৪২. ডুবো পাহাড়

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

সুস্মিতা বালাজীদের তিন তলার হাওয়াখানা।
একে অভজারভেটরিও বলে সুস্মিতারা।
এখানে বসে হ্রদের মত বিশাল সরোবরের উপর দিয়ে আন্দামানের শান্ত নীল সমুদ্র দেখা যায়।
আহমদ মুসার শূন্য দৃষ্টি নীল সাগর পেরিয়ে ছুটছে আরও দূরে, অনেক দূরে- আরব সাগরও পার হয়ে। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে জোসেফাইনের মিষ্টি হাসির শান্ত সুন্দর মুখ।
এইমাত্র টেলিফোন করেছিল ডোনা জোসেফাইন। তার রুটিন টেলিফোন। আগে সাত দিন পর পর টেলিফোন করতো। সন্তান আহমদ আব্দুল্লাহ জন্ম নেয়ার পর সাত দিন থেকে নেমে এসেছে এখন তিন দিনে। প্রতি তিন দিন পর সে এখন টেলিফোন করে। ডোনার যুক্তি হল আহমদ আব্দুল্লহ আসার পর তার দায়িত্ব বেড়েছে এবং তার সাথে দুশ্চিন্তাও বেড়েছে। এখন সাত দিন অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিন দিন পরের ডোনার এই টেলিফোন আহমদ মুসার কাছে অমৃতের মত, যেন প্রানসঞ্জীবনী সুধা। তিন দিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায় একটি পরিচিত কন্ঠের মিষ্টি সম্বোধনে।
কিন্তূ ডোনা আজ টেলিফোন করেছে দু’দিনের মাথায়।
আজ ডোনা ছিল দারুন খুশি।
ফ্রান্স থেকে তার আব্বা এসেছে এবং রাশিয়া থেকে এসেছে তার মা (ওলগার মা)। কিন্তূ এই খুশির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে জোসেফাইন। বলেছে, ‘এই মুহূর্তে খুব ফিল করছি আমি তোমাকে। মনটা অস্থির লাগছে। চারদিকে আমার সবই আছে, কিন্তূ মনে হচ্ছে কিছুই নেই। হঠাৎ করে শূন্যতার একটা যন্ত্রণা আমাকে ঘিরে ধরেছে। তাই একদিন আগেই তোমাকে টেলিফোন করলাম।’ কথা শেষ করেই সে তাড়াতাড়ি বলে উঠেছে, ‘স্যারি, আমার কথা গুলোকে শাব্দিক অর্থে নিও না। আব্বা, আম্মা এসেছেন তো। তাই মনটা হঠাৎ আনন্দে বাঁধন হারা হয়ে উঠেছে। আহমদ মুসা উত্তরে বলেছে, কিন্তূ জোসেফান, আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি এ কথা তো ঠিক।’ উত্তরে জোসেফাইনের জবাবটা দীর্ঘ ছিল। বলেছে, কষ্ট পাচ্ছি এ কথা যদি বলি তা ঠিক হবে না। কিন্তূ এ কষ্টে যে সুখ আছে, তা কষ্টের চেয়ে অনেক বড়, এ কথা তুমি অন্তত বুঝবে। কারণ এমন কষ্ট তোমার মাঝেও আছে এবং কষ্টের মধ্যে যে বড় সুখ তা আমার মত তোমাকেও সান্তনা দেয়। আর তুমি আমাকে কোন কষ্ট দাও না। এ কষ্ট যদি কেউ দিয়ে থাকেন তিনি আমার আল্লাহ, বিশ্ব জাহানের প্রভূ। আনন্দের সাথে বুক পেতে এই কষ্ট আমি গ্রহন করেছি। কারণ এর যে পরম জাযাহ তিনি পুরস্কার হিসাবে প্রস্তূত রেখেছেন তা তোমার আমার কল্পনার বাইরে। বল, এরপর তুমি কষ্টের কথা বলতে পার?’ আহমদ মুসা বলেছে, ‘বলতে পার জোসেফাইন। পুরস্কারের অস্তিত্ব যেমন বাস্তব, কষ্টেরও অস্তিত্ব তেমনি বাস্তব। কষ্ট আছে বলেই তো পুরস্কার। তবে আমার খুব ভাল লাগছে জোসেফাইন, আল্লাহর ইচ্ছাকে তুমি এমনভাবে গ্রহন করতে পেরেছ দেখে। তোমার এই ধৈর্য আমাকে আরও শক্তি যোগাবে।’ জোসেফাইন উত্তরে আবেগরুদ্ধ কন্ঠে বলেছে, ‘সকল প্রসংসা আল্লাহর। আর আল্লাহকে তুমিই আমাকে চিনিয়েছ। আল্লাহর প্রতি এই নির্ভরতা আমি তোমার কাছে থেকেই শিখেছি। আজকের এই যে আমি, তাকে তুমিই গড়েছ। সুতরাং………।’ জোসেফাইনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তার কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠেছে, ‘মানুষ একমাত্র আল্লাহই গড়ে জোসেফাইন। আল্লাহরই দেয়া যে আলো আমি তোমার কাছে তুলে ধরেছি, তাঁকে গ্রহন করার শক্তি আল্লাহই তোমাকে দিয়েছেন। এ আলোয় যে আলোর জীবন তুমি পেয়েছ, আল্লাহই দয়া করে তা গড়ে দিয়েছেন। সর্বাবস্থায় সব প্রশংসা আল্লাহর।’ সঙ্গে সঙ্গেই জোসেফাইন বলেছে, ‘ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি আমার ভূল শুধরে দিয়েছ। তুমি আমার স্বামী, আমার শিক্ষক। এটা আমার গর্ব।’ আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গেই বলেছে, ‘ব্যাপারটা একতরফা নয় জোসেফাইন। আমাদের কুরআন শরীফে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের অভিভাবক হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। অভিভাবক শিক্ষকও। সুতরাং শুধু ছাত্রী নয়, শিক্ষকও তুমি।’ হেসে উঠেছিল জোসেফাইন। বলেছে, ‘স্যার যদি ছাত্রীকে স্যারে উন্নতি করেন, তাহলে কোন বোকা ছাত্রী আনন্দে আত্মহারা হবে না।’ আহমদ মুসা বলেছেন, ‘কথাটা ওভাবে নয় এভাবে বল, স্বামী-স্ত্রী দুজনকে সমান আসন দেয়ার জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ।’ একটু সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলেছে জোসেফাইন, তোমার সমান কথাটার সাথে আমি একমত নই। আল্লাহরব্বুল আলামিন স্ত্রীদের তাদের উপযুক্ত স্থান দিয়েছেন এ জন্য তার শুকরিয়া আদায় করছি। উত্তরে আহমদ মুসা বলেছে, ‘কথাটার মধ্যে প্রতিযোগিতা দরকষাকষি আছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দরকষাকষির নয়, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার। সম্প্রীতি ও সহযোগিতা না থাকলে দরকষাকষির রেজাল্ট খুব ফল দেয়না। আল্লাহ উভয়ের মধ্যে এই সম্প্রীতি ও সহযোগিতার কথাই বলেছেন।’
কথা শেষ জোসেফাইন আবার বলে উঠেছে, ‘তোমার অনেক সময় নিয়েছি, প্রসঙ্গ থেকেও অনেক দূরে সরে এসেছি। শোন, আপাকে বলো আমি টেলিফোন করব। রাখলাম টেলিফোন।’ বাধা দিয়ে আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিল, রেখো না প্লিজ। একটা দম নিয়ে জোসেফাইন বলেছে, তমার মনটা আজ খুব ফ্রি দেখছি। এমন ফ্রি দেখলে আমার ভয় করে।’ ‘কেন’ বলেছে আহমদ মুসা। ‘তোমার এমন ফ্রি হওয়া তোমার বড় কিছুতে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়, বলেছে ডোনা জোসেফাইন। তার কন্ঠ ভারী শোনা যাচ্ছিল। বলেছে আহমদ মুসা, ‘কিন্তূ তুমি তো অনেক শক্ত জোসেফাইন। তোমার দৃঢ়তা আমাকে শক্তি জোগায়।’ জোসেফাইন বলেছে, স্যরি এভাবে বলা আমার ঠিক হয়নি। কিন্তূ সত্যি কি জান? আহমদ আবদুল্লাহর দিকে চাইলে আমি যেন দুর্বল হয়ে পড়ি। তুমি পাশে থাকলে এ দুর্বলতা আমি অনুভব করি না। বুঝতে পারি, এটা আমার জন্যে শোভনীয় নয়। কিন্তূ……। কথা শেষ করতে পারে না ডোনা জোসেফাইন। গলায় আটকে যায় তার কথা। বেদনার একটা তীক্ষ্ণ ছুরি এসে আঘাত করে আহমদ মুসাকে। বলে সে, তোমার এ চিন্তা শোভনীয় নয় কেন জোসেফাইন, এ চিন্তাই স্বাভাবিক। একজন স্ত্রীর চেয়ে একজন ‘মা-স্ত্রীর’ দায়িত্ব তো বেশি হবেই। দায়িত্ব থেকে আসে চিন্তা, চিন্তার একটা পর্যায় ভয়ও।’ সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠেছে জোসেফাইন, ‘আমার দুর্বলতার কথা তোমাকে বলেছি সাহস পাওয়ার জন্যে, শক্তি পাব বলে। কিন্তূ এখন দেখছি, দুর্বলতাকে তুমি প্ররোচণা দিচ্ছ, আরও বাড়িয়ে দিচ্ছি। তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।’ আহমদ মসা বলেছে, আমি এখন শুধু আহমদ মুসা নই, একজনের স্বামী এবং একজনের পিতাও। বলেছে জোসেফাইন, ‘স্যরি, আমি যে কথা বলছি, সে কথা তুমিও বললে। কথা সত্য এবং খুবই বাস্তব। কিন্তূ এই দুর্বলতা আমার জন্যে হয়তো কিছুটা সাজে কিন্তূ তোমার সাজে না। তুমি একজন জোসেফাইনের স্বামী তুমি একজন আহমদ আবদুল্লাহর পিতা, কিন্তূ কোটি কোটি মানুষের তুমি ‘আহনদ মুসা’। আল্লাহর কাছে তুমি আহমদ মুসাই। এই আহমদ মুসা দুর্বল হতে পারে না।’ এক ধরনের আবেগ ঢেউ খেলে উঠেছিল আহমদ মুসার চেহারায়। ডোনা জোসেফাইনের কথাগুলোকে মনে হচ্ছিল অবিস্মরণীয় শিলালিপির এক মূর্তিমান সত্তার মত দেদীপ্যমান। বলে উঠেছিল আহমদ মুসা, ‘জোসেফাইন আমার কৃতজ্ঞতা নাও। তোমার মত স্ত্রী থাকলে কারো পথ হারাবার ভয় নেই। আল্লাহ তোমাকে জাযাহ দান করুন। তুমি শান্তির মরুদ্যান শুধু নাও জোসেফাইন, অব্যাহত প্রেরণার এক মানস সরোবরও।’ আহমদ মুসার কথার পিঠেই ডোনা জোসেফাইন বলে উঠেছিল, হ্যা, মহানজন সূর্য যখন ঘাতক চাঁদের প্রসংসা করে তখন শুনতে ভালোই লাগে।’
ডোনা জোসেফাইনকে নিয়ে আহমদ মুসার এই সুখ চিন্তা আর কতক্ষণ চলতো কে জানে। কিন্তূ চলতে পারলো না। হাওয়াখানায় উঠার সিঁড়ি-মুখের দড়জায় নক হল। ভেঙে গেল আহমদ মুসার সুখ সপ্ন। সাগরের নীল বুক থেকে ফিরে এল তার চোখ।
দরজার পেছনে বসেছিল আহমদ মুসা।
পেছনে একবার তাকাল আহমদ মুসা।
মুখ ফিরিয়ে আনল আবার। বলল, ‘এস শাহ বানু।’
অনুমতি পেয়ে শাহ বানু প্রবেশ করল হাওয়াখানায়।
পরনে তার ঢোলা সালোয়ার-কামিজ। মাথায় ওড়না, শরীরেও জড়িয়ে আছে।
মাথার ওড়নাটা কপালের উপর আরও টেনে দিয়ে চঞ্চল পদক্ষেপে আহমদ মুসার সামনে এল। বলল, ‘ভাইয়া আমি মাত্র একবার নক করেছি। কি করে বুঝলেন আমি।’
‘তুমি তর্জনী ভাঁজ করে ভাঁজ হওয়া আঙুল দিয়ে প্রথমে একবার নক করে থাক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া আপনি এত হিসাব-নিকেশ করেন কখন?’
‘হিসেব-নিকেশ নয়, এটা ভালো করে শোনার ব্যাপার।’
‘আমরাও তো শুনি, কিন্তূ এই ফল তো হয় না।’ শাহ বানু বলল।
‘শোন বটে, কিন্তূ আন্তরিকভাবে মনোযোগ দাও না।’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে শাহ বানু একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘হতে পারে।’
শাহ বানু থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘কিছু বলবে, না হাওয়া খেতে এসেছ?’
‘ভাইয়া, সুষমা টেলিফোন করেছিল। আপনি ছিলেন না। সে সুস্মিতা বালাজী আপার সাথে দেখা করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে। আপনাকে অনুরোধ করেছে, যে কোন উপায়ে সুস্মিতা আপার সাথে তার দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য।’
হ্যাঁ, সুস্মিতা আপারা পোর্ট ব্লেয়ারে থাকে। সেখানে গেলে সহজেই দেখা হতে পারে। ঠিক আছে, ওদের সাথে আলোচনা করে দেখব।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। এটুকুই বলার ছিল।’ বলল শাহ বানু।
‘তোমার কথা শেষ হয়ে থাকলে আমার কিছু বলার আছে তোমাকে।আহমদ মুসা বলল।
সোফায় হেলান দিয়ে আহমদ মুসার শূন্য দৃষ্টি আবার ফিরে গেল সাগরের দিকে।
আহমদ মুসার কথায় চমকে উঠে তাকায় শাহ বানু আহমদ মুসার দিকে। কিছুটা উৎসুক, কিছুটা ভয় মিশ্রিত ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। বলল, ‘আমি কিছু অন্যায় করে ফেলিনি তো।’
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না আহমদ মুসা। ভাবছিল সে। গতকাল সাহারা বানু আহমদ মুসাকে বলেছে শাহ বানু ও তারিকের ব্যাপারে। তার এবং আহমদ শাহ আলমগীরের ইচ্ছা তারিকের সাথে শাহ বানুর বিয়ে দেয়া। তারিক ও তারিকের পরিবারও এটা চায়। কিন্তূ দুর্বোধ্য হল শাহ বানু। এ সংক্রান্ত সব কথা সব প্রশ্নকেই সে এরিয়ে যায়। এই প্রস্তাবে তাকে আনন্দিত বলে মনে হয় না। আবার তারিককে সে খারাপ চোখে দেখে এটাও নয়। যদিও শাহ বানু কিছুটা সমালোচক, কিন্তূ সেটা আন্তরিক, বিদ্বেষমূলক নয়। সব মিলিয়ে এই ব্যাপারে সাহারা বানু কিছুই ঠিক করতে পারছে না, কি করবে বুঝতে পারছে না। তাই সে আহমদ মুসাকে অনুরোধ করেছে এই বিষয়ে দায়িত্ব নেয়ার জন্যে। সাহারা বানুর কথা, আহমদ মুসার কোন কথায় না করার সাধ্য শাহ বানুর নেই। সাহারা বানুর দেয়া এই দায়িত্ব নিয়েই শাহ বানুর সাথে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে আহমদ মুসা।
কি বলবে একটু গুছিয়ে নিল আহমদ মুসা। বলল, ‘কোন অন্যায় কোন দিন করেছ যে অন্যায় করবে? সেসব কিছু না শাহ বানু।’ আহমদ মুসার দৃষ্টি সাগরের দিক থেকে ফিরে এসেছে।
‘অজান্তে, অজ্ঞাতেও অন্যায় হয়ে যায় ভাইয়া। কেউ না জানলেও আল্লাহ তা জানেন।’
‘আল্লাহ তার বান্দার অজান্তে অজ্ঞাতের ভুল, অন্যায় গোপন রাখতেই চান এবং এসব তিনি মাফ করে দেন।’
ম্লান হাসল শাহ বানু। তার চোখের কোণটা ভারী হয়ে উঠেছিল। কেঁপে উঠেছিল তার মন। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ। অন্যায়কে আমি অন্যায় বলি বটে, কিন্তু অন্যায়ের স্মৃতিকেও যে আমার ভালো লাগে। আল্লাহ তো এটাও জানেন। এ অন্যায়কেও তিনি মাফ করবেন?
একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সামনে এল সে আহমদ মুসার। বলল, ‘বলুন ভাইয়া।’
শাহ বানুর ভারী চেহারা আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। শাহ বানুকে সহজ করার জন্যেই আহমদ মুসা বলল, ‘কারও সাথে ঝগড়া করেছ নাকি।’ মুখে হাসি আহমদ মুসার।
‘না ভাইয়া ঝগড়া করিনি। ঝগড়া তো একজনের সাথে হয়, আর হবে না।’ ম্লান হেসে বলল শাহ বানু।
‘কেন হবে না?’
‘সে আপনার ছাত্র।’ গম্ভীর কণ্ঠ শাহ বানুর।
‘তাতে কি?’
শাহ বানু আহমদ মুসার সামনের সোফায় বসল। বলল, ‘আপনার কথা বলুন ভাইয়া।’ জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল শাহ বানু।
একটা গাম্ভীর্য নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘কথাটা তোমার আম্মার পক্ষ থেকে হলে ভালো হতো। কিন্তু তিনি আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। কথাটা তুমি ও তারিক মুসা মোপলাকে নিয়ে।’ থামল আহমদ মুসা।
শাহ বানুর মুখ নিচু হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা থামলে একটুক্ষণ নিরবতা।
‘বলুন ভাইয়া।’ নিরবতা ভেঙে বলল শাহ বানু। তার কণ্ঠ একটু কাঁপা ও গম্ভীর।
‘সবাই মনে করেন, তোমাদের সম্পর্কটা খুবই ভালো হবে।’
‘আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি ভাইয়া।’ মুখ নিচু শাহ বানুর। কণ্ঠটা ভেঙে পড়ার মত ভারী।
আহমদ মুসা মুখ তুলল শাহ বানুর দিকে। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ।
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলল শাহ বানুও। বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না চেপে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে পালাল শাহ বানু।
মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। মনে মনে বলল, আমাদের মেয়েরা আনন্দের সিদ্ধান্তেও কাঁদে। এটাই স্বাভাবিক। জীবনে এর চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত কিছু নেই।
নিজের কথা মনে পড়ল আহমদ মুসার।
‘আমাদের কাঁদার হাসার কোনটারই সুযোগ হয়নি’, স্মৃতিচারণ করল আহমদ মুসা, ‘আমাদের বিয়েটা ছিল রণাঙ্গনের বিয়ের মত। বিয়ের আসন থেকে সোজা এয়ারপোর্ট গিয়েছি। যাবার পথে গাড়িতে কয়েকটা কথা হয়েছিল মেইলিগুলি মানে আমিনার সাথে। কি অসীম ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিল সে। সে সময় সে ভেঙে পড়লে আমি এগোতে পারতাম না। সব চাওয়া, সব আবেগ, সব কান্নাকে আড়াল করে সে বিদায় দিয়েছিল আমাকে। আড়ালের সে কান্নার সমুদ্র আমি পেছনে তাকালেই দেখতে পাই।’ ভারী হয়ে উঠল আহমদ মুসার দু’চোখের কোণ।
ভেবে চলে আহমদ মুসা, ডোনা জোসেফাইনের সাথে তার বিয়েও পরিকল্পনা করে হয়নি। কতকটা পথ-বিয়ের মতই ছিল ব্যাপার। এক সাথে রাশিয়া যাওয়া উপলক্ষ করে প্রয়োজনই দু’জনের চাওয়ার আকস্মিক মিলন ঘটায়। অভিভাবকদের পারিবারিক বিয়ের যে আনন্দ-আবেগ তার সাক্ষাত আহমদ মুসারা পায়নি। শাহ বানুর আবেগ-অনুভুতির মধ্যে তারই একটা প্রকাশ দেখল আহমদ মুসা।
অতীতের স্মৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল আহমদ মুসা। তার দু’চোখের শূন্য দৃষ্টি আঠার মত সেঁটে গিয়েছিল দূর সাগরের বুকে।
হাওয়াখানায় প্রবেশ করেছে সাহারা বানু, ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজী। সুস্মিতা বালাজী বগলদাবা করে ধরে নিয়ে আসছিল শাহ বানুকে। শাহ বানু তার চোখের অশ্রু মোছারও সুযোগ পায়নি।
হাওয়াখানায় তাদের সশব্দে প্রবেশ আহমদ মুসার তন্ময়তা ভাঙাতে পারেনি।
সুস্মিতা বালাজী শাহ বানুকে ধরে নিয়ে সবার আগে আহমদ মুসার কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল। সে আহমদ মুসার আপনাহারা তন্ময়তা দেখে থেমে যায় এবং আঙুলের ইশারায় সবাইকে চুপ করতে বলে।
সবারই চোখ পড়ল আহমদ মুসার তন্ময় ভাবের উপর।
তারা বুঝল, কোন চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেছে আহমদ মুসা।
সবাই চুপ। পল পল করে কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত।
এতগুলো লোকের উপস্থিতি টের পেল না আহমদ মুসা। তার চোখ দু’টির শূন্য দৃষ্টি ফিরে আসেনি সাগরের বুক থেকে। তার মুখে পাতলা একটা বেদনার প্রলেপ।
সুস্মিতা বালাজী একটু দ্বিধা করল। এগোল কয়েক ধাপ আহমদ মুসার দিকে।
শাহ বানু দ্রুত ফিস ফিস করে বলে উঠল, ‘আপা, ওনাকে এখন ডিষ্টার্ব না করলে হয় না?’
‘উনি এখন কোন কিছুতে ব্যস্ত নন। অতীতের কোন এক স্মৃতির গহ্বরে তিনি আটকা পড়েছেন মাত্র।’
‘ছোট ভাই।’ উঁচু, কিন্তু নরম কণ্ঠে ডাকল সুস্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসা হঠাৎ ঘুম ভাঙার মত চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘স্যরি আপা, আপনারা কখন এসেছেন। বসুন। আমি একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলাম।’
সুস্মিতা বালাজী সাহারা বানুকে বসিয়ে শাহ বানুকে পাশে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘না না ছোট ভাই, আপনি আনমনা নয়, অতীতের কোন স্মৃতির বাঁধনে আটকা পড়েছিলেন।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ঠিক তাই।’
‘একান্ত পার্সোনাল না হলে কি সে স্মৃতি জানতে ইচ্ছা করছে।’ বলল সুস্মিতা বালাজী।
‘পার্সোনাল নয়, পাবলিকই। তবে তেমন কিছু নয়।’ বিষয়টাকে এড়ানোর চেষ্টায় বলল আহমদ মুসা।
‘অতীতের যে ঘটনা আহমদ মুসাকে বর্তমানেও এসে আপনহারা করতে পারে, সে ঘটনা যে বড় কিছু অবশ্যই এতে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’ সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘আসলেই ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। আমি ভাবছিলাম বিয়ের রকম নিয়ে। কতক বিয়ে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা, বাহাস-বিতর্ক, অনুষ্ঠান-আয়োজন, মান-অভিমানের দীর্ঘ পটভুমিতে হয়ে থাকে। তার জন্যে আলোক সজ্জা হয়, গৃহ সজ্জা হয়, ঢাক-ঢোল পিটানো, গাড়ির মিছিল নামে, মানুষের মেলা বসে। আবার কতক বিয়ে এমন হয় যে, পাত্র-পাত্রীলও মনে হয় না যে তাদের বিয়ে হল।’ থামল আহমদ মুসা।
‘বিয়ের রকম নিয়ে হঠাৎ এত বড় ভাবনা এল কেন?’ বলল সুস্মিতা বালাজী।
হাসল আহমদ মুসা। তাকাল শাহ বানুর দিকে। বলল, ‘একটা বিয়ের ঘটকালি করতে গিয়ে আপা নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ে গেছে।’
ভ্রুকুঞ্চিত হল সুস্মিতা বালাজীর। মুহূর্তকাল চিন্তা করেই তাকাল শাহ বানুর দিকে। সে শাহ বানুর মুখটা একটু তুলে ধরে বলল, ‘চোখের পানিতে মুখ ভাসানো হচ্ছিল এই কারণে? তা খুশির অশ্রুতো এতবেশি হওয়া উচিত নয়।’
মাথানত করে মুখটা আড়ালে নিল শাহ বানু। মুখটা তার আবার বেদনায় নীল হয়ে গিয়েছিল। বিবেকের সব শাসানি উপেক্ষা করে মনটা ডুকরে উঠল। সত্যিই খুশির নয়, এ এক নিষিদ্ধ, অবাধ্য অশ্রু।
শাহ বানুকে কথা কয়টি বলেই সুস্মিতা বালাজী আহমদ মুসার দিকে ফিরল। বলল, ‘ছোট ভাই, আপনার বিয়ের কথা মনে পড়ল কেন?’
‘এসব কথা থাক।’
‘বলার মত না হলে থাক। কিন্তু আপনার অসাধারন তন্ময়তা দেখে লোভ হচ্ছিল জানার যে, বিয়ের কথাটা ঐভাবে মনে পড়েছিল কেন?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারটা সবসময় পাবলিক। বলা যাবে না কেন?’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘প্রথমে আমার মনে পড়ে সিংকিয়াং এ মেইলিগুলির সাথে আমার বিয়ের কথা। আমি প্রস্তুত হয়েছি সিংকিয়াং থেকে ককেশাসে যাবার জন্যে। প্লেন অপেক্ষা করছে বিমান বন্দরে। আমার বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাক্সিক্ষরা চাইল আমাকে এক ঠিকানায় বেঁধে ফেলতে। সঙ্গে সঙ্গেই মেইলিগুলির সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে গেল। বিমান বন্দরে যাবার গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। বিয়ের আসন থেকে উঠে আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। মেইলিগুলি আমার পাশে এসে বসল বিমান বন্দরে পৌছে দেবার জন্যে। ড্রাইভার গাড়ি ষ্টার্ট দিল। আমার গাড়ির আগে পেছনে বন্ধু-বান্ধবদের গাড়ির মিছিল। বিমান বন্দরে বন্ধু-বান্ধবদের সারিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুভেজা চোখ আর মুখে হাসি নিয়ে বিদায় দিল আমাকে মেইলিগুলি।’ থামল আহমদ মুসা।
সবাই হা করে শুনছে আহমদ মুসার কথা। তাদের চোখে অবিশ্বাসের বিস্ময়।
আহমদ মুসা থামতেই সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘এটা কি রূপকথার রসিকতা ছোট ভাই, না আসলে ঘটেছিল?’
‘ইতিহাস এটা আপা।’
শাহ বানু সোজা হয়ে বসেছিল। তার চোখে অপার বিস্ময় এবং অনেক প্রশ্ন। তার মুখ চিরেই যেন কথা বেরিয়ে এল, ‘তারপর আপনি কবে ফিরলেন আবার?’
প্রশ্ন শুনে চোখ বুজল আহমদ মুসা। মুখ নিচু হল তার। ধীরে ধীরে মুখটি উঁচু হল আবার। বেদনায় ভারী মুখ। বলল, ‘তারপর ঘটনার ¯্রােত আমাকে ভাসিয়ে নিল ককেশাসে, সেখান থেকে বলকানে, বলকান থেকে স্পেনে। স্পেনের পর দক্ষিণ ফ্রান্সে, দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে দুঃসংবাদ পেলাম মেইলিগুলির আব্বা-আম্মা নিহত, মেইলিগুলি নিখোঁজ। ছুটে গেলাম সিংকিয়াংএ। আমি বন্দী হলাম। হাত-পা বাঁধার পরেও খাটের সাথে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আহত ও বন্দী মেইলিগুলিকে সেখানে আনা হল। সেই বিয়ের পর এই আমাদের প্রথম দেখা। আমার শত্রুর ইচ্ছা আমাদের দু’জনকে একত্রিত করা এবং আমার চোখের সামনে আমার স্ত্রীকে লাঞ্চিত করা। আমার শত্রুটি এগিয়ে আসছিল মেইলিগুলির দিকে। আমার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। মেইলিগুলি পাথরের মত ভাবলেশহীন। শেষ মুহূর্তে মেইলিগুলির হাত ওড়নার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ক্ষুদ্র এক রিভলবার নিয়ে। ক্ষুদ্র, কিন্তু অত্যন্ত পাওয়ারফুল এই রিভলবার। মেইলিগুলি সব সময় এটা সাথে রাখত শেষ মুহূর্তের মত ঘটনায় ব্যবহার করার জন্যে। গুলী করল সে। গুলী খেয়ে পড়ে গেল শত্রুটি। গুলী করেই আহত মেইলিগুলি উঠল আমার দিকে আসার জন্যে। ওদিকে শত্রুটি গুলী খেয়ে পড়ে গেলেও পরমুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তার হাতেও উঠে এসেছে রিভলবার। তার রিভলবার টার্গেট করেছে আমাকে। মেইলিগুলি শেষ মুহূর্তে টের পেল। তখন রিভলবারের ট্রিগারে আঙুল চাপছে শত্রু। মেইলিগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে আড়াল করে দাঁড়াল। যে গুলীটা আমার বুক বিদ্ধ করতো, তা এসে বিদ্ধ করলো মেইলিগুলিকে। গুলী খেয়ে মেইলিগুলি পড়ে গেল খাটের উপর আমার গায়ে ঠেস দেয়া অবস্থায়। কিন্তু পড়ে গিয়েও রিভলবার ছাড়েনি মেইলিগুলি। সে সর্বশক্তি দিয়ে ডান হাত তুলে গুলী করল শত্রুকে। তার রিভলবারের সবগুলো গুলীই সে শেষ করল শত্রুর উপর। তার পরেই শরীর এলিয়ে পড়ল আমার উপর। গোলাগুলীর শব্দ শুনে উদ্ধার করতে আসা আমাদের সাথীরা এসে গেল। তারা বাঁধন খুলে দিল আমার। আমি মেইলিগুরীকে হাসপাতালে নিতে চাইলাম। কিন্তু আমাদের জন্য হাসপাতালের খোঁজ কেউ দিতে পারল না। মেইলিগুলির মাথা ছিল আমার কোলে।
হাসপাতালে যাবার মত তার অবস্থাও ছিল না। সে কষ্ট করে বলল, ‘আব্বা-আম্মা নিহত হবার সময়ই আমি মরে যেতে পারতাম। সেখান থেকে পালাবার পর প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। তোমার সাথে সাক্ষাত পর্যন্ত আমি আল্লাহর কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলাম। তা আমি পেয়েছি। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। শুধু কয়েকটি কথা বলার আছে তোমাকে।’ সবটুকু শক্তি দিয়ে সে বলল শেষ কথা কয়টি। কথা কয়টি শেষ হবার সাথে সাথে সেও হারিয়ে গেল।’ থামল আহমদ মুসা।
কারও মুখে কোন কথা নেই। সবারই মাথা নিচু।
কারও চোখই শুকনা নেই।
এক সময় নিরবতা ভাঙল সুস্মিতা বালাজী। বলল, ‘স্যরি ছোট ভাই, এমন কাহিনী শোনার জন্যে আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। কতকটা মজা করেই শুনতে চাচ্ছিলাম আপনার বিয়ের কাহিনী। সত্যি ছোট ভাই, বিয়েটা যেমন ছিল অসম্ভব এক রূপ কথা, তেমনি এর অকাল সমাপ্তিটাও অবিস্মরণীয় এক বিষাদগাথা। এই স্মৃতির মধ্যে কেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন বুঝলাম।’ থামল সুস্মিতা বালাজী।
শাহ বানু মুখ তুলতেই পারেনি। বোবা এক বেদনায় সে নির্বাক হয়ে গেছে।
সুস্মিতা বালাজী থামতেই সাহারা বানু বলল, ‘বৌমা শেষ কথাটা কি বলেছিল বেটা?’
‘ধন্যবাদ খালাম্মা। আমারও মন চাচ্ছে শুনতে। কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে সাহস হচ্ছিল না।’ বলল সুস্মিতা বালাজী।
আহমদ মুসা গম্ভীর। তার মুখ বেদনায় নীল তখনও।
সুস্মিতা বালাজীর কথায় আহমদ মুসার মুখে লজ্জাবিজড়িত ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘তিনটি কথা বলেছিল মেইলিগুলি। এক. তার এবং তার পিতার বিশাল সম্পত্তি যেন আমি গ্রহণ করি এবং আমার ইচ্ছামত কাজে লাগাই। দ্বিতীয় বিষয়ে সে বলেছিল, ‘বছরে অন্তত একদিন তোমার সান্নিধ্য পাই, এমন এক জায়গায় তুমি আমার কবর দেবে। আর তৃতীয় বিষয় হলো, জেদ্দা ইসলামী ব্যাংকের একাউন্টে তার যে টাকা আছে, সে টাকা আমার ছেলে পাবে। তার মালার লকেটে ‘একাউন্ট কোড আছে।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই সাহারা বানু দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তখন তোমার ছেলে কোত্থেকে এল। এই সেদিন না তোমার ছেলে হল?’
‘ঠিক খালাম্মা।’
‘ও তাহলে তুমি বিয়ে করবে, বাচ্চা হবে এটা ভেবেছিল সে।’ বলল সাহারা বানু।
‘না খালাম্মা, ভাবেনি। আমাদের ছোট ভাই যাতে বিয়ে করে, ঘর-সংসার করে পরোক্ষভাবে সে এই অনুরোধ করে গেছে, এই চাপই দিয়ে গেছে সে। আমাদের ভাবী মেইলিগুলির জীবনের এ আর এক মহত্তর দিক। মুমূর্ষূ অবস্থায়ও কত সুদূরপ্রসারী, কত বাস্তববাদী চিন্তা সে করেছে। তার ত্যাগ ও শুভ চিন্তার জাযাহ আল্লাহ তাঁকে দিন।’ সুস্মিতা বালাজী বলল।
মুগ্ধতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠল শাহ বানুর মুখ। মনের ভেতরে তার নানা কথার আলোড়ন, সত্যিই আহমদ মুসার যোগ্য সাথী মেইলিগুলি। সে শুধু নিজের জীবন দিয়ে আহমদ মুসার জীবনই বাঁচিয়ে যায়নি, আহমদ মুসাকে নতুন জীবন শুরু করতে বাধ্য করে গেছেন। জোসেফাইনও কি এরকম? সে তো ফরাসি রাজকন্যা। ওঁরা যখন ভালো হন, তখন আকাশ স্পর্শী হয়ে ওঠেন। শাহ বানু তার এই ভালো চিন্তার মধ্যেও তার মুগ্ধ মনের কোথাও যেন স্বস্তি অথবা অস্বস্তির একটা অস্তিত্ব অনুভব করছে। সেটা আকাশের চাঁদ ছুতে চাওয়ার ব্যর্থতা, না চাঁদ ছুঁতে চাওয়ার গর্ব থেকে উদ্ভুত তার হিসেব শাহ বানু মেলাতে চাইল না। অতীত যেমন তেমনই থাক না। তার যা তা তো এখন সামনের দিকে। কিছুক্ষণ আগের দু’চোখের সেই অঢেল অশ্রু ছিল তার নতুন জীবন জন্ম নেয়ার বেদনা সঙ্গীত। মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল শাহ বানুর।
সুস্মিতা বালাজীর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সাহারা বানু ‘আমিন’ বলে উঠল।
তারপর মুহূর্ত কয়েকের নিরবতা।
নিরবতা ভেঙে সাহারা বানু বলে উঠল, ‘জোসেফাইন বৌমার কাহিনী নিশ্চয় এমন দুঃখের হবে না। আমরা সেটা শুনে মনটা ভালো করতে পারি বেটা।’
ম্লান হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ঠিক খালাম্মা ওখানে এ ধরনের কোন কাহিনী নেই। তবে এ বিয়েটাও ছিল আকস্মিক। তাতিয়ানার দেয়া একটা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার আত্মীয়া ও রুশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী জার রাজকন্যা ক্যাথারিনের স্বার্থে রাশিয়া যাওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। ওদিকে ডোনা জোসেফাইনের পিতাকেও কিডন্যাপ করে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সবমিলিয়ে রাশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ডোনা জোসেফাইন গোঁ ধরল, সেও রাশিয়ায় যাবে আমার সাথে। আমি বললাম, ইসলামী বিধান মতে সম্পর্ক নেই এমন একটা মেয়েকে একা আমার সাথী করে নিতে পারি না। শুনে অনেকক্ষণ মুখ নিচু করে থাকে। তারপর ধীর ও ভারী কণ্ঠে বলে, আমি আগেই আব্বার মত নিয়েছি, আমার ইসলাম গ্রহণ করায় তাঁর আপত্তি নেই এবং আমি আপনাকে বিয়ে করলে তিনি আনন্দিত হবেন। দুঃখিত আপনার মত সুস্পষ্টভাবে আমি জেনে নিইনি। আপনার সম্মতি ছাড়াই আমি এতটা এগিয়ে আছি। এখন আপনি চাইলে আমাদের বিয়ে……….।’ কথা শেষ করতে পারে না ডোনা জোসেফাইন। কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। এরপর একটা মসজিদে গিয়ে আমাদের বিয়ে হয়। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাক্সক্ষী হাজির ছিলেন অনুষ্ঠানে।’
মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
কথা শেষ করেই মোবাইল তুলে নিল হাতে।
আহমদ মুসা টেলিফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে বলল, ‘আমি বেগম হাজী আহমদ আলী আবদুল্লাহ বলছি। আপনি?’
আহমদ মুসা সালাম দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমি আহমদ মুসা। চাচাজানের খবর কি?’
‘সেই খবর এবং আরও কিছু খবর দেবার জন্যেই তো গতকাল থেকে তোমাকে পাবার চেষ্টা করছি বাছা। তোমাকে পাচ্ছিলামই না।’
‘সব খবর ভালো তো?’
‘ভালো নয় বেটা। গতকাল বিকেলে আকস্মিকভাবে তাকে জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাড়ি আসার পথে তিনি নিখোঁজ হয়ে গেছেন। গত রাতে টেলিফোনে পুলিশ এ কথা আমাকে জানায়। আজ পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ কান্নাচাপা কণ্ঠে।
‘পত্রিকার খবরে কি লিখেছে খালাম্মা?’
‘লিখেছে যে, ‘আন্দামানে এক সময়ের গোয়েন্দা প্রধান হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ ডিটেনশন থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে কিডন্যাপড হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রে এটা জানা গেছে। পুলিশ এটা কনফারম করেছে। তার বাড়িতে যোগাযোগ করে জানা গেছে তিনি বাড়িতে পৌছাননি গভীর রাত পর্যন্ত। কে বা কারা কিডন্যাপ করতে পারে এ ব্যাপারে পুলিশ এবং হাজী সাহেবের বাড়ির লোকেরা কিছুই বলতে পারছেন না।’ সংক্ষেপে নিউজটা এই। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজন খবর হল, আজ সকালে একজন টেলিফোনে আমাকে বলেছে, আহমদ মুসাকে আমাদের হাতে তুলে দিলে আপনার স্বামীকে ছাড়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আহমদ মুসাকে না পেলে হাজী সাহেবকে হত্যা করা হবে।’
‘আপনি কি বলেছেন?’
‘আহমদ মুসা কে? আমরা তাকে কোথায় পাব? উত্তরে লোকটি বলেছে, কোথায় পাবেন তা জানেন, বলে টেলিফোন রেখে দিয়েছে লোকটি।’
‘নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেছে। নির্দিষ্ট সময়টা কখন সেটা কি বলেছে?’
‘না বলেনি।’
‘ভাববেন না খালাম্মা। তারা আমাকে ঐ নির্দিষ্ট সময়টা জানানোর পর সে সময় পার হওয়ার আগে পর্যন্ত হাজী সাহেব নিরাপদ। এদিকে আমি দেখছি কি করা যায়।’
‘ধন্যবাদ বেটা। আরেকটা জরুরি খবর। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন্দামানে এসেছিলেন। গোপনে আমার সাথে দেখা করেছিলেন। তোমাকে খোঁজ করছেন তিনি। তিনি গভর্নর বালাজী বাজীরাও মাধবকেও তোমার কথা বলেছেন। তোমার টেলিফোন নাম্বার তখন আমার কাছে ছিল না বলে জানাতে পারিনি।’
‘তার কোন টেলিফোন নাম্বার দিয়ে গেছেন?’
‘একটা নেম কার্ড দিয়েছিলেন। দুঃখিত, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি বলেছিলেন, তুমি গভর্নর কিংবা গভর্নর অফিসে যোগাযোগ করলেই তারা যোগাযোগ করিয়ে দেবেন।’
মনে মনে হাসল আহমদ মুসা। সরিষায় যে ভূত, তাতো রাষ্ট্রদূত মহোদয় জানেন না। বলল আহমদ মুসা, ‘ঠিক আছে খালাম্মা। আমি জেনে নেব। দিল্লীর মার্কিন দূতাবাসের টেলিফোন নাম্বার যোগাড় করা কঠিন হবে না।’
‘ঠিক আছে বেটা। শাহ বানুরা কেমন আছে?’
‘ভালে আছে খালাম্মা। শাহ বানুরা আপাতত নিরাপদ। আপনাকে সাক্ষাতে সব কথা বলব। আমি আসব আপনার ওখানে।’
‘আলহামদুলিল্লা। আল্লাহ ভরসা। শোন বেটা, পারলে প্রতিদিন খবর নিও, তোমার খবর জানিও। আর তুমি এস। এখন রাখছি টেলিফোন।’
আহম মুসা সালাম দিয়ে মোবাইল রেখে দিল।
সবাই উদগ্রীবভাবে আহমদ মুসার কথা শুনছিল। সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘কে টেলিফোন করেছিল? কোন দুঃসংবাদ মনে হচ্ছে!’
‘হ্যাঁ আপা’, বলে আহমদ মুসা সব কথা তাদের জানিয়ে বলল, ‘হাজী সাহেবের পরিবার ও হাজী সাহেব সব রকম ঝুঁকি নিয়ে আমাকে ও শাহ বানুদের সাহায্য করেছে।’
মুহূর্তেই উদ্বেগ ও বেদনার একটা ঢেউ খেলে গেল গোটা ঘরে।
কারো মুখে কোন কথা নেই। নিরবতা বেশ কিছুক্ষণ।
আহমদ মুসা তখন তার মোবাইলের ফোন বুকে টেলিফোন নাম্বারগুলো চেক করছিল।
এবারও কথা বলল, সুস্মিতা বালাজীই। বলল, ‘তার মানে আবার আপনি ফিরে যাচ্ছেন পোর্ট ব্লেয়ারে। কণ্ঠে হতাশার সুর।’
‘হ্যাঁ আপা যেতে হবে।’
‘এতবড় ঘটনা ঘটিয়ে আপনি এলেন। দু’একদিনও স্থির হয়ে বসবেন না?’ বলল সুস্মিতা বালাজী।
‘পৃথিবী স্থির নয় আপা। আমি আপনারা স্থির হবো কি করে? আমাদের এ পৃথিবীটা গতির উপর টিকে আছে। সবকিছুই এখানে গতিময়। গতিহীনতা মানেই এখানে মৃত্যু। সুতরাং স্থিরতা নয় গতি চাই আপা।’
‘কথায় আমরা জিততে পারবো না। দেখি ভাবিকেই সব জানাতে হবে।’
বলে একটু থামল সুস্মিতা বালাজী। একটু আত্মস্থ হল। তারপর আবার বলা শুরু করল, ‘আমরা যে কথাটা বলতে এসেছিলাম, তা এখনও বলাই হয়নি।’
আবার একটু থামল সুস্মিতা বালাজী। বলতে শুরু করল আবার, ‘ছোট ভাই আমাদের সুষমা রাও একদম পাগল হয়ে উঠেছে। বার বার টেলিফোন করছে। বলছে, হয় আমাকে নিয়ে যান, না হয় আপনাকে আসতে হবে। তার এই জেদের কিভাবে মোকাবিলা করি বলুন।’
‘আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি। আপনারা অনেকদিন বাইরে যাননি। আমার মনে হয় আপনারা পোর্ট ব্লেয়ার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। সেখানে আপনারা বোনের বাড়িতে উঠবেন। হোটেলেও উঠতে পারেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমিও ভেবেছি। এটা হতে পারে, কিন্তু গ-গোলটা একটু না থামলে নয়।’ সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘আমারও বাইরে যাবার জন্যে মন আকুলি-বিকুলি করছে। বিশেষ করে শংকরাচার্য মরে যাবার পর আমাদের সামনে সে রকম কোন আশংকাই আর বর্তমান নেই। কিন্তু সুস্মিতা ঠিকই বলেছে, এখন বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আদিবাসীদের এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
আহমদ মুসাও ভাবছিল। বলল, ‘ঠিকই বলেছেন, আদিবাসীদের এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া শাহ বানুদেরকেও কোথাও মুভ করানো ঠিক হবে না।’
‘তাহলে?’
‘যেহেতু সুষমাকে আনাও অসম্ভব। তাই বুঝিয়েই সুষমাকে শান্ত করতে হবে। তারও এটা বুঝা দরকার যে, আহমদ শাহ আলমগীর ছাড়া না পাওয়া পর্যন্ত তার বাইরে মুভ না করাটা বেটার। আমরা যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছি তারা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। তারা এমনকি সুষমাকে বিপদে ফেলে তার দায় আহমদ শাহ আলমগীরের পক্ষের লোকদের উপর চাপাতে পারে।’
চোখ ছানা-বড়া হয়ে উঠল সুস্মিতা বালাজীর। বলল, ‘শুনতে এটা অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু সুষমাকে খেপিয়ে তুলে তাকে পক্ষে পাওয়া এবং মানুষের মধ্যে শাহ পরিবারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছাড়াবার জন্যে অবশেষে তারা এটা করতে পারে। ধন্যবাদ ছোট ভাই। আমি সুষমাকে সব ব্যাপার বুঝিয়ে বলব।’
‘ধন্যবাদ আপা।’
থামল একটু আহমদ মুসা। চারদিকে চেয়ে বলল, ‘তারিক কোথায়, তাকে তো দেখছি না?’
‘সে আর্মস ষ্টোরে। অস্ত্র অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছে। তার খোঁজ করছেন কেন? তাকেও সঙ্গে নেবেন নাকি?’ বলল সুস্মিতা বালাজী।
‘না পোর্ট ব্লেয়ারে এখন তার প্রয়োজন নেই। সে এখানেই থাক। তবে অস্ত্র জ্ঞানের দিকে মনোযোগ দিয়েছে এটাকে আমি ভালো মনে করছি না। অস্ত্র জ্ঞান নয়, আজ বেশি প্রয়োজন জ্ঞানের অস্ত্রকে শাণিত করা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি! উল্টোটাই যে সত্য তা প্রমাণ করছেন।’ বলল শাহ বানু।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তুমি তো মোগল রক্ত! সামরিক বিবেচনা তোমাদের মজ্জাগত। তুমি তারিককে সৈনিক বানাতে চাও। কিন্তু শাহ বানু! আজ মোগলরা থাকলে, আমি যা বলছি তারা তাই বলত। জেনে রেখ শাহ বানু, অস্ত্রশক্তি কিংবা সৈন্য শক্তির অভাবে মোগলদের পতন হয়নি। পতন হয়েছে রাষ্ট্রজ্ঞানের অভাবে, অস্ত্র ও সৈন্য শক্তি ব্যবহারের জন্যে যে জ্ঞান দরকার তার অভাবে। আজ আন্দামানে আমাদের যে সংকট তার সমাধান অস্ত্র নয়, বুদ্ধির মাধ্যমেই আনতে হবে।’
‘কিভাবে? অস্ত্রই তো এখানে মুখ্য দেখছি।’ শাহ বানু বলল।
‘কিভাবে আমি জানি না, কিন্তু এটা বিশ্বাস করি। অস্ত্রের যে উপস্থিতি তুমি দেখছ, সেটা সাময়িক অবস্থার একটা প্রয়োজন মাত্র।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মাফ করবেন, আমি উঠছি। কয়েকটা কাজ সারতে হবে।’
‘ছোট ভাই, আপনি যাত্রা করছেন কখন?’ জিজ্ঞাসা সুস্মিতা বালাজীর।
আহম মুসা যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আবার ফিরল। বলল সুস্মিতা বালাজী ও ড্যানিশ দেবানন্দকে উদ্দেশ্য করে, ‘আপা, ভাই সাহেব, অপরিচয়ের প্রাথমিক অবস্থা তো চলে গেছে। এখনো ছোট ভাইকে কি ‘আপনি’ বলতেই হবে?’
একটা গাম্ভীর্য নামল সুস্মিতা বালাজী ও ড্যানিশ দেবানন্দের মুখে। মুহূর্তের জন্যে দু’চোখ বন্ধ হয়েছিল সুস্মিতা বালাজীর। বোধ হয় সেটা নিজের ভেতরটাকে দেখার জন্যেই। বলল, ‘ধন্যবাদ, না আর বলব না ছোট ভাই। সত্যিই আহমদ মুসা এখন আমাদের ছোট ভাই হয়ে গেছে। তোমাকে ওয়েলকাম।’
‘তোমাকে আমার পক্ষ থেকেও ওয়েলকাম।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ধন্যবাদ আপা, ভাই সাহেব।’ বলেই আহমদ মুসা আবার ঘুরে দাঁড়াল ঘর থেকে বের হবার জন্যে।

হাতের রক্তাক্ত চাবুকটা ঘরে ঢোকার পরেই একপাশে ছুড়ে দিয়ে লোকটি এসে টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
লোকটি দীর্ঘদেহী। দেখেই মনে হয় পেশী দিয়ে পেঁচানো লোকটির দেহে তিলমাত্র মেদ নেই।
লোকটি ঘর্মাক্ত।
মুখভরা তার বিরক্তি ও হতাশা।
টেবিলের ওপাশে ফুলসাইজ রিভলভিং চেয়ারে বসে আরেকজন লোক। লম্বা গেরুয়া দাড়ি ও মোচ এবং লম্বা গেরুয়া চুলে তার মুখ ও মাথা ঢেকে আছে। পরনেও তার গেরুয়া বসন।
পাশেই দাঁড় করানো বিশাল ত্রিশুল।
দেহ তার বিশাল না হলেও গড় সাইজের চেয়ে দর্শনীয়ভাবে বড়।
চোখ দু’টি তার লাল। তার দাড়ির রং এবং তার গেরুয়া বসনের সাথে খুবই সংগতিশীল।
ইনিই মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র। ইনি শিবাজী সন্তান সেনা ও শিবাজীবাদী আরও পাঁচটি সংগঠন নিয়ে গঠিত ‘মহাসংঘ’-এর আন্দামান এলাকার শীর্ষ সংঘপতি।’
বিশেষ সময় সন্ধিক্ষণ ছাড়া তিনি লোকচক্ষুর সামনে আসেন না। কিন্তু লোকরা সবাই তার চোখের সামনে থাকে সবসময়, মহাসংঘের সকলেই এটা ভালোভাবে জানে।
আজকের বিশেষ সময় সন্ধিক্ষণে তিনি উদয় হয়েছেন রাস দ্বীপে শিবাজী সন্তান সেনা (সেসশি) এর হেড অফিসে।
মহামুনি সংঘমিত্র তার মেরুদ- তীরের মত খাড়া রেখে সোজা হয়ে বসে দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
ঘরে ঢোকা লোকটির চেহারার দিকে চোখ পড়তেই মহামুনি সংঘমিত্রের লাল চোখ দু’টি জ্বলে উঠল। কণ্ঠেও ধ্বনিত হল বজ্র নির্ঘোষ শব্দ, ‘কথা আদায় করতে পারনি?’
‘প্রভু, মানুষকে যত রকমের নির্যাতন করা যায়, তার কোনটাই বাকি রাখা হয়নি। সে বার বার সংজ্ঞা হারাচ্ছে, কথাটি আদায় করা যাচ্ছে না। অবিরাম তার একটাই কথা, ‘বাক্স আমার কাছে নেই। এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। প্রভু ব্যাপারটা কি এমন হতে পারে যে, ‘বিষয়টি শুধু তার মায়েরই জানা আছে।’ বলল লোকটি।
লোকটির নাম কৃষ্ণ দাস তিলক। গুজরাটের ব্রাহ্মণ। ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের একজন ডাক সাইটে অফিসার ছিল। সে অত্যন্ত সাহসের সাথে ও গর্বের সাথে প্রকাশ্য ও অব্যাহতভাবে সাম্প্রদায়িক ভূমিকা পালন করতো। সর্বশেষ বোম্বাই-এর এক মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাকালে কৃষ্ণদাসকে তার নিজের রিভলবার দিয়ে একটি ঘরে লুকানো কয়েকজন মুসলিম বালককে গুলী করে মারার ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর হিন্দুস্তান সরকার কৃষ্ণদাসকে বরখাস্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু আইনের ফাঁক গলিয়ে যথারীতি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে সে বেরিয়ে আসে। তবে চারদিকের সমালোচনার মুখে সে আর চাকরিতে যোগ দেয় না। যোগদান করে সে ‘মহাসংঘ’ এর শিবাজী সন্তান সেনা দলে। যাকে হিন্দুস্তানের পুলিশের খাতায় ‘ব্ল্যাক আর্মি’ বলে ডাকা হয়। কৃষ্ণদাস তিলক সম্প্রতি আন্দামানে এসেছে এখানকার ‘ব্ল্যাক আর্মি’র দায়িত্ব নিয়ে।
কৃষ্ণ দাস তিলকের কথা শেষ হলে মহামুনি সংঘমিত্র চেয়ারে হেলান দিল। তার চোখে-মুখে এখন ক্রোধের চেয়ে বিরক্তির চিহ্নই বেশি। বলল, ‘কৃষ্ণ দাস তুমিও পুঁচকে ছেলে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে পরাজিত হলে। বাক্সের সন্ধান তার কাছে নেই, এ কথা ঠিক নয়। মোগলসহ প্রত্যেক রাজবংশই তাদের বংশীয় কোন দায়িত্ব হস্তান্তর করে উত্তরাধিকারীর হাতে, অন্য কারও কাছে নয়। সুতরাং বাক্সটা আহমদ শাহ আলমগীরের কাছেই পাওয়া যাবে।’
‘প্রভু, হাতিও এমন নির্যাতন সহ্য করতে পারবে না, কিন্তু তবু তো মুখ খুলছে না সে।’
‘যারা মৃত্যুকে জয় করে। তারা যে কোন কষ্টকে জয় করতে পারে। এজন্যেই আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনকে প্রয়োজন ছিল। এদের কাবু করতে হলে মানিসক আঘাত প্রয়োজন। তার সামনে যদি তার মা-বোনের গায়ে হাত পড়ত, তাহলে সে বাপ বাপ করে এসে পায়ে পড়ত।’
‘প্রভু, তার মা-বোন সম্পর্কে নতুন কোন খবর পাওয়া গেছে?’
‘এখনও নয়। তবে বিভেন বার্গম্যান ওরফে আহমদ মুসা পোর্ট ব্লেয়ারে আসছে। মনে করি আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনরা পোর্ট ব্লেয়ারেই রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করতেই হবে।’
‘বিভেন বার্গম্যান কি আহমদ মুসা? কি করে জানা গেল?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল কৃষ্ণদাস।
‘হাজী আবদুল্লাহ আলীর বাসা ও হোটেলের টেলিফোন মনিটর করে। সে মনিটর থেকেই প্রথম জানতে পারি বিভেন বার্গম্যান আসলে আহমদ মুসা। পরে হাজী আবদুল্লাহকে কিডন্যাপকারী মোসাদ গোয়েন্দারাও জানায় এ কথা। এ খবর জানার পর আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, কেন তার সাথে আমরা পেরে উঠছি না। ইসরাইলী ও পশ্চিমী গোয়েন্দারা যার কাছে অব্যাহতভাবে নাকানি চোবানী খাচ্ছে, তাকে আমরা এঁটে উঠব কি করে!’ বলল মহামুনি সংঘমিত্র।
তখন কৃষ্ণদাসের চোখের ছানাবড়া ভাব কাটেনি। বলল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, ‘প্রভু, দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমরা তার সাথে লড়াইয়ে নামব না। আমরা তাকে পেলেই খুন করব। আর আমাদের টার্গেট বাক্স। বাক্স পেলেই হয়ে গেল। আর আমি নির্দেশ দিয়েছি, নিপাত প্রোগ্রাম বন্ধ রাখতে। এখন প্রথম কাজ আহমদ মুসাকে খুন করা, দ্বিতীয় বাক্স উদ্ধার করা। এদিকে সমস্যা দেখা দিয়েছে বিভেন বার্গম্যান ওরফে আহমদ মুসাকে নিয়েই।’
‘কি সমস্যা প্রভু।’ কৃষ্ণদাসের চোখে বিস্ময়।
‘হাজী আবদুল্লাহ আলীর বাসার টেলিফোন মনিটর থেকে জানতে পেরেছি, মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন্দামানে বেড়াতে এসে বিভেন বার্গম্যানের খোঁজ করেছিরেন। তিনি একথা হাজী আবদুল্লাহ আলীর স্ত্রী সাথেও বলেছেন। আমাকেও তিনি বলেছেন বার্গম্যানের কথা। আবার নয়াদিল্লীতে ফিরেও টেলিফোন করে আন্দামান সরকারকে বিভেন বার্গম্যানের নিরাপত্তার প্রতি নজর রাখতে বলেন। সুতরাং খুব কৌশলে তাকে ড্রিল করতে হবে, যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।’
‘তাহলে সিআইএ’র লোক নয় তো সে?’ বলল কৃষ্ণদাস।
‘না তা নয়। সিআইএ’র লোক হলে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এর নাম্বার ওয়ান গোয়েন্দা ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেনকে সে মারতো না।’
‘তা ঠিক। তাহলে?’
‘সে কে আমাদের জানার দরকার নেই। তাকে কৌশলে সরাতে হবে যাতে কোনওভাবে সরকার কিংবা ‘মহাসংঘ’ -এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না থাকে।’
‘ধন্যবাদ প্রভু, ঠিক বলেছেন।’
বলে একটু থেমেই আবার মুখ খুলল, ‘এখন আমরা কি করব। শয়তানটি তো মুখ খুলছে না।’
‘বললাম তো, তার মা-বোনকে খুঁজে বের করতে হবে। এটা সম্ভব না হলে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। দেখতে হবে আন্দামানে তার আর কোন প্রিয়জন আছে কিনা।’
‘এমন কেউ কি তার আছে আন্দামানে?’
হঠাৎ করেই মহামুনি শিবদাস সংঘ মিত্রের মুখটা মলিন হয়ে উঠল। বলল, ‘এ প্রসঙ্গ এখন থাক। আমি এখন উঠব। তুমি যাও। হাজী আবদুল্লাহ আলীর বাসার উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে যেন শৈথিল্য না আসে। বিভেন বার্গম্যান পোর্ট ব্লেয়ারে থাকলে অবশ্যই হাজী আবদুল্লাহর স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করবেই, বাড়িতে কিংবা অন্য কোথাও। ওদের টেলিফোনও মনিটর করা হচ্ছে।’
বলে উঠে দাঁড়াল মহামুনি সংঘমিত্র।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল কৃষ্ণদাস তিলকও।

পোর্ট ব্লেয়র জুড়ে নিñিদ্র নজরদারী চলছে, নগরে যারা প্রবেশ করছে এবং যারা বের হচ্ছে তাদের প্রত্যেককেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া নগরীর প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দাদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। নগরীর উপকূল, সবগুলোর সব এন্ট্রি পয়েন্ট, বিমান বন্দরকে সার্বক্ষণিক নজরদারীর আওতায় আনা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা প্রশাসনিক নির্দেশে করা হয়েছে। জনগণের অবগতির জন্যে বলা হয়েছে, এটা রুটিন সতর্কতা ও চেকআপের মহড়া। জনগণের উদ্বেগের কোন কারণ নেই। তারা সব সময়ের স্বাভাবিক চলাফেরা, কাজ-কর্ম করে যাবেন।
নজরদারী ও চেকআপের কাজে পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাজ পরা রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবক। আসলে এরা স্বেচ্ছাসেবক নয়, এরা সকলে ‘মহাসংঘ’ ও শিবাজী সন্তান সেনা (সেসশি) এর সদস্য। নজরদারী ও চেকআপে এরাই আসল, পুলিশ সাইনবোর্ড মাত্র।
মহাসংঘ ও ‘সেসশি’ আহমদ মুসা আন্দামানে এসেছে এটা জেনে ফেরার পর মহাআলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে পর্দার অন্তরালে। মূল ভূখ-ের মুম্বাই ও উত্তর প্রদেশে যথাক্রমে ‘সেসশি’ ও মহাসংঘ-এর হেডকোয়ার্টার এক পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে আন্দামানে আহমদ মুসার আসার কথা শুনে। ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙা, আসামের নেলী, বোম্বাই; গুজরাটে সংখ্যালঘু নিধনের মত সংখ্যালঘু নির্মূলের রাজনীতি যারা করে, তারা ক্রোধে ফেটে পড়েছে। সেই সাথে মজলুম উদ্ধারে, অন্যায়ের প্রতিকারে আহমদ মুসার অনন্য রেকর্ডের কথা তারা জানে বলে তারা আতংকও বোধ করছে। মনে করছে, আইসবার্গের নিচে জাতিগত হিংসা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার যে ডুবো পাহাড় তারা লুকিয়ে রেখেছে, সেটাকে আহমদ মুসা দিনের আলোতে এনে ফেলতে পারে। এই ভয়, আতংক, ক্রোধ থেকে এবং মহাগুরু শংকরাচার্য ও স্বামী স্বরূপানন্দের মত লোকদের মহাজ্বালা সামনে রেখে তারা আন্দামানের গোপন সাম্প্রদায়িক আন্দোলনের নেতা মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রের উদ্দেশ্যে নির্দেশ জারি করেছে, আহমদ মুসা আর একদিনও যাতে জীবিত থাকতে না পারে। আন্দামানে এটাই তাদের এখন একমাত্র কাজ।
পোর্ট ব্লেয়ার ছাড়াও উত্তরে ‘নর্থ প্যাসেজ আইল্যান্ড’ থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের দক্ষিণে ডান কান প্যাসেজ পর্যন্ত মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামানের দুই উপকূলকেও সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারার মধ্যে রাখা হয়েছে।

ভাইপার দ্বীপের সামরিক অবজারভেটরি।
একটা নাইট ভিশন দূরবিনে চোখ রেখে বসেছিল জয়রাম রাঠোর। তার দুরবিনের চোখ ঘুরছে নর্থ প্যাসেজ দ্বীপের দক্ষিণে ‘কী’ আইল্যান্ড ও রিসেজ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী গোটা উপকূল রেখায়।
জয়রাম রাঠোর ‘মহাসংঘ’-এর একজন অপারেশন প্রধান। গভর্নরের বিশেষ নির্দেশে বিশেষ জুরী অবস্থায় সামরিক অবজারভেটরিতে সামরিক লোকদের সাথে সেও কাজ করছে। সামরিক লোকরা ধরে নিয়েছে জয়রাম রাঠোর কেন্দ্রীয় বিভাগের কেউ হবেন।
তার সহযোগী হিসেবে তার পাশেই বসেছিল এখানকার সেনা ইউনিটের একজন ক্যাপ্টেন। সে এক সময় জয়রাম রাঠোরকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার, আমরা যান সন্ধান করছি, সে অনুপ্রবেশকারী লোকটি কে?’
‘একজন ইন্টারন্যাশনাল টেররিষ্ট।’ বলল জয়রাম রাঠোর।
‘নাম জানা গেছে?’
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না জয়রাম রাঠোর। দ্বিধাগ্রস্ত ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। অবশেষে নাম সে বলল না। বলল, ‘টেররিষ্টদের নামের ঠিক নেই। যেখানে যেমন ইচ্ছা তেমন নাম নেয়। যেই হোক, সে একজন মুসলিম টেররিষ্ট।’
‘একটা কথা স্যার, মুসলমানরা হঠাৎ এমন টেররিষ্ট হয়ে উঠল কেন?’
‘তার মানে মুসলমানরা আগে টেররিষ্ট ছিল না বলতে চাও?’
‘আমি বলতে চাই না স্যার। ইতিহাস বলে। সে কথাই আমি বলছি।’
‘ইতিহাস কি বলে, শুনি।’
‘স্যার গত বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পর দু’টি আন্দোলনকে আমরা খুব বেগবান হতে দেখি। একটা হল কম্যুনিজমের বিস্তার, অন্যটি মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের পর মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে, তেমনি কম্যুনিজমের বিস্তারও এ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশ স্বাধীন হয়ে পড়ে। এই দুই সমান্তরাল আন্দোলনের মধ্যে কম্যুনিজমের রাজ্য গঠন ও রাজ্য বিস্তার ছিল হিংসা, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র নির্ভর। আর মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল জনগণের শক্তি, সুবিচার ও যুক্তিনির্ভর। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানরা সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কিন্তু এরপরও তারা কম্যুনিষ্টদের মত ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়নি। ভারতের কথাই ধরুন স্যার। এখানে মুসলমানদের আযাদী আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এতটাই নিয়মতান্ত্রিক ছিলেন যে, জীবনে একবারও তাঁকে জেলে যেতে হয়নি। তারপর দেখুন স্যার, বঙ্গভঙ্গ রহিত করার জন্য আমরা হিন্দুরা বিক্ষুব্ধ হয়ে আবেগের বশে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করেছি, বোমা মেরেছি, কিন্তু মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে এবং বঙ্গভঙ্গ রহিত করার বিপক্ষে কোন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করেনি, বোমাও হাতে তুলে নেয়নি।’
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
জয়রাম রাঠোরের মুখে-চোখে একটা বিরক্তি ভাব ফুটে উঠেছিল। ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল থামতেই জয়রাম রাঠোর বলল, ‘তুমি বোধ হয় ইতিহাসের ছাত্র ছিলে?’
‘জি স্যার।’
‘কোথায় তুমি লেখাপড়া করেছ, আলীগড়ে?’
‘না স্যার। অনার্স, মাষ্টার্স দু’টোই আমি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছি।’
‘ভালো করেছ। তবে তুমি সামরিক বাহিনীতে না এসে বিনোদাভাবে কিংবা রামমোহনের মত কোন সর্বোদয় নেতা হওয়া উচিত ছিল তোমার। থাক, তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর চাও?’
‘জি স্যার।’
‘তত্ব কথা শুনতে নাকি নগ্ন সত্যটা জানতে চাও?’
‘সত্য জানতে চাই স্যার।’
‘মুসলমানরা সীমাহীন সম্পদের মালিক এক বদ্ধ বোকার মত। ওদের কাছে এমন এক পরশ পাথর আছে যা গোটা দুনিয়াকে ওদের জন্যে সোনায় পরিণত করে দিতে পারে। কিন্তু এ কথাটা ঐ বোকারা জানে না। ওরা এটা জানা এবং ব্যবহার করার আগেই ওদের হাত-পা ভেঙে ওদের চলৎশক্তি রহিত করা প্রয়োজন। এই কাজই এখন চলছে।’ বলল জয়রাম রাঠোর।
‘বুঝলাম না স্যার। মুসলমানদের টেররিষ্ট হওয়া এবং তাদের হাত-পা ভেঙে চলৎশক্তিহীন করা- এ দুয়ের মধ্যে কি সম্পর্ক?’
‘কল্পনা করো ভোটের কোন এক প্রার্থীর কথা। ভীষণ জনপ্রিয়। মানুষ তাকে দারুণ ভালোবাসে। সে সকলের ভোট পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সময় যদি প্রমাণ হয়ে যায় যে, সে কোটি টাকা আত্মসাতকারী, কোটি টাকার কালোবাজারী। তখন তার অবস্থা কি দাঁড়ায়? হাত-পা ভাঙ্গা চলৎশক্তিহীন মানুষের মত হয়ে যায় না? প্রকৃত অর্থে মানুষের কাছে তার মৃত্যু ঘটে যায় কি না? মুসলমানরা টেররিষ্ট বলে চিহ্নিত হবার পর তাদের এই অবস্থাই হয়ে গেছে।’
‘কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল, মুসলমানরা হঠাৎ এভাবে টেররিষ্ট হল কি করে?’
‘কারণটা তো বলেছি। উদাহরণও দিয়েছি। এ থেকেই বুঝে নেয়া উচিত ছিল। আরও খোলাসা শুনতে চাও?’
‘জি স্যার।’
‘মুসলমানদের টেররিষ্ট বানানো হয়েছে। পুঁজি করা হয়েছে তাদের অসন্তোষকে। এ লক্ষ্যেই তাদের অসন্তোষকে বাড়ানো হয়েছে, কমানোর বা তাদের সমস্যা সমাধানের কোন চেষ্টা করা হয়নি। মুসলমানদের দু’টি সমস্যা ছিল খুব বড়। একটা ফিলিস্তিন, অন্যটা কাশ্মীর। জাতিসংঘের মাধ্যমে বহু আগেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু তা করতে দেয়া হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও রাশিয়া দুই পরাশক্তি দুই পক্ষ নিয়ে সমস্যা দুটিকে ঝুলিয়ে রাখে প্রায় ৪০ বছর। ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে ইসরাইল ও আরবদের মধ্যে এবং কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে তিনটি করে বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। জীবন ও সম্পদের সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। এই অবস্থায় জাতিসংঘের ব্যর্থতার পটভুমিতেই নব্বই দশকের আগে ও এর শুরু থেকে ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের বাসিন্দারা স্বাধীনতার জন্যে গেরিলা লড়াই শুরু করে। গোটা নব্বই এর দশক ধরে এ লড়াই চলে। পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার পতন ঘটার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমী শক্তির একক নেতৃত্বে এই সমস্যার সমাধান হলো না। এই অব্যাহত অবিচার, মুসলিম দেশসমূহে নিজেদের আদর্শ ও অধিকারের চেতনা অবলম্বন করে মুসলিম যুব শক্তির উত্থান, ইসলামের নামে ইরানে বিপ্লব এবং আফগানিস্তানে মুসলিম সমর শক্তির বিজয় শুধু মুসলিম বিশ্বে নয়, গোটা দুনিয়ায় মুসলমানদের মধ্যে নতুন জাগরণের জোয়ার সৃষ্টি করে। এই জাগরণের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্ররা এক নতুন শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করল। নতুন শক্তির এই উত্থানকে অংকুরেই শেষ করে দেবার জন্যে একটা বড় অজুহাত বা উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। ‘সন্ত্রাস’কে তারা এই উপলক্ষ হিসেবে বাছাই করল। আফগানিস্তানে গেরিলা যুদ্ধে বিজয়ী, কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে গেরিলাযুদ্ধরত এবং যুগ-যুগান্তের অবিচার পীড়িত মারমুখী হয়ে ওঠা মুসলমানদের উপর ‘সন্ত্রাসী’ হওয়ার দোষ চাপানো খুব সহজ ছিল। মুসলমানদের উপর সন্ত্রাসের দায় চাপানোর জন্যেই নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সন্ত্রাসী কর্মকা- অভিনীত হল। যেহেতু তাকফিরুল হিজরা, আল-জিহাদ ও হিজবুল্লাহর মত ক্ষুদ্র কয়েকটা গোষ্ঠী ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সব ইসলামী দলই গণতান্ত্রিক। তারা সন্ত্রাস-ষড়যন্ত্র পছন্দ করে না। তাই আল-কায়েদা নামে একটা ইসলামী দল ও লাদেন নামে একটা ইসলামী ব্যক্তিত্বকে খাড়া করা হয় এবং টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দায় এদের ঘাড়ে চাপানো হল। তাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে আফগানিস্তান ধ্বংস করা হল। শুরু হয়ে গেল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। মুসলমানদের বানানো হল এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ, অন্য কথায় সন্ত্রাসী।
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল জয়রাম রাঠোর।
‘ধন্যবাদ স্যার। বুঝতে পেরেছি সব। কিন্তু স্যার আমরা যার সন্ধান করছি, সে কি সত্যিই টেররিষ্ট, না বানিয়ে বলা হচ্ছে?’ বলল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না জয়রাম রাঠোর। তার মুখে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘তুমি সত্য জানতে চাও, না যা বলা উচিত তা জানতে চাও?’
‘সত্য জানতে চাই স্যার।’
‘সত্য জানতে চাইলে এখন উত্তর পাবে না। এখন আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি। যাকে আমরা বধ করব, তার সম্পর্কে ভালো চিন্তা বা ভালো কথার এখন সময় নয়।’
‘তাহলে অর্থ দাঁড়ায় স্যার, সে ভালো কেউ?’
জয়রাম রাঠোর চোখ পাকিয়ে ক্যাপ্টেন শশাংকের কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, সে সময় তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিয়ে স্ক্রীনের দিকে চেয়েই এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে সোজা হয়ে চেয়ারে বসল। বলল, ‘স্যার, স্যার……..।’
ওপারের কথা শুনল। শুনে শশব্যস্তে বলল, ‘স্যার, নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। আমাদের চোখ এড়িয়ে সে পোর্ট ব্লেয়ারে প্রবেশ করতে পারবে না। পশ্চিম উপকূলের স্পাইক আইল্যান্ড থেকে আমাদের লোক চোখ রেখেছে নর্থ প্যাসেজ সাউথ প্যাসেজসহ পশ্চিম উপকূলের দিকে। স্যার, পশ্চিম উপকূলে বাড়তি ব্যবস্থা হিসেবে আছে হারতাবাদের পশ্চিম উপকূলে আমাদের আরেকজন লোক। নেইল আইল্যান্ডে আমরা আরেকজনকে রেখেছি পূর্ব উপকূলে বাড়তি সতর্কতার জন্য। সাউথ আন্দামানের দু’পাশের গোটা উপকূলই আমাদের নজরে স্যার।’
থামল জয়রাম রাঠোর। ওপারের কথা শুনল। উত্তরে বলল, ‘না স্যার ভুল হবে না। তার চেহারা আমাদের মুখস্থ। চিনতে পারলেই গুলী, কোন কথা নয় স্যার।’
কথা শেষ করে ওপারের কথা শুনে ধন্যবাদ দিয়ে মোবাইল রেখে দিল জয়রাম রাঠোর।
‘কার টেলিফোন ছিল স্যার?’ উৎফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
‘কার আবার…।’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল জয়রাম রাঠোর। নিজেকে সামলে নিয়েই বলে উঠল, ‘উনি ছিলেন গভর্নর বিবি মাধব।’
বলেই দূরবিনের দিকে আবার মনোযোগ দিল। বলল ক্যাপ্টেন শশাংককে লক্ষ্য করে, ‘দেখ দুরবিনে ভালোভাবে চোখ রাখ।’
তার কথা শেষ হবার আগেই তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিয়ে তাকাল স্ক্রীনের দিকে। দেখল স্ক্রীনে বিপিন বাজওয়ার নাম ভেসে উঠেছে।
বিপিন বাজওয়া নেইল আইল্যান্ডের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নজর রাখছে উপকূলসহ পোর্ট ব্লেয়ারের সামনের আন্দামান সাগরের উপর।
জয়রাম খুশি হল মোবাইল স্ক্রীনে বাজওয়ার নাম দেখে। বলল, ‘কি খবর বাজওয়া?’
‘বড় ঘটনা ঘটে গেছে।’ বলল বাজওয়া। উত্তেজিত তার কণ্ঠস্বর।
‘কি ঘটনা?’
‘এক বিস্ফোরণে আহমদ মুসার বোট ধ্বংস হয়েছে। আহমদ মুসাও।’
‘কোথায়? কি ঘটনা?’
‘আমাদের নেইল আইল্যান্ড থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে। বলা যায় ৯৩ ডিগ্রী অক্ষাংশের উপর আমাদের বোট দ্বারা ঘেরাও অবস্থায় আহমদ মুসার বোটে বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
‘ঘটনাটা কি?’
‘আহমদ মুসার বোটটি যখন পশ্চিম উপকূলের স্পাইক আইল্যান্ডের উত্তর দিয়ে ‘নর্থ প্যাসেজে’ প্রবেশ করেছিল পূর্ব উপকূলে আসার জন্যে তখন স্পাইক আইল্যান্ডের আমাদের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তা দেখতে পায। বোটের আলো নিভানো ছিল, ইঞ্জিন ছিল সাইলেন্সার যুক্ত। বোটের চালক ছিল একমাত্র আরোহী। একটা কৌণিক অবস্থানের কারণে ‘নাইট ভিশন’ দুরবিনেও তাকে চেনা সম্ভব হয়নি। সন্দেহ হওয়ায় স্পাকি দ্বীপ থেকে একটা বোট তার পিছু নেয়। সন্দেহযুক্ত বোটটি ‘নর্থ প্যাসেজ’ পার হয়ে রিসেজ দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে বারেন দ্বীপকে বাঁয়ে রেখে দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করে। দক্ষিণগামী কোন বোট পাগলের মত এতটা পথ কখনও ঘোরে না। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। রিসেজ দ্বীপপুঞ্জের ‘আউট রাম’ দ্বীপের পর্যবেক্ষণ নৌকেন্দ্র থেকে আরও দুটি বোট তার পিছু নেয়। পোর্ট ব্লেয়ার বরাবর এসে রহস্যজনক বোটটি তার গতি পরিবর্তন করে সোজা পশ্চিম দিকে চলতে শুরু করে। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। নিশ্চিত বোঝা যায় বোটটির লক্ষ্য পোর্ট ব্লেয়ার। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা ওরা আমাদেরও জানায়। আমরা ‘নেইল আইল্যান্ড’ থেকে আরও তিনটি বোট নিয়ে সামনে থেকে এগোলাম। আমাদের তিনটি এবং পেছন থেকে তিনটি মোট ৬টি বোট রহস্যজনক বোটটিকে ঘেরাও করে ফেললাম। তখনও বোটের চালক লোকটিকে সরাসরি দেখা যায়নি। আমাদের লক্ষ্য ছিল রহস্যজনক বোটটিকে আটকানো। আমরা বোটের আলো নিভিয়ে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের নাইট ভিশন দূরবিনেই সে প্রথম ধরা পড়ল। আমরা চিনতে পারলাম সে আহমদ মুসা। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বোট থেকে সব বোটকে এলার্ট করা হল। ঘিরে ফেলা হল বোটটিকে। সেও আমাদের দেখে ফেলেছে। তার বোটের স্পীড সাংঘাতিক বেড়ে গেল। তীর বেগে সে এগোল পোর্ট ব্লেয়ারের দিকে। একদম বেপরোয়া। মনে হল সামনে অন্য বোট পড়ে গেলে তার উপর দিয়েই সে সামনে এগোবে। উপায় না দেখে তাকে থামাবার জন্য চারদিক থেকে মেশিনগানের গোলা বর্ষণ শুরু করলাম। আমাদের ব্যারিকেড ভাঙতে পারলেও শেষ রক্ষা করতে সে পারল না। সম্ভবত ফুয়েল ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে টুকরো টুকরো হয়ে গেল বোটটি। তার সাথে সাথে ছাই হয়ে গেছে আহমদ মুসাও।’
বিপিন বাজওয়ার দীর্ঘ বিবৃতি শেষ হল।
আনন্দ-বিস্ময়ে জয়রাম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর বলল চিৎকার করে, ‘ধন্যবাদ বাজওয়া তোমাদের সকলকে। আমাদের মহামুনি মানে স্যার কি জেনেছেন?’
‘এইমাত্র তো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর সবগুলো ফোন ব্যস্ত পেয়ে আপনাকেই প্রথম টেলিফোন করলাম।’
‘ঠিক আছে, আমি জানিয়ে দিচ্ছি। তোমরা এখন কোথায়?’
‘আমরা এখন বিস্ফোরণ ক্ষেত্রেই। আপনাদের হুকুমের অপেক্ষা করছি।’
‘ঠিক আছে। আমি তাহলে মহামুনি স্যারের সাথে কথা বলে নেই। তারপর জানাচ্ছি।’
কথা শেষ করেই ‘বাই’ বলে দ্রুত লাইনটা কেটে দিল।
জয়রাম রাঠোর দ্রুত টেলিফোন করল মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র ওরফে গভর্নর বিবি মাধবকে।
গভর্নর বিবি মাধব টেলিফোন ধরেই বলল, ‘তোমাদের ধন্যবাদ জয়রাম। খবর আমরা পেয়েছি। খবর শুধু এটা নয় জয়রাম, এটা মহাখবর। পৃথিবীর অধিশ্বররা যা পারেনি, তোমরা তাই করে দেখালে। সুতরাং আমরাই পৃথিবীর অধিশ্বর হব, এটা প্রমাণ হল।’
‘অবশ্যই মহামুনি গুরুদেব। আমাদের ‘মহাসংঘ’ অবশ্যই দুনিয়াতে মহাকীর্তি রেখে যাবে।’
‘আগে বিশ্বের কথা নয় জয়রাম। নর-দেবতা শিবাজী মহাপ্রভুর আমৃত্যু সংগ্রামের যে স্বপ্ন, যা মহাকবি রবীন্দ্রনাথ তার ‘এক ধর্মরাজ্য পাশে খ- ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি’ কবিতাংশে অপরূপভাবে প্রকাশ করেছেন, তার আশু বাস্তবায়ন আমাদের কাজ।
‘তথাস্তু মহামুনি মহাগুরু। আমার জন্যে আর কিছু নির্দেশ?’
‘কাল সকালে পুলিশ যাওয়া পর্যন্ত ওদের সেখানে অপেক্ষা করতে বল। কিছু আলামত পেলে তা ওরা সংগ্রহ করতে পারবে।’
‘তথাস্তু মহামুনি মহাগুরু!’
ওপার থেকে লাইন কেটে দেয়া হয়েছে।
জয়রাম রাঠোর মোবাইল রেখে দিল।
ক্যাপ্টেন শশাংক বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল জয়রাম রাঠোরের দিকে।
জয়রাম টেলিফোন রাখতেই ক্যাপ্টেন শশাংক বলল, ‘কার সাথে কথা বললেন স্যার? আমরা যার সন্ধান করছি, বোটসহ তার ধ্বংস হওয়ার খবর দেয়ার কথা বলে টেলিফোন করলেন। কিন্তু খবর তো দিলেন না।’
হাসল জয়রাম রাঠোর। বলল, ‘উনি আগেই খবর পেয়েছেন। তার খবর পাওয়ার লাইন বহু।’
‘কে তিনি স্যার? ‘মহাসংঘ’, ‘মহাকীর্তি’, ‘মহামুনি’, ‘মহাগুরু’ এসব কথার কিছুই বুঝলাম না স্যার।
‘এসব শব্দ থেকেই বুঝেছ, যার সাথে আমি কথা বলেছি, তিনি একজন অসাধারণ ব্যক্তি। সাধারণ্যে তার কথা বলা যায় না।’
‘স্যার দেশ আমাদের গণতন্ত্রের। এখানে আইনের দৃষ্টিতে সাধারণ-অসাধারণ নেই, এখানে অস্বচ্ছতার কোন দেয়াল নেই।’
‘কেতাবের কথা রাখ। কেতাবের কথা দিয়ে শাসন চলে, দেশ চলে, কিন্তু জাতি বাঁচে না।’
‘দেশ ও জাতিকে আপনি আলাদা করে দেখছেন?’
‘দেশের নাম, সীমার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু জাতির জীবন পথ অপরিবর্তনশীল। সুতরাং একটু পার্থক্য তো হতেই পারে।’
‘একটি গনতান্ত্রিক দেশে ‘জাতীয় জীবন পথ’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’, যদি মেজরিটির স্বার্থ হয়, তাহলে সেটাও গণতন্ত্রের অধীন। গণতন্ত্রের অধীন হলে সেটা আইনানুগ হবে এবং তাতে স্বচ্ছতা থাকবে। সুতরাং ‘জাতীয় জীবন পথ’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ তো আলাদা হচ্ছে না।’
‘আলাদা হলেই তা আইনানুগ হবে না, তাতে স্বচ্ছতা থাকবে না সেটা নয়। কিন্তু জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্তবর্তীকালীন একটা সময়ে প্রতিষ্ঠিত আইন ভাঙতে হয়, স্বচ্ছতাও রাখা যায় না। যেমন স্বাধীনতা সংগ্রাম। জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজও জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম চলছে। সে সংগ্রামে নেই বলে তুমি অনেক কিছু বুঝতে পারছো না।’
‘কিন্তু দেশ তো আমাদের স্বাধীন। আইন ও সংবিধানের বাইরে তো কোন সংগ্রাম চলতে পারে না। এ সংগ্রাম আসলে কি চায় স্যার।’ ক্যাপ্টেন শশাংকের চোখে সন্দেহ ও গভীর অনুসন্ধিৎসা।
‘ঐ তো বললাম শিবাজী যে জন্যে সংগ্রাম করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে কথা কবিতায় প্রকাশ করেছেন খ- ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে এক সাথে বেঁধে ‘এক ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা’।
‘কিন্তু এই ধরনের সংগ্রাম তো ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা চেতনা ও সংবিধান দু’য়েরই বিরোধী। তাছাড়া আমাদের হিন্দু ধর্ম তো কিছু পুরা কাহিনীর সমষ্টি মাত্র। এ দিয়ে আজ কোন ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। হলে সেটা হবে ধর্মের নামে স্বৈরতন্ত্র, ঠিক যেমন ছিল মধ্যযুগে ইউরোপের যাজক-রাষ্ট্র-তন্ত্র।’
চরম বিরক্তিভাব ফুটে উঠেছিল জয়রাম রাঠোরের চোখে-মুখে। বলল, ‘এই কিছুক্ষণ আগে তুমি মুসলিম রাষ্ট্রের কথা বলেছ, তাহলে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হবে না কেন?’
‘আমি মুসলিম রাষ্ট্রের কথা বলিনি। মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছি। তবে যদি ধরে নেই মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম মুসলিম রাষ্ট্রের জন্যে, যেমন ভারত ভাগ হয়েছে পৃথক ‘মুসলিম রাষ্ট্রের’ দাবীতে। তবু এখানে কথা আছে, মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে তাদের রাষ্ট্রনীতি আছে যা সাংঘাতিকভাবে আধুনিক। সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্র হতে পারে। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ নেই। মাফ করবেন রাজা দশরথ (রামচন্দ্রের পিতা) ও রামচন্দ্র যে রাজ্য পরিচালনা করেছেন তা নিজস্ব ধর্মচিন্তার ভিত্তিতে, ধর্মগ্রন্থের সুনির্দিষ্ট বিধানবলীর ভিত্তিতে নয়। সুতরাং মানব রচিত নয় এমন ‘সোর্স অব ল’ আমাদের নেই, যা মুসলমানদের আছে বলে তারা দাবী করে।’
‘তোমার এসব তত্ত্ব কথা রাখ ক্যাপ্টেন। তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবতা বড়। বাস্তবতা বহুদূর এগিয়ে গেছে। তোমার চোখ নেই তাই দেখতে পাচ্ছ না। ডুবো পাহাড় দেখেছ? নিশ্চয় দেখার কথা। ‘মহাসংঘ’ আজ ডুবো পাহাড়ের রুপ নিয়েছে। কিছুই দেখছো না তুমি। কিন্তু দেশ নামক সমুদ্রের সবটা জুড়ে রয়েছে ডুবো পাহাড়।’
‘কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। যা বলছেন তা কি ঠিক?’
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু স্যার আমার মনে হচ্ছে আমাদের পুরা কাহিনীর মতই এ এক কল্প কথা।’
‘অল্প বুদ্ধি ভয়ংকর ক্যাপ্টেন। জেনারেল হও তারপর বুঝবে আমি যা বলছি তার অর্থ।’ বলল জয়রাম রাঠোর অনেকটা বিদ্রুপের কণ্ঠে।
কথা শেষ করেই মুহূর্তকাল থেমে আবার বলা শুরু করল, ‘থাক এসব কথা। এস এখনকার করণীয় বিষয়ে আলাপ করি।’
‘করণীয় আর কি স্যার। মিশন আমাদের সফল। এখন ব্যারাক এবাউট টার্ন।’
‘না। কাল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছা পর্যন্ত যার যে জায়গা সেখানে থাকতে হবে।’
‘তথাস্তু স্যার।’
‘শব্দটি শেখার জন্যে ধন্যবাদ।’

গভর্নর হাউজের খাস বৈঠকখানা।
গভর্নর বিবি মাধব একটা সোফায় বসে। তার সামনে আরেক সোফায় আরও দু’জন লোক বসে।
কথা বলছিল বিবি মাধব, ‘হ্যাঁ, আমাদের সামনে থেকে প্রধান বাধা, প্রধান শত্রু আহমদ মুসা শেষ হয়েছে। কিন্তু আমাদের আসল কাজ একটুকুও এগোয়নি। আহমদ শাহ আলমগীর মুখ খোলেনি। সে মুখ না খুললে বাক্স পাওয়া যাবে না। বাক্স না পাওয়া গেলে আমাদের জন্য শিবাজী মহাপ্রভুর রেখে যাওয়া মহাভারত গঠনের নীলনকশা আমরা পাব না এবং মোগলদের গোপন ধনভা-ারও আমরা হাত করতে পারবো না। দুটোই আমরা চাই, একটা জাতির জীবন হিসেবে, আরেকটা জাতির সমৃদ্ধির জন্যে।’ থামল বিবি মাধব।
তার সামনের সোফায় বসে থাকা দুজনের একজনের চেহারা ভারতীয়, অন্যজন বিদেশী, সেমেটিক চেহারা।
বিবি মাধব থামতেই ভারতীয় চেহারার লোকটি বলে উঠল, ‘এটা খুবই আশ্চর্যের যে, এতদিনে সবকিছু করেও একজন লোকের কাছ থেকে কথা আদায় করা গেল না। অবিশ্বাস্য ঘটনা।’
‘অবিশ্বাসের কিছু নয় জেনারেল স্বামীজী। যে মৃত্যু চায়, কোন নির্যাতন, কোন ভয় তাকে বাধ্য করতে পারে না।’
জেনারেল স্বামীজীর পুরোনাম জেনারেল জগজিৎ জয়রাম। দু’বছর আগে তিনি ভারতীয় সেনা প্রধানের দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন। অবসর নেয়ার পরেই তিনি ‘শিবাজী সন্তান সেনার সদস্য হয়েছেন। আজ তিনি ‘মহাসংঘ’ এর একজন মহাগুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার নাম আজ জেনারেল স্বামী জগজিৎ জয়রাম মহাগুরু। মহাগুরু স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনি গ্রীনভ্যালি অপারেশনে নিহত হলে তার দায়িত্ব নিতে মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন। তিনি আন্দামানে ‘মহাসংঘ’ এর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন।
বিবি মাধব থামলে জেনারেল স্বামীজি বলে উঠল, ‘তাহলে উপায় কি?’
‘উপায় তার মানসিক প্রতিরোধ ভেঙ্গে দেয়া। এ ধরনের আদর্শবাদীদের দৈহিক কষ্ট দিয়ে তাদের মানসিক প্রতিরোধ ভাঙ্গা যায় না। আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনের ইজ্জত আহমদ শাহ আলমগীরের মত লোকদের কাছে নিজ জীবনের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি মূল্যবান।’ জেনারেল স্বামীজির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল বিদেশী চেহারার লোকটি।
বিদেশী চেহারার লোকটির নাম দানিয়েল ডেভিড। ইসরাইলী গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে। ইসরাইলের সেরা চৌকষ গোয়েন্দা কোলম্যান কোহেন আহমদ মুসার হাতে নিহত হবার পর তার স্থানে কাজকরতে এসেছে দানিয়েল ডেভিড।
দানিয়েল ডেভিড থামতেই বিবি মাধব বলল, ‘ওদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আহমদ মুসা ওদের উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল উত্তর আন্দামানের গ্রীনভ্যালিতে। আহমদ মুসা সেখান থেকে চলে আসার পর এবং বিস্ফোরণে বোটসহ আহমদ মুসা ধ্বংস হবার পর কয়েকবার আমরা গ্রীনভ্যালিতে গোপনে খবর নিয়েছি সেখানে আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনরা নেই। আহমদ মুসাই তাদেরকে সরায় অথবা পরে তারা সরে যায়। তাদেরকে চারদিকে খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোথায় এ সম্পর্কে কোন ক্লু আমরা এখনও পাইনি।’
থামল বিবি মাধব।
‘তাহলে উপায় কি? তাদের খোঁজ পাওয়ার উপরই নির্ভর করছে আমাদের লক্ষ অর্জন।’ বলল জেনারেল স্বামীজি।
সোফায় হেলান দিয়ে ছিল বিবি মাধব।
জেনারেল স্বামীজি থামলেও বিবি মাধব সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না। তার চোখে-মুখে গভীর চিন্তার ছাপ।
দানিয়েল ডেভিডের মুখেও কোন কথা ছিল না।
এক সময় বিবি মাধব সোজা হয়ে সোফায় বসল। বলল, ‘হ্যাঁ, আর কোন উপায় না দেখে আমি একটা উপায় বের করেছি। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার মত।’
‘সেটা কি?’ উদগ্রীব জেনারেল স্বামিজী জিজ্ঞাসা করল।
‘সেটা বলার জন্যে আমি আজ আপনাদের ডেকেছি।’
এটুকু বলে মুহূর্তের জন্যে থামল বিবি মাধব। পরক্ষণেই শুরু করল আবার, ‘আজ সকালে আমার মেয়ে আমার স্ত্রীর সাথে মন্দির থেকে আসার পথে কিডন্যাপ হয়েছে। কিডন্যাপ হয়েছে মানে আমি কিডন্যাপ করিয়েছি।’ থামল বিবি মাধব।
জেনারেল স্বামিজী ও দানিয়েল ডেভিড দু’জনেরই মুখ হা হয়ে গেছে বিস্ময়ে। তাদের মুখে কোন কথা নেই। তাদের বিস্ফোরিত চোখ গভর্নর বিবি মাধবের উপর নিবদ্ধ।
শুরু করল বিবি মাধব আবার, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের শেষ, নিরাপদ ও অব্যর্থ ব্যবস্থা হিসেবে আমরা এটা করেছি।’
গলাটা পরিষ্কার করার জন্যে একটু থেমেছিল। সেই সুযোগে দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল, ‘আপনার মেয়ের কিডন্যাপ হওয়ার সাথে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের কি সম্পর্ক রয়েছে! আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘আছে। আপনারা একটা বিষয় জানেন যে, আমার মেয়ে ও আহমদ শাহ আলমগীর এক সাথে পড়তো। আহমদ শাহ আলমগীর ভালোবাসে আমার মেয়ে সুষমাকে। আমরা সুষমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চাই, আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের জন্যে।’
‘কিভাবে?’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘আহমদ শাহ আলমগীরের সামনে একটা নাটক করা হবে। তার কাছ থেকে যা জানতে চাওয়া হচ্ছে তা না বললে তার প্রেমিকা ধর্ষিতা হচ্ছে, এই হবে সে নাটক। আমার বিশ্বাস আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনকে ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া যেত, এক্ষেত্রেও সে ফল পাওয়া যাবে।’ বিবি মাধব বলল।
‘কিন্তু আপনার মেয়ে এবং আহমদ শাহ আলমগীর দুজনেই এটা ধরে ফেলতে পারবে। তাদের এত দিনে জেনে ফেলা স্বাভাবিক যে, আপনি বা আপনার সরকার আহমদ শাহ আলমগীরের আটক করার পেছনে রয়েছে।’ বলল জেনারেল স্বামিজী।
‘আহমদ শাহ আলমগীর এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। আমার মেয়েও নয়। সে কোনওভাবে সন্দেহ করলেও কিডন্যাপ হওয়ার পর নিশ্চিত হবে যে, তার পিতা কিংবা পিতার সরকার আহমদ শাহের কিডন্যাপের সাথে নেই।’
‘কিন্তু কিডন্যাপ, মানে কিডন্যাপ নাটকের যে কোন পর্যায়ে তার কাছে প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে যে, তার পিতা বা পিতার সরকার তাকে একটা রক্তাক্ত নাটকের উপকরণে পরিণত করেছে। তখন সব পরিকল্পনা প- হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া আপনার মেয়ে সব কথা প্রকাশ করে সমস্যা বাড়াতে পারে, আমি ভয় করছি।’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘সেটা আমি চিন্তা করেছি মি. ডেভিড। চারজন চৌকশ মহিলা গোয়েন্দা সুষমাকে পাহারা দিয়ে রাখবে। অধিকাংশ সময় তাকে রাখবে ঘুম পাড়িয়ে। প্রয়োজনীয় কয়েকটা কথার বাইরে কেউ একটা কথাও তার সাথে বলবে না। মহাসংঘের সুরক্ষিত অফিসগুলোতেই তাকে রাখা হবে। সুতরাং আপনি যে আশঙ্কা করছেন তার কোনই সম্ভাবনা নেই।’ বিবি মাধব বলল।
‘কিন্তু মহামুনি স্যার, আহমদ শাহ আলমগীর যদি মুখ না খোলে। মুখ খোলার জন্যে ধর্ষনের নাটকও শুরু করতে হতে পারে। তারপরও যদি মুখ না খোলে। নাটককে যদি শেষ পর্যায় পর্যন্ত নিতে হয়?’ বলল জেনারেল স্বামীজি।
হঠাৎ মলিন হয়ে উঠল বিবি মাধবের মুখ। কিন্তু মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল। শক্ত হয়ে উঠল তার মুখ। তার মুখের পেশীগুলো যেন শক্ত পাথরের রূপ নিল। বলল, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে বাঞ্জিত তথ্য আদায়ের জন্যে যে কোন পর্যায় পর্যন্ত আমি যাব। মেয়েকেও আমি কুরবানী দেব।’
একটু থামল বিবি মাধব। তার মুখটি সহজ হয়ে এল। বলল, ‘তবে আমি মনে করি, সে পর্যন্ত যেতে হবে না। তার আগেই কথা তার কাছ থেকে পাওয়া যাবে।’
‘ধন্যবাদ ‘মহামুনি স্যার’ আপনাকে। আপনার এই ত্যাগের মনোভাব জাতির জন্যে একটা মহান দৃষ্টান্ত এবং আমাদের জন্য একটি অফুরন্ত প্রেরণা। কিন্তু স্যার, আহমদ শাহ আলমগীর যদি বিষয়টা আসলেই না জানে, তাহলে বলবে কি করে? সে ক্ষেত্রে আমাদের তো দু’কুলই যাবে।’ বলল জেনারেল স্বামীজী।
‘এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। আহমদ শাহ আলমগীরের বাপ বেঁচে নেই। সুতরাং তাকে এটা জানতেই হবে। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে তার কাছে তথ্যটা থাকবেই। সেসব কথা বললেই আমরা সেটা বুঝতে পারব।’
‘ধন্যবাদ। ঠিক বলেছেন, মহামুনি স্যার।’ জেনারেল স্বামীজী বলল।
‘বাই দি বাই। দি গ্রেট শিবাজীর সেই দলিলে কি আছে, আপনারা সেটা কি জানেন?’ বলল দানিয়েল ডেভিড।
‘মহাপ্রভু শিবাজী দলিলটি প্রনয়ের পর দ্বিতীয় যে ব্যক্তি এটা দেখেছেন, তিনি তার পুত্র শম্ভুজী। শিবাজী মহাপ্রভু ও শম্ভুজীর ডাইরি থেকে দলিল সম্পর্কে কিছু জানা গেছে। শিবাজী মহাপ্রভু তার ডাইরীর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাইশ বছর বয়সকালে ১৫৭১ সালের বৈশাখ শুক্লা নবমী বৃহস্পতিবার মহারাষ্ট্রের এক পাহাড়ে স্বর্গীয় পুরুষ গুরু রামদাস স্বামীর কাছে পরমার্থতত্ত্ব সম্পর্কে দীক্ষা লাভের পর দিব্যজ্ঞান লাভ হল। তাতে দেখলাম, আমি যে রাজ্য ফেলে পাহাড়ে এসেছিলাম, সে রাজ্য আসমুদ্র হিমাচল এবং সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াব্যাপী বিস্তৃত হয়ে মায়ের পবিত্র রূপ নিয়ে শুধু আমাকে নয় আমার পেছনে দাঁড়ানো আর্য সন্তানদের ডাকছে। সে দিব্যজ্ঞানের নির্দেশেই সেই পাহাড়ে বসে মা-রূপী সে সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনের জন্যে একটা দলিল রচনা করলাম। তারপর রাজ্যে ফিরে এসে রাজপাটে বসে ‘মহাভারত’ এর সংগ্রাম শুরু করলাম।’ তাঁর ডাইরীর সর্বশেষ বাক্য হিসেবে লিখেছেন, ‘মহাপবিত্র’ দলিলটির মহাগুরুভার আমি পুত্র শম্ভুজীকে অর্পণ করে গেলাম।’ আর শম্ভুজী তার ডাইরীর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাপুজীর মহাপবিত্র দলিলটি আমি সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখেও রক্ষা করতে পারলাম না। মোগল স¤্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেব আমার মত দলিলটিকেও বন্দী করে দিল্লী নিয়ে যাচ্ছে।’ দলিলটি সম্বন্ধে শম্ভুজীর ডাইরীতে আর কিছু পাওয়া যায়নি। আর শিবাজী মহাপ্রভু দলিলের বিষয় সম্পর্কে যেটুকু বলেছেন, তার চেয়ে বেশি জানা যায়নি।’ থামল বিবি মাধব।
আবেগে ভারী হয়ে উঠেছিল তার কণ্ঠ।
গম্ভীর হয়ে উঠেছিল দানিয়েল ডেভিডের মুখও বলল, ‘বুঝলাম, দলিলটা আমাদের ‘টেন কমান্ডমেন্ট’ এর মতই আপনাদের কাছে মূল্যবান। অবশ্য আমাদের ‘টেন কমান্ডমেন্টটা ডিভাইন।’
একটু থামল দানিয়েল ডেভিড। একটা ঢোক গিলে সঙ্গে সঙ্গেই সে আবার বলে উঠল, ‘একটা সা¤্রাজ্যের সীমা সেন্ট শিবাজী এঁকেছেন তার ডাইরীর ঐ বক্তব্যে। তাঁর দলিলেও নিশ্চয় এটা আরও তিনি সুনির্দিষ্ট করেছেন। ষোড়শ শতকের এই চিন্তাকে আপনারা এখন বাস্তব মনে করেন?’
‘শুধু বাস্তব নয়, আমরা একে ‘ধ্রুব’ মনে করি। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এর জন্যেই কাজ করছি। আমাদের মহাসংঘের এই একটাই লক্ষ্য। এর জন্যে যা করা দরকার, তা আমরা করব। আমার জীবন তুল্য সন্তান আমার মেয়েকে এই লক্ষ্যেই বলি দিতে রাজি হয়েছি।’ বলল বিবি মাধব। আবেগে প্রায় রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল তার কণ্ঠ।
‘স্যার, আপনাদের উদ্দেশ্যের প্রতি আমার আন্তরিক সম্মান। কিন্তু এতবড় উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন আপনাদের সংবিধান ও সরকার ব্যবস্থার সহায়তা ছাড়া কিভাবে হতে পারে, আমি বুঝতে পারছি না। আপনাদের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ এবং আপনাদের সরকারকে সে সংবিধানকেই মান্য করতে হবে। আপনারা তাহলে কিভাবে শিবাজীর মানে আর্য সন্তানদের ‘মহাভারত’ গঠন করবেন?’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘সংবিধান, সরকার সবই জনতার জন্যে এবং জনতার দ্বারা। সুতরাং জনতা সবকিছু পরিবর্তন করে যা চায়।’ বলল বিবি মাধব।
‘কিন্তু আপনাদের সমর্থিত দল তো জনতার সমর্থনে ক্ষমতায় গিয়েছিল, তারা তো কোন পরিবর্তনই আনতে পারেনি।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যেতে হবে। সে সুযোগ আমাদের এখনও হয়নি। তাছাড়া প্রস্তুত হওয়ার কাজ আমাদের শেষ হয়নি।’ বলল বিবি মাধব।
‘কি প্রস্তুতি?’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘মহাসংঘের কাজ এখনও সব জায়গায় পৌছেনি। শিবাজী মহাপ্রভুর ‘দলিল’ এখনও আমাদের হাতে আসেনি। ওটাই তো আমাদের মূল পাথেয় এবং ওটা আমাদের বাস্তবায়নের বিষয়ও।’ বলল বিবি মাধব।
‘তাহলে তো দেখা যাচ্ছে আপনারা যা চান, যা করবেন, তা এখনও নির্দিষ্ট নয় আপনাদের কাছে।’ দানিয়েল ডেভিড বলল।
‘এ কথা ঠিক নয়। রামচন্দ্রের মহাভারত আমাদের সামনে আছে। আমরা যা করব, আমরা তা জানি। শিবাজী মহাপ্রভুর নির্দেশনা সেটাকে আরও সুনির্দিষ্ট ও পূর্নাঙ্গ করবে মাত্র।’ বলল বিবি মাধব।
‘বুঝেছি। ধন্যবাদ।’
‘ওয়েল কাম মি. দানিয়েল ডেভিড।’
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল বিবি মাধব। বলল, ‘আপনারা বসুন। আরও কিছু কথা আছে। আমি ছোট্ট একটা কাজ সেরে আসছি।’
ড্রইংরুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে বিবি মাধব তার রেসিডেন্ট অফিসের দিকে ছুটল।

জ্ঞান ফিরে আসার সাথে সাথে সুষমা রাও চোখ খুলেই এক ঝটকায় উঠে বসল। দেখতে পেল একটু দূরে ঘরের ঠিক মাঝখানে চারজন মুখোশধারী মহিলা মেঝেতে বসে চাদর পেতে তাস খেলছে। তাদের প্রত্যেকের পাশে একটি করে রিভলবার।
মনে পড়ল সুষমা রাওয়ের, সে মন্দির থেকে মায়ের সাথে তাদের বাড়ির দিকে আসছিল। মন্দিরটা তাদের বাড়ির পাশেই এবং তা তাদের গভর্নর হাউজের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই। বাড়ি ও মন্দিরের মাঝামাঝি জায়গায় তারা আসতেই একটা মাইক্রো তীর বেগে এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়। মাইক্রো থেকে মুখোশধারী কয়েকজন নেমে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন তার মুখে একটি রুমাল চেপে ধরে, অন্যেরা তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নেয় মাইক্রোতে। রুমাল থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
আতংকের এক প্রবল চাপ নামে তার মনের উপর। শাহ বানুরা যেভাবে কিডন্যাপ হয়েছিল, তাহলে সেও ঐভাবে কিডন্যাপ হয়েছে। শরীল ও মন তার থর থর করে কেঁপে ওঠে। চারজন মুখোশধারী মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘কে আপনারা? আমাকে কেন ধরে এনেছেন?’
তারপর হাত-পায়ের বাঁধনের দিকে চেয়ে কান্না জড়িতকণ্ঠে বলল, ‘আমি কি অপরাধ করেছি?’
চারজন মুখোশধারীর কেউ কোন কথা বলল না। ফিরেও তাকাল না তার দিকে।
‘কেন কি করেছি আমি, ছেড়ে দাও আমাকে?’ কান্নার সাথে বলল সে।
এবার মুখোশধারীদের একজন পাশে রাখা রিভলবার তুলে নিয়ে তার দিকে ঘুরল। হাত উঠাল উপরে। তর্জনি তার রিভলবারের ট্রিগারে। চাপল সে ট্রিগার। একটা গুলী বেরিয়ে সুষমা রাওয়ের চুল ছুঁয়ে গিয়ে বিদ্ধ করল পেছনের দেয়ালকে।
বুক ফাটা আতংকে সুষমা রাওয়ের চোখ দু’টি বিস্ফোরিত হয়েছিল। মাথার উপর দিয়ে গুলী চলে গেলেও বেঁচে যাওয়ার কোন স্বস্তি তার চোখে মুখে ফুটে উঠল না। বুঝল সে, এরা পাখির মত মানুষও মারতে পারে। এবার গুলী তার চুল ছুঁয়ে গেছে পরের গুলী হয়তো মাথা ভেদ করে যাবে। কারা এই নিষ্ঠুররা? যারা শাহ বানুদের কিডন্যাপ করেছিল, যারা আহমদ শাহ আলমগীরকে কিডন্যাপ করেছে, যারা ডজন ডজন মানুষকে আন্দামানে খুন করেছে, তারাই কি এরা? কিন্তু তারা আমার জন্যে মেয়ে প্রহরী দিয়েছে কেন? মেয়ের জন্যে মেয়ে প্রহরী এমন নীতিবোধ তো তাদের থাকার কথা নয়? আসলে এরা কারা?
এই সময় ঘরের একটা মাত্র দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করল বিশাল বপু একজন মহিলা। তার পেছনে সৈনিকের পোশাকধারী একজন পুরুষ। দুজনেরই মুখে মুখোশ। মহিলার হাতে রিভলবার, আর সৈনিকের হাতে ষ্টেনগান।
সুষমা বুঝল সৈনিক লোকটি পদস্থ মহিলাটির গার্ড।
‘কি ঘটনা, গুলী কেন?’ ঘরে ঢুকেই বলল মহিলাটি।
ভেতরের চারজন মহিলা বিশাল বপু মহিলাটি ঘরে ঢুকতেই তাকে দু’হাত তুলে নমষ্কার করেছিল। তার প্রশ্নের উত্তরে একজন বলল, ‘মহা মাতাজী, মেয়েটি কান্না জুড়ে দিয়েছিল। থামিয়ে দেবার জন্যে ওই ব্যবস্থা করেছি আমরা।’
‘গুড।’ বলল বিশাল বপু মহিলাটিই।
‘ধন্যবাদ, মহামাতাজী।’ সেই মেয়েটিই বলল।
‘তবে দেখ, এখনই গুলীটা যেন মাথায় ঢুকে না যায়। তার ডার্লিং এর কাছ থেকে যদি কথা আদায় করে দিতে পারে, তাহলে দুজনেরই মুক্তি। আর কথা আদায় করে দিতে না পারলে তাকে মরার আগেই মরতে হবে। তারপর এক সময় আসল মরণ।’ বলল বিশাল বপু মহিলাটি।
বিশাল বপু মেয়েটির কথা শুনে কৌতুহল ও আশা জাগল সুষমা রাওয়ের মনে। বলল, ‘আমার ডার্লিং, কে সে ম্যাডাম?’ বিশাল বপু মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলল সুষমা রাও।
‘কেন আহমদ শাহ আলমগীর? সে তোমার প্রেমিক নয়?’
সুষমা রাও মহিলাটির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, ‘তার কাছ থেকে কি কথা আদায় করতে হবে?’
‘একটি বাক্সের কথা। বাক্সটি তার বাসায় কোথাও লুকানো আছে। আমরা বাক্সটি চাই।’ বলল বিশাল বপু লোকটি।
‘বাক্সের জন্যেই কি তাকে ধরেছেন?’ সুষমা রাও বলল।
‘হ্যাঁ, তাই।’
‘ওঁদের বাড়িতে তো এখন কেউ নেই। বাক্সটি আপনারা খুঁজে নিতে পারেন।’
‘আমরা আগেই খুঁজেছি। না পেয়েই তো তাকে ধরা হয়েছে।’
‘বাক্সের কথা উনি তোমাদের বলছেন না?’
‘বলছে না। সে মানুষ নয়, একটা পাথর। এত আঘাতে পাথরও ভেঙে যেত, কিন্তু তাকে মুখ খোলানো যায়নি।’
মুহূর্তেই মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল সুষমা রাওয়ের। বেদনার এক প্লাবন নামল তার চোখে-মুখে। ছল ছলিয়ে উঠল তার দুচোখ। এক অসহনীয় যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল বুক থেকে সর্বত্র।
একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বাক্সটি কি এমন গুরুত্বপূর্ণ যে এজন্যে তাকে কিডন্যাপ করেছেন, নির্যাতন করছেন?’
‘ওর মধ্যে আমাদের প্রাণ আছে। ও বাক্সটা আমাদের।’
‘বাক্সটা আপনাদের হলে উনি দেবেন না কেন?’
‘সেটাই তো আমাদের কথা। দেবে না কেন?’ সে মরতে রাজি, কিন্তু বাক্সের ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি নয়।’
মুখ মলিন হয়ে গেল সুষমা রাওয়ের। মরতে রাজি, কিন্তু বাক্স দিতে রাজি নয়। তাহলে কি বাক্সটি তাদের জন্যেও মূল্যবান? বাক্সটি কি………।’
সুষমা রাওয়ের ভাবনায় ছেদ পড়ল মহিলাটির কথায়। সে বলছে, ‘বাক্সটি তুমি আমাদের আদায় করে দাও। এজন্যে আমরা তোমাকে এনেছি।’
‘যদি এমনই হয় যে, তিনি মরতে রাজি বাক্স দিতে রাজি নয়, তাহলে আমার কথায় তা তিনি অবশ্যই দেবেন না।’
‘সে তোমাকে ভালোবাসে।’
‘যদি তাই হয়, তিনি যা চান না, আমি সেটার জন্যে চাপ দেব কেন? আর অন্যায় কথা তিনি শুনবেন কেন? আর ভালোবাসলেই যে সব কথা শুনতে হবে, মানতে হবে, তা স্বাভাবিক নয়।’
‘হ্যাঁ, ওটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা অস্বাভাবিকটা চাচ্ছি। তুমি অবশ্যই তাকে বলবে, তাকে শুনতেও হবে এবং সে শুনবেই।’
বিস্ময় নামল সুষমা রাওয়ের চোখে-মুখে। বলল, ‘শুনবেই, এ কথা কেমন করে বলছেন ম্যাডাম?’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না মহিলাটি। সে হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু সেটা যেন হাসি নয়, একটা বিকৃত চিৎকার। তার চোখে-মুখে লালসার বন্যা।
তার চিৎকার ও চেহারা দেখে আঁৎকে উঠল সুষমা রাও।
বিশাল বপু মহিলাটি একটু সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘সে চোখের সামনে তার সুন্দরী প্রেমিকা ধর্ষিতা হচ্ছে এটা দেখতে চাইবে না। সুতরাং কোন অসুর পুরুষ তোমার দেহের কাপড় টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে নেকড়ে যেমন শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেভাবে তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তখন তার মুখ থেকে বাক্সের কথা সুড় সুড় করে বেরিয়ে আসবে।’
মহিলাটির কথা শেষ না হতেই থর থর করে কেঁপে উঠেছে সুষমা রাওয়ের দেহ। সে বুঝতে পারল ওরা কি ষড়যন্ত্র করেছে! ভয় ও আতংকে কুঁকড়ে গেল সুষমা রাওয়ের দেহ।
আবার হেসে উঠল মহিলাটি। কুৎসিত হাসি। বলল, ‘এখনই কুঁকড়ে অর্ধেক হয়ে গেছ! তখন কেমন হবে অবস্থা! আর তোমার সে অবস্থা দেখে কি অবস্থা হবে তোমার প্রেমিকের!’
কোন কথা বলল না সুষমা রাও। চোখ বন্ধ করেছে সে। তার মনে হচ্ছে সে এক গহীন জঙ্গলে। চারদিক থেকে তাকে ছিঁড়ে খাবার জন্যে নেকড়েরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মনে পড়ল তার আহমদ মুসার কথা। তিনি কি জানতে পারবেন তার কিডন্যাপ হওয়ার কথা! আর…….।
সুষমা রাওয়ের ভাবনা ছিড়ে গেল আবার বিশাল বপু মহিলাটির অট্টহাসিতে।
হাসতে হাসতে বিজয়ীর ভঙ্গিতে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সুষমার দেহটা লুটিয়ে পড়ল খাটিয়ার উপর।

উপকূলের শক্ত পাথরটাতে মাথা রেখে অবসন্ন দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে মরার মত পড়ে থাকল আহমদ মুসা।
শরীরে তার একফোটা শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু মাথা তার সক্রিয়।
উপকূলের স্পর্শ পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা।
তার বোট ঘেরাও হয়ে পড়েছে, শেষ মুহূর্তে টের পায় আহমদ মুসা। শেষ রাতের নিরব সমুদ্র দিয়ে নিশ্চিন্তে বোট চালিয়ে আসছিল সে। তার চোখে নাইট ভিশন গগলস ছিল, কিন্তু তা ছিল খুবই স্বল্প পাল্লার। টের পেয়েই ওদের ঘেরাও থেকে বের হবার জন্যে আহমদ মুসা বোটের সবটুকু স্পীড ব্যবহার করেছিল। বোটটি লাফিয়ে উঠে তীরের মত চলতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনি চারদিক থেকে গুলী এসে তাকে ঘিরে ধরে। পরিণতি বুঝতে পারে আহমদ মুসা। ‘টিউব মেরিন আর্মার’ সে পরেই ছিল।
‘টিউব মেরিন আর্মার’ সর্বাধুনিক একটি আবিষ্কার। এটা ওয়াটার প্রুফ, এয়ার প্রুফ একটা টিউব। এর সাথে একটা ইঞ্জিন যুক্ত আছে এবং আছে একটা মিনি অক্সিজেন ট্যাংক। ইঞ্জিন চালু করলে টর্পেডো টিউবের মতই টিউবটি প্রচ- গতিশীল হয়ে যায়। মিনি ট্যাংকের অক্সিজেনে একজনের পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। অতএব এই টিউবে আশ্রয় নিয়ে একজন মানুষ সাগরের তলদেশ দিয়ে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে।
গুলী বৃষ্টির মধ্যে মাথা নিচু করে দুপা এগিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়ে পানিতে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। একটা গুলী এসে তার বাহুকে বিদ্ধ করে। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে গোটা শরীর আহমদ মুসার। এরপরও সে এদিকে তার মনোযোগ দেবার সময় পায় না। দ্রুত ভার্টিকাল ডাউন বোতাম টিপে পানির গভীরে নেমে যায়।
এ সময় আহমদ মুসা খেয়াল করে বুলেটের আঘাতে তৈরি ফুটো দিয়ে চিকন ধারায় হলেও তীর বেগে পানি প্রবেশ করছে টিউবে।
আঁৎকে ওঠে আহমদ মুসা। পানি যতই প্রবেশ করবে, অক্সিজেনের ক্ষেত্র ততই সংকুচিত হয়ে পড়বে। এক সময় পানি ভর্তি হয়ে যাবে টিউব, তার সাথে সাথেই টিউবটা অক্সিজেন শূন্য হয়ে পড়বে। তার মানে তখন আর পানির তলায় থাকতে পারবে না টিউবটা।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি প্যারালাল ফরোয়ার্ড বোতাম টিপে কম্পাসের নির্দেম মত সোজা পশ্চিমে সেট করে টিউব সাব-মেরিনের মাথা। তীর বেগে ছুটতে শুরু করে টিউবটি। অক্সিজেন শেষ হবার আগেই আহমদ মুসাকে অবরোধ জোন ও গুলীর রেঞ্জ থেকে দূরে সরে যেতে হবে।
টিউবটি পানিতে প্রায় পূর্ণ। আহমদ মুসা বোতাম টিপে টিউবের মাথা ৪০ ডিগ্রী আপওয়ার্ড ঘুরিয়ে নেয়, তারপর কয়েক মুহূর্ত। আহমদ মুসা উঠে আসে পানির সারফেসে।
টিউব থেকে বেরিয়ে আসে আহমদ মুসা। বাম হাতটা নড়াতে গিয়ে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে আহমদ মুসা।
গুলীটা বাহুর পেশি ছিঁড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, না পেশির মধ্যে ঢুকে আছে তা বোঝার উপায় নেই। সাগরের লোনা পানির জন্যেই বোধ হয় যন্ত্রণাটা অনেক বেশি।
টিউব থেকে বেরিয়েই আহমদ মুসা পেছনের ঘটনাস্থলের দিকে তাকিয়েছিল। দেখল সবগুলো বোটে আলো জ্বলে উঠেছে। আলোগুলো ছুটোছুটি করছে এবং আলোর ফ্লাশ চষে ফিরছে ঐ এলাকার সাগরের বুক। তাকেই খুঁজছে বুঝল আহমদ মুসা।
দৃষ্টি ফেরায় আহমদ মুসা সামনের দিকে।
পশ্চিম দিগন্তে ক্ষীণ আলোর একটা রেখা দেখা যায়। কতদূরে হবে উপকূল? বিশ থেকে তিরিশ মাইলের মত দূরে হবে, ভাবে আহমদ মুসা।
লাইফ-জ্যাকেটে ভেসেছিল আহমদ মুসা। সাঁতরাতে শুরু করে বাঁ হাত তুলতে গিয়ে আবারও অন্তর্ভেদী খোঁচা খায় সে। যন্ত্রণায় ঝিমঝিম করে উঠল তার গোটা শরীর।
বাঁ হাত ব্যবহার করা গেল না।
চিৎ হয়ে দুপা ও ডান হাত দিয়ে সাঁতরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে আহমদ মুসা।
গুলীর ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তখনও।
শরীরটাকে টেনে নিয়ে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ছিল। ফাঁপা জ্যাকেট বাধার সৃষ্টি করছিল বেশি।
দু’পায়ে পানি ঠেলে এবং অবশিষ্ট এক হাত দিয়ে পানি টেনে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোয় আহমদ মুসা উপকূলের দিকে।
অব্যাহতভাবে এই চলা।
থামার কোন অবকাশ নেই। যে কোন মূল্যে রাতের অন্ধকার শেষ হবার আগেই তাকে উপকূলে পৌছাতে হবে।
দুর্বল হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। তবু সর্বশক্তি দিয়ে দু’পা ও এক হাতকে আরও সক্রিয় করতে হয় তাকে।
দুঃসাধ্য এই প্রচেষ্টা।
যখন উপকূলে পৌছে, তখন দূর্বলতা ও ক্লান্তিতে সংজ্ঞা হারাবার মত অবস্থা আহমদ মুসার। লাইফ-জ্যাকেট না থাকলে অনেক আগেই ডুবে যেত সে। দেহকে ভাসিয়ে রাখার শক্তি তার ছিল না।
পাথরে মাথা রেখে অনেকক্ষণ অসাড় হয়ে পড়ে থাকার পর শক্তি যেন কিছুটা ফিরে পেল আহমদ মুসা। মাথার চিন্তাও ফিরে আসে পেছন থেকে বর্তমানে। ভাবনা এল মাথায়, অন্ধকার আরও ফিকে হবার আগেই তাকে সরে পড়তে হবে। পুব আকাশ সাদা হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে সুবহে সাদেকের স্বচ্ছতা নেমে আসছে।
আহমদ মুসা আস্তে আস্তে উঠে বসল। চারদিকে তাকাল।
দেখল, এখানকার উপকূলটা পাথর বাঁধানো। কিছুটা উপর থেকে সাজানো বাগানের মত। আর আহমদ মুসা বসে আছে একটা পাথুরে সিঁড়ির ধাপে। মাথা রাখার যে স্থানটাকে সে পাথর ভেবেছিল, সেটা পাথর বটে, কিন্তু সিঁড়ির একটা ধাপ।
সিঁড়ি বরাবর উপরে তাকাল আহমদ মুসা। সিঁড়ির শেষটা সে দেখতে পেল না। সিঁড়িটা খাড়া উঠে গিয়ে কিছুটা বেঁকে গেছে। সিঁড়ির শেষটা দেখা না গেলেও একটা মন্দিরের বিশাল চুড়া দেখতে পেল আহমদ মুসা। বুঝল, এটা একটা মন্দির এলাকা। সিঁড়িটা মন্দিরে উঠে গেছে। আহমদ মুসা চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারলো না এটা পোর্ট ব্লেয়ারের কোন এলাকা। উত্তর অংশ অবশ্যই নয়, দক্ষিণ দিকের কোন স্থানে এটা হতে পারে। আবার ভাবল, সে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের বিপরীত দিকে ‘ব্লেয়ার চ্যানেল’ এর উত্তর দিকের কোন জায়গায় এসে উঠেনিতো? ব্লেয়ার চ্যানেলের দক্ষিণ তীরে পোর্ট ব্লেয়ার। কিন্তু পরক্ষণেই আবার চিন্তা হলো, ব্লেয়ার চ্যানেলের উত্তর তীর খুবই খাড়া। সাগরের দিকটাও একই রকম খাড়া। সেখানে এমন সুন্দর জায়গা থাকতে পারে না। এটা যে পোর্ট ব্লেয়ার নিশ্চিত হল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল।
বিপর্যস্ত শরীরে কোমরের ভারী বেল্ট এবং পিঠের ট্যুরিষ্ট ব্যাগটাকে আরো ভারী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু ও দুটি ফেলা যাবে না। ওয়াটার প্রুফ বেল্ট ও ব্যাগে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আছে। পদে পদেই দরকার হবে। শোল্ডার হোলষ্টারে তার প্রিয় রিভলবারটার স্পর্শও অনুভব করতে পারছে।
বাম হাত চেপে ধরে সে হাঁটতে শুরু করল।
গুলীতে সৃষ্ট ক্ষত থেকে রক্ত এখন বেরুচ্ছে না। কিন্তু ভিজা ক্ষত স্থানের জমাট রক্ত গলছে।
পানিতে ধুয়ে গেলেও বাম বাহু ও বাঁদিকের কাপড়-চোপড় অনেকটা রক্তাক্তই দেখাচ্ছে।
আহমদ মুসা কয়েক ধাপ উঠেছে।
হঠাৎ সিঁড়ির বাঁকের ওপার থেকে দুটি মেয়ের মাথা সে দেখতে পেল। ধীরে ধীরে তাদের গোটা দেহ তার নজরে এল।
দুটি মেয়ে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। একজন তিরোশার্ধ, অন্যজন তরুণী।
দু’জনেরই কপালে ফোঁটা, কিন্তু একজনের সিঁথিতে সিঁদুর। তরুণীটির সিঁথিতে সিঁদুর নেই। তার হাতে পিতল রংয়ের একটা গোলাকার ট্রে মনে হচ্ছে।
নিশ্চয় ট্রেটিতে ফুল ও পুজার উপকরণ আছে, অনুমান করল আহমদ মুসা। সেই সাথে বাবল, মেয়ে দুটি নামছে সাগরে পূজার অর্ঘ দিতে।
মেয়ে দুটিও তাকে দেখে ফেলেছে।
আহমদ মুসা ক্ষণিকের জন্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল।
কিন্তু মেয়ে দুটি দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রথমে তাদের চোখে ছিল সাধারণ কৌতুহল দৃষ্টি। এই রকম চিন্তা যে, এই সাত সকালে সিঁড়ি দিয়ে কে উঠে আসছে! এ কৌতুহল শীঘ্রই বিস্ময়ে পরিণত হল, যখন দেখল লোকটি পানি থেকে উঠে আসছে।
আরও কাছে এসে পড়েছে আহমদ মুসা।
এবার পরিপূর্ণভাবে ওদের নজরে পড়েছে আহমদ মুসা। আহমদ মুসার বাম বাহু আহত, রক্তাক্ত, তা দেখতে পেয়েছে ওরা। আহমদ মুসার পিঠের ব্যাগ দেখতে পেয়েছে তারা। আহমদ মুসার চেহারার বিদেশী ভাবও তাদের নজর এড়ায়নি।
তাদের বিস্ময় এবার উদ্বেগে রূপ নিয়েছে।
আহমদ মুসা খুবই স্বাভাবিকভাবে উপরে উঠেছিল। মেয়েরা কিছু না বললে আহমদ মুসা ওদের এড়িয়ে উঠে যাবে, এটাই ভেবে রেখেছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা আরও এগিয়ে এলে তরুণীটি বড় মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপা লোকটি আহত, মনে হয় কোন ট্যুরিষ্ট। কারো দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কিংবা দুর্ঘটনায় পড়েছিল বোধ হয়।’
‘তা হতে পারে। কিন্তু রেডিও ঘোষণা শুনেছিস? একজন বিদেশী সন্ত্রাসীকে সরকার খুঁজছে। সে এমনি……।’
পেছনে খড়মের দ্রুত ঠক ঠক শব্দ শুনে বড় মেয়েটি কথা বন্ধ করে পেছনে তাকাল। দেখল প্রধান পুরোহিত দ্রুত নামছে সিঁড়ি বেয়ে।
পুরোহিত যোগানন্দ যোগী কোন কারণে মন্দিরের এ দিকটায় এসে দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে। একটু ভালো করে দেখেই ছুটে আসছে।
যোগানন্দ যোগী ‘মহাসংঘ’ এর সদস্য।
আন্দামান সাগরে বোট সমেত আহমদ মুসা ধ্বংস হবার খবর সে শুনেছে। খুশিতে আপ্লুত হয়ে ইতিমধ্যেই সে এক প্রস্থ পূজা দিয়েছে। শক্তিরূপিনী, অশুর নাশিনী মা দূর্গাকে। কিন্তু এখন ভিজা, আহত আহমদ মুসাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখেই তার কোন সন্দেহ রইল না যে, এই লোক সাগর থেকে উঠে আসছে। সেই সাথে তার দ্বিতীয় যে কথা মনে হল, তা হল সোজাসুজিই সাগরে বোট ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে, সুতরাং সাগর থেকে উঠে আসা লোক আহমদ মুসা হওয়াই স্বাভাবিক। সে সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে যতই আহমদ মুসার নিকটবর্তী হল, এই বিশ্বাস তার আরও দৃঢ় হল। মেয়ে দুটির পেছনে এসে আহমদ মুসার গুলীবিদ্ধ বাম বাহু দেখে তার আর কোন সন্দেহই রইল না।
সঙ্গে সঙ্গেই দুপায়ের খড়ম ফেলে দিয়ে সে হুংকার দিয়ে সামনে এগোল। কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবার তার উঠে এসেছে হাতে।
আঁৎকে উঠে মেয়ে দুটি সিঁড়ির দু’পাশে সরে গেল।
যোগানন্দ যোগীর মনে পড়ছে তার উপর হুকুমের কথা, ‘দেখামাত্র আহমদ মুসাকে হত্যা করতে হবে।’
রিভলবার তুলে নিয়েই যোগানন্দ যোগী চিৎকার করে উঠেছে, ‘বিভেন বার্গম্যান ওরফে আহমদ মুসা তোমার আর রক্ষা নেই। সাগরে থেকে তুমি বেঁচে উঠেছ, কারণ ডাঙ্গায় তোমার মরণ লিখা ছিল।’
বলেই যোগানন্দ যোগী আহমদ মুসার দিকে তাক করা রিভলবারের ট্রিগার টিপে দিয়েছে।
যোগানন্দ যোগীকে হাতে রিভলবার তুলে নিতে দেখেই আহমদ মুসার হাত শোল্ডার হোলষ্টারে চলে গিয়েছিল। আহমদ মুসাকে দেখামাত্র গুলী করার ‘মহাসংঘের’ সিদ্ধান্ত সে জানে। যোগানন্দ যোগীর বেপরোয়া চেহারা দেখে এবং কথার ধরনে এ কথাই তার আবার মনে পড়ল। শোল্ডার হোলষ্টার থেকে রিভলবার বের করলেও গুলী করার সময় ছিল না। আত্মরক্ষার জন্যে আহমদ মুসাকে বাঁ দিকে ছিটকে পড়তে হল। গুলী করার জন্যে ডান হাত উন্মুক্ত রাখার জন্যেই আহত বাম পাশটার উপরই আবার জুলুম করতে হল। গুলীটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল যোগানন্দ যোগীর। আহমদ মুসা তার দেহ সরিয়ে নিতে চার পাঁচ সেকেন্ড দেরী করলেই যোগানন্দ যোগীর বুলেট তার কপাল ফুটো করে দিত।
বাঁ দিকে মাটিতে ছিটকে পড়েই আহমদ মুসা তার রিভলবারের ট্রিগার টিপেছিল যোগানন্দ যোগীকে লক্ষ্য করে।
পাল্টা এই আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না যোগানন্দ যোগী। কিছু বুঝে উঠার আগেই কপালের ঠিক মাঝখানটায় গুলী খেয়ে আছড়ে পড়ল সে সিঁড়ির উপর। তারপর গড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নেমে গেল তার দেহটা।
গুলী করেই আহমদ মুসা তার বাম বাহুর যন্ত্রণায় নেতিয়ে পড়ল মাটির উপর। বামদিকে দেহকে ছিটকে দেয়ায় আহত বাম বাহুটা গিয়ে পড়েছিল একটা পাথরের উপর। দেহের গোটা চাপটাও গিয়ে পড়েছিল সেই আহত বাহুটার উপরই।
যন্ত্রণায় বাহুটা প্রায় অবশ হয়ে পড়েছিল। সেই সাথে দেহটাও তার ব্যথায় জরজর হয়ে পড়েছে।
ভয়-আতংকে পাথর হয়ে যাওয়া মেয়ে দুটি তাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিরবে দেখছিল।
প্রথমে সাধু যোগানন্দ যোগী গুরুজীর ঐভাবে তেড়ে আসা ও রিভলবার বের করা দেখে তারা অবাক হয়েছিল। যে গুরুজী একটা মাছি মারাকেও ¯্রষ্টার অনভিপ্রেত বলেন, সেই গুরুজীর হাতে রিভলবার! তারপর গুরুজী সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা লোককে ‘আহমদ মুসা’ বলে সম্বোধন করা দেখে ভীষণ চমকে উঠেছিল বড় মেয়েটি। ভেতর থেকে শতকণ্ঠে তার জিজ্ঞাসা ধ্বনিত হয়েছিল এই লোকটি তাহলে সেই আহমদ মুসা!
আতংকের ঘোর কাটলে আহমদ মুসা নামটা ধাক্কা দিল বড় মেয়েটিকে। গুরুজীর কপালে যে গুলী লেগেছে, এটা তো দেখাই গেল। এতক্ষণে গুরুজী বোধ হয় শেষ হয়ে গেছেন। কিন্তু আহমদ মুসা যাকে বলা হল, তিনিও কি গুলী খেয়েছেন। ওভাবে নির্জীব পড়ে আছেন কেন? গুরুজীর মতই কি তার অবস্থা? বুকের কোন গভীরে যেন একটা প্রবল অস্বস্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে তরুণীটির হাত ধরে টান দিয়ে বলল, ‘এস।’
বড় মেয়েটি দ্রুত এগোল আহমদ মুসার দিকে। গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার পাশে। সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসাও মাটি থেকে মাথা উঠিয়ে চাইল মেয়েটির দিকে।
‘আপনি ভালো আছেন? আপনার গুলী লাগেনি?’ উদগ্রীব কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল মেয়েটি।
বিস্মিত হল আহমদ মুসা। এই অচেনা হিন্দু মেয়েটির কণ্ঠে আন্তরিকতার সুর কেন? চোখে তার দরদ ভরা দৃষ্টি কেন?
জবাব দিতে আহমদ মুসার একটু দেরী হয়েছিল। মেয়েটিই আবার বলে উঠল, ‘আপনি কি সত্যিই আহমদ মুসা? ভয় নেই। আমি সুস্মিতা বালাজীর বোন। আমি পোর্ট ব্লেয়ারে থাকি, সুস্মিতা আপা আপনার কথা আমাকে বলেছেন।’
আহমদ মুসা তার ডান হাত দিয়ে বাম হাত চেপে ধরে উঠে বসল। বলল, ‘আল্লাহর অশেষ প্রশংসা। আমার চরম দুঃসময়ে আল্লাহ আপনাকে মিলিয়ে দিলেন। আপনার বোন সুস্মিতা বালাজীকেও এক কঠিন বিপদে আমি আল্লাহর সাহায্য হিসেবে পেয়েছিলাম।’
একটু থেমে একটা দম নিয়ে আবার আহমদ মুসা বলল, ‘হ্যাঁ আমি আহমদ মুসা।’
শুনে খুশি হল বড় মেয়েটি। কিন্তু পরক্ষণেই এক রাশ উদ্বেগের অন্ধকার নামল তার চোখে-মুখে। বলল সে দ্রুতকণ্ঠে, ‘সরকার ও গোটা প্রশাসন পাগল হয়ে উঠেছে আপনাকে শেষ করার জন্যে। পোর্ট ব্লেয়ারের কোন রাস্তা, হোটেল, বাড়ি আপনার জন্যে নিরাপদ নয়। আপনি উঠুন, এখনি এখান থেকে সরে পড়তে হবে।’
কথা শেষ করেই আবার বলে উঠল মেয়েটি, ‘আপনি হাঁটতে পারবেন?’
আহমদ মুসা উঠতে উঠতে বলল, ‘পারব। কিন্তু কোন জায়গাই নিরাপদ না হলে আমি কোথায় যাব, কোথায় নেবেন আপনারা আমাকে?’
‘সুস্মিতা বালাজীর বোনের বাড়িকে আপনি নিরাপদ ভাবতে পারেন।’ বলল বড় মেয়েটি।
আহমদ মুসা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘আমরা মন্দিরের দিক দিয়ে বেরুতে পারবো না। বাইরের রাস্তাও আমাদের জন্যে নিরাপদ নয়। সাগর তীর দিয়েই আমাদের যেতে হবে। মন্দির এলাকা পেরোবার পরও সাগর তীর হয়েই যাওয়া যাবে। একটু এগোলেই আমাদের বাড়ি।’
বলেই হাঁটতে শুরু করল বড় মেয়েটি। তার সাথে আহমদ মুসা ও তরুণীটিও।
পাশাপাশি তিনজন হাঁটছে। প্রথমে কিছুক্ষণ নিরবতা।
নিরবতা ভেঙে বড় মেয়েটিই প্রথমে কথা বলল, ‘আমার নাম সুরূপা সিংহাল। সুস্মিতা আপার ছোট খালার বড় মেয়ে আমি। আর এই মেয়েটি আমার চাচাতো বোন এবং সুষমা রাওয়ের খালাতো বোন। আন্দামান এলে আমাদের বাসাতেই থাকে, গভর্নর ভবনে সে যায় না। ওর নাম সাজনা সিংহাল।’
যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটছিল তারা।
আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বাম হাতটা চেপে ধরে হাঁটছিল।
‘স্যার, আপনার কষ্ট হচ্ছে আপনার পিঠের ব্যাগটা আমাকে দিন।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘ভাই, ও ঠিকই বলেছে। ওটা আমাদের দিন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘না বোনরা, আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না। বরং পিঠের চাপ আহত বাহুর যন্ত্রণাকে কিছুটা লাঘব করছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কষ্ট বেশি হবার কথা, লাঘব হচ্ছে কিভাবে স্যার?’ বলল বিস্মিত কণ্ঠে সাজনা সিংহাল।
‘পিঠে ভারের বোধ থাকায় কষ্টের অনুভূতিটা দু’ভাবে ভাগ হচ্ছে। এ ভার না থাকলে কষ্ট বোধটা আহত বাহুতে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
সুরূপা ও সাজনা দু’জনেই এক সাথে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দুজনের চোখেই বিস্ময়।
সুরূপা চোখ ফিরিয়ে স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘কোন বিষয়কে এমন নিখুঁতভাবে দেখা ঈশ্বরের দেয়া বিশেষ গুণ।’
সাজনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। সুরূপা বাধা দিয়ে বলল, ‘আমরা এসে গেছি সাজনা। সামনেই কাঁটাতারের বেড়া। এস আমরা নিচে নেমে যাই, নিচু করিডোরটা দিয়ে আমরা ওপারে চলে যাব, কাঁটাতারের বেড়া ডিঙাতে যাওয়া ঠিক হবে না।
ওরা তিনজন নিচে সাগরের কূলে নেমে গের। বড় বড় পাথর-টিলার কিছু চড়াই-উৎরাই ওদের পার হতে হল। ওপারে পৌছে গেল ওরা। এখন অনেকটা নিরাপদ। একটা বড়, মসৃণ পাথর দেখে সুরূপা আহমদ মুসাকে বলল, ‘ভাই, আপনি বসুন। আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে।’
বসল তিনজনই।
সুরূপা আহমদ মুসার বাহুর ক্ষতটা দেখছিল। বলল, ‘আমার মনে হয় গুলীটা বেরিয়ে গেছে।’
‘আমারও তাই মনে হয়। তা না হলে ক্ষতের দুটি মুখ থাকতো না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আপনি কোথায় গুলীবিদ্ধ হলেন? সাগরে পড়লেন কি করে? লঞ্চ ডুবি হয়েছিল? ‘সাগর থেকে বেঁচেছ, ডাঙ্গায় তোমার মরণ লিখা হয়েছে’ -গুরুজী এই কথা বলল কেন? গুরুজী আপনাকে মারতে চেয়েছিল কেন?’ -এক নিশ্বাসে প্রশ্নগুলো করল সাজনা সিংহাল।
‘গুরুজী কেন মারতে চায়, সে কথা তুমি সুরূপার কাছে শুনে নিও। সে নিশ্চয় সব কথা শুনেছে সুস্মিতা আপার কাছ থেকে। সাগরে কি করে পড়লাম, সেই কথা বলছি শোন। আমি………।’
‘এখন কোন কথা নয় ভাই। বাসায় চলুন, আপনি সুস্থ হোন তারপর সব কথা।’ বলে সুরূপা পকেট থেকে মোবাইল বের করল। কোথাও মোবাইলে কথা বলল। কোন এক ডাক্তার সোহনীকে বলল, ‘প্লিজ আপনি সার্জারী, ব্যান্ডেজ ও চিকিৎসার সরঞ্জাম নিয়ে আমার বাসায় চলে আসুন। এখনি প্লিজ।’
মোবাইল রেখে সুরূপা বলল, ‘ডাক্তার সোহনী পোর্ট ব্লেয়ার হাসপাতালের একজন সার্জন এবং সুস্মিতা আপার ক্লাসমেট ও বন্ধু। আমাদের সমস্যায় তিনি আসেন। আপনার ক্ষেত্রে যেমনটা প্রয়োজন, তিনি ততটাই বিশ্বস্ত।’
‘সোহনী নাম, তিনি কি মুসলিম?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘জি হ্যাঁ মুসলিম, কেরালার মেয়ে। পুরো নাম সোহনী শবনম। খুব ধর্মভীরু। নিয়মিত নামায পড়ে, মাথায় রুমাল বাঁধে। আপনাকে নিশ্চয় চিনবে।’ সুরূপা বলল।
কেরালার নাম শুনতেই আহমদ মুসার মনে পড়ল শাহ বানুর মায়ের কথা, হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর কথা। মোপলা বিদ্রোহের নায়ক তাদের পূর্ব পুরুষের কথা। বলল আহমদ মুসা, ‘ডাক্তার সোহনী শবনম কি কেরালা থেকে আসা, না আন্দামানের কেরালিয়ান?’
‘কেরালা থেকে আসা। কেরালার সরকারি হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার হয়ে আন্দামানে এসেছেন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
কথা শেষ করেই সুরূপা আবার বলে উঠল, ‘চলুন উঠি। সোহনীদি আবার এসে পড়বেন।’
সবাই উঠল। চলতে শুরু করল সাগর তীরের পাথুরে চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে।

ডাক্তার সোহনী ব্যান্ডেজ খুলেই বলে উঠল, ‘তাই বলে আপনার দেহ এত আঘাতের ধকল মোকাবিলার পরেও কেমন করে এত স্বাভাবিক! আপনার দেহে নিশ্চয় মেডিসিনের ষ্টোর আছে, অথবা আপনার দেহে আল্লাহ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, যা আঘাতের ক্ষতিকে দ্রুত পূরণ করে আপনাকে স্বাভাবিক করে দেয়। তা না হলে মেশিন গানের বুলেট পেশির গভীরে প্রবেশ করে বিপরীত দিক দিয়ে বের হয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা ঠিক হতে কমপক্ষে ১৫ দিন লাগার কথা, কিন্তু তার সিকি সময়ও তো আপনার লাগেনি!’
‘তাড়াতাড়ি আমার সুস্থ হওয়া প্রয়োজন। সে কারণেই আল্লাহর এই সাহায্য।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার ক্ষেত্রে এটা খুব বেশি ঠিক।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
একটু থেমেই আবার বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?’
‘নিশ্চয় করবেন? তবে ‘আপনি’ সম্বোধন না করলে খুশি হতাম। সুস্মিতা আপাও শেষে ছোট ভাই হিসেবে ‘তুমি’ বলেই সম্বোধন করেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শুধু বয়স মর্যাদার প্রতীক নয়। আপনাকে ছোট ভাই বলে আপন করার চাইতে আপনি যে মর্যাদার অধিকারী, সেটাকে বড় করে দেখাই বেশি প্রয়োজনীয়।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘আপনার প্রশ্ন বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
একটুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, ‘মনে রাখবেন প্রশ্নটা আমার মত একজন দুর্বল নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে। আপনার এই অস্থির জীবনের শেষ কোথায়? আমি যতটুকু জেনেছি, ততটুকুতেই আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি। জোসেফাইন ভাবী কি ভাবেন আমি জানি না।’
‘এটা ‘অস্থির জীবন’ নয় ডাক্তার সোহনী, এরই নাম জীবন। জীবন মানেই কাজ, কাজ মানেই অস্থিরতা। কাজের এই অস্থিরতা গৃহাঙ্গন থেকে বিশ্ব পর্যায়ে হতে পারে। এরই একপর্যায়ে আমার জীবন। সুতরাং এই অস্থিরতা শেষ হওয়ার কথা নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
হাসল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘আপনাদের মত লোকদের সাধারণ কথাও দর্শন হয়ে যায়। সহজ কথার একটা কঠিন দর্শন আপনি তুলে ধরেছেন। আমিও একমত আপনার সাথে। কিন্তু এই অস্থিরতার মাঝেও স্থিরতা থাকে। আমি সেটার কথাই বলেছি।’
‘আপনার কথা ঠিক। কিন্তু সব জীবন একরকম নয়। আপনাদের মোপলা বিদ্রোহের কথাই স্মরণ করুন।’ আহমদ মুসা বলল।
গম্ভীর হয়ে ওঠল ডাক্তার সোহনীর মুখ। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়নি। একটু পর ধীরে ধীরে বলল, ‘ঠিক বলেছেন।’
ডাক্তার সোহনী তার ডাক্তারী ব্যাগ গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে।
ব্যাগটি গুছিয়ে নিয়ে পাশের সোফায় বসল।
হাতের টিস্যুটা দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে একটু হাসল। বলল, ‘ওসব ভারী কথা থাক। এখন, বলুন গত রাতে চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে প্রচ- গোলা-গুলীর মধ্যে বোট থেকে সাগরে নামলেন, গুলীবিদ্ধ হলেন, সাবমেরিন টিউবও যখন গুলীতে ফুটো দেখলেন, তখন আপনার কি মনে হয়েছিল?’
‘প্রত্যেক বিপদের মধ্যে বাঁচার একটা পথ থাকেই, সেই বাঁচার পথ ব্যবহার করার জন্যে তখনকার অবস্থা মোকাবিলা করা ছাড়া আর কিছুই আমি ভাবিনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাবীর কথা? বাচ্চার কথা?’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘ওদের ছবি, সব সময় আমার চোখের সামনে থাকে। তবে ঐ মুহূর্তে ওদেরকে নিয়ে দূর্বল করার মত ভাবনা আমার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি।’
‘সে জন্যেই তো আপনি আহমদ মুসা। ধন্যবাদ। কিন্তু বলুন তো অতীতের এমন কোন ঘটনা বা স্মৃতি যা আপনাকে দূর্বল করে, দুঃখিত করে, ব্যথিত করে?’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘এমন কোন মানুষ দুনিয়ায় নেই যার জীবনে এই ধরনের কোন ঘটনা বা স্মৃতি নেই। আমার জীবনেও এমন অনেক ঘটনা আছে। এতই বেশি…..।’
এই সময় ছুটে ঘরে প্রবেশ করল সুরূপা সিংহাল। তার পেছনে পেছনে সাজনা সিংহালও।
আহমদ মুসার কথা আগেই থেমে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা তার দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসল।
‘ভাই, একটা দুঃসংবাদ।’ সুষমা রাও নিখোঁজ।’
‘সুষমা রাও নিখোঁজ?’ অনেকটা স্বগত কণ্ঠে উচ্চারণ করল আহমদ মুসা। তার চোখে মুখে বিস্ময়।
ধীরে ধীরে মাথাটা নিচু হল। চোখটাও তার বন্ধ হয়ে গেল। ভাবছে সে। কথা বলল না।
কথা বলল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘কবে থেকে নিখোঁজ?’
‘গতকাল বিকেল থেকে।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘কই পত্রিকায় তো আসেনি? গভর্নরের মেয়ে নিখোঁজ, ছোট ঘটনা নয়।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘সম্ভবত মর্যাদার ব্যাপারকে তারা বড় করে দেখছে।’ সুরূপা বলল।
‘কোত্থেকে নিখোঁজ হয়েছে?’ প্রশ্ন ডাক্তার সোহনীর।
‘গভর্নর হাউজের সামনে কালী মন্দিরে মায়ের সাথে পূজো দিতে গিয়েছিল। ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছে।’ বলল সুরূপা।
‘তাহলে তো এটা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়। নিখোঁজ এভাবে হয় না। বলতে হবে অপহৃত হয়েছে।’ ডাক্তার সোহনী বলল।
‘খালাম্মার সাথে কথা হল। তিনি নিখোঁজ শব্দই বললেন। অবশ্যই তার অবস্থা খুবই খারাপ। কান্নায় কথা বলতে পারছেন না। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘মন্দির পর্যন্ত এরিয়া গভর্নর হাউজের সিক্যুরিটি এলাকার মধ্যে। ওখান থেকে গভর্নরের মেয়ে অপহৃত হলে সাংঘাতিক দুঃসাহসিক কাজ!’ ডাক্তার সোহনী বলল।
‘পুলিশের থেকে তারা যদি বড় হয়, তাহলে দুঃসাহসের দরকার হয় না।’ সুষমা রাওয়ের অপহরণের ব্যাপারে প্রথম মুখ খুলল আহমদ মুসা।
‘পুলিশের থেকে তারা বড় হবে কেন? সন্ত্রাসী যত বড়ই হোক, পুলিশকে তারা ভয় করে।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘ব্যাপারটা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। তবে আমার মনে হয় সন্ত্রাসীরা সুষমা রাওকে অপহরণ করেনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে কে অপহরণ করেছে?’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘আমার কথা ঠিক নাও হতে পারে। তবে আমি সুষমা রাওয়ের অপহরণের যতগুলো বিকল্পের কথা ভাবলাম, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনার কথা হল, একটা জঘন্য উদ্দেশ্যে অপহরণের নাটক সাজানো হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলেন কি ভাই? এ নাটক সাজাবে কে? তার বাবা?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল সুরূপা সিংহাল।
‘আমি তাই অনুমান করেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি কারণে, সেই জঘন্য উদ্দেশ্যটি কি?’ প্রশ্ন সুরূপারই।
‘অনেকগুলো কারণের কথা চিন্তা করা যায়। সুষমা রাওয়ের সাথে সুস্মিতা বালাজী আপার যোগাযোগ হয়েছে, এটা তার পিতা জানতে পেরে এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যে এই কাজ করেছেন। কিন্তু এই কারণ আমার কাছে খুব যৌক্তিক নয়। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, সুষমা রাওকে অপহরণের নাটক সাজিয়ে তাকে সরিয়ে রেখে এর দায় আহমদ শাহ আলমগীর তথা মুসলমানদের উপর চাপিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোন দমনমূলক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে চান। এ কারণকেও আমার কাছে খুব শক্তিশালী মনে হয় না। তৃতীয় কারণ হতে পারে এই যে, বন্দী আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য একটা গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় সুষমা রাওকে।’
‘গিনিপিগ কিভাবে? কি তথ্য আদায়?’ বলল সুরূপা সিংহাল বিস্মিত কণ্ঠে।
আহমদ শাহ আলমগীর ও সুষমা পরষ্পরকে ভালোবাসে। সুষমাকে বন্দী আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে হাজির করে আহমদ শাহ আলমগীরকে এ কথা বলা হবে যে, তথ্য যদি সে প্রকাশ না করে, তাহলে তার সামনেই সব রকম নির্যাতন, এমনকি শ্লীলতাহানীর কাজ করা হবে। সুষমা রাওকে রক্ষার জন্যেই তখন আহমদ শাহ আলমগীর মুখ খুলবে। আর……’।
আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে ডাক্তার সোহনী বলে উঠল, ‘আপনি এটাও কি নিছক অনুমান করেছেন?’
‘না। এভাবে গিনিপিগ বানাবার জন্যে বিবি মাধবের লোকরা আহমদ শাহ আলমগীরের মা ও বোনকে অপহরণ করেছিল। কিন্তু তারা তাদের হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ায় তাদের গিনিপিগ বানানো সম্ভব হয়নি এবং আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে তথ্যও তারা আদায় করতে পারেনি। শেষ ব্যবস্থা হিসেবেই আমি মনে করি সুষমা রাওকে তারা অপহরণ করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার কথায় শক্তিশালী যুক্তি আছে। কিন্তু একজন পিতা কি তার মেয়ে নিয়ে এমন কিছু করতে পারেন?’
‘এটা হতে পারে যদি গরজটা মেয়ের চেয়েও বড় হয়। আর পিতা মনে করতে পারেন, আসলেই তার মেয়ের কোন ক্ষতি হবে না। মাঝখান থেকে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে তথ্য আদায় হয়ে যাবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু মেয়ের কাছে তো পিতা চিরদিনের মত ছোট হয়ে যাবেন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সুষমা রাও পিতাকে সন্দেহ করেছে, কিন্তু পিতা মেয়েকে জানতে দেয়নি তারাই যে আহমদ শাহ আলমগীরকে অপহরণ করেছে। তাঁর নিজের লোকরা ছদ্মবেশে সুষমাকে অপহরণ করেছে এবং জানতেও দেবে না তার পিতা এর সাথে জড়িত। সে বুঝবে আহমদ শাহ আলমগীরকে যারা আটক করেছে, তারাই আহমদ শাহ আলমগীরকে কথা বলাবার জন্যে সুষমাকে অপহরণ করেছে। সুষমা আরও বুঝবে, তার পিতা তাহলে আহমদ শাহ আলমগীরের অপহরণের সাথে জড়িত নয়। এতে গভর্নর মাধব মেয়ের সন্দেহের দায় থেকেও মুক্ত হবেন এবং কার্যোদ্ধারও হয়ে যাবে।’
ডাক্তার সোহনী, সুরূপা ও সাজনা সিংহাল সকলের মুখেই আনন্দ ও স্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছে। তাদেরও এখন স্থির বিশ্বাস সুষমার অপহরনের কাজ তার পিতাই করেছে এবং সুষমার আসলেই কোন ক্ষতি হবে না।
আনন্দ ও স্বস্তির মধ্যেও প্রশ্নের এক প্রবল স্ফুরণ ঘটেছে সাজনা সিংহালের চোখে মুখে। বলল সে, ‘খালুজান মানে সুষমা আপার আব্বা এতবড় একটা কাজ করেছেন কোন তথ্যের জন্যে? সে তথ্যের সাথে তার সম্পর্ক কি?’
‘এটাই আসল বিষয়। এই তথ্যের জন্যেই আহমদ শাহ আলমগীরকে অপহরণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো এই তথ্যকে কেন্দ্র করেই ঘটছে। কিন্তু এই ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানি না। আমি এ পর্যন্ত যেটা জানতে পেরেছি তা হল, শিবাজীর কি দলিল ও মোগল সম্রাটদের কি একটা নক্সা আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে আছে। এই জিনিসগুলো তারা চায়। এটা পেলে নাকি তাদের পথ ও পাথেও দুই-ই পাওয়া হয়ে যাবে। আবার ভারতে প্রতিষ্ঠিত হবে শিবাজীর স্বপ্নের ধর্মরাজ্য। কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় একত্রিত হবে আবার, ‘এক ধর্মরাজ্য পাশে খ- ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত।’ আহমদ মুসা বলল।
‘রবীন্দ্রনাথের এ কবিতাংশ জানলেন কি করে? আপনি তো বাংলা জানেন না, ভারতীয়ও নন।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘তোমার আপা সুস্মিতা বালাজীই আমাকে শিখিয়েছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
ডাক্তার সোহনী ও সুরূপার মুখ গম্ভীর। তারা ভাবছিল। সাজনার এবং আহমদ মুসার উত্তর তাদের কানে বোধ হয় পৌছায়নি।
আহমদ মুসার কথার শেষ শব্দ বাতাসে মেলাবার আগেই সুরূপা প্রশ্ন করল, ‘যারা ঐসব অপহরণের সাথে জড়িত, যারা ভারতে শিবাজীর ধর্মরাজ্য চায় তাদের সাথে গভর্নর বিবি মাধবের সম্পর্ক কি? তিনি তো ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের গভর্নর।’
গম্ভীর হল আহমদ মুসা। ভাবনার একটা ছায়া নামল তার চোখে-মুখে। বলল সে ধীরে ধীরে, ‘এটা তাঁর উপরি কাঠামো। ভেতরের রূপ ভিন্ন। ভারতের ‘শিবাজী সন্তান সেনা’, ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’, প্রভৃতি অত্যন্ত পরিচিত ও নির্দোষ জাতীয়তাবাদী সংগঠন। কিন্তু এগুলো আসলে পানির উপরে মাথা তোলা শৈল চূড়া। পানির নিচে লুকানো রয়েছে ‘ডুবো পাহাড়’-এর মত ‘মহাসংঘ’। মহাসাম্প্রদায়িক এই ‘মহাসংঘে’রই একজন নেতা বিবি মাধব। তিনি আন্দামান ‘মহাসংঘ’কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেই আমার বিশ্বাস।’ থামল আহমদ মুসা।
সুরূপা সিংহালরা কোন কথা বলল না। তাদের সকলের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়। বিস্ময়ে তাদের যেন বাকরোধ হয়ে গেছে।
আহমদ মুসাই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘ডুবো পাহাড় এই মহাসংঘই ভারতের সকল সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বিত-া এবং দাঙ্গার জন্য দায়ী। ধর্মের কারণে ভারত ভাগও হলেও ভাগ হওয়া অন্য দুই অংশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-ফাসাদ নেই। সেখানেও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের আন্দোলন আছে। কিন্তু সেটা গোপন নয়, গণতান্ত্রিক। সেখানে অবশ্য সন্ত্রাস আশ্রয়ী অগণতান্ত্রিক একটা ধর্ম আন্দোলন মাথা তুলেছিল, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ না হলেও সেখানকার সরকারের কঠোর অবস্থান ও জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করায় ঐ আন্দোলন পানার মত ভেসে গেছে। কিন্তু ভারতে তা হতে পারছে না।’
‘কেন? ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সরকার নিশ্চয় মহাসংঘটির কর্মকা-কে সমর্থন করে না। সেজন্যেই ওটা প্রকাশ্য পাহাড় নয়, গোপন ডুবো পাহাড়।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘প্রকাশ্যে সমর্থন করে না এটা ঠিক। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের মত কঠোর অবস্থানও নেয় না। বরং গোপন সায় আছে এটাই প্রমাণ হয়। যেমন, বাবরী মসজিদ ধ্বংস করল ‘শিবাজী সন্তান সেনা’রা নানা নামের ব্যানারে। তদানিন্তন নরসীমা রাওয়ের কংগ্রেস এতে প্রকাশ্যে অংশ নেয়নি বটে, কিন্তু বাধা দেয়নি, প্রতিরোধ করেনি। বাবরী মসজিদ রক্ষায় এগিয়ে যায়নি সরকারের পুলিশ ও সৈন্যরা। নিরবে দাঁড়িয়ে সবকিছু যেন উপভোগ করেছে।’ থামল আহমদ মুসা।
সুরূপা সিংহালদের মুখ ম্লান হয়ে গেছে। কথা বলল না সঙ্গে সঙ্গেই। একটু সময় নিয়ে ডাক্তার সোহনী বলল, ‘হতাশার কথা আপনি শোনালেন।’
‘হতাশ হবার কিছু নেই। ভারতে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত। ডুবো পাহাড় রূপী মহাসংঘের বিরুদ্ধে এই গণতন্ত্রই ভারতবাসীদের জন্যে রক্ষাকবচ, যদি গণতন্ত্রকে সত্যিকার গণতন্ত্র হিসেবে তারা বাঁচিয়ে রাখতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাই, আপনার কথা সত্য হোক। কিন্তু আন্দামান মহাসংঘের তৈরি সংকট থেকে উদ্ধার হবে কিভাবে, যেখানে গভর্নর নিজে জড়িত হয়ে পড়েছেন?’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘এই সংকট উত্তরণের চেষ্টাই আমরা করছি। দোয়া করুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে উঠে দাঁড়াল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘আপনার শরীরের দূর্বলতা কাটতে কিন্তু আরও একটু সময় লাগবে। এখনও আপনার বাইরে বেরোনো নিষেধ।’
‘ও, আপনাকে বলা হয়নি, আজ সকালেই তো উনি বাইরে বেরুবার জন্যে তৈরি হয়েছিলেন। একটা টেলিফোনের অপেক্ষা করতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত তিনি বেরুতে পারেননি।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
সুরূপার কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আমার এক পুরানো বন্ধু আটক আছেন। তার খোঁজেই একটু বেরোনো দরকার। সম্ভবত তার বাসার টেলিফোন খারাপ। খবর দিয়েও কোন সাড়া পাইনি।’
‘কিন্তু আপনি জানেন, আপনার চলাচল নিরাপদ নয়।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘আমি জানি বোন। ওদের চেষ্টা হল, কারফিউ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আমার চলাফেরা অসম্ভব করে তুলে ওদের লক্ষ্য অর্জন করা। অন্যদিকে আমার কাজ হল ওদের সতর্কতার সব আয়োজন ব্যর্থ করে দিয়ে আমার লক্ষ্যে উপনীত হওয়া। আমার চুপ করে বসে থাকার অর্থ হল, লক্ষ্য অর্জনে তাদের সাহায্য করা। আমার কি করা উচিত বলুন আপনারা।’
‘আমরা জানি আহমদ মুসা বসে থাকবার পাত্র নন। বিপদের ঘনঘটা তার খুব পরিচিত সাথী। কিন্তু আমার কৌতুহল আপনি এই মুহূর্তে বাইরে গিয়ে কি করবেন?’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘কিছুই করার না থাকলে, কোন পথই খুঁজে না পেলে কাজ হবে ওদের হাতে ধরা দেয়া। ধরা দিয়ে ওদের কাছে পৌছে পথ বের করে নেয়া। কিন্তু …..।
আহমদ মুসার কথা সামনে এগোতে পারলো না। বাধা দিয়ে কথা বলে উঠল সুরূপা সিংহাল। বলল, ‘এমন আত্মঘাতী কাজ করার চিন্তাও করেন?’ বিস্ময় ও উদ্বেগ তার কণ্ঠে। সাজনা ও ডাক্তার সোহনীরও মুখ হা হয়ে গেছে বিস্ময়ে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘নিরুপায় অবস্থায় এমন কাজ করতে হয়েছে। তবে এখন এমন কিছু করার প্রয়োজন নেই। চলার জন্যে আমার সামনে পথ খোলা। আপনারা কেউ সাহায্য করলে, বিশেষ করে তিনি যদি একজন ডাক্তার হন, তাহলে একটা অভিযান এখনি শুরু হতে পারে।’
ডাক্তার সোহনীসহ ওদের তিনজনের চোখেই বিস্ময় ও কৌতুহল। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই সুরূপা সিংহাল বলে উঠল, ‘আমাদের মধ্যে ডাক্তার তো একজনই আছে। কি বলবেন সোহনী আপা?’
‘হ্যাঁ, প্রস্তাবটা বিস্ময়ের এবং রোমাঞ্চকর। আমি বুঝতে পারছি না আহমদ মুসা, একজন ডাক্তার আপনাকে কি বিশেষ সহায়তা করতে পারেন?’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘কথা আমি সিরিয়াসলি বলেছি ডাক্তার সোহনী। হাজী আবদুল আলী আব্দুল্লাহ জেলে, তার স্ত্রীর সাথে আমার দেখা হওয়া দরকার। কিছু বিষয় তার কাছ থেকে জানা দরকার। কিন্তু তার বাড়ি ও টেলিফোন দুয়ের উপরই নজরদারী চলছে। তাঁর মোবাইলও মনিটর করা হচ্ছে। গোয়েন্দা ও পুলিশের নজর এড়িয়ে তাঁর বাড়িতে কারও যাওয়া সম্ভব নয়, এমনকি আত্মীয়-স্বজনদেরও যেতে দেয়া হচ্ছে না খবর পাচার হতে পারে এই আশংকায়। এই অবস্থায় একজন ডাক্তারই তাঁর বাড়িতে যেতে পারেন। তার সাথে থাকবে শিখ ড্রাইভার………।’
কথা বলতে বলতেই আহমদ মুসা সামনের ‘টি’ টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে নিল এবং ‘স্যরি’ বলে খেতে শুরু করল।
গ্লাস টেবিলে রাখতেই সাজনা সিংহাল বলল, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম ডাক্তার সোহনী না হয় হলেন ডাক্তার, আপনি কি তাহলে ড্রাইভার? ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন কোথায়? তারপর পোশাক?’
আহমদ মুসা সাথে করে আনা ওয়াটার প্রুফ ব্যাগ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করে সবার সামনে রাখল। শিখ সাজার মত পাগড়ী, পোশাক, দাড়ী, এমনকি গোঁফও বেরিয়ে এল তার ব্যাগ থেকে।
সাজনা সিংহাল ছোঁ মেরে ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে নিল। একটু নজর বুলিয়েই বলল, ‘তাহলে স্যার, আপনি ড্রাইভার শরন সিং।’
‘তাহলে দেখছি, আপনি পরিকল্পনা তৈরি করেই এসেছেন। কিন্তু ডাক্তার এভাবে পেয়ে যাবেন, এটা ঠিক করেছিলেন কিভাবে?’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘আমার পরিকল্পনায় ডাক্তার ছিল না। এই মাত্র এ বিষয়টা আমার মাথায় এসেছে ডাক্তার সোহনীকে দেখে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডাক্তার সোহনীকে না পেলে পোর্ট ব্লেয়ারে এসে ট্যাক্সির ব্যবস্থা কিভাবে করতেন?’
‘একজন ট্যাক্সিওয়ালাকে আটকে রেখে তার ট্যাক্সি ব্যবহার করতাম। নিরাপত্তার জন্যে ট্যাক্সির নাম্বার পাল্টে অকেজো, পরিত্যক্ত একটা ট্যাক্সির নাম্বার ব্যবহার করতাম। সে নাম্বারও আগে থেকেই জোগাড় করা আছে।’ আহমদ মুসা থামল।
কিন্তু ওদের কারও মুখে কোন কথা নেই।
সবার বিস্ময় দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। এতদিনের শোনা আহমদ মুসাকে তারা চোখের সামনে দেখছে। তার কাজ করার ধরন, তার কৌশল সব তারা নিজের চোখে দেখছে, খোদ আহমদ মুসার কাছেই শুনছে। এই বাস্তবতা স্বপ্নের চেয়েও বড় স্বপ্ন মনে হচ্ছে তাদের কাছে।
নিরবতা ভাঙল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘আমি রাজি জনাব। আমি আপনার কোন কাজে লাগলে, নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করব।’
‘ওয়েলকাম ডাক্তার সোহনী। আমার কাজ দ্রুত ও সহজ করে দিলেন। আমি মনে করি চিন্তার কিছু নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি তো বিনা কলেই যাচ্ছি। এটা যদি পুলিশ-গোয়েন্দারা জানে এবং বলে যে কল নেই যাচ্ছি কেন?’ ডাক্তার সোহনী বলল।
‘বলবেন, রুটিন চেকিং, প্রতিমাসেই হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘চমৎকার জবাব। রুটিন চেকিং বলাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। ধন্যবাদ আপনাকে।’ ডাক্তার সোহনী বলল।

আরও তিন ঘণ্টা পর। পড়ন্ত বেলা।
আহমদ মুসা শিখ ড্রাইভারের পোশাক পরে ড্রইংরুমে বসে ডাক্তার সোহনীর অপেক্ষা করছে, আর গল্প করছে সুরূপাদের সাথে।
ঠিক সময়েই গাড়ি বারান্দায় প্রবেশ করল ডাক্তার সোহনীর গাড়ি।
ডাক্তার সোহনী গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এল। তার হাতে ষ্টেথিসকোপ, গায়ে ডাক্তারের এপ্রন। এপ্রনে একটা বড় আকারের রেডক্রস ছাড়াও তার নিচে সবুজ কালিতে জ্বল জ্বল করছে আন্দামান সরকারি হাসপাতালের মনোগ্রাম। ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে রাখা একটা বড় ডাক্তারী ব্যাগও দেখ যাচ্ছে। গাড়ির সামনের ও পেছনের স্ক্রিণেও লাল রেডক্রসের মনোগ্রাম।
গাড়ির শব্দে শিখ ড্রাইভারবেশী আহমদ মুসাসহ সুরূপা ও সাজনা বেরিয়ে এসেছিল।
আহমদ মুসাকে দেখে ডাক্তার সোহনী সানন্দে বলে উঠল, ‘চমৎকার, একদম নিখুঁত ছদ্মবেশ। আগে না জানলে আমি চিনতেই পারতাম না আপনাকে।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা এগিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে পাঞ্জাবী মেশানো হিন্দীতে ডাক্তার সোহনীকে গাড়িতে বসার জন্যে আহ্বান জানাল।
‘ধন্যবাদ’ বলে ডাক্তার সোহনী গাড়িতে গিয়ে বসল।
গাড়ির দরজা বন্ধ করে আহমদ মুসা গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সুরূপা ও সাজনা। সাজনা বলল ডাক্তার সোহনীকে লক্ষ্য করে, ‘আমার হিংসা হচ্ছে আপনাকে একটা ইতিহাসের অংশ হতে দেখে।’
‘কিন্তু ইতিহাসের শুরু তোমাদের বাড়ি থেকে তোমাদের সহযোগিতায়। সুতরাং তোমরাও ইতিহাসের অংশ। আসি, আসসালাম।’ বলে আহমদ মুসা গাড়িতে ষ্টার্ট দিল।
সুরূপা দুই হাত জোড় করে উপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নোয়াল। বোধ হয় মা দূর্গা’র কাছে কোন প্রার্থনা করল। গাড়ি তখন বাড়ি থেকে রাস্তায় গিয়ে উঠেছে।
হঠাৎ আহমদ মুসা ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিল। তারপর গাড়ি ব্যাক করে গেটের ভেতর চলে এল। গেট থেকে একটু আড়ালে গাড়ি নিয়ে আবার ব্রেক কশল।
ডাক্তার সোহনী বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার জনাব?’
‘একটা ভুল হয়েছে। দু’মিনিট দেরি হবে।’ বলে আহমদ মুসা তার ব্যাগ থেকে গাড়ির দুটি নাম্বার নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল। ডাক্তার সোহনীর গাড়ির দুদিকে নাম্বার প্লেট খুলে গাড়ির ভেতরে ছুড়ে দিয়ে তার জায়গায় নতুন নাম্বার প্লেট লাগিয়ে দিল।
কাজ শেষ করে ড্রাইভিং সিটে ফিরে এল। সিটে বসে গাড়ির দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, ‘ডাক্তার সোহনী সম্প্রতি কোন ডাক্তার কি বিদেশে বা ছুটি নিয়ে মূল ভুখ-ে গেছে?’
‘গেছে। কেন?’
‘বলছি। তাদের কারও একজনের নাম বলুন।’
‘ডাক্তার আশা স্যাম্যাল আমেরিকা গেছেন এবং ডাক্তার নন্দিতা পাঞ্জাবে তার বাড়ি ছুটিতে গেছেন।’
‘তাহলে ডাক্তার সোহী এখন থেকে আমাদের ফিরে আসা পর্যন্ত আপনার নাম ডাক্তার নন্দিতা। আপনি এই অভিযানে ছিলেন এ কথা যাতে কোনভাবে প্রমাণ না হয় এজন্যে।’
‘কিন্তু এতে আমি বাঁচব, কিন্তু ডাক্তার নন্দিতার তো বিপদ হবে।’
‘ডাক্তার নন্দিতার বিপদ হবে কেন? তিনি তো ছুটিতে আছেন। প্রমাণ হবে যে, ‘কেউ নকল নন্দিতা সেজেছিলেন।’
হাসল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘গাড়ির নাম্বার প্লেট বদলাবার কারণ কি?’
‘গাড়িটা যে আপনার এটা যাতে কেউ খুঁজে বের করতে না পারে, এজন্যেই এই ব্যবস্থা।’
‘আল্লাহকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। তিনি নিশ্চয় আপনাকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন। আপনি এতটা আগাম চিন্তা করেন?’
‘এটা আমার কৃতিত্ব নয় মোটেই।’ গাড়ি ষ্টার্ট দিতে দিতে বলল আহমদ মুসা। গাড়ি রাস্তায় বেরিয়ে ছুটে চলল।
এক সময় ডাক্তার সোহনী পেছন থেকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা জনাব, সংস্কারক ও যোদ্ধা এ দুজনের মধ্যে কে বড়?’
‘দুজনেই বড়। সংস্কার জাতির পুনর্গঠনের কাজ করেন এবং যোদ্ধা জাতিকে রক্ষার জন্যে লড়াই করে। দুকাজই তাদের স্ব স্ব জায়গায় এক নাম্বার।’
‘আপনি একজন যোদ্ধা হিসেবে বলুন…………।’
আহমদ মুসা ডাক্তার সোহনীর কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘না আমি যোদ্ধা নই, যোদ্ধার দায়িত্ব অনেক বড়। আমি ছোট একজন সেবক, জাতির বিপদকালে সাহায্য করার চেষ্টা করি।’
‘এটা আপনার বিনয়। মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া, বলকান, স্পেন, প্রভৃতি জায়গায় যা করেছেন, সেটা যুদ্ধের চেয়েও বড়।’
‘না, ওগুলো যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের জন্যে আনুষ্ঠানিক একটা সেন্ট্রাল অথরিটি থাকতে হয়, জনগণের কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক সমর্থন ও গ্রহণ থেকে এই অথরিটির সৃষ্টি হয়। এসব কিছুই সেখানে ছিল না, এসবের প্রয়োজনও হযনি। কারণ আমি যেটা করেছি, সেটা অন্যায় ও অন্তর্ঘাতের মোকাবিলা এবং জাতিতে তার বিপদ উত্তরণে সহযোগিতা করা। বিপদ মুক্ত হয়ে জাতি অনেক জায়গায়ই স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছে। আর দেখুন, আমি আমার এ তৎপরতায় কোন আইন ভঙ্গ করিনি, আইনের পক্ষে কাজ করেছি এবং আইনের শাসন ও গণতন্ত্রকেই সামনে এগিয়ে নেবার চেষ্টা করেছি। আমি বিশ্বাস করি ডাক্তার সোহনী, আজ বিশ্বে মুসলমানরা যদি তাদের স্ব স্ব স্থানে আইনের শাসন রক্ষা ও গণতন্ত্র চর্চার উপর অটল থাকে এবং আল্লাহ যেমন চান তেমন ‘ভালো’ মানুষ হতে পারে, তাহলে তাদের সেই সোনালী দিনের পুনরাগমন নিশ্চিত হতে পারে।’
‘চমৎকার বলেছেন। ধন্যবাদ। কিন্তু বলুন আমাদের এই যাত্রা, আমরা যা করতে চাচ্ছি তা কি এই দেশের আইনের বিরুদ্ধে হচ্ছে না?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘না তা হচ্ছে না। এই দেশে একটা খুনি সন্ত্রাসী চক্র সরকারের অভ্যন্তরে একটা সরকার সৃষ্টি করে বেআইনিভাবে আইনকে হাতে নিয়ে নির্দোষদের উপরে যে নির্যাতন নিপীড়ন চালাচ্ছে, তারই বিরুদ্ধে আমাদের এই অভিযান। আমরা কেন, চক্রটির ষড়যন্ত্রের কথা যদি এদেশের দেশপ্রেমিক পুলিশ, গোয়েন্দারা জানত, তাহলে তাদেরও দায়িত্ব হতো এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়া। আমরা বলতে গেলে তাদেরই কাজ….।’
কথা শেষ না করেই আহমদ মুসা গাড়ির ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করাল।
সামনেই একজন পুলিশ হাত তুলে আছে, আহমদ মুসার গাড়িকে দাঁড়াবার নির্দেশ দিচ্ছে।
হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর বাড়ি এসে গেছে। সামনের মোড়টা ঘুরেই রাস্তাটা সোজা হাজী আবদুল আলী আবদুল্লার বাড়ি গিয়ে উঠেছে। এখানে এই একটিই রাস্তা। এদিক-সেদিক যাবার কোন রাস্তা নেই এবং এই রাস্তাটা হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর বাড়ি গিয়েই শেষ হয়েছে।
পুলিশ অফিসারটি কয়েক ধাপ হেঁটে আহমদ মুসা রূপী ড্রাইভার শরন সিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। তার সাথে ছিল আরও দুজন পুলিশ। তারাও এসে দাঁড়াল পুলিশ অফিসারের পেছনে।
পুলিশ অফিসারটি কয়েক ধাপ হেঁটে আহমদ মুসারূপী ড্রাইভার শরন সিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। তার সাথে ছিল আরও দুজন পুলিশ। তারাও এসে দাঁড়াল পুলিশ অফিসারের পেছনে।
পুলিশ অফিসারটি গাড়ির জানালার দিকে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘সিংজী আপনারা কোথায় যাচ্ছেন।’
‘হাজী আবদুল্লাহজীর বাড়িতে।’
পুলিশ অফিসার আহমদ মুসার কাছ থেকে সরে ডাক্তার সোহনীর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
ডাক্তার সোহনী একটা খবরের কাগজ পড়ছিল।
আহমদ মুসা পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলার সময় ডাক্তার সোহনী মুখের সামনে থেকে কাগজটা একটু সরিয়ে নিয়েছিল। বাম দিকের চুলের কিছু অংশ ও বাম চোখের উপর দিয়ে গালের উপর পড়েছিল। মুখের ঠোঁট বরাবর ছিল খবরের কাগজের উপরের প্রান্ত। ফলে মুখের পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না।
পুলিশ অফিসারকে তার জানালার দিকে আসতে দেখে ডাক্তার সোহনী নিজেই বলে উঠল, ‘কিছু ঘটেছে অফিসার?’
‘না, ম্যাডাম। ইমারজেন্সী চলছে তো। তাই রুটিন চেকিং হচ্ছে। হাজী সাহেবের বাড়িতে সাধারণের যাওয়াটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাজী সাহেবের বাড়ি থেকে আপনাকে ‘কল’ করা হয়েছে বুঝি?’ বলল পুলিশ অফিসার।
‘প্রতি মাসের রুটিন চেকিং বেগম সাহেবার।’
‘বুঝেছি।’ বলে একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে নোট বুক ও কলম বের করে বলল, ‘মাফ করবেন, শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যে। ম্যাডামের নাম কি?’
‘ডাক্তার নন্দিতা। পোর্ট ব্লেয়ার গভর্নমেন্ট হাসপাতাল।’
‘ধন্যবাদ। এই যথেষ্ট।’ বলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘যাও সিংজী।’
আহমদ মুসা গাড়ি ষ্টার্ট দিল। সে রিয়ার ভিউতে দেখল, গাড়ির নাম্বারও টুকে নিচ্ছে পুলিশ অফিসারটি।
‘অফিসার গাড়ির নাম্বারও লিখে নিচ্ছে ডাক্তার সোহনী।’ আহমদ মুসা বলল।
ডাক্তার সোহনী এক পলক পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ সিংজী। এখন বুঝতে পারছি গাড়ির নাম্বার ও আমার নাম বদলানো কত গুরুত্বপূর্ণ। যাক ফাঁড়াটা কেটে গেছে।’
‘কাটলেই ভালো’। বলল আহমদ মুসা।
কিন্তু কাটলো না।
হাজী সাহেবের বাড়ির বাউন্ডারি প্রাচীরের গেটে গাড়ি পৌছাতেই সাদা পোশাকের একজন লোক ভূতের মত উদয় হয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
গেটের সামনে এসে গাড়ি আগেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
লোকটি সোজা গিয়ে ডাক্তার সোহনীর জানালায় গিয়ে দাঁড়াল।
ডাক্তার সোহনী আগের মতই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। খবরের কাগজে তার মুখ ঢাকা।
সাদা পোশাকধারী লোকটি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মুখের সামনে থেকে কাগজটা একটু সরিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল লোকটির দিকে।
আগের মতই ডাক্তার সোহনী বাম পাশের বাম দিকের চোখ ও গাল প্রায় ঢেকে দিয়েছে।
ডাক্তার সোহনীকে তার দিকে চাইতে দেখেই সাদা পোশাকের লোকটি পকেট থেকে একটা আইডি কার্ড বের করে ডাক্তার সোহনীর সামনে তুলে ধরে বলল, ‘আমি গোয়েন্দা বিভাগের লোক। আমার উপর নির্দেশ আছে যে বা যারাই ভেতরে হাজী পরিবারের সাথে দেখা করতে বা কোন কাজ নিয়ে যান, তাদের সাথে থাকতে। আশা করি, আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন।’
তার কথার উত্তর না দিয়ে ডাক্তার সোহনী ডাকল আহমদ মুসাকে, ‘সিংজী।’
সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা বলল, ‘ইয়েস ম্যাডাম।’
তারপর পেছন দিকে না ফিরেই আহমদ মুসা গোয়েন্দার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ওয়েলকাম। আসুন স্যার। সামনে এসে বসুন।’
কথাগুলো বলছিল আহমদ মুসা আর পকেট থেকে ছোট একটা সেন্টের শিশি বের করে তার পাশের সিটের সামনে ড্যাশ বোর্ডের উপর রাখছিল।
আহমদ মুসা গোয়েন্দাকে তার পাশে এসে বসার আমন্ত্রণ জানালে ডাক্তার সোহনীর মুখ ম্লান হয়ে গেল। আহমদ মুসা যে জন্যে যাচ্ছে, সেই কাজ সে গোয়েন্দার সামনে কিভাবে করবে? তাদের মিশনটাই ব্যর্থ হয়ে গেল বোধ হয়। মনটা খারাপ হয়ে গেল ডাক্তার সোহনীর।
আহমদ মুসার আহ্বান পেয়ে গোয়েন্দা এসে গাড়ির দরজা খুলে আহমদ মুসার পাশের সিটে বসে বলল, ‘ধন্যবাদ সিংজী।’
‘ওয়েলকাম স্যার।’ বলল আহমদ মুসা।
প্রবেশের গেটটা বন্ধ ছিল। কিন্তু গেটম্যান গেট বক্সে বসে জানালা দিয়ে সব ব্যাপারই দেখছিল ও শুনছিল।
গোয়েন্দা লোকটি গাড়িতে উঠে বসলে গেটম্যান আর কোন কথা না বলে ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিল।
গেটের পরেই একটা পাথুরে মসৃণ রাস্তা সোজা এগিয়ে গাড়ি বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। রাস্তার দু’পাশ বরাবর ফুল গাছের সারি। আর রাস্তার দুদিক থেকে শুরু হয়ে বাড়িটার চারদিকের বিশাল এলাকা জুড়ে বিশাল ফলের বাগান। চারদিকের সবুজ সমুদ্রের মাথায় টিলার সাদা বাড়িটাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে।
গেট থেকে গাড়ি বারান্দার দূরত্ব ২০০ গজের কম হবে না।
গাড়ি চলছে গাড়ি বারান্দার দিকে।
পথের মাঝখানে এসে আহমদ মুসা গোয়েন্দাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মাফ করবেন স্যার, ড্যাশ বোর্ডের উপরের সেন্টের শিশিটি কি আমাকে দেবেন?’
কোন কথা না বলে গোয়েন্দা লোকটি তার সামনের ড্যাশ বোর্ড থেকে সেন্টের শিশি তুলে নিল। চোখের সামনে ধরে বলল, ‘প্রিন্সেস।’ তারপর নিচের টাইটেল লাইনে দেখল, ‘অ্যা প্রডাক্ট অব প্যারিস’। পড়েই হাঁ করে বলে উঠল, ‘প্রিন্সেস ব্রান্ড। তাও আবার প্যারিসের। একবার না শুঁকে দিচ্ছি না সিংজী।’
বলেই গোয়েন্দা লোকটি শিশির ছিপি খুলে মহানন্দে নাকে ধরল। সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথাটি সিটের উপর ঢলে পড়ল। তার হাত থেকে শিশিটি পড়ে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাঁ হাত দিয়ে শিশিটা ধরে ফেলল এবং চাপ দিয়ে ছিপি লাগিয়ে দিল।
গোয়েন্দাটির দেহ গাড়ির সিটে ঢলে পড়ল।
‘কি হল? গোয়েন্দা লোকটির কি হল জনাব?’ পেছনের সটি থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ডাক্তার সোহনীর।
‘সে জ্ঞান হারিয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন? কিভাবে? শিশিতে তাহলে কি কোন হার্ড ক্লোরোফরম ছিল?’
‘জি, হ্যাঁ। ফাঁদ পেতেছিলাম। সে ফাঁদে ধরা পড়েছে সে।’
‘ও গড! এমন ঘটনার জন্যেও আপনি প্রস্তুত ছিলেন? কি করে জানলেন এই ঘটনা ঘটবে?’
‘কিছুই জানতাম না। আমার কাছে যেমন রিভলবার আছে, তেমনি এই ক্লোরোফরমও রয়েছে। প্রয়োজনে ব্যবহার করেছি মাত্র।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনার ক্ষেত্রে ‘অবিশ্বাস্য’ শব্দ প্রযোজ্য নয়। কিন্তু গোয়েন্দা লোকটিকে এখন কি করবেন?’
‘যাবার সময় কোথাও রেখে যাবো। এখন সিটেই বসে থাকবে।’
গাড়ি বারান্দায় পৌছে আহমদ মুসা ও ডাক্তার সোহনী গাড়ি থেকে নামল। গাড়ি লক করে আহমদ মুসা দৌড় দিয়ে বারান্দায় উঠল। পেছনে পেছনে ডাক্তার সোহনী।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশের দরজাটার সামনে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
‘বলে তো আসা হয়নি। বেগম হাজী সাহেব দরজা খুলবেন তো?’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘বেগম সাহেবার জন্যে সংকেত আছে। তিনি বুঝবেন, অসুবিধা হবে না।’
বলে আহমদ মুসা কলিং বেলে তিন বারে এক, দুই ও তিন সংখ্যায় মোট ৬ বার চাপ দিল।
তারপর পাঁচ সেকেন্ডের মত অপেক্ষা।
কলিংবেল কথা বলে উঠল, ‘আসসালামু আলাইকুম। ওয়েলকাম, বাছা। এস।’
সঙ্গে সঙ্গেই দরজার অটোলক শব্দ করে খুলে গেল।
প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং ডাক্তার সোহনী।
সবই চেনা আহমদ মুসার।
ভেতরে ঢুকে গেল আহমদ মুসা।
ভেতরের ফ্যামিলী ড্রইংরুমে বসেছিল বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসাদের দেখেই উঠে দাঁড়াল হাজী হাসনা বেগম আবদুল্লাহ এবং এগিয়ে এল।
আহমদ মুসাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘আল্লাহর পর তোমাকেই আমি স্মরণ করছিলাম। আল্লাহর শোকর যে তোমাকে পেয়ে গেছি। তুমি এলে কেমন করে। বুঝতে পারছি তোমাকে আটকাবার জন্যেই ওরা পোর্ট ব্লেয়ারে কারফিউ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’
একটা দম নিয়ে বেগম হাজী হাসনা ডাক্তার সোহনীকে দেখিয়ে বলল, ‘কে এ বাছা?’
‘ইনি ডাক্তার সোহনী। এর ড্রাইভার সেজে সহজেই আসা সম্ভব হয়েছে। উনি আপনাকে চেকও করবেন। তাহলে ওর আসাটাও সার্থক হবে।’
‘ধন্যবাদ মা। অবশ্যই মা আমাকে দেখবে।’
বলে বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ দুজনকে টেনে নিয়ে সোফায় বসল।
বসেই আহমদ মুসা বলল, ‘প্রথমে কাজের কথা সেরে নেই আম্মা। আপনার কোন নির্দেশ-উপদেশ আছে কিনা আগে বলুন।’
‘তোমাকে বলার সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, হাজী সাহেবকে আটকে রাখার কথা সরকার অস্বীকার করছে। প্রথম দিকে নিচের অফিসাররা স্বীকার করলেও তারা এখন বলছে, খবরটা ভুল বুঝাবুঝির ফল ছিল। এই অস্বীকার করার কারণ খারাপ কিছু ঘটে থাকতে পারে বলে আমার ভয় হচ্ছে।’
থেমে গেল বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেছে তার কণ্ঠ।
‘ধৈর্য ধরুন আম্মা। খারাপ কিছু ঘটার পেছনে যুক্তি নেই। এমন কিছু ঘটতে পারে না।’ নরম কণ্ঠে সান্তনার সুরে বলল আহমদ মুসা।
চোখ মুছে বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ বলল, ‘তাহলে আটক রাখার কথা অস্বীকার করছে কেন?’
‘অন্য কোন কারণ থাকতে পারে। আমি এ ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি আম্মা। আপনি চিন্তা করবেন না। বলুন, আর কি কথা আছে।’
‘আমি তাঁর ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের গোয়েন্দা আটক কেন্দ্রগুলোর একটা তালিকা পেয়েছি। ওটা তোমার কাজে লাগবে বলে আমার মনে হয়েছে। আমার তৃতীয় কথা হল, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেয়া তার অয়্যারলেস মোবাইল নাম্বারটা হারিয়ে গিয়েছিল। ওটা পেয়েছি। উনি তোমার সাথে কথা বলার জন্যে উদগ্রীব।’
থামল বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ এবং হাতের ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট কার্ড বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাম্বার এতে রয়েছে।’
‘পোর্ট ব্লেয়ারে গোয়েন্দাদের আটক কেন্দ্রগুলোর তালিকা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার হাতের কার্ড দেখনি। দেখ। ওটা আমাদের হোটেলের একটা অ্যাড্রেস কার্ড। কার্ডটা একটু পুরু। একটু চেষ্টা করলেই কার্ডের দুটি লেয়ার আলাদা হয়ে যাবে। বেরিয়ে পড়বে সুপার ফাইল ফোল্ড করা একখ- কাগজ। ঐ কাগজে টেলিফোন নাম্বারটাও পাবে এবং ঐ তালিকাও পাবে।’ বলল বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা কার্ডের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ আম্মা।’
‘এখন বল তোমার কথা।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
‘আমার জানার বিষয়ও আপনার কথায় পেয়ে গেছি। আমি ভেবেছিলাম হাজী সাহেব কোথায় কোন জেলে আপনি জানেন। এখন দেখছি, সরকার তাকে আটক রাখার কথাই অস্বীকার করছে। আরেকটা বিষয় ছিল মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অয়্যারলেস টেলিফোন নাম্বার খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা। সেটা তো পেয়েই গেলাম। এখন আপনার স্বাস্থ্য চেক করা বাকি।’ আহমদ মুসা বলল।
পরিচারিকা এ সময় ট্রলি ঠেলে নাস্তা নিয়ে প্রবেশ করল।
বেগম হাজী আবদুল্লাহ ট্রলিটি টেনে নিয়ে বলল, ‘এস বাছা, এস মা। আমি দশ মিনিট আগে নাস্তা করেছি। এখন তোমাদের একাই নাস্তা করতে হবে।’
নাস্তা সেরে ডাক্তার সোহনী বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহকে, ‘সত্যি মা আমি আপনার ব্লাডপ্রেসার, ডায়াবেটিস এবং হার্ট পরীক্ষা করব। ব্লাডপ্রেসার ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা এখানেই করছি। হার্টের ইসিজি করব আপনাকে আপনার বেডে নিয়ে।’
পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষ হলে আহমদ মুসা বলল, বেগম হাজী আবদুল্লাহকে, ‘আম্মা এবার আমাদের উঠতে হবে। বেশি সময় থাকলে পুলিশের সন্দেহ হতে পারে।’
‘অবশ্যই যাবে বাছা। মাকে তুমি কি সান্তনা দিয়ে যাবে বল।’
‘আমার বিশ্বাস আম্মা, হাজী সাহেবকে ওরা কোন জেলে রাখেনি। গোয়েন্দাদের আটক কেন্দ্রেই তিনি বন্দী আছেন। আমি সব জায়গাতেই খুঁজবো। সুষমা রাও-ও কিডন্যাপড হয়েছে। আমার অনুমান তাকেও হাজী সাহেবের মত কোন গোয়েন্দা আটক কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে। লিষ্টটা পাওয়ায় তাকে খোঁজাও সহজ হয়ে গেল। অপেক্ষা করুন। আল্লাহর সাহায্য আমাদের বিজয়ী করবে।’
‘আমিন। আল্লাহ তোমার কথাকে সত্য করুন।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
‘আম্মা, এখন বাড়িতে আপনার পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘নেই।’ বেগম হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘এখন আমাকে একটা নাটক করতে হবে মা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘নাটক? কেন? কিসের নাটক?’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
‘আপনাকে ও পরিচারিকাকে ক্লোরোফরমে সংজ্ঞাহীন করে এই ড্রইং রুমে ফেলে রাখতে চাই। আর আপনার সিন্দুকের কাগজ-পত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখতে চাই এবং টাকা পয়সা গায়েব করতে চাই। সিন্দুকের……….।’
আহমদ মুসাকে বাধা দিয়ে বেগম হাজী আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘কি কারণে, কেন এসব করবে?’ তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘আপনাকে সন্দেহ থেকে বাঁচাবার জন্যে। আমরা আসার সময় একজন গোয়েন্দাকে সংজ্ঞাহীন করে এখানে এসেছি। তা না হলে সেও আমাদের সাথে আসত এবং তার সামনেই আমাদের কথা-বার্তা বলতে হতো।’ থামল একটু আহমদ মুসা।
সেই ফাঁকেই বেগম হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘বুঝলাম। কিন্তু আমাদের উপর সন্দেহ করবে কেন?’
‘শুধু সন্দেহ প্রথম সুযোগেই তারা আপনাকে গ্রেফতার করবে।’
‘কেন? কি কারণে?’ উদ্বেগভরা কণ্ঠে বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
‘যখন একজন গোয়েন্দাকে সংজ্ঞাহীন করে আমরা এখানে এসেছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওরা বুঝবে আমরা ডাক্তার হওয়ার যে পরিচয় দিয়েছি এবং আপনাকে চেক করতে আসার যে কথ বলেছি তা ঠিক নয় এবং আপনার সাথে দেখা করার জন্যেই এই কৌশল নিয়েছিলাম। তারা সন্দেহ করবে এই যোগসাজশে আপনিও জড়িত আছেন। সুতরাং আপনার কাছ থেকে তারা জানার চেষ্টা করবে, আমরা করা। এমনকি তারা আপনাকে এই অজুহাতে গ্রেফতারও করতে পারে। এখন আমরা যদি আপনাকে বেঁধে ও সংজ্ঞাহীন করে যাই এবঙ আপনার সিন্দুক লুট করি, তাহলে আপনাকে সন্দেহ করার তাদের কোন অবকাশ থাকবে না।’
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বেগম হাজী আবদুল্লাহর। বলল, ‘ঠিক বলেছ বাছা। তোমার এত বুদ্ধি! আল্লাহ তোমাকে আরও উন্নতি দিন।’
একটু থামল। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘তোমরা বস আমি একটু আসি। শরিফাকে সব বুঝিয়ে বলি। পুলিশকে কি বলতে হবে সেটা তার ভালোভাবে বুঝা দরকার। নাস্তার এসব আয়োজনও তাকে সরিয়ে ফেলতে হবে।’
বলে ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে গেল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
কয়েক মিনিট পরে ফিরে এল। বলল, ‘হ্যাঁ আমরা রেডি। ভল্ট মানে সিন্দুক চল খুলে দেই।’
‘না আম্মা, সিন্দুক আপনি খুলবেন না। আমি লেসার কাটার দিয়ে সিন্দুক খুলে সিন্দুক লুট করব।’
‘ঠিক আছে। লকটা নষ্ট হবে অবশ্য। সিন্দুকে কিছুই নেই। আছে মাত্র কিছু চেক বই, ব্যাংক সার্টিফিকেট, শেয়ার সার্টিফিকেট এবং জমি ও ব্যবসায়ের কিছু দলিল দস্তাবেজ। ওগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে বা নষ্ট হলে কোন ক্ষতি নেই।’
‘ঠিক আছে।’ বলে আহমদ মুসা এ্যাকশন শুরু করল। বেগম হাজী আবদুল্লাহকে তার বেডরুমে চেয়ারের সাথে বাঁধল। পরিচারিকা শরিফাকে সংজ্ঞাহীন করে বাইরের প্রবেশ দরজার কাছে ফেলে রাখল। বেগম হাজী আবদুল্লাহকে সংজ্ঞাহীন না করে বড় স্কচ টেপ তার মুখে সেঁটে মুখ বন্ধ করে দিল। তারপর তার চোখের সামনে লেসার কাটার দিয়ে সিন্দুকের লক কেটে ভেতরের সব কাগজপত্র টেনে বের করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলল। তারপর ‘আম্মাজী আমরা চললাম, দোয়া করবেন’ বলে ডাক্তার সোহনীকে ডেকে নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। যেন সত্যিই সে এক দস্যুতার কাজ সম্পন্ন করল।
বাইরে বেরিয়ে এসে বাড়িতে প্রবেশের দরজাটিরও লক লেসার কাটার দিয়ে ওপেন করে রাখল।
আহমদ মুসা ও ডাক্তার সোহনী নেমে এল গাড়ি বারান্দায়। একটু দূরে বাইরের গেটের দিকে নজর পড়তেই বিস্মিত হল আহমদ মুসা। গেটটি একেবারে খোলা। তাড়াতাড়ি গাড়ির ভেতরে তাকাল আহমদ মুসা। সংজ্ঞাহীন গোয়েন্দা তার সিটে নেই। গাড়ির দরজা টান দিয়েই আহমদ মুসা বুঝল কি ঘটেছে।
ভ্রুকুঞ্চিত হল আহমদ মুসার। বলল, ‘ডাক্তার সোহনী আমরা ধরা পড়ে গেছি।’
ডাক্তার সোহনী আহমদ মুসার চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। সেও খারাপ কিছু আশংকা করছিল। আহমদ মুসার কথা শুনে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাক্তার সোহনী বলল, ‘সংজ্ঞাহারা গোয়েন্দাটি গাড়িতে নেই দেখছি। ধরা পড়ে গেছি মানে ওরা কি আমাদের চিনে ফেলেছে?’
‘চিনে ফেলেনি। তবে জেনে ফেলেছে যে আমাদের পরিচয় ভুয়া।’
‘তাহলে?’
‘আমার মনে হয় সংজ্ঞাহীন গোয়েন্দাকে ওরা চিকিৎসার জন্যে নিয়ে গেছে। সম্ভবত সংখ্যায় দুই একজনের মত ছিল বলে তারা ভেতরে প্রবেশ করেনি। কিন্তু হয় তারা এখন বাইরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, নয়তো ওরা প্রস্তুত হয়ে আসার পথে।’
উদ্বেগ-আতংকে মুখ পাংশু হয়ে গেল ডাক্তার সোহনীর। কথা বলতে পারল না।
‘স্যরি ডাক্তার সোহনী, আপনাকে আমি বিপদে ফেলেছি। কিন্তু আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।’
বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে তার ব্যাগটি বের করে নিল। বলল ডাক্তার সোহনীকে লক্ষ্য করে, ‘আপনি গাড়িতে উঠে বসুন। ভয় করবেন না, ওদের চোখে ধুলা নয় ধুঁয়া নিক্ষেপ করে ঠিকই আমরা চলে যেতে পারব।’
‘আল্লাহ সাহায্য করুন।’ বলে ডাক্তার সোহনী গাড়িতে উঠে বসল।
আহমদ মুসা ছোট মার্বেলাকৃতির ছয়টি স্মোক বোম ভরল মোটা নলের পেট মোটা এক রিভলবারে।
এটা পাওয়ারফুল উৎক্ষেপক যন্ত্র। রিভলবারের মতই একাধিক্রমে ছয়বার ট্রিগার টেপা যায়। ছয় বারে ছয়টি স্মোক বোম ৫০ গজ পর্যন্ত দূরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই দশ বর্গগজ এলাকা জুড়ে ধুঁয়ার দেয়াল সৃষ্টি করতে পারে।
স্মোক বোম রিভলবার নিজের সিটের উপর রেখে আহমদ মুসা গাড়ির খুলে রাখা নাম্বার প্লেট বের করে নিল এবং গাড়িতে লাগানো নাম্বার প্লেট খুলে সামনে পিছনে দু’দিকেই আগের নাম্বার প্লেট লাগিয়ে নিল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে এসে বসল।
‘এখনই যে আগের নাম্বার লাগিয়ে ফেললেন? ওরা তো দেখে ফেলবে।’ ডাক্তার সোহনী বলল।
‘এখন আর ওরা গাড়ির নাম্বার দেখবে না। গাড়ি সমেত আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। আগের নাম্বারটা এখন লাগালাম, কারণ ওরা ইতিপূর্বে গাড়িতে যে নাম্বার লাগানো ছিল তা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, অথবা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিতে পারে। সুতরাং পুলিশের চোখ থাকবে গাড়ির পূর্বের নাম্বারের দিকে, এই নাম্বার লাগানোর ফলে আমরা নিরাপদে চলে যেতে পারব।’
‘সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি আপনাকে এমন দুরদৃষ্টি দিয়েছেন।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা মাথার পাগড়ি ও দাড়ি খুলে ফেলল। শুধু গোঁফটাই থেকে গেল।
পাশের জানালা পুরোটাই খুলে ফেলল।
বাম হাত ষ্টিয়ারিং-এ রেখে ডান হাতে তুলে নিল স্মোক বোমের রিভলবারটি।
ষ্টার্টার অন করার আগে আহমদ মুসা বলল, ‘ডাক্তার সোহনী আপনি সিটে শুয়ে পড়–ন এবং সিটের প্রান্ত ভালোভাবে ধরে রাখুন।’
আহমদ মুসা সামনে তাকিয়ে হিসেব করে নিল। বাগানের মাঝ বরাবর গিয়ে গেটের ওপাশে প্রথম স্মোক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাবে। তারপর রাস্তার প্রথম বাঁকে আরও দুটি। পরে দরকার মনে করলে সিদ্ধান্ত নেবে।
গাড়ি ষ্টার্ট দিল আহমদ মুসা। যতটা সম্ভব গতি বাড়াতে লাগল।
গাড়ি ষ্টার্টের শব্দ গেটের ওপাশে পৌছে গেছে। গাড়ি বাগানের মাঝ বরাবর আসতেই চার জন পুলিশ তাদের সাবমেশিনগান বাগিয়ে গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সেই পুলিশ অফিসার যার সাথে, আহমদ মুসারা কথা বলেছিল।
দেখার পর পলকমাত্র দেরি করেনি আহমদ মুসা। ট্রিগার টিপেছে স্মোক বোম রিভলবারের। ওরাও দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসার ট্রিগার টেপা। ওরাও তাদের হাতের সাবমেশিনগান তুলছিল। কিন্তু সেই সময়েই তাদের মাঝখানে গিয়ে বিস্ফোরিত হল স্মোক বোম।
স্মোক বোমা বিস্ফোরণের পর পরই আহমদ মুসার গাড়ি তীব্র বেগে এগিয়ে গেল গেটের দিকে।
গেটে পৌছেই আহমদ মুসা তিরিশ চল্লিশ গজের ব্যবধানে আরও একটি স্মোক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাল।
আহমদ মুসার গাড়ি গেট থেকে তিরিশ চল্লিশ গজ দূরে দ্বিতীয় বিস্ফোরণের জায়গায় পৌছাতেই পেছন থেকে বৃষ্টির মত গুলী ছুটে এল তার গাড়ির দিকে।
প্রথম স্মোক বোমা বিস্ফোরণের পর পুলিশ চারজন নিশ্চয় আতংকিত হয়ে পড়েছিল। বোমাটি যে নির্দোষ স্মোক বোমা এটা বুঝতে তাদের একটু সময় লেগেছিল। তারা বুঝে উঠে আক্রমণের জন্যে তৈরি হওয়া পর্যন্ত আহমদ মুসা গেট থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ গজ দূরে চলে এসেছিল।
ধুয়ার মধ্যে থেকে লক্ষ্যহীনভাবে ছোড়া পুলিশের গুলীর দু’একটি পেছনের গার্ডারে আঘাত করলেও গাড়ির কোন ক্ষতি হয়নি।
সামনে আর কোন পুলিশ দেখতে পেল না আহমদ মুসা। তাই স্মোক বোমার ব্যবহার আর করল না।
‘আলহামদুলিল্লাহ। মাত্র চারজন পুলিশ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ডাক্তার সোহনী। মনে হয় আরও দু’একজন পুলিশ ছিল তারা সংজ্ঞাহীন গোয়েন্দাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এখনো নতুন পুলিশ এসে পৌছায়নি। মনে হয় সংজ্ঞাহীন গোয়েন্দাকে তারা বেশি আগে খুঁজে পায়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সামনে আরও পুলিশ থাকতে পারে।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘থাকলে ক্ষতি নেই। সেই নাম্বারের গাড়ি, সেই শিখ ড্রাইভার এবং সেই ডাক্তার কাউকেই তারা পাবে না। আপনি এখনও ডাক্তারের এপ্রন খোলেননি। খুলে ফেলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
সত্যিই কোথাও আর পুলিশ তাদের আটকালো না।
ডাক্তার সোহনীর মুখে স্বস্তি ও হাসি ফিরে এসেছে। সহজ হয়ে বসে বলল, ‘আমি কৌতুহল বশতই আপনার অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা লাভ আজ আমার হল। আপনার সম্পর্কে শত কথা শুনেছিলাম। কিন্তু আজ আপনার সঙ্গী হয়ে দেখলাম, কোন বর্ণনাই আপনাকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।’
প্রসঙ্গটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোর’, ‘ওল্ড পুলিশ হেডকোয়ার্টার’, ‘শয়তানের সীমান্ত’, ‘পূর্বানী’, ‘আসু আশ্রম’ এবং ‘কালী বাড়ি’-এসব কি কোথায় আপনি জানেন?’
নামগুলো শুনেই হাসতে লাগল ডাক্তার সোহনী। বলল, ‘নামগুলো আপনি কোথায় পেলেন? এক জায়গায় কিভাবে নামগুলোকে একত্র করলেন?’
‘জায়গাগুলো আমার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে সাহায্য করুন প্লিজ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্থানগুলোর সবই একদিক দিয়ে ঐতিহাসিক। স্থানগুলোর স্থাপনাসমূহ পরিত্যক্ত ঘোষিত। সরকারের পূর্ত বিভাগ এ স্থানগুলোর দায়িত্বে রয়েছে।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘স্থানগুলো সম্পর্কে আমি আরও বিস্তারিত জানতে চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি আপনাকে কিছু সাহায্য করতে পারব। বেশি সাহায্য পাবেন পোর্ট ব্লেয়ার মিউজিয়াম থেকে।’ বলল ডাক্তার সোহনী।
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কি ব্যাপার, আপনি চিনতে পারেননি। বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তো!’ বলল দ্রুত কণ্ঠে ডাক্তার সোহনী।
‘স্যরি। মনটা অন্যদিকে ছিল। আশে পাশে তাকানো হয়নি।’
বলে আহমদ মুসা গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে এল। গেট দিয়ে প্রবেশ করল ভেতরে।

পোশাক পরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
পায়ে কেডস পরনে ফুলপ্যান্ট এবং গায়ে জ্যাকেট। মুখে গোঁফ।
বেরিয়েই ‘স্যরি’ বলে আবার তার কক্ষের দিকে চলে গেল।
ড্রইং রুমে বসেছিল সাজনা সিংহাল।
বাইরের দিক থেকে ড্রইংরুমে ঢুকলো সুরূপা সিংহাল। তার স্বামীকে বিদায় দেবার জন্যে সে বাইরে গিয়েছিল। তার স্বামী আনন্দ সিংহাল সরকারের কম্যুনিকেশন ব্যুরোতে কাজ করে। আজ তার নাইট ডিউটি।
সুরূপা সাজনার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘ভাই সাহেব বের হননি?’
‘বের হয়েই ‘স্যরি’ বলে আবার ভেতরে গিয়েছেন।’ বলল সাজনা।
‘সত্যিই আমি ভেবে অবাক হই, এ ধরনের একটি বিপজ্জনক অভিযানে বের হচ্ছেন, কিন্তু সাহায্য করার কেউ নেই, এমনকি কিছু হলে পেছনে খোঁজ নেবারও কেউ নেই। অথচ এই কাজে তার নিজের কোন স্বার্থ নেই। হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ, সুষমা রাও কেউই তাঁর সাথে কোন সম্পর্কিত নয়। সুষমার সাথে আমাদেরই রক্তের সম্পর্ক। কিন্তু আমরা তো তার জন্যে বিন্দুমাত্রও ভাবছি না।’ সুরূপা বলল।
‘আপা, সব সময় কিছু মানুষকে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হয়। তারা সমাজ, সভ্যতাকে শুধু দিয়েই যায়, নেয় না কিছু। এই হাতেম তাই, রবিনহুডদের জন্যেই আমাদের সমাজ সভ্যতা টিকে আছে, আপা।’ বলল সাজনা।
‘কিন্তু এজন্যে তো বাঁচা প্রয়োজন, সুস্থ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়ে তার কোন ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বল, এই রাতে তিনি একা যে কাজে যে জায়গায় যাচ্ছেন, তার কোন যুক্তি আছে? রাতের বেলা জায়গাগুলোই দেখতে ভয়ংকর, ঐ জায়গাগুলোতে যারা যায় বা থাকে, তারা হবে আরও ভয়ংকর।’ সুরূপা বলল।
সাজনা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা এসে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল।
সুরূপা ও সাজনা উঠে দাঁড়াল। কথা বলল সাজনা, ‘আসুন স্যার, বসুন।’
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসতে বসতে বলল, ‘আমাকে এখনই বেরুতে হবে। সাজনা তুমি আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পার।’
শুনেই সাজনা এক দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে এল।
‘ধন্যবাদ সাজনা।’ বলে আহমদ মুসা গ্লাসটি হাতে নিয়ে পানি খেল।
পানি খেয়েই উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘আসি সুরুপাজী, আসি সাজনা।’
সুরূপা উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, ‘কখন ফিরছেন?’ ম্লান কণ্ঠ সুরূপার।
আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করেছিল। ঘুরে দাঁড়াল। হাসল বলল, ‘ব্যাংকের চাকরিতে যেমন যাওয়ার সময় আছে, আসার সময় নেই। আমার এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রেও তাই। সময় মেপে যাই, কিন্তু ফেরার কোন সময় নেই।’
‘হাসতে পারছেন! ভাবনা হচ্ছে না?’ বলল সাজনা।
আবার হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘শিকারীর দৃষ্টি শিকারের দিকে থাকতে হয়, নিজের দিকে এলেই সব শেষ।’
‘স্যরি, ভাবনার দরকার নেই তাহলে।’ বলল সাজনা ম্লান কণ্ঠে।
সাজনার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলল, ‘ঠিক, ছোট বোনটি আমার।’
বলেই ‘আসি সুরূপা বোন’ বলে আবার ঘুরে দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করল।
বেরিয়ে গেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা বেরিয়ে গেলেও সুরুপা ও সাজনা স্থির দাঁড়িয়েছিল।
সাজনার দু’চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরূপা সাজনার দিকে তাকাল। দেখলো সাজনার চোখে অশ্রু। সুরূপা ধীরে ধীরে সাজনার কাঁধে একটি হাত রাখল।
মমতার এই স্পর্শে সাজনার চোখের অশ্রু আরও বাড়ল। সে মুখ গুঁজল সুরূপার কাঁধে। বলল, ‘আহমদ মুসা আমাকে ছোট বোন বলেছে আপা।’ সাজনার চোখে পানি, আর মুখে হাসি। তার কথাগুলো অশ্রু ও আনন্দ মিশ্রিত।

‘ওল্ড পুলিশ হেডকোয়ার্টার’ থেকে প্রায় আড়াইশ’ গজ দূরে ট্যাক্সি থেকে নামল আহমদ মুসা।
এই ওল্ড পুলিশ হেডকোয়ার্টার পোর্ট ব্লেয়ার গোয়েন্দাদের একটি গোপন কারাগার। আহমদ মুসা গত কয়েকদিনের বেগম হাজী হাসনা আবদুল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া পোর্ট ব্লেয়ার গোয়েন্দাদের গোপন কারাগারের তালিকায় উল্লেখিত সবগুলো বাড়ি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছে এবং বাড়িগুলোর উপর চোখও রেখেছে। একজন শিল্পপতির ছদ্মবেশে বাড়ি ও জমি কেনার জন্যে ঘুরে বেড়িয়েছে। গোপন কারাগারগুলোর আশে-পাশের পুলিশকে বকশিশ দিয়ে বাড়ির অবস্থা ও পরিচয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাতে দেখেছে ঐ বাড়িগুলো কোন পারিবারিক বাসভন কিংবা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো পরিত্যক্ত। কিন্তু এগুলোতে লোক থাকে, লোকদের যাতায়াতও দেখা যায়। সুতরাং সরকার বা গোয়েন্দা বিভাগ যে এগুলোকে গোপন কাজে ব্যবহার করছে তা এইসব খবর থেকেও পরিষ্কার হয়ে যায়। পরিত্যক্ত ওল্ড পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে বিশেষভাবে সন্দেহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এখানে লোকজন এমনকি কিছু মহিলারও ব্যস্ত গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। এ কারণেই আহমদ মুসা এখান থেকেই গোপন কারাগারগুলোতে অনুসন্ধান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামার পর রাস্তা বাদ দিয়ে জঙ্গলাকীর্ণ উঁচু-নিচু টিলা-গর্তপূর্ণ কষ্টকর পথেই বাড়িটিতে পৌছার সিদ্ধান্ত নিল। আহমদ মুসা গোপনে বাড়িটিতে প্রবেশ করতে চায় এবং গোপনে অনুসন্ধান করে দেখতে চায়। তাতে করে প্রতিপক্ষকে অন্ধকারে রাখা সম্ভব হবে। সংঘাত-সংঘর্ষ হলে প্রতিপক্ষ মনে করবে তাদের গোপন কারাগারগুলো ধরা পড়ে গেছে। সেক্ষেত্রে তারা হাজী সাহেবকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে।
আহমদ মুসা রাস্তা থেকে নেমে এল।
তার পরনে কালো প্যান্ট, গায়ে কালো জ্যাকেট এবং মাথায়ও কালো হ্যাট। রাতের অন্ধকারের সাথে সে একদম মিশে গেছে।
চোখে নাইট ভিশন গগলস থাকার পরেও অনেকবার হোঁচট খেয়ে নানা রকম আগাছা ও গাছ-গাছড়ার কষ্টকর বাধা পেরিয়ে বাড়িটির পশ্চিম দিকে অর্থাৎ বাড়ির পেছনে গিয়ে পৌছল। বাড়িটা তিন তলা। বেশ বড়। উপরে নিচে সব মিলিয়ে তিরিশ-চল্লিশটি রুম হবে। বাড়িটার পেছনে কিচেন বা ষ্টোর রুম হতে পারে। এদিকের কিছু অংশ মূল বিল্ডিং থেকে বাড়তি আকারে বেরিয়ে এসেছে। এই অংশটি একতলা।
আহমদ মুসা নিরাপদে বাড়ির গোড়া পর্যন্ত পৌছাতে পেরে খুশি হল।
একতলার এদিকের দেয়ালে একটা জানালা দেখতে পাচ্ছে। এ জানালা পথে কিংবা একতলায় উঠে বাড়িতে প্রবেশের সে চেষ্টা করতে পারে।
আহমদ মুসা নিশ্চিন্ত মনে এই পরিকল্পনা করছিল, ঠিক তখন বাড়িটির তিন তলা থেকে একটা দড়ির মই বেয়ে একতলার অংশের ছাদে নেমে এল একজন লোক। তার গলায় ঝুলানো নাইট ভিশন দূরবিন এবং দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখা রিভলবার।
একতলার ছাদে নেমেই সে বাম হাতে নাইট ভিশন দূরবিন চোখে লাগিয়ে ডান হাতে রিভলবার নিয়ে বিড়ালের মত নিশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের প্রান্তের দিকে এগোল। এ সময় তার পকেটের মোবাইল বেজে উঠল। সে তাড়াতাড়ি রিভলবার মাটিতে রেখে মোবাইল বের করে কলটি অফ করে দিল। কিন্তু ইতিমধ্যেই মোবাইলে দু’বার রিং হয়েছে।
নিচে জানালায় উঠার জন্যে প্রস্তুতিরত আহমদ মুসা মোবাইলে প্রথম রিং শুনেই চমকে গিয়ে উৎকর্ণ হয়ে উঠল। দ্বিতীয় রিং শুনেই সে নিশ্চিত হয়ে গেল, রিং টোন জানালা দিয়ে অর্থাৎ ঘরের ভেতর থেকে নয় একতলার ছাদের উপর থেকে আসছে। তাহলে ছাদের উপর লোক আছে নিশ্চয়। সে কি আগে থেকেই ছিল, না কেউ দেখতে পেয়ে তাকে টার্গেট করেছে। কিন্তু ছাদেকেন। পরক্ষণেই তার মনে হল, ছাদে বসে নিশ্চয় তারা নাইট ভিশন দূরবিন চোখে লাগিয়ে চারদিকে চোখ রাখছিল। নিশ্চয় সে দেখতে পেয়েছে যে আহমদ মুসা বাড়ির পশ্চিম দিক দিয়ে একতলার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা দেখেই সে তার দিকে এগিয়ে আসছে। এই চিন্তা করেই আহমদ মুসা দ্রুত একতলার দেয়ালের সাথে সেঁটে গিয়ে দেয়াল ঘেঁষে বাড়ির উত্তর পাশের দিকে এগোল। আহমদ মুসা ভাবল, লোকটি নিশ্চয় এক তলার নিচে বা পেছন এলাকায় তাকে খুঁজবে অথবা ছাদে ওঁৎ পেতে তার অপেক্ষা করবে।
আহমদ মুসা এক তলার বর্ধিত অংশ পার হয়ে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল। যেন এখান থেকে এক তলার ছাদটা পরিষ্কার দেখা যায়। আহমদ মুসা দেখল একজন লোক ছাদের পশ্চিম প্রান্তে বসে চোখে দূরবিন লাগিয়ে পশ্চিম পাশটাকে তন্ন তন্ন করে দেখছে। আহমদ মুসা বুঝল তাকেই খুঁজছে। আহমদ মুসার চোখেও নাইট ভিশন গগলস।
আহমদ মুসা একতলা অংশের উত্তরের দেয়ালে পাইপ দেখতে পেল।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল আহমদ মুসা।
শিকারীর মত সতর্ক পায়ে ছুটল সে পানির পাইপের দিকে।
পানির পাইপ বেয়ে ছাদের কাছ বরাবর উঠে দেয়ালের বাইরে এগিয়ে আসা কার্নিস ধরে ঝুলে পড়ল এবং এক ঝটকায় দুহাতে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে দেহের উপরের অর্ধেকটাকে ছাদে শুইয়ে দিয়ে পেছনটাকে ছাদে তুলে নিল। দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখা রিভলবার হাতে নিয়ে দ্রুত গড়িয়ে এগোতে লাগল লোকটির দিকে।
আহমদ মুসা লোকটির দুগজের মধ্যে আসার পর সে টের পেয়েছে।
পেছনে শব্দ পাওয়ায় লোকটি বোঁ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসাও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে রিভলবার তার দিকে উদ্যত করে।
লোকটির এক হাতে দূরবিন, অন্য হাতে রিভলবার। কিন্তু রিভলবার ধরা হাতটি নিচে ঝুলে আছে, আর দূরবিন ধরা হাতটা চোখ বরাবর উঁচুতে ধরে নেয়া।
লোকটি আকস্মিক এই আক্রমণের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তার কপাল বরাবর ধরে রাখা আহমদ মুসার রিভলবারের সামনে সে রিভলবার তুলতে পারছিল না।
আহমদ মুসা লোকটির দিকে রিভলবার ধরে রেখে কয়েক ধাপ এগিয়ে লোকটির হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিল এবং তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটির মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে বলল, ‘আমি এক প্রশ্ন দুবার করবো না। প্রশ্ন করে আমি তিন পর্যন্ত গুনব। এর মধ্যে উত্তর না পেলে তোমার মাথায় গুলী ভরে দেব।’
লোকটি ভয়ে একদম চুপসে গেছে। তার মুখ-চোখ থেকে মৃত্যু ভয় ঠিকরে পড়ছে।
‘তোমাদের এ গোপন কারাগারে কাকে বা কাদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছে?’
প্রশ্ন করেই আহমদ মুসা গুণতে শুরু করেছে। এক…….., দুই…….., তিন…। ‘তিন’ সংখ্যা উচ্চারণ শুরু করতেই সে বলল, ‘কাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে, নাম জানি না। একটি মেয়ে বন্দী আছেন।’
‘একটি মেয়ে?’ আপনাতেই প্রশ্নটি বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। ভাবছিল সে, মেয়েটি কি সুষমা রাও?’
‘হ্যাঁ, একটি মেয়ে। ভেতরে মেয়েরাই তার পাহারায় আছে।’
‘ভেতরে কজন পাহারাদার আছে? হাজী আবদুল্লাহকে কোথায় আটকে রেখেছে?’
‘পাঁচজন মেয়ে গোয়েন্দা ও দুজন ছেলে পুলিশ। হাজী আবদুল্লাহকে কোথায় রেখেছে জানি না। এখানে নেই।’ বলল লোকটি।
‘বল, মেয়েটিকে এই বাড়ির কোথায় রেখেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘দোতলার সব উত্তরের রুমে।’ বলল পুলিশ লোকটি।
‘পাহারাদার মহিলা গোয়েন্দারা কোথায়?’
‘মেয়েটির সাথে ঐ ঘরেই তারা থাকে।’
আহমদ মুসার তার কথা শেষ করার আগেই পকেট থেকে শিশি বের করেছিল বাম হাত দিয়ে। বাম হাত দিয়েই প্লাষ্টিক ছিপিটি খুলে তার মুখে চেপে ধরল।
পুলিশ লোকটির প্রতিরোধের কোন চেষ্টা ছিল না। সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল ছাদের উপর।
আহমদ মুসা তাকে টেনে ছাদের প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ লোকটির পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। তার পকেট থেকে মোবাইল ধরবে কিনা, লাইন কেটে দেবে কিনা, পুলিশের মোবাইলটি তার দরকার পড়বে কিনা, এ নিয়ে একটু ভাবল আহমদ মুসা। শেষে সিদ্ধান্ত নিল পুলিশের মোবাইল তার কোন কাজে আসবে না। আর লাইন কেটে দেয়ার বা ধরার দরকার নেই। মোবাইল আরও একবার বেজেছিল, তখনও কথা বলতে শোনা যায়নি। সম্ভবত কেটে দিয়েছিল লাইন। এবারও মোবাইল না ধরায় ভেতরে অবস্থানকারী পুলিশের কেউ নিশ্চয় আসবে তার কি হল খোঁজ নিতে।
আহমদ মুসা পুলিশের সংজ্ঞাহীন দেহ ছাদের পশ্চিম প্রান্তে নিয়ে হাত ধরে তার দেহকে নিচে ঝুলিয়ে দিল। তারপর ছেড়ে দিল। নিচে ঐ জায়গায় অল্প বালির একটা স্তুপ রয়েছে। তার উপর গিয়েই তার দেহটি পড়ল। লোকটির তেমন আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলো না।
আহমদ মুসা এক তলার ছাদ ধরে দৌড়ে চলে এল তিন তলার ছাদে উঠার দড়ির মইয়ের কাছে। তার সিদ্ধান্ত তিন তলার ছাদে উঠে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে সে। আহমদ মুসা খুশি হয়েছে এজন্য যে, সুষমা রাওকে এখানে পাওয়া গেলে বড় একটা কাজ হবে। বিবি মাধবরা তাকে টোপ বানিয়ে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের যে ষড়যন্ত্র করেছিল তা ব্যর্থ হবে।
আহমদ মুসা দড়ির মইয়ে পা রাখতে যাবে, এমন সময় উপর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘সন্তোষ, সন্তোষ তুই কোথায়?’
আহমদ মুসা বুঝতে পারল, সংজ্ঞাহীন সেই পুলিশের নাম সন্তোষ। তার মোবাইল নিরব দেখে তাকেই খুঁজতে এসেছে তার সহকর্মী পুলিশ বা পুলিশ অফিসার। খোঁজ করার জন্যে সে নিশ্চয় নিচ তলার ছাদে আসবে।
আহমদ মুসা দ্রুত দড়ির মইয়ের কাছ থেকে সরে এসে কাছেই দেয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা একটা বড় ভাঙা বাক্সের আড়ালে আশ্রয় নিল।
আহমদ মুসার ধারণাই সত্য হল। দড়ির মইয়ের নড়াচড়া দেখে বুঝল, লোকটি মানে দ্বিতীয় পুলিশ দড়ির মই বেয়ে নামছে।
প্রায় নেমে গেছে লোকটি।
লোকটি দুহাতে দড়ি আঁকড়ে ধরে দড়ির বারে পা ফেলে ফেলে নামছে। সে রিভলবারটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে আছে।
আহমদ মুসার লুকিয়ে থাকা বাক্স থেকে দড়ির মইয়ের দূরত্ব দুগজও হবে না।
পুলিশ লোকটির পা মাটিতে পড়ার আগেই তাকে অকেজো করার জন্যে প্রস্তুত হল আহমদ মুসা।
দড়ির মইয়ের বটমে ছাদের একেবারে কাছে এসে স্বাভাবিকভাবেই তার চোখ নিচের পা ও ছাদের দিকে নিবদ্ধ হয়েছিল। আহমদ মুসা এরই সুযোগ গ্রহণ করল।
আহমদ মুসা বাক্সের আড়াল থেকে বেরিয়ে পুলিশ লোকটির পেছন দিক দিয়ে গিয়ে তার একদম পেছনে দাঁড়াল। লোকটি তখন ছাদ থেকে মাত্র দড়ির মইয়ের দুই ষ্টেপ উপরে।
আহমদ মুসা তার রিভলবারের নল দিয়ে তার গায়ে একটা টোকা দিল।
লোকটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মত চমকে ওঠে পেছন দিকে তাকাল। একদম মুখের উপর আহমদ মুসাকে রিভলবার হাতে দেখে ভুত দেখার মত বিমূড় হয়ে পড়ল। কামড়ে ধরে রাখা রিভলবার তার মুখ থেকে পড়ে গেল।
‘নেমে পড়। তোমার আর কিছুই করার নেই। কথা না শুনলে মারা পড়বে।’ বলল আহমদ মুসা। তার রিভলবার লোকটির দিকে তাক করা।
পুলিশ লোকটি লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। সামনা সামনি হলে আহমদ মুসা দেখল সে পুলিশের সাধারণ সিপাই নয়, মাঝারি পর্যায়ের অফিসার।
নেমে দাঁড়িয়েই সে বলল, ‘আমার লোক কোথায়? তুমি কে?’
‘তোমার লোক ঘুমিয়ে আছে। ঘণ্টা তিনেক পর ঘুম ভাঙবে। আমি একজন জনসেবক। পরিত্যক্ত বাড়িতে তোমরা কি করছ, কোন অপরাধমূলক কাজ করছ কিনা তা দেখতে এসেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
পুলিশ অফিসারকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘যেভাবে দাঁড়িয়ে আছ, হাত দুটি উপরে তুলে সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাক। কথার সামান্য অন্যথা হলে রিভলবারের গুলী তোমার বক্ষ ভেদ করবে।’
বলে আহমদ মুসা এক ধাপ এগিয়ে তার বুকে রিভলবারের নল ঠেকিয়ে বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে ক্লোরোফরমের শিশি বের করে তার নাকে চেপে ধরল।
পুলিশ অফিসার নিশ্বাস বন্ধ করেছে, বুঝতে পারল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা রিভলবারের নল দিয়ে পুলিশ অফিসারের বুকে খোঁচা দিয়ে বলল, ‘জোরে নিশ্বাস নাও অফিসার।’
পুলিশ অফিসার আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে হুকুম তামিল করল। জোরে নিশ্বাস নিল। পরবর্তী কয়েক সেকেন্ডেই তার সংজ্ঞাহীন দেহ ছাদের উপর লুটিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা সংজ্ঞাহারা পুলিশ অফিসারের পকেট থেকে মোবাইলটি নিয়ে নিল। মনে করল, মোবাইলটিতে সুষমা সম্পর্কে পুলিশ অফিসারের সাথে বিবি মাধবের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
মোবাইলটি পকেটে ফেলে রিভলবারের দাঁতে কামড়ে ধরে দ্রুত দড়ির মই বেয়ে তিন তলার ছাদে উঠল আহমদ মুসা। দেখতে পেল সিঁড়িঘর। সিঁড়িঘরের দরজা খোলা।
আহমদ মুসা সিঁড়ি ঘর দিয়ে পা রাখল সিঁড়িতে। তার ডান হাতে রিভলবার।
নিঃশব্দে নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে। সে ভাবল, মহিলা পুলিশ গোয়েন্দারা যদি মেয়েটির সাথে ঘরের ভেতরে থাকে, তাহলে একজন মাত্র পুলিশ বাইরে আছে।
সাবধান হল সে, এই একজন পুলিশকে সরাতে পারলেই সে নিরাপদে ঘরটির দরজা পর্যন্ত পৌছাতে পারে।
এটা ভাবতে গিয়ে আহমদ মুসা বিস্মিত হল নিজের মেয়েকে বিবি মাধব এমন একটা অরক্ষিত জায়গায় রেখেছে? আবার ভাবল পুলিশেরই সাথে হেডকোয়ার্টারের তিনজন পুলিশ ও পাঁচজন মহিলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রাখা খুব অযৌক্তিকও নয়। আরেকটা প্রশ্নও জাগল আহমদ মুসার মনে। সুষমা রাও কি বুঝতে পেরেছে কিংবা জানতে পেরেছে যে, তার কিডন্যাপ হওয়ার কাজটি তার পিতার কা-! একজন পিতা কতটা নিষ্ঠুর হলে তার মেয়ের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে! ভাবতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হল আহমদ মুসা। আসলে তার গভর্নরের চেয়ারে বসা একটা ছদ্মবেশ মাত্র। গভর্নরের বিশাল ছদ্মবে নিয়ে সে শিবাজীর ‘ধর্মরাজ্য’ গোপন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে রয়েছে। এ থেকেই আঁচ করা যায়, ষড়যন্ত্রটি ‘ডুবো পাহাড়’-এর মত কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
আহমদ মুসা তিন তলার সিঁড়ির মিডল ল্যান্ডিং-এ নেমেই দেখতে পেল দুতলার ল্যান্ডিং-এ সিঁড়ির মুখেই তৃতীয় পুলিশটি চেয়ারে বসে আছে। তার দৃষ্টি নিচে দোতলার সিঁড়ির দিকে।
আহমদ মুসা শিকারী বাঘের মত সিঁড়ি বেয়ে এক পা দুপা করে এগোল পুলিশটির দিকে। আহমদ মুসা রক্তারক্তি এড়াতে চাচ্ছে। নিরবে কাজ সারতে চায় সে।
কিন্তু সিঁড়ির একদম গোড়ায় এসে পুলিশের দৃষ্টিতে পড়ে গেল।
আহমদ মুসাকে দেখে চমকে উঠেই পুলিশটি তার ষ্টেনগান ঘুরিয়ে নিতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা ধীর, কিন্তু কঠোর কণ্ঠে বলল, ‘হাতটা যেখানে আছে সেখানে রাখ, না হলে মাথার খুলি উড়ে যাবে।’
পুলিশটি আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল। তারপরই তার দুটি হাত শিথিল হয়ে গেল এবং হাতের ষ্টেনগান ঝুলে পড়ল।
আহমদ মুসা পুলিশের কাছে গেল। তার মাথায় রিভলবারের নল ঠেকিয়ে বলল, ‘অন্য দুজনের মত সংজ্ঞাহীন হওয়াই তোমার জন্য মঙ্গলজনক হবে।’
এ কথা বলে তার দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকা পুলিশের নাকে ক্লোরোফরমের শিশি চেপে ধরল আহমদ মুসা।
পুলিশ সংজ্ঞাহীন হয়ে সিঁড়িতে পড়ে গেলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে করিডোর সোজা উত্তর প্রান্তের শেষ ঘরটির দিকে চাইতেই দেখল প্লেন সাফারী পরা, কোমরে বেল্ট বাঁধা এবং মাথায় কালো কাপড় বাঁধা একজন মহিলার হাতের ষ্টেনগান তার দিকে উদ্যত হয়ে উঠেছে।
সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা রিভলবার ধরা ডান হাত সামনে নিয়ে করিডোরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ভুমি স্পর্শ করেই গুলী ছুড়ল মেয়েটিকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসার দেহ ভুমি স্পর্শ করার আগেই এক ঝাঁক গুলী উড়ে গেল তার দেহের উপর দিয়ে। কিন্তু আহমদ মুসার টার্গেটেড গুলী গিয়ে তার বক্ষ ভেদ করল। সে এত দ্রুত এই পাল্টা আক্রমণের আশা করেনি এবং ষ্টেনগানের লক্ষ্য পরিবর্তনের সময়ও পায়নি।
গুলী খেয়ে পড়ে গেল মেয়েটি।
আহমদ মুসা উঠে দৌড় দিল ঘরটির দিকে।
কয়েক ধাপ এগিয়েছে মাত্র। ঘর থেকে একযোগে বেরিয়ে এল চারজন মহিলা। তাদের সবার হাতে ষ্টেনগান। বেরিয়েই তারা দেখতে পেল আহমদ মুসাকে। ষ্টেনগান বাগিয়েই তারা বেরিয়ে এসেছিল। আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েই তারা গুলী ছুড়তে শুরু করল।
ওদের বেরুতে দেখেই আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছিল কি ঘটতে যাচ্ছে। ওদের ষ্টেনগান থেকে গুলী বেরিয়ে আসার আগেই আহমদ মুসা করিডোরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েই তার পায়ের দিকটা সামনে ছিটকে দিল। চিৎ অবস্থান হল তার দেহের এবং তার দেহটা সামনে এগিয়েও গেল অনেকখানি। মেয়ে চারজনই তার একেবারে সামনে এবং তার রিভলবারের মুখে পড়ল। অন্যদিকে মেয়ে চারজনের ষ্টেনগানের টার্গেট থেকে সে অনেকখানি সরে এসেছে। মেয়েরা তাদের টার্গেট আহমদ মুসার দিকে সরিয়ে আনার আগেই তার রিভলবার থেকে পরপর চারবার গুলী বেরিয়ে এলো। মেয়েগুলো খুব কাছে হওয়ায় সব গুলীই অব্যর্থ হল।
চার মেয়ে গোয়েন্দার দেহই দরজার সামনে স্তুপাকারে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠেই দৌড় দিল ঘরের দিকে।
লাফ দিয়ে লাশগুলো পেরিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সুষমা রাও পড়েছিল খাটের উপর। ভয়ে তার দেহটা কুঁকড়ে গিয়েছিল। দুহাত দিয়ে সে তার মুখ ঢেকে ছিল।
ঘরে পায়ের শব্দ শুনে আঙুলের ফাঁক দিয়ে আতংকিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে ছিল।
প্রথমটায় কালো কাপড়ে আবৃত ও মাথায় কালো কাপড় বাঁধা আহমদ মুসাকে সুষমা রাও চিনতে পারেনি। পরক্ষণে আহমদ মুসাকে চিনতে পেরেই ‘ভাইয়া’ বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা তার হাত-পায়ের বাঁধন কাটতে কাটতে বলল, ‘আর ভয় নেই। কিছু করার মত এখানে আর কেউ নেই। তবে তাড়াতাড়ি আমাদের সরে পড়তে হবে। গোলাগুলী হোক এটা চাইনি, কিন্তু হয়েই গেল।’
বাঁধনমুক্ত হয়েই সুষমা রাও ঝুপ করে বসে আহমদ মুসার পায়ে তার মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে তুলে বলল, ‘মানুষ মানুষের পায়ে হাত বা মাথা ঠেকাবার মত নত কোন অবস্থাতেই হতে পারে না।’
সুষমা রাও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি মানুষকে নয়, মানুষরূপী ভগবানকে প্রণা করেছি।’
‘মানুষ শুধু মানুষই। সে কোনোভাবেই আল্লাহর রুপ হতে পারে না। নবী-রসূলরাও মানুষ। আমি জানি, এ বিশ্বাসে তুমিও ফিরে এসেছ।’
বলেই আহমদ মুসা বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়িয়ে বলল, ‘এস।’
সুষমা রাও চলতে শুরু করে বলল, ‘স্যরি ভাইয়া। আমি দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আজন্ম অভ্যাসটাই আমার সামনে এসে গিয়েছিল।’
আহমদ মুসা ও সুষমা রাও এক তলা হয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।
মূল রাস্তায় উঠতে হলে প্রায় ১০০ গজের মত অফিসের প্রাইভেট রাস্তা অতিক্রম করতে হবে।
‘সুষমা আমরা রাস্তা দিয়ে যাব না। গুলীর শব্দ শুনে ভ্রাম্যমান কোন পুলিশ ইউনিট এদিকে এসে পড়তে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক ভাইয়া।’ বলল সুষমা রাও।
‘এস’ বলে আহমদ মুসা অফিসের সামনের বাগানে ঢুকে পড়ল এবং জঙ্গল এলাকার দিকে এগোল কোণাকুণি কিছু দূর গিয়ে রাস্তায় উঠার জন্যে।
আহমদ মুসা রাস্তার যেখান থেকে সুষমার বন্দীখানায় আসার জন্য জঙ্গল ভুমিতে নেমে এসেছিল, সেখানে পৌছে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা বড় পাথর দেখে নিজে বসল এবং পাশের একটা পাথর দেখিয়ে সুষমা রাওকে বসতে বলল। সুষমা রাও বসল।
‘একটু জিরিয়ে নাও সুষমা। জানি না কতটা হাঁটতে হবে, গাড়ি কোথায় পাব!’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি হাঁটতে পারব ভাইয়া।’ সুষমা রাও বলল।
‘ধন্যবাদ সুষমা। কিন্তু তোমার বাড়ি তো অনেক দূর।’ বলল আহমদ মুসা।
হঠাৎ আতংক-বেদনায় ভরে গেল সুষমা রাওয়ের মুখ।
‘আমাকে কি আমার বাড়িতে নিচ্ছেন?’ বলল সুষমা রাও।
‘হ্যাঁ। বাড়িতেই তো যাবে।’ আহমদ মুসা বলল।
মুখ নত করল সুষমা রাও।
আহমদ মুসা সুষমার দিকে তাকাল। একটু চিন্তা করল। বলল, ‘সত্যিই তাহলে তোমার পিতা তোমাকে কিডন্যঅপ করিয়েছেন?’
জবাব দিল না সুষমা রাও। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, ‘কিডন্যাপ করাননি, কিডন্যাপ করেছেন। তার গোয়েন্দা বিভাগই আমাকে কিডন্যাপ করেছে।’
আহমদ মুসা আলতোভাবে সুষমা রাওয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘আজকের দুনিয়াকে বড় জটিল করে তুলেছি আমরা বোন। ঘটাতে হয় না, অনেক সময় অনেক কিছু ঘটাতে বাধ্যও হতে হয়।’
‘আপনি জানেন না ভাইয়া। ভেতরের ব্যাপার অত্যন্ত ভয়াবহ। আমার পিতা শুধু আন্দামানের গভর্নর নন। তিনি ‘মহাসংঘ’ নামক নিখিল ভারত সন্ত্রাসী আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতা এবং এই সন্ত্রাসী আন্দোলনের আন্দামান শাখার তিনি প্রধান। তার ভিন্ন একটা গোপন নামও আছে। ‘মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র’ নামে তিনি সন্ত্রাসী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।’ থামলো সুষমা রাও।
‘তুমি এত জানলে কি করে? আগে তো বলনি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি জানতাম না। অপহৃত হয়ে এখানে আসার পর সব জানতে পেরেছি। মহিলা গোয়েন্দা যারা আমার প্রহরায় ছিল, যারা আপনার হাতে মারা পড়ল, তারা গোয়েন্দা পুলিশ হলেও মূলত ওরা ঐ ‘মহাসংঘ’-এর সদস্য। মহাসংঘের সদস্য হিসেবেই আমার পিতার দ্বারা পুলিশের চাকরিতে শামিল হয়েছে। আমার সামনে ওরা কথা বলতো না, কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লেই ওদের কথার বান ছুটতো। আমি ঘুমের ভান করে ওদের কথা শুনতাম। আমার কিডন্যাপ সংক্রান্ত কথা, আব্বার কথা, মহাসংঘের কথা তাদের কাছ থেকেই শুনেছি।’
থামল একটু সুষমা রাও। একটা দম নিল।
সেই ফাঁকে আহমদ মুসার প্রশ্ন, ‘তোমার কথা কি শুনেছ?’
‘আমাকে অপহরণ করা হয়েছে শাহ বানুদের বিকল্প হিসেবে। দরকার হলে আমার উপর চরম নির্যাতন চালিয়েও আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে তথ্য আদায় ছিল ওদের লক্ষ্য।’
থেমে গেল সুষমা রাও। কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুখ মুছে আবার সে বলল, ‘কোন পিতা তার কন্যা সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও আমার ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে।’ থামল সুষমা রাও।
‘তোমার আব্বার সম্পর্কে আরও কিছু শুনেছ?’
‘বিক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা তারা করেছে, ওদের পরিকল্পনা, আব্বাকে দিল্লীর গভর্নর বানানো। তারপর লোক সভায় নিয়ে আসা। এভাবে শীর্ষ নেতাদের অনেককে তারা পার্লামেন্টে নিয়ে আসবে এবং দেশব্যাপী তাদের পরিচিত করাবে।’ বলল সুষমা রাও।
‘মহাসংঘ সম্পর্কে ওরা কি বলেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘শিবাজীর স্বপ্নের সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ওদের লক্ষ্য। সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক দলের অধিকাংশই তাদের ‘মহাসংঘ’-এর সদস্য। এমনকি কম্যুনিষ্ট পার্টির উপর তলার প্রায় সব নেতাই তাদের সদস্য। তারা তাদের ‘মহাসংঘ’কে ‘ডুবো হিমালয়’ বলে ডাকে। বলে যে, যেদিন হিমালয় জাগবে, সেদিন শুধু তারাই থাকবে আর কেউ থাকবে না।’ থামল সুষমা রাও।
‘আমরা অনেকেই ‘মহাসংঘ’কে ‘ডুবো পাহাড়’ বলে থাকি। বাইরের এই ধারণা এবং ওদের কথার মধ্যে আশ্চর্য মিল দেখছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি ‘মহাসংঘ’কে জানতেন?’
‘খুব সামান্য। আন্দামানে ওদের কিছু নেতার সাথে দেখা হয়েছে, নাম জেনেছি, যাদের সাথে আমার মোকাবিলা হয়েছে।’
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘তুমি হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছ। উনিও সম্ভবত এদের কোন গোপন বন্দীখানায় বন্দী আছেন।’
‘উনি হোটেল সাহারার মালিক হাজী সাহেব না?’
‘হ্যাঁ, সুষমা। তুমি কি কিছু শুনেছ তার সম্পর্কে?’
‘কিছু শুনেছি ভাইয়া। গতকাল বড় কেউ একজন এসেছিল আমার কক্ষে আমাকে বুঝাবার জন্যে। সে সময় তার মোবাইলে একটা কল এসেছিল। সে কলে কথা বলার সময় এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন, ‘যতদিন না আহমদ মুসা ধরা পড়ছে, ততদিন হোটেল সাহারার মালিক হাজী সাহেবকে ছাড়া বা মারা কিছুই করা যাবে না। সে আমাদের একজন বড় টোপ। তাকে উদ্ধার করার জন্যে আহমদ মুসা আসবেই।’ বলল সুষমা রাও।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ সুষমা। তুমি অত্যন্ত বড় একটা সুখবর শুনিয়েছ। তিনি বেঁচে আছেন, এই খবর আমার জন্যে, তাঁর পরিবারের জন্য আকাশ ছোঁয়া আনন্দের সংবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ, সংবাদটা যে আমি দিতে পারলাম।’
‘আগের কথায় ফিরে আসি সুষমা রাও। বাড়ি যাওয়া প্রশ্নে ভেবে-চিন্তে কথা বল। এখনই সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার।’
‘দুঃখিত ভাইয়া, আমার পিতার কাছে বংশীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রয়োজনের চেয়ে বড় কিছু নেই। সুস্মিতা বালাজী আপা ও আমার ঘটনা তারই কিঞ্চিত প্রমাণ। এখন আপনিই সিদ্ধান্ত দিন ভাইয়া, আমার কি করা উচিত।’
‘তুমি কি সুরূপা সিংহাল ও সাজনা সিংহালকে চেন?’
হাসল সুষমা রাও। বলল, ‘কি বলছেন ভাইয়া, ওরা আমার বোন, খালাতো বোন। সুরূপা সিংহাল এখানে থাকে। কিন্তু সাজনা সিংহাল তো মহারাষ্ট্রে থাকে। আপনি চিনলেন কি করে?’
‘সাজনা সিংহাল পোর্ট ব্লেয়ারে বেড়াতে এসেছে। সুরূপার ওখানে আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি এত কিছু জানলেন কি করে? সুস্মিতা আপা বলেছে?’ সুষমা রাও বলল।
আহমদ মুসা তার গ্রীনভ্যালি থেকে পোর্ট ভ্যালিতে আসা, সুরূপাদের সাথে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে সব কথা সুষমা রাওকে সংক্ষেপে বলল।
আহমদ মুসা থামলে মুহূর্ত কয়েক চুপ থেকে বলল, ‘থ্যাংক গড, তিনি আপনাকে সব বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। আমাদের মত মজলুমদের জন্যেই জালেমের বিরুদ্ধে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করেন।’
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘সুরূপার বাড়ি আমার নিজের বাড়ি। ওখানকার চেয়ে ভালো থাকার জায়গা আমার আর নেই। আর আমার সবচেয়ে লাভ আপনি ওখানে থাকবেন।’
‘এবার আমরা উঠতে পারি, চল।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল আহমদ মুসা।
সুষমা রাও আহমদ মুসার সাথে সাথেই উঠে দাঁড়াল।
দুজন আবার হাঁটতে লাগল রাস্তায় উঠার জন্যে।
নাস্তার টেবিলে বসে ছিল সুরূপা সিংহাল, সাজনা সিংহাল ও সুষমা রাও।
সুরূপার স্বামী অরূপ রতন সিংহাল নাস্তার টেবিলে বসতে বসতে সুরূপা সিংহালকে জিজ্ঞেস করল, ‘আহমদ মুসা ভাই সাহেব কোথায়?’
‘তুমি ব্যস্ত ছিলে তোমার কম্পিউটার নিয়ে, আর উনি ভোরের নামায সেরেই নিচে নেমে গিয়েছিলেন সমুদ্র তীরে। এই এসে গোসলে ঢুকেছেন। তুমি করেছ যন্ত্র চর্চা, উনি করেছেন মাঠ চর্চা, আর আমরা করেছি গৃহ চর্চা। গৃহ চর্চা তো কোন কাজ নয়, তাই একটু আগেই আসতে পেরেছি নাস্তার টেবিলে।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘দেখ। আমার কিছু দোষ হতেই পারে। ভাই সাহেবকে দোষ দিও না। মাঠের পরিস্থিতি কোন সময়ই তাঁর হাতে থাকে না। অতএব তাঁর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মানতেই হবে।’ অরূপ রতন সিংহাল বলল।
‘এই কিছুক্ষণ আগে সুস্মিতা আপা টেলিফোন করেছিলেন। বললেন, ‘ভাই সাহেব সব কাজ কাঁটায় কাঁটায় করেন, শুধু নিজেরটা ছাড়া।’ বলেছেন, ‘তাঁর নিজের ক্ষেত্রে তাঁকে কোন ছাড় যেন না দেই।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘কিন্তু সেভাবে যদি তিনি নিজের কথা ভাবতেন, তাহলে আন্দামান তাঁকে দেখতে পেত না, আমরাও দেখতে পেতাম না। তিনি মদীনায় বসে স্ত্রী, ছেলে নিয়ে সংসার করতেন।’ অরূপ রতন সিংহাল বলল।
‘দুলাভাই ঠিকই বলেছে……।’ সুষমা রাও তার কথা শেষ করতে পারলো না। আহমদ মুসাকে নাস্তার টেবিলে আসতে দেখে থেমে গেল সুষমা রাও।
টেবিলের হেডচেয়ারের দুপাশে বসেছে সুরূপা ও অরূপ সিংহাল। সুরূপার পাশের চেয়ারটাতে বসেছে সাজনা সিংহাল, তারপর সুষমা রাও।
আহমদ মুসা দ্রুত এসে অরূপ সিংহালের পাশের আরেকটি চেয়ারে বসল।
‘ভাই সাহেব, আবার আপনি এ চেয়ারে বসলেন।’ তারপর হেডচেয়ারটির দিকে ইঙ্গিত করে অরূপ সিংহাল বলল, ‘ওটা আপনার, দয়া করে ওখানে বসুন।’
‘আপনাদের অনেক অনুরোধ রক্ষা করেছি। আর নয়। ঐ অবস্থানটা ফ্যামিলির হেডব্যক্তির জন্যে। এটাই নিয়ম। ভাই সাহেব, আপনি ওখানে বসুন। অথবা ওটা খালিই থাকুক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ফ্যামিলির সবার সম্মানিত ব্যক্তিই ওখানে বসেন। আসল ব্যাপার হল যারা টেবিলে বসবেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিতজনই ঐ চেয়ারে বসবেন, এটাই কথা। আমরা যারা টেবিলে আছি, তাদের মধ্যে ঐ চেয়ার আপনার প্রাপ্য। আমরা নয়, সবাই এ কথাই বলবে।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘এ নিয়ে আর কথা বাড়াব না। আমি মেহমান। ও জায়গা ফ্যামিলি প্রধানের বা ফ্যামিলির অন্য কারও, তাই কথাটা বলছিলাম।’
বলে আহমদ মুসা উঠে গিয়ে চেয়ারটিতে বসল।
হাসল অরূপ রতন সিংহাল। বলল, ‘আমরা আপনাকে মেহমান নয়, পরিবারের একজন বলে মনে করি ভাই সাহেব।’
‘ধন্যবাদ।’
বলে আহমদ মুসা একটু গম্ভীর হল। বলল, ‘দুঃখিত যে নাস্তার সময়ের একটু পরে আমরা নাস্তা করছি। বেরিয়েছিলাম প্রতিদিনের মত সাগর তীরে একটু দৌড়াদৌড়ি করেই চলে আসব। কিন্তু বেরিয়েই রিকশা যাত্রী দুজন লোকের মধ্যকার আলোচনার একটা অংশ শুনে তাদের পিছু নিতে হয়েছিল। দেরিটা সেই কারণেই।’
‘এমন কি গুরুত্বপূর্ণ কথা যে তাদের পিছু নিতে হল, সেটা কি বলা যায় স্যার?’ সাজনা সিংহাল বলল।
‘ওদের কথোপকথনের মধ্যে ‘হাজী আবদুল্লাহ’ নাম শুনতে পেয়েছিলাম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি। ধন্যবাদ।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘পিছু নেয়ার রেজাল্ট কি হল, সেটা কি বলা যায় ভাই সাহেব?’ বলল অরূপ সিংহাল।
‘অবশ্যই। পিছু নিয়ে ওদের সব কথা শুনেছি। তার মধ্যে আমার জন্যে কথাটা ছিল হাজী আবদুল্লাহকে যেখানে রেখেছে, তারা সেখানকার পাহারাদার। সেখানেই তারা যাচ্ছিল। আমি ওদের সাথে শেষ পর্যন্ত গিয়ে বাড়িটা দেখে এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে হাজী সাহেবকে যেখানে বন্দী করে রাখা হয়েছে, সে জায়গাটা দেখে এসেছেন। থ্যাংকস গড।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘হ্যাঁ, যা বুঝেছি, যা শুনেছি, তা যদি সত্য হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে স্যার, আজ রাতেই আপনার দ্বিতীয় অভিযান।’ বলল সাজনা সিংহাল। নাস্তার মধ্যেই কথা চলছিল।
সাজনার কথার জবাবে কিছু না বলে হাসল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, আপনি হাসছেন। আমি যেখানে বন্দী ছিলাম সে বন্দীখানায় আপনার ঢোকার আগের ঘটনা মনে হলে এখনও আমার গা কাঁপে। আমার কক্ষের পাঁচ প্রহরী আপনার গুলীতে মরল। ওরাও তো আপনার আগেই আপনাকে গুলী করেছিল, সে গুলী যদি আপনার লাগত! আপনার সেসব কথা মনে পড়ে না?’ বলল সুষমা রাও।
‘ওসব দুঃখের কথা মনে না পড়াই ভালো সুষমা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওটা তো শংকা, আতংক ও বীভৎসতার কথা, দুঃখ কোনটা?’ প্রশ্ন সুষমা রাওয়ের।
‘এখানে দুঃখটা হল পাঁচটা মেয়ের মৃত্যু মানে পাঁচটা পরিবারে দুঃখের পাহাড় নেমে আসা।’ আহমদ মুসা বলল।
টেবিলের সবাই আহমদ মুসার দিকে তাকাল। আহমদ মুসার ভারী কণ্ঠ তারা লক্ষ্য করল।
সঙ্গে সঙ্গে কেউ কথা বলল না। একটু পর অরূপ রতন সিংহাল বলল, ‘ভাই সাহেব, আপনার মন খুবই সংবেদনশীল। মানুষ, জীব নির্বিশেষে সকলের প্রতি আপনার ভালোবাসা দেখি। তাহলে আপনিই আবার কেমন করে কারও প্রতি গুলী চালাতে পারেন, যেমন ঐ পাঁচটি মেয়েকে মারলেন।’
আহমদ মুসার মুখে বিষণœতার একটা ছায়া নেমেছে। বলল, ‘আমার সামনে স্থির লক্ষ্য ছিল সুষমাকে উদ্ধার করা। এই পথে যে বাধাই আসুক তাকে সরিয়ে ফেলা। আমি আগে সুযোগ পেয়ে প্রুুষ পুলিশদের সংজ্ঞাহীন করে পথ পরিষ্কার করেছি। কিন্তু মেয়েগুলোর ক্ষেত্রে সে সুযোগ পাইনি। ওরাই আগে গুলী করেছে। ওদের না মারলে ওদের পরের গুলীতেই আমাকে মরতে হতো। আমি সুষমাকেও উদ্ধার করতে পারতাম না।’
‘ধন্যবাদ ভাই সাহেব। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। গোলাপ তুলতে গেলে কাঁটার ঘা সইতে হয়, পরীক্ষায় ভালো করতে হলে ভালো পড়ার কষ্ট, উপার্জন করতে হলে কাজ করার কষ্ট স্বীকার করতেই হয়। সুষমার মুক্তির মূল্য দেয়া তাদের জন্যে অবধারিত ছিল।’
‘ধন্যবাদ ভাই সাহেব’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। তার নাস্তা খাওয়া শেষ।
আহমদ মুসা তার ঘরের দিকে যাবার উদ্যোগ নিতেই সুরূপা সিংহাল হঠাৎ দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ভাই সাহেব, জরুরি খবর আছে। আপনি ড্রইং-এ একটু বসুন। আমরাও আসছি।’
ঔৎসুক্য, কৌতুহল আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল। ড্রইংরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, ‘সুখবরের শিরোনাম বলতে পারেন বোন।’
‘হ্যাঁ পারি।’ বলে একটু স্বর নামিয়ে সুরূপা বলল, দিল্লী থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আপনাকে টেলিফোন করেছিলেন। আপনি না থাকায়, আপনার মোবাইলে আমিই এ্যাটেন্ড করেছিলাম।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা গিয়ে ড্রইং রুমে বসল।
সবাই এল ড্রইংরুমে।
‘আবারও আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি যে আপনি টেলিফোনটি ধরেছিলেন। গত রাতে অনেক সময় ধরে তাকে টেলিফোনে পাওয়ার চেষ্টা করেছি। পাইনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অনেক রাতে গতকাল উনি ফেরেন। এসেই আপনার মেসেজ পান। অত রাতে টেলিফোন না করে সকালে টেলিফোন করেন। উনি ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আপনার কলের অপেক্ষা করবেন। এরপর ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্তু উনি ফ্রি থাকবেন।’
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়িতে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট, বেজেছে। আহমদ মুসা বলল, ‘বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবো না। এখনই টেলিফোনটা সেরে নেই।’
কথা শেষ করেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাম্বারে টেলিফোন করল।
রিংটোন তিনবার বেজে উঠতেই ওপার থেকে একটা ভারী গলা বলে উঠল, ‘গুড মর্নিং বিভেন বার্গম্যান। কেমন আছেন?’
‘গুড মর্নিং রবার্ট পাওয়েল। আমি ভালো আছি। আপনি কেমন?’
রবার্ট পাওয়েল নয়াদিল্লীস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত। আহমদ মুসার কথার উত্তরে সে বলল, ‘ভালো মি. বার্গম্যান। আমি আপনাকে খুঁজে হয়রান। আন্দামানে গিয়েও পাইনি। এদিকে বার বার আমাকে তাকিদ দিচ্ছে আপনাকে লোকেট করার। আন্দামানের খবরে উনি উদ্বিগ্ন।’
‘স্যরি। আন্দামানে যখন আপনি এসেছিলেন, তখন আমি পোর্ট ব্লেয়ার থেকে অনেক দূরে আহত হয়ে পড়েছিলাম। আপনি এখানে আসার খবর আমি ওখান থেকেই পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আপনার টেলিফোন নাম্বার তখন দিতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট আন্দামানের কোন খবরে উদ্বিগ্ন?’
‘মি. প্রেসিডেন্ট আমাকে আন্দামানের খবর নিয়মিত মনিটর করে পাঠাতে বলেছেন। আমি সেটা পাঠিয়ে যাচ্ছি। সম্প্রতি সেখানে রহস্যজনক নিহতের হার বেড়ে গেছে। যারা মারা যাচ্ছে তাদের প্রায় একশ ভাগই সিআইএ-এর তথ্যমতে ভারতের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘মহাসংঘে’র লোক। সিআইএ এ তথ্য দিয়েছে যে, মহাসংঘের বিপরীতে ‘বিভেন বার্গম্যান’ নামে একজন লোক কাজ করছে। এর বেশি সিআইএ আর কোন তথ্য দিতে পারেনি। মি. প্রেসিডেন্ট সেখানকার প্রকৃত অবস্থা কি জানতে চান আপনার কাছ থেকে। কোন সাহায্য আপনার দরকার কিনা জানতে চেয়েছেন।’
‘ধন্যবাদ মি. এ্যামবেসডর। আপনি আন্দামানের খোঁজ রাখছেন এজন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। পরিস্থিতি এখনো আরও জটিলই রয়েছে। বিশেষ করে মুসলমানদের বিশেষ কম্যুনিটির লোক যে পরিকল্পিতভাবে নিহত হচ্ছিল, সেটা বন্ধ হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারী সংগঠনের লোকরাই এখন নিহত হচ্ছে। তবে সমস্যার জটিলতা তাতে কমেনি। প্রধানত যাকে উদ্ধার করতে আমার আন্দামানে আসা, তাকে উদ্ধার করা যায়নি। তার উপর কিডন্যাপ হয়েছেন হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ। আপনি সেটা জানেন। ‘মহাসংঘ’ সংগঠনটি ‘ডুবো পাহাড়ে’র মতই বিপজ্জনক। খোদ আন্দামানের গভর্নর এর সাথে জড়িত দেখে মনে হচ্ছে, সরকার এবং সরকারের রাজনৈতিক মহলে ‘মহাসংঘে’র শিকড় মজবুতভাবে বিস্তৃত। আর এরা কতটা বেপরোয়া তা বুঝা যায়, স্বয়ং গভর্নর তার নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করার ঘটনা থেকে। এই……….।’
আহমদ মুসার কথা আর অগ্রসর হতে পারলো না। এ্যামবেসেডর আহমদ মুসাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘তুমি নিশ্চিত যে, গভর্নর বিবি মাধব এ কাজ করেছিলেন? সিআইএ সূত্রও আমাকে এটাই জানিয়েছে।’
‘ইয়েস মি. এ্যামবেসেডর, গভর্নর বিবি মাধবের মেয়ে সুষমা রাও-ও এ ব্যাপারে নিশ্চিত। আমি তো নিশ্চিত অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার শেষ বাক্যটার রেশ মেলাবার আগেই এ্যামবেসেডর দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘কিন্তু বিবি মাধব নিজের মেয়েকে কেন কিডন্যাপ করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সিআইএ দিতে পারেনি।’
‘মি. এ্যামবেসেডর, যে কারণে বিবি মাধব বা মহাসংঘ শাহ আলমগীরের মা-বোনকে কিডন্যাপ করেছিল, সেই একই কারণে সুষমা রাওকে তারা কিডন্যাপ করেন। আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোন হাতছাড়া হয়ে যাবার পর সুষমা রাওকে কিডন্যাপ করা হয়। সুষমা রাওকে আহমদ শাহ আলমগীরের সামনে হাজির করে তারা সুষমার উপর সব রকমের নির্যাতন চালিয়ে আহমদ শাহ আলমগীরকে মুখ খুলতে বাধ্য করতে চেয়েছিল। ওদের…….।’
আবারও আহমদ মুসাকে তার কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট পাওয়েল বলল, ‘বিবি মাধবও এত জঘন্য?’
‘মি. এ্যামবেসেডর, বিবি মাধব জঘন্য নয়, জঘন্য হল ‘মহাসংঘ’। এই ‘মহাসংঘ’ই মানুষকে অমানুষ বানাচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বলেছ মি. বার্গম্যান। তারা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে গুজরাটে যা করেছিল, সেই কাজই নিরবে আরও নিখুঁতভাবে, আরও সামগ্রিকভাবে করার কাজ তারা শুরু করেছে আন্দামান থেকে। একে আগে বাড়তে দেয়া যায় না। ভারত সরকারও নিশ্চয়ই একে আগে বাড়তে দেবে না। কিন্তু একটা কথা বলতো, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কি কথা বের করতে চায়?’
‘কি একটা বাক্স নাকি আহমদ শাহ আলমগীর কোথায় রেখেছে তা জানতে ও পেতে চায়। বাক্সে কি একটা দলিল ও আরও কিছু আছে। এর বেশি কিছু আমরা জানতে পারিনি এ্যামবেসেডর।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আহমদ শাহ আলশগীরের কাছে থাকা কাগজপত্র ওদের কাছে এত মূল্যবান হবে কেন? আহমদ শাহ আলমগীর কি গোপন কোন গোষ্ঠীর সাথে ছিল, যাদের কোন কাগজপত্র তার কাছে গচ্ছিত আছে?’ এ্যামবেসেডর বলল।
‘এমন কথা কেউ বলে না। এমন কোন সংগঠন আন্দামানে নেই।’
একটু থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘মি. এ্যামবেসেডর, আন্দামানে বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনারা কি করতে পারেন বলুন?’
‘আমরা অবশ্যই অনেক কিছুই করতে পারি। সবচেয়ে বড় যে কাজ করতে পারি সেটা হল ভারত সরকারকে গোটা বিষয় জানিয়ে তার কাছ থেকে প্রতিকার দাবী করা।’ বলল এ্যামবেসেডর রবার্ট পাওয়েল।
‘কি বলবেন আপনি?’
‘বলব ‘মহাসংঘে’র কথা। বলব আন্দামানে তাদের নির্মূল অভিযান, আহমদ শাহ আলমগীর ও হাজী আবদুল্লাহকে বন্দী করে রাখার কথা ইত্যাদি।’
কথা শেষ করেই এ্যামবেসেডর আবার দ্রুতকণ্ঠে বলে উঠল, ‘সুষমা রাও কি কোন ষ্টেটমেন্ট দিতে পারে?’
‘কাজে আসবে কি? আমি সুষমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখব। আমি মনে করি আপনি ভারত সরকারকে রাজি করাতে পারেন এবং ভারত সরকার সিবিআই-এর ভালো ইউনিটকে আন্দামানে পাঠাতে পারেন, তাহলে তারা হাজী আবদুল্লাহ ও আহমদ শাহ আলমগীরকে উদ্ধার করে হাতে-কলমে সব প্রমাণ করতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার পারার কথা বলছ কেন? স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। তুমি চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে তোমার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর শোন, আমার সব চুল সাদা হয়েছে। তুমি অনেক ছোট বলেই তোমাকে ‘তুমি’ বলেছি, কিছু মনে করো না। তাহলে কথার এখানেই শেষ বাই।’ বলল এ্যামবেসেডর রবার্ট পাওয়েল।
‘ধন্যবাদ মি. এ্যামবেসেডর। মি. প্রেসিডেন্টকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবেন। বাই।’ বলে মোবাইল অফ করে ফিরে এল সোফার দিকে। ধপ করে বসে পড়ল সোফায়।
পিন পতন নিস্তব্ধতার মধ্যে সুরূপা সিংহাল, সাজনা সিংহাল, অরূপ রতন সিংহাল ও সুষমা রাও আহমদ মুসার কথা শুনছিল। আহমদ মুসা যখন মোবাইল নিয়ে সরে যায়নি তখন কথা শোনা যেতে পারে বলে সবাই মনে করেছে।
আহমদ মুসা সোফায় বসতেই সাজনা সিংহাল বলল, ‘স্যার, টেলিফোনে ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দ কয়েকবার এসেছে। শেষে আপনি প্রেসিডেন্টকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। কোন প্রেসিডেন্ট? ভারতের?’
‘না সাজনা, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা আমরা বলেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
সাজনা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সুষমা রাও বলে উঠল, ‘আমাকে কি জিজ্ঞাসা করে দেখার কথা এ্যামবেসেডরকে বললেন ভাইয়া?’
‘তোমার ঘটনা সম্পর্কে তিনি তোমার কাছ থেকে একটা ষ্টেটমেন্ট চান।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন? তিনি কি করবেন?’ বলল সুষমা রাও।
‘তিনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট আন্দামানের ব্যাপারে ভারত সরকারকে বলবেন। তোমার ষ্টেটমেন্ট একটা দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অবশ্যই, আমি ষ্টেটমেন্ট দেব ভাইয়া।’
‘ঠিক আছে। তৈরি করে রাখ। তার বিশেষ টেলিফোনে আমি পাঠিয়ে দেব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ফ্যাক্সেও তো পাঠাতে পারেন।’ বলল সুষমা রাও।
‘না ফ্যাক্স, ই-মেইল, সাধারণ টেলিফোন কিছুই ব্যবহার করা যাবে না। অন্যেরা ধরে ফেলবে। ওটা মার্কিনীদের নিজস্ব চ্যানেলে পাঠাতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, আপনি যে সব কাজের কথা বললেন, সেসব কাজে কি তিনি ভারত সরকারকে বলে সাহায্য করাতে পারবেন?’ বলল সুষমা রাও।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বলাই যথেষ্ট। তার উপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে যদি একটা ইঙ্গিতও করেন, তাহলে দেখবে ভারতীয় আইন-শৃঙ্খলা এজেন্সী কিভাবে আন্দামানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চা এখন আর আমি খাচ্ছি না। এখনই একটু বেরুতে হবে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা তাকাল সাজনা সিংহালের দিকে। বলল, ‘দেখ, আমার পাগড়ী কোথায়?’
‘শিখ সাজার পাগড়ী তো? নিয়ে আসছি স্যার। ইস্ত্রি হয়ে আছে।’ বলেই দৌড় দিল সাজনা সিংহাল।
মুহূর্ত কয়েক পরেই সাজনা ইস্ত্রি করা পাগড়ী নিয়ে হাজির হল।
‘ধন্যবাদ, সাজনা।’
বলে পাগড়ী হাতে নিয়ে আহমদ মুসা তার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
আহমদ চলে গেলে সাজনা সিংহাল অরূপ রতন সিংহালের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, স্যারকে মার্কিন সরকার এত গুরুত্ব দেন কেন?’
‘দেবারই কথা সাজনা। বলা হয় আহমদ মুসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এক ষড়যন্ত্রের অক্টোপাস থেকে মুক্ত করে শান্তি, স্বচ্ছতা ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডার ফাদারসদের স্বপ্ন ছিল। তাই নতুন করে পুরাতনের স্বকীয় অবস্থানে ফিরে যাওয়া আমেরিকার বর্তমান নায়করা আহমদ মুসার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া স্বাভাবিক।’
‘খুব বড় বিষয়। আমি জানতাম না দুলাভাই, এত বড় পরিচয় তার! কিন্তু এই তুলনায় তাকে উপযুক্ত গুরুত্ব আমরা দিচ্ছি না।’ সাজনা বলল।
‘তাহলে এ বাড়িতে আর তাকে পাবে না। যতই ঝুঁকি থাক, সোজা গিয়ে হোটেলে উঠবেন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
সাজনার মুখ ম্লান হল। বলল, ‘তাহলে থাক বাবা বড় বড় ফর্মালিটি। উনি থাকছেন, সেটাই ভালো।’
বলে উঠে দাঁড়াল সাজনা সিংহাল। একটু পরে বলল, ‘চল সুষমা নিচে বাগানে যাই।’
সবাই উঠে দাঁড়াল।

সাগরের তীর ঘেষে দাঁড়ানো অভিজাত ‘সী ভিউ’ রেষ্টুরেন্ট। আহমদ মুসা সাগরের প্রান্তের একটা টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল।
আহমদ মুসা প্রায় নিয়মিতই এই সাগর তীরে আসে এবং এক সময় এই টেবিলে এসে বসে।
যথারীতিই একজন নিষ্ঠাবান শিখের পোশাক আহমদ মুসার দেহে।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আহমদ মুসা তাকিয়েছিল আন্দামান সাগরের স্থির কাল পানির দিকে।
তার টেবিলে তার মুখোমুখি আর একজন এসে বসল।
আহমদ মুসা সাগর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তার সামনে এসে বসা লোকটির দিকে তাকাল। তাকিয়েই চমকে উঠল আহমদ মুসা। সেদিন রিকশায় চড়ে যাওয়া এই লোকটিকেই অনুসরণ করে আহমদ মুসা হাজী আবদুল্লাহকে রাখা বন্দীখানায় পৌছেছিল। রিকশা চড়ে যাওয়ার সময় ওদের কথোপকথন থেকে এই লোকটির নাম শুনেছিল ‘হরিকিষাণ’। পরে ওখানে গিয়ে দেখেছিল হরিকিষাণ ঐ বন্দীখানার প্রহরা-ব্যবস্থার প্রধান। সম্ভবত সে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে থাকা ছাড়াও সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ‘মহাসংঘ’-এর প্রভাবশালী সদস্যও।
আহমদ মুসা তাকে চিনতে পেরেই সিদ্ধান্ত নিল লোকটিকে একটু বাজিয়ে দেখতে হবে। কিছু পাওয়া যেতেও পারে।
পরিচিত লোককে নতুন করে দেখছে এমন একটা ভাব নিয়ে আহমদ মুসা লোকটির উদ্দেশ্যে হিন্দী ভাষায় বলল, ‘হরিকিষাণজী, আপনি কেমন আছেন?’
হরিকিষাণ লোকটি ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে তার অপেক্ষা করছিল। আহমদ মুসার সম্বোধন শুনে সে ফিরে তাকাল। কিন্তু আহমদ মুসাকে চিনতে না পারায় একটা বিব্রত ভাব তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনি আমাকে চিনেন? কিন্তু আমি তো……….।’
‘চিনতে পারছেন না, এই তো?’ আহমদ মুসা হরিকিষাণের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল।
কথাটা শেষ করে আহমদ মুসা একটু থামল। পরক্ষণেই মুখে হাসি টেনে বলল, ‘কেন মনে পড়ছে না? ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোর’-এর বাড়িতে আমি আপনাকে দেখেছিলাম। আমি সাবেক জেনারেল জগজিত জয়রাম মহাগুরুর পক্ষ থেকে সেখানে গিয়েছিলাম হাজী আবদুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে।’
আসলে আহমদ মুসা জেনারেল জগজিত জয়রাম মহাগুরুকে চিনেই না। হরিকিষাণকে অনুসরণ করে সেদিন ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোরের ঘাঁটিতে গিয়ে আড়াল থেকে হরিকিষাণদের মুখেই ঐ জেনারেলের নাম এবং তার লোকদের আসার কথা শুনেছিল।
হরিকিষাণের মুখে লজ্জামিশ্রিত হাসি ফুটে উঠেছিল। সে বলল, ‘স্যরি, সেদিন ছিল রাত, আর আপনি হ্যাট পরেছিলেন। তাই চিনতে পারছিলাম না।’
তার অন্ধকারে ঢি ছোড়ার কৌশলটা কাজে লেগেছে দেখে আনন্দিত হল আহমদ মুসা।
‘তাই হবে। যাক, আপনারা কেমন আছেন? হাজী আবদুল্লাহর খবর কী?’
‘কেন, আপনি কিছু জানেন না?’
হরিকিষাণের কথায় মনে মনে উদ্বিগ্ন হল আহমদ মুসা। হাজী সাহেবের কিছু হয়নি তো! কিছু না জানার কথা বলছে কেন? ঘটেছে কি কিছু?
আহমদ মুসা হরিকিষাণের দিকে চোখ তুলে বলল, ‘আমি সেদিন ওখান থেকে ফিরেই কলকাতা গিয়েছিলাম, গত রাতে ফিরেছি। বিশেষ কিছু কি ঘটেছে?’
‘বড় কিছু ঘটেছে। বিপদ দেখা যাচ্ছে সামনে।’ বলে থামল হরিকিষাণ।
আরও উদ্বিগ্ন হল আহমদ মুসা। বলল, ‘কি ঘটেছে?’
‘সিবিআই তদন্তে আসছে। সম্ভবত হাজী সাহেবের পরিবার থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অভিযোগ গেছে যে, পুলিশ তাকে নিয়মমাফিক গ্রেফতার না করে বেআইনিভাবে লুকিয়ে রেখেছে। আমি সবকিছু জানি না। তবে আজই সিবিআই-এর শক্তিশালী টিম আসছে। আর সিবিআই গোয়েন্দারা নাকি ইতিমধ্যেই এসে গেছে।’
আহমদ মুসা মনে মনে খুশি হল। বুঝল যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাহলে এ্যাকশনে গেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা সরকারের চাপেই তাহলে এই ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
আহমদ মুসা কণ্ঠে কৃত্রিম ভয় নিয়ে বলল, ‘তাহলে এখন কি করা?’
‘সে চিন্তা উপর ওয়ালারা করছে। আজ হাজী আবদুল্লাহকে সরিয়ে ফেলা হবে। বন্দীখানা থেকে বের করে নিয়ে হাত-পা বেঁধে নৌকায় তুলে মাঝ সাগরে ডুবিয়ে দেয়া হবে।’
চমকে উঠল আহমদ মুসা। কিন্তু নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বলল, ‘সিবিআই-এর হাতে ধরা পড়া থেকে বাঁচার এটাই উপায়। আপনার তো তাহলে অনেক দায়িত্ব মি. হরিকিষাণ। হাজী আবদুল্লাহকে সরাবার দায়িত্ব তো আপনাকেই নিতে হবে।’
আহমদ মুসা চাইল তাদের পরিকল্পনার বিস্তারিতটা জানতে।
আহমদ মুসার কথার জবাবে হরিকিষাণ বলল, ‘আমার দায়িত্ব ঐ বাড়ি পাহারা দেয়া। ঐ অপারেশনের জন্যে লোক পাঠানো হবে পোর্ট ব্লেয়ার হেড অফিস থেকে। রাত ৩টার দিকে পানি সাপ্লাই সংস্থার ওয়াটার ক্যারিয়ার নিয়ে তারা আসবে।’
‘সিবিআই-এর গোয়েন্দা আগেই এসেছে বললেন, ওরা কিছু টের পাবে না তো?’ বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠে কৃত্রিম উদ্বেগ।
‘হ্যাঁ, ওরা ইতিমধ্যেই এসেছে শুনেছি। কিন্তু ওরা আমাদের গোপন বন্দীখানার সন্ধান পাবে কি করে? অতএব ভয়ের কিছু নেই।’
‘ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন। আপনি কখন যাচ্ছেন ডিউটিতে?’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল আহমদ মুসা।
‘সারদিন যাচ্ছি না। রাত ৮টার দিকে যাব।’
‘ওকে, হরিকিষাণ। আসি। বাই।’ বলল আহমদ মুসা।
বেরিয়ে এল আহমদ মুসা রেষ্টুরেন্ট থেকে।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। ঠিক সময়েই সে সবকিছু জানতে পেরেছে। অবশ্যই হাজী সাহেবকে বাঁচাতে হবে। ওদের হাত থেকে হাজী সাহেবকে ছিনিয়ে নেয়ার চেয়ে ওরা রাত ৩টায় বন্দীখানায় পৌছার আগেই তাকে সরিয়ে নেয়া অনেক সহজ হবে।
কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল হাজী সাহেবকে সে উদ্ধার করলে তাকে যে আন্দামান সরকার ‘মহাসংঘে’র সাথে মিলে আটক করেছিল, তা প্রমাণ করার পথ থাকবে না এবং মহাসংঘে’র সাথে আন্দামান সরকারের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি প্রমাণ করার একটা সুযোগ হাতছাড়া হবে। আহমদ মুসা চিন্তা করে দেখেছে, হাজী আবদুল্লাহ ও আহমদ শাহ আলমগীরকে উদ্ধার করা এবং মহাসংঘে’র কিছু লোক ক্ষয় হওয়া সমস্যার সমাধান নয়। সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী সংগঠন ‘মহাসংঘ’ যদি টিকে থাকে, তাদের কাজ করার সুযোগ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভারতের প্রশাসনযন্ত্রে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বাড়বে এবং বর্তমানের মত সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতি আরও বৃদ্ধি পাবে। এক হাজী আবদুল্লাহ ও আহমদ আলমগীরকে উদ্ধার করলেও আরও শত শত হাজী আবদুল্লাহ ও আহমদ শাহ আলমগীরকে তারা কব্জা করবে। সুতরাং প্রয়োজন এই সন্ত্রাসী সংগঠনের সমূলে উচ্ছেদ। আর এই কাজ শুধু করতে পারে ভারত সরকারই। এজন্যে প্রয়োজন মহাসংঘকে ভারত সরকারের কাছে হাতে-নাতে ধরিয়ে দেয়া। এর একটা সুযোগ তার হাতে এসেছে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার অবশ্যই তাকে করতে হবে।
হাজী আবদুল্লাহকে উদ্ধার করে নিজেদের গোপন আশ্রয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টাল আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গেই যে চিন্তাটা এসে আহমদ মুসার মাথায় ভর করল সেটা হল, কিভাবে হাজী আবদুল্লাহ ওদের হাতে থাকা অবস্থায় ওদেরকে সিবিআই-এর হাতে ধরিয়ে দেবে? সিবিআই-এর গোয়েন্দারা যারা এসেছে তাদেরকে হাজী আবদুল্লাহর বন্দী থাকার অবস্থানটা জানিয়ে দিতে পারলেই কাজ হয়ে যেত। কিন্তু সেটা কিভাবে? ওদের কোন কিছুই তো তার জানা নেই।
আহমদ মুসা বাসার দিকে হাঁটছিল। তার মাথার মধ্যে তখন তোলপাড় করছিল এসব চিন্তা। হঠাৎ তার মনে পড়লো দিল্লীস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে।
আহমদ মুসা পকেটে হাত দিল সঙ্গে সঙ্গেই। না পকেটে মোবাইল নেই। মর্নিং ওয়াকের সময় সাধারনত সে মোবাইল পকেটে নেয় না। সেই সিলসিলায় আজও মোবাইল তার সাথে নেই।
আহমদ মুসা হাঁটার গতি দ্রুত করল।
ঊাসার গেটে এসে পৌছাতেই দেখল, দু’তলার ব্যালকনি থেকে সাজনা সিংহাল তাকে ব্যস্ত হয়ে ডাকছে। আহমদ মুসা দৌড় দিল।
এক তলার ড্রইংরুমে প্রবেশ করেই দেখতে পেল হাতে মোবাইল নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে সুরূপা সিংহাল।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা তার হাত থেকে মোবাইল নিল।
‘এক্সেলেন্সী মি. রবার্ট পাওয়েল। মার্কিন রাষ্ট্রদূত।’ মোবাইলটি আহমদ মুসার হাতে দিতে দিতে ফিসফিসে কণ্ঠে বলল সুরূপা সিংহাল।
আহমদ মুসা মোবাইলটি কানে তুলে নিয়েই শুনল, ‘গুড মর্নিং বিভেন বার্গম্যান। কেমন আছ? তোমার কাজ হয়ে গেছে। সিবিআই ও অন্যান্য গোয়েন্দারা মুভ করেছে।’ বলল ওপার থেকে রাষ্ট্রদূত।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি কিছুটা জানতে পেরেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিভাবে?’ বলল ওপার থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তার কণ্ঠে বিস্ময়।
‘আকস্মিক এক সুযোগ পেয়ে গোপন ‘মহাসংঘেষ্ফর একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম, সিবিআই অপারেশন ইফনিট আসছে, গোয়েন্দা ইউনিট অলরেডি এসে গেছে।’
‘কিন্তু ওরা জানল কি করে? এই উদ্যোগ তো খুবই গোপনে চলছে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এ বিষয়টার তত্ত্বাবধান করছেন।’
‘তাহলে সিবিআই-এর শীর্ষ পর্যায়ে কোথায় ওদের লোক আছে নিশ্চয়?’
‘সাংঘাতিক ব্যাপার। বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীকে তাহলে জানাতে হয়।’
বলে একটা দম নিয়েই মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট পাওয়েল বলল, ‘শোন তোমাকে যে জন্যে টেলিফোন করেছি। তোমাকে একটা বিশেষ মোবাইল নাম্বার দিচ্ছি। সেটা আন্দামানে যাওয়া সিবিআই অপারেশন চীফের। তার সাথে যোগাযোগ রাখবে। তোমার ‘বিভেন বার্গম্যান’ নাম সে জানে। তোমার সাহায্য তাদের প্রয়োজন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমার মাধ্যমে তোমাকে এ অনুরোধ করেছেন।’
কথা শেষ করেই বিশেষ মোবাইল নাম্বারটি বলল মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
আহমদ মুসা নাম্বারটি লিখে নিয়ে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ মি. এ্যামবেসেডর। এই নাম্বারের চেয়ে বেশি মূল্যবান এই মূহুর্তে আমার কাছে আর কিছু নেই। এই সুযোগ হাতে পাওয়ার জন্যে আমি আপনাকে টেলিফোন করতে যাচ্ছিলাম। আপনি টেলিফোন না করলে এতক্ষণে আমার টেলিফোন পেয়ে যেতেন।’
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ঈশ্বর তোমাকে সাহায্য করুন।’ বলল মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
‘একটা বিষয়, সিবিআই অপারেশন টীম কখন আন্দামানে পৌছেছে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ধাজ সন্ধ্যা নাগাদ পৌছেছে বলে আমি জানি।’
‘এই সময়-সূচী ঠিক থাকা খুব জরুরি স্যার। এর চেয়ে যেন দেরি না হয়।’
‘কেন? কোন সমস্যা আছে?’
‘ইয়েস মি. এ্যামবেসেডর। আজ মধ্যরাতের দিকে সিবিআই এ্যাকশনে আসার আগেই হাজী সাহেবকে হত্যা করে তারা তাকে বেআইনিভাবে বন্দী করে রাখার দায় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায়।’
‘সর্বনাশ। তাহলে এখন প্রধানমন্ত্রীকে আমি বলছি যে, তাদের অবশ্যই সন্ধ্যার মধ্যে আন্দামানে পৌছাতে হবে। কিন্তু পৌছে অল্প সময়ের মধ্যে কি তারা কিছু করতে পারবে?’ বলল রবার্ট পাওয়েল। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘সেটা আমার উপর ছেড়ে দিন মি. এ্যামবেসেডর।’
‘স্যরি। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি আহমদ মুসা। ধন্যবাদ তোমাকে।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’
‘ঈশ্বর তোমাকে সাহায্য করুন। বাই।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করে মোবাইলটা পাশের সোফায় ছুড়ে দিয়ে নিজেও ধপ করে বসে পড়ল সোফার উপর। তারপর দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিল। তার মুখে স্বস্তির একটা আনন্দ।
উপরে দু’তলার ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে সুষমা রাও ও সাজনা সিংহাল এবং সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে সুরূপা সিংহাল আহমদ মুসার কথা শুনছিল। তারা বুঝল আজ রাতে ভয়ানক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। হাজী সাহেবের জীবনও বিপন্ন। তবে আহমদ মুসার মুখে স্বস্তি দেখে তারা আবার আশান্বিত হল। সুষমা রাও, সাজনা সিংহাল সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এল নিচে। আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া আপনার কথা শুনে আমরা আতংকিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আপনি আশংকা-আতংকের মত কিছুই যেন বলেননি।’
আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘সুষমা, বলা যায় আমি আন্দামানে এতদিন একাই লড়াই করেছি। মনে হয় এবার এই লড়াইয়ে সিবিআই তথা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে শামিল করতে পারছি। এ কারণেই আশংকার মধ্যে আমার এই আনন্দ।’
সুষমাসহ ওদের মুখেও স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। সুষমাই বলল, ‘হাজী আংকল নিরাপদ হবেন তো?’
গম্ভীর হল আহমদ মুসা। বলল, ‘নিরাপত্তা দেয়ার এষতিয়ার শুধুই আল্লাহর হাতে। কোন মানুষ ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছুই বলতে পারে না বোন।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘যাই, গোসল সেরে নাস্তা খেয়ে লম্বা আরেকটা ঘুম দেব।’
সিঁড়িতে কয়েক ধাপ উঠে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা সাজনাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি একটু দেখবে সাজনা মোটর সাইকেলটা ঠিক-ঠাক আছে কিনা, পুরো ট্যাংক তেল ভরেছে কিনা এবং সাইলেন্সার ঠিকমত লাগিয়েছে কিনা।’ বলেই আবার ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তারপর সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে উঠে গেল দুতলায়।
সুরূপা সিংহাল, সাজনা সিংহাল ও সুষমা রাও তিন জন এসে বসল সোফায়। তিনজনই গা এলিয়ে দিল সোফায়।
চোখ বন্ধ করেছিল সাজনা। চোখ বন্ধ করেই বলল, ‘মনে হচ্ছে দীর্ঘ এক স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলছি আমি।’
সুষমাও ঐভাবে চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিল। বলল, ‘স্বপ্নও এত সুন্দর, এত দীর্ঘ, এত থ্রিলিং হয় না সাজনা।’
‘তুমি খুব ভাগ্যবান সুষমা। এই সুন্দর, এই দীর্ঘ এবং থ্রিলিং স্বপ্নের তুমি একটা বড় অংশ। নায়ক আহমদ শাহ আলমগীর শত্রুর কবলে, তোমার এখন বুক ভরা দুঃখ। কিন্তু আমি নিশ্চিত, নায়ক নায়িকার বুকে ফিরে আসবেই। স্বপ্নের থ্রিল তো তোমাকে ঘিরেই।’
‘থ্রিল দেখলে, থ্রিলের মূল্যটা দেখেছে? আহমদ শাহ আলমগীর কি অবস্থায় কে জানে! নিজের পিতা হয়ে গেল আমার জন্য বিপজ্জনক। মা ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।’ বলল সুষমা রাও। তার কণ্ঠ ভারী। চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠেছে।
তার পাশেই বসেছিল সুরূপা সিংহাল। সে সুষমা রাওয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ধৈর্য ধরতে হবে বোন। দেখ না সুস্মিতা বালাজীকে। সে প্রায় ২০ বছর ধরে বনবাসে। আমাদের হাসি-কান্না সবই আমাদের জীবনের এক একটি দাবী হিসেবে আসে। জীবন-নাট্যের এক মহানায়ক আহমদ মুসার কথাই একবার ভেবে দেখ না। আহমদ শাহ আলমগীর তার কে? আন্দামানের যে লোকগুলোকে সে বাঁচাতে এসেছে, তারা তার কে? কেউ না। দেখ এদের জন্যেই তিনি বাড়ি-ঘর, স্ত্রী-পুত্র থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়েছেন শুধু নয়, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন কয়েকবার। এই যে মৃত্যুর মুখে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তিনি কি জানেন যে তিনি ফিরে আসবেন। ফিরে আসা, না আসা দুটোকে মেনে নিয়েই তিনি সামনে অগ্রসর হন। এটা আকাশস্পর্শী ভারী সিদ্ধান্ত। চূড়ান্ত কোরবানী এটা। জীবনেরই এক দাবী হিসেবে একে তিনি নিজের জীবনের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন।’ থামল সুরূপা সিংহাল।
সুষমা রাও ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ আপা। জীবনের জন্যে সুখের মত দুঃখও একটি বাস্তবতা। কিন্তু আপা তুমি একজন দেবতার উদাহরণ এনেছ। দেবতার এবং মানুষের শক্তি তো এক নয় আপা। আহমদ মুসা দেবতার মতই স্বপ্নের নায়ক, কল্পনার নায়ক, আমরা মাটির মানুষ তাঁকে শুধু নমষ্কারই করতে পারি, সমকক্ষ হতে পারি না। দেখলে তো মাত্র ক’ঘণ্টা পরে রাতে এক জীবন-মরণ লড়াইয়ে নামার আগে উনি দীর্ঘ ঘুম দিতে গেলেন। বাড়ির কথা, স্ত্রীর কথা, সন্তানের কথা, নিজের জীবনের কথা মনে পড়লে এমন নিশ্চিন্ত থাকা কি কারও পক্ষে সম্ভব!’ থামল সুষমা রাও।
সুরূপা সিংহাল বলল, ‘উনি দেবতা নন সুষমা। উনি মাটির মানুষ। আর সত্যিকার মানুষ দেবতার চেয়ে বড় হন। মুসলমান ধর্মের ইতিহাসে পড়েছ যে, ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টির পর তার ফিরিশতা অর্থাৎ এ্যাঞ্জেলদের মানুষকে সিজদা করতে বলেছিলেন। ঈশ্বরের পর মানুষের চেয়ে বড় কেউ নেই। একজন কবি বলেছেন, ‘আপনার লয়ে বিব্রত থাকিতে আসেনি কেহ অবনি পরে।’ সকলে যখন সবার তরে হয়, তখন সমাজ হয় সোনার সমাজ। আহমদ মুসারা সোনার সমাজের সোনার টুকরো।’
‘একটা কথা আপা, তোমার এ সোনার টুকরো’র পরিচয় কিন্তু তোমাদের দেখা ‘ভালো মানুষ’দের সাথে মিলে না। আমাদের ইতিহাসের ‘ভালো মানুষরা’ ‘অহিংসা পরমধর্ম’, সর্বজীবে দয়া’র অনুসারী, তারা সমাজের সংঘাত থেকে দূরে থেকে নিরিবিলি নিরুপদ্রব জীবন যাপন করতে চান এবং নিজেরা ভালো থেকে মানুষকে ভালো থাকার উপদেশ দেন। কিন্তু আহমদ মুসা মানুষকে শুধু ভালো থাকা নয়, ভালো হতে বলা নয়, মন্দের প্রতিরোধ এবং মজলুমের পক্ষে লড়াইয়েও নামেন। আপা, এই দুই ভালোর মধ্যে আসলে ভালো কোনটা?’
‘আহমদ মুসাই আসল ভালো’র প্রতীক । আমাদের কবি বলেছেন না যে, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করা অন্যায়-অত্যাচার করার মতই পাপ। শুধু ভালো করা নয়, মন্দের আক্রমণ থেকেও মানুষকে বাঁচাতে হবে। আহমদ মুসা দুই কাজই করেন।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
সঙ্গে সঙ্গেই সাজনা বলে উঠল, ‘জুলুমের প্রতিকার, জালেমের বিচার করা আইনের কাজ, রাষ্ট্রের কাজ। কেউ নিজে এর প্রতিকার বা বিচারের নামে যা করবে সেটা কি অবৈধ এবং আইনের প্রতি হস্তক্ষেপ হবে না?’
‘জুলুম, জালেমের বিচার করা রাষ্ট্রের কাজ, আইনের কাজ। কিন্তু জালেমের হাত থেকে, জালেমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করা যে কোন ব্যক্তির কাজ। যেমন কেউ কাউকে নির্যাতন করছে, যাকে নির্যাতন করা হচ্ছে আর যারা এই দৃশ্য দেখছে তাদের প্রত্যেকের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে মজলুমকে রক্ষা করা তারপর জালেমকে আইনের হাতে তুলে দেয়া।’ বলল সুরূপা সিংহাল।
‘কিন্তু মজলুমকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি জালেমকে আঘাত করতে হয়, সেটা কি তাহলে আইন হাতে তুলে নেয়া হবে না?’ জিজ্ঞেস করল সাজনা।
‘মজলুমকে তাৎক্ষণিক রক্ষার জন্যে যতটুকু করার প্রয়োজন পড়ে, সেটা অবশ্যই আইন হাতে তুলে নেয়ার মধ্যে পড়বে না। কিন্তু মজলুমকে রক্ষা করার পর ক্রুব্ধ হয়ে বা প্রতিশোধ বশত জালেমের উপর বাড়তি যা কিছুই করা হোক- তা আইন হাতে তুলে নেয়ার বা নিজে বিচারক সাজার মত অপরাধমূলক কাজ হবে।’ সুরূপা সিংহাল বলল।
সুরূপা সিংহালের কথা শেষ হতেই সুষমা রাও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ সুরূপা আপা। আপনি আহমদ মুসাকে যতটা ডিফাইন করেছেন, আহমদ মুসা নিজেও বোধ হয় এভাবে নিজেকে ডিফেন্ড করেন না। ধন্যবাদ আপনাকে। এবার চলুন, নিশ্চয় ভাইয়া গোসল সেরে বেরিয়েছেন।’
উঠে দাঁড়াল সুরূপা সিংহাল ও সাজনা সিংহাল দুজনেই।
উঠতে উঠতে সাজনা সিংহাল বলল, ‘চল আহমদ মুসা ভাইয়ার কাছ থেকে সুরূপা আপার ওকালতির ফি আদায় করব।’
হেসে উঠল সাজনা সিংহাল ও সুষমা রাও দুজনেই।
সুরূপা সিংহালও হাসল। বলল, ‘অন্তত তোমরা যে এটুকু মনে করেছ আমি আহমদ মুসার উকিল হতে পারি, এটাও আমার জন্যে সৌভাগ্যের।’
বলেই দু’হাতে দুজনের গলা জড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত দোতলায় উঠতে লাগল।

ঠিক রাত ২টা ৪৫ মিনিটে আট সিটের একটা ল্যান্ড ক্রুজার জীপ ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোর থেকে প্রায় তিনশ গজ দূরে মিডল পোর্ট রোডের পাশে এক ঝোপের অন্ধকারে এসে দাঁড়াল। জলপাই রঙের জীপটি অন্ধকারে একদম মিশে গেল। জীপে আটজন আরোহী। পেছনে তিন তিন করে ছয় জন। আর সামনে দুজন। ড্রাইভিং সিটে একজন তার পাশের সিটে একজন। জীপটি সিবিআই-এর।
ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া। সিবিআই অফিসার।
জীপটি দাঁড়াতেই মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া গলায় ঝুলানো নাইট ভিশন দুরবিন দ্রুত চোখে লাগাল।
দূরবিনের দুচোখ ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোরের দিকে। সামনের গোটা রাস্তাসহ মেডিকেল ষ্টোরের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া। দেখল গাড়ি বারান্দা এলাকায় দুটি ওয়াটার ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। খুশি হল মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া। বিভেন বার্গম্যানের দেয়া তথ্য অনুসারে ওয়াটার ক্যারিয়ারে করে হাজী আবদুল্লাহকে হত্যা করার জন্যে নিয়ে যাওয়া হবে।
মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লেফটেন্যান্ট শিকার আমাদের ঠিক জায়গায় রয়েছে। ঠিক সময়েই আমরা এসেছি।’
মেজর সুরজিতের জীপটি দাঁড়াবার তিন মিনিটের মধ্যে অনুরূপ আরেকটা জীপ এসে পঞ্চাশ গজ পেছনে দাঁড়াল।
এ জীপেও আটজন আরোহী।
এ জীপের পাশের সিটে রয়েছে কর্নেল সুরেন্দ্র সিং।
জীপ থামতেই সে অয়্যারলেস তুলে নিয়ে বলল, ‘সুরজিত সব ঠিক ঠাক আছে?’
‘জি স্যার। আমরা ঠিক সময়ে এসেছি। ওল্ড মেডিকেল ষ্টোর বাড়িটির গাড়ি বারান্দা এলাকায় দুটি ওয়াটার ক্যারিয়ার দেখতে পাচ্ছি।’ বলল মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া।
‘ওকে। বিভেন বার্গম্যানও তো বলেছে ওয়াটার ক্যারিয়ারে করেই হাজী আবদুল্লাহকে পাচার করা হবে।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র সিং।
‘ইয়েস স্যার।’
‘ওদিকে চোখ রেখ। ওদের গাড়ি মুভ করলেই আমরা অগ্রসর হবো। সামনে চৌমাথার মুখেই ওদের আটকাতে হবে।’
‘ইয়েস স্যার।’
‘ধন্যবাদ। বাই।’
বলেই অয়্যারলেসের লাইনটা কাট করে আরেকটা লাইনের নব পুশ করল কর্নেল সুরেন্দ্র সিং।
অয়্যারলেসে সঙ্গে সঙ্গেই একটা কণ্ঠ ভেসে উঠল, ‘ইয়েস স্যার, আমি শংকর।’
‘তোমরা বাড়ির পেছনে ঠিকভাবে পজিশন নিতে পেরেছ?’
‘জি স্যার। পেছন দিয়ে কেউ পালাতে পারবে না।’
‘ওকে, সব দিকে ঠিকভাবে নজর রাখ। বাই।’
বলে কর্নেল সুরেন্দ্র সিং লাইনটা অফ করে দিল।
রাত ২ টা ৫৫ মিনিট। কর্নেল সুরেন্দ্র সিং এর অয়্যারলেস টেলিফোন আবার বেজে উঠল।
‘হ্যালো, কর্নেল সুরেন্দ্র বলছি।’ টকিং লাইন অন করেই বলল কর্নেল সুরেন্দ্র সিং।
ওপার থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘ইয়েস, আমি বিভেন বার্গম্যান। আপনাদের উপস্থিতি ওদের কাছে ধরা পড়ে গেছে। ওরা মুভ করেছে। আপনাদের প্রতিরোধ ও হাজী আবদুল্লাহকে নিয়ে পালানোর কাজ একই সাথে করবে ওরা। ওকে। বাই।’
ওপার থেকে অয়্যারলেস টেলিফোন লাইন কেটে গেল। কর্নেল সুরেন্দ্র সিং ধন্যবাদও দিতে পারল না।
সঙ্গে সঙ্গেই কর্নেল সুরেন্দ্র সিং পুশ করল সুরজিতের লাইন।
‘হ্যালো, সুরজিত!’ ওপার থেকে সাড়া দিল।
‘ইয়েস, কর্নেল সুরেন্দ্র বলছি। ওরা টের পেয়েছে। মুভ! বেরুবার রাস্তা ওদের ব্লক করো।’ নির্দেশ দিল কর্নেল সুরেন্দ্র।
কর্নেল সুরেন্দ্রের কথা শেষ হবার পরবর্তী দুই তিন সেকেন্ডের মধ্যেই একটা বোমা বিস্ফোরিত হল মেজর সুরজিতের গাড়ির উপর।
কর্নেল সুরেন্দ্রর ‘মুভ’ শব্দ উচ্চারিত হবার সাথে মেজর সুরজিত ড্রাইভার লেফটেন্যান্ট বরুনকে ‘মুভ’ করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। বোমা যখন পড়ল তখন কয়েক গজ ‘মুভ’ করেছে মেজর সুরজিতের জীপ। সুতরাং বোমাটা গিয়ে সরাসরি আঘাত করল জীপের গজ চারেক পেছনের মাটিকে। আঘাতের ধ্বংসাত্মক একটা ঢেউ এসে আঘাত করল জীপের পেছনে। প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল জীপ। শেষ পর্যন্ত উল্টে গেল না। কিন্তু আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েছে পেছনের তিন জন সাথী।
পেছনে না তাকিয়েই মেজর সুরজিত পেছনের উদ্দেশ্যে বলল, ‘যারা ভালো আছ তারা সাথীদের দেখ।’ আর ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মুভ অন লেফটেন্যান্ট। চৌমাথার মুখে পৌছাতে হবে।’
ওদিকে বোমা বিস্ফোরিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই এদিকে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হল। এক পশলা ব্রাশ ফায়ারের শব্দ, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটু পরে আরেক পশলা ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হল এবং তার প্রায় সাথে সাথেই আরেকটা বোমা বিস্ফোরণের শব্দ হল কর্নেল সুরেন্দ্রের জীপের আট দশ গজ দূরে।
কর্নেল সুরেন্দ্রের জীপ তখন এগিয়েছিল মুভ করার জন্যে। প্রথম বোমা বিস্ফোরণের পরে মুহূর্তের জন্যে থমকে গিয়েছিল কর্নেল সুরেন্দ্রের জীপের ষ্টার্ট।
কর্নেল সুরেন্দ্রের মুখের সামনে অয়্যারলেস। সে চিৎকার করছিল, ‘মেজর সুরজিত হ্যালো, হ্যালো, মেজর সুরজিত।’
অয়্যারলেস হাতে থাকলেও বোমার ধাক্কা সামলানো, করণীয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেয়া ইত্যাদি চিন্তা করতে গিয়ে কর্নেল সুরেন্দ্রের কল এ্যাটেন্ড করতে পারেনি মেজর সুরজিত। প্রথম সুযোগেই অয়্যারলেস মুখের কাছে নিয়ে মেজর সুরজিত বলল, ‘ইয়েস মেজর। কয়েকজন লোকসহ আমাদের গাড়ির পেছনটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা এগোচ্ছি স্যার। আপনারা ওকে স্যার? দ্বিতীয় বোমার কি অবস্থা?’
‘বেভ বয়, মুভ। দ্বিতীয় বোমা আমাদের পর্যন্ত পৌছার আগেই বিস্ফোরিত হয়েছে। ব্রাশ ফায়ার তো নিশ্চয় তোমরা করনি। বেশ একটু দূরত্বে মানে বোমারুদের অবস্থান যেখানে ছিল, সেখান থেকে ব্রাশ ফায়ার হয়েছে।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘ঠিক তাই স্যার। তাহলে স্যার ব্রাশ ফায়ার আপনাদের গাড়ি থেকেও হয়নি?’ বলল মেজর সুরজিত।
‘অবশ্যই না।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘তাহলে?’ প্রশ্ন ফের সুরজিতের। ভাবছিল, হিসেব মেলাচ্ছিল কর্নেল সুরেন্দ্র। বলল, ‘ব্রাশ ফায়ার বিভেন বার্গম্যানের। প্রতিরোধ তত্ত্ব অনুযায়ী একটি করে নয়- বোমা আরও আসা উচিত ছিল। বিভেন বার্গম্যানের ব্রাশ ফায়ার আক্রমণকারীদের হত্যা করেছে।’
কর্নেল সুরেন্দ্রের কথা শেষ হতেই মেজর সুরজিত বলল, ‘স্যার দুটি ওয়াটার ক্যারিয়ারই ছুটে আসছে।’
‘চৌমাথা পর্যন্ত আসেনি নিশ্চয়।’
‘না স্যার।’
‘চৌমাথা দখল কর। তারপর আরও সামনে এগোও।’
মেজর সুরজিতের গাড়ি তখনও চৌমাথা থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে। কিন্তু চৌমাথা থেকে ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোরের দূরত্ব মোট ৫০ গজের বেশি নয়। ওয়াটার ক্যারিয়ার দুটো ইতিমধ্যেই ২৫ গজ পার হয়ে এসেছে। সুতরাং চৌমাথা থেকে তারা মাত্র পঁচিশ গজ দূরে। আর তারা আসছে মরণপণ গতিতে।
মেজর সুরজিতের গাড়ি যখন ১০ গজের মাথায় পৌছেছে, তখন প্রচ- বেগে একটা ওয়াটার ক্যারিয়ার এসে তার রাস্তার মুখে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে গেল এবং পরক্ষণেই তাতে জ্বলে উঠল আগুন। আর তার সাথে দ্বিতীয় ওয়াটার ক্যারিয়ারটি চৌমাথায় এসে বাঁক নিয়েই দক্ষিণের রাস্তা ধরে দ্রুত এগিয়ে চলল।
চৌমাথা থেকে উত্তর-দক্ষিণে যে রাস্তা বেরিয়ে গেছে তার নাম ‘সী এন্ড লেক রোড’। মানুষ সংক্ষেপে একে ‘সী লেক রোড’ বলে ডাকে। রাস্তার উত্তর প্রান্ত পোর্ট ব্লেয়ার লেক পর্যন্ত গেছে, আর দক্ষিণ মাথা এঁকে-বেঁকে সাগর তীরে গিয়ে শেষ হয়েছে। মেজর সুরজিতের জীপ দাঁড়িয়ে গেল।
রাস্তার দুধারেই সেখানে গভীর খাদ। বিশাল ওয়াটার ক্যারিয়ার পাশ কাটিয়ে সামনে এগোবার কোন উপায় নেই। তার উপর গোটা ক্যারিয়ারটিই এখন জ্বলন্ত। তেল ঢেলে দেয়ায় মাটিতেও আগুন জ্বলছে।
কর্নেল সুরেন্দ্রর জীপও এসে দাঁড়াল মেজর সুরজিতের জীপের পেছনে।
মেজর সুরজিতরা গাড়ি থেকে নেমেছে কর্নেল সুরেন্দ্রও নামল গাড়ি থেকে। বলল, ‘মেজর, ঐ ওয়াটার ক্যারিয়ারে করে হাজী আবদুল্লাহকে নিয়ে ওরা পালাচ্ছে।’
‘স্যার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এ রাস্তা থেকে নেমে দক্ষিণের রাস্তায় উঠা যাবে। মাটি এবড়ো-থেবড়ো, কিন্তু বড় কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।’ বলল মেজর সুরজিত সিন্ধিয়া।
‘হ্যাঁ, এটাই বিকল্প। চল কুইক।’ নিজের গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
ঠিক এ সময় একটানা ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ এল দক্ষিণের রাস্তার দিক থেকে অর্থাৎ দূরে ছুটে চলা ওয়াটার ক্যারিয়ারের দিক থেকে। তার সাথে সাথেই দুতিনটি টায়ার বাষ্ট হবার বিকট শব্দ।
কর্নেল সুরেন্দ্র এবং মেজর সুরজিত দুজনই চোখে নাইট ভিশন দূরবিন লাগিয়ে দেখল, ওয়াটার ক্যারিয়ারটি রাস্তার এ পাশে কাত হয়ে গেছে এবং একজন আপাদ মস্তক কালো কাপড়ে আবৃত লোক ওয়াটার ক্যারিয়ারটির সামনের দিকে ষ্টেনগান তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল সুরেন্দ্র বলল, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, কেউ পালাতে পারেনি। বিভেন বার্গম্যান ওদেরকে গাড়ির মধ্যেই আটকে রেখেছে।’
কথাগুলো বলেই সে পা বাড়াল রাস্তা থেকে নামার জন্যে এবং বলল, ‘একটি গাড়ি এখানে থাক। আরেকটি ওখানে আসবে। মেজর সুরজিত, মেজর পুরন্দর এবং আরও কয়েকজন এস। ছুটতে হবে ওদিকে।’
কর্নেল সুরেন্দ্র সিং, মেজর সুরজিত ও মেজর পুরন্দরসহ আরও তিন জন ছুটল ওয়াটার ক্যারিয়ারের দিকে।
ওরা গিয়ে পৌছল। ওরা দেখল, পাঁচজন লোক গাড়ির মাথার পাশে হাত তুলে বসে আছে। কাল জুতা, কাল প্যান্ট, কালো জ্যাকেট আর কালো হ্যাট পরা বিভেন বার্গম্যান ওদের দিকে ষ্টেনগান তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।
ওখানে পৌছার পরই মেজর সুরজিত ও মেজর পুরন্দরের ষ্টেনগান তাক হল ওদের লক্ষ্যে। আর তার সাথেই বিভেন বার্গম্যঅন তার ষ্টেনগানের মাথা সরিয়ে নিয়ে ষ্টেনগান ঝুলালো কাঁধে।
কর্নেল সুরেন্দ্র এগিয়ে গেল বিভেন বার্গম্যান ওরফে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘গুড মর্নিং বিভেন বার্গম্যান। আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন।’
‘ধন্যবাদ কর্নেল।’ বলেই আহমদ মুসা ঐ পাঁচ জনের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাঝের একজন সুঠামদেহীকে দেখিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয় চিনবেন, ইনি জেনারেল জগজিত জয়রাম। ইনি আন্দামান মহাসংঘের দ্বিতীয় ব্যক্তি। পুরো নাম এখন তাঁর জেনারেল জগজিত জয়রাম মহাগুরু। ডাকা হয় জেনারেল স্বামীজী বলে। ওর সামনে পড়ে থাকা তাঁর ঐ মোবাইলে উনি গাড়ি কাত হয়ে পড়ার পর টেলিফোন করেছিলেন সম্ভবত মহাসংঘের এক নম্বর ব্যক্তি কিংবা সংঘের অন্য কাউকে। আমি কলটা সমাপ্ত করতে দেইনি। এ কল থেকে এবং মোবাইল থেকে আরও প্রমাণ পেতে পারেন।’ থামল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ বিভেন বার্গম্যান। নয়া দিল্লীতে শুধু আপনার নাম শুনেছি। আজকের সফল অভিযানের সব কৃতিত্ব আপনার। আমাদের জীবনও আপনি বাঁচিয়েছেন। আপনি যদি ভারতীয় না হন, তাহলে আপনার প্রতি গোটা ভারতবাসীর কৃতজ্ঞতা।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘ধন্যবাদ কর্নেল। একটু বেশি বলেছেন আপনি। আমি যা করেছি সেটা সামান্য সহযোগিতা মাত্র। কৃতজ্ঞতা আমাদের ঈশ্বরকে জানানো উচিত। আমি এখন চলি। আপনাদের এখন অনেক কাজ। ঘণ্টা দেড়েক পর আমি আপনার সাথে কথা বলব।’
বলে একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘হাজী আবদুল্লাহকে ওরা সংজ্ঞাহীন করে চাদরে জড়িয়ে সিটের সেকেন্ড সারির ছাদের সাথে টাঙিয়ে রেখেছে।’
থামল আহমদ মুসা। তাকাল সবার দিকে। বলল, ‘আসি কর্নেল সুরেন্দ্র, মেজর সুরজিত, মেজর পুরন্দর। সকলকে আবার ধন্যবাদ।’
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে রাস্তার ঢাল থেকে নিচে নেমে গেল। ওখানে কাত হয়ে পড়েছিল একটা মোটর সাইকেল। মোটর সাইকেলটি তুলে নিয়ে আহমদ মুসা ওখানেই চড়ে বসল। মোটর সাইকেলটি নিঃশব্দে উঠে গেল রাস্তার উপর। দ্রুত হারিয়ে গেল অন্ধকারে।
কর্নেল সুরেন্দ্র তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অনেকটা স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘মি. বার্গম্যানের কাছ থেকে একটা শিক্ষা পেলাম। এ ধরনের অপারেশনে সাইলেন্সার যুক্ত মোটর সাইকেল খুবই কার্যকরী। সুতরাং গাড়ি থাকলেও, তার সাথে মোটর সাইকেল অবশ্যই থাকা দরকার।’
কথা শেষ করেই কর্নেল সুরেন্দ্র তাকাল মেজর সুরজিতের দিকে। বলল, ‘মেজর তোমরা এদের হাত-পা বেঁধে গাড়িতে তোল।’
ইতিমধ্যে গাড়িও এসে গেছে।
কথা বলার সময়ই কর্নেল সুরেন্দ্র রুমাল দিয়ে ধরে তুলে নিয়ে রুমালে জড়িয়ে জেনারেল জগজিত জয়রামের মোবাইল পকেটে রাখল।
মেজর সুরজিত ও মেজর পুরন্দর সকলের পকেটে এবং গাড়ি সার্চ করে যা কিছু পেল সব ভিন্ন কাপড়ে বেঁধে গাড়ির একটা ব্যাগে রেখে দিল।
জেনারেল জগজিত জয়রামসহ গ্রেফতারকৃত সকলকে গাড়ির মেঝেয় তুলল এবং হাজী আবদুল্লাহকে বাঁধন খুলে দিয়ে যতেœর সাথে গাড়ির সিটে শুইয়ে দিল।
কর্নেল সুরেন্দ্র মেজর পুরন্দরকে বলল গাড়িতে উঠে বসতে এবং গাড়ি সামনের ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোর বাড়িটাতে নিয়ে যেতে। অন্যদিকে প্রথম গাড়ির ড্রাইভিং অফিসার লেফটেন্যান্ট বরুনকে বলল গাড়ির তিনজন প্রহরীকে ওল্ড সেন্ট্রাল মেডিকেল ষ্টোরের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে হেডকোয়ার্টারে চলে যেতে এবং আরেকটি গাড়ি নিয়ে এখনি চলে আসতে।
মেজর পুরন্দর গাড়ি নিয়ে উঠে গেল রাস্তায় এবং চলল গোপন বন্দীখানা হিসেবে ব্যবহৃত বাড়িটার দিকে।
কর্নেল সুরেন্দ্র ও মেজর সুরজিত ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল রাস্তায়।
দুজনে হেঁটে চলল বাড়িটার দিকে।
‘মেজর, বিভেন বার্গম্যানকে কেমন মনে হল তোমার?’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘অদ্ভুত স্যার। কিন্তু এমন দক্ষ, অন্যের প্রয়োজনের প্রতি এত সচেতন এবং এমন বিনীত স্বভাবের মানুষ স্যার সিআইএ’র হতে পারে না। দেখলেন তো, কৃতিত্ব তিনি নিলেন না, বললেন কৃতজ্ঞতা ঈশ্বরের প্রাপ্য।
‘ঠিক বলেছ মেজর সুরজিত। সিআইএ’র প্রতি পদক্ষেপে বড় হওয়ার একটা অহমিকা আছে, অন্যের ত্রুটি ধরার প্রবণতা আছে। বিভেন বার্গম্যানের মধ্যে এটা নেই।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘তাহলে কে তিনি স্যার? নাকি মার্কিন মনের রূপান্তর ঘটছে? নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিন্তু ‘প্রেসিডেন্ট জেফরসন’ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ‘বিশ্বটা আমার তরে’ না বলে তিনি ‘সকলে আমরা সকলের তরে’ বলছেন।’ বলল মেজর সুরজিত।
‘হতে পারে মেজর। দিন কারও সমান যায় না। কলিংগ যুদ্ধের ভয়ংকর যোদ্ধা স¤্রাট অশোক কলিংগ যুদ্ধের পর ‘স্মৃতি অশোক’ এ পরিণত হয়েছিলেন। যাক, বার্গম্যানের আরও পরিচয় আমরা পাব। আমাদের গোটা অপারেশনে তিনি আমাদের সাথে আছেন।’
কথা শেষ করেই কর্নেল সুরেন্দ্র হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে উঠল। ওল্ড মেডিকেল ষ্টোর বাড়িটার দিকে থেকে কিছুটা হৈ চৈ এর মত শোনা যাচ্ছে। দ্রুতকণ্ঠে সে বলল, ‘কিছু ঘটল নাকি ওখানে?’
বলেই কর্নেল সুরেন্দ্র অয়্যারলেস তুলে নিল মুখের কাছে। কল করল মেজর পুরন্দরকে।
মেজর সুরজিত সিন্ধিয়াও উদগ্রীব হয়ে উঠল কি ঘটেছে তা শোনার জন্যে।

বিবি মাধবের খাটের পাশে ‘কিট ক্যাবিনেটে’র উপরে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল।
বালিশে আধা-শোয়া বিবি মাধবের চোখটা সবে ধরে এসেছিল।
মোবাইলের রিংটোন তার সে ঘুমের জাল ছিড়ে ফেলল। লাফ দিয়ে উঠে বসল। মোবাইলটি হাতে নিয়ে বলল, ‘হোল্ড অন।’
বলে সে দ্রুত খাট থেকে নামল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
গভর্নর বিবি মাধবের স্ত্রী পাশেই শুয়ে ছিল। তার চোখ দুটি ছিল বোজা। বিবি মাধব যখন মোবাইল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, সে চোখ খুলল। দ্রুত উঠে বসে খাট থেকে নেমে এল সেও। বিড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে সে স্বামীর পিছু নিল।
বিবি মাধবের স্ত্রীর চোখে-মুখে, কৌতুহল দুই-ই। তার স্বামী বিবি মাধব সারারাত ঘুমায়নি। আধা ঘণ্টা আগে বেড রুমে এসেছে, কিন্তু বেডে আসেনি। ঘরময় পায়চারি করে বেড়াচ্ছে এবং ঘড়ি দেখছে বার বার। মিনিট পাঁচেক আগে বেডে এসে সে আধা-শোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। মিসেস বিবি মাধবও ঘুমাতে পারেনি।
সে চোখ বুজে শুয়ে থেকে উদ্বেগের সাথে স্বামীর অস্থির অবস্থা অবলোকন করছে। তার মনে নানা প্রশ্ন, নানা চিন্তা। বড় কিছু একটা ঘটেছে নিশ্চয়। কি সেটা? তাদের মেয়ে সুষমা রাওয়ের কিছু ঘটেছে কি? সুষমা রাওয়ের কথা মনে হতেই উদ্বেগ বেড়ে যায় মিসেস বিবি মাধবের। এই তো কয়েকদিন আগেও তার স্বামী নিশ্চিন্ত নিশ্চয়তার সাথে বলতো, ‘তাদের মেয়ে শীঘ্রই মুক্ত হবে। তার কোন ক্ষতি হয়নি।’ কিন্তু গত কয়েখ দিন থেকে এই নিশ্চয়তার কথা তার স্বামী বলছে না। সুষমা রাওয়ের কথা উঠলেই, নানাভাবে সে তার কথা এড়িয়ে যায়। তার খারাপ কিছু ঘটেনি তো? অবশ্য কয়দিন থেকে তাদের মেয়ে সুরূপা সিংহাল টেলিফোনে তাকে সান্ত¦না দিচ্ছে যে, সুষমা রাওয়ের মত নিষ্পাপ-নির্দোষ মেয়ের কোন ক্