৪০. কালাপানির আন্দামানে

চ্যাপ্টার

টেলিফোন করে মোবাইলটা কানে ধরে উদগ্রীবভাবে অপেক্ষা করছে সুষমা রাও।
সুষমা রাওয়ের পাশে শাহ বানুও বসে আছে। টেলিফোনের ওপার থেকে আহমদ মুসার কণ্ঠ শুনতে পেয়েই সুষমা চিৎকার করে উঠল আনন্দে, ‘ও ভাইয়া! ছত্রিশ ঘণ্টা হলো তোমার কোন খোঁজ নেই। আমি কতবার টেলিফোন করেছি জান?’
‘আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম সুষমা। মোবাইল বন্ধ রাখতে হয়েছে। স্যরি। বল, কোন খবর আছে? শাহ বানুরা কেমন?’
‘আমার পাশেই আছে শাহ বানু। তুমি তাকেই জিজ্ঞেস করো কেমন আছে। খালাম্মা খুব ভাল আছেন। আমার আর কোন খবর নেই ভাইয়া। আমি প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, গুনছি আপনার কাছ থেকে ওঁর খবরের প্রতিক্ষায়।’
‘আমরা এগুচ্ছি সুষমা। আমার সাথী উদ্ধার হয়েছে। আমরা খবর পেয়েছি, যার প্রতিক্ষা তুমি করছ তাকে ‘রশ’ দ্বীপে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশাল দ্বীপটির কোথায় রাখা হয়েছে আমরা তা জানতে পারিনি।’
‘এটা তো বড় খবর ভাইয়া। ও জীবিত আছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় খবর…….।’ আবেগের উচ্ছাসে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল তার। থেমে গেল সুষমা রাও।
পাশে বসা শাহ বানুর চোখও ছল ছল করে উঠেছে। সে সান্তনার হাত রাখল সুষমার কাঁধে।
সুষমা নিজেকে সামলে নিয়ে আবার কথা বলল, ‘স্যরি ভাইয়া। কি বললে তুমি, কোন দ্বীপে?’
‘রশ দ্বীপে।’
সংগে সংগে কোন উত্তর দিল না সুষমা রাও। ভাবছিল। কপাল কুঞ্চিত তার।
ওপার থেকে আহমদ মুসাই কথা বলে উঠল, ‘কি হলো সুষমা, কথা বলছ না কেন?’
আহমদ মুসার এই কথাগুলো সুষমার কানে গেছে বলে মনে হয় না। একটা চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকা অবস্থায় সে ধীর কণ্ঠে বলল, ‘ভাইয়া আজ আব্বার বেড রুমের পাশ দিয়ে আসছিলাম। তাঁর মুখে ‘রশ’ দ্বীপের নাম শুনলাম। তিনি কাউকে বলছিলেন, ‘রশ দ্বীপের ডিফেন্স গোডাউনে আছে? ওখানেই থাকবে?’ একথা তিনি কাকে, কি ব্যাপারে বলেছেন, আমি কিছুই জানি না। যেহেতু তার কথায় রশ দ্বীপের নাম আছে, একটা জায়গারও নাম আছে। তাই তোমাকে জানালাম ভাইয়া।’
‘ধন্যবাদ সুষমা। তোমার আব্বা শীর্ষ দায়িত্বে। তিনি এখনকার সব কিছু না হলেও অনেক কিছুই জানেন। তার সব কথাই গুরুত্বপূর্ণ। এই তথ্য আমাদের কাজে আসবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওর সন্ধানে তো কাজে আসবে না!’ বলল সুষমা হতাশ সুরে।
‘সেটাও বলা যায় না সুষমা। ছোট্ট একটা আলামত পর্বত সমান অপরাধ প্রমাণের মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায়।’
‘কিন্তু এই তথ্যের কি সেই ভাগ্য হবে?’
‘হবে কিনা জানি না। তবে এই তথ্য থেকে একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানলাম। সেটা হলো রশ দ্বীপের গোডাউনগুলো এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ আমরা সবাই জানি, দুনিয়া জানে ওগুলো পরিত্যক্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত। ঐতিহাসিক কীর্তি হিসাবে ওগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে মাত্র। তোমার দেয়া তথ্যই এখন আমাদের বলছে ওর সন্ধান করার জন্যে সবগুলো গোডাউন চেক করতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ সুষমা রাও বলল।
হঠাৎ সুষমা রাও এর মুখ শুকিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি সে আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই বলে উঠল, ‘একটা কথা ভাইয়া।’ বলে চুপ করল সুষমা রাও।
‘কি কথা, বল?’ ওপার থেকে আহমদ মুসা বলল।
ভাবছিল সুষমা রাও। বলল, ‘থাক ভাইয়া। পরে বলব।’
‘ঠিক আছে।’
‘তুমি কেমন আছ ভাইয়া? খুব শুনতে ইচ্ছা করছে তোমাদের উদ্ধার অভিযানের কাহিনী।’
‘অবশ্যই শুনবে একদিন।’ আহমদ মুসা বলল।
থেমেই আবার সে বলে উঠল, ‘মেহমানদের সম্পর্কে তোমার আব্বা তো কিছু জানতে পারেননি, না?’
‘এদিকে উনি আসেন না। আর উনি এটা জানেন যে, কেউ না কেউ সব সময় এখানে থাকেই।’ সুতরাং অস্বাভাবিকতা কিছু নেই।’ বলল সুষমা রাও।
‘আল্লাহ ভরসা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার কথা এখনকার মত শেষ। তুমি শাহ বানুর সাথে কথা বল ভাইয়া।’
‘সব কথা তো হয়েই গেল। আর কি কথা বলব?’
‘ওর কথা আছে ভাইয়া। টেলিফোন ওকে দিলাম। বাই।’ বলে সুষমা মোবাইল গুঁজে দিল শাহ বানুর হাতে।
‘বল শাহ বানু।’ বলল আহমদ মুসা।
‘জি।’ শাহ বানু আটকে গেল এটুকু বলেই।
‘তুমি সুষমার সাথে ভালই আছ, আম্মা কেমন আছেন?’
‘জি, ভাল আছেন।’ উত্তর দিল শাহ বানু।
‘উনি খুব চিন্তা করেন নাতো? তোমাদের কোন অসুবিধা নেই তো?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সুষমা আম্মাকে চিন্তা করার সুযোগই দেয় না। আমরা খুব ভাল আছি।’
‘সুষমা তো অন্য কেউ নয়। প্রয়োজনের কথা তাকে বলবে।’
‘আমাদের প্রয়োজন আমরা বুঝার আগে সুষমাই টের পেয়ে যায়। তাই চিন্তা করার আগেই জিনিস এসে যায়, অনেকটা বেহেশতের মতই।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সুন্দর এক মেছাল দিয়েছো শাহ বানু। খুশি হলাম তোমাদের খবর শুনে। আর কোন কথা আছে?’
‘জি, না।’ বলল শাহ বানু।
‘সুষমা যে বলল তোমার কথা আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সুষমার কল্পনা বেশি। অনেক কথা, অনেক চিন্তা তার যেন কোত্থেকে উড়ে মাথায় আসে।’
‘বুঝেছি। দুজনার মধ্যে কথার ঠেলাঠেলি চলছে। ওটা ভাল। ঠিক আছে। রাখছি। বাই।’
‘বাই।’ শাহ বানু বলল।
শাহ বানু মোবাইল অফ করতেই সুষমা জড়িয়ে ধরল শাহ বানুকে। বলল, ‘কোন কথাই তো বললে না, মাঝখানে কল্পনাপ্রবণ বলে দোষ দিলে আমাকে।’
‘কি কথা বলব? আসলেই কিছু কথা নেই।’ বলে শাহ বানু সুষমার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালাল।
সুষমাও উঠে ছুটল তার পেছনে পেছনে।

পরবর্তী বই
‘আন্দামান ষড়যন্ত্র’