৪১. আন্দামান ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

এন্ডারসন দ্বীপ ও ইন্টারভূ দ্বীপের মাঝখান দিয়ে গ্রীন পয়েন্ট প্রণালী হয়ে এন্ডারসন দ্বীপের উত্তর প্রান্তে পৌঁছার পর আহমদ মুসার নির্দেশে বোটের উত্তরমুখী মাথা সোজা পূর্ব দিকে টার্ন নিল। এখান থেকে নাক বরাবর পূর্ব দিকে এগুলে গ্রীনভ্যালির মুখে পৌঁছা যাবে।
বোট এগিয়ে চলল গ্রীনভ্যালির ঐ মুখের দিকে।
আহমদ মুসা উঠে বোটের ফ্ল্যাগ-স্ট্যান্ডে ফিশিং বোটের একটা পতাকা গুঁজে দিল।
ফিরে এসে আহমদ মুসা বসতে বসতে বলল, সবাই মনে করুক যে এটা একটা ফিশিং বোট।’
বোট গিয়ে পৌঁছল গ্রীনভ্যালির মুখে।
মুখটা তিরিশ ফুটের বেশি প্রশস্ত হবে না। দু’পাশ থেকে সাঁড়াশির মত সবুজ বাহু মুখ পর্যন্ত পৌঁছেছে। মুখ পেরোলেই বিশাল হ্রদের মত এক বিশাল সরোবর। এ সরোবরের তিন প্রান্ত ঘিরেই গ্রীনভ্যালি। আবার কয়েক বর্গমাইলের গ্রীনভ্যালি ঘিরে সবুজ পাহাড়ের দেয়াল। অপূর্ব দৃশ্য।
মুখটা পেরিয়ে বোট ভেতরে প্রবেশ করতেই সামনে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল সবাই, ‘ওয়ান্ডারফুল’, অবিশ্বাস্য!’
তাদের সামনে শান্ত সরোবরের অগাধ কাল জলরাশি। এর ওপারে উপত্যকার সবুজ সমুদ্র এবং তাতে সবুজ চাদরে ঢাকা পাহাড়ের দেয়াল।
শাহ বানুরা যখন গ্রীনভ্যালির সৌন্দর্যের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে, তখন আহমদ মুসার চোখের দূরবীণ গ্রীনভ্যালির ছোট ও একমাত্র ল্যান্ডিং প্ল্যাটফরমের উপর নিবদ্ধ।
আহমদ মুসার চোখে-মুখে কৌতূহল। ল্যান্ডিং প্ল্যাটফরমে অপরিচিত দু’টি মাঝারি আকারের বোট দাঁড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসা বোট দু’টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা শুরু করল।
বোটে কোন পতাকা নেই। কোন বিশেষ মার্কসও দেখা যাচ্ছে না বোটের গায়ে।
বোটে কোন মানুষ আছে কিনা খুঁজতে লাগল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার ভাগ্য ভাল, একজন লোক বোটের চাঁদোয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে বোটের মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। তার পোশাক সাধারণ, বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। আরও ভালভাবে দেখতে লাগল লোকটাকে আহমদ মুসা। কিন্তু দেখা হলো না। লোকটি বোটের চাঁদোয়ার তলে আবার এল।
আহমদ মুসা দূরবীন রেখে উঠে গিয়ে ফিশিং বোটের পতাকা নামিয়ে ফেলল বোটের ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড থেকে।
ফিরে এস চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘ঘাটে আরও দু’টি অপরিচিত বোট নোঙর করা।’
‘তাতে কি স্যার? ঘাটে তো অনেকেরই বোট থাকতে পারে।’ বলল তারিক।
‘ওটা প্রাইভেট ঘাট। ওখানে তাদের নিজেদের বোট ছাড়া কোন বোট থাকে না, রাখার লোকও নেই গ্রীনভ্যালির ত্রিসীমানায়।’
‘তাহলে?’ বলল সাহারা বানু।
‘বোটে একজন লোককেও দেখতে পেয়েছি। সে আদিবাসী নয়। অথচ এই গ্রীনভ্যালি ও এর আশে-পাশের এলাকায় আমার আপা সুস্মিতা বালাজী ও তার স্বামী ড্যানিশ দেবানন্দ ছাড়া অআদিবাসী কোন লোক নেই।’
‘বোট তাহলে এল কোথেকে? তাও একটি নয় দু’টি।’
ভাবছিল আহমদ মুসা
একটু পর বলল, ‘এর একটাই ব্যাখ্যা যে, শংকরাচার্যের লোকেরা এখানে এসেছে।’
উদ্বেগের ছায়া নামল শাহ বানুদের চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তারিক, তুমি পেছনে এস।’
তারিক ড্রাইভিং সীট ছেড়ে দিয়ে পেছনে সরে এল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সীটে বসল। বোটের গতি বেড়ে গেল।
‘ওদের কোন বিপদ হয়নি তো বেটা? আমরা আবার ওখানে যাচ্ছি।
‘কিছু ভাববেন না খালাম্মা। সবকিছুই আল্লাহর ফায়সালার অধীন। আমাদের দায়িত্ব হলো, আমাদের কাছে যেটা কল্যাণকর মনে হবে, সেটাই করা।
‘আল্লাহ আমাদের সহায় হোন বেটা।’
‘আমিন’ বলল সকলে।
আহমদ মুসা দ্বিধা-সংকোচহীন গতিতে বোট নিয়ে নোঙর করল অপরিচিত একটি বোটের পাশে।
একটি বোট আসতে দেখে অপরিচিত বোটের একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। সন্দেহ-সংশয়পূর্ণ তার দু’টি চোখ তাকিয়েছিল আহমদ মুসাদের দিকে। তার একটি হাত পকেটে।
লোকটির পকেটের হাতে যে রিভলবার তা বুঝতে বাকি রইল না আহমদ মুসার। এই লোকটিকেই আহমদ মুসা দূরবীনে দেখেছিল।
বোট নোঙর করেই আহমদ মুসা পাশের বোটের সেই লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তুমি একাই আছ? মহাগুরুজীরও তো থাকার কথা ছিল। তিনিও গেছেন ওদের সাথে?’
‘তুমি কে’ আহমদ মুসার কোন প্রশ্নেরই জবাব না দিয়ে বলল লোকটি।
‘তুমি চিনবে না। মহুগুরুজীর সাথে আমার কথা হয়েছে। আমি পোর্ট ব্লেয়ার থেকে আসছি। ভেতরে যাদের দেখছ, ওদেরই নিয়ে আসার কথা।’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটি বোটের ভেতরে বসা শাহ বানুদের দিকে একবার তাকিয়ে একটু চিন্তা করল। বলল, ‘এঁদেরকেই মহাগুরুজী মানে আমরা সন্ধান করছি?’
‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ মুসা
এতক্ষণে লোকটি স্বাচ্ছন্দ ফিরে পেল। বলল, ‘হ্যাঁ, মহাগুরুজী সকলকে নিয়ে উপরে গেছেন। আমি বোট ও গোলাগুলী পাহারা দিচ্ছি। আ………।’
আহমদ মুসা তার কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘কেন সবাই গোলাবারুদ সাথে নিয়ে যাবার কথা। নিয়ে যায়নি?’
‘না, বাড়তি গোলাবারুদ নিয়ে যায়নি। ওঁরা গিয়ে অবস্থা দেখে প্রয়োজন হলে দু’জন লোক পাঠাবেন গোলাগুলী নিয়ে যাবার জন্যে।’ বলল লোকটি।
‘একটু কথা বলার দরকার মহুগুরুজীর সাথে। ওরা কখন গেছেন, কয়জন গেছেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পনের জন, পনের-বিশ মিনিনট হলো।’ বলতে বলতে লোকটি পকেট থেকে মোবাইল বের করল।
আহমদ মুসা ঐ বোটে গিয়ে উঠল। বলল, ‘মোবাইল আমাকে দাও। ওর নাম্বার আমি জানি।’
লোকটি মেবাইল তুলে ধরল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা ডান হাতে মোবাইলটি নিল তার কাছ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে বাম হাত দিয়ে রিভলবার বের করে তার মাথায় চেপে ধরল।
লোকটি ভূত দেখার মত চমকে উঠে পকেটে হাত দিতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা শান্ত গলায় শান্তকন্ঠে বলল, ‘রিভলবার বের করার চেষ্টা করো না। তার আগেই মাথা ছাতু করে দেবে।’
আহমদ মুসা লোকটির কাছ থেকে নেয়া মোবাইলটি পকেটে রেখে হাত দিয়ে লোকটির পকেট থেকে রিভলবার তুলে নিল। তারপর এক ধাক্কা দিয়ে লোকটিকে বোটের উপর ফেলে দিল। বলল তারিককে উদ্দেশ্য করে, ‘ব্যাগে দেখ ক্লোরোফরম আছে। দু’টুকরো তুলা ভিজিয়ে ওর নাকের দু’ছিদ্রে গুঁজে দাও।’
তারিক এল। সে লোকটির মুখ বাম হাতে চেপে ধরে ডান হাত দিয়ে দু’টুকরো ক্লোরোফরম ভেজা তুলা লোকটির নাকের দু’ছিদ্রে গুঁজে দিল। তারপর ডান হাত দিয়ে লোকটির বুক চেপে দিল কয়েকবার।
লোকটি নিশ্বাস বন্ধ করেছিল, সেটা খুলে গেল।
লোকটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।
‘তারিক তুমি ওই বোটে দেখ গোলাগুলী কোথায় আছে বের করে নিয়ে এস। আমি এ বোটে দেখছি।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা এ বোটে অস্ত্র-শস্ত্র কিছু পেল না, একটা ব্যাগ পেল। ব্যাগে ডাইরী এবং কাগজ পত্র দেখতে পেল একটা ফাইলে। আহমদ মুসা ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিল।
ওদিকে তারিক একটি গ্রেনেড লাঞ্চার ও একটা লাইট মেশিণগান সহ দু’বাক্স এ্যামুনিশন নিয়ে ঐ বোট থেকে নেমে এল।
আহমদ মুসা শাহ বানুদেরও নামিয়ে নিল বোট থেকে।
আহমদ মুসা একটা ব্যাগ পিঠে, আরেকটা কাঁধে ঝুলাল। রকেট লাঞ্চার ও মেশিনগান নিল কাঁধে। কিন্তু গোলাগুলীর বাক্স দু’টি তারিক নিতে পারছিল না।
শাহ বানু এগিয়ে এসে একটা বাক্স নিতে চাইল।
‘বেশ ভারী, তোমার কষ্ট হবে।’ বলে তারিক বাক্সটি শাহ বানুকে দিতে চাইল না।
‘মেয়েরা বোধ হয় কষ্ট করতে জানে না? মেয়েরা কোন দিন বোধ হয় যুদ্ধ করেনি?’ বলল শাহ বানু ক্ষোভের সাথে।
‘একটা বাক্স শাহ বানুকে দিয়ে দাও তারিক। একটা লোডেড রিভলবারসহ কিছু গুলীও তুমি দিয়ে দাও শাহ বানুকে। শাহ বানু ভাল গুলী চালাতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
গুলীর বাক্সটা কাঁধে নিয়ে রিভলবারটা ওড়নার নিচে কামিজের কোন গোপন পকেটে রেখে দিল। তারপর আহমদ মুসার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ধন্যবাদ ভাইয়া আমার প্রতি আস্থার জন্য।’
চারজনের যাত্রা শুরু হলো। প্রথমে আহমদ মুসা, তারপর শাহ বানু, শাহ বানুর পরে সাহারা বানু ও সবশেষে তারিক।
উপকূলের পর কয়েকটা চড়াই-উৎরাই বেয়ে উপত্যকার সমভূমিতে উঠতে হয়। চড়াই-উৎরাই সবটাই ঘন-জংগলে আচ্ছাদিত। তার মধ্য দিয়ে অস্পষ্ট একটা পায়ে চলার পথ।
দু’টি চড়াই পার হয়ে এসেছে আহমদ মুসারা। তৃতীয় চড়াইয়ের মাথায় পৌঁছে গেছে তারা। আরেকটা চড়াই-উৎরাই এর পরেই উপত্যকা। তৃতীয় চড়াই এর মাথায় উঠেছে আহমদ মুসা। তার পেছনে শাহ বানুও চড়াইয়ের মাথায় এসে গেছে। সাহারা বানু এবং তারিকও উঠছে চড়াইয়ের মাথায়।
আহমদ মুসা উৎরাই বেয়ে নামার যাত্রা শুরু করেছে। দু’ধাপ এগিয়েছে। এ সময় দু’পাশের ঝোপ থেকে দু’জন যবক স্টেনগান বাগিয়ে বেরিয়ে এল। আহমদ মুসার পথ রোথ করে দু’জন পাশাপাশি দাঁড়াল। তাদের স্টেগানের নল আহমদ মুসা, শাহ বানু সকলকেই কভার করেছে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে গেছে। তার বাম হাত কাঁধের মেশিনগান ও গ্রেনেড লাঞ্চার ধরে রেখেছে। আর ডান হাত জ্যাকেটের পকেটে এবং পকেটে রিভলবারের বাট ধরে আছে।
আহমদ মুসা হাত বের করতে গিয়েছিল। ওদের একজন চিৎকার করে বলল, ‘হাত বের করার চেষ্টা করে না। হাত বের করার আগেই ডজন খানেক গুলী তোমার শরীরে ঢুকে যাবে। এতক্ষণ গুলী ঢুকে যেত, কিন্তু মৃত্যুর আগে তোমাকে একটা কথা শোনাতে চাই। তুমি এ পর্যন্ত আমাদের যত লোক মেরেছ, তার দ্বিগুণ লোককে আমরা এই উপত্যকায় আজ হত্যা করব।’
বলে সে স্টেনগানের ট্রিগার টানা শুরু করেছিল।
শাহ বানুর বাম হাতে তার কাঁধের গুলীর বাক্স ধরা ছিল। আর তার ডান হাত ছিল স্বাভাবিকভাবেই ওড়নার নিচে। ওড়না কোমর পর্যন্ত নেমে যাওয়া।
শাহ বানু তাদের সামনে যমদূতের মত দু’স্টেনগানধারীকে উদয় হতে দেখ প্রথমটায় ঘাবড়ে যায় পরে সাহস ফিরে পায় এবং কামিজের পকেট থেকে রিভলভবার বের করে নেয়।
শাহ বানু আহমদ মুসার কয়েক গজ পেছনে ছিল এবং দু’স্টেনগানধারী ও তার মাঝে কোন আড়াল ছিল।
ষ্টেনগানধারী যখন কথা শেষ করল, শাহ বানু বুঝল কি ঘটতে যাচ্ছে। সমস্ত সত্তা যেন তার কেঁপে উঠল। সে সমস্ত মনোযোগ একত্রিত করে ওড়নার তলে তার রিভলবার সেট করল প্রথম ষ্টেনগানধারীকে লক্ষ্য করে। ওরা উৎরায়ের কিছুটা নিচে দাঁড়ানো থাকায় সুবিধা হলো টার্গেট করায়।
ষ্টেনগানধারী যখন তার ষ্টেনগানের ট্রিগার টানছিল, তখন শাহ বানু তার রিভলবারের ট্রিগার টিপে দিয়েছে। একটি গুলী বেরিয়ে গেল রিভলবার থেকে। সে গুলীর ফলাফলের অপেক্ষা না করে ট্রিগারে দ্বিতীয় আরেকটি চাপ দিল সে।
দু’টি গুলীর একটি গিয়ে বিদ্ধ করেছে প্রথম ষ্টেনগানধারীর বুকে এবং দ্বিতীয়টি মাথায়।
প্রথম গুলী গিয়ে ষ্টেনগানধারীকে বিদ্ধ করতেই আহমদ মুসা রিভলবার ধরা তার হাত পকেট থেকে বের করে নিয়েছে। সে টার্গেট করল দ্বিতীয় ষ্টেনগানধারীকে। শাহ বানুর দ্বিতীয় গুলী এবং আহমদ মুসার গুলী প্রায় এক সাথেই হলো।
দু’ষ্টেনগানধারীর গুলীবিদ্ধ দেহ মাটিতে আছড়ে পড়ে অল্প একটু গড়িয়ে স্থির হয়ে গেল।
শাহ বানু নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে তার গুলীতে নিহত প্রথম ষ্টেনগানধারীর দিকে। সে গুলী করেছে এবং লোকটি মরেছে- সবই যে তার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কি করে এসব ঘটে গেল বুঝতে পারছে না সে। তার কাঁধ থেকে গুলীর বাক্স পড়ে গেছে। তার হাত যেন শিথিল হয়ে পড়েছে।
সাহারা বানু পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল শাহ বানুকে। বলল, ‘ঠিক করেছ মা। আল্লাহর হাজার শোকর। আল্লাহ তোমাকে আরও সাহস দিক’।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘খালাম্মা শুধু ঠিক কাজ করেছে তাই নয়, ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করেছে। একটু দেরি হলে ওর ষ্টেনগানের গুলী আমাকে ‘এফোড়-ওফোড়……………..’।
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। শাহ বানুর একটা হাত এসে আহমদ মুসার মুখের উপর চেপে বসল। বলল সে আর্তকণ্ঠে, এমন শব্দ উচ্চারণ করবেন না ভাইয়া। আমি কিছু করতে না পারলে আল্লাহ আপনাকে দিয়ে কিছু করাতেন আত্মরক্ষার জন্যে।’
‘ঠিক শাহ বানু। আল্লাহ এটাই করেন’। গম্ভীর কন্ঠ আহমদ মুসার।
তারিক এগিয়ে এসেছে। সে বলল, ‘ধন্যবাদ শাহ বানু। তোমার প্রথম রিভলবার চালনা ঐতিহাসিক হয়েছে এবং সফল হয়েছে। ঐতিহাসিক এই কারণে যে, প্রথম গুলী আমার মত সকলের স্যার এবং মহানায়ক আহমদ মুসার প্রতিরক্ষায় বর্ষিত হয়েছে। পুরুষানুক্রমে এটা গল্প করা যাবে’।
শাহ বানু ফিরে তাকাল তারিকের দিকে। চোখে তার ভ্রুকুটি। বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না। তুমি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বলেছ। ভাইয়া এ ধরনের প্রশংসা পছন্দ করেন না। তবে তোমাকে ধন্যবাদ দিতে পারি এ কারণে যে, আত্মরক্ষার উপযুক্ত প্রস্তুতি কত প্রয়োজন তা তুমি বুঝেছ’।
মুখ লাল হয়ে উঠেছে তারিকের। ফুটে উঠেছে বিব্রতভাব। বলল, দুঃখিত বেশি বলে থাকলে। তবে বানানো কিছু বলিনি। আর আত্মরক্ষার প্রয়োজন ও প্রস্তুতির ব্যাপার একটি সার্বজনীন বাস্তবতা। এ উপলব্ধি কারও নেই, একথা ভাবা ঠিক নয়। প্রস্তুতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে পার্থক্য অবশ্যই থাকতে পারে’। তারিকের কণ্ঠ অনেকটাই অভিমান ক্ষুব্ধ।
মিষ্টি হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমাদের বাকযুদ্ধ খুবই ভাল লাগে। তবে শাহ বানু, আমার ছাত্রের প্রতি তোমার শেষ কথাটা খুব কঠোর হয়েছে’।
‘আমি দুঃখিত ভাইয়া। কিন্তু আপনার ছাত্রও শেষে নরম কথা বলেনি’। বলল শাহ বানু নরম কণ্ঠে।
‘তারিক, শাহ বানু ঠিকই বলেছে’। সেই মিষ্টি হাসি আহমদ মুসার মুখে তখনও।
‘আমি দুঃখিত স্যার’। তারও নরম কণ্ঠ।
‘অতীতেও ওরা এমন বাক যুদ্ধ করে এসেছে। কিন্তু তোমার মত মধ্যস্থতাকারী ছিল না বেটা। আশা করি মতপার্থক্যের দূরত্বটা এবার দূর হবে’। বলল সাহারা বানু প্রসন্ন কন্ঠে।
আহমদ মুসা হাসি মুখে ‘আমিন’ উচ্চারণ করে তারিককে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি গুলীর বাক্সটা শাহ বানুকে তুলে দাও’।
সঙ্গে সঙ্গে তারিক নিজের বাক্সটা কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখে শাহ বানুর বাক্সটা তুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার আমি দু’বাক্স দু’কাঁধে সহজেই নিতে পারব। শাহ বানু ফ্রি থাক। এতে আমাদের উপকারই হবে’।
আহমদ মুসা কথা বলার আগেই শাহ বানু বলে উঠল ‘মেয়েরাও ভার বহন করতে পারে। ঠিক আছে বাক্সটি আমিই তুলে নিচ্ছি’।
কথার সাথে সাথে শাহ বানু নিচু হয়ে বাক্সটি তুলে নিল কাঁধে।
আহমদ মুসা সেই মিষ্টি হেসেই বলল, ‘খুবই আনন্দের কথা, মেয়েরা খুব আত্মসচেতন হয়ে উঠছে। তারা বাড়তি ‘আনুকূল্য’ নিয়ে নিজেদের ছোট করতে চায় না। ভেব না তারিক, শাহ বানুর ডান হাত ফ্রি থাকছে।
‘স্যার, শাহ বানু কিন্তু সব সময়ই আত্মসচেতন। তার পরিচয়ের কারণেই হয়তো’। বলল তারিক।
শাহ বানু কথা বলার জন্য মুখ খুলেছিল। তার চোখে ভ্রুকুটি। কিন্তু তার আগেই দ্রুত আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আবার তারিক, তুমি বেশি বলে ফেলেছ। আমার ছোট বোনটি অহেতুক প্রশংসা পছন্দ করে না’।
‘স্যরি স্যার’। সঙ্গে সঙ্গেই বলল তারিক।
আহমদ মুসার কথার ঢংয়ে ঠোঁটে হাসি ফোটে উঠল শাহ বানুর। সে মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল, বোধ হয় হাসি আড়াল করার জন্যেই।
‘ঠিক আছে তারিক, স্যরি গ্রহণ করা হল। এবার তুমি পেছনে লাইনে দাঁড়াও। আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে’।
বলে আহমদ মুসা থামল। তার চোখে-মুখে ভাবনার চিহ্ণ ফুটে উঠল।
তারিক হটে গিয়ে সাহারা বানুর পেছনে তার জায়গায় ফেরত গেছে।
আহমদ মুসা রকেট লাঞ্চার পিঠে ঝুলিয়ে লাইট মেশিন গানটি হাতে নিল। ম্যাগজিন লোডেড কিনা পরীক্ষা করল। পকেট থেকে বের করে এক্সট্রা ম্যাগজিনও পরীক্ষা করে দেখল। তারপর লাইট মেশিনগানটি (এলএমজি) হাতে রেখেই তাকাল শাহ বানু তারিকদের দিকে। বলল, ‘এরা দু’জন যাচ্ছিল বোটে অ্যামুনিশনের বাক্স আনার জন্যে। তার মানে সংঘর্ষ হবে, শংকরাচার্যরা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু অ্যামুনিশন না যাওয়া পর্যন্ত কোন সংঘাত হচ্ছে না, এটা বলা যায়। যদি এরা দু’জন অ্যামুনিশন নিয়ে ওদের কাছে না ফিরে যায়, তাহলে নিশ্চয় ওদের কেউ এদের খোঁজ খবর নিতে আসবে। যদি এটাই ঘটবে বলে আমরা মনে করি, তাহলে আমাদের ওদের জন্যে অপেক্ষা করা দরকার। এই ধরনের গেরিলা আক্রমণে ওদের জান ও শক্তিক্ষয় আমাদের বিজয়কে সহজ করবে।
‘তথাস্তু ভাইয়া’। বলল শাহ বানু।
তারা সকলে গিয়ে ঝোপের আড়ালে বসে পড়ল। সেখান থেকে উৎরাই বেয়ে নেমে যাওয়া অনেকখানি দেখা যায়। পল পল করে এক ঘন্টা কেটে গেল। একটা অপরিচিত গন্ধ এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসার নাকে। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল আহমদ মুসার কথা। আহমদ মুসারা গল্প করছিল ফিসফিসে কন্ঠে।
গন্ধ পাওয়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার চোখ নেমে গেল পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরে নিচের দিকে। দেখল দু’জন লোক আসছে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে। তাদের দু’জনের কাঁধেই ষ্টেনগান ঝুলানো।
রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করে আহমদ মুসা সবাইকে চুপ করতে বলল।
শাহ বানুরাও রাস্তার দিকে চোখ ফিরাল। উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। শাহ বানু বলল, ‘আগের মতই দু’জন’।
ওরা দু’জন আহমদ মুসাদের অতিক্রম করে সামনে এগুলো। ষ্টেনগান কাঁধে ঝুলিয়ে দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে ওরা দ্রুত হাঁটছিল।
আহমদ মুসা এলএমজি ও গ্রেনেড লাঞ্চার মাটিতে নামিয়ে রেখে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। বিড়ালের মত পা টিপে টিপে দ্রুত ওদের পেছনে চলে গেল।
আহমদ মুসা তার দু’হাতের দু’রিভলবার ওদের দু’জনের বাম পিঠে চেপে ধরে বলল, হাত তুলে উপুড় হয়ে শুয়ে………….’।
আহমদ মুসার কথা শেষ হলো না। ওদের দু’জনের দু’হাত রিভলার সমেত বের হয়ে উপরে উঠল বিদ্যুত গতিতে।
আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝল এই বেপরোয়া লোক দু’জন হাত উপরে তুলেই উপর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলী করতে যাচ্ছে। আহমদ মুসার কাছে এটা বেনজীর ষ্টাইলের এক বেপরোয়া উদ্যোগ। এই দু’গুলির আওতায় যে আহমদ মুসা পড়তে পারে, এটাও আহমদ মুসা জানে।
আহমদ মুসার ভাবনার চেয়েও দ্রুত যেন মাথা থেকে নির্দেশ পৌঁছে গেল আহমদ মুসার দু’হাতের তর্জনিতে। দু’তর্জনি সঙ্গে সঙ্গেই চেপে ধরল দু’রিভলবারের ট্রিগার। আহমদ মুসা গুলী করেই ওদের গায়ের সাথে লেপ্টে গিয়ে ওদের দেহকে পুশ করল সামনের দিকে।
আহমদ মুসা গুলী করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওদের রিভলবার থেকেই দু’টি গুলীর আওয়াজ হলো। কিন্তু ততক্ষণে ওদের দেহে গুলী লাগার ফলে ওদের দেহ ও হাতে কম্পনের ধাক্কা গিয়ে লেগেছে। রিভলবারের ব্যারেল ওদের নড়ে গিয়ে উপরে উঠেছে অনেক খানি। ফলে গুলী দু’টি আহমদ মুসার অনেক উপর দিয়ে উড়ে গেল।
আহমদ মুসা ওদের দেহ নিয়ে উপুড় হয়ে পড়েছে। ওদের উপরে গিয়ে পড়েছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। তার দেহের সামনেটা রক্তে ভিজে গেছে।
গুলীবিদ্ধ দু’জনকে আহমদ মুসা চিৎ করল, দেখল, ওরা এখনও জীবিত থাকলেও কথা বলার পর্যায়ে নেই।
ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়া এসে সবাই আহমদ মুসার পাশে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা অনেকটা স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘আমি এদের দু’জনকে মারতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম এদের কাছে জানতে ওদিকের অবস্থা সম্পর্কে। কিন্তু বেপরোয়া এই লোকদের না মারতে পারলে, এরাই আমাকে মারত’।
বলে আহমদ মুসা তারিকের দিকে চেয়ে লোক দু’জনকে সার্চ করার নির্দেশ দিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। নির্দিষ্ট কয়েকটি নাম্বারে চাপ দিল দ্রুত।
‘হ্যালো’। ওপার থেকে সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘আসসালামু আলাইকুম। আপা, ওদিকের খবর কি?’
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। ছোট ভাই, আপনি কোথায়? ভাল আছেন?’ সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘আমরা উপত্যকার মুখে। তৃতীয় উৎরাই হয়ে নামছি আমরা’।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ওদিকে অনেক গুলীর শব্দ শুনলাম। কি ঘটনা?’
‘অনেকগুলো নয়, ছয়টি গুলীর আওয়াজ শুনেছেন। তার দু’টি আওয়াজ ওদের রিভলবার থেকে। অবশিষ্ট চারটি গুলী আমাদের। চারটি গুলীতে ওদের লোক কমেছে চার জন। ওদিকের অবস্থা বলুন আপা’।
‘অবস্থা এখনও খারাপ হয়নি ছোট ভাই। ওরা নৌপথ ও স্থলপথ দু’দিক থেকে দু’গ্রুপ এসেছে। আমাদের স্কুলের মাঠে ওরা ক্যাম্প করেছে। ওরা পঁচিশ জন। আগের মতই ওদের সবার কাছে ষ্টেনগান। আরও ভারী অস্ত্র নাকি ওদের আসবে। আমাদের লোকদের চার ভাগ করে চার জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এক গ্রুপ আমাদের বাড়ির সামনে, দ্বিতীয় গ্রুপ স্কুলের সামনে হইওয়ের দিক থেকে আসা রাস্তার পাশে, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রুপ স্কুলের উত্তরে আমাদের গোটা বসতিকে সার্কেল করা রাস্তায় উঠার মুখে গোপনে মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। ছোট ভাই, আমরা আপনার অপেক্ষা করছি’।
‘ঠিক আছে আপা। লোকদের গোপনে মোতায়েন ঠিক হয়েছে। ক্ষতি এড়াবার জন্যে সম্মুখ সংঘর্ষ এড়াতে হবে। আপা, ভাই সাহেবের সাথে একটু কথা বলব’।
‘দিচ্ছি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। সালাম ছোট ভাই’।
বলে সুস্মিতা বালাজী টেলিফোন দিয়ে দিল ড্যানিশ দেবানন্দকে।
ড্যানিশ দেবানন্দের সাথে সালাম বিনিময়ের পর আহমদ মুসা বলল, ‘আপার কাছে সব শুনলাম। আমি তাঁকেও বলেছি আমাদের সম্মুখ সংঘর্ষ এড়িয়ে বিচ্ছিন্নভাবে এ্যাকশনে এনে ওদের ক্ষতি করতে হবে। দুর্বল হয়ে পড়লে চূড়ান্ত আঘাতের সময় আসবে’।
‘সুবিধা হয়েছে ছোট ভাই, আমাদের স্কুলের গার্ডকে ওরা কাজে লাগিয়েছে। গার্ড খুব শক্ত, চালাক ও বিশ্বস্ত। তার কাছে মোবাইল আছে। মাঝে মাঝে সে খবর পাঠাচ্ছে। তার কাছেই শুনলাম, দু’জন লোক পাঠিয়েছে তারা বোটে কি কাজের জন্যে। কিন্তু ফিরে আসেনি। তার উপর গুলির শব্দ শুনে তারা উদ্বিগ্ন। খোঁজ নেবার জন্যে আরও দু’জন লোক পাঠিয়েছে। ওর টেলিফোন পাওয়ার পর আবার গুলীর শব্দ শুনলাম। কি ব্যাপার?’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ঐ দু’জনও মারা গেছে ভাই সাহেব’। আহমদ মুসা বলল।
‘থ্যাংকস আল্লাহ। ছোট ভাই, আপনার এখন পরিকল্পনা কি। আমরা তো আপনার অপেক্ষা করছি’।
‘আমি তৃতীয় উৎরাইয়ে ওদের জন্যে আরও অপেক্ষা করব। ওদের দু’টি গ্রুপ শেষ হয়েছে। এদের খোঁজ নিতে আরও লোক পাঠাবে। না এসে ওদের উপায়ও নেই। ভারী অস্ত্র তারা বোটে রেখে এসেছে। এই অস্ত্র তারা চায়, তাদের দরকার। সুতরাং লোকদের খোঁজে, অস্ত্রের খোঁজে তারা আসবে। আর তাদের এই পেছনটা ঝুঁকিপূর্ণ রেখে তারা সামনে আপনাদের দিকে এগুবে না। তাই আমি মনে করছি, তারা পেছনটাকে নিরাপদ করার জন্য এমনকি সর্বশক্তিও নিয়োগ করতে পারে’। বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের মহাগুরু শংকরাচার্য কি এই অভিযানে আছে ছোট ভাই?’ জিজ্ঞাসা ড্যানিশ দেবানন্দের।
‘নৌপথে বোটে করে যে দলটি এখানে এসেছে, তার সাথে শংকরাচার্য এসেছেন। উনি এখন আপনাদের স্কুলে নিশ্চয়’।
‘সে শয়তানের মত ষড়যন্ত্রকারী। সে কখন কোন দিকে কি করবে বলা মুস্কিল। তাকেই আমার ভয়, ছোট ভাই’।
‘গত কয়েক সপ্তাহ তার সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। ভয় করবেন না ভাই সাহেব’।
‘থ্যাংকস আল্লাহ। ছোট ভাই আপনি আসার পরই শুধু এই পরিবর্তন ঘটেছে’।
‘আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে কৃতিত্বটা আমাকে দিচ্ছেন কেন ভাই সাহেব। বলুন, আল্লাহ আন্দামানের উপর নজর দেয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে’।
‘স্যরি। আমাদের অভ্যাস পাল্টাতে সময় লাগবে’।
‘ধন্যবাদ ভাই সাহেব। আল্লাহ সাহায্য করুন’।
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। শুরু করল আবার, ‘শুনুন ভাই সাহেব, ওরা যদি এদিকে না এগোয়, তাহলে আমিই এগুব এবং ওদের পেছন থেকে উদের উপর চড়াও হবো। আর আপনাদের লোক যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। যদি শংকরাচার্যের লোকরা আমার এদিকে ছাড়া অন্য কোন দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে, তাহলে সব গোপন স্থান থেকে একসাথে ব্ল্যাংক ফায়ার করতে হবে। যাতে ওরা কোন এক দিকে অগ্রসর হতে না পারে এং অগ্রসর হতে চাইলে যেন বিভক্ত হয়ে সব দিকে অগ্রসর হয়। এতে ওদের বিভক্ত করে মার দেয়া সহজ হবে’।
‘ধন্যবাদ ছোট ভাই। আর কোন পরামর্শ?’
‘আপাতত নয়’।
‘সাহারা বানু, শাহ বানুরা কেমন আছে ছোট ভাই?’
‘ভাল আছে ভাই সাহেব’।
‘থ্যাংকস আল্লাহ’।
‘এখন টেলিফোন রাখছি। আসসালামু আলাইকুম’।
সালাম দিয়ে ওপার থেকে ড্যানিশ দেবানন্দ টেলিফোন অফ করল।
আহমদ মুসা মোবাইল অফ করে পকেটে রেখে বলল, এস তারিক লাশ দু’টো জংগলে লুকিয়ে ফেলি’।
এগিয়ে এল তারিক। বলল, ‘আমরা কি এখানে অপেক্ষা করব?’
‘এখানে নয়, আরও সামনে গিয়ে ঐ দু’টিলার পেছনে গিয়ে অপেক্ষা করব। টিলার উপর থেকে নিচে অনেক দূর দেখা যাবে। আর দু’টিলার মাঝখান দিয়ে যে পথ তা সংকীর্ণ। শত্রুদের এখানে ট্রাপে ফেলা আমাদের জন্য অনুকূল হবে’।
‘ওরা আসবে নিশ্চিত?’
‘কোন কিছুই নিশ্চিত নয়। আমাদের এটা আশা মাত্র। ওদের এই ভাবে বিচ্ছিন্ন করে মোকাবিলা করার আশা আমাদের সফল নাও হতে পারে’।
‘বুঝেছি স্যার’।
বলে লাঋম টেনে নেয়ার জন্যে হাত লাগাল তারিক। আহমদ মুসাও। লাশ দু’টো ঝোপের আড়ালে রেকে সামনে এগিয়ে টিলার কাছে চলে এল আহমদ মুসারা’।
টিলাটা অদ্ভুত ধরনের। দু’পাশের জংগলে কতকটা দেয়ালের আকারে টিলাটা বিস্তৃত। কিন্তু দু’পাশ থেকে রাস্তায় এসে টিলাটা গেটের আকার নিয়েছে। রাস্তার দু’পাশের দু’টিলা যেন গেটের স্তম্ভ।
গেটের এ পাশটায় বড় একটা গাছ। গাছটার ডাল-পালা প্রায় ঢেকে দিয়েছে টিলাটাকে।
গাছের তলাটা প্রায় পরিষ্কার এবং সমতল। আহমদ মুসা তার পিঠের ব্যাগের পকেট থেকে শক্ত নাইলনের ওয়াটার ওয়্যার বের করে নিল। উভচর কোট বৃষ্টিতেও কাজে লাগে, আবার সাগরে নামার জন্যে খুবই নিরাপদ। হাঙ্গর-কুমিরের দাঁত তো দুরের কথা বুলেটও এই বিশেষ নাইলন ফুটো করতে পারে না।
প্যাক করলে ওয়াটার ওয়্যারটি হাতের মুঠিতে নেয়া যায়, খুললে বিরাট আকার নেয়।
আহমদ মুসা ওটা খুলে মাটিতে বিছিয়ে সাহারা বানুকে বলল, খালাম্মা এখানে বসে পড়ুন। কতক্ষণ আমরা এখানে অপেক্ষা করব তা বলা মুষ্কিল। শাহ বানু ও আপনি বসুন। একটু কষ্ট কম হবে’।
‘আমাদের কষ্টের কথা বলছ? নিজের দিকে একটু তাকাও তো বেটা। তোমার গা রক্তে ভেজা। প্রতি মুহূর্ত কি টেনশনে কাটছে তোমার! দু’বাহুর মত জীবন-মৃত্যু তোমার দু’পাশে। সে তুলনায় আমরা পরম সুখে। অথচ তোমার সব কষ্ট আমাদের জন্যেই’। বলল সাহারা বানু।
‘মায়ের জন্যে সন্তানরা, বোনের জন্যে ভাইয়েরা তো কষ্ট করবেই। এ কষ্ট তাদের জন্যে কষ্ট নয়। কষ্টই যদি হবে, সন্তান, ভাই- এ সম্পর্ক তাহলে কেন?’ বলে টিলার দিকে এগুলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার চলার পথের দিকে অশ্রু সজল চোখে তাকিয়ে ছিল সাহারা বানু।
শাহ বানু তার মাকে টেনে নিয়ে ওয়াটার ওয়্যারে বসতে বসতে বলল, ‘বিষ্মিত হয়ো না আম্মা, আহমদ মুসার কাছে আল্লাহর এই গোটা দুনিয়া তাঁর একটা ঘর। এই ঘরের বাসিন্দা তুমি, আমি পর হবো কি করে?’
চোখ মুছতে মুছতে বলল সাহারা বানু, ‘আমি ভাবছি, ওর স্ত্রী আছে, সোনার টুকরো একটা সন্তান আছে, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে দুনিয়ার কোন বাঁধনে সে বাধা নয়। পরের জন্যে নিজকে এভাবে ভূলে যাওয়া অসম্ভব’। ভারী ও ভাঙা গলা সাহারা বানুর।
আল্লাহর সৈনিকরা নাকি এমনই হয়। আহমদ মুসা ভাইয়াই একথা বলেছিলেন। নিজের পিতা, মাতা, ভাইবোন, স্বামী-সন্তান, স্ত্রী-পুত্র, বাড়ি-ঘর, ব্যবসায়-বানিজ্য সবকিছুর চেয়ে নাকি আল্লাহ, তার রসূল স. এবং তাঁদের কাজকে বেশি ভালবাসতে হয়’। শাহ বানু বলল।
‘এরাই সোনার মানুষ শাহ বানু। আল্লাহর সাহায্য এদের জন্যেই সাহারা বানু বলল।

আহমদ মুসা চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে তাকাল তারিকের দিকে। টিলার আগাছা আর ঘাসের উপর বসে ঘুমে ঢুলছিল তারিক।
আহমদ মুসা তার পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘উঠে দাঁড়াও। যাও নিচে গিয়ে এই টিলায় বিশবার উঠা-নামা কর। ঘুম চলে যাবে’।
‘ধন্যবাদ স্যার। বলে তারিক টিলা থেকে নামা শুরু করল।
‘ভাইয়া ওর মাথায় বরফ আছে, সেখানে টেনশন প্রবেশ করলেও তা বরফ হয়ে যায়’। বলল শাহ বানু টিলার গোড়া থেকে। টিলার গোড়ায় সে মায়ের সাথে বসেছিল।
‘ঘুমের জন্যে মাথায় বরফ থাকতে হয় না। টেনশনের মধ্যেও ঘুম এসে যেতে পারে’। কৈফিয়তের সুরে বলল তারিক।
শাহ বানু মুখ খুলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তার আগেই বলে উঠল, ‘কোন কথা নয় শাহ বানু। বিতর্ক ‘ড্র’ থাকুক কোন সুসময়ের জন্যে’।
‘ঝগড়ার জন্যে আমি বলিনি ভাইয়া’। বলল শাহ বানু। কণ্ঠে কিছুটা ক্ষোভ।
‘ঝগড়া নয়, আমি কথাটা ক্লিয়ার করার জন্যে বলেছি’। বলল তারিক।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমাদের দু’জনকে ধন্যবাদ’।
দূরবীনে আবার চোখ রাখল আহমদ মুসা। দূরবীনের দৃষ্টি উৎরাইয়ের পথ পেরিয়ে ওদিকের চড়াই পর্যন্ত বিস্তৃত।
হঠাৎ দূরবীনের দৃষ্টি এক জায়গায় স্থির হয়ে গেল। চারজন তাদের ষ্টেনগান বাগিয়ে পথ ধরে উঠে আসছে।
আহমদ মুসা এদেরই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বিস্মত হলৌ ওদের সংখ্যা চারজন দেখে। সুস্মিতা বালাজী জানিয়েছে, ওরা দশজন এসেছে এদিকে। অবশিষ্ট ছয়জন কোথায় তাহলে? ওদের পেছনে আসছে?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, ওরা ভিন্ন পথ দিয়ে আসতে পারে। ওদের কৌশল এই হতে পারে যে, এরা চারজন আমাদের সংঘর্ষে নিয়ে আসবে, আর ওরা ছয়জন পেছন থেকে আমাদের উপর চড়াও হবে। এ পরিকল্পনা নিয়ে ওরা ছয়জন এ চারজনের আগেই নিশ্চয় যাত্রা করেছে। তাহলে তো ওরা অনেকখানি কাছে এসে গেছে।
সতর্ক হলো আহমদ মুসা। উঠে দাঁড়াল টিলার উপর। ছয় জন এদিকে আসার জন্যে রাস্তার কোন পাশটা বেছে নেবে ওরা?
তীক্ষন দৃষ্টি মেলে আহমদ মুসা গোটা পথটায় একবার নজর বুলাল। তার কাছে ধরা পড়ল, রাস্তার দক্ষিণ পাশ গোটাটাই কিছু খাড়া পাহাড় এবং গভীর খাদে ভরা। এ পাশ দিয়ে আসা অনেক সময়সাপেক্ষই শুধু নয়, ভীষন কষ্টকরও। সুতরাং এ পথ তারা অবশ্যই বিবেচনা থেকে বাদ দেবে। অতএব নিশ্চিত যে, ওরা উত্তরের জংগল পথেই আসছে।
আহমদ মুসাকে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত দেখে সাহারা বানু ও শাহ বানু দু’জনেই উঠে এসেছে। বলল সাহারা বানু, ‘তুমি খুব ভাবছ, কিছু ঘটেছে বেটা?
‘ওরা আসছে খালাম্মা। চারজনকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওরা তো দশ জন। আর ছয় জন নিশ্চয় অন্য পথে আসছে। মনে হচ্ছে আমাদেরকে এই চারজনের সাথে ব্যস্ত রেখে ঐ ছয় জন অন্যপথে এসে পাশ বা পেছন থেকে আমাদের উপর চড়াও হবার পরিকল্পনা করছে’।
উদ্বেগ ফুটে উঠল সাহারা বানুদের মুখে। কিছু বলতে যাচ্ছিল সাহারা বানু।
এই সময় দু’টি শুকর ছানা পূর্ব থেকে এসে তাদের পাশ দিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে ছুটে পালাল পশ্চিম দিকে।
এদিকে নজর পড়তেই এক হাত তুলে আহমদ মুসা কথা বলতে নিষেধ করল সাহারা বানুদের।
ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছিল আহমদ মুসার। তার মনে হলো শুকর ছানার ভয়ের উৎস ঐ ছয়জন হতে পারে। তার মানে ওরা জংগলের এই প্রান্ত বরাবরই আসছে।
‘খালাম্মা ঐ ছয়জন জংগলের এ প্রান্ত দিয়েই আসছে’।
বলেই চোখ ফিরাল আহমদ মুসা শাহ বানুর দিকে। বলল দ্রুত, ‘শাহ বানু তুমি খালাম্মাকে নিয়ে রাস্তার ওপাশে টিলার আড়ালে চলে যাও। তারিকও যাও সাথে’।
নির্দেশ পেয়েই শাহ বানু ওয়াটার ওয়্যার তাড়াতাড়ি গুটিয়ে নিয়ে বলল, ‘চল আম্মা’। শাহ বানু তারিকের দিকেও একবার তাকাল।
‘চল শাহ বানু’। তারিকও বলল।
‘কোন নির্দেশ ভাইয়া?’ চলতে শুরু করে শাহ বানু বলল।
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় শুকিয়ে গেছে ওদের মুখ। কথা বলার সময় শাহ বানুর কণ্ঠ কাঁপছিল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘নির্দেশ হলো, ভয় পেয়ো না। ওরা আমাদের দেখতে পায়নি, আমরা ওদের দেখেছি। আমরা বেটার অবস্থানে। আমাদের জন্যে এটা আল্লাহর সাহায্য। আর নির্দেশ হলো, তোমাদের সকলের কাছে লোডেড রিভলবার আছে। যদি কিছু করণীয় হয়, মন তোমাদের বলে দেবে যাও’।
আহমদ মুসার নিশ্চন্ত হাসি এবং আশার কথা শাহ বানুদের চলা অনেক সহজ করে দিল। সাহসও যেন ওরা ফিরে পেল। ‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে উঠল শাহ বানু ও তারিক একই সঙ্গে এবং ওরা চলে গেল।
আহমদ মুসা আবার টিলার শীর্ষে উঠে গেল।
ডাল পালা ও আগাছার আড়ালে ওটা সুন্দর জায়গা। ওখান থেকে একই সাথে রাস্তা ধরে আসা চারজন এবং জংগলের প্রান্ত দিয়ে আসা ছয় জন সকলকেই চোখে রাখা যাবে।
আহমদ মুসা দেখল রাস্তার চারজন চাশ গজের মধ্যে এসে গেছে।
আহমদ মুসা অনুমান করল ছয় জনের অগ্রবাহিনী নিশ্চয় তিনশ গজের মধ্যে চলে এসেছে।
আহমদ মুসা পকেট থেকে ফুল লোডেড দু’টি রিভলবার হাতে তুলে নিল। আহমদ মুসার প্রধান মনোযোগ জংগলের দিকে। জংগল বড় বড় গাছে ভরা। তবে শাল জাতীয় গাছগুলোর দীর্ঘ কাণ্ড শাখা-পাতা শূন্য। তার ফলে জংগলের আকাশটা যতটা নিবিড়-ঘন, নিচটা ততটাই ফাঁকা। তবে মাটিতে প্রচুর আগাছা রয়েছে, আগাছার অনেকগুলো বেশ বড়ও। তাই জংগলের তলাটা সহজে দৃষ্টিগোচর নয়। বিশেষ করে রাস্তার প্রান্ত বরাবর প্রচুর ঝোপ জংগল রয়েছে। এ সবের মধ্যে দিয়ে কেউ যদি লুকিয়ে আসতে চায়, তাহলে তারা সহজে চোখে পড়ার কথা নয়।
কিন্তু আহমদ মুসার চোখে দূরবীন থাকায় ঝোপ-ঝাড়ের গলি-খুঁজা তার কাছে অনেক স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। আগাছা, শাখা-প্রশাখার সামান্য নড়া-চড়াও তার নজর এড়াচ্ছে না।
অবশেষে ওরা ছয় জন আহমদ মুসার দূরবীনে ধরা পড়ল।
ওরা ছয় জন ষ্টেনগান বাগিয়ে বৃত্তাকারে বিড়ালের মত নিঃশব্দ পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। বৃত্তের সামনের দু’জনের চোখ সামনে, মানে পশ্চিমে, বৃত্তের দু’পাশের দু’জনের দৃষ্টি দু’দিকে, দক্ষিণ ও উত্তরে। আর বৃত্তের পেছনের দু’জন পেছনে চোখ রেখে কতকটা উল্টো হেঁটে এগিয়ে আসছে।
আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসা করল ওদের পরাকল্পনার।
আহমদ মুসা ভাবল, ওরা টিলার দেয়ালে এসে বাধা পাবে। তারপর তারা টিলা পেরিয়ে সোজা সামনে এগুবে টিলার উপরের এদিকটা সার্চ করতে আসবে কিনা এটা একটা বড় প্রশ্ন।
ওরা টিলার দেয়ালের কাছে এসে গেছে। সকলেই ওরা চারদিকে তাকাচ্ছে টিলায় ওঠার আগে।
আহমদ মুসা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে রিভলবার বাগিয়ে।
ওদের বৃত্তের সামনের দু’জন অতিসন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে টিলার দেয়ালে উঠে দেয়ালের ওপাশ মানে পশ্চিম পাশটায় নজর বুলাল। ঠিক তাদের মতই বৃত্তের দক্ষিন পাশে যে ছিল সে টিলার দেয়ালে উঠে ক্রলিং করে টিলার দেয়াল বেয়ে অনেক খানি উপরে উঠে এল এবং চারদিকটা দেখল। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার নেমে গিয়ে বৃত্তে যোগ দিল।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। লোকটি যদি আর দু’গজ এগুতো কিংবা আহমদ মুসা যদি টিলার একদম শীর্ষে আশ্রয় না নিত, তাহলে লোকটির চোখে পড়ে যেত।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। আহমদ মুসা এই মুহূর্তে ওদের আক্রমণ করতে চায় না। আহমদ মুসা চাইল পেছনের চারজনও আরও কাছে আসুক। যাতে একসাথে সবাইকে আক্রমণের আওতায় আনা যায়। আহমদ মুসার ইচ্ছা, ছয় জনের দলকে তাদের পেছন থেকে এবং চার জনের দলকে সামনে থেকে সে আক্রমণ করতে চায়। তার আরও লক্ষ্য হল, কেউ যেন লুকবার সময় না পায়।
ছয় জনের বৃত্তটি টিলার দেয়াল পেরিয়ে সামনে এগুলো।
গজ চারেক এগুবার পর হঠাৎ বৃত্তের সামনের দু’জন থমকে দাঁড়াল। তাদের একজন নিচু হয়ে মাটি থেকে একখণ্ড কাগজ হাতে তুলে নিল।
আহমদ মুসার দূরবীনে ধরা পড়ল চকলেটের একটি মোড়ক। হয় শাহ বানু, নয়তো তারিক চকলেট খেয়ে ওটা মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। আহমদ মুসাই দিয়েছিল ওদের চকলেট।
চকলেটের কাগজটি পেয়ে মুহূর্তেই ছয় জনের বৃত্তটির সবাই মাটিতে শুয়ে পজিশন নিল। ওরা চারদিকে তাকাচ্ছিল। ওদের সন্দিগ্ধ ও সতর্ক দৃষ্টি্
ওরা চারদিকটা ভালোভাবে দেখে নেবার পর তাদের সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো টিলার দিকে। সেই আগের মত বৃত্তাকারে চারদিকে চোখ রেখে তারা এগুলো টিলার দিকে। তাদের হাতের অস্ত্রগুলো উদ্যত এবং ট্রিগারে আঙ্গুল।
আহমদ মুসা নিশ্চিত, এবার ওরা টিলা সার্চ না করে ফিরবে না।
আহমদ মুসা অত্যন্ত সন্তর্পণে টিলার মাথাটা ডিঙ্গিয়ে ওপারের ঢালটায় চলে গেল। রিভলবার দু’টো মাটিতে রেখে লাইট মেশিনগানটার ব্যারেল ওদিকে ঘুরিয়ে নিল আহমদ মুসা।
কিন্তু ব্যারেল ঘুরাতে গিয়ে বিপত্তি ঘটল। একটা বড় পাথর স্থানচ্যুত হয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ওপাশে নিচের দিকে।
ওটা ওদের নজরে পড়তে দেরি হলো না।
সংগে সংগেই ওদিক থেকে শুরু হলো ব্রাশ ফায়ার।
মেশিনগানের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে আহমদ মুসা অপেক্ষা করছিল।
প্রায় পঞ্চাশ রাউন্ডের মত গুলীর পর গুলী কমে এল।
সম্ভবত! ওরা রেজাল্ট দেখার জন্যেই গুলী কমিয়ে দিয়েছিল।
আহমদ মুসার হাত মেশিনগানের ট্রিগারেই ছিল। ওদের গুলী কমার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা মাথাটা তুলে মেশিনগানের ব্যারেল টার্গেটের বরাবর নিয়ে গুলী বৃষ্টি শুরু করল।
মেশিনগানের ব্যারেল কয়েকবার ঘুরিয়ে প্রায় পনের সেকেন্ড ট্রিগার চেপে রাখল। দশ সেকেন্ড গুলীর পর ওদিক থেকে গুলীর শব্দ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা চকিতে একবার পেছন ফিরে তাকাল পেছনের চারজনের অবস্থান দেখার জন্যে। দেখল, ওরা কাছে চলে এসেছে। ষ্টেনগান বাগিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে আসছে ওরা। ওদের লক্ষ্য টিলা্
আহমদ মুসা ঘুরিয়ে নিল তার লাইট মেশিনগান। ট্রিগার টানল মেশিনগানের। শুরু হলো গুলী বৃষ্টি।
ওরা ছিল বৃত্তাকারে। আর এরা চার জন ছিল রাস্তার আড়াআড়ি একটা লাইনে।
গুলীবৃষ্টি হবার সঙ্গে সঙ্গে দু’জন ছুটে রাস্তার ওপাশের জংগলে ঢুকে গেল। দু’জনের লাশ পড়ে গেল রাস্তায়।
গুলী বন্ধ করে আহমদ মুসা টিলার পশ্চিম পাশে ছয় জনের অবস্থা দেখার জন্যে হামাগুড়ি দিয়ে টিলার পশ্চিম পাশে চলে এল। ওপারে গিয়েই দেখতে পেল টিলার গোড়ার কয়েকগজ দূরে ওরা ছয়জন বৃত্তাকারেই মরে পড়ে আছে।
আহমদ মুসা দ্রুত নিচে গেল। ভাবল দু’জন ওরা ওপারের জংগলে ঢুকেছে, এখনি যেতে হবে ওপারের টিলার দিকে।
কিন্তু এ ভাবনা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসার কানে প্রায় একসাথে দু’টি গুলীর শব্দ এসে প্রবেশ করল। সোজা হয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা। আর কোন গুলীর শব্দ হলো না। স্বস্তি ফুটে উঠল আহমদ মুসার মুখে। সে নিশ্চিত, গুলী দু’টি শাহ বানু ও তারিকের রিভলবারের এবং গুলী দু’টি ছোঁড়া হয়েছে ওপাশের জংগলে পালানো দু’জনকে লক্ষ্য করেই। আর তারা দু’জনই মারা গেছে। ওদের ষ্টেনগানের কোন গুলী শোনা যায়নি। তার মানে ওরা গুলী করার সুযোগই পায়নি।
তাকাল আহমদ মুসা টিলার দিকে। দেখল, শাহ বানু, সাহারা বানু ও তারিক টিলার নিচে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা ওদিকে তাকাতেই শাহ বানু বলল ‘ভাইয়া আমরা আসতে পারি?’
‘এস’। আহমদ মুসা বলল।
শাহ বানুরা এপারে এলে আহমদ মুসা বলল, দু’জনের দু’সফল গুলীর জন্যে ধন্যবাদ’।
বিষ্ময় নামল শাহ বানু ও তারিকের চোখে-মুখে। বলল শাহ বানু, ‘ভাইয়া জানলেন কি করে যে, আমরা দু’জনে গুলী করেছি এবং তা সফল হয়েছে?’
‘ওদের দু’জনের হাতে ষ্টেনগান ছিল, আর তোমাদের হাতে ছিল রিভলবার। দু’গুলী একসাথেই হয়েছে। তোমাদের গুলীর পরে ষ্টেনগান থেকে কোন গুলী হয়নি। এ সবই আমার কথার প্রমাণ’। বলল আহমদ মুসা।
‘আল্লাহকে ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনি এতদ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ভাইয়া?’ শাহ বানু বলল।
‘বেটা, তুমি ওদের ধন্যবাদ দিচ্ছ তোমার প্রাপ্য ধন্যবাদ আড়াল করার জন্য বুঝি!’ বলল সাহারা বানু।
‘পানিতেই যার বাস, তার কাছে পানি নতুন নয়, কিন্তু পানিতে যারা নতুন পা দিল, ধন্যবাদ তো তাদেরই প্রাপ্য খালাম্মা’। আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদের এত বড় স্বীকৃতি দিচ্ছেন ভাইয়া? বেশি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমি, মেয়েরা, এই মহান কাজে অচল’। বলল শাহ বানু। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘শাহ বানু, মেয়েদের এমন ছোট করে দেখলে, মানুষের অর্ধেকটাই ছোট হয়ে যায়। অথচ মোগলদের নূরজাহান, মুসলিম শাসক চাঁদ সুলতানা, বীর নারী হামিদা বানু প্রমুখের ইতিহাস তোমরা জান’। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া! আপনি………………।
আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠায় শাহ বানু কথা শেষ না করেই থেমে গেল।
আহমদ মুসা মুখের কাছে তুলে নিল মোবাইল। বলল, ‘জি আপা, ওয়া আলাইকুম সালাম’।
‘ছোট ভাই ভাল আছেন আপনারা? গুলী-গোলার শব্দে আমরা এখানে উদ্বিগ্ন’। বলল সুস্মিতা বালাজী।
‘হ্যাঁ ভাল আছি। ওদের দশজনই মারা গেছে, আলহামদুলিল্লাহ’।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনারা তাহলে এখন আসছেন?’
হ্যাঁ আসছি। ওদিকের খবর কি?’
‘এই মাত্র আমাদের স্কুলের গার্ড টেলিফোন করেছিল। গোলা-গুলীর শব্দ শুনে ওরা খুব খুশি। এ খবর শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে আমি টেলিফোন করলাম’।
‘হতে পারে, গোলা-গুলী শুনেই ওরা ধরে নিয়েছিল তারা শত্রুদের খতম করেছে। যাক ওখানে এখন ওরা কয়জন আছে?’
‘ওরা দশ এগার জন আছে’।
‘ঠিক আছে আপা। আপনার যেভাবে আছেন, সেভাবেই থাকুন। আমরা আসছি।
‘ঠিক আছে ছোট ভাই। সালাম’।
‘আসসালামু আলাইকুম’।
আহমদ মুসা মোবাইল পকেটে রেখে বলল, ‘চল আমরা যাত্রা করি। তার আগে শাহ বানু ও তারিক তোমরা অ্যামুনিশনের বাক্সের সাথে সাথে ওদের ষ্টেনগানগুলো কাঁধে তুলে নাও। আমাকেও কিছু দাও’।
‘না, ষ্টেনগানগুলো আমি নেব’। বলে সাহারা বানু ষ্টেনগানগুলো কুড়িয়ে নেবার জন্যে এগুলো।
‘না খালাম্মা, আপনি নন। ওরাই পারবে’। আহমদ মুসা বলল।
‘বেটা, তুমি না এইমাত্র নূরজাহান, সুলতানা রাজিয়াদের উদাহরণ দিলে। আরও উদাহরণ আছে। ভারতের বেগম হযরত মহল, ইসলামের প্রাথমিক যুগের বীর নারী খাওলার মত যুদ্বের ময়দানে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন অসংখ্য মুসলিম নারী। তাহলে আমি এই কয়টা ষ্টেনগান বহনের অধিকার পাব না কেন? সন্তানদের যুদ্ধে মা কি অংশ নিতে পারে না?’
‘ধন্যবাদ খালাম্মা। আমাদের মায়েরা এইভাবে জেগে উঠলে আমাদের জাতি নতুন এক সোনালী দিনের মুখ অবশ্যই দেখবে’। বলে আহমদ মুসা নিজে ষ্টেনগানগুলো কুড়িয়ে সাহারা বানুর কাঁধে ঝুলিয়ে দিল।
তারা গ্রীনভ্যালির উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করল।
রাস্তায় উঠে আসতেই আহমদ মুসার মোবাইল আবার বেজে উঠল।
মোবাইল নিয়ে মুখের কাছে তুলে ধরে বলল, ‘জি আপা, আসসালামু আলাইকুম। কোন নতুন খবর?’
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। ছোট ভাই এইমাত্র আমদের স্কুলের গার্ড জানাল, এইমাত্র ওদের সর্দার ওদের সবাইকে গ্রীনভ্যালি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। যে দশ জন উপকূলের দিকে গিয়েছিল সবাই মারা গেছে। ওরা বলেছে, আবার তৈরি হয়ে হেলিকপ্টার নিয়ে খুব শীঘ্রই নাকি ওরা আবার আসবে’। গার্ড আরও জানাল জোর প্যাকিং চলছে দু’এক মিনিটের মধ্যেই ওরা যাত্রা শুরু করবে। ছোট ভাই, আমাদের এখন কি করণীয়?’ বলল সুস্মিতা বালাজী উত্তেজিত তার কণ্ঠস্বর।
‘বুঝেছি আপা। ভাই সাহেব কোথায়?’
‘বাইরে লোকদের কাছে গেছে। আমাকে বল তোমার পরামর্শ’।
‘আপা প্রথম কথা হলো, ওদের কাউকেই গ্রীনভ্যালি থেকে যেতে দেয়া যাবে না। গ্রীনভ্যালির ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্যেই গ্রীনভ্যালির এসব কাহিনী বাইরে প্রকাশ হতে দেয়া উচিত হবে না। দ্বিতীয় কথা, ওরা প্রস্তুত হয়ে যাত্র শুরুর আগে ওদের আক্রমণ করা যাবে না। পালাবার সময় মানুষের মন দুর্বল হয়, ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং পাল্টা আক্রমণের উদ্যোগ প্রায়ই থাকে না। তৃতীয় কথা, ওরা যখন পালিয়ে যাবার জন্যে রাস্তায় উঠবে, তখন উত্তর দিকে রিংরোডের সংযোগস্থলে যারা আছে, তারা আক্রমনে আসবে। এই আক্রমণে তারা পেছনে গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে সামনে দৌড়াবে, তখন পূর্ব দিকে হাইওয়ে গামী রাস্তার পাশে যারা আছে, তারা পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে’।
‘ধন্যবাদ ছোট ভাই, সুন্দর পরিকল্পনা’। বলল সুস্মিতা বালাজী।
‘শুনুন আপা, আমাদের এখানে যারা এসেছিল, তাদের মধ্যে শংকরাচার্য নেই। তাহলে তিনি ওখানেই আছেন। তাকে জীবন্ত ধরতে পারলে ভাল। একটু দেখবেন’।
‘কঠিন কথা বলেছেন ছোট ভাই, এটা কে দেখাবে? আপনার মত মাথা ঠাণ্ডা করে, পরিকল্পনা করে গুলী করার লোক আমাদের নেই’।
‘ঠিক আছে আপা, আল্লাহ ভরসা। যেটা হবার সেটাই হওয়া উচিত। আর কোন কথা আপা?’
‘না, আপাতত নেই। আপনারা যতটা সম্ভব দ্রুত আসুন। কি হবে আমার ভয় করছে। রাখলাম। আসসালামু আলাইকুম’।
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম’ বলে মোবাইল বন্ধ করল আহমদ মুসা।
শাহ বানুরা সবাই তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা সংক্ষেপে সুখবরটা ওদের দিল।
যাত্রা শুরু হল আবার।