৪৯. বিপদে আনাতোলিয়া

চ্যাপ্টার

আংকারা এয়ারপোর্ট।
ভি.ভি.আই.পি. পার্কিং-এ গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা।
একজন সামরিক অফিসার ছুটে এসে বলল, ‘স্যার আসুন।’
আহমদ মুসাকে নিয়ে অফিসারটি লিফটে প্রবেশ করল।
লিফট তাদেরকে ভি.ভি.আই.পি. লাউঞ্জে নিয়ে এল।
অফিসারটি আহমদ মুসাকে একটা সোফায় বসিয়ে তার তিন-চার গজ পেছনে গিয়ে এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল।
মিনিট খানেকের মধ্যেই জেনারেল মেডিন মেসুদ সেখানে এল। সেনা অফিসারকে যেতে বলে আহমদ মুসার কাছে এল সে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে তার সাথে হ্যান্ডশেক করল। বলল, ‘সালিহা সানেম আসেনি?’
ম্লান হাসল জেনারেল মেডিন মেসুদ। বলল, ‘একদম ছেলে মানুষ। জেদ ধরে বসে আছে। আমাকে বলেছে, আমি স্যারকে বিদায় দিতে পারবো না। আমি যাব না এয়ারপোর্টে। এই জেদ থেকে তাকে নড়াতে পারিনি।’
বলে জেনারেল মেডিন মেসুদ পকেট থেকে একটা ফোল্ডার বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘এতে আপনার টিকেট ও বোর্ডিং কার্ড রয়েছে।’
‘ধন্যবাদ!’ বলে ফোল্ডারটি নিয়ে আহমদ মুসা হ্যান্ড ব্যাগের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার সাথে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের বৈঠক হয়েছে। সেখানে জেনারেল মোস্তফা এবং সেনাপ্রধানও ছিলেন। আপনার বিষয়টি নিয়েও আমি আলোচনা করেছি। আপনি পদত্যাগ করতে চান, সে কথাও আমি আলোচনা করেছি। তারা পদত্যাগের সাথে একমত হননি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তার তত্বাবধানে সেনা, পুলিশ ও বাছাইকরা কিছু গোয়েন্দা অফিসারকে নিয়ে ‘অ্যান্টি টেরোরিস্ট ব্যুরো’ (ATB) নামে একটা ‘অপারেশন সেল’ হচ্ছে, সেখানেই আপনাকে কো-ডাইরেক্টর হিসাবে নিতে চান। আমি এটাকে খুব ভালো মনে করেছি।’
‘আমি পদত্যাগ অফার করেছি আমার বিবেকের তাড়নায়। তবে আমার জন্যে তাঁরা যা ভালো মনে করছেন, আপনি যা ভালো মনে করছেন, তার মধ্যেই আমার কল্যাণ আছে বলে আমি মনে করছি।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘ধন্যবাদ জেনারেল। প্রধানমন্ত্রী শিঘ্রই আপনাকে ডাকবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
জেনারেল মেডিন মেসুদ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হলো না। সালিহা সানেম গট গট করে পা ফেলে সেখানে এসে হাজির হলো। তার পরনে তুর্কি সুলতান পরিবারের ঐতিহ্যিক পোষাক। মুখের একাংশে পাতলা একটা নেকাব।
খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘ধন্যবাদ সালিহা সানেম, তুমি এসেছ সেজন্য।’
সালিহা সানেম নিজেকে সোফার উপর ছুঁড়ে দেবার মত ধপ করে বসে বলল, ‘ওয়েলকাম, স্যার। আমি এসেছি, কিন্তু বিদায় দেবার জন্যে নয়। একটা কথা বলার জন্যে এসেছি।’
‘কী কথা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আপনি কবে আসবেন, এ ওয়াদা নেবার জন্যে আমি এসেছি।’ বলল সালিহা সানেম।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ভ্যান অঞ্চলে যে আমি আসব কখনও ভাবিনি, গতকাল আমি আংকারার আংগোরায় এসেছি, এটাও আমার ভাবনার অতীত ছিল। এভাবেই আবার একদিন হয়তো আংকারায় এসে পড়ব। ওয়াদা আমার নিও না বোন।’
বোন সম্বোধনে কেমন যেন ছায়া নেমে এসেই যেন আবার মিলিয়ে গেল।
একটু দেরি করল উত্তর দিতে। একটু ম্লান হাসি ফুটে উঠল মিস সালিহা সানেমের মুখে। বলল সে, ‘বোন বললে তো আসা মাস্ট হয়ে গেল। তাহলে তো ওয়াদা করতেই হবে।’
‘ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়াটাও বোনের জন্যে মাস্ট। আমি তোমাকে, জেনারেল সাহেব ও ম্যাডামকে মদীনায় আমার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এবারই হজ্জ্বে আসুন। অথবা ওমরার জন্যেও আসতে পারেন। আমরা খুশি হবো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া ঠিক বলেছেন বাবা। আমরা যাব। তুমি প্রোগ্রাম কর।’ সালিহা সানেম বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ্। ওর আমন্ত্রণ খুবই মূল্যবান মা। খুবই আনন্দের হবে আমাদের জন্যে। হজ্জ্বের স্বপ্ন আমাদের মনে ছিল। সে স্বপ্ন উনি বাস্তবতায় নিয়ে এলেন। আমরা শীঘ্রই পারিবারিকভাবে বসে সিদ্ধান্ত নেব।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘ওয়েলকাম জেনারেল। আমরা খুবই খুশি হবো। আমাকে প্লীজ আপনি জানাবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
একটু থেমেই আবার মুখ খুলল আহমদ মুসা। বলল, ‘একটা বিষয় আমি ভেবেছিলাম, কিন্তু বলতে ভুলে গেছি।’
‘আমি কি সানেম মাকে একটু ঘুরে আসতে বলব?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মেডিন মেসুদের।
‘না, ও থাকলে ক্ষতি নেই। বিষয়টা তেমন কিছু নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। শুরু করল আবার, ‘আপনি কি ভেবেছেন আপনার বৈঠকখানায় আমাদের আলোচনা ওরা সংগে সংগেই জানতে পারে, যার ফলে সংগে সংগেই ওরা আক্রমণ করে আমাদের হত্যার জন্যে। কিভাবে এটা সম্ভর হয়েছে?’
জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল, ‘বাড়ির কেউ এটা ওদের জানিয়েছে বলে সন্দেহ করেন? কিন্তু…’
জেনারেল মেডিন মেসুদের কথার মাঝখানেই বলে উঠল আহমদ মুসা, ‘কিন্তু আপনার কথা ঠিকই, বড়ির কেউ সব কথা শোনেনি। শুনলেও একই সবকিছু শোনা ও বলা সম্ভব নয়।’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মেডিন মেসুদের।
‘আমি মনে করি আপনার বাসায় ওরা সিসিটিভি ক্যামেরা ও ট্রান্সমিটার বসিয়ে রেখেছে। আপনাকে সবসময় ওরা ওয়াচে রেখেছে এবং আপনার সব কথা-বার্তাও মনিটর করছে।’
মুখ মলিন হয়ে গেল জেনারেল মেডিন মেসুদের। বিস্ময়ও নামল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, এটাই ঘটেছে। ধন্যবাদ আপনাকে। আমি আজই এসব খুঁজে বের করব। এখনি খবর দিচ্ছি সেনাবাহিনীর আলট্রা সেন্সর টিমকে।’
‘ওরা কারা বাবা? ওরা তোমাকে অনেক কথা বলেছে।’ বলল সালিহা সনেম।
বিব্রত জেনারেল মেডিন মেসুদ কিছু বলার আগেই আহমদ মুসা বলল, ‘ওরা দেশের শত্রু বোন।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল, ‘আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি মি. আবু আহমদ। মাউন্ট আরারাত অঞ্চলের যে সেনা অফিসারদের ট্রান্সফার করা হয়েছিল এবং তাদের জায়গায় যাদের রিপ্লেস করা হয়েছিল, সেই ট্রান্সফার ও রিপ্লেসমেন্ট বাতিল করার অর্ডার তৈরি করেছি। কালকেই এটা কার্যকরী হবে।’
‘না মি. জেনারেল এটা করবেন না। ওদেরকে আমরা ওদের মত করে চলতে দিতে চাই। ট্রান্সফার ও রিপ্লেসমেন্ট বাতিল করলে ওরা বুঝতে পারবে যে, ওদের ষড়যন্ত্র আমরা ধরতে পেরেছি। তাদের এই ষড়যন্ত্র ধরা পড়েছে এটা ওদের আমরা জানতে দিতে চাই না। আমরা দেখতে চাই, কী ষড়যন্ত্র ওরা করেছে। প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান জেনারেল মোস্তফা সবাই আমার সাথে একমত। এটা আমাদের জন্যে একটা সুযোগ। এই সুযোগ আপনিই সৃষ্টি করে দিয়েছেন মি. জেনারেল।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই এয়ার লাইন্সের একজন অফিসার এসে জেনারেল মেডিন মেসুদকে বলল, ‘স্যার, বোর্ডিং শেষ। স্যারকে নিতে এসেছি।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন অফিসার।’
হ্যান্ডশেকের জন্য আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে দিল জেনারেল মেডিন মেসুদের দিকে।
‘সময় খুব তাড়াতাড়িই চলে গেল। আমি কৃতজ্ঞ মি. আবু আহমদ। আপনার হতে আমার নতুন জন্ম হয়েছে।’ হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘আমি কিছুই করিনি জেনারেল। যেটা ঘটেছে, সেটা আপনার তকদির। আল্লাহ্ মানুষের জন্যে খেদমত চান। আল্লাহ্ আপনার সহায় হোন।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল সালিহা সানেমের দিকে। হসল। বলল, ‘এবার তুমি বিদায় না জানালেও আমি বিদায় নেব।’
‘আমি বিদায় জানাব না। তবে বলব আসুন।’ বলল সালিহা সানেম।
‘এটা বিদায় জানাবারই ভাষা।’ বলল আহমদ মুসা।
হাসল সালিহা সানেম। বলল, ‘আমি পরাজয় স্বীকার করলাম। জানেন তো মেয়েদের মন নরম।’
‘আল্লাহ্ নরম মন পছন্দ করেন। আল্লাহ্ হাফেজ বোন।’
বলে সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসার পেছনে চলল এয়ার লাইন্সের অফিসার। আহমদ মুসা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। এরপরও সেদিকে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে আছে সালিহা সানেম।
জেনারেল মেডিন মেসুদ ধীরে ধীরে হাত রাখল মেয়ের কাঁধে। বলল, ‘চল মা।’
চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল সালিহা সানেম। সেই সাথে চোখের অশ্রু মোছার চেষ্টা করল। বলল, ‘বাবা, ওকে না দখলে আমাদের পৃথিবী দেখা অসম্পুর্ণ থেকে যেত। পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টাতো না। অর্থ ও এনজয়মেন্টের বাইরে আজকের মানুষ কিছুই ভাবে না। আমি ওকে বিদায় জানাব কি করে, উনি যে আমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেলেন।’ আবেগে জড়িয়ে গেল শেষের কথাগুলো সালিহা সানেমের। নতুন করে সিক্ত হলো তার চোখ দু’টি অশ্রুতে।
‘মা, আমিও জীবনে প্রথম বারের মত এমন মানুষের মুখোমুখি হলাম। তুমি সব কথা জান না মা। উনি ইচ্ছে করলে আমার জীবন ধ্বংস করে দিতে পারতেন। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি আমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেলেন। কুরআন শরীফে পড়েছি, আল্লাহ্ বান্দার জন্যে তার দয়াকে অবশ্যকর্তব্য করে নিয়েছেন। ইনি আল্লাহর সে ইচ্ছারই একজন সাক্ষাত দূত। অপরাধীরা এদের স্পর্শেই সোনার মানুষ হয়ে যান। আল্লাহ্ ওকে দীর্ঘজীবী করুন।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘ওর পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানি না। কে উনি, ওর পরিচয় কী?’ জিজ্ঞাসা সালিহা সানেমের।
‘আমিও জানিনা মা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টও ওকে সমীহ করেন, শ্রদ্ধা করেন। তার যে কোন কথাই মেনে নেন। বিস্ময়কর এই মানুষ। তার পরিচয় সম্পর্কে আমিও কিছুই জানি না।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘এ কারণে আরও কষ্ট লাগছে বাবা।’ বলল সালিহা সানেম।
‘আমাদের এই কষ্টই ওদের জীবনের সার্থকতা মা। মানুষকে এভাবে জয় করতে পারার চেয়ে বড় সার্থকতা আর নেই মা।’
কথা শেষ করেই বলল, ‘চল মা।’ বাবা-মেয়ে দু’জনেই হাঁটা শুরু করল। আকাশে উড়ল আহমদ মুসার প্লেন।
‘বাবা, এ প্লেন কি ইস্কান্দারুন হয়ে ভ্যান যাবে?’ বলল সালিহা সানেম।
‘না মা, ভ্যানের জন্যে এটা বিশেষ ফ্লাইট। মি. আবু আহমদের জন্যে এই ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভ্যানকে এটা জানিয়েও দেয়া হয়েছে মি. আবু আহমদ নামে একজন বিশেষ মেহমান যাচ্ছে এই ফ্লাইটে।’
‘আলহমদুলিল্লাহ্। আল্লাহ্ তার সম্মান বাড়িয়ে দিন।’ বলল সালিহা সানেম। লিফট থেকে নেমে তারা গাড়ির দিকে এগোলো।

ইজদির-ভ্যান হাইওয়ে ধরে একটা ব্রান্ড নিউ মাইক্রো ছুটে যাচ্ছে ভ্যানের দিকে।
মাইক্রোটি সেনাবাহিনীর। গাড়ির নাম্বার বলছে মাইক্রোটি ইজদির সেনা-ডিভিশনের। নাম্বার জিরো থারটিন।
মাইক্রোতে আরোহী পাঁচজন। ড্রাইভিং আসনে একজন সেনা ড্রাইভার। মাঝের সীটে দু’জন, সাধারণ পোষাক পরা লোক।
আর একদম পেছনের সীটে দু’জন সামরিক অফিসার। চলছে গাড়ি। মাঝের সীটে সাধারণ পোষাক পরা দু’জন কথা বলছিল। দু’জনের একজনের পরনে কমপ্লিট স্যুট। অন্যজন প্যান্টের সাথে জ্যাকেট পরেছে।
স্যুট পরা লোকটি পেছন দিকে সামরিক অফিসারের পোষাক পরা দু’জনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘সাইমন, সোরেন শোন, এটা চুড়ান্ত একটা মিশন। এতে ব্যর্থ হওয়া যাবে না। তোমরা তাকে মারতে না পারলে, হয় সে মারবে তোমাদের, না হয় আমরা মারব তোমাদর। তোমাদের দু’জনের কোমরের বেল্টে বোমা পাতা আছে। তার রিমোট কন্ট্রোল আছে আমাদের হাতে। তোমরা তাকে মারতে ব্যর্থ হলেই তোমাদের দেহ উড়ে যাবে। আর যদি মারতে পার, তাহলে শুধু নতুন জীবন পাবে না, পাবে অঢেল টাকা, দুইজনে পাঁচ মিলিয়ন করে দশ মিলিয়ন ডলার।’
‘স্যার। আমরা মারতে যাচ্ছি, মরতে নয়। এটা নিশ্চিত হলেই হয় যে, তিনি এই ফ্লাইটে আসছেন। ভ্যান এয়ারপোর্টে নামছেন, ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ তিনি আসছেন গাড়িতে ওঠার জন্যে। তাহলে সে নির্ঘাত আমাদের হাতে মরবে যদি ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ ঢোকার আমরা সুযোগ পাই।’ বলল সেনা অফিসারের পোষাক পরা দু’জনের একজন।
সুটধারীই আবার কথা বলল, ‘যা নিশ্চিত হতে চাইছো, তা সবই নিশ্চিত। মি. আবু আহমদ এই ফ্লাইটেই আসছেন। কারণ এ বিশেষ ফ্লাইটটি আবু আহমদের জন্যেই। এয়ারপোর্টের কী পয়েন্টে বসা আমাদের লোক আজ সকালেই এই নিশ্চিত খবরটা দিয়েছে। ক’মিনিট আগেও জানিয়েছে বিশেষ প্লেনটি এখন মধ্য পথে। আর ভিভিআইপি লাউঞ্জ থেকে তারা যে এক্সিট প্ল্যান করেছে এয়ারপোর্টের সিকিউরিটির লোকরা, সেটাও আমাদের সেই লোকই যোগাড় করে দিয়েছে। তাকে স্বাগত জানানোর জন্যে ভিভিআইপি লাউঞ্জে তার সাথে মিলিত হবেন ভ্যানের পুলিশ প্রধান মাহির হারুন, ড. আজদা, ড. সাহাব নূরী, সাবিহা সাবিত। তাকে নিয়ে নাম্বার ওয়ান ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ আসবে। এক নাম্বার ট্রাকে প্রস্তুত আছে তার জন্য গাড়ি। লিফট থেকে তারা বের হয়ে গাড়ির দিকে এগোবে গাড়িতে ওঠার জন্যে।
এই এক্সিট প্ল্যানটা নিশ্চিত। আর তোমাদের এয়ারপোর্টে ঢুকতে কোন অসুবিধা হবে না। ইজদির পদেশের সেনা ডিভিশনের একজন জেনারেল কমান্ডিং অফিসারের চিঠি তোমাদের কাছে থাকবে। চিঠিতে লেখা আছে তিনি তার একজন আত্শয়াকে রিসিভ করার জন্যে তোমাদের পাঠিয়েছেন। একজন ভিভিআইপি প্যাসেঞ্জারের নামও যোগাড় করা হয়েছে প্লেনের যাত্রী লিস্ট থেকে। ‌ঐ যাত্রীকে যারা রিসিভ করতে যাবেন, এয়ারপোর্টে ঢোকার মুখে তাদের গাড়ি আটকাবার ভিন্ন ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ ঢুকতে পারার ব্যাপারটাও নিশ্চিত।’
‘তাহলে স্যার, আবু আহমদের মৃত্যুর ব্যাপারটাও নিশ্চিত।’ বলল পেছন থেকে সামরিক অফিসারের পোষাক পা দ্বিতীয় লোকটি।
‘ধন্যবাদ, এই রকম ডিটারমিনেশনই তো চাই। তবে আবার সাবধান করে দিচ্ছি, আবু আহমদের রিভলভার অসম্ভব ক্ষীপ্র। তোমরা যদি আগে তার চোখে পড়ো, তাহলে তোমরা কিছুই করতে পারবে না তাকে।’ বলল স্যুট পরা লোকটিই আবার।
‘ধন্যবাদ স্যার। অবশ্যই আমরা সাবধান থাকবো। তবে জেনে রাখবেন স্যার, স্নেক গ্রুপের আমরা যারা, তাদের গুলি কখনো মিস হয় না।’ সেনা অফিসারের পোষাক পরা অন্যজন বলল।
‘ধন্যবাদ!’ বলল মাঝের আসনের স্যুট পরা সেই লোকটি। সীটে এবার সোজা হয়ে বসল মাঝের আসনের লোকটি।
ছুটে চলেছে গাড়ি। নিরবতা কয়েক মুহূর্তের।
নিরবতা ভাঙল মাঝের আসনের লোকটি। বলল একটু ছোট স্বরে, ‘আমি বুঝতে পারছি না আংকারায় আমাদের পাঁচজন লোক জেনারেল মেডিন মেসুদের বাড়িতে ঐভারে বেঘোরে মারা পড়ল কী করে? জেনারেল মেসুদ কি আমাদের হাতের বাইরে চলে গেল?’
‘সর্বনাশের হোতা এখানেও সেই আবু আহমদ নামের শয়তান লোকটা। আমাদের লোক যারা জেনারেলের উপর চোখ রাখছিল, তারা গত পরশু আমাদের জানায়, আবু আহমদকে জেনারেলের মেয়ের সাথে জেনারেলের বাড়িতে ঢুকতে দেখা গেছে। আমরা তখনই বিপদের গন্ধ পাই এবং ঘটনা মনিটর করতে বলি। পরে রাতেই তারা আবার যোগাযোগ করে। তারা জানায় যে, আবু আহমদ জেনারেলের মেয়েকে গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করে তাকে পৌঁছে দেবার জন্যেই জেনারেলের বাড়িতে এসেছে। জেনারেলের মেয়েকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। জেনারেলের সাথে আবু আহমদের যে কথা-বর্তা হয়েছিল তার বিষয়বস্তু ছিল গুন্ডাদের হাত থেকে তার মেয়েকে উদ্ধার সম্পর্কে। এথেকে প্রাথমিক আশংকা আমাদের কেটে যায়। আরপর কি হলো আর জানা যায়নি। কিন্তু হঠাৎই গতকাল বেলা ১২ টার দিকে খবর আসে, আমাদের পাঁচজন লোক জেনারেলের বাসভবনে নিহত হয়েছে। তাঁরা জানায়, আমাদের আংগোরা ঘাঁটি প্রধানের নেতৃত্বে ঘাঁটির চারজন লোক তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যায় সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে। তাদের নিহত হবার খবর আসে বেলা ১২ টায়। পরে রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও ট্রান্সমিটার মনিটর থেকে জানা গেছে সব ব্যাপার। জেনারেলের সাথে আমাদের গোপন সম্পর্কের বিষয়টি আবু আহমদ জানতে পেরেছিল আগেই। আবু আহমদের সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদে জেনারেল সব কিছু স্বীকার করে বসে। এটুকুই শুধু জানা গেছে। তবে সিসিটিভিতে দেখা গেছে, আমাদের লোকদের আবু আহমদ কিভাবে খুন করেছে। সম্ভবতঃ জেনারেল আবু আহমদের জিজ্ঞাসাবাদে সব ফাঁস করে দিলে আমাদের লোকরা জেনারেল ও আবু আহমদকে হত্যার জন্যেই ওখানে তাড়াহুড়া করে ছুটে যায়। সিসিটিভি’র রিপোর্টে দেখা গেছে, আমাদের লোকরা আবু আহমদ, জেনারেল ও ওখানে উপস্থিত সবাইকেই টার্গেট করেছিল।’ দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল স্যুট পরা লোকটি।
‘তাহলে জেনারেল বিশ্বাসঘাতকতা করেছেই দেখা যাচ্ছে।’ বলল জ্যাকেট পরা লোকটি।
‘আবু আহমদের কাছে ধরা পড়ার পর সে গড় গড় করে সব বলে দিয়েছে।’ স্যুট পরা লোকটি বলল।
‘আবু আহমদকে জেনারেলের ওখানেই মারতে পারলে ভালো হতো। আমাদের লোকরা সে চেষ্টাই করেছিল। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আবু আহমদ নিশ্চয় ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছে সব কিছু এবং তা সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে মেরে সেই ফলতো আমরা পাবো না।’ বলল জ্যাকেটওয়ালা।
‘আবু আহমদ দুনিয়ায় না থাকলে সরকার সবকিছু জানলেও আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। সরকার আমাদের কিনে ফেলা ও দুর্নীতিবাজ সেনা, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দিয়ে আমাদের আট-ঘাট বাধা পরিকল্পনাকে বাধা দিতে পারবে না। শুধু চাই আমরা এখন আবু আহমদের মৃত্যু।’ স্যুট পরা লোকটি বলল।
এয়ারপোর্টের প্রবেশ পথে এসে পড়েছে গাড়ি।
‘গেটের বাইরে পুলিশের যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে গাড়ি দাঁড় করাও।’ নির্দেশ দিল স্যুটধারী লোকটি।
পুলিশের গাড়ির পাশে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। সেনা অফিসারের পোষাক পরা দু’জন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। সেনা অফিসারের পোষাক পরা দু’জন পেছনের সীট থেকে মাঝের সীটে এসে বসল। স্যুট পরা লোকটি গাড়ির জানালার কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘তোমরা যাও। ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ তোমারা ঢুকে যাওয়ার পর আমরা ঢুকব। ভিভিআইপি কার পার্কিং-এর সর্বশেষ প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকবে এই পুলিশের গাড়ি। এই গাড়িতে আমরা থাকব। মনে থাকে যেন দু’জনে দু’টি গুলি এক সাথেই করবে। টার্গেট গুলিবিদ্ধ হয়েছে নিশ্চিত হয়ে তোমরা দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে আসবে। আমাদের পুলিশের গাড়ি তোমাদের ফলো করবে। তোমাদের কোন ভয় নেই। যাও তোমরা।’
গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে চলল এয়ারপোর্টে প্রবেশের জন্যে।
স্যুট ও জ্যাকেটধারী পুলিশের গাড়ির কাছে যেতেই সামনের ও পেছনের দুই দরজা এক সাথে খুলে গেল।
গাড়িটার ড্রাইভিং সীটে ছেটে ছিল একজন পুলিশ। পেছনের সীটে ডিডিপি(ডেপুটি ডাইরেকটর অব পুলিশ) র‍্যাংকের একজন পুলিশ অফিসার। কিন্তু দু’জনের কাছেই ইজদির প্রদেশের ডিডিপি ও সাব ইন্সপেক্টর অব পুলিশের আইডি কার্ড আছে। কার্ডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বাক্ষর। সেই সাথে তাদের কাছে ইজদির প্রশাসন-কতৃপক্ষের চিঠি। তারা এসেছে একজন ভিভিআইপি প্যাসেঞ্জারকে রিসিভ করে ইজদির নিয়ে যাবার জন্যে।
স্যুট পরা লোকটি বসল ডিডিপি’র পাশে। আর জ্যাকেট পরা লোকটি বসল ড্রাইভিং সীটে বসা ইন্সপেক্টরের পাশে।
বসেই স্যুট পরা লোকটি পকেট থেকে দু’টি আইডি কার্ড বের করে ডিডিপি-কে দেখিয়ে বলল, ‘এই দেখুন আইডি কার্ড। আমরা দু’জন বোনাফাইড গোয়েন্দা অফিসার।’ হেসে উঠল দু’জনই হো হো করে।

গাড়ি ভিভিআইপি লাউঞ্জে রেখে লিফট দিয়ে উঠে ভিভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকল ড. আজদা, ড. সাহাব নূরী ও সাবিহা সাবিত। তারা দেখল, ভ্যান পুলিশের ডিজিপি মাহির হারুন আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত।
ড. আজদাদের দেখেই ডিজিপি মাহির হারুন বলল, ‘আমি আপনাদের কথাই ভাবছিলাম। আপনারা দেরি করছেন কেন?’
‘ধন্যবাদ স্যার। প্লেন সিডিউল সময়ে আসলেও পনের-বিশ মিনিট সময় আছে প্লেন ল্যান্ড করতে।’ বলল ড. আজদা।
‘আপনি বলছেন আরও পনের বিশ মিনিট দেরি আছে। কিন্তু আরও বিশ মিনিট আগে আংকারা থেকে পুলিশ প্রধান এরকেন আমাদের তাড়া দিয়েছেন যাতে তাড়াতাড়ি আমি এয়ারপোর্টে এসে আবু আহমদের সিকিউরিটির বিষয়টা দেখি।’ ডিজিপি মাহির হারুন বলল।
‘মি. আবু আহমদের নিরাপত্তা নিয়ে ওরা এত উদ্বিগ্ন?’ বলর ড. আজদা।
‘কারণ মি. আবু আহমদকে আমরা চিনি না, তারা চেনেন। এসব বিষয় নিয়ে আজ সকালেই প্রসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সেনা প্রধান ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধানের সাথে সম্মিলিত মিটিং করেছেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। সেখান থেকেই তিনি সোজা এসেছেন আংকারা এয়ারপোর্টে।’ ডিজিপি মাহির হারুন বলল।
‘আসলে উনি কে স্যার? রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা যার সাথে দীর্ঘক্ষণ বসে মিটিং করেন, তিনি অতি অসাধারণ। কে তিনি?’ জিজ্ঞাসা সাবিহা সাবিতের। বিস্ময় তার চোখে।
‘আমি জানি না সাবিহা সাবিত। আমি বিস্মিত উপরের যারা জানেন, তারা কেউ মুখ খুলেন না। কয়েকদিন আগে আমি আংকারা গেলে পুলিশ প্রধান মি. এরকেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন মি. আবু আহমদ আসলে কে? তিনি বলেছিলেন যে এ প্রশ্ন তারও। কিন্তু প্রশ্নটা তিনি অন্য কাউকে করতে সাহস পাননি। তিনি বলছেন, প্রসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও জেনারেল মোস্তফা ছাড়া আর কেউ তার পরিচয় জানেন না।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
মুখ হা হয়ে গেল ড. আজদা, ড. সাহাব নুরী ও সাবিহা সাবিতের। সাবিহা সাবিতই বলল, ‘এমন ব্যক্তিত্ব কে হতে পারেন স্যার, আমাদের দেশে কিংবা মুসলিম বিশ্বে?’
কিছু বলতে যাচ্ছিল ডিজিপি মাহির হারুন, এ সময় এয়ার লাইনসের প্রোটকল অফিসার এসে মাহির হারুনকে বলল, ‘স্যার, প্লেন ল্যান্ড করেছে। মি. আবু আহমদই প্রথম নামবেন।’
সবার চোখ গেল কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে বাইরে।
দুই তিন মিনিটের মধ্যেই এয়ার লাইন্সের সেই প্রোটোকল অফিসার আবু আহমদকে নিয়ে প্রবেশ করল ভিভিআইপি লাউঞ্জে।
বেশ দূরে থাকতেই আহমদ মূসা ডিজিপি মাহির হারুনসহ সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ মি. মাহির হারুন কষ্ট করে এসেছেন সেজন্য।’
সবাই সালাম নিল। সালাম নিয়ে ডিজিপি মাহির হারুন বলল, ‘আমার কষ্টের কথা বললেন, ওদের কষ্টের কথা বললেন না। বৈষম্য করা হলো না?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা আমার ভাই-বোন তো। ভাইয়ের জন্যে ওরা একটু কষ্ট করতেই পারে।’
‘আমাকে ভাই বলা হোল না, এটাও তো একটা বৈষম্য।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন। তার মুখে হাসি।
‘আপনি ভাই অবশ্যই। কিন্তু তার সাথে আপনি ভ্যানের পুলিশ প্রধানও। আপনার কাজ, সব সময় আইনের নিয়ন্ত্রণ। অতএব সে সময় খুবই মূল্যবান। সব নাগরিকের এই মূল্য সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. আবু আহমদ। সত্যিকার বড় যারা, তারা সবাইকে বড় করে দেখে। পুলিশকে এই মর্যাদার আসন কেউ দেয় না।’
আহমদ মুসা ডিজিপি মাহির হারুনের সাথে হ্যান্ডশেক করার পর ড. সাহব নূরীর সাথে হ্যান্ডশেক করে সাবিহা সাবিতের সামনে গিয়ে বলল, ‘ভাববেন না মি. মাহির হারুন সাবিহা সাবিতদের জেনারেশনকে দেখবেন ভিন্নভাবে। ওরা দেশ, জাতিকে বড় করবে, পুলিশকেও বড় করবে। কেমন, তাই না সাবিহা সাবিত?’
মুহূর্তের জন্যে কথায় ছেদ টেনেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘কি খবর, সাবিহা সাবিত? তোমাদের থিসিসের একটা শক্ত অংশ নিয়ে বিপদে পড়েছিলে, সেটা কেটেছে?’
হাসল সাবিহা সাবিত। সেই সাথে বিস্মিত তার চোখ। বলল, ‘ঐ ছোট ঘটনাও আপনার মনে আছে?’
‘ওটা ছোট ঘটনা নয়। ড. আজদাকে জিজ্ঞেস করে দেখ। যারা ডক্টরেট করেছে তারা এটা জানে। তাই না ড. আজদা?’ বলল ড. আজদার দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা। সবাই মিলে বসতে গেল।
বসতে গিয়ে আহমদ মুসা হাতের ব্যাগটা সোফায় রেখে বলল, ‘আপনারা বসুন। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। অজু বাকি আছে, প্লেনে অজুটা করতে পারিনি।’
আহমদ মুসা এগোলো টয়লেটের দিকে।
সবাই বসেছে।
ড. সাহাব নূরী বলল, ‘তার মানে মি. আবু আহমদ সব সময় অজুর সাথে থাকেন?’
হ্যাঁ মামা, এটা আমি খেয়াল করেছি। আমি দেখেছি, নামাযের সময় নয়, তবুও তিনি অজু করে এলেন। তার মানে অজু ভাঙলেই তিনি অজু করেন।’ ড. আজদা বলল।
‘আমি শুনেছি দরবেশ-বুজুর্গদের এ গুণ থাকে। খুবই ভালো ও মহৎ গুণ এটা। এ গুণও মি. আবু আহমদের আছে! এটা এটা বড় ব্যাপার। একজন লোক যখন সব সময় আল্লাহমূখী থাকতে চায়, তখন তার মধ্যে এ গুণের সৃষ্টি হয় শুনেছি।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘একটা ব্যাপার আপনারা লক্ষ্য করুন। কিছুক্ষণ আমরাই আলোচনা করলাম যে তিনি বড় একজন ব্যক্তিত্ব, যার পরিচয় তুরষ্কের পুলিশ প্রধানকেও জানতে দেয়া হয়নি! প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যার পরিচয় সীমাবদ্ধ! সেই ব্যক্তিত্ব একমাত্র আমাদের মাঝে এলেন কিন্তু বুঝা গেল না যে তিনি এত বড় একজন ব্যক্তিত্ব! তিনিই প্রথম আমাদের সালাম দিয়েছেন। কথাও বলেছেন তিনি আমাদের সাথে। আমার থিসিসের মত ছোট ঘটনার খবরও তিনি নিয়েছেন। এ সবের মাধ্যমে তিনি আমাদের গুরুত্বকেই বড় করে তুলে ধরেছেন, নিজের বড় ব্যক্তিত্বের, তার নিজের মর্যাদার কথা এবং তা প্রদর্শন করার বিষয় তিনি বিন্দুমাত্রও ভাবেননি।’ সাবিহা সাবিত বলল।
‘এটা সত্যিকার বড়ত্বের প্রমাণ। সত্যিকার বড়দের কাছে একজন পথের মানুষও পর্বতের মত বড়। বড়রা কিন্তু নিজেকে সবার চেয়ে ছোট মনে করে। মি. আবু আহমদের মধ্যে এইমাত্র এই গুণেরই তো আমরা প্রকাশ দেখলাম।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
আহমদ মুসা ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসেছে। গল্পগুজব চলছে।
এরই মধ্যে স্ন্যাক্স পরিবেশন করেছে লাউঞ্জের লোকরা।
সিকিউরিটির একজন লোক এসে বলল ডিজিপি মাহির হারুনকে, ‘স্যার, সব রেডি। মেহমানের গাড়ি পার হবার পর, অন্য যাত্রীরা তাদের গাড়িতে উঠবেন।’
‘ঠিক আছে, আমরা উঠছি।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
সবাই উঠে দাঁড়াল। চলল সবাই লিফটের দিকে।
লিফটে উঠে ডিজিপি মাহির হারুন বলল ড. আজদাকে, ‘আপনাদের ট্রাভেল প্ল্যানটা কী ড. আজদা?’
‘ধন্যবাদ। আমরা একপাই গাড়ি এনেছি সবাই আমরা এক সাথে যেতে চাই বলে। স্যার ও মামা বসবেন পেছনের সীটে। সাবিহা সাবিত গাড়ি ড্রাইভ করবে। আমি বসব তার পাশের সীটে।’
‘অল রাইট। আমার গাড়িটা থাকবে আপনাদের গাড়ির পেছনে। আপনাদের গাড়ি স্টার্ট নিয়ে এগোলে আমার গাড়ি স্টার্ট নেবে।’
লিফট থেকে ভিভিআইপি কার পার্কিং-এ এসে ডিজিপি মাহির হারুন আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে তার গাড়ির দিকে এগোলো। আহমদ মুসাও এগোলো তার গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসার ডান পাশে সাবিহা সাবিত। তবে সে ধাপ খানেক সামনে এগিয়েছে, ড্রাইভিং সীটে যাবে বলেই তার এই এগোনোটা।
গাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে তারা।
আশ-পাশটা দেখতে গিয়ে হঠাৎ সাবিহা সাবিতের চোখ দু’টি দুই তিন সারি সামনের একটা গাড়ির জানালায় আটকে গেল। দেখল গাড়িটার দু’টি জানালা অর্থাৎ ড্রাইভিং সীট ও পেছনের সীটের জানালা দিয়ে রিভলভারের দুই নল তাক করেছে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। রিভলভারের নলগুলো জানালার বাইরে বেরিয়ে আসেনি বলে সাধারণভাবে তা কারো নজরে পড়ার কথা নয়। বুঝতে পারল সাবিহা সাবিত কী ঘটতে যাচ্ছে।
কেঁপে উঠল তার গোটা অন্তরাত্মা। এখন তো চিৎকার করার সময় নেই, সাবধান করারও সময় নেই। পিছু হটে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়ার সময়ও নেই।
আর কিছু ভাবতে পারল না সাবিহা সাবিত। চোখের পলকে নিজের দেহটাকে সে সরিয়ে নিল আহমদ মুসার সামনে।
প্রায় একই সংগে দু’টি গুলি এসে বিদ্ধ হলো সাবিহা সাবিতের বাম বুকে। পড়ে যাচ্ছিল সাবিহা সাবিত পেছন দিকে।
আহমদ মুসার চোখে সবটা বিষয় ধরা পড়ে গেছে ততক্ষণে। জ্যাকেটের পকেট থেকে তার ডান হাতে উঠে এসেছে রিভলভার।
আহমদ মুসা বাঁ হাত দিয়ে সাবিহা সাবিতকে বুকে আঁকড়ে ধরে ডান হাত দিয়ে গুলি করল গাড়িটার সামনের টায়ারে।
গাড়িটা চলতে শুরু করেছিল। একটা বাঁক নিয়ে শব্দ করে গাড়িটা থেমে গেল। গাড়ি থেকে বের হয়ে দু’জন সেনা অফিসার ছুটে পালাচ্ছিল।
আহমদ মুসা গুলি করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দু’সেনা অফিসারের দেহই বিস্ফোরিত হলো। দু’টি দেহই অগ্নি গোলক হয়ে কিছুটা উপরে উঠে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল।
ডিজিপি ছুটে আসছিল আহমদ মুসার গাড়ির দিকে। আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. মাহির হারুন, আপনি ওদিকটা দেখুন ওদের আরেকটা গ্রুপ ভিভিআইপি কারপার্কেই আছে।’
‘দেখছি আমি মি. আবু আহমদ।’ বলে ডিজিপি মাহির হারুন সন্ত্রাসীদের গাড়ির দিকে ছুটল।
ড. সাহাব নূরী, আপনি ড্রাইভে বসুন। আর ড. আজদা আপনি দরজা খুলুন। একে হাসপাতালে নিতে হবে। দ্রুত কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল ওদের লক্ষ্য করে।
গাড়ির দরজা খুলল ড. আজদা ছুটে এসে।
আহমদ মুসা সাবিহা সাবিতকে পাঁজকোলা করে নিয়ে গাড়িতে উঠল। সীটের উপর শুইয়ে দিতে গেল সাবিহা সাবিতকে।
‘স্যার, আমাকে শক্ত করে ধরে রাখুন। ওরা আমাকে নিতে আসছে। আর একটু সময় চাই। একটা কথা বলতে চাই।’ খুব কষ্টের সাথে বেরিয়ে আসা এই কয়েকটা কথা প্রথম শোনা গেল সাবিহা সাবিতের কণ্ঠ থেকে।
‘ঠিক আছে আমি ধরে আছি তোমাকে। তোমার কিছু হবে না। আমরা নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে হাসপাতালে। কী বলবে বল তুমি।’
‘আমার চেয়ে সুখী মানুষ এই মুহূর্তে দুনিয়াতে আর কেউ নেই, স্যার। ওরা আপনাকে মারতে চেয়েছিল। আমি আপনাকে বাঁচাতে পেরেছি আল্লাহ্’র ইচ্ছায়।’ থেমে গেল সাবিহা সাবিতের কণ্ঠ।
চোখ দু’টি বুজে গেল তার।
‘তুমি এটা করতে গেলে কেন, সাবিহা? আমার তো দুনিয়াতে চাইবার কিছু নেই! কিন্তু তোমার তো জীবনের শুরু।’ আহমদ মুসা বলল।
‘দুনিয়াতে আপনার চাইবার কিছু নেই। কিন্তু দুনিয়ার প্রয়োজন আছে আপনাকে। আমার মত সাবিহা সাবিত শত আছে, আরও শত জন্মাবে। কিন্তু আপনার মত লোকদের আল্লাহ্ কদাচিৎ দুনিয়াতে পাঠান। আমি খুব খুশি। আমি আপনার বাহুর উপর মরতে পারছি। আমি…।’
‘তুমি এত কথা বলো না সাবিহা। আল্লাহ্ তোমাকে বাঁচাবেন। আমরা যাচ্ছি হাসপাতালে।’ বলল আহমদ মুসা।
দু’চোখ বুজে গিয়েছিল সাবিহা সাবিতের। খুলে গেল আবার। গভীর ক্লান্তি সে চোখে। যেন ঘুমে ছেয়ে আছে তার দুই চোখ। তার অস্ফুট কণ্ঠে আমি সেটা জানার জন্যে তো আর বেঁচে থাকবো না। বলবেন কি স্যার আপনার পরিচয়।’
আহমদ মুসার দু’চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু। বলল, ‘আমার পরিচয় না দেয়া আমার অহংকার নয়, সাবিহা; সেটা আমার প্রয়োজন। দুঃখিত আমি এর জন্যে। আমি তোমাদের এক ভাই- আহমদ মুসা।’
দু’চোখ বুজে গিয়েছিল সাবিহা সাবিতের। চমকে ওঠার মত প্রচণ্ড শক্তিতে তা যেন খুলে গেল। স্থির হলো আহমদ মুসার মুখের উপর। প্রাণ ভরে সমগ্র সত্তা দিয়ে যেন দেখছে আহমদ মুসাকে।
ওদিকে সিটের এক কোনে কোন রকমে বসে সাবিহা সাবিতের মাথায় হাত রেখে অঝোরে কাঁদছিল ড. আজদা। আহমদ মুসার কণ্ঠের শেষ উচ্চারণ শুনে সেও চমকে উঠে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। তার সে চোখেও বিস্ময়ের ঝড় উঠেছে।
আবার চোখ দু’টি বুজে গেল সাবিহা সাবিতের। কিন্তু তার ঠোঁটে অসীম এক প্রাপ্তি ও প্রসন্নতার হাসি। বলল অস্ফুট কণ্ঠে চোখ বুজে থেকেই, ‘আলহমদুলিল্লাহ্! আমার সৌভাগ্য। আল্লাহ্’র অসীম দয়া। আল্লাহ্’র কাছে নিয়ে যাবার মত সঞ্চয় আমার কিছুই ছিল না। কিন্তু এখন আল্লাহ্-কে বলতে পারবো, তার অতিপ্রিয় এক বান্দার পাশে আমি দাঁড়াতে পেরেছিলাম।’
চোখ দু’টি তার আবার খুললো। দৃষ্টি নিবদ্ধ আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘অনেক, অ-নে-ক বড় আপনি, পরকালেও কি পাশে থাকতে পা-রবো আপনার।’ তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে এবং তার কণ্ঠের শেষ শব্দের সাথে অবরুদ্ধ আবেগের একটা উচ্ছ্বাস যেন ভেঙে পড়ল। কেঁপে উঠল তার দেহটা। সেই সাথে তার মুখটা গড়িয়ে পড়ল এক পাশে। তার মুখে, দেহে নেমে এল প্রশান্তির এক নিখুঁত নিস্তব্ধতা।
সাবিহা সাবিতের মাথা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল ড. আজদা।
আহমদ মুসার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। কাঁপা, ভাঙা কণ্ঠ আহমদ মুসার।
গাড়ি থামিয়ে দিয়েছিল ড. সাহাব নূরী।
তার চোখ দিয়েও অশ্রু গড়াচ্ছে।
‘ড. নূরী, আপনি ড. মাহজুন মাজহারকে টেলিফোন করুন। তাঁকে ঘটনা জানিয়ে হাসপাতালে আসতে বলুন। আর চলুন আপনি হাসপাতালে।’
আহমদ মুসাই সাবিহা সাবিতের দেহ যেভাবে ধরে বসেছিল, সেভাবেই তাকে গাড়ি থেকে বের করে এনে হাসপাতালের ট্রলিতে তুলে দিল।
পাশেই সাবিহা সাবিতের পিতা ড. মাহজুন মাজহার দাঁড়িয়েছিল। মেয়ের রক্ত ভেজা লাশ দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল সে।
তার পাশে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলো না আহমদ মুসা। কাঁদা উচিত। মিনিট খানেক অপেক্ষার পর হাসপাতালের লোকরাই বিনয়ের সাথে বলল, ‘স্যার, দয়া করে আমাদের কাজ করতে দিন,০ প্লীজ।’
ড. মাহজুন মাজহার মুখ তুলল। তাকাল ওদের দিকে। অশ্রু ধোয়া তার মুখ।
উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চল বাবা, কোথায় যাবে।’
ট্রলি থেকে একটু সরে দাঁড়াতে গিয়ে দেখতে পেল আহমদ মুসাকে। সংগে সংগে জড়িয়ে ধরল তাকে। কেঁদে উঠল আবার।
‘স্যরি, স্যার। আমাকে বাঁচাতে গিয়েই জীবন দিতে হয়েছে সাবিহা সাবিতকে। আমি স্যরি।’ বলল আহমদ মুসা।
ড. মাহজুন মাজহার আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে তার দুই হাত আহমদ মুসার কাঁধে রেখে বলল, ‘স্যরি কেন?’ আমার মেয়ে কি যা করার নয় তাই করেছে, আমার মেয়ে কি অন্যায় কিছু করেছে? আমি কাঁদছি কি এই জন্যে যে আমার মেয়ে কেন জীবন দিতে গেল? না, তা নয় মি. আবু আহমদ। আমার এ কান্না গৌরবের। দেশের জন্যে বিনা দ্বিধায় জীবন দেয়ার মত সাহস আমার মেয়ে দেখাতে পেরেছে, এই দরনের মহৎ সিদ্ধান্ত সে নিতে পেরেছে, এই গৌরবেই আমি কাঁদছি। আলহামদুলিল্লাহ্! আমার মেয়ে ক’দিনেই আপনাকে চিনতে পেরেছে, বুঝতে পেরেছে যে, শত সাবিহা সাবিতের বিনিময়ে হলেও আপনাকে বাঁচানো দরকার। আমি…।’
আহমদ মুসা জড়িয়ে ধরল ড. মাহজুন মাজহারকে। বলল, ‘স্যার, এভাবে বলবেন না। দুনিয়ার সব মানুষ সমান। আর কারও জন্যে পৃথিবীর কোন কাজ আল্লাহ্ আটকে রাখেন না। তিনিই সবকিছুর নিয়ামক ও নিয়ন্তা।’
ড. মাহজুন মাজহার বলল, ‘তোমার কথাও ঠিক। কিন্তু আল্লাহ্ যেমন পাঁচ আঙুলকে সমান করে সৃষ্টি করেননি তেমনি দুনিয়ার সব মানুষ মেধা, যোগ্যতার দিক দিয়ে সমান নয়।’
কথা শেষ করে বলল, ‘চল, আমরা ওদিকে যাই। ড. আজদা ও ড. সাহাব নূরী সাবিহা সাবিতের সাথে গেছে।’
দু’জনেই চলল হাসপাতালের ভেতরে।
এক ঘন্টা পরে ভ্যান-এর পুলিশ প্রধান ডিজিপি মাহির হারুন এল হাসপাতালে।
আহমদ মুসা তখন বসেছিল হাসপাতালের ভিআইপি রিসেপশন লাউঞ্জে। সেখানে বসেছিল, আহমদ মুসা, ড. আজদা, ড. সাহাব নূরী, ড. মাহজুন মাজহার একজন পুলিশ ইনস্পেক্টর।
ডিজিপি মাহির হারুন লাউঞ্জে প্রবেশ করতেই পুলিশ ইনসপেক্টর উঠে দাঁড়াল।
‘তুমি একটু ওদিকে বস ইনসপেক্টর।’
পুলিশ ইনসপেক্টর একটা স্যালুট দিয়ে বাইরে চলে গেল।
ডিজিপি মাহির হারুন বসেই বলল, ‘স্যরি ড. মাহজুন মাজহার। সাবিহা সাবিত মেয়েটা অত্যন্ত ব্রাইট ছিল। সে আমাদের সবার আদরের। কেউই…।’
‘মি. মাহির হারুন, সাবিহা সাবিত বড় ছিল বলেই অতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে, বড় সাহস দেখাতে পেরেছে।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার। তার শেষের কথাগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ড. আজদা ড. মাহজুন মাজহারের পিঠে সান্তনার হাত রেখে বলল, ‘আপনি ঠিক বলেছেন আংকল। বুকে দুই দুইটি গুলি খাবার পরও তার চোখে মুখে দুঃখ-বেদনার কোন চিহ্ন ছিল না। একটুও কাঁদেনি, আর্তনাদ করেনি সাবিহা। মৃত্যুকে আসন্ন জেনেও সে বলেছে, আমার চেয়ে সুখি মানুষ এই মুহূর্তে, স্যার, ওরা আপনাকে মারতে চেয়েছিল, আমি আপনাকে বাঁচাতে পেরেছি আল্লাহ্’র ইচ্ছায়। দুনিয়াতে আপনার চাইবার কিছুনেই হয়তো, কিন্তু দুনিয়ার প্রয়োজন আছে আপনাকে। শেষ মুহূ…।’
ড. আজদার কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘সাবিহা সাবিত ছিল এখানে আমাদের সবার ছোট, কিন্তু সবার চেয়ে বড় কাজ সে করেছে। আল্লাহ্ তার শাহাদাত কবুল করুন। তার জন্যে এখন দোয়াই হবে তাকে স্মরণ করার, শ্রদ্ধা জানানোর উপায়।’
‘প্লিজ আপনারা এটাই করুন। একজন শহীদের পিতা হওয়ার এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার।
সবাই বলে উঠল। আমিন। একটু নিরবতা।
‘মাফ করবেন সকালে, আমি মি. আবু আহমদের সাথে একটু কথা বলতে চাই।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘তাহলে আমরা সবাই বাইরে যাবার দরকার নেই। আমাকে একটু কথা বলার সুযোগ দিলেই হলো।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘কোন অসুবিধা নেই। আমরা বরং খুশিই হবো।’ বলল ড. আজদা।
‘মি. আবু আহমদ, আপনি ঠিকই বলেছিলেন। ওদের আরেকটা গ্রুপ আরেকটা গাড়িতে ওখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, গুলি নিক্ষেপকারীরা ছিল সৈনিকের বেশে, অন্যদিকে আরেকটা গাড়িতে যারা ছিল, তারা ছিল পুলিশের গাড়িতে পুলিশের পোষাকে। পুলিশের গাড়ি হওয়ায় এবং গাড়িটাকে দ্রুত চলে যেতে দেখে আমি প্রথমটায় বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। আমি ধারণা করেছিলাম. পুলিশ হয়তো সন্দেহজনক কাউকে তাড়া করছে। কিন্তু যখনই মনে পড়ল গুলি নিক্ষেপকারীরা ছিল সৈনিকের পোষাকে, তখনই বুঝতে পারি আমি বিভ্রান্ত হয়েছি। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল পুলিশের গাড়ি ভেবে গেটে কেউ তাদের আটকায়নি। শেষ পর্যন্ত গাড়িটার আর হদিস মেলেনি। গাড়ির নাম্বার পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটা অবশ্যই ভুয়া নাম্বার হবে।’
একটু থামল ডিজিপি মাহির হারুন। মুহূর্ত কয় পরে আবার শুরু করল, ‘কিন্তু আমি বিস্মিত হচ্ছি, গুলি নিক্ষেপকারীদের মরতে হলো কেন? ধরা যাতে না পড়ে এ জন্যেই কি?’
‘ধরা যাতে না পড়ে এটা নিশ্চিত করার জন্যই তাদের দেহে আগে থেকে বোমা বাঁধা ছিল, এটাই হতে পারে। তবে সাধারণঃত এমনটা হয় না। নিজেদের কাউকে যখন কোন মিশনে পাঠানো হয়, তখন তার ধরা পড়া রোধ করার জন্যে তাকে হত্যা করা হবে এটা তাকে জানতে দেয়া হয় না। নিজেদের কাউকে যখন কোন মিশনে পাঠানো হয়, তখন তার ধরা পড়া রোধ করার জন্যে তাকে হত্যা করা হবে এট তাকে জানতে দেয়া হয় না। কারও গায়ে বোমা বেঁধে যখন কাউকে কোন মিশনে পাঠানো হয় তখন সেটা হয় বাধ্য করে কাজ করানোর ঘটনা। আমার মনে হয় আজকের ঘটনায় এমনটাই করা হয়েছে। আমার মনে হয়, এই বন্দুকবাজ দু’জনকে অঢেল টাকা দিয়ে বা অন্যকোনভাবে বাধ্য করে এই শর্ত দেয়া হয়েছে যে, মারতে না পারলে তাদের মরতে হবে। মারাটা যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্যেই এমনটা করা হয়েছে। না মারতে পারলে যেহেতু তাদেরই মরতে হবে, তাই মরার ব্যাপারে সামান্যতম গাফলতি হবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. আবু আহমদ। আপনার চিন্তাটাই সঠিক। তাহলে ধরে নিতে হবে সেনা অফিসারের পোষাক পরা গুলি নিক্ষেপকারীরা এবং পুলিশের পোষাকে আসা যারা তাদের হত্যা করল, তারা এক গ্রুপের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া হবার কথা ছিল।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘হওয়াটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা গাড়িটা অক্ষত আছে? গাড়িতে কিছু পাওয়া যায়নি? গাড়ির কাগজ-পত্র থেকে কোন ক্লু পাওয়ার সুযোগ আছে কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘গাড়ির কাগজপত্র ও গাড়ির নাম্বার, চেসিস নাম্বার দেখে কিছু বের করা যায় কিনা তা পরে ভেবে দেখতে হবে। গাড়িতে অন্য কোন কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। সিগারেটের একটা প্যাকেট পাওয়া গেছে। প্যাকেটের গায়ে কিছু হিজিবিজি লিখা আছে। এগারো ডিজিটের একটা নাম্বারও আছে, কিন্তু টেলিফোন নাম্বার নয়।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘সিগারেটের প্যাকেটটা কি আছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, আমরা নিয়ে এসেছি। আমার কাছেই আছে।’ বলে ডিজিপি মাহির হারুন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল। আহমদ মুসা সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একনজর উল্টে-পাল্টে দেখল।
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। ডিজিপি মাহির হারুন যাকে হিজিবিজি লেখা বলেছে, সেটা হিজিবিজি কিছু নয় কাঁপা হাতের হিব্রু ভাষায় লেখা। নাম্বারগুলোর দিকে চোখ নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার। এগারোটি ডিজিটের উপর একবার চোখ বুলিয়ে আহমদ মুসা ডিজিপি মাহির হারুনকে বলল, ‘মি. মাহির হারুন, জার্মান মোবাইল কোম্পানি ডিটিএল-এর বেসিক নাম্বার কি?’
‘জিরো থ্রি থ্রি সিক্স।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। বলল, ‘বেসিক নাম্বারের চার ডিজিটের দুই জোড়ার পত্যেকটিকে উল্টিয়ে লিখেছে। জিরো থ্রি হয়েছে থ্রি জিরো এবং থ্রি সিক্স হয়েছে সিক্স থ্রি। তাহলে পরবর্তী জোড় সংখ্যাগুলোকেও নিশ্চয় এভাবে উল্টিয়ে লেখা হয়েছে। তবে সর্বশেষ বেজোড় ডিজিটটি ঠিক থাকার কথা।’
‘কি করে বুঝলেন? ওটা কি কোন টেলিফোন নাম্বার?’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘হ্যাঁ মি. মাহির হারুন। এটি ডিটিএল-এর মোবাইল নাম্বার বলেই মনে হয়। ডিটিএল-এর চারটি বেসিক ডিজিটের দুই জোড়ার প্রত্যেক জোড়ার দুই ডিজিটকে আগে পিছে লিখেছে। আমি মনে করি পরবর্তী জোড়াগুলোকেও এইভাবে আগে-পিছে করে লিখেছে। দেখুন, এইভাবে সাজালে ডিটিএল-এর একটা মোবাইল নাম্বার হয়ে যায়।
সিগারেটের খোলটা হাতে নিল ডিজিপি মাহির হারুন। একবার ভালো করে চোখ বুলিয়েই সে উচ্ছাসিত কণ্ঠে বলে উঠল, ধন্যবাদ আবু আহমদ। আপনি নির্ভুলভাবে ধাঁধাঁটাকে ভেঙেছেন। নিশ্চিতই কারো একটা মোবাইল নাম্বার হবে এটা। তাদের কারো কি?’
‘তাদের কারো হবার সম্ভাবনাই বেশি। মনে হয়, গাড়িতে বসেই কষ্ট করে টেলিফোন নাম্বারটা লিখেছে। দেখুন প্রত্যেকটি ডিজিটই কিছুটা আঁকাবাঁকা এবং মাঝের স্পেসগুলোর মধ্যে কোন ভারসাম্য নেই। তার মানে চলন্ত গাড়িতে বসেই নাম্বারটি লেখা হয়েছে। জরুরি বলেই কষ্ট করে এভাবে লেখা হয়েছে এবং আজ গাড়িতে বসেই এই নাম্বার লেখা হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ডিজিপি মাহির হারুনের। বলল, ‘আপনি রাইটলি আইডেনটিফাই করেছেন আবু আহমদ। টেলিফোন নাম্বারটি আমাদের কাজে আসতে পারে। অন্য হিজিবিজি লেখার কিছু বুঝলেন?’
‘অন্য হিজিবিজি লেখাটাও হিব্রু। চলন্ত গাড়িতে বসে লেখা হয়েছে বলেই একটু বেশি হিজিবিজি লাগছে। এই হিজিবিজি অক্ষারগুলো হচ্ছে একটা রাস্তার নাম এবং একটা লোকেশনের নাম্বার।’ থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা এই ঠিকানাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করল। এখানে এভাবে সবার সামনে এই ঠিকানা প্রকাশ করা ঠিক মনে করল না। তাছাড়া হাসপাতালের এই ভিআইপি লাউঞ্জ কতটা নিরাপদ, এখানে কোন ইলেকট্রনিক চোখ বা কান আছে কিনা কে জানে। সুতরাং ঠিকানার বিষয়টা চেপে যাওয়াই ঠিক মনে করল আহমদ মুসা। ডিজিপি মাহির হারুনের পরবর্তী জিজ্ঞাসার জবাবে বলল আহমদ মুসা, ‘ওটা নিয়ে আর একটু ভাবতে হবে। সিগারেটের খোলটা আমার কাছেই থাক।’
‘ঠিক আছে মি. আবু আহমদ, ওটা আপনার কাছেই থাকা দরকার। তদন্ত পরিচালনার সব দায়িত্ব আপনার উপর দেয়া হয়েছে। তবে ওরা আপনাকে মারার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ চেষ্টা তারা শুরু থেকেই করছে। গতকাল আংগোরায় আপনার উপর আক্রমণ হয়েছে। আজ এখানে আপনাকে হত্যার একটা ভয়ংকর পরিকল্পনা করেছিল। আমরা আপনার জন্যে উদ্বিগ্ন। এরপর থেকে আপনার নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। প্লিজ আপনাকে সাবধান হতে হবে। আমরা আপনাকে যে কোন সাহায্য করতে প্রস্তুত।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘ধন্যবাদ আপনাকে। সাবধান থাকা সব মানুষের মত আমারও খুব স্বাভাবিক একটা প্রবণতা। বাকি আল্লাহ্ ভরসা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আল্লাহ্ ভরসা। আমার মেয়ে যাদের ষড়যন্ত্রে নিহত হয়েছে, তাদের আমি শাস্তি চাই। প্রার্থনা করি, ওদের পাকড়াও করে মি. আবু আহমদ ওদের শাস্তি দিতে এবং ষড়যন্ত্র উচ্ছেদ করতে সমর্থ হোন।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে বলে উঠল, ‘আমি একটু উঠতে চাই। ওদিকে কি হচ্ছে তা একটু দেখা দরকার।’
‘অবশ্যই, চলুন আমরাও যাব।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
সবাই উঠে দাঁড়াল।