৩৩. সুরিনামের সংকটে

চ্যাপ্টার

চারটি গাড়িই ছুটে চলল রিং রোডের দিকে।
সামনের দুটি গাড়ি পুলিশের। পেছনে দুটির একটিতে আহমদ মুসা ও আহমদ হাত্তারা, অপরটিতে আহমদ হাত্তার নিজস্ব নিরাপত্তা প্রহরী।
পুলিশের দুগাড়ির একটি ছয় সিটের জীপ। এই গাড়িতেই ডিএসপি সাহেব রয়েছে। ডিএসপি ছাড়াও রয়েছে একজন ড্রাইভার ও চারজন পুলিশ।
এ জীপের পেছনেই রয়েছে পুলিশের দ্বিতীয় গাড়ি। ক্যারিয়ার শ্রেণীর। পেছনটা খোলা। এতে রয়েছে আটজন পুলিশ।
পুলিশের এই ক্যারিয়ারের তুলনায় আহমদ মুসার কারটা খুবই ছোট দেখাচ্ছে।
আহমদ মুসা তার কারটা ক্যারিয়ার থেকে বেশ পেছনে রেখে চালাচ্ছে, যাতে সামনের দিকটা একটু ওয়াইডভাবে দেখা যায়।
নিঃশব্দে চলছে গাড়ি। গাড়ির ভেতরেও কোন কথা নেই।
এক সময় কথা বলে উঠল আহমদ হাত্তা। বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, সবার সামনে প্রাণ খুলে আপনাকে ধন্যবাদ দিতে পারিনি। ভেবেছিলাম মহান ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরব, তাও পারিনি। আল্লাহ আপনার মাধ্যমে এবার শুধু আমাকে নয়, গাড়িশুদ্ধ লোককে মর্মান্তিক মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করলেন। অথচ খুব ছোট্ট একটা ঘটনা, আমার একজন লোককে গাড়ির দিকে চোখ রাখতে বলে গিয়েছিলেন। এই ছোট কাজটাই পরে পর্বত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল। একেই বলে সত্যিকার দূরদৃষ্টি। তারপর ফটো-সাংবাদিকের কাজকে আপনি যে দৃষ্টিতে দেখেছেন, সেটাও এক অসাধারণ সূক্ষ দৃষ্টির ব্যাপার। এই দূরদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি কিভাবে আমরা অর্জন করতে পারি আহমদ মুসা?’
‘এ কথার দ্বারা আপনি বলতে চাচ্ছেন, এ গুণগুলো আপনার নেই। আল্লাহ এ গুণগুলো আপনাকে দেন নি। আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ কি আনা যায়?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না না, মি. আহমদ মুসা, কথাটা আমি এ অর্থে বলিনি। আমি বুঝাতে চেয়েছি, আপনার মাথায় যা এসেছে, আমাদের মাথায় তা আসেনি। কিভাবে তা আনা যায়’। শশব্যস্তে বলল আহমদ হাত্তা।
‘মি. আহমদ হাত্তা মানুষের দেহ-মন-মগজ আল্লাহর দেয়া অসীম শক্তির ভান্ডার, এ ভান্ডার থেকে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতগুলো বের করে আনতে হয় চেষ্টার মাধ্যমে। জিমন্যাস্টদের দেখে আমরা বিষ্মিত হই, রাবারের মত এমন ইলাস্টিক দেহ তারা কিভাবে তৈরী করল। বডি বিল্ডারদের দেখে আমরা অবাক হই, লোহার মত পেশীওয়ালা এমন শরীর তারা গড়ল কি করে? এসব কিন্তু আকষ্মিকভাবে পেয়ে যায়নি। চেষ্টার মাধ্যমেই অর্জন করেছে। জ্ঞান-বুদ্ধির ক্ষেত্রেও এই একই কথা। চর্চার মাধ্যমে জ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে হয়। নিজেদের মধ্যে যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা খুঁজে বের করা জ্ঞান চর্চারই একটা অংশ। মি. আহমদ হাত্তা, আপনি কি কোনদিন একান্তে বসে নিজের ভেতরের দিকে চোখ ফেলে খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছেন যে, আল্লাহ কি কি শক্তি সম্পদে আপনাকে সজ্জিত করেছেন? এ শক্তি-সম্পদকে কি আপনি চর্চায় আনার চেষ্টা করেছেন?’
‘স্যরি আহমদ মুসা, নিজেকে কোনদিন আমি এ দৃষ্টিতে দেখিইনি’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘আসলে মি. আহমদ হাত্তা, আল্লাহ আমাদেরকে কি দিয়েছেন, আল্লাহ আমাদের কাছে কি চান, এ মূল বিষয়টাই আমরা জানি না। আমাদের ব্যর্থতার যাত্রা শুরু এখান থেকেই’। বলল আহমদ মুসা।
‘স্যরি মি. আহমদ মুসা, এমন ধরনের ভাবনাও যে আছে, এমন ধরনের ভাবনা যে জীবনের জন্যে অপরিহার্য্য, এ বোধই তো কোনদিন আমার মধ্যে জাগেনি। এখান থেকেই প্রশ্ন জাগে আহমদ মুসা, জীবন সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই জীবন জিজ্ঞাসার অনুভূতি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে কিভাবে? সবাইকে কি দর্শন পড়তে হবে?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মি. হাত্তা, গোটা কুরআন শরীফ কি অর্থসহ পড়েছেন?’ অন্ততঃ মূল হাদিস গ্রন্থগুলো কি পড়েছেন? কুরআন ও হদিসের ভিত্তিতে যে বিশাল ইসলামী সাহিত্যের ভান্ডার গড়ে উঠেছে, তা কি পড়েছেন?’
‘স্যরি, আহমদ মুসা মাত্র কয়েকটা ছোট সূরার অর্থ পড়েছি। ৪০ হাদিস ও মাছলা মাছায়েলের একটা বই পড়েছি’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘আপনি যা পড়েছেন তা মৌল জ্ঞান সমুদ্রের এক ফোঁটা পানি মাত্র। আপনি জীবনকে কিভাবে জানবেন? কিভাবে জানবেন আপনার পরিচয়? জানবেন কি করে আল্লাহর ইচ্ছাকে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি লেখাপড়া করেছি সুরিনামে। পিএইচডি করেছি আমেরিকা থেকে। কিন্তু কোথাও এই সুযোগ হয়নি, সুযোগ ছিল না’। বলল আহমদ হাত্তা বিনীত কন্ঠে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আপনি সুরিনামের প্রধানমন্ত্রী হয়েও কিন্তু সুরিনামের এই শিক্ষার ব্যবস্থা করেন নি’। আহমদ মুসা বলল।
‘আমাকে এমন কিছু করতে হবে তাওতো কোনদিন আমার মাথায় আসেনি’।বলল আহমদ হাত্তা।
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘একটা শক্ত কথা বলি মি. হাত্তা, আহত হবেন না তো?’
আহমদ হাত্তা হাসল। তারপর গম্ভীর হয়ে উঠল তার চেহারা। উপচে পড়া আবেগের বিচ্ছুরণ ঘটল তার চোখে-মূখে। বলল, মি. আহমদ মুসা, এখন যদি আমার গায়ে চাবুক চালান, তাহলেও মনে করব, এটা আমার জন্যে আশীর্বাদ। বলুন আপনি’।
‘মি. হাত্তা আমি যে কথা বলব তা শুধু আপনার জন্যে নয়, আমাদের অনেকের জন্যে প্রযোজ্য। আমরা অনেকেই পিতা-মাতা সূত্রে মুসলমান, কিন্তু কার্যত আমরা মুসলমান হইনি’। আহমদ মুসা বলল।
সংগে সংগে উত্তর দিল না আহমদ হাত্তা। একটা আকষ্মিক ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। কিছুক্ষণ পর ধীর কন্ঠে বলল, ‘কিভাবে তাহলে মুসলমান হতে হয়?’
‘একজন মুসলিম কতগুলো গুণের সমাহার থেকে তৈরী হয়। যেমন সে আল্লাহকে পালনকর্তা ও বিধান দাতা একমাত্র প্রভূ বলে মানে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে আল্লাহর সর্বশেষ বার্তাবাহক হিসেবে মানে, সে বিশ্বাস করে যে, দুনিয়ায় তার প্রতিটি ভালো কাজের জন্যে আখেরাতে পুরুষ্কার পাবে ও প্রতিটি মন্দ কাজের জন্য তাকে আখেরাতে জওয়াবদিহী করতে হবে ও শাস্তির সম্মূখীন হতে হবে। এই ভয়কে সামনে রেখে আল্লাহ এবং তার রাসূল যা নিষেধ করেছেন তা সে পরহেজ করে চলে এবং যা করার নির্দেশ করেছেন তা যত্নের সাথে পালন করে থাকে।কোন লোভ তাকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। ইত্যাদি। এই গুণগুলো কারও মধ্যে সৃষ্টি হলে সে মুসলিম ঘরে জম্মগ্রহন না করলেও সে মুসলমান হয়ে যায়, অন্যদিকে মুসলিম ঘরে জম্ম গ্রহণ করার পরও কারও মধ্যে যদি এই গুণগুলো না থাকে, তাহলে সে কার্যতঃ মুসলমান থাকে না’। থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামলেও হাত্তা কথা বলল না। ভাবছিল সে। বলল একটু পর, ‘এই গুণগুলো আয়ত্ব সাপেক্ষ এবং জানা ও শেখা সাপেক্ষ। না জানলে, না শিখলে তো এ গুণগুলো আয়ত্ব করা যাবে না’।
‘এ জন্যেই তো মুসলমানদের জন্যে জ্ঞানার্জন ফরজ, ধর্মীয় ও জাগতিক সব জ্ঞানই’। বলল আহমদ মুসা।
‘এটা তো আমরা করিনি, আমাদের লোকরা করেনি’। আহমদ হাত্তা বলল।
‘এ জন্যে প্রধানত দায়ী সমাজের নেতারা, জাতির নেতারা’। বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে আমি দায়ী হচ্ছি’। আহমদ হাত্তা বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘শুধু দায়ী নন, প্রধান দায়ী’।
‘কেন?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘আল্লাহ যখন কাউকে ক্ষমতায় বসান, তার অপরিহার্য কাজগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায় মানুষকে ভাল কাজের নির্দেশ দেয়া, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। এই কাজটাই মানুষকে মুসলমান বানাবার কাজ। আপনি এ দায়িত্ব পালন করেন নি’। আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু কি করতে হবে, তা জানতাম না এবং ঐ রকম কিছু করা যে আমার দায়িত্ব তাও জানতাম না’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘এখন জানার পর কি করবেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আল্লাহ যদি আমাকে ক্ষমতায় যাবার সুযোগ দেন, তাহলে প্রথমেই দুটি কাজ করব। একটি হলো, মুসলমানদের জন্যে ইসলামী জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা। দ্বিতীয় কাজ হিসেবে মানুষকে ভালো কাজের নির্দেশ ও মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘ধন্যবাদ মি. হাত্তা। আল্লাহ আপনাকে আপনার জাতির নেতৃত্ব দেবার সুযোগ দিন’। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা সামনে তাকিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ একটা ব্রীজ তার চোখে পড়ল। সামনে রাস্তাটা ধনুকের মত বেঁকে পূর্ব দিকে মোড় নিয়েছে। ধনুকের ঠিক মধ্যভাগের কিছুটা পরেই ব্রীজটা।
আহমদ মুসা তার মুখের কথাটা শেষ করেই আহমদ হাত্তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. হাত্তা ব্রীজ দেখছি। ব্রীজ কোথ্থেকে এলো?’
‘কেন, সুরিনাম নদীরই একটা শাখার উপর এই ব্রীজ। ব্রাউনস ওয়ে থেকে এ শাখা সুরিনাম নদীর মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘কিন্তু আমি নগরীর কোথাও আর তো ব্রীজ দেখিনি। এ শাখা কি সুরিনামে পড়েনি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘না শাখাটি বাঁক নিয়ে শহরে প্রবেশ করে আবার বেঁকে গিয়ে সোজা আটলান্টিকে পড়েছে’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘তার মানে আমাদের এখন দুটি ব্রীজ পেরুতে হবে’। আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘আমরা তো অনেক ঘোরা পথে যাচ্ছি, তাই না?’ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তা ছিল না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ছিল। মনে হয় ভীড় কম ফ্রী রাস্তা বলেই এ রাস্তা বেছে নেয়া হয়েছে’। বলল আহমদ হাত্তা।
যুক্তিটা আহমদ মুসার কাছে মনোপুত হলো না। পারামারিবোর কোন রাস্তাই এমন ভীড়ের নয় যে এজন্যে এতটা ঘোরা পথ বেছে নিতে হবে।
হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। দুর্বল লাগল খুব নিজেকে। এর প্রভাব পড়ল গাড়ি চালনার উপরও। আহমদ মুসার গাড়ি পুলিশের ক্যারিয়ার ভ্যান থেকে কিছুটা পিছিয়েই পড়ল।
পুলিশের জীপটি ব্রীজে উঠে পড়েছে। পরক্ষণে পুলিশের ক্যারিয়ার ভ্যানটিও ব্রীজে উঠে পড়ল।
ব্রীজের উপর কিছুটা এগিয়েছে গাড়ি দুটো।
আহমদ মুসার গাড়ি ব্রীজের মুখ থেকে এখনও কিছুটা দূরে।
এ সময় সামনে থেকে প্রচন্ড বিষ্ফোরণের শব্দ হলো।
ভূমিকম্পের মত প্রচন্ডভাবে কেঁপে উঠেছে রাস্তা, প্রবল ঝাঁকুনি খেয়েছে গাড়ি।
আহমদ মুসার পা যেন অজান্তেই ব্রেক কষেছে গাড়ির।
আহমদ মুসা দেখল সামনে প্রলয়কান্ড ঘটে গেছে। ধোঁয়ার মধ্য দিয়েই দেখা যাচ্ছে, ব্রীজের এ দিকের অংশটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেই সাথে দুটি গাড়িও।
বিমূঢ় অবস্থা কেটে যেতেই আহমদ মুসা দ্রুত গাড়ি থেকে নামল। গাড়ি থেকে নামল বার্নারডোও। পেছনের গাড়ির নিরাপত্তা গার্ডরাও নেমে এল গাড়ি থেকে। নেমে এসেছে গাড়ি থেকে আহমদ হাত্তা ও অন্যরাও।
সকলের চোখে মুখেই বিমূঢ় আতংকভাব, শংকিত প্রশ্ন।
এরই মধ্যে বার্নারডো আহমদ হাত্তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার আপনার বাইরে বেরুনো ঠিক হয়নি। আপনি ভেতরে যান স্যার। ষড়যন্ত্র করেই আমাদের গতিরোধ করা হয়েছে’।
‘না বার্নারডো, ওদের ষড়যন্ত্রের কাজ শেষ হয়েছে। ওরা আমাদের দুগাড়িকে ধ্বংস করার জন্যেই ব্রীজে বোমা পেতেছিল। ওদের দুর্ভাগ্য, আমাদের গাড়ির বদলে পুলিশের দুগাড়ি বোমার শিকার হলো’। শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ হাত্তার মুখে বিষ্ময়ের বিষ্ফোরণ। এই সাথে তার দুচোখ ভরা আতংক। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘মি আহমদ মুসা আপনার মাধ্যমে আল্লাহ আবার আমাদের সবাইকে রক্ষা করলেন। পুলিশের দুটি গাড়িকে আগে দিয়ে আমাদের গাড়ি দুটিকে পেছনে না রাখলে আমরাই বোমার শিকার হতাম। আপনাকে……..?
আহমদ মুসা আহমদ হাত্তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, মি. হাত্তা আপনি এখনি প্রেসিডেন্টকে টেলিফোনে ঘটনার কথা জানান ও উদ্ধারের জন্যে আবেদন করুন’।
আহমদ হাত্তার সাথে কথা বলা শেষ করেই আহমদ মুসা আহমদ হাত্তার সেক্রেটারীকে বলল, ‘আপনি টেলিফোন করুন আইজিকে এবং তাড়াতাড়ি সাহায্য পাঠাতে বলুন’।
আবার আহমদ মুসা ফিরল বার্নারডোর দিকে। বলল, ‘বার্নারডো, তুমি মি. হাত্তাকে নিয়ে এখানে থাক। মি. হাত্তার সেক্রেটারীও এখানে থাকবে। আমি অন্য সবাইকে নিয়ে নদীতে যাচ্ছি, দেখি কিছু করা যায় কিনা’।
বলে আহমদ মুসা পাঁচজন নিরাপত্তা গার্ডকে নিয়ে রাস্তা থেকে নদীতে নামার জন্য যাত্রা শুরু করল।

সকাল আটটা। ঘুম ভাঙেনি আহমদ মুসার তখনও।
গত রাত দুইটায় আহমদ মুসা বাসায় ফিরেছে।
গতকাল অত্যন্ত ব্যস্ত দিন গেছে আহমদ মুসার।
ব্রীজের বোমা বিষ্ফোরণের ঘটনায় দুগাড়ি পুলিশের কেউ বাচেঁনি।
এই ঘটনার পর আহমদ মুসা আহমদ হাত্তাকে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল থানায়। দুটি কেস দায়ের করেছিল। তাকে হত্যার জন্যেই নির্বাচন অফিসে তার গাড়িতে বোমা পেতে রাখা হয়েছিল। আবার তাকে হত্যার জন্যেই ব্রীজে বোমা পেতে রাখা হয়। পুলিশ কর্তৃপক্ষ আহমদ হাত্তার জন্যে প্রেরিত পুলিশ টিমকে ব্রীফ করেছিল, পুলিশের গাড়ি দুটি আহমদ হাত্তার গাড়ি দুটির পেছনে থাকবে। আহমদ হাত্তার ফেরার জন্যে রিং রোডকে তারা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। এই তথ্য রোনাল্ড রঙ্গলালের সুরিনাম পিপলস কংগ্রেস ফাঁস করতে সমর্থ হয় এবং ব্রীজে বোমা পেতে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।
থানায় মামলা দায়েরের পরই আহমদ মুসা আহমদ হাত্তাকে নিয়ে চলে যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে। পূর্বেই আহমদ হাত্তার সেক্রেটারীকে প্রেস ক্লাবে পাঠানো হয়েছিল জরুরী ভিত্তিতে সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজনের জন্যে। রাত আটটায় দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের নিয়ে সুরিনামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আসন্ন নির্বাচন প্রার্থী আহমদ হাত্তার জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সফল সাংবাদিক সম্মেলনের পর গত চার মাসের মধ্যে প্রথম বারের মত আহমদ হাত্তা পার্টি অফিসে যায় এবং পার্টির নির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আহমদ হাত্তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ওভানডোদের ওখানে পৌঁছতে আহমদ মুসার রাত দুটো বেজে যায়।
রাত সাড়ে তিনটায় শুয়েছে আহমদ মুসা।
ঠিক সকাল আটটায় টেবিলে নাস্তা সাজানো হলো।
ওভানডো আগেই এসে বসেছিল ভেতরের ড্রইংরুমে। ধীরে ধীরে সেখানে ওভানডোর দাদী, ওভানডোর মা, ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকুলিন, লিসা, ফাতিমা সবাই এসে বসল।
তারা যেখানে বসেছে সেখান থেকে আহমদ মুসার শোবার ঘরের দরজা দেখা যায়।
লিসা এসেই ওভানডোকে বলল, ‘ভাইয়া উনি উঠেছেন কিনা দেখেছ, নাস্তার সময় তো চলে যাচ্ছে’।
‘রাখ তোমার নাস্তা। কাল ওঁর উপর দিয়ে যে ধকল গেছে, তাতে দুতিন দিন ওঁকে ঘুমানো দরকার’। বলল ওভানডো।
‘রাতে ফাতিমার আব্বা আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাহেব টেলিফোন করেছিলেন আহমদ মুসা বাসায় পৌঁছেছে কিনা জানার জন্যে। তিনি ফাতিমাকে বলেছেন, এক দিনে আহমদ মুসা যা করেছে, তাতেই দেশের পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। রিপাবলিকান পার্টি শুয়ে পড়েছিল, আহমদ মুসা একদিনেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন’। বলল ওভানডোর মা।
ওভানডোর মা থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘গতকাল তিনবার উনি আব্বাকে তার লোকজন সমেত সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন’। বলে ফাতিমা তার আব্বার কাছ থেকে যা শুনেছিল সব একে একে বলল।
‘কিন্তু আহমদ মুসা তো রাতে এসবের কিছু বলেনি। তার কথা শুনে মনে হয়েছে বড় তেমন কিছু ঘটেনি’। বলল ওভানডোর মা।
‘প্রয়োজনের বেশী তিনি একটুও বলেন না। দেখুন না, কদিন হলো আমাদের সাথে পরিচয়। কিন্তু কি জানি তার দেশ কোথায়, কে আছে তার? জানি না’। বলল জ্যাকুলিন, ওভানডোর স্ত্রী।
‘গত ১৯ তারিখ রাত থেকে আজ ২১ তারিখ পর্যন্ত দুদিন তিন রাতে আহমদ মুসা ভাই যে কাজ করেছেন তা আমরা তিন বছর তিন যুগেও পারতাম না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনাব আহমদ হাত্তা ঠিকই বলেছেন দুদিনে তিনি সুরিনামরে পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছেন। যারা কাজ করেন তারা কথা বলেন না। যারা বড় তারা বড়ত্ব প্রচার করেন না। আজ সকালের বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার দুটি বুলেটিনই আমি শুনেছি। তাতে গত দিন ও রাতের সব ঘটনা বিস্তারিত বলেছে এবং সব কৃতিত্ব দেয়া হয়েছে জনাব আহমদ হাত্তার শিখ ড্রাইভারকে। তার মানে আহমদ মুসার মত লোক জনাব আহমদ হাত্তার ড্রাইভারে পরিণত হলেন। শুনতে আমার খুব খারাপ লেগেছে, মনটা খছ খছ করেছে। ইচ্ছা হয়েছে চিৎকার করে বলি, তিনি ড্রাইভার নন, তিনি বিশ্ববিখ্যাত আহমদ মুসা। কিন্তু আমার কাছে যা খুবই খারাপ লেগেছে সেটা আহমদ মুসার কাছে কিছুই নয়। বলল ওভানডো।
‘বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা আর কি বলেছে ভাইয়া?’ লিসা বলল।
‘অনেক কথা বলেছে। একদম হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। নির্বাচন অফিসে জনাব হাত্তার গাড়ি ও ব্রীজে বোমা বিষ্ফোরণের জন্য রোনাল্ড রঙ্গলালের সুরিনাম পিপলস কংগ্রেসকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার আগেই জনাব হাত্তাকে রঙ্গলালরা আটকাতে চেয়েছিল, তা না পেরে নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার পর তাকে হত্যা করার চেষ্টা করে। বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ দিয়ে বিবিসি- ভয়েস অব আমেরিকা বলেছে, এসব ঘটনায় পুলিশের একাংশের ঘনিষ্ঠ যোগসাজস আছে। অন্যদিকে প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা হাটে হাঁড়ি ভাঙার কাজ কমপ্লিট করে দিয়েছেন। বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা এই সাংবাদিক সম্মেলনের উপর বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে আহমদ হাত্তা তার নির্বাচন করা বন্ধ করার জন্য রঙ্গলালের সুরিনাম কংগ্রেস কিভাবে তাকে কিডন্যাপ করে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল, কিভাবে তার মেয়েকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, কিভাবে গত চারমাসে সুরিনামের হাজার হাজার তরুন নেতা-কর্মীকে কিডন্যাপ করে হত্যা করেছে, কিভাবে তাকে গোপনে নাম ভাঁড়িয়ে দেশে প্রবেশ করতে হয়, দেশে ফিরলে তাকে ও তার কন্যাকে কিভাবে কিডন্যাপের চেষ্টা করা হয়, ওয়াং আলীর উপর কিভাবে নির্যাতন চালানো হয়, নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার জন্যে নির্বাচন অফিসে যাওয়ার পথে কিভাবে তার উপর হামলা চালানো হয় এবং সব শেষে কিভাবে গাড়ি ও ব্রীজে বোমা পেতে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় তার বিস্তারিত বিবরণ তথ্য প্রমাণ, তারিখ ইত্যাদি সমেত সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করেন। জনাব আহমদ হাত্তা এসব ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করেছেন এবং এসব অপরাধের জন্য রোনাল্ড রঙ্গলালসহ সুরিনাম কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের বিচার ও তাদেরকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণার দাবী জানিয়েছেন’।
থামলো ওভানডো।
ওভানডো থামতেই লিসা বলে উঠল, ‘এবার দেখো আহমদ হাত্তা আংকেল ও রিপাবিলিকান পার্টি আগের চেয়ে অনেক বেশি আসন নিয়ে জয়লাভ করবে’।
এ সময় আজকের সংবাদপত্রগুলো দিয়ে গেল কাজের ছেলেটা।
খবরের কাগজগুলো পেয়ে তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই।
লিসা ঘুরে ঘুরে সবার কাছে গিয়ে সব কাগজের উপর চোখ বুলানো শেষ করে বলল, ‘একি ভাইয়া কংগ্রেস সমর্থক কাগজগুলোও তো সব খবর ভালোভাবে দিয়েছে’।
‘না দিয়ে যাবে কোথায়। বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার মাধ্যমে সবাই সব খবর জানতে পেরেছে। এখন খবর চাপা দিলে তো পাঠকদের কিল খেতে হবে’। বলল ওভানডো।
‘ভাবছি, কংগ্রেসের রঙ্গলাল বাবুরা এখন মুখ দেখাবে কি করে?’ বলল লিসা।
‘বল কি তুমি, আজকেই সাংবাদিক সম্মেলন করে ওরা বলবে, ‘হাত্তা যা বলেছে সব মিথ্যা’। ওভানডো বলল।
‘মানুষ তা বিশ্বাস করবে কেন?’ বলল লিসা।
‘মানুষ বিশ্বাস না করুক, মুখ দেখানোর কাজটা হয়ে গেল’। ওভানডো বলল।
আহমদ মুসার ঘরের দরজায় শব্দ হলো।
সবাই তাকালো সেদিকে।
দেখলো সবাই, আহমদ মুসার দরজা খুলে গেছে। এখনি বেরিয়ে আসবে সে ।
জ্যাকুলিন, লিসা ও ফাতিমা তিনজনেই তাদের মাথার ওড়না কপাল পর্যন্ত টেনে নিল। ঠিক ঠাক করল ওড়নার গায়ের অংশও।
আহমদ মুসা ড্রইংরুমে প্রবেশ করল। সালাম দিল সবাইকে।
আহমদ মুসাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছে ওভানডোর দাদী। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ভাই চল নাস্তার টেবিলে।
সবাই উঠে দাঁড়াল।
নাস্তার টেবিলে আহমদ মুসার পাশে বসতে বসতে ওভানডো বলল, ‘আহমদ মুসা ভাই, আপনার মিশন সাকসেসফুল। এবার কয়েকদিন শুধু আপনাকে ঘুমাতেই হবে’।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘নাটকের একটা অংকের সমাপ্তিকে নাটকের সমাপ্তি বলো না ওভানডো’।
‘রঙ্গলালদের আর কি করার আছে ভাইয়া?’ ওভানডো বলল।
‘রঙ্গলাল ও তিলক লাজপত পালের উত্তরসূরীরা কি করতে পারে তা বলে তোমার মন খারাপ করাবো না, তার চেয়ে বল আজকের কাগজগুলো কি লিখেছে’। বলল আহমদ মুসা।
‘কি লেখেনি সেটা বলুন ভাইয়া। কিছু বাদ দেয়নি। কংগ্রেসের কাগজগুলো যে হঠাৎ আজ মানুষ হয়ে গেছে’। ওভানডো বলল।
ওভানডো থামতেই লিসা বলে উঠল, ‘বলুনতো পুলিশের দুগাড়িকে আগে থাকতে বলেছিলেন কেন, বোমার কথা জানতেন?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ঝড়ে বক পড়ে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ ব্যাপারটা এই রকম। আমি পুলিশকে সন্দেহ করেছিলাম। পুলিশ পেছনে থাকতে চেয়েছিল। রাজী হইনি। কারণ পুলিশের সাথে শত্রুপক্ষের যোগসাজশ থাকলে এবং শত্রুরা সামনে আক্রমণ করলে দুদিকের চাপে আমরা চিড়া চ্যাপ্টা হয়ে যাব। তাই পেছনটা উম্মুক্ত রাখতে চেয়েছিলাম। বোমার ব্যাপারটা জানলে পুলিশকে বাঁচানোও আমাদের অবশ্য কর্তব্য হতো।
আহমদ মুসা থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘নির্বাচন অফিসে গাড়ি বোমার ঘটনায় আপনি ফটো সাংবাদিককে সন্দেহ করলেন কেন? সে বোমা রাখতে পারে ভাবলেন কি করে?’
‘কেন পত্রিকায় লেখেনি? ফটো সাংবাদিককে গাড়ির সামনের টপে উঠে ভেতরে মুখ নেয়া এবং শেষের স্ন্যাপগুলো দেরি করে নেয়ার কথা শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছে যে, সে গাড়িতে অন্য কিছু করেছে। অন্য কিছু মানে, সে যদি শত্রু হয় তবে বোমা পাতাই স্বাভাবিক’।
আহমদ মুসা থামল।
ওভানডোর মা গম্ভীর হয়ে ভাবছিল। আহমদ মুসা থামতেই সে বলে উঠল, ‘তুমি বললে বাছা, নাটকের একটা অংক শেষ, নাটক শেষ হয়নি। তার মানে নাটকের আরও অংক বাকি। কি সে অংক বাবা?’
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠল। ওভানডো টেলিফোন ধরে কথা বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইয়া আপনার টেলিফোন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মি. আহমদ হাত্তা কথা বলবেন’।
আহমদ মুসা উঠে গেল টেলিফোন ধরতে।