৪৯. বিপদে আনাতোলিয়া

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তার গাড়িতে উঠল। বাম হাত স্টিয়ারিং-এ রেখে ডান হাতে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট করল গাড়ি। ঘড়ির দিকে তাকাল। আর আধাঘন্টা বাকি মেজর নাঈমের সাথে দেখা করার। মেজর নাঈম তাকে জানাবে দু’দিন আগে মাউন্ট আরারাতের ‘আর্ক অব নূহা’ উপত্যকায় ‘সোহা’ ও ‘হোলি আর্ক’ গ্রুপের লোকের লোকেরা যে সেনাদের পোষাক পরে গিয়েছিল, তারা সেনাবাহিনীর কিনা এবং নাম-পরিচয় কী?
আহমদ মুসা বিষয়টি জানতে টেলিফোন করেছিল আংকারায় জেনারেল মেডিন মেসুদের কাছে। জেনারেল মেসুদ তখনই নাম দিয়েছিল মেজর নাঈমের। বলেছিল, এই মেজর দেশ প্রেমিক এবং সোহাদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। জেনারেল মেসুদ আরও বলেছিল সে এ ব্যপারে মেজর নাঈমকে একটা ব্রীফ দেবে। পরে মেজর নাঈমই আহমদ মুসার সাথে যোগাযোগ করে দেখা করার সময় ঠিক করেছিল।
আহমদ মুসার গাড়ি মুভ করতে যাবে এই সময় একজন সামনে থেকে ছুটে আহমদ মুসার গাড়ি পর্যন্ত এসেই চোখের পলকে পকেট থেকে রিভলভার বের করে আহমদ মুসাকে গুলি করার জন্য।
লোকটি ছুটে গাড়ির সামনে আসতেই আহমদ মুসা টের পেয়েছে কী ঘটতে যাচ্ছে। তখন তার রিভলভার বের করার সময় ছিল না। সুতরাং আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টার কোন বিকল্প ছিল না।
আত্মরক্ষার জন্যে বাম দিকে সীটের উপর শুয়ে পড়ে আক্রমণে যাবার ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে। অন্যদিকে সামনে থেকে গুলি আসবে বিধায় সামনের স্টিয়ারিং-এর উপর ঝুঁকে পড়া বিপজ্জনক হবে। সবশেষে আহমদ মুসা ডান হাত ডান লকের উপর রেখে দেহটাকে ডান দরজার সাথে সেঁটে গিল। একটা গুলি কানের পাশ দিয়ে বাম কাঁধের উপর দিয়ে চলে গেল। আহমদ মুসা ডান হাত ইতিমধ্যে দরজার লক খুলে ফেলেছিল এবং দরজা ঠেলে গড়িয়ে পড়ল রাস্তার উপর। রিভলভারও পকেট থেকে বের করে নিয়েছিল আহমদ মুসা।
গাড়ির উইন্ড স্ক্রিন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল।
নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটা তার সামনে দিয়ে রাস্তার ডান পাশের দিকে গড়িয়ে চলল।
আহমদ মুসা রিভলভার বাগিয়ে দ্রুত গড়িয়ে চলল গাড়ির সাথে যাতে তার অবস্থান সম্পর্কে শত্রু পক্ষের বিভ্রান্তির সুযোগ সে নিতে পারে।
তাই হলো। আহমদ মুসা লোকটির পেছনে এসে পড়ল।
ওদিকে লোকটি সত্যিই বিভ্রান্ত হয়েছিল। সে সামনে তাকিয়ে আহমদ মুসাকে না দেখে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল গাড়ির দিকে ছুটে আসার জন্যে। তার হাতে উদ্যত রিভলভার।
ঘুরে দাঁড়িয়েই সে দেখতে পেল আহমদ মুসাকে।
কিন্তু সে তার রিভলভার আহমদ মুসার দিকে ঘুরিয়ে নেবার আগেই আহমদ মুসার রিভলভারের গুলি তার ডান হাতে বিদ্ধ হলো। রিভলভার ছিটকে পড়ল তার হাত থেকে।
হাত চেপে ধরে দৌড় দিল লোকটি পালাবার জন্যে।
এবার আহমদ মুসা তার পায়ে গুলি করল। তাকে জীবন্ত হাতে পেতে চায় আহমদ মুসা। এ পর্যন্ত ‘সোহা’ কিংবা ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’- এর কাউকেই জীবন্ত ধরা যায়নি।
পায়ে গুলি খেয়ে পড়ে গেল লোকট।
আহমদ মুসা ছুটল তার দিকে।
লোকটি পেছন ফিরে আহমদ মুসাকে একবার দেখল। তারপর গলায় ঝুলানো সোনার চেইনের লকেট মুখে পুরে শুয়ে পড়ল।
আরো জোরে দৌড়াল আহমদ মুসা। কিন্তু কোন ফল হলো না। আহমদ মুসা পৌঁছার আগেই পটাসিয়াম সায়ানাইড বিষ লোকটির জীবন কেড়ে নিয়েছে।
আহমদ মুসা লোকটার কাছে পৌঁছার সাথে সাথে ডিপি খাল্লিকান খাচিপ এবং পুলিশরাও পৌঁছে গেল।
‘স্যার, আপনি ঠিক আছেন তো? এরা পাগল হয়ে উঠেছে। আপনাকে সাবধান হতে হবে স্যার।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
খাল্লিকান খাচিপের কোন কথার জবাব না দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘মি. খাল্লিকান খাচিপ, একেও জীবন্ত ধরা গেল না। এর হাতে পায়ে গুলি করে ভেবেছিলাম জীবন্ত ধরতে পারব, তা হলো না। বুঝা যাচ্ছে, ‘সোহা’দের হার্ডকোর লোক যারা, তারা প্রত্যেকেই কাছে পটাসিয়াম সায়ানাইড রাখে।’
‘সাংঘাতিক ফেরোশাস আর দারুণ কমিটেড এরা দেখছি। এরকম ‘ডু-অর-ডাই’ যাদের নীতি, তাদের সাথে পারা কঠিন। স্যার, এখান থেকে বেরুলে দয়া করে আপনি পুলিশ নিয়ে বেরুবেন। আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা এত উদাসিন জানতে পারলে উপরওয়ালারা আমার চাকুরীই রাখবে না স্যার।’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘উপরওয়ালাদের আমি দেখব মি. খাল্লিকান খাচিপ। আপনি এ লাশসহ আগের দু’টি লাশকে দেখুন, এদের কোন ঠিকানা-পরিচয় বের করা যায় কিনা। আমার জরুরি কাজ আছে এক জায়গায়। আমি সেখানে যাচ্ছি।’
বলে আহমদ মুসা যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল।
মি. খাল্লিকান খাচিপ আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে বাধা দেবার সাহস পেল না। তবু বলল, ‘স্যার, আপনার উইন্ড শিল্ড একেবারে ছাতু হয়ে গেছে। আপনি আমার গাড়ি নিয়ে যান।’
‘পুলিশের গাড়ি নিয়ে গেলে অসুবিধা আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি এখনি একটা প্রাইভেট কার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি স্যার। উইন্ড শিল্ডের ভাঙা কাঁচে আপনার গাড়ির ভেতরটা বসার অযোগ্য হয়ে গেছে।’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
হাসল আহমদ মুসা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সে সময় নেই মি. খাল্লিকান খাচিপ। ইতিমধ্যেই আমার দেরি হয়ে গেছে। ভাববেন না, যুদ্ধ ক্ষেত্রে এর চেয়ে অনেক ভাঙা গাড়ি নিয়ে চলতে হয়। আমরা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে ধরে নিন।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। চলল গাড়ির দিকে।
‘মি নাজিম, একে দেখুন। এর নাম ছাড়া তার কিছুই আমরা জানি না। আমাদের দেশে তার কোন স্বার্থও নেই। কিন্তু দেখুন বার বার মৃত্যুর মুখে পড়লেও আমাদের লড়াই তিনি লড়ে যাচ্ছেন। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মডেল মানুষ আর দ্বিতীয় আছে বলে মনে হয় না। আল্লাহ্ তার ভালো করুন।’ আহমদ মুসাকে দেখিয়ে পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসার নাজিমকে কথাগুলো বলল ডিটি খাল্লিকান খাচিপ।
‘স্যার, এ ধরনের ভালো লোক আছে বলেই পৃথিবীটা এখনও কল্যাণ নিয়ে টিকে আছে। পর্বত প্রমাণ উঁচু স্যার এদের কর্তব্য, কিন্তু এরা নিজেদেরকে সবার চেয়ে ছোট করে দেখে। সেদিন স্যার খানার টেবিলে একটা প্লেট কম পড়েছিল। আমি শেষ প্রান্তে ছিলাম। প্লেট আমি সে কারণেই পাইনি। উনি উঠে এসে তার খানার প্লেটটি আমাকে দিয়ে আমার পরে বসলেন। আমি প্রতিবাদ করার আগেই বললেন, ‘খেয়েই আপনাকে ডিউটিতে দৌড়াতে হবে। আমার সে রকম ডিউটির কোন তাড়া নেই। সুতরাং আমার একটু পরে খেলে ক্ষতি নেই।’ আমার মত একজন পেটি পুলিশ অফিসার আর কোথায় তিনি, যাকে স্বয়ং প্রেসিডেন্টও সমীহ করেন, শ্রদ্ধা করেন। তাঁর এই কাজ আমাকে বড় করেনি বরং আরও বড় করেছে তাঁকেই।’
‘ধন্যবাদ ইন্সপেক্টর মি. নাজিম। আপনি ঠিক চিন্তা করেছেন। আসলেই তিনি ভিন্ন মাপের, ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। এমন মানুষ আমি দেখিনি।’
কথাগুলো বলছিল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ আহমদ মুসার চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে।
তার দু’চোখের শূন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সেদিকে গাড়িটি দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার পরও।
দৃষ্টি তার বাইরে থাকলেও তার অন্তরে চলছে তখন একটা হিসাব-নিকাশ। আবু আহমদ নামের লোকটি তো আমার মত খাল্লিকান খাচিপকেও পাল্টে দিয়েছে। আমি টাকার বিনিময়ে আসামীকে বাদী বানাতাম, আর বাদীকে বানাতাম আসামী। বিচার বিক্রি করতাম টাকার বিনিময়ে। অবশেষে টাকার বিনিময়ে দেশের শত্রুদেরও সাহায্য করতে শুরু করেছিলাম। এই আবু আহমদের নিঃস্বার্থ কাজের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত আমার বিবেককেও জাগিয়ে তুলেছে। সে বিবেকের পাহারায় আমার মত লোকও সেই পাপগুলো করার আর সুযোগ পাচ্ছে না।
পুলিশ অফিসার মি. নাজিম ডিপি খাল্লিকান খাচিপকে আপনার মধ্যে বিভোর হয়ে যেতে দেখে বলল, ‘স্যার, লাশগুলো নিয়ে যেতে হবে।’
চমকে উঠে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন অফিসার।’
‘চলুন।’ বলল পুলিশ অফিসার।
ওদিকে আহমদ মুসার গাড়ি পৌঁছে গেল মাউন্ট আরারাত সেনা ক্যাম্পের বাইরে হাইওয়ের পাশের মাউন্ট মালিক রেস্টুরেন্টে।
রেস্টুরেন্টটির ঠিক বিপরীতে রাস্তার ওপাশের উপত্যকায় রয়েছে বিরাট এক আঙুর বাগান। বাগানের মালিকানা একজন ইহুদি ব্যবসায়ীর। তার নাম মালিক মেরারী মালুস। তার নামের প্রথম শব্দ দিয়ে নামকরণ করা হয়েছে রেস্টুরেন্টটির। মজার ব্যপার হলো তার এই ইহুদি পরিচয় কেউ জানে না। সবাই তাকে মালিক সাহেব বলে জানে। রেস্টুরেন্টের মালিক হবার সুবাদে সেনা অফিসারদের সাথে তার ব্যপক পরিচয়।
আহমদ মুসা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি পার্ক করে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করল। রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে দূরবর্তী কোণের নির্ধারিত টেবিল তখনও খালি। আহমদ মুসা বসল গিয়ে টেবিলটিতে।
দু’মিনিটের মধ্যেই প্যান্ট ও টি-সার্ট পরা একজন তরুণ এসে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে টেবিলে বসার জন্য অনুমতি চাইল।
আহমদ মুসা তরুণটির মুখের দিকে চেয়ে দেখল তার নাকের ডান পাশে সুন্দর কালো একটা আচিল।
এই চিহ্নটার কথাই জেনারেল মেডিন মেসুদ আহমদ মুসাকে জানিয়েছিল।
‘বসুন।’ বলল আহমদ মুসা।
তরুণটি বসে বলল, ‘স্যার, আমি মেজর নাঈম মেহরান। জেনারেল মেডিন মেসুদের নির্দেশে আমি এখানে এসেছি।’
‘জানি। নাস্তার অর্ডার দিয়েছি। নাস্তা খেতে খেতেই কথা হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা কথা শেষ হবার সাথেই নাস্তা এসে গেল।
নাস্তায় কাঁটাচামচ লাগাবার আগেই মেজর নাঈম মেহরান পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘স্যার, এটি পকেটে রাখুন।’
আহমদ মুসা দ্রুত কাগজটি নিয়ে পকেটে পুরে বলল, ‘সবার পরিচয় এসেছে?’
‘সবার সম্ভব হয়নি, তবে অফিসারদের সবার পরিচয় পাওয়া গেছে।’ নাস্তার দিকে মুখ রেখে আস্তে করে বলল মেজর নাঈম মেহরান।
‘কর্নেলের নাম?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘নূহা উপত্যকায় তথাকথিত সেনা অভিযানের নেতৃত্বে যে একজন কর্নেল ছিলেন তার নাম মোস্তফা মিকাহ।’ বলল মেজর নাঈম মেহরান।
নামের শেষ শব্দটা বিস্মিত করল আহমদ মুসাকে। ‘মিকাহ্’ হিব্রু শব্দ। অর্থ ঈশ্বরের মত। এমন একটা হিব্রু নাম কোন মুসলমানের হতে পারে না। আর এই অর্থের নাম তো কোন মুসলমান রাখতেই পারে না। আহমদ মুসা বলল, ‘কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ মুসলমান তো?’
‘অবশ্যই। কেন বলছেন এ কথা?’ বলল মেজর নাঈম মেহরান।
‘তার মা নিশ্চয় ইহুদি কিংবা ইহুদি বংশোদ্ভুত ছিল। তা না হলে কর্নেলের নামে হিব্রু শব্দ এল কী করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ইহুদি মা হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সন্তান তো মুসলমান। তার নামে হিব্রু শব্দ রাখবে কেন? নিশ্চয় ভুল হয়েছে।’ বলল মেজর নাঈম মেহরান।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ভুল নয় মেজর। ইহুদি বংশনীতির বিধান হলো, তাদের মেয়েরা যাদের বা যে ধর্মের লোকের ঘরেই থাক, তাদের গর্ভের ছেলেরা হবে ইহুদি। এমন ছেলেদের তারা ইহুদি হিসাবেই গণনা করে।’
বিস্ময় ফুটে উঠল মেজর নাঈম মেহরানের চোখে মুখে। বলল, ‘তাহলে কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ ইহুদি?’
দু’জনেই মুখ নিচু করে খেতে খেতে কথা বলছিল।
আহমদ মুসা মেজর নাঈমের কথার কোন উত্তর না দিয়ে মুখ তুলল।
মুখ তুলে মাথাটা সোজা করতেই তার চোখ সোজাসুজি গিয়ে পড়ল কাউন্টারের এক পাশে বিশাল চেয়ারে বসে থাকা একজন সুদর্শন সুবেশধারী ভদ্রলোকের উপর। লোকটি তার দিকেই তাকিয়েছিল। আহমদ মুসার সাথে চোখাচোখি হতেই লোকটি চমকে উঠে তার চোখ সরিয়ে নিল। লোকটির হাতে মোবাইল এবং তার সামনে একটা কম্পিউটার। আহমদ মুসা কিন্তু চোখ সরিয়ে নেয়নি।
তার চোখে বিস্ময়, মনে প্রশ্ন। লোকটি তার দিকে তাকিয়ে ছিল কেন? অবশ্য তার উপর হঠাৎ চোখ পড়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সে চমকে উঠল কেন? এই চমকে ওঠার অর্থ হলো, ধরা পড়ার ভয়। কিন্তু সে কী করছিল যে ধরা পড়ার ভয় করবে? তাহলে কি সে আহমদ মুসার সবকিছু ফলো করছিল? কিভাবে? কোন প্রশ্নেরই আহমদ মুসার কাছে জবাব নেই।
আহমদ মুসা দেখল লোকটি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এর পরও তার চোখের একটা কোণ যেন আহমদ মুসার পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে।
আহমদ মুসা মুখ নিচু করল। বলল খেতে খেতে, ‘আমাদের এই রেস্টুরেন্টের মালিককে কতটুকু চেনেন?’
‘কেন, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, সফল ফার্মমালিক।’ বলল মেজর নাঈম মেহরান।
‘আমি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি মেজর।’ আহমদ মুসা বলল।
‘উনি একদমই রাজনীতি বিমুখ। রেস্টুরেন্টে কোন রাজনৈতিক আলোচনাও তিনি এলাও করেন না।’
‘চলুন, তাহলে এবার উঠি।’ বলেই আহমদ মুসা নাস্তার বিল টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল না মেজর নাঈম মেহরান।
সে বসে বসে ঠাণ্ডা পানিতে একটু করে চুমুক দিচ্ছিল। বলল সে, ‘স্যার, আপনি যান। আমি পরে যাব।’
‘ও ঠিক আছে। সেটাই ভালো।’ বলে আহমদ মুসা রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে পা বাড়াল।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে কয়েক ধাপ এগিয়েছে আহমদ মুসা এমন সময় তার পাশে এসে একটি গাড়ি হার্ড ব্রেক করল।
গাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে নামল একজন সেনা অফিসার। তার ইউনিফর্মের শোল্ডাল ব্রান্ডে একজন কর্নেলের ইনসিগনিয়া।
সে গাড়ি থেকে নেমেই মুখোমুখি হলো আহমদ মুসার।
কর্নেল দ্রুত তার পকেট থেকে রাভলভার বের করে তার নল আহমদ মুসার কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘ইউ আর আন্ডার এ্যারেস্ট।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ আমার অপরাধ কী?’
‘জানতে পারবেন।’ বলল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্।
‘আমি জানি আমার অপরাধ। আমি আপনাকে এবং মালিক মেরারী মালুসকে জেনে ফেলেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
কথাটা শুনে চমকে উঠেছিল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্। তার হাতটাও কেঁপে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা তার এই মেকি অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করল। বিদ্যুৎ বেগে তার বাম হাতটা উঠে গিয়ে কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র রিভলভার ধরা হাত এক ধাক্কায় উপরে ঠেলে দিল। একটা গুলিও রিভলভার থেকে বেরুল, কিন্তু তা মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।
কিন্তু তার পরেই দৃশ্যপট পাল্টে গেল। আহমদ মুসার ডান হাত বাম হাতের সাথেই উপরে উঠে গিয়েছিল। রিভলভার থেকে গুলি বেরুবার সাথে সাথেই আহমদ মুসার ডান হাত কর্নেলের হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিল। আহমদ মুসা রিভলভার কেড়ে নিয়েই পচণ্ড একটা আঘাত করল কর্নেলের মাথায় রিভলভারের বাঁট দিয়ে।
মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল কর্নেল। আহমদ মুসা তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে কর্নেলের গাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে ড্রাইভিং সীটে গিয়ে বসল।
গাড়ি স্টার্ট নিয়ে দ্রুত চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসা যখন কর্নেলকে রিভলভারের বাঁট দিয়ে মেরে তার সংজ্ঞাহীন দেহ গাড়িতে তুলছিল, তখন রেস্টুরেন্টের মালিক মি. মালিক মেরারী মালুস রেস্টুরেন্টের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। ভয়ংকর বিস্ময় আর উদ্বেগে তার মুখ চুপসে গেছে।
সব ঘটনা মেজর নাঈম মেহরানও দেখতে পেয়েছিল। সেও উদ্বেগ নিয়ে ছুটে এসেছিল। কিন্তু আহমদ মুসার গাড়ি ততক্ষণে রেস্টুরেন্ট এলাকার বাইরে চলে গেছে। দাঁড়িয়ে পড়েছিল মেজর নাঈম মেহরান। এ ঘটনায় সে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। তবে সে ভাবল, জনাব আবু আহমদ উপরের লোক। তিনি যাই করুন ভেবে চিন্তেই করবেন। সব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে মেজর নাঈম ধীরে ধীরে গিয়ে তার গাড়িতে উঠল।
ওদিকে আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন একজন আস্ত কর্নেলকে পাঁজাকোলা করে তার কক্ষে আহমদ মুসাকে ঢুকতে দেখে আঁতকে উঠল সে। বলল, ‘এই তো গেলেন, কোথায় পেলেন একে?’
‘এ সেই কর্নেল যার ইউনিফর্ম পরে সেদিন ‘আর্ক অব নূহা’ উপত্যকায় শহীদ হয়েছিল একজন ভূয়া কর্নেল।’ আহমদ মুসা বলল।
বুঝল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ। বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার, আপনি অনেকটা অগ্রসর হয়েছেন।’
‘আসল কাজটাই হয়নি। আপনি আমাকে সাহায্য করুন। এর কাছ থেকে অনেক কথা বের করতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অবশ্যই স্যার।’ বলল খাল্লিকান খাচিপ।
ঘরের মেঝেয় শুইয়ে দিয়েছিল কর্নেল মোস্তফা মিকাহকে।
‘সংজ্ঞা ফিরতে কত সময় লাগে কে জানে?’ স্বগত উক্তি করল খাল্লিকান খাচিপ।
‘সংজ্ঞা ফিরেছে মি. খাল্লিকান খাচিপ। ও এখন সংজ্ঞাহীনতার ভান করছে।’ বলেই আহমদ মুসা পকেট থেকে কলম নিয়ে এর নিবের তীক্ষ্ণ মাথা দিয়ে জোরে খোঁচা দিল কর্নেলের পায়ে।
কর্নেলের গোট দেহ স্প্রি-এর মত নেচে উঠল।
‘আর নাটক না করে উঠে বসুন কর্নেল।’ আহমদ মুসা বলল।
এই সাথে একটা চেয়ারও এগিয়ে দিল আহমদ মুসা কর্নেলের দিকে।
কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ উঠে চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘আপনার এই সাংঘাতিক আচরণের মাশূল আপনাকে দিতে হবে। আমি একজন সেনা অফিসার, মনে রাখবেন।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ তো সেদিন ‘আর্ক অব নূহা’ উত্যকায় নিহত হয়েছেন। লাশের ছবিও আমরা দেখাতে পারি। মি. খাল্লিকান খাচিপ ছবিটা তাকে দেখান তো প্লিজ।’
খাল্লিকান খাচিপ ড্রয়ার থেকে একটা ছবি বের করে কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র চোখের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘দেখুন কর্নেল মোস্তফার নাম, নাম্বার সবই এখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।’
মুখ চুপসে গেল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র।
আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘আপনি ‘সোহা’ ও ‘হোলি আর্ক গ্রুপ’-এর সাথে কতদিন থেকে আছেন?’
‘কী বলছেন আপনি? ঐ ধরনের কোন দলকে আমি চিনি না।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলভার হাতে নিয়ে বলল, ‘দেখুন কর্নেল, আমরা গল্প-গুজব করতে বসিনি। এক কথা আমি দু’বার বলব না।’
থামল আহমদ মুসা। পকেট থেকে এক খণ্ড কাগজ বের করল। ভাঁজ করা কাগজটি খুলল সে। কাগজটি মেলে ধরল সে কর্নেলের সামনে। বলল, ‘এই কাগজটি আমি হোলি আর্ক গ্রুপের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতার পকেট থেকে পেয়েছি। কাগজটি সাদা কাগজের একট শীট। কাগজে মার্ক ডিটেকটর ক্যামিকেল ছিটাবার পর এটা একটা নকশায় পরিণত হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে পূর্ব আনাতোলিয়ার আর্মেনিয়া সংলগ্ন তিনটি প্রদেশ এবং ছোট-বড় সবগুলো শহরের লোকেশন আছে। সেই সাথে রেড ডট। ২টি থেকে ৫টি পর্যন্ত ডট রয়েছে বিভিন্ন শহরে। আমি জানতে চাই কর্নেল, এই রেড ডটগুলোর অর্থ কী?’
‘বিশ্বাস করুন স্যার, এ ধরনের কাগজ আমি এই প্রথম দেখলাম। আমি জানি না এর অর্থ কী?’ বলল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্।
আহমদ মুসা তার রিভলভার তুলে একটা গুলি করল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ-কে লক্ষ্য করে। গুলিটা তার কানের উপরের অংশের কিছুটা ছিঁড়ে নিয়ে মাথা ও কানের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
ভীষণ আঁৎকে উঠে হাত দিয়ে কান চেপে ধরল কর্নেল মোস্তফা মাকাহ্। ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে গেছে তার মুখ।
‘এগুলিটা আমি আপনাকে সাবধান করে দেবার জন্যে করেছি, দ্বিতীয় গুলিটা কিন্তু আপনার মাথা গুঁড়ো করে দেবে।’ আহমদ মুসা বলল।
ভীত কর্নেল তার বিহবল চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘বলছি স্যার। একটা বড় কিছুর পরিকল্পনা হয়েছে স্যার, কিন্তু আমাদের এখনও জানানো হয়নি। বলা হয়েছে, আজ জানানো হবে।’ থামল কর্নেল মোস্তফা।
‘কে জানাবে, কোথায় জানাবে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ইজদিরের হোলি আরারাত হোটেলে আজ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় একজনের সাথে দেখা হওয়ার কথা। সেখানেই কর্মসূচী আমাদের জানানো হবে বলা হয়েছে। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না।’ বলল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্।
‘সেই একজন কে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সেটা আমাদের বলা হয়নি স্যার। শুধু আমাদের জানানো হয়েছে হোটেলটির তিন তলায় প্যারাডাইজ অডিটোরিয়ামে গিয়ে বসতে হবে। এটুকুই নির্দেশ ছিল আমার উপর।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘আর কারও কি ওখানে যাবার কথা ছিল?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এবার কী ব্যবস্থা হয়েছে জানি না স্যার। তবে এর আগে সব কথা, সব ব্রিফিং একাধিক লোককে নিয়ে হয়নি।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘আচ্ছা কর্নেল, রেস্টুরেন্টে আমাকে আক্রমণের জন্যে কে আপনাকে বলেছিল?’ আহমদ মুসা বলল।
কর্নেল মোস্তফা একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘মাউন্ট মালিক রেস্টুরেন্টের মালিক মেরারী মালুস।’
‘কী বলেছিলেন তিনি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘স্যার, আমার রেস্টুরেন্টের একটা টেবিলে আপনাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মেজর নাঈম একটা তালিকা দিয়েছেন একজনকে। তার মধ্যে আপনার নাম আছে। আমার মত হচ্ছে আর্ক অব নূহা উপত্যকায় যাদের ইউনিফর্ম পাওয়া গেছে, তাদের তালিকা। মেজর নাঈমকে পরে দেখবেন। কিন্তু তার সাথের লোকটাকে যেতে দিলে আপনার বিপদ হবে স্যার। তার মূল কথা এটাই ছিল।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘রেস্টুরেন্ট মালিক এসব কথা জানলেন কী করে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘আমি এটা জানি না স্যার। তিনি তো আমাকে আপনার ফটোও দেখিয়েছেন কম্পিউটারের মাধ্যমে। তা না হলে তো আমি আপনাকে চিনতেই পারতাম না।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
ভ্রূকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। তার মানে রেস্টুরেন্টের প্রত্যেক টেবিলের উপর ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার নজর রয়েছে প্রতি টেবিলে ট্রান্সমিটার যার মাধ্যমে শব্দ মনিটর করা হয়। একজন রেস্টুরেন্ট মালিক এই ব্যবস্থা করেছেন কেন। কিন্তু এ-নিয়ে চিন্তা করতে চাইল না আহমদ মুসা। কর্নেল মোস্তফাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘দেশের প্রতি ভালোবাসা কি আপনার মধ্যে অবশিষ্ট আছে কর্নেল মোস্তফা?’
মুখ নিচু করল কর্নেল মোস্তফা। দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল সে।
বলল, ‘দেশকে আমি ভালোবাসি স্যার। কিন্তু আমি বিপদে পড়েছি। আমার উপর আমার মা’র নির্দেশ হলো, আমি যেন সোহা’র মেহরান মুসেগ মাসিস যা বলবেন তাকে মায়ের নির্দেশ বলে মনে করি। আমি যা কিছু করেছি তা এই দায় থেকেই করেছি। আমি দেশকে ভালোবাসি স্যার।’
‘আমার একটা কথা কি আজ শুনবেন?’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ তুলে তাকাল কর্নেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘অবশ্যই স্যার। আপনি নির্দেশ করুন। আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু আপনি যে শাস্তি আমাকে দিয়েছেন, তা আমার প্রাপ্য ছিল।’
‘আজ সন্ধ্যায় আপনি ইজদিরের হোলি মাউন্ট আরারাত হোটেলে যাবেন। কি কর্মসূচি দেয় সেটা নেবেন। সে কর্মসূচিটি জানা দেশের জন্যে খুব বেশি প্রয়োজন। আমিও সেখানে আপনার আশে-পাশেই থাকব। আপনি হোটেল থেকে বেরিয়ে বিপরীত দিকের সিনাগগের পাশেই থাকব। আপনি হোটেল থেকে বেরিয়ে বিপরীত দিকের সিনাগগের পাশে রাস্তার কিনারে আপনার গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন পরীক্ষা করতে শুরু করবেন। এসময় পেছন দিক থেকে একটা লাল গাড়ি আসবে। আপনি সেই গাড়িটাকে ফলো করবেন।’ থামল আহমদ মুসা।
একটু থেমেই আবার বলল, ‘আমি আপনাকে ধরে নিয়ে এসেছিলাম, এই ব্যপারে কেউ জানতে চাইলে আপনি এ কথা বলবেন: আপনি আমাকে গুলি করতে গিয়েছিলেন, এই জন্যেই আমি আপনাকে ধরে এনেছিলাম। পরে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সবকিছুর সুরাহা হয়েছে। আর আপনি যেহেতু একজন সেনা অফিসার তাই আপনাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
‘ঠিক আছে স্যার, আমি এটাই বলব।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ কর্নেল, হয়তো সন্ধ্যার পরে কোথাও আমাদের দেখা হতে পারে। আমি চলি।’
‘অবশ্যই স্যার। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’ বলল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্।
সবাইকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
‘কর্নেল মি. মোস্তফা আপনি একটু বসুন, আমি ওকে বিদায় দিয়ে আসছি। আমিই আপনাকে পৌঁছে দেব।’
বলে ডিপি খাল্লিকান খাচিপ আহমদ মুসার সাথে বেরিয়ে এল। বলল আহমদ মুসাকে, ‘মি. আবু আহমদ, আপনি কি নিশ্চিত, কর্নেল মোস্তফা আপনার কথা শুনবে? যদি বিষয়টা ফাঁস করে দেয় সে ও-পক্ষকে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘মানুষ চিনতে আমার ভুল না হলে আমি মনে করি তাকে বিশ্বাস করা যায়। সত্যিই সে ইহুদি মায়ের সন্তান। মা তাকে ঐ কাজে বাধ্য করতে পারে।’
‘ধন্যবাদ আবু আহমদ। আপনার কথা সত্যি হোক। তাহলে স্যার আবার দেখা হবে। আস্-সালামু ‘আলাইকুম।’
আহমদ মুসা ‘ওয়া ‘আলাইকুম আস্-সালাম’ বলে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল।

আহমদ মুসা একজন তুর্কি ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ইজদিরের সেই হোলি আরারাত হোটেলের এক পাশের একটা টেবিলে বসে মাঝে মাঝে কফির কাটে চুমুক দিচ্ছে, আর সামনে ছড়ানো কাগজে চোখ রেখে হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। যেন মনোযোগ সহকারে সে তার ব্যবসায়ের কোন একটা জটিল হিসাব মেলাচ্ছে। চোখ দু’টি কাগজের উপর ব্যস্ত দেখা গেলেও রেস্টুরেন্টের দুই গেটের উপর নজরদারী ঠিক রেখেছে।
হাতঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজতে আর ৫ মিনিট বাকি। এখনও দেখা নেই কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র। সে আসার আগেই হোটেলে ঢুকে গেছে তা পারে না। আহমদ মুসা পাশের এক মসজিদে মিগরিবের পড়েই এসে হোটেলে ঢুকেছে। তুরস্কে মাগরিবের নামাযের পরের সময়কেই সন্ধ্যা বলে। সন্ধ্যাতেই কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র হোটেলে আসার কথা। সুতরাং সে সন্ধ্যার আগে হোটেলে আসেনি এটা নিশ্চিত।
সে হোটেলে ঢোকার আগেই হোটেলের চারদিকটা দেখে নিয়েছে, হোটেলে ঢোকার ও বেরুবার তৃতীয় কোন গেট নেই। তার সামনের দুই গেট দিয়ে ঢুকে কাউন্টারের ভেতরের প্রান্তের পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’কে নিশ্চয় তিন তলায় উঠতে হলে এই সিঁড়ি দিয়েই উঠতে হবে।
সাড়ে সাতটা বাজল। তার আরও কয়েক মিনিট পরে আহমদ মুসা দেখতে পেল, কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ হোটেলে প্রবেশ করল। তার পরনে কালো ট্রাউজারের উপর কালো জ্যাকেট, মাথায় একট ইংলিশ কালো হ্যাট।
আহমদ মুসা দেখল, কর্নেল মোস্তফা কাউন্টারে কিছু বলল, তারপর সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।
আহমদ মুসা ভাবল, উপরে কর্নেলের কতটা সময় লাগতে পারে। নিশ্চয় আধাঘন্টার বেশি নয়।
কিন্তু বিশ মিনিট পরেই কর্নেল উপর থেকে নেমে এল। তার মুখটা বিষণ্ন।
আহমদ মুসা ইতমধ্যেই হিসাবের কাগজপত্র গুটিয়ে নিয়ে নাস্তা করছিল।
কর্নেল মোস্তফা বেরিয়ে গেল হোটেল থেকে।
আরও মিনিট দুয়েক পরে আহমদ মুসার নাস্তা শেষ হলো।
সব বিল চুকিয়ে আহমদ মুসাও বেরিয়ে এল হোটেল থেকে। আহমদ মুসা তার লাল গাড়ি নিয়ে এগোচ্ছিল। সিনাগগের কাছাকাছি পৌঁছে দেখল রাস্তার কেনারে একটা গাড়ি দাঁড় করানো রয়েছে। গাড়িটার ফ্রন্ট টপ তুলে একজন গাড়ির ইঞ্জিন পরীক্ষা করছে। আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো রোকটি কর্নেল মোস্তফাই।
আহমদ মুসা একবার হর্ন বাজিয়ে কর্নেল মোস্তফার গাড়ির পাশ দিয়ে সামনে এগোলো।
সিনাগগের এলাকা পার হবার আগেই দেখল কর্নেল মোস্তফার গাড়ি তার পেছনে চলতে শুরু করেছে।
ইজদির শহর পেরিয়ে আরও মাইল দশেক চলার পর একটা সরাইখানায় গাড়ি দাঁড় করাল আহমদ মুসা।
কর্নেল মোস্তফার গাড়িও দাঁড়াল।
আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়ে আর কোন গাড়ি দেখল না। কেউ তাদের ফলো করেনি, নিশ্চিত হলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা সরাইখানার দিকে এগোলো।
কর্নেল মোস্তফাও।
আহমদ মুসা সরাইখানার রেস্টুরেন্টে না ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল বিশ্রাম কক্ষে যাবার জন্যে।
তুরস্কে সরাইখানার বিশ্রাম কক্ষ দুই ধরনের। এক ধরনের আছে ফ্রী। এখানে যে কেউ বিনা পয়সায় তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারে।
আরেক ধরনের আছে যার জন্যে ডোনেশন পে করতে হয়। যে রুম সে চায় তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ একটা ডোনেশন পে করলেই চাবি বেরিয়ে আসে। সে চাবি দিয়ে ঘর খুলে তিন দিন সে কক্ষে থাকা যায়।
আহমদ মুসা ডোনেশন পে করে একটা কক্ষে প্রবেশ করল। পেছন পেছন আসা কর্নেলকে ডেকে নিল।
কর্নেল ভেতরে প্রবেশ করেই বলল, ‘স্যার, খবর ভালো নয়।’
‘ভলো নয়, তা আপনার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি। বলুন খারাপ খবরটা কী?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
স্যার, কেউ আসেনি। কারও সাথেই দেখা হয়নি। কিছুক্ষণ বসার পর একটা টেলিফোন পাই। টেলিফোনটি আমার চেয়ারের পাশেই টিপয়ে রাখা ছিল। টেলিফোনে একজন বলে: ‘আপনার সামনে মঞ্চের টেবিলে একটা মেসেজ আছে নিয়ে যান।’ আমি গিয়ে মেসেজটা নেই।’
বলে কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ এক টুকরো কাগজ তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসা চোখ বুলাল কাগজের টুকরোটির উপর। তাতে লিখা: ‘কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।’
ভ্রূ-কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘কর্নেল, আমার ওখান থেকে মানে পুলিশ স্টেশন থেকে আসার পর আপনার কার কার সাথে দেখা বা কথা হয়েছে, আপনার বাড়ির লোকরা ছাড়া?’
কর্নেল একটু ভাবল। বলল, ‘আমি বাসা থেকে বের হইনি। অফিস থেকে ১২ ঘন্টার ছুটিতে আছি। বাইরের কারও সাথে দেখা বা কথা হয়নি। শুধু একবার টেলিফোন করেছিলেন মাউন্ট মালিক রেস্টুরেন্টে’র ওমার।’
আনন্দ প্রকাশ পেল আহমদ মুসার চোখে মুখে। বলল দ্রুতকণ্ঠে, ‘কী বলেছিলেন তিনি?’
‘তিনি বলেছিলেন, আপনার কোন যে বিপদ হয়নি, এজন্যে আল্লাহ্’র হাজার শোকর। আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, খবরা-খবর‌ও নিয়েছি। ঐ লোকরা মনে হচ্ছে বিপজ্জনক। ছেড়ে দেয়ার মধ্যে কোন কৌশল থাকতে পারে। আমি মনে করি, আপনি কয়েকদিনের ছুটিতে যান। আমি তাকে বলেছিলাম, ঠিক আছে দেখছি আমি।’ কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ বলল।
‘উনি আপনাকে এধরনের পরামর্শ দিলেন কেন? তাঁর সাথে আপনার আর কোন সম্পর্ক আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘না, নেই। এমনিতেই উনি সাংঘাতিক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের ব্যাপারে তিনি অনেক খবর রাখেন। সরকারের নানা রকম এজেন্সি আছে, কোন এজেন্সির সাথে তিনি আছেন কিনা জানি না।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘আপনি যদি শোনেন, তার রেস্টুরেন্টের প্রতিটি টেবিলেই শর্ট সার্কিট ক্যামেরার নজরদারী আছে এবং প্রতি টেবিলের কথা শোনার জন্যে ট্রান্সমিটার বসানো আছে, তাহলে কি বিশ্বাস করবেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
বিস্ময় ফুটে উঠল কর্নেল মোস্তফার চোখে মুখে। বলল, ‘বিশ্বাস করব স্যার। কারণ আমার ব্যাপারে আপনাদের আলোচনা কিভাবে সে শুনল এবং আপনার ফটো কিভাবে সে আমার ই-মেইলে পাঠাল, এই প্রশ্নগুলোর সমাধান হয় আপনার কথা বিশ্বাস করলেই।’
‘রেস্টুরেন্টটির মালিক মানে মি. মালিক মেরারী মালুস কোথায় থাকেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমি সেটা জানি না, স্যার।’ মাঝে মাঝে উনি রেস্টুরেন্টের উপর তলায় থাকেন দেখেছি।’ বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘এখন তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
একটু ভাবল কর্নেল মোস্তফা। বলল, ‘রাত ১১টায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়, তার আগে একবার তিনি রেস্টুরেন্টে আসেন। আমার মনে হয় এখন রেস্টুরেন্টেই পাওয়া যাবে তাকে।’
‘আপনি আমার সাথে থাকবেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোথায় কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা কর্নেল মোস্তফার।
‘আমি মি. মালিক মেরারী মালুসকে কিডন্যাপ করতে চাই। আপনি আমার সাথে থাকবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা কর্নেল মোস্তফাকে সাথে রাখতে চায়, কারণ তার মিশন ফেল হওয়ার কোন অবকাশই সে রাখতে চায় না। কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্-কে আহমদ মুসা বিশ্বাস করে, কিন্তু তবু সামান্য ঝুঁকিও সে নিতে চায় না। এজন্যেই সে কর্নেল মোস্তফাকে সাথে রাখতে চায় যাতে রেস্টুরেন্টের কর্তা মি. মালিক বিষয়টি জানার কোন সুযোগই যেন না পায়।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই কর্নেল মোস্তফা বলল, ‘আপনি সাথে রাখলে আমি গৌরব বোধ করব স্যার।’
আহমদ মুসা তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। বলল, ‘ধন্যবাদ।’
দু’জনেই সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এল।
কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্ তার গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তাকে বলল, ‘ও গাড়িতে নয়। আমার গাড়িতে আসুন। ও গাড়ি ওখানেই থাকবে।’
বলে আহমদ মুসা তার গাড়ির ড্রাইভিং সীটে উঠে বসল। পাশে উঠে বসল কর্নেল মোস্তফা।
ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলল গাড়ি। রাত দশটায় মাউন্ট মালিক রেস্টুরেন্টের সামনে এসে পৌঁছল গাড়ি।
আহমদ মুসা গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নামার আগে কর্নেল মোস্তফার দিকে চেয়ে বলল, ‘কর্নেল, আপনাকে বিষণ্ন দেখাচ্ছে টেলিফোনটি পাওয়ার পর থেকেই। টেলিফোন কার ছিল?’
কর্নেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘স্যার, আমার মায়ের টেলিফোন।’
‘ও, আচ্ছা।’ বলে আর একবার ভালো করে তাকাল কর্নেল মোস্তফার দিকে।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল। নামল কর্নেল মোস্তফাও।
আহমদ মুসা জ্যাকেটের পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে এগোলো রেস্টুরেন্টের দিকে। রেস্টুরেন্টের গেটে ছিল একজন নিরাপত্তা প্রহরী।
‘মালিক সাহেব কি রেস্টুরেন্টে আছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আছেন স্যার।’ উত্তর দিল নিরাপত্তার জন্যে দরজায় দাঁড়ানো লোকটি।
আহমদ মুসা পেছন ফিরে তাকিয়ে কর্নেল মোস্তফাকে বলল, ‘আপনি দরজায় দাঁড়ান।’
বলেই আহমদ মুসা রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেল। রেস্টুরেন্টে খদ্দের তেমন নেই। আর্মি ক্যাম্পের খদ্দের এ সময় থাকে না।
ক্যাশ কাউন্টারে কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন মি. মালিক মেরারী মালুস। তার গায়ে আগের মতই লাল জ্যাকেট এবং লাল ফেজ ধরনের টুপি। টুপিটা একটু বিশেষ ধরনের। টুপির বেজটা ইলাস্টিক। এই ইলাস্টিক মাথাকে কামড়ে ধরে রাখে। আর পরনে তার ধবধবে সাদা ট্রাউজার।
আহমদ মুসা কাউন্টারের মাঝ পথে যেতেই মালিক মেরারী মালুস তাকে দেখতে পেয়েছে। সংগে সংগেই সে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে রিভলভার। উঠে দাঁড়িয়েই সে গুলি করেছে আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়েই প্রবেশ করেছিল। মালিক মেরারী মালুস রিভলভার নিয়ে উঠে দাঁড়াবার সাথে-সাথেই আহমদ মুসার হাত বেরিয়ে এসেছিল পকেট থেকে রিভলভার সমেত।
মালিক মেরারী মালুসের হাত টার্গেটে উঠে আসার আগেই উঠে গিয়েছিল আহমদ মুসার হাত। কিন্তু আহমদ মুসা মারতে চায়নি মালিক মেরারী মালুসকে। তাই আহমদ মুসা মুহূর্তকাল অপেক্ষা করেছিল মালিক মেরারী মালুসের হাত উপরে উঠে আসার জন্যে।
মালিক মেরারী মালুসের হাত টার্গেটে উঠে এসে স্থির হবার সংগে সংগেই আহমদ মুসা ট্রিগার টিপেছিল।
আহমদ মুসার রিভলভারের গুলি যখন মালিক মেরারী মালুসের হাতে আঘাত করল। তখন তার তর্জনিও চেপে বসেছিল রিভলভারের ট্রিগারে। হাতটা তার কেঁপে গিয়েছিল। তার রিভলভার থেকে গুলি ঠিকই বেরুল, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে আঘাত করল রেস্টুরেন্টের গেটে দাঁড়ানো একজন নিরাপত্তা কর্মীকে।
অদ্ভুত নার্ভের অধিকারী মালিক মেরারী মালুস রিভলভার ছেড়ে দেয়নি হাত আহত হলেও। তার বাম হাত দ্রুত এসে আহত ডান হাত থেকে রিভলভার নিয়ে দ্বিতীয় গুলি করতে যাচ্ছিল আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসা মালিক মেরারী মালুসের বাম হাতের জন্যে অপেক্ষা করছিল। কারণ মালিক মেরারী মালুসদের জীবন্ত ধরতে হলে তাদের দুই হাত অকেজো করে তাদের পটাসিয়াম সায়ানাইড খাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে, এটা আহমদ মুসা ঠেকে ঠেকে বুঝেছে।
আহমদ মুসার দ্বিতীয় গুলিটা মালিক মেরারী মালুসের হাতের আঙুলগুলো গুঁড়ো করে দিয়ে হাতে ঢুকে গেল।
এবার রিভলভার পড়ে গেল তার হাত থকে।
এই সময়ই একটা গুলি এসে লাগল আহমদ মুসার হাতে। গুলিটা আহমদ মুসার কনুইয়ের নিচ থেকে চামড়া চিরে কব্জির কিছু অংশ ছিঁড়ে নিয়ে গেল।
তবুও আহমদ মুসার হাত থেকে রিভলভারে পড়ল না। তবে হাতটা নেমে গেল নিচে।
আহমদ মুসার মনোযোগ তখন এদিকে নয়, তার মনোযোগের লক্ষ্য নিবদ্ধ পেছন থেকে আসা গুলির শব্দের উৎসের প্রতি। বিদ্যুত বেগে আহমদ মুসার বাম হাত রিভলভার সমেত পকেট থেকে উঠে এসে ডান কাঁধের উপর দিয়ে শব্দের উৎস লক্ষ্যে আঘাত করল।
পেছন থেকে আসা গুলির শব্দের রেশ বাতাসে মেলাবার আগেই আহমদ মুসার গুলি নিক্ষিপ্ত হলো।
গুলি করেই ফিরে তাকাল আহমদ মুসা। দেখল, মাটিতে পড়ে বুক চেপে ধরে কাতরাচ্ছে কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্।
বিস্মিত আহমদ মুসা কর্নেলের দিকে যাবার জন্যে পা বাড়াবার আগেই গেছনে ফিরে কাউন্টারের দিকে তাকাল। দেখল, মালিক মেরারী মালুস আহত। ঝুলন্ত দুই হাত নিয়ে দৌড়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।
‘উপর দিয়ে পালাবার কোন পথ তাদের আছে?’ প্রশ্নটা মাথায় আসতেই আহমদ মুসা তার পালানো বন্ধ করার জন্যে তার দুই পায়ে দু’টি গুলি করল।
মালিক মেরারী সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা চারিদিকে চাইল। দেখল, কাউন্টারের ক্যাশিয়ার, রেস্টুরেন্টের বয়-বেয়ারা এবং কয়েকজন খদ্দের পাথরের মত বসে আছে। ভীত সন্ত্রস্ত তাদের চেহারা।
‘যে যেখানে আছেন আপনারা সেখানেই বসে থাকবেন, কেউ অন্যথা করলে তার অবস্থা মালিক মেরারীর মত হবে।’
বলে আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে মালিক মেরারী মালুসের কম্পিউটার থেকে হার্ড ডিস্কটা বের করে নিয়ে পকেটে পুরে মালিক মেরারী মালুসকে পাঁজকোলা করে নিয়ে রেস্টুরেন্টের গেটে এসে তাকে রেখে গিয়ে বসল কর্নেল মোস্তফা মিকাহ্’র কাছে। কর্নেল মোস্তফা কাতরাচ্ছে তখনও। তবে জীবনী শক্তি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
আহমদ মুসা তার পাশে বসে তার মাথা তুলে নিয়ে বলল, ‘আপনি এটা করলেন কেন? আমি সত্যিই আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম।’
‘ওদের সহযোগিতার জন্য আমার মায়ের নির্দেশ আমি পালন করেছি স্যার। জানি না, মা বড় না দেশ বড়। হয়তো দেশই বড়, কিন্তু মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, পালন করেছেন। তাঁর নির্দেশ আমি ফেলতে পারিনি স্যার।’
বলে একটা ঢোক গিলেই আবার ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘স্যার, আমি দেশকেও ভালোবাসি। সেকারণেই আমি আপনাকে মারতে চাইনি। হাতে গুলি করেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম মি. মালিক পালাতে পারুক।’
এরই মধ্যে পুলিশের গাড়ি এসে গেল। সামনের গাড়ি থেকে ডিপি খাল্লিকান খাচিপ নামল।
খাল্লিকান আহমদ মুসার দিকে ছুটে আসতে আসতে বলল, ‘আপনি ঠিক আছেন স্যার?’
‘ভালো, মি. খাল্লিকান, আপনি এখুনি কর্নেলকে হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করুন। আর মি. মালিক মেরারী মালুসকে পুলিশ অফিসে নিয়ে চলুন, আর সেখানে একজন ডাক্তারকে ডাকুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আমি মরতে চাই। বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহী হয়ে বাঁচতে চাই না। আমাকে দয়া করে হাসপাতালে নেবেন না।’ ক্ষীণ স্বরে আকুতিমাখা কণ্ঠে বলল কর্নেল মোস্তফা।
‘আপনার বিচার আপনি করবেন না কর্নেল। আপনার অসহায় অবস্থার কথা আমি জানি। ঐ রকম মা হলে যে কোন কারো বিপদ আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
দু’জন পুলিশ এসে ধরাধরি করে কর্নেল মোস্তফাকে গাড়িতে তুলল।
মালিক মেরারী মালুসকে আহমদ মুসা নিজের গাড়িতে নিল।
দু’টি গাড়ি হাসপাতালের দিকে আর অবশিষ্ট গাড়ি চলল পুলিশ অফিসের দিকে। কিছু পুলিশ থাকল রেস্টুরেন্টের পাহারায়।
পুলিশ অফিসে পৌঁছে আহমদ মুসা ডাক্তারকে বলল, ‘মি. মালিক আপনার হেফাজতে থাকবেন এক ঘন্টা। এ সময় আমি আপনার ওখানে উপস্থিত থাকবো।’
‘তার দরকার নেই স্যার, দু’জন পুলিশ দেব, তারা পাহারা দেবে।’ বলল খাল্লিকান খাচিপ।
‘না মি. অফিসার। মি. মালিকের মত সম্মানী ব্যক্তির চিকিৎসায় আমি হাজির থাকতে চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ। বলল, ‘আপনার কথাই ঠিক স্যার। পুলিশের সিপাইরা তাঁর সম্মানের জন্যে যথেষ্ট নয়। আমি থাকছি আপনার সাথে।’
ঠিক এক ঘন্টা পরেই ডাক্তার তার কাজ শেষে বেরিয়ে গেল।
মালিক মেরারী মালুসকে ভিন্ন একটা বেডে সরিয়ে দিয়ে অপারেশন টেবিলটি নার্সরা সরিয়ে নিয়ে গেল।
আহমদ মুসা মুখোমুখি হলো মালিক মেরারী মালুসের। ডিপি খাল্লিকান খাচিপ পাশে এসে বসল।
‘মি. মালিক, পুলিশ কিন্তু আপনাকে গ্রেফতার করেনি। সুতরাং আপনি মিসিং একজন মানুষ। এটা করা হয়েছে দুনিয়া থেকে আপনাকে মিসিং করার জন্যে, যদি সত্য কথা না বলেন তবেই।’ আহমদ মুসা বলল।
মালিক মেরারী মালুস ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে থাকল। কোন কথা বলল না।
আহমদ মুসা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে মালিকের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘পূর্ব আনাতোলিয়ার বাভিন্ন শহরে এই লাল ডটগুলোর অর্থ কী, মি. মালিক?’
মালিক মেরারী মালুস কাগজটা দেখে একটু যেন চমকে উঠেছিল। কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। কিছুই বলল না।
জ্বলে উঠল আহমদ মুসার চোখ। কিন্তু পরক্ষণেই ঠাণ্ডা হয়ে গেল তার চেহারা।
আহমদ মুসা তাকাল খাল্লিকান খাচিপের দিকে। বলল, ‘প্লিজ আপনি একটা কম্পিউটার আনতে বলুন এখানে। দেখি মি. মালিক কথা না বললেও তার কম্পিটার কথা বলে কিনা।’
ডিপি খাল্লিকান খাচিপ ইন্টারকমে নির্দেশ দিল কম্পিউটার সেকশন থেকে সেকশনের রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ারকে একটা কম্পিউটার নিয়ে এখানে আসতে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একজন তরুণ কম্পিউটার এনে সেট করল।
খাল্লিকান খাচিপ তরুণকে দেখিয়ে বলল, ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এই ছেলেটি আমাদের কম্পিউটার উইং দেখাশুনা করে। সে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা পকেট থেকে কম্পিউটারের একটা হার্ড ডিস্ক বের করে ছেলেটির হাতে দিয়ে বলল, ‘এই হার্ড ডিস্কটি সেট করে ফাইলগুলো ওপেন করো।’
‘সিওর স্যার!’ বলে তরুণটি কাজে লেগে গেল।
আহমদ মুসা, খল্লিকান খাচিপ, এমনকি মালিক মেরারী মালুসও তাকিয়ে আছে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে। কিছুক্ষণ কাজ করার পর ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, মাত্র তিনটা উইনডো এবং তিনটা ফাইল দেখা যাচ্ছে। একটি ফাইল রেস্টুরেন্টের হিসাব-নিকাশ এবং দৈনন্দিন জমা-খরচ। দ্বিতীয় ফাইল একটি আঙুর বাগানের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিক্রয় বিষয়ক। আর তৃতীয় ফাইলটা বিভিন্ন ব্যাংকের একটা পার্সোনাল একাউন্টের বিবরণী। এছাড়া আর কিছু নেই, সবটাই ফাঁকা।’
‘‘সবটাই ফাঁকা’ না ‘অন্ধকার’?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘স্যরি স্যার, অন্ধকার বলাই এ্যাপ্রোপ্রিয়েট। কারণ অবশিষ্টাংশের কোন দৃশ্যপট আমাদের সামনে নেই।’
‘আচ্ছা বলত, এমন কি হতে পারে যে, এই হার্ড ডিস্কে আরও উইন্ডো আছে, ফাইল আছে, কিন্তু তুমি দেখতে পাচ্ছ না?’ বলল আহমদ মুসা।
‘এমনটা স্বাভাবিক নয় স্যার। গোপন ফাইল থাকলেও তার কোন না কোন একটা নাম পাওয়া যাবে। সে ফাইল খোলা যাবে না, কিন্তু সে ফাইলের নাম বা কোন সংকেত হার্ড ডিস্কে পাওয়া যাবে অবশ্যই।’ ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি বলল।
‘আচ্ছা হার্ড ডিস্কের কোন অংশ ডিজাবল করা যায় কিনা সাময়িক ভাবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার জন্যে একটা প্রোগ্রাম বা ফাইল থাকবে। সে রকম কিছু দেখা যাচ্ছে না।’ বলল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি।
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। ভাবনার একটা ছাপ ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে।
চেয়ারে সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা।
বলল, ‘ইঞ্জিনিয়ার, তুমি কম্পিউটার থেকে ডিস্ক খুলে নাও।’
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা কম্পিউটার থেকে ডিস্ক খুলে নিল।
‘ইঞ্জিনিয়ার, তুমি দেখ ডিস্কের কোন অংশে কোথাও টাচ বাটন আছে কিনা যা অন/অফ- এর কাজে ব্যবহার হতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা তরুণ ইঞ্জিনিয়ারকে লক্ষ্য করে।
অনেকটা সময় ধরে পরীক্ষা করল ডিস্কটিকে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার। এক সময় তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। বলল সে আনন্দের সাথে, ‘ক্যামোফ্লেজড একটা টাচ বাটন পাওয়া গেছে। মনে হয় এটাই সেই বাটন যা আপনি খুঁজছেন।’
‘ধন্যবাদ ইঞ্জিনিয়ার। বাটনটির রং কী ইঞ্জিনিয়ার?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ধুসর।’ বলল ইঞ্জিনিয়ার।
‘ধুসর মানে ডাস্টি, ক্লাউডি। এটা নেতিবাচক শব্দ। অর্থাৎ কোন কিছু বন্ধ বা অফ থাকার ইংগিতবাহী। এখন বাটনটাকে টাচ বা প্রেস করে দেখতো বাটনটা স্বচ্ছ হয়ে উঠে কিনা।’ আহমদ মুসা বলল।
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি বাটনটি টাচ করেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। বলল, ‘স্যার, বাটনটি স্বচ্ছ-ট্রান্সপারেন্ট হয়ে উঠেছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ্। এখন ইঞ্জিনিয়ার তুমি ডিস্কটি আবার কম্পিউটারে সেট করো।’ আহমদ মুসা বলল।
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি হার্ড ডিস্কটি কম্পিউটারে সেট করেই সোৎসাহে বলে উঠল, ‘স্যার, নতুন উইন্ডো ওপেন হয়েছে। উইন্ডোটির নাম স্যার ‘আশার’ (Asher)।’
‘আশার (Asher)? ওটা হিব্রু শব্দ, অর্থ ‘ভাগ্যবান’ বা ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত’।’ আহমদ মুসা বলল।
কিন্তু উইন্ডো ওপেন করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি মন খারাপ করে বলল, ‘উইন্ডো ওপেনের জন্যে কম্পিউটার ‘পাসওয়ার্ড’ চাচ্ছে।’
আহমদ মুসা তাকাল মালিক মেরারী মালুসের দিকে। বলল, ‘তোমার গোপন উইন্ডো আমরা আবিষ্কার করেছি। এখন এর ‘পাসওয়ার্ডটা’ বল।’
মালিক মেরারী আগের মতই নিরব রইল। কম্পিউটারের দিক থেকে চোখটা সে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
আবারও আহমদ মুসার চোখটা জ্বলে উঠল। বলল, ‘তোমাকে কথা বলাতে জানি মি. মালিক। কিন্তু তুমি আহত। একজন আহতের উপর আঘাত করার মত নির্দয় আমরা নই। কিন্তু আহতের আচরণ যদি আগ্রাসী, বেয়াদব বা বিদ্রোহাত্মক হয়ে ওঠে, তাহলে কিন্তু সে আর আহতের মর্যাদা পাবে না।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল খাল্লিকান খাচিপের দিকে। বলল, ‘ভাবুন তো পাসওয়ার্ডটা ওরা কী রাখতে পারে।’
‘বড় কঠিন বিষয় মি. আবু আহমদ। দেখছি মানুষ হিসাবেও ওরা ভীষণ জটিল। আমরা ওকে মুসলমান বলেই জানতাম। তার রেস্টুরেন্ট, বগান সর্বত্রই আরবী ও কুরানিক কোটেশনের ছড়াছড়ি। এখন দেখছি বেটা পাঁড় ইহুদি।’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘আপনারা খেয়াল করেননি অফিসার। ওর নামের ‘মালিক’ শব্দটাই শুধু আরবী। পরবর্তী ‘মেরারী’ ও ‘মালুস’ দুই শব্দই হিব্রু। যাক এবিষয়, এখন আমাদের দরকার আশার ইউন্ডোর ‘পাসওয়ার্ড’।’
বলে আহমদ মুসা চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। কয়েক মুহুর্ত পর চোখ খুলে মালিক মেরারীর দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি উইন্ডো বা ফাইলের নাম রেখেছেন ভাগ্যবান বা আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তাহলে পাসওয়ার্ডটা হয় নিশ্চয় এর সাথে রিলেটেড এবং সেটা নাম বাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আচ্ছা, সে নাম বাচক শব্দ আপনাদের দলের নাম নয় তো!’
বলে তাকাল আহমদ মুসা ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটার দিকে। বলল, ‘তুমি পাসওয়ার্ডের জায়গায় টাইপ কর ‘SOHA-HAG’। এটা ওদের দুই সংগঠনের যৌথ নাম। ক্লিক করে দেখ কী রেজাল্ট আসে।’
ছেলেটি ক্লিক্ করে হতাশ চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, কম্পিউটার রিজেক্ট করছে।’
‘কী আর করা যাবে। ও. কে.।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল মালিকের দিকে। বলল, ‘তোমাদের কাছে আশীর্বাদপ্রাপ্ত কী, আর্মেনিয়া না ইয়েরেভেন? আপনারা বলে থাকেন, বন্যার পানি নেমে গেলে হযরত নূহ আ. ‘কিস্তি’ থেকে প্রথমে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভেনকে দেখতে পান। তাই ইয়েরেভেন আপনাদের কাছে বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট বলেই বিশেষ আনন্দ ও বিজয়ের প্রতীক।’
মালিক মেরারী মেলুসের চোখে-মুখে কোন প্রতিক্রিয়া নেই, তাই দুই চোখও সে বন্ধ রেখেছে।
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। করুণার হাসি। বলল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটাকে, ‘তুমি ইয়েরেভেন টাইপ কর। দেখ কম্পিউটার কী বলে।’
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি ‘ইয়েরেভেন’ টাইপ করে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। কম্পিউটার প্রত্যাখ্যান করেছে।
আহমদ মুসা ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটার মুখ দেখেই বুঝল, তাদের এ চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। বলল, ‘অভিজ্ঞতা তোমার কম ইঞ্জিনিয়ার। তাই উদ্বিগ্ন হচ্ছো। উদ্বেগের কিছু নেই। রক্ত-মাংসের জীবন্ত কম্পিউটার তো আমাদের হাতেই রয়েছে। এ কম্পিউটার থেকে কথা বের করতে ‘পাসওয়ার্ড’ লাগবে না, লাগবে শয়তানদের ঠিক করার যন্ত্র।’
কথা শেষ করেই আবার ফিরল মালিক মেরারীর দিকে। বলল, ‘পূর্ব আনাতোলিয়ায় আপনাদের কাছে সবচেয়ে আশীর্বাদ প্রাপ্ত কী? প্লাবনের পর নূহ আ.- এর কিস্তি নোঙর করেছিল মাউন্ট আরারাতে। এই মাউন্ট আরারাতেই হযরত নূহ আ. পা রেখেছিলেন কিন্তি থেকে নামার পর। আর্মেনিয়া, ইয়েরেভেন নয়, মাউন্ট আরারাতই তাহলে আপনাদের কাছে সবচেয়ে বেশি আশীর্বাদপ্রাপ্ত, পবিত্র স্থান। ও এই কারণে আপনারা আপনাদের গায়ে মাউন্ট আরারাতের উল্কিও পরেন! কথাটা আমার আগে মনে হয়নি কেন!’
আহমদ মুসা একটু থেমে আবার বলে উঠল ‘ইঞ্জিনিয়ার, এবার ‘আরারাত’কে পাসওয়ার্ড বানাও।’
‘স্যার, এটাই কিন্তু লাস্ট অপশন। এবার ব্যর্থ হলে গোপন উইন্ডো দেখা আর হবে না।’ বলল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘চিন্তা নেই, তুরুপের তাস এবার হয়তো পেয়ে গেছি। ভয় করছ কেন, বলেছি তো জীবন্ত কম্পিউটার আমাদের হাতে আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
ওদিকে শুয়ে পড়েছে মালিক মেরারী মালুস। প্রথম বারের মত তাকে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। তার চোখে-মুখে অস্থিরতা।
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি ‘আরারাত’ টাইপ করার পর ক্লিক করেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘আল্লাহু আকবার!’
খাল্লিকান খাচিপও আনন্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল চিৎকার করে, ‘স্যার, আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে মিরাকল মেধার জন্যে আপনাকে আমি নোবেল পুরস্কার দিতাম।’
‘নোবেল নয় আমি বেহেশত পুরস্কার চাই মি. খাচিপ। যাক ইঞ্জিনিয়ার। তুমি শোন, এবার গোপন উইন্ডোর সবগুলো ফাইল ওপেন করো।’
বলে আহমদ মুসা চেয়ার টেনে নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটির পাশে বসল।
প্রথম ফাইলটার নাম দেখে চমকে উঠল আহমদ মুসা। ফাইলটির নাম: ‘সোর্ড অব গড: ফাইনাল সলিউশন।’ ফাইলটার নামের মধ্যেই হিংস্রতার উৎকট গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এই হিংস্রতার টার্গেট কে কিংবা কী?
আহমদ মুসার এই ভাবনার মধ্যেই ফাইলটির প্রথম পাতা খুলে গেল।
প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম, ‘OS: Sword.’
শিরোনামের নিচে পূর্ণ পৃষ্ঠা প্রো-ফর্মায় তৈরী ডিজিটাল স্টেটমেন্টের মত কিছু।
‘এখানেই রাখ, পাতাটা দেখে নেই, কী আছে এতে।’
বলে আহমদ মুসা মনোযোগ দিল প্রো-ফর্মার দিকে।
ভার্টিক্যাল দিক থেকে মাত্র তিনটি কলাম। প্রথম কলাম ‘নাম’, দ্বিতীয় কলাম ‘সোর্ডস’ এবং তৃতীয় কলাম ‘টার্গেট’। নামের ঘরে হোরাইজেন্টালি আঁকা ২৪টি লাইনে এক থেকে ২৪টি নাম্বার সিরিয়ালি বসানো। ‘সোর্ডস’- এর ঘরে নামের ঘরে বসানো প্রতি নাম্বারের বিপরীতে লিখা দুই অথবা তিনটি করে ইংরেজী বর্ণ ক্যাপিটাল লেটারে। আর ‘নাম’ ও ‘সোর্ডস’ বরাবর ‘টার্গেট’- এর ঘরে ডিজিটাল অংশ বসানো হয়েছে ভগ্নাংশের আকারে। যেমন প্রথম নাম নাম্বার ‘১’ এরপর ‘সোর্ডস’- এর ঘরে লিখা ‘২’। তারপরেই টার্গেট এর ঘরে লিখা ১০০০- এর উপরে পঁচিশ অর্থাৎ পঁচিশ বাই এক হাজার। টার্গেটের ২৪টি ঘরে কোথাও ১০ বাই ৫০০, কোথাও ১০০ বাই ৫০০০, ইত্যাদি লিখা।
আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, এটা একটা পরিকল্পনা, ধাঁধাঁর আড়ালে রাখা হয়েছে।
‘পরবর্তী পেজে যাও ইঞ্জিনিয়ার।’ বলল আহমদ মুসা।
দ্বিতীয় পাতা ওপেন করল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি।
দ্বিতীয় পাতাটির উপর চোখ পড়তেই আহমদ মুসার চোখ দু’টি উজ্জল হয়ে উঠল। দেখল, এটা সেই রহস্যপূর্ণ ছক যেটা তার কাছে আছে। পূর্ণ পৃষ্ঠার নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় কালো বৃত্ত। কালো বৃত্তের মধ্যে নাম্বার। আর কোন বৃত্তের এক পাশে একটি রেড ডট, কোথায় দু’পাশে দুইটি রেড ডট। এভাবে কোথাও তিন পাশে তিনটি, কোথাও চার পাশে চারটি রেড ডট।
‘ইঞ্জিনিয়ার, তুমি ছোট কালো বৃত্তগুলোর নাম্বার সিরিয়ালি গুণে দেখ, বৃত্তের সংখ্যা এবং তার নাম্বারের সংখ্যা এক সমান কিনা।’
দশ সেকেন্ডের মধ্যেই ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা আহমদ মুসাকে বলল, ‘স্যার, কালো বৃত্ত এবং নাম্বারের সংখ্যা সমান।’
‘তার মানে কালো বৃত্তগুলোর নাম হলো ঐ নাম্বারগুলো। বৃত্তগুলো তাহলে কী?’
বলে আহমদ মুসা তাকাল কালো বৃত্তগুলোর অবস্থানের দিকে।
গভীর ভাবনার চিহ্ন আহমদ মুসার চোখে মুখে। বলল সে ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটাকে, ‘তুমি পূর্ব আনাতোলিয়ার একটা মানচিত্র সামনে আন।’
সংগে সংগেই পূর্ব আনাতোলিয়ার মানচিত্র কম্পিউটার স্ক্রিনে নিয়ে এল।
‘ইঞ্জিনিয়ার, মি. খাল্লিকান খাচিপ, দেখুন কালো বৃত্তগুলোকে পূর্ব আনাতোলিয়া বিশেষ করে পূর্ব প্রান্তের প্রদেশগুলোর উল্লেখযোগ্য স্থান বা শহরগুলোর অবস্থানের সাথে মেলানো যায় কিনা।’ বলল আহমদ মুসা।
কিছুটা সময় মিলিয়ে দেখার পর খাল্লিকান খাচিপ বলল, ‘স্যার, কারসের কয়েকটি, আগ্রির কয়েকটিসহ ইজদির প্রদেশের ২৪টি শহরের সাথে কালো বৃত্তের অবস্থান হুবহু মিলে গেছে।’
‘আল্-হামদুলিল্লাহ্। প্রথম কলামের রহস্য উদ্ধারে আমরা সফল। নাম অর্থাৎ জায়গার নাম আমরা পেয়ে গেছি। এখন দ্বিতীয় কলাম দেখুন। কলামের ‘সোর্ডস’ মানে ‘তরবারী’ বা ‘আর্মস’। এই ‘তরবারী’ বা ‘আর্মস’- এর কাছাকাছি আর কি হতে পারে? এর অর্থ বের হবার উপরই নির্ভর করছে ডাবল বা ট্রিপল ইংরেজি বর্ণগুলোর অর্থ কী!’ আহমদ মুসা থামল।
অন্য সবাই নিরব। ভাবছিল আহমদ মুসা। ভাবছিল সবাই।
আহমদ মুসা কথা বলল আবার। বলল, ‘সোর্ড বা অস্ত্র যারা চালায় তারাও এক অর্থে সোর্ড বা অস্ত্র। বরং তারাই প্রকৃত সোর্ড বা অস্ত্র। এই অর্থ গ্রহণ করার পর পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ডাবল বা ট্রিপল বর্ণের যে গুচ্ছ রয়েছে তা এক একটি করে নাম। তবে বর্ণগুচ্ছের সংকেত থেকে নাম উদ্ধারের সাধ্য আমাদের নেই।’ বলে আহমদ মুসা থামল আবার একটু।
তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল। মনে মনে সে বলল, নামগুলো নিশ্চিতভাবে তাদের বাহিনীর অফিসারদের হবে। যেমন মাউন্ট আরারাত পয়েন্টে কর্নেল মোস্তফা ছিল। তার সাথে নিশ্চয় আরও একজন কেউ আছে। কারণ মাউন্ট আরারাতে পয়েন্টে বর্ণের দু’টি গুচ্ছ। একটিতে MM, অন্য গুচ্ছটিতে AB, প্রথমটির অর্থ হলো মোস্তফা মিকাহ্- এই দুই শব্দের আদ্যাক্ষর। AB হবে নিশ্চয় অন্য দুই শব্দের আদ্যাক্ষর। সুতরাং স্থানের নামের সাথে এই ‘বর্ণগুচ্ছ’ আর্মি হেডকোয়ার্টারে পাঠালে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এদের নাম জানা যাবে। এ-নিয়ে তেমন চিন্তা নেই। এখন বের করতে হবে তৃতীয় কলাম ‘টার্গেট’- এর অর্থ।
আহমদ মুসা কথা বলার জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল, তার আগেই কথা বলে উঠল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ। বলল, ‘স্যার, আপনি নিরব হওয়া ভয়ের কথা। আমরা কি সামনে এগুতে পারছি না?’
‘আল্লাহ্ কারো পথ বন্ধ করেন না, যদি সে চেষ্টা করে সামনে এগোবার। আমরা চেষ্টা বাদ দেইনি। এখন আসুন আমরা তৃতীয় কলাম দেখি। তৃতীয় কলাম- এর ‘টার্গেট’ এর অর্থ আমরা সকলেই জানি যে, লক্ষ্যবস্তু। কিসের লক্ষ্যবস্তু বলুন তো?’ একটু থামল আহমদ মুসা।
‘কলাম’- এর দিক থেকে বোঝা যাচ্ছে লক্ষ্যবস্তুটা হলো ‘সোর্ড’- এর।’ বলর খাল্লিকান খাচিপ।
‘ধন্যবাদ অফিসার। এর পরের প্রশ্ন হলো। ‘সোর্ড’ হলো ঘাতক অস্ত্র। এর লক্ষ্যবস্তুর উপযুক্ত নাম কি হতে পারে?’
একটু থামল আহমদ মুসা। সবাই নিরব।
আহমদ মুসাই কথা বলল আবার, ‘সোর্ড-এর লক্ষ্যবস্তুর উপযুক্ত নাম হতে পারে ‘ভিকটিম’। সুতরাং…।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। ধন্যবাদ আপনাকে। এ সহজ বিষয়টা আমার মাথায় আসেনি।’ বলর ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘থ্যাংকস আফিসার। ‘সোর্ডস’- এর লক্ষ্যবস্তু যদি ‘ভিকটিম’ হয়, তাহলে টার্গেট কলামে যে সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, তা ভিকটিমদের সংখ্যা। এই অর্থটা খুবই পরিষ্কার। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করেছে ভগ্নাংশ সংখ্যা, অর্থাৎ ২৫ বাই ১০০০, ১০ বাই ৫০০ ইত্যাদির অর্থ কী?’ থামল আহমদ মুসা।
কারও মুখে কোন কথা নেই। ভাবছে আহমদ মুসা। ভাবছে সবাই।
ভাবনার মধ্যেই মুখ তুলল আহমদ মুসা।
তার চোখে আশের আলো জ্বলছে। বলল সে, ‘মি. মালিক মেরারী, ‘এই ভগ্নাংশের মধ্যে কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন?’
কথা বলল না মালিক মেরারী মালুস। কিন্তু তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে হিংস্র দৃষ্টি।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘জানি, আপনার খুব ইচ্ছা করছে গুলি করে আমার খুলিটা উড়িয়ে দিতে।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটার দিকে। বলল, ‘বলত, টেন বাই হন্ড্রেড বা এ ধরনের অংকের কত রকম অর্থ হতে পারে?’
‘স্যার, এর সাধারণ অর্থ দশ এর একশ ভাগের একভাগ। অন্য অর্থেও এর ব্যবহার হয়। যেমন, ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন, এই অর্থ মেলাতেও এমনটা লেখা হয়।’ ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা বলল।
‘আমরা টার্গেটের কী অর্থ করেছি?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ভিকটিম।’ বলল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি।
‘আচ্ছা, এখন দশ বাই হানড্রেড- এর যে অর্থ করলে তার আগে ‘ভিকটিম’ শব্দটা বসাও। দেখ বক্তব্যটা কী দাঁড়াচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বক্তব্যও দাঁড়াচ্ছে, ভিকটিম ১০০ জনের মধ্যে দশজন।’ বলল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি।
‘ধন্যবাদ, তাহলে কথা দাঁড়াচ্ছে, টার্গেট- এর ঘরে যে সংখ্যাগুলো রয়েছে, তার মধ্যে যে সংখ্যাগুলো উপরে রয়েছে, সেগুলো বিভিন্ন স্থানে ভিকটিম- এর সংখ্যা। কিন্তু নিচের অংকগুলোর অর্থ কী?’ থামল আহমদ মুসা।
‘জটিলতা একটার পর আরেকটা। ভিকটিম উপরেরটা হওয়ার পর নিচের অংকগুলো এই কলামের জন্যে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। এই অংকগুলো বোধ হয় ক্যামোফ্লেজের জন্যে।’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘তা মনে হয় না অফিসার। আচ্ছা দেখুন, টার্গেট কলামের ‘ভিকটিম’ মানে ‘মানুষ ভিকটিম।’ এই মানুষ ভিকটিমরা নিচের সংখ্যাগুলোর অংষ, সেটা অর্থ থেকেই বুঝা যাচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে নিচের অংকগুলোও এবং মানুষের সংখ্যাও একই। তাই হয় কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক তাই। ধন্যবাদ আপনাকে।’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘ধন্যবাদ, তাহলে অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ১০০ জনের মধ্যে ভিকটিম ১০ জন। এখন গোটা পেজ নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, তাহলে আমরা দেখব ধাঁধাঁর মধ্যে দিয়ে যে কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে অমুক স্থানে অমুকের দ্বারা এতজনের মধ্যে ভিকটিম হবে এতজন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়ান্ডারফুল! ওয়ান্ডারফুল!’ বলে হাততালি দিয়ে উঠল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
ঠিক এই সময়েই কঁকিয়ে উঠল মালিক মেরারী মালুস। যেন মাথায় তার তীব্র ব্যথা। অস্থির সে।
তার দিকে এগিয়ে গেল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘আমার মাথার টুপি খুলে ফেলুন। মাথাটা ফেটে গেল।’ চিৎকার করে বলতে লাগল মালিক মেরারী মালুস।
‘তোমার আবার মাথায় কী ঘটল? দেখি।’ বলে ডিপি খাল্লিকান খাচিপ টুপি খুলতে গেল মালিক মেরারী মালুসের।
আহমদ মুসা শান্তভাবে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মালিক মেরারী মালুসের দিকে। কিন্তু তার মনে হলো, তার বেদনাকাতর বিলাপের সাথে তার চোখের ভাব প্রকাশের কোন মিল নেই। তাহলে তার এটা অভিনয়? উদ্দেশ্য? টুপি খুলতে বলছে কেন? কোন ফাঁদ? কী হতে পারে? ঠিক বুঝতে পারলো না আহমদ মুসা। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারল যে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
ডিপি খাল্লিকান খাচিপ টুপিতে হাত দিতে যাচ্ছিল।
‘টুপিতে হাত দেবেন না মি. অফিসার।’ দ্রুত আদেশের সুরে বলল আহমদ মুসা।
হাত থমকে গেল ডিপি খাল্লিকান খাটিপের। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘কিন্তু স্যার…?’
আরও ভাবছিল আহমদ মুসা। টুপির মধ্যে যদি বিপদ থাকে। তাহলে সেটা আসবে কিভাবে? সে টুপি খুলতে বলছে, তার মানে টুপি খোলার সময় টুপির বেজ অংশ বর্ধিত হওয়ার ফলেই নিশ্চয় বিপদটা আসবে। সুতরাং, টুপির বেজ অংশ বর্ধিত হবার সুযোগ না দিয়ে যদি টুপিটা খোলা যায়, তাহলে বিপদ আসবে না, অন্যদিকে জানা যাবে টুপির ভেতরের রহস্য।
আহমদ মুসা ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটাকে খুবই ছোট একটা কাঁচি আনতে বলল।
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে একটা ক্ষুদ্র কাঁচি নিয়ে এল।
আহমদ মুসা কাঁচি নিয়ে এগুলো মালিক মেরারীর দিকে। বলল, ‘মি. মালাক, হাত দিয়ে টুপি খুলতে গেলে আপনার কষ্ট লাগবে। আস্তে করে বেজ- এর ইলাস্টিক কেটে দিয়ে টুপিটা আপনার মাথা থেকে তুলে নেয়া হলে আপনি জানতেও পারবেন না।’
মালিক মেরারীর চোখে আগুন। দু’পাশে রাখা আহত দু’হাত নাড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
আহমদ মুসার কাঁচি যখন এগুলো, মানে আহমদ মুসা তার বেডের পাশে পৌঁছাল, সংগে সংগেই সে এক বিকট চিৎকার দিয়ে উঠে দুই আহত হাত উপরে তুলে মাথার টুপি খুলতে গেল।
আহমদ মুসার চোখ মালিক মেরারীর আগুন-ঝরা চোখের দিকে নিবদ্ধ ছিল। কী ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝতে পারল আহমদ মুসা।
মালিক মেরারীর আহত হাত দু’টি টুপির কাছে পৌঁছার আগেই আহমদ মুসার বাম হাত পকেট থেকে রিভলভার নিয়ে গুলি করল মালিক মেরারীকে। গুলি গিয়ে লাগল মালিক মেরারীর বুকে। মালিকের দুই হাতকে যেহেতু এক সাথে গুলি করা যায় না, তাই তাকে নিবৃত্ত করার জন্যে বুকে গুলি না করে উপায় ছিল না।
মালিক মেরারীর উঠে আসা দুই হাত আছড়ে পড়ল দু’পাশে।
তার হাত দু’টি আছড়ে পড়ার মতই মালিক মেরারীও শেষ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই।
মুহূর্তেই ঘটে গেল গোটা ঘটনা। বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল উপস্থিত ডিপি খাল্লিকান খাচিপ এবং ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা।
বিস্ময় কাটিয়ে উঠে ডিপি খাল্লিকান খাচিপ বলল, ‘অকল্পনীয় ধরনের বেপরোয়া লোকটা, অদ্ভুত তার নার্ভ। কিন্তু তার টুপিতে কী আছে? কী করতে যাচ্ছিল সে?’
‘টুপিতে ভয়াবহ ঘাতক ধরনের কিছু আছে যা দিয়ে সে আমাদের মারতে চেয়েছিল, যাতে আমরা যে রহস্য ভেদ করেছি, তা আর কেউ জানতে না পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কী এমন ঘাতক থাকতে পারে সেখানে?’ বলল খাল্লিকান খাচিপ।
‘আচ্ছা দেখা যাক।’ বলে আহমদ মুসা মালিক মেরারী মালুসের মাথার দিকে এগুলো। টুপির বেজটা আস্তে করে কাঁচি দিয়ে কেটে দিল আহমদ মুসা। টুপির এক পাশ ঢিলা হয়ে গেল। বিপরীত পাশের ইলাস্টিক তখনও মাথার কাপড়ে আটকে আছে। ওপাশের টুপির ইলাস্টিক বেজটা কেটে দিল আহমদ মুসা। এরপর আলতোভাবে টুপিটা খুলে ফেলল। টুপির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ভয়ংকর পয়জন বোমা। ক্ষুদ্র বোমার গায়ের সাংকেতিক মার্ক দেখেই বুঝতে পারল আহমদ মুসা। বোমা থেকে সুক্ষ একটি বৈদ্যুতিক তার চার ভাগ হয়ে টুপির চারদিকের বেজ ইলাস্টিকের সাথে গিয়ে মিশেছে। যেখানে মিশেছে, সেখানেই সুক্ষ্ম বৈদ্যুতিক তারের সাথে ডেটোনেটর ফিট করা আছে। ইলাস্টিকে টান পড়লেই ডেটোনেটরের দুই পিন একে অপরকে স্পর্শ করবে এবং বৈদ্যুতিক তারের নেগেটিভ-পজিটিভ এক সাথে ক্লিক করার সাথে সাথেই পয়জন বোমার বিস্ফোরণ ঘটবে। ভাবতেই শিউরে উঠল আহমদ মুসা।
বোমাটা সবাইকে দেখিয়ে পয়জন বোমার টেকনোলজিটা সবাইকে বুঝিয়ে বলল আহমদ মুসা, ‘টুপির বেজ ইলাস্টিকে সামান্য টান পড়লেই বোমার ডেটোনেটর ক্লিক করতো এবং তখন ভয়ংকর পয়জন বোমার বিস্ফোরণ ঘটে যেত।’
ডিপি খাল্লিকান খাচিপ এবং ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটার মুখ আতংকে চুপসে গেল।
‘আমাদের মারলে সেও তো মরতো।’ ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘না, সে যদি মুখ, নাক ও চোখ বন্ধ করে দেড় মিনিট থাকতে পারতো, তাহলে সে বেঁচে যেত। বোমাটার ক্রিয়াকাল মাত্র দেড় মিনিট। এই দেড় মিনিটে এই বোমা দশ বর্গফুট এলাকার মানুষসহ সকল জীবের প্রাণ হরণ করতে পারে। এর কোন ধোঁয়া নেই। এর অদৃশ্য পয়জন-ওয়েভ চোখের পলকে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘নিশ্বাস বন্ধ রাখার জন্যে মুখ, নাক বন্ধ রাখার প্রয়োজন আছে। কিন্তু চোখ বন্ধ রাখা কেন?’ বলল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
‘বোমার পয়জন-ওয়েভ মানুষের দৃষ্টিও অন্ধ করে দিতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
আঁৎকে উঠল ডিপি খাল্লিকান খাচিপ। বলল, ‘সাংঘাতিক অস্ত্র। মালিক লোকটা তাহলে আমাদেরকে মেরে ফেলে পালাবার একটা ব্যবস্থা রেখেই দিয়েছিল। ভয়ানক লোক। আড্ডা গেড়েছিল দেখছি ঠিক জায়গায়!’
‘ভয়ানক লোক তো বটেই। কথা বলানো গেল না শেষ পর্যন্ত। আমাদের সব প্রশ্নের সমাধান আমরা পেলাম না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সব রহস্যের জট তো আপনি খুলেই ফেলেছেন। বড় কী তেমন বাকি আছে?’ জিজ্ঞাসা খাল্লিকান খাচিপের।
‘রহস্যের শেষ তালাটা খোলা বাকি আছে। অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর রহস্যের শেষ তালাটা খোলা না গেলে জানা যাবে না। ভিকটিম যাদের মধ্যে থেকে হবে, সেই লোকরা কারা? কবে, কিভাবে ভিকটিম হওয়ার ঘটনা ঘটবে? এর উদ্দেশ্যই বা কী? সোর্ডস- মানে আক্রমণকারী, যারা কিছু লোককে ভিকটিম বানাবে, তারা কারা? কেন, কিভাবে তারা এটা করবে? ইত্যাদি অনেক প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।’
বলে আহমদ মুসা চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। চোখ দু’টোও বুজে গেল তার। তার চেহারায় নেমে এলো গভীর ছায়া।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলল আহমদ মুসা। বলল, ‘মি. খাল্লিকান খাচিপ, এ বিষয়টা তো পরিষ্কার হয়েছে, একদিকে তাদের উদ্দেশ্য যেমন মাউন্ট আরারাতের স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার, অন্যদিকে তাদের ষড়যন্ত্রটা রাজনৈতিকও।
দেখা যাচ্ছে শহর ও আধাশহর এলাকাতেই তারা ঘটনা ঘটাবে। যাদের ভিকটিম বানাবে বা ঘটনার অস্ত্র হবে, তাদের সংখ্যা কোথাও দু’য়ের বেশি নয়। মাত্র একজন বা দু’জন, কোথাও দু’শ, কোথাও একশ, পাঁচশ জনকে ভিকটিম বানাবে কী করে? এ থেকে বুঝা যায় একজন বা দু’জন লোক যাদের ভিকটিম বানাবে, তারা একাই একশ বা এ হাজারের মত। এমন লোক কারা হতে পারে মি. খাল্লিকান খাচিপ?’
‘পুলিশ বা সেনারা হতে পারে।’ খাল্লিকান খাচিপ বলল।
‘ঠিক বলেছেন মি. খাল্লিকান খাচিপ। তাহলে এখন দেখতে হবে, যেস্থানে সোর্ডস হিসাবে দুই বা ততোধিক বর্ণমালার আড়ালে যাদের নাম আছে, সে স্থানে পুলিশ অফিসার ও সেনা অফিসারদের মধ্যে ঐ বর্ণমালার সাথে মিলে এমন কে কে আছেন। এদেরকে ডিটেক্ট করাটাই এখনকার প্রধান কাজ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ইউরেকা! ইউরেকা মি. আবু আহমদ, স্যার! আপনি ধাঁধাঁর জট ভেঙে ফেলেছেন। এখন যে কাজটার কথা বলেছেন, তা খুবই সহজ। পুলিশ অফিসারদের নাম আমি দু’এক ঘন্টার মধ্যেই দিতে পারব। সেনা অফিসারদের নামগুলোও যোগাড় করা যাবে।’ ডিপি খাল্লিকান খাচিপ বলল। আনন্দের উচ্ছ্বাস তার কণ্ঠে।
‘আপনি পুলিশ অফিসারদের নাম যোগাড় করুন। সেনা অফিসারদের নাম আমি যোগাড় করছি।’ আহমদ মুসা বলল।
বলেই আহমদ মুসা তার মোবাইলে কল করল জেনারেল মেডিন মেসুদকে।
আহমদ মুসার কণ্ঠ পেতেই জেনারেল মেডিন মেসুদ ওপার থেকে সালাম দিয়ে বলল, ‘কনগ্রাচুলেশন মি. আবু আহমদ। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আপনি সমস্যা সমাধানের প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। এখন আপনার চাই স্থানগুলোর বিপরীতে আদ্যাক্ষরের সংকেতে যাদের নাম আছে, তাদের নাম। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’
‘আপনি জানলেন কি করে এ সব?’ বলল আহমদ মুসা।
‘গোপন ব্যপারটা সহজ! আপনাকে বললে ক্ষতি নেই।’
একটু থামল জেনারেল মেডিস মেসুদের কণ্ঠ। বলল আবার, ‘যে ছেলেটা কম্পিউটারে আপনাকে সহযোগিতা করছে, সে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের লোক। মি. মালিকের রেস্টুরেন্টেও আমাদের গোয়েন্দা অফিসার ছিল। ইজদিরের সে হোলি আরারাত হোটেলেও আমাদের লোক ছিল।’
‘ওরা কি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের জন্য?’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
‘আস্তাগফিরুল্লাহ্! কী বলেন স্যার! ওরা আপনার নিরাপত্তার জন্যে।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘ধন্যবাদ জেনারেল। এবার কাজের কথা বলুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্থানগুলোতে সাংকেতিক বর্ণমালার আড়ালে যে অফিসারদের নাম পাওয়া যাবে, তার তালিক শীঘ্রই আপনাকে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, কী হতে যাচ্ছে স্থানগুলোতে? এটা জানা খুবই জরুরী।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আসলেই খুবই জরুরী।’ জেনারেল মেডিন মেসুদ বলল।
‘আপনি তালিকাটা তাড়াতাড়ি পাঠান জেনারেল। আমার ধারণা সঠিক হলে ঐ চিহ্নিত অফিসাররা ইতমধ্যেই ব্রীফ পেয়ে গেছে। সুতরাং জানার একটা পথ বের হবেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘পেয়ে যাবেন স্যার। আজ রাত শেষ হবার আগেই পেয়ে যাবেন। আমরা খুব উদ্বিগ্ন স্যার। মার খেতে খেতে ওদের দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে। বড় কোন অঘটন ওরা যে কোন সময় ঘটিয়ে বসতে পারে।’ বলল জেনারেল মেডিন মেসুদ।
‘আল্লাহ্ ভরসা। ওরা ধ্বংসের জন্যে, আর আমরা ভালোর জন্যে কাজ করছি। আল্লাহ্’র সাহায্য আমাদের সাথেই থাকবে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ্। আল্লাহ্ তাই করুন।’ বলল জেনারেল মেসুদ।
‘আমীন। ওকে জেনারেল, রাখি। আস্-সালামু ‘আলাইকুম।’ বলে সালাম নিয়ে মোবাইলের কল অফ করে দিল আহমদ মুসা।