২৮. আমেরিকার এক অন্ধকারে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

অবিরাম কেঁদে চলছে লায়লা জেনিফার।
ডাঃ মার্গারেট বলল, ‘এভাবে কাঁদলে মরার আগেই মরে যাবে জেনিফার। মৃত্যু অবধারিত একটি বিষয়। সুতরাং ভয় কিসের? কাঁদবে কেন?’
‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না আপা। ইতোমধ্যে যদি ওরা আমাকে মেরে ফেলত, তাহলে খুশী হতাম’।
‘তাহলে আর ভয় কিসের? এত কাঁদছ কেন?’
লায়লা জেনিফার মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিছু বলার জন্যে। দরজায় শব্দ শুনে থেমে গেল সে। দরজা খোলার শব্দ হলো।
ভয়ে মরার মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল জেনিফারের মুখ। সে ডাঃ মার্গারেটের পা ঘেঁষে বসল।
ডাঃ মার্গারেট জেনিফারের পিঠে সান্ত্বনাসূচক একটা হাত রাখল।
দরজা খুলে গেল। খাবারের ট্রলি ঠেলে প্রবেশ করল একজন। তার পেছনে আরেকজন। তার কোমরে রিভলবার ঝুলানো। হাতে একটা ওয়াকিটকি। সুবেশধারী লোকটি।
লোকটি চকচকে চোখে লায়লা জেনিফার ও ডাঃ মার্গারেটের দিকে তাকাল। লায়লা জেনিফারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বিনা কারণে কাঁদলে, কারণের সময় কাঁদার জন্যে চোখে পানি পাবেন কোথায়?’
ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফার কোনো কথা বলল না। মুখও তুলল না তারা। তাদের, বিশেষ করে লায়লা জেনিফারের অবস্থা আড়ষ্ট।
বলল লোকটাই আবার, ‘খুব তো ভয় দেখছি। আহমদ মুসার সংস্পর্শে যারা আসে, তাদের তো এমন ভয় থাকার কথা নয়। ভয়ংকর আহমদ মুসার পাল্লায় পড়েছিলেন আপনারা কেমন করে?’
ডাঃ মার্গারেট চকিতের জন্যে একবার মুখ তুলল। কিন্তু দু’জনের কেউই কোন উত্তর দিল না। কি বলবে তারা? আহমদ মুসা তো ভয়ংকর নয়, আল্লাহ তো তাকে ত্রাণকর্তা হিসেবে পাঠিয়েছেন। কিন্তু একথা তো বলা যাবে না। সুতরাং কিছু না বলাই ভালো।
ক্রোধে লোকটির মুখ লাল হয়ে উঠল। বলল সে চিৎকার করে, ‘কথা বলতে হবে। যাক না পনেরটা দিন। বসের নির্দেশ পনের দিন গায়ে হাত দেয়া যাবেনা। পনের দিনের মধ্যে যদি আহমদ মুসা আত্মসমর্পন না করে, তাহলে তোমরা আমাদের। তোমাদেরকে আমাদের হাতে তুলে দেবেন বস গণ-উৎসব করার জন্যে’।
ট্রলি ঠেলে নিয়ে আসা লোকটি খাবার নামিয়ে রেখেছে মেঝেতে। ট্রলি ঠেলে সে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে।
লোকটি কথা শেষ করেই ঘুরে দাঁড়াল ঘর থেকে বেরুবার জন্যে। যাবার জন্যে পা তুলে একটু মুখ ঘুরিয়ে লোভাতুর দৃষ্টি ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘কয়দিন খেয়ে-দেয়ে তৈরী হয়ে নাও ডার্লিং’।
বেরিয়ে গেল লোকটি। দরজা বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই।
লোকটি কি বলছে বুঝতে বাকি ছিল না কারোরই। কাঁপছিল লায়লা জেনিফার।
ডাঃ মার্গারেটের চোখেও আতংকের ছায়া। তবু লায়লা জেনিফারের দিকে চেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, ‘যারা অসহায়, তাদের আল্লাহ আছেন’।
‘আলহামদুলিল্লাহ’। চোখ মুছে বলল লায়লা জেনিফার।
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘পনের দিনের মধ্যে আত্মসমর্পনের কথা নিশ্চয় ওরা আহমদ মুসাকে বলেছে’।
‘অবশ্যই’।
‘আহমদ মুসা কি করবেন বলে মনে করেন?’ শুকনো কন্ঠে বলল লায়লা জেনিফার।
মুখ ম্লান হয়ে গেল ডাঃ মার্গারেটের। তার মনেও এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠল। আহমদ মুসার মুখটি ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। হৃদয়ের কোথাও চিন চিন করে উঠল পরিচিত সেই বেদনা। আবার আগের মতই চমকে উঠল সে। এই অন্যায় চিন্তাকে সে ভয় করে এবং মনের আড়ালে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু সুযোগ পেলে চিন্তাটা মাথা তোলে এবং তাকে বিব্রত করে। আহমদ মুসা হিমালয়ের মত উঁচু এক ব্যক্তিত্বই শুধু নন, ডোনা জোসেফাইনের আহমদ মুসাকে নিয়ে তার ভাববার অধিকার কোথায়? চোখ দুটি ভারি হয়ে উঠল ডাঃ মার্গারেটের।
বলল মার্গারেট ধীরে ধীরে, ‘যিনি নিজের চেয়ে পরের কথা বেশী ভাবেন, তিনি কি করতে পারেন তা বলা খুব সহজ নয় কি?’
‘তার মানে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন?’
‘তা জানি না। এটুকু আমরা বলতে পারি যে, তিনি আসবেন’। বলল ডাঃ মার্গারেট।
আসার অর্থ দুটোই হতে পারে। আমাদের উদ্ধারের জন্যে তিনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়বেন অথবা ওদের দাবী অনুসারে নিজেকে তিনি ওদের হাতে তুলে দেবেন’। বলল লায়লা জেনিফার।
‘ঠিক’।
বলে একটু থেমে আবার শুরু করল মার্গারেট, ‘একটা জিনিস আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়। আহমদ মুসাকে ধরার জন্যে আমাদের পোর্ট বানানো কেন?’ আমরা তাঁকে চিনি, জানি। কিন্তু গোল্ড ওয়াটাররা কেমন করে ধরে নিল যে, আমাদের আটকালেই আহমদ মুসাকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করা যাবে?’
‘কেন, আহমদ মুসাই তো আপনাকে দুঃসাহসিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেছিলেন’।
বলে একটু থামল লায়লা জেনিফার। তার বেদনা পীড়িত ঠোঁটে এক টুকরো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘শোনেননি, এরা কি বলে? ওদের ধারণা আপনাদের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক আছে যা আহমদ মুসাকে এদিকে টেনে আনবেই’।
ডাঃ মার্গারেটের হৃদয়টা কেঁপে উঠল। তার মুখের উপর দিয়ে লজ্জার লাল আভা খেলে গেল। সেই সাথে বিব্রত একটা ভাবও ফুটে উঠল তার চোখে মুখে।
কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে প্রসঙ্গটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেবার জন্যে বলল, ‘আসলে ভূল আমাদের। তোমার বাইরে না বেরুবার এবং আমার হাসপাতালের চাকরিতে যোগ না দেবার জন্য তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল। তাঁর আদেশ উপেক্ষা করে আমরা বিপদে পড়েছি। তাঁকেও বিপদগ্রস্ত করেছি’।
‘ভূল বটে, তবে সেখানকার অবস্থা তো স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় ঘরে আবদ্ধ থাকার কি যুক্তি ছিল?’ বলল লায়লা জেনিফার।
‘যুক্তি যে ছিল তা এই বিপদ ঘটার পর তো প্রমাণিত হলো। আমি ভাবছি, জর্জও না আবার কোন বিপদে পড়ে’। ডাঃ মার্গারেট বলল।
ডাঃ মার্গারেট জর্জের নাম উচ্চারণ করতেই মুহূর্তে লায়লা জেনিফারের মুখ আঁধারে মেঘের মত হয়ে গেল। বেদনায় নীল দেখালো ওর চেহারা। ধীরে ধীরে বলল, ‘ওর কথা ভুলে থাকতে চাই আপা। মনে হলে বুক কাঁপে। বুদ্ধির চেয়ে শক্তির উপর সে নির্ভর করতে চায় বেশী। জানি না সে কি করছে’। বলে কান্না রোধের চেষ্টায় দু’হাতে মুখ ঢাকলো লায়লা জেনিফার।
নরম কন্ঠে সান্ত্বনার সুরে ডাঃ মার্গারেট বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। জর্জের জন্যে তুমি ভেব না। আহমদ মুসার সাথে যোগাযোগ না করে সে কিছু করবে না’।
‘আমাদের এই আচরণে আহমদ মুসা ভাই নিশ্চয় খুব বিরক্ত হবেন। তার এই বিরক্তির চেয়ে আমাদের মৃত্যুই ভাল ছিল। আহমদ মুসা ভাইকে এর মধ্যে না জড়িয়ে ওরা যদি আমাদের মেরে ফেলত সেই ভাল ছিল’। বলল লায়লা জেনিফার।
‘ঠিক আমিও এটাই ভাবছি। কিন্তু শয়তানদের মতলব ভিন্ন। ওরা তো আমাদের মারবেই, আহমদ মুসাকেও ফাঁদে আটকাবে’।
‘এটা নিশ্চয়ই আহমদ মুসা ভাই জানেন। তাহলে তিনি শুধু শুধু ফাঁদে পড়তে আসবেন কেন?’
‘নিশ্চয়ই ওদের ফাঁদে পড়তে নয়, আমাদের উদ্ধার করতে আসবেন’।
লায়লা জেনিফারের চোখে মুখে আরও একরাশ বেদনা এসে ছড়িয়ে পড়ল। বলল আর্তস্বরে, ‘আমাদের উদ্ধার করার জন্যে এই বিপদে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন, এই কথা মনে হতেই বুক ফেটে যায়। কে আমরা? সামান্য দু’জন নারী। আমাদের মত হাজার জন মারা গেলেও পৃথিবীর কোন ক্ষতি হবে না’। থামল লায়লা জেনিফার।
একটা করুণ হাসি ফুটে উঠল ডাঃ মার্গারেটের মুখে। বলল ভেজা গলায়,’লায়লা তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু এ কথা বুঝাবে কে তাঁকে!’
‘অজানা অচেনা লায়লা জেনিফারের একটা চিঠি যাঁকে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে টেনে আনতে পারে এই আমেরিকায়, তাঁকে এ কথা বুঝানো লাগে কি?’
‘এত কিছু ঘটবে তা কি জানতাম। জানলে তাঁকে কি ডাকতাম!’ লায়লা জেনিফার বলল।
‘তুমি ডাকনি, আল্লাহ ডেকেছিল। তুমি একটা উপলক্ষ মাত্র। আল্লাহ তাঁকে দিয়ে আমেরিকায় কিছু করতে চান। ভেবে দেখ আমাদের টার্কস দ্বীপপুঞ্জের কথা। এখানকার দুর্বল মুসলমানরা তাদের অস্তিত্ব বিলোপকামী ভয়াবহ ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাবে, জাতি গোষ্ঠীসহ সারা দুনিয়া এদের নিরাপত্তা বিধানে ছুটে আসবে। এটা কি কল্পনাও করতে পেরেছ? যা কল্পনা করনি, তাই ঘটেছে। তাঁর বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা দিয়ে এটা তিনি ঘটিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে দিয়ে আরও কিছু ঘটাবেন আমেরিকায়’।
‘আপনার কথা সত্য হোক। এ বিপদ থেকে আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করুন’। জেনিফার বলল।
‘আমিন’। বলল মার্গারেট।

কথা বলছিল ইহুদী গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল আইজ্যাক শ্যারন এবং শুনছিল মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো এবং ইন্টেলিজেন্সের প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন।
দীর্ঘ বক্তব্য শেষ করে থামল জেনারেল আইজ্যাক শ্যারন।
ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে জর্জ আব্রাহাম জনসনের। বলল, ‘আপনি যা বললেন, তার দু’একটা বিচ্ছিন্ন চিত্র আমাদের কাছেও এসেছে। তার মধ্যে রয়েছে কয়েকটা হত্যাকান্ডের ঘটনা। ওসবের সাথে গোল্ড ওয়াটারের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়টা আঁচ করা গেছে। গোল্ড ওয়াটারের সাথে আপনাকেও দেখা গেছে। কিন্তু আপনি এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন, এটা আমাদের কাছে নতুন’।
‘স্যরি। আহমদ মুসাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছি, এই টেনশনে এত ব্যস্ত ছিলাম যে সৌজন্যমূলক একটু ‘হ্যালো’ বলব তারও সুযোগ পাইনি’। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘তা আমি বুঝেছি। আহমদ মুসা এখন আপনাদের কাছে সাত রাজার ধন। কিন্তু বলুন তো, এক ব্যক্তির উপর এতটা ক্ষ্যাপা, একটু বেশী বেমানান নয় কি?’
‘যে আপরাধে আপনারা একটা ভিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নরিয়েগাকে ধরে এনে সারা জীবনের জন্যে জেলে ঢুকিয়ে দিলেন, তার চেয়ে হাজারগুণ, লক্ষগুণ বেশী অপরাধ করেছে সে আমাদের কাছে। আমাদের রাষ্ট্র ইসরাইল সে ধ্বংস করেছে এবং কেড়ে নিয়েছে আমাদের হাত থেকে। তারপরও কত ঘটনায়, কত লোক আমাদের শেষ হয়েছে ওর জন্যে, তার হিসেব কষলে আতংকিত হতে হয়। তাকে একবার নয় শতবার হত্যা করলেও তার অপরাধ শেষ হবে না। কিন্তু আমরা তাকে হত্যা করব না। তাকে পণবন্দী করে যতটা পারা যায় আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থ আমরা হাত করতে চাই আরবদের কাছ থেকে’।
‘আমাদের আপত্তি নেই। এখন বলুন কি সাহায্য আপনি চান এফ. বি. আই (FBI) এর কাছে থেকে? বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘আহমদ মুসাকে খোঁজা এবং তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য আপনাদের সাহায্য চাই’।
একটু চিন্তা করল জর্জ আব্রাহাম জনসন। বলল, ‘কোন বড় অনুরোধ এটা নয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পেছনে এফবিআই এর লিগ্যাল গ্রাউন্ডটা কি হবে। তার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ নেই’।
‘চমৎকার এক অভিযোগ আছে। বিনা ভিসায় তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ। তাকে গ্রেপ্তারের জন্যে এটাই যথেষ্ট’।
হাসল আব্রাহাম জনসন। বলল, ‘আপনি কি মনে করেন এর মধ্যে সে ভিসা জোগাড় করেনি?’
একটু বিব্রত হলো জেনারেল শ্যারন। সঙ্গে সঙ্গে কোন জবাব দিল না।
জর্জ আব্রাহাম জনসনই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘আমরা আহমদ মুসাকে যতটা জানি, তার চিন্তা চলে সময়ের অনেক আগে। আমি নিশ্চিত তার পাসপোর্টে ক্যারিবিয়ান স্টেটগুলোর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা অবশ্যই আছে’।
‘আমিও আপনার সাথে একমত হচ্ছি মিঃ জনসন। কিন্তু অবস্থা তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে?’
‘সেটাই তো কথা। তার বিরুদ্ধে কি ধরনের অভিযোগ দাঁড় করানো যাবে?’
‘খুব সহজ পথ আছে। সে টেররিস্ট গ্রুপের নেতা। সন্ত্রাস ও সংঘাত সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে’।
‘দুনিয়া কি বিশ্বাস করবে আহমদ মুসা টেররিস্ট গ্রুপের সদস্য? সকলেই তো জানে এ পর্যন্ত কি কি কাজ সে করেছে। তাকে আর যাই হোক সন্ত্রাসী বলে চালানো যাবেনা’। বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘কেন যাবে না? সে যে খুন জখমে জড়িত হয়ে পড়েছে কাহোকিয়ার কয়েকটা ঘটনা দিয়ে তা প্রমাণ করা যাবে। এ থেকে সহজেই অভিযোগ আনা যাবে যে, আমেরিকার মুসলমানদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় সাহায্য করার জন্যে আহমদ মুসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে’।
হাসল জর্জ আব্রাহম জনসন। বলল, ‘কাহোকিয়ার পুলিশ কি রিপোর্ট দিয়েছে জানেন? বলেছে, শ্বেতাংগ সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ হোয়াইট ঈগল কাহোকিয়ার হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত। একটা রেড ইন্ডিয়ান দৈনিক পত্রিকায় এ রিপোর্ট প্রকাশিত ও হয়েছে। সুতরাং কাহোকিয়া হত্যাকান্ডের দায় তার উপর চাপানো যাবে না’।
‘এফ বি. আই-এর অফিসিয়ালী তাকে ধরার দরকার নেই। আনঅফিসিয়ালী এফ.বি.আই. আহমদ মুসাকে ধরে দিতে আমাকে সাহায্য করুক। এর জন্যে যে খরচ হবে, সেটা আমি দেব’। বলল জেনারেল শ্যারন।
আবার হাসল জনসন। তারপর গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, ‘ঠিক আছে জেনারেল শ্যারন, খরচ তো আপনি দেবেনই’।
বলে একটু থামল জর্জ আব্রাহাম জনসন। একটু নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘আহমদ মুসা মার্কিন রাজনীতির বন্ধু নয়। সুযোগ এলে আমরা তাকে ছাড়ব না। কিন্তু তার আগে তার গায়ে হাত দেয়া বিপদজনক হবে। মুসলিম দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াকে অবশ্যই আমাদের হিসেব করতে হবে। তবে আনঅফিসিয়ালি আপনাকে সাহায্য আমরা করব। কিন্তু আহমদ মুসা আমেরিকায় আছে এটা গোপন থাকা প্রয়োজন। এতে কাজের সুবিধা হবে, আমাদের ঘাড়ে কোন প্রকার দায় চাপানোর ভয় থাকবে না’।
জেনারেল আইজ্যাক শ্যারন খুশী হয়ে একগাল হেসে বলল, ‘তার আসার ব্যাপারটা গোপনই আছে। সে, আমরা এবং আপনারা কেউই চাই না এটা প্রকাশ হোক। সুতরাং প্রকাশ হবে না’।
কি যেন বলতে যাচ্ছিল জর্জ আব্রাহাম জনসন। হঠাৎ কি মনে হওয়ায় সে থেমে গেল। চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে জর্জ জনসনের। বলল, ‘জেনারেল শ্যারন, বিরাট একটা সুযোগ সামনে। আপনার ভাগ্য ভাল হলে খুব সহজেই আপনার কাজ উদ্ধার হয়ে যাবে’।
‘কি সে সুযোগ?’ দ্রুত কন্ঠে বলল সে। সোজা হয়ে বসল।
ওয়াশিংটন ডিসির গ্রীন ভ্যালিতে আমেরিকান মুসলিম সমিতি ও সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে সাত দিনব্যাপি একটা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখানে আহমদ মুসা নিশ্চয়ই সবচেয়ে সম্মানিত একজন অতিথি হবেন। খোঁজার কষ্ট না করে ওখান থেকেই তাকে ধরতে পারেন’। বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
জেনারেল শ্যারনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে একটা মহা সুযোগের সন্ধান আপনি দিয়েছেন। ওখানে আহমদ মুসা না এসেই পারেনা’।
ভাবছিল জর্জ আব্রাহাম জনসন। বলল, ‘আপনার জন্যে মহা সুযোগ বটে। তবে একটা সমস্যা আছে। আহমদ মুসার সন্ধান বা তাকে ধরতে গিয়ে সেখানে যদি হতাহতের ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে মার্কিন সরকার বিপদে পড়তে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসলিম প্রেসও সেখানে থাকবে’।
‘আপনারা যদি সহযোগিতা করেন, কোন হতাহতের ঘটনা ঘটার প্রশ্নই আসেনা’।
‘না, ওখানে এফ.বি.আই পরিচয় দিয়ে আমাদের কোন লোক ধরপাকড়ে যেতে পারবে না। আগেই তো বলেছি, আহমদ মুসাকে এই মুহূর্তে এফ.বি.আই-এর সরাসরি গ্রেপ্তার করার বৈধ কারণ নেই, আর কারণ ছাড়া গ্রেপ্তার ও করা যাবেনা। বিশেষ করে এই সম্মেলন থেকে সুপরিচিত কোন মুসলিম নেতাকে’।
‘তাহলে?’
‘কাজ আপনাদের লোক দিয়েই করতে হবে। তথ্যাদি দিয়ে কিছু সাহায্য আমরা করতে পারি’।
সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না জেনারেল শ্যারন। ভাবছিল সে। এক সময় বলল, ‘সম্মেলনটা কবে?’
‘আর সাতদিন পরে’।
‘সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথিদের একটা তালিকা আমাকে যোগাড় করে দিতে পারেন?’
‘ওটা দিয়ে কি হবে? আহমদ মুসা নিশ্চয় স্বনামে সেখানে আসছে না’।
‘আমার জানা দরকার আমেরিকা থেকে কারা সম্মেলনে আসছে। নিরাপদে কাজ উদ্ধারের একটা পথ তো বের করতেই হবে’।
‘ঠিক। লিস্ট আমাদের কাছে আছে। দিয়ে দেব আপনাকে’।
‘ধন্যবাদ’।
বলে একটু থেমে অবার শুরু করল জেনারেল শ্যারন, ‘ভবিষ্যত প্রশ্নে একটা কথা আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, মুসলমানদের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহনের ক্ষেত্রে পদে পদে আইন দেখার সত্যিই কি কোন প্রয়োজন আছে? আপনারা যদি সাবধান না হন তাহলে ইসলাম কিন্তু আমেরিকাকে গিলে ফেলবে। ইসলামী আদর্শের সাথে পেট্রোডলার যোগ হবার পর ইসলাম কিন্তু অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়াবে’।
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, সাম্প্রদায়িকতা কোন প্রকারে আমাদের কাছে ঘেঁসতে পারবেনা। কিন্তু মানুষের ইসলাম গ্রহন আমরা ঠেকাবো কি করে? মানবিক অধিকারে তো আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারিনা’।
‘যদি না পারেন, তাহলে ঠেকাবার দায়িত্বটা হোয়াইট ঈগলের হাতে ছেড়ে দিন’।
কথা শুনে হাসল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে উঠল জর্জ জনসনের মুখ। বলল, ‘আমরা হোয়াইট ঈগলের কোন কাজে বাধা দেই না। কাহোকিয়ার ঘটনা নিয়ে হোয়াইট ঈগলের কোন লোককে আমরা সামান্য জিজ্ঞাসাবাদও করিনি। কিন্তু তারা বোকার মত যে সব কাজ করছে, তাতে তারাও ডুববে, আমাদেরকেও বিপদে ফেলবে। দেখুন, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে কি কাজটাই না করল তারা। করতে কিছু পারেনি, মাঝখান থেকে মুসলিম দেশগুলোসহ গোটা দুনিয়া এলার্ট হয়ে গেল। বলা যায়, গোটা ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ফসকে গেল হোয়াইট ঈগলের হাত থেকে’।
‘তবু আমি মনে করি জনাব, হোয়াইট ঈগলই আপনাদের ভবিষ্যত। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে হোয়াইট ঈগল আবার যাতে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বসতে পারে, সে সাহায্য আপনাদেরকেই করতে হবে’। বলল জেনারেল শ্যারন।
আবার হাসল জর্জ জনসন। বলল, ‘মনে হচ্ছে হোয়াইট ঈগলের চেয়ে আপনার আগ্রহই বেশী?’
‘কারণ আছে। আপনারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে না নামলে, আমরা তাদের সাথে এঁটে উঠতে পারছি না। এক আহমদ মুসাই তো আমাদের ডুবিয়েছে’। জেনারেল শ্যারন বলল।
‘আপনার সাথে আমি একমত। ব্যক্তিগত কারণে আমি আরও বেশী একমত। কিন্তু……’
জেনারেল শ্যারণ জর্জ জনসনকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আপনার ব্যক্তিগত কারণ বুঝলাম না’।
হাসল জনসন। বলল, ‘আমার মা ইহুদী ছিলেন। আমার মাতুল পরিবার ইসরাইলে ছিলেন। ফিলিস্তিন বিপ্লবের পর তাদেরকে ফিলিস্তিন ছাড়তে হয়েছে, কারণ তারা ১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেছিলেন’।
আনন্দে চিৎকার করে উঠল জেনারেল শ্যারণ। বলল, ‘তাহলে তো আমাদের লোক আপনি। আমাদের দুঃখ আপনাকে বুঝাবার কোন প্রয়োজন নেই। এখন বলুন কি করতে পারেন আমাদের জন্যে’।
‘কি করতে পারব বলছি’।
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘আপনার কথা যদি সত্য হয়, আহমদ মুসা যদি এসেই থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, আর আপনারা যদি তাকে কিছু করতেই চান, তাহলে মনে হয় একটা সংকটের সৃষ্টি হবে আমাদের জন্যে। বলছি, মুসলিম বিশ্বের সাথে আমাদের সম্পর্কের কারণে আহমদ মুসার মত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। আপনারা যদি গোপনে তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে ভাল। কিন্তু যদি হত্যার মত কিছু ঘটে যায়, তাহলে আমরা অসুবিধায় পড়তে পারি’।
‘কেমন করে? কাউকে তো আমরা জানাচ্ছি না’।
হাসল জর্জ আব্রাহাম জনসন। বলল, ‘আপনাদের কারো দ্বারা প্রকাশ হতে পারে, আবার এফ.বি.আই এর কারো দ্বারাও প্রকাশ হতে পারে। আহমদ মুসাদের সাথীদের দ্বারা তো প্রকাশ হতে পারেই’।
‘তাতেই বা কি হবে? আহমদ মুসা অঘোষিতভাবে আমেরিকায় এসেছে। সুতরাং তার কোন দায়-দায়িত্ব মার্কিন সরকারের নেই। তার তো শত্রু কম নেই। কার দ্বারা কোথায় সে নিহত হলো তার দায় নিশ্চয় আপনাদের উপর বর্তাবে না’।
‘তাত্ত্বিকভাবে আপনার কথা ঠিক। যুক্তি হয়তো আমাদের পক্ষে থাকবে। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো বিশেষ করে কয়েকটি মুসলিম দেশ আমাদের মাফ করবে না’।
‘মুসলিম দেশগুলোর কথা এত বলছেন কেন? ওদের কি আছে? ভয় কি ওদের?’
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না জর্জ আব্রাহাম জনসন। একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘ভয় নয়, ভাব রাখতে চাই, সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার পরিবেশ রাখতে চাই। বলবেন, কেন? কারণ, আমরা যা চাই, তা যদি তাদের দিয়ে করাতে হয়, তাহলে ভাব রাখতে হবে, সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের মাঝে ঢোকার সুযোগও নিতে হবে’।
‘হাসালেন আপনি। যারা নিজের পায়ে হাঁটতে পারে না, যারা নিজের হাতে খেতে পারে না, তাদের দিয়ে কি করাবেন?’ বলল জেনারেল শ্যারন মুখে হাসি টেনে।
‘দেখুন, নেকড়ে মহিষকে একা পেলে মুহূর্তেই কাবু করতে পারে, কিন্তু দশটি মহিষ এক হলে সিংহও সে বুহ্যে ঢুকতে পারে না। মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে ঐ দুর্বলরই মহা বলবান হয়ে যাবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। তাই আমাদের নাক কেটে হলেও ওদের যাত্রা ভঙ্গের ব্যবস্থা করছি’।
‘নাক কাটতে গিয়ে মাথাটাই আবার কেটে না ফেলেন’। হেসে বলল জেনারেল শ্যারন।
‘এর উত্তর দিতে হলে অনেক আলোচনায় যেতে হবে। আজ থাক এ প্রসংগ। বলুন, আর কোন কথা আছে?’ হাতঘড়ির দিকে চকিতে একবার চোখ বুলিয়ে বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘তেমন নেই। শেষ কথাটা তাহলে কি দাঁড়াল?’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘আপনি কাজ শুরু করুন। অবস্থা কি দাঁড়ায় দেখুন। তথ্যাদি দিয়ে আমরা সাহায্য করব। একান্ত দরকার হলে এফ.বি.আই এর শীর্ষ অপারেটরদের একটা সশস্ত্র গ্রুপ আছে, তাদের কাজে লাগাব। তবু এফ. বি. আইকে সাধারণভাবে ব্যবহার করতে পারবো না। যেহেতু জানাজানি এড়াতে চাই’।
‘ধন্যবাদ, আজকের মত এ পর্যন্তই’। বলে উঠে দাঁড়াল জেনারেল শ্যারন।

রাগবি মাঠের গ্যালারী। রাগবি খেলা এই মাত্র শেষ হলো। জয় পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া তখন গ্যালারীতে। খেলা হচ্ছিল লস আলামোস ব্লু ও লস আলামোস স্টারের মধ্যে। ‘ফ্রান্সিসকো ভাস্কোডি করোনাডো’র স্মৃতি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ছিল আজ।
ফ্রান্সিসকো প্রথম ইউরোপীয় যিনি নিউ মেক্সিকোতে পা রাখেন ১৫৪০ খৃষ্টাব্দে। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত টুর্নামেন্টটি নিউ মেক্সিকোর সর্ববৃহৎ রাগবি টুর্নামেন্ট। দেশের শীর্ষ ৩২টি দলের খেলা ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
ফাইনাল খেলাটি বিভিন্ন বছর বিভিন্ন শহরে হয়ে থাকে। এ বছর হলো ‘সান জেরিনিমো’ স্টেডিয়ামে।
খেলা শেষের শেষ বাঁশিটি বাজার সাথে সাথে স্ট্যানলি নামের এক শ্বেতাংগ ছেলে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল ‘শয়তান জেরিনিমোকে যেভাবে পাছায় শুল ঢোকানো হয়েছিল, সেভাবে আজ জেরিনিমো স্টেডিয়ামেই লস আলামোস স্টারকেও সিকি ডজন গোল ঢুকানো হলো। হুর-রে’।
‘লস আলামোস স্টার রেড ইন্ডিয়ান অধ্যুষিত একটা দল। লস আলামোসের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে তাদের রিজার্ভ এলাকায় বাস করে আপাকি, জনি ও পাবলো ইন্ডিয়ানরা। লস আলামোস স্টারকে এদেরই দল ধরা হয়।
আর লস আলামোস ব্লুকে মনে করা হয় শ্বেতাংগদের দল।
স্ট্যানলির কথা শেষ হতেই জন নামের একজন আপাকি ইন্ডিয়ান ছাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ল স্ট্যানলির উপর এবং বলতে লাগল, ‘জেরিনিমো তোমার বাবা, জেরিনিমোর দেশ এটা। জেরিনিমোকে শয়তান বললি কেন? ফ্রান্সিসকোই তো শয়তান সন্ত্রাসী, অনুপ্রবেশকারী’।
জেরিনিমো ছিল আপাকি ইন্ডিয়ান এবং নিউ মেক্সিকোর সব ইন্ডিয়ানদেরই তিনি জাতীয় বীর। ইউরোপীয় শ্বেতাংগরা তাকে নিউ মেক্সিকোর ‘টেরর’ হিসেবে অভিহিত করত এবং বেশ কিছু লড়াইয়ের পর তাকে গ্রেপ্তার করে ১৮৮০ সালে।
স্ট্যানলি ও বিলির মধ্যে ভীষন মারামারি শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুই পক্ষেরই আরও কয়েকজন করে মারামারিতে যোগ দিল।
যারা মারামারিতে যোগ দিতে চায় না, তারা দ্রুত সরে গেল মারামারির জায়গা থেকে।
শেষ পর্যন্ত মারামারিটা শ্বেতাংগ ও ইন্ডিয়ানদের মধ্যে জাতিগত মারামারিতে পরিণত হলো।
মারামারির মধ্যেই তখনও গ্যালারিতে বসে ছিল সান ঘানেম নাবালুসি।
সে মারামারিতে যোগ দেয়নি, আবার উঠে পালায়নি।
সান ঘানেম ইন্ডিয়ান নয়, কিন্তু আবার পুরোপুরি শ্বেতাংগও নয়। গায়ের রং সাদাও নয়, সোনালীও নয়। তার নীল চোখটা শ্বেতাংগদের থেকে একেবারে ভিন্ন। কিন্তু চুল আবার সোনালী।
মারামারির মধ্যে দিয়েই ছুটে এল সান্তা আনা পাবলো সান ঘানেমের কাছে। সে সান ঘানেমের হাত ধরে টানতে টানতে বলল, ‘এভাবে বসে কেন? এস পালাই’।
সান্তা আনা পাবলো ইন্ডিয়ান মেয়ে এবং পাবলো ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীর। কিন্তু তার মুখ হ্যাটে অনেকটা ঢাকা থাকায় ইন্ডিয়ান বলে চেনা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে হ্যাটে মুখ ঢেকে সান ঘানেমকে নিয়ে যাবার জন্যে সে এসেছে।
সান ঘানেম উঠে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় তার সামনেই সে দেখল একজন শ্বেতাংগ তরুণ আরেকজন রেড ইন্ডিয়ানের বুকের উপর ছুরি বসাচ্ছে।
সান ঘানেম সান্তা আনা পাবলোর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো শ্বেতাংগ তরুনটির উপর এবং ছুরি সমেত তার
হাত ধরে ফেলল। তারপর ছুরি কেড়ে নিয়ে জোরে ছুঁড়ে মারল দূরে।
শ্বেতাংগ তরুনকে জাপটে ধরে রেখে কোন দিকে না তাকিয়েই ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সান ঘানেম। কিন্তু ছুরিটা ছুটে গিয়ে একটু দূরে ফাঁকা জায়াগায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন রেড ইন্ডিয়ান তরুনের বুকে আমূল বিদ্ধ হলো।
তরুনটি সংগে সংগে চিৎকার করে ঢলে পড়ল গ্যালারির উপর।
সান্তা আনা পাবলো সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ভাইয়া!’
চিৎকার করেই সে ছুটল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির দিকে।
সান্তা আনা পাবলোর চিৎকারে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সান ঘানেম। ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর চোখ পড়তেই ‘একি করলাম’ বলে আর্তনাদ করে উঠল সান ঘানেম।
শ্বেতাংগ তরুনকে ছেড়ে দিয়ে সেও ছুটল সান্তা আনা পাবলোর মত।
এ সময় চারদিক থেকে পুলিশের বাঁশি বেজে উঠল। পুলিশ ছুটে এল মারামারির জায়গায়।
সান্তা আনা পাবলো ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনের কাছে পৌঁছে দু’হাত দিয়ে তার বুক থেকে ছুরিটা বের করে ‘ভাইয়া’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর।
রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির নাম জিমি পাবলো। সান্তা আনা পাবলোর বড় ভাই।
সান ঘানেমও এসে পৌঁছল জিমি পাবলোর পাশে। তারপর বসে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে সান ঘানেম আবার আর্তনাদ করে বলল, ‘একি করলাম জিমি’।
ছুরিটা ঠিক হৃদপিন্ডে বিদ্ধ হয়েছিল। মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই মারা গেল জিমি পাবলো।
কয়েকজন পুলিশ এসে দাঁড়াল সেখানে। তাদের সাথে কিছু রেড ইন্ডিয়ান যুবক।
রেড ইন্ডিয়ান যুবকরা সবাই এক বাক্যে বলে উঠল সান ঘানেম খুন করেছে জিমি পাবলোকে।
সব পুলিশের প্রশ্নবোধক চোখ গিয়ে পড়ল সান ঘানেমের উপর। সান ঘানেমের বেদনা পীড়িত মুখ অসম্ভব রকম গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সে জিমি পাবলোর পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমিই খুন করেছি জিমি পাবলোকে’।
সান্তা আনা পাবলো তখনও কাঁদছিল জিমি পাবলোর বুকের উপর পড়ে।
সান ঘানেমের কথা কানে যেতেই চমকে উঠে মুখ তুলল সান্তা আনা। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল।
হঠাৎ তার ঠোঁট দু’টি প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। চোখ ফেটে নামল অশ্রু প্রবাহ।
যখন পুলিশ সান ঘানেমের হাতে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন সান্তা আনা কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কাঁপা ঠোঁট দু’টি ডিঙ্গিয়ে কোন শব্দ বেরুতে পারল না।
জিমি পাবলো ও সান ঘানেম দু’জনে সহপাঠি, তারা দু’জনেই রাজধানী সান্তাফে’র সান্তাফে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জিমি পাবলোর ছোট বোন সান্তা আনাও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
জিমি পাবলো ও সান ঘানেম শুধু সহপাঠি নয়, দু’জন দু’জনের ঘনিষ্টতম বন্ধুও।
পুলিশ অফিসার দু’জন পুলিশকে নির্দেশ দিল সান ঘানেমকে গাড়িতে তুলবার জন্য।
দু’জন পুলিশ দু’দিক থেকে এসে সান ঘানেমের দু’বাহু চেপে ধরল নিয়ে যাবার জন্যে।
পা বাড়াবার আগে সান ঘানেম অশ্রুতে ভেসে যাওয়া সান্তা আনার দিকে চোখ তুলে বলল, ‘জিমিকে আমি হত্যা করেছি, সান্তা আনা তুমি আমাকে ক্ষমা করো না’। শেষের কথাগুলো সান ঘানেমের আবেগে অবরুদ্ধ গলা থেকে ভেঙে ভেঙে বেরুল।
বোবা দৃষ্টিতে চেয়েছিল সান্তা আনা সান ঘানেমেরে দিকে। সান ঘানেমের কথায় তার গোটা শরীর যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। কি কথা যেন ঠোঁট ফুঁড়ে বেরুতে চাচ্ছে, পারছে না।
পুলিশ সান ঘানেমকে নিয়ে চলতে শুরু করলে সঙগা হারিয়ে সান্তা আনার দেহ গড়িয়ে পড়ল স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে।
নিউ মেক্সিকোর রাজধানী সান্তাফে’র উপকন্ঠে এক্সপ্রেস ওয়ের কাছাকাছি বাগান ঘেরা বিশাল এক বাড়ি।
বাড়িতে মৃত্যুর নিরবতা।
বাড়িতে একজন শুভ্রকেশ বৃদ্ধা, একজন মাঝবয়সী মহিলা এবং একজন তরুনী।
কান্নায় মূহ্যমান সবাই। চোখে মুখে তাদের আতংক ও উদ্বেগ।
একটা গাড়ি বাড়ির খোলা গেট দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ি বারান্দায় এসে থামল।
গাড়ি থেকে একজন লোক ও একজন মহিলা নামল।
বাড়ির বাইরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মাঝ বয়সী মহিলাটি। চোখ তার অশ্রুতে ভাসছিল। সে তাকিয়েছিল বাইরে। অপেক্ষা করছিল কারও।
গাড়িটি এসে থামতেই মহিলাটির চোখে মুখে আশার স্ফুরণ জাগল।
সোজা হয়ে দাঁড়াল সেই মাঝবয়সী মহিলাটি। গায়ের চাদরটা মাথার উপর তুলে দিয়ে বারান্দা ধরে কয়েক ধাপ এগিয়ে এল গাড়ি বারান্দার দিকে।
গাড়ি থেকে নেমেই মহিলাটি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল মাঝবয়সী মহিলাকে। বলল, ‘আপা ভেব না, সব ঠিক হয়ে যাবে’।
লোকটিও এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। সালাম দিল কান্নারত মহিলাকে। বলল, ‘চিন্তা করো না ভাবি, সান ঘানেম কোন অনুচিত কাজে জড়াতে পারে না, খুনতো নয়ই। কোন ব্যাপার আছে। ঠিক হয়ে যাবে সব’।
মহিলা চোখ মুছে বলল, ‘এস তোমরা’। বলে অন্য মহিলাটির হাত
ধরে ড্রইং রুমের দিকে হাটতে শুরু করল।
ড্রইং রুমে বসে ছিল বৃদ্ধা ও তরুনীটি, ওরা সবাই ড্রইং রুমে প্রবেশ করল। লোকটি সালাম দিয়ে সোজা গিয়ে বসল বৃদ্ধার পাশে। বলল, ‘আম্মা তোমরা দেখছি খুবই ভেঙে পড়েছ। আল্লাহ আছেন’।
বৃদ্ধাটি তাকাল তার দিকে। বলল, ‘অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সহায় বেটা। কিন্তু আমরা মাত্র তিনজন বাসায়। সান ঘানেম কি অবস্থায় আছে, কে খোঁজ নেবে?
‘ভেব না, ওদিকটা আমি দেখছি। ভাইয়া কবে গেছেন?’ বলল যুবক ছেলেটি।
‘ভাইয়া’ মানে ছেলেটির বড় ভাই। এই বাড়ির মালিক। নাম কারসেন ঘানেম নাবালুসি। থাকে সান্তাফের উত্তরে সান্তা ক্লারা শহরে।
কারসেন ও সারাসিন সহোদর ভাই। বৃদ্ধা তাদের মা। মাঝবয়সী মহিলাটি মরিয়ম মইনি, কারসেন ঘানেমের স্ত্রী। আর তরুণীটি কারসেন ঘানেমের মেয়ে ফাতিমা ঘানেম।
‘কারসেন কাল গেছে ওয়াশিংটন’। বলল বৃদ্ধা।
কারসেন ঘানেম নাবালুসি ‘মুসলিম এসোসিয়েশন অব নিউ মেক্সিকো’র (MANEM) ডাইরেক্টর। ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যলিতে আমেরিকান মুসলিম এসোসিয়েশনগুলোর সাত দিনব্যাপী যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কারসেন সেখানেই গেছে গতকাল।
‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবী?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম।
‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবি?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য কর জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম।
‘আমাদের পাড়ার একটা মেয়ে সেখানে ছিল। সেই খবর দিয়েছে’। বলল মরিয়ম মইনি।
‘প্রকৃতই কি ঘটেছিল, বলেছে কিছু?’
‘মারামারির মধ্যে সে এটা খেয়াল করেনি। জিমি পাবলো ছুরিবিদ্ধ হয়ে আর্তনাদ করে উঠলে ওদিকে সকলের চোখ যায়। রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই দোষ দিচ্ছে সান ঘানেম খুন….’।
কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি কেঁদে উঠল।
রুমাল দিয়ে চোখ মুছে মায়ের বদলে কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম। বলল, ‘রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই এক কথাই বলছে। শ্বেতাংগরা কিছুই বলতে পারছে না। তারা নাকি খেয়াল করেনি। আমাদের পাড়ার মেয়েটা বলল, জিমি পাবলোর বোন নাকি ভাইয়ার পাশেই ছিল, সেই নাকি সব জানে। কিন্তু কোন কথা বলেনি সে’।
‘তার কাছ থেকে জানার কিছু উপায় আছে? সেই তো আসল সাক্ষী’। বলল সারাসিন ঘানেম।
‘আমাদের কারও ওদের বাড়িতে যাওয়া মুস্কিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে জানা যাবে। তবে…..’।
কি কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল ফাতিমা ঘানেম।
‘কি বলছিলে বল’ বলল সারাসিন ঘানেম।
চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে ফাতিমা ঘানেমের। একটু দ্বিধা করে সে মুখ একটু নিচু করে বলল, ‘সান্তা আনা ভালবাসে ভাইয়াকে’।
‘কে সান্তা আনা? জিমি পাবলোর বোন?’
‘জি আংকেল।
‘তাহলে তো তার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে!’ বলল সারাসিন ঘানেম। তার চোখে আশার আলো।
‘পাওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস, ভাইয়া জিমি পাবলোকে খুন করতে পারে না। ভাইয়া এবং সে দুজন খুবই অন্তরংগ বন্ধু’।
‘কেন, বোনকে নিয়ে সান ঘানেমের সাথে তার যদি কিছু ঘটে থাকে?’
‘এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই আংকল। জিমি পাবলো সব জানতো এবং তার সম্মতি ছিল’।
‘তাহলে?’
‘আমি জানি না, কোন ষড়যন্ত্রও হতে পারে’।
‘কি ষড়যন্ত্র?সান ঘানেম ও সান্তা আনার মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি?’
‘হতে পারে’।
‘কিন্তু প্রমাণ করা যাবে কিভাবে?’
একটু ভাবল সারাসিন ঘানেম। তারপর বলল, ‘ভা্ইয়াকে কি খবর দেয়া হয়েছে?’
‘না খবর দেয়া হয়নি’। বলল মরিয়ম মইনি।
‘খবর তাঁকে জানানো দরকার নয়?’
‘হ্যাঁ’।
‘যদিও অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ উনি, তবু তাঁকে জানানো দরকার আমিও মনে করি’। সারাসিন ঘানেম বলল।
‘সারাসিন তুমিই তাহলে টেলিফোন কর’।
‘ঠিক আছে’।
বলে মোবাইল তুলে নিয়ে ডায়াল করল সারাসিন ঘানেম। ওপারে রিং হচ্ছে। কিন্তু কোন উত্তর নেই। কেউ ধরছে না টেলিফোন।
‘হয়তো টয়লেট কিংবা আশে পাশে কোথাও গেছে’। ভাবল সারাসিন ঘানেম।
মিনিট দশেক পর আবার টেলিফোন করল। কিন্তু ঐ একই অবস্থা। ওপার থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
ভ্রু কুঁচকে তাকাল সারাসিন ঘানেম ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ভাইয়া টেলিফোন অফ না করে টেলিফোন তো এইভাবে কোথাও ফেলে রাখেন না’।
‘না, সব কিছুরই তো ব্যতিক্রম আছে। তুমি কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন কর’।
মরিয়ম মইনি টেলিফোন নাম্বার তার আংকলকে দেয়ার জন্যে বলল ফাতিমা ঘানেমকে।
সারাসিন ঘানেম গ্রীন ভ্যালির কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন করে চাইল কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে।
একটু দেরী হলো। সম্ভবত কারসেনকে ডাকতে গেছে।
‘মিঃ কারসেন এসে ধরেছে টেলিফোন’। ওপার থেকে জানাল।
কারসেনের সাথে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর সব কথা জানালো সারাসিন ঘানেম।
কিন্তু কথা বলতে বলতে মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল সারাসিনের।
টেলিফোন রাখার পরেও চিন্তিত দেখাল সারাসিন ঘানেমকে।
‘কি হলো সারাসিন, তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে? কিছু বলেছে কারসেন?’ জিজ্ঞেস করল মরিয়ম মইনি।
‘ভাইয়া হু, হ্যাঁ ছাড়া কোন কথা বলেনি। এত বড় ঘটনা শোনার পর তাঁর যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার দরকার তা তার মধ্যে দেখলাম না’। বলল সারাসিন ঘানেম।
‘হয়তো খুব ব্যস্ততার মধ্যে আছে’। চিন্তিত কন্ঠে বলল মরিয়ম।
‘কিন্তু কন্ঠ? কন্ঠও তো ভাইয়ার মত মনে হলো না’। সারাসিনের চোখে মুখে বিষ্ময়।
‘এটা তুমি কি বলছ? সর্দি লাগলে গলা ভাংলে স্বরটা একটু ভিন্ন রকমের হয়, সে রকম একটা কিছু হবে’। মরিয়ম বলল।
‘শুধু কন্ঠ নয় ভাবি, ভাইয়া আমার সাথে যেভাবে কথা বলেছে, তাতে মনে হয়েছে যেন তিনি রাতারাতি সব ভূলে গিয়ে নতুন মানুষ হয়েছেন। সম্পূর্ণ অপরিচিতের মত কথা বলেছেন’।
সারাসিন ঘানেম থামতেই মরিয়ম বলে উঠল, ‘একই নামের ভিন্ন কারও সাথে কথা বলনি তো তাহলে? কারসেন নাম তো অনেকেরই থাকতে পারে’।
‘সেটা কি করে সম্ভব? আমি চেয়েছি নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে। তাছাড়া ভিন্ন লোক হলে কথার শুরুতেই তো তার কাছেও ধরা পড়ে যেত। কিন্তু উনি তো আমার সাথে কারসেন ঘানেম নাবালুসি হিসেবেই কথা বলেছেন’।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না মরিয়ম মইনি। ভাবছিল সে।
কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম, ‘আংকল আবার টেলিফোন করে কনফারেন্স অফিস থেকে বিষয়টা কনফার্ম করে নিলে হয় না?’
‘ঠিক বলেছ ফাতিমা, সেটাই করা যাক’।
বলে সারাসিন ঘানেম আবার টেলিফোন তুলে নিল হাতে।
আবার টেলিফোন করল ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যালিতে অনুষ্ঠানরত ‘আমেরিকান কাউন্সিল অব মুসলিম এসোসিয়েশন’(ACOMA) এর কনফারেন্স অফিসে।
ওখানে টেলিফোন ধরল রিসিপশনিস্ট।
সারাসিন ঘানেম বলল, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি টেলিফোন করেছিলাম। আমি কনফারেন্স এর কোন কর্তাব্যক্তির সাথে কথা বলতে চাই’।
রিসিপশনিস্ট জানাল, ‘তাঁরা সবাই ভীষণ ব্যস্ত। ঘন্টা দুই পরে টেলিফোন করলে সবাইকে পেয়ে যাবেন। আর আপনার প্রয়োজন কি সেটা জানালে আমিও তাদের জানাতে পারি’।
‘ধন্যবাদ। নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসি আমার ভাই। তাঁর সাথেই আমার কথা ছিল’।
‘সুবহানাল্লাহ, তাঁর ব্যাপার নিয়েই তো ওরা ব্যস্ত। তাঁকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে কি আলোচনা হচ্ছে’।
‘কেন? কি আলোচনা?’
‘আমি বলতে পারবোনা’।
‘যিনি বলতে পারবেন তাকে দিন। আমি কারসেনের ভাই। আমার জরুরী প্রয়োজন’। শান্ত, কিন্তু শক্ত কন্ঠে বলল সারাসিন ঘানেম।
একটু ধরুন স্যার, চেষ্টা করে দেখি কাউকে পাই কিনা।
অল্প কয়েক সেকেন্ড পরেই সে বলল, ‘আমি লাইন দিচ্ছি, কনফারেন্সের ডাইরেক্টরের সাথে কথা বলুন।
সালাম দিল সারাসিন ঘানেম।
সালাম গ্রহণ করে ওপার থেকে বলল, ‘আপনি কি কারসেন ঘানেমের ভাই?’
‘জি। আমি তার সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। কারসেন ঘানেম, যার সাথে অল্পক্ষণ আগে কথা বললাম, তাঁকে আমার ভাই কারসেন ঘানেম বলে মনে হয়নি’।
‘আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদেরও সেই রকম সন্দেহ। আপনার ধারণা আমাদেরকে নিশ্চিত করল’।
‘তাহলে ছদ্মবেশী কেউ কি কারসেনের ভূমিকায় অভিনয় করছে?’
‘তাইতো এখন মনে হচ্ছে’।
‘তাহলে কারসেন ঘানেম কোথায়?’
‘সেটা আমাদেরও প্রশ্ন’।‘
আতংকিত হয়ে উঠেছে সারাসিন ঘানেম। উদ্বেগ-উত্তেজনায় কাঁপছে তার দেহ। কম্পিত গলায় সে বলল, ‘এখন কি করণীয়?’
‘তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। কি অবস্থা দাঁড়ায় আপনাদের জানাব। কারসেন ঘানেমের প্রতি আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এখনকার মত রাখি?’
সারাসিন ঘানেম টেলিফোন রাখতেই মরিয়ম মইনি আর্তকন্ঠে বলে উঠল, ‘ওখানে কি ঘটেছে সারাসিন, কারসেনের কি হয়েছে?’
সারাসিন তখন নিজেই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। বজ্রপাতের মতই ভয়াবহ মনে হচ্ছে তার কাছে খবরটা্। কথা বলার শক্তিও যেন তার ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু তাকে এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে কেন? কারসেন ঘানেম উপস্থিত নেই, সান ঘানেম নেই। তাকেই তো এখন সব কিছু করতে হবে।
একটু নড়ে-চড়ে বসল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘ভাবি, এখন আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি খুব বেশী ভরসা করতে হবে। ওখান থেকে স্পষ্ট কিছু জানা গেল না। তবে কারসেন ঘানেমের পরিচয় দেয়া লোকটি কারসেন ঘানেম নয়।….’
সারাসিন ঘানেম এতটুকু বলতেই মরিয়ম কেঁদে উঠল।
থেমে গিয়েছিল সারাসিন ঘানেম। তাকাল সে তার ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ধৈর্য্য ধরতে হবে ভাবি আমাদের। লোকটিকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার কাছ থেকেই ভাইয়ার খবর জানা যাবে। কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ বলেছেন তারাও ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন’।
‘চারদিক থেকে আল্লাহ আমাদের একি বিপদ দিলেন! কি হবে এখন!’ আর্তকন্ঠে বলে উঠল বৃদ্ধা, কারসেন ঘানেম এবং সারাসিন ঘানেমের মা।
বলেই সে সারাসিন ঘানেমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এখন তো ওয়াশিংটন যেতে হবে তোর, কিন্তু সান ঘানেমের ব্যাপারটা দেখবে কে?’ কান্নারুদ্ধ কন্ঠ তার।
‘কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ টেলিফোন করে জানাবে। ওদিকের পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে আমাদের’। বলল সারাসিন ঘানেম।
মরিয়ম মইনি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ‘টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়।
টেলিফোন ধরল সারাসিন ঘানেম।
টেলিফোন ধরেই মরিয়ম মইনির দিকে চেয়ে বলল, ‘ভাবি আপনার টেলিফোন। সান্তা আনা নামে একটি মেয়ে করেছে’।
‘সান্তা আনা’ বলে ছু্টে এসে টেলিফোন হাতে নিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন নিয়ে নিজের সিটে ফিরে যেতে ভূলে গেল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলতে শুরু করল।
মরিয়ম মইনি বলছিল টেলিফোনে, ‘কেঁদো না মা বল কি ঘটেছিল। আমার সান ঘানেম তো খুন করতে…….’।
কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল তার কন্ঠ।
‘না, আন্টি, সান খুন করেনি। ও কাউকে খুন করতে পারে না’। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল সান্তা আনা।
‘বল মা কি দেখেছ তুমি। তুমি নাকি ছিলে ঘানেমের কাছে’।
‘আমি মারামারির ভেতর থেকে সানকে আনতে গিয়েছিলাম আন্টি। আমি যখন ওকে টেনে আনছিলাম সে সময় পাশেই একজন শ্বেতাঙ্গ একজন ইন্ডিয়ান ছেলের বুকে ছুরি বসাতে যাচ্ছিল। ইন্ডিয়ানকে বাঁচাবার জন্যে সান ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরিটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ছুরি গিয়ে লাগে দূরে দাঁড়ানো ভাইয়ার বুকে। সান……’।
কথা শেষ করতে পারলো না সান্তা আনা। কান্নায় জড়িয়ে গেল তার কথা।
‘সান কি তোমার ভাই জিমিকে দেখেছিল?’ জিজ্ঞেস বরল মরিয়ম মইনি।
সান্তা আনা বলল, ‘না আন্টি, সান সে সময় শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরেছিল, কোন দিকে তাকিয়ে সে ছুরি ফেলে দেয়নি’।
‘সত্য এই ঘটানাটা আর কেউ দেখেনি মা?’
‘যে ইন্ডিয়ান ছেলেকে সান বাঁচিয়েছে, সেই জনি লেভেনও এটা দেখেছে। কিন্তু এখন সে উল্টো কথা বলছে’।
‘কি বলছে?’
‘সান ঘানেম দেখেই ছুরি মেরেছে জিমি পাবলোকে’।
‘তার প্রাণ বাঁচাবার পরেও এই মিথ্যা কথা?’
‘ইন্ডিয়ানরা এখন এক জোট হয়েছে আন্টি। একজন ইন্ডিয়ান নিহত হয়েছে শ্বেতাঙ্গের হাতে, এই সেন্টিমেন্টটাকেই বড় করে তোলা হচ্ছে। তাছাড়া জনি লেভেন হিংসা করে সান ঘানেমকে’।
‘কেন?’কোন উত্তর দিল না সান্তা আনা।
‘জান না তুমি কেন ঈর্ষা করে?
‘জানি আন্টি’।
‘কি সেটা?’
‘কারণটা আমি আন্টি। আমি সান ঘানেমকে ভালবাসি, এটা সে দেখতে পারে না’। কান্নাজড়িতে কন্ঠে বলল সান্তা আনা।
‘এখন কি হবে মা? ওদিকে সানের আব্বাও……’। কান্নায় ভেঙে পড়ল মরিয়ম মইনি।
‘আপনি কাঁদবেন না আন্টি। ঈশ্বর আছেন। সানের জন্যে আমি সবকিছু…….’।
কথা শেষ করতে পারলো না।
টেলিফোন নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ ভেসে এল। তার সাথে শোনা গেল একটা ভারি গলা, ‘বলা হচ্ছে না তুমি সানদের পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ করবে না, তাদের কিছুই জানাতে পারবে না। ওরা আমাদের ইন্ডিয়ানদের শত্রু। তুমি সেই খুনি সানকে বাঁচাবার অঙ্গীকার করছ’।
‘আব্বা, আপনাকে বলেছি সানের কোন দোষ নেই। সে একজন ইন্ডিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে’। কাঁদতে কাঁদতে বলল সান্তা আনা।
‘এই কথা তুমি কয়জন ইন্ডিয়ানকে বলবে? আর তোমার কথা কে বিশ্বাস করবে, তুমি সানের পক্ষে তো বলবেই। আমার ছেলে তার ছুরিতে নিহত হয়েছে, এটাই আজ বড় সত্য। তারা এখন আমাদের শত্রু’।
‘কিন্তু আব্বা, তারা তো শত্রু নয়, সত্যকে তো মিথ্যা দিয়ে …..’।
কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই ওপার থেকে সান্তা আনার কান্না ভেজা কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেল।
নিশ্চয় টেলিফোন তার আব্বা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে অফ করে দিয়েছে।
টেলিফোনটা সোফায় ছুঁড়ে দিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ল মরিয়ম মইনি।
তার চোখের কোণে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল তা দপ করে নিভে গেল।
ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে।
সারাসিন ঘানেম উদগ্রীব কন্ঠে বলল, ‘কি ঘটেছে, কি শুনলেন ভাবি?’
‘সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্ক। তার আব্বা সান্তা আনাকে জিমি পাবলোর খুনি-পরিবারের সাথে কথা বলতে দেবে না। তাই তিনি টেলিফোন সান্তা আনার হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলেন’।
থেমে একটা দম নিয়ে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্কের গোটা বিবরণ দিয়ে বলল, এর পর সান্তা আনা শত ইচ্ছা করলেও আমাদের সান ঘানেমের পক্ষে সাক্ষী দিতে পারছে না। আর জনি লেভেন তো সাক্ষী বিরুদ্ধেই দিবে’।
‘জনি লেভেন কে ভাবি?’
‘জনি লেভেন একজন ইন্ডিয়ান ছেলে’।
এই জনি লেভেনকেই এক শ্বেতাঙ্গ ছেলে ছুরি দিয়ে হত্যা করতে যাচ্ছিল। সান ঘানেম লেভেনকে বাঁচাবার জন্যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরে তার হাত থেকে ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। এই ছুড়ে দেয়া ছুরিই ঘটনাক্রমে লাগে জিমি পাবলোর বুকে। এই ঘটনা সান্তা আনার মত জনি লেভেনও দেখে’।
‘লেভেনকে বাঁচাতে গিয়েই তো ঘটনা ঘটেছে, তাহলে লেভেন সান ঘানেমের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেবে কেন?’ বলল সারাসিন ঘানেম।
উত্তরে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা যা বলেছিল সব জানিয়ে বলল, ‘আমার সান ঘানেম নিরপরাধী হলেও গোটা অবস্থা তার বিরুদ্ধে গেছে’। মুখে রুমাল চেপে আবার কাঁদতে লাগল মরিয়ম মইনি।
সারাসিন ঘানেম বলল, ‘ভাবি। আল্লাহ একটা উপায় নিশ্চয় বের করে দেবেন। কোনভাবে যদি সান্তা আনাকে দিয়ে কোর্টে ঘটনাটা বলানো যায়, তাহলে লেভেন বিপক্ষে সাক্ষী দিলেও জেরায় সে ধরা পড়ে যাবে’।
‘কিন্তু সান্তা আনাকে হয়তো ওরা সাক্ষীই বানাবে না’। বলল বৃদ্ধা, সারাসিন ঘানেমের মা।
‘না আম্মা, তাকে সাক্ষী বানাতেই হবে, কারণ সেই প্রথম জিমি পাবলোকে ছুরিবিদ্ধ হতে দেখে এবং তার কাছে ছুটে যায়’। বলল সারাসিন ঘানেম।
‘কিভাবে সান্তা আনাকে দিয়ে সত্য কথা বলাবে! শুনলেই তো বৌমার কাছে সান্তা আনার বাপের আচরণের কথা। আর শুধু তো তার বাপ নয়, সব ইন্ডিয়ানরাই একজোট হয়েছে’।
‘বলেছি তো আম্মা। আল্লাহ একটা পথ অবশ্যই বের করে দেবেন’। সারাসিন ঘানেম বলল।
‘আংকেল, সান্তা আনাকে আমি জানি। সে মরে গেলেও ভাইয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে না। আমার মনে হচ্ছে, তাকে তারা সাক্ষী হিসেবে না নেবার সব রকম ব্যবস্থা করবে। এর প্রতিকার আমরা কিভাবে করব, সেটা আমাদের চিন্তা করা উচিত’।
‘ঠিক বলেছ মা। কিভাবে করা যাবে সেটা একটা বড় বিষয় হওয়া উচিত’। বলল সারাসিন ঘানেম।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন বেজে উঠল।
থমকে গিয়ে মরিয়ম মইনি টেলিফোন তুলে নিল হাতে।
টেলিফোন ধরে সালাম নিয়েই শুনল, ‘সারাসিন ঘানেম কে?’ উত্তরে বলল ‘ধরুন, দিচ্ছি’।
বলে মরিয়ম এস্তে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিফোন সারাসিনের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ‘নাও তোমার টেলিফোন, বোধ হয় ওয়াশিংটন থেকে’। কন্ঠস্বর কাঁপছে মরিয়ম মইনির।
‘আসসালামু আলাইকুম। সারাসিন ঘানেম বলছি’। টেলিফোন ধরে বলল সারাসিন ঘানেম।
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। দুঃখিত মিঃ সারাসিন, আপনার ও আমাদের সন্দেহই সত্য হয়েছে। সে একজন ইহুদী গোয়েন্দা। কারসেন ঘানেমের পরিচয় নিয়ে আমাদের সম্মেলনে যোগদান করেছিল’।
‘কারসেন ঘানেম কোথায়?’
‘তাঁর সম্পর্কে সে একেকবার একেক কথা বলছে, তবে আমাদের ধারণা তাঁকে কোথাও বন্দী করে রেখে তার পরিচয় নিয়ে সে সম্মেলনে এসেছে’।
‘কিন্তু যদি……..’। বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল সারাসিন ঘানেমের এক অশুভ আশংকায়। কথাটা মুখেও আনতে পারলো না সে।
‘বুঝেছি মিঃ সারাসিন ঘানেম। তার মুখ দেখে আমরা সে রকম কোন আশংকা করছি না’।
‘আমি কি আসব ওয়াশিংটনে?’
‘আমরা আপনাকে জানাব, যদি দরকার হয়। মিসেস ঘানেমকে আমাদের সালাম দেবেন এবং বলবেন কারসেন ঘানেমের ব্যাপারে যা যা করার সবই আমরা করব’।
‘কিন্তু ইহুদীরা যদি সত্যিই এ যুদ্ধে নেমে থাকে, তাহলে ব্যাপারটাতো সাংঘাতিক। ওরা তো এদেশে অপ্রতিদ্বন্ধী’। সারাসিন ঘানেমের কন্ঠে উদ্বেগের সুর।
‘ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী ছিল। সব সময় থাকবে তা নয়। অন্তত এই যুদ্ধে ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী নয়। বিশ্ব-ইহুদীরা প্রতিদ্বন্ধীতায় যাঁর কাছে বারবার হেরেছেন, সেই ব্যক্তিত্ব আল্লাহর রহমতে এখানে, আমাদের মাঝে উপস্থিত। তিনিই কারসেন ঘানেমের ব্যাপারটা দেখছেন’।
‘কে তিনি?’
‘দুঃখিত মিঃ সারাসিন, এটা টেলিফোন। নাম বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। ঐটুকু আপনাকে বললাম আপনাদের সান্ত্বনার জন্যে। দোয়া করবেন। রাখি’।
বলে সালাম দিয়ে ওপ্রান্ত থেকে টেলিফোন রেখে দিল।
টেলিফোন রেখে সারাসিন ঘানেম ওয়াশিংটন থেকে শোনা সব কথাই ধীরে ধীরে জানাল সবাইকে।
কারসেন ঘানেমের স্ত্রী মরিয়ম মইনি দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না চাপতে চেষ্টা করল, মেয়ে ফাতিমা ঘানেম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রুমালে চোখ মুছতে লাগল ঘানেমদের বৃদ্ধা মা ও মিসেস সারাসিন।
ঘর জুড়ে নিঃশব্দ এক কান্নার বৃষ্টি। ইহুদী খুনীরা জার্মানির নাজীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর বুদ্ধিতে এবং নৃশংসতায়। সকলের বুকই দুরুদুরু করে কাঁপছে।
নিরবতার মাঝে সারাসিন ঘানেম ধীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘উদ্বেগ আতংকের পাশে আল্লাহর সাহায্যের দিকটাকেই এখন অমাদের বড় করে দেখতে হবে। নাম ওরা বলেনি বটে, একটা বড় আশার কথা তো ওঁরা জানিয়েছে। ঐ পথেই হয়তো আল্লাহর সাহায্য আসবে’।
‘অল পাওয়ারফুল বলে কথিত আমেরিকান ইহুদী চক্রের মোকাবিলায় আমাদের কে আছে? যার কথা তাঁরা বললেন?’ চোখ মুছতে মুছতে বলল ফাতিমা ঘানেম।
‘তোমার মতই আমি এ বিষয়ে অজ্ঞ মা’। বলল সারাসিন ঘানেম।
‘কিন্তু কে সেই আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর কাছে বিশ্ব-ইহুদী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরেছে বারবার?’ আবার জিজ্ঞাসা ফাতিমা ঘানেমের।
‘থাকতে পারেন মা, সবার খবর আমরা জানি না’। বলল সারাসিন।
‘আপনি ওয়াশিংটনে গেলে আমরা আরও কিছু জানতে পারতাম’। ফাতিমা বলল।
‘ওঁরা জানাবেন। ওঁদের টেলিফোনের অপেক্ষা করতে হবে মা’।
বলে উঠে পড়ল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘আম্মা, ভাবি, আমি পুলিশ অফিস থেকে আসি। একজন এডভোকেটের সাথেও আলোচনা করে আসি’।
‘সান ঘানেমকে বলো, তার কোন চিন্তা নেই। আমরা সব রকম চেষ্টা করব। আল্লাহ আছেন’। বলল সান ঘানেমের দাদী, বৃদ্ধা মহিলাটি।
‘সারাসিন, সানকে তার আব্বা সম্পর্কে কিছু বলো না’। বলল সান ঘানেমের মা মরিয়ম মইনি।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। সালাম’।
বলে বেরিয়ে গেল সারাসিন ঘানেম।

ইহুদী গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শ্যারন, হোয়াইট ঈগল প্রধান গোল্ড ওয়াটার এবং এফ.বি.আই প্রধান কলিন্স গ্রীন ভ্যালির হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের মুখোমুখি রাস্তার ওপারে কম্যুনিটি হলের একটি কক্ষে একটা টেবিল ঘিরে বসে আলোচনায় মশগুল। হিউম্যান ডেভলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারেই ‘আমেরিকান কাউন্সিল অব মুসলিম এসোসিয়েশনস’ (ACOMA) এর ৭দিন ব্যাপি সম্মেলন শুরু হয়েছে।
হিউম্যান ডেভলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (HDRC) আমেরিকান মুসলমানদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
জেনারেল কম্যুনিটি হলের যে কক্ষে কথা বলছিল তার জানালা দিয়ে HDRC‘র প্রধান ফটক দেখা যায়।
‘সেদিকে চোখ রেখে কথা বলছিল জেনারেল শ্যারন। তার মুখ দারুন আনন্দে উদ্ভাসিত। সে বলছিল, ‘ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ। আহমদ মুসাকে আবার নাগালের মধ্যে পাওয়া গেছে। ভাবতে কি যে আনন্দ লাগছে, সে এখন সামনের ঐ বিল্ডিংটায় রয়েছে। আমরা তার খবর জানি, কিন্তু সে আমাদের খবর জানে না’।
‘আসল আনন্দ হবে তাকে ধরার পর। তাকে ধরার কি পরিকল্পনা?’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘ওটা কোন সমস্যা নয়। তিরিশজন কমান্ডো যোগাড় হয়েছে। যে কোন সময় ওখানে ঢুকে তাকে আমরা ধরে আনতে পারি’। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘কিন্তু তাতে রক্তপাত হবে, জানাজানি হবে, আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়াতে চলে যাবে খবর, এটা করা যাবে না। আমার প্রতি এফ.বি.আই-এর নির্দেশ এটা’। বলল এফ.বি.আই এজেন্ট কলিন্স।
এফ.বি.আই প্রধান জেনারেল আব্রাহাম জনসন ও জেনারেল শ্যারনের মধ্যে আলোচনা অনুসারে এফ.বি.আই শ্যারনকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে, প্রত্যক্ষ সাহায্য নয়। কলিন্সকে এখানে পাঠানো হয়েছে এটা নিশ্চিত করার জন্যে যে পুলিশকে জড়িয়ে পড়তে হয় এবং খবরের কাগজে যায় এমন ঘটনা যেন না ঘটে।
‘কলিন্স ঠিকই বলেছে, এই সম্মেলনে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে, তার ষোল আনা দায় গিয়ে পড়বে মার্কিন সরকারের ঘাড়ে’।
জেনারেল শ্যারন ভাবছিল। বলল, ‘তাহলে কমপ্লেক্সের বাইরে তাকে ধরার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা কঠিন হবে না। তবে এর জন্যে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা থাকতে হবে’।
জেনারেল শ্যারন থামতেই গোল্ড ওয়াটার বলে উঠল, ‘আহমদ মুসা কি নামে সম্মেলনে যোগদান করেছে’।
‘আহমদ আবদুল্লাহ’।বলল জেনারেল শ্যারন।
‘কোন দেশী হিসেবে’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
‘সউদি এ্যরাবিয়ান’।
‘পোশাক?’
‘পশ্চিমী, কিন্তু মুখে দাড়ি। দাড়ির স্টাইলে সে এমন বদলে গেছে যে, ফটো সামনে রেখেও তাকে চেনা কঠিন’।
‘তাহলে চোখ ও ভ্রুর পরিবর্তন ঘটিয়েছে সে?’
হতে পারে।
‘তার থাকার জায়গাটা আপনাদের হোটেলের আশে-পাশে নয়?’
‘না, সবার থাকার জায়গা ১১ তলা ভবনের টপ তিন ফ্লোরে, কিন্তু আহমদ মুসা আছেন তিন তলায়’।
‘এর কি কারণ?’
জেনারেল শ্যারন কিছু বলার আগেই কলিন্স বলল, ‘বিল্ডিংটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেই সেটা বুঝতে পারবেন’।
সবাই জানালা দিয়ে তাকাল। কিন্তু গোল্ড ওয়াটার ও জেনারেল শ্যারনের চোখে এখনও প্রশ্নবোধক দৃষ্টি।
কলিন্স বলল, ‘দেখুন তিন তলা থেকে বিল্ডিংটা সোজা উপরে উঠে গেছে। কিন্তু তিন তলা থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত দু’টি স্টেপ একটি দোতালায়, অন্যটি এক তলায়’।
‘সেটা তো দেখাই যাচ্ছে, তাতে কি হয়েছে?’
‘আর দেখুন বিল্ডিংটার এই স্টেপগুলো উপর থেকে তিনতলা পর্যন্ত বিল্ডিংটার চারদিকেই’।
‘হ্যাঁ ঠিক আছে’। বলল তারা দু’জনে এক সাথে।
‘এর অর্থ আহমদ মুসাকে এমন স্থানে রাখা হয়েছে, যেখান থেকে বিল্ডিংটার যে কোন দিক দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে’।
কলিন্সের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল জেনারেল শ্যারন ও গোল্ড ওয়াটার।
‘তার মানে আহমদ মুসা যে কোন পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত আছে’।
গোল্ড ওয়াটার বলল।
‘আহমদ মুসার জন্যে এটাই স্বাভাবিক’। বলল কলিন্স।
‘যতই প্রস্ত্তত থাকুক, এবার আহমদ মুসাকে ফাঁদে পড়তেই হবে। কমান্ডোরা গোটা কমপ্লেক্স ঘিরে রেখেছে’। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘ঈশ্বর আপনার কথাকে সত্য করুন’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
জেনারেল শ্যারনের চোখে মুখে কিছুটা উদ্বেগের ছাপ।
গোল্ড ওয়াটার থামলেও কোন কথা বলল না শ্যারন। তাকাল ঘড়ির দিকে। সত্যিই তার ভ্রু দু’টি এবার কুঞ্চিত হলো।
গোল্ড ওয়াটার ও কলিন্স উভয়েই বিষয়টি লক্ষ্য করেছে।
‘কি ব্যাপার জেনারেল?’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘কোহেন একটা প্রোগ্রাম ফেল করল কেন তাই ভাবছি’। বলল শ্যারন।
কোহেন একজন বিখ্যাত ইহুদী গোয়েন্দা এজেন্ট। নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসি’র ছদ্মবেশে এই কোহেনই কনফারেন্সে যোগ দিয়েছে। কারসেনের সাথে কোহেনের চেহারার কিছুটা মিল আছে। দু’জনই সেমিটিক-আফ্র মিশ্রণ।
‘কি প্রোগ্রাম ফেল করেছে কোহেন?’ গোল্ড ওয়াটারের চোখে বিষ্ময়।
‘সাড়ে পাঁচটায় আছর নামাজের বিরতি হবে। সে সময় কোহেন বেরিয়ে এসে কনফারেন্স বিল্ডিংটার এ প্রান্তটায় যে ওয়েস্টেজ বক্স আছে, সেখানে এক খন্ড কাগজ ফেলে রেখে যাবার কথা। কিন্তু ৬টা বেজে যাচ্ছে, এখনও সে এল না’।
‘কি কাগজ?’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘কনফারেন্স বিল্ডিংটার ফ্লোর ও আউট গেট ডিজাইন এবং আহমদ মুসার বর্তমান ছদ্মবেশসহ তার ফটো’।
‘দু’টোই তো খুব গুরুত্বপূর্ণ’। বলল এফ. বি. আই গোয়েন্দা কলিন্স।
‘নামাজের বিরতি হলেও কোন প্রোগ্রামে হয়ত আটকা পড়েছে’।
গোল্ড ওয়াটার বলল।
‘না মিঃ গোল্ড ওয়াটার। কোহেন এমন একজন গোয়েন্দা ব্যক্তিত্ব যার কর্মসূচীতে এক মিনিটও এধার ওধার কখনও হয় না। যতগুলো অসাধ্য সাধন সে করেছে, সবগুলোই নির্দিষ্ট সময়সূচীর ভেতরেই সে সম্পন্ন করেছে। এটা তাঁর রেকর্ড’।
‘তাহলে?’ বলল গোল্ড ওয়াটার চিন্তিত কণ্ঠে।
ভাবল কিছুক্ষণ জেনারেল শ্যারন।
তারপর জেগে উঠার মত দ্রুত তার ট্রাভেল কিট টেনে নিল। বের করল সিগারেট লাইটার সাইজের অয়্যারলেস রিসিভার। একটা বড় সাইজের স্পীকার বের করে তার সাথে কানেকশন জুড়ে দিল অয়্যারলেস রিসিভারের। বলল, ‘চিন্তা করে লাভ কি? কিছু ঘটলে অয়্যারলেসই তা বলে দিবে’।
বলে অয়্যারলেসের মেসেজ স্কোরের ‘কী’টা অন করে দিল।
স্পীকার সরব হয়ে উঠল।
প্রথম দিকে তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। নানা কথা-বার্তা, আলাপ-আলোচনা-নিত্য দিনকার স্বাভাবিক ধারা বিবরণী।
নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি মিঃ কারসেনের ছদ্মবেশে কনফারেন্সে যোগদানকারী ইহুদী গোয়েন্দা কোহেনের কাছে ছোট বোতাম আকৃতির যে অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার আছে তা কোন সময় অফ করা যায় না। সব সময় অন থাকে এবং অব্যাহতভাবে শব্দ করে, যাই ঘটুক তা নিখুঁতভাবে পাঠায়।
টেবিলের উপর রাখা অয়্যারলেস স্পিকারে তখন বক্তৃতা ভেসে আসছে।
‘কনফারেন্সে বক্তৃতা যেমন চলছে, সব বক্তৃতাই এভাবে রেকর্ড হবে। বিরাট দলিল এটা। এফ.বি.আই কিনতে চাইলে আমরা বিক্রি করতে পারি’। এফ.বি.আই এজেন্ট মিঃ কলিন্সের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল জেনারেল শ্যারন।
‘এই জন্যই বুদ্ধিতে আপনারা শ্রেষ্ঠ। তবে এক্ষেত্রে ব্যবসাটা হবে না। কারণ, প্রতি সেশনের ফুল প্রসিডিংস আমরা পেয়ে যাব’। বলল কলিন্স।
‘পেয়ে যাবেন, কেমন করে?’ বিষ্মিত কন্ঠ জেনারেল শ্যারনের।
‘এ ধরনের সম্মেলন করতে দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের একটাই শর্ত ছিল। সেটা হলো সম্মেলন সেশন গুলোর ফুল প্রসিডিংস এবং সম্মেলনে দাওয়াত প্রাপ্তদের তালিকা আমাদের দিতে হবে। তালিকা তারা দিয়েছে। সম্মেলনের সেশনগুলোর ফুল রেকর্ড তারা দিচ্ছে’। কলিন্স বলল।
‘দিচ্ছে নয়, দিবে’। সংশোধন করতে চাইল শ্যারন।
‘দেবে নয়, দিতে শুরু করেছে। প্রতিটি সেশন পরেই সে সেশনের রেকর্ড তারা পাঠিয়ে দিচ্ছে’।
স্পীকারে তখন বক্তৃতা চলছিল।
হঠাৎ বক্তৃতার শব্দ তরঙ্গের মাঝে একটা কন্ঠ ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘মিঃ কারসেন, আপনি একটু আসুন। জরুরী প্রয়োজন’। সামান্য একটু নিরবতা। তারপর আরেকটি কন্ঠ উচ্চারিত হলো, ‘চলুন’।
শেষের এ কন্ঠটি ইহুদী গোয়েন্দা কোহেনের।
তারপর অবার নিরবতা। স্পীকারে বক্তৃতার শব্দ ক্ষীণ হতে হতে এক সময় থেমে গেল।
‘তার মানে ডাকতে আসা লোকটি কোহেনকে নিয়ে সেমিনার হল থেকে বেরিয়ে এসেছে’। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘ঠিক তাই’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
আরও কতকগুলো মুহূর্ত পার হলো।
একটা দরজা খোলার শব্দ স্পীকারে ভেসে এলো। তারপর ভেসে এলো তা বন্ধ হবার শব্দও।
‘কোহেনকে নিয়ে লোকটি একটি ঘরে প্রবেশ করেছে। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘আসুন মিঃ কারসেন। আপনাকে সালাম দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত’। নতুন একটি কন্ঠস্বর স্পীকারে শোনা গেল।
নতুন কন্ঠটি কথা শেষ করে মুহূর্ত কালের মধ্যেই আবার বলে উঠল, ‘চমকে উঠলেন কেন মিঃ কারসেন? ঘানেম নাবালুসি তো সামান্য এই কথায় চমকে উঠার কথা নয়, বলুন’।
অয়্যারলেস স্পীকারে এই কথাগুলো শেষ হতেই চমকে উঠল জেনারেল শ্যারনও। তার চোখে মুখে সন্দেহ ও অস্বস্তির একটা ছায়া।
স্পীকারে কথা বলে উঠল আবার সেই নতুন কন্ঠটিই। বলল, ‘আচ্ছা মিঃ কারসেন, আপনার ওয়াশিংটনে পৌঁছার কথা ‘এয়ার আমেরিকার ‘জিরো জিরো থ্রি’ ফ্লাইটে, আর আপনি পৌঁছলেন প্রায় ১২ ঘন্টা পর ‘জিরো সেভেনটিন’ ফ্লাইটে, কেন?’
‘এখন এসব প্রশ্নের আমি অর্থ বুঝতে পারছি না। আপনিই বা এ প্রশ্ন করছেন কেন? কনফারেন্স নেতৃবৃন্দ তো রয়েছেন’।
‘কন্ঠটা কোহেনের, জানাল জেনারেল শ্যারন শুকনো গলায়।
‘আপনি তো দেখছেন, কনফারেন্সের নেতৃবৃন্দ আমার পাশেই বসে আছেন। তাদের পক্ষ থেকেই এ প্রশ্ন আমি করছি’। বলল সেই নতুন কন্ঠ।
‘আমাকে এভাবে প্রশ্ন করার অর্থ কি? ফ্লাইট ধরতে না পারা, ফ্লাইট চেঞ্জ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার’। স্পীকারে ভেসে এল কোহেনের কন্ঠ।
‘ফ্লাইট ধরতে না পারলে, ফ্লাইট চেঞ্জ করলে মাত্র বার ঘন্টার ব্যবধানে টিকিট তো চেঞ্জ করার প্রয়োজন হয় না। আপনি টিকিট চেঞ্জ করেছেন কোন কারণে?’
নতুন কন্ঠটির স্বর উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল জেনারেল শ্যারন। বলল সে শুকনো কন্ঠে, ‘মিঃ গোল্ড ওয়াটার চিনতে পারছেন এ কন্ঠ’।
‘না’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, এটা আহমদ মুসার কন্ঠ, যিনি আহমদ আবদুল্লাহ নামে সম্নেলনে যোগ দিয়েছেন’।
কিছু বলতে যাচ্ছিল গোল্ড ওয়াটার। কিন্তু তার আগেই স্পীকারে কোহেনের হাসির শব্দ শোনা গেল। বলল, ‘এসব ছোট খাট জিনিস নিয়ে আপনারা সময় নষ্ট করছেন কেন বুঝতে পারছি না। কেউ টিকিট হারিয়ে ফেললে সে নতুন টিকিট করতে পারে’।
‘মিঃ কারসেন ১২ ঘন্টা পর ভিন্ন ফ্লাইটে আসার কারণ বলেছেন ফ্লাইট ধরতে না পারা, এখন নতুন টিকিট কাটার কারণ বলছেন টিকিট হারিয়ে যাওয়া। টিকিট হারিয়ে যাওয়ার কথাটা ভিন্ন ফ্লাইটে আসার কারণ হিসেবে আগেই আসতে পারতো। তা আসেনি, কারণ কথাটা পরে বানানো। ফ্লাইট ধরতে না পারা কথাটাও বানানো নয় কি?’
স্পীকারে ভেসে আসে আহমদ আবদুল্লাহ ওরফে আহমদ মুসার কথা শুনে মুখ চুপসে গেল জেনারেল শ্যারনের। বলল, ‘সর্বনাশ গোল্ড ওয়াটার, ওরা কোহেনকে সন্দেহ করছে’।
‘ঠিক মিঃ জেনারেল, কিন্তু এটুকু প্রমাণ দিয়ে কারও সম্পর্কে ফাইনাল কথা বলা যায় না। সন্দেহ করা যায় মাত্র’।
স্পীকারে ভেসে এল কোহেনের গলা। বলল, ‘দেখুন আমি আমন্ত্রিত অতিথি। এভাবে আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন না। এটা অপমান করা’।
‘আপনার দুটো কারণই বানানো, মিথ্যা –এ কথার তো কোন জবাব দিলেন না?’ আহমদ আবদুল্লাহর গলা ভেসে এল স্পীকারে।
‘অহেতুক বিষয় জবাব দেবার মত নয়’। কন্ঠ কোহেনের।
‘আচ্ছা মিঃ কারসেন এ দু’টো ডকুমেন্ট দেখুন। একটি হলো সম্মেলনে যোগদানের সম্মতিসূচক লেটার অব এ্যাকসেপট্যান্স, অন্যটি সম্মেলনে আসার পর রেজিষ্ট্রেশন ফরম। দু’টোতেই মিঃ কারসেন মানে আপনার দস্তখত আছে। দেখুন তো দুই দস্তখত কি একজনের?’ স্পীকারে আহমদ আবদুল্লাহর কন্ঠ।
স্পীকার নিরব। কোহেনের কোন উত্তর নেই।
স্পীকারে আহমদ আবদুল্লাহরই অনুচ্চ, অথচ অত্যন্ত শক্ত কন্ঠ ভেসে এল। বলছে সে, ‘না মিঃ কারসেন টেবিল থেকে হাত দু’টো যতটুকু টেনেছেন, আর টানবেন না। টানলে দু’হাতই হারাবেন, কারণ আমার গুলি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয় না। আমি জানি, পড়ার জন্যে আপনার চশমার দরকার নেই। সম্মেলনে আসার পর লেখাপড়ার কোন কাজেই আপনি চশমা ব্যবহার করেননি। অতএব পকেট থেকে চশমা বের করবেন, এটা ঠিক নয়’।
কথায় একটু ছেদ নামল স্পীকারে। তারপরই আহমদ আবদুল্লাহ মানে আহমদ মুসার উচ্চকন্ঠ হাসি। তার কানে সাথে সাথেই ভেসে এল তার কন্ঠ, ‘আমি জানি, আপনার কোটের ভেতরের পকেটে যেখানে চশমা আছে, তার পাশেই শোল্ডার হোলস্টারে ঝুলছে নিউট্রন রিভলবার। সে রিভলবারের একটা বিষাক্ত ফায়ার কক্ষে উপস্থিত আমাদের ক’জনকে চোখের পলকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে এবং অন্তত ছ’মাসের জন্যে নিষ্ক্রিয় করে দেবে’।
মুহূর্ত কালের জন্যে নিরব হলো স্পীকার।
পরক্ষণেই আবার স্পীকারে কন্ঠ ভেসে এল আহমদ মুসার। বলছে সে কাউকে উদ্দেশ্য করে, ‘তোমরা এর পকেট থেকে নিউট্রন রিভলবারটা বের করে নাও। সার্চ করে দেখ দু’পায়ের মোজার সাথে আটকানো রিভলবার পেতে পার। সব শেষ অস্ত্র হিসেবে কোমরে বেল্টের আড়ালে একটা সুইচ নাইফ নিশ্চয় সে রেখেছে’।
নিরব হলো স্পীকার।
‘লোকটা অন্তরদ্রষ্টা নাকি। যে যে অস্ত্রের কথা আহমদ মুসা বলেছে সে সে অস্ত্র কোহেনের সেভাবেই রয়েছে’। বিষ্ময় মিশ্রিত করুণ কন্ঠে বলল জেনারেল শ্যারন।
‘কিন্তু অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার কোহেনের কাছে আছে এটা আহমদ মুসা বলতে পারেনি’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘এ জন্যেই আহমদ মুসা সর্বদ্রষ্টা বা অন্তরদ্রষ্টা নয়। কিন্তু অদ্ভূত নিখুঁত অনুমান তার’। জেনারেল শ্যারন বলল।
‘এমনও হতে পারে। কোহেনকে সন্দেহ করার পর আহমদ মুসা কোহেনের অজান্তে তাকে এবং তার লাগেজ সার্চ করেছে’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘হতে পারে, কিন্তু এভাবে কোহনেকে সার্চ প্রায় অসম্ভব। সার্চ করলে কোহেনের কাছে অবশ্যই তা ধরা পড়তো। আর ধরা পড়লে আগেই সে সাবধান হয়ে যেত। তাহলে এই বিপদে তাকে পড়তে হতো না’। বলল জেনারেল শ্যারন।
স্পীকার কথা বলে উঠল আবার।
স্পীকারে এবার অপরিচিত গলা। বলল, ‘মিঃ আহমদ আবদুল্লাহ, এদিকটা আপনি দেখুন। জরুরী টেলিফোন। আমি আসছি’।
‘ঠিক আছে,আসুন’। স্পীকারে আহমদ মুসার গলা।
স্পীকারে একটু নিরবতা।
মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই স্পীকারে ভেসে এল আহমদ মুসার গলা আবার। বলল, ‘দেখছেন তো অস্ত্রগুলো? একটা নিউট্রন রিভলবার, দুটো সাধারণ রিভলবার এবং একটা সুইচ নাইফ, মানে একটা যুদ্ধের অস্ত্র আপনার কাছে। মিঃ কারসেনের কাছে কি এগুলো থাকার কথা? মিঃ কারসেনের ছদ্মবেশে কে আপনি?’
স্পীকারে কোহেনের হাসির শব্দ ভেসে এল। হাসির সাথে সাথে তার কন্ঠও। বলল সে, ‘আহমদ মুসা আপনিও ছদ্মবেশ নিয়ে সম্মেলনে এসেছেন, আমিও ছদ্মবেশ নিয়ে সম্মেলনে এসেছি। আপনি জিতেছেন, আমি হেরে গেছি। এর বেশী আর কিছু জানতে পারবেন না’।
এবার স্পীকারে ভেসে এল আহমদ মুসার হাসি। বলল, ‘ভাল বলেছেন আপনি। দু’জনেরই ছদ্মবেশ। কিন্তু অনেক পার্থক্য।
সম্মেলনের উদ্যোক্তা ও অতিথি কারো কাছেই আমার ছ্দ্মবেশ নেই। সকলেই আমার পরিচয় ও নাম জানেন। কিন্তু আপনার নাম, পরিচয় আমরা কেউ জানি না। এখন আমরা সেটাই জানতে চাচ্ছি’।
স্পীকারে আহমদ মুসার কন্ঠ থেমে গেল। কিন্তু স্পীকার নিরব হওয়ার পরক্ষণেই আবা সরব হয়ে উঠল। স্পীকারে গলা পাওয়া গেল এবার টেলিফোন ধরতে যাওয়া সেই লোকটির। বলছে কন্ঠটি, ‘মিঃ আহমদ আবদুল্লাহ, মিঃ কারসেনের ভাই সারাসিন ঘানেম ফোন করেছিল ‘সান্তাফে’ থেকে। কিছুক্ষণ আগে উনি কথা বলেছেন এই মিঃ কারসেনের সাথে। কথা বলেই তাদের সন্দেহ হয়েছে। উনি টেলিফোন করেছিলেন জানার জন্যে যে, কি ঘটনা, তার ভাই কোথায়। এ নিয়ে তাদের বাড়িতে সবাই উদ্বিগ্ন’।
থেমে গেল স্পীকার। কথা শেষ করেছে লোকটি।
মহূর্ত মাত্র। স্পীকারে ভেসে এলো আহমদ মুসার গলা। বলছে কন্ঠটি, ‘বলুন মিঃ ছদ্মবেশী কারসেন, আপনি কে? মিঃ কারসেনকে কোথায় রেখেছেন, না তাকে হত্যা করেছেন?’ কঠোর কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘কোন সাহায্যই আপনাকে করব না আহমদ মুসা’। স্পীকারে শক্ত গলা মিঃ কোহেনের।
চোখে মুখে ভীষণ উদ্বেগ জেনারেল শ্যারনের। গোল্ড ওয়াটার ও কলিন্সের মুখও শুষ্ক। তাদের মুখেও কোন কথা নেই।
কোহেনের কথার পর স্পীকার থেমে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্যে। সেটা আবার সরব হয়ে উঠল। কঠোর কন্ঠ ভেসে এল আহমদ মুসার। সে বলছে, ‘এক আদেশ আমি দু’বার দেই না। বলুন শেষ সুযোগ এটা আপনার’।
‘বলেছি তো কোন সাহায্য আমার পাবেন না আপনি’ স্পীকারে কোহেনের কন্ঠ।
স্পীকার নিরব হলো।
হঠাৎ স্পীকার মোটা স্বরে ‘দুপ’ করে উঠল। তার সাথে সাথেই একটা আর্ত চিৎকার। চিৎকার কোহেনের।
আর্তনাদ করে উঠল জেনারেল শ্যারন। বলে উঠল আর্তস্বরে, ‘শয়তানটা কি কোহেনকে হত্যা করল?’
‘না, চিৎকারের ধরন সে কথা বলে না। আহমদ মুসা নিশ্চয় সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার ব্যবহার করেছে। নিশ্চয় আহমদ মুসা কোহেনের এমন জায়গায় গুলি করেছে যাতে কষ্ট পায়। কোহেনকে কথা বলাতে চায় আহমদ মুসা’। বলল এফ.বি. আই গোয়েন্দা কলিন্স।
‘আমাদের কিছু করা দরকার। এখনও না মেরে থাকলে যে কোন সময় আহমদ মুসা তাকে মেরে ফেলবে। মিঃ কলিন্স, মিঃ গোল্ড ওয়াটার আমাকে সাহায্য করুন। এখনি আমাদের কমান্ডোদের পাঠিয়ে তাকে মুক্ত করে আনা উচিত’। উত্তেজিত কন্ঠে বলল জেনারেল শ্যারন।
‘তাতে বিরাট রক্তপাত হবে। অনেক লোক মারা যেতে পারে। এ হত্যাকান্ড জাস্টিফাই করা যাবে না। এ ঝুঁকি নেয়া যাবে না’। পরিষ্কার কন্ঠে বলল কলিন্স।
‘ওদের কাছে বে আইনি অস্ত্র আছে। বেআইনি অস্ত্র দিয়ে একজন লোককে তারা আহত করেছে, এই অভিযোগে এফ.বি.আই সম্নেলনে ঢুকে আহমদ মুসাকে গ্রেপ্তার ও কোহেনকে মুক্ত করতে পারে’। বলল জেনারেল শ্যারন।
হাসল মিঃ কলিন্স। বলল, মিঃ জেনারেল উত্তেজিত হয়ে বাস্তবতাকে আপনি ভূলে যাচ্ছেন। এখন এফ.বি.আই ভেতরে ঢুকলে বেআইনি কোন অস্ত্রও পাবে না এবং আহত মিঃ কোহেনকেও পাবেনা। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে দু’টোকেই তারা সরিয়ে ফেলবে। আপনি ভূলে যাচ্ছেন কেন, সেখানে আহমদ মুসা আছে। সেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে’।
তাহল? কি করব আমরা? কিছু তো করতে হবে তাকে উদ্ধারের জন্যে’। বলল জেনারেল শ্যারন আকুল কন্ঠে।
‘মিঃ জেনারেল, অয়্যারলেস রেকর্ডে কি ঘটেছে পুরো শুনুন। তারপর করণীয় ঠিক করা যাবে। এখন তাড়াহুড়ো করে কোন লাভ নেই। যখন ঘটনা রেকর্ড হয়েছে সে সময় এবং যখন আমরা শুনছি তা এক সময় নয়। হতে পারে এ দু’ সময়ের মাঝে অনেক ব্যবধান’।
‘হ্যাঁ কলিন্স ঠিক বলেছে জেনারেল’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
‘হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। আমি সময়ের এই পার্থক্যের ব্যাপারটা একদমই ভূলে গিয়েছেলাম’। বলল জেনারেল চিন্তিত কন্ঠে।
স্পীকার সরব হয়ে উঠল আবার।
কন্ঠ ভেসে এল আহমদ মুসার। বলছে, ‘ডান কান উড়ে গেছে, এবার বাম কান উড়ে যাবে মিঃ ছদ্মবেশী কারসেন। আপনার পরিচয় আর আমার দরকার নেই। পরিচয় আপনার আমি পেয়ে গেছি। আপনি জেনারেল শ্যারনের লোক। একজন ইহুদী গোয়েন্দা ছাড়া আর কিছু নন। বলুন, মিঃ কারসেনকে কোথায় রেখেছেন?’
নীরব হলো স্পীকার। মুহূর্ত পরেই ভেসে এল আহমদ মুসার গলা। বলছে, ‘তিন পর্যন্ত গুনব। তিন উচ্চারিত হবার সাথে সাথে আমার গুলি ছুটবে’।
পরক্ষণেই স্পীকারে ভেসে এল আহমদ মুসার এক উচ্চারণের শব্দ।
স্পীকারে কন্ঠ শোনা গেল কোহেনের। বলছে, ‘আমি যখন ধরা পড়েই গেছি, তখন মিঃ কারসেন কোথায় তা বলতে আপত্তি নেই। তবে একটা শর্ত’।
‘কি শর্ত?’ স্পীকারে কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘বিনিময় হতে হবে। আমাকে ছেড়ে দেবেন, তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব’। স্পীকারে কন্ঠ মিঃ কোহেনের।
‘আপনি বলেন, কারসেন কোথায়, তাকে পাওয়ার পর আপনার মুক্তির কথা বিবেচনা করব’। কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘এটা কিন্তু প্রতিশ্রুতি হলো না’। কন্ঠ কোহেনের।
‘যা বলেছি, তার বাইরে আর কোন কথা নেই’। স্পীকারে ভেসে আসা এই দৃঢ় কন্ঠটি আহমদ মুসার।
‘কাগজ কলম দিন, লিখে ও এঁকে দিচ্ছি’। কোহেনের কন্ঠ স্পীকারে।
নীরবতা নেমে এলো স্পীকারে বেশ কিছুক্ষণ।
‘কোহেন নিশ্চয় লিখে দিচ্ছে ঠিকানা’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
এতক্ষণে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে জেনারেল শ্যারনের মুখে। বলল, ‘কোহেন ঠিক কাজ করেছে। সময় পেল সে। আমরাও সময় পেলাম। মিঃ কারসেন এখন আমাদের কাছে মূল্যবান কেউ নয়। আহমদ মুসা অবশ্যই কিছুটা রিল্যাক্সড হবেন এখন। সেটা হবে আমাদের জন্যে সুযোগ তাকে খাঁচায় বন্দী করার’।
‘ষড়যন্ত্র একটা হচ্ছে এখানে তাকে ঘিরে, এটা জেনে যাওয়ার পর আরও সাবধান হবে না?’ বলল কলিন্স।
‘তা হবে না। কিন্তু সম্মেলনের ভেতর থেকে কোন বিপদ আর নেই এটা জানার পর সে নিশ্চিন্ত হবে। আমি চাই সে সম্মেলন থেকে না পালাক। তাহলেই একটু সুযোগ আমরা পেয়ে যাব’। জেনারেল শ্যারন বলল।
জেনারেল কথা শেষ করার আগেই স্পীকার কথা বলে উঠছে। কন্ঠ এবার আহমদ মুসার। বলছে, ‘ধন্যবাদ মিঃ ইহুদী গোয়েন্দা। ইহুদীরা যে নিজেদের ব্যাপারে খুব বাস্তববাদী, আপনিও তা প্রমাণ করলেন’।
একটু নিরবতা স্পীকারে।
স্পীকারে আবার কন্ঠ ভেসে এল আহমদ মুসার। বলছে, ‘এর কানটায় ব্যান্ডেজ বেঁধে কিছু ঔষধ খাইয়ে দিন। তারপর ওর হাত পা বেঁধে ঘুম পাড়িয়ে দিন। আমি একেও নিয়ে যাব যাবার সময়। নিয়ে যেতে বলুন এঁকে’।
‘কোথায় যাবেন?’ ঘরের ভেতর থেকেই এক অপরিচিত কন্ঠ।
‘আমি যাব নিউ মেক্সিকোতে মিঃ কারসেনের সন্ধানে’। কন্ঠটি আহমদ মুসার।
‘এখনি?’ জিজ্ঞাসা সেই অপরিচিত কন্ঠটির।
‘এখনি’, কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘ওঁকেও ওখানে নেবেন? অসুবিধা হবে না তো?’ সেই অপরিচিত কন্ঠই আবার শোনা গেল।
‘না, ওকে নিচ্ছি না। নিরাপদ একটা স্থানে ওকে রেখে যাব। সম্মেলন কেন্দ্রে ওকে আর এক মূহুর্ত রাখাও নিরাপদ নয়’।
দরজা খোলার শব্দ এল স্পীকারে। বন্ধ করারও শব্দ পাওয়া গেল।
আর শোনা গেল না আহমদ মুসার কন্ঠ।
‘কোহেনকে আহমদ মুসার লোকরা বের করে এনেছে ঘর থেকে’। জেনারেল শ্যারন বলল।
‘ঠিক’। বলল মিঃ কলিন্স।
‘মিঃ কলিন্স আর দেরী করলে কোহেনকে উদ্ধার হয়তো আর কোন দিনই করা যাবে না। কিছু করতে হবে এবং তা এই মুহূর্তেই’। জেনারেল শ্যারন বলল।
‘উদ্ধার করা যাবে না কেন? আহমদ মুসা কোন প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করেনি বটে। কিন্তু তার কথা শুনে মনে হয়েছে মিঃ কারসেনকে পাওয়ার পর তারা কোহেনকে ছেড়ে দেবে’।
‘না দেবে না। কারণ, কারসেনকে পাওয়ার আগেই আহমদ মুসা আমাদের খাঁচায় বন্দী হবে’। বলল শ্যারন।
‘কি ভাবে?’ বলল কলিন্স।
‘কোহেন আহমদ মুসাকে মিঃ কারসেনের বন্দী করে রাখার স্থান বলে দিয়ে আহমদ মুসাকে ধরার একটা ফাঁদ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। আহমদ মুসা কারসেনকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই আমাদের হাতে চলে আসবে। এখন যদি আহমদ মুসাকে সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ধরা না যায়, তাহলে এই মুহূর্তেই আমাদের যাত্রা করতে হবে নিউ মেক্সিকোতে’।
‘তাহলে কোহেনকে আর উদ্ধার করতে পারছেন না’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘কেন?’ শ্যারন বলল।
‘কারণ, এখন কোহেন কিংবা আহমদ মুসা কেউই সম্মেলন কেন্দ্রে নেই। কোহেনকে নিরাপদ স্থানে রেখে আহমদ মুসা নিশ্চয় এখন মেক্সিকোর পথে রয়েছে’।
চমকে উঠল জেনারেল শ্যারন। বলল, ‘সত্যি তো। ভূলেই গিয়েছিলাম, ঘটনা ঘটার সময় এবং ঘটনার রেকর্ড শোনার সময়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য’।
বলেই উঠে দাঁড়াল জেনারেল শ্যারন। আসুন আমরা প্রস্তুত হই।
এখনি আমাদের নিউ মেক্সিকো যাত্রা করতে হবে’।
‘কিসে যাবে?’
‘আহমদ মুসা নিশ্চয় কোন এয়ার লাইন্সে নিউ মেক্সিকো যাচ্ছে। তার আগে আগে আমাদের পৌঁছতে হলে আপনার জেট বিমান ছাড়া কোন উপায় নেই। সব ধরনের খরচ আমি বহন করব। আপনি আপনার জেট প্রস্ত্তত করতে বলে দিন’।
‘ঠিক আছে মিঃ শ্যারন। কিন্তু মনে থাকে যেন আহমদ মুসাকে আমাদের কাছে থেকে কেনার চুক্তি এখনও বাতিল হয়নি’। গোল্ড ওয়াটার বলল।
‘না আমি ভূলিনি মিঃ গোল্ড ওয়াটার। আহমদ মুসাকে হাতে পেলে পয়সা আমাদের জন্যে কোন ব্যাপার নয়’।
‘কিন্তু আমাকে নিউ মেক্সিকো যেতে হলে এফ.বি.আই কর্তৃপক্ষের অনুমতি দরকার’। বলল কলিন্স।
‘না আপনাকে অবশ্যই যেতে হবে আমার সাথে। আপনি থাকলে একটা লিগ্যাল প্রটেকশন আমাদের সাথে থাকবে। ঠিক আছে আমি এখনি টেলিফোন করছি জর্জ আব্রাহাম জনসনকে’।
বলে জেনারেল শ্যারন টেলিফোন তুলে নিল হাতে।

সান্তাফে বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল আহমদ মুসা।
খুব সাধারণ ছদ্মবেশ তার।
মুখে গোঁফ লাগানো হয়েছে, যা কোন সময়ই লাগায় না এবং মাথাভর্তি ঈষৎ কোঁকড়া চুল পরেছে।
এতেই আহমদ মুসা একদম অন্য মানুষ হয়ে গেছে।
সাথে কোন লাগেজ নেই। লাগেজ রাখবেই বা কোথায়?
যে ধরনের কাজে এসেছে তাতে সাথে লাগেজ বহনের অবকাশও নেই।
আহমদ মুসার সামনে হাঁটছিল এক বৃদ্ধ। বয়স আশি-নব্বই এর মত হবে। একটা ট্রলিতে ব্যাগ ঠেলে নিচ্ছিল সে।
কষ্ট করে ভারসাম্য রক্ষা করে হাঁটছে সে।
গ্যাংওয়ের একটা উঁচু লেয়ারে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল বৃদ্ধ।
আহমদ মুসা তাকে ধরে ফেলল।
‘ধন্যবাদ’। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল বৃদ্ধটি।
বৃদ্ধটি রেড ইন্ডিয়ান, দেখল আহমদ মুসা।
‘ওয়েলকাম। আমি যদি ট্রলিটা বহন করি, আপনি তা কি পছন্দ করবেন?’
বৃদ্ধটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘না আমি অপছন্দ করব না’।
আহমদ মুসা ব্যাগসহ ট্রলি ঠেলে বৃদ্ধের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
লাউঞ্জ থেকে বের হবার সময় বৃদ্ধ আহমদ মুসাকে বলল, ‘তুমি অবশ্যই বিদেশী। কিন্তু একেবারে যে খালি হাত!’
‘বিদেশী হলেও চাকুরে, চাকুরীর মাধ্যমে অনেকেই এদেশী হয়ে গেছে। তাদের খালি হাতে সফর তো হতে পারে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার কি সান্তাফে’তে বাড়ি বা বাসা আছে?’ বলল বৃদ্ধ।
‘নেই’।
‘আত্মীয় স্বজন আছে?’
‘নেই’।
‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব আছে?’
‘নেই’।
‘তাহলে তো হলো না। তুমি ওয়াশিংটন থেকে আসছ নিউ মেক্সিকো। খালি হাতে খুব স্বাভাবিক নয়’।
বুড়োর বিশ্লেষণী শক্তি দেখে অবাক হলো আহমদ মুসা। মুখে হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা, ‘স্বাভাবিকের একটা ব্যতিক্রম তো আছে’।
‘আছে! সেটা অস্বাভাবিক’।
‘অস্বাভাবিক ঘটনা তো ঘটতেই পারে’।
লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা।
গাড়ি বারান্দায় আসার পর আহমদ মুসা ট্রলিটা রেখে বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনার জন্যে গাড়ি ঠিক করব কি? কোথায় যাবেন আপনি?’
‘ছেলের বাসা আছে এই সান্তাফে শহরেই। সেখানেই যাব, বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। তুমি কোথায় যাবে?’
‘যাবো সান্তা ফ্লারা। সেখান থেকে ক্লীফ ডোয়েলিং’।
‘তার মানে ক্লীফ ডোয়েলিং যাবে। তুমি পর্যটক বুঝি?’
‘দেশ বেড়ানো পর্যটন হলে আমি অবশ্যই পর্যটক’।
‘কিন্তু তুমি তাহলে সান্তা ফ্লারা যাবে কেন? ওখান থেকে ক্লীফ ডোয়েলিং যাবার রাস্তা সরাসরি নেই। ‘এস্পানোলা থেকে সরাসরি যোগাযোগ ক্লীফ ডোয়েলিং এর। আরও একটা সুখবর আমাদের বাড়ি এস্পানোলায়’।
‘সত্যি সুখবর। ঠিক আছে আমি এস্পানোলা হয়েই যাই। কিন্তু আপনি তো যাচ্ছেন না’।
‘হ্যাঁ যাচ্ছি। আমার বড় নাতি, আমার ছেলের বড় ছেলে খুন হয়েছে খেলার মাঠে হোয়াইটদের সাথে এক সংঘর্ষে। তুমি চল না আমার সাথে। ওদিককার অবস্থা একটু দেখে আমিও এস্পানোলা যাব, অথবা কাউকে দিয়ে তোমাকে পাঠিয়ে দেব’।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি খুশী হতাম আপনার ছেলেদের সাথে পরিচিত হতে পারলে। কিন্তু আমার একটু তাড়া আছে’।
বলে আহমদ মুসা একটা গাড়ি ডেকে বৃদ্ধকে তুলে দিল গাড়িতে। লাগেজগুলো তুলে দিয়ে বিদায় নেবার জন্যে বৃদ্ধের কাছে যেতেই একটা টুকরো কাগজ আহমদ মুসার হাতে তুলে দিয়ে বলল, এতে এস্পানোলার যেখানে আমাদের বাড়ি তার ঠিকানা আছে। তুমি সেখানে এস। আমি কালকের মধ্যেই আশা করি বাড়ি পৌঁছব’।
‘যখন এখানে আমার কেউ নেই, তখন এ ধরনের আশ্রয়ের আহবান লোভনীয়’।
বলে গুডবাই জানিয়ে চলে যাচ্ছিল আহমদ মুসা।
বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠল, ‘শোন শোন তোমার নামটাই বলনি’।
আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়িয়ে দু’পা সরে এসে বলল, ‘আহমদ আবদুল্লাহ’।
‘তুমি মুসলমান?’
‘কেন খারাপ মনে করছেন না তো?’
‘না হে, ভাল মনে করছি’।
‘মুসলমানদের সাথে পরিচয় আছে?’
‘বলব না, তুমি এস তখন বলব।
শুনলে তুমিও খুশী হবে’।
‘ঠিক আছে, আল্লাহর ইচ্ছা’।
বলে চলে যাবার জন্যে পা বাড়াল আহমদ মুসা আবার।
কিন্তু পরক্ষণেই ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, লজ্জা বিজড়িত কন্ঠে, ‘স্যার, আপনার ঠিকানা পেলাম, সেখানে তো আপনার নাম নেই’।
হাসল বৃদ্ধ, বলল, লিখে নাও, ‘রসওয়েল পাবলো’।

আহমদ মুসা দ্রুত ‘ক্লীফ ডোয়েলিং’ পৌঁছতে চেয়েছিল। পারল না। একটা রাত এস্পানোলাতে তাকে থাকতে হলো।
থাকতে হলো খোঁজ খবর নেবার জন্যেও।
আহমদ মুসার গন্তব্য ক্লীফ ডোয়েলিং নয়। ক্লীফ ডোয়েলিং থেকে একটু দক্ষিণে ‘লস আলামোসে’র দিকে একটু এগুলে গম্বুজাকৃতি একটা সবুজ পাহাড় আছে সেটাই তার গন্তব্য। সেই সবুজ পাহাড়ের মালিক ছিলেন একজন ইহুদী বিজ্ঞানী। তিনি মৃত্যুর সময় তার বাড়ি সমেত সবুজ পাহাড়টি দিয়ে গেছেন তাদের ধর্মীয় ‘সিনাগগ’ কে। সেখানে সেই বিজ্ঞানীর স্মৃতিতে তৈরী হয়েছে এক ‘সিনাগগ’। সেই সিনাগগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইহুদীবাদীদের একটা গোপন আস্তানা। এই গোপন আস্তানার একটা বড় কাজ হলো ‘লস আলামোসে’র উপর গোয়েন্দাগিরি করা।
‘লাস আলামোস’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে সমৃদ্ধ পারমাণবিক গবেষণ কেন্দ্র। এই কেন্দ্রেই তৈরী হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আণবিক বোমা। এখন এই গবেষণাগারে ‘স্ট্রাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ’ (SDI) এর নানা দিকের উপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছে। সবুজ পাহাড়ের ইহুদী সিনাগগ এ গবেষণার উপরই চোখ রাখছে। প্রতিটি উন্নয়ন এবং পরিকল্পনা ও প্রস্তাব তারা মনিটর করে।
আহমদ মুসা খোঁজ নিয়ে জেনেছে ‘ক্লীফ ডোয়েলিং’ থেকে তাকে যেতে হবে সবুজ পাহাড়ের সিনাগগের দিকে। ক্লীফ ডোয়েলিং থেকে দক্ষিণ দিকে ‘লস আলামোস’ পর্যন্ত এবং তার আশপাশ এলাকায় রাতে ব্যক্তিগত ছাড়া কোন ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস চলে না। আহমদ মুসাকে যেহেতু যেতে হবে ভাড়া গাড়িতে, তাই তাকে রাতটা অপেক্ষা করতে হলো এস্পানোলাতে।
এক রাত অপেক্ষা করাটা তার জন্যে শাপে বর হলো। ওয়াশিংটনে নকল কারসেনের কাছ থেকে ক্লীফ ডোয়েলিং ও লস আলামোস এর মাঝখানের গম্বুজাকৃতি সবুজ পাহাড়ের সিনাগগের নামটাই সে শুধু পেয়েছিল। কিন্তু এক রাতের সময় হাতে পাওয়ায় খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আরও কিছু জানতে পারল সে। বিল নামে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার তাকে বলল, ‘স্যার আমার দশ বছর ট্যাক্সি চালানোর জীবনে এই প্রথম একজন প্যাসেঞ্জার পেলাম সবুজ পাহাড় সিনাগগে যাবার’।
‘ইহুদীরা সিনাগগে যায় না?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘ওখানে কেন যাবে স্যার! ‘সান্তাফে’তেই তো সিনাগগ আছে’।
‘তাহলে ওখানে সিনাগগ করতে গেল কেন?’
‘জানি না স্যার। পর্যটকরাও ওখানে যায় না’।
‘কেন?’
‘সিনাগগের কর্তৃপক্ষরা নাকি পছন্দ করে না। বলে, এটা নতুন সিনাগগ। ঐতিহাসিক হলে দেখার কিছু থাকতো’।
বলল, ‘তুমি কোনদিন গেছ সেখানে?’
‘ক্লীফ ডোয়েলিং থেকে লস আলামোসে যাবার একটা রাস্তা সবুজ পাহাড়ের পাশ দিয়ে গেছে। একবার লস আলামোস গেছি ঐ পথ দিয়ে। ফেরার পথে লস আলামোস থেকে একজন আমার গাড়িতে উঠেছিল। সে নেমেছিল ঐ সিনাগগে। তাকে নামিয়ে দেয়ার জন্যে আমি সিনাগগের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সাংঘাতিক ওদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্যার। গাড়ি বারান্দা পৌঁছতে আমাকে দু’বার চেক করেছে ওরা’।
‘ঐ লোকটিকে চেক করেনি?’
‘না, করেনি। বরং সে লম্বা লম্বা স্যালুট পেয়েছে’।
‘বিল তুমি বললে লস আলামোসে মাত্র একবার গেছ। কেন?’
‘লস আলামোসে যাবার আলাদা পথ আছে সান্তাফে থেকে। অন্য পথগুলো বিশেষ করে উত্তর-দক্ষিন-পশ্চিম বনাঞ্চলের প্রাইভেট পথগুলো রেস্টিকেটেড। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া এ পথগুলো ব্যবহার করা যায় না’।
‘তাহলে তুমি সেদিন গিয়েছিলে কিভাবে?’
‘যাকে নিয়ে গিয়েছিলাম, সে লস আলামোসের একজন বিজ্ঞানী’।
‘যাকে তুমি নিয়ে এসেছিলে, সেও কি তাই?’
‘তা মনে হয়নি স্যার। সে লস আলামোস অফিস থেকে আমর গাড়িতে চড়েনি। গবেষণা কেন্দ্রের বাইরে একটা ঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। আমার গাড়ি সেখানে পৌঁছতেই সে রাস্তায় ছুটে আসে। মনে হয়েছিল, সে ওঁত পেতে ছিল গাড়ির অপেক্ষায়।
‘তাহলে নিশ্চয় সে লস আলামোসের চাকুরে নয়। কারণ চাকুরেরা সবাই পারমাণবিক গবেষণাগারের সেফটি কোড অনুসারে লস আলামোসেই থাকার কথা’।
‘কিন্তু তার গায়ে লস আলামোসের ইউনিফরম ছিল। আমার গাড়িতে উঠবার পর তড়িঘড়ি তা সে খুলে ফেলে’।
‘তড়িঘড়ি বলছ কেন বিল?’
‘গাড়িতে উঠেই দ্রুত সে ইউনিফরমের বোতাম খোলা শুরু করে’।
‘আচ্ছা তোমার গাড়িতে যাওয়া বিজ্ঞানী কি ইউনিফরম পরে ছিল?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন কেন? যাবেন তো আপনি সবুজ পাহাড়ে,লস আলামোসে তো নয়’।
‘দেখ জানার প্রত্যেকটা বিষয় খুটেঁ খুটেঁ জানা আমার অভ্যাস’।
বলে আহমদ মুসা তাকে খুব সকালে গাড়ি নিয়ে হোটেলে আসতে বলে বিদায় নিয়েছিল।
পরদিন সকালে সবুজ পাহাড় সিনাগগে যাত্রা করল আহমদ মুসা।
এস্পানোলা শহরটি রেড ইন্ডিয়ান রিজার্ভ এলাকার মধ্যে। এলাকাটির সীমান্ত সা্ন্তাফে জাতীয় ফরেস্ট এলাকার সাথে মিশে আছে।
রাজধানী সান্তাফেসহ নিউ মেক্সিকোর গোটা অঞ্চলটাই পার্বত্য উচ্চভূমি।
আহমদ মুসার মনে হলো গাড়িটা যেন ক্রমেই উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। মনে পড়ল রুদ্ধ পর্বতমালার কি এক পাহাড় হবে সামনেই। ঐ পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালেই তো ক্লীফগুলো।
আরও কিছু পথ চলার পর গাড়ি একটু বাম দিকে বাঁক নিল। তার মনে হলো গাড়ি এবার নিচে নামছে।
‘স্যার আমরা গ্রান্ডি নদীর সনি লুইস উপত্যকায় নামছি। এই উপত্যকাতেই আপনার সবুজ পাহাড়। এই উপত্যকারই আদিগন্ত বনরাজিবেষ্টিত উচ্চভূমিতে লস আলামোস ল্যাবরেটরী’।
‘বিল তোমরা নিউ মেক্সিকানরা লস আলামোস নিয়ে খুব গর্বিত তাই না?’
‘হ্যাঁ, স্যার। প্রথমটাসহ প্রথম দিকের সব আণবিক বোমা তো এই গবেষণাগারেই তৈরী হয়’।
‘শুধু তো তৈরী নয়, তোমাদের এই ট্রিনিটি ভ্যালিতে আণবিক বোমার প্রথম পরীক্ষাও সংঘটিত হয়’।
‘স্যার আপনি দেখছি এই এলাকার অনেক কিছুই জানেন’।
‘কেন, এটা তো সবাই জানার কথা। লস আলামোস, ট্রিনিটি ভ্যালি তো জগত বিখ্যাত। নিউ মেক্সিকো এলে কোন মানুষ এ দু’টো জায়গা না দেখে যায় না’।
গল্পে গল্পে অনেক সময় চলে গেল।
আহমদ মুসা বলল, ‘আর কতদূর তোমার সবুজ পাহাড়?’
‘আর দু’বাঁক ঘুরলেই স্যার’।
ড্রাইভার কথা শেষ করার সাথে সাথে হার্ড ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করাল।
ঝাঁকুনি সামলে উঠে সামনে তাকাতেই আহমদ মুসা দেখল, মুখোশ পরা একজন লোক স্টেনগান তাক করে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনাতেই আহমদ মুসার দৃষ্টি চারপাশ ঘুরে এল। দেখল, মুখোশ পরা আরও জনা পাঁচেক লোক স্টেনগান হাতে গাড়িটা ঘিরে ফেলেছে।
ছুটে এল দু’পাশ থেকে দু’জন গাড়ির জানালায়। একজন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এশিয়ান, এশিয়ান’।
পরক্ষণেই ছুটে এল বিশাল বপু আরেকজন লোক, তার হাতে একটা ফটো। সে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে, একবার হাতের ফটোগ্রাফের দিকে তাকাল। সেও বলে উঠল চিৎকার করে, ‘খুব একটা মিলছে না। কিন্তু এশিয়ান, এটাই বড় কথা। নামাও শালাকে। নিশ্চয় ছদ্মবেশে আছে’।
একজন সংগে সংগেই টান মেরে গাড়ির দরজা খুলে ফেলল। টানতে হলো না, আহমদ মুসা নিজেই নেমে এল গাড়ি থেকে। ভাবল, জেনারেল শ্যারনদেরই পাতা ফাঁদ কি? কিন্তু ওরা জানবে কি করে যে আহমদ মুসা নিউ মেক্সিকোর সবুজ পাহাড়ে আসছে! সে তো নিজ হাতে নকল কারসেন ওরফে ইহুদী কোহেনকে জর্জদের তত্বাবধানে রেখে এসেছে। সে মুক্ত হতে পেরেছে এটা বিশ্বাস হয় না। তাহলে এরা জানতে পারল কি করে? এরা যে আহমদ মুসাকেই খুঁজছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
আহমদ মুসা নামতেই একজন তার চুল এবং আর একজন গোঁফ ধরে টান দিল। খুলে গেল দুটোই।
সেই মোটা লোকটা চিৎকার করে উঠল, ‘মিলে গেছে। একেবারে মিলে গেছে। শয়তান আহমদ মুসাকে আবার আমরা হাতে পেয়েছি’।
নেমেই সে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘উঃ তোমার জন্যে আমরা গতকাল দুপুর থেকে এখানে বসে আছি। কি যে কষ্ট দিয়েছ’।
‘জানলে কি করে যে আমি আসব?’ আহমদ মুসা স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল।
মোটা লোকটি আহমদ মুসার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
‘বাঃ তুমি এমনভাবে কথা বলছ যেন আমরা তোমাকে স্বাগত জানাতে এসেছি। হাফ ডজন উদ্যত স্টেনগানের সামনে কথা বলতে বুক একটু্ও কাঁপল না?’
‘কাঁপবে কেন? তোমরা আমাকে হ্ত্যা করতে পারবে না। সে ক্ষমতা তোমাদের নেই’।
লোকটির চোখ জ্বলে উঠল। সে তার স্টেনগানের বাঁট দিয়ে একটা আঘাত করল আহমদ মুসার মাথায়।
আহমদ মুসা মাথা সরিয়ে নেয়ায় আঘাতটা কান দিয়ে কাঁধে নেমে এল। কান ছিঁড়ে গেল। দর দর করে বেরিয়ে আসা রক্ত বুক, পৃষ্ঠদেশ ভাসিয়ে দিতে লাগল।
‘ক্ষমতার কথা তুলছ, ক্ষমতা দেখবে চল’। আঘাত করার সাথে সাথে কথা কয়টি বলে হুংকার ছাড়ল সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে, এর হাত পা বেঁধে নিয়ে চল একে।
দু’জন ছুটে এল আহমদ মুসার দিকে।
‘দাঁড়াও তোমরা, আমি ড্রাইভারকে ভাড়াটা দিয়ে নেই’।
বলে আহমদ মুসা পকেটে হাত দিয়ে এক গুচ্ছ নোট বের করে ড্রাইভারের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘নাও বিল, ধন্যবাদ তোমাকে’।
ড্রাইভার উদ্বেগ, আতংকে একেবারে পান্ডুর হয়ে গেছে। আহমদ মুসাকে ভাড়া দিতে দেখে চোখ দু’টি তার ছল ছল করে উঠল। বলল, ‘থাক স্যার, আপনি…..’।
থেমে গেল, শেষ করতে পারল না। কথা আটকে গেছে তার গলায়।
আহমদ মুসা নোটগুলো ছুঁড়ে দিল ড্রাইভারের দিকে।
ওরা মহা উৎসাহে হাত পা বাঁধল আহমদ মুসার। তারপর চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল তাকে।
হঠাৎ ওদের একজন ঘুরে দাঁড়াল। চিৎকার করে উঠল ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে, ‘হারামজাদা, কি দেখছিস। এক মুহূর্ত দেরী করলে লাশ বানিয়ে দেব’।
ড্রা্‌ইভার তাড়াতাড়ি আহমদ মুসার দেয়া নোটগুলো কুড়িয়ে পকেটে ফেলে গাড়ি ব্যাক করে ছুটল সামনের দিকে।
শরীর কাঁপছে ড্রাইভারের। বুক তোলপাড় করছে আতংক ও বেদনায়।
তার মন বলে উঠল, যে লোক মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ড্রাইভারের ভাড়া পরিশোধ করতে ভোলে না, সে কোন খারাপ লোক হতে পারে না। কিন্তু কেন ওরা ওঁকে ধরে নিয়ে গেল। কি দোষ তাঁর!
আবার বিষ্মিতও কম হয়নি ড্রাইভার। সে যতখানি আতংক ও উদ্বিগ্ন হয়েছে, তার কণামাত্র উদ্বেগও ঐ লোকের চোখে মুখে দেখেনি। ব্যাপারটা অলৌকিক মনে হচ্ছে তার কাছে।
দু’জন আহমদ মুসার দেহ ঘরের মেঝেতে ছুড়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘দেখতে তো খুব হালকা পাতলা, কিন্তু পাথরের মত ভারি’।
আহমদ মুসার দেহ গিয়ে পড়ল জেনারেল শ্যারনের পায়ের কাছে।
সোফায় পাশাপাশি বসে ছিল জেনারেল শ্যারন, মিঃ গোল্ড ওয়াটার ও মিঃ কলিন্স।
জেনারেল শ্যারন ডান পা দিয়ে আহমদ মুসার পাঁজরে একটা ঘা দিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার আহমদ মুসা নিউ মেক্সিকোর সবুজ পাহাড়ে যে তুমি? লস আলামোস দেখতে এসেছিলে নাকি? কিন্তু লস আলামোসের রাস্তা তো এটা নয়’।
‘ভনিতা করবেন না জেনারেল শ্যারন। আপনি জানেন আমি কেন এসেছি’। বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আহমদ মুসা, তুমিও দেখছি বোকামী কর মাঝে মাঝে। তুমি কেমন করে নিশ্চিত হলে যে কোহেনকে আটকালে আমরা টের পাবো না এবং কোহেন আটক হওয়র পর সবুজ পাহাড়ে তুমি আসবে এটা আমরা বুঝব না?’
‘সত্যিই বলেছেন। কোহেনের কাছে অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার চীপস আছে, এ বিষয়টা আমাদের চিন্তায় আসেনি। আর আমি বোকামী না করলে আমাকে এভাবে আটকানো তোমার পক্ষে সম্ভব হতো কি করে?’
‘সেবার আমাদের বোকা বানিয়ে তুমি সরে পড়েছিলে। এবার তোমাকে বোকা বানিয়ে আমরা তোমাকে খাঁচায় পুরলাম’। বলে হো হো করে হেসে উঠল জেনারেল শ্যারন।
‘ঠিক আছে। আমাকে তো তোমরা পেয়েছ, এবার তোমরা মিঃ কারসেনকে ছেড়ে দাও। আর তোমাদের ওয়াদা অনুসারেই ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারকে ছেড়ে দিতে হবে’।
আবার জেনারেল হেসে উঠল হো হো করে। বলল, ‘কোহেনকে পাওয়ার পর আমরা ছেড়ে দেব মিঃ কারসেনকে। কিন্তু বল ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারকে ছাড়ি কি করে। ইতিমধ্যেই আমাদের লোকরা তাদের প্রেমে পড়ে গেছে। তুমিই বল আমি কেমন করে বঞ্চিত করি ওদের? ওরা তো এক সাগর তৃষ্ঞা নিয়ে আমাদের দেয়া মেয়াদ পনের দিন পার হওয়ার প্রহর গুনছে। এখন কিন্তু তুমি আমাদের হাতে, পনের দিনের মেয়াদ পার হওয়ার আর কোন প্রয়োজন নেই’।
‘কিন্তু আমি এও জানি মিঃ শ্যারন, আমি বেঁচে থাকতে তাদের গায়ে তোমরা হাত দেবে না’।
‘কেন?’
‘কারণ আহমদ মুসাকে তোমরা চেন’।
‘আহমদ মুসা, তোমার এই অতি আত্মবিশ্বাস তোমাকে অতীতে বহুবার বাঁচিয়েছে জানি, কিন্তু সব বার বাঁচাবে তা ঠিক নয়। সব কিছুরই একটা শেষ আছে। সেই শেষ অবস্থায় তুমি পৌঁছে গেছ। আগামীকাল সকালে তোমাকে নিয়ে আকাশে উড়ব আমরা ইউরোপের কোন একটি দেশের উদ্দেশ্যে। আমরা মার্কিন সীমান্ত অতিক্রম করার পর ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারকে ক্ষুধার্থ হায়েনারা ছিঁড়ে –ফেড়ে খাবে’।
বলে জেনারেল শ্যারন আবার হেসে উঠল হো হো করে।
‘মনে হচ্ছে মিঃ শ্যারন তোমার নিজের এবং সবার ভাগ্যটা যেন তুমিই লেখ’। বলল আহমদ মুসা।
‘ভাগ্য ঈশ্বরই লেখেন। তবে তোমাদের কবি ইকবালের একটা কথা আছে না, খুদিকে এমন বুলন্দ কর, যাতে খোদা বলেন, বল বান্দাহ তোমার ইচছা কি, আমি কি লিখব তোমার ভাগ্য। এখন ঈশ্বর তোমাদের ভাগ্য আমার হাতে দিয়ে দিয়েছেন’।
‘সৌভাগ্য আপনার মিঃ শ্যারন’।
‘আচ্ছা, মিঃ আহমদ মুসা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, আপনি এখন মুক্তির কথা ভাবছেন, না ভবিষ্যতটা অন্ধকার দেখছেন?’ বলল এফ.বি.আই এজেন্ট কলিন্স।
‘আপনি…..?’
‘আমি কলিন্স’।
‘আরেকটা পরিচয়ও আছে, আপনি এফ.বি. আই এর লোক’। বলল আহমদ মুসা।
বিষ্ময় দেখা দিল কলিন্সের চোখে মুখে। বলল, ‘আপনি কি করে জানলেন?’
‘এফ. বি. আই এজেন্টদের চোখেই তাদের পরিচয় লেখা থাকে সাধারণত’।
‘সাধারণত বললেন কেন?’
‘চেনা যায় না, এমন অসাধারণ ক্ষেত্রও বহু আছে’।
‘আমার প্রশ্নের কি জবাব দেবেন?’ বলল কলিন্স।
‘মুক্তি সম্পর্কে কোন ভাবনা আমার মাথায় এখন নেই। তাই বলে আমি সামনে অন্ধকারও দেখছি না। মৃত্যুকে যারা ‘অন্ধকার’ রূপে দেখে, তারা ভবিষ্যত অন্ধকার দেখতে পায়। কিন্তু মৃত্যু আমার কাছে আলোকিত এক সিংহ দরজা’। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা একটু থামল। পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু জেনারেল শ্যারন ও মিঃ গোল্ড ওয়াটারের সাথে এফ.বি.আই এর লোক কেন? মার্কিন সরকার কি জেনারেল শ্যারনকে সাহায্য করছে?’
মিঃ কলিন্সের মুখে কিছুটা বিব্রত ভাব ফুটে উঠল। বলল, ‘সরকারের কোন পলিসির প্রশ্ন এখানে জড়িত নেই। জেনারেল শ্যারন একজন গন্যমান্য লোক, আমাদের দেশে এসেছেন, তাই তাকে একটু সঙ্গ দেয়া’।
‘মেহমানকে সঙ্গ দেয়া আর লোক কিডন্যাপের অভিযানে তাকে সঙ্গ দেয়া কি এক জিনিস?’ আহমদ মুসার কন্ঠে জিজ্ঞাসা।
‘দেখুন আমি ছোট চাকুরী করি। এসব প্রশ্নের জবাব আমার দেবার কথা নয়’। বলল কলিন্স।
কলিন্স থামতেই গর্জন করে উঠল জেনারেল শ্যারন। বলল, ‘তুমি এদেশে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী একজন বন্দী। এফ.বি.আইকে তোমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে? সাহস তুমি খুব বেশীই দেখাচ্ছ’।
‘আমি বেআইনী প্রবেশকারী হলে সেটা দেখার দায়িত্ব মার্কিন সরকারের, জেনারেল শ্যারনের নিশ্চয় নয়’।
‘আহমদ মুসা আমি তোমার প্রশংসা করি। কিন্তু তোমার এখন অবস্থা কি, আর তুমি আলোচনা করছ কোন বিষয়ে। তোমাকে আমরা ধরেছি, কেন ধরেছি, কিভাবে ধরেছি, সে জবাবদিহি আমরা তোমার কাছে করব না’। বলল জেনারেল শ্যারন।
‘সেটা আমি জানি। আমি কথা বলছিলাম মিঃ কলিন্সের সাথে। কারণ সে সরকারী লোক। এমনকি তার সাহায্যও আমি চাইতে পারি’।
‘তা চাইতে পার, কিন্তু তোমাকে সাহায্য করার এখন দুনিয়াতে আর কেউ নেই’। শ্যারন বলল।
‘দুনিয়ার কোন সাহায্যকারীর আমার দরকারও নেই। আমার আল্লাহ আমার জন্যে যথেষ্ট’।
‘ঠিক আছে, দেখা যাবে’।
বলে জেনারেল শ্যারন উচ্চস্বরে বলল, ‘কে আছ, এদিকে এস’।
ডাকার সঙ্গে সঙ্গে চারজন বড়ি বিল্ডার গেরিলার মত পা ফেলে এগিয়ে এল।
‘বিল্ডানীয় অন্ধকূপ আছে না, সেখানে একে রেখে দাও। হাত পা বাঁধা থাকবে’।
বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বোধ হয় জান না, বিজ্ঞানী জন জ্যাকবের অতি পছন্দের বাড়ি এটা। যে সিনাগগ পেরিয়ে এলে সেটাও তাঁরই তৈরী। তাঁর অন্ধকূপে তুমি ভালই থাকবে। তুমি হয়তো বলবে বিজ্ঞানীর আবার অন্ধকূপ কি? বিজ্ঞানীর হবি ছিল মাঝে মাঝে কয়েকদিন ধরে কবরের নির্জনতায় বসবাস করা। তার অন্ধকূপ ঐ উদ্দেশ্যেই তৈরী। তুমি কাল সকাল পর্যন্ত ওখানে থেকে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় কর। একটা সুবিধা তোমাকে দেয়া হবে। সেটা হলো, অন্ধকার দূর করার জন্যে সেখানে তুমি আলো পাবে’। থামল জেনারেল শ্যারন।
তার থামার সাথে সাথেই ঐ চারজন এসে খেলনার মত আহমদ মুসাকে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল ঘর থেকে বাইরে বেরুবার জন্যে।
‘অন্ধকূপ থেকে বেরুবার চেষ্টা করো না। পারবে না। তাছাড়া সবুজ পাহাড়ের এই ঘাঁটি থেকে বেরুতে হলে তোমার সেনাবাহিনী দরকার’। চিৎকার করে বলল শ্যারন।
‘মিঃ কারসেনকে ছাড়ছেন কখন?’
‘দুঃখিত আহমদ মুসা, তুমি এখানে আসার আগেই মিঃ কারসেনকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাকে আমরা ছাড়ব, তবে তার আগে আমরা কোহেনকে ফেরত পেতে চাই’।
জেনারেল শ্যারন যখন কথা শেষ করল, তখন আহমদ মুসাকে ঘরের বাইরে নেয়া হয়েছে। আহমদ মুসা আর কোন কথা বলার সুযোগ পেল না।
খুশী হলো আহমদ মুসা যে তারা কোন সময়ই আহমদ মুসার চোখ বাঁধেনি।
ছোট বড় অনেক করিডোর পেরিয়ে তাকে নিয়ে আসা হলো অনেকটা ছোট আকারের একটি কক্ষে।
দেখে মনে হল কক্ষটি স্টোর রুম। কক্ষে বহু ড্রয়ার ও তাক। তাকগুলোতে কাঁচের স্লাইডিং ডোর। তাকগুলোতে নানা সাইজের কার্টুন।
কার্টুনগুলো হিব্রু ভাষায় লেখা।
হিব্রু ইহুদীদের নিজস্ব ভাষা। ইহুদীদের বাইরে এ ভাষার প্রচলন নেই।
অধিকাংশ কার্টুনে হিব্রু ভাষায় লেখা ‘প্রজেক্ট’ শব্দের পাশে বিভিন্ন সংখ্যা।
কক্ষের দরজার বিপরীত দেয়ালে স্টীলের বড় আলমারি। রং করা, কিন্তু ময়লা ও ধূলায় রং বিকৃত হয়েছে। মনে হয় আলমারিটায় বহুদিন কেউ হাত দেয়নি।
যে দু’জন আহমদ মুসাকে বহন করছিল তারা তাকে একটা বটম শেলফের পাশে ছুঁড়ে দেয়ার মত রেখে বলল, ‘শালার শরীরটা লোহার নাকি,এত ভারী কেন?’
আহমদ মুসার তখনও হাত পা বাঁধা।
আহমদ মুসা শেলফের পাশে পড়ার সময় এর স্লাইডিং ডোরে ধাক্কা খায়। দরজা সরে যাওয়ায় সেলফের এপাশের অনেকখানি ফাঁক হয়ে যায়। ভেতর থেকে একটা কাগজে অঁকা কার্টুন গড়িয়ে পড়ে আহমদ মুসার পাশেই।
কার্টুনটা ছোট, সম্ভবত বড় একটা কার্টুনের উপর ছিল, গড়িয়ে পড়েছে।
একটু মুখ ঘুরিয়ে চোখটা বাঁকিয়ে তাকাল কার্টুনটার দিকে। কার্টুনের গায়ে হিব্রু ভাষায় একটা সিল। পড়ল আহমদ মুসা ‘ব্যবহার শেষ, ধ্বংস করুন’। সিলের নিচে একটা হিব্রু ইনিশিয়াল এবং তারিখ। তারিখটা মাত্র চারদিন আগের।
কার্টুনটার প্রতি আগ্রহী হলো আহমদ মুসা। এটা কি কাজে ব্যবহার করেছে, এখন ধ্বংস করারই বা হুকুম কেন?
আহমদ মুসা কার্টুনটার উপর শুয়ে পড়ে কার্টুনটাকে হাতের মুঠোয় নিল।
আহমদ মুসাকে রেখেই দু’জন এগুচ্ছিল আলমিরার দিকে। আর অন্য দু’জন স্টেনগান বাগিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের দরজায়। আহমদ মুসার কৌশলটা তাদের নজরে পড়েনি।
আলমিরার দিকে এগিয়ে যাওয়া লোক দু’জন থমকে দাঁড়িয়েছিল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘দেখ অসুখ-বিসুখের ভান করোনা। লাভ হবে না’।
বলেই তারা এগুলো আলমিরার দিকে।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই কার্টুনটি চালান করল কোটের পকেটে।
আহমদ মুসা শুয়ে শুয়ে দেখছিল লোক দু’টিকে, যারা আলমিরার দিকে যাচ্ছে।
ওরা আলমিরার দিকে যাচ্ছে কেন? আলমিরা খুলবে নাকি। তাকে সোজা অন্ধকূপে নিয়ে যাওয়ার কথা তবে এখানে এই হল্ট কেন?
লোক দু’টি আলমিরার কাছে পৌঁছেছে। একজন হাত বাড়াল আলমিরার দরজার হাতলের দিকে। সে আলমিরার হাতলে হাত রাখতেই আলমিরা খুলে গেল।
বিষ্মিত হলো আহমদ মুসা। হাতল তাকে ঘুরাতে হলো না। তার মানে আলমিরার দরজা খোলার জন্যে হাতলে চাপ দিতে হয়। অথবা হাতলে কোন বোতাম বা সুইচ আছে।
দরজা খুলতেই ওদের একজন বলল ‘তাহলে সব ঠিক আছে। চল ব্যাটাকে নিয়ে আসি’।
ওরা এসে আহমদ মুসাকে নিয়ে গেল চ্যাংদোলা করে এবং ছুঁড়ে দিল আলমিরার ভেতর।
আলমিরাটা ফাঁকা, আলমিরার মেঝেয় ছিটকে পড়ে গেল আহমদ মুসা।
যারা আহমদ মুসাকে আলমিরার মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল, তাদের একজন আহমদ মুসাকে বলল, যাও তুমি এখন ঠিক অন্ধকূপে পেৌঁছে যাবে। তবে কূপটাতে অন্ধকার রাখা হয়নি, আলোকিত করা হয়েছে। তুমি নাকি খুব মূল্যবান, এজন্যে এই মর্যাদা তোমাকে দেয়া হয়েছে’।
তারা কথা শেষ করতেই আপনাতেই আলমিরার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আর পরক্ষণেই নড়ে উঠল দরজা। নামতে শুরু করল আলমিরাটা নিচে।
নিজেকে বোকা মনে হলো আহমদ মুসার। আলমিরাটা যে লিফট সে ঘুনাক্ষরেও তা ভাবতে পারেনি।
লিফট নামছে তো নামছেই। কত নিচে অন্ধকূপটা?
আহমদ মুসার মনে হলো চারতলা পরিমাণ নেমে লিফট থেমে গেল।
ধীরে ধীরে খুলে গেল লিফটের দরজা।
খোলা দরজা পথে দেখতে পেল একটা গোলাকার মেঝে, কার্পেট মোড়ানো। মেঝের চারদিক থেকে উঠে গেছে গোল দেয়াল। দেয়ালটাও কার্পেট মোড়ানো।
এটাই তাহলে বিজ্ঞানীর সেই অন্ধকূপ। ভাবল আহমদ মুসা।
বিজ্ঞানীর অন্ধকূপের মেঝে একেবারে শূন্য। বিছানো কার্পেট ছাড়া তিল পরিমাণ জিনিসও মেঝেতে নেই। খাবার পানিটুকুও রাখা হয়নি।
চমকে উঠল আহমদ মুসা।
কিছুতেই সে লিফট থেকে অন্ধকুপে নামবে না। নিশ্চয় লিফট উঠে যাবে। তার সাথে আহমদ মুসাও উঠে যাবে। ভাবল আহমদ মুসা।
যেমন শুয়েছিল তেমনি শুয়ে থাকল আহমদ মুসা লিফটের মেঝেতে।
সময় বয়ে যায়। অনেক সময়।
কিন্তু লিফট নড়ার নাম নেই।
তাহলে কি সে লিফটে থাকা পর্যন্ত লিফট উঠবে না? ভাবল আহমদ মুসা। তাহলে কি মানুষের দেহের ওজনের সাথে লিফটের ওঠানামার সম্পর্ক আছে? যেমন সে লিফটে উঠার সাথে সাথে লিফট নেমে এলো, তেমনি তার ওজন লিফট থেকে সরে যাবার পর লিফট উঠে যাবে? ধরা যাক উঠে যাবে, কিন্তু আবার নামবে কি করে? কেউ নামিয়ে নিয়ে আসবে, না অন্ধকূপে লিফট নামিয়ে আনার ব্যবস্থা আছে?
এমন হাজারো চিন্তা মাথায় এসে ভীড় করতে লাগল আহমদ মুসার।
একটা ভাবনা আহমদ মুসাকে খুবই পীড়িত করতে লাগল। বিজ্ঞানী এই অন্ধকূপে একদিন, দু’দিন কয়েকদিন থাকতেন। তাহলে এখানে আসা, এখান থেকে বের হ্ওয়ার একটা স্বাধীন ব্যবস্থা থাকবে না কেন? এটা স্বাভাবিক নয় যে এখান থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে তিনি অন্যের মুখাপেক্ষী ছিলেন।
শেষ এই ভাবনার মধ্যে আহমদ মুসা আশার প্রদীপ দেখতে পেল। তার মনে নতুন সাহসের ও সৃষ্টি হলো।
আহমদ মুসা হাত পায়ের বাঁধন খোলার পর লিফট থেকে নামার সিদ্ধান্ত নিল।
তার হাত পায়ের বাঁধন খুব একটা জটিল ছিল না। এই বাঁধন তারা দিয়েছিল সম্ভবত আহমদ মুসার আক্রমন থেকে বাঁচার জন্যে।
আহমদ মুসা বাঁধা হাত দুটো মুখের সামনে নিয়ে দাঁত দিয়ে হাতের বাঁধন খুলে ফেলল।
বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে আহমদ মুসা লিফট থেকে বেরিয়ে বিসমিল্লাহ বলে পা রাখল অন্ধকূপের মেঝেতে।
আহমদ মুসা লিফট থেকে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লিফট উঠে গেল।
লিফট উঠে যাওয়ার সাথে সাথে নিজেকে বড় একাকী মনে হলো আহমদ মুসার।
সত্যিই ভয়াবহ এক অন্ধকূপ এটা।
আহমদ মুসা উপর দিকে তাকিয়ে দেখল, গোলাকার দেয়াল উঠে গেছে উপরে। উপরের ছাদটি সে দেখতে পেল না।
মনে হয় গ্রাউন্ড ফ্লোরটাই এই অন্ধকূপের ছাদ, ভাবল আহমদ মুসা। এমন অন্ধকূপ যে কোথাও থাকতে পারে, কোনদিন ভাবেওনি সে। অভাবনীয় সেই অন্ধকূপে দাঁড়িয়ে সত্যিই কেমন একটা অজানা উদ্বেগ বোধ করল আহমদ মুসা।
পরক্ষণেই আগের সেই ভাবনাই ছুটে এল তার মনে। বিজ্ঞানী কেন এই অন্ধকূপ তৈরী করেছিলেন এই সবুজ পাহাড়ে তাঁর বাড়িতে? লোক বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনে এখানে এসে থাকবেন, এজন্যই? এ যুক্তিটা তাঁর কাছে মোটেই শক্তিশালী মনে হলো না।
এ সময় তাঁর হঠাৎ মনে পড়ল শেলফ থেকে পাওয়া পকেটে রাখা কার্টুনের কথা।
কার্টুনটি পকেট থেকে বের করল আহমদ মুসা।
খুলল কার্টুনটি।
অনেকগুলো টুকরো কাগজ বের হলো কার্টুনটির সাথে।
প্রত্যেকটি একই সাইজের।
কয়েকটিতে হিব্রু লেখা। অন্য সবগুলোতেই জটিল অংকন ও ডিজাইন। হিব্রুগুলো হাতে লেখা এবং ডিজাইন ও অংকনগুলো কম্পিউটার প্রিন্ট।
হিব্রু কাগজগুলো সম্ভবত ড্রইং কলম দিয়ে লিখা। অক্ষরগুলো ছোট ও সুক্ষ্ণ।
পড়ল আহমদ মুসা, এস.ডি.আই ফেজ ফাইভ গাইডেড কম্পিউটার কমান্ড ডিজাইন এন্ড মিসাইল কমান্ড কোডস প্লাস ফোর্থ জেনারেশন এস.ডি.আই কমান্ড কম্পিউটার।
আহমদ মুসা পড়ে বুঝল, ডিজাইন ও অংকনগুলো স্ট্রাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভের ফিফথ ফেজের হবে। কিন্তু এগুলো এই সিনাগগে কেন? আবার ভাবল, ইহুদী বিজ্ঞানীর এই বাড়ি ও সিনাগগ, তারই কোন কাজ হবে এ অংকন ও ডিজাইনগুলো। কিন্তু পরক্ষণেই মনে প্রশ্ন জাগল, এখন তো বিজ্ঞানী নেই। কে এগুলো ব্যবহার করলো এবং এগুলো ধ্বংস করারই বা প্রয়োজন কি? এ প্রশ্নের কোন জবাব পেল না সে।
ঘটনা কি বুঝতে না পারলেও আহমদ মুসা একটা জিনিষ বুঝলো, এস.ডি.আই ডাটাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে জানে এস.ডি.আই এর উপর যে গবেষণা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চালাচ্ছে, তা এখন ফোর্থ জেনারেশনে। সুতরাং এই ফিফথ জেনারেশনের ডাটা অগ্রগামী গবেষণার ফল। অতএব এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই চিন্তা করে আহমদ মুসা ডকুমেন্ট পেপারগুলো কার্টুনে পুরে কোটের ভেতরের পকেটে রেখে দিল।
হাতের কাজটা শেষ হলে, আগের চিন্তায় ফিরে গেল আহমদ মুসার মন। ফুল কার্পেটে মোড়া এই অন্ধকূপ যদি বিজ্ঞানী কোন সময় এখানে কাটিয়ে দেবার জন্যে করে থাকেন, তাহলে এখানে বসবাসের উপকরণ কোথায়? উপকরণ রাখার জায়গাও তো নেই। এমন তো হতে পারে না। তাহলে কি ওরা মিথ্যা বলেছে? বিজ্ঞানী আসলে এখানে থাকতেন না? না থাকলে কোন প্রয়োজনে কেন কার্পেটে মোড়া প্রায় চল্লিশ ফিট গভীর এই অন্ধকূপ তৈরী করা হলো? বিজ্ঞানী এখানে আসতেন, এ কথাই ঠিক ধরে নিতে হবে।
তাহলে কিভাবে থাকতেন, এ প্রশ্নের জবাব কি?
অন্ধকারের চার দেয়ালে নজর বুলালো আহমদ মুসা।
কালো লোমশ কার্পেটে আবৃত দেয়াল। মেঝেও তাই। কার্পেটের লোমগুলো অস্বাভাবিক লম্বা।
তার দু’চোখ মেঝের উপর দিয়েও ঘুরে এল, কিন্তু দেয়াল কিংবা মেঝেতে অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না।
কি খুঁজছে তার দু’চোখ?
দেয়ালে গোপন কেবিন রাখা আধুনিক রুম ডেকোরেশনের একটা খুবই চালু পদ্ধতি। বিজ্ঞানী তা রাখতে পারেন তার গোপন খাজাঞ্চিখানা বা প্রয়োজনীয় স্টোর হিসেবে। যা তার অন্ধকূপে থাকাকালীন কাজে আসবে।
কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়ল না।
চোখ দু’টি তার ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
শুয়ে পড়ল সে অন্ধকূপের মেঝেতে।
ফ্লোরে শুয়ে পড়ে আহমদ মুসা চোখ বুজতে যাচ্ছিল, এমন সময় সামনের দেয়ালটা যেখানে অন্ধকুপের মেঝের সাথে মিশেছে ঠিক সেখান থেকে একটা রূপালী আলোর ঝলক এসে তার চোখে লাগল। যেন কালোর অরণ্যে এক সূর্য বিন্দু।
সংগে সংগেই উঠে বসল আহমদ মুসা।
এগুলো সেই সূর্য বিন্দু লক্ষ্য করে। দেখল, সূর্য বিন্দুটা একটা পেরেকের শীর্ষভাগ। মনে হলো পেরেকটা কার্পেটকে দেয়ালের সাথে সেঁটে রাখার জন্যেই।
তাহলে এ ধরনের আরও আছে ভাবল আহমদ মুসা।
অকারণেই খুঁজতে লাগল সে পেরেকগুলো। পরে সে ভাবল, পেরেকগুলো খুলে কার্পেটের নিচের দেয়াল সে দেখতে পারে সেখানে রহস্যের কোন সমাধান পাওয়া যায় কিনা।
কিন্তু ব্যর্থ হলো আহমদ মুসা। তন্ন তন্ন করে খুজেঁও আর কোন পেরেক সে পেল না।
শোয়া অবস্থায় যেহেতু পেরেকটি চোখে পড়েছে, তাই মেঝেয় গড়িয়ে গড়িয়েও সন্ধান করল আহমদ মুসা। কিন্তু না, আর কোন পেরেক চোখে পড়ল না।
আহমদ মুসা ফিরে গেল সেই আগের পেরেকের কাছে।
পেরেকের কাছে মেঝেয় সে বসে পড়ল।
অবাক জিজ্ঞাসায় আবার দেখতে লাগল পেরেকটিকে। মাত্র একটা পেরেক দিয়ে কার্পেটটিকে তো আর আটকে রাখা যাবেনা। তাহলে? মাত্র একটা পেরেকের কি তাৎপর্য!
পেরেকের চেয়ে বেশী উজ্জ্বল মনে হচ্ছে পেরেকটিকে। আহমদ মুসা আরও খেয়াল করল, পেরেকের মাথায় যে খাঁজ কাটা থাকে এর তা নেই। তার মানে পেরেকটিকে ঘুরিয়ে নয়, পিটিয়ে লাগানো হয়েছে। কিন্তু এমনটা তো স্বাভাবিক নয়। কারণ এ ধরনের পেরেক মজবুত হয় না, সহজে তুলেও ফেলা যায়।
চিন্তাটার সংগে সংগেই আহমদ মুসা দুই আঙ্গুল দিয়ে পেরেকটি ধরে টান দিল।
সংগে সংগে হাতের সাথে উঠে এল পেরেকটি। কিন্তু পেরেক নয় বস্তুটা। নিচের দিকটা প্লেন এবং ব্ল্যাক স্টিল। যার চুম্বকত্ব আছে, তোলার সময়ই সে তা টের পেয়েছে। চুম্বকের আকর্ষণেই আরেকটা স্টিল বোতামের সাথে তা লেগে ছিল।
প্রথমটায় অবাক হয়েছিল আহমদ মুসা। পরে তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভাবল, নিশ্চয় এর মধ্যে কোন রহস্য আছে।
কিন্তু কি হতে পারে সে রহস্যটা?
রহস্যটা যাই হোক, কোন সন্দেহ নেই যে, বিজ্ঞানী তার প্রয়োজনেই সেটা করেছিলেন।
আহমদ মুসা চাপ দিল কাল বোতামটিতে।
সংগে সংগেই দেয়ালের তিন বর্গফুটের মত একটা অংশ কিঞ্চিত সরে গিয়ে দেয়ালের আড়ালে চলে গেল। বেরিয়ে পড়ল একটা সুড়ঙ্গ পথ।
সুড়ঙ্গ পথটি আলোকিত।
সুড়ঙ্গ পথের মুখ তিন বর্গফুটের মত হলেও ভেতরটা আরও প্রশস্ত। একজন মানুষ অনায়াসে হেঁটে চলাফেরা করতে পারে।
স্টিলের মজবুত সুয়ারেজ পাইপ দিয়ে সুড়ঙ্গটি তৈরী।
খুশী হলো আহমদ মুসা, সুড়ঙ্গটি নিশ্চয় বাইরে বেরুবার জন্যে। কিন্তু কেন বিজ্ঞানী শুধুমাত্র বাইরে বেরুবার জন্যে এত ব্যয়বহুল ব্যবস্থা করলেন? তাহলে তিনি কি কোন বিপদের ভয় করতেন যে, সবুজ পাহাড়ের তাঁর বাড়ি থেকে বাইরে বেরুবার পথ বন্ধ হতে পারে, তখন তিনি এই নিরাপদ সুড়ঙ্গ পথ ব্যবাহর করে বাইরে বেরুবেন? কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর কি এমন বিপদ হতে পারে?
এ প্রশ্নের কোন উত্তর তার কাছে নেই।
এসব থাক, বের হবার একটা পথ পাওয়া গেছে, এটাই বড় কথা। ভাবল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা প্রবেশ করল সুড়ঙ্গে।
গোটা সুড়ঙ্গটাই আলোকিত।
বহুদিন এ সুড়ঙ্গে কেউ ঢোকেনি। তার অর্থ কি বিজ্ঞানীর মৃত্যুর পর আর কেউ এ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেনি? বলা মুশকিল। ভাবল আহমদ মুসা।
চলছে তো চলছেই। কত বড় এই সুড়ঙ্গ?
বাইরে বেরুবার জন্য এত বড় সুড়ঙ্গ কেউ কাটে?
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল আহমদ মুসা ৪০ মিনিট হলো সে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছে।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। সবুজ পাহাড়ের বিজ্ঞানীর বাড়ি থেকে বাইরে বেরুবার সুড়ঙ্গ অবশ্যই এটা নয়।
কোথায় গেছে এ সুড়ঙ্গ? নিশ্চয় এমন কোথাও গেছে যা বাইরে বেরুবার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
এক ঘন্টা পার হয়ে গেল।
সুড়ঙ্গের সমান্তরাল পথ একটু একটু করে উপরে উঠতে শুরু করেছে।
গন্তব্যে তাহলে এসে গেছি, বলল মনে মনে আহমদ মুসা।
কতদূর হবে সে এসেছে সবুজ পাহাড় থেকে? অবশ্যই পাঁচ ছয় মাইলের কম নয়। আহমদ মুসার অনুমান যদি ভূল না হয়ে থাকে, তাহলে সে সবুজ পাহাড় থেকে পাঁচ ছয় মাইল দক্ষিণে এখন। এ অঞ্চলের ভৌগলিক পরিচয় তার জানা নেই। তাই বলা মুশকিল সে এখন কোথায়।
সারফেস লেভেলে প্রায় উঠে এসেছে সে। সতর্ক পদক্ষেপ এখন আহমদ মুসার।
যেখানে এসে সুড়ঙ্গ শেষ হলো, সেখানে সুড়ঙ্গের মুখে একটি কংক্রিটের স্ল্যাব। স্ল্যাবটি সুড়ঙ্গের মুখে এমন ভাবে সেট করা যে, স্ল্যাবটি নিচে নামানো যাবে না।
তাহলে উপরে তুলতে হবে।
কিন্তু এ সুড়ঙ্গের মুখটি কোথায়? সেটা কি ঘর? না উঠান? কিংবা পরিত্যক্ত কোন স্থান?
ঘর কিংবা জনসমাগমের কোন স্থান হলে স্ল্যাব তুললেই সে ধরা পড়ে যাবে। জংগল বা পরিত্যক্ত কোন স্থান হলে, তবেই নিরাপদ।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। বেলা তখন ১টা।
আহমদ মুসা তায়াম্মুম করে নামাজ পড়ে নিল।
তারপর ভাবল, স্ল্যাবের অংশবিশেষ তুলে দেখা যাক, কেমন জায়গা এটা।
বিজ্ঞানী যখন এখানে উঠতেন বা এদিক দিয়ে যাতায়াত করতেন, তখন স্থানটা তাঁর নিজের অথবা তার কোন প্রতিপক্ষের কোন নিরাপদ জায়গা হবে।
কংক্রিট স্ল্যাবের একটা অংশ ধীরে ধীরে উপরে তুলতে লাগল আহমদ মুসা।
একটু তুলেই বুঝল জায়গাটায় কার্পেট বিছানো রয়েছে।
তাহলে এটা ঘর নিশ্চয়। আর ঘর হলে কোন মানুষ থাকার সম্ভাবনা থাকছেই।
বিজ্ঞানী এ পথ দিয়ে রাতে না দিনে যাতায়াত করতেন?
হঠাৎ আহমদ মুসার খেয়াল হলো এটা লাঞ্চ আওয়ার। এখন তো সব আমেরিকানদেরই অফ পিরিয়ড়। এ সময় তারা ঘরে কিংবা অফিসে থাকে না।
এই চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা অতি সন্তর্পনে কংক্রিট স্ল্যাবটা সুড়ঙ্গের মুখ থেকে সরিয়ে কার্পেটের নীচ দিয়ে মেঝের উপর ঠেলে দিল।
তারপর নিজের দেহকেও স্ল্যাবের মত করেই সুড়ঙ্গের মুখ থেকে উপরে তুলে কার্পেটের নিচ দিয়ে মেঝের উপর ঠেলে দিল। নিজেকে সুড়ঙ্গের মুখ থেকে বের করে আনার পর তার প্রথম কাজ হলো স্ল্যাবটাকে আবার সুড়ঙ্গ মুখে বসিয়ে দেয়া।
কোন দিকে কার্পেটের নিকটতম প্রান্ত? কাপের্টের তলের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে দ্রুত বেরুবার জন্যে এ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার কাছে বড় হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা দ্রুত চারদিকে হাত ও পা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখল কোন দিকে কার্পেটটা ঢিলা বেশী। তার চিন্তা হলো, নিশ্চয়ই সুড়ঙ্গ মুখ কার্পেটের একটা প্রান্তে হবে এবং যে দিকে প্রান্ত হবে সে প্রান্তের কার্পেটকে অপেক্ষাকৃত ঢিলা পাওয়া যাবে।
সফল হলো আহমদ মুসা। তার হাতের ডান দিকের কার্পেট খুবই ঢিলা পাওয়া গেল।
আহমদ মুসা গড়িয়ে ঢিলা প্রান্তের দিকে এগুলো।
একটা দেয়ালে কার্পেট শেষ হয়েছে।
আহমদ মুসা কার্পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
এক সারি দৈত্যাকার কম্পিউটারের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে নিজেকে দেখল আহমদ মুসা।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। সুড়ঙ্গ মুখটা কম্পিউটারের আড়ালে থাকায় এখানে কি ঘটছে এ ঘরে কেউ থাকলেও তা তার নজরে পড়ার কথা নয়। বিজ্ঞানীকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল আহমদ মুসা।
কিন্তু এটা কোন জায়গা? কোথায় এসেছে সে?
আহমদ মুসা দুই কম্পিউটারের ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরটায় উঁকি দিল, দেখল ঘরের প্রায় চারদিক দিয়েই এ ধরনের কম্পিউটারের সারি। ঘরের মাঝখানটা ফাঁকা।
আহমদ মুসা ঘরের যে প্রান্তে, তার বিপরীত প্রান্তে দরজা। ঘরে কেউ নেই। লাঞ্চে গেছে নিশ্চয়ই।
আহমদ মুসার গোটা শরীর ধুলি ধুসরিত। পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা ও কোট প্যান্ট যতটা পারল পরিষ্কার করল।
তারপর এক কম্পিউটারের পাশ দিয়ে ঘরের মাঝখানে প্রবেশ করল।
দ্রুত একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিল কম্পিউটারের দিকে। সবগুলো কম্পিউটারই চালু অবস্থায় আছে।
প্রত্যেকটা কম্পিউটারের টপ কভারে একটা নাম পড়ে ভীষণ চমকে উঠল আহমদ মুসা। টপ কভারে পেস্টিং করা সুন্দর কাগজে সুন্দর করে লেখা ‘লস আলামোস ল্যাবরেটরী অব স্ট্রাটেজিক রিসার্চ’।
সবগুলো কম্পিউটারে এই একই শীর্ষ নাম।
তাহলে আহমদ মুসা এখন লস আলামোসের বিশ্ব বিখ্যাত স্ট্রাটেজিক রিসার্চ ল্যাবরেটরীর গ্রাউন্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে। কিন্তু ইহুদী বিজ্ঞানী তার সুড়ঙ্গ এই ল্যাবরেটরীতে নিয়ে এসেছে কেন? সুড়ঙ্গটি কি এ ল্যাবরেটরীতে গোয়েন্দাগিরির একটা পথ ছিল? ইহুদী বিজ্ঞানী কি এ স্ট্রাটেজিক ল্যাবরেটরীর গবেষণা চুরি করেছেন এ পথে? বহুতল বিশিষ্ট গোটা ল্যাবরেটরীর যাবতীয় গবেষণার ফল নিশ্চয়ই এই দৈত্যাকার কম্পিউটারে প্রসেস ও স্টোর হয় এবং এই কম্পিউটার কক্ষই ইহুদী বিজ্ঞানীর সুড়ঙ্গের মুখ।
কি ঘটেছে ভাবতেই শিউরে উঠল আহমদ মুসা। মাথাটা ঘুরে যেতে চাইল।
মাথাটায় একটা ঝাঁকি দিয়ে আহমদ মুসা ভাবল সব চিন্তার আগে তাকে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর গবেষণাগার থেকে সরে পড়তে হবে। এখানে তাকে ধরা পড়া চলবে না কোনক্রমেই।
দরজার দিকে তাকাল আহমদ মুসা। দরজা বন্ধ।
এগোলো আহমদ মুসা দরজার দিকে। খুব সন্তর্পনে দরজার নব ঘুরাল সে। লক আলগা হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে দরজা ফাঁক করল আহমদ মুসা।
উকিঁ দিয়ে দেখল, ইউনিফরম পরা একজন দরজার বিপরীত দিকে হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে ঝুলছে কাল কুচকুচে এক ভয়ংকর অটোমেটিকে কারবাইন।
আহমদ মুসা দ্রুত বের হয়ে কোন শব্দ না হয় এ জন্যে আলতো করে দরজা ছেড়ে দিয়ে লোকটি দরজার যেদিকে, তার বিপরীত দিকে বিড়ালের মত নিঃশব্দে ছুটল।
কোন দিকে কি আছে, বের হবার দরজাই বা কোন দিকে কিছুই জানা নেই আহমদ মুসার। অন্ধের মত সে ছুটছে।
দরজাটা পেরিয়ে কয়েক গজ এসেই একটা করিডোর পেল। করিডোর ধরে ডানদিকে এগোলো।
করিডোরটা ধরে কয়েক গজ এগোতেই একটা করিডোর জংশনের মুখে গিয়ে পড়ল সে। সেই সাথে মুখোমুখি হলো অটোমেটিকে কারবাইনধারী এক প্রহরীর।
করিডোর জংশনটা থেকে চারদিকে চারটা করিডোর বেরিয়ে গেছে।
প্রহরীটির মুখোমুখি হয়ে আকস্মিকতার একটা ধাক্কা খেয়েছিল আহমদ মুসা। কিন্তু প্রহরীটিই আহমদ মুসাকে দেখে হতচকিত হয়েছিল বেশী।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল প্রহরীটি।
আহমদ মুসা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক হাতে তার মুখ চেপে অন্য হাত দিয়ে তাকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে এল একটা দরজার দিকে।
দরজা ঠেলে প্রহরীকে ভেতরে ছুঁড়ে দিল। প্রহরীটি পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াল। তার হাতের ঝুলন্ত কারবাইন সে উপরে তুলছিল।
আহমদ মুসার ডান হাত তার আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তার হাতের একটা আঘাত গিয়ে পড়ল প্রহরীর কানের নিচে ঘাড়টায়।
লোকটি সংজ্ঞা হারালে আহমদ মুসা তার কারবাইনটা নিয়ে বেরিয়ে এলো করিডোরে। কোন দিকে যাবে সে?
সব করিডোরকেই আহমদ মুসার একই রকম মনে হলো। সুতরাং প্রহরীকে আটকাবার জন্যে আহমদ মুসা যে করিডোরে ঢুকেছিল সেই করিডোর ধরে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল।
কিছুদুর এগোবার পর আরেকটা করিডোরের মুখোমুখি হলো আহমদ মুসা। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল সে। তার মনে হলো, শব্দগুলো সিঁড়ি ভেঙে উপর থেকে নিচে নামছে সামনের করিডোর জংশনটার দিকে।
একটি করিডোরের শাখা এদিকে ডানে, অন্য দু’টি শাখা অন্য দু’দিকে চলে গেছে। আর সামনে সিঁড়ি। মনে হয় সিঁড়িটা দু’তলায় উঠে গেছে।
ঐ সিঁড়ি থেকেই শব্দগুলো ছুটে আসছে। ছুটে আসা লোকগুলো আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার সামনে এসে যাবে।
আহমদ মুসা আশে পাশে চাইল। দেখল, তার দু’পাশেই দু’টি দরজা। বাম দিকের দরজাটাই তার কাছে।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। একটা মেয়ে তার টেবিলে বসে কাজ করছিল।
কারবাইন নিয়ে আহমদ মুসাকে ঘরে ঢুকতে দেখে আতংকে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি।
আহমদ মুসা তার কারবাইনের নল নিচে নামিয়ে তর্জনি নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে মেয়েটিকে এক দিকে অভয় দিল, অন্যদিকে তাকে চুপ থাকতে বলল।
আতংকিত মেয়েটি কোন শব্দ না করে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা দরজার শ্যাডো গ্লাস দিয়ে বাইরে চোখ রাখল।
দরজার ওখান থেকে আহমদ মুসা সিঁড়ির নিচের অংশটা দেখতে পাচ্ছে।
সিঁড়ি দিয়ে পাঁচজন দৌড়ে নেমে এল। আহমদ মুসার করিডোর দিয়েই তারা ছুটে গেল আহমদ মুসা যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে। ওরা টের পেয়েছে, কিন্তু কিভাবে?
কিন্তু ভাববার সময় নেই আহমদ মুসার। বলল আহমদ মুসা মেয়েটিকে লক্ষ্য করে, ‘ম্যাডাম বাইরে বেরুবার গেট কোন দিকে?’
মেয়েটি কথা বলল না।
সে সহজে কথা বলবেনা, নিশ্চিত হলো আহমদ মুসা।
হাতের অটোমেটিক কারবাইনটা তুলতে চাইল। কিন্তু একজন নারীর বিরুদ্ধে তার হাত উঠল না। বলল আহমদ মুসা, ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম’।
বলে আহমদ মুসা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শুনতে পেল অনেকগুলো পায়ের শব্দ ছুটে আসছে এ দিকে।
ওরা কি ফিরে আসছে?
আহমদ মুসা আর কিছু ভাববার আগেই দেখল, ওরা ছুটে আসছে এ দরজা লক্ষ্যেই।
চট করেই চিন্তাটা আহমদ মুসার মাথায় এলো যে, এ মেয়েটিই ওদের সংকেত দিয়েছে। প্রত্যেকের কাছে এবং প্রত্যেক কক্ষেই কি তাহলে সংকেতের এ ব্যবস্থা আছে?
আহমদ মুসা চাইল মেয়েটির দিকে। দেখল তার মুখ ভয়ে কাগজের মত সাদা হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা বলল, ‘ভয় নেই, ওদের সংকেত দিয়ে আপনি চরম বিপদকালেও দেশের প্রতি অনুপম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন’।
বলে আহমদ মুসা দ্রুত দরজার সামনের চৌকাঠের ওপাশে দেয়াল ঘেষে দাঁড়াল কারবাইনের ব্যারেল উঁচু করে, যাতে দরজা খুললেই ওরা তার সামনে এসে যায়।
ওরা দৌড়ে আসার পর দরজার কাছাকাছি এসে বিড়ালের মত সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে।
শ্যাডো কাঁচের ভেতর দিয়ে আহমদ মুসা ওদের দেখতে পাচ্ছে, ওরা কিন্তু দেখছে না আহমদ মুসাকে।
ওদের একজন আস্তে দরজার নব ঘুরাল, তারপর এক প্রচন্ড ধাক্কায় গোটা দরজাই খুলে ফেলল।
সংগে সংগেই আহমদ মুসার কারবাইন গর্জন করে উঠল। এক পশলা গুলির বৃষ্টি ছুটে গেল সামনে।
আহমদ মুসা উবু হয়ে বসে মাটির একফুট উপর দিয়ে গুলি করেছে।
সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মাটিতে। মাটিতে পড়েই কেউ কেউ কারবাইন তুলতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল।
ওদের দিকে কারবাইন তাক করে বলল, ‘আমি তোমাদের হত্যা করতে চাইনি বলেই গুলি নীচ দিয়ে করেছি। কেউ তোমরা কারবাইনে হাত দেবে না। গুলি এবার পায়ে নয় বুকে করব’।
বলে আহমদ মুসা দ্রুত কারবাইনগুলো কুড়িয়ে নিল।
কোন দিকে যাবে আহমদ মুসা?
মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘সামনেই দোতলা থেকে সিঁড়ি গেটে নেমে গেছে’।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে চোখ ফিরাল মেয়েটির দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম’।
ছুটতে ছুটতেই কথাগুলো বলল আহমদ মুসা।
দ্রুত সিঁড়ি ভেংঙে উঠতে লাগল দোতলায়।
তার হাতে উদ্যত কারবাইন। একটি কারবাইন তার কাঁধে ঝুলানো। আরও চারটি কারবাইন সে ফেলে দিয়ে এসেছে সিঁড়ির গোড়ায়।
সিঁড়ি থেকে দোতলার মেঝেতে পা দিতে যাবে, এ সময় আরও চারজন সামনে থেকে ছুটে আসছে দেখল আহমদ মুসা।
দেখতে পেয়েই আহমদ মুসা দৌড়ানো অবস্থাতেই গুলি করল ওদের পা লক্ষ্য করে।
ওরা গেটের দিক থেকে বিশাল প্রশস্ত সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসছিল। সিঁড়িতেই ওরা আছড়ে পড়ল। কিন্তু সেদিকে দেখার সুযোগ নেই।
গুলি করেই আহমদ মুসা ছুটল সিঁড়ি ভেঙে নিচের দিকে।
সিঁড়ি একটা প্রশস্ত লনে গিয়ে শেষ হয়েছে। লনের পরেই বিশাল গেট। গেটের দু’পাশে দু’টি কক্ষ। সিকিউরিটি বক্স হবে নিশ্চয়ই ভাবল আহমদ মুসা।
লনের দু’পাশে দু’টি করে চারটি গাড়ি দাঁড়ানো। দু’টি কার, একটা জীপ এবং একটা সিকিউরিটি ক্যারিয়ার ধরনের গাড়ি।
গেট খোলা। দু’জন প্রহরী ছুটে আসছে খোলা গেট দিয়ে গুলি করতে করতে।
আহমদ মুসা নিজেকে ছুড়ে দিল সিঁড়ির উপর।
তারপর কারবাইন দু’টি বুকে ধরে দ্রুত গড়িয়ে নামতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে। চারপাশে গুলি এসে পড়ছে। একটা গুলি এসে বিদ্ধ করল আহমদ মুসার বাহু সন্ধিতে।
মনে হলো বাহুটা যেন কাঁধের সাথে নেই। গোটা শরীরটাই কেঁপে উঠছিল আহমদ মুসার।
কিন্তু মুহূর্তের জন্যও থামেনি সে, বরং গড়িয়ে পড়ে গতি আরও বাড়িয়ে দিল আহমদ মুসা। সিঁড়িতে তাকে টার্গেট করার যে সুবিধা নিচের লনে তা তারা পাবে না।
লনে পড়েই আহমদ মুসা ওদের গুলি বৃষ্টির মধ্যে মাথা নিচু করে গুলি করল ওদের লক্ষ্য করে।
ওরা দৌড়ে আসছিল। গুলি বৃষ্টি ওদের পা আঁকড়ে ধরেছে। আছড়ে পড়ল তারা লনের উপর।
গুলি করেই আহমদ মুসা দ্রুত গড়িয়ে চলল জীপের দিকে।
জীপের কাছে এসে শুয়ে থেকেই আহমদ মুসা নিজের দেহকে ছুঁড়ে দিল জীপের সিটে। জীপের লক হোলে চাবী ঝুলছে।
খুশী হলো আহমদ মুসা। ধন্যবাদ দিল আল্লাহকে। ভাবল এ গাড়িটাও নিশ্চয় সিকিউরিটিদের ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত ছিল। গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
দেখল, কারবাইন হাতে আরও দু’জন প্রহরী ছুটে এসেছে গেটে। গেট তখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসার জীপও গেটের মুখে এসে পড়েছে।
গেট বন্ধ করার সুযোগ হলো না।
আহমদ মুসার জীপের বেপরোয়া গতি তীব্রভাবে আঘাত করল গেটে। চলন্ত গেটের একটা অংশ বাঁকিয়ে নিয়ে বাইরে ছিটকে পড়ল গাড়ি।
আহমদ মুসার ভাগ্য ভাল যে, জীপটি প্রায় উল্টে গিয়েও আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
গেটে আসা প্রহরী দু’জন জীপের সামনে পড়ায় বাঁচার জন্যে দু’পাশে দু’জন ছিটকে পড়েছিল। দু’জনের হাত থেকে কারবাইন দু’টিও ছিটকে পড়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা তার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে তীব্র গতিতে ছুটল সামনে।
প্রহরী দু’জন কারবাইন দু’টি কুড়িয়ে নিয়ে গুলি করার পজিশনে আসার পর দেখল, জীপটি তাদের রেঞ্জের বাইরে। তবু তাদের কারবাইন গর্জন করে উঠল। গুলি গুলোর অপচয় ছাড়া কোনই লাভ হলো না এতে।
কারবাইন ছুড়ে ফেলে ওরা দু’জন দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে মাটিতে আঘাতের পর আঘাত করার মাধ্যমে ব্যর্থতার তীব্র গ্লানি হালকা করতে চাইল।

কম্পন উঠল পেন্টাগন, সি. আই. এ, এফ.বি. আই সব মহলে। দেশের সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে প্রতিষ্ঠিত ও সবদিক থেকে সংরক্ষিত তাদের সবচেয়ে মূল্যবান গবেষণাগার লস আলামোসে ইঁদুর ঢুকেছে। ঢুকলো কি করে?
লস আলামোস স্ট্রাটেজিক রিসার্চ ল্যাবরেটরীর চারদিকে কয়েক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ বনাঞ্চলে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ। কেউ যদি প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রবেশ করেও, কয়েক মিনিটের মধ্যে তার উপস্থিতি ও অবস্থান ধরা পড়ে যাবে। সূক্ষ্ণ ইলেকট্রনিক ক্যারিয়ার ছেয়ে রয়েছে গোটা বনাঞ্চল।
রাজধানী সান্তাফে থেকে একটা সড়ক গেছে লস আলামোসে। সে সড়কেরও শেষের দু’মাইল সংরক্ষিত। বিশেষ অনুমতি প্রাপ্ত নয়, অথবা লস আলামোসের নিজস্ব রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ি নয় এমন গাড়ি এ সংরক্ষিত সড়কে প্রবেশ করতে পারে না।
এস্পানোলা থেকে ক্লিফ ডোয়েলিং হয়ে একটা প্রাইভেট রোড লস আলামোস পর্যন্ত এসেছে। এ পথে অনেকগুলো চেকিং পার হতে হয়। আর এ পথে লস আলামোসের স্টাফরা ছাড়া কেউ আসতে পারে না।
এই অবস্থায় একজন লোক কিভাবে ঢুকল লস আলামোস ল্যাবরেটরীতে?
খবর পাওয়ার সংগে সংগেই প্রাপ্ত তথ্যাবলী নিয়ে বৈঠক বসেছিল এফ.বি.আই সদর দফতরে। এসেছিল সেখানে সি.আই.এ ও পেন্টাগনের প্রতিনিধি।
বৈঠকের শুরুতেই পেন্টাগনের স্ট্রাটেজিক উইনস ডেভলপমেন্ট চীফ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘কোন ঘরে সে প্রবেশ করেছিল, কিছু খোয়া গেছে কিনা আমাদের?’
এফ.বি.আই চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসন বললেন, ‘গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা করিডোরে প্রথম তাকে ডিটেক্ট করা হয়। উপর তলার কোন ঘরে এবং কম্পিউটার রুমে সে প্রবেশ করেছে কিনা তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কম্পিউটার অপারেশনে কোন ভিন্ন হাত পড়ার প্রমাণ মেলেনি। তবে আরও অনুসন্ধান না করে শেষ কথাটা বলা যাবে না’।
‘কোন দিক দিয়ে ঢুকেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে?’ জিজ্ঞেস করে সি.আই.এ’র প্রতিনিধি।
‘না পাওয়া যায়নি। তবে সম্মুখ গেট দিয়ে নয়, এটা নিশ্চিত। সম্মুখ গেটের ক্যামেরা মনিটরিং এবং মূল ভবনে প্রবেশ মুখের ক্যামেরা মনিটরিং এ প্রমাণ হয়েছে সম্মুখ দিয়ে সে প্রবেশ করেনি’। বলল এফ. বি.আই চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘যে লোকটি ঢুকেছিল, তার ফটো পাওয়া গেছে?’ জিজ্ঞেস করল সি.আই.এ প্রতিনিধি।
‘লস আলামোসের কক্ষ ও করিডোরের ক্যামেরাগুলো অফিস আওয়ারে বন্ধ থাকে। মূল ভবনের প্রবেশ মুখের ক্যামেরা থেকে তার মুখের ডান দিকের একাংশ ও পেছন দিকটার ফটো পাওয়া গেছে এবং গেটের ক্যামেরা থেকে তার সিঁড়িতে ও লনে গড়ানো ছবি পাওয়া গেছে, তাতে তার মুখাবয়বের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না’।
‘ব্যাড লাক, এখন কি করবেন ভাবছেন?’ বলল পেন্টাগন প্রতিনিধি।
এ মিটিং শেষেই আমি যাচ্ছি লস আলামোসে। সেখানে গেলে হয়তো আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার হবে। বলল আব্রাহাম জনসন।
আমাদের লোকরা যারা তাকে ফলো করেছিল, তাদের শেষ খবর কি?’ বলল সি.আই.এ প্রতিনিধি।
খবর ভাল নয়। ক্লীফ ডোয়েলিং এবং এস্পানোলার মাঝখানে লস আলামোস থেকে যে গাড়ি নিয়ে পালিয়েছিল, সে গাড়ি আমরা পেয়েছি। কিন্তু তাকে পা্ওয়া যায়নি’। বলল এফ.বি.আই চীফ।
‘কেমন করে যে গাড়ি রেখে নিরাপদে পালাতে পারল?’ বলল পেন্টাগন প্রতিনিধি।
‘আমাদের তেরজন কমান্ডো গার্ড ছিল লস আলামোসের গেটে। এই তেরজনের নয় জনই পায়ে গুলিবিদ্ধ। মাত্র তিনজন সুস্থ ছিল। এরা তিনজন আবার ছিল বিভিন্ন জায়গায়। একত্রিত হয়ে তারা যখন লোকটিকে তাড়া করে, তখন তারা বেশ পেছনে পড়ে যায়। আর প্রমাণ হয়েছে লোকটির মত এক্সপার্ট ড্রাইভার আমাদের কমান্ডোরাও নয়’।
‘ব্যাড লাক। লোকটি যখন সান্তাফের মেইন রোডে না গিয়ে অনেক ঘোরা পথ ক্লীফ ডোয়েলিং ও এস্পানোলার পথ বেছে নিয়েছে, তখন মনে হয় ঐ পথেই সে এসেছে’। বলল পেন্টাগন প্রতিনিধি।
‘আমাদেরও সেই ধারণা। আমি ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি, ঘটনার দিন এবং তার আগের দিন যত গাড়ি ঐ পথে লস আলামোসের দিকে এসেছে, সে সবের হদিস বের করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে’। বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ধন্যবাদ’। বলল পেন্টাগন প্রতিনিধি।
পেন্টাগন প্রতিনিধি থামতেই সি.আই.এ প্রতিনিধি বলে উঠল, ‘কিন্তু একটা বিষয় খুবই বিষ্ময়কর, কেউ নিহত হয়নি, নয় জনই আহত হয়েছে এবং আহতরা সবাই পা থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত স্থানে গুলিবিদ্ধ’।
‘ঠিক বলেছেন, এ ব্যাপারটা আমাকেও খুব বিষ্মিত করেছে। পা টার্গেট না করলে তো আহতরা প্রায় সবাই নিহত হওয়ার কথা কিন্তু পা লক্ষ্য করে গুলি করল কেন, তার জীবনের ঝুকিঁ নিয়েও?’
‘এ ধরণের ঘটনা আমি এর আগে কখনো শুনিনি। প্রতিপক্ষের গোয়েন্দার কাজ তো এটাই যে যত পারা যায় শত্রু নিধন করে পালাবার পথ পরিষ্কার করা। কিন্তু সে যেন হত্যা নয়, বাধাকে নিষ্ক্রীয় করে পালাবার পথ করে নিতে চেয়েছে’। বলল সি.আই.এ প্রতিনিধি।
‘ঠিক তাই’। বলল এফ.বি.আই চীফ।
এই মিটিং শেষ হয়েছিল অপরাহ্ন ৫টায়।
বিকেল সোয়া পাঁচটায় বিশেষ বিমানে চড়ে এফ.বি.আই চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসন যাত্রা করে লস আলামোসের উদ্দেশ্যে।
রাত সোয়া আটটায় সে পৌঁছে লস আলামোস স্ট্রাটেজিক রিসার্চ ল্যাবরেটরীতে।
ল্যাবরেটরীতে পৌঁছেই এফ.বি.আ্ই চীফ লস আলামোস ল্যাবরেটরীর প্রধান পরিচালক ডঃ হাওয়ার্ডকে বলে, ‘আমি ঘটনার স্থানগুলোতে যেতে চাই এবং সেখানেই আমি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলতে চাই’।
‘সবাই হাজির আছে চলুন’।
জর্জ আব্রাহাম জনসন প্রথম কথা বলল একজন প্রহরীর সাথে। ঐ প্রহরী আহমদ মুসাকে করিডোরে প্রথম দেখে। আহমদ মুসা তাকে পাশেই এক ঘরে নিয়ে সংজ্ঞাহীন করে ফেলে চলে যায়। তার মতে, ‘আক্রমনকারী উত্তর অথবা পশ্চিমের কম্পিউটার রুমের দিক থেকে আসতে পারে। লোকটি শ্বেতাংগ নয়’।
ছবিতে যতটুকু তাকে দেখা যায়, তাতেও মনে হয় লোকটি শ্বেতাংগ নয়। মনে মনে চিন্তা করল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
মিস সারা জেফারসনের কক্ষে এল জর্জ আব্রাহাম জনসন। আত্মগোপনের জন্যে এই সারা জেফারসনের অফিস কক্ষেই আহমদ মুসা প্রবেশ করেছিল।
মিস সারা জেফারসন লস আলামোস ল্যাবরেটরীর রিসার্চ লগ অফিসার। খুবই গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সারা জেফারসনের।
সারা জেফারসনকে বসতে বলে নিজে বসতে বসতে জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল, ‘এক উপলক্ষে আপনার সাথে দেখা হল। আপনাদের পরিবার আমাদের খুব শ্রদ্ধার পাত্র। প্রেসিডেন্ট জেফারসন ছিলেন আমেরিকার নিজস্ব চিন্তার জনক’।
‘ধন্যবাদ স্যার’। বলল মিস সারা জেফারসন।
‘ধন্যবাদ’ বলে একটু থেমে জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল, ‘আপনি নাকি অনুপ্রবেশকারীকে বাইরে বেরুবার পথ বলে দেন?’
একটু হাসল সারা জেফারসন। তারপর গম্ভীর হলো বলল, ‘জি স্যার’।
‘কেন?’
‘অদ্ভূত শত্রুটিকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি স্যার’।
‘কেমন?’
‘কারবাইন হাতে লোকটি আমার রুমে ঢুকল, আমি আতংকে চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম। লোকটি তার ঠোটেঁ আঙুল ঠেকিয়ে নিষেধ করল। তার চোখে মুখে খুনির রুদ্ররূপ দেখলাম না, খুব শান্ত অচঞ্চল সে। আমাদের কয়েকজন গার্ডকে যখন দৌড়ে যেতে দেখলাম পশ্চিম দিকে, বুঝলাম তারা এ লোকটিরই সন্ধান করছে। আমি ওদের সংকেত দিলাম। এ সময় লোকটি আমাকে বিল্ডিংটির গেট কোনদিকে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম না। আমি ভয় করছিলাম যে, এবার সে কিছু একটা করবে। কিন্তু ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম’ বলে বাইরে বেরুবার উদ্যোগ নিল সে। এ সময়ই আমাদের গার্ডরা ছুটে এল এ দরজায়। লোকটি আমার দিকে এমন একটা সবজান্তা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল যে, আমি বুঝতে পারলাম আমি গার্ডদের সংকেত দিয়ে ডেকে এনেছি সে সেটা বুঝতে পেরেছে। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। কাঁপতে শুরু করলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে লোকটি বলল, ‘ভয় নেই, সংকেত দিয়ে ওদের ডেকে এনে দেশের প্রতি আপনি অনুপম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন’। তারপর দেখলাম, দরজা খুলে প্রবেশ করা আমাদের পাঁচজন গার্ডকেই সে হত্যা করতে পারতো, কিন্তু করলো না। আমাদের লোকরা পায়ে গুলি খাবার পর পড়ে গিয়ে আবার যখন কারবাইন তুলে নিচ্ছিল তখন সে বলে, ‘তোমাদের হত্যা কতে চাইনি। কিন্তু আবার কারবাইনে হাত দিলে গুলি এবার পা নয় বক্ষ ভেদ করবে’। শত্রুর এই মানবিকতা, বদান্যতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এজন্যে দ্বিতীয় বার বেরুবার পথ সে জিজ্ঞেস না করলেও পথ বলে দেয়াকে আমি দায়িত্ব মনে করলাম’। দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল মিস জেফারসন।
‘ধন্যবাদ মিস জেফারসন। আমাদের ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু আপনি তাকে উপযুক্ত বিনিময় দিয়ে দিয়েছেন’।
‘খুব কি ক্ষতি করেছি? সে যেমন অসাধারণ বুদ্ধিমান, তাতে গেট বের করা তার জন্য কঠিন হতো না’।
‘তাও ঠিক’। বলে জর্জ আব্রাহাম জনসন কিছুটা চিন্তান্বিত হয়ে পড়ল। বলল, ‘আপনার কথায় শত্রুর যে কয়টা বৈশিষ্ট ফুটে উঠল, তাতে রহস্যের জটিলতা আরও বাড়ল’।
‘কিভাবে?’ প্রায় একসাথেই কথাটা বলে উঠল লস আলামোসের প্রধান পরিচালক ডঃ হাওয়ার্ড এবং পেন্টাগনের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান জেনারেল শেরউইন।
‘যে লোক এখানে প্রবেশ করেছিল, সে লস আলামোসে ইতিপূর্বে আসেনি, এর ছবিও দেখেনি এবং এর ইন্টারন্যাল ডিজাইন সম্বন্ধেও তার জ্ঞান ছিল না। এমন একজন লোককে কোন শত্রুপক্ষই লস আলামোসে পাঠাতে পারেনা। দ্বিতীয়তঃ, লোকটির সাথে সরাসরি শত্রুতা হলে মিস জেফারসনের শত্রুতামূলক কাজকে দায়িত্বশীলতা বলা এবং গার্ডদের কাউকেই হত্যা না করা আমার কাছে খুবই রহস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। একজন শত্রুর এই ধরণের আচরণ হওয়া অস্বাভাবিক’।
‘কিন্তু সে লস আলামোসে অনুপ্রবেশ করেছে এটাতো ঠিক?’ বলল জেনারেল শেরউড।
‘অবশ্যই’।
বলে একটু ভাবল জর্জ আব্রাহাম জনসন। তারপর বলল, ‘দুই সত্যের মাঝখানে একটা মিসিং লিংক আছে, যা আমাদের সামনে নেই। লোকটিকে ধরতে পারলেই এর সমাধান হতে পারে’।
কথা শেষ করেই সে চট করে তাকাল মিস জেফারসনের দিকে। বলল, ‘আপনি তো লোকটিকে খুব কাছে থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। তার সম্পর্কে বলুন তো’।
লোকটি অবশ্যই এশিয়ান অরিজিন। লোকটিকে আরবী মনে হয়েছে, আবার কখনও মনে হয়েছে তুর্কি চাইনিজ মিশ্রণ। চোখ কালো, কালো চুল। সব সময় শান্ত নিরুদ্বিগ্ন মুখ। গায়ের রং উজ্জ্বল স্বর্ণাভ। আমি অবাক হয়েছি, দরজায় আমার ডেকে আনা তার শত্রুদের দেখেও স্বাভাবিক কন্ঠে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে এবং শত্রুর সাথে যখন মোকাবিলার জন্যে দাঁড়াচ্ছে তখন তার মুখ দেখে আমার মনে হয়েছে এটা যেন তার কাছে খেলা’।
মিস জেফারসনের চেহারার বর্ণনায় হঠাৎ করেই জর্জ আব্রাহাম জনসনের চোখের সামনে একটা মানুষের ছবি ভেসে উঠল। সে লোকটি ওহাইও নদীর প্রবল স্রোতে ডুবে যাওয়া তার নাতিকে উদ্ধার করেছিল। আবার মিস জেফারসন লোকটার যে চরিত্রের বর্ণনা দিল তাতে তার চোখে ভেসে উঠেছে সেই আহমদ মুসার ছবি। এফ.বি.আই-এর ফাইলে আহমদ মুসার ডসিয়ারে তার এই অস্বাভাবিক গুণের কথা লেখা হয়েছে।
মনের এ কথাগুলোকে চেপে গিয়ে জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল, ‘মিস জেফারসন আমি জানি আপনি ড্রইং-এ অত্যন্ত ভাল। আপনি যে ছবিটা ভাষায় তুলে ধরলেন, তা দয়া করে আমাদের এঁকে দিন’।
‘দিতে পারি একটা শর্তে’।
‘কি শর্ত?’
‘তিনি ধরা পড়লে তার সাথে দেখা করে তাকে ধন্যবাদ দেবার আমাকে একটু সুযোগ দেবেন’।
‘মঞ্জুর’, হেসে বলল এফ.বি.আই চীফ।
জর্জ আব্রাহাম জনসন তার কথা শেষ করতেই মিস জেফারসন ড্রয়্যার থেকে দুই শিট কাগজ বের করে মেলে ধরল টেবিলে। বলল, ‘কোনটি নেবেন নিন’।
একই লোকের দু’টি স্কেচ।
স্কেচ দেখে চমকে উঠল জর্জ আব্রাহাম জনসন, ‘এ যে তাঁর নাতিকে উদ্ধার করা সেই লোকের মত’।
দু’টি থেকে একটি স্কেচ তুলে নিলেন জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ধন্যবাদ মিস জেফারসন’ বলে উঠে দাঁড়াল জর্জ আব্রাহাম। তার সাথে সাথে সবাই।

ক্লিফ ডোয়েলিং এলাকা পেরিয়ে আহমদ মুসার জীপ তীর বেগে ছুটছে এবার এস্পানোলার দিকে।
কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সে? এই রক্তভেজা শরীর আর রক্তে প্লাবিত জীপ নিয়ে শহরে ঢুকবে সে কেমন করে?
আহত বাহুর সন্ধি থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, এখনও হচ্ছে। ব্যান্ডেজ তো দূরে, আহত জায়গা বাঁধবারও সময় সে পায়নি। পেছনে তাড়া করে আসছে সিকিউরিটির লোকেরা।
প্রচুর রক্তক্ষরণে দুর্বলও হয়ে পড়েছে আহমদ মুসা। মাথা ঝিমঝিম করছে অনেকক্ষণ থেকে। দৃষ্টিও তার ঝাপসা হয়ে আসছে যেন।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল, এই অবস্থায় বেশীক্ষণ সে ড্রাইভ করতে পারবে না। আর এ গাড়িতে থাকলে সে মারা পড়ে যাবে।
বনাঞ্চল প্রায় পার হয়ে এসেছে। পাতলা হয়ে এসেছে গাছপালা। সামনেই মাঠ। কভার নেবার জায়গা সেখানে কম।
ক্লীফ ডোয়েলিং থেকে এস্পানোলা পর্যন্ত আসা ও যাওয়ার পথ পাশাপাশি, কিন্তু আলাদা। মাঝখানে আইল্যান্ড। তাতে গাছ পালা, ঝোপঝাড়ও আছে।
আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিল। কারও সাহায্য তাকে নিতে হবে। এ জন্যে এস্পানোলা থেকে আসা গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করা তার জন্যে নিরাপদ। এ রাস্তায় সিকিউরিটির লোকরা যে কোন সময় এসে পড়তে পারে।
আহমদ মুসা গাড়ি দাঁড় করাল।
এস্পানোলা থেকে আসা গাড়ির রাস্তা ডান দিকে। কিন্তু আহমদ মুসা নামল বাঁ দিকে। গাড়ি থেকে নেমে সে রাস্তা অতিক্রম করে বাঁদিকের জংগলের পাশে এসে দাঁড়াল। পেছন ফিরে দেখল, ফোটা ফোটা রক্ত রাস্তার উপর পড়েছে, তারপর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আরও রক্ত পড়ার সুযোগ দিল।
এরপর আহমদ মুসা রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে রক্তপড়া যথাসম্ভব বন্ধ করে জংগলের ভেতরে ঢুকে গেল। টলতে টলতে এগোলো পেছনের দিকে।
কিছুটা এগিয়ে আবার এস্পানোলাগামী রাস্তা অতিক্রম করে এস্পানোলা থেকে আসা রাস্তাও অতিক্রম করল। সে রাস্তার ডানপাশে এক ঝোঁপের আড়ালে আশ্রয় নিল। একটা কারবাইন তখনও তার ডান কাঁধে ঝুলছে। যদি সে ধরা পড়েই যায়, তাহলে তার শেষ রক্ষার অস্ত্র এটা।
বেশী দেরী করতে হলো না। মাত্র দু’মিনিট পরেই লস আলামোসের সিকুরিটি ক্যারিয়ারটা তীর বেগে এসে তার ফেলে আসা জীপের পাশে দাঁড়াল।
জীপ ফাঁকা দেখার পর তারা হৈচৈ করে উঠল। তারা রাস্তার ওপাশে নেমে গেল। খুঁজতে লাগল তারা আশে পাশে। কিছুক্ষণ পর একজনের উচ্চ কন্ঠ চিৎকার করে উঠল, ‘তোমরা সবাই চলে এস। এখানে দেখ জমাট বাঁধা অনেক রক্ত। নিশ্চয় তাকে কেউ গাড়ি করে তুলে নিয়ে গেছে এখান থেকে’।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা রক্তাক্ত জীপটাকে ক্যারিয়ারের পেছনে বেঁধে রাস্তার সামনের একটু অংশ ঘুরে আহমদ মুসার সামনের রাস্তা দিয়েই লস আলামোসের দিকে চলে গেল।
আহমদ মুসা শুনতে পেল অয়্যারলেসে কাউকে যেন তারা ব্রিফ করছে, ‘লোকটি এস্পানোলার দিকেই গেছে কোন প্রাইভেট গাড়িতে। সবগুলো গাড়ির উপর নজর রাখতে হবে এবং সবগুলো ক্নিনিক হাসপাতাল পাহারা দিতে হবে। সে গুরুতর আহত, নিশ্চয় কোন হাসপাতাল বা ক্নিনিকে সে যাবে’।
ওরা চলে গেল।
ধরা পড়া থেকে বাঁচল আহমদ মুসা।
কিন্তু এরপর সে কি করবে? এখনো রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটার সাধ্য তার নেই। তার উপর বুক ফাটা তৃষ্ঞা তাকে পাগল করে তুলেছে। মনে হচ্ছে এক সাগর পানিতেও তার তৃষ্ঞা মিটবে না।
তৃষ্ঞার এ অকথ্য যন্ত্রণা তার দেহের সব শক্তি যেন শুষে খাচ্ছে। কিন্তু তবু তাকে এগোতে হবে। একটা গাড়ি তাকে খুঁজে পেতে হবে। যে কাজ নিয়ে সে এসেছে, তার তো কিছুই হয়নি।
ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসা এগোলো রাস্তার দিকে। ঝাপসা চোখে টলতে টলতে যাচ্ছে আহমদ মুসা।
রাস্তায় উঠে সে মনে করল, এস্পানোলা গামী গাড়িতে তাকে উঠতে হবে এবং এ জন্যে ওপারের ঐ রাস্তায় তার যাওয়া দরকার।
রাস্তা পার হবার জন্যে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
তার বাম কাঁধে এখনো ঝুলছে কারবাইনটা।
আহত কাঁধে কারবাইনটাকে দশগুণ ভারী মনে হচ্ছে। আর এ কারবাইনটা তার জন্যে এখন বিপজ্জনক।
হাঁটতে হাঁটতেই আহমদ মুসার ডান হাত বাম কাঁধ থেকে কারবাইনটা নামাবার কাজ শুরু করে দিল।
বাম হাত একটু উপরে তুলতে গিয়ে তীব্র ব্যথা পেল আহমদ মুসা। সে একটু অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল।
ব্যথা পাওয়ার পর দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে।
ঠিক এ সময়েই কাছেই একটা হর্ণ বেজে উঠল। চমকে উঠে দ্রুত তাকাতে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠল আহমদ মুসার। অন্ধকার হয়ে গেল তার চারদিকের পৃথিবীটা।
নিজের উপর তার সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেল।
এস্পানোলা থেকে ক্লীফ ডোয়েলিং হয়ে যে রাস্তা কিউবো শহর পর্যন্ত গেছে, তা এক্সপ্রেস ওয়ে না হলেও কার্যত এক্সপ্রেস ওয়ে হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।
একটা গাড়ি তীব্র বেগে চলছিল ক্লীফ ডোয়েলিং এর দিকে। একজন লোককে রাজার হালে রাস্তা পার হতে দেখে ড্রাইভার হর্ন দিল একটু বিরক্ত হয়েই।
কিন্তু লোকটি দ্রুত সরে যাবার বদলে রাস্তায় ঢলে পড়ে গেল।
যথাসময়ে গাড়ির ব্রেক কষলেও গাড়িটা লোকটির প্রায় গা স্পর্শ করে দাঁড়ালো।
একজন তরুনী ড্রাইভ করছিল গাড়িটা।
তরুণীটি সান্তা আনা পাবলো।
তার পাশে তার দাদা, সেই বৃদ্ধ রসওয়েল পাবলো।
পেছনের সীটে সান্তা আনার দাদী।
গাড়ি থামিয়েই একবার বিরক্তি ও উদ্বেগ নিয়ে গাড়ি থেকে নামল সান্তা আনা। বৃদ্ধ রসওয়েল পাবলোও নামল গাড়ি থেকে।
সান্তা আনাই প্রথম পৌঁছেছিল পড়ে যাওয়া লোকটির কাছে।
পড়ে যাওয়া লোকটি আহমদ মুসা।
সান্তা আনা রক্তাক্ত আহমদ মুসাকে দেখেই ‘দাদু’ বলে চিৎকার করে উঠল।
বৃদ্ধ রসওয়েল পাবলোও সেখানে পৌঁছেছে।
আহমদ মুসার মুখের উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল বৃদ্ধ রসওয়েল। বলল দ্রুত কন্ঠে, ‘আরে এযে সেই ছেলেটা, এর এ দশা কেন?’
‘দাদু তুমি চেন এঁকে?’ জিজ্ঞেস করল সান্তা আনা।
‘হ্যাঁ, খুব ভাল ছেলে। আমরা এক সঙ্গে প্লেনে এসেছি’।
‘ভাল ছেলে বলছ, কিন্তু সাথে কারবাইন কেন? গুলিবিদ্ধ হয়েছে নিশ্চয় গোলাগুলি করতে গিয়ে’।
সান্তা আনার দাদী বৃদ্ধাও এসে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘তোমরা দাঁড়ায়ে কেন? ছেলেটা তো মারা যাবে। তাড়াতাড়ি গাড়িতে তোল’।
‘একটা ঝামেলায় পড়া কি ঠিক হবে? কেন, কি ঘটেছে আমরা কিছুই জানি না’। সান্তা আনা বলল।
‘কিছু জানার দরকার নেই, আমার চেনায় অবশ্যই ভূল হয়নি। ছেলেটি ভাল। নিশ্চয় কোন মারাত্মক বিপদে জড়িয়ে পড়েছে’।
বলে বৃদ্ধ আহমদ মুসাকে পাঁজা কোলা করে তুলে নেবার উদ্যোগ নিল।
আর কিছু না বলে সান্তা আনাও এগিয়ে এল। বলল, ‘দাদু ওঁর সামনের দিকটা ধর, আমি পেছনটা ধরছি’।
দাদা নাতনি দু’জনে মিলে আহমদ মুসাকে পেছনে সিটে তুলে নিল।
বৃদ্ধা কারবাইনটাও গাড়িতে তুলছিল।
সান্তা আনা না না করে উঠল। বলল, ‘দাদী, ঐ আপদ তুমি গাড়িতে তুলো না’।
‘ঠিক আছে। বাছাটার জ্ঞান ফিরুক। তারপর ফেলে দেয়া যাবে। জিনিষটা ওর তো’।
আহমদ মুসাকে গাড়িতে তুলেই বৃদ্ধ রসওয়েল বোতল থেকে ঠান্ডা পানি আহমদ মুসার মুখে ছিটাতে লাগল।
সান্তা আনা তার গাড়ি রাস্তার পাশে একটা গাছের ছায়ায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
সামনে দুই সিটে দাদী ও নাতনী এবং পেছনের সিটে বৃদ্ধ রসওয়েল। সবাই তাকিয়ে আহমদ মুসার মুখের দিকে।
‘আঘাত তার বাহু সন্ধিতে। আঘাতে সে সংজ্ঞা হারায়নি। সংজ্ঞা হারাবার কারণ হতে পারে রক্তক্ষরণজনিত দুর্বলতা। বলল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘দাদু, তুমি লোকটাকে ভাল বলছ কিসের ভিত্তিতে?’
‘ছেলেটার মুখ দেখ তো। এ কোন খারাপ লোকের চেহারা?’
‘খারাবিটা মানুষের ভেতরের ব্যাপার, দেহের ব্যাপার নয়’। বলল সান্তা আনা।
‘দেহের ব্যাপার নয় বোন, কিন্তু চেহারার ব্যাপার অবশ্যই। মানুষের চেহারায় তার পাপ অথবা পুণ্যের প্রকাশ অবশ্যই ঘটে’।
সান্তা আনা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
নড়ে উঠল আহমদ মুসা। চোখ খুলল সে। আচ্ছন্নের মত তার দৃষ্টি।
শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ঠোঁট। সে দু’ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল, ‘পানি, পা….নি’।
বৃদ্ধ রসওয়েল আহমদ মুসার মাথা একটু উঁচু করে তুলে ধরে পানির বোতল তার মুখে ধরল।
একবারেই এক বোতল পানির সবটুকু খেয়ে ফেলল আহমদ মুসা।
পানির বোতল মুখ থেকে সরাতেই আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে যার কোলে তার মাথা তার দিকে তাকাল।
তাকিয়েই বিষ্মিত আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বাম হাত চেপে ধরে উঠে বসল। বলল, ‘স্যার আপনি?’
তারপর চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি গাড়িতে কি করে এলাম?’ দুর্বল কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘এসব পরে শুনো। তোমাকে এখন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেয়া দরকার’।
‘না জনাব, হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে নয়। এতক্ষণে আশপাশের শহরসহ সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পুলিশ নিশ্চয় পাহারা বসিয়েছে’।
‘কেন তাদের সাথে তোমার বিরোধ কি, কি ঘটেছে?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘ঘটনা অনেক বড়। তবে এটুকু জেনে রাখুন আমি নির্দোষ, কিন্তু সরকারের সিকিউরিটি ফোর্সের সাথে আমার সংঘাত ঘটেছে, এটা ঠিক। আমি তাদের গুলিতে আহত, তাদেরও অনেকে আমার গুলিতে আহত হয়েছে। এই কারবাইনটাও আমি সিকিউরিটি ফোর্সদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি। আরও শুনুন, আমি হয়তো এখন তাদের তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যাকে তাদের অবশ্যই ধরা প্রয়োজন। আমি সম্পূর্ণ নিরপরাধ হবার পরেও এসব কিছু সত্য। এখন আপনারা আমাকে বিশ্বাসও করতে পারেন, অথবা আমাকে পুলিশের হাতেও দিতে পারেন’।
‘দাদু মনে হচ্ছে গুরুতর কিছু ঘটেছে। তবে ওঁর কাছ থেকে সবকিছু না শুনে ওকেঁ আমরা পুলিশের হাতে দিতে পারিনা’। বলল সান্তা আনা।
‘ও তো দুটি বিকল্প দিয়েছে। আমি প্রথমটিকেই গ্রহন করেছি। ওর প্রতি বিশ্বাস আমার নষ্ট হয়নি’। বলল বৃদ্ধ রসওয়েল পাবলো।
‘তাহলে আমরা এখন এস্পানোলা ফিরি দাদু?’ বলল সান্তা আনা।
‘আমার মনে হয় সান্তা ক্লারা এবং এস্পানোলাগামী প্রতিটি গাড়ি আজ চেক করা হবে’। আহমদ মুসা বলল।
ভাবছিল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘তাহলে দাদু ওঁকে আমরা আমাদের কম্যুনিটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওটা এস্পানোলার বাইরেও হবে। ওখানে হোয়াইট পুলিশ মাতব্বরী করতে পারবেনা’।
‘ঠিক বলেছিস বোন। কিন্তু কোন পথে যাবি?’ বলল রসওয়েল।
‘ভেব না দাদু। আমি এস্পানোলা রোড ও এস্পানোলার আশে পাশে যাব না’।
বলে গাড়ি স্টার্ট দিল সান্তা আনা। গাড়ি ছুটে চলল।
‘কোথায় যাচ্ছিলাম, কোথায় যা্চ্ছি। একেই বলে ঈশ্বরের কাজ’। বলল বৃদ্ধা, সান্তা আনার দাদী।
‘তুমি তো খুশীই হয়েছ দাদী’। সান্তা আনা বলল।
‘ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যই করেন’। দাদী বলল।
‘তোমরা আমাকে লুকিয়ে রাখছিলে, এটা বোধ হয় ঈশ্বর ভালোর জন্যেই করেছেন?’ সান্তা আনা মুখে ম্লান হাসি টেনে বলল।
‘নিশ্চয় তাই’। বলল সান্তার দাদী।
‘সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকা বোধ হয় ঈশ্বরের কাজ?’ ভারি গলায় বলল সান্তা আনা।
আহমদ মুসা বিষ্মিত হলো আলোচনার এই সিরিয়াস মোড় পরিবর্তনে এবং সান্তা আনাকে কান্নার কাছাকাছি পৌঁছতে দেখে। পটভূমিতে কোন বড় ঘটনা আছে কি?
বৃদ্ধ রসওয়েল হাসল। বলল, ‘এ দিক ভেবে ড্রাইভ খারাপ করো না বোন। নিশ্চিত থাক, ঈশ্বর সত্যকে সত্যই রাখেন’।
সান্তা আনা কিছু বলল না।
তার দাদীও নয়।
কিন্তু সবার মনেই একটা তোলপাড়।
সান্তা আনার আব্বা আম্মা জোর করেই সান্তা আনাকে পাঠিয়ৈ দিচ্ছে তার দাদা দাদীর সাথে তাদের পূর্বপুরুষের নিবাস জেমিস পাবলোতে।
জেমিস পাবলো সান্তাফে জাতীয় বনাঞ্চলের দক্ষিণ পশ্চিম অংশে পাবলো রেড ইন্ডিয়ান সংরক্ষিত এলাকায়।
বনবাসের মতই ব্যাপার অনেকটা। সান্তার বাবা মা এবং ইন্ডিয়ানরা চায়, সান্তা আনা মাস খানেকের মত নাবালুসি পরিবারের সংস্পর্শ থেকে দুরে থাক এবং মামলায় সাক্ষী দেয়ার কোন সুযোগ না পাক। এজন্যে সন্তাফে এবং এস্পানোলার কোন জায়গায় সান্তা আনার অবস্থান তারা নিরাপদ মনে করে নি।
অনেকক্ষণ পর সান্তা আনার দাদা রসওয়েল পাবলোই বলল, ‘বুঝলে সান্তা, হতে পারে ঈশ্বরের হাতই তোমাকে এস্পানোলা ফিরিয়ে নিচ্ছে’।
‘ধন্যবাদ দাদু’। বলল সান্তা আনা। তার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে একটা বেদনার হাসি।
তার দৃষ্টি সামনে প্রসারিত।
কিন্তু তাতে একটা অসহ্য যন্ত্রণা।
সেই যে সান ঘানেমকে পুলিশ নেয়ে গেল, তারপর সান ঘানেমের আর কোন খবর সে পায় নি। দেখা করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাড়ি থেকে কোন মতেই তাকে বের হতে দেয়া হয়নি। কি ভাবছে সান ঘানেম তাকে? ভাবছে কি সে যে, সবার মত আমিও তাকে ভাইয়ার খুনি ভেবে তার কাছ থেকে সরে গেছি।
হঠাৎ কান্নার একটা জোয়ার উথলে উঠলো সান্তা আনার বুক থেকে।
সান্তা আনা ঠোঁট কামড়ে তা রোধ করার চেষ্টা করল।
কান্না চাপতে গিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল সান্তা আনার দেহ।
পাশ থেকে তার দাদী বুঝল সান্তা আনার মনের অবস্থা। ধীরে ধীরে সে তার বাম হাত সান্তার পিঠে রাখল। বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে বোন। ঈশ্বর আছেন’।
দাদীর এ সান্ত্বনায় সান্তা আনার দু’চোখ বেয়ে নেমে এল নিরব অশ্রুর বন্যা।

এস্পানোলা শহর। বৃদ্ধ রসওয়েলের বাড়ি।
এস্পানোলার এক সবুজ টিলায় বাড়িটা। ছবির মত।
রসওয়েল পরিবার পাবলো রেড ইন্ডিয়ানদের এক সম্ভ্রান্ত ঘর। এখন আগের সেই সর্দারী সিস্টেম নেই। কিন্তু এক সময় তার পরিবারই নেতৃত্ব দিয়েছে বিশাল বিস্তৃত পাবলো ইন্ডিয়ান জনপদের।
জিমেস পাবলোতে রয়েছে তাদের বিশাল বাড়ি এবং বিপুল ভু-সম্পত্তি।
ইদানিং পরিবারটি বাস করছে এস্পানোলাতে। কিন্তু ছেলে চাকুরীতে ঢোকার পর সে এখন বাস করছে সান্তাফে-তে।
রসওয়েলের সুন্দর বৈঠকখানা।
আজ আহমদ মুসার গায়ে জ্বর নেই। আজই প্রথম সে বৈঠকখানায় এসে বসেছে।
রেড ইন্ডিয়ানদের কম্যুনিটি হাসপাতালে একদিন থাকার পর তাকে বাসায় নিয়ে এসেছে বৃদ্ধ রসওয়েল।
আহমদ মুসার বাহুসন্ধিতে অপারেশন করে গুলি বের করতে হয়েছে। দ্রুত সে সেরে উঠেছে। ডাক্তার বিষ্মিত কন্ঠে বলেছে রসওয়েলকে ছেলেটার দেহে যাদু আছে। তিরিশ দিনের নিরাময়ের কাজ তার তিরিশ ঘন্টায় হয়ে যাচ্ছে। আর ক’দিনের মধ্যে সে দৌড় ঝাঁপ করতে পারবে।
‘যাদুকে তুমি বিশ্বস কর ডাক্তার?’ ডাক্তারের কথার উত্তরে বলেছে বৃদ্ধ রসওয়েল।
ডাক্তার হেসে বলেছে, ‘আমি তার মানসিক শক্তিকে যাদু বলছি। যে মন সব সময় নিরুদ্বিগ্ন ও প্রশান্ত থাকে, তার নার্ভ অবিশ্বাস্য শক্তিশালী হয়। সে অসীম মানসিক শক্তির অধিকারী হয়। ছেলেটার মধ্যে আমার মতে ঐ ধরনের একটা মানসিক শক্তি আছে’।
‘ঠিক বলেছেন, আংকল। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার মুখ দেখে মনে হয়েছে তার কিছু হয়নি। কিন্তু আংকল এমন তো সাধারণত দেখা যায় না?’ বলেছিল সান্তা আনা।
‘এ এক অসাধারণ মানুষ মা’। বলেছিল ডাক্তার।
‘কিন্তু তাঁকে দেখে তো অসাধারণ কিছু মনে হয় না। খুব ভাল ছেলে এই যা’। বলে ওঠে বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘আমি ডাক্তার। আমি তার দেহের বাইরেরটাও দেখেছি, ভেতরটাও দেখেছি। তার শরীর নিখাদ এক পেটানো ইস্পাত, তার ভেতরের অবস্থানগুলোও তাই। দেখেছেন, এত রক্ত তার গেছে, কিন্তু এক ফোটা রক্তও তাকে বাহির থেকে দিতে হয়নি’। বলেছিল ডাক্তার। তাঁর কন্ঠে বিষ্ময়।
এসব কথা আলোচনা করছিল বৃদ্ধ রসওয়েল ও সান্তা আনা করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে।
আলোচনার এক পর্যায়ে সান্তা আনা বলল, ‘আমি খুব খুশী দাদু কয়টা দিন কাজের মধ্যে দিয়ে কাটল। কিন্তু লোকটা চলে গেলে কি আমাকে জিমেস পাবলোতে পাঠিয়ে দেবে?’
‘জিমেস পাবলো জায়গাকে এত ভয় করছিস কেনো? জিমেস পাবলো ও এস্পানোলার মধ্যে কি খুব পার্থক্য আছে?’
পার্থক্য যদি নাই থাকে তাহলে আমি এস্পানোলাতে থাকলে তোমাদের আপত্তি কেন?’
‘আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছু করার নেই। আমাদের ‘জিমি’ নিহত হওয়ার ঘটনা, শোক ও সেন্টিমেন্ট সৃষ্টিসহ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যখন যুক্তির কথা কারও কানে যাবে না। জানি ইন্ডিয়ানরা বাড়াবাড়ি করছে, তারা হঠাৎ করে পাবলো ইন্ডিয়ানদের সাংঘাতিক মিত্র সেজে বসেছে। ওদের মতলবটা আমার অজানা নয়’। বলল রসওয়েল।
‘আরেকটা কথা তোমাকে বলি দাদু, আমি সান ঘানেমকে ভালবাসি, এটা জানি ইন্ডিয়ানদের বিশেষ করে জনি লেভেনের সহ্য হচ্ছে না। তার একটা মতলব ছিল আমাকে নিয়ে। ঈর্ষার কারনেই এখন মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে ওরা’।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল বৃদ্ধ রসওয়েল। প্রায় গর্জে উঠল, ‘কি বললি জনি ইন্ডিয়ানরা চোখ তুলে তাকাতে চায় পাবলো মেয়েদের উপর। চোখ ছিঁড়ে ফেলব না’।
বলে আবার হাঁটতে লাগল। দাদুর কথায় উৎসাহিত হয়ে উঠল সান্তা আনা। কিন্তু বুঝতে পারলো না কেন দাদু জনিদের বিরুদ্ধে এমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল!
কিছু বলতে যাচ্ছিল সান্তা আনা। কিন্তু ততক্ষণে তারা ড্রইং রুমে প্রবেশ করেছে। থেমে গেল সান্তা আনা।
ড্রইং রুমে আহমদ মুসাকে দেখে খুশী হলো বৃদ্ধ রসওয়েল। উচ্ছসিত কন্ঠে বলল, ‘তুমি বৈঠকখানা পর্যন্ত এসেছ? বাঃ বেশ’।
বলে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে আহমদ মুসার কপালে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে বলল, ‘না, জ্বর নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ’।
আহমদ মুসার পাশের সোফায় বসে পড়ল বৃদ্ধ রসওয়েল।
সান্তা আনা বসল তাদের সামনের সোফাটায়।
বসার পর বৃদ্ধ রসওয়েল বলল, ‘আহমদ আবদুল্লাহ, তুমি ভাল হবার আগেই যাবো যাবো করছ, কিন্তু এদিকের খবর জান?’
‘কি খবর? আমাকে পুলিশ সন্ধান করছে সেই খবর?’ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি বুঝলে কেমন করে?’
‘খবরটা যখন ভয়ের, তখন পুলিশ আমাকে সন্ধান করা ছাড়া আর কি খবর হতে পারে?’
বলিনি তো আমি ভয়ের খবর দিচ্ছি’।
‘তা বলেন নি, কিন্তু যাব যাব করছ বলে যে খবর দেবেন, তা বাইরে বেরুতে না পারার মত ভয়ের খবরই হবে’।
‘তোমাকে ধন্যবাদ, তোমার আই কিউকে ধন্যবাদ। কিন্তু খবরটা সত্যি খুব ভয়ের। পুলিশ শুধু তোমার সন্ধান করছে তা নয়’।
‘আরও কি করছে?’
‘তোমার একটা ড্রইং করা ফটো সব পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
‘ড্রইং ফটো, ফটোগ্রাফ নয়?’
‘হ্যাঁ, ড্রইং ফটো’।
‘আমার ফটোগ্রাফই ওদের কাছে থাকার কথা, তাহলে ড্রইং করা ফটো কেন? অনেকটা স্বগোতেক্তির মতই কথাগুলো বলল।
মনে মনে আহমদ মুসা আরও বলল, আহমদ মুসা যে লস আলামোস গবেষণাগারে প্রবেশ করেছিল, এ সম্পর্কে ওরা তাহলে নিশ্চিত হয়নি। ড্রইং ফটোটা নিশ্চয় তাহলে নিখুঁত নয়। হলে তাকে তো তারা চিনতেই পারতো।
মনে মনে খুশী হলো আহমদ মুসা।
‘তোমার ফটো ওদের মানে সরকারের কাছে থাকার কথা বলছ কেন? কেন থাকবে তোমার ফটো সরকারের কাছে?’ বলল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘তার আগে বলুন, আর কি শুনেছেন?’ আহমদ মুসার পাল্টা প্রশ্ন।
‘পুলিশের উপর নির্দেশ এসেছে সংশ্লিষ্ট লোকটিকে ধরার সব রকম ব্যবস্থা করতে হবে’।
ড্রইং ফটোটা আমার বলে কি চেনা যায়?’
‘বর্তমান অবস্থার সাথে খুব একটা মিল নেই। ড্রইং ফটোতে তোমার মুখে গোঁফ এবং মাথায় ঝাঁকড়া চুল আছে। এই বেশেই প্রথম তোমাকে আমরা দেখেছিলাম’।
বৃদ্ধ রসওয়েল একটা ঢোক গিলল এবং সংগে সংগেই বলে উঠল, ‘আর কোন কথা নয়। এবার বল পুলিশ তোমাকে খুঁজছে কেন? সরকার এতটা ক্ষ্যাপা কেন তোমার উপর? তুমি আহত হলে কিভাবে? সরকারী কারবাইনটাই বা তুমি পেলে কোথায়?’
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘আমি একজন পণবন্দী মানুষকে উদ্ধার করার জন্যে নিউ মেক্সিকো এসেছি। তাকে ইহুদী গোয়েন্দা চক্র পণবন্দী করেছে।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো রসওয়েলের। বিষ্ময় দেখা দিল সান্তা আনার চোখে মুখেও।
‘লোকটি কে? আমেরিকান?’
‘হ্যাঁ’।
‘কে লোকটি?’
‘সান্তাফে’তেই বাড়ি। নাম, কারসেন ঘানেম নাবালুসি’।
নামটা কানে যেতেই চমকে উঠল বৃদ্ধ রসওয়েল এবং সান্তা আনা দু’জনেই।
বিষ্ময়ের ধাক্কায় দু’জনেই কথা বলতে পারলো না তৎক্ষনাৎ।
তাদের বিস্ময়ের কারণ কয়েকটি। কারসেন ঘানেম যে বন্দী বা পণবন্দী হয়েছে তা এই প্রথম শুনল তারা। দ্বিতীয় ব্যাপার হলো, ইহুদী গোয়েন্দারা কারসেন ঘানেমকে পণবন্দী করবে কেন? নিউ মেক্সিকোর মুসলমানদের সাথে ইহুদীদের তো তেমন কোন সম্পর্ক নেই। আর তৃতীয় কারণ, আহমদ আব্দুল্লার সাথে কারসেনের সম্পর্ক?’
সান্তা আনা বিষ্মিত হবার সাথে সাথে ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। একদিকে সান ঘানেম খুনের মিথ্যা অভিযোগে এখন জেলে, অন্যদিকে তার আব্বাও বন্দী হয়েছে কোন শত্রুর হাতে। ওদের যে এখন কি অবস্থা! ভাবতে গিয়ে বেদনায় মনটা মুষঢ়ে পড়ল।
‘কারসেন ঘানেম পণবন্দী হলো কোন কারণে? ইহুদীদের সাথে তার শত্রুতা কিসের?’ বলল রসওয়েল।
‘আমারই কারণে সে পণবন্দী হয়েছে। আমি……….’।
কথা শেষ করতে পারলো না আহমদ মুসা। তাকে বাধা দিয়ে রসওয়েল বলল, ‘তোমার কারণে? তুমি কারসেন ঘানেমকে চেন?’
‘চিনি না। ঘটনাটা বলছি শুনুন’। বলে একটু থামলো আহমদ মুসা।
বৃদ্ধ রসওয়েল ও সান্তা আনার উদগ্রীব দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। তাদের চোখে এখন বিষ্ময়, সংশয়, সন্দেহ অনেক কিছু।
আহমদ মুসা সোফায় সোজা হয়ে বসে কথা শুরু করল আবার, ‘ওয়াশিংটনের গ্রীণ ভ্যালিতে আমেরিকান মুসলিম এসোসিয়েশনগুলোর একটা সম্মেলনে হচ্ছে। আমি সে সম্মেলনে এসেছিলাম। সে সম্মেলনে নিউ মেক্সিকো মুসলিম সমিতির সভাপতি হিসেবে কারসেন ঘানেমেরও যাবার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা সম্মেলনে আমার যোগদানের বিষয় জানতে পারে। আমাকে ধরার জন্যে তারা সম্মেলনে অনুপ্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। এই লক্ষ্যে তারা ওয়াশিংটন যাবার পথে কারসেন ঘানেমকে কিডন্যাপ করে এবং তার ছদ্মবেশ নিয়ে সম্মেলনে যোগদান করে একজন ইহুদী এজেন্ট। আর কারসেন ঘানেমকে ওরা বন্দী করে রাখে ক্লিফ ডোয়েলিং এর দক্ষিণে সবুজ পাহাড়ে। কিন্তু সম্মেলনে যোগদানকারী ইহুদী এজেন্ট ধরা পড়ে যায়। তার কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি এই সবুজ পাহাড়ে কারসেন ঘানেমকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। জানার সংগে সংগে ছুটে আসি তাকে উদ্ধারের জন্যে’। একটু থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই বৃদ্ধ রসওয়েল বলল, ‘তোমার আসার পথেই বুঝি প্লেনে তোমার সাথে আমার ঐ দেখা?’
জি। বলে আহমদ মুসা সোফায় গা এলিয়ে আবার শুরু করল, ‘ঐ ইহুদী এজেন্ট ধরা পড়েছে এবং আমি যে কারসেন ঘানেমকে উদ্ধারের জন্য নিউ মেক্সিকোর সবুজ পাহাড়ে আসছি তা ওরা জানতে পারে। আমি এসে পৌঁছানোর আগেই ওরা কারসেন ঘানেমকে সবুজ পাহাড় থেকে সরিয়ে ফেলে এবং আমাকে ধরার জন্যে ওঁৎ পেতে থাকে। আমি ধরা পড়ে যাই ওদের হাতে’। থামল আহমদ মুসা।
‘সাংঘাতিক রোমাঞ্চকার কাহিনী তোমার। কিন্তু এ বিরোধ তোমার ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কেন? সরকার ও পুলিশের সাথে তোমার সংঘাত ঘটল কি করে? সরকার তোমার শত্রু হয়ে দাঁড়াল কেন?’ বলল রসওয়েল।
‘ওটা ঘটেছে ভাগ্যের ফেরে। একদম নিরপরাধ হয়েও ওদের কাছে আজ আমি সাংঘাতিক এক অপরাধী। ওরা আমাকে ৪০ ফুট মাটির গভীরে এক অন্ধকূপে বন্দী করে রাখে। ওখান থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করতে গিয়ে একটা গোপন সুড়ঙ্গ পথ পেয়ে যাই। মনে করলাম এ সুড়ঙ্গ পথে বাইরে বেরুনো যাবে, কিন্তু সে সুড়ঙ্গ পথে চলতে গিয়ে উঠলাম লস আলামোস স্ট্রাটেজিক ল্যাবরেটরীতে। সেখান থেকে পালাতে গিয়ে সংঘাত বাধল ওখানকার সিকিউরিটি ফোর্সের সাথে। আমি আহত হলাম, ওরাও অনেকে আহত হলো। সবকিছু জানতে পারলাম বটে, কিন্তু শত্রু হয়ে গেলাম আপনাদের সরকারের। তারা ভাবছে আমি বুঝি গোয়েন্দাগিরির জন্যে লস আলামোসে ঢুকেছিলাম’। বলল আহমদ মুসা।
রসওয়েল ও সান্তা আনা বিষ্ময়ে নির্বাক।
অনেক্ষণ পর ধীর ও চিন্তান্বিত কন্ঠে বৃদ্ধ রসওয়েল বলল, ‘তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করা কঠিন। লস আলামোস ল্যাবরেটরীর ভেতরে তোমাকে পাওয়া গেছে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর এক সত্য। মনে করা হবে, কোন ভয়ানক কাজ নিয়ে তুমি সেখানে ঢুকেছিলে। তুমি এমন জায়গায় ঢুকেছিলে যেটা দেশের সবোর্চ্চ স্পর্শকাতর স্থানগুলোর একটি। আমি তোমার জন্যে উদ্বিগ্ন বৎস।‘
‘ঘরের বাইরে একটা পদক্ষেপও আপনার এখন নিরাপদ নয় দেখা যাচ্ছে’। উদ্বিগ্ন কন্ঠ সান্তা আনার।
‘আমি ভাবছি নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ তুমি কিভাবে করবে; এটাই এখন বড় চিন্তা হওয়া উচিত’। বলল রসওয়েল শুকনো কন্ঠে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘না জনাব ঐ চিন্তা করার সময় নেই। আমি এখন বের হবো কারসেন ঘানেমের খোঁজে। তাঁকে উদ্ধার করার পর ভাবব ঐ ব্যাপারে কি করা যায়’।
‘কি বলছ তুমি, তোমার এখন জীবন বাঁচানো দায়, তুমি আরেক জনকে কেমন করে বাঁচাবে? বিষ্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘আমার জন্যে বেচারার জীবন এখন বিপন্ন, আমার প্রথম দায়িত্ব হবে তাকে উদ্ধার করা’।
‘তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তুমি যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাও, তাহলে তো দু’কুলই যাবে’। যুক্তি উণ্থাপন করল রসওয়েল।
‘আল্লাহ যদি আমাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন, কারসেন ঘানেমকে উদ্ধার করার সুযোগ না দেন, তাহলে কারসেন ঘানেমের উদ্ধার করার দায়িত্ব বর্তাবে আল্লাহর উপর’। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার কথায় বৃদ্ধ রসওয়েল ও সান্তা আনা দু’জনেই হেসে উঠল।
‘আপনি যে কথা বললেন, তা আপনি বিশ্বাস থেকে বললেন? আল্লাহর প্রতি আপনার এতটা আস্থা আছে?’ বলল সান্তা আনা।
‘নিছক আস্থা ও বিশ্বাস নয় সান্তা আনা, এটা আমার একিন যে আমার চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আল্লাহ ঐ নিরপরাধ মানুষকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন’। বলল আহমদ মুসা।
হঠাৎ সান্তা আনার মুখ চোখে আবেগের এক জোয়ার যেন এল। বলল, ‘ভাইয়া, কোন সাজানো খুনের কেসে যদি কোন নিরপরাধ ও ভালো মুসলিম ছেলেকে আটাকানো হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে বাঁচাবেন না?’
সান্তা আনার শেষ দিকের কথাগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আকষ্মিক এই ঘটনায় আহমদ মুসা বিব্রত হয়ে পড়ল। একবার বৃদ্ধ রসওয়েল ও একবার সান্তা আনার দিকে তাকাতে লাগল আহমদ মুসা।
বৃদ্ধ রসওয়েলের চোখে মুখেও বেদনার একটা ছায়া পড়েছে।
সে আহমদ মুসার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘দুঃখিত আহমদ আবদুল্লাহ, তোমার বিপদের পাশে সান্তা আনা আরেক বিপদের কথা নিয়ে এল’।
‘আমি বুঝলাম না জনাব, ‘সাজানো খুনের মামলায় কোন মুসলিম ছেলে জড়িয়ে পড়েছে?’
সে আরেক কাহিনী আহমদ আব্দুল্লাহ।
বলে একটু থেমে বৃদ্ধ রসওয়েল আবার শুরু করল, ‘ভেবেছিলাম কথাগুলো তোমাকে বলবনা, কিন্তু এখন দেখছি বলা দরকার। তোমার ঘটনার সাথে এর কিছুটা হলেও সম্পর্ক আছে। তুমি শুনেছ আমার নাতি সান্তা আনার ভাই জিমি পাবলো খুন হয়েছে। খুনের অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে কারসেন ঘানেম নাবালুসির ছেলে সান ঘানেম নাবালুসিকে। সমস্যা…..,
বৃদ্ধ রসওয়েলকে থামিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘কি বলছেন আপনি, কারসেন ঘানেমের ছেলে খুনের অভিযোগে প্রেপ্তার হয়েছে? খুন করেছে সে? আপনার নাতি খুন হয়েছে, সে খুনের জন্যে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা কেস সাজালো কে?’
‘সেই কাহিনীই তো বলছি শোন’।
বলে বৃদ্ধ রসওয়েল খেলার মাঠে কিভাবে শ্বেতাংগ ও ইন্ডিয়ানদের মধ্যে দাংগা বাধল, কিভাবে একজন শ্বেতাংগের হাত থেকে একজন ইন্ডিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে সান ঘানেম শ্বেতাংগের হাত থেকে কেড়ে নেয়া ছুরি ছুড়ে ফেলে দিলে তা জিমি পাবলোর বুকে গিয়ে বিদ্ধ হলো এবং সে মারা গেল। কিভাবে হত্যাকান্ডটির সাথে শ্বেতাংগ ও রেড ইন্ডিয়ান সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে পড়ল, তার বিবরণ দিয়ে বলল, ‘সান ঘানেম যে জিমি পাবলোকে লক্ষ্য করে ছুরি ছোড়েনি, একজন ইন্ডিয়ান ছাত্রকে খুন করতে উদ্যত শ্বেতাংগের ছুরি কেড়ে নিয়ে কোন দিকে কিছু না দেখেই যে ছুরিটা ছুড়ে ফেলে, এটা মাত্র দেখেছে সেই ইন্ডিয়ান ছেলে জনি লেভেন, যাকে সান ঘানেম বাঁচিয়েছিল আর সান্তা আনা। যেহেতু এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্বেতাংগ এবং ইন্ডিয়ান নিয়ে, তাই জনি লেভেন এখন বলছে সে দেখেছে সান ঘানেম দেখে শুনেই ছুরি মেরেছে জিমি পাবলোকে। বিশ্বাস করবার মত একটা কাহিনীও বানিয়েছে জনি লেভেন। সেটা হলো, সান ঘানেমের চোখ পড়েছিল সান্তা আনার উপর, জিমি এর বিরোধিতা করে, এই কারণেই সুযোগ পেয়ে সান ঘানেম হত্যা করে জিমি পাবলোকে’।
‘কিন্তু সান্তা আনা সাক্ষী দিলেই তো সান ঘানেম বেঁচে যায়। জিমি পাবলোর বোন বলেই তার সাক্ষীই বেশী গ্রহনযোগ্য হবে’। আহমদ মুসা বলল।
‘সমস্যা দাঁড়িয়েছে তো এখানেই। সান্তা আনার আব্বা আম্মা সান্তা আনাকে সাক্ষী দিতে দেবে না। যে কেস হয়েছে তাতেও সান্তা আনাকে সাক্ষীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে’।
‘কেন সাক্ষী দিতে দেবে না?’
‘দুই কারণে। এক, অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনাবশত হলেও সান ঘানেমের নিক্ষিপ্ত ছুরিতেই জিমি পাবলো মারা গেছে। দুই, সান্তা আনা সান ঘানেমকে ভালোবাসে, এরও তারা বিরোধী। সুতরাং সান ঘানেম দৃশ্যপট থেকে সরে যাক, এটাই তারা চায়। আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করছে শুনলাম জনি লেভেনের গোত্রের রেড ইন্ডিয়ানরা। তারা আমার ছেলেকে, আমাদের পরিবারকে সাংঘাতিকভাবে উত্তেজিত করছে। সান্তাফে-তে থাকলে ঘানেমদের পরিবার সান্তা আনার সাথে যোগাযোগ করবে, আবার সান্তা আনাও ওদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, এই আশংকায় তাকে রাজধানী থেকে দুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল’।
‘কিন্তু জনাব, সান্তা আনা সাক্ষী না দিলে তো সান ঘানেমের শাস্তি হয়ে যাবে’। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘তা আমি জানি, কিন্তু করার কিছু পাচ্ছি না। বিষয়টা আমার পারিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে আমি সব কিছু করতে পারতাম, এমন কি আমাদের পাবলো ইন্ডিয়ানদের মধ্যে সীমিত থাকলেও, আমার কথা তারা শুনতো। কিন্তু জনি, জিয়া প্রভৃতি আশে পাশের সব ইন্ডিয়ানরা এক জোট হওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে’।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরের কলিং বেল বেজে উঠল। থেমে গেল আহমদ মুসা।
সান্তা আনা উঠে দাঁড়ালো।
রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে দরজার দিকে এগুলো।
দরজা খোলার আগে লুকিং হোলে সে চোখ রাখল।
চোখ লাগানোর পরেই চমকে দরজা থেকে সরে এল।
তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে।
একটু সরে তার দাদুকে লক্ষ্য করে বলল, দাদু, আব্বা আম্মা এসছেন’।
বলে সে এগিয়ে দরজা খুলে দিল।
‘গুড মর্নিং আব্বা আম্মা’। খুশী হবার চেষ্টা করে তাদের লক্ষ্য করে বলল সান্তা আনা। তার বাবা আরিসকো পাবলো জবাবে বলল,
‘জি, ধন্যবাদ’।
সান্তা আনার মা ভেতরে ঢুকে জড়িয়ে ধরলো সান্তা আনাকে। বলল, সাত দিনেই মনে হচ্ছে সাত বছর তোকে দেখিনি। সান্তা আনার কপালে চুমু খেল তার মা।
সান্তা আনার আব্বা আম্মা বৃদ্ধ রসওয়েলের দিকে এগোলে সে বলে উঠল, ‘এস আরিসকো, এস বৌমা, তোমরা যে আমাদের বিশাল সারপ্রাইজ দিলে। কি ব্যাপার বলত? একটা খবরও দিলে না?’
আজ ভোরে সিদ্ধান্ত নিতে হলো আপনার কাছে আসতে হবে, জিমেস পাবলোতে প্রথমে টেলিফোন করেছিলাম। শুনলাম আপনি মর্নিং ওয়াকে। আর সান্তা ঘুমিয়ে। তাড়া ছিল, তাই আর যোগাযোগ না করে চলে এলাম’।
‘বেশ করেছ, বস’। বলল রসওয়েল।
বসল তারা সামনে, যেখানে সান্তা আনা বসেছিল।
সান্তা আনা এসে দাদুর পাশে একটা সোফায় বসল। পরে সান্তা আনার মা স্বামীর পাশ থেকে উঠে এসে সান্তা আনার পাশে বসল।
রসওয়েল আহমদ মুসার সাথে তার ছেলে ও বৌমা’র পরিচয় করিয়ে দিল। আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ইনি আহমদ আব্দুল্লাহ, আমার মেহমান। এ্যাকসিডেন্ট করেছিল। হাসপাতাল থেকে আমি নিয়ে এসেছি’।
আহমদ মুসা তাদের সাথে সম্ভাষণ বিনিময় করে বলল, ‘এ ক’দিন সান্তা আনার কাছে আপনাদের নাম অনেক শুনেছি।
‘ধন্যবাদ’। সান্তা আনার আব্বা আম্মা দু’জনেই বলে উঠল।
‘হঠাৎ করে এখানে আসার সিদ্ধান্ত কি ব্যাপার বলতো। কেস ফেসের কোন ব্যাপার নাকি?’ জিজ্ঞেস করল রসওয়েল।
‘জি আব্বা’, বলে একটু দ্বিধান্বিত চোখে একবার তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
বুঝতে পেরে রসওয়েল বলল, ‘আহমদ আব্দুল্লাহ সব কথা জানে। কোন অসুবিধা নেই, বলে ফেল’।
‘আজ ভোরে পুলিশ আমাকে টেলিফোন করেছিল। বলেছে, আমাদের তরফ থেকে আর একটা কেস হওয়া উচিত ঘানেম পরিবারের বিরুদ্ধে যে, তারা সান্তা আনাকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করেছে। তাকে সাক্ষী বানাতে চায় এবং জিমি পাবলো হত্যার কেসে যাতে আমরা না লড়ি সেজন্যে আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়। জিমি পাবলো কেন সান্তা আনার জীবনও বিপন্ন। এই কথা গত রাতে আমাকে জনি লেভেনের বাবাও বলেছে’। বলল আরিসকো পাবলো, সান্তা আনার আব্বা।
‘তার মানে জনিরাই পুলিশকে দিয়ে ওটা করিয়েছে’। বলল বৃদ্ধ রসওয়েল।
‘আমারও তাই মনে হয় আব্বা’। বলল আরিসকো পাবলো।
‘আমাদের কেস নিয়ে ওদের এত মাথা ব্যথা কেন বলতে পারো?’ রসওয়েল বলল ক্ষুব্ধ কন্ঠে।
‘শ্বেতাংগদের বিরুদ্ধে ওদের ক্রোধটা যেন বেশী’।
‘কিন্তু তুমি যে কেসের কথা বললে, তাতে ঘানেম পরিবারের কতটা ক্ষতি হবে? এই অভিযোগ কোর্টে প্রমান করা যাবে না। ওরা নিশ্চিত নির্দোষ প্রমাণিত হবে। মাঝখানে কি হবে? আমাদের জিমি গেছে, এবার আমাদের সান্তা আনারও মান ইজ্জত সব যাবে। আমরা আমাদের মেয়েকে নিয়ে এসব খেলা খেলতে চাই না। কিন্তু ওরা এটাই চায়’।
‘কিন্তু কেন চাইবে?’ আমরা শ্বেতাংগদের বিরুদ্ধে এক সাথে লড়ছি’।
বৃদ্ধ রসওয়েল তৎক্ষনাৎ কোন জবাব দিল না।
‘মাফ করবেন, বিষয়টা আপনাদের পারিবারিক। আমি কি বলতে পারি কিছু?’
আরিসকো পাবলো এবং মিসেস আরিসকো দু’জনেই তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার সরল নির্দেোষ চেহারা এবং তার কথার আন্তরিকতা তাদের হৃদয় যেন স্পর্শ করল। অপরিচিত হবার পরেও আহমদ মুসাকে যেন অনেক চেনা বলে মনে হল। বলল আরিসকো পাবলো, ‘না,অসুবিধা নেই। ঠিক আছে, বলুন’।
‘আমে যে কথাটা বলব, তা বলার আগেই আমি একটা প্রশ্নের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সান ঘানেম জনি লেভেনকেও হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, এ কেস তারা কেন করে না? এটা প্রমাণ করার জন্যে যথেষ্ট সাক্ষী তারা জোগাড় করতে পারবে। শ্বেতাংগ বিদ্বেষই যদি মূল কারণ হবে। এ ধরেণের কেস তারা সাজাতেই বা যায়নি কেন?’
মুহূর্তের জন্যে একটু থেমে আহমদ মুসা অবার শুরু করল, আমি জনাব রসওয়েলের সাথে একমত। তারা আপনাদের, মানে পাবলোদের একটা শীর্ষস্থানীয় পরিবারকে লাঞ্ছিত ও ছোট করতে চায়। রেড ইন্ডিয়ানদের একটা প্রাচীন মানসিকতা হলো, তারা কোন বংশ, গোত্র, বা পারিবারকে ছোট করতে বা তার উপর প্রতিশোধ নিতে চা্ইলে তাদের মেয়েদের লাঞ্ছিত করতো। জনাব রসওয়েল ঠিকই বলেছেন, ওরাও এটা চায়’।
‘কিন্তু কেন?’ সেটাইতো আমাদের প্রশ্ন।
‘বলছি’।
বলে আহমদ মুসা একটু থামল। একটু ভাবল। যেন গুছিয়ে নিল নিজেকে। তারপর বলতে শুরু করল, ‘কিছুদিন আমি কাহোকিয়াতে ছিলাম প্রফেসর আরপাহো আরিকারা’র অতিথি হয়ে। অমি…..’
আহমদ মুসা আগাতে পারল না। তাকে বাধা দিয়ে সান্তা আনার দাদু ও আব্বা দু’জনেই প্রায় একসাথে বলে উঠল, ‘আপনি কাহোকিয়া গেছেন? আপনি প্রফেসর আরাপাহো আরিকারাকে চেনেন?’
‘হ্যাঁ, কাহোকিয়াতে বেশ কিছুদিন ছিলাম। প্রফেসর আরাপাহো, সান ওয়াকার, প্রত্যেকের সাথেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল’।
‘সান ওয়াকারকেও চেনেন আপনি?’ জিজ্ঞেস করল সান্তা আনা।
‘হ্যাঁ বোন, তার দুঃসময়ে আমরা এক সাথে কিছুদিন ছিলাম। তোমরা চেন তাকে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাকে চিনব না আমরা? সেতো আমাদের গৌরব’। সান্তা আনা বলল।
বৃদ্ধ রসওয়েল, আরিসকো পাবলো এবং সান্তা আনা সকলের চোখেই বিষ্ময়।
কিছু বলতে যাচ্ছিল রসওয়েল। কিন্তু আহমদ মুসাকে কথা শুরু করতে দেখে থেমে গেল।
আহমদ মুসা বলল, ‘প্রফেসর আরাপাহোর ‘রেড ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’-এ আমি বেশ সময় কাটিয়েছি। অনেক কথা, অনেক ইতিহাস শুনেছি আমি প্রফেসর আরাপাহোর কাছে। আমি শুনেছি তাঁর কাছে, জনি ইন্ডিয়ানদের সাথে পাবলো ইন্ডিয়ানদের পুরাতন একটা বিরোধের কথা। এই বিরোধের সাথে ষোড়শ শতকে আমেরিকার এ অঞ্চলের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি ইস্তেভান এর নাম জড়িত। সম্ভবতঃ স্পেনীয়ানদের একজন হয়ে তিনি এসছিলেন আমরিকায়। আবার মুসলিম এই লোকটি তাঁর মেধা, দক্ষতা ও ব্যবহার গুনে রেড ইন্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়-এশীয়দের মধ্যে এক সেতুবন্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। রেড ইন্ডিয়ান ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তিনি এতটাই পরিচিত ছিলেন যে, রেড ইন্ডিয়ানরা তাঁকে তাদেরই একজন মনে করতো। বিশেষ করে টার্কো-মুসলিম কালচারের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ‘আনাসাজী’ ইন্ডিয়ানদের উত্তরসূরী পাবলো ইন্ডিয়ানরা ইস্তেভান’কে তাদের কম্যুনিটির একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে। ‘ইস্তেভান’ বিয়ে করে একজন পাবলো সর্দারের মেয়েকে। পাবলো ইন্ডিয়ানদের সাথে ‘ইস্তেভানে’র এই মিশে যাওয়াকে জনি ইন্ডিয়ানরা ঈর্ষার সাথে দেখতে থাকে। এর বড় কারণ ছিল অর্থনৈতিক। ইস্তেভান আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের সেতুবন্ধ হিসেবে ছিলেন ব্যবসা বানিজ্যসহ অন্যান্য আর্থিক সংযোগের একটা উৎস। ইস্তেভান পাবলো ইন্ডিয়ানদের একজন সদস্য হয়ে পড়ায় জনি ইন্ডিয়ানরা নিশ্চিত ধরে নিল পাবলোরা আর্থিক সুযোগ সুবিধা একচেটিয়াভাবে পেয়ে যাবে। এই ধারণা থেকেই জনি ইন্ডিয়ানরা ধীরে ধীরে ইস্তেভানের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইস্তেভান এটা জানতো না। ইস্তেভানের একটা হবি ছিল ভাল কাজের পক্ষে ও মন্দ কাজের বিপক্ষে প্রচার করে বেড়ানো। তাই সে তার ব্যবসায় বানিজ্যের পাশাপাশি মানুষকে ভাল ও মন্দ বিষয়ে শিক্ষাদান করে বেড়াত। সব ইন্ডিয়ান অঞ্চলে তার যাতায়াত ছিল অবাধ। এভাবেই সে যায় জনি ইন্ডিয়ানদের অঞ্চলে। সুযোগ পেয়ে জনি ইন্ডিয়ানরা তাকে একদিন খুন করে। এ ঘটনা ঘটে ১৫৩৯ খৃষ্টাব্দে। এ নিয়ে জনি ইন্ডিয়ানদের সাথে পাবলো ইন্ডিয়ানদের প্রচন্ড বিরোধ বাধে এবং যুদ্ধও সংঘটিত হয়। যুদ্ধে জনি ইন্ডিয়ান সর্দার ও প্রধান পুরোহিত মারা যায়’।
থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই বৃদ্ধ রসওয়েল বলল দ্রুতকন্ঠে, ‘নামটা কি ইস্তেভান না ‘ইস্তেপোনা?’ মনে পড়ছে না আমার, তখন স্কুলের ছাত্র। দাদুর সাথে গিয়েছিলাম ‘বান্দেলিয়ার মনুমেন্ট’ দেখার জন্যে। এই মনুমেন্টের সাথে তখন ছিল একটা যাদুঘর। এই যাদুঘরও দেখেছিলাম। এই যাদুঘরেই আমি দেখেছিলাম বহু রঙা আবক্ষ একটা ড্রইংচিত্র। দাদু বলেছিলেন, ‘এই চিত্র ভালো করে দেখ, ইনি আমাদের একজন পূর্বপরুষ। ইউরোপীয় হলেও একজন সর্দারজাদীকে বিয়ে করে ইন্ডিয়ান হয়ে গিয়েছিলেন। এঁদেরই আমরা উত্তর পুরুষ। দাদু তার নাম বলেছিলেন ইস্তেপোনা। আমি দাদুকে বলেছিলাম, ‘আমাদের পূর্ব পুরুষ হলে ছবিটা এখানে কেন?’ দাদু বলেছিলেন, ছবিটা আমাদেরই কোন এক পূর্ব পুরুষ আঁকিয়ে নিয়েছিলেন এবং আমাদের বাড়িতেই ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ নিয়ে এসেছেন। দেখ ছবির নিচে লেখা আছে আমাদের পরিবার মিউজিয়ামকে ওটা দান করেছে। দেখলাম, সত্যি তাই লেখা আছে’।
থামলো বৃদ্ধ রসওয়েল সম্ভবত দম নেবার জন্য। সে থামতেই আরিসকো পাবলো, বৃদ্ধের ছেলে বলে উঠল, ‘আমার দাদু আমাকেও দেখিয়েছিলেন ছবিটা’।
ছবিটা বান্দেলিয়ার যাদুঘরে এখনো কি আছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘যাদুঘরই এখন সেখানে নেই। যাদুঘরটাকে লস আলামোসে নিয়ে লস আলামোস যাদুঘরের সাথে একিভূত করা হয়েছে। কিন্তু ছবিটা সেখানেও নেই। ছবিটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওয়াশিংটনের কেন্দ্রীয় যাদুঘরে ইউরোপ-ইন্ডিয়ান কানেকশনের একটা দলিল হিসেবে’। বলল বৃদ্ধ রসওয়েল। থামল সে।
বৃদ্ধ থেমেই আবার শুরু করল, ‘নামের ব্যাপারে বলছিলাম আহমদ আব্দুল্লাহ’।
‘জি হ্যাঁ, বলছি’, বলে আহমদ মুসা শুরু করল, ‘আসলে ইস্তেভান হলো প্রকৃত নামের অপভ্রংশ বা আমেরিকান ভাঙন, আর ইস্তেপোনা হলো তাঁর প্রকৃত নামের একটা অংশ। মূলতঃ তাঁর নাম ছিল ইসমাইল, আর জম্মস্থান ছিল ইস্তেপোনা। ইস্তেপোনা দক্ষিণ স্পেনের একটা শহরের নাম। ‘ব্রোলটার’ থেকে মাত্র ৩০ মাইল উত্তর পূর্বে জিব্রালটার সাগরের তীরে অবস্থিত শহরটা। মূল নাম এবং জম্মস্থানের নাম মিলিয়ে তার নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘ইসমাইল ইস্তেপোনা’।
‘আপনি বলছেন তিনি আরব মুসলমান?’ বলল আরিসকো পাবলো।
‘আমি বলেছি প্রফেসর আরাপাহোর কাছে শুনে’।
‘একই কথা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেহে আরব মুসলিম ও ইন্ডিয়ান দুই রক্তই প্রবাহিত!’
‘এটা গৌরবের কথা আরিসকো। আরব মুসলিম পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ বিজেতা জাতি এবং আজ তারা অর্থ বিত্তে দুনিয়ার সেরা’।
‘ধন্যবাদ আব্বা’।
সান্তা আনা আলোচনায় অংশ নেয়নি। কিন্তু চোখ দু’টি তার আনন্দে নাচছে।
‘কিন্তু জনাব আহমদ আব্দুল্লাহ, জনিদের সাথে পাবলোদের যে যুদ্ধের কথা বললেন, তা আমরা দাদুর কাছে শুনিনি এবং ইন্ডিয়ান সাহিত্যে তা আমরা পড়িনি’।
‘কাহিনী আমার শেষ হয়নি জনাব’। আহমদ মুসা বলল।
‘বলুন মিঃ আব্দুল্লাহ’।
আহমদ মুসা শুরু করল। ‘যুদ্ধে জনিদের সরদার ও প্রধান পুরোহিত মারা যাওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং নতুন যুদ্ধের জন্যে সাহায্য যোগাড়ে তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ইন্ডিয়ানদের মধ্যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ বাধার আশংকা দেখা দেয়। এই অবস্থায় আমেরিকান ইন্ডিয়ান সর্দাররা বৈঠকে বসে এবং উভয় পক্ষকে আপোশে পৌঁছতে বাধ্য করে। ঠিক হয় যে, ইসমাঈল ইস্তেপোনা একজন বিদেশী। সে জনিদের হাতে খুন হওয়ায় একজন বিদেশী খুন হয়েছে, কোন ইন্ডিয়ান খুন হয়নি। সুতরাং তার পক্ষ থেকে পাবলো ইন্ডিয়ানরা যে যুদ্ধ করেছে সেটা অন্যায় হয়েছে। আর অন্যদিকে ইসমাইল ইস্তেপোনা বিদেশী হলেও পাবলোদের মিত্র ও আত্মীয়, তাই জনি ইন্ডিয়ানরা তাকে খুন করে অন্যায় করেছে। সুতরাং তাদের যুদ্ধটাও অন্যায়ের পক্ষে হয়েছে। তাই তাদেরকে তাদের সর্দার ও প্রধান পুরোহিত নিহত হবার প্রতিশোধের দাবী ছেড়ে দিতে হবে। অতঃপর উভয়পক্ষ এই যুদ্ধের কথা ভূলে যাবে। রেড ইন্ডিয়ান কোন আঞ্চলিক বা জাতীয় সাহিত্যে এই যুদ্ধের কথা লিখা হবে না এবং ছাত্রদের পড়ানো বা জানানোও হবে না। এই সাথে পাবলোদেরকে ইসমাইল ইস্তেপোনা’র কাহিনীও ভূলে যেতে হবে, তার হত্যা নিয়ে প্রচার বা কোন লেখালেখি করা চলবে না। এই সিদ্ধান্ত পাবলো ও জনি ইন্ডিয়ান উভয় পক্ষই মেনে নেয়। কিন্তু প্রফেসর আরাপাহো বলেছিল, জনি ইন্ডিয়ানরা সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বটে, কিন্তু তাদের সর্দার ও প্রধান পুরোহিতকে পাবলোরা যে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে, সে কথা ভূলে যায়নি। বংশ পরম্পরায় এই প্রতিশোধের আগুনকে তারা জিইয়ে রেখেছে’।
‘কিন্তু জনিদের এই মনোভাব সম্পর্কে প্রফেসর আরাপাহোর কাছে কি দলিল আছে?’ বলল আরিসকো পাবলো।
‘কত কি দলিল আছে আমি জানিনা। কিন্তু ইন্ডিয়ানদের মধ্যে একবার প্রতিশোধের আগুন জ্বললে তা যে বংশ পরম্পরায় সংক্রমিত হতে থাকে তার উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রফেসর আরাপাহো আমাকে জনিদের একটা গোপন দলিল দেখিয়েছিলেন যাতে অনেক কিছুর মধ্যে এ কথা আমি লেখা দেখেছি, ‘আমাদের নিহত সর্দারের ও প্রধান পুরোহিতের আত্মা এখনো শান্তি ও স্বস্তি পায়নি। পাবলোদের আমরা যতুটুকু লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে পারি, ততটুকু আমরা শান্তি পাব ও স্বস্তি লাভ করবে তাঁর আত্মা’। থামল আহমদ মুসা।
বৃদ্ধ রসওয়েল ও আরিসকো বিষ্ময়ে নির্বাক। তারা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। এক অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য কথা যেন তার কাছে থেকে তারা শুনছে। কিন্তু সান্তা আনার মুখ হয়েছে প্রসন্ন। তাতে একটা বিজয়ের আনন্দের ছাপ।
‘ধন্যবাদ আহমদ আব্দুল্লাহ’। অনেকক্ষণ পর বলে উঠল আরিসকো পাবলো।
মুহূর্তের জন্যে থেমে আবার সে বলল, ‘প্রফেসর আরাপাহোকে আমরা অবিশ্বাস করতে পারি না। তাছাড়া একথা আমার এখন মনে হচ্ছে, নানা রকম কেসে আমাদের জড়িয়ে আমাদের তারা হেনস্তা করতে চায়, তার সাথে আমাদের মেয়েকেও জনসমক্ষে হেয় ও লাঞ্ছিত করতে চায়। নতুন কেসের প্রস্তাব তারই একটা প্রমাণ’।
আরিসকো পাবলো থামতেই রসওয়েল বলল, ‘আরেকটা কথা জান না, জনি লেভেনের খারাপ দৃষ্টি আছে সান্তা আনার উপর’।
চমকে উঠল আরিসকো পাবলো। চোখ মুখ তার লাল হয়ে উঠল। কিছু ভাবল সে। কিছুক্ষণ পর সে বলল, ‘তাই হবে আব্বা, ওরা কি প্রস্তাব দিয়েছিল জান। সান্তা আনা নিরাপদ নয়। ঘানেম পরিবার মানে শ্বেতাংগরা যে কোন মূল্যে সান্তা আনাকে হাত করতে চাইবে। ওকে কিছু দিনের জন্য জনিদের এলাকায় পাঠিয়ে দাও। জনি লেভেন তো তার বন্ধুই। তাদের এ প্রস্তাবের পরই আমি সান্তা আনাকে আপনার সাথে জিমেস পাবলোতে পাঠিয়েছিলাম’।
‘শয়তানদের সাহস দেখ’। বলল রসওয়েল।
আমরা জিমির মৃত্যুতে একেবারে মুষড়ে পড়েছিলাম। তারই সুযোগ নেবার চেষ্টা করেছিল তারা । ঈশ্বর আমাদের বাঁচিয়েছেন’।
বলে আহমদ মুসার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, একটা বিপর্যয় থেকে আমাদের পরিবারকে আপনি বাঁচালেন। আপনাকে কথা দিচ্ছি সান ঘানেমের কেসে আমরা আর লড়ব না। সান্তা আনাকে সাক্ষী দিতে আমরা আর বাধা দেব না’।
‘ধন্যবাদ বেটা। আরেকটা সত্য তোমার সামনে এসেছে নিশ্চয়, জনিরা আমাদের যতটা শত্রু ঘানেম পরিবার কিন্তু আমাদের ততটা মিত্র হতে পারে। কারণ আমাদের পূর্ব পুরুষ ও ঘানেমদের পুর্ব পূরুষ মিত্র ছিল’।
‘তাও পরিষ্কার হয়েছে আব্বা। ঘানেম পরিবার মুসলমান, আর আমাদের বংশ ধারায় মুসলিম ইসমাইল ইস্তেপোনার রক্ত বহমান’। বলল আরিসকো পাবলো।
আরিসকো পাবলো থামতেই বৃদ্ধ রসওয়েল তাকাল সান্তা আনার দিকে কিছু বলার জন্যে। কিন্তু দেখল, সান্তা আনার দু’চোখ থেকে তার দু’গন্ড বেয়ে নিরব অশ্রুর দুই ধারা বইছে। রসওয়েল বলে উঠল, ‘আনন্দের সময় আমার বোন কাঁদছে কেন?’ মুখে হাসি রসওয়েলের।
‘না আমি কাঁদিনি দাদু’, বলে দু’হাতে মুখ ঢাকল সান্তা আনা।
আহমদ মুসা বলল, ‘দুঃখের আঁধারে উদিত আনন্দের সোনালী সূর্য দুঃখের বরফ গলিয়ে আনন্দ্রাশ্রুতে পরিণত হয়েছে। সান্তা আনার সে বরফ গলতে দিন’।
বলে আহমদ মুসা বৃদ্ধ রসওয়েলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি আপনাদের পূর্ব পুরুষ ও ঘানেমদের পূর্ব পুরুষের মৈত্রীর কথা বললেন, সেটা কি?’
‘হ্যাঁ, সেটাও একটা বড় খবর। কিছুক্ষণ আগে আমি তোমাদের বান্দেলিয়া যাদুঘরের কথা বলেছি, যে যাদুঘরে আমি গিয়েছিলাম দাদুর সাথে। ঐ যাদুঘরে আমাদের পূর্ব পুরষ ইস্তেপোনা ছাড়াও আরেক জনের ড্রইং চিত্র আমি দেখেছিলাম। তাঁর নাম ‘আব