৪১. আন্দামান ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

আন্দামান সাগরের বুক চিরে একটা বোট এগিয়ে চলেছে রস দ্বীপের দিকে।
বোটে একমাত্র আরোহী আহমদ মুসা। সেই বোট চালাচ্ছে।
এভাবে একটা বোট চালিয়ে ‘রস’ দ্বীপে আসা নিয়ম নয়। সরকারি ট্যুরিষ্ট কোম্পানী আছে, তাদের বোটে আসাতে হয়। সরকারি বোট চালকারই নিয়ে আসে। কিন্তু আহমদ মুসার বিশেষ মার্কিন পাসপোর্ট এবং বিশেষ ভিসার কারণে আহমদ মুসাকে একটা বোট নিয়ে ‘রস’ দ্বীপে যাবার অনুমতি দিয়েছে। তবে শর্ত দিয়েছে, ‘রস’ দ্বীপের নৌ-পোর্টে গিয়ে নৌবাহিনীর কাছে তাকে রিপোর্ট করতে হবে।
হাজী আব্দুল্লাহও তাকে একা ছাড়তে চায়নি। বলেছে, রস দ্বীপ একন যেমন নিরাপদ, তেমনি বিজ্জনকও। দ্বীপটি ভারতীয় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে বলে নিরাপদ, কারণ কোন ধরনের কোন সিভিল লোক এখানে বাস করে না। কিন্তু বিপদের কারণ নৌবাহিনী নিজেই। কারণ, তারা কাউকে সন্দেহ করলে দ্বীপেই তাদের কবর হয়। তারা মনে করে, কোন বিদেশী গোয়েন্দা ছাড়া কেউ ছাড়া সন্দেহজনক কেউ ঐ দ্বীপে যায় না। কিন্তু আহমদ মুসা হাজী আব্দুল্লাহর অকাট্য যু্ক্তি ও জেদ সত্ত্বেও তাকে সাথে নেয়নি। বলেছে, হাজী আব্দুল্লাহ দ্বীপে যাওয়ার বিশেষ অনুমতি পেলেও তার ‘রস’ দ্বীপে যাওয়াকে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখতে পারে। সন্দেহ করার কারণে গোয়েন্দারা যদি আহমদ মুসাদের অনুসরণ করে, তাহলে দ্বীপে যাওয়ার তাদের আসল লক্ষ্যই বানচাল হয়ে যেতে পারে। হাজী আব্দুল্লাহ অবশেষে আহমদ মুসার যুক্তির কাছে হার মেনেছে।
আহমদ মুসা ‍দু’হাতে বোটের ষ্টিয়ারিং ধরে সামনে স্থির দৃষ্টি রেখে ‘রস’ দ্বীপের কথাই ভাবছে। এক সময় ‘রস’ দ্বীপ ছিল আন্দামানের সবচেয়ে জমকালো দ্বীপ। কয়েদী জনসাধারণের জন্যে ভীতিকর প্রশাসনিক বিল্ডিং-এর সারি ছিল এই দ্বীপে। ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ আবাসিক বাড়ির মনোরম দৃশ্য। শাসনকারী শ্বেতাংগদের বেড়ানোর জন্য ছিল সুদৃশ্য পার্ক ও বীচ, ছির তাদের খেলার জন্য গল্ফ কোর্ট, পোলো গ্রাউন্ড। সাঁতার কাটার জন্যে অনেক স্যুইমিং পুল। ভু-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভে ছিল সারি সারি সামরিক ও পণ্য-গোডাউন। ১৯৪১ সালে এক ভুমিকম্প সব কিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এই ধ্বংস দ্বীপকে ফিরেয়ে দিয়েছে আগের অবস্থায়। দ্বীপ এখন বড় একটি জংগল। ভারতীয় নৌবাহিনীর লোক ছাড়া দ্বীপে কোন মানুষ নেই। এই প্রচার সত্য হলে, দ্বীপে শাহ্‌ আলমগীর বন্দী থাকার প্রশ্ন আসে কি করে। কে তাকে বন্দী করে নিয়ে যাবে যদি সেখানে কারো যাতাযাত না থাকে? তাছাড়াও মনে করতে হবে, সবকিছু সেখানে ধ্বংস হয়ে যায়নি। কিছু বাড়ি কিংবা গোডাউন অক্ষত আছে যেখানে আহমদ শাহ আলমগীরকে বন্দী করে রাখতে পারে। সত্যিই কি আহমদ শাহ্‌ আলমগীর সেখানে বন্দী আছে? গভর্নর বালাজী বাজীরাও মাধবের একটা উক্তিকে সামনে রেখে আহমদ মুসা ‘রস’ দ্বীপে যাচ্ছে। সুষমা রাও তার পিতা গভর্নর বালাজী বাজীরাওকে বলতে শুনেছিল রস দ্বীপের কোন গোডাউনে কাউকে রাখা হয়েছে। তাছাড়া ভাইপার দ্বীপে গঙ্গাধরকে যারা বন্দী রেখেছিল, তাদের নেতা স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনিও এ ধরনের কথা বলেছিল বলে গঙ্গারাম জানিয়েছিল। এ দু’টি অস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ করে না যে, আহমদ শাহ্‌ আলমগীর ঐ দ্বীপেই আছে, আবার এ সন্দেহও সৃষ্টি করে যে ঐ দ্বীপে তাকে রাখা হতে পারে। আন্দামান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকরা এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে, আহমদ শাহ্‌ আলমগীরকে ‘রস’ দ্বীপে রাখা যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে। আর এটা সত্য হলে স্বয়ং বালাজী বাজীরাও মাধব ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়েন। হাজি আব্দুল্লাহর অতীত কাহিনী এবং ইসরাইলী সহযোগিতার তথ্য বালাজী বাজীরাও এর সাথে জড়িত থাকার সন্দেহকে আরো ঘনিভূত করে। কিন্তু এ সন্দেহে একটা অনুমান মাত্র।
সামনে প্রসারিত আহমদ মুসার চোখে ‘রস’ দ্বীপটি দিগন্তে কাল রেখার মত ফুটে উঠল। আহমদ মুসার মাথায় ভাবনা এল, তার বোটটিকে সে দ্বীপের কোথায় দাঁড় করাবে? ‘রস’ উপকূলে দু’ধরের ঘাট আছে। ট্যুরিষ্ট বোটগুলোর জন্যে একটা ঘাট, আর কিচু আছে নৌবাহিনীর ঘাট। বেসরকারী কোন নৌযান নৌবাহিনীর ঘাটে ভেড়ার অনুমতি নেই। নৌবাহিনীর ঘাঁটি দ্বীপের দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর উপকূলে একটি করে। আর ট্যুরিষ্ট বন্দরটি দ্বীপের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে। দ্বীপের পশ্চিম উপকূলের অধিকাংশ বেসরকারি নোঙরের জন্য জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। এই উপকূল জুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এক সময়ের প্রাচ্যের প্যারিসের ধ্বংসাবশেষ। আন্দামানের প্রশাসনিক কেন্দ্র সাজানো-গোছানো মনোরম ‘রস’ দ্বীপকে বলা হতো প্রাচ্যের প্যারিস। সেই প্রাচ্যের প্যারিস এখন জংগলাকীর্ণ ধ্বংসের স্তুপ ছাড়া আর কিছু নয়। অনেকেই মনে করেন, দ্বীপ-কারাগার আন্দামানের হাজারো কয়েদীর জীবনব্যাপী কান্নার অভীশাপে ধ্বংস হয়েছে প্রাচ্যের প্যারিস নামের আন্দামানের এই রাজধানী। আহমদ মুসার ইচ্ছা মূল ধ্বংসপুরিতেই ল্যান্ড করা। আহমদ মুসা চিন্তা করেছে উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে ডানদিকে বাঁক নিয়ে দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর হয়ে দ্বীপটাকে একটা রাউন্ড দেবে সে। শেষ পর্যায়ে আসবে সে পশ্চিম উপকূলের মাঝামাঝি জায়গায়। তারপর টপ করে কোন খাড়ি দিয়ে ঢুকে যাবে দ্বীপের মানচিত্র সে দেখেছে পশ্চিম উফকূলে বেশ কয়েকটি সুন্দর খাড়ি আছে। আহমদ মুসারি বিশ্বাস রস দ্বীপের এক সময়ের পণ্য গোডাউন ও সামরিক গোডাউনগুলো কোন খাড়ির তীরেই হবে।
আহমদ মুসা মনে মনে খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল। গভর্নর বালাজী বাজীরাও-এর কথা যদি তারা ঠিত ধরে থাকে এবং স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনি যদি ঠিক বলে থাকে তাহলে ধ্বংস এলাকার কোন গোডাউনে আহমদ শাহ্‌ আলমগীরকে পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ পড়ল।
একটা হেলিকপ্টারের শব্দে মুখ তুলল সে। দেখল, তার বাম দিক অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে একটা হেলিকপ্টার ছুটে আসছে। ছোট হেলিকপ্টার। এ্যাকোমোডেশনের দিক থেকে ৬সিটের মাইক্রোর চেয়ে সুবিধাজনক হবে না।
হেলিকপ্টার কাছে চলে এসেছে। আবার মুখ তুলল আহমদ মুসা। এবার তার কারেছ স্পষ্ট হলো, হেলিকপ্টারটি কোন ট্যুরিষ্ট কোম্পানীর। কিন্তু হেলিকপ্টারটি সোজা ‘রস’ দ্বীপের দিকে যাচ্ছে না। তার মাথার উপর দিয়ে দক্ষিণমুখী তার গতি। আহমদ মুসা ভাবল, আরও দক্ষিণের, হয়তো নিকোবরের কোন দ্বীপ লক্ষ্য হতে পারে হেলিকপ্টারটির।
আহমদ ‍মুসা হেলিকপ্টারটির চিন্তা বাদ দিয়ে চোখ নামিয়ে সামনে দৃষ্টি প্রসারিত করল। হঠাৎ তার মনে হলো হেলিকপ্টারটি যেন তার মাথার উপর স্থির হয়ে আছে।
দেখার জন্য মুখ উপরে তুলল আহমদ মুসা। কিন্তু তাকিয়েই তার দু’চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। দেখল, হেলিকপ্টার থেকে সাদা এক গুচ্ছ সিল্কের কর্ড ধরনের কিছু নেমে এসেছে তার মাথার উপর। চিন্তা করার আগেই কর্ডের গুচ্ছটি তাকে এসে জড়িয়ে ধরল। সে যে ফাঁদে আটকা পড়েছে তা এবার বুঝতে বাকি রইল না আহমদ মুসার।
সিল্কের কর্ডটি একটা ম্যাগনেটিক ফাঁস। রিমোট কনট্রোরে মাধ্যমে ফোল্ড-আনফোল্ড করা যায়। সিল্কের কর্ডের গুচ্ছটি আহমদ মুসার দেহের উপর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে নিশ্চয় হেলিকপ্টার থেকে রিমোট কনট্রোল অন করা হয়েছিল। চোখের মিনিষেই সিল্কের কর্ডগুলো গুটিয়ে গিয়ে আহমদ মুসাকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। কোমর থেকে উপর দিকে দু’হাতসহ সবটাই অনড় বাঁধনের মধ্যে পড়ে গেল। হাত দু’টি তিলমাত্র নড়াবারও কোন উপায় ছিল না।
এরপর কি ঘটবে সেটার পরিস্কার আহমদ মুসার কাছে। ফাঁসটি এবার গুটিয়ে নেবে ওরা উপর থেকে। তুলে নেবে তারা তাকে হেলিকপ্টারে।
আহমদ মুসা নিশ্চিত, স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনিরাই তাকে এই ফাঁদে আটকেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা তাকে চিনল কি করে? জানল কি করে যে সে ‘রস’ দ্বীপে এইভাবে যাত্রা করেছে? একবারে নিশ্চিত না হয়ে তারা এইভাবে হেলিকপ্টার নিয়ে আসেনি। ‘রস’ দ্বীপে আসার বোটও সে নিজে ঠিক করতে যায়নি। বোট ঠিক করেছে হাজী আবদুল্লাহ নিজে এবং সেই একমাত্র বিদায়কালে তাকে দেখেছে। বোট কোম্পানীর লোকরা হাজী আবদুল্লাকে সন্দেহ করেছিল? তারাই কি খবর দিয়েছে কাউকে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল আহমদ মুসার মাথায়।
তাকে টেনে তোলা হলো হেলিকপ্টারে। আছড়ে ফেলা হলো তার দেহকে হেলিকপ্টারের মেঝের উপর।
আহমদ মুসা দেখল পাইলটসহ সাত সিটের হেলিকপ্টার। ভর্তি সবগুলো সিটই। তার মানে হেলিকপ্টারে লোকের সংখ্যাও সাতজন।
আহমদ মুসা সবার মুখের উপর দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল। একজনের পরনে গেরুয়া বসনম, তার মাথায় পাগড়িও রংও গেরুয়া, সে মধ্যবয়ষী। পাইলটসহ অন্য সবাই যুবক এবং তাদের পরনে প্যান্ট-টিসার্ট, পায়ে কেড্‌স। মুখে সকলের তৃপ্তির হাসি।
আহমদ মুসার দিকেও ওরা কটমট করে তাকিয়েছিল। যুবকদের একজন বলে উঠল, ‘এই আমেরিকান, আমেরিকার তো নয়।’
বলে উঠল আরেকজন, ‘আজগুবি কথা বলিস না আমেরিকান হলেই আমেরিকার হয়ে যায়।’
‘সত্যি আমেরিকান তো?’ অন্য একজন বলল।
‘না আমেরিকান। খোঁজ নেয়া হয়েছে।’ বলল প্রথম যুবকটি।
একজন যুবক হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল, স্বামীজী, ভাল করে দেখুন, আমরা হারবারতাবাদের ‘শাহ্‌ বুরুজে’র সামনে সেদিন গঙ্গারামরে সাথে থাকা একজন লোকের যে বিবরণ যোগাড় করেছি তার সাথে এর চেহারা সম্পূর্ণ মিলে যায়।’
যুবকটি গেরুয়া বসনধারী কপালে তিলক আঁকা মাঝবয়সী লোকটাকে লক্ষ্য করেই কথাগুলো বলল। গেরুয়া বসনধারী লোকটিও আহমদ মুসার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল।
স্বামীজীর পুরো নাম স্বামী স্বরূপানন্দ মহামুনি। ইনি দৃশ্যত আন্দামানের ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ নামক এনজিও’র প্রধান, কিন্তু কাজ করেন তিনি গোপন সন্ত্রাসী আন্দোলনের সাথে।
আগের যুবকটির কথা শেষ হতেই আরেকজন যুবক কথা বলার জন্য মুখ খুলেছিল। কিন্তু স্বামীজী তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘এবার তোমরা থাম।’
বলে সে একটু থামল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখ দু’টি লাল আর বাজপাখির মত তীক্ষ্ন। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি কে? তুমি আমেরিকান নিশ্চয়, কিন্তু তুমি শুধু বিভেন বার্গম্যান নও।’
স্বামী স্বরূপানন্দ মহামুনীর গলা ঠান্ড, শান্ত। কথা শুনেই আহমদ মুসা বুঝল, এ লোকটি ওদের থেকে আলাদা। প্রফেসনাল অ্যাকটিভিষ্টে সে। হতে পারে নেতা গোছেরও কেউ। তাকে ধরার মিশনে একজন নেতা আসাই তো স্বাভাবিক।
‘আপনারা কি পরিচয় সন্ধান করছেন?’ বলল আহমদ মুসা শান্ত কণ্ঠে।
আহমদ মুসার কথায় লোকটি ভ্রু-কুঞ্চিত করল। বিরক্তির প্রকাশ ঘটেছে তার চোখে-মুখে। বলল, ‘আমরা কোন পরিচয় সন্ধান করছি না, আমরা জানতে চাচ্ছি তুমি কে?’
‘কি পরিচয় জানতে চাচ্ছেন? নাম-ধামের বাইরের আরও কিছু পরিচয় আপনাদের ইমিগ্রেশন বিভাগ জানে । আপনাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘শাহবুরুজে আমাদের লোককে খুর করেছ, ভাইপার দ্বীপে আমাদের লোককে খুন করেছ, সেটাও কি আমাদের ইমিগ্রেশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানে?’ স্বামীজীর কণ্ঠ এবার ধারাল।
‘এ অভিযোগগুলো পুলিশের উত্থাপন করার কথা। পুলিশকে আপনাদের জানানোর কথা।
‘পুলিশ তো তোমাকে পাচ্ছে না। সাহারা হোটেল থেকে তুমি পালিয়ে এসেছ।’
‘পালিয়ে নয় সরে এসেছি দু’জন বিপদগ্রম্তকে সাহায্য করার জন্য।’
‘বিপদগ্রস্ত কারা? সাহারা বানু, শাহ্‌ বানু?’
‘অবশ্যই।’
‘ওদের সাথে বিভেন বার্গম্যানের কি সম্পর্ক?’
‘মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে, এজন্যে সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না।’
‘তারা কোথায়?’
‘নিশ্চয় তারা অন্য কারো আশ্রয়ে আছে। আমি এখানে বিদেশী। আমার বাড়ি-ঘর নেই এখানে। কাউকে আশ্রয় দেবার প্রশ্ন ওঠে না।’
‘শাহবুরুজে ও হারবারতাবাদ-পোর্ট ব্লেয়ার রাস্তায় আমাদের লোকদের খুব করেছ সেটাও কি মানুষকে সাহায্য করার জন্য।’
‘অবশ্যই।’
‘শাহবুরুজে কেন গিয়েছিলে?’
‘একজন পর্যটক অনেক কিছুই দেখে। একজন প্রাচীন কয়েদীর বাসস্থান শাহবুরজে দেখতে গিয়েছিলাম। ঠিক তখনই কিডন্যাপ হচ্ছিল সাহারা বানু ও শাহ্‌ বানু।’
‘কোন পর্যটক এখানে রিভলবার-বন্দুক নিয়ে আসতে পারে না। তুমি রিভলবার সাথে এসেছিলে কেন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে?’
‘আমি বন্দুক রিভলবার কিছুই আনিনি।’
‘কিন্তু আমাদের লোকদের তুমি রিভলবারে গুলীতে হত্যা করেছ।’
‘সেটা আমার রিভলবার নয়। ওদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া রিভলবার।’
‘একজন পর্যটক কি অমন পেশাদার বন্দুকবাজ হতে পারে?’
‘মার্কিন পুরুষ নাগরিকদের প্রত্যেকেরই একটি সৈনিক জীবন আছে। সৈনিকরা পেশাদার ক্রিমিনালদের চেয়ে অনেক দক্ষ বন্দুকবাজ।’
‘তুমি ভাইপার দ্বীপে আমাদের লোকদের খুন করেছ। গঙ্গারামকে উদ্ধার করতে যাওয়া কি একজন মার্কিন পর্যটকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?’
‌’গঙ্গারাম আমার গাইড ছিল, বন্ধু ছিল।তার বিপদে এগিয়ে যাওয়া পর্যটক হিসাবে নয়, মানুষ হিসাবে আমারদ দায়িত্ব ছিল।‌‌‌‌‌’
‘দুনিয়াতে এমন পর্যটক কিংবা মানুষ কি কোথাও আছে, যে বিদেশে গিয়ে স্বল্প পরিচিত এক মাত্র গাইডের উদ্ধারের জন্যে ডজনেরও বেশি লোক হত্যা করত পারে?’
‘অবশ্যই যেতে পারে। কারণ হত্যা এখানে বিষয় নয়, বিষয় ছিল গঙ্গারামকে উদ্ধার করা। উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে আপতিত ঘটনায় ডজন খানেকের মত লেঅক নিহত হয়েছে। পর্যটকও হতে পারতো। নিজেকে বাঁচানোর জন্যেই আক্রমণকারীদের হত্যা করতে হয়েছে। পর্যটক ওদের হত্যা করতে যায়নি, গঙ্গারামকে উদ্ধার করতে………।’ আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না।
স্বামী স্বরূপানন্দ মহামুনি বিদ্যুৎ বেগে তার আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখ দু’টি আরও লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। সে উঠে দাঁড়াবার সাথে সাথেই তার ডান পায়ের প্রচণ্ড এক লাথি গিয়ে পড়েছে আহমদ মুসার মুখে।
মুখটা সরিয়ে নেয়ায় লাথিটা গিয়ে আঘাত করেছে চোখের ঠিক পাশটায়। থেতলে গেল জায়গাটা। গড়িয়ে পড়তে লাগল রক্ত।
রক্তের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে কথার রাজ্যের শ্লেষ ছড়িয়ে বলল, ‘উকিলের মত আরগুমেন্ট পেশ করছো। তোমাকে ওকালতির জন্য আনা হয়নি, আনা হয়েছে হিসাব-নিকাশ শেষ করার জন্যে।’
স্বামী স্বরূপানন্দ ফিরে এল তার আসনে। একটু সামনে ঝুঁকে বসে বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এবাল বল ‘রস’ দ্বীপে কেন যাচ্ছিলে?’
রক্ত গড়িয়ে পড়েছে চোখের কোণ থেকে। হাত দু’টি আহমদ মুসার ফাঁসের মধ্যে বাঁধা থাকায় রক্ত মুছে ফেলার আর সুযোগ নেই।
উঠে বসল আহমদ মুসা। হাসল। বলল, ‘সবাই বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ‘রস’ দ্বীপে যায় না।’ শান্তকণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘আবার ওকালতির ভাষা শুরু করেছো।’ চিৎকার করে বলল স্বামী স্বরূপানন্দ।একটু থামল সে। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘কথা না বললেই বেঁচে যাবে তা নয়। এটা থানা পুলিশ নয়, কথা বের করে ছাড়ব। আর হাজী আবদুল্লাকেও ছাড়া হবে না। হাতে নাতে তাকে আমরা ধরব, তারপর সব বেরিয়ে আসেবে।’
স্বামীজী থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘তোমরা থানা-পুলিশ নও, তাহলে কে তোমরা? আমাকে এভাবে ধরার, এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার তোমাদের কি অধিকার আছে।’
‘আমরা কে? আমরা তোমাদের বাপ, তোমাদের দাদার বাপ, পরদাদার বাপ।’
‘আন্দামানে আমেরিকানদের বাপ এল কি করে?’
‘আহমদ শাহ্ আলমগীর, সাহারা বানুরা আমেরিকান নয়।’
‘তাদের বাপ হলে কি করে? তারা তো মুসলমান। তাদের দাদা-পরদাদারা হিন্দু ছিল বলেই কি বলছেন?’
‘তোমার এসব ওয়াজ রাখ। বল তুমি ‘রস’ দ্বীপে কেন যাচ্ছিলে? কি জানতে পেরেছ সেখানকার?’
‘তাহলে ওখানে জানার মত বড় কিছু আছে?’ ঠাণ্ডা গলায় বলল।
চোখ দু’টি জ্বলে উঠল স্বামীজীর। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এগুতে গেল আহমদ মুসার দিকে।
ঠিক এস সময় হেলিকপ্টার একটা ড্রাইভ দিল। পাইলট বলে উঠল, গুরুজী আমরা এসে গেছি। আমি চত্বরে ল্যান্ড করব? ওদিকে কিছু পুলিশ দেখা যাচ্ছে।’
স্বামী স্বরূপানন্দ এক ধাপ পিছিয়ে এসে বসে পড়ল সিটে। বলল, ‘পুলিশ তো কি হয়েছে। ওদরে বাবার লোক আমরা। নেমে যাও। এখানকার থানা-পুলিশের সবাই আমাদের চেনে। চিন্তা নেই। এই শয়তান আমেরিকানকে ষ্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া যাবে।’
স্বামী স্বরূপানন্দ থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘তোমাদের পুলিশের এই বাবা পুলিশ না তোমাদের মত কোন ক্রিমিনাল।’
আগুনের মত জ্বলে ওঠা চোখ নিয়ে তাকাল স্বামী স্বরূপানন্দ আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘শয়তান আমরা ক্রিমিনাল নই, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দেশকে অপবিত্রদের স্পর্শ থেকে মুক্ত করতে চাই। আর তাকে ক্রিমিনাল বলছ? তিনি শুধু পুলিশের মালিক নন, আন্দামানেরও মালিক।’
আহমদ মুসার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। বলল, আন্দামানের মালিক তো গভর্নরকে বলা যাযা এক হিসেবে।’
হুংকার দিয়ে আবার উঠে দাঁড়াল স্বামী স্বরূপানন্দ। বলল, ‘আমি গভর্নরের নাম বলেছি? হারামজাদার মুখ ভেঙ্গে দেব। তুই কি কাঠের তৈরী? এতবড় লঅথি খাওয়ার পরও বকবক করছিস। ভয় নেই তোর শরীরে?’
বন্যার বেগের মত কথাগুলো উদগীররণ করেই স্বামী স্বরূপানন্দ বসে পড়ল। বসে বসতে বলল, ‘চল দেখাচ্ছি মজা।’
স্বরূপানন্দের কথাগুলো আহমদমুসার কানে খুব কমই প্রবেশ করেছে। সে ভাবছিল অন্য কথা। স্বয়ং গভর্নর বালাজী বাজীরাও মাধব এই সন্ত্রাসী দলের নেতা, এটাই কি তাহলে সত্য?
একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হেলিকপ্টার থেমে গেল।
ল্যান্ড করেছে হেলিকপ্টার।
আহমদ মুসা মুখ ঘুরাল চারদিকটা দেখার জন্যে।
‘শয়তানকে এখন ক্লোরোফরম করনি। তাড়াতাগি করে।’ চিৎকার করে উঠল স্বামী স্বারূপানন্দ।
পর মুহূর্তেই একজন ছুটে এল। একটা টিউবের ছিপি খুলে সে আহমদ মুসার নাকের ফুটোয় গুঁজে দিল।
আহমদ মুসা বুঝল ওটা ক্লোরোফরম। একটু হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। সে চোখ বুঝল। পরমহূর্তেই তার দেহ টলে উঠে পড়ে গেল হেলিকপ্টারের মেঝের উপর।
পনের বিশ সেকেন্ডের বেশি ধরে থাকতে হলো না আহমদ মুসার নাকে।
‘বড় বড় কথা বলে, কিন্তু এত অল্প সময়ে কাবু? যাও, তোমরা শয়তানটার সংঙ্গাহীন দেহ ষ্ট্রেচারে নাও।’ বলল স্বামী স্বরূপানন্দ।
দু’জন ছুটে এসে আহমদ মুসার দেহ দরজার পাশে রাখা ষ্ট্রেচারের দিকে টেনে নিতে লাগল।

ষ্ট্রেচার থেকে আহমদ মুসাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ওরা মেঝের উপর।
মেঝের উপর আছড়ে পড়েছিল আহমদ মুসার দেহটা। মেঝের সাথে ঠুকে গিয়েছিল চোখের কোণের আহত জায়গাটা আবার। আহত জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল। হাত বাঁধা থাকার জন্যে আগে যেমন আহম জায়গায় হাত বুলাতে পারেনি, এখনও তেমনি সংজ্ঞাহীন থাকার ভান করার কারণে আহত জায়গায় হাত বুলাতে পারেনি, কিংবা আহত স্থানটাকে আরাম দেয়ার জন্যে দেহটাকে পাশ ফেরানোও সম্ভব হয়নি।
ওরা বেরিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করতেই মুখ থুবড়ো পড়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে শয়ন করলে আহমদ মুসা। চোখ বুজে কয়েকটা বড় শ্বাস নিয়ে আহমদ মুসা ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
মাথা ঘুরিয়ে নিল চারদিকটায়। বড় একটা ঘর।
দু’দিকে আড়াআড়ি দু’টি দরজা। কোন জানালা নেই। অনেক উপরে ভেন্টিলেশনের জন্যে ঘুলঘুলি রয়েছে।
কক্ষটি ষ্টোর রূম হিসাবে ব্যবহৃত হয় আহমদ মুসা অনুমান করল।
আহমদ মুসা উঠে বসার কথা চিন্তা করল। কিন্তু পরক্ষণেই বাবল, ঘরে যদি টিভি ক্যামেরা থাকে? তাহলে তো এখনি ওদের কাছে খবর হয়ে যাবে যে, আমি উঠে বসেছি, আমার জ্ঞান ফিরেছে। এত তাড়াতাড়ি কোনভাবেই সংজ্ঞা ফেরার কথা নয়। তখন তারা ভাবতে পারে আমি সংজ্ঞাহীনের ভান করেছিলাম। সেক্ষেত্রে তারা আমার ব্যাপারে আরও সাবধান হয়ে যাবে। কিন্তু তার মনে পড়ল, তাকে এই বাড়িতে প্রবেশ করানোর সময় স্বামী স্বরূপানন্দ বলেছিল, ‘এ পর্যন্ত বুঝা গেছে এ লোকটা সাংঘাতিক ধড়িবাজ। এক আপাতত ষ্টোরেই আটকে রাখা হোক। জানালা নেই, সুবিধা হবে। দরজায় পাহারা বসিয়ে রাখলেই চলতে।’ তার কথা শেষ হতেই আরেকজন বলে উঠেছিল সঙ্গে সঙ্গেই, ‘কিন্তু জানালা থাকলে নজর রাখা যেত। সেটা ভালো হতো না?’ উত্তরে স্বরূপানন্দ বলেছিল, ‘কেন উত্তরের দরজায় তো ‘আই-হোল’ আছে। আর সংজ্ঞাহীনদের উপর আবার কি দৃষ্টি রাখবে। আর বেশি সময় তো থাকছে না। মিঃ কোলম্যান এলেই তো আমরা এর একটা বিহিত করবো।’ একথাগুলো থেকেই পরিস্বার বুঝল আহমদ মুসা যে, এই ঘরে পর্যবেক্ষণের জন্যে কোনো টিভি ক্যামেরা নেই।
খুশি হলো আহমদ মুসা। উঠে বসল সে।
কোনও দিক থেকে কথার রেশ ছুটে আসতে শুরু করল এই সময়। কান খাড়া করল আহমদ মুসা।
খুবই ক্ষীণ, জড়ানো আওয়াজ। কিছুই বুঝতে পারল না আহমদ মুসা। উঠে দাঁড়াল সে।
আরেকটু কান পেতে শুনল। তারপর ধীরে ধীরে এগুলো আহমদ মুসা উত্তর দিকের দরজাটার দিকে। ঐ দিক থেকেই শব্দটা আসছে। আহমদ মুসাকে এই দরজা দিয়েই প্রবেশ করানো হয়েছিল, দেখেছে আহমদ মুসা। আর এ দরজাতেই ‘আই হোল’ আছে।
দরজার সামনে দাঁড়াল আহম মুসা। শব্দ বড় হয়েছে, খুব ষ্পষ্ট‌ এখনও নয়।
মুখ এগিয়ে নিয়ে সে সন্তর্পণে চোখ নিল আইহোলের কাছে।
আইহোলের মুখের সাটারটি খোলা ছিল। চমকে উঠেছিল আহমদ মুসা। ওপার থেকে কেউ চোখ রাখেনি তো ঘরে?
কিন্তু চোখ দু’টি আইহোলের সোজাসুজি এগিয়ে এসে দেখল ওপারে ফাঁকা, আলো দেখা যাচ্ছে।
আরেকটা ভুল ভাঙল আহমদ মুসার। ওটা আইহোল নয়। নিছকই একটা গোলাকার ফুটো। দু’পার থেকেই দেখা যায়। এ কারণেই বোধ হয় সাটার লাগানানোর ব্যবস্থা।
বাইরে থেবে বেসে আসা কথা এবার অনেক ষ্পষ্ট। কথার মধ্যে একটা পরিচিত কণ্ঠ পেল আহমদ মুসা। কোলম্যান কোহেন তাহলে এসে গেছে। ইসরাইলের গোয়েন্দাসংস্থা ‘মোসাদ’-এর সবচেয়ে সফল গোয়েন্দা হলো ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেন। আন্দামানে সে এসেছে ভারতে একটা বড় সন্ত্রাসী গ্রুপকে সাহায্য করার জন্যে। হাজী আব্দুল্লাহ আলীর কাছে আহমদ মুসা এই কথা শুনেছিল। এরাও বলেছিল কোলম্যান কোহেনের এখানে আসার কথা। না হলে এত তাড়াতাড়ি তার কণ্ঠ হয়তো সে ধরে ফেলতো পারতো না।
উৎকর্ণ হয়েছে আহমদ মুসা। দরজার ফুটো দিয়ে তার চোখ দু’টোও ‍ওদের সন্ধান করছে। দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ল ওরা।
ওরা ডান পাশে ওদিকের একটা দরজারর সামনে করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
স্বামী স্বরূপানন্দ ও ক্রিষ্টেফার কোলম্যান কোহেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এপাশ থেকে দু’জনকেই মুখোমুখি দেখা যাচ্ছে।
কথা বলছিল কোলম্যান কোহেনই। সে বলছিল, ‘…….. ওসব কথা সবই শুনেছি, কিন্তু কি বললেন লোকটি দেখতে এশিয়ান? এশিয়ান মানে কোন দেশের মত?’
‘তুর্কি বা আরব অঞ্চলের মত।’ বলল স্বামী স্বরূপানন্দ।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো কোলম্যান কোহেনের। অনেকটা স্বগতঃকণ্ঠে বলল, ‘তুর্কিদের চেহারা , তার সাথে আমেরিকান পাসপোর্ট।’ দৃষ্টিটা একটু নিচু, কিচুটা আত্বস্থভাব কোলম্যান কোহেনের।
‘ঠিক আছে, চলুন দেখবেন। অবশ্য সে এখনও সংজ্ঞাহীন।’ স্বামী স্বরূপানন্দ বলল।
‘চলুন যাওয়া যাক। আমি যার কথা ভাবছি সে নিশ্চয় নয়। তাকে এভাবে আপনারা পাকড়াও করতে পারতেন না। সে শৃগালের মত ধড়িবাজ, আর সিংহের মত হিংস্র।’
‘কিন্তু এও কম যায় না মিঃ কোলম্যান। আমরা যখন ক্রোধে ফেটে যাচ্ছি, ওকে আঘাত করছি, তখনও তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই, একদম পাথরের মত ঠাণ্ডা সে।’ বলল স্বামী স্বরূপানন্দ স্বামীজী।
‘এমন ক্রিমিনাল বহু আছে স্বামীজী। বলে মুহূর্তকাল থামল কোলম্যান কোহেন। পরে বলে উঠল, ‘তবে সে যদি হয়, তাহলে দেখা মাত্র গুলী করব। অতীতে ভুল করেছি, আর করব না।’ কোলম্যান কোহেন বলল।
‘কেন, কেন, গুলী কেন? তাকে তো এইমাত্র ধরা হল। কিছুই জানাই হয়নি তার কাছ থেকে।’ বলল স্বামীজী দ্রুত কণ্ঠে।
‘আমি যার কথা ভাবছি সে যদি হয়, তাহলে তার কাছ থেকে একটা কথাও আদায় করা যাবে না। সে ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না, এটা শত-সহস্রবার প্রমাণ হয়ে গেছে। তাকে বাঁচিয়ে রেখে কোন লাভ নেই।’
‘কিন্তু মারলেই বা লাভ কি?’
‘সে পালাতে পারবে না, আমাদের ক্ষতি করার আর তা সুযোগ থাকবে না।’
‘পালাবে কেন? আমরা পালাতে দেব কেন? আমাদের হাত থেকে কেউ এখনো পালাতে পারেনি।’
‘সে পারবে। সে মানুষ নয়, একেবারে অতিমানুষ। আমরা বহুবার ঠকেছি। আর ঠকার সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। টুইন টাওয়ারের ব্যাপার নিয়ে আমেরিকায় যা ঘটল, এরপর আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছেম তাকে দেখা মাত্র গুলী করার। তাকে দেখার পর একটা শব্দ উচ্চারণের মতও সময় নষ্ট করা যাবে না। চোখে পড়ার সাথে সাথেই তাকে গুলী করতে হবে। তাকে হত্যা করার মধ্যেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান।’
বলে একটু থেকে একটা দম নিয়েই আবার বলে উঠলম ’ও যে একাই একটা বোট নিয়ে ‘রস’ দ্বীপে যাচ্ছে, এটা টের পেলেন কি করে আপনারা? আর সে সন্দেহজনক মনে হলো কি করে?’
‘আমাদের চোখ ছিল হাজী আব্দুল্লাহ আলীর উপর। সেই -ই বিভেন বার্গম্যানকে ট্যুরিষ্ট অফিসে নিয়ে গেছে এবং ‘রস’ দ্বীপে যাবার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এইভাবে হাজী আব্দুল্লাহর উপর চোখ রাখতে গিয়ে হোটেল সাহারা থেকে নিখোঁজ হওয়অ সন্দেহের একটা বড় লক্ষ্য বিভেন বার্গম্যানকে আমরা পেয়ে যাই। তার ‘রস’ দ্বীপে যাওয়ার উদ্যোগে তার প্রতি আমাদের সন্দেহ আরও ঘনীভুত হয়। একদিকে আহমদ শাহ্ আলমগীরের পরিবারে সাথে তার সম্পর্ক থাকা, অন্যদিকে আহমদ শাহ্ আলমগীরকে বন্দী করে রাখা ‘রস’ দ্বীপে তার যাওয়ার সিদ্ধান্তে পরিস্কার হয়ে যায়, ‘রস’ দ্বীপে তার মিশন কি। তার উপর ট্যুরিষ্ট অফিস থেকে সে ‘রস’ দ্বীপের পুরানো মাত্রচিত্র যোগাড় করেছে সে যাবে দ্বীপের বাড়িঘর, গোডাউন, অফিস-আদালত, ইত্যাদিরর সুস্পষ্ট অবস্থান নির্দেশ করা আভে। এই ম্যাপ এখন নিষিদ্ধ ট্যুরিষ্ট বা সর্বসাধারণের জন্য। কিন্তু তার কাছে আমিরিকান বিশেষ পাসপোর্ট থাকায় সে এর প্রভাব খাটিয়ে উপরের অফিসারের কাছ থেকে মানচিত্রটা যোগাড় করেছে। এ খবর পাওয়ার পরই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে, তাকে যে কোন মূল্যে ধরতে হবে।’
‘বস কি সব জানেন?’ বলল কোলম্যান কোহেন।
‘বিবি মাধব?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার গোয়েন্দারাইতো প্রথম জানতে পারেন এবং আমাদের জানান। তাঁর নির্দেশেই তো দ্রুত হেলিকপ্টারটার যোগাড় হয়েছে।’
‘চলুন যাওয়া যাক।’ বলে আহমদ মুসার বন্দীখানার দরজার দিখে মুখ ফিরাল কোলম্যান কোহেন।
‘চলুন, কিন্তু বন্দী সম্পর্কে যে কথা বললেন, তার কি হবে? বসকে এ ব্যাপারে জানানো হয়নি।’
‘কোন ব্যাপারে?’
‘বন্দী যদি আপনাদের সেই লোক হন, তাহলে তাকে দেখা মাত্র হত্যা করবেন।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কেন এটা তাঁকে জানানো দরকার? সে লোক আমাদের শিকার। আমরা তাকে শিকার করব।’
‘এমন সাংঘাতিক শিকার লোকটি কে, যাকে হত্যাই আপনাদের নিরাপত্তার একমাত্র পথ?’
‘আপনারাও চেনেন, সে আহমদ মুসা।’
নামটা শুনে চমকে উঠে স্বামীজী মুখ তুল কোলম্যান কোহেনের দিকে। কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকল কোহেনের দিকে। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে তার মুখ।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে স্বামী স্বরূপানন্দ বলে উঠল, ‘সর্বনাশ! আহমদমুসা আমাদের দ্বীপের ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারে। যদি সত্যি হয় আমাদেরও দ্বিমত নেই আপনার সাথে। আমরা চাই না আমাদের দ্বীপপুঞ্জে আহমদ মুসাপর অস্তিত্ব এক মুহূর্তেও থাকুক। সে শুধুই বিপজ্জনক নয়, সে মুসলিম কমিউনিটির বিজয়ের এবং উত্থানের ‘পরশ পাথর।’
‘ধন্যবাদ মিঃ স্বরূপনান্দ।’
উভয়ে পাশাপাশি এগিয়ে বলল আহমদ মুসার বন্দীখানার দরজার দিকে।
দরজার ফুটোয় চোখ লাগিয়ে শ্বাসরুদ্ধভাবে আহমদ মুসা শুনছিল তাদের কখা।
ওদের দরজার দিকে আসতে দেখে দ্রুত পেছনে সরে এল।
ইহুদী গোয়েন্দা ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেনের কথা শোনার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আহমদ মুস। আক্রমণে না গিয়ে উপায় নেই। আক্রমণে না গেলে তাকে আক্রান্ত হতে হবে এবং সেক্ষেত্রে সুবিধাটা তাদের হাতেই তুলে দেয়া হবে।
পেছনে সরে এসেই ভাবল আহমদ মুসা, দরজার একপাশে লুকোলেই সুবিধা বেশি হয়।
সেদিকে যাবার জন্য পা তুলতে গিয়ে আহমদ মুসার মনে হলো, ওরা দরজা খোলার আগে নিশ্চয় দরজার ফুটো দিয়ে ঘরের ভেতরটা একবার দখেকে নেবে। যদি তারা আহমদ মুসাকে মেঝেতে আগের মত না দেখে তাহলে সাবধান হবে যাবে। ওদেরকে অসাবধান রেখে আক্রমণে যাওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত হবে, যদিও এতে ঝুঁকি আছে।
আহমদ মুসা এ দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করল। আহমদ মুসা আগের সেই সংজ্ঞাহীন অবস্থার মত শুয়ে পড়ল গিযে মেঝেতে।
আহমদ মুসা ঠিকই চিন্তা করেছিল। স্বামী স্বরূপানন্দ দরজার সামনে এসেই প্রথমে গিয়ে চোখ রাখল দরজার ফুটোয়। ঘরের ভেতরটা দেখে নিয়ে সে মুখ ঘুরিয়ে ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘না মিঃ কোহেন ওর সংজ্ঞা এখনও ফেরেনি। দেখবেন?’ বলে দরজা থেকে সারে এল স্বামী স্বরূপানন্দ।
কোলম্যান কোহেন গিয়ে ফুটোয় চোখ লাগাল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজার ফুটো থেকে মুখ সরিয়ে স্বামী স্বরূপানন্দের দিকে চেয়ে বলল, ‘সে ওপাশ ফিরে আছে। চেনা যাচ্ছে না। চলুন ভেতরে।’
স্বামী স্বরূপানন্দ দরজায় পাহারত ষ্টেনগানধারী চারজনের একজনকে বলল, ‘গনেজ দরজা খুলে দাও।’
দরজা খুলে গেল।
ঘরে প্রবেশ করল আগে স্বামী স্বরূপানন্দ। তারপর ক্রিষ্টোফর কোলম্যান কোহেন। তাদের পেছনে পেছনে প্রবেশ করল ষ্টেনগানধারী সেই চারজন প্রহরী।
দরজা থেকে একটু সামনে এগিয়ে স্বামী স্বরূপানন্দ দাঁড়াল। তার পাশে দাঁড়াল কোলম্যান কোহেন।
দাঁড়িয়েই স্বামী স্বরূপানন্দ বলে উঠল, ‘গনেশ যাও শয়তানটার মুখ এগিয়ে ঘুরিয়ে দাও।’
গনেশ নামক লোকটা ছুটল আহমদ মুসার দিকে।
সে গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার ওপাশে, তার মুখোমুখি। সে হাতের ষ্টেনগানটা মেঝেতে রেখে দু’হাত বাড়িয়ে আহমদ মুসাকে ঠেলে পাশ ফেরাতে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে ভেলকিবাজির’র মতই ঘটে গেল ঘটনাটা।
মেঝেয় রাখা ষ্টেনগানটা আহমদ মুসার মুখের কাছ থেকে মাত্র ফুট দেড়েক দূরে ছিল।
আহমদ মুসার দু’হাত ছুটে গেল সেদিকে। ষ্টেনগানটি দু’হাতে ধরেই চোখের পলকে পাশ ফিরল কোহেনদের দিকে। সেই সাথে ষ্টেনগান থেকে গুলীর স্রোত ছুটে গেল সেদিকে।
আহমদ মুসার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আকস্মিকতার ধাক্কায় কয়েক মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দ্রুত সামলে উঠেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর। তার লক্ষ্য আহমদ মুসার হাতের ষ্টেনগান।
লোকটার গোটা দেহই আড়াআড়িভাবে আহমদ মুসার উপর। আর তার দু’টি হাত গিয়ে চেপে ধরেছে আহমদ মুসার হাতের ষ্টেনগান।
লোকটি ষ্টেনগান ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টায় নিজের দেহটাকে সামনে সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল।
লোকটি তখনও দু’পায়ের উপর শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। হ্যাঁচকা টানে তার দেহত কুণ্ডলি পাকিয়ে পড়ে গলে। তার হাত থেকেও ষ্টেনগান ফশকে বেরিয়ে গেল। ষ্টেনগান টেনে নিয়েই উঠে দাঁড়িয়েছে আহমদ মুসা। লোকটিও উঠে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা ষ্টেনগান দিয়ে আঘাত করল লোকটির কানের পাশটায়।
পাক খেয়ে তার দেহ ঝরে পড়ল মেঝের উপর। আহমদ মুসা তাকাল দরজার দিকে। ওদের পাঁচটি দেহই মেঝেতে লুটিপুটি খচ্ছে। কেউ সঙ্গে সঙ্গে মরে গেছে, আবার কেউ আহত।
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল কোলম্যান কোহেনের দিকে। বুকে, পেটে সে গুলীবিদ্ধ। কিন্তু তখনও বেঁচে আছে। তার হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলভার তুলে নিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, স্যরি মিষ্টার কোহেন, তোমরা দেখামাত্র গুলীর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে বলে আমাকেও নিতে হয়েছে। তা না হলে তোমাকে কয়েকটা কথা বলতাম, বলার ছিল।
চোখ খুলেই ছিল কোলম্যান কোহেন। বলল বাধো বাধো গলায়, ‘তুমি আন্দামানে জানলে আমি আরও সাবধান হতাম। গতকালই মাত্র আমরা জানতে পেরেছি, তুমি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সুপারিশে বিশেষ মার্কিন পাসপোর্ট ও বিশেষ ইন্ডিয়ান ভিসা পেছেছ।’
‘বুঝলে মিঃ কোহেন, সিআইএ-মোসাদ আতাতের পতন শুরু হয়েছে। দুঃখ যে, শেষটা হয়তো তুমি দেখে যেতে পারবে না।’
‘দিন কারো সমান যায় না আহমদ মুসা। কিন্তু দিন আবার ফেরেও।’
‘দিন আমাদের ফিরছে।’ বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘তুমি আমাকে টকেটা সাহায্য করতে পর, আহমদ শাহ্ আলমগীরকে তোমরা কোথায় রেখেছ বল?’
‘মনে করেছ যে, মৃত্যু আসন্ন জেনে উদার হয়ে তোমার শেষ একটা প্রার্থনা আমি পুরণ করব। না, আমি মরার আগে মরতে চাই না।’
ঠিক এ সময় বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ ও হৈ চৈ শোনা গেল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। হাতের ষ্টেনগানটা কাঁধে ফেলে আরেকটা ষ্টেনগান কুড়িয়ে নিল।
‘আমাকে মেরে গেলে না আহমদ মুসা? মেরে ফেলে যাও।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল কোলম্যান কোহেন।
‘তোমাকে মারা আমার মিশন নয়। তোমাকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছি। তা করেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাকে মৃত্যু দিবেন।’ বলে আহমদ মুসা ছুটল দরজার দিকে।
দরজার পরেই একটা প্রশস্ত করিডোর। করিডোরটি পূর্বদিকে এগিয়ে উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে একটা বড় দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এটাই বাইরে বেরুবার দরজা। ওরা এদিক দিয়েই আহমদ মুসাকে বন্দীখানায় নিয়ে এসেছিল।
করিডোরে বেরিয়ে দেখল, চার-পাঁচজন লোক এদিকে আসছে। ওদের হাতের ষ্টেনগানগুলোর ব্যারেল নিচ দিকে নামানো। তাদের চোখে-মুখে কৌতুহলের চিহৃ। আহমদ মুসা বুঝল এখানে কি ঘটেছে ওরা জান না।
কিন্তু আহমদ মুসাকে দেখে মুহূর্তেই মুখের ভাব পাল্টে গেল। ফুটে উঠল ক্রোধ ও লড়াকু ভাব। ওরা ষ্টেনগান তুলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা ওদের লক্ষ্যে ছোট এক পশলা গুলী করে বলল, ‘শোন ষ্টেনগান তুলতে পারবে না। তার আগে সবাই মারা পড়বে। আমি খুনোখুনি চাই না। বাঁচতে চাইলে ষ্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত উপরে তুলে সবাই বাইরে চল।’
মাটি ছুয়ে যাওয়া ছোট্ট এক পশলা গুলীতেই কয়েকজন আহমদ হয়েছিল। ভয় ওদের চোখে-মুখে। ওরা আহমদ মুসার নির্দেশ পালন করল। ষ্টেনগান ফেলে দিয়ে গেটের দিকে হাঁটতে লাগল।
গেটের বাইরে চত্বরে কয়েকটি জীপ ও একটি মাইক্রো দাঁড়িয়েছিল। একটা জীব ছিল দরজার সামনেই।
আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল। তার চোখ ঘুরে বামপ্রান্তে পৌছার আগেই কটা রিভলবার গর্জন করে উঠল এবং একটা গুলী এসে বিদ্ধ করল তার বাম বাহুকে।
আহমদ মুসার চোখ তখন পৌছে গেছে সেদিকে। সে জীপটার বাম পাশ দিয়ে দেখল একটা গাছের ছায়ায় চারজন লোক। তাদের পেছনে চারটা চেয়ার। তাদেরই একজনের হাকে রিভলবার। তখনও উদ্ধত। অন্য তিনজনও রিভলবার হাতে তুলে নিয়েছে।
আহমদ মুসার ষ্টেনগানও ছিল উদ্ধত। ট্রিগারে ছিল আঙুল। ওরা ও ওদের উদ্ধত রিভলার চোখে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার তর্জনি ট্রিগার চেপে ধরছে।
বাহুর উপর আছড়ে পড়া গুলী নিঃসাড় করে দিয়েছে হাঁতটা। ঠেলে দিতে চাচ্ছিল দেহটাকে পেছনের দিকে।
কিন্তু আহমদ মুসা মুহূর্তেই হজম করে নিয়েছে আঘাতকে। বাম হাতটা দারুণ কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু ষ্টেনগান ছাড়েনি। আর ডান হাতের তর্জুনি আঘাতের এক শক-ওয়েভে কেঁপে উঠলেও আরও শক্তা করে ট্রিগার চেপে ধরেছিল।
ষ্টেনগান থেকে ছুটে যাওয়া গুলীর বৃদ্ধি গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো চারজনকেই গিয়ে গ্রাস করল। ওদের কারো রিভলবার থেকেই আর গুলী আসার সুযোগ হয়নি। ঝরে পড়ল মাটিতে ওদের চারটি দেহই।
আহমদ মুসা ওদের পেছনে আর সময় ব্যয় না করে দ্রুত গিয়ে জীপে উঠল। আনকোরা নতুন জীপ। কী হোলে চাবি ঝুলছিল।
খুশি হলো আহমদ মুসা।
ষ্টেনগান পাশে রেখে, বাম হাতটাকে টেনে ষ্টিয়ারিং হুইলে নিয়ে ডান হাতে ষ্টার্ট দিল গাড়ি।
গাড়ি ছুটে বেরিয়ে রাস্তায় এসে উঠল। রাস্তা ধরে ছুটে চলল তার গাড়ি। কোনদিকে কোথায় সে যাচ্ছে জানে না। জায়গার নাম কি তার জানা নেই। হেলিকপ্টারটি তাকে নিয়ে উত্তরদিকে এসেছে, এটুকু সে বুঝেছে। কিন্তু হেলিকপ্টারটি কোথায় ল্যান্ড করল, তা সে বুঝেনি। তবে হেলিকপ্টার যে গতিতে চলেছে, যতটা সময় নিয়েছে, তাতে অন্তত একশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে বলা যায়। তাতে আহমদ মুসার উত্তর আন্দামানের মায়া বন্দর, পাহলাগাঁও-এর মত কোন স্থানে রয়েছে।
ছুটে চলেছে আহমদ মুসার গাড়ি।
অন্ধের মত চলছে আহমদ মুসা। এই চলার ক্ষেত্রে তার এখন একটাই নীতিঃ অপেক্ষাকৃত ছোট রাস্তা থেকে বড় রাস্তায়।
প্রশস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। সূর্যের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বুঝল সে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যাচ্ছে।
তীরর মত সোজা রাস্তা।
আহমদ মুসা গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে কয়েকটি গাড়ির ছবি ভেসে উঠতে দেখল।
এ পর্যন্ত রাস্তায় কোন গাড়ির সাক্ষাত পায়নি আহমদ মুসা। প্রথমবার দেখা মিলল, তাও একসাথে তিনটি।
রিয়ারভিউ-এ চোখ রাখল আহমদ মুসা। তিনটি গাড়িই তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে এবং তিনটি গাড়ির একই গতি। তার মানে এক জোট হয়ে চলছে।
এই শেষ চিন্তাটা তার মাথায় আসার সাথে সাথে আহমদ মুসার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল যে গাড়িগুলো তার পেছনেই ছুটে আসবে।
আহমদ মুসা গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল, কোথায় যাবে সে? মায়া বন্দর থেকে সে যদি বেরিয়ে থাকে, তাহলে সাময়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পাহলাগাঁও। সেখানে পৌছা পর্যন্ত ডানে-বামে বেরুবার কোন পথ নেই। রাস্তার বামে সবুজ বনে আচ্ছাদিত পাহাড়, টিলার পর টিলা এগিয়ে গেছে দক্ষিণে। আর রাস্তার ডানে উত্তর দক্ষিণে বিলম্বিত উপত্যকাটা পশ্চিমে আরও কিছুটা প্রশস্ত। ঘন বনে ঠাসা এই উপত্যকায় কোন পথ ঘাটের কথা কল্পনাই করা যায় না, তবে এই উপপত্যকা দিয়ে একটা ছোট নদী বয়ে গেছে দক্ষিণে। মানচিত্রে পাওয়া এটুকু তথ্যই তার মুখস্ত আছে, আর কিছু নয়।
কিন্তু পেছনের ওদের এড়িয়ে পাহলাগাঁও পৌছা কি সম্ভব হবে?
গাড়ির দিকে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। ষ্পিডমিটাররে কাঁটা আরও এক ধাপ উপরে উঠল, সোজা ও মসুণ হলেও রাস্তায় চড়াই-উৎরায় থাকায় এর বেশি ষ্পিড নিরাপদ নয়। আর তার গুলীবিদ্ধ বাম হাতটা খুব সক্রিয় হতে পারছে না। এখনও রক্ত ঝরছে আহত স্থান থেকে। যন্ত্রণা বাড়ার সাথে সাথে হাতটা ভারীও হয়ে উঠেছে। গুলীটা বেরিয়ে গেছে না ভেতরে আছে বুঝতে পারছে না আহমদ মুসা। এটা দেখারও তো এখন সুযোগ নেই।
আহমদ মুসা শুনতে পেল তার পেছনে হেলিকপ্টারের শব্দ। চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল আহমদ মুসা। দেখল, পেছন থেকে একটা হেলিকপ্টার ছুটে আসছে। স্বামী স্বরূপানন্দদের সেই হেলিকপ্টারই হবে, নিশ্চিত ধরে নিল আহমদ মুসা।
একেবারে নিচ দিয়ে উড়ে আসছে হেলিকপ্টারটা।
তাদের পরিকল্পনা পরিস্কার হলো আহমদ মুসার কাছে। হেলিকপ্টারটা সামনে গিয়ে রাস্তা ব্লক করবে, আর পেছন তেখে ছুটে আসবে গাড়ি। এভাবে ফাঁদে ফেলবে তারা আহমদ মুসাকে। অথবা হেলিকপ্টার থেকে তার গাড়ি লক্ষ্যে ওরা গোলা ছুড়তে পারে, আবার বোমা ফেলতেও পারে যদি কোলম্যান কোহেন জীবিত থাকে। আহমদ মুসার মৃত্যুই তো কোলম্যান কোহেনের একমাত্র চাওয়া।
ধেয়ে আসছে হেলিকপ্টারটা। পেছনের দিনটি গাড়ির সমান্তরালে গেছে। আর দু’চার মিনিটের মধ্যেই তার মাথার উপরে এসে যাবে হেলিকপ্টার।
আহমদ মুসার ডানে উপত্যকার দিকে ঘন জংগল। গাড়ি ত্যাগ না করে উপায় নেই আহমদ মুসার। আপাতত উপত্যকার ঘন জংগলে তাকে আশ্রয় নিতে হবে।
আহমদ মুসা গাড়িটাকে রাস্তার ডান ধারে নিল।
রাস্তার ধারটা ঢালু হয়ে উপত্যকার দিকে নেমে গেছে। ঢালটা ঘাশ ও আগাছায় ভরা, বড় বড় গাছ, ঝোপঝাড়ও আছে। ঢাল কতটা গভীর আন্দাজ করতে পারছে না আহমদ মুসা।
রাস্তার ধার ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে তার গাড়ি।
আহমদ মুসা ষ্টেয়ারিং হুইল লক করল যাচে চালকবিহীন অবস্থাতেও গাড়িটা কিছুপথ সামনে এগুতে পারে। রাস্তা সোজা হওয়ায় এ ব্যবস্থা চলবে কিছুটা পথ পর্যন্ত। আহমদ মুসা চায় সে কোথায় নেমেছে, এ ব্যাপারে ওদের বিভ্রান্ত করতে।
আহমদ মুসা পেছনের গাড়ি ও হেলিকপ্টারের অবস্থানটা আর একবার দেখে নিয়ে উপর থেকে বড় গাছ গাছড়ার আড়াল আছে এমন একটা স্থান পছন্দ করে দু’টি ষ্টেনগান ও গাড়িতে পাওয়া গুলীর বাক্সটা জংগলে ছুঁড়ে দিযে আহদ বামবাহুকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রেখে ডানে কাত হয়ে নিজেকে ছুঁড়ে দিল রাস্তার ঢালে একটা ঝোপের মধ্যে।
আহমদ মুসার দেহ যেখান ঝোপে পড়ল, ঢাল সেখানে খাড়া হওয়ায় দেহটা উল্টে পাল্টে একটা গাছের গোড়ায় লেগে গেল।
প্রচণ্ড ব্যাথা পেল আহমদ মুসা তার আহত বাম হাতটায়।
বাম বাহু চেপে ধরে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে পড়ে থাকল।
ঐ পড়ে থাকা অবস্থাতেই শব্দ শুনে আহমদ মুসা বুঝল, প্রথমে হেলিকপ্টার, তারপর গাড়ি তিনটি তাকে অতিক্রম করে গেল।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে উঠল। সাপের মত নিঃশব্দে ক্রলিং করে ছঁড়ে ফেলা অস্ত্রগুলো কুড়িয়ে নিল।
আহমদ মুসা জংগলের ভেতর থেকে উজি দেবার জন্যে উঠে দাঁড়াল। তাকাল হেলিকপ্টার ও গাড়রি দিকে।
এই সময় ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হলো।
আহমদ মুসা দেখতে পেল, হেলিকপ্টার থেকে তার গাড়ি লক্ষ্যে গুলী করা হয়েছে।
হেলিকপ্টারটি আহমদ মুসার চালকহীন গাড়ি অতিক্রম করে সামনে গিয়ে রাস্তার কয়েক ফুট উপর পর্যন্ত নেমে গড়ির মুখোমুখি অবস্থানে স্থির দাঁড়িয়ে গেল।
গুলীতে আহমদ মুসার গাড়ির সামনের দু’টি টায়ারই ফেটে গেছে। গাড়িটি রাস্তার উপর হুমড়ি খেযে পড়ে উল্টে গেছে।
পেছনের তিনটি গাড়ি সেখানে পৌঁছে গেল। হেলিকপ্টারও রাস্তায় ল্যান্ড করল।
গাড়িগুলো ও হেলিকপ্টার থেকে কয়েকজন ছুটে গেল আহমদ মুসার উল্টে যাওয়া গাড়ির দিকে।
সবাই দাঁড়াল গাড়ির পাশে। সবারই হাতে উদ্যত ষ্টেনগান।
ওদের মধ্যে থেকে দু’জন ছুটে গিয়ে গাড়ির ভেতরটা দেখতে লাগল। কাত হয়ে থাকা গাড়িটা সব দিকে থেকে পরীক্ষা করে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াল। একজন চিৎকার করে কিছু বলল সবার উদ্দেশ্যে।
আহমদ মুসা বুঝল, গাড়িতে তাকে না পাবার কথাই বলা হচ্ছে। নিশ্চয় বলেছে, আহমদ মুসা গাড়িতে নেই, তার লাশও নেই।
অবশিষ্টরাও ছুটে গেল গাড়ির কাছে। গাড়িটাকে ঠেলে সোজা করে হলো।
গাড়ি পরীক্ষা করার পর সবাই গাড়ি থেকে সরে এল এবং তাদের দৃষ্টি ইতস্তত বাইরে ঘুরতে শুরু করল।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসা গলায় গেরুয়া চাদর ঝুলানো দীর্ঘকায় একজন লোক সবাইকে ডেকে কিচু কথা বলল এবং হাত নেড়ে রাস্তার পশ্চিম পাশের উপত্যকা এলাকার দিকে ইংগিত করল।
সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন ছুটল হেলিকপ্টারের দিকে। তারা হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে আনল একটা বাক্স। বাক্স থেকে এক এক করে সবাই হাতে নিল টিয়ার গ্যাস গান ধরনের বন্দুক। তার সাথে সবাই একটা করে হাতে নিল লাল রং-এর ঝোলানো ধলে ওয়ালা বেল্ট।
ভ্রুকঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
ওরা কি টিয়ার গ্যাস ছুঁড়বে? কিন্তু টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে কি হবে? টিয়ার গ্যাস তো মানুষকে ছত্রভঙ্গ করা, পালিয়ে দেরার জন্যে, কাউকে ধরার জন্যে নয়। কিন্তু ওরা তো তাকে ধরতে চায়।
লোকগুলো বেল্ট কোমরে বেঁধে হাতে বন্দুক নিয়ে ছুটে আসবে। ওরা রাস্তার পশ্চিম ধার বরাবর বেশ দূরে দূরে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
আহমদ মুসা বুঝল ওরা জংগলে ঢুকবে না। রাস্তা থেকে টিয়ার গ্যাস শেল ছুড়বে।
ব্যাপর কি বুঝতে না পেরে অতিসন্তর্পণে পিছু হটতে লাগল। আহমদ মুসা। তার বরাবর রাস্তায় দাঁড়ালো লোকটিকে তখনও সে দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ আহমদ মুসা লক্ষ্য করল বেল্টে ঝুলানো লাল থলের পাশে একটি গ্যাস মাস্ক ঝুলছে। পরক্ষেণেই দেখল লোকটি বেল্ট থেকে ঝুলানো গ্যাস মাস্ক খুলে নিয়ে মুখে পরছে।
আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা বুঝল, ওরা কাঁদানো গ্যাস ছুঁড়বে না। বন্দুকগুলো কাঁদানো গ্যাস ছোঁড়ার জন্যও নয়। কাঁদানো গ্যাসের সেলের মতই এক ধরণের গ্যাস বোমা তৈরী হয়েছে। ওগুলোকে কাঁদানো গ্যাসরে মতই বন্দুকে ফিট ককে শত্রুর ওপর ছোঁড়া যায়। চেতনা লোপকারী গ্যাস বোমা এগুলো।
ছোঁড়ার পর কাঁদানো সেলের মত ওগুলো ফাটে, তবে শব্দ করে নয়। শব্দ হয় না বলে শত্রুপক্ষ বুঝতেও পারে না যে, তাদের উপর গ্যাস বোমার আক্রমণ হয়েছে। কিচু বোঝার আগেই ওরা চেতনা হারিয়ে ফেলে শত্রুর হাতে পড়ে যায়। স্থান বিশেষে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আজ এটা ব্যবহার হচ্ছে। এই জংগলে যুদ্ধ ওদরে জন্যে মুস্কিল বলেই আহমদ মুসাকে ধরার সহজ পথ হিসেবে এই ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেছে।
আহমদ মুসা ঘন ঝোপ থেকে বেরিয়ে দ্রুত চলার জন্যে একটা ফাঁকা মত জায়গা ধরে ছুটতে শুরু করল। যতটা সম্ভব এদের আওতা থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে সে। কোন কাজ হবে না তবু নাকে রুমাল চেপেছে সে।
শব্দ না হওয়ার জন্য বুঝা যাবে না ভয়ংকর অদৃশ্য গন্ধহীন গ্যাস তাকে কখন আক্রমণ করছে। এখন ভাবছি, পরবর্তীতে ভাবার হয়তো সুযোগ হবে না, এমন নানা চিন্তা কিলবিল করছে আহমদ মুসার মাথায়।
তবু আহমদ মুসা ছুটছে। তার সাধ্য যা, ততটুকু করাই তো তার দায়িত্ব। পরবর্তী দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর। এই অঢল বিশ্বাস আহমদ মুসার আছে বলেই সে ভাবছে বটে, কিন্তু ভয় পায়নি।
বেশি এগুতে পারল না আহমদ মুসা।
তার সামনে পাথরের একটা নাঙ্গা টিলা পড়ল। তার দু’পাশেই ঘন জংগলের প্রাচীর। সেই টিলা টপকাতে গিয়ে তার মাথায় উটার পর কিছু বুঝে উঠার আগেই সংজ্ঞা হারিয়ে আছড়ে পড়ল টিলার উপর।
জায়গাটা ফাঁকা হওয়ায় এবং উঁচু ঠিলাটি নাঙ্গা হওয়ায় আহমদ মুসা নজরে পড়ল রাস্তায় দাঁড়ালো বন্দুকধারী লোকটির।
সে দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠল তার সাথীদের উদ্দেশ্যে। ডাকল সবাইকে।
সবাই ছুটে এল তার দিকে। গাড়ি নিয়ে ছুটে এল গলায় গেরুয়া চাদর জড়ানো দীর্ঘকায় লোকটিও।
গলায় গেরুয়া চাদর জড়ানো লোকটির হাতে একটি দূরবীন ছিল। সে চোখে দূরবীন লাগিয়ে টিলার দিকে তাকিয়ে দেখেই চিৎকার করে উঠল, ‘ঠিক পাওয়া গেছে শয়তানের বাচ্চাকে। শয়তান খুন করেছে স্বামী স্বরূপানন্দকে, কোলম্যান কোহেনকে এবং আমাদরে বহু লোককে। একে জীবন্ত হাতে পাওয়া আমাদের দরকার। যাও তোমরা কয়েকজন গিয়ে তাকে নিয়ে এস।
নির্দেশের সাথে সাথে চারজন ছুটে গেল।
কায়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে ধরা-ধরি করে নিয়ে এল। ছুঁড়ে ফেলল রাস্তায়।
বলল একজন, ‘এর সাথে এই দু’টি ষ্টেনগানও ছিল। এগুলো সে আমাদের লোকদের কাছে থেকে কেড়ে নিয়ে এসেছিল।’
‘শয়তান গুলীও খেয়েছে।’ বলেই গুলী খাওয়া আহম বাহুতেই জোরে একটা লাথি মারল গলায় গেরুয়া চাদর জড়ানো সেই লোক।
এই গোটা ঘটনা যখন থেকে ঘটতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই রাস্তার ওপাশের পাহাড় শীর্ষে দাঁড়ানো এক ঘোড়সওয়ার সবকিছু অবলোকন করছিল। তার চোখে দূরবীন। তার কাঁধে ঝুলানো বাধা ধরনের টিলিস্কোপিক মিনি মেশিন গান। মাথার টুটি থেকে আপাদ-মস্তক জলইপাই রংয়ের ইউনিফর্ম। বন আচ্ছাদিত পাহাড়ের সাথে সে একদম একাকার। তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করার কোন উপায় নেই। তার পাশে দাঁড়ানো চকলেট রংয়ের ঘোড়াকেই শুধু বেসুরো লাগছে। কালো গগলস পরা লোকটির মুখের খুব অল্পই দেখা যাচ্ছে।
লোকটি এক হাতে ঘোড়ার লাগাম অন্য হাতে কাঁধে ঝুলানো মিনি মেশিনগানটির ফিতা ধরে ঘোড়াকে টেনে নিয়ে নামছিল।
কিন্তু নিচে রাস্তায় আহমদ মুসাকে ওরা যখন হেলিকপ্টারে তুলতে যাচ্ছিল, তখন সে থমকে দাঁড়াল। ডান হতে থেকে ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিয়ে দ্রুত বাম কাঁধ থেকে মিনি মেশিনগানটা হাতে নিয়ে তাক করল রাস্তার ওদেরকে। মিনি মেশিন গানের টেলিস্কোপিক লেন্সটায় চোখ রেখে ট্রিগারে তর্জনি রাখর। চেপে ধরল ট্রিগার। ধরেই থাকল।
সিংগল বুলেট ফাংশন একটিভেট করা ছিল মেশিনগাটির। তার ফলে বুলেট ঝাঁক আকারে না বেরিয়ে এক এক করে বেরিয়ে যেতে লাগল।
প্রতিটি গুলী বেরুবার পর লোকটি মিনি মেশিনগানের টেলিস্কোপিক ব্যারেলকে নতুন টার্গেটের সাথে এডজাষ্ট করে নিচ্ছিল অদ্ভুত দ্রুততার সাথে।
মাত্র দশ সেকেন্ড। মিনি মেশিনগানের গর্জন থেমে গেল। নিচে রাস্তায় ১৫টি লাশ।’
বুঝে ওঠা ও প্রতিরোধের কথা বাবতে গিয়ে বোধ হয় পালাবারও চেষ্টা তাদের করা হয়নি।
নিহতদের রক্তস্রোত আহমদ মুসার সংজ্ঞাহীন দেহেও আসছিল।
মিনি মেশিন গানের ব্যারেল থেকে তর্জনি সরিয়ে নিয়েই লোকটি দ্রুত মেশিন গানটাকে বাম কাঁধে চালান করে লাফ দিয়ে ঘোড়ায় উঠল এবং দ্রুত নামতে শুরু করল পাহাড় থেকে রাস্তায়।