২৯. আমেরিকায় আরেক যুদ্ধ

চ্যাপ্টার

‘প্রসিডেন্ট বলতে গেলে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন।’ বলল জেনারেল শ্যারন। কান্নার মত ভেজা কন্ঠস্বর তার। ক্ষোভে-দুঃখে বিধ্বস্ত তার মুখ মন্ডল।
জেনারেল শ্যারন যাদের লক্ষ্য করে কথাগুলো বলল, তাদের সবার মুখ নিচু। ভাবনার দুর্বহ ভারে ঝুলে পড়েছে যেন সবার মাথা।
ওয়াশিংটনের বাইরে নির্জন এলাকার একটা বিশাল বাড়ির সাউন্ড প্রুফ ঘরে কাউন্সিল অব আমেরিকান জুইস এ্যাসোসিয়েশনস এবং আমেরিকান জুইস পিপলস লীগের নির্বাহী কমিটির যৌথ অধিবেশন বসেছে। আমেরিকান ইহুদীদের সব মাথাই এখানে হাজির। যাদের মধ্যে রাজনীতিক, শিল্পপতি, সাংবাদিক, কূটনীতিক, আমলা, আইনজীবী সব ধরনের লোক রয়েছে।
জেনারেল শ্যারন থামতেই একজন বলে উঠল, ‘যুদ্ধটা কি, দয়া করে সবাইকে বলুন।’
‘পূর্ব তথ্য সবই আপনারা জানেন। নতুন মারাত্মক যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো আমাদের চেষ্টায় আমাদের চরম বৈরী হয়ে ওঠা এফ.বি.আই চীফ ও সি.আই.এ চীফকে বরখাস্ত করেছিলেন প্রেসিডেন্ট, কিন্তু এই দুজনকে আবার পুনরবহাল করা হয়েছে। সেই সাথে প্রেসিডেন্টের কাছে পৌছার আমাদের প্রধান অবলম্বন প্রসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল হ্যামিল্টনকে পদচ্যুত করা হয়েছে। এরপরই এফ.বি.আই ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমাদের উপর। আমাদের একটা অফিস তারা ধ্বংস করেছে। আমাদের নয়জন লোককে তারা হত্যা করেছে, জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। গ্রেফতারের জন্যে আমাকে তাড়া করে ফিরছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, আমেরিকান ইহুদী কম্যুনিটির বিরুদ্ধে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দাঁড় করাচ্ছে। যে মামলার আসামী হবেন বিজ্ঞানী জন জ্যাকব থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য ইহুদী নেতৃবৃন্দ। এই ষড়যন্ত্র মামলার কাহিনী প্রচার হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকানদের ক্ষোভ, ক্রোধ গিয়ে আছড়ে পড়বে ইহুদীদের উপর।’ থামল জেনারেল শ্যারন।
সংগে সংগেই একজন যুবক উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘এমন ষড়যন্ত্র মামলায় সুযোগ আমরা কেন দিলাম। এই গোয়েন্দাবৃত্তি কি অপরিহার্য ছিল?’
তার কথা শেষ হতেই প্রধান গোছের কয়েকজন উঠে দাঁড়াল। সমস্বরে বলে উঠল, ‘আমাদের এই যুবক বন্ধু জাতির ইতিহাস জানেন না। যাকে গোয়েন্দাবৃত্তি বলছেন, তারও ইতিহাস জানেন না।’
কাউন্সিল অব জুইস এ্যাসোসিয়েশনসের সভাপতি এবং অনুষ্ঠানের সভাপতি ডেভিড উইলিয়াম জোনস বলে উঠল, ‘আপনারা একজন কথা বলুন।’
সবাই বসল। কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকল তাদের মধ্যে প্রবীণতম একজন। নিউইয়র্ক অঞ্চলের সভাপতি সে। বলল, ‘আমাদের যুবক বন্ধু যাকে ষড়যন্ত্র বলেছেন, তা ষড়যন্ত্র নয় আমাদের বাঁচার মূলমন্ত্র। এই মূলমন্ত্রই আমাদেরকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শক্তি মার্কিন-জীবনের কেন্দ্র বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। একে ষড়যন্ত্র বললে বিজ্ঞানী জন জ্যাকবকে ষড়যন্ত্রকারী বলতে হয়। কিন্তু জন জ্যাকব তো আমাদের জাতীয় বীর। তিনি তাঁর গোটা জীবনকে তিল তিল করে জাতির জন্যে বিলিয়ে গেছেন।’ থামল বৃদ্ধ।
যুবকটি উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি দুঃখিত।’ গম্ভীর কন্ঠে কথাটি বলেই সে বসে পড়ল।
আবার কথা শুরু হলো। এবার কথা বললো সভা সভাপতি ডেভিড উইলিয়াম জোনস। বলল, ‘অপ্রয়োজনীয় কথা বলার সুযোগ এখন নেই। আজ যে পরিস্থিতির আমরা মুখোমুখি সবার কাছে তা পরিষ্কার। অন্য কোন কথা নয়, সবাই বলুন এখন কি করণীয়। এটাই আজকের একমাত্র এজেন্ডা।’
ডেভিড উইলিয়াম জোনস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি ব্যাংকার, শিল্পপতি এবং মিডিয়া জায়ান্ট।
তার কথা শেষ হতেই আমেরিকান জুইস পিপলস লীগের সভাপতি কথা বলে উঠল। বলল, ‘করণীয় নিয়েও বড় আলোচনার দরকার নেই। করনীয় আমাদের একটাই। সেটা হলো, মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে আমাদের যারা আছেন এবং যারা আমাদের হতে পারেন, তাদের সকলকেই সক্রিয় ও সোচ্চার করে তুলতে হবে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের নেতা যারা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল সেইসব নেতাদের পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে। চারদিক থেকে শ্লোগান তুলতে হবে, প্রেসিডেন্ট মৌলবাদীদের পেট্রোডলারে বিক্রি হয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্টের যে গোপন ফাইল আমরা সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করছি, তার ভিত্তিতে তিনি অনৈতিক কাজের সাথেও জড়িত তা প্রমাণ করতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এইভাবে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যাতে তাকে ‘ইমপীস’ করা যায়। আর এই সব কাজে আমাদের অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং মানষকে বশিভূত করার যত অস্ত্র আছে সব কাজে লাগাতে হবে। আর আমাদের এই কাজের একটা প্রধান ও প্রথম কাজ হবে যেকোন মূল্যে আহমদ মুসাকে শেষ করে দেয়া। সেই আজ আমাদের সকল দুর্গতির মূল। তাকে শেষ করা গেলে আমেরিকায় আমাদের অন্য কাজগুলো আরও সহজ হয়ে যাবে।’
আমেরিকান জুইস পিপলস লীগের সভাপতি থামতেই সভার সভাপতি ডেভিড জোনস তাকে ধন্যবাদ দিল এবং সবাইকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনারা সকলে তাঁর কথার সাথে একমত?’
সংগে সংগে সবাই দুই হাত তুলে তাদের সমর্থন ও শপথের কথা জানাল।
হাসি ফুটে উঠল ডেভিড জোনসের মুখে এবং জেনারেল শ্যারনের মুখেও।
‘তাহলে সিদ্ধান্ত আমাদের হয়ে গেল। আমরা এখনকার মত উঠছি।’ বলল ডেভিড জোনস।
কথাটা শেষ করেই ডেভিড জোনস জেনারেল শ্যারনের দিকে ফিরে বলল, ‘মিঃ জেনারেল, বিভিন্ন মার্কিন গ্রুপের এ সময় আমাদের সমর্থন দরকার। হোয়াইট ঈগলের প্রধান গোল্ড ওয়াটার তো আপনার বন্ধু। তার মাধ্যমে হোয়াইট ঈগলকে কাজে লাগাবার ব্যবস্থা করুন।’
মুখটা ম্লান হয়ে গেল জেনারেল শ্যারনের। বলল, ‘তিনি আমার বন্ধু ছিলেন, কিন্তু এখন মনে হয় আর নেই। লস আলামোসের ঘটনা জানার পর তিনি বেঁকে বসেছেন। আমি তার সাহায্য চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, দেখুন আমি আমেরিকান বলেই হোয়াইট ঈগল করি। আমেরিকান হিসাবে দায়িত্বই আমার কাছে এক নম্বর।’ থামল জেনারেল শ্যারন।
‘কেন সে তো টাকার পাগল। তাকে দিন না কয়েক মিলিয়ন ডলার। দেখবেন কাত হয়ে গেছে।’
‘পরোক্ষ ভাবে তাকে আমি পরখ করেছি। তিনি বলেছেন, টাকা তার দরকার হোয়াইট ঈগলের জন্যে। আর হোয়াইট ঈগল আমেরিকার জন্যে। অতএব তার টাকা দরকার আমেরিকার জন্যে। আমেরিকার ক্ষতি করে কোন টাকা তার চাই না।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ডেভিড জোনস। বলল, ‘এই নীতিবাগিশতা আমাদের জন্যে একটা বড় বিপদ। বস্তুবাদকে এত উপরে তোলার পরেও এই নীতিবোধ অধিকাংশ আমেরিকানদের মধ্যে থেকে দূর করা যায়নি।’ থামল ডেভিড জোনস।
জেনারেল শ্যারনও কোন কথা বলল না। ভাবছিল সেও। দুজনের চোখেই তখন একটা ছবি ভাসছে। ভবিষ্যতের একটা ছবি। আমেরিকান এই নীতিবোধ ও প্যাট্রিওটিজমের বিরুদ্ধে তাদের বাঁচার এই যে লড়াই তার ভবিষ্যত কি?
প্রশ্নটি ভীতিকর আকারে জ্বল জ্বল করে উঠল তাদের চোখের সামনে। কিন্তু তার কোন উত্তর স্পষ্ট হয়ে উঠলো না।
একটা ভাবনা তাদের সামনে এখন প্রকট , কলম্বাসরা একদিন যাকে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বলেছিল, সেটা কি ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ই হয়ে দাঁড়াবে, না একে তারা তাদের আরেক ‘প্রমিজড ল্যান্ড’-এ পরিণত করতে পারবে?

পরবর্তী বই
এক নিউ ওয়ার্ল্ড