৫১. প্যাসেফিকের ভয়ংকর দ্বীপে

চ্যাপ্টার

হাসপাতালে আহমদ মুসা যখন পৌঁছল তখন দশটা।
ইনফরমেশন ডেস্ক থেকে খোঁজ নিয়ে আহমদ মুসা তিন তোলার ১১ নাম্বার কেবিনে গিয়ে হাজির হল।
আহমদ মুসাকে দেখেই ছুটে এসে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরল তামাহি মাহিন। মারেভা মাইমিতিও আহমদ মুসার কাছে এসে বলল, স্যার, আপনি সুস্থ তো? সারারাত মনে হচ্ছে আপনার ঘুম হয়নি। কালকের পোশাকই তো পড়ে আছেন! এ কি আপনার জ্যাকেটের দুই হাতাতেই যে রক্ত! ঠিক আছেন তো আপনি?
আহমদ মুসা হাসল। বলল, মারেভা, আমি ভেবেছিলাম তোমার প্রশ্ন বোধ হয় শেষ হবে না। ধন্যবাদ শেষ করার জন্যে। এত….।
কথা বলা হল না আহমদ মুসার। তেপাও শোয়া থেকে উঠে বসেছিল। কথা বন্ধ করে আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি গিয়ে তাকে ধরে শুইয়ে দিয়ে বলল, তুমি তো এই প্রথম সংজ্ঞালোপকারী গ্যাসের কবলে পড়েছ, তোমার সুস্থ হতে আরও কিছু সময় লাগবে। আর উঠে কি করবে। অন্তত কয়েক দিন গাড়ি চালাতে তুমি পারবে না।
ডাক্তারও তাই বলেছে। স্যার কি ঘটেছিল? আপনাকে না দেখা পর্যন্ত আমরা দারুন উদ্বেগে ছিলাম। ভোর বেলা আমরা হাসপাতাল থেকে টেলিফোন পাই, তেপাও নামে ট্যাক্সি চালককে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে এই মাত্র। সে অনুরোধ করেছে আপনাদের হাসপাতালে আসার জন্যে। আমি মারেভাকে সংগে সংগেই নিয়েই চলে আসি। মারেভাও চলে আসে। তেপাও আমাদের জানায়, কি এক জিনিষ গাড়ির ভেতরে পড়ার সাথে সাথেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে আর কিছুই জানে না। হাসপাতালের বেডে সে জ্ঞান ফিরে পায়। আমরা সংকিত হয়ে পড়ি যে, আপনিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং আপনি শত্রুর হাতে পড়েছেন। বলল মাহিন।
স্যার আপনাকেও অসুস্থ মনে হচ্ছে। আপনার জ্যাকেটের দুই আস্তিনে রক্ত। বলুন প্লিজ, কি ঘটেছিল, কি হয়েছিল আপনার?
নিশ্চয় বড় কিছু? বলল মারেভা মাইমিতি।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, সে অনেক কথা মারেভা। কেবিনের দরজা বন্ধ করে দাও বলছি।
মাহিন দৌড়ে গিয়ে কেবিনের দরজা বন্ধ করে ফিরে এলো।
তেপাও জ্ঞান হারিয়েছিল, কিন্তু আমি জ্ঞান হারাইনি। গোল বলটাকে গাড়ির ভিতরে পড়তে দেখেই আমি শ্বাস নেয়া বন্ধ করেছিলাম। কিন্তু অজ্ঞান হবার ভান করেছিলাম।
বলে আহমদ মুসা রাতের গোটা কাহিনী বলল। কিভাবে তাকে সংজ্ঞাহীন মনে করে ওঁরা ওদের গাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হাত-পা বেঁধে। কিভাবে তাঁদের কাছে আহমদ মুসাকে হত্যার নির্দেশ আসে, কিভাবে আহমদ মুসা দাত দিয়ে হাতের বাঁধন ও পরে পায়ের বাঁধন সে খুলে ও সংজ্ঞাহীনের মত পড়েছিল, কিভাবে তাঁরা গাড়ির সিটেই তাকে হত্যার উদ্যোগ নেয়, কিভাবে সে গাড়ির পাঁচজনকে হত্যা ও দু’জনকে আহত করে নিজেকে রক্ষা করে, কিভাবে আবার সামনে ও পিছন থেকে শত্রুপক্ষের গাড়ি দ্বারা সে আক্রান্ত হয়, কিভাবে সে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া বিস্ময়কর এক অস্ত্রে তাদেরকেই অকেজো করে দিয়ে ওদের ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর ওদের আকাশযান এক্সিকিউটর-১ ছুটে আসে তাঁকে হত্যার জন্যে, কিভাবে উপর থেকে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে, কিভাবে সে আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় নিজেকে রক্ষা করে এবং কিভাবে জ্যামিং মেশিন ফেলে দিয়ে এক্সিকিউটর-১ এর কবল থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়-সব কথা সংক্ষেপে বলল আহমদ মুসা।
মারেভা, মাহিন ও তেপাও সবার চোখেই আতংক আর বিস্ময়। তাঁদের কারও মুখে কোন কথা নেই। বিস্ময় ও আতংকের ঘোরে নির্বাক হয়ে গেছে যেন তাঁরা!
আহমদ মুসাই নিরবতা ভাঙল। হাসল সে। বলল, কি হলো, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি! ভাবছ এত ঘটনা ঘটল কিভাবে রাতের একটা অংশে!
তা নয়, স্যার। একটা সত্য ঘটনা রূপকথার ভয় ও বিস্ময়কেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সে ভয় ও বিস্ময়কে কাটাতে পারছি না।
বলে একটা ঢোক গিলেই আবার শুরু করল মারেভা, আপনার লাশ ১ বিলিয়ন ডলারে কিনতে চায় ওঁরা কারা? এবং কেন কিনতে চেয়েছিল?
ওঁরা পশ্চিমের একটি বড় সন্ত্রাসী গ্রুপ। যে কোন মুল্যে ওঁরা আমার মৃত্যু চায়। তাই আমার লাশ হাতে পেয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে চায়, আমি মরেছি। বলল আহমদ মুসা।
ওহ গড! বলে আঁতকে উঠল মারেভা আহমদ মুসার কথা শুনে। হতবাক হয়ে গেছে মাহিন ও তেপাও।
কিন্তু এরা কারা, যারা আপনাকে কিডন্যাপ করেছিল, হত্যার চেষ্টা করেছিল? বলল মাহিন।
আমি যাদের সন্ধানে এসেছি, এরা তারাই। ওঁরা আমার পরিচয় পেয়ে গেছে। সেদিন অ্যাপেক্স রেস্টুরেন্টে গৌরী নামে যে মেয়েটিকে দেখেছিলে, সে ঐ দলেরই সদস্য। আমার সন্ধানেই সে রেস্টুরেন্টে এসেছিল। সে ও তাঁর লোকজনই আমাকে কিডন্যাপ করে। আহমদ মুসা বলল।
ওহ গড! তাহলে তো ওদের লোক নানাভাবে আমাদের ফলো করছে! বলল মারেভা।
কিন্তু ওঁরা চিনতে পারল কি করে আপনাকে? মাহিন বলল।
আমাকে আহমদ মুসা পরিচয়ে ওঁরা জানতো না আজ রাতের আগে। তোমাদের তাহানিয়া অ্যাটলে একটা sos আমি মনিটর করেছিলাম, মুলত সেই ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যেই আমাকে ওঁরা কিডন্যাপ করেছিল। কিছু ঘটনা ঘটার পর ওঁরা জানতে পারে আমি আহমদ মুসা এবং এটা ওদের জানিয়ে দেয় পশ্চিমের ওদের মিত্র সংঘটনকে। আহমদ মুসা বলল।
তাহলে ওঁরা এখন আপনাকে নিশ্চয় হন্যে হয়ে খুজছে? বলল মারেভা।
হ্যাঁ, আজ শেষ রাতে ওঁরা হোটেলে আমার রুম পর্যন্ত এসেছিল। ভোর পর্যন্ত ওৎ পেতে ছিল হোটেলের পেছনের রাস্তায়। আমি এটা আঁচ করেই হোটেল রুমে যাইনি। ওদের গতিবিধি দেখার জন্যে আমিও হোটেলের রাস্তায় অপেক্ষা করছিলাম। সকালে ওঁরা চলে গেলে আমি তেপাও-এর সন্ধানে এসেছি। বলল আহমদ মুসা।
তাঁর মানে আপনি সারারাত ও এখন পর্যন্ত বাইরে! আপনার বিশ্রাম নেই, খাওয়াও হয়নি আপনার নিশ্চয়? আপনি নিজে ঠিক না হয়ে এই অবস্থায় আপনি এসেছেন তেপাও-এর খোঁজে! বলল মাহিন।
আমি তেপাও-এর জন্যে উদ্বিগ্ন ছিলাম। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁর কি হলো, তারপর গাড়ি আবার হাইজাকিং-এর পাল্লায় পড়ে কিনা। তাই খোঁজ নিতেই এসেছি। বলল আহমদ মুসা।
তেপাও-এর চোখ ছলছল করে উঠেছে। বলল, স্যার আপনি সারারাত মৃত্যুর সাথে লড়লেন। যে কোন সময় যে কোন কিছু হয়ে যেতে পারত। আপনারই রেস্ট বেশি দরকার। আর আপনি আমার খোঁজে ছুটে এসেছেন!
আচ্ছা যাক, বল, তুমি কিভাবে হাসপাতালে এলে? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
এই হাসপাতালেরই একজন ডাক্তার আমাকে নিয়ে এসে ভর্তি করে দিয়েছে হাসপাতালে। তেপাও বলল।
স্যার, এবার চলুন নাস্তা করবেন। হাসপাতালের ক্যান্টিনে ভালো নাস্তার ব্যবস্থা আছে। বলল মাহিন আহমদ মুসাকে।
না, আগে হোটেলে ফিরে আমাকে ফ্রেশ হতে হবে। বলল আহমদ মুসা।
ঐ হোটেলে ফেরা তো আপনার ঠিক হবে না স্যার! ওঁরা নিশ্চয় পাহারা বসিয়েছে। বলল মাহিন।
না মাহিন, ঐ হোটেলে ফিরছি না। আমি একটা পাবলিক কল অফিস থেকে হোটেলকে জানিয়ে দিয়েছি, আমি মুরিয়া চলে এসেছি কয়েক দিনের জন্যে। শীঘ্রই ফিরব।
আহমদ মুসা একটু থামতেই মারেভা বলল, কিন্তু হোটেলে যেতে চাইছেন যে আপনি?
তবে আমি পাতুতোয়ায় হোটেল প্যাসেফিক ইন্টারন্যাশনালে একটা কক্ষ নিয়ে রেখেছি। সেখানেই যাব আমি। এখান থেকে কাছেও হোটেলটা। বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় মারেভাদের চোখে-মুখে। বলল মাহিন, আপনি কি করে বুঝেছিলেন যে, হোটেলটা আপনাকে ছাড়তে হতে পারে?
আমি জেনে তা করিনি। আমাদের রসূল সঃ-এর এ ধরনের উপদেশ আছে, যৌবনে বার্ধক্যের চিন্তা করতে হয়, ভালো সময়ে খারাপ সময়ের কথা ভাবতে হয় ইত্যাদি। আমিও তাই ভালো সময়ে খারাপ সময়ের কথা চিন্তা করে ব্যবস্থা করে রেখেছি। বলল আহমদ মুসা।
কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিয়ে একটু রেস্ট নেব। তারপর একটু স্বরাষ্ট্র বিভাগে যাবো ফরাসি সেই পুলিশপ্রধানের সাথে আলোচনার জন্যে। এরপর ফিরব হোটেলে। তোমরা সেখানে আসতে পারো। পরামর্শ করা যাবে।
ফরাসি সেই পুলিশ অফিসারের কাছে কেন? ওঁরা কি কিছু বলেছে? কিছু ঘটেছে? জিজ্ঞাসা মারেভার।
না, কিছু ঘটেনি। তাঁর সাথে দেখা করে আজকের ঘটনা ব্রিফ করতে চাই। যা ঘটেছে তাঁর কিছু তো তাঁদের জানা দরকার! যে কোন সময় তাঁদের সাহায্যেরও দরকার হতে পারে। বলল আহমদ মুসা। কথা শেষ করেই ‘আল্লাহ্‌ হাফেজ’ বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল আহমদ মুসা। ঠিক বেলা তিনটায় মারেভা ও মাহিন পাতুতোয়ার হোটেল প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনালে গিয়ে পৌঁছল।
আহমদ মুসা ঘুম থেকে উঠে তাঁদের স্বাগত জানাল।
স্যরি স্যার, আপনাকে আমরা ঘুম থেকে তুললাম। বলল মাহিন।
তোমরা বরং আমার উপকার করেছ। আমি দিনে ঘুমাই না। কখনও ঘুমালেও এক ঘণ্টার বেশি নয়। তোমরা না এলে দেখছি আমার নিয়ম ভঙ্গ হতো। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা টয়লেট থেকে ওজু করে ফ্রেশ হয়ে এসে বলল, এখন বোধ হয় কফি খেতে আমাদের ভালো লাগবে।
বলে আহমদ মুসা কফি বানানোর সরঞ্জামের দিকে এগোল।
মারেভা উঠে দৌড়ে গেল কফি পটের কাছে। বলল স্যার, ছোট বোনকে আর লজ্জা দিবেন না। আপনি গিয়ে বসুন।
আমি কফি তৈরিতে এক্সপার্ট না হলেও তা না খাওয়ার মত হবে না নিশ্চয়।
ধন্যবাদ। বলে আহমদ মুসা এসে সোফায় বসল। কফি এল।
মারেভা আহমদ মুসা ও মাহিনকে কফি দিয়ে নিজে এক কাপ নিয়ে ভিন্ন সোফায় গিয়ে বসল।
আহমদ মুসা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, আচ্ছা মাহিন-মারেভা, আমি যদি বল আমি ‘মতু’তে যেতে চাই, তাহলে তোমরা কি বুঝবে?
মারেভারা একটু ভাবল।
মারেভাই প্রথম মুখ খুলল। বলল, পলিনেশীয় ভাষায় ‘মতু’ অর্থ দ্বীপ। সে অনুসারে আমি বুঝব, আপনি একটা দ্বীপে যেতে চান।
আমার কাছেও এটাই অর্থ স্যার। বলল মাহিন।
কিন্তু এভাবে কেউ কি বলে আমি ‘মতু’ যাব? আহমদ মুসা বলল।
না, তা বলে না স্যার। যে দ্বীপে যাবে, সে দ্বীপের নাম বলবে সেটাই স্বাভাবিক। বলল মারেভা।
কেউ যদি বলে ‘মতু’ যাব, তাহলে কি ধরে নেয়া হবে না যে, সে বিশেষ দ্বীপের নাম বলছে? আহমদ মুসা বলল।
জি স্যার, সেটাই ধরে নিতে হবে। বলল মারেভা ও মাহিন দু’জনেই।
‘মতু’ নামে কি কোন দ্বীপ আছে ফ্রেঞ্চ পলিনেশীয়ার বিশেষ করে মতুতোয়া অ্যাটল দ্বীপপুঞ্জে?
দু’জনেই ভাবল কিছুক্ষন। বলল মারেভা। না ‘মতু’ নামে কোন দ্বীপ নেই এবং থাকা স্বাভাবিকও নয়। দ্বীপের নাম ‘দ্বীপ’ হতে পারেনা।
আমিও তাই মনে করি স্যার। বলল মাহিনও।
মাহিনের কথা শেষ হতেই মারেভা বলে উঠল, ‘মতু’ সম্পর্কে এত কথা বলছেন কেন স্যার? ‘মতু’ নামে দ্বীপই বা খুজছেন কেন স্যার?
আমি যখন অজ্ঞানের ভান করে ওদের গাড়িতে পড়েছিলাম, তখন তাঁদের আলোচনা থেকে জানলাম, আমাকে ‘মতু’তে নিয়ে যাবার কথা ছিল ওদের। কিন্তু নির্দেশ আসে আমাকে ‘মতু’তে নেয়া যাবে না। তাহিতিতেই তাঁদের কোন এক ঘাটিতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ হয়। গাড়ির গতি পরিবর্তন করে তাহিতির ঘাটির দিকেই চলতে শুরু করে। পড়ে অবশ্য আবার নির্দেশ আসে আমাকে কোথাও নেয়া যাবে না ঐ রাস্তাতেই আমাকে হত্যা করতে হবে। আমি ওদের ‘মতু’ বলা থেকে বুঝেছি, ‘মতু’ অবশ্যই একটা দ্বীপের নাম।
ঠিক বলেছেন স্যার, ‘মতু’ একটা দ্বীপেরই নাম হবে। প্রশ্ন হল, ‘মতু’ দ্বীপটি কথায়?
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। ভাবছিল সে। মনে পড়ল তাঁর এসওএস(SOS) এর কথা। এসওএস (SOS) সত্য এটা প্রমানিত হয়েছে, এবং সে এসওএস ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান ঘাটি ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ থেকেই। একথাও পরিস্কার যে, সেখানেই বন্দী ৭৬ জন বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ এবং সেখানেই বন্দী আছেন সৌদি আরবের বিজ্ঞানী খালেদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মক্কী। আহমদ মুসা এসওএস ‘টি পেয়েছিল তাহানিয়া অ্যাটলের দক্ষিন মাথায় অবস্থান কালে। সেখান থেকে এক মাইলের মধ্যে বা আশেপাশে ‘মতু’ নামে কোন অ্যাটল দ্বীপ আছে কিনা! মারেভারা বলল, না এ নামে কোন দ্বীপ নেই। তাহলে কি ব্ল্যাক সানের লোকরা দ্বীপটির এই ছদ্মনাম দিয়েছে কিংবা তাঁরা কি দ্বীপের আংশিক নাম বলেছে?
আহমদ মুসা মাথা তুলে তাকাল মাহিনের দিকে। বলল, মাহিন তোমরা তাহানিয়া অ্যাটলের চারপাশের, বিশেষ করে ১ থেকে ২ মাইলের মধ্যে যে সব অ্যাটল দ্বীপ আছে সেগুলার কি নামের তালিকা দিতে পার?
অবশ্যই পারবো স্যার। হোটেলের মিডিয়া সেন্টারে কম্পিউটার আছে। কম্পিউটারের গোগলের স্যাটেলাইট ভিউতে গেলেই সব দ্বীপ ও তাঁর নাম পেয়ে যাব। বলে উঠে দাঁড়ালো মাহিন।
মারেভা, তুমিও যাও। বুদ্ধি শেয়ার করতে পারবে দু’জনে।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। মারেভা ভাবল, স্যার কি একা থাকতে চান কিছুক্ষন, না একা ঘরে মারেভার থাকা তিনি এড়াতে চাচ্ছেন। শেষটাই বোধ হয় ঠিক। আরও ভাবল, মারেভা ও মাহিনের এক সাথে ঘুরাও তিনি পছন্দ করছেন না। যাক, সত্তর তাঁদের বিয়েটা হিয়ে যাচ্ছে, তখন আর স্যারের কিছু বলার থাকবে না। আরেকটা কথা ভেবে ভালো লাগল মারেভার, ইসলাম ধর্ম মোতাবেক তাঁদের বিয়ে হচ্ছে! তাঁদের দুই পরিবারই ইসলাম গ্রহন করেছে।
চলে গেল মারেভা ও মাহিন।
ফিরে এলো তাঁরা মিনিট দশেকের মধ্যেই।
সিটে বসেই মাহিন বলল, স্যার আমাদের মিশন সফল। আমরা ‘মতু’ দ্বীপ পাইনি বটে, মতুতুংগা নামে একটা দ্বীপ পেয়েছি। ‘মতু’ শব্দসহ আর কোন দ্বীপের নাম মতুতুয়া দ্বীপপুঞ্জে নেই। সুতরাং আমরা মনে করি ‘মতু’ বলতে মতুতুংগা দ্বীপকেই বুঝানো হয়েছে।
কিন্তু ‘মতুতুংগা’ দ্বীপটি কোনটি? তাহানিয়ার দক্ষিনের দ্বীপটি? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
হ্যাঁ, দক্ষিনের দ্বীপটাই। বলল মারেভা।
কিন্তু, দ্বীপটা তো খুবই ছোট! ওঁর চারদিকের ল্যান্ড-লাইন খুবই সংকীর্ণ। ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’-এর জন্যে ওরকম দ্বীপ আইডিয়াল নয়। আহমদ মুসা বলল।
কিন্তু তাহানিয়ার আশেপাশে কেন গোটা দ্বীপপুঞ্জে ‘মতু’ শব্দসহ হন দ্বীপের নাম নেই। বলল মাহিন।
তা ঠিক। আমাকে দ্বীপটা আবার দেখতে হবে। আহমদ মুসা বলল।
কিন্তু ঐ জায়গাটা তো আপনার জন্যে নিরাপদ নয়! আপনিই তো বলেছিলেন, ওদের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় আমাদের বোঁট, আমাদের তিনজনের চেহারা ধরা পড়েছিল। সেই ছবি ও বোটের নাম্বার দেখেই ওঁরা আমাদের খোঁজ পায়। তারমানে তাহানিয়া ও আশেপাশের দ্বীপপুঞ্জ ওদের ক্লোজ ক্যামেরার রেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং তাহানিয়া, মুতুতুংগা ও এর আশেপাশে যাওয়া, বিশেষ করে আপনার জন্যে এখন আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বলল মারেভা।
ঠিক মারেভা, কিন্তু ওখানে না গেলে তো সমস্যার জট খুলছে না। ‘মতু’ যদি মতুতুংগাই হয়, তাহলে তাঁর ভিন্নতর কিছু খুঁজে পাওয়া যাবেই। সেটা সাগরের উপরে হতে পারে, সাগর বক্ষেও হতে পারে। আহমদ মুসা বলল।
একটু থেমেই আবার শুরু করল, আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাব তাহিতি সরকারের ‘ওসান ও ওসান রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তিয়ারে হিরেনুর কাছে। আজ গিয়েছিলাম তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান আর সেই পরিচিত মসিয়ে দ্যা গলের কাছে। তিনিই অধ্যাপক তিয়ারে হিরেনুর সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছেন। সাগরে যদি নামতে হয়, তাহলে তাঁর সাহায্য দরকার।
আপমি সাগরে নামবেন? বলল মাহিন।
নামবো না, নামতে যদি হয় তারই আগাম প্রস্তুতি। মতুতংগা সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর, তাঁর বাইরেটা দেখার পর এই বিষয়ে চিন্তা করব। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার মোবাইলের স্ক্রিনে কয়েকবার বিপ বিপ শব্দ করে একটা লাল আলো জ্বলে উঠল। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হবার পর তা থেমে গেল।
আহমদ মুসার ভ্রু কুঞ্চিত হল। তাকাল মাহিনদের দিকে। বলল, তেপাও তো নিচে গাড়িতে আছে, না?
জি হ্যাঁ। বলল মাহিন।
তাহলে একটা কল করে বল, গাড়ি পার্ক করে থাকার সময় কেউ তাকে কোন কথা জিজ্ঞেস করেছে কিনা?
সংগে সংগেই তাঁর সাথে কথা বলল মাহিন। কথা শেষ করে আহমদ মুসাকে বলল, গাড়ি পার্ক করার পাঁচ মিনিট পরে একজন লোক আসে, এবং বলে মাহিন ও মারেভা দু’জনেই আমার বন্ধু। তাঁদের এখানে আসার কথা আপনার গাড়িতেই। ওঁরা কথায় গেল? তেপাও বলেছে, এই হোটেলেই কোন কাজে গেছে। একথা শুনেই তাঁরা হোটেলে ঢুকেছে।
তোমরা রিসেপশনে কিছু বলেছ? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
আপনি রুম নাম্বার আমাদের দিয়ে আসেন নি। আমরা রিসেপশনে আপনার নতুন নাম বলে রুম নাম্বার জিজ্ঞাসা করেছি। বলল মারেভা।
মারেভা থামতেই মাহিন বলে উঠল, কেন এসব বলছেন স্যার, কিছু ঘটেছে?
আমার মনে হচ্ছে, তোমাদের ফলো করে কেউ এসেছে।
বিস্ময় ফুটে উঠল মারেভা ও মাহিন দু’জনের চোখে-মুখে। মারেভা বলল, কারা ফলো করেছে? ওঁরা?
হ্যাঁ ঠিক ধরেছ। বলল আহমদ মুসা।
তাঁর মানে ওঁরা আমাদের ফলো করে আপনার কাছে পৌছতে চায়। বলল মাহিন।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু বলা হলো না। তাঁর মোবাইলে কয়েকবার বিপ বিপ শব্দ উঠল, তাঁর সাথে মোবাইলের স্ক্রিনে চারটি লাল আলো ভিন্ন ভিন্নভাবে একই সাথে জ্বলে উঠেছে। সে চমকে উঠল। দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, মারেভা, মাহিন, তোমরা তাড়াতাড়ি এক পাশে সরে যাও। তাড়া……।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতে পারল না। প্রবল ধাক্কায় কক্ষের দরজা ভেঙ্গে পড়ল।
ধাক্কা দেয়া লোকেরা সামনে ঝুকে পড়েছিল। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে রিভলবার।
দরজায় ধাক্কা পড়ার প্রথম শব্দ কানে আসার সাথে সাথেই আহমদ মুসা মাথার পেছনে জ্যাকেটের গোপন পকেট থেকে দ্রুত রিভলবার বের করে তাক করল দরজার দিকে। রিভলবারের ট্রিগারে তাঁর তর্জনী।
দরজার পাল্লা পড়ে যেতেই দরজা ভেঙ্গে লোক দু’জন এসে গেল তাঁর রিভলবারের সামনে। নড়ে উঠল আহমদ মুসার তর্জনী অবিরামভাবে। সামনের দু’জন লোক গুলী খেয়ে পড়ে গেল দরজার উপরে।
গুলী অব্যাহত রেখেই আহমদ মুসা মেঝের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। ওদিক থেকেও গুলী আসা শুরু হয়েছে।
আহমদ মুসা মেঝের উপর ঝাপিয়ে পড়ার পর দরজায় দাঁড়ানো অবশিষ্ট দু’জনের, যারা গুলী ছোড়া শুরু করেছে, তাঁদের টার্গেট পরিবর্তন হয়ে গেল। এরই সুযোগ গ্রহন করল আহমদ মুসা মেঝেয় গিয়ে পড়ার সংগে সংগেই। আহমদ মুসার রিভালবার থেকে শেষ দুটি গুলী বেরিয়ে গেল।
আহমদ মুসার গুলী যখন ওদের দু’জনের বুকে বিদ্ধ হল, তখন তাঁদের রিভলবারও আহমদ মুসা লক্ষ্যে সরে এসেছিল। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হবার পর তাঁদের তর্জনীও তাঁদের রিভলবারের ট্রিগারে চেপে বসেছিল বটে, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আহমদ মুসার পেছনের দেয়ালকে গিয়ে বিদ্ধ করল।
আহমদ মুসা গুলী করেই দ্রুত গড়িয়ে সরে গিয়েছিল ওদের গুলী এড়াবার জন্যে। কিন্তু ওদের টার্গেটে আসেনি, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
একবার দরজার দিকে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। দেখল, মাহিন ও মারেভা মেঝেতে সোফার আড়ালে।
মাহিন, তোমরা ঠিক আছ। জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
ভীত ও আতংকগ্রস্থ মাহিন, মারেভা উঠে দাড়াল। কম্পিত কণ্ঠে বলল, মাহিন আমরা ভালো আছি। তাঁদের চোখ গিয়ে নিবদ্ধ হলো চারটি লাশের উপর এবং দেখল আহমদ মুসার রিভলবারটাও।
দরজায় বেশ কিছু ভীত, বিস্মিত ও উৎসুক লোকের ভিড় জমে গেছে। হোটেলের ম্যানেজারও এসে গেছে।
আহমদ মুসা দরজার দিকে এগিয়ে বলল, ম্যানেজার সাহেব, এরা আমার রুমের দরজা ভেঙ্গে আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছিল। আপনি পুলিশকে খবর দিন।
সংগে সংগেই ম্যানেজার তাঁর মোবাইলে টেলিফোন করল পুলিশকে।
সবাই পুলিশের অপেক্ষায়।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এসে গেল।
পিলিশ অফিসার এই রেঞ্জের প্রধান কর্মকর্তা হিমাতা হিরো হোটেলের ম্যানেজার ও আহমদ মুসার বক্তব্য গ্রহন করল। আহমদ মুসার বক্তব্য গ্রহন করার পর তাকে বলল, আমাদের স্যার মানে পুলিশ প্রধান মিস্টার দ্যাগল আপনার খুব ঘনিষ্ঠ, তাই না?
হা, পরিচিত। কেন? বলল আহমদ মুসা।
আমি তদন্তে আসার আগে এই হোটেলের এই রুমের ঘটনার বিষয়ে তাকে ব্রীফ করেছি। তিনি আপনার কথা আমাকে বলেছেন এবং আপনার নিরাপত্তার বিষয় দেখতে বলেছেন।
হ্যাঁ, তিনি খুব সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ। আহমদ মুসা বলল।
ধন্যবাদ, আপনি আপনার রিভলবারের লাইসেন্সটা আমাকে দেখান। এটা আমাদের রুটিন কাজ। আর আপনার রিভলবার ও লাইসেন্স আমাদের দিবেন। এটা কেসের জন্যে প্রয়োজন। আপনি আরেকটা রিভলবার ও লাইসেন্স এখনি পেয়ে যাবেন।
ধন্যবাদ। বলে আহমদ মুসা তাঁর রিভালবার ও লাইসেন্স পুলিশ অফিসারকে দিল।
পুলিশ কক্ষের দরজা ও নিহতদের বিস্তারিত ফটো গ্রহন করল। তারপর নিহত আক্রমণকারীদের রিভলবারগুলো কাপড় জড়িয়ে সাবধানে সংরক্ষনে নিল। লাশগুলোও নিয়ে গেল পুলিশ।
হোটেল ম্যানেজমেন্ট আহমদ মুসাকে অন্য একটি কক্ষে শিফট করল ঘরটা ঠিক করার জন্যে।
আহমদ মুসার সাথে মারেভা ও মাহিনও নতুন কক্ষে এল। আহমদ মুসা নতুন কক্ষে উঠতে গিয়ে দেখল, কক্ষের সামনের করিডোরে দুই প্রান্তের মুখে দু’জন করে চারজন পুলিশের প্রহরা রয়েছে।
কক্ষে প্রবেশ করেই মারেভা বলল, আমি পুলিশ আসার খবরে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। নিশ্চয় আপনার বন্ধু পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে সাহায্য করেছেন।
হ্যাঁ, সেটা তো অবশ্যই। তাছাড়া আমি তো বেআইনি কিছু করিনি। আত্নরক্ষার অধিকার সকলের আছে। আমি তাঁদের না মারলে তাঁদের হাতে আমাকে মরতে হতো। দেখামাত্র গুলী করার নির্দেশ নিয়েই তারা এসেছিল এবং তারা তাই করেছিল। আমার রিভলবারও বেআইনি ছিল না। আহমদ মুসা বলল।
দরজা ভাঙ্গার পর যা কিছু ঘটল তাকে অবিশ্বাস্য এক রূপকথার মত মনে হচ্ছে! ভয়ে আমার শ্বাসরুদ্ধ হবার মত হয়েছিল। কিন্তু কখন, কিভাবে, কোথেকে আপনি রিভলবার বের করলেন এবং একা চারজনকেই হত্যা করলেন, আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে হলো আপনি প্রস্তুত ছিলেন। বলল মাহিন।
আমাদের কেউ ফলো করেছে, তা আপনি কি করে বুঝলেন? বলল মারেভা।
আহমদ মুসা তাকাল মারেভাদের দিকে। বলল, আমার দরজার সামনে কার্পেটের ভেতরে পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি অ্যাংগেলে আলপিনের গোঁড়ার মত ক্ষুদ্র কয়েকটা আলট্রা সেনসেটিভ ইলেকট্রিক সিগন্যালার পেতে রাখা ছিল। তোমরা আমার রুমে আসার মিনিট সাতেক পর একজন লোক এসে আমার দরজার সামনে এসে দাড়ায়। পনেরো সেকেন্ডের মত দাড়িয়ে চলে যায়। আমার মোবাইলে এর সিগন্যাল আমি পেয়ে যাই। আমার সন্দেহ হয়, তোমাদের ফলো করা হয়েছে এবং তাঁদের একজন আমার রুমটা এসে চিনে গেল। আমি তেপাও-এর সাথে কথা বলে নিশ্চিত হলাম যে, তোমাদের ফলো করা হয়েছে। আমাদের কথা বলার ফাঁকেই ওঁরা প্রস্তুত হয়ে আমার দরজায় এসে দাড়ায়। চারটি সিগন্যাল পাই আমি আমার মোবাইলে। বুঝতে পারি ওঁরা চারজন এসেছে। এবার কক্ষ দেখার জন্যে নয়, আমাকে হত্যার জন্যে। আমি ভেবেছিলাম, ওঁরা দরজায় নক করবে, আমি খুলতে যাব অবশ্যই, তখনই ওঁরা আমাকে গুলী করবে এক সাথে পয়েন্টেড ব্ল্যাংক। এতে ওদের একজন মরলেও আমাকে ওঁরা মারতে পারবে, এই চিন্তাই তারা করবে। কিন্তু তারা ভুল করে।
কি ভুল করে? জিজ্ঞাসা মারেভার।
ওঁরা দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে সতর্ক করে দিতে চায়নি। ওঁরা চেয়েছে, আচমকা দরজা ভেঙ্গে অপ্রস্তুত অবস্থায় আমার উপর ঝাপিয়ে পড়তে। কিন্তু তা হয়নি। আমি সতর্ক ছিলাম। ওরাই দরজা ভাঙতে গিয়ে সামনের দু’জন কিছুটা হলেও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং ওদের সকলেরই রিভালবার আমাকে দেখার পর আমাকে লক্ষ্য করে উঠে আসতে বিলম্ব করে। এরই সুযোগ গ্রহন করে আমার তৈরি থাকা রিভালবার, প্রথমে সামনের দু’জনকে, পড়ে পেছনের দু’জনকে হত্যা করে। আহমদ মুসা বলল।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে শুনছিল মারেভা ও মাহিন আহমদ মুসার কথা। কি অদ্ভুত তাঁর প্রতি সেকেন্ডে প্রতি মুহূর্তের হিসাব! প্রতি মুহূর্তের সুযোগের কি অদ্ভুত সদ্ব্যবহার! দরজা ভাঙতে গিয়ে ওদের প্রস্তুতি ও মনোযোগের সামান্য যে বিচ্ছিন্নতা তাকে ব্যবহার করেই আহমদ মুসা বিজয়ী আর ওঁরা পরাজিত, মৃত।
আহমদ মুসা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে না পারলে এক ঝাক গুলীর শিকার তিনিই হতেন। জীবন আর মৃত্যু কত কাছাকাছি! ভাবতে গিয়ে বুক কেপে উঠল মারেভার। চোখ দুটি বিস্ফরিত মাহিনের।
আপনি বুঝতে পেরেছেন, ওঁরা এসেছে আপনাকে হত্যা করতে, আপনার ভয় লাগেনি? জিজ্ঞাসা করল মাহিন।
ভয় কি জন্যে? বলল আহমদ মুসা।
কেন। মৃত্যুর? মাহিন বলল।
মৃত্যু আল্লাহ্‌র নির্দেশ ছাড়া আসে না। সুতরাং মৃত্যু ভয় করার বিষয় নয় এবং কেউ মৃত্যু কামনা করুক আল্লাহ্‌ তা চান না। সেজন্যই আত্নরক্ষাকে অবশ্য কর্তব্য বলা হয়েছে। আমি সে চেষ্টা করেছি। বলল আহমদ মুসা।
ধন্যবাদ স্যার! স্রষ্টা বা আল্লাহ্‌র পরিচয়, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না। ক’দিনে আপনি অনেক কিছু শিখিয়েছেন আমাদের। মারেভা বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, শেখা, মানা ও করা কিন্তু এক জিনিষ নয় মারেভা।
স্যার, আপনি জানেন না, আমরা মানছি এবং করছিও। মারেভা বলল।
আমরা মানে কে? বলল আহমদ মুসা।
আমরা মানে আমাদের দুই পরিবার। আপনি একদিন বাসায় আসুন, বিস্মিত হবেন। আমাদের ড্রয়িং রুমের পাশের ঘরটা এখন নামাজ ঘর। আমার মাথা গায়ে যে ওড়না দেখছেন, তা এখন আমাদের সব মেয়ের মাথায়। মারেভা বলল।
ধন্যবাদ তোমাদের। আহমদ মুসা বলল।
স্যার, এখন আমাদের প্রতি আপনার নির্দেশ কি? বলল মাহিন।
তোমাদেরকে আগামী কয়েকদিন বা কিছুদিন বাড়িতে থাকা চলবে না। আহমদ মুসা বলল।
কেন স্যার, কিছু আশংকা করছেন? বলল মাহিন।
অবশ্যই। তোমরা ওদের নজরদারিতে রয়েছ। তোমাদের মাধ্যমে আমাকে ওঁরা খুঁজে পেতে চায়। না পেলে এমনকি ওঁরা তোমাদের আটকও করতে পারে যাতে আমাকে পাওয়ার ওদের একটা ব্যবস্থা হয়। আহমদ মুসা বলল।
মারেভা ও মাহিনের মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল। মারেভা বলল, ঠিক স্যার। ঠিক বলেছেন আপনি। এটা তারা করবে।
আমারও তাই মনে হচ্ছে স্যার, ওঁরা এই চেষ্টা করবে। আজও ওঁরা আমাদেরকে অনুসরন করেই এখানে এসেছে। মাহিন বলল।
স্যার, একটা কথা। আহমদ মুসার দিকে না তাকিয়েই বলল মারেভা।
কি কথা বল? আহমদ মুসা বলল।
মাহিন, তুমিই বল না। মাহিনের দিকে তাকিয়ে বলল মারেভা। রহস্যময় একটা লজ্জা এসে জড়ো হয়েছে যেন মারেভার মুখে। লাল হয়ে উঠেছে তাঁর মুখ।
মাহিনের মুখেও লজ্জা এসে জুটল। বলল, জড়সড় হয়ে, ও আমাদের বিয়ের কথা বলতে চাচ্ছে স্যার। সেতার কি হবে?
বিয়ে হতেই হবে, কবে যেন হচ্ছে বিয়ে? আহমদ মুসা বলল।
আগামী শুক্রবার, স্যার। তারিখটা তো আপনারই দেয়া স্যার!
হ্যাঁ, দাওয়াতের জন্যে তো কার্ড হচ্ছে না? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
না, হচ্ছে না। আপনি তো নিষেধ করেছেন।
আপনি যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই শুধু আত্মীয়দের নিয়ে ঘরোয়া অনুষ্ঠান হচ্ছে। মাহিন বলল।
তাই বলে ঘরে হচ্ছে না তো! বলল আহমদ মুসা। আমাদের এলাকার ক্লাব ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তবে সেখানে আলোকসজ্জার বাইরে কিছু হবে না। নেম-সাইন বোর্ডও থাকবে না। মাহিন বলল।
ধন্যবাদ। তোমরা কোথায় থাকবে বলে ঠিক করেছ? বলল আহমদ মুসা।
আব্বা-আম্মাদের সাথে পরামর্শ করে আমরা সেটা ঠিক করব। তবে অমনটা হবে না। আমাদের পাড়াতেই আমাদের আন্টিদের বাসা। সেখানেই আমাদের থাকতে হবে। মাহিন বলল।
দুঃখিত, আমার কারনেই তোমরা এই বিপদে পড়লে। বলল আহমদ মুসা।
বিপদ হলেও বিপদটা খুব আনন্দের স্যার। আপনার সাথি হতে পারা এক দুর্লভ গৌরব। স্যার, এই প্রথম বুঝতে পারছি আমাদের জীবনের মুল্য আছে। মারেভা বলল।
জীবনকে বুঝতে পারার জন্যে ধন্যবাদ।
মুহূর্ত কয়েকের জন্যে থামল আহমদ মুসা। আবার বলল, তোমরা সকালে বাড়ি থেকে বেরুবার পর তোমরা কি আর বাড়ি গিয়েছিলে?
না, যাবার সময় হয়নি। বলল মারেভা।
তাহলে তোমাদের বাড়ি যাওয়া দরকার। আহমদ মুসা বলল।
আপনি অনুমতি দিলে আমরা যেতে পারি। কিন্তু আপনি তো একা! তেপাও কি থাকবে এখানে? জিজ্ঞাসা মাহিনের।
অনুমতির প্রশ্ন কেন? তোমরা স্বাধীন ইচ্ছায় এসেছ, স্বাধীন ইচ্ছাতেই যখন ইচ্ছা তখন যাবে। কিন্তু ভাবছি তোমরা যাবে কিভাবে! আহমদ মুসা বলল।
এ নিয়ে ভাবনা কেন স্যার? বলল মাহিন।
তোমাদের যাতায়াতও এখন নিরাপদ নয়। হোটেলের সামনে ওঁরা নিশ্চয় পাহারায় আছে। তোমাদেরকেও ওঁরা ধরে নিয়ে যেতে পারে। আমাকে হাতে পাওয়ার এটা তাঁদের একটা কৌশল হতে পারে। আহমদ মুসা বলল।
তাহলে? বলল মারেভা।
ভাবছিল আহমদ মুসা। বলল, ঠিক আছে হোটেলের পেছন দিক দিয়ে চলে যাবার ব্যবস্থা করছি। হোটেলের কেউ একজন তোমাদেরকে হোটেলের পেছন দিকের পথ দেখিয়ে দেবে।
বলে একটু থেমে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, একটা কথা, তোমরা এভাবে আমার কাছে আর এসো না। বিপদ তোমাদের এড়িয়ে চলতে হবে। আর আমাকে এখানে কিংবা ঐ হোটেলে নাও পেতে পার। পুলিশ নিষেধ না করলে আমি এখান থেকে অন্য কোন হোটেলে চলে যেতে পারি। টেলিফোন যোগাযোগেও অসুবিধা হতে পারে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারি। আজকালের মধ্যেই আমি অ্যাটল দ্বীপে যাব।
একা? আমাদের সাথে নেবেন না? জিজ্ঞাসা মাহিনের।
না, মাহিন। আমাকে একাই যেতে হবে, ছদ্মবেশে অথবা সুযোগ হলে ট্যুরিষ্টদের সাথে যেতে পারি। আহমদ মুসা বলল।
কিন্তু স্যার, আপনার সাথে যাওয়ার চাইতে না যাওয়া আমাদের জন্যে বেশি কষ্টকর হবে। বলল মারেভা।
আমার জন্যে এ কষ্ট তোমাদের করতে হবে।
তোমাদের অনেক বিপদে জড়িয়েছি, এখন আর নয়। তবে প্রয়োজন বোধ করলেই তোমাদের ডাকব। আহমদ মসা বলল।
আপনিই ওদের টার্গেন স্যার। আপনি কি করে সেখানে যাবেন? বলল মারেভা। মুখ তার ম্লান। উদ্বেগও তার চোখে-মুখে।
বিপদ তো আছেই! বিপদের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হবে। ওদের হাতে ৭৫ থেকে ৭৬ জন্য বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ বন্দী আছে। ওদের বিপদ আমার বিপদের চেয়ে বেশি। মাহিন, মারেভা! জীবন বাজী রেখে অগ্রসর না হলে ওদের বাঁচানো যাবে না। বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠ নিরব, শান্ত, হৃদয়স্পর্শী।
আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। কিন্তু আমরা উদ্বেগে থাকব। বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল মারেভা।
মাহিনের চোখও অশ্রুশিক্ত।
তাদের অশ্রু আহমদ মুসাকেও স্পর্শ করল। তাহিতির মত দূরতম স্থানে এসেও মারেভা-মাহিনের মত ভাইবোন পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। অজান্তেই তার দুই চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল। বলল, মাহিন মারেভা, যুদ্ধক্ষেত্রের জন্যে বড় ভাইকে অশ্রু দিয়ে নয়, হাসি দিয়ে বিদায় দিতে হয়, বিশেষ করে মুসলমানদের এটা একটা ঐতিহ্য।
আমাদের বিশ্বাস, জ্ঞান কোনটাই অমন শক্ত নয়। আমাদের মাফ করুন। বলল মারেভা ও মাহিন।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, নিজেকে ছোট মনে করা বড় হওয়ার সিঁড়ি মারেভা। যাক। আমি হোটেলের কাউকে ডেকে বলে দিচ্ছি, সে তোমাদের হোটেলের পেছন দরজা দিয়ে বের করে দেবে। এদিকের সব ঠিকঠাক করে আমিও বের হবো।
বলে আহমদ মুসা টেলিফোনে হোটেলের একজন অফিসারকে কল করল।
টেলিফোন রেখেই আহমদ মুসা মারেভাদের বলল, তোমরা এখন কোথায় যাবে, কোন রুটে যাবে?
আমি মারেভাকে তার বাড়িতে রেখে আমার বাড়িতে যাব। এখান থেকে সোজা গিয়ে হাইওয়েতে উঠব। সেখান থেকে আমার বাড়িতে সোজা পথ একটাই, সেটা আপনি জানেন। রুট সম্পর্কে কি আপনি কিছু বলতে চান স্যার? বলল মাহিন।
না মাহিন…। কথা শেষ হলো না আহমদ মুসার। দরজায় নক হলো।
আহমদ মুসা কথা বন্ধ করে বলল, হোটেলের লোক এসে গেছে। দরজা খুলে দাও।
হোটেলের একজন কর্মচারী ঘরে ঢুকল।
আহমদ মুসা তাকে সব বুঝিয়ে বলল এবং বলল, চল, আমিও এগিয়ে দিয়ে আসব।
আহমদ মুসা পেছনের গেট পর্যন্ত গিয়ে ওদের বিদায় দিয়ে এল।
এসেই সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল জুতাসহ পা খাটের নিচে রেখে।
শুয়েই মনে হলো শরীর বিশ্রাম চায়।
চোখ জুড়ে তার তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হলো ড্রাইভার তেপাও-এর কথা। সে বেচারা তো কার পার্কে বসেই আছে! তাকে তো যেতে বলা হয়নি!
তাড়াতাড়ি আহমদ মুসা উঠে বসল।
বিছানার উপর থেকে মোবাইল নিয়ে আহমদ মুসা তেপাওকে টেলিফোন করল। বলল, স্যরি, তেপাও তুমি অনেক কষ্ট করলে।
না স্যার, কোন কষ্ট হচ্ছে না। আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আর একটা কথা স্যার। তিনজন লোক হোটেল থেকে বের হওয়ার পর গেটের দিকে চোখ রেখে এখানে ঠায় বসেছিল। গল্প করার ছলে জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল, তাদের সাহেব ভেতরে আর তার জন্যে তারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এইমাত্র এসে বলল, তাদের সাহেব চলে যেতে বলেছে। চলে যাচ্ছে তারা। কিন্তু হোটেল থেকে চলে না গিয়ে তারা তড়িঘড়ি হোটেলের পেছন দিকে চলে গেল। ওদের গতিবিধি কিন্তু শুরু থেকেই ভালো লাগেনি।
হোটেলের পেছনে গেছে? ঠিক দেখেছ? দ্রুত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
ঠিক দেখেছি স্যার। বলল তেপাও।
তেপাও, তুমি তাড়াতাড়ি গাড়ি হোটেলের বাইরে নিয়ে একটু দূরে দাঁড় করাও। আমি হোটেলের পেছন দিক দিয়ে আসছি। হোটেলের সামনে ওদের আরও লোক থাকতে পারে। তাড়াতাড়ি কর তেপাও।
বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়ে তৈরি হয়ে দ্রুত হোটেলের পেছন দিয়ে বেরিয়ে এল। একটু এসেই গাড়ি পেয়ে গেল। তেপাও অপেক্ষা করছিল। তেপাও সালাম দিল আহমদ মুসাকে।
সালাম নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে আহমদ মুসা বলল, তুমিও ইসলাম গ্রহণ করেছ তেপাও?
কিভাবে গ্রহণ করতে হয় জানি না। মারেভা, মাহিন সাহেবরা যা শিখিয়েছে আমি তা ঠিক ঠিক করি। আর কি করতে হবে বলুন স্যার। তেপাও বলল।
আমাদের ধর্মের কি তোমার ভাল লেগেছে, তেপাও? বলল আহমদ মুসা।
স্রষ্টা এক, এটা আমার খুব ভালো লেগেছে স্যার। আরেকটা বিষয় হলো, স্রষ্টার পূজা-আরাধনা সকলের জন্যে সমান ও সকলে স্বাধীনভাবে এটা করতে পারে। হাটে-মাঠে-ঘাটে-মন্দিরে সর্বত্র এবং এটা প্রতিদিনের বিষয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আপনি। আপনার মধ্যে ধর্মের যে ছবি দেখেছি, সেটা আমরা গ্রহণ না করে পারিনি স্যার। তেপাও বলল।
ধন্যবাদ তেপাও। ইসলাম হলো মানুষের স্বভাব-ধর্ম। মানুষের বিবেক যা বলে, ইসলাম তাই করতে বলে। বিবেক হলো মানব-মন ও মানব-মস্তিষ্কের জন্যে স্রষ্টার দেয়া বিধিবদ্ধ একটা প্রকৃতি। আল্লাহর বাণীবাহক বা মেসেঞ্জাররা দুনিয়াতে আসেন এই মানব প্রকৃতিকে সাহায্য ও শক্তিশালী করা জন্যে। সুতরাং যারা সত্য ধর্ম সঠিকভাবে মেনে চলে তারাই সত্যিকার মানুষ হয়। তেপাও, আমি সেই মানুষ হবার চেষ্টা করি মাত্র। বলল আহমদ মুসা।
সত্যিই আপনি আপনার আচরণের মত সুন্দর কথা বলেন স্যার, যদিও সব কথা বুঝা আমার জন্যে কঠিন হয়। তেপাও বলল।
গাড়ি ষ্টার্ট আগেই দিয়েছিল তেপাও। বলল, কোথায় যাব স্যার?
মারেভা ও মাহিন বাড়ি যাচ্ছে। ওদের ফলো করতে হবে। সোজা দক্ষিণের পথটা ধরে হাইওয়েতে ওঠ। তারপর মারেভা ও মাহিনের বাড়ি। তোমার কথা সত্য হলে শত্রু তাদের ফলো করছে। মারেভারা বিপদে পড়তে পারে। আহমদ মুসা বলল।
বুঝেছি স্যার, মাহিন ও মারেভা ম্যাডাম তাহলে হোটেলের পেছন দরজা দিয়ে বের হয়েছিল। শয়তানরা সামনের মত পেছনেও পাহারায় ছিল এবং সামনের ও পেছনের লোকরা একত্র হয়ে তাদের ফলো করেছে।
হ্যাঁ, তেপাও, এটাই ঘটনা। যতটা সম্ভব জোরে চালাও। ওদের ধরতে হবে। বলল আহমদ মুসা।
মাহিন সাহেব ও মারেভা ম্যাডামকে টেলিফোন করে সাবধান করে দেয়া যায় না স্যার? ওরা কোথায় এখন তা জানাও যাবে। তেপাও বলল।
ধন্যবাদ তেপাও। বিষয়টা আমার খেয়ালই হয়নি।
বলেই আহমদ মুসা কল করল মাহিনকে।
মাহিন ওপ্রান্ত থেকে বলল, বলুন স্যার, কোন খবর, কোন নির্দেশ?
তোমরা কি তোমাদের পেছন দিকে লক্ষ রেখেছ?
আমি মনে করছি, একটা গাড়ি তোমাদের ফলো করছে। আহমদ মুসা বলল।
এখন থেকে লক্ষ্য রাখছি স্যার। ওরাই কি ফলো করছে? বলল মাহিন।
হ্যাঁ ওরাই। শোন মাহিন, ওরা সংখ্যায় কম পক্ষে চারজন। তার উপর ওদের হাতে অস্ত্র আছে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে ওরা এখন পাগল। সুতরাং কোনভাবেই ওদের হাতে পড়া তোমাদের চলবে না। তোমরা….।
আহমদ মুসার কথার মধ্যেই মাহিন বলে উঠল, স্যার, ছোট মাইক্রো ধরনের একটা গাড়ি আমাদের ফলো করছে বলে মনে হচ্ছে। এখনও দেড়শ ২শ’ গজ পেছনে আছে।
মাহিন, তোমরা তো এখনও হাইওয়ে পাওনি! এ রাস্তায় কোন বড় সুপার মার্কেট আছে? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
জি স্যার, আমরা এখনও দক্ষিণমুখী রাস্তায়। তবে আমাদের সামনেই হাইওয়ে। দু’এক মিনিটের মধ্যেই হাইওয়ের ক্রসিং-এ আমরা পৌঁছে যাব। সেখানে বড় সুপার মার্কেট আছে স্যার। মাহিন বলল।
সুপার মার্কেটটি মোড়ের বামে মানে তোমাদের গাড়ির লাইনে পড়ে কিনা? বলল আহমদ মুসা।
জি স্যার, হাতের বামে। মাহিন বলল।
শোন, তোমরা মোড়ে গিয়ে সুপার মার্কেটের কারপার্কে গাড়ি পার্ক করেই দ্রুত সুপার মার্কেটে ঢুকে যাও। তারপর…।
আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে মাহিন বলে উঠল, ওরাও তো সুপার মার্কেটে ঢুকে যাবে এবং আমাদের ধরে আনতে পারবে।
হ্যাঁ, পারবে। কিন্তু ততক্ষণে সুপার মার্কেটের কারপার্কিং-এ আমরাও পৌঁছে যাব। আমরা এই সময়টুকুই চাই। তোমরা সুপার মার্কেটে ঢুকলে সেই সময় আমরা পেয়ে যাব। আহমদ মুসা বলল।
মারেভাকে নিয়েই চিন্তা স্যার। বলল মাহিন।
ভয় নেই মাহিন। মার্কেটে ঢুকে ওরা তোমাদের ধরে আনবে, এর জন্যে মানসিকভাবে তোমরা প্রস্তুত থাক। কিন্তু ওরা মার্কেটে না ঢুকে কার পার্কিং-এ তোমাদের জন্যে অপেক্ষাও করতে পারে। আহমদ মুসা বলল।
আচ্ছা স্যার, এখন আর ভয় করছে না। আপনার জন্য অপেক্ষা করব আমরা। বলল মাহিন।
আমরা আসছি। তুমি ড্রাইভারকে গাড়ি জোরে চালাতে বল। ওরা কারপার্কে পৌঁছার আগে অন্তত তোমরা সুপার মার্কেটের গেটে পৌঁছেছ, এটা নিশ্চিত হওয়া চাই। আর একটা কথা, ওরা মার্কেটে ঢুকে যদি তোমাদের কিডন্যাপ করতে চায়, তাহলে কিডন্যাপের সময় হৈ চৈ, চিৎকার করে এ কথা জানান দেবে, ওরা তোমাদের কিডন্যাপ করছে। এটা আমাদের সাহায্যে আসবে। আহমদ মুসা বলল।
ইনশাআল্লাহ স্যার। দোয়া করুন। বলল মাহিন।
আমিন! ‘আল্লাহ হাফেজ!’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।