৩৯. ধ্বংস টাওয়ারের নীচে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

ছুটছিল আহমদ মুসা পূর্বমুখী প্রশস্ত করিডোর ধরে। তার পেছনে বুমেদীন বিল্লাহ।
দুজনের হাতেই দুটি ডেডলি কারবাইন। উদ্যত অবস্থায়। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যেত দুটো কারবাইনের নল দিয়েই ধুঁয়া বেরুচ্ছে। তাদের পেছনে করিডোরের এক চৌমাথা। চৌমাথার উপর পড়ে আছে ছয় সাতটি লাশ। ওরা ছুটে এসেছিল উত্তর ও দক্ষিণের করিডোরটার দিক থেকে আহমদ মুসাকে বাধা দেয়ার জন্যে। বন্দীখানার ভেতরে প্রহরীদের সাথে যে সংঘর্ষ হয়, তার গুলীর শব্দ তারা পেয়েছিল।
আহমদ মুসার বন্দীখানা থেকে বেরুতে চেয়েছিল নিশব্দেই। কিন্তু তা পারেনি। আবার গেটেও যে গোপন এ্যালার্ম ব্যবস্থা ছিল তা আহমদ মুসারা একবারও ভাবেনি। এ এলার্ম পেয়েই দুপাশ থেকে বাড়তি প্রহরীরা ছুটে এসেছিল গেটের দিকে। এ সবের ফলেই হাইম হাইকেলকে খোঁজার জন্যে আহমদ মুসারা বন্দীখানায় যে কাজটা নি:শব্দে সারতে চেয়েছিল তা আর হয়নি।
তাদেরকে বন্দীখানা থেকে ছয়টি লাশ মাড়িয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। সব আট-ঘাট বেঁধে তাদের বন্দী করে রাখলেও তাতে একটা বড় ফসকা গিরা ছিল। তাদেরকে ক্লোরোফরম করেছিল তারা ঠিকই, কিন্তু আহমদ মুসা ও বুমেদীন বিল্লাহ তাদের নিশ্বাস বন্ধ করে রাখায় ক্লোরোফরম তাদের উপর কাজ করেনি। তারা সংজ্ঞা হারাবার ভান করে ওদের বোকা বানাতে পেরেছিল।
ওরা আহমদ মুসাদের পিছমোড়া করে বেঁধে মেঝেয় ফেলে রেখে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যেতেই আহমদ মুসা চোখ খুলেছিল। বুমেদীন বিল্লাহও। গেট আগলাবার ও বন্দীদের উপর নজর রাখার জন্য দুজন প্রহরী রাখা ও তাদের কড়া নির্দেশ দেয়ার বিষয়টাও তারা শুনে নেয়।
চোখ খুলেই মেঝের উপর উঠে বসে আহমদ মুসা। পিছমোড়া করে বাঁধা হাতের বাঁধন পরখ করার চেষ্টা করে বলে, ‘বিল্লাহ ওরা বিশেষ ধরনের রাবার রোপ দিয়ে বেঁধেছে। সম্ভবত এটা কোনভাবেই কাটা যাবে না।’
বুমেদীন বিল্লাহও উঠে বসেছিল। বলেছিল, ‘রাবারের বাঁধন খোলাও কঠিন ভাইয়া।’
আহমদ মুসা চোখ বন্ধ করে একটু ভেবেছিল। বলেছিল, ‘তবে বিল্লাহ রাবার দড়িতে যদি ইলাষ্টিসিটি থাকে, তাহলে কিন্তু একটা পথ বের করা যায়। বাঁধনটা যেভাবে হাতকে কামড়ে ধরেছে, তাতে রাবার দড়িতে ইলাষ্টিসিটি আছে বলেই মনে হচ্ছে। তোমারটা কেমন বিল্লাহ?’
‘ঠিক ভাইয়া, বাঁধনটা হাতে যেন ক্রমশই চেপে বসেছে।’ বলেছিল বুমেদীন বিল্লাহ।
খুশি হয় আহমদ মুসা। ঘরে ছিল ঘুট ঘুটে অন্ধকার। আহমদ মুসা বুমেদীন বিল্লাহর দিকে ঘুরে বসে বলেছিল, ‘আমি একটু চেষ্টা করি। দেখি তোমার বাঁধন কি বলে?’
‘কাজটা খুবই কঠিন ভাইয়া। পিছমোড়া করে বাঁধা হাত খুব একটা শক্তি খাটাতে পারবে না। কিন্তু বাঁধন দারুণ শক্ত বোঝাই যাচ্ছে।’ বলেছিল বুমেদীন বিল্লাহ।
‘তা ঠিক, বাঁধনটা খুবই শক্ত। কিন্তু বাঁধনের একটা সিংগল তারকে তুমি যদি আলগা করতে পার, তাহলে কিন্তু কাজ খুবই সহজ হয়ে যাবে।’ আহমদ মুসা বলেছিল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বুমেদীন বিল্লাহকে আবার বলে, ‘তোমার হাত এদিকে দাও।’
আহমদ মুসা তার দিকে পেছন ফিরেছিল।
আহমদ মুসা হাতের আঙুল দিয়ে বুমেদীন বিল্লাহর হাতের বাঁধন পরীক্ষা করে। অত্যন্ত শক্ত বাঁধন, রাবার ইলাষ্টিক হওয়ার কারণেই বাঁধন আরও কামড়ে ধরেছে হাতকে।
আহমদ মুসা অনেক চেষ্টার পর চিমটি দিয়ে ধরে একটা তারকে আলগা করে তাতে আঙুল ঢোকাতে পারল।
এ সময় বাইরে থেকে একজনের কণ্ঠ শোনা যায়। বলেছিল সে, ‘শালারা সংজ্ঞা হারায়নি। সাবধান। ঘর খোল। ওদের ঘুমিয়ে রাখতে হবে।’
কথাটা কানে যেতেই আহমদ মুসা বুঝে ফেলে সব। নিশ্চয় এঘরে সাউন্ড মনিটর যন্ত্র আছে, এমনকি টিভি ক্যামেরাও থাকতে পারে। তারা ঐভাবে কথা বলে ভুল করেছে।
ব্যাপারটা বুঝার সংগে সংগেই আহমদ মুসা বুমেদীন বিল্লাহর হাতের বাঁধনে ঢুকানো আঙুলটা বড়শির মত বাকা করে হাত দিয়ে জোরে টান দেবার উপায় না খুঁজে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সামনের দিকে।
আছড়ে পড়ে আহমদ মুসা মেঝের উপর। মুখ খুলে যায় বিল্লাহর হাতের বাঁধনের। বুমেদীন বিল্লাহ দ্রুত বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে এগিয়ে যায় আহমদ মুসার দিকে।
‘তাড়াতাড়ি বিল্লাহ। ওরা দরজা খুলছে।’
বুমেদীন বিল্লাহ অন্ধকারে আহমদ মুসার হাত খুঁজে নিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখে হাতে কামড়ে বসে আছে শক্ত বাঁধন। অন্ধকারে হাতের বাঁধন হাতড়ে একটা তার খুঁজে নিয়ে তা বিচ্ছিন্ন করার মত অত সময় তখন নেই। কিন্তু হঠাৎ পেয়ে গেল গিরার মুখটা। গিরার বাইরে দুই তারের বাড়তি অংশে গিয়েই তার হাত পড়েছিল। সংগে সংগেই বিল্লাহ সেই বাড়তি অংশটুকু ডান হাতে ধরে জোরে টান দেয় এবং আলগা হয়ে উঠে আসা তারের ভেতর বাম হাতের চার আঙুল ঢুকিয়ে তারকে টেনে ধরে। সঙ্গে সঙ্গেই ডান হাতের চার আঙুলও বাম হাতেদর আঙুলের সাথে গিয়ে যোগ হয়। তারপর ‘রেডি ভাইয়া’ বলে তীব্র একটা হ্যাচকা টানে ছিড়ে ফেলল রাবারের দড়ি।
হাতের বাঁধন খুলে গিয়েছিল আহমদ মুসার। কিন্তু পায়ের বাঁধন তখনও বাকি। খুলে যায় এই সময় দরজা। উজ্জ্বল আলোয় ভরে যায় ঘর।
হুড়মুড় করে পাশাপাশি দ্রুত হেঁটে দুজন কারবাইন বাগিয়ে ঘরে ঢোকে। তাদের পেছনে আরও দুজন এসেছিল। তারা কারবাইন বাগিয়ে পূর্ব থেকে পাহারায় থাকা দুজনের সাথে দরজা আগলে দাঁড়ায়।
দরজা খোলার আগেই আহমদ মুসা শুয়ে পড়েছিল হাত দুটি পিঠের তলায় নিয়ে, যেন বুঝা যায় তার হাত বাঁধাই আছে। আর পা বাঁধা তা দেখাই যাচ্ছিল।
কিন্তু বিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল বুমেদীন বিল্লাহ। তার হাত-পা খোলা।
ঘরে ঢুকেই একজন চিৎকার করে ওঠে, ‘একশালা বাঁধন খুলে ফেলেছে।’
ঘরে ঢুকে দুজনই বুমেদীন বিল্লাহর দিকে এগোয়। তারা যাচ্ছিল আহমদ মুসার পাঁচ ছয় ফুট দূর দিয়ে।
আহমদ মুসার দেহটা কাত হয়ে নড়ে ওঠে, যেন সে ওদের ভালো করে দেখতে চাচ্ছে।
হঠাৎ আহমদ মুসার দুহাত পিঠের তলা থেকে বেরিয়ে আসে এবং তার দুপা তীরের মত ছুটে গিয়ে আঘাত করে বিল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া লোক দুজনের হাঁটুর নিচটায়।
ওরা আকস্মিক এই আঘাতে চিৎ হয়ে উল্টে পড়ে যায়। ওরা আহমদ মুসার পাশেই পড়েছিল। আর ওদের একজনের কারবাইন ছিটকে এসে আহমদ মুসার উপর পড়ে।
আহমদ মুসা লুফে নিয়েছিল কারবাইনটা। চোখের পলকে ব্যারেল ঘুরিয়ে নেয় সে দরজায় দাঁড়ানো চারজনের দিকে। ওরাও কি ঘটছে দেখতে পেয়েছিল। প্রথমটায় একটা বিমূঢ় ভাব তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসাকে কারবাইন তাক করতে দেখে তারা সম্বিত ফিরে পায়। তারাও ঘুরাতে যায় তাদের ষ্টেনগানের নল। কিন্তু তখন দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাদের ষ্টেনগানের ব্যারেল ঘুরে আসার আগেই আহমদ মুসার গুলীবৃষ্টির শিকার হয় তারা। দেহগুলো ঢলে পড়ে দরজার উপর।
ওদিকে মেঝেয় পড়ে যাওয়া দুজনের একজন গড়িয়ে দ্বিতীয় ষ্টেনগানটার দিকে এগুচ্ছিল। অন্যজন এগুচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে।
বুমেদীন বিল্লাহ ছুটে গিয়ে ষ্টেনগানটা আগেই হাত করে নেয় এবং ষ্টেনগানের ব্যারেল ঘুরিয়েই গুলী করে ওদের দুজনকে। আহমদ মুসাও তার ষ্টেনগানের ব্যারেল ঘুরিয়ে নিয়েছিল। বিল্লাহ গুলী করে ওদের দুজনকে লক্ষ্য করে।
‘ধন্যবাদ বিল্লাহ, ওয়েলডান।’ বলে আহমদ মুসা উঠে বসে এবং পায়ের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে।
আহমদ মুসা ও বিল্লাহ দুজনে দুটি রিভলবার এবং আরও দুটি কারবাইন কুড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে।
ছুটছিল আহমদ মুসারা করিডোর ধরে। এখন তাদের কাছে এখান থেকে বের হওয়াটাই একমত্র লক্ষ্য। আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানী হাইম হাইকেলকে খোঁজা যাবে না। বের হবার জন্যে আহমদ মুসারা ‘এক্সিট’ সাইন দেখে সামনে দৌড়াচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ এক সময় আহমদ মুসার মনে হলো কেউ আর বাধা দিতে আসছে না কেন! বন্দীখানা থেকে বের হবার পর করিডোরের প্রথম মোড়টাতেই শুধু দুপাশ থেকে আসা প্রহরীদের বাধার সম্মুখীন হয়েছে তারা। তারপর থেকে তারা সামনে এগুচ্ছেই। কিন্তু কোন দিন থেকেই বাধা আসছে না, প্রতিরোধ আসছে না।
করিডোরটা একটা ঘরে এসে প্রবেশ করল।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘বিল্লাহ, আমরা নিশ্চিতই ট্রাপে পড়ে গেছি। এক্সিট আসলে………….।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। মেঝেটা তাদের পায়ের তলা থেকে সরে গেল। পাকা ফলের মত তারা পতিত হলো। গিয়ে আছড়ে পড়ল একটা শক্ত মেঝেতে। শব্দটা ফাঁপা ধরনের।
মেঝে শক্ত হলেও আহমদ মুসাদের তেমন একটা লাগেনি। যে উচ্চতা থেকে পড়েছে তা চৌদ্দ পনের ফুটের বেশি হবে না।
শক্ত মেঝেটাতে পড়ার সংগে সংগেই একটা ঝাঁকুনি খেল তারা। তার সাথে উঠল শব্দ। ইঞ্জিন ষ্টার্টের শব্দ।
আহমদ মুসা বুঝল এবং চারদিকে তাকিয়েও দেখল তারা একটা গাড়ির মেঝেতে এসে পড়েছে। তারা পড়ার সময় গাড়িতে ছাদ ছিল না। কিন্তু তারা পড়ার সাথে সাথেই দুপাশ ও পেছন থেকে ষ্টিলের দেয়াল উঠে এসে উপরটা ঢেকে দিয়েছে।
‘আমরা একটা গাড়িতে পড়েছি বিল্লাহ। এ গাড়িটাও একটা ফাঁদ।’ আহমদ মুসা বলল।
গাড়িটা তখন তীব্র গতিতে চলতে শুরু করেছে।
‘ঠিক ভাইয়া। গাড়িটাও একটা ট্রাপ। আমাদের কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।’
‘আরেক বন্দীখানায় নিশ্চয়।’ গাড়িটার চারদিক পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল আহমদ মুসা।
দেখল আহমদ মুসা, তারা যে ফ্লোরের উপর বসে আছে সেটা অল্প দুলছে। পরিষ্কারই বোঝা যাচ্ছে, এটা স্প্রিং-এর উপর রয়েছে। অবাকই হলো আহমদ মুসা। গাড়ি স্প্রিং-এর উপর থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্লোর আলাদাভাবে স্প্রিং-এর উপর থাকাটা তার কাছে একেবারেই নতুন। কেন? এর কোন ফাংশন আছে?
উপরে যে ঢাকনাটা গাড়ির ছাদে পরিণত হয়েছে, তার দুপাশে দুটি হাতল। মাথার উপর হাত বাড়ালেই মাথার উপরের ঢাকনাটা পাওয়া যায়। ভাবল খোলার এটা একটা ম্যানুয়াল ব্যবস্থা হতে পারে।
মেঝের উপর আরেক দফা চোখ বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসা আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করল। মেঝেটা লম্বালম্বি দুভাবে বিভক্ত। মাঝ বরাবর দুঅংশের জোড়। জোড়টা আলগা মনে হলো আহমদ মুসার কাছে। জোড়টা লম্বালম্বির দুপ্রান্তে অস্পষ্ট হলেও ঘর্ষণের দাগ দেখতে পেল আহমদ মুসা। ভ্রুকুঞ্চিত হলো তার। স্প্রিং-এর কারণে উঁচু-নিচুঁ হবার ফলে এ দাগ হয়নি। আরও বড় ধরনের কোন আঘাতের ফলেই এ দাগ সৃষ্টি হতে পারে। কি সে আঘাত? ভাবছিল আহমদ মুসা।
‘কি দেখছেন ভাইয়া? গুরুত্বপূর্ণ কিছু?’ বুমেদীন বিল্লাহ বলল।
‘বিল্লাহ আমার মনে হচ্ছে, গাড়ির উপরের ঢাকনার মত গাড়ির এ ফ্লোরটাও স্থানান্তরযোগ্য।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে? ঢাকনা যেমন সরে গিয়ে আমাদের গ্রহণ করেছে, তেমনি এ ফ্লোরও কি সরে গিয়ে আমাদের ফেলে দেবে?’ বুমেদীন বিল্লাহ বলল।
বিস্ময়-বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসা বিল্লাহর দিকে। পরক্ষণেই তার চোখে বিস্ময়ের বদলে দেখা দিল এক ঝলক আনন্দ। বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ বিল্লাহ। তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তাৎপর্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সত্যিই তুমি যা বলেছ, তার বাইরে আর কোন অর্থ দেখা যাচ্ছে না।’
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘ঢাকনা খোলা ছিল আমাদের গ্রহণ করে নিয়ে আসার জন্যে, তাহলে ফ্লোর খুলবে কি আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে যাবার জনে?’
‘সেটা কি হবে নতুন বন্দীখানা?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বিল্লাহ, তুমি সাংবাদিক থেকে একেবারে গোয়েন্দা বনে যাচ্ছ।’ আহমদ মুসা বলল।
বুমেদীন বিল্লাহ কিছু বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎ গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।
ঝাঁকুনির সাথে সাথেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে।
উঠে দাঁড়াবার সাথে সাথেই সে অনুভব করল পায়ের তলার মেঝে নড়ে উঠেছে।
সংগে সংগে আহমদ মুসা চিৎকার করে উঠল, ‘বিল্লাহ ফ্লোর নেমে যাচ্ছে। সাবধান গাড়ি ছেড় না।’
বলেই আহমদ মুসা এদিক ওদিক তাকিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে গাড়ির ছাদের ডান দিকের হাতলটি ধরে ফেলল।
বুমেদীন বিল্লাহ বসেছিল। সাবধান হবার সুযোগ নিতে পারেনি। শেষ মুহূর্তে পড়ে যাবার সময় কোন অবলম্বন না পেয়ে আহমদ মুসার একটি পা দুহাতে জড়িয়ে ধরল।
আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে হাতলের উপর ঝুলে পড়েছিল। বিল্লাহ ঝুলে পড়ল আহমদ মুসাকে ধরে।
ছোট দুটি স্ক্রুতে আটকানো হাতলের পক্ষে দুজনের ভার বহনের শক্তি ছিল না। আহমদ মুসার হাত অনুভব করল হাতল ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। আহমদ মুসা চিৎকার করে বিল্লাহর উদ্দেশ্যে বলল, ‘তাড়াতাড়ি আমার গা বেয়ে উঠে এসে বাঁ দিকের হাতলটি ধর। এ হাতলটি খসে যাচ্ছে। আহমদ মুসাও বাম হাত দিয়ে বাঁ দিকের হাতল ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না।
বিল্লাহ একবার তাকাল উপর দিকে। তারপর আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিল। পড়তে লাগল সে নিচের দিকে।
আহমদ মুসা নিচের দিকে তাকিয়ে ‘বিল্লাহ’ বলে চিৎকার করে উঠল। তারপর নিজেও তার হাত ছেড়ে দিল হাতল থেকে।
কিন্তু বিল্লাহ পড়ে যাওয়ার পরক্ষণেই গাড়ির ফ্লোর আবার উঠে আসতে শুরু করেছে। উঠে আসা ফ্লোরে আহমদ মুসার দেহ আটকে গেল।
আহমদ মুসার মুখ বেদনায় নীল হয়ে উঠেছে। গাড়ির ষ্টিলের ফ্লোরে একটা মুষ্ঠাঘাত করে বলল, ‘ও আল্লাহ, বিল্লাহ একা কোথায় গেল!’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল কিন্তু গাড়িটা আবার ভীষণ বেগে পেছন দিকে যাত্রা শুরু করল।
আহমদ মুসা বুঝল গাড়িটা যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফিরে যাচ্ছে। আরও বুঝল, গাড়িটা নিশ্চয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে। তা না হলে সে পড়ে যায়নি এটা জানার পর গাড়ি এভাবে ফেরত যেত না এবং আবার ফ্লোর নামিয়ে দিয়ে তাকেও ফেলার চেষ্টা করত।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
গাড়িকে থামানো কিংবা গাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া যায় কিনা তার উপায় সন্ধান করতে লাগল।
আহমদ মুসা ভাবল, গাড়িটা স্বয়ংক্রিয় হলে অবশ্যই তা কতকগুলো অবস্থা বা সময়-সীমা দ্বারা পরিচালিত হয়। সেগুলো কি?
তারা যখন গাড়ির মেঝেতে আছড়ে পড়ে, তখন দুপাশ থেকে ঢাকনা এসে গাড়িকে ঢেকে দেয় এবং গাড়িও ষ্টার্ট নেয়। তাদের আছড়ে পড়া, গাড়ি ঢাকনায় ঢেকে যাওয়া এবং ষ্টার্ট নেয়া কি একে-অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত? আবার গাড়ি তার লক্ষ্যে পৌছে যাওয়ার পর গাড়ির ফ্লোর খুলে যাওয়া, আবার বন্ধ হওয়া এবং গাড়ি ষ্টার্ট নেয়ার বিষয়টা নিশ্চয় নির্ধারিত প্রোগ্রাম ও সময়-সীমার সাথে সম্পর্কিত।
আহমদ মুসা গাড়ির ঢাকনার দুটি হাতলের কথা ভাবল। হাতল রাখার মধ্যে নিশ্চয় বড় কোন তাৎপর্য আছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবল, হাতলের উপর ঝুলেই তো সে একবার বেঁচেছিল। কিন্তু ঢাকনা তো খুলে যায়নি। আবার ভাবল, দুহাতল একসাথে ধরে সে একটা চেষ্টা করতে পারে।
চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা দুহাত বাড়িয়ে দুপাশের দুটি হাতল ধরে ঢাকনার উপর চাপ সৃষ্টির জন্যে ঝুলে পড়ল।
সংগে সংগেই ঢাকনাটি গুটিয়ে গিয়ে ইঞ্জিন ও ক্যারিয়ারের মাঝখানে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসা আছড়ে পড়ল ক্যারিয়ারের সামনের প্রাচীরের উপর। তার দুটি হাত ঢাকনার ফাঁকে পড়ে থেঁথলে গেল।
কিন্তু সে দেখল গাড়িটা থেমে গেছে।
গাড়ি থেমে গেলেও আহমদ মুসা কিছুক্ষণ নড়তে পারলো না আছড়ে পড়ার ধাক্কা এবং বেদনার নি:সাড় হয়ে যাওয়া দুটি হাত নিয়ে।
শীঘ্রই আহমদ মুসা শরীরটাকে টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। প্রথমেই চোখ পড়ল ড্রাইভিং বক্সের দিকে। যেখানে ড্রাইভিং সিট বা ড্রাইভার কিছুই দেখল না। আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো গাড়িটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে কম্পিউটারাইজড প্রোগ্রাম অনুসারে।
দ্রুত তাকাল দুপাশের দিকে। দেখল একটা সুড়ঙ্গের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে রেল। তার উপরে দাঁড়ানো গাড়িটা। আর উত্তর দিকে দিয়ে মসৃণ একটা পথ, ফুটপাথ বলা যায়, রাস্তাও বলা যায়। দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারে।
আহমদ মুসা দিকটা ঠিক করলো অনুমানের উপর। আহমদ মুসার ধারণা সুড়ঙ্গটা ডেট্রোয়েট ডেট্রোয়েট নদীর দিকে চলে গেছে। আর ডেট্রোয়েট নদীটা নগরীর পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল। সে মাটিতে পড়ার আগেই গাড়ি ছুটতে শুরু করেছে। গাড়ির ফোল্ড হওয়া ঢাকনাটাও উঠে এসে ঢেকে দিয়েছে গাড়িটাকে।
বুঝল আহমদ মুসা, নামার জন্যে যখন সে ডান পা উপরে তোলে তখন বাম পায়ের একটা বাড়তি চাপ পড়েছিল গাড়ির মেঝের উপর। সেই চাপেই গাড়িটা ষ্টার্ট নিয়ে থাকতে পারে। আর গাড়ি চলার সাথে নিশ্চয় সম্পর্ক আছে ঢাকনা গাড়িটাকে ঢেকে দেয়ার।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে নেমেই ছুটল যে দিক থেকে এসেছিল সেই দিকে। বিল্লাহর কি অবস্থা হয়েছে কে জানে! তাকে উদ্ধারই এখন প্রথম কাজ।
দশ মিনিট দৌড়াবার পর এক জায়গায় এসে তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। সামনে সুড়ঙ্গ জুড়ে ষ্টিলের দেয়াল। বাম দিকে তাকিয়ে দেখল, গাড়ি চলার রেলটি ষ্টিলের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে। আহমদ মুসা বুঝল, ষ্টিলের দেয়াল খোলা যায়। নিশ্চয় এ জন্যে কোন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে।
আহমদ মুসা একটু এগিয়ে টোকা দিল দেয়ালের গায়ে। একদম নিরেট ষ্টিলের দেয়াল। দেয়ালের গা সহ উপর নিচে অনেক খোঁজাখুঁজি করল দেয়াল সরিয়ে দেয়া বা দেয়ালে দরজা খোলার কোন ক্লু পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না। ভাবল আহমদ মুসা, হতে পারে রেলের উপর, গাড়ির চাপের সাথে সম্পর্কিত কোন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে।
উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা। ভেতরে ঢুকতে না পারলে খুঁজবে কি করে বুমেদীন বিল্লাহকে। সে বিপদে পড়েনি তো! যেখানে সে পড়েছে, সেটা নিশ্চয় আন্ডার গ্রাউন্ড বন্দীখানা। বন্দীখানা হওয়ার অর্থ লোকজন সেখানে আছে। তাদের হাতেই সে এখন পড়েছে। তারা বিল্লাহর উপর চরম কিছু কি করবে? শংকিত হলো আহমদ মুসা। কিন্তু ভাবল আবার, আহমদ মুসাকে না পাওয়া পর্যন্ত বিল্লাহকে তারা কিছু করতে নাও পারে।
গাড়ির রেল ট্রাক থেকে উত্তর পাশের রাস্তায় উঠে আসার জন্যে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক এ সময়ই আহমদ মুসা অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটি কাঁপছে।
কি কারণে মাটি কাঁপছে? জেনারেটর চলা, গাড়ি চলা ইত্যাদি নানা কারণে মাটি কাঁপতে পারে। তাহলে আবার সেই গাড়ি ফেরত আসছে না তো?
চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা রাস্তার উপর শুয়ে পড়ে রেল-এর উপর কান পাতল। রেলের উপর গাড়ির চাকার ঘর্ষনের স্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা।
গাড়ি ফিরে আসছে নিশ্চিত হলো আহমদ মুসা। কিন্তু কেন ফিরে আসছে? ধরা পড়া বন্দীদের কাছে আসছে? সে ধরা পড়েনি এটা নিশ্চয় ওরা জেনে ফেলেছে এবং তাকে খোঁজার জন্যেই ওরা আসছে?
যা হোক, এখন তাকে লুকাতে হবে। কিন্তু কোথায়?
চারদিকে চোখ বুলাল আহমদ মুসা। লুকানোর মত আশ্রয় কোথাও নেই। অথচ কিছুতেই ওদের চোখে পড়া যাবে না।
অবশেষে রেল লাইনটার পাশে মরার মত পড়ে থাকার কথা চিন্তা করল। তাতে সহজে ওদের চোখে পড়লেও আকস্মিক আক্রমণ করার একটা সুযোগ থেকে যাবে।
চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা রেল লাইনটার পাশে সটান শুয়ে পড়ল। ছুটে আসছে গাড়ি।
কান খাড়া করে চোখ বন্ধ করে নিঃসাড়ে পড়ে আছে আহমদ মুসা। শব্দ শুনে যখন মনে হলো গাড়ি দৃষ্টি সীমার মধ্যে পৌছেছে, তখন আস্তে মাথাটা একটু কাত করে সামনে তাকাল।
গাড়ি দেখতে পেল সে। গাড়িটা খোলা নয়, ঢাকা।
খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। গাড়িতে যারা আসছে, তারা তাকে দেখতে পাবে না। বরং সে এখন ভেতরে ঢোকার জন্যে এই গাড়ির সাহায্য নিতে পারে।
গাড়ির রেল লাইন থেকে ফুট তিনেক সরে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
পরিকল্পনা ঠিক করে নিয়েছে সে।
গাড়ি এই দেয়ালের কাছে এসে যে থামবে না সেটা সেটা জানে। তারা আসার সময় এখানে গাড়ি থামেনি। বন্দীদের নামিয়ে দেবার জন্যে বন্দীখানার উপরে গিয়েই প্রথম থেমেছিল।
গাড়ি এসে গেছে। আহমদ মুসা রেল লাইনটার পাশ বরাবর সামনে এগিয়ে দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। গাড়ি তখনও দশ বারো ফুট দূরে।
আহমদ মুসার পাশ থেকেই দেয়ালের একটা অংশ নিঃশব্দে উপরে উঠে গেল। যে দরজাটা উন্মুক্ত হলো তা গাড়িটা সহজভাবে ঢোকার জন্য যথেষ্ট। দরজা খোলার সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটা ঢুকে গেল ভেতরে।
দরজার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল আহমদ মুসা। গাড়িটা ঢুকে যাওয়ার পর মুহূর্তেই আহমদ মুসা চোখের পলকে দেয়ালের এপার থেকে ওপারে ঢুকে গেল। ঢুকেই ভেতরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। তার সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
বাহির থেকে ভেতরটা একেবারেই আলাদা। বর্গাকৃতির বিশাল ঘর। মেঝেতে দামী পাথর বিছানো। অবশিষ্ট তিনটি দেয়ালেই দরজা।
ঘরের উত্তর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়িটা। উত্তর দেয়ালেও একটা দরজা। সবগুলো দরজাই বন্ধ। ঘরে লুকানোর কোন আড়াল নেই।
গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেই আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে গাড়ির ওপাশের দেয়াল ও গাড়ির চাকার মাঝখানে আশ্রয় নিল।
আহমদ মুসা হাঁটু গেড়ে বসে সবে উপর দিকে তাকাল। দেখল, একটা অস্পষ্ট শীষ দেয়ার শব্দ করে গাড়ির উপরের কভার সরে গেল। গাড়ির মেঝেতে বসা একজনের মাথার হ্যাট নজরে পড়ল আহমদ মুসার। তাড়াতাড়ি আহমদ মুসা গাড়ির তলে সরে গেল।
‘জন, চল নেমে পড়ি।’ গাড়ির মেঝে থেকে একজনের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘চল, মিখাইল। কিন্তু জ্যাকের তো এতক্ষণে এখানে পৌছার কথা। এদিকটা একবার দেখে আমরা ওদিকে যেতে পারি। হারামজাদাটা লুকালো কোথায়, তাকে তো পেতে হবে!’ বলল জন নামের লোকটি।
‘চিন্তা নেই, ছোটটাকে তো পাওয়া গেছে। তার মুখ থেকেই সব কথা বেরুবে। চল।’ মিখাইল নামের লোকটি বলল।
বলে মিখাইল নামের লোকটি নিচে লাফিয়ে পড়ল।
‘হ্যাঁ তা তো দেবেই।’ নিচ থেকে বলল মিখাইল।
আহমদ মুসা গাড়ির নিচে মেঝে দিয়ে সাপের মত এগুচ্ছে মিখাইলের দিকে। এগুবার সময় ভাবল, গাড়ির নিচের এই মেঝেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা আছে। এদিক দিয়েই কিছুক্ষণ আগে বুমেদীন বিল্লাহ পড়ে গেছে। এ পর্যন্ত ভাবতেই তার বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল মিখাইলের কথায়। বুমেদীন বিল্লাহ তাহলে এখন ওদের হাতে! বিল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যেই এরা তাহলে এসেছে!
এটা চিন্তা করে নতুন করে সে ভাবল, বিল্লাহর কাছে পৌছা পর্যন্ত এদের ফলো করা উচিত হবে। এর আগে সে ভেবেছিল এদের দুজনকে কাবু করে গাড়ির কাছে রেখে দিয়ে সে বিল্লাহর সন্ধানে যাবে। এ সিদ্ধান্ত নিয়েই সে মিখাইলের দিকে এগুচ্ছিল। গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল জনও।
দুজনে এগুলো পুবের দরজার দিকে। আহমদ মুসার দুচোখ তাদের অনুসরণ করল। ওরা দুজন গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল।
ওদের একজন গিয়ে দরজার বাম পাশের দেয়ালে লম্বালম্বি আয়তাকার একটা প্যানেলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কালো বোর্ডের উপর সাদা ‘কী’ ডিজিটগুলো জ্বল জ্বল করছে। প্যানেলের সাইজ দেখে আহমদ মুসা ধরে নিল ওটা আলফাবেটিক্যাল প্যানেল হবে।
লোকটি তার তর্জনি দিয়ে প্যানেলের ‘কি’ গুলোতে টোকা দিতে লাগল। টোকা শেষ হতেই দরজা খুলে গেল।
ওরা দরজা দিয়ে ওপারে ঢুকে গেল। আর সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে যখন দরজার কাছে দাঁড়াল, তার আগেই দরজা বন্ধ হওয়ার ক্লিক শব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে প্যানেলের কাছে দাঁড়াল।
লোকটির নক করা দেখেই আহমদ মুসা জেনে ফেলেছে যে, সে কিবোর্ডে ‘DAVID’ টাইপ করেছে। অর্থাৎ ‘DAVID’ দরজার খোলার ‘পাস ওয়ার্ড’।
আহমদ মুসা দ্রুত ‘DAVID’ টাইপ করল কি বোর্ডে। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল।
আহমদ মুসা উঁকি দিল দরজা দিয়ে। দেখল, ওরা ডান দিকে করিডোর ধরে এগুচ্ছে। দুদিকে চকিতে একবার চেয়েই আহমদ মুসা বুঝল, করিডোরটি এ ঘরকে তিন দিক থেকে বেষ্টন করে আছে। করিডোরের ওপাশ দিয়ে ঘরের সারি।
আহমদ মুসা কাঁধ থেকে কারবাইনটা হাতে নিয়ে বিড়ালের মত ওদের পেছনে ছুটল।
ওরা দুজন প্রথমে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে কিছুটা এগিয়ে উত্তরমূখী আরেকটা করিডোর ধরে এগিয়ে চলল।
ওদের পিছে পিছে এগুচ্ছে আহমদ মুসা।
একটা ছোট করিডোরের বাঁকে বসে পড়ল আহমদ মুসা। বাঁক ঘোরার অপেক্ষা করছে সে। অকস্মাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মত গলার দুপাশ দিয়ে দুটো হাত এসে তাকে চেপে ধরল।
সবটুকু মনোযোগ সামনে দিতে গিয়ে পেছনের ব্যাপারে সাবধান হয়নি আহমদ মুসা। এখন কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারল সে। বুঝল, এই অবস্থায় সামনে-পিছনে দুদিক সামলানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না। আক্রান্ত হয়েও আহমদ মুসা তাই আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ না করে তার কারবাইন তুলে গুলী বৃষ্টি করল সামনের দুজনকে লক্ষ্য করে।
আক্রমণকারীর দুটি হাত তখন আহমদ মুসার গলায় চেপে বসেছে। কারবাইনটা তখনও আহমদ মুসার হাতে। কিন্তু আক্রমণকারীকে তার কারবাইনের নলের আওতায় আনার অবস্থা তখন আহমদ মুসার নেই। গলা থেকে মাথা পর্যন্ত অংশ প্রায় অকেজো হয়ে পড়ছে। শ্বাস নালীর উপর চাপ পড়ায় শরীরের সক্রিয়তাও কমে যাচ্ছে। বুক, চোখ ও মাথার উপর চাপ কষ্টকর হয়ে উঠছে। বাঁচার জন্যে কিছু করার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।
শেষ সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করতে চাইল আহমদ মুসা। সে সবটুকু দম একত্রিত করে দুহাতে আক্রমণকারীর জ্যাকেটের কলার জাপ্টে ধরে পা থেকে কোমর পর্যন্ত ঠিক খাড়া রেখে কোমর বাঁকিয়ে মাথা নিচে ছুড়ে দিয়ে ধনুকের মত বাঁকিয়ে নিয়ে এল।
আহমদ মুসার এ কাজটা ছিল তীব্র গতির এবং আকস্মিক। লোকটার পেছনটা আহমদ মুসার উপর দিয়ে ঘুরে এসে মাটিতে পড়ল।
লোকটির দুহাত আহমদ মুসার গলা থেকে আলগা হলো বটে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার সে আহমদ মুসার গলা জড়িয়ে ধরল।
ততক্ষণে আহমদ মুসার বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া হয়ে গেছে।
লোকটি আধা শোয়া অবস্থায় তার দুহাত আহমদ মুসার ঘাড়ে লক করে আহমদ মুসাকে মাটিতে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল।
আহমদ মুসা উবু অবস্থায় ছিল। সে দুপা প্রসারিত করে লোকটির ঘাড়ে লাগিয়ে একদিকে সে লোকটির দেহ পেছন দিকে পুশ করল, অন্যদিকে নিজের কাঁধ নিজের পেছন দিকে সজোরে ঠেলে দিল।
লোকটির দুহাত খসে গেল আহমদ মুসার কাঁধ থেকে।
হাত থেকে পড়ে যাওয়া কারবাইনটা পাশেই পড়ে ছিল। আহমদ মুসা দ্রুত তা কুড়িয়ে নিল এবং কারবাইনের নল ঘুরিয়ে নিল লোকটির দিকে।
লোকটিও তার হাত ছুটে যাবার সাথে সাথে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। আহমদ মুসাকে কারবাইন হাতে নিতে দেখে সেও পকেট থেকে বের করে নিয়েছিল রিভলবার। তার রিভলবার ধরা হাত উঠে আসছিল।
কিন্তু গুলী করার সময় সে পেল না। তার আগেই আহমদ মুসার কারবাইনের গুলীতে তার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল।
গুলী করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং কারবাইনটা বাগিয়ে ধরে ছুটল জন-মিখাইলরা যে দিকে যাচ্ছিল সেদিকে। জন ও মিখাইলের লাশ ডিঙাবার সময় দেখল তাদের কেউই বেঁচে নেই।
ওদের লাশ ডিঙাবার পরই করিডোরের একটি বাঁকে গিয়ে পৌছল। তার সামনে মানে উত্তরে এগোবার পথ বন্ধ। সে পূর্ব-পশ্চিম লম্বা সরল রেখার মত একটা করিডোরের মুখোমুখি।
কোনদিকে যাবে? বুমেদীন বিল্লাহকে কোথায় তারা রেখেছে? ঠিক এই সময়ে আহমদ মুসার নজরে পড়ল করিডোরের পশ্চিম দিক থেকে পাঁচ ছয়জন ছুটে আসছে করিডোর ধরে। ওদের প্রত্যেকের হাতেই কারবাইন।
আহমদ মুসা এক ধাপ পেছনে হটে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াল। ওদের পায়ের শব্দের দিকে উৎকর্ণ হয়ে থাকল কিছুক্ষণ।
ধীরে ধীরে ওদের পায়ের শব্দ নিকটতর হচ্ছে, ক্রমেই বাড়ছে ওদের পায়ের শব্দ। একেবারে কাছে এসে গেছে ওরা। হঠাৎ ওদের পায়ের শব্দ থেমে গেল। ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। ওরা দাঁড়াল কেন?
ব্যাপার কি দেখার জন্যে অতি সন্তর্পণে মুখটা সামনে এগিয়ে উঁকি দিল।
উঁকি দেবার সাথে সাথেই এক ঝাঁক গুলী ছুটে এল তার দিকে।
মাথা সরিয়ে নিয়েছে আহমদ মুসা। এক ঝাঁক গুলী তার মাথার কয়েক ইঞ্চি সামনে দিয়ে ছুটে গেল। মাথা সরিয়ে নিতে মুহূর্ত দেরি হলে তার মাথা ছাতু হয়ে যেত।
উঁকি দিয়ে প্রথম দৃষ্টিতেই আহমদ মুসা দেখতে পেয়েছে ওরা দাঁড়িয়ে নেই, শিকারী বাঘের মত এক ধাপ এক ধাপ করে নিঃশব্দে তার দিকে এগুচ্ছে।
এর অর্থ ওরাও আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েছে, এ বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল আহমদ মুসার কাছে। তার মানে যুদ্ধ সামনে।
আহমদ মুসা কারবাইনের ট্রিগারে হাত রেখে দেয়ালে পাজর ঠেস দিয়ে কৌশল নিয়ে ভাবছে।
এ সময় ওদিক থেকে গুলী শুরু হয়ে গেল। গুলী আসছে অবিরাম ধারায়। গুলীর এক অংশ দেয়ালের কোনায় এসে বিদ্ধ হচ্ছে। বেশীর ভাগই দেয়ালের পাশ দিয়ে গিয়ে করিডোরের বিপরীত দিকের দেয়ালকে বিদ্ধ করছে।
এভাবে অনর্থক পাগলের মত গুলী বর্ষণ করে চলার অর্থ কি? নিজেকেই এ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা। পরক্ষণেই উত্তর তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আসলে ওদের মতলব হলো, আহমদ মুসা যাতে আক্রমণের সুযোগই না পায় এজন্যেই ওদের অব্যাহত আক্রমণ। তাদের এখনকার অনর্থক আক্রমণই এক সময় অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখন যে গুলী কৌণিকভাবে আসছে, তা সমান্তরালে আসতে শুরু করলেই আহমদ মুসা গুলী বৃষ্টির মুখে অনাবৃত হয়ে পড়বে।
এই সুযোগ আহমদ মুসা তাদের দিতে পারে না। কিন্তু কোন পথে এগুবে সে।
এই আক্রমণের মধ্যেও তাকে পাল্টা আক্রমণের জন্যে একটা ফাঁক বের করতে হবে।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করে দেখল ছুটে আসা গুলীর ¯্রােত সীমাবদ্ধ আছে এক ফুট থেকে চার ফুট উচ্চতার মধ্যে। নিচের এক ফুট মাত্র তার জন্যে নিরাপদ জোন। এটাই তার পাল্টা আক্রমণের জন্য সুড়ঙ্গ পথ।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়ে সাপের মত এগুতে লাগল সামনে। করিডোরটির মুখে দেয়ালের শেষ প্রান্তে গিয়ে থামল আহমদ মুসা। ভাবল, সুযোগের এই সুড়ঙ্গটা মাত্র একবারই ব্যবহার করা যাবে। ওদেরকে বন্দুকের আওতায় আনার দরজা করে দেবে মাত্র একবারের জন্যে। সুতরাং তার প্রথম আক্রমণটা হবে শেষ আক্রমণ।
আহমদ মুসা তার কারবাইনের লোডটা পরীক্ষা করে নিল। তারপর কারবাইনের ব্যারেল ঘুরিয়ে ট্রিগারে হাত রাখল।
প্রস্তুত হয়ে মুখটা দেয়ালের বাইরে বাড়িয়ে দিতে যাবে এই সময় একটা কঠোর নির্দেশ শুনতে পেল পেছন দিক থেকে ‘তোমার খেলা সাঙ্গ শয়তানের বাচ্চা। আগে-পিছনে সবদিক থেকে ঘেরাও। অস্ত্র রেখে উঠে দাঁড়াও, দুহাত উপরে তোল, না হলে কারবাইনের ম্যাগাজিনের সবগুলো গুলী তোমার মাথায় ঢুকিয়ে দেব।’
আহমদ মুসা পেছন দিকে একবার তাকিয়ে অস্ত্র যেখান থেকে তাক করছিল সেখানে রেখেই সে ত্বরিত উঠে দাঁড়ালো দুহাত উপরে তুলে। আহমদ মুসার দুহাত তার মাথার পেছনটাকে আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে। তার ডান হাতের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে আহমদ মুসার রিভলবারের বাট তার ঘাড়ে জ্যাকেটের একটা পকেটে ঝুলছে। আহমদ মুসার দুচোখ বাজের মত ষ্টাডি করছে সামনের শত্রুকে।
লোকটি হোঁ হোঁ করে হেসে উঠল। তার হাতে কারবাইনের নলটি নাচছিল। লোকটি হাসির সাথে বলল, ‘তুমি খুব ঘড়েল আহমদ মুসা। কিন্তু আজ তুমি ব্রিগেডিয়ার শেরিল শ্যারনের হাতে পড়েছ। তোমার সব খেলা খত……….।’ কথা শেষ করতে পারলো না ব্রিগেডিয়ার শ্যারন।
আহমদ মুসার ডান হাত মাথার পেছন থেকে কয়েক ইঞ্চি নেমে গিয়ে লুকানো রিভলবার নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। চোখের পলকে ছুটে এসেছিল ব্রিগেডিয়ার শ্যারনকে লক্ষ্য করে।
ব্রিগেডিয়ার শ্যারন দেখতে পেয়েছিল ব্যাপারটা। কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার মুখের। সে দ্রুত ট্রিগারে তর্জনি ফিরিয়ে নিয়ে টার্গেট থেকে নড়ে যাওয়া কারবাইনের ব্যারেল তুলে আনছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসার রিভলবারের গুলী তার কপালটাকে গুড়ো করে দিল।
মেঝের উপর ছিটকে পড়ে গেল সে লাশ হয়ে।
গুলী করেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার রেখে যাওয়া কারবাইনের কাছে।
ওরা অনেক কাছে চলে এসেছে। ওদের গুলীর এ্যাংগল বদলে গেছে। সমকোণে পৌছতে দেরি নেই। কারবাইনের ট্রিগারে তর্জনি রেখে আহমদ মুসা মুখ বাড়াতে যাচ্ছিল দেয়ালের ওপারে। কিন্তু পারল না। গুলী আসছে এবার মাটি কামড়ে। নিচের যে এক ফুট জায়গা গুলীর বাইরে ছিল, তাও পূরণ হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা পেছনে সরে এল। ভাবল, ওদের কেউ কেউ এখন তাদের গান-ব্যারেল আরও নামিয়ে নিয়েছে।
সামনে এগুনো সম্ভব নয়। আবার চারদিকে তাকালো আহমদ মুসা।
গুলীর এই আয়ত্ত্বের বাইরে কোন উইনডো তাকে পেতে হবে। তা না হলে আক্রমণে যাওয়া যাবে না।
পাশের জানালার দিকে তাকালো আহমদ মুসা। উপরে গেল তার দৃষ্টি।
জানালার কিছু উপরে একই সমান্তরালে করিডোরের দুদেয়ালের মধ্যে কয়েকটি সংযোগ বার।
আহমদ মুসার মাথায় বুদ্ধি এসে গেল। কারবাইনটা কাঁধে ফেলে চোখের পলকে সে জানালায় উঠে লাফ দিয়ে বার ধরল। এক বার থেকে আরেক বার- এই ভাবে শেষ বারে উঠে বসল আহমদ মুসা। নিচ দিয়ে গুলীর ঢেউ বয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা এ ঢেউ ডিঙিয়ে করিডোরের মুখের ওপাশে পৌছতে চাইল নিরাপদ উইন্ডোর সুযোগ নেবার জন্যে।
ওরা এগিয়ে আসছে। সমকৌণিক অবস্থান থেকে তার মাত্র পনের বিশ ডিগ্রি দূরে অবস্থান করছে। তাদের কারবাইনের ব্যারেল আরও ডান দিকে, করিডোরের মুখের দিকে বেঁকে গেছে। করিডোর মুখের বামপাশটা নিরাপদ হয়েছে। কিছু গুলী ওদিকেও যাচ্ছিল সেটা বন্ধ হয়েছে। আহমদ মুসা ওখানেই পৌছতে চায়।
আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়ে কারবাইনের ট্রিগারে ডান তর্জনি রেখে বাম হাতে কারবাইনটা আঁকড়ে ধরে বার থেকে লাফিয়ে পড়ল করিডোর মুখের বামপাশের কোণায়।
প্রস্তুত ছিল আহমদ মুসা। মাটিতে পড়েই সে গুলীবৃষ্টি শুরু করল ওদের দিকে।
ওরা বুঝে উঠে তাদের কারবাইনের নল ফিরাবার আগেই ওরা সব লাশ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে ছুটল করিডোর ধরে পশ্চিম দিকে। লাশগুলোর পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদের একজনের পকেট থেকে মোবাইলের শব্দ শুনল। থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। সে লাশের পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে নিল। অন করে মোবাইলটি সে কানে ধরল।
‘এতক্ষণ দেরি কেন রাস্কেল। শোন, ব্রিগেডিয়ারের মোবাইল কোন সাড়া দিচ্ছে না। অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমরা ছোট শয়তানকে নিয়ে ০০৩৩ নাম্বারে ডক্টরের কক্ষে যাচ্ছি। সেখান থেকে ইমারজেন্সী এক্সিট নেব। তোমরা ওদিকটা দেখ।’ আদেশের সুরে ওপ্রান্ত থেকে কথাগুলো এল। তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওপার থেকে লাইন কেটে দিল।
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলে আহমদ মুসা মোবাইলটি পকেটে পুরে মনে মনে বলল, অন্ধকারে হাতড়ানোর হাত থেকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বিল্লাহ এবং ডক্টর হাইকেলকে ঐ ০০৩৩ নাম্বার কক্ষে পাওয়া যাবে নিশ্চয়। দৌড় দিল আহমদ মুসা।
দৌড়ে যাবার সময় ডান পাশের একটা কক্ষের নাম্বার দেখল ০০১৬, আর বাম পাশের ঘরটার নাম্বার দেখল ০০৪৯। মনে মনে হাসল আহমদ মুসা। ডান পাশে ৩৩-এর আগের ১৬ এবং বাম পাশে তেত্রিশের পরের ১৬ টি ঘর রয়েছে। তার মানে করিডোর যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই ৩৩ নাম্বার ঘরটি হয় ডান সারিতে হবে, নয় তো বাম সারিতে। এখন সে চোখ বন্ধ করে দৌড়াতে পারে।
দৌড়াতে দৌড়াতেই আহমদ মুসা আবার ভাবল, বন্দী হবার পর গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা ঘরের নাম্বার ১১১ দেখেছিল। আর বন্দীখানা থেকে বেরিয়ে সামনের একটা ঘরের নাম্বার পড়েছিল ০৭৩। এর অর্থ আহমদ মুসা এখন আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরের দ্বিতীয় বা বটম ফ্লোরে রয়েছে। এখান থেকে এক্সিট মানে গ্রাউন্ডে উঠার পথ। সে পথ কি ০০৩৩-এর সাথে বা কাছাকাছি রয়েছে? করিডোরের শেষ প্রান্তে হবার একটা অর্থ এও হতে পারে।
০০৩৩ নাম্বারটি পেল আহমদ মুসা। কিন্তু ঘরটির কোন দরজা নেই। বাম সারির শেষ ঘর এটি। ০০৩২-এর পর করিডোরের শেষ পর্যন্ত শুধু দেয়াল, দরজা নেই। কিন্তু দেয়ালেল মাঝামাঝি এক জায়গায় ঘরের নাম্বার ০০৩৩ ঠিকই লিখা রয়েছে।
দরজায় এসে আছাড় খাওয়ার মত বিপদে পড়ে গেল আহমদ মুসা। দেয়ালে কোন গোপন দরজা আছে কিনা দেখার চেষ্টা করল আহমদ মুসা। কিন্তু কোন হদিস পেল না।
সময় হাতে নেই। অস্থির হয়ে উঠল আহমদ মুসা।
ফিরে এল ০০৩২ নাম্বার কক্ষের দরজায়। আস্তে নব ঘুরাল দরজার। দরজা খুলে গেল।
খুশি হলো আহমদ মুসা ডুবন্ড লেকের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতই।
ঘরে প্রবেশ করল সে। বিশাল ঘর। আসবাবপত্র শোবার ঘরের মতই।
ঘরের দক্ষিণ দেয়ালে একটা দরজা দেখতে পেল আহমদ মুসা। বাইরের দরজার মতই এর দরজার লক সিষ্টেম।
বিসমিল্লাহ বলে দরজার নব ঘুরাল। খুলে গেল দরজা।
পরের ঘরটাও একই রকম বড়। তবে এ ঘরটি শোবার নয়। অফিস টেবিল ও সারি সারি কম্পিউটার সাজানো ঘরটি।
‘না আমি ইনজেকশান নেব না’- চিৎকার করে এই কথা বলার শব্দে চমকে উঠে আহমদ মুসা শব্দের উৎস লক্ষ্যে পশ্চিম দিকে তাকাল। দেখল, ঘরের পশ্চিম দেয়ালে একটা দরজা। দরজাটা আধ-খোলা। দরজার ওপার থেকেই শব্দটা ভেসে এসেছে।
আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। নিশ্চিত সে, ঐ ঘরটাই ০০৩৩ নাম্বার ঘর এবং সে ঘরে ঢোকার তাহলে এটাই দরজা।
চিৎকারটা থেমে যেতেই আরেকটা কণ্ঠ বলে উঠল, ‘ডক্টর তুমি সব সময় বল আমি ইনজেকশন নেব না, আর সব সময় ইনজেকশন দিয়েই আমরা তোমাকে ঘুমিয়ে রাখি। এই ঘুম তোমার মৃত্যুর বিকল্প।’
‘আমি বাঁচতে চাই না। মরতে চাই আমি। তোমরা মেরে ফেল আমাকে।’ অসহায় কণ্ঠে বলল সেই চিৎকার করে কথা বলা লোকটি।
‘তুমি একা মরলে আমাদের বিপদ আছে। আহমদ মুসা এবং তোমার পরিবারের সকলের সাথে তোমাকে একত্রে মরতে হবে। এই মৃত্যুর সাথেই তলিয়ে যাবে নাইন ইলেভেন নিউইয়র্কের লিবার্টি টাওয়ার ও ডেমোক্রাসি টাওয়ার ধ্বংসের সকল ইতিহাস।’ বলল দ্বিতীয় লোকটি আবার।
আহমদ মুসা বুঝল, ইনজেকশন নিতে না চাওয়া লোকটিই ডক্টর হাইকেল। আর দ্বিতীয় কণ্ঠটি আজর ওয়াইজম্যানেরই কোন লোক।
দ্বিতীয় কণ্ঠ থামতেই ডক্টর হাইম হাইকেল বলে উঠল, ‘আহমদ মুসা কে? তার সাথে আমার মৃত্যুর সম্পর্ক কি?’
‘তুমি জান না? সে তো সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে এসেছে তোমার কাছে। তোমাকে উদ্ধার করতে। তোমাকে তোমার কনফেশনের পুরষ্কার দিতে।’
বলে একটু থামল লোকটি। তারপর আবার বলে উঠল, ‘এই যে হাত বাঁধা পায়ে বেড়ি লোকটিকে দেখল, সে আহমদ মুসার সাথী। এ ধরা পড়েছে। আহমদ মুসাও ধরা পড়তে যাচ্ছে।’
একটু নিরবতা। আবার ডক্টর হাইকেল চিৎকার করে উঠল, ‘আমি ইনজেকশন নেব না। আমাকে ইনজেকশন দিও না।’
পরক্ষণেই ক্রুব্ধ কথা শোনা গেল সেই দ্বিতীয় কণ্ঠটির, ‘এই তোমরা এস। তোমরা হাত, পা মাথা ভালো করে ধর।’
তারপর চিৎকার ও ধস্তাধস্তির কিছু শব্দ উঠল।
আহমদ মুসা ভেবে নিয়েছে, ডক্টর হাইকেলকে ইনজেকশন দেবার আগেই তাকে উদ্ধার করতে হবে।
আহমদ মুসা তার কারবাইন কাঁধে ফেলে দুহাতে দু’রিভলবার তুলে নিয়েছে।
আস্তে করে দরজা দিয়ে উঁকি দিল আহমদ মুসা। দেখল, একটা খাটে শুয়ে আছে ড. হাইম হাইকেল। দুজনে তার দুহাত খাটের সাথে সেঁটে ধরে আছে। একজন ধরে আছে পায়ের দিকটা। আর একজনের হাতে ইনজেকশন। সে যাচ্ছে ইনজেকশন করতে।
বুমেদীন বিল্লাহ বসে আছে ঘরের মেঝেতে। সে পিছ মোড়া করে বাঁধা। তার পায়েও চেন লাগানো।
আহমদ মুসা ডান হাতের রিভলবার থেকে প্রথম গুলীটা করল ইনজেকশন ধরা হাতটিতে।
তার হাত থেকে ইনজেকশন পড়ে গেল। লোকটির ডান হাতের কব্জিতে গুলী লেগেছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার লোকটি সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে বোঁ করে ঘুরে দাঁড়াল। সেই সাথে তার বাঁ হাত বের করে এনেছে রিভলবার। বেপরোয়া লোকটির রিভলবার ধরা হাত বিদ্যুত বেগে উঠে আসছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসার ডান হাত তৈরিই ছিল। আরেকবার ট্রিগার টিপল আহমদ মুসা। লোকটি এবার গুলী খেল মাথায়। উল্পে পড়ে গেল সে খাটে, ড.হাইকেলের উপর।
লোকটির লক্ষ্যে ট্রিগার টিপেই আহমদ মুসা দেখল বাকি দুজনই রিভলবার বের করে তাকে তাক করেছে।
শুধু একটা গুলী করারই সময় পেল আহমদ মুসা। ডক্টর হাইকেলের মাথার দিকের লোকটি বুকে গুলী খেয়ে পড়ে গেল।
গুলী করেই আহমদ মুসা নিজের দেহটাকে সরিয়ে নেবার জন্যে বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। ড. হাইকেলের পায়ের দিকে দাঁড়ানো লোকটির নিক্ষিপ্ত গুলী আহমদ মুসার ডান হাতের তর্জনি সমেত হাতের রিভলবারকে আঘাত করল। তার রিভলবার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল এবং তর্জনির বামপাশটা কিছুটা ছিঁড়ে গেল।
আহমদ মুসা বেপরোয়া লোকটিকে আর দ্বিতীয় গুলীর সুযোগ দিল না। মাটিতে পড়ে গিয়েই বাম হাতের রিভলবার থেকে গুলী করল লোকটিকে। লোকটিও তার গুলী ব্যর্থ হয়েছে দেখে তার রিভলবার ঘুরিয়ে নিচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু তার আগেই বুকে আহমদ মুসার গুলী খেয়ে পড়ে গেল লোকটি।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল বুমেদীন বিল্লাহকে।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক সময়ে এসে পড়েছেন ভাইয়া। ওরা ডক্টর ও আমাকে নিয়ে এখনি চলে যেত। ডক্টর ইনজেকশন নিতে অস্বীকার করায় দেরি হচ্ছিল।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল বুমেদীন বিল্লাহ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তিনি তাদের এ সুযোগ দেন নি।’ বলে আহমদ মুসা তার বাম হাতের রিভলবার দিয়ে গুলী করে বিল্লাহর হাতের হ্যান্ডকাফ এবং পায়ের চেনের লক উড়িয়ে দিল। তারপর এগুলো ডক্টর হাইকেলের দিকে বলল, ‘স্যার আপনি ভাল তো?’
ড. হাইকেলের মাথা ভর্তি উস্কো-খুস্কো চুল। মুখভর্তি দাড়ি ও গোঁফ। গায়ের লম্বা কালো কোট ও প্যান্ট বহু ব্যবহারে মলিন। মুখের দুধে-আলতা রংয়ের উপর যেন কুয়াশার ছাপ। কিন্তু চোখ দু’টি উজ্জ্বল। তাতে অনমনীয় দৃঢ়তার ছাপ।
ড. হাইকেল উঠে বসল। তার বিস্ময় দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। তার দুটি চোখ যেন আঠার মত আটকে গেছে আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসার প্রশ্ন যেন সে শুনতেই পায়নি। বলল, ‘আপনিই কি আহমদ মুসা? আপনি আমার কাছে, আমাকে উদ্ধার করার জন্যে এসেছেন সাত-সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে?’
‘ঠিক উদ্ধার করার জন্যে নয়। আমি এসেছিলাম আপনার কাছে। এসে শুনলাম আপনি নিখোঁজ। অনেক খোঁজ খবর নেয়ার পর বুঝলাম আপনি বন্দী। তারপর শুরু উদ্ধার করার চেষ্টা। আপনার বাড়িতেও গেছি। ওরা সবাই ভাল আছে। আমি ডেট্রয়েটে আসর আগে নিউইয়র্কে আপনার ছেলে বেঞ্জামিন আমার সাথেই ছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
আনন্দের একটা ঢেউ খেলে গেল ডক্টর হাইকেলের মুখে। তারপর একটু গম্ভীর হলো। বলল, ‘বেঞ্জামিন এখন নিউইয়র্কে কেন?’
‘ছুটিতে এসেছে। এসে সে সব জানতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। অনেক কৃতজ্ঞতা। কিন্তু আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন আমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন? ওদের কথা-বার্তায় বুঝেছি, ওদের অনেক লোক মারা গেছে। অনেক আস্তানা ওদের ধ্বংস হয়েছে। আজ বুঝলাম এসব আপনিই করেছেন। কেন করছেন আমি বুঝতে পারছি না।’ ডক্টর হাইম হাইকেল বলল।
‘সবই জানবেন। সবই বলব। তবে আজ নয়, এ অবস্থায় নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে। আপনি মুসলমান বুঝতে পারছি। কোন দেশের লোক আপনি?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘কোন দেশের নাম করব! একটা দেশে আমি জন্মেছি, যে দেশকে এখন আমার দেশ বললে ভুল হবে। এই হিসেবে কোন দেশকেই আমি আমার দেশ বলতে পারি না। বলতে পারে, আমি সব দেশের বিশেষ করে সব মুসলিম দেশের আমি নাগরিক।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো ডক্টর হাইম হাইকেলের। ভাবনার চিহ্ন তার চোখে-মুখে। বলল আমি এক আহমদ মুসার কথা পড়েছি পত্র-পত্রিকায়। তিনি বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ান। মানুষের সমস্যা ও বিপদ তিনি মাথায় তুলে নেন। তাঁর অনেক সাকসেস ষ্টোরি আমি পড়েছি। তিনি একজন বিপ্লবী নেতাও। আপনি কি সেই আহমদ মুসা?’ জিজ্ঞাসা ড. হাইম হাইকেলের।
‘হ্যাঁ স্যার। ইনিই তিনি।’ বলল দ্রুত বুমেদীন বিল্লাহ আহমদ মুসা মুখ খোলার আগেই।
‘আমিও এটাই ভেবেছি। কিন্তু আমি বিস্মিত হচ্ছি, পরম প্রভু ঈশ্বর আমার প্রতি এত দয়া করেছেন! আহমদ মুসাকে পাঠিয়েছেন আমার সাহায্যার্থে! বলে একটু থামল ডক্টর হাইকেল। তারপর আবার মুখ খুলেছিল আহমদ মুসাকে কিছু বলার জন্যে।
তার আগেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘স্যার, পরে আমরা কথা বলব। এখন আমাদের বের হতে হবে এখান থেকে। আমার অনুমান ঠিক হলে আমরা এখন ভূমিতল থেকে দুতলা নিচে অবস্থান করছি।’
‘অনুমান কেন? আপনি তো উপর থেকে নিচে নেমেছেন!’ বলল ডক্টর হাইম হাইকেল।
একটু হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় আসিনি। ওরা আমাদের বন্দী করে এনেছিল।’
একটু বিস্ময়, একটু মলিনতা দেখা গেল ডক্টর হাইম হাইকেলের চোখে-মুখে। তারপরই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল, ‘চমৎকার। বন্দী থেকে বিজয়।’
‘বিজয় এখনো আসেনি স্যার। আমাদের বাইরে বেরুনো এখনও বাকি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই ঘরেই বাইরে বেরুবার কোন ব্যবস্থা আছে। আমি ওদের কথায় এটা শুনেছি।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ। আমারও এটাই বিশ্বাস।’ আহমদ মুসা বলল।
ঘরের চারদিকে তাকাচ্ছিল আহমদ মুসা।
ঘরটা পরিষ্কার। শোবার খাট ছাড়া ঘরে আছে একটি মাত্র ষ্টিলের টেবিল। এর বাইরে রয়েছে ঘরে প্রবেশের একটা দরজা। ঘরে আর কিছু নেই। টেবিলটি ঘরের পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ কোণায় একেবারে সেঁটে রাখা কোণের সাথে।
টেবিলের গাঁ ঘেঁষে পশ্চিম দেয়াল বরাবর রাখা খাটটি। টেবিল ও খাট দুটোই ষ্টিলের। ঘরের অবশিষ্টটা নগ্নভাবে ফাঁকা।
‘বলতো বিল্লাহ, টেবিল ও খাটটাকে এমন বেসুরোভাবে রাখা হয়েছে কেন? কেন ঘরের মাঝখানে রাখা হয়নি। গোটা মেঝো কোন কাজে ফাঁকা রাখা হয়েছে?’ বলল আহমদ মুসা অনেকটা স্বগত কণ্ঠে।
‘ঠিক বলেছেন ভাইয়া। ঘর সাজানোর দৃষ্টিতে এটা একেবারেই বিদঘুটে। কিন্তু কেন?’ বলল বুমেদীন বিল্লাহ।
‘আচ্ছা দেখ তো’, টেবিলের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় কম, তাই না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক। কিন্তু এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? আমাদের বের হওয়ার পথ বের করতে হবে।’ বলল বুমেদীন বিল্লাহ অস্থির কণ্ঠে।
‘বুমেদীন বিল্লাহ লক্ষ্য কর, খাট ও টেবিলের মধ্যকার উচ্চতা একটা সিঁড়ির সাধারণ ধাপের সমান।’ আহমদ মুসা বলল বিল্লাহর কথার দিকে কর্ণপাত না করে।
‘মি. আহমদ মুসা, ঘর থেকে এক্সিট নেয়ার ক্ষেত্রে এই খাট ও টেবিলের মধ্যে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে বলে আপনি মনে করছেন?’ আহমদ মুসার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে বলল হাইম হাইকেল।
একটু হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এ ছাড়া আর কোন অবলম্বন দেখছি না।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বিল্লাহকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বিল্লাহ, দেখ, টেবিল ও খাট নিশ্চয় মেঝের সাথে ফিক্সড করা।’
বিল্লাহ ছুটে গিয়ে দেখে বলল, ‘ঠিক ভাইয়া, ফিক্সড করা।’
আহমদ মুসার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এগিয়ে গিয়ে খাট ও টেবিলের তলা এবং পায়াগুলো ভালো করে পরীক্ষা করল, কিন্তু গোপন সুইচ জাতীয় কোন কিছুই পেল না।
এই প্রথম চেষ্টার ব্যর্থতার পর আহমদ মুসা এসে টেবিলের পাশ ঘেঁষে খাটের উপরে বসল।
আহমদ মুসার হাতে একটা টিস্যু পেপার ছিল। সে হাতের দলা পাকানো টিস্যু পেপার ওয়েষ্ট পেপার বাস্কেটের উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারল।
ছোট আয়তাকার ওয়েষ্টপেপারের বাস্কেট ছিল টেবিল ও খাটের মাঝখানে। আহমদ মুসার ছুড়ে দেয়া টিস্যু পেপার বাস্কেটে পড়ার বদলে গিয়ে পড়ল বাস্কেটের ওপারে, বাস্কেটের আড়ালে।
আহমদ মুসা বাস্কেটটি একপাশে সরিয়ে ওপাশ থেকে টিস্যু পেপারটি নেবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারলো না। বাস্কেটটি মেজের সাথে ফিক্সড।
বিস্মিত হয়ে আহমদ মুসা তাকাল বাস্কেটের দিকে। ফাঁকা কালো রংয়ের বাস্কেটের তলায় দেখল সাদা বড় আকারের স্ক্রুর মাথা। কিন্তু স্ক্রুর মাথায় যেমন খাঁজ থাকে, তেমন কোন খাঁজ এ স্ক্রুতে নেই।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
মুখ না তুলেই আহমদ মুসা ডাকল, ‘বিল্লাহ এদিকে এস।’
সাংবাদিক বিল্লাহ নব্য গোয়েন্দার ভাব নিয়ে ক্লুর সন্ধানে দেয়াল-খাট-টেবিলের আশে-পাশে ঘুর ঘুর করছিল। আহমদ মুসার ডাক পেয়ে ছুটে এল।
ঠিক এ সময় ০৩২ নম্বর ঘরের দরজায় ধাক্কার শব্দ হল। কয়েকটা ধাক্কার পরই ব্রাশ ফায়ারের শব্দ এল।
উদ্বিগ্ন চোখে বিল্লাহ তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আর ভীত ড. হাইম হাইকেল খাটের ওপ্রান্ত থেকে আহমদ মুসার দিকে সরে এসে কম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘ওরা এসে গেছে মি. আহমদ মুসা।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ভয় নেই। না হয় আরেক দফা লড়াই করতে হবে। আর সম্ভবত ওরা এসে আমাদের পাবে না।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বিল্লাহকে বাস্কেটের স্ক্রুর মাথা দেখিয়ে বলল, ‘ওতে চাপ দাও।’
বিল্লাহ এক হাত টেবিলে ঠেস দিয়ে ঝুঁকে পড়ে অন্য হাতে স্ক্রুর মাথায় জোরে চাপ দিল।
সঙ্গে সঙ্গে শিষ দেয়ার মত একটা লম্বা শব্দ উঠল। পশ্চিমের দেয়ালের একাংশ উপরে উঠে গেল এবং তার সাথে সাথে টেবিল ও খাটসহ মেঝের সংশ্লিষ্ট অংশ দেয়ালের ওপাশে ঢুকে যেতে লাগল।
এ সময়ই শোনা গেল ০০৩৩ ঘরের দরজায় ধাক্কা ও তারপর ব্রাশ ফায়ারের শব্দ।
টেবিল ও খাট ওপাশে পৌছে একটা সিঁড়ির সাথে সেট হয়ে গেল। দেখা গেল খাট থেকে টেবিল এবং টেবিল থেকে সিঁড়ির ধাপে উঠার সুন্দর পথ তৈরি হয়ে গেছে।
‘চলুন সবাই সিঁড়িতে উঠে যাই।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
প্রথমে ড. হাইম হাইকেল, তারপর বুমেদীন বিল্লাহ, সবশেষে সিঁড়িতে গিয়ে উঠল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা সিঁড়িতে উঠতেই টেবিল ও খাট আবার ফিরে গেল সেই ঘরে। নেমে এল দেয়ালও উপর থেকে।
‘এর আসাটা স্বয়ংক্রিয় নয়, কিন্তু যাওয়াটা স্বয়ংক্রিয়। মনে হয় ওজনের সাথে এর ফিরে যাওয়ার সক্রিয় হবার কোন সম্পর্ক আছে। আমরা ওতে অবস্থান করলে ওটা সম্ভবত ফেরত যেত না। আমরা নেমে আসায় ওর ওজন মূল অবস্থানে চলে আসায় তার ফিরে যাবার ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে।’ কথাগুলো বলেই আহমদ মুসা ড. হাইম হাইকেলকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চলুন স্যার। ওরা আমাদের পিছু ছাড়বে না। দেয়াল সরিয়ে এ পথে আসার পন্থা ওরা নিশ্চয় জানে। ওরা এখনি এসে পড়বে।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই ড. হাইম হাইকেল ও বুমেদীন বিল্লাহ দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসাও ছুটল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়িতে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ পেল আহমদ মুসারা। কিন্তু সিঁড়িটা এঁকে বেঁকে উপরে উঠায় আহমদ মুসাদের কোন অসুবিধা হলো না।
সিঁড়ি পথে আহমদ মুসারা একটা বাড়িতে গিয়ে উঠল। বাড়িটার পুব পাশ দিয়ে নদী এবং পশ্চিম পাশ ঘেঁষে সড়ক পথ।
ডেট্রয়েট শহরের এই এলাকাটা বলা যায় অফসাইড। অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা এটা। সবজির ক্ষেত ও প্রচুর ঝোপ-জংগল রয়েছে।
আহমদ মুসা দ্রুত ড. হাইম হাইকেল ও বুমেদীন বিল্লাহকে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াল। কোন গাড়ি-ঘোড়া পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
আহমদ মুসারা দাঁড়ানোর মিনিট খানেকের মধ্যেই একটা গাড়িকে আসতে দেখল। কাছাকাছি এলে দেখা গেল, গাড়িতে আরোহী মাত্র একজন মহিলা, সেই ড্রাইভ করছে।
আহমদ মুসা হাত তুললে গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। আহমদ মুসা দ্রুত তাকে বলল, ‘আমরা বিপদে পড়েছি। বিশেষ করে এই বৃদ্ধ। আমরা আপনার সাহায্য চাই।’
মেয়েটি তার চোখের সব শক্তি উজাড় করে আহমদ মুসাকে দেখল। তারপর মেয়েটি মাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করল। বলল, ‘উঠুন।’
পেছনের সিটে বিল্লাহ ও ড. হাইম হাইকেলকে বসিয়ে আহমদ মুসা নিজে সামনের ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে উঠে বসল।
এ সময় তিনজন ষ্টেনগানধারী বেরিয়ে এল আহমদ মুসারা যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই বাড়ি থেকে।
আহমদ মুসাদের গাড়িতে ওঠা তারা দেখতে পেয়েছে। গাড়ি লক্ষ্যে এক পশলা গুলি ছুটে এল তাদের ষ্টেনগান থেকে।
মেয়েটি বিস্মিত হয়েছে। গাড়ি ষ্টার্ট দিতে দিতে বলল মেয়েটি, ‘ঘটনা কি মি………..।’
‘আহমদ আমি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আহমদ?’ আপনি কি মুসলমান?’ মেয়েটির চোখে বিস্ময় দৃষ্টি।
‘জি হ্যাঁ।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল আহমদ মুসা।
মেয়েটি মুহূর্তকাল চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ‘আপনারা মূলত বাদী, না আসামী?’
‘বাদী।’ ত্বরিত জবাব দিল আহমদ মুসা।
‘আপনি বিশেষ করে বৃদ্ধের বিপদের কথা বললেন। বৃদ্ধটি কে, তার নাম কি?’ জিজ্ঞাসা করল মেয়েটি।
আহমদ মুসা একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘ইনি ডক্টর হাইম হাইকেল।’
ব্রাশ ফায়ারের শব্দ পাওয়া গেল এ সময় পেছন থেকে।
আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখল, পেছনে একটা কার ছুটে আসছে। আহমদ মুসা বুঝল, ওরাই পিছু নিয়েছে। নিশ্চয় গাড়িটা ওদের ওই বাড়িতে ছিল।
আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল। ডানে সবজির বাগান। বামে নদী পর্যন্ত ঝোপঝাড়।
সামনেই রাস্তাটা বাম দিকে একটা বাঁক নিয়েছে। বাঁক শেষে জংগল। খুশি হলো আহমদ মুসা।
তাকাল সে মেয়েটির দিকে। বলল, সামনের বাঁকে আমাকে নামিয়ে দিন। বাঁকটা ঘুরেই আমাকে নামিয়ে দেবেন। যাতে পেছনের গাড়ি দেখতে না পায়।’
মেয়েটির চোখে-মুখে উদ্বেগ। বলল, ‘নেমে কি করবেন? ওরা তো মেরে ফেলবে আপনাদের। তার চেয়ে সামনে কোন পুলিশের সাহায্য পাওয়া যায় কিনা দেখা যাক।’
‘না সবাই নামবে না। শুধু আমি নামব। ওদের এখানেই আটকাতে চাই। সামনে পুলিশের সাহায্য পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
মেয়েটির চোখে-মুখে বিস্ময়। বলল, ‘আপনি কিভাবে ওদের ঠেকাবেন? ওরা তো সংখ্যায় বেশ কয়েকজন। তাছাড়া ষ্টেনগানের মত বড় অস্ত্র ওদের আছে।’
‘কিন্তু এভাবে আপনি এবং আমরা সবাই বিপদগ্রস্ত হবো। ওরা গাড়ির টায়ারে গুলী করতে পারলে এখনি গাড়ি থেমে যাবে এবং আমরা সবাই ওদের গুলীর মুখে পড়বো। আর আমি নেমে গিয়ে ওদের গাড়ি আটকে দিতে পারব। এ পাশের দুটি টায়ারের যে কোন একটি ফাটাতে পারলেই ওরা থেমে যেতে বাধ্য হবে। তখন আপনারা নিরাপদে চলে যেতে পারবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনার কি হবে? ওদের গাড়ি আটকাতে পারলেও ওদের সবাইকে একা এঁটে উঠবেন কি করে?’ বলল মেয়েটি প্রতিবাদের সুরে।
‘আমি হবো আক্রমণকারী, ওরা আক্রান্ত। আমার জয়ী হবার সম্ভাবনা বেশি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সম্ভাবনা যদি সত্য না হয়?’ বলল মেয়েটি।
‘এতটা ভাবলে কোন কাজ করা যাবে না। করণীয় যা তা করতে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যস।’ বলে আহমদ মুসা একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘এখানেই নামিয়ে দিন।’
গাড়ি থামাল মেয়েটি। আহমদ মুসা গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল, ‘আপনার নাম কি জুলিয়া রবার্টস?’
‘হ্যাঁ।’ বলল মেয়েটি।
‘থ্যাংকস।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম।’ মেয়েটির চোখে বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টি।
গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বিল্লাহ চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ভাইয়া আমার জন্যে কোন নির্দেশ?’
‘মিস জুলিয়ার ঠিকানায় তোমাদের খোঁজ করব।’ চিৎকার করে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে নামিয়ে দিয়েই মেয়েটি গাড়ি ষ্টার্ট দিয়েছে। বিল্লাহ কথা শুরু করলেও সে গাড়ি স্লো করেনি। গাড়িটা যে থেমেছিল সেটা পেছনের গাড়িটাকে সে জানতে দিতে চায় না। আহমদ মুসা এটাই চেয়েছিল।
বাঁকটা একেবারেই এল প্যাটানের ছিল। তাছাড়া বাঁক এলাকায় ঝোপ ও গাছপালা ছিল বেশ বড় বড়। পেছনের গাড়িটা টের পেল না সামনের গাড়ির থামাটা।
পেছনের গাড়িটা বাঁকে আসার আগেই সড়কের পাশে ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে একটা মোটা গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে নিয়েছে আহমদ মুসা।
দুহাতে দু’রিভলবার রেডি।
পেছনের গাড়িটা ঝড়ের গতিতে বাঁকে এসে পৌছল। সামনের গাড়িটা বাঁকের কারণে আড়াল হওয়ার জন্যেই হয়তো তাদের বাড়তি এই তৎপরতা।
গাড়িটা আহমদ মুসার সোজাসোজি পজিশনে আসার আগেই গাড়ির সামনের চাকা লক্ষ্য করে দুহাত দিয়ে দু’টি গুলী ছুড়ল আহমদ মুসা। গুলী ব্যর্থ হওয়া এবং দ্বিতীয় গুলীর ঝুঁকি নিতে চায় না সে।
দুটি গুলীই অব্যর্থভাবে আঘাত করল গাড়ির সামনের টায়ারকে। মুহূর্তেই প্রচন্ড গতির গাড়িটা ছিটকে শূন্যে উঠে বেশ অনেকটা দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। তারপর আরও কয়েকটা গড়াগড়ি খেল। পরে প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো গাড়িটা। আগুন ধরে গেল গাড়িতে।
আহমদ মুসা রিভলবার পকেটে পুরে বেরিয়ে এল ঝোপ থেকে।
সড়কের ধার ঘেঁষে হাঁটা শুরু করল সামনের দিকে। জ্বলন্ত গাড়ি পেরিয়ে যাবার সময় দেখল, কেউ বাঁচেনি। মনে হয় কেউ গাড়ি থেকে বের হবার চেষ্টা করারও সুযোগ পায়নি।
সড়কের প্রান্ত ঘেঁষে হেঁটে চলেছে আহমদ মুসা। এ সড়কের ওদিকে সমান্তরালে, ফেরার সড়ক। দুসড়কের মাঝখানে ঘাসে ঢাকা প্রশস্ত আইল্যান্ড।
প্রায় দশ মিনিট পার হয়ে গেছে। পথ চলছেই আহমদ মুসা। লিফট নেয়ার মত কোন গাড়ি পায়নি। কার্গো ভ্যান কয়েকটা গেছে, যাত্রী ভর্তি হায়ার্ড ট্যাক্সিও কয়েকটা গেছে। কিন্তু আহমদ মুসা ওদের কোন অনুরোধ করেনি।
হঠাৎ আহমদ মুসা তার নাম ধরে ডাক শুনে ডান দিকে রাস্তার ওপাশে ফিরে তাকাল। দেখল, আইল্যান্ডের ওপারে ফেরার সড়কের বেড়া বরাবর দাঁড়িয়ে গাড়ির সেই মেয়েটা ও বিল্লাহ তাকে ডাকছে। তাদের পাশে তাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
বুঝল আহমদ মুসা। ওরা নিশ্চয় পেছনের গাড়িটা ধ্বংস হওয়া দেখতে পেয়েছে। তাই কোথাও এক্সিট নিয়ে ফিরতি পথ ধরে তাকে নেবার জন্যে তারা ফিরে এসেছে।
আহমদ মুসা সড়ক ক্রস করে চলল ওদের দিকে।

জুলিয়া রবার্টসের বাড়ি। দুতলার ভিআইপি গেষ্ট রুম।
আহমদ মুসা একটি সোফায় বসে।
ঘরের ওপাশে সুসজ্জিত বেড। ক্লান্ত শরীরটা চাচ্ছে শুয়ে একটা লম্বা ঘুম দিতে। কিন্তু আহমদ মুসার কাছে এই লোভের চেয়ে একটা চিন্তা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসার চোখ ঘুরে ফিরে বার বার জানালা দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাড়ির এ্যাপ্রোচ রোডটা দেখা যায়।
ঘরে প্রবেশ করল বুমেদীন বিল্লাহ। আহমদ মুসাকে দেখে বলল, ‘কি ব্যাপার, ভাইয়া এখনও কাপড়-চোপড় ছাড়েননি?’
আহমদ মুসা বিল্লাহর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, ‘ড. হাইম হাইকেলের খবর নিয়েছ?’
ড. হাইম হাইকেলকে বাড়ির ওপাশের আরেকটি ঘরে রাখা হয়েছে।
আহমদ মুসার প্রশ্নের ধরণ দেখে বিল্লাহ বলল, ‘কেন কিছু ঘটেছে? আপনি কি ভাবছেন?’ বিল্লাহর চোখে-মুখে ভাবনার প্রকাশ।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু অস্পষ্টভাবে ভেসে আসা একটা শব্দের অনুসরণে জানালা দিয়ে ছুটে গেল তার দুচোখ। একটি কার এবং ছোট একটি মাইক্রো প্রবেশ করল জুলিয়া রবার্টসের বাড়িতে। চোখ ফিরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা, রাত ৯টা।
‘ভাইয়া, কারো কি অপেক্ষা করছিলেন? তারা কি এসে গেছে?’ বলল বিল্লাহ।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘কারও অপেক্ষা করছি না। তবে কিছু একটা পাহারা দিচ্ছি।’
বসল বিল্লাহ। ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছে তার। বলল, ‘এখানে আবার কি পাহারা দিচ্ছেন ভাইয়া। কিছু ঘটেছে?’
‘হয় তো ঘটতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
উদ্বেগ ফুটে উঠল বিল্লাহর চোখে মুখে। ছোট কোন ঘটনা নিয়ে আহমদ মুসা এভাবে মাথা ঘামায় না। কিন্তু কি ঘটেছে? জুলিয়া রবার্টসকে তো তার ভালই মনে হয়েছে। নি:সন্দেহে সে সহানভুতিশীল ও আন্তরিক। বলল বিল্লাহ, ‘ভাইয়া আপনি কি ম্যাডাম জুলিয়া রবার্টসকে সন্দেহ করছেন?’
‘সন্দেহ নয়, তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।’ আহমদ মুসা বলল।
বিল্লাহ কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় দরজা নক করে ঘরে প্রবেশ করল জুলিয়া রবার্টস।
ঘরে ঢুকেই বলল, ‘আমি বসব না মি. আহমদ মুসা। চলুন ড্রইং রুমে একটু বসি। আরও কয়েকজন এসেছে। জরুরি কথা আছে।’
‘ওঁরা তো এফ.বি.আই-এর লোক। ওঁদের মধ্যে কি ডেট্রয়েটের এফ.বি.আই চীফ হেনরী শ্যারন রয়েছেন।’ বলল আহমদ মুসা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে।
জুলিয়া রবার্টসের দুচোখ ছানাবড়া। বলল, ‘আপনি কি করে জানলেন ওঁরা এফ.বি.আই-এর লোক?’
‘আপনি যেভাবে আমার পুরো নাম জেনেছেন, বলা যায় সে ভাবেই। আমার প্রশ্নের জবাব দেননি মিস জুলিয়া রবার্টস।’
‘আরও কি জেনেছেন?’ প্রশ্ন জুলিয়া রবার্টসের।
‘আপনিও এফ.বি.আই-এর লোক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওঁরা আসবেন তাও কি জানতেন? ওঁদের অপেক্ষাতেই কি কাপড়ও ছাড়েননি?’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘জি হ্যাঁ, জানতাম।’ বলল আহমদ মুসা।
তৎক্ষণাত আর কোন কথা বলল না জুলিয়া রবার্টস। বিস্ময়ের চিহ্ন তার চোখ-মুখ থেকে চলে গেছে। ঠোঁটে এক টুকরো মুগ্ধ হাসি। বলল অল্পক্ষণ চুপ থাকার পর, ‘আহমদ মুসর জন্যে কোন কিছুই বিস্ময়কর নয়, এ কথা ভুলে গিয়েছিলাম।’
বলে একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘হ্যাঁ মি. আহমদ মুসা, যাঁরা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে ডেট্রয়েটের এফ.বি.আই. কর্মকর্তা হেনরী শ্যারনও রয়েছেন। চেনেন তাঁকে?’
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘নাম জানি।’
‘ওকে, তাহলে আপনারা আসুন। আমি চলি।’ বলে জুলিয়া রবার্টস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
জুলিয়া রবার্টস বের হয়ে যেতেই বিল্লাহ বলে উঠল, ‘আপনি কি করে জানলেন ভাইয়া যে, ওরা এফ.বি.আই.-এর লোক এবং ওরা আসবে এখানে। জুলিয়া রবার্টসের পরিচয়ই বা কি করে পেলেন?’
‘এফ.বি.আই. এর লোকরা বিশেষ কোডে হর্ণ বাজায়। জুলিয়া রবার্টসের হর্ণ বাজানো দেখে চিনেছি। তার টেলিফোনের আলোচনা শুনে জানতে পেরেছি ডেট্রয়েটের এফ.বি.আই কর্মকর্তারা রাত ৯টায় এখানে আসছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘জুলিয়া রবার্টসের নাম কিভাবে জেনেছিলেন? তাঁর ঠিকানায় আমাদের খোঁজ করবেন বলেছিলেন। ঠিকানা জানলেন কিভাবে?’
হাসল আহম মুসা। বলল, ‘আমার সামনে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর একটা নেম কার্ড পড়েছিল। তাতেই ওঁর নাম-ঠিকানা লেখা ছিল। কার্ড ওঁর কিনা এজন্যেই গাড়ি থেকে নামার সময় ওঁর নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা দুপকেট থেকে দুরিভলবার বের করে লোড পরীক্ষা করল। তারপর বলল, ‘চল।’
বিল্লাহর চোখে-মুখে বিস্ময়। এ সময় আহমদ মুসা রিভলবার পরীক্ষা করল কেন? বলল, ‘ভাইয়া, এ সময় রিভলবার চেক করছেন কেন?’
‘রুটিন চেক।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘আমিও রুটিন চেক করি তাহলে।’ বলল বিল্লাহ এবং নিজের রিভলবার বের করল।
আহমদ মুসা তখন চলতে শুরু করেছে। বিল্লাহও আহমদ মুসার পেছন পেছন চলল। ড্রইংরুমে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। ড্রইংরুমটা বিশাল ঘর। গোটা ঘরটাই সোফায় সাজানো। ড্রইংরুমের তিনটি দরজা।
পুব দিকের দরজা বাইরে থেকে প্রবেশের। উত্তরের দরজা গেষ্ট ও সাধারণ আবাসিক উইং-এর দিকে। আর দক্ষিণের দরজা ষ্টোর ও কিচেন উইং-এর সাথে যুক্ত।
আহমদ মুসা দুতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ঘরের পশ্চিম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা দেখল, জুলিয়া রবার্টস ও মি. হাইম হাইকেলসহ ছয়জন ড্রইংরুমে বসে আছে। ওরা চারজন কেন? ওরা তো কারের চারজন। মাইক্রোর লোকজন কোথায়?
নিজেকে প্রশ্ন করে নিজের মনেই হাসল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছে জুলিয়া রবার্টস। সে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে।
ওরা চারজন যেমন বসেছিল, তেমনি বসে থাকল। শুধু ওদের ৮টি চোখ একসাথে গিয়ে স্থির হলো আহমদ মুসার উপর।
ওরা চারজন বসেছিল পুবমুখী ও উত্তরমুখী হয়ে দু’সোফায়। আর জুলিয়া রবার্টস ও ড. হাইম হাইকেল পশ্চিমমুখী এক সোফায়। ড্রইংরুমের সেন্ট্রাল সার্কেলেল দক্ষিণমুখী একটা সোফাই শুধু খালি আছে। সোফাটা বাইরের দরজার সোজাসুজি। খুশি হলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ও বুমেদীন বিল্লাহ গিয়ে সেই খালি সোফাটায় বসল।
আহমদ মুসারা বসার আগেই জুলিয়া সবাইকে সবার সাথে পরিচয় করে দিয়েছে।
আহমদ মুসা বসতেই ডেট্রোয়েটের এফ.বি.আই. চীফ হেনরী শ্যারন বলে উঠল, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আহমদ মুসা। অনেক বিপদ পাড়ি দিয়ে, অনেক কষ্ট করে আপনি মি. হাইম হাইকেলকে উদ্ধার করেছেন।’
‘ওয়েলকাম। তবে আমি আমার কাজ করেছি। এ জন্যে ধন্যবাদের প্রয়োজন হয় না।’ একটু হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘এটা আপনার বদান্যতা।’ বলে একটু থেমেই হেনরী শ্যারন আবার কথা বলে উঠল, ‘মি. আহমদ মুসা, আমরা ড. হাইম হাইকেলকে নিয়ে যাচ্ছি। আপনাকেও আমাদের সাথে যেতে হবে।’
বিস্মিত হলো না আহমদ মুসা। এ ধরনের কথা আসবে, আগেই তা ভেবেছে সে। কিন্তু শুরুতেই এমন নগ্নভাবে আসবে ভাবেনি আহমদ মুসা।
ঠোঁটে এক টুকরো হাসি টেনে আহমদ মুসা বলল, ‘কিন্তু ড. হাইম হাইকেলের সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে, সেটা এখনও হয়নি।’ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে উত্তর দিল না হেনরী শ্যারন। দেখা গেল আহমদ মুসার কথায় তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেছে। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘আপনি তো তার সাথে পরিচিতও নন, সম্পর্কিত নন। সুতরাং তেমন কি আর কথা থাকবে। ঠিক আছে, আপনিও যাচ্ছেন। আপনাদের কথা বলার সুযোগ করে দেব।’
আহমদ মুসার ভেতরটা শক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু মুখে তার কিছুই প্রকাশ পেল না। সে পাশে বসা বিল্লাহকে কানে কানে কিছু বলল। সংগে সংগে বিল্লাহ উঠে দাঁড়াল।
বিল্লাহ যখন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে এস।’
বলেই জুলিয়া রবার্টসের দিকে ফিরে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘ওকে একটু বাইরে পাঠাচ্ছি মিস জুলিয়া রবার্টস।’
‘ধন্যবাদ সৌজন্যের জন্যে।’ বলল জুলিয়া রবার্টস।
জুলিয়া রবার্টস যখন আহমদ মুসার কথার জবাব দিচ্ছিল, তখন হেনরী শ্যারন তার মোবাইলে কথা বলছিল।
হেনরী শ্যারনের কথা শেষ হতেই আহমদ মুসার তার কথার উত্তরে বলল, ‘আমি আপনাদের সাথে যাচ্ছিই এটা কিভাবে নিশ্চিত হলেন?’
সংগে সংগে উত্তর দিল না হেনরী শ্যারন। তার চোখে-মুখে ক্রোধের প্রকাশ। বলল শক্ত কণ্ঠে, ‘এফ.বি.আই. কারো মর্জি মাফিক নয়, নিজের মর্জি মাফিক কাজ করে।’
জুলিয়া রবার্টসের চোখে-মুখে চরম বিব্রতভাব ফুটে উঠেছে। তাকাল হেনরী শ্যারনের দিকে। বলল, ‘মি. শ্যারন, এমন তো কথা ছিল না? ড. হাইম হাইকেলকে তার পরিবারে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে, এটাই তো বলেছিলেন।’
‘মিস জুলিয়া রবার্টস, সে সময়ের পর অনেক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অনেক পরিবর্তনের জন্যে এই সময় যথেষ্ট।’ বলেই হেনরী শ্যারন তাকাল ড. হাইম হাইকেলের দিকে। বলল, ‘চলুন স্যার। আপনি ক্লান্ত। আপনার বিশ্রাম দরকার।’
‘মি. শ্যারন, আমি তো যাবই। আপনারা আমাকে বাড়ি পৌছাবেন, এটাই আমার জন্যে নিরাপদ। কিন্তু তার আগে আহমদ মুসার সাথে আমার প্রয়োজন শেষ করতে চাই।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘স্যার সেটা হবে। আমরাই তার ব্যবস্থা করব। আহমদ মুসা আমাদের সাথে যাচ্ছেন।’ হেনরী শ্যারন বলল।
‘আমি যাচ্ছি না মি. শ্যারন। আমি আপনার মর্জির অধীন নই।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার সাথে সাথেই স্প্রিং-এর মত উঠে দাঁড়াল হেনরী শ্যারন। উঠে দাঁড়াবার সাথেই তার হাতে উঠে এসেছে রিভলবার।
রিভলবার আহমদ মুসার দিকে তাক করে ক্রুব্ধ হেনরী শ্যারন কিছু বলতে যাচ্ছিল।
এরই সুযোগে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতার সাথে আহমদ মুসার হাত রিভলবার সমেত বেরিয়ে এল এবং আগুন উদগীরন করল।
গুলী গিয়ে আঘাত করল শ্যারনের রিভলবারের নলকে। তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল রিভলবার।
আহমদ মুসার বাম হাতও তুলে নিল আর একটি রিভলবার।
অবশিষ্ট তিনজন ইতিমধ্যে পকেটে হাত দিয়েছিল তাদের রিভলবার বের করার জন্যে। কিন্তু ততক্ষণে তারা আহমদ মুসার টার্গেটে এসে গেছে। বলল আহমদ মুসা শ্যারনকে লক্ষ্য করে, ‘মি. হেনরী শ্যারন, মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ হয় না। আপনার ইচ্ছাও পূরণ হবার কোন উপায় নেই।’
ক্রোধে ফুসছিল হেনরী শ্যারন। আগুনে তেল পড়ার মত জ্বলে উঠল সে। চিৎকার করে উঠল, ‘জন তোমরা এদিকে এস।’
কোন সাড়া এল না ওদিক থেকে।
আরও জোরে চিৎকার করল মি. শ্যারন।
‘মি. শ্যারন এক সময় ঘুম থেকে তারা জাগতেও পারে।’ মুখ টিপে হেসে বলল আহমদ মুসা।
চোখ দুটি ছানাবড়া হয়ে উঠেছে হেনরী শ্যারনের।
এ সময় ঘরে প্রবেশ করল বিল্লাহ।
আহমদ মুসা বলল, ‘বিল্লাহ, তুমি মি. শ্যারনকে একটু বল কিভাবে তুমি জনদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছো।’
‘তুমি এতটা এগুবে, সেটা বুঝিনি আহমদ মুসা। কিন্তু এটাই শেষ নয়। তোমার ঔদ্ধত্য সহ্য করা হবে না।’ ক্রোধের চোটে কাঁপতে কাঁপতে বলল হেনরী শ্যারন।
‘অপেক্ষা করুন মি. শ্যারন।’ বলেই আহমদ মুসা বিল্লাহকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এদেরকেও ঘুম পাড়িয়ে দাও বিল্লাহ। শান্তিতে থাকবেন ওঁরা। তবে বিল্লাহ, মিস জুলিয়া রবার্টসের ডোজটা যেন একটু কম হয়। কারণ ওঁকে জেগে উঠে এদেরকে হাসপাতালে নিতে হবে। একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর হেনরী শ্যারনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘হ্যাঁ মি. শ্যারন, বিশেষ ধরনের এবং সিগারেট সাইজের এই ক্লোরোফরম আমরা পেয়েছি আপনার বন্ধু ব্রিগেডিয়ার শেরিল শ্যারনের বন্দীখানা থেকে। আমাদের সংজ্ঞাহীন করার জন্যে এনেছিলেন। আমাদের বাঁধতে গিয়ে একটা প্যাকেট পড়ে যায় ওদের পকেট থেকে। এ্যান্টিডোজ ব্যবহার না করলে এই ক্লোরোফরম ঘুম ভাঙে না।’
বিল্লাহ এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে ক্লোরোফরম স্প্রে নিয়ে ওদের কাছে পৌছে গিয়েছিল।
বিল্লাহ প্রথমে গেল হেনরী শ্যারনের দিকে। তার নাকের কাছে স্প্রে নিয়ে মাথায় রিভলবারের নল ঠেকিয়ে বলল, ‘নিশ্বাস টানতে থাকুন, এক সেকেন্ড দেরী করলেই গুলী করব। নিশ্বাস টানুন।’
হেনরী শ্যারনের দুচোখ থেকে আগুন বেরুচ্ছে। কিন্তু সুবোধ বালকের মত নির্দেশ পালন করল সে। নি:শ্বাস টানল। আর তার সাথে সাথেই ঢলে পড়ল সংজ্ঞা হারিয়ে। ওদের চারজনেরই একই পরিণতি হলো।
বিল্লাহ ফিরে গিয়ে আহমদ মুসার পাশে বসল।
উঠে দাঁড়িয়েছে জুলিয়া রবার্টস। তার বিব্রত বেদনার্ত মুখ। বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, বিল্লাহ বসলেন কেন? আমি বাকি রয়ে গেছি।’
‘আপনি বাকিই থাকবেন। আপনাকে ক্লোরোফরম করার প্রয়োজন নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি তো বলেছেন।’ বলল জুলিয়া রবার্টস।
‘সেটা মি. হেনরী শ্যারনকে শুধু জানাবার জন্যেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শুধু জানাবার জন্যে? বুঝলাম না।’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘আপনাকে ক্লোরোফরম না করলে, তার অর্থ তারা বুঝত আপনি আমাদের সহযোগিতা করছেন। সেটা আপনার জন্যে বিপজ্জনক হতো। এজন্যেই তাদের জানিয়েছি যে আপনাকেও সংজ্ঞাহীন করা হবে।’ বুঝিয়ে দিল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু সংজ্ঞাহীন করার প্রয়োজন নেই বলছেন যে!’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা জেনেছেন আপনিও সংজ্ঞাহীন হয়েছেন। কিন্তু ওরা জানবে না যে আপনি সংজ্ঞা হারাননি, আপনাকে ক্লোরোফরম করা হয়নি।’
বিস্ময়ে হা হয়ে উঠল জুলিয়া রবার্টসের মুখ। বলল, ‘এতটা আট-ঘাট বেঁধে আপনি কথা বলতে পারেন?’
আহমদ মুসা উত্তর দিল না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘যা ঘটে গেল তার জন্যে আমি দু:খিত মিস জুলিয়া রবার্টস। আপনি…..।’
আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠল জুলিয়া রবার্টস, ‘আপনার ব্যাপারে ওঁরা বাড়াবাড়ি করেছেন বলে আমি মনে করি। কিন্তু আপনি বাইরের লোকদের নিস্ক্রিয় করার আগাম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি করে? ওঁদের মনোভাব আঁচ করতে পেরেছিলেন কিভাবে?’
‘আমি নিউইয়র্ক থাকতেই খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম ডেট্রোয়েটের এফ.বি.আই. চীফ হেনরী শ্যারন ইহুদী এবং শ্যারন-আজর ওয়াইজম্যান নেটওয়ার্কের তিনি সদস্য। তারপর আপনার সাথে গাড়িতে আসার সময় যখন দেখলাম আপনি অধ্যাপক হাইম হাইকেলসহ আমার খবর তাকে জানালেন এবং ৯টায় ওঁরা আসছেন জানলাম, তখনই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম ওরা যে কোন মূল্যে এই মহাসুযোগের সদ্ব্যবহার করবে। আর যখন দেখলাম ওরা একটা কার ছাড়াও একটা মাইক্রো সাথে করে নিয়ে এসেছে, তখন এটা বুঝা গেল, তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় জনশক্তি তারা নিয়ে এসেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
জুলিয়া রবার্টসের চোখে-মুখে বিস্ময়। বলল, ‘আমিও যেহেতু ব্যাপারটার সাথে জড়িত, তাই বোধ হয় আপনি আমাকে কিছুই জানাননি।’ কণ্ঠে কিছুটা অনুযোগের সুর।
‘না, আপনাকে জড়িত মনে করিনি। আপনি যেটা করেছেন, সেটা আপনার রুটিন ডিউটি। আপনাকে না জানাবার কারণ হলো, আপনাকে বিব্রত না করা এবং আপনাকে অসুবিধায় না ফেলা।’
হাসল জুলিয়া রবার্টস। বলল, ‘এতদিন আপনার কথা শুনেছি, আজ দেখলাম। নিজের লাভের চাইতে, অন্যের যাতে ক্ষতি না হয় সেটাকে আপনি বড় করে দেখেন। কিন্তু এই নীতি সমাজ সেবক, সমাজ সংস্কারকের হতে পারে, কিন্ত্ আপনার মত একজন যোদ্ধার এই নীতি কিভাবে?’
‘এটা নির্ভর করে যুদ্ধ ও যোদ্ধার লক্ষ্যের উপর। যুদ্ধ যদি হয় মানব সেবা ও মানব সমাজের সংস্কারের জন্যে, তাহলে যুদ্ধ ও যোদ্ধার নিজের লাভের চেয়ে মানুষের ক্ষতিকে বড় করে দেখা হয়। ইসলামে এই যুদ্ধকেই বলে ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর জন্যে যুদ্ধ করা’। আল্লাহর জন্যে যুদ্ধ হলে সেটা কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ বা জাতির স্বার্থে হয় না, হয় মানুষের জন্যে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি বা দেশ যুদ্ধ করবে কেন, ক্ষতি স্বীকার করবে কেন, জীবন দেবে কেন?’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘এই ধরনের যুদ্ধ তারা করতে পারে যারা স্রষ্টাকে পালনকর্তা, বিচারকর্তা এবং পুরষ্কার দাতা বা শাস্তিদাতা মানে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু এই বিশ্বাসের সাথে মানুষের জন্যে কাজ করার সম্পর্ক কি?’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘সম্পর্ক স্রষ্টা, পালনকর্তা, বিচারকর্তা ও পুরষ্কার বা শাস্তিদাতার উদ্দেশ্যে সাথে। স্রষ্টা চান তাঁর চাওয়া অনুসারে মানুষ মানুষের শান্তি ও কল্যাণের জন্যে কাজ করুক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এটা তো সমাজ সেবা, খুব বেশি হলে সমাজ সংস্কারের কাজ। যুদ্ধের কোন প্রশ্নই তো এখানে ওঠে না। কিন্তু আপনি বলেছেন যুদ্ধের লক্ষ্য এটা হতে পারে।’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘এই লক্ষ্যে যুদ্ধ নয়, কিন্তু যুদ্ধ হলে তার লক্ষ্য এটাই হওয়া উচিত।’ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। বলল আবার, ‘মানুষের শান্তি ও মংগলের জন্যে কাজ করার দুটো দিক আছে। একটা হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করা, অন্যটা হলো অন্যায়ের প্রতিরোধ করা। এই দুটি দিকের প্রথমটি দ্বিতীয়টির উপর নির্ভরশীল। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যেই অন্যায়ের প্রতিরোধ প্রয়োজন। তার মানে…….।’
‘তার মানে মানুষের শান্তি ও মংগলের লক্ষ্যে অশান্তি ও অমংগলের প্রতিরোধের জন্যে যুদ্ধ প্রয়োজন। এর অর্থ আপনাদের ইসলামে যুদ্ধ একটা একান্ত আবশ্যকীয় অস্ত্র।’ আহমদ মুসার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল জুলিয়া রবার্টস।
‘হ্যাঁ, যতদিন অশান্তি ও অমংগলের শক্তির হাতে এই অস্ত্র থাকবে।’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ টিপে হাসল জুলিয়া রবার্টস। বলল, ‘এই দৃষ্টি কোণ থেকে সন্ত্রাস যুদ্ধকে আপনি বৈধ বলবেন? কারণ সবল পক্ষ যেটাকে যুদ্ধ বলে, সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের সেই যুদ্ধই সন্ত্রাস নামে অভিহিত হয়। দুর্বলের এই যুদ্ধ সংগত কারণেই কৌশলের দিক দিয়ে ভিন্নতর হয়ে থাকে। দুর্বল এক্ষেত্রে সবলের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে না গিয়ে গেরিলা পন্থা অনুসরণ করে।’
‘আপনার কথিত দুর্বল পক্ষ যদি বৈধ কোন ষ্টেট (যদি তা বিদ্রোহের মাধ্যমেও) হয় এবং ষ্টেট-অথরিটি যদি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সবল শত্রুর যতটা পারা যায় ক্ষতি করার জন্যে গেরিলা ধরনের আক্রমণ শুরু করে, তাহলে এটা সন্ত্রাস হবে না। কিন্তু ষ্টেট অথরিটি ছাড়াই যদি কোন গ্রুপ বা পক্ষ তার শত্রুর বিরুদ্ধে এই ধরনের আক্রমণ শুরু করে, তাহলে সেটা সন্ত্রাসের পর্যায়ে পড়বে। আমাদের নবী (স.) মক্কায় ১৩ বছর ষ্টেটলেস অবস্থায় মানুষের জন্যে শান্তি ও মংগলের বাণী, অর্থাৎ ইসলাম প্রচার করেছেন। এই তের বছর তিনি সবল শত্রুর দ্বারা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ কোনভাবেই তিনি শত্রুর উপর পাল্টা আঘাত হানেননি। অথচ মদিনায় গিয়ে ষ্টেট-অথরিট অর্জন করার পর প্রতিটি আঘাত-আক্রমণের তিনি মোকাবিলা করেছেন। শত্রুর প্রস্তুতিকে দুর্বল বা নস্যাত করার জন্যে অভিযান পরিচালনা করেছেন। সুতরাং আপনার প্রশ্নের জবাব হলো, ন্যায়সংগত হলেও আপনার কথিত সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের অথরিটি বিহীন সন্ত্রাস যুদ্ধকে বৈধ বলে মনে করে না ইসলাম। ‘ক’এর অপরাধে ‘খ’কে শাস্তি দেবার অনুমতি ইসলামে নেই। অথচ সন্ত্রাসের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই ঘটে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন এটা আপনাদের ‘ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ’ তত্বের মধ্যে পড়ে তো।’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘ব্যক্তি পর্যায়ে অন্যায় প্রতিরোধে গিয়ে কোন সময় শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। সে শক্তি প্রয়োগ যদি সামনাসামনি কোন অন্যায় থেকে কাউকে বিরত রাখার জন্যে হয়, তাহলে এটা সন্ত্রাস হবে না, কেউ একে সন্ত্রাস বলবে না। কিন্তু কেউ যদি অন্যায়কারীকে এভাবে সামনাসামনি প্রতিরোধ করার প্রকাশ্য ও বাঞ্জনীয় দায়িত্ব পালন না করে এক সময় গোপনে গিয়ে তার বাড়িতে আগুন লাগায়, তাহলে এটা সন্ত্রাস হবে। কারণ এর দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যায়টির প্রতিরোধ হয় না এবং এই কাজে অন্যায়কারী ছাড়াও আরও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খোদ এই কাজটিই অন্যায়ে পরিণত হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু এর আগে আপনি বলেছেন, আপনাদের নবী ষ্টেট-অথরিটি বিহীন অবস্থায় মক্কা জীবনের তের বছরে কোন পর্যায়েই অন্যায় ও জুলুম নির্যাতনের প্রতিরোধ করেননি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। এখন বললেন ব্যক্তিপর্যায়ে অন্যায়ের প্রতিরোধে শক্তি প্রয়োগ করা যাবে। এটা ইসলাম সম্মত হলে আপনাদের নবী মক্কার জীবনে তা করেননি কেন?’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি এখানে বলেছি ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন গ্রুপ পর্যায়ের অন্যায়ের কথা এবং ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন গ্রুপ পর্যায়ের প্রতিরোধের কথা। এটা মানুষের অপরিহার্য দায়িত্বশীলতার অংশ বলেই মানব সমাজে এই কাজ চলে আসছে এবং চলা উচিত। ইসলাম একে উৎসাহিত শুধু নয় অবশ্য পালনীয় করেছে। কিন্তু অন্যায় ও জুলুম নির্যাতনকারী যদি ষ্টেট-অথরিটি হয়, জুলুম-নির্যাতন-অন্যায় যদি ষ্টেট অথরিটির অধীনে চলে তাহলে এর বিরুদ্ধে ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন গ্রুপ পর্যায়ের শক্তি প্রয়োগ বা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে ইসলাম অনুমোদন করেনি। আমাদের নবী (স.) মক্কা জীবনে এটা করেননি।’
‘এর অর্থ হলো, ষ্টেট অথরিটির সব অন্যায় ও জুলুম অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে যেতে হবে। এই কি?’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘না, রাষ্ট্রের নাগরিকরা তা অবশ্যই মুখ বুজে সহ্য করবে না। প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরকে অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে। এটাও ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ, যাকে আপনার পাশ্চাত্যের সবাই ভুল বুঝে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
জুলিয়া রবার্টস হাসল একটু মুখ টিপে। বলল, ‘অস্ত্রের যুদ্ধও তো জিহাদ?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু দুয়ের ক্ষেত্র আলাদা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝেছি। কিন্তু বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে আপনার মত কি? ষ্টেট অথরিটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন কোন সময় বিদ্রোহ বা মুক্তি সংগ্রামের পর্যায়ে পৌছতে পারে।’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘বিদ্রোহ বা মুক্তি সংগ্রাম ষ্টেট অথরিটির প্রতিপক্ষ আরেক ষ্টেট অথরিটি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে যে যুদ্ধ বা সংঘাতটা হয়, তা যেমন প্রকাশ্য ও ঘোষিত, তেমনি তা শুধু ষ্টেট অথরিটির নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত হয়। এই ধরনের বিদ্রোহ বা মুক্তি সংগ্রামমুলক কাজ সন্ত্রাসের পর্যায়ে পড়ে না। এই বিদ্রোহ, মুক্তি সংগ্রাম যদি ‘আল্লাহর জন্যে’, মানে মানুষের শান্তি ও কল্যাণের জন্যে হয়, তাহলে ইসলাম একে অনুমোদন করে।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল জুলিয়া রবার্টস।
থামল সে। হেসে উঠল। বলল আবার, ‘আপনি আমেরিকায়, সুরিনামে, ক্যারিবিয়ানে, আফ্রিকায়, ইউরোপে যা করেছেন এবং করছেন, তা কোন পর্যায়ে পড়ে? আপনি অস্ত্র ব্যবহার করছেন, মানুষও মারছেন।’
হাসল আহমদ মুসাও। উত্তরের জন্যে মুখ খুলেছিল। এ সময় ড. হাইম হাইকেল আহমদ মুসাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘এই উত্তরটা আমি দিতে চাই।’
বলে একটু থামল। তারপর বলা শুরু করল, ‘মি. আহমদ মুসা জিহাদকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন গ্রুপ পর্যায়ে অন্যায়ের প্রতিরোধ, ব্যক্তি বা সামষ্টিক নাগরিক পর্যায়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন, বিদ্রোহ বা মুক্তি সংগ্রাম পর্যায়ে সংঘাত ও যুদ্ধ এবং আন্তঃ ষ্টেট পর্যায়ের যুদ্ধ সংঘাত। আহমদ মুসা প্রথম ধরনের জিহাদ করছেন। অস্ত্রের ব্যবহার ও মানুষ মারা নিয়ে মিস জুলিয়া প্রশ্ন তুলেছেন। আপনাদের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, দ্বিতীয় প্রকারের জিহাদে ইসলামী নীতি অনুসারে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ, কিন্তু প্রথম প্রকারের জিহাদে অস্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজনীয় হতে পারে। কারণ অন্যায়কারীর হাতে যা থাকবে, তা নিয়েই তো তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। আহমদ মুসা এটাই করছেন। মি. বুমেদীন বিল্লাহ এবং আমাকে উদ্ধার করতে এসে বন্দী খানাতেই আহমদ মুসার হাতে দু’ডজনের মত লোক মরেছে। এই লোকদের না মারলে তিনি আমাকে মুক্ত করতে পারতেন না। এটাই শুধু নয়, তাঁকেও নিহত হতে হতো। তার এই যুদ্ধ বা জিহাদকে শুধু ইসলাম নয়, দুনিয়ার অন্য ধর্ম ও শাসন ব্যবস্থাও অনুমোদন করে।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ স্যার। আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু সন্ত্রাস সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?’ বলল জুলিয়া রবার্টস।
‘মি. আহমদ মুসার সব কথা আমি ভালোভাবে শুনেছি। সন্ত্রাস সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তার সাথে আমি একমত। তিনি তার ধর্মের জিহাদের যে দৃষ্টিকোন তুলে ধরেছেন তার সাথে আমি কয়েকটা কথা যোগ করব। জিহাদ বা যুদ্ধের ব্যাপারে ইসলামের নীতি খুবই স্বচ্ছ, বিস্তারিত ও বাস্তবমুখী। এদিক থেকে ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে একেবারেই আলাদা। ইসলাম সর্বকনিষ্ঠ এবং নবুওতের ধারায় সর্বশেষ ধর্ম হওয়ার দাবীদার বলেই হয়তো। ইসলাম মানুষের মতামতের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কারো উপর ধর্মমত চাপিয়ে দেবার বিরোধী। ইসলামের নবী তার জীবদ্দশায় মদিনার মুনাফিকদের বিকৃত বিশ্বাসকে সহ্য করে গেছেন, কিন্তু তাদের বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীকে সহ্য করেননি। যেমন তাদের ভিন্ন ‘মসজিদ’ তৈরির উদ্যোগ নস্যাত করে দিয়েছিলেন। মদিনার ইহুদীদের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে মৈত্রী গড়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের নবী নিজে যেমন চুক্তি লংঘন করেননি, তেমনি তিনি ইহুদীদের ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি লংঘনকে বরদাশত করেননি। বিচার ও বিচার কার্যকরী করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইসলামের নবী মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু বিভ্রান্তি, অনর্থ, অশান্তি সৃষ্টিকারী উদ্যোগের প্রতিরোধকে একান্ত আবশ্যকীয় বলেছেন। ইসলাম অশান্তি বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসকে ‘হত্যা’র চেয়ে মারাত্মক অপরাধ বলে অভিহিত করেছে। এমনকি একজন লোকের হত্যাকেও গোটা মানবজাতিকে হত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে। এ কারণেই ইসলাম অপরাধের প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানে অত্যন্ত কঠোর। ইসলামের মানবিক রূপ আমাদের পশ্চিমী দেশসমুহে যুদ্ধবাদী, সহ অবস্থান বিরোধী, অশান্তি সৃষ্টিকারী বলে চিত্রিত হয়েছে। মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার কসরত চলছে এই দৃষ্টিকোন থেকেই। পশ্চিমের এই চিন্তা বুঝার ভুল অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রসূত। নিরপেক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ হয়ে একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে ইসলামের মৌলবাদিতা অর্থাৎ মানবতা ও মানব সমাজ বিরোধী অপরাধের প্রতিরোধ, প্রতিবিধান ও বিচার প্রশ্নে ইসলামের অনড়তা, আপোষহীনতা মানব সমাজের শান্তি ও কল্যাণের জন্যেই প্রয়োজন। খোদ জাতিসংঘও এ বিষয়টা এখন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। এক সময় জাতিসংঘ শুধু শান্তি রক্ষা করে চলাকেই তার কাজ মনে করতো, কিন্তু এখন শান্তি প্রতিষ্ঠাকেও তার কাজ হিসাবে গ্রহণ করছে। জাতিসংঘ তার এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে গেলে অন্যদের অমঙ্গলের শক্তির বিরুদ্ধে তাকে যুদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই যুদ্ধ শুরু করেছে। জাতিসংঘ তার কুয়েত যুদ্ধ ও আফগান যুদ্ধকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই অপরিহার্য করেছে। এমনকি আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অনেক আগ্রাসনকে অনুরূপ যুক্তিতে বৈধ মনে করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রসহ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক দেশসমূহের নিরাপত্তার জন্যে প্রয়োজন হলে অশান্তি ও অমংগলের শক্তির বিরুদ্ধে আগাম আক্রমণকেও বৈধ করে নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ ও দখন তার এই নীতিরই একটা নগ্ন দৃষ্টান্ত। সুতরাং ইসলাম……….।’
ড. হাইম হাইকেলের কথায় বাধা দিল জুলিয়া রবার্টস। ড. হাইম হাইকেলের কথার মাঝখানেই সে বলে উঠল, ‘স্যার, তাহলে তো দেখা যাচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের যুদ্ধ নীতিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ গ্রহণ করেছে।’
হো হো করে হেসে উঠল ড. হাইম হাইকেল। বলল, ‘হ্যাঁ, গ্রহণ করেছে। ইসলামের বন্দুকটা নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু টার্গেট উল্টো দিকে স্থির করেছে। ইসলামের ‘যুদ্ধ’কে নিলেও যুদ্ধের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে নেয়নি। মি. আহমদ মুসা বলেছেন, ইসলামের জিহাদ বা যুদ্ধ ‘আল্লাহর জনে’, মানে মানুষের মুক্তি, শান্তি ও কল্যাণের জন্যে, কিন্তু আমাদের আমেরিকার যুদ্ধ আমেরিকার জন্যে, তার নিজ সম্পদ ও সমৃদ্ধির জন্যে। মুসলমানদের ‘আল্লাহর জন্যে’ যুদ্ধকে মৌলবাদ বলে গালি দিলেও তা মানুষের জন্যে শান্তি আনে, কল্যাণ আনে, আর আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শ্লোগানের আড়ালে যুদ্ধ করি নিজের জন্যে। তাই অশান্তি ও অমংগলের সৃষ্টি করে এবং সংশ্লিষ্ট জনগণের কাছে আমরা দখলদার ও খুনি হিসেবে চিত্রিত হই। অথচ ইসলামের সোনালী যুগের মুসলিম বিজেতাদের বিজিত দেশের মানুষ স্বাগত জানিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেছে, আর বিজয়ীরাও বিজিতদের বিজিত হিসেবে নয় ভাই হিসেবে বুকে টেনে নিয়েছে। সুতরাং দুযুদ্ধই যুদ্ধ, তবে দুয়ের মধ্যে স্বর্গ ও নরকের মত …………।’
ড. হাইম হাইকেলের কথার মাঝে আবার বাধা দিয়ে জুলিয়া রবার্টস বলে উঠল, ‘স্যার, আপনি কিন্তু দেশের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।’
‘না, দেশের বিরুদ্ধে নয়, আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডার ফাদারসদের স্বাধীনতা ও গনতন্ত্র নীতির পক্ষে কথা বলছি।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘আপনি তো ধর্মপ্রাণ ইহুদী, ইসলামকে আসলেই আপনি কেমন মনে করেন?’ জিজ্ঞাসা জুলিয়া রবার্টসের।
‘ইসলাম আধুনিক মানুষের জীবন-দর্শন।’ জবাব দিলেন ড. হাইম হাইকেল।
‘স্যার আমি জানি, আপনি আপনার আগের ইহুদী বিশ্বাস থেকে সরে এসে এখন এমন একটি ইহুদী বিশ্বাস অনুসরণ করেন যেখানে দয়া ও ভালোবাসাই মাত্র ধর্মের হাতিয়ার, যেখানে যুদ্ধ ও রক্তপাতের কোন স্থান নেই। কিভাবে আপনি তাহলে ইসলামকে আধুনিক মানুষের অনুসরণীয় ধর্ম বলেছেন যেখানে প্রতিরোধ-প্রতিবিধানের জন্যে যুদ্ধ অপরিহার্য?’
সংগে সংগে জুলিয়া রবার্টসের প্রশ্নের জবাব দিল না ড. হাইম হাইকেল। যেন দম নিচ্ছিল সে। একটু পর বলল, ‘আমি আমার জীবনের এক বিশেষ অবস্থায় যে বিশ্বাস বেছে নিয়েছি, তা আমার মনের শান্তির জন্যে প্রয়োজনীয় হলেও সে বিশ্বাস দুনিয়ায় শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ দুনিয়ায় সবল ও ষড়যন্ত্র পটু অমংগলের শক্তি দুর্বল ও নীরিহ মংগল কামনাকে গলা টিপে মারছে ও মারতেই থাকবে। পথহারা দূর্বল ও নিরীহ মানুষের মুক্তির জন্যে আজ খোদায়ী বিধানের অধীন একমাত্র জীবন্ত ধর্ম ইসলামের প্রয়োজন। ইসলামের প্রতিরোধ ও প্রতিকারের যুদ্ধই পারে মানুষের জন্যে শান্তি ও মংগল আনতে।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
ড. হাইম হাইকেল থামতেই জুলিয়া রবার্টস বলে উঠল, ‘স্যার, আপনি খুব বেশি হতাশ। কেন জাতিসংঘের মাধ্যমে তো আমরা মানুষের জন্যে এ শান্তি ও কল্যাণ আনতে পারি।’
হাসল ড. হাইম হাইকেল। বলল, ‘মিস জুলিয়া রবার্টস, দুনিয়ায় সকল মানুষের জন্যে পক্ষপাতহীন শান্তি, সুবিচার ও মংগল প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজন ব্যক্তি-নিরপেক্ষ, দেশ-নিরপেক্ষ অনড় নীতিবোধ। এই নীতিবোধ জাতিসংঘ নয়, একমাত্র স্রষ্টাই দিতে পারেন। কারণ স্রষ্টা সব মানুষের এবং মানুষও স্রষ্টার। আর একটা মৌলিক কথা হলো, যিনি নীতি প্রণয়নকারী, তিনিই যদি আবার তার বাস্তবায়নকারী হন, তাহলে তিনি সময় ও অবস্থার পরিবর্তনে নীতি পাল্টাতে পারেন। সুতরাং মানুষ কিংবা মানুষের দ্বারা পরিচালিত জাতিসংঘ একই সাথে বিধান দাতা ও বিধানের অনুসরণকারী দুই-ই হতে পারে না। এ জন্যেই মানুষের জন্যে খোদায়ী বিধান প্রয়োজন যা সকলের উপর সমভাবে প্রযোজ্য এবং এই বিধানই মানুষের শান্তি ও কল্যাণের পাহারাদার হবে। আমার মত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও স্বীকার করতে হবে যে, এই খোদায়ী বিধান আজ শুধু ইসলামের কাছেই আছে।’
বিস্মিত, বিব্রত, মুগ্ধ জুলিয়া রবার্টস বলল, ‘কেন, তাহলে স্যার আপনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, করছেন না?’
হাসল ড. হাইম হাইকেল। বলল, ‘আমি দুনিয়ার মানুষের কথা বলছি, নিজের কথা নয়। ব্যক্তিগত প্রসংগ থাক।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে আহমদ মুসা ‘কম্পারেটিভ ফেইথ ষ্টাডিজ’-এর প্রবীণ প্রফেসর ড. হাইম হাইকেলের কথা গোগ্রাসে গিলছিল। ড. হাইম হাইকেল থামতেই সে বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ স্যার। আমার বিশ্বাসকে আপনি আরও মজবুত করছেন যে, ইসলাম একদিন অবশ্যই বিশ্বের সব মানুষের একমাত্র জীবন-দর্শন হয়ে উঠবে।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর ড. হাইম হাইকেলকে ‘মাফ করবেন স্যার’ বলে জুলিয়া রবার্টসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস জুলিয়া রবার্টস, এদেরকে হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু তার আগে আপনি এফ.বি.আই.-এর চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসনের সাথে একটু কথা বলুন।’
‘সুপ্রীম বস জর্জ আব্রাহাম জনসনের সাথে? আমি? কেন?’ দুচোখ ছানা-বড়া করে বলল জুলিয়া রবার্টস।
‘আমার কথা তাকে বলুন। সব ব্যাপার তাকে জানান?’ বলল আহমদ মুসা।
‘উনি তো সবই জানতে পারবেন। সবই তাকে জানানো হবে অফিসিয়ালি।’ জুলিয়া রবার্টস বলল।
‘সেটা তো পরে। আমি এখান থেকে যাওয়ার আগেই তাঁকে জানানো দরকার। যাতে অন্তত আপনার কাছে পরিষ্কার হয় যে, সুযোগ নিয়ে আমি আইনের হাত থেকে পালাচ্ছি না। এফ.বি.আই. চীফ যখন ইচ্ছা ডাকলেই আমাকে পেতে পারেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে আপনি কথা বলুন। আমি সরাসরি তাঁর সাথে কথা বলার এক্তিয়ার রাখি না।’ জুলিয়া রবার্টস অনুরোধের সুরে বলল।
‘ঠিক আছে, সংযোগ লাগিয়ে দিন, আমি কথা বলব।’ বলল আহমদ মুসা।
ঠিক আছে। আমার পার্সোনাল ও অফিসিয়াল মোবাইল ছাড়াও নাম্বারহীন একটা মোবাইল আছে। সেটা নিয়ে আসি। আমি চাই, আমার সহযোগিতার কোন রেকর্ড স্যারের কাছে না থাক।’ বলে উঠে এক দৌড়ে উঠে গেল দুতলায়। এক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল সে মোবাইল নিয়ে।
আহমদ মুসা এফ.বি.আই.-চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসনের পার্সোনাল মোবাইল নাম্বার জুলিয়া রবার্টসকে বলল।
জুলিয়া রবার্টস নাম্বারগুলো টিপে সংযোগ দিয়েই দ্রুত তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
টেলিফোন ধরে ওপারের কণ্ঠ শুনেই চিনতে পারল। বলল, ‘গুড ইভিনিং। জনাব আমি আহমদ মুসা।’
ওপার থেকে কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আসসালামু আলাইকুম। তুমি তো ডেট্রয়েটে। কেমন আছ? নিশ্চয় কোন বিশেষ খবর?’
‘ড. হাইম হাইকেলকে ওদের হাত থেকে মুক্ত করেছি জনাব।’ আহমদ মুসা বলল।
ভেসে এল ওপার থেকে কণ্ঠ, ‘থ্যাংকস গড। অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। কখন, কিভাবে কোত্থেকে তাকে উদ্ধার করা গেল?’
আহমদ মুসা সংক্ষেপে কাহিনীটি বলল। সেই সাথে বলল জুলিয়া রবার্টস কিভাবে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরে আসতে সাহায্য করেন।
‘থ্যাংকস গড। রীতিমত থ্রিলিং ব্যাপার? তুমি এখন কোথায়?’ বলল ওপার থেকে জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘এখন মিস জুলিয়ার ড্রইংরুমে। আমার সামনে ডেট্রয়েটের এফ.বি.আই.-চীফ হেনরী শ্যারনসহ তার ৮জন লোক সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। আমি আপনাকে টেলিফোন করেছি একথা জানাবার জন্যে যে, আমি ডক্টর হাইম হাইকেলকে আমার সাথে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি এ বাড়িতে মুহূর্তের জন্যেও নিরাপদ নন। আপনি তার নিরাপত্তা ও অবস্থানের জন্যে ব্যবস্থা করলে তাকে আপনাদের কাছে হাজির করব।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল আহমদ মুসা।
‘থ্যাংকস। হেনরী শ্যারন কি তোমাদের আক্রমণ করেছিল? তোমাকে ও ড. হাইম হাইকেলকে ধরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল?’ ওপার থেকে বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
আহমদ মুসা জুলিয়া রবার্টসের গাড়ি করে আসার সময় থেকে যা ঘটেছে তার সব কথা বলল জর্জ আব্রাহাম জনসনকে।
‘থ্যাংকস গড। তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে। হেনরী শ্যারনদের হাতে পড়া মানে আজর ওয়াইজম্যানদের হাতে পড়া। এবার ওদের হাতে পড়লে তোমার ও ড. হাইম হাইকেলের নিহত হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা ছিল। আর নিশ্চয় এই কারণেই হেনরী শ্যারন বিষয়টা আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছে। সে আজ রাত পৌনে ৯টায়, মানে সে তোমার ওখানে পৌছার মাত্র পনের মিনিট আগে আমার অফিসের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু সে তোমাদের সম্পর্কে, তার অভিযান সম্পর্কে কিছুই জানায়নি। ভাল হয়েছে, তুমি ওদের সংজ্ঞাহীন করে আত্মরক্ষা করেছ, কাউকে হত্যা করতে হয়নি। থ্যাংকস গড।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘জনাব, আমিও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, আমি আপনাকে ও জুলিয়া রবার্টসকে বিব্রত অবস্থার মধ্যে ফেলিনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক, আমাদেরকে বিব্রত অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছ। মিস জুলিয়া রবার্টস কি তোমার পাশে আছে? ওকে টেলিফোনটা দাও।’
‘দিচ্ছি স্যার। এইসাথে আমি আপাতত বিদায় নিচ্ছি। আমি কি করছি আপনাকে জানাব। থ্যাংকস। বাই।’
আহমদ মুসা মোবাইলটি তুলে জুলিয়া রবার্টসের হাতে নিল।
জুলিয়া রবার্টস মোবাইল হাতে নিয়ে মুখের সামনে ধরে ‘গুড ইভিনিং স্যার’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল। কথা বলল তার চীফ বস জর্জ আব্রাহাম জনসনের সাথে।
কথা শেষ করে ধপ করে সোফার উপর বসে পড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘আজ দ্বিতীয়বার কথা বললাম তার সাথে। একবার বলেছিলাম চাকুরিতে যোগ দেবার সময়। আর আজ।’
এই স্বগোতোক্তির পর তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার বলেছেন, আপনারা আমার সাথে বেরুবেন। আমি হেনরী শ্যারনদেরকে হাসপাতালে রেখে আপনাদের নিয়ে যাব এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টে আপনাদের জন্যে তিনটা টিকিট থাকবে ফিলাডেলফিয়ার জন্যে। আপনাদের বিমানে তুলে দিয়ে তারপর আমার ছুটি। তবে এখান থেকে বেরুবার আগে আপনাদের ছদ্মবেশ নিতে হবে, স্যার বলেছেন।’
‘ফিলাডেলফিয়া কেন? আমি তো তাকে বলেছি, ড. হাইম হাইকেল তার বাড়িতে একদিনের জন্যেও নিরাপদ নন।’ বলল আহমদ মুসা।
হাসল জুলিয়া রবার্টস। বলল, ‘আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। আপনারা ড. স্যারের বাড়ি যাচ্ছেন না। আপনারা ফিলাডেলফিয়া এয়ারপোর্টে যাওয়ার পর পার্কিং নাম্বার ওয়ানে একটা নীল রংয়ের গাড়ি পাবেন। নাম্বার ‘FA 1876’ এবং সে গাড়ির ড্রাইভার থাকবেন একজন তরুণী। তরুণীটি একটি বিশেষ কোডে হর্ণ দিয়ে আপনাদের স্বাগত জানাবেন। সে কোড আপনি জানেন। গাড়ি যেখানে আপনাকে নিয়ে যাবে সেটা হবে, স্যার বলেছেন, আমেরিকায় আপনার জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। ব্যস। এবার চলুন ছদ্মবেশ নেবেন।’
জুলিয়া রবার্টসসহ আহমদ মুসারা তিনজন উপরে উঠে গেল। একটু পর চারজন নিচে নেমে এল। সবাই ধরাধরি করে সংজ্ঞাহীন দেহগুলো বাইরে মাইক্রোতে নিয়ে তুলল। তারপর বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
গাড়ির কাছে গিয়ে জুলিয়া রবার্টস বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, আপনি ড. স্যার ও বিল্লাহকে নিয়ে আমার গাড়িতে উঠুন। আর আমি হেনরী শ্যারনদের মাইক্রোতে ওঁদেরকে নিয়ে ওটা আমি চালিয়ে নেব।’
জুলিয়া রবার্টস নিজের গাড়ির চাবি আহমদ মুসার হাতে দিয়ে মাইক্রোতে গিয়ে উঠল।
আহমদ মুসারাও গিয়ে জুলিয়া রবার্টসের কারে উঠল।
গাড়ি ষ্টার্ট দিতে দিতে জুলিয়া রবার্টস গাড়ির জানালা দিয়ে আহমদ মুসাকে বলল, ‘আপনি আমাকে ফলো করবেন। হাসপাতাল থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত পার্কিং-এ আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন। গুড লাক। বাই।’
জুলিয়া রবার্টসের গাড়ি চলতে শুরু করল। তার পেছনে আহমদ মুসার গাড়িও।

গাড়িটা যেমন যান্ত্রিক। ড্রাইভার তরুণীটাও তেমনি যন্ত্রের মত। সামনে তাকিয়ে স্থির বসে আছে ড্রাইভিং সিটে। হাত দুটি তার ড্রাইভিং হুইলে। হুইলটার মাঝে মাঝে নড়া-চড়া ছাড়া আর সবকিছুই স্থির। গাড়িতে তোলার সময় যান্ত্রিক কণ্ঠে স্বাগত জানানো ছাড়া মেয়েটি আর একটা কথাও বলেনি। আহমদ মুসা ভাবল, মেয়েটি বোধ হয় এফ.বি.আই.-এর কেন্দ্রীয় স্পেশাল ফোর্সের সদস্য। বলা হয়, এরা বলেও না, শুনেও না, শুধুই হুকুম তামিল করে।
গাড়ির ম্যাপ স্ক্রীনে গাড়ির চলার পথ সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে। গাড়িটা ফিলাডেলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে উত্তর-পূর্বমুখী পেনরস এ্যাভেনিওতে প্রবেশ করেছিল। পেনরস এ্যাভেনিউ থেকে প্রবেশ করেছে বিখ্যাত ব্রডষ্ট্রিটে। ব্রডষ্ট্রিট থেকে গাড়ি এখন ওয়ালমাট ষ্ট্রিটে প্রবেশ করে পুব দিকে এগিয়ে চলেছে।
ড. হাইম হাইকেল আহমদ মুসার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘আমরা দেলোয়ার নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, দেলোয়ার নদী ও সিটিহলের মাঝখানের পুরানো অফিসিয়াল এলাকার কোথাও আমাদের নিয়ে যাচ্ছে।’
ড. হাইম হাইকেলের কথা শেষ হতেই গাড়িটা উত্তর দিকে টার্ণ নিয়ে ষষ্ঠ ষ্ট্রিট ধরে এগিয়ে চলল। কিন্তু মাত্র ১০০ মিটার গিয়েই গাড়ি পুবদিকে বাঁক নিয়ে ষ্ট্রিট থেকে নেমে সামনে এগুলো। তারপর আরও পঞ্চাশ মিটার গিয়ে পাঁচিল ঘেরা একটা বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়াল।
দাঁড়িয়েই ড্রাইভার তরুণী আহমদ মুসাদের দিকে তাকিয়ে ‘এক্সকিউজ মি স্যার’ বলে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
তরুণী এগুলো গেটের দিকে।
গেটের সিকিউরিটিকে কি যেন সে বলল। সংগে সংগে সিকিউরিটি লোকটি মোবাইল তুলে কথা বলল।
মিনিটখানেকের মধ্যেই ভেতর থেকে একজন লোক বেরিয়ে এল। সে সিকিউরিটির সাথে কথা বলেই ছুটে এল গাড়ির কাছে। গাড়ির দরজা খুলে বলল, ‘ওয়েলকাম স্যার, আসুন।’
লোকটি চল্লিশোর্ধ। সুন্দর সাদাসিধা পোশাক। সরল, হাসিমাখা মুখ।
গাড়ি থেকে বেরুল প্রথম আহমদ মুসা। তারপর ড. হাইম হাইকেল এবং শেষে বুমেদীন বিল্লাহ।
লোকটি সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আমি হেনরিক হফম্যান। ম্যাডামের কর্মচারী। এই বাড়ির কেয়ারটেকার। আপনাদের ব্যাপারে সবকিছু আমাকে বলা হয়েছে।’
একটু দম নিয়ে ড. হাইম হাইকেলে দিকে ইংগিত করে বলল, ‘ইনি নিশ্চয় ড. মুর হ্যামিল্টন। ম্যাডামের শিক্ষক। অসুস্থ। আর…………..।’
তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আর আমি জোসেফ জন।’ তারপর বুমেদীন বিল্লাহকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি ক্রিশ্চিয়ান কার্টার।’
‘জানি স্যার। আসুন। ওয়েলকাম।’ বলে গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ড্রাইভার তরুণী এগিয়ে এল আহমদ মুসাদের দিকে। স্যালুট দিয়ে বলল, ‘হ্যাভ অ্যা নাইস টাইম। বাই স্যার।’
‘থ্যাংক ইউ ম্যাডাম।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসারা হফম্যানের সাথে গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
গেটের ডানপাশে বাড়ির একটা নেম প্লেট। কাঠের ব্রাউন প্লেটের উপর সাদা অক্ষরে বড় করে লেখা ‘জেফারসন হাউজ।’ তার নিচে ব্র্যাকেটের মধ্যে ছোট অক্ষরে ‘ব্যক্তিগত মালিকানা’ শব্দ দ্বয় লেখা।
বাড়িটার নাম পড়ে ভ্রু কুঁচকালো আহমদ মুসা। কোন জেফারসন? টমাস জেফারসন নিশ্চয়। না হলে আর কোন জেফারসনের নামে এমন হাউজ হবে এবং এই খানে? ভাবনা বাড়ল আহমদ মুসার। এটা জেফারসন হাউজ হলে ম্যাডাম কে? বিরাট পরিবার, অনেক শাখা। ম্যাডাম অনেকেই হতে পারে। ফিলাডেলফিয়ার ‘জেফারসন হাউজ’-এর কথা আহমদ মুসা সারাহ জেফারসনের কাছে কোনদিনই শোনেনি।
আহমদ মুসারা গেট পার হয়ে প্রবেশ করল ভেতরে।
গেট থেকে লাল পাথরের একটা সুন্দর রাস্তা এগিয়ে গেছে বাড়ির দিকে। দুধারে ফুলের বাগান। বাগানটা বাড়ির চারদিক ঘিরেই। চারদিকের ফুল বাগানের মাঝখানে লাল পাথরের সুন্দর তিনতলা বাড়িটি।
লাল পাথরের রাস্তাটি বাড়ি থেকে একটু সামনে বেরিয়ে আসা গম্বুজাকৃতির ছাদে ঢাকা সুন্দর সাদা পাথরের চত্বরে গিয়ে শেষ হয়েছে। এটা গাড়ি বারান্দা হিসেবেই ব্যবহার হয়। তিনটা ধাপ পেরিয়েই সে বারান্দায় উঠা যায়। ছোট্ট অর্ধ চন্দ্রাকৃতি বারান্দার পরেই বাড়িতে প্রবেশের বিরাট দরজা। হেনরিক হফম্যানকে অনুসরণ করে ঐ দরজা পথে আহমদ মুসা বাড়িতে প্রবেশ করল।
দরজার পরে ছোট্ট একটা করিডোর পথ। তার পরেই বিশাল একটা লাউঞ্জ। তাঁরা লাউঞ্জে পৌঁছল।
হেনরিক হফম্যান বলল, ‘স্যার এটা বাড়ির পার্টি কর্ণার। এই নিচের তলাতেও আগে অফিস রুম ছিল, এখন তার কিছু অংশে কিচেন ও ষ্টোর করা হয়েছে। আমরা যারা আছি তাদেরও থাকার ব্যবস্থা এই ফ্লোরে। একতলা ও দুতলা রিমডেলিং হয়ে গেছে। তিনতলার কাজ বাকি। আপনাদের থাকার জায়গা দুতলায়। চলুন স্যার।’
দাঁড়িয়ে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে দুতলায় উঠার সিঁড়ির দিকে আবার হাঁটা শুরু করল হেনরিক হফম্যান।
আহমদ মুসারা চলল তার পেছনে পেছনে।
দুতলায় উঠে হেনরিক হফম্যান আহমদ মুসাদের প্রত্যেককে তার ঘরে নিয়ে গেল। সবাইকে বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে দুতলার লাউঞ্জে আসুন স্যার। ওখানেই চা-নাস্তা দিতে বলেছি। নাস্তার সাথে কথাও বলা যাবে। আর কাপড় ছাড়ার দরকার হলে আলমারিতেই সব পাবেন স্যার। প্রয়োজনীয় সব জামাকাপড় সেখানে রাখা আছে। কোন কিছুর দরকার হলে বলবেন।’
হেনরিক হফম্যান দুতলার লাউঞ্জে ফিরে এল। লাউঞ্জটা দুতলার সিঁড়ির মুখেই।
মিনিট পনেরোর মধ্যে আহমদ মুসা, ড. হাইম হাইকেল ও বুমেদীন বিল্লাহ লাউঞ্জে চলে এল।
গরম নাস্তা ও গরম চায়ের জন্যে ধন্যবাদ দিয়ে ড. হাইম হাইকেল বলল, ‘নাইস লোকেশান বাড়িটার। বাড়ির পুব পাশে ফিলোসফিক্যাল হল, উত্তর পাশে ইনডিপেনডেন্স হল এবং তার পাশেই কংগ্রেস হল। বলা যায় ফিলাডেলফিয়ার প্রাণকেন্দ্র এটা।’
বলে একটু থেমেই ড. হাইম হাইকেল তাকাল হেনরিক হফম্যানের দিকে। বলল, ‘মি. হফম্যান, এ বাড়িটার নাম ‘লিবার্টি হাউজ’ এবং এ বাড়িটা ‘ন্যাশনাল চাইল্ড ফাউন্ডেশন’এর অফিস ছিল। এ পরিবর্তনটা কি করে হলো?’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। দুমাস আগে এই পরিচয়ই ছিল। দুমাস হলো এই পরিবর্তন ঘটেছে। বাড়ির মালিকই এ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।’ বলে একটু থেমেই হফম্যান আবার বলা শুরু করল, ‘স্যার, এই বাড়িটা তৈরি করেন দুবার নির্বাচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন। ফিলাডেলফিয়ায় থাকাকালিন সময়ে এ বাড়িতে তিনি বাসও করেন। তিনিই বাড়িটির নাম দেন ‘লিবার্টি হাউজ’। এই বাড়িতে বসেই তিনি মার্কিন সংবিধান ‘বিল অব রাইটস’এর খসড়া তৈরি করেন। বোধ হয় এ কারণেই তিনি বাড়িটার নাম ‘লিবার্টি হাউজ’ রাখেন। তিনি ওয়াশিংটনে চলে গেলে বাড়িটা ভাড়ায় চলে যায়। সর্বশেষ ভাড়ায় ছিলেন ন্যাশনাল চাইল্ড ফাউন্ডেশন। দুমাস আগে তারা চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর বর্তমান মালিক ম্যাডাম মানে টমাস জেফারসনের গ্রান্ড গ্রান্ড ডটার মিস সারা জেফারসন সিদ্ধান্ত নেন বাড়িটা আর ভাড়া দেবেন না। বাড়িটাকে তিনি তার গ্রান্ড গ্রান্ড ফাদার টমাস জেফারসনের ‘ফ্যামিলি মেমোরিয়াল’ বানাবেন। ভার্জিনিয়ায় টমাস জেফারসনের বাড়ি এখন প্রকৃত অর্থে পাবলিক প্লেসে পরিণত হয়েছে। ওখানে কোন ফ্যামিলি প্রাইভ্যাসি আর সম্ভব নয়। এ কারণেই তিনি জেফারসনের ‘ফ্যামিলি মেমোরিয়াল, হিসেবে এই বাড়ি বেছে নিয়েছেন। নামও পরিবর্তন করেছেন উদ্দেশ্যের সাথে সংগতি রেখে।’
সবাই যখন হফম্যানের কথা শোনায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিল, তখন আহমদ মুসার একটা ভিন্ন অস্বস্তি। মনের একটা চিন্তা থেকেই এই অস্বস্তি। সারাহ জেফারসনের মায়ের মন্তব্য তার মনে আছে। অতীতের সব কিছু মুছে ফেলার জন্যে সারা জেফারসনের সময় ও সুযোগ প্রয়োজন। আহমদ মুসা কোনভাবেই আর তার বিব্রত হওয়ার কারণ হতে চায় না। যে কারণে আহমদ মুসা এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে সারার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। সারা জেফারসন তার খবর রাখছে জানতে পেরেও তার সাথে সৌজন্যমূলক কথা বলা থেকেও আহমদ মুসা বিরত থেকেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও সে আজ সারা জেফারসনের বাড়িতে এসে উঠেছে। এফ.বি.আই. চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসন বিষয়টা জেনেও কেন এটা করলেন? এটা তিনি ঠিক করেননি। মনে কিছু ক্ষোভেরই সৃষ্টি হলো তার।
ওদিকে গল্প চলছিল। কিন্তু আহমদ মুসার কানে ওদের গল্প ঢুকছে না। অস্বস্তিকর বিষয় তার মনকে অসুস্থ করে তুলেছে।
ওদের কথা বলার মাঝখানেই আহমদ মুসা অনেকটা বেসুরোভাবে বলে উঠল, ‘সকলে মাফ করবেন, আমি একটু রেষ্টে যেতে চাই।’
‘অবশ্যই, অবশ্যই। আপনারা ক্লান্ত। আমি উঠি। আমি নিচে আছি। ডাকলেই পাবেন।’ বলে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল হেনরিক হফম্যান।
সবাই উঠে দাঁড়াল।
ড. হাইম হাইকেলের রুমটা আহমদ মুসার রুমের সামনেই। আর বুমেদীন বিল্লাহর রুম ড. হাইম হাইকেলের রুমের পাশে।
আহমদ মুসা ড. হাইম হাইকেলকে তার কক্ষে পৌছে দিয়ে বলল, ‘স্যার, ঘরটা সব সময় লক করে রাখবেন। আপনি একা দয়া করে বেরুবেন না। রুম টেলিফোনে আমাকে ডাকবেন।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আমাদের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি।’ বলে একটু থামল ড. হাইম হাইকেল। তারপর বলল, ‘আপনার কাছে আমার অনেক জিজ্ঞাসা আছে। আপনি তো আমার বাড়িতে গেছেন।’
‘স্যার, আমি আপনার ছেলের মত। আমাকে সেইভাবে কথা বললে বাধিত হবো।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি তো মাথায় থাকার মত।’ ড. হাইম হাইকেল বলল।
‘না স্যার, মাথা থেকে বুকটা মনে হয় আরও কাছে।’ বলে আহমদ মুসা একটা দম নিয়েই ড. হাইম হাইকেলকে তার বাড়ির কিছু খবর দিয়ে বলল, ‘যা ঘটেছে তা বিস্তারিত বলার জন্যে আজই সুযোগ নেব।’
আহমদ মুসা থামতেই ড. হাইম হাইকেল বলল, ‘তুমি বলেছিলে, আমার কাছে তোমার কিছু কাজ আছে, সেটা কি?’
‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ স্যার। আপনার সাহায্য আমি চাই। সব বলব আপনাকে। এখন যাই স্যার। আপনি রেষ্ট নিন।’
আহমদ মুসা বেরুবার জন্যে পা বাড়াল।
‘আহমদ মুসা, তোমাকে সাহায্য করতে পারা আমার জন্যে গৌরবের ব্যাপার হবে।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘অনেক ধন্যবাদ স্যার।’ বলে আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসা রুম থেকে বেরুতেই তার দিকে ছুটে আসতে দেখল হেনরিক হফম্যানকে। তার হাতে একটা মোবাইল। তার কাছে কোন টেলিফোন এসেছে কি, ভাবল আহমদ মুসা।
হেনরিক হফম্যান তার কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘স্যার, আপনি আপনার মোবাইল ফেলে এসেছিলেন। ড্রাইভার মেয়েটা দিয়ে গেল।’
বলে সে তার হাতের মোবাইল আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল।
আহমদ মুসা মোবাইলটি হাতে নিয়ে বলল, ‘কোন ড্রাইভার?’
‘স্যার, আপনাদের ড্রাইভার। আপনি যে গাড়িতে আসলেন সেই গাড়ির ড্রাইভার। ’ বলল হেনরিক হফম্যান।
ভ্রুকুঞ্চিত হল আহমদ মুসার। মুখে বলল, ‘ঠিক আছে, ধন্যবাদ মি. হফম্যান।’
হেনরিক হফম্যান চলে গেল।
আহমদ মুসা তাকাল মোবাইলটার দিকে। দেখল, মোবাইলের স্ক্রীনে জলজল করছে তার নতুন নাম ‘জোসেফ জন’। ভাবল সে, এটাও এফ.বি.আই. চীফ জর্জ আব্রাহামেরই কীর্তি। তিনি নিশ্চয় চান না আমি সাধারণ টেলিফোনে তার সাথে বা কারো সাথে কথা বলি। তবু একবার টেলিফোন করে বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। ঘরে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা হ্যাংগারে কোটটি খুলে রেখে প্রথমেই দুরাকাত নামাজ পড়ল। শোকরানার নামাজ। আল্লাহ কঠিন কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছেন। ড. হাইম হাইকেলকেও দিয়েছেন সহযোগিতাকারী হিসাবে। ধ্বংস টাওয়ারের তলায় লুকানো ষড়যন্ত্রের রূপ কেমন, তার উদ্ধারকেও আল্লাহ সহজ করে দিন। এই প্রার্থনা আহমদ মুসা জানাল আল্লাহর কাছে।
আহমদ মুসা বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বিরাট ধকল গেছে শরীরের উপর দিয়ে গত দুদিনে। শয্যাকে মনে হচ্ছে ভীষণ মধুর। মনটাকে বাইরের জগত থেকে ফিরিয়ে এনে আত্মস্থ হতে চেষ্টা করল নিশ্চিন্ত রেষ্টের জন্যে। কিন্তু আত্মস্থ হতেই মন চারপাশের জগত থেকে অন্য এক জগতে চলে গেল। মনের আকাশ জুড়ে ভেসে উঠল ডোনা জোসেফাইনের মুখ, হাসি মাখা প্রাণবন্ত একটি মুখ। মুখে এক চির বসন্তের রূপ। ওতে শীতের বিশীর্ণতা কিংবা বর্ষার কালো মেঘের ঘনঘটা কোনদিন সে দেখিনি। শত বেদনাতেও কোন অনুযোগ, অভিযোগ তার নেই। হঠাৎ বাঁধ ভাঙা এক আবেগ এসে আছড়ে পড়ল তার হৃদয়ে। আবেগটা অশ্রু হয়ে বেরিয়ে এল তার দুচোখ দিয়ে।
চোখ মুছল না আহমদ মুসা। গড়াতে লাগল অশ্রু তার দুগন্ড বেয়ে। এ অশ্রু তাকে যন্ত্রণা নয়, দিল প্রশান্তি।
আহমদ মুসা হিসেব করে দেখল নিউইয়র্ক থেকে ডোনা জোসেফাইনের সাথে কথা বলার পর আজ ৯ম দিন পার হয়ে যাচ্ছে। তার সাথে ওয়াদা আছে টেলিফোন করার ক্ষেত্রে কোনক্রমেই সাতদিন অতিক্রম করবে না। গত কিছুদিনের মধ্যে প্রথম ব্যতিক্রম এবার ঘটল। সাতদিনের পর আরও দুদিন চলে গেছে। নিশ্চয় সে অস্থির হয়ে উঠেছে। তাকে তো এখন এমন অস্থির হওয়া চলবে না। বাচ্চা হওয়ার সময়টা ঘনিয়ে আসছে। ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। এখন হয় তো সে ঘুমিয়ে পড়েছে। থাক। সন্ধ্যার দিকে মানে সউদি আরবের সকাল বেলায় ভাল হবে টেলিফোন করা।
পাশ ফিরল আহমদ মুসা। কিন্তু ঘুমানোর চেষ্টা সফল হলো না। মোবাইল বেজে উঠল।
উঠে বসে টেনে নিল মোবাইল টেবিল থেকে। মোবাইলের স্ক্রীনের উপর চোখ রাখতেই দেল নাম্বারটি এফ.বি.আই. চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসনের।
মোবাইলটি কানের কাছে তুলে ধরতেই ওপার থেকে জর্জ আব্রাহাম জনসন বলে উফল, ‘আসসালাম জোসেফ জন, সব ঠিকঠাক? কোন অসুবিধা হয়নি তো?’
‘জি জনাব, সব ঠিক-ঠাক। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু…………।’ কথা শেষ না করেই আহমদ মুসা থেমে গেল কিভাবে বলবে সেটা ভেবে নেবার জন্যে।
‘কিন্তু কি, জোসেফ জন?’
‘আপনি যে স্থানকে আমাদের জন্যে আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে আমাদের এখানে এনেছেন। কিন্তু সে স্থানের মালিক এ বিষয়টা জানেন বলে আমার মনে হচ্ছে না।’
হো হো করে হেসে উঠল জর্জ আব্রাহাম জনসন। বলল, ‘ঠিকই বলেছ জোসেফ জন। তার অনুমতি ছাড়াই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ঠিক অনুমতি ছাড়াও নয়। ক’দিন আগে আমাকে সারাহ জেফারসন বলেছিল যে, তোমার মিশনের জন্যে তোমাকে অনেক দূর যেতে হতে পারে। তার জন্যে তোমাকে লম্বা একটা সময় আমেরিকায় থাকতে হবে। তোমার জন্যে নিরাপদ একটা ঠিকানা দরকার। এই কথা বলার সাথে সাথে সে বলেছিল তার ঐ ফিলাডেলফিয়ার বাড়ির কথা। ‘ফ্যামিলি মেমোরিয়াল’ গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে বেশ সময় লাগবে। তার আগে বাড়িটা খালিই পড়ে থাকবে। গতকাল তোমার সাথে আলোচনা করার পর আমি চিন্তা করলাম ড. মুর হ্যামিল্টনকে নিয়ে তুমি কোথায় যেতে পার! কোন জায়গাটা তোমাদের জন্যে নিরাপদ হতে পারে! এটা চিন্তা করতে গিয়েই সারা জেফারসনের সেদিনের কথা মনে পড়েছিল। সংগে সংগেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে জুলিয়া রবার্টসকে এ ব্যবস্থার করথা জানিয়ে দিয়েছিলাম। পরে আমি সারা জেফারসনকে আমার গৃহিত ব্যবস্থার কথা বলি। সে খুশি হয়ে বলে, আংকেল, আমি যা করতাম, আপনি তাই করেছেন।’ সুতরাং জোসেফ জন, মালিকের অনুমতি নেই তা বলতে পার না।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমন্ত্রণ আর বাধ্য হয়ে আতিথ্য দান বোধ হয় এক জিনিস নয় জনাব।’
‘জোসেফ জন, তুমি জান তুমি ঠিক বলছ না।’ বলে একটু থেমেই সে আবার বলে উঠল, ‘আমি বুঝতে পারছি না তোমাদেরকে। তুমি যেমন সত্যকে পাশ কাটাতে চাচ্ছ, হাসির ছলে হলেও, তেমনি তার ব্যাপারটাও আমাকে বিস্মিত করেছে। আজ সাত সকালে সারা আমাকে টেলিফোন করে বলল, ‘সে ইউরোপ চলে যাচ্ছে তিন মাসের সফরে। তুরষ্কের বসফরাস, মর্মরা ও কৃষ্ণ সাগর আর ইস্তাম্বুলের অলিতে-গলিতে প্রাণ খুলে ঘুরে বেড়াবে তিন মাস ধরে। তার একটা স্বপ্ন এটা। অথচ গত রাতে ১৫ মিনিট ধরে কথা হলো তার সাথে, কিছুই সে বলেনি। এত বড় একটা স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রোগ্রাম রাতের অবশিষ্ট কয়েক ঘণ্টায় কেন, কিভাবে সম্ভব হলো! যাক, এসব কথা জোসেফ জন। কাজের কথায় আসি। তোমাকে অবশিষ্ট কাজের ব্যাপারে দ্রুত হতে হবে। ড. মুর হ্যামিল্টনকে এভাবে বেশি দিন রাখা যাবে না। আর ওখানে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। হেনরিক হফম্যান লোকটা সবদিক দিয়েই ভাল এবং যোগ্য। মনে কর বাড়িটার এখন আমিই মালিক। আইনিসহ এর সবরকম তত্বাবধানের দায়িত্ব তিন মাসের জন্যে সারা আমাকেই দিয়ে গেছে।’ থামল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
আহমদ মুসা একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল। জর্জ আব্রাহামের শেষ কথায় সে সম্বিত ফিরে পেল। তাড়াতাড়ি কথা গুছিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘সুখবর জনাব, এখন ভাড়া দাবী না করলেই আমরা বাঁচি।’
‘জোসেফ জন, তোমরা আমেরিকার বাইরেটাই দেখ, অন্তর দেখ না।’ বলল আব্রাহাম জনসন।
‘অস্ত্রের কোন অন্তর থাকে না। আর ‘আমেরিকা’ আজ হৃদয়হীন সে অস্ত্রই হয়ে দাঁড়িয়েছে জনাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বললে না জোসেফ জন। আমেরিকার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহায্য-সহযোগিতার বিশ্বব্যাপী ভূমিকা তুমি অস্বীকার করতে পারো না।’
‘ঠিক জনাব। তবে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহায্য-সহযোগিতা আমেরিকার শক্তির কাঁধে সোয়ার, অথবা আমেরিকার শক্তি তার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহায্য-সহযোগিতার কাঁধে সওয়ার। সুতরাং শক্তি মানে অস্ত্রই আজ সবদিক থেকে আমেরিকার ইমেজ, অবয়ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
‘কিন্তু জোসেফ, আমেরিকা এটা নয়। এই অবয়ব আমেরিকার নেই। এক রাহুর গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসছে জর্জ ওয়াশিংটন, জেফারসন ও আব্রাহাম লিংকনের আমেরিকা। তোমার সাহায্য নতুন সূর্যের উদয় ঘটিয়েছে আমেরিকায়। তোমার বর্তমান অনুসন্ধান যদি সফল হয়, তাহলে আলোর পথে আমেরিকার আরেকটা উল্লস্ফন ঘটবে।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘আমিন।’ আহমদ মুসা উচ্চারণ করল। তারপর বলল, ‘আমি কৃতজ্ঞ আপনার অমূল্য সহযোগিতার জন্যে।’
‘না জোসেফ জন। আমি তোমাকে সাহায্য করছি না, সাহায্য করছি আমাকে, আমার প্রিয় আমেরিকাকে।’
‘ঠিক বলেছেন জনাব। কিন্তু আমি কাজ করছি সত্যের জন্যে, আমার জাতির জন্যে। ধ্বংস টাওয়ারের তলদেশে যে সত্য লুক্কায়িত আছে তা যদি উদ্ধার হয়, তাহলে বিজয় হবে সত্যের। কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হলো বাঁচবো আমরা সন্ত্রাসী হওয়ার দায় থেকে। এ দায়-মুক্তিই আমার কাছে আজ সবচেয়ে বড়। এই বড় কাজে আপনার সাহায্য চাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি। ধন্যবাদ আপনাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়েলকাম, জোসেফ জন। এখন বিদায় নেই জোসেফ।’ জর্জ আব্রাহাম বলল।
‘অশেষ ধন্যবাদ জনাব। বাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আসসালাম। গুড বাই।’ বলে ওপার থেকে লাইনটা কাট করল জর্জ আব্রাহাম।
আহমদ মুসা মোবাইলটি রেখে দিয়ে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করতে চেষ্টা করল।
আবার রুম টেলিফোন বেজে উঠল।
তুলল টেলিফোন আহমদ মুসা।
‘স্যরি জোসেফ, একটা জররি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। এখান থেকে আমার বাড়ি তো খুব কাছে। আমি মুর হ্যামিল্টন নাম নিয়ে অপরিচিতের মতই কথা বলতে চাই। আমার বাড়ির সাথে কথা বলতে পারি?’ বলল ওপ্রান্ত থেকে ড. হাইম হাইকেল।
‘আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। কিন্তু না পারেন আপনি নিজ নাম নিয়ে টেলিফোন করতে, না পারেন মুর হ্যামিল্টন নাম নিয়ে, কারণ আপনার বাসার টেলিফোন মনিটর করা হয়। এখন আরও বেশি হচ্ছে। তারা ধরে ফেলবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আমি মুর হ্যামিল্টন নাম নিয়ে করলে তারা চিনবে কি করে?’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘জনাব, গত রাতে আপনি ডেট্রোয়েট থেকে উধাও হওয়ার পর একজন ড. মুর হ্যামিল্টন বিমানে ফিলাডেলফিয়া এসেছেন। সেই ড. মুর হ্যামিল্টন ড. হাইম হাইকেলের বাসায় টেলিফোন করেছেন, এর অর্থ ওদের কাছে কি দাঁড়াবে? তারা নিশ্চিত ধরে নিতে পারে ডেট্রোয়েট থেকে আসা মুর হ্যামিল্টনই আসলে ড. হাইম হাইকেল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ, তুমি ঠিক বলেছ। এদিকটা আমার মাথায় আসেনি। সত্যিই তুমি অসাধারণ। গড ব্লেস ইউ।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ। চিন্তা করবেন না। আমিই ওদের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। রাখছি টেলিফোন। ডিষ্টার্ব করার জন্যে দুঃখিত। বাই।’
বলে ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিল ড. হাইম হাইকেল।
আহমদ মুসা টেলিফোন রেখে আবার শুয়ে পড়ল।
শরীরটাকে নিঃশেষে ছেড়ে দিল বিছানার উপর নিরংকুশ এক বিশ্রামের সন্ধানে।

ড. হাইম হাইকেলের বেডরুম।
আহমদ মুসা একটা সোফায় বসে। তার মুখোমুখি সোফায় বসে ড. হাইম হাইকেল। আহমদ মুসা কথা বলছিল।
বলছিল পেছনের বিশাল কাহিনীটা। বলছিল ইউরোপের গোয়েন্দা সংস্থা ‘স্পুটনিক’-এর ধ্বংস থেকে শুরু করে আজোরস দ্বীপের কথা, আজর ওয়াইজম্যানের সাথে সংঘাত সংঘর্ষের কথা, স্পুটনিকের গোয়েন্দাদের উদ্ধারের কথা এবং আজর ওয়াইজম্যান ড. হাইম হাইকেলের কনফেশন টেপ নিয়ে আসার কথা। বলছিল ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে আহমদ মুসার নিউইয়র্কে আসার কথা এবং তাকে সন্ধান করতে গিয়ে বিপদ ও ষড়যন্ত্রের চক্রজালে জড়িয়ে পড়ার কথা। বলছিল তার ফিলাডেলফিয়া যাওয়া এবং সেখানকার ঘটনা-দূর্ঘটনার কথা। সবশেষে বলেছিল তার ডেট্রোয়েটে আসা, বিপদে পড়া ও ড. হাইম হাইকেলকে উদ্ধারের কথা। সুদীর্ঘ কাহিনী সংক্ষেপে বলার পর ইতি টানতে গিয়ে বলল, ‘স্যার, কাহিনীর এসব ভূমিকা, আসল কাহিনী শুরুই হয়নি।’
আহমদ মুসার কাহিনীর মধ্যে ডুবে গিয়েছিল ডক্টর হাইম হাইকেল। তার চোখে-মুখে আনন্দ, বেদনা ও বিস্ময় যেন একসাথে এসে আছড়ে পড়েছে।
আহমদ মুসা থামলেও ড. হাইম হাইকেল কোন কথা বলল না। তার চোখ দুটো যেন আঠার মত লেগে আছে আহমদ মুসার উপর। তার বোবা দৃষ্টিতে বিস্ময়-বিমুগ্ধতা।
এক সময় মুখটা নত হয়ে গেল ড. হাইম হাইকেলের। মুহূর্ত কয় পরে মুখ তুলে বলল, ‘তুমি আরেক আরব্য রজনী শোনালে আহমদ মুসা! আনন্দের বিষয় হলো, এ আরব্য রজনী কল্পনার নয়।’
বলে থামল ড. হাইম হাইকেল। মুখটি আবার নিচু হলো তার। একটু পরেই মুখ তুলল। চোখ দুুুটি তার ছলছল করছে। বলল, ‘বাস্তব এই আরব্য রজনীর তুমি সিন্দাবাদ। আমার জন্যে, আমার পরিবারের জন্যে যা করেছ তার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব না। শুধু প্রার্থনা করব, সিন্দাবাদের কিস্তি যেন কূলে ভিড়ে।’
একটু থামল আবার ড. হাইম হাইকেল। রুমাল দিয়ে চোখ দুটি মুছে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি আহমদ মুসা তোমার মিশন কি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমার কনফেশন টেপ স্পুটনিকের গোয়েন্দাদের হাতে গেল কি করে?’
আহমদ মুসা বলল, ‘ঐ মহলের সাধারণ একটা ধারণা সেটা স্পুটনিক আপনার কাছ থেকে পেয়েছে। প্রথমে আমিও এটাই মনে করতাম। পরে আমি কামাল সুলাইমানের কাছে ঘটনা শুনেছি। কামাল……….।’
ড. হাইম হাইকেল কথা বলে ওঠায় আহমদ মুসা থেমে গেল। ড. হাইম হাইকেল বলছিল, ‘মাফ করবেন, কে এই কামাল সুলাইমান?’
‘তিনি স্পুটনিকের প্রধান গোয়েন্দা। আজর ওয়াইজম্যানের হাতে বন্দী সাত গোয়েন্দার তিনিও একজন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যরি, বলুন।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
আহমদ মুসা শুরু করল, ‘কামাল সুলাইমান বিশ বছর আগের টুইনটাওয়ার ধ্বংসের সেই কাশুন্দি ঘেঁটে সত্যটা বের করার জন্যে ওয়াশিংটন এসেছিলেন। এখানেই তিনি দেখা পেয়েছিলেন বৃদ্ধ এক ইহুদী পরিবারের। আর সেই ইহুদী পরিবারের এক বৃদ্ধের কাছ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন কনফেশন টেপ।’
‘তার নাম কি? রাব্বী উইলিয়াম কোলম্যান কোহেন?’ জিজ্ঞাসা ড. হাইম হাইকেলের।
‘জি।’ বলল আহমদ মুসা।
কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠল ড. হাইম হাইকেলের চোখে-মুখে। বলল, ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা! এ ধরনের কনফেশন সিনাগগের বাইরে যাওয়ার বিধান নেই। তার উপর রাব্বী উইলিয়াম কোহেনের মত লোক এমন কিছু করতে পারেন না। তিনি কোন নীতি-বিরুদ্ধ কাজ করবেন বলে তা বিশ্বাস করা মুষ্কিল।’
‘বিশ্বাস করা মুষ্কিল হলেও এটাই ঘটেছে এবং ঘটাটাই ছিল স্বাভাবিক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি রকম?’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘সে ছিল এক মজার ঘটনা। কামাল সুলাইমান একটু অসুস্থতা নিয়ে ওয়াশিংটনের একটা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। তার কক্ষের মুখোমুখি কক্ষটিতে ভর্তি হলেন একজন বৃদ্ধ রাব্বি। বয়সের ভারে অত্যন্ত দূর্বল, তার উপর অসুস্থ। একা হাঁটা তার জন্যে কষ্টকর ছিল। তার কোন এ্যাটেনডেন্ট ছিল না। ক্লিনিকের নার্স তাকে দেখাশুনা করতো, কিন্তু সবসময়ের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। মুখোমুখি দুঘরের দরজা ও জানালা একটু খোলা রাখলে দুঘর প্রায় এক হয়ে যেত। বৃদ্ধ রাব্বি ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনেই যখন নার্স তাকে হুইল চেয়ার থেকে তুলে শুইয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন কামাল সুলাইমান তাকে সাহায্য করে। তারপর থেকে কামাল সুলাইমান বৃদ্ধের খোঁজ খবর রাখত এবং প্রয়োজনে তাকে সাহায্য সহযোগিতা করতো। ব্যাপারটা অবশেষে তার রুটিন কাজে পরিণত হয়ে যায়। প্রথম দিকে এভাবে সহযোগিতা নিতে বৃদ্ধ সংকোচ বোধ করত, কিন্তু পরে কামাল সুলাইমানের আন্তরিকতায় তা দূর হয়ে যায়। বৃদ্ধ তাকে একদিন জিজ্ঞেস করে, তোমাদের সমাজে, দেশে ছেলে-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনরা কি এভাবেই পিতা-মাতার সেবা করে? কামাল সুলাইমান বলেছিল, জ্বি হ্যাঁ। আর এটা ছেলে-সন্তানদের শুধু দায়িত্ব হিসেবে করা হয় না, এটা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তাদের ভালোবাসার অংশ। এইভাবে দুজনের মধ্যে পিতা-পুত্রের মত একটা হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে বৃদ্ধ রাব্বীর রোগের অবস্থা খারাপের দিকে যায়। তার সাথে দুজনের সম্পর্কও আরও গভীর হয়। বৃদ্ধ রাব্বীর আত্মীয় বলতে তেমন কেউ ছিল না। রুটিন খবরাখবর সিনাগগের লোকরাই নিত। স্বজন না থাকায় বিরাট শূন্যতার কিছুটা যেন বৃদ্ধের পূরণ হয় কামাল সুলাইমানকে দিয়ে। কামাল সুলাইমান মুসলমান এ কথা বৃদ্ধ শুরুতেই জেনে ফেলে। পরে বৃদ্ধের কক্ষেও কামাল সুলাইমান মাঝে মাঝে নামাজ পড়ত। কামাল সুলাইমান ধার্মিক বলে তার প্রতি বৃদ্ধের ভালোবাসা যেন আরও বেড়ে যায়। ধর্ম নিয়েও তাদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়। একদিন বৃদ্ধ তাকে বলে, ‘এখনকার অবস্থা যাই হোক, ইহুদী ধর্ম বা জুদাইজমের সবচেয়ে কাছের ধর্ম ইসলাম। ধর্ম অনুশীলনের দিক দিয়েও ইহুদী ও মুসলমানরা পরষ্পরের খুব কাছাকাছি। বিশ্বাস কর, আমি ইহুদী না হলে মুসলমান হতাম।’ এধরনের কথায় কথায় একদিন বৃদ্ধ রাব্বী উইলিয়াম কোহেন কামাল সুলাইমানকে জিজ্ঞাসা করল, ‘চাকুরি, ব্যবসা কোন উদ্দেশ্যই তোমার নেই, তাহলে কেন তুমি আমেরিকা এসেছ? তোমার মত কাজের ছেলে শুধু ঘুরে বেড়িয়ে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করবে, এটা স্বাভাবিক নয়।‘ এইভাবে কথার প্যাঁচে পড়ে কামাল সুলাইমান তার উদ্দেশ্যের কথা বৃদ্ধকে বলে ফেলে এবং জানায় যে, সে নিশ্চিত নিউইয়র্কের টুইনটাওয়ার মুসলমানরা ধ্বংস করেনি। কে করেছে, সেটা উদ্ধার করতে তার সারা জীবনও যদি ব্যয় করতে হয় তবু সে করবে।’ কামাল সুলাইমানের কথা বৃদ্ধ শুধু শোনে, কিছুই বলে না। ধীরে ধীরে প্রসংগটি সে এড়িয়ে যায় অন্য কথার ছলে। বৃদ্ধের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় পৌছে যায় বৃদ্ধ রাব্বী উইলিয়াম কোহেন। মাঝে মাঝেই সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। জ্ঞান ফিরে পেলেই সে দেখত কামাল সুলাইমান শিয়রের কাছে বসে। এমনি একটা মুহূর্তে একদিন বৃদ্ধ কামাল সুলাইমানের একটা হাত তুলে নিল হাতে। বৃদ্ধের চোখ দুটি অশ্রু সজল হয়ে উঠেছে। বৃদ্ধ বলে, ‘প্রভুর কাছে যাওয়ার সময় আসন্ন। জানি না, প্রভুর সন্তুষ্টি আমি পাব কিনা। তাঁর জন্যেই আমি শেষ একটি কাজ করে যেতে চাই।’ থামে বৃদ্ধ। কামাল সুলাইমান বলে, ‘কি কাজ?’ বৃদ্ধ বলে, ‘তোমাকে সাহায্য করতে চাই।’ ‘কি সাহায্য?’ বিস্মিত কণ্ঠে বলে কামাল সুলাইমান। বৃদ্ধ কোন উত্তর না দিয়ে বলে, ‘ঐ আলমারিতে গতকাল সিনাগগ থেকে আনা যে ছোট্ট বাক্সটি আছে, সেটা আমার কাছে নিয়ে এস।’ বাক্সটি কামাল সুলাইমান নিয়ে এলে বৃদ্ধ বাক্স থেকে ভেলভেটের একটা ছোট্ট থলে বের করে কামাল সুলাইমানের হাতে তুলে দেয়। ক্লান্ত কণ্ঠে ধুঁকতে ধুঁকতে বলে বৃদ্ধ, ‘বেটা, তোমার জীবন তোমার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই থলেটাও তোমার কাছে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।’ বৃদ্ধ দম নেবার জন্যে থেমে যায়। কামাল সুলাইমান বিস্মিত কণ্ঠে বলে, ‘জনাব এতে কি আছে?’ বৃদ্ধ কষ্ট করে টেনে টেনে বলে, ‘তোমরা যা খুঁজছ বেটা……।’ কথাগুলো উচ্চারণ করেই বৃদ্ধের ক্লান্ত কণ্ঠ থেমে যায়, বুজে যায় চোখ দুটি। কয়েক মুহূর্ত পরে বৃদ্ধ আবার চোখ খুলে বলে ক্ষীণ কণ্ঠে, ‘বেটা, কোরআনের সুরা ইয়াসিন কি তোমার মুখস্থ আছে?’ ‘আছে।’ বলে কামাল সুলাইমান। বৃদ্ধ উজ্জ্বল চোখে অস্ফুট কণ্ঠে বলে, ‘তুমি ওটা পড়তে থাক, আর সাক্ষী থাক…..। আমি ঘুমাব।’ বলে বৃদ্ধ চোখ বুজে। কামাল সুলাইমান তাড়াতাড়ি উঠে ডাক্তার, নার্সদের ডাকে। তারা ছুটে আসে। যখন ডাক্তার, নার্সরা বৃদ্ধকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন কামাল সুলাইমান বৃদ্ধের শিয়রে দাঁড়িয়ে মনে মনে সুরা ইয়াসিন পাঠ করছিল। বৃদ্ধ আর চোখ খোলেনি। কামাল সুলাইমান ভেলভেটের সেই থলেতে পেয়েছিল আপনার কনফেশন টেপ।’ থামল আহমদ মুসা।
নিরব রইল ড. হাইম হাইকেল। তার সমগ্র চেহারা বেদনায় পাংশু। আর অশ্রুর প্রস্রবণ বইছে তার চোখ থেকে। নত মুখে অনেকক্ষণ অশ্রু মোচনের পর মুখ তুলল। বলল, ‘এখন আর আমার কোন বিস্ময় নেই আহমদ মুসা। মহান রাব্বী ঠিকই করেছেন। আর ইসলাম গ্রহণ করে তিনি তার বিজ্ঞতারই প্রমাণ রেখে গেছেন।’
‘স্যার, সুরা ইয়াসিন পাঠ করতে বলা এবং সাক্ষী থাকতে বলার অর্থ আপনিও এটাই করেন?’ বলল উৎসাহিত কণ্ঠে আহমদ মুসা।
‘এর আর কোন অর্থ নেই বৎস।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘আল হামদুলিল্লাহ।’ আহমদ মুসা বলল।
ড. হাইম হাইকেল মুখ তুলল। তাকাল আহমদ মুসার আনন্দিত মুখের দিকে। তারও মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সোফায় হেলান দিয়ে বসল সে। বলল, ‘এবার আহমদ মুসা, তোমার কথা বল।’
আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘স্যার, রাব্বী উইলিয়াম কোহেন যে অমূল্য সাহায্য করেছেন, তার পরের সাহায্য আপনার কাছ থেকে চাই।’
‘তার মানে আমার কনফেশনে প্রয়োজনীয় যে কথা নেই, তা জানতে চাও, তাতে যে ফাঁকগুলো আছে তা পূরণ করতে চাও। এক কথায় কনফেশনে যা বলা হয়েছে তাকে প্রমাণ করার উপকরণ চাও। এই তো?’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ঠিক স্যার।’
‘কেন চাও? প্রতিশোধ নেবার জন্যে?’ জিজ্ঞাসা ড. হাইম হাইকেলের।
‘প্রতিশোধ নয় স্যার। সত্য উদ্ধার করতে চাই। বিশ্ববাসীকে সত্যটা জানাতে চাই। জাতির কপাল থেকে সন্ত্রাসী হওয়ার কলংক মুছে ফেলতে চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার চাওয়া যুক্তিসংগত। আমার পাপ সাংঘাতিক কেউ জানুক। সত্যটা বাইরে যাক, এটাও আমার মনের একটা চাওয়া ছিল, যদিও মূলত আমার মানসিক শান্তির জন্যেই আমি কনফেশন করেছিলাম। আমি আনন্দিত যে, আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করছি, অন্যদিকে সত্যটা প্রকাশেরও একটা পথ হয়েছে। আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।’
বলে একটু থেমেই ড. হাইম হাইকেল আবার বলে উঠল, ‘তবে আমি বলার আগে তোমার কাছে কিছু শুনতে চাই। বিশ বছর আগের ঘটনা তো! তোমরা কতটুকু জান, জানার ক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছ, ঘটনা সম্পর্কে কি ধরনের সিদ্ধান্তে পৌছার পরে তোমরা সত্য-সন্ধানের ফাইনাল ষ্টেজে নেমেছ, তা আমি জানতে চাই। প্রথমে বল, ঘটনার পেছনে কারা আছে বলে তোমরা মনে কর?’
‘এ ব্যাপারে গত বিশ বছরে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। তার মধ্যে আমার মতে সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি হলো রুশ গবেষক ড. তাতিয়া কোরাজিনার কথা। তিনি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘ঘটনা ঘটাবার জন্যে যে ১৪ জনকে দায়ী করা হয়েছিল, তারা এ ঘটনা ঘটায়নি। বরং ঘটনার সাথে জড়িত আছে বড় একটা গ্রুপ যারা পৃথিবীর রূপ পাল্টে দিতে চায়। এরা সাংঘাতিক শক্তিশালী। এদের আয়ত্বে আছে ৩০০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ। গ্লোবাল গভর্নমেন্টের মাধ্যমে এরা এদের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে চায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তিনি তো সেই ক্ষমতাধরের নাম করেননি। কে সেই ক্ষমতাধর?’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘সেই শক্তিকে চিহ্নিত করার জন্যে দুটি বিষয়ের আলোচনা দরকার। এক. এই ঘটনার দ্বারা কে বা কারা লাভবান হয়েছে? দুই. ঘটনা সম্পর্কে কারা আগাম জানত?’
‘লাভবান হওয়ার বিষয়ে বলা যায়, এই ঘটনার দ্বারা দুনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে ইসরাইল। টুইনটাওয়ার ধ্বংসের আগে পশ্চিমী জনমতের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি বিরক্তি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভুতি বাড়ছিল। নাইন-ইলেভেনের দায় মুসলমানদের বিশেষ করে আরবদের ঘাড়ে চাপানোতে রাতারাতি অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আরবদের প্রতি সন্দেহ-সংশয় যতটা বেড়েছে, ততটাই সহানুভুতি বেড়েছে ইসরাইলের জন্যে। অন্যদিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠরোধ করার সুযোগ পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে আফগানিস্তান ও ইরাক ধ্বংস হওয়া, সিরিয়া, লেবানন, মিসর, সউদি আরবের মত দেশের স্বাধীন গতি শৃঙ্খলিত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সৈন্য অনির্দিষ্টকালের জন্যে আসন গেড়ে বসায় ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে এবং মার্কিনীদের কাছে ইসরাইলের মূল্য আরও বেড়েছে। অনুরূপভাবে টুইনটাওয়ার ধ্বংসের ফলে সীমাহীনভাবে লাভবান হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা যুদ্ধবাদী গোষ্ঠীর রাজনীতি। সবাই বলেছে টাওয়ার ধ্বংসের আগের পৃথিবী এবং পরের পৃথিবী এক পৃথিবী নয়। পৃথিবীর এই পরিবর্তন আমেরিকার ঐ যুদ্ধবাদী গ্রুপের পক্ষে গেছে। টাওয়ার ধ্বংসের জন্যে এমন এক শক্তিকে আমেরিকার তদানিন্তন সরকার দায়ী করে, যারা নির্দিষ্ট কিছু মানুষ কিংবা নির্দিষ্ট কোন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিনীরা যখন যেখানে চাইবে, তাদের হাজির করবে এবং সেখানে হামলা তাদের জন্যে বৈধ হয়ে যাবে। আমেরিকা আফগানিস্তান ধ্বংস করেছে, কিন্তু অদৃশ্য শত্রু অদৃশ্যই রয়ে গেছে। যাদেরকে সন্দেহাতীতভাবে দোষী সাব্যস্ত করে সকল আইনের নাগালের বাইরে এক দ্বীপে বন্দী করে নির্যাতন চালিয়ে গেছে, তাদের টাওয়ার ধ্বংসের ব্যাপারে কোন দোষ পাওয়া যায়নি। সেই শক্তিকে অন্য এক রূপে ইরাকে আনা হয়েছে। তারপর ইরাক ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু সেই শক্তিকে পাওয়া গেল না ইরাকে, অদৃশ্য হয়ে গেল। এইভাবে অদৃশ্য শত্রুকে আমেরিকার ক্ষমতাসীনরা যেখানে ইচ্ছা আবিষ্কার করেন এবং সেখানে আগাম আক্রমণ করা তার জন্যে বৈধ হয়ে যায়। এই সর্বব্যাপী শত্রুর ভয় আমেরিকান জনগণের মধ্যে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, আমেরিকান জনগণেরও মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয় আভ্যন্তরীন নিরাপত্তার নামে। একটি একক গ্লোবাল পাওয়ার লাভেল জন্যে যে সুযোগ তার প্রয়োজন ছিল, সেই সুযোগ নিউইয়র্কের লিবার্টি ও ডেমোক্রাসি টাওয়ার ধ্বংসের পর আমেরিকার যুদ্ধবাদী গোষ্ঠীর হাতে এসে যায়। সুতরাং টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে ইসরাইল এবং আমেরিকার একটি গোষ্ঠী লাভবান হয়। ঠিক এই ভাবেই ঘটনা থেকে লাভবান হওয়া এই দুপক্ষেরই জানা ছিল ঘটনা সম্পর্কে আগাম খবর। টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার আগের দুএকদিন শেয়ার মার্কেটে অস্বাভাবিক লেন-দেন হয়। যে ক্ষমতাধররা এর মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কামাই করে, তারা টাওয়ার ধ্বংস সম্পর্কে জানত। আমেরিকার সি.আই.এ, এফ.বি.আই-এর কাছে টাওয়ার ধ্বংস সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য ছিল, কিন্তু তারা প্রতিকারের পদক্ষেপ বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে সাহস করেনি। এ নিয়ে পরে লোক দেখানো তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়। তদন্ত কমিটিও ফলপ্রসূ কিছু করেনি। সম্ভবত যে সাহস সি.আই.এ, এফ.বি.আই-এর ছিল না, সে সাহস তদন্ত কমিটিরও থাকার কথা নয়। অন্যদিকে টাওয়ার ধ্বংসের ব্যাপারে ইসরাইলের পুরোপুরি জানা ছিল। টুইনটাওয়ারে চার হাজার ইসরাইলী কাজ করত, কিন্তু কেউ ঘটনার দিন কাজে যায়নি। কোন দেশের কত লোক মারা গেছে তার একটা তালিকা প্রকাশ পায় ঘটনার পরপরই, তাতে কোন ইসরাইলীর নাম ছিল না। পরে অবশ্য এ তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার একদিন পর জেরুসালেম পোষ্ট লিখে, চার হাজার ইসরাইলী নিখোঁজ। অন্যদিকে ঘটনার ৮ দিন পর ওয়াশিংটন পোষ্ট লিখে ১১৩ জন ইসরাইলী মারা গেছে। ওয়াশিংটন পোষ্ট এই কথা বলার একদিন পর সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বলেন ১৩০ জন ইসরাইলী নিহত হয়েছে। কিন্তু সবশেষে টুইনটাওয়ার ধ্বংসের ১১ দিন পর নিউইয়র্ক টাইমস মাত্র তিনজন ইসরাইলী নিহত হবার খবর লিখে। তারাও আবার ছিল ভ্রমণকারী, টুইনটাওয়ারের চাকুরে নয়। দ্বিতীয়ত ঃ টুইন টাওয়ার এলাকায় ঐ দিন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর একটা প্রোগ্রাম ছিল। সব ঠিকঠাক ছিল, শেষ মুহূর্তে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থার নিষেধের কারণে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রোগ্রাম বাতিল করেন। এফ.বি.আই. নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া সত্ত্বেও তিনি যাননি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইহুদীরা, ইসরাইলী গোয়েন্দা বিভাগ পুরোপুরি এবং আমেরিকার সি.আই.এ ও এফ.বি.আই-এর একটা অংশ টাওয়ার ধ্বংস সম্পর্কে জানত। এফ.বি.আই, সি.আই.এ শুধু জানত নয়, তারা ঘটনা ঘটার সময় প্রতিরোধ প্রতিকারের কোন ব্যবস্থাই করেনি। মাঠ পর্যায়ের এফ.বি.আই কর্মীরা যে তথ্য উপরে পাঠিয়েছিল, তা চাপা দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, দুনিয়ার সবাই জানে টাওয়ার ধ্বংসের আক্রমণকেও প্রতিরোধ করা হয়নি। প্রথম টাওয়ারে আক্রমণের পর দ্বিতীয় টাওয়ারে আক্রমণ করার মাঝে সময়ের যে ব্যবধান ছিল তাতে আমেরিকার সব জংগি বিমান, সব ক্ষেপণাস্ত্র সেখানে হাজির হতে পারতো। কিন্তু একটিও আসেনি। অথচ খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথম টাওয়ারে আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে তার ছবি দেখেন, কিন্তু নিস্ক্রিয় থাকেন। আক্রমণ যেন হতে দেয়া হয়েছে। কেন তা করা হয়েছে? উত্তর একই রকম। কোন শক্তিমানের প্রতি ভয়ই সম্ভবত এই নিস্ক্রিয়তার কারণ।’ থামল আহমদ মুসা।
থামতেই ড. হাইম হাইকেল বলে উঠল, ‘কিন্তু বল, সেই শক্তিমান পক্ষ কে বলে তোমরা মনে কর?’
‘কোন ব্যক্তি নয়, কোন বড় গ্রুপের কাজ এটা। এ গ্রুপের কোন বিশেষ নাম আছে কিনা, জানি না। এ গ্রুপের পরিচয়মূলক আরও কিছু তথ্য সামনে আনলে তাদের চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।’ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। সোজা হয়ে বসে আবার বলা শুরু করল, ‘বলা হয় এই যুদ্ধবাজ গ্রুপের বিদেশ নীতি Neo-colonialism এর সমার্থক। এরা আমেরিকার সামরিক শক্তি বা গোয়েন্দা শক্তি ব্যাবহার করে ডিক্টেটর শাসক, ধনী রাজনৈতিক পরিবার, দুর্নীতি সৃষ্ট গণতান্ত্রিক দলকে কাজে লাগিয়ে বা তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে পৃথিবীর জাতিসমূহকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। পেছনে তাকিয়ে আমেরিকার আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপমূলক রেকর্ডের ও তৎপরতার দিকে নজর দিলে এর ডজন ডজন প্রমাণ পাওয়া যাবে, নাম উল্লেখ করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই স্যার। কিন্তু এর চেয়েও এই গ্রুপের ভয়ংকর কাজটা হলো অন্তর্ঘাত। এই গ্রুপের একটা পলিসি হলো, ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী ঘটনা নিজেরা ঘটিয়ে তার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েতার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের বৈধতা দাঁড় করানো। ঠিক হিটলারের জার্মানীর পার্লামেন্ট পোড়ানোর ঘটনার মত। হিটলার তার পার্লামেন্টে আগুন দেয়ার জন্যে কম্যুনিষ্টদের দোষারোপ করেছিল। কম্যুনিষ্ট কার্ডধারী একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। সে লোক আগুন দেয়ার অপরাধ স্বীকারও করেছিল। কিন্তু পরে দুনিয়া জেনেছে এই পার্লামেন্ট পোড়ানোর কাজ খোদ হিটলার করিয়েছিল। প্রমাণ হয়েছিল হিটলারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হারমান গোয়েরিং-এর অফিস থেকে পার্লামেন্ট ভবন পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই সুড়ঙ্গ পথে গিয়ে হিটলারের লোকরাই পার্লামেন্টে আগুন দিয়েছিল। মনে করা হচ্ছে হিটলারের এই কৌশলটাকেই আমেরিকার একটি গ্রুপ এবং ইসরাইল তার রাষ্ট্রীয় পলিসি হিসাবে গ্রহণ করেছে। আমেরিকার এই যুদ্ধবাজ গ্রুপটির ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ’ করার মত এক জঘন্য ষড়যন্ত্র প্রেসিডেন্ট কেনেডি ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এই গোপন কর্মকান্ডের বিবরণ তুলে ধরেছে আমেরিকার ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি’র উপর লেখা জেমস বামফোর্ড-এর বই ‘Body of secrets : Anatomy of the Ultra-Secret National Security Agency’-এর লেখক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন দলিলের ভিত্তিতে লিখেন যে, পৃথিবী কাঁপানো ‘ইধু ড়ভ চরমং’ ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা শক্তিমান গ্রুপ কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতকে খেপানো এবং কিউবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ধ্বংসাত্মক কিছু সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানো ও তার দায় কিউবার উপর চাপানোর একটা পরিকল্পনা তৈরি করে। এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী ঘটনার মধ্যে ছিল আকস্মিক এক দাঙ্গা ও রায়ট সৃষ্টির মাধ্যমে কিউবা সন্নিহিত মার্কিন ঘাঁটি গুয়ানতানামোর জংগি বিমান, যুদ্ধ জাহাজ ও অস্ত্র-গুদাম উড়িয়ে দেয়া, ফ্লোরিডার মিয়ামী এরিয়া, এমন কি খোদ ওয়াশিংটন এলাকায় কম্যুনিষ্ট কিউবার নাম জড়িত করে সন্ত্রাসী অভিযান, ফ্লোরিডা উপকূলে কিউবান রিফুজী ভর্তি একটা বোট ডুবিয়ে দেয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাছাইকৃত কিছু এলাকায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো এবং এর সাথে কিউবার সম্পর্ক থাকার দলিল তৈরি করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা, ‘মেকি রাশিয়ান বিমান’ দ্বারা মার্কিন বেসামরিক বিমানকে হেনস্থা করা, মার্কিন বেসামরিক বিমান ও জলজাহাজ হাইজ্যাক, এমন কি বেসামরিক বিমান গুলী করে ভূপাতিত করা। এই সন্ত্রাস-পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট কেনেডির কাছে পেশ করা হলে তা এক কথায় তিনি বাতিল করে দেন। কেনেডি নিহত হবার পর ‘Assassination Record Review Board’ এই দলিল আবিষ্কার করে এবং ‘ন্যাশনাল আরকাইভস’ এই দলিল প্রকাশ করেছে।’
এ পর্যন্ত বলে আহমদ মুসা একটু থামল।
গম্ভীর ড. হাইম হাইকেল আহমদ মুসার দিকে পানির একটা গ্লাস ঠেলে দিয়ে বলল, ‘গলা একটু ভিজিয়ে নাও।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা একটু পানি খেয়ে আবার বলা শুরু করল, ‘প্রেসিডেন্ট কেনেডির আমলে শক্তিমান এই গ্রুপ যতটা শক্তিশালী ছিল, মনে হয় তারা পরে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার জলজ্যান্ত অনেক তথ্যকে তারা বেমালুম হজম করে ফেলেছে এবং ছয়কে নয়, আর নয়কে ছয় করতে সমর্থ হয়েছে। দুটাওয়ারের সাথে তৃতীয় একটা টাওয়ার সমূলে ধ্বংস হয়, অথচ বিমান তাকে আঘাত করেনি। এই টাওয়ার নিয়ে হৈ চৈ উঠেনি, কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি এবং তদন্তও করা হয়নি। কোন সিভিলিয়ান এয়ার লাইনারের পক্ষে অত নিচুতে অমন গতিতে এগিয়ে গিয়ে ঐ রকম নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘গ্লোবাল হক’ (যা দেখতে বোয়িং ৭৩৭-এর মত) হাই আলটিচুড বিমান তার ভয়ানক শক্তিশালী ‘দূর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’র মাধ্যমেই মাত্র সিভিল এয়ারলাইনার দিয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। এই প্রবল সন্দেহ সম্পর্কেও তাদের কোন বক্তব্য নেই। তাছাড়া টাওয়ার বালি দিয়ে তৈরি ঘরের মত মাটির সাথে মিশে যায় প্লেনের আঘাতে নয়, বরং গোড়ায় সংঘটিত বিশেষ ধরনের বিস্ফোরণের মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিল্ডিং এক্সপার্টরা এই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। কিন্তু অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মত এ তথ্যও মানুষের কাছে পৌছতে পারেনি। অনুরূপভাবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলো প্রথমে যে যাত্রী-তালিকা প্রচার করে, তার মধ্যে কোন মুসলিম নাম ছিল না। পরে ১৪টি মুসলিম নাম তালিকায় আসে। কেন আসে, কিভাবে আসে, তার কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। এমনি হাজারো তথ্যকে ঐ শক্তিমান গ্রুপটি দিনের আলোর মুখ দেখতে দেয়নি। এই গ্রুপটি এতই শক্তিশালী যে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে, নিউইয়র্ক টাইমস-এর ভাষায়, আমেরিকান পলিসি কার্যত এদেরই হাতে রয়েছে।’ থামল আবার আহমদ মুসা।
সোফায় হেলান দিয়ে বসা ড. হাইম হাইকেল সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘শক্তিমান পক্ষটির কাজ বললে, পরিচয় কিন্তু চিহ্নিত হলো না।’
ম্লান হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘কি নামে তাদের আমি ডাকব। পরোলোকগত মার্কিন লেখিকা গ্রেস হারসেলের কথা মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গ্রন্থকার। তিনি ইসরাইল সফর করেন। তার ভিত্তিতে একটা বই লেখেন। বইয়ের নাম হলো, ‘জেরুসালেম সফর’। তিনি এ বইতে ইসরাইলী একজন সাংবাদিকের একটি গর্বিত উক্তি উদ্ধৃত করেন এবং সে উক্তি হলো, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, বর্তমানে হোয়াইট হাউজ আমাদের হাতে, সিনেট আমাদের হাতে, নিউইয়র্ক টাইমস আমাদের হাতে, এমতাবস্থায় আমাদের প্রাণের সাথে আর কারও প্রাণের তুলনা হয় না।’ লেখিকা গ্রেস হারসেল তার উক্ত বই সম্পর্কে একটা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন তার অন্য একটি লিখায়। বলেছেন, ‘আমার এ বই অনেক বাধা-বিপত্তি, চক্রান্তের বেড়াজাল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হলো ১৯৮০ সালে। এরপর বেশ কয়েকটি গীর্জায় বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পেলাম। সাধারণ খৃষ্টানরা বিশ্বাস করতে চাইল না আমার পরিবেশিত তথ্যসমূহ। কারণ, তৎকালে ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরাইলের বিভিন্ন অত্যাচার, ভূমি দখল, বাড়িঘর বিধ্বস্ত করা, যখন-তখন গ্রেফতার ও অন্যান্য নির্যাতন সম্পর্কে আমেরিকান প্রচার মাধ্যমে কোন খবরই থাকত না। বিভিন্ন গীর্জায় বক্তৃতাকালে আমি যখন শ্রোতাদের আমার নিজের দেখা ঘটনাবলীর বর্ণনা দিতাম, আমাকে প্রশ্ন করা হত ‘আমরা তো সংবাদপত্রে এসব খবর পাই না?’ অথচ ইসরাইলের মত ছোট দেশে যত আমেরিকান সাংবাদিক কাজ করে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশেও এই পরিমাণ আমেরিকান সাংবাদিক নেই। এসব বিষয় আমাকে মনে করিয়ে দিল, নিউইয়র্ক টাইমস, দি ওয়াল ষ্ট্রিট জার্নাল, দি ওয়াশিংটন পোষ্ট, আর আমাদের দেশের অন্যান্য প্রায় সব সংবাদপত্র হয় ইহুদী মালিকানাধীন অথবা ইহুদী নিয়ন্ত্রিত। আর এসব সংবাদপত্র ইসরাইলের সমর্থক। এতসব সাংবাদিক ইসরাইলে কাজ করে শুধু ইসরাইলীদের দৃষ্টিকোন থেকে সংবাদ প্রচারের জন্য।’ লেখিকা গ্রেস হারসেলের এই মন্তব্য তার What Christians dorit know about Israil শীর্ষক প্রবন্ধে ছাপা হয়। গ্রেস হারসেলের এই বক্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফোর্থ ষ্টেট’ অর্থাৎ মিডিয়া জগতকে যে অক্টোপাশের হাতে বন্দী দেখা গেছে, সেই অক্টোপাশই সেদিন হোয়াইট হাউজ ও পার্লামেন্টকে পুতুলে পরিণত করেছিল। এই অক্টোপাশ ইহুদী লবী এবং সরকার, সিনেট ও প্রশাসনে কর্মরত তাদের অনুগতরা এবং নব্যঔপনিবেশিক যুদ্ধবাজ এক গ্রুপ নিয়ে গঠিত ছিল বলে আমি মনে করি। এই অক্টোপাশই সেদিন টুইনটাওয়ার ধ্বংস করে তার দায় মুসলিম মৌলবাদী পরিচয়ের অদৃশ্য এক গ্রুপের ঘাড়ে চাপিয়ে পৃথিবীর সম্পদ, শক্তিকেন্দ্র দখল করার জন্যে যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ার অবারিত সুযোগ করে নিয়েছিল। আমার কথা এ পর্যন্তই। এই কাজ সেদিন তারা কিভাবে করেছিল, সেটা আপনি বলবেন।’ থামল আহমদ মুসা।
ড. হাইম হাইকেল চোখ বুজে সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। সোজা হয়ে বসে বলল, ‘ধন্যবাদ তোমাকে। দেখছি, কোন দিক দিয়েই তুমি কারও পেছনে নও। সব দিকেই তোমার চোখ আছে। জটিল একটা বিষয়কে সরল অবয়বে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছ। এখন তুমি একটা মডেল দাঁড় করাও যে ধরনের ছবি তুমি আঁকলে, তারা কিভাবে ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।’
‘এ ব্যাপারে নতুন কথা নেই। যে সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাই আমি বলতে পারি।’
বলে একটু থামল। তারপর আবার বলা শুরু করল, ‘আমার বিশ্বাস সিভিল এয়ার লাইনার বিমান টুইন টাওয়ারে আঘাত করেনি, আঘাত করানো হয়েছে। হয় মার্কিনী বিমান গ্লোব হক’-এর বিমান হাইজ্যাক-এর অপ্রতিরোধ্য টেকনলজি কিংবা টুইনটাওয়ারে রিমোর্ট কনট্রোল ব্যবস্থা সিভিল এয়ার লাইনের বিমানকে টুইনটাওয়ারে টেনে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত ঃ বিমান হামলায় টুইনটাওয়ার ধ্বংস হয়নি। বিল্ডিং এক্সপার্টদের যেমন, তেমনি আমারও বিশ্বাস, টুইনটাওয়ারের বটমে বিশেষ বিস্ফোরক পাতা হয়েছিল। তৃতীয়ত ঃ টুইনটাওয়ার আক্রমণকারী কোন বিমানই হাইজ্যাক হয়নি। বিমানের যাত্রী ও ক্লুরা বুঝতেই পারেনি বিমানের কি হয়েছে, কোথায় যাচ্ছে। বিমানের কম্যুনিকেশন নেটওয়ার্ক নষ্ট করার কারণে বিমান বন্দরের সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারেনি। বিমানের ব্ল্যাকবক্স থেকে এর সাক্ষী পাওয়া যাবে বলে ব্ল্যাক বক্স গায়েব করা হয়। চতুর্থত ঃ বিমান হাইজ্যাক ও টুইনটাওয়ার ধ্বংসের জন্যে যে ১৫ জন মুসলমানকে দায়ী করা হয়েছে, তারা বিমানে থাকলেও তারা নির্দোষ যাত্রী ছিল মাত্র। এরা ছিল এফ.বি.আই অথবা ষড়যন্ত্রকারী গ্রুপের রিক্রুট। মিডিলইষ্ট, আফগানিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বকে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সাথে জড়াবার জন্যে এদেরকে ব্যবহার করা হয়েছে। মুসলিম নামের অনেক মানুষকে তারা এ ধরনের কাজের জন্যে তৈরি করা রেখেছে।’ থামল আহমদ মুসা।
গ্লাস থেকে একটু পানি খেল ড. হাইম হাইকেল। বলল, ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। তুমি অনেক ব্যাপারে অনেক কথা বলেছো। কিন্তু সব ব্যাপারে আমি বলতে পারবো না। কারণ ষড়যন্ত্রটা ছিল বেশ কয়েকভাগে বিভক্ত। একটার সাথে আরেকটার কোন প্রকার সম্পর্ক ছিল না। যারা বিমানের দায়িত্বে ছিল, তাদের কাজ ছিল টাওয়ার আঘাতকারী বিমান এবং এই বিমানকে টাওয়ারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে টেনে নেবার জন্যে ‘গ্লোব হক’ বিমানের ব্যবস্থা করা। অন্যদিকে টুইনটাওয়ারের দায়িত্ব যাদের ছিল, তাদের কাজ ছিল তিনটি। এক. টুইনটাওয়ারের আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে ঠিক সময়ে ‘সেফ ডেমোলিশন ডেভাইস’ (SDD)-এর বিস্ফোরণ ঘটানো, দুই. টাওয়ারে আঘাতকারী বিমান যখন এক মাইলের মধ্যে আসবে তখন টুইনটাওয়ারে বসানো বাড়তি চুম্বকীয় রিমোট কনট্রোল ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা যাতে টুইনটাওয়ারে আঘাত নিশ্চিত হয় এবং তিন. টুইনটাওয়ারে আঘাত-পরবর্তী সময়ে বিমানের ব্ল্যাকবক্সসহ নেগেটিভ ডকুমেন্ট গায়েব করা, জাল ডকুমেন্ট ছড়িয়ে রাখা। আর যারা ‘গিনিপিগ’ -এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, তাদের কাজ ছিল ‘গিনিপিগ’দের নাম নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট এয়ার লাইনসের যাত্রী তালিকায় সন্নিবেশিত করা এবং টুইনটাওয়ারের ঘটনায় তাদের মৃত্যুর ব্যাপারটা প্রকাশ পাবার পর এদের হত্যা করা ও গায়েব করে ফেলা। এই তিনটি বিভাগ ছাড়াও……………।’
আহমদ মুসা ড. হাইম হাইকেলের কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘গিনিপিগ’ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন? কথিত বিমান হাইজ্যাককারী মুসলমানদের?’
‘হ্যাঁ, আহমদ মুসা।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ স্যার। গত ২০ বছরে তাদের ক্ষেত্রে কেউ এই ‘গিনিপিগ’ শব্দ ব্যবহার করেনি। আপনিই মাত্র হতভাগ্যদের সঠিক অবস্থা তুলে ধরেছেন এই ‘গিনিপিগ’ শব্দ দ্বারা। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। স্যরি, কথার মাঝখানে কথা বলার জন্যে। বলুন স্যার।’
‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। ষড়যন্ত্রের যে তিনটি গ্রুপের কথা বলেছি, তা ছাড়াও ছিল আরেকটা গ্রুপ। এর নাম ‘মিডিয়া গ্রুপ’। যার কাজ ছিল আমেরিকান এবং আমেরিকায় কার্যরত বিদেশী, বিশেষ করে ইউরোপীয় ও অষ্ট্রেলিয়ান মিডিয়াম্যানদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করা এবং টাওয়ার ধ্বংসের পরপরই তাদের মাধ্যমে পরিকল্পিত নিউজ প্রচারের ব্যবস্থা করা। এই গ্রুপেরই আরেকটা বড় কাজ ছিল প্রশাসন, সরকার ও পার্লামেন্টের যে সব দায়িত্বশীল লোক অবাঞ্জিত, বেফাঁস বা বৈরি কথা বলতে পারে তাদের কাছে ভুয়া তথ্য সরবরাহসহ সবরকম পন্থা প্রয়োগ করে তাদের মুখ বন্ধ রাখা বা বাঞ্জিত কথা আদায় করা।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
‘কিন্তু স্যার, এই সব ভাগ বা গ্রুপ মিলে যে দল তার নাম তো বলেননি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘দলের কোন নাম ছিল না। ইসরাইল সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ, আমেরিকার ইহুদীবাদী লবীর কেন্দ্রীয় একটা গ্রুপ এবং আমেরিকার সরকার, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও পার্লামেন্টে তাদের অনুগতদের সমন্বয়ে গড়া ছিল এই দল। তবে তাদের ষড়যন্ত্র-কর্মসূচীর একটা নাম ছিল। নামটা হলো, ‘অপারেশন মেগা ফরচুন’ সংক্ষেপে OMF । তাদের অপারেশন সংক্রান্ত সব দলিলে সংক্ষিপ্ত ‘OMF’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের এই অপারেশনের নাম অনুসারে তাদের আমরা ‘অপারেশন মেগা ফরচুন গ্রুপ’ ‘OMF Group’ নামকরণ করতে পারি।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
‘তারপর স্যার।’ তাকিদ আহমদ মুসার।
‘তারপর তোমার জানার বিষয়টা কি?’ ড. হাইম হাইকেলের জিজ্ঞাসা।
‘অপারেশনের বিবরণ এবং তাদের অপরাধ প্রমাণ করার উপায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলেছি আহমদ মুসা, অপারেশন কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিল। আমার ভাগের বিবরণই আমার জানা।’ বলে একটু থামল ড. হাইম হাইকেল। মাথা নিচু করে একটু ভাবল বোধ হয়। তারপর মুখ তুলে কথা শুরু করল, ‘আমি যাদের ‘গিনিপিগ’ বলেছি, তাদের দায়িত্বে আমি ছিলাম। তুমি ঠিকই বলেছ, শতশত মুসলিম নামের মানুষ ওদের হাতে রয়েছে, তাদেরকে সুবিধামত ব্যবহার করে ওরা মুসলমানদের ফাঁসাবার জন্যে। তুমি যেটা জান না সেটা হলো, বিশেষ করে আরব বিশ্ব ও আফ্রিকা থেকে সংগৃহীত হতাশ ও ভোগ-পাগল মুসলিম যুবকদের রিক্রুট করে এদের ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে। এদেরকে পুতুলের মত কাজে লাগানো হয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এরা উপকরণ হয়েছে। সন্ত্রাসের বিরদ্ধে যুদ্ধ জিইয়ে রাখার জন্যে সন্ত্রাস সৃষ্টির প্রয়োজনে এদেরকেও ব্যবহার করা হয়েছে। আমার হাতে যাদের অর্পণ করা হয়েছিল, তারাই এদের কয়েকজন। এদের সংখ্যা ছিল উনিশ। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের প্রয়োজন চৌদ্দ জনের। সতর্কতার জন্যে ছয়জন বাড়তি লোক আনা হয়েছিল। ১৯ জনের প্রত্যেককেই আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল স্বাধীনভাবে একটা সেট প্রোগ্রাম দিয়ে। কিন্তু তারা ছিল অদৃশ্য পাহারার অধীনে। এদের সবার জন্যে টিকিট করা হয় এবং বোর্ডিং কার্ড নেয়া হয়। কিন্তু এরা কেউ বিমানে ওঠেনি। বিশেষ ব্যবস্থায় এদের ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। টাওয়ার ধ্বংসের পর এয়ারলাইন্স প্রথমে যে যাত্রী তালিকা দেয় তা বিমানে উঠা যাত্রীদের কাছ থেকে সংগৃহীত বোর্ডিং কার্ডের কাউন্টার পার্টের ভিত্তিতে। পরে আমাদের ‘মিডিয়া টিম’-এর হস্তক্ষেপে এয়ারলাইন্স তাদের তালিকা সংশোধন করে বোর্ডিং কার্ড ইস্যুর ভিত্তিতে নতুন তালিকা প্রকাশ করে। যাতে আমাদের ‘গিনিপিগ’দেরও নাম এসে যায়।’
থামল ড. হাইম হাইকেল। সোজা হয়ে বসে কয়েক ঢোক পানি খেল। বলতে শুরু করল আবার, ‘ওদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে বের করে এনে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একটা কনটেইনারে তোলা হয়। তারপর শুরু হয় সোয়া তিনশ মাইলের দীর্ঘ পথ যাত্রা। যাত্রার লক্ষ্য বোষ্টনের উত্তর-পূর্বে মাউন্ট মার্সি এলাকার দুর্গম রেডইন্ডিয়ান বসতি। মাউন্ট মার্সি পর্বতটি অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার উত্তর অংশের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত। মাউন্ট মার্সির দক্ষিণ দিক অ্যাডিরমডাক পর্বতমালায় ঘেরা। আর পশ্চিমে মাত্র চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে লেক অনটারিও এবং কানাডা সীমান্ত। লেক অনটারিও ও কানাডা সীমান্ত পশ্চিম দিক হয়ে উত্তর দিক ঘুরে অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালায় গিয়ে মিশেছে। এই বিচ্ছিন্ন, দূর্গম অঞ্চলে মাউন্ট মার্সির পশ্চিম পাদদেশে ঘনবনাকীর্ণ এক সবুজ উপত্যকা। এই উপত্যকা রেডইন্ডিয়ানদের জন্যে নির্দিষ্ট একটা স্থান। ঔপনিবেশিক বৃটিশদের সাথে ১৬৭৫-৭৬ সালে সংঘটিত বিখ্যাত ‘কিলফিলিপ যুদ্ধে’ পরাজিত ও বিতাড়িত রেডইন্ডিয়ানদের একটা ক্ষুদ্র অংশ চিড়িয়াখানার মত এই উপত্যকায় বাস করে। আমাদের টার্গেট ছিল এই রেডইন্ডিয়ানদের গোরস্থানের লাগোয়া পূর্ব নির্দিষ্ট একটা জায়গা। ভূ-তাত্বিক কর্মীর ছদ্মবেশে আমাদের লোকরা এখানে আগে থেকেই একটা গর্ত করে রেখেছিল। রাতের অন্ধকারে এখানেই পৌছা আমাদের লক্ষ্য। অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার উত্তরাংশের মাউন্ট মার্সি বরাবর পৌছে সড়ক থেকে আমাদের গাড়ি রাস্তার চিহ্নহীন পাথুরে ভূমিতে নেমে যায়। তারপর পাহাড়ের উপত্যকা, সুড়ঙ্গ ধরে ২০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি পৌছল রেডইন্ডিয়ানদের সেই গোরস্থানের কাছে। দিনটা ছিল ইন্ডিয়ানদের বাৎসরিক সম্মিলিত প্রার্থনা দিবস। রেডইন্ডিয়ান বসতির ওয়ান টু অল গিয়ে জড়ো হয়েছে তাদের সর্দারের বাড়িতে। এই সুযোগ নেয়অর জন্যেই দিনটা আমরা ঠিক করেছিলাম। গোরস্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে আমাদের গাড়ি দাঁড়াবার পর রাতের জন্যে অপেক্ষা করা হয়। অপেক্ষাকালীন এই সময়েই কনটেইনারে বিশেষ এক ধরনের গ্যাস প্রয়োগ করে তাদের হত্যা করা হয়। তারপর রাতের অন্ধকারে রেডইন্ডিয়ানদের কবর লাগোয়া গর্তে ওদের গণকবর দিয়ে আমাদের গাড়ি ফিরে আসে বোষ্টনে। আমার দায়িত্বাধীন ভাগের কাজের এভাবেই ইতি হয়।’
থামল ড. হাইম হাইকেল। তার মুখ গম্ভীর। অপরাধ ও যন্ত্রণার কালো ছায়া তাতে।
‘আপনার মধ্যে এই অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া কবে শুরু হয়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘তখন আমি ছিলাম কঠোর মনোভাবের এক ইহুদীবাদী কর্মী। আমি তখন মনে করতাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদী স্বার্থ রক্ষা ও গোটা দুনিয়ায় ইহুদী ইমেজ রক্ষা এবং ইহুদীদের উপর উদ্যত কৃপাণ সরিয়ে মুসলমানদের উপর ঘুরিয়ে দেবার জন্যে এই কাজের কোন বিকল্প নেই। নিরপরাধ লোকদের কন্টেইনারে তুলে নৃশংসভাবে হত্যা করা থেকেই আমার মনে প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে। এর সাথে যোগ হলো নিরপরাধ বিমানযাত্রীদের মর্মান্তিক মৃত্যু। কিন্তু এ সবের চেয়েও আমার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল সর্বব্যাপী সীমাহীন বীভৎস মিথ্যাচার এবং মিথ্যার উপর ভর করে মুসলিম নামের নিরপরাধ লাখো বনি আদমের উপর হত্যা, ধ্বংস ও দখল চাপিয়ে দেবার বিষয়টি। ‘অপারেশন মেগা ফরচুন’কে আমি আমার ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম। পরে সব দেখে আমার মনে হলো আমরা আমাদের ধর্মকেই হত্যা করছি। আমার আরও মনে হলো, ইহুদীদের ‘হাসকালা’ ধর্মমত বৈষয়িক উন্নতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমাদেরকে ধর্মহীন করে দিয়েছে। এই চিন্তা থেকেই ইহুদী বিশ্বাসের ‘হাসিডিক’ ধর্মমত আমি গ্রহণ করি। ‘হাসিডিক’ ধর্মমত ‘দয়া’ ও সানন্দ উপাসনার দিকেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে বেশি। এই ধর্মমত গ্রহণের পরেই আমি মনের পাপ-যন্ত্রণা লাঘবের জন্যে সিনাগগে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে কনফেশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমি মনে করছি, ঈশ্বর আমার কনফেশন গ্রহণ করেছেন। কনফেশনকে কেন্দ্র করে আমার যে দুঃখ-কষ্ট তা আমি মনে করছি ঈশ্বরেরই দেয়া আমার পাপ মোচনের জন্যে। সবশেষে তোমার আগমন, আমাকে উদ্ধার, আমার কাছে সাহায্য চাওয়া সবই ঈশ্বরই করাচ্ছেন। সুতরাং আমি তোমাকে সাহায্য করব, এটা ঈশ্বরেরই ইচ্ছা।’
দীর্ঘ বক্তব্যের পর থামল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ স্যার’, বলে শুরু করল আহমদ মুসা, ‘কিন্তু একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না, গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহৃত কজনকে কবর দেবার জন্যে অত দূরের স্থান বেছে নিলেন কেন?’
‘দুটি বিবেচনায় আমরা এটা করেছি। এক. রেডইন্ডিয়ানদের এই এলাকাটা দূর্গম ও নিরাপদ। কারও পক্ষে ওখানে যাওয়া এবং খোঁজ করা দুই-ই কঠিন। দুই. কোন কারণে সন্দেহ হলেও গণকবর খোড়াখুড়ি করা সম্ভব হবে না। রেডইন্ডিয়ানরা এটা করার কাউকে সুযোগ দেবে না। কারণ তারা সংগতভাবেই ভয় করবে গণকবর ও গণহত্যার সাথে ওদের সম্পর্কিত করার চেষ্টা করা হবে। দ্বিতীয়ত. এই খননকে তাদের গোরস্থানের শান্তি ও সম্মানের খেলাফ মনে করবে রেডইন্ডিয়ানরা।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
ড. হাইম হাইকেল থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘ষড়যন্ত্রের আরও বিভাগ আছে বলেছেন আপনি। কিন্তু তাদের কাউকেই আপনি চেনেন না?’
‘হ্যাঁ অনেককেই চিনি। ইহুদী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কট্টর ইহুদীবাদী অধ্যাপক এবং একটি ঐতিহাসিক ইহুদী পরিবারের সন্তান হিসেবে ‘ও.এম.এফ গ্রুপ’ (OMF Group)-এর কাছে আমার বিশেষ একটা মর্যাদা ছিল। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনেকের কাছে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত হলেও অনেক কিছুই আমি শুনতাম ও জানার সুযোগ হতো।’ ড. হাইম হাইকেল বলল।
‘তাহলে অন্যান্য গ্রুপের ব্যাপারেও আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তোমার কি প্রয়োজন, কি জানতে চাও সেটা বললে বুঝা যাবে আমি ঐ বিষয় জানি কিনা।’ ড. হাইম হাইকেল বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমার অনুসন্ধানের বিষয় হলো টাওয়ার ধ্বংসের কাজ কারা করেছে, তা বের করা এবং তার পক্ষে প্রমাণ যোগাড় করা। এখন দেখা যাচ্ছে ‘ও.এম.এফ গ্রুপ’ এটা করেছে। এই সত্যের পক্ষে আমি প্রমাণ যোগাড় করতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথার তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না ড. হাইম হাইকেল। সে সোফায় গা এলিয়ে দিল। তার চোখে-মুখে ভাবনার প্রকাশ ঘটল। অল্পক্ষণ পর সোফা থেকে গা না তুলেই বলল, ‘আহমদ মুসা, এই বিষয়টা আমি কোনদিন চিন্তা করেই দেখিনি। ঘটনার বিবরণ বর্ণনা করা যায়, কিন্তু তা প্রমাণ করা কঠিন। ‘ও.এম.এফ গ্রুপ’ টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা ঘটিয়েছে, এই সত্য তোমার কথায় এসেছে, ঘটকদের একজন হিসাবে আমিও বলেছি, কিন্তু প্রমাণ করাটা বলার মত সহজ নয়।’ থামল ড. হাইম হাইকেল।
আহমদ মুসা গম্ভীর। সোজা হয়ে সোফায় বসল। বলল, ‘কিন্তু প্রমাণ করার মিশন নিয়েই আমি আমেরিকায় এসেছি। এ মিশন সম্পূর্ণ করেই আমি ফিরব ইনশাআল্লাহ।’
সোফায় সোজা হয়ে বসল ড. হাইম হাইকেল। তার ভ্রুকুঞ্চিত। ভাবছে সে মুখ নিচু করে। এক সময় মুখ তুলে বলল, ‘তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি আহমদ মুসা। তোমার কথা আমার মধ্যে সাহসের সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে, অসম্ভব বলে কিছুই নেই। কিন্তু আমার সামনে অথৈ অন্ধকার সমুদ্র, বাতিঘরের আলো কোথাও দেখি না।’
ভাবছিল আহমদ মুসাও। বলল, ‘স্যার, প্রমাণের বহু বিষয় আছে। কিন্তু অত কিছুর প্রয়োজন নেই। মৌলিক ধরনের কয়েকটা বড় বিষয় প্রমাণ করতে পারলেই আমাদের হয়ে যায়।’
‘সে বিষয়গুলো কি?’ জিজ্ঞাসা ড. হাইম হাইকেলের।
‘প্রথম বিষয় হলো, ষড়যন্ত্রের যে অংশটা আপনি সম্পাদন করেছেন, তা থেকে প্রমাণ করা যে, হাইজ্যাকাররা বিমান হাইজ্যাক করে তা দিয়ে টাওয়ার ধ্বংস করেছে, এ কথা মিথ্যা এবং কথিত হাইজ্যাকারদেরকে টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার ১২ ঘণ্টা পর হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত. প্রমাণ করা যে, হাইজ্যাকাররা নয়, ‘গ্লোব হক’ ও টুইনটাওয়ারে পাতা চুম্বকীয় রিমোট কনট্রোল ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে যাত্রী বিমান টুইনটাওয়ারে আঘাত করতে সমর্থ হয়। তৃতীয়ত. টুইনটাওয়ার যাত্রী বিমান দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয় ঠিকই, তবে টুইনটাওয়ার গুড়িয়ে ধ্বসে পড়ে টুইনটাওয়ারের গোড়ায় পাতা ‘সেফ ডেমোলিশ ডেভাইস’-এর বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে। এটা প্রমাণ করতে হবে। এই তিনটি বিষয়ের প্রমাণই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট।’
ড. হাইম হাইকেল হা করে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘ধন্যবাদ তোমাকে আহমদ মুসা। ঠিকই বলেছ তুমি। এখন আমার মনে হচ্ছে এই সহজ বিষয়টি আমার মাথায় আসেনি কেন?’
বলে ড. হাইম হাইকেল মুহূর্তের জন্যে একটু থামল। পরক্ষণেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু প্রমাণ হওয়া এবং গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার কাজ কিভাবে হবে? ধর প্রথমটার কথাই। গণকবরে যাদের হাড়গোড় আছে, তারাই ও.এম.এফ গ্রুপ কথিত বিমান হাইজ্যাককারী তা প্রমাণ করতে হবে। কিভাবে করবে? গোপনে ওখানে গিয়ে কবর থেকে হাড়গোড় তুলে আনা খুবই কঠিন। তার পরেও না হয় গেলে, হাড়গোড় তুললে, নিয়ে এলে, কার্বন টেষ্ট, ফরেনসিক টেষ্টসহ বিভিন্ন আইডেনটিফিকেশন টেষ্ট দ্বারা না হয় প্রমাণ করলে ওগুলোই সেই বহুল কথিত হাইজ্যাকারদের দেহ এবং ওদেরকে হত্যা করা হয়েছে গ্যাস প্রয়োগে (যে গ্যাস বিমানে থাকে না) আর হত্যার সেই ঘটনা ঘটেছে টুইনটাওয়ার ধ্বংসের ১২ ঘণ্টার পর। কিন্তু তোমার দাবীগুলো অথেনটিসিটি পাবে কিভাবে, দুনিয়ার মানুষ গ্রহণ করবে কেন?’
চিন্তা করছিল আহমদ মুসা। এক সময় তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ড. হাইম হাইকেল থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘স্যার আমি যা ভাবছি তা যদি আমি করতে পারি, তাহলে গণকবর আবিষ্কারের কথা গোটা দুনিয়া জানবে এবং তাদের ফরেনসিক টেষ্ট, দাঁত টেষ্ট, ইত্যাদি সব কিছুই গোটা দুনিয়াকে জানিয়েই করা হবে। অতএব বিশ্বাসযোগ্যতা না পাবার প্রশ্ন নেই।’
‘এই অসাধ্য সাধন কিভাবে সম্ভব?’ জিজ্ঞাসা ড. হাইম হাইকেলের।
‘আল্লাহর সাহায্য থাকলে সবই সম্ভব। আপনাকে সব বলব স্যার।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা কথা শেষ করেই ড. হাইম হাইকেলের কিছু বলার আগেই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘স্যার, প্রমাণের দ্বিতীয় বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তায় আছি। এ ব্যাপারে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা ভেবে দেখতে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।’
আহমদ মুসার কথা ড. হাইম হাইকেল মনোযোগ দিয়ে শুনল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না। তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। ভাবছে সে। অনেকক্ষণ পর মুখ তুলল। বলল, ‘প্রমাণের জন্য অন্তত প্রয়োজন ঐ দিন ঐ কাজে ‘গ্লোব হক’-এর ‘অফিসিয়াল লগ’ ও ‘অর্ডার শীট’ উদ্ধার করা। আর…………।’
ড. হাইম হাইকেলের কথা মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘এ ‘লগ’ ও ‘অর্ডার শীট’ কোথায় পাওয়া যাবে?’
‘দৃশ্যত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘এয়ার সেফটি সার্ভিস’ (ASS) ডিভিশনে এটা থাকার কথা। কিন্তু আমি বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চিত নই।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
একটা দম নিয়েই আবার বলে উঠল, ‘টাওয়ার ধ্বংসে ‘সেফ ডেমোলিশন ডেভাইস’ যে ব্যবহার হয়েছিল, সেটা প্রমাণ করার জন্যে ধ্বংস টাওয়ারের ডাষ্ট-এর বিশেষ ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন।’
‘কিন্তু ধ্বংস টাওয়ারের ডাষ্ট এখন এত বছর পর কোথায় পাওয়া যাবে? টুইনটাওয়ারের জায়গায় তো নতুন টাওয়ার গড়ে তুলে ঐ এলাকা ঢেকে ফেলা হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘নিউইয়র্কের তিনটি প্রতিষ্ঠানে এই ডাষ্ট পাওয়া যাবে। ইন্টারন্যাশনাল টেরর মিউজিয়াম (ITM), ‘বিল্ডিং হিষ্টরী মিউজিয়াম’ (BHM) এবং ধ্বংস টাওয়ারের স্থানে নির্মিত নতুন টাওয়ার কমপ্লেক্সের ‘লিভিং মেমরি ল্যাবরেটরী’তে পাওয়া যাবে।’ কিন্তু এই ডাষ্ট পাউডারটাই বড় কথা নয়, এর প্রামাণ্য টেষ্ট রেজাল্ট প্রয়োজন।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ স্যার আপনার দেয়া তথ্যগুলো অমূল্য।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি অমূল্য বলছ। তুমি চেষ্টা করলেও এ তথ্যগুলো যোগাড় করতে পারতে। আসলেই তোমাকে সাহায্য করার মত তেমন কিছু আমার কাছে নেই।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘বলেন কি স্যার! আপনার প্রধান যে তথ্যের জন্য এসেছিলাম তা পেয়ে গেছি। তথাকথিত বিমান হাইজ্যাকারদের সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন, এই একটা তথ্যই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। শুধু একেই যদি আমরা সত্য প্রমাণ করতে পারি, তাহলে মুসলমানদের কপাল থেকে সন্ত্রাসী হওয়ার কলংক তিলক মুছে ফেলা যায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ‘ও.এম.এফ গ্রুপ’-এর সর্বব্যাপী ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতে হলে গোটা ষড়যন্ত্রকেই দিনের আলোতে আনতে হবে এবং এটা তুমিই পারবে আহমদ মুসা। আমেরিকান জনগণও তোমার কাছে আরও বেশি কৃতজ্ঞ হবে। তুমি আগেও তাদের অমূল্য উপকার করেছ। এই উপকার যদি তুমি করতে পার, তাহলে আমেরিকান জনগণ পুরোপুরিই মুক্ত হবে কুগ্রহের কবল থেকে।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
এ কথাগুলোর খুব অল্পই আহমদ মুসার কানে