৫১. প্যাসেফিকের ভয়ংকর দ্বীপে

চ্যাপ্টার

শর্ট রেঞ্জ অপশনে সুপার মাল্টি সাউন্ড মনিটর অবিরাম বিপ বিপ করেই চলেছে।
চার সিংহ মুর্তির উপর সেট করা রাজসিক ডিভানের উপর রাজশয্যায় শুয়ে ছিল আলেক্সি গ্যারিন। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সর্বময় কর্তা এই আলেক্সি গ্যারিন।
ঠিক শুয়ে থাকা নয়, বালিশে ঠেস দিয়ে পার্সোনাল পিসি হাতে নিয়ে কিছু করছিল। এর মধ্যেই তন্দ্রার শিকার হয়ে তার দেহটা বালিশের উপর নেতিয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
বিপ বিপ শব্দটা করেই চলেছে মোবাইলে সাইজের মাল্টি সাউন্ড মনিটরটা।
হঠাৎ ঘুমন্ত আলেক্সি গ্যারিনের হাতঘড়ি ক্ষীণ একটা রেড সিগন্যাল দেয়া শুরু করল। সেই সাথে সাউন্ডলেস ভাইব্রেশন শুরু হল।
এবার চমকে উঠে চোখ খুলল আলেক্সি গ্যারিন।
চোখ খুলেই সে তাকাল হাতঘড়ির দিকে। ঘড়ির স্ক্রীনে লাল অক্ষরে নোটিশ ‘অ্যালাইন ভয়েস মনিটোরড’।
শোয়া থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল এলাক্সি গ্যারিন। তার চোখ গিয়ে ফিক্সট হলো সুপার মনিটরের উপর। মনিটরের বিপ বিপ সাউন্ড বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু লাল নোটিশ মনিটরের স্ক্রীনে এখনও আছে।
তাড়াতাড়ি মনিটরটা তুলে নিয়ে আলেক্সি গ্যারিন ভিউ বাটনে চাপ দিল। মনিটরের স্ক্রিন থেকে লালা নোটিশ সরে গিয়ে সেখানে একটা রেড লেটার মেসেজ ভেসে উঠলঃ SOS-save our soul. We are seventy six….. (এসওএস, আমাদের বাঁচান। আমরা ছিয়াত্তর)…’ মেসেজটি অসম্পূর্ণভাবে ক্লোজ হয়ে গেল। সেই সাথে ধাতব কিছু আছড়ে পড়ার শব্দ হলো।
স্প্রিং-এর মত ডিভান থেকে লাফ দিয়ে নামল আলেক্সি গ্যারিন। তার মনের ভেতরটায় তখন তোলপাড়। আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ার (COP) থেকে কেউ মেসেজ পাঠাচ্ছে! তার মনের এই তোলপাড়ের ছাপ মুখেও এসে পড়েছে। তার মুখের পেশীগুলো লোহার মত শক্ত হয়ে উঠেছে। দু’চোখে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন।
আলেক্সি গ্যারিন লোকটি দেখতেও ইস্পাতের এক রোবটের মত। প্রায় ছয় ফুটের একটা স্লিম বড়ি তার। শক্তির প্রাচুর্য আর ফিটনেসের দীপ্তি যেন ঠিকরে পড়ছে তার দেহ থেকে।
আলেক্সি গ্যারিন মেঝের উপর লাফিয়ে পড়ে কোন কিছু করার আগেই হাতঘড়ি আবার নিরব শব্দে ভাইব্রেট করতে শুরু করল।
ঘড়ির স্ক্রীনের দিকে একবার তাকিয়েই বলে উঠল, হ্যাঁ গোরী, কি ঘটেছে? আলেক্সি গ্যারিনের কণ্ঠ দ্রুত ও কঠোর।
ঘড়ি থেকে কণ্ঠ ভেসে এল, মাই লর্ড, আমাদের রোবট-৩৯ তার প্রাকৃতিক চরিত্রের অন্যথা করে বাইরে থেকে এসওএস পাঠাচ্ছিল। তাকে ধরেছি। নির্দেশ বুলুন মাই লর্ড।
তুমি থাক ওখানে আমি আসছি। বলল আলেক্সি গ্যারিন।
কথা শেষ করেই আলেক্সি গ্যারিন দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। দরজার কাছাকাছি হতেই দরজা আপনাতেই খুলে গেল।
দরজা পার হয়ে করিডোরে পা রেখে একটু ঘুরল। দরজার দেয়ালে একটা ডিজিটাল কি বোর্ডে তিন ও নয় বাটন চাপল।
সংগে সংগে করিডোর সচল হয়ে উঠল।
করিডোরের লম্বালম্বি দু’টো অংশ একটা লাল, অন্যটি সবুজ। আলেক্সি গ্যারিন দাঁড়িয়েছিল সবুজ অংশে। সবুজ অংশই চলতে শুরু করেছে।
এ করিডোর সে করিডোর ঘুরে মুভিং এলেভেটরটি মনে হলো দু’তলা পরিমাণ নিচে।
প্রবেশ করল আলেক্সি গ্যারিন ৩৯ নাম্বার সেলে।
আলেক্সি গ্যারিন প্রবেশ করতেই সেলের মাঝখানে দাঁড়ানো আলেক্সি গ্যারিনের পার্সোনাল সিকিউরিটি ও পার্সোনাল অপারেশন কমান্ডার গৌরী বাউ করে দু’পা পেছনে সরে গেল। বলল, আসুন মাই লর্ড।
আলেক্সি গ্যারিন দেখল, রোবট-৩৯-এর দু’হাতে হাতকড়া। বসিয়ে রাখা হয়েছে এক চেয়ারে।
রোবট-৩৯ আসলে বিজ্ঞানী কুতাইবা ওয়াং-এর এখানকার সিরিয়াল নাম। সে পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ কণা-বিজ্ঞানী। বাড়ি তার চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। তিন মাস আগে অপহৃত হয়ে এখানে এসেছে। সে বন্দী জীবনের প্রথম দিন থেকেই মুক্তির চেষ্টা করছে। ওদের বন্দুকের মুখে টিভি ক্যামেরার সামনে ওদের ফরমাইসি গবেষণা করতে হয় ল্যাবরেটরীতে বসে। এই কাজ করার ফাকেঁই প্রতিদিন তিল তিল করে সে মাল্টিওয়েভ ট্রান্সমিটার তৈরী করে। এ ট্রান্সমিটারের ট্রান্সমিশন যে কোন ওয়েভ লেংথে প্রবেশ করতে পারে। ম্যাসেজ প্রেরণের শুরুতেই সে ধরা পড়ে গেছে। সে জানত, এ ধরনের মেসেজ গার্ড দেবার ব্যবস্থা এদের আছে। কিন্তু কুতায়বা ওয়াং বলেছিল মেজেস পাঠানোর পর ধরা পড়লে ক্ষতি নেই। নিজের জীবন দিয়েও যদি ৭৫জন বিজ্ঞানীর অতি মূল্যবান জীবন রক্ষা করা যায়, তাদের প্রতিভার অপব্যবহার থেকে সে প্রতিভাগুলোকে বাঁচানো যায় এবং এদের ষড়যন্ত্র বানচাল করা যায়। তাহলে সেটাই হবে তার জন্যে বেশি আনন্দের। কিন্তু তা সে পারেনি। মেসেজ পাঠানো তার সম্পূর্ণ হয়নি। যেটুকু পাঠিয়েছে, সেটুকু কি কোন কাজে লাগবে?এই চিন্তাই বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। শয়তানদের বড় শযতান আলেক্সি গ্যারিনকে সেলে প্রবেশ করতে দেখে এই চিন্তাই তার মধ্যে আবার তোলপাড় করে উঠল।
আলেক্সি গ্যারিন মোটা গোড়ালির পয়েন্টেড সু পায়ে মাটি কাঁপানো পদক্ষেপে বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখের চেহারা তার বিস্ফোরণ উন্মুখ। বলল সে বিজ্ঞান কুতায়বা ওয়াংকে লক্ষ্য করে, তোমার সাথে আর কে আছে এই ষড়যন্ত্রে? কথাগুলো তার শান্ত, কিন্তু বুলেটের মত শক্ত।
কুতায়বা ওয়াং কোন জবাব দিল না। আলেক্সি গ্যারিনকে কোন সাহায্য করার কোন প্রশ্নই আসে না।
দাতেঁ দাঁত চাপল যেন আলেক্সি গ্যারিন। তার ডান হাতটা বেরিয়ে এল প্যান্টের পকেট থেকে। তার হাতে ছোট্ট সাদা সর্বাধুনিক ভার্সনের লেজারগান। গানটি টার্গেট করেছে কুতায়বা ওয়াং-এর দুই হাত। পর মুহূর্তেই দেখা গেল, বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর দুই হাত নেই। কবজি থেকে দুই হাত তার উধাও হয়ে গেছে।
যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ার কথা বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর। কিন্তু তার মুখ থেকে একটা শব্দও বেরুল না। চোখ দু’টি তার বিস্ফোরিত। দাঁতে দাঁত চাপার তীব্রতায় মাড়ি ফেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে।
আলেক্সি গ্যারিন ঘুরে দাঁড়াল গৌরীর দিকে। বলল, গৌরী, তুমি ওকে যা করবার কর। তারপর দৃষ্টান্ত হিসাবে একে আমাদের অন্য রোবটদের দেখাও। তারপর আমার কাছে নিয়ে এস। আমি ততক্ষনে ভেতরের বাইরের ভিডিও ফুটেজগুলো নিজে একবার চেক করব।
বলেই আলেক্সি গ্যারিন গট গট করে হেঁটে দরজার দিকে চলল।
গৌরী ‘ইয়েস মাই লর্ড’ বলে একটা বাউ করল।
সেল থেকে বেরিয়ে গেল আলেক্সি গ্যারিন।
গৌরী ঘুরে দাঁড়াল বিজ্ঞানী কুতায়বার দিকে। বলল, ড. ৩৯, তোমাকে আর শাস্তি দেবার দরকার নেই। তোমার দেহের রক্ত যত কমছে, মৃত্যু তোমার তত নিকটবর্তী হচ্ছে। এর চেয়ে বড় শাস্তি তোমার জন্যে আর নেই।
বলেই গৌরী চেয়ারের পেছনে একটা বোতামে চাপ দিল। সংগে সংগে চেয়ারের চার পায়ার তলায় চার চাকা নেমে এল। চেয়ার ইঞ্চি দু’য়েক উপরে উঠল।
গৌরী চেয়ার ঠেলে নিয়ে চলল, সেলগুলোতে তার প্রদর্শনীর জন্যে। সেলগুলো বটমের দু’টি ফ্লোর জুড়ে।
টপ ফ্লোরে ভিআইপি রেসিডেন্টস ও তাদের অফিস। আলেক্সি গ্যারিন ও গৌরীরা যখন ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার (COP) –এ থাকে তখন টপ ফ্লোরেই তাদের আবাস হয়।
ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কাল্পনিক বা স্বপ্নের রাজধানী হলো এই ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’। একটা আ্যটলের তলদেশে বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা ক্যাপিটাল অব পাওয়ার।
গৌরী বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর চেয়ার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কাছের সেলটার দিকে। চেয়ারের হাতলের উপর দিয়ে ঝুলে থাকা তার কব্জি পর্যন্ত উড়ে যাওয়া বাহু থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে অবিরাম। কিন্তু কুতায়বার মুখ একেবারেই বাবলেশহীন। যেন আহত হাতটা তার নয়।
কাছের সেলটার একেবারে মুখোমুখি এসে গেছে গৌরী বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াংকে নিয়ে।
সেলগুলো মহাশূন্য ক্যাপসুলের আদলে তৈরি। বাইরের অংশটা ফাইবারিক কাচের তৈরি। বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছুই দেখা যায়। ক্যাপসুলের ভেতরে রয়েছে বেড, টয়লেট, লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি। ব্যায়াম করার জন্যে ঝুলন্ত বারসহ রয়েছে নানা উপকরণ।
এই ক্যাপসুল সেলগুলো রয়েছে বৃত্তাকার বিশাল একটা লাউঞ্জের চারদিক ঘিরে। বৃত্তাকার লাইঞ্জের মাঝখানে রয়েছে সেই ফাইবারকি কাচের দীর্ঘ আয়তাকার কক্ষ। তাতে সারিবদ্ধ টেবিল। রোবটের মত লোকরা বসে। সেলগুলোর সাথে অফিসকক্ষের লোকদের ইন্টারকম যোগাযোগ রয়েছে। এই অফিসকক্ষ থেকেই সেলগুলো কাজ-কর্ম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এছাড়া পর্যবেক্ষণের জন্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সিসি টিভি ক্যামেরা তো রয়েছেই। সেলগুলোর কোন কথা কোন কাজই মনিটর ও পর্যবেক্ষণের বাইরে নয়।
গৌরী বিজ্ঞানী কুতায়বা ওয়াং-এর চেয়ার ঠেলে সেলটির সামনে দাঁড়াতেই সেলে দরজা আপনাতেই খুলে গেল।
রোবট-৪০ মুক্তির স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা অবস্থা তোমরা দেখ। যে দুই হাত দিয়ে আমাদের আইন ভেঙেছিলে, সেই দু’হাত দেখ নেই। কিছুক্ষণ পর সেও দুনিয়ায় থাকবে না। বলল চিৎকার করে গৌরী।
রোবট-৪০ আরেকজন বিজ্ঞানী। সে ইন্দোনেশিয়ার ‘সী ম্যুনিকেশন সাইনটিস্ট’, নাম ড. সোয়েকার্ন নাসির। সে গৌরীর কথা শুনে চমকে তাকাল ড. কুতায়বা ওয়াং-এর দিকে। তার দু’হাতের দিকে নজর পড়তেই একটা বিষাদের ছায়া খেলে গেল ড. সোয়েকার্ন নাসিরের মুখের উপর দিয়ে। কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল মুখের বিষাদ ভাব, শক্ত হয়ে উঠল তার মুখ। তাতে ফুটে উঠল কঠিন সিদ্ধান্তের একটা চিহ্ন।
মুখে কিছুই বলল না ড. সোয়েকার্ন নাসির।
গৌরীর কথা শেষ হতেই কথা বলে উঠল ড. কুতায়বা ওয়াং। বলল, প্রিয় ভাই, আপনাকে বলছি, সবাইকে বলব, মুক্তির স্বপ্ন আমাদের সফল হবে। আংশিক হলেও আমি বাইরে মেসেজ পাঠাতে পেরেছি। আমি নিশ্চিত, এই মেসেজ আল্লাহ ঠিক জায়গায় পৌছিয়ে দেবেন। আপনারা এই শয়…।
কথা শেষ করতে পারলো না ড. কুতায়বা ওয়াং। গৌরীর রিভলবারের এক পশলা গুলি ড. কুতায়বা ওয়াং এর মাথা একবারে ছাতু করে দিল। রক্তের স্রোতে পেইন্ট হয়ে গেল ড. কুতায়বা ওয়াং-এর মুখ ও দেহের অর্ধাংশ। অর্ধাংশ উড়ে যাওয়া মাথা বীভৎস রূপ নিয়েছে।
রিভলবার পকেটে রাখতে রাখতে গৌরী বলল ড. সোয়েকার্ন নাসিরকে লক্ষ্য করে, রোবট ফরটি, মেসেজটা সে সবাইকে বলতে চেয়েছিল, বলার ব্যবস্থা করে দিলাম। একদম স্বর্গে গিয়ে বলবে। গৌরীর চোখ-মুখে আগুন।
কষ্টের একটা ভাব ফুটে উঠেছিল ড. সোয়েকার্ন নাসিরের চোখ-মুখে। কিন্তু মুহূর্তেই সে ভাবটা কেটে মুখের সেই শপথ দৃঢ় ভাবটা আবার ফিরে এল। মনে মনে বলল, ড. ওয়াং কি মেসেজ পাঠিয়েছে? কেমন করে সে এই অসাধ্য সাধন করল! মনে মনে স্যালুট দিল সে ড. ওয়াং-এর উদ্দেশ্যে। গৌরী ড. ওয়াং-এর হুইর চেয়ার ঠেলতে শুরু করেই আবার থমকে দাঁড়াল। মুখ ঘুরিযে বলল ড. নাসিরকে রোবট ফরটি, আমাদের বিজ্ঞানী ড. আলেকজান্ডারকে সাথে নিয়ে আমি বিকেলে দিকে তোমার কাছে আসব। সব ঠিক ঠিক রেখ। মনে আছে তো, আ্যন্টিম্যাটার ফুয়েলের আজ ল্যাবরেটরি টেস্ট হবার কথা। টেস্ট টিউব আজ তোমার রেডি রাখার কথা। আজ কিন্তু কোন এক্সকিউজ শোনা হবে না। ইলেকট্রিক চাবুকের কথা মনে আছে নিশ্চয়। তোমার পিঠের আগের ঘাগুলোর উপর ইলেকট্রিক চাবুক কি আরও ভাল ফল দেবে?
বলেই আবার চেয়ার ঠেলতে শুরু করল গৌরী।
একটা সেল থেকে আরেকটা সেলের দূরত্ব আট নয় ফুটের বেশি নয়। এক সেল থেকে অন্য সেলের ভেতরের সব কিছুই দেখা যায়। কিন্তু প্রতিটি সেলই সাউন্ডপ্রুফ। এক একটি সেলে একজন করে বিজ্ঞানী বাস করে এবং সেলের ল্যাবরেটরিতেই তাদের কাজ করানো হয়। আউটডোর পরীক্ষাগুলো বটম ফ্লোরের ওপেন স্পেসে করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ফ্লোরে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা থাকে এবং তাদের বন্দুকের মুখে কাজ করানো হয সেখানেই। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট কিডন্যাপ করে আনা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের দিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে থাকে।
গৌরী একের পর এক সেলে বিজ্ঞানী ওয়াং-এর মুক্তি প্রচেষ্টার পরিণতি দেখিযে চলল। সেকেন্ড ফ্লোরের সব সে কভার করার পর শেষ সেলটা থেকে প্রথম ফ্লোরে নামার মুভিং ইলেভেটারে উঠতে যাচ্ছিল। সেলটির বিজ্ঞানী ও ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের পুতুল হয়ে উঠা ড. স্যামুয়েল মাদারল্যান্ড গৌরীকে লক্ষ করে বলল, ইয়োর হাইনেস ম্যাডাম, একটা কথা বলতে চাই।
বলো রোবট-৬৯। বলল গৌরী।
আমার মনে হয় এই অবস্থায় একজন বিজ্ঞানীকে অন্য বিজ্ঞানীদের দেখানো ঠিক হচ্ছে না। এর দ্বারা তারা ভয় পাবার বদলে ক্ষুব্ধ বেশি হবে। আপনাদের উদ্দেশ্য ওদের থেকে কাজ নেয়া, বিক্ষুব্ধ করা নয়। ড. স্যামুয়েল মাদারল্যান্ড বলল।
থমকে দাঁড়াল গৌরী। বিজ্ঞানী ড. স্যামুয়েলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক মুহুর্ত ভাবল। তারপর মুখে হাসি টেনে বলল, ‘ধন্যবাদ রোবট-৬৯, তোমার পরামর্শের জন্যে ধন্যবাদ।
বলে প্রথম ফ্লোরে নামার জন্যে মুভিং এলিভেটরের দিকে না গিয়ে চেয়ার ঠেলে এগিয়ে চলল টপ ফ্লোরে ওঠার এলিভেটরের দিকে।
উঠে গেল টপ ফ্লোরে।
টপ ফ্লোরে উঠেই বিজ্ঞানী ড: ওয়াং-এর চেয়ার ঠেলে নিয়ে একটা সংকীর্ণ করিডোর হয়ে একটা প্রান্তে চলে গেল। দেয়ালের গায়ে বর্গাকৃতি একটা খাঁজে চেয়ার ঢুকিয়ে হাত উপরে তুলে দেয়ালের সাথে মিশে থাকা একটা টাচ বাটনে চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের ভেতর থেকে একটা দরজা এসে খাঁজটা ঢেকে দিল। ভেতর থেকে সূক্ষ্ম যান্ত্রিক একটা শব্দ ভেসে এল এবং একটা পতনের শব্দ।
গুডবাই রোবট-৩৯। বলার সাথে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল গৌরীর মুখে।
দেয়ালের খাঁজটা লাশ ও এ ধরনের বর্জ্য পাতালের সাগর বক্ষে চালান করার একটা ট্র্যাপ।
গৌরী ফিরে এল। গৌরী আলেক্সি গ্যারিনের কক্ষের সামনে আসতেই অটোমেটিক দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে ভারী কণ্ঠ ধ্বনিত হলো আলেক্সি গ্যারিনের, এস গৌরী। তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।
ইয়েস মাই লর্ড! বলে গৌরী ভেতরে প্রবেশ করল।
পেছনে দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
একটা ডিভানে রাজার মত পা ছড়িয়ে বসে ছিল আলেক্সি গ্যারিন। গৌরী ভেতরে প্রবেশ করলে আলেক্সি গ্যারিন সোজা হয়ে বসল। তার পাশে পড়ে আছে রিমোট কনট্রোল সেট।
গৌরী আস্তে আস্তে গিয়ে আলেক্সি গ্যারিনের একটু পাশে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
গৌরী, আমাদের রোবট নাম্বার ৩৯ সাংঘাতিক ছিল। সাংঘাতিক মেধাবী আর কুশলী ছিল। কারও সাথে যোগাযোগ ছাড়াই অভূতপূর্ব কায়দায় অবিশ্বাস্য শক্তির মাল্টিওয়েভ ট্রান্সফরমার বানিয়েছিল। চতুর্দিকে দু’শ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল তার এসওএস। বলল আলেক্সি গ্যারিন।
সর্বনাশ মাই লর্ড! এই বিশাল অঞ্চলের কোন না কোন জাহাজের মনিটরিং-এ তা ধরা পড়তে পারে। গৌরী বলল।
না, ভাগ্য বলে যদি কিছু থাকে তা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সাথে রয়েছে। পাশের অ্যাটলের ট্রানজিট স্টেশনে আমাদের যে এন্টেনা আছে, তার সার্চ পাওয়ার ঐ মেসেজের বিস্তার-রেঞ্জের চেয়ে অনেক বেশি। সেদিনের সে সময়ের সার্চ রিপোর্টের পুরো রিপোর্ট আমি দেখেছি। ঐ সময় রেডিও এ্যান্টেনাওয়ালা কোন যান্ত্রিক যান এই এলাকায় ছিল না। ইঞ্জিনওয়ালা বোট কিছু ছিল। ছবিতে দেখা গেছে সেগুলো নিছকই ফেরিবোট এবং খুবই ছোট পার্সোনাল। কোন ট্যুরিস্ট বোট কোথাও দেখা যায়নি। তবে ফেরি ধরনের একটা লোকাল বোট আমাদের পাশের তাহানিয়া অ্যাটলের আমাদের ট্রানজিট স্টেশনের একদম পাশে উত্তরে নোঙর করা ছিল। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, নির্দিষ্ট সময়টাতে আমাদের এই ক্যাপিটাল থেকে ট্রান্‌সমিটিং-এ যে ওয়েভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তার ম্যাপে দেখা যাচ্ছে ওয়েভের একটা ধারা ঐ বোটের উপর ভেঙে পড়ছে। এর কারণ একাধিক হতে পারে। ঐ বোটে মাল্টিওয়েভ মনিটর থাকা তার মধ্যে একটি। সুতরাং আমাদের আশংকা মাত্র ঐ বোটটি ঘিরে। থামল আলেক্সি গ্যারিন। তার দু’চোখে আগুন!
একটা সাধারণ বোটে ঐ ধরনের মাল্টিওয়েভ মনিটর থাকা স্বাভাবিক নয়। ঐ বোটের আরোহী কারা সেটা কি ছবি থেকে জানা গেছে মাই লর্ড?
আরোহী ছিল দু’জন ছেলে, একজন মেয়ে।
একজন ছেলে ও মেয়েটি পলিনেশীয় অঞ্চলের, অন্যজন বিদেশী। কিন্তু ইউরোপীয় নয়। ওদের ফটো-প্রিন্টও পেয়ে গেছি। উদ্বেগের ব্যাপার হলো, যে সময়টুকুতে মেসেজ প্রচার হতে পেরেছে, সে সময় তারা তিনজনই বোটের ভেতরে ছিল। মেসেজের শুরুতেই প্রথম ভেতরে ঢুকে বিদেশী লোকটি। তারপর অন্যরাও। বলল অ্যালিক্সি গ্যারিন।
তার মানে মাই লর্ড, আপনি কি মনে করেন ওরা মেসেজের কোন সিগন্যাল পেয়েই ভেতর ঢুকেছে মেসেজ রিসিভ করার জন্যে? গৌরী বলল। উদ্বেগ তার চোখে-মুখে।
সেটাই ঘটেছে এটা বলার মত কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু শতভাগ সন্দেহ যে, সেটাই ঘটেছে।
বলে মুহুর্তকাল থেমে আলেক্সি গ্যারিন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। বলল গৌরী, ফাইল রেডি। ফাইলে পাবে বোটের ছবি, বোটের নাম্বারও পাবে বোটে। তিনজন ছেলেমেয়ের ছবি রয়েছে ফাইলে। কাজ শুরু কর। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে চাই ঐ বিদেশীকে আমাদের হাতে। তাকে জীবিত পেতে হবে। প্রথমে দেশী দু’জনকে খুঁজে পেলে পরবর্তী কাজ সহজ হয়ে যাবে।
কথা শেষ করেই আলেক্সি গ্যারিন বলল, কাজ শুরু করার আগে গৌরী কিছু রেস্ট নাও। বলে আলেক্সি দু’ধাপ এগিয়ে বেডে উঠে গেল। গৌরী প্রথমে কিছুটা বিব্রত হলেও পরক্ষনেই তার মুখে রক্তিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেও বেডে উঠে গেল। সংগে সংগেই বেডটা ঢুকে গেল দেয়ালের মধ্যে।
অদৃশ্য হয়ে গেল বেডটা। দেয়াল ফিরে এল আগের জায়গায়।

গৌরী ও তার কমান্ডোরা গত ২৪ঘণ্টা ধরে ফলো করছিল মাহিন ও মারেভাকে। বোটের মালিকের কাছ থেকে তারা শুনেছিল, যে বিদেশীর জন্যে তারা সেদিন বোট ভাড়া করেছিল, সে বিদেশী যে মাহিন ও মারেভাদের শুধু গাইড নয়, বন্ধুও মনে হয়েছিল। এ থেকেই গৌরী নিশ্চিত হয়েছিল, মাহিন ও মারেভাকে ফলো করলেই সে বিদেশীকে পাওয়া যাবে। মাহিন ও মারেভাকে পাকড়াও করে তাদের কাছ থেকে জানার চেয়ে এটাই নিরাপদ। তাদের পাকড়াও করলে বিদেশী অবশ্যই সেটা জানবে এবং সে আত্মগোপন করতে পারে। মাহিন ও মারেভাকে ফলো করছে গৌরীরা। এই সিদ্ধান্ত থেকেই গৌরীদের সৌভাগ্যবানই বলতে হবে। বোটের নাম্বার ধরে বোটের মালিককে খুজে পাওয়া গৌরীদের জন্যে কঠিন হয়নি। তাহিতি থেকে তাহিতি, মুরিয়া ও তোয়ামতু অ্যাটল আইল্যান্ডে চলাচলকারী সব যান্ত্রিক বোট ও লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন করা হয়ে থাকে। এখান থেকেই গৌরীরা বোটটির মালিকের সন্ধান পেয়েছে। আর বোট মালিকের বুকিং রেকর্ড থেকে পেয়েছে মাহিনের ঠিকানা। মাহিনের ঠিকানায় ওৎ পেতে থেকে মাহিনের সাথে মারেভাকেও পেয়েছে। ভিডিও থেকে পাওয়া ছবির সাথে মিলিয়ে তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে গৌরীরা।
গত ২৪ ঘণ্টায় এক মুহুর্তের জন্যে গৌরীরা পিছু ছাড়েনি মাহিন ও মারেভার। দুই গ্রুপকে দু’জনের পেছনে লাগানো হয়েছে। গৌরী দুই গ্রুপের তদারক করছে।
এই ২৪ ঘণ্টায় মাহিন ও মারেভা আলাদা আলাদাভাবে বাজারে গেছে, পর্যটন অফিসে গেছে, একবার একটা হোটেলেও গিয়েছিল। গৌরীরা তাদের ফলো করেছিল। কিন্তু বিদেশী সেই লোকটিকে কোথাও দেখেনি। গৌরী শংকিত হয়ে পড়েছিল বিদেশী লোকটি চলে যায়নি তো কিংবা আলাদাভাবে অন্য কিছু করায় ব্যস্ত নয় তো! তাহলে কি আমরা ভুল করছি? মাহিন ও মারেভাকে ধরে তাদের কাছ থেকে কথা আদায় করাই কি উচিত ছিল?
গৌরী মারেভাদের গেটের অপজিটে রাস্তার ওপাশে একটা গাড়িতে বসে এসব কথা ভাবছিল। তার দু’চোখ এদিক সেদিক ঘুরে বারবার গিয়ে স্থির হচ্ছিল মারেভার সেই গেটে। দূরবীন দিয়ে মারেবার বাড়ির সামনের কিঞ্চিৎ অংশও দেখতে পাচ্ছিল গৌরী।
এক সময় দূরবীনেই ধরা পড়ল মাহিন একটা ট্যাক্সি নিয়ে মারেভাদের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। অল্প কিছুক্ষণ পর ট্যাক্সি আবার বেরিয়ে এল। এবার ট্যাক্সিতে দু’জন, মাহিন ও মারেভা।
বেরিয়ে তারা পাপেতির মুল শহরের দিকে না গিয়ে পূর্বদিকে চলল। মাহিন-মারেভাদের গাড়ি চলতে শুরু করলে মারেভাদের বাড়ির পাশের পার্কে একটা আড়াল থেকে আরেকটা গাড়ি বেরিয়ে মারেভাদের গাড়ির পিছু নিল।
তখন রাত আটটা। গৌরী তার গাড়িতে বসে সব দেখছিল।
এত রাতে কোথায় বেরুচ্ছে মাহিন ও মারেভা দু’জনে? সেই বিদেশীর কাছে কি? হতেও পারে। গৌরী তার গাড়ি স্টার্ট দিল।
পেছনের মোড় ঘুরে গাড়ি দু’টির পেছনে ছুটে চলল গৌরীর গাড়ি।
গাড়ি পাহাড়ি নদী টাওনার সমান্তরালে উত্তরে এগিয়ে চলেছে। সামনেই সাভাক।
গৌরীর মাথায় চিন্তা, মাহিন-মারেভারা যাচ্ছে কোথায়? টাওনা লেক একেবারেই তো সামনে!
গাড়ি স্লোপিং পথে নিচে নামতে শুরু করেছে।
অনেক দূর থেকে দেখা যায় ‘লা ডায়মন্ড ড্রপ তাহিতি’ নামের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক হোটেলের নিয়ন সাইন।
সাইনবোর্ডটা চোখে পড়তেই গৌরী ‘ইউরেকা’ বলে চিৎকার করে উঠল। উচ্চ কণ্ঠে বলল, কোন সন্দেহ নেই মাহিন-মারেভারা সেই বিদেশীর কাছেই যাচ্ছে। বড় বড় বিদেশীই এ হোটেলের বাসিন্দা।
মাহিন-মারেভাদের গাড়ি হোটেল লা ডায়মন্ড ড্রপ গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মাহিন ও মারেভা নামলে গাড়ি পার্কিং-এর দিকে চলে গেল।
মাহিন-মারেভারা নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনুসরণকারী ব্ল্যাক সান-এর গাড়ি এসে হোটেলটির গাড়ি বারান্দায় দাঁড়াল। তিনজন গাড়ি থেকে বেরিয়ে দ্রুত হোটেলের ভেতরে চলে গেল। আর একজন গাড়ি পার্কিং-এ রেখে আসার জন্যে ওদিকে গেল।
গৌরী তার গাড়ি পার্কিং-এ দাঁড় করিয়েই মোবাইল করল আগের গাড়ির ব্ল্যাক সান-এর লোকদেরকে। বলল, নাশকা, তোমরা ওদের ফলো করছ তো? ওদের পেছন ছাড়বে না। কোন রুমে ঢোকে কিংবা রেস্টুরেন্টে ঢোকে সেটা দেখ। আমি রিসেপশনে অপেক্ষা করছি। আমাকে জানাবে।
কল অফ করে গৌরী ধীরে-সুস্থে চলল হোটেলের রিসেপশনের দিকে। রিসেপশনে বসার অল্পক্ষণের মধ্যেই কল পেল গৌরী। কল অন করে সাড়া দিতেই ওপার থেকে নাশকার গলা পেল গৌরী। বলল চাপা কণ্ঠে, ম্যাডাম হোটেলের দশ তলার পেছনের দিকে ১০১৫ ডবল ডিল্যাক্স রুমে ওরা প্রবেশ করেছে। গৌরী তাদেরকে নির্দেশ দিল, তোমরা ওদের জন্যে অপেক্ষা কর। কি হচ্ছে জানাবে আমাকে।
মোবাইলটা জ্যাকেটের পকেটে ফেলে উঠে দাঁড়াল গৌরী। চলল বুকিং কাউন্টারের দিকে। মনে মনে বলল, জানতে চাই কক্ষটিতে থাকে ঐ লোকটি কোন দেশের, কি তার নাম।
খাস ইউরোপীয় চেহারার চুম্বকের মত আকর্ষণকারী অসামান্য এক সুন্দরীকে কাউন্টোরের সামনে দাঁড়াতে দেখে ছুটে এল কাউন্টারের যুবক এ্যাটেনড্যান্ট। বলল, ইয়েস, ওয়েলকাম ম্যাডাম। বলুন কি করতে পারি আপনার জন্যে?
নির্বিকার চেহারায় কোন পরিবর্তন এল না গৌরীর। বলল, একটা রুম চাই। ডবল ডিল্যাক্স ১০১৫ রুমটি কি পাওয়া যাবে? কয়েক বছর আগে এসে ঐ রুমেই ছিলাম।
বুকিং কাউন্টারের যুবকটির মুখটি ম্লান হয়ে গেল।
বলল, ম্যাডাম, রুমটি আগে থেকেই বুকড্‌। আপনি….।
গৌরী তার মধ্যেই বলে উঠল, ঐ কক্ষে কে আছে?
থেমে গিয়েছিল বুকিং কাউন্টারের যুবকটি। তাড়াতাড়ি রেজিস্টার দেখে বলল, বুকিং আছে ‘আবু আব্দুল্লাহ’-এর নামে।
মুসলমান! স্বগত কণ্ঠে বলল গৌরী। ভ্রু দু’টি তার কুঁচকে গেল। বলল সে, কোন দেশের?
সৌদি আরবের নাগরিক। বলল বুকিং কাউন্টারের যুবক।
সৌদি আরবের! ছবিতে তার যে পোষাক দেখেছি তা তো সৌদি আরবের নয়! অবশ্য সৌদিরা বাইরে গেলে ইনফরমাল ক্ষেত্রগুলোতে পশ্চিমা পোষাকই বেশি পরে! আবার স্বগত কণ্ঠ গৌরীর। একটু অস্বস্তি বোধ করল গৌরী। সৌদিদের প্রচুর টাকা। তারা বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেও থাকে প্রচুর। তাহিতিতে তারা আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল লোকটি তো বোটে মাল্টিওয়েভ মনিটর ব্যবহার করেছে। কোথায় পেল এমন বহুমুখী আলট্রা সেনসেটিভ মনিটর! বোটে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। মাহিন ও মারেভার নয়, তাদের পরিচয়, কাজ, তৎপরতা থেকেই তা পরিষ্কার। তাহলে মনিটর তো সেই সৌদি নাগরিকেরই! তীরের মত সেই সন্দেহ ও হিংস্র ক্রোধ এসে তার মনে প্রবেশ করল।
মোবাইল বেজে উঠল গৌরীর।
এক্সকিউজ মি! বলে গৌরী কাউন্টার থেকে অনেকটা সরে গিয়ে বলল, বল নাশকা, কি খবর?
ম্যাডাম ঘর থেকে বেরিয়ে সেই বিদেশীসহ তিনজন লিফটের দিকে যাচ্ছে। আমরা ফলো করছি। নাশকা বলল।
সেই বিদেশী কে? মানে সেই ছবির বিদেশী কিনা? বলল গৌরী।
ইয়েস ম্যাডাম, হুবহু সেই ছবির লোক। নাশকা বলল।
গুড, তোমরা ওদের ফলো করো। আমি নিচে আছি। বলল গৌরী।
গৌরী গিয়ে বসল কাছের এক সোফায়। ভাবতে লাগল, লোকটি কেমন হবে! তারা আলেয়ার পেছনে ছুটছে না তো! টাকাওয়ালা সৌদিদের বিচিত্র রকম শখ আছে। তারা মাল্টিওয়েভ মনিটর শখবশতও কিনে রাখতে পারে।
এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে গৌরী মনে মনে বলল, ঐসব চিন্তার সময় এখন নয়। তাকে ধরতে হবে, বাজিয়ে দেখতে হবে। তারপর অন্য কথা। তবে সৌদি নাগরিক তো বটে! কোন হৈ চৈ হওয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না। নিরাপদ জায়গায় ফাঁদে আটকিয়ে নিরবে কাজ সারতে হবে।
আবার মোবাইল বেজে উঠল গৌরীর। নাশকার কল।
গৌরী বলল, বল নাশকা।
ম্যাডাম, ওরা তিনজন হোটেলের ২১ তলায় এ্যাপেক্স রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। নাশকা বলল।
এ্যাপেক্স রেস্টুরেন্ট? সে তো সাংঘাতিক কস্টলি! এটা তো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর মত লোকদের বিনোদনের জায়গা। নানা রকম বিনোদন ও অন্যান্য খরচ তারা খাবার দাম থেকেই তুলে নেয়। প্রতিবারের প্রবেশ ফি’ই তো পাঁচশ মার্কিন ডলার! আবার ভাবল গৌরী, অনেক সৌদি নাগরিকের জন্যে টাকা কোন ফ্যাক্টর নয়।
নাশকা তোমরা বাইরেই অপেক্ষা কর। আমি আসছি। বলল গৌরী।
তারা হোটেলের ২১ তলার এ্যাপেক্স রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল। পেছন থেকে নাশকা এসে গৌরীর পেছনে দাঁড়াল।
পেছনে না তাকিয়েই গৌরী বলল, নাশকা, তোমরা বাইরে অপেক্ষা কর, আমি ভেতরে ঢুকছি।
বলেই গৌরী গিয়ে রেস্টুরেন্টের গেটে দাঁড়াল।
গেটের রিসেপশন অফিসার উঠে দাঁড়িয়ে গৌরীর আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ইয়েস ম্যাডাম, ওয়েলকাম।
গৌরী এগিয়ে গিয়ে গেটের পাশের এ্যাডমিশন কি হোলে একটা এক হাজার ডলারের নোট ছেড়ে দিল। সংগে সংগেই বেরিয়ে এল এ্যাডমিশন কার্ড। ভেতরে ঢুকল গৌরী।
বিশাল বহুভূজাকৃতির হলঘর! নরম আলো। নরম মিষ্টি মিউজিক বাজছে।
হলঘরের প্রতিভূজ বা বাহুতে একাধিক বিশ্রাম কক্ষ আছে।
সব মিলিয়ে হল ঘরে স্বপ্নময় একটা পরিবেশ। গানের কথা ও সুর, আলো-আঁধারির রহস্যময়তা, পোষাক-আশাক সবই অভিজাত প্রকৃতির।
গৌরী হলে প্রবেশ করে চারদিকে চোখ বুলাল। এক সময় তার চোখ গিয়ে স্থির হলো নিরিবিলি জায়গার একটা টেবিলে। টেবিলে তিনজন বসে। দু’জন ছেলে ও একজন মেয়ে। সেই বিদেশি, মাহিন ও মারেভা টেবিলটি ঘিরে বসে আছে। ভীষণ খুশি হলো গৌরী। ওরা এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু কাউকে সাক্ষী রেখে ওদের গ্রেফতার করা যাবে না। ছোট-বড় কোন ঝামেলাতেই পড়তে চায় না ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট।
মনে মনে একটা ছক দাঁড় করাল গৌরী। একদম নিরাপদ ছকটি। কিন্তু তার জন্যে দরকার রাতের একটা নিরব প্রহর। তার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে অনেকটাই। তার আগে ঐ বিদেশীকে ও সবাইকে একবার বাজিয়ে নেয়া যাক। আঁচ করা যাবে বিদেশী সম্পর্কে। এগোলো গৌরী টেবিলের দিকে।
দাঁড়াল টেবিলের শূন্য আসনটির পেছনে। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ করে, আমি শূন্য আসনটায় বসতে পারি। মাফ করবেন, আপনাকে এশিয়ান দেখে কথা বলার লোভে এলাম।
আহমদ মুসা তাকাল গৌরীর দিকে। দীর্ঘাঙ্গী, একহারা অপরূপ সুন্দরী এক ইউরোপীয় যুবতী। তার দেহ থেকে শক্তি ও সুস্থতা যেন ঠিকরে পড়ছে! অত্যন্ত বিরল এ ধরনের সুঠাম দেহ। চোখ দু’টিতে তার হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা আছে, তবে চোখ দু’টি তার স্বচ্ছ নয়। দুই বৈপরীত্য যেন এ মুহূর্তে তার মধ্যে সক্রিয়!
আপনি তো ইউরোপীয়, এশীয়দের প্রতি এ পক্ষপাতিত্ব কেন? বলল আহমদ মুসা।
হাসল গৌরী। বলল, এশিয়া হলো ‘মাদার অব আর্থ’। তাকে সত্যি আমি ভালবাসি। ভালবাসি বলে অনেক পড়াশোনা করেছি এশিয়ার উপর। তাই কিছু পক্ষপাতিত্ব হতে পারে।
আহমদ মুসা তাকিয়ে ছিল গৌরীর দিকে। কথাগুলো শুনতে ভালই লাগল। কিন্তু মনে হলো আহমদ মুসার কথাগুলোর গোড়ায় যেন কোন শিকড় নেই!
বলল আহমদ মুসা, প্লিজ বসুন মি….।
মিস গৌরী। আমার নাম গৌরী মি…। গৌরী বলল।
গৌরী’ নামটি শোনার সংগে সংগেই শক পাওয়ার মত বিদ্যুত খেলে গেল আহমদ মুসার গোটা দেহে। তার স্মৃতির আঙিনায় আছড়ে পড়ল একটা নাম ও আরও কিছু কথা। গৌরী তো গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার অভিলাষী সন্ত্রাসী শক্তি ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এক সময়ের সর্বোচ্চ শাসক প্রিন্স জিজরের পার্সোনাল সিকউরিটি ও কমান্ডার ছিল! আর এখনকার গোপন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট যেমন ওদের দলের নাম হুবহু নিয়েছে, তেমনি সেই সময়ের নেতা-নেত্রীদের নামও এরা গ্রহণ করেছে। তাহলে এই গৌরী আজকের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কেউ! না, এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা। এশিয়ায়, বিশেষ করে হিমালয় সংলগ্ন উপমহাদেশের হিন্দু সমাজে গৌরী একটা বহুল প্রচলিত নাম। কিন্তু এই গৌরী তো ভারতের নয়, এশিয়ার নয়, হিন্দু সমাজেরও নয়। তাহলে?
প্রশ্নটা ভেতরে রেখেই আহমদ মুসা নিজের নামটা বলল। বলল, আমার নাম আবু আব্দুল্লাহ!
গৌরী ‘আবু আব্দুল্লাহ’ নামটা আগেই শুনেছে বুকিং কাউন্টার থেকে, কিন্তু প্রকাশ করতে চায়নি ধরা পড়ার ভয়ে।
গৌরী হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল।
আহমদ মুসা হাত না বাড়িয়ে বলল, স্যরি, মিস গৌরী। আমাদের ধর্মে এ ধরনের হ্যান্ডশেক নিষিদ্ধ। প্লিজ বসুন।
গৌরী মারেভা ও মাহিনের সাথে হ্যান্ডশেক করে বসতে বসতে বলল, আপনাদের ধর্ম নিয়ে এটাই সমস্যা মি. আবু আব্দুল্লাহ, আপনারা মেয়েদের ছোট করে দেখেন।
হ্যান্ডশেক না করাটা মেয়েদের ছোট করে দেখার কারণে নয়। মুসলিম মেয়েরাও ছেলেদের সাথে হ্যান্ডশেক করে না, এটা তেমনি ছেলেদের ছোট করে দেখার কারণে নয়। আসলে এর পেছনে রয়েছে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলাজনিত কারণ। বলল আহমদ মুসা।
সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলাজনিত কারণ!
হ্যাঁ, সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলাজনিত কারণ।
কি সেটা? ভ্রূ কুঁচকে বলল মিস গৌরী।
বিষয়টা মানুষের মনস্তত্ত্ব ও প্রবণতার সাথে জড়িত মিস গৌরী। অনেক কথা বলতে হয় বিষয়টা পরিষ্কার করতে হলে। সংক্ষেপে কথাটা হলো, স্বামী-স্ত্রী ও ভাই-বোন, মামা-ভাগ্নি’র মত পারিবারিক অতি ঘনিষ্ঠ জন (যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ) ছাড়া অন্য ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা নিষেধ করেছে আমাদের ধর্ম। মেয়েদের নিরাপত্তা ও সমাজকে একটা বড় সমস্যা থেকে মুক্ত রাখার জন্যে। আহমদ মুসা বলল।
কিসের নিরাপত্তা, কেমন নিরাপত্তা? সামাজিক বড় সমস্যাটি কি? বলল গৌরী।
নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। উভয়ে মিলে আসে মানবীয় পূর্ণতা। সেজন্যে দু’জনের মধ্যে রয়েছে একে অপরের প্রতি এক দুর্লংঘ প্রাকৃতিক আকর্ষণ। এই আকর্ষণকে আইন ও শৃঙ্খলার মধ্যে এনে পিতা-মাতা, ছেলে-সন্তানের এক পরিবার সৃষ্টি করা হয়েছে। সুশৃঙ্খল পরিবার সুশৃঙ্খল সমাজের রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। অবাধ মেলামেশা-সৃষ্ট অনাচার পরিবারে বিপর্যয় আনে, শান্তি-শৃঙ্খলায় কুঠারাঘাত করে। পরিবারের এই বিপর্যয় সমাজ শৃঙ্খলা ও শান্তিকেও বিনষ্ট করে। আহমদ মুসা একটু থামল।
আবার শুরু করার আগেই গৌরী দ্রুত বলল, আর নিরাপত্তা বিষয়টা?
অপেক্ষাকৃত সবলের হাত থেকে দুর্বলের নিরাপত্তা। মেয়েরা সাধারণভাবে রক্ষণাত্মক, অন্যদিকে ছেলেরা অ্যাগ্রেসিভ ও আক্রমণাত্মক। নিরাপত্তা বলতে আমি বুঝিয়েছি ছেলেদের অনিয়ন্ত্রিত ও আক্রমণাত্মক ইচ্ছার কবল থেকে মেয়েদের নিরাপত্তার কথা। আহমদ মুসা বলল।
আপনি যেদিকে ইংগিত করেছেন, সেটা তো ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপার। ব্যক্তিগত পর্যায়েই তা রেখে দেয়া উচিত। এটা সমাজের ভাবনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। তেমনি সমাজও এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার কথা নয়। বলল গৌরী।
ব্যক্তির কাজ যখন অপরাধ হিসাবে সংঘটিত হয়, তখন তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপার থাকে না। পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পবিত্র সম্পর্কের বিষয়টি অবাধ মেলামেশার কারণে অপরাধ হিসাবে, অপরাধের মহামারি হিসাবে সংঘটিত হচ্ছে। পৃথিবীর দেশগুলো, বিশেষ করে অবাধ মেলামেশার দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে দেখুন, সেখানে নারীরা অপরাধের শিকার হওয়া, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ও ভঙ্গুরতা, নারীকেন্দ্রিক অপরাধ বিকৃতি ও তজ্জনিত মানসিক বিকৃতি ও অসুস্থাবস্থা কেমন বাড়ছে। আহমদ মুসা বলল।
গৌরীর মুখে একটা ভাবনার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল।
তার মনের এক অতল তল থেকে কে যেন তাকে বলল, গৌরী, তুমি কি নিজেই শক্তিমানের অনাচারের শিকার নও! তোমার কি পরিবার আছে, ঘর আছে! চমকে ওঠে সে। কিন্তু পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল গৌরী। বলল গম্ভীর কণ্ঠে, এসব অপরাধের পেছনে অনেক কার্যকারণ আছে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, স্যরি মিস গৌরী। যে কার্যকারণই থাক, এ কথা ঠিক যে, অবাধ মেলামেশার কারণে সুযোগ সহজলভ্য হওয়ায় নারীর উপর পুরুষের অনাচার বাড়ছে। সুতরাং তাদের নিরাপদ করতে হলে অবাধ মেলামেশা বন্ধ করে সুযোগের সহজলভ্যতা দূর করতে হবে।
কিন্তু বলুন, আমার সাথে হ্যান্ডশেকের ক্ষেত্রে কি সুযোগের সহজলভ্যতা দূর করার প্রশ্ন আসতে পারে? বলল গৌরী।
অপরাধ দমনে পুলিশী পাহারার ব্যবস্থা একটা আইন। অপরাধ যেখানে সংঘটিত হচ্ছে সেখানেও পুলিশ পাহারা থাকে, আবার অপরাধ যেখানে হচ্ছে না সেখানেও পুলিশ পাহারা থাকে। আমি এই নীতিগত কারণেই আপনার সাথে হ্যান্ডশেক করিনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি তো সাংঘাতিক মৌলবাদী! আপনি কি করেন?’
‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াই।’ গৌরীকে পরখ করার জন্যেই আহমদ মুসা ইচ্ছা করে এমন ইংগিতমূলক কথা বলল।
‘তার মানে আপনি মানুষের সেবা করে বেড়ান। তা কি ধরনের সেবা?’ বলল গৌরী। সেও চাইল আহমদ মুসা সম্পর্কে তাদের সন্দেহকে নিশ্চিত করতে।
‘ধরুন, মানুষ অভাবে পড়লে দেখা, কেউ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানো-এই আর কি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহিতিতে আপনার কাজ? কোন মিশন এখানে?’ বলল গৌরী। তার চোখে-মুখে হাসি থাকলেও তার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠা আহমদ মুসার দৃষ্টি এড়াল না।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তাহিতিতে মানুষ কোন কাজ নিয়ে আসে না। আসে সব কাজ ছেড়ে-ছুঁড়ে তাহিতেকে দেখতে।’ আহমদ মুসা প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেল। আর এগোতে চাইল না প্রসঙ্গটি নিয়ে। গৌরীর টার্গেট তার বুঝা হয়ে গেছে।
‘আপনি কি মতুতুংগা দ্বীপপুঞ্জের অ্যাটলগুলোতে গেছেন? অ্যাটলের রাজ্য না দেখলে তাহিতি দেখা হয় না।’ বলল গৌরী।
‘গেছি অ্যাটল দেখতে। আপনি ঠিকই বলেছেন। অপরূপ সুন্দর অ্যাটলের এ রাজ্য!’ আহমদ মুসা বলল।
‘জনবিরল অ্যাটল দ্বীপমালা শান্তির রাজ্যও বটে। ওখানে আপনি দেখবেন না কোন হিংসা-বিদ্বেষ, শুনবেন না কোন আর্তের আর্তনাদ। এ বিষয়টা আপনি কতটা লক্ষ্য করেছেন?’ বলল গৌরী।
মুখে হাসি ফুটল আহমদ মুসার। কিন্তু ভেতরে তার অন্য চাঞ্চল্য। গৌরীর প্রশ্নে লক্ষ্য সে পরিষ্কারভাবেই বুঝেছে। গৌরী চাচ্ছে অ্যাটলে যে ৭৬ জন বিজ্ঞানী বিপদগ্রস্থ, সেটা আহমদ মুসা জানে কিনা, এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে। এর অর্থ বিজ্ঞানীরা যে ‘এসওএস’ পাঠিয়েছে সেটা ধরা পড়ে গেছে। এখন ওরা সন্ধান করছে এসওএস কে বা কারা পেয়েছে। এ সন্ধানেই গৌরী তার কাছে এসেছে। তার মানে ওরা জেনে ফেলেছে, যখন SOS পাঠানো হয়, তখন আহমদ মুসাদের বোট তাহানিয়া অ্যাটলে ছিল। তা কি করে জানল ওরা? তাহলে কি পাহারা দেবার মত কোন গোপন পর্যবেক্ষণ টেকনলজি ওদের আছে!
এসব চিন্তায় একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। উত্তর দিতে একটু দেরী হলো।
গৌরীর দুই চোখের সমস্ত মনোযোগ তখন কিন্তু আহমদ মুসার দিকে নিবদ্ধ।
একটু হাসল আহমদ মুসা। ‘ভাবছিলাম মিস গৌরী, আপনার আবেগপূর্ণ প্রশ্ন সম্পর্কে। তোয়ামতু অ্যাটল রাজ্যের সবটা আমি এখনও দেখিনি। তবে সুন্দর ও শান্তি কিন্তু এক জিনিস নয়। শান্তি থাকলে অসুন্দরও সুন্দর হয়ে উঠে, শুধু ‘সুন্দর’ কিন্তু শান্তি নিশ্চিত করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
গৌরীর চোখে এক ধরনের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে নিশ্চিত ধরে নিল, আহমদ মুসা অ্যাটল রাজ্যে অশান্তি আছে এ কথাই বলছে। আর এর দ্বারা SOS মেসেজ পাওয়াটাকেই নিশ্চিত করল। মনের এ কথাগুলোকে লুকিয়ে রেখে গৌরী হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘আপনার জবাবটা সাংঘাতিক মি. আবু আবদুল্লাহ! আপনি দার্শনিকের মত উত্তর দিয়েছেন। ধন্যবাদ আপনাকে।’
বলতে বলতে গৌরী উঠে দাঁড়িয়েছে। শেষে বলল, ‘আমি চলি মি. আব্দুল্লাহ। খুশি হলাম আপনার সাথে কথা বলে। ধন্যবাদ সবাইকে।’
অন্য টেবিলের দিকে চলে গেল গৌরী।
গৌরী চলে যেতেই মারেভা বলল, ‘মেয়েটি কি করে তাতো বলল না। আমার মনে হচ্ছে সামরিক বাহিনীর মেয়ে। শরীরটা তার ঐ ধরনের তৈরি। কথাবার্তা ওদের মতই চটপটে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, সেনাবাহিনীর লোক হলে তো এমন অযাচিতভাবে কথা বলতে আসার কথা নয়!’
‘তুমি ঠিকই বলেছ মারেভা। উনি সেনাবাহিনীর লোক নন। আমি যাদের সন্ধান করছি, তিনি তাদের একজন।’ আহমদ মুসা বলল।
মারেভা ও মাহিন দু’জনেই চমকে উঠে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘কিন্তু ওরা আপনাকে জানল কি করে স্যার?’
‘সম্ভবত সেই ‘এসওএস’ মেসেজ ধরা পড়েছে। আমাদের বোটে যে মেসেজ মনিটর হয়েছে সেটা। মনে হচ্ছে, বোটের ক্লু ধরেই তারা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সর্বনাশ। কিন্তু মতলব কি ওদের স্যার?’ বলল মাহিন।
‘আমি সেটাই ভাবছি। তারা কি চায়, কি করতে চায়, এটা আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ওরা বড় কোন টার্গেট ছাড়া কিছু করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
ভয়ের ছায়া নামল মারেভা ও মাহিনের চোখে-মুখে। বলল, ‘তাহলে আপনার মানে আমাদের সকলের সাবধান হওয়া প্রয়োজন।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এখনও সব কিছু স্পষ্ট নয়। তবে সাবধানতা সব সময়ই ভাল।’ বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
উঠে দাঁড়াল মারেভা ও মাহিনও।
‘বিল তো এল না স্যার?’ বলল মাহিন।
‘এনট্রান্স ফি’র সাথে ভেতরের সবকিছুই ইনক্লুডেড মারেভা।’ আহমদ মুসা বলল।
হোটেলের লাউঞ্জে নেমে এল আহমদ মুসারা।
‘স্যার, আমরা আসি।’
‘না, আমি তোমাদের পৌঁছে দেব মাহিন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তেপাওকে ট্যাক্সি নিয়ে আসতে বলেছি। সে এসে গেছে।
চল।’ বলেই আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল।
মারেভা ও মাহিনও তার সাথে হাঁটতে শুরু করল।
ট্যাক্সির কাছাকাছি এসে একবার পেছনে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘মারেভা-মাহিন, তোমাদের বিয়ের তারিখ কবে ঠিক হলো?’
মারেভা-মাহিন দু’জনেরই মুখ লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠল। বলল মাহিন, ‘আসছে শুক্রবার, স্যার।‘
‘ধন্যবাদ। বিয়ে ছাড়া তোমাদের এভাবে চলা আর উচিত নয়।’
মারেভা ও মাহিন মুখ নত করল।
সবাই এগোলো আবার গাড়ির দিকে।