৪০. কালাপানির আন্দামানে

চ্যাপ্টার

একটা পাহাড় শীর্ষ ঘিরে একটা পুরানো বাড়ি।
বাড়ির অধিকাংশই ভেঙে চুরে গেছে। মাঝে মাঝে কিছু অংশ জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
বাড়ির সামনে কংক্রিটের একটা স্তম্ভে সেট করা একটা মার্বেল পাথরে লেখা ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সম্পত্তি’। বাড়িটা ইন্ডিয়ান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের একটা সম্পত্তি।
নিচ থেকে একটা পাথুরে রাস্তা এঁকে বেঁকে উপরে উঠে গেছে। তারপর রাস্তাটা বাড়ির বাইরের প্রান্ত দিয়ে বাড়িটাকে চারদিক থেকে সার্কুলার রাস্তা তৈরি করেছে। এই সার্কুলার রাস্তা থেকে অনেক শাখারাস্তা ঢুকে গেছে সার্কুলার বাড়িটার ভেতরে।
বাড়ির মতই রাস্তাগুলোও প্রায় নিশ্চিহ্ন।
সেই নিশ্চিহ্ন রাস্তা দিয়ে গংগারামকে চারজন লোক চ্যাংদোলা করে উপরে তুলছে।
গংগারামকে নিয়ে তারা ভাঙা বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করল। গলিপথ ঘুরে তারা গিয়ে পৌছল সুসজ্জিত একটা ঘরে। ঘরের দরজার পাশে একটা ছোট্ট সাইন-বোর্ড। তাতে লেখা ‘মোবাইল অফিস, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন।’
গংগারামকে নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করে আরও কয়েকটি ঘর পেরিয়ে এক অন্ধকার করিডোর দিয়ে এগিয়ে একটা অনুজ্জ্বল সিঁড়ি পথে নিচে নামল।
আন্ডারগ্রাউন্ডেও অনেক কক্ষ।
একটা বড় ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল ওরা চারজন গংগারামকে নিয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে ওরা গংগারামকে ছুড়ে দিল ঘরের মাঝখানে।
আলোকজ্জ্বল ঘর।
ঘরের মেঝে পাথরের, দেয়ালও পাথরের। ছাদটা চুন-শুরকিরই হবে।
ঘরে মাত্র তিনটি চেয়ার। দুটি হাতাছাড়া কুশন চেয়ার, আর একটা হাতাওয়ালা বিরাট কুশন চেয়ার।
হাতলহীন দুচেয়ারের উপর বসে আছে মুষ্টিযোদ্ধার মত মেদহীন পেশীবহুল দুযুবক। তাদের সামনেই গিয়ে পড়ল গংগারামের দেহ।
সংগে সংগেই যুবক দুজনের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘ব্রাভো, ব্রক্ষশ্রী শালাকে নিয়ে এসেছিস!’
‘জয়রাম স্যার। শয়তানকে বাড়িতেই পেয়েছি।’
‘স্বামীজী এতক্ষণ পৌছার কথা!’ বলল চেয়ারে বসা অন্যজন।
‘এর চেয়ে সোজাসুজি ‘রশ দ্বীপে’ নিলেই বোধ হয় ভাল হতো।’ বলল চেয়ারে বসা প্রথম জন।
‘না দেবানন্দ, ওখানে তো এক শয়তানকে রাখা হয়েছে। সবাইকে ওখানে জড়ো করা ঠিক হবে না। বরং আমি মনে করি, শয়তানদের জন্যে এটাই আসল জায়গা। এখানে বৃটিশরা রক্তপান করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের, আর আমরা রক্তের স্বাদ নেব শয়তান নেড়েদের।’ চেয়ারের দ্বিতীয়জন বলল।
‘ঠিক বলেছ নটবর, ইংরেজ বেনিয়াদের এই জল্লাদখানা হবে আমাদের শুদ্ধি অভিযানের জল্লাদখানা। কিন্তু সরকারের কি করবে? তাদের কারণে তো আমরা নিরাপদে অগ্রসর হতে পারছি না।’ বলল দেবানন্দ নামের লোকটি।
নটবরের চোখ পড়েছে গংগারামের উপর। দেখল,গংগারাম গোগ্রাসে গিলছে তাদের কথা। নটবর গংগারামের মুখে জোরে এক লাথি বসিয়ে বলল, ‘হারামজাদা কি শুনছিস। কোন লাভ হবে না। এটা যমালয়, এখান থেকে কেউ ফেরত যায় না।’
লাথিটা লেগেছিল গংগারামের ঠোঁটে। ঠোঁট ফেটে গল গল করে রক্ত বেরিয়ে এল।
গংগারাম কোন কথা বলল না। বলেও লাভ নেই জানে। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করল, আহমদ মুসা যেন এদের হাতে ধরা না পড়ে। সে নিশ্চিত যে, আন্দামানে এ পর্যন্তকার সকল অপঘাত মৃত্যু বা খুনের জন্যে এরাই দায়ী।
একজন ছুটে এসে ঘরে প্রবেশ করল। মহাগুরু স্বামীজী আসছেন।
দুজন তড়াক করে উঠে দাঁড়াল।
মাথা উঁচিয়ে বুক টান করে ৬ ফুট লম্বা, ফর্সা কিন্তু অসুর চেহারার গৈরিক বসনপরা কপালে তিলকআঁকা একজন লোক লম্বা পদক্ষেপে ঘরে প্রবেশ করল। তার হাতে সাতফুট লম্বা লাঠি। আগাগোড়া পিতল বাঁধানো।
উঠে দাঁড়ানো দেবানন্দ ও নটবর জোড় করে আভূমি নত হয়ে কুর্নিশ করল লোকটিকে। লোকটি এসে বসল বড় আর্ম চেয়ারটায়।
এই লোকটিই গোপন ‘শিবাজী ব্রিগেড’ এর দ্বিতীয় শক্তিধর নেতা মহাগুরু স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনি। ‘শিবাজী ব্রিগেড’ নামক গোপন দলটি গোটা উপমহাদেশে কাজ করার লক্ষ্যে তৈরি। তবে প্রথম কাজ শুরু করেছে তারা আন্দামান থেকে। আন্দামানের বিচ্ছিন্নতা, নির্জনতা তাদের জন্যে খুবই উপযোগী।
মহাগুরু স্বামীজী বসেই নটবর ও দেবানন্দকে লক্ষ্য করে বলল, ‘সোমনাথ শম্ভুজী আসবেন না। তাকে বারণ করেছি আসতে। তাকেও দুই মা-বেটি ও সেই খুনি শয়তানের খোঁজে লাগতে বলেছি। পুলিশও সাহায্য করবে। যে কোন মূল্যে তাদের চাই। খুনিটা সম্পর্কে তোমরা কিছু জানতে পেরেছ? এ কিছু বলেছে?’
গংগারামকে দেখিয়ে শেষ প্রশ্নটা করে কথা শেষ করল মহাগুরু স্বামীজী।
‘স্বামীজী, একে এইমাত্র আনা হলো। আমরা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। কোন জিজ্ঞাসাবাদ করিনি।’ বলল দেবানন্দ মাথা ঝুঁকিয়ে।
‘এইমাত্র মানে? নিচে এসেছে আধাঘণ্টা আগে, আর এখানে এসেছে পনের মিনিট আগে।’ বলল মহাগুরু স্বামীজী।
দেবানন্দ ও নটবর দুজনেরই মুখ চুপসে গেল। তারা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মহাগুরু স্বামীজী ঘুরে দাঁড়িয়েছে গংগারামের দিকে। বলল, ‘তোর নাম কি?’ জল্লাদের নিরস ও ধারাল কণ্ঠস্বর।
‘গংগারাম।’ গংগারাম বলল।
চোখ দুটি জ্বলে উঠল স্বামীজীর। বলল, ‘ব্যাটা ম্লেচ্ছ, যবন, আমাদের গংগা ও রাম দুপবিত্র নামকেই অপবিত্র করেছিস।’
বলে স্বামীজী তার হাতের লাঠির শেষ মাথাটা গায়ে চেপে ধরে বলল, ‘হারামজাদা, আমরা সব জেনে ফেলেছি। তুই তোর মুখেই নামটা বল।’
লাঠির শেষ মাথাটা গংগারামের গায়ে চেপে ধরার সাথে লাঠির মাথার একটা অংশ স্প্রিং-এর মত সংকুচিত হয়েছিল আর তার ফলে বেরিয়ে এসেছিল একটা পিন। পিনটা গংগারামের দেহ স্পর্শ করার সাথে সাথে গংগারাম বুক ফাটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিল।
পিনটি ছিল বিদ্যুততাড়িত। পিন গংগারামের দেহ স্পর্শ করার সাথে সাথে বিদ্যুত গিয়ে তাকে ছোবল হেনেছিল। অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েছিল গংগারাম। বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছিল তার দুচোখ।
লাঠি সরিয়ে নিয়ে মহাগুরু স্বামীজী বলল, ‘মিথ্যা বলার কি শাস্তি তা সামান্য টের পেলি। অতএব সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিবি। বল এবার তোর নামটা।’
‘গাজী গোলাম কাদের।’ বলল গংগারাম।
‘নাম পাল্টেছিলি কেন?’
‘কাজ ও চাকুরী-বাকরীর সুবিধার জন্যে।’
‘তুই মোপলা গোষ্ঠীর?’
‘হ্যাঁ।’
‘মোপলা যুবকরা মেন মরছে জানিস?’
‘না।’
‘তারা সব কাজে খুব সাহস দেখায়। তারা ভাবে, তাদের মত সাহসী ও শক্তিমান জাতি ভারতে নেই। সাহসী হওয়ার শাস্তি তারা পাচ্ছে। সুতরাং তুই সাহস দেখাবি না। এবার বল, গতকাল তুই আহমদ আলমগীরের বাড়ি গিয়েছিলি দুজন যাত্রী নিয়ে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ঐ যাত্রী এবং আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে গাড়িটা তুই পাঠিয়ে দিয়েছিলি, তাই না?’
‘না। আমার গাড়ি রেখে আমি নাস্তা করতে গেলে আমার গাড়ি হারিয়ে যায়। আমি থানায় মামলা করেছি।’
‘মিথ্যা কথা বলবি না। তুই তোর গাড়িতে ওদের পাঠিয়ে অন্য গাড়িতে করে হোটেল সাহারা পর্যন্ত ফিরেছিলি। আর ওরা তোর গাড়ি ধ্বংস হবার পর আমাদের যে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে আসে, সেই গাড়ি তুই হোটেল থেকে নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ার বাসষ্ট্যান্ডে রেখে আসিস। তার অর্থ তুই ঐ যাত্রীকে চিনিস এবং আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে এনে কোথায় রাখা হয়েছে তাও তুই জানিস।’ বলল চিৎকার করে মহাগুরু স্বামীজী।
ভয়ে চুপসে গেল গংগারাম। সে ভেবে পেল না এরা এত কথা এত তাড়াতাড়ি জানতে পারল কি করে! সে ভয়জড়িত কম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘আমি ওদের জানি না। আমি ওদের ভাড়ায় নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে গাড়ি ওদের ভাড়া দিয়েছিলাম। পরে ‘মামলা করলে আমি বাঁচতে পারব’-ওদের এই কথায় আমি মামলা করি। আমি ঐ সময় ওদের সাথে থাকাকালে ওদের নামও শুনিনি।’
মাহগুরু স্বামীজীর লাঠি আবার স্পর্শ করল গংগারামের দেহ। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল দেহ, সেই সাথে গলা ফাটানো চিৎকার। দেহটা ধনুকের মত বেঁকে গিয়ে কুঁকড়ে গেল অসহ্য যন্ত্রণায়। যন্ত্রণাটা মূর্তিমান হয়ে উঠেছে তার বিকৃত হয়ে যাওয়া চোখে-মুখে।
লাঠি সরিয়ে নিল স্বামীজী।
যন্ত্রণার নাচন থেমে গেল গংগারামের দেহের। নেতিয়ে পড়ল তার দেহ। হাঁপাচ্ছে গংগারাম।
‘বল, ঐ যাত্রী দুজন কে? কোথায় রাখা হয়েছে আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে।’ হুংকার দিয়ে বলল স্বামীজী গংগারামকে।
গংগারাম ভাবল, কথা না বললে এখনই নেমে আসবে আগের সেই নির্যাতন। কথা বলে তা হয়তো কিঞ্চিত ঠেকিয়ে রাখা যাবে। এই চিন্তা করেই সে ধীরে ধীরে বলল, ‘তাহলে আহমদ আলমগীরকে তোমরাই কি কিডন্যাপ করেছ কিংবা হত্যা করেছ?’
‘হত্যা করিনি, হত্যা করব। সে একটি সোনার হাঁস। তার ভেতরে সোনার ডিম আছে। সে ডিম পাওয়া হয়ে গেলেই তার দিন শেষ হয়ে যাবে।’
‘স্বামীজী, মানুষের ভেতর সোনার ডিম থাকে না।’
‘কিন্তু তার কাছে কোটি কোটি সোনার ডিমের চেয়েও মূল্যবান জিনিস রয়েছে। সেটা আমরা পেতে চাই। মারাঠী কন্যারা আমাদের কাছে স্বর্গের দেবী। সেই দেবীর উপর চোখ দেয়ার পরও আহমদ আলমগীর এখনও বেঁচে আছে ঐ সোনার ডিমের কারণেই।’
কথা শেষ করেই স্বামীজী তার লাঠি গংগারামের দিকে তাক করে বলল, ‘আমার জিজ্ঞাসার জবাব দাও গংগারাম।’ তার কণ্ঠে নিষ্ঠুর এক গর্জন।
ভীত কণ্ঠে গংগারাম বলল, ‘তারা এখন কোথায় জানি না। এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই স্যার।’
চোখ দুটি আবার জ্বলে উঠল স্বামীজীর। সে লাঠির বাঁট টেনে একটা লম্বা তরবারি বের করল। তরবারির শীর্ষ সুচাগ্রের মত তীক্ষè।
উঠে দাঁড়াল স্বামীজী।
একটানে ছিঁড়ে ফেলল গংগারামের জামা। তারপর তরবারির আগা গংগারামের বুকে ঠেকিয়ে বলল, ‘তরবারির মাথা তোর বুকে কিছু কাজ করবে। নড়া-চড়া করলে কিন্তু বুকে ঢুকে যাবে বেমালুম।’
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তরবারির আগা কাজ শুরু করে দিয়েছে। তার সাথে আর্তনাদ করতে শুরু করেছে গংগারামের কণ্ঠ। নড়ে-চড়ে ব্যথা লাঘব করার তার কোন উপায় নেই। সত্যি দেহটা একটু উপরে উঠলে, বুকটা এদিক-ওদিক নড়লেই তরবারির তীক্ষè ফলা ঢুকে যাবে বুকে। জোরে শ্বাস নিতেও ভয় করছে গংগারামের। জোরে আর্তনাদ করতে গিয়ে কয়েকবার ঘা খেয়েছে তরবারির তীক্ষè ফলার।
আর চিৎকার করছে না গংগারাম। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে শুধুই আল্লাহকে ডাকছে।
বেদনায় বুক ফেটে যাচ্ছে তার।
লাঙ্গল যেমন জমির বুক চিরে এগিয়ে যায়, তরবারির ফলা তেমনি গঙ্গারামের বুকের চামড়া চিরে সামনে অগ্রসর হচ্ছে অবিরাম গতিতে।
অসহ্য বেদনায় গংগারামের একেকবার মনে হচ্ছে তরবারিটাকে বুকের ভেতরে টেনে নিয়ে সব যন্ত্রণার ইতি ঘটায়। কিন্তু একদিকে আল্লাহর ভয়, অন্যদিকে আহমদ মুসার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠে বাঁচার প্রেরণা যোগাচ্ছে।
রক্তে বুক ভেসে যাচ্ছে গংগারামের।
মহাগুরু স্বামীজী মহাউল্লাসে বলল, ‘গাজী মিঞা, পরাজিত হয়ে যমালয়ে গেলেও একটা উপকার তোমার হবে। তোমার বুকে শিবের যে ত্রিশুল উৎকীর্ণ করে দিচ্ছি, তা তোমাকে অনেকখানি রক্ষা করবে।’
গংগারামের বুকের উপর তখনও চলছে স্বামীজীর তরবারির অগ্রভাগ লাঙ্গলের মত।
অসহ্য যন্ত্রণায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে গংগারাম।
ত্রিশুল আঁকা বন্ধ করে গংগারামের সংজ্ঞাহীন দেহে একটা লাথি মেরে বলল, ‘দেবানন্দ, এর সংজ্ঞা ফিরিয়ে আন। হারামজাদা সবই জানে, কথা আদায় করতেই হবে তার কাছ থেকে।’
দেবানন্দ এক গ্লাস ঠা-া পানি নিয়ে ছুটে এল। আর নটবর গংগারামের পায়ের কাছে বসে কলমের বল পয়েন্ট-এর অগ্রভাগ দিয়ে পায়ে খোঁচা দিতে লাগল।
‘সামান্য এক ড্রাইভারের বুক দেখি হাতির চেয়েও শক্ত। কথা বলানো গেল না।’ বলল স্বামীজী।
‘তাহলে কি গংগারামের কথাই সত্য যে, সে দুজন যাত্রীকে লিফট দিয়েছিল এবং গাড়ি দিয়েছিল মাত্র, সে তাদেরকে চেনে না?’ বলল নটবর।
‘কখনও না। অবশ্যই চেনে। গংগারাম শুধু গাড়িই ঐ যাত্রীদের দিয়েছিল তা নয়। এই কিছুক্ষণ আগে পুলিশ সূত্রে জেনেছি, গংগারামের ক্যাবে করে একজন যাত্রী আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারে আসছিল। অন্যদিকে গংগারাম একটা পিকআপে করে আহমদ আলমগীরের মা-বোনদের লাগেজ নিয়ে হোটেল সাহারায় পৌছে দেয়। একথা পিকআপটির ড্রাইভার পুলিশকে জানিয়েছে। পিকআপটির ভাড়া গংগারামই পরিশোধ করে। সুতরাং গংগারাম কোন কথাই সত্য বলছে না। সে সবই জানে।’
তিন চার মিনিটের মধ্যেই চোখ খুলল গংগারাম।
মহাগুরু স্বামীজী তার লাঠির আগা দিয়ে একটা জোরে খোঁচা দিল গংগারামকে।
বিদ্যুত একটা প্রচ- ছোবল দিল গংগারামের দেহে। লাফিয়ে উঠল গংগারামের দেহ। চিৎকার বেরিয়ে এল গংগারামের মুখ থেকে।
খোঁচা দিয়েই লাঠি সরিয়ে নিয়েছে স্বামীজী।
মুহূর্ত পরেই গংগারামের দেহ আবার স্থির হয়ে গেল।
ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে গংগারাম।
হেসে উঠল স্বামীজী। বলল, ‘তোমাদের কোরানে একটা কথা আছে যে, দোজখীদের উপর শাস্তি এমন ভয়ংকর হবে যে, তাদের বাঁচার কোন অবস্থা থাকবে না, আবার তাদের মরতেও দেয়া হবে না।’ মনে কর গংগারাম, এটাও এক দোজখখানা। তুমি যতক্ষণ মুখ না খুলছ, সব না বলছ, ততক্ষণ ঐ দোজখীদের মতই তোমার হাল করা হবে।’
বলে স্বামীজী তাকাল দেবানন্দের দিকে। বলল, ‘ত্রিশুলটা পরে আকব। রক্ত শুকিয়ে নিক। যাও আগুন থেকে একটা শিক নিয়ে এসো। বিদ্যুত-চর্চা কিছু সময় হয়েছে। এবার ওর দেহের উপর কিছুক্ষণ আগুন চর্চা করে নেই।’
ছুটল দেবানন্দ। আধা মিনিটের মধ্যেই জ্বলন্ত একটা লোহার শিক নিয়ে এল। শিকের মাথাটায় গনগনে লাল আগুন।
স্বামীজী শিকটাকে গংগারামের দিকে তাক করে এগুলো তার দিকে। গংগারাম চিৎকার করে চোখ বন্ধ করল।

আন্দামানের গভর্নল বালাজী বাজী রাও মাধব এর সরকারী বাসভবনের প্রাইভেট উইং-এর ড্রইংরুম।
আহমদ মুসা দেখা করতে এসেছে সুষমা রাও এর সাথে।
একজন পুলিশ তাকে এ ড্রইংরুমে পৌছে দিয়ে গেছে।
আহমদ মুসার অনুরোধে সুষমা রাও-এর সাথে তার এই সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পোর্ট ব্লেয়ারের ‘ব্লেয়ার মেমোরিয়াল হাইস্কুল এন্ড কলেজ’ এর প্রধান বলি গংগাধর তিলক। আন্দামানে আসার পথে জাহাজে আহমদ মুসার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল। সেই পরিচয়ের সূত্রে আহমদ মুসাকে সে এই সাহায্য করেছে।
সুষমা রাও পোর্ট ব্লেয়ার কলেজ থেকে ডিগ্রী পাশ করেছে। তাছাড়া সে হায়দরাবাদে ভর্তির আগে বলি গংগাধর তিলক তাকে কোচিং দিয়েছে। সুষমা রাওকে বলি গংগাধর তিলক বলেছিল বেভান বার্গম্যান নামে একজনকে আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে পাঠাতে চাই একটা বিষয়ে আলোচনার জন্যে। সুষমা ওয়েলকাম করেছিল তার স্যারের এই অনুরোধকে।
ভেতরের দরজা সামনে রেখে উত্তরমূখী একটা সোফায় বসে অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে দরজা দিয়ে প্রবেশ করল সুষমা রাও। প্রতিভাদীপ্ত এক সুন্দর তরুণী। হলুদ বরণ কন্যার গায়ে হলুদাভ সাদা সালোয়ার ও ফুলহাতা কামিজ। গলার দুপাশ দিয়ে সামনে একই রংয়ের ওড়না ঝুলানো। শালীন পোশাক। খুশি হলো আহমদ মুসা।
ঘরে ঢুকেই মেয়েটি হাসল। স্বচ্ছ হাসি। কিন্তু হাসির মধ্যেও কোথাও যেন এক টুকরো বেদনা জড়ানো। মুখ ভরা অপরূপ লাবণ্যের অন্তরালে বিষণ্ণতার একটা মেঘও যেন লুকিয়ে আছে।
‘আমি সুষমা রাও। স্যরি স্যার। আমার একটু দেরি হয়ে গেছে আসতে। আমি দুঃখিত।’ ঘরে ঢুকেই মেয়েটি বলল। দুহাত জোড় করে উপরে তুলে ‘নমষ্কার’ করল এবং তার সাথে বলল এ কথাগুলো।
বাঁ দিকে সোফায় আহমদ মুসার মুখোমুখি সে বসল।
সাথে সাথেই প্রায় নাস্তা প্রবেশ করল।
মেয়েটি নিজ হাতে আহমদ মুসাকে নাস্তা ও চা এগিয়ে দিল।
মেয়েটিও নাস্তা নিল। খেতে খেতে বলল, ‘স্যার নিশ্চয় আমাদের প্রিন্সিপাল স্যারের কলিগ। কতদিন আপনি এখানে? আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হয় একজন সৈনিক, শিক্ষক নয়।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সৈনিক! শিক্ষক নয় কেন?’
‘আমার মতে শিক্ষকরা প্রতিদিনই শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করে। তার ফলে তাদের মনে ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড (mission accomplished) মানে ‘লক্ষ্যে পৌছে গেছি’ ধরনের তৃপ্তির প্রতিচ্ছবি সাধারণ ভাবে তাদের মধ্যে প্রকাশ পায়। কিন্তু একজন সৈনিক সব সময় মনে করে তার কাজ সামনে। দেশের জন্যে, জাতির জন্যে দায়িত্ব পালনের তার মহাসন্ধিক্ষণটি এখনও আসেনি। সুতরাং একজন সত্যিকার সৈনিকের মধ্যে একটা ভিশনকে সব সময় জীবন্ত দেখা যায়।’ বলল সুষমা রাও।
‘আপনি তো সাইকোলজির ছাত্রী নন, আর্টের ছাত্রী। কিন্তু কথা বলছেন সাইকোলজির ছাত্রীর মত।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি যে শিক্ষক নন তার আর একটা প্রমাণ আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করেছেন। প্লিজ আমাকে ‘তুমি’ বলুন।’
‘কেন শিক্ষকরা ‘আপনি’ বলে না?’
‘বলেন স্যার। কিন্তু ছাত্রী না হলেও ছাত্রী পর্যায়ের সবাইকেই তারা সাধারণভাবে ‘তুমি’ বলে থাকে। যেমন আমি ব্লেয়ার কলেজ এর ছাত্রী। ঐ স্কুল কলেজের কোন শিক্ষকই আমাকে ‘আপনি’ বলবেন না।’ বলল সুষমা রাও।
একটু থেমে পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, ‘স্যার, আপনার কথা এখনও বলেননি। আমার প্রশ্নের জবাব দেননি।’
নাস্তা হয়ে গিয়েছিল।
সুষমা রাও চা তৈরি করে আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল।
বেয়ারা নাস্তার ট্রে সরিয়ে নিয়ে গেল।
আহমদ মুসার চায়ের কাপটি টি-টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। গাম্ভীর্য নেমে এসেছে তার মুখে। বলল আহমদ মুসা, ‘ধন্য সুষমা, ‘তুমি’ সম্বোধনের অনুমতি দিয়ে শিক্ষকের মত ঘনিষ্ঠ হবর সুযোগ দেয়ার জন্যে। আসলে আমি ব্লেয়ার স্কুল কিংবা কলেজের শিক্ষক নই। সম্মানিত অধ্যক্ষ গংগাধর তিলকের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত হয় তিন চারদিন আগে মাদ্রাজ থেকে আন্দামান আসার পথে জাহাজে। তিনি আমার অনুরোধে তোমার সাথে এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি দুঃখিত, এই কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে উপায় ছিল না।’
থামল আহমদ মুসা।
ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠেছে সুষমার। তার চোখে বিস্ময় ও কৌতুহল দুইই। তার পরিপূর্ণ দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের উপর। বলল সে ধীরে ধীরে, ‘আমি বিস্মিত হয়েছি বটে, কিন্তু আপনার দুঃখিত হবার মত অন্যায় কিছু ঘটেনি বলে আমি মনে করি। প্রিন্সিপাল স্যর কোন কল্যাণ কামনা ছাড়া এই কৌশলের আশ্রয় নেননি। আর আমার বড় ভাই নেই, থাকলে তাঁর দৃষ্টি আমার মনে হয় আপনার মতই হতো।’
‘ধন্যবাদ সুষমা, অনেক বড় আসন আমাকে দিয়েছ। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা একটু থামল। গাম্ভীর্য আর একটু গাঢ় হলো তার চোখে-মুখে। কথা বলে উঠল আবার, ‘আমি আসলে বেভান বার্গম্যান নই। আমি আহমদ শাহ আলমগীরের শুভাকাক্সক্ষী। তাঁর খোজ নেবার জন্যেই আমি এসেছি আমেরিকা থেকে। আমি আহমদ মুসা।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার সাথে সাথেই সুষমা রাও যন্ত্রচালিতের মত উঠে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে সীমাহীন বিস্ময়, তার সাথে আনন্দও।
পরক্ষণেই যে যন্ত্রচালিতের মত ধীরে ধীরে বসে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর চোখ খুলে বলল, ‘দেখুন, আমার সবই স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আহমদ শাহ আলমগীরের শুভাকাক্সক্ষী কেউ আমার এখানে আসবেন, কিন্তু তিনি আহমদ মুসা হবেন কি করে? আমি যে আমার চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না!’
‘তুমি কি আহমদ মুসাকে জান?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘খবরের কাগজে কিছু পড়েছি। আর মাঝে মাঝে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে গল্প শুনেছি। তার কাছে আহমদ মুসা বিশ্ব থিয়েটারের মহানায়ক। আর আমি মনে করে বসে আছি তিনি রবিনহুড ও জেমসবন্ডের এক সমন্বয়।’ বলল সুষমা রাও।
‘কল্পনা কল্পনাই। এস বাস্তবে আসি। অনেক কথা আছে।’
‘কিন্তু তার আগে বলুন, আমেরিকা থেকে আহমদ শাহ আলমগীরের কথা জানলেন কি করে? আর তার শুভাকাক্সক্ষী হয়ে আমার কাছে কেন?’
‘একটা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা গোটা বিষয় আমাকে ই-মেইল করে জানিয়েছে। তার মধ্যে তোমার কথাও ছিল।’
‘আমার কথাও ছিল? কি ছিল?’
‘আহমদ শাহ আলমগীরের নিখোঁজ হওয়ার সাথে গভর্নর বালাজী বাজী রাও মাধবের মেয়ে সুষমার সাথে তার সম্পর্কও একটা কারণ হতে পারে।’
মলিন হয়ে গেল সুষমা রাও এর মুখ। দুহাতে মুখ ঢেকে হাঁটুতে মুখ গুঁজল সে।
‘স্যরি সুষমা।’
সুষমা মুখ তুলল। অশ্রুতে ধুয়ে গেছে তার দুগ-।
‘স্যরি ভাইয়া। ঠিকই বলেছে ওরা, কিন্তু সরকার মানে আমার বাবা এর সাথে জড়িত আছে বলে আমার মনে হয় না। আমি বাবার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেছি।’
‘আমারও তাই মনে হয় সুষমা। আন্দামানে গত অল্প কিছুদিনের মধ্যে প্রায় তিন ডজন মানুষের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মৃত প্রায় সবাই মোপালা মুসলিম যুবক। আমার মনে হয় যারা এই মৃত্যুর জন্যে দায়ী তারাই আহমদ শাহ আলমগীরের নিখোঁজ হওয়ার সাথে জড়িত থাকতে পারে।’
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুষমার। বলল, ‘আমার আব্বাও মনে করেন বিপজ্জ্বনক বড় একটা চক্র এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকতে পারে।’
‘কারা এই চক্র?’ অনেকটা স্বগতোক্তির মত এই কথা বলে আহমদ মুসা গত তিন দিনের সব ঘটনা একে একে সুষমাকে বলল।
ভয়-আতংকে চুপসে গেছে সুষমা রাওয়ের মুখ। আর্তকণ্ঠে বলল, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের পরিবারের উপরও আজ এত বিপদ! তাই তো কাল বিকেল থেকে টেলিফোনে পাচ্ছি না।’
একটু থামল সুষমা রুদ্ধ হয়ে আসা কণ্ঠ সামলে নেবার জন্যে। বলে উঠল সে আবার, ‘আপনি আন্দামানে পা দেবার আগে থেকেই ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে এবং তিন দিনে এতসব সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে আপনাকে কেন্দ্র করে? তার মানে সেই চক্র আপনার সন্ধান পেয়েছে। এবং এর অর্থ আপনিও তাদের সন্ধান পেয়েছেন। অথচ এ পর্যন্ত এক ইঞ্চিও এগুতে পারেননি।’ বিস্ময়, আনন্দ ও কান্নার সমন্বয়ে কথাগুলো বলল সুষমা রাও।
‘ওরা আমাকে চিনতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তবে আমাকে টার্গেট করেছে আমি ওদের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু ওদের কোন পরিচয় সন্ধান এখনো পাইনি। ওদের কাউকেই আমি জীবিত হাতে পাইনি। তাই আমি সামনে এগুতে পারছি না।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই তার মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইল তুলে নিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে হোটেল সাহারার মালিক হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর কণ্ঠ শুনতে পেল। বলল ওপার থেকে, ‘বেভান, গংগারাম কিডন্যাপ হয়েছে।’
চমকে উঠল আহমদ মুসা। দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘কখন কোত্থেকে কিডন্যাপ হয়েছে?’
‘গত রাতে। বাসা থেকে। শোন, তুমি সুষমার সাক্ষাত পেয়েছ?’
‘পেয়েছি। তার সাথে কথা বলছি।’
‘ঠিক আছে কথা শেষ করে তাড়াতাড়ি এস। পরিস্থিতি মনে হয় জটিল হয়ে উঠছে। শোন, তোমার সব কথাই আমি গংগারামের মাধ্যমে জানি।’
‘ঠিক আছে জনাব। আমি সব বুঝেছি। আমি এমনটাই অনুমান করেছিলাম। এত দুঃসংবাদের মধ্যেও এদিকটা আমার কাছে আনন্দের যে, আমি একজন অভিভাবক পেলাম।’
‘উল্টো কথা বলো না যুবক। তোমাকে তো আমাদের সবার অভিভাবক করেই আল্লাহ আন্দামানে পাঠিয়েছেন। ছেলের মত তাই ‘তুমি’ বলেছি তোমাকে। আমাকে মাফ করো। আর কথা নয়। তুমি তাড়াতাড়ি এস।’
‘জি জনাব।’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
এক রাজ্যের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে ছিল সুষমা আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা কথা শেষ করতেই সুষমা বলে উঠল, ‘কে কিডন্যাপ হয়েছে ভাইয়া?’
‘গংগারাম নামের একজন ক্যাব ড্রাইভার। আন্দামানে সেই ছিল আমার গাইড, সাথী, সাহায্যকারী সব। তার আসল নাম গাজী গোলাম কাদের। সেও একজন মোপালা যুবক। মনে হয় আমার সন্ধান পাবার জন্যেই তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। এর অর্থ সে ভয়ংকর এক বিপদের মধ্যে পড়েছে।’ আহমদ মুসার কণ্ঠে বেদনার ছাপ।
‘কারা এই শয়তান? কেন তারা এসব করছে? আমিই কি এর জন্যে দায়ী? আলমগীরকে ভালবাসা যদি আমার অপরাধ হয়, তাহলে এজন্যে মাত্র আমিই অপরাধী। আমাকে শাস্তি তারা দিতে পারে। আলমগীর কিংবা সবাইকে এর সাথে জড়ানো হচ্ছে কেন?’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বলল সুষমা।
‘না সুষমা, তুমি এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু নও। আহমদ শাহ আলমগীর কিডন্যঅপ হওয়ার অনেক আগে ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে। আলমগীর যখন কিডন্যাপ হয়, তার আগেই আড়াই ডজন মানুষের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে। সুতরাং তোমার বিষয়টা এখানে গৌণ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে মুখ্য এখানে কোন বিষয়টা। আসলে কারা ওরা?’
‘সেটাই এখনকার প্রশ্ন সুষমা। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার ক্ষেত্রে তুমি কোন সহযোগিতা করতে পার কিনা, এ জন্যেই আমি তোমার কাছে এসেছি।’
সংগে সংগে কোন উত্তর দিল না সুষমা রাও। ভাবছিল সে।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলল। সে বলল, ‘আহমদ আলমগীর সম্পর্কে তোমাকে কোন দিন কিছু বলেছে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে থেকে অথবা অন্য কেউ?’
‘সেটাই ভাবছি। আমার ও আহমদ আলমগীরের ব্যাপারটা ঠিক কেউ জানতো না। সুতরাং কেউ কিছু বলার কথা নয়। একটা ঘটনার কথাই মনে পড়ে। তিন চার মাস আগের ঘটনা। প্লেনে আসছিলাম হায়দরাবাদ থেকে আন্দামানে। আমি ও আলমগীর পাশা-পাশি বসেছিলাম। পোর্ট ব্লেয়ার পৌছার পর লাগেজ কর্নারে আমি অপেক্ষা করছিলাম। আলমগীর তার লাগেজ নিয়ে এগুচ্ছিল চেকিং কাউন্টারের দিকে।
একজন লোক আমার পাশে এসে দাঁড়াল। মাঝ বয়সী। বলল, ‘মা, আমি সোমনাথ শম্ভুজী, মারাঠী। তোমাদের পরিবার ও আমাদের পরিবার একই এলাকার। তোমাদের ‘পেশোয়া’ পরিবার আমাদের সকলের গৌরবের বস্তু। সেই জন্যেই একটা কথা বলছি, আলমগীর ছেলেটির সাথে মেশা তোমার উচিত নয়। একদিকে সে শত্রু ধর্মের, অন্যদিকে সে শত্রু পরিবারের। সে সাপের বাচ্চা সাপই হবে। বলেই সে পিঠ চাপড়ে চলে যায়। আমি………….।’
সুষমা রাওকে বাধা দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘কি নাম বললে? সোমনাথ শম্ভুজী?’
‘হ্যাঁ। কেন এই নামের কাউকে চেনেন?’
‘চিনি না। তবে এই নামের একজন লোক আমাদের হোটেলে থাকে। আমার কক্ষের দরজায় সে একদিন এসেছিল। একথা আমাকে গংগারাম বলেছে।’
‘আপনার কক্ষের দরজায়? কেন?’
‘জানি না। বিষয়টাকে আমি তখন গুরুত্ব দেইনি।’
‘শুনুন। যেহেতু সোমনাথ শম্ভুজী বলেছিল সে আমাদের এলাকার লোক, আমাদের পরিবারকে ভালবাসে, তাই আব্বাকে তার ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি সোমনাথ শম্ভুজীকে চেনেন। আব্বা বলেছেন, শম্ভুজী একটা চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য। ওদের উদ্দেশ্য সফল হলে ভারতে শুধু গণতন্ত্র নয়, সত্যিকার মানুষ ও মানবতাও থাকবে না। যেমন…………।’
‘থাক সুষমা, আর প্রয়োজন নেই। আমার বুঝা যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এই সোমনাথ শম্ভূজীরাই আলমগীরের কিডন্যাপ এবং সব হত্যাকা-ের পেছনে রয়েছে।’ সুষমা রাওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল আহমদ মুসা।
বিস্ময় ফুটে উঠল সুষমা রাওয়ের চোখে-মুখে। বলল, ‘তিনি কোন চরমপন্থী দলের সদস্য বলেই কি এ কথা বলছেন?’
‘এর সাথে আমার দরজায় আড়ি পাতার ব্যাপারটাকে যোগ কর।’
‘বুঝতে পারছি না আপনার ওখানে আড়ি পাতবে কেন? আপনি তো বেভান বার্গম্যান, একজন আমেরিকান।’
‘কিন্তু আমার চেহারা তো আমেরিকান নয়। সেজন্যে সন্দেহ সে করতেই পারে। তাছাড়া হতে পারে সে হোটেলের প্রত্যেক নতুন বাসিন্দা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়ে থাকে। যেটাই হোক, এ থেকে প্রমাণ হয় এরা একটা মিশন নিয়ে কাজ করছে। একটা চরমপন্থী সংগঠনের মিশন কি হতে পারে, তা তোমার আব্বাই কিছুটা বলে দিয়েছেন যে’ ওরা সফল হলে ভারতে শুধু গণতন্ত্র নয়, সত্যিকার মানুষ ও মানবতাও থাকবে না। সোমনাথ শম্ভুজীরা আন্দামানে গণতন্ত্র, সত্যিকার মানুষ ও মানবতা নিধনেরই কাজ করছে।’
সুষমা রাও বিস্ময় বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ ভাইয়া, আপনি ঠিক ধরেছেন। কিন্তু ভাইয়া, এই রক্ত পিয়াসুরাই যদি আহমদ আলমগীরকে……….।’
কথা শেষ করতে পারলো না সুষমা। কান্নায় আটকে গেল তার কথা।
মুখে হাত চাপা দিয়ে মুখ নিচু করল সে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বলল, ‘ধৈর্য্য ধর সুষমা। আমি নিশ্চিত যে, আহমদ আলমগীর বেঁচে আছে।’
মুখ তুলল সুষমা। অশ্রু ধোয়া মুখ। চোখ দুটিও পানিতে ভরা। তার ঠোঁট দুটি কাঁপছে। কথা বলার চেষ্টা করেও পারল না। কান্না এসে কথাকে তলিয়ে দিল। আবার মুখ নিচু করল সে।
‘আমি ঠিক বলছি সুষমা, আহমদ আলমগীর বেঁচে আছে। তার বোন ও মাকে তারা কিডন্যাপের চেষ্টা করছে এটাই তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।’ শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সুষমা রাও মুখ তুলল। মুখ মুছে বলল, ‘ঈশ্বর আপনার কথা সত্য করুন ভাইয়া। কিন্তু ওঁর মা-বোনকে কিডন্যাপ করার সাথে ওঁর বেঁচে থাকার কি সম্পর্ক?’
‘আমার মনে হচ্ছে আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে তারা আহমদ আলমগীরের কাছে নিতে চায়। কেন নিতে চায় এর উত্তর একাধিক হতে পারে। আর একটি কথা হলো তারা আহমদ আলমগীরের কাছ থেকে এমন কিছু আদায় করতে চায় যা তারা পাচ্ছে না। তার উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির জন্যে তারা এখন আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে হাতের মুঠোয় নিতে চাচ্ছে।’
নতুন উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ সুষমার চোখে-মুখে। সে বলল, ‘কি পেতে চায় ওঁর কাছে। আমার কাছ থেকে সরে যাবার ওয়াদা?’
‘আমার তা মনে হয় না সুষমা। কারণ এমন ওয়াদার কোন মূল্য নেই। সুতরাং এমন অকার্যকর বিষয়ের জন্যে তারা এতবড় আয়োজন করতে পারে না।’
‘তাহলে?’ বলল সুষমা। তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও গভীর হয়েছে।
‘এটাই এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আচ্ছা সুষমা, আহমদ শাহ আলমগীর গোপন বা প্রকাশ্য কোন দল বা সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল?’
‘না, সে কোন কিছুর সাথেই জড়িত ছিল না। যাকে বলে বই পোকা সে সে ধরনেরই। তবে আহমদ শাহ আলমগীর সব ধরনের খেলা-ধুলা ও সমাজ-সেবার মত অনেক কিছুতে জড়িত ছিল। এ সবই করতো সে ব্যক্তি হিসাবে, কোন সংগঠনের সদস্য হিসাবে নয়। এমন কি কোন স্পোর্টস সংগঠনেরও সদস্য ছিল না।’ বলল সুষমা রাও।
‘তোমার অজান্তে কোন গোপন সংগঠনের সাথে তার জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তোমার মত কি?’
একটু ভাবল সুষমা রাও। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘আমরা দুজন দুজনের কাছে স্বচ্ছ আয়নার মত। দুজনের কাছে দুজনের কোন কিছুই গোপন নেই। এই অবস্থায় সে কোন কিছুর গোপন সদস্য থাকবে, এটা একেবারেই অসম্ভব।’
‘ধন্যবাদ সুষমা, আর পারিবারিক গোপন কিছু সম্পর্কে তোমার কি জানা আছে?’
আবার ভাবনায় ডুব দিল সুষমা রাও। কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে ফেরার পর সে বলল, ‘তেমন কিছু আমার মনে পড়ছে না। তবে শিবাজী ডাইনেষ্টি সম্পর্কে তার একটা কথা আমার মনে আছে। একদিন ভারতের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার সময় সে বলেছিল, ‘জান, তোমাদের শিবাজী প্রণীত তার ও পেশোয়া ডাইনেষ্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন দলিল তোমাদের হাতে নেই, সেটা আছে মোগল ডাইনেষ্টির হাতে।’ আমাদের এই ডাইনেষ্টি সংক্রান্ত কোন ব্যাপারেই আমার কোন আগ্রহ নেই। তাই বিষয়টা আমি এড়িয়ে গেছি। কিছু জিজ্ঞাসা করিনি তাঁকে এ ব্যাপারে।’
ভ্রু-কুঞ্চিত হয়েছে আহমদ মুসার। প্রবল একটা চিন্তার সয়লাব এসে তাকে আচ্ছন্ন করল। আহমদ আলমগীর শিবাজী-পেশোয়া ডাইনেষ্টির যে গোপন দলিলের কথা বলেছে সেটা কি? সে দলিলটা কি আহমদ শাহ আলমগীরের হাতে আছে? অন্যেরাও কি সেটা জানে? সুষমা কথা শেষ করতেই আহমদ মুসা বলল, ‘তুমি কি এই দলিল বিষয়ে কারো সাথে কখনও আলাপ করেছ সুষমা?’
‘না ভাইয়া, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনি জিজ্ঞাসা করায় ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেছে। আজ আপনাকেই প্রথম বললাম।’
কথা শেষ করে একটু থেমেই সুষমা আবার বলে উঠল, ‘আপনি এ দলিল নিয়ে কিছু ভাবছেন ভাইয়া? এর এখন কি গুরুত্ব আছে?’
‘সে গোপন দলিল কি আমরা জানি না। তবে শিবাজী প্রণীত তার ডাইনেষ্টির দলিল শত রাজভা-ারের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে। আর ওরা যদি জেনে থাকে সে দলিলের সন্ধান আলমগীর জানে, তাহলে সে তথ্য বের করার জন্যে তারা সবকিছুই করতে পারে।’
‘কিন্তু ওরা তা জানবে কি করে? আর ঐ দলিল আহমদ আলমগীরের কাছে থাকবে কেন?’ ভয় ও উদ্বেগ জড়িত কম্পিত কণ্ঠে বলল সুষমা রাও।
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে বড় নয় সুষমা, আর উত্তর আমাদের জানারও উপায় নেই। আমাদের ভাববার বিষয় হলো, দলিলের বিষয়টাও আহমদ আলমগীরের কিডন্যাপ হওয়ার একটা কারণ হতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে খুব বড় ঘটনা হবে এটা। কারণ গোটা ভারতের গোটা চরমপন্থী সেন্টিমেন্টকে আমরা এর সাথে জড়িত দেখতে পাব।’
মুখ শুকিয়ে চুপসে গেল সুষমা রাওয়ের। কোন কথা সে বলতে পারল না।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলে উঠল, ‘সুষমা, আমাকে এখন উঠতে হবে। আমাকে তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরতে বলা হয়েছে। মনে হচ্ছে, ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। গংগারামকে কিডন্যাপ করার অর্থ হলো, ওরা আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে হাতে পাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে।’
সুষমা তার আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। ছুটে এসে বসল আহমদ মুসার পায়ের কাছে কার্পেটের উপর। আহমদ মুসার দিকে মুখ তুলে সজল কণ্ঠে বলল, ‘ভাইয়া, আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া আহমদ আলমগীরে সাহায্যকারী আর কেউ নেই। আমার ভয়, পুলিশও তাকে পেলে মেরে ফেলবে। আব্বা মুখে কিছু না বললেও তিনি এভাবেই সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছেন। সুতরাং আপনি পুলিশ ও প্রশাসন কারও সাহায্য পাবেন না।’
বলে একটা ঢোক গিলল সুষমা রাও। তারপর বলল, ‘ভাইয়া, আমি কি আপনার কোন কাজে লাগতে পারি? আর কিছু না পারলেও ওর জন্যে জীবনটা আমি দিতে পারব।’
কান্নার দুরন্ত বেগ চাপতে চাপতে বলল সুষমা রাও।
আহমদ মুসা তার মাথায় হাত দিয়ে সান্তনার সুরে বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। আর তুমি দোয়া করলেই চলবে সুষমা।’
‘ভাইয়অ, আমি শাহ বানু ও আলমগীরের মা সাহারা বানুকে এনে রাখতে পারি না?’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জল হয়ে উঠল, ‘কোথায় রাখবে তুমি?’
‘আমাদের ফ্যামিলী উইং-এ আমার গেষ্টরুমে থাকবে। আব্বা জানতে পারবেন না। মা কিছু বলবেন না। গ্রাম থেকে আসা আত্মীয় হিসাবে থাকবেন।’
‘তোমার প্রস্তাবের জন্যে ধন্যবাদ। প্রয়োজন হলে ওদের তোমার কাছে পাঠাব, কথা দিচ্ছি সুষমা।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে হাতব্যাগটা খুলে একটা মোবাইল এবং একটা কার্ড আহমদ মুসার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, এ মোবাইলে আমার সব নাম্বার আছে। আমাকে যে কোন সময় পাবেন। আর এই কার্ডটা আমাদের ফ্যামিলী পাশ। আপনি এ পাশ নিয়ে যে কোন সময় ফ্যামিলী উইং-এর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবেন। ওঁদের স্বাগত জানানোর জন্য আমার সব কিছু প্রস্তুত থাকবে ভাইয়া।’
মোবাইল ও কার্ড পকেটে রেখে ‘ধন্যবাদ সুষমা’ বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে বিদায় দেওয়ার সময় সুষমা তার কম্পিত হাত তুলে কাতর কণ্ঠে বলল, ‘ভাইয়া, আমার মন প্রতিটা মুহূর্ত আপনার কলের জন্যে উন্মুখ থাকবে।’
‘সব ঠিক হয়ে যাবে সুষমা। আল্লাহ ভরসা।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসল।

আহমদ মুসার গাড়ি তখন পোর্ট ব্লেয়ার শহরের মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করছে।
মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রিনে দেখল হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর নাম্বার। তাড়াতাড়ি কথা বলল। আহমদ মুসার কণ্ঠ পেতেই হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ বলল, ‘তুমি কোথায়?’
‘হোটেল থেকে দুকিলোমিটার দূরে।’
‘শোন হোটেলের বাইরে ওরা অবস্থান নিয়েছে। লাউঞ্জেও ওরা আছে। পুলিশের দুজন বড় অফিসার এসেছিল। আমার মনে হয় তারাই ওদের এনেছে। পুলিশ অফিসাররা বোর্ডার সবার ফটো দেখছে এবং একজন পিকআপ-এর ড্রাইভারকে দেখিয়েছে। দুজন পুলিশ তোমার সাথে এবং শাহ বানু ও তার মায়ের সাথে দেখা করতে চায়। আমি বলেছি, এখন ওঁরা ঘরে নেই। পুলিশ অফিসার দুজন আবার আসবে বলে চলে গেছে। কিন্তু বুঝতে পারছি ওরা সবাই বসে আছে। আমার পিকআপ-এর ড্রাইভার তোমাদের চিনিয়ে দিয়েছে।’ বলল হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ।
‘জনাব, সোমনাথ শম্ভুজী কোথায়?’
জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘এখনি তোমার জানা দরকার?’
‘হ্যাঁ।’
‘ঠিক আছে, টেলিফোন ধরে রাখ।’
আধা মিনিট পরেই টেলিফোন এল আবার হাজী আবদুল আলী আব্দুল্লাহর। বলল, ‘উনি ঘরে নেই।’
‘শাহ বানু ও তার মা সাহারা বানুর খবর কি?’
‘ওঁরা ঘরে আছে। নিষেধ করেছি কোন প্রকার টেলিফোন ধরতে এবং দরজায় নক করলে সাড়া দিতে। এছাড়াও দরকার হলে পাশের ঘরে সরে যাবার ব্যবস্থা করে রেখেছি। পাশের ঘর খলি আছে।’
‘অনেক ধন্যবাদ জনাব।’
‘উল্টো কথা বলো না। ধন্যবাদ শুধুই তোমার প্রাপ্য। আল্লাহ দয়া করে তোমাকে আমাদের মধ্যে এনেছেন। শোন, এই হোটেল এবং আমার যা কিছু আছে সব তুমি তোমার মত করে ব্যবহার করতে পার।’
‘ধন্যবাদ।’
‘ধন্যবাদ নয়, এখন বল তুমি কি চিন্তা করছ।’
‘জনাব, আপনি শাহ বানুদের পাশের কক্ষে থাকুন। আমি মিনিট পনেরোর মধ্যে আসছি।’
‘কোথায়? হোটেলে?’
‘জি।’
‘কিভাবে? খবরদার তুমি এ কাজ করো না।’ আর্তনাদ করে উঠল হাজী আবদুল আলীর কণ্ঠ।
‘আল্লাহ ভরসা জনাব। ঠিক আমি পৌছে যাব। আপনি শাহ বানুদের রেডি রাখবেন। ওদের হোটেল ছাড়তে হবে।’
‘কিভাবে?’ আবার আর্তনাদ হাজী আবদুল আলীর কণ্ঠে।
‘আমি আসছি। সব বলব জনাব। আসি। আসসালামু আলাইকুম।’
ওপার থেকেও সালামের জবাব এল।
মোবাইলের কল অফ করে মনোযোগ দিল সামনের দিকে।

হোটেল সাহারা পোর্ট ব্লেয়ারের পূর্ব প্রান্তে সাগরের ধার ঘেঁষে বিরাট জায়গা জুড়ে অবস্থিত। হোটেলের সমগ্র এলাকা প্রাচীর ঘেরা। হোটেলের পূর্ব দিকে সাগর। পশ্চিম দিকে প্রাচীরের বিশাল গেট পর্যন্ত বাগান। বাগানের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া রাস্তা হোটেলের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। বাগানটা হোটেলের দক্ষিণ ও উত্তর প্রান্তে বিস্তৃত। বাগানের বাইরে দিয়ে বিভিন্ন ফলফলারীর গাছ এবং ছোট ছোট আগাছায় ভরা জংগল।
আহমদ মুসা হোটেলের প্রাচীরের কাছে যাবার আগেই একটা কাঁচা গলিপথ দিয়ে গাড়ি উত্তর দিকে ঘুরিয়ে নিল। দুটি দোকানের মাঝখান দিয়ে কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে প্রাচীরের ধার ঘেঁষে একটা বড় গাছের ছায়ায় ঝোপের আড়ালে গাড়ি দাঁড় করাল। সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। এদিকে কেউ আসবে না, নিশ্চিত আহমদ মুসা।
গাড়ির সিটে বসেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল সে। তারপর তৈরি হয়ে নেমে এল। গাড়ি লক করে চাবিটা গাড়ির চাকার তলায় রেখে দিল।
প্রাচীর ধরে প্রথমে উত্তরে তারপর পূর্ব দিকে এগুলেঅ আহমদ মুসা। তারপর একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল।
আজ সকালেই সে হোটেলের তিনদিকের গোটা বাগান ঘুরে বেড়িয়েছে। সব কিছুই দেখেছে সে। তার এই ঘুরে বেড়াবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তার কক্ষের জানালা থেকে দেখতে পাওয়া সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো কবরখানাটা দেখা। দেখেছে সে কবরখানা। কবরটা মওলানা লিয়াকত আলীর। তিনি আন্দামানে দ্বীপান্তরিত ভারতের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আহমদ মুাস শ্রদ্ধাভরে সালাম দিয়েছে করববাসীকে। আহমদ মুসা তাঁকে চেনেনি, কিন্তু বুঝেছে দেশ ও জাতির জন্যে বৃটিশের বিরুদ্ধে জীবন-পণ সংগ্রাম করেছে যে হাজার হাজার মুসলমান, এই মওলানা লিয়াকত আলী তাদেরই একজন। পরে হাজী আবদুল আলীকে জিজ্ঞাসা করে আহমদ মুসা জেনেছিল, আন্দামানে জেলের বাইরে বাড়িঘর করে স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের অনুমতি পেয়েছিল অনেক কয়েদি। মওলানা লিয়াকত আলী তাদেরই একজন। তিনি এই মুক্ত কয়েদিদের একটা জুমআ মসজিদের ইমাম ছিলেন। এই কবরের পাশেই তার বাড়ি ছিল। হাজী আবদুল আলীর পূর্ব পুরুষ বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অপরাধে ১৯২২ সালে দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চল থেকে দ্বীপান্তরিত হয়ে এখানে আসে। তারপর তাদেরই এক উত্তর পুরুষ এই জায়গাটা কিনে নেয়। হাজী আবদুল আলী তাদেরই এক উত্তর পুরুষ। বংশানুক্রমে মওলানা লিয়াকত আলীর পরিচয় তাঁর কাছেও পৌছে। তার স্মৃতি নয়, একটা ইতিহাস রক্ষার জন্যেই তিনি কবরটাকে ধরে রেখেছেন।
আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে কোমরে জড়ানো সিল্কের কর্ড বের করে হুকটা ছুঁড়ে মারল প্রাচীরের মাথায়। হুকটা প্রাচীরের মাথায় ভালভাবে আটকেছে দেখে নিয়ে তরতর করে সে উঠে গেল প্রাচীরের মাথায়।
সিল্কের কর্ডটা খুলে নিয়ে লাফিয়ে পড়ল সে ভেতরে। গুড়ি মেরে ছুটল সে হোটেলের দিকে। গিয়ে দাঁড়াল তার ঘরের জানালা বরাবর নিচটায়। একটা ইমারজেন্সী এক্সিটের ব্যবস্থা হিসাবে গত রাতেই সে তার জানালার স্ক্রুগুলো খুলে রেখেছে।
মাটি থেকে জানালার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া পানির পাইপ বেয়ে তরতর করে উঠে গেল দুতলার জানালায়। তারপর কার্নিসে দাঁড়িয়ে গোটা জানালাটা খুলে ভেতরে রেখে দিল এবং বেড়ালের মত নিঃশব্দে লাফিয়ে ঘরে গেল।
সোফায় বসে মুখ ও কপালের ঘাম মুছে একটু জুড়িয়ে নিল শরীরটাকে।
আহমদ মুসা হিসাব করল, তার এখন দ্বিতীয় কাজ হলো হাজী আবদুল আলী ও শাহ বানুদের কাছে পৌছা।
কিন্তু তার আগে আহমদ মুসা আলমারি থেকে ব্যাগ এনে দড়ির মই বের করে যথাস্থানে রাখল। ইমারজেন্সী এক্সিট সামনে রেখেই গত রাতে সে এই দড়ির মইটাও জোগাড় করেছে।
আহমদ মুসা গভর্নর হাইজে যাওয়া জামার উপর বহু পকেট ওয়ালা জ্যাকেট পরে নিল। সব ঠিক আছে দেখে নিয়ে আহমদ মুসা এগুলো দরজার দিকে।
আস্তে করে নব ঘুরিয়ে দরজাটি খুলল আহমদ মুসা।
সামনে দরজা সরাতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। চার-পাঁচ গজ দূরেই দাঁড়ানো সোমনাথ শম্ভুজী। তার হাতের রিভলবার উঠে এসে স্থির হলো আহমদ মুসার বুক বরাবর।
হেসে উঠল সোমনাথ শম্ভুজী। বলল, ‘প্রথমে শব্দ শুনে আমি মনে করেছিলাম ঘরে ইঁদুর-টিদুর হবে। চলেই যাচ্ছিলাম। সারাদিন দরজা পাহারা দিয়ে বসে আছি। কখন তুমি ঢুকেছিলে ঘরে ছদ্মবেশী আমেরিকান?’
গম্ভীর হয়ে উঠল সোমনাথ শম্ভুজী।
কঠোর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘হাত উপরে তোল বেভান বার্গম্যান। একটু চালাকির চেষ্টা করলে বুক তোমার এফোড় ওফোড় হয়ে যাবে।’
হাত উপরে তুলল আহমদ মুসা। তার মুখটা অকস্মাৎ যেন একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘কে আপনি? কি করছেন এসব? দিন-দুপুরে হোটেলে এভাবে………..।’
সোমনাথ শম্ভুজী একটা ধমক দিয়ে আহমদ মুসার কথা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘কে আমি, কি করছি সবই টের পাবে।’
কথা বলতে বলতে সোমনাথ শম্ভুজী যখন বাম হাতের রিভলবার ধরে ডান হাতে আহমদ মুসাকে সার্চ করতে আসছিল, ঠিক তখন উপরে উঠানো আহমদ মুসার ডান হাত জ্যাকেটের কলারের নিচ থেকে তীক্ষè ফলার ছুরি বের করে হাতে নিচ্ছিল।
ছুরিটা হাতে নিয়েই আহমদ মুসা সোমনাথ শম্ভুজীর পেছন দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘গংগারাম’ ডোন্ট ফায়ার।’
সোমনাথ শম্ভুজী চমকে উঠে মুহূর্তের জন্যে পেছনে তাকাল।
আহমদ মুসা মুহূর্তের এই সুযোগটাই চাচ্ছিল। ছুরির বাট ধরা আহমদ মুসার ডান হাত তীব্র বেগে নেমে এল। গিয়ে আঘাত করল সোমনাথ শম্ভুজীর পিঠের বাম পাশে ঠিক হৃদপিন্ডের উপর।
ছুরিটা আমূল বিদ্ধ হয়েছিল।
একটামাত্র চিৎকার সোমনাথ শম্ভুজীর মুখ থেকে বেরুল। তারপর সে ঢলে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা শম্ভুজীকে ধরে ঘরের ভেতরে টেনে নিল।
দ্রুত ছুটে আসা দুজনের পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা। সম্ভবত সোমনাথ শম্ভুজীর চিৎকার তারা শুনতে পেয়েছে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি সোমনাথ শম্ভুজীকে রেখে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
সোমনাথ শম্ভুজী পড়ে আছে দরজার পরেই ঘরের মেঝেতে।
দুজন লোক ছুটে এসে দরজায় মুহূর্তের জন্যে দাঁড়াল। তাদের হাতে রিভলবার। তারপর তারা দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল সোমনাথ শম্ভুজীর দিকে। দুজন পাশাপাশি।
আহমদ মুসা গুড়ি মেরে একটু এগিয়ে অকস্মাৎ তার দুপাকে ছুঁড়ে দিল তাদের সামনে।
তারা দেখতে পেল আহমদ মুসাকে। কিন্তু তারা কিছু ভাববার আগেই আহমদ মুসার বাড়িয়ে দেয়া পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মুখ থুবড়ে সোমনাথ শম্ভুজীর উপর।
আহমদ মুসা দ্রুত উঠে গিয়ে তার দুহাতের দুরিভলবার দুজনের দিকে তাক করে বলল, ‘তোমরা তোমাদের হাতের রিভলবার ফেলে দাও।’
কিন্তু আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই তারা বিদ্যুত বেগে তাদের শরীর উল্টিয়ে নেয়ার সাথে সাথে তাদের রিভলবার ঘুরিয়ে নিচ্ছিল।
গুলী না করে আহমদ মুসা কোন উপায় থাকল না। আহমদ মুসা তার রিভলবারের নল দুজনের পাঁজরে চেপে ধরে এক সাথেই ট্রিগার চাপল।
শব্দ এড়াবার জন্যে গুলী করতে চায়নি আহমদ মুসা। দুজনের গায়ে রিভলবারের নল চেপে তার গুলী করা শব্দ এড়াবার লক্ষ্যেই।
আহমদ মুসা একটু অপেক্ষা করল। না আর কেউ এল না।
ঘর থেকে বেরিয়ে সে দরজা লক করে ছুটল শাহ বানুদের ঘরের দিকে।
শাহ বানুদের ঘরের পাশের ঘরে হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর থাকার কথা।
আহমদ মুসা সেই দরজায় নক করল।
দরজায় ডোর ভিউ আছে।
ডের ভিউতে আলোর নড়াচড়া লক্ষ্য করল আহমদ মুসা।
পরক্ষণেই দরজা খুলে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে হাজী আবদুল্লাহ।
তার পেছনে ঘরের মাঝখানে মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছে শাহ বানু ও তার মা সাহারা বানু।
হাজী আবদুল্লাহ জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘তুমি কি পনের মিনিটেই এসে গেছ। এই পনের মিনিট আমার কাছে পনের বছরের মত ভারী হয়েছে। কি করে এলে তুমি?’
‘জনাব যে পথে এসেছি, সে পথেই ফিরব। দেখবেন আপনি।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘মা আপনারা রেডি?’
‘হ্যাঁ বাবা, কিন্তু কি নিতে হবে বুঝতে পারছি না।’ সাহারা বানু বলল।
‘প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন নেই মা।’
‘আমরা কোথায় যাব বেটা?’
‘চিন্তা করে দেখলাম মা হোটেলে যেমন আপনারা নিরাপদ নন, তেমনি পরিচিত কোন মুসলিম ঘরও নিরাপদ নয়। সব ভেবে সুষমা রাও-এর প্রস্তাব আমি গ্রহণ করেছি মা। সুষমা রাওয়ের সাথে আপনাদের পরিচয় আছে তো!’ আহমদ মুসা বলল।
‘জি, ভাল পরিচয় আছে।’ বলল শাহ বানু।
‘সুষমা রাও তার কাছে তোমাদের রাখতে চায়। পরিচয় হবে আপনারা তাদের গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়।’
‘ভাল-মন্দ কিছুই আমরা বুঝব না বেটা, তুমি যেটা ভাল মনে কর, সেটাই করবে।’ সাহারা বানু বলল।
‘সুষমা রাও যদি এ দায়িত্ব নেয়, তাহলে এটা হবে সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘সুষমা আন্তরিকভাবে এ অনুরোধ করেছে। এ কারণে আমিও ভাল মনে করেছি এটা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া নিখোঁজ হওয়ার পর সুষমা আমাদের বাড়ি এসেছে এবং প্রতিদিনই টেলিফোনে আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছে। আমিও মনে করি এটা ভাল ব্যবস্থা হবে।’ বলল শাহ বানু।
‘কিন্তু এদের নিয়ে কিভাবে যাওয়া যাবে আহমদ মুসা?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘আহমদ মুসা নয়, বলুন বেভান বার্গম্যান।’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘ভুল আর হবে না মি. বার্গম্যান।’
‘চলুন যাওয়া যাক।’ বলে আহমদ মুসা দরজা খুলে প্রথম বের হলো করিডোরে। চারদিকে দেখে বলল, ‘আপনারা আসুন।’
সবাই চলল আহমদ মুসার ঘরের দিকে।
ঘরের লক খুলে প্রথমে তাদের ঘরে ঢুকিয়ে আহমদ মুসা ঢুকল।
ঘরে ঢুকে আঁৎকে উঠোছে হাজী আবদুল্লাহ, সাহারা বানু এবং শাহ বানু তিনজনেই।
‘একি আহমদ মুসা? কিভাবে হলো?’ আর্তকণ্ঠে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘আপনি বলেছিলেন সোমনাথ শম্ভুজী তার কক্ষে নেই। তাই বলে হোটেলে ছিল না তা নয়। সে আমার কক্ষের সামনে কোথাও ওঁৎ পেতে আমার ঘরের উপর সার্বক্ষণিক চোখ রেখেছিল। আমি বাগান দিয়ে এসে পানির পাইপ বেয়ে জানাল দিয়ে ঘুরে ঢুকি। আপনার কাছে যাবার জন্যে যখন দরজা খুলেছিলাম, তখন রিভলবার বাগিয়ে আমার উপর সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেষে এই পরিণতি তার হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু অন্য দুজন?’
‘ওরাও সোমনাথ শম্ভুজীর লোক। শম্ভুজীর চিৎকার শুনে ওরা ছুটে এসেছিল। দেখুন তাদের হাতে এখনও রিভলবার ধরা আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। ওরা আক্রমণ করল, আবার ওরাই মারা পড়ল। তোমার হতে যাদু আছে আহমদ মুসা। এতদিন শুনেছি, এবার চোখে দেখার সৌভাগ্য হলো।’
‘যাদু নয় জনাব, আল্লাহর সাহায্য আছে।’
বলেই আহমদ মুসা জানালার নিচে রাখা দড়ির মই নিয়ে জানালার দুপাশের দুহুকের সাথে ভাল করে বাঁধতে লাগল, আর শাহ বানুকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি মৃত ওদের সবার পকেট সার্চ কর। নেমকার্ড, যে কোন ধরনের কাগজ ও মোবাইল পেলে আমাকে দাও।’
আহমদ মুসা দড়ির মই সেট করে বলল হাজী আবদুল্লাহকে, ‘জনাব, আমি সোমনাথ শম্ভুজীর ঘরটা একটু সার্চ করে আসি।’
‘তার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু কি পেতে চাচ্ছ?’ বলল আবদুল্লাহ।
‘আহমদ আলমগীর ও গংগারামকে তারা কোথায় রেখেছে, ওদের আস্তানা কোথায়, এদের উদ্দেশ্য ও পরিচয় কি, ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য আমার দরকার।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই শাহ বানু সোমনাথ শম্ভুজীসহ মৃত তিনজনের পকেট থেকে পাওয়া কিছু টুকরো কাগজ এনে আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল।
আহমদ মুসা দ্রুত চোখ বুলাতে লাগল কাগজের টুকরোগুলোর উপর। বিভিন্ন ধরনের স্লিপ। কোনটাতে ঔষধের নাম লেখা, কোনটাতে মানুষের নাম লেখা, কসমেটিকস-এর নামও দুটো স্লিপে পাওয়া গেল। কয়েকটা ব্যবসায় কোম্পানীর কার্ডও পাওয়া গেল। একটা স্লিপের উপর এসে চোখ আটকে গেল আহমদ মুসার। তাতে লেখা:
‘এই চিরকুটের বাহক দুজন পিকআপের ড্রাইভারকে তোমার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশকে বলেছি। তারা সাহায্য করবে। এই হোটেলেই ওরা আছে। ওদের ধরতেই হবে। ‘ভাইপার’ এ তোমার আসার দরকার নেই। ক্যাব শয়তানটাকে আমরাই দেখব। ওর কাছ থেকে কথা পেলে সংগে সংগেই তোমাকে জানাব।’ -স্বামীজী
রুদ্ধশ্বাসে চিরকুটটি পড়ল আহমদ মুসা। তার কোন সন্দেহ নেই। ‘ক্যাব-শয়তান’ বলতে গংগারামকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘ভাইপার’ কি বাড়ি, না জায়গা? আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল হাজী আবদুল্লাহকে, ‘জনাব, ভাইপার কি? এ নামের কোন বাড়ি বা স্থান আছে?’
‘ভাইপার ছোট্ট দ্বীপের নাম, পোর্ট ব্লেয়ারের অংশ। কেন জিজ্ঞাসা করছ?’
‘সন্ধ্যার পর ওরা গংগারামকে ভাইপার-এ নিচ্ছে।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আহমদ মুসা। নিতে পারে। ভাইপার-এ পোর্ট ব্লেয়ারের পুরানো জেলখানা। ওটা পোড়ো বাড়ি। পুরাতত্ব বিভাগ কিছু কিছু সংস্কার করে স্মৃতি হিসাবে ধরে রেখেছে। ক্রিমিনালরা জনমানবহীন ঐ জায়গায় আড্ডা গারতে পারে।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
আনন্দের প্রকাশ ঘটল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘ধন্যবাদ জনাব। আমি শাহ বানুদেরকে সুষমার ওখানে দিয়েই তাহলে ছুটব ভাইপার দ্বীপে।’
‘ভাইপার দ্বীপের কোন কিছুই তুমি চিনবে না। আমি চিনি। আমি তোমার সাথে থাকব। ভেব না। আমিও বন্দুক চালাতে জানি, দেখবে।’
‘কিন্তু জনাব, আমি তো ওদিক দিয়ে চলে যাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে। আমি এ লাশগুলো সামলাবার ও তোমার ঘরটা পরিষ্কার করার কাজ সেরে এখন থেকে ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় পুরানো ভিক্টোরিয়া ব্রীজে পৌছব। ও ব্রীজ দিয়েই ভাইপার দ্বীপে যেতে হয়। ব্রীজের গোড়ায় বসে তোমার অপেক্ষা করব। তুমি ওখানে পৌছে সমান মাপের তিনটা হর্ন দেবে। আমি আড়াল থেকে বেরিয়ে আসব।’
‘ঠিক আছে জনাব। তাহলে আমি এখন আর সোমনাথ শম্ভুজীর কক্ষে যাচ্ছি না। ইনশাআল্লাহ ফিরে এসে দেখব। ওর ঘরে যেন অন্য কেউ না ঢোকে আপনার লোকদের সেটা দেখতে বলবেন।’
‘তথাস্তু বেভান।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। তার মুখে আনন্দের হাসি।
আহমদ মুসা ঘুরল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘মা, দড়ির মই দিয়ে নামতে পারবেন তো? এক তলার দূরত্ব অসুবিধা হবে না।’
‘নামতে তো হবেই বেটা।’
‘ধন্যবাদ মা! আশা করি অসুবিধা হবে না। আমি আগে নিচে যাব। নিচ থেকে মই ধরে রাখব।’
বলে আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে ঘরের রাইটিং টেবিলটা নিয়ে এল জানালার নিচে। চেয়ারও আনল টেবিলের ধারে। বলল আহমদ মুসা শাহ বানুকে, ‘চেয়ার থেকে টেবিলে, টেবিল থেকে জানালায় এবং জানালা থেকে দড়ির মই বেয়ে নিচে নামবে, ঠিক আছে?’
‘উত্তরটা দিতে পারব নিচে নামার পর।’ বলল শাহ বানু। চিন্তান্বিত তার মুখ।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল শাহ বানুর চিন্তাক্লিষ্টতা। বলল, ‘ভাবছ কেন শাহ বানু। তুমি মোঘল কন্যা না? মধ্য এশিয়ার ‘পারগানা’ থেকে ভারতের ‘দিল্লী’ পর্যন্ত মোঘল ইতিহাস জান না? মোঘল দুহিতারা কি হাতির পিঠে, ঘোড়ার পিঠে বসেনি এবং পায়দলে যুদ্ধ করেনি?’
‘ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি আসার পর সবই মনে পড়তে শুরু করেছে। সাহস, বাঁচার আশা সবই ফিরে আসছে। আপনি সামনে আছেন, সব কিছুই আমরা পারব।’ বলল শাহ বানু। ভারী ও গম্ভীর কণ্ঠ শাহ বানুর।
‘ধন্যবাদ শাহ বানু’ বলে আহমদ মুসা ঘরের চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে হাজী আবদুল্লাহকে বলল, ‘জনাব, ঘর সাফ করার সময় লোকরা যেন চেয়ার টেবিল ঠিক জায়গায় রাখে এবং জানালাটাও তুলে জানালার স্পেসে সেট করে রাখে, একটু দেখবেন। যে কোন সময় পুলিশ ওদের নিয়ে আমাদের ঘরগুলো সার্চ করতে পারে।’
কথা শেষ করেই ‘আমি নিচে যাচ্ছি’ বলে আহমদ মুসা জানালায় উঠে গেল।
‘বেভান, তুমি জানালা খোলার পর জানালার হুক কি যথেষ্ট শক্তিশালী আছে?’
‘একজন মানুষ বহন করার মত শক্তিশালী অবশ্যই। ভয় হুকের তীক্ষè প্রান্ত নিয়ে। আল্লাহ ভরসা, মাত্র পনের ষোল ফুট উচ্চতার ব্যাপার তো। এই মুহূর্তে বিকল্প চিন্তার সময় নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই তর তর করে নেমে গেল আহমদ মুসা দড়ির মই বেয়ে।
নিচে নেমে দড়ির মই টেনে ধরলে শাহ বানুর মা দড়ির মই বেয়ে ভালভাবেই নেমে এল।
কিন্তু শাহ বানু মাঝপথ পর্যন্ত আসতেই দড়ির মই ছিঁড়ে পড়ে গেল।
মই টেনে ধরে নিচে দাঁড়িয়ে ছিল আহমদ মুসা, তাই নিচে পাথরের উপর পড়া থেকে রক্ষা পেল শাহ বানু। হাত বাড়িয়ে যথাসময়েই তাকে ধরে ফেলেছিল আহমদ মুসা।
উপর থেকে চাপা কণ্ঠে হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘বেভান, তোমরা সবাই ঠিক আছ তো?’
আহমদ মুসা শাহ বানুকে দাঁড় করিয়ে উপরে তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ধন্যবাদ, ঠিক আছি আমরা।’
বলে আহমদ মুসা বলল শাহ বানুকে, ‘বললাম বটে, কিন্তু তুমি আসলেই ঠিক আছ তো?’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আমি তো বেঁচে গেছি। আঘাত আপনার পাবার কথা।’ বলল শাহ বানু কম্পিত ও বিব্রত কণ্ঠে। তখনও শাহ বানু নিজেকে সামলে নিতে পারেনি।
‘কিভাবে কি ঘটে গেল, আমার কিছুই মনে পড়ছে না।’ বলে আহমদ মুসা হাঁটা শুরু করে বলল, ‘আসুন আম্মা, শাহ বানু এস।’
সমস্যা দেখা দিল প্রাচীর টপকাতে গিয়ে। আহমদ মুসা সহজেই প্রাচীর পার হয়েছিল হুকওয়ালা সিল্কের কর্ডের সাহায্যে। সে কর্ড তো শাহ বানু ও সাহারা বানুর ক্ষেত্রে অচল।
সমস্যাটা শাহ বানুরাও উপলব্ধি করেছে। শাহ বানুর মা সাহারা বানু বলল, ‘দড়ির মই তো ছিঁড়ে গেছে। প্রাচীর টপকাব কি করে বেটা?’
‘আমি পার হয়েছিলাম সিল্কের কর্ডে হক প্রাচীরে আটকিয়ে। এখনকার কথা তখন মনেই পড়েনি। অসুবিধা নেই আম্মা। আসুন।’
বলে আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায় গিয়ে কোমর থেকে হুকওয়ালা কর্ড খুলে প্রাচীরের মাথায় ছুড়ে মেরে হুক আটকিয়ে নিল। তারপর বসে পড়ল আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায়। বলল, আম্মা আমার দুকাঁধে পা রেখে কর্ড ধরে দাঁড়ান। আমি দাঁড়াবার পর তিন ফিট উপরে থাকবে প্রাচীরের মাথা। হাত দিয়ে ভাল করে প্রাচীরের মাথা ধরে প্রাচীরের উপরে গিয়ে আপনি বসুন। পরের ব্যবস্থা আমি প্রাচীরে উঠে করব।’
‘কি বলছ বেটা, তোমার কাঁধে পা রাখব?’ বলল সাহারা বানু প্রতিবাদের সুরে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলল, ‘আম্মা আমাকে মাফ করুন, এখন কথা বলার সময় নয়। আমরা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে আছি। জীবনের স্বাভাবিক আইন এখানে চলবে না, প্লিজ।’
বলে আবার বসে পড়ল আহমদ মুসা।
আর কোন কথা না বলে শাহ বানুর মা জুতা খুলে দুহাতে সিল্কের কর্ড ধরে আহমদ মুসার দুকাঁধে পা রেখে উঠে দাঁড়াল।
তাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘আম্মা, এবার আপনি কর্ড ছেড়ে দিয়ে প্রাচীরের মাথা শক্ত করে ধরুন।’
‘ধরেছি বেটা।’ বলল সাহারা বানু।
‘এবার আপনি প্রাচীরের মাথায় উঠার চেষ্টা করুন, আমি পা ধরে ঠেলে দিচ্ছি।’
বলে আহমদ মুসা সাহারা বানুর দুপা ধরে তাকে উপরের দিকে ঠেলে দিল।
সাহারা বানু সহজেই উঠে বসল প্রাচীরের মাথায়।
আবার বসে পড়ল আহমদ মুসা। বলল, ‘এস শাহ বানু।’
বিব্রত, সংকুচিত শাহ বানু কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না।
দ্রুত গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার পেছনে।
‘আম্মা যা করেছেন দেখেছ সেভাবেই তোমাকে প্রাচীরের মাথায় উঠতে হবে।’
শাহ বানু জুতা খুলে ‘আই এ্যাম স্যরি’ বলে সিল্কের কর্ড ধরে সে আহমদ মুসার কাঁধে উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে শাহ বানুর দুপা ধরে উপরে ঠেলে দিলে সে মায়ের মতই প্রাচীরের মাথায় উঠে বসল।
আহমদ মুসা সিল্কের কর্ডের সাথে শাহ বানু ও সাহারা বানুর জুতা ও ব্যাগ বেঁধে কর্ড ধরে উঠে গেল প্রাচীরের মাথায়।
উঠেই বলল সাহারা বানুকে, ‘আম্মা, আপনি দুহাতে প্রাচীরের মাথা ধরে বাইরের পাশে ঝুলে পড়–ন। ভয় নেই আমিও আপনার হাত ধরে থাকছি।’
‘ভেব না, আমি পারব বেটা।’ বলে সাহারা বানু প্রাচীরে ঝুলে পড়ল।
আহমদ মুসাও একইভাবে ঝুলে পড়ল প্রাচীরে। তারপর বাঁ হাত দিয়ে প্রাচীর ধরে রেখে ডান হাত সরিয়ে নিয়ে ধরল সাহারা বানুর এক হাত। বলল, ‘আম্মা, এখন আমি আপনার যে হাত ধরেছি সেটা প্রথমে ছেড়ে দিন, পরে দ্বিতীয় হাতটাও ছেড়ে দিয়ে আমার হাতের উপর ঝুলে পড়–ন।’
‘কিন্তু তুমি দুজনের ভার এক হাতে………….।’ কিছু বলতে যাচ্ছিল সাহারা বানু। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করার পর কোন প্রশ্ন তোলা ঠিক নয় আম্মা।’
‘আল্লাহ সাহায্য করুন’ বলে সাহরা বানু চোখ বন্ধ করে দ্বিতীয় হাতটা প্রাচীর থেকে সরিয়ে ঝুলে পড়ল আহমদ মুসার হাতে।
প্রবল এক ঝাঁকুনি খেল আহমদ মুসার দেহ। কিন্তু তার অনড় বাঁ হাত লোহার হুকের মতই প্রাচীরের মাথায় চেপে বসেছিল। প্রাচীরের অসমান মাথা লোহার হুকের তেমন ক্ষতি করতে পারে না, কিন্তু আহমদ মুসার হাতকে সুঁচের মত বিদ্ধ করল।
সাহারা বানু যখন ঝুলে পড়ছিল, শাহ বানুও তখন চোখ বন্ধ করেছিল ভয়ে, তার মা পড়ে যাবার কোন শব্দ না পেয়ে সব ঠিক আছে বুঝে চোখ খুলল শাহ বানু। দেখল তার মা ঝুলছে আহমদ মুসার হাতে।
‘থ্যাংকস গড।’ অস্ফুট কণ্ঠে বলল শাহ বানু।
সাহারা বানু হাতের উপর ঝুলে পড়লে আহমদ মুসা বলল, ‘আম্মা, এখন আপনি মাটি থেকে ফুট খানেকেরও কম উপরে। লাফিয়ে পড়ুন মাটিতে। জায়গাটা ভাল, ঘাসে ঢাকা নরম মাটি।’
বলার পরেই ‘রেডি’ বলে সাহারা বানুর হাত ছেড়ে দিল আহমদ মুসা।
ছোট একটা শব্দ হলো।
‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি ঠিক আছি বেটা।’ নিচ থেকে চাপা কণ্ঠে বলল সাহারা বানু।
শাহ বানুকে আর বলতে হলো না। আহমদ মুসা তার দিকে তাকাতেই সে ঝুলে পড়ল প্রাচীরে। তারপর একহাত বাড়িয়ে দিল আহমদ মুসার দিকে। তারপর দ্বিতীয় হাত প্রাচীর থেকে টেনে নিয়ে ঝুলে পড়ল আহমদ মুসার হাতের উপর।
শাহ বানুর সুবিধা হলো নিচ থেকে তার মা ধরে ফেলায়।
আহমদ মুসা নিচে নেমে এল।
ব্যাগ ও জুতা কর্ড থেকে খুলে তাদের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘স্যরি, আপনাদের খুব কষ্ট হয়েছে আম্মা। কিন্তু এ ছাড়া তো আর কোন পথ ছিল না।’
শাহ বানু ঝুঁকে পড়ে আহমদ মুসার দুপায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে করতে বলল, ‘সব কষ্ট করলেন আপনি আর বলছেন কষ্ট করলাম আমরা। মহামানুষদেরকে কি এতটাই বিনয়ী হতে হয়?’
আহমদ মুসা পা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করে বলল, ‘একি হচ্ছে শাহ বানু?’
‘বড়দের গায়ে পা লাগলে এখানে সালাম করা হয় বেটা।’ বলল শাহ বানুর মা সাহারা বানু।
‘হিন্দুয়ানী রীতি শাহ বানু দেখছি ভালই রপ্ত করেছে।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
শাহ বানু কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাধা দিয়ে বলল, ‘আর কোন কথা নয়, এখান থেকে বেশ একটু দূরে গাড়ি। চল।’
শাহ বানুরা জুতা পরে নিয়েছিল। সবাই চলতে শুরু করল।
গাড়ির আলো নিভিয়ে রেখেই আহমদ মুসা গাড়ি নিয়ে মেইন রোডে উঠে এল। ছুটল গাড়ি।
আহমদ মুসাদের গাড়ির পাশ ঘেঁষে দুটি পুলিশের গাড়িকে হোটেল সাহারার দিকে যেতে দেখল।
আহমদ মুসা মনে মনে বলল হাজী সাহেব ইতিমধ্যে ঘরটা পরিষ্কার ও ঠিক-ঠাক করতে পাল কিনা?
মোবাইল তুলে নিয়ে আহমদ মুসা হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহকে দুগাড়ি পুলিশ হোটেলে যাচ্ছে তা জানাল।
হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘তোমার ঘরটা ধুয়ে ফেলার পর এখন মুছে ফেলা হচ্ছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘরটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
শহরের মাঝখানে একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে আহমদ মুসা গাড়িটা একটা গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে গাড়ির আলো জ্বেলে পোর্ট ব্লেয়ারের রোডম্যাপ বের করল গভর্নর হাউজে সোজা যাবার পধটা আর একবার দেখে নেয়ার জন্যে। রাতে পোর্ট ব্লেয়ারে গাড়ি চালাবার অভিজ্ঞতা এই প্রথম।
আলো জ্বলতেই আহমদ মুসার হাতের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠল শাহ বানু, তার বাম হাতটা রক্তে ভেসে গেছে।
সাহারা বানুও দেখতে পেয়েছে। বলল আর্তকণ্ঠে, ‘বেটা, আহত হাতটাকে আবার আহত করেছ? দেখি, কিভাবে হলো?’
‘আম্মা, প্রাচীরের মাথা অমসৃণ। সিমেন্ট ও পাথরের তীক্ষè কণা রয়েছে প্রাচীরের মাথা জুড়ে। প্রাচীর থেকে সকলকে নামিয়ে দেবার সময় সব ভার তো বাঁ হাতের উপর পড়েছিল। সিমেন্ট ও পাথরের ঐ সব তীক্ষè কণায় হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে।’
‘বেটা, আল্লাহ তোমাকে এত ধৈর্য্য দিয়েছেন? নিজের এতবড় অসহনীয় কষ্টটাও কাউকে বুঝতে দাওনি। তার উপর আমাদের কষ্টের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করছ! শুনলাম তুমি আমাদের রেখে ভাইপার দ্বীপে যাবে গংগারামকে উদ্ধারের জন্যে। সেখানে কি ঘটবে তুমি ভাল করেই জান। এ অবস্থায় তুমি কি করে যাবে সেখানে?’ বলতে বলতে কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল সাহারা বানুর কণ্ঠ।
শাহ বানুরও চোখ থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার দুগ- বেয়ে। এক সময় আহমদ মুসা ছিল তার স্বপ্নের মানুষ। কিন্তু বাস্তবের মানুষটি সব স্বপ্ন, সব কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছেন। দড়ির মই ছিড়ে তাঁর কোলে পড়ে গিয়েছিল শাহ বানু। দুহাতে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে শাহ বানুকে রক্ষা করেছে সে। কিন্তু তিনি বললেন, কিভাবে কভন কি ঘটেছে তার কিছুই মনে নেই। পাথরে যেমন স্পন্দন ওঠে না, ইনি ঠিক তেমনি হবেন। ভাবতে গা শিউরে উঠছে তার। মানুষের ওজনের প্রবল চাপে একটি মাত্র হাতে পাথর ও সিমেন্ট কণা প্রবেশ করে হাতকে যখন ক্ষত-বিক্ষত করছিল, তখন কি অদ্ভুত স্বাভাবিকতার সাথে তিনি কাজ করে যাচ্ছিলেন এবং তার অসুবিধা একটু তিনি জানতে দেননি। গাড়িতে আলো না থাকলে হয়তো জানাই যেত না। ইসলামের সোনালী যুগের মানুষ সে দেখেনি। নিশ্চয় এমন মানুষই ছিল তারা। তা না হলে জগত জয়ের সাথে জগতের মানুষকে কেমন করে জয় করল তারা!
চিন্তায় ছেদ নামল শাহ বানুর। আহমদ মুসা কথা বলে উঠেছিল তার মায়ের কথার জবাবে, ‘হাতের আঘাতটা খুব বেশি কিছু নয় মা। ভাইপার দ্বীপে যাওয়ার প্রোগ্রাম এক ঘণ্টাও পিছিয়ে দেয়া যাবে না।’
‘শাহ বানু, গাড়িতে দেখ ‘ফাষ্ট এইড বক্স’ আছে। হাতে ভাল করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দাও।’ বলল সাহারা বানু।
আহমদ মুসা রোড ম্যাপ গুটিয়ে রেখে গাড়ি ষ্টার্ট দিয়ে বলল, ‘এখন সময় হবে না। আপনাদের ওখানে পৌছে দিয়ে হাজী আবদুল্লাহ সাহেবের আগেই আমাকে ভিক্টোরিয়া ব্রীজ-এর গোড়ায় পৌছা দরকার। সেখানে গিয়ে আমি ব্যান্ডেজটাকে বেঁধে নেব, কথা দিচ্ছি মা। হাজী সাহেব নিশ্চয় ভাল ব্যান্ডেজ বাঁধতে পারেন।’
‘কিন্তু গভর্নর হাউজের লোকরা এ সব রক্তারক্তি দেখে কি বলবে?’ বলল সাহারা বানু পাল্টা যুক্তি হিসেবে।
‘আমি সেখানে গাড়ি থেকে নামবো না।’ বলে আহমদ মুসা সুষমার দেয়া মোবাইলে সুষমার ‘ওয়ানটাচ’ ডায়ালে মোবাইল করল।
ওপারে টেলিফোন ধরেই সুষমা বলে উঠল, ‘আমার কি সৌভাগ্য। আস্সালামু আলাইকুম।’
‘ওয়াচ্ছালাম। শাহ বানুদের নিয়ে আসছি সুষমা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ও! নাইস। ধন্যবাদ ভাইয়া। কতক্ষণের মধ্যে পৌছবেন? আমি গেটে যাচ্ছি।’ সুষমা ওপার থেকে বলল।
‘ধরো আধা ঘণ্টা। অন্তত তোমার মাকে এ ব্যাপারে সঙ্গে সঙ্গেই জানানো উচিত।’
‘অলরেডি আমি জানিয়েছি ভাইয়া। মাও তাঁদের ওয়েলকাম করবেন। তবে গ্রামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসাবে, মোঘল পরিবারের সদস্য হিসাবে নয়।’
‘তুমি কিন্তু ঝুঁকি নিচ্ছ সুষমা। তুমি একটি মোঘল পরিবারকে আশ্রয় দিচ্ছ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই। কিন্তু এটা কি ইতিহাসে নতুন? মারাঠী নেতা শিবাজী ও তাঁর পুত্র শম্ভুজী আওরঙ্গজেবের হাতে মোঘল কারাগারে বন্দী থাকলেও তারা মেহমান হিসাবে ব্যবহার পেয়েছেন। শত্রুতা সত্ত্বেও মারাঠীরা আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে মোঘলদের সহযোগিতায় গেছে। আমাদের চতুর্থ পেশোয়া প্রথম মাধব রাও মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে ইংরেজের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন এবং বন্দীদশা থেকে তাকে মুক্ত করে মোঘল সাম্রাজ্য পুন:প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৭৭২ সালে।’ সুষমা রাও বলল।
‘তাহলে বলা যায় সুষমা এখন দ্বিতীয় মাধব রাও।’
হেসে উঠল সুষমা। একটু থেমে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি মাধব রাও এই অর্থে যে, আমি আমার যে কোন মূল্যে আহমদ আলমগীরকে মুক্ত দেখতে চাই। একটি মোঘল পরিবারের সাথে সম্পর্কের আমি সেতুবন্ধ হতে চাই। কিন্তু তাঁর মুক্তির জন্যে তো কিছুই করতে পারবো না, কোন সহযোগিতা আপনি নিলে আমি বাধিত হবো।’
‘শাহ বানুদের কাছে রাখছ, এখন এটাই সবচেয়ে বড় সহযোগিতা। ওদের একটা নিরাদ হোটেলে রেখেছিলাম। কিন্তু শয়তানরা সন্ধান পেয়ে যায়। অল্পের জন্যে আজ এঁরা শয়তানদের হাতে পড়া থেকে বেঁচে গেছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অশেষ ধন্যবাদ ভাইয়া যে, আপনি আমার কথা মনে করেছেন।’ বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল সুষমা।
একটু থেমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবার বলে উঠল, ‘ওঁর মুক্তির ব্যাপারে কি ভাবছেন ভাইয়া?’
‘আমি নিশ্চিত সুষমা, আহমদ আলমগীর মুক্ত হবে। আমি অনেকটা পথ এগিয়েছি। রহস্যের অন্ধকারটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন।’ বলল সুষমা।
‘এখনকার মত কথা শেষ, রাখছি সুষমা।’
মোবাইলের কল অফ করে দিল আহমদ মুসা। মুখ ফিরাল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘সুষমার সাথে কথা হলেঅ আম্মা। ওর মাকে সে আগেই বলে রেখেছে। তার মা তাদের আত্মীয় হিসাবে স্বাগত জানাবে। তাদের আত্মীয় পরিচয়েই ওখানে থাকবেন। আর এখন সুষমা গেটে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। কোন ঝামেলা হবে না।’
‘ধন্যবাদ বেটা, তোমার কাজে কোন ফাঁক নেই। আল্লাহ তোমাকে আরও সাহায্য করুন।’ বলল সাহারা বানু।
সাহারা বানু থামতেই শাহ বানু আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি তো সুষমাকে চিনতেন না। মাত্র একবার দেখা হয়েছে। কিন্তু আপনাদের কথা শুনে মনে হলো এক যুগ থেকে আপনাদের পরিচয়। কি করে এটা সম্ভব?’
‘তোমাদের সাথেও আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু তোমরা কি আমাকে তোমাদের পরিবারের একজন করে নাওনি?’
‘আমার প্রশ্ন এখানেই। কেন, কেমন করে এটা হতে পারে?’ বলল শাহ বানু।
‘শোন, তোমার কাজ যদি ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ হয়, তাহলে তাতে এমন একটা শক্তি সৃষ্টি হয়, এমন একটা বরকত আল্লাহ তাতে দেন যে, তোমার সততা, স্বার্থহীনতা ও উদ্দেশ্যের পবিত্রতার কথঅ আর বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না, প্রমাণ করার প্রয়োজন পড়ে না। এ কারণে ফলের জন্যে সময়ের প্রয়োজন হয় না। এক যুগের রেজাল্ট এক দিনেও পেয়ে যেতে পার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ তো আল্লাহর জন্যে কাজ করা।’ বলল শাহ বানু।
‘হ্যাঁ, শুধু আল্লাহরই সন্তুষ্টির জন্যে, আল্লাহকে খুশি করার জন্য কাজ করা। আল্লাহ খুশি হন সেই কাজে যে কাজ নিরপরাধ কাউকে আঘাত করে না, যে কাজে কোন অন্যায় অবিচার নেই, যে কাজে কোন অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করা হয় না, যে কাজ মানুষের কল্যাণের জন্যে হয় এবং যে কাজ কারও ক্ষতির বিনিময়ে কারও কল্যাণ করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অনেকে ভাল কাজ বা কল্যাণের কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত করতে চায় না। আল্লাহকে মানে না, এমন লোকও ভাল কাজ, কল্যাণেল কাজ করে বা করতে পারে।’ বলল শাহ বানু।
‘হ্যাঁ। করে, করতে পারে। এ ধরনের ভাল কাজের লোকদের উদাহরণ পচা ফলের মত। পচা ফলের কিন্তু সবটাই পচা হয় না। হয়তো ফলের বৃহত্তর অংশ, এমন কি ৯০ ভাগ অংশও ভাল থাকতে পারে। কিন্তু এর পরও মানুষ একে পচা ফলই বলে এবং মানুষ কিনতে চায় না সেটা পচা ফল সেজন্য। যাদের কাজের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ নয়, যারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও পছন্দ-অপছন্দের অনুসরণে কাজ করে না, তারা পচা ফলের সাথে তুলনীয় এই কারণে যে, তাদের সব কাজ মানুষের কল্যাণে হয় না, তারা সব ক্ষেত্রে অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। যেমন, একজন সহৃদয় ধনী লোক মানুষের কল্যাণে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, যে ধন তিনি অর্জন করেছেন, তার মধ্যে কালো টাকা আছে, তার সাথে জড়িয়ে আছে বহু বঞ্চিতের দীর্ঘশ্বাস, আর নির্যাতিতের কান্না। দেখা যাচ্ছে, এই ধনীর খরচটা প্রশংসার, কিন্তু উপার্জনটা নিন্দার। আল্লাহর প্রতি ঈমান নেই, বা ভয়-ভালবাসা নেই, এমন লোকদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাদের শতকরা নব্বই জনই এই ধরনের মানুষ। দুচারজন এর ব্যতিক্রম হতে পারেন, যেমন আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারেও হযরত আবু বকর (রা) ভাল লোক ছিলেন, নবী হওয়ার আগে আল্লাহর রসূল (স) সব দিক দিয়ে ভাল ছিলেন এবং হযরত খাদিজা (রা) সবদিক দিয়ে ভাল মহিলা ছিলেন।’ থামল আহমদ মুসা।
‘চমৎকার। ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু ‘ফি সাবিলিল্লাহর অনুসারী, মানে ভালো মানুষ হওয়া খুব কঠিন।’ বলল শাহ বানু।
‘না, খুবই সহজ। তুমি যদি আল্লাহকে ভালবাস এবং তার সৃষ্টিকে ভালবাস, তাহলে তোমার অলক্ষ্যেই তুমি ভাল মানুষ হয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি ভালবাসাটা গাড়ির ষ্টিয়ারিং হুইল-এর মত। ষ্টিয়ারিং হুইল যেমন গাড়ির গতিকে নিয়ন্ত্রিত করে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ও ক্ষতিগ্রস্থ করা থেকে গাড়িকে রক্ষা করে, তেমনি আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আল্লাহর সৃষ্টির জন্যে ভালবাসা মানুষের জীবনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যাতে তার দ্বারা মানুষ শুধু কল্যাণই পায়, ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এবং এই ভালবাসাই তাকে অন্যায়ের প্রতিবিধান ও প্রতিরোধে এমন কি জীবন-উৎসর্গেও উদ্বুদ্ধ করে।’ থামল আহমদ মুসা।
থেমেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘সামনেই গভর্নর হাউজ আম্মা। আমরা এসে গেছি।’
নড়ে-চড়ে বসল শাহ বানু ও সাহারা বানু। কাপড় ও চুল ঠিক-ঠাক করার দিকে মনোযোগ দিল তারা।
আহমদ মুসা নীরব। তার দৃষ্টি সামনে।
গাড়ির গতি কমে এসেছে আগের চেয়ে।