৪৭. বসফরাসে বিস্ফোরণ

চ্যাপ্টার

সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পঁয়ষট্টি এবং প্রায় পঁয়তাল্লিস ডিগ্রি কৌণিক পথে সিঁড়ি দিয়ে নামার পর সমতল সুড়ঙ্গ পেয়ে গেল আহমদ মুসা। হেঁটে চলার মতো যথেষ্ট বড় আয়তনের সুড়ঙ্গটি।
ওপরে-নিচে পাশে সব দিকেই পাথরের দেয়াল।
নিকশ অন্ধকার।এক সময় হয়তো আলোর বন্দোবস্ত ছিল। এখন নেই।
সুড়ঙ্গের সমতলে এসে আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়েছে।
সামনে পা ফেলার আগে তার মনে হলো, শত্রুরা শুধুই চলে যায়নি, তাদের যাতে কেউ ফলো করতে না পারে সেজন্যে তারা অবশ্যই কিছু করেছে বা করবে। কি করতে পারে? বিস্ফোরক পাততে পারে। গ্যাস ছাড়তে পারে। বাইলেনগুলোতে চোরাগুপ্তা হামলার জন্যে পাহারা বসাতে পারে।
আহমদ মুসা গ্যাস-মাস্ক পরে আছে। সুতরাং গ্যাস তার জন্যে কোন সমস্যা নয়। মাল্টি ডিটেক্টর তার হাতে আছে। এ ডিটেক্টর বিস্ফোরক যে কোন অবস্থায় থাক ডিটেক্ট করতে পারে। হিউম্যান বডি-ওয়েভ সেঞ্জিং মনিটরটি আহমদ মুসা জুড়ে দিয়েছে বিস্ফোরক ডিটেক্টরের সাথে। এর ফলে দু’টি বিষয়কে এক সাথে মনিটর করা যাবে।
আহমদ মুসা চলতে শুরু করল। তার দৃষ্টি বিস্ফোরক ডিটেক্টর ও হিউম্যান বডি ওয়েভ সেঞ্জিং মনিটরের দিকে। দ্রুত এগোচ্ছে আহমদ মুসা।
ওরা কি সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পেরেছে? মনে হয় না। প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করার পর তারা এ পর্যন্ত যে সময় পেয়েছে, তাতে তারা সুড়ঙ্গের অর্ধেক পথ পার হতে পারে। সুতরাং তারা যখন সুড়ঙ্গের প্রান্তে পৌঁছবে তখন নিশ্চয় উদ্ধার অভিযানের জন্যে সেনা সদস্য ও পুলিশ মোতায়েন হয় যাবে। সুতরাং প্রেসিডেন্টকে নিয়ে তাদের সরে পড়া অবশ্যই সম্ভব হবে না। তখন তারা কি পদক্ষেপ নেবে সেটাই চিন্তার বিষয়। কারণ এর সাথে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার বিষয় জড়িত আছে।
সুড়ঙ্গের অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে আহমদ মুসা। কতটা পথ বলা মুস্কিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো অর্ধেকটা পথ সে অবশ্যই পার হয়েছে। সংগে সংগেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। তার মানে ওরা সুড়ঙ্গের বাইরের প্রান্তে পৌছে গেছে। যে কোন ঘটনার সময় তাহলে আসন্ন।
আহমদ মুসা তাকাল হিউম্যান সেঞ্জিং মনিটরের দিকে। কিন্তু স্ক্রিনটা অন্ধকার। তার মানে কোন হিউম্যান বডি তার রেঞ্জের মধ্যে আসেনি।
যতটা সম্ভব একই দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে আহমদ মুসা।
হঠাৎ সংগে সংগে কয়েকটা ধাতব সংঘর্ষের শব্দ কানে এলো আহমদ মুসার। শব্দগুলো কানে পৌঁছতেই আহমদ মুসা ডান দিকে কাত হয়ে পড়ে গেল সুড়ঙ্গের দেয়ালে।
কিন্তু দেরী করে ফেলেছিল আহমদ মুসা। খেসারত দিতে হলো বাম বাহুকে। কাঁধের সন্ধিস্থলের বাহু-মাস্‌লের একটা অংশ উড়ে গেল।
হাত থেকে পড়ে গেল স্টিকটা।
অবিরাম গুলী আসছে।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়েছিল সুড়ঙ্গের ফ্লোরের একপাশে।
গুলীগুলোর সবই সুড়ঙ্গের ফ্লোরের এক-দেড় ফুট ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই স্টিকটা টেনে তার মাথায় সেট করা হউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরের দিকে তাকাল। দেখল ১০০ মিটার সংখ্যাটি ফ্লাশ করছে। তার মানে ওরা একশ’ মিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। নিশ্চয় ওরাও তাদের সেঞ্জিং মনিটরে আহমদ মুসার অবস্থান চিহ্নিত করেছে। তার অবস্থান টের পেয়েই তারা গুলী ছুঁড়ছে।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজ-কটনের একটা বড় টুকরা বের করে বাম বাহুটা বেঁধে নিল।
ইতিমধ্যে গুলীবর্ষণ কমে এসেছিল।
আহমদ মুসা ক্রলিং করে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। গুলী যেহেতু ফ্লোরের এক-দেড় ফুট ওপর দিয়ে যাচ্ছে, তাই ক্রলিং করে সে এগোতে পারে।
বাড়তি সতর্কতা হিসাবে আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে বুলেট-প্রুফ হেড কভার বের করে মাথায় পরে নিল। মুখে গ্যাস-মাস্ক থাকায় হেড কভারটা সেট করতে একটু অসুবিধা হলেও মোটামুটি সেট হয়ে গেল।
ক্রলিং করে এগোতে লাগল আহমদ মুসা।
আট-দশ ফুট এগোতেই আবার গুলী বৃষ্টি বেড়ে গেল।
আহমদ মুসা কিন্তু থামল না। এগোতেই লাগল।
আহমদ মুসা পাল্টা গুলী করতে পারছিল না। কারণ ওদের সাথে প্রেসিডেন্ট আছেন। কোনক্রমেই তার নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না।
আরও বিশ বাইশ মিটার চলার পর আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
মোবাইল বের করে কল অন করতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কন্ঠ শুনতে পেল আহমদ মুসা। বলছিল সে, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি ঠিক আছেন? কোন্‌ অবস্থানে আপনি?’
‘আমি ভালো আছি। আমি সুড়ঙ্গে ওদের থেকে ৭০ মিটার দূরে, গুলী বৃষ্টির মধ্যে ক্রলিং করে এগোচ্ছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘খুব সাবধান, মি. খালেদ খাকান। আপনার নিরাপত্তা কিন্তু আমাদের কাছে খুব বড় বিষয়। এদিকে কিন্তু মহাসংকট! আমরা সুড়ঙ্গ এলাকাসহ গোটা বসফরাস অঞ্চল বন্ধ করে দিয়েছি। ওরা সম্ভবত সুড়ঙ্গের মুখের কাছাকাছি কোথাও অবস্থান করছে। পাঁচ মিনিট আগে ওরা দু’ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে একটা হেলিকপ্টারে বিজ্ঞানী ড. আমির আব্দুল্লাহ আন্দালুসি ও খালিদ খাকানকে নিয়ে সুড়ঙ্গ গেটে পৌঁছাতে হবে। হেলিকপ্টারে করে যাবার পথে তারা কোন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে প্রেসিডেন্টকে মুক্তি দেবে। তারা কোন নিরাপদ স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত আকাশে কোন বিমান হেলিকপ্টার উড়লে, তাদের ফলো করলে তারা প্রেসিডেন্টসহ হেলিকপ্টার ক্রাশ করবে। আর দু’ঘন্টার মধ্যে হেলিকপ্টার সুড়ঙ্গ মুখে না পৌঁছলে তারা প্রেসিডেন্টকে সেখানেই হত্যা করবে, এবং সেই সাথে ‘নিরব ধ্বংসের দৈত্য’ নামের মারণাস্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়বে ইস্তাম্বুলের ওপর। এসব আপনি আরও ভালো বুঝবেন। এখন আমরা উভয় সংকটে! প্রেসিডেন্টের জীবনকে কোনভাবেই আমরা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না। এখন বলুন, আপনার পরামর্শ কি?’ জেনারেল মোস্তফা কামাল বলল।
‘ওরা যা বলেছে তাই করবে। চিনি আমি ওদের। আপনারা তাদের দাবি মেনে নিন। বলুন যে, খালেদ খাকানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত সুড়ঙ্গে ঢুকেছে। তাকে লোকেট করার আমরা চেষ্টা করছি। তাকে পেলেই আমরা তাকেসহ বিজ্ঞানীকে হেলিকপ্টারে করে সুড়ঙ্গে মুখে পৌঁছাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের দাবি আমরা মেনে নেব? আপনিই এটা বলছেন? আর কোন পথ নেই?’ বলল জেনারেল মোস্তফা ভাঙা গলায়। তার কন্ঠে কান্নার সুর।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা হারানো আমাদের ঠিক নয়। এখনও এক ঘন্টা পঞ্চান্ন মিনিট আমদের হাতে আছে। এ সময়ে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।’
‘স্যরি। আল্লাহর উপর আমাদের ভরসা আমাদের আছে। বরাবরের মতো আপনার কাছেও আমাদের অনেক আশা। এই ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট সময়ের জন্যে আপনি কি ভাবছেন? আমদের কি করণীয় বলে আপনি মনে করেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘প্রেসিডেন্ট ওদের হাতে থাকায় পরিস্থিতির উপর কমান্ড ওদের হাতে। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধার করার যে কোন অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ দু’দিক থেকেই। ওরা প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে পারে, আবার আমাদের আক্রমণেও প্রেসিডেন্টের ক্ষতি হতে পারে। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারের জন্যে এমন একটা পদ্ধতি দরকার যাতে প্রেসিডেন্টের কোন ক্ষতি হবে না, আবার ওরাও প্রেসিডেন্টের ক্ষতি করার কোন সুযোগ পাবে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এমন পদ্ধতিটা কি? গ্যাস-বোম, গ্যাস-বুলেট, গ্যাস-স্প্রে এই ধরনের অস্ত্র এক্ষেত্রে নিরাপদ। কিন্তু ওদের গ্যাস-মাস্ক আছে এটা নিশ্চিত। সুতরাং এ ধরনের কোন অস্ত্র কাজে আসবে না। আপনি কি অন্য কোন রকম কোন অস্ত্রের কথা চিন্তা করছেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘নার্ভ গ্যাসের তিনটি প্রকার খুব বেশি পরিচিত। সেগুলো হলো এনজি-১, এনজি-২ ও এনজি-৩। এই তিনটি নার্ভ গ্যাসই ভয়ংকর। প্রথমটি মানুষের মৃত্যু ঘটায়, দ্বিতীয়টি মানুষকে পঙ্গু করে দেয় এবং তৃতীয়টি মানুষের চিন্তা ও চলচ্ছক্তি বহুদিনের জন্যে অচল করে দেয়। কিন্তু আরেকটা নার্ভ গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে, যাকে এনজি-৪ বলা হচ্ছে। এই গ্যাস-অস্ত্র ওগুলোর মতো ক্ষতিকর নয়। মানুষের মস্তিষ্কের ওপর এর কোন ক্রিয়া নেই। এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহারে মানুষের চলচ্ছক্তি, কাজ করার শক্তি কয়েক ঘন্টার জন্যে রহিত হয়ে যায়। এই সময় তার হাত-পা একেবারেই অকার্যকর থাকে। কিন্তু চিন্তা-চেতনা পরিষ্কার থাকে। কথাও স্বাভাবিকভাবে সে বলতে পারে। আমি এ অস্ত্রের কথাই চিন্তা করছি। এই অস্ত্রের বড় গুণ হলো, গ্যাস-মাস্ক এক্ষেত্রে অকার্যকর। এই গ্যাস মানুষের যে কোন ধরনের পোশাক ভেদ করে লোমকূপ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে।’ আহমদ মুসা থামল।
‘আলহামদুলিল্লাহ! ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান, আপনি সুন্দর একটা সন্ধান দিয়েছেন। এই নার্ভ উইপন আমাদের ডিপার্টমেন্টে নেই। সেনাবাহিনীর আছে কি না তা বলতে পারছি না। আমি এখনি খোঁজ নিচ্ছি। আমি আপনাকে এখনি জানাচ্ছি মি. খালেদ খাকান।’
বলে সালাম দিয়েই কল অফ করে দিল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসাও কল অফ করে দিয়ে আগের মতোই ক্রলিং করে সামনে এগোতে লাগল। ওদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়ার আগেই ওদের থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে পৌঁছতে হবে।
মিনিট পাঁচেক পরেই আবার আহমদ মুসার মোবাইল পকেটে নাচা-নাচি শুরু করে দিল।
আহমদ মুসা নিয়ে কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার গলা পেল।
সালামের উত্তর দিয়েই সে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, মি. খালেদ খাকান। এনজি-৪ নার্ভ গ্যাস মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে ‘স্যাম্পল’ হিসেবে সেনাবাহিনীর হাতে এসেছে। তারা মাত্র দু’বার এর টেস্ট করেছে। কিন্তু তারা বলেছে, এ নার্ভ গ্যাস দূর থেকে স্প্রে করা যায় না। এর বুলেট কিংবা বোমাও তৈরী হয়নি। এর পাইপ গানের রেঞ্জ মাত্র কয়েক মিটার। এখন…।’
‘হ্যাঁ, জেনারেল মোস্তফা, সর্বোচ্চ ২৫ মিটার দূর থেকে এটা ছোঁড়া যায়।’ জেনারেল মোস্তফার কথার মাঝখানেই বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘আপনি এত ডিটেইল জানেন? ওরা তো বলল, আবিষ্কারের পর মাত্র মাস দুয়েক হলো এর সফল টেস্ট হয়েছে। দুনিয়ার অধিকাংশ সেনাবাহিনী নাকি এর এখনও খোঁজই জানে না! আপনি কি করে জানলেন ওরা বিস্ময় প্রকাশ করেছে!’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘থাক, ওসব কথা জেনারেল মোস্তফা। এখন জেনারেল মোস্তফা, এ ব্যাপারে আপনাদের চিন্তা বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, ওদের সাথেও আমার আলাপ হয়েছে মি. খালেদ খাকান। ওরা আপনার সাথে একমত যে, প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে উদ্ধারের জন্যে এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহারই একমাত্র পথ। কিন্তু গুহামুখের যে অবস্থান, তাতে ওদের নজর এড়িয়ে ওদের অতটা কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটা হতে পারে ওদের দাবি মেনে নিয়ে ওদেরকে হেলিকপ্টার সরবরাহের ছলে ওখানে নেমে এই নার্ভ গ্যাসের ব্যবহার করা। কিন্তু হেলিকপ্টারকে যেখানে ল্যান্ড করতে হবে, সেখানে থেকে সুড়ঙ্গ মুখের দূরত্ব এতটা যে, হেলিকপ্টারে বসে এ অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। হেলিকপ্টার থেকে বের হয়ে সামনে এগিয়ে সে অস্ত্রের ব্যবহার করতে গেলে কিডন্যাপকারীদের নজরে পড়তে হবে এবং তাতে প্রেসিডেন্টের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এই অবস্থায় সবার মত হল, কিছু করা আপনার পক্ষেই শুধু সম্ভব। অবশ্য সুড়ঙ্গের স্বল্প পরিসর জায়গায় গুলী বৃষ্টির মধ্যে সামনে এগোনো যে বিপজ্জনক, সেটা আমরা ভেবেছি। তবু…।’
জেনারেল মোস্তফার কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আমি এগোবার চেষ্টা করছি এবং এগোচ্ছি। কিন্তু এনজি-৪ পাইপগান এখানে আমার কাছে পৌঁছার ব্যাপারে কি চিন্তা করেছেন?’
‘এনজি-৪ পাইপগান নিয়ে দু’জন কমান্ডো যাবে, আমরা চিন্তা করেছি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘কিন্তু তারা যদি গুলী খেয়ে মারা যায়? সুড়ঙ্গের শেষ বাঁক থেকে সুড়ঙ্গ মুখ পর্যন্ত একশ’ পচিশ মিটার জায়গাটা খুবই বিপজ্জনক। সুড়ঙ্গ এখানে একেবারে সোজা। তার ওপর বাঁকের পরের কিছুটা জায়গা উঁচু, মানে সামনের দিকে গড়ানো। এখানে এসে বেশ কয়েকটা ফ্লোরকে হিট করেছে। ভাগফল, বিপজ্জনক ঐ এলাকার একেবারে শেষ প্রান্তে এলে তারা আমার সন্ধান পায় হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরের মাধ্যমে। তবু আমাকে গুলী খেতে হয়েছে। আহত হওয়ার মাধ্যমে আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু এখন ঐ বিপজ্জনক এলাকা অতিক্রম করা তাদের জন্যে কঠিন হবে। এই অনিশ্চয়তার ওপর আমাদের উদ্ধার মিশন তো নির্ভর করতে পারে না!’
থামল আহমদ মুসা।
‘স্যরি, মি. খালেদ খাকান, আপনি যে গুলীবিদ্ধ আপনি সেটা আমাদের জানান নি। আমরা…।’
আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘এই বিষয় এখন আমাদের আলোচ্য নয়। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন, এটাই বড় কথা।’ এখন বলুন, জেনারেল মোস্তফা, ডল রোবট আপনারা পাঠাতে পারবেন কি না। ওগুলো তো দূর নিয়ন্ত্রিত, বাঁকা পথেও তাকে চালানো যায়।’
‘ইউরেকা, ইউরেকা, পেয়েছি, পাওয়া গেছে পথ! ধন্যবাদ আপনাকে মি. খালেদ খাকান। কয়েক কিলোমিটার দূরে পাঠনো যায় দূর নিয়ন্ত্রিত এমন রোবট যন্ত্র আমাদের আছে। এখনই ব্যাবস্থা করছি। কয়েকটা রোবটকে আমরা পাঠাব।’ বলল জেনারেল মোস্তফা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে।
‘ধন্যবাদ, জেনারেল মোস্তফা। এখন কয়েকটা কথা শুনুন। প্রথম কথা হলো, এখনই আপনারা এনজি-৪ পাইপগানসহ কয়েকটা রোবট যন্ত্র পাঠিয়ে দেবেন। দুই. সুড়ঙ্গ মুখ অর্থাৎ তাদের অবস্থান পর্যন্ত এখনও আমার সামনে ৫০ মিটার পথ। ওদেরকে এনজি-৪ পাইপগানের রেঞ্জে আনতে হলে আমাকে আরও ২৫ মিটার এগোতে হবে। আমি এই পঁচিশ মিটার পথ এগোবার পর এবং এনজি-৪ পাইপগান হাতে পাওয়ার পর আপনারা ওদের দাবি মানার ঘোষণা দেবেন। দাবি মানার ঘোষণা আগে এলে আমার সামনে এগোনোটা চুক্তির খেলাফ হবে। ওদের দাবি মানার পর আমি আর সামনে এগোবো না। তাহলে ওরা নিশ্চিত হবে সব দিক থেকেই আমরা অফেনসিভ কাজ বন্ধ করেছি। ওরা নিশ্চিত হবার ফলে অসতর্কও হবে। এর দশ মিনিট পর এনজি-৪ ব্যবহার করব। তৃতীয়ত. আমি এনজি-৪ ব্যবহার করার দশ মিনিট পর আপনারা হেলিকপ্টার নিয়ে সুড়ঙ্গ মুখে ল্যান্ড করবেন। চতুর্থত. ওদের দাবি মেনে নিলে ওরা নিশ্চয় শর্ত দেবে যে, ওদের একজন বা দু’জন হেলিকপ্টারের ভেতরের অবস্থা দেখার এবং আমাকে ও বিজ্ঞানীকে বেঁধে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্যে। হেলিকপ্টার ল্যান্ড করলে ঐ রকম শর্ত যদি না দেয় অথবা কেউ যদি হেলিকপ্টারে না যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে এনজি-৪ তার মিশন সম্পূর্ন করেছে। তখন…।’
আহমদ মুসাকে বাধা দিয়ে জেনারেল মোস্তফা বলে উঠল, ‘কিন্তু খোদা না খাস্তা, যদি এনজি-৪ কার্যকরী না হয়, তাহলে কি হবে?’
‘আমি এক দিকের বিকল্প বলেছি। খোদা না করুক, আমার দিক থেকে যদি কোন সাড়া না পান, তাহলে এটাই হবে আপনাদের কাজ। অন্যদিকে আগে ঘটেছে, কি করতে হবে আমিই সেটা আপনাদের জানাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আল্লাহ সে ধরনের পরিস্থিতি আনবেন না। আমরা আপনার কলের অপেক্ষা করব।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘ওকে, আসসালামু আলাইকুম।’
ওপার থেকে, ‘খোদা হাফেজ, ওয়া আলাইকুম সালাম।’ শুনতে পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা কল অফ করে মোবাইল পকেটে রেখে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রেস্ট নিল। তারপর শুরু করল আবার ক্রলিং।
এবার গতি দ্রুত করল আহমদ মুসা।
আবারও গুলী বর্ষণ শুরু হলো।
গুলী বৃষ্টি চলতে লাগল এবার অঝোর ধারায়।
আহমদ মুসার ভাগ্য ভালো এ জায়গাটা একটু উচু হয়ে সামনের দিকে গেছে। ফলে গুলীগুলো আরও একটু নিরাপদ দূরত্ব দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সামনে কোথাও যদি এর বিপরীত হয় মানে ফ্লোরটা নিচু হয়, তাহলেই বিপদ ঘটতে পারে।
এরকম কিছু ঘটলো না। আহমদ মুসা সামনে এগিয়েই চলল।
আহমদ মুসার মোবাইল নড়েচড়ে উঠল।
কল এসেছে।
উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা, জেনারেল মোস্তফার কল কেন আবার!
দেহের ভারটা ডান পাশে নিয়ে সামনে এগোনো অব্যাহত রেখেই আহমদ মুসা কষ্ট করে আহত বাম হাত দিয়েই মোবাইল বের করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়েই থমকে গেল। জোসেফাইনের টেলিফোন।
টেলিফোন মুখের কাছে নিয়ে সালাম দিয়ে আহমদ মুসা জোসেফাইনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘আমি ভালো আছি, ডার্লিং জোসেফাইন! এক ঘণ্টা পর ইনশাআল্লাহ তোমার সাথে কথা বলল। দোয়া করো। ভালো থেকো।’
আহুমদ মুসার কথা শেষ হতেই ওপার থেকে জোসেফাইন বলল, ‘আল্লাহ হাফেজ! আসসালামু আলাইকুম।’ জোসেফাইনের কন্ঠ ভারী। ভারী কন্ঠ কাঁপছিল তার।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম!’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। জোসেফাইনের কম্পিত ভারী কন্ঠ তার সমগ্র চেতনায় একটা যন্ত্রনার সৃষ্টি করেছে।
মূহুর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল, ‘সব অবস্থায় একমাত্র মহান আল্লাহরই সব প্রশংসা।’
আহমদ মুসা তার এগোনোর গতি আরও দ্রুত করল। আবৃত হাতটাকেও পুরোপুরি কাজে লাগাল।
একে তো ভ্যাপসা গরম। তার ওপর পরিশ্রম ও আহত বাহুর ওপর বাড়তি চাপ- সব মিলিয়ে ঘামে গোসল হয়ে গেছে আহমদ মুসার।
এক জায়গায় এসে আবার থমকে গেল আহমদ মুসা। হঠাৎ এখানে এসে সুড়ঙ্গের ফ্লোর উঠের পিটের মতো ফুলে উঠেছে। গুলীগুলো প্রায় তার গা ছুঁয়েই বেরিয়ে আসছে। গুলী চলা অবস্থায় আর এক ইঞ্চিও সামনে এগোনো সম্ভব নয়।
হতাশ হয়ে আহমদ মুসা গা এলিয়ে দিল সুড়ঙ্গের ফ্লোরের ওপর। হতাশ হলেও আশার আলো একটা রয়েছে। সে থেমে গেলে গুলীও থেমে যাবে, অন্তত কমে যাবে। তার সুযোগ সে নিতে পারবে।
মন কিছুটা প্রসন্ন হলো।
আর কত দূরে সে ২৫ মিটার রেঞ্জ থেকে?
হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরটা সে টেনে নিল। তার স্ক্রিনের ওপর চোখ পড়তেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার চোখ। ২৫ মিটারের বেশি জায়গা সে অতিক্রম করে এসেছে। সামনে আর মাত্র ২৪ মিটার বাঁকি।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা, ঠিক জায়গায় আল্লাহ থামিয়ে দিয়েছেন তাকে।
এবার আহমদ মুসার দৃষ্টি প্রসারিত হলো পেছনের নিকশ কালো অন্ধকারের দিকে।
এখন তার ডল-রোবট আসার অপেক্ষা।
সময়ের পরিমাপ করল আহমদ মুসা। প্রায় ১ ঘন্টার মতো সময় হাতে আছে। রোবটের যে গতি, তাতে এই পথটা পাড়ি দিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি লাগবে না। এর অর্থ রোবটের জন্যে আরও কমপক্ষে আধা ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।
গুলী বৃষ্টি কমে এসেছে।
আরও আধা ঘন্টা পার হলো। রোবট এলো না।
পকেটের মোবাইল আবার সাড়া দিয়ে উঠল আহমদ মুসার।
আহমদ মুসা মোবাইলের রিং টোন বন্ধ করে ভাইব্রেশন এলার্ট অন করেছে।
এখন শত্রুরা এতই কাছে যে, নিচু স্বরে কথা বলাও ঝুকিপূর্ণ।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল, জেনারেল মোস্তফার টেলিফোন।
কল অন করে আহমদ মুসা মোবাইল ফ্লোরে রেখে মোবাইলে মুখ ঠেকিয়ে ফিস ফিসে কন্ঠে বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা আমি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে গেছি। এখন রোবটের অপেক্ষা।’
‘প্রস্তুতিতে একটু সময় লেগেছে। প্রায় ১৫ মিনিট আগে চারটা রোবট তাদের যাত্রা শুরু করেছে। মনিটরিং-এ থাকা সেনা অফিসার আমাকে কিছুক্ষণ আগে জানালেন, ১০ মিনিট পর্যন্ত পথ ভালোভাবেই চলেছে, ইনশাআল্লাহ ঠিকঠাক তা লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
রোবট হাতে পাওয়ার পর আমি একটা মিস কল দিব, তারপর আপনারা দাবি মানার ঘোষনা দিবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওদের সাথে আবার আমাদের কথা হয়েছে। আমরা বলেছি, দাবি মানার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। শীঘ্রই আমরা জানাচ্ছি। তারা দাবির সাথে আরও কিছু কথা যোগ করেছে। তারা বলেছে, সুড়ঙ্গ পথে যারা তাদের পিছু নিয়েছে, তাদের পিছু নেয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং দাবি মানার সংগে সংগে তাদের পিছু হটে সরে যেতে হবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আমি অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে দিয়েছি এবং আপনারা দাবি মানার পর আমি অবশ্যই অন্তত পাঁচ মিটার পেছনে সরে যাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে, পিছু হটা শুরু হলেই চলবে। আর শুনুন, ম্যাডাম টেলিফোন করেছিলেন। উনি খুব উদ্বিগ্ন। বিষয়টা দেখলাম উনি জানেন। আমি তাঁকে বলেছি, কোন ভয় নেই, জনাব খালেদ খাকান পরিকল্পনা মোতাবেক এগোচ্ছেন। অবশ্য আপনার আহত হওয়ার কথা আমি তাকে জানাইনি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ধন্যবাদ জেনারেল, প্রেসিডেন্ট কিডন্যাপ হওয়ার কথা ম্যাডাম কি করে জানলেন? আপনারা তো কয়েকজন ছাড়া আর কারো কাছেই এটা প্রকাশ করেননি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘উনি তার বান্ধবীর কাছ থেকে জেনেছেন। আমি এ বিষয়ে তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ঠিক আছে। আমি বুঝেছি। তাহলে এখানেই কথা শেষ। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। ‘আল্লাহ হাফেজ!’ ওপার থেকে বলল জেনারেল মোস্তফার কন্ঠ।
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করতে করতে ভাবল জোসেফাইনের বান্ধবীর কথা। নিশ্চয়ই সে শিক্ষিকার কাছ থেকেই খবরটা জেনেছে। জোসেফাইনের এই বান্ধবী মহিলা আসলে কে? নিজে গরজ করে কেন এত তথ্য সংগ্রহ করে? বলতে গেলে আহমদ মুসার সাফল্য অনেকখানিই তার সাহায্যের ফল। কেন এত উপকারী সে? কেন সে সরাসরি কথা বলে না? এবার এ ব্যাপারে কিছু খোঁজ-খবর নিতেই হবে।
আহমদ মুসা কল অফ করে মোবাইল পকেটে পুরে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল আবছা এক নীল ডট। নীল ডটটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। রোবট এসে গেছে!
মিনিট খানেকের মধ্যে দু’টি রোবট তার হাতে এসে পৌছল।
পেছনে আর কোন ডট চিহ্ন দেখলো না। তার মানে চারটা রোবটের মধ্যে দু’টি শেষ পর্যায়ে এসে ওদের গুলীতে ধ্বংস হয়েছে কিংবা অন্যকিছু ঘটেছে। দু’টি যে ঠিকঠাক পৌছতে পেরেছে এজন্যে আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
দুই রোবটের সাথে বেঁধে দেয়া এনজি-৪ এর দু’টি পাইপগান খুলে নিয়ে রোবটকে নিষ্ক্রিয় করে পাশে রেখে দিল।
পেন্সিল টর্চ জ্বেলে আহমদ মুসা পাইপ গান দু’টোকে পরীক্ষা করল। দেখল, দু’টিই ঠিকঠাকভাবে লোডেড। ফায়ারিং ডিস্ট্যান্স সর্বোচ্চ ২৫ মিটার, সেটাও পরিষ্কার লেখা আছে পাইপগানের গায়ে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেল পাইপগানের গায়ের লেখা থেকে। সেটা হলো, পাইপগান ফায়ার করার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাস টিউব সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছে নিরবে বিকিরণ শুরু করবে। দূরত্ব কম হলে আরও কম সময় লাগবে। বিকিরন কেন্দ্রের ৫ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে এনজি-৪ গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে। গন্ধহীন অদৃশ্য এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ৫ মিনিটের মধ্যে এর এ্যাকশন পূর্ণভাবে প্রকাশ পাবে। এক সময়ের জন্যে দু’টি গ্যাস টিউব সর্বোচ্চ ডোজ।
‘তার মানে’, ভাবল আহমদ মুসা, ‘পাইপগান ফায়ার করার ছয় মিনিটের মধ্যেই ভিকটিমরা শারীরিকভাবে অচল হয়ে পড়বে।’
বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা তার মোবাইল থেকে একটা মিস কল দিল জেনারেল মোস্তফাকে।
মাত্র পাঁচ মিনিট। আহমদ মুসার হাতের মোবাইল ভাইব্রেট করতে শুরু করল। দেখল মোবাইলের স্ক্রীনে মেসেজের সিগন্যাল।
মেসেজটি ওপেন করল আহমদ মুসা। জেনারেল মোস্তফার মেসেজ: দাবি মানার সম্মতি তাদের জানিয়ে দেয়া হলো। তারা খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে আমাদের।’
মোবাইলের কল অফ করে আহমদ মুসা হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরটা সামনে এনে শেষ বারের মতো পরীক্ষা করল, শত্রুরা ঠিক ২০ মিটার দূরে।
আহমদ মুসা দুই পাইপগানের ডিস্ট্যান্স এডজাস্ট করে সময় দেখে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রথমে একটা পাইপ গান ফায়ার করল।
প্রথম পাইপগান ফায়ার করার পর দ্বিতীয় পাইপ গান তুলে নিয়ে হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরে আবার ওদের ২০ মিটার দূরত্ব ঠিক আছে কি না দেখে নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে দ্বিতীয় ফায়ার করল আহমদ মুসা। সময়টা আবার দেখে নিল। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, ‘হে জগতসমূহের মহান সর্বশক্তিমান মালিক, আমার জ্ঞান-সামর্থ্য অনুসারে আমি চেষ্টা করলাম, ফল আপনার হাতে, ফল দেবার মালিক আপনি। আপনার কাছে সবচেয়ে ভালোটা প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’
বলতে গেলে এই প্রার্থনাতেই আহমদ মুসার কেটে গেল ছয় সাত মিনিট।
শেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা ভাবল, আল্লাহ করেন তো এই সময়ের মধ্যে এনজি-৪ গ্যাস টিউব তার মিশন শেষ করেছে।
পরীক্ষার জন্যে আহমদ মুসা ক্রলিং করেই সামনে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। ওরা সক্রিয় থাকলে অবশ্যই গুলী আসবে। যেহেতু এই এগিয়ে যাওয়া হবে ওয়াদার খেলাফ, তাই এ গুলী বৃষ্টি ভয়াবহ ধরনের তীব্র হতে পারে।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা অগ্রসর হতে লাগল। খুব দ্রুত সে ঝুঁকিপূর্ণ উঁচু জায়গাটা পার হলো। কিন্তু ওদিক থেকে কোন গুলী এলো না।
মনটা খুশিতে ভরে গেল আহমদ মুসার।
তবু নিশ্চিত হবার জন্যে সাবধানে আরও অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখল।
কিন্তু গুলী আর এলো না।
আহমদ মুসা আরও এগোল।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে সুড়ঙ্গের ওদিক থেকে বড় দু’টি চোখ জ্বল জ্বল করছে। আলোর কালার দেখে বুঝল, ও দু’টি দরজার ঘুলঘুলি। তার মানে সে দরজার শেষ প্রান্তে এসে গেছে। মনিটরটি টেনে নিয়ে দেখল মাত্র ৪ থেকে ছয় মিটার দূরে ওরা। তার মানে আহমদ মুসা ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আহমদ মুসার মন। তাদের এনজি-৪ পুরোপুরি কাজ করেছে। ওরা সবাই এখন শারীরিকভাবে অকেজো।
আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে টর্চ বের করে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে রিভলবার বাগিয়ে টর্চ জ্বালল।
টর্চের আলো গিয়ে পড়ল লুটোপুটি খেয়ে পড়ে থাকা কিছু মানুষের ওপর।
পড়ে আছে পাঁচজন মানুষ।
সকলেই নিশ্চল।
তাদের চোখে দৃষ্টি আছে, দৃষ্টির ভাষা আছে, কিন্তু গতি নেই।
ওদের চোখ-ভরা বিস্ময় আর ভয়!
আহমদ মুসার দু’চোখ আকুল হয়ে খুঁজছিল প্রেসিডেন্টকে।
প্রেসিডেন্ট ঐ পাঁচজনের মধ্যে নেই।
আহমদ মুসার লাইটের ফোকাস আরও সামনে গিয়ে সুড়ঙ্গ- মুখের দরজার ওপর গিয়ে পড়ল।
এগোল আহমদ মুসা দরজার দিকে ওদের ডিঙিয়ে।
দরজাটা ১ ইঞ্চিরও বেশি পুরু ইস্পাতের প্লেট। বিদ্যুৎ খুঁটির মতো মোটা ইস্পাতের দু’টি বার দিয়ে দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ। বার দু’টি দু’পাশের পাথরের দেয়ালে ঢোকানো এবং সিমেন্টের প্লাস্টার দিয়ে আটকে দেয়া। দরজাটা যেমন পুরু, তেমনি স্টিলের হুকটা হেভি। মনে হয় কামানের গোলা মেরেও এই দরজার কিছু করা যাবেনা।
বিকল্প পথ তাহলে আছে।
আহমদ মুসার টর্চের ফোকাস বামে, সামনে ঘুরে ডান দিকের একটা সিঁড়ির ওপর এসে পড়ল।
সিঁড়িটা একতলা সমান উঁচু এবং তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা দরজায়।
সুড়ঙ্গ-মুখের দরজার মতোই ও দরজাটা পুরু স্টিলের মনে হলো।
দরজাটা আধা খোলা।
দরজার পাশেই পাঁচ-ছয় ইঞ্চি আয়তনের একটা স্টিল বার দেখে আহমদ মুসা বুঝল সুড়ঙ্গের দরজার মতো এই হেভি স্টিল বারটা দিয়েই এই দরজা বন্ধ ছিল। এ দরজাও কামান দেগে ভাঙার মতো নয়।
আহমদ মুসার মনে পড়ল প্রাসাদের লে-আউটে সে সুড়ঙ্গ-মুখের পাশে মিলিটারী পর্যবেক্ষন টাওয়ার দেখেছিল। এটাই কি সে টাওয়ার হতে পারে?
এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে রিভলবার বাগিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
পা দিয়ে দরজা ধীরে ধীরে পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে তাকাল ঘরের ভেতরে। রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি ছিল আহমদ মুসার।
কিন্তু ভেতরে দেখল একই দৃশ্য।
প্রথমেই নজর পড়ল দু’জনের ওপর। দুই চেয়ারে ওদের দু’জনের দেহ নেতিয়ে পড়ে আছে।
ওদের দু’জনের সামনেই গ্রেনেড লাঞ্চার ও হেভি মেশিনগান। ওগুলো ফায়ার প্যানেলে বাইরের বিভিন্ন ডাইরেকশনে তাক করে পেতে রাখা।
পর্যবেক্ষণ প্যানেলে রয়েছে একাধিক দূরবিন।
আহমদ মুসা বুঝল, এসব জিনিসই মিলিটারিদের। সন্ত্রাসী কিডন্যাপাররা এগুলো দখল করে নিয়েছিল মাত্র।
আহমদ মুসা এবার তাকাল ঘরের পেছন দিকে। চেয়ার দু’টির একটু পেছনেই দেখতে পেল দু’টি সংজ্ঞাহীন দেহ। তাদের দেহে সামরিক পোশাক। এরাই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে ছিল, এদের মেরে বা সংজ্ঞাহীন করেই তারা সিঁড়ি মুখের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার দখল করে নিয়েছিল।
আরো পেছনে এলো আহমদ মুসার চোখ।
পেছনে দেয়ালের সাথে লাগানো একটা বেড দেখতে পেল। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সৈনিকদের বিশ্রাম নেয়ার মতো একটা সাধারণ বেড। বেডের ওপর দেখতে পেল প্রেসিডেন্টের দেহ।
আহমদ মুসা ছুটে গেল প্রেসিডেন্টের কাছে। সংজ্ঞাহীন প্রেসিডেন্ট। নেতিয়ে পড়ে আছে তাঁর দেহ।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টের শিথিল একটা হাত তুলে পাল্‌স পরীক্ষা করল। পাল্‌স স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
এই সময়ই মোবাইল কেঁপে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইলের কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কন্ঠ, ‘মি. খালেদ, এদিকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। আপনার কলের অপেক্ষা করছিলাম। কি অবস্থা? সব ঠিক তো?’
‘মিশন সাকসেসফুল! এই মাত্র প্রেসিডেন্টের সংজ্ঞাহীন দেহের পাশে এসে আমি বসলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ! প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আমার পাশে। আপনি তাঁর সাথে কথা বলুন।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘আসসালামু আলাইকুম, মি. খালেদ খাকান।’ ওপার থেকে প্রধানমন্ত্রীর গলা শোনা গেল।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ! স্যার, আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টের পাশে বসে। তিনি সংজ্ঞাহীন, কিন্তু ভাল আছেন। আমি পাল্‌স পরীক্ষা করেছি। একদম নরমাল।’
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। আমরা সবাই, আমার দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’ প্রধানমন্ত্রীর ভারী কন্ঠ। আবেগে কাঁপছে তাঁর কন্ঠ।
‘স্যার, সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনিই আমাদের সাহস, বুদ্ধি, শক্তি সব কিছু দিয়েছেন।’
‘ঠিক মি. খালেদ খাকান। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে দিয়ে তাঁর কাজ করান, তিনি ভাগ্যবান। ভাগ্যবানকেই তিনি বাছাই করেন। শুনুন মি.! আমরা সবাই হেলিকপ্টার নিয়ে আসছি। আমি ম্যাডামকেও আনতে পাঠিয়েছি। তিনিও আসবেন। লতিফা আরবাকান তাঁকে নিয়ে আসবে। ওকে…।’
প্রধানমন্ত্রীর কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘স্যার, আপনারা আসুন। কিন্তু একটা হেলিকপ্টারেই আসতে হবে। যাতে পাহারায় বা পর্যবেক্ষণে থাকা শত্রুপক্ষ বুঝে যে, তাদের দাবি অনুসারেই হেলিকপ্টার এসেছে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি ও খালেদ খাকানকে ওদের হাতে তুলে দিতে। তারা বুঝুক যে, তাদের বিজয় হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে গুড হিউমারে রাখতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান, আপনি ঠিক বলেছেন। আবেগ আমাদের বাস্তবতা থেকে সরিয়ে এনেছিল। জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধানই শুধু প্রেসিডেন্টকে আনতে যাবে। আর প্রেসিডেন্ট ও আপনাকেই শুধু নিয়ে আসবে। হেলিকপ্টার চলে আসার মিনিট পনের পরে চারদিকের পুলিশ ও সেনা অফিসাররা গিয়ে সুড়ঙ্গের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করবে। আমরা সকলেই সামরিক হাসপাতালের চত্বরে অপেক্ষা করছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার, ঠিক চিন্তা করেছেন। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন!’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওকে, মি. খালেদ খাকান। আসসালামু আলাইকুম।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘ওকে স্যার, ওয়া আলাইকুম সালাম।’
বলে আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, কিডন্যাপার ‘থ্রি জিরো’দের দেয়া দাবি পূরনের শেষ সময়ের আর ২০ মিনিট বাকি আছে। বিশ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার পৌঁছলেই ওরা ভাববে ওদের দাবি পূরণের জন্যেই হেলিকপ্টার এসেছে। আহমদ মুসার উদ্বেগ হলো, ওরা কোনওভাবে সন্দেহ করলে ওরা মরিয়া হয়ে মেটালিক ধ্বংসের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যার ফলে হেলিকপ্টার, গাড়ী মেটালিক কোন কিছু ব্যবহারই সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্ট ভবনের ওপর আমাদের সোর্ড- এর ডিফেন্স আমব্রেলা আছে, সামরিক হাসপাতাল পর্যন্ত সবটা পথের ওপর নেই।
আহমদ মুসাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার ১০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার এসে গেল।
বিমানবাহিনী হেলিকপ্টারের দক্ষ পাইলট গুহামুখের একদম সন্নিকটেই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করাল। এসব মাউন্টেন রাইডার হেলিকপ্টার পাহাড়ে ল্যান্ড করার সামান্য সুযোগও কাজে লাগাতে পারে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করেতেই আহমদ মুসা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দরজা খুলে প্রেসিডেন্টকে কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এসে এগোলো হেলিকপ্টারের দিকে।
দীর্ঘ সময় পর বাইরের আলো-বাতাসের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ আহমদ মুসার।
চারদিকে চোখ যেতেই দেখল, পাহাড় ও বসফারাসে সেনা ও পুলিশের বেস্টনি তৈরী হয়ে আছে।
হেলিকপ্টার থেকে সিঁড়ি নেমে এসেছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ির গোড়ায় পৌছতেই জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধান নেমে এলো।
তিনজন ধরাধরি করে প্রেসিডেন্টকে হেলিকপ্টারে তুলল।
হেলিকপ্টারটি একটি ফ্লাইং হাসপাতালও। একজন ডাক্তারও আছে।
প্রেসিডেন্টকে বেডে রাখতেই তাঁকে নিয়ে কাজে লেগে গেল ডাক্তার।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টকে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর পুলিশপ্রধানও।
‘তুরস্ক আপনার এত ঋণ শোধ করবে কি করে মি. খালেদ খাকান?’ আবেগে কন্ঠ ভেঙে পড়ল জেনারেল মোস্তফার।
জেনারেল মোস্তফা, মি. খালেদ খাকানের গুলীবিদ্ধ স্থান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে নতুন করে। ডাক্তার এদিকে দেখুন।’ বলল পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
জেনারেল মোস্তফা ডাক্তারের দিকে একবার তাকিয়ে ছুটে এলো আহমদ মুসার আহত জায়গাটা দেখার জন্যে। বলল, ‘এদিকের চাপে ভূলেই গেছি আপনার আহত হওয়ার কথা।’
ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘না, ডাক্তার সাহেব, আপনি প্রেসিডেন্টকে পরীক্ষা করুন। ভার তুলতে গিয়ে চাপে একটু ব্লিডিং হচ্ছে। হাসপাতালে তো যাচ্ছিই। এখন কিছু দরকার নেই।’
‘আপনি প্রেসিডেন্টকে আনতে গেলেন কেন? আমরাই নিয়ে আসতাম। একটা বাহু এভাবে আহত হওয়ার পর কিছুতেই এ ভার বহন করা ঠিক হয়নি। কেন আমাদের নামতে নিষেধ করেছিলেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আপনারা পরিচিত ব্যক্তিত্ব। হেলিকপ্টারে পুলিশপ্রধান ও গোয়েন্দাপ্রধান এসেছেন, এটা শত্রুকে জানানো হতো না। অন্য কিছু ঘটেছে বলে সন্দেহ করতো। যাক এ প্রসংগ। আসুন বসি।’ আহমদ মুসা বলল।
হেলিকপ্টার আকাশে উঠে আসার পর দ্রুত চলতে শুরু করেছে।
বসেছে আহমদ মুসারা।
‘মি. খালেদ খাকান, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনি নিজেকে নিজেই বোধ হয় চিনতে পারবেন না। ধুলো, বালি, কালিতে আপনার পোশাকেরই শুধু রং পাল্টায়নি। মুখটাকেও অচেনা করে দিয়েছে।’
বলে হাসল জেনারেল মোস্তফা।
‘বহুকালের পুরানো সুড়ঙ্গ। ধুলো, বালি, কালির স্তর পড়ে গেছে। ওর মধ্যে দিয়েই গড়াগড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
পাশ থেকে ডাক্তার বলে উঠল, ‘আমাদের মহামান্য প্রেসিডেন্ট পারফেক্টলি ওকে। অল্পক্ষনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসবে। হাসপাতালে নিয়ে এ্যান্টি এনজি-৪ ইনজেকশন দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন।’
এবার দশ মিনিটও লাগল না সামরিক হাসপাতালে পৌঁছতে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল সামরিক হাসপাতালের চত্বরে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতেই সিঁড়ি নেমে গেল। ছুটে এলো এ্যাম্বুলেন্স। সেনারা চারদিকে সতর্ক অবস্থানে। হেলিকপ্টার থেকে নিরাপদ দূরে কয়েকটা কার দাঁড়িয়ে আছে।
এ্যাম্বুলেন্সটা উঠে এলো হেলিকপ্টারের দরজার সমতলে। হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার এ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে হেলিকপ্টারের বেডটাকে গড়িয়ে এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে গেল।
নিচে নেমে গেল এ্যাম্বুলেন্স।
‘মি. খালেদ খাকান, সিঁড়ির গোড়ায় প্রধানমন্ত্রী। আপনি আগে নামুন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে।
‘অলরাইট’ বলে আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে পেছনে জেনারেল মোস্তুফা এবং পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
সিঁড়ির গোড়ায় মাটিতে পা দেবার আগেই আহমদ মুসা দেখতে পেল অল্প একটু দূরে কারের খোলা দরজা দিয়ে আহমদ মুসার দিকে হাত নাড়ছে তার ছেলে আহমদ আব্দুল্লাহ। তার পাশে জোসেফাইন। আর ড্রাইভিং সিটে দেখতে পেল লতিফা আরবাকানকে।
আহমদ মুসা হাত নেড়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
সিঁড়ি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখতেই আহমদ মুসাকে এসে জড়িয়ে ধরল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘আমার সরকার, আমার জনগণের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। মহাআতংক, মহাক্ষতি থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। আল্লাহ আপনাকে এর জাযাহ দিন!’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠ প্রধানমন্ত্রীর।
‘ধন্যবাদ স্যার’ বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার গোটা শরীর ধুলো-বালিতে ভরা। আপনার কাপড়-চোপড়ও নষ্ট হয়ে গেল।’
‘আপনি ধুলো-ময়লার মধ্যে সাতার কেঁটেছেন, আর আমি জামা-কাপড়েও কিছু ধুলো-কালি লাগাতে পারবো না!’
বলেই প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসার আহত বাহু স্পর্শ করে জানতে চাইলেন, ‘হেলিকপ্টারে ডাক্তার ছিল, উনি কি আপনার আহত স্থানটা পরীক্ষা করেছেন? ‘
‘আমি নিষধ করেছিলাম। এখন গিয়ে দেখাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এই তো আপনার জন্যে এ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছে! ম্যাডাম এসেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন।
এ্যাম্বুলেন্স ও জোসেফাইনের কারটি পাশেই এসে দাঁড়িয়েছিল।
মোবাইল বেজে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর। মোবাইলটা তুলে নিতে নিতে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি এ্যাম্বুলেন্স যান। আমি আসছি হাসপাতালে।’
‘ওকে স্যার। আসসালামু আলাইকুম।’
বলে আহমদ মুসা এ্যাম্বুলেন্স ও গড়ির দিকে এগোলো।
এ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে একজন ডাক্তার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আসুন স্যার।’
আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘না, ডাক্তার, আপনি চলুন। আমি ঐ কারে আসছি।’
আহমদ মুসা এগোলো কারের দিকে।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসেছে লতিফা আরবাকান।
এদিকে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে আহমদ আব্দুল্লাহও বেরিয়ে এসেছে।
জোসেফাইন গাড়ির ভেতরে সিটে বসে আছে। আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে ডান হাতে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেল কপালে।
‘তোমার কাপড়ে ময়লা, মুখে ময়লা। কেন? ময়লা পরিষ্কার করনি কেন?’
আহমদ আব্দুল্লাহকে চুমু খেয়েই একটু ঝুঁকে পড়ে সালাম দিল জোসেফাইনকে।
জোসেফানের মুখে হাসি, চোখে অশ্রু।
সালাম নিয়ে বলল, ‘আহমদকে নামিয়ে দাও তোমার আঘাতে চাপ পড়ছে।’
আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে নামিয়ে দিয়ে সামনে তাকিয়ে সালাম দিল লতিফা আরবাকানকে।
সালাম নিয়ে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার উঠুন।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে গাড়িতে তুলে নিজে উঠে বসল।’
লতিফা আরবাকান গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজে সিটে গিয়ে বসল।
গাড়ির সিটে বসে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার, কত বড় ঘটনা যে ঘটে গেল, মানুষ জানতেই পারলো না। জানতেই পারলো না, একজন বিদেশী তাদের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারের জন্যে কি করেছেন, কিভাবে রক্ত ঝরিয়েছেন, কিভাবে মৃত্যুর মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন! আমার তুরস্কের পক্ষ থেকে আপনাকে কনগ্র্যাচুলেশন স্যার।’
আবেগ-উচ্ছ্বাসজড়িত কান্নায় লতিফা আরবাকানের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছিল।
‘উনি তো বিদেশী নন লতিফা। গোটা দুনিয়া তো ওঁর দেশ।’ বলল জোসেফাইন। শান্ত, ভারী কন্ঠ জোসেফাইনের।
‘ধন্যবাদ, ম্যাডাম। এটাই উপযুক্ত উত্তর। ধন্যবাদ আপনাদের।’ লতিফা আরবাকান বলল। তখনও কান্না তার কন্ঠে।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
চলতে শুরু করল গাড়ি।
আহমদ আব্দুল্লাহ আহমদ মুসার কোলে মুখ গুঁজেছে।
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘তুমি এসেছ, ধন্যবাদ।’
জোসেফাইনের নিরব সজল দৃষ্টি আহমদ মুসার চোখে।
ধীরে ধীরে আনত হলো জোসেফাইনের মুখ।
তার মাথাটা ধীরে ধীরে গিয়ে ন্যস্ত হলো আহমদ মুসার কাঁধে। তার সজল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু।
জোসেফাইনের একটি হাত আঁকড়ে ধরেছে আহমদ মুসার একটা হাতকে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে যাবার পথে আহমদ মুসা ঘড়িতে সময় দেখে জোসেফাইনকে বলল, ‘যথাসময়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে ওয়াদা মতো তোমার সাথে ডিনার করতে পারছি, ইনশাআল্লাহ!’
জোসেফাইনের ঠোঁটেও মধুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ইনশাআল্লাহ!’