিজস্ব দলীল থেকে এই মানবাধিকার লংঘন-ষড়যন্ত্রের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্ট গ্রুপের সমীক্ষা অনুসারে গত ৬ বছরে জনসংখ্যার বিশেষ শ্রেণী মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে গড়ে ১৪ শতাংশ হারে। মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। গত ছয় বছরের প্রথম বছর মুসলিম শিশুর মৃত্যু হার শতকরা ৬ ছিল, কিন্তু ষষ্ঠ বছর অর্থাৎ গত বছর এই হার ছিল শতকরা ২৫, তার আগের বছর ছিল শতকরা ২০ এবং তার আগের বছর শতকরা ১৫ ছিল। হোয়াইট ঈগলের নিজস্ব দলিলে গত তিন বছরের একটা মুল্যায়ন পাওয়া গেছে। চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্টদের সমীক্ষা ছিল টার্কস দ্বীপপুঞ্জের উপর, কিন্তু হোয়াইট ঈগল-এর মূল্যায়ন গোটা ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল নিয়ে। এই মূল্যায়নে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রতিটি দ্বীপ-রাষ্ট্রের চিত্র পৃথক পৃথক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মূল্যায়ন অনুসারে গত তিন বছরে গোটা ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাসের গড় হার ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে কিউবাতে সবচেয়ে কম, তিন বছরে গড়ে হ্রাস ১০ শতাংশ এবং সবচেয়ে বেশি টার্কস দ্বীপপুঞ্জে, তিন বছরে গড় হ্রাস ২১ শতাংশ।
‘হোয়াইট ঈগল’ পরিচালিত মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাসের পদ্ধতিটি চরম অমানবিক এবং হৃদয়বিদারক। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ম্যাটারনিটিতে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া মুসলিম শিশু সন্তানদের নানা মেডিকেল পদ্ধতিতে কৌশলে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি গ্রান্ড টার্কস-এর কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে সদ্য মৃত তিনটি মুসলিম শিশুর লাশ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একজনকে ‘স্লিপ পয়জনিং’ এবং অন্য দু’জনকে ভয়ংকর ‘ডেথ ভাইরাস’ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ‘হোয়াইট ঈগল’ নামের গোপন সংগঠন পরীক্ষার এই রিপোর্টগুলো এবং পরীক্ষার উপকরণসমূহ চুরি করে বিষয়টি ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করে। হাসপাতালের শিশু ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান ডাঃ ক্লার্ক চুরি ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। মনে করা হচ্ছে, কমপক্ষে গত ৬ বছর ধরে লাখ লাখ মুসলিম পুরুষ শিশুকে এই ধরনের নানা পন্থায় হত্যা করা হয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে প্রবল ডেমোগ্রাফিক ভারসাম্যহীনতার। স্যাম্পলিং সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে মুসলিম মেয়ে শিশু ও পুরুষ শিশুর গড় অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০:১ এবং সবচেয়ে উপদ্রুত টার্কস দ্বীপপুঞ্জে এই অনুপাত ৩০:১-এ পৌছেছে। মনে করা হচ্ছে, এই প্রজন্ম তাদের বয়স কালে মুসলিম তরুণীরা বিয়ের জন্যে মুসলিম তরুণ পাবে না। ফলে মুসলিম মেয়েরা স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন লাভে ব্যর্থ হবে অথবা শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে তাদেরকে অমুসলিমদের ঘরে প্রবেশ করতে বাধ্য হতে হবে।
প্রাপ্ত তথ্যাবলীর ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে মনে করা হচ্ছে, মানবতা বিরোধী এই জঘন্য অপরাধের সাথে ‘হোয়াইট ঈগল’ নামের গোপন সংগঠন জড়িত। এক শ্রেণীর শ্বেতাংগ পুলিশ, আমলা, ডাক্তার অথবা হাসপাতাল কর্মীরা কোথাও স্বতস্ফূর্তভাবে, কোথাও ভয়ে-প্রলোভনের কারণে বাধ্য হয়ে ‘হোয়াইট ঈগল’কে সহযোগিতা দিচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, জাতীয় সরকারগুলো ব্যাপক অনুসন্ধান চালালে ‘হোয়াইট ঈগল‘এর এজেন্ট পুলিশ, আমলা ও অন্যান্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে না। তবে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ‘হোয়াইট ঈগল’-এর মত আন্তআমেরিকান সংগঠনের হুমকি ও চাপ মোকাবিলার সাধ্য ছোট ছোট জাতীয় সরকারগুলোর নেই। এ জন্যেই তারা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে তাদের তৃতীয় বিশ্বের বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত টিমের মাধ্যমে তদন্ত ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে এদের কালো হাত ভেঙে দিতে না পারলে গোটা আমেরিকার অবস্থাকে তারা ঐ একই পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।’
‘রিপোর্ট সার-সংক্ষেপ’ উপস্থাপনার পর ‘সরেজমিন’ প্রতিবেদন শুরু হলো।
ডা: মার্গারেট ও জর্জের চোখ টিভি’র দৃশ্যে যেন আটকে গেছে আঠার মত। গোগ্রাসে যেন তারা গিলছে সব কথা। দেখছে সবকিছু সম্মোহিত হওয়ার মত।
প্রোগ্রামটি ছিল বিশ মিনিটের।
প্রোগ্রাম শেষ হয়ে গেলেও সম্মোহন যেন তাদের কাটল না। তাদের মুখে কোন কথা নেই। নড়াচড়া করতেও তারা যেন ভুলে গেছে।
টেলিফোন বেজে উঠল। জর্জ তার মোবাইলটা তুলে নিল পাশ থেকে।
টেলিফোন ধরেই তা আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাইয়া জেনিফারের টেলিফোন।’
আহমদ মুসা টেলিফোন ধরতেই সালাম দিয়ে জেনিফার বলল, ‘অভিনন্দন ভাইয়া। যে ঘটনা ওরা টার্কস দ্বীপপুঞ্জে আমাদের প্রচার করতে দেয়নি, তা আপনি বিশ্বময় ছড়িয়ে দিলেন। ভাইয়া, কি বলে কি দিয়ে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাব ভাইয়া।’ আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল জেনিফারের কণ্ঠ।
‘পাগল বোন, ভাইকে বুঝি এভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়?’
‘আমার নয় ভাইয়া, এটা জাতির কৃতজ্ঞতা।’
‘জাতি কি আমার নয়?’
‘তবু ভাইয়া, আমি জাতির মধ্যকার একজন।’
‘আচ্ছা থাক এসব। শোন, একে শুধু আনন্দের নয়, আশংকার দৃষ্টিতেও দেখতে হবে। তোমাকে এবং মার্গারেটকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। ওরা এটা শোনার পর এতক্ষণে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে গেছে। ষ্টুডেন্ট গ্রুপের সমীক্ষার তথ্য পাচার করার জন্যে তোমাকে এবং হাসপাতালের তিনটি শিশুর পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করার জন্যে মার্গারেটকেই ওরা সন্দেহ করবে। সুতরাং তোমাদেরকে খুবই সাবধান থাকতে হবে। রাস্তায় বেরুনো তোমার একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে।’
‘আমি তো লুকিয়েই আছি। ওখানে আপনাদের সাথে এক সাথে টিভি দেখার ইচ্ছা আমার ছিল। কিন্তু রাস্তায় বেরুতে হবে, এ কারণেই তো যেতে পারলাম না। জর্জকে টেলিফোন দিন। আমি ওর সাথে ঝগড়া করবো। আমার সৌভাগ্য সে কেড়ে নিচ্ছে।’
‘জেনিফার, তোমার আর জর্জের সৌভাগ্য আলাদা হয়ে গেল কখন? দিচ্ছি ওকে টেলিফোন, ঝগড়া কর।’
বলে আহমদ মুসা জর্জকে টেলিফোন দিল। দিতে দিতেই শুনল জেনিফার চিৎকার করছে, ‘থাক ওর সাথে আর কথা বলব না।’
জর্জ টেলিফোন ধরে বলল, ‘বেশ জেনিফার, আমি তো কথা বলতে চাইনি।’
ওপারের কথা শুনে জর্জ আবার বলল, ‘তুমি আসতে পারনি, এটা কি আমার দোষ?’
ওপারের কথার পর জর্জ পুনরায় বলল, ‘বা! বা! বা!, আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে এলাম না কেন, তুমি বলনি কেন? আমি তো তোমাকে চালাই না, তুমিই আমাকে চালাও। তাই……..।’
জর্জের কথা শেষ হতে পারল না। ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিয়েছে জেনিফার।
জর্জ টেলিফোন রাখতে রাখতে বলল, ‘রেগে গেছে জেনিফার’
‘তুমি যাতা বলে ওকে রাগাও জর্জ, এটা ভাল নয়।’ বলল ডা: মার্গারেট।
‘আপা, তুমি তো কোন সময়ই জেনিফারের ত্রুটি দেখ না। ওই প্রথম আজ অযৌক্তিক কথা বলেছে।’
আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি। বলল, ‘ঠিক আছে জর্জ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আজ জেনিফারই ঝগড়াটা প্রথম শুরু করেছে।’
আহমদ মুসা থামতেই ডা: মার্গারেট চকিতে আহমদ মুসার দিকে একবার চোখ তুলল। তারপর কম্পিত চোখটা নামিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘FWTV’-তে এই অসম্ভব ঘটনা কিভাবে ঘটতে পারলো?’
‘এটা তো অসম্ভব ঘটনা নয়!’
‘আমাদের কাছে অসম্ভব। লোকাল খবরের কাগজে যে নিউজ ছাপা যায় না, সে নিউজ বিশ্ব টিভি’তে বিশ্বময় প্রচার হবে এটা অসম্ভব ঘটনা নয়?’
‘তা ঠিক। কিন্তু FWTV –এর মত বিশ্বমানের টিভিগুলো এ ধরনের বিষয় পেলে লুফে নেয়।’
‘কিন্তু পেল কি করে?’
‘আমি ওদের কাছে পাঠিয়েছি।’
‘সেটা আমরা বুঝেছি।’ হেসে বলল ডা: মার্গারেট।
থেমেই ডা: মার্গারেট আবার শুরু করল, ‘কিন্তু পেয়েই ওরা প্রচার করল? BBC কিংবা VOA কে দিলে তারা কি প্রচার করত?’
‘না করত না।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আসল কথা ডা: মার্গারেট, FWTV এবং WNA-এই দু’টি সংবাদ মাধ্যম মুসলমানদের তৈরি। বিশ্বমানের সংবাদ মাধ্যম হিসাবে যে দায়িত্ব, সেটা তারা পালন করার সাথে নিজস্ব দায়িত্বও এভাবে তারা পালন করছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ ডা: মার্গারেট ও জর্জ এক সাথেই বলে উঠল।
একটু থেমেই জর্জ আবার বলল, ‘এ সংবাদ মাধ্যম দু’টির এই গোপন পরিচয় কি অন্যেরা জানে?’
‘কেউ কেউ এটা সন্দেহ করে। কিন্তু সবাই এটা জানে, এ সংবাদ মাধ্যম দু’টিতে মুসলিম কিছু পুঁজিপতির পুঁজি আছে। কিন্তু তারা মনে করে অন্যগুলোর মতই এটা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে এ সংস্থা দু’টোর সংবাদ প্রচারে নিরপেক্ষতা এদের সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার সুযোগ কাউকে দিচ্ছে না। মুসলিম কোন গ্রুপ বা শাসকের দ্বারা কোন অন্যায় হলে তা এ সংবাদ মাধ্যম দু’টো সোচ্চার কণ্ঠেই প্রচার করে থাকে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ডা: মার্গারেটকে বলল, ‘তুমি কি কিছুদিনের জন্যে ছুটি নিতে পার?’
‘কেন?’
‘হাসপাতালে যাতায়াত তোমার নিরাপদ নয়। তাছাড়া আমি মনে করি কিছুদিন তোমার একটু সরে থাকা দরকার।’
‘আপনি যা আদেশ করবেন তাই হবে।’
‘এটা আমার আদেশ নয়, পরামর্শ।’
মুখ নিচু রেখেই থামল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘নেতা যেটা দেন তা পরামর্শ নয়, নির্দেশ।’
‘আদেশ না হয়ে পরামর্শই হওয়া ভাল নয় কি? আদেশ হলে তা তো অপরিহার্য হয়ে যায়।’
‘আদেশ না মানতে পারি, এ ভয় তাহলে আপনার আছে?’
‘মার্গারেট, আমার কথা বিশেষ কারো জন্যে নয়, সাধারণ নীতি হিসাবে বলেছি।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে ডা: মার্গারেট উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘আমি উঠছি। আজ কিন্তু আপনি খেয়ে যাবেন। সব রেডি।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মার্গারেট দ্রুত ড্রইং রুম ত্যাগ করল।
মার্গারেট চলে গেলে জর্জ টিভি বন্ধ করে দিল। মুখোমুখি হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘এরপর কি ভাইয়া? হোয়াইট ঈগল তো ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে উঠবে বলছেন। কিন্তু বিশ্ব কিছু বলবে না?’
‘অবশ্যই বলবে। দেখবে আগামী কালের সংবাদপত্র এই নিউজ কমবেশী কভার করবে গোটা দুনিয়ায়। প্রতিক্রিয়াও কালকে থেকেই প্রকাশ হওয়া শুরু করবে। এবং এটা অবশ্যই একটা ইস্যুতে পরিণত হবে।’
‘এর ফল কি হবে?’
‘কি ফল হবে আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি বৃটিশ সরকার, টার্কস দ্বীপপুঞ্জের এ ঘটনার জন্যে ঘরে বাইরে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়বে। সুতরাং বাধ্য হয়েই তাকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জে ‘হোয়াইট ঈগল’-এর মূলোচ্ছেদ করতে এগিয়ে আসতে হবে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। এটা হবে আমাদের জন্যে একটা বড় লাভ। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের জন্যে।’
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই ভেতর থেকে জর্জের ডাক পড়ল, ‘ওঁকে নিয়ে এস জর্জ।’
সংগে সংগেই জর্জ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন ভাইয়া। বাড়িতে আর কেউ নেই, কাজের দু’জন মেয়ে ছাড়া।’
আহমদ মুসাও উঠল। খাবার টেবিলে বসল জর্জ এবং আহমদ মুসা।
খাবারগুলো ঠিক-ঠাক এগিয়ে দিয়ে ডা: মার্গারেট বলল, ‘শুরু করুন সেলফ সার্ভিস।’
‘এটাই নিয়ম, ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপা, তুমি বস। দাঁড়িয়ে রইলে যে!’ বলল জর্জ।
‘হোষ্ট হিসাবে তুমি তো খাচ্ছই। মেহমানের অস্বস্তির কোন কারণ নেই।’ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল মার্গারেট।
জর্জ একটু ভাবল। তারপর আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, এভাবে একত্রে খাওয়ার ব্যাপারে ইসলামের কোন নিষেধাজ্ঞা আছে?’
‘নিরাপদ পরিবেশে পর্দাসহ বিয়ে নিষিদ্ধ নয় এমন লোককে খাবার পরিবেশন করা, তার সাথে দেখা করা, কথা বলা যায়, কিন্তু একান্ত বাধ্য না হলে এক সাথে খাওয়া যায় কিনা আমার জানা নেই।’
‘নিরাপদ পরিবেশ কি?’ জর্জ বলল।
‘যাদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ নয় এমন দু’জন ছেলে মেয়ে কোন নিভৃত স্থানে বা কোন নির্জন কক্ষে দেখা করতে বা কথা বলতে পারে না। তবে নিরাপদ হলে পারে। অর্থাৎ সাথে যদি স্বামী ও ভাই-এর মত কেউ থাকে তাহলে পারে। সাথে স্বামী ও ভাই-এর মত অতি আপন কেউ থাকাই নিরাপদ পরিবেশ।’
‘এক সাথে খাওয়ার ক্ষেতেও এই একই বিধান হতে পারে না কেন?’
‘আমি মনে করি একান্ত বাধ্য হলে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে এটা আমার মনে হয় মুসলিম সংস্কৃতি বিরোধী।’
‘কারণ?’ প্রশ্ন করল জর্জ।
‘জনাব, কারণ বলবেন না। এসব ব্যাপারে কত বই আছে, কোরআনের তফসির এবং হাদীস তো আছেই। লেখাপড়া করবে না, শুধু প্রশ্ন। এত কথা বললে খাওয়া হবে না। খেতে দাও।’ কৃত্রিম শাসনের সুরে বলল ডাঃ মার্গারেট।
জর্জ আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যরি, ভাইয়া। আপা ঠিকই বলেছেন।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঠিক আছে তোমার প্রশ্নটার জবাব আরেকদিন দেব।’
‘জর্জ কিন্তু লেখাপড়া করে না। ওর আবেগ যতটা বেশি, লেখাপড়া ততটাই কম।’ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল মার্গারেট।
‘তাই নাকি জর্জ?’
‘ভাইয়া আপা ইসলামের পন্ডিত হচ্ছেন, আমাকে পন্ডিত হতে বলেন।’ বলল জর্জ।
‘পন্ডিত না হও, প্রয়োজনীয় সবকিছু তোমাকে জানতে হবে।’
‘সে চেষ্টা করছি ভাইয়া। কোরআন শরীফ আমি অর্থসহ দু’বার পড়া সম্পন্ন করেছি। মিশকাত শরীফের অর্ধেক পর্যন্ত পড়েছি। তাছাড়া মাসলা-মাসায়েলের বই নিয়মিতই দেখি।’
‘ধন্যবাদ জর্জ। আর তোমার আপা?’
‘সে হিসেব আমি দিতে পারবো না। ওঁর টেবিল ভর্তি বইয়ে। ডাক্তারি বিদ্যা সে ভুলতে বসার পথে।’
আহমদ মুসা তাকাল ডাঃ মার্গারেটের দিকে। বলল, ‘জর্জের অভিযোগ সত্য নয় আশা করি। তোমাকে শ্রেষ্ঠ ডাক্তার হতে হবে, সেই সাথে হতে হবে একজন শ্রেষ্ঠ মুসলমান।’
আহমদ মুসার দিকে মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল ডাঃ মার্গারেট। তার মুখ রক্তিম হয়ে উঠেছে লজ্জা এবং অপরিচিত এক আবেগে। বলল, ‘দোয়া করুন।’
বলে ডাঃ মার্গারেট কি মনে হওয়ায় দ্রুত রিফ্রেজারেটরের দিকে এগুলো।
আহমদ মুসা মনোযোগ দিল খাওয়ার দিকে।

টেলিফোনের শব্দে আহমদ মুসার ঘুম ভাঙল। রাত তখন ৩টা। ধরল টেলিফোন। লায়লা জেনিফারের কণ্ঠ। কান্নায় কথা বলতে পারছে না জেনিফার।
‘সময় নষ্ট করো না জেনিফার। কি ঘটেছে বল?’ একটু শক্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘মার্গারেট আপাকে কেউ ধরে নিয়ে গেছে। জর্জ আহত হয়ে বাইরে পড়ে আছে।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল জেনিফার।
‘কি বলছ তুমি জেনিফার? তুমি বাসা থেকে?’
‘আমি বাসায়। জর্জের বাসায় আর কেউ নেই। কাজের মেয়েটা আমার টেলিফোন নম্বার জানত, এইমাত্র আমাকে জানাল।’
‘তুমি টেলিফোন রেখে দাও। আমি এখনি বেরুচ্ছি।’
‘ভাইয়া, আমি যাব।’
‘বেশ প্রস্তুত থাক। আসছি আমি।’
রাত সাড়ে তিনটার মধ্যেই আহমদ মুসা জেনিফারকে নিয়ে জর্জদের বাড়ি পৌছল।
জর্জকে তখন প্রতিবেশীরা কয়েকজন এসে ধরাধরি করে ড্রইং রুমে এনে তুলেছে।
জর্জ আহমদ মুসাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা কোন কথা না বলে জর্জের মাথায় হাত বুলিয়ে জর্জের আঘাত পরীক্ষা করল। দেখল, জর্জের দু’হাত ক্ষত-বিক্ষত। বাধা দেবার জন্যে দুহাতে ছোরা ধরে ফেলারই ফল এটা। তাছাড়া তার ডান বাহুতে এবং কাঁধে মারাত্মক আঘাত।
কাজের মেয়েরাও প্রতিবেশীরা ক্ষতগুলো কাপড় দিয়ে বেঁধে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা কান্নারত বিমূঢ় জেনিফারের দিকে চেয়ে বলল, ‘জেনিফার তুমি থানায় এবং হাসপাতালে টেলিফোন কর।’
বলে আহমদ মুসা কান্নারত জর্জের দিকে চেয়ে বলল, ‘জর্জ এখন কান্নার সময় নয়। তুমি আমাকে সাহায্য কর।’ আদেশের সুরে কথাগুলো বলল আহমদ মুসা।
জর্জ চোখ মুছল। শান্ত হবার চেষ্টা করল।
‘বল, যারা মার্গারেটকে ধরে নি