৪০. কালাপানির আন্দামানে

চ্যাপ্টার

অন্ধকুপের মত ঘরটি।
ডিম লাইটের মত একটা আলো জ্বলছে ঘরের মাঝখানে। সে আলো ঘরের সামান্য অংশেরই অন্ধকার তাড়াতে পেরেছে। আলোকিত অংশটিও ধোঁয়াটে। এর বাইরে ঘন অন্ধকারের দেয়াল।
ভীতিকর পরিবেশ।
মেঝেতে পড়ে আছে একটা তরুণের দেহ। বয়স বাইশ-তেইশের মত। একহারা বলিষ্ঠ দেহ। সুন্দর চেহারা। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ।
তার দেহ রক্তাক্ত। চাবুকের ঘায়ে ফেটে যাওয়া ক্ষত-বিক্ষত শরীর।
সংজ্ঞাহীন তরুণটি।
তার পড়ে থাকা দেহের ঠিক উপরে ছয় সাত ফিট উঁচুতে একটু দূরত্বের দুটি শিকল ঝুলছে। দুই শিকলেরই প্রান্তে হ্যান্ডকাফ লাগানো। হ্যান্ডকাফ দুটিও রক্তাক্ত। বুঝাই যাচ্ছে হ্যান্ডকাফ দুটি তরুণের দুহাতে লাগানো ছিল। দুই শিকলে তার দুহাত বেঁধে টাঙিয়ে রেখে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে।
এক সময় ধীরে ধীরে চোখ খুলল যুবকটি। চোখ খুলে কোন দিকে চাইল না সে। উর্ধমুখী অবস্থায় তার চোখ খুলেছিল, দৃষ্টি তার উর্ধমুখী হয়েই থাকল।
তরুণটির মুখ থেকে কাতর কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল, ‘পানি’, ‘পানি’, ‘পানি’।
অন্ধকারের দেয়াল ভেদ করে তিনজন লোক এগিয়ে এল তরুণটির কাছে।
তাদের পরনে কালো প্যান্ট, কালো শার্ট এবং মাথায় তাদের ভারতের ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডোদের মত কালো কাপড় বাঁধা।
কাছে এসে তাদের একজন বলল, ‘শাহজাদার জ্ঞান ফিরল তাহলে। জয় হোক শাহজাদা আহমদ শাহ আলমগীরের।’ তার মুখভরা বিদ্রুপের হাসি।
সে থামতেই আরেকজন বলে উঠল, ‘সম্রাজ্য কবে অক্কা পেয়েছে, আগ্রা দূর্গে কবে উড়েছে বৃটিশ পতাকা, এখন সেখানে উড়ছে ভারতের ত্রিরঙ্গা। কিন্তু এদের নামের বাদশাহী যায়নি! নাম রেখেছে আহমদ শাহ আলমগীর!’ বলে লোকটি হো-হো করে হেসে উঠল।
তরুণটির ক্লান্ত, কাতর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘তোমরা আমাকে মেরে ফেলতে চাও, মেরে ফেল। অনেককেই তো মেরেছ। দেরি করছ কেন?’
‘মরতে তোমাকেই হবেই। তুমি আমাদের মারাঠী কন্যা, পবিত্র নামে যার নাম সেই জিজা’র উপর তোমার অপবিত্র নজর ফেলেছ। মরতে তোমাকে হবেই। কিন্তু তার আগে আমাদের মহাবাপুজী ‘শিবাজী’র তৈরি ভবিষ্যত সম্পর্কিত ‘নীল নক্সা’র আধার ক্ষুদ্র চন্দন বাক্সটি আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে। যতক্ষণ বা যতদিন তা না দেবে, ততদিন শতবার মৃত্যু চাইলেও তোমার মৃত্যু আমরা দেব না। কিন্তু দেব মৃত্যুর চেয়ে বড় যে কষ্ট, সেই কষ্টের পাহাড়।’
‘বার বার তোমাদের আমি বলেছি, বাক্সটা কি আমি জানি না। বাক্সটি আমি দেখিনি। এমন কোন বাক্স আমাদের কাছে নেই। তোমরা আমার বাড়ি সার্চ করে দেখতে পার।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তোমাদের বাড়িতে খোঁজা আমরা অবশ্য বাকি রাখিনি। গত এক বছরে তোমাদের বাড়িতে কয়েকবার ঢুকেছি। সব জায়গা সার্চ করেছি। সন্দেহজনক সবকিছু নিয়ে এসেছি। কিন্তু বাক্সটা পাইনি। তোমরা ওটা মাটির তলায় কিংবা অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছ।’ বলল সেই তিনজনের একজন।
‘আমি এ সম্বন্ধে কিছুই জানি না। আমি আমার আব্বা, দাদার কাছেও এমন বাক্স সম্পর্কে কোন গল্প শুনিনি। তোমাদের মহাবাপুজী’র এই বাক্স আমাদের কাছে আসবে কেন?’ আহমদ শাহ আলমগীর বলল।
‘আসবে কেন আমরাও জানতাম না। কিন্তু এক বছর আগে আমরা নিশ্চিত জেনেছি। আগেই আমরা শিবাজী পৌত্র ‘শাহুজী’র এক দলিল থেকে জানতাম, শাহুজীকে বন্দী করার সময় সম্রাট আওরঙ্গজেব এই বাক্সটিও শাহুজীর কাছ থেকে কেড়ে নেন। তারপর এ বাক্সটি অজানার অন্ধকারে চলে যায়। শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ রেংগুনে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে ঘটনাক্রমে তার ডাইরীটি একজন ভারতীয় পুরোহিতের হাতে পড়ে যায়। এই পুরোহিত ছিলেন বোম্বাই-এর একশ দশ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত শিবাজীর জন্মস্থান শিবন গিরি-দুর্গস্থ মন্দিরের সেবায়েত। সেবায়েত ডাইরীটিকে অতি-যতœ করে মন্দিরের এ্যান্টিক্স বিভাগের আলমারিতে রেখে দেন। গত বছর এই ডাইরীটি আমাদের ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু এক সদস্যের চোখ পড়ে যায়। তিনি ডাইরীটির ফটো নিয়ে আসেন। এই ডাইরীর এক স্থানে সম্রাট বাহাদুর শাহ লিখেছেন, ‘আল্লাহর শোকর যে, বাক্সটি আমি শাহজাদা ফিরোজ শাহ-এর হাতে তুলে দিতে পেরেছি। আমাদের শাহজাদাদের মধ্যে ফিরোজ শাহ-ই সবচেয়ে ধর্মভীরু, দেশপ্রেমিক, সাহসী ও সংগ্রামী চরিত্রের। বাবরের সাহস, আকবরের দেশপ্রেম এবং আওরঙ্গজেবের ধর্মভীরুতা ও দৃঢ়তার অপূর্ব সমাবেশ তার মধ্যে আমি দেখেছি। আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ওরা মোঘল রাজত্বের ইতি ঘটাতে চায়। মোঘল সাম্রাজ্য হয়তো এরপর থাকবে না। তবু আমার দায়িত্ব হিসাবে ভারতের মুসলমানদের পক্ষে মোঘল সম্রাজ্যের রক্ষক হিসাবে ফিরোজ শাহকেই আমি নির্বাচন করতে চাই। মোঘলদের গোপন অর্থভান্ডারের নক্সা ও চাবি, তুরষ্কের খলিফার পক্ষ থেকে মোঘল শাসন কর্তৃত্বের সনদ এবং শিবাজীর বাক্স তারই প্রাপ্য। প্রশ্ন উঠতে পারে, শিবাজীর বাক্সটি আমাদের কাছে এমন সম্পদ হয়ে উঠল কেন? কারণটা বলি। শিবাজীর বাক্সে রয়েছে কতগুলো বিচ্ছিন্ন তা¤্রলিপি। তা¤্র লিপিগুলো দুর্বোধ্য সংকেতের অনুসরণে একত্রিত করলে পাওয়া যায় শিবাজীর এক স্বপ্ন কাহিনী। সে কাহিনী বিভেদ, বিদ্বেষ এবং হিংসার। ভারতে শত শত বছরের মুসলিম শাসন হিন্দু-মুসলমানদের সহযোগিতা ও সহাবস্থানের যে অপূর্ব সমাজ সৃষ্টি করেছে, শিবাজীর স্বপ্ন তা ভেঙে দিয়ে মুসলমানদের সাথে তারা বৌদ্ধদের মত আচরণ করতে চায়। এই ধ্বংসাত্মক দলিলটি সম্রাট আওরঙ্গজেব ‘শাহুজী’র হাত থেকে উদ্ধার করার পর একে বংশীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এভাবেই শিবাজীর বাক্সটি মোঘলদের একটি পারিবারিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। যাক এ দিকের কথা। আমি শিবাজীর বাক্সের মধ্যেই পুরলাম মোঘল ধন-ভান্ডারের নক্সা ও চাবি এবং মোঘল রাজত্বের সনদপত্র। শাহজাদা ফিরোজ শাহ তখন দিল্লীর বাইরে বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তৎপরতায় ব্যস্ত। বৃটিশদের তখনও পর্যন্ত অজানা গোপন পথ দিয়ে তাকে আগ্রা দুর্গে নিয়ে এলাম। সব জানিয়ে তার হাতে তুলে দিলাম বাক্সটি। তার সাথে সাথে তাকে দিলাম আমার মাথার মুকুট। তাকে বললাম পারলে ওটা তুমি পরো। না পারলে ওটা তুমি এই সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সমাধিতে রেখে দিয়ে তাঁকে জানিয়ো, আমরা তার অযোগ্য উত্তরসূরীরা পারছি না তার দেয়া দায়িত্বভার বহন করতে।’ এখানে শেষ বাহাদুর শাহের বাক্স সংক্রান্ত উক্তি। অনেক অনুসন্ধানের পর জেনেছি, শাহজাদা ফিরোজ শাহ ভারতের দেশীয় রাজা জমিদারদের উস্কিয়ে বিরোধী যুদ্ধ সংগঠিত করতে গিয়ে এক পর্যায়ে ধরা পড়েন এবং আন্দামানে নির্বাসিত হন। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, পোর্ট ব্লেয়ারে নামার সময় তার লাগেজের যে লিষ্ট করা হয়, তার মধ্যে চন্দন কাঠের সেই বাক্সটি ছিল। জেল কর্তৃপক্ষ শাহজাদার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ঐ বাক্সসহ সব কিছুই তাকে ফেরত দেন। সুতরাং বাক্সটি তোমার আব্বার কাছে আছে। এখন বাক্সটি তোমার কাছে।
দীর্ঘ বক্তব্য শেষ করল লোকটি।
‘চন্দন কাঠের কেন, কোন ধরনের বাক্সই আমার কাছে নেই।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর জোরের সাথে।
চিৎকার করে উঠল সেই লোকটিই। বলল, ‘খবরদার মিথ্যা কথা বলবে না। মুখ একেবারে গুড়ো করে দেব।’ বলে সে প্রচ- এক ঘুসি চালাল আহমদ শাহ আলমগীরের মুখে।
ঠোঁটের কোণ কেটে গেল এবং নাক ফেটে বেরিয়ে এল রক্ত।
দুহাত মুখে চাপা দিয়ে যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করল আহমদ শাহ আলমগীর।
তিনজনের অন্য আরেকজন বলল, ‘তোমার মা মোপলা বংশের তাই না?’
‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তাহলে তোমার মা তো তোমার চেয়ে শক্ত হবে, তাই না?’
কথা বলল না আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তোমার বোনের নাম কি?’
‘আর্জুমান্দ শাহ বানু।’
‘বয়স কত?’
এ প্রশ্নের জবাব দিল না আহমদ শাহ আলমগীর।
‘সে তো সুষমা রাও এর সাথে চেন্নাই-এর ষ্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তোমার বোনই বোধ হয় তোমার ও ‘সুষমা রাও’-এর মধ্যে দুতিয়ালী করেছে?’
‘না।’ পরিষ্কার জবাব দিল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তাহলে তুমিই সুষমা রাও এর ঘাড়ে চেপেছ? হায়দরাবাদের ইউনিভার্সিটি অব টেকনলজিতে তুমি পড়। এই ঘাড়ে চাপার জন্যেই বোধ হয় তুমি ঘন ঘন চেন্নাই আস?’
‘না। আমি আন্দামানে ফেরার সময় ওদিক দিয়ে বোনকে নিয়ে আসি এবং যাবার সময় তাকে ওখানে রেখে যাই।’
‘মোপলাদের রয়েছে আরবীয় সৌন্দর্য আর মোঘলদের তুর্কি সৌন্দর্য। এই দ্ইুয়ের সমাহার আর্জুমান্দ শাহ বানু তাই না?’
এই প্রশ্ন করে লোকটি থামতেই ওদের তিনজনের তৃতীয়জন বলে উঠল। এত ভনিতা না করে আসল কথাটাই বলে ফেল না। আগামী কালের মধ্যে বাক্সের সন্ধান আমরা যদি না পাই, তাহলে বেগম আর্জুমান্দ শাহ বানুকে আমরা এখানে নিয়ে আসবো। তারপর জান তোমার সামনে কি ঘটবে!’
‘তোমরা আমাকে নির্যাতন করো, মেরে ফেল আমাকে। কিন্তু আমার বোনের গায়ে তোমরা হাত দিতে পারবে না।’ উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘তোমাকে মেরে ফেলে আমাদের লাভ নেই। আমরা চাই বাক্স। ওটা এখন আমাদের প্রাণ। ওতে শুধু আমাদের ‘মহাবাপুজী’র পবিত্র দলিলই নেই, আছে মোঘল ধন-ভা-ারের চাবী। ঐ ধন-ভান্ডারের মালিক এখন আমরা। আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করছি, তুমি মুখ খোলনি। গ-ারের চামড়া তোমার গায়, আর গাধার মত তোমার সহ্য শক্তি। এবার আমরা দেখব, বোনকে শেষ হয়ে যেতে দেখলে তোমার এই সহ্যশক্তি কতক্ষণ থাকে।’
‘তোমরা বিশ্বাস কর, আসলেই আমার কাছে বাক্সটি নেই।’ কাতর কণ্ঠে বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
তার কথা শেষ না হতেই চিৎকার করে উঠল ওদের তিনজনের একজন, ‘বলেছি না যে, নেই, জানি না- এই ধরনের কথা আর উচ্চারণ করবে না।’ বলে সে সর্বশক্তি দিয়ে এক লাথি মারল আহমদ শাহ আলমগীরের পাঁজরে।
অন্য একজন বলে উঠল, ‘চল আমরা এখন যাই। কাল সকালে এসে শেষ কথা শুনে যাব। যদি মুখ না খোলে তাহলে যা ঘটার তাই ঘটবে।’
আরেকজন বলল, ‘ঠিক আছে আমরা এখন যাচ্ছি। মনে রেখ, তোমার মৃত্যু নেই। তোমার বোন যাবে, তারপর তোমার মা যাবে, কিন্তু তুমি থাকবে।’
বলেই সে অন্ধকারের দিকে তাকাল। বলল, ‘শোন তোমরা, একে পানি খাইয়ে যাও। আর এর হাত-পা বেঁধে রাখ। আর সর্বক্ষণ এর উপর চোখ রাখবে।’
ওরা তিনজন যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই আবার অন্ধকারের দেয়ালের আড়ালে হারিয়ে গেল।
উদ্বেগ-আতংকে তখন আহমদ শাহ আলমগীরের চোখ-মুখ বিস্ফোরিত। তার মনে একটুও সন্দেহ নেই, ওরা যা বলেছে তাই করবে। কিন্তু কি করবে সে! কি করে রক্ষা করবে তার বোনকে, তার মাকে আর নিজেকে! আহমদ শাহ আলমগীর এখন বুঝতে পারছে, এরা বিরাট-বিশাল এক চক্র। শুধু আন্দামান নয়, গোটা ভারতে এরা ছড়িয়ে আছে। আত্মসমালোচনার আদলে সে ভাবলো, সুষমা রাওকে ভালবেসে কি সে নিজের পরিবারকে, নিজের জাতিকে বিপদে ফেলল! কিন্তু তার এতে দোষ কি! ওরা যা বলল সেভাবে আমি ওর ঘাড়ে চাপিনি। একটি হৃদয়ের পবিত্র আবেগকে, পবিত্র আকাক্সক্ষাকে সে স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র। জানি মারাঠী কন্যা, ব্রাহ্মণ কন্যা, জানি সে চির মোঘল বৈরী ও হিন্দু-রাষ্ট্র-চিন্তার আধুনিক জনক শিবাজীর বিখ্যাত পেশোয়া পরিবারের সন্তান, কিন্তু এসব পায়ে দলেই তো সে এসেছে। সে আমার দরজায় নক করেছে, আমি দরজা খুলে দিয়েছি মাত্র। এমনই ঘটে, ঘটেছে। আমাদের আন্দামানে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। এ নিয়ে কেউ কোনদিন কথা তোলেনি, কারও কাছেই এ বিষয়টা কোন ইস্যু ছিল না। এখন এ বিষয়টা বড় হয়ে উঠল কেন? কারা এরা? আন্দামানে কি তাহলে শান্তির দিন, স্বস্তির দিন শেষ হয়ে গেল?
উদ্বেগ-আর্তক আরও শতগুণ বেড়ে ঘিরে ধরল আহমদ শাহ আলমগীরকে। অসহায় মন তার ডেকে উঠল আল্লাহকে। আল্লাহর সাহায্যই শুধু তাদেরকে বাঁচাতে পারে, অটুট রাখতে পারে আন্দামানের শান্তি ও স্বস্তির জীবনকে। ভারতের সিকি শতক রাজ্য ও ৭টি ইউনিয়ন এলাকার মাত্র এক আন্দামান-নিকোবরই ছিল সব দিক দিয়ে অখ- এক শান্তির টুকরো, শান্তির দ্বীপ। একেও কি এখন অশান্তি এসে গ্রাস করবে!
আহমদ শাহ আলমগীরের চিন্তা আর এগুতে পারলো না। দুজন ষ্টেনগানধারীর পাহারায় একজন লোক পানি নিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল আহমদ শাহ আলমগীরের। পানি দেখার পর যেন সে পাগল হয়ে উঠল। প্রায় কেড়ে নিল পানির বোতল। ঢক ঢক করে গিলতে লাগল পানি বোতল থেকে। এক নিঃশ্বাসেই বোতল সে শেষ করে ফেলল।
আহমদ শাহ আলমগীর বোতল হাতে ধরা থাকতেই ওরা তার হাতে হ্যা-কাফ ও পায়ে শিকল পরিয়ে লক করে দিল।
ওরা ওদের কাজ শেষ করে যেমন যন্ত্রের মত এসেছিল, তেমনি যন্ত্রের মত চলে গেল।
আহমদ শাহ আলমগীর গা এলিয়ে দিল মাটিতে।

জিজা সুষমা রাও এর দুচোখ থেকে অঝোর ধারায় নামছে অশ্রু।
সুষমা রাও ভারতীয় একটি ইউনিয়ন টেরিটোরী আন্দামান-নিকোবর-এর গভর্নর বালাজী বাজী রাও মাধব-এর একমাত্র মেয়ে। বয়স বিশ-একুশ বছর হবে। দুধে-আলতা রংয়ের নিরেট আর্য-ব্রাহ্মণ কন্যা সে। তার সৌন্দর্যের অপরূপ সুষমার পাশে তার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বে রয়েছে এক সম্মোহনী শক্তি। কিন্তু অবিরল অশ্রুর বন্যায় সব কিছুই তার ঢেকে গেছে।
মুখ নিচু করে কাঁদছে সুষমা রাও।
তার পাশেই বসে তার মা ভারতী রাও। প্রবল অস্বস্তিতে ভরা বেদনা জর্জরিত তার মুখ।
তাদের সাথে সামনে সোফায় বসা বালাজী বাজী রাও মাধব। সবাই তাকে বিবি মাধব বলেই জানে। ক্রোধ-অসন্তুষ্টির প্রবল ছায়া তার চোখে মুখে। সে কথা বলছিল সুষমা রাওকে উদ্দেশ্য করে।
সুষমা রাও কান্নায় ভেঙে পড়লে সে থেমে গিয়েছিল। আবার শুরু করল সে। বলল, ‘মা, তুমি কি জান, তোমার নামের প্রথম অংশ ‘জিজা’ কার নাম?’
‘জি বাবা। শিবাজীর মার নাম।’ অশ্রুরোধের চেষ্টা করে বলল সুষমা রাও।
‘শুধু শিবাজী বললে তার অসম্মান হয় মা। তিনি আমাদের জাতির নতুন রাজনৈতিক জাগরণ ও সামরিক উত্থানের মহান জনক। তিনি আমাদের মহাবাপুজী। যাক। শোন, তোমার ‘জিজা’ নাম তোমার দাদু রাখেন। এর পেছনে এক স্বপ্ন তাঁর মধ্যে কাজ করেছে। মহান শিবাজী আধুনিক হিন্দু জাতির স্রষ্টা হলে, তার মা জিজা মহাশিবাজীর ¯্রষ্টা। তোমার নাম জিজা রাখার মাধ্যমে তোমার দাদু চেয়েছেন, জিজার মতই তুমি জাতিস্বার্থ দেখবে, জাতিকে ভালবাসবে। কিন্ত তুমি একি করলে মা, আমাদের আবহমান এক শত্রু পরিবারের প্রত্যক্ষ এক উত্তরাধিকারীকে তুমি ভালবেসেছ! ওদের বিরুদ্ধে মহান শিবাজী, তার পুত্র ‘শম্ভুজী’ এবং শম্ভুজীর পুত্র ‘শাহুজী’ আজীবন লড়াই করে গেছেন। সব কিছুই করা হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব কিন্তু এই মোঘল পরিবারকে বন্ধু বানানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কি করে সম্ভব? তৃতীয় পানিপথ যুদ্ধের দগদগে স্মৃতি একজন মারাঠী কিংবা একজন হিন্দুও তার মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। সেই সর্বগ্রাসী পানিপথ যুদ্ধে আমরা ৪০ হাজার বললেও প্রকৃতপক্ষে ২ লাখ মারাঠী মারা গিয়েছিল। মারা গিয়েছিল আমাদের ৪০ জন সেনাপতি। তোমার প্র-পিতামহ পেশোয়া বালাজী বাজী রাও এর বড় ছেলে বিশ্বাস রাও ছিলেন পানিপথ যুদ্ধের নেতা। তিনি নিহত হন। নিহত হন প্রধান সেনাপতি সদাশিব রাও। এই আঘাত সহ্য করতে পারেননি বালাজী বাজী রাও। অসুস্থ হয়ে তিনিও মারা গেলেন। পানিপথ যুদ্ধের পর মারাঠীদের এমন কোন বাড়ি ছিল না, যেখানে ক্রন্দনের রোল ওঠেনি। আর এই পানিপথই ধ্বংস করে দিয়ে যায় হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন।’
‘কিন্তু বাবা, মাফ করবেন আমাকে। এই যুদ্ধের জন্যে মোঘলারা কতটুকু দায়ী? কেন সেদিন আমরা গিয়েছিলাম দিল্লী দখল করতে? এই অভিযানই তো এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধ ডেকে আনে।’ বলল সুষমা রাও কান্নাজড়িত কণ্ঠে।
‘আমরা দিল্লী দখল করতে না গেলে, তারা আসত মারাঠা দখল করতে। থাক এ কথা। আমার নামটাও তোমার দাদু ‘বালাজী বাজী রাও মাধব’ রেখেছিলেন কোন উদ্দেশ্যে জান? আমার নামের প্রথম অংশ তৃতীয় পানিপথ যুদ্ধে আমাদের হৃদয়বিদারক পরিণতির প্রতীক এবং শেষ অংশ ‘মাধব’ আমাদের জাতির বিপর্যর কাটিয়ে উত্থানের স্মারক। কারণ বালাজী বাজী রাও-এর এক পুত্র মাধব রাও পরাজিত শক্তিকে সাময়িকভাবে হলেও সংহত করেছিলেন এবং অল্প সময়ের জন্যে হলেও মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে অনেকটা আশ্রিত করে তার মাধ্যমে দিল্লীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুতরাং দেখ, তোমার দাদুর মধ্যে কতবড় জাতীয় ও পারিবারিক আবেগ ছিল। এই আবেগ আমাদের প্রত্যেক মারাঠীর মধ্যে থাকা উচিত। তুমি এর এক ইঞ্চিও বাইরে যেতে পার না।’
গভর্নর বিবি মাধব থামলে সুষমা রাও কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘বাবা এনিয়ে আমি এখন আপনার সাথে কোন তর্ক করব না। সে সময় এখন নয়। বাবা, আহমদ শাহ আলমগীরকে আপনার বাঁচাতে হবে। আমার যদি সত্যিই অপরাধ হয়ে থাকে, আমাকে যে শাস্তি দেবেন আমি গ্রহণ করব। আমি মরতেও রাজী আছি। বাবা, আপনি ওঁকে বাঁচান। আপনাদের রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারবে না। আপনি দয়া করে তাকে উদ্ধারের উদ্যোগ নিন।’
বলতে বলতে সুষমা রাও ছুটে গিয়ে তার বাবার পায়ের কাছে বসে তার বাবার কোলে মুখ গুঁজল। নিঃশব্দ কান্নায় সে ভেঙে পড়ল।
এক ধরনের বিক্ষোভ ও বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছে বিবি মাধবের মুখ। সে কান্নারত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে তুলে পাশে বসাল। বলল, ‘মা, ওকে শুধু ‘আলমগীর’ বলবে। আহমদ শাহ নয়। ঐ নাম শুনলে আমার বুক ফেটে যায়। মোঘলরা আমাদের প্রতিপক্ষ, কিন্তু আহমদ শাহ আবদালী সবচেয়ে বড় খুনি। তৃতীয় পানিপথে আমাদের বিপর্যয়ের কারণ এই আহমদ শাহ আবদালী। সেই খুন করেছে আমাদের বিশ্বাস রাও, সদাশীব রাওকে, ৪০ জন সেনাপতিকে এবং দুলাখ আমাদের ভাইকে।’
বলতে বলতে আবেগ-প্রবণ হয়ে উঠেছিল বিবি মাধব।
বোধ হয় নিজেকে শামলে নেবার জন্যেই একটু থামল সে। একটু পর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘স্যরি মা, প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। শোন মা, আলমগীরের শত্রুর সংখ্যা বিশাল, তাদের শক্তিও অসীম। সে নিখোঁজ হবার পরই পুলিশ তার উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছে না।’
‘কিন্তু বাবা, এ পর্যন্ত অনেকগুলো রহস্যজনক খুন হয়েছে আন্দামান নিকোবরে। আমি চেন্নাই-এ থাকতেও কাগজে এসব পড়েছি। কিন্তু পুলিশ কোন সুরাহা করতে পারেনি। সুতরাং সাধারণ পুলিশ তৎপরতার দ্বারা আলমগীর উদ্ধার হবে বলে আমি মনে করি না।’
‘কিন্তু মা, এই কাজের জন্যে আমার হাতে পুলিশ ছাড়া আর কি আছে?’
‘সিবিআই-এর লোকরা এসে আবার চলে গেল কেন?’
‘তারা বলেছে, খুনগুলো সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং স্থানীয় শত্রুতা জনিত। কোন ষড়যন্ত্র বা বিশেষ কোন উদ্দেশ্য এর পেছনে নেই। এসবের তদন্তের জন্যে স্থানীয় পুলিশই যথেষ্ট।’
‘কিন্তু আলমগীর কোন শত্রুতাজনিত কারণে কিডন্যাপ হয়েছে, এটা কেউ মনে করছে না। আমিও মনে করি না। আশ-পাশের দ্বীপসহ পোর্ট ব্লেয়ারে আলমগীর এমন এক এবং একমাত্র ছেলে যার কোন শত্রু নেই। তার কিডন্যাপ অবশ্যই ষড়যন্ত্রমূলক। নানা কার্য কারণ থেকে এই কথা আমি নিশ্চিত করেই বলছি বাবা।’
‘সে ষড়যন্ত্রটা কি হতে পারে বলে তুমি মনে কর?’ বলল সুষমা রাও এর পিতা গভর্নর বিবি মাধব সোজা হয়ে বসে।
‘আমি তা জানি না বাবা। কিন্তু সাম্প্রতিক রহস্যজনক যে খুনগুলো হয়েছে তারা সবাই মুসলমান। ব্যাপারটাকে আমি কাকতালীয় বলে মনে করি না। আবার একটা কিডন্যাপের ঘটনা ঘটল সেও মুসলমান। আমার মনে হয়, খুনগুলো ও কিডন্যাপের উৎস একই হতে পারে।’
‘তোমার কথা তোমার কল্পনাও হতে পারে। পুলিশ তো তোমার মত করে ভাবছে না।’
‘সুতরাং বাবা, পুলিশ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। আপনাকে কেন্দ্রের সাহায্য চাইতে হবে। আপনি তাড়াতাড়ি এই ব্যবস্থা করুন বাবা।’
‘তোমার বাবার ক্ষমতা সীমাহীন নয় বেটা। বিশেষ করে সিবিআই যে মন্তব্য করে চলে গেছে। তারপর দিল্লীর সাহায্য পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে গেছে। চাপ দিলেই বলবে পুলিশকে কেন কাজে লাগাচ্ছি না।’
‘তাহলে?’ সুষমা রাও-এর গলা কান্নায় জড়িয়ে গেল।
সুষমার বাবা বিবি মাধব পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমি দেখছি মা। আমাদের গোয়েন্দা দফতরের সাথে তোমার চিন্তা নিয়ে আলোচনা করে দেখি তারা কি বলে? কিন্তু তোমাকে আবার একটা কথা বলছি মা, তুমি সব কথা বলেছ। আন্দামান সরকার চেষ্টা করবে তাকে উদ্ধারের জন্যে। তোমার কাছ থেকে কিন্তু তার সম্পর্কে আর কোন কথা আমি শুনব না। মারাঠী রাও পরিবারের কেউ কোন মোঘল সন্তান সম্পর্কে দুর্বলতা দেখাবে এটা অপমানজনক। এই অপমানকর কিছু যেন আর কানে না আসে।’
বলেই ওঠে দাঁড়াল বিবি মাধব। বেরিয়ে গের পারিবারিক ড্রইং রুম থেকে।
পিতা বেরিয়ে গেলেও পাথরের মত স্থির বসে থাকল সুষমা রাও। তার চোখে-মুখে বিস্ময়-বেদনা, আতংক-উৎকণ্ঠা ও অপমানের একটা সয়লাব এসে যেন আছড়ে পড়ল। তার মনে হলো, তীরে নামার সিঁড়ি এক সাথে ভেঙে পড়ল। উত্থাল সাগরে সব সহায় যেন তার কাছ থেকে সরে গেল। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
তার মা ভারতী রাও এসে তার পাশে বসল। মেয়েকে বুকে টেনে নিল। বলল, ‘ধৈর্য ধর মা। তোমার বাবার কথা নিয়ে মন খারাপ করার প্রয়োজন নেই। এখনকার প্রশ্ন হলো, আলমগীর উদ্ধার হওয়া, অন্যকিছু নয়।’
‘তাহলে তার উদ্ধার সম্পর্কে তো আম্মা কোন কথা বলতে পারবো না বাবাকে। তার মানে সে উদ্ধার হবে না, এটাই বাবা বোঝাতে চেয়েছেন।’ কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলল সুষমা রাও।
‘এভাবে বলো না মা। সব চেষ্টার পরও তো উদ্ধার নাও হতে পারে। এমনও তো হতে পারে, উদ্ধার চেষ্টা শুরুর আগেই সে নি……।’ কথা শেষ করতে পারল না সুষমার মা ভারতী রাও। সুষমা রাও মায়ের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ বুঝেছি, সর্বনাশা কথাটা উচ্চারণ করো না, মা। তোমরা সবাই বোধ হয় এটাই চাচ্ছ।’
বলে উঠে দাঁড়িয়ে সুষমা রাও ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ভারতী রাও উঠে সুষমার পেছনে পেছনে ছুটল।

চেন্নাই থেকে আন্দামানগামী জাহাজে উঠতে গিয়ে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। একটা দেশ থেকে বের হবার সময় যে ধরনের চেকিং হয় তার সবই এখানে করা হচ্ছে। পাসপোর্ট চেকিং, ভিসা চেকিং, লাগেজ চেকিং থেকে শুরু করে আন্দামান-নিকোবরে প্রবেশের জন্যে কি ধরনের অনুমতি দেয়া হয়েছে তাও তারা দেখছে।
আহমদ মুসা ইতিমধ্যেই জেনেছে আন্দামানে প্রবেশের জন্যে চার ধরনের অনুমতি আছে। ট্যুরিষ্টরা শুধুমাত্র তালিকা অনুযায়ী ট্যুরিষ্ট স্পটগুলো ভিজিটের অনুমতি পায়। ব্যবসায়ীরা পোর্ট ব্লেয়ারের বাইরে কোথাও যাবার অনুমতি পায় না। আন্দামান-নিকোবর-এর বাসিন্দাদের জন্যেও অনুমতিপত্র আছে। কিছু কিছু এলাকায় বিনা অনুমতিতে তাদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। এছাড়া এক ধরনের বিশেষ অনুমতিপত্র আছে। এই অনুমতি প্রাপ্তরা আন্দামান-নিকোবরের সব জায়গায় যেতে পারে। তবে ট্রাইবাল এরিয়া ও রস দ্বীপে যাবার আগে পুলিশকে শুধু জানাতে হয়।
আহমদ মুসা শুধুমাত্র আমেরিকান সরকারের কল্যাণে ভারতের ওয়াশিংটন দূতাবাসের মাধ্যমে এই বিশেষ অনুমতিপত্র পেয়েছে। আর এটা বিশেষভাবে সম্ভব হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সৌজন্যে।
আর এটা পাওয়ার ক্ষেত্রে তার আরেকটা সুবিধা হয়েছে আহমদ মুসা মুসলিম নামের পাসপোর্ট ব্যবহার করেনি। আসার আগে মুসলিম নামের পাসপোর্ট বাদ দিয়ে যুডীয়-খৃষ্টান নামের একটা নতুন পাসপোর্ট দিয়েছে এফ.বি.আই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন। এই পাসপোর্টে তার নাম হয়েছে ‘বেভান বার্গম্যান’। পাসপোর্টে তার পরিচয় দেয়া হয়েছে ‘পরিবেশবাদী’ ও ‘পুরাতত্ববিদ’ হিসাবে। ভিআইপি ভিসা পেয়েছে সে।
এই পাসপোর্ট ও ভিসার কারণেই সে যথেষ্ট খাতির পেল কাউন্টারে গিয়ে। পাসপোর্ট দেখেই বডিচেকিং ও লাগেজ চেকিং না করেই তাকে ছেড়ে দিয়েছে।
আহমদ মুসা জাহাজে উঠল। বিরাট জাহাজ।
জাহাজের টপ ফ্লোরে ভিআইপি কক্ষ নিয়েছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা জাহাজে ঢুকে উপরে ওঠার জন্যে এগুচ্ছিল। কথা কাটাকাটির শব্দ কানে এল তার। তাকিয়ে দেখল, জাহাজের লবীতে দুজন লোক একজন লোককে জাহাজ থেকে নামিয়ে নেবার জন্যে টানাটানি করছে। যাকে টানাটানি করছে তার পরনে পাজামা-শেরোয়ানী। মাথায় রামপুরী টুপী। মুখে ছোট করে ছাটা দাড়ী।
লোকটি প্রতিবাদ করছে, যুক্তি দেখাচ্ছে। কিন্তু কে শোনে প্রতিবাদ, যুক্তি। লোক দুজন তাকে আগে জাহাজ থেকে নামিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। বলছে, চল নিচে নেমে সব কথা শুনব। চারিদিকে সব লোক দাঁড়িয়ে থেকে তামাশা দেখছে। কেউ কিছু বলছে না, প্রতিবাদ করছে না।
লোক দুজন লোকটিকে টেনে-হেঁচড়ে নামিয়ে নিতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসা ওপরে না উঠে এগুলো লোকদের দিকে।
তাদের সামনে গিয়ে আহমদ মুসা যারা টেনে-হিঁচড়ে নিচ্ছে লোকটিকে তাদের উদ্দেশ্যে বলল ইংরেজীতে ‘আপনারা কি পুলিশের লোক?’ আহমদ মুসা শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল।
লোক দুজন লোকটিকে ছেড়ে আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
আহমদ মুসা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমি একজন আমেরিকান ট্যুরিষ্ট। নাম ‘বেভান বার্গম্যান।’ ইংরেজীতেই কথা বলছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসর ঋজু কণ্ঠ ও প্রশ্নের ধরন এবং অযাচিত পরিচয় দেয়ার নির্ভীক ষ্টাইল দেখে ও পরিচয় পেয়ে ওরা বোধ হয় দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল।
তাদের দু’জনের একজন বলল, ‘না, আমরা পুলিশের লোক নই। আমরা………..।’
লোকটিকে কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘তাহলে কি আপনরা গোয়েন্দা?’
লোক দুজনের চোখে-মুখে বিব্রত ভাব ফুটে উঠল। সেই লোকটিই আবার দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে জবাব দিল, ‘না, আমরা গোয়েন্দা নই।’
আহমদ মুসা এবার তাকাল যাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে নিচ্ছিল তার দিকে। তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কি এদের চেনেন? কোন লেন-দেন আছে এদের সাথে?’
‘না, এদের আমি চিনি না। কোন দিন এদের সাথে দেখাও হয়নি। লেন-দেনের তো প্রশ্নই ওঠে না।’ বলল লোকটি দ্রুত ও স্পষ্ট কণ্ঠে।
আহমদ মুসা ফিরে তাকাল লোক দুজনের দিকে। বলল, ‘আপনারা ওঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন কেন? আপনারা কি এ জাহাজের যাত্রী?’
ওদের একজন বলল, ‘না, আমরা যাত্রী নই।’
যাত্রী না হলে জাহাজে আপনারা প্রবেশ করলেন কেমন করে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
লোক দুজন তৎক্ষণাৎ কোন জবাব দিল না।
চারদিকে দাঁড়ানো লোকদের মধ্যে গুঞ্জন আগেই শুরু হয়েছিল তা এ সময় সরব হয়ে উঠল। কয়েকজন বলল, ‘এরা নিশ্চয় হাইজ্যকার।’
কয়েকজনের এই কথার রেশ ধরে এবার সবাই বলে উঠল, ‘নিশ্চয় হাইজ্যাকার এরা। পুলিশ ডাক। পুলিশে দাও এদেরকে।’
হৈ চৈ শুনে জাহাজের কয়েকজন এগিয়ে এল। সব শুনে তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলল, ‘ঠিক আছে, এদেরকে পুলিশে দিচ্ছি। কি করে জাহাজে ঢুকল সেটাও দেখছি।’
বলে লোক দুজনকে ধরে তারা জাহাজ থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল।
শেরোয়ানী পরা লোকটি দুহাত জোড় করে চারদিাকের সবার শুকরিয়া আদায় করে আহমদ মুসার কাছে এসে দুহাত জড়িয়ে ধরে বলল, ‘স্যার, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। ওরা নিশ্চয় আমাকে হাইজ্যাক করত। আরও কি করতে জানি না।’ বলতে গিয়ে লোকটি কেঁদে ফেলল।
সবাই তাকে সান্তনা দিল।
আহমদ মুসাকেও সবাই ধন্যবাদ দিল। বলল, ‘কি হচ্ছে, কি করতে হবে আমরা বুঝতেই পারছিলাম না।’
আহমদ মুসা লোকটির পিঠ চাপড়ে, সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে উপরে ওঠার জন্যে সিঁড়ির দিকে এগুলো।
আহমদ মুসা কেবিনে গিয়ে ব্যাগ, ইত্যাদি গোছগাছ করে রেখে ঘণ্টাখানেকের মত গড়িয়ে নিল। তারপর ডেকলাউঞ্জে চলে এল। উদ্দেশ্য সমুদ্রের উন্মুক্ত সান্নিধ্য উপভোগ করা। কাছে থেকে সমুদ্রের লোনা স্বাদ গ্রহণ অনেক দিন ভাগ্যে জোটেনি।
রেলিং-এর ধার ঘেঁষে একেবারে প্রান্তের সারিতে এক ডেক চেয়ারে বসল আহমদ মুসা।
সামনে আদিগন্ত সমুদ্র। সীমাহীনতার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ভাল লাগে আহমদ মুসার।
সেই ভাল লাগার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল আহমদ মুসা।
‘হ্যাল্লো মি. বার্গম্যান’-বাম দিক থেকে বাম কানের উপর আছড়ে পড়া শব্দে আহমদ মুসার আনমনা অবস্থা ভেঙে পড়ল।
তাকাল আহমদ মুসা বাম দিকে। দেখল, বয়ষ্ক এবং ভদ্র চেহারার একজন লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে। বয়স পঞ্চাশের কম হবে না। স্বাস্থ্য ভাল। বয়সের চিহ্ন তার চেহারার উপর নেই।
আহমদ মুসার মনে বিস্ময়, লোকটি তার নাম জানল কি করে। দুএকদিনের মধ্যে কোথাও তার সাথে দেখা হয়েছে কিনা মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু স্মৃতি হাতড়ে লোকটির দেখা মিলল না।
লোকটিও বুঝতে পেরেছে আহমদ মুসার অবস্থা। বলল, ‘আপনি আমাকে চিনবেন না, এই ঘণ্টাখানেক আগে আমি আপনাকে চিনেছি।’
বলতে বলতে লোকটি আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কথা শেষ করেই সে বলল, ‘আপনার পাশে বসতে পারি মি. বার্গম্যান?’
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে সলজ্জ হেসে বলল, ‘অবশ্যই। বসুন। ওয়েলকাম।’
লোকটি বসল।
লোকটি হ্যান্ডশেকের জন্যে আহমদ মুসার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমি শ্রী গংগাধর তিলক। আমি পোর্ট ব্লেয়ারের ‘ব্লেয়ার মেমোরিয়াল গভর্নমেন্ট হাইস্কুল এন্ড কলেজ’-এর প্রিন্সিপাল।’
পোর্ট ব্লেয়ারের সরকারী হাইস্কুল এন্ড কলেজ-এর প্রিন্সিপাল জেনে খুব খুশি হয়ে উঠল আহমদ মুসা। কিছু বলতে যাচ্ছিল সে।
কিন্তু আহমদ মুসার আগেই শ্রী গংগাধর তিলকই আবার বলে উঠল, ‘এক নিমিষেই কখনো কখনো এক যুগের পরিচয় হয়ে যায়। সে রকমই হয়েছে। আপনি আমার ছেলের বয়সী হলেও এক নিমিষেই আমি আপনার ভক্ত হয়ে গেছি। দুঃখ যে, আপনার মত মানুষ লক্ষ নয়, কোটিতেও একজন পাওয়া যাবে না। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল গংগাধর তিলক।
‘স্যার, প্রতিবাদ করার মত লোক অনেক আছে, কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তারা সামনে এগোয় না। যদি তারা মনে করতো যে কোন অবস্থায় আইনকে পাশে পাওয়া যাবে, তাহলে প্রতিরোধ-প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে কেউ দ্বিধা করতো না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ। ঠিক রোগ ধরেছেন আপনি। আইনের সহায়তা তো দূরে থাক, বাদী হতে গিয়ে আসামীও হতে হয়।’
বলে একটু থামল। আবার বলে উঠল, ‘আপনি আমেরিকান আপনার কাছেই শুনলাম। আন্দামান যাচ্ছেন সরকারী কোন কাজে, না ব্যবসায়-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে?’
‘বেড়ানের উদ্দেশ্যে।’
‘কম্যুনিকেশন কিন্তু খুব ভাল নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পায়ে হাঁটা ও নৌকায় বেড়ানোর প্রধান মাধ্যম।’
‘এ দুটো মাধ্যমই আমার পছন্দনীয়।’
‘তাহলে আর কথা নেই।’
আহমদ মুসা শুরু থেকেই ভাবছিল। আন্দামানের বর্তমান সম্পর্কে কিছু জানার ইনি ভাল মাধ্যম হতে পারেন। আহমদ মুসা আলোচনার বিষয়টাকে ঐ দিকেই ঘুরিয়ে নিতে চাইল। বলল, ‘আমি জানতাম আন্দামান-নিকোবর শান্তি ও সম্প্রীতির একটা দ্বীপ। ভারতের যে কোন এলাকার চাইতে এখানকার সামাজিক পরিবেশটা ভাল। কিন্তু আসার আগে আমি ইন্টারনেটে পড়লাম, আন্দামানে সম্প্রতি বেশ কিছু রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং জনপ্রিয় একজন ছেলে সম্প্রতি নিখোঁজ হয়েছে। বিষয়টা জেনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। ব্যাপার কি বলুন তো?’
শ্রী গংগাধর তিলক তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। তার চোখে-মুখে একটা অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনি ঠিকই শুনেছেন। তবে একটু কম শুনেছেন। সৌদি আরবের একটা এনজিও একটা ছোট্ট দ্বীপ ভাড়া নিয়ে সেখানে একটা কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছিল। কমপ্লেক্সটা সমূলে ধ্বংস করা হয়েছে। এই সব ঘটনা আন্দামানের ইতিহাসকেই কলংকিত করেছে। বিশেষ করে আহমদ শাহ আলমগীর-এর নিখোঁজ হওয়া আন্দামানের সকলের মনকেই নাড়া দিয়েছে। ছেলেটি আমার প্রতিষ্ঠান থেকেই পাশ করেছে। সে অত্যন্ত ভাল ছাত্র এবং আমার প্রিয় ছাত্র ছিল। সে এক অবিশ্বাস্য চৌকশ ছেলে। সে কোন পরীক্ষায় মেযন দ্বিতীয় হয়নি, তেমনি কোন খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় সে কখনও দ্বিতীয় হতো না। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর সে খেলাধুলা ছেড়ে দেয়। না হলে খেলাধুলার বহু আইটেমে সে জাতীয় দলে স্থান পেয়ে যেত। সবাই মনে করত, ছেলেটি আন্দামান নিকোবরের মুখ উজ্জ্বল করবে। আহমদ শাহ আলমগীরের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা আন্দামানবাসীদের জন্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত।’
‘তার নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে আপনি কি মনে করছেন? মানুষ কি মনে করছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘মনে করা হচ্ছে এই ভাল করাটাই তার জন্যে কাল হয়েছে। হিংসা পরবশ হয়ে কেউ এই কাজ করতে পারে।’
‘ছেলেটির কে আছে, তাদের বাড়ি কোথায়?’
‘ছেলেটির মা আছে, এক বোন আছে। অন্যান্য আত্মীয় স্বজনও আছে। পোর্ট ব্লেয়ারের পশ্চিমে কাছেই হারবারতাবাদে তার পৈত্রিক নিবাস।’
‘আপনি এই যে রহস্যজনক মৃত্যুর কথা বললেন এবং এই যে ছেলেটি নিখোঁজ হলো, এসবের জন্যে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি? তদন্তের খবর কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, গ্রেফতার হয়নি।’
‘সাংঘাতিক ব্যাপার। তাহলে চক্রটি বেশ বড় নিশ্চয়। আন্দামান তো নিরাপদ নয়। আগে জানলে…………।’ কৃত্রিম একটা ভয় চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আহমদ মুসার।
কিন্তু আহমদ মুসা কথা শেষ করার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে শ্রী গংগাধর তিলক বলল, ‘না, না, ভয় করার কোন কারণ নেই। ঘটনাগুলো খুব দুঃখজনক হলেও আপনার জন্যে সান্তনার যে, আহমদ শাহ আলমগীরের নিখোঁজ হওয়াসহ রহস্যজন মৃত্যুর যত ঘটনা ঘটেছে, তার সবগুলোর শিকার মুসলমানরা। অন্য কোন ধর্মের লোকের কোন ক্ষতি হয়নি।’
‘শুধু মুসলমানরা শিকার হয়েছে? কেন?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল আহমদ মুসা নিপুণ এক অভিনেতার মত।
‘কেন আমি জানি না। কিন্তু এটাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে।’ বলল গংগাধর তিলক।
‘ভারতের অন্যান্য এলাকার মত এখানে শিবসেনা, আর.এস.এস ইত্যাদির মত সংগঠন গোপনে তৈরি হয়েছে নিশ্চয়?’
‘এ ধরনের কোন প্রকাশ্য সংগঠন নেই। গোপনে থাকার যে কথা বলছেন, সেটা আমি জানি না।’ বলল গংগাধর তিলক।
‘আন্দামান-নিকোবর তো কেন্দ্র শাসিত। কেন্দ্রের নিয়োগ করা গভর্নর এখানকার শাসন পরিচালনা করেন। বিষয়টি কি গভর্নরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল না গংগাধর তিলকের কাছ থেকে। কি যেন ভাবছিল। তার ঠোঁটে অস্পষ্ট এক টুকরো হাসি। বলল, ‘কি বলব বলুন। বেশির ভাগ লোকের ধারণা গভর্নরের ইংগিতেই কিডন্যাপ-এর ঘটনা ঘটেছে। কারণ গভর্নরের মেয়ের সাথে তার প্রেম আছে। গভর্নর বিবি মাধব ছেলেটাকে পথ থেকে সরিয়ে দেবার জন্যেই এটা করেছেন। কিন্তু আমার মতে ঘটনা তা নয়।’
‘কেন নয় বলছেন জনাব?’ আবার আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘যেদিন সে কিডন্যাপ হয় সেদিন আমাদের কলেজে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গভর্নর বিবি মাধব। কৃতিছাত্র হিসাবে আহমদ শাহ আলমগীরের শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ছাত্রের পুরষ্কার নেবার কথা ছিল। এ অনুষ্ঠানে আসার পথেই আলমগীর নিখোঁজ হয়ে যায়। সেদিনের গোটা সময়ের গভর্নর সাহেবের কথা-বার্তা, আচার-আচরণের আমি সাক্ষী। শিক্ষকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় মানুষ সম্পর্কে আমার যতটুকু জানা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই আমি বলছি আলমগীরের সেদিনের কোন ঘটনার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। এরপরও যদি জড়িত থাকেন, তাহলে বলতে চাই, তার চেয়ে বড় অভিনেতা আর নেই।’ বলল গংগাধর তিলক।
কথা শেষ করেই গংগাধর তিলক উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি একটু যাই, কাজ আছে। আপনার সাথে কথা বলে খুব খুশি হলাম। আপনি শুধু সাহসী ও প্রতিবাদী নন, খুব সজ্জন ব্যক্তি বলেও আমি মনে করি আপনাকে। আমার প্রতিষ্ঠানে একদিন আসুন। আরো কথা হবে।’
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল। তার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আপনার ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পেলে খুবই খুশি হবো।’
গংগাধর তিলক চলে গেল।
আহমদ মুসা দুধাপ এগিয়ে রেলিং-এ ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। চারদিকে চাইতে গিয়ে তার চোখে পড়ল, সেই শেরওয়ানীধারী যুবক কিছুটা দূরে রেলিং-এ দুহাতের কনুই ঠেস দিয়ে সাগরের দিকে চেয়ে আছে।
শেরওয়ানীধারী যুবকও এদিকে তাকিয়েছে। সেও দেখতে পেল আহমদ মুসাকে।
দেখতে পেয়েই সে দ্রুত এগিয়ে এল আহমদ মুসার দিকে।
কাছাকাছি হয়ে বলল, ‘স্যার বোধ হয় ভিআইপি কেবিনে আছেন?’
আহম মুসা খুব খুশি হয়েছে যুবককে এভাবে এখানে পেয়ে। আন্দামানের মুসলমানদের ব্যাপারে গংগাধর তিলকের চেয়ে অনেক বেশি জানা যাবে এই যুবকের কাছ থেকে। তাছাড়া তার আক্রান্ত হওয়ার কারণ কি, এটাও রহস্য হয়ে আছে আহমদ মুসার কাছে।
আহমদ মুসা যুবকটির প্রশ্নের হ্যাঁ সুচক জবাব দিয়ে বলল, ‘আসুন, বসে কথা বলা যাক।’
‘ধন্যবাদ স্যঅর, আমেরিকাকে জানার আমার খুব আগ্রহ। এক স্বপ্নের দেশ বলতে পারেন ওটা আমার।’
বলতে বলতে দুজনে এক সাথে এগিয়ে এসে পাশাপাশি বসল।
বসেই যুবকটি বলে উঠল, ‘স্যার নিশ্চয় এশিয়ান- আমেরিকান? কোন দেশের?’
‘আপনিই বলুন কোন দেশের।’
‘তুরষ্ক থেকে মিসর পর্যন্ত কোন দেশের বংশোদ্ভুত হবেন।’
‘যথেষ্ট বুদ্ধি করে কথা বলেছেন। বুঝা যাচ্ছে, বিভিন্ন দেশের মানুষ সম্বন্ধে ভাল জ্ঞান রাখেন। এখন বলুন ঐ লোকদের সম্পর্কে। তারা কোথাকার এবং আপনার উপর চড়াও হয়েছিল কেন?’
‘লোকগুলো অবশ্যই ভারতের।’ বলে যুবকটি চুপ করল।
‘প্রশ্নের এক অংশের জবাব হলো, অন্য অংশের?’
‘আমি তো আগেই বলেছি তাদের চিনি না, তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না আমি স্যার।’ বলল যুবকটি।
‘আপনার নামটাই কিন্তু এখনও জানা হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যরি। জি, আমার নাম, ‘ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহ।’
‘সুন্দর নাম। আপনার বাড়ি কি আন্দামানে?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘কি করেন?’
‘কিছু করতাম, এখন করি না।’
‘কি করতেন?’
‘গ্রীন আইল্যান্ডের রাবেতা কমপ্লেক্স মসজিদের একজন ইমাম এবং সেখানকার ইসলামিক স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলাম।’
ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহর পরিচয় পেয়ে আহমদ মুসা ‘মেঘ না চাইতে জল পাওয়া’র মত আনন্দিত হলো। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। বলল কিছু না জানার ভান করে, ‘ছিলেন মানে? এখন সেখানে ইমাম ও শিক্ষক হিসাবে নেই? চাকুরী ছেড়ে দিয়েছেন?’
যুবকটি গম্ভীর হলো। গভীর বেদনার ছায়া পড়ল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘রাবেতার সে কমপ্লেক্স ধ্বংস হয়ে গেছে। মসজিদ নেই, স্কুল নেই এবং আমার চাকুরীও নেই।’
‘ধ্বংস হয়েছে মানে? কিভাবে ধ্বংস হলো?’ বলল আহমদ মুসা মুখে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে।
‘কে বা কারা একরাতে গোটা কমপ্লেক্সের মূলোচ্ছেদ করে সেখনে গাছ-পালা লাগিয়ে দিয়েছে। বুঝাই যায় না সেখানে কোন স্থাপনা ছিল। শুধু ধ্বংসই নয়, রাবেতার কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা আন্দামান ও ভারতের নয়, তাদের রাতারাতিই এক জাহাজে তুলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।’ ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহ বলল।
‘কোন প্রতিবাদ-প্রতিকার হয়নি এই অবিচারের?’
‘কে প্রতিবাদ-প্রতিকার করবে? যারা করতে পারতো, তাদের তো দ্বীপ থেকে বাইরে চালান করে দেয়া হয়েছে। পরে অবশ্য রাবেতা দিল্লী সরকারের কাছে প্রতিবাদ করে প্রতিকার দাবী করেছে। দিল্লী প্রতিকার কিছু করেনি, বরং বলেছে, এ রকম কোন সংস্থা আন্দামানে আছে বা ছিল তা দিল্লী সরকারের জানা নেই, আন্দামান কর্তৃপক্ষও জানাতে পারেনি।’ যুবকটি বলল বেদনাপীড়িত কণ্ঠে।
‘সাংঘাতিক ব্যাপার? এই ধ্বংসের পিছনে সরকারের যোগ-সাজস আছে? না খোদ সরকারই এটা করেছে?’
‘কিছ জানি না। জানার চেষ্টা করতেও পারিনি। যদিও আমার বাড়ি আন্দামানে, তবু সেই রাতে আমাকে অন্য সবার সাথে আন্দামানের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এতদিন নানা কারণে ফিরতে পারিনি। আজ ফিরছি।’
আহমদ মুসার চোখে-মুখে ভাবনার ছাপ। বলল, ‘আন্দামানে কোথায় বাড়ি আপনার? কে আছে সেখানে?’
‘পোর্ট ব্লেয়ারের দক্ষিণে ছোট শহর কালিকটে আমার বাড়ি। সেখানে আমার আব্বা-আম্মা ছাড়া আর কেউ নেই।’
ভাবনা দূর হয়নি আহমদ মুসার চেহারা থেকে। ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহ থামতেই সে বলে উঠল, ‘যারা আপনাদের রাবেতা কমপ্লেক্স ধ্বংস করেছে, তারাই কি চেন্নাই বন্দরে আপনাকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করেছিল?’
বিস্ময় ফুটে উঠল ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহর চোখে-মুখে। বলল, ‘আমি তো এইভাবে জিনিসটাকে দেখিনি। হতে পারে তারাই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি আন্দামানে যাই তারা তা নাও চাইতে পারে। তবে অন্যেরাও এ ঘটনা ঘটাতে পারে। বিশেষ করে মুসলমানরা এখানে দুষ্কৃতিকারীদের হাতে এমন হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়।’
‘আপনি আন্দামানে কেন ফিরছেন? পরিবারের কাছে, না আরও কিছু করণীয় আছে আপনার?’
‘রাবেতা কমপ্লেক্স ধ্বংসের ব্যাপারে একটা কেস দায়ের করব। পুলিশ কিছু করলে তাদের সহযোগিতা করব। আর কিছু নয়। রাবেতা বলেছে পোর্ট ব্লেয়ারের কোন মসজিদকে কেন্দ্র করে ছোট-খাট অফিসের মাধ্যমে রাবেতার কিছু কাজ চালু রাখতে।’
‘আন্দামানে রাবেতার অফিস ধ্বংসের মত কাজ কে বা করা করতে পারে, এ ব্যাপারে আপনার কোন ধারণা আছে কি?’
‘ধারণার জন্যে কিছু তৎপরতা চোখে পড়া দরকার। কিন্তু এমন কোন বৈরী বা সন্দেহ করার মত তৎপরতা কখনই চোখে পড়েনি। আন্দামান-নিকোবর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মানব হিতৈষী এনজিও হিসাবে রাবেতা এখানে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিল। এ সংস্থার দিকে কাউকে কখনও বৈরিতা তো দূরে থাক প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেও দেখিনি।’
‘কিন্তু আকস্মিকভাবে এমন ঘটনা ঘটা কি সম্ভব?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সম্ভব নয়, কিন্তু ঘটেছে?’
‘আপনি বলছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা, কিন্তু এরই মধ্যে কয়েকজন মুসলিম যুবক খুন হয়েছে, আহমদ শাহ আলমগীর কিডন্যাপ হয়েছে, এর ব্যাখ্যা তাহলে কি?’
‘এ সবই অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। তবে হ্যাঁ, এগুলো সাম্প্রদায়িক ঘটনাও হতে পারে, তবে তা এখনও প্রমাণ হয়নি। রাবেতা অফিস ধ্বংস হবার মতই এগুলো রহস্যপূর্ণ। বিশেষ করে আহমদ শাহ আলমগীরের নিখোঁজ হওয়া সকলের মনকেই নাড়া দিয়েছে।’
‘আহমদ শাহ আলমগীর সম্পর্কে আপনি কি জানেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘খুব ভাল ছেলে। মাথা যেমন ভাল, তেমনি ভাল তার লিডারশীপ কোয়ালিটি। দেশ ও মানুষের উপকার হয়, এমন সব ক্ষেত্রেই তার অগ্রণী ভূমিকা। মনে হয় কয়েক জেনারেশন পর তার মধ্যে প্রকৃত মোগল রক্ত নতুন করে জেগে উঠেছে।’
‘এবড় জনপ্রিয় ছেলের শত্রু কে হতে পারে? কারও সাথে তার এমন কোন ঘটনা ছিল যারা এটা করতে পারে?’
‘সে পড়তো অন্ধ্র প্রদেশের হায়দরাবাদে। বাড়িতে ছুটি-ছাটার সময় আসতো। তার এমন শত্রু আন্দামানে ছিল বলে মনে হয় না।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি এখন উঠতে চাই। আপনাকে আবার আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ বলে উঠে দাঁড়াল ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহ।
চলতে শুরু করেই সে আবার ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, সময় যদি পান, আমার বাসায় এলে খুব খুশি হবো।’ বলে সে তার একটি নেমকার্ড আহমদ মুসার হাতে তুলে দিয়ে আবার চলতে শুরু করল।
মনে মনে আহমদ মুসা বলল, সময় না পেলেও আপনার বাড়িতে যেতে হবে। আপনার সাথে দেখা করতে হবে বন্ধু।
এ বিষয়ে ভাবতে গিয়ে খুশি হলো আহমদ মুসা। আন্দামান গোটাটাই তার কাছে অন্ধকার ছিল। হোটেল ছাড়া কোন ঠিকানা তার জানা ছিল না। এখন তিনটি ঠিকানা তার হাতে। একটি গংগাধর তিলকের হাইস্কুল এন্ড কলেজ, দ্বিতীয়টি ইমাম ইয়াহিয়া আহমাদুল্লাহর বাড়ি এবং তৃতীয়টি নিখোঁজ আহমদ শাহ আলমগীরদের বাসার ঠিকানা। তাছাড়া সুষমা রাও সম্পর্কেও কিছু জানা গেছে। আহমদ শাহ আলমগীর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুষমা জানতে পারে।
মন প্রসন্ন হয়ে উঠল আহমদ মুসার। অনেক হালকা লাগল মনটাকে।
আবার সে দৃষ্টি ফেরাল সামনের আদিগন্ত সমুদ্রের দিকে।
আদিগন্ত সমুদ্র যেখানে আকাশের সাথে এক হয়ে গেছে, সেখানে গিয়ে তাদের সাথে একাকার হয়ে গেল আহমদ মুসার মনও।