৪৯. বিপদে আনাতোলিয়া

চ্যাপ্টার

রাত ৩টা। ইজদির প্রদেশের রাজধানী শহরের ‍উপকণ্ঠে পৌঁছল আহমদ মুসার গাড়ি।
গাড়ি ড্রাইভ করছে আহমদ মুসা। তার পাশের সীটে বসা পূর্ব আনাতোলিয়ার পুলিশের ডাইরেক্টর জেনারেল মাহির হারুন, আর পেছনের সীটে বসা ইজদিরের পুলিশ প্রধান ডিপি খাল্লিকান খাচিপ।
উপরের নির্দেশ পেয়ে রাত দু’টার দিকে এসে পৌঁছেছেন ডিজিপি মাহির হারুন আহমদ মুসার সাথে অভিজানে যোগ দেবার জন্যে।
আহমদ মুসাদের অভিযানের লক্ষ্য হলো ইজদিরের সেনা গ্যারিসনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার সেলিম আস সুয়ুতি এবং ইজদির সেনা ইউনিটের কমব্যাট আর্মির প্রধান কর্নেল জালাল জহির উদ্দিনের বাড়ি। তাদের দু’জনকেই গ্রেফতার করতে হবে এই রাতেই। ইজদিরের ‘সোর্স’ হিসাবে যাদের নাম আছে, তারা এই দু’জনই।
আহমদ মুসা রাত আড়াইটার দিকে সোর্ডসদের তালিকা পেয়েছে। সেই সাথে মেডিন মেসুদ এবং জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে জানিয়েছে, তারা আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভেনে পোস্টেড তাদের এজেন্টের কাছে এটুকু জানতে পেরেছে যে, আগামী কাল সকালে পূর্ব আনাতোলিয়ায় বড় একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ইয়েরেভেনের সরকারী মহল খুব খুশি। ইতোমধ্যে আর্মেনিয়া থেকে বহু সাংবদিক চোরাই পথে পূর্ব আনাতোলিয়ার বিভিন্ন শহরে প্রবেশ করেছে। তারা তাদের নিজের খরচে বিদেশী সাংবাদিকদেরও নিয়ে এসেছে।
সাংবাদিক বিশেষ করে বিদেশী সাংবাদিক আসার খবরে আঁৎকে উঠেছে আহমদ মুসা। তার মনে হয়েছে, নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ খবর হওয়ার যোগ্য কিছু এখানে ঘটতে যাচ্ছে। মালিক মেরারী মালুসের কম্পউটারে পাওয়া পরিকল্পনায় যে ভিকটিমের সংখ্যা আহমদ মুসা পেয়েছে, সেটা বেশ বড়। এত বড় হত্যার ঘটনা ঘটলে সেটা অবশ্যই এসটা মহাখবর হবে। কিন্তু কারা হত্যা করবে? সোর্ডরা? কেন হত্যা করবে? কাদের হত্যা করবে? তাদের কোথায় পারে? ইত্যাদি প্রশ্ন নিয়ে আহমদ মুসা আবার অনেক ভেবেছে। কিন্তু উত্তর পায়নি। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে কিছু জানা যায় কিনা।
এরপরেই আহমদ মুসারা ছুটে এসেছে ইজদিরে। ব্রিগেডিয়ার সেলিম আস সুয়ুতি এবং কর্ণেল জালাল জহির উদ্দিনের গ্রেফতার থেকে যে রেজাল্ট পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে রাতের মধ্যেই মালিক মেরারী মালুসের কম্পউটারে পাওয়া পরিকল্পনায় উল্লেখিত সব স্থনের, সব ‘সোর্ডস’দের গ্রেফতার করা হবে। ওদের সকলের নাম ও লোকেশান চিহ্নিত করা হয়েছে। আহমদ মুসার গাড়ি প্রবেশ করল ইজদির শহরে।
আহমদ মুসার পামে বসা ডিজিপি মাহির হারুনের দিকে চেয়ে বলল, ‘মি. মাহির হারুন, ব্রিগেডিয়ার সেলিম আস সুয়ুতি এবং কর্ণেল জালাল জহির উদ্দিনের বাড়ির অবস্থা কী?’
‘স্যার, আমাদের গোয়েন্দারা তাদের দু’জনের বাড়িই ঘিরে রেখেছে। ব্রিগেডিয়ার সেলিম রাত সাড়ে দশটায় এবং কর্ণেল জালাল রাত ১১ টায় বাড়িতে প্রবেশ করেছে। তারপর বাড়িতেই আছে।’ বলল পূর্ব আনাতোলিয়ার ডাইরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ মাহির হারুন।
‘কথা ছিল যে, তারা ব্রিগেডিয়ার ও কর্ণেল দু’জনেরই গেটের প্রহরীসহ সেনা অফিসারদের কৌশলে বন্দী করে গেটের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে রাত ৩ টার মধ্যেই এবং দুই অফিসারেরই শয়নকক্ষকে লোকেট করবে এবং কক্ষের সকল এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্টের উপর নজর রাখবে, এটা কত দূর হয়েছে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘স্যার, পাঁচ মিনিট আগে আমি ওদের সাথে কথা বলেছি। কাজগুলো সবই ঠিকমত হয়েছে। বাড়ির চারদিক ঘিরে রাখাসহ দুই সেনা অফিসারের শয়নকক্ষকে চোখে চোখে রেখেছে।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
ইজদির শহর অতিক্রম করছে আহমদ মুসার গাড়ি। শহরের পূবে পাহাড় ঘেরা একটা সুন্দর সমতল উপত্যকায় ইজদিরের সেনা গ্যারিসন।
এই উপত্যকা ঘিরে পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সেনা অফিসারদের আবাসস্থল।
গ্যারিসনে ঢোকার পরই পাশাপাশি দু’টি টিলার মাথায় রয়েছে ব্রিগেডিয়ার এবং কর্ণেলের বাসা।
গ্যারিসনে ঢোকার পর উপত্যকার ডান পাশে দুই পাহাড়ের মাঝখানের কয়েকটি টিলার প্রথমটিতেই ব্রিগেডিয়ার সেলিম আস সুয়ুতির বাসা। তার পরের টিলাতেই কর্ণেল জালাল জহির উদ্দিনের বাসা।
উপত্যকা থেকে গাড়ির রাস্তা এঁকে-বেঁকে টিলার মাথায় বাড়ির একদম গাড়িবারান্দায় গিয়ে উঠেছে।
বাড়ির সীমানা প্রাচীরটা গ্রীলের। গেটও গ্রীলের। গেটের পাশেই একটা ছোট কক্ষ। সিকউরিটির লোকদের বসার জায়গা ওটা। গেট রুমে কেউ নেই বলেই তাদের বাধা পেতে হয়নি। নিজেরাই গেট খুলে ভেতরে এসেছে।
গেট থেকে গাড়ি বারান্দার দূরত্ব একশ গজের কম হবে না।
আহমদ মুসার গাড়ি ব্রিগেডিয়ার সেলিমের বাড়ির গাড়িবারান্দায় পৌছতেই ডিজিপি মাহির হারুনের ওয়্যারলেস বিপ বিপ শব্দ করে বলল, ‘আমাদের লোকরা জানাচ্ছে, ব্রিগেডিয়ার সেলিম ও আরেকজন ঘর থেকে বেরিয়েছে। সম্ভবতঃ ওরা বাইরে বেরুবে। আমাদের লোকরা ওদের আটকাবে কিনা জানতে চাচ্ছে।’ ডিজিপি মাহির হারুনের কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘বাধা দিতে নিষেধ করুন। ওরা বাইরে আসুক। আমরা গাড়িটা একটু আড়ালে নিয়ে যাচ্ছি। ওদের একটা কথা জিজ্ঞেস করুন, ব্রিগেডিয়ার সামরিক পোষাকে আছে, না সাধারণ পোষাকে।’
ওদিকে ডিজিপি মাহির হারুন আহমদ মুসার মেসেজ তার লোকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
ডিজিপি মাহির হারুন আহমদ মুসার মেসেজ ওদের পৌঁছে দিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করল এবং আহমদ মুসাকে জানাল যে ব্রিগেডিয়ার সাধারণ পোষাকে রয়েছেন।
আহমদ মুসারা সবাই গাড়ি থেকে নেমেছে। তাদের সকলের চোখ বাড়ির মূল গেট ও গাড়ি বারান্দার দিকে। গাড়ি বারান্দায় একটি প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। সেনাবাহিনীর নয় গাড়িটা।
আহমদ মুসা ব্রিগেডিয়ার সেলিমকে নিয়ে ভাবছিল। এখন তো তার বাইরে যাওয়ার কথা নয়, ডিউটির প্রয়োজন ছাড়া। আর প্লেইন পোষাকে যখন বেরিয়েছেন, তখন তো অফিসে বা কোন ডিউটিতে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে কেন বেরুচ্ছে? সাথের লোকটি তাহলে কোন গেস্ট বা বিশেষ কউ! শয়নকক্ষে নিয়ে গেছেন যখন, বিশেষ কেউই হবার কথা। গাড়িবারান্দায় যে প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কি তাহলে ঐ গেস্টের! বাড়িটা ঘুরে ওরা বেরিয়ে এল। নেমে এল গাড়িবারান্দায়।
গেস্ট লোকটি পঞ্চাশোর্ধ, টাক মাথা। কমপ্লিট ইউরোপীয় পোষাক, শুধু মাথায় হ্যাট নেই।
ব্রিগেডিয়ার দু’ধাপ সামনে এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে ধরল। গেস্ট লোকটি গাড়িতে ঢোকার আগে ব্রিগেডিয়ারের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘জেনারেল, ইজদির থেকে মানে আপনার কাছ থেকে কাল সকালেই আমরা বড় আশা করছি। ইজদিরের সাফল্য হবে আমাদের জন্যে বড় সাফল্য।’
‘ভাববেন না, সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। আমরা বড় খবরই দেব।’ বলল ব্রিগেডিয়ার সেলিম।
গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। চলতে লাগল গাড়ি।
আহমদ মুসা দ্রুত তাকাল ডিজিপি মাহির হারুনের দিকে। বলল, ‘ওকে আপনারা আটকান। গেটে গিয়ে তাকে গেট খোলার জন্যে অথবা সিকউরিটিকে ডাকার জন্যে গাড়ি থেকে নামতে হবে। সেই সুযোগে তাকে আপনারা দু’জন গিয়ে আটকাবেন, আহত করে হলেও। আমি ব্রিগেডিয়ারকে দেখছি।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ডিজিপি মাহির হারুন ও খাল্লিকান খাচিপ বাগানের মধ্যে দিয়ে দৌড় দিল গেট লক্ষ্যে।
গেস্টকে বিদায় দিয়ে ব্রিগেডিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল বাড়ির দরজার দিকে।
আহমদ মুসা জুতার আগায় ভর করে বিড়ালের মত নিঃশব্দে ছুটল ব্রিগেডিয়ারের পেছনে।
গাড়িবারান্দা পেরিয়ে বারান্দায় উঠে গেছে ব্রিগেডিয়ার সেলিম।
আহমদ মুসা কয়েক ধাপ পেরিয়ে বারান্দায় উঠতে গিয়ে তার পায়ের শব্দ ব্রিগেডিয়ার সেলিমের কানে পৌঁছে গেল। বোঁ করে চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল সে।
আহমদ মুসা তখন বারান্দায় উঠে গেছে। ব্রিগেডিয়ার সেলিমের মুখোমুখি সে।
হঠাৎ আহমদ ‍মুসাকে সামনে দেখে অস্বাভাবিক একটা বিস্ময় ও বিমূঢ়তা ব্রিগেডিয়ার সেলিমকে আচ্ছন্ন করেছিল মুহুর্তের জন্যে। আর সেই সময়েই আহমদ মুসার রিভলভার ব্রিগেডিয়ার সেলিমের বুকে গিয়ে স্পর্শ করল।
ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়েছিল ব্রিগেডিয়ার সেলিম।
আহমদ মুসা সময় নষ্ট করল না। বাম হাতটাকে আয়রন শীটের মত সোজা ও শক্ত করে একটা কারাত ছুড়ে দিল ব্রিগেডিয়ার সেলিমের ডান কানের নিচে ঘাড়ের নরম জায়াগাটায়। বজ্রের মত আঘাত হানল করাতটা।
ব্রিগেডিয়ার সেলিমের মাথাটা আগেই দুলে উঠল। তারপর শরীরটাও। সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল সে।
আহমদ মুসা তার দু’হাত পিছমোড়া করে বেঁধে কাঁধে তুলে নিয়ে চলল গেটের দিকে।
গেটে গিয়ে আহমদ মুসা দেখল, ডিজিপি মাহির হারুন ও ডিপি খাল্লিকান খাচিপ ঐ লোকটাকে পাকড়াও করে বেঁধে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু আহত হয়েছেন খাল্লিকান খাচিপ। তার ডান চোখের উপরে কপালটা ফেটে গেছে।
‘আহা, আপনি আহত হয়েছেন দেখছি, উহ! ঐ লোকটা যৌবনকালে মুষ্ঠিযোদ্ধা ছিল নাকি যে, আপনার চোখের আশ-পাশটাকেই টার্গেট করেছে!’ বলল আহমদ মুসা খাল্লিকান খাচিপের প্রতি সমবেদনার সুরে।
‘না, উনি লোকটার পেছনে ছুটতে গিয়ে গেটের দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছিলেন।’ ডিজিপি মাহির হারুন বলল। তার মুখে হাসির কিঞ্চিত ঝলক।
‘এবার চলুন। আমি বন্দী দু’জনকে আমার গাড়িতে নিচ্ছি। আর আপনারা দু’জন বন্দী লোকটির গাড়ি নিন। গাড়িও একটা প্রমাণ হতে পারে। আসুন তাড়াতাড়ি করি। কর্নেলের ওখানে যেতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওখানে আর যেতে হবে না স্যার। কর্নেল পালাচ্ছিল। আমাদের লোকদের ধরতে বলেছিলাম। ধরে নিয়ে আসছে। আমাদের এক গোয়েন্দা অফিসার কর্নেলে গুলিতে মারা গেছে স্যার।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন।
‘ধন্যবাদ মি. মাহির হারুন। আমাদের মিশন সফল। এখন এই মিশনের পেছনে যে আসল মিশন আছে তা সফল হলেই হয়। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। এদের মুখ থেকে দ্রুত কথা বের করতে যেন আমরা সমর্থ হই। সকালেই ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কী ঘটতে যাচ্ছে, কিভাবে ঘটতে যাচ্ছে, সেটা আমাদেরকে রাতের মধ্যেই জানতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমিন।’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন সংগে সংগেই।
‘যদি না জানা যায়? যদি না কথা বলে ওরা?’ ডিপি খল্লিকান খাচিপ বলল।
‘চিন্তা নেই। বলবে ওরা কথা। ওদের মত দুর্নীতিবাজ খুনিদের আল্লাহ্ নেই, বেহেশত নেই। দুনিয়ার জীবনটা ওদের বড় প্রিয়। এরাও জানে তারা যা করে তা অন্যায়, দেশের চেয়ে, ঈমানের চেয়ে এদের কাছে জীবন বড়। কারণ জীবনের জন্যেই এদের কমিটমেন্ট। সুতরাং দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া এরা কমিটমেন্টের জন্যে জীবন খোয়ায় না।’ বলল আহমদ মুসা।
গাড়িতে উঠল সবাই। দু’টি গাড়ি নেমে এল উপত্যকায়।
ওয়্যারলেস বিপ বিপ করে উঠল ডিজিপি মাহির হারুনের।
ডিজিপি মাহির হারুন অয়্যারলেস ধরেই বলল, ‘তোমরা আসছ কর্নেলকে নিয়ে?’
ওপারের কথা শুনে বলল, ‘আমরা গ্যারিসনের গেট পার হয়েই দাঁড়াচ্ছি। তোমরা এস।’
কথা শেষ করে ডিজিপি মাহির হারুন আহমদ মুসাকে বলল, ‘কর্নেলকে ধরে নিয়ে ওরা আসছে।’
গ্যারিসনের গেটের বাইরে কর্নেল জলাল জহির উদ্দিনকে ধরে নিয়ে গোয়েন্দার একটি দল আহমদ মুসাদের সাথে মিলিত হলো।
এবার তিনটি গাড়ি একত্রে যাত্রা শুরু করল। আহমদ মুসার গাড়ি আগে।
‘আমরা কি ইজদিরের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যাচ্ছি স্যার?’ জিজ্ঞাসা ডিজিপি মাহির হারুনের।
‘না, আমরা যাচ্ছি ইজদিরের দক্ষিণের জনমানবহীন মালভূমিতে। কথা আদায়ের ভালো জায়গা ওটা, আবার কবর দেবারও নিরিবিলি জায়গা।’ আহমদ মুসা বলল।

কবর দিতে হয়নি। আহমদ মুসার শুরুর বক্তৃতা, তার হাতের রিভলভার এবং চারদিকের শুনশান অবস্থা দেখেই আত্মসমর্পণ করল ব্রিগেডিয়ার সেলিম এবং কর্নেল জালাল। তারা দু’জনেই বলল, ‘তারা স্বেচ্ছায় নয়, ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে ওদের কথা শুনতে বাধ্য হয়েছে। কর্নেল বলেছে, নির্দোষ পথে অঢেল অর্থের লোভ দেখিয়ে ওরা তাকে তাদের জালে আটকায়। জালের অক্টোপাশ ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে তার জন্যে। এভাবে সে ওদের হাতের পুতুলে পরিনত হয়েছে। আর ব্রিগেডিয়ার সেলিম বলেছে, ‘আমি যখন বিয়ে করার চিন্তা-ভাবনা করছিলাম, ঠিক তখনই সুন্দরী ও প্রতিভাবান এক মেয়ের প্রেমের ফাঁদে পড়ে যাই। বিয়ে হওয়ার পর মেয়েটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাকে নানা রকম অসৎ কাজে জড়ায় এবং আমাকে একজন ক্রিমিনালে পরিনত করে। আমি তারপর তাদের কাজ উদ্ধারের যন্ত্র হয়ে যাই।’
রাত শেষের সকালে তারা কী করতে যাচ্ছিল তার বিবরণ দেয়ার পর তারা কান্নজড়িত কণ্ঠে তাদের দুর্ভাগ্যের পটভূমি বর্ণনা করেছিল।
পরদিন সকালে তারা কী ঘটাতে যাচ্ছিল তার বিবরণ দিতে গিয়ে দু’জন একই কথা বলেছিল। তারা যে বিবরণ দিয়েছিল, তা এই:
‘আমাদের বলা হয়েছিল তুরস্কে বিশেষ করে পূর্ব আনাতোলিয়ায় সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে হত্যা, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। আর্মেনীয় জেনোসাইড তার একটা প্রমাণ। গোটা দুনিয়া এটা জানে, কারণ এই ঘটনা প্রচার পেয়েছে বিশ্ব জুড়ে। সেই হত্যা, নির্যাতন ও বৈষম্য এখনও চলছে। মাত্র গত কিছু দিনের মধ্যে পূর্ব আনাতোলিয়ায় হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ হয়েছে, জেলে গেছে আরও হাজার হাজার। পরিকল্পিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে ড্রাগ চোরাচালানসহ অন্যান্য অমূলক অভিযোগ আনা হয়েছে। আর…
আহমদ মুসা কর্নেল জালাল জহির উদ্দিনের কথার মাঝখানে বলে ওঠে, ‘কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া ও জেলে যাওয়া লোকজন যে আর্মেনীয় বা ইহুদি সংখ্যালঘু নয়, তা কি আপনারা জানেন? জানেন কি সংখ্যাগুরুরাই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে উচ্ছেদ হয়েছে এবং জেলেও গেছে সংখ্যাগুরুরাই? আর এই ষড়যন্ত্রের শিকার করেছে মাউন্ট আরারাতের উল্কি আঁকা আর্মেনীয় সংখ্যালঘুরাই করেছে।’
চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠেছে কর্নেল জালাল ও ব্রিগেডিয়র সেলিম দু’জনেরই। বলেছিল ব্রিগেডিয়ার সেলিম, ‘আমরা এ বিষয়টা জানি না। আমরা তাদের কথা বিশ্বস করেছি। কারণ আমরা এটুকু জানতে পেরেছি, কিছুদিন থেকে পূর্ব আনাতোলিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে ব্যপকভাবে লোক উচ্ছেদ হচ্ছে এবং ব্যপকভাবে গ্রেফতারও হচ্ছে। কারা গ্রেফতার হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কারা করছে, এ বিষয়গুলো আমাদের সমনে আসেনি।’
হেসেছিল আহমদ মুসা। বলল, ‘যারা উচ্ছেদ করিয়েছে, জেলে পাঠিয়েছে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, তারাই নিজেদের নির্যাতিত বলে আপনাদের বোকা বানিয়েছে। যাক, বলুন কর্নেল আপনার কথা।’
কর্নেল শুরু করে আবার, ‘তারা বলেছে, এই হত্যা, নির্যাতন, জেল জুলুমের অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক মহলকে সবকিছু জানাতে হবে। জানাতে হলে আর্মেনীয় জেনোসাইডের ভিকটিম হবে সংখ্যালঘুরাই। কয়েক হাজার সংখ্যালঘুর জীবনের বিনিময়ে যদি পূর্ব আনাতোলিয়া থেকে জুলুমশাহীর অবসান ঘটে, তাহলে এই আত্মত্যাগে কোন ক্ষতি নেই। এই আত্মত্যাগে সংখ্যালঘুরা প্রস্তুত। এখন তাদের হত্যা করার কাজটা সেনা অফিসারদের করতে হবে। এই হত্যা করার সময় পূর্ব আনাতোলিয়ার বিভিন্ন শহর, বন্দর, বাজারে হাজার হাজার লোক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। দোকন-পাট, হাট-বাজারে আগুন দেবে, পুলিশের উপর হামলা করবে। ব্যাপক বিক্ষোভ, বিদ্রোহের মুখে আসহায় পুলিশ পিছু হটবে। নৈরাজ্য বন্ধের জন্যে তখন সেনাদের ডাক পড়বে। সেটাই হবে আপনাদের এ্যাটাক করার মুহূর্ত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখ বন্ধ করে গুলি চালাবেন। আপনাদের ইজদিরে ৫০ হাজার লোকের বিক্ষোভ হবে। এখানে কমপক্ষে ৩ হাজার লাশ আরা চাই।’ থামে জালাল জহির উদ্দিন।
‘অর্থাৎ, এভাবে পূর্ব আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলে ২৪টি শহর, বন্দর, বাজার থেকে লাশ চায় তারা। কিন্তু এই লাশ দিয়ে কী করবে তারা? তারা এই হত্যাকাণ্ডকে উপলক্ষ্য করে গণবিপ্লব ঘটাতে চায়? কিন্তু তারা তো তা পারবে না। এত লাশ পড়ার পরে রাস্তায় কেউ নামবে না অবশ্যই সেনাদের মোকাবিলা করার জন্যে। তাহলে তারা কী চায়?’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘আমরা সেটা সুনির্দিষ্টভাবে জানি না স্যার। এ’নিয়ে তারা কখনও কথা বলেনি।’ বলেছিল ব্রিগেডিয়ার সেলিম।
‘আচ্ছা, আজ সকালে তোমাদের প্রোগ্রাম কী ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
কর্নেল জালালই শুরু করল আবার, ‘আজ সকাল আটটায় শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ওরা মিছিল শুরু করবে। নয়টায় পৌঁছবে তারা সিটি সেন্টরে। এই সময়টা অফিসে যাবার, কাজে যাবার, কাজ শুরু করার সময়। মিছিলের ফলে শহরে একটা অচলাবস্থা দেখা দেবে। সিটি সেন্টার থেকেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ শুরু হবে। পুলিশের উপরও হামলা হবে। পুলিশকে ছত্রভংগ করা হবে। আত্মরক্ষার জন্যে তারা সরে দাঁড়াবে। এই সময় দশটার দিকে স্যার ব্রিগেডিয়ার সেলিম আস্-সুয়ুতী আর্মি মুভ করতে নির্দেশ দেবেন বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্যে। এভাবেই তিন হাজার লাশ পড়ার ব্যবস্থা হবে।’ থামে কর্নেল জালাল তার কথা শেষ করে।
কথাগুলো বলছিল কর্নেল জালাল ও ব্রিগেডিয়ার সেলিম ষড়যন্ত্রকারীদের একজন আগাসি খান জিয়ানকে সামনে রেখেই। যিনি ধরা পড়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার সেলিরে সাথে তার বাড়িতে।
আগাসি খান জিয়ান মাথা নিচু করে বসেছিল। তার হাত দু’টি পিছ মোড়া করে বাঁধা।
আহমদ মুসা বাম হাত দিয়ে তার মুখ উপরে তুলে ধরে বলল, ‘আপনার পরিচয় ব্রিগেডিয়ার বলেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, আপনি বড় কোন নেতা নন। বিচারে আপনার শাস্তি হতে পারে, কিন্তু সেটা প্রাণদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের পর্যায়ে যাবে না। আর যদি আপনি সহযোগিতা করেন, তাহলে আপনার এই সহায়তার জন্য শাস্তি আরও লঘু হতে পারে। অন্যদিকে, আপনি যদি আমাদের সহায়তা না করেন, তাহলে আপনার প্রাণ যাবে। আপনার কাছে যে সহায়তা আমরা চাই, সেটা হলো, আপনাদের সংগঠন এই লাশ চাচ্ছে কেন? কী লক্ষ্য তাদের? আপনি শুনে রাখুন, এক প্রশ্ন আমি দু’বার করি না। আমি দশ পর্যন্ত গুণব, এর মধ্যে আমার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে আপনাকে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা দশ পর্যন্ত সংখ্যা গুণা শুরু করল।
গুণতে গিয়ে নয় উচ্চারণ করেই আহমদ মুসা তার রিভলভার তুলে একটা গুলি চালাল আগাসি খান জিয়ানের লক্ষ্যে। গুলিটা তার মাথার ডান পাশের এক গুচ্ছ চুল তুলে নিয়ে চলে গেল।
লোকটা ভীষণ চমকে উঠল। ভয়ে আতংকে চুপসে গেল তার মুখ।
আহমদ মুসা দশ গুণার সাথে সাথেই সে চিৎকার করে উঠল। বলল, ‘আমি বলছি, সব কথা আমি বলছি।’
আহমদ মুসা দশ না গুণে রিভলভার নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘বলুন, লাশ কেন চাচ্ছে আপনাদের সংগঠন?’
‘আমাদের সংগঠন এই ধরনের একটা জেনোসাইড চাচ্ছে সারা বিশ্বকে পাশে পাবার জন্যে। বিশ্বের কাছে প্রমাণ করার জন্যে যে এই ভূখণ্ডের মানুষ তুরস্কের হাতে নিরাপদ নয়, এই কথাও প্রমাণ করার জন্যে যে, এই ভূখণ্ড তুরস্কের অধীনে থাকতে পারে না।’ বলল আগাসি খান জিয়ান।
‘কিভাবে বিশ্বকে সব উল্লেখযোগ্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক পূর্ব তুর্কিস্তানের ২৪টি স্পটে এসে পৌঁছেছে। তারা সব হত্যার ফটো ও নিউজ সংগ্রহ করবে এবং আজ থেকে কয়েকদিন পূর্ব-তুর্কিস্তানের এ ঘটনাই বিশ্বের প্রধান নিউজ হবে। ছবি ও নিউজের অব্যাহত প্রচার এমন জনমত গঠন করবে যা তুরস্ককে একঘরে করে পূর্ব আনাতোলিয়াকে একটা স্বাধীন আর্মেনীয় রাষ্ট্রে পরিণত করবে। যেমনটা পূর্ব তিমুরের ক্ষেত্রে হয়েছে।’ কথা শেষ করল আগাসি খান জিয়ান।
আহমদ মুসার মুখে অবাক বিস্ময়ের ছাপ। আহমদ মুসা অনেক কিছু ভেবেছে, কিন্তু এই সংঘাতিক বিষয়টা তার ভাবনায় আসেনি। একটা রাষ্ট্রের একটা অঞ্চলকে নিয়ে কি ভয়ানক ষড়যন্ত্র!
আহমদ মুসা আগাসি খান জিয়ানকে ধন্যবাদ দিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে জেনারেল মোস্তফাকে আগাসি খান জিয়ান যা বলল সব জানাল।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। তুরস্ককে আপনি বাঁচালেন। ২৪টি স্পটের বিক্ষোভের স্থানে গুলি করার জন্যে যারা নির্ধারিত তারা সকালের অনেক আগেই গ্রেফতার হবে। তাদের সবার বাড়ি ঘিরে রাখা হয়েছে। আপনার এই টেলিফোনের অপেক্ষায় ছিলাম শুধু। তারা ২৪টি স্পটের কোথাও জমায়েত হতে পারবে না তার ব্যবস্থা ভোর হওয়ার আগেই সম্পন্ন হবে। বিদেশী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদিকরা সব জায়গায় শান্তি শৃঙ্খলা দেখতে পাবে। আপনি ডিজিপি মাহির হারুনকে আমার সাথে কথা বলতে বলবেন। আমি সেনা প্রধান, পুলিশ প্রধান এখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বসে আছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আস্-সালামু আলাইকুম।’ মোবাইলে কথা শেষ হতেই আগাসি খান জিয়ান বলল, ‘স্যার, এই ষড়যন্ত্রই শেষ নয়। এর চেয়েও ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্র তারা এঁটেছে।’
‘কী সেটা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আদিগন্ত এক সমুদ্রের বিশাল জনমানবহীন এলাকার একটা দ্বীপে ইউরোপ আমেরিকাসহ কিছু দেশের আলট্রান্যাশনালিস্ট মন্ত্রীদের যুক্তফ্রন্ট ব্ল্যাকহেড সিন্ডিকেটের রাজ্য গঠন হচ্ছে। অস্ত্র-শস্ত্রসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তাদের থাকবে। গণতন্ত্র, ধর্মসহ সব ধরনের নীতি-নৈতিকতার তারা বিরোধী। পশ্চিমের কিছু দেশ ও সরকারও তাদের টার্গেট। কিন্তু প্রধান টার্গেট হলো ইসলাম ও মুসলমানরা। কারণ তারা মনে করে আজকের দুনিয়ায় ইসলামই একমাত্র নৈতিক বিধানের ধর্ম। তাই ইসলাম তাদের প্রথম টার্গেট। মুসলিম দুনিয়ার সফল রাজনীতিক, সফল বিজ্ঞানী, সফল শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের শত্রু। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন সফল বিজ্ঞানী, সফল রাজনীতিক, সফল শিক্ষাবিদকে কিডন্যাপ, নিস্ক্রিয় ও ইলিমিনেট করা হয়েছে। এটা সময়কে তারা নির্দিষ্ট করেছে। এই সময়ের মধ্যে তারা ইলিমিনেশন প্রোগ্রাম শেষ করবে।’ থামল আগাসি খান জিয়ান।
‘কিন্তু তাদের আল্টিমেট টার্গেট কী? তারা কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সেটা আমি জানি না স্যার। ঘটনাক্রমে আমি এ বিষয়টা জানতে পারি এবং আমি নিজে মানবতা বিরোধী এই কাজকে সমর্থন করি না বলেই বিষয়টা আপনাকে জানালাম।’ বলল আগাসি খান জিয়ান।
আগাসি খান জিয়ানের এই কথাগুলোর একটা বর্ণও আহমদ মুসার কানে প্রবেশ করেনি। তার মনে পড়ে গিয়েছিল কয়েকদিন আগে ভ্যান টাইমসে পড়া একটা ছোট খবরের কথা। খবরে রহস্যপূর্ণভাবে হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন মানুষের কথা বলা হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে দুইজন বিজ্ঞানী, তিন জন রাজনীতিক ও চারজন বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাবিদ হারিয়ে যাওয়ার খবর ছিল ঐ নিউজ আইটেমে। সবাই মুসলিম দেশের নাগরিক এবং হারিয়ে যাওয়া লোকরা সবাই ছিল মুসলিম। নিউজের বিষয়টা মনে হতেই আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। খবরটা মিলে যাচ্ছে আগাসি খান জিয়ানের কথার সাথে।
‘আচ্ছা, ব্ল্যাকহেড সিন্ডিকেটের লোকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ কী?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘কিছু আলোচনা আমি শুনেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে, ওরা দুনিয়ায় হোয়াইটদের সুপ্রিম্যাসি এবং হোয়াইটদের ধর্ম ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইহুদিবাদের সুপ্রিম্যাসি চায়।’ বলল আগাসি খান জিয়ান।
‘কিন্তু ইহুদি ধর্ম তো হোয়াইটদের নয়, সেমিটিকদের। এখনও তাদের ধর্মগোষ্ঠীকে সেমেটিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখায় সফল হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কথা ঠিক। গত দেড়শ’ বছরের খ্রীস্টান ইভানজেলিস্ট আন্দোলন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যে খ্রীস্টান ও ইহুদিদের একটা ঐক্য গড়তে সমর্থ হয়েছে। এখন খ্রীস্টানরা একথা বলছে যে, আরাইলই হবে যিশুখ্রীস্টের শেষ যুদ্ধের শেষ রঙ্গমঞ্চ। অতএব, ইসরাইল শুধু ইহুদিদের নয়, খ্রীস্টানদেরও। এই লক্ষ্যে খ্রীস্টান ও ইহুদিদের নতুন প্রজন্ম একটা ঐক্য গড়ে তুলেছে।’ আগাসি খান জিয়ান বলল।
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। এ বিষয়ে আমারও কিছু জানা আছে। এটা একটা ডেকোরাম কোয়ালিশন। ব্ল্যাকহেড সিন্ডিকেটের এটাই যদি রাজনৈতিক মতাদর্শ হয়, তাহলে তা খুবই বিপজ্জনক হবে।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল ডিজিপি মাহির হারুনের দিকে। বলল, ‘আমি এখন উঠব। কাজ এখানে শেষ। আপনি এই তিনজনকে পুলিশ কাস্টডিতে পাঠিয়ে দিন। আমি এদের ব্যপারে সরকারকে বলব, যাতে এদেরকে আসামী নয়, সাক্ষী বানানো যায়।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালো।
ডিজিপি মাহির হারুন ও খাল্লিকান খাচিপ তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তাদের চোখে অসীম শ্রদ্ধার বহিপ্রকাশ। ওরা কিছু বলতে চেয়েও পারল না। আমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করেছে গাড়ির দিকে।

সদ্য বিবাহিত ড. আজদা আয়েশা ও ড. মোহাম্মদ বারজেনজো, দু’জনেই বর ও বধূবেশে এসে সালাম করল আহমদ মুসাকে! তাদের দু’পাশে দু’জনের পরিবারের সিনিয়র সদস্যরা।
আহমদ মুসা ড. আজদা ও ড. বারজেনজো-কে দোয়া করে বলল, ‘তোমরা নবী-নন্দিনী ফাতেমা (রাঃ)ও হযরত আলী (রাঃ)-এর মত হও।’
অশ্রু গড়াচ্ছিল বর-বধুর চোখ থেকে।
পাশে দাঁড়ানো ড. বারজেনজো’র পিতা বলল, ‘স্যার, আপনি শুধু দু’জনকে, দুই পরিবারকে নয় দুই বিবাদমান কম্যুনিটিকে একাত্ম করেছেন। আপনি আমাদের তুরস্ককে বাঁচিয়েছেন যেমন, তেমনি বাঁচিয়েছেন দুই কম্যুনিটিকে।’ তার কণ্ঠ আবেগরুদ্ধ হয়ে উঠেছিল শেষ দিকে।
‘দুই কম্যুনিটিকে একাত্ম শুধু নয়, আমাদেরকেও একটা অন্ধকার গহ্বর থেকে তুলে এনেছেন। আমাদের ঈমান ফিরে পেয়েছি। আমাদের রাজনীতিও হয়েছে পরিশুদ্ধ। আমাদের পরিবার ও আমাদের কম্যুনিটি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’ বলল মস্কো থেকে আসা ড. আজদার বাবা। তারও কথাগুলো শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
‘আমি শুধু নিমিত্ত মাত্র। আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
স্যার, সকলের ইচ্ছায়ই ‘ভ্যানে’ই বিয়ের আনুষ্ঠান হলো। আগামী পরশু আমাদের গ্রামের বাড়ি আরিয়াসে উভয় পক্ষ থেকে যৌথভাবে অনুষ্ঠান হবে, সেখানে আপনি প্রধান অতিথি। আজই আপনাকে আমরা সেখানে নিয়ে যাব। বর-বধু বাসর হবে।’ বলল ড. আজদার মা।
আহমদ মুসা শুনে হাসল। বলল, ‘যেতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু আমার ফ্লাইট আজ সাড়ে ১২টায়।’
চমকে উঠল ড. আজদা এবং ড. বারজেনজো, দু’জনেই। বলল ড. আজদা, ‘সাড়ে ১২টায় আপনার ফ্লাইট? কোথায় যাবেন? আমরা তো কেউ জানি না!’
‘আমার এ ফ্লাইট যাবে মদিনা শরীফে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোথায় ভাইয়া, জরুরী কাজটা কী? আর কোন আজদা আপনাকে ডেকেছে?’ বলল ড. আজদা। বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলল।
‘না বোন, এবার কোন আজদার সন্ধানে নয়, এবার আমার যাত্রা একটি দ্বীপের সন্ধানে।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে। ফিরে তাকাল টার্কিস এয়ার লাইন্সের এক অফিসারের দিকে। বলল, ‘দেরি করে ফেললাম কি খুব?’
‘না স্যার, আপনার জন্যে একটা বিশেষ বিমান তুরস্ক সরকার ব্যবস্থা করেছেন। অসুবিধা নেই।’ বলল টার্কিস এয়ার লাইন্সের অফিসার।
আহমদ মুসা সবাইকে সালাম দিয়ে টার্কিস এয়ার লাইন্সের অফিসারের সাথে হাঁটতে লাগল।
ফিরে তাকাল না পেছনে। অশ্রু ও স্নেহের বাঁধনের কাছে সে খুব দুর্বল। সে জন্যেই অতীতের দিকে তাকাতে তার ভয় হয়। ভয় হয় ফাতেমা ফারহানা, মেরী, আয়েশা আলিয়েভা, তাতিয়ানা, মেইলিগুলিদের মুখ সামনে আনতে।
আহমদ মুসারও চোখের দু’কোণ ভিজে উঠেছিল। আঙুল দিয়ে চোখটা মুছে ফেলে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আহমদ মুসা।

পরবর্তী বই
একটি দ্বীপের সন্ধানে