২৭. মিসিসিপির তীরে

চ্যাপ্টার

সেনেনদোয়া নদী দিয়ে এগিয়ে চলছিল সুন্দর একটি মোটর বোট।
সেনেনদোয়া নদীটি উত্তর বাহী। …. পর্বতমালা থেকে বেরিয়ে গ্রেটভ্যালি হয়ে সেনেনদোয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশ ঘেঁষে উত্তরে এগিয়ে চলেছে পটোম্যাক নদীতে।
মাঝারী স্পীডে চললেও স্রোতের বিপরীতে চলছে বলে বেশ শব্দ করে পানি কাটছে বোটটি।
বিলাসবহুল ট্যুরিস্ট বোট।
বোটের দোতলার কেবিনে ইজি চেয়ারে বসে আছে ষাটোর্ধ বয়সের প্রফেসর আরাপাহো আরিকারা। ইলিয়া রাজ্যের মিসিসিপি তীরের প্রাচীন রেড ইন্ডিয়ান নগরী ‘কাহোকিয়া’র ‘রেড ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’ (RIHR)- এর চেয়ারম্যান তিনি। তিনি একজন সম্মানিত রেড ইন্ডিয়ান বুদ্ধিজীবী।
ছুটির সুযোগে তিনি বেড়াতে বেরিয়েছেন।
তার এক ছেলে ও এক মেয়ে দু’জনেই জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্টবিজ্ঞানের ছাত্র।
তার এই সফরে দুই ছেলেমেয়েও তার সাথী।
নৌ-পথে ভ্রমণের মজার প্ল্যান নিয়ে বেরিয়েছে তারা।
তারা ওয়াশিংটন নগরীর উপকণ্ঠ থেকে ট্যুরিস্ট মটর বোট নিয়ে যাত্রা করেছে। পটোম্যাক থেকে তারা পড়েছে সেনেনদোয়া নদীতে। এ নদী থেকে তারা উঠবে এক্সপ্রেস ওয়েতে। তারপর পশ্চিম ভার্জিনিয়ার চার্লসটন হয়ে তারা যাবে হান্টিংটনে। এখান থেকে ওহাইও নদী পথে তাদের নৌযাত্রা শুরু হবে আবার। ওহাইও হয়ে মিসিসিপি দিয়ে তারা পৌঁছবে কাহোকিয়া।
ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে প্রফেসর আরাপাহো আরিকারা চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছে।
তার ছেলে জিভারো ডেক চেয়ারে বসে মাঝে মাঝে চারদিকে দেখছিল, আবার একটা উপন্যাসে চোখ বুলাচ্ছিল এবং মেয়ে হায়েদা ওগলালা উপরে কেবিনের ছাদে, ছাদ সমান বিশাল ফোম ম্যাটে গড়াগড়ি দিচ্ছে। জিভারো এবং ওগলালা দু’জনেরই উদ্দেশ্য শরীরে কিছুক্ষণ সূর্য্যের তাপ নেয়া।
কেবিনের ছাদে বড়ো কোন আঘাত বা ভারি কিছু পড়ার শব্দ হলো। সেই সাথে ওগলালার চিৎকার।
প্রফেসর আরাপাহো আরিকারা নদী তীরের দৃশ্যের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। তার মনে পড়ছিল, এই উপত্যকা বনাঞ্চলে একদিন রেড ইন্ডিয়ানদের শক্তিশালী সাম্রাজ ছিল। যার কেন্দ্র ছিল মিসিসিপি কেন্দ্রিক সমভূমি অঞ্চল। এই বিশাল অঞ্চলে মোহক নেতা রেড ইন্ডিয়ান বীর হাইওয়াথার নেতৃত্বে ইরিকুইস ইন্ডিয়ানদের শক্তিশালী শাসন গড়ে উঠেছিল। এই রকম নদীগুলোর দু’তীরে এবং বনাঞ্চলে শিকার সন্ধানী রেড ইন্ডিয়ানদের ছিল গৌরবপূর্ণ বিচরণ। প্রফেসর আরাপাহো আরিকারা যেন দেখতে পাচ্ছে সেদিনের তাদেরকে।
মাথার উপরে প্রচণ্ড শব্দ এবং ওগলালার চিৎকারে তার সম্বিত ফিরে এল। সোজা হয়ে বসল সে। বলল হাঁক দিয়ে ছেলেকে লক্ষ্য করে, ‘কি হয়েছে জিভারো?’
বলে নিজেই বেরিয়ে এল কেবিন থেকে ডেকে।
ততক্ষণে জিভারো সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে উঠে গেছে কেবিনের ছাদে।
প্রফেসর আরাপাহো আরিকারাও সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠল। বয়স তার ষাটোর্ধ হলেও দেখতে চল্লিশের বেশি মনে হয় না।
প্রফেসর আরাপাহো আরিকারা ছাদের উপর নজর পড়তেই দেখল, একজন যুবক পড়ে আছে ছাদের ফোম ম্যাটের উপর। তার কপালে ক্ষত। রক্ত বেরুচ্ছে সেখান থেকে।
ওগলালা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই।
জিভারো ঝুঁকে পড়ে যুবকটিকে পরীক্ষা করছিল।
প্রফেসর আরাপাহো ছাদে উঠতেই জিভারো বলল, ‘আব্বা, লোকটা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে।’
মোটর বোট তখন ব্রীজ থেকে বেশ একটু দক্ষিণে সরে এসেছে।
প্রফেসর আরাপাহো তাকাল ব্রীজের দিকে। কোন মানুষ, কোন গাড়ি কিছুই দেখতে পেল না। যুবকটি কি নিজেই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল? না কেউ তাকে ফেলে দিয়েছিল?
এসব চিন্তা রেখে যুবকটির দিকে তাকিয়ে প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘যুবকটি এশিয়ান। এবং কপালের আঘাতটি তার বোটে পড়ার ফলে নয়। একে নিচে নিয়ে চল জিভারো।’
‘ঠিক বলেছেন আব্বা। ওর পেছনটা আগে পড়েছে। এখানে কপালে সে আঘাত পায়নি।’ বলল হায়েদা ওগলালা।
বলে ওগলালা একটু থামল দম নেবার মত। তারপর বলল, ‘অল্পের জন্যে আমি বেঁচে গেছি। আমার একদম মাথার কাছেই ও এসে পড়েছে।’
বাপ, বেটা, বেটি তিনজনেই ধরাধরি করে নামাল যুবকটিকে নিচে দু’তলার ডেকে।
নিচ থেকে বোটের একজন স্টাফ এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রফেসর আরাপাহো তাকে তাড়াতাড়ি ফাস্ট এইড বক্স আনতে বলল নিচ থেকে।
ফার্স্ট এইড বক্স আনলে প্রফেসর আরাপাহো বক্স থেকে স্পিরিটের শিশি তুলে নিয়ে বলল, ‘এর সংজ্ঞা আগে ফেরানো দরকার।’
বলে সে স্পিরিটে তুলা ভিজিয়ে যুবকটির নাকে ধরে রাখল।
যুবকটি আহমদ মুসা।
প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই সে লাফিয়ে পড়েছিল ব্রীজ থেকে। আল্লাহর করুনা সে পানিতে পড়েনি, আবার বোটের নরম ম্যাট তাকে বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। কিন্তু বোটে পড়ার পর পুরোপুরি সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে।
স্পিরিটের উদ্দীপক গন্ধে তাড়াতাড়ি সংজ্ঞা ফিরে পেল আহমদ মুসা। চোখ মেলল সে।
প্রথমেই চোখ বুজে গেল আহমদ মুসার। মনে পড়লো তার, সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার গা ভিজা নয়। তাহলে কি এই বোটের উপর পড়েছিল? এবং সে সংজ্ঞা হারিয়েছিল? কতক্ষণ সময় গেছে? হোয়াইট ঈগলের লোকেরা কোথায়? এরা কারা? চেহারায় এরা রেড ইন্ডিয়ান। কিন্তু পোশাকে ইউরোপিয়ান। তাহলে শিক্ষিত ও শহুরে রেড ইন্ডিয়ান এরা।
আবার চোখ খুলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা চোখ খুললে জিভারো আহমদ মুসার ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে তার মাথা উঁচু করে তুলে ধরল। আর প্রফেসর আরাপাহো এক গ্লাস ব্রান্ডি আহমদ মুসার মুখের কাছে তুলে ধরে বলল, ‘খেয়ে নাও। শরীরটা সবল হবে। ভাল লাগবে তোমার।’
‘গ্লাসে নিশ্চয় ব্রান্ডি অথবা বিয়ার? আমি মদ খাই না।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল প্রফেসর আরাপাহো এবং জিভারো ও ওগলালার চোখে-মুখে।
‘অল রাইট ইয়ংম্যান। এখন কেমন মনে করছ?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘ভালো জনাব।’ বলে উঠে বসল আহমদ মুসা।
‘বসে থাকতে পারবে? না শুয়ে পড়বে? আহত স্থান থেকে এখনও রক্ত বেরুচ্ছে। তাড়াতাড়ি ড্রেসিং করে দিতে হবে।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা প্রফেসর আরাপাহোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জনাব আপনি কষ্ট করবেন? একটু পর আমিই সব কিছু ঠিক করে নিতে পারব।’
‘তোমার সৌজন্য বোধের জন্যে ধন্যবাদ।’ বলে প্রফেসর আরাপাহো কাজে লেগে গেল।
ড্রেসিং করতে করতে বলল, ‘খারাপ হবে না আমার ড্রেসিং। ভাল ট্রেনিং আছে এ ব্যাপারে আমার।’
ড্রেসিং শেষে আহমদ মুসাকে নিয়ে এল কেবিনে।
আহমদ মুসা নিজেই হেঁটে এল এবং কেবিনের টয়লেটে গিয়ে তার মুখ পরিষ্কার করল। জিভারো এবং ওগলালা পাশে দাঁড়িয়েছিল। জিভারো সাহায্য করতে চাইলে আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাদের, যেটুকু পারা যায় নিজে করাই ভাল।’
কেবিনের টেবিলে বসল সবাই। পরিবেশিত হলো গরম চা।
প্রফেসর আরাপাহো চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে বলল, ‘ইয়ংম্যান, অবশ্যই চাযে তোমার অভ্যেস আছে? নাও।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’ বলে চা তুলে নিল আহমদ মুসা।
জিভারো এবং ওগলালাও চায়ে চুমুক দিল।
চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘ইয়ংম্যান, তোমার কপালের আহত স্থানে দু’বার আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটা কয়েক ঘণ্টা আগের, আরেকটা তাজা। সত্যি কি তাই?’
‘জ্বি, ঠিক বলেছেন।’
‘তোমার নাম কিন্তু এখনও আমরা জানি না। তুমি কি মুসলিম?’
‘জ্বি। কি করে বুঝলেন?’
‘প্রথমত, তোমার কপালে নামাযের চিহ্ন দেখেছি। দ্বিতীয়ত, তুমি মদ খাও না।’
‘জনাব, নাম জিজ্ঞেস করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আমি ঠিক নামটা বলতে পারি না।’
‘বুঝেছি। দেখ, আমি কাহোকিয়ার ‘রেড ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’- এর চেয়ারম্যান। এরা আমার ছেলেমেয়ে। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।’
আহমদ মুসা ওদের দু’জনের দিকে তাকাল। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনে মনে পড়ল সান ওয়াকার, মেরী রোজ ও শিলা সুসানের কথা। বলল ওদের লক্ষ্য করে, ‘তোমরা কি ঈগল সান ওয়াকারকে চেন?’
সান ওয়াকারের নাম শুনেই দু’জনের চোখ-মুখ যেন নতুন করে জেগে উঠল। তার সাথে কিছুটা মলিন হয়ে উঠল ওগলালার মুখ। একটা বেদনার প্রকাশ সেখানে স্পষ্ট।
ওগলালাই জিজ্ঞেস করল, ‘চিনেন আপনি তাকে?’ কণ্ঠ তার অনেকটা শুকনো।
‘চিনতাম না। তবে একই বন্দীখানায় থাকার সময় তাকে চিনেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘একই বন্দীখানায়? আমরা শুনেছি সে তো হোয়াইট ঈগলের হাতে বন্দী।’
‘আমিও বন্দী ছিলাম হোয়াইট ঈগলের হাতে।’
প্রচণ্ড এক বিস্ময় নেমে এল ওগলালা, জিভারো এবং প্রফেসর আরাপাহোর চোখে-মুখে।
কিছুক্ষণ যেন তারা কিছুই বলতে পারল না।
‘হোয়াইট ঈগল তোমাকে বন্দী করল কেন? শুধু অশ্বেতাংগ বলে নিশ্চয় নয়?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো নীরবতা ভেঙে।
‘ঠিক বলেছেন জনাব। আমি ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে অশ্বেতাংগ বিশেষ করে মুসলমানদের পক্ষ নিয়েছিলাম, এটাই আসল কারণ। আমার কারণে নাকি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলকে শ্বেতাংগকরণের ওদের পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, আমাকে বিক্রি করে ওরা বিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে চেয়েছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
জিভারো, ওগলাল এবং প্রফেসর আরাপাহোর স্থির দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখে নিবদ্ধ। তাদের চোখে বিস্ময় ও কিছুটা সমীহের ভাব।
আহমদ মুসা থামলে সংগে সংগেই প্রফেসর আরাপাহো বলে উঠল, ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি ক্যারিবিয়ানে ওদের অশ্বেতাংগ বিরোধী ষড়যন্ত্রের কথা। তাহলে তুমিই এসব করিয়েছ বলছ?’
‘আমি কৃতিত্ব দাবী করছি না। ওদের সাথে আমার শত্রুতার কারণ বলেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
প্রফেসর আরাপাহো হাসল। বলল, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। আমার কথার ঐ রকম অর্থ হওয়ার জন্যে আমরা দুঃখিত।’
বলে একটু থামল প্রফেসর আরাপাহো। থেমেই আবার বলল, ‘হোয়াইট ঈগল তোমাকে বিক্রি করার অর্থ বুঝলাম না।’
‘হ্যাঁ, ওরা আমাকে ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করতে যাচ্ছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
প্রফেসর আরাপাহোসহ ওদের তিনজনেরই ভ্রু কুঞ্চিত হলো টাকার অংক শুনে। বলল প্রফেসর আরাপাহো, ‘ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার লাভ?’
‘ওদের সাথে আমার পুরানো শত্রুতা। ইসরাইলে ওদের পতন নাকি আমার কারণে। ওরা প্রতিশোধ নিতে চায় এবং আমাকে হাতে রেখে কয়েকটি মুসলিম সরকারের সাথে দর কষাকষি করতে চায়।’
প্রফেসর আরাপাহোর বিস্ময় বিজড়িত মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘তুমি নিরাপত্তার কারণেই তোমার নাম বলনি। কিন্তু তুমি সাংঘাতিক একটা অস্ত্র তুলে দিলে আমাদের হাতে। ঐ লাভজনক ব্যবসায়ের উদ্যোগ হোয়াইট ঈগলের মত আমরাও নিতে পারি।’
‘আমি নিশ্চিত হবার পরই একথা বলেছি জনাব। কাহোকিয়ার রেড ইন্ডিয়ান সংস্থার কেউ এই ব্যবসা করতে যাবে না।’
‘তুমি কাহোকিয়াকে জান?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘কিছু কিছু শুনেছি। সান ওয়াকারও কাহোকিয়া এবং আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্টের লোক।’
গম্ভীর হলো প্রফেসর আরাপাহোর মুখ। বলল, ‘তুমি আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্টের বিষয়ে জান?’
‘কিছু কিছু।’
‘ইয়ংম্যান, আমার মনে হচ্ছে তুমি যথার্থ ভাবেই নাম বলায় সতর্কতা অবলম্বন করেছ। প্রয়োজন হলে নামটা তোমার বলো। আপাতত আমি তোমাকে আহমদ মুসা বলেই ডাকব। এখন বলল, কেমন করে বন্দীখানা থেকে এই সেনেনদোয়া নদীর ব্রীজে এলে?’
প্রফেসর আরাপাহোর মুখে আহমদ মুসার নাম শুনে বিস্ময়ে ‘থ’ হয়ে গেল আহমদ মুসা। বলল, ‘আহমদ মুসাকে আপনি চেনেন?’
‘চিনি না জানি। এবং জানি শুধু নয়, আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্টের সকলেই জানে আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা তাদের জীবন্ত মডেল।’
‘ঠিক আছে ঐ নামটায় দিন। কিন্তু নামটা বাইরে দয়া করে বলবেন না। সীমাবদ্ধ রাখবেন আপনাদের তিনজনের মধ্যে।’
প্রফেসর আরাপাহো এবং ওগলালা ও জিভারো কারোরই বুঝতে বাকি রইল না যে, তাদের সামনের যুবকটিই আহমদ মুসা। তাদের তিনজনের বিস্ময় দৃষ্টি গিয়ে আছড়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
নীরবতা ভাঙল প্রফেসর আরাপাহো। বলল, ‘আমি খুশী যে আমি ঠিক মানুষকে ঠিক নাম দিয়েছি। আর ঈশ্বরের প্রশংসা করছি যে, তিনি আপনাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এনেছেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ দিয়েছেন। অধিকার বঞ্চিত রেড ইন্ডিয়ানরা খুশী হবে আপনার আগমনের এ খবরে।’
প্রফেসর আরাপাহোর মুখে এখন ‘আপনি’ সম্বোধনে বিব্রত বোধ করল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি আপনার ছেলের বয়সের। আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করলেই আমি খুশী হবো।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু বয়সে ছেলের মত হলেও ওজন কিন্তু দাদার বয়সের। এ সম্মান তোমাকে না দিয়ে আমরা পারি না।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘আপনার মত মুরুব্বীদের স্নেহ আমার জন্যে বড় সম্মান।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এখন বল সেনেনদোয়া ব্রীজে তোমার আসা এবং তোমার নদীতে পড়ার কাহিনী। আর সান ওয়াকারের খবর কি?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা তার বন্দী হওয়া, বন্দী অবস্থায় গোল্ড ওয়াটারের ক্লোজ সার্কিট টিভি মনিটরে সান ওয়াকারকে দেখা ও তার পরিচয় পাওয়া, বন্দীখানা থেকে মুক্ত হওয়া এবং সান ওয়াকারকে মুক্ত করা, তাকে নিয়ে বন্দীখানা থেকে বের হওয়া, একটা গাড়ি হাইজ্যাক করে পলায়ন, মেরী রোজ-এর সাথে পরিচয় হওয়া, স্থল ও আকাশ পথে ঘেরাও হয়ে পড়ার পর মেরী রোজ ও সান ওয়াকারকে পালাবার সুযোগ করে দেয়ার জন্যে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে নামিয়ে দিয়ে ওদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেবার জন্যে গাড়ি নিয়ে অগ্রসর হওয়া এবং সবশেষে চলন্ত গাড়ি থেকে ব্রীজে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে কপালে আবার আঘাত পাওয়া এবং বাঁচার জন্যে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া ইত্যাদি সব কথা সংক্ষেপে বর্ণনা করল তাদের কাছে।
সম্মোহিতের মত তারা শুনল সব কথা। বিস্ময় ও প্রশংসার প্রশ্রবণ তাদের চোখে মুখে।
আহমদ মুসা থামতেই ওগলালা বলল, ‘সান ওয়াকার অসুস্থ। সে পালাতে পারবে?’ ওগলালার কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
‘পারবে। সাথে মেরী রোজ আছে। এবং আমার ধারণা শিলা সুসানও তাদের খোঁজে আসছে।’
‘তার কি ওয়াশিংটনে ফিরে যাওয়া ঠিক হবে?’ ওগলালা বলল।
‘আমি মনে করি, ঠিক হবে না।’
‘কিন্তু মেরী রোজরা তাকে ওয়াশিংটনেই ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করবে?’
আহমদ মুসা ওগলালার কথার মধ্যে সান ওয়াকারের প্রতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনুরাগ এবং মেরী রোজ-এর প্রতি বিরাগ লক্ষ্য করল। এটা কি সান ওয়াকারের সাথে তার কোন বিশেষ সম্পর্কের ইংগিত দেয়? না এটা রেড ইন্ডিয়ান সান ওয়াকার, আর শ্বেতাংগ মেরী রোজ-এর প্রতি তার স্বাভাবিক মনোভারের প্রকাশ? কোনটা ঠিক বুঝতে পারল না আহমদ মুসা।
বলল আহমদ মুসা, ‘আমার মনে হয় তারা নিরাপত্তার দিকটা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেবে।’
‘আপনি’ সেনেনদোয়ার ব্রীজে গাড়ি থামিয়ে না নেমে লাফিয়ে পড়তে গেলেন কেন?’ বলল জিভারো।
‘ওরা আমাকে তিনটি গাড়ি ও হেলিকপ্টার নিয়ে তাড়া করছিল, বুঝতে পারছিলাম, গাড়ি চালিয়ে বা গাড়ি থেমে নেমে ছুটে পালিয়ে ওদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে না। এই সময় পেয়ে গেলাম ব্রীজ। সিদ্ধান্ত নিলাম নদী দিয়ে পালাব। কিন্তু এই পালানো নিরাপদ করতে হলে ওদের বুঝতে দেয়া যাবে না যে আমি নদী দিয়ে পালিয়েছি। তা করতে হলে গাড়ি ব্রীজের উপর রাখা যাবে না, গাড়ি পাঠাতে হবে ব্রীজের ওপারে। ড্রাইভার বিহীন চলন্ত গাড়ি নিশ্চয় ওপারে গিয়ে এ্যাকসিডেন্ট করবে। ওরা বুঝবে এ্যাকসিডেন্ট করেছি, তারপর পালিয়ে গেছি। সে জন্যেই গাড়ি স্পীডে রেখে গাড়ি থেকে ব্রীজে লাফিয়ে পড়েছি। এ কৌশল কাজ দিয়েছে। সম্ভবত নদীর দিকে কেউ ওরা আসেনি। ওদের হেলিকপ্টার স্থলাঞ্চল ঘুরে বেড়াচ্ছে, নদীর উপর একবারও আসেনি।’
‘সাংঘাতিক উপস্থিত বুদ্ধি আপনার।’ বলল জিভারো।
‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি কোন রোমাঞ্চ কাহিনী পড়ছি। আপনি যদি আপনার কাহিনী লিখতেন দারুণ বিক্রি হতো।’ ওগলালা বলল।
চা’র পর নাস্তাও খেল তারা ঐ টেবিলে বসেই।
বেশ অনেকক্ষণ থেকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেনি প্রফেসর আরাপাহো। ভাবছিল সে। একসময় বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘ঈগল সান ওয়াকার রেড ইন্ডয়ানদের সমকালিন শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। আমি ভাবছি, এ প্রতিভার কি হবে? সেতো এখন কোথাও নিরাপদ নয়।’
আহমদ মুসা মুখ খোলার আগেই ওগলালা বলে উঠল, ‘আব্বা তার এ বিপর্যয়ের কারণ মেরী রোজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই বলাবলি করছে, মেরী রোজ সান ওয়াকারের ঘনিষ্ঠ হওয়াকে বর্ণবাদীরা মেনে নেয়নি। মেরী রোজ থেকে সান ওয়াকারকে বিচ্ছিন্ন করে বিদেশে কোথাও পাঠিয়ে দেবার জন্যেই হোয়াইট ঈগল সান ওয়াকারকে কিডন্যাপ করেছে। বলাবলি হচ্ছে, সান ওয়াকার যদি মেরী রোজ-এর সাথে সম্পর্ক না রাখে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনও সময় আর ফিরে আসতে চেষ্টা না করে, তাহলে সান ওয়াকারকে তারা পৃথিবীর কোনও দেশে পাঠিয়ে দেবে।’ ওগলালা থামল। তার কণ্ঠে ক্ষোভ ও অভিমান ঝড়ে পড়ল। সেই সাথে অব্যক্ত এক আবেগে লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ।
‘আমি সান ওয়াকারকে জানি। সে এসব শর্তের কোনটাই মানবে না। জীবনের বিনিময়েও নয়। সুতরাং তার অবস্থা বিপজ্জনক, সে কথাই আমি ভাবছি।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘বর্ণবাদীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শ্বেতাংগীনি মেরী রোজকে সান ওয়াকারের দিকে ঠেলে দেয়, সান ওয়াকারকে দিয়ে তাকে হিপনোটাইজ করে তারা এই সর্বনাশ……..।’
কান্নায় অবরুদ্ধ উচ্ছ্বাসে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। কথা শেষ করতে পারলো না ওগলালা।
রুমালে মুখ চাপা দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, ‘সান ওয়াকারকে সে দু’চোখে দেখতে পারতো না, কত অপমান ও লাঞ্ছনা যে সান ওয়াকারকে করেছে। তারপর হঠাৎ তার রাতারাতি পরিবর্তন হওয়া একটা ষড়যন্ত্র।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলে সে ছুটে পালাল।
মুহূর্তকাল নীরবতা।
নীরবতা ভেঙে প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘কিছু মনে করো না আহমদ মুসা। ও খুব ইমোশনাল এবং জেদী। কিন্তু আবার ঠান্ডা হতেও দেরী হয় না।’
‘বুঝতে পেরেছি। কিন্তু একটা জিনিস আমি বলতে পারি। সান ওয়াকারকে কিডন্যাপ যে কারণেই করুক। কিন্তু এখন তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্টে-এর কাহোকিয়া সম্মেলনে তার ভূমিকা।’
‘সে তো ছাত্র মাত্র। কোন কর্মকর্তা সে তো নয়, মুভমেন্টের!’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘সম্মেলনের দাবী-নামা নাকি তার ড্রাফটিং।’
‘হোয়াইট ঈগল এটাও জানতে পেরেছে?’ প্রফেসর আরাপাহো বলল।
‘তারা সান ওয়াকারের কাছে জানার চেষ্টা করছিল ‘এইম’ (AIM-আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট)- এর সেন্ট্রাল কমিটির নবনির্বাচিত সদস্যদের নাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সান ওয়াকারতো এসব বলে দেয়ার মত ছেলে নয়। প্রফেসর আরাপাহো বলল।
‘সুতরাং সান ওয়াকারের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ইতিমধ্যেই তার উপর দৈহিক নির্যাতন চালানো হয় অনেক। সে হয়তো বাঁচতো না ওদের হাত থেকে।’
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তোমাকেও ধন্যবাদ। সে বেঁচে গেছে।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘হ্যাঁ, এ যাত্রা বেঁচে গেছে।’
‘ঠিক বলেছ, তার বিপদ সামনে আরও আছে। খুবই দুঃসংবাদ এটা আমাদের জন্যে।’ প্রফেসর আরাপাহো বলল।

পরদিন সকাল।
বোট এসে ভিড়েছে স্ট্যানটনের কিছু উত্তর-পূর্বে ক্ষুদ্র নদীবন্দর ‘পোর্ট ভ্যালিতে।’
বন্দরটি সেনেনদোয়া নদী এবং গ্রেট ভ্যালি এক্সপ্রেসওয়ের একটা সংযোগ স্থল। পরিকল্পনা অনুসারে প্রফেসর আরাপাহোরা এখানে নামবে এবং সড়ক পথে যাবে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার চার্লসটন হয়ে হান্টিংটনে। হান্টিংটন ওহাইও নদীর একটা নৌবন্দর। এই নদী বন্দর থেকে প্রফেসর আরাপাহোরা যাবে ওহাইও ও মিসিসিপি হয়ে কাহোকিয়া।
আহমদ মুসা শুয়ে ছিল তার বেড়ে।
প্রফেসর আরাপাহো এসে ঢুকল আহমদ মুসার কেবিনে।
প্রফেসর আরাপাহোকে দেখে আহমদ মুসা উঠে বসতে যাচ্ছিল।
প্রফেসর আরাপাহো তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘না উঠো না, তুমি অসুস্থ।’
বলে প্রফেসর আরাপাহো বসল কক্ষের একটা চেয়ারে। বলল, ‘তুমি নাকি বলেছ এখানে নেমে তুমি চলে যেতে চাও?’
‘জ্বি, বলেছে।’
‘অসম্ভব। তোমার ভীষণ জ্বর। তোমাকে এভাবে আমরা ছাড়তে পারি না। তাছাড়া তোমাকে আমি কাহোকিয়াতে নিতে চাই।’
‘আমি ক্যারিবিয়ানের খোঁজ-খবর নিতে চাই। তাছাড়া সান ওয়াকাররা কোথায়, সেটাও দেখতে চাই।’
‘সব হবে। কিন্তু আগে তোমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে এবং সেই সাথে তোমাকে কাহোকিয়াতেও যেতে হবে।’
বলে আহমদ মুসাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকাল পেছনে।
পিতার সাথে সাথে ওগলালাও এসে প্রবেশ করেছিল ঘরে। তাকে লক্ষ্য করে প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘এ্যাম্বুলেন্স ওয়াগন কার’ পাওয়া গেছে মা?’
‘জ্বি, আব্বা। স্ট্যানটন থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসে পৌঁছবে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা যাত্রা করতে পারব।’
‘ধন্যবাদ মা, সুন্দর এ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ। এখন তুমি আহমদ মুসার ঔষধ ও কাপড় প্যাক করে এস ওদিকে।’
বলে বেরিয়ে গেল প্রফেসর আরাপাহো।
ঔষধ প্যাক করতে করতে ওগলালা বলল, ‘জনাব, আপনাদের সমাজে মেয়েরা নাকি আপাদ-মস্তক কাপড়ে প্যাক করে রাস্তায় বের হয়?’
ওগলালার কথার ঢংয়ে আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আপাদ-মস্তক কাপড়ে প্যাক করে নয়, সৌন্দর্যের স্থানগুলো ঢেকে বের হতে হয়।’
‘কেন?’
‘খারাপ দৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে।’
‘এভাবে আগাম খারাপ ধারণা করে নেয়া কি ঠিক? খারাপ ঘটলে তবেই না তাকে খারাপ বলা যায়।’
‘মেয়েদের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং আকৃষ্ট হবার পর খারাপ চিন্তার উদয় হওয়া মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। সুতরাং এ ব্যাপারে আগাম চিন্তা করা যায়।’
‘প্রবৃত্তিটা যদি সহজাত হয়, তাহলে তো এ থেকে আপনি, আমি, শিক্ষক, ছাত্র কেউই মুক্ত নয়। তাই কি?’
‘হ্যাঁ তাই।’
‘কিন্তু এটা কি বাস্তবতা?’
‘শিক্ষক-ছাত্রী কিংবা শিক্ষিকা-ছাত্রের মধ্যে অঘটন বা ঘটনা কি নেই?’
ওগলালা একটু চিন্তা করে বলল, ‘আছে।’
‘এটা কি বাস্তবতার প্রমাণ নয়?’
‘সবক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। ব্যতিক্রমের উপর কিন্তু কোন সাধারণ সিদ্ধান্ত হয় না।’
‘এ দু’চারটা ঘটনা আসলে ঘটনার আইস বার্গ। দেখুন, সব খারাপ চিন্তা খারাপ ঘটনায় রূপ নেয় না। আবার সব খারাপ ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ পায় না। সুতরাং সব মিলিয়ে ব্যতিক্রম যাকে বলছেন, তা ব্যতিক্রম নয়।’
‘তার অর্থ প্রত্যেক মানুষের মধ্যে প্রবৃত্তিগতভাবে খারাপ প্রবণতা আছে এবং সেই অর্থে ধরে নিতে হবে প্রত্যেক মানুষই খারাপ।’
‘কথাটা এইভাবে বলা ভাল, প্রত্যেক মানুষ খারাপ, আবার প্রত্যেক মানুষই ভাল। আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনে স্রষ্টা বলেছেন, মানুষকে সুন্দরতর বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, আবার তাকে নিচ থেকে নীচত্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব পাশাপাশিই বাস করে।’
‘মেয়েরা তাদের সৌন্দর্য ঢেকে বের হওয়াই কি ঐ পশুত্বের আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়?’
‘কথাটা এইভাবে বলুন, মেয়েরা জনসমক্ষে তাদের সৌন্দর্য ঢেকে রাখা মানুষের পশুত্বকে উস্কে না দেবার উপায়।’
‘আপনি সুন্দর করে কথা বলেন। ঠিক মনোযোগী প্রফেসরের মত। যাক, আপনাদের মেয়েদের সৌন্দর্য ঢেকে বেরুনোর যুক্তি পেলাম। এখন বলুন, আমাদের সম্পর্কে আপনি কি ভাবেন?’
‘আমি বাইরের সংস্কৃতির লোক। ভাববেন তো আপনারা।’
‘ঠিকই বলেছেন। তবে ভাববার এ বিষয়টা কোনদিন কেউ এমনভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়নি। ধন্যবাদ আপনাকে।’
বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘মিঃ আহমদ মুসা, সান ওয়াকার অনেকটা আপনার মতই ভাবে। সে হিটলারের মত মেয়েদেরকে রান্নাঘরে ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষপাতি।’
বলতে গিয়ে ওগলালার মুখ হঠাৎ মলিন হয়ে গেল।
থামল সে আবার। থেমেই আবার অনেকটা স্বগোতোক্তির মত বলল, ‘সেই ভাল, অতি সরল সান ওয়াকার কিনা শ্বেতাংগদের ফাঁদে গিয়ে পড়ল।’
বলেই তাড়াতাড়ি দু’হাতে মুখ ঢেকে ছুটে বেরিয়ে গেল ওগলালা।
আহমদ মুসা খুব বিস্মিত হলো না। আগেই সে বুঝতে পেরেছিল ওগলালা ভালোবাসে সান ওয়াকারকে। আর সে মনে করে মেরী রোজ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সান ওয়াকারকে ভালোবাসার ফাঁদে আটকেছে। সে জন্যে ওগলালা ভীষণ ক্রুদ্ধ মেরী রোজ-এর উপর। এ বিষয়টা আজ আরও পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে এবং বুঝল যে, সান ওয়াকারের প্রতি ওগলালার ভালোবাসা সাংঘাতিকভাবে অন্ধ। এই বুঝতে পারা শংকিত করল আহমদ মুসাকে। বেচারা মেরী রোজ ওগলালার হিংসার শিকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ আহমদ মুসা যতটুকু দেখেছে, সান ওয়াকারের প্রতি মেরী রোজ-এর ভালোবাসা নিখাদ। সান ওয়াকারের জন্যে মেরী রোজ-এর চোখে যে উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা সে দেখেছে তাতে কোন কৃত্রিমতা নেই।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই প্রফেসর আরাপাহো যাত্রা করল এ্যাম্বুলেন্স ওয়াগনে করে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার চার্লসন হয়ে ওহাইও নদীর বন্দর শহর হান্টিংটনের উদ্দেশ্যে।
ওয়াগনের পেছন দিকটায় আরামদায়ক শোবার ব্যবস্থা আছে। আহমদ মুসাকে সেখানে শোয়ানো হলো।
বেডের পাশেই এ্যাটেনডেন্টের সিটে বসেছে জিভারো এবং সামনে বসে প্রফেসর আরাপাহো এবং ওগলালা।
গাড়ি চলতে শুরু করলে আহমদ মুসা বলল, ‘অনুমতি দিলে আমি বসতে পারি। একটুও জ্বর নেই। আমি সুস্থ। শুয়ে থাকলে আমি চারদিকের দুর্লভ দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’
‘তাই কি? জিভারো গা’টা দেখতো।’ হেসে বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘সত্যি আব্বা, গায়ে তাপ নেই।’ কপাল পরীক্ষা করে জিভারো বলল।
‘না আব্বা, ওকে উঠতে দিও না। জ্বর ছাড়লেই বুঝি মানুষ সুস্থ হয়ে যায়?’ বলল ওগলালা।
‘ঠিক বলেছ মা। তবে যেহেতু সে এসেছে নতুন, এই বিবেচনায় তাকে বসার সুযোগ দেয়া যায়।’
‘ধন্যবাদ স্যার, ওগলালা ভেটো দেবার আগেই আমি উঠে বসলাম।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘ভেটোকে ভয় করার কিছু নেই। ভেটোর সেই সুদিন আর নেই।’
‘সুদিন আছে। বলুন, ঠান্ডা যুদ্ধের পর ভেটো দেবার মত দেশ নেই।’
প্রফেসর আরাপাহোর মুখে মুগ্ধ হাসি। বলল, ‘বৎস আহমদ মুসা, তোমাকে যতই দেখছি আমি বিস্মিত হচ্ছি। এমন বিপ্লবীর কাঠিন্য, রাশভারি আচরণ, রুচির নিরসতা, বুলেটের মত নির্দয় গতি, প্রভৃতি কিছুই নেই তোমার মধ্যে। এমন কাগজের মত সাদা মন আর শিশুর মত সারল্য নিয়ে তুমি বিপ্লবী কেমন করে? তোমার মত সংবেদনশীল লোকের লেখক-কবির মত শিল্পী হওয়া উচিত।’
‘না আব্বা, উনি সমাজ সংস্কারক বা মিশনারী হলে মানাতো ভাল। মানুষের মন গড়ার মাধ্যমে দেশ গড়তে উনি ভাল পারতেন।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল ওগলালা।
‘তাহলে কথাটা দাঁড়াচ্ছে, আমাদের সন্মানিত আহমদ মুসা ভাই ‘অল ইন ওয়ান’।’ বলল জিভারো।
‘জিভারোর কথায় যে মানুষের ছবি ভেসে ওঠে, তা ‘অল পারফেক্ট’ বা পূর্ণ মানুষের ছবি। এমন অল পারফেক্ট মানুষ শুধু আল্লাহর বার্তাবাহী নবি-রাসুল বা প্রফেটরাই হতে পারেন। যেমন জগতের শেষ প্রফেট মুহাম্মদ (সঃ)। তাঁরা মডেল। তাদের অনুসরণে মানুষ পারফেক্ট হবার চেষ্টা করবে। কিন্তু ঐ পর্যায়ে পৌঁছা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং ‘অল ইন ওয়ান’ আর কেও হতে পারেনা।’ বলল আহমদ মুসা গভীর কণ্ঠে।
‘সব প্রফেটই কি সম্পূর্ণ মানুষ?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু তোমাদের প্রফেট যুদ্ধ করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, যিশু তা করেননি।’ প্রফেসর আরাপাহো বলল।
‘যিশু পূর্ণ মানুষ তার সময়ের জন্যে। আর একটি কথা, সব প্রফেট কে সমান দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোও হয়নি। যেমন যিশু এশেছেন বনি ইসরাইলের জন্যে, কিন্তু শেষ প্রফেট এসেছেন বিশ্বের সব মানুষের জন্যে এবং সর্বকালের জন্যে।’
‘ও নাইস, নাইস! আমরা যিশুর ধর্ম গ্রহণ করিনি। ঠিক করেছি। সারা পৃথিবীর জন্যে যিনি, সর্বকালের জন্যে যিনি, তার ধর্মই মানুষের সত্যিকারের ধর্ম।’ আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠল ওগলালা।
‘ঠিক বলেছ ওগলালা। তবে এটা নিয়ে এসো আরও ভাবি। আহমদ মুসার কাছে আরও জানা যাবে।’
বলে একটু থেমেই প্রফেসর আরাপাহো আবার বলল, ‘ওগলালার কথাই ঠিক, তুমি প্রকৃতই মানুষ গড়া ও সমাজ গড়ার লোক। কিন্তু তোমার হাতে আবার বন্দুক কেন?’
‘কারন আমার প্রফেট যুদ্ধ করেছেন, দেশ শাসন করেছেন। স্রষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের জন্যে। আজ অন্যায়ের প্রতিরোধ কি বন্দুক ছাড়া সম্ভব?’
‘বুঝেছি, তমাদের মিশন শুধু উপদেশ দেয়ার নয়, আদেশ দেয়ারও। সত্যিই এই বৈশিষ্ট্য অনন্য।
প্রফেসর আরাপাহোর কণ্ঠ থামতেই ড্রাইভারের কণ্ঠ ভেসে এল, স্যার আমরা পশ্চিম ভার্জিনিয়া স্টেটে প্রবেশ করছি।’
সবাই তাকাল সামনে।
কথায় কথায় তারা অনেকটা পথ চলে এসেছে।
‘আহা, আমি অনেক দৃশ্য মিস করেছি।’ বলে আহমদ মুসা দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো বাইরে।

ওহাইও নদীর জল কেটে এগিয়ে চলেছে সুন্দর বিলাসবহুল মোটর বোট টি।
প্রফেসর আরাপাহোর ভাড়া করা এ বোট টি আগেরটার চেয়ে বড় এবং সুন্দরও। এবার আরও বেশিক্ষণ বোটে থাকতে হবে। ওহাইও নদীর ৯০০ কিলোমিটার এবং মিসিসিপি’র ৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে কাহোকিয়াতে পৌঁছার জন্যে।
ওহাইও, মিসিসিপি আহমদ মুসার স্বপ্নের নদীগুলোর অন্যতম।
সেই স্বপ্নের নদীর নীল জলে ভেসে ভেসে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসা।
ওহাইওকে সীমান্ত নদী বলা যায়। সব সময় এর গতি দুই স্টেটের সীমান্ত দিয়ে। হান্টিংটন পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে পশ্চিম ভার্জিনিয়া ও ওহাইও স্টেটের সীমান্ত দিয়ে। হান্টিংটনের পর ২০০ কিলোমিটার চলল ওহাইও এবং কেনটাকি স্টেটের সীমান্ত রেখা ধরে। এখন এগিয়ে চলছে কেনটাকি এবং ইন্ডিয়ানা স্টেটের সীমান্ত বরাবর।
আহমদ মুসা বোটের দু’তলার ডেকে ইজি চেয়ারে বসে উপভোগ করছে চারদিকের দৃশ্য। তার বামদিকে কেনটাকি স্টেট আর ডান দিকে নদীর ওপারে ইন্ডিয়ানা স্টেট।
ওগলালা এসে প্রবেশ করলো ডেকে। পাশেই এক চেয়ারে বসল। তার পোশাকে বেশ পরিবর্তন এসেছে। মিনিস্কার্ট ও টাইট প্যান্টের বদলে সে এখন পরেছে লম্বা স্কার্ট, গাউন ধরনের ঢিলা জামা হাতাওয়ালা। এখন এসেছে মাথায় রুমাল জড়িয়ে।
চেয়ারে বসে সে বলল, ‘দেখুন তো আমাকে কেমন লাগছে?’
আহমদ মুসা ওগলালার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, ‘আমি বলব না,তুমিই বল তোমার কেমন মনে হচ্ছে?’
হাসল ওগলালা। বলল, ‘খুবই ফরমাল মনে হচ্ছে। এভাবে কি সর্বক্ষণ কেউ থাকতে পারে? না চলাফেরা সম্ভব এভাবে?’
‘তার মানে ভাল লাগছে না।’
‘ঠিক তা নয়। আমাকে নতুন মনে হচ্ছে। আর যেহেতু ভাল লাগাটা রিলেটিভ। এজন্যে কাউকে এটা ভালও লাগতে পারে, মন্দও লাগতে পারে।’
‘কিন্তু তোমার তো নিজস্ব ভাল লাগা মন্দ লাগা আছে।’
‘হঠাৎ নিজেকে যেন দায়িত্বশীল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, অন্যদের সাথে ধুম-ধারাক্কা, হৈচৈ, লাফালাফি যেন আমার জন্যে নয়। হাসি পাচ্ছে এটা ভাবতে।’
এ সময় ডেকে প্রবেশ করলো জিভারো। বলল ওগলালার দিকে তাকিয়ে, ‘বাহ!তোকে তো সুন্দর মানিয়েছে।’
‘তুমি বিদ্রূপ করছ নাতো ভাইয়া?’ বলল ওগলালা।
‘না সত্যি বলছি, তোকে অনেক ‘এলিট’ মানে অনেক মর্যাদা সম্পন্ন মনে হচ্ছে।’
‘ঠিক বলেছ জিভারো, শালিন পোশাকে মেয়েদের মর্যাদা সম্পন্ন করে তোলে। মানুষ তাদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে নয়, মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে।’
‘কিন্তু মেয়েদেরকেই শুধু শালিন ও সংযত হতে হবে কেন ? আপনাদের ধর্মে মেয়েদের জন্যে অবাধ মেলামেশাকে আপত্তিকর বলা হয়েছে কেন ?’ বলল ওগলালা আহমদ মুসার দিকে ফিরে বসে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘অবাধ মেলামেশা শুধু মেয়েদের জন্যে নয়, ছেলেদের জন্যেও আপত্তিকর বলা হয়েছে। তবে মেয়েদেরকে বেশী শালিন, সংযত ও চলাফেরায় সাবধান হতে বলা হয়েছে এজন্যে যে, একদিকে মেয়েরা আত্মরক্ষায় দুর্বল, আর অন্য দিকে ছেলেরা সবল ও মেয়েদের ব্যাপারে আক্রমণাত্মক। কোন অঘটন ঘটলে, তাতে ক্ষতিও হয় মেয়েদের বেশী।’
‘বুঝেছি ভাইয়া আপনি যা বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু মেয়েদের শালিন, সংযত ও সাবধান হওয়াই কি পুরুষের এই যুলুম ও অবিচারের প্রতিকার ? কেন…।’
আহমদ মুসা ওগলালা কে বাধা দিয়ে হেসে বলল, ‘বুঝেছি তোমার কথা। এটুকুকেই প্রতিকার বলা হয়নি। যে পুরুষের দ্বারা এ ধরনের অঘটন ঘটবে, তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ধর্ষণকারী যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে প্রকাশ্যে ও জনসমক্ষে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া হয়েছে। আর যদি সে বিবাহিত হয়, তাহলে প্রকাশ্যে ও জনসমক্ষে তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান দেয়া হয়েছে। এ ধরনের শাস্তির ব্যাবস্থা করা হলে ধর্ষণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।’
‘কিন্তু ভাইয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণকে ধর্ষণ হিসেবে প্রমাণ কারা যায় না।’ বলল জিভারো।
‘এ কারনেই দাম্পত্য জীবনের বাইরে সব ধরনের অবৈধ অঘটনকে আমাদের ধর্ম ব্যাভিচার বা অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে হোক অসম্মতিতে হোক এই অপরাধের একই ধরনের শাস্তির বিধান করা হয়েছে।’
‘সাংঘাতিক ! আমাদের সমাজে এটা অকল্পনীয়।’ জিভারো বলল।
‘সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর প্রয়োজন আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি ভাবছি ভাইয়া। আমি সমর্থন করছি আপনাকে, আপনাদের আইনকে। ধন্যবাদ নতুন এক শিক্ষার জন্যে।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল জিভারো, কিন্তু হঠাৎ নারী ও পুরুষ কণ্ঠের সম্মিলিত চিৎকারে তার কণ্ঠ থেমে গেল। তিনজনই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
কেবিন থেকে বেরিয়ে এল প্রফেসর আরাপাহো।
চার জনই গিয়ে দাঁড়াল যেদিক থেকে চিৎকার আসছে সেদিকে রেলিং-এর ধারে। দেখল তারা, একটা মোটর বোটে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে পৌঢ় নারী-পুরুষ। স্বামী-স্ত্রী হবে। বোটের একটু দূরে একটি বালক হাবুডুবু খাচ্ছে পানিতে।
নদীর এই জায়গাটা জনবিরল এবং মোহনা ধরনের। সামনেই একটা শাখা নদী বেরিয়ে গেছে ওহাইও কেনটাকির দিকে। সে কারনেই সম্ভবত নদিতে স্রোত এখানে বেশ জোরালো।
ঐ স্বামী- স্ত্রীর চিৎকারে ডুবন্ত বালকটির দিকে তাকিয়ে এসেট ওসেট দুই বোটের সবাই শোরগোল করে উঠছে।
আহমদ মুসা ডুবন্ত বালকটিকে দেখার সাথে সাথেই গা থেকে কোট ও পা থেকে জুতা খুলে ছুড়ে ফেলে রেলিং-এ উঠে দাঁড়াল।
জিভারো ও ওগলালা দু’জনেই এটা দেখে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি এভাবে নামবেন না । এখানে ওহাইও’র স্রোত খুব খারাপ, তার উপর আপনি অসুস্থ। আর এত উঁচু থেকে লাফ দিতে পারেন না।’
কিন্তু তাদের কথা আহমদ মুসা যেন শুনতেই পেল না। দু’হাত সামনে বাড়িয়ে মাথা নিচু করে লাফ দিয়েছে সে। বাজপাখির মত নেমে গেল নদীর পানি লক্ষ্যে। পানিতে পরল না, পানিতে ঢুকে গেল তীরের মত নিঃশব্দে।
দুইটি বোট থেকে দজন খানেক চোখের দৃষ্টি তার দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু পানিতে সেই যে ঢুকে গেল, উঠল না সে। সব চোখ আশা করছে সে সাঁতরে দ্রুত এগিয়ে যাবে ছেলেটির কাছে। ছেলেটি যে ডুবে যাচ্ছে। সত্যিই ডুবে গেল। দেখা যাচ্ছে না ছেলেটিকে আর।
ডুকরে কেঁদে উঠল পৌঢ় নারী-পুরুষ। হায় হায় করে উঠল দুই বোটের মানুষ।
কোথায় আহমদ মুসা?
সেও কি ডুবে গেল নাকি! আর্তনাদ করে উঠল ওগলালা।
ঠিক এ সময়েই ছেলেটি যেখানে ডুবে গিয়েছিল, সেখান থেকে আট-দশ গজ দূরে ছেলেটিকে এক হাত উপরে তুলে ধরে ভেসে উঠল আহমদ মুসা।
দুই বোটের সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। পৌঢ় দুই নারী-পুরুষ দু’হাত উপরে তুলে ঈশ্বরকে ডাকতে লাগল।
আহমদ মুসা বালকটিকে এক হাতে ঐভাবে উঁচু করে ধরে সাঁতরে এগুলো বোটের দিকে স্রতের প্রতিকুলেই। বোটও এগুতে লাগল আহমদ মুসার দিকে।
বোট থেকে দড়ির মই নামিয়ে দেয়া হলো।
আহমদ মুসা ছেলেটিকে নিয়ে দড়ির মইয়ে দাঁড়ালে ওরা তাদের বোটে তুলে নিল।
ছেলেটির পেট পানিতে ভর্তি। কিন্তু সম্পূর্ণ সংজ্ঞা হারায়নি সে তখনও।
আহমদ মুসা ছেলেটিকে নিয়ে ডেকে এসে নামতেই প্রৌঢ়া মহিলাটি হুমড়ি খেয়ে পড়ল বালকটির উপর। প্রৌঢ় লোকটি মহিলাটিকে টেনে তুলে বলল, ‘আগে ছেলেটিকে বাঁচতে দাও।’
‘ধন্যবাদ।’ প্রৌঢ়টির উদ্দেশ্যে কথাটি বলে আহমদ মুসা বালকটির পেট থেকে পানি বের করার প্রক্রিয়া শুরু করল।
ততক্ষণে প্রফেসস আরাপাহো তার বোট এ বোটের গায়ে ভিড়িয়ে ওগলালা ও জিভারোকে নিয়ে নেমে এসেছে এ বোটে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেলেটির পেটের পানি বের হয়ে গেল এবং ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠল।
প্রৌঢ় লোকটি ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে তুলে দিল প্রৌঢ়া মহিলাটির কোলে। মহিলাটি তাকে বুকে জড়িয়ে আরেক দফা কেঁদে উঠল।
প্রৌঢ় লোকটি আহমদ মুসার দু’হাত জড়িয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ বাবা। ঈশ্বর তোমার ভাল করবেন।’
বলেই প্রৌঢ় লোকটি ছুটে গেল তার কেবিনে। মিনিট খানেক পরেই বেরিয়ে এল একটি চেক হাতে করে। চেকটি আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘একমাত্র নাতির নবজীবন লাভে আনন্দিত তার দাদুর পক্ষ থেকে এক লাখ ডলার উপহার দিলাম বাবা।’
আহমদ মুসা চেক হাতে নিল। তারপর বালকটির গালে তকা দিয়ে আদর করে প্রৌঢ়টিকে বলল, ‘এ আপনার নাতি। সেই সাথে এ ঈশ্বরের সুন্দরতম সৃষ্টি মানুষের একজন এবং এই হিসেবে এ আমারও ভাই। এ ছোট ভাইয়ের জন্যে আমার এ ছোট্ট উপহার গ্রহণ করুন।’
বলে আহমদ মুসা চেকটি প্রৌঢ়ের হাতে তুলে দিল।
প্রৌঢ়টি বিস্মিত চোখে কম্পিত হাতে চেকটি গ্রহণ করলো। বলল, কে তুমি বাবা এত সুন্দর কথা বল? তুমি চার্চের ফাদার হলে আমি বিস্মিত হতাম না। কিন্তু তোমদের মত নব্য যুবকের জন্যে এটা বিস্ময়। যাই হোক, যে ভাবেই হোক তুমি আমার উপহার প্রত্যাহার করলে বাবা।’
‘তাহলে কি আপনি চান পরোপকার, মানব সেবা, কারও বিপদে এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি লাভজনক ব্যাবসায় পরিনত হোক ?’
প্রৌঢ় কথা বলল না। স্তম্ভিত চোখ তার আহমদ মুসার উপর নিবিদ্ধ। এক সময় সে আহমদ মুসার দু’হাত চেপে ধরে বলল, ‘এস বাবা, তোমার সাথে একটু কথা বলি। এক দুর্লভ যুবক তুমি।’
এগিয়ে এল ওগলালা। বলল প্রৌঢ়কে, ‘মাফ করবেন আংকল, ওর কাপড় পাল্টানো দরকার। ঠাণ্ডায় ওর ক্ষতি হবে।
আহমদ মুসা প্রৌঢ়ের সাথে ওগলালা, জিভারো এবং প্রফেসর আরাপাহোর পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি ওঁদের অতিথি। আমি চলি জনাব।’
প্রৌঢ় আহমদ মুসার হাত ছেড়ে দিয়ে ওঁদের সাথে সম্ভাষণ বিনিময় করল। তারপর আহমদ মুসার দিকে ফিরে বলল, ‘ঠিক, তাড়াতাড়ি তোমার কাপড় পাল্টানো দরকার।’
বলে পকেট থেকে নিজের পরিচিতি কার্ড বের করে আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলল, ‘তুমি কি আমেরিকান?’
আহমদ মুসা কার্ড হাতে নিয়ে বলল, ‘না, আমি আমেরিকান নই।’
‘আমার পরিচয় তোমার কাছে থাকল। সময় করে যদি দেখা করো, তাহলে আমি এবং আমার ছেলে খুব খুশী হবো। তাছাড়া তোমার কোন প্রয়োজনে যদি আমি লাগতে পাড়ি, তাহলে নিজেকে সউভাগ্যবান মনে করব।’ বলল প্রৌঢ় কৃতজ্ঞতা ভরা কণ্ঠে।
প্রৌঢ় প্রফেসর আরাপাহোর দিকেও ফিরল। বলল, ‘প্রফেসর নামে আপনাকে চিনি। খুশী হলাম দেখা হওয়ায়। আপনারাও আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন।’
আহমদ মুসা ওগলালাদের বোটে পার হয়ে প্রৌঢ়ের পরিচিতি কারদের দিকে নজর দিল। ভাল করে নজর পড়তেই চমকে উঠল। নাম জর্জ আব্রাহাম জনসন। পরিচয় ডাইরেক্টর ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।
আহমদ মুসারা পাশাপাশি হেঁটে কেবিনে চলে এসেছিল।
‘কার্ডে কি পড়লেন ভাইয়া ? লোকটি কে?’ জিজ্ঞেস করলো ওগলালা।
‘লোকটি এক অর্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পাওয়ারফুল ব্যাক্তি। এফবিআই-এর ডাইরেক্টর জর্জ আব্রাহাম জনসন।’ বলে আহমদ মুসা কার্ডটি তুলে দিল ওগলালার হাতে।
নাম শুনার সাথে সাথে তারা তিনজনই দাঁড়িয়ে পড়েছে। প্রফেসর আরাপাহো ওগলালার হাত থেকে কার্ডটি নিল। কার্ডটির দিকে একবার নজর বুলিয়ে বলল, ‘ঠিকই বলেছ আহমদ মুসা তার শক্তি সম্পর্কে। আগে জানলে আরও আলাপ করা যেত।’
‘আব্বা ওঁকে আর না আটকানো উচিত। ওর কাপড় পাল্টানো দরকার।’
বলেই ওগলালা আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি গরম সাওয়ার নেবেন। উপকার হবে।’
‘ধন্যবাদ ওগলালা। মেয়েদের সংসার জ্ঞান সত্যি মজ্জাগত। এই বয়সে এত বিষয় জান কি করে ? সান ওয়াকার সত্যিই বলে ‘go back to kitchen.’
‘আমি এর প্রতিবাদ করছি। আপনার ধর্ম ইসলামও এ কথা বলেনা। কিন্তু পরে কথা হবে, আপনি যান।’
আহমদ মুসা মিনিট দশেকের মধ্যেই ফিরে এল।
একটা ডেকে টেবিল ঘিরে ওরা তিনজন বসে। চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে বসে ওরা।
আহমদ মুসাও বসল।
সঙ্গে সঙ্গেই ওগলালা এক কাপ গরম চা আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘চা দিলাম বলে আমি ‘রান্নাঘর’-এর উপযুক্ত বলে বসবেন না যেন।’
‘কেন বলব ? তুমিই তো বলেছ আমাদের ধর্ম ইসলাম এটা সমর্থন করে না।’
‘কি বলে সেই কথাও সবাইকে বলুন।’ বলল ওগলালা
‘বলে মেয়েরা উপযুক্ত পরিবেশ তাদের মন-মানসিকতা ও সামর্থের সাথে সঙ্গতিশীল সব কাজই করতে পারবে।’
‘ধন্যবাদ। আরও ধন্যবাদ এ জন্যে যে, আপনি এক লাখ টাকার উপহার ফেরত দিয়েছেন মিঃ জর্জ আব্রাহাম জনসনকে। আমার মন আকুলি-বিকুলি করছিল আপনার পরিচয় তাকে দেবার জন্যে। তাহলে সে বুঝতো, আহমদ মুসার মানবিকতা ও মহত্ত্ব কতবড় এবং কিভাবে সে হৃদয়ের ঐশ্বর্য দিয়ে প্রাচুর্যকে পদাঘাত করতে পারে।’
ওগলালা একটু থেমেছিল।
সেই সুযোগে কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল জিভারো।
কিন্তু ওগলালা ‘আমার আসল কথাই বলা হয়নি ভাইয়া’ বলে থামিয়ে দিল জিভারো কে। তারপর আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, আপনার প্রাপ্ত ধন্যবাদ দিয়েছি। এখন প্রাপ্ত নিন্দার কথা বলি, আপনার ঐভাবে নদীতে লাফিয়ে পড়া ঠিক হয়নি। এক অঘটনের প্রতিকার করতে গিয়ে আরেক অঘটন ঘটতে পারতো।
‘কিন্তু ওগলালা কোন অঘটন ঘটেনি। অন্যদিকে একটা জীবন বেঁচেছে। এজন্যে ওঁকে ধন্যবাদ দেয়া প্রয়োজন।’ বলল জিভারো।
‘ঘটেনি কিন্তু ঘটতে পারতো। এ থেকে ভবিষ্যৎ এর জন্যে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন।’ বলল ওগলালা।
জিভারো কিছু বলতে যাচ্ছিল।
প্রফেসর আরাপাহো তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘তোমার কথাও ঠিক, ওগলালার কথাও ঠিক। কিন্তু এই দুই কথার কোনটাই আহমদ মুসার জন্যে প্রয়োজন নেই। আহমদ মুসাকে আমরা নামে চিনেছি। কার্যক্ষেত্রে একঝলক দেখার সৌভাগ্য হলো। তবে ঈশ্বর কে বলি, তাকে কার্যক্ষেত্রে এমন ভাবে দেখার যেন প্রয়োজন না হয়।’
‘ঠিকই বলেছেন আব্বা। তবে কিছু কাজ না দেখালে দুর্লভ সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হবো।’ বলল ওগলালা।
‘কিন্তু এই যে তুমি তাকে নসিহত করলে ঐভাবে ঝুঁকি না নিতে।’
ওগলালা সলাজ হাসল। বলল, ‘সব কাজ, সব ঘটনাই তো আর পর্বতপ্রমাণ উঁচু থেকে নদীর ঘূর্ণিপাকে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়।’
হেসে উঠল প্রফেসর আরাপাহো এবং জিভারো।
হাসি দেখে ভ্রূকুটি করল ওগলালা। লজ্জা ও অপমানের চিহ্ন ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। হাত থেকে চায়ের কাপ টেবিলে রেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল ওগলালা এবং কোন কথা না বলে গট গট করে হেঁটে কেবিনের ভেতরে চলে গেল।
‘ঠিক ছোট্টটিই রয়ে গেছে একেবারে। দৈত্য-দানবের কেচ্ছা শুনবে, কিন্তু কোলের নির্ভয় আশ্রয়ে বসে।’ হাসতে হাসতে বলল প্রফেসর আরাপাহো।
কথা শেষ করেই প্রফেসর আরাপাহো নদীর ডান পাড়ে ইন্ডিয়ানা স্টেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই যে সবুজ সুন্দর রাজ্যটি দেখছ, আমেরিকার অন্যান্য স্থানের মত এখানেও রেড ইন্ডিয়ানদের রক্তের স্রোত বইয়েছে। ১৭৭৯ সালে পরাজিত ব্রিটিশ বাহিনী এই অঞ্চল মার্কিন বাহিনীর হাতে ছেরে দেয়। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানরা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে দিতে চায়নি। মার্কিন বাহিনী দু’বার পরাজিত হয় রেড ইন্ডিয়ানদের হাতে। আঠার বছরের অব্যাহত লড়াইয়ের পর মার্কিন বাহিনী এখানকার বাসিন্দা রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতিরোধ নির্মূল করে শক্তির জোরে। আজ তুমি এই ইন্ডিয়ানা স্টেটে কোন ইন্ডিয়ান খুঁজে পাবেনা।’
প্রফেসর আরাপাহোর শেষ কথাটা আবেগে ভারি হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা সমবেদনার সুরে নরম কণ্ঠে বলল, ‘এই রক্তলেখা কাহিনী পৃথিবীর বহুদেশে আছে। কিন্তু আপনাদের কাহিনীর চেয়ে মর্মন্তুদ আর কোনটাই নয়।’
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা বলল আবার, ‘আপনারা বাড়তি যে ৭১৫ টি রিজার্ভ এলাকা দাবী করেছেন, তার মধ্যে এই ইন্ডিয়ানা স্টেটের কোন এলাকা আছে?’
‘আছে। ওয়াবাল নদী উপত্যকা এবং মিশিগান হ্রদ সংলগ্ন ‘সাউথ বেন্ড’ এলাকা।’
‘কিন্তু আপনারা রিজার্ভ এলাকা দাবী করার মাধ্যমে কি নিজেদের ‘জাতি’ হওয়ার বদলে ‘উপজাতি’তে পরিণত করেছেন নাকি ?’
‘তুমি ঠিক বলেছ। তার অর্থ এটাই বুঝায়। কিন্তু এটা আমাদের একটা কৌশল। আমাদের যোগ্য করে তৈরি করার কৌশল। এর পরের পদক্ষেপ হবে জাতীয় জীবনের সর্বত্র আমাদের ন্যায্য অংশ আদায় করা।’
‘কিন্তু শ্বেতাঙ্গ বা ইউরোপিয়ানদের বৈরী নীতি অনুসরনে তা করা ঠিক হবে না।’
‘সেটা এখন আমাদের নীতিও নয়। ভাই হওয়ার সমানাধিকার নিয়েই আমরা আমাদের অংশ চাইব। এবং আমরা জানি মুষ্টিমেয় বর্ণবাদী ছাড়া অধিকাংশ আমেরিকান এবং মার্কিন সংবিধানের সমর্থন আমরা পাব।’
প্রফেসর আরাপাহো কথা শেষ করতেই কেবিনের দরজায় ওগলালা এসে আদালতের ঘোষকের মত হাঁক ছাড়ল, ‘খাদ্য খাবার টেবিলে প্রস্তুত। সকলকে খাদ্য গ্রহনের জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।’
প্রফেসর আরাপাহো উঠল। তার সাথে আহমদ মুসা এবং জিভারো।
তখন বোট চলছে ইলিনয় স্টেট ও কেনটাকির সীমান্ত দিয়ে। ক’মিনিট আগে ওয়াবাশ নদীর সংযোগ স্থল পেরিয়ে এসেছে। এখানে ওহাইওতে মিশিগান হ্রদের পানি সমৃদ্ধ ওয়াবাশ নদীর পানি যুক্ত হওয়ায় নদীর গতি অপেক্ষাকৃত বেগবান।
এখান থেকে মিসিসিপির সংযোগ স্থল পর্যন্ত প্রায় দু’শ কিলোমিটার এলাকা ইলিনয় স্টেটের জনবিরল প্রেইরীর অংশ। দু’ধারেই বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। নদীর দু’ধারে ঝোপঝাড়, গাছ-পালা অবশ্যই আছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য শহর বা জনপদ এই দু’শ কিলমিতারের মধ্যে নেই, একমাত্র পাদুকান শহর ছাড়া। পাদুকান শহর ওহাইও এবং কেনটাকি নদীর সংযোগ স্থলে অবস্থিত।
কেনটাকি নদীর ২৫ কিলোমিটার আগে বার্কলে নদী।কেনটাকির মতই এ নদী ওহাইও থেকে বেরিয়ে কেনটাকির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিকে টিনেমির দিকে এগিয়ে গেছে।
বোট তখন বার্কলে’র উৎসের মুখে প্রায় পৌঁছে গেছে।
বোটের দু’তলার ডেকে বসে গল্প করছে ওরা চারজন, প্রফেসর আরাপাহো, আহমদ মুসা, জিভারো এবং ওগলালা।
হঠাৎ বাম দিকের তীর থেকে একটি জোরালো ও ভারি কণ্ঠ ভেসে এল, ‘বোট ভিড়াও এদিকে।’
চমকে উঠল আহমদ মুসারা। ভয় ফুটে উঠল প্রফেসর আরাপাহোর চোখে-মুখে।
‘পুলিশ নাকি?’ বলল ওগলালা।
‘না, পুলিশ অবশ্যই নয়। নৌ-পুলিশ হলে তাদের বোট থাকতো। আমার মনে হচ্ছে, এরা অন্য কেউ। এখান থেকে মিসিসিপি পর্যন্ত এই এলাকাটা ভাল না।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা ভাবছিল। তার দৃষ্টি তীরের দিকে। তীরে ওরা দশ বারোজন লোক। সবাই বসে। যে কথা বলছে সে দাঁড়িয়ে। তার হাতে আধুনিক রাইফেল।
ওদিক থেকে আর কোন কথা এলোনা। এল বন্দুকের শব্দ। তীরের সেই লোকটির হাতের বন্দুক মোটর বোটের দিকে তাক করা।
বন্দুকের গুলী হবার মুহূর্তেই একটি গুলী এসে বিদ্ধ করল বোটের ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডকে।
চখের পলকে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডটি কোথায় উড়ে গেল!
গুলীর প্রায় সাথে সাথে তীরের সেই কণ্ঠটি আবার ধ্বনিত হলো, ‘দু’বার আমি নির্দেশ করিনা। বোট না ভেড়ালে বোমা মেরে উড়িয়ে দেব।’
প্রায় মরার মত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে জিভারো এবং ওগলালার মুখ। ভয় ও উদ্বেগে মুষড়ে পড়েছে প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা তাদের দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। ডেকের সামনের দিকটায় এগিয়ে বলল, ‘বোট ভিড়ানো হচ্ছে।’
বলে আহমদ মুসা রেলিং পাশে নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ক্রুদের বলল, ‘বোট তীরে ভেড়াও।’
আহমদ মুসা ফিরে এল প্রফেসর আরাপাহোদের কাছে।
প্রফেসর আরাপাহো ভীত ও শুষ্ক কণ্ঠে বলল, ‘বোট ভেড়ানো কি ভাল হলো। শুনেছি ওরা নিষ্ঠুর ও জঘন্য প্রকৃতির লোক। এই এলাকায় আগেও নৌ-ডাকাতি ও হাইজ্যাকের ঘটনা ঘটেছে।’
‘উপায় কি। মিথ্যা হুমকি ওরা দেয়নি। সত্যিই ওরা বোট উড়িয়ে দিতে পারতো।’ একান্ত স্বাভাবিক ও উদ্বেগহীন কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘আমার ভয় করছে। বোট ওরা তীরে ভেড়াতে বলছে কেন? ওরা কি করতে চায় আমাদের?’ বলল ওগলালা।
‘যা ঘটার তাই ঘটবে। ভয় করে লাভ কি? ইশ্বরের উপর ভরসা কর।’ বলল আহমদ মুসা।
বোট ভিড়েছে।
তীরের লোকদের নির্দেশে সংযোগ সিঁড়িও নামিয়ে দেয়া হয়েছে তীরে।
সিঁড়ি লাগার সঙ্গে সঙ্গে ওরা সিঁড়ি বেয়ে ঝড়ের বেগে উঠে এল বোটে।
সাতজন ওরা।
সাতজনের মধ্যে সবার আগে যে বোটে উঠল তার হাতে স্টেনগান এবং কোমরে ঝুলানো রিভলবার। আর অন্যদের হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। সবাই শ্বেতাঙ্গ।
বোটে উঠে প্রফেসর আরাপাহোদের দিকে নজর পড়তেই সবাই হৈহৈ করে উঠল, ‘ব্যাটা ইন্ডিয়ান! তোদেরই মুখ দেখতে হলো।’
আর আহমদ মুসার দিকে নজর পড়তেই স্টেনগানধারী বলে উঠল, ‘আর তুই কে হে। তকে তো এশিয়ান কালা আদমী মনে হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। আমি এশিয়ান। এখন বল, তোমরা বোট ভিড়াতে বললে কেন ?’
লোকটি হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘তোদের আদর-সোহাগ করার জন্যে বোট ভেড়াতে বলেছি’। বলে আবার একবার হাসল কুৎসিত কণ্ঠে।
ওরা বোটে উঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রফেসর আরাপাহো, জিভারো ও ওগলালা উঠে দাঁড়িয়েছিল।
ওগলালা ছুটে এসে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসার পেছনে। তার ভীত মুখ রক্তহীন পাণ্ডুর।
হাসি থামিয়ে স্টেনগানধারী লোকটি আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তর পেছনে ওটা কে? খাসা সুন্দরী তো! আহ! মেঘ না চাইতেই জল!’
‘দেখ এঁরা সম্মানি লোক।’ তারপর প্রফেসর আরাপাহোর দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘উনি একজন সম্মানিত প্রফেসর। এরা দুজন ওঁর ছেলেমেয়ে। এঁরা পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে।’
লোকটি আবার সেই হেঁড়ে স্বরে হো হো করে হেসে উঠল। বলল, গরুর রাখাল যাযাবর ব্যাটারা আবার কবে সম্মানি হল?’
কথা শেষ করেই সাথীদের দু’জনকে নিরদেশ দিল, ‘তোমরা নিচে যাও। বোটের ক্রুদের ঠিক করো।’ অন্যদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এদের সার্চ করো। টাকা-পয়সা, অস্ত্রপাতি কিছু আছে কিনা দেখ। সুন্দরীকে সার্চ করার দরকার নেই, ওকে সার্চের কাজটা আমিই পড়ে করব।’
সার্চ হয়ে গেলে লোকটি প্রফেসর কে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা বোট থেকে নেমে যাও’।
প্রফেসর আরাপাহো তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা বলল, ‘মিঃ প্রফেসর এদের সাথে ঝগড়া করে লাভ নেই। চলুন আমরা নেমে যাই’।
প্রফেসর আরাপাহোর মুখ মলিন হয়ে উঠল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল যাওয়ার জন্যে। বোটের সিরির দিকে পা বাড়াবার আগে আহমদ মুসা বলল, ‘চল ওগলালা’।
আহমদ মুসার কথা শোনার পড় প্রফেসর আরাপাহো এবং জিভারো হাঁটা শুরু করেছে বোট থেকে নামার জন্যে।
আহমদ মুসা ওগলালাকে ডেকেছে বটে বোট থেকে নামার জন্যে, কিন্তু নিজে এক পা বাড়ায়নি চলার জন্যে।
এদিকে ওগলালা বোট থেকে নামার জন্যে চলা শুরু করার সাথে সাথে স্টেনগানধারী সরদার গোছের লোকটি বলল, ‘না সুন্দরী যাবে না। সে আমাদের সাথে থাকবে। কাল সকালে সুন্দরী ও বোট দুটোই তোমরা ফেরত পাবে।‘
বলেই সে এগুলো ওগলালাকে ধরার জন্যে।
চিৎকার করে ছুটে যাচ্ছিল ওগলালা তার পিতার দিকে। তার পিতা প্রফেসর আরাপাহো এবং জিভারো লোকটির কথা শোনার সাথে সাথেই থমকে দাঁড়িয়েছে।
ওগলালার পথ রোধ করে দাঁড়াল লোকটি।
ওগলালা বাধা পেয়ে ছুটে এসে আহমদ মুসার আড়ালে দাঁড়াল। তার মুখ মরার মত পাণ্ডু। কাঁপছিল সে আতঙ্কে।
আহমদ মুসা হাসি মুখে ওগলালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয় কি ওগলালা। ওরা তো আমাদের মত মানুষ।’
‘ঠিক বলেছ কালা এশিয়ান। তোমার বুদ্ধি আছে। তবে আমরা তোমাদের মত নয়, অনেক উৎকৃষ্ট মানুষ। সুন্দরীও বুঝবে আমাদের সাথে থাকার পর।’
বলে লোকটি এক পা দু’পা করে এগুতে লাগল ওগলালার দিকে।
লোকটির অবশিষ্ট চারজন সাথী দাঁড়িয়েছিল প্রফেসর আরাপাহো আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানে। আর প্রফেসর আরাপাহো এবং জিভারো দাঁড়িয়ে আছে বোটের আরেকটু সামনের দিকে।
লোকটি একদম কাছে এসে গেছে।
ওগলালা আহমদ মুসার গা ঘেঁষে পেছনে দাঁড়িয়েছিল।
লোকটি তার স্টেনগান ডান হাতে নিয়ে আহমদ মুসার ডান পাশ দিয়ে তার বাম হাত বাড়িয়ে এগুলো ওগলালাকে ধরার জন্যে।
লোকটির লক্ষ্য তখন তার শিকার ওগলালার দিকে।
আল্লাহর দেয়া এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা তার ডান হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় স্টেনগানটা কেড়ে নিয়েই স্টেনগানের বাঁট দিয়ে আঘাত করল লোকটির ঘাড়ে। তারপর স্টেনগান সোজা করে নিয়েই একটু দূরে দাঁড়ানো চারজনকে লক্ষ্য করে স্টেনগানের ট্রিগার টিপল আহমদ মুসা।
ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা চারজন প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা ঐটুকু সময়েরই সুযোগ গ্রহণ করে। চারজন কিছু করার আগেই একই সাথে এক ঝাঁক গুলীর শিকার হয়ে ঝরে পড়ল মাটিতে।
এদিকে ঘাড়ে আঘাত পাওয়া লোকটি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মরিয়া হনে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা ছিটকে পড়ে গেল ডেকের উপর।
লোকটি জাপটে ধরেছে ডেকে পড়ে যাওয়া আহমদ মুসাকে।
কিন্তু আহমদ মুসার হাত দু’টি মুক্ত থেকে গেছে। আহমদ মুসার ডান হাতে তখনও স্টেনগান। কিন্তু গুলী করার জো নেই।
আহমদ মুসা দু’হাতে স্টেনগান ধরে একটু উঁচু করে লম্বাভাবে আবার আঘাত করল লোকটির মাথায়। পর পর কয়েকবার।
আহমদ মুসাকে জাপটে ধরা লোকটির হাত কিছুতা শিথিল হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা নিজের দেহকে প্রবলভাবে ঘুরিয়ে দেহকে গড়িয়ে নিল এবং লোকটিকে ছিটকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক এই সময়েই জিভারো চিৎকার করে উঠল ‘পেছনে গুলী ভাইয়া’।
এ চিৎকার কানে যাবার সাথে সাথেই এক পাশে নিজের দেহকে ছিটকে দিল আহমদ মুসা। তার দেহটি মাটি স্পর্শ করার আগেই দুটি গুলী একই সাথে অতিক্রম করল তাকে। দাঁড়িয়ে থাকলে তার বুক ও মাথা ভেদ করতো গুলী দুটো।
আহমদ মুসা মাটিতে পড়েই তার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পেছন দিকে। দেখতে পেল নিচের ডেক থেকে উঠে আসা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে ওরা দু’জন তারা আবারও বন্দুক তাক করেছে আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে নেবার সাথে সাথে দু’হাতে ধরা তার স্টেনগানকেও সোজা করে নিয়েছিল। লোক দুটি তার চোখে পড়ার সাথে সাথেই স্টেনগানের ট্রিগার টিপল আহমদ মুসা তাদের লক্ষ্য করে।
ওরাও ট্রিগার টিপতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই স্টেনগানের ছুটে যাওয়া অনেক গুলীর গ্রাসে পরিণত হলো তারা।
তাদের দেহ গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে নিচে।
গুলী করেই তাকাল আহমদ মুসা তাকে আক্রমণকারী সেই লোকটির দিকে।
দেখল লোকটি টলতে টলতে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তার হাতে রিভলবার।
তার মাথার পেছন দিক স্টেনগানের বাঁটে ভালই আঘাত পেয়েছে। আহত জায়গা থেকে রক্ত গড়িয়ে তার পেছন পেছন ভিজে যাচ্ছে।
রিভলবার হাতে লোকটিকে যখন আহমদ মুসার চোখে পড়ল। তখন স্টেনগান ঘুরিয়ে গুলী করার সময় ছিল না। মুহূর্তও নষ্ট না করে আহমদ মুসসা স্টেনগান ছুড়ে মারল লোকটির রিভলবার ধরা হাত লক্ষ্যে।
ছিটকে পড়ল রিভলবার লোকটির হাত থেকে।
রিভলবার হাতছাড়া হলে লোকটি স্টেনগান কুড়িয়ে নেবার জন্যে ঝাপিয়ে পড়ল স্টেনগানের উপর।
স্টেনগান ছুড়ে দিয়েই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল। সে ছুটে গেল লোকটির লক্ষ্যে।
লোকটি দু’হাত দিয়ে স্টেনগান আঁকড়ে ধরেছিল।
আহমদ মুসা এক পা দিয়ে স্টেনগান চাপা দিয়ে অন্য পা দিয়ে প্রচণ্ড এক লাথি মারল লোকটির স্টেনগান ধরা হাতে।
লোকটির থেথলে যাওয়া হাত স্টেনগান ছেড়ে দিল।
আহমদ মুসা দু’হাতে লোকটিকে তুলে দাঁড় করিয়েই প্রচণ্ড এক ঘুষি মারল তার মুখের এক পাশে। সে ছিটকে গিয়ে পড়ল। একেবারে পড়ল গিয়ে রিভলবারের উপর। নতুন প্রাণ পাওয়ার মত সে তুলে নিল রিভলবার। রিভলবার ঘুরাল সে আহমদ মুসার দিকে।
কিন্তু দেখল আহমদ মুসার স্টেনগান আগেই তাকে লক্ষ্য করে হাঁ করে উঠেছে।
আহমদ মুসা লোকটিকে ঘুষি মেরেই পায়ের তলা থেকে তুলে নিয়েছিল স্টেনগান।
লোকটিকে রিভলবার কুড়িয়ে ঘুরতে দেখেই আহমদ মুসা স্টেনগানের ট্রিগার টিপল।
লোকটির ঝাঁঝরা দেহ গড়িয়ে পড়ল ডেকের উপর।
চারিদিকে একবার তাকিয়ে স্টেনগান ফেলে দিল আহমদ মুসা হাত থেকে।
জিভারো, প্রফেসর আরাপাহো এবং ওগলালা এতক্ষণ ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে পাথরের মত নিশ্চল মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল স্বপ্নাতীত এক দৃশ্য।
এবার জিভারো ছুটে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে।
প্রফেসর আরাপাহোও এল। সে আহমদ মুসার মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘ঈশ্বর তমাকে দীর্ঘজীবি করুন বৎস।‘
আর ওদিকে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়ানো ওগলালার স্থির চোখ দু’টি থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, কৃতজ্ঞতার অশ্রু, অবিরামভাবে।
আহমদ মুসা সেদিকে এগুবার জন্যে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল। ‘অশ্রু কেন ওগলালা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর।’
ওগলালা ছুটল আহমদ মুসার দিকে। ছুটে এসে উপুড় হয়ে মাথা রাখল আহমদ মুসার পায়ে।
আহমদ মুসা তাকে টেনে তুলল ল বলল, ‘বোস, মানুষ আল্লাহর সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টি। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে তার মাথা নত হবে না, এটা আল্লাহ চান।’
‘হতে পাড়ে ভাইয়া। কিন্তু মাটির মানুষও অনেক সময় ঈশ্বর হয়ে ওঠেন।’ কান্নায় ভেঙে পড়ল তার কথা।
‘আল্লাহ মাফ করুন। যে মানুষকে তুমি ঈশ্বর বলবে, হতে পাড়ে সে আল্লাহর মাত্র একজন অনুগত বান্দাহ।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল জিভারোর দিকে। বলল, ‘জিভারো বোটের ক্রুদের বল, লাশ গুলো নদীতে ফেলে সবগুলো জায়গা ভালও করে ধুয়ে দেবে।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা প্রফেসর আরাপাহোর দিকে চেয়ে বলল, ‘আমার মনে হয় লাশ ও অস্ত্রগুলো পুলিশের জন্যে রেখে ঝামেলা বাড়ানো ঠিক হবে না।’
‘না, তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। পুলিশ আশেপাশে থাকলে দেখা যেত। এখন কোথায় পুলিশ খুঁজে বেড়াব।’
জিভারো আহমদ মুসার নির্দেশ নিয়ে নিচের ডেকে চলে গেল।
আর আহমদ মুসা, প্রফেসর আরাপাহো এবং ওগলালা কেবিনের ভেতরে এসে একটা টেবিল ঘিরে বসল।
ক-মিনিট পর জিভারো এসে প্রবেশ করল। বলল, ‘ওরা কাজে লেগে গেছে। নোঙর তোলা হয়েছে। এখনি বোট চলতে শুরু করবে।’
‘ঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছ। বলতে চেয়েছিলাম এটা। ভুলে গেছি।’
চা এল।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রফেসর আরাপাহো অনেকটা স্বগতোক্তির মত বলল, ‘জীবন রক্ষাকারী এবং জীবন সংহারী দুই আহমদ মুসাকেই আজ দেখলাম।’
‘কোন আহমদ মুসা বড় আব্বা?’ বলল ওগলালা।
তার পিতা প্রফেসর আরাপাহো মুখ খলার আগেই জিভারো বলে উঠল, ‘আব্বা যাকে জীবন সংহারী আহমদ মুসা বলেছেন, সেই আহমদ মুসাই বড়।’
‘তোমার যুক্তি কি বলত।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘খুবই সহজ। প্রথম ঘটনায় একজন বালকের জীবন রক্ষা হয়েছে। তার বেশি কিছু ঐ ঘটনায় নাই। কিন্তু শেষের এই ঘটনায় চলমান পায়ের একটা পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সাতজন লোকের প্রাণ সংহার হয়েছে, কিন্তু এর দ্বারা অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে এবং অনেক পরিবার ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছে। অন্যায় জুলুম সংহারী আহমদ মুসার এই রুপই বড়।’
‘ধন্যবাদ জিভারো। আমিও তাই মনে করি। ভালো কাজ ভালো, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিরোধ এর চেয়ে অনেক বেশি মুল্যবান। ভাল কাজের ভাল ফলের যে পরিধি, তার চেয়ে অন্যায় প্রতিরোধের যে ভাল। তার পরিধি অনেক বেশি ব্যাপক।’
প্রফেসর আরাপাহো থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ জনাব, আপনার কথা আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনেরই প্রতিধ্বনি অনেকটা। আমাদের ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, হত্যা, জুলুমের মত অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি বিধানের মধ্যে মানুষের জীবন নিহিত।’
‘তার মানে শাস্তিটা মানুষের জীবনের মত মুল্যবান। শাস্তি না থাকলে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। তাই কি ?’
‘হ্যাঁ তাই।’
‘তাহলে অনেকে এবং অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ড ও কঠোর শাস্তি তুলে দিচ্ছে বা তুলে দেওয়ার কথা বলছে তার কি হবে?’ বলল জিভারো।
‘এটা এক ধরনের চিন্তা বিকৃতি। এই বিকৃতদের কাছে বিচারের খড়গ ভয়ংকর, কিন্তু অপরাধীদের খড়গ যেন একটা স্বাভাবিক ঘটনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শাস্তি কি মানুষের সুস্থ ও শান্তির জীবন নিশ্চিত করতে পারে?’ জিভারো বলল।
‘আমাদের ধর্মগ্রন্থে এই ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে দু’ধরণের কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক, ভালো কাজের নির্দেশ দিতে হবে এবং মন্দ কাজ, পাপ, অপরাধ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘নির্দেশ ও বিরত রাখার চেষ্টাই কি যথেষ্ট?’ জিভারো বলল।
‘আমাদের ধর্মের বিধান অনুসারে এ দু’টি বাহ্যিক পদক্ষেপের পর্যায়ভুক্ত। আত্মিক ও বিশ্বাসগত কিছু পদক্ষেপ রয়েছে। এই বাহ্যিক ও আত্মিক ব্যবস্থা একত্রে মিলিত হলে তবেই মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা বা অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বিশ্বাসগত যে ব্যবস্থার কথা বললে সেটা কি?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘ঐশীগ্রন্থ আল কোরআনের মাধ্যমে আমরা যে জীবন দর্শন পেয়েছি, সে জীবন দর্শন হলোঃ মানুষের দুনিয়ার জীবন মৃত্যু পরবর্তী চিরন্তন জীবনের প্রস্তুতি পর্ব মাত্র। দুনিয়ার জীবনে ভাল কাজ করলে পরজীবনে চিরন্তন পুরস্কার পাওয়া যাবে এবং খারাপ কাজ করলে চিরন্তন শাস্তির সম্মুখিন হবে। দুনিয়ার জীবনে মানুষ ছোট-বড় যে কাজই করুক তার ভাল অথবা খারাপ যে কোন একটি ফল রয়েছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনে তা ভোগ করতে হবে। যে মানুষ স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে তার দ্বারা শুধু ভাল কাজই হবে এবং মন্দ কাজ থেকে সে বিরত থাকবে। এই বিশ্বাসগত নিয়ন্ত্রণ মানুষকে সকল পাপ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বিশ্বাস মানুষকে এত পরিশুদ্ধ করতে পারে?’ বলল জিভারো।
‘এটা নিছক কোন বিশ্বাস নয়। মানব জীবনের এটা অনিবার্য বাস্তবতা যা তার অস্তিত্বের মতই সত্য। এই বিশ্বাসের শক্তি জগতের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
‘আপনি ভয়ংকর কথা শুনালেন। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের ঐ পরিণতি থেকে তো আমরা কিংবা কোন মানুষ তাহলে মুক্ত নয়?’ বলল ওগলালা চোখ কপালে তুলে। ঘটনার পর প্রথম মুখ খুলল ওগলালা। কথা বললেও তার মুখের গাম্ভীর্য ও বিষণ্নতা কাটেনি।
‘না কোন মানুষই মুক্ত নয়।’
‘কিন্তু আমরা তো এ বিশ্বাসের কথা এভাবে জানি না। তাহলে আমাদের কি হবে?’
‘যারা জানে, জানানোর দায়িত্ব তাদের। আর সত্য সন্ধানী বিবেক সত্যের সন্ধান যে কোন ভাবে পাবেই। যেমন আজ আপনারা আমার কাছ থেকে সন্ধান পেলেন।’
‘হাসল প্রফেসর আরাপাহো। বলল, ‘তুমি একজন দক্ষ এবং খাঁটি মিশনারী। এ পরিচয়ে তুমি দেখছি অনেক বড়। তুমি সবশেষে যে কথাটা বললে তার অর্থ হলো তুমি মানুষের অস্তিত্বের মত সত্য যে পথের সন্ধান দিলে তা আমাদের মেনে নেয়া।’
‘হাসল আহমদ মুসাও। বলল, ‘এটা দোষণীয় নয় নিশ্চয়। নিজের জন্যে যা ভাল মনে করা হয়, তা অপরের জন্যে ভাল মনে করাই প্রকৃত কল্যাণকামীতার লক্ষণ।’
‘ধন্যবাদ বৎস। তোমার সাথে দেখা হওয়ায় ঈশ্বরের শুকরিয়া আদায় করছি। মনে হচ্ছে, তোমার সংস্পর্শে আমরা নতুন মানুষে পরিণত হচ্ছি।’
‘তাও বটে।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘এখন এ পর্যন্তই। চলুন ওরা কতটা কি করল দেখা যাক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না একটু বসুন। আমার একটা কথা। এই কিছুক্ষণ আগের কঠিন বিপদের সময় আপনার মুখ আমি সব সময় নির্ভয় ও উদ্বেগহীন দেখেছি এবং আপনার ঠোঁটে হাসিও দেখেছি। আপনি কি একটুকুও ভয় পাননি?’ বলল ওগলালা।
‘আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, ‘ভাল বা মন্দ করার একমাত্র মালিক আল্লাহ, জীবন ও মৃত্যুর ফায়সালা শুধু আল্লাহই করেন, এই বিশ্বাস থাকলে কোন মানুষকে ভয় করার কোন অবকাশ থাকে না, কোন বিপদেই তখন ভয় আসে না।’
‘কিন্তু আপনি যদি পরাজিত হতেন, ওরা ছিল সাত অস্ত্রধারী।’ বলল জিভারো।
‘ভাবতাম ওরা জয়ী হবার মত তাই আল্লাহ তাদের জয় দিয়েছেন। তবে আমিও জয়ী হবার চেষ্টা করতাম তারপর।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা সাতজন মরেছে, মরেও তো যেতে পারতেন আপনি?’ জিভারোই আবার বলল।
‘হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার চেষ্টা জয়ের জন্যে, কিন্তু মৃত্যুর জন্যেও আমি সব সময় পস্তুত।’
প্রফেসর আরাপাহো, জিভারো এবং ওগলালা স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
‘আহমদ মুসার কথা শেষ হলেও তারা কেউ কথা বললো না, বলতে পারলো না।
কিছুক্ষণ পর ওগলালা প্রশ্ন করল, ‘আপনার দেশ কোথায়? আপনার বাড়ি কোথায়? আপনার কে আছে?’ প্রশ্নগুলোর সাথে সাথে রাজ্যের মমতা ঝরে পড়ল ওগলালার চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘তুমি কঠিন প্রশ্ন করেছ ওগলালা।’
বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘আমি জন্মগ্রহন করেছি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে, যাকে পূর্ব তুর্কিস্তানও বলা হয়। কিন্তু সেটা এখন আমার দেশ নেই। আমাকে অনেক দেশ তাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে। কোনটাকে আমার দেশ বলব? আমি এ নিয়ে কোন সময় ভাবিনি।’
আবার থামল আহমদ মুসা। হাসল আবারও। বলল, ‘কে আছে’ বলতে নিশ্চয় রক্তের সম্পর্কের কাউকে বুঝিয়েছ। তেমন আমার কউ নেই। আমার আব্বা, আম্মা, ছোট ভাই সবাই নিহত হয়েছে সেই জিনজিয়াং-এ। আমি বেঁচে ছিলাম উদ্বাস্তু হয়ে। রক্তের সম্পর্কের বাইরে সবচেয়ে ঘনিষ্টতম হলেন স্ত্রী। আমি ক’মাস আগে বিয়ে করেছি। তিনি আছেন।’ থামল আহমদ মুসা।
সলজ্জ একটা রক্তিমাভা ফুটে উঠেছে ওগলালার মুখে। তার সাথে প্রবল উৎসুক্য। বলল, ‘মাত্র ক’মাস আগে বিয়ে? তিনি কোথায়? দেশ না থাকলে তিনি কোথায় আছেন? তিনি কি আমেরিকা এসেছেন?’
‘আমাদের নবীর দেশ সৌদি আরবের অন্যতম পবিত্র নগরী ‘মদিনা’ শরীফে তাঁকে রেখে এসেছি।’ আহমদ মুসা থামল।
তৎক্ষণাৎ কেউ কথা বলল না।
সবার চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ও বেদনার চিহ্ন।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তিনি কিছু ঘটাননি। কিন্তু আপনার কিছু ঘটলে উনি কি জানতে পারতেন? কি হত তাঁর? কি করতেন তিনি?’ নরম কম্পিত গলায় বলল ওগলালা।
আহমদ মুসার ঠোঁটে এক টুকরো স্বচ্ছ হাসি। বলল, ‘আমি সানসালভাদরে হোয়াইট ঈগলের হাতে ধরা পড়ার আগের দিন তাঁর সাথে কথা বলেছি টেলিফোনে। আবার সুযোগ পেলে বলব।’
‘আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না জনাব।’ ব্যথিত-ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল ওগলালা।
‘উত্তর আমি জানি না ওগলালা। আমার অভিভাবক যিনি, আমার স্ত্রীরও অভিভাবক যিনি সেই আল্লাহর উপর তাঁর ও আমার দু’জনেরই ভরসা।’ গোটা আলোচনায় এই প্রথমবারের মত আহমদ মুসার কণ্ঠ একটু কাঁপল, একটু ভারিও শুনাল।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
বলল, ‘চলুন ওদিকটা দেখা যাক।’
সবাই উঠল।
প্রফেসর আরাপাহো উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘আহমদ মুসা, তোমার শক্তি ও সাহসের উৎস কি তা আজ দেখলাম, যে লোক ঈশ্বরের উপর ভরসা করে জীবন-মৃত্যুর সব প্রশ্ন পেছনে ফেলে উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে অগ্রসর হতে পারে, তার অসাধ্য কিছুই থাকবে না, সে অজেয় হবে, এটাই স্বাভাবিক। তোমাকে অভিবাদন নয় আহমদ মুসা, তোমার বিশ্বাসকে, তোমার মহান নবীকে, যাঁর শিক্ষা তুমি অনুসরণ কর এবং তোমার আল্লাহকে, যাঁর বিধান তুমি পালন কর, আমি অভিবাদন জানাচ্ছি এবং তোমার বিশ্বাসের সাথী হবার অংগিকার করছি।’
বলে আহমদ মুসার দিকে হাত বাড়াল প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা আনন্দে লুফে নিল প্রফেসর আরাপাহোর হাত।
এক হাত আরেক হাতকে বাড়িয়ে ধরল নিবিড়ভাবে। যন্ত্রচালিতের মতো কোন অমোঘ আকর্ষণে ওগলালা এবং জিভারোর হাতও এসে যুক্ত হলো দু’টি হাতের সাথে।
এ যেন চার হাতের মিলন নয়, বিশ্বাসী চার হৃদয়ের এক অপরূপ মিলন।

বোট ধুয়ে-মুছে সাফ করা হয়েছে।
কিছুক্ষণ আগের রক্তাক্ত ঘটনার কোন চিহ্নই বর্তমান নেই।
জিভারো নিচের ডেকে নেমে গেছে কোন কাজে। প্রফেসর আরাপাহো তার কক্ষে বিশ্রাম নিতে গেছে।
আহমদ মুসা তার দু’হাতের কনুই বোটের রেলিং-এ রেখে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে তাকিয়ে আছে সামনে ইন্ডিয়ানার অবারিত সবুজ সৌন্দর্যের দিকে।
ওগলালা আস্তে আস্তে এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়াল। দু’হাতের কনুই রেলিং-এ রেখে আহমদ মুসার মতই সামনে ঝুঁকে পড়ল এবং তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপর মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার বিশ্বাসের সাথী হবার অংগিকার করেছি। কিন্তু আপনি যে কষ্ট দিয়েছেন তা ভুলে যাইনি। আপনি নিষ্ঠুর! নিষ্ঠুর! নিষ্ঠুর!’
আহমদ মুসা কপাল কুঞ্চিত করে ওগলালা দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলাম না। নিষ্ঠুরতার কি দেখলে?’
‘আপনি সবার প্রতি হয়তো সুবিচার করছেন, কিন্তু অবিচার করছেন ভাবীর প্রতি। এটা নিষ্ঠুরতা।’
‘কিন্তু তোমার ভাবীর সাথে তুমি কথা বলনি। তাঁর কাছ থেকে কিছু শোননি।’
‘শোনার কি প্রয়োজন আছে? আমি মেয়ে নই? কোন মেয়েই তার স্বামী কোন বিদেশ-বিভূয়ে অজানার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে তা বরদাশত করতে পারে না।’
‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু তোমার ভাবী শুধু তো নারী নয়, তিনি আমার বিশ্বাস ও কর্মের সাথী। আমার যে কাজ সেটা তারও কাজ এবং সে কারণেই তিনি আমাকে উৎসাহের সাথে বিদায় দিতে পারেন।’
‘এটা যুক্তির কথা। এ যুক্তির বাইরে মনের একটা ভিন্ন অবস্থান আছে।’
‘আছে। কিন্তু তারপরও একজন মেয়ে তার হাতের বিয়ের মেহেদী না মুছতেই স্বামীকে যুদ্ধে পাঠায় এবং স্বামীকে আর ফিরে পায় না-এ দৃষ্টান্তও আছে।’
‘এবং তার শেষহীন ও সীমাহীন বুক ফাটা কান্নার দৃষ্টান্তও আছে। আমি নারী, আমি এ অসহায় নারীর কথাই বলছি।’
‘ঠিক বলেছ। কিন্তু তুমি, আমি এবং তোমার ভাবী সংসারের এ বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করতে পারব?’
‘আমি জানি না। কিন্তু নারীর অশ্রুর মূল্য পুরুষরা দেয় না, এটাই ঠিক।’
বলেই ছুটে পালাল ওগলালা। তার শেষ কথাটা ছিল কান্নায় ভারি।
আহমদ মুসা ডাকল না তাকে।
ওগলালার কান্না ভরা কণ্ঠ আহমদ মুসাকে মনে করিয়ে দিল সান ওয়াকারের কথা। মনে পড়ল মেরী রোজ এর কথাও। বেদনায় ভরে গেল আহমদ মুসার মন। ওগলালার হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে সার ওয়াকারকে নিয়ে তার প্রতিকার কিসে!