৪৭. বসফরাসে বিস্ফোরণ

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

বিদ্যুৎ বিভাগের লাইন চেকিং কাজের লক্কড় মার্কা একটা গাড়ি ড্রাইভ করে আহমদ মুসা বার্বারোস বুলেভার্ড থেকে ১০১ নম্বর বাড়ির সংযোগ রাস্তায় প্রবেশ করল।
আহমদ মুসার পরনেও বিদ্যুৎ বিভাগের লাইনম্যানদের পোশাক। মাথার চুল অগোছালো। চেহারায় রোদ পোড়া, ক্লান্ত ভাব। পায়ে পুরানো ময়লা বুট।
বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়িটি ১০১ নম্বর বাড়ির সংযোগ রাস্তায় ঢুকতেই দু’জন লোক এসে হাত তুলে গাড়ির সামনে দাঁড়াল।
গাড়ি দাঁড় করাল আহমদ মুসা।
‘কোথায় যাও?’ বলল একজন।
‘একশ’ এক নম্বর বাসা থেকে টেলিফোন করেছে। জরুরি।’ স্থানীয় টার্কিস ভাষায় বলল আহমদ মুসা। এ ধরণের প্রয়োজনীয় কয়েকটি বাক্য সে গত আধা ঘন্টা ধরে মুখস্থ করেছে।
উত্তর শুনে লোক দু’জন একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। একজন আরেকজনকে বলল, ‘নিশ্চয় লাইনে কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে, জরুরি টেলিফোন করেছে।’
অবশেষে তারা সামনে থেকে সরে গেল। হাত দিয়ে ইশারা করে যেতে বলল।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। ওদের দু’জনের পকেটে রিভলবার আছে, তাদের পকেটের ওজন দেখেই তা বুঝতে পেরেছে আহমদ মুসা। সেই সাথে আরও বুঝতে পারল, বাড়িটাকে তারা কড়া পাহারায় রেখেছে।
আহমদ মুসার লক্কড় মার্কা পিকআপ গাড়িটা গিয়ে বাড়ির গাড়ি বারান্দায় থামল।
হাতে প্লাস্টিকের ছোট্ট থলে নিয়ে লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা।
গাড়ি বারান্দার পরেই তিন ধাপের সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে উঠলেই মূল বারান্দা। মূল বারান্দাতেই বড় দরজা। এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা যায় বাড়ির ড্রইং রুমে।
কিন্তু আহমদ মুসা এ দরজার দিকে না এগিয়ে বারান্দাটির পাশ দিয়ে বাড়িটিতে প্রবেশের আরেকটি বড় দরজার দিকে এগোলো।
বাড়িতে প্রবেশের এটাই প্রধান দরজা।
দরজায় দ্রুত নক করল আহমদ মুসা, কাজের তাড়া থাকলে যেমনটা হয়।
দরজা খুলে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে গুন্ডাকৃতির একজন মানুষ। কঠোর মুখে ভীষণ বিরক্তি প্রকাশ করল আহমদ মুসাকে দেখে।
কিছু বলতে যাচ্ছিল লোকটি। তার আগেই আহমদ মুসা ‘আমি ইলেকট্রিসিয়ান, ভেতর থেকে জরুরি কল করেছে’ বলে অনুমতি না নিয়েই ভেতরে ঢুকে গেল।
লোকটি এমনটা আশা করেনি। সে দু’ধাপ পিছিয়ে গিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও, যেতে পারবে না এখন। আমি জিজ্ঞেস করে দেখি, তোমাকে কেউ ডেকেছে কিনা?’
‘যাও, জিজ্ঞেস করে এসো।’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটির দু’দিকে প্রসারিত হাত নেমে এলো নিচে।
‘তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি ভেতরের লোকের সাথে কথা বলছি।’ বলে লোকটি পকেট থেকে মোবাইল বের করে পেছন ফিরে দাঁড়াল কথা বলার জন্যে।
আহমদ মুসার বাম হাতে ঝুলছিল একটা টুলস ব্যাগ, ডান হাত খালি ছিল।
লোকটি ঘুরে দাঁড়াতেই আহমদ মুসার ডান হাত দ্রুত তার ডাক পকেটে চলে গেল, আর বাম হাতের টুলস ব্যাগ বাম কাঁধে তুলে নিয়ে হাতটি মুক্ত করল।
আহমদ মুসার ডান হাত বেরিয়ে এলো একটা ভাঁজ করা ছোট্ট রুমাল নিয়ে।
লোকটা তখন সবে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে মাত্র।
আহমদ মুসা দু’ধাপ সামনে এগিয়ে গেল দ্রুত, বিড়ালের মতো নিঃশব্দে। সংগে সংগেই তার বাম হাত চোখের পলকে পেঁচিয়ে ধরল লোকটির গলা সাঁড়াশির মতো। সেই সাথে তার ডান হতের রুমাল এসে চেপে বসল লোকটির নাকে।
লোকটি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করল কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু পারল না। কয়েক মুহূর্তেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
আহমদ মুসা তার সংজ্ঞাহীন দেহ ডিঙিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরটায় একটা লাউঞ্জ।
লাউঞ্জের চারদিকেই ঘর। পশ্চিম-উত্তর কোণে একটা সিঁড়ি ওপর দিকে উঠে গেছে। সিঁড়ির গোড়া দিয়ে লাউঞ্জ থেকে একটা করিডোর চলে গেছে পশ্চিম দিকে।
আহমদ মুসাদের পাওয়া তথ্য সত্য হলে এই বাড়িতেই এনে তোলা হয়েছে কিডন্যাপড হওয়া অসুস্থ বিচারপতিকে। বাড়ির ভেতর-বাইরের পাহারাও এটাই প্রমাণ করেছে।
কিন্তু এখন কোন্ দিকে অগ্রসর হবে বুঝতে পারলো না আহমদ মুসা। লাউঞ্জের বাম দিকের ঘরগুলোর সব দরজাই বন্ধ। ভাবল আহমদ মুসা, এক তলার কোন ঘরে অবশ্যই তিনি নেই। এসব ঘরে সাধারণত প্রহরী ও বাড়ির কর্মচারীরাই থাকে। হয় তাকে আন্ডারগ্রাউন্ড কোন ফ্লোরে রাখা হয়েছে, না হয় ওপর তলার কোথাও। বাড়িটি তিন তলা।
সিঁড়ি দিয়ে ওপর তলায় ওঠা যায়, কিন্তু পশ্চিম দিকের করিডোরটি কোথায় গেছে?
আহমদ মুসা এগোলো সিঁড়ির গোড়ার দিকে।
সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছেই আহমদ মুসা দেখতে পেল, সিঁড়ির গোড়া থেকে করিডোরের যে দেয়াল শুরু হয়েছে, সিঁড়ির গোড়ার পরেই এর সংলগ্ন দেয়ালে লিফটের দরজা। লিফটের দরজার ফ্লোর ইনডিকেটরে গ্রাউন্ড প্রথম ও দ্বিতীয় ফ্লোরের আগে আরও দু’টি ফ্লোর ইনডিকেটর, ইউজি ওয়ান ও ইউজি টু রয়েছে। এর অর্থ আন্ডারগ্রাউন্ডে দুটি ফ্লোর আছে এবং এই লিফট দিয়েই সেখানে যাওয়া যাবে।
আহমদ মুসা পা তুলল লিফটের দিকে যাওয়ার জন্যে।
এই সময় তার মনে হলো তার পেছনে মানুষ।
পকেটের হাতটা রিভলবারের বাঁটটা চেপে ধরল। মাথা ঘোরাতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দু’পাশ থেকে দু’টি শক্ত বস্তু এসে তার মাথায় চেপে বসল। স্পর্শ থেকেই বুঝল দু’টিই রিভলবারের নল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে হাত বের না করে ওদেরকে কথায় জড়িয়ে সময় নিতে চাইল। বলল সে, ‘তোমরা কে, কি চাও?’
কথার সাথে সাথেই দু’জন তার সামনে এসে দাঁড়াল। তাদেরও হাতে রিভলবার।
আহমদ মুসার মাথা থেকে রিভলবারের নল এক তিলও সরেনি।
তার সামনের গিয়ে দাঁড়ানো একজন বলল, ‘আমরা কে, কি চাই, তা নয়। তুমি কে, কি জন্যে এখানে ঢুকেছ, সেটা বলো।’
‘তোমরা আমাকে এ প্রশ্ন করছ কেন, তোমরা জান আমি কে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন প্রশ্ন করছি জান না? গেটের আমাদের প্রহরীকে তুমি সংজ্ঞাহীন করে ভেতরে ঢুকেছ। তুমি বিদ্যুৎ বিভাগের লোক নও, কে তুমি?’ বলল সেই আগের লোকটিই।
কথা বলার জন্যে আহমদ মুসা মুখ তুলেছিল লোকটির দিকে। তাকাতে গিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ানো একটা মেয়ের ওপর চোখ পড়ল। হাতে তার বই, পরনে ক্রিম রংয়ের প্যান্টের ওপর ক্রিম রংয়ের বিশেষ কাটিং-এর কোট। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল এটা ‘বসফরাস কলেজ অব টেকনোলজি’র ছাত্রীদের ইউনিফরম। মেয়েটি বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে এদিকে তাকিয়েছিল। আহমদ মুসার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি কয়েক ধাপ ওপরে উঠে আড়ালে সরে গেল।
উত্তর না দিয়ে আহমদ মুসাকে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে ধমক দিয়ে সেই লোকটি তার রিভলবার আহমদ মুসার দিকে তাক করে বলল, ‘চালাকি করার চেষ্টা করো না, চারদিকে গুলীতে মাথার খুলি গুঁড়ো হয়ে যাবে।’
‘কি জানতে চাও তোমরা?’ বলল আহমদ মুসা শান্ত কণ্ঠে।
ক্রোধে ফেটে পড়ল সামনে লোকটি। আহমদ মুসার কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে বলল, ‘তুমি এখানে এসেছ কেন?’
‘তোমরা জান যে, প্রধান বিচারপতিকে উদ্ধার করতে এসেছি আমি এখানে। তাকে তোমরা কিডন্যাপ করে এখানে নিয়ে এসেছ।’ লোকটির মতোই উচ্চ স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সামনের লোকটি আহমদ মুসার কপাল থেকে রিভলবার সরিয়ে আহমদ মুসার হাঁটুতে একটা লাথি মারল এবং দু’ধাপ পেছনে সরে গিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘এবার তুই মর্।’
তার হাতের রিভলবারটা আবার উঠে আসতে লাগল আহমদ মুসার লক্ষ্যে।
লাথিটা খুব জোরেই মেরেছিল। আহমদ মুসা তার পা’টা একটু শিথিল করে না নিলে হাঁটুটা ভেঙেই যেত।
এভাবে আকস্মিক লাথি খেলে পড়ে যাবার কথা। আহমদ মুসাও পড়ে গিয়েছিল। এমন একটা সুযোগই চাইছিল সে। পড়ে যাওয়ায় সে পেছন থেকে টার্গেট-করা দুই রিভলবারের আওতার বাইরে চলে এসেছে।
পড়ে যাওয়ার সময় আহমদ মুসার দেহ মেঝে স্পর্শ করার আগেই তার ডান হাত পকেট থেকে বের হয়ে এসেছে রিভলবার নিয়ে।
আহমদ মুসা চিৎ হয়ে পড়ে গিয়েছিল বলে তাকে লাথি মারা লোকটি তার সামনেই ছিল।
‘এবার তুই মর্’ বলে লোকটি তার রিভলবারের ট্রিগার টেপার আগেই আহমদ মুসা তার ট্রিগার টিপে দিয়েছিল।
আহমদ মুসার রিভলবারের গুলী ৪০ ডিগ্রী এ্যাংগেলে গিয়ে লোকটির বাম বক্ষ বিদ্ধ করেছে। গুলী খেয়ে তার দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলেও তার তর্জনিটা রিভলবারের ট্রিগারে ঠিকই চেপে বসেছিল। কিন্তু টার্গেটটা দেহের কম্পনের সাথে কেঁপে গিয়েছিল। গুলীটা আহমদ মুসার মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পেছনে দাঁড়ানো একজন রিভলবারধারীর হাঁটুতে গিয়ে বিদ্ধ করল।
লোকটির হাত থেকে রিভলবার পড়ে গেল। সে দু’হাত দিয়ে হাঁটু চেপে ধরে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা প্রথম গুলী করেই দ্বিতীয় গুলীটি করল সামনে দাঁড়ানো দ্বিতীয় লোকটিকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা তখনও পড়ে আছে চিৎ হয়ে।
দ্বিতীয় গুলী করেই চোখ ফিরিয়ে দেখল পেছনে দাঁড়ানো অন্য লোকটি তার ডান পাশে। লোকটির রিভলবার উঠে এসেছে আহমদ মুসার লক্ষ্যে। আহমদ মুসা তার রিভলবার ঘুরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু টার্গেটকে তাক করার সময় নেই।
আহমদ মুসার এই চিন্তা যত দ্রুত চলেছে, তার চেয়ে দ্রুত সচল হয়ে উঠেছে তার শরীর।
উদ্ধত রিভলবারের ওপর চোখ পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার দেহ মিডল ব্যাটে পেটানো ফুলটস ক্রিকেট বলের মতো গড়িয়ে গেল লোকটির দু’পায়ের দিকে।
লোকটি গুলী করেছিল। গুলীটি আহমদ মুসার গড়ানো দেহের প্রান্ত থেকে মাত্র ছয় সাত ইঞ্চি দূরে মেঝেকে গিয়ে বিদ্ধ করেছে। যথাসময়ে তার দেহ না গড়ালে গুলীটি তার বাম বুককে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিত।
রিভলবারের টার্গেট সরিয়ে নিয়ে লোকটি দ্বিতীয় গুলীর জন্যে ট্রিগারে তর্জনি চাপছিল। কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসার গড়ানো দেহ প্রচন্ডভাবে আঘাত করল তার দু’পায়ে।
লোকটি হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে বসেছে।
লোকটিও পড়ে গিয়েই এক মোচড়ে দেহটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে বসেছে। রিভলবার সে ছাড়েনি। তার রিভলবারও ঘুরে আসছে আহমদ মুসার দিকে। লোকটির চোখে-মুখে বেপরোয়া ভাব।
আহমদ মুসার হাতের রিভলবারও উদ্ধত ছিল। বেপরোয়া লোকটিকে সময় দেয়া যাবে না ভেবেই আহমদ মুসা তর্জনি চাপল তার রিভলবারের ট্রিগারে।
রিভলবার থেকে বেরিয়ে গেল একটা গুলী। আর তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়িয়ে স্থির হবার আগেই তার দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উফল। একটা গুলী তার উরুতে এসে বিদ্ধ হয়েছে। গুলীটা বাম উরুর বাম পাশের একটা অংশকে আগ্রাসি এক কামড় দিয়ে কিছু অংশ তুলে নিল।
আহমদ মুসার দেহ কেঁপেছে, কিন্তু তার রিভলবার ধরা ডান হাত ও দু’চোখ এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। দু’চোখ ও রিভলবার এক সংগেই ঘুরে গেল শব্দ লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা দেখল, হাঁটুতে গুলী খাওয়া লোকটিই রিভলবার তুলে নিয়ে তাকে গুলী করেছে।
তার দিকে চোখ পড়ার সংগে সংগেই আহমদ মুসা গুলী করল লোকটিকে তাকে দ্বিতীয় গুলী করার সুযোগ না দিয়ে।
বসে থাকা লোকটির মাথা গুঁড়ো হয়ে গেল। নিঃশব্দে সে ঢলে পড়ল মেঝেতে।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল সিঁড়ির গোড়ার দিকে। তাকে হয় আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে হবে, নয়তো ওপরে যেতে হবে। সে নিশ্চিত এই বাড়িতেই প্রধান বিচারপতি বন্দী আছেন।
ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে সিঁড়ির দিকেও চোখ গেল আহমদ মুসার। দেখল সিঁড়ির মাথায় সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে সৌম্য দর্শন একজন বৃদ্ধ। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো। তার বাম হাত সিঁড়ির রেলিংয়ে রাখা। লোকটির মাথার চাঁদিতে ছোট্ট একটা টুপি।
তার মানে বৃদ্ধটি ইহুদি, মেয়েটি নিশ্চয় বৃদ্ধটিরই কেউ। তাহলে সেও তো ইহুদি! তারা কি এই কিডন্যাপারদের অংশ? কিন্তু ওরা তো এ্যাকশনে নেই। একই দলের হলে ওরা নির্বিকার দর্শক হবে কেন? একই দলের হলে হয় এ্যাকশনে আসার কথা, নয়তো পালানোর কথা, অথচ তাদের দেখে মনে হচ্ছে শংকিত, বিস্মিত দর্শকের ভূমিকায়। একই বাড়িতে তাহলে এরা কারা?
আহমদ মুসার চোখে-মুখে যখন এসব প্রশ্ন, তখন শংকিত, বিস্মিত বৃদ্ধটি বলে উঠল, ‘এসব এখানে কি ঘটছে, কেন ঘটছে, ওরা কারা? আপনি কে?’
এক নিঃশ্বাসে অনেক প্রশ্ন করে থামল বৃদ্ধটি। কণ্ঠে তার শংকা ও উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
‘আপনি এই লোকটিকে চেনেন না? এরা তো এই বাড়িরই লোক মনে হচ্ছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না, এদের আমি চিনি না। আমি ওপর তলায় থাকি। নিচ তলাটা আমি ভাড়া দিয়েছি ডেভিড ইয়াহুদ নামে একজন ভদ্রলোককে অফিস করার জন্য। তারা কয়েকদিন হলো এখানে বসছেন।’ বলল বৃদ্ধটি।
‘ডেভিড ইয়াহুদকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘জার্মানিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আমি পড়ি, তখন সে ছাত্র ছিল সেখানে।’ বৃদ্ধটি বলল।
বৃদ্ধ থামতেই মেয়েটি ফিস ফিস করে তাকে কিছু বলল।
শুনেই চমকে উঠল বৃদ্ধটি। বিস্ফোরিত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল বৃদ্ধটি চিৎকার করে, ‘প্রধান বিচারপতিকে ওরা কিডন্যাপ করে এখানে এনেছে, এটা নাকি আপনি বলেছেন? কি ঘটনা?’
‘জি, ওরা আজ প্রধান বিচারপতিকে কিডন্যাপ করে এখানে এনেছে। আমরা নিশ্চিত জেনেই তাকে উদ্ধারের জন্যে এসেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাঁর মানে প্রধান বিচারপতি এখন আমার এই বাড়িতে বন্দী আছেন!’ কম্পিত কণ্ঠে বলল বৃদ্ধটি।
‘আমি তাই মনে করি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওপরের তলায় নেই, আমি ওপরে থাকি বলে নিশ্চিত করে বলতে পারি। তাহলে নিচ তলায় আছেন। চলুন দেখি।’ বলল বৃদ্ধটি।
‘বাবা, কিন্তু উনি তো আহত। ঊরুতে গুলী লেগেছে ওনার।’ বলল মেয়েটি।
মেয়েটির হাতে তখনও কয়েকটি বই।
‘ঠিক তো। যাও, তুমি গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসো। আমি নিচে নামছি।’ বলল বৃদ্ধটি।
‘না, এসব এখন নয়। আসুন, আগে প্রধান বিচারপতির সন্ধান করি। ওটাই বেশি জরুরি।’
‘জরুরি অবশ্যই। সাধারণ ব্যান্ডেজে সময় বেশি লাগবে না।’ বলল মেয়েটি।
‘আমার হাঁটুতে ক্রেপ গার্ডার আছে। আমি ওটা টেনে ওপরে তুলে নিয়েছি। অন্তত রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে এতে।’ বলল আহমদ মুসা।
বৃদ্ধটি এক হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে অন্য হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে নিচে নেমে এলো।
তার সাথে মেয়েটি নেমে এলো।
আহমদ মুসাও সিঁড়ির গোড়ায় চলে এসেছে।
বৃদ্ধ ও মেয়েটি এসে তার সামনে দাঁড়াল।
বৃদ্ধটি বলল, ‘আমি ডেভিড হারজেল। বসফরাস কলেজ অব টেকনোলজি থেকে আমি রিটায়ার করেছি। ফিজিক্স পড়াতাম। তবে অধ্যাপনা নয়, ব্যবসায় ছিল মূল নেশা। এখন ব্যবসাটা কর্মচারীরা দেখে।’ আর বৃদ্ধ মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল, ‘আমার মেয়ে হান্নাহ হাগেরা, বসফরাস কলেজ অব টেকনোলজি ছাত্রী। কলেজ-হোস্টেলেই সে থাকে।’
‘আপনি বোধ হয় কলেজেই ফিরে যাচ্ছিলেন?’ আহমদ মুসা বলল মেয়েটিকে লক্ষ্য করে।
‘কি করে বুঝলেন?’ বলল মেয়েটি। তার বিস্ময় ভরা দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে।
‘কয়েকটি বই হাতে নিয়ে আপনি নামছিলেন।’ আহমদ মুসা বলল।
মেয়েটি হাতের বইগুলোর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘ভুলেই গিয়েছিলাম বইগুলোর কথা। এই জরুরি বইগুলো নেয়ার জন্যে আধ-ঘন্টা আগে বাসায় এসেছিলাম। ফিরতে গিয়েই এই সাংঘাতিক ঘটনার মুখে পড়লাম।’
‘সাংঘাতিক ঘটনা না ঘটিয়ে উপায় ছিল না। চলুন, আমরা দেখি।’
বলে আহমদ মুসা চলতে শুরু করল লিফটের দিকে।
তার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল হান্নাহ হাগেরা ও বৃদ্ধ ডেভিড হারজেল।
আহমদ মুসা গিয়ে দাঁড়াল লিফটের সামনে। নিচে নামার জন্যে ডাউন বাটনে চাপ দিল, কিন্তু লাইট ইনডিকেটর জ্বলল না।
লিফটের দরজার চারদিকটা একবার দেখল আহমদ মুসা। তারপর টপে ফ্লোর ইন্ডিকেটরের ডান পাশে প্রায় অদৃশ্য একটা বোতামের ওপর চাপ দিল। সংগে সংগেই ডাউন মুভিং ইন্ডিকেটরে আলো জ্বলে উঠল।
বৃদ্ধ ডেভিড হারজেল নিরবে আহমদ মুসার কাজ দেখছিল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়! লিফটের মুভিং ইন্ডিকেটর যে বিদ্যুৎ কানেকশনের অভাবে কাজ করছে না, তা বুঝল কেমন করে? প্রায় অদৃশ্য বাটন সে খুঁজে পেল কেমন করে এত দ্রুত? আর টপ ফ্লোর ইন্ডিকেটরের দু’পাশেই অনুরূপ বাটন আছে, কিন্তু ডান দিকের বাটনটাই চাপল কেন?
এসব প্রশ্ন ও একরাশ বিস্ময় নিয়ে বৃদ্ধ ডেভিড হারজেল বলল, ‘ফ্লোর ইন্ডিকেটরের দু’পাশেই অনুরূপ বাটন আছে। আপনি কি করে বুঝলেন ডান পাশের বাটন টিপলেন লিফট বিদ্যুৎ কানেকশন পাবে?’
‘এ ব্যবস্থা আপনারাই করে রেখেছেন। বাম বাটনের সারপেসের দিকটি দুই অর্ধবৃত্তে বিভক্ত এবং ডানেরটি বিভক্ত নয়। এতেই বামেরটি ডিসকানেক্ট, আর কানেক্ট করার বাটন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অসাধারণ আইকিউ আপনার! এ পর্যন্ত কেউই না বলে দিলে এই গোলকধাঁধাঁ ভাঙতে পারেনি। আপনার কাছেই প্রথম এই গোলকধাঁধাঁ পরাজিত হলো।’ বলল বৃদ্ধ।
‘শুধু আই কিউ নয়, লড়াইতেও অসাধারণ! উনি যে অবস্থায় পড়েছিলেন, তাঁর বাঁচা অবিশ্বাস্য ছিল। কিন্তু উনি শুধু বাঁচেননি, যাদের পরাজয় অকল্পনীয় ছিল, তারা সবাই মরেছে ওনার হাতে।’ মেয়েটি বলল।
‘আসুন’ বলে লিফটে প্রবেশ করল আহমদ মুসা মেয়েটির কথা শেষ হবার আগেই।
ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরা লিফটে প্রবেশ করল।
প্রথমে তারা সার্চ করল আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর ওয়ান।
লিফট ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর ওয়ান’- এ পৌঁছলে আহমদ মুসা বৃদ্ধ ও মেয়েটিকে লিফট থেকে নামতে অনুরোধ করে লিফট লক করে পরে নিজে নামল।
‘লিফট লক করার দরকার হলো কেন?’ জিজ্ঞাসা ছিল বৃদ্ধ ডেভিড হারজেলের।
‘যাতে অন্য কোন ফ্লোর থেকে কেউ লিফট ব্যবহারের সুযোগ না পায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি, আর ইতোমধ্যে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর-টু’ থেকে কেউ পালাতে না পারে, এজন্যেই এ ব্যবস্থা। আপনি অনেক দূরের ভবিষ্যতকেও দেখেন।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘এটা ভবিষ্যত দর্শন নয়। ভবিষ্যত স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ জানেন না। আমি যেটা করেছি সেটা কমনসেন্সের ব্যাপার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর ওয়ান’ কতকগুলো প্রায় ফাঁকা কক্ষের সমষ্টি। সব কক্ষেই অনুসন্ধান হলো, কিন্তু কিছুই মিলল না। অফিস ঘরের টেবিলে একটা নোট-শিট পেল। আজকের তারিখ দেয়া ওপরের শিটটাতেই শুধু বিক্ষিপ্ত কিছু লেখা। শিটটা ছিঁড়ে আহমদ মুসা পকেটে পুরল। বলল মেয়েটি ও বৃদ্ধকে লক্ষ্য করে, ‘এ ফ্লোরটি বন্দী কাউকে রাখার উপযুক্ত নয়। চলুন, নিচের ফ্লোরটি দেখি।’
বলে আহমদ মুসা লিফটের দিকে পা বাড়াল।
সবাইকে নিয়ে লিফট নেমে এলো ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর-টু’ মানে আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরের সবচেয়ে নিচের তলায়।
লিফট থেকে ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরা নেমে গেলে আহমদ মুসা লিফট লক করে বেরিয়ে এলো।
নিচের ফ্লোরটির অর্ধেকটাই ফাঁকা। বাকি অংশের তিন দিকে সারিবদ্ধ কেবিন। এর পরেই মাঝখানে রয়েছে প্রশস্ত অনেকখানি জায়গা।
‘এখানে অল্পক্ষণ আগেও লোক ছিল, এখন নিশ্চয় নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
ডেভিড হারজেল হাঁটতে হাঁটতেই তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে প্রশ্ন। বলল, ‘কেন বলছেন এ কথা?’
আহমদ মুসা কেবিনগেুলোর দরজা খুলে দেখছিল।
সব কেবিনের দরজা বন্ধ, কিন্তু লক করা নয়। এক প্রান্তের একটা কেবিনের দরজাই শুধু খোলা।
আহমদ মুসা সে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। বলল ডেভিড হারজেলের প্রশ্নের জবাবে, ‘খেয়াল করে দেখুন, পাতলা একটা সুগন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এই ফরাসি মৃগনাভির সুগন্ধ আমি আপনাদের গেটে এর চেয়ে বেশি পরিমাণে পেয়েছি। আমার বিশ্বাস এখানকার সুগন্ধের উৎস আগের, গেটেরটা পরের। তুরস্কের প্রধান বিচারপতি এই সুগন্ধ ব্যবহার করেন, এটা আমি তার লাইফ-ডসিয়ার থেকে জানি। ইন্টারনেটে এই লাইফ-ডসিয়ার আছে।’
‘আপনার এই অনুমান প্রশংসনীয়, কিন্তু এতটুকুতেই কি বলা যায় প্রধান বিচারপতিকে এখানে আটকে রাখা হয়েছিল? ফরাসি ঐ মৃগনাভি অনেকেই ব্যবহার করেন, এটাই স্বাভাবিক।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘আপনার কথাও ঠিক।’ বলে আহমদ মুসা খোলা দরজা দিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল।
ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরাও কেবিনের দরজায় এসে পড়েছে।
কেবিনটির খাটের এদিকের পায়ার পাশে পড়ে থাকা একটা চকচকে ছোট্ট জিনিসের দিকে আহমদ মুসার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।
আহমদ মুসা গিয়ে ওটা তুলে নিল।
জিনিসটার ওপর চোখ বুলিয়েই আহমদ মুসা একটু উচ্চ স্বরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, মি. ডেভিড হারজেল, প্রধান বিচারপতি এখানে ছিলেন। তার চিহ্ন তিনি এখানে ফেলে রেখে গেছেন।’
ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরা দু’জনেই জিনিসটা তুলে নেয়াকে উৎসুকের দৃষ্টিতে দেখছিল। বলল হান্নাহ হাগেরা দ্রুত কণ্ঠে, ‘কি ওটা পেলেন?’
আহমদ মুসা জিনিসটা তাদের দিকে তুলে ধরে বলল, ‘বিচারপতির মনোগ্রামের কোটপিন। বিচারপতিরা এটা পরেন।’
ডেভিড হারজেল ওটা দেখে বলল, ‘ঠিক বলেছেন। এটা বিচারপতিদের কোটপিন।’
বলার সাথে সাথে বৃদ্ধ ডেভিড হারজেলের মুখটা কঠোর হয়ে উঠল। বলল, ‘ওরা আমার বাড়িকে সন্ত্রাসের আড্ডা বানিয়েছিল! ডেভিড ইয়াহুদকে আমি প্রতিভাবান একজন ভালো মানুষ মনে করতাম।’
মুহূর্তের জন্যে একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু তাঁকে নিয়ে এসেই আবার সরিয়ে নিল কেন?’
‘ওরা বুঝতে পেরেছিল, তাদের এই আড্ডার ঠিকানা আমরা পেয়ে গেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনারা কে? আপনার পরিচয় কিন্তু জানা হয়নি।’ জিজ্ঞাসা ডেভিড হারজেলের।
‘আমি খালেদ খাকান। আমি আপনাদের পুলিশকে সাহায্য করছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার নাম বললেন, পরিচয় কিন্তু বললেন না। আপনি পুলিশ এটুকু মাত্র বোঝা গেছে।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘প্লিজ এসব কথা পরে হবে। এখন উদ্বেগজনক হলো অসুস্থ প্রধান বিচারপতি কোথায় কিভাবে আছেন! তাকে অবিলম্বে উদ্ধার করতে না পারলে তার ক্ষতি হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার গম্ভীর কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
ডেভিড হারজেল ও হাগেরার চোখে-মুখে উদ্বেগের ছায়া খেলে গেল। বলল ডেভিড হারজেল, ‘কিন্তু তারা প্রধান বিচারপতিকে কিডন্যাপ করেছে কেন? তাকে নিয়ে তারা কি করবে? আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘এর উত্তর দিতে হলে অনেক কথা বলতে হবে। শুধু এটুকু জেনে রাখুন, ওরা বিদেশের স্বার্থে গোপনে কাজ করেন। রোমেলী দুর্গের ল্যাবরেটরী অব টেকনোলজিকে ওরা ধ্বংস করতে চায়। ওরা ল্যাবরেটরীর প্রধান বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে কিডন্যাপ করেছিল। তাকে উদ্ধার করা হলে ওরা সুযোগ পেয়ে চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করেছে। সম্ভবত পণবন্দী হিসেবে কিংবা প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে ওরা প্রধান বিচারপতিকে হত্যাও করতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সাংঘাতিক ঘটনা! কিন্তু প্রধান বিচারপতিকে ওরা সরিয়ে নিয়েছে। কোথায় পাওয়া যাবে ওদের?’ উদ্বেগে ডেভিড হারজেলের কণ্ঠ কাঁপছিল।
ভাবছিল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা বেশিক্ষণ আগে যায়নি প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে। ওরা চারজনকে পেছনে রেখে গিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য পেছনটা নিরাপদ রাখা এবং তাদের এ ঘাঁটির সন্ধান সত্যিই কেউ পেয়েছে কিনা, কেউ আসে কিনা, সেটা দেখার জন্যে। আমার ধারণা তাদের এখান থেকে পালানোর সময় আধা ঘন্টার বেশি হবে না।’
ভ্রু কুঞ্ছিত হয়ে উঠেছিল হান্নাহ হাগেরার। আধা ঘন্টা আগে বাড়িতে আসার সময় ঠিকই সে দেখেছিল দু’টি গাড়িকে তাদের বাড়ি থেকে চলে যেতে। সামনে একটা মাইক্রোবাস ছিল, পেছনে একটা জীপে ছিলেন ডেভিড ইয়াহুদ আংকেল। তাহলে কি প্রধান বিচারপতিকে নিয়েই তারা পালাচ্ছিলেন ঐ সময়! বুকটা কেঁপে উঠল হান্নাহ হাগেরার। বলল সে, ‘হ্যা, আধা ঘন্টা আগে আমি বাড়িতে আসার সময় দু’টি গাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে যেতে দেখেছি। একটা মাইক্রো, অন্যটা জীপ। জীপ চলাচ্ছিলেন ডেভিড ইয়াহুদ আংকেল নিজে।’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘সন্দেহ নেই ঐ মাইক্রোবাসেই অসুস্থ প্রধান বিচারপতি ছিলেন। আপনি ঠিক কোন্‌ জায়গায় ওদের দেখেছিলেন, কোন্‌ দিকে যাচ্ছিলেন?’
‘গাড়ি দু’টি প্রধান রাস্তায় উঠতে যাচ্ছিল, সে সময় আমি ওদের ক্রস করি। আমি অটো রিকশায় আসছিলাম। ডেভিড ইয়াহুদ আংকেল আমাকে দেখেননি, আমি তাকে দেখেছি। পরে আমি পেছনে ফিরে তাকাইনি। ওরা রাস্তায় উঠে কোন্‌ দিকে গেছে দেখিনি। তবে…।’
বলে থেমে গেল হান্নাহ হাগেরা।
‘তবে কি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমি যখন ডেভিড ইয়াহুদ আংকেলকে ক্রস করে এসেছি, সে সময় তার কণ্ঠ থেকে দু’টি শব্দ আমার কানে এলো। একদম অচেনা দু’টি শব্দ, আমি বুঝলাম না। পেছন দিকে তাকালাম। দেখলাম একজন জীপের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলাম তাকে লক্ষ্য করেই শব্দ দু’টি বলা হয়েছে। এই লোকটি চারজনের একজন যারা আপনার সাথে সংঘর্ষে এই মাত্র মারা গেল।’
একটু থামল হান্নাহ হাগেরা।
আহমদ মুসা উন্মুখ হয়ে উঠেছে। বলল, ‘শব্দ দু’টি কি মিস হান্নাহ হাগেরা?’
‘শব্দ দু’টি এই রকম: ডেকেল কারমেল।’
শব্দ দু’টি শুনে একটু ভাবল। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। বলল দ্রুত কণ্ঠে, ইস্তাম্বুলে ‘পাম ট্রি গার্ডেন’ নামে কোন বাগান বা ‘পাম ট্রি গার্ডেন’ নামে কোন এলাকা আছে?’
ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরা কথা বলল না তৎক্ষণাত। ভাবছিল তারা। একটু পর বলল, ‘না, এ নামের কোন বাগান বা স্থানের নাম আমরা শুনিনি।’
আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করে দ্রুত একটা কল করল।
ওপারের সাড়া পেয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘আমি খালেদ খাকান, জেনারেল মি. মোস্তফা, ইস্তাম্বুলে ‘পাম ট্রি গার্ডেন’ বা ‘পাম গার্ডেন’ এলাকা বলে কিছু আছে?’
‘না, মি. খালেদ, এমন নামের স্থান বা গার্ডেন ইস্তাম্বুলে নেই। আপনি কোথায়?’
‘আমি ঐ ঠিকানা থেকে কথা বলছি। এখান থেকে ওরা পালিয়েছে। আমার মনে হয় ‘পাম গার্ডেন’ নামের কোথাও পালিয়েছে। আপনি কোথায়?’
‘এখনও হাসপাতালে। পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন তোমার ওখানে রওয়ানা দিয়েছে।’ বলল ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফা।
‘এখন আর ওঁদের আসার প্রয়োজন ছিল না। যাক, শুনুন, আপনার পাশে কি কম্পিউটার আছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, আছে। কেন বলছেন? কি করতে হবে?’ বলল জেনারেল মোস্তফা ওপার থেকে।
‘আপনি দয়া করে ইন্টারনেটে ইস্তাম্বুল ফাইলে ‘পাম ট্রি গার্ডেন’ অথবা ‘ডেকেল কারমেল’ নামে কিছু পান কিনা দেখুন। আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষা করছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি খালেদ খাকান। দেখছি আমি। ধন্যবাদ। সালাম।’
ওপার থেকে মোবাইল অফ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা হাত নিচে নামাল। কিন্তু মোবাইলটা হাতেই রাখল।
ডেভিড হারজেল ও হান্নাহ হাগেরা আহমদ মুসার দিকে তাকিয়েছিল। তাদের চোখে-মুখে প্রশ্ন। মোবাইলে কথা দু’একটা তাদেরও কানে গেছে। বলল ডেভিড হারজেল আহমদ মুসা তাদের দিকে ঘুরে তাকাতেই, ‘তাহলে ডেকেল কারমেল অর্থ কি পাম ট্রি গার্ডেন?’
‘হ্যাঁ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটা তো হিব্রু শব্দ!’ জিজ্ঞাসা ডেভিড হারজেলের।
‘হ্যাঁ, হিব্রু শব্দ!’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু এর অর্থ আমি ইহুদি হয়েও জানি না। আপনি জানলেন কি করে?’ বলল ডেভিড হারজেল।
‘ইসরাইল একটা মৃত ভাষাকে জীবিত করছে তো, তাই এর প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ আছে আমার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘জেনারেল মোস্তফা কে, মি. খালেদ খাকান?’ বলল হান্নাহ হাগেরা। তার চোখে-মুখে বিস্ময়!
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘উনি তুরস্কের নিরাপত্তা-গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাজী জেনারেল মোস্তফা কামাল।’
‘তাহলে তো মনে হয়, আপনি তার চেয়ে বড়। তুরস্কের নিরাপত্তা গোয়েন্দাপ্রধানকে যিনি নির্দেশ দিতে পারেন তিনি তো নিশ্চয় অসম্ভব বড় হবেন। আপনি যেটুকু পরিচয় দিয়েছেন, তার সাথে আপনার কাজ মেলে না।’ হান্নাহ হাগেরা বলল।
‘বড় হবার প্রয়োজন হয় না। বন্ধুস্থানীয় যারা, তাদের নির্দেশ দেয়া যায়, এমনকি অবস্থা বিশেষে যে কেউ যে কাউকে নির্দেশ দিতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল ডেভিড হারজেল। তখন মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
থেমে গেল ডেভিড হারজেল।
আহমদ মুসা মোবাইল উঠিয়ে নিয়ে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফা বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, মি. খালেদ খাকান। আপনার চেষ্টা সফল। ‘পাম ট্রি গার্ডেন’- এর সন্ধান পাওয়া গেছে। ওটা একটা বাসা-কাম-ল্যাবরেটরি।’
‘কার বাসা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ইস্তাম্বুলের ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির স্কুল অব এ্যাডভান্স ফিজিক্স-এর রিটায়ার্ড প্রফেসর আবু আবদুর রহমান আরিয়েহর বাড়ি। তার ব্যক্তিগত ল্যাবরেটরি রয়েছে ঐ বাড়িতে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘তার পরিচয় সম্পর্কে আপনি কত দূর জানেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘তিনি পার্টিকেল ফিজিক্সের একজন প্রতিভাবান প্রফেসর। লেবাননে জন্ম। লেখাপড়া শেষে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে এসে তুরস্কেই থেকে গেছেন। রিটায়ার করার পর অধিকাংশ সময়ই ইউরোপে কাটান। ক’দিন আগে তিনি জার্মানিতে গিয়েছিলেন। ফিরেও এসেছেন সম্ভবত।’
বলে একটু থামল জেনারেল মোস্তফা। তারপর বলল, ‘তার সম্পর্কে এত কথা কেন? পাম গার্ডেনেরই বা খোঁজ করছেন কেন?’
‘সব বলব। আপনি অবিলম্বে সাদা পোশাকের পুলিশ দিয়ে বাড়ির গোটা কমপ্লেক্স ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা করুন। বাড়ি থেকে কেউ বেরুলে তাকে গোপনে আটকে রাখার ব্যবস্থা করুন। আমি ওখানে যাচ্ছি। বাড়িটার ঠিকানা বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
বাড়ির নম্বর ও লোকেশন আহমদ মুসাকে জানিয়ে জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেনকেও আমি জানাচ্ছি। আমিও যাচ্ছি ওখানে। আমার অনুমান মিথ্যা না হলে আপনি সন্দেহ করছেন প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে নিয়ে ওখানেই রাখা হয়েছে। একটা কথা মি. খালে খাকান, আপনাকে অসুস্থ মনে হচ্ছে। আপনি ঠিক আছেন তো?’
‘কেমন করে মনে হলো আমি অসুস্থ?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আপনি নিশ্চয় একটা কথা জানেন না, আমি একজন সাউন্ড এ্যানালিস্টও। আপনার কথার প্রতিটা শব্দের মধ্যে সূক্ষ্ণ একটা কম্পন আছে। এই ধরণের কম্পন কোন দৈহিক আঘাত থেকে আসে। আমি ঠিক বলেছি কিনা বলুন।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘হ্যাঁ, জেনারেল মোস্তফা, আমার হাঁটুর একটু ওপরে একটা গুলী আঘাত করেছে। খুব বড় আঘাত নয়। একটা পাশ ঘেঁষে গুলীটা বেরিয়ে গেছে। আমি ভালো আছি, মি. জেনারেল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘গুলী লেগেছে? তাহলে আপনি চলে আসুন, না আমি আসব? আপনার চিকিৎসার পর আমরা ওদিকে এগোবো। আমি বলে দিচ্ছি বাড়িটা ঘিরে রাখবে।’ প্রায় এক নিঃশ্বাসে দ্রুত কণ্ঠে বলল কথাগুলো জেনারেল মোস্তফা।
‘এই তো আপনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এজন্যেই কথাটা গোপন করেছিলাম। আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না। চিকিৎসার যদি কিছু থাকে করেই আমি ওখানে যাচ্ছি। আপনি আসুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, মি. খালেদ খাকান, এ ব্যাপারে আপনার ওপর আমার আস্থা নেই। আপনি আপনার নিজের ওপর অবিচার করেন অথচ সুবিচারের শুরু নিজের হক থেকেই। আল্লাহ এটা চান।’ বলল গম্ভীর কণ্ঠে জেনারেল মোস্তফা।
‘আমি এটা মানি। অবস্থার কারণে ব্যতিক্রম কখনও হতেই পারে। এক্ষেত্রে কনসেশন আল্লাহ দিয়েছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আজ ঐ ধরণের কনসেশন আল্লাহ দেবেন না। আমি রাখছি। আপনি কথা রাখবেন, তারপর ওখানে যাবেন। আমি যাচ্ছি।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসাও মোবাইল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করতেই ডেভিড হারজেল বলল, ‘পাম গার্ডেন পেয়েছেন? কোথায়? ওখানে যাবেন, এখনি?’
‘সন্ধান পেয়েছেন ওনারা। পূর্ব ইস্তাম্বুলের পাহাড় এলাকায়। হ্যাঁ, জনাব, যেতে হবে আমাকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে, যাবেন। আগে চলুন, আপনার আঘাতের শুশ্রূষা দরকার। তারপর যাবেন। দরকার হলে আমিই আপনাকে পৌঁছে দেব।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘ঠিক আছে চলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
সবাই বেরিয়ে এলো বেসমেন্ট থেকে। সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি ওপরে উঠছিল আহমদ মুসা ও হান্নাহ হাগেরা। সামনে ডেভিড হারজেল।
‘আপনার কি ক্রেপ ব্যান্ডেজ আছে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা মেয়েটিকে।
‘আপনি ইস্তাম্বুলে খুব বেশি দিন আগে আসেননি তাহলে?’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘কেন বলছেন এই কথা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘কারণ ইস্তাম্বুলে এটা আইন যে, কলেজ লেভেলের প্রত্যেক মেয়েকে সিভিল ডিফেন্স ও নার্সিং ট্রেনিং এবং হাসপাতালে তিন মাস কাজ এবং এই লেভেলের ছেলেদেরকে তিন মাস সামরিক ট্রেনিং ও তিন মাস সামরিক ক্যাম্পে থাকা বাধ্যতামূলক। এই সাথে প্রতিটি বাড়িতে একটি মিনি মেডিকেল কাউন্টার থাকতে হবে।’ বলল হান্নাহ হাগেরা হাসি মুখে।
উঠে এসেছে তারা দু’তলায়।
ওপরে ওঠার পরেই লাউঞ্জের মতো প্রশস্ত একটা জায়গায় গুচ্ছাকারে সোফা সাজানো।
হান্নাহ হাগেরা আহমদ মুসাকে সোফায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, ‘মেডিকেল জিনিসপত্র সব ঠিকঠাক করে আমি আসছি।’
আহমদ মুসা বসল।
পাশে বসল ডেভিড হারজেলও। ডেভিড হারজেল বসেই আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি বিস্মিত হচ্ছি, মি. খালেদ খাকান। ডেভিড ইয়াহুদের সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়েও আমি তাকে চিনতে পারিনি। আমি বুঝতে পারছি না তার এসব করার পেছনে লক্ষ্য কি, স্বার্থ কি?’
‘ওরা সম্ভবত একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কর্ম চুরি করতে চায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি বিষয়ের গবেষণা কর্ম?’ জিজ্ঞাসা ডেভিড হারজেলের।
‘সম্ভবত পারটিকেল ফিজিক্সের কোন বিষয়ে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘পারটিকেল ফিজিক্সের বিখ্যাত গবেষক প্রফেসর আরিয়েহের তো ড. ডেভিড ইয়াহুদের সাথে সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। সে আবার পারটিকেল ফিজিক্সের কোন্ গবেষণা কর্ম নিয়ে এমন হন্যে হলো? ফিজিক্সের মতো কোন গবেষণা কর্ম নিয়ে তার তো আগ্রহী হওয়ার কথা নয়!’ বলল ডেভিড হারজেল।
আহমদ মুসা বিস্মিত হলো প্রফেসর আরিয়েহের নাম শুনে। এই প্রফেসর আরিয়েহ নিশ্চয় প্রফেসর আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ। উনিও তো পারটিকেল ফিজিক্সের প্রফেসর। বলল আহমদ মুসা, ‘মি. ডেভিড হারজেল, আপনি কি প্রফেসর আরিয়েহকে চেনেন?’
‘আগে প্রায়ই দেখা হতো। এখনও সিনাগগে মাঝে মাঝে দেখা হয়। লোকটা খুব গুণী লোক। বিজ্ঞানের জগত ছাড়া তাঁর আর কোন জগত নেই।’ বলল ডেভিড হারজেল।
‘উনি থাকেন কোথায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আগে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে থাকতেন, এখন কোথায় থাকে জানি না।’ ডেভিড হারজেল বলল।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো ডেভিড হারজেল সব কথাই সত্য বলেছেন। আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ কোথায় থাকেন জানলে তিনি পাম গার্ডেনও চিনতে পারতেন। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ সিনাগগে যান কেন? তাহলে কি…? মনে সন্দেহটি উঁকি দিতেই আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘মি. ডেভিড হারজেল, বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ সিনাগগে যান কেন?’
হাসল ডেভিড হারজেল। বলল, ‘আপনি কি তাকে মুসলিম মনে করেছেন? সে একজন সক্রিয় ইহুদি।’
‘তাহলে নামটা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এমন নাম আপনি প্রচুর দেখবেন। অনেক রকম সুবিধা লাভের জন্যে স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় অনেক ইহুদিই, বিশেষ করে রাজনৈতিক চিন্তায় নাম পাল্টায়। তাঁর নামও ঐভাবে পাল্টানো হয়েছে।’ বলল ডেভিড হারজেল।
‘ডেভিড ইয়াহুদের মতো কোন গোপন সংগঠনের সাথে কি তিনি জড়িত?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘তা আমি জানি না। তিনি নিরেট একজন গবেষক। তবে আমাদের ইহুদিদের মধ্যে যারা চরমপন্থী তাদের সাথেই তার ওঠাবসা।’ বলল ডেভিড হারজেল।
‘এ চরমপন্থীরা কারা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘এ ব্যাপারে আমার স্বচ্ছ ধারণা নেই। তবে আমি যেটা বুঝেছি তাতে ইহুদিবাদকে আধিপত্যের এক অস্ত্র হিসেবে যারা দেখতে চায়, প্রফেসর আরিয়েহ তাদের সাথে একমত।’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক এ সময় হান্নাহ হাগেরা এসে দাঁড়িয়েছিল। বলল, ‘সব ঠিক ঠাক, আসুন, মি. খালেদ খাকান।’
বলেই হান্নাহ হাগেরা চলতে শুরু ককরল। আহমদ মুসাও তার পিছু পিছু চলল।
লাউঞ্জ থেকে এক করিডোর ধরে সামনে এগিয়ে শেষ প্রান্তের একটা রুম বাড়ির মেডিকেল কর্নার।
মোটামুটি বড়-সড় ঘর। দু’টি বেড। বসার জন্যে কয়েকটি সোফা ও চেয়ার। একটা উঁচু লম্বা টেবিল, ঠিক অপারেশন টেবিলের মতো। স্টিলের ফ্রেমে একটা কাচের আলমারি। তাতে ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।
ঘরটিতে আয়োডিনের গন্ধ হাসপাতালের মতোই।
আহমদ মুসা দেখল, ছোটখাট অপারেশনের মতোই ব্যান্ডেজ ও অন্যান্য সরঞ্জাম একটা ছোট টেবিলে সাজানো। অনুরূপ আরেকটা টেবিলে পানির গামলা। ঘরের অন্য পাশে রয়েছে একটা পানির বেসিন।
সব দেখে আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে হান্নাহ হাগেরার দিকে চাইতেই সে বলল, ‘আপনি টেবিলে উঠে শুয়ে পড়ুন। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
আহমদ মুসার মুখে বিব্রত ভাব ফুটে উঠল। নিজের উরুর ব্যান্ডেজ সে নিজেই করতে চায়। বলল সে, ‘ধন্যবাদ, মিস হান্নাহ হাগেরা, ছোট শুশ্রুষা ও ব্যান্ডেজের কাজটা আমিই করে নিতে পারব।’
হান্নাহ হাগেরা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে বিস্ময়! বলল, ‘আপনি একা কিভাবে করবেন? কেন করবেন? বলেছি তো এর ওপর আমার ট্রেনিং আছে।’
‘স্যরি, নিজের যে কাজটা নিজে করতে পারা যায়, সে কাজটা আপনিও নিশ্চয় অন্য কাউকে দেবেন না করতে।’ বলে হাসল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে চাইল হান্নাহ হাগেরা। ঠোঁটে ফুলে উঠল এক টুকরো হাসি। বলল, ‘নিজে করার মতো কাজ এটা নয়, বিশেষ করে সাহায্যকারী যখন থাকে। আমি বুঝেছি, আপনি একটু গোঁড়া মুসলমান। তাই…।’
‘না, আমি গোঁড়া মুসলমান নই। ‘মুসলিম’ শব্দের আগে গোঁড়া, অগোঁড়া বিশেষণ লাগানো যথার্থ নয়।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
‘কেন, যারা ধর্মীয় অণুশাসন মানার নামে বাড়াবাড়ি করে, তাদেরই তো গোঁড়া বলা হয়?’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধর্মীয় অনুশাসন মানার নামে যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে, তাহলে সেটা ধর্মীয় আদর্শ ও অনুশাসনের পরিপন্থী কাজ। এটাকে গোঁড়ামি বলা যায় না। গোঁড়ামি অর্থে সাধারণত যারা ধর্মীয় আদর্শ ও অনুশাসন পুরোপুরি মানতে চেষ্টা করে তাদেরকে বুঝানো হয়। কিন্তু ‘গোঁড়ামি’ শব্দের ব্যবহার এক্ষেত্রে যথার্থ নয়। এখানে ‘গোঁড়ামি’র বদলে ‘একনিষ্ঠ’ বা ‘নিষ্ঠাবান’ শব্দের ব্যবহার যথোপযুক্ত। কারণ ধর্মীয় আদর্শ ও অনুশাসন পুরোপুরি মেনে চলতে চেষ্টা করা ভালো জিনিস, কিন্তু ‘গোঁড়ামি’ শব্দ থেকে এই ভালো অর্থ বুঝায় না।’
‘তার মানে আপনি ধর্মের নিষ্ঠাবান অনুসারি। ধন্যবাদ আপনাকে।’
বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছনের ওয়াল হ্যাংগারে এক সেট পোশাক দেখিয়ে বলল, ‘ব্যান্ডেজ শেষে আপনি এ পোশাক পরে নেবেন। পরনের জামা-কাপড় আপনার নষ্ট হয়ে গেছে। আর হ্যাঁ, বিদ্যুৎ অপারেটরের চেহারাটাও এই সুযোগে পাল্টে নেবেন।’ হান্নাহ হাগেরার মুখে হাসি।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো হান্নাহ হাগেরা।
হান্নাহ হাগেরাকে দেখেই ডেভিড হারজেল বলল, ‘কি ব্যাপার, তুমি চলে এলে?’
‘বাবা, উনি একাই নিজের ট্রিটমেন্ট করবেন।’ বলল হান্নাহ হাগেরা। তার ঠোঁটে হাসি।
‘উনি তাই বললেন? আশ্চর্য মানুষ!’ ডেভিড হারজেল বলল।
‘সব দিক দিয়েই আশ্চর্য মানুষ বাবা তিনি! তবে গত আধা ঘন্টায় তাঁর যে পরিচয় মিলেছে তাতে ‘আশ্চর্য’ বিশেষণ তাঁর জন্যে যথেষ্ট নয়। যিনি তুরস্কের সিকউরিটি চীফ জেনারেল মোস্তফাকে ডিকটেট করতে পারেন তাঁর পরিচয় কি হতে পারে বাবা ভেবে দেখ।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘হ্যাঁ, দেখছি ডেভিড ইয়াহুদরা তো কম নয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যে নামবে সে তো ওদের থেকে বড়ই হবে।’ ডেভিড হারজেল বলল।
‘কিন্তু বাবা, বুঝতে পারছি না, ডেভিড ইয়াহুদ আংকেলরা কাজটা কি করছেন? বিজ্ঞানীকে ধরে রাখতে পারেননি, বাগে পেয়ে অসুস্থ বিচারপতিকেই পণবন্দী বানিয়েছেন। এতটা মরিয়া কেন ওরা? কি কারণে?’
ভাবনায় কপাল কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল ডেভিড হারজেলের। ধীরে ধীরে বলল, ‘সব কথা আমি খালেদ খাকানকে বলিনি। ডেভিড ইয়াহুদের সন্ত্রাসী কাজ-কর্মের দিকটা আমি একেবারেই জানি না, কিন্তু তাদের ধ্বংসকারী গবেষণা কর্মের দিকটা আমি কিছু জানি। একদিন সিনাগগে নিরিবিলি আলাপকালে বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ বলেছিলেন, ‘দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় আসতে দেরি নেই। মানুষ পরমাণুকে নিজের ইচ্ছার অধীন করে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র বানিয়েছে, তেমনি আলোর পরমাণু ফোটন পারটিকেলকে দাস বানিয়ে দুনিয়ার সব শক্তির সব সমরস্ত্রকে অদৃশ্য এক অস্ত্র দ্বারা নিরব ধ্বংসের শিকারে পরিণত করব।’ আমি বিস্মিত কণ্ঠে বলেছিলাম, ‘এমন অস্ত্রের কল্পনা কি বাস্তব?’ উত্তরে তিনি বলেছিন, ‘বলতে পারেন সাফল্য থেকে মাত্র আমরা এক গজ দূরে।’
বলে একটু থামল ডেভিড হারজেল। পর মুহূর্তেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু বুঝতে পারছি না, তাদের কথা সত্য হলে তারা তো ভয়ংকর অস্ত্র আবিষ্কার করছে, তাহলে তারা অন্য একজন বিজ্ঞানীর গবেষণা নিয়ে এমন মরিয়া হয়ে উঠল কেন?’
‘বাবা, বিজ্ঞানী বিজ্ঞানীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়। এও হয়তো তেমনি একটা ব্যাপার। কিন্তু বাবা, আমি ভাবছি অন্য কথা, ডেভিড ইয়াহুদ আংকেল এমন ভয়ংকর অস্ত্র তৈরী করছেন কেন, কার স্বার্থে? কোন রাষ্ট্রের তারা কেউ নন, মালিকও তারা কোন রাষ্ট্রের নন, তাহলে দুনিয়ার সব অস্ত্রাগার ধ্বংস করে তারা কি করবেন?’ বলল হান্নাহ হাগেরা। তার কণ্ঠে বিস্ময়!
‘এর উত্তর আমিও জানি না, মা। ডেভিড ইয়াহুদ ও আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ দু’জনেই তুরস্কের নাগরিক। কিন্তু তুরস্কের পক্ষে তারা কাজ করছে না, এ কথা পরিস্কার। আবু আবদুর রহমান আরিয়েহের কথাবার্তায় যে ইংগিত পেয়েছি, তাতে বুঝা যায় তারা জায়নবাদী কোন চক্রান্ত বা পশ্চিমী কোন পাওয়ার সিন্ডিকেটের পক্ষে কাজ করছে। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তা হবে সাংঘাতিক বিপজ্জনক।’ বলল ডেভিড হারজেল। তার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার কালো ছাপ।
হান্নাহ হাগেরার চোখে-মুখেও আশংকার ছাপ। বলল, ‘ব্যাপারটা আমার কাছে সিরিয়াস মনে হয়নি। কিন্তু এখন আপনার শেষ কথাগুলো শুনে আমি আতংকিত বোধ করছি। এতো পৃথিবীর বিরুদ্ধে, পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধে একটা ভয়াবহ ষড়যন্ত্র। আমি ভেবে পাচ্ছি না আমাদের তুরস্ক এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের স্থান হয়ে দাঁড়াল কেমন করে?’
দু’জনই সোফায় বসে আলোচনায় তন্ময় হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা পেছনে এসে গিয়েছিল।
হান্নাহ হাগেরার কথার জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল ডেভিড হারজেল। কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসা বলল, ‘স্যরি মিস হান্নাহ, তুরস্ক কেন ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের স্থান হয়ে দাঁড়াল?’
হান্নাহ হাগেরা বসে থেকেই পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, আহমদ মুসা একদম তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে নতুন প্যান্ট ও শার্ট। আগের জ্যাকেটটাও তার গায়ে আছে।
হান্নাহ হাগেরা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বসুন, বলছি আপনার উত্তর।’
আহমদ মুসা বসতে বসতে বলল, ‘আমাকে এখনি ছুটতে হবে।’
‘হ্যাঁ, যে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করছিলেন। কি সব ভয়ংকর অস্ত্র নাকি আবিষ্কৃত হয়েছে! ফোটন পারটিকেল ব্যবহার করে নাকি দুনিয়ার সব মারণাস্ত্র তার অস্ত্রাগারেই নিরবে ও পলকের মধ্যে ধ্বংস করার অস্ত্র আবিষ্কার করেছে এক ব্যক্তি বা একটি সংঘ এবং এই আবিষ্কারের গবেষণা নাকি তুরস্কেই হয়েছে! এই ভয়ংকর খবরের কথাই বলছিলাম।’
চমকে উঠল না আহমদ মুসা। কিন্তু বিস্মিত হলো এই ভেবে যে, তাহলে ডেভিড ইয়াহুদরা আমাদের আইআরটি ফোটনের গামা পারটিকেল থেকে সোর্ড (SOWRD-Saviour of world Rational Domain) আবিষ্কার করেছে, সে খবর এঁদের কানে পর্যন্তও পৌঁছে গেছে! তবু স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা হিসেবেই বলল, ‘এমন সাংঘাতিক খবর আপনারা কোথা থেকে পেলেন?’
হান্নাহ হাগেরা তার পিতার দিকে চাইল।
ডেভিড হারজেল একটু নড়ে বসল। একটা অস্পষ্ট চিন্তার রেখা তার মুখে ছায়া ফেলেছিল। বলল, ‘ডেভিড ইয়াহুদ বলেছিল, তারা নাকি এ ধরণের ভয়ংকর গবেষণা করছে। সাফল্য থেকে তারা নাকি মাত্র এক গজ দূরে! এই গল্পটাই আমি হান্নাহর কাছে করছিলাম।’
হাসল আহমদ মুসা। মনে মনেই বলল, তারা তো গবেষণা করছে না, গবেষণার ফল তারা হাইজ্যাক করতে চাচ্ছে। কিন্তু তা মারণাস্ত্র নয়, মারণাস্ত্র থেকে রক্ষার অস্ত্র। তবে এসব মনের কথা না বলে আহমদ মুসা বলল, ‘মারাত্মক খবর! কিন্তু তারা কি ঐ ভয়ংকর অস্ত্র পাওয়া থেকে এক গজ দূরে! না গবেষণার সাফল্য থেকে এক গজ দূরে!’
‘হ্যাঁ, গবেষণার সাফল্য থেকে তারা মাত্র এক গজ দূরে, এই কথাই তারা বলছেন।’ বলল ডেভিড হারজেল।
আহমদ মুসা এবার একটু বিস্মিতই হলো! ডেভিড ইয়াহুদরা তো আমাদের আইআরটি থেকে সফল অস্ত্র ‘সোর্ড’ হাইজ্যাক করতে চাচ্ছে! তাছাড়া এটা তো মারণাস্ত্র নয়, মারণাস্ত্রকে অচল করার অস্ত্র। আর এ অস্ত্র তো কোন অস্ত্রাগারে গিয়ে তা ধ্বংস করবে না। তাহলে অমন কথা ডেভিড ইয়াহুদ বলল কেন? এসব কথা আহমদ মুসার মনে নতুন করে জাগল। কিন্তু কোন সমাধান পেল না।
আহমদ মুসার চিন্তা আবার ঘুরে গেল বন্দী, অসুস্থ প্রধান বিচারপতির দিকে। আহমদ মুসার দেহটা সোজা হয়ে এ্যাটেনশনের রূপ নিল। বৃদ্ধ ডেভিড হারজেলকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আমি এখন উঠতে চাই স্যার, অনেক ধন্যবাদ।’
কথা শেষ করেই চাইল আহমদ মুসা হান্নাহ হাগেরার দিকে। তার রক্তাক্ত কাপড়ের প্যাকেটটা পাশ থেকে হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘এটা আমি বাইরের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যাব। নতুন এক প্রস্থ কাপড়ের জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কাপড়গুলো ফেরত পাঠানো শোভন হবে না। আপনি এমন অবস্থায় পড়লে কি করতেন বলুন তো?’
হাসল হান্নাহ হাগেরা। বলল, ‘আমি বলতে পারি যদি আপনি আমাকে কপি না করার প্রতিশ্রুতি দেন।’
‘এভাবে কপি সাধারণত আমি করি না। সুতরাং আপনি বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি নতুন আর এক প্রস্থ কাপড় তার জন্যে পাঠিয়ে ঋণটা শোধ করতাম।’ বলে হাসতে লাগল হান্নাহ হাগেরা।
‘আমার মনের কথাই আপনি…?’
আহমদ মুসাকে কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠল হান্নাহ হাগেরা, ‘আপনি আপনার মনের কথার দোহাই দিয়ে এখন প্রতিশ্রুতি উল্টালে চলবে না। আপনি আমাকে কপি করবেন না স্বীকার করে নিয়েছেন।’
‘আপনার মতো আমারও তো ঋণ শোধ করা দরকার, সেটা কিভাবে হবে?’
‘দুনিয়াতে মহাজন-খাতক, দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের বাইরে কোন সম্পর্ক নেই?’ জিজ্ঞাসা হান্নাহ হাগেরার। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘অবশ্যই আছে এবং সে মানবিক সম্পর্কটাই প্রধান।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে তো কথা থাকে না।’ হান্নাহ হাগেরা বলল। তার মুখে হাসি।
‘ধন্যবাদ মিস হান্নাহ। আমি…’
আহমদ মুসাকে আবার বাধা দিয়ে হান্নাহ হাগেরা বলে উঠল, ‘এ ধরণের ‘ধন্যবাদ’ সাধারণত সম্পর্কের ইতি ঘটানোর সমার্থক। কিন্তু গত ১ ঘন্টায় এমন এক মহাঘটনার সাথে আমাদের জড়িয়েছেন, যা ইচ্ছা করলেই আমরা ভুলে যেতে পারবো না। এ ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে আমরা কিছু আশা করি।’
আহমদ মুসার মুখে ভাবনার একটা ছায়া নামল। বলল, ‘সব ধন্যবাদ বিদায়ের নয়, মিস হান্নাহ। ঘটনার ব্যাপারে মিস হান্নাহ যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটা আমার জন্যে আরও আনন্দের। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, আরও সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। ওয়েল মিস হান্নাহ, আমি আপনাদের সাহায্য চাই।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল মিস হান্নাহ ও ডেভিড হারজেলও। ডেভিড হারজেল বলল, ‘অবশ্যই, ইয়ংম্যান! সাহায্য করার যদি কিছু থাকে, অবশ্যই পাবে।’
‘ধন্যবাদ আপনাদের, আমি চলি।’ বলল আহমদ মুসা।
হান্নাহ হাগেরা আহমদ মুসা দিকে এগিয়ে এল। আহমদ মুসার হাত থেকে রক্তাক্ত জামা-কাপড়ের প্যাকেট নিয়ে বলল, ‘ট্রাসে আমিও ফেলে দিতে পারব। চলুন, আপনাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিই।’
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠলে হান্নাহ হাগেরা বলল, ‘আমরা তুরস্কের কোন কাজে লাগলে খুশি হবো। সত্যি, আপনার সাথের এক ঘন্টা আমার কাছে এক হাজার বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে!’
আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল। ‘আসি, মিস হান্নাহ, প্রার্থনা করুন বিপদটা তাড়াতাড়ি যেন কেটে যায়! ওকে, বাই!’ বলল আহমদ মুসা।
হান্নাহ হাগেরা বলতে চাইল, ‘বিপদ তাড়াতাড়ি শেষ হলে তো আপনি হাওয়া হয়ে যাবেন!’ কিন্তু বলল সে, ‘ঈশ্বর আমাদের ওপর সদয় হোন! আসুন স্যার। বাই!’
হান্নাহ হাগেরা ফিরে এলো তার পিতার কাছে। পিতার পাশে বসেই বলল, ‘বাবা, বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান আরিয়েহই যে তোমাকে ঐ আবিষ্কারের কথা বলেছেন, সেটা গোপন করলে কেন? তিনিই তো আবিষ্কারের কথা বলেছিলেন! তাঁর নাম না বলে ড. ইয়াহুদের নাম বললে কেন?’
বৃদ্ধ ডেভিড হারজেল একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকাল হান্নাহ হাগেরার দিকে। ধীর কণ্ঠে বলল, ‘সব সময় সব কথা বলতে নেই। আমি তাদের সাথে একমত নই বটে, কিন্তু আমি বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমানকে ঝামেলায় জড়াতে চাইনি। তিনি একজন গুণী, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ।’
‘কিন্তু বাবা, তিনি তো ঝঞ্ঝাট বাঁধানোর অস্ত্র তৈরী করছেন।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘তা করছেন। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি কোন বিশেষ গরজে এটা নাও করতে পারেন। বিজ্ঞানীরা কোন সিংহাসনে বসতে চান না। যারা বসতে চান, তারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করেন।’ ডেভিড হারজেল বলল।
‘কিন্তু বাবা, তুমি যা বলেছ, তাতেই তো দেখা যাচ্ছে যে, তিনিই দুনিয়াকে দাস বানানোর কথা বলছেন। তার মানে তিনি অস্ত্রের জোরে দুনিয়াকে দাস বানাতে চান।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘তিনি চান, একথা ঠিক নয়। তিনি হয়তো জায়নবাদীদের কোন রাজনৈতিক অভিলাষের শিকার হয়েছেন।’ ডেভিড হারজেল বলল।
‘এই জায়নবাদীরা কারা, বাবা? শুনেছি, জার্মানিতে নিরীহ ইহুদিরা যে মার খেল তার পেছনে ছিল এই জায়নবাদীদের হাত। তারা কারা? এখন তারা কি চাচ্ছে?’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘এসব বিষয় নিয়ে তুমি মাথা ঘামিয়ো না হান্নাহ। ওরা বিপজ্জনক। শুধু সেদিন জার্মানিতো নয়, এখনও দুনিয়া জুড়ে নিরীহ ইহুদিরা তাদের হাতে মার খাচ্ছে। এরা ওদের চাঁদা দিয়ে চলার অসহায় গর্দভ মাত্র। কিছু বলে লাভ নেই।’ বলল ডেভিড হারজেল। তার চোখে-মুখে বেদনার প্রকাশ।
‘তাহলে কি ওদের ভয়ে তুমি বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমানের নাম খালেদ খাকানের কাছে বলনি?’ জিজ্ঞাসা হান্নাহ হাগেরার।
‘না, মা। ভয়ে নয়, সমবেদনায়। বিজ্ঞানী লোকটাকে আমার কাছে নিরীহ বলে মনে হয়। ভয় করলে ডেভিড ইয়াহুদের নাম বলতাম না।’ বলল ডেভিড হারজেল।
‘তাহলে আমাকে ভয় করতে বলছ কেন? জিজ্ঞাসা আবারো হান্নাহ হাগেরার।’
‘ভয় না করলেও আমার কিছু করার ক্ষমতা, সময় কোনটাই নেই। কিন্তু তুমি ভয় করলে অনেক কিছু করার সময় ও সুযোগ তোমার আছে। আমি চাই না এ পথ তুমি মাড়াও। এই পথকে ভয়ের চোখে দেখাই নিরাপদ।’ ডেভিড হারজেল বলল। গম্ভীর হয়ে উঠেছিল কণ্ঠ তার।
সংগে সংগেই কোন উত্তর দিল না হান্নাহ হাগেরা। গাঢ় একটা ভাবনার ছায়া তার চোখে-মুখেও। এক সময় বলল হান্নাহ হাগেরা অনেকটা স্বগত কণ্ঠেই, ‘ঠিক আছে, বাবা, কিন্তু এ অব্যাহত ষড়যন্ত্রের প্রতিরোধ করবে কে?’
‘আমি জানি না, মা। হয়তো খালেদ খাকানরাই।’ বলেই উঠে দাঁড়াল ডেভিড হারজেল।
হান্নাহ হাগেরার ভাবনা-কাতর চোখে-মুখে এক টুকরো প্রশান্তির আলো জ্বলে উঠলো খালেদ খাকানের নাম শুনে।
সোফায় গা এলিয়ে দিল হান্নাহ হাগেরা।

গাড়ি বারান্দায় গিয়ে গাড়ি থামতেই ডেভিড ইয়াহুদ লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল।
দ্রুত বারান্দার তিনটি ধাপ পেরিয়ে বারান্দায় উঠে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ।
আবু আবদুর রহমান আরিয়েহের চোখে-মুখে উত্তেজনা। সে দাঁড়িয়েছিল যেন ডেভিড ইয়াহুদের অপেক্ষায়!
ডেভিড ইয়াহুদ বারান্দায় উঠে আসতেই তার সাথে হ্যান্ডশেক করে আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ তাকে টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
পাশাপাশি সোফায় বসেই আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ বলল, ‘আপনারা এ কি করলেন? এ বিপজ্জনক বন্দীকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?’
‘করার কিছুই ছিল না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বন্দীকে আমরা তুলেছিলাম ডেভিড হারজেলের ওখানে। আমাদের একটা ভুলের জন্যে ঐ ঠিকানাটা প্রতিপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে সন্দেহ করেই দ্রুত ওখান থেকে সরে আসতে হয়েছে।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘ঐভাবে এ ঠিকানাও শত্রুপক্ষের জানা হয়ে যেতে পারে। এ সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি।’ আবু আবদুর রহমান আরিয়েহ বলল।
‘ঠিক হয়নি এটা আমি জানি। এই সেনসেটিভ ঠিকানার ওপর কারও কোন প্রকার সন্দেহের দৃষ্টি না পড়ে এই সার্বিক প্রচেষ্টা আমাদের রয়েছে। এখন কি করা যায় বলুন।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘আমরা যে গবেষণার কাজ এখানে করছি, তার অগ্রাধিকার সবার ওপরে। যে কোন মূল্যে এর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। আমি মনে করি, বন্দীকে অবিলম্বে অন্য কোথাও শিফ্‌ট করুন।’ বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান বলল।
‘কিন্তু ইস্তাম্বুলে নিরাপদ কোন আশ্রয় আমাদের আর নেই। এখানে বন্দীকে রাখা ঠিক হবে না, এ বিষয়ে আমিও একমত। তাহলে কি করা যায় বলুন?’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘আপনারা প্রধান বিচারপতিকে কেন বন্দী করেছেন, বলুন তো?’ জিজ্ঞাসা বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমানের।
‘বিজ্ঞানী হাতছাড়া হয়ে যাবার পর সুযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তাকে পণবন্দী করা হয়েছে চাপ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানেীকে ফেরত পাওয়া বা অন্য কোন সুবিধা লাভের ক্ষীণ আশায়।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘আপনাদের সিদ্ধান্ত ঠিকই তাৎক্ষণিক, সুচিন্তিত নয়। কারণ প্রধান বিচারপতির বিনিময়ে তারা বিজ্ঞানীকে আমাদের হাতে তুলে দেবে না। প্রধান বিচারপতিকেই উদ্ধারের জন্যে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। প্রধান বিচারপতিকে বন্দী করে রাখার মধ্যে কোন লাভ নেই, ষোল আনাই ক্ষতির আশংকা।’ বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান বলল।
‘আপনার পরামর্শ কি তাহলে?’ জিজ্ঞাসা ডেভিড ইয়াহুদের।
চোখ বন্ধ করে এক মুহুর্ত ভেবে বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান বলল, ‘তাকে ছেড়ে দিয়ে আসাই সব দিক থেকে মঙ্গল। প্রধান বিচারপতিকে পেলে ওদের অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রক্ষা পেয়ে যাবে এবং নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়ে আমরা নতুন উদ্যোগে কিছু করার সুযোগ পাব।’
ডেভিড ইয়াহুদ একটু ভেবে বলল, ‘আপনার যুক্তিই ঠিক মি. আরিয়েহ। তাহলে ওদের আমি বলে দিই ওরা তাকে রাস্তার পাশে কোন এক জায়গায় ফেলে রেখে আসবে।’
‘উনি কি অবস্থায় আছেন?’ জিজ্ঞাসা বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমানের।
‘উনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আছেন। আগে চোখ বাঁধা ছিল, এখন বাঁধা নেই।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘ঠিক আছে, যেভাবে বলেছেন সেটাই করুন। আপদ বিদায় হোক!’ বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান বলল।
‘আসছি আমি, বলে আসি ওদের।’
বলে ডেভিড ইয়াহুদ দ্রুত উঠে গেল।
দু’মিনিট পরে ফিরে এলো ডেভিড ইয়াহুদ। বলল, ‘ওদের পাঠিয়ে দিয়েছি। সাবধানে কাজটা সারতে বলেছি।’
ডেভিড ইয়াহুদ বসল বিজ্ঞানী আবু আবদুর রহমান আরিয়েহর পাশে।
‘এটাই ভালো হলো, ড. ডেভিড ইয়াহুদ! আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। নিশ্চিত লাভ ছাড়া ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ানোর কোন দরকার নেই।’ বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ বলল।
সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছিল ডেভিড ইয়াহুদ। সোজা হয়ে বসল। তার সারা মুখ জুড়ে হতাশার ছাপ। বলল ধীরে ধীরে, ‘অনেক দিনের পরিকল্পনার জাল পেতে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে ধরলাম। লাভ হলো না। জাল কেটে বেরিয়ে গেল। এই আহমদ মুসাই অতীতে আমাদের বার বার সর্বনাশ করেছে। এবারের সর্বনাশটাও সে-ই করল। সে দৃশ্যপটে উদিত না হলে সোর্ডের ফর্মুলা, সোর্ডের মডেল সবই এতদিন আমাদের হাতে এসে যেত। হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলো এই শয়তানটা!’
‘হঠাৎ কেন আসবে? ওআইসি ও তুরস্ক সরকার পরিকল্পনা করেই তাকে নিয়ে এসেছে। আহমদ মুসা এখন ইসলামী বিশ্বের শেষ তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, যেখানেই তাদের অনতিক্রম্য ক্রাইসিস, সেখানেই আহমদ মুসাকে হাজির করা হচ্ছে।’ বলল বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ।
‘বুঝতে পারছি না আমি, আমরা এখন কোন্ পথে এগোবো? আমি নতুন করে তেলআবিব ও ই্উরোপ-আমেরিকার আমাদের নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ করেছিলাম, আহমদ মুসাকে মোকাবিলা করতে পারে এমন কাউকে পাঠানোর জন্যে। তারা কোন আশ্বাস দিতে পারেনি। তারা বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে হাতে আনাকেই গুরুত্ব দিয়েছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাকে হাতে এনেও রাখতে পারলাম না। আমি ভাবছি, তাকে কিডন্যাপ করার নতুন উদ্যোগ শুরু করার কোন বিকল্প নেই। একজন ব্যক্তিকে তারা তো বাক্সবন্দী করে রাখতে পারবে না। প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে তাকে হাতে পাওয়ার একটা সুযোগ পাওয়া যাবেই।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। দূর্বল ও বেদনার্ত কণ্ঠ তার।
সোফায় গা হেলান দিয়ে ভাবছিল বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ। তার চোখ দু’টি বোজা ছিল। সে সোজা হয়ে বসল। মাথা নিচু হলো তার। বলল, ‘ফোটন পারটিকেলস’-এর ঝাঁককে একটা স্বয়ংক্রিয় ডিফেনসিভ শিল্ডে পরিণত করা এবং তাকে স্বয়ংক্রিয় ক্যারিয়ারে পরিণত করে বন্দী মারণাস্ত্রকে গভীর মহাশূণ্যে নিয়ে ধ্বংস করার বিজ্ঞান ও টেকনোলজি আমার কাছে এখনও আকাশ কুসুম বলেই মনে হয়। বুঝতেই পারছি না এই অসাধ্য ও কল্পনার একটা বিষয়কে ড. আন্দালুসিরা কিভাবে বাস্তবে পরিণত করল। এতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিফেন্স টেকনোলজি! একে হাত করতে না পারলে তো আমাদের সব আশা-ভরসাই শেষ হয়ে যাবে!’ হতাশ কণ্ঠস্বর বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহর।
‘আমাদের সাফল্য আর কত দূরে ড. আরিয়েহ?’ জিজ্ঞাসা ডেভিড ইয়াহুদের।
‘ল্যাবরেটরি টেস্ট তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। মডেল টেস্টও সফল হয়েছে। অপারেশন শুরুর জন্যে প্রস্তুত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’ বলল ড. আরিয়েহ।
ড. ইয়াহুদের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘রোমেলী দুর্গের ওদের ‘ইনস্টিটউট অব রিসার্চ এন্ড টেকনোলজি’, ওদের সোর্ড, ওদের বিজ্ঞানীরা আমাদের প্রথম টার্গেট হতে পারে না? সবার অলক্ষ্যে ওদের সব চিহ্ন আমরা দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলতে পারি না?’
‘একটা বিকল্প পথ হিসেবে এটা আমাদের সামনে আছে। কিন্তু এর পথে আছে অদৃশ্য দেয়ালের বাধা। ওদের সোর্ডের ডিফেনসিভ শিল্ডের মনিটর যদি সুপার সেনসেটিভ হয় এবং যদি সোর্ডের শিল্ড হাইয়েস্ট পাওয়ার পারটিকেলের হয়, তাহলে আমাদের ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন (Foton Silent Destruction Deomon-FSDD) ধ্বংস করার বদলে সোর্ডের হাতে বন্দী হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমাদের ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন (FSDD) বা ‘ডাবল ডি’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে।’ বলল বিজ্ঞানী আরিয়েহ গম্ভীর কণ্ঠে।
‘কিন্তু তারা যদি অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকে এবং সে সম্ভাবনাই বেশি।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘সেটাও সম্ভাবনার ব্যাপার।’ নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, তারা সব সময় প্রস্তুত থাকে না। থাকারই কথা।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘আর কি বিকল্প আছে?’ বলল হতাশ কণ্ঠে ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘বিকল্প আর কিছু নেই। ওদের বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে কিডন্যাপ করা অথবা মেরে ফেলা অথবা ওদের ধ্বংস করা-এই দুই পথেই আমাদের এগোতে হবে।’ ড. আরিয়েহ বলল।
‘কিন্তু ওদের ধ্বংস করার পথই তো অনিশ্চিত।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘আমি তত্ত্বগত অসুবিধার কথা বলেছি। বাস্তবে সুবিধাও থাকতে পারে, আশংকা সত্য নাও হতে পারে। বিষয়টা আরও বিবেচনা সাপেক্ষ, যা ভাবছি সে রকম অসম্ভব নাও হতে পারে।’ ড. আরিয়েহ বলল।
ড. আরিয়েহর কথা শেষ হবার আগেই ড. ডেভিড ইয়াহুদের টেলিফোন বেজে উঠেছিল।
ড. ইয়াহুদ তার মোবাইল বের করে নিয়েছিল তার পকেট থেকে। ড. আরিয়েহর কথাও তখন শেষ হয়ে যায়।
ড. ইয়াহুদ মোবাইলে ও প্রান্তের সাড়া পেতেই বলে উঠল, ‘কি খবর জোনাহ, কাজ শেষ?’
‘হ্যাঁ, শেষ। তাকে এই মাত্র ওরা তুলে নিয়ে গেছে।’ বলল ওপার থেকে।
‘এত তাড়াতাড়ি? তোমরা ওখানেই?’ এপার থেকে প্রশ্ন ড. ইয়াহুদের।
‘বলছি। আমরা তাকে হাইওয়ের বাঁদিকেই চৌরাস্তার টপ ফ্লাইওভারে ফেলে রেখে চলে এসে আবার রাস্তা ঘুরে ওদিকে গিয়েছিলাম। মানুষের জটলা দেখে আমরা যাচ্ছিলাম ওখানে। পৌঁছতেই দেখলাম একজন তার সংজ্ঞাহীন দেহ গাড়িতে তুলল। গাড়িতে তুলে দরজা বন্ধ করে মোবাইলে কথা বলতে বলতে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দিকে যাচ্ছিল। স্পষ্ট শুনলাম উনি বলছিলেন, ‘জেনারেল, তাকে পাওয়া গেছে মাঝপথেই। প্রয়োজন নেই আর আপনাদের আসার। হাসপাতালে ফিরুন। আমি ওঁকে নিয়ে হাসপাতালে আসছি।’ কথা শেষ করেই গাড়ি নিয়ে উনি ছোটেন সিজলীর দিকে। আমার মনে হয় লোকটি কোন সরকারি লোক হবেন।’
‘লোকটি কেমন? ইউনিফর্মে ছিল?’ জিজ্ঞাসা ড. ইয়াহুদের।
‘না, সিভিল ড্রেসে। একহারা সাধারণ ফিগার। এশীয় চেহারা।’ বলল ওপার থেকে জোনাহ।
‘ঠিক আছে তোমরা চলে এসো। ওকে।’
বলে মোবাইল মুখের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে অফ করে দিল।
মোবাইলের লাউড স্পীকার অন ছিল। মোবাইলের সব কথা ড. আরিয়েহও শুনছিল।
মোবাইল বন্ধ করে ড. ইয়াহুদ কিছু বলার আগেই ড. আরিয়েহ বলে উঠল, ‘মি. ইয়াহুদ, বুঝা যাচ্ছে, যে লোকটি প্রধান বিচারপতিকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেছে সে তাকে উদ্ধার করতেই এদিকে আসছিল এবং জেনারেল মোস্তফারাও আসছিল উদ্ধার অভিযানেই। কিন্তু এদিকে কেন?’
থামল ড. আরিয়েহ। তার চোখে-মুখে উদ্বেগের ছায়া। বলল সে, ‘টেলিফোনে জোনাহ যা বলল তাতে তো বুঝা যাচ্ছে ওরা এদিকেই আসছিল। কিন্তু কেন এদিকে বলা মুস্কিল। এ পথ দিয়ে তো অনেক দিকেই যাওয়া যায়।’
‘তা যাওয়া যায়। এখানেও তো আসা যায়।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘তা আসা যায়। কিন্তু তারা এখানে আসবে কেন?’ বলল ড. ইয়াহুদ।
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু যে উত্তর আমাদের জানা নেই, তা কারও জানা নেই, তা ঠিক নাও হতে পারে। ডেভিড হারজেলের বাড়ির সন্ধান তারা পেয়েছিল, এ কথা আমরা জানি। সুতরাং আমাদের এ ঠিকানার নিরাপত্তা নিয়ে আশংকা আমরা করতেই পারি।’ বলল ড. আরিয়েহ।
ড. ইয়াহুদ কোন উত্তর দিল না। তাকিয়ে ছিল সে ড. আরিয়েহর দিকে। একটু সময় নিয়ে ধীর কণ্ঠে সে বলল, ‘ড. আরিয়েহ, আপনি ঠিক বলেছেন। আহমদ মুসা যেন বাতাস থেকে সব কিছুর গন্ধ পায়! এখন আমাদের করণীয় কি ভাবছেন?’
‘আমি আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছি। এ ঠিকানাও ছেড়ে দিতে হয় কিনা তা আমাদের ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়াল।’ ড. আরিয়েহ বলল।
‘আপনার ভাবনা ঠিক। কিন্তু প্রধান বিচারপতিকে উদ্ধারের পর আমাদের এই ঠিকানা ওদের সন্দেহের তালিকায় আর নেই। কারণ প্রধান বিচারপতিকে তারা পেয়েছে অন্য এক জায়গায়। এর অর্থ এখানে তাকে আনা হয়নি। অতএব, এ ঠিকানার সন্ধান তারা পেলেও এটা এখন তাদের ভুলে যাবার কথা।’ বলল ড. ইয়াহুদ।
‘আপনার যুক্তি ঠিক। প্রধান বিচারপতিকে উদ্ধারের পর আমাদের এ ঠিকানা নিয়ে তাদের ভাববার কথা নয়। এ যুক্তির সাথে আমিও একমত। কিন্তু আশংকা থেকে মুক্ত হতে পারছি না।’ ড. আরিয়েহ বলল।
‘আশংকা থাকা ভালো। আমরা সাবধান হতে পারব। কিন্তু সাবধান থাকার জন্য বেশি কিছু করার দরকার নেই।’ বলল ড. ইয়াহুদ।
‘আপনার কথা ঠিক। কিন্তু আমাদের ‘ডাবল ডি’ মানে ‘ফোটন সাইলেন্স ডেসস্ট্রাকশন ডেমন’ (FSDD) গবেষণার অংশ বিশেষ অন্যত্র আমি সরিয়ে ফেলতে চাই, বিশেষ করে ‘মডেল’ ও ‘টেস্ট’ অংশ অন্যত্র সরিয়ে রাখাই ভালো। শুধু ‘রিসার্চ অংশ এখানে থাকবে।’ ড. আরিয়েহ বলল।
‘কিন্তু এত বড় জায়গা কোথায় পাওয়া যাবে?’ জিজ্ঞাসা ড. ইয়াহুদের।
‘চিন্তা করুন। আমিও চিন্তা করছি। জায়গা অবশ্যই পাওয়া যাবে। ইউরোপ-আমেরিকার দূতাবাস কর্তৃপক্ষ যারা ইস্তাম্বুলে আছেন তারাও আনন্দের সাথে আমাদের সাহায্য করবেন।
‘ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন! আমরা আরও একটু ভাবনা-চিন্তা করি। আপনি যেটা বলেছেন সে রকমই সিদ্ধান্ত হতে পারে, যদি জায়গা পাওয়া যায়। ধন্যবাদ ড. আরিয়েহ আমি উঠি। আমাদের কোথায় কি অবস্থা একটু খোঁজ নিতে হবে।’
উঠে দাঁড়াল ড. ইয়াহুদ।
ড. আরিয়েহও উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে দিল ড. ইয়াহুদের দিকে। বলল, ‘ভাববেন না, ড. ইয়াহুদ, আমরা দুর্বল হইনি। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মারণাস্ত্র এখন আমাদের হাতে এবং এই খবর কেউ জানে না, ইউরোপ-আমেরিকাও নয়। ওরা জানলে পাগল হয়ে যাবে। আমাদের কোন শর্তই ওরা অপূর্ণ রাখবে না। সোর্ড ইউরোপ-আমেরিকার আতংকের কারণ বটে, কিন্তু ‘ডাবল ডি’র খবর জানলে ওদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাবে। অতএব, আমাদের চিন্তার কিছু নেই।’
‘ধন্যবাদ ড. আরিয়েহ। ‘সোর্ড’-এর ফর্মুলা হাত করা এবং সোর্ড ও তার গবেষণা ধ্বংস করার জন্যে ওরা আমাদের সাহায্য করছে। এই সাহায্য আমাদের ও আমাদের ‘ডাবল ডি’র শত্রু ‘সোর্ড’কে ধ্বংস করতে যেমন আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি আমাদের ‘ডাবল ডি’র গবেষণা তৈরিতেও সাহায্য করছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তিনি তাঁর আশীর্বাদ আমাদের ওপর ঢেলে দিয়েছেন।’
কথা শেষ করে ড. আরিয়েহর হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আসি, বাই!’
‘ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন! আসুন।’ বলল ড. আরিয়েহ।

ইস্তাম্বুল সামরিক হাসপাতালের ভিভিআইটি স্যুট।
ইজি চেয়ারে শুয়ে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। তার বাম ও ডান পাশের সোফাগুলোর বাম পাশের একটি সোফায় বসে আছে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সিকউরিটি চীফ জেনারেল মোস্তফা কামাল এবং ডান পাশের পাশাপাশি দু’সোফায় বসে আছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আহমদ আরদোগাল বাবাগলু ও প্রধানমন্ত্রী হোসেইন ইসমাইল সেলিক।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দেখতে এসেছেন বিজ্ঞানী ড. আব্দুল্লাহ আন্দালুসিকে। জেনারেল মোস্তফা কামাল হাসপাতালেই ছিলেন। ভিভিআইপি অতিথিদের তিনিই সাথে করে কক্ষে নিয়ে এসেছেন।
বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি অনেকখানি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তার সুস্থ হেয়ে উঠতে সময় লাগছে। ইলেক্ট্রিক শক তার দেহের কোষগুলোর বিরাট ক্ষতি করেছে। আস্তে আস্তে সেরে উঠছেন। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কুশল বিনিময় ও টুকটাক কথা চলছিল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি এবং প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দু’জনেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছিলেন যে, আল্লাহ শুধু বিজ্ঞানীকে নন, একটা শ্রেষ্ঠ গবেষণাকে তিনি রক্ষা করেছেন।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার, মানবতার পক্ষের একটা গবেষণাকে তিনি সব দিক দিয়েই সাহায্য করেছেন। খালেদ খাকান কে আমি জানি না। তবে তাকে সাক্ষাত ফেরেশতা বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। তিনি আসার পর যা ঘটছে, তিনি যা করছেন এবং আমাদের উদ্ধারের ঘটনা আমি দেখলাম, তাতে তিনি আল্লাহর তরফ থেকে এক জীবন্ত সাহায্য। আপনাদের মোবারকবাদ যে, এমন একজন ব্যক্তিকে আপনারা বাছাই করেছেন।’
‘ড. আন্দালুসি, আপনি যেমন আল্লাহর এক বিশেষ সাহায্য মুসলিম উম্মার জন্যে, তেমনি তিনিও এক সাহায্য। আল্লাহর অসীম দয়ার জন্যে আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
এভাবেই তাদের অনির্দিষ্ট আলোচনা এগিয়ে চলছিল।
প্রেসিডেন্টের পি.এস. এসে প্রবেশ করল।
প্রেসিডেন্টকে কানে কানে কিছু বলে সরে দাঁড়ালো পেছন দিকে।
প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আহমদ মুসা এসেছে। তাকে আসতে বলি?’
‘ইয়েস মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার যদি আপত্তি না থাকে।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন।
‘আমার আপত্তি থাকার কোন প্রশ্নই নেই।’
বলে তাকালেন বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির দিকে। বললেন, ‘মি. খালেদ খাকান আসছেন, ড. আন্দালুসি!’
‘ওয়েলকাম। তার আসার জন্যে কোন অনুমতির দরকার নেই।’ বলল বিজ্ঞানী ড. আন্দুলুসি।
প্রেসিডেন্টের পি.এস. বেরিয়ে গেল।
মিনিট খানেকের মধ্যে আহমদ মুসাকে নিয়ে প্রবেশ করল ভিভিআইপি রুমটির সিকিউরিটি অফিসার তুর্কি সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল।
আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে বলল, ‘স্যরি, আমি নিশ্চয় অসময়ে এসে পড়েছি।’
কক্ষের সবাই সালাম দিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘না, মি. খালেদ খাকান, আপনি নিশ্চয় সুসময়ে এসেছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনারেল মোস্তফাসহ বিভিন্ন সূত্রে জেনেছি। কিন্তু আপনার কাছ থেকে কিছু শোনা হয়নি। ওদের পর পর কয়েকটা সেট ব্যাক হবার পর এবং প্রধান বিচারপতিকে তারা ছেড়ে দেয়ার পর কি মনে হয় যে, তারা অফেনসিভে আসবে? কিন্তু তার আগে বলুন, আপনি কেমন আছেন? কবে আপনি হাসপাতলে থেকে বেরুলেন? আপনার আঘাতের অবস্থা কি? আঘাতটার ব্যাপারে কিন্তু আপনি নিজের প্রতি যথেষ্ট অবহেলা দেখিয়েছেন, ডাক্তারের কাছে আমি শুনেছি।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি। গতকাল হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছি। জেনারেল মোস্তফা তখন ছিলেন সেখানে।’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘আপনি প্রধান বিচারপতিকে ছেড়ে দেয়ার কথা তুলেছেন। প্রধান বিচারপতিকে পণবন্দী রেখে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে না ভেবেই তারা তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তাদের উদ্দেশ্য সফল না হওয়া কিংবা তাদের ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত অফেনসিভের আশংকা বাদ দেয়া যাবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক, মি. খালেদ খাকান। ওদের অফেনসিভ যে কোন দিক থেকে যে কোন সময় আসবে এটাই ধরে নিতে হবে। ওরা যথেষ্ট দূর্বল হয়েছে, তবে ওদের মূলোচ্ছেদ ঘটেনি।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘ঠিক, মি. প্রেসিডেন্ট।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা।
তাকাল প্রেসিডেন্টের দিকে। বলল, ‘কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্যে আমি এসেছিলাম। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে, ড. আন্দালুসি যদি অনুমতি দেন, তাহলে কথা বলতে পারি।’
‘আমাদের আপত্তি থাকবে কেন? আমাদের উপস্থিতিতে কথা বলায় আপত্তি নেই তো?’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্টের কথা শেষ হতেই বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি বলে উঠল, ‘আমার অনুমতির প্রয়োজন এ কথা মেনে হলো কেমন করে আপনার? আপনাকে যে কোন সহযোগিতা করতে পারলে খুশি হবো।’
‘ধন্যবাদ সকলকে। যে কথাটা আমি বলতে চাই, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে। মি. প্রেসিডেন্ট ও মি. প্রধানমন্ত্রী তা শোনার মতো সময় দিলে আমি খুব খুশি হবো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। তাহলে শুরু করুন আপনার কথা।’ প্রেসিডেন্ট বললেন।
‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট।’ বলে একটু থামল। মুহুর্তের জন্যে একটু ভাবল। তাকাল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির দিকে। বলল, ‘ড. আন্দালুসি, আমাদের সোর্ড (Saviour of World Rational Domain-SOWRD) তো ডিফেনসিভ অস্ত্র, ফোটন পারটিকেলস দিয়ে কি অফেনসিভ অস্ত্র তৈরী সম্ভব?’
বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, এ প্রশ্ন কেন করছেন?’
‘কারণ পরে বলব। আপনি বলুন এটা সম্ভব কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘মি. খালেদ খাকান, যে শক্তি বা বস্তু ব্যবহারে ডিফেনসিভ অস্ত্র বানানো যায়, তা দিয়ে অফেনসিভ অস্ত্র বানানোও সম্ভব।’ বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি বলল।
‘ধন্যবাদ ড. আন্দালুসি। ফোটন পারটিকেলস দিয়ে যে অফেনসিভ অস্ত্র তৈরী হবে, তার চরিত্র কেমন হতে পারে, তার ধ্বংসকারী ক্ষমতা কি ধরণের হবে?’ বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে উত্তর দিল না বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘অস্ত্রের চরিত্র ও ধ্বংসকারিতা নির্ভর করবে কি ধরণের ফোটন পারটিকেলস কি মাত্রায় ব্যবহার করা হবে তার ওপর।’
‘প্রচলিত পরমাণু অস্ত্র ও ফোটন অস্ত্রের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য কি হতে পারে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
হাসল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, আপনি এসব সাংঘাতিক বিষয় নিয়ে কেন আলোচনা করছেন।’
বলে থামল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। শোয়া অবস্থা থেকে মাথাটা ওপরে তুলে বসার চেষ্টা করল ইজি চেয়ারে। তারপর বলল, ‘ফোটন বুলেট বা ফোটন এক্সপ্লোশনের সাধারন যে চরিত্র তাতে সহজ ভাষায় যা বলা যায় তা হল, পরমানু অস্ত্র ধ্বংস করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, আর ফোটন ধ্বংস করবে নিরব-নিস্তব্ধ আঘাতে এবং এ ক্ষেত্রে ধ্বংসও হবে টোটাল, কোন ধ্বংসাবশেষও থাকবে না। এ এমন এক ভয়ংকর দৃশ্য যার কল্পনাও মানুষের বিবেক ও সত্তাকে অবশ করে দেয়ার মতো’। বলল বিজ্ঞানী ডঃ আন্দালুসি। তাঁর গোটা মুখমণ্ডল বেদনাক্লিস্ট হয়ে উঠেছে।
উপস্থিত সকলের চোখে-মুখেও বিস্ময় ও বেদনার চিহ্ন!
‘ড. আন্দালুসি, এ ধরনের অস্ত্র তৈরির গবেষণা চলছে এবং গবেষণার চূড়ান্ত সাফল্য গজ খানেকের বেশি দুরে নয়, এমন তথ্য তথ্য বা এমন দাবি কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?’
আহমদ মুসার কথা শুনেই তড়াক করে উঠে সোজা ইজি চেয়ারে বসল ড. আন্দালুসি। তাঁর চোখে-মুখে বিস্ময় ও আতংকের চিহ্ন! তীব্র দৃষ্টিতে সে তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। বলল দ্রুত ও শুকনো কণ্ঠে, ‘নিশ্চয় মি. খালেদ খাকান, আপনি কোন ভয়ংকর রসিকতা করছেন না!’
‘না জনাব। যদি বিষয়টা ভয়ংকর হয়, তাহলে আমি ভয়ংকর বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছি। তথ্যটা আমি যেখান থেকে যেভাবে পেয়েছি, তাতে এটা বিশ্বাস করেছি।‘ বলল আহমদ মুসা।
‘কে বা কারা এই অস্ত্র তৈরি করেছে বা করছে?’ জিজ্ঞাসা বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির। তাঁর কণ্ঠে কম্পন স্পষ্ট।
‘ওয়াল ওয়ার্ল্ড অরবিট বা থ্রি জিরো’ এই অস্ত্র তৈরি করেছে বা করছে।‘ বলল আহমদ মুসা।
‘থ্রি জিরো’ মানে যারা আমাদের গবেষণা হাত করার চেষ্টা করছে, যারা আমাকে কিডন্যাপ করেছিল, তারা?’
‘ইয়েস ড. আন্দালুসি, আমি এই তথ্যই পেয়েছি।’ আহমদ মুসা বলল।
জবাবে কোন কথা বলল না বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। তাঁর গোটা চেহারা উদ্বেগ ও আতংকের কালো চাদরে ঢেকে গেছে। সেই সাথে গভীর ভাবনার রেখা তাঁর চোখে-মুখে।
প্রেসিডেন্ট আহমদ আরদোগাল বাবাগলু, প্রধানমন্ত্রী হোসেইন ইসমাইল সেলিক ও তুরস্কের নিরাপত্তাপ্রধান জেনারেল মোস্তফার চোখে-মুখেও বিস্ময়, উদ্বেগ, আতংক! প্রেসিডেন্ট বললেন আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘মি. খালেদ, ভয়ংকর এক তথ্য আপনি দিলেন। আপনি সত্য বলেছেন এবং বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বক্তব্যে বুঝেছি, এ ধরনের অস্ত্র তৈরি থিয়োরিটিক্যালি সম্ভব। কিন্তু যিনি আপনাকে খবরটি দিয়েছেন বা যে সুত্রে আপনি খবরটি পেয়েছেন, সেই সুত্র কতটা সত্য ইনফরমেশন দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?’
‘মি. প্রেসিডেন্ট, সুত্রের সত্যতা সম্পর্কে আমি একশ’ ভাগ নিশ্চিত।’ কোন প্রকার সন্দেহ থাকলে বিষয়টা আমি এখানে তুলতাম না’। বলল আহমদ মুসা ধীর ও দৃঢ় কণ্ঠে।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। কথাটা বললাম এই কারনে যে, খবরটা শ্বাসরুদ্ধ হবার মতো ভয়ংকর, বিশেষ করে ‘থ্রি জিরো’র মতো সন্ত্রাসী সংস্থার হাতে এই অস্ত্র গেলে গোটা পৃথিবীতে তো বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে!’ প্রেসিডেন্ট বললেন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘ওদের সংঘটনের নাম ‘One World Orbit’। তারা গোটা দুনিয়া দখল করে একক একটি রাষ্ট্র বানাতে চায় যার নিয়ন্ত্রক হবে তারা। এজন্যই এমন অস্ত্র তাঁদের চাই, যা দিয়ে কয়েক মুহূর্তে দুনিয়ার সব শক্তিকে ধ্বংস করতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে ওঁরা তো পশ্চিমাদেরও বিরোধী?’ প্রেসিডেন্ট বললেন।
‘অবশ্যই। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমাদের বন্ধু নয়, ওদের ব্যবহার করছে মাত্র।’ বলল আহমদ মুসা।
‘থ্রি জিরো’-এর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পূর্ব-পশ্চিম সবাই আমরা এক হতে পারি, একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারি। অন্তত ভয়ংকর এই অস্ত্রের ব্যাপারে এক সাথে কাজ করতে পারি।’ বললেন প্রধানমন্ত্রী।
‘পশ্চিমীদের জানালে হিতে বিপরীত হতে পারে। পশ্চিমীরা সন্ত্রাসী এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে অস্ত্রটা নিয়ে সেটা আমাদের উপর প্রয়োগ করতে পারে। ‘থ্রি জিরো’ বিপদে পড়লে ওদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আমাদের ধ্বংস করার সুযোগ নিতে পারে। সুতরাং কল্যাণ হলো, বিষয়টা কাউকে না জানিয়ে এই ভয়ংকর অস্ত্রের হাত থেকে দুনিয়ার মানুষকে রক্ষার জন্যে আমাদেরই উদ্যোগ গ্রহন করা।’ আহমদ মুসা বলল।
স্বস্তিতে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও নিরাপত্তাপ্রধান জেনারেল মোস্তফার। পরক্ষনেই আবার উদ্বেগ নেমে এলো প্রেসিডেন্টের চোখে-মুখে। বললেন, ‘কিন্তু আমরা যদি যথাসময়ে ওদের সব পরিকল্পনা নস্যাত করতে সমর্থ না হই, অস্ত্র যদি তৈরি হয়ে যায় বা এর ব্যবহার হয়, তাহলে?’
‘এ ঝুঁকি আছে, মি. প্রেসিডেন্ট। তবে আমি মনে করি অস্ত্র তারা এতো তাড়াতাড়ি ব্যবহার করবে না। তাঁদের অস্ত্র তৈরি যদি সম্পূর্ণও হয়ে যায়, তাহলেও তারা অস্ত্রের উৎপাদন, ব্যবহারের পরিকল্পনা, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে। চিন্তা করবে তারা অস্ত্র ব্যবহারের পরবর্তী অবস্থা নিয়েও। তারা অস্ত্রাগার ধ্বংস করতে পারবে, কিন্তু দুনিয়ার সব মানুষকে তো ধ্বংস করতে পারবে না। ধ্বংস করতে পারবে না দুনিয়ার কোটি কোটি সংখ্যক প্রচলিত অস্ত্র। অতএব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তাঁদের অনেক ভাবতে হবে, অনেক প্রস্তুতিরও প্রয়োজন আছে। সুতরাং সময় আমরা পাবো’। আহমদ মুসা বলল।
আবার মুখে ঔজ্জ্বল্য ফিরে এল প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর। বললেন প্রেসিডেন্ট, ‘এখন তাহলে কি করনীয়? ‘থ্রি জিরো’ কোথায় তাঁদের গবেষণা চালাচ্ছে? সেটা কি তুরস্কে? ইস্তাম্বুলে?’
‘নিশ্চিত করে বলা যাবে না। গবেষণার বিভিন্ন পার্ট থাকতে পারে। সব এক যায়গায় থাকতে পারে, আবার অনেক যায়গায় বিভক্ত অবস্থায় থাকতে পারে। তবে এটা আমি নিশ্চিত মনে করি যে, মূল গবেষক ইস্তাম্বুলে আছেন’। আহমদ মুসা বলল।
‘তিনি ইস্তাম্বুলে আছেন? তিনি তুরস্কের বাসিন্দা, নাগরিক? না তিনি আছেন, এখানে এখন?’ বলল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি। তাঁর কণ্ঠে বিস্ময়-পীড়িত কম্পন।
‘আমি যতটা জেনেছি তিনি তুরস্কের বাসিন্দা।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা কথা শেষ করলেও কেউ কথা বলল না। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, জেনারেল মোস্তফা, বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি সবার চোখে-মুখেই বিস্ময়।
নিরবতা ভাঙল বিজ্ঞানী ডঃ আন্দালুসি। বলল, ‘শুধু ইস্তাম্বুল নয়, গোটা তুরস্কে অ্যাডভান্সড ফিজিক্স ও পারটিকেল বিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করে, প্রত্যেককেই আমি চিনি। তাঁদের গবেষণা সম্পর্কেও মোটামুটি জানি। এদের কেউ হবেন নিশ্চয়।’ বলল বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি।
‘এই অনুসন্ধানের ব্যাপারে কিছুটা এগিয়েছি, নিশ্চিত হবার জন্যে আরও কিছুটা সময় লাগবে। আমি আশাবাদী খুব সত্বরই এ ব্যাপারে একটা সুখবর আমি দিতে পারব’। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান।’ কথাটা প্রায় এক সাথেই বলে উঠলেন প্রেসিডেন্ট ও বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি।
আহমদ মুসা তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে ড. আন্দালুসির দিকে চেয়ে বলল, ‘ড., একটা বিষয় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, ফোটন পারটিকেলস থেকে তৈরি ওদের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের সোর্ড-এর কি ভুমিকা হতে পারে?’
আহমদ মুসার প্রশ্নে খুশির প্রকাশ ঘটল প্রধানমন্ত্রীর চোখে। বললেন, ‘ধন্যবাদ খালেদ খাকান, এ প্রশ্নটা আমার মনেও জেগেছে। বিষয়টা আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ভ্রু কুঞ্চিত হল ড. আন্দালুসির। ভাবল সে। একটু পর ধীর কণ্ঠে বলল, ‘এর সুস্পষ্ট জবাব দেয়া কঠিন। ফোটন পারটিকেলস থেকে মারনাস্ত্র কোন্‌ শ্রেণীর ফোটনের এবং কত মাত্রার তা জানলে নির্দিষ্ট জবাব দেয়া যেত। তবে একটা কথা বলতে পারি, ফোটন পারটিকেলসের মারনাস্ত্র কোন না কোন মেটালে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রবাহিত হয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে। আমাদের সোর্ড মেটালিক সে ক্ষেপণাস্ত্রকে বন্দী করে ধ্বংস করতে পারবে। আর ফোটন পারটিকেলস মারনাস্ত্র যদি শ্রেণী ও মাত্রার বিচারে আমাদের সোর্ড এর চেয়ে কম পাওয়ারফুল হয়, তাহলে সে ফোটন মারনাস্ত্রকেও নিউট্রাল করে ফেলতে পারবে আমাদের সোর্ড। আর ফোটন মারণাস্ত্রটি শ্রেণী ও মাত্রায় বেশি পাওয়ারফুল হলে সোর্ডের শিল্ড কেটে তা বেরিয়ে যাবে, কিন্তু লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে না। কারন গাইডেড হবার মতো মেটালিক যান বা ক্ষেপণাস্ত্র তাঁর থাকবে না। তবে সমস্যা এই যে, প্রচলিত কোন রাডারে ফোটন মারনাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ধরা পড়বে না অতি ক্ষুদ্র অবয়ব হওয়ার কারণে। তবে ফোটন মারনাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে যদি সোর্ড মোতায়েন থাকে এবং সোর্ড যদি অ্যাকটিভেটেড (চালু) অবস্থায় থাকে, তাহলে ফোটন মারনাস্ত্র একটা নির্দিষ্ট দুরত্বে পৌছার পর সোর্ডের চোখে ধরা পড়ে যাবে এবং তারপর যা ঘটবে তা আগেই বলেছি।’
‘তাঁর মানে আমাদের সোর্ড যদি অ্যাকটিভেটেড অবস্থায় মোতায়েন থাকে, তাহলে লক্ষ্যবস্তু ফোটন মারনাস্ত্রের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল।
‘তাত্ত্বিকভাবে আমি তাই মনে করি। ফোটন মারনাস্ত্রের কম্পোজিশন ও শক্তির ডিটেইলটা পেলে সুনির্দিষ্ট একটা অপিনিওন দাঁড় করানো যেতে পারে’। বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি বলল।
‘তাহলে এখন ফোটন মারণাস্ত্রের কম্পোজিশন ও শক্তিকে বিস্তারিত জানা প্রথম বিষয় হিসাবে দাঁড়াচ্ছে। পরের বিষয় হলো, এই সর্বনাশা মারনাস্ত্র ও তাঁর গবেষণাকে দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করা। আপনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন, মিঃ খালেদ খাকান?’ বললেন প্রধানমন্ত্রী।
‘মি. প্রধানমন্ত্রী, আপনি যেটা বলছেন সেটা আমারও কথা। এই দুই লক্ষ্যে আমরা কাজ করব, ফল আল্লাহ্‌র হাতে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি বুঝতে পারছি না, এই ভয়ংকর অস্ত্র তৈরি যখন সম্পূর্ণ করেছে, তখন কেন তারা আমাদের সোর্ড-এর ফর্মুলা ও গবেষণা হাত করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে? ড. আন্দালুসি এ বিষয়ে আপনি কিছু বলবেন দয়া করে?’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘অবশ্যই মি. প্রেসিডেন্ট। তিনটি কারনে তারা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে। এক. ফোটন পার্টিকেলস থেকে এ্যান্টি-এটাকিং ডিফেন্সিভ শিল্ড তারা আবিষ্কার করতে পারেনি। দুই. তারা পশ্চিমের ননকনভেনশনাল অস্ত্র ভাণ্ডারকে অচল হয়ে পড়ার ভয়াবহ অবস্থা থেকে রক্ষার কোন দায়িত্ব পেয়েছে পশ্চিমের কাছ থেকে এবং তিন. আত্মরক্ষার এই সুযোগ তারা আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে চায়। মিঃ খালেদ খাকান, কি ভাবছেন এ ব্যাপারে?’ বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি বলল।
‘আমার নতুন কিছু কথা নেই। ডঃ আন্দালুসি যা বলেছেন, সেটা আমারও কথা। প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে একটা কথা বলতে চাই, ওদের গবেষণার কথা আমরা জানতে পেরেছি, এটা ‘থ্রি জিরো’র কোনভাবেই জানা ঠিক হবে না। জেনে ফেললে অনেক কিছু ঘটাতে পারে। ওদের অপ্রস্তুত রেখে আমাদের ওদের ওপর গিয়ে পড়তে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তথাস্তু, আহমদ মুসা। সরকারের কোন ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানাবো না। কিন্তু আমরা সাংঘাতিকভাবে উদ্বিগ্ন, খালেদ খাকান। আমাদের যে কোন সাহায্য আপনার জন্যে প্রস্তুত থাকবে। জেনারেল মোস্তফা সব ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ্‌ আপনাকে সাহায্য করুন! আপনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আপনি জীবন বাজি রেখে যা করছেন কোন মূল্যে তাঁকে পরিমাপ করা যাবে না। আল্লাহ্‌ আপনাকে এর জাযাহ দান করুন!’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘মি. প্রেসিডেন্ট, আমি আল্লাহ্‌র বান্দাদের জন্যে কাজ করছি। আল্লাহ্‌ যদি সন্তুষ্ট হন, এটাই আমার পরম পাওয়া।’ বলল আহমদ মুসা নরম কণ্ঠে।
‘এটাই ঠিক, মি. খালেদ খাকান। মানুষ জাগতিক কোন লাভের জন্যে এভাবে জীবন পণ করে কাজ করতে পারেনা। একমাত্র আল্লাহ্‌র জন্যে যে কাজ সে কাজেই মানুষ এতটা নিবেদিত, এতটা বেপরোয়া হতে পারে।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
ঘরে প্রবেশ করল প্রেসিডেন্টের পি.এস.। বলল সে প্রেসিডেন্টকে, ‘স্যার, ডাক্তার ও নার্স এসেছেন।’
‘স্যরি। আমরা অনেক সময় নিয়েছি। ওঁদের আসতে বল। আমরা উঠছি।’
বলেই উঠে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্ট।
উঠে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী, জেনারেল মোস্তফা, আহমদ মুসা সকলেই।
প্রেসিডেন্ট কয়েক ধাপ এগিয়ে আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘ইয়াংম্যান, আপনি আমাদের গর্ব। আল্লাহ্‌ আপনার বুদ্ধি, শক্তি সব বাড়িয়ে দিন। আজ আসি, আবার দেখা হবে। আসসালামু আলাইকুম।’
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিল। সব শেষে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো আহমদ মুসা ও জেনারেল মোস্তফা।
হাসপাতালের লাউঞ্জে বেরিয়ে জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে ডেকে নিয়ে এক প্রান্তের নিরিবিলি সোফায় গিয়ে বসল। বলল, ‘অবস্থা সত্যিই ভয়ংকর। কোন্‌ পথে কিভাবে এগোবেন বলে ভাবছেন?’
‘পথ এখনও বের হয়নি। পথ বের করার জন্যে কিছু কাজ করতে হবে। সেদিন আপনি যে পাম গার্ডেনের ঠিকানা দিয়েছিলেন, গোপনে সেখানে একটা হানা দেব। দেখি সেখানে কোন ক্লু মিলে কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমাদের কিছু করনীয় আছে?’ জিজ্ঞেস করল জেনারেল মোস্তফা।
‘আপনাকে জানাবো। আমি সেখানে যাবার আগে আপনার সাথে তো আলোচনা হবেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। তাহলে আমি উঠছি। আপনি না হয় আমাদের অফিসে চলুন। এক সাথে যাওয়া হবে।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘গেলে বাড়তি কি লাভ হবে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
হাসল জেনারেল মোস্তফাও। বলল, ‘আপনি যে ধরনের লাভের কথা বলছেন, তেমন কিছু আমার হাতে নেই। তবে আপনাকে একটা সাইন্স ফিকশন দেখাতে পারি। সদ্য রিলিজড্‌ হয়েছে। বিজ্ঞানের যে দিকটা আলোচনা হলো, সে ধরনের বিষয়েরই একটা ছবি।’
‘আপনি যখন দেখেছেন, তখন অবশ্যই ভালো হবে। আমারও লোভ জাগছে। চলুন।’ বলল আহমদ মুসা।
দু’জন উঠে দাঁড়াল।
লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এগোলো গাড়ির দিকে।

জেনারেল মোস্তফার প্রতিশ্রুত সিনেমাটি দেখল আহমদ মুসা। প্রথমে হালকা মুডে, রসিকতার মধ্যে দেখা শুরু করলেও শীঘ্রই সে সিরিয়াস হয়ে উঠল।
দেখল আহমদ মুসা, দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী বিজ্ঞানীর কাহিনী সিনেমাটি। দু’জন বিজ্ঞানীর একজন হলেন প্ল্যানেট আর্থ-এর বিজ্ঞানী ড. লেভী, অন্য বিজ্ঞানী পৃথিবীর প্রতিবেশী গ্রহ ‘নেবুলা’র ড. ক্রিস্টি ক্রায়েস্ট। দু’জন বিজ্ঞানী একে অপরকে টপকে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় পাগল। একজনকে আরেকজন মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারলে খুব খুশি। একজন একটা আবিষ্কার করলে, তার বেটার ভারশন তৈরি করতে না পারলে অন্যজন স্থির থাকতে পারে না। দু’জনের প্রতিযোগিতা শেষে বিধ্বংসী প্রতিযোগিতায় রূপ নিল। ড. লেভী হয়ে দাঁড়ালেন পৃথিবীর রক্ষক, আর ড. ক্রিস্টি ক্রায়েস্ট তাঁর গ্রহ-রাজ্য নেবুলার পাহারাদার। তাঁদের এই বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দিল প্ল্যানেট আর্থ ও প্ল্যানেট নেবুলা উভয়কেই। নেবুলার বিজ্ঞানী ড. ক্রিস্টি ক্রায়েস্ট পরমাণুর নিউক্লিয়াসের কানেকটিভিটির সুত্র আবিষ্কার করে তাঁকে কাজে লাগিয়ে এ্যান্টি –রিঅ্যাকটিভ ‘ডিঅ্যাকটিভ ভিটিং এন্ড ডিফিউজিং ওয়েভগান’ নামের অস্ত্র তৈরি করছে। ভয়াবহ এই অস্ত্র প্ল্যানেট আর্থের একটি প্রাণীরও কোন ক্ষতি না করে পৃথিবীর সব অস্ত্র মুহূর্তে অচল করে দিতে পারে। অন্য দিকে এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে প্ল্যানেট আর্থের বিজ্ঞানী ড. লেভী আলোর ফোটন পারটিকেলস-এর গ্রেড এইড থেকে ‘হর্ন অব গড’ ওরফে ‘সাইলেন্ট ডেথ ওয়ারিওর’ নামের অস্ত্র আবিষ্কার করেছে। এই মারণাস্ত্র শুধু প্ল্যানেট নেবুলার সব অস্ত্র ভাণ্ডার নয়, সেখানকার সব ধরনের মেটালকে মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া করে দিবে। ফলে প্ল্যানেট নেবুলার সব কল-কারখানা বন্ধ করা সহ অফিস-আদালত ও বাড়ি-ঘরের কাজও অচল করে দেবে। এই আবিষ্কারের কথা ঘোষিত হবার পর প্ল্যানেট নেবুলার অনুরোধে প্ল্যানেট আর্থ ও প্ল্যানেট নেবুলা’র মধ্যে বৈঠক বসল। আলোচনার পর নিঃশর্তভাবে সারেন্ডার করল নেবুলার বিজ্ঞানী ড. ক্রিস্টি ক্রায়েস্ট।
এই হলো সিনেমাটির কাহিনী।
সিনেমাটি শেষ হবার পর ক্রেডিট লাইনের এক জায়গায় কাহিনীর আইডিয়ার জন্যে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে জনৈক বিজ্ঞানী ডঃ আরিয়েল আরিয়েহ-এর।
প্রথমে দু’চারটি কথা বললেও আহমদ মুসা নির্বাকভাবে সিনেমাটি দেখা শেষ করল।
সিনেমাটি তাঁকে দারুণভাবে বিস্মিত করল। তাঁর মনে হলো, তাঁদের আইআরটির প্রতিরক্ষা অস্ত্র ‘সোর্ড’ ও ‘থ্রি জিরো’র ফোটন পারটিকেলসের বিধ্বংসী অস্ত্রের কথা পরোক্ষভাবে সিনেমায় বলা হয়েছে। সিনেমাটি আমেরিকায় তৈরি। নাম দেখা গেল, নির্মাতা সংস্থাটি একটি লিমিটেড ফার্ম। তারা এ ধরনের একটা সিনেমা কিভাবে তৈরি করতে পারল? ব্যাপারটা কাকতালীয়? একটা সাইন্স ফিকশন লেখকের চিন্তা ও একটি বাস্তবতা কি কাকতলীয়ভাবেই মিলে গেছে? কাহিনীর আইডিয়া এসেছে ড. আরিয়েল আরিয়েহর কাছ থেকে। এই বিজ্ঞানী ড. আরিয়েল আরিয়েহ কে? হঠাৎ মনে পড়ল ‘থ্রি জিরো’ র বিজ্ঞানী ড. আবু আবদুর রহমানের নামের শেষেও আরিয়েহ আছে। তাহলে ড. আরিয়েল আরিয়েহও কি ইহুদি বিজ্ঞানী? তাই হবে। আরিয়েল আরিয়েহ পুরোটাই হিব্রু নাম যার অর্থ ঈশ্বরের সিংহ আরিয়েহ। আর ‘আরিয়েহ’ হলো ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত-এর একজন সেনাধ্যক্ষ। সিনেমার আরেকটি জিনিস আহমদ মুসার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। সেটা হলো, ড. লেভী নিরব ধ্বংসের যে অস্ত্র তৈরি করেছে, সেটা ফোটন পারটিকেলস-এর এইটথ গ্রেড থেকে তৈরি। ‘থ্রি জিরো’ র বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ নিরব ধ্বংসের অস্ত্র তৈরি করেছে, সেটা তাহলে কত গ্রেড থেকে তৈরি? ফোটন পারটিকেলস-এর অষ্টম গ্রেড? কিন্তু আলোর পারটিকেলস-এর তো কোন অষ্টম গ্রেড নেই? নাম হর্ন অব গড, ড. লেভীর মারণাস্ত্রগুলো খুব মজার মনে হলো আহমদ মুসার কাছে। ‘হর্ন অব গড’ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র শিং-ই শেষ পর্যন্ত জয়ী হল।
আহমদ মুসা চিন্তায় একেবারে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। কখন কথা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সম্বিত ফিরে আসেনি আহমদ মুসার। জেনারেল মোস্তফা হাসি মুখে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। এক সময় বলে উঠল, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনাকে নিয়ে এসে বৃথা যায় নি। সিনেমাটি আপনাকে দারুণভাবে ভাবাতে পেরেছে দেখছি।’
ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলো আহমদ মুসা। তাকাল জেনারেল মোস্তফার দিকে। বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা, ফিল্মটি তো আপনি আগে অবশ্যই দেখেছেন। আমরা সামরিক হাসপাতালে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম, সেটার পর এ ফিল্মটি আবার দেখে আপনার কি মনে হচ্ছে?’
গম্ভীর হল জেনারেল মোস্তফা।
‘কিছু যে মনে হবে, এজন্যেই ফিল্মটি দেখার জন্যে আপনাকে নিয়ে এসেছি। সত্যিই আমি ভেবে অবাক হয়েছি, ফিল্মটি যেন আমাদের আইআরটির সোর্ড ও থ্রি জিরোর ফোটন মারনাস্ত্রেরই কাহিনী! পার্থক্য শুধু এটুকু যে, ফিল্মের বিজ্ঞানী ক্রিস্টি ক্রায়েস্টের ‘ডিএ্যাকটিভেটিং অ্যান্ড ডিফিউজিং’ অস্ত্র গিয়ে সব অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে দেয়। আর সোর্ড মাত্র এটাকিং অস্ত্রকে আটকে ফেলে দূর আকাশে নিয়ে গিয়ে তাঁকে ধ্বংস করে দেয়।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘বিষয়টাকে আপনি কি কাকতালীয় বলবেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘বলতে কষ্ট হবে, কিন্তু আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে বলুন তো?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘থ্রি জিরো ইহুদিবাদীদের সংস্থা, আর ফিল্মটিও নিশ্চয় কোন ইহুদিবাদীর পরিকল্পিত।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাদের মধ্যে কোন যোগসূত্র থাকার কথা বলছেন?’
‘অনুমান করে বলার মধ্যে কোন লাভ নেই। এটা অনুসন্ধানের বিষয়, বিশেষ করে বিজ্ঞানী ড. আরিয়েল আরিয়েহ কে, তা জানতে পারলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
টেলিফোন বেজে উঠল জেনারেল মোস্তফার।
মোবাইল তুলে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপার থেকে পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা, আমি এখন রোমেলী দুর্গে। এখানে বিস্ময়কর ভূতুড়ে একটা ঘটনা ঘটেছে। রোমেলী দুর্গের উত্তর পাশে নৌবাহিনীর জরুরী অস্ত্র ডিপোর সব অস্ত্র হাওয়া হয়ে গেছে। ধাতব ডাস্টের একটি স্তর ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই, এমনকি সেই ডিপোর জানালার গরাদসহ কোন প্রকার মেটাল অবশিষ্ট নেই। আর…।’
‘বলুন রোমেলী দুর্গের কি অবস্থা?’ পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেনকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল জেনারেল মোস্তফা। তাঁর চোখে-মুখে উদ্বেগ ও ভীতি নেমে এসেছে।
‘রোমেলী দুর্গের সব ঠিক আছে।’ বলল পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
‘একটু ধরুন মি. নাজিম এরকেন।’
বলেই জেনারেল মোস্তফা উৎসুক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, বোধ হয় ভয়ানক এক দুঃসংবাদ। আমাদের রোমেলী দুর্গের উত্তর পাশের নৌবাহিনীর অস্ত্র ডিপোর সব অস্ত্র ও ডিপোর সব ধরনের জিনিস ডাস্ট হয়ে গেছে, কিন্তু রোমেলী দুর্গের সব ঠিক আছে।’
বিদ্যুস্পৃষ্ট হওয়ার মতো চমকে উঠল আহমদ মুসা। নেমে এলো তাঁর চোখে- মুখে উদ্বেগ। মুহূর্ত ভাবল আহমদ মুসা। মুহূর্তের জন্যে তাঁর চোখ দু’টিও বুজে গিয়েছিল। চোখ খুলেই আহমদ মুসা বলল, ‘ওকে বলুন, বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে। তথ্যটা বাইরে প্রকাশ হতে দেয়া যাবে না। আর চলুন, ওখানে যেতে হবে আমাদের।’
জেনারেল মোস্তফা বিষয়টি পুলিশপ্রধানকে জানালে পুলিশপ্রধান বলল, ‘সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর্মস ডিপোর স্টাফদের পর্যন্ত ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয় নি। সেনাবাহিনীর কয়েকজন টপ অফিসার ও পুলিশের মধ্যে আমিই শুধু বিষয়টা জেনেছি।’
‘মিঃ নাজিম এরকেন, আমি খালেদ খাকানকে নিয়ে আসছি।’
বলে সালাম দিয়ে মোবাইল অফ করে দিল জেনারেল মোস্তফা।
মোবাইলটা পকেটে রেখে জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে বলল, ‘কিছু আন্দাজ করেছেন, মিঃ খালেদ খাকান?’
‘চলুন, গিয়ে দেখা যাক। তবে আমি ভাবছি, ‘থ্রি জিরো’ কি রোমেলী দুর্গে আইআরটি’র ওপর আক্রমন করল, না ডিপোটির ওপর টেস্ট আক্রমন? সিদ্ধান্তের আরও কিছু বিষয় জানা দরকার।’ বলল খালেদ খাকান।
‘চলুন, তাহলে বেরুনো যাক।’ বলেই উঠে দাঁড়াল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল।

নৌবাহিনীর আপতকালীন অস্ত্রাগারের অবস্থা দেখে হতবাক হলো আহমদ মুসা। অস্ত্রের স্থানগুলো আছে, কেসগুলো আছে কিন্তু অস্ত্রগুলো নেই, হাওয়া হয়ে গেছে! জানালার ষ্টীল ফ্রেম ও অন্যান্য মেটালিক আসবাবপত্র সবই হাওয়া! স্থানগুলোতে অস্বাভাবিক বর্ণের পাউডারের সূক্ষ্ম আস্তরন লক্ষণীয়। মেঝের পাউডারের মতো ঘরের দেয়াল-ছাদও একটা ভিন্ন বর্ণের সূক্ষ্ম আস্তরণে যেন ঢেকে গেছে, আহমদ মুসার সাথে জেনারেল মোস্তফা, পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন দেখল সব ঘুরে ঘুরে।
গোটা সময়ে কেউ একটা কথাও বলেনি। সবার চোখে-মুখেই অপার বিস্ময়, আর গভীর উদ্বেগের সমাহার!
অস্ত্রাগার ও তাঁর আশপাশটা দেখা শেষ করে আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন, রোমেলী দুর্গে যাই।’
নৌবাহিনীর আপতকালীন এই অস্ত্রাগারের ৫০ ফুটের মাথায় রোমেলী দুর্গের শুরু। শুরুতেই রোমেলী দুর্গের উত্তর টাওয়ার।
দুর্গে প্রবেশ করে আহমদ মুসারা শুরুতেই দেখল দুর্গের উত্তর টাওয়ার। টাওয়ারটা একেবারেই অক্ষত। গোটা দুর্গের কোথাও কোন প্রকার ক্ষতি বা অস্বাভাবিকতা দেখা গেল না।
তারা ইন্সটিটিউট রিসার্চ এন্ড টেকনোলজির আহমদ মুসার কক্ষে গিয়ে বসল।
আহমদ মুসারা বসার পরপরই ঘরে প্রবেশ করল তরুন আলোক-বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস আব্দুল্লাহ সেনুসী।
বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস আব্দুল্লাহ ইন্সটিটিউটের প্রধান ড. আন্দালুসির প্রধান গবেষণা সহকারী। বলল সে, ‘আমাদের ল্যাবরেটরিসহ ইন্সটিটিউটের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। সব ঠিক আছে।’
‘ড. আন্দালুসিকে আপনি জানিয়েছেন বিষয়টি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘জি জনাব, আপনার টেলিফোন পেয়েই বিষয়টি আমি ড. আন্দালুসিকে জানিয়েছি।’ বলল ড. ইবনুল আব্বাস।
‘শুনে তিনি কি বললেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তিনি খুব উদ্বিগ্ন হয়েছেন। বলেছেন, আইআরটিকে লক্ষ্য করেই তারা ফোটন মারণাস্ত্রের হামলা চালিয়েছিল। আমাদের সোর্ড শিল্ড অ্যাকটিভ না থাকলে আমাদের আইআরটি’রও একই দশা হতো।’ ড. বিজ্ঞানী ইবনুল আব্বাস বলল।
‘নৌবাহিনীর আর্মস ডিপো ধ্বংস হওয়ার ব্যাখ্যা কি ড. ইবনুল আব্বাস?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমাদের সোর্ড শিল্ডের আওতার বাইরে ছিল ওটা। আর ওদের ফোটন অফেনসিভ আর্মস-এর বিস্তার ছিল আমি মনে করি রোমেলী দুর্গ থেকে দু’শ ফুট বেশি। এই বর্ধিত অংশ দুর্গের দু’দিকেই বিস্তৃত ছিল। কিন্তু দুর্গের দক্ষিন অংশে উল্লেখযোগ্য কোন ধাতব স্ট্রাকচার না থাকায় সেটা আমরা বুঝতে পারছি না।’ বলল ড. ইবনুল আব্বাস।
‘আপনারা সোর্ড শিল্ডকে অ্যাকটিভ রেখেছিলেন, না অ্যাকটিভ করেছেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অ্যাকটিভ ছিল না, ঘণ্টা খানেক আগে আমরা অ্যাকটিভ করেছি। হাসপাতাল থেকেই ড. আন্দালুসি এই নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন।’ ড. ইবনুল আব্বাস বলল।
‘মাত্র এক ঘণ্টা আগে? তার মানে গত এক ঘণ্টার মধ্যে ওদের এই আক্রমণটা হয়েছে? ইন্না লিল্লাহ! যদি সোর্ড অ্যকটিভ করা না হতো, তাহলে কি হতো!’
বলল আহমদ মুসা। তাঁর কণ্ঠে উদ্বেগের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটল। ভাবল সে, হাসপাতালে তাঁদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনার পরপরই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ড. আন্দালুসি আইআরটিকে সোর্ড শিল্ড অ্যাকটিভ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। ড. আন্দালুসির দূরদৃষ্টিরও প্রশংসা করল।
ভাবতে গিয়ে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলে আহমদ মুসা। জেনারেল মোস্তফার মোবাইল বেজে উঠার শব্দে সে সম্বিত ফিরে পেল।
জেনারেল মোস্তফা টেলিফোন ধরে জি, ইয়েস স্যার বলেই কথা শেষ করল।
আহমদ মুসা বুঝল, প্রধানমন্ত্রীর বা প্রেসিডেন্টের মতো ওপরের কারও টেলিফোন নিশ্চয়ই।
মোবাইল পকেটে রেখে জেনারেল মোস্তফা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, প্রেসিডেন্টের ইনার সিকিউরিটি টীমের জরুরী বৈঠক বসেছে। আপনাকে নিয়ে এখনি যাবার জন্য আমার ওপর নির্দেশ হয়েছে। চলুন উঠি।’
আহমদ মুসার সাথে কথা শেষ করেই জেনারেল মোস্তফা পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. নাজিম এরকেন, আপনি এ ঘটনার উপর প্রধানমন্ত্রীর জন্যে ব্রীফ তৈরি করুন। আর এ দিকটা দেখুন আপনি।’
বলে উঠে দাঁড়াল জেনারেল মোস্তফা।
সাথে আহমদ মুসাও।
সকলের সাথে সালাম বিনিময় করে তারা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো।
বসফরাসের তীরেই প্রেসিডেন্টের অবকাশকালীন প্রাসাদ। গত পক্ষকাল ধরে প্রেসিডেন্ট এখানেই অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীও এখানে এসেছেন আংকারা থেকে দু’দিন হলো।
আহমদ মুসারা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করে ভেতরের কার পার্কিং-এ নামতেই একজন প্রোটোকল অফিসার এগিয়ে এলো। বলল জেনারেল মোস্তফা ও আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘স্যার, মহামান্য প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। আসুন স্যার।’
প্রোটোকল অফিসারকে অনুসরন করল আহমদ মুসা ও জেনারেল মোস্তফা।
হাঁটতে হাঁটতে প্রোটোকল অফিসার বলল, ‘প্রেসিডেন্ট চলে গেছেন তাঁর আন্ডারগ্রাউন্ড অফিস রুমে। সেখানেই আপনাদের ডেকেছেন।’
এ করিডোর, সে করিডোর ঘুরে একটা লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল তারা।
ঘুরতে গিয়ে প্রোটোকল অফিসার হোঁচট খেল জেনারেল মোস্তফার সাথে। প্রোটোকল অফিসারের জুতার অগ্রভাগটা ঠোকর খেল জেনারেল মোস্তফার জুতার সাথে।
পড়ে যাচ্ছিল প্রোটোকল অফিসারটি। জেনারেল মোস্তফা তাঁকে ধরে ফেলল।
প্রোটোকল অফিসারটি ‘স্যরি’; ‘স্যরি’ বলতে বলতে বিনয়ে বিগলিত হয়ে গেল।
‘না, না, ঠিক আছে। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তো! আমি চলা অবস্থায় ছিলাম। এরকম ঘটতেই পারে। এ কিছু না, ঠিক আছে। ওকে লেট আস প্রোসিড।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসার মুখে কিন্তু একটা বিরক্তি ভাব ফুটে উঠেছিল। আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার পাশাপাশি হাঁটছিল। আহমদ মুসা দেখেছে, জেনারেল মোস্তফার সাথে তার এভাবে হোঁচট লাগার কথা নয়। প্রোটোকল অফিসার খুব শর্ট স্পেস নিয়ে ঘুরেছে। ঘোরার সময় জুতাটাও সে চালিয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোরে। সে কি অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল, না তাঁর কাণ্ডজ্ঞানের অভাব আছে?’
কিন্তু আহমদ মুসা কিছু বলল না।
জেনারেল মোস্তফার কথার জবাবে প্রোটোকল অফিসার বলল, ‘স্যার, আমার আর সামনে এগোবার অনুমতি নেই। লিফটে আপনারা একাই যাবেন। লিফটের গোঁড়ায় প্রেসিডেন্টের পি.এস. আপনাদের রিসিভ করবেন।’
লিফটে উঠল জেনারেল মোস্তফা ও আহমদ মুসা।
সত্যি প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন।
আহমদ মুসারা মিটিং রুমে প্রবেশ করতেই প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ওয়েলকাম, মি. খালেদ খাকান! আপনাদের জন্যেই আমাদের অপেক্ষা। আসুন, বসুন।’
একটা ডিম্বাকৃতি টেবিলের একপাশে একটা কিং চেয়ারে বসে আছেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর ডান পাশে প্রধানমন্ত্রী। তার ডান পাশে প্রধানমন্ত্রী। সামনে আরও চারজন। প্রেসিডেন্ট সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন আহমদ মুসাকে। চারজনের একজন তিন বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ, দ্বিতীয় জন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা এ্যাডভাইজার, তৃতীয় জন পার্লামেন্টের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং চতুর্থ জন পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেতা।
পরে সবাইকে আহমদ মুসার পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, ‘তাঁর সম্পর্কে আমি আগেই আপনাদের ব্রীফ করেছি। তিনি তুরস্কের জন্যে, মুসলিম উম্মার জন্যে যা করেছেন তার জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ।’
কথা শেষ করে একটু থামলেন প্রেসিডেন্ট। তারপর মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে। বললেন, ‘এবার মিটিং-এর কাজ শুরু হতে পারে মিভ প্রধানমন্ত্রী।’
ঠিক এই সময়েই আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
বিব্রত হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘এক্সকিউজ মি, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। মোবাইল আমার অফ আছে। কিন্তু ইমার্জেন্সি অপশনে কলটি এসেছে। আমি কি এ্যাটেন্ড করতে পারি?’ বলল আহমদ মুসা বিনীতভাবে।
‘অবশ্যই মি. খালেদ খাকান। নো ম্যাটার। আপনি কলটি এ্যাটেন্ড করুন।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘ধন্যবাদ, একসেলেন্সি।’ বলে আহমদ মুসা মোবাইল নিয়ে একটু দুরে সরে গেল।
স্ক্রীনের নম্বারটি দেখেই বুঝল জোসেফাইনের ফোন। একটু উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা। মোবাইল বন্ধ দেখেও ইমারজেন্সী অপশনে কলটি সে করেছে। এ রকম সে করে না। কোন কি বিপদ হয়েছে তাঁর?’
কলটি অন করেই সালাম দিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘তোমরা ভালো আছো তো জোসেফাইন?’
‘স্যরি, আমরা ভালো আছি। কিন্তু একটা খবর দেয়ার জন্যে তোমাকে এই কলটি করতে হলো। এইমাত্র জেফি জিনা আমাকে জানাল, তুমি এখন প্রেসিডেন্ট হাউজে থাকতে পার কোন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং-এ। প্রেসিডেন্ট হাউজের একজন প্রোটোকল অফিসার ‘থ্রি জিরো’ র এজেন্ট। তার উপর বিশেষ নির্দেশ গেছে মিটিংটি মনিটর করার। খবরটি এইটুকুই। ওকে। সালাম। রাখি?’ টেলিফোনের ওপার থেকে বলল জোসেফাইন।
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। বিরাট উপকার করলে তুমি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার নয়। ধন্যবাদ প্রাপ্য জেফি জিনার।’ বলল জোসেফাইন।
‘তাকেও ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে। জানাবো তাকে। রাখছি টেলিফোন। সালাম।’
‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে আহমদ মুসাও কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ফিরে এলো টেবিলে। সে কানে কানে বিষয়টা জানালো জেনারেল মোস্তফাকে।
চমকে উঠল জেনারেল মোস্তফা। উদ্বেগে ছেয়ে গেল তার চোখ-মুখ। সে উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। বলল, ‘মহামান্য প্রেসিডেন্ট, জনাব খালেদ খাকান এইমাত্র জানতে পেরেছেন, প্রেসিডেন্টের একজন প্রোটোকল অফিসার ‘থ্রি জিরো’ র লোক। তাঁর উপর দায়িত্ব পড়েছে এই মিটিং-এর আলোচ্য বিষয় মনিটর করার।’
থামল জেনারেল মোস্তফা।
প্রেসিডেন্ট সোজা হয়ে বসলেন। তারও চোখ-মুখ ছেয়ে গেল উদ্বেগে। বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট হাউজে এখন তিনজন প্রোটোকল অফিসার। তিনজনই আজ হাজির আছে। এই তিনজনের মধ্যে কে সে? অবস্থার প্রেক্ষিতে মি. খালেদ খাকানের দেয়া তথ্য সত্য বলে মনে করছি। ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান।’
‘তিন প্রোটোকল অফিসারকেই গ্রেপ্তার করে তাদের কাছ থেকে তথ্য নেয়া হোক!’ বলল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পরে গেল আসার পথে লিফটের সামনে প্রোটোকল অফিসারের সাথে জেনারেল মোস্তফার হোঁচট লাগার কথা। এই হোঁচট লাগাকে তখনই স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। সে কি তাহলে হোঁচট লাগার মহড়া করে জুতার মাধ্যমে জুতায় অথবা হাত দিয়ে কোট প্যান্টের কোথাও ট্রান্সমিটার চিপস পাচার করেছে?
কথাটা মনে আসতেই আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফাকে বলল, ‘নিশ্চয়ই ঐ প্রোটোকল অফিসারটি। তার জুতার সাথে আপনার জুতার হোঁচট লাগিয়ে ট্রান্সমিটার চিপস পাচার করেছে অথবা পোশাকেও তা লাগিয়ে দিতে পারে।’
ভ্রু কুঞ্চিত হলো জেনারেল মোস্তফারও। বলল, ‘সত্যিই তার হোঁচট লাগানোটা আমাকে অবাক করেছে। চলুন দেখি, জুতাটা আগে চেক করি।’
টর্চ আনা হল। ম্যাগনিফাইং গ্লাস আহমদ মুসার কাছেই ছিল।
জুতায় টর্চের আলো ফেলে আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার বাম জুতা পরীক্ষা করতে লাগল ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে। বাম জুতার সামনের বাম পাশে টপটার তলার দিকে টার্ন নেবার জায়গায় আলপিনের মাথার মতো ক্ষুদ্র একটা চিপস পাওয়া গেল। বিশেষ ধরনের চুম্বক দিয়ে ওটা তুলে নেয়া হল।
আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার পোশাকের সামনের দিকটার ওপরও চোখ বুলাতে চাইল। আহমদ মুসার মনে পড়ল লোকটিকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্যে যখন তাকে ধরেছিল জেনারেল মোস্তফা, তখন লোকটির বাম হাত জেনারেল মোস্তফার বাম হাত চেপে ধরেছিল। দেহের আর কোন জায়গায় তার হাত পড়েনি।
আহমদ মুসা তার বাম হাত ও কোটের হাতা পরীক্ষা করল। আতিপাতি অনুসন্ধানের পর হাতার বোতামে আরেকটা চিপস পাওয়া গেল। এ চিপসটাও বিশেষ চুম্বক দিয়ে তুলে নেয়া হল।
চিপস দু’টি প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীও দেখলেন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে।
তারপর আহমদ মুসা লেজার বীমার দিয়ে পুড়িয়ে দিল চিপস দু’টি।
এতক্ষন কেউ কথা বলেনি।
নীরবতা ভাঙলেন প্রেসিডেন্ট। বললেন, ‘মিঃ খালেদ খাকান, ঘটনা কি বলুন তো?’
‘ঘটনাটা জেনারেল মোস্তফার সাথে ঘটেছে। তিনিও বলতে পারেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনিই বলুন মি. খালেদ খাকান। ঘটনা আমার সাথে ঘটলেও গোটা ঘটনা আপনার দেখার সুযোগ হয়েছে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ধন্যবাদ, জেনারেল মোস্তফা।’ বলে আহমদ মুসা লিফটের সামনে পৌঁছে প্রোটোকল অফিসার পেছন ফিরতে গিয়ে কিভাবে জেনারেল মোস্তফার পায়ের সাথে তার পা হোঁচট খায়, কিভাবে প্রোটোকল অফিসার পড়ে যাচ্ছিল, কিভাবে জেনারেল মোস্তফা তাকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করল, কিভাবে ভারসাম্য রক্ষার জন্যে প্রোটোকল অফিসার তার বাম হাত দিয়ে জেনারেল মোস্তফার বাম হাত আঁকড়ে ধরেছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা করল। ‘প্রোটোকল অফিসারের জুতার মাথায় একটা ট্রান্সমিটার চিপস সাজানো ছিল, সেটা হোঁচট লাগানোর সময় জেনারেল মোস্তফার জুতায় পাচার করেন এবং তার হাতে বাড়তি ব্যাবস্থা হিসেবে আরেকটি চিপস ছিল, সেটা তিনি পড়ে গিয়ে অন্য জুতায় পেস্ট করতে চেয়েছিলেন। পড়ে যেতে না পেরে তিনি জেনারেল মোস্তফার হাতার বোতামে সেটা লাগিয়ে দেন। আমি এরকমই ধারনা করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান! আপনি হোঁচটটাকে অস্বাভাবিক মনে করেছিলেন বলেই একটা বড় সিক্রেট আউট হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচলাম, তেমনি শয়তানটাকে ধরা সহজ হয়ে গেল।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
প্রেসিডেন্ট আহমদ আরদোগাল বাবাগলু একটা টেলিফোনে কথা শুনছিলেন। টেলিফোনটা রেখে দিয়ে বললেন, ‘জেনারেল মোস্তফা, শয়তানটা ধরা পড়ল ঠিকই কিন্তু ধরে রাখা গেল না। ধরা পরার সংগে সংগেই সে পটাসিয়াম সাইনাইড খেয়েছে। মি. খালেদ খাকানের কথা থেকে কে কালপিট তা আঁচ করতে পেরেই আমি তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলাম। বোধ হয় কিছু সে আঁচ করতে পেরেছিল। পালাচ্ছিল সে। বাইরে গেটে গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে তাকে ধরে ফেলা হয়। কিন্তু লাভ হলো না। আমাদের সিক্রেটটা রক্ষা পেলেও ভয়ানক শত্রু হাতের মধ্য থেকে বেরিয়ে গেল।’
বলে একটু থামলেন প্রেসিডেন্ট। তারপর আবার বলা শুরু করলেন, ‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন! আপনার অদ্ভুত বুদ্ধি-শক্তিকে আল্লাহ আরও বাড়িয়ে দিন!’
আহমদ মুসার উদ্দেশ্যে কথা শেষ করে ঘুরে বসলেন প্রেসিডেন্ট। সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এবার মিটিং শুরু হতে পারে। আমাদের সামনে ভয়াবহ বিপদ দুটি। এক. শত্রুরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে এমনকি প্রেসিডেন্ট ভবনের মতো স্থানেও অবস্থান নিতে পেরেছে। দুই. এক ভয়াবহ মারনাস্ত্র আমাদের মাথার ওপর ঝুলে আছে। সে এমন এক মারনাস্ত্র যা অদৃশ্য এবং তার ধ্বংসলীলাও অদৃশ্য। আমরা কিভাবে এই দুই সংকটের মোকাবিলা করব, সে ব্যাপারে যার যার চিন্তার কথা বলুন।’
সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ আলী আব্দুল্লাহ গুল বলল, ‘আমাদের পরিচিত ও প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে অবিলম্বে সোর্ড শিল্ডের নিরাপত্তা বলয়ে আনা দরকার। আমাদের প্রধান শিল্প-কারখানাগুলোকেও এই নিরাপত্তা আমব্রেলা দিতে হবে। আর এই ভয়ানক শত্রুদের ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়ার জন্যে আমাদের গোয়েন্দা ব্যাবস্থাপনার সর্বাত্মক ব্যবহার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ভাই মি. খালেদ খাকানের সাহায্যই হবে আমাদের জন্যে মুখ্য বিষয়।’
থামল সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ আলী আব্দুল্লাহ গুল।
পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা, পার্লামেন্টের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির প্রধান, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হোসেন ইসমাইল সেলিক কমবেশি একই কথা বললেন। প্রধানমন্ত্রী তার কথায় একটা যোগ করেছেন, সেটা হল যে, তিনি বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির সাথে আলোচনা করেছেন। তুরস্ককে সোর্ডের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর শেষ কথাটা শুনে প্রেসিডেন্ট ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আহমদ মুসার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘বলুন মি. খালেদ খাকান আপনি কি ভাবছেন?’
‘আরও সংকট মোকাবিলার জন্যে সবাই যা বলেছেন তার সাথে আমি একমত। কিন্তু এ সংকটের নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধান হলো ধ্বংসের এই অস্ত্রকে শুরুতেই গোড়া সমেত উপড়ে ফেলা। ষড়যন্ত্রের গবেষণাগারকে শেষ করে দেয়া। এই লক্ষ্যে দ্রুত এগুনো দরকার।’ বলল আহমদ মুসা।
প্রেসিডেন্টের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘এই দুরূহ দায়িত্ব মি. খালেদ খাকান, আপনাকেই নিতে হবে।’
‘একসেলেন্সি, আমি চেষ্টা করছি, চেষ্টা করব। জানি না কতখানি সফল হব!’ আহমদ মুসা বলল।
‘মি. খালেদ খাকান, আমাদের সরকারের সব রকম সাহায্য আপনার সাথে থাকবে। যেখানে যখন প্রয়োজন, সেনাবাহিনীকে ডাকলেও পাবেন।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘একসেলেন্সি, আমি কালকের মধ্যেই ইস্তাম্বুলের এমন একটা মানচিত্র চাই, যাতে কোন্‌টা দোকান, কোন্‌টা কিসের কারখানা, তার ইন্ডিকেশন থাকবে। ফাঁকা জায়গাগুলোর মালিক কারা বা কে? তারও জওয়াব থাকতে হবে মানচিত্রে।’ বলল আহমদ মুসা।
প্রেসিডেন্ট তাকালেন জেনারেল মোস্তফার দিকে। প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা বুঝে জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘একসেলেন্সি, এ ধরনের মানচিত্র আছে, খুবই সিক্রেট। তবে মি. খালেদ খাকান অবশ্যই এটা পাবেন।’
‘ধন্যবাদ জেনারেল মোস্তফা।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘ধন্যবাদ জেনারেল মোস্তফা।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘সোর্ড-এর মোতায়েন করা, সেটা কি হয়েছে?’
‘একসেলেন্সি, বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি নিজেই বলেছেন, এটা অবিলম্বে হওয়া দরকার।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘মোতায়েন হয়েছে কিনা?’ জিজ্ঞাসা প্রেসিডেন্টের।
‘প্রয়োজনীয় লোকেশনের ম্যাপ মনে হয় পৌঁছে গেছে, একসেলেন্সি। আমি এখনি একবার খোঁজ নেব।’
‘ধন্যবাদ, খোঁজ নিন। আমরা এখন তাহলে উঠতে পারি। মি. খালেদ খাকান, আপনি একটু বসলে বাধিত হবো।’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘অবশ্যই বসব, মি. প্রেসিডেন্ট।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ছাড়া অন্য সবাই উঠে দাঁড়াল। প্রেসিডেন্টও উঠে চলে গেছেন তার পেছনের দরজা দিয়ে।
সবাই আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিল।
সবাই চলে যেতেই একজন অফিসার ঘরে ঢুকল। বলল, ‘আপনি আসুন স্যার, মহামান্য প্রেসিডেন্ট আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
অফিসারটির সাথে লিফট দিয়ে উঠে এলো আহমদ মুসা।
প্রাসাদের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ওঠার পর ভিন্ন একটা লিফটে প্রাসাদের দু’তলায় গেল।
অফিসারটি এনে বসাল তাকে একটা ড্রইং রুমে। বলল, ‘ এটা মহামান্য প্রেসিডেন্টের প্রাইভেট ড্রইং রুম। এখানে তিনি তার ব্যক্তিগত মেহমানদের বসান।’
আহমদ মুসা বসল। তার আগে নজর বুলিয়ে দেখেছে, একেবারে বসফরাসের ওপরেই যেন ড্রইং রুমটি! নিচে উঁকি দিলে বসফরাসের পানিতে গিয়ে নজর পড়ে। অসম্ভব সুন্দর জায়গা! বসফরাসের বহু দূর দেখা যায় এখানে বসে। দেখা যায় রোমেলী দুর্গের চূড়াও।
অফিসারটি ড্রইং রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
প্রেসিডেন্ট ঢুকলেন ড্রইং রুমে। সংগে সংগেই অফিসারটি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
প্রেসিডেন্ট ড্রইংরুমে প্রবেশ করলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। সালাম দিয়ে হাত বাড়াল হ্যান্ডশেকের জন্য।
প্রেসিডেন্ট হ্যান্ডশেক করে জড়িয়ে ধরলেন আহমদ মুসাকে। বললেন, ‘আপনাকে খালেদ খাকান বলে ডাকতে ভাল লাগে না, মি. আহমদ মুসা।’
বলে আহমদ মুসাকে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বললেন, ‘এখন তো আমাদের নিজস্ব পরিমন্ডলে আপনি আহমদ মুসা হয়ে যেতে পারেন।’
‘হ্যাঁ, যাদের কাছে পরিচয়টা গোপন করতে চেয়েছিলাম, সেই শত্রুরা আমার পরিচয় জানতে পেরেছে নিশ্চয়। সুতরাং বিষয়টা আর গোপন নেই। তবে নামটা গোপনই থাক, তুরস্কের কাজটা খালেদ খাকানই শেষ করুক।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
‘আপনার এখানে কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো? ম্যাডাম বোর ফিল করছেন নাতো?’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘কোন অসুবিধে নেই। লতিফা আরবাকান খুব চৌকস মেয়ে। তিনি ম্যাডামকে নানাভাবে ব্যস্ত রেখেছেন। আর ইউর একসেলেন্সি, গোল্ড রিজর্টে থেকে কেউ বোর ফিল করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে প্রেসিডেন্ট সোজা হয়ে বসলেন তার সোফায়। গম্ভীর হয়ে উঠেছে তার মুখ। বললেন, ‘আমি সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন, আহমদ মুসা! সোর্ড মোতায়েন হলে নিরাপত্তা সমস্যার একটা আশু সমাধান হবে! কিন্তু ওদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র নস্যাতের কি হবে? আপন কি ভাবছেন এ ব্যাপারে?’
‘আল্লাহ ভরসা, একসেলেন্সি। আমি অগ্রসর হবার একটা পথ পেয়েছি। সেদিন প্রধান বিচারপতিকে উদ্ধারের জন্যে যে বাড়িতে ঢুকেছিলাম, সেখান থেকে একটা ক্লু পেয়েছি। সেটা ধরেই সামনে এগোব। আমার মনে হয় আমি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন। আমি ভেবে পাচ্ছিনা, তুরস্কের কারা এ ভয়ানক গবেষণার সাথে জড়িত!’
‘আমি যতটা জেনেছি ‘থ্রী জিরো’র সাথে এখানে জায়োনিস্ট একটা গ্রুপ জড়িত।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু এর জন্যে তো ব্যাতিক্রমধর্মী প্রতিভার বিজ্ঞানী দরকার। ড. আন্দালুসির মত বিজ্ঞানী কি খুব বেশী তৈরি হয়?’ বললেন প্রেসিডেন্ট।
আহমদ মুসার মনে পড়ল বিজ্ঞানী ড. আব্দুর রহমান আরিয়েহের কথা। তিনিও পার্টিকেল ফিজিক্সের বিজ্ঞানী। কিন্তু তিনিই সেই বিজ্ঞানী তা সে জানেনা। সুতরাং আহমদ মুসা সেদিকে গেল না। বলল, ‘নিশ্চয় ওদের কেউ আছে। ইনশাআল্লাহ সবই আমরা জানতে পারব।’
বেয়ারা নাস্তার ট্রলি নিয়ে প্রবেশ করল।
নাস্তার বিশাল আয়োজন দেখে আহমদ মুসা বলল, ‘দেখছি ডিনারের কাজ হয়ে যাবে!’
‘ডিনার পর্যন্ত তো আপনাকে রাখা যাবে না, থাকবেন না। সেই কবে আসার পর মাত্র ১ দিনের জন্য মেহমানদারির সুযোগ পেয়েছিলাম। তারপর আপনাদের আর পাইনি। অনেক ঝড়-ঝাপটা আপনার উপর দিয়ে গেল। সৌভাগ্যবশত আজ আমার বাড়িতে আপনাকে পেলাম। ছাড়ি কি করে?’
‘ধন্যবাদ, মি. প্রেসিডেন্ট। আসুন, দেরি করে লাভ নেই।’
প্রেসিডেন্ট এগিয়ে এসে বললেন, এ সময় এত সব খাবার বয়স আমার নেই। আমি কফি খেয়ে আপনাকে সঙ্গ দেব। আপনি শুরু করুন।
‘ধন্যবাদ, মি. প্রেসিডেন্ট’ বলে আহমদ মুসা নাস্তা খাবার জন্যে কাঁটা চামচ হাতে নিতেই কাঁটা চামচের ব্রান্ড নামের উপর আহমদ মুসার চোখ আটকে গেল। পড়ল, ‘আরিয়েহ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ।’ কিছুটা বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল আহমদ মুসার চোখে মুখে!
নাস্তা খাওয়া শুরু করে আহমদ মুসা বলল, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আপনাদের কাঁটা চামচ কি আপনাদের দেশীয় কোম্পানীর?’
‘হ্যাঁ, মি. আহমদ মুসা। কোম্পানী আমাদের দেশীয়। সুন্দর নয় জিনিসগুলো? এ কোম্পানীর এই প্রোডাক্টগুলো বিদেশেও খুব পপুলার।’
‘কোম্পানীটা কি প্রাইভেট?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘হ্যাঁ, প্রাইভেট।’ প্রেসিডেন্ট বলল।
‘স্যরি, মালিক কে বা কারা কোম্পানিটির?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
হাসল প্রেসিডেন্ট। বলল, ‘মালিক বা মালিকদের নাম আমি জানিনা। তবে বিরাট পুঁজিওয়ালা কোম্পানি ওটা। উত্তর ইস্তাম্বুলে বসফরাসের তীরে পাহাড় অঞ্চলে বিশাল এলাকা নিয়েছে ওদের গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির জন্যে। কিন্তু কোম্পানীর বিষয়টি আপনার এভাবে মাথায় ঢুকল কেন?’
কোম্পানীর নামের প্রথম শব্দ আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ‘আরিয়েহ’ নামটা হিব্রু। তৌরাতের সৈনিকের আরিয়েহ! তুরস্কের একটি কোম্পানীর নামের আগে হিব্রু শব্দ কেন? এ জিজ্ঞাসা থেকেই আহমদ মুসার প্রশ্নগুলো। কিন্তু আহমদ মুসা এসব কোন কথা না তুলে বলল, ‘আমাদের এশিয়ান প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে বিদেশী তৈজসপত্রই সব সময় দেখে আসছি। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের খাবার টেবিলে দেশী কাঁটা চামচ দেখেই আমি কোম্পানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ধন্যবাদ আপনাকে, একসেলেন্সি।’
আরও কথাবার্তা হলো।
নাস্তা শেষ করে কফি খেয়ে বিদায় নিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে বিদায় নেবার সময় প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ‘মি. আহমদ মুসা, সব ব্যাপারে আপনার যে অনুসন্ধিৎসা, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি এই কাঁটা চামচ ব্যাবহার করছি অনেক দিন। কিন্তু আমি খেয়ালই করিনি কাঁটা চামচ ঐ কোম্পানির। তবে কোম্পানি সম্পর্কে কোন এক অকেশনে আমি ঐ কথাগুলো জানতে পারি।’
‘আপনার প্রাসাদের এসব কেনাকাটা কার দায়িত্ব?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘ব্যবস্থাপনার একটা উইং আছে। তারাই এসব দেখে।’ প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন।
উইংটির হেড কে জানতে ইচ্ছা হয়েছিল আহমদ মুসার। কিন্তু প্রশ্নটাকে সৌজন্যের খেলাফ মনে করে বিদায় নিয়ে চলে এসেছিল।

পাম গার্ডেনের প্রাচীর টপকানোর পর প্রতি মুহুর্তে বিপদের আশংকা নিয়ে এক পা দু’পা করে আহমদ মুসা যখন পাম গার্ডেনের মূল বিল্ডিং-এর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল,তখন দূরে কৃষ্ণ সাগরের বুকে সোবহে সাদেকের সফেদ আলো ফুটে উঠেছে।
তার সাথে পাম গার্ডেন এলাকার গোটা অবয়বও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রাচীর ঘেরা বিশাল পাম গার্ডেন এলাকা। উত্তর ইস্তাম্বুলের বসফরাসের পশ্চিমে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে জেকেরিয়ার উত্তর-পূর্বে বিশাল এলাকা নিয়ে এই পাম গার্ডেন এলাকা। গোটা এলাকাই উঁচু প্রাচীরে ঘেরা।
আহমদ মুসার চাহিদা অনুসারে জেনারেল মোস্তফার নির্দেশে মধ্যরাত থেকে নিরাপত্তা রক্ষীরা পাম গার্ডেন এলাকা ঘিরে রেখেছে। জেনারেল মোস্তফাও একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার সংকেতের অপেক্ষা করছে।
ঠিক হয়েছে আহমদ মুসা গোপনে একাই ভেতরে প্রবেশ করবে। ভেতরটা অনুসন্ধানের পর করণীয় সম্পর্কে আহমদ মুসা জানানোর পর বাইরের নিরাপত্তা বাহিনী মুভ করবে।
আহমদ মুসা দেয়ালের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকাল। দেয়ালটা ৪ তলার উঁচু পর্যন্ত উঠে গেছে। দেয়াল ডিঙাতে তাকে চারতলা উঁচু পর্যন্ত উঠতে হবে।
পেছন দিকে দরজা আছে কিনা তা দেখার জন্যে আহমদ মুসা দেয়ালের গোঁড়া ধরে হাঁটতে লাগল।
গোটা পেছনটা ঘুরল আহমদ মুসা। কিন্তু সলিড ওয়াল ছাড়া আর কিছুই পেলনা। একতলা পরিমান উঁচুতে কোন জানালা পর্যন্ত নেই। দেয়ালের স্ট্রাকচার অনেকটা গোডাউন বা জেলখানার মত।
দেয়ালের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে হতাশ ভাবে চারদিকে তাকাল আহমদ মুসা। ভোরের সফেদ আলো নেমে আসলেও তখনও অন্ধকার কাটেনি। তবে বিল্ডিং-এর স্ট্রাকচারগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই আলো-আঁধারের মধ্যে আহমদ মুসার প্রাচীরের ভেতরে কম্পাউন্ডে সিনাগগের স্ট্রাকচার নজরে পড়ল। ভাল করে দেখল সিনাগগই, কিন্তু এত ছোট!
কৌতূহলবশতই সেদিকে এগুলো আহমদ মুসা।
ডিজাইনের দিক দিয়ে বিল্ডিংটি নিখুঁত এক সিনাগগ, এমনকি দরজা, জানালার কারুকাজ পর্যন্ত সিনাগগের।
কিন্তু এত বড় কমপ্লেক্সের মধ্যে এত ছোট সিনাগগ কেন?
দরজার দিকে আরেকটু এগোলো আহমদ মুসা।
দরজার ওপরের মাথায় চৌকাঠে মাকড়সার জাল দেখে বিস্মিত হল আহমদ মুসা। এত সুন্দর করে সিনাগগ তৈরি হয়েছে তার ব্যবহার হবে না কেন?
দরজার আরও ঘনিষ্ঠ হলো আহমদ মুসা।
দরজার মুখোমুখি হতেই দরজার সুশৃঙ্খল ডিজাইনের মধ্যে অসম একটা আঁকাজোঁকার ওপর আহমদ মুসার নজর আটকে গেল। ডিজাইনগুলোর সবই দরজার রংয়ে দরজার ওপর খোদাই করা। সুশৃঙ্খল ডিজাইনের ওপর বিশৃঙ্খল আঁকাজোঁকা সহজেই আহমদ মুসার নজরে পড়ে গিয়েছিল।
আঁকাজোঁকার ওপর নজর স্থির হতেই আহমদ মুসা দেখল ওগুলো অর্থহীন নয় আঁকাজোঁকা নয়। ওগুলো হিব্রু অক্ষর।
হিব্রু অক্ষর দেখে আগ্রহ বাড়ল আহমদ মুসার। অক্ষরগুলো মিলিয়ে আহমদ মুসা পড়ল শব্দটি ইলিরাজ (Eliraz)। হিব্রু ‘ইলিরাজ’ শব্দের অর্থ ‘মাই গড ইজ মাই সিক্রেট’ (আমার ঈশ্বর আমার গোপনীয়তা)।
আহমদ মুসার মনে পড়ল, ইহুদীরা এই কথাকে তাদের গোপনীয়তার শপথ কিংবা গোপনীয়তা রক্ষার দোয়া হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু আহমদ মুসা বুঝতে পারল না, এই কথাটি এখানে এই দরজার উপর লেখা কেন? আহমদ মুসা জানে এই পাম গার্ডেনে গোপনীয়তার কিছু অবশ্যই আছে। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার দোয়াটা এই দরজায় কেন? তাহলে কি এখানে গোপনীয়তার কিছু আছে?
আহমদ মুসার মন খুশি হয়ে উঠল। প্রশ্ন এলো মনে, এই ছোট্ট স্থাপনার সিনাগগের ডিজাইন কি কোন ক্যামোফ্লেজ?
ভেতরে ঢোকার জন্যে দরজা ঠেলল আহমদ মুসা।
খুলে গেল দরজা।
আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে পকেট থেকে পেন্সিল টর্চটা বের করে জ্বালাল।
ঘরের চারদিক দেখল।
ঘরটি প্রার্থনার ঘরের মতো করেই সাজানো। ঘরের পশ্চিম দিকে একটা বেদি। বেদির ওপর একটা ডেস্ক।
আহমদ মুসা উঠে গেল বেদির ওপর। দেখল বুক সমান উঁচু ডেস্কটি একটা বাক্স বা আলমারির মতো। বাক্স বা আলমারির দু’টি পাল্লা এলুমিনিয়াম প্যানেলের ওপর দাঁড়ানো।
ডেস্কটি দেখলেই মনে হবে উঁচু চেয়ারে বসে ডেস্কে বই, ফাইল ইত্যাদি রাখা হয়। আর অনুষ্ঠানের জিনিসপত্র, কাগজপত্র রাখা হয় ডেস্কের আলমারিতে।
কোন কাগজপত্র কি আছে ডেস্কের আলমারিতে? তাতে গোপনীয় বা প্রয়োজনীয় কিছু থাকতে পারে?
আহমদ মুসা আলমারিটি খোলার জন্যে এলুমিনিয়াম প্যানেলের উপর দাঁড়ানো দু’টি পাল্লা দু’দিকে ঠেলে দিল।
খোলা জায়গা দিয়ে সামনে তাকাতেই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল আহমদ মুসার মুখ। দেখল কংক্রিটের একটা সরু সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ আহমদ মুসা আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করল। সে ভাবল, নিশ্চয় এই সিঁড়ি পাম গার্ডেন থেকে বেরুবার একটা গোপন এক্সিট পয়েন্ট। তার মানে এই সিঁড়ি দিয়ে পাম গার্ডেনে প্রবেশ করা যাবে।
পকেট থেকে আহমদ মুসা মেশিন রিভলবারটা বের করে হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করল।
আহমদ মুসার বাম হাতে টর্চ এবং ডান হাতে উদ্যত রিভলবার।
সিঁড়িটি মোটামুটি প্রশস্ত, একটা লম্বা ঘরে গিয়ে শেষ হলো।
ঘরটিতে একটা খাটিয়া, পানির পাত্র, ইত্যাদিসহ টুকিটাকি জিনিস রয়েছে। দেখলেই মনে হবে মিনি সিনাগগটির এটা একটা রেস্ট রুম অথবা মালখানা এবং এটা এখানেই শেষ।
কিন্তু আহমদ মুসা এটা মানতে পারল না। নিশ্চয় এখানে একটা গোপন পথ পাওয়া যাবে পাম গার্ডেনের ভেতরে ঢোকার।
আহমদ মুসা ঘরের চারদিকটা ঘুরল। মেঝে, দেয়াল সবটাই সলিড।
খাটিয়াটি ঘরের কোণায়। দেয়াল সেঁটে পাতা আছে।
খাটিয়ার উপর হালকা বেড।
খাটিয়ার নিচটা দেখার জন্যে আহমদ মুসা খাটিয়ার লম্বা লম্বি প্রান্ত ধরে ওপরে তুলল।
খাটিয়ার মাথা তিন-সাড়ে তিন ফুটের মতো ওপরে ওঠাতেই খাটিয়াটি আকস্মাৎ হাত থেকে ছুটে গিয়ে দেয়ালের গায়ে সেঁটে গেল এবং নিচের মেঝেটা চোখের পলকে দেয়ালে ঢুকে গেল। আর তার সঙ্গেই একটা সিঁড়িপথ উন্মুক্ত হয়ে গেল।
আল্লাহর এই সাহায্যের জন্যে তার শুকরিয়া আদায় করে আহমদ মুসা এক হাতে টর্চ অন্য হাতে রিভলবার নিয়ে নামতে শুরু করল। বিশ-বাইশ স্টেপের একটা দীর্ঘ সিঁড়ি।
সিঁড়িটা এবার নেমে এলো বিশাল ফুটবল খেলার মাঠের মতো একটা হলঘরে। মেরিল দুর্গের নিচে আইআরটি’র টেস্ট গ্রাউন্ডের মতোই এটা বিশাল।
বিশাল ক্ষেত্রটির চারদিকে চাইতে গিয়ে একে পরিত্যক্ত মনে হলো। বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে মেঝের এখানে-সেখানে ইস্পাত ও কংক্রিটের স্থাপনা। ভাঙাচোরা। দেখেই মনে হচ্ছে, তাড়াহুড়ো করে ভেঙেচুরে কেউ যেন এগুলো থেকে কিছু খুলে নিয়ে গেছে!
এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে দেখতে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় সরু লম্বা প্লাস্টিকের একটা সাইনবোর্ড পেল। সাইনবোর্ডটি হিব্রু ভাষায়। হিব্রু ভাষা দেখে সাইন বোর্ড হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা। পড়ল ‘ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন’ (FSDD) টেস্ট কাউন্ট ডাউন।
সাইন বোর্ডের নামে বিস্ময়-বিস্ফারিত হল আহমদ মুসার চোখ। ওদের ফোটন মারনাস্ত্রটি কি এই ‘ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন’ (FSDD)? এখানেই কি তার টেস্ট হতো? ল্যাবরেটরি তাহলে কি ওপরে? কিন্তু (FSDD) এখানে কেন? কোথায় গেল ওসব? ওরা কেউ কি এখানে নেই তাহলে? ওপরটা দেখতে হবে। ছুটল আহমদ মুসা ওপরে ওঠার জন্যে সিঁড়ির খোঁজে।
সিঁড়ি পেল না, কিন্তু বিশাল লিফট পেয়ে গেল।
লিফটে উঠে ওপরে চলে এলো আহমদ মুসা।
ওপরে উঠেই আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এ বাড়িতে কেউ নেই।
আহমদ মুসা টেলিফোন করল জেনারেল মোস্তফার কাছে। বলল, ‘আমরা ঠিক ঠিকানায় এসেছি। কিন্তু ইতোমধ্যেই চিড়িয়া উড়ে গেছে। আপনি চলে আসুন এবং দয়া করে আইআরটি’র বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাসকে এখানে আসতে বলুন। সব কিছুই তারা নিয়ে গেছে, কিন্তু যা পড়ে আছে তা থেকে ওদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে বলে আমি মনে করি।’
‘ঠিক আছে মি. খালেদ খাকান। আমি বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাসকে এখনি আসতে বলছি। আর আমি আসছি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা টেলিফোনের ওপার থেকে।
জেনারেল মোস্তফা এলে আহমদ মুসা বলল, ‘বিজ্ঞানী ইবনুল আব্বাস আসলে এক সাথে সব দেখা যাবে! আসুন, আমি যা দেখেছি সে বিষয়ে আপনার সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করি।’
গল্প চলল তাদের দু’জনের মধ্যে।
আধা ঘণ্টার মধ্যে বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস এসে পৌঁছলেন।
আহমদ মুসা টাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘আপনার জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি। ‘থ্রী জিরো’র এটা একটা ঘাঁটি। ওদের যে ফোটন মারনাস্ত্রের কথা আমরা জানি, তার গবেষণা, পরীক্ষা ইত্যাদি বোধ হয় এখানেই হয়েছে। এ বিষয় সুস্পষ্ট ধারনা নেয়ার জন্যে আমরা আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। আপনি এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করলে বাধিত হবো।’
‘অবশ্যই, চলুন দেখি।’ বলল বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস।
পাম গার্ডেনের মূল বিল্ডিংটি তিনতলা। তিনতলাটা বসবাসের জন্যে। দু’তলায় ল্যাবরেটরি। গ্রাউন্ড ফ্লোরটা স্টোর। আণ্ডারগ্রাউন্ড দুই ফ্লোরের ওপরের তলাটি হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং শপ। আর তার নিচের ফ্লোরটি টেস্ট গ্রাউন্ড।
বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখল। সময়ের জ্ঞান তার ছিল না। যেন নেশার ঘোর তাকে পেয়ে বসেছিল! সর্বশেষে ‘ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন’-এর সাইন বোর্ড নিয়ে বিজ্ঞানী ইবনুল আব্বাস টেস্ট গ্রাউন্ডের মাটিতেই বসে পড়ল। সাইন বোর্ডটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘এ যে দেখছি মানবের সাথে দানবের লড়াই!’ আমাদের অস্ত্রের নাম ‘saviour of world rational demon’ (বিশ্বের মানব সম্প্রদায়ের রক্ষক) আর ওদেরটা হলো ‘foton sailent destrauction demon’ (নিরব ধবংসের ফোটন-দানব)। আমাদেরটা মানুষের শান্তি-স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে, আর ওদেরটা ধংসের তাণ্ডব চালিয়ে মানুষকে দাস বানানোর জন্যে।’
শান্ত কণ্ঠে এই স্বগোতক্তি করার পর বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস মুখ তুলে আহমদ মুসার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, এখানেই ফোটন মারনাস্ত্র যার নাম ‘ফোটন সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন’-এর গবেষণা, নির্মাণ, টেস্ট ও ব্যবহারের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে ফোটন অস্ত্র ও এর মূল বাহক যন্ত্র এখানে তৈরি হলেও কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্টস ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে এসেছে। ট্রাস কর্নারে জমা কার্টুনগুলো থেকে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেসব স্পেয়ার পার্টসের স্পেসিফেকিশনে ওদের ফোটন মারনাস্ত্র, অবয়ব, প্রকার ও শক্তিরও আঁচ করা যাবে। তবে এ ব্যাপারে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।’
থামলেন বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস।
‘আপনি আনন্দের কথা শোনালেন। যদি ওদের মারনাস্ত্রের আকৃতি, প্রকৃতি ও শক্তি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সেটা হবে আমাদের জন্য বিরাট লাভের। আপনি তাদের সে অস্ত্র এখান থেকেই ব্যবহৃত হয়েছে বললেন। কিন্তু সে রকম সাইলো-টাইলো তো এখানে নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ফোটন অস্ত্রের জন্যে সাইলোর দরকার হয় না। এর জন্যে বিরাট বপুর ভারী ক্ষেপণাস্ত্রেরও দরকার হয় না। জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ধাতব-পরমাণুকে আলোতে রূপান্তরিত করা হয়। সে আলোর ঘনীভুত আঁধারে স্থাপন করা হয় অকল্পনীয় মাত্রার এ্যাকটিভেটেড ও কমপ্রেসড ফোটন পারটিকেলস। তারপর একে পরিচালিত করা হয় লক্ষ্যের দিকে। এর গতি আলোর গতির মত হয় না। গতি নিয়ন্ত্রিত করা যায় বলে এটা মিনিটে গোটা পৃথিবী একবার ঘুরে আসতে পারে, আবার মিনিটে এক মাইল দুরেও পাঠানো যায়।’ বলল বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস।
‘যা বললেন, সেটা ওদের ফোটন মারনাস্ত্রের ফাংশন। ওদের এ অস্ত্র অফেনসিভ। কিন্তু আমাদের ডিফেনসিভ অস্ত্র ‘সোর্ড’-এর ফাংশন কেমন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের, ‘সাইলেন্ট ডেস্ট্রাকশন ডেমন’ (নিরব ধ্বংস দানব) ও আমাদের ‘সেভিয়ার অব ওয়ার্ল্ড র‍্যাশনাল ডোমেইন’ (বিশ্ব মানবতার রক্ষক) অস্ত্রের মূল কনসেপ্ট একই। উভয়েই ফোটন পারটিকেলস থেকে তৈরি। উভয়ের ধ্বংস ক্ষমতার চরিত্রও একই রকম। তবে দুই অস্ত্রের প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওদেরটা সবার শক্তিকে ধ্বংস করে সবাইকে দাস বানানোর লক্ষ্যে সৃষ্টি। আর আমাদেরটা মাত্র আক্রমন করতে আসা অস্ত্রকে ধ্বংস করে পৃথিবীর সব মানুষকে রক্ষার লক্ষ্যে তৈরি। নির্মাণ কৌশলের দিক দিয়েও দুই অস্ত্রের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। ফোটন পারটিকেলসকে ধ্বংসাত্মক আক্রমনের অস্ত্র হিসেবে তৈরি করা সহজ। ওরা সেটাই করেছে। কিন্তু আমরা ফোটন পার্টিকেলসকে আক্রমণকারী সব অস্ত্রকে ধ্বংস করার আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র হিসেবে ডেভেলপ করেছি। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আক্রমণকারী অস্ত্র আক্রমনে ছুটে এলে তাকে আকাশেই বন্দী করে দূর আকাশে নিয়ে গিয়ে ধ্বংস করা হবে যাতে পৃথিবীর কোন ক্ষতি না হয়। এটা অত্যন্ত জটিল এক টেকনোলজিক্যাল উদ্ভাবনির মধ্যমে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।’
‘আল্লাহর রহমতে আমরা গর্ব করতে পারি, দুনিয়াতে এটা আমাদের অদ্বিতীয় এক উদ্ভাবন। দুনিয়ার আর কারও বিজ্ঞান এর ধারে কাছেও যেতে পারেনি। এজন্যে আমাদের সোর্ড’কে বাগিয়ে নেয়া, এর সূত্র ও নির্মাণ কৌশলকে হাত করার জন্যে ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
দীর্ঘ বক্তব্য দিল বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস আব্দুল্লাহ।
‘আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাদের দুনিয়ার মানুষকে রক্ষার জন্য এ ধরনের অস্ত্র উদ্ভাবনের তৌফিক দিয়েছেন। এর দ্বারা আবার প্রমানিত হলো, আমরা দুনিয়ার সব মানুষ, আল্লাহর সব বান্দাহর স্বার্থ ও শান্তির পক্ষে। আমাদের হাতে বিজ্ঞান ফিরে আসা মাত্র আমরা তাকে ধ্বংস নয়, মানুষের কল্যাণ ও তাদের রক্ষার কাজে লাগিয়েছি।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই জেনারেল মোস্তফা বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ, ড. ইবনুল আব্বাস, ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। এখন আপনারা একটা পরামর্শ দিন, এই পাম গার্ডেনকে কি আমরা এভাবেই রেখে যাব, না একে আমাদের তত্বাবধানে নেয়া দরকার।’
‘না, না এটাকে ফেলে রাখা বা অরক্ষিত রাখা যাবে না। এখানে এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত এখনও আছে, যা খুবই মূল্যবান। আমি মনে করি, পাম গার্ডেনকে আইআরটির তত্বাবধানে দেয়া উচিত।’ দ্রুত কণ্ঠে জোর দিয়ে বলল ড. ইবনুল আব্বাস।
‘ঠিক আছে। আমরা পাম গার্ডেনকে আপাতত তালাবদ্ধ করে এর চারদিকে পাহারা বসিয়ে রাখছি। তারপর সরকার আপনাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘ঠিক আছে তাহলে আপনি এটাই করুন। আমরা গাড়িতে গিয়ে বসছি, আপনি আসুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে। ধন্যবাদ।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
আহমদ মুসা ও বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস পাম গার্ডেন থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোলো।
আহমদ মুসারা গিয়ে গাড়িতে বসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই জেনারেল মোস্তফা চলে এলো।
জেনারেল মোস্তফা বসেই বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, আমরা যাচ্ছি এখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। বিষয়টা তাকে ব্রিফ করা দরকার।’
আহমদ মুসা তখন ভাবছিল অন্য বিষয়। জেনারেল মোস্তফার কথায় এদিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা, আপনারা যান। আমাকে একটা জরুরি কাজে যেতে হবে কয়েক জায়গায়।’
জেনারেল মোস্তফা একটু ভাবল। বলল, ‘সেটা নিশ্চয়, আমি মনে করি, এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক আছে মি. খালেদ খাকান। উইস ইউ গুড লাক!’
‘ধন্যবাদ জেনারেল মোস্তফা’ বলে আহমদ মুসা গাড়িতে স্টার্ট দিল।

বসফরাস কলেজ অব টেকনোলজির কার পার্কিং-এ গাড়ি পার্ক করে কলেজ ক্যাফেটেরিয়াটা খুঁজে নিল আহমদ মুসা।
ঢুকল ক্যাফেটেরিয়ায়।
বেশ বড় ক্যাফেটেরিয়া।
ঘড়িতে দেখল বিকেল ৬টা বাজতে কিছু বাকি।
ক্যাফেটেরিয়াটি গমগমে নয়। তবে প্রায় টেবিলেই একজন দু’জন করে বসে আছে।
একটা খালি টেবিল বেছে নিয়ে বসল গিয়ে তাতে আহমদ মুসা।
হান্নাহ হাগেরার জন্যে এখন অপেক্ষা।
টেলিফোনে কথা হয়েছে আধা ঘণ্টা আগে। তিনটায় তার ক্লাস শেষ হবার পর সে হোস্টেলে ফিরেছে। সে বলেছে ছ’টায় সে ক্যাফেটেরিয়াতে থাকবে।
গোটা ক্যাফেটেরিয়ার ওপর একবার চোখ বুলাল আহমদ মুসা। না, হান্নাহ হাগেরা আসেনি এখনও।
চোখ ঘুরিয়ে নিতেই দরজায় চোখ পড়ল আহমদ মুসার। চোখ পড়ল হান্নাহ হাগেরার দিকে। সে দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে চোখ বুলাচ্ছে।
সেও দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে।
হাত তুলে আঙুল নাচিয়ে আহমদ মুসাকে স্বাগত জানিয়ে চলে এলো আহমদ মুসার কাছে।
আহমদ মুসা একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ, তুমি ঠিক ছয়টাতেই ক্যাফেটেরিয়াতে এসেছ হান্নাহ।’
‘এ কৃতিত্ব আমার নয়, সময়টা যাকে দিয়েছিলাম তার। এক মিনিট দেরি করার সাহস আমার হয়নি।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘বুঝলাম না, আমি ভীতির বিষয় হলাম কেমন করে?’ আহমদ মসা বলল। তার কণ্ঠে বিস্ময়!
হাসল হান্নাহ হাগেরা। বলল, ‘শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা থেকে ভয় ও সতর্কতা আসে।’
‘তা আসতে পারে। তুমি কেমন আছ? তোমার আব্বা কেমন আছেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জিজ্ঞেস করলেন না, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র আপনি হলেন কি করে?’ আহমদ মুসার কথায় কান না দিয়ে বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘আমাদের সমাজে ছোটরা বড়দের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দেয়া স্বাভাবিক নিয়ম।’ বলল আহমদ মুসা।
হান্নাহ হাগেরার ভারী মুখেই হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনাকে ফাঁদে ফেলে কার সাধ্য! সব পথই আপনার জানা। ধন্যবাদ। এখন বলুন, কি জন্যে আমাকে তলব করেছেন?’
‘তলব করিনি। একটা সাহায্য চাইতে এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সাহায্য? আমার কাছে? তাও আবার আপনি?’ বলল হান্নাহ হাগেরা। তার মুখে বিস্ময়!
একটু থেমে মুখে হাসি টেনে বলল, ‘কি সাহায্য করে সৌভাগ্যবতী হতে পারি বলুন?’
‘ডেভিড ইয়াহুদরা বিধ্বংসী যে মারনাস্ত্র তৈরি করেছে বলে তোমরা বলেছিলে, সে সম্পর্কে কি তোমরা আর কিছু জেনেছ?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
বিস্ময়ের রেখা ফুটে উঠল হান্নাহ হাগেরার চোখে-মুখে। বলল, ‘না, এ ব্যাপার নিয়ে তো আর আমরা চিন্তা করিনি। কেন এ কথা জিজ্ঞেস করছেন?’
‘জানো তো ডেভিড ইয়াহুদরা আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। তাদের হাতের ভয়ানক অস্ত্র আমাদেরই তো আতংকের বিষয়! খোঁজ-খবর তো আমাদের নিতেই হবে। সে কারণেই এ ব্যাপারে আমাদের খোঁজ-খবর নিতে হচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আমরা তো আর ঐ ব্যাপারে খোঁজ নিইনি।’ হান্নাহ হাগেরা বলল।
‘ডেভিড ইয়াহুদ বিজ্ঞানী নন আমরা জানি। তার পক্ষে কে এই গবেষণা কাজ করছে বলতে পার তোমরা?’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার দৃষ্টি হান্নাহ হাগেরার ওপর স্থির নিবদ্ধ।
হান্নাহও আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে।
হান্নাহ হাগেরা বলতে চাইল যে, বিষয়টার অত দূর আমরা জানি না। কিন্তু আহমদ মুসার চোখের সামনে মিথ্যা কথাটা গলা পর্যন্ত এসেও আটকে গেল। তার মনে হল আহমদ মুসার মিষ্টি, অথচ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি তার অন্তরের কথাগুলো যেন সব পড়তে পারছে!
কোন কথাই বলল না হান্নাহ হাগেরা।
আহমদ মুসাই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘প্লিজ হান্নাহ, কারও ক্ষতি আমরা করতে চাই না। আমরা চাই, ঐ ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক অস্ত্র শুধু নয়, কোটি মানুষকে বাঁচাতে চাই সন্ত্রাসীদের দাসত্বের হাত থেকে। প্লিজ আমাদের সাহায্য কর।’
হান্নাহ হাগেরার মনে পড়ল তার পিতার কাছ থেকে শোনা কথা, ডেভিড ইয়াহুদরা দুনিয়ার সবার অস্ত্র ধ্বংস করে দুনিয়ার সবাইকে পদানত করতে চায়। খালেদ খাকান তো চাইছে তাদেরই বাঁচাতে। এমন ভয়ংকর অস্ত্র তৈরি করছে যে বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান আরিয়েহ সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে, সেই বিজ্ঞানীর নিরাপত্তা তার কাছে বড় হবে কেন? তার নাম গোপন করে অবশ্যই ঠিক করেননি তার আব্বা।
সোফায় হেলান দিয়ে সোজা হয়ে বসল হান্নাহ হাগেরা। বলল, ‘আমি যতটা জানি, সেই বিজ্ঞানীর নাম আব্দুর রহমান আরিয়েহ। তিনি…।’
‘তিনি পার্টিকেল সাইন্সের একজন রিটায়ার্ড প্রফেসর।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে আপনি জানেন তাকে?’ হান্নাহ হাগেরা বলল।
‘এটুকুই। তিনি কোথায় থাকেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘স্যরি। আমার দৌড় নাম জানা পর্যন্তই। আর আমার সাথে তার পরিচয় সিনাগগে। আব্বাও তিনি কোথায় থাকেন জানেন না। তবে আমার ধারণা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানতে পারেন।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
হান্নাহ’র শেষের কথাগুলো আহমদ মুসার কাছে পৌঁছেনি। সে তখন ভাবছিল অন্য কথা। আসলেই তার ঠিকানা এদের কারও জানার কথা নয়। ঐ ধরনের ভয়ংকর অস্ত্র যিনি তৈরি করেন, যেখানে বসে তৈরি করেন, তার অবস্থান হান্নাহ ও ডেভিড হারজেলের মতো কিছুটা বাইরের লোকদের জানানো হবে তা স্বাভাবিক নয়। তাছাড়া পাম গার্ডেনই যদি ড. আব্দুর রহমান আরিয়েহর কর্মস্থল-আবাসস্থল হয়ে থাকে, তাহলে তো তিনি সেখানে এখন নেই।
ভাবনার মধ্যে কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল। হান্নাহ হাগেরার কথার জবাব দেয়া হয়নি।
হান্নাহই কথা বলল আবার, ‘কি ভাবছেন?’
‘ভাবছি বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান আরিয়েহর কথা। কি করে জানব সে কি করছে, কতোটা এগিয়েছে! তবু খুশি হলাম হান্নাহ যে, তোমার কাছে তার নামটি জানা গেল। বলতে পার, বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান কোন্‌ সিনাগগের সদস্য ছিলেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যরি! আমি জানিনা। ঠিক আছে আমি আব্বাকে জিজ্ঞেস করছি।’ বলেই হান্নাহ হাগেরা তার মোবাইলে একটা কল করল।
কথা শুরুর আগেই আহমদ মুসা দ্রুত তাকে বলল, ‘তুমি একটু জিজ্ঞেস করবে, সেখানে সদস্যদের রেজিস্টার রাখা হয় কিনা কিংবা যারা আসে সবার রেজিস্ট্রেশন হয় কিনা।’
‘ধন্যবাদ’ বলে মোবাইল কলের দিকে মনোযোগ দিল।
কথা বলল সে তার আব্বার সাথে। সে কোন্‌ সিনাগগের সদস্য, সিনাগগে রেজিস্টার আছে কিনা, নাম রেজিস্ট্রি করতে হয় কিনা ইত্যাদি সব কথাই সে জিজ্ঞেস করল।
কথা শেষ করে, কল অফ করে সিনাগগটির নাম উল্লেখ করে বলল, ‘আব্বার সাথে আব্দুর রহমান আরিয়েহর এই সিনাগগে দেখা হতো। আব্বা বললেন, সিনাগগে কোন রেজিস্টার রাখা হয়না। রেজিস্টার সিনাগগ কাউন্সিলে। সিনাগগ কাউন্সিলই সদস্যদের পছন্দ অনুসারে সিনাগগ বরাদ্দ করেন।’
‘ধন্যবাদ। তোমাকে কষ্ট দিলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ দিয়ে উঠতে চাচ্ছেন তা হবে না। আমাদের কেন্টিনের বিকালের নাস্তা খুব ভাল।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
‘নাস্তায় আপত্তি নেই। এর জন্যে ধন্যবাদ পাবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
হান্নাহ হাগেরা হেসে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ সবচেয়ে সহজ ও সস্তা পেমেন্ট।’
‘কারণ এটার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। যেমন রোদ, বৃষ্টি, বায়ু, ইত্যাদির কোন মূল্য লাগে না। কারণ আল্লাহ এগুলো সবার জন্যে অপরিহার্য করেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
আল্লাহর প্রতি আপনার খুব বিশ্বাস, না?’ জিজ্ঞাসা হান্নাহ হাগেরার।
‘হ্যাঁ, যিনি সৃষ্টি করেছেন, পালন করেছেন এবং যাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস অবশ্যই থাকবে। তোমার বিশ্বাস নেই?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
গম্ভীর হল হান্নাহ হাগেরার মুখ। বলল, ঈশ্বর একজন আছেন বিশ্বাস করি। কিন্তু সিনাগগে আমি যাই না। কোন আনুষ্ঠানিকতাও পালন করি না। এসবের মধ্যে আমি কোন প্রাণ খুঁজে পাই না। ধর্ম যদি ঈশ্বরের ইচ্ছায় জীবন গঠনের জন্যে হয়, তাহলে জীবন গঠনের কিছু পাই না ধর্মে।’
‘কোন ধর্মেই পাবে না বা নেই, একথা ঠিক নয়। তোমার ধর্মে এটা ঠিক হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সব ধর্মই তো ধর্ম। একই ধরনের। তবে মানি, আপনাদের ধর্মে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আছে। এটা ইউনিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা আপনাদের ধর্মকে সক্রিয় রেখেছে।’ বলল হান্নাহ হাগেরা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘হান্নাহ, তুমি আমাদের ধর্মকে আংশিকভাবে দেখেছো। পুরোটা দেখলে বলতে ইসলাম সত্যিই মানুষের জীবন গঠনের ধর্ম!’
হাসল হান্নাহ হাগেরা। বলল, ‘এটা কিন্তু এক ধরনের ধর্ম প্রচার।’
‘ভালোর দিকে ডাকা সব সময়ই ভালো কাজ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে ভালোর দিকে যাওয়া সব সময়ই ভালো। অর্থ ভালোর দিকে আমাকে যেতে হবে। তার মানে আপনি আমাকে ‘প্ররোচনা’ দিচ্ছেন ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্যে।’ বলল হান্নাহ হাগেরা। তার মুখে হাসি।
‘ভালো’র দিকে যেতে বলাকে ‘প্ররোচনা’ বলে না, ‘প্রেরণা’ বলে।’ আহমদ মুসা বলল।
নাস্তা এসে গেল টেবিলে।
‘মেনে নিলাম ‘প্রেরণা’ দিয়েছেন। এখন প্রেরণা কাজে লাগলে হয়। আসুন শুরু করি। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।’ কথা বলার সাথে সাথেই হান্নাহ হাগেরা আহমদ মুসার প্লেটে মাছের গরম কাটলেট তুলে দিল।
‘প্রেরনা’ কাজে লাগা, না লাগা নির্ভর করে গ্রহণকারীর আন্তরিকতার ওপর।’ বলে আহমদ মুসা কাঁটা চামচ হাতে তুলে নিল।
‘ঠিক আছে বলটা আমার কোর্টেই থাক। তবে প্রেরণাদাতাকে বলের খোঁজ-খবর নিতে হবে।
‘কিন্তু এটা শর্ত হওয়া উচিত নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
হান্নাহ হাগেরা হাসল। বলল, ‘তথাস্তু।’
বলে হান্নাহ হাগেরাও কাঁটা চামচ হাতে নিল।

মুখ বিষণ্ণ আব্দুর রহমান আরিয়েহর।
তার অফিস রুমের পাশেই বসার ঘরে একটা সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে সে।
বলছিল ডেভিড ইয়াহুদ, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ড. আরিয়েহ। আপনি সন্দেহ ঠিকই করেছিলেন। আপনি ঠিক সময়ে সরে আসার সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যেত!’
‘সর্বনাশ হয়েছে কিনা কে বলতে পারে?’ সোফায় সোজা হয়ে বসল ড. আবদুর রহমান আরিয়েহ।
‘তার মানে?’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ। সেও সোফায় সোজা হয়ে বসেছে।
‘তাড়াহুড়া করে আমাদের সেখান থেকে আসতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব আমরা সরিয়ে এনেছি বটে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কিছু সেখানে পড়ে আছে এবং আমাদের FSDD-এর স্থাপনার চিহ্ন সেখানে রয়েছে যা থেকে এর ডিজাইন সম্পর্কে একটা ধারনা হতে পারে। তেমনিভাবে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারে যা থেকে কোন গবেষণার প্রকার-প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যেতে পারে।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘আপনার কথা ঠিক। একটা ধারণা তারা পেতে পারে। তবে সে ধারণা দ্বারা তারা অবশ্যই আমাদের FSDD সম্পর্কে কোন কিছুই আঁচ করতে পারবে না বলেই আমি মনে করি। কিন্তু আমি ভাবছি বাড়িটার ঠিকানা তারা কিভাবে পেল? দ্বিতীয়ত বাড়িটার লোকদের কারও সম্পর্কে তারা কিছু জানতে পেরেছে কিনা, বিশেষ করে আপনার নাম?’ ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘তা পারবে না। বাড়িটা রেজিস্ট্রি করা আছে পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষণাকারী একটা এনজিও’র নামে। এনজিওটা আমার নাম ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এ দ্বারা বাড়িটা আমার তা প্রমাণিত হবে না। কারণ রেজিস্ট্রেশনের পরবর্তী রেকর্ডে আমার নাম নেই।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, শুরু থেকেই আমরা এতটা সতর্ক ছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের সতর্ক হতে হবে। এক এক করে আমরা পেছনে হটে এই শেষ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থানকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘কিন্তু কিভাবে সেটা আমরা পারব? পাম ট্রি গার্ডেনের ঘাঁটিটাকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেছিলাম। কিন্তু সেটাও তো ওদের নজরে পড়ে গেল।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘নিশ্চয়েই অসাধ্য সাধন করেছে খালেদ খাকান নামের শয়তান আহমদ মুসা। সে ইস্তাম্বুলে আসার পর থেকেই আমাদের পিছু হটা শুরু হয়েছে। তার মতো বড় শয়তান আর নেই। তাকে পথ থেকে সরাতে না পারলে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবেনা।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘কিন্তু কিভাবে? চেষ্টা তো কম হয়নি!’ ড. আরিয়েহ বলল।
ড. ডেভিড ইয়াহুদ ভাবছিল। সংগে সংগেই সে ড. আরিয়েহর কথার জবাব দিল না।
একটু ভেবে ডেভিড ইয়াহুদ বলল, ‘তাকে পথ থেকে সরাবার আমরা কোন চেষ্টাই বাকি রাখিনি। হত্যাই তাকে আমাদের পথ থেকে সরাবার একমাত্র পথ। সে চেষ্টা অতীতে বহুবার করা হয়েছে, এবারও কয়েকবার করা হয়েছে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে কোন চেষ্টাই সফল হয়নি।’ একটু থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘তাহলে?’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘আমি একটা নতুন চিন্তা করেছি। আমাদের কর্মী স্মার্থা প্রেসিডেন্ট হাউজে আমাদের অত্যন্ত বিশ্বাসী একজন লোককে অনেকদিন আগে সেট করেছে। স্মার্থা আমাকে গতকাল জানিয়েছে, ট্রান্সমিটার সেট করতে গিয়ে প্রোটোকল পদে নিয়োগ করা আমাদের লোক ধরা পড়ার পর বিপর্যয়ের মধ্যে আমরা পড়েছিলাম, সেটা কাটিয়ে ওঠা গেছে। প্রেসিডেন্টের ব্যবস্থাপনা বিভাগে লোক থাকায় খাদ্য তৈরি বিভাগে দু’জন লোক ঢোকানো গেছে। এরা দু’জন আগে ইস্তাম্বুল সেনা গ্যারিসনের কুকিং-এ কাজ করত। সুতরাং অসুবিধা হয়নি।’
থামল আবার ডেভিড ইয়াহুদ।
‘এখন কি করতে চান?’ জিজ্ঞাসা ড. আরিয়েহর।
‘এবার বড় ঘটনা ঘটাতে চাই। স্বয়ং প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করবো এবার আমরা। একমাত্র তাঁকে কিডন্যাপ করলেই আহমদ মুসাকে আমাদের হাতে তুলে দিতে বা বহিস্কার করতে বাধ্য করা যাবে। তাকে হাতে পেলে বা বহিষ্কার করতে পারলে ওদের সোর্ড-এর ফর্মুলা উদ্ধার ও বিজ্ঞানীদের হাতে পাওয়াও সহজ হয়ে যাবে।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ।
‘কিন্তু প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করা কি সম্ভব হবে? সফল হলে তার ফল হবে অকল্পনীয়, কিন্তু ব্যার্থ হলে তার কুফলও হতে পারে…।’
ড. আরিয়েহর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, ‘স্যার, খারাপ কিছু ভাবার দরকার নেই। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোন বিকল্প নেই। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। আমাদের বিজয়ী হতেই হবে। আর…।’
মোবাইল বেজে উঠল ডেভিড ইয়াহুদের। কথা থামিয়ে মোবাইল তুলে নিল।
‘হ্যাঁ, ওয়েলকাম স্মার্থা। বল।’ বলে স্মার্থার সাথে কথা বলতে শুরু করল ডেভিড ইয়াহুদ। কথা বলতে বলতে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ড. ডেভিড ইয়াহুদের মুখ।
স্মার্থাকে ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে কথা শেষ করেই ডেভিড ইয়াহুদ ফিরে তাকাল ড. আরিয়েহর দিকে। বলল, ‘একটা সুখবর ড. আরিয়েহ। আমার চিন্তার সাথে এই সুখবরটা পরিপুরক। স্মার্থা জানাল, প্রেসিডেন্ট ইস্তাম্বুলে থাকার যে সময় নির্ধারিত ছিল, তার আগেই তিনি আংকারা চলে যাচ্ছেন। তাঁর অফিস ও পার্সোনাল স্টাফের অগ্রবর্তী দল ইতিমধ্যেই আংকারা চলে গেছে। দু’একদিনের মধ্যে তিনি চলে যাবেন। একটা মিনিমাম স্টাফ নিয়ে তিনি আছেন।’
থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আপনি যে সুযোগ চাচ্ছিলেন, মনে হয় ঈশ্বর সে সুযোগ আপনাকে দিয়েছেন। এখন দেখুন সুযোগ কিভাবে কাজে লাগাবেন।’ বলল বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ।
‘সেজন্যে আরও তথ্য আমাদের দরকার। আমাদের বেন গালিব গিদন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ব্যবস্থাপনা বিভাগে এবং আরও দু’জন কুকিং বিভাগে থাকলেও তাদের টেলিফোন-মোবাইল ব্যবহার করতে না পারা এবং প্রাসাদের বাইরে বেরুতে বিধি-নিষেধ থাকার কারণে তাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা পাওয়া কঠিন। তবে স্মার্থা চেষ্টা করে বেন গালিব গিদনের সাথে যোগাযোগ করতে। তাছাড়া সে খবরটা জেনেছে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষকদের কাছ থেকে। শিক্ষকরা গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রোগ্রামে নিয়ে আসার জন্যে।’
থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘প্রেসিডেন্ট কি তাদের দাওয়াত গ্রহন করেছেন? গ্রহন করলে খুব ভাল হয়।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘কেন বলছেন এ কথা?’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘প্রেসিডেন্ট দাওয়াত কবুল করলে শিক্ষকদের সাথে তাঁর আরও যোগাযোগ হবে। স্মার্থা এই সুযোগ নিতে পারবে। আমি সেই কথাই বলছিলাম।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘ঠিক বলেছেন ড. আরিয়েহ। প্রেসিডেন্ট দাওয়াত গ্রহন করেছেন। স্মার্থা নিশ্চয় এ সুযোগ গ্রহন করতে পারবে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘স্মার্থা কতটা পারবে, সেটাই চিন্তার কথা।’ বলল ড. আরিয়েহ।
‘সেটা চিন্তার কথা বটে, তবে স্মার্থা শিক্ষক হিসেবে খুব পরিচিত। তার ওপর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে নিউক্লিয়ার বিষয়ের ওপর স্মার্থা একটা কোর্স করছে। সেই সূত্রেও স্মার্থা শিক্ষকদের সাথে পরিচিত এবং তাদের সাথে ব্যাপক ওঠাবসা আছে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। সত্যই স্মার্থা বড় একটা সুযোগ করে দিতে পেরেছে। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন!’
বলেই হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞানী ড. আরিয়েহ উঠে দাঁড়াল। বলল, দেরি হয়ে গেছে। ওরা ল্যাবে বসে আছে। যাই।’
ড. ডেভিড ইয়াহুদও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মি. আরিয়েহ, ওদের সোর্ড-এর পাওয়ারের পরিমাপ করাটা কি সম্ভব হয়েছে? আমাদের ‘ডাবল ডি’ ওদের ‘সোর্ড’-এর ডিফেন্স ভাঙতে না পারলে আমাদের সব প্লান-পরিকল্পনাই তো মাঠে মারা যাবে!’
‘হ্যাঁ, মি. ডেভিড ইয়াহুদ, ওদের ‘সোর্ড’-এর ডিফেন্স পাওয়ার যে এত উঁচু মানের তা আমি ভাবতেই পারিনি। আমাদের ডেমন ‘ডাবল ডি’ যে ৯০ ভাগ অংশ সরাসরি ‘সোর্ড’-এর মুখোমুখি হয়েছিল তার সবটাকেই ‘সোর্ড’ ভয়ংকর ব্ল্যাক হোলের মতো শুধু গিলেই ফেলেনি, আমাদের অ্যাটাকিং ফোটন পার্টিকেলগুলোকে রূপান্তরিত করে তার সহযোগী বানিয়ে ফেলেছে। সোর্ড-এর আওতার বাইরে থাকা মাত্র দশ ভাগ ডাবল ডি গিয়ে ওদের নৌবাহিনীর একটা অস্ত্র ডিপোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ ধ্বংসটুকুই আমাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক আক্রমণ মিশনের ফল।
থামল ড. আরিয়েহ মুহূর্তের জন্যে। পর মুহূর্তেই আবার মুখ খুলেছিল কথা শুরুর জন্যে। কিন্তু তার আগেই ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলে উঠল, ‘আপনার সহযোগী বিজ্ঞানী আইতানের কাছে এ ভয়ংকর খবর আমি শুনেছি মি. আরিয়েহ। কিন্তু, ‘সোর্ড’-এর ব্ল্যাক হোলের মতো এমন ভয়ংকর গ্র্যাভিটেশনাল ক্ষমতার কথা তিনি বলেননি। ‘সোর্ড’-এর পাওয়ার কি সত্যিই এতটা ভয়ংকর?’
থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। তার মুখ উদ্বেগ-আতংকে ভরা।
ড. আরিয়েহর মুখ ভয়ানক বিমর্ষ। সোফায় আবার সে বসে পড়ল। মনে হলো যেন আছড়ে পড়ল তার দেহটা সোফার ওপর। বলল, ‘বিস্ময় আমাদের হতবাক করে দিয়েছে! সর্বোচ্চ শক্তির আলোক পার্টিকেল তারাও ব্যবহার করেছে, আমরাও ব্যবহার করেছি। কিন্তু সেই পার্টিকেল শক্তিকে অতটা মাল্টিপ্লাট করল কি দিয়ে, কিভাবে? অলৌকিক এই গ্র্যাভিটেশনাল পুল (চৌম্বক আকর্ষণ শক্তি) এলো কি করে তাদের পার্টিকেলে? এই শক্তি বলেই সোর্ড যে কোন চলন্ত মরনাস্ত্র বন্দী করে ধ্বংস করতে পারে। আমার মনে হয় আজকের দিনে এটাই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিস্ময়!’
‘আপনারা বিষয়টার পরীক্ষা ও পরিমাপে কতটা এগোতে পেরেছেন?’ জিজ্ঞাসা ড. ডেভিড ইয়াহুদের।
ওটা দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার। ওটার ওপর কোন সিদ্বান্ত আটকে রাখা ঠিক হবে না। এখন আমাদের হাতে যে অস্ত্র আছে তাকেই কাজে লাগাতে হবে। সোর্ড-এর প্রতিরক্ষা সব কিছুকে বা গোটা দেশকে রক্ষা করতে পারে না। আমাদেরকে এই সুযোগ নিতে হবে। আমাদের শক্তি ছোট নয়। একদিনেই আমরা এদের অস্ত্রাগার, শিল্প-কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা ইত্যাদি ধ্বংস করে দেশকে বিরান ভূমিতে পরিণত করে দিতে পারি। ওদের ষ্টিল ফ্রেমের আকাশচুম্বি বিল্ডিংগুলো চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি মনে করি এরপর তারা আমাদের পায়ে পড়ে আমাদের দাবি মেনে নেবে।’
থামল ড. আরিয়েহ।
ওটা আমাদের সর্বশেষ সিদ্বান্ত। ওদিকে এখন যাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সকল প্রকার আন্তর্জাতিক জানাজানি ও প্রতিক্রিয়া আমাদের এখন এড়িয়ে চলতে হবে। আমাদের সব পরিকল্পনা ফেল করলে শেষ সিদ্বান্ত আমাদের নিতে হবে, তখন পশ্চিমের সাথে আমাদের ‘গিভ এন্ড টেক’- এর ভাগাভাগিতে যেতে হবে। এতে আমাদের মনোপলি থাকবে না এবং আসল লক্ষ্যও আমরা অর্জন করতে পারবো না। সুতরাং আমাদেরকে অন্য উপায়ে লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। আমরা যে পরিকল্পনা নিয়েছি, সেটা সফল হবে বলে আমি মনে করি।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ।
‘ঈশ্বর আমাদেরকে সাহায্য করুন!’ বলে আবার উঠে দাঁড়াল ড. আরিয়েহ। তার চোখে আশার আলো।
ড. আরিয়েহ ও ড. ডেভিড ইয়াহুদ দু’জনেই বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।

নানা চিন্তা কিলবিল করছে আহমদ মুসার মাথায়। আইআরটির ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এন্ড টেকনোলজি’র ওপর ওদের আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু ওদের আক্রমণের শক্তি যে কত ভয়ানক তা প্রমাণিত হয়েছে নৌবাহিনীর অস্ত্র ‘ডিপো’র ওপর ওদের আক্রমণের প্রকৃতি দেখে। এ এক ধরনের ভৌতিক ধ্বংসলীলা। আক্রমণকে কেউ দেখবে না, বুঝবে না, কিন্তু চোখের পলকে আস্ত্রাগার, কলকারখানা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। আমাদের ‘সোর্ড’-এর প্রটেকশন আমব্রেলা ছাড়া এই নিরব ধ্বংসলীলা রোধ করার আর কোন উপায় নেই। কিন্তু ‘সোর্ড’-এর এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা দেয়া যাবে, কত কত জায়গায় দেয়া যাবে? ধ্বংসের এই দৈত্য আগে বাড়তে দিলে গোটা দুনিয়ার কি হবে! সকলের নিরাপত্তার একমাত্র উপায় ড. আরিয়েহ এবং তার অস্ত্র ও গবেষণাকে ধ্বংস করা। এই কাজ দ্রুতই হতে হবে। কিন্তু আরিয়েহকে পাওয়া যাবে কোথায়? সে কি ইস্তাম্বুলেই আছে, না বাইরে কোথাও পালিয়েছে? বিশাল তার লটবহরকে এত তাড়াতাড়ি বাইরে নেয়া সম্ভব নয়। এটা নিশ্চিত যে, তারা ইস্তাম্বুলেই আছে। তাছাড়া ‘সোর্ড’-এর ব্যাপারটার কোন হেস্তনেস্ত না করে তারা দূরে সরবে না। ‘সোর্ড’কেই এখন তাদের একমাত্র ভয়। রোমেলী দুর্গে ‘আইআরটি’র ওপর আক্রমণ করে তারা বুঝেছে ‘সোর্ড’-এর কাছে তাদের অস্ত্র অচল। সুতরাং ‘সোর্ড’ এখন তাদের পথের একমাত্র বাধা, একমাত্র শত্রু। এ শত্রুকে রেখে তারা কোথাও যাবে না। আমরা যেমন এখন ড. আরিয়েহ-ডেভিডদের অস্ত্র ধ্বংস করাকেই প্রধান কাজ ভাবছি, তেমনি ওরাও ‘সোর্ড’-এর ফর্মুলা হাত করা এবং আমাদের আইআরটি ধ্বংস করে ‘সোর্ড’কে শেষ করে দেয়াকেই নিশ্চয় সবচেয়ে বড় বিষয় ভাবছে। সামনে একটা ভয়ংকর লড়াই। লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ তাদের মতো আমরাও গ্রহণ করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো, ওরা আমাদের সব জানে, কিন্তু ওদের আমরা কয়েকটা নাম ছাড়া কিছুই জানি না। ওদের ঘাঁটির সন্ধান করতে না পারলে আমরা ওদের ওপর আঘাত করতে পারছি না। ড. আরিয়েহর নাম পেলাম। এখন সবচেয়ে বড় দরকার ওদের ঘাঁটির সন্ধান পাওয়া।
আহমদ মুসার হাত দু’টি গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে ঠিকভাবে থাকলেও এবং তার দুই চোখের দৃষ্টি ঠিকভাবে কাজ করলেও এই সব চিন্তায় কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু জেনারেল মোস্তফার অফিস ক্রস করে যেতেই সে সম্বিত ফিরে পেল সম্ভবত গেটের সেন্ট্রির লম্বা স্যালুট দেখেই।
গাড়ি পেছনে নিয়ে গেট দিয়ে জেনারেল মোস্তফার অফিসে প্রবেশ করল।
গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল জেনারেল মোস্তফা। আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামতেই বলল, ‘কি ব্যাপার মি. খালেদ খাকান, আপনিও এমন আপনভোলা হয়ে পড়েন? বেমালুম অফিস পার হয়ে যাবার মতো এতটা?’
হাসল আহমদ মুসা। ডান হাতের ব্যাগটা বাম হাতে নিয়ে জেনারেল মোস্তফার সাথে হান্ডশেক করে বলল, ‘মাথায় এখন একটাই চিন্তা ড. ডেভিডদের নতুন ঠিকানা কোথায়?’
গম্ভীর হলো জেনারেল মোস্তফার মুখ। বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই তো এখনকার সবচেয়ে বড় চিন্তা। কিন্তু কিছু সুরাহা হলো মি. খালেদ?’
দু’জনেই গাড়ি বারান্দা থেকে বারান্দার ধাপ ভেঙে অফিসের দিকে উঠছিল। আলো কোন দিকেই দেখা যাচ্ছে না। এলাম একটা বিষয় আলোচনার জন্যে।’
অফিসে ঢুকে আহমদ মুসাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজের আসনে গিয়ে বসল। বলল, ‘বলুন মি. খালেদ খাকান। আমরা কি করব?’
আহমদ মুসা মুখ খুলেছিল কথা বলার জন্যে। তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল-স্ক্রীনে নামটা দেখেই আহমদ মুসা মোবাইল মুখের কাছে তুলে নিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম, জোসেফাইন, সব ঠিক-ঠাক তো! ভালো আছ তো!’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আমরা ভালো আছি। একটা জরুরি ব্যাপারে টেলিফোন করেছি। জেনি জিফা এইমাত্র টেলিফোন করেছিল। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে সে জানিয়েছে।’ ওপার থেকে বলল জোসেফাইন।
‘কি ঘটতে যাচ্ছে? কেন তিনি বললেন? কি জানতে পেরেছেন তিনি? এ সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছেন?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘একজন শিক্ষিকা তার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কোর্স করেন। তার কথাবার্তায় তিনি বিষয়টা আঁচ করেছেন। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কি একটা অনুষ্ঠান হবে! প্রেসিডেন্টকে সেখানে নেয়া হবে। সেই সূত্রে শিক্ষক প্রতিনিধিদল প্রেসিডেন্ট ভবনে কয়েকবার গেছেন। কোর্স করতে আসা শিক্ষিকা শিক্ষক প্রতিনিধি দলের সাথে যেসব কথা বলেছেন এবং যে চিঠিটা তিনি দিয়েছেন তা থেকেই তার সন্দেহ হয়েছে।’ বলল জোসেফাইন।
‘তেমন দু’একটা কথা কি তিনি জানিয়েছেন, চিঠিটা কি ছিল?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, চিঠিটা জেফি জিনাকেই দিয়েছিল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বেন গালিব গিদন নামের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেয়ার জন্যে। তাকে বলা হয়েছিল, কার পার্কিং-এ তাদের স্বাগত জানাতে আসা প্রোটোকল অফিসারের পাশেই লোকটি থাকবে। তার শার্টের নেম-ব্যান্ড–এ ‘বেন গালিব’ লেখা থাকবে। হ্যান্ডশেক করার সময় তাকেই চিঠিটা দিয়ে দিতে হবে। জেফি জিনা বলল, সে জানত যে, প্রেসিডেন্ট হাউজের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একজন ‘থ্রি জিরো’র বলে একটা সন্দেহ রয়েছে। বেন গালিব গিদন নামের ‘গিদন’ শব্দ দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। এ নামটি হিব্রু। তাওরাতের একজন বীর যোদ্ধার নাম এটা। এই সন্দেহ থেকেই চিঠিটা সে পড়ে। চিঠির বক্তব্যকে তার রহস্যপূর্ণ মনে হয়। চিঠিতে লেখা ছিল:
‘বেন গালিব গিদন,
তোমার ডেভিরা, পিতা, দু’চার দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছেন তুমি জান। যাওয়ার আগে একটা বুঝাপড়া হওয়া দরকার। ঘুম হলে সে ভালো থাকে। ডেব্রা, তোমার বোন, আসছে। ইলিরাজ ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
তোমার অ্যান্টি-
এসএম সিমশন।’
কথা শেষ করল জোসেফাইন।
‘চিঠিটা কি উনি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বেন গালিবকে দিয়েছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘দিয়েছে। না দিলে তো তিনি সন্দেহ করেছে, এটা ধরা পড়ে যেত। চিঠিটি কপি করে নিয়েছিল সে।’
‘চিঠি থেকে কি সন্দেহ করেছিলেন তিনি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘তিনি বলেছেন, ‘ডেভিরা’ বলতে প্রেসিডেন্টকে বুঝানো হয়েছে। ‘পিতা’ শব্দ ‘ডেভিরা’র পরে বসায় ওর কোন অর্থ নেই। প্রেসিডেন্টকে নিয়েই কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। ‘ডেভিরা’ শব্দের মতো ‘ডেব্রা’ শব্দেরও ভিন্ন অর্থ আছে।’ জোসেফাইন বলল।
মুহূর্তের জন্যে ভাবল আহমদ মুসা। মনের পাতায় গেঁথে যাওয়া চিঠির কথাগুলোর ওপর একবার নজর বুলাল সে। বলল, ‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। আমার মনে হয় ‘ইলিরাজ’ শব্দেরও বিশেষ অর্থ আছে। তোমার বান্ধবী ‘জেফি জিনা’কেও ধন্যবাদ। তাঁর বলা আর কোন কথা আছে জোসেফাইন?’
‘আমার বুঝি কোন কথা নেই? জেফির কথাই শুধু শুনতে চাচ্ছ যে!’
হাসি চাপতে চাপতে কথাটা বলল জোসেফাইন, বুঝল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আমি জোসেফাইনের কথা শুনেছি, জেফির নয়।’
‘কিন্তু আমি তো জেফি’র কথা বলছি।’ জোসেফাইন বলল।
‘কিন্তু মধুর কণ্ঠটা জোসেফাইনের, ভাষাও জোসেফাইনের, বিষয়ের কথা বাদ দাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘যাক, প্রশংসার দরকার নেই। তোমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। কিন্তু তুমি এখন কোথায়?’ বলল জোসেফাইন।
‘জেনারেল মোস্তফার অফিসে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কয়টা বাজে এখন?’ জোসেফাইনের জিজ্ঞাসা।
ঘড়ির দিকে না তাকিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘আজকে কিন্তু ঠিকই লাঞ্চে আসব। শর্ত হলো তোমার দেয়া ইনফরমেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এ সম্পর্কিত জরুরি কিছুতে জড়িয়ে না পড়লে ঠিকই আমাকে লাঞ্চের টেবিলে পাবে।’ হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা।
ওপার থেকে উত্তর আসতে একটু দেরি হলো। মূহূর্ত পরেই শোনা গেল জোসেফাইনের কণ্ঠস্বর। বলল, ‘লাঞ্চের কথা বলো না, আসতে পারবে না। অনুরোধ, লাঞ্চটা ঠিক সময়ে খেয়ে নিও। আর ডিনার থেকে কিন্তু ছুটি নেই, মনে রেখ।’
‘নিয়ন্ত্রণের রশিটা তো এমন করে টানা দেখে? নতুন মনে হচ্ছে।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
‘কেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বার্থ বুদ্ধ্বি বাড়বে না?’ বলল জোসেফাইন। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘তোমার স্বার্থ চিন্তা কত আছে আমি তা জানি। বল তো ব্যাপার কি?’
‘বলব না, তুমি ডিনারে এসো।’ জোসেফাইন বলল ওপার থেকে।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘জোসেফাইন, এতটা সময় আমাকে অশান্তিতে রাখতে পারবে তুমি?’
জোসেফাইনের উত্তর এলো একটু দেরিতে। বলল, ‘তুমি এখন যুদ্ধ্বক্ষেত্রে। আবেগকে এতটা প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমি…।’
জোসেফাইনের কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘একে আবেগ বলো না জোসেফাইন। এ আত্মা ও অস্তিত্বের আকুতি।’
‘স্যরি! আমার এ কথার অর্থ- প্রতি পদক্ষেপে তোমাকে স্বাভাবিক, সচেতন ও সাবধান থাকতে হবে। তুমি এমন একটা পথে, যেখানে জীবন ও মৃত্যু এক সাথে…।’
আবেগে রুদ্ব হয়ে গেল জোসেফাইনের গলা। কথা আটকে গেল তার।
কিন্তু সংগে সংগেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে গলাটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, ‘আজকের দিনটা কোন্‌ দিন বলত?’
‘আজ…?’ হঠাৎ সচেতন হয়ে স্মৃতির সন্ধানে লাগল আহমদ মুসা। কিছুটা বিব্রত হয়ে উঠল সে।
জোসেফাইনই আহমদ মুসাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো। বলল, ‘কয়েক বছর আগের এক সুন্দর অপরাহ্ন, প্যারিসের এক মসজিদ…।’
‘স্যরি, আর বলো না জোসেফাইন। এদিন তো ভোলার নয়। ভুলিনি তো এর আগে। আজ ভুললাম কি করে এই প্রিয় দিনটাকে! তোমার টেবিলে মেহেদীর রংটা দেখেও আমার মনে পড়া উচিত ছিল। ধন্যবাদ তোমাকে। আমি আসছি।’
‘আবার তুমি আবেগকে বড় করছ। না, তুমি আসবে না এখন। তোমার সামনে যে কাজ তা আমাদের ব্যাক্তিগত স্বার্থের চেয়ে অনেক বড়। সকালে তোমাকে বলিনি তার কারণও এটাই। আমি ডিনারে তোমার অপেক্ষা করবো।’ বলল জোসেফাইন।
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। সত্যিই সাংঘাতিক গোলকধাঁধায় পড়েছি। সমাধানটা দেখা যাচ্ছে খুব কাছে, কিন্তু কোন পথ আমরা পাচ্ছি না। তাহলে এখনকার মত এটুকুই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অসময়ে তোমার অনেকটা সময় নিয়েছি। দুঃখিত। খোদা হাফেজ! আসসালামু আলাইকুম।’ বলল জোসেফাইন।
‘কিন্তু আমি আনন্দিত হয়েছি। ওয়া আলাইকুম সালাম।’
আহমদ মুসা কল অফ করতেই উৎকণ্ঠিত জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘স্যরি মি. খালেদ খাকান, ম্যাডামকে কষ্ট দিবেন না। আমাদের অপরাধী করবেন না।’
একটু থামল। বলল আবার সংগে সংগেই, ‘মি. খালেদ খাকান, ম্যাডাম কি তথ্য দিলেন। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, চিঠি, সন্দেহ ইত্যাদি সব কথা শুনলাম। কিছুই বুঝলাম না।’ জেনারেল মোস্তফার চোখে-মুখে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘গুরুতর কিছু তথ্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাউজের একজন কর্মকর্তার কাছে একটা চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিটা রহস্যপূর্ণ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চিঠিতে কি ছিল সেটা কি জানা গেছে?’ দ্রুত কন্ঠে বলল, জেনারেল মোস্তফা।
‘চিঠিটা ছোট। আমাকে বলেছে। লিখুন, আমি বলছি।’
‘ধন্যবাদ’ বলে জেনারেল মোস্তফা একটা নোট প্যাড টেনে নিল। আহমদ মুসা বললে লিখে ফেলল জেনারেল মোস্তফা।
লেখার পর বলল, ‘হ্যাঁ, মি. খালেদ খাকান, বেন গালিব গিদনকে আমিও চিনতে পারছি। সে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের প্রশাসন বিভাগের কর্মচারী ব্যবস্থাপনা শাখার একজন কর্মকর্তা।’
‘সে কি ইহুদি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
প্রশ্ন শুনে বিস্মিত চোখে তাকাল জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘না তো, সে ইহুদি নয় তো!’
‘কিন্তু তার নামের ‘গিদন’ শব্দটা হিব্রু, ইহুদিরাই শুধু ব্যবহার করে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোন অর্থ আছে এ শব্দের?’
‘তাওরাতে উল্লিখিত একজন যোদ্ধার নাম এটা।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় বিমূঢ় চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল জেনারেল মোস্তফা। একটু পর বলল, ‘অথচ সে বলেছিল সিরিয়ার এক গ্রামের নাম গিদন। ওটা ছিল তার পূর্বপুরুষের বাসস্থান। পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবেই তারা নামের সাথে এই নাম ব্যবহার করে থাকে।’
মুহূর্তের জন্যে থেমেই আবার বলে উঠল, ‘দুনিয়াটা বড় অসরল। ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে মি. খালেদ খাকান যে, আমরা মুসলমানরা ছাড়া দুনিয়ার সবাইকেই দেখছি ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে দারুন মৌলবাদী। ওসমানীয় খিলাফত আমলে আমাদের তুরস্কে মুসলমানদের চেয়ে খৃষ্টান প্রজাদেরকেই বেশি সু্যোগ-সুবিধা দেয়া হতো। আর আমাদের আজকের নব্য তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে ইসলাম নির্বাসিতই হয়েছিল। কিন্তু আমরা ধর্ম ছাড়লেও ওরা কিন্তু দেখছি ওদের ধর্ম ছাড়েনি। যাক, আসুন, চিঠির দিকে মনোযোগ দিই।’
চিঠির ওপর নজর বুলাল জেনারেল মোস্তফা। বলল, ‘সত্যিই চিঠিটা রহস্যপূর্ণ। এই রহস্য থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, এই চিঠির পেছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে অবশ্যই। চিঠির কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হলে রহস্যটা বুঝা যাবে। বেন গালিব গিদনের ‘পিতা’ কে বা কি, ‘বুঝাপাড়া’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে, ‘ইলিরাজ’ কি ইত্যাদি। আপনি কিছু বুঝছেন, মি. খালেদ খাকান?’
‘আমিও চিন্তা করছি। যার কাছে তথ্য এসেছে তিনি কিছু ক্লু দিয়েছেন। বলেছেন; ‘পিতা’ শব্দের কোন অর্থ নেই। তেমনি আমার বোন শব্দেরও কোন অর্থ নেই। কারণ ‘বোন’ শব্দ ‘পিতা’র মতো ‘ডেব্রা’ শব্দের পরে বসেছে। ‘পিতা’ ও ‘বোন’ যদি অনর্থক শব্দ হয়, তাহলে ‘ডেভিরা’, ‘ ডেব্রা’ শব্দের নিশ্চয় কোন অর্থ আছে। ‘গিদন’ ও ‘ইলিরাজ’ শব্দ হিব্রু। ‘ডেভিরা’ ও ‘ডেব্রা’ নিশ্চয় হিব্রু শব্দ। এ দুটি শব্দের অর্থ জানা দরকার। হিব্রু ডিকশনারী নিশ্চয় আপনার অফিসে আছে।’
সংগে সংগে জেনারেল মোস্তফা উঠে গিয়ে হিব্রু ডিকশনারি নিয়ে এলো।
বসে ডিকশনারি থেকে শব্দ দু’টি খুঁজে বের করল। বলল, ‘হ্যাঁ, মি. খালেদ খাকান, ‘ডেভিরা’ শব্দের অর্থ আশ্রম, আশ্রয় এবং ‘ডেব্রা’ শব্দের অর্থ মৌমাছির ঝাঁক। আর ‘গিদন’ শব্দের অর্থ আপনি তো বলেছেনই। ‘ইলিরাজ’ শব্দ আপনার জানা। ওটার অর্থ কি?’
‘ইলিরাজ’ অর্থ ‘গোপন’।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বিদঘুটে’ সব অর্থ! চিঠিটার অর্থ তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে মি. খালেদ খাকান?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। বলল, ‘তোমার আশ্রয় দু’চার দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছে তুমি জান। যাওয়ার আগে একটা বুঝাপাড়া হওয়া দরকার। ঘুম হলে সে ভালো থাকে। মৌমাছির ঝাঁক আসছে। গোপন ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।’ তিনটি হিব্রু শব্দের অর্থ পাওয়ার পর এই দাঁড়াচ্ছে চিঠির বক্তব্য। যিনি এই তথ্যটা দিয়েছেন, তার বক্তব্য হলো চিঠির ‘ডেভিরা’ বা ‘আশ্রয়’ শব্দের অর্থ ‘প্রেসিডেন্ট’। এদিক থেকে ‘বুঝাপড়া’ ও ‘ঘুম’ বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সাথে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন হলো: ‘বুঝাপড়া’, ‘ঘুম’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে? আর পরবর্তী দুই বাক্যের ‘মৌমাছির ঝাঁক’ ও ‘গোপন ব্যাপার’ বিষয় দুটিও রহস্যপূর্ণ।’
‘প্রেসিডেন্টের সাথে বেন গালিব গিদনের কি বুঝাপড়া হতে পারে! নিশ্চয় এটা কোন ষড়যন্ত্র। আর শেষের ‘গোপন ব্যাপার’টাও সেই ষড়যন্ত্র। কিন্তু ‘ঘুম’ আর ‘মৌমাছির ঝাঁক’ বলতে কি বুঝাচ্ছে?’
থামল জেনারেল মোস্তফা।
‘আসল বিষয় সম্ভবত এই শব্দ দু’টির অর্থের মধ্যে নিহিত রয়েছে।’
বলে থামল আহমদ মুসা।
সোফায় গা এলিয়ে দিল আহমদ মুসা। অর্ধবোজা তার চোখ। গভীর ভাবনার ছাপ তার চোখে- মুখে।
হঠাৎ সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। তাকাল জেনারেল মোস্তফার দিকে। বলল, ‘মি. জেনারেল, ‘বুঝাপড়া’ ব্যাপারটা যদি তার ক্ষতি করার কোন ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে ‘ঘুম’ ও ‘মৌমাছির ঝাঁক’ সেই ক্ষতি করার অস্ত্র হতে পারে। যে ধরনের ‘ক্ষতি’ করা হবে, সেই ধরনের অস্ত্র হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কি ধরনের ক্ষতি করতে চায়? আমার মনে হচ্ছে, তাঁকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করা হবে। আর…।’
‘কিডন্যাপ? প্রেসিডেন্টকে!’ আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে বলল জেনারেল মোস্তফা। তার দু’চোখ ছানাবড়ার মতো বিস্ফোরিত!
একটু সামলে উঠেই জেনারেল মোস্তফা আবার দ্রুত কন্ঠে বলে উঠল, ‘এমন সাংঘাতিক চিন্তাটা আপনার কেন এলো?’
‘দেখুন, ইতিমধ্যে ওরা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে দু’টি কিডন্যাপের আশ্রয় নিয়েছে। তৃতীয় প্রচেষ্টাও কিডন্যাপেরই হতে পারে। বড় কোন ভিভিআইপিকে কিডন্যাপ তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সহজ। আর প্রেসিডেন্ট হতে পারেন তাদের সবচেয়ে মূল্যবান শিকার, লক্ষ্য অর্জনে যা হবে অব্যর্থ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কথায় যুক্তি আছে।’ শুকনো কন্ঠে বলল জেনারেল মোস্তফা। তার চোখ- মুখ থেকে রক্ত যেন সরে গেছে। তাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
কথাটা শেষ করে মুহূর্তের জন্যে থেমেই আবার বলল, ‘তাহলে, ‘ঘুম’ ও ‘মৌমাছির ঝাঁক’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?’
‘তাদের অতীতের দু’টি কিডন্যাপেই তারা ক্লোরোফরম জাতীয় সংজ্ঞালোপকারী বস্তু ব্যবহার করেছে। প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটতে পারে। ‘ঘুম’ শব্দটি আমি মনে করি, এরই ইংগিত দিচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে কোনওভাবে সংজ্ঞাহীন করে তাকে কিডন্যাপ করা হবে? ‘মৌমাছির ঝাঁক’ কথাটার কি অর্থ দাঁড়াচ্ছে?’ বলল অস্থির কন্ঠে জেনারেল মোস্তফা।
‘চিঠির ‘ঘুম’ শব্দের ইংগিত এ রকমই বলছে। আমার মতে ‘মৌমাছির ঝাঁক’ হতে পারে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত সেই বেন গালিব গিদনকে তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সাহায্য দিতে আসবে তারা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে এটা একটা পরিপূর্ণ ষড়যন্ত্র! ওরা আঁট-ঘাট বেঁধে লেগেছে। আমাদের মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে গিদনের মতো, সেই প্রটোকল অফিসারের মতো তাদের আরও লোক অনুপ্রবেশ করে থাকতে পারে। এত বড় ষড়যন্ত্র একার পক্ষে সম্ভব নয়।’
থামলো জেনারেল মোস্তফা। তার শুষ্ক কন্ঠ কাঁপছিল।
থেমেই আবার বলে উঠল, ‘এখনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের অফিসকে জানাতে হবে। মি খালেদ খাকান, এখনই আমাদের কিছু করা দরকার। কিন্তু কি করা দরকার? ষড়যন্ত্র কত দূর এগিয়েছে কে জানে! যদি কিছু…।’
কন্ঠ আপনাতেই থেমে গেল জেনারেল মোস্তফার।
‘চিঠির যা বক্তব্য তাতে প্রেসিডেন্ট আংকারা যাওয়ার আগেই তারা ঘটনা ঘটাবার চেষ্টা করবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে যে কোন সময় ঘটনা ঘটতে পারে। তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু এ সপ্তাহেই তিনি আংকারা যাবেন। তার মানে আর চার দিন বাকি। খুব বেশি ভাবার সময় নেই। এখন বলুন, কি করব আমরা? আমাকে এখনি একবার প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যেতে হবে।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘দুটি কাজ এখনি করুন। এক. মৌমাছির ঝাঁক মানে বাইরের লোক যাতে কোন পরিচয়েই কোনভাবেই ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করুন। দুই. প্রেসিডেন্ট প্রাসেদের চীফ অব স্টাফকে বলুন, তিনি যেন বেন গালিব গিদনকে চোখে চোখে রাখেন অথবা তাকে গ্রেফতারও করতে পারেন। আপনি প্রধানমন্ত্রীর ওখানে যান, কিন্তু আমাকে এখনই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাবার ব্যবস্থা করে দিন। প্রধানমন্ত্রীর ওখান থেকে আপনিও সেখানে আসুন।’ আহমদ মুসা বলল।
কোন কথা না বলে জেনারেল মোস্তফা অয়ারলেস তুলে নিল। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের চীফ অব স্টাফ ইসমত ইউসুফ ইনুনুর সাথে সংযোগ নিয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘আমি জেনারেল মোমস্তফা কামাল। বেন গালিব গিদন কোথায়?’
সালাম নিয়ে ওপার থেকে ইসমত ইউসুফ ইনুনু বলল, ‘স্যার, আজ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ইন্টারনাল স্টাফদের বার্ষিক গেট টুগেদার। বেন গালিব গিদন ওখানেই গেছে। আমিও যাব। তাকে দরকার স্যার?’
‘না। শোন, তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখ। আর প্রেসিডেন্টের সার্বক্ষণিক পার্সোনাল সিকিউরিটি বাড়িয়ে দাও। আর উনি এখানে থাকা পর্যন্ত আগামী কয়েকদিন দর্শনার্থীসহ সব রকম প্রোগ্রাম বাতিল করে দাও। মি. খালেদ খাকান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাচ্ছেন। তার প্রয়োজন অনূসারে তাকে সহযোগিতা করো। একটু পরে আমিও আসব।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘আপনার নির্দেশ পালিত হবে স্যার। আজ সকালে প্রেসিডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলোজিতে একটা প্রোগ্রাম করেছেন। কয়েকটা সাক্ষাৎকার ছাড়া সামনের কয়েকদিন বড় কোন প্রোগ্রাম নেই।’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘মাননীয় প্রেসিডেন্টের আজকের প্রোগ্রামটা ভালো হয়েছে। তিনি এখন কোথায়?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘উনি রেস্টে আছেন। একবার হয়তো অনুষ্ঠানেও আসবেন।’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘ঠিক আছে সাবধান থেক। মি. খালেদ খাকান যাচ্ছেন?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘স্যার, কিছু কি ঘটেছে? কোন কিছুর আশংকা আছে?’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘যে কোন সময় যে কোন কিছু ঘটতে পারে। আবার নাও ঘটতে পারে। কিন্তু ঘটবে এটা সামনে নিয়েই এ্যালার্ট থাকি আমরা।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘অবশ্যই স্যার।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে সালাম দিয়ে কল অফ করে দিয়েই জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘তাহলে মি. খালেদ খাকান, আমি উঠছি।’
‘আমিও উঠব। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের একটা লে-আউট আমি চাই, জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই এটা আপনার দেখা উচিত।’
বলেই জেনারেল মোস্তফা কম্পিউটার থেকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের একটা লে-আউটের প্রিন্ট বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘খেলাফত আমলের দোলমাবাসি প্যালেসই এখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ। প্রেসিডেন্ট যখন ইস্তাম্বুলে থাকেন, তখন এই প্রাসাদেই তিনি উঠেন। আগের লে-আউটের বড় ধরনের কোন পরিবর্তন হয়নি। আপনি দেখুন, কোন কিছু প্রশ্ন থাকলে ইসমত ইউসুফ ইনুনু উত্তর দিতে পারবে।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল জেনারেল মোস্তফাও।
দু’জনে এক সাথেই বেরিয়ে এলো।
গাড়ি বারান্দায় নেমে আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে নিজের গাড়ীর দিকে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, সত্যিই আমি উদ্বিগ্ন বোধ করছি। ওদের হাত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।’
‘আল্লাহ হাফেজ, জেনারেল মোস্তফা।’
বলে আহমদ মুসা নিজের গাড়ির দিকে এগোলো।

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের গেটে আহমদ মুসার গাড়ি ব্রেক করতেই একজন লোক, গোয়েন্দা অফিসারই হবে, ছুটে এলো আহমদ মুসার গাড়ীর জানালায়। আহমদ মুসা নিজের আইডি কার্ড তাকে দেখাতেই সে স্যালুট দিয়ে সরে দাঁড়িয়ে ইংগিতে গেট খুলে দিতে বলল।
আহমদ মুসার গাড়ি কার পার্কে দাঁড়াতেই একজন প্রোটোকল অফিসার ছুটে এলো। আহমদ মুসার গাড়ির দরজা খুলে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘ইনুনু স্যার ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, আমি প্রোটোকল অফিসার আহমদ তুঘরিল।’
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
হাঁটতে লাগল প্রোটোকল অফিসার আহমদ তুঘরিলের সাথে।
কার পার্কের পরে প্রেসিডেন্ট ভবনের মূল ফটক। ফটকে বডি স্ক্যানিং এর ব্যবস্থা আছে। স্ক্যানিং মেশিনের ভেতর দিয়েই সকলকে যেতে হয়।
কিন্তু প্রোটোকল অফিসার আহমদ মুসাকে পাশের গ্রীল গেট দিয়ে নিয়ে গেল যে গেট শুধু প্রেসিডেন্টই ব্যবহার করেন।
প্রাসাদে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা প্রাসাদের আশেপাশে যাদেরই দেখল, তাদের মধ্যে একটা ত্রস্ত ভাব।
‘আপনাদের যে বার্ষিক গেট টুগেদার হচ্ছিল, সেটা কি চলছে? মি. ইসমত ইউসুফ ইনুনু কি ঐখানেই ব্যস্ত?’ প্রোটোকল অফিসারকে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘স্যার, মহামান্য প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি গেট টুগেদার অনুষ্ঠনে আসছিলেন। আসার পথে হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। তাঁকে সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যেতে দেখে তার পিএস ও চারজন সিকিউরিটি অফিসারও সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। ইনুনু স্যার খবর পেয়ে ছুটে যান। তিনি বেন গালিব গিদনকে ডাক্তার ডাকার জন্যে পাঠিয়ে দিয়ে কয়েকজনকে নিয়ে ধরাধরি করে প্রেসিডেন্টকে তার কক্ষে নিচ্ছিলেন। আমি তখন এসেছি আপনাকে রিসিভ…।’
প্রোটোকল অফিসারের কথা শুনে আহমদ মুসা একবারে বজ্রাহতের মতো হয়ে গেল। প্রবল উদ্বেগ-আতংকের ছায়া নেমেছে তার চোখে। রহস্যময় সেই চিঠির ‘ঘুম’-এর কথা তার মনে পড়েছে। মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে।
পরক্ষণেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে প্রায় চিৎকার করার মতো কন্ঠে বলল, ‘আমাকে প্রেসিডেন্টের কাছে নিয়ে চল। সেখানে মি. ইনুনুও নিশ্চয় আছেন। চলো, দৌড় দাও।’
প্রোটোকল অফিসার একবার আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে দৌড় দিল। আহমদ মুসাও তার পিছনে দৌড়াচ্ছে।
দৌড়াবার পথেই আহমদ মুসা এক জায়গায় দেখতে পেল পাঁচ ব্যক্তি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। চারজন অস্ত্রধারী, একজন নিরস্ত্র।
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়ালো। বলল প্রোটোকল অফিসারকে লক্ষ্য করে, ‘এঁরাই কি প্রেসিডেন্টের পিএস ও পাঁচ জন সিকিউরিটি?’
প্রোটোকল অফিসারও থমকে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার।’
আহমদ মুসা বসে পড়ে একজনের নাকের কাছে মুখ নিয়ে গন্ধ শুঁকার চেষ্টা করল।
গন্ধ শুঁকেই চমকে উঠল সে। যা সন্দেহ করেছিল। তাদের সংজ্ঞাহীন করে রাখা হয়েছে। যে গন্ধটা পেল তা এক ধরনের ক্লোরোফরম জাতীয় গ্যাস। এর বৈশিষ্ট্য হলো দূর থেকে ফায়ার করে গ্যাসটা বাতাসে ছড়িয়ে দিলে এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে কেউ এর সংস্পর্শে এলে সে ধীরে ধীরে তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। ব্যাপারটা মানুষের কাছে অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো দেখায়। আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, এটা বেন গালিব গিদনদেরই কাজ। তাহলে প্রেসিডেন্টের কি অবস্থা? ওরা ক্লোরোফরম বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে চুপ করে অবশ্যই বসে নেই। তাহলে কি করেছে ওরা?
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উদ্বেগে আচ্ছন্ন তার মুখ। প্রোটোকল অফিসারকে বলল, ‘চল। প্রেসিডেন্টকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে?’
আবার ছুটতে লাগল প্রোটোকল অফিসার আহমদ তুঘরীল।
তারা প্রবেশ করেছে প্রেসিডেন্টের রেসিডেন্সিয়াল উইং-এ।
পেছনে পায়ের শব্দ শুনে মুখ ঘুরিয়ে দেখল, পোশাক পরা কয়েকজন সিকিউরিটির লোক ছুটে আসছে।
আরও কিছুটা এগিয়ে সুন্দর সাজানো একটা লাউঞ্জ পার হয়ে কয়েকটা ঘরের একটা সুন্দর ব্লক দেখতে পেল।
ফ্লোরটা তিন তলায় হতে পারে।
প্রোটোকল অফিসার বলল, ‘ঘরগুলোর সবই প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষ। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শয়নকক্ষে তিনি থাকেন।’
ঘরের সামনে তিনজন লোককে দাঁড়ানো এবং চারটি দেহ পড়ে থাকতে দেখল।
আরও কাছে এগিয়ে তারা দেখে বুঝল চারটি দেহই সংজ্ঞাহীন।
প্রোটোকল অফিসার বলল, ‘স্যার, প্রেসিডেন্টকে যারা ধরাধরি করে নিয়ে এসেছিল, সেই চীফ অব স্টাফ ইসমত ইউসুফ ইনুনু ও আরও চারজন সিকিউরিটির লোকও সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে।
আহমদ মুসারা পৌছে গেল সেখানে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়েই দাঁড়ানো তিনজনের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, ‘প্রেসিডেন্ট কোথায়? দ্রুত ও শক্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
পেছন থেকে দৌড়ে আসা সিকিউরিটির লোক এসে দাঁড়িয়েছে। তারাও শুনতে পেল আহমদ মুসার প্রশ্ন।
তিনজনের একজনের হাতে ডাক্তারী ব্যাগ। সেই বলল, ‘মি. গিদন আমাকে ডাকতে গিয়েছিল অসুস্থ প্রেসিডেন্টকে এসে দেখার জন্যে। আমরা এসে প্রেসিডেন্টকে পাইনি। এঁদের পাঁচজনকে সংজ্ঞাহীনভাবে পড়ে থাকতে দেখতে পেলাম। প্রেসিডেন্টের পার্সোনাল স্টাফ এসে বলল, মুখে গ্যাস মাস্ক লাগানো ডাক্তারের মতো এ্যাপ্রোন পরা চারজন লোক প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গেছে।’
থামল ডাক্তার, সে ইংগিত করে প্রেসিডেন্টের পার্সোনাল স্টাফকে দেখিয়ে দিয়েছিল।
‘কোথায় তুমি তাদেরকে দেখছ?’ আহমদ মুসার প্রশ্ন সেই পার্সোনাল স্টাফকে উদ্দেশ্য করে।
‘লিফটের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।’ বলল লোকটি।
‘তুমি চেন তাদের?’
‘না।’
‘তুমি তাদের ফলো করনি, অন্তত গেট পর্যন্ত?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘স্যার, আমাকে ওরা বলল, আমরা প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি গিয়ে ডাক্তারকে ডেকে আন। তিনি অবশিষ্টদের ব্যবস্থা করবেন। আমি সংগে সংগেই ডাক্তারের খোঁজে চলে যাই। ডাক্তারকে না পেয়ে দ্রুত এখানে ফিরে এসে দেখি ডাক্তার সাহেব এখানে।’
আহমদ মুসা পাশে এসে সিকিউরটির লোকদের একজনকে বলল, ‘আপনারা নিশ্চয় নিচের সিকিউরটি ক্যাম্প থেকে এসেছেন। সংজ্ঞাহীন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে নিশ্চয় কেউ নিচে নামেনি? আমরা নিচ থেকে আসলাম। আমরা এটা দেখিনি।’
‘গেটের দিকে যাবার পথেই আমাদের ক্যাম্প। কেউ নিচে যায়নি।’
‘আর কোন গেট নেই?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আছে, কিন্তু সেগুলো পার্মানেন্টলি বন্ধ। বন্ধ থাকলেও সে গেটগুলোতেও পাহারা আছে।’ বলল সিকুউরিটিদের একজন।
‘কিন্তু গেটগুলো তো কেউ খুলতেও পারে!’ বলল আহমদ মুসা।
আমাদের সিকিউরিটি অফিস থেকে গেটগুলোকে সার্বক্ষণিক মনিটর করা হয়। আমরা এখানে আসার আগ পর্যন্ত গেটগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণে ছিল। কিন্তু সেদিকে কেউ যায়নি।’
আহমদ মুসা এবার তাকাল ডাক্তার ও পার্সোনাল স্টাফ লোকটার মাঝখানে দাঁড়ানো লোকটার দিকে। আহমদ মুসা নিশ্চিত এই লোকটাই বেন গালিব গিদন। তবু আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনিই কি বেন গালিব গিদন?’
লোকটি ভীত ও বিস্মিত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘জি স্যার।’
‘ওরা কোন্‌ দিকে যেতে পারে মি. গিদন?’
‘আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা স্যার। ডাক্তার আনতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি এই অবস্থা।’ বলল গিদন।
‘গেটগুলো ছাড়া বাড়ি থেকে বেরুনোর আর কোন পথ আছে?’
‘আমি জানি না স্যার। আমার মনে হয় সে রকম কোন ব্যবস্থা নেই।’ বলল গিদন মুখটা নিচু রেখেই।
‘তাহলে ওরা গেল কোন্‌ দিক দিয়ে?’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা এখানে আসার আগে গাড়ীতে বসে যতটা সম্ভব প্রাসাদের লে-আউটের ওপর নজর বুলিয়েছে। গ্রাউন্ড মানে ফার্স্ট ফেজ লে-আউটের দক্ষিন-পূর্ব কোণের দিকে এক জায়গায় নিম্নমুখী একটা এ্যারো আঁকা আছে। এ ধরনের এ্যারো লে-আউটের অন্য আর কোথাও নেই। আর প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষের যে ব্লক, তা প্রাসাদের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকাতেই। এখান থেকে বসফরাসের পানি ও তীর খুব বেশি দূরে নয়। লে-আউটের তীরটা এই দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় সুনির্দিষ্টভাবে কোন এলাকাকে মিন করছে তা বলা মুস্কিল।’
‘এটাই এখন সবচেয়ে বড় রহস্যের স্যার।’ বলল লোকটি।
‘আপনার কাছেও এটা রহস্য?’
লোকটি চোখ তুলে চাইল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে বিস্ময় ও ভয় দুইই! বলল, ‘শুধু রহস্য নয় স্যার, সাংঘাতিক একটা রহস্য।’
‘এ সময়টা মিথ্যা বলার সময় নয় মি. গিদন। কিছু জানলে সেটা বলুন।’ বলল আহমদ মুসা নরম কন্ঠে।
লোকটির চোখ দু’টি চমকে উঠে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার আমি যা জানি তাই বলেছি।’
চারজন সিকিউরিটির লোকসহ সবার দৃষ্টি বেন গালিব গিদনের দিকে। সবার মনেই বিস্ময় কেন তাকে এভাবে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে! তাকে কি সন্দেহ করা হচ্ছে? কেন?
আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলবার বের করল। তাক করল তার দিকে। বলল, ‘আমি কিন্তু এক কথা দু’বার বলি না। বল, প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করে কোন্‌ পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?’ শক্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
বেন গালিব গিদন ভয়ার্ত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু কোন কথা বলল না।
আহমদ মুসা তার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝল, এ থ্রি জিরোর কোন পাকা ক্যাডার নয়। ‘থ্রি জিরো’র অনেককেই সে মুখোমুখি দেখেছে। তাদের চোখে ভয় থাকে না, থাকে হিংসার আগুন, ক্রোধের বহ্নি শিখা। ওদের কথা বলানো যায় না, একে কথা বলানো যাবে।
আহমদ মুসা আবার কথা বলল।
‘আমি তিন গোণা পর্যন্ত সময় দিলাম।’
বলেই আহমদ মুসা গুণতে লাগল, এক দুই…।
বেন গালিব গিদন চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘আমি কিছুই জানিনা। আমাকে…।’
আহমদ মুসার তর্জনি ট্রিগারে চেপে বসল। একটি গুলি বেরিয়ে গিয়ে বেন গিদনের কব্জির নিচে হাতের তালুর ওপরের একটা অংশ খাবলা দিয়ে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
সে চিৎকার করে কব্জি চেপে ধরল।
চমকে উঠল উপস্থিত সবাই। ভীত-বিব্রত সবাই। কিন্তু আহমদ মুসাকে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। তারা মনে করছে সে এ ব্যাপারে নিশ্চয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ।
আহমদ মুসার রিভলবারের নল একটুও নড়েনি। বলল কঠোর কন্ঠে, ‘গুলিটা তোমার কব্জি টেস্ট করেছে। যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর না দিলে এবার মাথা গুঁড়ো করে দেব।’
আহমদ মুসার রিভলবারের নল উঠতে লাগল তার মাথা লক্ষ্যে।
‘আমি বলছি, আমি বলছি স্যার।’
চিৎকার করে বলল বেন গালিব গিদন।
কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। বলতে লাগল, ‘ওরা সুড়ঙ্গ পথে এসেছিল। প্রেসিডেন্টের পারসোনাল সিকিউরিটি অফিসার এক লাখ ডলারের বিনিময়ে সুড়ঙ্গের মুখ ভেতর থেকে খুলে দিয়েছিল। আমিই তাকে টাকাটা দিয়েছিলাম। ঐ সিকিউরিটি অফিসারই তাকে দেয়া গ্যাসটিউব স্প্রেয়ার থেকে ক্লোফরম স্প্রে করেছিল।’
‘সুড়ঙ্গের মুখ কোথায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘প্রেসিডেন্টের বেড রুম ব্লকের ঠিক কেন্দ্রে বিশাল স্টিল লকারের মধ্যে।’ বলল বেন গালিব গিদন।
‘প্রেসিডেন্টের সে সিকিউরিটি অফিসারের নাম কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সোলেমান আফেন্দী।’
বলে সামনে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকা চারজন সিকিউরিটি অফিসারের একজনকে দেখিয়ে দিল সে।
মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইল পকেট থেকে বের করে স্ক্রীনের দিকে একবার তাকিয়ে মুখের কাছে তুলে নিয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা, সব শুনেছেন। আমি আসার পূর্বক্ষণে ঘটনা ঘটেছে। প্রেসিডেন্টকে সংজ্ঞাহীন করে কিডন্যাপ করা হয়েছে। তার সাথে আটজন সিকিউরিটি অফিসারও সংজ্ঞাহীন। সিকিউরিটি অফিসার সোলেমান আফেন্দী বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সেই সুড়ঙ্গ পথ খুলে দিয়েছে।’
‘প্রেসিডেন্টকে সুড়ঙ্গ পথে নিয়ে গেছে? তাহলে তো গোটা বসফরাস ও তীরবর্তী সব রাস্তা বন্ধ করে দিতে হবে। এখন আপনি কি করছেন? আমরা আর কি করব? প্রেসিডেন্ট কিডন্যাপ হয়েছেন এই সংবাদটাকে গোপন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ ভীত, উদ্বেগ-ভরা কন্ঠে বলল জেনারেল মোস্তফা।
সুড়ঙ্গ দিয়ে কিডন্যাপের কথাটা বেন গালিব গিদনের কাছ থেকে বের করেছি। সোলেমান আফেন্দীর নামও সেই বলেছে। শুনুন…।’
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। তাকে যে আপনি এত তাড়াতাড়ি কথা বলাতে পেরেছেন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘কথা বলাবার জন্যে তাকে গুলী করে আহত করতে হয়েছে। যাক। শুনুন, আমি সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছি। আপনারা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে পালাবার সব পথ বন্ধ করে দিন। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে মিনিট সাতেক সময় গেছে। ওরা নিশ্চয় সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পারেনি।’
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান, সিকিউরিটি অফিসারদের কাউকে নিয়ে আপনি সুড়ঙ্গে নামুন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘সুড়ঙ্গ দিয়ে এগোতে হবে ওদের অলক্ষ্যে। ওদের টের পেতে দেয়া যাবে না। ওরা নিশ্চয় সুড়ঙ্গ পথকে বিপজ্জনক করে গেছে। সুড়ঙ্গে ওদের সাথে লড়াই করা যাবে না। কারণ ওদের হাতে প্রেসিডেন্ট আছেন। ওখানে নিরব লড়াইয়ের প্রয়োজন হবে। সুতরাং লোক বেশি নিয়ে লাভ নেই। ওদের অস্ত্রে ওদের ঘায়েল করব, এটাই হবে আমাদের চেষ্টা।’
‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান। আপনার সিদ্ধান্তই ঠিক। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবচেয়ে বড়।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আরেকটা বিষয়, সুড়ঙ্গ কি একমুখী, না এর শাখা-প্রশাখা আছে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আমি সুড়ঙ্গে কোনদিন প্রবেশ করিনি। তবে জানি, সুড়ঙ্গটা একমুখী। কিন্তু ধাঁধা সৃষ্টির জন্যেই এর ব্লাইন্ড শাখা-প্রশাখা রয়েছে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ধন্যবাদ, জেনারেল মোস্তফা। আর কিছু?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আর কি বলব! প্রধানমন্ত্রী শুনে কেঁদে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন উপরে আল্লাহ এবং তাঁর বান্দা খালেদ খাকানই আমাদের ভরসা। আল্লাহ আপনাকে সব সময় সাহায্য করেছেন। এই কঠিন বিপদেও তিনি আপনাকে, আমাদেরকে সাহায্য করুন। পুলিশপ্রধান ও অন্যরা দুই-এক মিনিটের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পৌছে যাবেন। আমি এদিকটা দেখব।’
‘আল্লাহ সহায়। আসসালামু আলাইকুম।’
আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
তাকাল আহমদ মুসা সিকিউরিটি অফিসারদের দিকে। বলল, ‘তোমরা একজন এখনই এই বেন গালিব গিদন ও সোলেমান আফেন্দীকে গ্রেফতার কর। আর দু’জন যাও সুড়ঙ্গের মুখ ঠিক আছে কিনা দেখ। অন্যজন আমাকে ওখানে নিয়ে চল।’
সিকিউরিটি অফিসারদের চারজনেই পা ঠুকে আহমদ মুসাকে স্যালুট দিল।
আহমদ মুসা ব্যাগ খুলে একবার চেক করল তার গ্যাস মাস্ক, অত্যাধুনিক গ্যাস গান মাল্টি ডিটেক্টর, নাইট ভিউ গগলস, হিউম্যান বডি ওয়েভ, সেঞ্জিং মনিটর ইত্যাদি সব ঠিক আছে কিনা।

সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পঁয়ষট্টি এবং প্রায় পঁয়তাল্লিস ডিগ্রি কৌণিক পথে সিঁড়ি দিয়ে নামার পর সমতল সুড়ঙ্গ পেয়ে গেল আহমদ মুসা। হেঁটে চলার মতো যথেষ্ট বড় আয়তনের সুড়ঙ্গটি।
ওপরে-নিচে পাশে সব দিকেই পাথরের দেয়াল।
নিকশ অন্ধকার।এক সময় হয়তো আলোর বন্দোবস্ত ছিল। এখন নেই।
সুড়ঙ্গের সমতলে এসে আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়েছে।
সামনে পা ফেলার আগে তার মনে হলো, শত্রুরা শুধুই চলে যায়নি, তাদের যাতে কেউ ফলো করতে না পারে সেজন্যে তারা অবশ্যই কিছু করেছে বা করবে। কি করতে পারে? বিস্ফোরক পাততে পারে। গ্যাস ছাড়তে পারে। বাইলেনগুলোতে চোরাগুপ্তা হামলার জন্যে পাহারা বসাতে পারে।
আহমদ মুসা গ্যাস-মাস্ক পরে আছে। সুতরাং গ্যাস তার জন্যে কোন সমস্যা নয়। মাল্টি ডিটেক্টর তার হাতে আছে। এ ডিটেক্টর বিস্ফোরক যে কোন অবস্থায় থাক ডিটেক্ট করতে পারে। হিউম্যান বডি-ওয়েভ সেঞ্জিং মনিটরটি আহমদ মুসা জুড়ে দিয়েছে বিস্ফোরক ডিটেক্টরের সাথে। এর ফলে দু’টি বিষয়কে এক সাথে মনিটর করা যাবে।
আহমদ মুসা চলতে শুরু করল। তার দৃষ্টি বিস্ফোরক ডিটেক্টর ও হিউম্যান বডি ওয়েভ সেঞ্জিং মনিটরের দিকে। দ্রুত এগোচ্ছে আহমদ মুসা।
ওরা কি সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পেরেছে? মনে হয় না। প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করার পর তারা এ পর্যন্ত যে সময় পেয়েছে, তাতে তারা সুড়ঙ্গের অর্ধেক পথ পার হতে পারে। সুতরাং তারা যখন সুড়ঙ্গের প্রান্তে পৌঁছবে তখন নিশ্চয় উদ্ধার অভিযানের জন্যে সেনা সদস্য ও পুলিশ মোতায়েন হয় যাবে। সুতরাং প্রেসিডেন্টকে নিয়ে তাদের সরে পড়া অবশ্যই সম্ভব হবে না। তখন তারা কি পদক্ষেপ নেবে সেটাই চিন্তার বিষয়। কারণ এর সাথে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার বিষয় জড়িত আছে।
সুড়ঙ্গের অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে আহমদ মুসা। কতটা পথ বলা মুস্কিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো অর্ধেকটা পথ সে অবশ্যই পার হয়েছে। সংগে সংগেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। তার মানে ওরা সুড়ঙ্গের বাইরের প্রান্তে পৌছে গেছে। যে কোন ঘটনার সময় তাহলে আসন্ন।
আহমদ মুসা তাকাল হিউম্যান সেঞ্জিং মনিটরের দিকে। কিন্তু স্ক্রিনটা অন্ধকার। তার মানে কোন হিউম্যান বডি তার রেঞ্জের মধ্যে আসেনি।
যতটা সম্ভব একই দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে আহমদ মুসা।
হঠাৎ সংগে সংগে কয়েকটা ধাতব সংঘর্ষের শব্দ কানে এলো আহমদ মুসার। শব্দগুলো কানে পৌঁছতেই আহমদ মুসা ডান দিকে কাত হয়ে পড়ে গেল সুড়ঙ্গের দেয়ালে।
কিন্তু দেরী করে ফেলেছিল আহমদ মুসা। খেসারত দিতে হলো বাম বাহুকে। কাঁধের সন্ধিস্থলের বাহু-মাস্‌লের একটা অংশ উড়ে গেল।
হাত থেকে পড়ে গেল স্টিকটা।
অবিরাম গুলী আসছে।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়েছিল সুড়ঙ্গের ফ্লোরের একপাশে।
গুলীগুলোর সবই সুড়ঙ্গের ফ্লোরের এক-দেড় ফুট ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই স্টিকটা টেনে তার মাথায় সেট করা হউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরের দিকে তাকাল। দেখল ১০০ মিটার সংখ্যাটি ফ্লাশ করছে। তার মানে ওরা একশ’ মিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। নিশ্চয় ওরাও তাদের সেঞ্জিং মনিটরে আহমদ মুসার অবস্থান চিহ্নিত করেছে। তার অবস্থান টের পেয়েই তারা গুলী ছুঁড়ছে।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজ-কটনের একটা বড় টুকরা বের করে বাম বাহুটা বেঁধে নিল।
ইতিমধ্যে গুলীবর্ষণ কমে এসেছিল।
আহমদ মুসা ক্রলিং করে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। গুলী যেহেতু ফ্লোরের এক-দেড় ফুট ওপর দিয়ে যাচ্ছে, তাই ক্রলিং করে সে এগোতে পারে।
বাড়তি সতর্কতা হিসাবে আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে বুলেট-প্রুফ হেড কভার বের করে মাথায় পরে নিল। মুখে গ্যাস-মাস্ক থাকায় হেড কভারটা সেট করতে একটু অসুবিধা হলেও মোটামুটি সেট হয়ে গেল।
ক্রলিং করে এগোতে লাগল আহমদ মুসা।
আট-দশ ফুট এগোতেই আবার গুলী বৃষ্টি বেড়ে গেল।
আহমদ মুসা কিন্তু থামল না। এগোতেই লাগল।
আহমদ মুসা পাল্টা গুলী করতে পারছিল না। কারণ ওদের সাথে প্রেসিডেন্ট আছেন। কোনক্রমেই তার নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না।
আরও বিশ বাইশ মিটার চলার পর আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
মোবাইল বের করে কল অন করতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কন্ঠ শুনতে পেল আহমদ মুসা। বলছিল সে, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি ঠিক আছেন? কোন্‌ অবস্থানে আপনি?’
‘আমি ভালো আছি। আমি সুড়ঙ্গে ওদের থেকে ৭০ মিটার দূরে, গুলী বৃষ্টির মধ্যে ক্রলিং করে এগোচ্ছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘খুব সাবধান, মি. খালেদ খাকান। আপনার নিরাপত্তা কিন্তু আমাদের কাছে খুব বড় বিষয়। এদিকে কিন্তু মহাসংকট! আমরা সুড়ঙ্গ এলাকাসহ গোটা বসফরাস অঞ্চল বন্ধ করে দিয়েছি। ওরা সম্ভবত সুড়ঙ্গের মুখের কাছাকাছি কোথাও অবস্থান করছে। পাঁচ মিনিট আগে ওরা দু’ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে একটা হেলিকপ্টারে বিজ্ঞানী ড. আমির আব্দুল্লাহ আন্দালুসি ও খালিদ খাকানকে নিয়ে সুড়ঙ্গ গেটে পৌঁছাতে হবে। হেলিকপ্টারে করে যাবার পথে তারা কোন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে প্রেসিডেন্টকে মুক্তি দেবে। তারা কোন নিরাপদ স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত আকাশে কোন বিমান হেলিকপ্টার উড়লে, তাদের ফলো করলে তারা প্রেসিডেন্টসহ হেলিকপ্টার ক্রাশ করবে। আর দু’ঘন্টার মধ্যে হেলিকপ্টার সুড়ঙ্গ মুখে না পৌঁছলে তারা প্রেসিডেন্টকে সেখানেই হত্যা করবে, এবং সেই সাথে ‘নিরব ধ্বংসের দৈত্য’ নামের মারণাস্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়বে ইস্তাম্বুলের ওপর। এসব আপনি আরও ভালো বুঝবেন। এখন আমরা উভয় সংকটে! প্রেসিডেন্টের জীবনকে কোনভাবেই আমরা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না। এখন বলুন, আপনার পরামর্শ কি?’ জেনারেল মোস্তফা কামাল বলল।
‘ওরা যা বলেছে তাই করবে। চিনি আমি ওদের। আপনারা তাদের দাবি মেনে নিন। বলুন যে, খালেদ খাকানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত সুড়ঙ্গে ঢুকেছে। তাকে লোকেট করার আমরা চেষ্টা করছি। তাকে পেলেই আমরা তাকেসহ বিজ্ঞানীকে হেলিকপ্টারে করে সুড়ঙ্গে মুখে পৌঁছাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের দাবি আমরা মেনে নেব? আপনিই এটা বলছেন? আর কোন পথ নেই?’ বলল জেনারেল মোস্তফা ভাঙা গলায়। তার কন্ঠে কান্নার সুর।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা হারানো আমাদের ঠিক নয়। এখনও এক ঘন্টা পঞ্চান্ন মিনিট আমদের হাতে আছে। এ সময়ে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।’
‘স্যরি। আল্লাহর উপর আমাদের ভরসা আমাদের আছে। বরাবরের মতো আপনার কাছেও আমাদের অনেক আশা। এই ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট সময়ের জন্যে আপনি কি ভাবছেন? আমদের কি করণীয় বলে আপনি মনে করেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘প্রেসিডেন্ট ওদের হাতে থাকায় পরিস্থিতির উপর কমান্ড ওদের হাতে। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধার করার যে কোন অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ দু’দিক থেকেই। ওরা প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে পারে, আবার আমাদের আক্রমণেও প্রেসিডেন্টের ক্ষতি হতে পারে। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারের জন্যে এমন একটা পদ্ধতি দরকার যাতে প্রেসিডেন্টের কোন ক্ষতি হবে না, আবার ওরাও প্রেসিডেন্টের ক্ষতি করার কোন সুযোগ পাবে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এমন পদ্ধতিটা কি? গ্যাস-বোম, গ্যাস-বুলেট, গ্যাস-স্প্রে এই ধরনের অস্ত্র এক্ষেত্রে নিরাপদ। কিন্তু ওদের গ্যাস-মাস্ক আছে এটা নিশ্চিত। সুতরাং এ ধরনের কোন অস্ত্র কাজে আসবে না। আপনি কি অন্য কোন রকম কোন অস্ত্রের কথা চিন্তা করছেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘নার্ভ গ্যাসের তিনটি প্রকার খুব বেশি পরিচিত। সেগুলো হলো এনজি-১, এনজি-২ ও এনজি-৩। এই তিনটি নার্ভ গ্যাসই ভয়ংকর। প্রথমটি মানুষের মৃত্যু ঘটায়, দ্বিতীয়টি মানুষকে পঙ্গু করে দেয় এবং তৃতীয়টি মানুষের চিন্তা ও চলচ্ছক্তি বহুদিনের জন্যে অচল করে দেয়। কিন্তু আরেকটা নার্ভ গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে, যাকে এনজি-৪ বলা হচ্ছে। এই গ্যাস-অস্ত্র ওগুলোর মতো ক্ষতিকর নয়। মানুষের মস্তিষ্কের ওপর এর কোন ক্রিয়া নেই। এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহারে মানুষের চলচ্ছক্তি, কাজ করার শক্তি কয়েক ঘন্টার জন্যে রহিত হয়ে যায়। এই সময় তার হাত-পা একেবারেই অকার্যকর থাকে। কিন্তু চিন্তা-চেতনা পরিষ্কার থাকে। কথাও স্বাভাবিকভাবে সে বলতে পারে। আমি এ অস্ত্রের কথাই চিন্তা করছি। এই অস্ত্রের বড় গুণ হলো, গ্যাস-মাস্ক এক্ষেত্রে অকার্যকর। এই গ্যাস মানুষের যে কোন ধরনের পোশাক ভেদ করে লোমকূপ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে।’ আহমদ মুসা থামল।
‘আলহামদুলিল্লাহ! ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান, আপনি সুন্দর একটা সন্ধান দিয়েছেন। এই নার্ভ উইপন আমাদের ডিপার্টমেন্টে নেই। সেনাবাহিনীর আছে কি না তা বলতে পারছি না। আমি এখনি খোঁজ নিচ্ছি। আমি আপনাকে এখনি জানাচ্ছি মি. খালেদ খাকান।’
বলে সালাম দিয়েই কল অফ করে দিল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসাও কল অফ করে দিয়ে আগের মতোই ক্রলিং করে সামনে এগোতে লাগল। ওদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়ার আগেই ওদের থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে পৌঁছতে হবে।
মিনিট পাঁচেক পরেই আবার আহমদ মুসার মোবাইল পকেটে নাচা-নাচি শুরু করে দিল।
আহমদ মুসা নিয়ে কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার গলা পেল।
সালামের উত্তর দিয়েই সে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, মি. খালেদ খাকান। এনজি-৪ নার্ভ গ্যাস মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে ‘স্যাম্পল’ হিসেবে সেনাবাহিনীর হাতে এসেছে। তারা মাত্র দু’বার এর টেস্ট করেছে। কিন্তু তারা বলেছে, এ নার্ভ গ্যাস দূর থেকে স্প্রে করা যায় না। এর বুলেট কিংবা বোমাও তৈরী হয়নি। এর পাইপ গানের রেঞ্জ মাত্র কয়েক মিটার। এখন…।’
‘হ্যাঁ, জেনারেল মোস্তফা, সর্বোচ্চ ২৫ মিটার দূর থেকে এটা ছোঁড়া যায়।’ জেনারেল মোস্তফার কথার মাঝখানেই বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘আপনি এত ডিটেইল জানেন? ওরা তো বলল, আবিষ্কারের পর মাত্র মাস দুয়েক হলো এর সফল টেস্ট হয়েছে। দুনিয়ার অধিকাংশ সেনাবাহিনী নাকি এর এখনও খোঁজই জানে না! আপনি কি করে জানলেন ওরা বিস্ময় প্রকাশ করেছে!’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘থাক, ওসব কথা জেনারেল মোস্তফা। এখন জেনারেল মোস্তফা, এ ব্যাপারে আপনাদের চিন্তা বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, ওদের সাথেও আমার আলাপ হয়েছে মি. খালেদ খাকান। ওরা আপনার সাথে একমত যে, প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে উদ্ধারের জন্যে এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহারই একমাত্র পথ। কিন্তু গুহামুখের যে অবস্থান, তাতে ওদের নজর এড়িয়ে ওদের অতটা কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটা হতে পারে ওদের দাবি মেনে নিয়ে ওদেরকে হেলিকপ্টার সরবরাহের ছলে ওখানে নেমে এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহার করা। কিন্তু হেলিকপ্টারকে যেখানে ল্যান্ড করতে হবে, সেখানে থেকে সুড়ঙ্গ মুখের দূরত্ব এতটা যে, হেলিকপ্টারে বসে এ অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। হেলিকপ্টার থেকে বের হয়ে সামনে এগিয়ে সে অস্ত্রের ব্যবহার করতে গেলে কিডন্যাপকারীদের নজরে পড়তে হবে এবং তাতে প্রেসিডেন্টের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এই অবস্থায় সবার মত হল, কিছু করা আপনার পক্ষেই শুধু সম্ভব। অবশ্য সুড়ঙ্গের স্বল্প পরিসর জায়গায় গুলী বৃষ্টির মধ্যে সামনে এগোনো যে বিপজ্জনক, সেটা আমরা ভেবেছি। তবু…।’
জেনারেল মোস্তফার কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আমি এগোবার চেষ্টা করছি এবং এগোচ্ছি। কিন্তু এনজি-৪ পাইপগান এখানে আমার কাছে পৌঁছার ব্যাপারে কি চিন্তা করেছেন?’
‘এনজি-৪ পাইপগান নিয়ে দু’জন কমান্ডো যাবে, আমরা চিন্তা করেছি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘কিন্তু তারা যদি গুলী খেয়ে মারা যায়? সুড়ঙ্গের শেষ বাঁক থেকে সুড়ঙ্গ মুখ পর্যন্ত একশ’ পচিশ মিটার জায়গাটা খুবই বিপজ্জনক। সুড়ঙ্গ এখানে একেবারে সোজা। তার ওপর বাঁকের পরের কিছুটা জায়গা উঁচু, মানে সামনের দিকে গড়ানো। এখানে এসে বেশ কয়েকটা ফ্লোরকে হিট করেছে। ভাগফল, বিপজ্জনক ঐ এলাকার একেবারে শেষ প্রান্তে এলে তারা আমার সন্ধান পায় হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরের মাধ্যমে। তবু আমাকে গুলী খেতে হয়েছে। আহত হওয়ার মাধ্যমে আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু এখন ঐ বিপজ্জনক এলাকা অতিক্রম করা তাদের জন্যে কঠিন হবে। এই অনিশ্চয়তার ওপর আমাদের উদ্ধার মিশন তো নির্ভর করতে পারে না!’
থামল আহমদ মুসা।
‘স্যরি, মি. খালেদ খাকান, আপনি যে গুলীবিদ্ধ আপনি সেটা আমাদের জানান নি। আমরা…।’
আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘এই বিষয় এখন আমাদের আলোচ্য নয়। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন, এটাই বড় কথা।’ এখন বলুন, জেনারেল মোস্তফা, ডল রোবট আপনারা পাঠাতে পারবেন কি না। ওগুলো তো দূর নিয়ন্ত্রিত, বাঁকা পথেও তাকে চালানো যায়।’
‘ইউরেকা, ইউরেকা, পেয়েছি, পাওয়া গেছে পথ! ধন্যবাদ আপনাকে মি. খালেদ খাকান। কয়েক কিলোমিটার দূরে পাঠনো যায় দূর নিয়ন্ত্রিত এমন রোবট যন্ত্র আমাদের আছে। এখনই ব্যাবস্থা করছি। কয়েকটা রোবটকে আমরা পাঠাব।’ বলল জেনারেল মোস্তফা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে।
‘ধন্যবাদ, জেনারেল মোস্তফা। এখন কয়েকটা কথা শুনুন। প্রথম কথা হলো, এখনই আপনারা এনজি-৪ পাইপগানসহ কয়েকটা রোবট যন্ত্র পাঠিয়ে দেবেন। দুই. সুড়ঙ্গ মুখ অর্থাৎ তাদের অবস্থান পর্যন্ত এখনও আমার সামনে ৫০ মিটার পথ। ওদেরকে এনজি-৪ পাইপগানের রেঞ্জে আনতে হলে আমাকে আরও ২৫ মিটার এগোতে হবে। আমি এই পঁচিশ মিটার পথ এগোবার পর এবং এনজি-৪ পাইপগান হাতে পাওয়ার পর আপনারা ওদের দাবি মানার ঘোষণা দেবেন। দাবি মানার ঘোষণা আগে এলে আমার সামনে এগোনোটা চুক্তির খেলাফ হবে। ওদের দাবি মানার পর আমি আর সামনে এগোবো না। তাহলে ওরা নিশ্চিত হবে সব দিক থেকেই আমরা অফেনসিভ কাজ বন্ধ করেছি। ওরা নিশ্চিত হবার ফলে অসতর্কও হবে। এর দশ মিনিট পর এনজি-৪ ব্যবহার করব। তৃতীয়ত. আমি এনজি-৪ ব্যবহার করার দশ মিনিট পর আপনারা হেলিকপ্টার নিয়ে সুড়ঙ্গ মুখে ল্যান্ড করবেন। চতুর্থত. ওদের দাবি মেনে নিলে ওরা নিশ্চয় শর্ত দেবে যে, ওদের একজন বা দু’জন হেলিকপ্টারের ভেতরের অবস্থা দেখার এবং আমাকে ও বিজ্ঞানীকে বেঁধে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্যে। হেলিকপ্টার ল্যান্ড করলে ঐ রকম শর্ত যদি না দেয় অথবা কেউ যদি হেলিকপ্টারে না যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে এনজি-৪ তার মিশন সম্পূর্ন করেছে। তখন…।’
আহমদ মুসাকে বাধা দিয়ে জেনারেল মোস্তফা বলে উঠল, ‘কিন্তু খোদা না খাস্তা, যদি এনজি-৪ কার্যকরী না হয়, তাহলে কি হবে?’
‘আমি এক দিকের বিকল্প বলেছি। খোদা না করুক, আমার দিক থেকে যদি কোন সাড়া না পান, তাহলে এটাই হবে আপনাদের কাজ। অন্যদিকে আগে ঘটেছে, কি করতে হবে আমিই সেটা আপনাদের জানাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আল্লাহ সে ধরনের পরিস্থিতি আনবেন না। আমরা আপনার কলের অপেক্ষা করব।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘ওকে, আসসালামু আলাইকুম।’
ওপার থেকে, ‘খোদা হাফেজ, ওয়া আলাইকুম সালাম।’ শুনতে পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা কল অফ করে মোবাইল পকেটে রেখে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রেস্ট নিল। তারপর শুরু করল আবার ক্রলিং।
এবার গতি দ্রুত করল আহমদ মুসা।
আবারও গুলী বর্ষণ শুরু হলো।
গুলী বৃষ্টি চলতে লাগল এবার অঝোর ধারায়।
আহমদ মুসার ভাগ্য ভালো এ জায়গাটা একটু উচু হয়ে সামনের দিকে গেছে। ফলে গুলীগুলো আরও একটু নিরাপদ দূরত্ব দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সামনে কোথাও যদি এর বিপরীত হয় মানে ফ্লোরটা নিচু হয়, তাহলেই বিপদ ঘটতে পারে।
এরকম কিছু ঘটলো না। আহমদ মুসা সামনে এগিয়েই চলল।
আহমদ মুসার মোবাইল নড়েচড়ে উঠল।
কল এসেছে।
উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা, জেনারেল মোস্তফার কল কেন আবার!
দেহের ভারটা ডান পাশে নিয়ে সামনে এগোনো অব্যাহত রেখেই আহমদ মুসা কষ্ট করে আহত বাম হাত দিয়েই মোবাইল বের করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়েই থমকে গেল। জোসেফাইনের টেলিফোন।
টেলিফোন মুখের কাছে নিয়ে সালাম দিয়ে আহমদ মুসা জোসেফাইনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘আমি ভালো আছি, ডার্লিং জোসেফাইন! এক ঘণ্টা পর ইনশাআল্লাহ তোমার সাথে কথা বলল। দোয়া করো। ভালো থেকো।’
আহুমদ মুসার কথা শেষ হতেই ওপার থেকে জোসেফাইন বলল, ‘আল্লাহ হাফেজ! আসসালামু আলাইকুম।’ জোসেফাইনের কন্ঠ ভারী। ভারী কন্ঠ কাঁপছিল তার।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম!’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। জোসেফাইনের কম্পিত ভারী কন্ঠ তার সমগ্র চেতনায় একটা যন্ত্রনার সৃষ্টি করেছে।
মূহুর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল, ‘সব অবস্থায় একমাত্র মহান আল্লাহরই সব প্রশংসা।’
আহমদ মুসা তার এগোনোর গতি আরও দ্রুত করল। আবৃত হাতটাকেও পুরোপুরি কাজে লাগাল।
একে তো ভ্যাপসা গরম। তার ওপর পরিশ্রম ও আহত বাহুর ওপর বাড়তি চাপ- সব মিলিয়ে ঘামে গোসল হয়ে গেছে আহমদ মুসার।
এক জায়গায় এসে আবার থমকে গেল আহমদ মুসা। হঠাৎ এখানে এসে সুড়ঙ্গের ফ্লোর উঠের পিটের মতো ফুলে উঠেছে। গুলীগুলো প্রায় তার গা ছুঁয়েই বেরিয়ে আসছে। গুলী চলা অবস্থায় আর এক ইঞ্চিও সামনে এগোনো সম্ভব নয়।
হতাশ হয়ে আহমদ মুসা গা এলিয়ে দিল সুড়ঙ্গের ফ্লোরের ওপর। হতাশ হলেও আশার আলো একটা রয়েছে। সে থেমে গেলে গুলীও থেমে যাবে, অন্তত কমে যাবে। তার সুযোগ সে নিতে পারবে।
মন কিছুটা প্রসন্ন হলো।
আর কত দূরে সে ২৫ মিটার রেঞ্জ থেকে?
হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরটা সে টেনে নিল। তার স্ক্রিনের ওপর চোখ পড়তেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার চোখ। ২৫ মিটারের বেশি জায়গা সে অতিক্রম করে এসেছে। সামনে আর মাত্র ২৪ মিটার বাঁকি।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা, ঠিক জায়গায় আল্লাহ থামিয়ে দিয়েছেন তাকে।
এবার আহমদ মুসার দৃষ্টি প্রসারিত হলো পেছনের নিকশ কালো অন্ধকারের দিকে।
এখন তার ডল-রোবট আসার অপেক্ষা।
সময়ের পরিমাপ করল আহমদ মুসা। প্রায় ১ ঘন্টার মতো সময় হাতে আছে। রোবটের যে গতি, তাতে এই পথটা পাড়ি দিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি লাগবে না। এর অর্থ রোবটের জন্যে আরও কমপক্ষে আধা ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।
গুলী বৃষ্টি কমে এসেছে।
আরও আধা ঘন্টা পার হলো। রোবট এলো না।
পকেটের মোবাইল আবার সাড়া দিয়ে উঠল আহমদ মুসার।
আহমদ মুসা মোবাইলের রিং টোন বন্ধ করে ভাইব্রেশন এলার্ট অন করেছে।
এখন শত্রুরা এতই কাছে যে, নিচু স্বরে কথা বলাও ঝুকিপূর্ণ।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল, জেনারেল মোস্তফার টেলিফোন।
কল অন করে আহমদ মুসা মোবাইল ফ্লোরে রেখে মোবাইলে মুখ ঠেকিয়ে ফিস ফিসে কন্ঠে বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা আমি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে গেছি। এখন রোবটের অপেক্ষা।’
‘প্রস্তুতিতে একটু সময় লেগেছে। প্রায় ১৫ মিনিট আগে চারটা রোবট তাদের যাত্রা শুরু করেছে। মনিটরিং-এ থাকা সেনা অফিসার আমাকে কিছুক্ষণ আগে জানালেন, ১০ মিনিট পর্যন্ত পথ ভালোভাবেই চলেছে, ইনশাআল্লাহ ঠিকঠাক তা লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
রোবট হাতে পাওয়ার পর আমি একটা মিস কল দিব, তারপর আপনারা দাবি মানার ঘোষনা দিবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওদের সাথে আবার আমাদের কথা হয়েছে। আমরা বলেছি, দাবি মানার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। শীঘ্রই আমরা জানাচ্ছি। তারা দাবির সাথে আরও কিছু কথা যোগ করেছে। তারা বলেছে, সুড়ঙ্গ পথে যারা তাদের পিছু নিয়েছে, তাদের পিছু নেয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং দাবি মানার সংগে সংগে তাদের পিছু হটে সরে যেতে হবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আমি অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে দিয়েছি এবং আপনারা দাবি মানার পর আমি অবশ্যই অন্তত পাঁচ মিটার পেছনে সরে যাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে, পিছু হটা শুরু হলেই চলবে। আর শুনুন, ম্যাডাম টেলিফোন করেছিলেন। উনি খুব উদ্বিগ্ন। বিষয়টা দেখলাম উনি জানেন। আমি তাঁকে বলেছি, কোন ভয় নেই, জনাব খালেদ খাকান পরিকল্পনা মোতাবেক এগোচ্ছেন। অবশ্য আপনার আহত হওয়ার কথা আমি তাকে জানাইনি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ধন্যবাদ জেনারেল, প্রেসিডেন্ট কিডন্যাপ হওয়ার কথা ম্যাডাম কি করে জানলেন? আপনারা তো কয়েকজন ছাড়া আর কারো কাছেই এটা প্রকাশ করেননি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘উনি তার বান্ধবীর কাছ থেকে জেনেছেন। আমি এ বিষয়ে তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ঠিক আছে। আমি বুঝেছি। তাহলে এখানেই কথা শেষ। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। ‘আল্লাহ হাফেজ!’ ওপার থেকে বলল জেনারেল মোস্তফার কন্ঠ।
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করতে করতে ভাবল জোসেফাইনের বান্ধবীর কথা। নিশ্চয়ই সে শিক্ষিকার কাছ থেকেই খবরটা জেনেছে। জোসেফাইনের এই বান্ধবী মহিলা আসলে কে? নিজে গরজ করে কেন এত তথ্য সংগ্রহ করে? বলতে গেলে আহমদ মুসার সাফল্য অনেকখানিই তার সাহায্যের ফল। কেন এত উপকারী সে? কেন সে সরাসরি কথা বলে না? এবার এ ব্যাপারে কিছু খোঁজ-খবর নিতেই হবে।
আহমদ মুসা কল অফ করে মোবাইল পকেটে পুরে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল আবছা এক নীল ডট। নীল ডটটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। রোবট এসে গেছে!
মিনিট খানেকের মধ্যে দু’টি রোবট তার হাতে এসে পৌছল।
পেছনে আর কোন ডট চিহ্ন দেখলো না। তার মানে চারটা রোবটের মধ্যে দু’টি শেষ পর্যায়ে এসে ওদের গুলীতে ধ্বংস হয়েছে কিংবা অন্যকিছু ঘটেছে। দু’টি যে ঠিকঠাক পৌছতে পেরেছে এজন্যে আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
দুই রোবটের সাথে বেঁধে দেয়া এনজি-৪ এর দু’টি পাইপগান খুলে নিয়ে রোবটকে নিষ্ক্রিয় করে পাশে রেখে দিল।
পেন্সিল টর্চ জ্বেলে আহমদ মুসা পাইপ গান দু’টোকে পরীক্ষা করল। দেখল, দু’টিই ঠিকঠাকভাবে লোডেড। ফায়ারিং ডিস্ট্যান্স সর্বোচ্চ ২৫ মিটার, সেটাও পরিষ্কার লেখা আছে পাইপগানের গায়ে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেল পাইপগানের গায়ের লেখা থেকে। সেটা হলো, পাইপগান ফায়ার করার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাস টিউব সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছে নিরবে বিকিরণ শুরু করবে। দূরত্ব কম হলে আরও কম সময় লাগবে। বিকিরন কেন্দ্রের ৫ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে এনজি-৪ গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে। গন্ধহীন অদৃশ্য এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ৫ মিনিটের মধ্যে এর এ্যাকশন পূর্ণভাবে প্রকাশ পাবে। এক সময়ের জন্যে দু’টি গ্যাস টিউব সর্বোচ্চ ডোজ।
‘তার মানে’, ভাবল আহমদ মুসা, ‘পাইপগান ফায়ার করার ছয় মিনিটের মধ্যেই ভিকটিমরা শারীরিকভাবে অচল হয়ে পড়বে।’
বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা তার মোবাইল থেকে একটা মিস কল দিল জেনারেল মোস্তফাকে।
মাত্র পাঁচ মিনিট। আহমদ মুসার হাতের মোবাইল ভাইব্রেট করতে শুরু করল। দেখল মোবাইলের স্ক্রীনে মেসেজের সিগন্যাল।
মেসেজটি ওপেন করল আহমদ মুসা। জেনারেল মোস্তফার মেসেজ: দাবি মানার সম্মতি তাদের জানিয়ে দেয়া হলো। তারা খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে আমাদের।’
মোবাইলের কল অফ করে আহমদ মুসা হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরটা সামনে এনে শেষ বারের মতো পরীক্ষা করল, শত্রুরা ঠিক ২০ মিটার দূরে।
আহমদ মুসা দুই পাইপগানের ডিস্ট্যান্স এডজাস্ট করে সময় দেখে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রথমে একটা পাইপ গান ফায়ার করল।
প্রথম পাইপগান ফায়ার করার পর দ্বিতীয় পাইপ গান তুলে নিয়ে হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরে আবার ওদের ২০ মিটার দূরত্ব ঠিক আছে কি না দেখে নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে দ্বিতীয় ফায়ার করল আহমদ মুসা। সময়টা আবার দেখে নিল। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, ‘হে জগতসমূহের মহান সর্বশক্তিমান মালিক, আমার জ্ঞান-সামর্থ্য অনুসারে আমি চেষ্টা করলাম, ফল আপনার হাতে, ফল দেবার মালিক আপনি। আপনার কাছে সবচেয়ে ভালোটা প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’
বলতে গেলে এই প্রার্থনাতেই আহমদ মুসার কেটে গেল ছয় সাত মিনিট।
শেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা ভাবল, আল্লাহ করেন তো এই সময়ের মধ্যে এনজি-৪ গ্যাস টিউব তার মিশন শেষ করেছে।
পরীক্ষার জন্যে আহমদ মুসা ক্রলিং করেই সামনে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। ওরা সক্রিয় থাকলে অবশ্যই গুলী আসবে। যেহেতু এই এগিয়ে যাওয়া হবে ওয়াদার খেলাফ, তাই এ গুলী বৃষ্টি ভয়াবহ ধরনের তীব্র হতে পারে।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা অগ্রসর হতে লাগল। খুব দ্রুত সে ঝুঁকিপূর্ণ উঁচু জায়গাটা পার হলো। কিন্তু ওদিক থেকে কোন গুলী এলো না।
মনটা খুশিতে ভরে গেল আহমদ মুসার।
তবু নিশ্চিত হবার জন্যে সাবধানে আরও অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখল।
কিন্তু গুলী আর এলো না।
আহমদ মুসা আরও এগোল।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে সুড়ঙ্গের ওদিক থেকে বড় দু’টি চোখ জ্বল জ্বল করছে। আলোর কালার দেখে বুঝল, ও দু’টি দরজার ঘুলঘুলি। তার মানে সে দরজার শেষ প্রান্তে এসে গেছে। মনিটরটি টেনে নিয়ে দেখল মাত্র ৪ থেকে ছয় মিটার দূরে ওরা। তার মানে আহমদ মুসা ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আহমদ মুসার মন। তাদের এনজি-৪ পুরোপুরি কাজ করেছে। ওরা সবাই এখন শারীরিকভাবে অকেজো।
আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে টর্চ বের করে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে রিভলবার বাগিয়ে টর্চ জ্বালল।
টর্চের আলো গিয়ে পড়ল লুটোপুটি খেয়ে পড়ে থাকা কিছু মানুষের ওপর।
পড়ে আছে পাঁচজন মানুষ।
সকলেই নিশ্চল।
তাদের চোখে দৃষ্টি আছে, দৃষ্টির ভাষা আছে, কিন্তু গতি নেই।
ওদের চোখ-ভরা বিস্ময় আর ভয়!
আহমদ মুসার দু’চোখ আকুল হয়ে খুঁজছিল প্রেসিডেন্টকে।
প্রেসিডেন্ট ঐ পাঁচজনের মধ্যে নেই।
আহমদ মুসার লাইটের ফোকাস আরও সামনে গিয়ে সুড়ঙ্গ- মুখের দরজার ওপর গিয়ে পড়ল।
এগোল আহমদ মুসা দরজার দিকে ওদের ডিঙিয়ে।
দরজাটা ১ ইঞ্চিরও বেশি পুরু ইস্পাতের প্লেট। বিদ্যুৎ খুঁটির মতো মোটা ইস্পাতের দু’টি বার দিয়ে দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ। বার দু’টি দু’পাশের পাথরের দেয়ালে ঢোকানো এবং সিমেন্টের প্লাস্টার দিয়ে আটকে দেয়া। দরজাটা যেমন পুরু, তেমনি স্টিলের হুকটা হেভি। মনে হয় কামানের গোলা মেরেও এই দরজার কিছু করা যাবেনা।
বিকল্প পথ তাহলে আছে।
আহমদ মুসার টর্চের ফোকাস বামে, সামনে ঘুরে ডান দিকের একটা সিঁড়ির ওপর এসে পড়ল।
সিঁড়িটা একতলা সমান উঁচু এবং তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা দরজায়।
সুড়ঙ্গ-মুখের দরজার মতোই ও দরজাটা পুরু স্টিলের মনে হলো।
দরজাটা আধা খোলা।
দরজার পাশেই পাঁচ-ছয় ইঞ্চি আয়তনের একটা স্টিল বার দেখে আহমদ মুসা বুঝল সুড়ঙ্গের দরজার মতো এই হেভি স্টিল বারটা দিয়েই এই দরজা বন্ধ ছিল। এ দরজাও কামান দেগে ভাঙার মতো নয়।
আহমদ মুসার মনে পড়ল প্রাসাদের লে-আউটে সে সুড়ঙ্গ-মুখের পাশে মিলিটারী পর্যবেক্ষন টাওয়ার দেখেছিল। এটাই কি সে টাওয়ার হতে পারে?
এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে রিভলবার বাগিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
পা দিয়ে দরজা ধীরে ধীরে পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে তাকাল ঘরের ভেতরে। রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি ছিল আহমদ মুসার।
কিন্তু ভেতরে দেখল একই দৃশ্য।
প্রথমেই নজর পড়ল দু’জনের ওপর। দুই চেয়ারে ওদের দু’জনের দেহ নেতিয়ে পড়ে আছে।
ওদের দু’জনের সামনেই গ্রেনেড লাঞ্চার ও হেভি মেশিনগান। ওগুলো ফায়ার প্যানেলে বাইরের বিভিন্ন ডাইরেকশনে তাক করে পেতে রাখা।
পর্যবেক্ষণ প্যানেলে রয়েছে একাধিক দূরবিন।
আহমদ মুসা বুঝল, এসব জিনিসই মিলিটারিদের। সন্ত্রাসী কিডন্যাপাররা এগুলো দখল করে নিয়েছিল মাত্র।
আহমদ মুসা এবার তাকাল ঘরের পেছন দিকে। চেয়ার দু’টির একটু পেছনেই দেখতে পেল দু’টি সংজ্ঞাহীন দেহ। তাদের দেহে সামরিক পোশাক। এরাই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে ছিল, এদের মেরে বা সংজ্ঞাহীন করেই তারা সিঁড়ি মুখের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার দখল করে নিয়েছিল।
আরো পেছনে এলো আহমদ মুসার চোখ।
পেছনে দেয়ালের সাথে লাগানো একটা বেড দেখতে পেল। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সৈনিকদের বিশ্রাম নেয়ার মতো একটা সাধারণ বেড। বেডের ওপর দেখতে পেল প্রেসিডেন্টের দেহ।
আহমদ মুসা ছুটে গেল প্রেসিডেন্টের কাছে। সংজ্ঞাহীন প্রেসিডেন্ট। নেতিয়ে পড়ে আছে তাঁর দেহ।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টের শিথিল একটা হাত তুলে পাল্‌স পরীক্ষা করল। পাল্‌স স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
এই সময়ই মোবাইল কেঁপে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইলের কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কন্ঠ, ‘মি. খালেদ, এদিকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। আপনার কলের অপেক্ষা করছিলাম। কি অবস্থা? সব ঠিক তো?’
‘মিশন সাকসেসফুল! এই মাত্র প্রেসিডেন্টের সংজ্ঞাহীন দেহের পাশে এসে আমি বসলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ! প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আমার পাশে। আপনি তাঁর সাথে কথা বলুন।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘আসসালামু আলাইকুম, মি. খালেদ খাকান।’ ওপার থেকে প্রধানমন্ত্রীর গলা শোনা গেল।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ! স্যার, আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টের পাশে বসে। তিনি সংজ্ঞাহীন, কিন্তু ভাল আছেন। আমি পাল্‌স পরীক্ষা করেছি। একদম নরমাল।’
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। আমরা সবাই, আমার দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’ প্রধানমন্ত্রীর ভারী কন্ঠ। আবেগে কাঁপছে তাঁর কন্ঠ।
‘স্যার, সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনিই আমাদের সাহস, বুদ্ধি, শক্তি সব কিছু দিয়েছেন।’
‘ঠিক মি. খালেদ খাকান। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে দিয়ে তাঁর কাজ করান, তিনি ভাগ্যবান। ভাগ্যবানকেই তিনি বাছাই করেন। শুনুন মি.! আমরা সবাই হেলিকপ্টার নিয়ে আসছি। আমি ম্যাডামকেও আনতে পাঠিয়েছি। তিনিও আসবেন। লতিফা আরবাকান তাঁকে নিয়ে আসবে। ওকে…।’
প্রধানমন্ত্রীর কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘স্যার, আপনারা আসুন। কিন্তু একটা হেলিকপ্টারেই আসতে হবে। যাতে পাহারায় বা পর্যবেক্ষণে থাকা শত্রুপক্ষ বুঝে যে, তাদের দাবি অনুসারেই হেলিকপ্টার এসেছে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি ও খালেদ খাকানকে ওদের হাতে তুলে দিতে। তারা বুঝুক যে, তাদের বিজয় হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে গুড হিউমারে রাখতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান, আপনি ঠিক বলেছেন। আবেগ আমাদের বাস্তবতা থেকে সরিয়ে এনেছিল। জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধানই শুধু প্রেসিডেন্টকে আনতে যাবে। আর প্রেসিডেন্ট ও আপনাকেই শুধু নিয়ে আসবে। হেলিকপ্টার চলে আসার মিনিট পনের পরে চারদিকের পুলিশ ও সেনা অফিসাররা গিয়ে সুড়ঙ্গের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করবে। আমরা সকলেই সামরিক হাসপাতালের চত্বরে অপেক্ষা করছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার, ঠিক চিন্তা করেছেন। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন!’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওকে, মি. খালেদ খাকান। আসসালামু আলাইকুম।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘ওকে স্যার, ওয়া আলাইকুম সালাম।’
বলে আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, কিডন্যাপার ‘থ্রি জিরো’দের দেয়া দাবি পূরনের শেষ সময়ের আর ২০ মিনিট বাকি আছে। বিশ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার পৌঁছলেই ওরা ভাববে ওদের দাবি পূরণের জন্যেই হেলিকপ্টার এসেছে। আহমদ মুসার উদ্বেগ হলো, ওরা কোনওভাবে সন্দেহ করলে ওরা মরিয়া হয়ে মেটালিক ধ্বংসের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যার ফলে হেলিকপ্টার, গাড়ী মেটালিক কোন কিছু ব্যবহারই সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্ট ভবনের ওপর আমাদের সোর্ড- এর ডিফেন্স আমব্রেলা আছে, সামরিক হাসপাতাল পর্যন্ত সবটা পথের ওপর নেই।
আহমদ মুসাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার ১০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার এসে গেল।
বিমানবাহিনী হেলিকপ্টারের দক্ষ পাইলট গুহামুখের একদম সন্নিকটেই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করাল। এসব মাউন্টেন রাইডার হেলিকপ্টার পাহাড়ে ল্যান্ড করার সামান্য সুযোগও কাজে লাগাতে পারে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করেতেই আহমদ মুসা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দরজা খুলে প্রেসিডেন্টকে কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এসে এগোলো হেলিকপ্টারের দিকে।
দীর্ঘ সময় পর বাইরের আলো-বাতাসের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ আহমদ মুসার।
চারদিকে চোখ যেতেই দেখল, পাহাড় ও বসফারাসে সেনা ও পুলিশের বেস্টনি তৈরী হয়ে আছে।
হেলিকপ্টার থেকে সিঁড়ি নেমে এসেছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ির গোড়ায় পৌছতেই জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধান নেমে এলো।
তিনজন ধরাধরি করে প্রেসিডেন্টকে হেলিকপ্টারে তুলল।
হেলিকপ্টারটি একটি ফ্লাইং হাসপাতালও। একজন ডাক্তারও আছে।
প্রেসিডেন্টকে বেডে রাখতেই তাঁকে নিয়ে কাজে লেগে গেল ডাক্তার।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টকে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর পুলিশপ্রধানও।
‘তুরস্ক আপনার এত ঋণ শোধ করবে কি করে মি. খালেদ খাকান?’ আবেগে কন্ঠ ভেঙে পড়ল জেনারেল মোস্তফার।
জেনারেল মোস্তফা, মি. খালেদ খাকানের গুলীবিদ্ধ স্থান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে নতুন করে। ডাক্তার এদিকে দেখুন।’ বলল পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
জেনারেল মোস্তফা ডাক্তারের দিকে একবার তাকিয়ে ছুটে এলো আহমদ মুসার আহত জায়গাটা দেখার জন্যে। বলল, ‘এদিকের চাপে ভূলেই গেছি আপনার আহত হওয়ার কথা।’
ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘না, ডাক্তার সাহেব, আপনি প্রেসিডেন্টকে পরীক্ষা করুন। ভার তুলতে গিয়ে চাপে একটু ব্লিডিং হচ্ছে। হাসপাতালে তো যাচ্ছিই। এখন কিছু দরকার নেই।’
‘আপনি প্রেসিডেন্টকে আনতে গেলেন কেন? আমরাই নিয়ে আসতাম। একটা বাহু এভাবে আহত হওয়ার পর কিছুতেই এ ভার বহন করা ঠিক হয়নি। কেন আমাদের নামতে নিষেধ করেছিলেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আপনারা পরিচিত ব্যক্তিত্ব। হেলিকপ্টারে পুলিশপ্রধান ও গোয়েন্দাপ্রধান এসেছেন, এটা শত্রুকে জানানো হতো না। অন্য কিছু ঘটেছে বলে সন্দেহ করতো। যাক এ প্রসংগ। আসুন বসি।’ আহমদ মুসা বলল।
হেলিকপ্টার আকাশে উঠে আসার পর দ্রুত চলতে শুরু করেছে।
বসেছে আহমদ মুসারা।
‘মি. খালেদ খাকান, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনি নিজেকে নিজেই বোধ হয় চিনতে পারবেন না। ধুলো, বালি, কালিতে আপনার পোশাকেরই শুধু রং পাল্টায়নি। মুখটাকেও অচেনা করে দিয়েছে।’
বলে হাসল জেনারেল মোস্তফা।
‘বহুকালের পুরানো সুড়ঙ্গ। ধুলো, বালি, কালির স্তর পড়ে গেছে। ওর মধ্যে দিয়েই গড়াগড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
পাশ থেকে ডাক্তার বলে উঠল, ‘আমাদের মহামান্য প্রেসিডেন্ট পারফেক্টলি ওকে। অল্পক্ষনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসবে। হাসপাতালে নিয়ে এ্যান্টি এনজি-৪ ইনজেকশন দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন।’
এবার দশ মিনিটও লাগল না সামরিক হাসপাতালে পৌঁছতে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল সামরিক হাসপাতালের চত্বরে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতেই সিঁড়ি নেমে গেল। ছুটে এলো এ্যাম্বুলেন্স। সেনারা চারদিকে সতর্ক অবস্থানে। হেলিকপ্টার থেকে নিরাপদ দূরে কয়েকটা কার দাঁড়িয়ে আছে।
এ্যাম্বুলেন্সটা উঠে এলো হেলিকপ্টারের দরজার সমতলে। হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার এ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে হেলিকপ্টারের বেডটাকে গড়িয়ে এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে গেল।
নিচে নেমে গেল এ্যাম্বুলেন্স।
‘মি. খালেদ খাকান, সিঁড়ির গোড়ায় প্রধানমন্ত্রী। আপনি আগে নামুন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে।
‘অলরাইট’ বলে আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে পেছনে জেনারেল মোস্তুফা এবং পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
সিঁড়ির গোড়ায় মাটিতে পা দেবার আগেই আহমদ মুসা দেখতে পেল অল্প একটু দূরে কারের খোলা দরজা দিয়ে আহমদ মুসার দিকে হাত নাড়ছে তার ছেলে আহমদ আব্দুল্লাহ। তার পাশে জোসেফাইন। আর ড্রাইভিং সিটে দেখতে পেল লতিফা আরবাকানকে।
আহমদ মুসা হাত নেড়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
সিঁড়ি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখতেই আহমদ মুসাকে এসে জড়িয়ে ধরল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘আমার সরকার, আমার জনগণের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। মহাআতংক, মহাক্ষতি থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। আল্লাহ আপনাকে এর জাযাহ দিন!’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠ প্রধানমন্ত্রীর।
‘ধন্যবাদ স্যার’ বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার গোটা শরীর ধুলো-বালিতে ভরা। আপনার কাপড়-চোপড়ও নষ্ট হয়ে গেল।’
‘আপনি ধুলো-ময়লার মধ্যে সাতার কেঁটেছেন, আর আমি জামা-কাপড়েও কিছু ধুলো-কালি লাগাতে পারবো না!’
বলেই প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসার আহত বাহু স্পর্শ করে জানতে চাইলেন, ‘হেলিকপ্টারে ডাক্তার ছিল, উনি কি আপনার আহত স্থানটা পরীক্ষা করেছেন? ‘
‘আমি নিষধ করেছিলাম। এখন গিয়ে দেখাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এই তো আপনার জন্যে এ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছে! ম্যাডাম এসেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন।
এ্যাম্বুলেন্স ও জোসেফাইনের কারটি পাশেই এসে দাঁড়িয়েছিল।
মোবাইল বেজে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর। মোবাইলটা তুলে নিতে নিতে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি এ্যাম্বুলেন্স যান। আমি আসছি হাসপাতালে।’
‘ওকে স্যার। আসসালামু আলাইকুম।’
বলে আহমদ মুসা এ্যাম্বুলেন্স ও গড়ির দিকে এগোলো।
এ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে একজন ডাক্তার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আসুন স্যার।’
আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘না, ডাক্তার, আপনি চলুন। আমি ঐ কারে আসছি।’
আহমদ মুসা এগোলো কারের দিকে।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসেছে লতিফা আরবাকান।
এদিকে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে আহমদ আব্দুল্লাহও বেরিয়ে এসেছে।
জোসেফাইন গাড়ির ভেতরে সিটে বসে আছে। আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে ডান হাতে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেল কপালে।
‘তোমার কাপড়ে ময়লা, মুখে ময়লা। কেন? ময়লা পরিষ্কার করনি কেন?’
আহমদ আব্দুল্লাহকে চুমু খেয়েই একটু ঝুঁকে পড়ে সালাম দিল জোসেফাইনকে।
জোসেফানের মুখে হাসি, চোখে অশ্রু।
সালাম নিয়ে বলল, ‘আহমদকে নামিয়ে দাও তোমার আঘাতে চাপ পড়ছে।’
আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে নামিয়ে দিয়ে সামনে তাকিয়ে সালাম দিল লতিফা আরবাকানকে।
সালাম নিয়ে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার উঠুন।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে গাড়িতে তুলে নিজে উঠে বসল।’
লতিফা আরবাকান গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজে সিটে গিয়ে বসল।
গাড়ির সিটে বসে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার, কত বড় ঘটনা যে ঘটে গেল, মানুষ জানতেই পারলো না। জানতেই পারলো না, একজন বিদেশী তাদের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারের জন্যে কি করেছেন, কিভাবে রক্ত ঝরিয়েছেন, কিভাবে মৃত্যুর মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন! আমার তুরস্কের পক্ষ থেকে আপনাকে কনগ্র্যাচুলেশন স্যার।’
আবেগ-উচ্ছ্বাসজড়িত কান্নায় লতিফা আরবাকানের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছিল।
‘উনি তো বিদেশী নন লতিফা। গোটা দুনিয়া তো ওঁর দেশ।’ বলল জোসেফাইন। শান্ত, ভারী কন্ঠ জোসেফাইনের।
‘ধন্যবাদ, ম্যাডাম। এটাই উপযুক্ত উত্তর। ধন্যবাদ আপনাদের।’ লতিফা আরবাকান বলল। তখনও কান্না তার কন্ঠে।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
চলতে শুরু করল গাড়ি।
আহমদ আব্দুল্লাহ আহমদ মুসার কোলে মুখ গুঁজেছে।
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘তুমি এসেছ, ধন্যবাদ।’
জোসেফাইনের নিরব সজল দৃষ্টি আহমদ মুসার চোখে।
ধীরে ধীরে আনত হলো জোসেফাইনের মুখ।
তার মাথাটা ধীরে ধীরে গিয়ে ন্যস্ত হলো আহমদ মুসার কাঁধে। তার সজল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু।
জোসেফাইনের একটি হাত আঁকড়ে ধরেছে আহমদ মুসার একটা হাতকে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে যাবার পথে আহমদ মুসা ঘড়িতে সময় দেখে জোসেফাইনকে বলল, ‘যথাসময়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে ওয়াদা মতো তোমার সাথে ডিনার করতে পারছি, ইনশাআল্লাহ!’
জোসেফাইনের ঠোঁটেও মধুর এক