২৭. মিসিসিপির তীরে

চ্যাপ্টার

কাহোকিয়ার ফেডারেল রেস্টহাউজ।
মিঃ ডেভিড তার কক্ষের দরজা খুলে সুন্দর বেড এবং সাজানো-গোছানো ঘর দেখে খুব খুশী হলো।
হাতের ব্যাগটা সে মেঝের উপর ছুড়ে দিয়ে বিছানার উপর ঝাপিয়ে পড়ল।
মিঃ ডেভিড আসলে মিঃ ডেভিড গোল্ড ওয়াটার। হোয়াইট ঈগলের আমেরিকান প্রধান। ডেভিড ছদ্মনামে সে ফেডারেল রেস্টহাউজে উঠেছে।
ফেডারেল রেস্টহাউজ রেড ইন্ডিয়ান রিজার্ভ এলাকা কাহোকিয়ার ফেডারেল কমিশনারের অফিস কর্তৃক পরিচালিত রেস্টহাউজ। ভ্রমণ বা অন্য কোন কাজে ভিআইপি নাগরিক যারা কাহোকিয়া আসেন, তারা ইচ্ছা করলে থাকতে পারেন এখানে। কিন্তু এই মানের হোটেল থেকে চারগুণ বেশি ভাড়া ও খাবারের চার্জ দিতে হয় এখানে। তবু নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে উল্লেখযোগ্য সবাই এখানে উঠতে চায়। স্ট্যাটাস অনুসারে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই রেস্ট হাউজে থাকতে দেয়া হয়। যেহেতু রেস্টহাউজটা ফেডারেল কমিশনের অফিস-এর অংশ, তাই এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফেডারেল কমিশনারের হাতে।
রেড ইন্ডিয়ানদের প্রত্যেক রিজার্ভ এলাকায় একটি করে ফেডারেল কমিশন আছে। ফেডারেল কমিশন রেড ইন্ডিয়ান রিজার্ভ এলাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থ দেখা ছাড়াও সেখানকার প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার আপিলেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে।
ডেভিড গোল্ড ওয়াটার জেনারেল আইজ্যাক শ্যানরণসহ তার আরও চারজন নিরাপত্তা কর্মীকে নিয়ে সে এই রেস্টহাউজে উঠেছে। জেনারেল আইজ্যাক শ্যারণ আইজ্যাক ছদ্মনামে রেস্টহাউজে পরিচিত হয়েছেন।
তারা ওয়াশিংটনের সেক্রেটারী অব স্টেটের অফিস থেকে পরিচিতি কার্ড নিয়ে এসেছে তাই সম্মানিত মেহমান হিসেবে জায়গা পেয়েছে রেস্টহাউজে।
ডেভিড গোল্ড ওয়াটার নিজেকে বেশ ক্লান্ত মনে করছে। ওয়াশিংটন থেকে বিমানে এসেছে শিকাগো। সংগে সংগেই সেখান থেকে হেলিকপ্টারে কাহোকিয়া।
গোল্ড ওয়াটারের চোখ ধরে এসেছিল। তার দরজায় নক হলো।
চোখ খুলল সে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজায় মাঝ বয়সি এক শ্বেতাংগ দাঁড়িয়ে। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমি এ্যালেন ট্যালন্ট। এখানকার ফেডারেল কমিশনার। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুনলাম, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মেহমান এসেছেন। দেখা করতে এলাম।’
‘আমি ডেভিড। আসুন।’ বলে ডেভিড গোল্ড ওয়াটার ট্যালন্টকে নিয়ে এসে সোফায় বসাল।
নিজে বসতে বসতে ডেভিড বলল, ‘ঠিক স্টেট ডিপার্টমেন্টের মেহমান নয়। আমার সাথে একজন সম্মানিত বিদেশীও আছেন, মিঃ আইজ্যাক। পাশের রুমেই উনি আছেন। সব মিলিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আমাদের একটা পরিচিতি পত্র দিয়েছে।’
‘ঐ একই হলো।’ বলে একটু থামল ট্যালন্ট। তারপর আবার শুরু করল, ‘আপনারা কতদিন থাকছেন? কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? আমি কি করতে পারি আপনাদের জন্যে?’
‘থাকার ঠিক নেই যতদিন ভাল লাগবে থাকব। উদ্দেশ্য কাহোকিয়া দেখা। রেড ইন্ডিয়ানদের এলাকা, কোন চোর-ছ্যাচ্ছর হাইজ্যাকারের ফাদে না পড়ি, এটুকু আপনি দেখবেন।’
‘অবশ্যই কাহোকিয়া ভাল জায়গা। এখানকার স্থানীয়রাও ভাল। তবে খুবই স্বতন্ত্রমনা এবং মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন। আমি মনে করি কাহোকিয়া সমঝদারদের জন্যে একটা স্বর্গভূমি। কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস এখানে চোখে দেখা যায়। মিসরের পিরামিড এলাকা পর্যটকদের স্বর্গভূমি বলা হয়, কিন্তু কাহোকিয়া তারচেয়ে কোন অংশে কম নয়। বরং এখানকার কাহোকিয়ার মাটির পিরামিডগুলো মিসরের-গুলোরচেয়েও বড় এবং সংখ্যাতেও বেশি। সুতরাং দেখার অনেক কিছু পাবেন।’
ট্যালন্ট থামতেই আবার দরজায় নক হলো।
‘আসুন।’ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল ডেভিড।
ঘরে প্রবেশ করল রেস্টহাউজ অফিসের একজন স্টাফ। হাতে তার একটা রেজিস্টার। স্টাফটি এক তরুণ রেড ইন্ডিয়ান।
‘প্রাথমিক কাজটা তোমাদের এখনও সারা হয়নি? ঠিক আছে, সেরে নাও।’ এ কথাগুলো ট্যালন্ট রেড ইন্ডিয়ান তরুণকে লক্ষ্য করে বলে মুখ ফিরাল ডেভিড গোল্ড ওয়াটারের দিকে। বলল, মিঃ ডেভিড, এখন আসি। পরে কথা হবে। সময় করে একবার চা খান আমার অফিসে।’
‘অবশ্যই।’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে ডেভিড গোল্ড ওয়াটার হ্যান্ডসেক করল ট্যালন্টের সাথে।
ট্যালন্ট চলে গেল।
রেড ইন্ডিয়ান তরুণটি তার রেজিস্টার হাতে তখনও দাঁড়িয়েছিল।
‘তোমার নাম কি? বস।’
তরুণটি বসল। বলল, ‘আমি নাভাজো।’
কথা বলার মত একজন রেড ইন্ডিয়ান তরুণকে দেখে খুশিই হলো ডেভিড গোল্ড ওয়াটার। কারণ সে জানে, রেড ইন্ডিয়ান চক্রে প্রবেশ করতে হলে, ঈগল সান ওয়াকার এবং তাকে সাহায্যকারী আহমদ মুসার খোঁজ পেতে হলে রেড ইন্ডিয়ানদের সাহায্য দরকার। গোল্ড ওয়াটার এবং জেনারেল শ্যারণের দৃঢ় বিশ্বাস, সান ওয়াকার অবশ্যই ওয়াশিংটন ফেরেনি, তার নিরাপত্তার জন্যে আহমদ মুসা নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে এসেছে কাহোকিয়াতে কিংবা অপর কোন রেড ইন্ডিয়ান রিজার্ভ এলাকায়। কাহোকিয়াকেই তারা প্রথম সন্দেহ করেছে। তাই এসেছে তারা প্রথমে কাহোকিয়াতেই।
‘বল নাভোজো, তোমাকে কি সাহায্য করতে পারি।’ বলল গোল্ড ওয়াটার খুবই আন্তরিক কণ্ঠে।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমাদের রেজিস্টার পূরণের জন্যে কতকগুলো রুটিন ইনফরমেশন।’
‘বল সে সব কি?’
‘পূর্ণ নাম, ঠিকানা, বয়স, কতদিন থাকবেন, সফরের উদ্দেশ্য, খাবেন রেস্টহাউজে কিনা, বেড়াবার সময় ‘গাইড’ বা সিকুরিটি দরকার কিনা, ইত্যাদি।’
ডেভিড গোল্ড ওয়াটার ডিকটেট করল এবং নাভাজো লিখল তার রেজিস্টারে।
কতদিন থাকবে সে ব্যাপারে গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘যতদিন ভাল লাগবে, ততদিন থাকব। যে মুহূর্তে মনে করব চলে যাব, সে মুহূর্তেই চলে যাব। রেস্টহাউজেই খাবার ব্যবস্থা থাকবে, তবে বাইরেও কখনও খেতে পারি। প্রতিদিনের পেমেন্ট প্রতিদিনই করব।’
আর সফরের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে বলল, ‘কাহোকিয়ার কিছু লোকের সাথে পরিচয় ছিল তাদের সাথে দেখা সাক্ষাত এবং কাহোকিয়াকে দেখা ও জানা।’
গাইড ও সিকুরিটির লোক নেয়ার ব্যাপারে বলল, ‘লোক পছন্দ করে নিয়োগ দিয়ে রাখতে চাই। দরকার হলে সাথে নেব।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে নোট শেষ করে উঠে দাঁড়াচ্ছিল নাভাজো।
‘একটু বস নাভাজো।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
নাভাজো বসল
‘তোমার বাড়ি কাহোকিয়াতেই না?’ জিজ্ঞেস করল গোল্ড ওয়াটার।
‘জ্বি হ্যা।’
‘ওল্ড কাহোকিয়াতে না নিউ কাহোকিয়াতে?’
‘ওল্ড অংশে।’
‘তাহলে তোমরা বোধহয় খুব পুরনো বাসিন্দা?’
‘জ্বি হ্যা।’
‘তোমার লেখাপড়া?’
‘ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় থেকে গ্রাজুয়েশন।’
‘বাইরের মানে স্টেটের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ যায় না।?’
‘অনেকেই যায়।’
‘বল, ওয়াশিংটনের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ আছে?’
গোল্ড ওয়াটারের এসব প্রশ্নের টার্গেট সান ওয়াকারের প্রসঙ্গ সামনে আনা এবং তার সম্পর্কে জানা। সান ওয়াকারও নিশ্চয় ওল্ড কাহোকিয়ার বাসিন্দা হবে। শিক্ষিত নাভাজো নিশ্চয় তাকে চিনবে।
গোল্ড ওয়াটারের প্রশ্নে নাভাজো একটু ভাবল। তার মুখটাকে কিছুটা ম্লান দেখাল। বলল, ‘তিনজনের কথা আমার মনে পড়ছে। আমার মনে হয় শুধু এ তিনজনই সেখানে পড়ে।’
‘বা! তিনজন! কম নয়তো। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে জান?’
‘জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে।’
‘সবাই?’
‘হ্যা।’
‘নিশ্চয় খুব ভাল ছাত্র ওরা। স্কলারশীপে না নিজ খরচে ওরা পড়ছে?’
‘শুধু একজন ঈগল সান ওয়াকার স্কলারশীপ পেয়েছে। সে একজন ছাত্র-বিজ্ঞানী।’
গোল্ড ওয়াটারের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন সে সাত রাজার ধন কুড়িয়ে পেয়েছে।
পরক্ষণেই মুখে কৃত্রিম বিস্ময় টেনে বলল, ‘ঈগল সান ওয়াকারের বাড়ি এখানে? কাহোকিয়াতে? তার কথা শুনেছি, পড়েছি কাগজে। বিজ্ঞানে কৃতিত্বের জন্যে অনেক গোল্ড মেডেল পেয়েছে।’
‘জ্বি হ্যা, ওর বাড়ি এই কাহোকিয়াতেই।’
‘ওল্ড না নিউ কাহোকিয়াতে?’
‘ওল্ড কাহোকিয়ায়।’
‘এখন তো সে বিশ্ববিদ্যালয়ে না?’
মুখ ম্লান হয়ে উঠল নাভাজোর। বলল, ‘তার এখন খুব বিপদ। তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। ছাড়া পেয়ে সে লুকিয়ে আছে।’
‘বল কি নাভাজো? এ রকম খবর তো শুনিনি! তাকে কিডন্যাপ করার কে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে? সে কোথায়? পুলিশ নিশ্চয় কিছু করছে?’
‘সে কাহোকিয়াতেই পালিয়ে এসেছে। পুলিশ তার জন্যে কিছুই করেনি শুনেলাম।’
সাফল্যের আনন্দে চোখ দু’টি আনন্দে চিক চিক করে উঠল গোল্ড ওয়াটারের।
কিন্তু পরক্ষণেই চোখে-মুখে কৃত্রিম সমবেদনার বান ডাকিয়ে বলল, ‘আহা বেচারা, তার জন্যে তো কিছু করতে হবে। পুলিশ ও সরকারের কিছু বড় বড় লোকের সাথে আমার পরিচয় আছে। আমি অবশ্যই কিছু করতে পারবো।’
‘তাহলে সত্যিই সে উপকৃত হয়।’
‘তার সাথে দেখা করিয়ে দিতে পার? কিংবা বাড়ির ঠিকানা দিলেও চলবে।’
‘সে আসার পর আমার সাথেও দেখা হয়নি। নিজের বাড়িতে নয়, কোন এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকে শুনেছি। একটু খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাব।’
‘ধন্যবাদ নাভাজো। তার কথা শুনে সত্যিই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। দেখ তুমি কত তাড়াতাড়ি তার সাথে দেখা করিয়ে দিতে পার।’
‘অবশ্যই আমি তাড়াতাড়ি চেষ্টা করব স্যার। সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে।’
কথা শেষ করেই আবার সে বলল, ‘তাহলে উঠি স্যার এখন?’
‘এস। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।’
‘ধন্যবাদ স্যার। বাই।’ বলে উঠে দাঁড়াল এবং বেরিয়ে গেল ঘর থেকে নাভাজো।
নাভাজো বেরিয়ে যেতেই গোল্ড ওয়াটার টেলিফোন তুলে জেনারেল আইজ্যাক শ্যারণকে বলল, ‘এখনই চলে এস আমার ঘরে, মহা খবর আছে। টেলিফোনে বলা যাবে না।’
মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘরে এসে প্রবেশ করল আইজ্যাক শ্যারণ।
সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘কেবল সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বিছানায় গা দিয়েছি। খুব ক্লান্তি লাগছে। বল তোমার মহাখবর।’
‘সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে আইজ্যাক খবরটা শোনার পর। দেখ, তুমি গোছ-গাছ করে এতটা সময় কাটিয়েছ। কিন্তু আমি এক মিনিটও নষ্ট না করে আসল আজে লেগে গেছি। ইতিমধ্যেই আমি আবিস্কার করে ফেলেছি, ঈগল সান ওয়াকার কাহোকিয়াতে আছে।’
কথাটা শুনতেই জেনারেল আইজ্যাক লাফিয়ে উঠল শোয়া থেকে এবং গোল্ড ওয়াটারের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘ব্রাভো, ব্রাভো, সত্যিই তুমি কাজের লোক গোল্ড ওয়াটার। তুমি যাদু জান নাকি?’
‘যাদু নয়, বুদ্ধি বলে খবরটা বের করেছি।’ বলে গোল্ড ওয়াটার নাভাজোর সাথে তার সব কথার রিপোর্ট দিল জেনারেল আইজ্যাককে।
জেনারেল আইজ্যাক শোনার পর আনন্দের আতিশয্যে আবার হ্যান্ডশেক করল গোল্ড ওয়াটারের সাথে এবং বলল, ‘বড় শয়তানের খোঁজ পেয়েছ?’
‘আহমদ মুসার?’
‘হ্যা।’
‘জিজ্ঞেস করলে ওর মনে কোন সন্দেহ জাগতে পারে ভেবে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। তবে কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি সান ওয়াকারের সাথে তার আসা স্বাভাবিক।’
‘তোমার কথা ঠিক হোক গোল্ড ওয়াটার। আমি আমার কথা রাখব। তার মূল্যটা আমরা বাড়িয়ে দেব।’
‘ধন্যবাদ আইজ্যাক শ্যারণ। এখন আমাদের প্রথম কাজ হলো সান ওয়াকার কোথায় থাকে তা জেনে নেয়া এবং গোপনে তার উপর চোখ রাখা।’
‘ঠিক বলেছ গোল্ড ওয়াটার, আমরা এসেছি তা ঘূর্ণাক্ষরেও যেন সান ওয়াকার টের না পায়।’
‘অবশ্যই। আমি নাভাজোকে বলেছি সান ওয়াকারের সাথে দেখা করার কথা। এটা নাভাজোকে আমার আগ্রহ ও সমবেদনা দেখাবার জন্যে। আমি কৌশলে জানব সান ওয়াকার কোথায় থাকে সে ঠিকানা। কাজ ও ব্যস্ততার কথা বলে দেখা করার বিষয়টাকে এড়িয়ে যাব।’
‘কিন্তু সেও তো বলতে পারে সান ওয়াকারকে দেখা করার জন্যে।’
‘তাও বলতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, সান ওয়াকার যেহেতু লুকিয়ে থাকছে, তাই সরকারী রেস্টহাউজে আসার মত কাজ সে করবে না। তবু আমরা বিষয়টার দিকে লক্ষ্য রাখব।’
‘সান ওয়াকারকে পাহারা দিয়ে খুঁজতে হবে আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসাকে পাওয়ার পর এক আঘাতেই ওদের দু’জনকেই জালে পুরতে হবে।’
‘অবশ্যই। এখন মুখ্য কাজই হলো আহমদ মুসার সন্ধান করা।’
‘আরেকটা কথা গোল্ড ওয়াটার। নাভাজো আমাদেরকে সহযোগিতা করবে, এটা ধরে নিয়েও আমি মনে করি নাভাজোর উপর গোপনে আমাদের চোখ রাখতে হবে। তার বাড়ির ঠিকানাসহ সে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে দেখা করছে তা আমাদের সংগ্রহ করতে হবে। এর দ্বারা সান ওয়াকার ও আহমদ মুসাকে সে বলার বা দেখার আগেই আমরা তাদের পেয়ে যেতে পারি।’
আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল গোল্ড ওয়াটারের। বলল, ‘তুমি ঠিক বুদ্ধি বের করেছ জেনারেল আইজ্যাক। তোমাকে ধন্যবাদ।’
‘আরও একটা কথা গোল্ড ওয়াটার। তোমাদের সেই মেরী রোজও সান ওয়াকারের সাথে থাকতে পারে। সেটাও যেন মনে রাখে তোমাদের লোকে অনুসন্ধানের সময়।’
‘ধন্যবাদ আইজ্যাক। মেরী রোজ চোখে পড়া অর্থ সান ওয়াকারকে পেয়ে যাওয়া, যদি সে সান ওয়াকারের সাথে এসে থাকে।’
জেনারেল আইজ্যাক কিছু বলতে যাচ্ছিল। দরজায় নক হলো।
জেনারেল আইজ্যাক কথা বন্ধ করে তাকাল গোল্ড ওয়াটারের দিকে।
ডেভিড গোল্ড ওয়াটার উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দেখল, একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে। এইভাবে আকস্মিক পুলিশকে দেখে মনে মনে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিল গোল্ড ওয়াটার। চোখে সম্ভবত তার কিছুটা প্রকাশ ঘটেছিল।
পুলিশ অফিসারের ঠোঁটের কোণায় এক টুকরো হাসি ফেুটে উঠেছিল মুহূর্তের জন্যে। বলল, ‘কমিশনার সাহেব পাঠালেন আমাকে আপনার সাথে পরিচিত হবার জন্যে এবং একথা জানাতে যে, প্রয়োজনীয় যে কোন সাহায্যের জন্যে আমরা প্রস্তুত আছি।’
‘অনেক ধন্যবাদ। আসুন বসুন।’ বলে গোল্ড ওয়াটার একপাশে সরে গিয়ে তাকে ভেতরে প্রবেশের জন্যে আহ্বান জানাল।
পুলিশ অফিসারকে নিয়ে গোল্ড ওয়াটার এসে বসাল সোফায়।
মনে মনে খুশীই হলো গোল্ড ওয়াটার। পুলিশ অফিসার রেড ইন্ডিয়ান হওয়ায় তার সাথে পরিচয় খুবই জরুরী মনে করল সে। কথায় কথায় সান ওয়াকারের প্রসঙ্গ তুলে তার সম্পর্কে এদের মনোভাবও জানা যাবে।
গোল্ড ওয়াটার সোফায় বসেই বলল পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে, ‘খুব খুশী হয়েছি আপনি আসায়। আমরা এখানে নতুন, কিছু জানাও যাবে আপনার কাছ থেকে।’
‘কিছু মাটির পিরামিড এবং কিছু ঐতিহাসিক বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া তেমন কিছু জানা, দেখার নেই কাহোকিয়াতে।’
‘কাহোকিয়ার আকর্ষণ তো এগুলোই।’ বলে একটু থেমেই গোল্ড ওয়াটার আবার বলল, ‘এখানকার আইন-শৃঙ্খলা কেমন?’
‘বেশ ভাল। মানে খুবই ভাল বলা যায়। সাত দিনেও একটা মামলা আসে না। আমরা অলস হয়ে গেলাম স্যার।’
‘খুবই সুখবর। নিশ্চিন্তে বেড়ানো যাবে। আচ্ছা একটা খবর বলুন তো, শুনলাম বিখ্যাত ছাত্র-বিজ্ঞানী ঈগল সান ওয়াকার, যে কিডন্যাপ হয়েছিল, তার বাড়ি নাকি এই কাহোকিয়াতে?’ জিজ্ঞাসা করল গোল্ড ওয়াটার।
সান ওয়াকারের নাম শুনতেই মুখটা ম্লান হয়ে গেল পুলিশ অফিসারটির। বলল, ‘জি, তার বাড়ি এই কাহোকিয়াতে।’
‘কাহোকিয়ার জন্যে তো এটা গৌরব।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘গৌরব অবশ্যই। কিন্তু গৌরব সূর্য বোধহয় অস্তমিত হয়ে যাচ্ছে! সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, পড়া শুনা নেই। পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে এখন।’
‘দুর্ভাগ্য আমাদের। সে এখন কোথায়?’
‘কাহোকিয়াতেই সম্ভবত। একদিন তার সাথে দেখা হয়েছিল। সে বাড়িতে থাকে না।’
‘কেন আপনারা তার উপর চোখ রাখেন না তার নিরাপত্তার জন্যে?’
‘সে পুলিশকে বিশ্বাস করে না। সে মনে করে তার কিডন্যাপ-কারীদের পুলিশ চেনে, কিন্তু তাকে মুক্ত করার কোনই ব্যবস্থা করেনি।’
‘আপনাকেও বিশ্বাস করে না?’
‘না। মনে করে আমি একজন আদেশ পালনকারী চাকুরে।’
‘কিন্তু আপনাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। তার অলক্ষ্যেই তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা আপনারা করতে পারেন।’
‘সে রকম কিছু করলে তার নজরে পড়বেই এবং সে ক্ষেত্রে সন্দেহ করে সে কাহোকিয়া ছেড়েই চলে যেতে পারে।’
‘সে কি এখন কাহোকিয়াতেই? খুব ইচ্ছা আমার বেচারার সাথে দেখা করার।’
‘কয়দিনের খবর আমি জানি না।’
‘নিশ্চয় কাহোকিয়াতেই আছে।’
‘খবর জোগাড় করতে পারলে আমি জানাব আপনাকে। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’
‘ধন্যবাদ স্যার। আমার আর কিছু করণীয় আছে?’
‘ধন্যবাদ। এখন নেই। দরকার হলে বলব।’
‘আপনার কাহোকিয়া সফর সুন্দর হোক। বাই।’ বলে বেরিয়ে গেল পুলিশ অফিসার।
পুলিশ অফিসার বেরিয়ে যেতেই জেনারেল আইজ্যাক বলল, ‘কাহোকিয়াতে আসার পর দেখছি সব কিছুই আমাদের পক্ষে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে লক্ষ্য অর্জন আমাদের হাতে মুঠোয়।’
‘যদি আহমদ মুসা কাহোকিয়াতে থাকে।’
‘তুমি কি মনে কর?’
‘আমার চেয়ে আহমদ মুসাকে তুমিই ভাল জান। সুতরাং তুমিই বলতে পার তার গতি-বিধির ধরণ সম্পর্কে।’
‘সে সব সময় নতুন। তাই তাঁর সম্পর্কে আগাম কিছু বলা মুস্কিল।’ বলল জেনারেল আইজ্যাক শ্যারণ মুখ ম্লান করে।
‘তবে আমি বলতে পারি, সান ওয়াকারকে নিরাপদে কাহোকিয়াতে পৌঁছানো এবং যেহেতু সে আমেরিকায় নতুন তাই ঐতিহাসিক কাহোকিয়া দেখার এটা তার সুযোগ, এই দুই কারণে অবশ্যই সে কাহোকিয়াতে এসেছে।
‘তোমার কথা সত্যি হোক।’ বলে তার ঘরে ফেরার জন্যে জেনারেল আইজ্যাক শ্যারণ উঠে দাঁড়াল।
গোল্ড ওয়াটারও উঠল। এগুলো বিছানার দিকে অর্ধ সমাপ্ত বিশ্রাম সমাপ্ত করার জন্যে।

ওল্ড কাহোকিয়ার একটা সাধারণ পুরাতন বাড়ি।
বাড়ির বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ি।
বাড়িটা সান ওয়াকারের খালার। সান ওয়াকার কাহোকিয়াতে ফেরার পর নিজ বাড়িতে না থেকে এখানেই থাকছে।
সান ওয়াকার কিছু ব্যাগ-ব্যাগেজ এনে গাড়িতে তুলল। তারপর বাড়ির ভিতরে ফিরে গিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় বসতে বসতে হাঁক দিল মেরী রোজ, সুসান তোমরা এস।
পরক্ষণেই মেরী রোজ এসে সান ওয়াকারের পাশে সোফায় বসল। তার মুখ ভার। বলল, ‘সান তুমি আমাকে এভাবে জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছ কেন?’
‘বলেছি তো, এভাবে তোমার থাকাটা তোমার আব্বা, তোমার পরিবার ভালভাবে নেবেন না।’
‘আমি তো আম্মাকে টেলিফোনে বলেছি, হঠাৎ করে একটা প্রোগ্রামে শামলি হয়ে কাহোকিয়া এসেছি।’
‘তারপরও কয়েকদিন পার হয়ে গেছে।’
‘তাতে কি?’
হাসল সান ওয়াকার। বলল, ‘তুমি ভুলে যাচ্ছে কেন তুমি দেশের প্রধান বিচারপতির কন্যা। দূরে কোথাও পিকনিকে যাবার অনুমতিও যেখানে তোমার পরিবার দেয় না, সেখানে এই আসাটাকে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে নেবেন?’
একটু থামল সান ওয়াকার। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘তুমি কোনভাবে তোমার পরিবার বা কারও কাছে ছোট হও আমি তা চাই না। আবার সেই ছোটটা যদি আমার কারণে হও, তাহলে ভীষণ কষ্ট লাগবে আমার। নিশ্চয় আমাকে তুমি কষ্ট দিতে চাইবে না।’
মেরী রোজ কিছু বলল না। মুখ নিচু করে চুপ করে থাকল।
ড্রইং রুমে প্রবেশ করল শিলা সুসান। বলল, ‘সবাই বসে কেন? চল মেরী রোজ।’ বলে মেরী রোজ-এর দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসল শিলা সুসান। বলল, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি।’
এরপর বাইরের দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল, ‘এস আমি গাড়িতে উঠছি।’
শিলা সুসান হাসি মুখে কবিতাংশটি শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ করার সময় বেদনায় ভরে যায় তার মুখ। মনের কোণের গোপন একটা বেদনা যেন তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
‘শুনলে সুসানের কবিতা?’ সান ওয়াকার বলল।
‘আমি ভুরি ভুরি পাইনি, ভুরি ভুরি চাই না। এক তোমাকেই চেয়েছি, পেয়েছি। তাও কেড়ে নেবার আতংক সব সময় আমাকে তাড়া করে ফিরছে। তাই তো ভয় করছে তোমাকে ছেড়ে যেতে। কান্নায় ভারি হয়ে উঠল মেরী রোজ এর কণ্ঠ।
সান ওয়াকার তার একটা হাত মেরী রোজ-এর কাঁধে রেখে সান্ত্বনার স্বরে বেলল, ‘মেঘ কেটে একদিন সুদিনের সোনালী সূর্য উঠবেই।’
শিলা সুসান গাড়িতে উঠার অল্প কিছুক্ষণ পর মেরী রোজ এবং সান ওয়াকারও গাড়িতে এসে উঠল। সান ওয়াকার গাড়ির চালককে নির্দেশ দিল বিমান বন্দরে চল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
‘কার আছে ভুরি ভুরি সুসান?’ শিলা সুসানকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল মেরী রোজ। সে ভুলতেই পারেনি সুসানের টিপ্পনি।
‘হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে দেখ।’
‘দেখলাম। কিন্তু নেই কার?’
‘পেট ভরা থাকলে কারও ক্ষুধা টের পাওয়া যায় না।’
‘তুই তো কোনদিন বলিসনি ক্ষুধার কথা। সত্যিই এরকম কিছু আছে নাকি?’ হেসে বলল মেরী রোজ।
শিলা সুসানের মুখেও হাসি। ম্লান হাসি। মুহূর্তের মধ্যে সান ওয়াকারের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল মেরী রোজকে, ‘আমি একটা নীতিকথা বলেছি।’
কথাটা শেষ করে একটু থেমেই আবার শুরু করল সে, ‘যাক এসব। আজ এভাবে যাত্রা করতে গিয়ে কিন্তু আহমদ মুসার কথা খুব মনে পড়ছে। বেচারার কি হলো আমরা কোন খোঁজ নিতেও পারলাম না। অথচ আমার উপর একটা দায়িত্ব ছিল তাঁর খোঁজ করা এবং একজনকে জানানো।’
‘শিলা সুসান তুমি ঠিক বলেছ। যে লোক নিজের জীবন বিপন্ন করে আমাকে বাঁচাল এবং আমাদের নিরাপদ করার জন্য বিপদের সব বোঝা নিজের ঘাড়ে নিয়ে চলে গেল তার জন্যে আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ বলল সান ওয়াকার।
‘সত্যি আমাদের নামিয়ে দিয়ে যখন উনি যান, তখন তাঁর পেছনে ধাওয়া করছিল তিনটি গাড়ি এবং একটি হেলিকপ্টার। এই অবস্থায় আমাদের বাঁচা অসম্ভব বলেই তিনি আমাদের নামিয়ে দিয়ে আমাদের নিরাপদ করে সব বিপদ নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন। উনি বাঁচতে পেরেছেন কি?’
‘ওভাবে বলিসনে রোজ। অমন প্রশ্ন তোলাও অলুক্ষণে। ওঁকে বাঁচতে হবে। মানুষের জন্যেই বাঁচতে হবে।’ শিলা সুসান বলল।
‘ঈশ্বর তাকে সাহায্য করুন। কিন্তু আমি বলছি একটা অসম্ভব সম্ভব হয়েছি কিনা সেই কথা।’
‘আহমদ মুসাকে আমরা সম্পূর্ণ দেখিনি, তাঁর সবটা আমরা জানি না। কিন্তু গোল্ড ওয়াটারের ফাঁদ তাঁকে আটকাতে পারবে বলে মনে করি না।’ বলল শিলা সুসান।
‘আমিও তাই মনে করি। হোয়াইট ঈগলের বন্দীখানা থেকে বের হবার সময় উনি প্রতিটি দুর্লঙ্ঘ বাধা যে বুদ্ধি ও কৌশলে অতিক্রম করেন, তা না দেখলে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।’
‘তোমাদের কথাকে ঈশ্বর সত্য করুন।’ বলল মেরী রোজ।
সান ওয়াকার কথার মোড় ঘুরিয়ে নিল, কাহোকিয়া সম্পর্কিত আলোচনায়।
এক সময় তাদের আলোচনা গাড়ি চালকের কথায় নেমে গেল। গাড়ি চালক বলল, ‘স্যার ব্রীজের মুখ রোধ করে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।’
সবাই তাকাল সেদিকে। ঠিক, একটা জীপ গাড়ি ব্রীজের মুখে রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সান ওয়াকার বলল, ‘গাড়িটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তুমি গিয়ে দেখ।’
ঘোড়ার গাড়িটা তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে।
সান ওয়াকার ঐ নির্দেশ দেবার পর গাড়ির চালক নেমে পড়ল গাড়ি থেকে এবং গেল গাড়িটার কাছে।
আরেকটা গাড়ি এ সময় এসে দাঁড়াল সান ওয়াকারদের গাড়ির ঠিক পেছনে।
সান ওয়াকার মনে করল এ গাড়িটা তাদের সামনের পথ বন্ধ দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল সান ওয়াকার। সে দেখতে পেল, তাদের গাড়ির চালক জীপটির কাছে পৌঁছতেই জীপ থেকে দু’জন লোক লাফ দিয়ে নেমে আক্রমণ করল তাদের গাড়ির চালককে। হঠাৎ আক্রমণে বিমূঢ় গাড়ির চালক বাধা দেবারও কোন সুযোগ পেল না। সে কয়েকটি ঘুষি ও লাথি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারা গাড়ি চালকের দেহটি ব্রীজের নিচে ছুড়ে দিয়ে লাফ দিয়ে জীপে উঠল।
সান ওয়াকার গাড়ি থেকে নেমে ওদিকে যাবে কিনা চিন্তা করতেই দেখল জীপ গাড়িটা ষ্টার্ট নিয়ে তাদের দিকেই ছুটে আসছে।
কিছু বুঝে উঠার আগেই জীপটি সান ওয়াকারের গাড়ির একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।
জীপটা থামতেই লাফ দিয়ে নামল দু’জন জীপ থেকে।
সান ওয়াকার গাড়ির দরজা খোলার শব্দে পেছনে তাকিয়ে দেখল পেছনের কার থেকেও দু’জন নেমেছে।
চারজনই এগিয়ে আসছে সান ওয়াকারের ঘোড়ার গাড়ি লক্ষ্যে।
এতক্ষণে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারল সান ওয়াকার। তার পাশে বসে ছিল মেরী রোজ। সে সরে এল সান ওয়াকারের গা ঘেঁষে। বলল, ওদের মতলব ভাল মনে হচ্ছে না’। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
সামনে সান ওয়াকারদের দিকে মুখ করে বসে ছিল শিলা সুসান। তার মুখে উদ্বেগ। বলল সে ফিস ফিস করে, ‘সান, মনে হচ্ছে ওরা আমাদের দিকে ফিরে আসছে’।
উদ্বেগ ফুটে উঠল সান ওয়াকারের মুখেও।
সান ওয়াকার উঠে দাঁড়াল।
ওরা চারজন তখন সান ওয়াকারের গাড়ি ঘিরে ফেলেছে। চারজনই শ্বেতাংগ। ওদের একজন সান ওয়াকারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শুনেছি তুমি কারাত-কুংফুতে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছ। কিন্তু চারটে রিভলবারের কাছে তোমার ঐ ট্রেনিং কোন কাজে আসবে না’।
সান ওয়াকার চেয়ে দেখল, ওদের চারজনের হাতেই রিভলবার।
চারদিকে তাকাল সান ওয়াকার।
এলাকাটা জনবিরল।
পুরাতন কাহোকিয়া শহরের দক্ষিণাংশ। এই ওল্ড কাহোকিয়ার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে এয়ারপোর্ট রোডে মিসিসিপির একটা ক্যানালের উপর এই ব্রীজ। মাত্র ১০০ গজ দূরে মিসিসিপি থেকে বেরিয়ে এসেছে ক্যানালটি। মোহনা এলাকা বলে ক্যানালটি প্রায় নদীর মতই প্রসস্ত।
ব্রীজের দু’পাশেই কয়েকটা প্রাইভেট জেটি আছে। প্রত্যেকটি জেটি বরাবর উপরে একটা অফিসও আছে। যা বৈঠকখানা, বিশ্রামাগার ও অস্থায়ী গোডাউন হিসেবেও ব্যবহার হয়।
ছয় সাতটি এ ধরনের অফিসের একটিতেও আলো নেই।
কিন্তু সেদিক থেকে চোখ ফরাবার আগেই একটিতে আলো জ্বলে উঠল। সেই সাথে খুলে গেল তার এদিকের দরজাও। সান ওয়াকার বুঝল, নিচের জেটিতে বোট বা লঞ্চ ভিড়িয়ে কে বা কারা উঠে এসেছে।
সান ওয়াকারের দৃষ্টি আবার ফিরে এল সেই চারজনের দিকে।
ওরা ঠিকই বলেছে কারাত এবং কুংফু’তে সান ওয়াকরের ট্রেনিং আছে। কিন্তু চারদিকের রিভলবারের বিরুদ্ধে তা এখন কোন কাজে লাগবে না্
সান ওয়াকারের মনে পড়ল ঈশ্বরের কথা। কিন্তু কোন ঈশ্বরকে ডাকবে? রেড ইন্ডয়ানদের ঈশ্বর নিরাকার বটে। কিন্তু তার নানা আকারে নানা ভাবে পুঁজাও হয়। তাদের কাকে সে ডাকবে। সান ওয়াকারের মনে পড়ল তার গোত্র ব্ল্যাক ফুট ইন্ডিয়ানদের এক ঈশ্বর ‘আল্লাহ’র কথা। সান ওয়াকারের দাদা বলতেন, আল্লাহ সব মানুষ এবং সব সৃষ্টির স্রষ্টা এবং তিনি সর্বশক্তিমান ও সবকিছুর উপর ক্ষমতাশালী। এই বিপদকালে সান ওয়াকার সেই আল্লাহর কথা স্মরণ করল। তার উদ্বেগ তার নিজেকে নিয়ে নয়। তার উৎকণ্ঠা মেরী রোজ ও সুসানকে নিয়ে। তাদের কোন অপমান, ক্ষতি সে বরদাশত করতে পারবে না। প্রায় ভুলে যাওয়া আল্লাহকে স্মরণ করে তার সাহায্য প্রার্থনা করল সান ওয়াকার।
ওরা চারজন ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।
ওদের একজন চাপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘তোমরা তিনজন হাত উপরে তুলে দাঁড়াও। শোন, সান ওয়াকার তোমার সামান্য চালাকি ধরা পড়ার সাথে সাথে প্রথমে তোমার প্রেমিকা মেরী রোজ মরবে, তারপর তোমার বান্ধবী।’
হাত তুলল সান ওয়াকাররা তিনজনই্ তারপর ওদের লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা কারা? কি চাও তোমরা?’
‘সব জানবে’।
চারজনের একজন এই কথা বলেই নির্দেশ দিল, ‘সান ওয়াকার হাত তুলে রেখেই তুমি প্রথম নেমে এস, তারপর ওরা দু’জন’।
তার কথা শেষ হবার সাথে সাথেই চারটি গুলীর শব্দ হলো পর পর।
সান ওয়াকার দেখল ভোজবাজীর মত চারজনের হাত থেকেই রিভলবার পড়ে গেছে।
ওরা চারজন গুলী যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকে একবার তাকিয়েই ছিটকে পড়া রিভলবার তারা তুলে নিতে গেল।
আবার সেই চারটা গুলীর শব্দ হলো।
ওরা চারজন রিভলবার না তুলে প্রত্যেকেই বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল এবং দৌড়ে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
দু’টি গাড়িই ষ্টার্ট নিয়ে ছুটে পালাল।
সান ওয়াকার, মেরী রোজ এবং শিলা সুসান তিনজনেই তাকিয়েছিল গুলীর উৎস লক্ষ্যে। দেখল, একজন লোক এগিয়ে আসছে। তার দু’হাতে দুটি রিভলবার। মাথায় হ্যাট। হ্যাটের ছায়া মুখের উপর পড়ায় মুখ দেখা যাচ্ছে না।
লোকটি আরও কাছে এগিয়ে এসেছে।
আরও তিনজন লোক এগিয়ে আসছে তার পেছন পেছন। তারাও বেরিয়েছে সেই জেটি সংলগ্ন অফিস থেকে, যেখানে সান ওয়াকার আলো জ্বলে উঠতে দেখেছে।
এগিয়ে আসা লোকটি তার হাতের রিভলবার পকেটে রেখে দিয়েছে।
আরও কিছুটা এগিয়েই লোকটি এক হাত দিয়ে মাথার হ্যাট নামিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল, ‘সান ওয়াকার, সুসান, মেরী রোজ তোমরা?’
বলেই সে দ্রুত পা চালালো সান ওয়াকারদের দিকে।
‘এতো আহমদ মুসা, সান ওয়াকার’। কণ্ঠে একটা আনন্দের উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল এবং লাফ দিয়ে নামল গাড়ি থেকে শিলা সুসান।
‘ঠিক, আহমদ মুসাই’। বলে সান ওয়াকার নামল গাড়ি থেকে। তার সাথে মেরী রোজও।
নেমেই সান ওয়াকার গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘আমার দাদার আল্লাহ স্বয়ং নেমে এসেছেন আপনার রূপ ধরে’। আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বলল সান ওয়াকার।
‘তোমার দাদার আল্লাহ? বুঝলাম না সান ওয়াকার’।
‘ধন্যবাদ। আপনি আমাদের বাঁচিয়েছেন’। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল শিলা সুসান।
‘ঈশ্বর যে কিভাবে সাহায্য করেন। আজ চোখে দেখলাম’। বলল মেরী রোজ।
এর মধ্যে এসে পৌঁছে গেল প্রফেসর আরাপাহো, জিভারো এবং ওগলালা।
‘দীর্ঘজীবী হও সান ওয়াকার। কি ঘটেছে বলত? ওরা কার?’
সান ওয়াকার এগিয়ে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানিয়ে প্রফেসর আরাপাহোর হাত চুম্বন করে বলল, ‘স্যার ওদের চিনতে পারিনি। ওরা শ্বেতাংগ। হঠাৎ আমরা দু’দিক থেকে আক্রান্ত হয়েছি’।
‘এ সময় তোমরা এদিকে কোথায় যাচ্ছ ঘোড়ার গাড়ি করে?’
‘স্যার এয়ারপোর্টে যাচ্ছিলাম। মেরী রোজ ও শিলা সুসান ওয়াশিংটনে ফিরবে’।
প্রফেসার আরাপোহা আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি তো ব্যাপারটা প্রথম দেখতে পেয়েছ। বুঝতে পেরেছ কিছু?’
‘ওদের একজনকে পেলেই তো অনেক কিছু বুঝা যেত? কিন্তু হত্যার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চারজনের কাউকে হত্যা বা আটকাবার চেষ্টা করলে না কেন?’
‘বেড়াতে এসেছি কাহোকিয়াতে। প্রথমেই হত্যার মত কাজে জড়িয়ে পড়তে চাইনি। বিশেষ করে ওরা এদের হত্যার চেষ্টা করেনি, কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল’।
‘কিন্তু যে কাজ তারা করতে যাচ্ছিল তা হত্যার চেয়েও ভয়ংকর হতো’। বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘সেটা ঠিক। তবে হত্যার মত কারণ আমি পাইনি’। আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বলেছ বৎস। তোমার সিদ্ধান্তই ঠিক। সত্যি তোমার আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বি এবং এর চেয়ে বড় শক্তি আর কিছু নেই’। বলল প্রফেসর আরাপাহো।
একটু থামল প্রফেসর আরাপাহো।
থেমেই আবার শুরু করল, ‘কথা বলার জায়গা এটা নয়। ওদের প্লেন ক’টায় সান ওয়াকার?’
‘প্লেন আর পাওয়া যাবে না। সময়ের চেয়ে ১৫ মিনিট বেশি হয়েছে’। সান ওয়াকার বলল।
‘তাহলে আজকের মত ওদের নিয়ে ফিরে যেতে চাও?’
‘জ্বি হ্যাঁ’।
‘সান ওয়াকার, পেছনের গাড়ি নিশ্চয় তোমাকে ফলো করে এসেছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমারও তাই মনে হয়। এখন আমার মনে পড়ছে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে আসার সময় বাড়ির অল্প দূরে পেছনের এই গাড়িটাকেই মনে হয় পার্ক করা দেখেছিলাম রাস্তার পাশে’।
‘তাহলে ঐ বাড়িতে ফেরা তোমাদের জন্যে নিরাপদ নয়। ওদের শিকার হাতছাড়া হয়েছে। তার উপর আহত হয়েছে ওরা। ওরা এখন পরিণত হয়েছে ক্ষ্যাপা কুকুরে’।
‘তাহলে আমার নিজের বাড়িতে ফিরতে পারি’। সান ওয়াকার বলল।
‘কেন তোমরা কোথায় ছিলে? কোথেকে তোমরা এসেছ?’
‘মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর থেকে আমি আমার খালার বাড়িতে থাকছি’।
‘তোমার নিজ বাড়িতে নয় কেন?’
‘আমার সন্দেহ, আমার বাড়ির উপর ওরা চোখ রাখবে’।
‘তাহলে এখন আবার নিজের বাড়িতে ফিরতে চাচ্ছ কেন?’
উত্তর দিল না সান ওয়াকার। ভাবছিল সে।
‘পরে চিন্তা করো সান ওয়াকার, এখন চল আমাদের বাড়িতে’। বলল প্রফেসর আরাপোহা।
পিতার কথায় ওগলালার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই নামল সেখানে মলিনতার ছায়া। তবু মুখে হাসি টেনে বলল, মেরী রোজ ও শিলা সুসানের দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে, ‘আব্বা ঠিকই বলেছেন। এখন তোমাদের সকলের আমাদের বাড়িতে যাওয়াই সব দিক থেকে যুক্তিসংগত।’
‘ধন্যবাদ, ওগলালা’। বলল মেরী রোজ।
ওগলালা তার পিতার দিকে চেয়ে শিলা সুসানকে দেখিয়ে বলল, ‘আব্বা এ শিলা সুসান। সান ওয়াকারের সাথে পড়ে। আমাদের বন্ধু’।
একটু থেমে একটা ঢোক গিলে মেরী রোজকে দেখিয়ে বলল, ‘আর এ মেরী রোজ আব্বা। এও সান ওয়াকারের সাথে পড়ে এবং সান ওয়াকারের বাগদত্তা।’
শেষ কথাটা বলার সময় গলাটা কাঁপছিল ওগলালার।
বোধহয় এ ব্যাপারটা ঢাকা দেয়ার জন্যেই জোরে হেসে উঠল ওগলালা। কিন্তু সেটা হাসির শব্দ হলো, কিন্তু হাসি হলো না।
আহমদ মুসা তাকাল ওগলালার দিকে। কিছুটা বিব্রত দৃষ্টি আহমদ মুসার। ভাবল আহমদ মুসা, সরল ও বেপরোয়া ওগলালা কি ঘটিয়ে বসে আল্লাহই জানেন।
মেরী রোজ ও শিলা সুসানের চোখেও বিস্ময় দৃষ্টি ফুটে উঠেছিল মুহূর্তের জন্যে।
ওগালালা থামতেই আহমদ মুসা বলল, ওসব পাসোর্নাল ব্যাপার এখন না তোলাই ভাল। চল যাওয়া যাক।’
‘গাড়ির চালককে দেখতে হয়, তার কি অবস্থা’। বলল সান ওয়াকার।
আহমদ মুসা জিভারোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি এদের নিয়ে যাও। গাড়িতে উঠ গিয়ে। আমি ও সান ওয়াকার গাড়ি চালকের দেখি। তার হাতে ঘোড়ার গাড়ির দায়িত্ব তুলে দিয়ে আমরা আসছি’।
বলে আহমদ মুসা ও সান ওয়াকার পা বাড়াল ব্রীজের দিকে।
আহমদ মুসা ও সান ওয়াকার চলে যেতেই জিভারো বলল, ‘একজন ভাই ও একজন ভাবী পেয়ে গেলি’।
ওগলালা জিভারোর এই টিপ্পনির কোন জবাব না দিয়ে গম্ভির মুখে শিলা সুসান ও মেরী রোজ দু’জনের দু’হাত দু’হাতে ধরে হাঁটা শুরু করল যেখানে থেকে এসেছিল সেই অফিসের দিকে।
জিভারো বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ওগলালার দিকে। জীবনে এই প্রথমবার ওগলালা জিভারোর একটা টিপ্পনির জবাব দিল না। পিঠাপিঠি দু’ভাইবোন ওরা। দু’জনের মধ্যেকার মধুর বিরোধ মাতিয়ে রাখে বাড়িকে, গোটা পরিবারকে সব সময়।
কিন্তু ওগলালার এই আচরণে অবাক হলো জিভারো।
বিষয়টা তার পিতারও নজর এড়ায়নি। কিছু বলতে গিয়েও সে চেপে গেল। সম্বিত ফিরে পাওয়ার মত হেসে উঠে বলল, ‘চল যাই।’

ওগলালাদের বাড়ির দক্ষিণের একটি ব্যালকনিতে দু’হাতের কনুইয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল মেরী রোজ। তার মুখ ভার। চোখ দু’টি বেদনার্ত।
কিছুক্ষণ পর সান ওয়াকার এসে প্রবেশ করল ব্যালকনিতে। দু’হাতে ঠেস দিয়ে মেরী রোজ-এর মতই সে দাঁড়াল ব্যালকনির রেলিং ঘেঁষে। মেরী রোজ-এর মুখের দিকে একবার চেয়ে প্রশ্ন করল, ‘এভাবে চলে এলে কেন?’
‘কোন কারণে নয় এমনিই উঠে এসেছি।’ সান ওয়াকারের দিকে না তাকিয়েই বলল মেরী রোজ।
‘কেউ না বুঝলেও আমি বুঝেছি তুমি এভাবে চলে এলে কেন? ওগলালার কথায় তুমি মাইন্ড করেছ।’
‘না। ওগলালার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু মাইন্ড করিনি। ওতো ঠিকই বলেছে। একজন শ্বেতাংগীনি বিশেষ করে একটি শীর্ষ শ্বেতাংগ পরিবারের কন্যা ভালবাসবে একজন রেড ইন্ডিয়ানকে, এটা শ্বেতাংগরা বরদাশত করতে পারেনি বলেই তোমার জীবনে বিপর্যয় নেমেছে। এর মানে আমার প্রেম তোমার জীবনে বিপর্যয় ঘটিয়েছে। ওগলালার এ কথা সত্য।’ মেরী রোজ-এর শেষের কথাগুলো আবেগ ও কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল।
‘ওরা বরদাশত করতে পারবে না, এটা কি কোন নতুন সত্য? তুমি, আমি সকলেই কি এটা জানি না?’
‘কিন্তু তোমার জীবনে বিপর্যয় নেমেছে এটা সবার জন্যে নতুন সত্য।’
‘এ সত্যও নতুন নয়? তুমি আমি কি জানতাম না এ ধরনের অসম ভালবাসার ক্ষেত্রে আমাদের চারদিকে কি ঘটছে? জানতাম। জানার পরেই আমরা ভালবেসেছি।’
‘তোমাকে এমন মূল্য দিতে হবে ভাবিনি আমি’।
‘কি এমন মূল্য দিয়েছি? অনেকে তো জীবন দিয়েছে, আমি তো বেঁচে আছি।’
‘ওভাবে তুমি বলো না। আমার জন্যে তোমার মত প্রতিভাকে নষ্ট হতে আমি দেব না।’
‘তাহলে কি করবে? ওদের কথা মানবে? আমি দেশত্যাগ করি, আর তুমি নতুন জীবন শুরু কর, এটা তুমি চাও?’
মেরী রোজ মুখ তুলে সান ওয়াকারের দিকে চাইল। তার দু’চোখ পানিতে ভরে উঠেছে।
মেরী রোজ তার মাথা সান ওয়াকারের কাঁধে রেখে দু’হাতে সান ওয়াকারের হাত চেপে ধরল। বলল, ‘আমি তা চাইতে পারি বলে তুমি মনে কর?’
‘মনে করি না বলেই তো প্রশ্ন করলাম।’
‘তাহলে শোন, তুমি আমার জীবন সমার্থক।’
‘তাহলে কষ্টকে ভয় পাচ্ছ কেন?’
‘আমার নয়, তোমার কষ্টকে ভয় পাচ্ছি।’
‘তাহলে তুমি আমাকে তোমার চেয়ে দুর্বল মনে কর?’
মেরী রোজ হেসে ফেলল। বলল, ‘তা বুঝি মনে করতে পারি? তবে একটা কথা মেয়েরা যতটা আঘাত হজম করতে পারে, ছেলেরা তা পারে না’।
‘এটা তো দৈহিক দুর্বলতারই লক্ষণ’।
‘আবার এটা কিন্তু মনের সবলতারও লক্ষণ’। হেসে বলল মেরী রোজ।
‘যদিও এ ব্যাপারেও আমার কথা আছে। তবু দুর্বলতা ও সবলতার ফিফটি শেয়ার মেনে নিচ্ছি।’
একটু থেমেই সান ওয়াকার আবার বলল, ‘চল যাই।’
দু’জনেই পা বাড়াল ব্যালকনি থেকে ঘরের দিকে।
সান ওয়াকার যখন কথা শেষ করল তার আগেই ওদিকে আহমদ মুসা কথা শেষ করেছে ওগলালার সাথে।
সান ওয়াকার উঠে যাবার পর পর ওগলালা উঠে গিয়েছিল ভারি মুখ নিয়ে।
আহমদ মুসা সবইল লক্ষ্য করেছে।
ওগলালার আব্বা উঠে ঘরের দিকে যেতেই আহমদ মুসা যেদিকে ওগলালা গেছে সেদিকে চলে গেল।
ওগলালা উত্তরের এক ব্যালকনিতে সামনের সবুজ বাগানের দিকে চেয়ে মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা ব্যালকনিতে প্রবেশ করে ডাকে ওগলালাকে।
ওগলালা জবাব দেয় না, মুখও ফিরায় না। কিন্তু তার চোখ-মুখ ছলছলে হয়ে উঠেছিল।
‘ওগলালা তোমাকে আমি বকুনি দিতে এসেছি, কথা বলছ না কেন?’
ওগলালা চরকির মত ঘুরে দাঁড়ায়। বলে, ‘আমি জানি আপনি আমাকে বকবেন। বকুন, বকুন, বকুন!’ বলে ফুফিয়ে কেঁদে উঠল ওগলালা।
আহমদ মুসা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ওগলালা এমন করে কেঁদে ফেলবে, আহমদ মুসা ভাবেনি। সে মনে করেছিল, ওগলালা রুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে সমর্থন করবে। কিন্তু হয়ে যায় তার উল্টো।
আহমদ মুসা ধীর কণ্ঠে ওগলালাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বোন, আমি তোমার মনের অবস্থা জানি। তুমি মেরী রোজকে সান ওয়াকারের বাগদত্তা বলে পরিচয় দিয়েছিলে, তখন খুশী হয়েছিলাম বাস্তবতাকে তোমার মেনে নেয়া দেখে। কিন্তু তুমি এভাবে মেরী রোজকে আঘাত করলে কেন? অথচ তুমি জান মেরী রোজ-এর কোন দোষ নেই।’
‘বুঝতে পারছি আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু ভাইয়া মনকে আমি ধরে রাখতে পারিনি। মাঝে মাঝেই মন বলে উঠে, আজকের শ্রেষ্ঠতম রেড ইন্ডিয়ান প্রতিভা সান ওয়াকারকে ধ্বংস করার জন্যেই মেরী রোজকে দিয়ে শ্বেতাংগরা ফাঁদ পেতেছে।’ বলেছিল ওগলালা কান্না ভেজা কণ্ঠে।
‘কিন্তু তুমি তো জান বোন, এটা সত্য নয়।’
‘জানি, কিন্তু মনকে বুঝাতে পারি না। সান ওয়াকারকে কেড়ে নিয়েছে ওরা।’
‘কিন্তু এর জন্যে না সান ওয়াকার, না মেরী রোজ দায়ী। সান ওয়াকার ও মেরী রোজ তোমার ব্যাপারটার কিছু জানতো না।’
‘ভাইয়া, আমি জানি দোষ আমার। সান ওয়াকার আমার আবাল্য সাথী। তাকে কিছু জানাবার আছে কোনদিনই ভাবিনি। ভাবলাম সেদিন, যেদিন সান ওয়াকার মেরী রোজ-এর হয়ে গেল এবং যেদিন আমার শূন্য বুক হাহাকার করে উঠল।’ বলে দু’হাতে মুখ ঢেকে ওগলালা বসে পড়েছিল। কাঁদছিল ওগলালা। কেঁপে কেঁপে উঠছিল তার দেহ।
আহমদ মুসা কি বলবে ভেবে পায় না। কি সান্ত্বনা দেবে তাকে।
বাকহারা মানুষের মত দাঁড়িয়ে থাকে আহমদ মুসা্
কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়েছিল ওগলালা। কান্না থেমে গিয়েছিল তার। রুমাল দিয়ে চোখ মুছে সে বলেছিল, ‘ভাইয়া, আর ভুল হবে না আমার। আর কোনদিন বকুনি দিতে হবে না আপনার বোনকে। আমি মেরী রোজ-এর কাছে মাফ চেয়ে নেব।’ খুব শান্ত কণ্ঠ ওগলালার।
আহমদ মুসার চোখ দুটিও ভিজে উঠেছিল। বলেছিল আহমদ মুসা ধীর কণ্ঠে; না বোন মেরী রোজকে এখন তুমি কিছুই বলো না। তোমার মনের অবস্থা যদি সামান্যও টের পেয়ে যায় সে, তাহলে সমস্যা জটিল হয়ে যাবে। কিছু বলার দরকার হলে বোনের পক্ষ থেকে আমিই বলব তাকে।’
‘ঠিক আছে ভাইয়া।’
‘ধন্যবাদ ওগলালা।’
‘এ ধন্যবাদ আপনারই প্রাপ্য।’
‘বুঝলাম না।’
‘ধৈর্য ধরা, সর্ব অবস্থায় মানুষকে সম্মান করা, নিজের অধিকারের সাথে সাথে অন্যের অধিকারকে সমান দৃষ্টিতে দেখার মত শিক্ষা এ কয়দিনে আপনার কাছ থেকে পেয়েছি।’
‘বল ইসলামের কাছ থেকে পেয়েছ।’
‘ঠিক ভাইয়া। আগে শুধু পৃথিবীর জীবন নিয়েই ভাবতাম। এখন মৃতু্য পরবর্তী জীবন নিয়েও ভাবি। বোধ হয় এ কারণেই আগের সেই জেদ আমার মধ্যে আর নেই।’
‘ধন্যবাদ বোন। ওদিকে একটু দেখি। আসি?’
‘ওকে, সালাম।’ বলেছিল ওগলালা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল চলার জন্যে। ঘুরে দাঁড়ায় আবার ওগলালার দিকে। বলে ‘ওয়া আলাইকুম সালাম।’
আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি। সালাম নেবার পর বলেছিল, ‘ইসলামের প্রতি তোমাদের আকর্ষণ বিষ্ময়কর। আমেরিকার এই গভীর অভ্যন্তরে এমন কিছু ঘটতে পারে তা আমার অকল্পনীয় ছিল।’
‘রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের নাকি একটা ইতিহাস আছে। ভাইয়া কি সেই ইতিহাস?’
আব্বা কি সব বলেছিলেন আমার মনে নেই।
‘আচ্ছা চলি ওগলালা’ বলে আহমদ মুসা আবার পা বাড়ায় যাবার জন্যে।
আহমদ মুসা সান ওয়াকারদের খুঁজতে খুঁজতে দক্ষিণের ব্যালকনিতে ঢোকার মুখেই মুখোমুখি হলো তাদের।
আহমদ মুসা সান ওয়াকার ও মেরী রোজ এর মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আমি মেরী রোজকেই খুঁজছিলাম। ভাল হলো তোমাদের দু’জনকে পেয়ে। এসো একটু বসি।’
আহমদ মুসা ঘরের সোফায় গিয়ে বসল।
ঘরটা বাড়ির অতিথিদের ব্যবহার্য ড্রইং রুম।
সান ওয়াকার এবং মেরী রোজও আহমদ মুসার সামনের সোফায় পাশাপাশি বসল।
আহমদ মুসার ঠোঁটে আপনাতেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘সান ওয়াকার ও মেরী রোজকে লক্ষ্য করে, তোমাদের দু’জনের মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে তোমাদের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।’
দু’জনের মুখই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। দু’জনেই মুখ নিচু করল। কিছু বলল না।
‘এই বিষয়েই তোমাকে কয়েকটা কথা বলব মেরী রোজ’। বলল আহমদ মুসাই গম্ভীর কণ্ঠে।
‘বলুন ভাইয়া’।
‘ওগলালা ঐ কথাটা তোমাকে আহত করার জন্যে বলেছে বলে তুমি মনে করনি তো?’
‘প্রথমটায় তাই মনে করেছিলাম। পরে বুঝেছি, অবস্থার চাপ থেকেই ওগলালা ঐ কথা বলেছে এবং তা যুক্তিসংগত।’
‘ধন্যবাদ মেরী রোজ। আমি এখনি ওগলালার সাথে কথা বললাম। সে খুব অনুতপ্ত ও লজ্জিত। প্রত্যেক রেড ইন্ডিয়ানের মত সেও সান ওয়াকারের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেই তৎক্ষণিক আবেগ থেকে ঐভাবে কথা বলেছে’।
‘বুঝেছি ভাইয়া। আমি ওগলালার সাথে এ নিয়ে কথা বলব। আমি রেড ইন্ডিয়ান হলে আমার সেন্টিমেন্টোও তার মতই হতো।’
‘ধন্যবাদ, মেরী রোজ। তোমরা বস। আমি উঠি, কাজ আছে।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল চলে যাবার জন্যে।
ঘরে এসে প্রবেশ করল প্রফেসর আরাপাহো। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘সুখবর আহমদ মুসা। তোমার আর যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হলো না। সান ওয়াকারের গোটা পরিবার এসে হাজির হয়েছে।’
একটু হাসল। তারপর বলল সান ওয়াকারকে লক্ষ্য করে, ‘আমি ওদের বসিয়েছি। যাও তোমরা ওদিকে ওগলালা গেছে।’
পরে আবার আহমদ মুসাকে বলল, ‘আজও আমার ইনষ্টিটিউটে তোমার যাওয়া হলো না। ঠিক আছে। আরেকদিন যাবে। আমি চলি। টেলিফোন পেয়েছি, একটু আগেই, আজ অফিসে যেতে হচ্ছে।’
বলে প্রফেসর আরাপাহো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
প্রফেসর আরাপাহো বেরিয়ে যেতেই সান ওয়াকার বলল, ‘চলুন ভাইয়া, খুব খুশী হবেন তারা আপনাকে পেলে। সব কথা তারা জানেন।’
‘আমার নামও?’
‘না ভাইয়া নাম বলিনি। প্রকৃত পরিচয়ও দেয়নি’।
‘ঠিক আছে চল। কিন্তু শুধু আমাকে বলছ কেন? মেরী রোজকে না বেশি পরিচয় করিয়ে দেয়া দরকার।’
‘ওর সাথে পরিচয় হয়ে গেছে।’
‘আসল পরিচয়?’
মুখ লাল হয়ে উঠল সান ওয়াকারের। বলল, ‘আসল পরিচয় বলতে হয়নি, তাঁরা বলার আগেই বুঝেছেন’।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
সান ওয়াকার এবং মেরী রোজও।

প্রফেসর আরাপাহোর ড্রইং রুম জমজমাট।
সান ওয়াকারের আম্মা আব্বা পাশাপাশি বসেছে। তাদের পাশে বসেছে মেরী রোজ।
তাদের মুখোমুখি আরেক সোফায় বসেছে আহমদ মুসা। তার পাশে সান ওয়াকার।
অন্যদিকে পাশাপাশি সোফায় বসেছে জিভারো এবং শিলা সুসান।
ওগলালা মেহমাদারীতে ব্যস্ত।
সে স্থির হয়ে বসতে পারেনি। সে উঠে যাচ্ছে আবার এসে বসছে।
কথা বলছিল সান ওয়াকারের আব্বা শাম ওয়াকার।
হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে কথা বলছিল তিনি। তার ডান হাতটা রাখা ছিল হাঁটুর উপর।
তার হাতের অনামিকায় পরা আংটির উপর নজর পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার মনে হল সোনার আংটির উপর ক্যালিওগ্রাফিক ষ্টাইলে আরবী হরফ।
কৌতুহল সৃষ্টি হলেো আহমদ মুসার মনে। বলল সান ওয়াকারের আব্বা শাম ওয়াকারকে, ‘জনাব আমি কি আপনার আংটি দেখতে পারি?’
‘অবশই বেটা’ বলে শাম ওয়াকার তার ডান হাতের অনামিকা থেকে আংটি খুলে আহমদ মুসার হাতে দিল।
আহমদ মুসা দেখল আংটিটি। ঠিক আংটির উপর ক্যালিওগ্রাফিক ষ্টাইলে আরবী বর্ণ উৎকীর্ণ। আরও বিস্মিত হলো যখন দেখল ক্যালিওগ্রাফিক হরফে আল্লাহ শব্দ লেখা।
আহমদ মুসা ভাবল, নিশ্চয় ষ্টাইল হিসেবে এটা আংটিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘আংটি কোথেকে কিনেছেন?’
‘কেনা নয়তো। তৈরি করা।’ বলল সান ওয়াকারের আব্বা শাম ওয়াকার।
‘আপনি তৈরি করে নিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ আমি তৈরি করে নিয়েছি। আব্বার হাতে এ ধরনের আংটি ছিল। দাদার হাতেও দেখেছি। এটা আমাদের বংশের মঙ্গল আংটি’।
‘এ ডিজাইনটা কোথায় পেলেন? ডিজাইনে যে লেখা আছে তাকি আপনি ঠিক করে দিয়েছিলেন?’
‘ওঠা লেখা নয়, মঙ্গল চিহ্ণ। আব্বা ও দাদার আংটিতেও এটা ছিল। এ মঙ্গল চিহ্ণ পরিবারের কর্তা ব্যক্তির হাতে থাকলে পরিবার অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। কোন রোগ ঔষধে না সারলে এ মঙ্গল চিহ্ণের আংটি ধুয়ে পানি খাওয়ালে সে ভাল হয়ে যায়’।
ভ্রুকুচকে গেল আহমদ মুসার। হঠাৎ তার মনে পড়ল ওগলালার কিছুক্ষণ আগের কথা যে, রেড ইণ্ডিয়ানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের একটা ইতিহাস আছে। আরবী আল্লাহ শব্দ এরা পেল কোথায়? পুরুষানুক্রমে ‘আল্লাহ’ শব্দকে ওরা মঙ্গলের প্রতীক বলে মনে করছে কেন? এই ধরনের বিশ্বাস গড়ে ওঠে ঐতিহ্য থেকে? আল্লাহ শব্দের সাথে তাদের ঐতিহ্যিক যোগসূত্র কোথায়?
ভাবতে গিয়ে আহমদ মুসা একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল।
প্রশ্ন করল শাম ওয়াকারই ‘কি ভাবছ? বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা? খৃষ্টানরা এবং রেড ইণ্ডিয়ানদেরও অনেকে এটা বিশ্বাস করে না’।
‘অবিশ্বাস নয় জনাব আমি ভাবছি অন্য কথা। আপনাদের ঈশ্বরকে আপনারা কি বলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘বিভিন্ন গোত্র বিভিন্ন সিম্বল ও অনুষ্ঠানকে ঈশ্বরের ক্ষমতার সাথে যুক্ত করে। আসলে আমাদের ঈশ্বর একটি অদৃশ্য শক্তি। উপবাস অবস্থায় ধ্যানকালে তাকে দেখা যায়’। বলল শাম ওয়াকার।
আহমদ মুসা আংটির ক্যালিওগ্রাফি দেখিয়ে বলল, ‘এটা কোন চিহ্ণ নয়, এটা সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা ‘ঈশ্বর’-এর নাম’।
আহমদ মুসা এ কথা বলার সাথে সাথে সান ওয়াকারের আব্বা শাম ওয়াকার সোজা হয়ে বসল। তার চোখে-মুখে কৌতুহল ও বিস্ময়। একটু ভেবে নেবার পর বলল, ‘কি ভাষায় লেখা? আমরা কেউ বুঝতে পারিনি’।
‘আরবী ভাষায় লেখা’।
‘ভাষার নাম শুনেছি। কোথাকার যেন ভাষা?’
‘মধ্য প্রাচ্যের আরব দেশ ও আরব জাতির ভাষা’।
‘ঈশ্বরের কি নাম লেখা আছে?’
‘আল্লাহ’।
‘আল্লাহ? আল্লাহ… আল্লাহ….. হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ওয়াশিংটনে গিয়ে মিনারওয়ালা এক বাড়ি থেকে খুব মধুর আওয়াজে উপাসনার ডাক শুনেছিলাম। সে ডাকে ‘আল্লাহ’ শব্দ ছিল। এ নাম আরবী ভাষায় লেখা কেন?’
‘আপনি ওয়াশিংটনে উপাসনার জন্যে খুব মধুর যে ডাক শুনেছিলেন, সেটা ছিল আরবী ভাষায়। গোটা দুনিয়ার মুসলমানরা তাদের উপাসনায় আরবী ভাষা ব্যবহার করে’।
‘কারণ?’
‘মধ্য প্রাচ্যের আরব দেশে ‘মুহাম্মাদ’ (স.) নামে একজন ‘প্রফেট’ জন্মগ্রহণ করেন ৫৭০ খৃষ্টাব্দে। তিনিই স্রষ্টা প্রেরিত সর্বশেষ নবী। যেহেতু তিনি আরবী ভাষী, তাই তাঁর ভাষাতেই সর্বশেষ ঐশ্বরিক গ্রন্থ হিসেবে ‘আল কোরআন’ নাজিল হয়। এই ঐশ্বরিক গ্রন্থে স্রষ্টা তার নাম ‘আল্লাহ’ বলেছেন। গোটা দুনিয়ায় ঈশ্বর বা স্রষ্টার যত নাম মানুষ ব্যবহার করে তার মধ্যে মাত্র এই নামই মৌলিক। গোটা দুনিয়ার মুসলমান স্রষ্টাকে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকে এবং আল কোরআনের ভাষা আরবীকে উপাসনার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে’। আহমদ মুসা থামল।
শাম ওয়াকার কোন কথা বলল না। ভাবছিল সে। তার কপাল কুঞ্চিত।
আহমদ মুসাই কথা বলল। বলল সে, ‘আমি ভাবছি বংশ পরম্পরায় আপনাদের আংটিতে ‘আল্লাহ’ নাম এবং আরবী অক্ষর এল কি কর?’
‘শুধু আংটিতে নয় বৎস। আমাদের বাড়ির সংরক্ষিত রেকর্ডে এমন কিছু কাপড় ও কাগজপত্র ছিল যাতে কিছু দুর্বোধ্য ভাষা লিখিত ছিল দেখেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য ‘ওল্ডেড নী ক্রিক’-এর যুদ্ধে আমরা সব হারিয়েছি। তখন আমরা বাস করতাম সাউথ ডাকোটায়। ইউরোপীয়রা তখন ঐ অঞ্চল দখলের যুদ্ধে লিপ্ত। ওদের সাথে আমাদের শেষ যুদ্ধ হয় ‘ওল্ডেড নী ক্রিক’-এ। যুদ্ধে আমাদের ব্ল্যাক ফুট ইণ্ডিয়ানসহ কয়েকটা রেড ইণ্ডিয়ান গোত্র দু’শ মানুষসহ বাড়িঘর সব হারাই। সেই সাথে হারিয়ে যায় আমাদের পারিবারিক ঐসব রেকর্ড। তবে মহামূল্যবান একটা রেকর্ড আমাদের কাছে আছে। যুদ্ধে যাবার সময় আমার পূর্ব পুরুষ ছোট বাক্সে রাখা ঐ জিনিসটি সাথে নিয়েছিলেন। আমি দাদার কাছে শুনেছি, ঐ পবিত্র বাক্সটা কাছে ছিল বলেই তার আব্বা যুদ্ধে বেঁচে যান। তার আশেপাশে সবাই নিহত হয়। সারা জীবন দাদা আপসোস করেছেন এই বলে যে, তিনি যদি পবিত্র বাক্সটা বাড়িতে রেখে আসতেন, তাহলে তিনি হয়তো মরতেন, কিন্তু রক্ষা পেত তাঁর পরিবার। কিন্তু তাঁর বৃদ্ধ আব্বা ছেলের নিরাপত্তার জন্যেই বাক্সটি আব্বার দাদার সাথে দিয়েছিলেন। বাক্সটি আমাদের বাড়িতে এখনও আছে। এটা আমাদের পরিবারের নিরাপত্তার প্রতীক’।
‘আপনার সাউথ ডাকোটা থেকে ইলিনয়-এর কাহোকিয়াতে কবে এলেন?’
ঐ যুদ্বের পরেই দাদা সহায়-সম্পদ বাড়িঘর পরিবার সব হারিয়ে মিসিসিপি ধরে চলে আসেন এই কাহোকিয়াতে’।
‘ঐ বাক্সে কি আছে?’
‘একটি কাল ভেলভেট কাপড়। তাতে সোনালী লেকা’।
‘কি লেখা আছে?’
‘আমি জানি না। দাদার কাছে শুনেছি, কাপড়ে ঈশ্বরের ঘরের দোয়া আছে এবং কাপড়ের কথাও ঈশ্বরের।’
‘লেকা কাউকে পড়তে দেননি?’
‘কাউকে দেখানো হয়নি।’
‘আমি দেখতে পারি?’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না শাম ওয়াকার। একটু ভেবে বলল, ‘তোমার সম্পর্কে সান ওয়াকার, বিশেষ করে শিলা সুসানের কাছ থেকে অনেক কিছু শুনেছি, তুমি পরোপকারী ও পবিত্র মানুষ। তুমি নাকি দিনে পাঁচবার ঈশ্বরের উপসনা কর। তাছাড়া তুমি আংটির পাঠোদ্ধার করেছ। আংটিটাও ঐ বাক্সের মতই আমাদের কাছে পবিত্র। সুতরাং বাক্স আমি অবশ্যই তোমাকে দেখাতে পারি এবং তা এখনি পারি।’
‘এখনি?’ উজ্জ্বল চোখে বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা ইতিমধ্যেই ভেবে নিয়েছে এই পরিবার বা এদের গোত্রের অতীতের সাথে মুসলমানদের কোন একটা সম্পর্ক রয়েছে।
‘হ্যাঁ, এখনি। আমার দাদার ঐতিহ্যের অনুসরণে আমরা যেখানেই যাই বাক্সটা সাথে রাখি। ওটাকে আমরা মনে করি আমাদের নিরাপত্তার ধর্ম।’
বলতে বলতেই শাম ওয়াকার তার জামার তলা থেকে তার বগলের নিচে ঝুলানো ছাত্রদের ইনষ্ট্রমেন্ট বক্সের মত একটা আয়তাকার বাক্স বের করে আনল। সুন্দর কাজ করা কাঠের বাক্স।
সামনের টিপয় টেবিলের উপর রুমাল বিছিয়ে তার বাক্সটি রাখল শাম ওয়াকার।
বাক্সে ডিজিটাল কম্বিনেশন লক। শাম ওয়াকার ডিজিটগুলো ঘুরিয়ে বাক্সের তালা খুলল।
ঘরের অন্য সবাই এতক্ষণ তন্ময় হয়ে শুনছিল আহমদ মুসা এবং সান ওয়াকারের আব্বার কথা।
সান ওয়াকারের আব্বা শাম ওয়াকার বাক্সের তালা খুলতে শুরু করলে সবাই এগিয়ে এসে বাক্সের চারদিক ঘিরে দাঁড়াল। উম্মুখ সবাই।
বাক্সের ডালা খুরতেই চোখে পড়ল চোখ ধাঁধানো কালো রঙের সুন্দর ভাজকরা ভেলভেট কাপড়।
সবার চোখ আছড়ে পড়েছে কাপড়টির উপর।
আহমদ মুসা দু’হাত দিয়ে ধরে ধীরে ধীরে কাপড়টি তুলল। মেলে ধরল টেবিলের উপর। ঘন কাল কাপড়ের উপর সোনালী রঙের লেখা অপরূপ লাগছে দেখতে।
আহমদ মুসার নজর কাপড় ও লেখার উপর পড়তেই বুঝতে বাঁকি রইল না, কাপড়টি কাবা শরীফের গেলাফের অংশ। কাপড়ের লেখা গেলাফে লিখিত আল কোরআনের কাবাঘর সংক্রান্ত আয়াতের অংশ। কাপড়টি যেহেতু একটা খণ্ড, তাই আয়াতের কতকগুলোর শব্দই মাত্র এখানে রয়েছে। পড়ল আহমদ মুসা লেখাগুলো আয়াতগুলোর সাথে মিলিয়ে।
দেখা ও পড়ার সাথে সাথে অপার বিস্ময় ও কৌতূহল এসে আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল। কাবার গেলাফের অংশ শত বছর কিংবা তারও আগের রেড ইণ্ডিয়ানদের বাক্সে আসবে কি করে?
আহমদ মুসার কপাল কুঞ্চিত হল।
তার মুখ ন্যস্ত হয়েছে তার দু’হাতে।
গালে হাত দিয়ে বসার মত গভীর চিন্তায় নিমগ্ন আহমদ মুসা।
ঘরের সবার দৃষ্টি হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল বাক্সের কাপড়ের উপর। এখন সবার দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হয়েছে আহমদ মুসার উপর। আংটির মতই অশ্রুতপূর্ব কিছু কথা তারা আশা করে বাক্সের পবিত্র কাপড় সম্পর্কে।
‘কি ভাবছ তুমি বাছা, বুঝলে কিছু?’ চিন্তামগ্ন আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল শাম ওয়াকার।
‘আমি ভাবছি, বিস্মিত হচ্ছি এই জিনিস আপনার এখানে আসল কি করে?’
‘চিনতে পেরেছ? বুঝতে পেরেছ?’ শাম ওয়াকার বলল।
‘আরবের যে ‘প্রফেট’-এর কথা এখনি বললাম, সেই নবী জন্মগ্রহণ করেন যে পবিত্র নগরীতে তার নাম মক্কা। এটাই প্রথিবীর প্রথম নগরী। এই নগরীতে প্রথিবীর আদি মানুষ হযরত আদম (আঃ) পৃথিবীর আদি উপাসনা গৃহ হিসাবে আল্লাহর ঘর কা’বা নির্মাণ করেন। আল্লাহর এই ঘর এখনও বর্তমান। এই ঘরেরই গেলাফের অংশ এটা’।
আহমদ মুসার এই কথা একটা তড়িৎ প্রবাহের মত কাজ করল গোটা ঘরে সকলের মধ্যে।
সবাই হঠাৎ নড়ে উঠল। সোজা হয়ে বসল। সকলের বিস্ফারিত চোখ গেলাফ খণ্ডের উপর নিবদ্ধ।
শাম ওয়াকারের চোখ-মুখ ভয়, বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় অপরূপ আকার ধারণ করেছে। হঠাৎ আভূমি নত হয়ে তার মাথা গেলাফ ষ্পর্শ করল।
তারপর মাথা তুলে মুখ উর্ধ্বমুখী করে বলল, ‘মহান ঈশ্বর, আমাদের সৌভাগ্যের জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ’।
‘জনাব একটা কথা বলি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই বাবা’।
‘যে কাবার এই গেলাফ, সেই কাবা’র মালিক যে আল্লাহ, সিজদা শুধু তাঁরই প্রাপ্য, এই গেলাফের নয়’।
‘তোমার অত যুক্তির কথা আমি বুঝি না। ঈশ্বর মানে তোমার ‘আল্লাহ’ অদৃশ্য, তাঁর দৃশ্যমান প্রতিনিধি আমাদের কাছে এই গেলাফ’।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বুঝিয়ে বললেই বুঝবেন, এ নিয়ে পরে কথা হবে। এখন বলুন, আদি মানুষ আদমের তৈরি আদি উপাসনাগৃহ আল্লাহর ঘর-এর এই গেলাফ আপনাদের কাছে কিভাবে এল?’
‘নিশ্চয় আল্লাহই আমাদের দান করেছেন। কিন্তু বল, চিনতে পারলে কেমন করে যে এটা আল্লাহর কা’বার গেলাফ?’
‘ঐ পবিত্র নগরীতে জন্মগ্রহণকারী সমগ্র জগতের জন্যে প্রেরিত সর্বশেষ প্রফেট মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর যে ঐশ্বরিক গ্রন্থ আল কোরআন নাজিল হয়, সেই পবিত্র গ্রন্থের আল্লাহর বণী এই গেলাফে লেখা আছে’।
‘কেমন করে বুঝলে?’
‘এই গেলাফ খণ্ডটি কাবা ঘরের বিশাল গেলাফের একটা অংশ। গোটা গেলাফে আল্লাহর যে বাণী লিখিত আছে, তার মাত্র কয়েকটা শব্দ এই গেলাফ খণ্ডে আছে। আল্লাহর সেই গোটা বাণীই আমার মুখস্থ আছে। সুতরাং দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি’।
‘মুখস্থ আছে তোমার?’ বিষ্ফারিত চোখে জিজ্ঞেস করল শাম ওয়াকার।
‘জ্বি, মুখস্থ আছে’।
‘শুনতে পারি আমরা?’
‘অবশ্যই। তাহলে একটু বসুন। আমি আমার মুখ হাত মাথা পবিত্র করে আসি’।
বলে আহমদ মুসা তোয়ালে নিয়ে টয়লেটে ঢুকল এবং অজু করে মুখ হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল।
বসল আহমদ মুসা তার জায়গায়। বলল, ‘মানুষের জন্যে প্রেরিত আল্লাহর সর্বশেষ বাণীর গ্রন্থ আল কোরআনে মোট ৬৬৬৬ আয়াত বা পংক্তি রয়েছে। ২৩ বছর ধরে এই পংক্তিগুলো আল্লাহর তরফ থেকে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর নাজিল হয়। কোরআন নাজিল শুরু হয় ৬১০ খৃষ্টাব্দে, শেষ হয় ৬৩৩ খৃষ্টাব্দে এবং এ বছরই প্রফেট মুহাম্মাদ (সঃ) ইন্তেকাল করেন। কোরআনের পংক্তিগুলো নাজিল হওয়ার সংগে সংগে প্রফেটের শত শত অনুসারীরা তা মুখস্থ করে ফেলত এবং তা লিখেও রাখা হতো’।
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, কোরআন শরীফের যে আয়াতের অংশ এই গেলাফের লেখাগুলো, আমি এখন সে আয়াত পাঠ করছি’।
বলে আহমদ মুসা আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পাঠ করল এবং পড়তে লাগল।
“বল, আল্লাহ সত্য বিবৃত করেন। সত্যপন্থী ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরণ কর। মানুষের জন্যে যে প্রথম উপাসনা গৃহটি নির্মিত হয় তা মক্কায়। বরকতপূর্ণ এ গ্রন্থ এবং মানব জাতির জন্যে পথ প্রদর্শনের এ কেন্দ্রভুমি। এখানে রয়েছে সুষ্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং ইব্রাহিমের উপাসনার স্থান। যে এখানে প্রবেশ করে সে লাভ করে নিরাপত্তা। মানুষের মধ্যে যারা যেখানে পৌঁছার সামর্থ রাখে, তারা যেন এ গৃহে হজ্জ সম্পন্ন করে এবং এটা তাদের উপর আল্লাহর অধিকার। কেউ এটা অস্বীকার করলে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন”।
আহমদ মুসার মধুর স্বরে কোরআন তেলাওয়াত যেন সম্মোহিত করল ঘরের সবাইকে। ভয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা, বিস্ময় সকলের চোখে।
তেলাওয়াত শেষ হলে অভিভূত কণ্ঠে শাম ওয়াকার বলল, ‘আরবী ভাষা এত সুন্দর, আল্লাহর বাণী এত মধুর! এর অর্থ কি জানতে পারি?’
আহমদ মুসা অর্থ বলল।
অর্থ শুনে বিস্মিত চমৎকৃত শাম ওয়াকার বলল, ‘ইব্রাহিম কি ‘আব্রাহাম’?
‘জ্বি, হ্যাঁ’।
‘তার ধর্ম অনুসরণ করার অর্থ? প্রফেট মুহাম্মাদের ধর্ম তাহলে কি?’
‘আব্রাহাম-এর ধর্মই মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ধর্ম’।
একটু ভাবল শাম ওয়াকার্ বলল, ‘মক্কার কা’বা ঘরে মানে আল্লাহর ঐ ঘরে আব্রাহামও উপাসনা করেছেন?’
‘শুধু উপাসনা নয়, তিনি এবং তার ছেলে ইসমাঈল কা’বা ঘর পুননির্মান করেন’।
‘পুননির্মাণ কেন?’
‘আদি মানুষ হযরত আদমের তৈরি আল্লাহর কা’বা নূহের প্লাবনের সময় নষ্ট হয়ে যায়। এই নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘরই হযরত ইব্রাহিম পুননির্মাণ করেন’।
আবার ভাবল শাম ওয়াকার কিছুক্ষণ।
ঘরের অন্য সবাই নীরব। তারা তাদের সমস্ত আগ্রহ নিয়ে শুনছে দু’জনের কথোপকথন।
কিছুক্ষণ পর মখ খুলল শাম ওয়াকার। বলল, ‘পবিত্র ঐশীগ্রন্থের ঐ আয়াতে বলা হয়েছে, সামর্থ থাকলে সবাইকে ঐ ঘরে হজ্জ করতে হবে? হজ্জ কি?
‘হজ্জ একটি ইবাদত। কাবা এবং কাবা সন্নিহিত কতিপয় স্থানে কিছু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে এটা করতে হয়’।
‘মানুষ কি যায়?’
‘প্রফেট মুহাম্মাদ (সঃ) প্রচারিত ধর্ম যারা গ্রহণ করেছেন, তারা যান’।
‘আমরাও কি তার ধর্মের অনুসারী? না হলে কাবার গেলাফ আমাদের হাতে কেন?’
‘এটা আমারও প্রশ্ন’।
‘আমাদের পূর্ব পুরুষদের কারও সাথে নিশ্চয় ইসলামের সংযোগ এবং সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল’। বলল সান ওয়াকার দীর্ঘ মৌনতা ভেঙে।
‘আচ্ছা একটা প্রশ্ন, ‘শাম’ ‘ওয়াকার’ এই সব শব্দগুলো কি রেড ইণ্ডিয়ান? অর্থ কি এসব শব্দের?’
‘শব্দগুলো রেড ইণ্ডিয়ান নয়। অর্থও আমাদের জানা নেই’। বলল শাম ওয়াকার।
‘এই শব্দগুলো আরবী ভাষায় আছে’।
‘আরবী ভাষায়? বলছ কি তুমি? বলত অর্থ কি?’
‘ওয়াকার অর্থ মর্যাদা, সম্মান, সহনশীলতা, ইত্যাদি। আর ‘শাম’ শব্দ আসলে শামস। শামস অর্থ সুর্য। তাহলে শামস ওয়াকার-এর মোটামুটি অর্থ দাঁড়াল মর্যাদাবান সূর্য। আর…..’।
আহমদ মুসাকে থামিয়ে শাম ওয়াকার বলল, ‘আমার নাম আরবী এবং আমাদের বাড়িতে কা’বার গেলাফ্ এর অর্থ কি?’ বিস্ময় বিমূঢ় কণ্ঠ শাম ওয়াকারের।
‘আপনারা ভাগ্যবান আংকেল। খুঁজতে গেলে আপনাদের শিকড় নিশ্চয় আমাদের মেহমান ভাইয়ের সাথে জুড়ে যাবে। আমাদের এই সৌভাগ্য নেই, তাই আগে-ভাগেই আমরা মেহমান ভাইয়ের ধর্ম গ্রহণ করে বসে আছি’। বলল ওগলালা।
‘প্রফেসরসহ তোমরা সবাই?’
‘জ্বি আংকেল’।
‘তাহলে তো আমরা মুসলমান আছিই’।
‘কিন্তু মেরী রোজ?’ টিপ্পনি কেটে বলল ওগলালা।
‘বর্ণবাদের বেড়া ডিঙানোর সাথে সাথে তাহলে আমি বলব, ‘আমি ধর্মের বেড়াও ডিঙিয়েছি’।
‘তবে ইসলাম ধর্মের খাতিরে নয়’। একটা খোঁচা দিল ওগলালা মেরী রোজকে।
‘ঠিক ওগলালা, এক্ষেত্রে আমি তোমার অনেক পেছনে’। চট করে জবাব দিল মেরী রোজ।
ওগলালা চোখ ঘুরিয়ে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘সত্যি কথা, মুসলমান হওয়ার জন্যে আরও অনেক কিছু তোমাদের করতে হবে। মুসলিম অর্থ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত মানুষ। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার মাধ্যমে যে গুণ ও চরিত্র অর্জিত হয়, তা-ই মানুষকে মুসলমান বানায়, আল্লাহর মাধ্যমেই ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করায়’।
‘সে গুণগুলো কি বৎস?’ বলল শাম ওয়াকার।
‘ধীরে ধীরে সবই জানতে পারবেন। বলব সব। কিন্তু এখন বলুন এই ‘মিরাকল’-এর তাৎপর্য কি? এই কাবার গেলাফ এবং আপনাদের অতীতটা কি?’
শাম ওয়াকার মাথা নিচু করল। বলল, ‘এই প্রশ্ন আমাকেও অস্থির করে তুলেছে বেটা।’
‘আব্বা সম্ভবত কিছু সাহায্য করতে পারবেন।’ বলল ওগলালা।
‘হ্যাঁ উনি আমেরিকা এবং রেড ইণ্ডিয়ানদের ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। তিনি অনেক কিছুই জানেন।’ বলল শাম ওয়াকার।
‘আমার মনে হয় আংকেলদের অতীত আবিষ্কার হলো, তার উপর একটা সেলিব্রেশন হওয়া উচিত’। বলল জিভারো, ওগলালার ভাই।
‘আমি সমর্থন করি। তবে সেটা আবিষ্কার পুরো হবার পর। কিন্তু তার আগে তুমি এবং শিলা সুসান যে পরষ্পরকে আবিষ্কার করেছ তার উপর একটা সিলেব্রেশন হতে পারে। বলল ওগলালা।
জিভারো এবং শিলা সুসান দু’জনেই যেন অজান্তেই পরষ্পরের দিকে তাকাল। তারা বিব্রত ও তাদের মুখ লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়।
জিভারো চোখ রাঙিয়ে তাকাল ওগলালার দিকে।
‘আমি ওগলালাকে সমর্থন করছি। আমি মনে করছি এটাও একটা বড় খবর।’ মেরী রোজ বলল।
‘দেখ মেরী রোজ, তুমি কথা বলো না। তুমি একেবারে কাঁচের ঘরে। তুমি যে অনেককে হারিয়ে দিয়ে ‘গোল্ড কাপ’ জয় করেছ তার সিলেব্রেশন কবে?’
মেরী রোজ এবং সান ওয়াকার দু’জনেই চকিত দৃষ্টিতে একবার শাম ওয়াকারের দিকে তাকাল। সান ওয়াকার মুখ নিচু করেছে। আর মেরী রোজ কটমট করে তাকিয়েছে শিলা সুসান-এর দিকে।
শিলা সুসান-এর কথার পর একটা নীরবতা নেমে এল। নীরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমরা লাফ দিয়ে একেবারে ইতিহাস থেকে বর্তমানে চলে এসেছ। আমিও মনে করি, বর্তমানই প্রথম বিবেচ্য। তোমাদের সিলেব্রেশনের প্রস্তাব আমি সমর্থন করছি। এখানে দুই মুরুব্বী, সান ওয়াকারের আব্বা ও আম্মা, হাজির আছেন। প্রফেসর সাহেব এলে এঁদের সবার সাথে আমি এ বিষয় নিয়ে আলাপ করবো। আমাদের ধর্ম ইসলাম দুই জীবনকে জোড়ার কাজ ঝুলিয়ে না রাখার পক্ষপাতি।’
সান ওয়াকারের আব্বা এবং আম্মা মুখ টিপে হাসছিল। বলল সান ওয়াকারের মা, ‘ওগলালাকে আর বাদ রাখছ কেন বেটা। তারও জোড়া তো এখানে হাজির….।’
আহমদ মুসা সান ওয়াকারের আম্মাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, ‘ওগলালা আমার বোন তো! ওর ব্যাপারটা আমাকে বিশেষভাবে দেখতে হবে।’
‘ও তাই? সেটা তো আরও ভাল বাছা’। বলল সান ওয়াকারের মা।
আহমদ মুসা যখন কথা বলছিল, তখনই উঠে গেছে জিভারো ও শিলা সুসান। সান ওয়াকারের মা কথা শুরু করলে উঠে যায় সান ওয়াকার ও মেরী রোজ।
সান ওয়াকারের মা থামতেই ওগলালা আহমদ মুসাকে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া। তবে আমার ব্যাপারটা বিশেষ ভাবে দেখার দরকার নেই। সবাইকেই মেরী রোজ আর শিলা সুসান হতে হবে তা ঠিক নয়’। আবেগ ভরা গম্ভীর কণ্ঠ ওগলালার।
বলেই ওগলালা ছুটে পালাল ঘর থেকে।
সেদিকে তাকিয়ে সান ওয়াকারের মা বলল, ‘খুব ভাল মেয়ে ওগলালা। ছোট বেলা থেকে দেখছি। একেবারে কাগজের মত সাদা মন।’
‘ঠিক বলেছেন খালাম্মা। তবে এর জীবনের চলার পথে বেশি বেশি আহত হয়। এরা পৃথিবীকে নিজের মত দেখে কিন্তু পৃথিবী তেমন নয়। তাই ঠকে এরা পদে পদে।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল সান ওয়াকারের আম্মা। যেমন গিয়েছিল তেমনি ছুটে এসে ড্রইং-এ ঢুকল ওগলালা। ঢুকেই ঝড়ের মত বলল, ‘আসুন টেবলি চা রেডি। আমি ওদেরও ডাকছি।’
বলেই ঝড়ের মত আবার বেরিয়ে গেল।
সান ওয়াকারের মা’র মুখে স্নেহের হাসি। সে উঠল।
সান ওয়াকারের আব্বা এবং আহমদ মুসাও উঠল্।