৪১. আন্দামান ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে আহমদ মুসা। কিন্তু চোখ খুলল না সে।
মনে পড়েছে তার সব কথা। সংজ্ঞালোপকারী গ্যাস আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্যে সে পালাচ্ছিল। কিন্তু পারেনি সে পালাতে। হঠাৎ চিন্তা রুদ্ধ হয় গিয়েছিল, চারদিকটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, এটুকুই শুধু তার মনে আছে। তার অর্থ সে সংজ্ঞা হারিয়েছিল। তার মানে সে এখন শত্রুর হাতে বন্দী। কিন্তু তার পিঠের নিচের শয্যাটাকে খুব নরম, আরামদায়ক মনে হচ্ছে কেন? এই গেরুয়া বসনা কাপালিকদের বন্দীখানা শুখু নগ্ন মেঝে নয়, তার জন্যে সেটা কাঁটা বিছানো হবার কথা। সন্তর্পণে হাত-পা নাড়ল আহমদ মুসা। না, হাত-পায়ে বাঁধন নেই। এই সাথে সে অনুভব করছে, স্নিদ্ধ বাতাসে তার গা জুড়িয়ে যাচ্ছে। সে বুঝল খোলা জানালা পথে আসা স্বাভাবিক বাতাস এটা। তাছাড়া সে বাতাসের প্রবাহ দেখে বুঝতে পারছে একাধিক জানালা খোলা রয়েছে। তাহলে একটা বন্দীখানা কিভাবে হতে পারে? নরম আরামদায়ক বিছানা, হাত-পা মুক্ত, জানালা খোলা-এ অবস্থায় তাকে কোন বন্দীখানায় রাখা হতে পারে না।
ধীরে ধীরে চোখ খুলল আহমদ মুসা।
দ্রুত চারদিকটা দেখতে চাইল সে।
কিন্তু তার চোখ দু’টি আটকে গেল বাম পাশে পাশাপাশি দু’চেয়ারে বসা একজন পুরুষ ও একজন মহিলার উপর।
লোকটির রং পিতাভ। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। উচ্চতা মাঝারি। দেহে শক্ত কাঠামোতে সুন্দর স্বাস্থ্য। চেহারায় হাসির প্রলেপ। পরনে বাদামী রংয়ের প্যান্ট ও টিসার্ট। মহিলার সাদা-স্বর্ণাভ রং। একহারা, দির্ঘাঙ্গী। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। পরণে জিনসের প্যান্ট ও জ্যাকেট। তারও বয়স লোকটির কাছাকাছি।
আহমদ মুসা ওদের দিকে চাইতেই লোকটি ‘গুড় ইভনিং’ বলে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে।
‘গুড ইভনিং টু বোথ’ বলে আহমদ মুসা নিজের দিকে তাকাল। দেখল তার বাম বাহুতে সুন্দর ব্যান্ডেজ। গায়ের জামা পাল্টানো, নতুন সার্ট গায়ে। প্যান্ট ঠিক আছে, কিন্তু পায়ের জুতা খোলা।
চোখ ঘুরিয়ে আবার আহমদ মুসা তাকাল লোকটির দিকে।
লোকটির মুখে এক টুকরো হাসি ফুঠে উঠল। বলল, ‘আপনার অনুমতি না নিয়েই আমরা আপনাকে অপারেট করেছি।’
কথাটা শেষ করেই হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে একটা বুলেট হাতে নিয়ে বলল, ‘থ্যাংকস গড় যে, বুলেটটি সারফেস সমান্তরালে ঢুকায় পেশির অনেক ক্ষতি হলেও হাড় বেঁচে গেছে।’
‘ধন্যবাদ আপনাদের। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় অপারেশন করায় নতুন কষ্ট থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু এত সুন্দর ব্যান্ডেজ! এ তো নিখুঁত ডাক্তারী কাজ‍!’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটি মুখে হাসি নিয়ে তাকাল পাশের মহিলার দিকে। তারপর মুখ ফিরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘যিনি করেছেন তিনি ডাক্তার। এ কৃতিত্ব ওঁর।’
আহমদ মুসা ডাক্তার মহিলার দিকে চেয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম।’
‘ওয়েলকাম। আহপনার চোখের কোণায় আরও একটি নতুন আঘাতের চিহ্ন দেখলাম। দেখলাম আরও কয়েকটি বড় আঘাতের চিহ্ন যেগুলো কয়েকনিদ আগের হবে। এ কারণেই আমি প্রতিষেধক ধরনের কোন ইনশেকশন দিইনি। আমি মনে করি ওগুলো দেয়া আভে।’ বলল মেয়েটি খুব শান্ত ও ধীর কণ্ঠে।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই লোকটি বলে উঠল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, আপনি কখন গুলীবিদ্ধ হলেন? আপনি গাড়ি চালিয়ে ঐ রাস্তার ঐ স্থানে আসা থেকে আপনাকে দেখেছি আমি। দুরবীনে খুঁটি-নাটি সবকিছুই আমার কাছে ধরা পড়েছে। আপিনি একটু কায়দা করে গাড়ির সামনে এগুনো অব্যাহত রেখে আত্নগোপন করার জন্যে লাফিয়ে পড়েছিলেন গাড়ি থেকে। তারপর থেকে আপনাকে কেউ গুলী করার ঘটনা তো আমার মনে পড়ছে না।’
আহমদ মুসা উত্তর দেবার আগেই ডাক্তার মেয়েটি কথা বলে উঠল। বলল, ‘তুমি যে সময়ে তাঁকে দেখেছ বলেছিলে, আহত স্থান দেখে আহত হওয়াটা তার আগে বলে আমার মনে হয়েছে।’
‘ডাক্তার ম্যাডাম ঠিক বলেছেন। আগেই আমি আহত হয়েছিলাম। আজ সকালের দিকে ওরা আমাকে বন্দী করে নিয়ে আসে। ওদের বন্দীখানা থেকে পালাবার সময় আমি আহম হই। ওরা আমাকে ধরার জন্যেই ফলো করছিল।’ বলল আহমদ মুসা ডাক্তার মেয়েটির কথা শেষ হতেই।
‘ওহ তো! আপনার সম্পর্কে কিছুই জানা হয়নি। আপনাকে কেন ওরা বন্দী করে এনেছিল? পালাবার পর কেনই বা অমন মরিয়া হয়ে উঠেছিল ওর আপনাকে ধরার জন্যে? ওরা কারা?’ বলল লোকটি।
আহম মুসা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কি বলা উচিত তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। এই দ্বিধাগ্রস্ততা নিয়েই তাকাল আহমদ মুসা ওদের দিকে।
আহমদ মুসার দ্বিধাগ্রস্ততা লক্ষ্য করল লোকটি। গম্ভীর হলো সে। বলল, ‘আপনার সমস্যা বুঝেছি। কি বলবেন, কতুটুকু বলবেন তা নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি যে, অন্য কারও পক্ষে আমাদের কাজ করার কোন সম্ভাবনা নেই। আমরা আপনার বন্ধু হতে পারবো কিনা জানি না, তবে একজন অতিথির শত্রু আমরা কিছুতেই হবো না।’
লজ্জা মিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাদের। মানুষের কতকগুলো স্বাভাবিক দুর্বলতা আছে, আমি তার উর্ধে নই।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলতে শুরু করল, ‘আমি পোর্ট ব্লেয়ার থেকে এককভাবে ভাড়া করা বোট নিজেই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিছিলাম ‘রস’ দ্বীপে। ‘রস’ দ্বীপে পৌঁছার আগেই একটা হেলিকপ্টার থেকে ফাঁদ ফেলে আমাকে বন্দী করে হেলিকপ্টারে তুলে নেয়।’ এরপর বন্দীখানা থেকে পালানো পর্যন্ত সব কথা ওদের বলল আহমদ মুসা।
ওরা গভীর মনোযোগ দিয়ে আহমদ মুসার কথা শুনছিল। আহমদ মুসা থামতেই লোকটি বলে উঠল, ‘বুঝতে পারছি, আপনি ওদের আট-দশজন লোক মেরেছেন। সুতরাং ওরা মরিয়া হয়ে উঠার কথাই। কিন্তু এটা তো পরের কথা। আমার বিস্ময় লাগছে হেলিকপ্টার নিয়ে গিয়ে ফাঁদে ফেলে অভিনব অবস্থায় বন্দী করল ওরা কারা? এবং এভাবে আপনাকে বন্দী করতে হলো আপনার কোন অপরাধে বা তাদের কোন স্বার্থে?’
‘আমার অপরাধ বোধ হয় এই যে, ওরা ‘রস’ দ্বীপে একজন যুবককে বন্দী করে রেখেছে, আমি তাকে উদ্ধার করতে চাই। আরও অপরাধ হলো, ওরা এ পর্যন্ত আন্দামান-নিকোবরের অর্ধশতকের মত যুবককে হত্যা করেছে, আরও হত্যা করতে চায়। কিন্তু ওরা মনে করেছে যে, ওদের পরিকল্পনায় আমি বাধ সাধছি।’
‘পঞ্চাশ জন খুন করেছে? এত সংখ্যাক খুনের খবর তো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি!’ বলল ডাক্তার মহিলাটি।
‘সবগুলো খবরই দুর্ঘটনা বা অপঘাতে মৃত্যু হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। অধিকাংশই পানিতে ডুবে মরার খবর হিসেবে পত্রিকায় এসেছ।’
‘হ্যাঁ, এমন খবর পত্রিকায় বেশ পড়েছি। এগুলো কি সবই খুন তাহলে?’ ডাক্তার মহিলাটি বলল।
‘কোন সন্দেহ নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘পুলিশ জানে?’ জিজ্ঞাসা মহিলাটির।
‘সবাই হয়তো জানে না, কিন্তু পুলিশের একটা বড় অংশ এ ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত আছে।’
‘ষড়যন্ত্রটা কি?’
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে মুখ নিচু করল। একটু ভাবতে চাইল। একটু চিন্তা করে বলল, ‘ওটা একটা নির্মুল করার প্রোগ্রাম। একটা বিশেষ জনগোষ্ঠীকে শেষ করার প্রোগ্রাম।’
ডাক্তার মহিলা ও লোকটি দু’জনেই কপাল কুঞ্চিত হলো। একটা জ্বলন্ত জিজ্ঞাসা ওদের চোখে-মুখে আছড়ে পড়ল।
‘কোন জনগোষ্ঠীকে?’ এবার প্রশ্ন ছেলেটির।
আহমদ মুসা উঠে বসেছিল।
কিন্তু মহিলাটি চেয়ার থেকে উঠে ছুটে এল। বসতে বাধা দিয়ে আবার শুইয়ে দিল আস্তে আস্তে। বলল, ‘আপাতত কিছুটা সময় স্থির শুয়ে থাকতে হবে। উঠতে গেলে আহত জায়গায় প্রেসার পড়বে। আবার ব্লিডিং হবে। অনেক ব্লিডিং হয়েছে। আর ব্লিডিং হতে দেয়া যাবে না। জানেন তো এটা জংগল, রক্ত দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই।’
‘স্যরি ম্যাডাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সহযোগিতার জন্যে ধন্যবাদ।’ বলে মহিলা তার চেয়ারে ফিরে এল।
‘উঠে বসে বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বলুন।’ বলল লোকটি।
‘আমাদের পারস্পরিক পরিচয়টা হয়ে গেলে ভাল হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলোচনা ফ্রি হবার জন্যে?’ ডাক্তার মহিলাটি বলল।
‘ঠিক তাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু পরিচয় হবার পর যদি আবার কিছু কথা লুকোবার প্রয়োজন হয় উভয় পক্ষেই? পরিচয় হলেও মুক্ত আলোচনায় সমস্যা আছে।’ মেয়েটি বলল।
‘লুকানোটাই যদি কল্যাণকর মনে হয়, তাহেল সেটাও মনে করি ঠিক আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘চমৎকার বলেছেন আপনি। সব কথা বলা সময় কল্যাণকর হয় না।’ লোকটি বলল।
কথা শেষ করেই চেয়ার ঠেস দিল লোকটি। চোখে-মুখে একটা গাম্ভীর্য নেমে এল হঠাৎ। বলল, ‘আমাদের কথাই প্রথম বলি। আমার পিতা ভারতীয়, মা থাইল্যান্ডের মেয়ে। আমার পিতৃদত্ত নাম ড্যানিশ দেবানন্দ। আমার মা আমার নাম দেন মংকুত চোলালংকন, প্রথম থাই রাজার নাম অনুসারে। আমার মা’র গর্ব ছিল তিনি চীন থেকে আসা থাইল্যান্ডের প্রথম রাজা মংকুত পরিবারের মেয়ে। আমি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় বিয়ে করি আমার পাশে উপবিষ্ট তখন ডাক্তারী পড়ুয়া মহারাষ্টের মেয়ে এই সুস্মিতা বালাজীকে। এটা হলো আমাদের পরিচয়ের প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বটা হলো, আমরা দু’জন ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার এই জংগলে এলাম কি করে? আমরা দু’জন পিতৃ-মাতৃহত্যার দায় মাথায় নিয়ে পালিয়ে বাস করছি এই জংগলে।’ থামল ড্যানিশ দেবানন্দ।
আহমদ মুসার কপাল কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল। সে ভাবছিল।
ড্যানিশ দেবানন্দ থামতেই আহমদ মুসা বলল, আপনি কোথায় চারকি করতেন?’
‘পোর্ট ব্লেয়ারের ইন্ডিয়ান রোডস্ এন্ড কম্যুনিকেশন ডিপার্টমেন্টে।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘আপনার পুরো নাম কি ড্যানিশ দিব্য দেবানন্দ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
চমকে উঠল ড্যানিশ দেবানন্দ। বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি জানলেন কি করে?’
‘আপনার পিতার নাম কি ড্যানিশ দিনা প্রেমানন্দ এবং মার নাম সাবিতা থানাবাতান?’
‘হ্যাঁ।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ চেয়ারে সোজা হয়ে বসে। বিস্ময়ে বিস্ফোরিত তার দু’চোখ। একবার তাকাল সে স্ত্রী সুস্মিতা বালাজীর দিকে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনি এত কিছু জানলেন কি করে? আপনি গোয়েন্দা বিভাগের লোক নন তো?’
একটু হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি গোয়েন্দা নই। তবে একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমার বন্ধু লোক। তাঁর কাছেই অন্য একটি বিষয়ে শুনতে গিয়ে আপনাদের প্রসঙ্গ ঘটনাক্রমে আসে। আপনি আপনার পিতা-মাতাকে খুন করেননি, এটাই ঠিত তাই না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি এতোসব বলেছেন কি করে? তিনিই বা কি করে বলেছেন?’
‘হ্যাঁ। আপনারা ভিন্ন বাড়িতে থাকতেন। আপনার পিতা-মাতা খুন হওয়ার পরপরই আপনার টেলিফোন পেয়ে আপনার পিতা-মাতার বাড়িতে পৌঁছান। গিয়ে আপনারা দেখতে পান তাঁরা দু’জনেই ছুরিবিদ্ধ। তারা তখন মুমুর্ষূ। আপনারা দু’জনে তাদের দু’জনের দেহ থেকে ছুরি খুলে ফেলেন। এই সময় সেখানে আপনাদের পরিচিত কেউ পৌঁছেন। তারা খুনের দায়ে আপনাদের অভিযুক্ত করেন এবং বাইরে দাঁড়ানো নকল পুলিশকে দেখিয়ে আপনাদের ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখান। মুক্তির বিনিময়ে তারা একটি বিলে সই ও আপনার পিতার ফার্মের মালিকানা দাবি করেন। একদিকে পিতা-মাতার মৃত্যু, অন্যদিকে তাদের হত্যার দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় বিপর্যস্ত আপনারা তাদের সব দাবি মেনে নিয়ে পালিয়ে আসেন।’ থামল আহমদ মুসা।
শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তখন ড্যানিশ দেবানন্দ এবং ডাক্তার সস্মিতা বালাজীর।
আহমদ মুসা থামতেই ড্যানিশ দেবানন্দ উঠে দাঁড়িয়ে বিহব্বল কণ্ঠে বলল, ‘আপনার কথার প্রতিটি বর্ণ সত্য। কিনতু সেই গোয়েন্দ কর্মকর্তা এসব জানলেন কি করে? এ তো কারও জানার কথা নয়। এসব তিনি আপনাকে বললেনই বা কেন?’
‘আমার সেই সাবেক গোয়ান্দো বন্ধু সে সময় আন্দামন-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জির প্রধান গোয়েন্দা কর্মকতা ছিলেন। তিনি ঐ ঘনটার তদন্দ করেছিলেন। তিনি মহাগুরু শংকারাচার্য শিরোমনিকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। শংকরাচার্য সব বিষয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি সব কথা নাকি খুলে বলেছিলেন। কিন্তু চার্জ শিটের আগেই মামলার কার্যক্রম অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যায়।’
আবেগ-উত্তেজনায় ধপ করে আবার চেয়ারে বসে- পড়ল ড্যানিশ দেবানন্দ। বলল, ‘মহাগুরু শংকরাচার্য শিরোমনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন? আমার এ দুর্দশা ও আমার পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণ এই মহাগুরু শংকরাচার্য শিরোমনি। কিন্তু তিনি কি আমার পিতামাতাও খুনি?
‘সব আলোচনা তিনি করেননি। তবে এটুকু বলেছিলেন, আপনার আব্বার ড্রইংরূম, করিডোর এবং বাইরের গেট সব জায়গায় টিভি ক্যামেরা ছিল। শংকরাচার্য এটা জানতেন না। তদন্তে গিয়ে সব ফিল্ম তিনি পেয়ে যান। যার ফলে শংকরাচার্য কোন অপরাধই গোপন করতে পারেননি।’
‘থ্যাংকস গড়। আমি ঈম্বরের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঈশ্বর অবশ্যই আছেন, তা না হলে দৃশ্যপট এভাবে উল্টে গেল কেমন করে?’
আহমদ মুসা ভাবছিল মহাগুরু শংকরাচার্য শিরোমনির ব্যাপার। ড্যানিশ দেবানন্দ তাকে চেনে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কতটুকু চেনে, কতটা জানে তাকে। তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সে কি জানে? ড্যানিশ দেবানন্দ থামতেই আহমদ মুসা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘শংকরাচার্য শিরোমনির সাথে আপনার বিরোধরে কারণ কি? তার সাথে আপনাদের জানা-শোনা কিভাবে, কেমন করে, কতটুকু জানেন তাকে আপনি?’
একটু ভাবল ড্যানিশ দেবানন্দ। বলল, ‘যতদুর মনে পড়ছে শুরুর দিকে শংকরাচার্য ও তার লোকোরা আসতেন মহারাষ্ট থেকে। ‘শিবাজি সন্তান সেনা’ নামে তাদের কি এক সংগঠন আছে। সংক্ষেপে বলত, ‘সেসশি’ বা সূর্য। এই সংগঠনের জন্যে মোটা চাঁদা নিত প্রতিবছর। তারা বলত, জাতির প্রতিরক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কাজ করছে। আমি বাঙ্গালোর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আন্দামানে ফিরে এলাম। বাবার বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনষ্ট্রাকশন ফার্ম ফিল এখানে। কিন্তু আমি তাতে যোগ না দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলাম। এর বড় কারণ ছিল বাবার টাকা কামাবার কৌশল আমার পছন্দ হতো না। সরকারি কনষ্ট্রাকশন ফার্মে যোগ দিলে শংকরাচার্য ও তার লোকরা আমার কাছে যাওয়া আশা শুরু করল। তাদের আবেগ-উত্তেজনাকর কথা আমার খুব পছন্দ হতো। আমি…………।’
‘তাদের আবেগ উত্তেজনাকর কথাগুলো কেমন ছিল?’ ড্যানিশ দেবানন্দের কথার মাঝখানে বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘শমাংক, শংকরাচার্য, শিবাজী, গান্ধীর জীবন তারা সমানে নিয়ে আসত। বলত যে, তাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্যেই আমাদের সংগঠন। তারা ভারতবর্ষকে আর্য-মুনি-ঋষিদের শাস্তিত সাম-গান ধ্বনিত এক স্বর্গ বানাতে চেয়েছিলেন। সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে ভারতবর্ষকে সেই রূপ দেয়অর জন্যেই আমরা কাজ করছি। তাদের এই কথা আমার খুব ভালো লাগত। এই ভালোলাগার কারণেই আমি ওদের
অনেক প্রোগ্রামে গেছি, ওদের অফিসগুলোতে গেছি। কিন্তু……………।
আবার ড্যানিশ দেবানন্দের কথায় বাধা দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আন্দামানেও কি তাদের অফিস ছিল? কোথায় ছিল?’
‘অফিস ছিল, গোপনে পরিচালিত তাদের প্রধান অফিষ ছিল ‘রস’ দ্বীপের ফাষ্ট সার্কেলে, যেখানে আন্দামানের গভর্নরের অফিস, বাসভবন ও ডিফেন্স ষ্টোরেজ ছিল। ডিফেন্স ষ্টোরের পাশেই গভর্নর ও তার পরিবারের আন্ডার গ্রাউন্ড শেল্টার ছিল তাদের প্রধান অফিস। সে আন্ডা গ্রাউন্ড শেল্টারের মাটির উপর ছিল গভরর্নর ভবনের ব্যাকওয়ার্ড এক্সিট বা পেছনের দরজা। সেটা ছিল কয়েকটি ঘরের সমষ্টি পাথরের তৈরি দু’তলা একটি স্থাপনা। এখান দিয়ে যেমন বাইরে বের হওয়া যায়, তেমনি আন্ডার শেল্টারে যাওয়া যায়। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টার থেকে ডিফেন্স গোডাউনে যাওয়ারও পথ আছে। ১৯৪১ সালে জুনের ভুমিকম্পে গভর্নর ভবনসহ রস দ্বীপের সব সরকারি স্থাপনা মাটির সাথে মিশে গেছে। কিন্তু আন্ডার শেল্টার, এর মাথার উপরের দু’তলা অংশ এবং ডিফেন্স গোডাউন সম্পুর্ণ অক্ষত রয়ে গেছে। এটাই শংকরাচার্যদের ‘সেসশি’ বা ‘সূর্য’ সংগঠনের আন্দামান হেড কোয়ার্টার। কিন্তু এখানে সাইনিবোর্ড আছে পুরাতত্ত্ব পবিভাগের আঞ্চলিক অফিসের। অফিসে পুরাতত্ত্ব বিভাগের কয়েকটা চেয়ার-টেবিল, ফাইল ছাড়া কোন কাজ নেই। পরিচালকসহ দু’তিন জন কর্মচারী আছে তারা কার্যত ‘শিবাজী সন্তান সেনা’ ‘সেসশি’র বেতনবুকে পরিণত হয়েছে। আন্দামান নিকোবরের সবগুলো পুরাতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অফিসই তাদের দখলে। এসব অফিসের কয়েকটিতে আমি গিয়েছি।’ থামল ড্যানিশ দেবানন্দ।
সে থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘আপনি ওদরে কথা পছন্দ করতেন। বলুন তার পরে কথা।’
‘হ্যাঁ, ওদের কথা-বার্তা ও কাজ আমার খুবই পছন্দ হতো। কিন্তু পরে এই পছন্দ আমি ধরে রাখতে পারিনি। প্রথমেই মন আমার বিষিয়ে ওঠে তাদের একটা দাবি শুনে। এক কোটি টাকা বাজেটের একটা রোড কনষ্ট্রাকশন তখন আমার হাতে নিয়েছিলাম। স্বয়ং মহাগুরু শংকরাচার্য শিরোমনি আমাকে এসে বললেন, প্রকল্পের অর্ধেক টাকা তাদের ফান্ডে দিতে হবে। তার মানে প্রকল্পের ১ কোটি টাকা মধ্যে ৫০ লাখ টাকাই তাদের দিতে হবে। বিস্ময়ে আমার চোখ ছাড়াবড়া। বললাম, ‘কেন দিতে হবে?’ ‘জাতির জন্যে জাতির কাজে।’ বললেন তিনি। ‘কিভাবে দেব? এ টাকা তো জাতির কাজের জন্যেই।’ বললাম আমি। ‘তোমাদের প্রকল্প দেশের কাজের জন্যে, জাতির কাজের জন্য নয়। দেশ ও জাতি এক নয়। দেশ এখন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সকলের। এই দেশ পবিত্র না করতে পারা পর্যন্ত দেশের স্বার্থের প্রতি আমাদের কোন আগ্রহন নেই।’
তার এই কথা সেদিন আমাদের বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিল। তাদের ভেতরের জঘন্য রূপ আমাকে আতংকিত করে তুলেছিল। আমি সেদিন তাদের দাবী প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এই বলে যে, আমার এই চাকরিটা দেশের স্বার্থ দেখার জন্যে। আমি দেশের এক পয়সাও প্রকল্পের বাইরে খরচ করতে পারবো না। আমার প্রত্যাখ্যানকে শংকরাচার্য তাদের চূড়ান্ত অপমান ও আমার জাতিদ্রোহিতার হিসেবে দেখেছিল। আমি না বুঝলেও সেই থেকে আমার ও আমার পরিবারের প্রতি তাদের শত্রুতার শুরু। আরেকটা ঘটনা ঘটতে দেখেছি পোর্ট ব্লেয়ারের সেলুলার জেলে আমার চোখের সামনে। সেদিন সেলুলার জেল প্রতিষ্ঠার দিনকে ‘কালো দিবস’ হিসাবে পালনের অনুষ্ঠান ছিল। সরকারি প্রয়োজেন অনুষ্ঠান হচ্ছেল। সেলুলারে যেসব বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন, যারা জেলে মারা গেছেন এবং সেলুলার জেলে যারা ফাঁসিতে জীবন দিয়েছিলেন, তাদের সচিত্র বিবরণ অনুষ্ঠানের মঞ্চ ও দেয়ালে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তার মধ্যে আন্দামানের লর্ড মেয়োকে হ্যত্যাকারী সেলুলার জেলের কয়েদী সেলুরার জেলেই ফাঁসিতে জীবন দানকারী শের আলী, সেলুলার জেলের সুপরিচিত কয়েদি দামোদর সাভারকার এবং সেলুলার জেলে মৃত্যুবরণকারী একজন দাশীনক মওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী-এই তিনজনের সচিত্র বিরণ মঞ্চের দেয়ালে টাঙানো হয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরু হলে স্বাগত বক্তব্য দেয়ার সময় মহাগুরু শংকরাচার্য এবং স্বামী স্বরূপানন্দ সামনের কাতার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত ভাষণ থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মঞ্চের দেয়াল থেকে শের আলী ও মওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর সচিত্র বিবরণসহ অনুষ্ঠান কক্ষের দেয়ালে মুসলিম নামের যাদের পরিচিতি টাঙানো আছে, সব সরিয়ে ফেলা হোক।’ অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দিচ্ছেলেন ভারতীয় ইতিহাসের প্রবীণ প্রফেসর এবং আন্দামান-নিকোবর স্মৃতিরক্ষা প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক রমানন্দ রাধাকৃষ্ণাণ। তিনি হাত জোড় করে তাদের বসতে অনুরোধ করে বললেন, শের আলী ও মাওলানা খয়রাবাদীসহ তাদের বিবরণ সরিয়ে নিলে, তাদের প্রতি যেমন অসম্মান হবে, তেমনি আমাদের অনুষ্ঠানেরও অঙ্গহানি হবে।’
তার এই কথার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান হলে চল্লিশ পঞ্চাশ জুন গেরুয়াধারী দাঁড়িয়ে গেল এবং একযোগে চিৎকার করে বলল, ‘ওদের সরিয়ে দিন। ওরা কেউ নয়, ওরা কেউ নয়?’ বুঝলাম শংকরাচার্য আট-ঘাট বেঁধে এসেছে।
রমানন্দ রাধাকৃষ্ণাণ আবার হাত জোড় করে বললেন, ‘সম্মানিত উপস্থিতি, ্কষদিরাম যেমন ভারতীয় ইতিহাসের জাতীয় বীর, তেমনি শের আলীও। সাভারকার যেমন আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র, তেমনি ফজলে হক খয়রাবাদীর আত্নদানও আমাদের গর্বের বস্তু। আমি আপ……..।’
কথা শেষ করতে পারলো না রাধাকৃষ্ণাণ। দর্শকের আসন থেকে র্শকরাচার্য এবং স্বরূপানন্দ ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাধাকৃষ্ণাণের উপর। তাদের হারেদ ত্রিশুল দিয়ে তার উপর প্রহার শুরু করল। ওদের হাত থেকে রাধাকৃষ্ণাণকে যখন উদ্ধার করা হলো, তখন তিনি রক্তাক্ত। অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে গেল। এই ঘটনার পর আন্দামানের সেলুলার জেল ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ও রেকর্ড থেকে ভোজবাজীর মত মুসলিম নাম উবে গেল।
এই ঘটনার পর আমি শংকরাচর্যদের ঘৃণা করতে শুরু করি। এরপর আমি কোন কাজেই ওদের সহযোগিতা করিনি।’
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল ড্যানিশ দেবানন্দ। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘আমি অনেক কথা বলেছি, এবার আপনি বলুন।’
বলে চেয়ারে হেলান দিল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ঠিক বলেছ, আমরা তো ওঁর নাম পর্যন্ত এখনও জানি না।’
বলে তাকাল ডাক্তার সুস্মিতা বালাজী আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আমার বিস্ময় লাগছে শংকরাচার্যদের ব্যাপারে আপনার আগ্রহ দেখে। আপনি আপনার বন্ধু সাবেক গোয়েন্দার কাছে প্রসংগক্রমে শংকরাচার্যের সম্পর্কে শুনেছেন। কিন্তু শুধু এটুকু শোনা থেকে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে এত আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।’
‘ঠিক বলেছেন। শংকরাচার্যদের সম্পর্কে আমিও কিচু জান, তাই আরও কিছু জানার চেষ্টা করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন?’ ডাক্তার সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘আমি শুধু শংকরাচার্য নয়, তাদরে ‘সেসশি’ অর্থাৎ ‘শিবাজী সন্তান সেনা’দের সম্পর্কে সবকিছু জানতে চাই। স্বামী স্বরূপানন্দ এখন নেই এবং মহাগুরু স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনিও এখন পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বটে, কিন্তু তাদের শিবাজী সন্তান সেনা এখনও তাদের মতই ভয়ংকর।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজীর চোখে-মুখে বিষ্ময় ফুটে উঠেছে। বলল ড্যানিশ দেবানন্দ, ‘শংকরাচার্য পালিয়ে বেড়াচ্ছে এবং স্বরূপানন্দ নেই মানে?’
‘স্বামী স্বরূপানন্দ নিহত হয়েছে আজ কিছুক্ষণ আগে এবং শংকরাচার্য দু’দিন আগে ভাইপার দ্বীপের পুরানো জেলখানায় শের আলীর বসবাস ও ফাঁসির স্থানেই মৃত্যুর মুখ থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা গম্ভীর কণ্ঠে।
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজীর বিষ্ময় ভরা দুই জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। দু’জনেই উন্মুখ হয়ে উঠেছে কিছু বলার জন্যে। সুস্মিতা বালাজীই আগে বলে উঠল, ‘এতটা বিস্তারিত খবর ও নিখুঁত তথ্য আপনি জানেন কি করে? আপনি কি সবকিছু…..।’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল সুস্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসার মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘যার নেতৃত্বে আমাকের আজ বন্দী করা হয়েছিল তিনি স্বামী স্বরূপানন্দ। আমি বন্দীখানা থেকে পালাবার সময় যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে স্বামী স্বরূপানন্দও আছে। আর শংকরাচার্যরা আন্দামানে আমার গাইড ও সাথী গোপী কিষাণ গঙ্গারাম ওরফে গাজী গোলাম কাদেরকে বন্দী করে রেখেছিল ভাইপার দ্বীপের ঐ জেলে। আমি তাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলাম। সংঘর্ষে যারা নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে শংকরাচার্যও থাকার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভাঙ্গ জেলখানার আন্ডার গ্রাউন্ড গোপন পথ দিয়ে সে পালাতে সক্ষম হয়।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজীর চোখে-মুখে বিষ্ময়-কৌতুহল আরও বেড়েছে। তারা দেখছে আহমদ মুসাকে। হঠাৎ তাদের মনে হচ্ছে, যে সহজ সরল যুবককে তারা দেখছে, সে যেন আসলে অন্য কেউ, অন্য কিছু। তার বয়সের চেয়ে, তার আকারের চেয়ে অনেক উঁচুতে উঠল যেন সে। কথা বলে উঠল ডাক্তার সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘এবার আপনার সম্পর্কে দয়া করে কিছু বলুন।’
আহমদ মুসা তাকাল ডাক্তার সুষ্মিতা বালাজীর দিকে। বলল, ‘এভাবে কথা বললে আমার কথা আমি বলতে পারবো না। কোন বড় বোন কি এভাবে কথা বলে?’
চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ডাক্তা সুষ্মিতা বালাজীর। বলল, ‘বড় বোন? বড় বোন বলছেন আমাকে?’
‘কেন বড় বোন হতে পারেন না? আমার জীবনে অনেক ছোট বোন পেয়েছি, কিন্তু বড় বোন একটিও পাইনি। বড় বোনের মধুর অভিভাবকত্ব আমার কাছে এক স্বপ্ন।’ বলল আহমদ মুসা। হাসি দিয়ে কথা শুরু করলেও শেষে আহমদ মুসার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠেছিল।
আগেবে ভারী হয়ে উঠেছে ডাক্তার সুষ্মিতা বালাজীর চোখ-মুখ। বলল, ‘থ্যাংকস গড়। কেন পারবো না বড় বোন হতে। আমার কোন ছোট ভাই নেই। ঈশ্বর যদি একটি ছোট ভাই দেন, সেটাকে আমি অসীম দয়া বলেই গ্রহণ করব।’ আবেগ-ঘন কণ্ঠে বলল ডাক্তার সুষ্মিতা।
‘এবার বড় ভাইটি তোমার নাম?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলে উঠল।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘কোন নাম বলব, পাসপোর্টের নাম, না পিতা-মাতার দেয়া নাম? আমার……………।’
‘দুই নাম তো হয় না। পিতা-মাতার দেয়া নামই তো পাসপোর্টের নাম হয়। নাম বদলালেও নাম একটাই হয়ে থাকে।’
‘আমি আন্দামানে আসার সময় মার্কিন পাসপোর্ট নিয়ে এসেছি। এ পাসপোর্টে আমার নাম দেয়া হয়েছে বেভান বার্গম্যান। এটাই এখন আমার নাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মার্কিন পাসপোর্ট নেয়ার আগে কোন দেশের পাসপোর্ট ছিল? কি নাম ছিল?’ জিজ্ঞাসা করল ডাক্তা সুষ্মিতা বালাজী।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন পাসপোর্ট দিয়েছে, তেমনি অনেক দেশই দিয়েছে আমাকে পাপোর্ট। নামও বিভিন্ন হয়েছে।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজী দুজনের চোখই বিষ্ময়ে বিষ্ফোরিত। বলল সুষ্মিতা বালাজীই আবার, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিমিনালদের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নামের পাসপোর্ট থাকে। কিন্তু তোমাকে তো ক্রিমিনাল বলে মনে হচ্ছে না।’
‘ক্রিমিনালদের যারা ধরে তাদের কিন্তু এ রকম পাসপোর্টের দরকার হয়ে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে কি তুমি গোয়েন্দা? ইন্টারপোলের কেউ?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘না গোয়েন্দা নই, পুলিশও নই।’
‘কিন্তু ছদ্মনামে তাহলে আন্দামানে এলে কেন?’
তৎক্ষণাৎ জবাব না দিয়ে একটু ভাবল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘আসল নামে এলে প্রতিপক্ষ সাবধান হয়ে যেত। আমি চাইনি ‘মিশন’ সফল করার আগেই ঝামেলায় পড়ি।’
‘এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, তোমার নাম তোমার প্রতিপক্ষ এবং অনেকেই আগে থেকেই জানে। তোমার প্রতিপক্ষ এখানে কে? তোমার মিশন এখানে কি?’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
প্রতিপক্ষের কাউকেই চিনতাম না। এখানে এসে তাদের মধ্যে যাদের চিনেছি তারা হলেন মহাগুরু শংকরাচার্য শিরোমনি, স্বামী স্বরূপানন্দ এবং দেখেছি নাম না জানা কিচু লোককে।’
‘অবাক ব্যাপার, মিশন নিয়ে এসেছ, অথচ তাদের কাউকে চেন না, নামও জান না! মিশনটা কি ছিল?’ জিজ্ঞাসা ডাক্তার সুষ্মিতা বালাজীর।
‘ধরুন একটা খুন হলো। খুনিকে ধরার মিশন নিয়ে এলেন। খুনিকে চেনা মিশনের শর্ত নয়।’
হাসল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘ঠিক। কিনতু তুমি কি সেরকম কোন মিশন নিয়ে এসেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কি সেটা?’
‘যে কথা কিছুক্ষণ আগে বলেছিলাম। গত কিছুদিনের মধ্যে প্রায় অর্ধ শতের মত লোক খুন হয়েছে আন্দামান নিকোবরে। খুন বলে প্রচার হয়নি। প্রচার হয়েছে তারা অপঘাতে মারা গেছে। কিন্তু আসলেই সবগুলো কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার। সবচেয়ে লক্ষনীয় হলো হত্যার শিকার সবাই একই কম্যুনিটির লোক। দ্বিতীয়………।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে কথা বলে উঠল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘কোন কম্যুনিটির লোক তারা?’
‘মুসলিম।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো ড্যানিশ দেবানন্দ এবং সুষ্মিতা বালাজীর। গম্ভীর হয়ে উঠল তাদের মুখ।
‘দ্বিতীয় যে বিষয়’, আবার কথা শুরু কলল আহমদ মুসা, ‘ভয় হলো, ‘রাবেতায়ে আলম আল ইসলামী’ নামের আন্তর্জাতিক একটি মুসলিম সংগঠন পোর্ট ব্লেয়ার উপসাগরের ‘সবুজ দ্বীপটি’ ভাড়া নিয়ে সেখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ক একটা কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছিল। সে কমপ্লেক্সটি রাতারাতি দ্বীপ থেকে উধাও হয়েছে। কোন স্থাপনা সেখানে ছিল, এ চিহ্নও নেই। তৃতিীয়ত, ভারতের মোঘল রাজবংশের ধ্বংসাবশেষের একটা টুকরো আন্দামানে ছিল। যুবক আহমদ শাহ্ আলমগীর এখানকার মোগল পরিবারটির একমাত্র পুরুষ সন্তান। সে নিখোঁজ এবং তার মা এবং একমাত্র বোনের জীবন হয়ে উঠেছিল বিপন্ন। এই রহস্যপূর্ণ ও উদ্বেগজনক বিষয়গুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাবার মিশন নিয়েই আমি আন্দামানে এসেছি। এই মিশন ছাড়া আন্দামানের আর সবটাই ছিল আমার কাছে অন্ধকার।’
‘অন্ধকারে আলো জ্বলল কি করে? শংকরাচার্যদের সন্ধান পেলে কি করে?’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসা আন্দামানে আসার পথের ঘটনা, পোর্ট ব্লেয়ারের একজন শিক্ষক গঙ্গারাম তিলকের সাথে সাক্ষাত এবং পোর্ট ব্লেয়ারে আবার পর গোপী কিষণ গঙ্গারামের সাথে পরিচয় হওয়া এবং প্রাথমিক ঘটনাগুলোর সব বিবরণ দিয়ে বলল, আহমদ শাহ্ আলমগীরের বাসায় পৌঁছতে সেদিন একটু দেরি হলে তার মা বোনকে পাওয়া যেত না। কিডন্যাপ থেকে তাদরে রক্ষা করতে দিয়ে দশ বারো জনের জীবনহানী ঘটেছে। তারপর ওদেরকে হোটেলে রাখা, গোপী কিষণ গঙ্গারাম কিডন্যাপ হওয়া থেকে পরবর্তী সব ঘটনা বলল আহমদ মুসা।
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিমা বালাজী দু’জনেরই চোখে-মুখে অপার বিষ্ময়। ড্যানিশ দেবানন্দ বলল, ‘তুমি দেখছি রীতিমত লড়াইয়ের মধ্যে আছ।’
ড্যানিশ দেবানন্দের কথা শেষ হতেই সুষ্মিতা বালাজী বলল উঠল, ‘কি বলছ, শাহ্ বানু ও তার মাকে একদম গভর্নরের বাড়িতে নিয়ে রেখেছ!
‘গভর্নর বিবি মাধবের মেয়ে সুষমা রাও আহমদ শাহ্ আলমগীরকে ভালবাসে এবং তার খাতিরেই সে এতবড় ঝুঁকি নিয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল সুষ্মিমা বালাজী। বলল, ‘মহারাষ্ট্রের বিশেষ করে বালাজী রাও বংশের মেয়েরা রাজপুত মেয়েদের মতই। এরা কথা দিয়ে জীবন দিয়েও রাখে।’
হাসল ড্যানিশ দেবানন্দও। বলল, ‘আমি ভাগ্যবান স্বীকার করতেই হবে।’
বুঝার চেষ্টা করে আহমদ মুসাও হেসে উঠল। বলল, ‘আমিও ভাগ্যবান যে আমার আপা বালাজী রাও পরিবারের।’
মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে সুষ্মিতা বালাজী বলল, ‘ভাগ্যবান হতেই হবে। বালাজীরা শুধু ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাক্ষ্মণ পরিবারই নয়, তারা মারাঠা শক্তির স্রষ্টা।’
‘ধন্যবাদ আপা। কিন্তু বলুন তো গভর্নর বালাজী বাজীরাও মাধন পরিবারের সাথে আপনার যোগাযোগ এখন কেমন?’ বলল আহমদ মুসা।
গম্ভীর হলো সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘তিনি আমার মামা। কিন্তু যোগাযোগ নেই গত বিশ বছর।’ সুষমা’ আমারই দেয়া নাম। আমি দেখেছিও তাকে সেই বিশ বছর আগে।’
‘আপনাদের বিপদে কোন সাহায্য তাদের নেননি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সে অনেক কথা। আমার অসমবর্ণ বিয়েকে আমাদের পরিবার গ্রহণ করেনি বলে আমি কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে যাইনি। তাছাড়া আমাদের কাছে পুলিশের চেয়ে বড় বিপদ ছিলেন শংকরাচার্যরা।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই ড্যানিশ দেবানন্দ মুখ খুলল। বলল, ‘দেখ সুষ্মিতা, বত্রিশ সিংহাসনের কেচ্ছার মত আমাদের কথায় কিন্তু নানা শাখা গজাচ্ছে। আসল কথাই এখনও আমরা জানিনি। এতক্ষণ তোমার ভাইয়ের যে কাহিনী আমরা শুনলাম, তাতে মনে হচ্ছে আমরা আরেক রবিনহুডের পাশেই বসে আছি। কিন্তু রবিহুডের নাম পর্যন্ত আমরা জানি না।’
সুষ্মিতা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। তারও মনে এই একই কথা। মাত্র একজন লোক বাইরে থেকে আন্দামানে এসে নিজের কোন স্বার্থে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লো, অসম সাহসের সাথে বিরাট এক পক্ষকে মোকাবিলা করলো, পথে দাঁড়ানো সব শক্তিই এ পর্যন্ত যার কাছে পরাভূত হলো, বিষ্ময়কর এই ব্যক্তিটি কে? ড্যানিশ দেবানন্দের কথা কানে যাওয়ার পর সুষ্মিতা বালাজির ভাবান্তর ঘটল। বলল, ‘দেবানন্দ ঠিক বলেছে। তোমার সত্যিকার নামই তো আমাদরে এখন ও জানা হয়নি, তোমার পরিচয়ও বলনি।’
‘আপনাদের কম্পিউটার আছে?’
‘আছে। কিন্তু তুমি অন্য কথায় যাচ্ছ কেন?’
‘যাইনি। কম্পিউটারে ইন্টারনেট কানেকশন আছে?’
‘অবশ্যই। আমাদের সংবাদপত্রের তৃষ্ণা মেটেতো ইন্টারনেট দিয়েই। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে এ প্রসঙ্গ আনছ কেন?’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘প্রাসঙ্গিকভাবেই বলছি। কোথায় আপনাদের কম্পিউটার?’
উঠে দাঁড়াল ড্যানিশ দেবানন্দ। বলল, ‘সুষ্মিতা, কম্পিউটার এখানেই নিয়ে আসি।’
বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মিনিট খানেকের মধ্যে সে কম্পিউটার ঠেনে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। কম্পিউটার দাঁড় করাল আহমদ মুসার মাথার কাছে।
ড্যানিশ দেবানন্দ তার চেয়ারে ফিরে এল।
আহমদ মুসা উঠে বসতে গেলে সুষ্মিতা বালাজী তাকে ধরে বসাল।
‘আপা, আপনি দেখছি আমাকে পরনির্ভরশীল করে ছাড়বেন। এর চেয়ে অনেক অনেক খারাপ অবস্থাতেও কেউ আমাকে এভাবে সাহায্য করে না।’
‘বউ এখানে হাজির নেই। তার বিরুদ্ধে বদনাম ছড়িও না।’
‘বদনাম নয় আপা। এমন অবস্থায় দূরে দাঁড়িয়ে সে সাহস দেয় আর বলে, উঠে উঠে যাচ্ছ, কোন কষ্ট হচ্ছে না তোমার ইত্যাদি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে স্ত্রীকে ‘স্ত্রী’ না বানিয়ে এক অপারত ‘তুমি’ বানিয়েছ। কিন্তু…।’
সুষ্মিতা বালাজীর কথার মাঝখানে ড্যানিশ দেবানন্দ বলে উঠল, ‘সুসি, ওকে তুমি আবার ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছ। কম্পিউটার এনে দিয়েছি, এখন আমাদের প্রশ্নের জবাব চাই।’
‘ধন্যবাদ ড্যানি।’
বলে আহমদ মুসার দিকে তাকাল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘কম্পিউটার তো এসেছ। আগে প্রশ্নের জবাব দাও। তারপর কম্পিউটার হাত দিও।’
‘দু’টোই হবে।’
বলে আহমদ মুসা কম্পিউটাররের কি বোর্ডে হাত চালাতে লাগল।
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজীর দৃষ্টি কম্পিউটার স্ক্রিনের উপর। তাদের চোখে-মুখে বিষ্ময়, তাদের প্রশ্নের জবাবের সাথে কম্পিউটারের কি সম্পর্ক।
ইন্টারনেটে প্রবেশ করেছে আহমদ মুসা। সার্চ করা নয়, সবই যেন মুখস্ত তার। আহমদ মুসার আঙুল নড়ছে, সেই সাথে অবিরাম পাল্টে যাচ্ছে কম্পিউটার স্ক্রিনের দৃশ্যে।
অপলক চোখে তাকিয়ে আছে ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিমা বালাজী কম্পিউটারে স্ক্রীনের দিকে।
তারা দেখল, অস্থির কারসারটি এক সময় শিরোনামে একটি পয়েন্টে গিয়ে স্থির হলো। তারপর আহমদ মুসার তর্জনি একটা কীতে ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে ভেষে উঠল একটা ফটো। ফটোটাকে ধীরে ধীরে স্ক্রীন জোড়া করে তুলল আহমদ মুসা।
ফটো দখে চমকে উঠল ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজী। মুখ ফেঁড়েই যেন কথা বেরিয়ে এল সুষ্মিতা বালাজীর, ‘এতো তোমার ফটো? ইন্টারনেটে কেন?’
প্রশ্ন করে থামল সুষ্মিতা বালাজী।
‘ইন্টারনেটে তোমার ‘ওয়েব সাইট’ আছে নাকি?’ সুষ্মিতার কথার রেশ মিলিয়ে যাবার আগেই ড্যানিশ দেবানন্দের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো প্রশ্ন।
‘আমার কোন ওয়েব সাইট নেই। এটা মার্কিন ‘সিআইএ’র একটি ওয়েব সাইট। শিরোনামঃ ‘পরিবর্তনের নিয়াময় যারা’ (Potentials of Change) ।’
‘সাংঘাতিক ব্যাপার। সিআইএ’র ‘পটেনশিয়ালস অব চেইঞ্জ’-এ তোমার পরিচিতি দিয়েছে? দেখি।’
বলে সুষ্মিতা বালাজী চেয়ার টেনে এগিয়ে এলো কম্পিউটারের কাছে।
ড্যানিশ দেবানন্দও চেয়ার টেনে সুষ্মিতার পাশে বসল।
প্রথম ওয়েব পেশ খোলাই ছিল।
ছবির নিচেই জ্বল জ্বল করছে একটি নামঃ ‘আহমদ মুসা।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজীর চোখ আটকে গেল নামটার উপর।
বিষ্ময়ের এক ধাক্কা তাদের দু’জনের মুখেই আছড়ে পড়ল। কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে তাদের কপাল। নীরব দৃষ্টিতে দু’জন দু’জনের দিকে তাকাল। নামটা দু’জনেরই চেনা। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তার সম্পর্কে জেনেছে। সবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন সংকটে তার ঐতিহাসিক অবদা এবং টুইনটাওয়ার ধ্বংসের রহস্য উদঘাটনের শ্বসরুদ্ধকর কাহিনী তাদের সামনে রয়েছে। অনেক ঘটনার বিষ্ময়কর সেই নায়ক আমাদের সামেনের এই লোকটি? তাকেই কি আমরা শত্রুর হাত থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে এনেছি। গর্ব ও তৃপ্তির শিহরণ খেলে গেল তাদের দেহে। তারা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার দৃষ্টি তখন জানালা দিয়ে বাইরে নিবদ্ধ। বাইরে দেখা যাচ্ছিল নিচে উপত্যাকার সবুজ বনানীর উপর দিয়ে আন্দামান উপসাগরের নীল পানি। এই নৈসর্গিক দৃশ্যের কোন অন্তহীনের মধ্যে যেন ডুবে গেছে তার মন। একটা ধ্যানমগ্নতা ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। এ মানুষ তো পৃথিবীকে এবং এই পৃথিবীর সব মানুষকে শুধু ভালই বাসতে পারে। এই মানুষেরই হাতে প্রাণসংহারকারী বন্দুক গর্জন করে ওঠে কি করে!
ড্যানিশ দেবানন্দ এবং সুষ্মিতা বালাজীর চোখে-মুখে এবার বিষ্ময়ের স্থানে ফুটে উঠল শ্রদ্ধার ভাব আর অনেক প্রশ্ন।
কিন্তু আহমদ মুসার ঐ ধ্যানমগ্নতা তারা ভাঙতে চাইল না। সুষ্মিতা বালাজী আবার চোখ ফেরাল কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে। ফটোর নিচেই আহমদ মুসার নাম। তারপরই শুরু আহমদ মুসার ডসিয়ার-তার জীবন ও কাজের বিবরণ।
ড্যানিশ দেবানন্দের চোখও ফিরে এসেছে কম্পিউটার স্ক্রীনে। তারও চোখ আহমদ মুসার ডসিয়ারের উপর।
‘এস ডসিয়ার দেখে নেই। সিআইএ’র ডসিয়ার দেখছি অনেক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল।
‘হ্যাঁ, ঠিক।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
সুষ্মিতা বালাজী ডসিয়ারের এক এক পেজ ওপেন করতে লাগল এবং পড়ে চলল। ড্যানিশ দেবানন্দও।
ওয়েব পেজ পড়া শেষ হলো। বিষ্ময়ে বিমুগ্ধ দু’জনেরই মুখ।
দু’জনেই মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসাও মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়েছে তাদের দিকে।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিনতু তার আগেই ড্যানিশ দেবানন্দ বলে উঠল, ‘মিঃ আহমদ মুসা, শ্রীকৃষ্ণ যদি এখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তাহলেও আমরা এত বিষ্মিত হতাম না, যতটা বিষ্মিত হয়েছি আপনাকে এইভাবে পেয়ে। কারণ, ভগবান ভক্তদের দর্শন দিতেই পারেন, কিন্তু আপনার দেখা পাওয়া ছিল অসম্ভব, অকল্পনীয়। ওয়েলকাম আপনাকে।’
মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার। বলল, ‘ওয়েলকাম জানাবার জন্যে ‘আপনি’ সম্বোধনের কি প্রয়োজন?’
‘আহমদ মুসাকে ‘তুমি’ বলব আমরা কি করে?’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘বলুন আপনি আহমদ মুসার পিতা-মাতা, বড় ভাই, বড় বোননা কি তাকে ‘আপনি’ বলবে?’
‘তা বলবে না।’
‘তাহলে আপনি কি বড় বোন হতে অস্বীকার করছেন?’
একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল সুষ্মিতা বালাজী। তার মুখে নেমে এল বেদনার ছায়া। তাকাল পূর্ণ দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘না, অস্বীকার করতে পারি না, এ ডাক কেউ প্রত্যাখান করতে পারে না।’ আবেগের উচ্ছাছে আটকে গেল সুষ্মিতার বালাজীর শেষ কথাগুলো।
একটু থেকে নিজেকে সামলে, চোখে টলটলে অশ্রু নিয়ে মুখে হাসি টানার চেষ্টা করে বলল, ‘যাই বলুন, আপাতত ‘তুমি’ সম্বোধন মখে আসছে না এবং নাম ধরে ডাকতে পারবো না। ঠিক আছে?’
‘না, এ আপোষ প্রস্তাবে না করা কিছু নেই।’ বলে ড্যানিশ দেবানন্দ মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনাকে এভাবে পেয়ে বিষ্ময়ে যে শক খেয়েছি আমরা, তার চেয়ে কিন্তু বেশি বিষ্ময়কর মনে হচ্ছে আপনার আন্দামানে আসা। আপনি যখন এসেছেন, তখন ধরতেই হবে এখানে খুব বড় একটা ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সেটা কি? মাত্র কয়েক ডজন লোক খুন হওয়া দু’একজন কিডন্যাপড হওয়া খুব বড় ঘটনা নয়, এমন ঘটনা বহুদেশেই এখন ঘটছে।’
গাম্ভীর্যের একটা ছায়া নামল আহমদ মুসার চোখে। বলল, ‘ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ধরুন, ঐ নিহত লোকরা যদি একটা ধর্ম বিশ্বাসের হয়, কিডন্যাপপ লোকটিও যদি ঐ একই কম্যুনিটির হয়, তাহলে এর একটা ভিন্ন অর্থ হয় না?
বিষ্ময় নামল ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজীর চোখে-মুখে। কথা বলে উঠল সুষ্মিতা বালাজীই প্রথম। বলল, ‘তাম মানে নিহতরা সবাই মুসলামান।
‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহল দাঁড়াচ্ছে বিষয়টা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষজাত।’ সুষ্মিমা বালাজী বলল।
‘শংকরাচার্য শিরোমনির মত লোকরা যখন এর সাথে জড়িত, তখন বিষয়টা যে উৎকট সাম্প্রদায়িক হবে সেটা অবধারিত।’ আহমদ মুসা উত্তর দেবার আগেই বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘আপনি ঠিক বলেছে ভাই সাহেব। বিষয়টা শুধু উৎকট সাম্প্রদায়িক নয়, সাংঘাতিকভাবে পরিকল্পিতিও। আপনি যেটা বললেন, ওরা আন্দামানের সেলুলার জেলের ইতহাস থেকে মুসলমানদের নাম মুছে ফেলতে চায়। ঠিক এভাবেই ওরা আন্দামান থেকেও মুসলমানদের বিশেষ করে সক্রিয়-সচেতন মুসলমানদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চায়। এটাই মুল বিষয়, কিন্তু এর সাথে কিছু অনুসঙ্গ আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সে অনুসঙ্গটা কি?’ প্রশ্ন সুষ্মিতা বালাজীর।
‘আমি জানি না। তবে আমাদের গঙ্গারাম ওদের হাতে বন্দী থাকার সময় শুনেছিল, একটা মহামুল্যবান বাক্স নাকি তারা উদ্ধারের চেষ্টা করছে বড় শয়তান মানে আহমদ শাহ্ আলমগীরের কাছে থেকে। এই বাক্স উদ্ধারের জন্যে তারা যা করার তাই করবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘একটা বাক্স কি করে এই ধরনের একটা ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে? নিশ্চয় তাহলে বাক্সটা বড় কিছুর একটা অংশ।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘হবে হয়তো। আমি এ ব্যাপারে কিছুই শুনিনি।’ আহমদ মুসা বলল।
সুষ্মিতা বালাজী কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘরে প্রবেশ করল রান্নার এ্যাপ্রন পরা একটি মেয়ে। তাকে দেখে থেকে গেল সুষ্মিতা বালাজী। বলে উঠল মেয়েটিকে লক্ষ্য করে, ‘জারওয়া, সব রেডি?’
জারওয়া আদিবাসি মেয়ে। বলল ভাঙা হিন্দিতে, ‘সব তৈরি মাতাজী।’
‘যাও নিয়ে এস।’ নির্দেশ দিল সুষ্মিতা বালাজী।
মেয়েটি চলে গেল।
‘বুঝতে পারলাম না মেয়েটি কোন আদিবাসি গ্রুপের?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘মিশ্র গ্রুপের। আমাদের এই উপত্যকা ও পাহাড়ে সেন্টেনেরিল ও জারওয়া গ্রুপের উপজাতিরা একসাথে এক সমজে বাস করে। বহুদিরে পারস্পরিক বৈবাহিতক সম্বন্ধের ফলে দু’গ্রুপের মিশ্রুণে তৃতীয় একটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘কিন্তু এমন তো শুনিনি। আন্দামান-নিকোবরের চারটি প্রধান উপজাতি গ্রুপই আলাদাভাবে আলাদা অঞ্চলে বাস কের। এদের মধ্যে কোনই সামাজিক সম্পর্ক নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটাই ঠিক ছোট ভাই। কিন্তু এখানকার ব্যাপারটা একটা ব্যতিক্রম। প্রাকৃতিক এক বিপর্যয় এভাবে এক করে দিয়েছে। অনেক বছর আগে ভয়াবহ এই সাইক্লোন উলট-পাঠল করে দিয়েছিল এই দ্বীপকে। পর্বতপ্রমাণ ঢেউ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়েছিল এখান থেকে সেখানে। সেই ঢেউ ৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে রেখে গিয়েছিল এই পাহাড়ে। এই পঞ্চশ জনের একটা অংশ সেন্টেনেলিস ও অপর অংশটা ছিল জারওয়া গ্রুপের। একসাথে মিলে-মিশেই এরা ঘর বাঁধে। এখন ওরা এক হয়ে গিয়েছে।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
সুষ্মিতা বালাজীর কথা শেষ হতেই ট্রলি ঠেলে নাস্তা নিয়ে প্রবেশ করল জারওয়া।
ট্রলিটা এসে দাঁড়াল আহমদ মুসার খাট ঘেঁসে। ট্রলিতে একটা বড় ট্রে। ট্রেতে একদম শহরে নাস্তা-ব্রেড রোল, বাটার কিউব, গরম সুপ ওফরের জুস। তার সাথে কফি-চিনি-দুধের পট এবং তিনটি কাপ।
‘ছোট ভাই, আপনার সংজ্ঞা ফেরার আগে আমাদের নাস্তা হয়ে গেছে। আপনি নাস্তা করে নিন, আমরা কফি খাচ্ছি।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।’
‘ধন্যবাদ। সত্যি ক্ষুধার্ত আমি।’
বলে আহমদ মুসা ট্রলির কাছে সরে এল। নাস্তার উপর একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘সুপটা কিসের? ভেজিটেবল?’
‘না, চিকেন সুপ।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসা সুপের বাটি সামে থেকে একটু পাশে সরিয়ে রেখে ব্রেড-বাটার খেতে শুরু করল।
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজী কাপে কফি ঢেলে নিয়ে খেতে শুরু করল।
‘এই গহীন জংগলে এমন টাটকা নাস্তা কি করে এল?’ আহমদ মুসা বলল।
‘গহীন জংগল হলেও এখান থেকে উত্তরে মায়াবন্দর এবং দক্ষিণে পাহলাগাঁও সমান দূরত্বে। আমাদের আদিবাসি লোকদের ঐ দুই শহরেই প্রতিনিদ যাতায়াত আছে। প্রতিদিনই সরবরাহ আনা হয় সেখান থেকে।’ বলল সুষ্মিতা বালাজঅ।
‘তাহলে মায়াবন্দর কিংবা পাহলাগাঁওয়ে না থেকে এখানে কেন? শংকরাচার্য ও পুলিশের ভয়েই কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটাই প্রথম কারণ। আমরা চেয়েছি, ঐ কশাই-কাপালিক ও পুলিশের ছায়া থেকে দূরে থাকতে। দ্বিতীয় কারণ হলো, এই উপপত্যকা, পাহাড় এবং পাহাড়ীদের আমরা ভালবেসে ফেলে।ছ। এদের নিয়েই আমাদের জীবন। এটাই আমাদের পৃথিবী।’ বলল সুষ্মিমা বালাজী।
আহমদ মুসা ব্রেড-বাটার-জুস খেয়ে কফির কাপ টেনে নিল।
‘সুপ যে থাকল ছোট ভাই। অনে রক্ত গেছে, আপনার জন্যে ওটা খুবই দরকার।’ সুষ্মিতা বালাজী বলল।
এক টুকরো সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। বলল, ‘স্যরি, মুরগির সুপ বলে খেতে পারছি না।’
‘মুরগি খান না?’ সুষ্মিতা বালাজী বলল।
‘খাই। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় বিধান অনুসারে আল্লাহর নাম নিয়ে যদি জবাই করা না হয়, তাহলে মরগি, খাসি, গরু ইত্যাদি কোন প্রাণীরই গোসত আমরা খেতে পারি না।’ বলল আহমদ মুসা।
বিষ্ময় ফুটে উঠল সুষ্মিতা বালাজী এবং ড্যানিশ দেবানন্দ দু’জনের চোখে-মুখেই। কয়েক মুহূর্ত তারা কিছু বলতে পারল না। পরে সুষ্মিতা বালাজী বলল, ‘আল্লাহর নাম নেয়া নয় বলেই এসব কোন কিচুই আপনি খাবেন না? কিন্তু এই নাম নেয়া না নেয়ার মধ্যে কি এমন এসে যায়?’
‘আল্লাহর নাম না নেয়ার মধ্যে গোশতের গন্ধ, স্বাদ কিংবা ফিজিক্যাল কোন পার্থক্য হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সৃষ্টিগত দদি থেকে জীবনের সাথে এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেটা কেমন?’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘এই বিশ্বজগতে যা আছে সকলেই আমরা আল্লাহর সৃষ্ট। সৃষ্টি হিসাবে গরু, ছাগল, ভেড়া, মানুষ, মুরগি সকলেই আমরা সমান। তাহলে আমরা গরু, ছাগল, মুরগি ইত্যাদিকে দেদার জবাই করে খাচ্ছি কেন, কোন অধিকারে? খাচ্ছি এই অধিকারে যে স্রষ্টা স্বর্য় এই অধিকার আমাদের দিয়েছেন। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি বলয়কে চলমান, অব্যাহত রাখার জন্যেই এক সৃষ্টিকে আরেক সৃষ্টির ভোগ্য বানিয়েছেন। মানুষ খাবে মুরগি, মরগি খাবে পোকাড়মাকল, পোকাড়মাকল বাচঁবে আবার অন্যকিছু খেয়ে। এইভাবে সৃষ্টির সবাই বাঁচবে, সষ্টি-জগৎ থাকবে চলমান। সুতরাং আমরা যে গরু খাচ্ছি, মরগি খাচ্ছি, খাসি খাচ্ছি, তা আমাদের শক্তির জোরে খাচ্ছি না, আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে খাচ্ছি। এই বিধানকে স্বীকৃতি দেয়া, স্মরণ করার জন্যেই ভোগ্য প্রাণীকে জবাই করতে আল্লাহত নাম নিতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
সুষ্মিতা বালাজী ও ড্যানিশ দেবানন্দ যে গোগ্রাসে গিলছিল আহমদ মুসার কথা। তাদের স্থির দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের উপর। আর বিষ্ময়ে হা হয়ে গেছে তাদের মুখ। আহমদ মুসা থামলেও তারা কথা বললো না। তাদের দৃষ্টি একইভাবে নিবদ্ধ থাকল আহমদ মুসার দিকে। তাদের শোনা যেন শেষ হয়নি। অথবা যেন হজম করছে আহমদ মুসার কথাগুলো।
আহমদ মুসা কফির কাপ তুলে নিয়ে একটু একটু চুমুক দিচ্ছিল গরম কফিতে।
নীরবতা ভাঙল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘ধন্যবাদ ছোট ভাই, আপনি অপরূপ এক সৃষ্টি-দর্শন সামনে নিয়ে এসেছেন। জীবন ধারণের জন্যে একে-অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত বা নির্ভরশীল সৃষ্টি বলয়ের কথা আমরাও জানি, কিন্তু এর সাথে স্রষ্টার ইচ্ছা বা বিধানকে যুক্ত করে একে যে অপরূপ করে তুললেন, সেটা বিষ্ময়কর শুধু নয়, তা জীবনের এক নতুন অর্থ সামনে নিয়ে আসে।’
বলে একটা দম নিল সুষ্মিতা বালাজী। একটু ভাবল। তাপর বলল, ‘কিন্তু বলুন স্রষ্টার নাম নিয়ে তার বিধানকে স্বীকৃতি না দেয়া, বা স্বরণ না করার মধ্যে ক্ষতি বৃদ্ধি কি আছে? আইন বা সিষ্টেম হিসাবে কেন এ বিষয়টাকে অপরিহার্য করে নিতে হবে।’
‘আল্লাহর এই ইচ্ছা ও বিধানকে স্বরণ করা বা স্বীকৃতি দেয়ার মধ্যে বড় লাভ হলো,পৃথিবীতে আমরা ভোগ দখলের ক্ষেত্রে আমার শক্তিকে আমি আমার ক্ষমতাকে বড় করে দেখছি না, নিয়ামক ভাবছি না বরং আল্লাহর দেয়া অধিকার হিসেবেই ভোগ দখল করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষ গ্রহণ করলে, জীবনের সবক্ষেত্রেই সে এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ করবে। সবক্ষেত্রেই সে আল্লাহর ইচ্ছা ও বিধান তালাশ করবে। এই জীবন-দর্শন যখন কোন মানুষের অনুসরণীয় হয়ে যায়, তখন মানুষ কেন কোন পশু-পাখিও তার দ্বারা অহেতুক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আল্লাহর কোন ইচ্ছা বা আইনকে সে লংঘন করে না, কোন অন্যায়কে সে প্রশ্রয় দেয় না, কোন জুলুম অত্যাচারেও সে শামিল হয় না।’ থামল আহমদ মুসা।
সুষ্মিতা বালাজী ও ড্যানিশ দেবানন্দের চোখে-মুখে নতুন বিষ্ময়-বিমুগ্ধতা। আহমদ মুসা থামতেই কথা বলে উঠল ড্যানিশ দেবানন্দ, ‘ছোট ভাই সাহেব, তিল তো দেখি একেবারে তাল হয়ে গেল। শুরু হয়েছিল মুরগির গোশত খাওয়া না খাওয়া নিয়ে, কিন্তু আপনি পরিণত করলেন একটা জীবন-দর্শনে। আর আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, কোন ধর্মীয় মঞ্চ থেকে ধর্মবেত্তা কোন দার্শনিক বক্তৃতা দিচ্ছে। যাক, এখন বলুন ঈশ্বরের ইচ্ছা ও বিধানকে স্মরণ করা বা স্বীকৃতি দিলে কোন আইন কেউ লংঘন করবে না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না, জুলুম-অত্যাচারে শামিল হবে না এমন লোক তৈরি হবে, এটা কি বাস্তব?’
‘খুবই বাস্তব। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-তারা, গাছ-পালা, জীব-জন্তু সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও বিধানকে নিখুঁতভাবে মেনে চলছে তাদের গোটা জীবনে। সকল অংগ-প্রত্যাংগসহ। মানুষের দেহও একইভাবে আল্লাহর বিধান মেনে চলে। মানুষ কিভাবে জীবন যাপন করবে, কি বলবে কি বলবে না, কি করবে কি করবে না, কি খাবে কি খাবে না, ইত্যাদি কর্মমূলক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেই শুধু মানুষকে স্বাধীনাতা দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। এই স্বাধীনতা দেয়ার সাথে সাথে আল্লাহ মানুষকে বলে দিয়েছেন যে, তিনি জীবন-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন এটা দেখার জন্যে যে মানুষ সৎকর্মশীল হয় কিনা।’ সৎকর্মশীল হওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর ইচ্ছা ও বিধান অনুসারে কিংবা বিবেকের নির্দেশ অনুসারে চলা। এভাবে চলা সম্ভব, অবাস্তব নয়। শুধু প্রয়োজন জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
সুষ্মিতা বালাজী মুখ খুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ড্যানিশ দেবানন্দ বলে উঠল, ‘এই দৃষ্টিভংগির পরিবর্তনটা কি? ঈশ্বরের ইচ্ছা বিধানকে মেনে চলা?’
‘এই মেনে চলাটা কাজ, দৃষ্টিভঙ্গির ফল। জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি হলো, জীবন জীবনের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা।’ এই ধারণা আজ বিভিন্ন রকম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘যেমন, মানুষ কর্মফল অনুযায়ী পুনর্জন্ম হওয়া, দুনিয়ার জীবনই সব-এর আগেও কিছু না পরেও কিছু নেই, যিশু সকল পাপের দায় নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন এবং সে কারণে যিশুর অনুসারীর স্বর্গ নিশ্চিত, ইত্যাদি দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছেন তো ছোট ভাই?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘হ্যাঁ। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই জীবনের কাজ-কর্ম নির্ধারিত ও পরিচালিত হয়। দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হলে জীবনের কাজ-কর্ম সঠিক হবে ও কল্যাণকর হবে সকলের জন্যেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ছোট ভাই, আপনি বলছেন দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হলে জীবনের কাজকর্ম সঠিক হবে। তার মানে সব দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়। তাহলে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে বাছাই হবে, কে বাছাই করবে?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল ।
‘একটা প্রবাদ আছে, নিজের ভাল পাগলেও বুঝে। স্রষ্টার দেয়া মানুষের এটা একটা বিশেষ গুণ। আল্লাহর দেয়া এই বিশেষ গুণ বা শক্তির নাম বিবেক। মানুষের এই বিবেকই বলে দেয় কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ, কোনটা কল্যাণকর, আর কোনটা অকল্যাণের। মানুষের বিবেকের এই শক্তিই বলে দিতে পারে, জীবনের কোন দৃষ্টিভঙ্গিটি তার জন্যে ভাল, কল্যাণকর।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম ছোট ভাই, কিন্তু কল্যাণকর বা করণীয় হিসাবে আপনি ‘স্রষ্টার ইচ্ছা বা বিধান’ এবং ‘বিবেকের বাছাই’ দুই দিকেরই উল্লেখ করেছেন। অথচ সত্য ও কল্যাণ একটাই হবে, একদিকেই থাকবে, এর দুই রূপ হতে পারে না।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘ঠিক বলেছেন। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছা ও বিধান’ এবং ‘বিবেক’ দুই জিনিস নয়। বিবেক স্রষ্টার দেয়া। এর বাছাই আল্লাহর ‘ইচ্ছা ও বিধানের’ পরিপন্থী হয় না। শুধু মাধ্যম হিসাবে আলাদা। আল্লাহর সৃষ্ট ভাল-মন্দ বাছাইয়ের একটা স্থায়ী ব্যবস্থা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘নবী-রসূল মানে ডিভাইন মেসেঞ্জারদের কথা বলছেন, ধর্মের কথা বলছেন। ডিভাইন মেসেঞ্জারদের মাধ্যমে ধর্মের আকারে স্রষ্টার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আইন-বিধান আসছে, বিবেকের আবার প্রয়োজন কি?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘দু’য়ের উদাহরণ অনেকটা অর্জিত শিক্ষা ও কমনসেন্সের মত। শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়, কিন্তু অশিক্ষিতের একটা কমনসেন্স থাকে, যা দিয়ে সে ভালো-মন্দের বাছ-বিছার করে জীবন পরিচালনা করতে পারে। নবী-রসুলরা আল্লাহর তরফ থেকে মানুষের জন্যে জীবন-যাপন প্রাণালী বা জীবন পদ্ধতি নিয়ে আসেন। মানুষ তাদের কাছে থেকে শিক্ষা লাভ করে সৎ, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু যারা নবী-রসূলদের সাক্ষাত পায়নি কিংবা তাদের শিক্ষা লঅভের সুযোগ হয়নি, তাদের ভাল থাকার, ভাল করার উপায় হিসাবেই ভালকে ভাল, মন্দকে মন্দ মনে করার কমনসেন্স বিবেককে বিধিবদ্ধভাবেই নেয়া হয়েছে, যাতে করে আল্লাহ ‘জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন এটা দেখার জন্যে যে মানুষ সত্যিই কর্মশীল হয় কি না’- এই পরীক্ষা সবার ক্ষেত্রে হয়ে যায়।’ থামল আহমদ মুসা।
গভীর ভাবনার ছায়া ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজীর চোখে-মুখে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা কথা বলল না।
ওরা তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
নীবরতা ভাঙল ড্যানিশ দেবানন্দই। বলল, ‘ছোট ভাই, এই কয়েক মিনেটে আপনার কাছ থেকে যা শিখলাম, কয়েক দিন, কয়েক মান আপনার সাথে পেলে জীবন সম্পর্কে সত্যিই পণ্ডিত হয়ে যাব। কিন্তু বলুন ভাই, জানতাম আপনি জগৎ কাঁপানো একজন বিপ্লবী, বন্দুক-গোলা-বারুদ আপনার সাথী, সংঘাত-সংঘর্ষ আপনার প্রতিদিনের রুটিন কাজম সেই আপনাকে দেখছি ধর্মবেত্তা এক পরম ভাববাদী রূপে। আল্লাহর নাম না নিয়ে জবাই করলে আপনি সে মুরগি খান না। মানে আপনার ধর্মের প্রতিটি আদেশ নিষেধ আপনি সিরিয়াসলি মেনে চলেন। তা মানে আপনি একটা ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেচেন নিজেকে, আর আপনার বৃহত্তর মানুষ পরিচয়কে পরিত্যাগ করেছেন। আপনার মত বিপ্লবী এটা কিভাবে পারলেন?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানুষ একটা প্রজাতির নাম, বলা যায় পশু প্রজাতির অংশ। নিছক এই প্রজাতি হিসাবে মানুষের রূপ-রস-গন্ধ কিছুই নেই, মানুষ প্রকৃত পক্ষে এই অবস্থায় মানুষ হয় না। মানুষকে মানুষ হবার জন্যে তার পশু-প্রবৃত্তির উপর তার মানবিক যুক্তিবাদিতাকে প্রভাবশীল করে জীবনকে তার পরিচালনায় একে নিয়ন্ত্রকের আসতে বসাতে হবে। এই মানবিক যুক্তিবাদিতা কতকগুলো নিয়ত-নীতি-মূল্যবোধের নাম, কতকগুলো আদেশ-নিষেধ ও বিধি-ব্যবস্থার নাম। এইগুলো মানুষ লাভ করে নবী-রসুলদের মাধ্যমে আসা বিশ্ব-চরাচরের স্রষ্টা আল্লাহর ইচ্ছা ও বিধান থেকে। মানুষ যখন মানুষ হবার জন্যে এই মানবিক যুক্তিবাদিতা বা মানবিক জীবন বিধান গ্রহণ করে তখন তার আরও একটি নাম হয়ে যায়। আমি এ ধরনের একটা নাম গ্রহণ করছি। এর দ্বারা আমি মানুষ পরিচয়কে পরিত্যাগ করিনি, বরং আমার পশু প্রবৃত্তিকে হটিয়ে সেখানে মানবিক যুক্তিবাদিতাকে বসিয়ে আমার মানুষ পরিচয়কে পূর্ণ করেছি।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুষ্মিতা বালাজীর দু’জনের চেহারাতেই বিষ্ময়-বিমুগ্ধতা। আহমদ মুসা থামলে এবার কথা বলে উঠল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘চমৎকার ছোট ভাই, চমৎকার উত্তর দিয়েছেন। ভেবেছিলাম এবার আপনি আটকা পড়বেন। এই মোক্ষম প্রশ্নটার কোন জবাব নেই বলেই জানতাম। এমন অকাট্য পশ্নের কোন যৌক্তিক জবাবই হতে পারে না। কিন্তু এখন আপনার উত্তর শুনে মনে হচ্ছে প্রশ্নের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি যৌক্তিক ও সংগত আপনার জবাব। আপনার কথা শতভাগ সত্য। শিক্ষা-সভ্যতা-সংস্কার-সামাজিকতার স্পর্শহীন আবহমান বনচারী একজন মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্কথ্য খুবই কম। কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষা-মূল্যবোধ তাকে সত্যিকার মানুষ করে তোলে এবং তখন তার মানুণ নাম ছাপিয়ে তার নতুন পরিচয় জ্ঞাপক নাম মূখ্য হয়ে ওঠে। যেনম ভারতীয়, আমেরিকান।’
‘না, হলো না আপা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি হলো না বলছেন?’
‘উদাহরণটা ঠিক হয়নি। ভারতীয়, ইন্ডিয়ান এসব রাজনৈতেক পরিচয় জ্ঞাপক নাম। রাজনৈতিক পরিচয়ের পার্থক্যে কিন্তু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের পার্থক্য ঘটে না। যেমন একজন জার্মান ও একজন ফরাসির মধ্যে মূল্যবোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিগত কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু একজন জার্মান ও একজন তুর্কির মধ্যে বিরাট পার্থক্য বিরাজমান। একজন জার্মান ও একজন ফরসীর মধ্যে পার্থক্য না থাকার কারণ তারা উভয়েই ক্যাথলিক খৃষ্টান, আর একজন তুর্কি ও একজন জার্মানের মধ্যেমার পার্থক্যের কারণ জার্মানীরা ক্যাথলিক তুর্কিরা ইসলামী ধর্মমতে বিশ্বাসী। আর একটা কথা, দু’জার্মানের মধ্যে বিরাট পার্থক্য হতে পারে যদি দু’জার্মান দু’ধর্মমতে বিশ্বাসী হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধগত পার্থক্যের নিয়াকম হলো ‘ধর্ম?’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘ঠিক ধরেছেন আপা।’
‘তাহলে কথা দাঁড়াচ্ছে, ধর্মবোধই ‘পশু-মানুষ’কে মানবিক ‘মানুষে পরিণত করে, তাই কি? নিশ্চয় আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হবে। কিন্তু একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষের সহজান ‘বিবেক’ বা কমনসেন্স কি মানুষকে মানুষ বানাতে পারে না? আপনিই তো বিবেককে ঈশ্বরের দেয়া ভাল-মন্দ বাছাইয়ের একটা শক্তি বলেছেন।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘হ্যাঁ নিছক বিবেক বা কমনসেন্স যদি পশু মানুষকে ‘মানবিক মানুষ’ বানাতে পারত, তাহলে ঈশ্বর বা আল্লাহ এবং তার নবী-রসূলেদের আর দরকার হতো না, সহজেই দর্মনিরপেক্ষা হওয়া যেতো। কিন্তু তা সম্ভব নয় ভাই সাহেব। বিবেক বা কমনসেন্সের কাজ বিরাট, কিন্তু তার কাজের ক্ষেত্র খুবই সীমিত। বিবেক তার স্বভাব-প্রকৃতির মাধ্যমে ভালকে ভাল বলে, খারাপকে খারাপ বলে, এমনকি আল্লাহর প্রয়োজন অনুভব করে কোন কিছুকে ঈশ্বর বানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু মানব জীবনের জন্যে মানিবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধভিত্তিক একটা সিস্টেম বা সংবিধান দাঁড় কারাতে পারে না। নবী-রসূলদের অভাবে জংগলবাসী মানুষের বিবেক যেমন একটা পারেনি, নবী-রসূলদের অস্বীকার করে নগরবাসী সভ্য মানুষ কার্লমার্কস, এঞ্জেলস ও মাওসেতুং-এর বিবেকও তেমনি তা পারেনি। এ সিষ্টেম বা ধর্ম আসে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে নবী-রসূলদের মাধ্যমে।
সুষ্মিতা বালাজীদের চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি এবং মুখে ফুটে উঠেছে উজ্জ্বল হাসি।
‘সমস্যার সাংঘাতকি একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছোট ভাই। আপনার দৃষ্টান্তও চমৎকার। আপনার যুক্তি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু বলুন তো, আপনার ব্যস্ত জীবনে এসব জটিল বিষয়ে চিন্তা করেন কেন, সময়ই বা কখন পান?’
‘যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধকে আমার জীবন-পথের সিস্টেম বা ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছি, আমার কাজ সে ধর্মেরই অংশ। সুতরাং আমার এই চিন্তা আমার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ছোট ভাই। এই জবাব আপনি দেবেন তা আগেই বুঝেছি। বুঝতে পারছি আপনি খুবই মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদী মানুষ। আপনি আপনার ‘ধর্ম’ ইসলামকে আপনার জন্যে বাছাই করেচেন, না উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন বলে গ্রহণ করেছেন?’ জিজ্ঞাসা সুষ্মিতা বালাজীল।
‘আমি জন্মসূত্রে ইসলাম পেয়েছি। আমার আজকের বাছাইতেও ইসলাম একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার এই বাছাই পক্ষপাতদৃষ্ট হওয়াই তো স্বাভাবিক।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী। তার মুখে হাসি।
‘বাছাই সম্পর্কে এ প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার বাছাইটা ‘সত্য’ সন্ধানের জন্যে হলে, তাতে তখন পক্ষপাতের প্রশ্ন আসে না। এমনিভাবে প্রত্যেককেই সত্যকে যাচাই-বাছাই করে বের করে আনতে হবে। সত্য সব সময় একটাই হয়। সুতরাং সত্য সন্ধান যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে সবাই আমরা এক সময় এক জায়গায় এসে দাঁড়াব।
সুষ্মিতা বালাজী মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে চোখ দু’টি বড় করে তাকাল ড্যানিশ দেবানন্দের দিকে। বলল, ‘শুনেছ ছোট ভাই কি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বুঝেছ?’
‘বুঝব না কেন? সত্য যেহেতু একটাই, এখন তার ধর্ম যদি সত্য হয় তাহলে এক জায়গায় গিয়ে না দাঁড়িয়ে উপায় কি!’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ। তার মুখেও কৃত্রিম গাম্ভীর্য।
সুষ্মিতা বালাজী মুখ ঘুরাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনার ধর্মকেই একমাত্র সত্য ধর্ম মনে করেন?’
‘না করলে আমি গ্রহণ করেছি কেন?’
‘তাতো ঠিক।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী। একটু থামল। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘সত্য বললেই তো হলো না। সবাই তার ধর্ম সত্য বলবে। সত্য যাচাইয়ের একটা মাপকাঠি তো থাকতে হবে। সেটা কি?’ সুষ্মিতা প্রশ্ন করল আহমদ মুসাকে।
‘মানব জীবনের প্রকৃতি ও প্রয়োজনের বিচারে মানুষের জন্যে এমন একটি ধর্ম বা জীবন পদ্ধতি দরকার। যা হবেঃ
ক. মানুষের সমগ্র জীবন পরিচালনার একটা সামগ্রিক ব্যবস্থা।
খ. মানুসের প্রকৃতি ও প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যশীল সার্বিক শান্তি ও কল্যাণের ব্যবস্থা।
এখন এক এক ধর্মকে সামনে নিয়ে দেখুন, কোন ধর্ম উপরের দুটি শর্ত পুরণ করতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল্
‘ছোট ভাই, খুঁজে এ শর্ত দুটি কোত্থেকে বের করলেন? আপনার দ্বিতীয় জটিল শর্ত পূরণ তো পূরের কথা, প্রথম শর্তই আমার জানা কোন ধর্ম পূরণ করতে পারে না। যেমন আমাদের হিন্দু ধর্ম। আমাদের ধর্মে পূজা-পার্বনের কিছু নীতি-নিয়ম, ব্রাক্ষ্মণ-দেবতার কিছু ফাংশন ছাড়া মানুষের জন্যে মান্য বা করণীয় কিছুই সেখানে নেই। খৃষ্ট ধর্মে ৭দিনে ১দিন গীর্জায় যাওয়া ছাড়া মানব জীবন পরিচালনায় কোন নীতি ও বিধান নেই। বৌদ্ধ ধর্মতো জীবন বিমুখ ও নির্বাণে বিশ্বাসী। ইহুদী ধর্ম তো বণী ইসরাইল ছাড়া আর কারও পালনীয় নয়, আর এখানেও জীবন পরিচালনার সার্বিক বিধান অনুপস্থিত। শুধু ইসলামকেই সক্রিয় ও কর্মের ধর্ম বলে মনে হয়। আমি বিস্তারিত জানি না। আপনিই বলতে পারেন আপনার এই ধর্ম ঐ শর্ত দু’টি পালন করে কিনা।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
আহমদ মুসা মুখ খোলার আগেই সুষ্মিতা বালাজী দ্রুতকণ্ঠে বলে উঠল, ‘ড্যানি, তুমি তো ছোট ভাইয়ের ধর্মকে ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে দিলে। আর বাকি থাকল কি?’
আহমদ মুসা কফির কাপ ট্রেতে রেখে হাসি মুখে বলল, ‘তাহলে আমি আর নিজের ঢোল নিজে বাজাব না। আপনারাই বরং আরও অনুসন্ধান করুন, জানুন।’
‘আপনাকে আর ঢোল পেটাতে হবে না। ড্যানি যেটুকু পিটিয়েছে তাই যথেষ্ট। বাকির জন্য ওয়েব সাইট আছে। অনেক বলেছেন, আর কথা নয়। রেষ্ট নিন।’
বলে সুষ্মিতা বালাজী ট্রেতে সব কাপ, বাটি সাজাল। তারপর বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আপনার মুরগি ও অন্যান্য গোশত খাওয়া দরকার। এখন কি করলে খেতে পারবেন তাই বলুন।’
‘আপনারা আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করুন। গরু-খাসি যারা জবাই করে, তাদের আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করতে বলুন।’
‘কি বলতে হবে লিখে দিন। মুরগি আমরাই জবাই করব। গরু-খাসির ব্যবস্থাও করব।’
বলে কাগজ-কলম এগিয়ে দিল আহমদ মুসাকে সুষ্মিতা বালাজী।
‘একটা কাগজে আহমদ মুসা লিখল, ‘বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবর’। বলল, ‘এই বাক্যটি বাই-এর সময় তিনবার বলতে হবে।
‘বাক্যটির অর্থ বলুন।’ বলল সুষ্মিতা বালাজী।
‘অর্থ হলো, ‘আল্লাহর নামে মুরু করছি। আল্লাহ সর্ব শ্রেষ্ঠ।’
হাসল সুষ্মিতা বালাজী। বলল, ‘তাহেল আল্লাহকে তো স্বীকৃতি দিয়েই দিলাম। মুসলমান হয়ে যাবো না তো আবার এই কথা বললে?’
‘অবশ্যই। কিন্তু ক্ষতি নেই। তুমিও ওয়াকওয়ার দিয়ে যাও।’ টিপ্পনি কাটল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘না, অতটুকুতে কেউ মুসলমান হয় না। অতএব ভয় নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ড্যানি, তুমি না জেনে ওয়াকওভার দিয়েছ। আমি তা করব না। দেখি ওয়েব সাইটে আজ থেকেই পড়াশুনা শুরু করব।’
বলে ‘ট্রে’ নিয় উঠে দাঁড়াল সুষ্মিতা বালাজী। বলল আহমদ মুসাকে, ‘ভাই এখন শুয়ে পড়ুন। কাল সকল থেকে একটু করে হাঁটতে পারেন, আজ নয়।’
চলা শুরু করে ড্যানিশ দেবানন্দকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ড্যনি তুমি বাড়িতে থাক। আমি রোগীটাকে দেখে আসি।’
‘তাহলে তুমি খোঁজ নিয়ে এস ঐ এলাকার কোন নতুন লোক দেখা গেছে কিনা। নিশ্চয় ওরা আসবে। লোকেরা যেন চোখ রাখে।
‘ঠিক আছে।’
বলে নাস্তার ট্রে নিয়ে ভেতরে চলে গেল সুষ্মিতা বালাজী।
‘ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব, ওরা না এসে পারে না।’
‘চিন্তা নেই। ঐ এলাকায় আমাদের লোকেরা চোখ রাখছে?’
বলে উঠে দাঁড়াল ড্যানিশ দেবানন্দ। বলল, ‘ছোট ভাই আপনি শুয়ে পড়ুন। দেখি সুষ্মি বেরুল কিনা। আর একটা কথা বলতে হবে তাকে।’
ড্যানিশ দেবানন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আহমদ মুসা না শুয়ে কম্পিউটারের দিকে ঘুরে বসল। তার ডান হাতটা এগুলো কম্পিউটারের ‘কী’ বোর্ডের দিকে।