৩৮. ধ্বংস টাওয়ার

চ্যাপ্টার

ভর্তি মদের গ্লাসটা গলায় উপুড় করে মুখ বিকৃত করে শেরিল শ্যারন বলল, ‘এই শালা নিশ্চয় আহমদ মুসা। মনে একটু ভয়-ভীতি নেই। কথা বলছে যেন এটা শ্বশুর বাড়ি। এরকম পাথরের মত নার্ভ তো আহমদ মুসা ছাড়া আর কারো নেই। শালাকে এইবার ফাইনাল ফাঁদে ফেলেছি। মৃত্যুর বাইরে তার মুক্তি নেই।’
থামল শেরিল শ্যারন।
মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেরিল শ্যারন বর্তমানে ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা ইরগুন জাই লিউমি ও ওয়াল্ড ফ্রিডম আর্মি (WFA) দুয়েরই প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে, ডেট্রয়েটে। চরম সাম্প্রদায়িক হিসাবে তার বদনাম ছিল মার্কিন সেনাবাহিনীতে। বৈষম্যমূলক কিছু কাজের অপরাধেই তার চাকুরী যায় সেনাবাহিনী থেকে। চাকুরী যাবার পরেই সে জেনারেল শ্যারনের গোয়েন্দা দলে যোগ দেয়। এখন সে আজর ওয়াইজম্যানের WFA এর সাথে কাজ করছে।
শেরিল শ্যারন থামতেই তার টেবিলের ওপাশে বসা বডি বিল্ডার গোছের জো বিশপ বলল, ‘তার ধরা পড়ার পেছনে বেশি কৃতিত্ব কিন্তু আমাদের নিউইয়র্ক অফিসের জেমস-এর। সেই তো খবর দিয়েছে বিদেশী চেহারার দুজন লোক আজ রাতেই ডেট্রয়েটে রওয়ানা দিয়েছে।’
জেমস হলো আয়াজ ইযাহুদের বাড়িতে হামলাকারীদের একজন। হামলাকারীদের মধ্যে সে একমাত্র পালাতে পেরেছিল। নিউইয়র্ক অফিসসহ সব জায়গায় সেই তাদের অভিযানের মর্মান্তিক বিপর্যয়ের খবর পৌঁছায়। সে আয়াজ ইয়াহুদের বাড়ির পাশে শেষ পর্যন্ত ওঁৎপেতে ছিল। আহমদ মুসা ও কামাল সুলাইমান আয়াজ ইয়াহুদের বাড়ি থেকে বের হলে সে তাদের পেছনে পেছনে যায়। আহমদ মুসারা ডেট্রয়েটে যাবার জন্যে যে প্লেনের টিকিট কেটেছে সেটাও সে জেনে নেয় এবং জানিয়ে দেয় ডেট্রয়েট অফিসকে।
‘জেমস নিজের থেকে যে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে তার তুলনা হয় না। তাকেই নিউইয়র্কের চীফ বানিয়ে দেবার সুপারিশ আমি করব।’ বলল শেরিল শ্যারন।
‘কিন্তু স্যার, এখনও তো আমাদের চীফ আজর ওয়াইজম্যানের কাছ থেকে কোন মেসেজ এল না। এই কথিত আহমদ মুসাদের আমরা কি করব, কোথায় রাখব, সেটা তো আমাদের জানা দরকার।’ জো বিশপ বলল।
‘এখনও হয়তো উনি আকাশে আছেন। ফ্লোরিডা পৌঁছার পরেই আমাদের বার্তা পাবেন। তারপরই আসবে তার জবাব।
জো বিশপ হাত ঘড়িটা দেখল। বলল, ‘স্যার বিমানটা যদি ঠিক সময়ে ফ্লাই করে থাকে, তাহলে সিডিউল মোতাবেক এখন থেকে ২০ মিনিট আগে তিনি ফ্লোরিডায় পৌঁছে গেছেন।’
জো বিশপের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই শেরিল শ্যারনের মোবাইল সেটটা বেজে উঠল।
সেটটা উঠাল শেরিল শ্যারন।
‘হ্যালো। গুড মর্নি। আমি এস. শ্যারন বলছি।’ বলল শেরিল শ্যারন।
‘গুডমনিং, আমি আজর ওয়াজম্যান। তোমার জরুরি মেসেজটা কি, তাড়াতাড়ি বল।
শেরিল শ্যারন আহমদ মুসাদের পাকড়াও করার ঘটনাটা জানিয়ে বলল, ‘আমাদের মনে হচ্ছে স্যার সে আহমদ মুসাই হবে।’
গলা ছড়িয়ে সোৎসাহে বলে উঠল আজর ওয়াইজম্যান, তার চেহারা ও শরীরের বর্ণনা দাও তো।
বর্ণনা দিল শেরিল শ্যারন।
বর্ণনা শুনে আজর ওয়াইজম্যান বলে উঠল, ‘মিলে যাচ্ছে শ্যারন। তুমি ঠিকই ধরেছ। হাইম হাইকেলকে উদ্ধারে আহমদ মুসা আসতেই পারে।’
তারপর একটু নিরব থেকেই উচ্ছাসিত গলায় আজর ওয়াইজম্যান বলল, ‘তুমি ইতিহাস সৃষ্টি করেছ শ্যারন। তুমি শিয়াল ধরতে গিয়ে সিংহ ধরার মত কাজ করেছ। তোমাকে ধন্যবাদ। কোথায় রেখেছ তাকে?’
‘ভূগর্ভস্থ কয়েদ খানায়। পিছ মোড়া করে হাত পা বাঁধা হয়েছে। তার উপর ক্লোরাফরম করে সংজ্ঞাহীন করে রাখা হয়েছে। ঘরের দরজায় দুজন পাহারাদার রাখা হয়েছে।’
‘গুড। কিন্তু আহমদ মুসার জন্যে এটুকু যথেষ্ট নয়। তুমি নিজেই ঘরটার উপর চোখ রাখ। মনে রেখ অস্যধ্য সাধন করার ক্ষমতা আহমদ মুসার আছে। আমি জরুরি কাজ সেরে আজ রাতেই রওয়ানা হব। ততক্ষণে তাকে যে কোন মূল্যে ধরে রাখ। মনে রেখ তাকে ধরে রাখা হাইম হাইকেলের চেয়েও লক্ষগুনে জরুরি। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা দুনিয়ায় আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে তাকে নিশ্চিহ্ন করার উপর। সে কাজ আমি করব, আসছি। গুড বাই।’
শেরিল শ্যারন টেলিফোন রেখে বলল, ‘দেখেছ বিশপ, বসের গলা কাঁপছে। যার সম্পর্কে কথা বলতে এতদূর থেকে বসের গলা কাঁপছে, তাকে আমরা পাকা ফল ছিঁড়ে নেয়ার মত কেমন সহজে ধরে ফেললাম।’
‘যতটা ভয়ংকর শুনেছি, তেমন মনে হয়নি স্যার। ভয়ংকররা স্বভাবগতভাবেই গোঁয়ার হয়, কিন্তু একে দেখলাম নিরেট ভদ্রসন্তান।’
‘ভদ্র ভয়ংকররাই বেশি ভয়ংকর হয়। আহমদ মুসা সে রকমই একজন।’ বলেই হাত ঘড়ির দিকে তাকাল শেরিল শ্যারন। বলল দ্রুত কণ্ঠে জো বিশপকে, ‘এখন হাইম হাইকেল জেগে উঠার কথা। যাও বল, ওকে লাঞ্চ খাইয়ে আবার ঘুমিয়ে দিতে হবে। ঘুমের ঔষধ আগের ডোজ অনুসারেই।
শুনেই জো বিশপ উঠতে যাচ্ছিল। এ সময় ইন্টারকম প্যানেলের ইমার্জেন্সী লাল বাতি জ্বলে উঠল। সেই সাথে বেজে উঠল টেবিল সাইরেন। তারপর শ্যারনের পি.এ-এর টেলিফোন, ‘স্যার কোথাও থেকে গুলীর আওয়াজ আসছে। সিকিউরিটি ব্রাঞ্চ থেকে ইমার্জেন্সি ঘোষনা করা হয়েছে।’
লাফ দিয়ে উঠল শেরিল শ্যারন।
শেরিল শ্যারন ও জো বিশপ দুজনেই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল।
লক্ষ্যবিহীনভাবে ছুটতে গিয়ে শেরিল শ্যারন বলল, ‘অসাধ্য সাধন যে করতে পারে, সেই আহমদ মুসার বন্দীখানার দিকে আগে চল।’

পরবর্তী বই
ধ্বংস টাওয়ারের নিচে