৪৩. পাত্তানীর সবুজ অরণ্যে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসা কর্নেল সুরেন্দ্রের কাছে টেলিফোন সেরে মোবাইলটি জ্যাকেটের পকেটে রেখে গুহার গায়ে হেলান দিল। মনে মনে ভাবল, ১৫ মিনিট পরে সে যাত্রা করবে। তাহলে কর্নেল সুরেন্দ্ররা এবং সে একই সময়ে ‘মহাসংঘ’র আন্ডার গ্রাউন্ড ঘাঁটির মুখে প্রত্নতত্ব অফিস এলাকায় পৌছে যাবে। এদিকে তার ১৫ মিনিটের একটা বিশ্রামও হয়ে যাবে।
আহমদ মুসা তার গোটা শরীর ঢিলা করে চোখ বুঝল।
শুধু তার কানটাই সক্রিয় রইল। তার দুই কানে লাগানো ছিল ‘সাউন্ড মনিটরিং’-এর দুই রিসিভার। কি যেন ভেবে পনের মিনিটের জন্যে মনিটরিং-এর রিসিভার কান থেকে নামিয়ে নেবার জন্যে ওদিকে হাত বাড়াতেই হালকা শব্দে একটা কোরাস ভেসে এল তার কানে।
হাত সরিয়ে নিল আহমদ মুসা। রিসিভার থামাল না।
সোজা হয়ে বসে শব্দের কোরাস বুঝার চেষ্টা করল।
কিছুটা শোনার পর তার মনে হলো অনেকগুলো লোকের এক সঙ্গে চলার জমাট শব্দ এটা। শব্দগুলো ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে। তার মানে একদল লোক এদিকে এগিয়ে আসছে।
কথাটা মনে আসতেই তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। কারা আসছে? মহাসংঘ’র লোকরা নিশ্চয়। কিন্তু দল বেঁধে এদিকে আসছে কেন? ওদের একটা অংশ কি এখান থেকে চলে যাচ্ছে? বোট দুটো কি এজন্যেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে? এটা কি ওদের রুটিন যাতায়াত? ওরা এক নম্বর নেভি ডকে সিবিআই-এর লোকদের আসা টের পায়নি তো?
আহমদ মুসা গুহা থেকে বেরিয়ে দ্রুত গাছ-পালা ও আগাছার আড়াল নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
সামনের এলাকা নজরে আসে এমন জায়গায় উঠে একটা গাছের আড়ালে বসল। পাহাড়ের গা গাছ-গাছড়া ও নানারকম আগাছায় ঢাকা। আহমদ মুসা বসলে ঢেকে গেলো তার দেহ। ব্যাগ থেকে দূরবীণ বের করে চোখে লাগাল সে।
সামনের এলাকাটা এবড়ো-থেবড়ো পাথুরে জমি। ঘাস-আগাছায় ঢাকা। মাঝে মাঝে বড় গাছ আছে, কিন্তু তার সংখ্যা খুব বেশি নয়। সুতরাং সামনে বহুদূর দেখা যায়। দৃষ্টি সার্কেলের প্রান্ত পর্যন্ত।
দূরবীনের চোখ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নেবার সময় হঠাৎ দূরবীনের চোখে ভেসে উঠল মানুষের সারি। যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যুহের মত সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে দশ বারোজন লোক। প্রত্যেকের হাতে কিছু লাগেজ এবং অস্ত্র। তার মধ্যে বেশ কয়েকজনের কাঁধে বড় বড় ব্যাগ। আর দুজন বহন করছে কফিনাকৃতির লম্বা একটি কাঠের বাক্স।
দূরবীনের চোখ এই গোটা দলের ওপর ঘুরে আসার আগেই স্নায়ু তন্ত্রীতে একটা শক ওয়েভ খেলে গেল। জেগে উঠল গোটা শরীর, শক্ত হয়ে উঠল গোটা দেহ।
হঠাৎ তার মনে জাগল, এই ঘাঁটি থেকে মহাসংঘের ওরা পালাচ্ছে শাহ আলমগীরকে নিয়ে। ওরা তাহলে অবশ্যই জেনেছে যে, নৌবাহিনীর ১নং ডকে সিবিআই-এর একটা দল নেমেছে, কিন্তু তারা বুঝতেও পেরেছে যে, সিবিআই-এর টার্গেট তাদের এই ঘাঁটি। এটা বুঝেই তারা পেছনের এই দরজা দিয়ে পালাবার জন্যে ছুটে আসছে।
আহমদ মুসা দূরবীন থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
আনন্দের একটা অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করল। সে নিশ্চিত এই দলের মধ্যে রয়েছে আন্দামানের গভর্নর বালাজী বাজি রাও মাধব এবং আহমদ শাহ আলমগীর। কফিনের মত লম্বা কাঠের বাক্সটায় যে আহমদ শাহ আলমগীরকে বহন করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই।
আহমদ মুসার ভাবনা দ্রুত হলো।
প্রথমেই ভাবল ব্যাপারটা কর্নেল সুরেন্দ্রকে জানানো দরকার।
পকেট থেকে মোবাইল তুলে নিল হাতে। মোবাইল করল সিবিআই-এর কর্নেল সুরেন্দ্রকে।
সব শুনে কর্নেল সুরেন্দ্র বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার, আমরা ৫ মিনিটের মধ্যে যাত্রা করছি। কিন্তু স্যার, গাড়ি চলবে না। যতটা পারি আমরা দৌড়ে এগুবো। এতেও তো সময় লেগে যাবে। ওরা ততক্ষণে…………।’ দ্রুত, উত্তেজিত কণ্ঠ কর্নেল সুরেন্দ্রের।
আহমদ মুসা তার কথার মাঝখানেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘চিন্তা নেই কর্নেল। আমি ওদের আটকে রাখব। ওদের হত্যা নয়, সারেন্ডার করাবার চেষ্টা করতে হবে। এজন্যই আপনাদের তাড়াতাড়ি এখানে পৌছা প্রয়োজন।’
‘ওকে স্যার আমরা আসছি যতটা পারি দ্রুত।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘ঈশ্বর সাহায্য করুন। বাই।’
মোবাইল পকেটে রেখে দিল আহমদ মুসা।
আবার চোখে দূরবীন লাগাল। দেখল ওরা আরও অনেকখানি পথ এগিয়ে এসেছে। ওরাও দ্রুত হাঁটছে।
দূরবীন চোখ থেকে নামাল আহমদ মুসা।
ওদের ঠেকানোর বিষয়টি মাথায় এসেছে।
ভাবছে সে। তার দরকার ফায়ারিং গান। কিন্তু তার ব্যাগে যে সাবমেশিনগান আছে, তা ছোট ম্যাগাজিনের এবং হালকা।
বোটে দেখা বাক্সগুলোর কথা মনে পড়ল আহমদ মুসার। ওগুলোর কয়েকটিতে হেভি মেশিনগান ও হেভি সাব-মেশিনগান রয়েছে। কিন্তু বোটে যাওয়া, আসা এবং অস্ত্রগুলো সংযোজন করার জন্যে যে সময় দরকার তা তার নেই।
হঠাৎ আহমদ মুসার মাথায় এল, সে বোট দুটোর নোঙর তুলে লেকের মাঝামাঝি কিংবা ওপারে গিয়ে অপেক্ষা করতে পারে। বোট দখল তাদের জন্য অসম্ভব হবে। তখন তারা ফিরে যাবার চিন্তা করবে। ভাববে যে, দ্বীপের জংগলে আত্মগোপন করে সুযোগ মত পালাবে। কয়েকটা গোপন ঘাটে তাদের বোটও রাখা আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তারা ফেরার পথে গিরিপথ পার হবার আগেই কর্নেল সুরেন্দ্ররা এসে পড়বে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। ওদের ফাঁদে ফেলার এটাই সবচেয়ে ভাল উপায় হবে।
আহমদ মুসা পাহাড় থেকে নেমে এল।
গিরিপথ ধরে ফিরে চলল লেকের দিকে বোটের উদ্দেশ্যে।
গিরিপথ বড়, ছোট নানা সাইজের পাথরে ভরা। যাবার সময় ধীরে-সুস্থে গেছে খুব অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এখন তাড়াহুড়া করতে গিয়ে পথ চলাটা খুব কষ্টকর মনে হচ্ছে।
লেকের কিনারায় পৌছে আহমদ মুসা বোট দুটির নোঙর খুলে একটি আরেকটির পেছনে বাঁধল। বোট চালিয়ে নিয়ে গেলো লেকের মাঝখানে।
লেকের পানি যেমন শান্ত, নিস্তরংগ, তেমনি লেকের আবহাওয়াও একেবারে মৌন। লেকের তিন দিক জুড়ে পাহাড়। একদিক দক্ষিণ পাশটা মাত্র খোলা, তাও ঘন বনে ঢাকা। সুতরাং দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের দেয়াল না থাকলেও দাঁড়িয়ে আছে জংগলের প্রাচীর। এই জংগলের প্রাচীরকে দুভাগ করে একটা খাড়ি বেরিয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। চার দিক এভাবে ঘেরা বলেই বাতাসের প্রবাহহীন স্থির, শান্ত লেকটা।
বোটগুলোও স্থির, শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
আহমদ মুসা বোটের কেবিনে ঢুকে বাক্সগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। সবগুলো বাক্সেই দেখল অস্ত্র। আহমদ মুসা বিশেষ ধলনের অটো রিভলবার রাইফেল বের করে নিল। এ রাইফেলে একবার ট্রিগার টিপলেই এক এক করে বারটি গুলী বেরিয়ে যায় যদি না অটো ষ্টপ ফাংশন অন করা থাকে। রাইফেলটির রেঞ্জও সাধারণ রাইফেল থেকে বেশি।
আহমদ মুসা রাইফেলটা নিয়ে কেবিনের দরজার পাশে বসল। এখান থেকে গিরিপথসহ লেকের উত্তর উপকূলের প্রায় গোটাটাই দেখা যাচ্ছে।
মোবাইলটা বেজে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইল কানের সামনে নিয়ে আসতেই কণ্ঠ শুনতে পেল সিবিআই কর্মকর্তা কর্নেল সুরেন্দ্রের।
‘হ্যালো কর্নেল, কোন খবর?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না মি. বার্গম্যান, খবর তেমন নয়। আমরা পুরাতত্ব অফিস মানে ওদের পরিত্যক্ত ঘাঁটি পর্যন্ত এসেছি। ওদের খবর কি?’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘আমি এখন লেকে। ওদের পালিয়ে যাবার বোট দুটি দখল করে লেকের মাঝ বরাবর নিয়ে এসে বসে আছি। মিনিট পনের ওদের খবর জানি না। তবে ওরা যে গতিতে আসছিল, তাতে আর পনের মিনিটের মধ্যে লেকের ধারে পৌছে যাবে। ওরা নিশ্চয় এখন গিরিপথের কাছাকাছি পৌছে গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মি. বার্গম্যান, আপনি এনকাউন্টার নিয়ে কি ভাবছেন?’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘আমার ধারণা ওরা যখন লেকের ধারে পৌছবে, তখন আপনারা গিরিপথের মুখে পৌছে যাবেন। তখন ওরা বোট হাতের নাগালে না পেয়ে কি করে, সেটা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। ভাল হয় যদি আপনি গিরিপথের মুখে এসে আমাকে একটা কল দেন।’
‘ওকে মি. বার্গম্যান। আমরা আরও দ্রুত গিরিপথের মুখে পৌছার চেষ্টা করছি।’
‘ওকে। বাই’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা মোবাইল পকেটে রেখে দুপা সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বাক্সের স্তুপে ঠেস দিয়ে বসল।
দেহটাকে শিথিল করে দিল সে।
চোখ তার গিরিপথের দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু তাতে শূন্য দৃষ্টি।
ভাবছে আহমদ মুসা।
ভাবছে সামনের এনকাউন্টার নিয়ে। কতটা সহজে আহমদ শাহ আলমগীরকে উদ্ধার এবং আন্দামানের গভর্নর বিবি মাধবসহ অন্যদের বন্দী করা যায়, এই চিন্তা এসে পেয়ে বসল আহমদ মুসাকে।
মনে মনে অনেক অংক কষার পর আহমদ মুসা এক নজরে বোঝার জন্য একটা ছক আঁকল। মনটা তার প্রসন্ন হয়ে উঠল। বিবি মাধবরা গিরিপথের এপ্রান্তে পৌছলেই কর্নেল সুরেন্দ্রকে এ একশন প্ল্যান সে জানিয়ে দেবে।

বিবি মাধবরা বারো জনের একটা দল।
মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র’র ছদ্মবেশে বিবি মাধব সবার সামনে।
মুখে তার লম্বা, গোঁফ, দাড়ি। গৈরিক রং করা। মাথায় গৈরিক পাগড়ী। গায়েও গৈরিক বসন। গলায় এক গুচ্ছ রুদ্রাক্ষের মালা। কপালে চন্দনের তিলক।
ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রেখে দ্রুতই হাঁটছে বলা যায়। দীর্ঘদেহী বিবি মাধবের দ্রুত হাঁটা অনেকের জন্যে ডবল মার্চের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র ওরফে গভর্নর বিবি মাধবের পাশাপাশি হাঁটছিল সাবেক জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি আন্দামানে মহাসংঘের দ্বিতীয় ব্যক্তি এবং রস দ্বীপের ‘মহাসংঘ’ ঘাঁটির প্রধান। সে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আগাম অবসর দেয়া একজন মেজর। তার চরমপন্থী মতামতের জন্য তাকে আগাম অবসর দেয়া হয়। অবসর দেয়ার পরদিনই সে ‘শিবাজী সন্তান সেনা’য় যোগ দেয়। সেই সূত্রে এখন ‘মহাসংঘ’-এর প্রথম সারির নেতাদের একজন সে।
‘মহামুনি প্রভু, সিবিআই আমাদের এই ঘাঁটি তো দূরে থাক কোন ঘাঁটির খবরই জানতো না। আজ একেবারে আমাদের এই ঘাঁটিতে এসে হাজির! কিভাবে?’ বলল জেনারেল (অব) কৃষ্ণমূর্তি মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রকে লক্ষ্য করে।
‘এটা বিস্ময়ের নয়, এর চেয়ে বড় বিস্ময়ের হলো সিবিআই একবার এসে চলে গেল, আবার ফিরে এল কেন? আসলে সবকিছুর মূলে রয়েছে আমেরিকান নাগরিক ছদ্মবেশে আসা বিভেন বার্গম্যান। সেই নয়া দিল্লীস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তাদের সরকারকে ম্যানেজ করে আমাদের সরকারকে কোনভাবে বুঝিয়ে সর্বনাশটা করেছে।’ বলল মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র ওরফে গভর্নর বিবি মাধব।
‘প্রভু আমাদেরও তো লোক আছে। তারা কি করল?’ জেনারেল (অব) কৃষ্ণমূর্তি বলল।
‘সিবিআই’-এর এই অপারেশন প্রধানমন্ত্রী নিজেই তদারক করছেন। কারুরই কিছু করার সুযোগ নেই।’ বলল বিবি মাধব।
‘বিপদ এভাবেই বোধহয় আরেকটি বিপদ ডেকে আনে। প্রভু, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি? আমার তো মনে হচ্ছে, আমাদের কোন ঘাঁটির সন্ধানই ওদের অজানা নেই।’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির কথা শেষ হতেই থমকে দাঁড়াল বিবি মাধব। তাকাল সে জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির দিকে। তার চোখ থেকে আগুন ছিটকে বেরুল। বলল, ‘আজ মাফ করে দিলাম। এই ধরনের হতাশার কোন কথা দ্বিতীয়বার শুনলে শুধু আমাদের সাথে চলার নয়, বেঁচে থাকারও অধিকার হারাবে।’
‘মাফ করুন গুরুজী।’ সঙ্গে সঙ্গেই কাঁচু-মাচু মুখে ভয় জড়িত কণ্ঠে বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
কথা শেষ করেই জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি বলল, ‘গুরুজী আমরা গিরিপথটার মুখে এসে গেছি।’
‘অলরাইট। সবাই আমাকে ফলো করো। আমার পেছনেই আহমদ শাহ আলমগীরের বাস্কেটের সাথে তুমি থাকবে। সবাইকে দ্রুত আসতে হবে। ওরা যদি ঘাঁটির উপর চোখ রেখে থাকে, তাহলে আমাদের চলে আসা ওদের কাছে সংগে সংগেই ধরা পড়ে গেছে। তাহলে বুঝতে হবে অনেক আগেই ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে।’ গভর্নর বিবি মাধব বলল।
সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সকলেই ছুটল।
লেকের ধারে প্রথমেই পৌছল বিবি মাধব।
লেকের দিকে চোখ পড়তেই এক রাশ বিস্ময় এসে তাকে গ্রাস করল। দেখল যে, এই ঘাটে নোঙর করা তাদের দুটি বোট লেকের মাঝখানে ভাসছে।
‘জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি, তুমি বোট দুটিকে ঠিকমত নোঙর করেছিলে? বোটগুলো ভেসে গেল কি করে?’ চিৎকার করে বলল বিবি মাধব।
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি ছুটে এসে বিবি মাধবের পেছনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলল, ‘প্রভু আমি বোট দুটো ভালভাবে নোঙর করেছিলাম। নোঙর আটকানো ছাড়াও চেন দিয়ে বেঁধেছিলাম পাথরের সাথে’
মহামুনিরূপী গভর্নর বিবি মাধব কোন জবাব দিল না। সে তাকিয়েছিল ভাসমান দুবোটের দিকে। ভাবছিল সে।
বোটের দিকে চোখ রেখেই হাতের ষ্টেনগানটা ফেলে দিয়ে ডান হাতটা পেছনে প্রসারিত করে বলল, ‘অটো রাইফেলটা দাও।’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি তার পিঠে ঝুলন্ত অটো রাইফেলটা বিবি মাধবের হাতে তুলে দিল।
রাইফেলটা হাতে নিয়ে বিবি মাধব দুটি বোট লক্ষে অবিরাম গুলী চালাল। বারটা গুলীর গোটা ম্যাগাজিন শেষ করল সে।
তারপরও কিছুক্ষণ চোখ রাখল সে বোট দুটির উপর। তারপর চোখ ফেরাল সে জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির দিকে। বলল, ‘নিশ্চিত হলাম বোট খালি কিনা। লোক থাকলে গুলী বৃষ্টির জবাব আসত কিংবা লোকদের নড়াচড়ায় বোট দুলত অথবা বোট সরিয়ে নেবার উদ্যোগ নিত। কোন কিছুই হয়নি। আর লোক থাকলে তারা বোট নিয়ে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন! সুতরাং বোটে কেউ নেই।’
কথা শেষ করে মুহূর্তকাল থেমেই জেনারেল কৃষ্ণমূর্তিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি কয়েকজনকে পাঠিয়ে দাও। ওরা গিয়ে বোট দুটি নিয়ে আসুক।’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোকের দিকে চোখ ফিরিয়ে সে বলল, ‘তোমরা যাও, কুইক। দুজন দুটো বোট চালিয়ে নিয়ে এসো।’
ওরা দুজন আহমদ শাহ আলমগীরকে রাখা কাঠের লম্বা বাক্সটি বহন করে এনেছিল। লেকের কিনারায় পৌছে ওরা বাক্সটি নামিয়ে রাখলো।
হুকুম পেয়েই ওরা তৈরি হলো।
ওরা লেকের পানিতে নামতে যাচ্ছিল। এই সময় মেশিনগানের অব্যাহত গুলীর শব্দ এল গিরিপথের উত্তর প্রান্তের দিক থেকে।
চমকে উঠল বিবি মাধব।
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওরা এসে গেছে। গিরিপথে ঢুকে গেছে। আক্রমণ করেছে ওরা আমাদের লোকদের।’
থামল বিবি মাধব। তার চোখ-মুখে সীমাহীন উদ্বেগ ও ভীতির চিহ্ন।
‘হ্যাঁ, গুরুজী ওরা এসে গেছে। বোটও কাছে নেই আমরা সরে পড়তে পারছি না। এখন আমাদের ওদের প্রতিরোধ করতে হবে।’ বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি। তারও মুখে বিমূঢ় ভাব।
‘বোট আনা ও প্রতিরোধ দুই-ই আমাদের করতে হবে।’ গভর্ণর বিবি মাধব।
‘অতদূর থেকে বোট তীরে আনা পর্যন্ত নিরাপদ সময় আমরা পাব কিনা?’ বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
‘ঠিক বলেছ জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি। তাহলে কি করা যায়?’ বিবি মাধব বলল।
‘গুরুজী আপনার নিরাপত্তার বিষয়টিই এখানে সবচেয়ে বড়। চলুন আমরা এ দুজনের সাথে বোটে চলে যাই। আপনি একটা বোটে অপেক্ষা করবেন, আমি আরেকটা বোট নিয়ে এসে এদের তুলে নিয়ে যাব।’ বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি যখন কথা বলছিল, তখন তাদের কয়েকজন লোক তীরে এসে পৌছল। এই সময় গিরিপথের উত্তর প্রান্তের দিক থেকে বোম ফাটারও শব্দ এল।
‘আমাদের লোকদের হাতে তো বোম নেই। তাহলে বোম ওরাই ফেলছে নাকি?’ উদ্বিগ্ন ও দ্রুত কণ্ঠে বলল বিবি মাধব।
‘ঠিক গুরুজী।’ বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
‘তাহলে তো ওরা আরও দ্রুত এসে পড়বে।!’
‘হ্যাঁ প্রভু। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আপনি পানিতে নেমে পড়ুন। আমি এদের কিছু নির্দেশ দিয়ে আসছি।’
জেনারেল কৃষ্ণমূতির কথা শেষ হবার সাথে সাথে বিবি মাধব গায়ের আলখেল্লা ও পায়ের জুতা খুলে ফেলে এবং গলায় ঝুলানো চাদর কোমরে বেঁধে পানিতে নেমে পড়ল।
ওরা চারজন সাঁতরে আসছে বোটের দিকে। বিবি মাধব সবার আগে। তারপর জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি। তাদের পেছনে মহাসংঘের সৈনিক দুজন এক সাথে সাঁতরাচ্ছে।
দেখা গেল বিবি মাধব ও জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি ভাল সাঁতরাতে পারে। ওরা পেছনের দুজনকে প্রায় আট-দশ হাত পেছনে ফেলে বোটের কাছে পৌছে গেল।
বোটে প্রথমে উঠল মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র’ ওরফে গভর্নর বিবি মাধব। তার পরেই জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
তারা উঠে বসে একটু রেষ্ট নিচ্ছিল আর দেখছিল তীরের পরিস্থিতি।
আহমদ মুসা কেবিন থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার দুহাতে দুটি রিভলবার।
আহমদ মুসা কেবিন থেকে বেরিয়ে দুতিন ধাপ আসতেই সম্ভবত বোট দুলে উঠা দেখেই বিবি মাধব ও জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি দুজনেই এক সাথে পেছনে তাকাল। তাদের দিকে তাক করা রিভলবার হাতে আহমদ মুসাকে দেখে তারা ভূত দেখার মত আঁতকে উঠল। তাদের আতংকিত বোবা দৃষ্টি যেন আটকে গেল আহমদ মুসার মুখে।
‘স্রষ্টাকে ধন্যবাদ। আপনাকেই নৌকায় চেয়েছিলাম বিবি মাধব। আপনার খেলা শেষ। এবার দুজনেই ডেকের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন।’ আহমদ মুসার কণ্ঠ এবার কঠোর।
মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রকে গভর্নর বিবি মাধব নামে সম্বোধন করায় জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি চোখ ছানাবড়া করে তাকাল তাদের নেতা মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রের দিকে। তার চোখে-মুখে অপার বিস্ময়। সে আহমদ মুসার দিকেও তাকাল। চোখে তার একরাশ প্রশ্ন, অবিশ্বাসও কিছুটা।
আহমদ মুসা তার কথাটা শেষ করেই জেনারেল কৃষ্ণমূর্তিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তাহলে তোমরা জাননা তোমাদের মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রই গভর্নর বিবি মাধব। তিনি আইনের লোক হয়ে ছদ্মবেশে তোমাদের নিয়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছেন।’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির বিস্ময়ে বোবা হয়ে যাওয়া দৃষ্টি আবার ঘুরে গেল বিবি মাধবের দিকে।
গভর্নর বিবি মাধব কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ঘুরে দাঁড়াবার ক্রুব্ধ ভাব নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা রিভলবার নেড়ে ধমকে উঠে বলল, ‘কোন কথা নয়, আগে দুজনে উপুড় হয়ে ডেকের উপর শুয়ে পড়ুন।’
কিন্তু তারা ডেকে শুয়ে পড়তে ইতস্তত করছিল।
আহমদ মুসার বাম হাতে ধরা রিভলবারটা একটু নড়ে উঠল। গর্জন করে ওঠা রিভলবার থেকে একটা গুলী বেরিয়ে বিবি মাধবের কানটা প্রায় স্পর্শ করে ছুটে গেল।
সংগে সংগেই বিবি মাধব এবং জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি দুজনই শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে।
আহমদ মুসা পকেট থেকে কয়েক খন্ড রশি বের করে জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘গভর্নর বিবি মাধবকে পা’সহ পিছ মোড়া করে বেঁধে ফেল।’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি ভয়ের সাথে তাকাল বিবি মাধবের দিকে। নির্দেশ পালনের কথা যেন সে ভুলে গেল।
নড়ে ওঠল এবার আহমদ মুসার ডান হাতের রিভলবার। গর্জে ওঠল আবার। একটা গুলী গিয়ে জেনারেল কৃষ্ণমূর্তির কানের একটা অংশ ছিড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি চিৎকার করে উঠে বসে রশি কুড়িয়ে নিয়ে গভর্নর বিবি মাধবের পা দুটি ও পরে পিছ মোড়া করে হাত দুটি বাঁধল।
‘বিভেন বার্গম্যান ওরফে আহমদ মুসা’, গর্জে উঠল গভর্নর বিবি মাধব, ‘মনে রেখ আমি শুধু আন্দামানের গভর্নর নই, আমি ভারতে একজন রাজনীতিক। তোমাকে এই আচরণের জন্যে চরম মূল্য দিতে হবে।’
‘আমার কথা পরে, আপনি নিজের কথা আগে ভাবুন বিবি মাধব। ভারতে সংবিধান এবং ভারতের জনগনের বিরুদ্ধে আপনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অন্যান্য সব প্রমাণ যোগড় হয়েছে। আজ আপনাকে হাতে-নাতে ধরায় সবচেয়ে বড় প্রমাণ যোগাড় হয়ে গেল।’
আহমদ মুসা এ কথাগুলো বলছিল আর বাঁধছিল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তিকে। বাঁধা হয়ে গেলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
তাকাল আহমদ মুসা সাঁতরে আসা বাকি দুই জনের দিকে। ওরা কূলের দিকে পালাচ্ছিল। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমরা তীরেই যাও, বোটে জায়গা হবে না।’
আহমদ মুসা রিভলবার পকেটে রেখে মোবাইল বের করল। কল করার জন্য মোবাইল মুখের কাছে তুলে নিল। ওপার থেকে কর্নেল সুরেন্দ্রের কণ্ঠ পেয়ে বলল, ‘গুড নিউজ কর্ণেল মি. সুরেন্দ্র। পরিকল্পনা কাজ দিয়েছে। মহামুনি শিবনাথ সংঘমিত্র ওরফে গভর্নর বিবি মাধব একজন সংগীকে নিয়ে বোটে এসেছেন সাঁতরে। তাঁকে বন্দী করা হয়েছে। ওপার থেকে আপনার ভয় দেখানো খুব কাজ দিয়েছে।’
‘স্যার, এটা তো ছিল আপনারই পরিকল্পনা। ধন্যবাদ স্যার। এখন কি করণীয় বলুন। গুলী করতে করতে তীর পর্যন্ত কি আমরা এডভান্স করব?’ ওপার থেকে বলল সিবিআই-এর কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘তাতে রক্তপাত হবে মি. সুরেন্দ্র। অনেক লোক মারা যেতে পারে। আমি অন্য চিন্তা করছি। বোটে মাইক্রোফোন আছে। আর ওরা প্রায় সবাই তীরে এসে দাঁড়িয়েছে এবং দুএকজন গিরিপথের এদিকের মুখ পর্যন্ত পৌছে গেছে। মাইক্রোফোনে আমি ওদেরকে আত্মসমর্পণের জন্যে আহবান জানাতে চাই। তাদের নেতা ধরা পড়ে গেছে। তারাও ধরা পড়ার অবস্থায়। তারা আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে করি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের চিন্তা করছেন। ধন্যবাদ স্যার। আপনার আশা ব্যর্থ হলে তারপর আমরা অপারেশন শুরু করব।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘মি. সুরেন্দ্র, এখন থেকে মিনিট খানেক পর আপনি আকাশের দিকে ফাঁকা গুলী ছুঁড়ে এদিকে এগুতে থাকবেন। ইতিমধ্যে ওদেরকে আত্মসমর্পনের আহবান জানানো আমার শেষ হয়ে যাবে। ফাঁকা গোলাগুলী ছুঁড়ে ঐভাবে আপনার অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখবেন যতক্ষণ না আমি মোবাইল করি।
ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওকে স্যার।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
মোবাইল পকেটে রেখে আহমদ মুসা জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি ওরফে ভাস্করের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘তোমার পরিচয় জানা হয়নি। তুমি কে? তোমার নাম কি?’
জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি এবার জবাব দিতে দেরি করল না। বলল, ‘আমার নাম জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক জেনারেল আমি। ‘মহাসংঘ’ এর রস দ্বীপের ঘাঁটির প্রধান।’
‘গুড।’ খুশি হলো আহমদ মুসা এই ভেবে যে, সর্বোচ্চ নেতা এবং এখানকার স্থানীয় নেতা দুজনেই ধরা পড়েছে। এতে ওদের আত্মসমর্পণ করানো সহজ হবে।
আহমদ মুসা বোটের পজিশন ঠিক-ঠাক করে নিয়ে হর্নটাকে তীরের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মাউথ পীস মুখের সামনে ধরে উচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘মহাসংঘের কর্মীবৃন্দ, আপনাদের শীর্ষ নেতা মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র এবং রস দ্বীপের ঘাঁটি প্রধান জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি ধরা পড়েছেন। তারা আমাদের হাতে বন্দী। আপনারও ঘেরাওয়ের মধ্যে আছেন। পেছন থেকে সিবিআই-এর সৈন্যরা আপনাদের ঘিরে ফেলেছে। সামনে লেক। পালাবার পথ নেই। অতএব আত্মসমর্পণই বুদ্ধিমানের কাজ। না হলে সবাই মারা পড়বেন। আমি আপনাদের আত্মসমর্পণের আহবান জানাচ্ছি, চিন্তা করার জন্যে পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। রাজি হলে সবাই গিয়ে সব অস্ত্র লেক-তীরের কাঠে বাক্সটার উপর রেখে হাত তুলে দাঁড়াবেন।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হওয়ার সংগে সংগেই গিরিপথের উত্তর প্রান্ত থেকে বন্দুক ও মেশিনগানের গর্জন ভেসে আসতে লাগল। আহমদ মুসা বুঝল কর্নেল সুরেন্দ্ররা ফাঁকাগুলী করতে করতে অগ্রসর হওয়া শুরু করেছে।
মিনিট তিনেক পার হলো।
এর পরেই দেখা গেল মহাসংঘের অস্ত্রধারী কর্মীরা এক এক করে গিয়ে কাঠের বাক্সটার উপর অস্ত্রপাতি রেখে সার বেঁধে হাত তুলে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা গুনে দেখল ওরা দশজন।
আহমদ মুসা জেনারেল কৃষ্ণমূর্তিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জেনারেল তোমরা মোট কজন এসেছ?’
‘আমাদেরসহ মোট বারজন।’ বলল জেনারেল কৃষ্ণমূর্তি।
‘ধন্যবাদ জেনারেল।’ বলে আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করল। কল করল কর্নেল সুরেন্দ্রের নাম্বারে।
ওপার থেকে কর্নেল সুরেন্দ্রের কণ্ঠ পেতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘কর্নেল মি. সুরেন্দ্র, ওরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে। ওরা নির্দিষ্ট করে দেয়া জায়গায় অস্ত্র জমা দিয়ে এসে সবাই হাত তুলে দাঁড়িয়েছে। এবার দ্রুত আপনারা চলে আসুন।’
‘ধন্যবাদ স্যার, আপনার প্ল্যান কামিয়াব হয়েছে। আমরা আসছি।

আত্মসমর্পণকারী দশ জনকে সিবিআই জওয়ানরা পিছমোড়া করে বাঁধছিল, আহমদ মুসা দুই বোট তীরে এনে নোঙর করল।
বোট তীরে ভিড়তেই কর্নেল সুরেন্দ্র বোটে উঠল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘স্যার মি. বিভেন, আমি ওদের বিশেষ করে গভর্নর স্যারের একটা ফটো নিতে চাই তিনি যে অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছেন, সে অবস্থায়।’
‘হ্যাঁ সেটা তো আপনার একটা আইনি প্রয়োজন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ইয়েস মি. বিভেন স্যার।’ বলেই কর্নেল সুরেন্দ্র তীরে দাড়ানো ক্যামেরাধারী একজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমার ওদিকের ফটো নেয়া শেষ তো! এখন বোটে এসো, এদের ফটো নিতে হবে।’
নির্দেশ পেয়েই লোকটি বোটে উঠে এল।
গভর্নর বিবি মাধব এবং জেনারেল কৃষ্ণমূর্তিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘একসিলেন্সি মি. গভর্নর এবং জেনারেল স্যার আমার দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমি আপনাদের ফটো নেব।’
ফটোগ্রাফার ক্যামেরা তাক করল গভর্নরের দিকে।
‘দাঁড়াও কর্নেল সুরেন্দ্র, তো…….।’ চিৎকার করে কথা বলতে যাচ্ছিল বিবি মাধব।
কর্নেল সুরেন্দ্র তাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘একসিলেন্সি, দয়া করে আমাকে সরকারি কাজে বাধা দেবেন না। আপনি কথা বলুন, তাতে আমার আপত্তি নেই।
কর্নেল সুরেন্দ্র যখন কথা বলছিল, তখন সিবিআই ফটোগ্রাফারের ক্যামেরা একের পর এক ক্লিক করে চলছিল।
‘আমি আন্দামানের গভর্নর। আমাকে এভাবে গ্রেফতার করতে পার না প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়ার অনুমতি ছাড়া।’ বলল বিবি মাধব ক্রুব্ধ কণ্ঠে।
‘প্রমাণ পেলে আন্দামানের যে কাউকে আমি গ্রেফতার করতে পারব, এ অথরিটি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে আন্দামানে পাঠিয়েছেন। তার উপর এই দশ মিনিট আগে প্রধানমন্ত্রীকে আমি সব কথা জানিয়েছি। তিনি প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে তার অনুমতি নিয়ে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন আপনাকে গ্রেফতার করার জন্যে। তিনি আমাকে আরও জানিয়েছেন, ‘আন্দামান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দামানের গভর্নরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
এ কথা শোনার সংগে সংগে গভর্নর বিবি মাধবের মুখ মলিন হয়ে গেল। তার চোখে-মুখে নামল উদ্বেগের গভীর ছায়া। বলল, ‘কর্নেল সুরেন্দ্র তোমার মোবাইলটা আমাকে দাও। আমি প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলব। প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এই বিভেন বার্গম্যান আমেরিকান পরিচয় দিয়ে সব কলকাঠি নেড়েছে। কিন্তু বিভেন বার্গম্যানকে তো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং তোমরাও জান না।’
‘আমি জানতাম না একথা ঠিক একসিলেন্সি। কিন্তু এক মিনিট আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, বিভেন বার্গম্যান আসলে আহমদ মুসা।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘জানার পরেও প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কথা শুনেছেন? তোমরাও তাকে সহযোগিতা করছ?’ উচ্চকণ্ঠে বলল বিবি মাধব। তার কণ্ঠে হতাশার সুর।
‘একসিলেন্সি, আমরা তাকে সহযোগিতা করছি না, তিনিই দয়া করে আমাদের সহযোগিতা করছেন। আর প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কথা শুনবেন কেন? আন্দামানের প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে তারা সঠিক পদক্ষিপ নিয়েছেন। তিনি যদি এ ব্যাপারেও কোন সহযোগিতা করে থাকনে, সেটা তার শুভেচ্ছা।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘তুমি ঠিক বলছ না। সে তার সম্প্রদায় মুসলমানদের স্বার্থে সব কিছু করেছে। আর……।’ বিবি মাধব কথা শেষ করতে পারল না। মাঝপথেই থেমে যেতে হলো।
কর্নেল সুরেন্দ্র বিবি মাধবের কথার মাঝখানেই বলে উঠল, ‘ব্যাপারটাকে ঐভাবে না দেখে বলুন যে, একদল মজলুম মানুষের স্বার্থে তিনি কাজ করছেন।’
‘তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, আমরা জালেম?’ ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল বিবি মাধব।
‘আমি কিছুই বলছি না একসিলেন্সি। সে কথা আইন বলবে, বিচার বলবে।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘বিচার কি বলবে? আমরা জাতির স্বার্থে কাজ করেছি। ব্যক্তি স্বার্থে কিছু করিনি আমরা।’
কর্নেল সুরেন্দ্রের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘একসিলেন্সি আপনারা আমাদের অগ্রজ। একটা কথা বলি, একজনের সর্বনাশ করে আরেকজনের ‘পৌষ মাস’ আনা ভাল কাজ নয়, সব আইনেই এটা অপরাধ।’
কথা শেষ করেই কর্নেল সুরেন্দ্র আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘চলুন স্যার, আহমদ শাহ আলমগীরকে বাক্স থেকে উদ্ধার করতে হবে।’
আহমদ মুসা মনে মনে আহমদ শাহ আলমগীরের কথা ভেবে অধীর হয়ে উঠেছিল। কর্নেল সুরেন্দ্র নিজের থেকেই একথা মনে করায় খুশি হলো আহমদ মুসা। দুজনে বোট থেকে নেমে চলল বাক্সটার দিকে।
বাক্সের পাশে দাঁড়াতেই বুকটা দুরু দুরু করে উঠল আহমদ মুসার। কি অবস্থায় দেখবে সে আহমদ শাহ আলমগীরকে!
বাক্সের উপরের ঢাকনায় অনেকগুলো বড় বড় ফুটো। বাক্সের দুপাশে দেয়াল এবং পা ও মাথার দিকেও কয়েকটা করে বড় ফুটো। বুঝল আহমদ মুসা, আহমদ শাহ আলমগীরের বাঁচার ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা না হয় এজন্যে বাক্সে ভালো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাক্সটির দুপ্রান্ত প্লাষ্টিক দড়ি দিয়ে বাঁধা।
আহমদ শাহ আলমগীর সংজ্ঞাহীন, না সজ্ঞানে রয়েছে? ভাবল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ঝুঁকে পড়ল বাক্সটির উপর।
ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে প্রথমে জোরে একটি টোকা দিল। মুহূর্তকাল থেমে একই সাথে জোরে আরো একটি টোকা দিল।
এই টোকার ধরন আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে পরিচিত। তাদের পরিবারে আঙুল বা কলিংবেল যাই হোক নক করার ক্ষেত্রে এই সংকেত ব্যবহার করা হয়। টোকার এই সংকেতের মাধ্যমে আহমদ মুসা আহমদ শাহ আলমগীরকে এই মেসেজ দিতে চাইল যে, সে এখন আপন পরিবেশে, শত্রুদের হাতে নয়।
আহমদ মুসা নক করার কয়েক মুহূর্ত পরেই ভেতর থেকে বাক্সের ঢাকনায় ঠিক আহমদ মুসার নিয়মেই তিনবার নক হলো।
অপার খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। কর্নেল সুরেন্দ্রও ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল। সে খুশি হয়ে আহমদ মুসাকে বলল,‘গুড নিউজ স্যার। আহমদ শাহ আলমগীর সজ্ঞানে এবং সচল অবস্থায় আছে। আপনার সংকেতের জবাব দিয়েছে সে। কিন্তু আপনার সাথে এ সহযোগিতা করল কেন সে? শত্রুর সংকেতে সে তো রেসপন্স করার কথা নয়।’
‘আমি তার ফ্যামেলী কোডে সংকেত দিয়েছি কর্নেল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি।’ প্রসন্ন মুখে কথাটা বলেই কর্নেল সুরেন্দ্র কোমরের বেল্টে ঝুলানো খাপ থেকে ছুরি বের করে দু’প্রান্তের বাঁধন কেটে দিল।
আহমদ মুসা দুহাত দিয়ে বাক্সের উপরের ঢাকনা তুলে বন্ধনের এক প্রতীক অর্গলটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
আহমদ মুসার চোখ দুটি গিয়ে স্থির হলো অপার প্রত্যাশিত আহমদ শাহ আলমগীরের মুখের উপর। অনিয়ন্ত্রিত, অগোছালো লম্বা দাড়ি-গোফ এবং মাথা থেকে নেমে আসা বিশৃঙ্খল লম্বা চুলে মুখ প্রায় ঢেকে গেছে। কালোর মধ্যে মুখের সাদা দীপ্তি এবং উজ্জ্বল চোখ দেখতে পেল আহমদ মুসা। শবাসনে থাকার মত চিৎ হয়ে সে শুয়ে ছিল। তার প্রলম্বিত হাত দুটি লম্বাভাবে দেহের উপর রাখা ছিল।
আহমদ শাহ আলমগীরের চোখ চার দিকে ঘুরে এসে আহমদ মুসার মুখের উপর স্থির হলো। ধীরে ধীরে তার চোখে ফুটে উঠল সাত রাজারধন কুড়িয়ে পাওয়ার এক আনন্দ।
আর আহমদ মুসার চোখে অবশেষে আহমদ শাহ আলমগীরকে ঘিরে পাওয়ার অশ্রুঘন এক আবেগ।
শোয়া থেকে তাকে তুলে আনার জন্যে আহমদ মুসা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
আহমদ শাহ আলমগীরের ডান হাত উঠে এল। কাঁপছিল তার হাত। অপুষ্টিতে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার হাতের চামড়া। হাতের আঙুলগুলো অনেকটাই শিথিল।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে ফেলল। আহমদ শাহ আলমগীরের বাম হাত উঠে এল এবং আঁকড়ে ধরল আহমদ মুসার হাত।
আহমদ মুসা তাকে টেনে তুলল এবং জড়িয়ে ধরল। আহমদ শাহ আলমগীরও আহমদ মুসাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
‘তুমি ঠিক আছ আহমদ শাহ আলমগীর?’ নরম কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘আমার সব দুঃখ, সব বেদনা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। আমি আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরতে পেরেছি। তিনি আমাকে উদ্ধার করতে এসেছেন, উদ্ধার করেছেন।’ অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল আহমদ শাহ আলমগীর। তার শেষ কথাগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আহমদ মুসা নরমভাবে আহমদ শাহ আলমগীরকে পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিল। বলল, ‘আমি আহমদ মুসা তুমি কি করে জানলে?’
‘আপনি বিভেন বার্গম্যান, ওরফে আহমদ মুসা। আপনার সব কথাই ওরা গল্প করতো এবং বলতো, ‘আহমদ মুসা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে সত্য, তবে আহমদ মুসা কেন তার বাবাও পারবে না তোকে উদ্ধার করতে। কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম।’
আহমদ মুসা আহমদ শাহ আলমগীরকে একটু উঁচু করে বাক্সের বাইরে নিয়ে এল। বলল, ‘তোমার কাছ থেকে অনেক কথা শোনার আছে। চলো আগে বোটে, হাঁটতে পারবে?’
আহমদ শাহ আলমগীর কিছু বলার আগেই পাশ থেকে সিবিআই কর্নেল বলল আহমদ মুসাকে, ‘স্যার শাহ সাহেবের বাক্সে শোয়া অবস্থায় একটা ফটো নেয়া হয়েছে, বাক্সের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় একটা ছবি নিতে চাই স্যার।’
‘অবশ্যই, আপনার আইনের জন্যে যা যা প্রয়োজন, তা অবশ্যই করবেন।’
বলে আহমদ মুসা আহমদ শাহ আলমগীরকে বাক্সের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সরে এল।
কিন্তু আহমদ শাহ আলমগীর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। টলে উঠল তার দেহ।
সিবিআই-এর ক্যামেরা ক্লিক করে উঠল।
বাক্সের পাশে টলায়মান আহমদ শাহ আলমগীরের দেহটাই ক্যামেরাবন্দী হয়ে গেল।
আহমদ মুসা এবং কর্নেল সুরেন্দ্র দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলল আহমদ শাহ আলমগীরকে। পড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেল সে।
‘স্যার এঁর দেহের কাঠামোটা শুধু ঠিক আছে, দীর্ঘ নির্যাতন তাঁর দেহের আর কিছু বাকি রাখেনি। দেখুন দুই হাতের কব্জিই ক্ষত-বিক্ষত। মনে হয় ভেতরে ঘা এখনও কাঁচা আছে। বাহুতেও দেখুন অনেক কালচে দাগ। কাপড়ের নিচে দেহের অবস্থা যে কি ঈশ্বর জানেন।’ বলল কর্নেল সুরেন্দ্র।
‘আল্লাহর অশেষ প্রশংসা কর্নেল। তাদের এতসব নির্যাতন ব্যর্থ হয়েছে। নির্যাতনের ভয়াবহ শক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছে আহমদ শাহ আলমগীর। ওরা যা চেয়েছিল তার কাছ থেকে তা পায়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কারণ সম্ভবত এই যে, তার দেহের শক্তি যত কমেছে, মনের শক্তি তত বেড়েছে।’
কথা শেষ করেই কর্নেল সুরেন্দ্র বলল, ‘স্যার চলুন একে তাড়াতাড়ি বোটে নিয়ে যাই। কিছু খাওয়াতে হবে। আমাদের কাছে চা, জুস ও শুকনো খাবার আছে।’
‘হ্যাঁ চলুন। সত্যই ওকে খাওয়ানো প্রয়োজন। কখন খেয়েছে কে জানে? আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার তাকে দেয়া হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
দু’জনে দুদিক থেকে ধরে আহমদ শহা আলমগীরকে বোটে তুলল।
বোটের কেবিনে বিছানা পাতাই ছিল।
আহমদ শাহ আলমগীরকে অজু করিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল আহমদ মুসা।
একজন সৈনিককে নিয়ে প্রবেশ করল কর্নেল সুরেন্দ্র। কর্নেল সুরেন্দ্রের হাতে পানির একটি বোতল, জুসের ক্যান এবং সৈনিকের হাতে পেপার প্লেটে শুকনো খাবার ও চা।
আহমদ শাহ আলমগীরকে খাবার দিয়ে কর্নেল সুরেন্দ্র আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার ওদিকের একটা ব্যবস্থা করতে হয়। কে কিভাবে আমরা যাব ঠিক করে ফেলতে হয়।’
‘দিল্লী কি বলছে?’
‘দিল্লী থেকে সিবিআই এর একটা টীম পোর্ট ব্লেয়ারে আসছে, তারা গভর্নর বিবি মাধবকে দিল্লী নিয়ে যাবে। আর অন্য সব বন্দীরা এখানে থাকবে। তাদের জিজ্ঞাসাবাবদ করে মহাসংঘের সব তথ্য জানতে হবে। ‘মহাসংঘে’র সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
‘নাইস। বন্দীদের নিয়ে সবাই এক সাথে যেতে পারলে ভাল হয়। আমাদের দুটি বোট আছে। তৃতীয় একটি বোট ডোবানো আছে, এ বোটেই আমি এসেছিলাম। তিনটি হলেও এক সাথে আমরা যেতে পারছি না। এই……….।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই কর্নেল সুরেন্দ্র বলে উঠল, ‘স্যরি স্যার মাঝখানে কথা বলার জন্যে। এক সাথে আমরা যাচ্ছি না। আমার সহকারী মেজর বীরবল সৈনিকদের নিয়ে এখানে থাকছে। আমরা মাত্র জনাছয়েক সৈনিক ও বন্দীদের নিয়ে এখন পোর্ট ব্লেয়ারে যাব। মেজর বীরবলরা মহাসংঘের রস দ্বীপের ঘাঁটি সার্চ করে তথ্য প্রমাণাদি যা পায় তা নিয়ে পরে পোর্ট ব্লেয়ারে যাবে। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে পুলিশ আসার জন্যেও তাদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। ঘাঁটির দায়িত্ব পুলিশের হাতে ন্যাস্ত করার আগে তারা যেতে পারবে না।’
‘ওকে কর্নেল, সঠিক সিদ্ধান্ত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ স্যার। তাহলে ওদিকটা দেখি। সব ব্যবস্থা করে ফেলি।’ কর্নেল সুরেন্দ্র বলল।
‘ওকে কর্নেল।’
কর্নেল সুরেন্দ্র উঠে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
খাওয়া শেষ করেছে আহমদ শাহ আলমগীর।
খাবারের অবশিষ্ট নিয়ে বেরিয়ে গেল সৈনিকটি।
সৈনিকটি বেরিয়ে যেতেই আহমদ শাহ আলমগীর পশ্চিম দিকে ঘুরে সিজদায় পড়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ সিজদায় থাকল।
সিজদা থেকে উঠে সালাম ফিরিয়ে ঘুরে বসল আহমদ মুসার দিকে।
তার চোখে অশ্রু। বলল সে, ‘আপনার আন্দামানে আগমন অকল্পনীয় এক ব্যাপার। আল্লাহর অসীম দয়া। আমার এবং আমাদের সাহায্যের জন্যেই আপনাকে তিনি এখানে এনেছেন। যাদের কেউ থাকে না, আল্লাহ বোধ হয় এভাবেই তাদের সাহায্য করেন।’ কান্না জড়ানো কণ্ঠ আহমদ শাহ আলমগীরের।
‘অবশ্যই।’ বলে আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করল। বলল, ‘তোমার আম্মা, শাহবানু, সুষমার সাথে কথা বলো। ওঁরা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছে।’
‘আমার মা-বোন এবং পরে সুষমাকে কিডন্যাপ করেছে আমাকে কথা বলতে বাধ্য করার অস্ত্র হিসাবে এটা আমি ওদের কাছেই শুনেছি। আবার ওঁরা তাদের হাতছাড়া হয়েছে, সে কথা বলেও তারা আমাকে নির্যাতন করেছে। আমি তখনই বুঝেছি, আপনিই তাদের উদ্ধার করেছেন।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
আহমদ মুসা মোবাইল কল করতে করতে বলল, ‘ধর তাদের যদি তোমার সামনে নিত আর তাদের নির্যাতন করতো, তাহলে কি ওদের প্রার্থীত তথ্য দিয়ে দিতে ওদেরকে?’
‘আমার বলার কিছু ছিল না। ওরা যা জানতে চায় আমিতা জানি না।’ আহমদ শাহ আলমগীর বলল।
‘শোন আহমদ শাহ আলমগীর, ঐ বিষয়টা কি? তা জানার খুব ইচ্ছা আমারও। কোন তথ্য বা কি তোমার কাছে ওরা জানতে চাচ্ছিল?’ বলল আহমদ মুসা দ্রুতকণ্ঠে এবং আগ্রহের সাথে।
‘জি, সেটা এক বাক্সের কথা।’ বলতে শুরু করল আহমদ শাহ আলমগীর, ‘বাক্সটিতে না কি আছে…………।’
আহমদ মুসা হাত তুলে ইশারা করে থামতে বলায় থেমে গেল আহমদ শাহ আলমগীর।
আহমদ মুসা মোবাইলে কল পেয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে শুরু করেছিল।
…………..আমি ভাল আছি, আহমদ শাহ আলমগীর ভাল আছে। খালাম্মাকে ডাক। আহমদ শাহ আলমগীরের সাথে কথা বল।’
আহমদ মুসা মুখ থেকে মোবাইল সরিয়ে আহমদ শাহ আলমগীরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘শাহবানুর সাথে কথা বল। খালাম্মা আসছে। এঁদের সাথে কথা শেষ কর, তারপর সুসমার সাথেও লাগিয়ে দেব।’
আহমদ শাহ আলমগীরের চোখ-মুখ মুহূর্তেই আনন্দ-আবেগে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিল।
আহমদ মুসা তার হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে বলল, ‘তুমি কথা বল, আমি এখুনি আসছি।’
বলে আহমদ মুসা বোটের কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। আহমদ মুসা চাইল, আহমদ শাহ আলমগীর সংকোচহীন পরিবেশে প্রাণখুলে কথা বলুক। সুষমার সাথে আহমদ শাহ আলমগীরের কথা বলার অবস্থা কেমন হবে, সেটাও ভাবনায় এল আহমদ মুসার। কান্না ও বাঁধভাঙ্গা আবেগের বন্যা নিশ্চয় দুজনের কণ্ঠই রুদ্ধ করে দেবে। এই না বলার মধ্যেই তাদের সব বলা হয়ে যাবে।

হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর বিশাল ডাইনিং রুম। ডিম্বাকৃতি বিশাল টেবিলটি মেহমানদের জন্যে সুন্দর করে সাজানো। সব রেডি। মেহমানরা আসলেই খাদ্য পরিবেশন করা হবে। হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ এবং তার স্ত্রী ঘুরে ঘুরে সব ঠিক-ঠাক আছে কিনা দেখছে।
ডাইনিংটি সাগরের তীর ঘেঁষে। ডাইনিং রুম লম্বালম্বি। পুব ধারটায় কাঁচের দেয়াল। কাঁচের ভিতর দিয়ে বিশাল আন্দামান সাগরের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। কাঁচের দেয়ালের উত্তর প্রান্ত ঘেঁষেই একটা ল্যান্ডিং। সেখান থেকে একটা সিড়ি উঠে গেছে দুতলায়। ডাইনিং-এর জন্যেই সম্ভবত এই সিঁড়িটা ব্যবহার করা হয়। সিঁড়ির এই ল্যান্ডিংটার পূর্ব প্রান্তে একটা দরজা। দরজাটা খুলেই দেখা যাবে একটা পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে সাগরের পানিতে। পানির লেভেলে সিঁড়ির সাথে একটা সুন্দর বোট বাঁধা।
টেবিলের চারদিক এবং গোটা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষ করে হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ এবং বেগম হাসনা আবদুল্লাহ দুজন এসে একটা সোফায় পাশাপাশি বসল।
বসেই হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘আহমদ মুসা তো এতক্ষণ এসে পৌছার কথা।’
‘বাছাকে কোন টাইম ফ্রেমে বাঁধা চলে না। যে নিজে নিজের নিয়ন্ত্রক নয়, সে কোন নিয়মের মধ্যে নিজেকে বাঁধবে কি করে?’ বলল বেগম হাসনা আবদুল্লাহ।
‘আমাদের সবার জীবনই তো আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। ফল বা রেজাল্ট যা কিছু তাঁর কাছ থেকেই আসে। কিন্তু কাজ করার পরিকল্পনার অধিকার তো তিনি মানুষকে দিয়েছেন। কাজ হলে ফল তিনি মানুষকে দেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের জন্যে রুটিন তৈরি করার এক্তিয়ার মানুষের রয়েছে। এ এক্তিয়ার আল্লাহ আহমদ মুসাকে একটু বেশি দেবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘ধন্যবাদ। ঠিক বলেছ।’
কথার সাথে সাথে বেগম হাসনা আবদুল্লাহ সোফায় গা এলিয়ে দিল। বলল, ‘আমার কাছে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কি ছিল আন্দামান, কি হয়ে গেল। মাত্র একজন মানুষ এল, আর সব পাল্টে গেল!’
মিষ্টি হাসল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘সেই মানুষটি তো শুধুই মানুষ নয় হাসনা। সে রূপকথা ‘জিয়ন কাঠি’ এবং সবাই যার সন্ধানে পাগল সেই ‘সৌভাগ্য স্পর্শমনি’ বা ‘পরশ পাথর’ সে। তার স্পর্শে লোহা সোনা হয় না বটে, কিন্তু তার পরশে অশান্তি শান্তিতে এবং সন্ত্রাস সুস্থতায় রূপান্তরিত হয়।’
হাজী আবদুল্লাহ থামতেই কলিং বেল বেজে উঠল। বাজল তাদের ফ্যামিলি কোডে।
বেগম হাসনা আবদুল্লাহর মুখে একটা আনন্দের প্রবাহ খেলে গেল। সুইচ কনট্রোল বাক্সটা হাতে তুলে নিতে নিতে বেগম হাসনা আবদুল্লাহ বলল, দেখ, ঠিক সময়েই এসে গেছে আহমদ মুসা।’
পরে কনট্রোল বক্সের একটা সুইচ টিপে বক্সটিকে মুখের কাছে নিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলায়কুম। বেটা আহমদ মুসা এসো।’
আহমদ মুসা এল। ড্রইং হয়ে ডাইনিং লাউঞ্জে প্রবেশ করল।
হাজী আবদুল্লাহ এবং বেগম হাজী আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাল।
আহমদ মুসা হাজী আবদুল্লাহর সাথে হ্যান্ডশেক করে এবং বেগম আবদুল্লাকে সালাম দিয়ে তাদের সামনের সোফায় গিয়ে বসল।
বেগম হাজী আবদুল্লাহ বসেই বলে উঠল, ‘তুমি বহুদিন বাঁচবে বেটা। তোমার কথাই বলছিলাম আমরা, তুমি এসে পড়েছ।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘খবরটা আনন্দের আম্মা। কিন্তু সমস্যা হলো, দুনিয়াতে যত বেশি সময় থাকব, হিসাবের খাতা ততই লম্বা হবে, পাকড়াও হওয়ার বিপদের ঝুঁকি ততই বাড়বে।’
‘তুমি এমন চিন্তা করলে আমাদের দশা কি হবে বাছা! পরের তরে তোমার জীবন, হিসাবের খাতায় তোমার বিরুদ্ধে তো লেখার কিছু নেই।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
গাম্ভীর্য নেমেছে আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘আল্লাহর রসূল স.-এর সাহাবীরা যারা বেহেশতের আগাম সুসংবাদ পেয়েছিলেন, তারাও মহাহিসাবের দিনে তাদের কি হবে এ চিন্তায় অঝোর নয়নে কাঁদতেন।’
‘সুবহানাল্লাহ।’ উচ্চারিত হলো হাজী আবদুল্লাহর কণ্ঠে।
সবার চোখে-মুখেই উদ্বেগের মলিনতা।
একটা নিরবতা নামল সবাইকে ঘিরে।
নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসাই। বলল হাজী আবদুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে, ‘জনাব বিরাট সুখবর, গভর্নর বিবি মাধব স্বীকারোক্তিমূলক বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছে। সন্ত্রাসী দল ‘শিবাজী সন্তান সেনা’ এবং ‘মহাসংঘে’র গোটা নেটওয়ার্কের নাম-পরিচয় ধরা পড়ে গেছে। শীর্ষ নেতারাসহ প্রথম ও মাঝারী শ্রেণীর সব নেতাই ধরা পড়ে গেছে। আসার সময় কর্নেল সুরেন্দ্রের কাছে সর্বশেষ তালিকাটা দেখে এলাম।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের হিন্দুস্তান বোধ হয় বেঁচে গেল এক সর্বনাশা ষড়যন্ত্রের কবল থেকে। মহাসংঘের শীর্ষ নেতা কে? তিনিও ধরা পড়েছেন?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘তিনি শাসক দলসহ অনেক রাজনৈতিক দলের আধ্যাত্মিক নেতা এবং নির্দলীয় সক্রিয় রাজনীতিক রাজগুরু দেশমুখ লালা রামমনোহর লেহিয়া। তাকে সর্বশেষে আজ কিছুক্ষণ আগে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
‘সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ঠিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ আনন্দ-বিস্ফোরিত চোখে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
একটু থেমেই আবার বলল হাজী আবদুল্লাহ, ‘আন্দামানের আর নতুন কিছু ধর-পাকড় বাকী আছে?’
‘সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে থেকে আর নতুন কোন ধর-পাকড় নেই। যা হয়েছে শুরুতেই। বেশি লোক ধরা পড়েছে পুলিশ ও আমলাদের মধ্য থেকে। কর্নেল সুরেন্দ্র বললেন, যে লিষ্ট তারা পেয়েছিল গভর্নর বিবি মাধবের ফাইল থেকে, সে লিষ্ট অনুসারে উল্লেখযোগ্য সবাই ধরা পড়েছে। এখন তারা আহমদ শাহ আলমগীর ও সুষমা রাওয়ের কিডন্যাপসহ প্রতিটি ঘটনা ও হত্যাকান্ডের পৃথক পৃথক তদন্ত করছে। মামলাগুলো আদালতে উঠলে সব রহস্য, সহ কথা প্রতিটি হিন্দুস্তানীর কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিশেষ করে আহমদ শাহ আলমগীর ও সুষমা রাওয়ের কিডন্যাপ হিন্দুস্তানের সর্বকালের ইতিহাসের বড় ঘটনায় পরিণত হবে বলে কর্নেল সুরেন্দ্র মনে করেন।’ থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই বেগম হাজী আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘সব খবরই আনন্দের। কিন্তু সুষমা রাও ও মিসেস বিবি মাধবের কথা ভেবে আমার কষ্ট হচ্ছে। পিতা ও স্বামীর সম্বন্ধটা সবার ওপরে।’
‘ঠিক বলেছেন আম্মা। এই সম্বন্ধ সবকিছুর ওপরে। সুষমা রাও এবং মিসেস বিবি মাধবও বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছেন। খবর জানার পর মা ও মেয়ে বুক ভাঙা কান্নায় ভেংগে পড়েন, অঝোর ধারায় তাদের চোখে অশ্রু নামে। তাদের সামনে বসে থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। অপরাধী মনে হয়েছে নিজেকে। সান্তনা দেবার মত কোন কথা তাই আমার মুখে যোগায়নি। কিন্তু শীঘ্রই মিসেস মাধব নিজেকে সামলে নেন। চোখ মুছে তাড়াতাড়ি বলল, ‘স্যরি বেটা, আমাদের মাফ করো। আমাদের কান্নাকে ক্রিমিনালের প্রতি সমবেদনা মনে করো না। এ কান্না আমাদের আপন জনের বিয়োগ ব্যথার।’ তারপর একটু থেমেই আবার বলে ওঠেন, ‘আমাদের সাথে তুমিও চলো বেটা। সিবিআই যেটা চেয়েছে, তার কিডন্যাপ সম্পর্কে সেই ষ্টেটমেন্ট তো সুষমা দেবেই, আমিও তার মা হিসাবে সুষমাকে কিডন্যাপের অভিযোগে গভর্নর মাধবের বিরুদ্ধে কেস দায়ের করব। তিনি কিডন্যাপ করিয়েছেন, সেটা আমি তার মুখ থেকেই শুনেছি। সত্যিই সুষমা রাও সিবিআই ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে তার বিরুদ্ধে শক্ত জবানবন্দী রেকর্ড করিয়েছে। তার মা মিসেস মাধবও সুষমাকে কিডন্যাপের অভিযোগে শক্ত কেস দায়ের করেছে।’
‘সত্যিই বিস্ময়কর এ ঘটনা বাছা।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
‘পাপের পাল্লা ভারী হলে, সহ্যের সীমা শেষ হয়ে গেলে এক সময় এরকমই হয়। আহমদ শাহ আলমগীরকে কিডন্যাপের একটা যুক্তি হয়ত তাদের দেয়ার মত আছে, কিন্তু নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করার কারণ হিসাবে যে যুক্তিই দাঁড় করানো হোক তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই পাপই শেষে বিবি মাধবরা করেছেন। তাছাড়া সুস্মিতা বালাজীর সাথে নিজের মামা হয়ে যে আচরণ বিবি মাধব করেছেন, তা আপনারা শুনেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ মনে আছে, বিশ বছরের বনবাস জীবন, সেও এক অপরূপ রূপ কথা।’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
বেগম হাজী আবদুল্লাহর কথা শেষ হবার আগেই কলিংবেল বেজে উঠেছিল। কথা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বেগম হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘নিশ্চয় মেহমানরা কেউ এসেছে। দেখছি আমি। আহমদ মুসা তুমি বস।’
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়িয়েছিল।
বেগম হাজী আবদুল্লাহর কথার উত্তরে আহমদ মুসা বলল, ‘না আম্মা আপনি বসুন। সম্ভবত শাহবানুরা এসেছে।’
ইতিমধ্যেই হাজী আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়িয়েছিল। হাত উঁচু করে আহমদ মুসাকে থামতে ইঙ্গিত করে বলল, ‘জনাব আহমদ মুসা, আপনি আমাদের অসীম সম্মানের দুর্লভ মেহমান। বয়সে বড় হওয়ার সুবাদে আপনার মহত্বের সুবাদে আমরা অনুচিত সুযোগ আপনার কাছে নিচ্ছি। তাই বলে আমাদের মেহমানদের দরজা খুলে দেয়ার এবং তাদের স্বাগত জানানোর দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে, এতটা বেআদব হওয়া আমাদের ঠিক নয়।’ গম্ভীর কণ্ঠ হাজী আবদুল্লাহর।
কথা শেষ না করেই উত্তরের অপেক্ষা না করে বড় বড় পা ফেলে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল হাজী আবদুল্লাহ।
কিন্তু উত্তর আহমদ মুসা দিলই। বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে, ‘আম্মাজী একেবারে ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’, আর সন্তানের আসন থেকে একেবারে মাথায় তুলে বসানো, এটা কি হলো?’
গম্ভীর হয়ে উঠেছে বেগম হাজী আবদুল্লাহও। বলল, ‘ঠিকই বলেছেন উনি। তোমার সহজ-সারল্য, অন্যকে বড় করে দেখার, অন্যকে সম্মান দেয়ার তোমার সার্বক্ষণিক আচরণের কারণে আমরা ভুলে যাই যে, তুমি দুর্লভ এক মানুষ, এক মহাসম্মানের মেহমান তুমি আমাদের, যার সামনে আমাদের সংযত, সপ্রতিভ ব্যবহার কাম্য। তুমি আমাদের মাফ কর আহমদ মুসা।’ আবেগে ভারী কণ্ঠ বেগম আবদুল্লাহর।
আহমদ মুসা ধপ করে বসে পড়ল তার সোফায়। তারও মুখে গাম্ভীর্য নেমে এসেছে।
হাজী আবদুল্লাহ মেহমানদের নিয়ে প্রবেশ করল ড্রইংরুমে।
এসেছে মিসেস বিবি মাধব সুষমার মা, সুষমা রাও, আহমদ শাহ আলমগীর, তার মা সাহারা বানু ও বোন শাহবানু এবং তারিক মুসা মোপলা।
আহমদ মুসা এবং বেগম আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়াল। হাসি মুখে স্বাগত জানাল মেহমানদের।
আহমদ শাহ আলমগীর, সুষমা, শাহবানু এবং তারিক মুসা মোপলা বেগম হাজী আবদুল্লাহকে পা ছুঁয়ে সালাম করল।
বেগম আবদুল্লাহ তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বলল, আমাকে নয় আগে সালাম করতে হতো আহমদ মুসাকে। তার সামনে আমাদেরকে আগে সম্মান দেখানো অপরাধ না হলেও অসৌজন্যমূলক।’
‘স্যরি খালাম্মা। ঠিক বলেছেন আপনি। আমরা তাকে সালাম করছি। কিন্তু উনি পা ছুঁয়ে সালাম করতে দেন না।’
বলে আহমদ শাহ আলমগীর এগোলো আহমদ মুসার দিকে।
লম্বা চুল, দাড়ি, গোঁফ কেটে আহমদ শাহ আলমগীর নতুন মানুষ হয়েছে। দেহে দূর্বলতা থাকলেও চোখে-মুখে আগের সেই ক্লান্তি আর নেই। রক্তিম সাদা চেহারায় ঔজ্জল্য ফিরে এসেছে। বাইশ-তেইশ বছরের সুদর্শন, টগবগে যুবকের চেহারা তার পুরোপুরি ফিরে এসেছে। তাকে মোগলদের একমাত্র প্রতিকৃতি হিসেবে খুবই উপযুক্ত মনে হচ্ছে।
আহমদ শাহ আলমগীরের সাথে তারিক মুসা মোপলা, সুষমা-শাহবানুরাও এগুচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা সোফায় বসে পড়ল। বলল, ‘এসো সবাই আমার পা ছুঁয়ে সালাম করো। দু’একটা ফুলও পায়ের কাছে রাখতে পার। ভগবানরা নাকি অবতার হয়ে মাঝে মাঝে দুনিয়াতে আসেন মানুষের ত্রাতা হয়ে। আমি সেরকমই একজন অবতার কিনা!’ গম্ভীর, ভারী কণ্ঠ আহমদ মুসার।
সুস্মিতা বালাজী, ড্যানিশ দেবানন্দ, সুরুপা সিংহাল এবং সাজনা সিংহালকে নিয়ে হাজী আবদুল্লাহও এসে দাঁড়িয়েছিল। তারাও শুনল কথাগুলো।
বেগম আবদুল্লাহ, সুষমার মা, সাহারা বানু সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল তাদের স্বাগত জানানোর জন্যে।
সুষমার মা মিসেস বিবি মাধব গিয়ে সুস্মিতা বালাজী ও সুরুপা সিংহালকে এক সাথে জড়িয়ে ধরল। সুস্মিতা বালাজী এসে সুষমা রাও শাহবানুকে জড়িয়ে ধরল এক সাথে।
আহমদ মুসার কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়েছিল আহমদ শাহ আলমগীর ও তারিক মুসা মোপলা। আহমদ মুসার এমন কণ্ঠ, এমন কথা তারা কখনও শোনেনি। তারা ভেবেছিল বেগম আবদুল্লাহর কথায় আহমদ মুসা হাসবে এবং তার পা ছুঁতে গেলে আহমদ শাহ আলমগীরদের ধমকাবে। কিন্তু তার বদলে আহমদ মুসাকে অভিমান-ক্ষুব্ধ হতে দেখে আহমদ শাহ আলমগীর অবাক হয়েছে। তারা এই অবস্থাতেই গিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করল সুস্মিতা বালাজী এবং ড্যানিশ দেবানন্দকে।
সুস্মিতা বালাজী আহমদ শাহ আলমগীর ও তারিক মুসা মোপলার মাথায় হাত বুলিয়ে আহমদ মুসার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে বলল, ‘ছোট ভাই, আমরা অবিশ্বাস করার মত এমন কথা, আমরা ভয় পাবার মত এমন ক্ষুব্ধ কণ্ঠ তো আপনার কখনো শুনিনি? কি ব্যাপার ছোট ভাই, অবতার হওয়ার প্রশ্ন উঠল কেন?’
সুস্মিতা বালাজী থামতেই সুষমার মা মিসেস বিবি মাধব বলে উঠল, ‘আরও কথা আছে সুস্মিতা। আমরা এসে কিন্তু এদের ঠোটে হাসি দেখেছি, কিন্তু চোখের দৃষ্টি ও মুখের চেহারায় কিন্তু হাসি দেখিনি। যেন বিব্রতকর কিছুর মাঝে আমরা এসে পড়েছি।’
মিসেস বিবি মাধব থামতেই শব্দ করে হেসে উঠল বেগম আবদুল্লাহ বলল, ‘না বিব্রতকর কিছু ঘটেনি। ঘটেছে মজার কিছু।’
কথা শেষ করেই বেগম আবদুল্লাহ তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল বলে দাও আহমদ মুসাকে তুমি কি বলেছিলে?’
হাজী আবদুল্লাহ তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার মুখে স্নেহসিক্ত হাসি এবং চোখে সম্ভ্রমপূর্ণ দৃষ্টি। বলল, ‘তোমাকে জিজ্ঞাসা করছেন ওঁরা, তুমিই বল হাসনা।’
‘ব্যাপারটা ঘটেছে মেহমানদের স্বাগত জানানোর বিষয় নিয়ে।’ বেগম আবদুল্লাহ আহমদ মুসাকে হাজী সাহেব কি বলেছিল, আহমদ মুসা কি বলেছিল, বেগম আবদুল্লাহ কি বলেছিল সব তাদের জানিয়ে বলল, ‘আসলে আহমদ মুসা সব সময়ই ব্যক্তি আহমদ মুসাকে বড় করে তুলে ধরার ঘোর বিরোধী।’
‘এটাই আহমদ মুসা। বড়দের প্রতি, গুরুজনদের সাথে আহমদ মুসা এই ব্যবহারই করেন।’ বলল সাহারা বানু।
‘যার যে মর্যাদা সেটা তাকে দেয়া এবং যার যে সম্মান সেটা পাওয়াই তো স্বাভাবিক। গুণের স্বীকৃতি দেয়া তো অন্যায় নয় ছোট ভাই।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল সুস্মিতা বালাজি। সুস্মিতা বালাজীর শান্ত ও ভারী কণ্ঠস্বর।
আহমদ মুসা সোফায় সোজা হয়ে বসল।
তার ঠোঁটে হাসির অস্পষ্ট একটা ধারা ফুটে উঠল। বলল, ‘সম্মান ও মর্যাদার পেছনে থাকে কারও কোন মহৎ চিন্তা বা কাজ। এই কাজ ও আদর্শের স্বীকৃতি, অনুসরণ স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক, অসমিচীন হলো ব্যক্তিকে বড় করে তোলা। এই বড় করে তোলাটা ব্যক্তি-পুজা পর্যন্তও পৌছতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্রের কাজ আদর্শ আজ হারিয়ে গেছে। পূজা পায় এখন ব্যক্তি রামচন্দ্র, ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণ। ইসলাম একে সমর্থন করে না, ইসলাম এর বিরুদ্ধে। আমাদের নবী মুহাম্মদ স. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ, আল্লাহর বার্তাবাহক। মানুষের জন্যে মডেল জীবন তাঁর। তিনি শ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সকলের মত একজন মাটির মানুষ। নবী হওয়ার পরেও তিনি জীবিকার জন্যে পারিশ্রমিক নিয়ে ইহুদীকে পানি তোলার কাজ করে দিয়েছেন। সকলের সাথে পাতার বিছানায় শুয়েছেন, শুকনো রুটি খেয়েছেন। তাকে আসতে দেখে বসে থাকা কাউকে উঠে দাঁড়াতে তিনি নিষেধ করেছেন। তার জন্যে সবার চেয়ে আলাদা কোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। এভাবে আমাদের নবী স্বয়ং ব্যক্তি-মানুষকে বড় করে তোলার কোন রসম-রেওয়াজ গড়ে উঠতে দেননি এবং তিনি এই ধরনের মানসিকতার মূলোচ্ছেদ করেছেন। আমার কথা এখানেই। আমাদের রসূল স. ব্যক্তি বন্দনার মূলোচ্ছেদ করেছেন। সুতরাং আমাদের উচিত তাকে অনুসরণ করা।’
থামল আহমদ মুসা।
সবাই নিরব।
নিরবতা ভাঙল সেই সুস্মিতা বালাজীই। বলল, ‘আল্লাহর রসূলের দৃষ্টান্ত দেয়ার পর আর কিছু বলার থাকে না। কিন্তু তাঁর কাজকে এত সম্মান, স্বীকৃতি দেয়া হলে ব্যক্তি এতটা নিষিদ্ধ হবে কেন? কাজ তো ব্যক্তিরই। তাছাড়া ব্যক্তি হলে, তার কাজও বড় হয়ে যেতে পারে। ব্যক্তির স্মরণ তার কাজকে সামনে আনতে পারে।’
‘কাজের স্মরণ ব্যক্তির স্মরণও সামনে এনে দেয়। এতটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু ব্যক্তির সামনে না হওয়াই ভাল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ইসলাম এই ব্যাপারে এত কঠোর কেন?’ বলল সুস্মিতা বালাজিই।
‘কঠোর এই কারণে যিশুর মত আর কাউকে যেন ঈশ্বর-পুত্র না বানানো হয়, রামচন্দ্রের মত আর যেন কেউ ভগবান না হন। ব্যক্তি-বন্দনা সংশিস্নষ্ট ব্যক্তির চরিত্র নষ্ট করে এবং তার প্রতিভার ক্ষতি করে। অন্যদিকে মানুষকেও অন্ধ ব্যক্তিকেন্দ্রীক করে দেয়। তখন মানুষ তার মূর্তি তৈরিতে যতটা অগ্রণী হয়, তার কাজ ও আদর্শের অনুসরণে ততটাই পিছিয়ে যায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। সবার তরফ থেকে ধন্যবাদ তোমাকে। বুঝতে পেরেছি, আমরা। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি এই বোঝার সুযোগ আমাদের করে দিয়েছেন।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। তার কণ্ঠ শ্রদ্ধাসিক্ত, নরম।
কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল আহমদ শাহ আলমগীর।
আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই বিষয়ে আর কোন কথা নয়। আমি একটা নতুন বিষয় এখানে উত্থাপন করতে চাই।’
বলে আহমদ মুসা থামল। হাসি মুখে তাকাল এক এক করে আহমদ শাহ আলমগীর, সুষমা রাও, শাহবানু এবং তারিক মুসা মোপলার দিকে।
হঠাৎ করে আহমদ মুসার এই দৃষ্টির কবলে পড়ে তারা চারজনই সংকুচিত হয়ে পড়ল। লাল হয়ে গেল সুষমা রাও ও শাহবানুর মুখ।
সবশেষে তাকাল আহমদ মুসা মিসেস বিবি মাধবের দিকে। বলল, ‘খালাম্মা আমি উত্থাপন করতে পারি?’
উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল সুষমার মা মিসেস বিবি মাধবের মুখ। বলল, ‘বেটা বুঝেছি আমি ইংগিত। এ অনুমতি আমার দেয়া আছে বেটা।’
‘ধন্যবাদ খালাম্মা।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মুহতারাম হাজী আবদুল্লাহ চাচাজীকে ধন্যবাদ। তার দাওয়াতে আমরা একত্রিত হবার সুযোগ পেয়েছি। এই দাওয়াতে আন্দামানের নতুন গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এবং দিল্লী থেকে সিবিআই প্রধানও আসছেন। আমি প্রস্তাব করছি, এই মহৎ অনুষ্ঠানে আহমদ শাহ আলমগীর-সুষমা এবং তারিক-শাহবানু ‘আকদ’ সম্পন্ন করা হোক।’ থামল আহমদ মুসা।
একটু নিরবতা।
আহমদ শাহ আলমগীর ও তারিক মুসা মোপলার চোখে-মুখে আকস্মিকতা সূচক বিস্ময়ভাব। সুষমা ও শাহবানুর মুখ নিচু। আর সুস্মিতা বালাজী, সুরূপা ও সাজনা সিংহালের চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে। সাহারা বানু ও মিসেস বিবি মাধব দু’জনেই গম্ভীর, মুখে প্রসন্ন ভাব।
প্রথমে নিরবতা ভাঙল বিবি মাধব। বলল, ‘বেটা আহমদ মুসা এই প্রস্তাব উত্থাপন করবে, আমি সেটা সুষমাদের দিকে তাকানো দেখেই বুঝেছি। আমি অনুমতিও দিয়েছি। আহমদ মুসাকে ধন্যবাদ যে, ভাই-বোনদের কথা সে এতটা মনে রাখে।’
মুহূর্তকালের জন্য থামল মিসেস বিবি মাধব। মুহূর্তের জন্যে মুখটা নিচু করেছিল। আবার মুখ তুলল। ভারী, গম্ভীর মুখে বলল, ‘সবাই জানেন আমার স্বামী সুষমার বাবা বালাজী বাজিরাও মাধব এখন সরকারি কাষ্টডিতে এবং দিল্লীতে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে পিতার হাজির থাকার কথা। সে সুযোগ নেই। কিন্তু বিষয়টি তাকে জানিয়ে আমি অনুমতি নিয়েছি। তাঁকে নেয়ার আগে সিবিআই আমাকে সুযোগ দিয়েছিল তাঁর সাথে একান্তে কথা বলার। আমি সে সময় আহমদ শাহ আলমগীরের সাথে সুষমার বিয়ে কথা তুলেছিলাম। তিনি অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং তিনি না থাকলেও তাঁর অনুমতি আমাদের সাথে আছে।’ থামল মিসেস বিবি মাধব। তার শেষের কথা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সুষমা গিয়ে জড়িয়ে ধরল তার মাকে। কান্নায় ভেঙে পড়ল সুষমাও।
সাহারা বানু উঠে গিয়ে সুষমার মাথায় হাত বুলিয়ে মিসেস বিবি মাধবের কাঁধে হাত রাখল। বেগম আবদুল্লাহ গিয়ে মিসেস বিবি মাধবের পাশে বসল। তার একটি হাত তুলে নিল হাতে। বলল, ‘মিসেস মাধব আমরা গর্বিত। আমাদের ভারতবাসী সকলের জন্যে আপনারা একটি মহৎ দৃষ্টান্ত।’
মিসেস মাধব চোখ মুছে বলল, ‘স্যরি বেগম আবদুল্লাহ, স্যরি বোন সাহারা, স্যরি এভরিবডি।’ তারপর সুষমাকে কোলে টেনে নিল এবং আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বেটা আহমদ মুসা, তুমি ‘আকদ’ এর আয়োজন কর। সুষমার বিয়েও মুসলমানী মতেই হবে। ভালোই হবে, গভর্নর বিচারপতি রাও থাকবেন। আমরা একই বংশের।’
এরই মধ্যে গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এবং দিল্লী থেকে আসা সিবিআই চীফ ব্রিগেডিয়ার যশোবন্ত যশোরাজকে রিসিভ করার জন্য হাজী আবদুল্লাহ বাইরে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরে মেহমানদের সাথে নিয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করলেন।
ড্রইংরুমে ঢুকেই গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এগিয়ে গেল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও হাত বাড়িয়ে দিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘ওয়েলকাম স্যার। আবার আপনার সাথে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হবে ভাবিনি।’
‘সৌভাগ্য আমার আহমদ মুসা। আমাদের দেখা যে কেউ পেতে পারে, কিন্তু আপনার দেখা পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। সেদিন আপনার সাথে আলোচনা আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা।’ বলে গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও পাশে এসে দাঁড়ানো সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজকে আহমদ মুসার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
আহমদ মুসা দ্রুত হাত বাড়িয়ে বলল, ‘কনগ্রাচুলেশন স্যার, সিবিআই একটা ঐতিহাসিক কাজ করেছে। ভারতের মানুষ চিরদিন মনে রাখবে এটা।’
সিবিআই প্রধান যশোবন্ত যশোরাজ আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘না মি. আহমদ মুসা, কনগ্রাচুলেশন আপনার প্রাপ্য। আমি দিল্লী থেকে আপনাকে অভিনন্দন জানাবার জন্যই এসেছি। আপনি জানেন না, সিবিআই একবার এসে বিভ্রান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল। এবার আসলে আপনি সব কাজ করেছেন, সিবিআই শেষ মুহূর্তে আপনাকে সাহায্য করেছে মাত্র।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই হাজী আবদুল্লাহ এগিয়ে এসে গভর্নর বিচারপতি রাও ও সিবিআই চীফকে একটা নির্দিষ্ট সোফা দেখিয়ে বলল, ‘স্যাররা বসুন।’
তারা গিয়ে বসল। সিবিআই চীফ আহমদ মুসাকে টেনে নিয়ে তার পাশে বসাল।
সবাই বসলে উঠে দাঁড়াল হাজী আবদুল্লাহ। সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়গণ! আমরা দুজন সম্মানিত মেহমানের অপেক্ষা করছিলাম। গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এবং সিবিআই চীফ মি. যশোবন্ত যশোরাজ এসেছেন। আমরা মেহমানদ্বয়কে আমাদের মাঝে স্বাগত জানাচ্ছি। লাঞ্চের পর আমাদের একটা প্রোগ্রাম আছে। লাঞ্চে যাওয়ার আগে এ বিষয়ে কিছু বলবেন মিসস বিবি মাধব।’
কথা শেষ করেই মিসেস বিবি মাধবের দিকে তাকিয়ে অনুরোধ করলেন তাকে বলার জন্যে।
উঠে দাঁড়াল মিসেস বিবি মাধব। বলল, ‘সম্মানিত মেহমানদ্বয় এবং ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আসন্ন লাঞ্চের পর আমার মেয়ে সুষমা রাওয়ের সাথে আহমদ শাহ আলমগীর এবং আহমদ শাহ আলমগীরের বোন শাহবানুর সাথে আন্দামানের বাসিন্দ, এখন লন্ডন প্রবাসী তারিক মুসা মোপলার ‘আকদ’ এর অনুষ্ঠান হবে। সম্মানিত মেহমানদ্বয়সহ সকলকে উক্ত অনুষ্ঠানে শরীক হবার জন্যে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
মিসেস বিবি মাধবের কথা শেষ হতেই গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এবং সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজ মৃদু হাততালির সাথে সাথে এক সংগে বলে উঠল, ‘শুভ সংবাদ সুস্বাগত, শুভ সংবাদ সুস্বাগত।’
তাদের সাথে সাথে সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।
মিসেস বিবি মাধব আবার উঠে দাঁড়াল এবং সবাইকে ধন্যবাদ জানাল।
হাজী আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমরা এখন লাঞ্চে……।’
সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজ হাত তুলল হাজী আবদুল্লাহর উদ্দেশ্যে। হাজী আবদুল্লাহ মাঝখানে থেমে গেল।
উঠে দাঁড়াল যশোবন্ত যশোরাজ। বলল, ‘আমি দুঃখিত মাঝখানে কথা বলার জন্যে। আমরা লাঞ্চের পর যেহেতু আরেকটা বড় অনুষ্ঠানে জড়িয়ে পড়ব, এজন্যে লাঞ্চের আগেই ভারত সরকারের একটা ঘোষণা আমরা সবাইকে জানাতে চাই। ঘোষণাটি আহমদ মুসার বিষয়ে। আজ প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অতি মূল্যবান সহযোগিতা দেয়ার জন্যে আহমদ মুসাকে ‘ভারত মহাপদ্ম’ পদক এবং পাঁচ লাখ ডলার পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।’ আপনারা জানেন ‘ভারত মহাপদ্ম পদক’ বিদেশীদের জন্যে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা। আমি আপনাদের আনন্দের সাথে জানাতে চাই, গত কয়েকদিনে ‘ব্ল্যাক আর্মি’ বা ‘শিবাজী সন্তান সেনা’ ও ‘মহাসংঘ’ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা সকলেই ধরা পড়েছে। এ কাজে সাবেক গভর্নর বিবি মাধব আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছেন। একটা ঘটনা তাকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে। সেটা হলো, কন্যা সুষমা রাওয়ের প্রতি তাঁর অবিচার। তিনি বলেছেন, যে মত বা মতাদর্শ নিজের মেয়ের ব্যাপারেও এমন অন্ধ করে দেয়, তা অবশ্যই কল্যাণের নয়, ধ্বংসের।’ থামল যশোবন্ত যশোরাজ।
আহমদ মুসা সম্পর্কিত ঘোষণা শুনেই যশোবন্ত যশোরাজের কথার মাঝখানেই সবাই হাততালি দিয়ে উঠেছিল। এবার সকলে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে মোবারকবাদ দিতে শুরু করল। আহমদ শাহ আলমগীর ও তারিক মুসা মোপলা তাকে জড়িয়ে ধরল আনন্দে।
ধন্যবাদের উত্তর দেয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘পদক মানুষকে দেয়া হয় না, তার কাজকে দেয়া হয়। আমার কাজ ছিল আন্দামানের মজলুম মানুষের জন্যে। আমি পুরুষ্কারের অর্থ পেলে আন্দামানের মজলুমদের স্মরণে এমন একটি মিনার তৈরিতে এ টাকা খরচ করব, যে মিনার আন্দামানের চারদিকের গোটা সাগর এলাকা থেকে দেখা যাবে।’ যে মিনারে আলোর অক্ষরে লেখা থাকবে বৃটিশ কারাগারে মৃত মওলানা ফজলে হোক খয়রাবাদী, মওলানা ইয়াহিয়া আলী, মৌলভী আহমাদুল্লাহ, শহীদ শেরআলীসহ সবার নাম। এতে আরও থাকবে গাজী গোলাম কাদের ওরফে গোপী কিষন, গঙ্গারামসহ এ যুগের সব শহীদের নামও। নামগুলো আলো ছড়াবে গোটা আন্দামান ও চারদিকের সাগরে। এটা হবে ভারতের সংগ্রামী নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস।’
তালি বাজানো আগেই শুরু হয়েছিল গভর্নর বিচারপতি রাও ও সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজ। আহমদ মুসার কথা শেষ হলে গোটা হল সকলের সম্মিলিত তালির শব্দে গম গম করে উঠল।
‘আপনার এই মহৎকাজে আমাদের সকল সহযোগিতা আপনি পাবেন।’ বলল গভর্নর বিচারপতি রাও।
হাজী আবদুল্লাহ দাঁড়িয়েছিল। কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু তার আগেই মিসেস বিবি মাধব বলল, একটা কৌতুহল। মহাসংঘে’র প্রধান লক্ষ্য ছিল একটা বাক্স উদ্ধার। এ রহস্যের কোন সমাধান হয়েছে?’
গভর্নর বিচারপতি রাও তাকাল সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজের দিকে।
‘অল রাইট স্যার, আমি বলছি।’ বলে সিবিআই চীফ তাকাল মিসেস বিবি মাধবের দিকে। বলল, ‘জি ম্যাডাম, বাক্সটি বাস্তব। ঐতিহাসিক বাক্সটি বেরিয়েছে আহমদ শাহ আলমগীরের বাসা থেকেই। কিন্তু বাক্সের খবর আহমদ শাহ আলমগীর কিংবা তার পরিবারের কেউ জানতো না। আহমদ শাহ আলমগীরের পরিবারের অনুরোধে বাক্স রহস্যটির শেষ দেখার জন্যে আহমদ মুসা ও সিবিআই এর লোকরা এক সাথে বাক্সটি খুঁজতে শুরু করে। বাড়ির প্রতিটি জিনিস ও জায়গা অনুসন্ধানসহ সম্ভাব্য স্থানগুলো খুঁড়েও দেখা হয়, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায় না। অবশেষে আহমদ মুসাই পিতলের প্লেটে আঁকা বাড়ির স্কেচে একটা ধাঁধাঁ খুঁজে পান। ধাঁধাঁটির রহস্যভেদ করেন আহমদ মুসা এবং ধাঁধাঁর সংকেত অনুসরণ করেই বাড়ির মাষ্টার বেডের প্রধান দরজার বটম চৌকাঠের তিন ফুট মাটির নিচে বাক্সটি উদ্ধার হয়।’ একটু থামল যশোবন্ত যশোরাজ।
থামতেই কয়েকজনের তরফ থেকে একই প্রশ্ন ছুটে এল, ‘কি পাওয়া গেল বাক্সতে?’
‘মহাসংঘ যা বলেছিল সেগুলোই। একটা পেপার ডকুমেন্ট, একটা নক্সা। মহাংসঘের মতে পেপার ডকুমেন্টটা জাতির উদ্দেশ্যে শিবাজীর একটা উইল। কিন্তু পেপার ডকুমেন্টে একটা শব্দও অক্ষত পাওয়া যায়নি। দলিলের একটা সীল অক্ষত পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা সীলটিকে শিবাজীর ব্যক্তিগত সীল বলে চিহ্নিত করেছেন। আর নক্সাটি মোগল সম্রাটদের গুপ্ত ধনভান্ডারের।’ বলল যশোবন্ত যশোরাজ।
‘নক্সাটি যে মোগল গুপ্ত ধনভান্ডারেরই এটা কি নিশ্চিত?’ বলল সুরূপা সিংহাল।
হাসল সিবিআই প্রধান যশোবন্ত যশোরাজ। বলল, ‘নক্সা অনুসরণে আজ গুপ্তধন উদ্ধার করা হয়েছে। আগামীকালের পত্রিকা এবং টিভি নেটওয়ার্কে খবরটা আপনারা পেয়ে যাবেন।’
গুপ্তধন উদ্ধারের খবরে গোটা হলে একটা গুঞ্জন উঠল। সাজনা সিংহাল বলে উঠল, ‘এ গুপ্ত ধনের মালিক কি সরকার, না মোগলদের বংশধর আহমদ শাহ আলমগীর?’
গাম্ভীর্য নেমে এল যশোবন্ত যশোরাজের মুখে। ‘চলমান বিধান অনুসারে সব গুপ্তধনের মালিক জাতি, মানে সরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে এই জাতীয় নীতি অনুসরণ করা হয়নি। গুপ্তধনের নক্সার সাথে শেষ মোগল সম্রাটের উইল ছিল। উইলে বলা হয়েছে, যখন গুপ্তধন উদ্ধার হবে, তখন অবস্থা যাই হোক, গুপ্তধনের দুই তৃতীয়াংশ পাবে ভারতের জনগণ অর্থাৎ দিল্লীতে প্রতিষ্ঠিত সরকার। অবশিষ্ট অংশের দুই তৃতীয়াংশ নিয়ে মুসলিম ছাত্রদের বিজ্ঞান ও ধর্মশিক্ষার জন্যে একটা ফান্ড গঠিত হবে এবং গুপ্তধনের সর্বশেষ অংশ যার কাছে গচ্ছিত অবস্থা থেকে নক্সা পাওয়া যাবে তিনি পাবেন। ভারত সরকার উইলের ইচ্ছা গ্রহণ করেছেন। তবে মোগল পরিবারের সদস্যগণ, আহমদ শাহ আলমগীর, সাহারা বানু এবং শাহবানু গুপ্তধনের অর্থ গ্রহণ না করে তা মুসলিম ছাত্রদের ধর্ম ও বিজ্ঞান শিক্ষা তহবিলের সাথে যুক্ত করতে বলেছেন। এটাও ভারত সরকার মেনে নিয়েছেন। এর পরই গুপ্ত ধনভান্ডার উদ্ধার করা হয়।’
যশোবন্ত যশোরাজের কথার মাঝখান থেকেই সমগ্র হলরুমে আনন্দ ধ্বনি শুরু হয়েছিল। যশোবন্ত যশোরাজ থামলে হাততালিতে ভরে গেল হল।
হাততালির মধ্যেই সাজনা সিংহাল প্রশ্ন করল, ‘স্যার, শিবাজীর পেপার ডুকুমেন্টে সীল ঠিক থাকলেও দলিলের লেখা অক্ষত পাওয়া গেল না কেন?’
‘এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা নেয়া হয়েছে। তারা বলেছিল, লেখার কালি যেসব উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ সময়ে সেসবের বিক্রিয়ার ফলেই চামড়ার কাগজ নষ্ট হয়ে গেছে। আর সীলের কালি ছিল ভিন্ন। আর গুপ্তধনের নক্সা ছিল পাতলা গোল্ড প্লেটের উপর খোদাই করা।’ থামল যশোবন্ত যশোরাজ।
হাজী আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়াল সংগে সংগেই। বলল, ‘সিবিআই প্রধানকে ধন্যবাদ। তিনি আমাদের প্রত্যাশিত জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন। আরও জিজ্ঞাসা থাকতে পারে, তবে আর সময় নেয়া ঠিক হবে না। আমি সকলকে লাঞ্চের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
বলে হাজী আবদুল্লাহ গভর্নর বিচারপতি রাও এবং যশোবন্ত যশোরাজকে সাথে নিয়ে টেবিলের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। অন্যদিকে বেগম আবদুল্লাহ মেয়েদের নিয়ে চললেন।

তখন বিকেল।
রোদের রং ফিকে হয়ে এসেছে।
সূর্য ডুবতে ঘণ্টা খানেকের বেশি বাকি নেই।
হাজী আবদুল্লাহর ‘সী ভিউ ড্রইং রুম।’ ডাইনিং রুমের উত্তর পাশের এ ড্রইং রুমটি প্রাইভেট, শুধু ফ্যামেলি ব্যহারের জন্য। সাগরের দিকে এগিয়ে তৈরি এ ড্রইং রুমটি। এর তিন দিকেই সাগর। ড্রইং রুমের সোফাগুলো কাঁচের দেয়ালকে সামনে রেখে এমনভাবে সাজানো যে সবাই তার সামনে সাগর দেখতে পাবে।
এ ড্রইংরুম থেকেও একটা সিঁড়ি নেমে গেছে সাগরে। এ সিঁড়ির গোড়াতেও একটা সুন্দর বোট বেঁধে রাখা।
আহমদ মুসা কাঁচের দেয়ালের ধার ঘেঁষে একটা সোফায় বসেছিল। তার সামনে কাঁচের একটা লম্বা টি টেবিল। বাঁ দিকে কাঁচের দেয়ালে দেখা যাচ্ছে আন্দামান সাগর। আহমদ মুসার সামনে টি টেবিলের উপর রাখা আছে একটা সুন্দর দূরবীন।
আহমদ মুসার ডান দিকে টি টেবিলকে সামনে রেখে বসেছে ড্যানিশ দেবানন্দ।
ড্রইংরুমের টেবিলগুলোতে বিকেলের নাস্তা এনে সাজানো হচ্ছে। অন্যরা কেউ এখনও আসেনি।
সবাই টায়ার্ড ছিল।
বিয়ের সব অনুষ্ঠান শেষ হতে বিকেল ৩টা বেজে যায়। তারপর সবাই রেষ্টে গেছে। বিয়ে অনুষ্ঠানের পর গভর্নর বিচারপতি বিশ্বনাথ রাও এবং সিবিআই প্রধান যশোরাজ চলে গেছে। দুই নব দম্পতিসহ অন্যরা সবাই এ বাড়িতেই রেষ্ট নিচ্ছে।
‘আন্দামানের ঘটনার সুন্দর সমাধান হলো। দুই দম্পতির মিলন ঘটল। ছোট ভাই সাহেব আপনি জীবনে এমন ঘটনার মুখোমুখি বহু হয়েছেন কিন্তু আজকের ঘটনার কি কোন বিশেষ দিক আপনার হৃদয়ে রেখাপাত করেছে?’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ভাই সাহেব, আজকের ঘটনার বিশেষ দিক হলো, আন্দামানের গভর্নর এবং ভারতীয় সিবিআই চীফের উপস্থিতি। এমন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য এইভাবে খুব কম পেয়েছি। এজন্যে ভারত সরকারকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ।’
‘কিন্তু ভাইসাহেব, এক ‘মহাসংঘ’ শেষ হলো, আরেক ‘মহাসংঘ’ যদি গজায়?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘যদি নয়, অবশ্যই গজাবে। তারও মোকাবিলা আপনারা এভাবে করবেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তখন আহমদ মুসাকে কোথায় পাব?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে সুস্মিতা বালাজী, সিংহাল দম্পতি ও সাজনা সিংহাল। তাদের সাথে সাথেই এসে প্রবেশ করেছে সাহারা বানু ও মিসেস মাধব।
আহমদ মুসা সালাম দিয়ে স্বাগত জানাল সবাইকে।
আহমদ মুসার কথা ও ড্যানিশ দেবানন্দের প্রশ্ন শুনতে পেয়েছিল সুস্মিতা বালাজীরা।
সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘ছোট ভাই মি. দেবানন্দের প্রশ্নের জবাব শুনতে আগ্রহী। বলুন।’
‘উত্তর সোজা। আর কোন আহমদ মুসা আসবে, অথবা ভারতেও তখন অনেক আহমদ মুসা তৈরি হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে আপনি আর আসবেন না!’ গম্ভীর কণ্ঠ সুস্মিতা বালাজীর।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘পৃথিবীটা ওয়ান ওয়ে চলার পথ। এ পথ শুধু চলার, ফেরার নয়।’
‘পৃথিবীর জীবন পথ এবং ব্যক্তি মানুষের জীবন পথ এক নয় স্যার। ব্যক্তি মানুষ এক পথে বার বারও ঘোরা-ফেরা করে। আপনি এ সত্যটা পাশ কাটাচ্ছেন স্যার।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘বা! ছোট ভাইকে তো তুমি দারুণভাবে ধরেছো। চমৎকার।’ বলল সুস্মিতা বালাজী্
‘শুধু আজ নয় আপা, ছোট ভাইয়ের সাথে তর্কে-বিতর্কে সে ইউনিক।’ সুরূপা সিংহাল বলল।
‘আলোচনা ভাল, কিন্তু তর্ক-বিতর্ক কি খুব ভালো সুরূপা?’ বলল মুরুবিবয়ানার সুরে ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘না দুলাভাই, তার তর্ক-বিতর্ক মনগড়া নয়। জানেন, আমাদের ছোট ভাই আর তার স্যার রস দ্বীপের অপারেশনে গেলে সাজনা মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়েছে এবং মসজিদে গিয়ে মোমবাতি ও লোবান দিয়ে এসেছে তার নিরাপদ……..।’ সুরূপা সিংহালকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সাজনা সিংহাল তার মুখ চেপে ধরল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। কিন্তু বেগম আবদুল্লাহ এক হাতে সুষমা রাও, অন্য হাতে শাহবানুকে ধরে ড্রইং রুমে প্রবেশ করল। সুষমার পাশে রয়েছে আহমদ শাহ আলমগীর এবং শাহবানুর পাশে রয়েছে তারিক মুসা মোপলা।
ওরা ড্রইংরুমে ঢুকে সোজা আহমদ মুসার দিকে আসছিল।
আহমদ মুসা একটু সরে বসল।
ওদের গায়ে তখনও বিয়ের পোশাক।
আহমদ মুসা হাসল। আহমদ মুসা আগে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে ওদের স্বাগত জানাল।
‘ওয়া আলাইকুম’ বলে সুষমা রাও ও আহমদ শাহ আলমগীর এবং শাহবানু ও তারিক মুসা মোপলা দুই দম্পতিই হঠাৎ আহমদ মুসার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হাত দিয়ে আহমদ মুসার পা ছুঁয়ে সেই হাত চুম্বন করল।
তার সাথে সাথেই তারা উঠে দাঁড়াল এবং সুষমা রাও হাত জোড় করে বলল, ‘মাফ করুন ভাইয়া। আর কোন দিন সালাম করার জন্যে পায়ে হাত দেব না।’
‘আজ দেয়ার দরকার হলো কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হৃদয়ের যে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা তা প্রকাশের জন্যে আপনার পায়ে মাথা রাখার চেয়ে উপযুক্ত কিছু পাইনি ভাইয়া।’ বলল সুষমা রাও।
আহমদ মুসা তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তীব্র অসন্তোষ তার চোখে-মুখে। বলল, ‘সুষমা নতুন। তার অনেক কিছু শেখার বাকি। কিন্তু আহমদ শাহ আলমগীর, তারিক, শাহবানু তোমাদের কথা কি সুষমার মতই?’
ওরা তিনজন কেউ কথা বলল না। তাদের মাথা নিচু।
আহমদ মুসাই আবার বলল, ‘তোমরা কি মনে কোন মানুষ তার নিজ শক্তিতে কোন মানুষের ভাল বা মন্দ করতে পারে?’
‘স্যরি ভাইয়া……।’ কথা কথা শেষ না করেই থেমে গেল আহমদ শাহ আলমগীর।
‘স্যার, শক্তি তো মানুষের নিজেরই।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘মানুষের কিছুই নয়। তার যে সত্তা সেটা তার নয়। মানুষের দেহ পরষ্পর আলাদা বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের (কণা) একত্র যোগফল। আল্লাহর আদেশের অধীন হয়ে তারা মানুষের দেহ তৈরি করেছে। কণাগুলো বিচ্ছিন্ন হলে মুহূর্তেই দেহ নামক কোন জিনিস আর চোখে পড়বে না। বল এই মানুষের নিজের কি থাকতে পারে? মানুষের ইচ্ছা, শক্তি সব কিছুই আল্লাহর তরফ থেকে অর্পিত। যদি বলতে চাও, মানুষকে অর্পণ-সূত্রে মালিক বলতে পার।’
‘ধন্যবাদ স্যার। বুঝেছি।’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘তাহলে এটাও তোমরা বুঝবে, অর্পণ সূত্রে মালিক যে মানুষ, তাকে ধন্যবাদ দেয়া যায়, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো যায় এই জন্যে যে সে অর্পিত শক্তিকে মংগলের পথে ব্যায় করেছে। কিন্তু মাথা যদি নোয়াতে হয়, সিজদা যদি করতে হয়, তাহলে সেটা আল্লাহকেই করতে হবে। সুষমা তোমরা আল্লাহর যা প্রাপ্য সেটা আমাকে দিতে এসেছ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যরি ভাইয়া। আপনি আগেও এ সম্পর্কে বলেছেন। কিন্তু বিষয়টাকে এমন সিরিয়াসলি দেখিনি। আমরা একে নিছক একটা কালচার মনে করেছি। আর ভাইয়া আমাদের আন্দামানে গুরুজনদের পা ছুঁয়ে সালাম করাটা মুসলমানদের জীবনেরও অঙ্গ হয়ে গেছে।’ সুষমা বলল।
‘আজকের জন্যেই এটা হয়েছে, ভবিষ্যতে আর হবে না।’ বলল আহমদ শাহ আলমগীর।
আহমদ মুসা হাসল। ওদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘যাও ভাইরা, বোনরা গিয়ে বস।’
আহমদ মুসাদের টি-টেবিলটি অনেক দীর্ঘ। এর তিন দিক ঘিরে দশটা সোফা পাতা। টেবিলে আহমদ মুসা ও ড্যানিশ দেবানন্দ ছাড়াও ওপ্রান্তে বসেছে সুস্মিতা বালাজী, সুরূপা ও সাজনা সিংহাল এবং সুরূপার স্বামী। মাঝের খালি সিটগুলোতে সুষমা ও শাহবানুরা গিয়ে বসল।
আহমদ মুসার উত্তর দিকে কাঁচের দেয়ালের গা ঘেঁষে পাতা আরেকটা টেবিলে বসে মিসেস বিবি মাধব, সাহারা বানু, বেগম আবদুল্লাহ এবং হাজী আবদুল্লাহ।
সবাই বসলে আহমদ মুসা দুদিকে তাকিয়ে বলল, ‘নবীন-প্রবীণদের এই মেরুকরণ কিভাবে হলো? পরিকল্পিতভাবে, না আপনাতেই?’
‘পরিকল্পিতও না, আপনাতেও নয়। তুমিই যুব-তরুণদের ওখানে টেনে নিয়েছ বেটা।’ বলল মিসেস বিবি মাধব।
‘তাহলে আমি আপনাদের টানতে পারলাম না কেন?’ আহমদ মুসা বলল। তার মুখে হাসি।
‘তুমি টেনেছ বাছা। কিন্তু প্রবীণরাই পিছিয়ে এসেছে যুব-তরুণদের সামনে রাখার জন্যে।’ আবারও বলল মিসেস বিবি মাধবই।
নাস্তা পরিবেশিত হয়েছে।
নাস্তা খেতে খেতে আলোচনাও চলল।
নাস্তা হয়েছে, কিন্তু কথা-বার্তা এলোমেলোভাবে চলছেই।
কথার ফাঁকে আহমদ মুসা এক সময় টি-টেবিলের দূরবীনটি তুলে নিল। দূরবীনটি ড্যানিশ দেবানন্দের।
আহমদ মুসা দূরবীনটি চোখে লাগিয়েই বলে উঠল, ‘বা! সাহেব, আপনার দূরবীনটি সাংঘাতিক পাওয়ারফুল।’
আহমদ মুসার দূরবীনের চোখ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে।
‘সত্যিই চমৎকার আপনার দূরবীন। আমি আন্দামান সাগরের ওপারে থাই-মালয়েশিয়ার সীমান্তের উঁচু পাহাড়টা এবং পাত্তানীর সবুজ অরণ্য পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘টেলিস্কোপিক লেন্স-সিষ্টেমের এই দূরবীনটা সত্যিই খুব পাওয়ারফুল। দূরবীনের এটাই লেটেষ্ট জেনারেশন। ছোট ভাই দূরবীনটা আপনাকে গ্রহণ করাতে পারলে আমি খুব খুশি হবো। আমার কোন কাজে লাগে না। আপনার নানা অভিযানে নানা প্রয়োজনে দূরবীনের দরকার হয়। আপনার কাছে এর সদ্ব্যবহার হবে।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
আহমদ মুসার চোখে তখনও দূরবীন। দূরবীনের সাহায্যে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে দেখছিল। ড্যানিশ দেবানন্দের কথায় তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘দখল করার আগে দিয়ে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ ভাই সাহেব।’
‘ওটা কথার কথা হলো ছোট ভাই। আপনি জীবনে কোন কিছুর জবর দখল করেছেন?’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
আহমদ মুসা কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল। হঠাৎ অন্য কিছুর প্রতি মনোযোগ তার কথা থামিয়ে দিয়েছে। দেখা গেল সে লেন্স এডজাষ্টার ঘুরিয়ে ভিউ ক্লোজ করছে। দূরবীনের চোখ তার এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
আরও কিছুক্ষণ দেখে আহমদ মুসা বলল, ‘মজার একটা জিনিস। আপনি দেখুন তো ভাই সাহেব।’
কথা শেষ করার সাথে সাথেই আহমদ মুসা চোখ থেকে দূরবীন সরিয়ে ড্যানিশ দেবানন্দের হাতে দিতে দিতে বলল, ‘সামনেই দেখুন খেলনার মত মজার কিছু ভেসে আসছে।’
ড্যানিশ দেবানন্দ দূরবীন তার চোখে লাগাল। তার মুখে হাসি।
ইতিমধ্যে সকলের দৃষ্টিই আহমদ মুসাদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে।
‘কি ওটা স্যার?’ সাজনা সিংহাল প্রশ্ন করল।
‘খেলনা নৌকা। সম্ভবত পাতার, রঙিন কাগজেরও হতে পারে। তার ছোট্ট মাস্তুলে পতাকা। পতাকাটাও মজার। আরও কি সব দেখলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
ড্যানিশ দেবানন্দের দূরবীনের চোখ এক জায়গায় স্থির। মনোযোগ দিয়ে দেখছে সে। তার মুখে হাসি এখন নেই। গম্ভীর, ভারী হয়ে উঠেছে তার মুখ।
এক সময় সে চোখ থেকে দূরবীন সরাল। তার মুখ তখনও গম্ভীর। তার সাথে কিছুটা কৌতুহল ও উত্তেজনারও ছাপ। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল সে, ‘ছোট ভাই, ওটা নৌকা কিন্তু নৌকা নয়। ওটা এক ধরনের এস ও এস (SOS)। চীনা-থাই প্রাচীন রীতি অনুসারে আল্লাহর কাছে চিঠি।’
‘আল্লাহর কাছে চিঠি?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার। তার কণ্ঠে বিস্ময়।
‘হ্যাঁ ছোট ভাই, নৌকায় একটা চিঠি আছে। নৌকা ‘পবিত্র পাতা’র (Divine leaves) তৈরি। চীনা-থাই ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে সে দেশে এক প্রকারের গাছ আছে যা স্বর্গ থেকে আসা। ওর পাতাগুলো পবিত্র। পাতাগুলো হিন্দু মন্দিরে পূজার উপকরণ, বৌদ্ধ মন্দিরে বৌদ্ধের মূর্তির বেদি সাজানো হয় ঐ পাতা দিয়ে এবং এই পাতাগুলো দিয়ে মসজিদের মিম্বরের বিছানা তৈরি হয়, জায়নামাযও বানানো হয়। পাতাগুলো পানিতে পচেনা, শুকালেও ভেঙে যায় না। নৌকার ছোট মাস্তুলে একটা পতাকা দেখছেন। নীল বর্ডার দেয়া সাদা পতাকা। ওটা থাইল্যান্ডের সর্বপ্রাচীন ‘সাকোথাই’ রাজবংশের পারিবারিক পতাকা। সাকোথাই রাজবংশ এখন মংকুত বা চকরী রাজবংশ নামে থাইল্যান্ডে বর্তমান রয়েছে। অবশ্য এরা এখন ঐ পতাকা বদলেছে। সেই প্রাচীন সাকোথাই…….।’
‘কিন্তু ঐ খেলনা নৌকায় ঐ পতাকা কেন?’ ড্যানিশ দেবানন্দকে থামিয়ে তার কথার মাঝখানে বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘সেই কথাই বলতে যাচ্ছি। পতাকার সাদা অংশে নিশ্চয় দেখছেন একটা লাল ছোপ। এটা একটা মেসেজ, এটাই এসওএস (SOS) । এই মেসেজে বলা হয়েছে, মানুষের শান্তির জীবনে আগুন লাগানো হয়েছে বা হচ্ছে কিংবা হবে। এই সংকট থেকে বাঁচার জন্যে সাহায্য চেয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে মেসেজ পাঠানো হয়েছে পবিত্র পাতার নৌকাকে বাহন সাজিয়ে। প্রাচীন বিশ্বাস হলো, আল্লাহ নিজ কুদরতে এই মেসেজ কারও ঘাটে বা কারো হাতে পৌছে দেবেন। তাদের আরও বিশ্বাস, নৌকাটি যিনি প্রথম দেখবেন সাগরে বা ঘাটে, তিনিই হবেন স্রষ্টার সেই মনোনীত বক্তি।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
আহমদ মুসার চোখে-মুখে বিস্ময়। রূপকথার মতই লাগলো কথাগুলো। কিন্তু পাতার নৌকাটি বাস্তব। সেখানে পতাকা বাস্তব। তাতে রক্তের ছোপটাও বাস্তব। কণ্ঠে বিস্ময় নিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘নৌকাটি তো এখানে আমিই প্রথম দেখলাম। তার মানে মেসেজটাকে আল্লাহ আমার কাছেই পৌছাচ্ছেন?’
ড্যানিশ দেবানন্দের মুখে হাসি। বলল, ‘সাকোথাই ও তাদের বর্তমান উত্তরসূরীদের এটাই বিশ্বাস।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তার মানে বলতে চাচ্ছেন, নৌকা আমার কাছেই এসেছে।’
‘আমি বলছি না, ওদের প্রাচীন বিশ্বাস বলছে।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
শুধু টেবিলের নয়, ঘরের সবাই শুনছিল আহমদ মুসাদের কথা। ড্যানিশ দেবানন্দ থামতেই বেগম আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘আমার অবাক লাগছে মি. দেবানন্দ সাকোথাই রাজবংশের এই প্রাচীন বিশ্বাসের কথা জানলেন কি করে?’
‘কারণ আমাদের জামাই দেবানন্দের মা চীনা-থাই প্রাচীন রাজবংশ ‘সাকোথাই’ এর একটি শাখার মেয়ে, যে শাখা ৭৮২ খৃষ্টাব্দে থাইল্যান্ডে নতুন চকরী রাজবংশ নাম নিয়ে তাদের সাম্রাজ্য পুনঃস্থাপন করে।’
‘ওয়েলকাম জামাই। এই বড় খবরটি আমরা জানতাম না। নতুন পরিচয়ে ওয়েলকাম জামাই।’ বলল বেগম আবদুল্লাহ।
মুহূর্তকাল নিরবতা।
সুস্মিতা বালাজী ড্যানিশ দেবানন্দের সামনে থেকে দূরবীনটা টেনে নিয়ে বলল, ‘দেখি নৌকাটা এখন কোথায় কোন দিকে যাচ্ছে।’
দূরবীন চোখে লাগাল সুস্মিতা বালাজী।
তার দূরবীনের চোখ খুঁজতে লাগল নৌকাটিকে। এক সময় প্রায় চিৎকার করে সে বলে উঠল, ‘নৌকাটি এসে গেছে আমাদের ঘাটের দিকেই আসছে।’
আহমদ মুসা সুস্মিতা বালাজীর কাছ থেকে দূরবীনটি নিয়ে চোখে লাগাল। একটু ঝুঁকে পড়ল কাঁচের দেয়ালটার উপর। দেখল, সত্যিই নৌকাটি এসে গেছে, নিচে নেমে যাওয়া সিড়ির যেখানে একটা বোট বাঁধা আছে, নৌকাটি প্রায় সেখানে পৌছে গেছে।
আহমদ মুসা দূরবীনটি টেবিলে রেখে ড্যানিশ দেবানন্দকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চলুন ভাই সাহেব নৌকাটি নিয়ে আসি। আমরা নামতে নামতে নৌকা ঘাটে পৌছে যাবে।’
আহমদ মুসা ও ড্যানিশ দেবানন্দ দুজনেই উঠে দাঁড়াল।
‘জামাই দেবানন্দ তোমার রূপকথাকে জীবন্ত দেখলে সেটা একটা ভাগ্যের ব্যাপার হবে। গুডলাক দেবানন্দ।’ উৎসাহ দিয়ে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসাদের সাথে অনেকেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। কেউ কাঁচের দেয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, আবার কেউ কেউ সিঁড়ি মুখের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসারা নেমে গেল সিঁড়ির একদম পানির কিনারায়।
তখনও কয়েক গজ দূরে নৌকাটা। কিন্তু ঠিক সিঁড়ি বরাবরই ভেসে আসছে।
নৌকাটি এসে ঠিক ষ্টিলের সিঁড়ির সাথে আটকে গেল। যেন নোঙর করল নৌকাটি।
৬ ইঞ্চির মত লম্বা নৌকাটি। ঠিকই পাতার তৈরি। কাগজের নৌকার মত ডিজাইনেই যেন তৈরি হয়েছে নৌকাটি, দুই ইঞ্চি লম্বা মাস্তুলটি ও নৌকার মাঝখানের পিরামিড আকৃতির পেটের সাথে আটকানো। পতাকাটি দেড় ইঞ্চি বর্গাকৃতির।
ড্যানিশ দেবানন্দ বলল, ‘ছোট ভাই আপনিই নৌকাটি তুলে নিন।’
‘অবশ্যই’। আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে নৌকাটি পানি থেকে তুলে নিল।
নৌকা নিয়ে আহমদ মুসারা তাদের টেবিলে ফিরে এল।
পাশের টেবিল থেকে মিসেস বিবি মাধব, বেগম আবদুল্লাহ, সাহারা বানু ও হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাদের সাথে সাথেই ছুটে এল এ টেবিলে।
সবাই গাদাগাদি করে আহমদ মুসাদের টেবিল ঘিরে বসল। সবার দৃষ্টি ৬ ইঞ্চি নৌকাটির দিকে।
‘মি. দেবানন্দ, সাকোথাই নৌকাটির পতাকায় রক্তের ছোপ দিয়ে ‘এসওএস’ সংকেত দেয়া হয়েছে বুঝলাম। এ সংকেত সাকোথাইদের কোন উত্তরসূরীদের কাছ থেকে এসেছে এটাও বুঝলাম। কিন্তু ‘এসওএস’ সংকেত কেন, কি ঘটনা, কোত্থেকে এল এই সংকেত ইত্যাদি বিষয় না জানলে এই ‘এসওএস’-এর সার্থকতা কি?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘স্যার, যে পাতা দিয়ে এই নৌকা তৈরি হয়েছে, রীতি অনুসারে তার সাথে একটা চিঠি জড়ানো থাকার কথা। তাতেই সব বিস্তারিত লেখা থাকে।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ভাই সাহেব, তাহলে খুলুন নৌকাটা। দেখা যাক চিঠি আছে কিনা, সে রকম চিঠি থাকলে সেটা একটা বড় ঘটনা হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
ড্যানিশ দেবানন্দ নৌকাটি টেনে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে পতাকাটি খুলে দিল নৌকা থেকে।
পাতা ভাঁজ করে তৈরি করা নৌকাটি খুলে ফেলল ড্যানিশ দেবানন্দ। পাতার সাথে এক সাথে ভাঁজ করা বেশ বড় একখন্ড কাগজও বেরিয়ে এল। নিজে না দেখেই কাগজটি ড্যানিশ দেবানন্দ তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
কাগজ খন্ডটি ৬ ইঞ্চি ও ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য-প্রস্থের। কাগজটি ওয়াটার প্রুফ। দুপাশেই লেখা। যে কালিতে লেখা তাও ওয়াটার প্রুফ এবং অমোচনীয়।
কাগজ ও কালি সম্পর্কে এ খবর দিল ড্যানিশ দেবানন্দ। কাগজ খন্ডটি আহমদ মুসার হাতে তুলে দেবার সময় আরও জানাল, ‘আমার মা’র কাছে এই কালি সম্পর্কে শুনেছি। রাজ পরিবারের লোকরা ছাড়া এই কালি তৈরির ফর্মুলা আর কেউ জানে না। মা জানতেন তৈরি করতে, কিন্তু কোনদিন তৈরি করেননি। রাজ পরিবারের কেউ ভিন্ন পরিবারে গেলে এবং কোন জাতি বিষয়ক ডকুমেন্ট ছাড়া এ কালির ব্যবহার নিষিদ্ধ।’
আহমদ মুসা কাগজ খন্ডটি হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে বলল, একপাশে আরবী, অন্যপাশে সাকোথাই বর্ণমালা অর্থাৎ থাইভাষায় লেখা। আমি…..।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। তার কথার মাঝখানে সাজনা সিংহাল বলে উঠল, ‘আরবী কোত্থেকে এল স্যার? নৌকাটি আসতে পারে থাই-বার্মার দিক থেকে।’
‘দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পাত্তানী অঞ্চলের লোকেরা তাদের থাই ভাষা লেখার ক্ষেত্রে থাই ও আরবী দুই বর্ণমালাই ব্যবহার করে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
একটু থামল। মুখ তুলে সবার দিকে তাকাল। বলল, ‘আমি নিশ্চিত কাগজের দুই পাশের লেখার বিষয়বস্তু একই। আরবী ভাষা আমরা দু’একজন ছাড়া কেউ বুঝব না। সুতরাং দেবানন্দ ভাই সাহেব চিঠির থাই ভাষার দিকটা পড়ুন। সে ভাষা আমরা সবাই বুঝব।’
বলে আহমদ মুসা চিঠি তুলে দিল ড্যানিশ দেবানন্দের হাতে।
‘তথাস্তু ছোট ভাই’ বলে চিঠি হাতে তুলে নিল ড্যানিশ দেবানন্দ। পড়তে শুরু করলঃ
‘‘আমি যয়নব যোবায়দা। আমার নিকটতম একজন পূর্ব পুরুষ পাত্তানীর একজন রাজা সুলতান আবদুল কাদির কামালুদ্দিন। পূর্ববর্তী একজন পূর্ব পুরুষ পাত্তানী মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতাম আহমদ শাহ ওরফে চাউসির বাংগসা। চাউসির বাংগসা ছিলেন থাইল্যান্ডের ‘সাকোথাই’ রাজবংশের যুবরাজ। ১৩৫০ সালের দিকে পাত্তানী অঞ্চলে আসেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান আহমদ শাহ নাম গ্রহণ করেন। সে অঞ্চলে ১৬০০ খৃষ্টাব্দের দিকে মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সুলতান আহমদ শাহ এর উত্তরসূরীদের দ্বারা এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বংশেরই এক সুলতান হলেন, সুলতান আবদুল কাদের কামালুদ্দিন। এই সুলতান আবদুল কাদেরের সংগ্রামী পুত্র টংকু আবদুল কাদেরের নাতনি আমি। আমার ভাই জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিন এবং আমার দাদী নিয়ে আমাদের তিনজনের পরিবার। ১৯০২ সালে পাত্তানী অঞ্চল পুরোপুরি থাই শাসনে চলে যাওয়া এবং আমাদের বংশের অন্যান্য সকল সদস্য হিজরত করে মালয়েশিয়ায় চলে যাবার পর গত শত বছরে আমাদের এই পরিবার পাত্তানী-জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। শাসন ব্যাংককের হাতে থাকলেও লাখ লাখ পাত্তানী মুসলমানদের সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এই পরিবারের উপর এসে বর্তেছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পাত্তানীরা প্রায় স্বাধনি জীবন-যাপন করছিল এবং চীন বংশোদ্ভুত আমাদের সাকোথাই পরিবারের কারণে থাইল্যঅন্ডের চিনা বংশোদ্ভুতদের (যাদের সংখ্যা তিন চতুর্থাংশে) মধ্যে ইসলামের প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। এই সময় বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল। এক রাতে আমাদের অঞ্চলের প্রধান সেনানিবাসের উপর এক নৃশংস হামলা হলো। সংঘর্ষে বেশ কিছু থাই সৈন্য নিহত ও আহত হলো। পরদিন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া আক্রমণকারীদের কিছু জিনিস কুড়িয়ে পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটি বন্দুক, টুপি, ইত্যাদি রয়েছে। বন্দুকের প্রতিটি বাঁটে খোদাই করে ‘আল্লাহ’ শব্দ লেখা। টুপিরও চারধারে এমব্রয়ডারীতে ‘আল্লাহ’ শব্দ আঁকা। গজব নাজিল হলো প্রথমই আমাদের পরিবারের উপর। আমার ভাই গ্রেফতার হলেন। পরে গ্রেফতার হলো আরো অনেক পাত্তানী যুবক। বিশেষ করে আমার ভাইয়ের গ্রেফতারে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হলো গোটা পাত্তানী অঞ্চলে। এই পরিস্থিতিতে পাত্তানীর আরও কয়েকটি থাই সেনাশিবীরে আক্রমণ হলো। পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে সেনাদের আক্রমণের শিকার হলো পাত্তানী গ্রাম। জীবন দেয়া-নেয়ার নৃশংসতায় পাত্তানীর সবুজ অরণ্য আজ রক্তাক্ত। এর ভবিষ্যৎ কি আমি জানি না। তবে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, এসব কিছুর মধ্যে একটা ভয়াবহ ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং সে ষড়যন্ত্রই জয়ী হতে যাচ্ছে। এই সংঘাত সৃষ্টির সাথে আমার ভাই, আমার পরিবার কিংবা পাত্তানীদের পরিচিত কোন সংস্থা-সংগঠন জড়িত নয়। একথা ঠিক আমার দাদা টংকু আবদুল কাদের এক সময় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু তার জীবদ্দশাতেই সর্বসম্মতিক্রমে অস্ত্র পরিত্যাগ করে শান্তিপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলন তিনি শুরু করেন। শেষ দিকে তিনি বলতেন, ‘আমাদের দেশের আদি পরিচয় ‘সাকোথাই’ (সুখের এক সুপ্রভাত) এবং ‘মোয়াং থাই’ (‘মুক্ত মানুষের মাটি’)। থাইল্যান্ডকে যদি আমরা এই আসল পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে আমরা পাত্তানীর মুসলমানরা সেখানে সব অধিকারই পেয়ে যাব। আমাদেরকে এই প্রাপ্তির আন্দোলনটাই প্রথম করতে হবে। এজন্যে প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।’ টংকু আবদুল কাদেরের এই কথাগুলো আজ তলিয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে ঘাতকের অস্ত্র। ঘাতকের এই অস্ত্র যেমন থাই সৈন্যদের প্রতি উদ্যত, তেমনি উদ্যত পাত্তানীদের সত্য কথা, সুস্থ চিন্তার বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে এই পাত্তানীরা থাই সৈন্যদের প্রতিশোধেরও শিকার। পাত্তানীরা আজ এই দ্বিমুখী আগুনের অসহায় ইন্ধন। এই আগুনে আমরা পুড়ে শেষ হবার মুখোমুখি। প্রতিটি নতুন দিন; অবস্থার নতুন অবনতি নিয়ে আসছে। এই অবনতি রোধ করে পাত্তানী ও থাই মুসলমানদের বাঁচাবে কে? আল্লাহই পারে। তাঁর কাছেই আমার চিঠি।’’
চিঠি পড়া শেষ করল ড্যানিশ দেবানন্দ।
সবার চোখ ড্যানিশ দেবানন্দের মুখের দিকে। পিন পতন নিরবতার মধ্যে শুনছিল সবাই।
ড্যানিশ দেবানন্দ থামলেও পিনপতন নিরবতা ভাঙল না।
চিঠির কথাগুলো ভাবাচ্ছে সকলকে।
নিরবতা ভেঙে কথা বলল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘আমি দুঃখিত, আমি নৌকাটিকে খেলনা মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, একটা জনগোষ্ঠীর তরফ থেকে মর্মান্তিক এক এসওএস।’
বলে মুহূর্তকাল থেমে আবার শুরু করল, ‘থাইল্যান্ডের পাত্তানী অঞ্চলের ঘটনা জানি। কিন্তু ভেতরের এই ভয়াবহ ঘটনা আমি জানি না। আল্লাহ তাদের রক্ষা করুন।’
‘চিঠিতে চিঠির লেখিকা যয়নব যোবায়দার যে পরিচয় দেয়া হয়েছে, সে দিক থেকে আমি মনে করি চিঠিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চিঠির প্রতিটি কথা সত্য। আর সাকোথাইদের ইতিহাসে এমন চিঠি প্রেরণের দৃষ্টান্ত বেশি নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের চিঠি ব্যক্তিগত বিষয়ে হয়ে থাকে। পরের জন্যে বা জাতীয় বিষয়ে এমন চিঠির ঘটনা আমি শুনিনি। আমি শুনেছি, জাতীয় বিষয়ে লেখা এ ধরনের চিঠি কখনও ব্যর্থ হয় না।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ড্যানিশকে ধন্যবাদ। সে যে তার বংশের ঢোল পেটাচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। থাইদের প্রাচীন সব ইতিহাসেই এসব কথা আছে। আমি থাই রূপকথাতেও এটা পড়েছি। কিন্তু আমাদের সামনে যে চিঠিটা সেটা রূপকথা নয়।’ বলল সুস্মিতা বালাজি।
‘রূপকথার মত এই চিঠিটির গন্তব্য কি আমাদের এ বাড়ি ধরে নিতে হবে?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘এ ধরনের চিঠির গন্তব্য বাড়ি বা স্থান হয় না, হয় ব্যক্তি এবং সে ব্যক্তি হয় ঈশ্বরের প্রতিনিধি।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘বাড়ির মালিক হিসাবে চিঠির মালিক তাহলে কি আমি হব?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘আমি বলেছি, প্রথা অনুসারে নৌকা প্রথম যার নজরে পড়ে এবং যিনি নৌকা তুলে নেন, তিনি নৌকার মালিক হন।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘চিঠি তো ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে লেখা। মানুষ এ চিঠি নিয়ে বা এর মালিক হয়ে কি করবে?’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘সাকোথাইদের বিশ্বাস, ঈশ্বরের নামে লেখা চিঠি ঈশ্বরই তার মনোনীত লোকের হাতে পৌছে দেন। সুতরাং মানুষ চিঠির মালিক হন ঈশ্বরের তরফ থেকেই।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘ও গড! স্যার তাহলে নৌকা দেখেছেন ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই!’ সাজনা সিংহাল বলল।
‘শুধু এখানে নয়, গোটা আন্দামানে আল্লাহ আর কাকে মনোনীত করতে পারে বল?’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
জানালার ভেতর দিয়ে আন্দামান সাগরের দিকে তাকিয়েছিল আহমদ মুসা। শূন্য দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া তার দৃষ্টি। ভাবলেশহীন মুখ। চারপাশের কোন কথাই যেন তার কানে প্রবেশ করেনি।
ধীরে ধীরে এক সময় তার মুখ ঘুরে এল জানালা থেকে, আন্দামান সাগরের দিক থেকে।
বেগম হাজী আবদুল্লাহর কথা তখন শেষ হয়েছে। আহমদ মুসা বলে উঠল হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে, ‘জনাব, চিঠিতে উল্লেখিত নাটের গুরু তৃতীয় শক্তিটি কে কে হতে পারে?’
‘বলা মুস্কিল। তবে সেই শক্তি থাই সরকারের বন্ধু নয়, কিন্তু তারা পাত্তানী মুসলমানদের শত্রু, এ বিষয়টি চিঠি থেকে পরিষ্কার।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘কিন্তু এ শক্তির পরিচয় কি হতে পারে?’ আহমদ মুসা বলল। তার ভ্রুকুঞ্চিত।
‘সুনির্দিষ্ট করে বলা মুস্কিল। তবে থাইল্যান্ডেরই কোন মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপ এরা হতে পারে।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করল। এই সময় তার চোখ গিয়ে পড়ল হঠাৎ টিভি স্ক্রীনের উপর। টিভি’র সাউন্ড তখন খুব কম করা ছিল। লাইভ টেলিকাষ্ট হচ্ছিল একটা ফুটবল খেলা। টিভি স্ক্রীনের বটমে নিউজের হাইলাইটস দেখাচ্ছিল। তাতে ‘থাইল্যান্ডে রক্তক্ষয়ী সংঘাত’ শিরোনাম দেখল আহমদ মুসা। দেখেই ঘুরে বসল।
আহমদ মুসাকে অনুসরণ করে সবার দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো টিভি স্ক্রীনের ওপর। পড়ল সবাই, ‘পাত্তানী অঞ্চলে পাত্তানী শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে একটা থাই সেনাশিবিরের উত্তরে একটা থাই সেনাশিবিরের উপর আকস্মিক আক্রমণে ১১ জন থাই সেনা নিহত হয়েছে। থাই সৈন্যরা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং হামলাকারীদের অনুসরণ করে পাত্তানীদের একটা বড় গ্রামে পৌছে। সে গ্রামের মাদরাসায় তখন বার্ষিক ধর্মসভা চলছিল। থাই সৈন্যরা সে জমায়েতের উপর আক্রমণ চালায়। সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে ৪৩ জন গ্রামবাসী নিহত হয়। আহতের সংখ্যা কয়েক শত।’
খবরটি পড়ার সাথে সাথে সবার মুখ বিষণ্ণতায় ভরে গেল।
কিন্তু আহমদ মুসার মুখ ভাবলেশহীন, অনেকখানি অন্যমনস্ক যেন সে। এখান থেকেও অন্যকিছু সে দেখছে, ভাবনার ক্ষেত্র যেন তার অন্য কোথাও।
বিষাদ-নিরবতটা ভাঙল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘বৎস আহমদ মুসা, টিভিতে যে কাহিনী আমরা পড়লাম, তাতে যারা থাই সেনা শিবির আক্রমণ করেছিল এবং গ্রামের জনসভার দিকে পালিয়ে গিয়ে সেনা আক্রমণ সেখানে সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তারাই তোমার সেই তৃতীয় পক্ষ। বুঝা যাচ্ছে, এরা এক বিপজ্জনক পক্ষ। বিপজ্জনক এক ফাঁদে আটকেছে থাই মুসলিম ও থাই সরকার দুই পক্ষকেই।’
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘রাইট স্যার।’ কণ্ঠ আহমদ মুসার নিস্তরঙ্গ ও নিরুত্তাপ।
বলেই আহমদ মুসা মোবাইল তুলে নিল হাতে। মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ পড়তেই দেখল ব্যাটারীর রেড সিন্যাল, ‘রিচার্জের ম্যাক্সিমাম সময় ৬ মাস পার হয়ে গেছে। আনএবল টু এ্যাক্ট।’
আহমদ মুসা হাতের মোবাইল টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, মোবাইল বিদ্রোহ করেছে। ছয় মাস রিচার্জ করা হয়নি। ল্যান্ড টেলিফোনটা দিন আপা।’
টেবিলের ওপাশে সুস্মিতা বালাজীর কাছে একটা ল্যান্ড টেলিফোন ছিল।
সুস্মিতা বালাজী দাঁড়িয়ে টেলিফোনটা আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ছোট ভাই, আমার মোবাইলটিও আইএসডি। দেব আপনাকে?’
অন্য সবাই এক সাথে বলে উঠল, ‘কোথায় টেলিফোন করবেন? মোবাইল নিন।’
‘সউদি আরবে জোসেফাইনের কাছে টেলিফোন করব। ল্যান্ড টেলিফোনটাই আরামদায়ক হবে।’ শান্ত গলায় বলল আহমদ মুসা।
জোসেফাইনের নাম শুনতেই সকলের মুখে সম্ভ্রমপূর্ণ প্রসন্ন ভাব ফুটে উঠল।
এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে সাজনা সিংহালের মুখে।
চট করে উঠে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে পড়ে টেলিফোন সেটের স্পীকার অন করে দিল।
‘এ কি করলে সাজনা? সুষমা স্পীকার অফ করে দাও।’
সুষমা ওদিকে হাত বাড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা সুষমাকে নিষেধ করে বলল, ‘সাজনা তার ম্যাডামের কথা শুনতে চায়। তাকে হতাশ করার দরকার নেই।’
সাজনা সিংহাল উঠে দাঁড়াল। বলল আহমদ মুসার উদ্দেশ্যে, ‘স্যার, নাম আমার হচ্ছে। কিন্তু সকলেই উন্মুখ হয়ে আছে তাঁর কথা শোনার জন্যে। দেখুন, এক এক করে জিজ্ঞাসা করছি। কেউ না বলবে না।’
‘না জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই। তোমার পক্ষে ভোট অনেক। তোমারই জিত হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অনেক ধন্যবাদ স্যার। আমার চেয়ে অন্যেরা আরও খুশি হয়েছেন।’ বলল সাজনা সিংহাল।
টেলিফোন সেট টেনে নিয়ে ডায়াল করল আহমদ মুসা।
সেকেন্ডের মধ্যে ওপার থেকে একটা নরম নারী কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আসসালামু আলাইকুম’ আমি জোসেফাইন।
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কেমন আছ জোসেফাইন?’ বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠ শান্ত, সম্ভ্রমপূর্ণ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কোত্থেকে বলছ? ভাল আছ তো? তোমার মোবাইল বন্ধ কেন?’
‘জোসেফাইন, তুমি তিনটা প্রশ্ন করলে। আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি।’
‘স্যরি। তোমার মোবাইল হঠাৎ রেসপন্স না করায় আমি ওরিড ছিলাম। আমি ভাল আছি, আহমদ আবদুল্লাহ ভাল আছে। ওকে, এখন বল।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, আহমদ আবদুল্লাহ ভাল আছে। কিন্তু তুমি ভাল নেই। একটা ক্লান্তি তুমি গোপন করছ। সকালেও কথা বলার সময় আমার এটা মনে হয়েছে।’
‘ঠিক ধরেছ। গত ২দিন আমার জ্বর গেছে। গত রাত থেকে আমি ভাল।’
‘জ্বরটা কেন, ডাক্তার কি বলেছেন?’
‘চিন্তা করো না এ নিয়ে। ডাক্তার আয়েশা ও ডাক্তার ফাতিমা দেখেছেন। সিজনাল ধরনের জ্বর বলেছেন।’
‘ওকে জোসেফাইন। আমার মোবাইলে চার্জ ছিল না সেজন্য পাওনি। আমি ভাল আছি। আমি এখনও বিয়ে বাড়িতেই আছি।’
‘ও নাইস। শাহবানু, সুষমারাও নিশ্চয় আছে। নতুন জীবনে ওদের ওয়েলকাম। আল্লাহ ওদের জীবন দীর্ঘ করুন, মঙ্গলময় করুন। আমার সালাম ওদের দিও। দুই বোনকে কিছু প্রেজেন্ট করেছ?’
‘স্যরি। আমি এ দিকটা তো ভাবিইনি।’
‘এটাই স্বাভাবিক। সব ভাবনা এক সাথে হয় না।’
‘এখন বল, তোমার পরমর্শ কি?’
‘দুবোনকে দুটি ‘ইউনিভার্স এ্যাটলাস’ উপহার দাও।’
‘ইউনিভার্স-এ্যাটলাস’। ওটা দিয়ে ওরা কি করবে?
‘কেন বৈচিত্রময় পৃথিবীর দেশ ও মানুষের ভূগোলকে দেখবে, রূপময় আকাশের বিশালতা ও অপরূপতাকে দেখবে এবং দেখবে এর বিজ্ঞানময় স্রষ্টাকে।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। ইউনিভার্স এ্যাটলাসের নতুন অর্থ দিলে তুমি আমাকে। তোমাকে ধন্যবাদ। এই এ্যাটলাস ওদের দেব।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। এখন তোমার কথা বল।’
‘কোন কথা?’
‘যা বলার জন্যে টেলিফোন করেছ?’
‘কি করে নিশ্চিত হলে?’
‘তোমাকে অন্যমনস্ক দেখছি। তোমার মন অন্য কোথাও নিশ্চয়। তুমি আববা-আম্মার কথা জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছ। তুমি নিজে কয়েকদিন আগে খোঁজ নিলে ডাক্তার ফাতিমা আমেরিকা থেকে এসেছে কিনা। কিন্তু আজ তার নাম শুনেও কিছু বললে না। নিশ্চয় তোমার মন কোথাও আটকা পড়ে গেছে।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। তুমি ঠিকই ধরেছ। নতুন একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।’
বলে আহমদ মুসা সমুদ্র ভেংগে আসা পাতার বিস্ময়কর নৌকা, যয়নব যোবায়দার চিঠি এবং চিঠির সব কথা সংক্ষেপে বলল।
থামল আহমদ মুসা।
থামার সাথেই ওপার থেকে জোসেফাইন বলে উঠল, ‘অদৃশ্য তৃতীয় পক্ষটা কে জান? ওরা বন্ধু বেশে শত্রু অতিশয়। ইসলামী বিপ্লবীর পোশাক পরে ওরা এসেছে।’
‘এত তাড়াতাড়ি ওদের তুমি চিনলে কি করে? তুমি কিন্তু আমার ভাবনাকেই প্রকাশ করেছ জোসেফাইন। ধন্যবাদ।’
‘ওয়েলকাম। ওদের চেনার জন্যে সময়ের প্রয়োজন নেই জনাব। সেই টুইন-টাওয়ারের নাইন-ইলেভেন পর বন্ধুবেশী এ ষড়যন্ত্রকারীদের সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে।’
বলে একটা দম নিয়েই জোসেফাইন বলল, ‘তুমি থাইল্যান্ডে যাত্রা করছ কখন?’
‘আমি যাচ্ছিই, এটা কেন ধরে নিলে?’ মুখে হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে জবাব এল না জোসেফাইনের কাছ থেকে। মুহূর্ত কয়েক পরে সে বলল, ‘তুমি যাচ্ছ, আমি এ কথা বলিনি। তোমার যাওয়া উচিত বলেই আমি এ কথা বলেছি। আল্লাহর কাজের কোন আবেদনের সাড়া তিনি তাঁর কোন বান্দার মাধ্যমেই দেন। বোন যয়নব যোবায়দার দরখাস্তের সাড়া আল্লাহ দেবেন তার কোন বান্দাকে পাঠিয়েই। সেই সৌভাগ্যবান মানুষ আমার স্বামী হোন এটাই তো আমি চাইব।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। অসংখ্য ধন্যবাদ আল্লাহকে, যিনি তোমাকে দিয়েছেন আমাকে জীবন সঙ্গিনী হিসাবে। থাইল্যান্ডে যাওয়ার ব্যাপারে আমার দ্বিধাগ্রস্ততা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। আবারো ধন্যবাদ জোসেফাইন।’
‘এত ধন্যবাদ তখন প্রয়োজন হয়, যখন পাওয়াটা আশাতীত হয়ে থাকে। তুমি কি ভেবেছিলে জোসেফাইনের পরামর্শ অন্যরকম হতে পারে?’
‘না। আমি ভাবছিলাম অন্য বিষয়। আন্দামান থেকে ফিরে আমাদের আমেরিকা যাওয়ার প্রোগ্রাম আছে। আমেরিকায় তোমার আমন্ত্রণ যে কারণে, সে অনুষ্ঠান তো এ মাসেই। এটাই আমার ভাবনার বিষয় ছিল।’
‘ঠিকই ভেবেছ। এ ব্যাপারে আমার মত হলো, আমেরিকা যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিলও নয়, আবার যাওয়ার সিদ্ধান্তও নয়। ওটা আল্লাহর হাতে থাক। এই মুহূর্তের জন্যে যেটা করণীয়, সেটাই করতে হবে।’ বলল জোসেফাইন শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে।
‘আমিন। সিদ্ধান্ত তুমি দিয়ে দিলে।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে সানন্দ হাসি।
‘এ সৌভাগ্য আমার উপর বর্তালে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু সত্য হলো, আমি তোমার সিদ্ধান্ত পূর্ণ করলাম মাত্র।’
‘এটাই স্বাভাবিক জোসেফাইন। দু’জনে মিলেই তো আমরা পূর্ণাঙ্গ।’ আবেগে ভারী কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার।
‘আলহামদুলিল্লাহ। এটাই আল্লাহর ইচ্ছা।’
একটু থেমে একটা দম নিয়েই আবার বলে উঠল জোসেফাইন, ‘আজকে তোলা আহমদ আবদুল্লাহর একটা ছবি কম্পিউটারে পাঠাচ্ছি। তুমি ওটা থাইল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারবে।’
‘তোমার ছবিও।’
‘পাঠাব না।’
‘কেন?’
‘চোখ বুজে দেখ, ছবিটা দেখতে পাবে। ওর চেয়ে ভাল ছবি কোন ক্যামেরা দিতে পারে না।’
‘ঠিক জোসেফাইন।’
‘ধন্যবাদ।’
‘আর কিছু কথা?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি। কখন তুমি যাত্রা করছ থাইল্যান্ডে?’
‘আন্দামানে থাই ভিসার ব্যবস্থা আছে। যদি আজ ভিসা পেয়ে যাই, তাহলে প্লেনের সিট পেলে আজকেই চলে যাব।’
‘না, শাহবানু, সুষমা বোনদের এইমাত্র বিয়ে হলো। ওদের আনন্দের দিনে নিরানন্দ ডেকে এনো না। একদিন ওয়েট করো। তাছাড়া সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে তো কিছু সময় লাগবে।’
থামলো জোসেফাইন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তার কণ্ঠ শোনা গেল। বলল, ‘তোমার আর কিছু কথা না থাকলে রাখি। ডাক্তার ম্যাডাম যে কোন সময় এসে পড়তে পারেন। তৈরি হতে হবে।’
‘ঠিক আছে জোসেফাইন। আন্দামান ছাড়ার আগে তোমাকে আবার কল করব।’
‘ওয়েলকাম। শাহবানু, সুষমাদের আমার স্নেহ দিও। আর হাজী আংকেল এবং বেগম আবদুল্লাহ, সাহারাবানু ও মিসেস বিবি মাধব খালাম্মাদের আমার কৃতজ্ঞতা জানিও। ওঁরা তোমাকে যে স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েছেন, আমি এখন থেকেও তার উষ্ণতা পাচ্ছি। আল্লাহ ওঁদের সবার মংগল করুন।’
‘ওকে জোসেফাইন। আহমদকে আমার স্নেহ, আম্মাদের আমার সালাম দিও। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আল্লাহ হাফেজ।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা চেয়ারে হেলান দিল।
ঘরে পিনপতন নিরবতা।
নির্বাক সবাই।
সবার চোখে বিমর্ষ-বেদনার ছাপ।
আহমদ মুসাও কি দিয়ে কথা শুরু করবে তা ভেবে পেল না।
পল পল করে সময় বয়ে যাচ্ছে।
মুখ তুলল সাজনা সিংহাল। তার চোখ অশ্রুতে টল টল করছে বলল, ‘স্যার আপনি আজকেই যান। একদিন আরও থাকা মানে স্মৃতির আরও বেড়ে যাওয়া। মানুষের কষ্ট তাতে বাড়বে। আপনার মনে কিছুরই দাগ পড়ে না। কিন্তু সবার মন এমন পাথর নয়।’ থামল সাজনা সিংহাল।
তার দুগন্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
সবার চোখই সিক্ত। মাথা নিচু।
চোখ মুছল সুষমা রাও। সে মুখ তুলল। বলল, ‘ভাইয়া সাজনা একদমই ছেলে মানুষ। ওর মন একেবারে সাদা। দুঃখের কোন কাল দাগ সেখানে নেই। কিন্তু ভাইয়া আমরা সবাই মনে করেছিলাম, আপনাকে কিছুদিন আমরা পাব। কিছু জানব, শিখব আমরা। এতদিন সংঘাত-সংকটের মধ্যে দিন গেছে। আপনি জানেন না ভাইয়া, আমার আম্মা আজ বাদ ফজর সুস্মিতা বালাজী আপাকে সাথে নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আপনাকে সারপ্রাইজ দেবেন বলে কিছু বলেননি।’
এক ঝলক আনন্দে আহমদ মুসার মুখ ভরে গেল। সংগে সংগেই উঠে দাঁড়িয়ে মিসেস বিবি মাধবকে উদ্দেশ্য করে আহমদ মুসা বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ওয়েলকাম, খোশ আমদেদ খালাম্মা।’
‘আলহামদুলিস্নাহ। ধন্যবাদ বেটা। কিন্তু বেটা যে আলো তুমি এখানে জ্বেলেছ, তা একদমই ক্ষুদ্র। ভয় করছি, তুমি চলে গেলে অন্ধকারে না সব ছেয়ে যায় আবার।’ বলল সুষমার মা মিসেস বিবি মাধব।
‘ভয় নেই খালাম্মা। এ আলোর মালিক আল্লাহ। তিনিই একে আরও প্রজ্জলিত করবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই তো শুনলাম, আল্লাহ তার ইচ্ছা তার বান্দাকে দিয়ে্ই বাস্তবায়ন করেন। তুমি এমন এক দেবদূত বেটা। তুমি এভাবে চলে যেয়ো না। সাজনা একটু বেশি বলে ফেলেছে। আকস্মিক আঘাতটা তাকে বেশি আহত করেছে বলেই হয়ত। কিন্তু আমরা সবাই তো তার মত করেই ভাবছি।’ মিসেস বিবি মাধব বলল।
সুস্মিতা বালাজী এবং ড্যানিশ দেবানন্দ পাথরের মত বসে আছে।
বিবি মাধব থামলে মুখ খুলে ধীরে ধীরে বলল, ‘নৌকাটাকে আমি মজা হিসেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু মজা যে ছোট ভাই আহমদ মুসার জন্যে ‘সমর’ হয়ে দাঁড়াবে, কল্পনাও করতে পারিনি। যাক ছোট ভাই, বিষয়টা কিন্তু ঐ রকম ইমারজেন্সী নয় যে আপনাকে আজ কিংবা কালই চলে যেতে হবে!’
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘ভাইসাহেব, মেয়েটা লিখেছে প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। টেলিভিশন নিউজেই দেখলেন এবং ১১ জন সৈনিক ও ৪৩ জন গ্রামবাসীর নিহত হবার খবর পড়লেন। এই ঘটনা নিশ্চয় আরও ঘটনার জন্ম দেবে। এটা নিশ্চয়ই ইমারজেন্সী।’ আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ শাহ আলমগীর। তাকে থামিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘শাহ সাহেব শোন। তুমি ও দেবানন্দ ভাই সাহেব জনাব হাজী আংকলের পরামর্শ নিয়ে গভর্নর কিংবা সিবিআই যাকে বলে পার কাল ১২ টার মধ্যে আমি থাইল্যান্ডের ভিসা চাই। আজই বা কাল বিকালের জন্যে পোর্ট ব্লেয়ার এবং কোলকাতা ব্যাংকক প্লেনের টিকিট করে রাখ।’
আহমদ শাহ আলমগীর আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল।
আবার আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিল।
আহমদ শাহ আলমগীরের চোখে নতুন অশ্রুর বেগ দেখা দিল।
ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সুষমা রাও। সে মুখ তুলল কিছু বলার জন্যে।
আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘না, সুষমা তুমি যা বলবে তা আমি জানি।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই সাজনা সিংহাল বলে উঠল, ‘স্যার, গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমি আপনাকে পরম গণতন্ত্রী ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখছি আপনি নির্দয়ভাবে মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারেন।’
আহমদ মুসা মিষ্টি হাসল। বলল, ‘মানুষের নয় ভাই-বোনদের মুখ বন্ধ করতে পারি। শাসন করার জন্যে ভাই-বোন তো পাইনি। তাই এমন সুযোগ পেলে ছাড়ি না।’
‘আমি বুঝি তাহলে মানুষ?’ ম্লান কণ্ঠে বলল সাজনা সিংহাল।
শব্দ করে হেসে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমাকে মুখ বন্ধ করতে বললে করতে না। এমন ভাই-বোনও আছে যারা বড়দের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়।’
‘এ বেয়াদবদের আপনি খারাপ চোখে দেখেন তাহলে।’ সাজনা সিংহাল বলল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘উল্টো। ওরা বেশি অধিকার দাবী করে এবং পায়ও।’
‘ও গড’ বলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল সাজনা সিংহাল।
পাশ থেকে সুস্মিতা বালাজী সাজনা সিংহালের পিঠে একটা কিল দিয়ে বলল, ‘এবার খুশি তো!’
মুখ ঢেকে রাখা আঙুলের ফাঁক দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে সাজনা সিংহালের। সেদিকে নজর পড়তেই ভ্রুকুচকালো সুস্মিতা বালাজী। কিন্তু মুখ খুলল না।
আহমদ মুসার দৃষ্টি আবার ফিরে গেল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘জনাব আমি ভেবেছিলাম আন্দামানের কাজ শেষ হলে আপনাদের সবাইকে নিয়ে ওমরা করতে সউদি আরবে নিয়ে যাব। কিন্তু আমি পারছি না। আপনি দয়া করে এ দায়িত্ব নিন। আমি সউদি সরকারকে এবং দিল্লীস্থ সউদি রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলেছি। দুচারদিনের মধ্যে সরকারি আমন্ত্রণ এসে যাবে। আপনারা মক্কা, মদিনা ও তায়েফ সফর করবেন।’
ঘর জুড়ে আনন্দের একটা গুঞ্জন উঠল।
গুঞ্জন ছাপিয়ে মিসেস বিবি মাধবের কণ্ঠ শ্রুত হলো। বলল, ‘এই দাওয়াত কারা পাবে?’
একটা দ্বিধায় পড়ল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে কথা বলতে হলো না। হাজী আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘এখানে হাজির যারা তারা সবাই দাওয়াত পাবে, আহমদ মুসার কথার ধরনে এটাই আমি বুঝেছি।’
‘তাহলে তো এখানের সবাই দাওয়াত পাচ্ছে।’ হাসি মুখে বলল মিসেস বিবি মাধব।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। তাকাল এবার সুরূপা সিংহালের দিকে। পরে দৃষ্টি ফিরিয়ে বিবি মাধবের দিকে চেয়ে বলল, ‘সুরূপা বোনরাও কি……….।’
কথা শেষ করতে হলো না আহমদ মুসার। তার কথার মাঝখানেই বিবি মাধব বলল, ‘হ্যাঁ বেটা সুরূপা, সাজনারা আমার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ সুস্মিতা আমাকে এদিকে এগিয়ে দিয়েছিল। পরে সুরূপাদের দেখেই আমি ফাইনালী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।’
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। উঠে দাঁড়াল সে। বলল, ‘ওয়েলকাম সুরূপা বোন, দুলাভাই এবং সাজনা।’
বসল আহমদ মুসা। বসতে বসতে বলল, ‘সাজনা এত বড় কথা তুমি আমার কাছ থেকে লুকাতে পারলে?’
চোখ মুছে ফেলেছে সাজনা সিংহাল। বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছা এ রকমই ছিল। আপনার কাছেই শুনেছিলাম, যেদিন যা ঘটবে, সেটা আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট।’
‘ঠিকই বলেছ। ধন্যবাদ সাজনা।’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ খুলেছিল সাজনা কিছু বলার জন্যে। কিন্তু তার আগেই সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘ছোট ভাই, মধুরতম একটা স্বপ্ন আপনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। মক্কায় যাওয়া, আল্লাহর ঘর কাবা দর্শন খুব বড় একটা স্বপ্ন। সেখানে যাবার পরই শুধু উপলব্ধি করতে পারব এ স্বপ্নের স্বরূপ। কিন্তু মদীনায় যাব, ভাবী জোসেফাইনকে দেখতে পাব, এই আনন্দ এখনই পাগল করে তুলছে মনকে।’
সাজনা সিংহাল, সুষমা ও শাহবানু একই সাথে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ঠিকই বলেছেন আপা। মনে হচ্ছে এখনই যদি যাবার ব্যবস্থা হতো!’
‘দেখ এমনভাবে বলে তোমরা ওমরার পূণ্য নষ্ট করো না। আল্লাহ নিয়ত অনুসারে ফল দেন। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে যদি ওমরা পালন কর তাহলে এর পূণ্য পাবে। আর যদি সৌদি আরব সফর হয় জোসেফাইনকে দেখার জন্য তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে সেই পূণ্য মিলবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা বলে উঠল মিসেস বিবি মাধব। বলল, ‘ওদের কথা আমি বলি বেটা। আসলে নিয়ত ওদের ঠিক আছে। বৌমা জোসেফাইনকে দেখার বিষয়টা বাড়তি নিয়ত। বলতে পার এটা বোনাস আনন্দ।’
‘ধন্যবাদ খালাম্মা।’ বলে বিবি মাধবের দিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘আমি এখন উঠতে চাই চাচাজান। বেশ কিছু কাজ আছে।’
সংগে সংগেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল আহমদ শাহ আলমগীরকে লক্ষ্য করে, ‘শাহ ভাইটি এ বিশেষ দিনে তোমার আর বেরিয়ে কাজ নেই। আমি তো বেরুচ্ছিই। আমি থাই ইমিগ্রেশন হয়েই তাহলে যাই।’
তড়াক করে উঠে দাঁড়াল আহমদ শাহ আলমগীর। বলল, ‘ভাইয়া বিশেষ দিন কোন বাধা নয় এটা আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমি কারও কোনই কাজে আসিনি ভাইয়া। আপনার এ নির্দেশটুকু পালনের সুযোগ আমাকে দিন। আপনি চলে যাবেন, নির্দেশ পালনের সুযোগ তো আর পাব না।’ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল আহমদ শাহ আলমগীরের কণ্ঠ।
আহমদ মুসা কয়েকধাপ এগিয়ে আহমদ শাহ আলমগীরের কাঁধে হাত রেখে হাসি মুখে বলল, ‘ঠিক আছে তুমিই যাবে ভাই।’
ড্যানিশ দেবানন্দ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘অরিজিন্যাল নির্দেশনামায় ওর সাথে আমার নামও ছিল ছোট ভাই।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার কথা সংশোধন করছি। ঠিক আছে আপনারা যাবেন।’
তারিক মুসা মোপলা বিষন্ন মুখে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার আমি বাদ পড়েছি।’
আহমদ মুসা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘তুমি আমার শিষ্য। আমার সাথে তুমি বেরুবে। আমি গাড়ির কাছে যাচ্ছি। তুমি তৈরি হয়ে এসো।’
আহমদ মুসা সবাইকে সালাম দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
হাজী আবদুল্লাহও উঠে দাঁড়াল। বলল, দেবানন্দ, শাহ আলমগীর তোমরা এসো। কাগজপত্র দেখি। তোমাদের এখনই বেরুনো উচিত। প্রয়োজন হলে গভর্নরকে বলে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। ভিসা আজ চাই-ই। ভিসা না হলেও আহমদ মুসা কিন্তু কালকেই চলে যাবে। সে সময়সূচী ঠিক রাখে। অবস্থা অনুকূল না হলে প্রতিকূলতার মধ্যেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’
হাজী আবদুল্লাহর সাথে ড্যানিশ দেবানন্দ ও আহমদ শাহ আলমগীর বেরিয়ে গেল।
ঘরে তখন শুধু মেয়েরাই।
কেউ কথা বলছে না।
পাশের আন্দামান সাগরের মৌনতা যেন ঘরটাকেও এসে গ্রাস করেছে।
কারও মুখ নিচু। কারও শূন্য দৃষ্টি আন্দামান সাগরের দিকে।
সুস্মিতা বালাজী এক সময় সাগরের দিক থেকে শূন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল। চোখ বুজে ধীরে ধীরে বলল, ‘আহমদ মুসার আন্দামান জীবনের পাতা উল্টে যাচ্ছে। কেউ একে রোধ করতে পারবে না।’
‘তারপর আন্দামান কি ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাবে? এ হয় না। এটা নিষ্ঠুরতা।’ বলল সাজনা সিংহাল। তার কথা চিৎকারের মত শুনাল।
সুস্মিতা বালাজী তার একটা হাত সাজনা সিংহালের কাঁধে রাখল সান্তনার পরশ হিসাবে। বলল আবার ধীরে ধীরে, এটাই হয় সাজনা। এটাই ওঁর জীবন। মায়ার শৃংখলে বাঁধা পড়লে তিনি তো এগোতে পারতেন না। দেখ না জোসেফাইন ভাবী তাঁকে শৃংখলে বেঁধেছেন, কিন্তু ধরে রাখেননি।’
সাজনা সিংহাল কোন উত্তর দিল না। তার একটি হাত গিয়ে জড়িয়ে ধরল সুস্মিতা বালাজীর হাতকে।
অন্যকারও মুখে কোন কথা নেই।
দেয়ালের ঘড়িতে সময়ের কাঁটা এগিয়ে চলেছে টিক টিক করে।

আহমদ মুসার গাড়ি ব্যাংকক এয়ারপোর্ট থেকে ব্যাংকক শহরে প্রবেশ করে সেন্ট্রাল এভেনিউ ধরে সোজা পশ্চিমে অগ্রসর হচ্ছে।
শহরের পশ্চিম প্রান্তে এই এভিনিউয়ের ধারে একটা ফ্যামিলি হোটেল আছে। একটা মুসলিম ফ্যামিলি হোটেল পরিচালনা করে। ঘরোয়া পরিবেশে চমৎকার খাওয়ার ব্যবস্থা আছে সেখানে। আহমদ মুসার ইচ্ছা সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে এসে উঠবে থাই-শেরাটন হোটেলে। তারপর লম্বা একটা ঘুম দিয়ে বিকেলে বেরুবে।
গাড়ি এগুচ্ছে।
আহমদ মুসার খুব ভাল লাগল মিৎসুবিশি জীপটা। নতুন গাড়ি এবং কমফোরটেবল। গাড়িতে যে দুর্দান্ত গতি আছে তা দেখলেই বোঝা যায়। স্পিডমিটারের দিকে তাকিয়ে এরই সমর্থন পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা বসেছিল পেছনের সিটে।
উর্দিপরা ক্যাব ড্রাইভার তরুণ বয়সের। ‘তোমার নাম কি ছেলে?’ পেছন থেকে ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘ভূমিবল।’ বলল ড্রাইভার।
‘একেবারে রাজার নামে নাম। ভূমিবল তো তোমাদের রাজা ছিল।’
‘জি স্যার তিনি রাজা ছিলেন। আমার বাপ-মা চেয়েছিলেন আমি রাজা হব না, কিন্তু রাজার মত হবো।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তুমি দেখতে রাজার মত, গাড়িও রাজার মতই।’
হাসল ড্রাইভার ছেলেটিও। বলল, ‘গাড়ি এখনও আমার নয় স্যার। ব্যাংকে বন্ধক আছে। ঋণ শোধ হবার পর গাড়ি আমার হবে।’
গাড়ি তখন মধ্য ব্যাংকক পার হয়েছে। বাঁ দিকে আদালতসমূহ রেখে অনেকখানি এগিয়েছে গাড়ি। হঠাৎ কিছুদূর সামনে আহমদ মুসা চোখের পলকে গাড়ির জ্যাম গড়ে উঠতে দেখল। তার পরেই বোম বিস্ফোরণ ও ব্রাশ ফায়ারের শব্দ।
আহমদ মুসার ড্রাইভার ভূমিবল ব্যাপারটা বুঝতে দেরি করে ফেলেছিল। তাই সংগে সংগে গাড়িও থামাতে পারেনি।’
গাড়ি ঘটনাস্থলের প্রায় গা ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রাইভার মুখ ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘স্যার গাড়িটা ব্যাক করি।’
কিন্তু তার কথা শেষ না হতেই দুধার থেকে দুজন পুলিশ এসে গাড়ির দরজায় নক করতে লাগল।
পুলিশ অফিসার দুজনকে খুবই অস্থির ও অসহিষ্ণু দেখাল। তারা ঘটনাস্থলের ধোয়ার ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে।
ড্রাইভার সুইচ টিপে দুদিকের দরজা আনলক করে দিল। দরজা খুলে যেতেই একজন পুলিশ অফিসার হাত ধরে টেনে ড্রাইভারকে তার সিট থেকে বের করতে করতে বলল, ‘গাড়ি আমাদের দরকার। সন্ত্রাসীদের ফলো করতে হবে।’
ড্রাইভারকে বের করে দিয়ে পুলিশ অফিসারটি ড্রাইভিং সিটে বসল। অন্যদিকের দরজা দিয়ে অন্য পুলিশ অফিসারটি পাশের সিটে উঠে বসল।
গাড়ি ছুটতে শুরু করল।
অস্থির উত্তেজিত পুলিশ অফিসার দুজন একবারও পেছনের দিকে ফিরে তাকায়নি। পেছনের সিটে যে আরেকজন লোক আহমদ মুসা বসে আছে তা জানতেই পারল না।
ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় আহমদ মুসা দেখল পুলিশের কয়েকটি গাড়ি বোম ও বুলেটে লন্ডভন্ড ও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ে আছে। কোন কোনটিতে আগুন জ্বলছে। দরজা খোলা অবস্থায় আরেকটি প্রিজন ভ্যানকে দেখল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা বুঝল, ‘সন্ত্রাসীরা তাহলে তাদের কোন বন্দী সহযোগীকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে।’
সোজা রাস্তা।
তীব্র বেগে ছুটে চলছিল গাড়ি।
সামনের দুজন অফিসারের মধ্যে ড্রাইভিং সিটের পুলিশ অফিসারকে সাব ইন্সপেক্টর লেবেলের মনে হলো আহমদ মুসার কাছে। আর পাশের সিটের পুলিশ অফিসারটি যে খুবই উচ্চপদস্থ হবেন, তার কাঁধের ইনসিগনিয়া দেখেই তা বুঝল আহমদ মুসা।
গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর আহমদ মুসা সামনেই দুটি মিটসুবিশি জীপ দেখতে পেল। ওদের পাগলের মত গতি দেখেই বুঝা যাচ্ছে ওরাই পলাতক।
শহর থেকে পশ্চিমমুখী হাইওয়ে ধরে এগুচ্ছে গাড়ি।
আগের গাড়ি দুটিও চলছিল ফুল স্পীডে।
আহমদ মুসাদের জীপ কিছুতেই ওদের সাথে দূরত্ব কমাতে পারছে না।
তখন গাড়ি শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে। শহরতলির পরেই অনেকটা জনবিরল এলাকা। রাস্তার দু’দিকেই উঁচু-নিচু, এ্যাবড়ো-থেবড়ো জমি। মাঝে-মধ্যে বড় বড়, দীর্ঘ খাদ। আগাছা ও গাছ-গাছড়ায় ঢাকা জমি। এখান থেকে পশ্চিম দিকে সবচেয়ে কাছের শহর নাখোঁ, তাও তিরিশ চল্লিশ মাইল দূরে। এর পরের শহর ব্যান পং। ব্যান পং শহরটি থাইল্যান্ডের বিখ্যাত নর্থ-সাউথ হাইওয়ের উপর। এই হাইওয়ে থেকে পশ্চিমে সীমান্ত পর্যন্ত এলাকা ঘনবন আচ্ছাদিত পার্বত্যভূমি। এই পার্বত্যভূমিরই পশ্চিম ধার ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণে বিলম্বিত বিলাদতুংগ পর্বতশ্রেণী।
সূর্য তখন মাথার উপরে।
তীব্র বেগে ছুটছে গাড়ি।
দুই পুলিশ অফিসারের মত আহমদ মুসারও দৃষ্টি সামনে।
হঠাৎ বনের মাঝে দেখতে পেল সামনে কিছু দূরে রাস্তার ধারে একটা গাছ থেকে চলন্ত কিছু একটা নিচে পড়ল। সবুজের মধ্যে চলন্ত সাদাকে পরিষ্কার চোখে পড়েছে আহমদ মুসার।
ভ্রু-কুচকে গেল আহমদ মুসার।
বস্তুটি যে মানুষ এবং গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমেছে এতে তার কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু কে সে এই জনশূন্য এলাকায়?
পলাতকদের লোক?
তাহলে তো একজন নয়!
অনুসরণকারী গাড়ি আটকাবার জন্যে ওদের একটা পশ্চাত বাহিনীও হতে পারে।
সামনেই রাস্তার এলটার্ন।
এলটার্ন বলেই টার্নের ওপারে বেশ দূরে গাছ থেকে লাফিয়ে নামার ঘটনা ঘটলেও কৌণিক সংক্ষিপ্ত পথে তা সুন্দর দেখা গেছে।
রাস্তা এলটার্ন হওয়ার কারণে সামনের গাড়ি দুটোকেও আর দেখা যাচ্ছে না। টার্গের গাড়ি চোখের আড়াল হবার পর পুলিশের গাড়ি বাঁকে এসে গতি আরও বেশি দ্রুত করবে এবং তাদের দৃষ্টি সামনের দিক নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এই সুযোগে কি সন্ত্রাসীরা পুলিশের গাড়ির উপর চড়াও হতে চায়?
গাড়ি তখন বাঁক পার হতে যাচ্ছিল।
‘স্যার সাবধান। এখানে শত্রু ওঁৎ পেতে থাকতে পারে।’ পেছন থেকে দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল আহমদ মুসা।
বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মত চমকে ওঠে পেছনে তাকাল দুজন পুলিশ অফিসার। দুজনের হাতেই উঠে এসেছিল রিভলবার। গাড়ি ড্রাইভকারী পুলিশ অফিসার তার চোখ সামনে ফিরিয়ে নিলেও তার এক হাতে রিভলবার, অন্যহাতে ছিল ষ্টিয়ারিং হুইল।
পাশের পুলিশ অফিসারটির রিভলবার আহমদ মুসার দিকে তাক করা। বলল, ‘কে তুমি? গাড়িতে ছিলে তুমি?’
‘আমি এ গাড়ির যাত্রী। আমি ভাড়া করেছিলাম এ গাড়ি। আপনারা পেছনে তাকাননি, দেখতেও পাননি। সেসব কথা এখন নয়, পরে শুনবেন। আমি বলছি, আপনাদের গাড়ি যে কোন সময় আক্রান্ত হতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি কি করে জানলে?’ বলল পুলিশ অফিসারটি। তার চোখে সন্দেহের ছায়া।
গাড়ি তখন এল টার্নটি পার হয়ে এসেছে।
আহমদ মুসা জবাব দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু কিছুই শোনা গেল না। গাড়ি দুদিক থেকে আসা ব্রাস ফায়ারের শব্দে ডুবে গিয়েছিল, সেই সাথে থেমেও গিয়েছিল আহমদ মুসার কণ্ঠ।
অকস্মাৎ গুলীবর্ষণের মধ্যে পড়ে দুই পুলিশ অফিসারসহ আহমদ মুসা গাড়ির মেঝেয় শুয়ে পড়ল।
পেছনের চাকায় গুলী খেয়ে গাড়িও দাঁড়িয়ে পড়েছে।
গুলী বৃষ্টিতে আকস্মিক ছেদ পড়ায় আহমদ মুসা ও পুলিশ অফিসার দুজন মাথা তুলছিল।
সেই সময়ই গাড়ির দুপাশের সবগুলো জানালা সশব্দে ভেঙে পড়ল। জানালা দিয়ে প্রবেশ করল ষ্টেনগানের চারটি ব্যারেল। চারটি মুখ উঁকি দিল তার সাথে। কালো হ্যাটধারী একজন বলল, ‘আল্লাহর শত্রুরা তোরা বেঁচে আছিল তাহলে? ভাল হলো। তোদের জীবিতই দরকার বেশি। তোদের কাছে আমাদের এক শতেরও বেশি মুজাহিদ বন্দী আছে। তোদের বিনিময়ে ওদের ছাড়িয়ে নেয়া যাবে।’
তার কথার মধ্যেই সবগুলো দরজার ছিটকিনি খুলে দেয়া হলো। টেনে খুলে ফেলল তারা দরজা। তারা টেনে বের করল দুজন পুলিশ অফিসার ও আহমদ মুসাকে। দুজন পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে রিভলবার তারা আগেই কেড়ে নিয়েছিল।
আহমদ মুসাদের গাড়ি থেকে বের করেই পুলিশের গাড়ি ওরা রাস্তা থেকে উত্তর দিকের জংগলাকীর্ণ খাদের দিকে ঠেলে দিল।
সংগে সংগেই দক্ষিণ দিকে জংগল ফুঁড়ে তিনটি গাড়ি বেরিয়ে আসতে দেখল।
ওরা মোট আটজন। সবার হাতেই ছোট বাঁটের ছোট ব্যারেলের কারবাইন জাতীয় ষ্টেনগান। ওদের কারবাইনগুলো তাক করা দুজন পুলিশ অফিসারসহ আহমদ মুসার দিকে।
হ্যাটপরা লোকটিই তাদের নেতা।
সে তার রিভলবারের নল সিনিয়র পুলিশ অফিসারটির থুতনির নিচে ঠেকিয়ে বলল, ‘বড়শীতে এতবড় মাছ উঠবে ভাবিনি। একেবারে থাই গোয়েন্দা পুলিশের দ্বিতীয় ব্যক্তি। সেই সাথে সিটি পুলিশের কমিশনার!’ আর সন্দেহ নেই আমাদের সব পাত্তানীকে এবার ছাড়িয়ে নিতে পারব।’ আর এই ছেলেটি কে? দেখতে খুব ভদ্র মনে হচ্ছে, কিন্তু শরীরটা দেখছি সৈনিকের। সেনা বাহিনীর লোক নয়তো?’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে শেষ কথা কয়টি বলল হ্যাটধারী লোকটি।
তার কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আমি এই ট্যাক্সি ক্যাবের যাত্রী। ওঁদের গাড়ি নষ্ট হবার পর ওঁরা আমাদের ক্যাবটি দখল করেছেন।’
‘ভাগ্য যখন তোমাকে আমাদের হাতে এনে দিয়েছে, তখন ধরে নাও তোমাদের ভাগ্যের এখানেই শেষ। আমরা একটা প্রিন্সিপাল মেনে চলি। সেটা হলো, বন্ধু যারা নয়, তারা সবাই আমাদের শত্রু। আর শত্রুকে জীবন্ত আমরা ছাড়ি না।’ বলল লোকটি।
‘বুঝলাম আমি বাঁচবো না। কিন্তু পুলিশ অফিসার দুজনকে তো বন্দীরা মুক্ত হবার পর ছাড়বেন বললেন।’ আহমদ মুসা বলল।
জোরে হেসে উঠল হ্যাটধারী লোকটি। বলল, ‘আল্লাহর শত্রুদের দেয়া ওয়াদার মূল্য নেই। আমাদের লক্ষ্য কাজ উদ্ধার।’
আহমদ মুসার থেকে মাত্র এক মিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ষ্টেনগানধারীর ষ্টেনগানের কালো বাঁটে সাদা রংয়ে উৎকীর্ণ হিব্রু লেখা শুরুতেই চোখে পড়েছিল। তারপর যে লোকটি কথা বলছিল তার কালো হ্যাটে কালো রংয়ের একটা হিব্রু বর্ণ দেখা যাচ্ছে। বর্ণটায় হিব্রু ঈশ্বর শব্দের আদ্যাক্ষর। এই ছোট্ট দুটি দৃশ্য অনেক বড় কথা বলে দিল আহমদ মুসাকে। লেটেষ্ট ইসরাইলী অস্ত্রে সজ্জিত এই সন্ত্রাসীরা তাহলে কারা? এদের মুখে আল্লাহর নাম কেন? পাত্তানীদের মুক্ত করার কথা এরা বলছে কেন? পাত্তানীদের সাথে ব্যাংককের ইসরাইলী অস্ত্রধারী ও ইসরাইলী ক্যাপ পরা এই সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক কি?
এসব চিন্তায় যখন আহমদ মুসা হাবুডুবু খাচ্ছে, তিনটি গাড়ি এসে তখন পশ্চিমমুখী হয়ে ষ্টার্টের পজিশন নিয়ে দাঁড়াল এবং গাড়ি থেকে তিনজন বেরিয়ে এসে অন্যদের পাশে এসে দাঁড়াল।
আহমদ মুসার ডান পাশে দুজন পুলিশ অফিসার। আর সামনে ওরা সারি বেধে দাঁড়িয়ে। হ্যাটধারী মাঝখানে পায়চারী করছে আর কথা বলছে।
আহমদ মুসার বাঁ দিকে গজখানেক দূরে দাঁড়িয়েছিল যে ষ্টেনগানধারী সে তার ষ্টেনগানের ব্যারেল আহমদ মুসার দিক থেকে নামিয়ে ষ্টেনগানটি ডান হাতের কব্জিতে ঝুলিয়ে নিল। পকেট থেকে বের করল প্লাষ্টিকের সরু রশি। এগোলো পুলিশের দু’জন অফিসারের দিকে। প্রথমে পিছমোড়া করে বাঁধল পুলিশ কমিশনারকে। তারপর ঐভাবেই পিছমোড়া করে বাঁধতে লাগল সহকারী গোয়েন্দা প্রধানকে।
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান বলল, ‘তোমরা যাই কর। তোমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। বন্দীদের তোমরা পাবে না।’
‘না পেলেও চলবে। পাত্তানীর ইসলামী বিপ্লবীরা পুলিশের দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে শেষ করেছে এটা কম বড় পাওয়া নয়।’ ঠান্ডা গলায় হাসতে হাসতে বলল হ্যাটধারী লোকটি।
শিউরে উঠল আহমদ মুসা লোকটির কথা শুনে। এরা হত্যা করে সেটা চালিয়ে দেবে ইসলামী বিপ্লবীদের নামে! কারা এরা? যয়নব যোবায়দা কথিত এরাই কি সেই তৃতীয় শক্তি?
সহকারী গোয়েন্দা প্রধানকে বাঁধা হয়ে গেছে।
এবার এগিয়ে আসছে লোকটি আহমদ মুসার দিকে।
তার হাতের কব্জীতে ঝুলছে বেঁটে-খাটো ভয়ংকর ষ্টেনগানটি। প্লাষ্টিকের বাঁটটি দুহাতে ধরে সে এগুচ্ছে। তার মুখে এক টুকরো বিজয়ীর হাসি।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। যেন সে লোকটির মুখোমুখি হচ্ছে। আসলে আহমদ মুসা চাইল, লোকটি যেন তার ডানদিক দিয়ে পিছনে না গিয়ে তার সামনে দিয়ে তার বাম দিক ঘুরে পেছনে যায়।
তাই হলো।
লোকটি আহমদ মুসার সম্মুখ ঘুরে পেছনে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা এই সময়টারই অপেক্ষা করছিল। প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রী, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়েছিল, ঠিক নেকড়ের শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বক্ষণের মত।
লোকটি আহমদ মুসার বুক বরাবর আসতেই আহমদ মুসা দুই ধাপ এগুনোর সাথে সাথেই তার বাম হাত বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরল তার গলা। সেই তাকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে নিয়ে লোকটির পিঠকে সেঁটে ধরল বুকের সাথে। সেই সময় আহমদ মুসার ডান হাত লোকটির হাত থেকে ষ্টেনগান কেড়ে নিয়েই গুলী করেছে হ্যাটধারীকে। তারপর লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকাদের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল ভয়ংকর মিনি ষ্টেনগানটিকে। ওরাও মরিয়া হয়ে গুলী করেছিল আহমদ মুসাকে। তাদের সবগুলো গুলী গিয়ে বিদ্ধ করেছিল তাদের সাথী লোকটিকে। শুধু একটি মাত্র গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল আহমদ মুসার ডান হাতকে কনুইয়ের নিচে।
গুলীবিদ্ধ হওয়ার পর মুহূর্তের জন্যে ছেদ নেমেছিল আহমদ মুসার গুলীতে। কিন্তু আহমদ মুসা বুকে ধরা লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে দুহাত দিয়ে ষ্টেনগান ধরে গুরী করা সম্পূর্ণ করেছিল, যাতে গুলী করার মত কেউ ওদের মধ্যে আর না থাকে।
দুজন পুলিশ অফিসারের চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া। যেন সিনেমার কোন পরিকল্পিত দৃশ্য দেখছে তারা। কিন্তু সিনেমা এটা নয়। সন্ত্রাসীদের ১১টি লাশ তাদের সামনে পড়ে আছে। তাদের সাথের নায়ক যাত্রী যুবকটিও আহত।
শিঘ্রই ওদের মুখ থেকে বিস্ময়ের ধাক্কা কেটে গেল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল আনন্দ।
ওরা আহমদ মুসার দিকে তাকাল এবং এগিয়ে এল তার দিকে।
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘ওয়ান্ডারফুল ইয়ংম্যান। তুমি কল্পনাকেও হার মানিয়েছ। আমার গোটা চাকরি জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা তুমি আজ ঘটিয়েছ। কনগ্রাচুলেশনস।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান অফিসারটি।
‘স্যার আমি আপনাদের হাতের বাঁধন খুলে দিচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের হাতের বাঁধন খুলে দিল।
বাঁধন মুক্ত হয়েই জড়িয়ে ধরল সে আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসাকে আবার ধন্যবাদ দিয়ে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান বলল, তুমি আহত ইয়ংম্যান, অফিসারকে আমি খুলে দিচ্ছি।
সিটি পুলিশ কমিশনার বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েই ছুটে গেল আহমদ মুসার কাছে। পকেট থেকে বের করল পকেট ফাষ্ট এইড। ইনভেলাপ ছিঁড়ে বের করল এ্যান্টিসেপটিক মেডিকেটেড প্যাডযুক্ত ব্যান্ডেজ। আহমদ মুসার ডান হাতের আস্তিন সরিয়ে ব্যান্ডেজের একাংশ ছিঁড়ে আহত স্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে দিতে বলল, ‘ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। তোমাকে মনে হচ্ছে রূপকথার রাজপুত্র। আর রাজপুত্রকে মনে হচ্ছে অতি অভিজ্ঞ একজন শিকারী। এই অপারেশনে তুমি একটিও ভুল করনি। কে তুমি জানতে পারি?’
‘অফিসার এসব কথা এখন থাক। বেশ কিছু করণীয় আছে আমাদের এখন।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান সিটি পুলিশ কমিশনারকে লক্ষ্য করে।
‘ঠিক বলেছেন স্যার। যে গাড়িকে আপনারা অনুসরণ করছিলেন, তা এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আপনারা সামনের নাখো শহরের পুলিশকে গাড়ি দুটোকে আটকাতে বলতে পারেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু গাড়ির নাম্বার না হলে…….।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘পেছনের গাড়িটার নম্বর আমি দেখেছি স্যার। তাছাড়া গাড়ির বিবরণ দিলেও কাজ হবে।’
‘নাম্বার তোমার মুখস্ত আছে?’ সহকারী গোয়েন্দা প্রধান বলল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
আহমদ মুসা নাম্বার বলল।
চোখ কপালে তুলেছে সিটি পুলিশ কমিশনার। বলল, ‘আমিও কয়েক ঝলক নাম্বার দেখেছি। কিন্তু মুখস্ত করিনি। মুখস্তের কথা মনেও হয়নি।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান নাখো শহরের পুলিশের সাথে কথা বলছিল। পলাতক গাড়ির নাম্বার ওদেরকে দিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল।
টেলিফোন শেষ করেই সহকারী গোয়েন্দা প্রধান সিটি পুলিশ কমিশনারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি পুলিশকে আসতে বল লাশগুলো নিয়ে যেতে হবে। ততক্ষণে এসো আমরা ওদের বডি চেক করি।’
লাশগুলোর বডি চেকিং-এর কাজে আহমদ মুসাও শরীক হলো।
হ্যাটওয়ালা নেতা লোকটির লাশ আহমদ মুসার সামনেই ছিল। আহমদ মুসা তাকে দিয়েই শুরু করল। তার গোটা দেহ সার্চ করে একটা মানিব্যাগ ও একটা মোবাইল ছাড়া কিছুই পেল না। মোবাইলের ফোন বুক ও সিমকার্ডে প্রচুর নাম ও টেলিফোন নাম্বার দেখল। সবগুলোই প্রায় মুসলিম নাম। ওনারস শিরোনামে নাম ‘ডি, দারায়ুস’। আর মানি ব্যাগে টাকা ছাড়া দেখল টোল ট্যাক্স ও লন্ড্রির স্লীপ। টোল ট্যাক্স ও লন্ড্রীর স্লীপ হাতে রেখে আহমদ মুসা মোবাইল ও মানিব্যাগ সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের হাতে দিয়ে বলল, ‘স্যার যে মোবাইলগুলো পাওয়া যাবে তাতে পাওয়া টেলিফোন নাম্বারের একটা তালিকা হওয়া দরকার।’
‘অবশ্যই ইয়ংম্যান। মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু মোবাইল ও মানিব্যাগ লাশের পকেটেই থাক আপাতত। লাশগুলোর আইডেনটিফিকেশনের সময় ওগুলোর প্রয়োজন হবে।’
‘ঠিক স্যার।’ বলে আহমদ মুসা একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘খাদে পড়ে যাওয়া ট্যাক্সি ক্যাবে যেতে চাই। আমার ব্যাগ ওখানে আছে। তাছাড়া গাড়ির কন্ডিশনটাও দেখে আসতে চাই। গাড়িটা বেচারা ট্যাক্সি-ক্যাব মালিকের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। মুখটা তার প্রসন্ন হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। তোমার মনটা দেখছি খুবই সংবেদনশীল। চিন্তা করো না, আমাদের রেসকিউ টীম গাড়িটা ওখান থেকে উদ্ধার করবে। আর ট্যাক্সি-ক্যাব মালিককে নতুন গাড়ির দাম আমরা দিয়ে দেব।’
‘ধন্যবাদ স্যার, গাড়ি থেকে ড্রাইভারের কাগজপত্রও নিয়ে আসবো।’
বলে আহমদ মুসা খাদের দিকে এগোলো।
আর সহকারী গোয়েন্দা প্রধান লাশগুলোর বডিসার্চ করার কাজ শেষ করতে মনোযোগ দিল।
পাশেই বডি সার্চরত সিটি পুলিশ কমিশনার সহকারী গোয়েন্দা প্রধানকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার ছেলেটাকে আমি বুঝতে পারছি না। দেখতে একেবারে সরল-স্বচ্ছ, আবার বুদ্ধি গোয়েন্দাদের মত। কমান্ডোদের মত ক্ষীপ্র, লড়াকু। আবার সৎ মানুষের মত দায়িত্বশীল। আশ্চর্যের বিষয়, ট্যাক্সি ক্যাবের সে আরোহী মাত্র ছিল। ট্যাক্সি-ক্যাব মালিকের ক্ষতির কথা তার মনে এল কি করে! বিষয়টা আমাদের ভাবার কথা!’
‘আমিও তোমার মত আশ্চর্যান্বিত থানি। তোমার মত আমিও ভাবছি। সে কোন গোয়েন্দা হতে পারে। কমান্ডো বা সৈনিকও হতে পারে কোন দেশের। অথবা সুশিক্ষেত, প্রশিক্ষিত একজন সিভিলিয়ানও হতে পারে। তবে সে ক্রিমিনাল নয় এটা মনে করি।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান।
সিটি পুলিশ কমিশনারের নাম উদয় থানি। আর ‘পুরসাত প্রজাদীপক’ হলো সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের নাম।
সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের কথা শেষ হতেই সিটি পুলিশ কমিশনার উদন থানি বলল, ‘স্যার আমারও তাকে ক্রিমিনাল মনে হয়নি। ট্যাক্সি ক্যাব মালিকের প্রতি তার সহানুভূতিও তাকে ক্রিমিনাল সাইকোলজি থেকে বহুদূর নিয়ে গেছে।’
‘ঠিক আছে, সবই জানা যাবে থানি। সেতো আমাদের সাথে আছে। গুলীটা তার হাতে খুব ডীপ হয়ে বসেছে অপারেশন দরকার হবে। পুলিশ হাসপাতালেই তাকে আমরা নেব।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক।
লাশগুলোর বডি সার্চ শেষ হয়েছে।
আহমদ মুসা এল।
‘তোমার ব্যাগের কোন ক্ষতি হয়নি তো?’ আহমদ মুসাকে দেখেই বলে উঠল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক।
‘তেমন ক্ষতি হয়নি স্যার। তবে গাড়িটার বডি আস্ত নেই।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা হাতের এক গুচ্ছ কাগজ সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এসব ক্যাব-ড্রাইভারের কাগজপত্র।’
‘তার কাগজপত্র তুমিই রাখ। তার সাথে যোগাযোগে তুমি সাহায্য করলে ভাল হবে।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান।
পুলিশের গাড়ির একটা বহর পৌছল সহকারী সিটি পুলিশ কমিশনার ও ব্যাংকক পশ্চিম জোনের এসপি’র নেতৃত্বে।
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান ও সিটি পুলিশ কমিশনার ওদের সব বুঝিয়ে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে আহমদ মুসাকে নিয়ে তারা একটি গাড়িতে উঠে বসল।
পুলিশ ড্রাইভার ষ্টার্ট দিল গাড়ি।
ছুঠল গাড়ি ব্যাংককের উদ্দেশ্যে।
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ইয়ংম্যান, আমরা অনেক ঘটনা ঘটালাম, কিন্তু আমাদের পরিচয় এখনো হয়নি, পরষ্পরের নামও আমরা জানি না। তাছাড়া কথাও নিশ্চয় অনেক আছে। এসো আমরা সময়টা কাজে লাগাই।’
আহমদ মুসা খুশি হলো।
কথা শুরু হলো।

সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের বিশাল ড্রইংরুম।
একটা সোফায় আহমদ মুসা বসে আছে।
আহমদ মুসা এখন সুস্থ।
হাতের আহত স্থানটা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে, আহমদ মুসা পুলিশ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর একটা হোটেলে উঠেছে। হোটেল ঠিক করে দিয়েছে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক নিজেই। হোটেলটা পুরসাত প্রজাদীপকের বাড়ির কাছেই। পুরসাত প্রজাদীপকের বাড়ি শহরের ভিআইপি অফিসারদের রেসিডেন্সিয়ার এরিয়ার এক প্রান্তে। তার বাড়ির পরেই শহরের অভিজাত কমার্শিয়াল এলাকা। কমার্শিয়াল এলাকার শুরুতেই ব্যস্ত এভিনিউয়ের পাশে আহমদ মুসার অভিজাত হোটেলটি।
আহমদ মুসাকে বসিয়ে ‘স্যার চা নিয়ে আসি’ বলে বেরিয়ে গেছে বেয়ারা।
আহমদ মুসা হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। বেলা ১২টা বাজতে যাচ্ছে। মিনিট পনের দেরী। ১২টায় আসার কথা বলেছেন পুরসাত প্রজাদীপক। তিনি অফিস থেকে আসবেন। খাবেনও আহমদ মুসাকে সাথে নিয়ে। আহমদ মুসা যোহরের নামায আগাম পড়ে বের হয়েছে। বিভেন বার্গম্যানের পরিচয় আহমদ মুসা এদের দিয়েছে। কিন্তু আহমদ মুসার পরিচয় এখনও এরা জানে না। আহমদ মুসা ব্যাংকক আসার আগে আন্দামানে ছিল এটাও এরা জেনে গেছে। ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের শুধু কয়েকজন আহমদ মুসার পরিচয় জানে বলে এ পরিচয় এদের কাছে প্রকাশ পায়নি। ব্যাংককের মার্কিন দূতাবাসও আহমদ মুসার ব্যাপারে থাই সরকারকে অবহিত করেছে। আহমদ মুসা বেশ খাতির পাচ্ছে এ সরকারের কাছ থেকে। বিশেষ করে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসাকে খুবই স্নেহ করে এবং সিটি পুলিশ কমিশনার উদন থানির কারণে পুলিশেরও দারুণ আনুকুল্য পাচ্ছে আহমদ মুসা।
ঝুমুরের মিষ্টি পাতলা শব্দে মুখ তুলল আহমদ মুসা। দেখল ভেতর থেকে ড্রইংরুমে প্রবেশ করছে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের মেয়ে সিরিত থানারতা। বিশ একুশ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী। পরনে ব্লাউজ ও স্কার্ট। পায়ে দুই ফিতার হাই হিল স্যান্ডেল। দুধে আলতা পায়ের সাথে মানানসই সোনার সোনালী ঝুমুর। হাঁটার তালে তালে পাতলা মিষ্টি শব্দ হচ্ছে।
মেয়েটা এসে আহমদ মুসার পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘স্যার, ভূজ বাহাদুর আপনাকে এভাবে একা ফেলে গিয়ে চা বানাচ্ছে এটা ঠিক করেনি।’
‘না, আমিই ঠিক করিনি। আমি পনের মিনিট আগে এসে গেছি। তোমার আববার সাথে আমার এ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১২টায়।’
‘না ঠিক করেছেন স্যার। যা ঘটার ছিল সেটাই ঘটেছে। আমারও কথা বলার সুযোগ হলো আপনার সাথে।’
কথায় ছেদ এনে মুহূর্তকাল থেমেই মেয়েটি আবার বলে উঠল, ‘আপনি সেদিন সাংঘাতিক কাজ করেছেন স্যার। আববা বলেন, তারা যা করতে সাহস করেনি, তাই আপনি করেছেন। আববা আরও কি বলেন জানেন, জীবনের মায়া যাদের আছে, তারা এমন কাজ করতে কখনই এগোয় না। জীবনের মায়া আপনার নেই?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘জীবনের প্রতি মায়া থাকলেই কি কেউ মৃত্যু এড়াতে পারে?’
‘পারে না। কিন্তু আমি তা বলছি না। আমি বলছি, মৃত্যুকে আলিংগণ করতে যাওয়ার কথা। মৃত্যু ভয় যার মধ্যে আছে, সে এটা পারে না।’ বলল সিরিত থানারতা।
‘আসলে সেদিন আমি মৃত্যুকে আলিংগণ করতে যাইনি। বরং মৃত্যুর হাত থেকে নিজে বাঁচা এবং দুজন শীর্ষ পুলিশ অফিসারকে বাঁচাবার জন্যেই আমি ওটা করেছিলাম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝলাম না।’ বলল মেয়েটি।
‘কথায় কথায় সন্ত্রাসীরা এ কথা বলেছিল যে, যারাই তাদের হাতে ধরা পড়ে, তাদের আর তারা জীবন্ত ছাড়ে না। প্রয়োজনীয় কথা আদায় করা, কিংবা তাদের কাজে লাগিয়ে পরে তাদের তারা হত্যা করে ফেলে। তাদের হাতে বন্দী হওয়ার অর্থ মৃত্যুকে আলিংগন করে নেয়া। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মৃত্যুকে আলিংগন করার আগে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা আমার সফল হয়। ওরাই মৃত্যুকে আলিংগণ করে।’
মেয়েটির চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। বলল, ‘আতংকের কথাকে আপনি সুন্দর সাহিত্যের ভাষায় বলেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।’
থামল মেয়েটি। তার মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠল। বলল আবার, ‘স্যার, আবার আববার কথায় ফিরে আসি। আববা বলেছেন যে, তাঁদের মত পুলিশেরা যা পারেনি, আপনি তাই পেরেছেন। তার অর্থ কার্যত আপনি আমাদের পুলিশদের চেয়েও বড়। তাহলে আপনি কে, এ প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই ওঠে। আববা বলেছেন, আপনি ‘বিভেন বার্গম্যান’। আমেরিকার নাগরিক। ‘সাকোথাই’ রাজবংশের পাত্তানী শাখার একজন শাহজাদীর আবেদনে আপনি তাদের সাহায্য করতে এসেছেন। কিন্তু এটা আপনার পরিচয় নয়। আসলে আপনি কে?’
আহমদ মুসার মুখে হঠাৎ গাম্ভীর্য নেমে এল। কিছুটা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। বলল সে, ‘মিস সিরিত। তোমার পিতাও আমার পরিচয় এভাবে জিজ্ঞাসা করেনি। তুমি এতটা আগ্রহী কেন?’
‘ধারালো ও বিস্ময়কর কাজ দেখে তার কথার ওজন পরিমাপ করা যায় না। তার পরিচয়ের সাথে তার কথার ওজন পরিমাপ করা যায়। আমি আপনার পরিচয় জেনে আপনার কথা সম্পর্কে চিন্তা করতে চাই।’ বলল সিরিত থানারতা।
‘আমার কোন কথা সম্পর্কে ভাবতে চাও?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পাত্তানী শাহজাদা জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিনকে তার সাথীরাই মুক্ত করে নিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি বলেছেন যে, তৃতীয় একটা সন্ত্রাসী পক্ষ ধরে নিয়ে গেছে। আপনার কথা সত্য নয়, এটাই আমি ভাবতে চাই।’ বলল সিরিত থানারতা। গম্ভীর এবং সিরিয়াস কণ্ঠ সিরিত থানারতার।
তার কণ্ঠে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘দুই ধারণার মধ্যে একটা সত্য, একটা মিথ্যা হতেই পারে। কিন্তু তুমি এত সিরিয়াস কেন? তুমি এ নিয়ে এত ভাবছই বা কেন?’
‘আমি চাই, তার সাথীরা তাকে মুক্ত করে নিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি অন্যরকম বলছেন। শুনতে কষ্ট লাগছে আমার।’ বলল সিরিত থানারতা। তার কণ্ঠ এবার নরম, বিনীত।
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টিতে তাকাল সিরিত থানারতার দিকে। তার মনে জিজ্ঞাসা, জাবের জহীর উদ্দিনের সাথে সিরিতের সম্পর্ক আছে? জাবের জহীর উদ্দিন ব্যাংককের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে পরিচয় হয়ত কোনওভাবে থাকতে পারে। কিন্তু নিছক পরিচয় কি জাবের জহীর উদ্দিনের নিরাপত্তা সম্পর্কে তাকে এতটা উতলা করতে পারে! আহমদ মুসা বুঝতে পারছে সিরিত চাচ্ছে জাবের জহীর উদ্দিন সাথীদের দ্বারা মুক্ত হয়ে এখন নিরাপদ। আহমদ মুসার ধারণা তাকে কষ্ট দিচ্ছে, কারণ; আহমদ মুসার কথা সত্য হলে জাবের জহীর উদ্দিন সন্ত্রাসীদের হাতে বন্দী থাকে। এসব চিন্তা করে বলল আহমদ মুসা, ‘মিস সিরিত, বুঝতে পারছি জাবের জহীর উদ্দিনের মঙ্গল চাও। তাহলে আমার কথায় তোমার কষ্ট না পেয়ে খুশি হওয়া উচিত ছিল।’
চোখ ভরা প্রশ্ন নিয়ে সিরিত থানারতা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘বুঝলাম না আপনার কথা স্যার।’
‘জাবের জহীর উদ্দিনকে তার সাথীরা উদ্ধার করে নিয়ে গেছে একথা যদি সত্য হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের যে অভিযোগ এসেছে তাও সত্য প্রমাণ হয়। আর সেদিন ওরা চারজন পুলিশকে হত্যা করে জাবের জহীর উদ্দিনকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। আগের সেনা হত্যার দায়তো আছেই, এই পুলিশ হত্যার দায়ও বর্তাবে জাবের জহীর উদ্দিনের ঘাড়ে। এর অর্থ জাবের জহীর উদ্দিন পুরোপুরি একজন সন্ত্রাসী নেতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আমি চাচ্ছি জাবের জহীর উদ্দিনকে নির্দোষ প্রমাণ করতে।’ আহমদ মুসা বলল।
উদ্বেগ-আতংকে চুপসে গেছে সিরিত থানারতার মুখ। তার চিন্তার ভুল তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু আহমদ মুসা যা বলেছে, তাতে জাবের জহীর উদ্দিন কিভাবে নির্দোষ প্রমাণ হবে এটা সে বুঝতে পারছে না। বলল, ‘নির্দোষ প্রমাণ হবে কিভাবে?’
‘আমি বলেছি, সন্ত্রাসী একটা তৃতীয় পক্ষ জাবের জহীর উদ্দিনকে বাগে নেবার জন্যে তাকে ছিনতাই করেছে। সন্ত্রাসী এই তৃতীয় পক্ষই পাত্তানী অঞ্চলে সন্ত্রাস করছে। সেনানিবাসে হামলা করছে, সেনা সদস্যদের হত্যা করছে এবং এসবের দায় জাবের জহীর উদ্দিনরাসহ শান্তিকামী মুসলমানদের উপর চাপাচ্ছে তাদের সন্ত্রাসী প্রমাণের উদ্দেশ্যে। জাবের জহীর উদ্দিনকে ওরা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে বিশেষ মতলবেই।’ আহমদ মুসা বলল।
সিরিত থানারতার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার, আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। কিন্তু আপনার কথা আপনার ধারণা, প্রমাণ হবে কি করে?’
‘আমি তোমাদের থাই পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগকে এ বিষয়টা বলেছি। জাবের জহীর উদ্দিনের বোন যয়নব যোবায়দার চিঠি আমি তাদের দেখিয়েছি। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ আমার কথাকে ইতিবাচক হিসাবে নিয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে আজ বৈঠক হচ্ছে। দেখা যাক কি হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ বলল সিরিত থানারতা।
মুহূর্ত কয়েক থেমেই সিরিত থানারতা বলল, ‘আগের প্রশ্নটাই আবার করতে ইচ্ছা করছে, আপনি আসলে কে স্যার? একজন আমেরিকান বিভেন বার্গম্যান কেন এভাবে ছুটে এসেছেন? কেন তিনি এমন আন্তরিকতার সাথে জাবের জহীর উদ্দিনের স্বার্থকে নিজের স্বার্থ হিসাবে গ্রহণ করেছেন?’
‘আমার যে পরিচয় পেয়েছ, তা কি যথেষ্ট নয় আমার উপর আস্থার রাখার জনে, মিস সিরিত?’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যরি স্যার। আমি সে অর্থে বলিনি। কৌতুহল থেকেই এই প্রশ্ন করেছি। আপনার উপর আস্থার জন্যে আপনার কোন পরিচয়ের দরকার নেই।’
সিরিত থানারতার কথা শেষ হবার সংগে সংগেই গাড়ি বারান্দায় গাড়ি পার্ক করার শব্দ হলো। পরক্ষণেই জুতার শব্দ শোনা গেল।
ড্রইংরুমে প্রবেশ করল থাইল্যান্ডের সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক।
‘গুড মর্নিং বিভেন বার্গম্যান। আমি আসার পথে ভাবছিলাম, নিশ্চয় তুমি এসে বসে আছ। তুমি বরং আগেই আসবে, তোমার লেট হবার কথা নয়। কতক্ষণ এসেছ তুমি?’
‘১২ মিনিট হলো এসেছি। একটু আগেই আসা হয়ে গেছে।’
‘ভালো করেছ।’ বলে পুরসাত প্রজাদীপক তাকাল মেয়ে সিরিতের দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ মা, তুমি বিভেনকে সঙ্গ দিয়েছ।’
‘এটা তো সৌভাগ্যের ব্যাপার ড্যাড। শুধু দুনিয়া নয়, দুনিয়ার বাইরের কথাও তাঁর কাছ থেকে জানা যায়।’ বলল সিরিত থানারতা।
উঠে দাঁড়াল সিরিত থানারতা। বলল, ‘ড্যাড তুমি বস। আমি দেখি ভুজ বাহাদুর চা আনতে এত দেরি করছে কেন?’
ভেতরে চলে গেল সিরিত থানারতা।
বসল আহমদ মুসার পাশের সোফায় পুরসাত প্রজাদীপক।
‘স্যার আপনি কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে আসলে ভাল হতো না?’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল, ‘মাঝে মাঝে ইউনিফরম ২৪ ঘণ্টাও গায়ে থাকে। সুতরাং ইউনিফরমে কোন সমস্যা নয়। আর আমি ফ্রেশ আছি। দীর্ঘ মির্টি থেকে বেরিয়ে হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নিয়েছি।’
‘ওকে স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
পুরসাত প্রজাদীপক তাকাল নিজের হাত ঘড়ির দিকে। বলল, ‘আমরা একটার দিকে লাঞ্চ খাব।’
‘ঠিক আছে স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
সোফায় গা এলিয়ে দিল পুরসাত প্রজাদীপক। চোখটাও বন্ধ করল। কিন্তু মুহূর্ত কয়েক পরেই আবার সোজা হয়ে বসল। দুই হাঁটুর উপর দুই কনুই রেখে মুখটা একটু নিচু করল। বলল, ‘স্যরি বিভেন বার্গম্যান, তোমার কথা সরকার গ্রহণ করেননি। কোন তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতির বিষয় কোনদিক দিয়ে কোনভাবেই সামনে আসেনি। জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিন যে ঘটনায় যেভাবে গ্রেফতার হয়েছে, যে প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করা হলো, তাতে মাঝখানে তৃতীয় পক্ষের কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি এবং এর পক্ষে যুক্তিও যথেষ্ট নয়। থাই সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এটাই রায়। স্যরি, বিভেন বার্গম্যান, আমাদের কোন কথা কাজে আসেনি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি; তুমি যা ভেবেছ সেটাই সত্য। এখন কি করা যায় বল?’
‘ওরা যা চিন্তা করেছেন ওদের জন্যে এটাই স্বাভাবিক। যয়নব যোবায়দার চিঠি, চিঠি পাওয়ার কাহিনী তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। অপরাধীদের একটা আত্মরক্ষার কৌশল একে তাঁরা মনে করতেই পারেন। বিশেষ করে জাবের জহীর উদ্দিনকে মুক্ত করে নিয়ে যাবার সময় রক্তক্ষয়ী ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা তাঁদের পক্ষে গ্রহণ করা কঠিন।’ ধীর কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল।
ভাবছিল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক। আহমদ মুসা কথা শেষ করার পরও কোন কথা সে বলল না। একটু পর সে মাথা তুলল। আবার সোফায় গা এলিয়ে বলল, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমান। বিষয়টা তুমি ঠিক বুঝেছ। কিন্তু এখন তাহলে কি করবে বল।’
‘এখন আমি আমার মত করে এগোব স্যার। আমি যয়নব যোবায়দা ও জাবের জহীর উদ্দিনদের সাহায্য করতে চাই।’
‘কিন্তু একা কি করবে?’
‘কি করতে পারব আমি জানি না। কিন্তু আমি মনে করি এই ভাল কাজে ঈশ্বর নিশ্চয় সাহায্য করবেন।’
‘তোমার বিস্ময়কর দক্ষতা-যোগ্যতার সাথে তোমার বিশ্বাসের এই মিশ্রণ এক বিরাট শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা অভিজ্ঞতা যে, অনড় বিশ্বাসীরা যদি বুদ্ধি, দক্ষতা ও যোগ্যতার অস্ত্রে সজ্জিত হয়, তাহলে তারা অজেয় হয়ে ওঠে। গত কয়েকদিন ধরে তোমাকে দেখে আমার এই অভিজ্ঞতার কথাই বার বার মনে হয়েছে। আরেকটা কথা বলি বিভেন বার্গম্যান?’
‘বলুন স্যার।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান তুমি মুসলিম। তোমার বিভেন বার্গম্যান নামটা ঠিক কিনা জানি না, তবে তুমি আমেরিকান এবং তোমার আমেরিকান ভিআইপি পাসপোর্টে কোন ত্রুটি নেই।’
থামল পুরসাত প্রজাদীপক।
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘আপনি অতি অভিজ্ঞ একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ছদ্মবেশ আপনার কাছে ধরা পড়বে এটা স্বাভাবিক। সংগত কারণেই আমাকে পরিচয় গোপন করতে হয়েছে, এটাও আপনি নিশ্চয় বুঝবেন।’
‘এটা আমার কাছে পরিষ্কার ইয়ংম্যান।’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘নিষ্ঠাবান মুসলমানদের জন্যে পরিচয় গোপন করা কঠিন বিভেন বার্গম্যান। তোমার কপালে সিজদার চিহ্নই তোমার পরিচয় বলে দিয়েছে। আমি প্রথমে ওটাকে স্কিনের কোন প্রাকৃতিক স্পট মনে করেছিলাম। পরে বুঝেছি, ওটা প্রাকৃতিক নয় সিজদার দাগ।’
‘পাসপোর্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের গোপন ওয়েব সাইট থেকে আমরা এটা জেনেছি। তাছাড়া ইন্ডিয়ার সিবিআই চীফ আমার বন্ধু। তুমি যেহেতু ইন্ডিয়ায় অনেকদিন ছিলে, তাই তাঁকেও আমি তোমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি তোমার উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন এবং তিনি একটি মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন যে, তুমি মার্কিন প্রেসিডেন্টের খুব প্রিয়ভাজন লোক। ব্যাংককস্থ মার্কিন দূতাবাসের তোমার ব্যাপারে উদ্বিগ্নতা দেখেও আমি এটা বুঝেছি। তবে সিবিআই চীফ যশোবন্ত যশোরাজ তোমার ব্যাপারে একটা রহস্য রেখে দিয়েছেন। শেষ কথা হিসাবে বলেছেন, বিভেন বার্গম্যানের একটা মূল্যবান পরিচয় তোমাকে দিলাম না, সেটার তোমার প্রয়োজন নেই বলে।’
থামল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘আমার পরিচয় আপনি যা জানেন, সবাই কি তা জেনেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমি এবং আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের চীফ ছাড়া আর কেউ জানে না। এটা জানানো হবে না।’
‘ধন্যবাদ স্যার। বাড়তি ঝামেলা থেকে আমি বাঁচতে পারব।’
পুরসাত প্রজাদীপক একটু হাসল। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান, থাই মুসলমানদের কাছে আমি কিন্তু চরম বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত।’
‘কারণ?’ ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
‘কারণ এই যে, আমি আইন রক্ষা ও আইন প্রয়োগে বিন্দুমাত্র কনসেশন দেই না। বিশ পঁচিশ ভাগ আইনের ভুল ব্যবহারও হয়। এই ভুল ব্যবহারকে উদ্দেশ্যমূলক, বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করা হয়। মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রে এর শিকার হয়েছে। এ সব থেকেই একটা ধারণা সৃষ্টি হয়ে গেছে। চলমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের ক্ষেত্রে আমি বিশেষ সতর্ক, তারা বিশেষ পর্যবেক্ষণের অধীন। কিন্তু তাদের ব্যাপারে বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক দৃষ্টি আমার নেই।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক।
‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়েলকাম ইয়্যম্যান।’ বলে পুরসাত প্রজাদীপক তার হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান, তুমি আমাদের ব্যক্তিগত সাহায্য পাবে। প্রয়োজন হলে, চাইলে যে কোন সময় পুলিশের সাহায্য তোমার জন্য ব্যবস্থা করা হবে। সরকার যাই ভাবুন, তোমার ‘তৃতীয় পক্ষ তত্ব’ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আজকের জটিল বিশ্ব-রাজনীতিতে অনেক দেশেই কোন স্বার্থের পক্ষে ষড়যন্ত্রকারী ও সাবোটিয়ার হিসাবে তৃতীয় পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। আমি আন্তরিকভাবেই চাচ্ছি, তোমার এই তত্ব সত্য হোক এবং থাই মুসলমানদের উপর আরোপিত ইলজাম মিথ্যা প্রমাণ হোক।’
‘সহযোগিতার এ প্রতিশ্রুতির জন্যে ধন্যবাদ স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার ঐ ‘তৃতীয় পক্ষটি’কে, এ সম্পর্কে তুমি সুনির্দিষ্ট কোন চিন্তা করেছ?’ জিজ্ঞেস করল পুরসাত প্রজাদীপক।
প্রশ্নটির সংগে সংগেই জবাব দিল না আহমদ মুসা। তৃতীয় পক্ষ সম্পর্কে তার সুষ্পষ্ট একটি ধারণা আছে। তার উপর সেদিন তৃতীয় পক্ষের সন্ত্রাসীদের হাতে ইসরাইলী অস্ত্র এবং সন্ত্রাসীদের মাথায় ‘হিব্রু’ বর্ণমালা খচিত ক্যাপ দেখে তার ধারণা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় পক্ষের এই পরিচয়ের কথা আহমদ মুসা ওদের এখনও জানায়নি। আহমদ মুসা আশংকা করছে থাই গোয়েন্দারা এটা জানতে পারলে ইসরাইলী গোয়েন্দারাও কোনওভাবে তা জেনে ফেলতে পারে। আহমদ মুসা চায় না, তৃতীয় পক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের পরিচয় মুসলমানদের কাছে ধরা পড়ে গেছে, এটা তারা না জানুক। অপ্রস্তুত অবস্থায় ওদের মুখোশ খুয়ে যাওয়া সবদিক থেকে সুবিধাজনক হবে। এসব চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, ‘আমরা ওদের ব্যাপারে এখনও শূন্য অবস্থানেই আছি। সামনে এগুলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’
‘অবশ্যই বিভেন বার্গম্যান। তবে তারা যারাই হোক, তারা থাই বৌদ্ধ এবং থাই মুসলিম কারোরই বন্ধু নয়।’
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান। তুমি একটু বস। আমি একটু ঘুরে আসি। আর হ্যাঁ, আমরা ঠিক একটাতেই লাঞ্চ করব।’
পুরসাত প্রজাদীপক হাঁটতে শুরু করল ভেতরে যাবার দরজার দিকে।
দরজা পর্যন্ত পৌছতেই সিরিত থানারতা বাইরে থেকে দৌড়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল। উত্তেজনা ও কৌতুহল মিশ্রিত তার মুখ। দৌড়রত অবস্থায়ই বলল, ‘স্যার আপনি তো ড্রাইভার আনেন না। আজ কি ড্রাইভার এনেছেন?’
‘না আনিনি। এ কথা কেন বলছ?’
‘একজন প্রফেশনাল ড্রাইভারের ইউনিফরম পরা একজন লোক আপনার গাড়ির পাশ থেকে উঠে যেতে দেখলাম। তার হাঁটার মধ্যে পলাতক চোরের মত আচরণ ছিল। আমার দেখে ভাল মনে হয়নি।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ড্রাইভার আসবে কোত্থেকে?’
ওদিকে পুরসাত প্রজাদীপকও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার মুখেও একই কথা, এ সময় এখানে ড্রাইভার আসবে কোত্থেকে!’
বলে সে ড্রইংরুমের ভেতরে এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়াল।
‘চলুন দেখে আসি। সন্দেহের শেষ রাখতে নেই। সেল্ফ ড্রাইফের চুক্তিতে আমি গাড়ি ভাড়া নিয়েছি। কোন ড্রাইভার আসার কথা নয়।’
বলে আহমদ মুসা বাইরের দরজার দিকে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে পুরসাত প্রজাদীপক ও সিরিত থানারতা হাঁটতে শুরু করল।
গাড়ির কাছে পৌছে আহমদ মুসা পকেট থেকে পেন্সিল আকৃতির একটা ডেটোনেটরও বের করল।
অত্যন্ত পাওয়ারফুল এ ডেটোনেটর। মেটাল, বিস্ফোরক, এমনকি প্লাষ্টিক কভার উইপনস পর্যন্ত সে ডিটেক্ট করতে পারে।
গাড়ির কাছাকাছি পৌছতেই ডেটোনেটর বিপ বিপ করা শুরু করল। আর লাল সিগনালও ভীষণ নাঁচতে শুরু করেছে।
সবাইকে দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘গাড়িতে নিশ্চিত বোম পেতে রেখেছে। আপনারা দাঁড়ান, আমি দেখি বোমাটা কোথায় পেতেছে।’
আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করেছে। পুরসাত প্রজাদীপক খপ করে আহমদ মুসার হাত ধরে ফেলল। বলল, ‘তোমার গিয়ে কাজ নেই। বোম ডিফিউজ করা বিস্ফোরক এক্সপার্টদের কাজ। আমি ওদের ডাকছি।’
কথা শেষ করেই পুরসাত প্রজাদীপক পুলিশ হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন করল। দ্রুত একটি বোম স্কোয়াড পাঠানোর নির্দেশ দিল।
‘বোম ডিফিউজ করা নয়, আমি যাচ্ছিলাম বোমটা কোথায় থাকতে পারে দেখতে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এ গাড়িতে হাত দেওয়াও ঠিক হবে না। পুলিশের বাড়িতে এসেছ, পুলিশের সাথে আছ। অতএব পুলিশী বিধান তোমার মানতে হবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
পুলিশের বোম স্কোয়াড এল।
গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই গাড়ির চার দরজা এক সাথে খুলে গেল। চারজন পুলিশ নেমে এল গাড়ি থেকে।
স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত এসে স্যালুট করল পুরসাত প্রজাদীপককে।
‘গুড ডে ইন্সপেক্টর। ঐ গাড়িটায় বোম পাতা আছে। তোমরা দেখ।’ আহমদ মুসার গাড়ির দিকে ইংগিত করে বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
ইন্সপেক্টর তার বোম স্কোয়াডের তিন জনসহ এগোলো গাড়িটার দিকে।
তারা প্রথমে ডিটেক্টর দিয়ে গাড়ির চারদিক থেকে গাড়িটা পরীক্ষা করল। তারপর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল।
ইন্সপেক্টর মংগুত কয়েক ধাপ হেঁটে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের কাছে এল। বলল, ‘স্যার ড্রাইভিং দরজার ভেতরের অংশে বোম ফিট করা আছে। গাড়ি স্ক্যান না করে গাড়ির দরজা খোলা নিরাপদ নয়। স্ক্যান করলে তবেই বুঝা যাবে ডিফিউজের কি ব্যবস্থা নেয়া যাবে।’
‘ওকে, গো অন।’
বোম স্কোয়াড ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বের করে ১ বর্গফুট আয়তন স্ক্রিন বিশিষ্ট একটা স্ক্যানার দাঁড় করিয়ে ফেলল।
গাড়ির চারদিক ঘুরে স্ক্যানিং সম্পূর্ণ করল বোম স্কোয়াড। স্ক্যানিং স্ক্রীনে গাড়ির ভেতরের প্রতি ইঞ্চির বিস্তারিত অবস্থা তারা দেখল এবং এসব দৃশ্যের ফটোও তৈরি হলো।
বোম স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত এবং সহযোগী তিন জন এল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের কাছে। বলল, ‘স্যার ড্রাইভিং দরজার ভেতরের পাশে বোম পাতা রয়েছে এবং প্রত্যেক দরজার লকের সাথে ডেটোনেটর লাগানো রয়েছে। যে কোন দরজা খুলতে গেলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। সুতরাং গাড়ি বাঁচিয়ে বোম ডিফিউজ করা অসম্ভব। এমনকি গাড়িটি ঠেলে স্থানান্তর করতে গেলে যে ঝাঁকুনি লাগবে ডোর লকে, তাতেও বোমের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’
‘ডোর লকে কোন ঝাঁকুনি লাগলেই বিস্ফোরণ! একেবারে আট-ঘাট বাধা পরিকল্পনা। মৃত্যু অবধারিত করেছিল গাড়ির মালিকের। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তা হয়নি। কিন্তু গাড়ি তো বাঁচছে না! বলে সহকারী গোয়েন্দা পুরসাত প্রজাদীপক তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
‘গাড়ি না বাঁচলে যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা যাবে স্যার। কিন্তু তার আগে ওদের সাথে একটু কথা বলে দেখি স্যার আরও কি করা যায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম বিভেন বার্গম্যান। দেখ কি করা যায়।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘তোমাদের কাছে গ্লাস-কার্টার আছে?’ ইন্সপেক্টর মংগুতকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা।
‘আছে স্যার।’ বলল ইন্সপেক্টর মংগুত।
‘গ্লাস ষ্টিকার হুক আছে?’
‘আছে স্যার।’
‘ওগুলো বের কর।’
‘ইন্সপেক্টর নির্দেশ দেবার আগেই তার একজন সাথী ব্যাগে সার্চ করা শুরু করে দিয়েছে। দু’টি জিনিস বের করে সে ইন্সপেক্টরের হাতে দিল।
আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে গ্লাস কাটার ও গ্লাস ষ্টিকার হুক নিয়ে নিল এবং ইন্সপেক্টরকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ড্রাইভিং সিটের জানালার গোটা কাঁচ যদি সরিয়ে নেয়া যায়, তাহলে বোম ডিফিউজের কাজ করতে পারবেন না?’
ইন্সপেক্টর মংগুত এতক্ষণে হাসল। বলল, ‘পারব স্যার খুব সহজেই। কিন্তু গ্লাস কাটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে স্যার।’
‘তা অবশ্যই। কিন্তু আমি সেটা দেখব।’
বলে আহমদ মুসা গাড়ির দিকে যাবার জন্যে পা বাড়াল।
‘আপনি কেন স্যার? কাজটা ওঁদের করতে দিন।’ বলল সিরিত থানারতা। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘না বিভেন বার্গম্যান তোমার দরকার নেই। ইন্সপেক্টররাই ওটা করবেন।’ পুরসাত প্রজাদীপক কতকটা নির্দেশের সুরে কথাগুলো বলে উঠল।
আহমদ মুসা মুখ ফিরাল পুরসতা প্রজাদীপকের দিকে। বলল, ‘স্যার ওরা কাজটাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। কিন্তু আমি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি না। সুতরাং কাজটা আমারই করা উচিত।’
বলে হাঁটা শুরু করল আহমদ মুসা।
সিরিত থানারতা উপরের দিকে চেয়ে ভীতকণ্ঠে বলল, ‘গড ব্লেস হিম।’
পুরসাত প্রজাদীপক বলল, ‘সাবধান বিভেন, গড ইজ উইথ ইউ।’
আহমদ মুসা গিয়ে গাড়ির দরজার সামনে দাঁড়াল। আহমদ মুসার পেছনে পেছনে বোম স্কোয়াডের লোকরাও গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ইন্সপেক্টরকে বলল, ‘আপার স্ক্যানার সেট করুন। আমি বোম ও ডেটোনেটরের অবস্থা দেখতে চাই।’
সংগে সংগেই দরজার সামনে স্ক্যানার তারা সেট করল।
আহমদ মুসা দেখল বোমাটা ড্রাইভিং সিট ও দরজার মাঝখানের ফ্লোরে আঠালো টেপ দিয়ে সেটে রাখা আছে। বোমের একটি গ্রন্থি থেকে বেরিয়ে আসা চারটি তার গাড়ির চারটি দরজার ডোর লকের দিকে ঢুকে গেছে।
আহমদ মুসা দরজার কন্ডিশন ভালো করে দেখল। গাড়িটা নতুন না হলেও দরজার সেটিং নিখুঁত দেখতে পেল। সুতরাং গাড়ির দরজা যেহেতু নড়বড়ে নয়, তাই জানালার গ্লাস কাটার চাপ দরজার কিছু অংশের উপর একটু বেশি পড়লেও ডোর লকের উপর বিন্দুমাত্রও পড়বে না।
নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা জানালার গ্লাসের ঠিক মধ্যখানে গ্লাস ষ্টিকার বসিয়ে দিল।
গ্লাস কাটার হাতে নিল আহমদ মুসা।
বোম স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত বলে উঠল, ‘স্যার খুব সাবধান! খুব সেনসেটিভ ডেটোনেটরও আছে। যা সামান্য কম্পন তাড়িত হয়েও বিস্ফোরণ ঘটায়।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক ও সিরিত থানারতাও আহমদ মুসার অনেকটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। পুরসাত প্রজাদীপক অনুরোধের স্বরে বলল, ‘গাড়ির দাম বেশি নয়, বোম সমেত কার ধ্বংস করা হোক। তুমি এসব করতে যেয়ো না।’
পুরসাত প্রজাদীপক থামতেই সিরিত থানারতাও বলল, ‘প্লিজ স্যার, বোম স্কোয়াড যাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছে, সে কাজ আপনি করবেন না।’
আহমদ মুসা পেছন ফিরে তাকাল। বলল, ‘স্যার আমার লক্ষ্য বোমটা আস্ত পাওয়া। তাতে জানা যাবে এটা কোথা থেকে সাপ্লাই হয়েছে।’
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান বিস্ময়ের সাথে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার মনে একটা আকস্মিক তোলপাড়ঃ যে ভাবনা পুলিশের ভাবার কথা ছিল, সেটা বিভেন বার্গম্যান ভাবছে!
কিছু বলতে যাচ্ছিল পুরসাত প্রজাদীপক। কিন্তু আহমদ মুসা তার আগেই হেসে উঠে বলল, ‘গাড়ির দরজার যে কন্ডিশন, তাতে কাঁচ কাটতে যে প্রেশার পড়বে সেটা ডোর-লক পর্যন্ত পৌছাবে না। শুধু ডোর লকের কাছাকাছি বাম প্রান্তটা কাটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। তবু আমি মনে করি কাটারকে যদি কৌশলে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ডোর লকে বিন্দুমাত্র চাপও পড়বে না।’
‘যদি কৌশলে ব্যবহার করা না যায়?’ শুকনো মুখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল সিরিত থানারতা।
‘সেভাবে ব্যবহার করা যাবে বলেই তো কাটতে যাচ্ছি।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ঘুরে গাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে স্থির হাতে কাটার ধরে কাটারের শীর্ষ কৌণিক পয়েন্টকে বাঁ প্রান্তের মাথায় গ্লাসের বুকে সেট করল। আহমদ মুসা ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তকেই প্রথমে কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্লাসের উপর কাটারের শীর্ষ কৌণিক এমনভাবে সেট করেছে যাতে সর্বনিমণ পরিমাণ স্থানের উপর কাটারের চাপ লম্বভাবে পড়ে। কাটার সেট করেই আহমদ মুসা তা এক টানে জানালার বটম পর্যন্ত নিয়ে এল।
না কিছুই ঘটল না।
আলহামদুলিল্লাহ বলে আহমদ মুসা এরপর টপ ও বটম প্রান্ত কেটে ফেলল। সবশেষে গ্লাস ষ্টিকারের হুক ধরে রেখে ডান প্রান্ত কেটে ফেলল। বাঁ হাত দিয়ে জানালার গ্লাসটি টেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াবার আগেই পেছন থেকে সিরিত থানারতা বলে উঠল, ‘থ্যাংক গড, ওয়েল কাম স্যার, কনগ্রাচুলেশন।’
‘ওয়েলকাম সিরিত।’ বলে আহমদ মুসা বোম স্কোয়াডকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ইন্সপেক্টর আপনারা কাজ শুরু করতে পারেন।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার।’ বলে ওরা কাজে লেগে গেল।
সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক তৎক্ষণাত কিছু বলেনি। চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে সে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দি। বোম স্কোয়াড কাজ শুরু করলে পুরসাত প্রজাদীপক আলতোভাবে আহমদ মুসার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘তুমি নিশ্চয় বোমটাও ডিফিউজ করতে পারতে?’
‘স্যার, এটুকু জানি বিভিন্ন ধরনের বোম কিভাবে ডিফিউজ করতে হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কি জান না বলতো? তোমার ব্যাপারে বিস্ময় বাড়ছেই বিভেন বার্গম্যান।’
‘জানার বিষয় যে দুনিয়াতে কত, তা আমরা কেউ জানি না। জানা গেলে সবচেয়ে জ্ঞানী যে ব্যক্তি সে হয়ত বলতো আমি যা জানি, তা কিছু না জানার কাছাকাছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কঠিন কথাও তুমি সুন্দর করে বলতে পার বিভেন বার্গম্যান।’ পুরসাত প্রজাদীপক বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল সিরিত থানারতা। কিন্তু তার আগেই গাড়ির ওখান থেকে ইন্সপেক্টর মংগুত বলে উঠল, ‘থ্যাংক গড, বোমকে ডিফিউজ করা গেছে।’
বলে সে ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘স্যার আপনার কাছ থেকে আমরা একটা পুরনো শিক্ষা নতুন করে পেলাম যে, সংকট সমাধানের একটা না একটা পথ অবশ্যই থাকে, তাকে খুঁজে বের করতে হয়। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার।’
‘বোম ডিফিউজ করার জন্যে তোমাদের ধন্যবাদ ইন্সপেক্টর।’
‘সেই সাথে ধন্যবাদ ঈশ্বরকে যে, তিনি বিভেন বার্গম্যানের জীবন বাঁচিয়েছেন।’
কথা শেষ করেই ইন্সপেক্টর মংগুতকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি পুলিশ ষ্টেশনে খবর দাও। তারা আসুক কেসটা রেকর্ড করুক। ড্রাইভারের ছদ্মবেশে একজন এসে গাড়িতে বোম পেতে যায়। আমাদের গেটের দারোয়ানের ষ্টেটমেন্ট নিতে হবে। গেটের টিভি ক্যামেরার রেকর্ড থেকে ড্রাইভার লোকটার ফটো নিতে হবে। সে মনে হয় আশে-পাশে কোথাও ওঁৎ পেতে আছে গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে তা নিজ চোখে দেখে যাওয়ার জন্যে। তদন্তের কাজ এখনই শুরু করতে হবে।’
একটু থামল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল, ‘ইন্সপেক্টর, আমরা ভেতরে আছি।’
ঘুরে দাঁড়াল পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘চলো বিভেন বার্গম্যান, চলো মা সিরিত।’
হাঁটতে লাগল পুরসাত প্রজাদীপক। তার পিছনে আহমদ মুসা ও সিরিত থানারতাও হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা চলা শুরু করেই সিরিত থানারতাকে বলল, ‘আমি কৃতজ্ঞ মিস সিরিত। তুমি আমার জীবন বাঁচাতে সতর্ক করেছ।’
সিরিত থানারতা বিস্মিত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘কিভাবে স্যার?’
‘গাড়ি থেকে নকল ড্রাইভারকে পালাতে তুমিই দেখেছ এবং তাকে তুমি সন্দেহ করেছ। এই সন্দেহ থেকেই এই বোম উদ্ধার হলো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আমার এখনও বিস্ময় লাগছে স্যার তাকে আমার সন্দেহ হলো কেন? কেনই বা মনে হলো যে, ছুটে গিয়ে কথাটা আমার বলা দরকার। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ একজন এসব করিয়েছে। স্যার এটা ঈশ্বরেরই কাজ।’ সিরিত থানারতা বলল।
‘ঠিক বলেছ সিরিত। এমনটা ঘটে। তবে ভাগ্যিস তুমি ওখানে ছিলে। কিন্তু বুঝতে পারছি না, তুমি তো ভেতরে চলে গিয়েছিলে, ওখানে গেলে কখন?’ বলল আহমদ মুসা।
সিরিত থানারতা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। নিজের আঙুলে চাপ দিয়ে সামনে তার পিতার দিকে ইংগিত করে একটু দাঁড়াতে বলল।
আহমদ মুসা দাঁড়াল।
সিরিত থানারতা তার কণ্ঠ নামিয়ে বলল, ‘স্যার আমি আড়ি পেতে আপনাদের কথা শুনছিলাম। জাবের জহীর উদ্দিনের ব্যাপারে সরকার কি ভাবছে তা জানার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। তবে দুঃখ পেয়েছি, সরকারের সিদ্ধান্তের শুনে। কিন্তু অন্য একটা লাভ হয়েছে। আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি মুসলমান। আমি খুশি হয়েছি।’
‘কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘কারণ, জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিনও মুসলমান। আমি এখন নিশ্চিত যে, সরকারের কথা যাই হোক জাবের জহীর উদ্দিনরা আপনার মত মিরাকল লোকের সাহায্য পাবে।’ সিরিত থানারতার শেষের কথাগুলো ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই সাথে তার চোখ দু’টিও সজল হয়ে উঠেছিল।
‘ভেব না সিরিত, সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।’ সান্তনার কণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘স্যার, আজ আপনার কথা শোনার পর ভাবনা অনেক কমেছে। কিছুক্ষণ আগে আপনার ও আববার আলোচনায় আরও আশান্বিত হয়েছি। তবু স্যার, কষ্ট মন থেকে যাচ্ছে না। স্যরি।’ কাঁপা কণ্ঠ সিরিত থানারতার।
‘ধৈর্য্য ধরতেই হবে সিরিত। আজ আল্লাহ যেমন তোমার মধ্যে কথা বলে উঠেছেন, যেভাবে তিনি আজ আমাদের সাহায্য করেছেন, সেভাবেই তিনি আমাদের সাহায্য করবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
সিরিত থানারতা রুমাল দিয়ে চোখ ভাল করে মুছে নিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। চলুন আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’
ড্রইং রুমে ঢোকার মুখেই ভুজ বাহাদুরকে পাওয়া গেল। তাকে বলল পুরসাত প্রজাদীপক, ‘টেবিলে খাবার লাগিয়েছ?’
‘স্যার খাবার লাগিয়েও সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, আবার লাগানো হচ্ছে। মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে। স্যার।’
‘আচ্ছা। তুমি ওদিকে দেখ।’ ভুজ বাহাদুরকে এ কথাগুলো বলে সোফায় বসে পড়ল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল সে আহমদ মুসাকে, ‘এসো আমরা একটু বসি।’
‘স্যার, এই ফাঁকে আমি নামাযটা পড়ে নিতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ও, তোমাদের মধ্যাহ্নের একটা নামায তো আছে। তা নামাযের জায়গাটা কোথায় হলে চলবে?’ পুরসাত প্রজাদীপক বলল।
‘যে কোন জায়গায়। একটু খালি মেঝে হলেই ভাল হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মা সিরিত, ওকে ওপাশের রুমটায় নিয়ে যাও। রুমটা খালি আছে, মেঝেও পরিষ্কার।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
সিরিত থানারতাও উঠেছে। বলল, ‘স্যার আপনাদের নামায দিনে পাঁচবার হয়, ঠিক না?’
আহমদ মুসা সিরিত থানারতার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘স্যার আপনাদের ধর্মে নিয়মিত অনেক ধর্মীয় আচার পালন করতে হয়, কিন্তু তা সহজ। কিন্তু আমাদের ধর্মে কোন ধর্মীয় কাজ নেই, দায়িত্বের ভার নেই, কর্তব্যের তাড়া নেই।’ সিরিত থানারতা বলল।
‘সেটাই তো ভাল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাল কোথায় স্যার। মাঝে মাঝেই মনে হয়, ধর্মের কাজ যখন নেই, তখন ধর্মটা কেন! বিশ্বাসকে যৌক্তিক ও জীবন্ত রাখার জন্যে যদি কোন কাজ বা দায়িত্ব-কর্তব্য না থাকে, তাহলে বিশ্বাসও এক সময় হারিয়ে যায়। তাই হচ্ছে স্যার। আমরা আর নিজেকে বৌদ্ধ বলে গৌরব বোধ করি না।’
‘নো-কমেন্ট।’
‘কমেন্ট আপনি করবেন কেন, আমিই তো করলাম।’
বলে একটা দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার খালি রুম এটাই।’
‘আমার তো খালি রুম দরকার নেই, দরকার কয়েক ফুট মেঝের। ধন্যবাদ সিরিত।’
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে গেল।
সিরিত ফিরে এল ড্রইং রুমে। বসল পিতার পাশে। বলল, ‘আববা, তোমার বোম স্কোয়াড কিন্তু গাড়ি সমেত বিস্ফোরণ ঘটানো ছাড়া বোম ডিফিউজের উপায় বের করতে পারেনি। মি. বিভেন সেটা পেরেছে।’
‘সেটাই ভাবছি সিরিত। যতই বিভেনকে দেখছি, বিস্ময় বাড়ছে। জানালার কাঁচ সরিযে বোম ডিফিউজ করার বুদ্ধিই শুধু সে বের করেনি, যে জানালার গ্লাস কাটার ঝুঁকি নিতে সাহস করেনি আমাদের বোম স্কোয়াড, সেই কাজ সে অদ্ভুত দক্ষতার সাথে করেছে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘কিন্তু আববা আমার কাছে এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের হলো, একজন আমেরিকান মুসলমান পাত্তানীর একটি চিঠি পেয়ে তাদের সাহায্য করতে ছুটে এল একা!’ সিরিত থানারতা বলল।
‘বিস্ময়ের তো বটেই, কিন্তু মা, সে যে এ ধরনের দায়িত্ব নেয়ার উপযুক্ত তা সে ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে।’
এ সময় গেটের সিকিউরিটি গার্ডম্যান ড্রইংরুমের দরজায় এসে ভেতরে আসার অনুমতি চাইল।
সে অনুমতি নিয়ে ভেতরে এসে একটি চিঠি পুরসাত প্রজাদীপকের হাতে দিয়ে বলল, ‘স্যার এটা মেহমান বিভেন বার্গম্যানের জন্যে চিঠি।’
পুরসাত প্রজাদীপক চিঠিটি হাতে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে ওঁকে দিয়ে দেব।’
সিকিউরিটি চলে গেল।
চিঠিটি একটি চিরকুট।
চিরকুটটি হাতে পেয়েই ভ্রু’কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের। অপরাধের বিভিন্ন ধারার সাথে পরিচিত পুরসাত প্রজাদীপক ভালো করেই জানে, এমন অবস্থায় এ ধরনের চিরকুট কোন ভাল খবর নিয়ে আসে অথবা বহন করে খারাপ কোন সংবাদ।
চিরকুটটির ভাঁজ খুলে চোখের সামনে তুলে ধরল।
এই সময় নামায শেষে ড্রইং রুমে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
পুরসাত প্রজাদীপক তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘এসো বিভেন বার্গম্যান। তোমার কাছে একটা চিরকুট এসেছে। তুমিই পড়।’
‘আহমদ মুসা পুরসাত প্রজাদীপকের পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘আমার নামে চিরকুট?’ আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়।
পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসার হাতে চিরকুট তুলে দিয়ে বলল, ‘গেট থেকে আমাদের সিকুরিটির লোক দিয়ে গেছে। তাকে এইমাত্র কে একজন লোক এটি দিয়ে গেছে।’
আহমদ মুসা চিরকুটটি হাতে নিয়ে দ্রুত তার ওপর চোখ বুলাল। আহমদ মুসার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘স্যার যারা বোম পেতেছিল আমাকে মারার জন্যে, তারাই এই চিরকুটটি পাঠিয়েছে।’ পড়ছি শুনুনঃ
‘‘বিভেন বার্গম্যান, বোমের হাত থেকে বেঁচে গেছ, আনন্দ করে নাও। জেনে রাখ, আমাদের ‘ব্ল্যাক ঈগল’’ যার উপর নজর ফেলে, সে আর বাঁচে না। তোমাকে বোমায় মারার সিদ্ধান্ত আমরা পাল্টেছি। তুমি আমাদের ১১ জনকে হত্যা করেছ। তোমার দেহকে আমরা এগার টুকরো করব। তবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কাল সকালের আগে যদি থাইল্যান্ড ত্যাগ করো, তাহলে তোমার মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিত হয়ে যাবে।’
চিঠি পড়া শেষ করে আহমদ মুসা বলল, ‘চিঠিতে কারও দস্তখত নেই। দস্তখতের স্থানে একটা ‘ব্ল্যাক ঈগল’ আঁকা। ঈগলটি সোজা উর্ধমুখী হয়ে ক্রিসেন্টের পেটে বসে আছে। ক্রিসেন্টের দু’টি বাহু ঈগলটির দু’পাশ দিয়ে উঠে দু’বাহুর দু’প্রান্ত যেখানে কাছাকাছি পৌছেছে, সেখানে একটি তারকা। তারকার ছয়টি বাহু। আর……।’
‘থাক বিভেন বার্গম্যান। চিঠির মনোগ্রাম নয়, চিঠির বক্তব্যের দিকে এসো।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানে বলে উঠল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘সাংঘাতিক-সর্বনাশা চিঠি এটা। কিছু করতে হবে।’ বলল সিরিত থানারতা। তার মুখ ভয়ে-উদ্বেগে ফ্যকাশে হয়ে গেছে।
‘ঠিক তাই মা। মারাত্মক চিঠি। সাংঘাতিক দুঃসাহস ওদের। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতেও ওরা এভাবে চিঠি পাঠাতে পারে! কিন্তু বিভেন বার্গম্যান তুমি এ নিয়ে ভাবছ বলে তো মনে হচ্ছে না?’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘স্যার আমার তো চিন্তার কিছু নেই। ওরা কিভাবে কোথায় আমাকে আক্রমণ করবে, এটা ওদের চিন্তার বিষয়। ওদের পরিকল্পনা আমার জানা থাকলে তা নিয়ে চিন্তা করতাম। কিন্তু সেটা তো জানি না।’ আহমদ মুসার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘কিন্তু সাবধান তো হতে হবে। এজন্যে চিন্তা করা দরকার।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘স্যার ওরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় এসে গাড়িতে বোম পেতেছে, চিরকুট পাঠিয়ে থ্রেট করে গেছে। সাবধান হওয়ার আর জায়গা কোথায় থাকল স্যার?’ আহমদ মুসা বলল।
যদি তাই তোমার বিশ্বাস হয়, তাহলে কাল সকালের আগেই থাইল্যান্ড থেকে চলে যাও বিভেন বার্গম্যান। তুমি খুব ভাল ছেলে, আমাদের অশেষ উপকার করেছ। তোমার কোন ক্ষতি আমরা সহ্য করতে পারবো না। ওদের শত্রুতা আমাদের সাথে। আমরা ওদের দেখে নেব।’
পুরসাত প্রজাদীপক থামতেই সিরিত থানারতা বলে উঠল, ‘উনি যাবেন কেন আর যেতে বলছই বা কেন? তাঁকে নিরাপত্তা দেয়া তো তোমাদের কাজ।’
‘আমি পালাব না মিস সিরিত। আমাকে এগার টুকরো করতে হলে তো তাদের আমার কাছে আসতে হবে, গায়ে হাত দিতে হবে। আমারও ওদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন, জানা প্রয়োজন। না হলে জাবের জহীর উদ্দিনকে আমি উদ্ধার করব কি করে?’ বলল আহমদ মুসা নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
সিরিত থানারতার বিস্ময়-বিস্ফোরিত চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। তার ভাবনা, বিভেন বার্গম্যানের মনটা কি পাথরের তৈরি? সেখানে কোন ভয় প্রবেশ করে না? এই সাংঘাতিক অবস্থায় এভাবে এমন কথা সে বলতে পারে কি করে!
পুরসাত প্রজাদীপকও তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। বলল, ‘ধন্যবাদ, বিভেন বার্গম্যান, তুমি ঠিক তোমার মতই কথা বলেছ। তুমি নিশ্চিত থাক, আমার সবরকম সহযোগিতা তোমার সাথে আছে। কিন্তু বিভেন বার্গম্যান, অবশেষে চিঠির ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এবং জাবের জহীর উদ্দিন যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এটা হওয়া অসম্ভব স্যার। ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এর আজকের চিঠিও প্রমাণ করছে, ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এবং জাবের জহীর উদ্দিনরা আলাদা।’
‘কিভাবে?’ উৎসুক কণ্ঠে বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘চিঠির মনোগ্রামে ব্ল্যাক ঈগলের চারপাশে ক্রিসেন্টের বেষ্টন থাকলেও মনোগ্রামের শীর্ষে ক্রিসেন্টের দু’বাহুর মুখোমুখি হওয়ার জায়গায় দেখুন ছয় কোণের একটি তারকা। ছয় কোণের এই তারকা ইহুদীদের প্রতীক। এই তারকা মনোগ্রামটির শীর্ষে রয়েছে এবং এই তারকাই মনোগ্রামের মৌল পরিচয়। ‘ব্ল্যাক ঈগল’ মুসলিম সংগঠন হলে মনোগ্রামে এই চিহ্ন অবশ্যই ব্যবহৃত হতো না।’ আহমদ মুসা বলল।
ঠিকই বলেছ বিভেন বার্গম্যান। ইহুদীদের তারকার ছয়টি কোণ মুসলমানদেরর তারকায় পাঁচটি কোণ। মুসলিম সংগঠনের মনোগ্রামে ছয় কোণের তারকা ব্যবহৃত হতে পারে না। কিন্তু বিভেন বার্গম্যান এতে তো দুঃশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। সিআইএ এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের সাহায্য এখনও তারা পায়। সে কারণে এখনও তারা অদম্য। তারা করতে পারে না এমন কিছু নেই। আজকের ঘটনা এবং এই চিঠিও তার একটা প্রমাণ। সুতরাং আমি মনে করছি বিভেন বার্গম্যান। এটাই ভাল যে, তুমি কাল সকালের মধ্যে চলে যাও। যুদ্ধে কৌশলগত পশ্চাৎ অপসরণ দোষের নয়।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক গম্ভীর কণ্ঠে।
‘ধন্যবাদ স্যার, আপনি আমার নিরাপত্তার কথা আন্তরিকভাবে ভাবছেন। কিন্তু স্যার আগেই বলেছি, আমি আমার মিশন শেষ না করে চলে যাবো না। আমি আপনাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবো না স্যার। আমি আমার মত করে চলতে বাধা পাব না, এটুকু নিশ্চয়তা শুধু আপনার কাছ থেকে চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তুমি আমাকে ভুল বুঝো না বিভেন বার্গম্যান। তোমাকে সাহায্য করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে। আমি ওদের আলটিমেটাম এড়াবার জন্যেই তোমাকে ঐ পরামর্শ দিচ্ছিলাম। এরপরও তুমি এগোতে চাইলে আমাদের সাহায্য তুমি পাবে। দেশের সব পুলিশ অফিস, পুলিশ ষ্টেশনে অবস্থানের সুযোগ তুমি পাবে, তুমি চাইলে পুলিশ শক্তিকেও তোমার পাশে পাবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘আপনাদের সাহায্য আমার দরকার হবে, কিন্তু পুলিশের আশ্রয় কিংবা পুলিশের যানবাহন আমি ব্যবহার করবো না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন?’ জিজ্ঞাসা সিরিত থানারতার।
‘পুলিশ ও পুলিশের অবস্থান সকলের চোখের সামনে থাকে। সুতরাং আমাকে খুঁজে পাওয়া ও আমার উপর চোখ রাখা সহজ হবে। এতে করে তারা তাদেরকে আমার চোখের আড়ালে রাখতে পারবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার এ কথা ঠিক বিভেন বার্গম্যান। কিন্তু তুমি হোটেল-রেষ্টহাউজে থাকতে গেলেও তো তাদের নজরে পড়ে যাবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘তবু এটা নিরাপদ, এ ঠিকানা তাদের অনেক খুঁজে বের করতে হবে, কিন্তু পুলিশ ষ্টেশন তাদের খুঁজতে হবে না।’
পুরসাত প্রজাদীপকের মুখে একটা সহজ হাসি ফুটে উঠল। চোখে তার প্রশংসার দৃষ্টি। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল। তার কথায় বাধা দিয়ে সিরিত থানারতা বলল, ‘আর কোন কথা নয় এখন। খেতে খেতেও বাকি কথা বলতে পারবেন। উঠুন খেতে চলুন।’
‘ঠিক বলে মা’ বলে পুরসাত প্রজাদীপক উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসাও।

গাড়ি করে হোটেলে ফিরছিল আহমদ মুসা। জানালার কাঁচ কাটা সেই গাড়িটা নিয়ে।
আহমদ মুসা তখন গাড়িটা নিয়ে ভাবছিল। গাড়িটা হোটেলের একটি পর্যটন সংস্থার। বিরাট ক্ষতি হয়েছে গাড়ির। বেশ অর্থ দন্ড দিতে হবে তাকে। অবশ্য পুরসাত প্রজাদীপক ইতিমধ্যেই টেলিফোনে সংস্থাটিকে জানিয়ে দিয়েছে দুর্ঘটনার কথা। পুলিশ বিভাগই যে গাড়ির ক্ষতিপূরণ দেবে জানিয়ে দিয়েছে সেটাও। কিন্তু আহমদ মুসা পুলিশের এ অফার গ্রহণ করতে রাজি হয়নি।
হাউজিং পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি। এ রাস্তার ওধারেই আহমদ মুসার হোটেল। কিন্তু অনেকটা পথ ঘুরে সেখানে পৌছতে হবে।
রাস্তায় তখন গাড়ির প্রচন্ড ভিড়। দাঁড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি। রাস্তায় গাড়ির স্রোতে প্রবেশ করতে হলে উপযুক্ত স্পেসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আহমদ মুসার দৃষ্টি ছিল সামনে। একটা ভাঁজ করা কাগজ এসে পড়ল আহমদ মুসার কোলের উপর। টের পেল আহমদ মুসা। ভাঁজ করা কাগজটির দিকে একবার তাকিয়েই আহমদ মুসা খোলা জানালা দিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। এই মাত্র হ্যাট মাথায় পরা একজন লোক তার গাড়ি অতিক্রম করে গেছে। নিশ্চয় সেই কাগজটা ফেলে গেছে।
পেছন দিকে তাকিয়ে সেই হ্যাটওয়ালাকে দেখতে পেল আহমদ মুসা। হ্যাঁ, দেখেই বুঝল একজন মেয়ে সে। কালো ফুল প্যান্ট, লাল হাফ হাতার শর্ট সার্ট, মাথায় বাদামী কালারের হ্যাট। মেয়েটি খুব নিশ্চিন্তে হাঁটছে। বুঝল মেয়েটি শত্রু নয়।
বিস্মিত আহমদ মুসা তার চোখ ফিরিয়ে নিল। কোল থেকে কাগজটি তুলে নিল। ভাঁজ খুলে কাগজটি মেলে ধরল চোখের সামনে।
কাগজটি একটা চিঠি। পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখা। পড়ল আহমদ মুসাঃ
‘আপনার একাধিক প্যান্ট ও সার্টের সাথে সুচাগ্র সাইজের ট্রান্সমিটার লাগানো আছে। আপনার লাগেজ ব্যাগেও তা লাগানো থাকতে পারে। আপনি যেখানেই থাকেন, যেখানেই যান, শত্রুরা ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল অনুসরণ করে আপনাকে লোকেট করতে পারবে। প্রতি পদে তাদের পক্ষে আপনাকে অনুসরণ করা সম্ভব।’
আপনার একজন শুভাকাঙক্ষী
স্বাভাবিক বিস্ময়ের এক অক্টোপাস এসে আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল। শত্রুপক্ষের নজরে সে আছে, কিন্তু এতটাই ঘেরাও সে তাদের দ্বারা! কি করে এটা সম্ভব হয়েছে!
আহমদ মুসা হোটেলের রেন্ট-এ-কার কর্নারে নেমে গাড়িটা সংশিস্নষ্ট কোম্পানিকে জমা দিয়ে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে প্রবেশ করল পাশের একটি পেশাকের দোকানে। দোকানটি শুধু পোশাকের নয়, হোটেলের একজন অতিথি তার নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারের যা চাইতে পারে তার প্রায় সবই আছে। আহমদ মুসা দুই সেট পোশাকসহ আন্ডারওয়্যার থেকে শুরু করে গেঞ্জি, মোজা, জুতা সবই কিনল। দোকান থেকে বেরিয়ে উঠে এল হোটেলের লবীতে। গিয়ে দাঁড়াল রিসেপশনের পাশে বুকিং কাউন্টারে। বলল কাউন্টারের লোকটিকে, ‘আমার হিসাবটা দিন। এখনই পাওনা মিটিয়ে দেব। আমি চারটার মধ্যেই চলে যাব।’
‘ওকে স্যার’ বলে লোকটি কম্পিউটারের হিসাব কষে হিসাবের কাগজ আহমদ মুসার হাতে দিল।
আহমদ মুসা টাকা পরিশোধ করে লিফটের দিকে চলল। পেছন থেকে একজন বেয়ারা পাশে এসে বলল, ‘স্যার আপনি যাচ্ছেন, আমি আসব?’
আহমদ মুসা তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘এসো।’
দশতলার নিজের কক্ষে চলে এল আহমদ মুসা।
কয়েক মিনিটের মধ্যে বয়ও এসে পৌছল ঘরে। ঢুকেই বলল, ‘স্যার আপনার তো লাগেজ রেডি হয়নি। এইমাত্র বাইরে থেকে আসলেন। আমি কি সাহায্য করব?’
তাকাল আহমদ মুসা বেল বয়ের দিকে। বলল, ‘ঠিক আছে। একটু কষ্ট কর।’
পরে থাকা গায়ের সবকটা পোশাক খুলে নতুন কেনা সেটের একটি পরে নিয়েছিল আহমদ মুসা।
নতুন ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল আহমদ মুসা। পুরনো কিছুই এ ব্যাগে তুলল না। চিরুনী, টুথ ব্রাশের মত জিনিসও নয়। এসব কিছুই আহমদ মুসা নতুন কিনে নিয়ে এসেছে।
বেল বয়টি পুরনো ব্যাগে কাপড়-চোপড়সহ সবকিছু গুছিয়ে তুলেছিল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এত তাড়াতাড়ি টিকিট পেয়ে গেলেন স্যার, কোন এয়ার লাইন্সের টিকিট?’
বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মত উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল বেল বয়ের দিকে। প্রথমেই যে বিষয়টি তার কাছে বড় হয়ে উঠল সেটা হলো ছেলেটি তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে। সে আজ যাচ্ছে, এটা সে জানে এবং তাড়াহুড়া করে তার চলে যাওয়া প্রয়োজন, এ বিষয়টাও তার জানা। এর এই অর্থ যে, ব্ল্যাক ঈগলের সাথে এর কোন রকম সম্পর্ক আছেই। তার পোশাক পরিচ্ছদ ও লাগেজে এমন ব্যাপক ‘ট্রান্সমিটার’ স্থাপন করা হোটেলের একাধিক লোকের সাথে ‘ব্লাক ঈগলের’-এর যোগসাজস ছাড়া সম্ভব হয়নি। এই বেল বয় কি তাদের মধ্যে একজন?
আহমদ মুসার হাত প্যান্টের পকেটে চলে গেছে। বেরিয়ে এল রিভলবার নিয়ে। রিভলবার সোজা বেল বয়টির দিকে তাক করল। এগিয়ে গেল তার দিকে।
বেল বয়টি ভূত দেখার মত উঠে দাঁড়িয়েছে। তার দু’চোখ ভয়ে বিস্ফোরিত।
‘তোমার নাম কি?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। কঠোর কণ্ঠ তার।
‘এ্যারন।’ শুকনো কণ্ঠে আটকা গলায় বলল বেল বয়।
নাম শুনে আহমদ মুসার চোখে আনন্দের এক নতুন ঝিলিক দেখা গেল।
‘এই হোটেলে ‘ব্ল্যাক ঈগলে’র কয়জন আছ তোমরা?’
আহমদ মুসা এ্যারনের কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে বলল, ‘বলবে, না মরবে?’
মুখ তুলল বেল বয় এ্যারন। বলল সে, ‘বলছি স্যার। আমরা দু’জন আছি। একজন লন্ড্রীতে, আমি বেল বয়।’ মরার মত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার মুখ।
‘আমার পোশাক-লাগেজে ‘ট্রান্সমিটার’ বসিয়েছে কে?’
‘আমরা দু’জনেই। লন্ড্রীতে এবং রুমে।’
‘কেন?’
‘আমরা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।’
‘কে বাধ্য করেছিল?’
‘ব্ল্যাক ঈগল’-এর মি. আইজ্যাক।’
‘কে এই আইজ্যাক?’
‘চিনতাম না। ব্যাংকক সেন্ট্রাল সিনাগগে তার সাথে আমাদের পরিচয় হয়।’
‘তিনি কি থাইল্যান্ডের মানুষ?’
‘না। তিনি ইংরেজি ও হিব্রু ভাষায় কথা বলেন।’
‘বললে তোমাদের বাধ্য করা হয়েছিল। কেন বাধ্য হয়েছিলে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলেছিল যে তাদের পরিচয় আমরা জেনে গেছি। এখন হয় তাদের সাথে থাকতে হবে, নয়তো মরতে হবে আমাদের রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।’ বলল বেল বয় এ্যারন।
‘তিনি বা তারা কোথায় থাকেন? কিভাবে তোমাদের যোগাযোগ হতো তাদের সাথে?’
‘তারাই যোগাযোগ করতেন। কোথায় থাকেন জানি না। সিনাগগে কোন কোন শনিবারে তাদের দেখা যায়।’
‘তারা কেমন লোক বলে তোমাদের মনে হয়?’
‘ভালো মনে হয়নি স্যার।’
‘কিন্তু তারা তোমার জাতি ভাই।’
‘এখানে জাতির প্রশ্ন নয় স্যার। প্রশ্ন ন্যায়-অন্যায়ের। তাদের কথা না শুনলে তারা আমাদের হত্যা করতে চেয়েছিল?’
‘ঠিক আছে, লাগেজ বাধা শেষ কর। আমার তাড়া আছে।’ রিভলবার পকেটে রেখে বলল আহমদ মুসা।
বেল বয় এ্যারনের চোখে-মুখে আশার আলো ফুটে উঠল। বলল, ‘স্যার আমাকে মাফ করে দিয়েছেন?’
‘কি করব, তোমার দোষ খুঁজে পেলাম না।’
‘কিন্তু স্যার, তারা আমার সামনে একজনকে গুলী করে মেরেছিল। তার অপরাধ ছিল সে ঐ দিন আপনার গাড়িতে বোমা ফিট করতে পারেনি আপনি আগাম এসে পড়ায়।’
‘তুমি এ খবরও জান?’
‘হোটেলের পাশের পার্কে এ ঘটনা ঘটেছে। ডিউটি টাইমের বাইরে সময় পেলে আমরা ওখানে গিয়ে আড্ডা দিয়ে থাকি। ইদানিং কখনো কখনো তিনিও ওখানে যেতেন।’
‘ঠিক আছে, শেষ কর কাজ।’ বলে আহমদ মুসা নতুন ব্যাগটা গোছানো শেষ করে তালা লাগিয়ে ব্যাগটি পাশে নিয়ে সোফায় বসল।
বেল বয় এ্যারন তার ব্যাগ গোছানোর কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার একটা কথা বলব?’
‘বল।’
‘স্যার আপনি তাদের মত নন। তারা আপনার জানের দুশমন কেন?’
‘তারা আমার সামনে থেকে একজনকে কিডন্যাপ করেছে। আমি তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে ঘটনাক্রমে তাদের কয়েকজন লোক আমার হাতে মারা গেছে। এরপরও লোকটিকে মুক্ত করা যায়নি।’
‘স্যার ওদের গল্পে আমি একজনকে ধরে রাখার কথা শুনেছি।’
‘কিভাবে কি বলেছিল তারা?’
‘মোবাইলে কারও সাথে কথা বলার সময় বলেছিল, বন্দীকে আমরা ব্ল্যাক ফরেষ্টের ঘাটি থেকে পাত্তানী জংগলের কাতান টেপাংগোর ঘাটিতে নিয়ে গেছি। কাজের অনেক সুবিধা হবে।’
ব্ল্যাক ফরেষ্টের নাম শুনে মনে মনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। ব্যাংককের পশ্চিমে সীমান্ত ঘেষে শতাধিক মাইলের বিশাল এই ফরেষ্ট। ব্ল্যাঙ্ক টংকু পর্বতমালার অংশ এটা। যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জাবের জহীর উদ্দিনকে ঐ ফরেষ্টের কোন ঘাঁটিতে রাখা হয়েছিল। এই ঘাঁটির সন্ধানেই বের হতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। ভীষণ খুশি হলো আহমদ মুসা এ্যারনের কাছে এই তথ্য পেয়ে। আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ এ্যারন, তুমি একটা ভালো তথ্য দিয়েছো। চলো আমরা বের হই। নতুন এ ব্যাগটা আমি হাতে রাখছি। ওটা তুমি নাও।’
আহমদ মুসা হোটেলের গাড়ি বারান্দায় এসে দেখল, প্রথম দিনের ক্যাব ড্রাইভার ভূমিবল দাঁড়িয়ে আছে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘কেমন আছ ভূমিবল? সেই যে তোমার বাড়ি থেকে এসেছি, আর দেখা নেই। এ গাড়িটাই বুঝি নতুন কিনলে।’
আহত আহমদ মুসা পুলিশ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হবার পর প্রথম কাজ হিসেবে গিয়েছিল ভূমিবলের বাড়িতে। ধ্বংস হওয়া গাড়ির যে ব্যাংক ঋণ বাকি ছিল, সেটা পরিশোধ করে আরেকটা নতুন গাড়ি কেনার টাকা সে গিফট করেছিল। ভূমিবলের মা ও বোন সাকোনার সাথেও তার পরিচয় হয়েছিল।
‘জি স্যার’ বলে ভূমিবল কৃতজ্ঞতা সূচক কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমার তাড়া আছে। তুমি কি এয়ারপোর্টে যাবে?’
‘অবশ্যই স্যার।’
আহমদ মুসা পাশে দাঁড়ানো ‘এ্যারন’কে বলল, ‘তোমার হাতের ব্যাগটা ভূমিবলের পাশের সিটে দিয়ে দাও।’ বলে আহমদ মুসা এ্যারনের হাতে একশ ডলারের নোট গুজে দিয়ে হাতের ব্যাগটা নিয়ে ভূমিবলের পেছনের সিটে উঠল।
ষ্টার্ট নিল গাড়ি।
হোটেল থেকে বেরিয়ে চলতে শুরু করেছে গাড়ি। ভূমিবল বলল, ‘স্যার ম্যাডাম সিরিত ও সাকোনা অপেক্ষা করছে। ওদিক দিয়ে যাব কি?’
‘কোথায় ওরা? কি করে জানল আমি এয়ারপোর্টে যাচ্ছি?’
‘সাকোনা ম্যাডাম সিরিতের কাছ থেকে শুনে আমাকে টেলিফোন করেছে।’
‘বুঝেছি, গোয়েন্দারা পুরসাত প্রজাদীপককে জানিয়েছে। ঠিক ওদের বলে দাও ওরা সিরিতের বাড়িতে অপেক্ষা করুক। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ওখানে ফিরব।’
‘তার মানে আপনি বিমানে কোথাও যাচ্ছেন না। তাহলে এয়ারপোর্টে কেন?’
‘কিছু লোককে বুঝাবার জন্যে যে, আমি বিমানে দেশ ছেড়েছি। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসব। আমাকে ডিপারচার পার্কিংএ নামিয়ে তুমি এ্যারাইভাল পার্কিং-এ চলে যাবে। আমি ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে এ্যারাইভাল লাউঞ্জে যাবো। এ্যারাইভাল লাউঞ্জে যাবার সময় তুমি তোমার পাশের ব্যাগটা আবর্জনার কন্টেইনারে ফেলে দিয়ে যাবে।’
ব্যগাটার দিকে একবার তাকিয়ে সে তার দুচোখ কপালে তুলে বলল, ‘বুঝলাম না স্যার।’
‘ওটা তুমি পরে জানবে। এখন তুমি বল, পাত্তানী অঞ্চলে তুমি কখনও গেছ কিনা।’
‘জি গিয়েছি স্যার। এ বছরও একবার গিয়েছি।’
‘এখন কি ব্যাংককের বাইরে যাবার জন্যে প্রস্তুত আছ তুমি? যাবে কি আমার সাথে পাত্তানী অঞ্চলে?’
‘পাত্তানী কেন আপনার সাথে কোথাও যেতে আমার আপত্তি নেই স্যার।’
‘ধন্যবাদ ভূমিবল। এবার স্পীড বাড়াও। তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে পাত্তানী যাত্রা করব।’
গাড়ির স্পিড বেড়ে গেল।
এয়ারপোর্ট রোড ধরে ছুটে চলল গাড়ি।
‘মাফ করবেন স্যার, ব্যাগটার ব্যাপারে কৌতুহল আমার যাচ্ছে না।’ বলল ভূমিবল দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘গায়ের নতুন পোশাক ও নতুন ব্যাগের জিনিসপত্র ছাড়া যে সব কাপড়-চোপড় আমি পড়েছি, সব আছে ঐ ব্যাগে। ওগুলো অপয়া হয়ে গেছে ভূমিবল।’
‘বুঝলাম না স্যার। পোশাকের কি দোষ হলো?’
‘শুধু পোশাক নয়, ঐসব কাপড়-চোপড়সহ ব্যাগ এবং হয়ত ব্যবহার্য সব কিছুতেই শত্রু পক্ষ সিগনালিং ট্রান্সমিটার সেট করেছে। এসব নিয়ে আমি যেখানেই যাব ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল অনুসরণ করে ওরা আমাকে খুঁজে বের করতে পারবে। সেই জন্যে পুরনো সবকিছুই ফেলে দেয়া দরকার।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ভূমিবল দ্রুতকণ্ঠে বলল, ‘এই কথা আমি সাকোনার কাছেও শুনেছি স্যার।’ এই মাত্র সে আমাকে বলল, ‘স্যার বিরাট ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েছেন। তাঁর কাপড়-চোপড়, জিনিসপত্রে শয়তানরা অটোমেটিক সিগন্যাল-চিপস সেট করেছে। যখন ইচ্ছা তার কাছে পৌছতে তাদের কোন অসুবিধা নেই। এই বিষয়টা নাকি সে আজ আপনাকে জানিয়েছে।’
‘কি বললে, সাকোনা আমাকে জানিয়েছে? আজ!’ বিস্ময় আহমদ মুসার চোখে-মুখে।
‘জি, স্যার।’
আহমদ মুসা মুহূর্তকাল চিন্তা করল। বলল, ‘আচ্ছা আমার গাড়ির জানালা দিয়ে একটা চিরকুট ফেলে দিয়ে উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল একজন মেয়ে। পেছনে তাকিয়ে দেখেছিলাম, কালোপ্যান্ট, হাফ হাতা লাল সার্ট এবং বাদামী কালারের হ্যাট। তাহলে সে সাকোনা ছিল।’
‘ঠিক স্যার। সে এখনও ঐ পোশাকেই আছে।’
‘ভূমিবল, সে আমার অসীম উপকার করেছে। কিন্তু সে জানল কি করে? আর ঐ সময় সে যাচ্ছিল কোত্থেকে?’
‘সে এই হোটেলে চাকরি করে স্যার। ভোরে ডিউটিতে এসেছিল।’ বলল ভূমিবল।
‘বুঝেছি। দাও ওর মোবাইল নাম্বারটা। ওকে একটা ধন্যবাদ দেই।’
ভূমিবল তার মোবাইলে ‘সাকোনা’কে কল করে মোবাইলটা আহমদ মুসাকে দিয়ে বলল, ‘স্যার কথা বলুন।’
আহমদ মুসা মোবাইলটি হাতে তুলে নিল।
কথা বলল সাকোনার সাথে।

অদ্ভুত একটা জায়গা।
দু’পাহাড়ের মাঝখানে উঁচু পাথুরে-উপত্যকা।
উপত্যকাটা খুব বড় নয়।
পঞ্চাশ বর্গগজের বেশি হবে না।
এর উত্তর ও দক্ষিণে পাহাড়ের দেয়াল। পশ্চিমে ছোট্ট একটা গভীর হ্রদ। আর পূর্বে বিরাট জলাভূমি। এ জলাভূমি দক্ষিণে এগিয়ে গেছে পাত্তানী নদী পর্যন্ত। এখান থেকে পাত্তানী নদীর দূরত্ব ১০ কিলোমিটারের মত….. যেখানে পাত্তানী নদী একটা হ্রদে গিয়ে পড়েছে। পাত্তানীর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর ‘ইয়ালা’ এখান থেকে ৫০ কিলোমিটারের মত দূরে।
দু’পাহাড়ের কোলের এই ছোট্ট পাথুরে উপত্যকার আকাশটা আরও অদ্ভুত। দু’দিক থেকে পাহাড়ের মাথাটা কার্নিসের মত এগিয়ে এসে উপত্যকার আকাশকে ঢেকে দিয়েছে।
এই উপত্যকায় গড়ে উঠেছে একটা পাথুরে বাড়ি। বাড়িটা কতকটা দুর্গের ষ্টাইলে তৈরি।
বাড়িটার একটা কাহিনী আছে। পাত্তানী অঞ্চলের মুসলিম সালতানাতগুলো যখন থাই রাজার অধীনে চলে যায়, তখন রাজ্যচ্যুত সুলতান আবদুল কাদির কামালুদ্দিন জংগলে পালিয়ে এসে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু করেন। তিনিই সে সময় মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছাকাছি দীগন্ত প্রসারী ঘন জংগলের মধ্যে দু’পাহাড়ের মাঝখানের এই দুর্গম স্থানে তাঁর বিদ্রোহের রাজধানী গড়ে তোলেন। পরবর্তী কালে তার সশস্ত্র আন্দোলন যখন অস্ত্র পরিত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ফিরে আসে, তখন বিদ্রোহের রাজধানী পরিত্যাগ করে তারা চলে যায় এবং বাড়িটা চোর-ডাকাত ও বেআইনি কাজের আড্ডা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে আসা-যাওয়ার মাধ্যম হলো নৌকা বা অন্য কোন জলযান।
একটা সুন্দর বোট এসে উপত্যকার পূর্ব তীরে নোঙর করল।
পানির লেভেল থেকে উপত্যকার সারফেস প্রায় বিশ ফিট উপরে। স্থানান্তরযোগ্য একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করা যায়।
নিচে বোট থেকে কিংবা দূর থেকে উপত্যকটার বাড়িটা দেখা যায় না। গোটা পাহাড় এবং পাহাড়ের গা ঘন বনে আচ্ছাদিত।
বোটটা উপত্যকায় ভীড়তেই বোটের কেবিন থেকে বেরিয়ে এল প্রায় ৬ ফুট লম্বা তীরের মত ঋজু দেহের একজন মানুষ।
সে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতেই মাঝারী শব্দে তিনবার তিন নিয়মে বোটটার হর্ন বেজে উঠল।
সংগে সংগেই ক্রেন জাতীয় কিছুর মাথা উপত্যকার ফ্লোরের বাইরে বেরিয়ে এল। ক্রেনের মাথায় প্রায় গার্ড বক্সের মত বড় ষ্টিল বক্স। সেই বক্স থেকে নেমে এল লিফট, একেবারে বোটের ওপর। বোটের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসা লোকটি লিফটে উঠে বসল।
লিফট উঠে এল উপরে।
ক্রেনটি গুটিয়ে গিয়ে লিফটিকে বাড়িতে প্রবেশের গেটে নামিয়ে দিল।
গেট থেকে লাল পাথরের একটা রাস্তা সোজা এগিয়ে একটা উঁচু বারান্দার সিঁড়িতে গিয়ে পৌছেছে। এই রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ ঘর। ঘরগুলোর দরজা ও জানালা জাতীয় গবাক্ষগুলো দেখলে মনে হয় এগুলো দুর্গমুখের প্রতিরক্ষা আয়োজনের অংশ। গবাক্ষগুলো দিয়ে বন্দুক ব্যবহার করা যায়, কামানও ব্যবহার করা যায়।
গেটের ভেতরে দু’পাশে দু’জন প্রহরী দাঁড়িয়ে ছিল।
বোট থেকে উঠে আসা লোকটি ডিজিটাল লক ব্যবহার করে গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই সামরিক কায়দায় স্যালুট দিল।
লোকটি এগোলো লাল রাস্তা ধরে উঁচু বারান্দার দিকে। গেটের চারজন প্রহরীর দু’জন চলল তার পিছু পিছু।
পাঁচ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে লোকটি ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দা পেরিয়ৈ বন্ধ দরজার সামনে।
সংগে সংগে দরজা খুলে গেল।
সোফায় সাজানো ঘরটি।
একটি সোফায় বসেছিল তিনজন লোক। ভদ্র পোশাক, কিন্তু খুনি চেহারা।
লোকটি ঘরে ঢুকতেই তিনজনই উঠে দাঁড়াল।
‘মি. আশের, লেভিকে দেখছি না। সে কোথায়?’
তিন জনের একজনকে লক্ষ্য করে বলল লোকটি।
তিনজনের যে লোকটি সামনে ছিল, সে হাতের গগলসটা পকেটে রেখে বলল, ‘মি. হাবিব হাসাবাহ স্যার, আপনার নির্দেশক্রমে লেভিকে পাত্তানীতে আসা আগন্তুককে অনুসরণ করার জন্যে পাঠানো হয়েছিল। সে ফেরেনি, কোন খবরও দেয়নি। আমরা এখানে আসার পূর্ব পর্যন্ত তাকে পাত্তানী শহর, ও সুলতান গড়সহ আশে-পাশের সব এলাকায় খুঁজেছি। পাওয়া যায়নি তাকে।’
কথার ওপর কোন মন্তব্য না করে হাবিব হাসাবাহ সামনের দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে বলল, ‘এসো তোমরা।’
হাবিব হাসাবাহ প্রবেশ করল যে ঘরে, সেটা একটা বড় অফিস কক্ষ।
ঘরের মাঝখানে বড় একটি টেবিল। টেবিলের সামনে চারটে চেয়ার। টেবিলের ওপাশে একটি বড় রিভলভিং চেয়ার রয়েছে। তার বাম পাশে সাইড টেবিলে একটা কম্পিউটার। কম্পিউটারের ওপাশে সাইড টেবিলে একা সুইচ বোর্ড রাখা। তাতে নানা রঙের ও আকারের অনেকগুলো সুইচ।
হাবিব হাসাবাহ গিয়ে রিভলভিং চেয়ারে বসল। বসতে বলল ওদের তিনজনকে সামনের চেয়ারে।
হাবিব হাসাবহ থাইল্যান্ডের ‘ব্ল্যাক ঈগল’-এর প্রধান। সে লেবাননের ইহুদী বংশোদ্ভুত। আমেরিকায় সে বড় হলেও অনর্গল আরবী বলতে পারে। আরবী পোশাক পরলে তাকে একজন জবরদস্ত আলেম বলে মনে হয়। মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর সময় আলেমের পোশাকই সে পরিধান করে।
‘পাওয়া যায়নি তাকে, এর অর্থ কি তোমরা মনে করছ?’ বসেই প্রশ্ন করল হাবিব হাসাবাহ।
আশের নামের লোকটি বলল, ‘অন্তত সে স্বাধীন অবস্থায় নেই স্যার।’
‘না সে বন্দী নেই। তোমরা ভুলে যাচ্ছ কেন, সে বন্দী থাকলে সিগন্যাল পাঠাবার মত ব্যবস্থা তার কাছে আছে।’ বলল হাবিব হাসাবাহ।
‘স্যরি স্যার, বিষয়টা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনার কথাই ঠিক স্যার, সে বন্দী নেই।’ বলল বসে থাকা তিনজনের মাঝের জন।
‘কিন্তু ড্যান, এটা ঠিক না হলেই ভাল হতো।’ হাবিব হাসাবাহ বলল।
‘স্যরি স্যার।’ বলল ড্যান।
আশের, ড্যান এবং অন্যজন লাদিনো-এই তিনজনই হাবিব হাসাবাহর দক্ষিণ হস্ত। এই তিনজনই মিসরীয় ইহুদী। কিন্তু তারা লেখাপড়া করেছে আমেরিকায়। এরা আঞ্চলিক আরবীও অনর্গল বলতে পারে, এই নামগুলো তাদের প্রকৃত নামের অংশ। কিন্তু প্রকাশ্যে এই নাম ব্যবহার হয় না। বাইরের জন্যে তাদের চমৎকার মুসলিম নাম রয়েছে। ‘আশের’-এর মুসলিম নাম শেখ আবু দাউদ, ড্যান-এর নাম শেখ আমর ঈসা এবং লাদিনোর নাম শেখ আলী ইলিয়াস। হাবিব হাসাবহারও বাইরের পরিচয় শেখ হাবিব হাসাবাহ।
‘ঠিক আছে। আগন্তুক সম্পর্কে কি জান তোমরা?’
‘তার ব্যক্তি পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি স্যার। তাকে আমরা প্রথম দেখি চাস্ফুতে। নিয়ম অনুযায়ী আমাদের লোকরা ‘চাস্ফু’ জংশনে রেল ও সড়কপথে আসা নতুন লোকদের ওপর নজর রাখছিল। নাখো সান্তান থেকে আসা বাস পরিবর্তনের জন্যে নামা একজন শিখ যাত্রী আমাদের লোকদের বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একজন শিখ যুবক সে। মাথায় বাদামী পাগড়ী মুখ ভরা দাড়ি। গায়ে ইংলিশ পোশাক একদম আধুনিক শিখ। কিন্তু এলাকার কিছুই চেনে না। এমনকি ট্রেন থেকে নেমে কোন দিকে যাবে কি করবে এটা নিয়েও দ্বিধায় পড়েছিল। পদে পদে জিজ্ঞাসা করে সামনে এগুচ্ছিল। সুযোগ বুঝে আমাদের লোকরা তার কাছে যায় এবং তাকে সাহায্য করার সুযোগ নেয়। যাত্রী পরিচয়ে তার সাথেই বাসে ওঠে লেভি। সর্বশেষ যোগাযাগ হয় তার সাথে মোবাইলে। ফটথালং বাস ষ্টেশনের গাড়ি থেকে সে আমাকে মোবাইলে জানায়, লোকটির নাম বাজাজ সিং। পাত্তানী শহরের জন্যে টিকিট করলেও তার আগেই সুলতান গড়ে সে নামবে। আমি আমার মুসলমান নাম ‘জহীর উদ্দিন’ বলেছি। তাতে তার কোন প্রতিক্রিয়া বুঝিনি। এ পর্যন্ত তার সাথে কথা বলে কিছুই আদায় করতে পারিনি। তবে সন্দেহের বিষয় হলো, সুলতান গড়ে কোথায় যাবে এই প্রশ্ন সে এড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, সে-ই আমাকে প্রশ্ন করেছে বেশি। তার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো, এদিকের আইন-শৃঙ্খলা কেমন, কিছু সংঘর্ষের ঘটনা মানুষকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে ইত্যাদি। লেভি’র এই কথাগুলো স্যার আমাকেও সন্দিগ্ধ করে তোলে। আমি তাকে বাজাজ সিংকে অনুসরণ করা অব্যাহত রাখতে বলি। এখানেই তার সাথে আমার কথা শেষ হয়। তারপর ঘণ্টা দুয়েক পর্যন্ত তার কোন টেলিফোন না পেয়ে আমিই তাকে টেলিফোন করি। কিন্তু তার কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। সুলতান গড়ে আমরা যাই। কিন্তু তার সন্ধান মেলেনি।’
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল ড্যান।
‘তুমি ঠিকই বলেছ ড্যান, কথাগুলো সন্দেহের। সংঘর্ষগুলো কেন এবং কোন ঘটনা বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, এসব তো পত্র-পত্রিকা থেকেই জানা গেছে। সে প্রশ্ন করে তা জানার চেষ্টা করল কেন? তার মানে সে অন্য কিছু জানতে চায়। এমনও হতে পারে যে, পরে আরও আলোচনা হয়েছে এবং আরও কিছু জানাজানি হয়েছে। তার ফলে কিছু ঘটে থাকতে পারে। এখন প্রয়োজন বাজাজ সিংকে খুঁজে বের করা।’ বলল হাবিব হাসাবাহ।
‘স্যার, বিভেন বার্গম্যান কি সত্যি চলে গেছেন?’ প্রশ্ন করল লাদিনো।
‘বৃটিশ এয়ারওয়েজের হিথ্রোগামী একটি ফ্লাইটে বোর্ডিং কার্ড সে নেয়। যাত্রী তালিকায় তার নাম আছে, এ খবর আমি পেয়েছি। সুতরাং ঐ ব্যাপারে সন্দেহ করার এখনও কিছু ঘটেনি।’ হাবিব হাসাবাহ বলল।
কথা বলার জন্য মুখ খুলেছিল ড্যান। হাবিব হাসাবাহ তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক।’ এরপর বলল, ‘বিবৃতিটি জাবের জহীর উদ্দিনকে দিয়ে সই করিয়েছ?’
মুখ বিমর্ষ হয়ে উঠল ড্যানের। বলল, ‘সই’ করানো যায়নি স্যার। তার এক কথা তোমাদের কোন সহযোগিতা আমরা করব না। তাকে বাধ্য করার জন্য যা করা প্রয়োজন, তা আমরা করেছি। সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু সে রাজি হয়নি।’
‘তাকে নিয়ে এসো।’ নির্দেশ দিল হাবিব হাসাবাহ।
সংগে সংগেই আশের ও ড্যান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অল্পক্ষণ পরেই জাবের জহীর উদ্দিনকে নিয়ে তারা ঘরে প্রবেশ করল।
বাইশ-তেইশ বছরের যুবক জাবের জহীর উদ্দিন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। সোনালী গায়ের রং। তার মধ্যে চাইনিজ চেহারাই বেশি স্পষ্ট। পরতে গ্যাবাডিন জাতীয় কাপড়ের প্যান্ট। গায়ে সার্ট নেই, একটা জ্যাকেট মাত্র। বোতাম খোলা। মাথার চুল ছোট। আঁচড়ানো নয়।
জাবের জহীর উদ্দিনকে নিয়ে ওরা ঘরে ঢুকতেই হাবিব হাসাবাহ তার বাম পাশের সাইড টেবিলে রাখা সুইচ বোর্ডের একটা সুইচ টিপে দিল। সংগে সংগেই তার টেবিলের ডান দিকে একটু দূরে মেঝের একটা অংশ সরে গেল এবং সেই সুড়ঙ্গ পথে বড় আকারের হাতল ওয়ালা চেয়ার উঠে এল। চেয়ারের সাথে নানা রকম তারের সংযোগ। হাবিব হাসাবহ আরেকটা সুইচ টিপতেই চেয়ারটির ওপর চোখ ধাঁধানো বাল্ব নেমে এল ছাদের দিক থেকে।
‘জাবেরকে চেয়ারে বসিয়ে দাও আশের।’ হাসাবাহ বলল ভারী গলায় আদেশের সুরে।
আশের ও ড্যান জাবেরের দু’হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বসাল সেই চেয়ারে।
জাবের একটুও আপত্তি না করে বসল চেয়ারে। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু চোখ দু’টি বড় উজ্জ্বল।
হাবিব হাসাবাহ তার চেয়ার একটু ঘুরিয়ে নিয়ে মুখোমুখি হলো জাবের জহীর উদ্দিনের। বলল, ‘জাবের তুমি ষ্টেটমেন্ট সই করোনি কেন?’
‘আমি তোমাদের জঘন্য ষড়যন্ত্রের সহযোগী হবো, তা তোমরা ভাবলে কি করে?’ বলল জাবের জহীর উদ্দিন দৃঢ়কণ্ঠে।
‘তুমি তো আমাদের সহযোগিতা করছ। খুবই মূল্যবান সহযোগিতা। সেদিন তোমার আঙুল কেটে তার রক্তে তোমার জামা রাঙিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা আমাদের খুব কাজ দিয়েছে।’
‘কি কাজ দিয়েছে?’ বিস্ময়ের সুরে বলল জাবের জহীর উদ্দিন।
‘সেটা শুনে তোমার কাজ নেই। শোন ষ্টেটমেন্টে স্বাক্ষর করা এবং ভিডিও ক্যামেরার সামনে কিছু বলে আমাদের সহযোগিতা তোমাকে করতে হবে।’ শক্ত কণ্ঠ হাবিব হাসাবাহর।
‘আমি আমার কথা বলে দিয়েছি, জ্ঞানত এবং প্রত্যক্ষভাবে কোন সহযোগিতাই আমি তোমাদের করব না। তোমরা মুসলমানদের শত্রু, ইসলামের শত্রু, আমাদের মাতৃভূমি থাইল্যান্ডের শত্রু।
হো হো করে হাসল হাসাবাহ। বলল, ‘শত্রু আমরা নই। সরকারের খাতায় শত্রু তুমি। তুমি শত্রু হিসাবেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলে। তারপর তুমি তোমার সন্ত্রাসী সংগীদের সহায়তায় পালিয়ে এসেছ। এখন পুলিশ হন্যে হয়ে গোটা দেশে তোমাকে খুঁজছে, আমাদের নয়। আগের জীবনে ফিরে যাবার আর কোন পথ তোমার নেই। সুতরাং আমাদের সাহায্য তোমাকে করতেই হবে।’
‘পুলিশ এবং সরকার আমাদের ভুল বুঝেছে। এ ভুল তাদের একদিন ভাঙবে।’
‘হয়তো ভাঙবে। কিন্তু তা শোনার জন্যে তোমরা কেউ বেঁচে থাকবে না, এমনকি ‘পাত্তানী’ নামটাও তখন বেঁচে নাও থাকতে পারে।’ বলল হাবিব হাসাবাহ। তার ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি।
‘হ্যাঁ তোমরা এটাই চাচ্ছ। কিন্তু জেনে রেখ, তোমরা ষড়যন্ত্রকারীরা সর্বশক্তিমান নও। আল্লাহই সর্বশক্তিমান।’ বলল জাবের জহীর উদ্দিন।
আল্লাহর নাম শুনেই ক্রোধে ফুঁসে উঠল হাবিব হাসাবাহ। বলল, ‘জান, তোমার ঐ চেয়ার ও চেয়ারের তারগুলোই সর্বশক্তিমান। একটা সুইচ টিপলেই তারগুলো তোমার দেহে যন্ত্রণার জাহান্নাম সৃষ্টি করবে আর চেয়ার তোমাকে একবিন্দু নড়তে দেবে না, মুখও খুলতে পারবে না চিৎকারের জন্যে। যন্ত্রণার আগুন তাতে আরও দাউ দাউ করে বাড়বে।’
‘হ্যাঁ এ শক্তিটুকু তোমাদের আছে। কিন্তু আমাকে পক্ষে নেবার শক্তি তোমাদের নেই।’ বলল দ্বীধাহীন কণ্ঠে জাবের জহীর উদ্দিন।
সংগে সংগে কোন উত্তর এল না হাবিব হাসাবাহর তরফ থেকে। তার দৃষ্টি জাবের জহীর উদ্দিনের ওপর নিবদ্ধ। দৃষ্টিতে একটা শূন্যতা। ভাবছে সে।
হঠাৎ তার ঠোটে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘তোমার বোনের নাম যয়নব যোবায়দা না? খুব সুন্দর নাম।’
জাবের জহীর উদ্দিন কোন উত্তর দিল না। কিন্তু তার চোখ দুটি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। শয়তান তার বোনের কথা জিজ্ঞাসা করছে কেন?’
‘তোমার বোন খুব সুন্দরী না? ঠিক খলিফা হারুন অর রশীদের মহিয়সী যোবায়দার মত?’
এবারও কোন কথা বলল না জাবের জহীর উদ্দিন। কিন্তু কেঁপে উঠেছে তার অন্তরটা। তার প্রিয় বোন, একমাত্র বোন যয়নব যোবায়দার সম্মান ও মর্যাদার চেয়ে বড় কিছু নেই তার এই দুনিয়ায়।
আবার কথা বলে উঠল হাবিব হাসাবাহই। বলল, ‘কথা বলছ না কেন? শক্তি, দৃঢ়তার বাহাদুরী এতটুকুই! বোনের নাম শুনেই কথা বন্ধ হয়ে গেছে, মর্যাদায় আঘাত লেগেছে। কিন্তু জান কি, তোমার সুন্দরী বোন এখন আমাদের কব্জায়?’
‘কি বলছ তোমরা, এ হতে পারে না?’ প্রতিবাদে চিৎকার করে উঠল জাবের জহীর উদ্দিনের কণ্ঠ।
‘এ হতে পারে, হয়েছে। তুমি যদি চাও তাকে এখানে নিয়ে আসছি। তোমার সামনেই তার সর্বস্ব লুণ্ঠনের ব্যবস্থা করছি।’
‘না আমার বোনের গায়ে তোমরা হাত দিতে পারবে না। আমার সাথে তোমাদের বাগড়া। আমার বোনকে এর মধ্যে তোমরা টেনে এন না।’ ব্যাকুল, বিনীত জাবের জহীর উদ্দিনের কণ্ঠ।
মুখে হাসি ফুটে উঠল হাবিব হাসাবাহর। বলল, ‘তুমি যদি এটা চাও, সেটা হতে পারে এক শর্তে।’
‘সেটা কি?’
‘আমরা যেভাবে চাইব, তুমি আমাদের সাহায্য করবে?’
সংগে সংগে উত্তর দিতে পারল না জাবের জহীর উদ্দিন। তাদের শর্ত তার কাছে হিমালয়ের মত দুর্বিষহ। কিন্তু তার বোনের নিষ্পাপ চেহারা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এই বোনকে হায়েনার গ্রাসে কি করে সে ঠেলে দেবে। মনটা তার হু হু করে কেঁদে উঠল। তার মন বলে উঠল, বোনকে রক্ষা করাই আশু দায়িত্ব। অন্য দায়িত্বের কথা পরেও সে চিন্তা করতে পারবে।
জাবের জহীর উদ্দিনকে নিরব থাকতে দেখে হাবিব হাসাবাহ বলল, ‘তাহলে তোমার সিদ্ধান্তে তুমি অটল। তাহলে…………..।’
হাবিব হাসাবাহর কথা শেষ করতে না দিয়ে জাবের জহীর উদ্দিন বলল, ‘আমি তোমাদের শর্তে রাজি। তবে আমাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তোমরা তার কোন অসম্মান করোনি এবং তাকে ছেড়ে দিতে হবে।’
জাবের জহীর উদ্দিনের কথা শুনেই হাবিব হাসাবাহ বলে উঠল, ‘তোমার শর্ত মঞ্জুর জাবের। আমি এখনি বেরুব। কাল সকালে আমি আসব। তখন তোমার বোনের সাথে কথা হওয়ার পর বিষয়টা চুড়ান্ত হবে।’
‘এখন কেন নয়?’ জাবের জহীর উদ্দিন বলল।
‘তোমার বোনকে ভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে। এখন আমার অসুবিধা আছে। কাল সকালে তাকে নিয়ে আসব।’ বলল হাবিব হাসাবাহ।
তাকাল জাবের জহীর উদ্দিন হাবিব হাসাবাহর দিকে। তার চোখে সন্দেহ।
বুঝতে পেরে হাবিব হাসাবাহ বলল, ‘আমি বলেছি জাবের তোমার বোনের কোন ক্ষতি হবে না।’
বলেই হাবিব হাসাবাহ আশেরকে বলল, ‘যাও জাবেরকে নিয়ে যাও। রেখে তাড়াতাড়ি এসো।’
জাবেরকে রেখে আশের ফিরে এল দু’মিনিটের মধ্যেই।
আশের ঘরে ঢুকতেই হাবিব হাস