৪৯. বিপদে আনাতোলিয়া

চ্যাপ্টার

প্লেনটা আছে আংকারার খুব কাছের শহর আংগোরায়। আংগোরা তুর্কি সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক সদর দফতর।
গন্তব্য আংগোরা হলেও আহমদ মুসাকে নামতে হবে আংকারা বিমান বন্দরে। সেখান থেকে পাহাড়ী পথে বিশ মিনিটের ড্রাইভে আংগোরা।
আংকারা বিমান বন্দরে তাকে রিসিভ করার জন্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসতে চেয়েছিল জেনারেল মোস্তফা। কিন্তু আহমদ মুসা রাজি হয়নি। বলেছিল, আমার মিশনটা গোপন। শুরুতেই ভিআইপি পরিচয় পেলে মিশনটা আর গোপন কি! জেনারেলের পরিচয় তো জানাই গেছে। উত্তরে আহমদ মুসা বলেছিল, আমরা তাকে জানাতে পেরেছি, কিন্তু সে জানতে পারুক তা আমি চাই না। তার মাধ্যমে ষড়যন্ত্র জানা যায় কিনা, সেই চেষ্টাই আমরা করব। এজন্যই তাকে গ্রেফতারের আমি বিরোধিতা করেছি।
মিসেস আব্দুল্লাহ্ গাজেনের ডিইরি থেকে যে ইংগিত পাওয়া গেছে, তার ভাত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়েই জেনারেল মেডিন মেসুদের পরিচয় জানা গেছে। মিসেস গাজেনের ডিইরিতে জেনারেল সম্পর্কে কয়েকটা ক্লু পাওয়া গিয়েছিল। তার প্রশস্ত কপাল। সদা হস্যোজ্জ্বল মুখ। ট্রেনিং-এ ব্রিলিয়ান্ট রেকর্ডের অধিকারী। ট্রেনিং-এর পর প্রথম নিয়োগ পায় ভ্যান ইউনিটে। এনব ক্লু সামনে রেখে আহমদ মুসার অনুরোধে তুরস্কের অভ্যন্তনীণ নিরাপত্তা প্রধান জেনারেল মোস্তফা অনুসন্ধান চালিয়ে চারজন সিনিয়র জেনারেলকে চিহ্নিত করে। এই চারজন জেনারেলের ব্যক্তিগত জীবনের উপর অনুসন্ধান চালানো হয়। খোঁজ নেয়া হয় ভ্যান-এর সাথে কার যোগাযোগ বেশি, কে বেশি বেশি ভ্যান-এ যায়। এই অনুসন্ধান থেকে বেরিয়ে আসে জেনারেল মেডিন মেসুদের নাম। সে এক সময় প্রতিটি উইক এন্ডে ছুটি কাটাতে ভ্যান-এ যেত। ভ্যান-এ তার কোন নিজস্ব বাড়ি নেই। সুতরাং ভ্যান-এ গেলে তার ওঠার কথা সেখানকার সবচেয়ে সুন্দর সেনা রেস্ট হাউজে। কিন্তু অধিকাংশ সময় সেনা রেস্ট হাউজে উঠতোই না। কোন কোন সময় যখন উঠতো, তখনও সে সেখানে থাকতো না। তার ফ্যামিলি রেকর্ড থেকে এটাও জানা যায় যে, তার দাম্পত্য জীবনে কোন সমস্যা না থাকলেও বিয়েটা তার অমতে হয়েছিল। তার সার্ভিস রেকর্ড থেকে আরেকটি বিষয়ও জানা যায়, সেটা হলো ভ্যান-এ তার প্রথম পোস্টিং হওয়ার পর সেখান থেকে তার ট্রান্সফার ঠেকানো এবং তদ্বির করে কয়েকবার ভ্যান-এ পোস্টিং নেবার তার একজন সেনা অফিসারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে সেনা অফিসার মেডিন মেসুদ বলেই প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং মিসেস গাজেনের গোপন স্বামী হিসেবে জেনারেল মেডিন মেসুদের বিশাল সম্পত্তির সাথে তার আয়ের কোন সংগতি নেই। এটাও প্রমাণ করে তার অবৈধ আয়ের পেছনে তার কোন অবৈধ তৎপরতা বা যোগসাজশের সম্পর্ক আছে।
জেনারেল মেডিন মেসুদ চিহ্নিত হবার পর তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসা এই সিদ্ধান্তে বাধা দেয়। বলে যে, তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোন্ ষড়যন্ত্রে সে যুক্ত, সে ষড়যন্ত্রের প্রকৃতি ও পরিধি কি তা নাও জানা যেতে পারে। অথচ সেসব জানা, শাস্তি পাওয়ার চেয়ে অনে বেশি প্রয়োজন। আহমদ মুসার এ যুক্তিকে তুর্কি সরকার গ্রহণ করে এবং বিকল্প হিসাবে কি করা যায় সে দায়িত্ব তারা আহমদ মুসার উপরই অর্পণ করে।
সে দায়িত্ব নিয়েই আহমদ মুসা আজ যাচ্ছে আংগোরায়।
কারও ‘এক্সকিউজ মি!’ শব্দে আহমদ মুসার চিন্তার স্রোতটা বাধা পেয়ে থেমে গেল।
সুন্দর সুরেলা কণ্ঠ। মিষ্টি উচ্চারণ।
আহমদ মুসা মুখ তুলে চাইল। দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ-বাইশ বছরের অসম্ভব সুন্দরী একটি মেয়ে।
দেখেই আহমদ মুসা চিনতে পারল। ইস্কান্দরুন থেকে এ মেয়েটি বিমানে উঠেছে। তার বাম পাশের প্যাসেজের ওপারে জানালার কাছের একটা সীটে বসেছিল মেয়েটি।
ভ্যান থেকে আহমদ মুসার বিমানটি উড়ে ইস্কান্দরুনে কয়েক মিনিটের একটা যাত্রা বিরতি করেছিলে। ইস্কান্দারুন তুরস্কে ভূমধ্যসাগর উপকুলের একটা গুরত্বপুর্ণ নৌবন্দর। এটা পর্যটন শহরও। সেই সাথে এটা তুরস্কের কৌশলগত নৌঘাঁটিও।
আহমদ মুসা মুখ তুলে তাকাতেই মেয়েটি বলল, ‘আমি আপনার পাশের সীটে বসতে পারি? আমি স্টুয়ার্ডকে বলেছি।’ মেয়েটির চোখে-মুখে বিব্রত ভাব। কণ্ঠে সংকোচ।
মেয়েটির বিব্রতভাব ও সংকোটকে মেকি বলে মনে হলো না আহমদ মুসার। তার চোখের ভাষায় কোন মতলবের চিহ্ন নেই। তার বদলে আছে অসহায়ত্বের প্রকাশ।
‘আসনটা শূন্য। আমার আপত্তি নেই।’
‘থ্যাংক ইউ…।’ মেয়েটি কথা শেষ করল না। প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটে উঠেছে তার চোখে মুখে।
‘আবু আহমদ আব্দুল্লাহ।’ নিজের নাম বলল আহমদ মুসা।
‘থ্যাংক মি. আব্দুল্লাহ।’ বলে মেয়েটি আহমদ মুসার পাশের শূন্য সীটে বসে পড়ল।
‘স্যরি, টু ডিস্টার্ব ইউ। আমি ওখানে কমফোর্ট ফিল করছিলাম না।’ বসেই বলল মেয়েটি।
আহমদ মুসা এর আগেই লক্ষ্য করেছে মেয়েটার পাশের সীটে খুবই সুবেশধারী ক্রিমিনাল চেহারার একজান মানুষ।
আহমদ মুসা মেয়েটার কথার জবাবে বলল, ‘ওয়েলকাম মিস। আপনার অবশিষ্ট ভ্রমণ সুন্দর হোক।’
আহমদ মুসার পাশের শূন্য আসনটিতে বসতে গিয়ে বলল মেয়েটি, ‘আমার নাম সানেম, সালিহা সানেম।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি তো আংকারা যাচ্ছেন?’ মেয়েটির প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, আংকারা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি কি সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন?’ জিজ্ঞানা আবার মেয়েটির।
বিস্মিত আহমদ মুসা তাকাল মেয়েটির দিকে। বলল, ‘সেনাবাহিনীতে চাকুরীর কথা ভাবলেন কি করে?’
‘স্যরি, সেনাবাহিনীর অফিসাররা সাধারণঃত স্মার্ট হয়, চৌকশ হয় এবং শরীরাও সাধারণঃত মেদহীন হয়। আপনিও সেরকমই, তাই বলছিলাম।’ মেয়েটি বলল।
‘স্যরি, আমার ইমেজ আপনাকে বিভ্রান্ত করেছে। আমি সেনাবাহিনীতে চাকুরী করি না।’ আহমদ মুসা বলল।
ট্রলিতে নাস্তা আসছে। সালিহা সানেমের চোখ ওদিকে গেল।
আহমদ মুসা উঠে টয়লেটের দিকে চলে গেল। ফিরে এসে দেখল নাস্তা পরিবেশিত হয়েছে।
সালিহা সানেম মদ খাচ্ছে পানির মত। পুরা এক বোতল সে নিয়ে নিয়েছে।
তার নাস্তার সাথেও মদের বোতল দেখল আহমদ মুসা।
বিস্মিত আহমদ মুসা বসতেই সালিহা সানেম বলে উঠল, ‘আপনি ছিলেন না। আমি যা নিয়েছি, আপনার জন্যেও তাই নিয়েছি। ঠিক করিনি?’
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
নাস্তা দেয়া শেষ করে নাস্তার ট্রলি নিয়ে ফিরছিল বিমান ক্রুরা।
আহমদ মুসা মদের বোতল ওদের ফেরত দিয়ে বলল, ‘এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিন।’
পানি দিয়ে ওরা চলে গেল।
‘আমি আমার বোতল শেষ করে ফললাম, আর আপনি ফেরত দিলেন?’
‘আমি মদ খাই না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডাক্তারের নির্দেশ? কোন অসুখ-বিসুখ?’ বলল সfলিহা সানেম।
‘কোন অসুখ-বিসুখ নয়। আমি মুসলিম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমিও তো মুসলিম।’ বলল সলিহা সানেম।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মুসলিম অবশ্যই, কিন্তু মুসলিমদের জন্যে মদ নিষিদ্ধ, এটা আপনি মানেন না।’
‘আমি কেন, আমার চারদিকের প্রায় সবই তো মদ খায়।’ সালিহা সানেম বলল।
‘তারাও মানেন না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম, আপনি ধর্ম মেনে চলেন। আমি আপনাকে আধুনিক মানুষ মনে করেছিলাম।’ সালিহা সানেম বলল।
আবার হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধর্ম মানলে বুঝি আধুনিক মানুষ হওয়া যায় না? ধর্ম ও আধুনিকতা কি দুই ভিন্ন জিনিস?’
‘স্যরি, আমি তাই মনে করি। যারা ধর্ম মানে, তারা অতীতমুখী। অতীতমুখী হয়ে আধুনিক হওয়া যায় না।’ বলল সালিহা সানেম।
‘আচ্ছা বলুনতো, যারা ধর্ম মানে, তারা কি আধুনিক ডিজাইনের বিল্ডিং-এ বাস করে না? তারা কি আধুনিক কল-কারখানায় তৈরি আধুনিক কাপড়ের, আধুনিক ডিজাইনের পোষাক পরে না, যেমন আমি? খাবার টেবিলে কি আধুনিক বাসন-কোসন ব্যবহার করে না তারা? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানসহ সব আধুনিক বিষয় কি তারা পড়ে না? তারা কি নানা ধরনের আধুনিক পেশায় নিয়োজিত নেই? তাদের ঘরে কি কম্পিউটার নেই? তারা কি সব ধরনের আধুনিক কম্যুনিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে না? তারা কি আধুনিক কালের সমৃদ্ধ ভাষা চর্চ্চা করে না? আধুনিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খায় না? পর্যটন-দেশ ভ্রমণে তারা কি নেই? তারা কি স্কলারশীপ পায় না? স্কলারশীপ নিয়ে বা নিজ খরচে তারা কি দেশ-বিদেশে পড়ছে না? ধর্ম যারা মেনে চলে তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, লেখক, কবি, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কি নেই?’ আহমদ মুসা থামল।
‘আপনার সব প্রশ্নের জবাব আমার কাছে ‘হ্যাঁ’।’ বলল সালিহা সানেম। সে কিছুটা বিব্রত।
‘তাহলে ধর্ম যারা মানে তারা তো আধুনিক। অতীতমুখী হলো কেমন করে তারা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘বিশ্বাসে তারা অতীতমুখী।’ বলল সালিহা সানেম।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সে বিশ্বাসগুলো কি? আল্লাহতে বিশ্বাস করা, সে বিশ্বাসের ভিত্তিতে আল্লাহর হুকুম অনুসারে নামায পড়া, রোযা রাখা, যাকাত দেয়া, আখেরাতে বিশ্বাস করা, ইহজগতের কৃতকর্মের জন্যে পরজগতে পুরস্কার অথবা শাস্তি পাওয়া, এসব কি?’
সালিহা সানেমের চোখে-মুখে বিব্রত অবস্থা বেড়ে গেছে। বলল, ‘হ্যাঁ, এসবই। আরও আছে যেমন বোরখা পরা, ছেলেমেয়েদের মেলা-মেশাকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখা, ইত্যাদি।’ কণ্ঠ তার শিথিল।
‘ধন্যবাদ, কথাগুলো খোলাখুলি বলার জন্য। কিন্তু বলুন তো, আল্লাহতে বিশ্বাস করা যদি অতীতমুখিতা বা পুরাতনপন্থা হয়, তাহলে এর আধুনিক পন্থাটা কি হবে?’ খুব শান্ত ও নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
চোখ-মুখের সেই বিব্রত ভাব নিয়েই সে বলল, ‘না, ঠিক আল্লাহতে বিশ্বাস করা পুরাতন পন্থা বা অতীতমুখিতা নয়, এই বিশ্বাসকে উপলক্ষ্য করে যে বাড়াবাড়ি করা হয়, সেটাই অতীতমুখিতা।’
‘আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দাবী অনুসারেই তো নামায পড়া হয়, রোযা রাখা হয়, যাকাত দেয়া হয়। এসবকে আপনি কি বলবেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘নামায, রোযা, যাকাত এসব কারও অভ্যাস হিসাবে ভালো জিনিস। কিন্তু এসব নিয়ে যখন বাড়াবাড়ি করা হয়, অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়, এসব না করলে কাফের বলা হয়, তখন এই প্রবণতা অন্ধ অতীতমুখী মানসিকতার পর্যায়ে পড়ে যায়।’ সালিহা সানেম বলল।
‘সমাজে কখনও কখনও কেউ কেউ এটা করেন। কিন্তু আল্লাহ এটা করতে বলেননি। নামায, রোযার মত এবাদতগুলোতে যদি আন্তরিকতা না থাকে, নিজ ইচ্ছা না থাকে, একাগ্রতা না থাকে তাহলে তা আল্লাহ গ্রহণই করবেন না। কিন্তু একটা কথা বলুন মিস সালিহা সানেম, আপনি যা বিশ্বাস করেন, আপনি যা স্বীকার করেন, তা করা আপনার উচিত কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘অবশ্যই তা করা উচিত।’ বলল সালিহা সানেম।
‘যদি তা না করেন, তাহলে মানুষ আপনাকে কি বলবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ওয়াদা ভংগকারী বলবে, বিশ্বাস ভংগকারী বলবে’ বলল সালিহা সানেম।
‘আল্লাহকে যদি আপনি বিশ্বাস করেন, আপনি যদি নিজেকে মুসলিম মনে করেন, তাহলে বিশ্বাসের দাবী মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসাবে সে কাজগুলো, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, সৎ ও পবিত্র জীবন যাপন, হারাম পরিহার ইত্যাদি করা দরকার, সেগুলো না করলে আপনার পরিচয় কী হবে, কী বলবে মানুষ আপনাকে?’ আহমদ মুসা বলল।
সংগে সংগে উত্তর দিল না সালিহা সানেম। তার বিস্মিত দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। তারপর মুখ না তুলেই আস্তে আস্তে বলল, ‘তার মানে আপনি বলছেন, আমি বিশ্বাস ভংগকারী। আর বিশ্বাস ভংগকারী মুসলিম হওয়ার মানে অপরিহার্য শর্ত লংঘনকারী হিসাবে আমাকে কফের বলা যায়।’ বিস্মিত কণ্ঠ সালিহা সানেমের।
‘না মিস সানেম, আমি তা বলছি না। যদিও ‘কাফের’ শব্দের অর্থ বিশ্বাস অস্বীকারকারী, তবুও এ শব্দ কোন মুসলিমের উপর প্রয়োগ করা যায় না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একজন মুসলিম নামায না পড়লেও, রোযা না করলেও, হারাম খেলেও, পবিত্র জীবন যাপন না করলেও সে তার বিশ্বাস বা ঈমান পরিত্যাগ করে না। কাজে-কর্মে ঈমানের প্রকাশ না ঘটলেও ঈমান তার মধ্যে থাকে। তাই তো দেখা যায় বেনামাযি লোক এক সময় নামায পড়ে, এক সময় রোযা না করলেও, কোন এক সময় সে একনিষ্ঠ রোযাদার হয়ে যায়। সুতরাং কোন মুসলিমকে কাফের বলা ঠিক নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ। আপনি ঠিক বলেছেন। মুসলিম হিসাবে ইসলামের কোন অনুশাসন আমি অনুসরণ করি না, এ কথা ঠিক। কিন্তু আল্লাহর প্রতি আমার বিশ্বাস নেই, রসূলকে মানি না, এমন চিন্তা আমার মনে কোন সময় আসেনি। কিন্তু দেখুন, আমার পোষাক-পরিচ্ছদ ও আচার-আচরণ, চলা-ফেরা দেখেই আমাকে কাফেরের খাতায় নাম লিখে দিয়েছে। এটাই তো অন্ধত্ব, পশ্চাৎমুখিতা।’ বলল সালিহা সানেম।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওদের বাড়াবাড়ি আছে ঠিকই, কিন্তু আপনার পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, চলা-ফেরায় কি বাড়াবাড়ি নেই?’
সালিহা সানেম একটু ভাবল। বলল, ‘সোসাইটিতে যা প্রচলিত আছে, তার বাইরে আমি কিছুই করতে পারি না, কিছুই করি না। এসব আমার বাড়াবাড়ি নয়।’
‘আপনি আপনার সোসাইটির একজন। আপনার মত বহুজন নিয়েই আপনার সোসাইটি। সমাজ যা প্রচলন করে, সমাজে যা প্রচলিত হয়, তাতে সোসাইটির প্রত্যেক সদস্যের অংশ আছে। কিন্তু সে দায় সম্পর্কে আমার কোন কথা নেই। আমি জানতে চাচ্ছি, আধুনিকতা হিসাবে আপনি যা পরেন, যা করেন সে ব্যাপারে আপনার মন কি বলে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘কঠিন প্রশ্ন। এসব ব্যাপারে মন আলাদা কিছু বলে কিনা বুঝিনি, ভেবেও দেখিনি কখনও। আমি যা করছি, মন তো তার সাথেই আছে।’ বলল সালিহা সানেম।
‘আচ্ছা, আপনাদের ক্লাবে আড্ডায় যখন আপনি দেখেন ছেলেরা ফুলড্রেসে, আর মেয়েরা অর্ধনগ্ন বা নামমাত্র পোষাকে, তখন কি আপনার কিছুই মনে হয় না? কেন মেয়েদের এ পোষাক? কার স্বর্থে? সে স্বার্থ কি মেয়েদের?’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার প্রশ্ন শেষ হলেও তৎক্ষণাত উত্তর এল না সালিহা সানেমের কাছ থেকে। তার মাথাটা নিচু হয়েছে। ভাবছে সে।
ধীরে ধীরে মুখ তুলে সালিহা সানেম বলল, ‘আমি বুঝেছি আপনার কথা। আপনি বলতে চাচ্ছেন, নারীদের মনোরঞ্জনের উপকরণে পরিণত করা হয়েছে, ভোগের পন্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে নারীরা। আমি এভাবে কোনদিন ভাবিনি। আমি মনে করতাম এটা নারীদের অধিকার, স্বধীনতা । কিন্তু আপনি যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন, সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। তবে মেনে নেয়ার জন্যে আরও ভাবতে হবে।’
‘অবশ্যই ভাববেন মিস সালিহা সানেম। ইসলাম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানচর্চ্চাকে স্বাগত জানায়। আল্লাহর গোটা সৃষ্টিই তো জ্ঞানময়, বিজ্ঞা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই সীট বেল্ট বাঁধার ঘোষণা এল, ‘আংকারায় ল্যান্ড করতে যাচ্ছে বিমান।’
আহমদ মুসা থেমে গিয়েছিল। সীট-বেল্ট বাঁধায় মনোযোগ দিয়েছে সবাই। আহমদ মুসা এবং সালিহা সানেমও।
ট্যাক্সিএ সীটে গা এলিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা তার গন্তব্য আংগোরার কথাই ভাবছে। আংগোরা একটি সামরিক নগরী। পর্বত্য শহর। এখানে বেসরকারি কিছু লোকও আছে। কিন্তু তারাও সামরিক ব্যক্তিদেরই বংশধর। এখানে কয়েকটা ভালো হোটেল আছে পর্যটকদের জন্যে। সে হোটেলগুলোরই একটিতে আহমদ মুসার জন্যে সীট বরাদ্দ হয়েছে একজন পর্যটক হিসাবে।
রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলো আহমদ মুসা। চারদিকটা সবুজ টিলা, আর সবুজ উপত্যকায় ভরা। গাড়িটা যখন চড়াইয়ে উঠেছে তখন চারদিকের সবুজ দৃশ্য এবং টিলার উপরের ছবির মত রং-বেরং এর বাড়ি চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। রাস্তার দু’ধারটাও ছবির মত সাজানো।
ড্রাইভারের কাছ থেকে জানল প্রাইভেট বাড়ি কিছু আছে, কিন্তু রাস্তার দু’পাশের অধিকাংশ বাড়িই হোটেল-মোটেল জাতীয়। প্রচুর পর্যটক আসে। তাছাড়া প্রচুর দেশীয় লোক এখানকার নিরিবিলি পরিবেশে ছুটি কাটাতে আসে।
আহমদ মুসার গাড়ি একটা সবুজ চড়াই অতিক্রম করছিল। দেখতে পেল, দু’টি মাইক্রো ও একটা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে একটা মেয়েকে পাঁচ-ছয় জনে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে রাস্তার পাশের একটা মোটেলে ঢুকে গেল। মেয়েটা প্রাণপণে চিৎকার করছিল বাঁচাও, বাঁচাও বলে।
ড্রাইভার বলল, ‘স্যার, এমনটা এই অঞ্চলে প্রায়ই ঘটে। বাড়িগুলো যেমন সুন্দর লাগছে, এখানে যারা সময় কাটাবার জন্যে আসে তারা সবাই কিন্তু এ রকম সুন্দর নয়। নানা রকম গ্যাং এখানে আছে, বাইরে থেকেও আসে। অপহরণ ও নানা অপরাধমূলক ঘটনা এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।’
আহমদ মুসার গাড়িটা চড়াই অতিক্রম করে একটা উপত্যকায় নামছিল। আহমদ মুসার কানে মেয়েটার বাঁচার জন্যে প্রাণপণ চিৎকার তখনও বাজছিল।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল মেয়েটার পরনে দেখা নীল প্যান্ট ও গোলাপী শার্টের কথা। মানে নীল প্যান্ট আর গোলাপী শার্টই সালিহা সানেমের পরনে ছিল। সেই সাথে আরও মনে পড়ল, সালিহা সানেম যে সীট ছেড়ে দিয়ে সরে এসেছিল সে সীটের পাশের সীটের সুবেশধারী ক্রিমিনাল চেহারার লোক ও তার লোলুপ দৃষ্টির কথা।
মনে পঢ়ার সংগে সংগেই আহমদ মুসা বলল, ‘গাড়ি ঘুরাও ড্রাইভার। ঐ মেয়েটাকে যে বাড়িতে নিয়ে গেছে, সেখানে চল।’
ড্রাইভার বলল, ‘স্যার, ওখানে যেতে হলে সাত-আট মাইল ঘুরতে হবে। সামনে আরও তিন মাইল গেলে তবেই আমরা ফিরতি পথে যাওয়ার প্যাসেজ পাব।’
‘গাড়ি ঘুরিয়ে এই পথেই ব্যাক করো।’ নির্দেশ দিল আহমদ মুসা।
ড্রাইভার ভীত কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, তাহলে নির্ঘাত আমাকে জেলে যেতে হবে। গাড়িটাও আটক হয়ে যাবে বহুদিনের জন্যে।’
‘আমি সেটা দেখবো। গাড়ি ঘুরাও ড্রাইভার।’ ধমকে উঠল আহমদ মুসার কণ্ঠ।
ড্রাইভার একবার মুখ ফিরিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। আর মনে মনে বলল, ‘আল্লাহ্! এটুকু পথ যেন আমি পুলিশের হাতে পড়া ছাড়াই অতিক্রম করতে পারি।’
নির্বিঘ্নে পথটুকু পেরিয়ে এল গাড়িটি। যে বাড়িটিতে মেয়েটিকে তারা তুলেছে তার সামনে মেইন রোডের উপর আহমদ মুসা নেমে পড়ল।
ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিয়ে তার হাতে একশ ডলারের একটি নোট তুলে দিয়ে বলল, ‘তুমি থাকতে পারো, আবার চলেও যেতে পার।’
গাড়ির ভাড়া ঠিক হয়েছিল পঞ্চাশ ডলার। একশ ডলার হাতে পেয়ে ড্রাইভার আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, ‘স্যার, দরকার হলে সারাদিন আমি এখানে আপনার জন্যে অপেক্ষা…।’
আহমদ মুসা দৃঢ় পদক্ষেপে এগোলো বাড়িটার দিকে, যেন সেও একজন কাস্টমার ঐ মোটেলের। মোটেলের প্রধান গেটে তাকে আটকাল দু’জন নিরাপত্তা প্রহরী। বলল, ‘স্যার, রুম খালি নেই। রেস্টুরেন্টও বন্ধ।’
আহমদ মুসা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘যারা মেয়েটিকে ভেতরে নিয়ে গেছে, আমি তাদের দলের লোক। আমাকে নিয়ে চল তাদের কাছে।’
নিরাপত্তা প্রহরীদের একজন বলল, ‘স্যার, আমাদের গেট ছাড়ার অনুমতি নেই। আপনি ভেতরে গিয়ে অন্যদের বলুন।’
নিরাপত্তা প্রহরীরা বিশ্বাস করেছে তার কথা। খুশি হলো আহমদ মুসা।
‘বাইরে কার সাথে কথা বলছিস তোরা। কাউকে ভেতরে ঢকতে দিবি না। মোটেল বন্ধ।’ বলতে বলতে বিপুল বপু একজন লোক গেটে এসে দাঁড়াল।
নিরাপত্তা প্রহরী দু’জন তাকে স্যালুট করল। একজন বলল, ‘স্যার, এই লোক ওদের সাথের। যেতে চায় তাদের কাছে।’
বিপুল বপু লোকটি আহমদ মুসার দিকে তাকাল সন্দেহের দৃষ্টিতে। বলল, ‘বলুন তো, তাদের সাথে যে মেয়েটি আছে, তার পোষাক কেমন?’
‘নীল প্যান্ট ও গোলাপি শার্ট।’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটির দু’চোখ থেকে সন্দেহ সরে গেল।
বলল, ‘আসুন ভেতরে।’
আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকল। বলল, ‘ওরা কোথায়? আমাকে নিয়ে চলেন ওদের কাছে। জরুরি কথা আছে ওদের সাথে।’
‘ওদের কি কথা শোনার সময় আছে? যে মাল নিয়ে এসেছে, কোটিতে একটাও সে রকম মেলে না! ওরা এখন পাগল তাকে নিয়ে।’ বলল লোকটি।
‘সেটা আমি জানি।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল মোটেলের দু’তলার সিঁড়ির দিকে। সেদিকে যাবার জন্যে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
‘আহা কি করেন, ওরা তো উপরের দিকে নেই। যে চিৎকার, আর্তনাদ চলছে, তাকি উপর তলায় বলে? ওরা আছে আন্ডার গ্রাউন্ডে।’
বলে বিশাল বপু লোকটি এগোলো উপরে ওঠার সিঁড়ির পাশের একটা রুমের দিকে। রুমের দরজা বন্ধ। লোকটি চাবি দিয়ে লক খুলে ঘরে প্রবেশ করল। ঘরে বড় একটি আলমারি। লোকটি এগোলো আলমারির দরজার দিকে। আলমারির দরজা বন্ধ। হাতল ঘুরিয়ে সে আলমারির দরজা খুলে ফেলল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘যান, ভেতরে বেজমেন্ট ফ্লোরে তাদের সবাইকে পাবেন।’
আলমারির দরজা আসলে একটা সিঁড়িমুখের গেট।
গেট পেরিয়ে সিঁড়ি মুখের স্ট্যান্ডিং-এ এসে দাঁড়াতেই সা নারী কণ্ঠের কান্না এবং কথা-বার্তা ও হাসির শব্দ শুনতে পেল।
পেছনে আলমারির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা শিকারী বাঘের মত নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করল। নেমে এল বেজমেন্টে। বিরাট ঘরের দু’পাশ জুড়ে ‘এল্’(L) প্যাটার্নে বেশ কিছু ঘর। সবগুলো ঘরই বন্ধ।
কান্নাকাটি ও কথা-বার্তার শব্দ আসছে শেষ প্রান্তের দিক থেকে।
সারিবদ্ধ ঘরগুলোর দেয়াল ঘেঁষে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল আহমদ মুসা। তার জ্যাকেটর দু্ই পকেটে তার দুই হাত। দুই হাতের তর্জনী দুই রিভলভারের দুই ট্রিগারে। দুই রিভলভারের মিনি সাইলেন্সেরও অন করে নিয়েছে।
কিছুটা এগোনোর পর নিশ্চিত হলো ডান পাশের একটা ঘরের কোনার দিক থেকে কথা-বার্তা ও কান্নাকাটির শব্দ আসছে। শিকারী নেকড়ের মত নিঃশব্দে এগোচ্ছে আহমদ মুসা। আর একটা কক্ষ পার হলেই করিডোরের বাঁকে পৌঁছে যাবে। করিডোরটা ঐখনে বাঁক নিয়ে ডান দিকে এগিয়ে গেছে, যেদিক থেকে কথা ও কান্নাকাটির শব্দ আসছে, সেদিকে।
করিডোরে পৌঁছাতে আর গজ দুয়েক জায়গা বাকি। হঠাৎ খুবই অস্পষ্ট একটা শব্দে গোটা দেহে উষ্ঞ শিহরণ জাগাল।
অজান্তেই থমকে গেল সে। শব্দটা স্পষ্ট হচ্ছে তার কাছে। পদশব্দ।
এগিয়ে আসছে কেউ। তার পায়ের শব্দই বলছে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে স্টেপ নিয়ে ফেলেছে।
এই চিন্তার সাথেই পকেট থেকে রিভলভার সহ ডান হাত বের করে সোজা লম্বা বসে পড়ল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে একটা লোহার রড ঘাড়ের উপর দিয়ে মাটিতে গিয়ে আঘাত করল। সে আঘাতের একটা অংশ তার ঘাড়েও অনুভূত হলো। ঘাড়টা থেঁতলে যাওয়ার মত চিন চিন করে উঠল। অন্যদিকে লোহার রডধারী লোকটিও ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। তার মাথাটা এসে পড়ল আহমদ মুসার পিঠের উপর।
আহমদ মুসা বোঁ করে ঘুরেই রিভলভার চেপে ধরল তার মাথায়। কিন্তু সে সময়েই লোকটির দুই জোড়া পায়ের আঘাত দুই হাতুড়ির মত এসে পড়ল আহমদ মুসার মাথায়। আহমদ মুসা উল্টে পড়ে গেল। কিন্তু আহমদ মুসা হাতের রিভলভার ছাড়েনি।
লোকটি দু’পা দিয়ে আঘাত করেই পা দু’টি মাটিতে ছুড়ে দিয়ে তার ওপর ভর করে দক্ষ এ্যাক্রবেটের মত উঠে দাঁড়িয়েছে। কোমর থেকে ছুরি খুলে নিয়েই লোকটি ছুঁড়ে মারল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা গড়িয়ে একপাশে সরে গিয়ে আঘাতটা আড়াল করল।
আঘাতটা ব্যর্থ হওয়ায় লোকটি পকেট থেকে পিংপং বলের মত একটি গোলাকার বস্তু হাতে নিয়ে ছুঁড়ে মারার জন্য হাত তুলল।
আহমদ মুসা আর সময় নষ্ট করল না। তার তর্জনি চেপে বসল তার রিভলভারের ট্রিগারে।
সাইলেন্সার লাগালো রিভলভার থেকে নিঃশব্দে একটা গুলি বেরিয়ে লোকটির কপাল দিয়ে ঢুকে মাথাটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। জ্যাকেটটা ঠিক করে বিভলভারটা হাতে নিয়েই এগোলো সামনের দিকে।
ঘরটির দেয়ালের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে এগিয়ে যাওয়া করিডোরের দিকে উঁকি দিল। দেখল করিডোরে কেউ নই। করিডোরের দক্ষিণ পাশে একটা দরজা। দরজাটা আধাবন্ধ। ঐ ঘর থেকেই শব্দগুলো আসছে।
আহমদ মুসা করিডোরে নেমে গেল। নিঃশব্দ পায়ে এগোলো দরজার দিকে। দরজার পাশে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কোন কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে সব কথা, সবার কথা পাচ্ছে, বুঝতে পারছে সে। কিছু একটা ঘটল, মেয়েটা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্নারত অবস্থায় বলছে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও তোমরা। আমার সর্বনাশ করো না। আমি তোমাদের কী ক্ষতি করেছি? আমাকে ছেড়ে দাও তোমরা।’
এখন নিঃসন্দেহ হলো যে, এটা সালিহা সানেমের গলা।
সালিহা সানেম থামতেই এজন লোক হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘অত বাহাদুরি কোথায় গেল? তুমি না জেনারেলের মেয়ে? কোথায় জেনারেল, ডাক? আমাদের চেন না। তোমার বাপের মত অনেক জেনারেল আমাদের পকেটে আছে। মন্ত্রীরাও আমাদের সালাম করে। আমাদের না হলে ওদের একদিনও চলে না। আমাদের কোন ক্ষতি করনি বলছো? নাইট ক্লাবে আমাদের সাথে নাচতে তো আপত্তি করনি। নেচে-গেয়ে তো আমাদের পাগল করেছ। যখন বললাম, এই পাগলকে শান্ত কর। তখন গালি-গালাজ শুরু করলে। অত সতী-সাধ্বী হলে নাইট ক্লাব গিয়েছ কেন? মানুষের মনে আগুন জালিয়েছ কেন? এটা ক্ষতি নয়? জামা খুলেছি। এবার শালির প্যান্ট কেটে ফেল, খুলে পড়ে যাক।’
সম্ভবতঃ ভিতরে কিছু ঘটল। সালিহা সানেম চিৎকার করে উঠল।
আহমদ মুসা ভাবল, আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।
আমদ মুসা তার জ্যাকেটের পকেটে একটা রিভলভার রেখে ডান হাতে একটা রিভলভার বাগিয়ে ধরে এক লাফে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। নির্দেশ দিল সবাইকে মাথার উপর হাত তুল…
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না। তার বাম দিকে কিছু দূরে এ দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো একজন লোক এদিকে ঘুরেই গুলি করল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
এমন ঘটনা আহমদ মুসার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না।
আহমদ মুসা নিজেকে এক পাশে সরিয়ে নিয়েই লোকটিকে গুলি করল।
লোকটি দ্বিতীয় গুলি করার আগেই বুকে গুলি খেয়ে ভূমিশয্যা নিল।
ইতিমধ্যে ঘরের অন্য পাঁচজনই রিভলভার পকেট থেকে আহমদ মুসার বাম হাত রিভলভারসহ বেরিয়ে এসেছিল। আহমদ মুসার ডান হাত গুলি করার সাথে সাথেই তার বাম হাতও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রথম গুলি করার পর ডান হাতও বাম হাতের সাথে যুক্ত হলো। পাঁচ জনের মধ্যে চারজনই গুলি খেয়ে পড়ে গেল। পঞ্চম লোকটি, মানে ক্রিমিনাল চেহারার সুবেশধারী লোকটি সালিহা সানেমের পেছনে দাঁড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল।
লোকটি তার রিভালভারের নল সালিহা সানেমের মাথায় ঠেকিয়ে দাবী করল যে, আহমদ মুসা তার হাতের রিভলভার ফেলে না দিলে সে সালিহা সানেমকে গুলি করবে। সে আহমদ মুসাকে রিভলভার ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াবার নির্দেশ দিল।
আহমদ মুসা রিভলভার ফেলে দিয়ে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠাল।
লোকটি সালিহা সানেমের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘তুমি যেই হও, তোমার হাতের তারিফ করি। তেমার মত এত দ্রুত রিভলভার চালানোর মত লোক জীবনে আমি দেখিনি, ওয়েস্টার্ন উপন্যাসে পড়েছিই শুধু।’
লোকটি মুহূর্তের জন্যেও সালিহা সানেমের মাথা থেকে রিভলভার সরায়নি।
সে আহমদ মুসাকে নির্দেশ দিল হাত উপরে রেখে দরজা থেকে সরে পশ্চিমের দেয়ালের দিকে চলে যেতে।
আহমদ মুসা বিনা বক্য ব্যয়ে তাই করল।
লোকটি সালিহা সানেমকে দরজার দিকে হাঁটার নির্দেশ দিল।
হাঁটতে লাগল সালিহা সানেম।
লোকটিও তার রিভলভারের নল সালিহা সানেমের মাথায় চেপে ধরে চোখ দু’টো আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ রেখে সালিহা সানেমের সাথে হাঁটা শুরু করেছে।
আহমদ মুসা বলল, ‘বৃথাই চেষ্টা করছ। তোমার বাঁচার উপায় নেই। একবার দরজার দিকে তাকাও।’
লোকটি ফাঁদে পড়ে গেল। সত্যিই সে সংগে সংগে চোখ ফিরাল দরজার দিকে। এটুকু সুযোগেই আহমদ মুসা চাচ্ছিল।
লোকটি চোখ ফেরাতেই আহমদ মুসা মাথার পেছরে জ্যাকেটের গোপন এক পকেটে আটকানো রিভলভার ডান হাতে তুলে নিয়েই গুলি করল।
আহমদ মুসা গুলি করেছিল লোকটির রিভলভার ধরা হাতে।
লোকটি অসম্ভব ক্ষীপ্র। সে দরজার দিকে চোখের একটা পলক ফেলেই বুঝতে পেরেছে যে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
সংগে সংগে সে তার রিভলভার ধরা হাত ও মুখ এক সাথেই আহমদ মুসার দিকে ঘুরিয়েছে। তার ফলে তার হাতটা আগের জায়গা থেকে সরে এসেছে। আর তার জায়গায় গিয়ে সেট হয়েছে তার মাথা।
হাতের বদলে মাথায় গুলি খেল লোকটা।
দেহটা তার পাক খেয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
মেয়েটা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে এবং ডুকরে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা সালিহা সানেমের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘শান্ত হও বোন, আর ভয় নেই।’
আহমদ মুসা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গায়ের জ্যাকেটটা খুলে সালিহা সানেমের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘জ্যাকেটটা পরে নাও।’
সালিহা সানেমের বোধ এতক্ষণে যেন ফিরে এল। বিব্রতকর এক অস্বস্তিতে তার মুখ কুঁকড়ে গেল। তাড়াতাড়ি সে তার প্রায় নগ্ন গায়ে জ্যাকেটটা পরে নিল।
তার গায়ের গোলাপি সর্টটা টুকরো টুকরো অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল।
আহমদ মুসা বাম হাতের রিভলভারটা পকেটে পুরে ডান হাতের রিভলভার বাগিয়ে ধরে ঘর থেকে বেরুবার জন্যে পা বাড়িয়ে বলল, ‘এসো সানেম।’
সালিহা সানেম আহমদ মুসার পেছনে পেছনে চলতে লাগল।
আহমদ মুসা ওপরে গ্রাউন্ড ফ্লোরে উঠে এল।
রিসেপশন কাউন্টারেই পেল বিপুল বপু লোকটাকে। আহমদ মুসা এগোলো তার দিকে।
বিপুল বপু লোকটি আহমদ মুসার হাতে রিভলভার আর মেয়েটাকে বেঢপ জ্যাকেট পরা বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে ভীত সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে উঠে দাঁড়াল।
‘আপনাদের আন্ডারগ্রাউন্ডটা ক্রিমিনালদের আড্ডাখানা, তাই না? ক্রিমিনালদের সাথে তাহলে ক্রিমিনালদের যোগ আছে? এখানকার থানার ফোন নম্বর দিন।’ ধমকের সুরে বলল আহমদ মুসা।
লোকটি পুলিশের কথা শুনে আর্তনাদ করে উঠল। বলল, ‘স্যার, বিশ্বাস করুন, আমরা প্রাণের ভয়ে ওদের কথা শুনতে বাধ্য হই। আমরা ক্রিমিনাল নই। আমরা ব্যবসায়ী।’
‘পুলিশের টেলিফোন নাম্বার দিন, তাদের কাছেই আপনার এ কথাগুলো বলবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
বিপুল বপু লোকটি আহমদ মুসার সামনে এসে হাত জোড় করে বলল, ‘স্যার, পুলিশকে ডাকবেন না দয়া করে। আমাদের ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যাবে তাহলে।’
‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরে ছয়-সাতটা লাশ পড়ে আছে। পুলিশ না এলে ওগুলোর কী হবে?’
‘ছয়-সাতটা লাশ?’ উচ্চারণ করল বিপুল বপু লোকটি। তার দুই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে।
তারপর ‘ও গড!’ বলে বসে পড়ল সে।
‘পুলিশের নাম্বার দিলেন না? আমি থাকা অবস্থায় পুলিশ এলে আপনাদেরই ভালো হতো?’ বলল আহমদ মুসা।
তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল বিপুল বপু লোকটি। বলল, ‘স্যার, দিচ্ছি টেলিফোন।’
বলে সে ছুটল রিসেপশন টেবিলে। ইনডেক্স দেখে নাম্বার বের করে নিজেই ডায়াল করল। বলল, ‘স্যার, রিং হচ্ছে। টেলিফোন নিন আপনি।’
‘তুমিই জানাও পুলিশকে। আসতে বল পুলিশকে তাড়াতাড়ি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার। সেই ভালো। আমি বলছি পুলিশকে।’ বলল বিপুল বপু লোকটি।
সাত-আট মিনাটের মধ্যেই পুলিশ চলে এল। একজন পুলিশ অফিসার পাঁচ-ছয় জন পুলিশ নিয়ে রিসেপশন লিউঞ্জে প্রবেশ করল।
‘কি মি. নাদির। কী ঘটিয়েছেন আপনি? কোথায় খুন? কোথায় লাশ?’ লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে পুলিম অফিসারটি বিপুল বপু লোকটিকে লক্ষ্য করে বলল।
তড়িঘড়ি ছুটে এল নাদির নামের বিপুল বপু লোকটি পুলিশের কছে। বলল, ‘স্যার আমি ঘটাইনি। ওরা সাক্ষী।’ আহমদ মুসাদের দেখিয়ে বলল নাদির সামের বিপুল বপু লোকটি।
আহমদ মুসা ও সালিহা সানেম তখন বসে রিসেপশনের সামনের দু’টি সোফায়। পুলিশ অফিসার তাকাল তাদের দিকে।
‘খুনের সময় আপনারা ছিলেন?’ জিজ্ঞেস করল পুলিশ অফিসার।
‘ছিলাম শুধু তাই নয়, যাদের লাশ পড়ে আছে, তাদের আমিই খুন করেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি? তাহলে পালাননি কেন?’
‘পালাব কেন? লাশ আপনাদের হাতে তুলে দেবার জন্যে বসে আছি।’ আহমদ মুসা বলল।
পুলিশ অফিসার একবার দৃষ্টি তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনি খুন করেছেন? কেন?’
আহমদ মুসা তাকাল বিপুল বপু মি. নাদিরের দিকে। বলল, ‘বলুন মি. নাদির, পুলিশ অফিসারকে সব খুলে বলুন।’
বিপুল বপু পুলিম অফিসারকে বলল কিভাবে সাত আটজন লোক ক্রন্দনরত সালিহা সানেমকে হোটেলে নিয়ে এল, কিভাবে অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য করল বেজমেন্টের রুম তাদের ছেড়ে দিতে, কিভাবে আহমদ মুসা অস্ত্রধারীদের লোক পরিচয় দিয়ে বেজমেন্টে চলে গেল। শেষে সে বলল, ‘এই মাত্র বেজমেন্ট রুম থেকে এসে ইনি আমাকে বললেন, ঐ সাত-আটজন অস্ত্রধারী নিহত হয়েছে, পুলিশে খবর দাও। আমি পুলিশকে খবর দিয়েছি স্যার। ওদের সাত-আটজন নিহত হওয়ার কথা শুনেছি, এখনও দেখিনি। আমরা পুলিশের জন্য অপেক্ষা করছি।’
পুলিশ অফিসার ঘুরল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘চলুন আমাদের সাথে। লাশগুলো আগে দেখব।’
‘আমরা এখানে বসে আছি। মি. নাদিরকে নিয়ে আপনারা দেখে আসুন।’ আহমদ মুসা বলল ঠান্ডা কণ্ঠে।
পুলিশ অফিসার ইতস্তত করছিল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘পালানোর ইচ্ছা থাকলে আগেই পালাতাম। এখনো পালাতে পারি। আপনারা কয়েকজন আমাদের আটকাতে পারবেন না।’
পুলিশ অফিসার মুহূর্ত কয় আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে, আপনারা বসুন। আমরা আসছি। নিয়ম অনুসারে একজন পুলিশ এখানে থাকবে।’
‘নিয়ম তো আপনাদের পালন করতেই হবে।’ বলে হাসল আহমদ মুসা।
একজন ছাড়া পুলিশ অফিসার অন্য পুলিশ সদস্য ও মি. নাদিরকে নিয়ে বেজমেন্টে নেমে গেল। ফিরে এল মিনিট দশেক পর।
পুলিশ অফিসার এলে আহমদ মুসা বলল, ‘ভিকটিম এই মেয়ের জবানবন্দী নিয়ে নিন। আমরা চলে যাবো।’
‘কিন্তু আপনাদের যে থানায় যেতে হবে।’ পুলিশ অফিসার বলল।
‘থানায় যাবার দরকার নেই। আপনি মেয়েটার জবানবন্দী নেবেন। আপনারা মামলা দায়ের করবেন। আপনারা ডাকলে মেয়েটি সাক্ষ্য দেবার জন্যে আসতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু নিয়ম হলো…।’ কথা বলতে শুরু করেছিল পুলিশ অফিসার। আহমদ মুসা পুলিশ অফিসারকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটাও নিয়ম।’
পুলিশ অফিসারের মুখে অসন্তোষ ফুটে উঠল।
বলল, ‘আমরা যে নিয়মের কথা বলব, সেটাই মানতে হবে।’
আহমদ মুসা সালিহা সানেমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার আইডি কার্ড দাও।’
সালিহা সানেম তার আইডি কার্ড বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল।
আহমদ মুসাও নিজের আইডি কার্ড বের করে দু’টি আইডি কার্ড পুলিশ অফিসারের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘আপনি ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার লিখে নিন। দরকার হলে গিয়ে আমাদের এ্যারেস্ট করে নিয়ে আসবেন। এখন আমাদের হাতে সময় নেই; আমরা চললাম।’
পুলিশ অফিসার দু’টি আইডি কার্ডের দিকে নজর বুলিয়েই চমকে উঠল। সংগে সংগে উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসাকে স্যালুট করল। বলল, ‘স্যার, মাফ করুন। আপনাদের পরিচয় জানলে এসব কথা বলতাম না। স্যার, আমি ম্যাডামের জবানবন্দী লিখে নিচ্ছি, একটু সময় দিন স্যার।’
সালিহা সানেমের আইডি কার্ডে তার পরিচয় দেয়া ছিল ‘আংগোরা মিলিটারি স্টাফ কলেজের ট্রেইনি, জেনারেল মেডিন মেসুদের মেয়ে।’ আর আহমদ মুসার আইডি কার্ডে পরিচয় লেখা ছিল, ‘ভিভিআইপি সিকিউরিটি পারসোনেল।’ তার কার্ডে ইনস্ট্রাকশন ছিল, কার্ড হোল্ডার সব জায়গায় আ্যাকসেস পাবেন এবং যে সহযোগিতা তিনি চাইবেন, তা তাকে দিতে হবে।’ কার্ডে তুরস্কের পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন এবং তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটি প্রধান জেনারেল মোস্তফা কামালের দস্তখত ছিল।
‘ঠিক আছে, ওর জবানবন্দী লিখে নিন। আমিও আমার ছোট্ট একটা মন্তব্য লিখে দেব।’ বলল আহমদ মুসা পুলিশ অফিসারের কথার জবাবে।
‘ধন্যবাদ স্যার!’ বলে পুলিশ অফিসার নিজেই লিখতে বসে গেল।

ড্রইং রুমের দরজা খুলে যেতেই আহমদ মুসা দেখতে পেল সালিহা সানেমকে। সালিহা সানেমই প্রথম সালাম দিল আহমদ মুসাকে।
সালামের জবাব দিয়ে আহমদ মুসা ভেতরে দিল আহমদ মুসাকে।
সালামের জবাব দিয়ে আহমদ ভেতরে প্রবেশ করল।
সালিহা সানেম সোফা দেখিয়ে বলল, ‘বসুন স্যার। আব্বা হঠাৎ টেলিফোন পেয়ে হেড কোয়ার্টারে গেছেন। এখনি এসে যাবেন। আমাকে ‌এ্যাটেন্ড করতে বলেছেন আপনাকে।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
সালিহা সানেম আহমদ মুসার সামনে এক সোফায় বসল।
সালিহা সানেমের পোষাক দেখে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। ফুলহাতা কামিজ পরেছে। একটা ওড়না মাথার উপর দিয়ে গলা পেঁচিয়ে গায়ের উপর নেমে এসেছে। পরনে ঢিলা সালওয়ার। মুখে বাহুল্য মেকআপ নেই। যেটুকু আছে সেটা খুবই স্বাভাবিক। মুখে গাম্ভীর্য।
গতকালের চেয়ে তার আজকের এই রূপ কত ভিন্ন। গতকাল পরনে ছিল টাইট প্যান্ট। বোতাম খোলা সার্ট। চোখে-মুখে উপচে পড়া চপলতা।
বসেই সালিহা সানেম বলল, ‘স্যার, আব্বা আপনার ভক্ত হয়ে গেছেন। গতকাল থেকে কতবার যে আপনার কথা তিনি বলেছেন! যতবার বলেছেন, ততবারই আব্বার কণ্ঠকে কান্নায় ভারি দেখেছি। আব্বাকে এমন ভেঙে পড়া অবস্থায় কখনও দেখিনি। জানেন, আজ ভোরে আমি আব্বাকে কুরআন শরীফ পড়তে দেখেছি। আব্বা যে কুরআন পড়তে জানেন, সেটাই আমি জানতাম না।’
‘সালিহা সানেম, এটা আমার প্রতি ভক্তির প্রকাশ নয়। আপনার প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসা এটা। আপনি তার একমাত্র সন্তান। আপনার বিপদে পড়া তার সমগ্র সত্তাকেই নাড়া দিয়েছে। কুরআন যে তিনি পড়েছেন, সেটা আপনার বিপদ মুক্তির জন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু তিনি আপনাকে এ্যাঞ্জেল, মানে আল্লাহর ফেরেশতা বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, ‘আমি সৈনিক হিসেবে ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু জনাব আবু আহমদ যে পরিস্থিতিতে যে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন এবং যে ঝুঁকি নিয়েছেন, তা আমি পারতাম না।’’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এমন তিনি বলতেই পারেন। আপনার মুক্ত হওয়া তাকে সীমাহীন আনন্দ দিয়েছে। আর বেশি আনন্দিত হলে মানুষ কথা বেশি বলেন এবং বিশেষণও বেশি ব্যবহার করেন।’
‘আপনিও বেশি বলছেন স্যার, যাতে কোন প্রশংসা আপনার উপর আরোপ না হয়।’ বলল সালিহা সানেম।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘প্রশংসা এভাবে অপাত্রে আরোপ করা হবে কেন? আমি যে কৌশল, বুদ্ধি, সাহস ও শক্তি দেখিয়েছি, তার কোনটা আমি সৃষ্টি করেছি বা কোনটার আমি মালিক? একটারও নয়। আমি যা পেয়েছি, তাতে আমিও বিস্মিত হয়েছি, কৃতজ্ঞ হয়েছি আল্লাহর প্রতি যে, তিনি এই শক্তি, সাহস, কৌশল আয় বুদ্ধি আমাকে দিয়েছেন।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হলেও সালিহা সানেম কিছু বলল না। গাম্ভীর্যের একটা ছাপ নামল সালিহা সানেমের চোখে-মুখে। সেই সাথে মাথাটা তার নিচু হলো।
মুহুর্ত কয় পর সে মাথা তুললো। বলল আস্তে আস্তে, ‘স্যার, গতকাল প্লেনে আমি বলেছিলাম, আমি আপনার কথা বুঝলাম তবে মানতে পারলাম না। মেনে নেয়ার জন্যে আমাকে আরও ভাবতে হবে। গতকাল ঐ ঘটনার সময় আমার মনে সেই ভাবনা এসেছিল। আমি গতকাল সারারাত এ নিয়ে ভেবেছি স্যার, ওরা আমার উপর যে আক্রমণ করেছিল, তাতে ওরা দোষী। কিন্তু ওদের চেয়ে আমি বেশি অপরাধী। আমি গত কয়েকদিন এস্কান্দারুন সী বিচে এবং এস্কান্দারুনের নাইট ক্লাবে যে পোষাক পরে যেভাবে ওদের সাথে মানে সবার সাথে নেচেছি, সেটা তাদেরকে আমার প্রতি প্রলুব্ধ করা ও আমন্ত্রণ জানানোর মতোই। তারা যখন প্রলুব্ধ হয়ে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছে নগ্ন দাবী নিয়ে তখন তাদেরকে আমি অপমান করেছি। সে অপমানের শোধ তাদের নেবারই কথা। তার চেয়ে বেশি কিছু তো করেনি। আমার অপরাধই তাদের অপরাধী বানিয়েছে। আমি…’
কথা শেষ করতে পারলো না সালিহা সানেম। কান্নায় আটকে গেলে তার কথা। দু’হাতে মুখ ঢাকল সে।
‘ধন্যবাদ সালিহা সানেম, তোমার উপলব্ধির জন্যে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘উপলব্ধি এল অনেক দেরিতে। অনেক পাপ করেছি আমি। আল্লাহর কাছে তো আমি দাঁড়াতে পারবো না। কী বলব আল্লাহকে আমি! আজ ফজরে আমি চেষ্টা করেও নামাযে দাঁড়াতে পারিনি।’ বলল আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে সালিহা সানেম।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তুমি কুরআন শরীফ পড়া জান না?’
‘না, জানি না স্যার। ছোট বেলায় দাদার কাছে কিছু সূরা ও দোয়া শিখেছিলাম। তিনি নামাযও শিখিয়েছিলেন। এটুকুই আমার সম্বল।’
‘কুরআন পড়নি সে জন্যেই হতাশ হচ্ছ এবং আল্লাহর কাছে দাঁড়াবে কিভাবে সেটা ভাবছ। ভাবনার কিছু নেই সানেম। আল্লাহ রহমান, রহীম। তিনি গফুর। তিনি তাঁর বান্দাহদের মাফ করার জন্যে সর্বক্ষণ তৈরি আছেন। যতই গুনাহ নিয়ে বান্দার তাঁর ক্ষমার জন্যে প্রার্থনা করুক, তিনি মাফ করেন। কুরআন শরীফে তিনি বলেছেন, ‘বল (হে রসূল), হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ (অন্যায়, অবিচার, অনাচার, গুনাহের মাধ্যমে), আল্লাহর ক্ষমা সম্পর্কে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব অপরাধ মাফ করে দেবেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এস এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর সেই শাস্তি আসার আগে যখন তিনি আর ক্ষমা করবেন না।’ বলল আহমদ মুসা।
একটু নড়ে চড়ে সোজা হয়ে বসে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সালিহা সানেম আহমদ মুসার দিকে। তার দু’চোখ অশ্রুসিক্ত, কিন্তু তাতে আশার ঔজ্জ্বল্য। বলল, ‘আমার জন্যে তো সেই শাস্তির সময় আসেনি, যখন আর তিনি ক্ষমা করবেন না?’
‘অবশ্যই না। গতকাল তো তিনি তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এটা তো তোমার প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণা।’ আহমদ মুসা বলল।
সালিহা সানেমের চোখ দু’টি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘আল্লাহর হাজার শুকরিয়া…’
কথা শেষ করতে পারল না সালিহা সানেম। আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। অশ্রুসিক্ত চোখ তার অশুতে আবার ভরে গেল।
ড্রইংরুমে প্রবেশ করল এক পরিচারিকা। বলল সালিহা সানেমকে, ‘ছোট ম্যাডাম, সাহেব এসেছেন। আসছেন তিনি।’
চলে গেল পরিচারিকা। সালিহা সানেম তাড়াতাড়ি চোখ মুছল।
ঘরে ঢুকল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
জেনারেলের পোষাক তার পরনে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল তার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্যে। কিন্তু জেনারেল মেডিন মেসুদ হ্যান্ডশেক নয়, জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘আপনি আত্মীয়ের চেয়ে বড় আত্মীয় আমার। আপনাকে স্বাগত।’
সোফায় বসতে বসতে জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল, ‘দুঃখিত আমি, মি. আবু আহমদ। আমি সময় দিয়েও থাকতে পারিনি। অফিসে জরুরি কাজ পড়েছিল।’
বলেই তাকাল মেয়ে সালিহা সানেমের দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ মা, তুমি মেহমানকে এ্যাটেন্ড করেছ। চা-টা দিয়েছ মেহমানকে?’
‘জ্বী, আমি নিষেধ করেছি। আমি আপনার অপেক্ষা করছি।’ আহমদ মুসা বলল।
উঠে দাঁড়াল সালিহা সানেম। বলল, ‘বাবা তোমরা কথা বল। আমি ওদিকে দেখছি।’ ড্রইং থেকে বেরিয়ে গেল সালিহা সানেম।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমাকে সময় দেবার জন্যে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মি. আবু আহমদ এই সৌজন্যের দরকার নেই। বলেছি, আপনি আমার আত্মীয় হয়ে গেছেন। আপনি আমার পরিবারের একজন।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘ধন্যবাদ আপনার এই শুভেচ্ছার জন্যে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘নিশ্চয় আপনার কিছু কথা আছে। বলুন মি. আবু আহমদ।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা কিছু বলল না। ভাবল, সরাসরি কথাটা পাড়বে, না কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সবকিছু জানার চেষ্টা করবে। আহমদ মুসার মন বলল, জেনারেলের মন যে অবস্থায় আছে, তাতে সরাসরি কথায় আসা যায়। সত্যের একটা শক্তি আছে।
এসব ভেবে আহমদ মুসা বলল, ‘স্যার, কিছু জানার আগে আমার সম্পর্কে বলতে চাই। আমি পুলিশের লোক নই, আমি সেনাবাহিনীর লোক নই, কোন গোয়েন্দা বিভাগের লোকও নই। আমি শখের গোয়েন্দাও নই। আমি একজন স্বাধীন মানুষ। তবে নিজ ইচ্ছায় অথবা কোন আহবানে সাড়া দিয়ে কাউকে বা কোন দেশকে সাহায্য করতে আমি ভালোবাসি। এ রকম একটা কাজ নিয়ে আমার এখানে আসা।’
‘সত্য ও সুন্দর পরিচয়ের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। বলুন কী কাজে এসেছেন? আমি কী সাহায্য করতে পারি?’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘আপনার সম্পর্কে কিছু কথা জানতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলুন কী কথা?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মেডিন মেসুদের।
‘এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে তুরস্কের শত্রু একটা সন্ত্রাসী সংগঠনের ট্র্যাপে পড়েছেন আপনি।’ ধীর, শান্ত, শক্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
কথাটা শুনে চমকে উঠল না জেনারেল মেডিন মেসুদ। ধীরে ধীরে চোখ তুলে একবার তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দেখল তার মুখভাবে তেমন কোন পরিবর্তন নেই। আবার মুখ নিচু করল মেডিন মেসুদ।
বেশ সময় নিল সে কথা বলতে। একসময় মুখ তুলে সে বলল, ‘আমার উত্তর ‘না’ হলে আপনার কাজ কি হবে, আর ‘হ্যাঁ’ হলে আপনি কী করবেন?’
‘উত্তর ‘না’ হলে আমাকে আরও অনুসন্ধান করতে হবে। আর ‘হ্যাঁ’ হলে আমি পরবর্তী কাজে হাত দেবার চেষ্টা করবো।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার কথা জানার আগে আপনি কি বলবেন, আপনি কতটা জানতে পেরেছেন?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মেডিন মেসুদের।
‘মি. জেনারেল স্যার, মিসেস অ্যানোস আব্দুল্লাহ গাজেনের ডায়েরি থেকে আমি সবকিছুই জানতে পেরেছি। ডায়েরিতে আপনার নাম ছিল না। সে নামও যোগাড় হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে তো আপনার সবকিছুই জানা হয়ে গেছে। আর কী জানতে চান?’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘স্যার, দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে আপনার সাহায্য চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেটা কী?’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘উল্কি চিহ্নধারী, যারা মিসেস অ্যানোস আব্দুল্লাহ গাজেনকে তাদের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করেছিল, যারা আপনাকে ট্র্যাপে ফেলেছিল, যারা এখন মাউন্ট আরারাত অঞ্চলে, বলতে গেলে গোটা পূর্ব আনাতোলিয়া জুড়ে এক শ্রেণীর লোককে উচ্ছেদ করে, অস্থানীয় এক শ্রেণীর লোককে বসাচ্ছে, তারা কারা? এটাই আমার প্রথম জানার বিষয়।’ আহমদ মুসা বলল।
ভাবছিল জেনারেল মেডিন মেসুদ। তার কপালে কয়েকটা ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। বলল, ‘মানবিক দুর্বলতার কারণেই আমি ওদের ট্র্যাপে পড়ি। আমি মিসেস আ্যানোস আব্দুল্লাহর অসহায়ত্ব দেখে সব বুঝেছিলাম। আমি তাকেও বাঁচাতে পারিনি, আমিও বাঁচতে পারিনি। চাকুরীকে আমি ভয় করি না, শাস্তিকেও নয়। কিন্তু ভয় করেছি আমার পরিবারের বিপর্যয়কে। আমি ওদের বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশনে যেতে পারিনি এ কারণেই। ওরা আমাকে ওদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছে। আমার অফিসে, আমার চার পাশেও অনেক দালাল সৃষ্টি করেছে। আমি ভয় করছি, আপনি এখানে এসেছেন, এটাও ওদের নজরে পড়বে।’ থামল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
ভ্রু কুচকে গেল আহমদ মুসার। বলল, ‘আমি এখানে এটাও কি ওদের নজরদারিতে পড়বে? এতটাই ক্লোজভাবে ওরা ওয়াচ করছে আপনাকে?’
‘শুধু আমাকে নয়, যাদেরকে ওরা ব্যবহার করে প্রত্যেককেই ওয়াচে রাখে। অতি সম্প্রতি আমার প্রতি ওয়াচ তাদের বেড়েছে। আমি তাদের অনেক কিছু জানি বলেই হয়তো অথবা ওরা বড় কিছু করতে যাচ্ছে। সে কারণেই তাদের এই বাড়তি সতর্কতা।’
একটু থামল জেনারেল মেডিন মেসুদ। টিপয়ে রাখা গ্লাসের পানি থেকে এক ঢোক পানি গিলে বলল, ‘আপনাকে কি ওরা চেনে?’
‘চেনাই স্বাভাবিক। অনেক কয়টা এনকাউন্টার ওদের সাথে আমার হয়েছে। তবে কতটুকু জানে, সবাই চেনে কিনা, তা আমি জানি না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে আপনার পরিচয় ওদের সবার কাছে আছে অবশ্যই। এটাই ওদের নিয়ম।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘তাহলে আমি এখানে এসেছি তা ওদের নজরে পড়েছে বলছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমার তাই মনে হয়।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘ঠিক আছে। এতোটা আমি ভাবিনি। সাবধান হতে হবে। এবার প্লিজ বলুন আমি যা জানতে চেয়েছি।’ বলল আহমদ মুসা।
মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল জেনারেল মেসুদ।
তারপর সোজা হয়ে সোফায় বসল। বলল, ‘ওরা ওদের পরিচয় সম্পর্কে কোন সময়ই কিছু বলেনি। তবে আব্দুল্লাহ গাজেনের কাছ থেকে আমি জেনেছি, এখন ওরা দুই সংগঠন এক সাথে কাজ করছে। একটা হলো ‘সোহা’, মানে Son of Holy Ararat (SOHA), আর একটা ‘Lover of Holy Ararat’, সংক্ষেপে, ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’ বলে এরা নিজেদের পরিচয় দেয়। এদের মধ্যে ‘সোহা’ সংগঠনটি কোন একটা রাজনৈতিক লক্ষ্যে কাজ করছে। আর ‘হোলি আরারাত’ বা ‘আর্ক’ গ্রুপটা ক্রিমিনাল সংগঠন। শুনেছি নুহ (আঃ)- এর নৌকার গুপ্তধন উদ্ধারের জন্যে এরা কাজ করছে। এই দুই সংগঠন কেন একত্রিত হলো, এটা অজানা রহস্য। ‘সোহা’ কী রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কাজ করছে, এটাও আমার কাছে স্পষ্ট নয়।’
‘পূর্ব আনাতোলিয়ার কয়েকটি প্রদেশে বিশেষ করে মাউন্ট আরারাত অঞ্চলে মাদক ব্যবসার ফাঁদ পেতে ওরা শত-শত সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষকে জেলে পুরেছে, বহু পরিবারকে তারা বিরান করেছে এবং নতুন বসতি নিয়ে আসছে তারা এই অঞ্চলে। এ সম্পর্কে, এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি কী জানেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। ভ্যান অঞ্চলে আমি বেশ কিছু দিন যাই নি।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘ওদের সাথে সর্বশেষ যোগাযোগ আপনার কবে হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে জবাব দিল না জেনারেল মেডিন মেসুদ। নতুন একটা ভাবনার রেখা তার চোখে-মুখে। বলল একটু সময় নিয়ে, ‘সাত দিন আগে ওরা এসেছিল।’
‘কোথায় এসেছিল? বাসায় না অফিসে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা অফিসে যায় না। বাসায় এসেছিল।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘এই সময় তো ওদের ক্রাইসিস ঐ অঞ্চলে। সে সব কোন বিষয় নিয়ে কি তারা এসেছিল?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ওরা এসেছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ দাবী নিয়ে।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘কী সেটা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘তারা ইজদির, আগ্রি, ভ্যান, কারস প্রভৃতি প্রদেশে মোতায়েন করা সেনা অফিসারদের একটা তালিকা নিয়ে এসেছিল। এই মুহূর্তে ওদের ট্রন্সফার চেয়েছিল এই প্রদেশগুলোএ বাইরে কোথাও। সেই সাথে তারা এসেছিল সেনা অফিসারদের আরেকটি তালিকা। তাদের দাবী ছিল ওদের ট্রান্সফার করার পর ঐ শূন্য স্থানগুলো তাদের মনোনীত সেনা অফিসারদের দ্বারা পূরণ করতে।’ ভ্রূ কুচকে গেল আহমদ মুসার।
‘কেন তারা চেয়েছে এটা? কিছু বলেছে তারা?’
‘না বলেনি।’ জবাব জেনারেল মেডিন মেসুদের।
‘বদলি এবং নতুন নিয়োগগুলো কি হয়ে গেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘না, আমি সব ট্রান্সফারে রাজী হইনি। তাদের প্রচন্ড চাপ ও ভয় দেখানো সত্বেও আমি ইজদির প্রদেশ সব এবং আগ্রি ও কারস প্রদেশের দু’একটা ট্রান্সফারে রাজী হয়েছি।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘তাহলে ওদের দেয়া তালিকা অনুসারে ইজদির প্রদেশের সব ট্রান্সফার হয়ে গেছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না, তারা কোন টাইম লিমিট দেয়নি। কিন্তু ‘অবিলম্বে’ করতে হবে এই দাবী ছিল।’
আহমদ মুসার কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো। ভাবছিল আহমদ মুসা। তাদের এই ট্রান্সফার চাওয়া এবং তাদের পছন্দমত লোক বসানোর অর্থ হলো সেনা বিরোধিতা পরিহার করা অথবা সেনা সহায়তা লাভ করা। কিন্তু কেন? তারা পুলিশের ক্ষেত্রে এমন ধরনের কিছু করেনি তা নিশ্চিত। কিন্তু কেন করেনি? হঠাৎ আহমদ মুসার অবচেতন মনের কোন অতল থেকে একটা প্রবল জিজ্ঞাসা ভেনে এলো। তাহলে কি বড় ধরনের এমন কিছু করতে চাচ্ছে যাতে সেনা সহযোগিতা অপরিহার্য? সেটা বিদ্রোহ ধরনের কোন কিছু যেখানে পুলিশের তেমন কিছু ভূমিকা পালনের নেই? চিন্তার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল আহমদ মুসা।
জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল, ‘কী ভাবছেন মি. আবু আহমদ?’
‘ভাবছি, ওরা অপছন্দের সেনা অফিসারদের ট্রান্সফার ও পছন্দের সেনা অফিসারদের সেখানে এনে কী করতে চায়, কী তাদের টার্গেট, এটাই ভাবছিলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এলাকায় কিছু কাজ তারা বাগিয়ে নিতে চায়, এটাই আমি মনে করেছিলাম।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘সেটাই ভাবা যেত যদি ট্রান্সফার ও রিপ্লেসমেন্টের ঘটনা এক, দুই বা কিছু জায়গায় হতো বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু তা হয়নি। তারা দেশের একটা অঞ্চলের চার-পাঁচটি প্রদেশ থেকে সরিয়ে দেশপ্রমিক সেনা অফিসারদের একখানে আনতে চায়, তাদের আজ্ঞাবহদের এলাকায়। এ ধরনের আয়োজন কিছু কাজ বাগিয়ে নেয়ার জন্যে হতে পারে না। আমার ধারণা, এর সাথে রাজনৈতিক বা ভূখন্ডগত স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
চমকে উঠল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
তার চোখের দৃষ্টিও চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘মি. আবু আহমদ, আপনি সাংঘাতিক বিষয়ের দিকে ইংগিত করেছেন। তারা যে দাবী করেছে, একটা প্রদেশে তারা সে দাবী আদায় করে নিয়েছে। তার লক্ষ্য যে, আপনি যা বলেছেন, ঐ ধরনের কিছু হতে পারে তা আমি ভাবতেও পারিনি। আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু সেটা কী? তারা তো কোন রাজনৈতিক দল নয়। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তাদের সম্পর্ক আছে বলেও জানি না। আর ভূখন্ডগত লক্ষ্য অর্জনের ব্যপারটাতো আরও বড়।’ জেনারেল মেডিন মেসুদের কণ্ঠে চিন্তার সুর। মুখে তার উদ্বেগের চিহ্ন।
‘কিন্তু এমন হতে পারে আমরা হয়তো যা চিন্তা করতে পারছি না, এমন কিছু তো থাকতে পরে, ঘটতেও পারে। মাদক ব্যবসায়ের ফাঁদে ফেলে যাদের জেলে পাঠানো হচ্ছে, যাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং যাদের সেখানে বসানো হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তারা দুই শ্রেণীর মানুষ। ‘সোহা’ ও ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’ সংগঠনগুলোর লোকজন এবং যাদের মাউন্ট আরারাত অঞ্চলে বসানো হচ্ছে, তারা দেখা যাচ্ছে আর্মেনীয় অরিজিন। তারপর তারা মাউন্ট আরারাতের উল্কি পরে। কিন্তু কেন? এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে সীমান্তের ওপারে আর্মেনিয়ায়। আর্মেনীয়দের ধর্মীয় জীবন শুধু মাউন্ট আরারাত কেন্দ্রিক নয়, মাউন্ট আরারাত কেন্দ্রিক তাদের একটা রাজনৈতিক দর্শনও আছে। আর্মেনীয়রা বলে প্লাবন সরে গেলে হযরত নূহ (আঃ)- এর কিস্তি যখন মাউন্ট আরাতের উপর এসে দাঁড়ালো, তখন প্লাবন থেকে জেগে ওঠা প্রথম ভূখণ্ড হিসাবে আর্মেনিয়ার রাজধানী ‘ইয়েরেভেন’কে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। এই দেখতে পাওয়া থেকেই হযরত নূহ (আঃ)-এর নাম দিয়েছেন ‘ইয়েরেভেন’। ‘ইয়েরেভেন’ অর্থ ‘দেখা গেছে’। আর্মেনীয়রা মনে করে থাকে, হযরত নূহ (আঃ) নিজেই মাউন্ট আরারাত ও আর্মেনিয়াকে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ করে গেছেন। এ ছাড়া তারা বলে মাউন্ট আরারাত সন্নিহিত গোটা অঞ্চল নিয়ে ছিল আর্মেনীয়দের ‘ওরারতু’ সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের নাম থেকে মাউন্ট আরারাতের নামকরণ করা হয়। সুতরাং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় দিক দিয়েই মাউন্ট আরারাত সন্নিহিত গোটা অঞ্চল আর্মেনীয়দের। তারা নিজেদের সেই ‘ওরারতু’ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মনে করে। কে জানে আপনার কথিত ‘সোহা’ ও ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’ কোন লক্ষ্যে কাজ করছে। তবে আমি এটুকু জানি উল্কিওয়ালারা আর্মেনিয়ার অতিপ্রাচীন উগ্র জাতীয়তাবাদী একটা গ্রুপ। তারা গ্রেটার আর্মেনিয়ার জন্যে কাজ করে আসছিল। আমি জানি না, ‘সোহা’ ও ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’ এর উল্কিওয়ালারা সেই উল্কিওয়ালাদের উত্তরসূরী কিনা!’ দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল আহমদ মুসা।
জেনারেল মেডিন মেসুদ স্তম্ভিত চোখে চেয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। বলল, মি. আবু আহমদ, আপনি অদ্ভুত এক ইকুয়েশন করেছেন। যা মিলে গেছে উদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে। আমি বিস্মিত হয়েছি। আপনি তুরস্কের সাথে আর্মেনিয়ার সংঘাতের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করেছেন। প্রফেশনাল প্রয়োজনেই সামরিক একাডেমিতে আমাকে দেশের ইতিহাস ও প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের ইতিহাস পড়তে হয়েছে। কিন্তু ইকুয়েশনটা এভাবে আমাদের সামনে আসেনি। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। মাউন্ট আরারাত ও আর্মেনিয়া সম্পর্কে যা বলেছেন তাতো সত্যই। ওরারতু সাম্রাজ্য সম্পর্কে যা বলেছেন তা যে সত্য তার প্রমাণ আমাদের সামনেই রয়েছে। ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’- এর তুরস্কের চীফ যিনি তার নাম ‘ওরান্ত ওরারতু’। অর্থাৎ, ‘ওরারতু সাম্রাজ্য তারা ফিরিয়ে আনতে চায়’- আপনার এ কথা সত্য।’ বলে একটু থামল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। সে মুখে অপরাধবোধের একটা চিহ্ন। বলল ধীর কণ্ঠে, ‘আমি জানি না তারা দেশের কী সর্বনাশ করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। আমি তাদের সহযোগিতা করেছি, এখনও করছি। এখন বলুন আমি কী করতে পারি?’
‘জেনারেল মেডিন মেসুদ, শুধু আপনি কেন, এমন শত শত মানুষকে বিভিন্নভাবে ট্রাপে ফেলে ওরা ব্ল্যাকমেইলিং করছে। ওদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে ওদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেই শুধু ওদের এই কালো থাবা থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। আপনি সাহায্য করেছেন। ওদের পরিচয় আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম। এখন ওদের কোন ঠিকানা অথবা ওদের কোন কনট্যাক্ট সূত্র আমাদের পাওয়া দরকার যাতে বড় কিছু ঘটে যাওয়ার আগেই ওদের পাকড়াও করা যায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি ওদের কোন ঠিকানা কোন দিন পাইনি। টেলিফোন নাম্বারও না। তবে অ্যানোস আব্দুল্লাহ্ গাজেন কি এক প্রেক্ষাপটে আমাকে ওদের একটা কনট্যাক্ট পয়েন্ট দিয়েছিলেন। আমি কোন দিন সেটা খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করিনি। সেটা হলো…।’
কথা শেষ করতে পারলো না জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘বাবা, তোমরা সাবধান! সাবধান! ওরা প্রহরীদের মেরে ফে…।’ চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল সালিহা সানেম।
কিন্তু সে কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল দরজা। হুড়মুড় করে ঘরে প্রবেশ করল জনা পাঁচেক লোক। ওদের হাতে উদ্যত রিভলভার।
ওদের রিভলভার তাক করেছে জেনারেল মেডিন মেসুদ ও আহমদ মুসা দু’জনকেই।
আহমদ মুসা ও জেনারেল মেডিন মেসুদ দু’জনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল।
ঘটনাটা তাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই আকস্মিক।
আহমদ মুসার হাত দু’টি মাথা পর্যন্ত উঠেছিল। ওরা হাত তুলতে নির্দেশ দেয়নি তখনও। মনে হবে যেন আহমদ মুসা ভয়েই আগাম হাত তুলে ফেলেছে। আসল ব্যাপার হলো, আহমদ মুসার সাথের একমাত্র রিভলভারটা রয়েছে মাথার পছনে জ্যাকেটের গোপন পকেটে আটকানো। আরও একটা রিভলভার পকেটে ছিল। সেটা সিকিউরিটির লোকজন গেটেই রেখে দিয়েছে।
ড্রইংয়ে ঢুকেই ওদের একজন চিৎকার করে জেনারেল মেডিন মেসুদকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বিশ্বাসঘাতক, আমাদের সাথেও গাদ্দারী করলি? আমাদের শত্রু এক শয়তানকে আমাদের সব কথা বলে দিলি? এতক্ষণ তোর লাশ ফেলে দিতাম। কিন্তু সময় নিলাম এই কথা বলার জন্যে যে, তুই আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলি, কিন্তু তাতে লাভ হলো না। কারণ যে শয়তানকে সব কথা বলেছিস, তাকেও তোর সাথেই যেতে হবে পরপারে।’
বলে হো হো করে হেসে উঠল লোকটি। বলল, ‘মনে করেছিলি চারদেয়ালের ভেতর ষড়যন্ত্র করবি, কেউ জানতে পারবে না। কিন্তু জানিস না তোকেও আমরা সার্বক্ষণিক পাহারায় রেখেছি। তোর বাড়ির ড্রইংরুমসহ কয়েকটি স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাসহ ট্রান্সমিটার পতা রয়েছে। তোর সব কথা সব দৃশ্যই আমাদের কাছে পৌঁছে যায়।’ একটু থামল লোকটি।
তাকাল সে ড্রইং রুমের ভেতরের দরজায় দাঁড়ানো সালিহা সানেমের দিকে। বলল, ‘ভালোই হলো জেনারেল। তোর প্রাণ-ভোমরা অতিব আদরের একমাত্র সন্তানও হাজির। সেই প্রাণ-ভোমরা চোখের সামনে গুলি খেয়ে ঢলে পড়তে দেখলে তোর কেমন লাগবে?’ বলেই রিভলভারের নল সে সালিহা সানেমের দিকে ঘুরিয়ে নিল।
‘নিরস্ত্র একজন মহিলাকে মারতে আপনাদের লজ্জা হচ্ছে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে শয়তান তোকে দিয়েই শুরু করি।’ বলে রিভলভারের নল সে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল।
আহমদ মুসার মাথা পর্যন্ত তোলা হাত দু’টো মাথার পেছন পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। লোকটির কথার রেশ বাতাসে মেলাবার আগেই তার ডান হাত মাথার পেছন থেকে রিভলভার টেনে নিয়েই হাতটা সামনে এনেই গুলি করল লোকটির ঠিক কপাল লক্ষ্য করে।
গুলি করেই আহমদ মুসা বাঁ দিকে মেঝের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তার চোখ এবং রিভলভার ধরা হাতটা লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি।
অন্য চারজন ইতিমধ্যে আহমদ মুসাকে টার্গেট করে ফেলেছিল। গুলি তারা করল। কিন্তু ততক্ষণে আহমদ মুসার দেহটা মাটিতে গিয়ে পড়েছে। চারটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পেছনের দেয়ালে গিয়ে আঘাত করল।
আহমদ মুসা মাটিতে পড়েই রিভলভারের ট্রিগার চেপে ধরেছিল। স্বয়ংক্রিয় রিভলভার থেকে একের পর এক বেরুতে লাগল গুলি। আহমদ মুসা শুধু তার রিভলভারের নলটাকে অবশিষ্ট চারজনের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। ওদিকে ওরা চারজন প্রথম গুলি করার পর দ্বিতীয় গুলির জন্যে রিভলভারের নল ঘুরিয়ে নিচ্ছিল নতুন টার্গেটের দিকে। কিন্তু দ্বিতীয় গুলি করার পজিশনে পৌঁছার আগেই আহমদ মুসার স্বয়ংক্রিয় রিভলভারের চারটি গুলি ওদের চারজনকে শিকার করে ফেলল।
ড্রইংরুমের ভেতরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সালিহা সানেম যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল।
আর বিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল জেনারেল মেডিন মেসুদ। তার পরনে জেনারেলের ইউনিফর্ম। কিন্তু সে সশস্ত্র ছিল না। আহমদ মুসার সাথে আলোচনায় বসার আগেই রিভলভার রেখে এসেছিল।
গুলি খেয়ে শেষ চারজনকে পড়ে যেতে দেখল জেনারেল মেডিন মেসুদ। তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসাএ হাতে রিভলভার। তখনও মেঝে থেকে ওঠেনি সে।
জেনারেল মেডিন মেসুদ ছুটে গেল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘আমি ঠিক আছেন তো মি. আবু আহমদ?’
‘আল হামদুলিল্লাহ। আমি ঠিক আছি জেনারেল।’
জেনারেল মেডিন মেসুদ জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘ধন্যবাদ আবু আহমদ। গতকাল আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছেন। আজ আবার আমাদের দুজনকেই বাঁচালেন। আল্লাহ্’র হাজার শোকর।’
জেনারেল মেডিন মেসুদ আহমদ মুসাকে টেনে এনে বসাল সোফায়।
এই সময় সিকিউরিটির লোকেরা দৌড়ে এসে ঘরে ঢকল। একজন অফিসার পাঁচটি লাশের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনারা ভলো আছেন তো? স্যার, গেটের তিন জন সিকিউরিটিকে মারতে ওরা সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার ব্যবহার করেছে। রাস্তায় গাড়িতে থাকা আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি।’
‘হ্যাঁ, আমরা ভালো আছি। এই ভালো থাকার কৃতিত্ব তাঁর। মি. আবু আহমদের কাছে রিভলভার না থাকলে এবং তিনি বিস্ময়কর ধরনের ক্ষীপ্র না হলে ওদের বদলে আমাদের লাশই পড়ে থাকতো।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘স্যরি, ইট ইজ এ গ্রেট ল্যাপস অন আওয়ার পার্ট, স্যার।’ সেই অফিসারটি বলল।
‘ল্যাপস কিছু হয়নি তোমাদের। বল, ওরা সফল হয়েছিল।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ। সে একটু থেমেই আবার বলল, ‘লাশগুলোর ব্যবস্থা কর অফিসার।’
‘স্যার, পুলিশকে ইনফর্ম করেছি। ওরা আসছে। স্যার, আপনারা একটু ওদিকে বসুন। আমরা এদিকটা দেখছি।’ অফিসারটি বলল।
‘ওকে নিয়ে তুমি এসো বাবা ভেতরের লাউঞ্জে। আমি দেখছি ওদিকে।’ বলেই সালিহা সানেম ভেতরে ঢুকে গেল।
‘চলুন মি. আবু আহমদ। আমরা ওদিকে বসি।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘মি. জেনারেল, ওদের বলুন ওরা লাশগুলোকে ভালোভাবে যেন সার্চ করে। ওদের পরিচয়, ঠিকানা আমাদের দরকার।’
জেনারেল তাকাল অফিসারের দিকে। অফিসার স্যালুট দিয়ে বলল, ‘আমরা সবকিছু ভালোভাবে দেখব স্যার।’
‘আচ্ছা মি. আবু আব্দুল্লাহ, আপনার কাছে তো রিভলভার থাকার কথা নয়। ওটা তো সিকিউরিটরা গেটেই রেখে দেয়ার কথা।’ চলতে চলতে বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘আমার পকেটের রিভলভারটা ওদের দিয়েছিলাম। কিন্তু লুকানো দ্বিতীয় রিভলভার আমি দেইনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘গোপন করলেন কেন? আপনি কি জানতেন এ ধরনের ঘটনা ঘটবে?’ বলল সালিহা সানেম।
‘জানার কথা অবশ্যই নয়। আমি আমার অভ্যাস বশতই আমার গোপন অস্ত্রটি আমার কাছে রেখেছিলাম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ। মি. আবু আব্দুল্লাহ। আপনার এই অভ্যেস আজ আমাদের বাঁচিয়েছে।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘আচ্ছা ধরুন স্যার, যদি আপনার কাছে রিভলভার না থাকতো, তাহলে কী করতেন আজ?’ জিজ্ঞাসা সালিহা সানেমের।
‘কী করতাম ঘটনা ঘটার পর বলা মুষ্কিল। তবে প্রথম সুযোগেই ওদের একজনের অস্ত্র দখল করার চেষ্টা করতাম। আল্লাহর সাহায্য চাইতাম…’
‘ধন্যবাদ মি. আবু আহমদ। সব বিষয়ই আল্লাহ্ আপনাকে অকৃপণ হাতে দিয়েছেন। তাঁর হাজার শোকর।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই সালিহা সানেম বলল, ‘আমরা এসে গেছি। আসুন, বসেই আমরা কথা বলি।’
সবাই এগোলো বসার জন্যে সোফার দিকে।