৩৫. নতুন গুলাগ

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

‘তাহলে বলবে না ডকুমেন্টগুলো কোথায় রেখেছ?’ বলল রাগে চোখ মুখ লাল করে এক সারিতে তিনটি চেয়ারে বসা তিনজনের মাঝের জন সামনে হাঁটু ভেঙে দাঁড়ানো তিন বন্দীকে লক্ষ্য করে।
হাঁটু ভেঙে দাঁড়ানো তিন বন্দীর খালি গা। পরনে পাতলা কাপড়ের হাফ ট্রাউজার।
বন্দীদের চেহারা বিপর্যস্ত। শরীরে শত নির্যাতনের চিহ্ন।
তিন বন্দীই কাঁপছিল। পা, হাঁটু তাদের দেহের ভার বইতে পারছিল না। কিন্তু বসার উপায় নেই, নিচে তীক্ষ্ণ পেরেক আঁটা চেয়ার। আবার সোজা হয়ে দাঁড়াবারও সুযোগ নেই, মাথার চার ইঞ্চি উপরেই অনুরূপ তীক্ষ্ণ পেরেক আঁটা ইস্পাতের বোর্ড স্থির হয়ে আছে।
‘এই প্রশ্ন তোমরা শতবার করেছ। এ পর্যন্ত শতবারই জবাব দিয়েছি, তোমরা আমাদের স্পুটনিক অফিস পুড়িয়ে সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছ।’ কান্নায় ভেঙে পড়া কন্ঠে বলল তিন বন্দীর মাঝের জন।
‘আমরা বিশ্বাস করি না তোমাদের কথা। তোমরা কম ধড়িবাজ নও। ডকুমেন্টগুলোর শুধু একটি করে কপি তোমাদের কাছে ছিল এটা অবিশ্বাস্য। তোমাদের বলতে হবে ডকুমেন্টগুলোর ডুপ্লিকেট কোথায়।’ বলল চেয়ারে বসা সেই মাঝের জনই।
বন্দীরা তাদের সহ্য ও শক্তির শেষ সীমায় পৌঁছেছিল। তাদের দেহে কম্পন বেড়ে গেছে। শরীর তাদের আঁকা-বাঁকাভাবে দুলতে শুরু করেছে। চোখ তাদের বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ তিনটি দেহ তাদের এক সাথেই খসে পড়ল সারি সারি পেরেক আঁটা চেয়ারের উপর। সঙ্গে সঙ্গে তাদের তিনটি কন্ঠই যন্ত্রনায় বুকফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল।
চেয়ারে বসা তিনজন হো হো করে হেসে উঠল। বলল তিনজনের ডান পাশের জন, ‘তোদের ঈমান গেল কোথায়? দাঁড়িয়ে থাকতে পারলি না তো ঈমানের শক্তিতে। তোদের আল্লাহ শক্তি যোগাল না হাঁটুতে এবং পায়ে?’
তিন বন্দীই যন্ত্রনায় আর্তনাদ করছিল। কিন্তু আর উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। কারণ পেরেক আঁটা সেই ইস্পাতের বোর্ড নেমে এসেছে ঠিক আগের মতই মাথার চার ইঞ্চি উপরে।
চারদিক থেকে শত শত যন্ত্রনা-জর্জরিত চোখ দেখছিল তাদের অসহ্য আহাজারি।
স্থানটা বিশাল একটি গোলাকার হলঘর। নিচু ছাদ আট-নয় ফুটের বেশি উচুঁ হবে না।
হলঘরটার চারদিক ঘিরে মোটা লোহার গ্রীল ঘেরা ছোট ছোট ঘর। ঘরগুলোকে খোঁয়ার বলাই ভাল। ঘরগুলোতে দাড়ানো যায় না, পা মেলে শোয়াও যায় না। ঘরের মেঝেগুলো এবড়ো-থেবড়ো কাঠের তৈরী। মাথার উপরের কংক্রিটের ছাদগুলো মুভেবল। সুইচ টিপে সেগুলো সরিয়ে দেয়া যায়, আবার লাগানো যায়। দরকার হলে বন্দীদের রোদে পোড়ানো, আবার বরফ বৃষ্টিতে শাস্তি দেবার জন্যেই এই ব্যবস্থা।
বিশাল ঘরের ঠিক মাঝখানে প্রায় ২০ বর্গফুট আয়তনের গোলাকার একটা কংক্রিটের বেদী। এই চত্বরের উপরের ছাদটা গম্বুজের মতো উঁচু। বিশেষভাবে নির্মিত এই গম্বুজে এবং বেদীর নিচে নির্যাতনের হাজারো উপকরণ সাজিয়ে রাখা। যখন যেটা তাদের প্রয়োজন সুইচ টিপলেই উপর থেকে নেমে আসে এবং নিচ থেকে উঠে আসে। বন্দীদের একাকী বা দলবদ্ধভাবে এখানে এনে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের যতপ্রকার মারাত্মক পন্থা আছে, সবই তারা পরীক্ষা করেছে এখানে বন্দীদের উপর।
হলঘরের চারপ্রান্তের দু’একটি ছাড়া সবগুলো খোঁয়াড়েই বন্দী রয়েছে। তাদের সংখ্যা দু’শ জনের কম হবে না। তাদেরই বেদনা জর্জরিত চোখ অসহায় দৃষ্টিতে দেখছে তিন বন্দীর উপরে চলমান নির্যাতন। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে কানে আঙুল দিয়ে চেষ্টা করছে বাঁচতে। কিন্তু মনের কষ্ট তাতে এক বিন্দুও লাঘব হচ্ছে না। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে প্রার্থনার হাত উপরে তুলে।
তিন বন্দীর অসহায় কাতরানী ছাপিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে চেয়ারে বসা তিনজনের উল্লাস ধ্বনি।
এক ঝাঁক পেরেক বিদ্ধ স্থান থেকে রক্ত ঝরছে তিন বন্দীর। রক্ত চেয়ার থেকে গড়িয়ে পড়ছে বেদিতে।
নির্যাতনকারী টিমের তিনজনের মাঝের জনই টিম লিডার। তার বয়স অন্য দু’জনের চেয়ে কিছু বেশী। তবে কারো বয়স চল্লিশের বেশি নয়। তিনজনের পরনেই ইউরোপিয়ান স্যুট। তবে ইউরোপিয়ানদের মত সাদা নয়। মুখের গড়নও এ্যাভারেজ ইউরোপীয় থেকে আলাদা। যারা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেগীন, ইয়াহুদ বারাক, এ্যারিয়েল শ্যারনদের দেখেছেন, তারা বলবেন এরা তিনজন ঐ প্রধানমন্ত্রীদের ভাই হবেন কোন না কোন দিক থেকে। এরা যে নিখাদ ইহুদী তা তাদের দিকে একবার তাকিয়েই ওয়াকিফহাল যে কেউ বলে দিতে পারে।
তিন চেয়ারের মাঝের লোকটি তার ডান পাশের লোকটিকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘মি. আইজ্যাক, সুইচে এবার হাত দিন। রক্ত বেশি গেলে আমাদের ক্ষতি।’
হাসল আইজ্যাক শামির। বলল, ‘ঠিক বলেছেন মি. দানিয়েল ডেভিড, ওদের তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের ডকুমেন্টের মতই ওদের রক্ত আমাদের কাছে মুল্যবান। ওরা বাঁচলে ডকুমেন্ট বের হবেই।’
বলে আইজ্যাক শামির তার চেয়ারের পাশেই মেঝের উপর সেট করা একটা বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেলল একটা হুক অন করে। ওটা ইলেক্ট্রনিক কনট্রোল বক্স। প্যানেলে সারি সারি অনেক সুইচ। একটা প্যানেলের একটা সুইচকে আইজ্যাক শামির রেড কেবিন থেকে গ্রীন কেবিনে নিয়ে গেল। সংগে সংগেই তিনজন বন্দীর নিচ থেকে পেরেক আঁটা চেয়ার মেঝের ভেতর ঢুকে গেল এবং অনুরূপভাবে মাথার উপর থেকে পেরেক বিছানো ইস্পাতের আয়তাকার বোর্ডটিও চোখের নিমেষে উঠে গম্বুজে ঢুকে গেল।
আহত রক্তাক্ত বন্দী তিনজন আছড়ে পড়ল মাটিতে। বসবার তাদের শক্তি ছিল না, উপায়ও ছিল না। তাদের তিনটি দেহই মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
নির্যাতনী টীমের জিজ্ঞাসাবাদকারী তিনজনের নেতা দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল সংগে সংগেই, ‘না তোমরা শুতে পারবে না, আরাম তোমাদের কপাল থেকে মুছে গেছে। পরকালে যখন বেহেশত আশা কর, তখন জাহান্নামের শাস্তিটা এখানেই ভোগ করে যাও।’
বলে দানিয়েল ডেভিড চেয়ারের হাতলে তার হাতের নিচেই থাকা একটা সুইচে চাপ দিল। চাপ দেয়ার সাথে সাথেই বেদিটির এক প্রান্ত থেকে ৩ বর্গফুটের মত জায়গার মেঝে একটু নিচে নেমে মেঝের আড়ালে হারিয়ে গেল এবং উঠে এল একটা লিফট। লিফটে একজন মানুষ। লোকটির পরনে সামরিক ইউনিফর্ম। কুস্তিগীরের মত চেহারা।
‘এসটি জিরো ওয়ান, তুমি ওদের আমাদের সামনে সারিবদ্ধ করে বসিয়ে যাও। আর এক পেগ করে ব্রান্ডি দাও ওদের।’ লিফট দিয়ে উঠে আসা ইউনিফরমধারীকে লক্ষ্য করে বলল দানিয়েল ডেভিড।
আদেশ শুনে এসটি জিরো ওয়ান লিফটে করে আবার নিচে নেমে গেল। এক বোতল ব্রান্ডি নিয়ে ফিরে এল আধা মিনিটের মধ্যেই।
জিরো ওয়ান লোকটি তিনটি চেয়ারের সামনে তিনজন বন্দীকে খেলনার মত তুলে এনে বসিয়ে দিল।
বন্দীদের এভাবে বসার ক্ষমতা ছিল না। বসেই তারা কঁকিয়ে উঠল ব্যথায়। ক্লান্তি ও যন্ত্রনায় তারা মাথা সোজা করে বসে থাকতে পারছিল না।
জিরো ওয়ান পেগ ভর্তি ব্রান্ডি ওদের সামনে রেখে বলল, ‘খেয়ে নাও। এ হলো এখনকার জন্যে মেডিসিন। খেলেই দেখবে মাথা সোজা করতে পারছ।’
‘তোমরা এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝেছ, মদ, ব্রান্ডি ধরনের হারাম জিনিস আমাদের খাওয়াতে পারবে না। কিছু দিতে চাইলে আমাদের পানি দাও।’ বলল তিনজনের সারি থেকে মাঝের বন্দী।
‘ব্রান্ডি না খেলে তোমাদের পানি দেওয়া হবে না।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
দানিয়েল ডেভিড ৩ জনের জিজ্ঞাসাবাদকারী দলের নেতা।
বন্দীরা কেউ কোন কথা বলল না।
দানিয়েল ডেভিড তার বাম পাশের লোকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘মি. হাইম হারজেল তাহলে আপনার জিজ্ঞাসাবাদটা সেরে নিন।’
হাইম হারজেল নড়ে চড়ে বসল।
তাকাল বন্দীদের দিকে।
চোখ তার নির্দিষ্ট করল মাঝের জনের দিকে। বলল, ‘কামাল সুলাইমান, অনেক কথাই বলেছ। এখন বল, মোস্তাফা কামাল আতাতুর্কের বংশধর হবার পরেও তোমার এই পরিবর্তন কেন?’
‘কোন পরিবর্তন?’ হাইম হারজেলের দিকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল কামাল সুলাইমান।
এই কামাল সুলাইমান ৭ জনের গোয়েন্দা সংস্থা স্পুটনিক এর প্রধান। সে কামাল আতাতুর্কের বংশধর, একমাত্র জীবিত বংশধর।
‘তোমাদের মৌলবাদ গ্রহনের কথা বলছি। কামাল আতাতুর্কের যুক্তি ও প্রগতির পথ পরিত্যাগ করে তোমরা মৌলবাদী পথ বেছে নিতে গেলে কেন? যেমন ধর তোমার নামের দুটো অংশ ‘কামাল’ ও ‘সুলাইমান’। কামাল ঠিক আছে, এটা পারিবারিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতি স্বীকৃতি। কিন্তু সুলেমান কেন? ‘সুলেমান’ তো ওসমানীয় খলিফাদের একজনের নাম। কামাল আতাতুর্ক এদের পরিত্যাগ করেছিলেন। এদের একজন তোমার নামের অংশ হলো কি করে?’ বলল হাইম হারজেল।
‘নামটা রেখেছিলেন আমার পিতা। তিনি আমার নাম রাখার সময় পারিবারিক ইতিহাস এবং জাতীয় ঐতিহ্য দুই-ই সামনে রেখেছিলেন’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘জাতীয় ঐতিহ্য কোনটা? সুলেমান নাম?’ জিজ্ঞেস করল হাইম হারজেল।
‘হ্যাঁ, সুলাইমান নাম’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘সুলাইমান জাতীয় ঐতিহ্য হলো কি করে? কামাল আতাতুর্ক তো এই ঐতিহ্য পরিত্যাগ করেছিলেন’। বলল হাইম হারজেল।
‘কামাল আতাতুর্ক যাঁকে এবং যাঁদেরকে পরিত্যাগ করেছিলেন, আমার পিতা নিশ্চয় তাঁদেরকেই গ্রহন করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ওসমানীয় খিলাফতের মহান বিজেতা, মহান শাসক এবং ইউরোপের মহাভয়ের ঝান্ডা সুলাইমানকে আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে। তার চাওয়ার স্মারক আমার ‘সুলাইমান নাম’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘তার মানে তোমার পিতা তাহলে কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, তুর্কিরা শুধুই তুর্কি এবং তুর্কিদের পরিচালনা করবে তুরস্ক ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান, ইসলাম নয়-এই মতবাদ পরিত্যাগ করেছিলেন?’ বলল হাইম হারজেল।
‘শুধু আমার পিতা কেন, সাধারণভাবে তুর্কিরা সবাই এই মতবাদ পরিত্যাগ করেছে’। কামাল আতাতুর্ক ১৭ বার সামরিক আইন ব্যবহার করে তুর্কি জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষ বানানোর জন্যে বহু আইন করেছেন, কিন্তু এরপরও মসজিদে বসার আসন স্থাপন, মসজিদে জুতা পায়ে নামাজ আদায়, নামাজের ভাষা হিসেবে তুর্কি ভাষা চালু, আরবী বিলোপ, নামাজে সেজদার নিয়ম বাতিল, মসজিদে প্রার্থনাকে সুন্দর করার জন্যে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র চালু ইত্যাদির মত পরিকল্পনা তাকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতে হয়। সেই তুর্কি জনগণ আজ আরও স্বাধীন এবং শক্তিশালী’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘আচ্ছা তোমার পিতার কথা বাদ দিলাম। তোমার পিতা আংকারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ গ্রাজুয়েট। কিন্তু তুমি তো ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করেছ, ইউরোপের সংস্কৃতি-সভ্যতার মধ্যে বড় হয়েছ, কিন্তু তুমি মৌলবাদী হলে কি করে?’ জিজ্ঞেস করল হাইম হারজেল।
‘মৌলবাদ বা মৌলবাদী পরিভাষা পশ্চিমের একশ্রেণীর সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি। মুসলিম জাতির ক্ষেত্রে এই পরিভাষা প্রযোজ্য নয়। সুতরাং আমাকে মৌলবাদী নই, বলতে পারেন ধর্মনিরপেক্ষতা পরিহার করে আমি মুসলিম হলাম কি করে’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘ঠিক আছে বল, গোঁড়া মুসলিম হলে কি করে?’ বলল হাইম হারজেল।
‘গোঁড়া বা অগোঁড়া মুসলমান বলে কিছু মুসলিম জাতির মধ্যে নেই’। ‘মুসলিম’ হওয়ার গুণগুলো যার মধ্যে যত বেশি বর্তমান সে তত বেশি পূর্ণাংগ মুসলমান, যার মধ্যে যত কম সে তত অপূর্ণাংগ।’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘আচ্ছা বল, যে কামাল আতাতুর্ক একদিন বলেছিলেন, ‘কেবলমাত্র ইসলামের কর্তৃত্ব নির্মূল করার পরই তুর্কিরা অগ্রগতি লাভ করতে পারে এবং সম্মানিত আধুনিক জাতিতে পরিণত হতে পারে’, সেই কামাল আতাতুর্ক পরিবারের ছেলে হয়ে পূর্ণাংগ মুসলমান হলে কি করে? বলল হাইম হারজেল।
‘এই প্রশ্নের জবাবের সাথে আমার বন্দী হওয়া বা তোমাদের স্বার্থের তো সম্পর্ক দেখছি না?’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘দেখ, তোমাদের ‘স্পুটনিক’ সংস্থা ধ্বংস ও তোমাদের বন্দী করার পেছনে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাসি ও লিবার্টি টাওয়ার ধ্বংস বিষয়ে তোমাদের তদন্ত বানচাল করা ছিল একটি বড় কারণ মাত্র, সব কারণ নয়। আমাদের উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মহীনতা, ভোগ-বিলাস আর চরিত্রহীনতার সয়লাবের মধ্যে থেকে তোমরা এবং তোমাদের মত হাজার হাজার যুবক কি করে নিখাঁদ ইসলামে ফিরে এলো!এই ফিরে আসার পথগুলো, কারণগুলো আমরা চিহ্নিত করতে চাই। এ জন্যেই দেখ আমরা তো তোমাদের সাতজনকেই মাত্র ধরিনি। এই বন্দীখানাতেই তোমরা আছ দু’শজনের মত। তোমাদের সাথে আরও যারা এখানে আছে, তারা সবাই তোমাদের মত নেতৃস্থানীয় এবং ‘ডু অর ডাই’ ধরনের সাংঘাতিক এ্যাকটিভিস্ট যুবক। তাদের ধরে তাদের আন্দোলন বানচাল করতে চেয়েছি এটা ঠিক, কিন্তু আসল কারণ এদের আদর্শবাদিতার উৎস সন্ধান করা। এক্সরে করার মত করে সব অজানা রহস্য জেনে নেয়া। এই একই কারণে তোমাকে এই জিজ্ঞাসাবাদ। এখন বল, উত্তর দাও’। বলল হাইম হারজেল। তার দুই চোখে ঠান্ডা সাপের মত ক্রুরতা।
‘এই অজানাকে জানা তোমাদের কোন কাজে লাগবে?’ জিজ্ঞেস করল কামাল সুলাইমান।
ঠান্ডা হাসি হাসল হাইম হারজেল। বলল, ‘রোগ জীবানু কি, কেমন, তার ধর্ম কি জানলেই তো কেবল প্রতিষেধক তৈরী করা যায়। তোমাদের মৌলবাদ কোত্থেকে কিভাবে এল জানলে তবেই তো প্রতিবিধানের পথ বের করা যাবে। আচ্ছা বল, আমার প্রশ্নের জবাব দাও।
‘তুমি যে প্রশ্ন করেছ, এক কথায় তার কোন জবাব নেই। অনেক কথা বলতে হবে এজন্য’। বলল কামাল সুলাইমান।
‘ক্ষতি নেই বল। আমরা শুধু তা শুনবই না রেকর্ডও করব।’ বলল হাইম হারজেল।
‘তুমি ঠিকই বলেছ, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মহীনতা এবং ভোগবাদিতার সয়লাবের মধ্যে আমি মানুষ হয়েছি জার্মানীর এক অভিজাত পল্লীতে। আমার পিতার মধ্যে ঐতিহ্য-প্রীতি প্রবল ছিল। কিন্তু সেটা ছিল তার মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাইরের কাজ-কর্মে তার কোন প্রকাশ ছিল না। জার্মান-সংস্কৃতির আবহাওয়ায় আর দু’দশজনের মতই আমি মানুষ হয়েছিলাম। চেতনা আমার প্রথম ধাক্কা খেল নূরী এ্যারেন-এর Turkey today and tomorrow বইয়ের কয়েকটা লাইন পড়ে। কামাল আতাতুর্কের অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের মধ্যে ৪৬ জন কুর্দি নেতাকে কামাল এক সাথে ফাঁসি দিয়েছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে একজন কুর্দি নেতা শেখ সাইদ হত্যাকারীকে যে কয়টি বলেছিলেন, নূরী এ্যারেন তার বইতে সে কথাগুলো উল্লেখ করেছেন। শেখ সাইদ বলেছিলেন, ‘তোমার প্রতি আমার কোন ঘৃণা নেই। তুমি ও তোমার মনিব কামাল আল্লাহর নিকট ঘৃণিত। শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে আমাদের ফায়সালা হবে।’ শেখ সাইদের এ কথাগুলি প্রথমবারের মত আমার মনে চাবুকের মত আঘাত করে। এই ঘটনার পরপরই আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনা আমার কাছে প্রায় অপরিচিত আমাদের গ্রন্থ আল কোরআন-এর মর্যাদা আমার কাছে আকাশস্পর্শী করে তোলে। ঘটনাটি হলো, একটা ম্যাগাজিনে বৃটিশ রাজনীতিক গ্লাডস্টোন-এর একটা উক্তি পাঠ। উক্তিটি বৃটিশ পার্লামেন্টে গ্লাডস্টোন-এর ভাষণের একটা অংশ। এতে বৃটিশ পার্লামেন্টের ‘সেক্রেটারী ফর কলোনিজ’ মি. গ্লাডস্টোন বলেছিলেন। ‘যতদিন মুসলমানদের আল কোরান থাকবে, আমরা ততদিন তাদেরকে বশ করতে পারবো না। হয় আমাদেরকে তাদের কাছ থেকে এটি কেড়ে নিতে হবে, অথবা তারা যেন এর প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে তার ব্যবস্থা করতে হবে। (So long as the Muslims have the Quran, “we shall be unable to dominate them. We must either take it from them, or make them lose their love of it.”) এই বক্তব্য পাঠ করার সংগে সংগে আমার মনে ঝড়ের বেগে একটি কথা প্রবেশ করল এবং সেটা হলো, ‘আল কোরআনই আমাদের মানে মুসলমানদের স্বাধীনতার শক্তি, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি। আরও মনে হলো, আমার পূর্ব-পুরুষ মোস্তফা কামাল তাহলে হয়তো তার অজান্তেই গ্লাডস্টোনদের পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করেছিলেন। এই চিন্তা হঠাৎ করে আমাকে নতুন মানুষে পরিণত করল। পাল্টে গেল আমার জীবন ধারা। পড়া-শোনার বিষয় আমার পাল্টে গেল। পরিবারের সবাইকে বিস্মিত করে আমি নামাজী বনে গেলাম। এই সময় আমি মোস্তফা কামালের সমসাময়িক তুরস্কের নির্ভীক জননেতা বদিউজ্জামান নূরসীর জীবন ও কর্মের উপর একটা গ্রন্থ পড়লাম যা আমার জীবনকে আমূল পাল্টে দিল। তার অনেক কথা আমার কাছে অথৈ সমুদ্রে পথহারা নাবিকের কাছে ‘বাতি ঘর’ এর মত জীবনদায়িনী মনে হলো । যেমন মোস্তফা কামাল এক ঘটনায় নামাজকে কটাক্ষ করে উক্তি করলে জনাব নুরসী তুরস্কের লৌহ মানবের মুখের উপর বলেছিলেন, ‘পাকা, ঈমানের পর ফরয নামাজই তো ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা নামাজ আদায় করে না, তারা বিশ্বাসঘাতক। আর বিশ্বাসঘাতকের অভিমত গ্রহন করা যায় না।’ ইসলামের প্রতি ভালোবাসাও আমি নূরসীর কাছ থেকে শিখেছি। মোস্তফা কামালের শাসনে তুরষ্কে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সয়লাব যখন অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠল, তখন স্বাস্থ্যগতভাবে নুরসী খুবই ভেঙে পড়লেন, অথচ তার কোন রোগ ছিল না। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার নিজের দুঃখ গুলো সইতে পারি। কিন্তু ইসলামের দুঃখ আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। ইসলামী দুনিয়ার উপর আমি প্রদত্ত প্রতিটি আঘাত আমার অন্তরের উপর হানা দেয়। তাই আমি এমন ভেঙে গেছি। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের উপর নীতি ও আইনকে স্থান দেয়া, মানুষকে ভালোবাসা, মুসলমানদেরকে ভালোবাসার শিক্ষাও আমি জনাব নুরসীর কাছ থেকে পেয়েছি। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক জনাব নুরসীর উপর জেল-জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, নির্বাসন কতই না করেছেন। কিন্তু যখন মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে অস্ত্র, সৈন্য, গোলা-বারুদ সব প্রস্তুত করে তার কাছে যুদ্ধের অনুমতি চাওয়া হলো, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা কার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান? মোস্তফা কামালের সৈন্য কারা? ওরা এদেশেরই ছেলে। আপনি কাদেরকে হত্যা করবেন? তারা কাকে হত্যা করবে? আপনি কি চান আহমদ মুহাম্মদকে আর হাসান হোসাইনকে হত্যা করুক।’ যে কোন অবস্থায় অস্ত্রের চেয়ে যুক্তিকে, বুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবার শিক্ষা আমি নূরসীর কাছ থেকেই পেয়েছি। তিনি সশস্ত্র তৎপরতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। যুক্তি ও বুদ্ধি অস্ত্রকেই তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর মনে করতেন। আমরা ‘স্পুটনিক’ গড়েছি তা অনেকটা তাঁর এ শিক্ষা থেকেই। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস যুক্তি ও বুদ্ধির অস্ত্র দিয়েই আপনাদের এবং সকলের সব ষড়যন্ত্র আমরা নস্যাত করতে পারব।’ থামল কামাল সুলাইমান।
‘যদি বেঁচে থাক।’ বলেই হাইম হারজেল চোখ ফেরাল কামাল সুলাইমানের বামপাশে বসা ওসমান আবদুল হামিদের দিকে। তুরষ্কের ওসমানীয় খিলাফতের শেষ সক্রিয় খলিফা সুলতান আবদুল হামিদের বংশধর। তার দিকে চোখ তুলে ধরে বলল হাইম হারজেল, ‘তোমার পূর্ব পুরুষদের কামাল আতাতুর্ক সুইজারল্যান্ডে নির্বাসন দিয়েছিল। পরবর্তীকালে তোমাদের পরিবার নিরেট একটি ইউরোপীয় পরিবারে পরিণত হয়। আরবী ভাষার চর্চা তাদের মধ্য থেকে উঠে যায়। আরবী ভাষা ভুলে যায় তারা। তুমি কিভাবে মৌলবাদী হলে মানে পূর্ণাংগ মুসলমান হলে সে কাহিনী তোমার কাছ থেকে শুনেছি। শুধু একটা বিষয়ই জানার বাকি আছে সেটা হলো, তুমি আরবী শিখলে কোথায়?’
‘আরবী আমি শিখিনি। আরবী ভাষা আমি জানি না। সবে শিখতে শুরু করেছি।’ বলল ওসমান আবদুল হামিদ।
‘জান না? তাহলে কোরআন ও হাদিস পড় কি করে?’ হাইম হারজেল বলল।
‘ইংরেজী অনুবাদ পড়ি।’ জবাব দিল ওসমান আবদুল হামিদ।
‘ও, আচ্ছা।’ বলে হাইম হারজেল ফারুকের বংশধর এবার আবদুল্লাহ আল ফারুকের দিকে তাকাল। তাকে উদ্দেশ্য করে বলল হাইম হারজেল, ‘সেদিন তোমার কাছ থেকে কিছু জেনেছি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে বাকি রয়ে গেছে। বল, তোমার ঘরে ফেরার উপলক্ষ বা কারণটা কি?’
‘ঘরে ফেরা মানে কি ইসলামে ফিরে আসা?’ জিজ্ঞেস করল আবদুল্লাহ আল ফারুক।
‘হ্যাঁ ঠিক, ইসলামে ফেরা।’ বলল হাইম হারজেল।
‘এটা ঠিক ইসলামের চর্চা আমাদের পরিবার থেকে লোপ পেয়েছিল। কিন্তু আমরা মুসলমান এ কথা কেউ আমরা কখনোও ভুলিনি। তারপর নানা কার্যকারণ ও ঘটনায় পূর্ণাংগ ইসলামে আমি ফিরে এসেছি। সে অনেক কথা, কোনটা বলব আমি?’ বলল আবদুল্লাহ আল ফারুক।
‘শুধু বল, কোরআন হাদিস পড়ে, না কিভাবে তোমরা প্রথম চোখ খুলল?’ বলল হাইম হারজেল।
সংগে সংগে ‍উত্তর দিল না আবদুল্লাহ আল ফারুক হারজেলের প্রশ্নের। ভাবছিল সে। একটু পর সে বলল, ‘আমি তখন প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একদিন লাইব্রেরীতে বসে নোট তৈরী করছিলাম। নোট শেষে বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমার হাতের কাছেই ইবনে খালদুনের মুকাদ্দামা পড়ে আছে। এই বিখ্যাত বইটির অনেক নাম শুনেছি। কিন্তু কোন দিন হাতে নিয়ে দেখিনি। কাছে পেয়ে আজ হাতে তুলে নিলাম। সূচীটা দেখে নিলাম। তারপর পাতা উল্টাতে লাগলাম। এক জায়গায় কয়েকটা লাইন সবুজ মার্কার দিয়ে চিহ্নিত করা দেখলাম। ভাবলাম আমার মতই নোটকারী পাঠকের কাজ। আগ্রহ নিয়ে মার্ক করা লাইন কটি পড়তে লাগলামঃ ‘নবীর আল্লাহ প্রদত্ত বাণী ছাড়া রাজনৈতিক ও স্থায়িত্ব অর্জনে আরবরা অক্ষম। কারণ চারিত্রিক কঠোরতা, গর্ব, বর্বরতা এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে পরস্পরের প্রতিহিংসা তাদের মজ্জাগত। ইচ্ছা ও আকাঙ্খার ঐক্য ছাড়া এগুলো দূরিভূত হওয়া খুবই কষ্টকর। নবীর ধর্মই তাদের রুক্ষতা ও প্রতিহিংসাকে দমন করতে পারে। কারণ এই ধর্মই তাদেরকে বর্বর জাতি থেকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছে। তাদের মধ্যে এ সময় এমন ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়া উচিত যিনি তাদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করবেন এবং অসত্য থেকে বিরত রাখবেন তবেই তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে এবং নেতৃত্ব দানে সক্ষম হবে।’ ইবনে খালদুনের এ বক্তব্য একবার দু’বার নয় অনেকবার পড়লাম। কথাগুলো সম্মোহিত করে ফেলল আমাকে। আমার মনে হলো এই লাইন কয়টিতে পৃথিবীর সমাজ বিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন যা বলেছেন তার চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। এক মুহূর্তেই আরব দেশগুলোর অনৈক্য, দূর্বলতা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বহুমুখিতা, পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদির কারণ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। মনে হলো, নবীর শিক্ষা ও আদর্শের শক্তিই আরবদের এবং মুসলমানদের আবার শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করতে পারে। এই চিন্তা আমার সত্ত্বা জুড়ে তড়িত প্রবাহের মত ছড়িয়ে পড়ল। আমি যেন নতুন চিন্তা চেতনায় নতুন মানুষে পরিণত হলাম। তারপর কয়েকদিনে আমি ইবনে খালদুনের এই মুকাদ্দামা পড়ে শেষ করলাম। তখন শুধু আরব জীবন, আরব ইতিহাস নয়, গোটা পৃথিবীর ইতিহাস ও সভ্যতা নতুন পরিচয় নিয়ে আমার সামনে আবির্ভুত হলো। আমার মনে হলো মুসলমানরা ঈমান, কোরআন ও হাদীসের ভূমিকা পরিহার করলে তাদের সংস্কৃতি সভ্যতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না-আরবতত্ত্ব নয়, জাতিতত্ত্ব নয়, লীন হয়ে যেতে হয় বৈরী সভ্যতা সংস্কৃতি ও জাতিদেহের মধ্যে। সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম শুধু স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিয়ে বাঁচার জন্যে নয়, সুন্দর মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী চিরন্তন শান্তির জন্যে আমাকে ইসলামে ফিরে আসতে হবে। এই হলো আমার ঘরে ফেরার কাহিনী।’ থামল আবদুল্লাহ আল ফারুক।
আবদুল্লাহ আল ফারুক থামতেই দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল আবদুল্লাহ আল ফারুকদেরকে লক্ষ্য করে, ‘তোমরা খুব সরল এবং সৎ। কিন্তু স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন তোমাদের ভাগ্যে নেই, সুন্দর মৃত্যুও নয়। পরকালীন শান্তি হয়তো পাবে। কারণ আর যাই হোক আজকের বিশ্ব পরিচালনা তোমাদের দ্বারা সম্ভব নয়।’
‘হ্যাঁ, জানোয়ারের বিশ্ব যদি হয় তা পরিচলানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু মানুষের বিশ্ব পরিচালনা সম্ভব। আর এ বিশ্ব জানোয়ারদের নয় মানুষের।’ বলল কামাল সুলাইমান।
‘জানো মানুষই সবচেয়ে বড় জানোয়ার?’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘তাদের মানুষ করার জন্যই তো শেষ নবীর শেষ রেসালত।’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘কিন্তু তা করতে পারেনি তোমাদের শেষ নবীর শেষ রেসালত। এই কারণেই তো জানোয়ার বন্দী করতে পারনি, যাদের জানোয়ার বল তারা তোমাদের বন্দী করে এনেছে।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘তোমার কথাই শেষ কথা নয়, দেখো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তোমাদের লীলা-খেলার ইতি ঘটছে, ঘটবে। সেখানে জেনারেল শ্যারনসহ তোমাদের অনেকেই বিচারের সম্মুখিন হচ্ছে।’
চোখ দুটি জ্বলে উঠলো দানিয়েল ডেভিডের। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘তার শোধ নিচ্ছি আমরা এবং নেব।’
বলে একটু থামল দানিয়েল ডেভিড। একটু পর বলল, ‘তোমাদের আস্ফালন বুদবুদের মত। জানো, মি.হাইম হারজেল তোমাদের কাছ থেকে কি জেনে নিল?’
কামাল সুলাইমানরা এ জিজ্ঞাসার জবাবে কিছুই বলল না। দানিয়েল ডেভিডই আবার কথা বলে উঠল। বলল, ‘তোমাদের ঈমান ও শক্তির গভীরতা তিনি যাচাই করলেন। দেখলেন, মূল কোরআন হাদিস থেকে কোন শিক্ষা তোমরা পাওনি। কোরআন হাদিসের গোটা শিক্ষাও তোমরা জান না। কিছু কার্যকারণের মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে একটা জাতীয় আবেগের সৃষ্টি হয়েছে মাত্র এবং এটা পরীক্ষায় টিকবে না। তোমরা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।’
হাসল কামাল সুলাইমান। বলল, ‘ইসলামের প্রথম যুগে যাঁরা মক্কায় শহীদ হয়েছিলেন, বদর প্রান্তরে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, ওহোদ-খন্দকে শহীদ হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁরা সকলে গোটা কোরআন পড়েছেন-জেনেছেন বলেছেন বলেই শহীদ হননি। বরং ঈমানের জন্যে নয় আমলের জন্যে গোটা কোরআন জানা শর্ত। আর মানুষ জীবন দিতে পারে ঈমানের যুক্তিতেই। সুতরাং তোমাদের ইচ্ছা এতদিন পূরণ হয়নি, কোনদিনই পূরণ হবে না।’
চোখ দু’টি আবার জ্বলে উঠল দানিয়েল ডেভিডের। শক্ত হয়ে উঠল তার চোয়াল। সে তার ডান দিকে বসা আইজ্যাক শামিরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে কিছু নির্দেশ দিতে যাচ্ছিল এমন সময় একটা শক্তিশালী বীপ বীপ শব্দ ভেসে এল।
সংগে সংগে নিজেকে সামলে নিয়ে লাল চোখে কামাল সুলাইমানের দিকে চেয়ে বলল, ‘বস আসছে। এখন আর সময় নেই। যে মুখে এই অহংকারের কথা বললে, সে মুখ গুঁড়ো করে দেব। তৈরী থেক।’
কথা শেষ করল এবং তার পরেই দু’পাশের দু’জনকে বলল, ‘চল এদের খোঁয়াড়ে রেখে আসি।’
বলেই বন্দী তিনজনকে টেনে নিয়ে ওরা ছুটল খোয়াড়ের দিকে।
ওদের খোয়াড়ের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে, গ্রীলের দরজায় বিশাল তালা ঝুলিয়ে দ্রুত ফিরে এল নিজ নিজ চেয়ারের কাছে।
বীপ বীপ শব্দ তখনও চলছিল।
কিন্তু তাদের সামনের মেঝের চেহারাটা পাল্টে গেছে। বন্দীদের রক্তে ভেজা মেঝেটা কোথায় সরে গেছে। তার জায়গায় শোভা পাচ্ছে শ্বেত পাথরের সুন্দর মেঝে।
ওরা তিনজন ফিরে এসে চেয়ারে বসল না। তাদের দৃষ্টি শ্বেত পাথরের মেঝের দিকে। অপেক্ষা করছে তারা তাদের বসের।
মাত্র কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা।
তার পরেই শ্বেত পাথরের ওপাশ ঘেঁষে অনেকখানি জায়গায় মেঝে সরে গেল এবং সেখানে চোখের পলকে উঠে এল একটা চেয়ার সমেত একজন মানুষ। চেয়ারে বসা লোকটার তীরের মত ঋজু দেহ। লাল মুখটা পাথরের মত কঠিন। চোখের দৃষ্টিটা শূণ্য। তাতে কোন ভাষা নেই। গায়ে সামরিক পোশাক। হাতে সোনার একটি গ্লোব। গ্লোবের মাঝে জেরুসালেমের প্রোথিত নল আকারের একটা সোনারই দন্ড। তার মাথায় ছয় তারকার একটা পতাকা।
ইনিই আজর ওয়াইজম্যান। ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মির’ অবিসংবাদিত নেতা। তার হাতের গ্লোবটি নেতার মনোগ্রাম। নেতার হাতেই শুধু এটা শোভা পায়।
ওরা তিনজন দাঁড়িয়েই ছিল।
আজর ওয়াইজম্যান উঠে এসে স্থির হতেই ওরা তিনজন তাকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিল।
আজর ওয়াইজম্যানও একজন সর্বাধিনায়কের মত সামরিক কায়দায় স্যালুট গ্রহন করল এবং তাদেরকে ‘গুড মর্নিং’ বলে স্বাগত জানিয়ে বসতে বলল।
বসল ওরা তিনজন।
‘মি.দানিয়েল ডেভিড, আপনাদের মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, আপনাদের হাত শূণ্য। কিন্তু আজ তিন সপ্তাহ যাচ্ছে।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘আমরা দুঃখিত। আমাদের হাত সত্যিই শূণ্য। অবিশ্বাস্য ব্যাপার স্যার, শারীরিক এধরনের নির্যাতনে হাতিও কথা বলে কিন্তু এই নির্যাতনেও তাদের কথা বলা পারছে না।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘বিস্ময়ের কথা বলছেন কেন? এটা তো জানা কথা। আর হাতির সাথেও তুলনা চলে না। হাতি পশু, মানুষ নয়। সুতরাং মানুষ হাতির চেয়ে শক্ত হবে। আর মানুষের মধ্যে মুসলমানরা শক্তিশালী, একথা বাইরে না বললেও তোমাদের তো মনে রাখা উচিত।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘ঠিক বলেছেন স্যার। নির্যাতনের এখানকার সকল প্রক্রিয়াই ব্যর্থ হয়েছে তাদের কথা বলাতে। তারা বলে জাহান্নামের শাস্তি এর চেয়েও ভয়াবহ।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘এটাই তো ওদের শক্তি। মৃত্যুকে যারা সোনালী জগতে প্রবেশের সোনার সিংহদ্বার বলে মনে করে, তারা দুনিয়ার সব ভয়কেই জয় করে। কিন্তু মি.দানিয়েল ডেভিড, তাদের কথা বলাতে হবে। ডকুমেন্টের ডুপ্লিকেট তাদের কাছে অবশ্যই আছে এবং সেগুলো আমাদের অবশ্যই চাই।’ আর ওয়াইজম্যান বলল।
‘ডুপ্লিকেটগুলো যখন ওদের কাছে আছে, নিশ্চয় তারা কোথাও সেগুলো রেখেছে। স্যার, সেগুলো খুঁজে পাওয়া কি সম্ভব নয়?’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি। ফল হয়নি। আবার চেষ্টা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। এই সাতজনের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব কাউকেই এই অনুসন্ধান তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে না। এরপর আমরা চিন্তা করেছি, এই সাতজনের যাদের স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি আছে তাদের এখানে নিয়ে আসব। তাদের কথা বলাবার এটাই শেষ পথ।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
আজর ওয়াইজম্যানের শেষের কথাগুলো শুনে তিনজনের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল দানিয়েল ডেভিড, ‘স্যার ওদের কথা বলাবার হন্যে ওদের স্ত্রী সন্তান ও মায়েরাই হবে অব্যর্থ অস্ত্র। স্যার, আমার মতে এই সাতজনের আত্মীয় বন্ধুদের সন্ধানে সময় ব্যয় না করে অবিলম্বে এদের পরিবার পরিজনদের এখানে আনলেই কাজ হবে বেশি।’
‘হ্যাঁ, সেটাও আমরা ভাবছি। আমি যাচ্ছি স্ট্রাসবার্গে দু’একদিনের মধ্যে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘আপনাকেই যেতে হবে? খুব বড় কাজ তো ওটা নয়। নির্দেশ দিলেই তো ওদের এখানে নিয়ে আসবে।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘ওখানে যেতে হবে। মনে হচ্ছে আমরা নতুন এক বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছি। খবর পাওয়া গেছে, আহমদ মুসা নাকি স্ট্রাসবার্গের উদ্দেশ্যে সুরিনাম ছেড়েছে। আমরা খবরটাকে অবিশ্বাস করছি না। যে মাফিয়া গ্রুপের কাছে থেকে খবর পাওয়া গেছে তাদের সাথে ভাল সম্পর্ক সুরিনাম সরকারের। তাদের মাধ্যমে আহমদ মুসার টিকিটের বিস্তারিত বিবরণ পেয়ে গেছি। সে সুরিনাম থেকে মদিনায়, মদিনা থেকে আসছে স্ট্রাসবার্গে। এই স্ট্রাসবার্গে আসার দিনক্ষণটাই অনিশ্চিত রয়ে গেছে আমাদের কাছে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘কেন সে আসছে স্ট্রাসবার্গে?’ জিজ্ঞেস করল দানিয়েল ডেভিডের পাশ থেকে হাইম হারজেল।
‘ইউরোপের একমাত্র কার্যকর মুসলিম গোয়েন্দা সংস্থা স্পুটনিক ধ্বংস হয়েছে, সংস্থার ৭জন পরিচালকের সবাই নিখোঁজ। স্ট্রাসবার্গে এমন সাংঘাতিক ঘটনা ঘটার পর জিজ্ঞাসার প্রয়োজন আছে কি যে আহমদ মুসা সেখানে কেন আসছে!’
‘স্যরি। ঠিক বলেছেন স্যার। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, ইউরোপের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা যেখানে স্পুটনিক ঘটনার কোন কুল কিনারা করতে পারেনি, সেখানে আহমদ মুসা এসে কি করবে।’ বলল হাইম হারজেল।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আহমদ মুসা কি ঘটিয়েছে এটা দেখার পরেও আপনি একথা বলছেন? মার্কিন এফবিআই বহু বছরেও যার টিকির নাগাল পায়নি, আহমদ মুসা তার শুধু নাগাল পাওয়া নয়, ইহুদীদের শত বছরের সব আয়োজনই তো সে ধ্বংস করে দিয়েছে। ইহুদি গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শ্যারনের গায়ে কেউ কোন দিন হাত দিতে পারে নি। কিন্তু আহমদ মুসা তাকে মার্কিন কারাগারে নিক্ষেপ করে এমন মামলায় জড়িয়েছে যে জেলের বাইরে আসাই হয়তো তার পক্ষে আর সম্ভব নয়।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
মুখ শুকিয়ে গেছে হাইম হারজেলের। মুখ নিচু করল সে। কথা বলতে পারল না।
মুখ খুলল দানিয়েল ডেভিড। বলল, ‘স্ট্রাসবার্গে আহমদ মুসার আগমন সত্যিই খুব খারাপ খবর। আজ পর্যন্ত দুনিয়ার যে জায়গাতেই সে পা দিয়েছে, সেখানেই ভাগ্যের আনুকুল্য সে পেয়েছে। আর………।’
‘মি.হাইম হারজেল আহমদ মুসাকে জিরো করতে চেয়েছিলেন। আর আপনি তাকে ‘হিরো’ করতে চাচ্ছেন। আমরা যদি তাকে অজেয় হিরোই মনে করি, তাহলে তো আমাদের করার কিছুই থাকে না।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘স্যরি স্যার।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘ধন্যবাদ মি.দানিয়েল ডেভিড। আসলে কি জানেন, অতীতে আহমদ মুসা সম্পর্কে আমাদের পলিটিক্স ঠিক হয়নি। তাকে বন্দী করে আমরা আর্থিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছি। এটা ঠিক হয়নি। তার মত লোককে যে বন্দী রাখা যায় না, এটা বুঝতে আমরা ভুল করেছি। সুতরাং এবার আমাদের সিদ্ধান্ত সুট অন সাইট। দেখা মাত্রই তাকে গুলী করা হবে। তাকে আমাদের দরকার নেই, তার লাশ দরকার।’
‘স্ট্রাসবার্গে আপনি কবে যাবেন স্যার?’ জিজ্ঞেস করল দানিয়েল ডেভিড।
‘আজই।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘একটা কথা স্যার।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘কি কথা?’
‘স্পুটনিকের ৭জন ছাড়া আর ২শর মত যারা আছে, তারা কিন্তু এদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। মুখ থেকে মুখে, কান থেকে কানে এই পদ্ধতিতে তারা তথ্য আদান-প্রদান ও শিক্ষা ক্লাস চালু করেছে। এদের এক সাথে এইভাবে রাখা আমাদের লক্ষ্যের পক্ষে কল্যাণকর হচ্ছে না।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
হাসল আজর ওয়াইজম্যান। বলল, ‘মি.ডেভিড, স্পুটনিকের সাতজন ছাড়াও যাদের এখানে রাখা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব অঞ্চলের ইসলামের নেতা। তারা প্রত্যেকেই একটি করে শক্তির জেনারেটর। এখানে তাদের শেখার এবং শেখাবার কিছু নেই মি.ডেভিড।’
বলে একটু থামল আজর ওয়াইজম্যান। শুরু করল আবার, ‘আমাদের এটাকে ‘ক্যাম্প গ্রিনডার’ বলতে পারেন। মানুষকে পেষণ করে তার রস নিংড়ে নেয়াই এই ক্যাম্পের লক্ষ্য। ওদের কাছ থেকে সব তথ্য, সব কথা নিংড়ে নিয়ে ওদের আমরা আটলান্টিকে ডুবিয়ে দেব।’
‘কিন্তু ওদের সন্ত্রাসী সংগঠন ও অস্ত্রপাতি সম্পর্কে তো কিছুই জানা যাচ্ছে না। বলছে না কিছুই ওরা শত নির্যাতনেও।’ বলল তিনজনের একজন আইজ্যাক শামির।
‘থাকলে তো বলবে কিছু ওরা। ওরা সন্ত্রাসী নয়, সন্ত্রাসী কোন সংগঠনও ওদের নেই।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘কিন্তু আমরা ওদের সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছি সন্ত্রাসী সংগঠন হওয়ার অভিযোগে এবং ওদেরও তো আটক করেছি ভয়ানক সন্ত্রাসী হিসেবে।’ বলল সেই আইজ্যাক শামিরই।
আজর ওয়াইজম্যানের পাথুরে মুখে হাসি ফুটে উঠল বলল, ‘তোমরা জান, ওটা আমাদের প্রোপাগান্ডা, ওদের সংগঠন নিষিদ্ধ করা ও ওদের আটক করার একটা ওজর। আসলে আমরা চাই, ইসলামী পূণর্জাগরনের সব সংস্থা সংগঠন ধ্বংস করতে এবং ওদের পুনর্জাগরণের গোপন কথাগুলো জানতে।’
‘কিন্তু সেরকম কোন তথ্য আমরা বের করতে পারছি কি?’ বলল হাইম হারজেল।
‘প্রচার। এই কিছুক্ষণ আগে কামাল সুলাইমানের কাছ থেকে যে কথাগুলো বের করলেন, তার প্রিন্টের উপর আমি আসার সময় চোখ বুলিয়ে এসেছি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সে দিয়েছে। আমাদের উদ্বেগের বিষয় হলো, গত ৫০ বছরে মুসলিম বিশ্বে এমন কি ঘটল যে, মুসলিম তরুণরা, যুবকরা হঠাৎ করে ধর্ম নিরপেক্ষ, এমন কি তাদের অতিপ্রিয় ভাষা ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ ছেড়ে দিয়ে ইসলামের প্রতি অসীম ভালোবাসায় পাগল হয়ে উঠল। এই রহস্য উদঘাটন হচ্ছে। এই তো ক’মিনিট আগে কামাল সুলাইমানদের কাছ থেকে যা শুনলে, তাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।’ থামল আজর ওয়াইজম্যান।
সে থামতেই দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল, ‘সেটা কি?’
‘এক ধরনের ইতিহাস, এক ধরনের বই-পুস্তক এবং এক ধরনের ঘটনাবলী এমনকি সেকুলার মুসলিম যুবকদেরকেও ইসলামে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রবল শক্তিশালী জেনারেটরের ভূমিকা পালন করছে। কামাল সুলাইমানদের দেয়া তথ্য থেকে এই বিষয়টা সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেল।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘এই জানায় লাভ কি?’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘জানায় লাভ হলো, আমরা এখন মুসলিম পাবলিকেশন্স এবং মুসলিম লাইব্রেরীসহ সব পাবলিকেশন্স ও লাইব্রেরীর দিকে নজর দেব। কিছু দিনের মধ্যেই দেখবেন, লাইব্রেরী থেকে ঐ ধরনের বইগুলো উধাও হয়ে গেছে, পুস্তক বিক্রেতাদের দোকান থেকে ঐ ধরনের বই সব রাতারাতি বিক্রি হয়ে গেছে এবং কোন প্রকাশনাই আর ঐ ধরনের বই প্রকাশ করছে না। দু’একটা প্রকাশনা যদি বেয়াড়া হয়, তাহলে স্পুটনিকের মতই সেগুলো জন্মের মতো ধ্বংস হয়ে যাবে। তাছাড়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমরা মুসলিম সরকারগুলোকে বাধ্য করবো যাতে মৌলবাদী, উত্তেজক, প্ররোচক ঐসব বই এর প্রকাশনা শান্তির স্বার্থেই বন্ধ করে দেয়া হয়।’ থামল আজর ওয়াইজম্যান।
দানিয়েল ডেভিডের চোখ-মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল দানিয়েল ডেভিড, ‘ধন্যবাদ স্যার। আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি। কিন্তু স্যার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নিয়ে কি করবেন? ওরা আমাদের বিরুদ্ধে তো উঠে পড়ে লেগেছে। জেনারেল শ্যারনকে ওরা মনে হয় ফাঁসি দিয়েই ছাড়বে।’
চিন্তা করছিল আজর ওয়াইজম্যান। দানিয়েল ডেভিড থামার একটু পর বলল, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক দেশ। মার্কিন জনগণ তাদের স্বার্থে আঁচড় লাগাতে দিতেও নারাজ। আমরা ইহুদীবাদীরা এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেইনি। আমরা তাদের পাতের ভাত কেড়ে খেতে শুরু করেছিলাম। কিছু মানুষকে হয়তো চিরদিনই বোকা বানিয়ে রাখা যায়, তবে সব মানুষকে সব সময়ের জন্যে বোকা বানিয়ে রাখা অসম্ভব, আমরা এ সত্যটাকেও আমলে দেইনি। নিউইয়র্কের লিবার্টি টাওয়ার ও ডেমোক্রাসি টাওয়ার ধ্বংসের দায় মুসলমানদের ঘাড়ে সফলভাবে চাপাবার পর যে মহাসুযোগ আমরা পেয়েছিলাম, তা আমাদেরকে বেশি বেপরোয়া করে তুলেছিল। এটা আমাদের ক্ষতি করেছে। আর আহমদ মুসা আমেরিকায় গিয়ে এরই সুযোগ গ্রহন করেছে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোটা পরিবেশ আমাদের প্রতিকূলে। নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে আমাদের সেখানে। ভয়ের কিছু নেই, আমরা চিন্তা করছি, আগামী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসে আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করার চেষ্টায় আমরা হাত দিয়েছি এবং পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমাদের পছন্দনীয় হয় তার জন্যে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের এসব প্রচেষ্টা বানচাল হয়ে যাবে যদি নিউইয়র্কের লিবার্টি ও ডেমোক্র্যাসি টাওয়ার ধ্বংসের আসল রহস্য মার্কিন জনগনের সামনে এসে যায়। এজন্যেই আমরা স্পুটনিক ধ্বংস করেছি, স্পুটনিকের হোতা সাত শয়তানকে আমরা আটক করেছি এবং তাদের সংগ্রহ করা লিবার্টি ও ডেমোক্র্যাসি টাওয়ার ধ্বংসের প্রকৃত প্রমাণাদি আমরা হাত করার চেষ্টা করছি। ঐ সাত শয়তানের কাছ থেকে যে কোন মূল্যে আমাদেরকে ঐ ডকুমেন্ট উদ্ধার করতেই হবে। দরকার হলে ওদের সব আত্মীয় পরিজনকে এখানে নিয়ে আসব এবং সাত শয়তানের মুখ খোলার জন্যে এদের গিনিপিগ বানাব। সুতরাং এই সাও তোরাহ দ্বীপের আমাদের মিশন সফল হওয়ার উপরই নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ভবিষ্যত। নিউইয়র্কের লিবার্টি ও ডেমোক্র্যাসি টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য ফাঁস হয়ে গেলে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা দুনিয়ার কাছে আমরা বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হবো।’ থামল আজর ওয়াইজম্যান।
আজর ওয়াইজম্যানের পাথুরে মুখ ভাবলেশহীন। কিন্তু দানিয়েল ডেভিডের চোখে মুখে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বলল দানিয়েল ডেভিড, ‘স্যার, সাও তোরাহ মিশন ব্যর্থ হবে না স্যার। সাত শয়তানকে অবশেষে কথা বলতেই হবে। তবে আহমদ মুসাকে ঠেকানো দরকার স্যার।’
‘হ্যাঁ, আহমদ মুসার ব্যাপারটা আমরা দেখছি। যে যাতে স্পুটনিকের ঘটনার ব্যাপারে নাক গলাতে না পারে, সে ব্যবস্থা আমরা যে কোন মূল্যেই করব। আমি আজই যাচ্ছি সেখানে।’
কথা শেষ করেই ‘গুড মর্নিং টু অল। ‍উইথ ইউ গুডলাক’ বলে চলে গেল আজর ওয়াইজম্যান।
‘গুড মর্নিং’ বলে দানিয়েল ডেভিডরাও তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।
ততক্ষনে চেয়ার সমেত আজর ওয়াইজম্যান অদৃশ্য হয়েছে।
তিনজনই আবার বসে পড়ল চেয়ারে। ঘড়ির দিকে তাকাল দানিয়েল ডেভিড। বলল, ‘চলুন আমাদেরও সময় হয়েছে যাবার।’

উপর থেকে দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে স্ট্রাসবার্গ শহরকে। বিমানটি তখন চক্কর দিচ্ছে স্ট্রাসবার্গের আকাশে। সবুজ রাইন উপত্যকা। গাঢ় সবুজ উপত্যকার পশ্চিম বরাবর নেমে আসা পাহাড়ের দেয়াল। ইউরোপের প্রধান ধমনী রাইন নদী বয়ে চলেছে আকাশের রংধনুর মত এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্তে। উপত্যকার সবুজ শাড়িতে রাইন যেন জীবন্ত এক রূপালী পাড়।
আহমদ মুসার মুগ্ধ চোখ দু’টি রাইন উপত্যকা ঘুরে এসে নিবদ্ধ হলো স্ট্রাসবার্গের উপর।
সবুজের সমুদ্রে লাল-সাদায় মেশানো সুন্দর শহর স্ট্রাসবার্গ। শহরের সবকিছু ছাড়িয়ে সবার উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ‘গথিক গীর্জা’। গথিক গীর্জার উপর নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার উৎসুক দু’টি চোখ। শহরের সবচেয়ে পুরানো অংশ এই ঐতিহাসিক গীর্জার সামনেই ‘দি রাইন ইন্টারন্যাশনাল হোটেল’। এ হোটেলে সিট বুক করা আছে আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার নজর পড়ল সুন্দর পাহাড়ী নদী ‘রাইনে’র উপর। এই নদীটি ঘিরেই গড়ে উঠেছে স্ট্রাসবার্গ নগরী। ‘রাইন’ থেকে একটা ক্যানেল গিয়ে পড়েছে রাইনে। এর ফলেই স্ট্রাসবার্গ কার্যত সমুদ্র বন্দরে পরিণত হয়েছে।
স্ট্রাসবার্গ এয়ারপোর্টে নামল আহমদ মুসা। স্ট্রাসবার্গ এয়ারপোর্ট থেকে রাস্তাটা তীরের মত সোজা গিয়ে প্রবেশ করেছে স্ট্রাসবার্গে। গাড়ির রিয়ার ভিউতে দীর্ঘ পথ এবং পথে গাড়ির দীর্ঘ সারির গোটাটাই নজরে আসে।
স্ট্রাসবার্গে ঢুকে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। খুবই প্রাচীন শহর, কিন্তু রাস্তাগুলো আধুনিক। এয়ারপোর্ট রোডের মতই রাস্তাগুলো সোজা, ছবির মত সাজানো। গাড়ি থেকে সামনে পেছনে অনেকদূর দেখা যায়। চোখ রাখা যায় অনেক দূর।
ভাড়া করা ট্যাক্সির পয়সা মিটিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা প্রবেশ করল দি রাইন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে।
রিসেপশন কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটা জার্মান মিশ্রিত ফরাসী ভাষায় আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাল। আর মেয়েটাকেও পুরো জার্মান মনে হলো না, আবার পুরো ফরাসীও নয়।
ভাষা ও চেহারাগত দিকটা এই রাইন উপত্যকা এবং এর সন্নিহিত এলাকার একটা বৈশিষ্ট্য। কারণ ফ্রান্স ও জার্মান বর্ডারের এই এলাকাটা শত শত বছর ধরে ফ্রান্স-জার্মান সংঘাতের শিকার। এই অঞ্চলটা কখনও ফ্রান্সের অংশ থেকেছে, কখনওবা জার্মানীর অংশ হয়েছে। ১৫০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এই এলাকা জার্মানরা শাসন করেছে। তারপর ফরাসীরা এটা দখল করে। জনগণ তাদের উপর ফরাসী পরিচয় চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু এই জনগনই আবার ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবের পর ফরাসী হবার জন্যে পাগল হয়ে ওঠে। ১৮৭১ সালে জার্মানরা যখন এই এলাকা দখলে করে নেয়, তখন এই এলাকার মানুষ জার্মানদের প্রত্যাখ্যান করে ফ্রান্সে হিজরত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফরাসীরা এই এলাকা জার্মানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই জার্মান এ অঞ্চলটা আবার দখল করে নেয়। যুদ্ধের পর ফ্রান্স অঞ্চলটা আবার ফিরে পায়।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটা স্বাগত জানালে আহমদ মুসা তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘আমি বিদেশী বলেই আমার কৌতূহল। আমি বুঝতে পারছি না আপনি জার্মান না ফরাসী।’
মেয়েটা হাসল। বলল, ‘আপনার কি মনে হয়?’
‘জার্মান ও ফরাসী দুই-ই মনে হয় আমার কাছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি ইউরোপীয়।’ বলে আবার হাসল মেয়েটি। বলল আবার আহমদ মুসাকে কথা বলবার সুযোগ না দিয়েই, ‘এটা বললাম কেন জানেন, স্ট্রাসবার্গ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী, মানে এখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড কোয়ার্টার।’
‘জানি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আরও কি জানেন, স্ট্রাসবার্গ সম্রাট শার্লেম্যানের স্পিরিচুয়াল ক্যাপিটাল ছিল?’ হেসে বলল মেয়েটি।
‘জানি। কিন্তু শার্লেম্যানের ধর্মরাজ্যের স্পিরিচুয়াল ক্যাপিটালকে ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী হিসেবে বেছে নিলেন কেন?’ হাসির সাথে হালকা কন্ঠেই বলল আহমদ মুসা।
প্রায় ৫০ বছর আগে জার্মানী ও ফ্রান্সের দুই রাষ্ট্রপ্রধান এই স্ট্রাসবার্গে বসেই শার্লেম্যানের আদর্শে ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করার নীল নক্সা করেছিলেন বলে বোধ হয়।’
‘শার্লেম্যানের খৃষ্টীয় মৌলবাদী আদর্শে নব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন!’ আহমদ মুসার চোখে মুখে কৃত্রিম বিস্ময়।
‘তা জানি না।’ হেসে উঠে কথাটা বলেই মেয়েটি মুখে সিরিয়াস ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘ওকে স্যার। এবার নিশ্চিন্ত থাকুন আমি একজন ফরাসী।’
‘আমি আহমদ আবদুল্লাহ। সৌদি আরব থেকে একটা কক্ষ বুক করা আছে। বুকিং নাম্বার ডবল ‘এ’ ডবল ‘জিরো’ ডবল ‘নাইন’।
‘প্লিজ স্যার, বলে মেয়েটি কমপিউটার কী বোর্ডে আঙুল ঘুরিয়ে স্ক্রীনের উপর দৃষ্টি বুলিয়ে বলল, ‘ওকে স্যার। ওয়েলকাম।’
ফরমালিটিজ সেরে আহমদ মুসার হাতে চাবি তুলে দিতে গিয়ে হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় বলে উঠল, ‘মি.আহমদ আবদুল্লাহ, একটা খবর দিতে ভুলে গেছি। আপনার দুজন বন্ধু আপনি এসেছেন কিনা, কবে আসবেন জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নাম বলেননি।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘আমার বন্ধু, নাম বলেনি!’
‘স্যার, ব্যাপারটা খুবই অসৌজন্যমূলক এবং অগ্রহনযোগ্য। সেজন্যে বিষয়টার আমরা ফরমাল রেকর্ডও করিনি।’ বলল মেয়েটি।
‘মাফ করুন, বলতে পারেন কন্ঠ দুটি কি জার্মান না ফরাসী ছিল?’
‘ওকে স্যার। জার্মান-ফরাসী কোনটিই নয়। খাঁটি বৃটিশ উচ্চারণ।’ বলল মেয়েটি।
ভাবছিল আহমদ মুসা। এমন কোন বৃটিশ বন্ধু নেই যারা তার এখানে আসার কথা জানে এবং এখানে সিট বুক করার কথা জানতে পারে!আবার ভাবল, ভুলও তো ওদের হতে পারে? আবার এমনও হতে পারে মুসলিম নামে বুকিং দেখে সরকারী কোন এজেন্সী অথবা অন্য কোন মহল পরিচয় চেক করার জন্যেই টেলিফোন করতে পারে। বেদনাদায়ক হলেও এটা সত্য যে, নিউইয়র্কের লিবার্টি ও ডেমোক্রাসি টাওয়ার ধ্বংসের পর থেকে মুসলমানদেরকে ইউরোপ আমেরিকায় সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। কিন্তু সেটা হলে সব মুসলিম বোর্ডারের ব্যাপারেই খোঁজ-খবর নেয়া হবে। সেটা হচ্ছে কি?
এটা চিন্তা করেই আহমদ মুসা রিসেপশনিস্ট মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হোটেলে কি আর কোন মুসলিম বোর্ডার আছেন?’
‘আছেন। দু’জন। একজন জার্মান ছাত্রী ‘ফাতিমা কামাল’, অন্যজন ফরাসী ছাত্র যায়েদ ফারুক। কিন্তু কেন বলুন তো?’
‘তাদের ব্যাপারে কেউ কি টেলিফোনে কিছু জিজ্ঞেস করেছে?’
‘না ।’ ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠেছে মেয়েটির। বলল সে আবার, ‘মি.আহমদ আবদুল্লাহ, আপনি কিছু সন্দেহ করছেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ভাবছিলাম। বেনামী টেলিফোন তো!’
‘মি.আহমদ আবদুল্লাহ, আপনি ইচ্ছা করলে পুলিশকে জানাতে পারেন।’
আবার হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আপাতত থাক। ধন্যবাদ আপনাকে।’
আহমদ মুসা কক্ষের চাবি নিয়ে চলে গেল তার কক্ষে।
কক্ষ পছন্দ হলো আহমদ মুসার। কক্ষের স্টাইল গথিক গীর্জার মত ট্রেডিশনাল হলেও উপকরণ সবই আধুনিক ।
আহমদ মুসা গোসল সেরে বিশ্রামে যেতে যেতে ভেবে নিল। কাজ শুরু করার আগে শহরটাকে ভালো করে দেখে নেবে । আজ পূর্ণ বিশ্রাম, কাল থেকে শহর দেখে শুরু।
সেদিন আহমদ মুসা ফিরছিল ‘ইউরোপা’ রোড হয়ে । বিখ্যাত এই ইউরোপা রোডেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড কোয়ার্টার। আহমদ মুসা রাস্তার থার্ড লেইন ধরে গাড়ি চালাচ্ছিল। অভ্যাস বশতই রেয়ারভিউতে চোখ যাচ্ছিল তার।
এক সময় বিস্মিত আহমদ মুসার চোখ দুটি আঠার মত লেগে গেল রেয়ারভিউতে। দেখল, দু’টি গাড়ি, একটা ব্রাউন, অন্যটি এ্যাশকালার, অনেক্ষণ ধরে তার পেছনে আসছে একই গতিতে। গাড়ি দুটি মাঝে মাঝেই সমান্তরালে চলে যাচ্ছে, আবার আগে পিছে চলে আসছে। তাও আবার বাই রোটেশানে একবার ব্রাউনটা আগে আসছে, পরে আবার এ্যাশকালারটা। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল গতকালও গাড়ি দুটিকে সে তার পেছনে দেখেছে এবং এয়ারপোর্ট থেকে আসার সেই প্রথম দিনেও এই গাড়িই তার পেছনে ছিল । হতে পারে অন্যান্য দিনেও গাড়ি দুটি তার পেছনে ছিল, কিন্তু হয়তো তার চোখে পড়েনি।
ভাবল আহমদ মুসা। এটা কি কোন কো-ইন্সিডেন্ট, না কেউ তাকে ফলো করছে? সিদ্ধান্ত নিল আহমদ মুসা, আগামীকালও সে এ বিষয়টি পরীক্ষা করবে।
হোটেলের পার্কিং প্লেসে গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা। গাড়ি থেকে নেমেই গীর্জা ও হোটেলের মাঝের রাস্তার উপর চোখ ফেলল, না গাড়িটা এ রাস্তায় ঢোকেনি। গীর্জার মোড়ে বাঁক নিয়ে তাকে গীর্জার রাস্তায় প্রবেশ করতে হয়েছে। হতে পারে, ওরা বাঁকের আড়ালে দাঁড়িয়ে এদিকে চোখ রাখছে।
আহমদ মুসা ঢুকে গেল হোটেলে।
পরদিন আহমদ মুসা যাচ্ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্পুটনিক অফিসে। সেদিন এসেই একবার গেছে। কিন্তু আরও ভালো করে দেখা প্রয়োজন।
যা ভেবেছিল তাই। গাড়ি দু’টি আসছে তার পেছনে।
ওরা ফলো করছে তাকে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু ওরা কারা? ওরা কি তাকে নবাগত মুসলিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে ফলো করছে, না তাকে আহমদ মুসা হিসেবে ফলো করছে? কিন্তু তাকে আহমদ মুসা হিসেবে চিনবে কি করে? সন্দেহ নেই, তার ফটো ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইরগুন যাই লিউমি’ ও ‘মোসাদে’র কাছে আছে। কিন্তু আহমদ মুসার এই স্বাভাবিক চোহারার ফটো তাদের কাছে নেই। তাছাড়া তাকে আহমদ মুসা হিসেবে যদি চিনেই থাকে, তাহলে তাকে শুধু ফলো করবে কেন? তাকে এ কয়দিনে হত্যা বা বন্দী করার উদ্যোগ নেয়াই স্বাভাবিক ছিল। তাহলে কি ওরা আমাকে ধরার আগে আমার কন্ট্যাক্ট পয়েন্টগুলে চিহ্নিত করতে চায়? যাদেরকে তাদের দরকার হতে পারে? শুধু মুসলিম ব্যক্তিত্ববলে পরিচয় জানা বা কন্ট্যাক্ট পয়েন্টগুলোর সন্ধান করার জন্যে এভাবে কেউ পেছনে লেগে থাকতে পারে? হয়তো পারে। তবে আহমদ মুসার মন বলল, ওরা নিছক একজন মুসলিম ব্যক্তিত্বে সন্ধানে ঘুরছে না। তাহলে? তাহলে কি তারা তাকে আহমদ মুসা হিসেবে চিনতে পেরেছে, না আহমদ মুসা হিসেবে সন্দেহ করছে?
গ্রীন সার্কেলে পৌঁছে গেছে আহমদ মুসা। এই গ্রীন সার্কেলেই স্পুটনিকের অফিস ছিল।
গ্রীন সার্কেলটা বিশাল একটি সার্কুলার মার্কেট। বিশাল সার্কুলার মার্কেটটির মাঝখানে বিরাট গ্রীন সার্কেল, বৃত্তাকার বিরাট বাগান। বাগানটা গাছে ঠাসা। মাঝে মাঝে বসার বেঞ্চি ও বাচ্চাদের দোলনা। বৃত্তাকার বাগানটির মাঝখানে আবার ঘাসে ঢাকা বৃত্তাকারি একটি উন্মুক্ত চত্বর। বৃত্তাকার বাগান ও তার চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকার মার্কেটটি, মাঝখান দিয়ে বৃত্তাকার একটি রাস্তা। আবার বৃত্তাকার মার্কেটটির বাইরের চারপাশ ঘিরে একটা প্রশস্ত সার্কুলার রোড।
আহমদ মুসার গাড়ি প্রবেশ করল এই সার্কুলার রোডে। দিনটা রোববার। বিকেল। মার্কেট বন্ধ।
সার্কুলার রোডে গাড়ি ছিল না বললেই চলে।
আহমদ মুসার এক মিনিট পর অনুসরণকারী গাড়ি দুটি প্রবেশ করল সার্কুলার রোডে।
আহমদ মুসা কি করবে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। যে লেন দিয়ে স্পুটনিক অফিসে প্রবেশ করতে হয়, সেই লেন দিয়ে আহমদ মুসা ধীর গতিতে প্রবেশ করল মার্কেট ও বৃত্তাকার বাগানের মাঝের ইনার সার্কুলার রোডে।
গাড়ি দুটিও প্রবেশ করল।
বাগানে দু’চার জন লোক দেখা যাচ্ছে। ছুটির দিনে বাগানে যে ভীর হয়, তা এখনও হয়ে ওঠেনি।
আহমদ মুসা তার গাড়ির রিয়ারভিউতে দেখল, গাড়ি দুটো দুরত্ব আগের চেয়ে কমিয়ে দিয়েছে। সার্কুলার রোড হওয়ার কারণে আহমদ মুসার গাড়ি যাতে চোখের আড়ালে না যায়, সেজন্যেই এ দূরত্ব কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
পেছনের গাড়ি দুটি পাশাপাশি ড্রাইভ করে আহমদ মুসার পেছনে পেছনে আসছিল।
আহমদ মুসা এক সময় চোখের পলকে তার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে তীব্র বেগে এগিয়ে গাড়ি দুটি ব্লক করে তাদের সামনে দাঁড়াল এবং তার সাথে সাথেই গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এল আহমদ মুসা।
গাড়ি দুটিও হার্ড ব্রেক কষে দাড়িয়ে পড়েছিল। প্রথমটায় তারা হচকচিয়ে গিয়েছিল। সে ভাবটা কাটিয়ে উঠে আহমদ মুসাকে সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখেই ওরা গাড়ির দুপাশে দুজন বেরিয়ে এল। তারা দুদিক থেকে দুজন এক পা দু’পা করে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের একজনের হাতে রিভলবার কোটের আড়ালে লুকানো। আরেকজনের হাতে রেশমি ফাঁস। ওরা এত তাড়াতাড়ি এগ্রেসিভ হয়ে উঠবে, আহমদ মুসা তা ভাবে নি। আর আহমদ মুসা এভাবে এখানে রিভলভার ব্যবহার করাকেও ভাল মনে করছে না।
আহমদ মুসা তার ভাবনা শেষ করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই সে দেখল, যার হাতে ফাসি তার ফাঁসিটা আকাশে উড়তে শুরু করেছে।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল এবং এ্যাক্রোব্যাটিক কায়দায় ‍দু’হাত প্রসারিত করে সামনে মাটির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পা আকাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে শূন্যেই শরীরটাকে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে দু’পায়ের প্রচন্ড লাথি মারল রিভলবার হাতে নিয়ে দাড়াঁনো লোকটির মাথায়।
লোকটি রিভলবার তুলেছিল এবং গুলিও করেছিল আহমদ মুসার লাথি তার মাথায় আঘাত করার সময়। কিন্তু গুলিটা ৭৫ ডিগ্রী কোণ করে আসা আহমদ মুসার দেহের অনেক নিচ দিয়ে চলে গেল।
জোড়া পায়ের লাথি খেয়ে লোকটির দেহ ছিটকে পড়ে গেল গাড়ির পাশে। তার সাথে আহমদ মুসার দেহও ভূপাতিত হলো।
মাটিতে পড়েই উঠে বসল আহমদ মুসা। লোকটির হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলবার কুড়িয়ে নিয়েছে সে।
লোকটি উঠে বেসেছিল। আহমদ মুসা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলবারের বাট দিয়ে তার মাথায় প্রচন্ড এক ঘা দিল।
লোকটি সংগা হারিয়ে ফেলল।
আহমদ মুসা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল ফাঁসিওয়ালা লোকটি কোথায়। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।
আহমদ মুসা ক্রলিং করে গাড়ির পেছনে ঘুরে গাড়ির ওপাশটায় উকি দিল। কিন্তু কেউ নেই।
‘তাহলে কি ওপাশের গাড়ির ওপারে লুকিয়েছে?’ ভাবল আহমদ মুসা।
ভাবার সংগে সংগেই আহমদ মুসা হাতে রিভলবার বাগিয়ে ধরে কয়েক লাফে ওগাড়ির পেছনে চলে গেল। তার পর মুহূর্তকাল থেমেই গাড়ির ওপাশটায় উঁকি দিল। না কেউ নেই। তাহলে কি পালিয়েছে?
পরক্ষনেই তার মনে হলো, সে তো তাকে বোকা বানায়নি?
সংগে সংগেই স্প্রিং এর মত উঠে দাড়িয়ে পেছন ফিরল আহমদ মুসা। কিন্তু তখন দেরী হয়ে গেছে। তার চোখের সামনে দিয়ে প্রথম গাড়িটা সাঁ করে বেড়িয়ে গেল। দেখল, যাবার সময় দ্বিতীয় লোকটি তার সংগাহীন সাথিকে তুলে নিয়ে গেছে। বুঝল আহমদ মুসা, সে যখন দু’গাড়ির এপাশ ওপাশ দেখছিল, তখন ঐ দ্বিতীয় লোকটি প্রথম গাড়ির সামনের দিকটায় গিয়ে লুকিয়েছিল। তারপর সে দ্বিতীয় গাড়ির দিকে চলে যাওয়ায় তার সুযোগ নিয়ে সাথিকে সহ পালিয়েছে।
বোকার মত কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকল আহমদ মুসা। তারপর রিভলবারটা পকেটে ফেলে এগুলো দ্বিতীয় গাড়িটার দিকে। টার্গেট হলো, ওদের খোঁজ পাওয়ার মত কোন কাগজপত্র ওদের গাড়িতে পাওয়া যায় কিনা।
গাড়িতে লাইসেন্স, ব্লুবুক ছাড়া কাগজ জাতীয় আর কিছুই পেল না।
লাইসেন্স ও ব্লুবুকের ঠিকানাগুলো টুকে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
আসরের নামাজের সময় তখন যায় যায় অবস্থা। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বাগানে প্রবেশ করে একটা গাছের আড়াল খুঁজে নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম অর্থাৎ কাবামুখী হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল।
চারটি চোখ আহমদ মুসাকে ফলো করছিল। একজন তরুনীর দুই চোখ এবং একজন তরুনের দুই চোখ। এই চার চোখ আহমদ মুসার সাথে দুই গাড়িওয়ালার সংঘাত –সংঘর্ষটাও দেখেছে। কিভাবে আহমদ মুসার গাড়িটা অনুসরণকারী দু’গাড়ির মুখোমুখি হলো, কিভাবে আহমদ মুসা একজন রিভলবারওয়ালা ও একজন ফাঁসওয়ালার মুখোমুখি হলো, কেমন দক্ষ এ্যাক্রোব্যাটিক কায়দায় আহমদ মুসা একই সাথে ফাঁস থেকে বাচল এবং রিভলবারধারীকে কুপোকাৎ করল, কিভাবে একজন গাড়িওয়ালা সংগাহীন একজন সাথীকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচল, সবই তাদের চার চোখ অবলোকন করেছে বাগানের এক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। আহমদ মুসা বাগানে প্রবেশ করার পরও সে তাদের চোখের সামনেই ছিল। তাদের সে বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি যে, একজন শান্তশিষ্ট চেহারার ও সাধারণ মাপের একজন মানুষ কিভাবে দু’জন ষন্ডামার্কা ফরাসীকে নাকে খত দিয়ে ছাড়ল!কিন্তু তারা যখন আহমদ মুসাকে নামাজ পড়তে দেখল তখন তাদের চার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। দু’জন এক সাথেই স্বগত কন্ঠে বলে উঠল, ‘লোকটি তাহলে মুসলমান।’
ধীরে ধীরে তাদের দু’জনের চোখমুখের বিস্ময় কেটে গিয়ে সেখানে আনন্দের প্রকাশ ঘটল। আহমদ মুসা মুসলমান একথা জানার পর তাদের মনে আনন্দের অন্ত রইল না। তারা ভেবে খুশি হলো যে, একজন এশিয়ান মুসলিম দু’জন বন্দুকধারী ফরাসীকে অবলীলাক্রমে পরাজিত করতে পারল।
দুজনেই ধীরে ধীরে এগুলো নামাজরত আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা তখন মুনাজাত করছে।
আহমদ মুসার পাশে গিয়ে থমকে দাঁড়াল ওরা।
আহমদ মুসাও মুনাজাত এই সময় শেষ করেছিল। ঘাসের উপর পায়ের ক্ষীণ নরম শব্দ আহমদ মুসার কান এড়ায়নি। তাকাল আহমদ মুসা ওদের দিকে।
আহমদ মুসার চোখে ছিল ক্ষীপ্র এক সতর্কতা। চোখ যখন সে ওদের দিকে ঘুরাচ্ছিল, তখন তার হাত চলে গেল গিয়েছিল রিভলবারের বাঁটে।
পাশে এসে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণীদেরও এটা চোখে পড়েছিল।
আহমদ মুসার চোখ ওদের উপর পড়তেই তরুণীটি বলে উঠল, ‘আসসালামু আলাইকুম।’
‘আসসালামু আলাইকুম।’ তরুণটিও বলে উঠল তরুণীটির কন্ঠ থামতেই।
তরুণ তরুণী দু’জনের চেহারাই ইউরোপ-এশিয়ায় মেশানো। চোখ ও চুল ওদের এশিয়ান। কিন্তু গায়ের রং ইউরোপীয়, তবে তার সাথে একটা সোনালী মিশ্রণ আছে যা তাদেরকে অপরূপ করে তুলেছে।
এমন এক জোড়া তরুণ-তরুণীর কাছ থেকে আকস্মিক সালাম পেয়ে আহমদ মুসা বিস্ময়ের একটা ধাক্কা খেল। সে এ সময় তার শত্রুদেরকেই আশা করেছিল।
আহমদ মুসার মুহূর্তকালের নিরবতার সুযোগে তরুণীটিই আবার বলে উঠল, ‘রিভলবার হাতে রাখার দরকার নেই। আমরা আপনার বন্ধু। আপনার মারামারি আমরা দেখেছি। আপনি মুসলিম দেখে পরিচয়ের জন্যে আমরা এলাম।’ মেয়েটির মুখে মিস্টি হাসি।
আহমদ মুসার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘দু’টি সংশোধনী। আপনারা আমার বন্ধু না হয়ে ভাই বোন হলে খুশি হবো। দ্বিতীয়ত, ঘটনাটা মারামারি ছিল না। ওরা আমাকে মারতে চেয়েছিল, আমি আত্মরক্ষা করেছি।’
তরুণ তরুণী দু’জনেই হাসল। আহমদ মুসার সামনে বসতে বসতে বলল, ‘ওয়েলকাম। আমরা আনন্দের সাথে ভাই-বোন হতে রাজী আছি। তবে শর্ত ‘আপনি’ সম্বোধন ‘তুমি’ তে নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়টাও আমরা মেনে নিচ্ছি। দু’গাড়িওয়ালারা আসলে, যতদূর বুঝেছি, আপনাকে ওরা ফলো করছিল এবং সেখান থেকেই ঘটনার সৃষ্টি। সুতরাং তারাই আক্রমনকারী।’
‘কিন্তু ভাইয়া, কোন জার্মান-ফরাসীকে আমি কোনদিন এইভাবে এশিয়ানের হাতে কুপোকাত হতে দেখিনি। এই বিজয়ের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ এবং সেই সাথে জানাচ্ছি ওরা কিন্তু আপনাকে ছাড়বে না। আর কি ঘটনা আছে জানি না, কিন্তু ওদের আর্য অহং এ দারুণ ঘা লেগেছে।’ বলল তরুণীটি।
‘বোন, জার্মান ফরাসী ও এশিয়ান এই দৃষ্টিতে বিষয়টিকে না দেখাই ভাল। এটা যেমন ন্যায়-অন্যায়ের একটা দ্বন্দ্ব ছিল, তেমনি যখন কোন সংঘাত বাধে সেটা কোন অন্যায় থেকেই বাধে। কিছু ক্রিমিনাল ছাড়া সব জার্মান ফরাসীই ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে।’ বলল আহমদ মুসা।
তরুণীটি আহমদ মুসার মুখের শেষ শব্দ সম্পূর্ণ হবার আগেই বলে উঠল, ‘আপনি কে জানি না। আপনার চিন্তা অবশ্যই মহৎ। কিন্তু সাধারণভাবে এটা বাস্তব নয়। পশ্চিমের যারা এশিয়া আফ্রিকা দখল করে একদিন এশিয়া আফ্রিকার মানুষকে যথেষ্ট শাসন শোষনের শিকারে পরিণত করেছিল, তারা এখনও এশিয়া আফ্রিকার মানুষকে সেই একই দৃষ্টিতে দেখে। শাসন শোষনের কৌশল শুধু তারা পাল্টেছে।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার কথা আমি অস্বীকার করছি না বোন। কিন্তু একে পূব-পশ্চিমের সংঘাত বা পশ্চিমের শোষণ হিসাবে দেখো না। বেদনাদায়ক হলেও যেটা ঘটছে, সেটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক ব্যক্তির মত প্রতিটি জাতি গোষ্ঠীই তাদের ভাল চিন্তা করবে, স্বার্থ চিন্তা করবে এটাই স্বাভাবিক। পশ্চিম আজ ‘গণতন্ত্রের’ নামে এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে যে হস্তক্ষেপ করছে, মুক্ত অর্থনীতির নামে এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকে যে কব্জা করছে, মানবাধিকারের শ্লোগান তুলে এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের জাতি গঠন ও সংহতিকে যে বাধাগ্রস্থ করছে এবং তথাকথিত ‘সাসটেইনেবল ফেইথ বা ভ্যালুজে’র নামে তারা জাতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের উপর যে ছড়ি ঘুরাতে চাচ্ছে, সেটা পশ্চিমী বিভিন্ন রাষ্ট্র বা জাতির ‘ভাল’ বা ‘স্বার্থ’ চিন্তা করেই। প্রশ্ন হলো তাদের এই ‘ভাল’ বা ‘স্বার্থ’ চিন্তা আমাদের ক্ষতি করছে। আমাদের এই ক্ষতি তারা করতে পারছে তাদের বুদ্ধি ও শক্তির বলে। এর প্রতিকার ভিক্ষা চেয়ে পাওয়া যাবে না, কারণ ভিক্ষুকের আবেদনে তারা কিছু ভিক্ষা দিতে পারে, কিন্তু তাদের ‘ভাল’ বা ‘স্বার্থ’ যাতে, সেখান থেকে সরে দাঁড়াবে না। এর অর্থ হলো আমাদের ‘ভালো’ আমাদের ‘স্বার্থ’ আমাদের দেখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে।’ থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই তরুনীটি বলে উঠল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি চিন্তার একটা বাস্তব ও বিপ্লবাত্মক দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন। কিন্তু এটা কিভাবে? আপনিই তো বললেন, ওরা শক্তি ও বুদ্ধির জোরে এটা করছে। শক্তি বা বুদ্ধি কোন যুদ্ধেই তো আমরা ওদের সাথে পারবো না।’
‘না পারা পর্যন্ত মার খেতেই হবে। দুর্বলরা এভাবেই মার খায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেচ্ছার কি এখানেই শেষ? কোন পথ তাহলে নেই?’ বলল তরুনীটি।
‘আছে। ইউরোপের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ইউরোপ যদি তাদের স্বার্থে একক মুদ্রা, একক অর্থনীতি, একক একটি পার্লামেন্ট গড়তে পারে, তাহলে মুসলিম দেশগুলো অর্থাৎ এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলো নিজস্ব বানিজ্য ব্যবস্থা, নিজস্ব বিনিয়োগ ব্যবস্থা ইত্যাদি গড়তে পারবে না কেন?’ আহমদ মুসা হাসল।
‘আপনার মারামারি দেখে মনে হয়েছিল, আপনি সাংঘাতিক একজন লড়াকু ব্যক্তি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনি একজন সাংঘাতিক পলিটিশিয়ান। আসলে……….।’
তরুণীটি তরুণকে বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘এই প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে, আগে বিশ্ব রাজনীতিটা শেষ হোক।’
তরুণীটি মুহূর্তের জন্যে থামল। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, আপনি মুসলিম দেশ ও আফ্রো-এশীয় দেশগুলোকে যা করতে বলেছেন, তার জন্যেও তো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দরকার।’
‘সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ন্যায়কে ভালোবাসা এবং অন্যায়ের সাথে কোন সমঝোতায় না যাওয়ার শক্তি। এই শক্তি অন্যসব শক্তি সৃষ্টি করে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি এক দূর্লভ শক্তির কথা বললেন, যার দুর্ভিক্ষ এখন সবচেয়ে প্রকট।’ আহমদ মুসা থামতেই দ্রুত কন্ঠে বলে উঠল তরুণটি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এই দুর্ভিক্ষ প্রকট বলেই আমাদের ভোগান্তিও প্রকট।’
‘ধন্যবাদ। রাজনীতির কথা এখন থাক। বলুন, দুই ইউরোপীয় আপনাকে তাড়া করছিল কেন? চেনেন ওদের? বলল তরুণটি।
‘ওদের চিনি না। কিন্তু তাড়া করার কারণ বোধ হয় জানি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি কারণ?’ বলল তরুণীটি।
আহমদ মুসা ওদের দুজনের দিকে তাকাল। বলল, ‘তার আগে তোমাদের পরিচয় জানা দরকার।’
সংগে সংগে তরুণীটি বলে উঠল, ‘আমি ফাতিমা কামাল। জার্মানীর ‘বন’ এ বাড়ি। বনের স্টেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী।’
তরুণীটি কথা শেষ না হতেই তরুণটি বলা শুরু করল, ‘আর আমি যায়েদ ফারুক। প্যারিসে বাড়ি। প্যারিস ইউনিভার্সিটির ছাত্র।’
বিস্ময় ও আনন্দের চিহ্ন আহমদ মুসার চোখে মুখে। তরুনটির কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলল, ‘তোমরা কি দি রাইন ইন্ট্যারন্যাশনাল হোটেলে থাক?’
‘হ্যাঁ। কি করে জানলেন?’ এক সাথে বলে উঠল তরুণ-তরুণী দু’জনেই।
‘আমিও ঐ হোটেলেই উঠেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আমাদের কথা জানলেন কি করে?’ বলল তরুণীটি।
‘আমি যেদিন হোটেলে আসি, সেদিনই আমি কাউন্টারে খোঁজ নিয়েছিলাম আর কোন মুসলিম এই হোটেলে আছে কিনা? তারাই আমাকে তোমাদের দু’জনের নাম বলেছিল।’
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু তোমরা তো দুই প্রান্তের দুইজন, তোমাদের পরিচয় কিভাবে? না বন্ধু ছিলে তোমরা?’
‘না কেউ কাউকে চিনতাম না। আমি যেদিন হোটেলে আসি, সেদিন রিসেপশনে ‘হালাল’ খাবার নিয়ে আলাপ করছিলাম। এ সময় যায়েদ পাশে দাড়িয়ে ছিল। সে অযাযিতভাবেই আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। এভাবেই আমাদের পরিচয়।’ বলল তরুণীটি।
‘তোমরা কি হালাল-হারাম মান? জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ঠোটে এক টুকরো হাঁসি।
‘না মানলে মুসলমানিত্ব থাকবে কি করে?’ তরুণটি বলল।
আহমদ মুসার ঠোটে আরও স্পষ্ট মিস্টি হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘মুসলমানিত্ব রক্ষার জন্যে আর কি কর? তোমরা দুজন কি আসরের নামাজ পড়েছ?’
তরুণ-তরুণী দুজনের মুখই ম্লান হয়ে গেল। মুখ নিচু হয়ে গেল তাদের। একটু পরেই তরুনীটি মুখ তুলল। বলল, ‘স্যরি ভাইয়া। আমি নামাজ পড়ি। তবে বাইরে বেরুলে অনেক সময় অবস্থার কারণে পড়তে পারি না। কিন্তু কাজা পড়ে নেই।’
যায়েদ ফারুকের মুখ লাল। তরুনীটি মানে ফাতিমা কামাল থামতেই যায়েদ ফারুক বলে উঠল, ‘আমার জবাব দেবার কিছু নেই ভাইয়া। আমাকে কেউ কোনদিন এভাবে বলেনি। নামাজ না পড়ার অপরাধ-বোধ আমার ভেতরে আছে। আমি আজ থেকে নামাজ পড়ব ভাইয়া।’
‘তোমাদের ধন্যবাদ।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘তোমরা জিজ্ঞেস করছিলে ওরা আমাকে তাড়া করার কারণ কি, তাই না? আমি স্ট্রাসবার্গ বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই ওরা আমাকে ফলো করছে। আমি যেখানে যাচ্ছি, তারা পিছু পিছু যাচ্ছে। প্রথম দু’দিন আমি বুঝতে পারিনি। আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওদের মুখোমুখি হবো। তাদের মুখোমুখি হতে গিয়েই এই সংঘর্ষ।’ থামল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনের চোখে মুখে বিস্ময়। আহমদ মুসা থামতেই তারা বলল, ‘সাংঘাতিক ঘটনা। কিন্তু এ শত্রুতার কারণ কি?’
‘কারণ কি আমি জানি না। তবে আমি যেটা অনুমান করি, সেটা হলো ব্যাপারটা খুবই বড়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কি সেটা?’ বলল ফাতিমা কামাল। তার চোখে শংকা।
আহমদ মুসার চোখে মুখে নেমে এল গাম্ভীর্য। ধীরে ধীরে বলল, ‘আমার মনে হয় ‘স্পুটনিক’ নামের গোয়েন্দা সংস্থা যারা ধ্বংস করেছে এবং এর গোয়েন্দাদের যারা কিডন্যাপ করেছে, তারা বা তাদের ভাড়া করা লোক এরা।’ আহমদ মুসা থামল।
‘স্পুটনিকে’র নাম শুনেই চমকে উঠেছে যায়েদ ও ফাতিমা দু’জনেই। আহমদ মুসা যখন তার কথা বলা শেষ করল, তখন বিস্ময় শংকায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে তাদের চেহারা।
আহমদ মুসা থামলেও কয়েক মুহূর্ত তারা কথা বলতে পারল না। পরে ফাতিমা কামালই ধীরে ধীরে বলল, ‘আপনি স্পুটনিকের ঘটনা জানেন? কিন্তু ওরা আপনার পেছনে লাগবে কেন?’
‘জানি। লা-মন্ডে পত্রিকায় পড়েছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আর ওরা আপনার পেছনে কেন? বলল ফাতিমা কামাল।
‘ওরা বোধ হয় ধরে নিয়েছে আমি যখন স্ট্রাসবার্গে এসেছি, তখন স্পুটনিকের ব্যাপার নিয়ে নিশ্চয় আমি কিছু করব। এ জন্যেই তারা আমার গতি বিধির উপর নজর রাখছে।’
যায়েদ ও ফাতিমার বিধ্বস্ত চার চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ।
এক সময় ফাতিমার ধীর কন্ঠ থেকে বের হয়ে এল, ‘আপনি কে ভাইয়া? আপনার কথা থেকেই প্রমাণ হচ্ছে স্পুটনিক ধ্বংসকারীরা আপনাকে চেনে এবং স্ট্রাসবার্গে এলে আপনি স্পুটনিক ঘটনার অনুসন্ধান করতে পারেন, তাও তারা জানে। কে তাহলে আপনি ভাইয়া?’
ফাতিমা থামতেই যায়েদ বলে উঠল, ‘ঠিক, আমরা এ পর্যন্ত তো আপনার কিছু জানি না। এমনকি আপনার নাম পর্যন্তও না। বলুন ভাই।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমাকে আহমদ আবদুল্লাহ বলে ডাকাই যথেস্ট নয় কি?’
‘আপনি কোত্থেকে এসেছেন?’ বলল ফাতিমা।
‘সৌদি আরব থেকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি এখানে এলেই স্পুটনিক ব্যাপারে অনুসন্ধান করবেন এটা তারা ভাবতে গেল কেন? আপনাকে কেমন করে ওরা চেনে?’ জিজ্ঞেস করল যায়েদ ফারুক।
‘আমি গোয়েন্দা কাজে খুব আগ্রহী। বিশেষ করে মুসলমানরা এ ধরনের কোন বিপদে পড়লে আমি সেখানে যাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু মনে হচ্ছে ওরা আপনাকে ভয় করে। সে জন্যে আপনার গতিবিধি ওরা পাহারা দিচ্ছে এবং সুযোগ পেয়েই আপনাকে আটকাবার বা মারার চেষ্টা করেছিল। এটা কেন?’ বলল ফাতিমা।
‘স্পুটনিকের ব্যাপারে কেউ খোঁজখবর নিক, কেউ এর সাথে জড়িয়ে পড়ুক তা নিশ্চয় তারা চায় না। কারণ এটাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমরাও তো এই কাজেই এসেছি এবং এ নিয়ে প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থার সাথেও আলাপ করেছি। আমরা তাদের আত্মীয়। আমরা এ ঘটনায় জড়িত হয়ে পড়তেই পারি। কিন্তু আমাদের উপর তাদের চোখ পড়েনি।’ বলল ফাতিমা।
‘তোমরা তাদের আত্মীয়? কে তোমরা?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
ফাতিমাই প্রথম কথা বলে উঠল। বলল, ‘আমি স্পুটনিকের নাম্বার ওয়ান গোয়েন্দা পরিচালক কামাল সুলাইমানের ছোট বোন। আমি বনের পারিবারিক বাড়িতে থাকি। স্পুটনিকের ব্যাপারে অনুসন্ধানের জন্যেই এখানে এসেছি। শত্রু চোখ এড়াবার জন্যেই ভাইয়ার বাড়িতে উঠিনি। আর যায়েদও স্পুটনিকের দ্বিতীয় গোয়েন্দা পরিচালক আবদুল্লাহ ফারুকের ছোট ভাই। সেও একই লক্ষ্যে স্ট্রাসবার্গে এবং আমার মত একই কারণে হোটেলে উঠেছে।’
‘তোমাদের অভিনন্দন। তাহলে আমরা একই উদ্দেশ্যে স্ট্রাসবার্গে এসেছি এবং কাকতালীয়ভাবে একই হোটেলে অবস্থান করছি। শুধু একটাই পার্থক্য। আমি স্পুটনিকের সাতজন ঐতিহাসিক পরিচালকের কারও সাথেই কোনভাবে সম্পর্কিত নই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনাকেও ধন্যবাদ। আমাদের মধ্যে আরেকটা পার্থক্য আছে। সেটা হলো আমরা এসেছি রক্তের টানে, আর আপনি এসেছেন হৃদয়ের টানে। রক্তের টানের চেয়ে হৃদয়ের টানটাই বেশি মূল্যবান।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘এসব কথা থাক বোন। তোমরা এবার কাজের কথায় এস। কিছুক্ষণ আগে যা ঘটল, তাতে শত্রুর লেজে পা পড়েছে। এরা দ্রুত একটা পাল্টা ছোবল মারবে।’ বলল আহমদ মুসা।
যায়েদ ও ফাতিমা দু’জনেরই চোখে মুখে শংকা ফুটে উঠল। যায়েদ বলল, ‘তার মানে ওরা আক্রমন করবে?’
‘আমার তাই বিশ্বাস।’
বলে আহমদ মুসা একটু থামল। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আক্রমনকারী গাড়ি দুটির নাম্বারসহ থানায় একটা ডায়েরী করতে চাই যে, গ্রীন সার্কেলের ইনার সার্কুলার রোডে আমি আক্রান্ত হই। দু’টি গাড়িতে দু’জন লোক আমাকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করে। ওদের একটা গাড়ি এবং তোমরা ঘটনার সাক্ষী।’
‘আমরা সাক্ষী হতে রাজি আছি। কিন্তু পুলিশের কাছে বিশেষ কোন সাহায্য মিলবে না।’ বলল যায়েদ।
‘আমি পুলিশের সাহায্য চাই না, আইনকে আমার পক্ষে চাই। এ জন্যেই এই ডায়েরী।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার চিন্তা ঠিক ভাইয়া। গ্রীন সার্কেলের একটু পরেই একটা থানা আছে। যাবার সময় ডায়েরী করা যাবে।’ ফাতিমা বলল।
‘যে গাড়ি ফেলে ওরা পালিয়েছে, সেই গাড়িও পুলিশের হাতে দেওয়া দরকার।’ বলল যায়েদ।
‘সার্কেল পুলিশকে ডেকে বললেই হবে।’ ফাতিমা বলল।
‘যায়েদ-ফাতিমা, ঘটনার ব্যাপারে তোমরা কি পরিমাণ এগিয়েছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না ভাইয়া। আমরা কিছুই এগুতে পারিনি। আমাদের দু’জনের পরিচয় হবার পর আমরা চেষ্টা করছি ভাইয়ারা যে সব করেছেন ও করছেন তার ভিত্তিতে ভাইয়াদের শত্রুদের একটা তালিকা করার।’ ফাতিমা বলল।
‘কিভাবে করছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অতীতের পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে ও ভাইয়াদের বন্ধু-বান্ধবদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে।’ বলল যায়েদ।
‘আপনার কাজ কতদূর ভাইয়া?’ ফাতিমা বলল।
‘সবে আজ কাজ শুরু হলো। এ কয়দিন আমি শহর দেখে বেড়িয়েছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আজ কিভাবে কাজ শুরু হলো’, ফাতিমা বলল।
‘কিছুক্ষণ আগে গ্রীন সার্কেলে ওদের আক্রমনের মাধ্যমে। শুরুটা খুবই ভাল হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিভাবে?’ যায়েদ বলল।
‘শত্রুরা আক্রমন করা মানে শত্রুর সাথে দেখা হওয়া। তার মাধ্যমে শত্রুদের পরিচয় উদ্ধারের একটা সুযোগ সৃষ্টি হলো। গাড়ি চুরি করা ও গাড়ির লাইসেন্স ও ব্লবুক ভূয়া হতে পারে, কিন্তু ওগুলোতে হাতের যে ছাপ আছে তা ভূয়া নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই সংঘাত আরও সংঘাতের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং আমি খুশি যে, আবারও তাদের দেখা পাব।’ বলল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ও যায়েদের চোখে মুখে বিস্ময়। ফাতিমা বলল, ‘ওরা আবার আক্রমন করবে। আরও সংঘাত হবে। এতে আপনি খুশি। কিন্তু আমাদের তো বুক কাঁপছে।’
‘বুঝলাম, আপনি জাত গোয়েন্দা ভাইয়া। কিন্তু সংঘাতের রেজাল্ট পক্ষে-বিপক্ষে দুই-ই হতে পারে। বিপক্ষে যাবে সে ভয় আপনার নেই?’ বলল যায়েদ।
‘এসব ভাবলে তো এগুনো যাবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝা গেল, আপনি আমাদের মত সাধারণ কেউ নন এবং এও বুঝা গেল ওরা আপনাকে ভয় করে কেন?’ বলল ফাতিমা।
‘আমরা আনন্দিত ভাইয়া। আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন। আমরা যা করছি, সেটা পুলিশ যা করছে সে রকমই। কিছুই হবে না এতে।’ যায়েদ বলল।
যায়েদ থামতেই ফাতিমা কামাল বলে উঠল, ‘ভাইয়া, আমাদের দু’জনকে কি আপনি সাথে নিতে পারেন?’
ফাতিমার হঠাৎ এই প্রশ্নে আহমদ মুসা মুখ তুলে তাদের দিকে তাকাল। তারপর মুখ নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘নিতে পারি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।’
‘কি সমস্যা?’ বলল ফাতিমা।
‘সমস্যা হলো তোমরা দু’জন বিবাহিত নও।’ আহমদ মুসা বলল।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনের মুখেই বিস্ময় ফুটে উঠল তারপর লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল মুখ।
সংগে সংগে কথা বলতে পারল না তারা। একটু পর ফাতিমা বলল, ‘আপনার কথা বুঝলাম না ভাইয়া। বিয়ের সাথে আমাদের প্রস্তাবের সম্পর্ক কি!’
‘অনধিকার চর্চার জন্যে মাফ করো বোন। আমি তোমাদের দু’জনের মধ্যেকার বিয়ের কথা বলছি। তোমাদের দু’জনের মধ্যে বিয়ে না হয়ে থাকলে কিংবা বিয়ে না হলে তোমরা দু’জনে যেমন একত্রে এভাবে কাজ করতে পার না, তেমনি তোমরা দু’জনে বিবাহিত হলেই শুধু তোমরা একত্রে আমার সাথে কাজ করতে পার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এর কারণ কি ভাইয়া?’ ফাতিমাই বলল আবার।
‘ইসলামের বিধান অনুসারে যাদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, এমন ছেলে মেয়েরা বিবাহ ছাড়া এভাবে মেলামেশা করতে পারে না। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে নিভৃতে দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষনের জন্যেও দেখা হওয়া নিষিদ্ধ।’
‘নিষিদ্ধ? মানে হারাম?’ বলল ফাতিমা।
‘হ্যাঁ, তাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কারণ?’ বলল ফাতিমা।
‘কারণ শয়তান মানুষকে খারাপ পথে টেনে নেবার জন্যে সদা প্রস্তুত। আর ইসলাম সকল অঘটনের পথ বন্ধ করতে চায়।’
‘বুঝেছি।’ লাজ রাঙা মুখে বলল ফাতিমা।
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু ভাইয়া আমি ও যায়েদ এমন নিভৃতে অনেক বসেছি, মিশেছি।’
‘কিছু ঘটেনি। কিন্তু ঘটবে না এমন কথা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? আর ব্যতিক্রম তো থাকতেই পারে। কিন্তু আইন হয় সকলের জন্যে। সকলকেই সেই আইন মানতে হয়। ব্যতিক্রম যারা, তাদেরকেও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে তো আমরা এতদিন অপরাধ করেছি ভাইয়া। কিন্তু আমাদের কি দোষ? আমাদের জার্মানীতে মুসলিম পরিবারে এমন মেলামেশা আছে।’ ফাতিমা বলল।
‘আপনি কি ইসলামের সকল বিধিবিধান মেনে চলেন ভাইয়া?’ বলল যায়েদ।
‘পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে অনেক সময়ই পারি না। কিন্তু মানার ইচ্ছা আছে, চেষ্টা আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদেরও তাই করা উচিত। কিন্তু ভাইয়া আপনি যে বিষয়ে প্রস্তাব করেছেন, সেটা নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। যায়েদ ভেবেছে কিনা জানি না।’ বলল ফাতিমা।
যায়েদের মুখে সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আমি ভাইয়ার কাছে মিথ্যা বলব না। মিস ফাতিমা আমাকে মাফ করুন, আমি তাঁকে নিয়ে ভেবেছি।’
‘কিন্তু আমার অজ্ঞাতে সেটা, আমাকে কিছু বলনি কখনও।’ বলল ফাতিমা লজ্জায় লাল হয়ে।
‘দুঃখিত, ভাবনাটা কখন যে আমার মনে এসেছে বলতে পারব না। যখন ভাবনাটা আমার জন্যে সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে, তখন বিষয়টা বার বার আমি তোমাকে বলতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি একে কিভাবে নেবে তাই বলতে সাহস পাই নি।’
‘তাহলে তুমি আমাকে ভয় কর দেখছি?’ ফাতিমার ঠোঁটে লজ্জা ও হাসির মিশ্রণ।
‘কারণ, সত্যিই তোমার প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।’ বলল যায়েদ মুখ নিচু করে।
‘ও, এই কারণেই অপ্রয়োজনেও তোমাকে আমার কক্ষে আসতে দেখেছি।’ বলল ফাতিমা। তার কন্ঠে শাসনের সুর।
‘আমি দুঃখিত ফাতিমা আমার দূর্বলতার জন্যে।’ বলল যায়েদ নরম কন্ঠে।
ফাতিমা হেসে উঠল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘ভাইয়া, আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমরা ধরা পড়ে গেছি। আমি বিয়ের কথা ভাবিনি বটে, কিন্তু শুধু যায়েদ নয়, আমিও দেখছি ওর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমি ওর ঘরে যাইনি বটে, কিন্তু আমি মনে মনে চাইতাম ও আমার ঘরে আরও বেশি আসুক। আমি আরও স্বীকার করছি ভাইয়া। আপনার কথাই ঠিক। কিছু ঘটেনি বটে, কিন্তু সব কিছুই ঘটতে পারতো। আমি আপনার প্রস্তাবে রাজী ভাইয়া। এখন ওর মত জিজ্ঞাসা করুন।’ ফাতিমার শেষের কথাগুলো কান্নাজড়িত আবেগে রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
যায়েদ মুখ তুলে বলল, ‘অন্যায় অবাঞ্চিত গোপন দূর্বলতার জন্যে আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। অবাধ মেলামেশারই এটা স্বাভাবিক পরিণতি ছিল। ভাইয়া, আপনি ঠিকই বলেছেন এই অবস্থা অব্যাহত থাকা আর এক মুহূর্তও উচিত নয়। ফাতিমাকে ধন্যবাদ। ফাতিমা কি ভাববে এজন্যে আমার রাজী থাকার কথা বলতে পারিনি। আমি আনন্দের সাথে আমার মত দিচ্ছি।’
যায়েদ থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘আনন্দ শব্দ যোগ করার কোন দরকার ছিল না। ভাইয়া সম্মতির কথা জানতে চেয়েছেন, কোন বিশেষণ নয়।’
‘স্যরি। তবে এটা খারাপ বিশেষণ নয়, ভাল বিশেষণ।’ যায়েদ বলল।
‘প্যারিসের লোকদের ঘরোয়া বুদ্ধি মোটা শুনেছিলাম। আজ প্রমাণ পেলাম। আমাদের ‘বনে’ ব্যক্তির লজ্জাশীলতা এখনও আছে, প্যারিসে তা নেই।’ বলল ফাতিমা।
‘দেখুন ভাইয়া, ফাতিমা প্যারিস তুলে কথা বলছে। বন আর জার্মানীর কথা আমরা কম জানি না।’ কৃত্রিম ক্ষোভ ফুটে উঠল যায়েদের কন্ঠে।
ফাতিমা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাধা দিয়ে বলল, ‘বিয়েটা বন-প্যারিসের মধ্যে হচ্ছে না, হচ্ছে ফাতিমা ও যায়েদের মধ্যে। তাদের কালচার শুধুই বন ও প্যারিস ভিত্তিক নয়।’
থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘তাহলে তোমরা তোমাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলো। শুভ কাজ সত্ত্বরই হয়ে যাওয়া উচিত।’
বলে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। তোমরা যাও অজু করে এস। দু’জনেই আমার সাথে নামাজ পড়বে।’
ওরাও আহমদ মুসার সাথে উঠে দাড়িয়েছে। আনন্দের সাথে ওরা চলল অজু করার জন্যে।

ঘুম ভেঙ্গে গেল আহমদ মুসার।
একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেছে।
কিসের শব্দ?
ধীরে ধীরে চোখ খুলল আহমদ মুসা।
ঘর অন্ধকার। কিন্তু দক্ষিনের দেয়াল জোড়া নীল পর্দার মধ্যে দিয়ে বাইরের নগর রাতের নিস্তব্ধতা এসে ঘরের দক্ষিণ প্রান্তের স্বচ্ছতা কিছুটা ফিঁকে করে ফেলেছে।
আহমদ মুসা চোখ খোলার পর তার চোখ আশপাশটা ঘুরে এসে প্রথমেই সোজা গিয়ে নিবদ্ধ হলো দক্ষিণ দেয়ালের পূব প্রান্তের তার বরাবর পর্দার উপর। চোখ পড়তেই আটকে গেল সেখানে তার চোখ। পর্দা নড়ছে।
কেন নড়ছে? দক্ষিণে গোটাটাই কাঁচের দেয়াল। কোন ফাঁক নেই। বাতাসের প্রবাহ প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। তাহলে নড়বে কেন পর্দা?
নড়ে উঠা পর্দা আবার স্থির হয়েছে।
আহমদ মুসা চোখ সরায়নি পর্দার সেই অংশের উপর থেকে।
মুহূর্তকাল পরেই পর্দা ধীর গতিতে আবার দুলে উঠল এবং সেই সাথে একটা চলন্ত ছায়ামূর্তি পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এল।
ঘরের অন্ধকারে ছায়ামূর্তিটিকে আরও গাঢ় অন্ধকার দেখাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে আহমদ মুসা দেখল ছায়ামূর্তিটির ডান হাত কোমর পর্যন্ত উচুঁতে প্রসারিত। দেহটি সামনের দিকে একটু বেঁকে আসা।
লোকটির ডান হাতে রিভলবার এবং সে আক্রমণাত্মক ভংগিতে পা পা করে অতি সাবধানে তার বেডের দিকে এগিয়ে আসছে।
বুঝল আহমদ মুসা কি ঘটতে যাচ্ছে।
শক্ত হয়ে উঠল আহমদ মুসার দেহ। তার চোখ দু’টি স্থির নিবদ্ধ লোকটির উপর।
আস্তে আস্তে আহমদ মুসা তার ডান হাত বালিশের তলায় নিল। কিন্তু হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল কার রিভলবারটা জ্যাকেটের পকেটেই রয়ে গেছে। গত রাতে বাইরে থেকে ফেরার পর রিভলবারটা রীতি অনুসারে পকেট থেকে বের করে বালিশের তলায় রাখা হয়নি।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। যেদিন প্রয়োজন সেদিনই তার এ ভূলটা হয়ে গেছে।
লোকটি এগিয়ে আসছে।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘুমের ভান করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহমদ মুসা। যেহেতু ওর হাতে রিভলবার, তাই সে দূরে থাকতে প্রতিরোধ বা প্রতিআক্রমনের চেষ্টা করে লাভ নেই।
লোকটি খাটের কাছাকাছি পৌঁছে খাট ঘুরে আহমদ মুসার পেছন দিক থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। খাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে আহমদ মুসার মাঝ বরাবর আসার পর লোকটি বাম হাত থেকে ডান হাতে রিভলবারটি নিল এবং লোকটির ডান হাত ঢুকে গেল তার পকেটে। বেরিয়ে এল সাদা রঙের কিছু একটা নিয়ে।
আহমদ মুসা বুঝল ওটা একটা সাদা রুমাল। সাদা রুমাল কেন? মনে প্রশ্নটা জাগার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বুঝল, নিশ্চয় ঐ রুমালের ভেতর রাখা আছে ক্লোরোফরম ক্যাপসুল। হাতের চাপে ওটা ভেঙে নিয়ে রুমাল নাকে চাপার সেকেন্ডের মধ্যেই একজন মানুষ সংগা হারিয়ে ফেলে।
লোকটির পরিকল্পনা বুঝে খুশি হলো আহমদ মুসা। এখন আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, সে প্রথমেই গুলী করবে না।
লোকটি আহমদ মুসার ডান পাশ ঘুরে তার মাথার পেছনে আসছিল। তার রিভলবার ধরা বাম হাতটি তখন আহমদ মুসার ডান বাহুর উপরে। রিভলবারের নল আহমদ মুসার দেহকে তাক করে নয়, বুকের উপর দিয়ে সমান্তরাল।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল, লোকটি মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে ক্লোরোফরম করতে চায়। যাতে আহমদ মুসার ঘুম ভাঙলেও হাত দিয়ে আক্রমন করার উপযু্ক্ত সুবিধা না পায়।
তার আগেই তার হাতে যে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে তার সদ্ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল। এমন একটি নিরাপদ সুযোগেরই সে অপেক্ষা করছিল।
সিদ্ধান্তের সাথে সাথেই কাজ।
আহমদ মুসার ডান হাত বিদ্যুত বেগে উঠে এল এবং আঘাত করল লোকটির রিভলবার ধরা বাম হাতে।
রিভলবার তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা তার দেহটাকে একটা পাক দিয়ে মেঝেয় নেমে দাঁড়াল। কিন্তু আহমদ মুসা স্থির হয়ে দাঁড়াবার আগেই লোকটি আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা সরে দাঁড়াবার সুযোগ পেল না। সে পড়ে গেল মেঝের উপর এবং তার দেহের উপর এসে পড়ল লোকটি।
লোকটি এসে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তাকে কঠিনভাবে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ফেলল, যাতে সে এ্যাকশনে যাবার সুযোগ না পায়। তারপর আহমদ মুসা লোকটির পাল্টা কিছু শুরু করার আগেই নিজের দেহটায় একটা মোচড় দিয়ে লোকটিকে নিচে ফেলল। তারপর তাকে কাবু করার জন্যে আহমদ মুসা তার বুকে উঠে বসার জন্যে দেহটাকে একটু গুটিয়ে নিতে গেল। তার ফলে স্বাভাবিকভাবেই আহমদ মুসার দেহের চাপ কিছুটা লুজ হয়েছিল মুহূর্তের জন্যে। এই সুযোগই কাজে লাগাল লোকটি। সে দেহটাকে একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আহমদ মুসাকে ছিটকে ফেলে আবার সে আহমদ মুসার উপর চেপে বসল।
কিন্তু সেও আহমদ মুসাকে সামলাতে পারল না। আহমদ মুসা আবার লোকটিকে ফেলে দিয়ে তার উপর চড়ে বসল।
ঠিক এই সময় অন্ধকারের ভেতর থেকে একজন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসার উপর ঝাপিয়ে পড়া এই লোকটি দক্ষিণ দেয়ালের পশ্চিম পাশ দিয়ে কাঁচ কেটে ভিতরে প্রবেশ করেছিল। আহমদ মুসার নজর শুধু পুব দিকে নিবদ্ধ ছিল বলে পশ্চিম দিক দিয়েও যে আরেকজন ঘরে প্রবেশ করছে সেটা দেখতে পায়নি।
লোকটি এতক্ষন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শত্রু-মিত্র চেনার চেষ্টা করেছে। নিশ্চিত হয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা ছিটকে পড়ল পাশেই। আকষ্মিক এই আক্রমনের জন্যে প্রস্তুত ছিল না আহমদ মুসা। ঘাড়ে আঘাত পেল সে।
ছিটকে পড়ার পর নিজেকে সামলে নিতে একটু দেরী হলো আহমদ মুসার। নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। এ সময় ওরা দু’জন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
আহমদ মুসা চিৎ হয়ে আছড়ে পড়ল আবার।
আছড়ে পড়ার পর আহমদ মুসা অনুভব করল তার ডান হাত গিয়ে পড়েছে একটা শক্ত ধাতব জিনিসের উপর। হাত নেড়ে পরীক্ষা করে আনন্দিত হলো আহমদ মুসা ধাতব জিনিসটি একটি রিভলবার। আহমদ মুসার মনে পড়ল এই রিভলবারটিই প্রথম লোকটির হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল।
ওরা দু’জন এসে চেপে বসেছিল আহমদ মুসার উপর। ক্লোরোফরমের গন্ধ আবার পেল আহমদ মুসা। বুঝল, ওরা তাকে সংগাহীন করার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা তার ডান হাত সক্রিয় করল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, রিভলবার ব্যবহার না করে উপায় নেই।
ডান হাতটা টেনে এনে আহমদ মুসা প্রথম গুলীটা করল তার উপর চেপে বসা একজনের বুকের পাঁজরে ঠেকিয়ে।
লোকটা বুক ফাটা চিৎকার করে তার বুকের উপর থেকে উল্টে পড়ল তার পাশের লোকটির উপর।
আহমদ মুসা আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক মনে করল না। দ্বিতীয় লোকটির হাতে রিভলবার থাকতে পারে। সে এবার রিভলবার ব্যবহারে মরিয়া হয়ে উঠবে।
ইতিমধ্যে পাশের লোকটি চিৎকার করে উঠেছে, ‘কুত্তার বাচ্চা গুলী করেছ। তোমাকেও মরতে…..’
লোকটি কথা শেষ করতে পারল না। আহমদ মুসার রিভলবার শব্দ লক্ষ্যে পর পর দু’বার অগ্নিবৃষ্টি করল।
লোকটি চিৎকার করারও সুযোগ পেল না। নিরব হয়ে গেল।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কক্ষের আলো জ্বেলে দিয়ে সোজা টেলিফোনের কাছে গেল। টেলিফোন করল হোটেল সিকুরিটিকে। বলল, ‘আমার ঘরে দু’জন লোক ঢুকে আমাকে আক্রমন করেছিল। দু’জনেই নিহত হয়েছে। আপনার আসুন, পুলিশে খবর দিন।’
সংগে সংগেই হোটেল সিকুরিটির লোকেরা এসে গেল। দশ মিনিটের মধ্যেই এসে গেল পুলিশ। এল গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও।
পুলিশের হাঙ্গামা শেষ হতে সকাল ৮টা বেজে গেল। পারিপার্শ্বিক সব তথ্যাদি পাওয়ার পর পুলিশ আহমদ মুসার বক্তব্য গ্রহন করেছে। প্রথমত, প্রমাণিত হয়েছে লোক দু’জন হোটেলের সম্মুখ দরজা দিয়ে বৈধভাবে প্রবেশের কোন রেকর্ড নেই। দ্বিতীয়ত, প্রমাণিত হয়েছে অসৎ উদ্দেশ্যে তারা লাইলন কর্ড ব্যবহার করে পেছন দেয়াল বেয়ে আহমদ মুসার ঘরে প্রবেশ করেছে। লোক দু’জনের জুতার তলায় হোটেলের দেয়ালের পিংক রং পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, গোয়েন্দা পুলিশের মাইক্রো এক্সরে ক্যামেরায় দক্ষিণ দেয়ালের যে গ্লাস কেটে ওরা দু’জন প্রবেশ করেছিল, তাতে তাদের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। চতুর্থত, ক্লোরোফরম লোক দু’জনই বহন করেছে তার প্রমাণ তাদের পকেট থেকে পাওয়া গেছে। সর্বশেষ আহমদ মুসার হাতে যে রিভলবার আছে তাতে নিহত দু’জনের একজনের হাতের আঙুলের ছাপও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, আহমদ মুসা নির্দোষ এবং লোক দু’জন আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ করতে এসেই নিহত হয়েছে। তাদের মোটিভ হিসেবে রেকর্ড করেছে, স্পুটনিক ঘটনায় অপহৃতদের দু’জন আত্মীয় আহমদ আবদুল্লাহ (আহমদ মুসা)সহ এসেছেন স্ট্রাসবার্গে স্পুটনিকের ব্যাপারে খোঁজ নিতে এবং স্পুটনিকের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের আক্রমনের এরা শিকার হয়েছে।
পুলিশ এই কেসকে ডাকাতি ও অপহরণ করার চেষ্টার মামলা হিসেবে গ্রহন করে আহমদ মুসাকে সব সন্দেহ ও দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং পুলিশবাদী কেস হিসেবে একে গ্রহন করা হয়েছে।
আহমদ মুসার কক্ষকে পুলিশ সীল করল। হোটেল কর্তৃপক্ষ আহমদ মুসাকে হোটেলের সর্বোচ্চ তলায় একটা অধিকতর নিরাপদ কক্ষ বরাদ্দ করল।
পুলিশ চলে যেতেই ফাতিমা কামাল আহমদ মুসাকে বলল, ‘ভাইয়া, বেয়ারা আপনার সুটকেস আপনার ঘরে নিয়ে যাক। আপনি এখন আমার ঘরে চলুন। ওখানে যায়েদ অপেক্ষা করছে। অনেক জরুরী কথা আছে।’
বলেই, ফাতিমা কামাল বেয়ারাকে আহমদ মুসার সুটকেস তার কক্ষে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে আহমদ মুসার হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে বলল, ‘আসুন ভাইয়া’।
আহমদ মুসা তার সাথে হাঁটতে শুরু করল।
ফাতিমা কামালের ঘরে এসে বসল সবাই।
আহমদ মুসা বসতেই যায়েদ বলে উঠল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি ভয়ংকর ঘটনা থেকে আপনাকে রক্ষা করেছেন, আমাদেরকেও সাহায্য করেছেন।’
‘আমার কিন্তু এখনও স্বপ্ন মনে হচ্ছে যায়েদ। অন্ধকার রাত। দু’জন লোক টার্গেট করে দেখে শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু যারা আক্রমন করল তাদেরকে তাদেরই রিভলবার দিয়ে হত্যা করা হলো। এ যেন জগতের শীর্ষ এক গোয়েন্দা কাহিনী।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘তুমি ঠিকই বলেছ ফাতিমা। আশায় আমার বুক ভরে উঠেছে। আমাদের জন্যে যা অসম্ভব, আমাদের জন্যে যা অকল্পনীয়, সেটাই আমাদের এই নতুন ভাইয়ার জন্যে খুবই সাধারণ। আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন আমাদের মহাসংকটে। বুক আমার ভরে উঠেছে আশায়।’ বলল যায়েদ।
‘একজন গোয়েন্দা অফিসার কি মন্তব্য করেছেন জান। বলেছেন, ‘আটঘাট বাধাঁ ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচা অসম্ভব ছিল। মি.আহমদ আবদুল্লাহ নিশ্চয় অসাধারণ লোক।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘এই জন্যেই বিপদ তাঁর উপর এসে চেপে বসেছে। নতুন বিপদও আসন্ন।’ যায়েদ বলল।
‘কি বিপদ?’ সংগে সংগেই প্রশ্ন করে উঠল ফাতিমা কামাল। উদ্বেগে তার দু’চোখ কপালে।
‘ঐ বিপদের কথাই তো তোমাকে বলেছি। ভাইয়াকে এখনই আসতে বলেছিলাম সে কথা বলার জন্যেই।’ বলল যায়েদ।
‘বল তাড়াতাড়ি।’ ফাতিমা কামাল বলল।
‘রাতে ঘটনার খবর পাওয়ার পর থানা কর্মকর্তার সাথে পুলিশের যে বড় অফিসার, সহকারী পুলিশ কমিশনার এসেছিলেন, তিনি আমার পরিচিত। আমার এক বন্ধুর বড় ভাই। ভোর পর্যন্ত তিনি এখানে ছিলেন। তারপর চলে যান। দশ মিনিট আগে আমাকে টেলিফোন করে ভয়াবহ খবর দিলেন। সেটা হলো, পুলিশ কমিশনার হঠাৎ উল্টে গেছেন। তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন সুযোগমত কোন রেকর্ড বা সাক্ষী না রেখে ভাইয়াকে গ্রেপ্তার করতে। তিনি মনে করেন, ভাইয়াকে যারা অপহরণ করতে গিয়েছিল তাদের পেছনে সাংঘাতিক বড় কোন পক্ষ আছে, হতে পারে তারা স্পুটনিক ধ্বংস ও এর ৭জনকে অপহরণ করার সাথে জড়িত। তিনি আশংকা করেন পুলিশ ভাইয়াকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঐ পক্ষের হাতে তুলে দিবে।’ থামল যায়েদ।
সংগে সংগেই ফাতিমা কামাল বলে উঠল, ‘কিভাবে পুলিশ গ্রেফতার করবে? পুলিশের স্পট ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টের (SIP) যে কপি ভাইয়াকে পুলিশ দিয়েছে তাতে তাকে সব সন্দেহ থেকে মুক্ত করা হয়েছে।’
‘বললাম তো, পুলিশ তো আইনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখাবে না। কোন রেকর্ড বা সাক্ষী না থাকে এমনভাবে কথা বলার জন্যে তাকে তুলে নিয়ে এবং তারপর গায়েব করবে।’ বলল যায়েদ ফারুক।
‘ফরাসী পুলিশের একজন শীর্ষ অফিসারকে এইভাবে মুহূর্তে পাল্টে ফেলল, এই পক্ষটা আসলে কে?’ ফাতিমা কামাল বলল।
যায়েদ ফারুক কিছু বলল না।
আহমদ মুসার ঠোঁটের কোণে কেবল এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘চিন্তা করো না ফাতিমা। নিশ্চয় শীঘ্র তাদের পরিচয় দিনের আলোতে বেরিয়ে আসবে। সে পর্যন্ত ধৈর্য্য ধর।’ বলল আহমদ মুসা শান্ত কন্ঠে।
‘আল্লাহ সেটা করুন, কিন্তু তার আগে তো মহাবিপদ। সব তো শুনলেন ভাইয়া, আমরা এখন কি করব?’ ফাতিমা কামাল বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘চিন্তার কিছু নেই। শত্রুরা এসব করে আমাদেরই সাহায্য করছে।’
‘কিভাবে ভাইয়া?’ দু’চোখে কপালে তুলে প্রশ্ন করল যায়েদ ফারুক।
‘শত্রুরা আমাদেরকে চেনে, আমরা তাদের চিনি না। তারা এ্যাকশনে না এলে আমরা এ্যাকশনে যাব কি করে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম। তারা এ্যাকশনে এল। সেই পরিমাণে এ্যাকশনে যাবার ক্ষমতা কি আমাদের আছে? তার উপর দেখছি পুলিশ ওদের সহযোগিতা করবে বলল।’
‘এটা নতুন কিছু নয়। পুলিশের একটা গ্রুপ নিশ্চয় ওদের সহযোগিতা করে আসছে। তা না হলে স্পুটনিক মামলাটা এগুচ্ছে না কেন?’
‘ডবল বিপদ। এখন তাহলে আমাদের কি করণীয়? বুঝা যাচ্ছে, পুলিশ এখন ওঁৎ পাতছে আপনাকে ধরার জন্যে।’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল ফাতিমা কামাল।
‘এত উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই বোন। হোটেল কর্তৃপক্ষকে আমি এখনি জানিয়ে দিচ্ছি। হোটেলে কক্ষ আমার ঠিকই থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে আমি বাইরে থাকব।’ শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা কোথায় যাবো?’ জিজ্ঞেস করল ফাতিমা কামাল।
‘তোমাদেরকে হোটেল ছেড়ে দিতে হবে। তোমরা তোমাদের আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠবে। অথবা বাড়ি চলে যাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না ভাইয়া। আত্মীয়রা এমনিতেই বিপদের মধ্যে আছে। তাদের বিপদ বাড়াতে চাই না। আপনাকে সে খবর তো এখনও বলিনি। আমাদের দু’জনের আত্মীয়ের বাসা আজ রাতে তন্ন তন্ন করে সার্চ করা হয়েছে। অন্যান্য……………’
কথা শেষ করতে পারলো না যায়েদ। আহমদ মুসা তার কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘তোমাদের দু’জন আত্মীয় মানে আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কামাল সুলাইমানের বাসা?’
‘জি ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘কারা সার্চ করেছে, পুলিশ?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘পুলিশ নয়। অন্য কেউ। বাড়ির সবাইকে ক্লোরোফরম করে অঢেল সময় নিয়ে তারা বাড়িতে কি যেন খুঁজেছে। প্রতিটি সুটকেস, ব্যাগ, কাপবোর্ড, ড্রয়ার, আলমিরাসহ বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা তারা সার্চ করেছে। এমন কি সোফা, চেয়ারের গদিও তারা ফেঁড়ে দেখেছে।’ বলল যায়েদ।
‘অন্য পাঁচজনের বাসা?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘খবর জানতে পারিনি। তবে আরও জানতে পেরেছি, আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কামাল সুলাইমানের বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজন যারা স্ট্রাসবার্গে আছেন, তাদের বাসাও এভাবে সার্চ করা হয়েছে।’ বলল যায়েদ।
‘বল কি?’
বলে আহমদ মুসা অল্প কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘কোন অতিমূল্যবান দলিল বা কোন প্রমাণ তারা হাত করতে চায়। কিন্তু সে দলিল বা প্রমাণ কোথায় আছে তা তারা জানে না। আমার মনে হচ্ছে, অন্য পাঁচজনের বাড়ি ও তাদের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের বাড়িও আজ রাতে সার্চ করা হয়েছে।’
থামল আহমদ মুসা। কিন্তু তার কপাল তখনও কুঞ্চিত। ভাবছে সে। আবার সে বলা শুরু করল, ‘এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার তিনটা জিনিস মনে হচ্ছে-এক, ৭জন যাদের অপহরণ করা হয়েছে তাদের ইন্টেরোগেট করেও কোন এক মূল্যবান দলিলের হদিস বের করতে শত্রুরা পারেনি। অবশেষে নিজেরাই দলিল উদ্ধারে বের হয়েছে। দুই, সবকিছু সমেত স্পুটনিক অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা প্রমাণ এখনও অক্ষত আছে যা স্পুটনিক অফিসের বাইরে কোথাও সরিয়ে রাখা হয়েছিল। তিন, আমার মনে আশা জাগছে, এই দলিল হাত করার পূর্ব পর্যন্ত অপহৃতদের শত্রুরা হত্যা করবে না।’ থামল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ও যায়েদ হা করে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। ফাতিমার দু’চোখের কোনায় অশ্রু চিক চিক করছে।
দু’জনেই কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
প্রথম তাদের নিরবতা ভাঙল ফাতিমা। বলল, ‘ভাইয়া, আল্লাহ আপনার কথা মঞ্জুর করুন। তারা বেঁচে আছেন, একথা সত্য হোক।’ কান্নায় ভারী হয়ে গেল ফাতিমার কন্ঠ।
‘ভাইয়া, আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আপনার মত সাহসী, শক্তিমান ও তীক্ষ্ণধী সংগ্রামী মানুষের আমাদের প্রয়োজন ছিল। আল্লাহ তা পূরণ করেছেন।’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘ভাইয়া, বাড়ি সার্চ করা থেকে আপনি যে তিনটি জিনিস বের করে আনলেন, তার প্রতিটি অক্ষর আমার কাছে সত্য মনে হচ্ছে। ভাইয়া বলুন, এখন আমরা কি করতে যাচ্ছি। আমরা তিনজনেই তো একটা বাড়ি নিতে পারি।’
‘না, তোমরা এক সাথে বাড়ি নিতে পার না। তোমরা………..’
আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মাঝখান থেকে যায়েদ বলে উঠল, ‘ভাইয়া, আমি ও ফাতিমা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দু’জনের পরিবারকেও জানিয়েছি। এখন আপনার অনুমতি হলেই আমরা বিয়ে করতে পারি।’ লজ্জা সংকোচে বিব্রত কন্ঠ যায়েদের।
লজ্জা এসে ছেয়ে ফেলেছে ফাতিমার মুখে। রাঙা হয়ে উঠেছে তার মুখমন্ডল। নত মুখে সেও বলে উঠল, ‘ভাইয়া, ও ঠিকই বলেছে।’
‘আমার অনুমতি কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, আপনাকেই আমরা প্রকৃত অভিভাবক মনে করছি। আপনি যেভাবে আমাদের কল্যাণ কামনা করেছেন, যেভাবে আপনি আমাদের ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকিয়েছেন, খোলামেলা পরামর্শ দিয়েছেন, সেভাবে আমাদের পরিবার আমাদের দিকে কখনও তাকায়নি।’ বলল যায়েদ।
‘তবু আমি তোমাদের পরিবারের কেউ নই। পরিবারের অনুমতি তোমাদের অবশ্যই নিতে হবে। তোমরা পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু সব মুসলমানই তো ভাই ভাই এবং একটি পরিবারের মত।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘হ্যাঁ, ইসলাম এটা বলেছে। কিন্তু সেই সাথে পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে বলেছে এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া প্রথম কর্তব্য বলে উল্লেখ করেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে ভাইয়া। আমরা পরিবারকে জানিয়েছি মানে তাদের অনুমতিও নিয়েছি।’ বলল ফাতিমা।
‘ধন্যবাদ। তাহলে যায়েদ তুমি প্যারিসে তোমার দু’একজন নিকটতম লোকদের নিয়ে জার্মানির বনে ফাতিমার বাড়িতে যাও। সেখানেই বিয়ে অনুষ্ঠিত হোক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, তাহলে আপনাকে যেতে হবে। সবাই খুশি হবে।’ বলল ফাতিমা।
‘পরে যাব। তোমাদের ‍দু’জনের শুধু নয়, স্পুটনিকের ৭জনের পরিবার সম্পর্কে আমার দারুণ আগ্রহ। পরিবারগুলোকে আমি দেখতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই। কি করে এই ঐতিহাসিক ও সেকুলার পরিবারগুলো থেকে স্পুটনিকের জন্ম হলো, তা জানার আমার ইচ্ছা অসীম। এই পরিবারগুলো একদিন মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়ের জন্যে এই পরিবারগুলো বিরাটভাবে দায়ী। সেই পরিবার থেকেই আবার স্পুটনিকের জন্ম কেমন করে হলো তা আমি জানতে চাই।’ থামল আহমদ মুসা। আবেগে তার কন্ঠ ভারী হয়ে উঠেছিল।
ফাতিমা ও যায়েদের বিস্ময় ও শ্রদ্ধামিশ্রিত চার চোখ নিবদ্ধ ছিল আহমদ মুসার উপর। বলল, ভাইয়া, চাচাতো ভাই কামাল সুলাইমানের পরিবর্তন কিভাবে হলো সেটা আমাদের কাছে বিস্ময়। মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের উত্তর পুরুষ কামাল সুলাইমান কামাল আতাতুর্কের মতই ইসলামের প্রতি ক্রিটিক্যাল ছিল। নিউইয়র্কের টুইন (লিবার্টি ও ডেমোক্রেসি)টাওয়ার ধ্বংসের জন্যে মুসলমানরা যখন অভিযুক্ত হলো, তখন সে ইসলাম ও মৌলবাদী মুসলমানদের গালিগালাজ করার ব্যাপারে অন্যান্যা জার্মানদের চেয়েও অগ্রণী ছিল। তারপর হঠাৎ করে তার পরিবর্তন ঘটল। শুধু তার পরিবর্তন নয়, গোটা পরিবারকেও সে পরিবর্তন করে ছেড়েছে। আমার সাথে দেখা হলেই বলতো, ‘হাসবি কম। মনে রাখবি তুই মজলুম মুসলিম জাতির একজন সদস্য।’ মাঝেই মাঝেই আরও বলত, ‘জানিস মুসলমানদের উপর আজ যে যুলুম চলছে তার জন্যে মুসলমানরা দায়ী নয়, দায়ী একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যারা মুসলমানদের ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে, যারা তাদের সহায় সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে, তারাই পুলিশ সেজে চুরি ডাকাতির অভিযোগে মুসলমানদের গ্রেফতার করছে এবং নিজেরা চুরি ডাকাতি ও খুন জখম সংঘটিত করে মুসলমানদের ফাঁসিতে লটকাচ্ছে।’ থামল ফাতিমা। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল তার কন্ঠ।
আহমদ মুসা সংগে সংগে কথা বলল না। তারও মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
যায়েদের মুখ নিচু।
আহমদ মুসাই নিরবতা ভাঙল। বলল, ‘আলহামদুল্লিাহ। কামাল সুলাইমান ‘কামাল’ না হয়ে ‘সুলাইমান’ হয়েছেন।’
‘বুঝলাম না ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘অর্থ হলো কামাল সুলাইমান তুরষ্কের মোস্তফা কামাল না হয়ে তুরষ্কের ওসমানীয় খিলাফতের ‘সুলাইমান, দি ম্যাগনিফিসেন্ট’ হয়েছেন। সুলাইমান দি ম্যাগনিফিসেন্ট (১৪৯৪ খৃঃ-১৫৬৬খৃঃ) তুর্কি খিলাফতের সবচেয়ে সফল শাসক। গোটা ভূমধ্যসাগরে তার নৌবাহিনী ছিল অপ্রতিরোধ্য।’
কথা শেষ করে একটু থামতেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘ইতিহাসের এসব কথা থাক। এস, বর্তমান নিয়ে ভাবি।’
ফাতিমা কামাল চোখ মুছে বলল, ‘আপনিও আমাদের সাথে ‘বন’ এ যাবেন, একথা এখনও বলেননি।’
‘না বোন এ সময় নয়। শত্রুরা অনেক কাছাকাছি এসেছে। এ সময় দূরে সরা যাবে না। ওরা আমাদের বাড়িতে ঢুকেছে, এখন আমরা ওদের বাড়িতে ঢুকতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা নরম কন্ঠে।
‘তাহলে ‘বন’ থেকে ওদের আসতে বলি। যায়েদও বলুক তার পরিবারকে আসার জন্যে। বিয়ে স্ট্রাসবার্গেই হবে।’ ফাতিমা বলল দৃঢ় কন্ঠে।
‘ফাতিমা ঠিকই বলেছে। এটাই হবে।’ বলে একটু থামল যায়েদ। একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘তাহলে বাড়ি নেয়ার কি হবে? আজ এ মুহূর্তেই তো আপনার হোটেল থেকে সরা দরকার ভাইয়া।’
‘ঠিক আছে। একটা বাড়ি আজই ঠিক করে ফেল। লোকেশন যাতে নিরিবিলি ও নিরাপদ হয়। বাড়িটার এক অংশে আমি থাকব। অন্য অংশে বিয়ের পর তোমরা থাকবে।’
‘তাহলে ভাইয়া, আমি বাড়ির খোঁজে বের হচ্ছি। উঠব, অনুমতি দিন।’
‘ঠিক আছে, আমিও বের হচ্ছি। চল।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাড়াল।
‘কিন্তু বাইরে তো পুলিশ ওঁৎ পেতে আছে।’ এক সাথে বলে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ। তাদের কন্ঠে প্রতিবাদের সুর।
‘শুধু পুলিশ কেন, ওরাও ওঁৎ পেতে থাকার কথা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে বেরুবেন কেন?’ দুজনেই আবার বলে উঠল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘পুলিশ এবং ওরা জানে আমি হোটেলে আছি। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া ও ভেতরে থাকা এক কথাই। পুলিশ পক্ষে থাকলে হোটেলের ভেতরটা ওদের জন্যে আরও সুবিধাজনক।’
বলে আহমদ মুসা সোফায় সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তোমরা চিন্তা করো না। আল্লাহ আছেন।’
উঠে দাড়াল আহমদ মুসা।
যায়েদও উঠে দাড়াল। বলল, ‘আপনি এগোন ভাইয়া, আমি আমার রুম থেকে আসছি।’
যায়েদ সালাম দিয়ে কক্ষ থেকে বেরুবার জন্যে হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসাও।
নিরব ফাতিমা। উদ্বিগ্ন তার দু’চোখ। শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকল ওদের যাত্রা পথের দিকে।

আজর ওয়াইজম্যানের চোখ দু’টি তার সামনে টেবিলে রাখা দু’টি ফটোর উপর স্থিরভাবে নিবদ্ধ।
দু’টি ফটোই আহমদ মুসার বলে কথিত। একটি ফটো ওয়াইজম্যানদের ফটো। আহমদ মুসার ফটো হিসাবে ফাইলে সংরক্ষিত। আরেকটি ফটো স্ট্রাসবার্গ পুলিশের কাছ থেকে সদ্য সংগৃহীত। ফটোটি পুলিশ তুলেছে আহমদ মুসার হোটেল কক্ষে দু’জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর।
আজর ওয়াইজম্যানের হাতে একটা পাওয়ারফুল এ্যামপ্লিফায়ার লেন্স। সেটা ‍দিয়ে খুঁটে খুঁটে সে পরীক্ষা করছে ফটো দু’টিকে।
আজর ওয়াইজম্যান ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মির (WFA) প্রধান। সাও তোরাহ দ্বীপ থেকে মাত্র কিছুক্ষণ আগে সে স্ট্রাসবার্গে পৌছেছে।
ফটো দুটি গভীর মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করার পর মুখ তুলল আজর ওয়াইজম্যান। হাতের লেন্সটা টেবিলে রেখে সামনে বসা WFA এর স্ট্রাসবার্গ এর স্টেশন চীফ লাইবারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমাদের ফাইল ফটোর সাথে হোটেলের কথিত আহমদ মুসার ফটোর মুখের আদল হুবহু মিলে যাচ্ছে। কিন্তু চোখ-মুখের মাইক্রো রিডিং মিলছে না। একেবারেই আলাদা। এটা কি করে সম্ভব বুঝতে পারছি না।’
আজর ওয়াইজম্যান থামতেই লাইবারম্যান বলে উঠল, ‘কিন্তু হোটেলের এই লোক আহমদ মুসা হতেই হবে। গ্রীন সার্কেল ও হোটেলের সাংঘাতিক ঘটনা প্রমাণ করছে লোকটি আহমদ মুসা না হয়েই পারে না। হোটেলের ঘটনায় পুলিশ পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছে। সাফল্যের সাথে আমাদের লোকেরা হোটেল কক্ষে প্রবেশ করেছিল। পুলিশের মতে তারা প্রথমে আক্রমণ করারও সুযোগ পেয়েছিল। ক্লোরোফরম ভেজা রুমাল খাটের পাশে পাওয়ার অর্থ আহমদ মুসাকে তারা নিদ্রিত অবস্থায় পেয়েছিল এবং তাকে সংগাহীন করার জন্যে ক্লোরোফরমসহ রুমালও তারা বের করেছিল। কিন্তু নিদ্রিত অবস্থায় প্রথমে আক্রমণ করেও দু’জনে আহমদ মুসাকে এঁটে উঠতে পারেনি। আহমদ মুসার মত অসাধারণ কেউ না হলে এটা সম্ভব ছিল না।’
‘আমার কথাও এটাই। মদিনা থেকে স্ট্রাসবার্গে আসা আহমদ মুসার সিডিউলের সাথে এ লোকটির স্টাসবার্গে আসার সিডিউল মিলে যাচ্ছে। চেহারা ও মুখের আদলটাও মিলে যাচ্ছে। কিন্তু আসল জায়গায় তো মিলছে না’, বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘কোন কারণ নিশ্চয় আছে। কিন্তু লোক যে একই এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।’ লাইবারম্যান বলল।
‘সে কারণটা কি হতে পারে?’ জিজ্ঞেস করল আজর ওয়াইজম্যান।
‘হতে পারে দুটি ফটোগ্রাফের কোন একটিতে আহমদ মুসার ছদ্মবেশ আছে।’ বলল লাইবারম্যান।
‘কিন্তু ছদ্মবেশ তো মুখের মাইক্রোরিডিং পাল্টাতে পারে না।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘পারে স্যার। প্লাস্টিক মেকআপ সম্পর্কে আমার বিশেষ পড়াশুনা আছে। আমি জানি, সর্বাধুনিক এমন কিছু প্লাস্টিক মেকআপ আছে যা সব দিক দিয়ে চামড়ার মত। চামড়ার মতই এতে রেখা, লোম ও লোমকূপ আছে। আলট্রা মাইক্রো লেন্সেও চামড়ার সাথে এর কোন ভিন্নতা ধরা পড়ে না।’ বলল লাইবারম্যান।
‘ধন্যবাদ লাইবারম্যান। আপনার এ মত আমি গ্রহন করছি এবং আমরা এখন এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, হোটেলের এই লোকটি আহমদ মুসাই।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘অবশ্যই।’ বলল লাইবারম্যান।
‘তাহলে একথাও বলা যায় যে, সে এখন আমাদের হাতের মুঠোয়।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘তা আমরা বলতে পারি। হোটেল কক্ষে নিহত হওয়ার ঘটনার পুলিশ রিপোর্টটি আহমদ মুসার পক্ষে গেলেও পুলিশ আমাদেরকে সহযোগিতা করবে তার ব্যবস্থা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার পুলিশের প্রতি কিছু নির্দেশ দিয়েছেন। তারা সুযোগমত আহমদ মুসাকে গ্রেপ্তার করে আমাদের হাতে তুলে দেবে।’ বলল লাইবারম্যান।
‘পুলিশের সাহায্য একটা বাড়তি বিষয়। তাদের উপর নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘না স্যার। আমরা বসে নেই। হোটেলের চারদিকে আমরা ২৪ ঘন্টা পাহারা বসিয়ে রেখেছি। আমরা আহমদ মুসাকে চোখের আড়াল হতে দেব না। সুযোগ পেলে আমরা পুলিশের অপেক্ষা করব না। আমরা নিজেরাই তাকে জালে আটকাব।’ বলল লাইবারম্যান।
‘আমি চাই আহমদ মুসাকে ‘সাও তোরাহ’ দ্বীপের খাঁচায় পুরতে। তাকে খাঁচায় ভরতে পারলে শুধু বহু তথ্য পাওয়া যাবে তা নয়, গোটা দুনিয়ায় আমাদের মিশন নিরাপদ হয়ে যাবে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের এতবড় বিপর্যয় ঘটাতে আহমদ মুসা পারল কিভাবে?’ জিজ্ঞেস করল লাইবারম্যান।
‘আহমদ মুসা শৃগালের মত ধূর্ত, বাঘের মত ক্ষিপ্র, সিংহের মত সাহসী এবং স্যার এ.এইচ. ডুনান্টের চেয়েও মানবিক এবং পোপের চেয়েও দয়ালু। কোন গুণের ঘাটতি তার ভেতর নেই। নিজের জীবন বিপন্ন করে বিপজ্জনক ওহাইও নদীতে ডুবে যাওয়া থেকে এফবিআই চীফ মি.জর্জের নাতিকে উদ্ধার করে আহমদ মুসা এফবিআই চীফের হৃদয় জয় করে নেয়। সবুজ পাহাড় ও লস আলামাসের মধ্যকার আণবিক ও সামরিক তথ্য পাচারের ইহুদী গোয়েন্দা সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করে তা মার্কিন সরকারের হাতে তুলে দেয়াসহ বহু নিঃস্বার্থ ও উপকারী কাজের মাধ্যমে সে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আস্থা অর্জন করে। অন্যদিকে সে আমাদের বেশ কিছু অপরাধমূলক বড় ধরনের কাজকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেয়। এভাবেই সে গত একশ বছরে মার্কিন মাটিতে প্রোথিত আমাদের শেকড়কে আমূল উপড়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছে। মার্কিন সরকার, মার্কিন কংগ্রেস ও মার্কিন সমাজে আমাদের শক্তিশালী লবি আজ সম্পূর্ণই অকার্যকর হয়ে পড়েছে এক আহমদ মুসার তৎপরতায়। এই আহমদ মুসাই এসেছে স্ট্রাসবার্গে। স্পুটনিক যে কাজ হাতে নিয়েছিল, সে কাজ করার জনেই সে যদি স্ট্রাসবার্গে এসে থাকে, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। কয়েক বছর আগে সংঘটিত নিউইয়র্কের ‘লিবার্টি ও ডেমোক্র্যাসি’ টাওয়ার ধ্বংস আমরাই করেছি একথা যদি সে প্রমাণ করতে পারে, তাহলে দুনিয়ার কোথাও আমাদের জায়গা হবে না। সুতরাং স্ট্রাসবার্গে এখন আমাদের একমাত্র কাজ সর্বশক্তি দিয়ে আহমদ মুসাকে ধ্বংস করা।’
দীর্ঘ বক্তব্য দেয়ার পর থামল আজর ওয়াইজম্যান। তার চোখে-মুখে সফরের ক্লান্তি এবং কন্ঠে হতাশার সুর।
‘স্যার, আপনি কি নিশ্চিত আহমদ মুসা ‘স্পুটনিক মিশন’ নিয়ে স্টাসবার্গ এসেছে?’ বলল লাইবারম্যান উদ্বিগ্ন কন্ঠে।
‘এছাড়া কোন কাজে সে স্ট্রাসবার্গ আসবে? আহমদ মুসার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এ ধরনের মিশন নিয়ে সে বার বার বিভিন্ন জায়গায় গেছে। আর ‘স্পুটনিক মিশনে’র ব্যাপারটা সফল হয়, তাহলে একদিকে মুসলিম জাতিকে তারা ইতিহাসের জঘণ্য অপরাধের দায় থেকে বাচাঁতে পারবে, অন্যদিকে আমাদের তারা আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘স্পুটনিকের সবই তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তাছাড়া স্পুটনিকের সাত শয়তানও আমাদের হাতে। আহমদ মুসা যতই করিতকর্মা হোক, আমার বিশ্বাস খুব বেশি সামনে এগুতে পারবে না। আরেকটা বড় বিষয় হলো, স্ট্রাসবার্গ পুলিশের কাছ থেকে সে ভাল সহায়তা পাবে না।’ লাইবারম্যান বলল।
লাইবারম্যানের চোখে-মুখে যতটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছিল, ততটাই অস্বস্তি প্রকাশ পাচ্ছিল আজর ওয়াইজম্যানের মুখে। তার কপাল কুঞ্চিত। অস্বস্তিকর ভাবনায় ডুবে যাওয়া তার মুখমন্ডল। লাইবারম্যান থামার পর একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সে বলল, ‘স্পুটনিক অফিসের সবরকমের দলিল দস্তাবেজ আমরা ধ্বংস করেছি। কিন্তু অফিসের দলিল দস্তাবেজই যে সবটুকু এটা কে বলবে। এ সবের কপি তারা অন্যকোন নিরাপদ জায়গায় রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। এগুলো তো আহমদ মুসা পেয়েও যেতে পারে। কারণ, স্পুটনিকের সাথে জড়িত সব পরিবার থেকেই সে সমান সহযোগিতা পাবে।’ থামল আজর ওয়াইজম্যান।
উদ্বেগে ভরে উঠেছে লাইবারম্যানের চোখ-মুখ। বলল, ‘তাহলে এ দলিলগুলো তো আমাদের যে কোন মূল্যে খুঁজে পেতে হবে। সাও তোরাহে ওদের কাছ থেকে কিছু জানতে পারেননি, বলেনি কিছু তারা?’ লাইবারম্যানের কন্ঠে উত্তেজনা।
‘না কিছুই বলেনি। কোনওভাবেই তাদের মুখ খোলা যায়নি। যে নির্যাতনে হাতিও চিৎকার করবে, সে নির্যাতনও তারা হজম করে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘মানুষ এমন হতে পারে?’ বিস্ময় লাইবারম্যানের কন্ঠে।
‘তারা ভিন্ন মানুষ।’ বলল ওয়াইজম্যান।
‘কেমন?’
‘মৃত্যুকে ওরা সাফল্যের সিংহদ্বার বলে মনে করে। সেই সাফল্যের তুলনায় এই কষ্টটা নাকি খুবই ছোট।’ ওয়াইজম্যান বলল।
‘তাহলে?’
‘পথ একটাই, আহমদ মুসাকে সরিয়ে দেয়া।’ বলল ওয়াইজম্যান।
‘সেটা তো এক নাম্বার কাজ। স্পুটনিক পরিবারে কি হানা দেয়া যায় না এই দলিল দস্তাবেজের সন্ধানে?’ লাইবারম্যান বলল।
‘কেন, গত রাতে তো স্পুটনিকের ৭ নেতার বাড়িসহ ওদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাড়ি আদ্যপান্ত সার্চ করেছ।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘আচ্ছা, তাহলে এসব কাগজই কি খুঁজেছি গত রাতে? কিন্তু কিছুই তো মেলেনি!’ লাইবারম্যান হতাশ কন্ঠে বলল।
‘মিলবে কি এত সহজে! ওদের বৌ-বেটিকেও নিয়ে যেতে হবে সাও তোরাহতে। দেখা যাবে তারপর তাদের মুখ বন্ধ থাকে কতক্ষণ।’ বলল ওয়াইজম্যান।
‘ঠিক বুদ্ধি। ওদের দেহ যতটা শক্ত, তাদের নৈতিকতা ততটাই স্পর্শকাতর। বৌ বেটির ইজ্জত যেতে দেখলে, স্রোতের মত বেরিয়ে আসবে ওদের মুখ থেকে কথা।’
বলে একটু থেমেই সে আবার বলা শুরু করল, ‘তাহলে এই কাজে আমরা দেরি করছি কেন? নির্দেশ দিন আমরা শুরু করি।’
‘না মি.লাইবারম্যান। আহমদ মুসাকে ধ্বংস করাই প্রথম কাজ। তাকে শেষ করলে, অন্য কাজ ধীরে সুস্থে করায় কোন ক্ষতি হবে না।’
এ সময় টেলিফোন বেজে উঠল লাইবারম্যানের।
টেলিফোন কানের কাছে তুলে নিল লাইবারম্যান। ওপ্রান্তের কথা শুনে সে বলে উঠল, ‘জরুরী খবর? বল বল।’
ওপারের খবর শুনল। তারপর এক ঝলক তাকাল সে ওয়াইজম্যানের দিকে এবং বলল ওপ্রান্তকে, ‘একটু হোল্ড কর, কথা বলি স্যারের সাথে।’
বলে টেলিফোন এক পাশে সরিয়ে নিয়ে ওয়াইজম্যানকে লক্ষ্য করে দ্রুতকন্ঠে বলল, ‘স্যার, আহমদ মুসা হোটেল থেকে বেরিয়েছে। সে একা একটি ট্যাক্সিতে চড়ে বিষমার্ক রোড ধরে এদিকেই এগিয়ে আসছে।’ থামল লাইবারম্যান।
লাইবারম্যান থামতেই আজর ওয়াইজম্যান বলে ঊঠল, ‘ওরা যারা আছে সবাইকে পিছু নিতে বল। ঈল পার্কের মোড়ে ওকে চারদিক থেকে আটকাতে হবে। এ অঞ্চলটায় মানুষের যাতায়াত খুবই পাতলা। এখানেই ওর নিপাত ঘটাতে হবে। বলে দাও আমরা আসছি।’
লাইবারম্যান সব কথা ওদের বুঝিয়ে বলে টেলিফোন রাখল।
ওয়াইজম্যান লাইবারম্যানকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আরও যাদের দরকার তাদের বলে দাও সেখানে যেতে। দেখ, আমাদের ব্যর্থ হওয়া চলবে না। আর তৈরী হও এখনি।’
বলে ওয়াইজম্যান উঠে দাঁড়াল।
উৎসাহের সাথে উঠে দাড়াল লাইবারম্যানও।
ওয়াইজম্যান তার কক্ষের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে পাশে ফিরে তাকিয়ে লাইবারম্যানকে বলল, ‘পুলিশ কমিশনারকে কি আমাদের এই মিশনের কথা বলবে?’
‘হ্যাঁ, বলল তাদের সাহায্যও পাওয়া যেতে পারে।’ লাইবারম্যান বলল।
চিন্তা করছিল ওয়াইজম্যান। বলে উঠল, ‘না লাইবারম্যান, পুলিশকে জড়িয়ে লাভ নেই। তাদের কারণে কোন সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে।’
বলে সে পুনরায় চলতে শুরু করল তার কক্ষের দিকে তৈরী হওয়ার জন্যে।
লাইবারম্যানও এগুলো তার কক্ষের দিকে।
ঈল পার্কটি স্ট্রাসবার্গ শহরের মতই পুরাতন।
পার্কটি নদীর সমান্তরালে। বিরাট জায়গা জুড়ে।
পার্কের পাশ দিয়ে রাস্তা। রাস্তার সমান্তরালে নদীর তীর ঘেঁষে মাঝে মাঝে হোটেল ও ট্যুরিস্ট ভিলায় মাঝে মাঝে রয়েছে বাগান। এ বাগানগুলো নদীর পানি পর্যন্ত নেমে গেছে।
শান্ত নিরিবিলি এলাকা। শহরের হৈ-হুল্লোড়ের বিন্দুমাত্রও এখানে নেই।
পার্কের পাশের সড়ক ধরে চলছে আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসার টার্গেট নগরীর মেয়র অফিস। মেয়র অফিসের রেজিস্ট্রেশন বিভাগ থেকে আহমদ মুসা একটা ঠিকানা যোগাড় করতে চায়। গতকাল বিকেলে তাড়া খেয়ে যে গাড়ি ছেড়ে ওরা পালিয়েছিল, সে আমেরিকান গাড়িটার কাগজপত্রে যে নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে, তাতে রাস্তার নাম আছে, কিন্তু বাড়ির নাম ও নাম্বার নেই। মেয়র অফিস থেকে এই নাম নাম্বার পাওয়া যায় কিনা, সেটাই সে দেখতে চায়।
আহমদ মুসার গাড়ি চলছিল মধ্যম গতিতে।
সামনেই ঈল পার্কের একটা মোড়। মোড়টা ত্রিরাস্তার একটি সংযোগ স্থল। এই মোড় থেকে একটা রাস্তা ঈল নদীর কিনারা পর্যন্ত নেমে গেছে।
মোড়টাতেও তেমন ভীড় ও গাড়ি ঘোড়ার সমাগম নেই। তবে বেশ কিছু গাড়ি পার্ক করা আছে দেখতে পেল আহমদ মুসা। সবগুলো গাড়িরই মুখ মোড়ের দিকে। হয়তো আরোহীরা নেমে পার্কে ঢুকেছে ভাবল আহমদ মুসা।
মোড়ে প্রবেশ করল আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসার গাড়ি তখন মোড়ের মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছে। হঠাৎ আহমদ মুসা বিস্ময়ের সাথে দেখল, সামনে ও বাম দিক থেকে এক জোড়া করে দুই জোড়া গাড়ি তীরবেগে এগিয়ে আসছে। প্রথমে আহমদ মুসা মনে করেছিল মোড় ঘুরে গাড়িগুলো কোন দিকে চলে যাবে। কিন্তু পরক্ষনেই তার বুঝতে বাকি রইল না গাড়িগুলো তার গাড়ি লক্ষ্য করেই পাগলা গতিতে এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ করেই ব্রেক কষেছে আহমদ মুসা তার গাড়ি। সামনে এগুনো যায় না, বামেও না। আর ডাইনে পার্কের দেয়াল। পেছনে হটা ছাড়া পথ নেই।
কিন্তু পেছনে হটতে গিয়ে রিয়ারভিউতে চোখ পড়তেই দেখল, পেছন থেকে আর এক জোড়া গাড়ি সেই একই গতিতে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
গাড়িতে আবার ব্রেক কষে গাড়ি থেকে আহমদ মুসা বেরোতে যাবে এমন সময় তিন দিক থেকে বৃষ্টির মত গুলী শুরু হলো।
তিন দিকের গুলির বৃষ্টি এসে ছেঁকে ধরল তার গাড়িকে। গাড়ির সামনে ও পেছনের উইন্ড স্ক্রিন ও সব জানালা মুহূর্তেই উড়ে গেল। ঝাঁঝরা হতে লাগল গাড়ি।
হোটেল থেকে ভাড়ায় আনা গাড়িটার জন্যে কষ্ট লাগল আহমদ মুসার। গাড়ির মেঝেয় শুয়ে নিজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করল।
পাল্টা আক্রমনের কোন সুযোগ পেল না আহমদ মুসা। তিন দিকের অবিরাম গুলিবৃষ্টির মধ্যে মুহূর্তের জন্যেও মাথা তোলার কোন সুযোগ নেই। আর একটা মাত্র রিভলবার দিয়ে সে সামলাবে কোন দিকে।
হঠাৎ গুলীবর্ষণ তিন দিক থেকেই থেমে গেল। কি ব্যাপার? মুখ ঘুরিয়ে চোখ উপরে তুলল আহমদ মুসা। দেখল, চারদিক থেকেই ছয়টি স্টেনগানের নল প্রবেশ করেছে আহমদ মুসার গাড়ির মধ্যে।
আহমদ মুসা গাড়ির মেঝে থেকে উঠে বসল। শান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, ‘কি ব্যাপার? কে তোমরা? এভাবে কেন আমাকে আক্রমন করেছ, আমার গাড়ি ধ্বংস করেছ?’
‘বাঃ আহমদ মুসা বাঃ! ছয় ছয়টি স্টেনগানের মুখে দাঁড়িয়েও এমন স্বাভাবিক কন্ঠে কথা বলতে পার তুমি?’ বলল সাড়ে ছয় ফুট লম্বা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও নেতা গোছের একজন লোক।
বলেই সে একজনকে নির্দেশ দিল, ‘ওকে বের করে আন।’
তাদের পেছন থেকে আরও দু’তিন জন লোক ছুটে এল। তাদের একজন টান দিয়ে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া একটা দরজা খুলে ফেলল।
দু’জনে হিড় হিড় করে টেনে আহমদ মুসাকে গাড়ি থেকে বের করল এবং শুইয়ে দিল রাস্তায়।
সাড়ে ছয় ফুট লম্বা সেই লোকটি এগিয়ে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘ওয়েলকাম আহমদ মুসা। গত দুদিন ছিল তোমার, আজ তৃতীয় দিনটা আমাদের এবং এই তৃতীয় দিনটাই ফাইনাল। তোমাকে হত্যা করতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম, তোমার পেটের অনেক কথা তাহলে চিরদিনের জন্যে হারিয়ে যাবে। সে কথাগুলো আমাদের খুবই দরকার। এ জন্যেই এখনও তুমি প্রাণে বেঁচে আছ।’
‘আমার সৌভাগ্য।’ বলল আহমদ মুসা লোকটির দিকে তাকিয়ে। এই সাথে ভাবল আহমদ মুসা, এই লোকটিই কি স্পুটনিক ধ্বংসের নেতা? নেতা না হলে নেতা গোছের যে কেউ হবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
‘সৌভাগ্য নয়, প্রমাণ হবে এটাই চরম দুর্ভাগ্য, যখন যাবে ‘সাও তোরাহ’তে। আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিনের ‘গুলাগ’টা কাল্পনিক ছিল, ঈশ্বরের এই ‘গুলাগ’ কিন্তু কাল্পনিক নয়।’
‘ঈশ্বরের কোন ‘গুলাগ’ থাকে না মি.। তাঁর আছে জাহান্নাম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ ‘গুলাগ’ না বলে ‘জাহান্নাম’ও একে বলতে পার। কারণ এখানেও লোক ঢোকে, কিন্তু বের হয় না।’ বলল সেই সাড়ে ছয় ফুট লম্বা লোকটা।
‘দুনিয়ার সাজা নকল ঈশ্বরদের জাহান্নাম সম্পর্কে এ দাবী করা যায় না মি.।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমরা দুনিয়ার ঈশ্বর নই, অধীশ্বর আহমদ মুসা। জাহান্নাম সম্পর্কে ঐ কথা বলছ? ঠিক আছে তোমাকে দিয়েই তার প্রমাণ হবে, তুমি দেখতে পাবে।’
বলেই লোকটি যারা আহমদ মুসাকে টেনে বের করেছিল, তাদের একজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘একে ক্লোরোফরম লাগাও।’
সংগে সংগেই লোকটি এগিয়ে এল।
আহমদ মুসার কাছে এসে পকেট থেকে বের করল ক্লোরোফরম স্প্রেয়ার।
আহমদ মুসাও তাকাল ক্লোরোফরম স্প্রেয়ার কনটেইনারের দিকে। দেখেই চিনল ওটা ভয়ংকর ধরনের একটা ক্লোরোফরম। এ ক্লোরোফরম দিয়ে কাউকে অজ্ঞান করলে দশ বারো ঘন্টার আগে তার জ্ঞান ফেরে না। এর কার্যকারিতাও অত্যন্ত দ্রুত। কারো নাকে স্প্রে করার দুই তিন সেকেন্ডের মধ্যে সে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আবার এর আরেকটা গুণ হলো, কোথাও এটা স্প্রে করলে তিন চার গজের মধ্যে কেউ থাকলে সেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সুতরাং এটা যে ব্যবহার করে তাকে একটা ছোট গ্যাস মাস্ক পরতে হয়। তবে এর একটা অসুবিধা রয়েছে। সেটা হলো, এর সংজ্ঞাহীন করার কার্যকারিতা স্প্রে করার এক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না।
লোকটি ক্লোরোফরম স্প্রেয়ার হাতে নেয়ার সাথে সাথে নাকে গ্যাস মাস্কও পরে নিয়েছে।
গ্যাস মাস্কের ট্রিগারে তার তর্জনি স্থাপন করল লোকটি।
আহমদ মুসাকে ঘিরে রাখা স্টেনগানধারীরা তাদের স্টেনগান আহমদ মুসার দিকে উদ্যত রেখেই ওরা চার পাঁচ গজ দূরে সরে গেল।
আহমদ মুসাকে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
লোকটি স্প্রে করতে লাগল আহমদ মুসার নাকে। প্রায় পাঁচ সেকেন্ড সে স্প্রেটা ধরে রাখল আহমদ মুসার নাকের উপর।
পাঁচ সেকেন্ড স্প্রে করার পর স্প্রে বন্ধ করে সে দু’তিন সেকেন্ড অপেক্ষা করল। তারপর হঠাৎ আকষ্মিকভাবে সে লোহার স্পাইকওয়ালা জুতার গোড়ালী দিয়ে প্রচন্ড এক ঘা দিল আহমদ মুসার বাম হাতের তালুতে। আহমদ মুসার দেহ নড়ল না, হাতও নয়। শুধু মুখ থেকে অস্ফুট ‘আ….আ’ শব্দ বেরিয়ে এল। তার গলার স্বরটা ঘুমিয়ে পড়ছে এমন মানুষের কন্ঠস্বরের মত শোনাল।
লোকটি আবার সেকেন্ড খানেক সময় নিয়ে আহমদ মুসার নাকে স্প্রে করল।
তারপর সেকেন্ড দেড়েক অপেক্ষ করে আগের মত লোহার স্পাইক দেয়া গোড়ালি দিয়ে আকষ্মিকভাবে প্রচন্ড এক আঘাত করল আহমদ মুসার পায়ের পাতায়।
কিন্তু এবার আর আহমদ মুসার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরুল না।
‘ধন্যবাদ জ্যাকব, তোমার কাজ শেষ। এখন তুমি ওকে টেনে নিয়ে লাইবারম্যানের মাইক্রোটার কাছে চল।’ বলল সেই সাড়ে ছয়ফুট লম্বা লোকটি ক্লোরোফরম স্প্রে করা ‘জ্যাকব’ নামক লোকটিকে লক্ষ্য করে।
জ্যাকব আহমদ মুসাকে টেনে নিয়ে এল লাইবারম্যানের মাইক্রোর কাছে।
লোকটি এখানে পৌঁছে তার নাক থেকে গ্যাস মাস্ক খুলে ফেলল।
সবাই সেখানে এল।
সেই সাড়ে ছয়ফুট লম্বা লোকটিও।
সে বলল লাইবারম্যানকে লক্ষ্য করে, ‘লাইবারম্যান, মিশন সফল। পূর্ণ সফল হবে যখন একে ‘সাও তোরাহ’তে নিয়ে খাঁচায় পুরতে পারব। এর জন্যে সেখানে একটা সোনার খাঁচা তৈরী করব। অন্য খাঁচায় একে মানায় না।’
বলে একটু থেমে লাইবারম্যানকে লক্ষ্য করে আবার বলে উঠল, ‘আহমদ মুসাকে নিয়ে তোমার মাইক্রোর মেঝেতে শুইয়ে দাও। আরও চারজন স্টেনগানধারীকে নাও তোমার মাইক্রোতে। সে দশ বারো ঘন্টার আগে জাগবে না। তবু সাবধান থাকবে। নিয়ে গিয়ে হাত পা বেঁধে খাঁচায় ফেলে রাখবে। আমি ‘রাইন ইন্টারন্যাশনাল হোটেল’ হয়ে ঘাঁটিতে ফিরব।
‘রাইন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে কেন মি.আজর ওয়াইজম্যান?’ বলল লাইবারম্যান।
‘আহমদ মুসার নতুন রুম কোনটি, তার হ্যান্ডব্যাগসহ তার লাগেজ কোথায় সে সব খোঁজ নিয়ে আসব। ওগুলো হাত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যে ডকুমেন্টগুলো আমি খুঁজছি তা আহমদ মুসার কাছে থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। সাত গোয়েন্দার অসমাপ্ত কাজ এর পক্ষেই করা সম্ভব। দেখা যাক, এর কাছে ঐ সব কোন কিছু তথ্য পাওয়া যায় কিনা।’ বলল সাড়ে ছয় ফুট লম্বা আজর ওয়াইজম্যান লোকটি।
‘ঐ ছুঁড়ি-ছোঁড়া ‍দু’জনের কি করা যায়?’ লাইবারম্যান বলল।
‘ওরা জিরো। ওদের গায়ে হাত দিয়ে খামাখা কেন পুলিশের ঝামেলায় পড়তে যাবে?’ বলল ওয়াইজম্যান।
‘ঠিক আছে স্যার।’ লাইবারম্যান বলল।
কথা শেষ করেই লোকজনের দিকে চেয়ে বলল, ‘তোমরা আহমদ মুসাকে আমার মাইক্রোতে তোল। আর স্টেনগানওয়ালা চারজন ওঠ আমার গাড়িতে।’
বলে লাইবারম্যান এগুলো তার গাড়িতে ওঠার জন্যে।
ওয়াইজম্যানও এগুলো তার কারের দিকে।
অল্পক্ষনের মধ্যেই এলাকাটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু পড়ে থাকল আহমদ মুসার ভাড়া করে আনা ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাড়িটা।
চলছে লাইবারম্যানের মাইক্রোবাসটি। গাড়ির মেঝের উপর উপুড় হয়ে আছে আহমদ মুসা।
তার পাশেই গাড়ির সিটে পাশপাশি বসে আছে চারজন লোক।
আর গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে আছে লাইবারম্যান। তার পাশে ড্রাইভিং সিটে আরেকজন ড্রাইভ করছে গাড়ি।
স্টেনগানধারী একজন তার জুতা দিয়ে আহমদ মুসার গায়ে টোকা দিয়ে বলল, ‘ব্যাটা নাকি খুব সাংঘাতিক। কিন্তু আমাদের বুদ্ধির কাছে কুপোকাত!এমন ফাঁদে ফেলা হয়েছে যে, কিছুই করতে পারল না।’
‘আমাদের দু’জন লোক মেরেছে গত রাতে এই লোক। মজা করে শোধ নেয়া যাবে।’ বলল তার পাশের আরেকজন স্টেনগানধারী।
‘কি শোধ নেবে, এতো দেখছি লিকলিকে ছেলে মানুষ। এর সম্পর্কে শোনা কথাগুলো আমার খুব বিশ্বাস হয় না।’ বলল আরেকজন।
‘একে আমার কোথায় নিচ্ছি, শার্লেম্যানের ৫নং বাড়িতে, না বড় বসের ফ্ল্যাটে?’ চতুর্থজন বলে উঠল।
‘কেন বলছ একথা?’ প্রথমজন বলল।
‘শোধ তোলার কথা বলছ তাই। ফ্ল্যাটে নিলে তো সেখানে আমাদের শোধ নেয়া যাবে না।’ চতুর্থজন উত্তর দিল।
‘চিন্তা করো না, তোমাদের সব ইচ্ছা পূরন হবে। তোমরা যেখানে চাচ্ছ সেখানেই নেয়া হবে।’ বলল লাইবারম্যান।
তাদের এই সব গল্প কথা চলতেই থাকল।
আহমদ মুসা সবই শুনছিল। ক্লোরোফরম তাকে সংজ্ঞাহীণ করতে পারে নি। ক্লোরোফরম স্প্রে করার সময় থেকে পাকা দেড় মিনিট সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ছিল। তাকে গাড়ির দিকে টেনে নেয়ার সময় যখন সে নিঃশ্বাস নিয়েছে, তখন ক্লোরোফরম এর কার্যকারিতা শেষ।
সংজ্ঞাহীন হওয়ার ভান করতে গিয়ে তাকে দারুণ কষ্ট করতে হয়েছে। জুতার লোহার স্পাইকওয়ালা গোড়ালী দিয়ে তার হাতের তালুতে আকষ্মিক এমন আঘাত করেছে যে চুপ করে থাকা অসম্ভব। আহমদ মুসা ধৈর্য্যের সব শক্তি একত্রিত করে চুপ থেকেছে শুধু একটা ক্ষীণ ‘আহ’ শব্দ করার মাধ্যমে। এটুকু শব্দ আহমদ মুসা ইচ্ছা করেই করেছে এটা প্রমাণ করার জন্যে যে, আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে। পায়ের তালুতে দ্বিতীয় আঘাতও তাকে হজম করতে হয়েছে কোন শব্দ না করে।
তাদের গল্পের মাঝে আহমদ মুসা একবার পলকের জন্যে চোখ খুলল। তার ভাগ্য ভাল যে উপুড় অবস্থায় তার মুখ স্টেনগানধারীদের দিকে ফেরানো ছিল। ফলে পলকটুকুতেই দেখতে পেল তার পাশেই গাড়ির সিটে বসা চারজনকে। তাদের পাগুলো আহমদ মুসার গা প্রায় স্পর্শ করে আছে। তাদের একজনের স্টেনগানটা কোলে। অন্য তিনজনের স্টেনগান মাটিতে রেখে ব্যারেল কোলে ঠেসে দেয়া। একজনের স্টেনগানের গোড়া আহমদ মুসার ডান বাহু স্পর্শ করে আছে।
আহমদ মুসা হিসেব কষল, সামনে থেকে লাইবারম্যানের এ্যাকশনে আসতে কতক্ষন সময় নেবে? এর মধ্যে সে কি পেছনটা নিকেশ করতে পারবে? কিন্তু এছাড়া তো উপায় নেই।
মসৃণ রাজপথের উপর দিয়ে মাইক্রোটা চলছিল তীরের বেগে।
চোখ দুটি আহমদ মুসা আবার অর্ধ নির্মিলিতের মত খুলে স্টেনগানের বাটটা আবার দেখে নিল।
তারপর চোখের পলকে আহমদ মুসা বাট ধরে স্টেনগানটা টেনে নিয়েই দেহটা ঘুরিয়ে চিৎ হয়ে গেল।
ওদের চারজনেরই চোখ পড়ে গিয়েছিল আহমদ মুসার উপর। কিন্তু ভুত দেখার মত আৎকে উঠেছিল সবাই। তাদের এই আৎকে ওঠার ভাব তারা কাটিয়ে ওঠার আগেই আহমদ মুসার হাতের স্টেনগান ওদের চারজনের উপর দিয়ে ঘুরে এল।
কি রেজাল্ট হয়েছে না দেখেই শোয়া অবস্থাতেই মুখটা ডানদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে স্টেনগান তাক করলো লাইবারম্যানকে।
চেয়ারের আড়ালে সে। তবু তার চেয়ারের ডানপাশ দিয়ে তার শরীরে ডান পাশের কিছু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আহমদ মুসার হাতে নিখুঁত টার্গেট নেবার সময় ছিল না। সঠিক লক্ষ্যেই আহমদ মুসার স্টেনগান থেকে গুলির ঝাঁক বেরিয়ে গেছে।
গুলি করেই আহমদ মুসা উঠে দাড়াল। গাড়ি কিন্তু ছুটে চলছে তীর বেগেই।
আহমদ মুসার হাতের স্টেনগান তাক করা ড্রাইভারের দিকে। বলল, ‘ড্রাইভার, সামনে গাড়ি দাঁড় করাও। মনে রেখ দ্বিতীয়বার বলব না, গুলী করব।’
বলার সংগে সংগেই ড্রাইভার গাড়ির লেন চেঞ্জ করে রাস্তার কিনারে নিয়ে গেল। কয়েক গজ গিয়েই গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা হাতের স্টেনগানটা গাড়ির পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে দরজা খুলে নামতে নামতে বলল, ‘ড্রাইভার, এখনি এদের কোন ক্লিনিকে নিলে এদের কেউ কেউ বেঁচে যেতে পারে।’
কথা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিল।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে ওখানেই দাড়িয়ে থাকল। মাইক্রোটি চোখের আড়ালে চলে যাবার পর একটা ট্যাক্সি ডেকে তাতে উঠে বসতে বসতে বলল, ‘হোটেল রাইন ইন্টারন্যাশনাল’।
হোটেল রাইন ইন্টারন্যাশনাল যাওয়ার কথা আহমদ মুসা বলল বটে, কিন্তু পরে চিন্তায় এল, ওদের বড় বস আজর ওয়াইজম্যান তো হোটেল রাইনেই গেছে। সে সেখানে কি করবে, কি বলবে কে জানে!হুট করে হোটেলে যাওয়া তার ঠিক হবে কিনা। কিন্তু হোটেলে না গেলে সে যাবে কোথায়? সে যে লাইবারম্যানদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে একথা আজর ওয়াইজম্যান এখনি জানতে পারবে। জানতে পারার সংগে সংগে সে নিশ্চয় এবার পুলিশকে লেলিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তৎপর হবে। এই সাথে ওয়াইজম্যানরাও আরও মরিয়া হয়ে উঠবে। এই অবস্থায় খোঁজ খবর না নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করা তার জন্যে ঠিক হবে কিনা। তাছাড়া হোটেলের টুরিস্ট সেকশনের যে গাড়ি সে ভাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সেটা কোথায় এ প্রশ্নও উঠবে। গাড়ি হারিয়ে গেছে এ কথাও বলা যাবে না, আবার যে হাল হয়েছে গাড়ির সেটাও বলা যাবে না। কারণ তাতে অনেক প্রশ্ন উঠবে, যার জবাব সে দিতে পারবে না।
এসব চিন্তার মধ্যেই আহমদ মুসা পৌঁছে গেল হোটেলের কাছে। সে ঠিক করল হোটেলে না গিয়ে আপাতত সে গীর্জার সামনে নেমে যাবে।
গীর্জার পার্কিং এ নেমে পাশের একটা গাড়ির দিকে তাকাতেই খুশি হয়ে উঠল আহমদ মুসা। দেখল, ফাতিমা ও যায়েদ একটা গাড়িতে বসে।
ওদের দেখে খুশি হওয়ার পরক্ষনেই আবার চিন্তিত হয়ে পড়ল আহমদ মুসা। ফাতিমারা হোটেলের বদলে গীর্জার পার্কিং এ কেন? হোটেলে কি কিছু ঘটেছে?
আহমদ মুসা এগুলো ওদের দিকে।
ওরাও দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে।
ওরা ছুটে এল আহমদ মুসাকে দেখে।
ওদের মুখে এ সময় যে হাসিটা থাকা স্বাভাবিক সেটা নেই।
ওদের এই অবস্থা দেখে আহমদ মুসাও হাসতে পারল না।
ওরা কাছে আসতেই আহমদ মুসা বলল, ‘কি ব্যাপার, তোমরা এখানে? ভাল আছো তো?’
আহমদ মুসার জিজ্ঞাসার কোন জবাব না দিয়ে ফাতিমা ও যায়েদ এক সাথে বলে উঠল, ‘আপনি সুস্থ আছেন, আপনি ভাল আছেন তো ভাইয়া?’ তাদের কন্ঠে উদ্বেগ।
‘তোমরা একথা বলছ কেন? উদ্বিগ্ন কেন তোমরা এত?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া আপনাকে ওরা ধরে নিয়ে যায়নি?’ বলল যায়েদ চোখ কপালে তুলে।
‘হ্যাঁ গিয়েছিল। মুক্ত হয়ে আসলাম। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?’
‘এই তো ক’মিনিট আগে আমি আসার সময় ঈল পার্কের মোড়ে আপনার গাড়ি ঝাঁঝরা অবস্থায় দেখলাম। আমি গাড়ির নাম্বার দেখে চিনতে পারি ও গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। জিজ্ঞেস করে সেখানে জড়ো হওয়া লোকদের একজনের কাছে শুনলাম, ছয় সাতটা গাড়ি এ গাড়িটাকে ঘিরে ফেলে বিরামহীন মেশিনগানের গুলী চালিয়ে গাড়ির এ হাল করেছে। এ গাড়ি থেকে একজনকে বের করে ঐ গাড়িওয়ালারা ধরে নিয়ে গেছে। কি ঘটেছিল ভাইয়া, কি করে আপনি মুক্ত হলেন?’ বলল যায়েদ।
আহমদ মুসা সংক্ষেপে ঘটনাটা ওদের বলল। ঘটনা শুনে ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বলল ফাতিমা, ‘ভাইয়া মাত্র ১২ ঘন্টার মধ্যে আপনি দ্বিতীয়বার জীবন পেলেন।’
তারপর যায়েদ ও ফাতিমা দু’জনেই হাত উপরে তুলে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। হে আল্লাহ, আমাদের ভাইয়ার বুদ্ধি, শক্তি, সাহস আরও বাড়িয়ে দিন। এ ধরনের সব বিপদেই তিনি যেন জয় করতে পারেন।’
তারা থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘তোমরা এখানে কি করছ? ঐ শয়তানদের একজন নেতা আজর ওয়াইজম্যান তো হোটেলে আসার কথা আমার রুমের খোঁজ খবর নেবার জন্যে!’
‘সে এসেছিল এবং খোঁজ নিতে আপনার কক্ষেও ঢুকেছিল। সে যখন কাউন্টারে কথা বলছিল, তখন আমি কাউন্টারের পাশে ছিলাম। সব আমি শুনি এবং তাকে ফলো করি। তার ছবিও আমি নিয়েছি। যেভাবে অথরিটির সাথে সে কথা বলছিল এবং কাজ করছিল, তাতে আমার মনে হয়েছে সে ষড়যন্ত্রকারীদের একজন বড় কেউ হবেন। যাই হোক, তার কথা শুনে আমি বুঝে যে, আপনার কোন বিপদ হয়েছে। সেজন্যে হোটেলের লবিতে বসেই আমি যায়েদের অপেক্ষা করি। সে এলে তার কাছে সব শুনে গাড়ি নিয়ে আমরা হোটেল থেকে সরে এসে এখানে অপেক্ষা করি। আমাদের ভয় হচ্ছিল আপনাকে হস্তগত করার পর আমাদের কক্ষেও ওরা হানা দেবে।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘দিতে পারে। কারণ তারা যে জিনিস খুঁজছে তা আমার সুটকেসে পায়নি। আমার হ্যান্ডব্যাগ ও তোমাদের ব্যাগেজ দেখার জন্যে তোমাদের কক্ষেও হানা দিতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি খুঁজছে ভাইয়া ওরা?’ বলল যায়েদ।
‘স্পুটনিকের গোয়েন্দারা নিউইয়র্কের টুইন (লিবার্টি ও ডেমোক্রাসি) টাওয়ার ধ্বংসের প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে যে দলিল দস্তাবেজ যোগাড় করেছিল, সে সবেরই কতকগুলো বা কোনটি সম্ভবত তারা খুঁজছে। লা-মন্ডের রিপোর্টে গোয়েন্দা অপহরণ করার কারণ হিসাবে এ ধরনের কিছুকেই সন্দেহ করা হয়েছিল। আজ আজর ওয়াইজম্যানের মুখেও এ ধরনের কথাই শুনেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, আপনি ওদের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার পর ওরা নিশ্চয় দারুণ ক্ষেপে গেছে। এই অবস্থায় হোটেল আপনার জন্যে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, আমাদের জন্যেও। কি করা যায় এখন। বাড়ি একটা পেয়েছি। ভাড়া একটু বেশি হলেও আপনি যেমন চেয়েছিলেন, সেরকমই বাড়িটা। বাড়িটাতে কালকে উঠলে ভাল হয়, ‘তবে আজকেও উঠা যায়।’ বলল যায়েদ।
‘আমরা এখনি হোটেল ছেড়ে দেব। আমি ও যায়েদ গিয়ে উঠব ভাড়া করা বাড়িতে। আর ফাতিমা উঠবে আপাতত তার আত্মীয়ের বাড়িতে।’ আহমদ মুসা বলল।
ম্লান হয়ে গেল ফাতিমা কামালের মুখমন্ডল। পরক্ষনেই লজ্জায় ছেয়ে গেল তার মুখ। ফুটে উঠল ঠোঁটে লজ্জা মিশ্রিত হাসি। বলল, ‘ভাইয়া, আপনার জন্যে আরও কিছু খবর আছে। কামাল সুলাইমান ভাইয়ার বাসা থেকে অল্পক্ষন আগে জানিয়েছে, আজ বাদ আসর স্ট্রাসবার্গ মসজিদ কম্যুনিটি হলে দু’পক্ষই বিয়ের আয়োজন করার ব্যাপারে রাজী। আপনার মত পেলেই এটা চূড়ান্ত হবে।’
আহমদ মুসার মুখে ফুটে উঠল মিস্টি হাসি। বলল, ‘ওয়েলকাম বোন। আমার আগের কথা বাতিল। তুমিও আজ যায়েদের সাথে ভাড়াবাড়িতে উঠবে। ওদের বলে দাও। শুভস্য শীঘ্রম।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ মুখ নত করে বলল ফাতিমা কামাল।
আহমদ মুসার মুখে সংকোচ জড়িত এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ফাতিমা, যায়েদ, মনে করতে পারো আমি তোমাদের উপর অন্যায় চাপিয়ে দিয়েছি। ভাবতে পার যে, তোমাদের ইনটিগ্রিটিকে আমি সন্দেহ করছি। আমি………’।
আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে ফাতিমা কামাল বলে উঠল, ‘ভাইয়া আপনার কথা ঠিক নয়। আপনি আমাদের সত্যিকার অভিভাবকের কাজ করেছেন। আপনি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, আমরা আমাদের অল্পই জানি, স্রষ্টা জানেন সবটুকুই। সুতরাং আমাদের জন্যে তাঁর নির্দেশই চূড়ান্ত।’ ফাতিমার কন্ঠ আবেগাপ্লুত ও দৃঢ়।
‘ধন্যবাদ বোন’, বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘চল হোটেলের বিল চুকিয়ে আমরা চলে আসি।’
আহমদ মুসাসহ ওরা দু’জন আবার গিয়ে গাড়িতে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল হোটেলের দিকে।
‘ভাইয়া, আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে কোথায় যাচ্ছি?’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘বাদ আসরের অনুষ্ঠান পর্যন্ত তুমি তোমার ভাইয়া কামাল সুলাইমানের বাড়িতে থাকবে। আমি যায়েদকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে উঠব। যায়েদ বাসায় উঠে বাড়ি গুছাবে। আর আমি পরবর্তী অভিযানের জন্যে কিছু খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করব।’
‘কি অভিযান?’ জিজ্ঞেস করল ফাতিমা।
‘ও কথা এখন থাক। পরে বলব।’ বলল আহমদ মুসা।
গাড়ি প্রবেশ করল হোটেলের কার পার্কিং এ।

সত্যিই আহমদ মুসা যেমন চেয়েছিল, সে রকমই বাড়িটা।
আহমদ মুসার কক্ষটি বেশ বড়। এটাচড বাথ। কক্ষ থেকে ফ্ল্যাটের বাইরে বেরুবার ইন্ডিপেনডেন্ট প্যাসেজ। অন্যদিকে দুটি বেডরুম আর একদিকে গেস্টরুম নিয়ে ফাতিমা যায়েদদের অংশ। আহমদ মুসার কক্ষ থেকে ডাইনিং ড্রইং এ প্রবেশের একটা দরজা রয়েছে। এই দরজা বন্ধ থাকলে ফ্ল্যাটের দুই অংশ বলা যায় আলাদাই হয়ে পড়ে। দরজাটা দুই দিক থেকেই বন্ধ করা যায়। সিদ্ধান্ত হয়েছে দরজাটা দুই দিক থেকেই বন্ধ রাখা হবে। দুই পক্ষের কারও প্রয়োজন হলে নক করে দরজা খুলতে হবে। ফ্ল্যাট থেকে বাইরে বেরুবার জন্য ফাতিমা-যায়েদদের প্যাসেজও আলাদা।
নতুন দম্পতি হিসেবে ফাতিমা ও যায়েদ ফ্লাটে উঠেছে মাগরিবের নামাজের আধা ঘন্টা আগে। স্ট্রাসবার্গ মসজিদ কম্যুনিটি হলে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি হয়েছে খুবই সুন্দর, কিন্তু সংক্ষিপ্ত। স্ট্রাসবার্গের পনেরটি মুসলিম পরিবার যোগ দিয়েছিল এই বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়ের পর ফাতিমা ও যায়েদের আত্মীয় স্বজনরা তাদেরকে ফ্ল্যাটে তুলে দিয়ে গেছে।
রাত ১১টা। আহমদ মুসা নক করল ফাতিমা-যায়েদদের অংশে ঢোকার পার্টিশন ডোরে।
খুলে গেল দরজা।
দরজা খুলে দিয়েছে যায়েদ।
আহমদ মুসা সালাম দিল যায়েদ ও ফাতিমা দুজনকে।
ফাতিমা কামাল বসেছিল সোফায়।
আহমদ মুসা দরজায় এসে সালাম দিতেই সালামের জবাব দিয়ে উঠে দাড়াল ফাতিমা। আরও বলল, ‘ওয়েলকাম ভাইয়া।’
বিয়ের পোশাকটা নেই ফাতিমা কামালের পরনে। কিন্তু যে পোশাক পরেছে তাতেও তাকে নববধুই লাগছে। ফুলহাতা কামিজ তার পা পর্যন্ত নেমেছে। মাথার রুমাল কপাল ঢেকে গলা জড়িয়ে বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে। ফাতিমা কামালের শ্বেতাভ গোলাপী দেহে গোলাপী এই পোশাক তাকে অপরূপ করে তুলেছে।
নত দৃষ্টিতে আহমদ মুসা যায়েদের সাথে গিয়ে সোফায় বসল।
ফাতিমা কামালও বসল।
যায়েদ গিয়ে বসেছে ফাতিমার পাশে। আর আহমদ মুসা তাদের সামনের আরেকটি সোফায়।
ফাতিমার চোখে মুখে লজ্জার ছাপ। লাল হয়ে উঠেছে মুখ।
যায়েদও অনেকটাই বিব্রত।
প্রথম নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসাই। বলল, ‘নতুন সংসার, কোন অসুবিধা নেই তো তোমাদের?’
‘আলহামদুলিল্লাহ। কোন অসুবিধা নেই ভাইয়া।’ বলল যায়েদ। তার মুখে সলজ্জ হাসি।
‘ভাইয়া, আমরা তো জানি না, আপনি কি বাইরে বেরিয়েছিলেন? ফিরলেন এখন?’ বলল ফাতিমা।
‘না তো, কোথাও বের হইনি? কেন বলছ এ কথা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘বাইরের পোশাক আপনার পরনে।’ বলল ফাতিমা।
‘ও’ বলে হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বাইরে বের হইনি, বের হবো। সে কথাই তোমাদের বলতে এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই রাত ১১টায় বাইরে বেরুবেন? কোথায়?’ বলল ফাতিমা ও যায়েদ একই সাথে। তাদের কন্ঠে বিস্ময়।
‘বলেছিলাম তো এক অভিযানে বেরুতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোথায়?’ বলল যায়েদ।
‘ওদের একটা আস্তানার সন্ধান পেয়েছি। আমি যখন সংজ্ঞাহীন হওয়ার ভান করে ওদের গাড়ির মেঝেতে পড়েছিলাম, তখন ওদের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে আমি ওদের একটা ঘাঁটির ঠিকানা পেয়ে যাই। সেখানেই যাব। দেখি, ওদের পরিচয়, পরিকল্পনা এবং অপহৃত সাতজনকে কোথায় রেখেছে-এসব ব্যাপারে কোন তথ্য উদ্ধার করা যায় কিনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আজই একটা বড় ঘটনা ঘটেছে। ওরা সাংঘাতিক ক্ষেপে আছে আপনার উপর। এই অবস্থায় এত রাতে আপনার একা তাদের ঘাঁটিতে যাওয়া ঠিক হবে না।’ বলল ফাতিমা দৃঢ় প্রতিবাদের কন্ঠে।
‘না ফাতিমা। শত্রুকে আঘাত করার পর শত্রু পাল্টা আঘাত করার আগেই যদি তাকে আবার আঘাত করা যায়, তাহলে শত্রুকে তাড়াতাড়ি কাবু করা যায়। আজ ওরা যে আঘাত খেয়েছে, তার পাল্টা আঘাতের চিন্তায় ওরা এখন ব্যস্ত। নতুন আঘাত আসতে পারে এটা তারা ভাবছে না এবং আত্মরক্ষারও কোন চিন্তা তাদের মাথায় নেই। সুতরাং এটা একটা বড় সুযোগ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার সাথে যুক্তিতে পারবো না ভাইয়া। আপনার এই যুক্তির জবাবে কি বলতে হবে আমার জানা নেই। কিন্তু আমি যেটা জানি, সেটা হলো আপনার একা ঐ শত্রুপুরীতে যাওয়া ঠিক নয়’।
আহমদ ‍মুসা হাসল। বলল, ‘এসব অভিযান দল বেধে হয় না ফাতিমা। দলবল নিয়ে গেলে শত্রুদের আগাম জেনে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। তাতে লোকক্ষয় হলেও লক্ষ্য অর্জন হয় না। এ জন্যে একা যাওয়াটাই নিরাপদ ও ফলপ্রসু’।
‘কিন্তু একা গিয়ে যদি আপনি বিপদে পড়েন, কোন সাহায্যের যদি আপনার দরকার হয়? না ভাইয়া, আপনার একা যাওয়া হবে না’। বলল ফাতিমা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সবচেয়ে বড় সাহায্যদাতা যিনি, তিনি তো সাথেই আছেন। তিনিই সাহায্য করবেন ফাতিমা। আমাদের তার উপরই নির্ভর করা উচিত’।
‘আল্লাহর কথা বলছেন ভাইয়া? তিনি তো আছেনই। তিনি অবশ্যই সাহায্য করবেন। কিন্তু তিনিই তো শত্রু মোকাবিলায় আমাদের উপযুক্ত প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। কিন্তু আপনি তা করেছেন না ভাইয়া’। বলল ফাতিমাই।
‘আমার সাধ্য যা সেভাবেই আমি প্রস্তুতি নিয়েছি ফাতিমা। বলতে পার, লোক সাথে নেই, একা যাচ্ছি। কিন্তু শত্রুর বিরুদ্ধে এমন অনেক কাজ আছে যা একা করতে হয়। আমি সে রকম একটা কাজেই যাচ্ছি। আমি গোপনে তাদের ঘাঁটিতে ঢুকব। অনুসন্ধান করব। তাদের সম্পর্কে তথ্যাদি যোগাড়ের চেষ্টা করব। এমন ধরনের কাজে একা যেতে হয়। আমি সেটাই করছি বোন’। আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝলাম। কিন্তু ভাইয়া, এ ধরনের কাজেও তো সংঘর্ষ হয়। প্রয়োজনীয় সাহায্যের দরকার হয়’। বলল ফাতিমা।
‘দোয়া কর তোমরা বোন। এই সাহায্য যেন আল্লাহ করেন, আমাকে তোমরা বাধা দিওনা। আমি এই কাজ নিয়ে একাই তো এসেছি শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে। সর্বজ্ঞ আল্লাহ এটা জানেন এবং তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন’।
ফাতিমা কোন জবাব দিল না। তার অপলক দু’চোখ তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
যায়েদের বিস্ময় বিমুগ্ধ দু’চোখ নিবদ্ধ আহমদ মুসার মুখের উপর।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ভাই বোনরা এভাবে তাকিয়ে কেন?’
‘ভাবছি ভাইয়া’। ফাতিমা বলল।
‘কি ভাবছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাবছি, ভাইয়ার পরিচয় জানার ভাগ্য কি আমাদের এখনও হলো না? আমি নিশ্চিত ভাইয়া, আপনার এমন একটা পরিচয় আছে যা এত বড় যে আমরা সামান্য মানুষ হয়ে তা জানা ঠিক নয়’। ফাতিমা বলল।
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘ফাতিমা, যায়েদ, গত দু’তিন দিনের পরিচয় থেকে, আমার আচরণ থেকে কি তোমাদের এই বিশ্বাসই হয়েছে?’
‘না ভাইয়া, এ বিশ্বাস নয় বরং উল্টো বিশ্বাসই হয়েছে এবং এ কারণেই মনে কষ্ট লাগছে যে, এত আপন করে যিনি আমাদের নিয়েছেন, স্নেহ ও অভিভাবকত্বের ছত্রছায়া যিনি আমাদের পরম আকাঙ্খিত এক নতুন জীবনে নিয়ে এসেছেন, তার পরিচয় আমরা জানি না, আমাদের জন্যে এটা অবশ্যই বড় কষ্টের ভাইয়া’। বলল ফাতিমা আবেগে ভারী কন্ঠ তার।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার কথা বুঝতে পারছি বোন। তোমাদের কাছ থেকে আমার পরিচয় গোপন করার কোন সিদ্ধান্ত আমি নেইনি। আমি এই মিশনে এখানে আসার আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার পরিচয় আমি কোথাও প্রকাশ করব না। তাতে আমার কাজ অনেকখানি সহজ হবে এবং শত্রুকে অনেকখানি অসতর্ক ও অপ্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যাবে। কিন্তু শত্রুরা আমার পরিচয় যেভাবেই হোক জেনে ফেলেছে। আমার পরিচয় আগাম জেনেই আজ সকালে ওরা আমাকে ঐভাবে আট-ঘাট বেঁধে বন্দী করতে এসেছিল। শত্রুদের কাছ থেকে আমার পরিচয় গোপন রাখার জন্যেই নিজের পরিচয় গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শত্রুরা সেই পরিচয় যখন জেনেই ফেলেছে, তখন আর পরিচয় গোপনের প্রয়োজন দেখি না’।
বলে আহমদ মুসা সামনের টি টেবিল থেকে স্লিপ পেপারের একটা পাতা ছিড়ে নিয়ে তাতে খস খস করে নিজের নাম লিখল এবং তা স্লিপ প্যাডের নিচে চাপা দিয়ে একটু হেসে বলল, ‘আমি আমার পরিচয় লিখে রাখলাম, পরে পড়ে নিও’।
বলে আহমদ মুসা একটু থামল। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে তা যায়েদের হাতে দিয়ে বলল, ‘এতে আমি যেখানে যাচ্ছি তার ঠিকানা লেখা আছে। আমি যদি ভোর পর্যন্ত না ফিরি, তাহলে তোমার পরিচিত পুলিশ অফিসারকে এবং পুলিশ স্টেশনকে এই ঠিকানা জানিয়ে বলবে, স্পুটনিক যারা ধ্বংস করেছে, স্পুটনিকের ৭ গোয়েন্দাকে যারা কিডন্যাপ করেছে, তাদের একটা ঘাঁটির ঠিকানা এটা। ঠিকানাটায় আপনারা এখনি রেড করুন’।
যায়েদ স্লিপটা হাত পেতে নিল। কিন্তু কোন কথা বলল না।
ফাতিমাও কিছু বলল না।
হঠাৎ করে তাদের দু’জনের দু’চোখ ছল ছল করে উঠেছে। উদ্বেগে-আশঙ্কায় তাদের মুখ পান্ডুর।
ফাতিমার দু’চোখের অশ্রু তার দু’গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
আহমদ মুসা তাদের অশ্রু দেখে আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, ‘তোমাদের এই মমতার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তোমরা চিন্তা করো না। আল্লাহই আমাদের সহায়’।
বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
সালাম দিয়ে ঘুরে দাড়িয়ে আহমদ মুসা ফ্ল্যাটের গেটের দিকে এগুলো।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেই উঠল। তারা আহমদ মুসার পেছন পেছন গেট পর্যন্ত এগুলো। তারপর ‘ফি আমানিল্লাহ, আল্লাহ হাফেজ’ বলে বিদায় জানাল আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসাও ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলে লিফটের দিকে এগুলো।
লিফট নেমে গেলেও ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেই গেটের দু’চৌকাঠে ঠেস দিয়ে সামনে শূণ্য দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে থাকল।
অনেকক্ষন পর ফাতিমা একইভাবে সামনের দিকে দৃষ্টি মেলে বলে উঠল, ‘যায়েদ, ভাইয়া তো আসলেই আমাদের কেউ নন। কিন্তু মন মানছে না কেন? তার বিপদের ভয় এমন করে মনকে পীড়া দিচ্ছে কেন? এ কিসের টান যায়েদ?’
যায়েদও ঐভাবেই স্বগতোক্তির মত জবাব দিল, ‘আমিও জানি না ফাতিমা। তবে এটুকু অনুভব করি, তিনি তার অসীম মমতা দিয়ে আমাদের মন জয় করে নিয়েছেন। বলতে পার ফাতিমা, তার মত এত মমতা এত দায়িত্ববোধ, এত মধুর শাসন আর কারও কাছ থেকে কখনও আমরা পেয়েছি?
‘কিন্তু কেন তিনি এত আদর করেন, কেন তাঁর এই দায়িত্ববোধ, কেন এই মধুর শাসন যায়েদ? আমরা তো তাঁর কেউ নই’। বলল ফাতিমা উদাস কন্ঠে।
‘হতে পারে এটা এক আদর্শের সহমর্মিতা’। যায়েদ বলল।
‘কিন্তু আদর্শিক ভাইদের সাথে তো আমাদের কম দেখা হয়নি। এমন তো দেখিনি কখনও’।
‘হতে পারে খাঁটি আদর্শে গড়া এক মানুষের সন্ধান আমরা এই প্রথম পেলাম’। যায়েদ বলল।
কে তাহলে আমাদের অদেখা, অচেনা অতুলনীয় এই মানুষটি? জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল ফাতিমার কন্ঠে।
‘চল দেখি, তাঁর পরিচয়, তিনি কি লিখে গেছেন’। বলে যায়েদ সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সম্বিত ফিরে পাওয়ার মত চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল ফাতিমা। ভেতর দিকে ছুটতে ছুটতে বলল, ‘ধন্যবাদ যায়েদ, তুমি স্মরণ করিয়ে দিয়েছ। এস তুমি’।
ফাতিমা ছুটে গিয়ে না বসেই স্লিপ প্যাডের নিচ থেকে আহমদ মুসার রাখা কাগজটা তুলে নিল। কাগজের উপর চোখ বুলাতে বুলাতে সোজা হয়ে দাঁড়াল ফাতিমা।
স্লিপে লেখা ‘আহমদ মুসা’ নাম পড়ে প্রচন্ড এক ধাক্কা খেল ফাতিমা। সমস্ত সত্তায় তার যে ধাক্কাটা ব্যঙ্ময় হয়ে উঠল তা হলোঃ ‘আহমদ মুসা। কোন আহমদ মুসা? ক্যারিবিয়ান, আমেরিকা ও সুরিনামের ঘটনায় সদ্য আলোচিত সেই আহমদ মুসা, যিনি ফ্রান্সে, সুইজারল্যান্ড, কংগো, ফিলিস্তিন, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, মিন্দানাওয়ের অসংখ্য সুঘটনার জনক?’
এই সব জিজ্ঞাসার মধ্যে হারিয়ে গেল ফাতিমা। কাগজের স্লিপটা তার হাতে ধরা। তার উপর আঠার মত লেগে আছে ফাতিমার চোখ। মূর্তির মত নিরব-নিশ্চল ফাতিমা।
যায়েদও ফাতিমার কাছে এসে পৌছাল। বলল, ‘কি ফাতিমা, কি দেখলে? কি নাম, কি পরিচয় লিখেছেন তিনি?’
কোন কথা বলল না ফাতিমা।
নির্বাক মূর্তির মত হাতের কাগজটা যায়েদের হাতে তুলে দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল সোফায়।
কাগজটিতে দ্রুত চোখ বুলাল যায়েদ।
‘আহমদ মুসা’র নাম পড়ে চমকে উঠল যায়েদ। কয়েকবার পড়ল নামটা। না তার পড়া ঠিক। এই নামটাই লেখা আছে কাগজে। কাগজ থেকে মাথা তুলে ভাবল একটু আহমদ মুসার কথা। তারপর ‘ও গড’ বলে বসে পড়ল সোফায় ফাতিমার পাশে।
দু’জন পাশাপাশি বসে।
দু’জনেই নিরব।
দু’জনের চোখে-মুখেই বিস্ময় ও বিহবলতার ভাব।
নিরবতা ভাঙল যায়েদ। বলল, ‘আমি ভাবতে পারছি না ফাতিমা। আমরা তিন দিন ধরে আহমদ মুসার সাথে আছি। ভাবলেই আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে যে, ঐ ঘরটিতে বিশ্ব বিখ্যাত আহমদ মুসা থাকেন, আর এইমাত্র তিনি বেরিয়ে গেলেন আমাদের সাথে কথা বলে’।
ধীরে ধীরে ফাতিমা মুখ খুলল। সম্মোহিত কন্ঠে স্বগতোক্তির মত বলল, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না আমারও, আহমদ মুসা এত সহজ, এত সরল, এত সাধারণ। আবার বিশ্বাস হচ্ছে এই কারণে যে, গত তিন দিনে তিনি যা করেছেন সেটা আহমদ মুসারই কাজ। আজকের পাশ্চাত্যের দুর্বিনীত, অহংকারী যোগ্যতাকে এভাবে ধুলায় মিশিয়ে দিতে আহমদ মুসাই পারেন, আর কেউ নয়’। আবেগে কন্ঠ ভারী হয়ে উঠেছে ফাতিমার।
‘আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে যে, আহমদ মুসা স্ট্রাসবার্গে এসেছেন, স্পুটনিক ধ্বংসের কেসটাকে তিনি গ্রহন করেছেন এবং মুসলামানদের এইটুকু বিপদও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে’। আবেগে ভারী হয়ে উঠেছে যায়েদের কন্ঠও।
ফাতিমার স্বগত কন্ঠ আবার, ‘বড়ত্বের প্রকাশ একটুও তাঁর মধ্যে নেই। কিন্তু স্নেহ-মমতার সিড়ি বেয়ে তিনি কখন যেন আমাদের মাথার উপর উঠে বসেছেন। তিনি যা বলেন তা করা আমাদের জন্য অমোঘ হয়ে যায়। এ ভাবেই বুঝি তিনি নেতা না হয়েও সবার নেতা’।
‘আলহামদুলিল্লাহ ফাতিমা। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। স্ট্রাসবার্গে আহমদ মুসার সাথী হবার জন্যে আল্লাহ আমাদেরকেই বেছে নিয়েছেন’। বলল আবেগ জড়িত কন্ঠে যায়েদ।
ফাতিমা একটু ঘুরে বসে যায়েদের দু’হাত চেপে ধরে বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ যায়েদ। এটা আমাদের জন্যে পরম গর্বের’। থামল ফাতিমা।
যায়েদ কিছু বলল না। দু’জনেই নিরব।
একটু পর নিরবতা ভাঙল ফাতিমাই। বলল, ‘কিন্তু আমরা তাকে কোন সহযোগিতা করতে পারছি কই? বিপজ্জনক ও সংঘাতের সব কাজ তিনি একাই করেছেন। আজও তাই গেলেন। আজ সকালের ঘটনায় তিনি বন্দী হয়েছিলেন। ভাবতে পার, যদি তিনি মুক্ত হতে না পারতেন। তার মত এত মূল্যবান মানুষ এতটা নিরাপত্তাহীন থাকা কি ঠিক?’
‘আমরা কি সহযোগিতা করব, আর কি সহযোগিতা তিনি নেবেন। আমরা রিভলবার চালাতে পারা ছাড়া এই লাইনে আর কোন অভিজ্ঞতাই নেই। আচ্ছা বল, এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমাদের কি করণীয়?’ বলল যায়েদ।
‘আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে’। বলল ফাতিমা।
‘কি বুদ্ধি?’ জিজ্ঞেস করল যায়েদ।
‘পরে বলছি। বুদ্ধিটা একটু পাকিয়ে নেই’।
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল ফাতিমা, ‘তার আগে একটু গড়িয়ে নেব’।
যায়েদও উঠে দাড়িয়েছে। বলল, ‘আমি?’
‘তোমার পথ তুমি দেখ? তোমার বেডরুম ওদিকে’। বলল ফাতিমা। তার ঠোঁটে হাসি।
‘কিন্তু আজ দুই পথ তো এক হয়ে গেছে।’ বলল যায়েদ। তারও মুখে হাসি।
‘তা ঠিক। কিন্তু আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্রে।’ ফাতিমা বলল।
হাসল যায়েদ। বলল, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বলতে পার যুদ্ধের তাঁবুতে। এক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূলের (স.) দৃষ্টান্তই আমাদের পথ দেখাতে পারে’। হাসল যায়েদ।
সলজ্জ হাসিতে রাঙা হয়ে উঠল ফাতিমার মুখ। বলল, ‘মনে থাকে যেন সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর রাসূলের (সঃ) এর দৃষ্টান্ত এভাবে খোঁজ করা হবে’।
‘অবশ্যই’। বলে যায়েদ তার এক হাত বাড়িয়ে দিল ফাতিমার দিকে।
ফাতিমার এক হাত এগিয়ে এসে ধরল যায়েদের হাত।
দু’জনেই এক সাথে পা বাড়াল সামনে।

শার্লেম্যান রোডের ৫ নাম্বার বাড়িটা বেশ বড়। তিনতলা বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা।
গেটের উপর বিরাট সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘হিউম্যান রাইটস ইউনিভার্সাল গ্রুপ, স্ট্রাসবার্গ’। সাইনবোর্ডে রাস্তার নামও নেই, বাড়ির নাম্বারও নেই।
আহমদ মুসা বিকেলে এসে দেখে না গেলে এই বাড়ি খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হতো। আশে পাশের লোকদের জিজ্ঞেস করে তবেই আহমদ মুসা ‘হিউম্যান রাইটস ইউনিভার্সাল গ্রপে’র অফিসকে ৫ নাম্বার বাড়ি বলে চিনতে পেরেছিল।
বাড়িটা চেনা আছে বলে আহমদ মুসা খুব নিশ্চিন্তে বাড়ি থেকে বেশ দূরে গাড়ি থেকে নেমে গাড়িটা ছেড়ে দিল।
পথচারীর মত হেঁটে হেঁটে বাড়িটার প্রান্তে এসে মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
আর কিছুটা এগুলে গেট। কিন্তু আহমদ মুসা গেট দিয়ে প্রবেশ করতে চায় না।
আহমদ মুসা যেখানে এসে দাড়িয়েছিল, সেখান থেকেই বাড়িটার প্রাচীর শুরু। সেখান থেকে একটা প্রাচীর শার্লেমান সড়কের পাশ ঘেঁষে দক্ষিণে এগিয়ে গেছে। এই প্রাচীরেই বাড়িতে প্রবেশের গেট। আরেকটা প্রাচীর বাড়ির উত্তর সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমে এগিয়ে গেছে। এই প্রাচীরটাই বাড়ির পশ্চিম ও দক্ষিণ সীমানা ঘুরে শার্লেম্যান রোডের প্রাচীরের সাথে এসে মিশেছে।
আহমদ মুসা তাঁর হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, রাত সাড়ে এগারটা বাজে।
সে উত্তরের প্রাচীরের ধার ঘেঁষে পশ্চিম দিকে এগুলো।
আহমদ মুসা ঠিক করেছে প্রাচীর টপকে সে ভেতরে ঢুকবে। এভাবে সবার অলক্ষ্যেই সে ভেতরে ঢুকবে। মারামারি বা শত্রু নিধনে তার কোন লাভ নেই। তার চাই কিছু দলিল-প্রমাণ। যা থেকে জানা যাবে, স্পুটনিকে কি ঘটছে, কেন ঘটছে এবং স্পুটনিকের ৭ গোয়েন্দা কোথায়। এজন্যে গোপনে সে বাড়ি সার্চ করতে চায়। সে নিশ্চিত যে, এভাবেই সে একদিন এখান থেকে বা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় দলিল দস্তাবেজ পেয়েই যাবে।
আহমদ মুসা পশ্চিম প্রাচীরের মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাড়াল।
এ প্রাচীরের পর একটা ফলের বাগান। তারপর বাড়িটা। বাড়িটার উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে ফুলের বাগান। ফলের বাগান শুধু পশ্চিম দিকেই।
বাড়িটাতে পৌঁছা পর্যন্ত গাছের আড়াল পাওয়া যাবে বলেই আহমদ মুসা এ দিকটা বেছে নিয়েছে। প্রাচীরটা সাত ফুটের মত উঁচু।
কোন কষ্টই হলো না আহমদ মুসার প্রাচীর ডিঙ্গাতে।
একটু দৌড়ে এসে কয়েক ফুট প্রাচীর বেয়ে উঠে গিয়ে প্রাচীরের মাথা ধরে ফেলে খুব সহজেই প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে গেল আহমদ মুসা।
বাগানের গাছগুলো বেশ দূরে দূরে। তার ফলেই গাছগুলো বড় বড়।
আহমদ মুসা বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগোচ্ছে বাড়ির দিকে।
বাড়ির চারদিকে চারটি আলোর ব্যবস্থা আছে। সেই আলোতে বাড়ি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বাগানের জমাট অন্ধকার একটুও দূর হয়নি। অনেকটা অন্ধের মতই হাঁটছে আহমদ মুসা।
চোখে কিছু দেখছে না বলেই কান দু’টি সে বেশি সতর্ক রেখেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, নরম ঘাসের উপর তার পায়ের যে শব্দ, সে রকম অনেকগুলো শব্দ তার কানে আসছে। যেন তার ডানে, বামে, পেছনে অনেকগুলো পা তার মত করেই সামনে অগ্রসর হচ্ছে, এই অনুভূতি হওয়ার সাথে সাথেই থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
চারদিকে সতর্ক চোখ বুলাচ্ছে সে।
এই সময় একটা গম্ভীর কন্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘ঠিকই সন্দেহ করেছ আহমদ মুসা। আমরা ঘিরে ফেলেছি তোমাকে চারদিক থেকে। ডজনখানেক স্টেনগান তোমাকে তাক করে আছে। আমাদের প্রত্যেকের চোখে ইনফ্রারেড গগলস। তোমার সবকিছুই আমরা দেখছি। কোন বেয়াদবীর দূর্মতি হলে একেবারে ভর্তা হয়ে যাবে। যেভাবে হাঁটছিলে, সেভাবেই সামনে এগুতে থাক’। কন্ঠটি থেমে গেল।
তার প্রত্যেকটি কথাই আহমদ মুসা বিশ্বাস করল। মনে খুব কষ্ট লাগল আহমদ মুসার, এমন দিনেই সে তার ইনফ্রারেড গগলস নিয়ে আসেনি।
হাঁটতে লাগল আহমদ মুসা। সেই কন্ঠটি অন্ধকারে হো হো করে হেসে উঠল। বলল, আজ গাড়িতে আমাদের একজন লোক বোকার মত এই ৫ নাম্বার বাড়ির কথা উচ্চারণ করেছিল, তুমি পালাবার পর আমরা বুঝেছি তুমি ৫ নাম্বার বাড়িতে আসবে। কিন্তু এত দ্রুত আসবে, আজই আসবে, সেটা আমরা কল্পনাতেও ভাবিনি। কিন্তু আহমদ মুসা তুমি চালাক হয়েও এই বোকামি কেন করলে। প্রকাশ্যে দিবালোকে তুমি বাড়ি দেখতে আসবে, বাড়ি দেখে যাবে, আর তোমাকে কেউ দেখবে না, এটা তুমি ভাবতে পারলে কেমন করে। এটাই ঈশ্বরের মার বুঝলে?’
‘তোমরা ঈশ্বর মান নাকি?’ আহমদ মুসা বলল। তার কন্ঠে বিদ্রুপ।
‘মায়ের কাছে মাসির কথা বল না আহমদ মুসা। তুমিও জান ইহুদীরা মানে বনি ইসরাইলা ঈশ্বরের চিরকালীন বাছাই করা সন্তান’। বলল কন্ঠটি।
‘বাছাই করা ঠিকই, তবে সেটা বেহেশতে যাওয়ার জন্যে নয় নিশ্চয়’। আহমদ মুসা বলল।
বাড়ির পেছনে তখন তারা পৌঁছে গেছে। আলোর মধ্যে সবাই দাড়িয়ে।
আহমদ মুসা দেখল, ঠিকই প্রায় চৌদ্দজন স্টেনগানধারী তাকে ঘিরে আছে।
‘আহাম্মকের কথার কোনো জবাব হয় না আহমদ মুসা’।
আহমদ মুসা দেখল কন্ঠটি ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মির স্ট্রাসবার্গের স্টেশন চীফ লাইবারম্যানের।
লাইবারম্যানের বাম হাতে রিভলবার। আর ডান হাতটা গলার সাথে ঝুলিয়ে রাখা। আহমদ মুসা বুঝল, লাইবারম্যান সকালের ঘটনায় শুধু আহতই হয়েছিল।
কথা শেষ করেই লাইবারম্যান ঘুরে দাঁড়াল বাড়ির দিকে। তারপর রিভলবারটা পকেটে রেখে পকেট থেকে বাঁ হাত দিয়ে ক্ষুদ্র মোবাইল সেটের মত একটা কিছু বের করল।
সামনেই ছিল একটা দরজা। বাড়ির পেছনের দরজা এটাই।
লাইবারম্যান তার বাম হাত উঁচু করল দরজাটির সমান্তরালে। সংগে সংগে দরজাটা খুলে গেল। আহমদ মুসা বুঝল লাইবারম্যানের হাতের ওটা রিমোট কনট্রোল।
দরজা খুলে যেতেই একজন লোক বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। তার হাতে একটি হ্যান্ডকাফ।
তাকে দেখেই লাইবারম্যান বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, তুমি আহমদ মুসাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দাও। সকালের ভুল আমরা করব না’।
আহমদ মুসাকে হ্যান্ডকাফ পরানো হলে তাকে নিয়ে সবাই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। সবার আগে লাইবারম্যান। তার পেছনে আহমদ মুসা। অন্য অস্ত্রধারীরা আহমদ মুসার পেছনে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে আহমদ মুসাকে নিয়ে সবাই এল একটা সিড়ি ঘরে। এখান থেকে সিড়ি উঠে গেছে দু’তলা, তিনতলায়।
সিঁড়ি ঘরে ঢুকেই বৈদ্যুতিক বোর্ডের সুইচের সারি থেকে একটা সুইচে চাপ দিল লাইবারম্যান। সুইচটা অন করার সাথে সাথেই সিড়িঘরের মেঝের একাংশ সরে গেল। বেরিয়ে পড়ল নিচে নামার সিড়ি।
সিড়ি দিয়ে নামল ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে।
নিচের আন্ডারগ্রাইন্ড ফ্লোরটার মাঝখানে সোফা সজ্জিত একটা লবী ছাড়া গোটাটাই ছোট বড় বিভিন্ন কক্ষে ভরা।
আহমদ মুসাকে নিয়ে ওরা একটি কক্ষে তুলল। কক্ষটি বেশ বড়। কক্ষের একপ্রান্তে সিংগল সাইজের লোহার খাট। খাটটি মেঝের সাথে ফিক্সড করা।
আহমদ মুসাকে কক্ষে ঢুকিয়েই লাইবারম্যান বলল, ‘আহমদ মুসা এটাই তোমার ঘর। তবে বেশিক্ষণ তোমাকে এখানে থাকতে হবে না। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আজর ওয়াইজম্যান আসছেন। তিনি ফিরে এলেই আমরা এখানে আসব। আমরা আসার আগ পর্যন্ত তুমি শুয়ে শুয়ে তোমার জীবনের একটা হিসেব নিকেষও করে নিও। কারণ আমরা আসার পর আর তুমি সুযোগ পাবে না’। থামল লাইবারম্যান।
‘পাব না যদি তুমি ঈশ্বর হও। কিন্তু তুমি ঈশ্বর নও মি.লাইবারম্যান’। বলল আহমদ মুসা।
‘ঈশ্বর হওয়ার প্রয়োজন নেই আহমদ মুসা। ঈশ্বর অনেক স্বাধীনতাই মানুষকে দিয়ে দিয়েছেন’। থামল লাইবারম্যান।
কিন্তু আহমদ মুসা কোন উত্তর দিল না। ভাবল, বেহুদা আলোচনায় কোন লাভ নেই।
লাইবারম্যানই আবার কথা বলে উঠল। বলল, ‘আহমদ মুসা আজ সকাল পর্যন্ত তুমি অসংখ্যবার সুযোগ পেয়েছ। কিন্তু সব কিছুরই একটা শেষ আছে আহমদ মুসা। সেই শেষ মাথায় তুমি পৌঁছে গেছ। আর তোমাকে নিয়ে আমরাও ধৈর্য্য সহ্যের শেষ মাথায় পৌঁছেছি। তোমার লাশ পড়ত ঐ অন্ধকার বাগানেই। কিন্তু আজর ওয়াইজম্যান নিজেই তোমার শেষ বিচারটা করতে চান বলেই তুমি কিছুটা সময় পেয়ে গেলে’।
বলেই ঘুরে দাঁড়াল লাইবারম্যান। কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েই আবার ফিরল সে। বলল সে একজনকে লক্ষ্য করে, ‘লেগ চেইনটা আননি?’
‘ইয়েস বস’। বলল লোকটি।
‘লাগাওনি কেন এতক্ষণ?’ ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল লাইবারম্যান।
‘বস আমি আপনার নির্দেশের অপেক্ষা করছি’। বলল লোকটি।
কথা শেষ করেই লোকটি তড়িঘড়ি করে আহমদ মুসার পায়ের কাছে বসে পড়ল। পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিল আহমদ মুসার এবং সেটা লক করে দিল।
লাইবারম্যান বলে উঠল, ‘তোমার ব্যাপারে আমরা আর কোন ঝুঁকি নিতে চাই না আহমদ মুসা। সকালে তোমার হাত-পায়ে শৃঙ্খল পরালে আমাদের তিনজন লোককে জীবন দিতে হতো না, আমিও আহত হতাম না’।
‘এখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চিন্তই লাইবারম্যান?’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলতে পার। তুমি পালাতে পারছ না, তোমার হাত-পা নিষ্ক্রিয় করা গেছে এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। সকালের ভুল আমরা শুধরে নিয়েছি’।
বলে ঘুরে দাঁড়াল লাইবারম্যান। বেরিয়ে গেল সে ঘর থেকে।
তার সাথে সাথে অন্য সকলেও।
লাইবারম্যান তার শেষ কথাটার কোন জবাব পেল না আহমদ মুসার কাছ থেকে। কিন্তু ঘুরে না দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকালে সে দেখতে পেত একটা হাসি। এ হাসি বিদ্রুপ করছে লাইবারম্যানকে।
আহমদ মুসার পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই বসে পড়ল আহমদ মুসা মেঝেতে।
তার হাতের হ্যান্ডকাফের মতই পায়ের চেইনটা। ছয়সাত ইঞ্চির বেশি লম্বা নয়।
দুই হাঁটু দুই দিকে ছড়িয়ে বসতে পারল না আহমদ মুসা। ঐভাবে বসতে পারলে জুতার গোড়ালী হাতের বেশি কাছে পেত। দুই হাটু একদিকে নিয়ে দুই পা এক সাথে ছড়িয়ে বসল আহমদ মুসা।
পা দু’টি গুটিয়ে যথাসম্ভব কাছে নিয়ে এল সে। তারপর দু’হাত দিয়ে ডান জুতায় হুক দিয়ে আটকানো গোড়ালিটা খুলে ফেলল।
জুতার গোড়ালী হাতে নিয়ে আহমদ মুসা গোড়ালীর ভেতরের পাশের একটা বিশেষ স্থানে চাপ দিতেই গোড়ালীর গোটা সারফেসটাই ক্লিক করে উঠে গেল। বেরিয়ে পড়ল একটা কেবিন। কেবিন থেকে আহমদ মুসা বের করে আনল সিগারেটের চেয়ে সরু এবং আধা সিগারেটের মত লম্বা সুচবিহীন সিরিঞ্জের মত একটা ছোট বস্তু। এটাই ‘মাইক্রো লেসার টর্চ’। এর লেসার বীম দিয়ে যে কোন তালা, সরু সাইজের যে কোন আইরন বার এবং আধা ইঞ্চি পরিমাণ পুরু স্টিলশিট গলিয়ে ফেলা যায়, কেটে ফেলা যায়।
আহমদ মুসা জুতার গোড়ালিটা আবার লাগিয়ে দিয়ে হাত-পায়ের শৃঙ্খল কাটার দিকে মনোযোগ দিল।
লেসার বীম দিয়ে হ্যান্ডকাফের লক এবং পায়ের চেইনের লক গলিয়ে শেষ করে দিতেই হাত পায়ের চেইন খুলে গেল আহমদ মুসার।
আহমদ মুসা লেসার টর্চ পকেটে পুরে হ্যান্ডকাফ ও পায়ের চেইন কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাড়াল। এগুলো খাটের দিকে।
স্টিলের খাটের উপর রঙিন কাপড়ে মোড়া ফোমের তোষক। পায়ের দিকে একটা কম্বল মুড়িয়ে রাখা। কম্বল দেখে খুশি হলো আহমদ মুসা। কম্বল মুড়ি দিয়ে তার হাত-পাকে সে ওদের চোখের আড়ালে রাখতে পারবে।
আহমদ মুসা হাতের হ্যান্ডকাফ ও পায়ের চেইন তোষকের তলে রেখে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
ঘুমাবার আগে আহমদ মুসার একটাই অস্বস্তি ছিল যে, তার কাছে কোন অস্ত্র নেই। সার্চ করে সব অস্ত্রই ওরা কেড়ে নিয়েছে। এমনকি ঘড়ি, কলমও। তার ভাগ্য ভাল যে জুতা জোড়া খুলে নেয়নি তারা।
দরজা খোলার শব্দে আহমদ মুসার তন্দ্রা ভাঙল। কিন্তু চোখ খুলল না সে। কিন্তু অনুভব করল ঘরে অনেক লোক প্রবেশ করেছে।
প্রথম কন্ঠ শুনতে পেল সে লাইবারম্যানের। বলছিল সে, ‘ঘুমাচ্ছে আহমদ মুসা’।
‘এই অবস্থায় মানুষের ঘুম আসে। আচ্ছা লোক এই আহমদ মুসা’। একটি ভারী কন্ঠ বলে উঠল। আহমদ মুসা বুঝতে পারল এ কন্ঠ আজর ওয়াইজম্যানের।
‘শেষ ঘুম তো স্যার’। বলল লাইবারম্যান।
বলে একটু থেমেই বলে উঠল সে আবার, ‘এই ঘুমটাই তার শেষ ঘুম হোক স্যার’।
‘না লাইবারম্যান, মৃত্যুটা তাহলে খুব শান্তির হবে তার। সে মরবে খুবই অসহায়ভাবে এবং অসহ্য যন্ত্রনা তাকে পেতে হবে’।
বলে একটা দম নিয়ে হাতের রিভলবারটাকে একবার চেক করে একজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি গিয়ে ওকে লাথি মেরে জাগিয়ে দাও। দেখুক সে যম তার শিয়রে’।
আহমদ মুসা অনুভব করল একজন তার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটির পায়ের শব্দ যখন প্রায় মাথার পাশ পর্যন্ত এল, তখন আহমদ মুসা চোখ ও মুখকে ঘুম কাতর রেখেই দু’চোখের পাতা সামান্য খুলল। দেখতে পেল, স্টেনগানধারী একজন লোক দু’হাতে স্টেনগান ধরে ব্যারেল উচু করে রেখে তার ডান পা তুলছে আহমদ মুসার বুকে লাথি মারার জন্যে।
তার লাথিটা আহমদ মুসার বুক স্পর্শ করার আগেই চোখের পলকে আহমদ মুসার দু’হাত ছুটে গিয়ে লোকটির স্টেনগান কেড়ে নিল এবং শুয়ে থেকেই তার আগুন ঝরা স্টেনগানকে ঘরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরিয়ে নিতে লাগল।
তার মধ্যেই সে দেখতে পেল একজনকে ঢাল সাজিয়ে তার আড়ালে দাঁড়িয়ে পিছু হটে কে একজন ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
ঘরে তখন কেউ দাড়িয়ে নেই। সবার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে লুটানো। রক্তে ভাসছে তারা।
আহমদ মুসা ষ্টেনগান হাতে রেখেই উঠে দাঁড়াল। লাশগুলোর দিকে একবার নজর করল। লাইবারম্যানের লাশ সে দেখতে পেল, কিন্তু আজর ওয়াইজম্যানকে দেখতে পেলনা। বুঝল সে, আজর ওয়াইজম্যানই তাহলে তাদের একজনকে ঢাল সাজিয়ে নিজেকে রক্ষা করে পালিয়ে গেছে। কিন্তু তাকে পেলে তো সব পাওয়া হয়ে যায়।
চিন্তাটা মাথায় আসতেই আহমদ মুসা ছুটল তার পিছু নেবার জন্য।
আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে সিঁড়িতে এল।
সিঁড়ি মুখটা বন্ধ।
আহমদ মুসা দেখল সিঁড়ি মুখের কোথাও কোন বোতাম বা কোন সুইচ নেই।
দ্রুত নেমে এলো আহমদ মুসা সিঁড়ি ঘরে। সিঁড়ি ঘরে সে পেয়ে গেল সুইচবোর্ড। দেখল, সব সুইচ অন, শুধু একটাই অফ। অফ সুইচটাকে অন করে দিয়ে আহমদ মুসা সিঁড়ির গোড়ায় ছুটে এল। দেখতে পেল, সিঁড়ির মুখ খুলে গেছে।
আহমদ মুসা দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। সিঁড়ি ঘরে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত চোখে পড়ল তার। ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো যে, আজর ওয়াইজম্যান আহত হয়েছে।
রক্তের দাগ অনুসরন করে ছুটল আহমদ মুসা।
বাইরের গেটে যখন এসে দাঁড়াল, দেখতে পেল ছুটন্ত একটা গাড়ির পেছনের লাল আলো।
‘ঐ গাড়িতেই পালাল আজর ওয়াইজম্যান, ভাবল আহমদ মুসা।
এ সময় পাশে একাধিক পায়ের শব্দ শুনে ষ্টেনগান তাক করে তাড়াক করে ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, আমরা বলে চিৎকার করে উঠল সামনে থেকে।
আহমদ মুসা তার ষ্টেনগানের ব্যারেল সংগে সংগেই নিচু করল।
এক ঝাঁক গুলী গিয়ে মাটিতে বিদ্ধ হলো। আহমদ মুসা ততক্ষনে ষ্টেনগানের ট্রিগার থেকে তার তর্জ্জনি সরিয়ে নিয়েছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে এসে দাঁড়াল যায়েদ এবং ফাতিমা।
প্রচন্ড বিস্ময় ও বিরক্তি আহমদ মুসার চোখে মুখে। ধমকের স্বরে বলল, এ তোমরা কি পাগলামী করেছ, এখনি সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারতো।
‘আমাদের ভুল হয়েছে ভাইয়া। কথা না বলে এভাবে এগোনো ঠিক হয়নি।’ ভয় মিশ্রিত ভেজা গলায় বলল ফাতিমা।
‘তার চেয়ে বড় ভুল হয়েছে এভাবে তোমাদের আসা।’ বলল
আহমদ মুসা।
‘ফাতিমা প্রস্তাব করল। আমিও ঠিক মনে করলাম। তাই……..।’
কথা শেষ না করেই থেমে গেল যায়েদ।
যায়েদ থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘মাফ করবেন ভাইয়া, আমরা সব জানার পর ঘরে শুয়ে থাকতে পারিনি। বিশেষ করে যখন ভেবেছি আমরা বাসায় রাত যাপন করছি, আর আমাদের এক ভাই আমাদের জন্য মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে, তখন ঘরে থাকা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়েছে।’ ফাতিমার আবেগ জড়িত কন্ঠে কান্নার সুর।
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ তোমাদের দায়িত্ববোধের জন্য। আমি হয়তো ঠিক মনে করছি না। কিন্তু তোমরা যা করা উচিত, সেটাই করেছ।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার মন, আপনার বিচারবোধ এবং আপনার স্নেহ এত বড় বলেই আপনি এত বড় এবং আহমদ মুসা। আপনার প্রতি আমাদের অভিনন্দন। আজ আমরা দু’জন আমাদের কে সব চেয়ে ভাগ্যবান মনে করছি।’
‘ওয়েলকাম বোন তোমাদের। তোমাদের কান্ড দেখে আমার স্ত্রী জোসেফাইনের কথা মনে পড়ছে। ঘটনাগুলো বিয়ের আগের। আমি ওকে নির্দেশ দিয়ে আসতাম। কিন্তু আমার অনুপস্থিতির সময় সে তার বিচারবোধ দ্বারা পরিচালিত হতো। বেশ কিছু অভিযানে সে আমার নির্দেশ অমান্য করে আমার পিছু নিয়েছে এবং আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, ভাবীকে এজন্যে কি আপনি বকেছেন?’ বলল ফাতিমা মুখে হাসি টেনে।
‘বকেছি। কিন্তু তার যুক্তিতে তিনি অনড়। আমার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিচারবোধ দ্বারা পরিচালিত হবার অধিকার তাঁর রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।’
ফাতিমার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘এ জন্যেই তিনি আমাদের ভাবী এবং আপনার উপযুক্ত সঙ্গিনী।’
ফাতিমা থামতেই যায়েদ তড়িঘড়ি বলে উঠল, ‘ভাইয়া আপনি শুধু আমাদের ভাইয়া নন, আমাদের মানে ফরাসীদের জামাই আপনি। এটা আমাদের একটা বড় গর্ব, যেটা ফাতিমাদের নেই।’ কি রকম? বুঝলাম না। ভাইয়া ফরাসীদের জামাই কি করে? বলল ফাতিমা। তার কন্ঠে বিস্ময়।
‘ও, তুমি জানই না। ভাবী তো মারিয়া জোসেফাইন লুই, ফ্রান্সের সর্বশেষ রাজবংশ বরবুনদের রাজকুমারী। ‘লুই দ্যা গ্রেট’ নামে পরিচিত ফ্রান্সের শক্তিমান সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর তিনি সরাসরি বংশধর।’ বলল যায়েদ চোখ–মুখ উজ্জল করে।
‘ও গ্রেট নিউজ আমাদের জন্যে। কিন্তু যায়েদ ফরাসী হিসাবে তোমার যে গর্ব, তার চেয়ে আমার গর্ব বড়, মুসলমান হিসাবে।
আমার একজন ভাই বিয়ে করেছেন তোমাদের রাজকুমারীকে।’
ফাতিমা বলল।
‘সেই হিসাবে তো আমার গর্ব ডবল। ফরাসী হওয়ার পাশা পাশি আমি মুসলমানও।’ চট করে বলল যায়েদ।
ফাতিমা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বধা দিয়ে বলল, তোমরা ঝগড়াটা বাড়িতে গিয়ে করো। এখন কাজের কথায় এস।
তোমরা এসে ভালই হয়েছে, এত বড় বাড়ি সার্চ করতে হবে, তোমাদের সাহায্য দরকার। চলো ভেতরে। বলে আহমদ মুসা চলতে শুরু করল।
যায়েদ ও ফাতিমা চলল তার পেছনে পেছনে।
সিঁড়ি রুমে ঢুকে আহমদ মুসা বলল, ‘চলো যাই আগে আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে। ওখানে ডজন খানেক মানুষ মরে পড়ে আছে। ওদের সার্চ করা থেকেই কাজ শুরু করি।’
আহমদ মুসা সুইচ অন করে সিঁড়ি মুখ উন্মুক্ত করে নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে। যায়েদ ও ফাতিমা তার পেছনে পেছনে চলল।
তারা পৌছল সেই রক্ত প্লাবিত কক্ষ।
ঘরে রক্তের বন্যা ও লাশের স্তুপ দেখে আঁৎকে উঠল ফাতিমা।
বলল, এত রক্ত এত লাশ।
‘ফাতিমা, এই কক্ষ আমার লাশ পড়ে থাকার কথা ছিল, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় পড়ে আছে তাদের লাশ। আমি এখানে আসব, আগেই ওরা আঁচ করতে পেরেছিল। তার ফলে আমি এসেই ওদের ফাঁদে পড়ে যাই এবং বন্দী হই। হাত পায়ে বেড়ি লাগিয়ে এ ঘরেই ওরা আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। আজ রাতেই আমাকে হত্যা করার কথা। সে উদ্দেশ্যেই-অল্প ক’মিনিট আগে ওরা আমার ঘরে ঢুকেছিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। মারতে এসে সবাই ওরা মরেছে শুধু পালাতে পেরেছে ওদের শীর্ষনেতা লোকটি।’ বলে থামল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেরই বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা থামলেও সংগে সংগে কথা বলল না ওরা।
একটু পর যায়েদ বলে উঠল, ‘একজন আহত, রক্তাক্ত লোককে আমরা গাড়ি করে পালাতে দেখলাম। সেই তাহলে নেতা?’
যায়েদ থামতেই ফাতিমা বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে অভিনন্দন ভাইয়া।’ মাত্র দুই দিনে চারটি অভূতপূর্ব বিজয়। আগের অবস্থায় বিস্মিত হতাম, কিন্তু এখান সেই অবস্থা নেই। এসব বিজয় আহমদ মুসার জন্য কিছুই নয়। শুধু বলব, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন।
আহমদ মুসা তখন মৃতদের সার্চ শুরু করে দিয়েছে। যায়েদ ও আহমদ মুসাকে সহযোগিতা করতে লাগল। কিন্তু তাদের কাছে কিছুই পাওয়া গেল না।
আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ওদের পকেটে কোন তথ্য-প্রমাণ না পেলে ও একটা বড় জিনিস পাওয়া গেছে। সেদিন হোটেলে মৃত দু’জনের সার্টের কলারে যে ইনসিগনিয়া পাওয়া গিয়েছিল, এদেরও সার্টের কলারে সেই ইনসিগনিয়াই রয়েছে। তারা যে একই দলের লোক পুলিশ এটা সহজেই বুঝতে পারবে।এটা স্পুটনিক কেসের জন্য ভালই হবে।
‘কিন্তু এই ঘটনায় পুলিশ কি আপনাকে সন্দেহ করবে?’ বলল ফাতিমা।
‘পুলিশ বুঝবে কিনা জানি না, কিন্তু পুলিশকে বুঝানো হবে। আজর ওয়াইজম্যান বেঁচে গেছে। সেই পুলিশের বিশেষ কাউকে জানাতে পারে এবং আমার পিছনে পুলিশকে লেলিয়ে দেয়ার কাজ জোরদার করতে পারে। তবে আইনগতভাবে পুলিশের চিন্তা আজর ওয়াইজম্যানদের বিরুদ্ধেই যাবে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল। বলল, ‘এস উপরে সব ফেলার সার্চ করতে হবে, নিশ্চয় কিছু পাওয়া যাবে।’
ফাতিমা ও যায়েদ আহমদ মুসার পিছে পিছে চলল।
নিচের তলায় তারা কিছুই পেল না। দেখে তাদের মনে হলো, নিচের তলাটা এক সময় ষ্টোর ও চাকর বাকরদের বাসস্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। অবশ্য কয়েকটিতে কিছুক্ষন আগেও লোক ছিলো বলে তাদের মনে হলো।
দু’তলাটা সুসজ্জিত। দু’তলার ঘরগুলো প্রায় সবগুলই চেয়ার- টেবিল-সোফায় সাজানো অফিস ও সিটিং কক্ষ। তবে কাগজপত্র নেই কোন টেবিলে। আফিসগুলো পরিত্যক্ত মনে হলো তাদের। টেবিলের ড্রয়ার, আলমারি হাতড়িয়ে কিছু কাগজপত্র ও কয়েকটা টেলিফোন ইনডেক্স যা পেল তা সবই ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের এবং পুরানা।
তিন তলার অধিকাংশ কক্ষই ফাঁকা। দক্ষিন দিকে পেল চারটা বেড রুম একই সারিতে। দেখে মনে হলো, এ বেড রুমগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। চারটি বেড রুমের পাশে একটা কম্পিউটার কক্ষ খুঁজে পেয়ে গেল। ঘরটি একদম তাজা। কিছুক্ষন আগেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হলো তাদের। কয়েকটি বাটনে ক্লিক করে আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো যে, কম্পিউটার আজও ব্যবহৃত হয়েছে।
ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা ফাতিমা ও যায়েদের দিকে। বলল, যায়েদ, ফাতিমা এবার তোমাদের বিদ্যার পরীক্ষা হবে। দু’টা কম্পিউটার টার্মিনালের সব ফাইল, সব কিছু তোমাদের খুঁটে খুঁটে সার্চ করতে হবে। আমি ততক্ষণে অন্য কক্ষগুলো দেখে আসি।’
বলে আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরুতে যাচ্ছিল। যায়েদ পেছন থেকে বলে উঠল, কম্পিউটারের সিক্রেট ফাইলগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেশি। নিশ্চয় ওগুলোর কোড কোথাও রেখে যায় নি। কোন ফাইলে বা কোন প্রোগ্রামে কোড বা কোডগুলোকে ক্যামোফ্লেজ করে রেখে গেলেও তা এত তাড়াতাড়ি বের করা অসম্ভব হতে পারে। ওদের কোড কি হতে পারে, এ ব্যাপারে আপনি কিছু অনুমান করেন কি না।
থমকে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসা। তার চেখে মুখে নেমে এল ভাবনার ছাপ। মুখ নিচু হলো তার। চোখ দু’টিও বন্ধ হয়ে গেল মুহুর্তের জন্য। বুঝা গেল গোটা ভাবনাকে সে কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করছে।
একটু পর চোখ খুলল আহমদ মুসা। মুখ তুলল সে।
যায়েদর মুখে দুই চোখ নিবদ্ধ করে বলল আহমদ মুসা, ‘অত্যন্ত কঠিন, মানে অসম্ভব একটা প্রশ্ন করেছে যায়েদ। তবে আমি যদি ওদের কেউ হতাম, তাহলে যে কোডগুলো আমি ব্যবহার করতাম, সেটা তোমাকে বলতে পারি।’
বলে আহমদ মুসা মুহূর্তকাল চিন্তা করে বলল, ‘তোমাকে অনেকগুলো অপশন নিয়ে ট্রাই করতে হবে। তার প্রথমটি হলো, ‘Harzel’ অথবা ‘H’, দ্বিতীয় ‘Azr Wiseman’ অথবা AW, তৃতীয় ‘World Freedom Army’ অথবা ‘WFA, চতুর্থ ‘HAWWFA’, পঞ্চম ‘HAWFA’ এবং ষষ্ঠ ‘New Gulag’ অথবা ‘NG’, হলো সর্বশেষ।’
আহমদ মুসা থামতেই বিস্মিত কন্ঠে ফাতিমা বলল, ‘World Freedom Army’(WFA) থেকে যে কোড নিয়েছেন তার যুক্তি
বুঝলাম।ওটা ওদের সংগঠনের নাম। সংগঠনের নামে কোড হতে পারে। কিন্তু অন্য কোডগুলোর যুক্তি বুঝছি না। ওগুলো কি আপনার নিছক কল্পনা?
‘কোনটাই কল্পনা নয় ফাতিমা। ইহুদীরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রিয়। Hazrel (H) ইহুদীবাদের জনক। Azr Wiseman (AW) এর Wiseman একজন বৃটিশ ইহুদী বিজ্ঞানী, তিনি বলা যায় ইসরাইল রাষ্ট্রের জনক। আর ‘Azr’ হলো ‘World Freedom Army’ (WFA) আন্দোলনের জনক। ‘HAWWFA’ and ‘HAWFA’ উপরোক্ত তিনটি নামের শব্দগুলোর আদ্যাক্ষরের সমাহার। সব শেষ সাবেক সোভিয়েতের ‘New Gulag’ সংস্কৃতির প্রতি ইহুদীদের আকর্ষণ খুব বেশি। সর্ব কনিষ্ঠ হিসাবে সাবেক সোভিয়েতের ‘নির্মূলকরণ’ সংস্কৃতি তারা অনুসরণ করছে। সুতরাং তাদের জন্য ‘New Gulag’ সুন্দর কোড ওয়ার্ড হতে পারে। বলল, আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। কিন্তু একটা কথা। ইহুদীরা ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রিয় হলে তো’ Temple’ ‘Solomon’ ‘Sabat’ ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী শব্দও তো তাদের কোড ওয়ার্ড হতে পারে। কিন্তু এগুলোকে তো আপনি বাদ দিয়েছেন।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ইসরাইল, ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ ‘ইরগুনজাইলিউমি’ ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রিডোম আর্মি’ প্রভৃতি ধর্মবাদী নয়, ইহুদীবাদী, আধিপত্যবাদী ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি। এ কারণে ওদের ধর্মবাদী ঐতিহ্যের চেয়ে ইহুদীবাদী ঐতিহ্যের প্রতিই নজর দিতে হবে।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’
হাসি মুখে এক সাথে বলে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ। পরে যায়েদ আবার বলল, ‘আল্লাহ আপনার চিন্তাকে কবুল করুন এবং আমাদের কামিয়াব করুন।’
বলে যায়েদ কম্পিউটারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ফাতিমাও।
আহমদ মুসাও আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে হাটা শুরু করেছে।
আধা ঘন্টা পরে আহমদ মুসা ফিরে এলো হতাশ হয়ে। তিনতলার অবশিষ্ট ঘরগুলো সার্চ করে কিছুই পাওয়া যায়নি।
আহমদ মুসা কম্পিউটার রুমে ঢুকতেই ফাতিমা চাপা চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ইউরেকা, ইউরেকা। আমরা যা খুঁজছিলাম তা বোধ হয় পেয়ে গেছি ভাইয়া। সব আমরা বুঝছি না, আপনি বুঝবেন। আসুন।
আহমদ মুসা গিয়ে যায়েদের পাশে বসল।
কথা শেষ করেই ফাতিমা আবার বলে উঠল, আপনাকে আরও অভিনন্দন ভাইয়া। আপনার অনুমান সত্য। আপনার দেয়া কোড দিয়ে দুই কম্পিউটারের সিক্রেট ফাইলগুলো খোলা গেছে।’
‘কোন দু’টি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘New Gulag এবং Harzel’ উত্তর দিলো ফাতিমা।
আহমদ মুসা আর কোন কথা না বলে মনোযোগ দিল কম্পিউটারের স্ক্রীণের দিকে।
‘ভাইয়া মনে হয় আমরা সাংঘাতিক জিনিস পেয়ে গেছি।’ বলল যায়েদ। তারপর যায়েদ ‘কিবোর্ডে’ একটা বোতাম চাপ দিয়ে স্ক্রীনের একটা জিনিসের দিকে ইংগিত করে বলল, ওটা কি চিনতে পারছেন ভাইয়া।
হ্যাঁ , ওটা ‘স্পুটনিক।’ রাশিয়ার প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ স্পুটনিকের নিচের হেডিংটা পড়ুন। বলল, যায়েদ।
‘এর বিপজ্জনক পরিকল্পরা’-পড়ল শিরোনামটি আহমদ মুসা।
স্ক্রীনের শিরনাম দেয়া পাতাটি যায়েদ ধীরে ধীরে উপরে তুলল। বলল, ‘ভাইয়া, এবার স্পুটনিকের বিপজ্জনক পরিকল্পনাটা, পড়ুন।
পড়তে লাগল আহমদ মুসা। পাতাটি ধীরে ধীরে উপরে উঠছে আর পড়ছে তা আহমদ মুসা।
পড়ার এক পর্যায় এসে আহমদ মুসা আনন্দে যায়েদের পিঠ চাপড়ে চিৎকার করে উঠল, ‘যায়েদ, এ তো আমাদের স্পুটনিকের পরিকল্পনা!
নিউইয়র্কের ‘লিবার্টি’ ও ডেমোক্রাসি’ টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য উন্মোচনে স্পুটনিক তদন্তের যে পরিকল্পনা করেছিল এবং এর যে উদ্দেশ ছিল, এ সবইতো এখানে বলা হয়েছে ! আলহামদুলিল্লাহ। থামল আহমদ মুসা।
কম্পিউটার স্ক্রীনে পাতাটি থেমে গিয়েছিল। আবার তা উপরে উঠতে লাগল। সামনে এসে দাঁড়াল পাতার দ্বিতীয় শিরনাম। যায়েদ বলল, ‘ভাইয়া পড়েন শিরোনামটা।’
‘ষ্টার ওয়ারঃ স্পুটনিককে গুলি করে নামানো’ পড়ল শিরোনামটি আহমদ মুসা। বলল, ‘তার মানে এবার স্পুটনিক ধ্বংসের পরিকল্পনা। আগাও যায়েদ।’
কম্পিউটার স্ক্রীনে পাতা উপরে উঠতে লাগল। উম্মুক্ত হতে লাগল পাতার লেখাগুলো। বলল যায়েদ, ‘ধীরে ধীরে পড়তে থাকুন ভাইয়া’ পড়তে লাগল আহমদ মুসা। তার পড়া যতই এগুলো, তার চোখে-মুখে আনন্দ-বিস্ময়ের খেলা ততই বাড়তে লাগল।
এক সময় পাতাটা কম্পিাউটার স্ক্রীনে স্থির হয়ে গেল। তার মানে দ্বিতীয় শিরোনামের বক্তব্য শেষ।
যায়েদ বলল, ‘কি বুঝলেন ভাইয়া?’
আহমদ মুসা ভাবছিল। তার ভাবনায় ছেদ নামল যায়েদের কথায়।
তাকাল সে যায়েদের দিকে। বলল, একটু ক্যামোফ্লেজ করেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না। ওদের ‘ষ্টার ওয়ার’ টা হলো নিউইয়র্কের টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য অনুসন্ধানে স্পুটনিকের পরিকল্পনা। ‘ষ্টার ওয়ার’ বর্জন মানে স্পুটনিকের তদন্ত বর্জন করার জন্য তারা স্পুটনিকের পিসফুল ডেথ ঘোষনা করেছে। ষড়যন্ত্রের এই প্রকল্পে আরও দেখা যাচ্ছে ওদের কাছে স্পুটনিকের চেয়ে বড় হলো স্পুটনিকের সাত নির্মাতা। কারণ ‘স্পুটনিক ওয়ান’ হারালে ‘স্পুটনিক টু’ তৈরী করতে পারে। তাই স্পুটনিকের জন্য যে দন্ড সেই দন্ড সাত নির্মাতার জন্যও। তবে তার আগে সাত নির্মাতার এক্সরে প্রয়োজন ‘ষ্টারওয়ার’ অর্থাৎ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য সন্ধানে তারা কতটুকু এগিয়েছে, কাদেরকে আরও তারা জানিয়েছে তা বের করার জন্য।’ থামল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া, আমরা এটাই বুঝেছি। তবে স্পুটনিকের ‘পিসফুল ডেথ’ ব্যাপারটা বুঝিনি।’ বলে উঠল যায়েদ ও ফাতিমা প্রায় এক সংগেই।
‘পিসফুল ডেথ’ মানে উত্তাপ-উত্তেজনাহীন নিরব মৃত্যু। স্পুটনিককে এভাবেই ধ্বংস করা হয়েছে। স্পুটনিকের সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বিল্ডিং-এর গায়ে কোন আঁচড় লাগেনি, আসবাবপত্রও সব ঠিক আছে। শুধু নেই ফাইল কাগজ-পত্র, ফিল্ম এবং কম্পিউটারের সফটওয়ার ও ডিস্কগুলো। এগুলো নেই, কিন্তু কি হয়েছে এগুলোর সামান্য নির্দশনও কোথাও নেই। মনে হতে পারে, স্পুটনিকের সাত গোয়েন্দা অফিস ছেড়ে দিয়ে ফাইল-পত্র নিয়ে কোথাও উধাও হয়েছে। এটাকে বলা হয়েছে স্পুটনিকের পিসফুল ডেথ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অদ্ভুত এ কৌশল ভাইয়া। ফারাসী গেয়েন্দারা যদি স্পুটনিকের অফিসের কেমিকেল টেষ্ট না করত, তাহলে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তার কিছুই জানা যেত না, বলল ফাতিমা।
ফাতিমা থামতেই যায়েদ বলে উঠল, আরও মজার জিনিস ভাইয়া, আমরা যার কিছুই বুঝতে পারিনে।’
কথা বলতে বলতেই যায়েদ কস্পিউটারের কীবোর্ডে তার আঙুল চালনা শুরু করেছে। আহমদ মুসা তাকিয়ে আছে কম্পিউটারের স্ক্রীনের দিকে। বলল, মজার জিনিসটা কি যায়েদ?
‘একটা মানচিত্র ভাইয়া।’ বলেই যায়েদ কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে আঙুলি সংকেত করল, দেখুন ভাইয়া তৃতীয় একটা শিরোনাম।’
আহমদ মুসা আবার চোখ ফিরাল কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে। তাকাতেই চোখে পড়ল ‘নিউগুলাগ’ শিরোনামটা। ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
শিরোনামটা উপরে উঠে এল।
তার সাথে সাথে স্ক্রীনে ভেসে উঠল একটা মানচিত্র।
মানচিত্রটা যে একটা দ্বীপের, তা পরিস্কার বুঝা যায় তার চারদিকের রং দেখে। মানচিত্রেও বিভিন্ন বর্নের ল্যান্ড স্কেপ। মানচিত্রের নীচে লেখা ‘নিউ গুলাগ সাও তোরাহ।’
কম্পিউটার স্ক্রীনের উপর ঝুঁকে পড়েছে আহমদ মুসা।
যায়েদ, ফাতিমাও নিরব।
কিছুক্ষন পর মাথা সোজা করে বসল আহমদ মুসা। চোখ বন্ধ তার।
ভাবছে আহমদ মুসা।
মূহূর্ত কয়েকপর চোখ খুলল আহমদ মুসা। বলল, ‘এটা মজার জিনিস নয় যায়েদ। এটা ভয়ংকর একটা স্থানের মানচিত্র। মানচিত্রের নিচে ফুট নেট আকারে তারকা চিহ্নিত দু’টো প্যারাগ্রাফ পড়েছ যায়েদ?’
‘জ্বি, ভাইয়া।’ যায়েদ বলল।
‘দেখ এক নাম্বার প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, ধর্মহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল বলে, ‘ওল্ড গুলাগ’ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ‘নিউ গুলাগে’র ভিত্তি হবে ঈশ্বরের মনোনীত ধর্ম এবং নিউ গুলাগ পরিচালনা করবে ঈশ্বরের সহস্র সহস্র বছরের পরীক্ষিত ও মনোনীত লোকেরা। দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে আছে, নিউ গুলাগ ঈশ্বরের বিশ্ব গড়ার একটা কারখানা এবং ল্যাবরেটরী। পৃথিবীর পথভ্রষ্ট মিলিট্যান্ট-মৌলবাদীদের এখানে এনে এক্সরে করা হবে এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা চলবে, গোটা পৃথিবীতে যাতে দ্রুত ইসরাইলের ঈশ্বরের রাজত্ব কায়েম হয়।’
থামল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার বলল, কি বুঝলে যায়েদ, ফাতিমা।
‘বুঝলাম, ধর্মহীন কম্যুনিষ্টদের গুলাগ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু ইহুদীদের ধর্মের নিউ গুলাগ সফল হবে। কিন্তু ঝুঝতে পারছিনা এক্সে-রে এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী চিকিৎসার ব্যাপারটা।’ বলল, ফাতিমা।
‘ব্যাপারটা আমার কাছেও খুব স্পষ্ট নয়। তবে যতটুকু বুঝতে পেরেছি তাতে বিষয়টা এই রকম হতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিউ গুলাগে ধরে নিয়ে যাবে। সেখানে তাদের সব কথা বের করে নেয়া হবে বা জেনে নেয়া হবে যেমন এক্সরে’র মাধ্যমে করা হয়। এর ফলাফলের ভিত্তিতেই অতঃপর গোটা দুনিয়ায় তারা অপারেশন পরিচালনা করবে।’
আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আমারও তাই মনে হয়।’ বলল যায়েদ।
‘সবটাই ভয়ংকর ব্যাপার ভাইয়া। ঐ এক্সরের পর নিশ্চয়ই ওখানে
কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। আর বিশ্বব্যাপী ওদের অপারেশনটা ওল্ড গুলাগের ষ্ট্যালিনের মত।’ বলল ফাতিমা। তার চোখে-মুখে আতংক।
‘ঠিক বলেছ ফাতিমা। তবে ইহুদীবদীরা এটা করবে ধর্ম, মানবতা, মানবাধিকার ও সন্ত্রাস দমনের পোশাক পরে।’ বলে একটা দম নিয়েই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের স্পুটনিকের সাত গোয়েন্দাকে নিউ গুলাগ সাও তোরাহ দ্বীপেই রাখা হয়েছে।’
চমকে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেই। তাদের দু’জনের চোখে-মুখেই নেমে এল অন্ধকার। দু’জনে এক সাথে বলে উঠল, ‘কোথায় এই দ্বীপ?’ কান্নার মত ভারী শোনাল তাদের কন্ঠস্বর।
আহমদ মুসা গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। বলল, এটাই এখন প্রধান প্রশ্ন।’
সংগে সংগেই আবার সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘যায়েদ সবগুলোর প্রিন্ট নাও। আর চল যাবার আগে পুলিশকে টেলিফোনে সব কিছু বলে যাই।’
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘যায়েদ তুমি প্রিন্টগুলো তাড়াতাড়ি সেরে ফেল। আমি এখনি আসছি।’
আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল পাঁচ মিনিট পরে দ্রুত। বলল, ‘যায়েদ প্রিন্ট শেষ?’
‘জি ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘তাহলে তোমরা দু’জন দ্রুত আমার পেছনে এস।’ বলেই আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরুবার জন্য হাঁটা শুরু করল।
ফাতিমা উঠে দাঁড়িয়েছিল সংগে সংগেই। যায়েদও কাজ গুছিয়ে নিয়ে আহমদ মুসার পেছনে হাঁটতে লাগল।
তারা দ্রুত নেমে এল নিচের তলায়।
এসে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের গেট থেকে যে করিডোরটা ভেতরে এগিয়ে এসেছে তার মুখে দেয়ালের আড়ালে ওঁৎ পেতে দাঁড়াল তারা। আহমদ মুসা তার হাতে রিভলবার তুলে নিয়েছে।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেরই চোখে-মুখে উদ্বেগ। বলল, যায়েদ ‘কি ব্যাপার ভাইয়া?’ ফিস ফিস কন্ঠ যায়েদের।
‘একটা প্রাইভেট কারকে আমি বাইরের গেটে দাঁড়াতে দেখেছি। দেখেছি দু’জন লোক নামতে। এরা নিশ্চয় WFA-এর লোক। ওদের রিল্যাক্স মুড দেখে মনে হয়েছে ওরা এখানকার ভেতরের খবর জানে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আমরা এগুচ্ছিনা কেন?’ ফাতিমা বলল।
‘সামনে এগিয়ে ওদের মুখোমুখি হয়ে আমি আর লড়াই বাধাতে চাই না। আমি ওদের ধরতে চাই। এ পর্যন্ত ওদের কাউকে আমরা জীবন্ত হাতে পাইনি। ওদের কাউকে জীবন্ত হাতে পেলে ‘নিউ গুলাগ সাও তোরাহ’ দ্বীপ কোথায় জানার চেষ্টা করা যেত।
ফাতিমা ও যায়েদের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। ফাতিমা বলে উঠল, ‘আপনার এ চিন্তা ঠিক ভাইয়া।’
‘কিন্তু ওরা তো এতক্ষনে ভেতরে প্রবেশ করার কথা। আসছেনা কেন? ঠিক আছে, তোমরা এখানে দাঁড়াও। আমিএকটু ওদিকে…..।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলনা। পেছন থেকে একটা কর্কশ কন্ঠ ধ্বনিত হলো, ‘ও দিকে নয়, এ দিকে তোমার যম আহম …….। তারও কথা শেষ হতে পারল না।
পেছনের দিকে কর্কশ কন্ঠ ধ্বনিত হবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে নিজেকে ছুড়ে দিল মেঝেতে এবং সেই সাথেই তার হাতের রিভলবার গর্জন করে উঠল পরপর কয়েকবার।
ওদিকে পেছন থেকে যে কন্ঠ গর্জন করে উঠছিল তারা ছিল দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতে উদ্যত রিভলবার। তাদের কন্ঠ থেমে যাবার সাথে সাথে তাদের রিভলবার ও গর্জন করে উঠেছিল।
আহমদ মুসা আগেই মেঝেয় ছিটকে পড়ার ফলে গুলি দু’টি তার উপর দিয়ে চলে যায়। তারা দ্বিতীয় গুলি করার আগেই আহমদ মুসার গুলি তাদের বিদ্ধ করল। বুকে গুলি খেল তারা দু’জনেই। তাদের রক্তাক্ত দেহ লুটোপুটি খাচ্ছিল মেঝেতে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ভয় ও আকস্মিকতায় কাঠ হয়ে ফাতিমা ও যায়েদ পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়েছিল। বাকরোধ হয়ে গেছে যেন তাদের। মৃত্যুকে যেন তারা একদম চোখের উপর নাচতে দেখল। জীবন ও মৃত্যু এত কাছাকাছি!
আহমদ মুসা যদি ঠিক সময়ে মেঝতে নিজেকে ছুঁড়ে দিতে না পারতো, তাহলে ওদের প্রথম গুলিই তার বক্ষ ভেদ করত। তারপর আহমদ মুসা যদি তার গুলিগুলো করতে কয়েক মুহুর্তও বিলম্ব করতো, তাহলে ওদের দ্বিতীয় গুলীর শিকার হতো আহমদ মুসা। তারপর ওদের তৃতীয় গুলি নিশ্চয় ছুটে আসতো যায়েদ ও ফাতিমার লক্ষ্যে। তাদের পকেটে একটি করে রিভলবার আছে, কিন্তু বের করার কথা মনে হয় নি, কখন বের করবে তাও বুঝতে পারেনি। আহমদ মুসা এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন!এত ক্ষিপ্র তিনি !যা ঘটে গেল তা অবিশ্বাস্য এক ঘটনা বলে মনে হচ্ছে তাদের কাছে। তাদের স্থির চোখের শূন্য দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এস যায়েদ এদের একটু চেক করি।’
বলে আহমদ মুসা ওদের দিকে এগুলো।
আহমদ মুসার কথা শুনল যায়েদ। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া হলোনা তার মধ্যে। যেমন নিশ্চল দাঁড়িয়েছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে রইল।
আহমদ মুসা প্রথমেই ওদের জামার কলার ব্যান্ড পরীক্ষা করল। তারপর তাদের পকেটগুলো সার্চ করল। দু’জনের পকেটে দু’টি মানিব্যাগ ছাড়া আর কিছুই পেলনা। মানিব্যাগে কোন কাগজপত্র পেলনা। এমনকি কোন নেমকার্ডও নয়। শুধু কিছু ইউরো মুদ্রা রয়েছে মানিব্যাগে। মানিব্যাগ দু’টি আবার ওদের পকেটে রেখে দিয়ে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘যায়েদ ফাতিমা এ দু’জনের কলার ব্যান্ডে ঐ একই ইনসিগনিয়া রয়েছে।’
কথা শেষ করে একটু থেমেই আবার বলল, চলো আমরা যাই।
আশে-পাশের কোন টেলিফোন বুথ থেকে পুলিশকে এখনি খবরটা জানাতে হবে। যাতে WFA -এর কেউ এখানে আসার আগেই পুলিশ আসতে পারে, সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
আহমদ মুসা ‘এসো’ বলে হাঁটতে শুরু করল।
নিশ্চল মূর্তির আবস্থা থেকে ওরা নড়ে উঠল এবং আহমদ মুসার সাথে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে ফাতিমা বলল, ‘এ ধরনের সংঘাতে জীবন-মৃত্যু যে কত কাছাকাছি, তা আজ প্রথম দেখলাম।
আপনার খারাপ লাগেনা ভাইয়া? একটুও চিন্তা হয়না আপনার? আমার বুক এখনোও কাঁপছে। যদি মেঝেয় ছিটকে পড়েগুলী করতে একমুহুর্তও দেরী করতেন তাহলেই তো আপনি আর থাকতেন না। আমি ভাবতেই পারছিনা এ সব কথা।’ কন্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠছিল ফাতিমার।
‘জীবন-মৃত্যু কোন বুলেটের বা কোন অস্ত্রের হাতে নয়। এর ফায়সালা আসে আল্লাহর কাছ থেকে এবং তা আসে যখন তা আসার কথা। সুতরাং এ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই।’ তারা গেটে পৌছে গিয়েছিল।
‘ভাইয়া সামনেই রাস্তার পূর্ব পাশে টেলিফোন আছে। আমি আসার আগে দেখেছি।’ বলল, যায়েদ গেটে পৌছেই।
‘যায়েদ চল, টেলিফোনটা করবে তুমি। টেলিফোন করে আমরা পাশেই কোথাও অপেক্ষা করব। এ বাড়িটা পাহাড়া দিতে হবে, যাতে পুলিশ আসার আগে ওরা কেউ আসতে না পারে।’
আহমদ মুসা ‘এস’ বলে আবার হাঁটা শুরু করল।
‘টেলিফোনে কি বলব ভাইয়া?’ বলল যায়েদ।
‘বলবে, ‘অমুক নাম্বার বাড়িতে গোলাগুলির আওয়াজ শুনেছি। বড় কিছু ঘটছে সেখানে। ব্যস আর কিছু নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
টেলিফোন করে আহমদ মুসারা পাশেই অপেক্ষা করল। দশ মিনিটও পার হলো না। পুলিশের দু’টি গাড়ি ছুটে এল তীব্রবেগে এবং তাদের অতিক্রম করে চলে গেল বাড়িটার দিকে।
এবার যায়েদ গাড়ি ষ্টার্ট দিল যাবার জন্যে। গভীর রাতের নিরবতা ভেঙে ছুটে চলছে গাড়ি। যায়েদের পাশে আহমদ মুসা।
পেছনের সিটে ফাতিমা।
চোখ বন্ধ করে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে আহমদ মুসা।
তিন জনেই নিরব।
নিরবতা ভাঙল যায়েদ। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের স্বরণীয় রাত চির স্বরণীয়ভাবে কাটল ভাইয়া। আমরা খুব খুশি।’
‘তোমাদের অভিনন্দন। কিন্তু মনে রেখ, তোমাদের দু’জনের নতুন জীবন যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এবং সে যুদ্ধটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়েকে প্রতিষ্ঠার জন্য। সুতরাং এটা আমাদের সৌভাগ্য।’ যায়েদ বলল।
‘ধন্যবাদ যায়েদ, তোমাদের মত করে সব মুসলমান যে দিন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের সংগ্রাম কে তাদের জন্য সৌভাগ্যের মনে করবে, সেদিন গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের জীবন থেকে, অন্ধকারের অমানিশা কেটে যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সেদিন কত দূরে ভাইয়া? ফাতিমা বলল।
‘সেটা নির্ভর করছে তোমরা তরুন-তরুনীরা কত দ্রুত সামনে আগাতে পারছো তার ওপর।’ বলল আহমদ মুসা।
ফাতিমা কোন কথার উত্তর দিল না। তার নিরব দৃষ্টি প্রসারিত হলো সামনে।
যায়েদের দৃষ্টিও সামনে প্রসারিত।
আবার আহমদ মুসা তার চোখ বন্ধ করেছে। ভাবছে সে।
এক সময় যায়েদ মুখ তুলল আহমদ মুসার দিকে। বলল, কি ভাবছেন ভাইয়া?
চোখ খুলল আহমদ মুসা। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘ভাবছি ওদের নিউ গুলাগ ‘সাও তোরাহ’ দ্বীপের কথা। কেথায় এই ভয়ংকর দ্বীপটা? কিন্তু এই মুহুর্তে তার চেয়েও বেশি ভাবছি আজকের রাতের ঘটনাকে পুলিশ কতটা, কিভাবে ব্যাবহার করবে? তারা প্রেসকে এ চাঞ্চল্যকর বিষয়টা জানতে দিবে কিনা?
বলেই আহমদ মুসা হঠৎ সোজা হয়ে বসল। তার চেখে- মুখে চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। বলল দ্রুত কন্ঠে, যায়েদ ফাতিমা কোন সাংবাদিকের ঠিকানা তোমাদের কাছে আছে?
ফাতিমা, যায়েদ দু’জনেই সোজা হয়ে বসল। যায়েদ বলল, আমার কাছে কোন সাংবাদিকের টেলিফোন নাম্বার নেই। তবে আবদুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় সাংবাদিক বুমেদিন বিল্লাহর টেলিফোন নাম্বার থাকতে পারে। কাল ঐ সাংবাদিক ভাইয়ার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ছিলেন।’
‘বুমেদিন বিল্লাহ’ মানে লা-মন্ডের সাংবাদিক যিনি প্রথম নিউজটা করেছিলেন।’
‘হ্যাঁ ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, তাকেই আজ বেশি দরকার। কিন্তু তিনি কি স্ট্রাসবার্গে আছেন?
‘শুনেছিলাম আছেন। তিনি নাকি এই কেসটার ব্যাপারে আগ্রহী।’ যায়েদ বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে যায়েদ মোবাইলে তুমি তোমার ভাইয়ার বাসায় টেলিফোন কর। সাংবাদিক বুমেদীন বিল্লাহর টেলিফোন নাম্বার নাও।’ দ্রুত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
গাড়ির ষ্টিয়ারিং এ এক হাত রেখে অন্য হাতে মোবাইলে টেলিফোন করল যায়েদ। প্রথমবার ও দ্বিতীয়বারের চেষ্টাতেও টেলিফোন কেউ ধরল না। তৃতীয় বারের চেষ্টায় টেলিফোন রিসিভ করল ওপার থেকে। খুশিতে মুখ উজ্জল হয়ে উঠল যায়েদের। বুমেদীন বিল্লাহর নাম্বার সে নিয়ে নিল।
টেলিফোন অফ করে দিয়ে বলল যায়েদ, ‘আলহামদুলিল্লাহ, নাম্বারটা পেয়েছি ভাইয়া।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। এবার, মিঃ বুমেদীন বিল্লাহকে দেখ। পেলে তাকে বল, ‘শার্লেম্যান রোডের ৫নং বাড়িটা স্পুটনিক ধ্বংসকারী ও সাত গোয়েন্দাকে অপহরনকারীদের একটা ঘাঁটি। আজ রাতে ওখানে ওদের বার চৌদ্দজন লোক মারা গেছে। ওখানে ওদের ঐ অফিসে কয়েকটা কম্পিউটার রয়েছে। কম্পিউটারে স্পুটনিক ধ্বংস ও সাত গোয়েন্দাকে অপহরনের ব্যাপারে চাঞ্চলকর তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ব্যাস, এই টুকুই বললে হয়ে যাবে। এই মাত্র পুলিশ সেখানে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে যায়েদ মোবাইল তুলে নিল। টেলিফোন করল। প্রথম বারেই ওপার থেকে সাড়া পেয়ে গেল যায়েদ। আহমদ মুসা যেভাবে বলেছিল সেই ভাবেই সব কথা যায়েদ সাংবাদিক বুমেদিন বিল্লাহকে জানাল। তারপর ওপারের কথা সে শুনল। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল যায়েদের। ধন্যবাদ বলে সে মোবাইলটা অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ও ফাতিমা উদগ্রীব হয়ে শুনছিল যায়ে