৩৮. ধ্বংস টাওয়ার

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

রাব্বানিক্যাল ইউনিভার্সিটি নিউইয়র্ক-এর অভ্যর্থনা কক্ষ। ক্লান্ত দেহটা সোফায় এলিয়ে বসে আছে আহমদ মুসা। ড. হাইম হাইকেল এই ইউনিভার্সিটির ‘ফেইথ স্টাডিজ’ বিভাগের প্রধান রাব্বি। ড. হাইম হাইকেলের সাথে দেখা করতে চায় আহমদ মুসা। এই খবর সে পাঠিয়েছে মিনিট পাঁচেক আগে। ড. হাইম হাইকেল আসবেন, অথবা ভেতরে তার ডাক আসবে, এরই অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
শান্ত, নিস্পৃহভাবে বসে থাকলেও বুকটা আহমদ মুসার আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে অনেকটাই অস্থির।
আহমদ মুসার এই নতুন আমেরিকান মিশনে রাব্বি ড. হাইম হাইকেলই তার প্রাইম টার্গেট, প্রধান অবলম্বন। নিউইয়ের্কের লিবার্টি টাওয়ার ও ডেমোক্রোসি টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য উদঘাটনে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে কামাল সুলাইমানদের স্পুটনিক যে সত্যের সন্ধান পায় তার প্রধান সাক্ষী এই ধর্মনেতা ইহুদী জগতের বিশিষ্ট রাব্বি ড.হাইম হাইকেল।
আজ থেকে বিশ বছর আগে নিউইয়ের্কের টুইনটাওয়ার, লিবার্টি টাওয়ার ও ডেমোক্রাসি টাওয়ার, ধ্বংস হয় বিস্ময়কর অভূতপূর্ব এক আক্রমণে। এর জন্যে দায়ী করা হয় একটি মুসলিম গ্রুপকে। সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় সব মুসলমানকেই। তারপর মুসলিম বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত পর্যন্ত ধ্বংস-বিপর্যয়ের ঝড় বয়ে যায়। মুসলমানদের অনেকেই একে তাদের অপরিণামদর্শী কিছু সদস্যের অপরাধ থেকে সৃষ্ট ভ্যগ্যলেখা হিসাবে মেনে নেয়। আবার অনেকেই একে গোপন ষড়যন্ত্রের পাতা ফাঁদে জড়িয়ে পড়া ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। দীর্ঘ বিশ বছর পর এই শেষোক্ত ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কামাল সুলাইমানদের গোয়ান্দা সংস্থা ‘স্পুটনিক’ এই ব্যাপারে সত্য উদঘাটনের জন্যে অনুসন্ধান শুরু করে। সন্ধান পায় তারা এক গোপন ষড়যন্ত্রের। অনেক দলিল-দস্তাবেজ তারা যোগাড় করে এর সমর্থনে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল ছিল ইহুদী সিনাগগের কনফেশন টেবিলে ‘সর্বশক্তিমান ও শেষ দিনের বিচারক’ ‘জিহোবা’র সামনে পেশ করা ‘কনফেশন’-এর একটি অডিও টেপ। এই কনফেশনে তিনি নিউইয়র্কের টাওয়ার ধ্বংসে তার অপরাধ অংশের কথা স্বীকার করেছিলেন। এই কনফেশন ঘটনাক্রমেই রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল এবং ঘটনাক্রমেই সে টেপের একটি কপি কামাল সুলাইমানরা পেয়ে যায়। কিন্তু টাওয়ার ধ্বংসে তাদের সামনে ইহুদীদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রমাণের জন্য এই কনেফেশন যথেষ্ট নয়। এজন্য যে তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন তা যোগাড়ে রাব্বি ড. হাইম হাইকেলের পক্ষেই সাহায্য করা সম্ভব। এই ষড়যন্ত্রের জগতে প্রবেশের পথে সেই একমাত্র প্রত্যক্ষ সোর্স। এ কারণেই আহমদ মুসা ছুটে এসেছে তার কাছে।
রাব্বি ড.হাইম হাইকেল লোকটি কেমন সে আহমদ মুসাকে কিভাবে গ্রহণ করবে, কনফেশনের টেপের কথা স্বীকার করতে রাজি হবে কিনা, ইত্যাদি ভাবনাপীড়িত দুরু দুরু মন নিয়ে অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার পরণে কালো হ্যাট, কালো লম্বা কোট। এটাই হাসিডিক ইহুদীদের পোশাক। রাব্বি ড. হাইম হাইকেলও হাসিডিক পন্থী ইহুদী। অবশ্যই ড. হাইম হাইকেল পৈতৃক সূত্রেই ছিলেন ‘হাসকলা’ পন্থী ইহুদী। হাসকলারা বাইরের জীবনে ধর্মের ভূমিকাকে তেমন একটা আমল দেয় না। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে জীবনকে ও জাতিকে সমৃদ্ধ করাকেই এরা প্রধান কর্তব্য মনে করে। অন্যদিকে হাসিডিকরা লেখাপড়া চর্চার চাইতে ‘দয়া’ ও ‘সানন্দ উপাসনাকে’ বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ড. হাইম হাইকেল টাওয়ার ধ্বংসের কিছুকাল পর এই হাসিডিক মত গ্রহণ করেন।
আহমদ মুসা একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ তার নাম ধরে সম্বোধনের শব্দে সে সম্বিত ফিরে পেল। মুখ তুলে দেখল, তার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশোর্ধ। পরণে রাব্বির পোশাক। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বলছিল সে, ‘আপনি মি. আইজ্যাক দানিয়েল?’
আহমদ মুসা ‘আইজ্যাক দানিয়েল’ নাম নিয়েই এসেছে এই ইহুদী বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. হাইম হাইকেলকে খোঁজ করার জন্যে। সে ফিলিস্তিন থেকে এই নামে পাসপোর্ট করে রেখেছিল। এবার এই পাসপোর্ট নিয়েই আহমদ মুসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে।
আহমদ মুসা লোকটির দিকে তাকিয়েই উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার। হ্যাঁ, আমি আইজ্যাক দানিয়েল।’
‘ওয়েলকাম।’ বলে হাত বাড়িয়ে লোকটি বলল, ‘আমি জ্যাকব, হাইকেলের সহকর্মী।’
আহমদ মুসা তার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘পরিচিত হয়ে খুশি হলাম স্যার।’
‘আমিও।’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। জ্যাকব বাধা দিয়ে বলল, ‘স্যরি, আসুন আমার সাথে।’
জ্যাকব চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসাও তার সাথে সাথে চলল।
পাশের একটি কক্ষে গিয়ে দুজনে বসল।
বসেই রাব্বি জ্যাকব বলল, ‘দয়া করে বলবেন কি রাব্বি ড. হাইকেলের সাথে আপনার কি সম্পর্ক? কেন দেখা করতে চান তার সাথে?’
‘তিনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধু। বাকি প্রশ্নের জবাব তিনিই তো চাইবেন।’ বলল আহমদ মুসা। তার শেষের বাক্যটা একটু শক্ত হয়েছিল।
রাব্বি জ্যাকবের চেহারায় পরিবর্তন দেখা গেল না। শান্ত কন্ঠে সে বলল, ‘রাব্বি ড. হাইকেল নেই। তার দেখা আপনি পাবেন না।’
‘কোথায় তিনি?’ বলল, আহমদ মুসা।
‘সেটাও আপনি জানবেন না। কারণ আমিও জানি না।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
ভ্রু কুঁচকে গেল আহমদ মুসার। বলল দ্রুতকন্ঠে, ‘আপনি জানবেন না কেন? অফিস তো নিশ্চয় জানে।’
‘অফিসও জানে না।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
‘এটা অসম্ভব। আমি অফিসকে জিজ্ঞাসা করতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সাক্ষাৎ প্রাথী হওয়ার স্লিপ তো অফিসেই পাঠিয়েছিলেন। অফিস আমাকে পাঠিয়েছে। ভিন্নভাবে অফিস আর কথা বলবে না।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
স্তম্ভিত হলো আহমদ মুসা। ড. হাইকেল এখানে এক উচ্চপদে চাকুরী করেন। তিনি কোথায় আছেন বা কোথায় গেছেন কেউ জানবে না, এটা কি করে হতে পারে! বলল আহমদ মুসা, ‘তিনি কি এখানে চাকুরী করেন না? চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন? একমাস আগে প্রকাশিত নিউইয়র্কের এডুকেশন গাইড বইতেও দেখেছি, তিনি এখানকার ‘ফেইথ স্টাডিজ’ বিভাগের প্রধান।’ আহমদ মুসার কন্ঠে বিস্ময়।
‘এডুকেশন গাইডের তথ্য ঠিক। তিনি আমাদের ফেইথ স্টাডিজ বিভাগের প্রধান। কিন্তু তিনি নেই। দিন পনের আগে তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন। কাউকেই কিছু বলে যাননি।’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
‘বাড়ির লোকেরা কি বলে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তারাও আমাদের মত অন্ধকারে। তার বাড়িতে মা ছাড়া তেমন কেউ নেই। একমাত্র ছেলে বাইরে লেখা-পড়া করছে।’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
‘পুলিশ কি এ বিষয়ে কিছু জানে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পুলিশ চেষ্টা করছে, কিন্তু কোন সন্ধান পায়নি বলে জানি।’
‘স্যার, তার উধাও হওয়া সম্পর্কে আপনি কি মনে করেন?’
জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার জিজ্ঞাসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না রাব্বি জ্যাকব। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল ভয়ের চিহ্ন। কয়েক মুহূর্ত পর এদিক ওদিক তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। সবাই বিষয়টাকে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছে। আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক বলছেন, তিনি হয়তো নিজেই কোথাও চলে গেছেন? আমরা কয়েকজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট রাব্বি ড.আইয়াজ ইয়াহুদের কাছে গিয়েছিলাম ড. হাইকেলের সন্ধানের ব্যাপারে আরও তৎপর হবার জন্য। বিষয়াটি পত্র-পত্রিকায় আনার জন্যে অনুরোধ করেছিলাম আমরা। তিনি আমাদেরকে আবেগপ্রবণ না হবার জন্যে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘পুলিশকে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব তাদের। বহুদিন থেকে ড. হাইকেল ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগছিলেন। এক সময় তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সেখান থেকে নিজেই নেমে গিয়ে ‘ফেইথ স্টাডিজ’ বিভাগের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলেন। সাম্প্রতিককালে তিনি চিন্তারও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার ব্যাপারে সব চিন্তা আপনারা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন।’
আহমদ মুসা স্তম্ভিত হলো ড. হাইকেলের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার কথা শুনে। আহমদ মুসা বলল, ‘ড. হাইকেল মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার কথা কি সত্য?’
‘ড. হাইকেল আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। আমি কখনও এমন কিছু লক্ষ্য করিনি।’
‘তাহলে ড. আয়াজ ইয়াহুদ এটা বললেন কেন? মানে তার কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার কথা বললেন কেন? তিনি কি তাহলে আপনাদের চেয়ে বেশি জানেন ড. হাইকেল সম্পর্কে?’ প্রশ্ন তুলল আহমদ মুসা।
‘আমারও তাই মনে হয়। আমরা সবাই উদ্বিগ্ন, কিন্তু তার মধ্যে কোন উদ্বেগ দেখিনি।’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
‘ড. আয়াজ ইয়াহুদ তাহলে কিছু সহযোগিতা করতে পারেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আপনি তার সাক্ষ্যত পাবেন না। আর ড. হাইকেলের ব্যাপারে আপনার সাথে কোন আলোচনায় তিনি রাজি হবেন না।’ রাব্বি ড. জ্যাকব বলল ।
‘কেন বলছেন একথা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘তিনি প্রশাসন বিভাগকে একটা নির্দেশ দিয়েছেন যে, ড. হাইকেল সম্পর্কে কোন কথা আর তার বলার নেই। যা জানার তা যেন মানুষ পুলিশের কাছ থেকে জেনে নেয়। এ বিষয়ে কোন সাক্ষাতকার কাউকে তিনি দেবেন না।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
‘দেখুন রাব্বি ড. হাইম হাইকেল আমার অকৃতিম শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধু। এসেছিলাম তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতকারের উদ্দেশ্য। তেমন কোন কাজ ছিল না। কিন্তু এখন দেখছি, তাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা আমাকে করতে হবে। আমার এমন কিছু হলে তিনি অবশ্যই এটা করতেন।’
রাব্বি ড. জ্যাকব সঙ্গে সঙ্গে কোন কথা বলল না। ভাবছিল সে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলল, ‘তাতে কোন লাভ হবে না। আপনিই বিপদেই পড়বেন। দেখুন আমরা বিনা কারণে চুপ করে বসে নেই। ড. হাইকেলের ব্যাপারে আমাদের মুখ খুলতে নিষেধ করা হয়েছে। এরপর আমরা গিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের কাছে। তিনিও আমাদের হতাশ করেছেন।’
‘কে নিষেধ করেছে? আর নিষেধ আপনারা মানবেন কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘কে নিষেধ করেছে জানি না। হুমকি এসেছে টেলিফোনে। না মেনে আমরা কি করব? বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ং প্রধান যখন বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, পুলিশও যেখানে গতানুগতিক, সেখানে আমরা কার উপর নির্ভর করব?’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. আয়াজ ইয়াহুদের বাসায় তাঁর আর কে কে আছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘তার এক মেয়ে ও স্ত্রী। এই দুজনসহ তিনজন নিয়ে তার সংসার।’ বলল রাব্বি জ্যাকব।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তার অফিসের একটা এক্সটেনশন তো তাঁর বাসায় আছে, তাই না?’ বলল আহমদ মুসা।
হ্যাঁ। অফিসের নিরিবিলি কাজগুলো তিনি বাসায় বসে করাই পছন্দ করেন।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
‘তার অর্থ অফিসের কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাথে তাঁর রেসিডেন্সিয়াল অফিসের কম্পিউটারগুলো যুক্ত কি বলেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সেটাই স্বাভাবিক।’ রাব্বি জ্যাকব বলল। বলে সে তার হাত ঘড়ির দিকে তাকাল।
‘প্লিজ স্যার, আর একটি কথা। রাব্বি ড. হাইম হাইকেলের বাসা এখানে কোথায় ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ফিফথ এভেনিউতেই সবকিছু। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও জুইস মিউজিয়ামের মাঝের জায়গাটুকুও বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখানে বিশ্বাবদ্যালয়ের অনেক কয়টি রেসিডেন্সিয়াল ব্লক আছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও তার পার্সোনাল স্টাফদের বাসা। আর পশ্চিমের সর্বশেষ লাইনে ‘ফিফথ’ এভিনিউ-এর লাগোয়া যে ব্লক সেটিই ‘আই’ ব্লক। এ ব্লকের দুতলায় সর্ব উত্তরের ফ্লাটে থাকতেন রাব্বি ড. হাইম হাইকেল।’
‘তিনি নিখোঁজ হবার পর তার বাড়িতে আপনারা গেছেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘গেছি। কেন এ কথা বলছেন।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
‘এখন কে আছেন তাঁর বাড়িতে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পুলিশ তার বাড়ি সীল করে রেখেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ রকম থাকবে। তিনি বাসায় একাই থাকতেন।’ রাব্বি জ্যাকব বলল।
’ধন্যবাদ স্যার।’
‘ধন্যবাদ’ বলে উঠতে উঠতে রাব্বি জ্যাকব বলল, ‘আমার চোখ দেখতে যদি ভুল না করে থাকে, তাহলে আপনি আমাদের মত চুপ করে থাকার মত লোক নন বলেই মনে হচ্ছে। তবু আমি বলব, পাগলামী করবেন না। ওদের গায়ে হাত দিতেও পারবেন না।’
আহমদ মুসাও উঠে দঁড়াল। বলল, ‘ওদের তো আপনি জানেন না, তাহলে একথা বলছেন কেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। তার চোখে বিস্ময়।
‘আমি ওদের জানি না। কিন্তু ড. হাইকেল মনে হয় ওদের জানতেন। কথাচ্ছলে একদিন তিনি আমাকে বলে…………’
রাব্বি ড. জ্যাকবের কথা শেষ হলো না, অস্পষ্ট একটা শব্দ লক্ষ্যে দরজার দিকে আহমদ মুসা চাইতেই দেখল একটা রিভলবারের নল উঠে এসেছে রাব্বি জ্যাকবকে লক্ষ্য করে। রিভলবারে সাইলেন্সার লাগানো। সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা এক হ্যাচকা টানে সরিয়ে নিল রাব্বি জ্যাকবকে। তারপরেই অ্যাক্রোব্যাটিক ঢংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটির উপর। শীষ দেওয়ার মত শব্দ করে একটা গুলী তার আগে বেরিয়ে এসেছে। তার সাথে একটা আর্তনাদও উঠেছে জ্যাকবের মুখ থেকে।
আহমদ মুসার দেহ চরকির পুরো এক রাউন্ড ঘুরে দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথমেই তার জোড়া পা গিয়ে আঘাত করল লোকটার তলপেটে।
লোকটা পেছন দিকে ছিটকে দরজার বাইরে পড়ে গেল। হাত থেকে রিভলবারটাও পড়ে গেছে।
জোড়া পায়ে আঘাত করার পর আহমদ মুসা চিৎ হয়ে পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। মুহূর্ত পরেই আহমদ মুসা উঠল। ছুটল লোকটির দিকে এবং চিৎকার করে উঠল, ‘খুনি, সন্ত্রাসী পালাচ্ছে। ধরুন তাকে।’
লোকটি আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং ছুটে পালাচ্ছিল।
রাব্বি ড. জ্যাকবের আর্তনাদও সবাই শুনতে পেয়েছিল।
লোকটি অভ্যর্থনা কক্ষের মধ্যে দিয়েই দৌড় দিয়েছিল।
অভ্যর্থনা কক্ষ ও আশ পাশের সবাই লোকটির দিকে ছুটছিল। কিন্তু লোকটি দুটি বোমা ফাটিয়ে পালানোর নিরাপদ পথ করে নিল। আহমদ মুসা লোকটিকে পালাতে দেখেই দ্রুত আবার ফিরে এসেছিল রাব্বি ড. জ্যাকবের কক্ষে।
রাব্বি জ্যাকব তার ডান হাত দিয়ে বাম বাহু চেপে ধরে বসেছিল। গুলী লেগেছে তার বাম বাহুর উপরের অংশে।
আহমদ মুসা তার পাশে বসে ক্ষতস্থানটা একটু পরীক্ষা করে বলল, ‘ঈশ্বর আপনাকে বাঁচিয়েছেন। বাহুর আঘাতও খুব মারাত্মক নয়।’
রাব্বি জ্যাকব মুখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। । বলল, ‘হ্যাঁ, ঈশ্বর আজ আপনার রূপ ধরে এসেছিল। আপনি চোখের পলকে ওভাবে টেনে না নিলে গুলীটা আমার বুক বিদ্ধ করতো।’
সবাই এসে দাঁড়িয়েছিল তাদের চারপাশে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ছুটে এসেছিল। এসেই বলল, ‘তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে। এ্যাম্বুলেন্স রেডি।’
কথা কয়টি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আয়াজ ইয়াহুদ রাব্বি জ্যাকবকে লক্ষ্য করে বলল, ‘কি করে, কেন এসব ঘটল ।’ তারপর অপরিচিতি আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইনি কে? এ সময়ে কেন এখানে?
রাব্বি জ্যাকব বলল, ‘স্যার ইনিই আজ আমাকে বাঁচিয়েছেন। ইনি দেখা করতে এসেছিলেন। আমি তার সাথে এখানে বসে কথা বলছিলাম। একপর্যায়ে দরজায় এসে ঐ সন্ত্রাসী আমাকে গুলী করে। ইনি অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় আমাকে সরিয়ে না নিলে বাহুতে যে গুলী লেগেছে তা বুকে লাগত। তারপর ইনি আমাকে সরিয়ে দিয়েই আক্রমণকারীর উপর ঝাঁপিয়ে না পড়লে সন্ত্রাসী দ্বিতীয় গুলী করার সুয়োগ পেয়ে যেতো।’
রাব্বি জ্যাকব থামতেই বিশ্বাবদ্যালয়ের প্রেসিন্ডেট আয়াজ ইয়াহুদ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। বুদ্ধি, শক্তি ও সাহসে যুবকরা এ রকমই হওয়া উচিত।’
এ্যাম্বুলেপ্স থেকে স্ট্রেচার এসে পৌঁছল। রাব্বি ড. জ্যাকবকে আহমদ মুসাই স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল।
স্ট্রেচার নিয়ে চলা শুরু হলে রাব্বি জ্যাকব আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল,’আপনি হাসপাতালে আসছেন তো।
‘আবশ্যই আপনার সাথে দেখা করবো।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে। বলল, ‘স্যার অনধিকার চর্চা হলেও আমি বলতে চাই. ড. জ্যাকবের উপর শত্রু তার উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যর্থ হয়েছে। সুতারাং সফল হবার জন্য আবারও তারা চেষ্টা করতে পারে।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো ড. আয়াজ ইয়াহুদের। বলল, ‘ইয়ংম্যান, তুমি তো সাংঘাতিক বুদ্ধিমান। ঠিক বলেছ তুমি। আমি এখনি পুলিশকে বলছি। আর পুলিশকে তোমার তো একটা জবানবন্দী দিতে হবে। তুমি লিখে দাও তাতেই চলবে। ড. জ্যাকব তো সবকিছুরই সাক্ষী। সবাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

আহমদ মুসা ধীরে ধীরে নিকটবর্তী হল রাব্বিনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব নিউাইয়র্ক-এর প্রেসিডেন্ট ড. আয়াজ ইয়াহুদের বাসার।
এইমাত্র আহমদ মুসা বেরিয়ে এসেছে রাব্বি ড. হাইম হাইকেলের বাসা থেকে।

ড. হাইকেলের বাসা সীল করা। আহমদ মুসা প্রবেশ করে পেছনের এমারজেন্সী এক্সিট দিয়ে। আহমদ মুসা ল্যাসার বীম দিয়ে এক্সিটটির দরজা খুলতে গিয়ে দেখে জরুরি দরোজারটার তালা খোলা। বুঝে নেয় আহমদ মুসা তার আগে আরোও এক পক্ষ এ পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিল। সে পক্ষ যে আজর ওযাইজম্যান বা জেনারেল শ্যারনদেরই কেউ হবে সে ব্যাপারেও তার কোন সন্দেহ নেই। আহমদ মুসা আরও বুঝে নেয়, যে তথ্যের সন্ধানে আহমদ মুসা ড. হাইম হাইকেলের বাড়িতে প্রবেশ করেছে তা পাবার কোন সম্ভাবনা নেই।
সত্যি তাই। আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে দেখে সবগুলো ঘর লন্ড ভন্ড। কোন কাগজপত্রের চিহ্ন কোন ঘরে নেই। কম্পিউটারের মেমোরিতে কিছুই নেই। ডিস্ক থেকে সবকিছুই মুছে গেছে। ধ্বংসকারী কোন ওয়েভ পুড়িয়ে গেছে, মুছে দিয়ে গেছে সব। স্পুটনিকের ল্যাবও এই অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ধ্বংস করা হয়েছিল।
তবে স্টিলের ফাইল ক্যাবিনেটের বটম ক্যাবিনেটের তলায় বুক সাইজের ইঞ্চি খানেক পুরু স্টিলের এয়ারটাইট একটা কেস পেয়েছে। সুইচ-লক খুলে সে দেখেছে ভেতরে একটা ইনভেলাপে ফিল্ম জাতীয় কিছু আছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যামিলি ডকুমেন্ট হতে পারে এবং উৎকৃষ্ট একটা সুভেনীর মনে করে আহমদ মুসা সেটা ব্যাগে তুলে নেয়।
সামনেই ড. আয়াজ ইয়াহুদের বাড়ি।
ড. আয়াজের কথাই ভাবছিল আহমদ মুসা। লোকটির সাথে প্রথম সাক্ষাৎ খারাপ হয়নি। তার সাথে প্রথম দেখা এখনকার আলোচনায় কাজ দেবে। কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং হয়তো বাইরেও আজর ওয়াইজম্যানদের লোক মোতায়েন আছে। আহমদ মুসা যে ড. হাইম হাইকেলকে খুঁজতে এসেছে, এটা ওরা জানতে পারে এবং এসে তাদের আলোচনায় আড়িও পাততে পারে। এটা ড. জ্যাকবের ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে। সে দেখেছে যখন রাব্বি ড. জ্যাকব ড. হাইম হাইকেল সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছে, তখনই তাকে হত্যার জন্যে গুলী করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল ড. জ্যাকবের মুখ বন্ধ করা। যে কথা তখন তারা বলতে দেয়নি, সে কথা পরে আহমদ মুসা ড. জ্যাকবের কাছ থেকে শুনেছে। ড. জ্যাকবের বলা সে কথাটি হলো, ড. হাইকেল তাকে একদিন বলেছিল, ‘ধর্মের নামে অর্ধমের হিংস্রতা আর বরদাশত হয় না। সত্যের উপর অসত্যের বলৎকার সত্যিই অসহনীয়। আমিও পাপ করেছি, অমার্জনীয় পাপ। প্রায়শ্চিত্য করার পথেও দুর্লংঘ দেয়াল।’ ড. হাইকেলের এইকথা শুনে ড. জ্যাকব বিস্মিতকন্ঠে সঙ্গে সঙ্গে বলছিল, ‘ধর্মের নামে অধর্মের হিংস্রতা কে করছে? কি পাপ করেছেন আপনি? প্রায়শ্চিত করার পথে কে আপনাকে বাধা দিচ্ছে?’ ড. জ্যাকবের এই প্রশ্নে ভীত হয়ে পড়েছিল ড. হাইম হাইকেল। সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে সংকুচিত করে নেয়। চারদিকে সর্তক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল, ‘থাক মি.জ্যাকব কথাগুলো আপনার মাঝেই রেখে দেবেন। আরো লাখো আমেরিকানের মত আমিও স্বাধীন মানুষ নই। দানবের অক্টোপাশে বন্দী । তারপর চুপ হয়ে গিয়েছিল ড. হাইকেল। কোন কথাই তার কাছ থেকে আর বের করা যায়নি।
আহমদ মুসার চিন্তা আবার ফিরে এল ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে। ড. আয়াজ কি আজর ওয়াইজম্যানদের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত? সেদিন ড. হাইকেলের উপর আক্রমণের সাথে জড়িতদের কি তিনি জানেন? ড. আয়াজ ইয়াহুদের সেদিনের আচরণ ও কথা-বার্তায় আহমদ মুসার এটা মনে হয়নি। আবার হতে পারে ড. আয়াজ গভীর পানির মাছ।
ড. আয়াজ ইয়াহুদের বাড়ির মখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে আহমদ মুসা। গেটের কলিং বেলের সুইচ হাতের নাগালের মধ্যে। কিন্তু কলিং বেলে চাপ দেবার আগেই গেটম্যানকে তার দিকে আসতে দেখল।
আহমদ মুসাও তার দিকে এগুলো।
‘স্যার কাকে চাই?’ গেটম্যান বলল বিনীতভাবে।
‘এইমাত্র আয়াজ ইয়াহুদ স্যারের সাথে টেলিফোনে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছেন। দরজা খুলুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে স্যার আমি সিকিউরিটির লোকদের একটু জিজ্ঞাসা করে আসি।’
‘না, দরকার নেই। দেরি হয়ে যাবে।’ বলে দরজায় ঠেলা দিল।
গেটম্যান একটু চিন্তা করল, তারপর আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল। তারপর দরজা খুলে একপাশে সরে গেল।
আহমদ মুসা প্রবেশ করল ভেতরে।
‘স্যার সোজা চলে যান। সামনের দরজা খোলা। ওটা অভ্যর্থনা কক্ষ। অভ্যর্থনা কক্ষের পরেই অফিসিয়াল ড্রইংরুম। আমি আসব সাথে?’ বলল গেটম্যান।
‘না সাথে আসার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে গেট রক্ষা করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
কথাগুলো বলতে বলতেই আহমদ মুসা হাঁটা দিয়েছিল দরজাটির লক্ষ্যে।
দরজাটি বাড়িতে ঢোকার একমাত্র প্রবেশ পথ। দরজার পশ্চিম পাশে একটা সিঁড়িঘর। এ সিঁড়িঘরের প্রবেশ পথ পশ্চিম দিকে। এ প্রবেশ পথে আসার পথও ভিন্ন। এর ফলে ড. আয়াজ ইয়াহুদের ডুপ্লেক্স ফ্লাটের পথ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।
এই রেসিডেপ্সিয়াল বিল্ডিং-এর একতলা ও গ্রাউন্ড ফ্লোর নিয়ে এই ডুপ্লেক্স। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াহুদ থাকে। তিন তলা থেকে উপরে থাকে তাঁর অন্যান্য স্টাফরা।
আহমদ মুসা দরজার সামনে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়িয়েই টোকা দিল দরজায়। তারপর দরজা খোলার অপেক্ষা না করেই ঘরে ঢুকে গেল। চোখ ধাঁধানো সুন্দর ঘরটির একদম পুব প্রান্তে সুন্দর একটা টেবিলকে সামনে নিয়ে বসে আছে রিসেপশনিস্ট এক তরুণী।
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে চাঞ্চল্য। আহমদ মুসা অনুমতির অপেক্ষা না করে ঘরে প্রবেশ করার জন্যেই হয়তো এই চাঞ্চল্য। বলল রিসেপশননিস্ট তরুণীটি, ‘স্যার হঠাৎ এভাবে……..কি চাই আপনার?’
বলতে বলতেই তরুণীটি তার চেয়ার থেকে সরে আহমদ মুসার দিকে কিছুটা এগিয়ে এল।
‘আমি স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছি, জরুরি। নিয়ে চল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার আপনি বসুন। আমি তাঁকে বলে আসি’। রিসেপশনিস্ট তরুণীটি বলল।
‘না, অতটা সময় আমি দিতে পারবো না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে স্যার, টেলিফোনে তাঁকে বলি?’ তরুণীটি বলল।
আহমদ মুসা ভাবল, তাও হতে দেয়া যাবে না। কাউকে কোন খবর দেয়ার কিংবা নিজস্ব প্রস্তুতির কোন সুযোগ দেয়া যাবে না। এ চিন্তা থেকেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘প্রয়োজন নেই। ভয় নেই। তিনি আমার পরিচিতি। নিয়ে চল আমাকে।’
মেয়েটির এরপরও দ্বিধা করছিল। কিন্তু আহমদ মুসার কঠোর হয়ে ওঠা মুখের দিকে চেয়ে তরুণীটি আর কিছু বলতে সাহস পেল না। ‘আসুন স্যার’ বলে হাঁটতে শুরু করল তরুণীটি ড্রইংরুমের দরজার দিকে। কিন্তু কয়েক ধাপ এগিয়েই তরুণীটি তার টেবিলে ফিরে এল। টেবিলের ড্রয়ার খুলে ছোট একটা ভ্যানিটি কেস হাতে তুলে নিল। ভ্যানিটি কেসটাও খুলল ডান হাতের তর্জনি দিয়ে কি একটা পরখ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটা দিল।
আহমদ মুসাও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেও হাঁটা শুরু করল। নিচের ড্রইং লাউঞ্জ থেকেই দুতালায় উঠার সিঁড়ি। তরুণীটি আহমদ মুসার দিকে ফিরল। বলল,‘স্যার উপরে আছেন। আপনি বসুন। আমি বলে আসি।’
‘প্রয়োজন নেই। চলুন উপরে।’ বলল আহমদ মুসা শান্ত, কিন্তু কঠোর নির্দেশের সুরে।
ভীত তরুণীটি অসহায় কন্ঠে বলল, ‘স্যার আপনি যেতে পারেন। আমি এভাবে যেতে পারি না।’
‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার কোন ক্ষতি হবে না। তোমাকে আমি সাথে নিচ্ছি পথ চেনার জন্যে নয়, তুমি যাতে এখনকার ঘটনা বাইরে কোথাও জানাতে না পার এজন্যই সাথে নেয়া। অতএব তোমাকে যেতেই হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
তরুণীটির চোখে-মুখে দেখা দিল আতংক। বিনা বাক্যব্যায়ে সে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করল। আহমদ মুসা তার পিছু নিল।
দুতলার সিঁড়ির মুখ থেকেই থোকায় থোকায় সোফা সজ্জিত তারকাকৃতির বিরাট লাউঞ্জ। এটা ফ্যামিলি গ্যাদারিং-এর জায়গা।
সিঁড়িমুখে পৌঁছেই তরুণীটি পাথরের মত দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
আহমদ মুসা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, মাঝখানে দুটি সোফায় তিনজন বসে আছে। দেখেই আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছিল একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. আয়াজ ইয়াহুদ। তার পাশে বসা তরুণীটি নিশ্চয় তার মেয়ে। তাদের সামনেই বসে মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা। মহিলা মিসেস আয়াজ ইয়াহুদ হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই।
আহমদ মুসারা সিঁড়ি মুখে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেল সোফায় সোজা হয়ে বসে আছে ড. আয়াজ ইয়াহুদ। তার চোখে-মুখে কিছুটা বিস্ময় ও প্রশ্ন ফুটে উঠেছিল। পরক্ষণেই সে প্রশ্ন করল তরুণীটিকে লক্ষ্য করে, ‘লিসা কি ব্যাপার?’ বলেই সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ইয়ংম্যান, তুমি তো সেই, যাকে সেদিন ড. জ্যাকবের উপর আক্রমণের সময় দেখেছিলাম? কিন্তু তুমি এখানে? এভাবে?’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি সেই । আপনার কাছে কিছু জানার আছে। এজন্যে এসেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এ জানার কাজটা অফিসেও করা যেত। কিংবা সময় নিয়ে আসা যেত।’ তীব্র ক্ষোভ ও বিরক্তি ঝরে পড়ল ড. আয়াজ ইয়াহুদের কথায়।
‘স্যার আমি যা বলতে চাই, জানতে চাই তার জন্য এমন একটা পরিবেশ চাই। আপনি বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু আমার কথা আমাকে বলতে হবে।’ ঠান্ডা কিন্তু শক্ত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
ড. আয়াজ ইয়াহুদ তাকাল তার স্ত্রী ও মেয়ের দিকে। ইংগিত করল উঠে যাবার জন্যে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা বলল, ‘স্যার ওঁরা এখানেই থাকবেন।’
ড. আয়াজ ইয়াহুদ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপর ইংগিত করল তার রিসেপশনিস্ট লিসাকে চলে যাবার জন্যে। কিন্তু এবারও আহমদ মুসা বাধ সাধল। বলল, ‘ওকে নিচে রেখে আসতে চাইনি বলেই সাথে নিয়ে এসেছি। সেও এখানে থাকবে স্যার।’
ড. আয়াজ ইয়াহুদ চোখ ফেরাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে কিছুটা দিশেহারা ভাব, সেই সাথে একরাশ জিজ্ঞাসা। বলল, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না মি. ………………….।’
‘আইজ্যাক দানিয়েল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ, আইজ্যাক দানিয়েল, তোমার কথা আমার সাথে, এদের কি প্রয়োজন?’ ড. আয়াজ ইয়াহুদ বলল।
‘পরে বুঝবেন স্যার।’ বলল আহমদ মুসা।
আবারও বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকাল ড. আয়াজ ইয়াহুদ আহমদ মুসার দিকে। একটু ভাবল। তারপর আহমদ মুসাকে বামপাশের খালি সোফাটা দেখিয়ে বলল, ‘বস।’
‘মাফ করবেন স্যার, আমি দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলব। যাতে আমি চারিদিকের উপর নজর রাখতে পারি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন, তুমি কি কোন প্রকার ভয় করছ? আমার এখানে তো ভয়ের কিছু নেই।’ বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘স্যার, এটা আমার সাবধনতা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কথা বলার আগে তোমার পরিচয় আমার জানা দরকার।’ বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘আমি রাব্বি ড. হাইকেলের শুভাকাক্ষী ও বন্ধু।’ আহমদ মুসা বলল।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো ড. আয়াজ ইয়াহুদের। বলল, ‘ভাল। কিন্তু আমার সাথে তোমার কি কথা?’
‘স্যার, রাব্বি ড. হাইম হাইকেল কোথায়? তাঁর কি হয়েছে জানতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা খুব শান্ত কন্ঠে।
‘এটা জানার জন্যে তোমার এত বড় আয়োজন? বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কারোও কাছে জিজ্ঞাসা করলে এটা জানতে পারতে?’ ড. আয়াজ ইয়াহুদ বলল।
‘আপনার কাছে জানতে চাই। আপনি যা জানেন, অন্যেরা তা জানে না।’
কিছুটা বিব্রতভাব ড. আয়াজ ইয়াহুদের চোখে-মুখে। বলল, ‘তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন না। বাড়িতেও তিনি নেই। তার আত্নীয়-স্বজনের বাসাতেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। হঠাৎ তিনি নিরুদ্দেশ হয়েছেন। পুলিশে এটা জানানো হয়েছে। এইতো আমি জানি।’
‘আপনি আরও জানেন যে, একটি শক্তিশালী মহল তাকে কিডন্যাপ করেছে এবং তারাই সেদিন ড. জ্যাকবকে খুন করার চেষ্টা করেছিল।’
আহমদ মুসা একথা বলার সাথে সাথে একটা চমকে উঠা ভাব ফুটে উঠল ড. আয়াজ ইয়াহুদের চোখে মুখে। কিন্তু নিজেকে সামলে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠল, ‘তুমি অনধিকার চর্চার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছ ইয়ংম্যান।’
‘স্যার আপনি অপরাধী চক্রকে আড়াল করছেন। পুলিশ তাঁর অনুসন্ধানের ব্যাপারে আন্তরিক নয়, এটাও আপনি জানেন।’ ঠান্ডা, কিন্তু শক্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
ক্রুদ্ধভাবে উঠে দাঁড়াল ড. আয়াজ ইয়াহুদ। বলল তীব্র কন্ঠে, ‘এসব বানোয়াট কথা বন্ধ কর। বেরিয়ে যাও তুমি।’
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘আরও আছে স্যার, আপনারা ড. হাইম হাইকেল চিন্তার ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে, একথা প্রচার করে তার নিরুদ্দেশ হওয়াটাকে স্বাভাবিক দেখাতে চাচ্ছেন।’
এই সময় ড. আয়াজ এর মেয়ে নুমা ইয়াহুদ টেবিলের উপর থেকে ‘রিমোট কলার’ টেনে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে বোতাম টিপে দিল।
টের পেয়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা। প্রথমটায় চোখ দুটি জ্বলে উঠেছিল আহমদ মুসার। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল আহমদ মুসা। বলল আহমদ মুসা নুমা ইয়াহুদকে লক্ষ্যে করে, ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম, প্রশংসনীয় ক্ষিপ্রতার জন্যে। পিতার উপযুক্ত সন্তানের কাজ করেছেন।’
আহমদ মুসা তার কথা শেষ করার আগেই নিচতলায় দ্রুত পদশব্দ শুনতে পেল।
আহমদ মুসা সিঁড়ি মুখের সামনে থেকে একটু সরে রেলিং-এ ঠেস দিয়ে নিচে তাকিয়ে বলল, ‘সিকিউরিটি উপরে এস। স্যার ডাকছেন। কুইক।’
দুজন সিকিউরিটির লোক এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসতে লাগল। দুজনের হাতেই স্টেনগান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি ব্রিগেডের লোক এরা। পরণে কালো পোশাক, মাথায কালো হেলমেট।
ওরা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসে সিঁড়ির মুখে দাঁড়াল। তাকাল ড. আয়াজ ইযাহুদের দিকে নির্দেশ লাভের জন্যে।
ড. আয়াজ ইয়াহুদ আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওকে ধরে বাইরে নিয়ে যাও এবং পুলিশে দাও। অবৈধ প্রবেশ ছাড়াও ড. হাইকেলের নিরুদ্দেশের ঘটনার সাথে এই লোক সংশ্লিষ্ট হতে পারে, এটাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ।’
‘আব্বা পুলিশে দেয়া কেন? উনি তো কিছু জানতে এসেছিল।’ নুমা ইয়াহুদ তার পিতাকে লক্ষ্য করে বলল।
‘চুপ কর নুমা। সেদিনের ঘটনা, আজকে এভাবে প্রবেশ এবং প্রশ্নগুলোর ধরণ প্রমাণ করে ড. হাইকেলের ঘটনার সাথে সে শুধু জড়িতই নয়, কোন উদ্দেশ্যে আমাদেরকে ব্ল্যাক মেইল করতে চাচ্ছে।’ বলে ড. আয়াজ ইয়াহুদ সিকিউরিটিকে বলল, ‘নিয়ে যাও একে।’
সিকিউরিটির লোক দুজন আহমদ মুসার দিকে এগুলো। আহমদ মুসার কাছাকাছি হয়ে তারা স্টেনগান এক হাতে নিয়ে আর এক হাত খালি করল। স্টেনগানের ব্যারেল তারা আহমদ মুসার সমান্তরালে তুলে রাখল।
আহমদ মুসা নির্লিপ্তভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সিকিউরিটির লোকেরা অগ্রসর হলে হেলান দেয়া অবস্থা থেকে শুধু সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু আহমদ মুসার মধ্যে প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। সুতরাং সিকিউরিটির লোকেরা নিশ্চিন্তভাবে আহমদ মুসাকে ধরে নেবার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল।
সিকিউরিটির দুজন লোক আহমদ মুসার নাগালের মধ্যে পৌঁছতেই আহমদ মুসার দুহাতের কারাত চোখের পলকে বজ্রপাতের মত গিয়ে আঘাত করল তাদের হেলমেটের ঠিক ধার ঘেঁষে কানের নিচের নরম জায়গাটায়।
দুজনের দেহই টলে উঠে পাক খেয়ে আছড়ে পড়ল মেঝের উপর।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্ফারিত হয়ে হয়ে উঠেছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদদের চোখ। তারা যেন অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা সিকিউরিটি দুজনের স্টেনগান কুড়িয়ে নিয়ে নিচে ছুঁড়ে দিয়ে বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদদের লক্ষ্যে করে, ‘আপনারা বসুন। আমার কথা শেষ হয়নি।’
আহমদ মুসার কথার রেশ মিলিয়ে যাবার আগেই ওরা পুতুলের মত বসে পড়ল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করে মুহূর্তের জন্যে একটু থেমেছিল। তারপর বলল, ‘ড. আয়াজ ইয়াহুদ আপনি আমাকে ড. হাইকেলের নিরুদ্দেশ হবার ঘটনার সাথে জড়িত করতে চাচ্ছিলেন। হতভাগ্য ড. হাইকেল সম্পর্কে যে-ই অনুসন্ধান এগিয়ে আসবে, তাকে সরিয়ে দেবারই এটা একটা কৌশল। এর অর্থ ড. হাইকেলকে নিরুদ্দেশ বা হত্যা করার সাথে আপনি জড়িত আছেন।’
ড. আয়াজ ইয়াহুদের বিস্মিত-বিব্রত চেহারায় ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। কঁকিয়ে উঠে বলল, ‘না এটা মিথ্যা কথা, আমি ড. হাইকেল নিরুদ্দেশ বা হত্যার সাথে জড়িত নেই। আমি………………..।’ কথা শেষ করতে পারল না ড. আয়াজ ইয়াহুদ। তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল।
ড. আয়াজ ইয়াহুদ থেমে যেতেই তার মেয়ে নুমা ইয়াহুদ বলে উঠল, ‘আমি এই বিশ্বাবদ্যালয়ের ছাত্রী এবং ফেইথ স্টাডিজ বিভাগেরই। আমি খুব ভালো করে জানি, ড. হাইকেল আংকলের সাথে আব্বার সম্পর্ক বরাবরই খুব ভালো। ড. হাইকেল আংকেল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়লেন, তখন তিনি চেষ্টা করেছিলেন আব্বা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হন। আর আব্বা প্রেসিডেন্ট হলেও ড. হাইকেল আংকেলকে সিনিয়ার হিসাবে সব সময় শ্রদ্ধা করেন। ড. হাইকেল আংকেলকে নিরুদ্দেশ করা বা হত্যা করার কোন মটিভ আব্বার তরফ থেকে থাকা বাস্তব নয়।’
‘ধন্যবাদ ম্যাডাম নুমা। আপনি ভাল তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু ‘মটিভ’ অনেক সময় ব্যাক্তিগত নাও হতে পারে, সামষ্টিক বা সম্প্রদায়গতও হতে পারে।’ আহমদ মুসা শান্ত কন্ঠে বলল।
অন্ধকার নামল নুমা ইয়াহুদের মুখে। আহমদ মুসা যে কথা বলেছে তা এক তিলও মিথ্যা নয়।
ইহুদী তরুণী নুমা যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত তার চেহারা। সে রাব্বানিক্যাল ইউনিভার্সিটির ফেইথ স্টাডিজ বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী।
আহমদ মুসার কথা নিয়ে সে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আব্বার ক্ষেত্রে সে ধরনের কোন সামষ্টিক ও সাম্প্রদায়িক মটিভ আছে কি?
আহমদ মুসা একটু পেছন সরে রেলিং-এ হেলান দিল। তারপর বলল, ‘ড. হাইম হাইকেল এমন একটা ভয়াবহ বিষয় সম্পর্কে জানতেন যে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে তাদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থে বিপর্যয় নামতে পারে। সেজন্য একটা গ্রুপ তাকে হত্যা বা লোক চক্ষুর আড়ালে নিতে চেয়েছে।’
বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো নুমা ইয়াহুদের চোখ। ড. আয়াজ ইয়াহুদও চমকে উঠে চোখ তুলেছে আহমদ মুসার দিকে। মিসেস আয়াজ ইয়াহুদের চোখে-মুখে নেমে এসেছে ভয়ের ছায়া।
বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে নুমা ইয়াহুদ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসাকে, ‘আপনি নিশ্চয় ইহুদী সাম্প্রদায়িক স্বার্থের দিকেই ইংগিত করেছেন। ইহুদী-কম্যুনিটির স্বার্থ তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপর্যয়ের মুখেই। বিদেশ থেকেই আসা জেনারেল শ্যারনের বাড়াবাড়ি, বিজ্ঞানী জ্যাকবের মত ইহুদী নেতৃস্থানীয় লোকদের অগ্রহণযোগ্য ও চরম অপরাধমূলক অন্তর্ঘাত, আর বিস্ময়কর আহমদ মুসার সাথে মার্কিন সরকারের আঁতাত বিপর্যস্ত করেছে ইহুদী কম্যুনিটিকে। এর বাইরে আরও এমন কি ভয়ংকর তথ্য আছে, যা প্রকাশ করলে ইহুদী-কম্যুনিটির স্বার্থ আরও বিপর্যস্ত হবে? থাকলেও ড. হাইকেলের মত একজন নিষ্ঠাবান ইহুদী তা প্রকাশ করতে যাবেন কেন, ‘যার কারণে তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে ঠেলে দেবার দরকার হবে?’
‘মিস নুমা এ প্রশ্ন আপনি আপনার পিতাকে করুন।’ শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
নুমা ইয়াহুদের চোখে-মুখে আরেক দফা অন্ধকার নামল। সে তাকাল তার পিতার দিকে।
ড. আয়াজ ইয়াহুদের চেহারা বিপর্যস্ত। নতুন এক ভয়ের দৃশ্য তার চোখে-মুখে। ‘না নুমা এমন কোন তথ্য আমি জানি না। আমি…………।’
আবারও কথা শেষ করতে পারল না ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘কথা শেষ করুন ড. আয়াজ ইয়াহুদ।’ শক্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
ড. আয়াজ ইয়াহুদ চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে তার চোখ-মুখ। কিছু বলতে পারল না সে।
‘আব্বা আপনাকে ভীত দেখছি কেন? কেন এই ভয়? ইনি তো আমাদের ভয় দেখাননি, বরং আমরাই সিকিউরিটি ডেকেছিলাম। সত্য কিছু থাকলে তা বলা প্রয়োজন আব্বা। দেখা যাচ্ছে উনি অনেক কিছুই জানেন।’ বলল নরম কন্ঠে নুমা ইয়াহুদ।
মাথা নিচু করল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘ঠিক মিস নুমা। আমি ভয় দেখাইনি। আমি কিছু জানতেই এসেছি। আমি ড. হাইকেলকে সাহায্য করতে চাই। ড. আয়াজ যা জানেন তা দিয়ে যদি আমকে সাহায্য না করেন, তাহলে জানার জন্য আমি যে কোন উপায় অবলম্বন করব। ড. হাইকেলকে সাহায্য করার ব্যাপারে কোন বাধা আমি মানবো না।’ বলে আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলবার বের করে হাতে নিল।
নুমা ইয়াহুদসহ সকলেই তার দিকে চোখ তুলল। ড. আয়াজ ইয়াহুদ ও মিসেস আয়াজ ইয়াদের চোখে-মুখে অপরিচিত ভয়। কিন্তু নুমা ইয়াহুদের চোখে-মুখে এবার ভয় নয়, বিমুগ্ধতা। তার মনে এখন আর কোন সন্দেহ নেই, আহমদ মুসা যা করছে তা ড. হাইকেলকে সাহায্যের জন্যেই করছে। আহমদ মুসা একজন বিপদগ্রস্তের পক্ষ নেয়া এবং তার কথায় ঋজুতা ও সাহস এবং সর্বোপরি বিপদ ও চরম উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যেও অদ্ভুত স্বাভাবিক ও সরল আচরণ তাকে বিস্ময়-বিমুগ্ধ করেছে। অবিশ্বাস্য এক ফিল্মী চরিত্র জীবন্ত রূপ নিয়ে যেন তার সামনে।
কারও মুখে কোন কথা নেই।
আহমদ মুসাই নিরবতা ভাঙল। বলল, ‘ড. আয়াজ ইয়াহুদ আমার সময় খুবই কম। আমি আর সময় দিতে পারছি না।’ আহমদ মুসার কন্ঠ শান্ত, কিন্তু বুলেটের মতই বিদ্ধকারী।
‘বলুন আব্বা। উনি তো ড. হাইকেল আংকেলকেই সাহায্য করতে চান।’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
মুখ তুলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ। তাকাল আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণভাবে। বলল, ‘মি. আইজ্যাক দানিয়েল। আপনি অবশ্যই জানেন না আপনি এক ভয়ংকর পথে পা বাড়িয়েছেন। আমি ভয় করি, আপনি এগুতে পারবেন না। মাঝখানে আমাদের সকলের ড. হাইকেলের পরিণতি হবে।’ ভয়জড়িত নরম কন্ঠ তার।
নুমা ইয়াহুদ ও মিসেস আয়াজ ইয়াহুদ শুনছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদের কথা। ড. আয়াজ ইয়াহুদের এ স্বীকৃতিতে অপার বিস্ময় ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। তাহলে ড. আয়াজ ইয়াহুদও জানেন যে, ড. হাইম হাইকেলের কি পরিণিতি হয়েছে। অথচ তারা এতদিন ড. আয়াজ ইয়াহুদের কাছ থেকেও জেনেছে চিন্তার কোন প্রকার ভারসাম্যহীনতা থেকেই ড. হাইম হাইকেল কোথাও চলে গেছেন!
ড. আয়াজ ইয়াহুদ থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘ড. আয়াজ ইয়াহুদ, এ পথে পা দেবার আগেই আমি জানি এটা ভয়ংকর পথ। এখন বলুন আপনি কি জানেন?’
‘আমি আপনাকে বেশি সাহায্য করতে পারবো না। আমি এতটুকু জানি যে, ড. হাইকেলকে কিডন্যাপ করা হয়েছে এবং যারা কিডন্যাপ করেছে তাদের লোকজন আমাদের চারপাশে আছে পাহারা দেবার জন্য, যাতে আমরা কোন কিছু করতে না পারি। সেদিন ওদের একজন খুন করার চেষ্টা করেছিল ড. জ্যাকবকে।’
‘আপনি কি করে জানলেন, তিনি কিডন্যাপ হয়েছেন। কিডন্যাপকারীদের আপনি চেনেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
ওদের লোক আমার সাথে দেখা করেছে এবং বলেছে, আমি যেন পুলিশকে এবং অন্য সবাইকে একথা বলি যে অনেক দিন থেকে তিনি কিছুটা চিন্তার ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি হঠাৎ তা বেড়ে যায়।’ তারা আমাকে একজন মানসিক ডাক্তারের নাম দিয়েছে এবং বলেছে, আমি যেন বলি,এই ডাক্তারের কাছে যেতেন ড. হাইম হাইকেল।’ একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, আমি ওদের কাউকে চিনি না। ওরা রাতে আসতো এবং মুখোশ পরে কথা বলতো।’
‘আপনি পুলিশকে কিছু বলেছেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওদের কিছু বলেনি।’
‘যে ডাক্তারের কথা ওরা বলেছে, সে ডাক্তারকে আপনি চেনেন? ঠিকানা জানেন?’
‘ঠিকানা জানি।’
‘বলুন ঠিকানাটা।’
ড. আয়াজ ইয়াহুদ ঠিকানা বললে লিখে নিল আহমদ মুসা।
‘ড. হাইকেলকে কোথায় রেখেছে? তিনি কি বেঁচে আছেন? কিছু জানেন?’
‘মি. আইজ্যাক দানিয়েল ওরা শুধু শোনার জন্যে আসে, কিছু বলার জন্য নয়।’
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না আহমদ মুসা। একটু ভাবল। বলল, ড. হাইম হাইকেলের বাড়ির ঠিকানা বলুন। কোন সাহায্য যদি সেখান থেকে পাই।’
ড. আয়াজ ইয়াহুদ ঠিকানাটা দিয়ে বলল, ‘আমার মনে হয় তাঁর বাড়ি আমাদের চেয়ে আরও বেশি অন্ধকারে আছে।’
‘তাতে একটু সুবিধা পাওয়া যাবে। তাঁর বাড়ি তার নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে পুলিশ ও আরও উপর মহলে হৈচৈ করতে পারবে, যা আপনারা পারেননি ওদের ভয়ে। কিডন্যাপকারীদের চাপে ফেলার জন্য এই হৈচৈ-এর প্রয়োজন আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সেই ভয়াবহ তথ্যের কথা কি বলবেন, যে তথ্য ড. হাইম হাইকেল আংকেলের কাছে রয়েছে, যার কারণে তিনি কিডন্যাপ হয়েছেন?’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
আহমদ মুসা তাকাল রিসেশনিস্ট লিসার দিকে। তারপর নুমা ইয়াহুদের দিকে ফিরে বলল, এইভাবে বলা যাবে না মিস নুমা।’
নুমা ইয়াহুদ ব্যাপারটা বুঝল। সেও তাকাল একবার লিসার দিকে। আহমদ মুসাও তাকাল আবার লিসার দিকে। বলল, ‘মিস লিসা, তোমার ভ্যানিটি ব্যাগটা কি আমি দেখতে পারি?’
সঙ্গে সঙ্গেই লিসার মুখ ভয়ে এতটুকুন হয়ে গেল। ফ্যাকাসে হয়ে গেল তার মুখের রং। পাথরের মত সে স্থির হয়ে গেছে। ভ্যানিটি কেস ধরা তার হাত কাঁপছিল। ভ্যানিটি কেস তুলে ধরার শক্তি যেন তার নেই।
‘মাফ করবেন লিসা’ বলে আহমদ মুসাই তার হাত থেকে ভ্যানিটি কেসটি নিয়ে নিল।
আহমদ মুসা ভ্যানিটি কেসটি খোলা দেখতে পেয়েছিল, এখনও খোলাই আছে।
আহমদ মুসা ভ্যানিটি কেসে দেখল দিয়াশলাই সাইজের একটি রেকর্ডার চালু রয়েছে।
আহমদ মুসার মুখে একটুরো হাসি ফুটে উঠল। বলল লিসাকে লক্ষ্য করে, ‘তোমার কক্ষেই তুমি এটা অন করেছিলে, তারপর তো এটা অন করাই ছিল। তাহলে তো সব কথাই রেকর্ড হয়েছে, তাই না?’
কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে রেকর্ডার অফ করে দিয়ে অন করল রেকর্ড প্লেয়ারের সুইচ।
ফিরল আহমদ মুসা ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে ।
চলছে রেকর্ড প্লেয়ার।
তাদের এতক্ষণের সব কথাই আবার বলে যাচ্ছে রেকর্ডার।
স্তম্ভিত ড. আয়াজ ইয়াহুদরা সকলেই।
এক সময় ড. আয়াজ ইয়াহুদ তীব্র কন্ঠে বলে উঠল, ‘এতো সাংঘাতিক গোয়েন্দাগিরী? লিসা, এটা কি তুমি সরকারের নির্দেশে করছ।’
ভীত, বিপর্যস্ত লিসা বলার আগেই আহমদ মুসা বলল, ‘না সে সরকারের পক্ষে নয়, ড. হাইম হাইকেলের কিডন্যাপকারীদের পক্ষে কাজ করছে।’
‘বুঝলেন কি করে?’ জিজ্ঞাসা নুমা ইয়াহুদের।
‘তার ভয়ের ধরন দেখে বুঝেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ও গড!’ বলে আর্তনাদ করে উঠল ড.আয়াজ ইয়াহুদ।
‘আমি কি ঠিক বলেছি লিসা?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল লিসাকে।
ভয় ও আতংকে পান্ডুর মুখটি নত করল লিসা।
‘তুমি কত টাকার বিনিময়ে এই কাজ করছ লিসা?’
ফুপিয়ে কেঁদে উঠল লিসা। কান্নার মধ্যে সে বলল, ‘এক পয়সা আমি নেইনি। পয়সা নিয়ে স্যারের বিরুদ্ধে এমন কাজ আমি করতে পারি না। আমি একাজ না করলে ওরা আমাকে ও আমার আব্বা-আম্মাকে মেরে ফেলবে। রাজী না হওয়ায় আমার আব্বাকে ওরা কিডন্যাপ করেছিল। বাধ্য হয়ে আমি রাজী হয়েছি।’ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল তার শেষ কথাগুলো।
দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল লিসা।
আহমদ মুসা দুপা এগিয়ে তরুণীর মাথায় আলতোভাবে হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমাকে ওরা কি ধরনের দায়িত্ব দিয়েছিল?’
মেয়েটি মুখ তুলল। বলল, ‘স্যারের সাক্ষাত করতে আসা লোকদের সাথে কি আলাপ হয় এবং টেলিফোনে কি কথা উনি বলেন, এসব রেকর্ড করা ছিল আমার দায়িত্ব। স্যারের অফিসের কথা-বার্তা ও টেলিফোনের কথা-বার্তাও রেকর্ড করা হয়েছে।’
‘অফিসে কে করছে এই কাজ?’ দ্রুত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘আপনার পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট ‘জন’।’
আমার বিশ বছরের পুরানো কর্মচারী জন!’ বিস্ময় ও উদ্বেগ ঝরে পড়ল ড. আয়াজের কন্ঠে।
কথা শেষ করেই ড. আয়াজ ইয়াহুদ আবার বলে উঠল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কেউ জড়িত আছে কি না তুমি জান?’
‘শুধু এটুকু জানি প্রফেসর ও প্রসাশনের মধ্যে আরও দুতিনজন জড়িত আছে। কিন্তু তাদের নাম জানি না স্যার।’ বলল লিসা।
‘তুমি যে তথ্য যোগাড় কর, সেগুলো কি তারা এসে নিয়ে যায়?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘না ওরা কেউ আসে না। ওদের নির্দেশ মত ক্যাসেট বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় রাখতে হয়। ওরা এসে সেখান থেকে নিয়ে যায়।’ লিসা বলল।
‘তুমি ওদের কাউকে চেন না?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ওদের একজনই দুবার আমাদের সাথে দেখা করেছে। আর কারো সাথে দেখা হয়নি। ঐ একজন লোক ছাড়া আমি কাউকে চিনি না।’ বলল লিসা।
‘ওরা এসব কেন করছে, কেন ড. হাইম হাইকেলকে কিডন্যাপ করেছে, এ ব্যাপারে কিছুই জান না তুমি?’
‘হ্যাঁ, আমাকে রাজি করার যুক্তি হিসাবে ওরা বলেছে, ‘নবী মুসা যেভাবে বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, সেভাবে আমরাও ইহুদী জাতিকে বিশেষ করে মার্কিন ইহুদী সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য কাজ করছি। সব ইহুদীরই উচিত আমাদের সহযোগিতা করা।’ লিসা বলল।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। তাকাল ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে। বলল, ‘স্যার আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনার কাছ থেকে পেয়েছি। প্রয়োজনে আপনাদেরকে যে কষ্ট দিয়েছি সেজন্য আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
আহমদ মুসা কথা শেষ করতেই লিসা কান্নাজাড়িত স্বরে বলল, ‘স্যার আমার কি হবে? আমি যদি ওদের তথ্য সরবরাহ করতে না পারি, তাহলে ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।’
‘কেন, তুমি এই ক্যাসেটটা নিয়ে যাবে। তাদের দেবে, তবে একটা শর্তে। শর্তটা হলো, ক্যাসেটটা ওরা যেখানে রাখতে বলবে, সে স্থানের কথা আমাকে সঙ্গে সঙ্গেই জানাতে হবে। তুমি বিপদে পড় এমন কিছু করব না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সর্বনাশ এ ক্যাসেট ওরা পেলে তো আমরা বিপদে পড়ব।’ বলে উঠল আয়াজ ইয়াহুদ।
‘স্যার নিশ্চিত থাকুন, ওরা ক্যাসেট শোনার সুযোগ পাবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এতটা নিশ্চয়তা আপনি কিভাবে দিতে পারেন। ঝুঁকি থেকেই যাবে’। বলল নুমা ইয়াহুদ।
‘ঝুঁকি আবশ্যই থাকবে এবং এ ধরনের ঝুঁকি নিতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ক্যাসেটে যা আছে তাতে আমাদের পরিবার মহাবিপদে পড়বে। লিসা তো ক্যাসেট না দিলেও পারে, ওরা তো এ ঘটনার কথা জানছে না।’ বলল নুমা ইয়াহুদ ।
‘এতেও ঝুঁকি আছে। কারণ এ বাড়িতে বাইরের কে কখন আসছে এটা জানবার জন্য ওদের লোক আরো থাকতে পারে। বলল আহমদ মুসা।
নুমা এবং ড. আয়াজদের সকলের মুখ ম্লান হয়ে গেল।
‘স্যার আমি আপনাদের বিপদে ফেলার জন্য আসিনি, অন্তত এ ব্যাপারে নিশ্চত থাকুন।’ সান্ত্বনার সুরে আহমদ মুসা বলল।
বলেই আহমদ মুসা তার মোবাইল নাম্বার ও ক্যাসেট সমেত ভ্যানিটি ব্যাগ তুলে দিল লিসার হাতে আর বলল, প্রতিশ্রুতির কথা মনে রেখো লিসা।’
‘ফিরল আহমদ মুসা ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে। বলল, এক্সকিউজ মি স্যার, এক্সকিউজ মি ম্যাডাম, আমি আসি।’
‘না, জনাব, আপনার কথা শেষ হয়েছে, কিন্তু আমাদের কথা শেষ হয়নি।’ অনেকটা প্রতিবাদের সুরে সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল নুমা ইয়াহুদ। আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
‘আংকেল ড. হাইম হাইকেল এমন কি ভয়ংকর তথ্য জানতেন যার জন্য তার এই পরিণতি এবং যা চাপা দেয়ার জন্য এতো কিছু ঘটছে?’ বলল নুমা ইয়াহুদ।
‘ইহুদীবাদীদের এক ভয়ংকর পাপ তিনি জানেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি সে পাপ কাহিনী?’ বলল নুমা ইয়াহুদ।
‘স্যরি, বলার আগে আমাকে ভাবতে হবে। আমি চলি। সিকিউরিটি দুজনের সংজ্ঞা এখনি ফিরে আসবে।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াতে গেল।
‘শুনুন আমার প্রশ্ন শেষ হয়নি।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল নুমা ইয়াহুদ।
দ্রুত আবার ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। মুখ ফেরাল নুমা ইয়াহুদের দিকে।
নুমা ইয়াহুদই আবার কথা বলল, ‘এতক্ষণের ঘটনায় আমার মধ্যে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সেটা হলো, আপনি কে? আমি যতটা শুনেছি তাতে একজনের সাথে আপনার মিল আছে। তিনি আহমদ মুসা। বলুন আপনি কে? আপনি আমেরিকান নন, অথচ এত কথা জানেন এবং ড. হাইম হাইকেলকে বন্ধু বলছেন। ড. হাইম হাইকেল কোনদিন বিদেশে যাননি। তার মত ঘরকুনো মানুষের বিদেশী বন্ধু থাকার কথা নয়।’
‘স্যারি নিরাপত্তাজনিত কারণেই আমার পরিচয় এখন আমি বলব না। তবে আমার সাথে আহমদ মুসার মিল দেখার ব্যাপারটা মজার হয়েছে। আহমদ মুসার সাথে তুলনা করার মত অত তথ্য আপনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি জেনেছি আমার এক বন্ধু সারাহ জেফারসনের কাছ থেকে। আজ সকালেও তার সাথে কথা বলেছি।’ বলল নুমা ইয়াহুদ।
‘উনি এত কথা জানেন কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘শুধু জানেন তা নয়, আমার মনে হয় তিনি…….
কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ থেমে গেল নুমা ইয়াহুদ। বলে উঠল, না থাক। অনুমানে কোন কথা বলা ঠিক নয়।’
থেমে পরমুহূর্তেই আবার বলে উঠল, ‘ভেবে বলবেন বলেছেন। কিভাবে বলবেন? আবার কি দেখা হবে?’
‘পৃথিবী গোল। দেখা হওয়াই স্বাভাবিক।’ বলেই আহমদ মুসা ‘সকলকে ধন্যবাদ, বাই’ কথাটি উচ্চারণ করে দ্রুত নামল সিঁড়ি বেয়ে।
আহমদ মুসা চোখের আড়াল হতেই মিসেস ইয়াহুদ, নুমা ইয়াহুদের মা, নিজের দেহকে সশব্দে সোফায় এলিয়ে দিয়ে বুকে ক্রস এঁকে বলল, ‘কি দেখলাম, কি ঘটল! সিনেমার চেয়েও ভয়ংকর। ঈশ্বর রক্ষা করেছেন।’
হাসল নুমা ইয়াহুদ। বলল, ‘তুমি এত ভয় পেয়ে গেছ আম্মা!’
‘ভয় পাব না! তোর আব্বার কথা, তোর কথা যদি বিশ্বাস না করতো, আরো কথা যদি আদায় করতে চাইতো, তাহলে কি ঘটতো ভাবতেও…………..। দেখলি তো, তার হাতের এক ঘায়ে সিকিউরিটির লোক কুপোকাত। দেখতে নেহায়েত ভদ্রলোক, কিন্তু কাজে একেবারে আগুন।’ বলল মিসেস ইয়াহুদ।
‘তুমি ঠিক বলেছ আম্মা। তবে মি.আইজ্যাক দানিয়েল ক্রিমিনাল নন।’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
‘ক্রিমিনাল এভাবে এত কিছু ঝুঁকি একজন ভালো লোককে সাহায্য করতে আসে না।’ বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ। একটু থামল। তারপর সোজা হয়ে বসে বলল, ‘আমি ভাবছি লোকটির মিশন নিয়ে। আমরা ড. হাইম হাইকেলের আশা ছেড়ে দিয়েছি ভয় ও চাপে পড়েই। কিন্তু এই লোকটি এই লস্ট কেস নিয়েই ছুটেই এসেছে এবং মনে হচ্ছে সে ছুটবেই। এটা খুব বড় একটা ঘটনা এবং লোকটাও একজন বড় কেউ হবে।’
‘আব্বা উনি যে ভয়ংকর তথ্যের কথা বললেন, যা ড. হাইম হাইকেল আংকেল জানতেন বলেই তাঁর এই দুর্ভোগ, সে সম্বন্ধে তুমি কিছুই জান না আব্বা?’ বলল নুমা ইয়াহুদ।
‘আমি সত্যি জানি না। তবে সেটাও কোন বড় ঘটনা হবে। হাইকেল পরিবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তারাই এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছেন। ড. হাইম হাইকেল বিশ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পর কি হল তিনি বিশ্বাবদ্যালয় পরিচালনা থেকেই সরে দাঁড়ালেন! সরে দাঁড়ালেন আগের বিশ্বাস থেকে! সরে দাঁড়ালেন সামাজিকতার সকল ক্ষেত্র থেকেও! আমার মনে হতো, কি এক অসহ্য যন্ত্রণা তিনি চেপে রাখতে সদাব্যস্ত। লোকটির কথিক ‘ভয়ংকর তথ্য’-এর সাথে ড. হাইম হাইকেলের এই গোটা মানসিক অবস্থার কি কোন যোগ আছে! যদি থাকে তাহলে তা হবে ভয়ংকর বড় এক তথ্য।’ ড. আয়াজ ইয়াহুদ থামল। শান্ত গম্ভীর কন্ঠ তার।
‘আব্বা, মি আইজ্যাক দানিয়েলের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে ড. হাইম হাইকেলের সে ভয়ংকর তথ্যটি সামষ্টিক ও সম্প্রদায়গত। যদি তাই হয়, তাহলে ভয়ংকর তথ্যের ভয়ংকরতা আরও ভয়ংকর হতে বাধ্য।’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
‘আমিও তাই মনে করি।’ বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘তাহলে পুলিশকে ব্যাপারটা বলা উচিত নয় কি?’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
‘কিন্তু তথ্যটা আমরা জানি না। বলব কি?’ বলল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘তাহলে আব্বা মি. আইজ্যাক দানিয়েলকে আমাদের প্রয়োজন। তিনি সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। এখন দেখছি, আমাদেরই সাহায্য চাওয়া উচিত তাঁর কাছে।’ নুমা ইয়াহুদ বলল।
কথা শেষ করেই নুমা ইযাহুদ উঠে দাঁড়াল। রেলিং-এর উপর ঝুঁকে পড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ডাকল রিসেপশনিষ্ট লিসাকে।
লিসা আহমদ মুসার পরপরই নিচে নেমে গিয়েছিল।
দৌড়ে উপরে উঠে এল লিসা।
নুমা ইয়াহুদ লিসার কাছ থেকে আহমদ মুসার মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে নিল। তারপর ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসতে বসতে বলল, ‘এখন আমার মনে হচ্ছে, আইজ্যাক দানিয়েল ঈশ্বর প্রেরিত। তাকে আমাদের সাহায্য করা প্রয়োজন।’
‘কোন আবেগকে প্রশ্রয় দিও না। ড. হাইম হাইকেল হারিয়ে গেছেন। ড. জ্যাকব খুন হতে বেঁচে গেছেন। শুধু নিজের জন্য নয়, প্রতিষ্টানের স্বার্থও আমাদের কাছে বড়। এই স্বার্থ নিশ্চিত করে কিছু করা গেলে সেটা দেখা যাবে।’ বলে উঠে দাঁড়াল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
তার সাথে সাথে মিসেস ইয়াহুদও।
একটা বড় শ্বাস ছেড়ে মাথাটাকে একটু হাল্কা করার চেষ্টা করে সোফায় গা এলিয়ে দিল নুমা ইয়াহুদ। হাতের মোবাইল নাম্বারটার দিকে অলসভাবেই একবার চোখ বুলাল।

নিউইয়র্ক ফিফথ এভিনিউ-এর ফুটপাত ধরে এগুচ্ছিল একজন যুবক ও একটি বালক। যুবকটি আগে, বালকটি পেছনে।
ফিফথ এভেনিউ-এর যেখানে ইহুদী মিউজিয়াম ও রাব্বানিক্যাল ইউনিভার্সিটির সীমা একসাথে মিশেছে, সেখানে পৌঁছে যুবকটি দাঁড়াল। ফিরে তাকাল বালকটির দিকে। পরক্ষণেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল যুবকটি। আর বালকটি পেছন ফিরে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল।
যুবকটিকে দাঁড়াতে দেখে আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ দুই সীমানার ঐ সংযোগস্থলেই লিসা তার ক্যাসেটটি রেখেছে বলে তাকে জানিয়েছে। আহমদ মুসা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার সবচেয়ে কাছের গেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আহমদ মুসা নিশ্চিত, ক্যাসেটটি রাখার পর তা নিতে ওরা খুব দেরি করবে না। তাই আহমদ মুসা খবরটি লিসার কাছ থেকে পাওয়ার পরই এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে।
যুবকটিকে চলে যেতে দেখে এবং বালককে উল্টো যাত্রা শুরু করতে দেখে হতাশ হলো আহমদ মুসা। আহমদ মুসা বুঝল, কোন কথা হঠাৎ মনে হওয়ায় যুবকটি বালককে কোন কাজে কোথাও ফেরত পাঠিয়েছে। ওরা তার টার্গেট নয়।
দুতিন মিনিটও যায়নি। হঠাৎ আহমদ মুসা দেখল বালকটি তার সামনে দিয়ে আবার ফিরে আসছে। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। যে সময় গেছে তাতে বালকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকাও পার হতে পারেনি। কি কাজে গিয়েছিল? এরই মধ্যে কি কাজ শেষ হলো?
আহমদ মুসার চোখ বালকটিকে অনুসরণ করলো।
বালকটি গিয়ে থমকে দাঁড়াল সে সংযোগ স্থলে।
অজান্তেই আহমদ মুসা সোজা হয়ে উঠল। সেই একই জায়গায় বালকটি আবার দাঁড়াল।
কি ব্যাপার? প্রশ্নটি মনে জেগে ওঠার সাথে সাথে আহমদ মুসার সব স্নায়ুতন্ত্রী খাড়া হয়ে উঠল।
বালকটি দাঁড়িয়ে পড়েই দুপা এগিয়ে সীমান্ত রেলিং-এর পাশে পৌঁছেই নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ল এবং রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে ডান হাত ভেতরে ঢুকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আবার বের করে নিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই হাঁটা শুরু করল সামনে যেদিকে যুবকটি গেছে সেদিকে।
আহমদ মুসার কাছে সব বিষয়ই পরিস্কার হয়ে গেল। বালকটিকে ক্যাসেট দেখিয়েই ফেরত পাঠানো হয়েছিল পরে একা এসে নিয়ে যাবে এ জন্য। খুব সাবধানী ওরা, ঝুঁকিটা বালকের উপর দিয়ে যাচ্ছে। বালক ভাড়া করাও হতে পারে।
আহমদ মুসা পিছু নিল বালকটির।
বালকটি একই গতিতে হাঁটছে। একবারও পেছনে ফিরে তাকায়নি।
ইহুদী মিউজিয়াম পার হবার পর বালকটি একটা গলিতে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসা তাকে অনুসরণ করল। আহমদ মুসার লক্ষ্য হলো, তাকে অনুসরণ করে ওদের কোন ঠিকানার সন্ধান লাভ করা এবং সেই সাথে ক্যাসেটটি তাদের হাত থেকে উদ্ধার করা।
বালক দক্ষিণমুখী সে গলি থেকে পুর্বমুখী আরেক গলিতে প্রবেশ করল।
পুবের গলিতে বেশ কিছুটা এগুবার পর আহমদ মুসার হঠাৎ মনে হলো বালটিকে তার এ ফলো করা ওরা ধরে ফেলেছে। জেনে ফেলেছে বালকও। তারা সময় ক্ষেপণ করছে আহমদ মুসাকে ফাঁদে আটকাবার জন্যে।
এই চিন্তা মনে আসার সাথে সাথেই আহমদ মুসা মনে করল, ওদের ফাঁদ পাতা সম্পূর্ণ হবার আগেই বালককে ধরা প্রয়োজন এবং ক্যাসেটটাকে হাত করা দরকার। বালকের কাছ থেকেও ওদের কোন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
নিঃশব্দে আহমদ মুসা দৌড় দিল বালকটিকে লক্ষ্য করে। কয়েক লাফে আহমদ মুসা পৌঁছে গেল বালকটির কাছে।
শেষ মুহূর্তে বালকটি টের পেয়ে গিয়েছিল। সেও দৌড় দিয়েছিল। কিছুটা এগুলোও। কিন্তু ধরা পড়ে গেল আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসা তার এক হাত চেপে ধরে বলল, ‘আমি তোমার শত্রু নই। আমি ক্যাসেটটা খুজঁছিলাম। তুমি পেয়ে গেছ। আমাকে দিয়ে দাও।’
আহমদ মুসার হাসি এবং তার শান্ত কথা শুনে বালকটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে আস্থা স্থাপনের একটা জিজ্ঞাসা।
পাশেই গাড়ির শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা বালকটির হাত ছেড়ে দিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তীব্র গতিতে একটা গাড়ি রাস্তার ওপাশ দিয়ে সামনের দিকে ছুটে আসছিল। গাড়িটি ছোট মাইক্রো। দরজা খোলা। স্টেনগানের একটা নগ্ন ব্যারেল ঝিলিক দিয়ে উঠল আহমদ মুসার চোখে।
স্টেনগানের ব্যারেল ঝিলিক দেয়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে বালকটির জামার কলার ঠেনে ধরে পেছনে দিকে ছিটকে পড়ল। তার আগেই স্টেনগান গর্জন করে উঠেছে।
আর্তনাদ করে উঠেছে বালকটি। আহমদ মুসার বাম হাত প্রচন্ড শক্তির একটা ছোবলে কেপেঁ উঠছে।
ছিটকে পড়েই তাড়াতাড়ি উঠে বসল আহমদ মুসা। তাকাল সে বালকটির দিকে। কাতরাচ্ছে সে। দেখল বালকের বামপাশটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। নিজের হাতের যন্ত্রণাও সে অনুভব করতে পারছে। মনে হচ্ছে তার কনুয়ের একটু উপরে কিছুটা জায়গায় যেন ধারালো কিছু দিয়ে কেউ কেটে তুলে নিয়ে গেছে।
দৃষ্টি ফেরাল আহমদ মুসা গুলি বর্ষণকারী গাড়ির দিকে। মুহূর্তের জন্য সে দেখতে পেল গাড়িটাকে। উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে গড়িটা চোখের আড়ালে চলে গেল।
বুঝল আহমদ মুসা বালক এবং সে দুজনই ওদের টার্গেট ছিল। তবে বালকটি ছিল প্রধান টার্গেট। তারা চায়নি বালকটি আহমদ মুসার হাতে পড়ুক।
বালকটি জ্ঞান হারায়নি। আহমদ মুসা তাকে পাঁজকালো করে তুলে নিয়ে সাত্বনা দিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি ঠিক হয়ে যাবে। ভয় নেই তোমার।’
বালকটি আহমদ মুসার দিকে তাকাল। যন্ত্রণাকাতর কন্ঠে বলল, ‘আপনি কি পুলিশের লোক?’
‘না, আমি পুলিশ নই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা আমাকে মারল কেন? কান্নায় সুরে বলল বালকটি।
‘ওরা কারা তুমি জান?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। তার চোখে একটা আশার আলো।
‘ঐ গাড়ি আমি চিনি। ওদের গাড়ি ওটা।’ বালকটি বলল।
‘ওরা কারা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘পরিচয় জানি না। ওদের একজনকে আমি চিনি। বাসায় গেছি।’ কথা বলতে বলতেই এগুচ্ছিল আহমদ মুসা। পেয়ে গেল একটা ট্যাক্সি।
বালককে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বলল, ‘ড্রাইভার প্লিজ কোন হাসপাতালে নিয়ে চলুন।’
ছুটতে লাগল ট্যাক্সি।
‘আমার তো ইনসিওরেন্স কার্ড নেই। হাসপাতালে দেখাবার টাকাও নেই।’ বালকটি দুর্বল কন্ঠে করুণ সুরে বলল।
আহমদ মুসা মিষ্টি হাসল। বলল, ‘বলেছি না তোমার ভয় নেই, চিন্তা নেই। টাকা আমার কাছে আছে।’
বালকটি কিছু বলল না।
পরে বালকটি তার ডান হাত দিয়ে তার জ্যাকেটের বুক পকেট থেকে একটা মিনি ক্যাসেট বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল। বলল, ‘এতে কি আছে? এখানে পড়েছিল কেন?’
‘এসব তুমি পরে শুনো। বেশি কথা বলা তোমার ঠিক নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
বালকটি চুপ করল। কিন্তু একটু পর আবার বলে উঠল,‘খাবার সময়ও বাড়ি না গেলে মা খুব ভাববে। আমার মাকে আপনি খবর দিতে পারবেন? মা ছাড়া আমার কেউ নেই।’
‘বাড়ির ঠিকানা আমাকে দিও। আমি আবশ্যই তোমার মাকে খবর জানাব। কি করেন তোমার মা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার মা পঙ্গু। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন।’ বলল বালকটি।
একটা বেদনার ছায়া নামল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। বলল, তোমাদের চলে কিভাবে?’
‘মা একটা ভাতা পান। কিন্তু সেটাও কমে গেছে। সব খরচ তাতে চলে না। আমাকেও কিছু আয় করতে হয়।’বালকটি বলল।
‘কি আয় কর তুমি? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
বালকটি আহমদ মুসার প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকল।
আহমদ মুসা বুঝল এই বয়সে তাকে এমন কালো পথে নামতে হয়েছে, যা সে বলতে পারবে না।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে একটা কথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। ঐ ক্যাসেটটা ওখানে থাকার খবর আহমদ মুসার জানার অর্থ কি ওরা এটাই ধরবে না যে, লিসাই তাকে এ তথ্যটা জানিয়েছিল কিংবা লিসাই পেতেছিল এই ফাঁদটা! যদি এই অর্থ তারা ধরে তাহলে লিসা কি ওদের নতুন ক্রোধের শিকার…………….।
আহমদ মুসা চিন্তা শেষ করতে পারল না। ড্রাইভার বলে উঠল, স্যার হাসপপাতালে এসে গেছি।’
তার কথার সাথে সাথেই ট্যাক্সিটি দাঁড়িয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা দ্রুত ভাড়া চুকিয়ে বালকটিকে পাঁজকোলা করে নিয়ে নেমে পড়ল।

আহমদ মুসা হুইল চেয়ার ঠেলে বালকটির মা মিসেস প্যাকারকে ড্রইংরুমে তুলে দিয়ে বলল, ‘মিসেস প্যাকার আমি এখন বিদায় নিতে চাই।’
মিসেস প্যাকার আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি তুলে তাকাল। বলল, ‘আপনি কে জানি না। আপনার নামও এখনও আমাকে বলেননি। যাই হোক আপনি একজন সৎ মানুষ। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’
আহমদ মুসা পকেট থেকে কিছু ডলার তুলে নিয়ে মিসেস প্যাকারের হাতে গুজে দিয়ে বলল, ‘আপনার এক ভাইয়ের পক্ষ থেকে এই টাকা আপনি রাখুন। আপনার ছেলে প্যাকার জুনিয়রের সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। আর ডাক্তারের সাথে আমি কথা বলেছি। আজই আপনার ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসুন। এলাকার কম্যুনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তার ও নার্সকে বললেই তারা প্রতিদিন দেখে যাবে। কিছু পয়সা তার জন্য লাগবে। হাসপাতালে তাকে রাখা নিরাপদ নয়।
মিসেস প্যাকারের চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। বলল, ‘আমি আমার ছেলের কাছ থেকেই সব শুনেছি। আজ দুবার তাকে আপনি মৃত্যুর অবস্থা থেকেই বাঁচিয়েছেন। হাসপাতালের বিল চুকিয়ে দিয়েছেন। আবার নিজেকে ভাই বলছেন এক অসহায় মহিলার। কোন আমেরিকানই এভাবে কারো ভাই হতে আসে না। বলবেন কি আপনি……………।’
মিসেস প্যাকারকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, ‘সুযোগ পেলে বলব একদিন সব। আমাকে এখনি যেতে হবে। তাড়া আছে।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতেই তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল হাতে নিয়ে তাকাল মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠা টেলিফোন নাম্বারের দিকে। অপরিচিত নাম্বার দেখে ভ্রু-কুঁচকে উঠল তার।
টেলিফোন রিসিভ করল আহমদ মুসা। ‘হ্যালো’ বলে সাড়া দিতেই ওপ্রান্ত থেকে একটা মেয়ে কন্ঠ বলে উঠল, ‘আমি নুমা। লিসাকে ওরা গুলী করে মেরে ফেলেছে।’ কান্নায় তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল।
নুমা মানে নুমা ইয়াহুদের টেলিফোন।
কথাটা শোনার সাথে সাথে আকস্মিক শক খাওয়ার প্রচন্ড এক যন্ত্রণা আহমদ মুসার গোটা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল যেন তার।
নিজেকে সামলে নিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘স্যরি। এমন আশংকার কথা আমি ভেবেছিলাম। কিন্তু তাকে সাবধান করার সময় পেলাম না। মোবাইলে তাকে পাইনি। ওঁর কাছেই যাচ্ছিলাম আমি। স্যরি।’
‘ক্যাসেটের খবর কি? ওদের হাতে পড়েনি তো?’ বলল নুমা ইয়াহুদ। কাঁপা কন্ঠে ঝরে পড়ছে সীমাহীন উদ্বেগ।
‘ভয় নেই। ক্যাসেটটি এখন আমার কাছে। এতেই ওরা ক্ষেপেছে। ওরা মনে করেছে, লিসাই সব জানিয়ে দিয়েছে ওদের শত্রু পক্ষকে।’ বলে মুহূর্তের জন্য থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘আমি লিসাদের ওখানে যাচ্ছি নুমা। বেচারার পরিবার খুব সংকটে পড়ল।’
সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত কন্ঠে বলে উঠল নুমা, ‘আমি লিসাদের ওখান থেকেই কথা বলছি। আমরা সবাই এখন লিসাদের বাড়িতে।’
‘নুমা আমি আসছি। বাই।’ বলে আহমদ মুসা টেলিফোন শেষ করতেই মিসেস প্যাকার বলল, ‘কিছু ঘটেছে? কোন দুঃসংবাদ?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠ মিসেস প্যাকারের।
একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল আহমদ মুসা। শুনলে মিসেস প্যাকার ভয় পেয়ে যাবে। তার ছেলের ব্যাপারে আরও উদ্বিগ্ন হবে। কিন্তু পরে ভাবল, তাদের ভয় পাওয়ার দরকার। তাতেই বাস্তবতার ব্যাপারে তারা সাবধান হতে পারবে। এই চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, যারা আপনার ছেলেকে কাজে লাগিয়েছে, যারা আবার তাকে খুন করার চেষ্টা করেছে, তারা রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের পি.এ মিস লিসাকে খুন করেছে।’
‘কেন?’ উদ্বিগ প্রশ্ন মিসেস প্যাকারের।
‘লিসাকে ওরা জোর করে কাজে লাগিয়েছিল। লিসা তাদের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে বলে ওদের ধারণা।’ আহমদ মুসা বলল।
প্রবল এক ভয়ের অন্ধকার নতুন করে নেমে এল মিসেস প্যাকারের মুখে। বলল, ‘আসলে ঘটনা কি মি. আইজ্যাক দানিয়েল?’ ওরা কি চাচ্ছে, কি করছে?’
‘রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হাইকেল নিরুদ্দেশ হয়েছেন। তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। তার ব্যাপারে যাতে কেউ কিছু জানতেই না পারে এজন্যই অজ্ঞাত পরিচয় ঐ লোকেরা এসব করছে।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় ফুটে উঠল মিসেস প্যাকারের চোখে-মুখে। মুহূর্ত কয়েক চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘ড. হাইম হাইকেলকে নিরুদ্দেশ বলা হচ্ছে কেন? আমি যতদূর জানি, তিনি একজন মানসিক রোগী হিসাবে কোন এক মানসিক হাসপাতালে আছেন।’
বিস্ময় ফুটে উঠল আহমদ মুসার চোখেও। বলল, ‘আপনি জানেন কিছু? কি করে জানেন?
‘আমার স্নায়ু সংক্রান্ত অসুখের জন্যে আমি কিছুদিন সাইক্রিয়াটিস্ট ড. নিউম্যান-এর প্যাসেন্ট ছিলাম। আমি দুদিন তাকে টেলিফোনে ড. হাইম হাইকেলের বিষয় আলোচনা করতে শুনেছি। দুদিনই আমি তার কাছেই বসা অবস্থায় তিনি টেলিফোন ধরেন। ঘরের একপ্রান্তে সরে কথা বললেও তার সব কথাই আমার কানে এসেছিল। প্রথম দিন তিনি যা বলেছিলেন তার সার কথা হলো, ‘আমি ভেবে দেখেছি, ড. হাইম হাইকেলকে মানসিক হাসপাতালে রাখাই নিরাপদ। আজীবনও রাখা যাবে। আমি একটা সার্টিফিকেট দেব, তবে ঐভাবে।’ দ্বিতীয় দিন তিনি যা বলেছিলেন তাহলো, হ্যাঁ ড. হাইম হাইকেলের পরিবার সবচেয়ে বড় সমস্যা। তবে অন্য সবদিক ঠিক থাকলে, হাইম হাইকেলের পরিবারও এক সময় বিষয়টাকে স্বাভাবিক হিসাবে মেনে নেবে। যে কোন মূল্যে তার পরিবারকে শান্ত রাখতে হবে।’
থামল একটু মিসেস প্যাকার। থেমেই আবার বলে উঠল, কথাগুলো থেকে তখন আমি যে অর্থ ধরেছিলাম, তাহলো ‘ড. হাইম হাইকেল অসুস্থ। তাকে মানসিক হাসপাতালেই রাখা হচ্ছে। তিনি ড. নিউম্যানের প্যসেন্ট। ড. হাইম হাইকেলের এই অবস্থায় তার পরিবার নিয়ে তারা সমস্যায় পড়েছেন।’
‘ধন্যবাদ মিসেস প্যাকার। আপনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। দয়া করে কি ডা. নিউম্যানের ঠিকানা দিতে পারেন?’ আহমদ মুসা বলল।
ডা. নিউম্যানের ঠিকানাটা আহমদ মুসাকে দিতে দিতে বলল, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি বুঝতে পারছি আমার ছেলের সম্পর্কে আমাকে আরও সাবধান হতে হবে।’
‘ধন্যবাদ ম্যাডাম, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে। বাই।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল।

আহমদ মুসার ট্যাক্সি ছুটছে ডা. নিউম্যানের বাড়ির দিকে। ডা. নিউম্যানের সন্ধান পেয়ে আহমদ মুসা দারুন খুশি। প্রথমে সে ডা. নিউম্যানের কথা শুনেছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদের কাছে। কিন্তু ডা. নিউম্যানের ঠিকানাসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে মিসেস প্যাকার।
লিসার ওখানে গিয়ে আহমদ মুসা খুব বেশি দেরি করেনি। ওখানে তার যাওয়া ছিল লিসার বাবা-মাকে সমাবেদনা জানানো, তাদের আর্থিক অবস্থা সর্ম্পকে জানা এবং লিসার মোবাইল পরীক্ষা করা। কিন্তু গিয়ে শোনে যে, খুনিরা লিসাকে খুন করে তার মোবাইল নিয়ে গেছে। আহমদ মুসা দেখল, লিসার আব্বা-আম্মা সহজ সরল খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে মহাবিপর্যয়ের ছাপ। আহমদ মুসা ড. আয়াজ ইয়াহুদকে জিজ্ঞাসা করেছিল, লিসার পরিবার তো তার উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন চলবে কি করে ওদের।
আহমদ মুসার প্রশ্ন শুনে পিতার পাশে দাঁড়ানো বিস্মিত নুমা ইয়াহুদ প্রশ্ন করেছিল আহমদ মুসাকে, ‘এ প্রশ্ন আপনার মাথায় এল কি করে? আপনি তো কোনভাবেই লিসার পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট নন?’ আহমদ মুসা বলেছিল, লিসা নিহত হয়েছে আমাকে সাহায্যে করতে গিয়েই। আমি আপরাধবোধ করছি এই অসহায় পরিবারের কাছে।’
‘এখন কি করতে চান?’ জিজ্ঞাসা করল নুমা ইয়াহুদ। তার ঠোঁটে মুখ টেপা হাসি।
‘যতটা সম্ভব আমি পরিবারটির ক্ষতিপূরণ করতে চাই।’ বলে আহমদ মুসা।
‘সত্যি আপনি প্রয়োজনের চেয়েও ভালো মানুষ। লিসা তো আপনাকে সাহায্য করতে যেয়ে খুন হয়নি। খুন হয়েছে আমাদেরকে সাহায্য করতে গিয়ে।’ বলেছিল নুমা ইয়াহুদ।
‘কেমন করে?’ আহমদ মুসা বলেছিল।
‘প্রকৃতপক্ষে লিসা সাহায্য করেছিল ড. হাইম হাইকেল আংকেলকে, আপনাকে নয়। সুতরাং লিসার দায়িত্বটা আমাদের।’ বলেছিল নুমা ইয়াহুদ।
নুমার কথা শেষ হতেই ড. আয়াজ ইয়াহুদ বলে উঠেছিল, ‘হ্যাঁ মি. আইজ্যাক দানিয়েল, আমরাই ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলফেয়ার ফান্ড থেকে লিসার নামে একটা পেনশন তার পরিবারকে দেব।’
ধন্যবাদ জানিয়েছিল আহমদ মুসা ড. আয়াজ ইয়াহুদকে। তারপর আহমদ মুসা ক্যাসেটকে কেন্দ্র করে বালক জুনিয়র প্যাকারের দুর্ঘটনার কথা তাদের জানিয়েছিল। কাহিনীটা শুনে নুমা ইয়াহুদ বলেছিল, ‘আপনিও নিশ্চয় আহত। আপনার বাম বাহুটাকে আজ শুরু থেকেই একটু বাঁকা অবস্থায় দেখছি কোটের হাতার আড়াল সত্ত্বেও।’
‘ও কিছু না, সামান্য।’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘গুলীর আঘাত?’ উদ্বিগ কন্ঠে প্রশ্ন করেছিল মিসেস ইয়াহুদ।
‘জি, হ্যাঁ।’ বলেছিল আহমদ মুসা। তারপরই সে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদের দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য। বলেছিল, ‘স্যার বিদায় দিন, জরুরি একটা কাজ আছে।’
‘কি কাজ?’ হ্যান্ডশেক করতে করতে জিজ্ঞেস করে ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘স্যার আপনার কাছে ডা. নিউম্যান এর নাম শুনেছিলাম। আর ঠিকানা পেয়েছি মিসেস প্যাকারের কাছে। তার দেয়া তথ্য অনুসারে ডা. নিউম্যান জানেন ড. হাইম হাইকেল কোথায় আছেন। আমি এখন তার সন্ধানে যাব।’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘এই আহত অবস্থায়?’ বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করেছিল নুমা ইয়াহুদ।
নুমার কথা শেষ হতেই ড. আয়াজ ইয়াহুদও বলেছিল, ‘তুমি জান ওরা কত বেপরোয়া, ভয়াবহ। লিসা, জুনিয়র প্যাকার এবং তার আগে ড. জ্যাকবের দৃষ্টান্ত তোমার সামনেই আছে। আহত অবস্থা নিয়ে তোমার ঐ ধরনের কাজে যাওয়া ঠিক নয়।’
‘আপনাদের এই শুভেচ্ছার জন্য ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু ওরা যতটা বেপরোয়া, তার চেয়ে বেশি বেপরোয়া হতে না পারলে ওদের সাথে পারা যাবেনা। ওদের কোন সময় দেয়া যাবে না। ক্যাসেট উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই যদি আমি লিসার সাথে যোগাযোগ করতে পারতাম, তাহলে এই দুর্ঘটনা রোধ করা যেতেও পারতো।’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু তুমি একা ওদের সাথে লড়াই করবে কি করে? পুলিশের উপরের অবস্থা কি আমি জানি না। কিন্তু পুলিশের নিচের লোকেরা ওদের কেনা।’ বলেছিল আয়াজ ইয়াহুদ।
‘এই অবস্থার মধ্যেই কাউকে না কাউকে এগুতে হবে স্যার, পথ তো বের করতে হবে।’
কথা শেষ করেই ‘বাই টু অল’ বলে ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা।
চোখ ভরা একরাশ বিস্ময় নিয়ে ভাবছিল নুমা ইয়াহুদ। আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সে বলে উঠল, ‘মি. আইজ্যাক দানিয়েল, আপনি কি শুধুই একজন আইজ্যাক দানিয়েল? শুধুই কি একজন শুভকাঙ্ক্ষী ড. হাইম হাইকেল আংকেলের? আমরাও তো তার শুভাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু আমরা কেউইতো এই দায়িত্ব নিচ্ছি না। আসলে কে আপনি? কেন্দ্রীয় কোন গোয়েন্দা সংস্থার লোক আপনি নন, কারণ আপনি বিদেশী। তাহলে কে আপনি?’
ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলল না সে। গম্ভীর হয়ে উঠেছিল তার মুখ। একটু ভেবে বলল, ‘নুমা তুমি যা বলেছ তার সবই সত্য। আমি আইজ্যাক দানিয়েল নই। দুঃখিত আমি, এ মুহূর্তে আমি কে তা বলব না। আমি ভয় করি, পরিচয় কাজের পথে বাধা হতে পারে।’
নুমার বিস্মিত চোখে জেগে উঠে হাজারও প্রশ্ন।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ চোখ ড. আয়াজ ইয়াহুদের। এক ধাপ এগিয়ে একেবারে মুখোমুখি দাঁড়াল আহমদ মুসার। বলল, ‘আমরা আর তোমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করব না। আমি এরাবিয়ান ক্লাসিক্যাল স্টোরিতে হাতেম তাই-এর কাহিনী পড়েছি। তুমি আরেক হাতেম-তাই। তুমি ড. হাইম হাইকেলের শুভকাঙ্ক্ষী বলেছ, সেটা ঠিক নয়। তুমি তাকে চিনই না। ঠিক কিনা?’
‘জি, হ্যাঁ।’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘তাহলে তুমি কার জন্য কাজ করছ? ড. হাইম হাইকেলের জন্য তো অবশ্যই নয়। হাতেম তাই একজন প্রেমিক শাহজাদার স্বার্থে একজন পরিজাদীকে শাপমুক্ত করার জন্য কাজ করেছিল। তোমার লক্ষ্য কি?’ বলেছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
হেসেছিল আহমদ মুসা। বলেছিল, ‘আমি কোন পরিজাদীকে নয়, এক পরম সত্যকে চরম মিথ্যার অবগুণ্ঠন থেকে মুক্ত করতে চাই।’
‘সেই সত্যটা বা মিথ্যাটা কি তুমি অবশ্যই বলবে না, কিন্তু সেই সত্য বা মিথ্যার সাথে ড. হাইম হাইকেলের সর্ম্পক কি?’ অপার বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল ড. আয়াজ ইয়াহুদ।
‘সেই সত্যের জগতে প্রবেশের তিনিই আমার কাছে এখন একমাত্র সিংহদ্বার। বলেছিল আহমদ মুসা।
ভ্রুকুঁচকাল ড. আয়াজ ইয়াহুদ। অবাক বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেছে নুমা ইয়াহুদের দুচোখ।
কথা যেন হারিয়ে গেছে ড. আয়াজ ইয়াহুদের মুখ থেকে। সে বুঝতে পারছে ড. হাইম হাইকেল তাহলে এমন তথ্য জানে যা মিথ্যার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে দেবে। যুবকটি এই তথ্যের জন্যেই তাহলে ড. হাইম হাইকেলকে খুঁজছে। কিন্তু কি এমন তথ্য ওটা। হঠাৎ তার মনে হল ড. হাইম হাইকেলের জীবনের যে পরিবর্তন তার সাথে এই সত্য বা মিথ্যার কি যোগ আছে? অবশেষে এই প্রশ্নই করল আহমদ মুসাকে, ‘বৎস, তুমি আমার ছাত্রের মতো, ছেলের মতো। বলত, ড. হাইম হাইকেলের জীবনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সাথে তোমার কথিত ঐ সত্য বা মিথ্যার কোন সর্ম্পক আছে কি?’
‘এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ায় কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু দুঃখিত, আমি বিষয়টা সত্যই জানি না।’
আহমদ মুসা থামতেই নুমা ইয়াহুদ বলে উঠল, ‘সেই সত্যটা আপনি না বলুন, কিন্তু সেই সত্যের সাথে আপনার সর্ম্পক কি? না হাতেম তাই-এর মত নিছকই জনসেবা এটা?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘নুমা জনসেবা আসলে আত্নসেবাই। কারণ জনের উপকার নিজেরও উপকার আসে। উপকারের রূপ এক নয়, বহু।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ‘বাই’ বলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।
চলতে শুরু করল।
পেছন থেকে নুমা বলেছিল,‘মি. ……………… সেই জনের মধ্যে কিন্তু ‘নুমা’ও একজন, তার পিতা আছেন এবং মাতাও। সুতরাং ………….।’
‘সুতরা আমার কাজ আপনাদেরই কাজ।’ মুখ না ঘুরিয়ে চলতে চলতেই বলেছিল আহমদ মুসা। নুমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে।
‘ধন্যবাদ।’ বলে নুমা অনেকটা স্বগতোক্তির মত।
আহমদ মুসার কানে কথাটা পৌঁছায় না।
হাঁটা দ্রুত করেছিল আহমদ মুসা। পেছন ফিরে আর তাকায়নি সে। ডা. নিউম্যানের চিন্তা তখন আহমদ মুসার মাথা জুড়ে।
ডা. নিউম্যানের বাসা ‘ইস্ট রিভারে’র পশ্চিম তীরে বিখ্যাত রুজভেল্ট ড্রাইভ-এর একটু পশ্চিমে নিউইয়র্ক হসপিটাল ও কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের মাঝখানে। আহমদ মুসা কার্ল সুজ পার্কের মুখে রুজভেল্ট ড্রাইভে উঠে দক্ষিণে ছুটে চলল।
দুহাত আহমদ মুসার স্টিয়ারিং হুইলে। দৃষ্টি তীরের মত সোজা রাস্তার উপর প্রসারিত। ভাবছে আহমদ মুসা। নিউইয়র্ক এসে এ পর্যন্ত যা পেয়েছে তা কম নয়। কিন্তু ড. হাইম হাইকেলের সন্ধান এখনো পায়নি। কিন্তু তিনি কোথায় থাকতে পারেন তা জানা গেছে। প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবারও সুযোগ হয়েছে। ড. হাইম হাইকেলের বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেছে। এখন ড. নিউম্যানের সহযোগিতায় আরও কিছুটা এগুনো যাবে।
আহমদ মুসার গাড়ি নিউইয়র্ক হাসপাতাল বরাবর এসে পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে নিউইয়র্ক হাসপাতাল ও কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের মাঝের স্ট্রিট ধরে এগিয়ে চলল।
ডা. নিউম্যানের বাড়ি খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হলো না আহমদ মুসার। স্ট্রিট থেকে একটা ছোট বাইলেনের মাথা জুড়ে বাড়িটা।
গাড়ি বারান্দায় গাড়ি পার্ক করেই গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা।
গাড়ি বারান্দা থেকে তিন ধাপের একটা সিঁড়ি পেরোলেই একটা বড় বারান্দা। বারান্দায় উঠলেই সিঁড়ির সোজা সামনে বড় দরজার একটা গেট। দরজার এক পাশে কলিং বক্স। সুইচ টিপল কলিং বক্সের।

‘ধন্যবাদ মি.জন ফ্রাংক, লিসাকে ঠিক শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু বালকটির কি খবর?’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
দানিয়েল ডেভিড আজর ওয়াইজম্যানের অন্যতম দক্ষিণ হস্ত। আজর ওয়াইজম্যান ওয়াশিংটন যাবার পর নিউইয়র্কে ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মি’র দায়িত্ব সে পালন করছে।
আর জন ফ্রাংক মার্কিন হাজতে বন্দী জেনারেল শ্যারনের লোক। আন্ডার গ্রাউন্ডে থেকে সেই এখন গোটা পূর্ব আমেরিকার ইহুদী গোয়েন্দা কার্যকম পরিচালনা করছে।
আজর ওয়াইজম্যানের ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মি এবং জেনারেল শ্যারনের ‘গোয়েন্দা আর্মী’ এক লক্ষ্যে এক হয়ে গেছে। লক্ষ্য হলো আমেরিকায় তথা দুনিয়ায় ইহুদীবাদীদের দ্বিতীয় এবং চুড়ান্ত বিপর্যয় ঠেকানো। তারা এক হয়েছে, নিউইয়র্কের লিবার্টি টাওয়ার ও ডেমোক্রেসি টাওয়ার ধ্বংসের প্রকৃত রহস্য যদি দুনিয়াবাসী জানতে পারে, তাহলে শ্যারন ও আজর ওয়াইজম্যানদের পা রাখার জায়গা থাকবে না দুনিয়ার কোথাও।
‘দুঃখিত, আমি নিশ্চিত ছিলাম বালক জুনিয়ার প্যাকার মরে গেছে। কিন্তু খবর পেলাম, সেই শয়তানের বাচ্চা আহত অবস্থায় তাকে কোন হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’ বলল জন ফ্রাংক।
‘এই শয়তানের বাচ্চাটা কোত্থেকে উদয় হলো? ড. জ্যাকবকে সেই বাঁচিয়েছে। লিসাকে সন্ধান করে হাত করেছিল আমাদেরকে খুঁজে বের করার জন্য। আজ বালককেও সেই বাঁচাল। নিশ্চিত যে, সে বালকের মাধ্যমে আমাদের সন্ধান লাভের চেষ্টা করবে।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘সে আশার গুড়ে বালি। বালকটি আমাদের কিছুই জানে না। একটা হোম সার্ভিসে সে কাজ করত। সেখান থেকেই তাকে রিক্রুট করেছি। তার কাজের ফাঁকে আমাদের কাজ করে দিত।’ বলল জন ফ্রাংক।
‘তার বাড়ি কোথায়? তাকে পাওয়া প্রয়োজন।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘দরকার হয়নি তার ঠিকানার আর তাই সেটা আমরা জোগাড়ও করিনি।’ বলল জন ফ্রাংক।
‘আজ কিন্তু ভীষণ দরকার হয়ে পড়েছে। আপাতত সেই হাসপাতাল খোঁজার নির্দেশ দিন। তারপর কান টানলে মাথা এসে যাবে। আমাদের কিছু কাজের সে সাক্ষী। লিসার মতই তাকে মরতে হবে।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘আমাদের লোকেরা ইতিমধ্য সে কাজে লেগে গেছে।’ বলল জন ফ্রাংক।
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘আমি মনে করি ঐ বালক এখন বিষয় নয়। আমাদেরকে ঐ লোকটিকে খুঁজে পাবে, এ ভয়ও আমাদের এখনকার বিষয় নয়। এখন তাকে আমাদের খোঁজা দরকার। কোত্থেকে কেন সে ড. হাইম হাইকেলের খোঁজে এসেছে। স্পুটনিকের লোকেরা মুক্ত হবার পর এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো এ বিষয়টির সাথে আহমদ মুসা জড়িত হয়ে পড়েছে।’
নড়ে-চড়ে সোজা হয়ে বসল দানিয়েল ডেভিড। বলল, ‘ঠিক বলেছেন মি. ফ্রাংক। টুইনটাওয়ার সংক্রান্ত দলিল স্পুটনিকের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর তারা ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে সবচেয়ে বেশি হন্য হয়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক। নতুন দলিলের জন্য ড. হাইম হাইকেলকে তাদের চাই-ই। আপনি ঠিকই বলেছেন এই লোকটিকে অবশ্যই আমাদের খুঁজে পেতে হবে। শুধু ড. হাইম হাইকেলকে আড়ালে রাখলে চলবে না, তাদেরকে ড. হাইম হাইকেল পর্যন্ত পৌঁছার সব পথই বন্ধ করতে হবে, সেদিকে যাবার সব উদ্যোগকেই বানচাল করে দিতে হবে।’
‘কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে কোথায়। নিশ্চয় কোন হোটেলেই উঠেছে সে।’ বলল, জন ফ্রাংক।
কথা শেষ করেই হঠাৎ পরম কিছু পেয়ে যাবার মত আনন্দে ‘ইউরেকা, ইউরেকা’ বলে চিৎকার করে উঠল, ‘লিসার মোবাইলে নিশ্চয় লোকটার টেলিফোন নাম্বার পাওয়া যাবে। লিসা অবশ্যই তার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করত।’
তার কথা শেষ হবার আগেই সে পকেট থেকে লিসার মোবাইলটা বের আনল। মোবাইল থেকে লিসার কল সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই তার চোখে-মুখে হতাশার অন্ধকার নেমে এল। মোবাইলের কল লগের ‘ডায়ালড’ ও রিসিভড’ সেকশনে কোন নাম্বারই এন্ট্রি নেই। তার মানে কল আসা বা কল করার পরপরই ইরেজ করে ফেলা হতো। আর মোবাইলের ফোন বুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ বারোজনের নাম্বার ছাড়া আর কোন নাম্বার নেই।
‘মেয়েটি সাংঘাতিক ধড়িবাজ ছিল।’ বিরক্তির সাথে বলল জন ফ্রাংক।
‘থাক মরা মানুষের পিন্ডিপাত করে কোন লাভ হবে না। এখন বলুন, আমরা এগুবো কোন পথে। লোকটিকে পেতেই হবে।’
মোবাইল বেজে উঠল দানিয়েল ডেভিডের।
মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রীনে কল নাম্বারের দিকে চোখ পড়তেই তার চোখে-মুখে একটা আড়ষ্ঠতা ও সমীহের ভাব ফুটে ঊঠল। ত্বরিত সে জন ফ্রাংকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এক্সলেন্সি আজর ওয়াইজম্যানের টেলিফোন।’
কথা শেষ করেই কল ওপেন করে বলে উঠল, ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি।’
‘শোন, নিউইয়র্কের গোটা বিষয় ভেবে দেখলাম। যা ঘটেছে খুব বড় ঘটনা। মনে হচ্ছে ঘটনা আরও বড় কিছুর দিকে এগুচ্ছে। ডবল এইচ (হাইম হাইকেল) আমাদের জন্যে দোজখের এক দরজার মত হয়ে উঠেছে। তাকে কেউ খোঁজ করা মানে আমাদের ভাগ্যে আগুন লাগাবার চেষ্টা। সুতারাং এই চেষ্টাকে যে কোন মূল্যে বানচাল করতে হবে।’ ওপার থেকে বলল আজর ওয়াজম্যান।
‘এক্সিলেন্সি আমরাও এখন এ বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করছিলাম। লোকটাকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে আমরা এখন সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘ধন্যবাদ। কিন্তু লোকটাকে তোমরা কেউ দেখেছ? ওপ্রান্ত থেকে বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘আমি আজ এক ঝলক দেখেছি গাড়ি থেকে। আমেরিকান নয়।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘এই খবরটাই তো ভয়ের। বড় শয়তানটা মানে আহমদ মুসা সাও তোরাহ থেকে এত তাড়াতাড়ি নিউইয়র্কে চলে আসবে তা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এক বা একাধিক লোক এসেছে তাতো দেখাই যাচ্ছে এবং এ পর্যন্ত সে কার্যকরভাবেই সামনেই এগিয়েছে। এখনিই তাদের গতিরোধ করতেই হবে।
‘এক্সিলেন্সি সে আমাদের জালের বাইরে কিছুই করতে পারেনি। সে প্রতিপদেই বাধা পেয়েছে। ডবল এইচ সম্পর্কে কোন তথ্যই সে কারো কাছ থেকে পায়নি। যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে তার ফলেই কারও কাছ থেকে সে সহযোগিতা পাচ্ছে না।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘আরেকটা কথা আমি ভাবছি, এই লোকটা ডবল এইচ সম্পর্কে তার প্রয়োজনীয় খবরাদি না পেলে তার বাড়ি পর্যন্ত ছুটতে পারে। লোকটা ডবল এইচের বাড়ি যাওয়া আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। আমরা পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তার নিরুদ্দেশ হওয়া, পুলিশ তার সন্ধানের চেষ্টা করছে, ইত্যাদি বলে তাদের থামিয়ে রেখেছি। তারাও এখানে-সেখানে কিছু দৌড়া-দৌড়ি করে এখন চুপ হয়ে গেছে। ডবল এইচ-এর ছেলে লেখাপড়ার জন্য বাইরে থাকায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে। এই অবস্থায় লোকটা যদি ডবল এইচের বাড়ি যায়, তাহলে ব্যাপারটা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। এজন্য লোকটা কিংবা বাইরের কেউই যাতে ডবল এইচের বাড়ি যেতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
থামল আজর ওয়াইজম্যান।
সে থামতেই দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল, ‘এক্সিলেন্সি। আপনি জানেন, আমরা ফিলাডেলাফিয়ার আমাদের স্টেশনে এ ব্যাপারে আগেই বলেছি। ডবল এইচের বাড়িতে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থা হিসাবে ডবল এইচের ফ্যামিলির সাথে ঘনিষ্ট একটি মেয়ে, যে আমাদের লোক, বাড়ির ভেতরের সবকিছু উপর চোখ রাখছে। সুতরাং আমাদের চোখ এড়িয়ে বাইরের কেউ সেখানে গিয়ে কিছু করতে পারবে না।’
‘ধন্যবাদ। এ সম্পর্কে দ্বিতীয় বিষয় হলো, আমরা বাইরের লোককে আটকাতে সফল নাও হতে পারি। সেক্ষেত্রে পরিবারটি যাতে আমাদের মুঠোর বাইরে না যায় সেজন্য ডবল এইচের সাথে তার পরিবারের কৌশলগত একটা সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যপারে কি করতে হবে, পরিবারকে কি বলতে হবে, এ ব্যপারে ডিটেল নোট আমি ‘ই-মেইল-এ’ পাঠাচ্ছি।’
‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি। আমরা আপনার ‘ই-মেইল’-এর অপেক্ষা করছি।’
কথা শেষে মোবাইল অফ করে দিয়ে দানিয়েল ডেভিড তাকাল জন ফ্রাংকের দিকে। বলল, ‘মি. ফ্রাংক মনে হচ্ছে আমাদের কাউকে ফিলাডেলফিয়ায় যেতে হতে পারে। আমরা শিঘ্রই এক্সিলেন্সির কাছ থেকেই ই-মেইল পাব, তারপর এ ব্যপারে বিস্তারিত জানতে পারব। আর এ দিকে লোকটাকে পাকড়ও করার কাজকে নাম্বার ওয়ান গুরুত্ব দিতে হবে।’
কথা বলতে যাচ্ছিল দানিয়েল ডেভিড।
বেজে উঠল কলিং বেল।
থেমে গেল দানিয়েল ডেভিড।
জন ফ্রাংক এগুলো রিসিভিং বক্সের দিকে। বাইরের কলিং বেল ‘টিভি ক্যামেরা সজ্জিত ইন্টারকম সিস্টেম। এর মাধ্যমে ভেতর থেকে কলারের ছবিও দেখা যায়, জবাবও দেয়া যায়।
রিসিভারের সুইচ অন করতেই স্ক্রীনে একটা ছবি ভেসে উঠল। অপরিচিত। আমেরিকানও নয়। ভ্রুকুঁচকালো সে। হঠাৎ তার মনে হলো, ক’ঘন্টা আগে বালক জুনিয়ার প্যাকারের সাথে এই লোকটিকেই সে দেখেছিল কি! এক ঝলক দেখা চেহারা তার মনে নেই। কিন্তু এই নীল ব্লেজার ও কালো প্যান্টই সে দেখেছিল। এটা একটা ‘রিয়ার কম্বিনেশন’ বলে তার মনে আছে এই রংয়ের কথা। পরিচয়ের ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চিত হতেই বিস্ময় ও আনন্দ দুই-ই তাকে ঘিরে ধরল। আনন্দ এই কারণে যে, আকাঙ্ক্ষিত লোকটা একদম নাকের ডগার সামনে। আর বিস্ময়ের কারণ হলো, লোকটা এখানে কেন? তাদের উপস্থিতির কথা জেনে কি এসেছে! কিন্তু কি করে হয়, এটা তো একটা বিখ্যাত ডাক্তারের বাড়ি। মাত্র আজই যে এই ডাক্তারকে এখান থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে তারা এ বাড়িতে এসেছে, একথা অন্য কারো জানার কথা নয়। তাহলে কি সে ডাক্তারের কাছে এসেছে? এটা স্বাভাবিক।
এসব ভাবতে ভাবতেই জন ফ্রাংক সরে এল দানিয়েল ডেভিডের কাছে।
দানিয়েল ডেভিড বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিল জন ফ্রাংকের দিকে। জন ফ্রাংকের ভাবনা ও বিস্ময় জড়িত চেহারা দানিয়েলের নজর এড়ায়নি।
জন ফ্রাংক ফিরে এসে সব কথা খুলে বলল দানিয়েলকে। দানিয়েলের মুখও বিস্ময় ও আনন্দে ছেয়ে গেল। সে আনন্দ-উৎসাহে বলে উঠল, ঈশ্বর আমাদের সহায় হয়েছেন। শিকারকে দোর গোড়ায় এনে দিয়েছেন।
বলেই সে ছুটল কল-রিসিভারের দিকে। এক ঝলক দেখেই সে এসে জড়িয়ে ধরল জন ফ্রাংককে। বলল, আমার চোখ যদি ভুল না দেখে তাহলে বলছি, ইনিই আহমদ মুসা।’
কথা শেষ করে একটা দম নিয়ে জন ফ্রাংকের কথা বলার চেষ্টাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘একে এখানে আটকাতে হবে।’
বলে সে ত্বরিত গুছিয়ে নেয়া একটা প্লান সম্পর্কে জন ফ্রাংকে কানে কানে বলল।
প্ল্যান শুনে জন ফ্রাংকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল,‘ধন্যবাদ আপনাকে। একেবারে ধন্বন্তরী প্লান। কিন্তু যা শুনেছি, তাতে আহমদ মুসার মত লোককে কি এভাবে আটকানো যাবে?’
কথা শেষ করেই জনফ্রাংক ছুটল কল রিসিভারের দিকে। এ সময় কলিং বেল আবার বেজে উঠল।
রিসিভার অন করাই ছিল। জনফ্রাংক বলে উঠল, ‘স্যরি আমি টয়লেটে ছিলাম। ডাক্তার সাহেবও ওদিকের বারান্দায়। বলুন আপনি কে, কি চাই?’
জন ফ্রাংকের সন্দেহ ঠিক। ও প্রান্তের লোকটিকেই জন ফ্রাংক বালক জুনিয়র প্যাকারের সাথে দেখেছিল। কিছুটা ছদ্মবেশ থাকলেও আহমদ মুসা হিসাবে তাকে চেনা অসম্ভব ছিল না।
আহমদ মুসার ঠোঁটে রহস্যময় এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছিল। বলল সে জন ফ্রাংকের প্রশ্নের উত্তরে, ‘আমি ডা. নিউম্যানের সাথে দেখা করতে এসেছি।’
জন ফ্রাংকের ঠোঁটেও ফুটে উঠল রহস্যময় হাসি। বলল, ‘ওয়েলকাম। আমি ডা. নিউম্যানের একজন এ্যাসিটেন্ট। আমি গেটলক খুলে দিচ্ছি ঢুকেই ডান পাশের কক্ষটায় বসুন। স্যারকে বলে আসছি।
খট করে অফ হয়ে গেল কল বক্সের কানেকশান। আর সাথে সাথেই ক্লিক করে খুলে গেল দরজার লক।
দরজা খুলতেই একটা প্রশস্ত করিডোর। শুরুতেই বাম পাশে একটা দরজা এবং ডান পাশে একটা দরজা।
আহমদ মুসা ডান দিকের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ঘরটির ভেতরে নজর পড়তেই বুঝল, ডাক্তারের রোগী দেখার ঘর।
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে চারদিকটা দেখতে লাগল। আহমদ মুসা পশ্চিম দরজা দিয়ে ঢুকেছে। ঘরে আর একটি দরজা আছে উত্তর দিকে।
ডাক্তারের টেবিলটা উত্তর দরজা দিয়ে ঢুকেই পুব পাশে। ডাক্তারের বড় টেবিলটার সামনে তিনটা চেয়ার। ডাক্তার বসেন দক্ষিণমুখী, আর তার দর্শনার্থী বা রোগীরা তার সামনে উত্তরমুখী হয়ে বসেন।
আহমদ মুসা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখছিল।
উত্তর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল একজন লোক।
ব্যায়াম-পুষ্ট সুঠাম দেহের লোক। সে ঘরে ঢুকে কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে হাসিমুখে আহমদ মুসার দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়াল।
লোকটির মুখে হাসি ফুটে উঠল বটে, কিন্তু হাসির নিচে হিংসার কালো রেখাটা দেখা যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক করল।
‘স্যার আমি জন ফ্রাংক। ডাক্তারের এ্যাটেনডেন্ট।’ তারপর চেয়ার দেখিয়ে আহমদ মুসাকে বসতে বলল।
আহমদ মুসা বসতে যাচ্ছিল ডাক্তারের টেবিলের সামনের চেয়ারে।
আহমদ মুসা যখন চেয়ারে বসছিল, তখন জন ফ্রাংক ঘরের পশ্চিম প্রান্তের দিকে এগিয়ে পশ্চিমের দরজাটা, যে দরজা দিয়ে আহমদ মুসা প্রবেশ করেছিল, সেটা খুলে পাল্লার হুক লাগিয়ে দিল। দরজাটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে দেখল।
আহমদ মুসাকে ফিরে তাকাতে দেখে জন ফ্রাংক বলল, ‘ঘরটা অনেক্ষণ বন্ধ আছে, একটু ফ্রেস বাতাস আসুক স্যার।’
আহমদ মুসার চোখে নতুন সিদ্ধান্তের আলো জ্বল জ্বল করছিল। সেটা আরও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল।
জন ফ্রাংক আহমদ মুসার বাম পাশের টেবিলের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
তার ডান হাতটা তার কোটের পকেটে।
জন ফ্রাংক দাঁড়িয়েই বলে উঠল, ‘এখনি ডাক্তার স্যার এসে পড়বেন।’
আহমদ মুসা জন ফ্রাংককে ধন্যবাদ দিয়ে সামনের দিকে মনোযেগী হলো। টেবিল-জোড়া কাঁচটা বিশেষভাবে তৈরি সাদা কার্পেটের উপর রাখা।
হঠাৎ টেবিলের কাঁচের মধ্যে সরু পাতলা সাপের মত একটা ছায়াকে লাফিয়ে উঠতে দেখল আহমদ মুসা।
দৃশ্যটি আহমদ মুসার চোখে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার মাথাটা নিচু হয়ে ডান দিকে তীব্র গতিতে ছুটে গেল। ডান পাশের চেয়ার এবং নিজের বসা থাকা চেয়ার নিয়ে সে পড়ে গেল মেঝেতে।
তার সাথে নাইলনের একটা ফাঁস টেবিলের উপর পড়ে গড়িয়ে গেল নিচে। নাইলনের ফাঁসের গোড়ার প্রান্তটি ধরে দাঁড়িয়েছে দানিয়েল ডেভিড পশ্চিম প্রান্তের খোলা দরজায়।
আহমদ মুসা পড়ে যাবার সাথে সাথেই উল্টে নিয়েছে শরীরটা। তার ফলে দেহের পায়ের দিকটা পড়ল দক্ষিণ দিকে এবং মাথা উত্তর দিকে। এবার ফাঁস হাতে নিয়ে পশ্চিম দরজায় দাঁড়ানো দানিয়েল ডেভিডকে দেখতে পেল আহমদ মুসা। দেখল দ্রুত সে পকেটের দিকে হাত নিচ্ছে।
আহমদ মুসা দেহটাকে ঘুরিয়ে নিয়েই পকেট থেকে রিভলবার বের করে এনেছিল। আহমদ মুসা কোন সুযোগ দিতে চাইল না ফাঁস ওয়ালাকে। শুয়ে থেকেই তার রিভলবার ঘুরিয়ে নিয়ে দ্রুত গুলী ছুড়ল এবং সেই সাথেই রিভলবার ঘুরিয়ে নিল জন ফ্রাংকের দিকে।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল জন ফ্রাংক। কিন্তু দানিয়েল ডেভিডকে গুলী করা দেখে সে সম্বিত ফিরে পেল এবং দ্রুত পকেট থেকে রিভলবার বের করল। কিন্তু ততক্ষণে রিভলবার ঘুরিয়ে নেয়া হয়ে গেছে আহমদ মুসার।
রিভলবার ঘুরিয়ে নিয়েই গুলী করেছে আহমদ মুসা। গুলী গিয়ে বিদ্ধ হলো জন ফ্রাংকের রিভলবার ধরে রাখা হাতের মুঠোয়।
রিভলবার ছিটকে পড়ে গেল জন ফ্রাংকের হাত থেকে। জন ফ্রাংক আর্তনাদ করে উঠে বাম হাত দিয়ে ডান হাতের মুঠোটা চেপে ধরল।
আর ওদিকে বুকে গুলী বিদ্ধ দানিয়েল ডেভিডের দেহটা আছড়ে পড়েছিল দক্ষিণের দেয়ালের উপর। তার দেহের পেছন দিকটা মেঝেয় আর মাথার দিকটা দরজার পাশে দুদেয়ালের কোণে ঠেস দেয়ার মত আটকে গেছে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং কুড়িয়ে নিল জন ফ্রাংকের রিভলবারটা। তারপর গিয়েই দাড়াল জন ফ্রাংকের মখের দিকে। বলল, ‘ফাঁসে আটকে ফেলে বন্দী করতে চেয়েছিলে না? আজোরসের হারতা দ্বীপেও তোমাদেরকে ফাঁস ব্যবহার করতে দেখেছি। সাগর- মহাসাগর জুড়ে লুট-তরাজ ও দস্যুতার রেকর্ড সৃষ্টিকারী পূর্ব পুরুষদের সনাতন যুদ্ধ-মানসিকতায় ফিরে যাচ্ছ নাকি তোমরা?’
বলে আহমদ মুসা রিভলবারের নল দিয়ে জন ফ্রাংকের নিচু করে রাখা মুখটাকে উঁচু করে তুলল। বলল, অপরাধীরা অপরাধ করলে তার একটা চিহ্ন রেখেই যায়। তোমরা কলিং ইন্টারকমের রিসিভার অন করে রেখেই শলা-পরামর্শ করেছিলে। শুনতে একটু কষ্ট হয়েছে, কিন্তু শুনতে পেয়েছি সব।’
আহমদ মুসা একটু থামল।
কঠোর হয়ে উঠল তার চেহারা। বলল, ‘ডা. নিউম্যান কোথায়?’
‘এখান থেকে চলে গেছে।’ বলল জন ফ্রাংক।
‘সেটা আগেই বুঝতে পেরেছি। আমি জিজ্ঞাসা করছি কোথায় গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপাতত ওয়াশিংটন গেছে, তারপর কোথায় যাবেন জানি না।’ বলল জন ফ্রাংক।
‘তাহলে তোমাদের নেতা আজর ওয়াইজম্যান ওয়াশিংটনেই আছে?’
জন ফ্রাংক আহমদ মুসার এ প্রশ্নের কোন জবাব দিল না।
‘যাক। এ প্রশ্নের জবাব আমার প্রয়োজন নেই। এখন বল, ড. হাইম হাইকেলকে তোমরা কোথায় রেখেছ?’ ধীর শান্ত শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
চমকে উঠে জন ফ্রাংক তাকাল আহমদ মুসার দিকে। চোখের দৃষ্টিতে টই-টুম্বর হিংস্রতা। কোন জবাব দিল না সে।
‘এই প্রশ্নের জবাব আমার প্রয়োজন মি. ফ্রাংক।’ বলে আহমদ মুসা তার রিভলবার তাক করল ফ্রাংকের চোখ বরাবর। বলল, ‘এখুনি জবাব না পেলে গুলী করব।’
কিন্তু লোকটি পাথরের মত নিরব রইল।
আহমদ মুসা তার রিভলবারের নল লোকটির বাম কানের বরাবর সরিয়ে আনল।
ঠিক এই সময়ই রিভলবারের সেফটি ক্যাচ তোলার শব্দ এল পেছন থেকে।
শব্দটি তার কান স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা জন ফ্রাকের সামনে চোখের পলকে এক ধাপ সরে গেল।
সঙ্গে সঙ্গেই একটা গুলী এসে জন ফ্রাংকের বুক বিদ্ধ করল।
দানিয়েল ডেভিড বুকে গুলী খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু গুলীটা তার হৃদপিন্ডকে মাঝামাঝি বিদ্ধ না করে একটু পাশ দিয়ে যাওয়ায় সে মরেনি তখনও। মরিয়া দানিয়েল ডেভিড একটা মহাসুযোগের সদ্ব্যব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেফটি কাচের শব্দ ও আহমদ মুসার বিপদ আঁচের অদ্ভুত শক্তি ও ক্ষীপ্রতা তাকে সফল হতে দিল না।
কিন্তু যখন সে দেখল তার গুলী বুমেরাং হয়েছে, হত্যা করেছে জন ফ্রাংকেই, তখন সে শিথিল, কম্পিত দুহাতে তার রিভলবার আবার তুলছিল সর্বশক্তি ব্যয় করে।
এ যাত্রায়ও সে সফল হলো না। আহমদ মুসা তার আগেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং তার রিভলবারও উঠে এসেছিল তাকে তাক করে। গুলী করতে আহমদ মুসার কষ্ট হচ্ছিল। ওদের অন্ততঃ একজনকে সে জীবন্ত চেয়েছিল কথা বের করার জন্য। কিন্তু গুলী না করে তার আর উপায় ছিল না। এক গুলী দিয়ে দুহাতকে নিস্ক্রিয় করার চেষ্টার মধ্যে ঝুঁকি আছে। সে ঝুঁকি আহমদ মুসা নিতে চায়নি।
আহমদ মুসার গুলী এবার দানিয়েল ডেভিডের মাথাকেই গুঁড়িয়ে দিল।
দুলাশের দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে আহমদ মুসা পাশের চেয়ারটায় একটু বসল। ওদের কাউকে এখন পর্যন্ত জীবন্ত পাওয়া গেল না। আসল লক্ষ্য হল ড হাইম হাইকেলের সন্ধান লাভ, সেটারই কোন অগ্রগতি এখনও হলো না।
একটু রেস্ট নিয়ে উঠে আহমদ মুসা মৃত দুজনকেই সার্চ করল, তারপর সার্চ করল গোটা বাড়িটা। কিন্তু প্রয়োজনীয় এমন কিছু পেল না। একটা বিষয়ে আহমদ মুসার বিস্ময় লাগল, ওরা ডা. নিউম্যানকে সরিয়ে দিল কেন? এটা কি ওদের সতর্কতা না ওরা জানতে পেরেছে যে, ডা. নিউম্যানের ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে!
বাড়িটা থেকে শূন্য হাতে বের হতে হতে আহমদ মুসা ভাবল ড. হাইম হাইকেল সম্পর্কে জানার জন্যে সামনে একটা অবলম্বই দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো ড. হাইম হাইকেলের পরিবার তার সাহায্য করতে পারে। আবার তাদের দিয়ে পথও বের করা যেতে পারে। কারণ তাদের সহযোগিতা করতে পুলিশ, সরকার, সবাই বাধ্য।
সুতারাং আহমদ মুসার নেক্সট ইনভেস্টিগেশন ফিলাডেলফিয়া, ড. হাইম হাইকেলের বাড়ি।

ফিলাডেলফিয়া এয়ারপোর্ট থেকে তীরবেগে ছুটে আসছে একটা কার। দিলাওয়ার এভেনিউতে প্রবেশ করে গাড়ি দিলাওয়ার নদী তীর ধরে ছুটে চলছে। দিলাওয়ার এভেনিউ থেকে গাড়িটি লম্বার্ড স্ট্রিটে প্রবেশ করে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল। সেন্ট পিটার্স চার্চ বরাবর এসে গাড়িটি প্রবেশ করল থার্ড স্ট্রিটে। চার্চ পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে গাড়িটা স্ট্রিট থেকে নেমে লাল পাথরে বাধা প্রাইভেট রাস্তা একশ গজের মত চলার পর গাড়িটা বিশাল এক বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
পুরানো মডেলের নতুন বাড়ি। বাড়িটি ষোড়শ শতকের তৈরি। ফিলাডেলফিয়ার এই এলাকা একটি ইউরোপীয় বসতি। বৃটিশ সম্রাট দ্বিতীয় চার্লস কর্তৃক নিয়োজিত প্রথম বৃটিশ গভর্নর উইলিয়াম পেম এই দিলাওয়ার উপকূলে ল্যান্ড করার পরই এই বসতি স্থাপিত হয়। এই এলাকার শত শত বাড়ি এখনও সেই আগের মডেলেই বিদ্যামান। চারশ’ বছরের পুরানো বাড়িগুলো সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু আকার-আঙ্গিকে হাত দেয়া হয়নি। ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষার জন্য মডেল, স্টাইল হুবহু রক্ষা করা হয়েছে।
যে বাড়িটার সামনে গাড়িটা গিয়ে দাঁড়াল, সে বাড়িটাও এই শত শত বাড়ির একটি। কিন্তু বাড়িটার আরেকটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আমেরিকার বিখ্যাত ইহুদী ব্যক্তিত্ত্ব হাইম সলমনের বাড়ি এটা। অতুল বিত্তের অধিকারী এই হাইম সলমন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সমুদয় অর্থ তুলে দিয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের তহবিলে। স্বাধীনতা উত্তর আমেরিকার সরকার গঠন ও পরিচালনা এবং শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে হাইম সলমন। সুতারাং এই বাড়িটা ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান এবং পরিবারটাও পরম শ্রদ্ধাস্পদ।
গাড়িটা গেটের সামনে দাঁড়াতেই গেট বক্স থেকে সিকিউরিটি ছুটে এসে গেটের দরজা খুলে দিল।
গাড়ি লাল পাথরের রাস্তা ধরে সুন্দর ফুল-বাগানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে প্রশস্ত গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নামল সুদর্শন, বুদ্ধিদীপ্ত এক তরুন। হাতে ছোট্ট একটা হ্যান্ড ব্যাগ। এক দৌড়ে সে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল বারান্দায়। বাড়িতে প্রবেশের দরজার মুখোমুখি হতে দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে হাসি মুখে এক তরুণী। দরজা খুলেই তরুণীটি তরুণকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘হাই বেঞ্জামিন।’
‘হাই ব্রাউন। তুমি! এখন, এখানে তোমাকে দেখব ভাবতেই পারছি না।’ বলল বেঞ্জামিন।’
বেঞ্জামিনের পুরো নাম হাইম বেঞ্জামিন। হাইম হাইকেলের ছেলে এবং হাইম সলমনের উত্তম পুরুষ। পড়ে রোমের ‘ইউনিভার্সিটি অব থিয়োলজী’তে। সে ‘কম্পারেটিভ রিলিজিওন’-এর ছাত্র। তার পরীক্ষা ছিল বলে পিতার খবর তাকে জানানো হয়নি। পরীক্ষা শেষে জানতে পেরেই ছুটে এসেছে বাড়িতে।
আর ব্রাউনের পুরো নাম বারবারা ব্রাউন। বেঞ্জামিনদের প্রতিবেশী এক ইহুদী পরিবারের মেয়ে সে। পরিবারটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাইগ্রেট করে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন ছোটবেলা থেকে সহপাঠি ও বন্ধু। বারবানা ব্রাউন এখন ফিলাডেলফিয়া বিশাববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী।
বেঞ্জামিন কথা শেষ করতেই ব্রাউন বলে উঠল, ‘আমি এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। দাদীর সাথে দেখা করতে এলাম। তুমি আসছ শুনলাম। তাই তোমাকে ওয়েলকাম করার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।’
হাসিমুখে কথাগুলো বলল বারবানা ব্রাউন। কিন্তু হাসির মধ্যেও একটা অস্বস্তির প্রকাশ দেখা গেল তার মধ্যে। চোখের কোণায় যেন অপরাধের একটা কালো দাগ।
বারবানা ব্রাউন বেঞ্জামিনের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বলল, দাদীর শরীর খুবই ভেঙে পড়েছে। তিনি উঠতে যাচ্ছিলেন তোমাকে রিসিভ করার জন্যে। আমি তাকে জোর করে শুইয়ে রেখেছি।’
বেঞ্জামিনের কথা শুনতে পেয়েছিল বেঞ্জামিনের দাদী গ্লোরিয়া হাইম।
বেঞ্জামিনের মা মারা গেছে। অনেক বছর হলো। দাদীই বেঞ্জামিনকে মানুষ করেছে। বেঞ্জামিনের পিতা হাইম হাইকেল চাকুরীর কারণে বেশির ভাগ সময় নিউইয়র্কেই থাকত। আর বেঞ্জামিন পড়ত ফিলাডেলাফিয়াতেই। সুতারাং পিতা-মাতা দুজনেরই স্নেহ দাদী বেঞ্জামিনকে দিয়েছে।
বেঞ্জামিন ইটালীর রোমে পড়তে গেলে দাদী গ্লোরিয়া মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়ে। হাইম হাইকেল মাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য নিউইয়র্ক থেকে প্রতি সপ্তাহেই ফিলাডেলফিয়াতে আসত। একদিকে বেঞ্জামিন বিদেশে অন্যদিকে একমাত্র ছেলে হাইম হাইকেল নিরুদ্দেশ। শারীরিকভাবই দারুন ভেঙে পড়েছে গ্লোরিয়া।
বেঞ্জামিন গিয়ে জড়িয়ে ধরল দাদীকে।
বেঞ্জামিন দাদীকে সাত্ত্বনা দিল। বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে দাদী। আব্বার কোন শত্রু থাকতে পারে আমি বিশ্বাস করি না। তাঁর ক্ষতি কে করবে, কেন করবে দাদী?’
‘আমিও তাই ভাবি। কিন্তু কোথায় গেল হাইকেল! তুই রোম যাবার পর কোন উইক এন্ডেই সে ফিলাডেলাফিয়ায় আসা বন্ধ করেনি।’ বলল দাদী।
‘এটা অবশ্যই চিন্তার বিষয় দাদী। কিন্তু এ থেকেই কোন খারাপ চিন্তা আমরা না করলেও পারি। সাধারণ ফর্মালিটির বাইরে তিনি কোথাও থাকতে পারেন। একথা সত্যি দাদী, আব্বার মধ্যে বিস্ময়কর মানসিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ইহুদী ধর্মের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে এসেছেন। দুর্বোধ্য এই পরিবর্তন। পারিবারিক উত্তরাধিকার রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের পদ পরিত্যাগ করে তিনি একাডেমিক একটা ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে নেমে এলেন। সবচেয়ে বড় কথা দাদী, সবকিছু থেকে নিজেকে বিছিন্ন করার একটা প্রবল আত্মমুখী প্রবণতা তার মধ্যে আমি দেখেছি। সুতারাং কোথাও গিয়ে কিছু সময়ের জন্য তিনি আত্মগোপন করতে পারেন।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘বেঞ্জামিন, বয়সের পরিবর্তনের সাথে চিন্তাধারায় যে কোন পরিবর্তন আসতে পারে, তা বিস্ময়কর হতেও পারে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই কারণে হাইকেল তার মায়ের প্রতি, তার পরিবারের প্রতি এতটা অবিচার করবে, তা আমি মেনে নিতে পারছি না।’ বলল দাদী গ্লোরিয়া।
‘এটা ঠিক বলেছ দাদী। আব্বার ইদানিংকালের মানবতাবাদী চিন্তার সাথেও এটা মিলে না। আচ্ছা পুলিশ কি বলছে দাদী?’ জিজ্ঞাসা বেঞ্জামিনের।
‘ফিলাডেলাফিয়ার পুলিশ প্রধান ঘটনার পর আমার কাছে এসেছিল। সমবেদনা প্রকাশ করেছিল। বলেছিল, ‘সকলের সম্মানিত হাইম হাইকেলকে উদ্ধারের সব রকম চেষ্টা তারা করবে। কিন্তু তদন্তের কাজটা চলবে নিউইয়র্ক ভিত্তিক। সব ব্যাপার জানে বিশ্বাবদ্যালয় এবং সেখানকার পুলিশ।’ বলল দাদী।
‘ঠিক আছে দাদী, আমি দুএকদিনের মধ্যেই নিউইয়র্ক যাব।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘ঠিক আছে ভাই। এখন আর কথা নয়। যাও কাপড় ছাড়, ফ্রেশ হও।’ বলল গ্লোরিয়া হাইম।
‘আচ্ছা দাদী, একটু পরে আসছি। তোমার সাথে বসেই চা খাব।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
উঠে দাঁড়াল সে।
উঠে দাঁড়াল বারবারা ব্রাউনও।
‘তুমি এখন চলে যাবে? একটু পরে যাও। এস কথা বলি।’ বারবানা ব্রাউনকে লক্ষ্য করে বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘তোমার এখন রেস্ট প্রয়োজন।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘কথাকে রেস্টের বিকল্প বলছি না। চল।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
হাইম বেঞ্জামিন কাপড় ছেড়ে ফ্রেস হয়ে এসে সোফায় বারবারা ব্রাউনের মুখোমুখি বসল। বলল, ‘আচ্ছা ব্রাউন বলত তুমি কি ভাবছ? আমি বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম,আব্বা নিভৃত জীবনের জন্য কিছু সময়ের জন্য কোথাও হয়তো গেছেন। ধর্ম চিন্তায় যারা গভীরভাবে ডুবে যান, তাদের ক্ষেত্রেই কখনও কখনও এমন ঘটে। কিন্তু এখন দাদীর কথায় মনে হচ্ছে, সত্যি আব্বা এমন দায়িত্বহীন হতে পারেন না। দাদী ও পরিবারের চিন্তাকে বাদ দিয়ে তিনি কোন চিন্তাই গ্রহণ করতে পারেন না।’
বেদনা মিশ্রিত একটা বিব্রতভাব ফুটে উঠেছিল বারবারা ব্রাউনের মুখেও। এই ভাবটা চাপতে চেষ্টা করে বলল বারবারা ব্রাউন, আমি দাদীর সাথে একমত। বড় কিছু ঘটেছে। ভেবে-চিন্তে তোমার সামনে এগুনো দরকার।
‘বড় কিছু একটা কি হতে পারে?’ জিজ্ঞেস করল হাইম বেঞ্জামিন।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না বারবারা ব্রাউন। কি উত্তর দেবে সে! সে নিজেও সবকিছু জানে না। কিন্তু এটুকু জানে যে, আংকেল ড. হাইম হাইকেল বিপদে আছেন। হাইম পরিবারকে তা জানতে দেয়া হবে না। ইহুদীদের স্বার্থেই নাকি এটা প্রয়োজন। আংকেল ড. হাইম হাইকেলের স্বার্থেই নাকি কোন বিদেশীকে, এমনকি অপরিচিত কোন স্বদেশীকেও হাইম পরিবারের সাথে দেখা করতে দেয়া যাবে না কিছুতেই। এই পাহারা দেবার দায়িত্ব তার উপরেও পড়েছে। পরিবারের অজান্তে এটা করতে তার খারাপ লাগছে। সে বুঝতে পারছে না এর মধ্যে ইহুদী স্বার্থের কি আছে, হাইম পরিবারের স্বার্থেরই বা কি আছে! তবু অর্পিত দায়িত্ব তাকে পালন করতে হচ্ছে। হাইম বেঞ্জামিন শুধু তার বন্ধু নয়, তার সব কিছুই সে। কিন্তু তার সাথেও লুকোচুরি খেলতে হচ্ছে তাকে। সত্য কথাটা বলা যাচ্ছে না। এই চিন্তা তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।
চিন্তার টানাপোড়নে বিব্রত বারবারা ব্রাউন উঠে হাইম বেঞ্জামিনের পাশে গিয়ে বসল। তুলে নিল হাইম বেঞ্জামিনের একটা হাত। বলল, ‘বেঞ্জামিন ‘বড় কিছু একটা’ কি আমি জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে আংকেল বড় বিপদে পড়েছেন।’
থামল বারবানা ব্রাউন। একটা দম নিয়ে ভয়ার্ত ফিসফিসে কন্ঠে বলল, ‘আমার মনে হয় তোমাদের পরিবারের উপরও চোখ রাখা হচ্ছে।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো বেঞ্জামিনের। সোজা হয়ে বসল। বারবারা ব্রাউনের দুহাতই সে তার হাতের মুঠোর মধ্যে নিল। বলল, ‘ব্রাউন, সত্যি এটা? কি করে বুঝলে তুমি?’
কথা গুছিয়ে রেখেছিল বারবারা ব্রাউন। বলল, আমাদের কম্যুনিটির বিভিন্ন সূত্র থেকে এটা বলা হচ্ছে। আর গতকাল নিজেও আমি তোমাদের বাসায় একটা টেলিফোন ধরেছি দাদীর নির্দেশে। টেলিফোন যিনি করেছিলেন, কথার উচ্চারণ থেকে বুঝলাম তিনি একজন বিদেশী। তিনি বললেন, মি. হাইম বেঞ্জামিন আগামীকাল ক’টায় পৌঁছাচ্ছেন?’ আমি উত্তরে জিজ্ঞাসা করলাম, কে আপনি? তিনি বললেন, আমি ড. হাইম হাইকেলের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি মি. হাইম বেঞ্জামিন ও তার দাদীর সাথে দেখা করতে চাই।’ আমার বিস্ময় লেগেছে তুমি আজ আসছ এ বিষয়টা একজন বিদেশী নিউইয়র্ক থেকে জানল কি করে? ‘দাদী অসুস্থ, পরে যোগাযোগ করবেন’ বলে আমি তাঁকে এড়িয়ে গেছি।’
ওদিকে হাইম বেঞ্জামিন কিছু বলার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। বারবারা ব্রাউন থামতেই বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘আশ্চর্য, আমি এই দুমিনিট আগে টয়লেট থেকে বেরিয়ে একটা টেলিফোন ধরলাম। টেলিফোনটা তোমার সেই লোকের। ঠিক সেই বিদেশী উচ্চারণ। তোমাকে যা বলেছে আমাকেও তাই বলল। আব্বার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী সে, আমার সাথে দেখা করতে চায়।’
‘অবাক ব্যাপার! তুমি এসেছ এক ঘন্টাও হয়নি, সে জানল কি করে?’ বলল বারবারা ব্রাউন। বিস্ময়ভরা তার কন্ঠে।
হাইম বেঞ্জামিন চিন্তা করছিল। বলল,‘আধুনিক ব্যবস্থায় বিমান বন্দরকে জিজ্ঞাসা করে বা ইন্টারনেট-ই-মেইলের মাধ্যমেও এটা জানা সম্ভব।’
‘আবার বাড়ির উপর চোখ রেখেও জানা সম্ভব।’ বারবারা ব্রাউন বলল।
‘হ্যাঁ, তাও সম্ভব।’ বলল, হাইম বেঞ্জামিন।
‘তুমি কি বলেছ লোকটাকে?’ জিজ্ঞাসা করল বারবারা ব্রাউন।
‘আমি তাকে সময় দিয়েছি। আমি নিউইয়র্ক যাবার আগে তার সাথে আলোচনা করলে ভালোই হবে।’ বলল বেঞ্জামিন।
‘অপরিচিত একজন মানুষ। তার উপর বিদেশী। একজন অপরিচিত বিদেশী কি করে আংকেলের শুভাঙ্ক্ষী হতে পারেন?
হঠাৎ তার সাথে দেখা করা কি ঠিক হবে? তার কোন বদ মতলবও থাকতে পারে।’ বারবারা ব্রাউন বলল।
‘হঠাৎ করে তো দেখা করছি না। আসছেন আগামীকাল। আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় থাকছে।’ বলল বেঞ্জামিন।
কলিংবেল বেজে উঠল।
বারবারা ব্রাউন দৌড়ে গিয়ে কলটা রিসিভ করল। কথা বলল। তারপর ছুটে এল হাইম বেঞ্জামিনের কাছে। বলল, ‘একজন পুলিশ অফিসার এবং নিউইয়র্ক রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর এসেছেন। তোমার সাথে দেখা করবেন।’
হাইম বেঞ্জামিনের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠল। ওরা কি আব্বার সম্পর্কে কোন সুসংবাদ এনেছেন? মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকল হাইম বেঞ্জামিন যেন কোন সুখবর সে পায়।
উঠে দাঁড়াল হাইম বেঞ্জামিন। বলল,‘চল ব্রাউন, ওদের নিয়ে আসি।’
মেহমান দুজনকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে এসে ওরা চারজন ড্রইংরুমে বসল। বেঞ্জামিন ও বারবারা পাশাপাশি এক সোফায় বসল। আর অন্য দুটি সোফায় বসল পুলিশ আফিসার এবং নিউইয়র্ক রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিস।’
হাইম বেঞ্জামিন বসেই মি. ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার, আপনি আসায় খুব খুশি হয়েছি। আমি নিজেই নিউইয়র্ক যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। আমরা খুব উদ্বিগ্ন।’
‘আমরাও নিদারুন দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন। আসলেই এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলার জন্যে আমরা এসেছি।’ বলে একটু থামল ফ্রান্সিস। তারপর পুলিশ অফিসারের দিকে চেয়ে বলল, ‘এসপি সাহবে আপনিই কথাটা শুরু করুন।’
পুলিশ অফিসারের চোখে-মুখে একটা বিব্রতভাব ফুটে উঠল। তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হবার চেষ্টায় নড়ে-চড়ে বসল। বলল, ‘আমি এ্যালেন শেফার। নিউইয়র্কের ইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্ট-এর একজন তদন্তকারী অফিসার। দুঃখের সাথে বলছি, আমরা ড. হাইম হাইকেলকে অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় খুঁজে পেয়েছি। যা বুঝা গেছে তাতে মনে হয়েছে ভীষণ এক ভয়ে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর জীবন প্রচন্ড ঝুঁকির মুখে। এর একটা সত্যতা পাওয়া গেছে, গত কয়েকদিনে রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একজন খুন হয়েছে, দুজনকে খুন করার চেষ্টা করা হয়েছে। ড. হাইকেলের সন্ধানে তাদের হত্যা ও জখম করা হয়। এই আশংকাকে সামনে রেখেই ড. হাইকেলকে খুঁজে পাওয়ার খবরটা প্রকাশ করা হয়নি। আর……………..।’
পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফারের কথার মাঝখানেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘আব্বা এখন কোথায়?’
‘একটা মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে।’ বলল এ্যালেন শেফার।
‘কোন হাসপাতালে?’ জিজ্ঞাসা বারবারা ব্রাউনের।
‘সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ ছাড়া কাউকে বলার অনুমতি নেই। আমিও জানি না ম্যাডাম।’ বলল পুলিশ অফিসার।
‘পরিবারের সদস্যরাও তা জানতে পারবে না?’ জিজ্ঞেস করল হাইম বেঞ্জামিন।
‘পরিবারের সদস্যরা জানতে পারবে না?’ কিন্তু যেতে পারবে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আমরা এসেছি।’ পুলিশ অফিসারটি বলল।
‘বলুন ঘটনা কি?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না পুলিশ অফিসারটি। একটু ভাবল। বোধ হয় কথা গুছিয়ে নিল। তারপর বলতে শুরু করল, ‘ড. হাইম হাইকেল একদিকে অপ্রকৃতিস্থ, অন্যদিকে অদৃশ্য এক প্রবল শত্রু তাকে তাড়া করে ফিরছে। এই অবস্থায় তার যেমন চিকিৎসা দরকার, তেমনি দরকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার। এজন্য তাকে চিকিৎসার জন্য এমন এক জায়গায় রাখা হয়েছে, যা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া কেউ জানে না। আপনাদেরও জানানো যাবে না এই কারণে যে, আপনাদের যাতায়াত বা অন্য কোনভাবে বিষয়টা শত্রুরা জেনে ফেলতে পারে। শত্রুরা ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে আপনাদের উপরও চোখ রেখেছে। তবে সিন্ধান্ত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পুলিশের তত্ত্ববধানে ড. হাইম হাইকেলকে দেখানো হবে তার পরিবারের লোকদের।’
একটা ঢোক গিলল পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফার। থামতে হলো তাকে।
পুলিশ অফিসার থামতেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, আমার দুটি কথা। এক, আপনি বলেছেন হাসপাতালের নাম, ঠিকানা আমাদের জানাবেন না। কিন্তু ওখানে যখন যাব, তখন তা তো জানা হয়েই যাবে। তাহলে নাম, ঠিকানা জানাতে আপত্তি কেন? দুই. আব্বাকে আমাদের দেখানো হবে বলেছেন। দেখানোর অর্থ সাক্ষাত ও কথা বলা নয়। ‘দেখানো হবে’ বলতে আপনি কি অর্থ করেছেন?’
পুলিশ অফিসারটির মুখে একটা অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। বিব্রতও মনে হলো কিছুটা। কিন্তু এরপরও হাসার চেষ্টা করে সে বলল, ‘ড. হাইম হাইকেলের পরিবারকে তার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হবে, দেখানো হবে, কিন্তু সাক্ষাত করানো হবে না। ডাক্তারের নিষেধ। যথেষ্ট সুস্থ না হওয়ায় আত্নীয়-স্বজনের সাথে তাকে সাক্ষাত করানো যাবে না। যে কোন আবেগ উত্তেজনা তার জন্য ক্ষতিকর। এই একই কারণে তাঁকে তাঁর কোন পরিচিতজনের সাথেও সাক্ষাত করানো হচ্ছে না। যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেখানকার নাম- ঠিকানা না জানানোর অর্থ হলো, ড. হাইম হাইকেলের পরিবার সেখানে যাবেন বটে, কিন্তু যাওয়ার রাস্তা এবং যাওয়ার স্থান তাদের দেখতে দেয়া হবে না। শেডে ঢাকা বন্ধ গাড়িতে করে যে ঘরে বসে তারা হাইকেলকে দেখবেন, সেই ঘরে নিয়ে নামিয়ে দেয়া হবে। দেখার পর ঐ ঘর থেকে ঐভাবেই আবার ফিরিয়ে আনা হবে।’
বিরক্তি ফুটে উঠল হাইম বেঞ্জামিনের মুখে। বলল, এত কিছুর আমি কারণ বুঝছি না। ড. হাইম হাইকেলের পরিবারকেও বিশ্বাস করা হবে না কেন? আব্বার শত্রু কে বা কারা, কেন তা আমরা জানতে পারব না?’
পুলিশ অফিসারের মুখে সেই আগের অস্বস্তিভাব আবারও ফুটে উঠল। ম্রিয়মান কন্ঠে বলল, ‘যা করা হচ্ছে সবই ড. হাইম হাইকেলের স্বার্থে।’ বলে একটু থামল পুলিশ অফিসার। তারপর পুনরায় বলা শুরু করল, ‘মুসলিম একটি মৌলবাদী চক্র বিরাট এক ষড়যন্ত্র এঁটেছে ড. হাইকেলকে ঘিরে। ড. হাইম হাইকেল একটি ঐতিহাসিক পরিবারের অত্যন্ত সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাছ থেকে ঐ চক্র একটা কনফেশন আদায় করতে চায় যে কোন মূল্যে। তারপর তাকে হত্যা করতে চায়, যাতে সে কনফেশনের কোন প্রতিবাদ জানানোর কোন সুযোগ না পান।’
পুলিশ অফিসার থামতেই বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘কনফেশনটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কিসের কনফেশন এটা?’
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। তবে এইটুকু জানি যে, জাতীয় মহাগুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনার সাথে এই কনফেশন জড়িত। এই কনফেশন শত্রুর হাতে এমন এক মহাঅস্ত্র তুলে দেবে যা ইতিহাসই পাল্টে দিতে পারে।’ বলল পুলিশ অফিসারটি।
বিস্ময় ও ভীতির ছায়া নেমে এসেছে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউনের চোখে-মুখে। পুলিশ অফিসারটি থামলেও তারা কোন কথা বলতে পারল না। ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন, তার আব্বা কি এমন জানেন বা চাপে পড়ে ভিত্তিহীন কি এমন কনফেশন করতে পারেন যা ইতিহাস পাল্টে দিতে পারে! তার পিতার মানসিক পরিবর্তনের সাথে এই কনফেশন ব্যাপারটার কি কোন সর্ম্পক আছে?
পুলিশ অফিসারই আবার কথা বলে উঠল। বলল, ‘সব কথা আমরা জানি না। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতির স্বার্থে, ড. হাইম হাইকেলের স্বার্থে আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন বলে আমরা সবাই আশা করি।’
ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন। একটু পর বলল, ‘ঠিক আছে মি. এ্যালেন শেফার। আমরা কবে দেখা করতে পারি?’
‘সুবিধা অনুসারে আমাদের পক্ষ থেকেই তা আপনাদের জানানো হবে।’ বলল পুলিশ অফিসার।
হাইম বেঞ্জামিন পাশের ডেস্ক থেকে স্লিপ প্যাডের একটা পাতা নিয়ে এসে পকেট থেকে কলম বের করে পুলিশ অফিসারকে বলল, ‘আপনার অফিস ও বাসার টেলিফোন নাম্বার দিন, যাতে আমরাও যোগাযোগ করতে পারি আপনার সাথে।’
পুলিশ অফিসার কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়ে বাধো বাধো কন্ঠে বলল, ‘আমি অফিসে কখন থাকি, বাসায় কখন থাকি তার কোন স্থিরতা নেই। সুতরাং আমাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে লাভ হবে না। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টরের সাথে যোগাযোগ রাখবেন, তাহলেই হবে।’
কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাইম বেঞ্জামিন তার কাগজ ও কলম রেখে দিতে দিতে বলল, ‘ধন্যবাদ ওঁদের সকলের টেলিফোন আমাদের কাছে আছে।’
হাইম বেঞ্জামিনের কথা শেষ হতেই পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়াল। তার সাথে উঠল নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিস। বলল পুলিশ অফিসার, ‘আমরা দুঃখিত। একেবারে অসময়ে আপনাদের বিরক্ত করেছি। আপনি বাড়িতে ফিরে বোধ হয় একটু রেস্টও নিতে পারেননি।’
‘আমাদের খুশি হবার কথা। আমরা খুশি হয়েছি। আমাদের জন্যেই কষ্ট করে আপনারা এসেছেন। কষ্ট করে আসার জন্য ধন্যবাদ।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফার এবং নিউইয়র্ক রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিসকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন আবার বসল।
কপাল কুঞ্চিত, চোখ আধ-বোজা। ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন।
তার চিন্তায় বাধ সেধে বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘বলেছিলাম না বেঞ্জামিন আংকেল বড় কোন বিপদে পড়েছেন এবং বলেছিলাম যে, তোমাদের বাড়ি ও তোমাদের উপর চোখ রাখা হচ্ছে। দেখলে সবই সত্য প্রমাণ হলো। ওরাও বলে গেল এবং আমিও নিশ্চিত যে, শত্রু পক্ষ তোমাদের বাড়িতে আসবে, তোমাদের সাথে দেখা করারও চেষ্টা করবে।’
‘কেন আসবে আমরা তো কিছুই জানি না।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘এখন তো অনেক কিছুই জানলে’। বারবারা ব্রাউন বলল।
‘আব্বা যখন বিপদগ্রস্থ, তখন সে বিপদ আমাদের স্পর্শ করবেই।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ভেব না বেঞ্জামিন। শত্রুরা তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবে না।’ বারবারা ব্রাউন বলল।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো হাইম বেঞ্জামিনের। বলল, ‘তুমি এতটা নিশ্চিত কেমন করে?’
একটু সংকুচিত ভাব দেখা দিল বারবারা ব্রাউনের চোখে-মুখে। একটু হেসে স্বাভাবিক হয়ে বলল, কেন যারা আংকেলের নিরাপত্তা দিচ্ছেন, তাদের কি দায়িত্ব নয় তোমাদেরকে নিরাপত্তা দেয়া?’
‘এটা যুক্তির কথা, কিন্তু বলেছ নিশ্চিত কথা। যাক। আব্বার অপ্রকৃতিস্থ হবার বিষয়টি আমার মন মেনে নিতে পারছে না। একমাস আগেও আব্বার যে চিঠি পেয়েছি, তাতে তাঁকে সুস্থ শুধু নয়, আরও গভীর ও স্বচ্ছ চিন্তার মনে হয়েছে।’ বলল বেঞ্জামিন।
‘তুমি বলছ এক মাস আগের কথা। কিন্তু বর্তমানকে তো মানতে হবে বেঞ্জামিন।’ বারবারা ব্রাউন বলল।
‘মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। কি করব বুঝতে পারছি না। আব্বার সাথে সাক্ষাত করতে পারবো না, এ কেমন কথা!’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ডাক্তারের কথা তো মানতেই হবে। ডাক্তারের উপর ভরসা করা ছাড়া করার কি আছে!’ বারবারা ব্রাউন বলল।
সেই সাথে বারবারা ব্রাউন সরে বেঞ্জামিনের ঘনিষ্ট হলো। বেঞ্জামিনের কাঁধের উপর হাত রেখে বলল, ‘আবেগ নয়, তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে বেঞ্জামিন। আমার মনে হচ্ছে, বিপর্যয়টাকে যতটা আমরা দেখছি, তার চেয়ে বড়। তোমাকে সবদিক দেখে চলতে হবে।’
‘পরিবারের সবকিছু আব্বাই দেখেছেন, এখন তিনিই বিপদে। খুবই অসহায় বোধ করছি আমি।’ বলল বেঞ্জামিন।
বারবারা ব্রাউন হাত দিয়ে বেঞ্জামিনের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার পাশে থাকব বেঞ্জামিন।’
বেঞ্জামিন কোন কথা বলল না।
মাথাটা সে এলিয়ে দিল বারবারা ব্রাউনের কাঁধে।

দিলাওয়ার নদীর তীরে দিলাওয়ার এভেনিউর ঠিক উপরেই একটা হোটেলে উঠেছে আহমদ মুসা। ইউরোপীয় ট্যুরিস্টের ছদ্মবেশে। সামান্য ছদ্মবেশেই সে একেবারে বদলে গেছে। সুবেশী একজন এ্যাংলো-এশিয়ান ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে তাকে।
দুপুরে সে হোটেলে উঠেছে। গোসল করে খাওয়ার পর একটু রেস্ট নিয়েই আহমদ মুসা বেরিয়েছিল এলাকাটা দেখার জন্যে। সেই সাথে সাথে হাইম বেঞ্জামিনের বাড়িটাও সে দেখে এসেছে।
হোটেলে উঠেই আহমদ মুসা যোগাযোগ করেছে হাইম বেঞ্জামিনের সাথে। বলেছে, ‘আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি, আপনার আব্বার ব্যাপারে আপনার সাথে কিছু আলোচনার জন্যে।’ সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসেনি বেঞ্জামিনের কাছ থেকে। একটু পর বলে, ‘আমরা সিন্ধান্ত নিয়েছি, আমি কিংবা আমাদের পরিবারের কেউ আমার আব্বার ব্যাপার নিয়ে কারও সাথে কথা বলব না।’ আহমদ মুসা উত্তরে এই সিদ্ধান্তের কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল। বেঞ্জামিন বলেছিল, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই বলে। কারও কিছু জানার থাকলে পুলিশের কাছ থেকেই জানা উচিত।’ আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ আমি গত সাতদিনে নিউইয়র্কে সে রকম পুলিশ তালাশ করেছি, যিনি ড. হাইম হাইকেলের সর্ম্পকে কিছু জানেন। কিন্তু এ রকম পুলিশ পাইনি, যে অন্তত; এটুকু বলতে পারে, ড. হাইকেলের লা-পাত্তা হবার তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ধরনের তদন্ত শুরু হয়, সংশ্লিষ্ট লোকের ঘর থেকে। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে শুনেছি, ঘরটি পুলিশের কেউ এখনও দেখেইনি। তাঁকে যদি অসুস্থ বা অপ্রকৃতিস্থ বলা হয়, তাহলেও এর পটভূমির জন্যে তার ঘরের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসের তার ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র ও কাগজপত্রের পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ দরকার হয়। পুলিশ তার কিছুই করেনি। তদন্তের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন পুলিশ অফিসারই পাইনি। সুতরাং যা জানতে চাই, কাকে জিজ্ঞাসা করব?’ আহমদ মুসার এ দীর্ঘ কথার পর সঙ্গে সঙ্গেই বেঞ্জামিন কিছু বলেনি। বোধ হয় ভাবছিল। একটু পরে বলে ওঠে, ‘আপনি নিউইয়র্কের নিউইয়র্কভীল ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফারের কাছে গেছেন? তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।’ শুনেই আহমদ মুসা বলে উঠেছিল, ‘কি নাম বললেন পুলিশ অফিসারের?’ বেঞ্জামিন উত্তরে বলে, ‘এ্যালেন শেফার।’ আহমদ মুসা একটু ভেবে বলেছিল, ‘আমি নিউইয়র্কের নিউইয়র্কভিল ডিস্টিক্টেই রয়েছি। ওখানকার পুলিশ অফিসে আমি খোঁজ-খবর নিয়েছি। ওখানে ১১ জন তদন্তকারী অফিসার আছেন। তার মধ্যে এ্যালেন শেফার নামে কাউকে পাইনি!’ উত্তরে বলেছিল বেঞ্জামিন ‘পাননি! কয়েকদিন আগেই তো আমার সাথে কথা বলে গেল!’ ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছিল আহমদ মুসার। একটু ভেবে নিয়ে সে, বলেছিল, ‘নিউইয়র্কের পুলিশ আপনার এখানে এসেছিল? তার নাম এ্যালেন শেফারই ছিল? ঠিক মনে আছে আপনার?’ হাইম বেঞ্জামিন বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক আছে।’ একটু ভেবে আহমদ মুসা বলেছিল, ‘আমার অনুরোধ, আপনি সময় করে নিউইয়র্ক পুলিশের ওয়েব সাইটে নিউইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্টের পুলিশের লিস্টটা একটু পরীক্ষা করুন। ওখান থেকে টেলিফোন নাম্বার নিয়ে আপনি টেলিফোনও করতে পারেন।’ আহমদ মুসা থামতেই বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘আমি এখনি দেখছি। মিনিট দশেক পরে আপনার সাথে কথা বলব। স্যরি, এখন রাখছি।’ বলেই সে টেলিফোন রেখে দিয়েছিল।
ঠিক দশ মিনিট পর আহমদ মুসা টেলিফোন করার আগে হাইম বেঞ্জামিনই আহমদ মুসাকে টেলিফোন করে। আহমদ মুসা টেলিফোন ধরে হ্যালো বলতেই হাইম বেঞ্জামিন বলতে শুরু করে, ‘স্ট্রেঞ্জ মি. ………….।’
‘আইজ্যাক দানিয়েল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ মি. দানিয়েল, আমি কম্পিউটারের ওয়েব সাইটে চেক করেছি। নিউইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্ট-এ এ্যালেন শেফার নামে কোন পুলিশ নেই। আমি টেলিফোনও করেছিলাম। ওখানকার পুলিশ অফিস জানাল, ঐ নামের কোন পুলিশ অফিসার এখানে নেই। গত তিন বছরের মধ্যে ছিল না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম কোন পুলিশ অফিসার তারা আমাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিল কিনা। তারা পাঠায়নি বলেছে। আপনার কথাই ঠিক। তারা আমার আব্বার অন্তর্দ্ধানের তদন্ত বিষয়ে কোন তদন্ত অফিসারই নিয়োগ করেনি এখনও।’ হাইম বেঞ্জামিন থামলেই আহমদ মুসা বলেছিল, ‘মি.হাইম বেঞ্জামিন আপনার সাথে আমার কথা আছে। আসতে পারি?’ একটু চুপ করে থেকে হাইম বেঞ্জামিন বলেছিল, ‘কি বলব মি. দানিয়েল, বুঝতে পারছি না।’ আহমদ মুসা বলল, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন আমাকে বিশ্বাস করার দরকার নেই। আমার কথা আপনি শুনবেন। আমি একাই এসেছি। একাই আপনার সাথে কথা বলব। আমাকে সার্চ করে ঢুকাবে আপনার সিকিউরিটি। আপনি যে কোন কাউকে সঙ্গে রাখতে পারেন।’ অবশেষে সাক্ষাতের সময় দেয় বেঞ্জামিন।
কাপড়-চোপড় পরেই আহমদ মুসা বসেছিল। বেঞ্জামিনের বাড়িতে যাবার জন্যে ঠিক সন্ধ্যা ৭ টায় উঠে দাঁড়াল।
দরজা খুলল।
দরজা খুলে বাইরে মুখ বাড়াতেই একজন লোকের মুখোমুখি হয়ে গেল। লোকটি যুবক বয়সের এবং লাল শ্বেতাংগ। আহমদ মুসার দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসার মুখোমুখি হতেই লোকটি চমকে উঠল এবং পেছনে ফিরে করিডোর বরাবর হনহন করে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে লোকটির পেছনে হাঁটতে শুরু করল। আহমদ মুসা নিশ্চিত, লোকটি তার ঘরের সন্ধানেই এসেছিল।
সামনেই করিডোরের একটা বাঁক।
লোকটি বাঁক ঘুরে গেল।
আহমদ মুসা দরজা বন্ধ করতে যেয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছিল।
আহমদ মুসাও বাঁক ঘুরল। কিন্তু বাঁক ঘুরে লোকটিকে আর দেখতে পেল না। লিফট রুম সামনে, কিন্তু বেশ একটু দূরে। এত তাড়াতাড়ি সে লিফটে নেমে যেতে অবশ্যই পারেনি। কিন্তু গেল কোথায়? লোকটি তার মতই কি হেটেলের বাসিন্দা? আহমদ মুসার দরজায় তার ঐভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা কি একটা বোকামি? কিন্তু লোকটির চোখ-মুখ দেখে তা মনে হয়নি।
মাথায় এসব ভাবনা নিয়েই আহমদ মুসা লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
এসে গেল লিফটটা।
আহমদ মুসা চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে লিফটে প্রবেশ করল। মনে মনে বলল, এখন ড. হাইম হাইকেলের পরিবারের সদস্যের সাথে কথা বলাই তার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। অন্যদিকে সে নজর দেবে না। সে নিশ্চিত যে, তার ফিলাডেলাফিয়ায় আসা শত্রুর কাছে ধরা পড়ে গেছে। লোকটি তাদের হওয়াটাই ঘটনার সবচেয়ে সংগত ব্যাখ্যা।
আহমদ মুসা হোটেলের সামনে কয়েক ঘন্টার চুক্তিতে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে যাত্রা করল।
আহমদ মুসার গাড়ি দেলোয়ার এভেনিউ থেকে ক্যাথেরিন স্ট্রিটে প্রবেশ করে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল। তারপর পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে প্রবেশ করল থার্ড স্ট্রিটে।
আহমদ মুসার গাড়ি এগিয়ে চলল ঐতিহাসিক ‘সাউথওয়াক’ আবাসিক এলাকার মধ্যে দিয়ে। ষোড়শ শব্দাতীর এ আবাসিক এলাকা। এলাকার বাড়ি ঘরগুলো কাঠামো, ডিজাইন সবই ষোড়শ শতাব্দীর। আধুনিক সংস্কার বাড়িগুলোকে আধুনিক করে তুলেছে। এই আবাসিক এলাকারই একেবারে উত্তর-প্রান্তে ড. হাইম হাইকেলের বাড়ি।
আবাসিক এলাকার রাস্তাগুলো প্রশস্ত। বাড়িগুলো অনেক দূরে দূরে। সব বাড়িই চারদিক থেকে বাগানে সুসজ্জিত। এতে এলাকার শোভা বেড়েছে, কিন্তু চারদিকে একটা শুন-সান নির্জনতা নেমে এসেছে। সন্ধ্যা সাতটাতেই মধ্যরাতের নিরবতা-নির্জনতা এসে জুড়ে বসেছে। কচিৎ দুএকটা গাড়ির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।
আহমদ মুসা একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল, অতীতে ফিরে গিয়েছিল তার মন। ভাবছিল, ষোড়শ শতাব্দীর আগে এই ফিলাডেলফিয়ার কোন অস্তিত্ব ছিল না। অস্তিত্ব ছিল না ইউরোপীয় কোন মানুষের। আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিনয়ানদের ‘দিলওয়ার’ জাতি গোষ্ঠি বাস করত এই ফিলাডেলফিয়া অঞ্চলে। ষোড়শ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে ইউরোপের ডাচরা প্রথমবারের মত এ অঞ্চলে এল। তারপর ১৬৪০ সালের দিকে ইউরোপের সুইডিশরা দিলওয়ার ইন্ডিয়ানদের এই অঞ্চলে এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলল। ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের উপর ইউরোপের সাম্রাজবাদী লোভাতুর দৃষ্টি তীব্র হয়ে উঠল। শুরু হলো এ এলাকার দখল নিয়ে ডাচ, সুইডিশ ও ইংরেজদের মধ্যে ঘোরতর লড়াই। এলাকার আসল মালিক সহজ, সরল দিলওয়ার ইন্ডিয়ানদের ঘরছাড়া করে আগেই হটিয়ে দেয়া হয়েছিল। দখলের লড়াই-এ অবশেষে জিতে যায় বৃটেন। আমেরিকা হয়ে দাঁড়ায় বৃটেনের উপনিবেশ। তারপর……।’
আহমদ মুসার চিন্তা আর এগুতে পারল না। ড্রাইভারের কথায় আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ নেমে এল। ড্রাইভার বলেছিল, ‘স্যার আপনার সাথে আর কেউ আসছে?’
‘না তো! কেন বলছ এ কথা?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘স্যার, ক্যাথেরিন স্ট্রিট থেকে একটা গাড়ি আমাদের পিছে পিছে আসছে। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত আমাদের সমান স্পীডে এসেছে। এখন স্পিড বাড়িয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে।’ বলল ড্রাইভার।
আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখতে পেল একটা গাড়ির হেডলাইড। আহমদ মুসা খুশি হলো ড্রাইভারের উপরে। বলল, ‘ধন্যবাদ ড্রাইভার তোমার সর্তক দৃষ্টির জন্যে। তুমি যে গতিতে গাড়ি চালাচ্ছ, সেই গতি অব্যাহত রাখ! সত্যিই অনুসরণ করে থাকলে দেখা যাক ওরা কারা! পুলিশ তো নয় দেখাই যাচ্ছে।’
‘জি স্যার, পুলিশ নয়।’ বলল ড্রাইভার।
আহমদ মুসা পেছন থেকে দৃষ্টিটা ফিরিয়ে আনল ড্রাইভারের দিকে। বলল, ‘ড্রাইভার, তোমার ইংলিশ উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে, ‘আরবের কোন দেশে তোমার বাড়ি।
‘জি স্যার আমি জর্দানী।’ বলল ড্রাইভার।
‘কতদিন তোমরা আছ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘স্যার, বহুদিন। মাঝখানে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর আমার আব্বা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলন। দেশে গিয়ে আব্বা মারা যান। এখন অবস্থা আগের চেয়ে ভালো বলে এক বছর আগে আমি ফিলাডেলফিয়ায় ফেরত এসেছি।’ বলল ড্রাইভার।
অবস্থা এখন ভালো মনে করছ?’ আহমদ মুসা বলল।
‘জি স্যার। এই সরকারের আগের সরকারের আমল থেকেই অবস্থা ভাল হযেছে। তবে গত এক বছর হলো পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে গেছে। স্যার, এজন্য আমরা আমেরিকার মুসলমানসহ দুনিয়ার সব মুসলমান আহমদ মুসার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি মার্কিন সরকার ও মার্কিন জনগণের চোখ খুলে দিয়েছেন। মার্কিনীদের কাছে আমাদের সম্মান রাতারাতি একেবারে যেন আকাশচুম্বি হয়ে উঠেছে। তারা এখন মুসলমাদেরকেই প্রকৃত বন্ধু মনে করে।’ উৎসাহের সাথে আবেগ-ঘন কন্ঠে বলল ড্রাইভার।
‘ভাল খবর শুনালে ড্রাইভার। কিন্তু মার্কিনীরা শুধু তোমাদেরকেই ভালবাসে, না তোমাদের ধর্মকেও ভালবাসে, তোমাদের সংস্কার-সংস্কৃতিকেও ভালোবাসে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাল কথা মনে করে দিয়েছেন স্যার। এমন প্রশ্ন কেউ কখনও জিজ্ঞাসাই করে না। অথচ অকল্পনীয় সব ঘটনা ঘটেছে এ ক্ষেত্রেই। আপনি ফিলাডেলফিয়ার মুসলিম ‘সানডে’ স্কুলগুলিতে গিয়ে দেখুন স্কুলের দুই তৃতীয়াংশ ছেলেমেয়েই আমেরিকান খৃষ্টান পরিবারের। মুসলিম স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষা ভাল হয়, ভাল অভ্যাস গড়ে ওঠে বলে খৃষ্টান পরিবারও এখানে তাদের ছেলেমেয়ে পাঠায়।’ ড্রাইভার বলল।
‘কতগুলো ‘সানডে স্কুল’ আছে তোমাদের?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘শহরে দশটি মসজিদ আছে। দশটি মসজিদেই ‘সানডে স্কুল’ আছে। এছাড়া আরও দশ বারটা মুসলিম ‘সানডে স্কুল’ গড়ে উঠেছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়।’ বলল ড্রাইভার।
‘আমেরিকানরা কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে?’ আহমদ মুসা বলল।
বহু স্যার। প্রতি সপ্তাহে ফিলাডেলফিয়ার প্রত্যেক মসজিদে জুমুআর নামাজের পর চার পাঁচজন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। স্যার, এই সপ্তাহে আমাদের মসজিদে ছয়জন ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে স্থানীয় খৃষ্টান চার্চের ফাদার ও একজন প্রফেসর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। খৃষ্টান চার্চটা ছয় মাস আগে বন্ধ হয়ে যায় কোন প্রার্থনাকারী যায় না বলে।’
থামল ড্রাইভার। একটা দম নিল। তারপর আবার বলে উঠল, ‘স্যার কি মুসলমান? এশিয়ান তো বুঝতেই পেরেছি।’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগে ড্রাইভার আঁৎকে উঠার মত শব্দ করে চাপা কন্ঠে বলে উঠল, ‘স্যার রং সাইড নিয়ে সামনে থেকে একটা গাড়ি আমাদের দিকে ছুটে আসছে।’
আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়েছিল। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল সামনে। দেখল, ড্রাইভারের কথা ঠিক। আহমদ মুসাদের গাড়ির পথ রোধ করে গজ পাঁচেক সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে।
আহমদ মুসাদের গাড়িকেও ড্রাইভার থামিয়ে দিয়েছিল। পেছনের গাড়িটাও পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেছে।
‘স্যার কি করব? আমরা পাশ কাটাতে চাইলে ওরা নির্ঘাত গুলী করবে।’ গাড়ি থামিয়েই বলে উঠল ড্রাইভার।
‘তুমি ঠিক সিন্ধান্ত নিয়েছ ড্রাইভার। দেখা যাক ওরা কে, কি চায়।’ বলল আহমদ মুসা।
থামার পরেই আগে পিছের দুগাড়ি থেকে চারজন দ্রুত নেমে এল। ছুটল তারা আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
‘ড্রাইভার গাড়ির জানালার কাঁচগুলো নামিয়ে ফেল। বন্ধ থাকলে ওরা ভেঙে ফেলতে পারে।’ বলল দ্রুতকন্ঠে আহমদ মুসা।
‘কিন্তু স্যার………………।’ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল ড্রাইভার। বোধ হয় আহমদ মুসার নির্দেশের প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। কিন্তু কি মনে করে থেমে গিয়ে সুইচ টিপে সব জানালার কাঁচ খুলে দিল।
ছুটে আসা ওরা চারজন দুজন করে আহমদ মুসার দুপাশের জানালায় এসে দাঁড়াল। তাদের প্রত্যেকের হাতে রিভলবার।
দু’পাশের জানালা থেকে দুজন আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘বেরিয়ে আসুন। এক মুহূর্ত দেরি করলে গুলী করব’।
‘দুদিক থেকেই বলছ, তোমরাই বল কোন দরজা দিয়ে বের হবো।’ শান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
গাড়ি দাঁড়িয়েছিল রাস্তার অনেকটা বাম প্রান্ত ঘেঁষে। ডানেই প্রশস্ত মূল রাস্তাটা।
ডান দিকের দুজনের মধ্যে একজন রিভলবার নাচিয়ে বলল, ‘এদিক দিয়ে নাম।’ বলেই সে দক্ষিণ দিকের দুজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা এদিক এস।’
সঙ্গে সঙ্গেই বাম পাশের দুজন দৌড় দিয়ে ডান পাশে চলে এল।
‘ড্রাইভার দরজার কী আনলক করেছ?’ ধীরে সুস্থে বলল আহমদ মুসা।
ওদের চারজনের মধ্যে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে দুজন এবং দরজার পিছন দিকে দাঁড়িয়েছে দুজন। দরজার পাল্লা খুলে সামনের দিকে যাবে বলে ওদিকে কেউ নেই।
আহমদ মুসা ড্রাইভারকে দরজা খোলার কথা বলার সাথে সাথে ক্লিক শব্দ করে দরজা খুলে গেল।
আহমদ মুসা দরজার দিকে ঘুরে বসে এগুলো দরজার দিকে।
হঠাৎ ওদের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘দাঁড়াও।’
আহমদ মুসা থেমে গেল।
রিভলবার বাগিয়ে রেখেই সামনে থেকে একজন ছুটে এসে বলল, ‘তোমার কাছে রিভলবার আছে, ওটা দিয়ে দাও।’
‘তোমাদের চারজনের কাছে চার রিভলবার, এরপরও আমার এক রিভলবারের ভয় করছ।’ বিদ্রূপাত্মক হাসির সাথে একথাগুলো বলতে বলতে আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে ওদের দিয়ে দিল।
রিভলবার হাতে নিয়ে লোকটা একটু পেছনে হটে আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।
সে যখন পেছনে হটছিল, তখন আহমদ মুসা দরজার দিকে এগুলো। দরজায় পৌঁছে পা দুটো দরজার প্রান্তে নিয়ে বাম হাত দিয়ে দরজা খুলে জোরে সামনের দিকে ঠেলে দিল। তার পরেই সে দুপায়ের উপর ভর দিয়ে দুহাত সামনে নিয়ে মাথাকে কিছুটা নিম্নমুখী করে বাইরে ড্রাইভ দিল। দুহাত তার মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে পা দুটি তার বিদ্যুত বেগে অর্দ্ধচন্দ্রাকারে ঘুরে গিয়ে সামনে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজনের বুকে আঘাত করল। ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল ওরা।
আহমদ মুসার পা দুটো ঘুরে গিয়ে মাটি স্পর্শ করতেই দুপায়ের দুমোজায় আটকানো রিভলবার বের করে নিয়ে ডান হাতের রিভলবার দিয়ে তাক করল গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়ানো দুজনকে। তাদের একজনের কানের পাশ দিয়ে একটা ফাঁকা গুলী করে বলল, রিভলবার ফেলে দাও, না হলে পরের দুই গুলী দুজনের মাথায় ভরে দেব।’
আকস্মিক এই ঘটনায় তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। রিভলবার সমেত হাত তাদের নিচে ঝুলে পড়েছিল। কানের পাশ দিয়ে ফাঁকা গুলীটাও ম্যাজিকের মত কাজ করল। তারা তাদের হাতের রিভলবার একটু সামনে ছুড়ে ফেলে দিল।
ওদিকে মাটিতে ছিটকে পড়া দুজন উঠে তাদের হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলবার হাত করার জন্য এগুচ্ছিল।
আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবার তাদের দিকে তাক করা ছিল। আহমদ মুসা ওদের নির্দেশ দিল, আর এক ইঞ্চি এগুবে না। দুজনকেই লাশ বানিয়ে দেব।
ওরা দুজনেই থমকে গেল।
আহমদ মুসা এবার দুদিকে রিভলবার তাক করে রেখে পা দিয়ে রিভলবার চারটিকে এক জায়গায় নিল। তারপর ওদের চারজনকেই নির্দেশ দিল ওদের পেছনের গাড়িটার পাশে এসে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে।
যন্ত্রের মতই ওরা নির্দেশ পালন করল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে ক্ষুদ্র একটা ক্লোরোফরম স্প্রেয়ার বের করে ওদের নাকে স্প্রে করল। তারপর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষার পর ওদের সংজ্ঞাহীন দেহ ওদের গাড়িতে তুলে স্টাটার থেকে চাবিটি খুলে নিয়ে গাড়ির সব জানালা-দরজা বন্ধ করে লক করে দিল। তারপর গাড়িটাকে একটা গাছের অন্ধকারে ঠেলে দিল।
আহমদ মুসার ড্রাইভার বেরিয়ে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার চোখে বোবা বিস্ময়।
আহমদ মুসা তার দিকে চেয়ে বলল, ‘ড্রাইভার ঐ গাড়িটাকেও রাস্তার বাইরে ঠেলে দাও। পারবে।’
‘ইয়েস স্যার। বলে ড্রাইভার তখনি গাড়িটা রাস্তার বাইরে ঠেলে দিল।’
আহমদ মুসা ওদের গাড়ি লক করার আগে ওদের চারটি রিভলবারও ওদের গাড়িতে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু গুলী বের করে নিয়েছিল।
আহমদ মুসা এসে গাড়িতে উঠে বসল।
ড্রাইভার এসে তার সিটে বসতেই আহমদ মুসা বলল, ‘একটু দেরি হয়ে গেল ড্রাইভার, ওখানে ঠিক সময় পৌঁছাতে পারলাম না। দেখ জোরে চালিয়ে পুশিয়ে নিতে পার কিনা!’
ড্রাইভারের মুখ হা হয়ে গেছে বিস্ময়ে। বলল, ‘স্যার আপনি দেরি হওযার জন্যে চিন্তা করছেন, কিন্তু এদিকে তো আপনি প্রাণে বেঁচে গেলেন। এই অবস্থায় আপনি প্রোগ্রাম বাতিলও করতে পারেন।’
‘আমি যদি প্রোগ্রাম বাতিল করি, তাহলে যারা আমাকে বাধা দিতে এসেছিল তারা জিতে যায়, উদ্দেশ্য তাদের সফল হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি স্যার। কিন্তু গোয়েন্দারা আপনাকে বাধা দিতে এসেছিল কেন?’ বলল ড্রাইভার।
‘কাদের গোয়েন্দা বলছ? ওদের? কেমন করে বুঝলে ওরা গোয়েন্দা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমাদের গোয়েন্দারা সাধারণত সাদা সার্টের সাথে কালো জুতা, কালো মোজা, কালো প্যান্ট এবং কালো হ্যাট পরে থাকে। আর কোন অফিসিয়াল অপারেশনে গেলে চার জনের টীম গিয়ে থাকে।’ বলল ড্রাইভার।
‘কিন্তু ড্রাইভার, ওরা গোয়েন্দা নয়। ওরা গোয়েন্দাদের ছদ্মবেশ পরেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেমন করে আপনি এতটা নিশ্চিত কথা বলছেন?’ ড্রাইভার বলল।
‘মার্কিন গোয়েন্দা ও পুলিশরা যে রিভলবার ও অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে তাতে একটা বিশেষ মার্কিং থাকে, এদের চারজনের রিভলবারে তা ছিল না। তবে বুট কালো বটে, কিন্তু বুটের কন্ডিশন পুলিশের মত নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আল-হামদুলিল্লাহ, আপনি মারামারির মধ্যে এত কিছু খেয়াল করেছেন। আমি এই বৈশিষ্টের বিষয়ে জানিই না।’ বলে ড্রাইভার তাকাল আহমদ মুসার দিকে পেছনে ফিরে। বলল, ‘স্যার, সিনেমার আমি একজন আগ্রহী দর্শক। ফাইটিং যেভাবে শুরু হলো এবং শেষ হলো, তেমন দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি।’ বলেই একটু থেমেই সে আবার শুরু করল, ‘স্যার আপনার পরিচয় জিজ্ঞাসা করার অধিকার আমার নেই। আমার মাত্র একটি জিজ্ঞাসা। আমি বুঝতে পারছি, এশিয়া বা উত্তর আফ্রিকার কোন দেশে আপনার বাড়ি। আপনি মুসলিম কিনা?’
‘এটা জানার আগ্রহ কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমার জীবনে এটা একটা অবিস্মরণীয় ঘটনাতো! ঘটনার নায়ক মুসলিম হলে গর্বের সাথে মানুষের কাছে গল্প করতে পারব। এ রকম সাহস ও বীরত্ব তো আমরা বহুদিন আগে হারিয়ে ফেলেছি!’ শেষ দিকে তার আবেগে কন্ঠ ভেঙে পড়ল।
ড্রাইভারের নিখাদ আবেগ আহমদ মুসাকেও স্পর্শ করল। আনমনা হয়ে পড়ল সেও। হঠাৎ করে তার সামনে যেন দুঃখ-বেদনা, লাঞ্ছনা-আপমানের কালো মেঘে ঢাকা এক দিগন্ত ভেসে উঠল। সে এক দীর্ঘ কালো রাত। রাজনৈতিক পরাধীনতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, জ্ঞানের দেউলিয়াপানা মুসলমানদের চারদিক থেকে নিষ্পিষ্ট করেছে। তাদের অসহায় আর্তনাদ আকাশকে ভারী করেছে। সৃষ্টি হয়েছে কান্নার সমুদ্র। বহু বছরের দাসত্বে ভীরুতা-কাপুরুষতা হয়ে পড়েছিল তাদের চরিত্র-বৈশিষ্ঠ্য। ড্রাইভারের আবেগ রুদ্ধ কন্ঠ এই দুর্ভাগ্যের দিকেই ইংগিত করেছে। আহমদ মুসারও দুচোখের কোণ ভারী হয়ে উঠেছিল।
একটা নিরবতা নেমে এসেছিল। নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘ড্রাইভার, আহমদ মুসা এই আমেরিকাতেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তুমিই তো বললে। তোমাদের অবস্থাও তিনি পাল্টে দিয়েছেন। তাকে নিয়ে তো গর্ব করতে পার।’
‘স্যার, তিনি তো জাতির গর্বের ধন। তার স্থান সবার মাথার উপরে, আকাশে। তাকে দেখার সৌভাগ্যও কোনদিন আমার হবে না। তাকে নিয়ে গর্ব করার মত কোন গল্প নেই। আজ যে গল্প সৃষ্টি হয়েছে, তা আমার জন্যে এক গর্বের কাহিনী।’ বলল ড্রাইভার।
‘হ্যাঁ ড্রাইভার, আমি তোমার এক ভাই।’
আল-হামদুলিল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ। তাহলে অনেক আহমদ মুসা তৈরি হয়েছে। তার সাথে এসেছে এক উর্বর পরিবেশও আমাদের আমেরিকায়। আল-হামদুলিল্লাহ।’ আবেগ জড়িত কন্ঠে বলল ড্রাইভার।
গাড়ি হাইম হাইকেলের বাড়ি ক্রস করে চলে যাচ্ছিল।
‘ড্রাইভার গাড়ি থামাও। আমরা এসে গেছি।’ বলে আহমদ মুসা হাইম হাইকেলের বাড়ি দেখিয়ে দিল।
‘স্যরি’ বলে ড্রাইভার গাড়ি পিছিয়ে নিল। তারপর থার্ড স্ট্রিট থেকে নেমে প্রবেশ করল লাল পাথরে বাঁধানো প্রাইভেট রোডে।
এগিয়ে চলল গাড়ি হাইম হাইকেলের গেটের দিকে।

আহমদ মুসা গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গেটে দাঁড়িয়েছিল দুজন সিকিউরিটির লোক।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন বেরিয়ে এল বাড়ির ভেতর থেকে।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা দুজনেই তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দুজনেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো, গেটের ওপারে গাড়ির উপর ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো লোকটি অস্বাভাবিক চরিত্রের কোন মানুষ নয়। নিজের অজান্তেই তাদের মন যেন প্রসন্ন হয়ে উঠল। তবে অবাক হলো আহমদ মুসার সুন্দর কাটিং-এর স্যুটকে ধুলি ধুসরিত দেখে।
ভেতরে দাঁড়িয়েই হাইম বেঞ্জামিন সিকিউরিটির লোকদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ওঁকে আসতে দাও।’
হাইম বেঞ্জামিনের পাশে দাঁড়ানো বারবানা ব্রাউনের চোখে-মুখে একটা চাঞ্চল্য নেমে এল। সে বলল সিকিউরিটিদের উদ্দেশ্য, ‘সার্চ করে দেখো কোন অস্ত্রপাতি আছে কিনা।’
আহমদ মুসা গেটে এসে দাঁড়ালে একজন সিকিউরিটি তাকে সার্চ করল। তার সার্ট কোর্ট-প্যান্টের পকেট, কোমর, শোল্ডার হোলস্টার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকল। সার্চ করে কোন অস্ত্র পেল না।
আহমদ মুসা ভেতরে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘গুড ইভনিং, মি…………। ওয়েলকাম।’
‘গুড ইভনিং। ধন্যবাদ। আমি আইজ্যাক দানিয়েল। নামটা বোধ হয় আগেও বলেছিলাম।’ মুখ ভরা হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
হাসল হাইম বেঞ্জামিনও। বলল, ‘স্যরি। একটু পরীক্ষা করলাম যে, যাঁর সাথে কথা বলেছি তিনিই এসেছেন কিনা।
হাইম বেঞ্জামিন ও আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক করল।
হ্যান্ডশেক করেই হাইম বেঞ্জামিন বারবারা ব্রাউনের দিকে ইংগিত করে আহমদ মুসাকে বলল, ‘ইনি আমার বন্ধু ও আমাদের পরিবারের শুভাকাংখী।’
বারবারা ব্রাউন হাত বাড়াল আহমদ মুসার দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য।
আহমদ মুসার হাত না বাড়িয়ে উপায় ছিল না। কারণ, বলা যাবে না বাধাটি কি।
আহমদ মুসা ও বারবারা ব্রাউন হ্যান্ডশেক করল। এই সাথে বারবারা ব্রাউন বলল, ‘আমি বেঞ্জামিনের কাছে সব শুনেছি। ওয়েলকাম। আমি মনে করি, আপনার সাথে বেঞ্জামিন পরিবারের এই সাক্ষাত গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আসুন বলে ভেতরে যাবার জন্যে হাঁটা শুরু করল হাইম বেঞ্জামিন।
হাইম বেঞ্জামিন আগে আগে হাঁটছিল।
পেছনে পাশাপাশি আহমদ মুসা ও বারবারা ব্রাউন।
তিনজন এসে ড্রইংরুমে বসল।
পাশাপাশি এক সোফায় বসল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন। তাদের সামনে এক সোফায় বসল আহমদ মুসা।
বসে একটু সপ্রভিত হেসে হাইম বেঞ্জামিন বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘একটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি মি. দানিয়েল?’
‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কোট-প্যান্ট ধুলি-ধুসরিত হবার চিহ্ন দেখছি। পরার সময় এমনটা থাকার কথা নয়।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
আহমদ মুসা হেসে উঠল। বলল, ‘ঠিক ধরেছেন। পরার সময় এমনটা থাকার কথা নয়। ছিলও না।’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করল হাইম বেঞ্জামিন।
‘পথে আত্মরক্ষার জন্যে লড়াই করতে হয়েছে। সেজন্যে ধুলায় গড়াগড়িও খেতে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি ব্যাপার?’ প্রশ্ন করল দুজনেই বিস্ময়ে চোখ কলাপে তুলে।
আহমদ মুসা পথের সব ঘটনা বিস্তারিত তাদের জানাল।
‘সর্বনাশ। সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারতো। অলৌকিকভাবে আপনি বেঁচে গেছেন। ঈশ্বর আপনাকে সাহায্য করেছে।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। তার কন্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
বারবানা ব্রাউন নিরব। তার মুখ মলিন হয়ে উঠেছে। বুঝতে পারল, ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থাই এটা করেছে। কেন তারা করবে? ড. হাইম হাইকেলের পরিবার যদি কারও সাথে সাক্ষাত করতে চায়, তাহলে তাতে বাধা দেয়া হবে কেন? তাছাড়া তাদের গোয়েন্দা বিভাগ এ মিথ্যাচার কেন করল? বেঞ্জামিন নিশ্চিত হয়েছে এবং সেও নিউইয়র্ক পুলিশে অফিসে টেলিফোন করে জেনেছে ইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্ট-এ কিংবা নিউইয়র্কের কোন পুলিশ জোনেই এ্যালেন শেফার নামে কোন পুলিশ অফিসার নেই। তাহলে তাদের ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা মহামিথ্যাচার কেন করল? এসব ঘটনার পিছনে কি তাহলে আরও ঘটনা আছে যা বারবারারা জানে না? কিন্তু যাই থাক, ড. হাইম হাইকেলের পরিবারের সাথে মিথ্যাচার কেন? এ্যালেন শেফার যদি মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে তার বলা সব কথাই মিথ্যা হয়ে যায়। মিথ্যা হয়ে যায় ড. হাইম হাইকেল সর্ম্পকে সে যা বলেছে তাও!
বারবারা ব্রাউনের চিন্তায় ছেদ নামল আহমদ মুসার কথার শব্দে। আহমদ মুসা বলছিল হাইম বেঞ্জামিনের কথার উত্তরে, ‘হয়তো মেরে ফেলাই তাদের টার্গেট, কিন্তু আপাতত তারা আটক করতেই চেয়েছিল আমাকে।’
‘তাদেরকে কি আপনি চেনেন? তারা কেন আপনাকে আটক করত চেয়েছিল? বেঞ্জামিন বলল।
‘না তাদের কাউকে আমি চিনি না। আমি এখানে আসতে না পারি, আমি আপনাদের সাথে কথা বলতে না পারি, সেই ব্যবস্থাই তারা করতে চেয়েছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
হঠাৎ বিদ্যুত চমকের মত হাইম বেঞ্জামিনের মনে পড়ল তার সাথে দেখা করতে আসা নিউইয়র্কের সেই ভূয়া পুলিশ অফিসার বলে প্রমাণিত এ্যালেন শেফারের কথা। তিনি বলেছিলেন যে, ড. হাইম হাইকেলের শত্রুরা আমাদের বাসার উপর চোখ রেখেছে। তারা আমাদের সাথেও দেখা করতে চেষ্টা করবে। তাহলে আইজ্যাক দানিয়েল কি সেই দেখা করার পক্ষ এবং তাকে কি এ্যালেন শেফারের লোকেরাই বাধা দিয়েছিল! এ্যালেন শেফার যে ভূয়া তা প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে আইজ্যাক দানিয়েল কি ঠিক পক্ষ? এ প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই।
হাইম বেঞ্জামিন মনোযোগ দিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথার উত্তরে বলল, ‘আপনি ওদের চেনেন না। কেন তাহলে ওরা আপনাকে বাধা দেবে এখানে আসতে?’
‘লোক হিসাবে ওদের চিনি না বটে, কিন্তু ওরা কারা আমি জানি। আমি নিউইয়র্কে এসে যেদিন থেকে ড. হাইম হাইকেলের কেন কিভাবে অন্তর্ধান ঘটল, তাকে উদ্ধারের জন্যে কি করা হয়েছে, কিভাবে তার সন্ধান পাওয়া যাবে, ইত্যাদি ব্যাপারে সন্ধান শুরু করেছি, সেদিন থেকেই ওরা আমার প্রতি পদে বাধার সৃষ্টি করেছে। প্রথম দিনেই রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হাইম হাইকেলের বন্ধু ড.জ্যাকব যখন ড. হাইকেলের অন্তর্ধানের ব্যাপারে আমাকে তথ্য দিচ্ছিলেন, সে সময় ড. জ্যাকবকে হত্যা করার জন্যে তার উপর হামলা হয়। অস্ত্র ও বোমা সজ্জিত ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেরা তাকে ধরতে পারেনি।’ এই কাহিনী দিয়ে কথা শুরু করে আহমদ মুসা কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের বাড়িতে গিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট, তাঁর মেয়ে নুমা ইয়াহুদ ও পি,এ লিসা কিভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছিলে, এই সহযোগিতা করতে গিয়ে লিসা কিভাবে ওদের হাতে নিহত হয় এবং সবশেষে বলল বালক জুনিয়ার প্যাকারের কাহিনী ও তার গুলীবিদ্ধ হবার কথা।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউনের মন্ত্রমুগ্ধের মত মুসার কথা শুনছিল। বিস্ময় ও উদ্বেগে তাদের চোখে-মুখে নেমে এসেছিল অন্ধকারের একটা ছায়া। আহমদ মুসা থামলেও ওরা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। ওদের চোখ আঠার মত লেগেছিল আহমদ মুসার উপর।
একটু সময় নিয়ে হাইম বেঞ্জামিন ধীর কন্ঠে বলল, ‘এত কিছু ঘটে গেছে? আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে? কিন্তু ……………।’
হাইম বেঞ্জামিন কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. আয়াজ ইয়াহুদ অথবা তাঁর মেয়ে নুমা ইয়াহুদের কাছে টেলিফোন করে বিষয়টা আরো একটু জানুন। আমার অনুরোধ।’
আহমদ মুসা থামতেই বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘আমি নুমা ইয়াহুদকে চিনি। সে গত বছর ফিলাডেলফিয়া ক্যাম্পিং-এ এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রপস নিয়ে। পনের দিন আমরা একসাথে ছিলাম। আমি তাকে টেলিফোন করতে পারি। আমার মোবাইলে তার নাম্বার আছে।’
বলেই বারবারা ব্রাউন কথা বলার জন্যে একটু আড়ালে চলে গেল।
দশ মিনিট পর বারবারা ব্রাউন ফিরে এল হাসিমুখে। বসতে বসতে বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘মি. দানিয়েল, নুমা ইয়াহুদ আপনার যেভাবে প্রশংসা করল তাতে মনে হলো আপনি ওর হৃদয় সিংহাসনের অবিসংবাদিত হিরো।
‘ওসব কথা পরে বলো। এখন কাজের কথায় এস।’ বারবারা ব্রাউন থামতেই কথা বলে উঠল হাইম বেঞ্জামিন।
‘বল কি! কাজের কথাই তো শুরু করেছি। বুঝতে পারছি না, নুমা ইয়াহুদ ও ড. আয়াজ ইয়াহুদের কাছে যিনি শার্লক হোমস ও আলেকজান্ডার শেয়ার্জনেগার এর যোগফল, তাঁর সম্পর্কে ওঁরা আর কি বলতে পারেন?’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ড ড. আয়াজ ইয়াহুদ স্যারের সাথে কথা বলেছ?’ হাইম বেঞ্জামিন জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ। তিনিও লিসা নিহত হওয়া, ড.জ্যাকব ও বালক আহত হওয়ার বিষয়টি কনফার্ম করলেন। বললেন যে, তাঁর কাছ থেকেই তোমাদের বাসার ঠিকানা নিয়েছেন। তিনি আরও বললেন, যতটা পারা যায় আইজ্যাক দানিয়েলকে সাহায্য করা উচিত। তিনি জানালেন, একটি চক্র, যাদেরকে তিনি চেনেন না, ড. হাইম হাইকেলের অনুসন্ধান, তার সম্পর্কে কাউকে কোন তথ্য দেয়া, এমনকি তার সম্পর্কে আলোচনাতেও বাধা দিচ্ছে। এদের ভয়েই ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে কোন কিছুই তারা করতে পারেনি। প্রথমবারের মত আইজ্যাক দানিয়েলই নির্ভীকভাবে এপথে এগিয়েছেন। এখনও কোন বাধাই তার পথরোধ করতে পারেনি।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘এই যদি হয় ব্যাপার, তাহলে আমরা পুলিশকে খবর দিতে পারি। আমরা তাদের সাহায্য নিতে পারি।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘হ্যাঁ ও ব্যাপারেও ড. আয়াজ আংকেল বলেছেন। তিনি বললেন, পুলিশ তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেনি। পুলিশকেও তারা নিস্ক্রিয় করে রেখেছে।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘তাহলে উর্ধতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা জানাতে পারি।’ সোজা হয়ে বসে জোরের সাথে বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘দেখুন মি.হাইম বেঞ্জামিন, ড. হাইকেলের সুস্থ ও জীবিত উদ্ধার করা আমাদের টার্গেট হওয়া উচিত। পুলিশের সর্বস্তরেই ওদের লোক আছে। পুলিশ যখন জোরে-শোরে এ্যাকশনে যাবে, পুলিশের মাধ্যমেই ওরা খবর পেয়ে যাবে। যদি দেখে ওরা ধরা পড়ে যাচ্ছে, তাহলে অভিযুক্ত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য ওরা ড. হাইম হাইকেলকে চিরতরে গায়েব করে ফেলতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার শেষ কথায় কেঁপে উঠল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন দুজনেই। উদ্বেগ-আংতকে পান্ডুর হয়ে গেল তাদের মুখ। বলল হাইম বেঞ্জামিন, ‘তাহলে কি করা যাবে?’ তার কণ্ঠে অসহায় সুর।
আহমদ মুসা বলল, ‘এগুতে হবে সন্তর্পনে। এমন কি পুলিশকেও না জানিয়ে। কৌশলে বা যে কোন মূল্যে ড. হাইম হাইকেলের অবস্থান জানতে হবে। তারপর তাঁকে উদ্ধার।’
‘কিন্তু কঠিন দায়িত্ব কে নেবে? আমরা পারব?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘সেজন্যে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের সাহায্য চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি সাহায্য?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ড. হাইম হাইকেলকে ওরা কোথায় রেখেছে, এই তথ্য জানতে হবে। পুলিশ অফিসার ছদ্মবেশে ওরা আপনাদের কাছে এসেছিল। আমার বিশ্বাস ওরা আবারও আসবে। ওরা চেষ্টা করবে হাইম হাইকেলের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। আর এই সুযোগ নিতে হবে হাইম হাইকেল পরিবারকে।’ আহমদ মুসা বলল।
হাইম বেঞ্জামিন তাকাল বারবারা ব্রাউনের দিকে। তারপর আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল, ‘মি. আইজ্যাক দানিয়েল, আপনি এত বড় দায়িত্ব নেবেন কেন? আপনার কোন পরিচয় আমরা জানি না।’
প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না আহমদ মুসা। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,‘সংগত প্রশ্ন করেছেন। পরিচয় ছাড়া একসাথে চলা যায় না। কিন্তু পরিচয় দিতে সময় লাগবে। তার আগে আপনাদের আস্থা আমার উপর বাড়তে হবে, আমার আস্থাও বাড়তে হবে আপনাদের উপর। আমি ভয় করি আমার পরিচয় যদি ওরা পেয়ে যায়, তাহলে আমাদের ক্ষতি করতে পারে ওরা নানাভাবে। আপাতত পরিচয় ছাড়াও আমরা একসাথে এগুতে পারি। আপনি চান আপনার পিতা উদ্ধার হোক, আমিও চাই ড. হাইম হাইকেল উদ্ধার হোক।’
‘মাফ করবেন। আগের প্রশ্নটাই আবার করছি। আমার পিতা উদ্ধার হলে আপনার কি লাভ? প্লিজ, কোন সন্দেহ করে আমি এ কথা বলছি না। আমার কৌতূহল।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
এবারও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না আহমদ মুসা। গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসা। একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি কেন ড. হাইম হাইকেল উদ্ধার হোক চাই, এটা জানতে হলে জানা প্রয়োজন ওরা কেন ড. হাইম হাইকেলকে আটক রাখতে চায়।’
হাইম বেঞ্জামিনের চোখ দুটি উজ্জল হয়ে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ, সেটা তো অবশ্যই জানার বিষয়।’
‘মি. হাইম বেঞ্জামিন আপনি জানেন, আপনার পিতা অতীতের বিশ্বাস ও আচরণ পরিত্যাগ করেছেন। তার…………।’
হাইম বেঞ্জামিন আহমদ মুসার কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘এ বিষয়টা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু কেন এই পরিবর্তন, সেটাই আমাদের সকলের প্রশ্ন।’
‘আমি যতদূর জানি, ড. হাইম হাইকেল তার জাতির কোন বিশেষ কাজ এবং কাজের পন্থাকে মেনে নিতে পারেননি। শুধু মেনে নিতে পারেননি নয়, জাতির ঐ পন্থারই তিনি বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তার নিজ অতীতের তিনি বোধ হয় প্রতিবিধানও করতে চেয়েছিলেন। জাতির একটা বিশেষ গোষ্ঠী এটা মেনে নেয়নি এবং নিশ্চিত হয়েছে যে, ড.হাইকেলের এই পরিবর্তন এবং তার প্রতিবিধান করার মনোভাব তাদের ক্ষতি করবে। এরাই ড. হাইম হাইকেলকে আটক করে রেখেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠল হাইম বেঞ্জামিনের। পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফারের কথা মনে পড়েছে তার। বলেছিল সে, শত্রুরা ড. হাইম হাইকেলকে দিয়ে কিছু তথ্যের ব্যাপারে কনফেশন করাতে চায়, যা ইতিহাস কে বদলে দেবে। এই কনফেশনই কি মি. আইজ্যাক দানিয়েলের ভাষায় আব্বার প্রতিবিধানমূলক কাজ? মি. আইজ্যাক দানিয়েল কি সেই কনফেশন বা প্রতিাবধানের সুবিধাভোগী পক্ষ? হাইম বেঞ্জামিন তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ওদের ক্ষতির সুবিধাভোগী পক্ষ কি আপনি বা আপনারা? আপনারা কি কনফেশন করাতে চান আব্বাকে দিয়ে?’
‘কনফেশন শব্দে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। মনে পড়ল ‘স্পুটনিক’-এর নেয়া ড. হাইম হাইকেলের কনফেশন স্টেটমেন্টের কথা। হাইম বেঞ্জামিন নিশ্চিত এই ‘কনফেশন’-এর দিকেই ইংগিত করেছেন। কিন্তু হাইম বেঞ্জামিনের তো এটা জানার কথা নয়। হতে পারে পুলিশ অফিসারের ছদ্মবেশে আসা এ্যালেন শেফার কোন ফর্মে এই কথা হাইম বেঞ্জামিনকে বলেছে। বলল আহমদ মুসা হাইম বেঞ্জামিনকে উদ্দেশ্য করে, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন, কনফেশন করাবার প্রশ্ন নেই। আতীতের প্রতিবিধান হিসাবে নিজেই স্বতঃস্ফুর্তভাবে কোথাও কনফেশন করেছেন। এটাই ওদের কাছে তার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর সুবিধাভোগীর কথা বলছেন! ড. হাইম হাইকেল কারও সুবিধার্থে এই কনফেশন দেননি, সত্য প্রকাশের স্বার্থেই তিনি এটা করেছেন। আর সত্য প্রকাশ হলে এবং মিথ্যার ভার অপসৃত হলে কারও না কারো তো উপকার হবেই।’
‘বুঝলাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আব্বা যদি কনফেশন করে ফেলেই থাকেন, তাহলে সবই তো শেষ। আটকে রেখেছে কেন আব্বাকে তাহলে তারা?’ জিজ্ঞাসা বেঞ্জামিনের।
‘আমার মতে এর দুটো কারণ। এক, কনফেশনে সত্যের একটা অংশের মাত্র প্রকাশ ঘটেছে, সত্যের সবটা নয়। অবশিষ্ট সিংহভাগ সত্যকে তারা ড. হাইম হাইকেলকে আটক রাখার মাধ্যমে চেপে রাখতে চায়। দুই. ওরা মনে করে ড. হাইম হাইকেলের সেই কনফেশন তারা উদ্ধার করে এনেছে। এর কোন কপিই আর বাইরে নেই। সুতারাং ড. হাইম হাইকেল এখন আটক থাকলে সত্য প্রকাশ হওয়ার আর ভয় নেই। কিন্তু তারা জানে না যে, কনফেশনের মূল কপিই বাইরে রয়ে গেছে। তারা যা উদ্ধার করেছে এবং আরও যেগুলো ধ্বংস করেছে সেগুলো মূলটার নকল কপি মাত্র।’ আহমদ মুসা বলল।
বিস্ময় ভরা চোখে হাইম বেঞ্জামিন বলল, ‘সত্যটা’ কি মি. আইজ্যাক দানিয়েল? কনফেশনে কি আছে? সত্যটা প্রকাশ হলে এমন কি ঘটবে?’
‘এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ থাক।
আপনার আব্বাই এর উত্তর ভালো দিতে পারবেন। আপনার আব্বা উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত এটুকু অবশিষ্ট থাক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আরও কিছু অবশিষ্ট থাকল। আপনার পরিচয় এখনও আমরা পাইনি।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘পরিচয়ের ব্যাপারটা এমন কিছু নয় যে, সেজন্যে উন্মুখ হয়ে থাকতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল হাইম বেঞ্জামিন। বলল, পরিচয়ের মধ্যে ‘এমন কিছু’ না থাকলে পরিচয় প্রকাশে ভয় করতেন না মি. আইজ্যাক দানিয়েল।’
‘আসুন, কাজের কথায় আসি। আমাকে আপনারা সাহায্য করবেন কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
গম্ভীর হলো হাইম বেঞ্জামিন। বলল, ‘এ জিজ্ঞাসা বরং আমাদের। আমরা আপনার সাহায্য চাই মি. আইজ্যাক দানিয়েল।’
‘ধন্যবাদ। আমি সাহায্য নিতে এবং সাহায্য দিতেই এসেছি মি. হাইম বেঞ্জামিন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলুন আমাদের কি করণীয়?’ জিজ্ঞাসা হাইম বেঞ্জামিনের।
‘এ্যালেন শেফার মানে আপনার আব্বার আটককারীরা যে আপনাদের সাথে যোগাযোগ করেছে, এটা খুবই আনন্দের খবর। এখন ওদের সাথে আপনার সর্ম্পক বৃদ্ধি করতে হবে এবং জেনে নিতে হবে, আপনার আব্বাকে ওরা কোথায় রেখেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
খুশি হয়ে উঠল হাইম বেঞ্জামিন। বলল, ঠিক পরামর্শ। আব্বার নিকটবর্তী হবার এটাই সবচেয়ে সহজ পথ। ইতিমধ্যেই ওরা প্রস্তাব করেছে যে, আমাদেরকে আব্বার কাছে নিয়ে যাবে। তবে দূর থেকে দেখাবে মাত্র, কথা বলতে দেবে না এবং তার সাথে সাক্ষাতও করাবে না।’
আহমদ মুসা দারুন খুশি হয়ে উঠল। বলল, ‘থ্যাংকস গড। ওটুকু যথেষ্ট। উনার থাকার লোকেশানটা জানতে পারলেই হলো।’
‘নাম, ঠিকানা না জানলেও আমরা এটুকু জানতে পেরেছি, আংকেল ড. হাইম হাইকেলকে একটা মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘মানসিক হাসপাতালে? ওরা বলেছে?’ বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘জি হ্যাঁ। তিনি নাকি অপ্রকৃতিস্থ।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানসিক হাসপাতালে রেখেছে, এটা সত্য। কিন্তু অপ্রকৃতিস্থ, এই কথা ডাহা মিথ্যা।’
‘আপনি এটা মনে করেন? আপনার কথাকে ঈশ্বর সত্য করুন।’ প্রার্থনার সুরে বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘সুস্থ ড. হাইম হাইকেল নিউইয়র্কের যে মানসিক ডাক্তার কৌশলগত কারণে মানসিক হাসপাতালে রাখার পরামর্শ দিয়েছিল, আমি সে ডাক্তারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পাইনি তাকে। যা বুঝেছি, নিউইয়র্ক থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।’
এরপর আহমদ মুসা বলল ডাক্তারের বাড়িতে ওদের লোকেরা তাকে বন্দী বা হত্যা করার চেষ্টা করেছিল এবং সংঘর্ষে ওদের দুজন লোক মারা যায়।
বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বারবারা ব্রাউন বলল, ‘ইতিমধ্যে ওদের দুজন লোক মারা গেছে আপনার হাতে?’
‘আমি দুঃখিত। না মারতে পারলে ওখানে আমাকেই লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হতো।’ আহমদ মুসা বলল।
হাইম বেঞ্জামিন একথায় অংশ নিল না। সে আগের প্রশ্নই আবার করল, ‘আপনি নিশ্চিত মি.দানিয়েল যে, আব্বা অপ্রকৃতিস্থ হননি?’ হাইম বেঞ্জামিনের কণ্ঠ কান্নার মত ভারী।
‘আমি নিশ্চিত মি. হাইম বেঞ্জামিন। আমি যে বালক প্যাকারের কথা কিছুক্ষণ আগে বলেছি, সে বালকের মা মিসেস প্যাকার ঐ মানসিক ডাক্তারের একজন প্যাসেন্ট ছিলেন। তিনি নিজ কানে ডাক্তারকে এ বিষয়ে আলাপ করতে শুনেছেন। তাছাড়া আমি রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আয়াজ ইয়াহুদসহ অনেকের সাথে আলোচনা করে বুঝেছি, ড. হাইম হাইকেল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তাঁর মানসিক রোগের কথা ওরা ছড়িয়েছে তাঁর অন্তর্ধানকে যুক্তিসংগত করার জন্যে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘থ্যাংকস গড। আপনার প্রতিটি কথা ঈশ্বর সত্য করুন।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। তার দুচোখ খেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
‘বারবারা ব্রাউন বেঞ্জামিনের কাঁধে হাত রাখল তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে।
সান্ত্বনার সুরে নরম কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল, ‘ধৈর্য্য ধরুন। সব ঠিক হয়ে যাবে মি. হাইম বেঞ্জামিন। ড. হাইম হাইকেলের মত সৎ-সজ্জন ব্যাক্তির কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। ঈশ্বরও তো আছেন।’
আহমদ মুসা একটু থামার পরেই আবার বলে উঠল, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন, আমি চলে যাবার পর থানায় একটা ডাইরী করাবেন এই বলে যে, ‘একজন অপরিচিতি লোক আমাদের বাসায় এসেছিল। মনে হয় সে ড. হাইম হাইকেলের অন্তর্ধান ঘটনার সাথে জড়িত। তার থেকে পরিবারের আরও ক্ষতির আশংকা করছি।’
‘আপনার বিরুদ্ধে এই ডাইরী?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন একই সাথে।
‘হ্যাঁ। যাতে এ্যালেন শেফাররা বুঝে যে আপনারা তাদের সাথেই আছেন। আমি এলেও আমার সাথে ফলপ্রসু আলোচনা আপনাদের হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলেছে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন। বলল, ‘এই সুবিধার জন্যে আপনার মাথায় এতবড় বিপদ ডেকে আনবেন?’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এ সময় বাইরে হৈচৈ-এর শব্দ শোনা গেল।
হৈচৈটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসারা তিনজনই উঠে দাঁড়াল।
হাইম বেঞ্জামিন কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল ব্যাপার কি দেখার জন্যে। কিন্তু বেশি দূর যেতে হল না।
ঝড়ের বেগে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল ৪ জন অপরিচিত লোক আর তাদের বাধা দিতে আসা দুজন সিকিউরিটির লোক।
ড্রইংরুমে প্রবেশ করেই ওরা চারজন সোজা হয়ে এসে দাঁড়াল আহমদ মুসার সামনে। তাদের হাতের চার রিভলবার তারা তাক করল আহমদ মুসার লক্ষ্যে। বলল তাদের একজন চিৎকার করে, ‘আমাদের সংজ্ঞাহীন করে গাড়িতে বন্ধ করে রেখে মনে করেছিলে এখানে কাজ সেরে চলে যাবে। কিন্তু তা আমরা হতে দিচ্ছি না। চল, এবার আমরা তোমাকে কি করি দেখবে।’
প্রথমে বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, এদেরকে আহমদ মুসা গাড়িতে বন্ধ করে এসেছিল। এরা এ্যালেন শেফারের লোক। পাহারা দিচ্ছে যাতে কেউ ড. হাইম হাইকেলের বাড়িতে তার পরিবারের সাথে মিশতে না পারে। এদের ক্রোধ আইজ্যাক দানিয়েলের উপর। আইজ্যাক দানিয়েলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল তারা দুজনেই। এর বাইরেও বারবারা ব্রাউন যে বিষয়টা ভাবছিল তা হলো, এরা নিশ্চয় ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার লোক। কিন্তু তাদের সে চেনে না কেন? এদের কি অন্য জায়গায় থেকে আনা হয়েছে! কিন্তু তাকে বলা হয়নি কেন? হতে পারে, বারবারা ব্রাউন ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্বাসের পরীক্ষায় উর্ত্তীন হতে পারেনি। সেটাই ভাল। এসব অস্বচ্ছ ‘হাইড এন্ড সীক’ খেলার কাজ তার মোটেই পছন্দ নয়।
আর আহমদ মুসা ওদের চারজনকে চিনতে পেরেছিল। ওদের একজন চিৎকার করে আহমদ মুসাকে শাসানো শেষ হলে আহমদ মুসা হাসিমুখে বলল, ‘তোমাদের তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত তোমরা এখনও বেঁচে আছ এবং এখানে আসার সুযোগ পেয়েছ এজন্যে।’
ওরা চারজন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল আরও। ওদের তর্জন-গর্জনের মধ্যে একজন তার রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনী চেপে বলল, ‘আর একটু চাপলেই বুলেট তোমার কপাল ফুটো করে মগজ লন্ড ভন্ড করে দেবে।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমার রিভলবারের গুলী আছে কিনা পরীক্ষা করেছ?’
একথা বলতেই লোকটিই চমকে উঠে তার রিভলবার পরীক্ষা করল। গুলী নেই। তার চোখ ছানা-বড়া হয়ে উঠল গুলী নেই দেখে। সে তাকাল অন্য তিনজনের দিকে। ওরা তিনজনও একে একে রিভলবার পরীক্ষা করল। প্রত্যেকেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল বিস্ময়ে। কারও রিভলবারে গুলী নেই।
আহমদ মুসা ওদের বিপর্যস্ত চোখের সামনে ঝুঁকে পড়ে দুহাত দিয়ে দুপায়ের মোজায় আটকানো দুটি রিভলবার বের করে আনল। আহমদ মুসা সরে এল ড্রইংরুমের দরজার দিকে। ওরা চারজনসহ হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউনও এবার তার সামনে।
আহমদ মুসা তাক করেছে তার রিভলবার দুটো ওদের চারজনের দিকে। বলল, ‘দেখলে তো নাটকের দৃশ্য কিভাবে পাল্টে গেল? তোমরা কি করে ধরে নিলে যে বুলেট ভরা রিভলবারগুলো আমি তোমাদের কাছে ফেলে এসেছি? মাত্র মৃত্যুই এ ধরনের ভুলকে ডেকে নিয়ে আসে।’
ওদের চারজনের বিমুঢ় মুখে এবার আতংক নেমে এল। বলল, দেখ আমরা সরকারী লোক। গায়ে হাত দিলে ভাল হবে না। আমরা নিজে করিনি। সরকারী হুকুম তামিল করার জন্যেই আমরা এসেছিলাম।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ভয় করো না আমার রিভলবারের মূল্যবান বুলেট তোমাদের জন্যে নয়। সামান্য কয়টা পয়সার বিনিময়ে এসেছ আমাকে মারতে। এই ধরনের খারাপ কাজ আর করো না।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল রিভলবার দুটো পকেটে ফেলে তাকাল হাইম বেঞ্জামিনের দিকে। বলল, ‘জানি আমি বেরোনের পর আপনারা থানায় গিয়ে কেস করবেন যে, আমি আপনাদের হুমকি দিতে বা হত্যা করতে এসেছিলাম। তবে আমার অনুরোধ এই চারজন নকল গোয়েন্দা সম্পর্কেও থানায় অভিযোগ করবেন। ওরা সরকারী গোয়েন্দার পোশাকে এসেছিল নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে। এটা অপরাধ।’
হাইম বেঞ্জামিন ভালভাবে তাকাল লোক চারজনের দিকে। ঠিক তো, ওদের চারজনেরই পরনে সরকারী গোয়েন্দা পোশাক।
আহমদ মুসা থামতেই ওদের চারজনের একজন বলে উঠল, ‘মিথ্যা কথা। সরকারী হুকুমেই আমরা এসেছি।’
‘সরকারী কোন লোকের হুকুম হতেই পারে। কিন্তু সেটা সরকারী হুকুম নয় এবং তোমরা সরকারী লোক নও। ফিলাডেলফিয়ার পুলিশ প্রধানকে জিজ্ঞাসা করলেই এটা জানা যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
তারপর আহমদ মুসা ‘সকলকে গুডবাই’ বলে ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসার পরপর বেরিয়ে গেল ওরা চারজনই। যাবার সময় বেঞ্জামিনকে বলল, ‘স্যরি স্যার আমরা শয়তানটাকে আটকাতে পারিনি। আপনাদের কোন ক্ষতি করেনি তো? ভীষণ চালাক আর ধড়িবাজ লোকটা। আমরা এসে পড়ে ভালই হয়েছে। চলে যেতে বাধ্য হলো।’
‘আপনাদেরকে এই দায়িত্ব দিয়েছিল কে? জিজ্ঞাসা বারবারা ব্রাউনের।
‘দুঃখিত, আমরা বলতে পারব না ম্যাডাম।’ বলে তারা চারজন বেরিয়ে গেল ড্রইংরুম থেকে।
ওরা চলে গেলে বারবারা ব্রাউন বলল, ‘বেঞ্জামিন তুমি একটু দাঁড়াও। আমি একটা টেলিফোন করে আসি।’ বলে মোবাইল নিয়ে টেলিফোন গাইডের খোঁজে হাইম বেঞ্জামিনের ঘরে গেল।
মিনিট তিনেক পর ফিরে এল বারবারা ব্রাউন। তারপর সে ও হাইম বেঞ্জামিন সোফায় ফিরে এসে পাশাপাশি বসল। বারবারা ব্রাউনই প্রথম কথায় বলল, ‘অনেক প্রশ্নেরই সমাধান আজ হলো বেঞ্জামিন। মি.আইজ্যাক দানিয়েল ঠিকই বলেছেন, এরা চারজনই ভূয়া গোয়েন্দা। আমি ফিলাডেলফিয়ার পুলিশ প্রধান মি. টেলারের কাছে টেলিফোন করেছিলাম। তিনি খোঁজ নিয়ে জানালেন, কোন ওয়াচার বা গোয়েন্দাকে ড. হাইকেলের বাসায় পাঠানো হয়নি আজ।’
‘তাহলে এই প্রতারণামূলক কাজ করল কে?’ জিজ্ঞাসা হাইম বেঞ্জামিনের।
‘যারা এ্যালেন শেফারকে পুলিশ অফিসার সাজিয়েছিল, তারাই সাজিয়েছে এদেরকেও।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছি, আইজ্যাক দানিয়েল এদের ঠিক ঠিক চিনে ফেলল কি করে!’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘আইজ্যাক দানিয়েল সাধারণ কেউ নয় বলেই আমি মনে করি। দেখলে না, ওরা চারজন তাকে ঘিরে ফেলল, তখন তার চোখে-মুখে ভয়ের সামান্য কোন প্রকাশ ঘটেনি। আর দেখ ওদের রিভলবার আগেই খালি করে ওখানে রেখে এসেছিল। কি বিস্ময়কর দুরদৃষ্টি। আরেকটা ব্যাপার, তাঁকে সার্চ করে তার পকেটের রিভলবার গেটে রেখে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কি কল্পনা করতে পেরেছি যে, তার দুমোজার সাথে গোজা রয়েছে আরো দুটি রিভলবার! এখানেও অদ্ভুত দুরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। আমার ………………।’ শেষ করতে পারলো না বারবারা ব্রাউন তার কথা।
তার কথার মাঝখনেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘কিন্তু এখানে সে কি আমাদের সাথে প্রতারণা করেনি? সে আমাদের সার্চকে ফাঁকি দিয়েছে, অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেছে।’
‘তোমার কথা একদিক দিয়ে ঠিক। কিন্তু প্রয়োজনেই এটা সে করেছে। আমরা তো ভেবেছি আমাদের কথা। কিন্তু তিনি ভেবেছেন আমাদের বিষয় ছাড়াও তার আরও শত্রুর কথা। সুতারাং তাকে প্রস্তুত থাকতে হয়েছে। তা যে ঠিক তা প্রমাণই হলো।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘ঠিক বলেছ বারবারা। ওদের একটা করে রিভলবার খালী করে রেখেছিল। ওদের কাছে আরও রিভলবার যদি থাকতো।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
হাইম বেঞ্জামিন একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘দেখ আইজ্যাক দানিয়েল কেমন চালাক। তার সাথে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টা ওদের চারজনকে জানতে দিল না, বরং বিপরীতটাই বুঝিয়ে দিল তার বিরুদ্ধে থানায় কেস করার প্রসঙ্গটি অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলে।’
‘তার মানে তার দৃষ্টি দেখ সব দিকেই আছে। আবার দেখ যেমন তার বুদ্ধি, তেমনি এক্সপার্ট দেখ ফাইটিং-এও। আমার মনে হচ্ছে, নুমা ইয়াহুদ তাঁর সম্পর্কে যা বলেছে, তার চেয়েও তিনি বড়। দেখ এক সিটিং-এই তিনি আমাদের সামনের অন্ধকারকে একদম স্বচ্ছ, ঝরঝরে করে দিয়েছেন।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘ঠিক বলেছ। আমার আনন্দ লাগছে, আব্বার উদ্ধারে তার মত লোকের সাহায্য পাব। এখন বল বারবারা, আমরা এগুবো কিভাবে। আমাদের উপর দায়িত্ব হলো, এ্যালেন শেফারদের মাধ্যমে আমাদের আব্বার অবস্থান জানার ব্যবস্থা করা। এখন কেমন করে ওদের সাথে যোগাযোগ করব।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি সব ব্যবস্থা করবেন বলে মনে হয়।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘ঠিক আছে কালই মি. ফ্রান্সিসের সাথে যোগাযোগ করব। দরকার হলে নিউইয়র্ক যাব।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ঠিক আছে বেঞ্জামিন। আমি তাহলে এখন উঠি।’ বারবারা ব্রাউন বলল।
‘না চল, ডিনার খেয়ে যাবে। টেবিলে বোধ হয় রেডি।’ বলে উঠে দাঁড়াল হাইম বেঞ্জামিন।
বারবারা ব্রাউনও উঠে দাঁড়াল।

আজর ওয়াইজম্যানের সামনের টেবিলের ওপাশে বসেছিল বিল পুলম্যান।
বিল পুলম্যান ওয়ার্ল্ড ফ্রিডম আর্মি (WFA) ও ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার নিউইয়র্ক অফিসের প্রধান সমন্বয়কারী।
কথা বলছিল বিল পুলম্যান, ‘স্যার আইজ্যাক দানিয়েলকে এ পর্যন্ত যে কয়জন দেখেছে, তাদের বর্ণনা থেকে নিশ্চিত প্রমানিত হয় না যে তিনিই আহমদ মুসা।’
‘কিন্তু তার প্রতিটি কাজ প্রমাণ করে যে সে আহমদ মুসা না হয়ে পারে না।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘তা ঠিক স্যার। অবশ্য আহমদ মুসা ছদ্মবেশ ধরতে উস্তাদ। সাধারণ ছদ্মবেশেও সে নিজেকে পাল্টে ফেলতে পারে। বিশেষ করে খুব অভ্যস্ত চোখ না হলে তার ছদ্মবেশ ধরা মুশকিল। অতএব আমি মনে করি, তাকে আহমদ মুসা হিসাবে ধরেই আমাদের অগ্রসর হওয়া দরকার।’ বিল পুলম্যান বলল।
‘যদি তা ধরে নিতে হয়, তাহলে সেটা এক বিপদের কথা। কারণ মার্কিন সরকার ও প্রসাশনের সকল পর্যায়ের সে সহযোগিতা পাবে। তবু কিন্তু এ লড়াইয়ে আমাদের জিততে হবে পুলম্যান।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘অবশ্যই স্যার। নিউইয়র্কের লিবাটি টাওয়ার ও ডেমোক্র্যাসি টাওয়ার ধ্বংসের সত্যটা যদি প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাহলে স্যার ইহুদীবদীরা আবার রোমান যুগের মত অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে। সুতরাং যে কোন মূল্যে সত্যের প্রকাশ রোধ করতে হবে।’ বিল পুলম্যান বলল।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, স্পুটনিকের যোগাড় করা সব ডকুমেন্ট আমরা ধ্বংস করতে পেরেছি এবং অবশিষ্ট যেগুলো ওদের হাতে ছিল, সেগুলোর সবটাই আমাদের হাতে এসে গেছে। না হলে আমরা মহাবিপদে পড়ে যেতাম। সে ডকুমেন্টগুলো ওরা হারিয়েছে বলেই খোদ আহমদ মুসাই পাগলের মত ছুটে এসেছে ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে। ড. হাইম হাইকেলকে পেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট তারা নতুন করে তৈরি করতে পারবে। সুতারাং যেভাবেই হোক ড. হাইম হাইকেলকে আড়ালে রাখতে হবে। তাকে না পেলে আহমদ মুসারা এক ইঞ্চিও সামনে এগুতে পারবে না।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘মাফ করবেন স্যার। দেখা যাচ্ছে ড. হাইম হাইকেল প্রকৃত অর্থেই আমাদের জাতির জন্যে এক বিপজ্জনক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এখনকার সব শক্তিই তাকে আড়ালে রাখার চেষ্টায় ব্যায়িত হচ্ছে। এই অবস্থায় এই বোঝা আমাদের জাতিদেহ থেকে ঝেড়ে ফেলার মধ্যেই জাতির কল্যাণ।’ বিল পুলম্যান বলল।
‘কোন আমেরিকানের কাছে তুমি কখনই এ ধরনের কথা বলবে না। কোন আমেরিকান ইহুদীর কাছে তো নয়ই। যতদিন মার্কিন রাষ্ট্র থাকবে ততদিন হাইম সলমন মাকির্নীদের মধ্যে বেঁচে থাকবে এবং হাইম পরিবারও জাতীয় সম্মানের এক কেন্দ্রস্থল হিসাবে বর্তমান থাকবে। যদি ড. হাইম হাইকেলের কিছু হয়, তাহলে আজ না হয় কাল তা প্রকাশ পাবেই। তখন যে প্রতিক্রিয়া হবে সেটা আমরা ইহুদীবাদীরা বহন করতে পারবো না। অন্যভাবে তাকে ধীর প্রক্রিয়ায় মুছে ফেলতে হবে। অবশ্যই তাকে আড়াল করার শেষ রক্ষা যদি নাই হয়, তাহলে আশু জাতীয় স্বার্থকেই বড় করে দেখব। তাকে সরিয়ে দেয়ার দরকার হলে সরিয়েই দেব।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘ধন্যবাদ স্যার। তাকে শুধু পাগল প্রমাণ করা নয়, সত্যিই পাগলে পরিণত করার কাজটাই সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেন এই কাজটা আমরা করতে পারছি না।’ বিল পুলম্যান বলল।
‘এই কাজ আমরা প্রথম থেকে শুরু করেছি। কিন্তু ডাক্তারদের বক্তব্য হলো ড. হাইকেল অত্যন্ত শক্ত মন ও নিখাদ চরিত্রের লোক। ঈশ্বরমুখিতা তার এতই দৃঢ় যে, তার মনকে, চিন্তাকে বিছিন্ন ও বহুমুখী করার কোন পন্থাই এখনও সফল হয়নি। এই চেষ্টা আমাদের জারি আছে। আমরা সম্প্রতি তার ব্রেনের উপর ইলেক্ট্রনিক ওয়েভকে কার্যকর করার চেষ্টা শুরু করেছি। এই চেষ্টা যদি যথেষ্ট পরিমাণে সফল হয়, তাহলে তার চিন্তা-পদ্ধতিকে বিকৃত করা সম্ভব হবে।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘ধন্যবাদ স্যার। স্যার আরেকটা কথা। আহমদ মুসাকে ‘শুট এট সাইট’ এর নির্দেশ দিন। এটা প্রমাণ হয়েছে, তাকে বন্দী করে আমরা এঁটে উঠতে পারছি না, অতীতেও পারিনি। সুতরাং তাকে বন্দী নয় দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দিন।’ বিল পুলম্যান বলল।
‘ঠিক বলেছ বিল। আমিও এ রকমই ভাবছি। আমরা যদি এতদিন এ সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে অনেক আগেই আমরা আহমদ মুসার হাত থেকে মুক্তি পেতাম। আমাদের………………….।’
কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়াল আজর ওয়াইজম্যানের পার্সোনাল সেক্রেটারী। বলল আজর ওয়াইজম্যানকে, ‘স্যার পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফার ও রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টর মি. ফ্রান্সিস এসেছেন।’
‘ওঁদের নিয়ে এস।’ নির্দেশ দিল আজর ওয়াইজম্যান।
‘ফিলাডেলফিয়ার কোন খবর আছে স্যার।’ জিজ্ঞাসা করল বিল পুলম্যান।
‘ঐ ব্যাপারেই আসছেন এ্যালেন শেফার ও ফ্রান্সিস। বলল ওয়াইজম্যান।
কক্ষে প্রবেশ করল ফ্রান্সিস ও এ্যালেন শেফার।
তারা কক্ষে প্রবেশ করে আজর ওয়াইজম্যানকে রাজাসুলভ দীর্ঘ বাও করল।
আজর ওয়াইজম্যান তাদের ইংগিত করলে তারা বসল গিয়ে বিল পুলম্যানের বাম পাশে পাশাপাশি।
ওরা বসতেই আজর ওয়াইজম্যান চেয়ারে হেলান দিয়ে তাকাল এ্যালেন শেফারের দিকে। বলল,‘মি. শেফার বলুন ফিলাডেলফিয়ার খবর কি?’
এ্যালেন শেফারের প্রকৃত নাম জোসেফ এরাম। তিনি ইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্টের ইনভেস্টিগেটিভ অফিসার। সেদিন এ্যালেন শেফার নাম নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় ড. হাইম হাইকেলের বাসায় গিয়েছিলেন। সে একজন কট্টর ইহুদীবাদী।
‘স্যার আজই আমি ফিলাডেলফিয়া থেকে জানতে পেরেছি, বারবারা ব্রাউন আমাদের সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছে।’ আজর ওয়াইজম্যানের প্রশ্নের উত্তরে বলল ‘এ্যালেন শেফার ওরফে জোসেফ এরাম।’
‘তার মানে সেদিন আইজ্যাক দানিয়েল ড. হাইম হাইকেলের ছেলে হাইম বেঞ্জামিনের সাথে কি আলাপ করেছে তার কিছুই আমরা জানতে পারিনি!’ আহত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল আজর ওয়াইজম্যান।
‘জি হ্যাঁ, বারবারা ব্রাউন জানিয়ে দিয়েছে, হাইম পরিবারের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন কাজ সে করতে পারবে না এবং সেদিনের আলোচনা সম্পর্কেও সে কোন কথা বলবে না। তবে এটুকু বলেছে যে, এ্যালেন শেফারের প্রস্তাবে হাইম বেঞ্জামিন রাজী আছে এবং হাইম বেঞ্জামিনের সাথে দেখা করতে আসা আইজ্যাক দানিয়েল লোকটিকে সে সন্দেহের চোখে দেখছে। সে কেস করেছে এ কারণেই।’ বলল এ্যালেন শেফার।
‘বারবারা ব্রাউনের এ পরিবর্তনের কারণ কি? সে তো একজন ভালো ইহুদী গোয়েন্দা কর্মী।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘সে জানিয়েছে এটা তার নীতিগত সিদ্ধান্ত। হাইম পরিবারের সম্পর্কিত কোন কিছুই সে নিজেকে জড়িত করবে না।’ এ্যালেন শেফার জানাল।
‘দেখা যাচ্ছে হাইম বেঞ্জামিন আসার পরই তার এ পরিবর্তন। কারণ কি?’ আবার প্রশ্ন করল আজর ওয়াইজম্যান।
‘স্যার অনেকেই ভাবছেন প্রেম ঘটিত কোন ব্যাপার রয়েছে এর পেছনে। সে হয়তো মনে করছে বেঞ্জামিনের উপর কোন গোয়েন্দাগিরী করা তার ঠিক হবে না। এ রকম কিছু ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।’ বলল এ্যালেন শেফার।
এ্যালেন শেফার থামতেই আজর ওয়াইজম্যান বলে উঠল, ‘তার এই পরিবর্তন বা কোন প্রকার ঠুনকো সেন্টিমেন্ট গ্রহণযোগ্য নয়। তার ব্যাপারে আমরা পরে ভাবব।’ বলে আজর ওয়াইজম্যান তাকাল ফ্রান্সিসের দিকে। বলল, ‘মি. ফ্রান্সিস হাইম পরিবারের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারটা সবাইকে বলুন।’
রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর নেইল ফ্রান্সিস নড়ে-চড়ে বসে বলল, ‘হাইম বেঞ্জামিনের সাথে আমরা দেখা করে আসার পর হাইম বেঞ্জামিনই আমার সাথে প্রথম যোগাযোগ করেছে। প্রথম দিনেই সে বলেছে, এ্যালেন শেফারের দেয়া প্রস্তাব অনুসারে আমাদের দেখা করার ব্যবস্থা করুন। এরপর আরও তিনবার সে টেলিফোন করেছে। প্রতিবারেই সে ঐ ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছে। অধৈর্য হয়ে পড়েছে তারা। এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের বুঝিয়ে রাখা যাচ্ছে না।’
নেইল ফ্রান্সিস থামলে আজর ওয়াইজম্যান বিল পুলম্যানকে বলল, ‘তুমিও তো ব্যাপারটা জান। তুমি কি ভাবছ বল।’
‘জি স্যার, আমি সব শুনেছি। আমি তাদের অধৈর্য হওয়াটাকে পছন্দ করছি না। এ্যালেন শেফার যে প্রস্তাব দিয়ে এসেছেন, আমরা তা আমাদের সুবিধা অনুযারী বাস্তবায়ন করব। দেখা করানোর ব্যাপারটাকে যতটা পারা যায় আমি ‘ডি’লে’ করানোর পক্ষপাতী।’ বিল পুলম্যান বলল।
আজর ওয়াইজম্যান আবার তাকাল এ্যালেন শেফারের দিকে। বলল, ‘জোসেফ এরাম তুমি এ ব্যাপারে কি বলতে চাও?’
জোসেফ এরাম ওরফে এ্যালেন শেফার তাকাল আজর ওয়াইজম্যানের দিকে। বলল, ‘স্যার আমার হাইম পরিবারকে এই প্রস্তাব দেওয়ার আসল কারণ হলো তাদের শান্ত রাখা, আমাদের হাতে রাখা। যাতে এ নিয়ে তারা হৈচৈ না বাধায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্যার আমি মনে করি, ড. হাইম হাইকেলকে দেখার ওদের সুযোগ দেয়া দরকার। দেখা হলে তারা নিশ্চিত হবে যে, ড. হাইম হাইকেল বেঁচে আছেন। তিনি অসুস্থ। তার চিকিৎসা হচ্ছে। তারা এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করার প্রয়োজন অনুভব করবে না। এতে আমাদের কাজের সুবিধা হবে।’ থামল পুলিশ অফিসার জোসেফ এরাম।
আজর ওয়াইজম্যান এবার সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘হাইম পরিবারকে দেয়া আমাদের প্রস্তাব নিয়ে আমরা কি করব, এ ব্যাপারে তোমাদের প্রত্যেকের কথার পেছনেই যুক্তি আছে। কিন্তু তোমরা কেউই বারবারা ব্রাউনের পরিবর্তনের বিষয়টাকে সামনে রেখে হাইম পরিবার সর্ম্পকে আমাদের করণীয় বিচার-বিবেচনা করে দেখনি। বারবারা ব্রাউনের এই পরিবর্তন ছোট বিষয় নয়। তার চিন্তা-ধারার এই পরিবর্তনের মত হাইম পরিবারের চিন্তা ধারায় কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা আমরা জানতে পারছি না। যতদিন এটা জানা না যাবে ততদিন হাইম হাইকেলের সাথে তার পরিবারকে দেখা করানো যাবে না।’
‘কিন্তু স্যার বেশি দিন দেরি হলে করলে তারা বিরক্ত হবে, বিক্ষুব্ধ হবে এবং ধৈর্য্যহারা হলে এই বিষয়টা সরকার ও সংবাদপ্রত্রের কাছে চলে যেতে পারে।’ বলল নেইল ফ্রান্সিস।
‘কিন্তু মি. ফ্রান্সিস, এমন ধরনের কিছু যাতে তারা না করতে পারে তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু দেখা করার পর কেউ যদি হোস্টাইল হয়, কিংবা হোস্টাইল কাউকে যদি দেখা করানো হয়, তাহলে যে ক্ষতি হবে তার প্রতিবিধানের কোন পথই থাকবে না। তার ফলে গোটা প্ল্যান আমাদের ভন্ডুল হয়ে যাবে। যে কোন মূল্যেই এটা হতে দেয়া যাবে না।’ বলল আজর ওয়াইজম্যান।
‘স্যার ঠিকই বলেছেন। কিন্তু স্যার এখন ওদের মুখ বন্ধ করা যাবে কিভাবে?’ বলল নেইল ফ্রান্সিস।
‘খুব সহজে। বিল পুলম্যান একদিন যাবে ফিলাডেলফিয়ায় ড. হাইম হাইকেলের বাড়িতে। বলবে বেঞ্জামিনকে শত্রুপক্ষের সাথে যেন পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কোনভাবেই তারা যোগাযোগ না করে। অন্যথা যদি হয় তাহলে তারাও বিপদে পড়বে, ড. হাইম হাইকেলকেও মেরে ফেলবে। তাদের আচরণের উপরই নির্ভর করবে কবে কখন তারা ড.হাইম হাইকেলের সাথে দেখা করতে পারবে। অন্যথায় ড. হাইম হাইকেলের মতই বেঞ্জামিনও একদিন হারিয়ে যাবে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘বুঝলাম। তার আগ পর্যন্ত আমি কি বলব ওদের। ওরা আজ কিংবা যেকোন সময় যোগাযোগ করতে পারে।’ বলল ফ্রান্সিস।
‘জানাবেন, ক’দিনের মধ্যেই আমাদের লোক আপনাদের ওখানে যাবে আলোচনার জন্যে। এ বিষয়ে তারাই কথা বলবে।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
‘স্যার, আহমদ মুসা যদি সত্যিই এসে থাকে, তাহলে সে কি শুধু হাইম পরিবারের উপরই নির্ভর করবে? সরকার ও প্রশাসনের ক্ষমতাবান অনেকের সাথেই তার সখ্যতা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সে যোগাযোগ করছে কিনা আমরা কি তার খোঁজ রাখছি?’ বলল বিল পুলম্যান।
‘আহমদ মুসার এ সুবিধা আছে। জেনারেল শ্যারন জেলে থাকায় আমাদের বিরাট অসুবিধা হয়েছে এক্ষেত্রে। বিরাট ভীতি ও হতাশাও ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের যারা অবশিষ্ট আছে তাদের মধ্যে। এরপরও তাদের যথাসাধ্য সাহায্য আমরা পাচ্ছি।’ আজর ওয়াইজম্যান বলল।
কথা শেষ করেই আজর ওয়াইজম্যান উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তোমরা এস। আমার জরুরি এনগেজমেন্ট আছে। আমি চললাম।
আজর ওয়াইজম্যান বেরিয়ে গেলে অন্যরা সবাই উঠে দাঁড়াল।

আহমদ মুসা অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল তার হোটেল কক্ষে। হাইম বেঞ্জামিন আসছে, তারই জন্যে অধিরভাবে অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
মাত্র আধা ঘন্টা আগে সে ফিলাডেলফিয়া পৌঁছেছে। ফিলাডেলফিয়া এসেছে বারবারা ব্রাউনের জরুরি টেলিফোন পেয়ে। বারবারা ব্রাউন টেলিফোন করেছিল হাইম বেঞ্জামিনের পক্ষ থেকে। টেলিফোনে বিস্তারিত কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, তাদের অনুরোধ আপনি অবিলম্বে ফিলাডেলফিয়া আসুন। হাইম পরিবার খুবই বিপদে।
টেলিফোন পেয়েই আহমদ মুসা ফিলাডেলফিয়া চলে এসেছে। হোটেল কক্ষে উঠেই আহমদ মুসা হাইম বেঞ্জামিনকে টেলিফোন করেছিল। টেলিফোন পেয়েই হাইম বেঞ্জামিন আহমদ মুসাকে কিছু বলতে না দিয়ে বলে, ‘স্যার এখনি হোটেলে আসছি। আপনি অপেক্ষা করুন।’ আহমদ মুসা আর কিছুই বলতে পারেনি তাকে। কথা বলার সময় বেঞ্জামিনের গলা কাঁপছিল। কণ্ঠস্বর ছিল ভীত, উদ্বিগ্ন। আহমদ মুসা তাকে তার হোটেল কক্ষে ওয়েলকাম করে টেলিফোন রেখে দিয়েছিল।
উদ্বেগ ঘিরে ধরেছিল আহমদ মুসাকে। নিশ্চয় বড় কিছু ঘটেছে। কি ঘটতে পারে? বারবারা ব্রাউনের যে টেলিফোন পেয়ে আহমদ মুসা নিউইয়র্ক থেকে এখানে এসেছে, সে টেলিফোনেও উদ্বেগ ছিল, কিন্তু সেটা এমন ভেঙ্গে পড়া ছিল না। আমাকে বাড়িতে না ডেকে আমার হোটেলে ছুটে আসছে কেন?
এমন অনেক চিন্তা আহমদ মুসাকে অস্থির করে তুলছে।
দরজায় নক হলো।
আহমদ মুসা দরজার দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল।
দরজায় দাঁড়িয়ে হাইম বেঞ্জামিন।
বেঞ্জামিনের উস্কো-খুস্কো চেহারা। টাই পরেনি। সার্টের উপর দিকের দুটি বোতাম খোলা। তার চোখ-মুখ থেকে উদ্বেগ ঠিকরে পড়ছে।
‘গুড ইভনিং মি. বেঞ্জামিন। ওয়েলকাম।’ দরজা খুলেই বেঞ্জামিনকে স্বাগত জানাল আহমদ মুসা।
‘স্যার, ওরা বারবারা ব্রাউনকে ধরে নিয়ে গেছে।’ আহমদ মুসার সম্ভাষণের কোন জবাব না দিয়ে কম্পিত কণ্ঠে, ভাঙা গলায় হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘আচ্ছা শুনছি তোমার কথা। এস, আগে বস।’ বলে আহমদ মুসা তাকে ধরে এনে সোফায় বসাল।
তার পাশে বসল আহমদ মুসা। বিস্ময় আহমদ মুসারও চোখে-মুখে। বলল, ‘কখন ধরে নিয়ে গেছে তাকে?’
‘এই ঘন্টা খানেক আগে।’ উত্তর দিল হাইম বেঞ্জামিন।
‘কেন নিয়ে গেছে, কি বলে নিয়ে গেল?’
‘বারবারা ব্রাউন যেতে অস্বীকার করেছিল। তার মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে ধরে নিয়ে গেছে।’
‘কেন নিয়ে যাচ্ছে কিছু জানায়নি?’
‘বাইরের কারো সাথে আব্বা সর্ম্পকে কথা বলতে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছিল। বিশেষ করে নিষেধ করেছিল আপনার সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ না করতে। কিন্তু বারবারা যে আমার পক্ষ থেকে আপনার কাছে টেলিফোন করেছে। সেটা গোটাটাই তারা মনিটর করেছে। এমনকি আজকের সকালের কথাও। তার প্রথম অপরাধ হলো, সেদিন আমাদের সাথে আপনার যে কথা হয়েছিল, সেটা বারবারা ব্রাউন ওদের জানাতে অস্বীকার করেছে। দ্বিতীয় অপরাধ হলো, সে আপনার সাথে যোগাযোগ রেখেছে।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘কোত্থকে নিয়ে গেছে? বাড়ি থেকে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘জি হ্যাঁ, বাড়ি থেকে।’
‘বাড়ির লোকেরা থানায় জানায়নি?’
‘না স্যার। নিয়ে যাবার সময় তারা বলেছে, বারবারা ব্রাউন আমাদের লোক আমরা নিয়ে যাচ্ছি। থানায় বলে লাভ হবে না। থানা জানে। এ বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে, হৈচৈ করলে আরও বড় ঘটনা ঘটবে? পরিবারের লোকেরা সাংঘাতিক ভীত হয়ে পড়েছে।’
‘তাহলে থানায় জানানো হয়নি?’
‘জানিয়েছে স্যার। কিন্তু থানা সরেজমিনে খোঁজ নিতেও আসেনি। আনঅফিসিয়ালী বলেছে, বারবারা ব্রাউন একটি প্রাইভেট ডিটেকটিভ ফার্মে কাজ করতো। ফার্মই তাকে নিয়ে গেছে তাদের কাজে।’ বলে একটা দম নিল হাইম বেঞ্জামিন। তারপর আবার বলা শুরু করল, ‘স্যার পুলিশকে জানিয়ে, পুলিশকে হাত করেই এটা ওরা করেছে। সুতারাং পুলিশ কিছুই করবে না। আমার ভয়ই হচ্ছে, বারবারা ব্রাউনের কাছ থেকে কথা আদায়ের জন্যে ওরা তার উপর নির্যাতন চালাবে। আমরা এখন কি করব স্যার। এই বিপদে আপনার কথাই আমার মনে পড়েছে। বলুন আমরা কি করব? আমার আব্বারই বা কি হবে!’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘এসব কিছু না ঘটলে, আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক চলতে পারলে ভাল হতো। সে পথ এখন বন্ধ। কারণ তারা আপনাদেরও সন্দেহ করছে। এই অবস্থাটা বিপজ্জনক। তারা ধরা পড়ার ভয়ে ভীত হয়ে ড. হাইম হাইকেলকে কিছু করে বসলে সেটা মহা ক্ষতির কারণ হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
আংতকে-উৎকণ্ঠায় হাইম বেঞ্জামিনের মুখের চেহারা পান্ডুবর্ণ ধারণ করল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল তার। বলল,‘স্যরি, আমি ওদের কথা মত চলে চেষ্টা করেছি লক্ষ্যে পৌঁছতে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় বারবারা ব্রাউনকে আমাদের সাক্ষাতের সব কথা ওদের জানাতে বললে। তাছাড়া টেলিফোনে ওরা মনিটর করবে, এটার চিন্তাও আমাদের মাথায় আসেনি স্যার। আমরা দুঃখিত।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বেঞ্জামিন এটা দুঃখের বিষয় নয়, পর্যালোচনার বিষয় এটা। যা হাতছাড়া হয়ে যায়, বুঝতে হবে তা হাতছাড়া হবার জন্যেই। এখানে দুঃখ নয়, শিক্ষার বিষয় থাকে।’
চোখের দুকোণ মুছে নিয়ে হাইম বেঞ্জামিন বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। এখন আমরা কি করব বলুন। ওর মা শিলা ব্রাউন ভীষণ কাঁদছে। ওরা খুব নির্বিবাদী পরিবার। বংশানুক্রমে ওরা শিক্ষকতা পেশায়। ওর আব্বা ব্যাফেল ব্রাউন ইউনিভার্সিটি অব দেলওয়ারের শিক্ষক এবং ফিলাডেলফিয়া জুইস এ্যাসোসিয়েশনের কালচারাল কমিটির সভাপতি। ভীষণ রেগে গেছেন তিনি। তাঁকে না জানিয়ে, অনুমতি না নিয়ে কেন বারবারা ব্রাউন জেনারেল শ্যারনের ইসরাঈল-কেন্দ্রিক গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ দিল। তার………….।’
বেঞ্জামিনের কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘তুমি কি জানতে?’
‘জানতাম না। এবার আসার পর আমি ওর কাছ থেকেই শুনেছি। সে আমাকে জানায় যে, ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা তাকে নিয়োগ করেছে আমাদের বাসায় কে আসে, কে যায়, আমরা কখন কার সাথে যোগাযোগ করি, কি বলি, ইত্যাদি বিষয়ে রিপোর্ট করার জন্যে। চাপিয়ে দেয়া এই দায়িত্ব তার মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ওদের কোন কথাই সে শুনতে রাজী নয়। এটা তার আরও বিপদ ডেকে আনবে।’ বলল বেঞ্জামিন। শেষ বাক্যটা তার আবেগ-রুদ্ধ কণ্ঠ থেকে খুব কষ্টে বের হয়েছিল।
আহমদ মুসা বেঞ্জামিনের গায়ে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে বলল,‘যারা বারবারাকে নিয়ে গেছে তাদের কাউকে চেন? ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থার অফিস, যেখানে বারবারা মাঝে মাঝে যেত তার ঠিকানা তুমি জান?’
‘জ্বি না। ওদের কাউকে চিনি না, ঠিকানাও ওদের জানি না স্যার।’ বলল বেঞ্জামিন।
‘ওদের বাসার কেউ জানে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘এ ব্যাপারে কোন কথা ওদের আমি জিজ্ঞাসা করিনি।’ বেঞ্জামিন বলল।
‘আমরা বারবারার বাসায় এখন যেতে পারি না।?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই স্যার।’
‘আমার কি পরিচয় দেবে তাদের কাছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলব আমার বন্ধু এক প্রাইভেট গোয়েন্দা।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ধন্যবাদ। চল আর দেরি নয়।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসারা পৌঁছল বারবারা ব্রাউনদের বাড়িতে।
বাইরে সিকিউরিটির দুজন লোক ছাড়া আর কেউ ছিল না।
হাইম বেঞ্জামিন আহমদ মুসাকে লন চেয়ারে বসিয়ে এক দৌড়ে ভেতরে গেল। দুতিন মিনিট পরেই ফিরে এল সে।
হাইম বেঞ্জামিনের সাথে আহমদ মুসা প্রবেশ করল ভেতরে।
ভেতরে ড্রইংরুমে একটা সোফায় পাশাপাশি বসেছিল মি. ব্রাউন ও মিসেস ব্রাউন।
মি. ও মিসেস ব্রাউন ছাড়া বাসায় কেউ নেই।
মিসেস ব্রাউনের বিধ্বস্ত চেহারা। আর পানি ভরা মেঘের চেহারা মি. ব্রাউনের।
বেঞ্জামিন ওদের সাথে আহমদ মুসার পরিচয় করিয়ে দিল। বলল মি. ব্রাউনকে, ‘আংকেল আমার বন্ধু প্রাউভেট ডিটেকটিভ মি. দানিয়েলকে নিয়ে এসেছি। পুলিশ কি করবে জানি না। কিন্তু আমাদের কিছু করা দরকার।
‘ধন্যবাদ বেঞ্জামিন।’ বলল মি. ব্রাউন, বারবারা পিতা।
তারপর মি. ব্রাউন তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ওয়েলকাম মি. দানিয়েল। আমাদের বিপদে আপনার এগিয়ে আসার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু পুলিশ যেখানে সক্রিয় হবার মত কিছু পাচ্ছে না, সেখানে আমরা কি করতে পারি!’
‘বিপদের সময় যার যতটুকু সাধ্য চেষ্টা করা উচিত। সাফল্য ঈশ্বরের হাতে।’ আহমদ মুসা বলল।
মি. ব্রাউন রুমাল দিয়ে চোখ ভাল করে মুছে নিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘ভাল বলেছ ইয়ংম্যান। নিশ্চয় তুমি গভীরভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাসী!’
‘সৃষ্টি তার স্রষ্টার প্রতি তো বিশ্বাসী হবেই, তাঁর উপর নির্ভর করবেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শেখ তোমরা এই বাছার থেকে। এই বিপদের সময় এখনও তোমরা একবারও ঈশ্বরের নাম করনি। বাছাই প্রথম আমার ঘরে আলো জ্বালল।’ চোখ মুছতে মুছতে বলল মিসেস ব্রাউন। তারপর সোজা হয়ে বসে আহমদ মুসার দিকে ঘুরে বলল, ‘বাছা তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার মধ্যে ঈশ্বর আছেন। তুমিই পারবে আমার বাছাকে বাঁচাতে। পারবে না?’
‘চেষ্টা করতে অবশ্যই পারব মা। ঈশ্বর জানেন তিনি কি ফল দেবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
মিসেস ব্রাউন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। বলল একটু সময় নিয়ে, ‘বাছা তুমি আমাকে মা বলেছ? বারবারা নেই, আমার মন হাহাকার করছে এই ডাকের জন্যে বাছা। তুমি এই ডাক ফিরিয়ে এনেছ। তুমি বারবারাকে ফিরিয়ে আন বাছা।’
বলেই মুখ নিচু করল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মুখে রুমাল চাপা দিয়ে কান্না রোধের চেষ্টা করতে লাগল মিসেস ব্রাউন।
কেউই কোন কথা বলতে পারল না।
একটু নিরবতা।
অসহনীয় বেদনার এক পরিবেশ।
মিসেস ব্রাউন নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ-চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘স্যরি। তোমরা কথা বল।’
আহমদ মুসাই কথা বলে উঠল, ‘যারা মিস ব্রাউনকে নিয়ে গেছে, তাদের বা তাদের ঠিকানা সম্পর্কে কিছু জানেন আপনারা?’
‘তারা কোন দিনই আমাদের বাড়িতে আসেনি। দেখিনি তাদের কোন দিন।’ বলল মি. ব্রাউন।
‘মিস ব্রাউন যে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ছিল, তার পরিচয় ও ঠিকানা সম্পর্কেও নিশ্চয় আপনারা জানেন না!’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘না জানি না। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যে নিজেকে জড়িয়েছে সে আমাদের কোন দিনই জানায়নি। দুর্ভাগ্য আমাদের!’ বলল মি. ব্রাউন।
‘মাফ করবেন, আমি কি তার ঘর, তার টেবিল,কাগজপত্র, হ্যান্ডব্যাগ, ইত্যাদি পরীক্ষা করতে পারি? আপনারা দয়া করে অনুমতি দেবেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম বাছা। তুমি যে সহযোগিতা চাইবে, সবই আমরা করব।’ বলেই উঠে দাঁড়াল মিসেস ব্রাউন। বলল, ‘চল তার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল বেঞ্জামিন ও মি. ব্রাউনও।
প্রবেশ করল তারা মিস ব্রাউনের ঘরে। সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো ঘর। শোবার বিছানা, পড়ার টেবিল, ওয়াল ক্যাবিনেট, কোথাও কোন অগোছালো অবস্থা নেই।
কিন্তু পরিপাটি অবস্থার মধ্যে পড়ার টেবিলে একটা মানিব্যাগ পড়ে আছে বেসুরোভাবে। মানিব্যাগটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা তাকাল মিসেস ব্রাউনের দিকে। বলল, মিস ব্রাউনের হ্যান্ড পারসটা কোথায়?
‘ওর সাথেই ছিল নিয়ে গেছে।’ বলল মিসেস ব্রাউন।
‘কিন্তু তার এ মানিব্যাগটা তো তার হ্যান্ড পারসেই থাকার কথা। এখানে পড়ে কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘এ মানিব্যাগটা তার কাছে মানে তার পারসেই ছিল। কিন্তু যাবার সময় সে ফেলে দিয়ে গেছে। গাড়ি করে যখন তাকে নিয়ে যায়, তখন বারবারা গাড়ির জানালা দিয়ে মানিব্যাগটা বাইরে ছুঁড়ে দেয়।’ বলল মিসেস ব্রাউন।
আনন্দের একটা ঝিলিক ফুটে উঠল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। তার কণ্ঠ থেকে একটা স্বগত উক্তি বেরিয়ে এল, ‘ও গড! থ্যাংকস টু বারবারা। থ্যাংকস টু গড।’
ওরা তিনজনই আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বেঞ্জামিন বলল, ‘কি দেখলেন, কি পেলেন স্যার?’
‘শত্রুদের ঠিকানা পেয়ে গেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোথায়?’ বিস্মিত প্রশ্ন বেঞ্জামিনের।
‘ঐ মানিব্যাগে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু বাছা, তুমি মানিব্যাগটা এখনও দেখই নি।’ বলল মিসেস ব্রাউন।
‘দেখার দরকার নেই মা। ওর মধ্যে যদি শত্রুর পরিচয় ও ঠিকানামূলক কিছু না থাকতো মিস ব্রাউন তাহলে তার মানিব্যাগ এভাবে গাড়ির জানালা দিয়ে ফেলে দিত না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বলেছ দানিয়েল। আমারও বিস্ময় লেগেছে, শুধু ডলার রক্ষার জন্যে মানিব্যাগটা এভাবে ফেলল কেন সে!’ বলল মি. ব্রাউন।
আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে মানিব্যাগটা তুলে নিল।
মানিব্যাগে যা ছিল সব বের করে আহমদ মুসা টেবিলে রাখল।
কিছু ডলার, কয়েকটা নেমকার্ড, দুটি ক্রেডিট কার্ড, কয়েকটা চিরকুট এবং কয়েক পাতার ছোট একটা টেলিফোন গাইড পেল মানিব্যাগ থেকে।
আহমদ মুসা টেলিফোন গাইডটা তুলে দিল মি. ব্রাউনের হাতে। বলল, ‘দেখুন সন্দেহ করার মত কোন নাম, ঠিকানা, টেলিফোন আপনার চোখে পড়ে কিনা। আমি নেম কার্ড ও চিরকুটগুলো দেখছি।’
নেম কার্ডের সবগুলোই বিখ্যাত কিছু শপস ও বিজনেস হাউজের। চারটি চিরকুটে চার মোবাইল নম্বর লেখা। কিন্তু নম্বরের সবগুলোই ফিলাডেলফিয়ার বাইরের।
আহমদ মুসা নেম কার্ড ও চিরকুটগুলো বেঞ্জামিনের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘দেখ তুমি কিছু বুঝতে পারো কিনা।’
মি. ব্রাউন বলল,‘দানিয়েল, টেলিফোন গাইডে অপরিচিত কোন নম্বর দেখছি না। সবই আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বিশববিদ্যালয় ও কমার্শিয়াল শপস-এর নম্বর এবং এদের সাথে মোটামুটি আমরা সকলেই পরিচিত।’
আহমদ মুসাও নজর বুলাল টেলিফোন গাইডটার উপর। টেলিফোন নম্বরগুলো সত্যিই ‘আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কেটিং’ এই চ্যাপ্টারে বিভক্ত। অবাক হলো আহমদ মুসা যে, ‘বিবিধ বলে বিভাগ নেই। বিস্মিত আহমদ মুসা বলল, ‘বারবারা ব্রাউন দেখছি খুবই ঘরমুখো ছিল।। তার কনট্যাক্ট খুবই সীমিত ছিল।’
‘হ্যাঁ বাছা। মেয়ে আমার খুবই ভাল। বিশ্ববিদ্যালয় ও বাড়ি ছাড়া সে কিছু বুঝত না। প্রয়োজনীয় শপিং-এ মাঝে মাঝে বাইরে যেত, কিন্তু আড্ডা দেয়া তার স্বভাব ছিল না। আমার এমন ভাল মেয়েই আজ বিপদে পড়ল।’ বলল মিসেস ব্রাউন। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।
টেলিফোন গাইডের একদম শেষ পাতায় কিছুটা সংকেত ধরনের লেখা আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। লেখাটি এই রকমঃ L.F. `Sinai’ ch. `Phila’. অক্ষর ও শব্দগুলোর মাত্র Sinai ও Phila শব্দ দুটি কোটেড।
ভ্রু-কুঁচকালো আহমদ মুসার। একটা রহস্যের গন্ধ পেল এর মধ্যে। লেখাটা আহমদ মুসা দেখাল মি. ব্রাউনকে।
মি. ব্রাউন বলল, ‘এটা আমি দেখেছি দানিয়েল। কিছু বুঝতে পারিনি আমি। তার পড়াশুনার সাথে সম্পর্কিত কিছু হতে পারে মনে করেছি।
বেঞ্জামিন ও মিসেস ব্রাউনও লেখাটা দেখল। তারাও এর কোন অর্থ বের করতে পারলো না।
আহমদ মুসা আবার হাতে নিল টেলিফোন গাইডটা। আবার সে চোখ বুলাল লেখাটির উপর। হঠাৎ আহমদ মুসার চোখ-মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। বলল, ‘মিস ব্রাউনের নিশ্চয় পার্সোনাল কম্পিউটার আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’ বলল মি.ও মিসেস ব্রাউন একসাথেই।
‘আমাকে দয়া করে সেখানে নিয়ে চলুন। আমি নিশ্চিত এই সংকেতগুলো তার কম্পিউটার এ্যাকাউন্টের সাথে জড়িত।’ আহমদ মুসা বলল।
কম্পিউটারটা পরিবারের লাইব্রেরী রুমে।
লাইব্রেরী রুমে গিয়ে আহমদ মুসা কম্পিটারের চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।
আহমদ মুসা কম্পিউটারের ফাইল তালিকা থেকে PSF (পার্সোনাল সিক্রেট ফাইল) বেছে নিয়ে ফাইলটি ওপেন করল। ফাইল আনলক করার জন্যে আহমদ মুসা `Sinai’ টাইপ করল। অনন্দে মুখ উজ্জল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। ফাইল আনলক হয়ে গেছে। স্ক্রীনে ভেসে উঠল আবার অনেকগুলো ফাইলের তালিকা। তালিকার উপর চোখ বুলাল আহমদ মুসা। সর্বশেষ ফাইলটা হলো `Phila’. সে ফাইলটিতে ক্লিক করতেই স্ক্রীনে ভেসে উঠল লাল অক্ষরে লেখা একটা ঠিকানা।
‘ইউরেকা’ বলে আনন্দে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
বেঞ্জামিন ও মি. ব