২৯. আমেরিকায় আরেক যুদ্ধ

চ্যাপ্টার

এফ.বি.আই-এর বিমানটি ল্যান্ড করেছে ওয়াশিংটন এয়ারপোর্টের ননকমার্শিয়াল বিশেষ টারমাকটিতে।
বিমান থেকে নেমে এল চারজন, জর্জ আব্রাহাম, অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার, জেনারেল শেরউড এবং আহমদ মুসা।
সবশেষে নেমেছে আহমদ মুসা।
প্লেনের সিঁড়ির প্রায় মুখেই দাঁড়িয়েছিল পাশাপাশি তিনটি গাড়ি। একটি সেনাবাহিনীর গাড়ি। নিতে এসেছে জেনারেল শেরউডকে। আর দুটি গাড়ির একটি এফ.বি.আই-এর, অন্যটি সি.আই.এ’র। এফ.বি.আই ও সি.আই.এ’র গাড়ির সামনে দুই সংস্থার দুজন উর্ধ্বতন অফিসার দাঁড়িয়েছিল আগে থেকেই।
প্লেনের সিঁড়ি থেকে টারমাকে নামতেই এফ.বি.আই-এর অফিসার এগিয়ে এল জর্জ আব্রাহামের দিকে এবং সি.আই.এ’র অফিসার অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের কাছে। সামরিক কায়দায় স্যালুট করে তারা দুজন দুজনের হাতে দুটি চিঠি তুলে দিল।
জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার দুজনেই চিঠির উপর চোখ বুলাল। সংগে সংগে তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়। পরক্ষণেই বিমর্ষতা এসে গ্রাস করল তাদের মুখ।
জেনারেল শেরউড ও আহমদ মুসা তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল। জেনারেল কিছু বলতে যাচ্ছিল। সে সময় সেনাবাহিনীর গাড়িটা এসে তার সামনে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে একজন অফিসার নেমে স্যালুট করে বলল, ‘আমরা প্রস্তুত স্যার।’
জেনারেল শেরউড আরেকবার জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ইচ্ছা চেপে গিয়ে গাড়িতে উঠল।
সংগে সংগে গাড়িটা স্টার্ট দিল।
গাড়িটা শ’দেড়েক গজ এগুতেই আরেকটা গাড়ি তীর বেগে এসে একেবারে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের হাতে চিঠি দেয়া ও তাদের চেহারা দেখে বড় একটা কিছু ঘটা সম্পর্কে আশংকিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছু বলার ব্যাপারে দ্বিধা করছিল।
এ সময় তীব্র গতির গাড়ি একেবারে পাশে এসে হার্ড ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ায় চমকে উঠে সেদিকে তাকাল। দেখল ড্রাইভিং সিটে বেঞ্জামিন বেকনকে। চোখে-মুখে উত্তেজনা বেঞ্জামিনের।
‘কুইক।’ মাত্র এই শব্দটাই উচ্চারণ করল বেঞ্জামিন বেকন।
গাড়ির স্টার্ট সে বন্ধ করেনি।
এতেই আহমদ মুসা অনেক কিছু বুঝে ফেলল। সে দ্রুত উঠে বসল বেঞ্জামিনের ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে।
ততক্ষণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে এফ.বি.আই ও সি.আই.’’র অফিসার দুজন। তারা চিৎকার করে উঠল, ‘আহমদ মুসা তুমি মুভ করতে পার না। তুমি আন্ডার এ্যারেস্ট।’
কিন্তু গাড়ি তখন তীব্র গতিতে ব্যাকগিয়ার করে মুখ ঘুরিয়ে তীর বেগে ছুটতে আরম্ভ করেছে।
এফ.বি.আই ও সি.আই.এ’র অফিসার পকেট থেকে রিভলভার বের করে গাড়ি লক্ষ্যে গুলী করতে শুরু করেছে।
গাড়ি দুটি থেকে আরও চারজন লাফ দিয়ে নেমেছে। তারাও যোগ দিল গুলী বর্ষণে।
কিন্তু গাড়ি তখন তাদের নাগালের বাইরে।
বেঞ্জামিন বেকনের মাথায় ফেল্ট হ্যাট। কপালের শেষটা পর্যন্ত নামানো। আহমদ মুসার সাথে কথা বলার সময় মাত্র মুহূর্তের জন্যে হ্যাটটা একটু উপরে তুলেছিল।
‘আপনি ঢুকলেন কি করে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন, ছুটিতে থাকলেও আইডেনটিটি কার্ড আমাদের কাছে থাকে।’
‘কি ঘটনা বলুন তো, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘বলব। দেখুন সামনে। বের হওয়া নিশ্চয় সহজ হচ্ছে না।’ সামনের দিকে চিন্তিত দৃষ্টি মেলে বলল বেঞ্জামিন বেকন।
আহমদ মুসা সামনে টারমাকের প্রান্তে একটু দূরে দুটি লাল আলো জ্বলতে দেখলো।
‘লাল আলো জ্বলছে ওটা কি গেট?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যা। একটা বেরুবার গেট, আরেকটা প্রবেশের।’
‘গেট কিসের তৈরী?’
‘অসুবিধা হবে না। দুটিই দুভাগে বিভক্ত গ্রীল গেট। এখন নতুন কোন ব্যারিয়ার না দিলেই হয়। তবে আমি বেরুব প্রবেশের গেট দিয়ে, নিশ্চয় ওদিকে ওদের নজর থাকবে কম।’
‘ঠিক বেঞ্জামিন। আমার বিশ্বাস সে সময় ওরা পাবে না। বিশেষ করে প্রবেশের গেটের কথা ওরা নাও ভাবতে পারে।’
আহমদ মুসার কথাই সত্য হলো।
গ্রীলের গেট বন্ধ। দেখা গেল, গেটের বাইরে ডান দিক থেকে একটা ২০ টনি বাঘা ট্রাক সবে এগিয়ে আসছে গেটের দিকে। ওটা দিয়ে গেট ব্লক করা ওদের টার্গেট। কিন্তু তার আগেই বেঞ্জামিন বেকনের গাড়ি প্রায় ১০০ মাইল বেগে আঘাত করল গ্রীলের গেটটিতে।
মুহূর্তে তালা ভেঙে গেটের দুই পাল্লা দুদিকে ছিটকে পড়ে গেল।
গাড়িটাও ছিটকে পড়ল বাইরে।
বেঞ্জামিন বেকন গাড়ি সামলে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
পেছনে একবার তাকিয়ে বেঞ্জামিন বেকন বলল, ‘দুটো গাড়িই পিছু নিয়েছে।’
‘এরপর আপনার পরিকল্পনা কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা পিছু নেবে আমার পরিকল্পনায় সেটা আছে। ওদের কাঁচকলা দেখাবার ব্যবস্থাও রেখেছি।’
বলে গাড়ির স্পীড আরও বাড়িয়ে দিল বেঞ্জামিন বেকন।
বিশেষ এ ল্যান্ডিং টারমাকে প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট সম্পূর্ণ আলাদা। রাস্তাও আলাদা। দুই রাস্তার মাঝখানে সমান্তরাল দুফুটের মত উঁচু দেয়ালের মধ্যে দিয়ে প্রলম্বিত গাছ-পালার সারি।
ছুটছিল বেঞ্জামিন বেকনের গাড়ি।
তার পেছনে ছুটে আসছে পেছনের দুটি গাড়ি।
এক জায়গায় রাস্তার প্রান্তের দেয়াল ঘেঁষে গাড়ির হার্ড ব্রেক কষল বেঞ্জামিন বেকন। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, ‘মিঃ আহমদ মুসা আসুন, কুইক।’
বেঞ্জামিন বেকন লাফ দিয়ে দেয়াল পার হয়ে গাছ-পালা ঠেলে লাফ দিয়ে ওপারের রাস্তায় গিয়ে পড়ল। তার পেছনে আহমদ মুসাও। ওখানে রাস্তার ধার ঘেঁষে একটা সাদা টয়েটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। লাফ দিয়ে ড্রাইভিং সীটে উঠে বসল বেঞ্জামিন বেকন।
আহমদ মুসাও উঠে বসল তার পাশে।
সংগে সংগেই গাড়ি ছুটতে আরম্ভ করল।
আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়েছিল। দেখল, ওরা চার পাঁচজন এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পেছনে ফেলে আসা জায়গায়। তাকিয়ে আছে তাদের গাড়ির দিকে। কোন গাড়ি নেই তাদেরকে অনুসরণ করার।
তাদের অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে হাসি পেল আহমদ মুসার। দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল সামনে। বলল, ‘মিঃ বেঞ্জামিন বেকন সত্যিই আপনে ওদের কাঁচকলা দেখিয়েছেন। ওরা গাড়ি পায়নি। মনে হলো, আমাদের গাড়ির নাম্বারটাও ওরা নিতে পারেনি।’
‘কেমন করে বুঝলেন?’
‘বুঝলাম, কারণ ওরা মোবাইল বের করেনি। ওদের প্রথম কাজ ছিল আমাদের অনুসরণ করা। আর দ্বিতীয় কাজ ছিল, আমাদের গাড়ির নাম্বার পুলিশদের জানিয়ে দেয়া।’
‘ধন্যবাদ। ঠিক বলেছেন। ওরা গাড়ির নাম্বার দেখতে না পাওয়ার একটা কারণ পেছনের লাইট আমি নিভিয়ে দিয়েছিলাম।’
‘কিন্তু এরপরেও ওরা বসে থাকবে না। গাড়ির রঙ ও ধরন তারা দেখেছে। এটুকুও পুলিশের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।’ বলল আহমদ মুসা।
‘দেখবেন, আবারও কাঁচকলা দেখাব।’
গাড়ি বেরিয়ে এসেছে এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে।
সামনেই একটা রোড জংশন।
এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে বিভিন্ন দিকে এগুবার এটাই একমাত্র নিস্ক্রমন দরজা।
রোড জংশনে পৌঁছার আগেই একটা ফিলিং স্টেশন। তার পাশেই একটা পার্কিং হাউজ। অনেকে ভীর এড়াবার জন্যে এখানে গাড়ি রেখে এয়ারপোর্টে যায়।
বেঞ্জামিন বেকনের গাড়ি শা করে সে পার্কিং হাউজে প্রবেশ করে একটা আমেরিকান কালো ৬ সিটের ফোর্ড জীপের পাশে পার্ক করল এবং দ্রুত আহমদ মুসাকে নামতে বলে নিজে নেমে পড়ল।
দুজনেই দ্রুত গিয়ে উঠল সে কালো ফোর্ড জীপটায়। ড্রাইভিং সিটে বেঞ্জামিন বেকন।
গাড়ি পার্কিং হাউজ থেকে বেরিয়ে এসে ছুটতে শুরু করল রোড জংশনের দিকে।
‘দেখুন, এয়ারপোর্ট রোড থেকে জংশন রোডে প্রবেশকারী সব সাদা গাড়িকেই থামাচ্ছে পুলিশ।’ বলল বেঞ্জামিন সামনের দিকে স্থির চোখ রেখে।
‘আপনাদের এফ.বি.আই ও পুলিশের প্রশংসা করতে হয়। সত্যিই সময়ের সাথে ওরা পাল্লা দিয়ে চলে। এখানে সামান্য সুযোগকেও ওরা কাজে লাগাতে চেয়েছে।’
‘এটা ওদের প্যাট্রিওটিজম। কিন্তু ইহুদীবাদীরা আজ এই প্যাট্রিওটিজমকে ডিক্টেট করছে।’ বেঞ্জামিন বেকন বলল।
রোড জংশনে প্রবেশ করল গাড়ি।
পুলিশের নাকের ডগার উপর দিয়ে চলল বেঞ্জামিন বেকনের গাড়ি। তারা চোখ তুলেও দেখলো না।
গাড়ি এসে পরলো এক্সপ্রেস এভেনিউতে। সোয়াশ’ কিলোমিটার বেগে ছুটতে লাগলো গাড়ি।
‘ধন্যবাদ বেঞ্জামিন বেকন, সবগুলো বিপদ আপনি ডিঙিয়ে এসেছেন সুন্দরভাবে।’ আহমদ মুসা গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিতে দিতে বলল।
‘বিপদ ডিঙাতে পারলাম কই? বিপদ তো আরও গভীর হয়েছে।’ বেঞ্জামিন বেকনের গলায় উদ্বেগ।
আহমদ মুসা আবার সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘কি ব্যাপার বলুন। ঘটনা কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি। আমাকে এভাবে ছোঁ মেরে নিয়ে এলেন। মিঃ জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে কি যেন চিঠি পড়ে মুষরে পড়তে দেখলাম। কি ঘটেছে?’ আহমদ মুসার কন্ঠেও উদ্বেগ।
‘জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের কি চিঠি পেয়েছেন আমি জানি না। তবে তাঁরা সাময়িক বরখাস্ত পত্র পাবার কথা।’ বলল বেঞ্জামিন বেকন।
‘বরখাস্ত পত্র?’ আহমদ মুসার কন্ঠ আর্তনাদের মত শোনাল। সে যেন আকাশ থেকে পড়ল।
‘জি জনাব, বরখাস্ত পত্র। সেই সাথে গাড়ির সামনে দাঁড়ানো এফ.বি.আই অফিসারের কাছে ছিল আপনাকে গ্রেফতারের আদেশ পত্র।’
‘আমাকে গ্রেফতারের আদেশ পত্রের অর্থ বুঝলাম। কিন্তু ওদের বরখাস্তের কথাটা কি ঠিক?’
‘বললাম তো চিঠিতে কি আছে জানি না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ওদের সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা জানি।’
‘কেন এই নির্দেশ? অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে আমার কাছে।’
‘অবিশ্বাস্য হবে কেন? ইহুদীবাদীদের অসাধ্য কিছুই নেই। তাদের লম্বা হাত প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত সহজেই পৌঁছেছে এবং মুহূর্তেই বাদী আসামী হয়ে পড়েছে, আসামী হয়েছে বাদী।’
‘আর একটু বিস্তারিত বলুন। এমন অসম্ভব কিভাবে সম্ভব হতে পারে? ইহুদীবাদীদের জঘন্য ষড়যন্ত্র হাতে-নাতে ধরা পড়েছে। যারা এটা ধরল তাদের জন্যে পুরস্কারের বদলে কারাগার বরাদ্দ হলো কি করে?’
‘বিস্তারিত সব আমিও জানি না। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের পি,এস রবিন নিক্সন আমাদের ‘ফ্রি আমেরিকা’র সদস্য। এক ঘন্টা আগে আমাকে সে টেলিফোনে জানিয়েছে এই খবর যে, আহমদ মুসাকে গ্রেফতার এবং জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন। সে আমাকে আরও জানিয়েছে, সব ঘটনার এমন উল্টো ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যাতে আহমদ মুসা প্রধান ষড়যন্ত্রকারী এবং জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার তার সহযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। রবিন নিক্সন বলেছে নাটের গুরু হলো প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি জেনারেল শ্যারনের সাথে যোগসাজশ করেছেন এবং পরে প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়ে স্বমতে আনতে পেরেছেন। রবিন আমার কাছে একটা ভিডিও টেপ পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন ভিডিও টেপ দেখলেই সব কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু বেঞ্জামিন বেকন, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, একটা জলজ্যান্ত সত্যকে কিভাবে মিথ্যায় পরিণত করা সম্ভব?’ আহমদ মুসার কন্ঠে তখনও অপার বিস্ময়।
‘চলুন, ভিডিও টেপ দেখবেন।’
‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’
‘সারা জেফারসনের বাড়িতে ভার্জিনিয়ায়। ওখানেই আপনি আপাতত লুকাবেন।’
মুখটা আনন্দিত হয়ে উঠল আহমদ মুসার। বলল, ‘সারা জেফারসন কি ভার্জিনিয়ায়?’
‘না। উনি লস আলামোসে। তবে তিনি উইকএন্ডে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবেন।’
‘উনি নেই, ওখানে যাব কেন? এটা কি ঠিক হবে?’
‘আমাকে উনি এই নির্দেশই দিয়েছেন। আপনি তার ওখানে থাকবেন তিনি না আসা পর্যন্ত।’
‘নির্দেশ দিয়েছেন? আপনার চেয়ে বয়সে ছোট হবেন তিনি, নির্দেশ দেবেন কেন?’
একটু চমকে উঠল বেঞ্জামিন বেকন। বলল হেসে উঠে, ‘ও কিছু না, কথার কথা বলেছি। একই ‘ফ্রি আমেরিকা’র সদস্য তো আমরা।’ বেঞ্জামিনের ঠোঁটে হাসি এলেও তার চোখে মুখে অপ্রস্তুত ভাব।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। বলল গম্ভীর কন্ঠেই, ‘তাহলে কি সারা জেফারসন ‘ফ্রি আমেরিকা’র নেত্রী?’
চমকে উঠল বেঞ্জামিন বেকন। স্টেয়ারিং হুইলে রাখা তার হাত দুটিও কেঁপে উঠেছিল। সেই সাথে মুখটাও তার মলিন হয়ে উঠেছিল।
আহমদ মুসা সেদিকে তাকিয়ে একটা হাত বেঞ্জামিন বেকনের কাঁধে রেখে বলল, ‘আমি জানি মিঃ বেঞ্জামিন বেকন, এ তথ্যটা অত্যন্ত গোপনীয়। আমার কাছেও গোপন থাকবে। ওকেও জানতে দেব না যে আমি জানি। আর এতে কোন দোষ ও নেই। কারণ আপনি আমাকে এ তথ্য জানান নি।’
‘ধন্যবাদ মিঃ আহমদ মুসা। উনি হয়তো তার পরিচয় জানাতেও পারেন। আপনার মত ব্যক্তির কাছে তিনি নিজেকে গোপন রাখবেন বলেও মনে হয় না। সে যাক, আপনি এত দ্রুত কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, এটা সত্যিই বিস্ময়কর।’
‘বিস্ময়ের এতে কিছুই নেই। আমার বর্তমান অবস্থার বিষয়টা এত তাড়াতাড়ি উনার জানা এবং আপনার ‘নির্দেশ’ লাভের কথা থেকেই বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। আর তাকে না দেখলে, কথা না বললে নিশ্চয় বিষয়টা আমার নজর এড়িয়ে যেত। তাকে দেখেই বুঝেছি টমাস জেফারসনের নেতৃত্ব ও মৌলিকত্ব দুই গুণই যেনি তার মধ্যে আছে। আর আমাকে তার ভার্জিনিয়ার বাড়িতে দাওয়াত দেয়া থেকে তখনই আমার মনে হয়েছিল কোন চিন্তা-ভাবনা বা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি রয়েছেন।’
গাড়ি তখন পটোম্যাক ব্রীজ পার হয়ে ভার্জিনিয়ার পথ ধরে চলছিল। ডান দিকে অল্প দূরে পেন্টাগন। আর সামনে অরলিংটন সিমেট্রি। নিরব রাস্তার দুপাশে গাছ-পালা, ঝোপ-ঝাড়ের সারি।
বেঞ্জামিনের গাড়ি ফ্রি ওয়ে ধরে ছুটে চলেছে জেফারসনের বাড়ি মন্টিসেলোর দিকে।
অরলিংটন সিমেট্রি এলাকায় তখনও পৌঁছেনি গাড়ি।
হঠাৎ বেঞ্জামিনের খেয়াল হলো অরলিংটন না ঘুরে নতুন ডাইভারশন রোড হয়ে গেলে অনেক সময় বাঁচবে। চিন্তা করেই বেঞ্জামিন ডানদিকে অর্থাৎ পেন্টাগনের দিকে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ডাইভারশন রোডটা পেন্টাগনের প্রায় পাশ দিয়েই চলে গেছে। মাঝখানে শুধু ঘন গাছ আচ্ছাদিত উঁচু ও দীর্ঘ টিলা।
গাড়ি চলছিল সে টিলার পাশ দিয়েই। আহমদ মুসা সে টিলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পেন্টাগনের এত কাছে জংগল কেন?’
‘খুব পাশে নয় মিঃ আহমদ মুসা, দূরত্ব দেড় মাইলের কম হবে না। একে পেন্টাগনের ফাঁদ বলতে পারেন। এ জংগলের মাটি ও গাছের কান্ড, শাখা, পাতা কোন কিছুই শত্রুর জন্যে নিরাপদ নয়। এর বাইরে রয়েছে অদৃশ্য পাহারার একটা ব্যুহ।’ বেঞ্জামিন বলল।
‘সেটাই স্বাভাবিক।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই উৎকর্ণ হয়ে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘শুনেছেন গুলীর শব্দ?’
‘ঠিক, আমারও কানে এসেছে। একাধিক শব্দ।’ বলল বেঞ্জামিন।
‘একটু আগেও এ ধরনের শব্দ কানে এসেছে। সেগুলোও তাহলে গুলীর শব্দ ছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সামনে কিছু ঘটছে নিশ্চয়।’ বলে বেঞ্জামিন বেকন তার গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল।

জর্জ জুনিয়রের বুকে মাথা রেখে অস্থিরভাবে কাঁদছিল সাবা বেনগুরিয়ান। বলছিল, ‘কেন তুমি ওই চিঠি লিখে দিলে? এ শয়তানদের হাতে ঐ মাস্টার কম্পিউটার পড়লে কি হবে তুমি জান?’
জর্জ জুনিয়র সাবার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ঐ কম্পিউটারের চেয়ে তোমার সম্মান আমার কাছে অনেক বড়।’
‘ঐ কম্পিউটার তো শুধু কম্পিউটার নয়। ওটা তো দেশ।’
‘তুমি ভেব না সাবা, ওদের ষড়যন্ত্র সফল হবে না। কিছু রেকর্ড ধংস করলেই দেশ শেষ হয়ে যাবে না।’
‘তোমার আব্বাদের কোন ভাল খবর না পাওয়া পর্যন্ত রেকর্ডের মূল্য তুমি অস্বীকার করতে পারবে না।’
আব্বার কথা মনে হতেই অসহনীয় এক খোঁচা লাগল তার বুকে। এক যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল দেহের সকল স্নায়ুতন্ত্রীতে। সে নিউ মেক্সিকো যাবার জন্যে বেরিয়েছিল। যাওয়া তো হলোই না, উপরন্তু সে নিজেই বন্দী হয়ে পড়ল। ওদিকের অবস্থা কে জানে! ওদিকের সব প্রমাণ শেষ করেই কি এরা এদিকের সব প্রমাণ নির্মূল করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে! বুকটা কেঁপে উঠল তার আতংকে। বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ সাবা। কিন্তু তোমার ক্ষতি সহ্য করার শক্তি কি আমার আছে!’
জর্জ জুনিয়রের বুকে মুখ গুঁজে সাবা বলল, ‘তা জানি। কিন্তু যে ক্ষতি হলো তার পরিমাপ নেই।’
‘ভেবো না সাবা। ঈশ্বর আছেন। অন্ধকারে আলো জ্বলবেই।’
‘কিন্তু আমি সবকিছুর উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আমার স্বজাতির যে বেঈমানী আমি দেখেছি, তাতে দুনিয়ায় কোন নীতিবোধ আছে বলে আমি মনে করতে পারছি না।’ বলল সাবা বেনগুরিয়ান।
‘নীতিবোধ তাদের নেই বলে কারও নেই, তা ভাবতে যাবে কেন?’
কিছু বলতে যাচ্ছিল সাবা বেনগুরিয়ান। হঠাৎ সামনের দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেল সে। একজন লোক এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বিড়ালের মত নিঃশ্বব্দ পায়ে এগিয়ে আসছে তাদের সেলের দিকে।
জর্জ জুনিয়রেরও চোখে পড়েছে লোকটা।
জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান দুজনেই সোজা হয়ে বসেছে। তাদের স্থির দৃষ্টি লোকটির দিকে।
লোকটি সেলের দরজার সামনে এসে ঠোঁটে তর্জনি চেপে চুপ থাকার ইংগিত করল।
পকেট থেকে একটা চাবি বের করে লোকটি তালা খুলে সেলের দরজা খুলে ফেলল। বলল দ্রুত ফিসফিস কন্ঠে, ‘আসুন, পালাবার এই সুযোগ। দুজন ছাড়া সবাই চলে গেছে কম্পিউটার আনতে।’
‘আপনি কে?’ বলল জর্জ জুনিয়র বিস্মিত কন্ঠে।
‘আমাকে চিনবেন না। আমি মিস সাবার আব্বা মিঃ আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের একজন ভক্ত। জীবন বাঁচানো থেকে শুরু করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ সব তাঁরই দয়ায় হয়েছে। সুযোগ পেয়েছি তাঁর জন্যে কিছু করার। আসুন, তাড়াতাড়ি।’
জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান দ্রুত উঠল এবং লোকটির পেছনে পেছনে বেরিয়ে এল সেল থেকে। চলতে চলতে ফিসফিস করে লোকটি বলল, ‘মিঃ আইজ্যাক বেনগুরিয়ানকেও ওরা মেরে ফেলবে।’
‘উনি কোথায়?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল জর্জ জন জুনিয়র।
‘ইনস্টিটিউট এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ’ অফিসের রেসিডেন্সিয়াল
ব্লকে তাকে রাখা হয়েছে। তাকে বুঝানো হয়েছে এফ.বি.আই-এর জ্বালাতন থেকে দূরে রাখার জন্যেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। আসলে তিনি এখন নজরবন্দী। মিস সাবাকে শেষ করার পর তাকেও হত্যা করা হবে।’
কেঁপে উঠল জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান দুজনেই। বলল সাবা বেনগুরিয়ান, ‘এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অফিসে কেন? আব্বাকে ওরা চিনবে না?’
‘চিনলে কি হবে? অফিসের টপ টু বটম ইহুদীবাদীতে ভরা। শুধু এই ইনস্টিটিউট নয়, এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজের দুনিয়াব্যাপী গোটা নেটওয়ার্কই তো এরা নিয়ন্ত্রণ করে।’ বলল লোকটি।
খুব সামনেই দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। থমকে দাঁড়াল লোকটি।
তার পেছনে থমকে দাঁড়াল জর্জ জুনিয়র এবং সাবা বেনগুরিয়ানও।
সামনেই একটা দরজা। দরজার ওপার থেকে পায়ের শব্দ আসছিল।
থমকে দাঁড়ানোর পর মুহূর্তেই দরজায় এসে উদয় হলো দুজন লোক। তাদের হাতে স্টেনগান। তাদের চোখেও আগুন। তাদের নাক বরাবর সামনেই ধরা পড়া চোরের মত দাঁড়িয়েছিল জর্জদেরকে উদ্ধারকারী লোকটি। তাদের একজন তার স্টেনগানটা ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতের এক প্রচন্ড ঘুষি চালাল লোকটিকে।
উদ্ধারকারী লোকটি ঘুষি খেয়ে দড়াম করে পড়ে গেল মেঝের উপর।
লোকটি ঘুষি মেরেই স্টেনগান তাক করল জর্জ জুনিয়র এবং সাবা বেনগুরিয়ানের দিকে। চিৎকার করে বলল, ‘ভেবেছিলে পালাবে? যারা একবার এই সেলে ঢোকে তারা আর জীবিত বের হয়ে যেতে পারে না।’
বলে পেছনের লোকটিকে নির্দেশ করল, ‘এদের বেঁধে ফেল, তারপর সেলে ঢোকাও।’
জর্জদের উদ্ধারকারী লোকটি মেঝেয় পড়ে গিয়েই ওদের অলক্ষ্যে পকেট থেকে রিভলভার বের করে নিয়েছিল। জর্জদের বেঁধে ফেলার নির্দেশ বাতাসে মেলাবার আগেই তার রিভলভার থেকে দুটি গুলী বের হয়ে এল।
স্টেনগানধারী দুজনই গুলীবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
জর্জদেরকে উদ্ধারকারী লোকটি উঠে দাঁড়িয়েই জর্জদের লক্ষ্য করে বলল, ‘আসুন।’
বলে সে ছুটল দরজা পেরিয়ে।
জর্জরাও তার পিছে পিছে ছুটল।
কিন্তু বাড়ি থেকে বেরুতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল লোকটি। ফিস ফিস কন্ঠে বলে উঠল, ‘পুরো যে দলটি গিয়েছিল কম্পিউটার উদ্ধার করতে, তারা ফিরে এসেছে।’ তার কন্ঠ তখন কাঁপছে।
প্রায় পাগলের মত সে এদিক ওদিক তাকিয়ে জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ানকে টেনে নিয়ে পাশেই ছোট্ট একটা কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষটি জেনারেটর রুম। কক্ষটি বাড়িতে ঢোকার প্রবেশ পথ এবং সিঁড়ি দিয়ে দুতলায় উঠার মুখেই। সবই দেখা যায় কক্ষটি থেকে।
জর্জরা দেখল প্রায় দশ বার জন লোক ভেতরে প্রবেশ করল।
‘ওরা সবাই উপরে উঠে গেছে, আসুন এই সুযোগ।’ বলে লোকটিই দ্রুত বেরোল ঘর থেকে।
জর্জ জুনিয়র এবং সাবা বেনগুরিয়ানও তার পেছনে পেছনে ছুটে বেরিয়ে এল।
কিন্তু বেরিয়ে বাইরের করিডোরটায় পা দিয়েই তারা মুখোমুখি পড়ে গেল একজনের। লোকটি ঐ দলেরই একজন। সম্ভবত সেই গাড়ি ড্রাইভ করেছে। গাড়ি পার্ক করে আসাতে পেছনে পড়ে গেছে।
মুখোমুখি হয়ে দুপক্ষই প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারকারী লোকটি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছিল। আর ড্রাইভার লোকটি তার নিজেদের লোকের সাথে জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ানকে দেখে ব্যাপারটা বুঝে উঠতে দেরি করে ফেলেছিল। যখন বুঝে উঠে রিভলভার বের করতে যাবে, তখন তার বুক বরাবর তাক হয়ে উঠেছে জর্জদের উদ্ধারকারী লোকটির রিভলবার।
উপায়ন্তর না দেখে লোকটি চিৎকার করে উঠেছিল। আর সেই সাথেই বুকে গুলীবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল লোকটি।
‘আসুন ঐ গাড়ির দিকে।’ বলে ছুটতে শুরু করেছে লোকটি।
গ্যারেজের দিকে পার্ক করা ছিল একটা মাইক্রোসহ দুটি জীপ। লোকটি ছুটছিল একদম সামনের জীপটার দিকে। শুধু ওটাই পার্ক করা ছিল গেটের দিকে মুখ করে। জীপটি জেনারেল মটরস-এর ৬ সিটের একটা বড় জীপ।
লোকটি ছুটে গিয়ে প্রথমেই ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ফেলল।
জর্জরাও এসে পড়েছে।
‘গাদ্দার, তোরা পালাবি, তা হবে না।’ উপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল। সম্ভবত নিচে গুলীর শব্দ পেয়ে কেউ নিচে তাকিয়ে ওদের দেখে ফেলেছে।
চিৎকারের সাথে সাথে স্টেনগানের গুলী ভেসে এল।
তখন গাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে জর্জরা। প্রথমে প্রবেশ করে জর্জ গিয়ে বসেছে ড্রাইভিং সিটে।
সাবা বেনগুরিয়ান উঠতে যাচ্ছে সেই সময়ই গুলী বৃষ্টি এবং সেটা গাড়ির দরজা লক্ষ্যেই।
জর্জদের উদ্ধারকারী লোকটি নিজের গা দিয়ে ঢেকে সাবা বেনগুরিয়ানকে গাড়িতে উঠিয়ে দিল। দরজাটাও সে বন্ধ করল। তার পরেই উদ্ধারকারী লোকটি তার ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহটা নিয়ে গাড়ির দরজার নিচেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সাবা বেনগুরিয়ান গাড়ির দরজা খুলে দেখতে যাচ্ছিল।
জর্জ জুনিয়র ঝুঁকে এসে চিৎকার করে উঠল, ‘সাবা দরজা খুল না, মাথা নিচু কর। কি দেখবে, বেচারার দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।’
বলে জর্জ গাড়িতে স্টার্ট দিল। গুলী বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাড়িটি তীব্র গতিতে ছুটল গেটের দিকে।
গ্রীলের গেট ভেঙে জীপটি বেরিয়ে এল বাইরের রাস্তায়।
জীপটি যখন বাড়িটির এরিয়া ছাড়াচ্ছে, তখন ছেড়ে আসা গেটের সম্ভবত পেছনেই দুটি ইঞ্জিন গর্জন করে উঠার শব্দ পেল জর্জ জুনিয়র।
গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল জর্জ জুনিয়র।
একটা ট্রাফিক পয়েন্ট এড়াতে গিয়ে জর্জের গাড়ি পটোম্যাক রোডে গিয়ে পড়ল। পটোম্যাক রোড থেকে অরলিংটন হাইওয়ের রিং-এ গিয়ে পৌঁছল। রিংটা জর্জের গাড়িকে তার তাড়াতাড়িজনিত একটা ভুলের কারণে অরলিংটনমুখী হাইওয়ে চ্যানেলে নিয়ে ফেলল।
ঘাড়ের উপর বিপদ নিয়ে আর কিছু করার ছিল না।
জর্জের গাড়ি ছুটে চলল অরলিংটন হাইওয়ে ধরে। ওদের দুটি গাড়িও আঠার মত লেগে আছে পেছনে। বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছে। দূরত্ব ক্রমশই কমে আসছে।
জর্জ জুনিয়র শেষ পর্যন্ত পেন্টাগনের রাস্তায় যেতে চেয়েছিল, পেছনের তাড়া খেয়ে সেদিকেও ঘুরতে পারল না। গাড়ি তাতে স্লো করতে হয়। এমনিতেই ওদের গুলীর রেঞ্জে তার গাড়ি এসে গেছে।
আরো সামনে এগিয়ে পেন্টাগন এলাকায় প্রবেশের জন্যেই জর্জ জুনিয়র তার গাড়ি পেন্টাগন এলাকা ঘেঁষে চলে যাওয়া ডাইভারশন রোডটির দিকে ঘুরিয়ে নিল।
রাস্তার এক জায়গায় এসে জর্জ জুনিয়র সাবা বেনগুরিয়ানকে বলল, ‘আমি গাড়ি দাঁড় করাব। দাঁড় করানোর সাথে সাথেই তুমি নেমে পড়বে, আমিও। তারপর জংগলের মধ্যে দিয়ে পেন্টাগনের দিকে ছুটতে হবে। এটাই বাঁচার একমাত্র পথ।’
হার্ড ব্রেক কষে এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করাল জর্জ জুনিয়র। দুজনেই দুই দরজা খুলে পা বাড়াল নামার জন্যে।
পেছনের গাড়ি দুটি সম্ভবত এটাই আঁচ করেছিল। পেছন থেকে শুরু হলো গুলী বৃষ্টি।
বের হতে পারল না ওরা গাড়ি থেকে।
গুলী ছুড়তে ছুড়তে পেছনের দুটি গাড়ি এগিয়ে আসছে জর্জদের গাড়ির দিকে।
জর্জদের গাড়ি ততক্ষণে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান গাড়ির মেঝেতে শুয়ে আত্মরক্ষা করছে।

অল্প এগিয়ে ছোট্ট একটা বাঁক পার হতেই আহমদ মুসা ও বেঞ্জামিন দুজনেই গাড়ি তিনটি দেখতে পেল।
‘টার্গেট সামনের ঐ জীপটা। জীপটাকে তো এরা ভর্তা করে ফেলল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ও জীপটা থেকে কিন্তু উত্তর আসছে না। মুনে হয় যুদ্ধটা এক তরফা। ও জীপটা মজলুম আর পেছনের মাইক্রো ও জীপটি জালেমের ভূমিকায় দেখছি অবতীর্ণ হয়েছে।’ বেঞ্জামিন বলল।
‘আপাতত তাই মনে হচ্ছে।’
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘জোরে চালাও, ওদের থামাতে হবে।’
কাছাকাছি পৌঁছে আহমদ মুসাই প্রথমে গুলী করল। গুলী করে দুটি গাড়ির পেছনের মাইক্রোটার পেছনের উইন্ড স্ক্রীন ভেঙে দিল। দ্বিতীয় গুলী পেছনের উইন্ড স্ক্রীনের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করে মাইক্রোর সামনের উইন্ড স্ক্রীনও ভেঙে দিল।
সামনের জীপ ও মাইক্রো দুটিই তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে।
জীপ ও মাইক্রো থেকে গুলী করতে করতে কয়েকজন নেমে পড়ল।
আহমদ মুসা পিস্তল পকেটে রেখে স্টেনগান হাতে তুলে নিল। বেঞ্জামিনও।
ভয় দেখানোর জন্যেই তারা ফাঁকা গুলী করল লোকগুলীর পাশ দিয়ে, ওপর দিয়ে।
ভয় তারা পেল। দ্রুত তারা গাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল এবং গাড়ির জানালা দিয়ে গুলী চালাতে লাগল।
ঠিক এই সময় রাস্তার ডান পাশের জংগলের ভেতর থেকে একটা
হ্যান্ড লাউড স্পীকারের শব্দ ভেসে এল, ‘আপনারা সবাই গুলী বন্ধ করুন। অস্ত্রগুলো রেখে সবাই গাড়ির ডানপাশে এসে দাঁড়ান। যে গাড়ি দেরী করবে সে গাড়িই উড়িয়ে দেয়া হবে।’
আহমদ মুসা ও বেঞ্জামিন মুহূর্ত দেরী না করে স্টেনগান গাড়ির ভেতরে রেখে বেরিয়ে এসে গাড়ির ডান পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
অন্যদিকে একদম সামনের জীপ থেকে জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাড়ির মেঝে থেকে গড়িয়ে গাড়ির ডানপাশের রাস্তায় নেমে এল।
কিন্তু মাঝের গাড়ি দুটি থেকে তখনও কেউ নামেনি।
জবাব সংগে সংগেই এল।
জংগলের ভেতর থেকে একটা গোলা এসে নিঁখুত অপারেশনের মত মাইক্রোর ছাদটি উড়িয়ে নিয়ে গেল।
কাজ হলো এতে।
মাঝের জীপ ও মাইক্রো থেকে প্রায় দশ জন লোক খালি হাতে গাড়ির ডান পাশে এসে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ওদের দেখছিল কিছুটা বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে। ওরা দশজন যারা নেমেছে তাদের কেউই পুরো শ্বেতাংগ নয়। গায়ের রং, দেহের গড়ন সবই বলে দেয় সেমেটিক বা এশিয়ান কোন মিশ্রণ ওদের দেহে আছে। হঠাৎ আহমদ মুসার মাথায় ঝড়ের মত একটা চিন্তা প্রবেশ করল। ওরা কি ইহুদী? জেনারেল শ্যারনের লোক হতে পারে?
আহমদ মুসা মুহুর্তের জন্য ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা শেষ মুহূর্তে আহমদ মুসার চোখে পড়েছে।
দেখল ওদের দশজনের একজনের হাত শূন্যে উঠে গেছে। হাতে একটা গোলাকার বস্তু। তার হাতের টার্গেট সামনের ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া জীপ থেকে বেরিয়ে আসা সেই দুজন ছেলে মেয়ে।
কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে আহমদ মুসার বিলম্ব হয়নি।
বিদ্যুৎ বেগে আহমদ মুসার একটা হাত পকেটের ভেতরে ঢুকে বেরিয়ে এল এবং তা উপরে উঠল বিদ্যুৎ ঝলকের মত।
হাতের জিনিসটি ছোঁড়ার জন্যে লোকটির হাত একবার পেছনে এসে জোরে ছুটে যাচ্ছিল সামনে। সে মুহূর্তে আহমদ মুসার রিভলভারের গুলী গিয়ে আঘাত করল ঠিক লোকটির হাতে।
সামনের জীপ থেকে বের হওয়া ছেলে ও মেয়েটি শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিল যে তারা বোমার শিকার হতে যাচ্ছে। তারা কুকড়ে গিয়েছিল ভয়ে।
গুলী লোকটির হাতে লাগার সাথে সাথে ভয়াবহ কান্ড ঘটে গেল।
হাতের জিনিসটা ছিল একটা গ্রেনেড। গ্রেনেডটির বিস্ফোরন ঘটল ঠিক ওদের মাঝখানে। মুহূর্তেই বিপর্যয় ঘটে গেল।
প্রচন্ড বিস্ফোরণে জনাদশেক মানুষের দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল চারদিকে।
ধোঁয়া একটু হালকা হলে দেখা গেলো ওরা দশজনের সবাই আহত নিহতের তালিকায়।
জংগলের বুক ফেঁড়ে ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে এল ৫জন সৈনিক।
পাঁচ জনের মধ্যে একজন কর্ণেল র‍্যাংকের অফিসার। অবশিষ্ট ৪ জনও বিভিন্ন র‍্যাংকের অধঃস্তন অফিসার। এসেই কর্ণেল র‍্যাংকের অফিসারটি অধঃস্তন অফিসারদের নির্দেশ দিল, আহত নিহতের সবাইকে একটা গাড়িতে তুলে আমাদের মিলিটারী হাসপাতালে নিয়ে যাও। আহত প্রত্যেককে পাহারায় রাখবে।
সৈনিকরা, আহমদ মুসা ও বেঞ্জামিন সবাই ধরাধরি করে আহত নিহতদের গাড়িতে তুলল।
সাবা বেনগুরিয়ান ও জর্জদের ভয় ও আতংকে কাঠ হয়ে যাওয়া অবস্থা তখনও কাটেনি।
দুজন অফিসার আহত নিহতদের গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আর দুজন রয়ে গেল কর্ণেলের সাথে।
গাড়িটাকে বিদায় করে কর্ণেল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে যে ওদের শেষ হামলা থেকেও এদের দুজনকে আপনি বাঁচিয়েছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, কেউ কেউ তো আহত নিহত হলোই।’
বলে একটু থেমে সেই ছেলে মেয়ে দুজনের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘ওরা ও আপনারা কি এক সাথের?’
‘না, গোলাগুলী হতে দেখে আমরা এর সাথে জড়িয়ে পড়েছি।’ বলল আহমদ মুসা।
জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান এগিয়ে এল তাদের দিকে। বলল জর্জ জুনিয়র সৈনিক ও আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ। ওদের বন্দীখানা থেকে আমরা পালিয়েছি। ওরা আমাদের মেরে ফেলার জন্যেই ধাওয়া করেছিল। আপনারা বাঁচিয়েছেন।’
‘আপনার নাম পরিচয় কি বলুন তো?’ যেন চিনতে পারছে, জর্জ জুনিয়রের দিকে এমন দৃষ্টিতে চেয়ে কপাল কুঞ্চিত করে বলল কর্ণেল লোকটি।
‘আমি জর্জ জন আব্রাহাম জুনিয়র। আমার পিতা জর্জ আব্রাহাম জনসন।’ বলল জর্জ জুনিয়র।
‘তার মানে তুমি আমাদের জর্জ মুর আব্রাহামের ছোট ভাই?’ বলল কর্ণেল।
‘হ্যাঁ।’
আহমদ মুসা ও বেঞ্জামিন দুজনেরই চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেছে। জর্জ জুনিয়র ইহুদীদের হাতে বন্দী হয়েছিল? কেন? জর্জ জুনিয়রকে ওরা হত্যা করবে কেন? এসব প্রশ্ন ঝড়ের মত এসে আহমদ মুসার মনে ভিড় জমাল।
‘তোমার আব্বার খবর জান? তুমি বন্দী হয়েছিলে কেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
জর্জ জুনিয়র চমকে উঠে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘আপনি জানেন কিছু? কোন খবর আমি জানি না।’
‘আমরা এক সাথেই নিউ মেক্সিকো থেকে এসেছি ওয়াশিংটনে, এই কিছুক্ষণ আগে।’
‘তিনি ভাল আছেন?’ জর্জ জুনিয়র জিজ্ঞেস করল।
‘ভালো আছেন। কিন্তু তিনি এবং এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার সাসপেন্ড হয়েছেন তাদের পদ থেকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অসম্ভব। কেন?’
‘অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। কারণ বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে।’
‘দয়া করে দুএকটা বলুন। নাহলে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’ জর্জ জুনিয়র বলল।
‘তাঁর বিরুদ্ধে নির্দোষ ইহুদীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এবং অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার আহমদ মুসার পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মিথ্যা এ অভিযোগ। আমি তার জীবন্ত সাক্ষী। এজন্যেই ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমার আব্বাকে ওরা নজরবন্দী করে রেখেছে।’ বলল তীব্র কন্ঠে মেয়েটি।
‘তুমি কে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
কথা বলে উঠল জর্জ জুনিয়র। বলল, ‘এঁর নাম সাবা বেনগুরিয়ান। আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের মেয়ে।’
‘অর্থাৎ ইহুদী ধনকুবের আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের মেয়ে?’ বলল বেঞ্জামিন বেকন।
‘তুমি জীবন্ত সাক্ষী কি করে হলে?’ বলল আহমদ মুসা সাবা বেনগুরিয়ানকে।
‘ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল শ্যারন আব্বার বন্ধু। সেই সুযোগ নিয়ে তিনি আমাকে জর্জ আব্রাহামের মাস্টার কম্পিউটারের লস আলামোসের ইহুদী গোয়েন্দা সংক্রান্ত সব রেকর্ড মুছে ফেলার জন্যে কাজ করতে বাধ্য করেন। সেখানে গিয়েও আমি শেষ পর্যন্ত দেশের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারিনি। আমি আরও কিছু বিষয় জানতে পারি। এ সব কারণেই আমাকে ও আব্বাকে বন্দী করা হয়েছে। আমার কাছ থেকে জেনারেল শ্যারনের বিষয়ে জর্জ জুনিয়র সব কিছু জেনেছে বলে তাকেও বন্দী করা হয়।’
সাবা বেনগুরিয়ান থামতেই কর্ণেল বলে উঠল, ‘আপনারা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, সবই দেশের নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
আর এখানে যা ঘটল তারও সম্পর্ক আছে দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়ের সাথে। সুতরাং আপনাদের সবাইকে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটি দফতরে যেতে হবে।’
কর্ণেল থামতেই জর্জ জুনিয়র বলে উঠল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আপনার পরিচয় তো জানলাম না। আব্বাদের সাথে আপনি এলেন কেমন করে? সব বিষয়ই বা আপনি কি করে জানেন?’
‘আমি গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়ে এসেছি। চলুন পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটি দফতরে গিয়েই সব আলোচনা করা যাবে।’
‘চলুন যাওয়া যাক। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দফতরের চীফ জেনারেল শেরউড আজই পৌঁছার কথা। তিনি নিশ্চয়ই পৌঁছেছেন।’ বল কর্ণেলটি।
সবাই এগুলো গাড়ির দিকে।

পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান জেনারেল শেরউড টেবিলে বসতেই তার টেলিফোন বেজে উঠল।
একটু বিরক্ত লাগলেও টেলিফোন তুলে নিল জেনারেল শেরউড।
জেনারেল শেরউড ক্লান্ত। তিনি নিউ মেক্সিকো থেকে অনেক ধকল আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তার দফতরে এসে সবেমাত্র বসেছে। বাড়িতেও যায়নি সে।
টেলিফোন করেছে জেনারেল শেরউডের সহকারী ব্রিগেডিয়ার স্টিভ স্টিফেনসন।
তার কাছ থেকেই খবর পেল যে, জর্জ আব্রাহাম জনসনকে এফ.বি.আই চীফ-এর পদ থেকে এবং অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে সি.আই.এ চীফ-এর পদ থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমান বন্দর থেকেই আহমদ মুসা পালিয়েছে। আরও জানল, জর্জ আব্রাহামের ছোট ছেলে জর্জ জন জুনিয়র নিখোঁজ। রহস্যের ব্যাপার হলো, তার চিঠি নিয়ে এসে জর্জ আব্রাহামের পার্সোনাল কম্পিউটার কারা যেন নিয়ে গেছে। তার কয়েক ঘন্টা আগে এফ.বি.আই হেড কোয়ার্টারের কম্পিউটার কক্ষ বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছে। খবরগুলো দিয়ে ব্রিগেডিয়ার স্টিভ স্টিফেনসন বলল, ‘পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে উঠেছে স্যার। আপনার রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা অফিস তার উল্টো কথা বলছে। আমি পুরোটা আপনার কাছে পাঠাচ্ছি স্যার।’
‘পাঠাও স্টিভ। আমি যে রিপোর্ট পাঠিয়েছি, তার প্রতিটা বর্ণ সত্য। আমরা বড় কোন ষড়যন্ত্রের মুখে স্টিভ।’
বলে টেলিফোন রেখে দিল জেনারেল শেরউড।
টেলিফোন রাখার পর হতভম্বের মত কিছুক্ষণ বসে থাকল জেনারেল শেরউড। ভাবছিল সে, জর্জ আব্রাহাম জনসনের মত প্রবীণ ও সুখ্যাত এবং অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের মত ব্রিলিয়ান্ট অফিসার কখনও সাসপেন্ড হতে পারে! এতদূর এগিয়েছে ইহুদীবাদীরা। আহমদ মুসা গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়েছে, ভালই হয়েছে। তার বাইরে থাকা দরকার সত্য উদঘাটনের জন্যেই। এখন এই মুহূর্তে তার নিজের কি করণীয়?
হঠাৎ তার মনে হলো জর্জ আব্রাহামকে একবার তার টেলিফোন করা দরকার।
টেলিফোন করল। কিন্তু টেলিফোন কেউ ধরল না।
অনুসন্ধান করে জানতে পারল, তার টেলিফোন লাইন নষ্ট কোন কারণে।
মোবাইল টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করল জেনারেল শেরউড। কিন্তু জানা গেল এ লাইনটাও তার খারাপ।
বিস্মিত জেনারেল শেরউড। সে টেলিফোন করল অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে। তারও সব টেলিফোনের এই একই অবস্থা।
উদ্বেগ চরমে উঠল জেনারেল শেরউডের। তাদের টেলিফোন লাইনও নষ্ট, একথা তার বিশ্বাস হলো না। তার মনে হলো, তাদেরকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে। তারা কি নজরবন্দীও?
লাল টেলিফোন তুলে নিল জেনারেল শেরউড। টেলিফোন করল সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটনকে।
জেনারেল শেরউডের গলা পেয়াই জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন বলে উঠল, ‘কখন তুমি ফিরলে শেরউড?’
‘পাঁচ মিনিট আগে স্যার।’
‘তিনজনের টীম গিয়েছিল লস আলামোসে। দুজন সাসপেন্ড, তুমি একজন বাকি।’ বলল জেনারেল ওয়াশিংটন কতকটা রসিকতার সুরে।
‘প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের হাত সম্ভবত আমার পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। স্যার, সবই আপনার জানার কথা। কিছু একটা করুন স্যার।’ জেনারেল শেরউডের কন্ঠে উদ্বেগ।
‘আহমদ মুসা সম্পর্কে রিপোর্টে যা লিখেছ, তা তোমার ইমপ্রেশন থেকে, না বিশ্বাস থেকে?’
‘নিখাদ বিশ্বাস থেকে লিখেছি স্যার।’
‘আহমদ মুসাকে আমিও কোনদিন পছন্দ করিনি। কিন্তু তার বিষয়ে একটা কথা আমি জানি, সে মিথ্যা কথা বলে না।’
‘ধন্যবাদ স্যার। তার সাথে বেশ কিছু সময় থেকে আমার বিশ্বাস হয়েছে, উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবার মত লোক সে নয়। তাছাড়া ঘটনার মধ্যে থেকে আমরা দেখেছি, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা যা বলেছেন তা সত্য নয়।’
‘কিন্তু শেরউড, আহমদ মুসা মিরাকলগুলো ঘটাতে পারল কেমন করে?’
‘ওগুলো মিরাকল নয় স্যার, আহমদ মুসার অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও বিশ্লেষণী শক্তির ফল। আমি সে সবের মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা দেখিনি স্যার।’
‘গ্রেফতার এড়িয়ে বিমান বন্দর থেকে তার পালানোর ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করবে? বলা হচ্ছে, ষড়যন্ত্রের মধ্যে ছিল বলেই এ পালাবার ব্যবস্থাও সে করে রেখেছিল।’
‘স্যার, আমার ধারণা ‘ফ্রি আমেরিকা’ আন্দোলনের দুঃসাহসী কেউ আহমদ মুসাকে সাহায্য করেছে। ইহুদীরা আহমদ মুসার পেছনে লাগায় ‘ফ্রি আমেরিকা’ আহমদ মুসাকে সাহায্য করছে।’ বলল জেনারেল শেরউড।
‘ফ্রি আমেরিকা’ আহমদ মুসাকে সাহায্য করায় ওরা কিন্তু সুযোগ পেয়েছে ঘটনাগুলো আহমদ মুসার সাজানো ষড়যন্ত্র বলার।’
‘ঠিক স্যার। কিন্তু কি করণীয়? ইহুদীরা তাদের এ ষড়যন্ত্র চাপা দিতে পারলে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ইহুদী ষড়যন্ত্র সত্যিই আমাদের গিলে ফেলবে।’
‘কিন্তু প্রমাণ নেই শেরউড। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা অফিস এবং প্রেসিডেন্টকে ওরা বুঝাতে পেরেছে। এখন কিছু করতে গেলে কাগজে-কলমে প্রমাণ করতে হবে।’
‘এ ধরনের ষড়যন্ত্র খুব কমই হাতে-কলমে প্রমাণ করা যায়। ইহুদী ঘাটি সবুজ পাহাড় থেকে লস আলামোস পর্যন্ত যে সুড়ঙ্গ আহমদ মুসা আবিষ্কার করেছেন, তার চেয়ে বড় প্রমাণ কি আর প্রয়োজন আছে স্যার?’
‘সে সুরঙ্গের একটা ব্যাখ্যা তারা দাঁড় করিয়েছে। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা অফিস ও প্রেসিডেন্ট সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট।’
‘তাহলে ইহুদী কৌশলেরই কি জয় হবে স্যার?’
‘আমি তোমাকে একটা কথা বলি শেরউড। ইহুদীদের পাপের ভার বোধ হয় পূর্ণ হয়েছে। আহমদ মুসার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগমন সম্ভবত তারই আলামত। এখন দরকার প্রমাণের। আহমদ মুসার গ্রেফতার এড়ানোর অর্থ একটা অবশ্যই আছে।’
‘ধন্যবাদ স্যার। মাফ করবেন স্যার, এফ.বি.আই এবং সি.আই.এ-কে নিষ্ক্রীয় করার পর আমার মতে সেনাবাহিনীই এখন জাতির ভরসা। সুতরাং আপনার উপর অনেক দায়িত্ব বর্তেছে স্যার।’
‘ধন্যবাদ শেরউড। বাই।’
জেনারেল শেরউড টেলিফোন রেখে সোজা হয়ে বসতেই আবার টেলিফোন বেজে উঠল।
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ স্টিফেনসনের টেলিফোন। সে বলল, ‘স্যার আমাদের পেন্টাগন এলাকার সীমানায় একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।’
‘কি ঘটেছে?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠ জেনারেল শেরউডের।
‘দুটি গাড়ি একটা জীপকে তাড়া করে আমাদের দক্ষিণ প্রান্তের ডাইভারশন রোডে আসে। জীপটির আরোহী দুই ছেলে মেয়ে জীপ থামিয়ে পেন্টাগন এরিয়ায় পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু পেছনের দুটি গাড়ির গুলী বৃষ্টির মুখে তারা গাড়ি থেকে বের হতে পারে না। জীপের দুজন ছেলেমেয়েকে ওরা মেরেই ফেলতো। কিন্তু পেছন থেকে আরেকটি গাড়ি এ সময় এসে পড়ে। তারা সেই আক্রমণকারী গাড়ি দুটির উপর গুলী বর্ষণ করে ওদের থামিয়ে দেয়।
ঐ এলাকায় আমাদের প্রহরারত কর্ণেল তার পাঁচজন সাথী নিয়ে এ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে। সবাই নেমে আসে জীপ থেকে, দুই তরুণ তরুণী, মাঝের দুই গাড়ি থেকে দশজন এবং শেষে আসা গাড়ির দুজন। বিস্ময়ের ব্যাপার গাড়ি থেকে আমাদের লোকদের চোখের সামনে সেই দশজনের একজন গ্রেনেড ছুঁড়ে ঐ দুই তরুণ তরুণীকে হত্যার চেষ্টা করে। পেছনের গাড়ির দুজনের একজন ঠিক সময়ে গ্রেনেড নিক্ষেপকারী লোকটির হাত লক্ষ্যে গুলী করে। তরুণ তরুণী বেঁচে যায়, কিন্তু গ্রেনেডের ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে ঐ দশ জনের মাঝখানে। ওদের ৬ জন নিহত, ৪ জন মারাত্মক আহত। সবাইকে পেন্টাগনে নিয়ে আসা হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো তাদের পরিচয়। তরুণটি জর্জ আব্রাহাম জনসনের ছেলে আর মেয়েটি ইহুদী ধন কুবের আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের মেয়ে। দুজনেই জেনারেল শ্যারনের বন্দীখানা থেকে পালিয়েছে। পেছনে ধাওয়া করা শ্যারনদের লোকরাই………’
‘আর শোনার দরকার নেই, এই মুহূর্তে ওদের এখানে নিয়ে এস। আমিই শুনব ওদের কাছে। কোন গুরুতর ব্যাপার মনে হচ্ছে ব্রিগেডিয়ার।’ বলল জেনারেল শেরউড।
‘ঠিক আছে স্যার, আমি আসছি।’
টেলিফোন রেখে দিল জেনারেল শেরউড।
তার ভ্রু দুটি কুঞ্চিত হলো। চোখে মুখে একটা উত্তেজনা। এফ.বি.আই প্রধানের নিখোঁজ ছেলে জেনারেল শ্যারনদের হাতে বন্দী ছিল? তাহলে তার হাতে চিঠি লিখিয়ে নিয়ে শ্যারনদের লোকরাই জর্জ আব্রাহামের মাস্টার কম্পিউটার নিয়ে গেছে? এর অর্থ কি দাঁড়াচ্ছে, এফ.বি.আই হেড কোয়ার্টারের কম্পিউটার কক্ষটি জেনারেল শ্যারনের লোকরাই ধ্বংস করেছে?
দুচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল জেনারেল শেরউডের। তার মনে হলো, সামনে এগুবার একটা দরজা যেন তার সামনে খুলে গেল।
মিনিট খানেকের মধ্যেই জেনারেল শেরউডের পি.এস টেলিকমে বলে উঠল, ‘স্যার ব্রিগেডিয়ার সাহেবরা এসেছেন।’
‘নিয়ে এস ওদের।’ জেনারেল শেরউড বলল।
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ সবাইকে নিয়ে প্রবেশ করল জেনারেল শেরউডের অফিস কক্ষে।
সবাইকে স্বাগত জানানোর জন্যে জেনারেল শেরউড দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
সবার দিকে নজর বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসার উপর নজর পড়তেই আনন্দ, বিস্ময় ও আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়ল জেনারেল শেরউড। কিন্তু সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্যে।
পরক্ষণেই সে ছুটল আহমদ মুসার দিকে। সে যে একজন জেনারেল তা যেন ভুলে গেল। ভুলে গেল তাদের সামরিক ফর্মালিটির কথা। জেনারেল শেরউড ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘এই মুহূর্তে আমি সবচেয়ে বেশি আশা করছিলাম আপনাকে। ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ।’
তারপর জেনারেল শেরউড আহমদ মুসাকে হাত ধরে টেনে এনে চেয়ারে বসাল। তারপর সবাইকে বসার অনুরোধ করল।
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ স্টিফেনসনের দুই চোখ তখন বিস্ময়ে ছানাবড়া। জেনারেল শেরউডের মত কঠোর, রাশভারি ও সার্বক্ষণিক ফরমাল লোক এই লোকটিকে দেখে তার সব বৈশিষ্ট্য ভুলে গেলেন কি করে! কোন মানুষের বেলায়ই জেনারেল যা কোনদিন করেননি, এই লোকটির ক্ষেত্রে তা তিনি করলেন কেন? তার মত লোক তার অফিস কক্ষে সবার চোখের সামনে সিট থেকে উঠে এসে একজনকে জড়িয়ে ধরবেন, এটা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অসীম ভাগ্যবান এই লোকটি কে?
কতকটা এই ধরনেরই প্রশ্ন জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ানের মনেও। কে এই লোক? পেন্টাগনের একটি শীর্ষ পদের একজন ডাকসাইটে জেনারেল সিট থেকে উঠে এসে যাকে জড়িয়ে ধরেন এবং হাত ধরে নিয়ে গিয়ে সম্মানের সাথে চেয়ারে বসান, তাঁর পরিচয় কি হতে পারে? জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান দুজনেরই মনে পড়ল, এই লোকটি ঠিক সময়ে গুলী করে গ্রেনেড নিক্ষেপ না ঠেকালে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। কি তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কি অদ্ভূত তাঁর ক্ষীপ্রতা। আব্বাদের সাথে নিউ মেক্সিকো থেকে এসে গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়েছেন। তাহলে তো উনি আব্বাদের সাথেরই লোক। কে তাহলে এই লোক? যাহোক ঈশ্বর তাঁকে পাঠিয়েছেন তাদের দুজনকে বাঁচাতে।
সকলকে বসতে বলে জেনারেল শেরউড গিয়ে তার চেয়ারে বসল।
বসেই ব্রিগেডিয়ার স্টিভকে বলল আহমদ মুসাকে দেখিয়ে, ‘তুমি নিশ্চয় এঁকে চিনতে পারনি?’
‘না স্যার।’
‘তুমি তাকে জান, দেখনি। কিন্তু ফটো তো দেখেছ।’ বলল জেনারেল শেরউড।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো ব্রিগেডিয়ার স্টিভের। তীক্ষ্ণ হলো তার দৃষ্টি।
হঠাৎ লাফিয়ে উঠল চেয়ার থেকে। বলল, ‘ইনি আহমদ মুসা! স্যার, ইনি আহমদ মুসা?’ তার কন্ঠে একটা উচ্ছ্বাস, চোখে তার বিস্ময়-বিমুগ্ধ দৃষ্টি।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল ব্রিগেডিয়ার স্টিভের সাথে। বলল, ‘হ্যাঁ, আমি আহমদ মুসা।’
‘খুশি হলাম, স্যার।’ বলল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ।
বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টি তখন জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ানেরও। সাবা বেনগুরিয়ানও অনেক শুনেছে আহমদ মুসা সম্পর্কে পিতার কাছে এবং জেনারেল শ্যারনের কাছে। তার কাছে ছিল আহমদ মুসার একটা ভয়ংকর রূপ। কিন্তু আহমদ মুসাকে এখন খুবই আকর্ষণীয় ও নিষ্পাপ এক ভদ্রলোক বলে মনে হচ্ছে তার কাছে। তাদেরকে বাঁচিয়েছেন বলেই কি! কিন্তু জেনারেল শেরউডের মত লোকদেরও সম্মান ও শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করেছেন দেখা যাচ্ছে।
জর্জ জুনিয়র তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। সে অনেকটা দ্বিধাগ্রস্ত হাত বাড়াল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আব্বা-আম্মার কাছে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। জর্জ এডওয়ার্ড মুর সম্পর্কে আলোচনা উঠলে আপনার কথা ওঠেই।’
জর্জ আব্রাহাম জনসনের নাতি এবং সেনা গোয়েন্দা অফিসার জর্জ মুর আব্রাহামের ছেলে জর্জ এডওয়ার্ড মুরকেই আহমদ মুসা ওহাইও নদীতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল।
আহমদ মুসা হাসি মুখে তার সাথে হ্যান্ডশেক করল। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তোমার সাথে দেখা হলো।’
‘কিন্তু মিঃ আহমদ মুসা, আপনার জর্জ আব্রাহামের নাতিকে বাঁচানো এখন জর্জ আব্রাহামের বিরুদ্ধে আপনার সাথে যোগসাজসের একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
‘উপযুক্ত কারণ বটে।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই জেনারেল শেরউড জর্জ জুনিয়রের দিকে চেয়ে বলল, ‘জর্জ, আমরা একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। লস আলামোসের তদন্তে তোমার আব্বার সাথে আমিও ছিলাম। যা আমাদের কাছে সত্য, তা মিথ্যায় পরিণত হয়েছে। যে এফ.বি.আই চীফ বাদি হয়ে কেস দায়ের করবেন, তিনিই এখন আসামী। এই অবস্থায় কি সহযোগিতা করতে পার তোমরা? আমরা কিভাবে হাতে-কলমে প্রমাণ করব যে, তোমাদের ও অন্যসব ঘটনার সাথে জেনারেল শ্যারন জড়িত আছেন?’
জর্জ জুনিয়র কথা বলার আগেই সাবা বেনগুরিয়ান কথা বলে উঠল। বলল, ‘স্যার আমি নিজের কানে শুনেছি, জেনারেল শ্যারন টেলিফোনে ইহুদী গোয়েন্দা বেনইয়ামিনকে বলছেন যে, লস আলামোসে ডেথ স্কোয়াড পাঠানো হয়েছে এবং বেনইয়ামিনও যেন সেদিকে যায় ঘটনার বিবরণ সংগে সংগে দেবার জন্যে। তারপর তিনিই আমাকে নিয়োগ করেন জর্জ আব্রাহামের লস আলামোস সংক্রান্ত কম্পিউটার রেকর্ড নষ্ট করার জন্যে।’
‘তুমি জর্জ জুনিয়রের বন্ধু হিসেবে এই কথাগুলো সাজিয়েছ। তোমার বলার কি আছে? বল?’ বল জেনারেল শেরউড।
সাবা বেনগুরিয়ান কানে কানে জর্জ জুনিয়রের সাথে কথা বলল। জর্জ জুনিয়র সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। দুজনের মুখই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সাবা বেনগুরিয়ানই কথা বলল, ‘স্যার একটা ডকুমেন্ট বোধ হয় আমি আনতে পেরেছি। আমাদের বাড়ির চারদিকসহ গেট, গেটের পরের লন ও করিডোর এবং ড্রয়িং রুমে সার্বক্ষণিক ভিডিও ক্যামেরা পাতা আছে। আমার সাথে জেনারেল শ্যারন যেসব কথা বলেন এবং আমাকে ও আব্বাকে যখন জেনারেল শ্যারন অন্যত্র সরিয়ে নেবার প্রস্তাব করেন, তখন আব্বা ও জেনারেল শ্যারনের যে আলাপ হয়, তাতে জেনারেল শ্যারন বর্তমান বিপদ ও ভবিষ্যত নিয়ে অনেক কথা বলেন। আমি আড়াল থেকে শুনেছি। আমাকে ও আব্বাকে যখন তার লোকজন গিয়ে নিয়ে আসে তার আগেই আমি ভিডিও ক্যামেরার রীল বের করে নিয়ে নেই এবং আসার সময় গেটের দারোয়ানকে দিয়ে আসি জর্জ জুনিয়রকে দেবার জন্যে। ওটা জর্জের কাছে আছে।’
জেনারেল শেরউড ও আহমদ মুসা দুজনের মুখই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘শ্যারনের বন্দীখানায় ওরা সার্চ করে ওটা নিয়ে নেয়নি?’ বলল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ অনেকটা দ্রুত কন্ঠে। তার চোখে মুখে যেন কিছুটা অস্বস্তি।
‘খুব সাধারণ জায়গায় রেখেছিলাম। শুধু ওখানটায় ওদের সার্চ বাকি ছিল।’ বলল জর্জ জুনিয়র।
‘ধন্যবাদ জর্জ ও সাবা। একটা অতি ভাল খবর পাওয়া গেল। কিন্তু ভিডিওতো পরীক্ষা করা হয়নি?’ বলল জেনারেল শেরউড।
‘এখন পরীক্ষা করা যায় স্যার।’ বলল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ। তার কন্ঠে উৎকণ্ঠিত আগ্রহ।
‘না থাক।’ এ কথা বলে জেনারেল শেরউড একটু থামল। তারপর আবার বলল আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে, ‘মিঃ আহমদ মুসা, প্রমাণ সংগ্রহ সম্পর্কে আপনি কিছু ভাবছেন?’
‘মিস সাবার আব্বাকে যেখানে বন্দী করে রাখা হয়েছে, সে ঠিকানা মিস সাবা জানে। তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা গেলে সেটা একটা প্রমাণ হতে পারে।’
‘ঠিক। এ মিশন এই মুহূর্তেই আমরা হাতে নিতে পারি।’
এ সময় বেঞ্জামিন বেকন আহমদ মুসার কানে কানে কিছু বলল। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল জেনারেল শেরউডকে লক্ষ্য করে, ‘মিঃ জেনারেল, আরও একটা ডকুমেন্ট আমাদের হাতে আছে।’
‘কি সেটা?’ উদগ্রীব কন্ঠে বলল জেনারেল শেরউড।
‘সে টেপটা এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। টেপটা জেনারেল শ্যারন ও জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটা রেকর্ড।’
ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল জেনারেল শেরউডের। ‘সত্যি সে রেকর্ড আপনাদের কাছে আছে? কিন্তু কোথায় পেলেন সেটা? আপনি তো আমাদের সাথেই এলেন।’
আহমদ মুসা বেঞ্জামিন বেকনের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘ইনিই আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছেন। টেপটা এরই সংগ্রহ।’
‘ও, হো! ওর সাথে পরিচয় তো হয়নি।’
বলে বেঞ্জামিন বেকনের দিকে জেনারেল শেরউড হাত বাড়িয়ে বলল, ‘হ্যাল্লো।’
আহমদ মুসা কথা বলে উঠল বেঞ্জামিন বেকনের আগে। বলল, ‘ওর পরিচয়টা একটু বিদ্ঘুটে। ওর পরিচয়টা পরে হবে মিঃ জেনারেল।’
হাসল জেনারেল শেরউড। বলল, ‘একবার কথাটা উঠার পর পরিচয়টা হয়ে যাওয়াই সব দিক থেকে শোভন নয় কি আহমদ মুসা?’
‘ঠিক বলেছেন জেনারেল।’
বলে আহমদ মুসা বেঞ্জামিন বেকনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর বলল, ‘ইনি এফ.বি.এই-এর অফিসার বেঞ্জামিন বেকন। ছুটিতে আছেন। তার আরেকটা পরিচয় তিনি ‘ফ্রি আমেরিকা’ সংগঠনের সদস্য।’
জেনারেল শেরউড উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল বেঞ্জামিন বেকনের সাথে।
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ বেঞ্জামিনের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়ল। উঠল না। তার চোখে মুখে একটা ভাবান্তর।
জেনারেল শেরউড তার ডান দিকের লাল টেলিফোনে হাত রেখে বলল, ‘মাফ করুন আপনারা, আমি একটু চীফ জেনারেল স্যারের সাথে কথা বলে নেই। আমার মনে হয় কোন কাজেই এখন আর এক মুহূর্ত দেরী করা ঠিক নয়। তাঁর সাথে এখনি সাক্ষাৎ হওয়া দরকার।’
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ বলে উঠল, ‘স্যার, আমি কি একটু উঠতে পারী? পাঁচ মিনিট পর আসব।’
‘এস। চীফ স্যার তোমাকে উপস্থিত চাইতে পারেন।’
‘আসছি স্যার।’ বলে উঠে দাঁড়াল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ।
ব্রিগেডিয়ার স্টিভ বেরিয়ে যেতেই আহমদ মুসা দ্রুত জেনারেল শেরউডকে বলল, ‘মাফ করুন জেনারেল, আপনাদের টেলিফোন মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চয় আছে?’
‘আছে। কেন?’ উৎসুক কন্ঠ জেনারেল শেরউডের।
‘এই মুহূর্ত থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত আপনার এ বিভাগ থেকে যতগুলো টেলিফোন বাইরে যাবে, তা মনিটর করুন।’
‘কেন?’
‘আমার মনে হচ্ছে, কতকগুলো সিক্রেট কথা এ সময় বাইরে পাচার হবে।’
ভ্রু কুঁচকে উঠল জেনারেল শেরউডের। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘আমি আপনার ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছি মিঃ আহমদ মুসা।’ তার কন্ঠে উত্তেজনা।
জেনারেল শেরউড দ্রুত উঠে পেছনের দরজা দিয়ে পাশের কক্ষে প্রবেশ করল।
বেঞ্জামিন বেকন, জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান সবার দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। তারা সবাই অবাক হয়েছে। কিন্তু সবাই নিরব।
আহমদ মুসাই কথা বলল, ‘জর্জ জুনিয়র, আমি জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত।’
‘আব্বা নিশ্চয় বাসায় ফিরেছেন। বাসাতেও নিরাপদ নন?’ বলল জর্জ জুনিয়র।
‘বাসাতে পাহারা এখনো থাকবে নিশ্চয়।’
‘তা থাকার কথা। সাসপেন্ড তো চাকরীচ্যুতি নয়।’
তাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিছু সময় পর ঘরে প্রবেশ করল জেনারেল শেরউড। তার মুখ গম্ভীর। ভীষণ এক নিম্নচাপের লক্ষণ। চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা।’
ঘরে প্রবেশ করল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ।
জেনারেল শেরউডের মুখটা যেন আরও কঠোর হয়ে উঠল। ব্রিগেডিয়ার স্টিভের দিকে না তাকিয়েই জেনারেল শেরউড বলল, ‘তোমার টেলিফোন ঠিক পাঁচ মিনিটেই শেষ করেছ স্টিভ।’ ব্রিগেডিয়ার স্টিভ ভূত দেখার মত চমকে উঠল। হঠাৎ তার মুখে যেন এক পোঁচ কালি কেউ ঢেলে দিল।
ঘরে প্রবেশ করল দুজন মিলিটারী পুলিশ।
সবাই তাকাল দুজন মিলিটারী পুলিশের দিকে। ব্রিগেডিয়ার স্টিভও। তার চোখে মুখে তখন চাঞ্চল্য।
দুজন মিলিটারী পুলিশ পা ঠুকে স্যালুট করল জেনারেল শেরউডকে।
‘ব্রিগেডিয়ার স্টিভকে গ্রেফতার কর।’ পুলিশ দুজনের দিকে একবার মাথা তুলে তাকিয়েই নির্দেশ দিল জেনারেল শেরউড। বজ্রপাতের মতই তার কন্ঠ স্থির, তীব্র।
উঠে দাঁড়িয়েছিল ব্রিগেডিয়ার স্টিভ। তার মুখ ফ্যাঁকাশে হয়ে গিয়েছিল। কাঁপছিল যেন সে। নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করে বলল, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমার অপরাধ কি স্যার?’
‘যথা সময়ে মিলিটারী ট্রাইবুন্যালই তোমাকে জানাবে ব্রিগেডিয়ার স্টিভ।’ কঠোর কন্ঠ জেনারেল শেরউডের।
মিলিটারী পুলিশ দুজন ব্রিগেডিয়ার স্টিভের দুহাতে হাতকড়া লাগিয়ে তাকে নিয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
ঘরে তখন পিনপতন নিরবতা। একমাত্র আহমদ মুসা ছাড়া অন্য সকলেই বিস্ময়-বিমূঢ়।
নিরবতা ভাঙল জেনারেল শেরউড। বলল, ‘আবার আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি আহমদ মুসা। এক বিশ্বাসঘাতককে আপনি ধরিয়ে দিয়েছেন।’
বলে একটু থামল। চেয়ারটা একটু টেনে নিয়ে নড়ে-চড়ে বসল। বলল, ‘বলুন তো ব্রিগেডিয়ার স্টিভকে কখন কিভাবে সন্দেহ হলো? তাকে কি আগে থেকে চিনতেন?’
‘না, চিনতাম না। কিছুক্ষণ আগে আজই প্রথম দেখা তার সাথে।’
বলে থামল আহমদ মুসা। একটু হাসল। বলল, ‘ঘটনা হয়তো বড় তেমন কিছু নয়। কিন্তু যা ঘটেছে তাতেই আমার নিশ্চিত বিশ্বাস হয়েছে, ব্রিগেডিয়ারের আরেকটা পরিচয় আছে।’
‘কি সে ঘটনা?’
‘প্রথমে তার হাতের সোনার আংটি আমার চোখে পড়ে। আংটিতে একটি হিব্রু অক্ষর খোদাই করা। সেটা জেনারেল শ্যারনের আদ্যাক্ষর। প্রথম সন্দেহ আমার সৃষ্টি হয় এখান থেকেই। ইহুদী ছাড়া অথবা ইহুদীদের প্রতি বড় রকমের ভালবাসা ছাড়া কারও মধ্যে এই হিব্রু প্রীতি থাকা সম্ভব নয়। আর ………’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে জেনারেল শেরউড বলে উঠল, ‘মিঃ আহমদ মুসা, তার হাতের আংটি আমারও চোখে পড়েছে। চারদিকে হীরক খচিত তার আংটির প্রশংসা পর্যন্ত আমি করেছি। কিন্তু হিব্রু অক্ষর তো আমি খেয়াল করিনি।’
‘হিব্রু অক্ষর আরবী ক্যালিওগ্রাফিক ঢংয়ে লেখা। খুব ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা খুব কঠিন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ। তারপর বলুন।’ জেনারেল শেরউড বলল।
‘দ্বিতীয় সন্দেহ হয় তার একটা টেলিফোন থেকে। আমাদের ঘটনা শোনার পর তিনি আপনার কাছে টেলিফোন করেন। কিন্তু তার আগে আরও এক জায়গায় টেলিফোন করেন তিনি। সে টেলিফোন নাম্বার আমাকে বিস্মিত করে। সন্দেহটাকে দৃঢ় করে। টেলিফোন নাম্বারটা পেন্টাগনের নয়, কিংবা নয় প্রেসিডেন্ট ভবনেরও। টেলিফোনে তিনি নিজের নাম বলেননি। যার কাছে করেছিলেন তাকে নাম ধরে সম্বোধনও করেননি। আমাদের ঘটনা এবং জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ানের বিষয়ে যে সব তথ্য টেলিফোনে জানালেন, তা অনেকটা সাংকেতিক ধরণের। যা খুবই অস্বাভাবিক।’
‘মিঃ আহমদ মুসা, টেলিফোন নাম্বারটা কি এই?’ বলে একটা টেলিফোন নাম্বার বলল জেনারেল শেরউড।
আহমদ মুসা মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ এটাই সেই নাম্বার।’
‘জানেন, কার নাম্বার এটা?’
‘না।’
‘নাম্বারটা ‘আমেরিকান জুইস পিপললস লীগ’ (AJPL)-এর সভাপতির নাম্বার। মাঝে মাঝে জেনারেল শ্যারনও এ টেলিফোনে কথা বলেন।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, তাহলে তো আমাদের হাতে আরেকটা বড় প্রমাণ জুটল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আপনার আহমদ মুসা। আপনার অদ্ভূত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। একজন বিশ্বাসঘাতককে ধরিয়ে দিয়েছেন এবং শত্রুর হাতে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য পাচার বন্ধ করতেও সাহায্য করেছেন।’
‘কেন, টেলিফোন উনি করতে পারেননি?’
‘উনি জানেন টেলিফোন তিনি করেছেন, কিন্তু তার কথার একটা শব্দও বাইরে যায়নি। আমাদের সুপার সেনসেটিভ গ্রাহক যন্ত্র ও ব্লকড সিস্টেম তার মোবাইলের প্রতিটি বর্ণ রেডিও ওয়েভ থেকে শুষে নিয়েছে।’
‘ধন্যবাদ মিঃ জেনারেল। তথ্যগুলো ইহুদীদের হাতে পড়লে তারা আত্মরক্ষার সুযোগ পেত। সে সুযোগ আপনি তাদের দেননি।’
‘আমি কি করলাম। আপনি যা বললেন আমি তো শুধু সেটুকুই করেছি। আচ্ছা বলুন তো, পাঁচ মিনিটের জন্য ব্রিগেডিয়ার স্টিভ বাইরে যাচ্ছেন টেলিফোন করার জন্যে এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত হলেন কি করে?’ জেনারেল শেরউড বলল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বিশ্বাসঘাতকদের সাইকোলজী হলো, বিশ্বাসঘাতকতার কাজ তারা প্রথম সুযোগেই করে থাকে।’
‘ধন্যবাদ মিঃ আহমদ মুসা।’
বলে একটু থামল জেনারেল শেরউড। একটু ভাবল। বলল, ‘আমি চীফ স্যারের সাথে এখনই এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। তার আগে আসুন আমরা মিস সাবার বাসার ভিডিও এবং জেনারেল হ্যামিল্টন ও জেনারেল শ্যারনের কথোপকথনের ভিডিও দেখি। ব্রিগেডিয়ার স্টিভের টেলিফোন রেকর্ডও আপনারা শুনবেন।’
কথা শেষ করেই জেনারেল শেরউড উঠে দাঁড়াল এবং পাশের কক্ষে চলে গেল। একটু পরেই সবাইকে ডেকে নিল জেনারেল শেরউড। প্রবেশ করল পাশের ঘরে।
ঘরটি বেশ বড়। নানা যন্ত্রপাতিতে ঠাসা। বিভিন্ন টেবিলে অনেকগুলো চেয়ার।
চেয়ারগুলোকে ঘরের মাঝখানে সাজানো হয়েছে। সামনে একটা বড় কম্পিউটার স্ক্রীন। সাজানো-গোছানো একটা ড্রয়িং রুমের দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
আহমদ মুসারা সবাই বসল।
‘প্রথমে সাবা বেনগুরিয়ানের ভিডিও ফিল্ম দেখানো হচ্ছে।’
শুরু হলো ভিডিও ফিল্মের প্রদর্শন।

মার্কিন সশস্ত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটনের বিশাল কনফারেন্স কক্ষ।
একটা গোল টেবিলের একপাশে একপাশে বসেছেন মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান রোনাল্ড ওয়াশিংটন। তার ডান পাশে বসেছে এ্যালাইড কমান্ড কমিটির দুজন সদস্য বিমান ও নৌ বাহিনী প্রধান। আর তার বাম পাশে বসেছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদ্বয়।
গোল টেবিলের অন্যপাশে বসেছে আহমদ মুসা, বেঞ্জামিন বেকন, জর্জ জুনিয়র ও সাবা বেনগুরিয়ান।
সভার শুরুতেই জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন বলেন, ‘কতিপয় ঘটনা আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একটা সংকটের সৃষ্টি করেছে। সবুজ পাহাড় থেকে লস আলামোসের সুপার সেনসেটিভ কম্পিউটার কক্ষ পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটা যদি ইহুদীদের গোয়েন্দা সুড়ঙ্গ হয়, তাহলে এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের এক মহাদূর্ঘটনা। আবার এটা কোন আপতকালীন গোপন বহিরাগমন পথ কিনা? তারপর আমাদের নিরাপত্তা গোয়েন্দা কমিটির সদস্যরা ফেরার সময় লস আলামোস থেকে সান্তাফে বিমান বন্দর পর্যন্ত হামলা, হত্যাকান্ড ও বিমান ধংসের যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, তা কারা কোন উদ্যেশ্যে ঘটিয়েছে? এ সবের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সরকারের কাছে এসেছে, তার কোনটি সত্য? তাছাড়া সাবা বেনগুরিয়ান ও জর্জ জুনিয়রকে কারা কেন কিডন্যাপ করেছিল? সাবা বেনগুরিয়ানের পিতাকে কারা কিডন্যাপ করেছে এবং কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রয়োজন। সাবা বেনগুরিয়ান ও তার পিতার ঘটনাটি ছাড়া অন্য সব বিষয়ের বিবরণ সরকার ও আমাদের কাছে রয়েছে। প্রশ্নগুলোর একটা ব্যাখ্যা সরকারের কাছে রয়েছে। যার ফলে এফ.বি.আই ও সি.আই.এ চীফ বরখাস্ত হওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। সত্য তিক্ত হলেও সত্য সত্যই। কিন্তু মিঃ আহমদ মুসা ও মিঃ জর্জদের কাছ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও দলিল এসেছে। যা সরকারের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে। সব চেয়ে বড় কথা এই সত্য উদ্ঘাটনে আমাদের রাষ্ট্র উপকৃত হবে সবচেয়ে বেশি। এই চিন্তা করেই আমি আপনাদেরকে আমার এ্যালাইড কমান্ড কমিটির সামনে হাজির করেছি। সত্য উদ্ঘাটনে আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। তাতে আমরা লাভবান হবো এবং আহমদ মুসা আপনিও লাভবান হবেন। অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন।’ কথাগুলো বললেন জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন আহমদ মুসাদের লক্ষ্য করে শান্ত ও গম্ভীর কন্ঠে।
উত্তরে আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ জেনারেল ওয়াশিংটন। আমি নিজেকে অভিযোগ থেকে বাঁচানোর চাইতে মার্কিন জনগণের চোখের উপর থেকে অন্ধত্বের কালোপর্দা ছিঁড়ে ফেলতে চাই। আমাদেরকে এ সুযোগ দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ।’
জেনারেল ওয়াশিংটন ও তার টিমের অন্যান্য সদস্যদের চোখে মুখে অস্বস্তির একটা ছায়া নেমে এল। জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন বলে উঠলেন, ‘মন্তব্য একটু কঠোর হলো না মিঃ আহমদ মুসা? মার্কিন জনগণ স্বাধীন ও স্বনির্ভর, তারা অন্ধ নয়। আর তারা তাদের রক্ষা করতে সমর্থও।’ জেনারেল ওয়াশিংটনের কন্ঠে কিছুটা সামরিক রুক্ষতা।
কিন্তু আহমদ মুসার চোখে মুখে কোনই ভাবান্তর এল না। বলল, ‘আমি দুঃখিত জেনারেল। গণতান্ত্রিক দেশে সরকার যদি জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্যে হয়, তাহলে সরকারের অন্ধত্ব জনগণের অন্ধত্ব হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তাই হয়েছে। বাইরে কোন স্থান থেকে লস আলামোস পর্যন্ত সুড়ঙ্গ আবিষ্কার হওয়ার মত মারাত্মক ঘটনা ঘটার পর সেখানে গিয়ে এফ.বি.আই, সি.আই.এ ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি যে প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠাল তা শুধু উপেক্ষা নয়, সেই শীর্ষ ব্যক্তিদের দুজনকে বরখাস্ত করা হলো তারা ফেরার আগে এবং তাদের কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই। কোন গণতান্ত্রিক সরকার অন্ধ না হলে, জনগনকে অন্ধ মনে না করলে এই ধরণের পদক্ষেপ নিতে পারে না।’
‘আমি এ সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবো না।’
বলে একটু হাসল জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন। তারপর বলল, ‘সময় নষ্ট না করে আসুন আমরা কাজের কথায় আসি। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন আপনি?’
‘পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আপনাদের কাছে আছে। আপনারা জানেন সবকিছু। এখন আপনাদের প্রয়োজন প্রশ্নগুলোর জবাব। আমি মনে করি অধিকাংশ প্রশ্নের জবাব আপনারা পেয়ে যাবেন সাবা বেনগুরিয়ানের বাসার এবং জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন ও জেনারেল শ্যারনের কথোপকথোনের টেপ থেকে। যদি কিছু বাকি থাকে, আমরা সাহায্য করব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ মিঃ আহমদ মুসা।’
বলে জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন জেনারেল শেরউডের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘শুরু কর তাহলে শেরউড।’ তাদের গোল টেবিলের পাশেই একটা ট্রলিতে বড় একটা কম্পিউটার।
জেনারেল শেরউড রিমোট প্লেয়ার হাতে নিয়ে তার কীতে চাপ দিল। বিশাল কম্পিউটারের স্ক্রীনে একটা ড্রয়িং রুমের দৃশ্য ফুটে উঠল।
‘আমরা সাবা বেনগুরিয়ানদের ভিডিও থেকে শুরু করছি। আমরা দেখছি সাবা বেনগুরিয়ানদের বৈঠক খানার দৃশ্য।’ বলল জেনারেল শেরউড।
শুরু হল ভিডিও শো।
জেনারেলদের দৃষ্টি ধীরে ধীরে আঠার মত লেগে গেল কম্পিউটার স্ক্রীনে।
তাদের চোখে কখনও বিস্ময়, কখনও উদ্বেগ। পাথরের মত নিশ্চল বসে তারা। দুটি ভিডিও টেপেরই প্রদর্শন শেষ হলো। কিন্তু জেনারেলদের চোখ কম্পিউটার স্ক্রীন থেকে সরেনি। গভীর বিস্ময় ও উদ্বেগ তাদের চোখে মুখে।
ধীরে ধীরে জেনারেলরা চেয়ারে হেলান দিল। নিচু হলো তাদের মুখ।
জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন সামনের গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে পানি পান করল, নড়ে চড়ে বসল সে।
তারপর তার দুপাশের জেনারেলদের সাথে ফিস ফিসে কন্ঠে কিছু পরামর্শ করল এবং তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আপনাকে আমাদের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে, আমার জাতির পক্ষ থেকেও।’ আবেগপূর্ণ গম্ভীর কন্ঠ জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটনের।
বলে মুহূর্তকালের জন্যে একটু থেমে আবার বলল, ‘আমার কোন জিজ্ঞাসা নেই আহমদ মুসা। ঘটনার যে বিবরণ আমাদের কাছে আছে, যেসব তথ্য আমরা পেয়েছি এবং যে জীবন্ত ডকুমেন্ট আমরা দেখলাম, তাতে আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন আপাতত নেই। আমরা প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করছি। আমাদের অনুরোধ প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করা ও এর রেজাল্ট পর্যন্ত আপনারা আমাদের সাথে থাকুন। পেন্টাগনের অতিথি ভবনে আপনারা আমাদের মেহমান।’
‘ধন্যবাদ জেনারেল। আমি তিনটি বষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করব। লস আলামোসে গোয়েন্দাগিরীর তদন্ত তো হবেই। কিন্তু তার সাথে ‘খন্ড জ্যামিং টেকনোলজি’ এবং ‘ডিটেক্টর-নিউট্রাল জ্যাকেট মোড়া বোমা’ তারা কিভাবে সংগ্রহ করল বা তৈরী করল তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এবং অবিলম্বে সাবা বেনগুরিয়ানের আব্বা আইজ্যাক বেনগুরিয়ান-কে উদ্ধার করা দরকার। তিনি একটা বড় প্রমাণ হতে পারেন। আরও একটা বড় বিষয় আছে মিঃ জেনারেল। কথা উঠতে পারে লস আলামোসের সবুজ পাহাড় সুড়ঙ্গটি গোপন সুড়ঙ্গ নয়, ওটা লস আলামোসের গোপন একটা ইমারজেন্সী এক্সিট সুড়ঙ্গ। কিন্তু আমরা প্রমাণ করব লস আলামোস প্রতিষ্ঠার অনেক পরে ইহুদী বৈজ্ঞানিক জন জ্যাকবের আমলে তার তৈরী গোয়েন্দা সুড়ঙ্গ এটা। এজন্যে সুড়ঙ্গের পাথর ও মাটির কার্বন টেষ্টের একটা দলিল আপনার হাতে থাকতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে। এ তিনটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অবিলম্বে কাজ শুরু করছি।’
একটু থেমে সবার দিকে চেয়ে বলল, ‘তাহলে আমরা এবার উঠতে পারি।’
জেনারেল রোনাল্ড ওয়াশিংটন উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল অন্য সবাই।
‘জেনারেল শেরউড তুমি মেহমানদের নিয়ে যাও। তাঁদের সব ব্যবস্থা কর।’
বলে জেনারেল ওয়াশিংটন হাত বাড়াল আহমদ মুসার দিকে। একে একে সে হ্যান্ডশেক করল জর্জ জুনিয়র, সাবা বেনগুরিয়ান এবং বেঞ্জামিন বেকনের সাথে। বেঞ্জামিনের সাথে হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে বলল, ‘ইয়ংম্যান তোমার সাথে হ্যান্ডশেক করছি ‘ফ্রি আমেরিকা’র একজন হিরো হিসেবে, তোমাকে এফ.বি.আই-এর সদস্য এই মুহূর্তে মনে করছি না।’
‘ধন্যবাদ স্যার। ‘ফ্রি আমেরিকা’ সবার সহযোগিতা চায়। বিশেষ করে আপনাদের।’
‘এই তো সহযোগিতা করছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল।