৫১. প্যাসেফিকের ভয়ংকর দ্বীপে

চ্যাপ্টার

ক্যাপিটাল অব পাওয়ারের সিচুয়েশন রুম।
সিচুয়েশন রুমের এক প্রান্তে সূর্যকার একটি বেদি। বেদির উপর সুন্দর রাজকীয় কার্পেট পাতা।
বেদির সামনে শ্বেত পাথরের মেঝেতে সারিবদ্ধ তিনটি চেয়ার। চেয়ারগুলোও সাদা ধবধবে রঙের।
তিনটি চেয়ারের মাঝের চেয়ারে গৌরী। তার ডানে জিজর, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের অপারেশন চীফ। আর গৌরির বাম পাশে বসেছে ডারথ ভাদের, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের গোয়েন্দাপ্রধান।
তার সবাই উন্মুখভাবে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। তাদের সবারই মুখ বিষণ্ণ।
তাদের অপেক্ষার ইতি হলো।
বেদির পেছনের দেয়াল ফুঁড়েই যেন বেরিয়ে এল রক্তলাল চেয়ারে বসা আলেক্সি গ্যারিন, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সর্বময় কর্তা। তার গায়ে লাল রাজকীয় পোষাক।
ধবধবে সাদা ঘরে লালের আগমন অনেকটাই সূর্যোদয়ের মত।
বেদির মাঝখানে এসে স্থির হলো চেয়ারটি।
বেদির নিচে মেঝেয় চেয়ারে বসা জিজর, গৌরী ও ডারথ ভাদের উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা বাও করে বলল, লং লিভ আওয়ার লর্ড! লং লিভ আওয়ার সিন্ডিকেট!
বসল তারা তিনজন।
আজ আলেক্সি গ্যারিনের মুখে মুখোশ নেই।
চল্লিশ বছেরের মত বয়সের একজন মানুষ সে। পশ্চিমের সে সাদা রঙের মানুষ। শক্ত চোয়াল, কঠিন মুখ, চোখের দৃষ্টিতে কঠোরতা। মুখে লাবণ্য-কমনীয়তা কিছু ছিল কিনা কোনদিন, তা বুঝা যায় না। কঠিন ও কঠোরতার মাঝে হারিয়ে গেছে যেন সুকমার বৃত্তির সব কিছু।
আলেক্সি গ্যারিনের দৃষ্টি সবার উপর দিয়ে ঘুরে এসে স্থির হলো জিজরের মুখের উপর।
জিজর মাথা নত করল।
এ সব কি হচ্ছে জিজর?
মাই লর্ড! বলে চুপ করে থাকল জিজর।
তিনটি কমিটি করে দিয়েছিলাম আহমদ মুসাকে এলিমিনেট করতে, কিন্তূ তোমাদের ৮ সদস্যের এলিট কামান্ডোরা নিজেরাই এলিমেনেট হয়ে গেল। কেন, কিভাবে? বলল আলেক্সি গ্যারিন। কঠোর যান্ত্রিক তার কন্ঠ।
গৌরীদের তিনজনের মুখও মলিন হয়ে গেল পরাজিত সৈনিকের মত।
জিজর উঠে দাঁড়িয়ে বাউ করে বলল, মাই লর্ড, আমাদের অভিযান ঠিক ভাবে……।
জিজরের কথার মধ্যেই আলেক্সি গ্যারিন বলে উঠল, থাক জিজর। এই কথাগুলো একটু পরে শুনব। আগে শুনতে চাই, আমাদের কোন লোক এ পর্যন্ত শ্ত্রুর হাতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়ার অঘটন কিভাবে ঘটল?
মাই লর্ড! আমার কথার মধ্যে এটাও বলব মাই লর্ড। বলল জিজর।
বল। বলল আলেক্সি গ্যারিন কঠোর কন্ঠে।
মাই লর্ড! সেদিন রাতে বড় ঘটনার পর আপনার নির্দেশে তিনজনে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, আহমদ মুসাকে প্রস্তূতি ও পরিকল্পনার কোন সুযোগ দেয়া যাবে না। প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তাকে একের পর এক আঘাত হানতে হবে। এই লক্ষেই সে রাতের পর আহমদ মুসাকে খুঁজে পাবার জন্যে সকালেই আমরা মারেভা ও মাহিনকে খুঁজে নিই এবং তাদের ফলো করে হাসপাতালে যাই। সেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিল আহমদ মুসার ড্রাইভার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আহমদ মুসা হাসপাতালে আসেনি। একজনকে পাহারায় রেখে আমাদের কয়েকজন আহমদ মুসার আগের হোটেলে চলে আসে। জানা যায় সে হোটেলে আহমদ মুসা যায়নি। এটা জেনে আমাদের লোকেরা আবার সেই হাসপাতালে ফিরে আসে। তারা সে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারে আহমদ মুসা এসে চলে গেছে। দুর্ভাগ্য, পাহারায় থাকা আমাদের লোক তাকে চিনতে পারেনি। আহমদ মুসা ছদ্মবেশে ছিল বলে মনে হয়। কিন্তূ মাহিন ও মারেভা তখনও হাসপাতালে ছিল। আমাদের লোকেরা তাদের আনুসরন করে নতুন এক হোটেলে গিয়ে আহমদ মুসাকে পায়। তার হোটেল কক্ষে থাকা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তারা চারজন প্রথম সুযোগেই তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হোটেলে ও তার আশেপাশে পুলিশ ছিল না। তার লাশ আনার পথে কোন বাধাও ছিল না। পরিকল্পনা হয় প্রথমে দু’জন এক আঘাতেই দরজা ভেঙে ফেলবে। আর প্রস্তূত থাকা দু’জন এক সাথে গুলি করবে আহমদ মুসাকে। একজন এ্যাটেনডেন্টকে টাকা দিয়ে ঐ সময়ে গল্পরত আহমদ মুসা, মারেভা ও মাহিনের মিটিং ডায়াগ্রাম সংগ্রহ করা হয়েছিল।পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল। এক আঘাতে দরজাও ভেঙে পড়েছিল। কিন্তূ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমাদের প্রস্তূত থাকা লোকেরা অপ্রস্তূত আহমদ মুসার আগে গুলি ছুঁড়তে পারেনি। এই অবস্থায় সেখানে আমাদের চারজন নিহত হয় এবং আমাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর আহমদ মুসার হোটেলের দু’পাশে পুলিশের পাহারা বসে। এই অবস্থায় আমাদের অবশিষ্ট লোকেরা হোটেলের পেছন দরজা দিয়ে মাহিন ও মারেভাকে চলে যেতে দেখে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে, মারেভা ও মাহিনকে তারা পণবন্দী করবে আহমদ মুসাকে হাতের মধ্যে পাওয়ার জন্যে এবং তারা সিদ্ধান্ত অনুসারে মারেভাদের পিছু নেয়। হাইওয়ের যে স্থানকে ওদের কিডন্যাপ করার পরিকল্পনা করে, তার কিছু আগে মারেভা ও মাহিন গাড়ি থামিয়ে একটা সুপার মার্কেটে নেমে পড়ে। আমাদের লোকেরা সিদ্ধান্ত নেয় ওরা মার্কেট থেকে বেরুলেই তাদের ধরে গাড়িতে তুলবে এবং কিছু ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে ত্রাস সৃষ্টি করে তারা বেরিয়ে আসবে। কিন্তূ তাদের গাড়ি তোলার সময় কোত্থেকে একটা গাড়ি এসে হাজির হয়। আমাদের তিনজন লোককে হত্যা করে মারেভাদের উদ্ধার করে নিয়ে চলে যাবার সময় তার ছোঁড়া তিনটি গুলিতে সিরিয়াসভাবে আহত আমাদের একজন লোককে তারা ধরে নিয়ে যায়। যাবার সময় চিৎকার করে বলে যায়, আহতকে আমরা হাসপাতালে নিচ্ছি। এর কিছুক্ষন পর আমাদের লোকেরা থানায় যায়। থানা অদ্ভুত কাথা জানায়। বলে, আমাদের আহত ঐ ব্যক্তিকে যা থানায় নিয়ে আসছিল, সে থানায় এসে ডাইরি করে গেছে, আহত আমাদের লোককে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে কয়েকজন লোক। কয়েকটি গাড়ি নিয়ে তার গাড়ি তারা ঘিরে ফেলে আহতকে ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এরপর আমাদের আহত লোকটির আর কোন খোঁজ আমরা পাইনি। মারেভা ও মাহিন নিখোঁজ রয়েছে। তাদের বাড়িতে তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের পরিবারের লোকেরাও উদ্বিগ্ন। থানায় তারা ডাইরিও করেছে।
থামল জিজর। মুহূর্তকাল থেমেই আবার বলল, মাই লর্ড, আমরা পর্যালোচনা করেছি, আমাদের পরিকল্পনায় তেমন কোন ভূল নেই। আহমদ মুসা অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আমাদের প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থ করে দেয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রেও অকল্পনীয়ভাবে তারা আক্রমণের শিকার হয়, যখন তারা ব্যস্ত ছিল মারেভা ও মাহিনকে গাড়িতে তোলার জন্যে। অতএব, মাই লর্ড, আমাদের পর্যালোচনায় আমাদের ব্যর্থতার কারণ, সামর্থ্য ও সুযোগের অভাব নয়। মাই লর্ড! আমরা মুখাপেক্ষী আপনার সিদ্ধান্ত ও আদেশের। থামল জিজর।
তোমাদের কাজ ও বক্তব্যের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। সুপার মার্কেটে আমাদের লোকদের মেরে আমাদের বন্দীদের কেড়ে নিল, তারা একজন না কয়জন ছিল? সে বা তারা হঠাৎ সেখানে উদিত হলো কোত্থেকে? তাদের সুপার মার্কেটে ঢোকা পরিকল্পিত কি না? আহতকে কেউ কেড়ে নিয়েছে, থানায় এই খবর দেওয়া সাজানো কিনা? এই সব বিষয়ে তোমাদের অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা হয়নি।
বলে আলেক্সি গ্যারিন মুহূর্তের জন্যে থামল। আবার শুরু করল, আমি নিশ্চিত সুপার মার্কেটে আমাদের লোকদের হত্যা, মারেভাদের উদ্ধার ও আমাদের লোকদের ধরে নিয়ে যাওয়ার কাজ আহমদ মুসা করেছে। সে ছাড়া এভাবে এই কাজ করার লোক পলিনেশীয়ায় আর কেউ নেই। সে কোন ভাবে মারেভাদের বিপদ জেনে বা বুঝতে পেরে তাদের ফলো করে এবং মারেভাদেরকে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অনুসারেই মারেভারা সুপার মার্কেট প্রবেশ করে সময় ক্ষেপণের জন্যে, যাতে সেই সময়ের মধ্যে আহমদ মুসা পৌছতে পারে। এ না হলে যে মারেভারা ভয়ে হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে আসে, তারা সুপার মার্কেটে ঢুকবে মার্কেটিং করার জন্যে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আহতকে ছিনতাইয়ের কাহিনী সেই সাজিয়েছে, যাতে আহতকে হাসপাতালে পৌছাবার দায় থেকে বেঁচে যায়। নিশ্চয় আমাদের আহত লোকটি মরে গেছে অথবা আহমদ মুসা হত্যা করেছে। কারণ গুলিবিদ্ধ সিরিয়াস আহতকে বন্দী রাখা ও চিকিৎসা করার সুযোগ হোটেলে থাকা আহমদ মুসার কাছে নেই।
আলেক্সি গ্যারিন থামতেই জিজর বলল, মাই লর্ড! হতে পারে, গাড়ির মধ্যেই তাড়াহুড়া করে আমাদের আহত লোকটির কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করেছে এবং কথা আদায় করতে না পেরে আরও নির্যাতন করতে গিয়ে মেরেই ফেলেছে।
গৌরীর মুখে কথা এসেই গিয়েছিল যে, আহমদ মুসা এ ধরনের শত্রু নয়, সে আহত বন্দীকে নির্যাতন বা হত্যা করতে পারে ন। কিন্তূ নিজেকে সামলে নিল গৌরী। নিজেকে এভাবে প্রকাশ করতে চাইল না গৌরী। কিন্তূ আহমদ মুসার প্রতি এই অভিযোগ তার মনে একটা কষ্টের সৃষ্টি হলো।
হ্যাঁ জিজর, এটাই ঘটেছে। আহমদ মুসা বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে বড় টেররিস্ট। এই কাপুরুষটির এই ন্যাক্কারজনক কাজ তার পাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আমরা তাকে ছাড়ব না।
মুহূর্ত কয়েকের জন্যে থেমে ডারথ ভাদেরের দিকে চেয়ে বলল, ভাদের এই ঘটনা ও আহমদ মুসা সম্পর্কে নতুন কি তথ্য তোমার কাছে আছে বল? ডারথ ভাদের উঠে দাঁড়িয়ে বাউ করে বলল, ঘটনা সম্পর্কে নতুন কোন তথ্য নেই। সুপার মার্কেটের লোকদের সাথে কথা বলে আমাদের গোয়েন্দারা লোকটির চেহারা, পোশাক-আশাক, কথার ধরন ইত্যাদি যে তথ্য পেয়েছে, তাতে মাই লর্ডের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়, লোকটি আহমদ মুসাই ছিল। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আহমদ মুসা তাহিতি থেকে হঠাৎ যেন কোথাও উধাও হয়েছে বা পালিয়ে গেছে। কোন হোটেলে বা অন্য প্লেসে কোন সময় তাকে আমাদের গোয়েন্দারা পায়নি।
আহমদ মুসা সম্পর্কে ভাল জানলে একথা বলতে না ডারথ ভাদের। সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালায় না। সে অত্যন্ত বিপদজ্জনক। এ পর্যন্ত আমাদের কোন চেষ্টাই সফল হয়নি। সবচেয়ে বিস্ময়ের হলো, তাকে কখনও আইনের চোখে অপরাধী বানানো যায় না। সব জায়গায় সে ত্রাতার ভুমিকায় থাকে, আইন ও পুলিশের পক্ষেই তারা কাজ করে। আমি বুঝতে পারছি না, হঠাৎ সে তাহিতিতে এল কেন? কোন মিশনে সে এসেছে। কিন্তূ তার উদ্দেশ্য না জানলেও সে আমাদের জন্যে বিপদজ্জনক। আমাদের পশ্চিমি বন্ধুরা একটা উদ্ধেগজনক তথ্য দিয়েছে। সেটা হলো সৌদি বিজ্ঞানী খালেদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাক্কী’র অনুসন্ধানের দায়িত্ব সৌদি সরকার আহমদ মুসাকে দিয়েছে। আরেকটা তথ্য তারা দিয়েছে, আমাদের যারা বিজ্ঞানী খালেদ মোহাম্মদ আব্দুল্লাকে কিডন্যাপ করেছিল, তাদের পিছু নিয়ে আহমদ মুসা ওমান পর্যন্ত এসেছিল। অন্য দিকে আমাদের লোকদের তথ্য হলো, ওমানের সাগর তীরের একটি হোটেলে তাদের উপস্থিতি একজনের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। গ্যাস বোমা ফেলে তাকে সংজ্ঞাহীন করে তড়িঘড়ি করে তারা পালিয়ে এসেছে। এই দুই তথ্য মেলালে দেখা যাচ্ছে, ওমান হোটেলের সেই লোকটি ছিল আহমদ মুসা। সে আহমদ মুসাই এখন তাহিতিতে। সুতরাং সুস্পষ্ট না জানলেও এটা ধরেই নিতে হবে যে, সে বিজ্ঞিনীর সন্ধানেই তাহিতিতে এসেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সে তাহিতিতে আসবে কেন? সে জানবে কি করে এখানেই তাকে পাবে! কিন্তূ আহমদ মুসার অসাধ্য কিছু নেই। সুতরাং আমাদের প্রজেক্ট আজ ঝুঁকির মধ্যে। একে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে দিতে পারি না। সাফল্য যখন আমাদের হাতের মুঠোয়, গোটা দুনিয়াকে অচল করে দিয়ে, সবার উপর আমরা সচল থাকার যে যাদুরকাঠি আমরা হাতে পেতে যাচ্ছি, তখন কাউকেই আমাদের দিকে চোখ তুলে চাইতে দিতে পারি না। আমাদের প্রোজেক্টের স্বার্থে আহমদ মুসাকে অবশ্যই মারতে হবে। তাকে মারার জন্যে একের পর এক প্লান তোমরা বানাও। এক অপশন ব্যর্থ হলে অন্য অপশন সংগে সংগেই তোমরা যেতে পারবে। এ পর্যন্ত যদিও আমরা সফল হইনি, তবে আমাদের পদক্ষেপ সঠিক হয়েছে। এজন্য তোমাদের মোবারকবাদ দিচ্ছি। আহমদ মুসা অত্যন্ত চালাক, অত্যন্ত ক্ষিপ্র ও অতুলনীয় উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী। এই গুণগুলোই তাকে এ পর্যন্ত বাঁচিয়েছে, কিন্তূ সব সময় তাকে বাঁচাবে না। কেউ এভাবে বাঁচেও না। ভূল এক সময় করেই এবং খতম হয়ে যায় সেই একটি ভূলেই।আমাদেরকে তারই অপেক্ষায় একের পর এক ফাঁদ পেতে যেতে হবে শয়তানের বাচ্চাকে ধরার জন্যে। থামল আলেক্সি গ্যারিন।
আলেক্সি গ্যারিনের কথার মধ্যে মাঝে মাঝেই গৌরীর মনটা খচ খচ করে উঠেছে কিছু বলার জন্যে। আহমদ মুসা শুধু অসম্ভব চালাক, ক্ষিপ্র ও উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারীই নয়, সে মানবিক ও নীতিনিষ্ঠও। তার জীবন দৃষ্টি, আচরণ কোনও অপরাধীর মত নয়। বন্দীদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ও মমতা গৌরীকে বিস্মিত করেছে। মন জয়ও কি করেনি! না হলে জ্যামিং মেশিনটা সে আহমদ মুসাকে দিয়ে এল কেন, যা আহমদ মুসাকে ঐ সংঘর্ষে জয়ী করেছে।
কথা শেষ করে আলেক্সি গ্যারিন তাকাল গৌরীর দিকে। তাকে অন্যমনস্কতায় ডুবে থকতে দেখে বলল, গৌরী, কি ভাবছ তুমি?
চমকে উঠে গৌরী নিজকে সামলে নিল। মাই লর্ড, এসব নিয়েই ভাবছি।
কি ভাবছ তুমি? বলল আলেক্সি গ্যারিন।
গৌরী মাথা নিচু করে একটু ভেবে বলল, মাই লর্ড! সে এখন আড়লে চলে গেছে আমাদের উপর্যুপরি আক্রমণে। তার সাথে মারেভা ও মাহিনও। আমি মনে করি, আমরা কিছুটা চুপ থেকে তাদেরকে আড়াল থেকে বের করে আনা দরকার। তারপর তাকে আঘাতহানার সুযোগ নিতে হবে তার অপ্রস্তূত অবস্থায়, অন্য দিকে আমাদের প্রজেক্টের রক্ষার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত আছে কিনা, সেদিকে নজর দিতে হবে।
আলেক্সি গ্যারিনের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ধন্যবাদ গৌরী। তোমার চিন্তা ও পরামর্শকে স্বাগত জানাচ্ছি। তুমি সঠিক চিন্তা করেছ। ওরা গর্তে ঢুকেছে, গর্ত থেকে বের করে আনতে হবে তাদের। জিজর, এবার তোমার সামনের চিন্তা সম্পর্কে বল।
মাই লর্ড, ম্যাডাম গৌরী ঠিক বলেছেন। তাদেরকে যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন এ মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনেও যেতে পারবো না। তবে সংগোপনে তাদের সন্ধান অব্যাহত রাখাতে হবে, বিশেষ করে মারেভা ও মাহিনের বাড়ির উপর খুব সাবধানে নজর রাখতে হবে। মাহিনরা নিশ্চয় তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখবে। এই পথেই আহমদ মুসার সন্ধান পাওয়া যাবে। তার সন্ধান পাওয়া ও তাকে শেষ করাকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিতে হবে। এজন্যে তাহিতি দ্বীপে আমাদের জনশক্তির সর্বোচ্চ মবিলাইজেশন করতে হবে। প্রতিটি স্থানে আমাদের নজরদারি করতে হবে। সর্বত্র সব দিকে থেকে তাকে ঘিরে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে পলিনেশীয়ার বাইরে থেকে এবং আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ার থেকেও আমাদের লোকজনকে তাহিতিতে নিতে হবে। আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ারের বাইরেই আহমদ মুসাকে ধ্বংস করতে হবে। আমি মনে করি ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট এই ঝামেলা এড়াতে পারলে নির্বিঘ্নে তার লক্ষে পৌছে যাবে। জিজর বলল।
আলেক্সি গ্যারিন এবার ডারথ ভাদেরের দিকে তাকাল।
ডারথ ভাদের প্রস্তূত ছিল। বলল সংগে সংগেই, মাই লর্ড, আমি ম্যাডাম গৌরীও মি, জিজরকে সমর্থন করছি। দরকার হলে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাহিতিতেই আহমদ মুসাকে ধ্বংস করতে হবে। থামল ডারথ ভাদের।
সবার কথা শেষ হলে আলেক্সি গ্যারিন চোখে নিচে নামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, তাহলে এটাই ঠিক হলো, মারেভা ও মাহিনের বাড়ির উপর গোপন নজরদারি চলবে, তাদের বাড়ির লোকজনদের গতিবিধির উপরও গোপনে নজর রাখা হবে এবং গোটা তাহিতি দ্বীপে চলবে গোপন চিরুণী অভিযান। এজন্য প্রয়োজনীয় শক্তিকে তাহিতিতে মোবিলাইজ করার প্লানও মঞ্জুর করা হবে। জিজর ও ডারথ ভাদের উপস্থিত থেকে তাহিতির অভিযান পরিচালনা করবে। আর গৌরী ক্যাপিটাল অব পাওয়ারের দায়িত্বে থাকবে, যেহেতু তার গুলিবিদ্ধ হাত এখনও পুরোপরি সুস্থ নয়। তোমরা এবার প্রস্তূতি গ্রহন করো। ওকে। কথা শেষ করল আলেক্সি গ্যারিন।
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আলেক্সি গ্যারিনের আসন হটে পেছনের দেয়ালের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল, ঠিক যেভাবে এসেছিল। গৌরীরা তিনজনও উঠে দাঁড়াল।
গৌরী কক্ষের বাইরে যেতেই তার মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখল তার বস আলেক্সি গ্যারিন।
কল অন করে, ইয়েস মাই লর্ড! বলতেই ওপার থেকে আলেক্সি গ্যারিন বলল, গৌরী এস, আমি শোবার ঘরে।
সংগে সংগেই মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল গৌরীর। চোখে ফুটে উঠল অপমান ও জ্বালাময় বেদনার একটা ছাপ।
ইয়েস মাই লর্ড! বলল গৌরী। কথা বলতে কষ্ট হলো গৌরীর।
হ্যাঁ, শোন গৌরী। কয়েক দিন তোমাকে সাদা পোষাকে দেখছি। ওটা আমি দু’চোখে দেখতে পারিনা, সাদা হলো মৃত্যুর প্রতীক। তুমি আগের মত লাল পোষাক পরে এস। তুমি লাল তোমার ভেতরটাও লাল। তোমার গায়ের লাল পোষাক তাই মনে আগুন জ্বালায়। এ আগুন আমার সবচেয়ে প্রিয়। এস গৌরী। বলল আলেক্সি ওপার থেকে।
গৌরী ইয়েস মাই লর্ড! বলতেই ওপার থেকে কল অফ হয়ে গেল।
যন্ত্রের মত কল অফ করল গৌরী।
মুখে ইয়েস মাই লর্ড! বললেও গৌরীর চোখে জ্বলে উঠেছে অপমানের আগুন। এতদিন নারীত্বের, ব্যক্তিত্বের এই অপমানের আগুন অবচেতন মনের কোন এক কোণে যেন সে অনুভব করতো! আজ সেই আগুন তার চোখে নেমে এসেছে। আহমদ মুসা তার মনের সুপ্ত আগুনকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেদিন ‘লা ডায়মন্ড ড্রপ’ হোটেলের ‘অ্যাপেক্স’ রেস্টুরেন্টে আহমদ মুসার সাথে কয়েক মিনিট আলোচনা তাকে নতুন জীবন দিয়েছে। তার নারীত্বের মর্যাদার চেতনা এখন আকাশ স্পর্শ করেছে। মোবাইলটা পকেটে রেখে মনে মনে বলল গৌরী, আগুন শুধু মনোরঞ্জনের জন্য নয় মাই লর্ড, ধ্বংসেরও হতে পারে।
এ আগুন যেন অশ্রু হয়ে জমেছে তার চোখের দুই কোণে!
চোখ মুছে গৌরী পা বাড়াল আলেক্সি গ্যারিনের ঘরের দিকে। ওখানেই এক প্রস্থ লাল পোষাক আছে। কোন এক সময় তা সে খুলছিল। আর নিয়ে আসা হয়নি। ওটাই পরা যাবে সেখানে গিয়ে। তার মনের দরজায় আহমদ মুসার পবিত্র, প্রশস্ত, সুন্দর অবয়বটা এসে দাঁড়াল। সে যেন ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে গৌরীকে এগোতে নিষেধ করছে! অশ্রুর একটা ঢেউ যেন তার দুই চোখের কোণকে প্লাবিত করল আবার। মনে মনেই বলল, আহমদ মুসা, তোমার কথাগুলো স্বাধীন মানুষের জন্যে, আমি স্বাধীন মানুষ নই!
গৌরী হাঁটছিল। তার হাঁটা থামল না।

আহমদ মুসাকে স্বাগত জানিয়ে নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে বলল তাহিতিসহ পলিনেশীয়া দ্বীপপুঞ্জের স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রধান ফারসি আমলা মসিয়ে দ্যাগল, জরুরি বিষয়টা আপনার কি মি.আহমদ মুসা?
ধন্যবাদ স্যার, এই সাক্ষাত দেয়ার জন্যে।
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। সোজা হয়ে বসে বলল, আমি ছদ্মবেশ নিয়ে তোয়ামতো দ্বীপপুঞ্জে গিয়েছিলাম সংশ্লিষ্ট দ্বীপ এলাকায়ও ঘুরেছি। সব বিষয়ে একটা ধারণা নেবার চেষ্টা করেছি। লক্ষ অর্জনের জন্যে কিছু টার্গেটও ঠিক করেছি। সামনে এগোবার জন্যে আপনার সাহায্য আমার প্রয়োজন।
মি. আহমদ মুসা, আপনার উপর আমার একশ’ ভাগেরও বেশী আস্থা আছে। সেদিন আমরা আলোচনায় বুঝেছি, আতগুলো মুল্যবান মানুষের জীবন রক্ষা করতে হলে গোপন অভিযানের কোন বিকল্প নেই এবং এই অভিযান আপনাকে দিয়েই সম্ভব। তবুও বলছি আপনার সামনে এগোনোর ব্যাপারে সব দিক আপনি ভেবেছেন কিনা, সব ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত কিনা? বলল তাহিতিসহ ফ্রেঞ্চ পলিনেশীয়ার স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান মসিয়ে দ্যাগল।
সংশ্লিষ্ট সব ব্যাপার নিয়েই আমি ভেবিছি। তবে ঝুঁকির প্রশ্ন তো আছেই।
এ ধরনের অভিযানে ঝুকি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে ঝুকি যাতে কমানো যায়, এজন্যে আপনার কছে এসেছি সাহায্যের জন্যে। আহমদ মুসা বলল।
অবশ্যই সাহায্য পাবেন। আমারা প্যারিসকে বিষয়টা ব্রিফ দিয়েছি। তারা সব রকম সাহায্যের নির্দেশ দিয়েছেন। দরকার হলে এখানকার সেনা ইউনিট ব্যবহার করা যাবে। বলল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান দ্যাগল।
ধন্যবাদ স্যার। বলল আহমদ মুসা।
আপনার প্রয়োজনের কথা বলুন মি. আহমদ মুসা।
স্যার, এক, আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল দরকার। ছোট, যাতে এই দ্বীপ বা অ্যাটলের কিনারায় পৌছতে পারি। ওদের রাডার বা সিসি ক্যামেরা’কে ফাঁকি দিয়ে ওদের দ্বীপের নির্দিষ্ট টার্গেটে পৌছার জন্যে এটা দরকার। দুই, রাডার ও ক্যামেরার রেজিস্ট্যান্ট পোশাক দরকার। তিন, ইলেক্ট্রন জ্যামিং মেশিন আমার দরকার এবং চার আলট্রা সাইলেন্সর টেকনলজির মিনি মেশিন রিভালবার আমার প্রয়োজন। শর্ত হলো, এই সবই ফেরত দেব, এই টেকনলজি কারও হাতে যাবার ভয় নেই। বলল আহমদ মুসা।
হাসল স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল। বলল, ফেরত দেয়া, টেকনলজি ট্রান্সফার না হওয়ার প্রশ্ন তুলছেন কেন, আহমদ মুসা? আর কি করে জানলেন যে, এই জিনিসগুলো আমাদের কাছে আছে?
স্যার, আমি পৃথিবীর সব মিলিটারির টাইম জার্নাল নিয়মিত দেখি। এসব জিনিস ফরাসিরা কবে আবিস্কার করেছে তাও আমি জানি। বলল আহমদ মুসা।
কিন্তূ আহমদ মুসা সাবমেরিন ছাড়া আমাদের আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল, যেটা আছে সেটা ডুবুরীদের ক্যাপসুলের মত। তবে আরও উন্নত। এ থেকে কোন বুদ্বুদ বের হয় না। সাবমেরিনের মত এটা চলতে পারে। কম পানিতেও চলে তবে তার গতি বেশী নয়, ম্যাক্সিমাম ছয় ঘন্টার মত এটা পানির তলে থাকতে পারে। এটা বানানো হয়েছে গোয়েন্দাদের ছোট-খাট কাজে ব্যবহারের জন্যে। স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল বলল।
এটাই আমার মিশনের জন্যে এ্যাপ্রেপ্রিয়েট স্যার। বলল আহমদ মুসা।
আপনার সৌভাগ্য মি. আহমদ মুসা। এই আন্ডারওয়াটার ক্যাপসুলটি দুদিন আগে আমাদের সংগ্রহে এসেছে। এর ব্যাবহারের কয়েকটা বিষয় আপনাকে শিখতে হবে। বলল স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল।
ধন্যবাদ স্যার। আপনারা সাহায্য করলে শিখে নেব। অন্য তিনটি বিষয়ে বলুন। বলল আহমদ মুসা।
ওগুলোর ব্যাপারে সমস্যা হবে না। তবে রাডার ও ক্যামেরা রেজিস্ট্যান্ট পোষাকের বিকল্পও আমাদের আছে। স্বয়ংক্রিয় ক্রোকোডাইল ও ডলফিন পোষাক আছে। ওর ভেতরে ঢুকে পানিতে ও স্থলে যে কোন দিকে, যে কোন ডিস্টিনেশনে চালানো যায়। তবে রাডার ও ক্যমেরা রেসিস্ট্যান্ট নয়। অন্যদিকে রাডার ও ক্যামেরা রেসিস্ট্যান্ট পোশাক রাডার ও ক্যামেরার ব্লাইন্ড অ্যারর হিসাবে চিহ্নিত হবে। সুবিধা হলো এ পোশাকে আপনি যত্র-তত্র যেতে পারবেন, কিন্তূ ক্রোকোডাইল ও ডলফিনের পক্ষে তো সব জায়গায় যাওয়া স্বাভাবিক নয়! থামল স্বরাষ্ট সচিব মসিয়ে দ্যাগল।
হ্যাঁ, রাডার, ক্যামেরা রেসিস্ট্যান্ট পোশাকই আমার জন্য ভাল হবে স্যার। বলল আহমদ মুসা।
ঠিক আছে, মি, আহমদ মুসা। আপনার যা চাহিদা সেটাই পাবেন। স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল বলল।
আমি অ্যাটলে ঢোকার পর কোন লোক অ্যাটলে ঢূকবে না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্যে সারফেসে পেট্রল বোট ও পানির নীচে সাবমেরিন পাহারায় থাকতে হবে? এবং………।
আহমদ মুসা কথার মাঝখানেই দ্যাগল বলে উঠল, সাবমেরিন কেন? সারফেসে পাহারায় থাকলেই তো হয়।
অ্যাটলের ভেতরে ঢোকার কোন আন্ডারওয়াটার প্যাসেজ আসে কিনা তা জানি না। থাকলে সেদিক দিয়ে লোক ঢুকে যেতে পারে। ওদের বিভিন্ন ধরনের আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল আছে। আমি ওদের টিউব সাবমেরিনও দেখেছি। বলল আহমদ মুসা।
কি বলেছেন আপনি! ওদের সাবমেরিন, এমনটি টিউব সাবমেরিনও আছে? কোথায় থাকে ওসব?
আছে যে আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। কোথায় থাকে তা জানি না। তাহিতির কোস্টাল লেগুন এবং তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জের একাধিক লেগুনে থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, ওদের হেলিকপ্টার ও এয়ার-ক্যাপসুলও রয়েছে। বলল আহমদ মুসা।
হ্যাঁ হয়ে গেল স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগলের মুখ! কোন কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। বিস্ময় কাটিয়ে উঠে বলল, মি, আহমদ মুসা! এত কথা তো আগে বলেননি। রীতিমত ওরা রাষ্ট শক্তি বনে গেছে। বিপদজ্জনক ওদের প্রস্তূতি। এই অবস্থায় আমি ওদের হেড কোয়ার্টার বা ঘাঁটিতে আপনাকে ঢুকতে দিতে পারি না। আমি প্যারিসে জানাব। ওদের অনুমতি লাগবে।
আপনি ওদের জানান। কিন্তূ এ কারনে আমাদের এ্যাকশনের জন্য দেরি করার প্রয়োজন নেই। বলল আহমদ মুসা।
প্রয়োজন আছে মি, আহমদ মুসা। আমাদের শক্তি বাড়াতে হবে। স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল বলল।
তাদের সাথে যুদ্ধ করার তো প্রয়োজন নেই। শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজন কি? আমি জানি যে শক্তি আপনার হাতে আছে সেটাই যথেষ্ট ওদের পরাজিত করার জন্যে। বলল আহমদ মুসা।
ধরুন, ওদের হেড কোয়ার্টার দখল হয়ে গেল। হেড কোয়ার্টারে যাবার পথ ওরা না পেলে এবং পানি, আকাশ ও আন্ডারওয়াটার পথে ওরা হেড কোয়ার্টারে যেতে না পারলে ওরা বিশৃঙ্খল ও ভীত হয়ে পড়বে। আমি মনে করি এ ধরনের শক্তি আপনার আছে। আপনার দু’টি ডেস্টয়ার ও কামান, মেশিনগান ও এ্যান্টিএয়ারক্রাফটগানসজ্জিত ২০টি বড় ধরনের মিলিটারি পেট্রল বোট রয়েছে। আর সাবমেরিন আছে বলেও আপনার কাছ থেকে শুনেছি। সুতরাং ওদের বাইরের শক্তিকে ক্রাশ করার জন্যে এই আয়োজনই যথেষ্ট। আরেকটি কথা স্যার হেড কোয়ার্টার ও উদ্ধার পর্বে শক্তি কোন কাজে লাগবে না, এখানে বুদ্ধির যুদ্ধে জিততে হবে এবং বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের উদ্ধার করতে হবে। তাদের নিরাপত্তার জন্যে এই নিরব অপারেশনের প্রয়োজন। বলল আহমদ মুসা।
স্বরাষ্ট সচিব অনেক্ষণ চুপ করে থাকলো। ভাবল। তারপর বলল, ধন্যবাদ মি, আহমদ মুসা, আপনি ঠিক পথেই চিন্তা করছেন। কিন্তূ আপনার চূড়ান্ত অভিযানের আগে অ্যাটলটিতে আন্ডারওয়াটার কোন প্যালেস আছে কিনা তা কি জানা দরকার নয়?
তারও কোন প্রয়োজন দেখি না স্যার। বরং তা দেখতে গেলে ওদের সাথে যদি দেখা হয়ে যায়, ওরা যদি আমাদের জেনে ফেলে কিংবা কোন কারণে সংঘাত বাঁধলে বিষয়টা জানাজানি হয়ে যাবে এবং ওরা আরও সতর্ক হয়ে যেতে পারে। আমাদের এ অপারেশনের কনসেপ্ট হলো স্যার, ওদের সতর্ক হওয়ার আগে নিরবে ওদের ক্ষমতার কেন্দ্রকে অকেজো করে দেয়া এবং বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর পরই দরকার হবে ক্ষমতার প্রদর্শনী, বাইরের বিজয়টা নিশ্চিত করার জন্যে। বলল আহমদ মুসা।
আমি একমত মি. আহমদ মুসা। কিন্তূ ভাবছি হেড কোয়ার্টার দখলে নেয়ার ভয়ংকর কাজটা কিভাবে হবে। এর সাফল্যের উপরই নির্ভর করছে সব কিছু। আপনার কি পরিকল্পনা? আমাকে প্লিজ একটু আশ্বস্ত করুন। স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগল বলল।
আমার কোন পরিকল্পনা নেই স্যার। আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসা করে আমি ভেতরে প্রবেশ করব। প্রতিটি সুযোগের যথাযথ ও সময়োচিত সদ্ব্যবহার করব। সন্দেহ নেই অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ভালোকাজ করার জন্যে আমি যাচ্ছি। আল্লাহর নির্দেশ এটা। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন। বলল আহমদ মুসা।
ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। আপনার অনেক কাহিনী আমি শুনেছি। আজ দেখছি। আপনার জীবনের সাফল্যের শক্তিকেও আজ আমি প্রত্যক্ষ করলাম। স্বার্থ নয়, স্রষ্টার জন্যে যারা কাজ করেন মৃত্যুভয়সহ কোন কিছু হারাবার ভয় তাদের থাকে না। তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
সব কিছুর পিছুটানমুক্ত কেউ যদি হয়, তাহলে সে সব কিছু করতে পারে। পারবেন আহমদ মুসা, আপনিই পারবেন। গড ব্লেস ইউ। স্বরাষ্ট সচিব মসিয়ে দ্যাগল বলল।
মুহূর্তকাল থেমেই আবার বলল, মি. আহমদ মুসা। আপনি যা চেয়েছেন তা পাবেন এবং যা করতে বলেছেন তা আমি সবই করব।
ধন্যবাদ স্যার, অনেক ধন্যবাদ। বলল আহমদ মুসা।
ওয়েলকাম মাই ফেবারিট ইয়ংম্যান। আমি টেলিফোন করে দিচ্ছি আমাদের নৌ-ঘাটিতে। ফরমাল মেসেজও পাঠাচ্ছি। আজ বা কাল যে কোন সময় সেখানে জয়েন করতে হবে। অন্তত ১২ ঘন্টা সময় সেখানে এক্সারসাইজের জন্যে আপনাকে দিতে হবে।
ওকে স্যার। বলল আহমদ মুসা।
তাহলে কথা আপতত এখানেই শেষ। প্রয়োজন হলে যে কোন সময় আমাকে টেলিফোন করতে পারেন। আমার প্রাইভেট নাম্বার তো আপনার কাছে আছেই। এ সব কথা বলতে বলতেই উঠে দাঁড়াল স্বরাষ্ট মি. সচিব দ্যাগল।
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল।
হ্যান্ড শেক করে আহমদ মুসা বেরিয়ে এল। মি. দ্যাগলও অন্য ঘরের দিকে চলে গেল।
স্বরাষ্ট সচিবের কক্ষ থেকে আহমদ মুসা বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই মি. দ্যাগলের পিএস বলল, স্যার, গাড়ি ডাকব?
না, আমি ট্যাক্সি নিয়ে এসেছিলাম, ছেড়ে দিয়েছি। তবে চিন্তা নেই, আমি আর একটা ট্যাক্সি ডেকে নেব।
স্যার বলেছেন আপনার সাথে গাড়ি না থাকলে আমাদের গাড়ি দিয়ে আপনাকে পৌছে দিতে। বিনীতভাবে মি. দ্যাগলের পিএস বলল।
না, ধন্যবাদ। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা গাড়ি বারান্দার সামনে আসতেই সেখানে অপেক্ষমাণ এক শিখ ড্রাইভার আহমদ মুসাকে সালাম করল। তারপর শিখ ড্রাইভারদের মতই হিন্দি মেশানো তাহিতি ল্যাংগুয়েজে বলল, সাব কি যাবেন? আমার গাড়ি আছে।
বিস্ময় দৃষ্টিতে সালাম দেয়া দেখে আহমদ মুসা তার দিকে তাকিয়েছিল। তবে সে তাকে চিনতে পারলো। শিখ ড্রাইভার যখন কথা বলল, তখন তার দাঁত, মুখ, চোখ দেখে বুঝল, শিখ ড্রাইভারের ছদ্মবেশ সঠিকভাবে হয়নি।
খুশি হলো আহমদ মুসা। ক’দিন আন্ডারগ্রাউন্ড থাকার পর শিখ ড্রাইভারের ছদ্মবেশে তেপাও বের হয়েছে। ভাল। তার উপার্জনও দরকার। কিন্তূ সে তাহিতির স্বরাষ্ট বিভাগের গাড়ি বারান্দায় কেন? আমাকে দেখে সে যে পরিমান বিস্মিত হয়েছে, তাতেই প্রমানিত হয় সে আমাকে এখানে আশা করেনি। তা হলে সে এসেছে কেন?
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে স্বরাষ্ট সচিব দ্যাগলের পিএস-এর দিকে ফিরে বলল, ধন্যবাদ, আমি গাড়ি পেয়েছি। আমি এর গাড়িতেই যাব।
ইয়েস স্যার। আমি স্বরাষ্ট সচিবকে বলল। বলল সচিবের পিএস।
স্যার, আপনি একটু দাঁড়ান। আমি কার পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে আসছি। বলল তেপাও আহমদ মুসাকে।
বলেই সে ছুটল কার পার্কের দিকে।
গাড়ি নিয়ে এল তেপাও। কিন্তূ তার সেই ট্যাক্সি নয়। ভিন্ন নাম্বার ও অপেক্ষাকৃত নতুন ট্যাক্সি।
গাড়িতে উঠে বসল আহমদ মুসা। গাড়ি চলতে শুরু করল।
তেপাও, তুমি কি গাড়ি পাল্টেছ? বলল আহমদ মুসা।
মারেভা ম্যাডাম বলল, আমার গাড়ির নাম্বার ওরা পেয়ে থাকতে পারে। সুতরাং গাড়ি বের করতে চাইলে নতুন গাড়ি বের করতে হবে। তাই আমি গাড়ি পাল্টিয়েছি। ছদ্মবেশও নিয়েছি শত্রুদের থেকে নিজকে আড়াল করার জন্যে। তেপাও বলল।
তুমি এখানে এসেছিলে কেন? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
স্বরাষ্ট সচিব মি. দ্যাগলের সাথে দেখা করার জন্যে।
আহমদ মুসার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল! বলল, স্বরাষ্ট সচিবের সাথে দেখা! কেন?
আপনার বিষয়ে খোঁজ খবর নেবার জন্যে। কোথাও খোঁজ না পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম। সেইজন্যেই আমাকে স্বরাষ্ট সচিবের সাথে দেখা করার জন্যে পাঠানো হয়েছে। আমাদের ধারণা তিনি নিশ্চয় আপনার খবর বলতে পারবেন। বলল তেপাও।
স্বরাষ্ট সচিব যদি দেখা না করতেন? আহমদ মুসা বলল।
অবশ্যই দেখা করতেন। আমি আপনার বিষয়ে জানার আছে, এ কথা বলে দেখা করতে চাইতাম। বলতাম, অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন, তাই আপনার সাথে দেখা করা দরকার। বলল তেপাও।
সত্যিই কি কোন জরুরি প্রয়োজন তেপাও? আহমদ মুসা বলল।
সত্যিই জরুরি প্রয়োজন আমরা মনে করি। প্রয়োজনটা হলো আপনাকে কিছু খবর জানানো। অবশ্য আমরা জানি না, খবরগুলো আপনার কাছে জরুরি কিনা। বলল তেপাও।
কি খবর তেপাও, তাড়াতাড়ি বল। আহমদ মুসা বলল।
স্যার আজ সকালে আমি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ছিলাম আমার এই নতুন ট্যাক্সি নিয়ে এবং এই ছদ্মবেশে। দু’জন লোক এল স্ট্যান্ডে। তারা একে, ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিল এবং গাড়ির নাম্বারও দেখছিল। আমার গাড়িটা ছিল এক প্রান্তে। অবশেষে তারা আমার কাছে এল এবং বলল, আমি তেপাও নামে কোন ড্রাইভারকে চিনি কিনা। আমি বলাম এ নামে কোন ড্রাইভারকে আমি চিনি না। তার অন্য কোন নামও থাকতে পারে। পরে তারা বলল, আমি হোটেল লা ডায়মন্ড ড্রপ-এ যাব কিনা। আমি যেতে চাইলে তারা আমার গাড়িতে উঠল। চলার পথে তারা যে গল্প করছিল এবং টেলিফোনে তাদের যে কথা হয়েছিল, সেটাই আপনাকে আমার জানাবার বিষয়। বলল তেপাও।
কি কথা শুনেছ তাদের? নিশ্চয় আমার কাজে লাগবে। বলল আহমদ মুসা।
তারা বলছিল, আহমদ মুসা, মাহিন, মারেভারা গেল কোথায়? এ সব বিষয় নিয়েই তারা কথা বলছিল। একজন বলছিল, হোটেল, নিজেদের বাড়ি, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি কোথাও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় যেতে পারে তারা? আমরা তেপাওকেও খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে পেলেও ওদের সন্ধান লাভ সহজ হতো।
অন্যজন বলল, আমরা তাদের সন্ধান করতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। এই চেষ্টায় তাদের পাওয়া যাবে না। ওরাও এটা বুঝেছে। এবার অন্য ব্যবস্থা হচ্ছে।
কি ব্যবস্থা? বলল প্রথম জন।
আমি সব জানি না। তবে শুনলাম, তাহিতি ও মুরিয়া দ্বীপের প্রতি ইঞ্চি জায়গা খুঁজে হলেও ওদের বের করবে তারা। এজন্যে তাহিতি ও মুরিয়ার বাইরে থেকে, এমনকি হেড কোয়ার্টার ‘মতু’ থেকেও তাদের দরকারী সব লোককে তাহিতি ও মুরিয়াতে আনা হচ্ছে। আমি শুনেছি, তাহিতিতেই আহমদ মুসাকে তারা ধ্বংস করবে। বলল দ্বিতীয় লোক।
দ্বিতীয় লোকের কথা চলাকালেই একটা কল আসলো তার মোবাইলে। সে তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে মোবাইল ধরল। বলল, ইয়েস স্যার, আমি সনি।
অপর পক্ষের কোন কথা শুনা গেল না। এপারের দ্বিতীয় লোকটি শুধু বলে চলল, জি স্যার, ওকে স্যার, ঠিক সিদ্ধান্ত, আমরা প্রস্তুত, মুহূর্তের জন্যেও আমরা কাজ বন্ধ রাখিনি স্যার। কথা শেষ করে ফোন রাখল দ্বিতীয় লোকটি।
কে টেলিফোন করেছিল সান? প্রথম লোকটি বলল।
কে আবার জারা, বস জিজরের দক্ষিন হস্ত।
কি বলল? জিজ্ঞাসা প্রথম লোকটির।
অনেক কথা। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
কি কথা? প্রথম লোকটি আবার বলল।
আমি যা বলছি সেটাই। বাইরে থেকে সব লোককে তাহিতি মুরিয়াতে আনা হচ্ছে। এমনকি আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ার মতু থেকেও এখানকার জন্যে দরকারী সব লোককে তাহিতিতে আনা আছে। আজ থেকে লোক আসা শুরু হয়েছে। কালকের মধ্যে সব এসে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ারের ‘লর্ড’ মানে বসের যে তিনজন সিকিউরিটিপ্রধান রয়েছে তার মধ্যে প্রধান দু’জন চীপ অব অপারেশন জিজর ও গোয়েন্দাপ্রধান ডারথ ভাদের এখানকার অপারেশন পরিচালনার জন্যে গতকালই তাহিতি এসেছেন। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
তাহিতিকে তাহলে কি যুদ্ধক্ষেত্র বানাবে? বলল প্রথম লোকটি।
না, না। লোকটি বলল সবকাজ অত্যন্ত সংগোপনে হবে। গোটা তাহিতি ও মুরিয়া দ্বীপে নিশ্ছিদ্র চিরুনী অভিযান চলবে গোপনে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অলক্ষ্যে। এই অভিযান চলবে তাহিতি ও মুরিয়া দ্বীপে একই সংগে। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
বিশাল পদক্ষেপ। কিন্তূ আহমদ মুসাকে, যে তার জন্যে এই আয়োজন? বলল প্রথম লোকটি।
কি বলছ তুমি। টাকার অংকে ওকে পরিমাপ করা যাবেনা। ওর লাশের মুল্যই নাকি উঠেছে বিলিয়ন ডলার! বলল দ্বিতীয় লোকটি।
অসম্ভব ব্যাপার! বলছেন কি আপনি! প্রথম লোকটি বলল।
কিন্তূ তাহিতি ও মুরিয়াতে এত কিছু হবে কিন্তূ এখানকার পুলিশ বা গোয়েন্দারা টের পাবে না? বলল প্রথম লোকটি।
হাসল প্রথম লোকটি। বলল, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কি টাকার অভাব! কত টাকা লাগে মাট পর্যায়ের পেটি অফিসারদের কিনতে? নিশ্চিত থাকুন সে কেনা হয়ে গেছে। পুলিশও এই সাথে আমাদের সহযোগিতা করবে। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
তাহলে আর কোন চিন্তা নেই। কিন্তূ একটা বিষয়ে আশংকা হয়, বিপদ তো একটা এসেই গেছে। ঈশ্বর না করুক। আহমদ মুসা যদি ধরা না পড়ে, তাহলে আমাদের কোন বিপদ হবে না তো? আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ার কতটা সুরক্ষিত? আমাদের ভবিষ্যৎ কিন্তূ এই সাফল্যের উপর নির্ভর করছে। বলল প্রথম লোকটি।
নিশ্চিত থাক। আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ার দুনিয়ায় নয়, পাতালে। আমরা ছাড়া যেতে পারে একমাত্র দৈত্য, আর কেউ নয়। বলল দ্বিতীয় লোকটি।
কিন্তূ আমরা যেতে পারলে অন্যেরা যেতে পারবে না কেন? কথায় আছে, এক মানুষ যা পারে অন্য মানুষও তা পারবে। প্রথম লোকটি বলল।
এ তত্ত্ব সব ক্ষেত্রে খাটে না। আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ারের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি খাটে না। প্রথমে পাতালে নামার পথ পাওয়ার বিষয়টি একটা অসম্ভব ব্যাপার। তার পরের ধাপে নামার ব্যাপারটা আরও কঠিন, সেখানে ধাঁধা আছে। ইলেকট্রনিক নানা ধাঁধা আছে। দু’দিকের দেয়াল ফুঁড়ে স্বয়ংক্রিয় গুলি অনুপ্রবেশকারীকে পদে পদে ঝাঁঝরা করে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। কেউ রাস্তা পেরিয়ে প্রাসাদের দরজায় পা রাখতে পারলেও দরজা খুলতে পারবেনা। ডিজিটাল লকের কোড ভাঙা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আর ভেতরে তো আরেক গোলক ধাঁধা। চারটি ফ্লোরের এলিভেটর প্রতিটি করিডোরে দ্বিমুখীভাবে চলে। কোনটা কোন দিকে চলছে কেউ জানে না?
শুনেছি, আমাদের সব গোপন কোড, আমাদের সব কিছু শুধু একজনই জানে। যে আমাদের সব কিছু জানে, তাকে এই পরিস্থিতিতে মতু থেকে সরানো দরকার নয় কি?
হাসল দ্বিতীয় লোকটি। বলল, তাকে পাওয়া অত সোজা নয়। সে আমাদের চার তলায় থাকে বটে, কিন্তূ কোথায় থাকে কেউ জানেনা এবং সে এক কক্ষেও সব সময় থাকে না। তার ব্যপারে জানতে পারে শুধু ম্যাডাম গৌরী। তাও কতটা জানে জানি না।
এত কিছু তুমি জান কি করে? ভেতরের তো কিছুই আমরা জানি না। বলল প্রথম লোকটি।
আমি বাইরের অপারেশনের দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র কিছু দিন হলো। তার আগে আমি ডিজাইনার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে ভেতরের সব কাজের সাথেই যুক্ত ছিলাম। কক্ষ বিন্যাস, ইলেক্ট্রিক ও এলিভেটর নেটওয়ার্কিং সব কিছুর সাথেই আমি ছিলাম।
কাজটা ছিল খুব জটিল। এটি তৈরি করা প্রাসাদ নয়। প্রাকৃতিক নিয়মে বা আগের মানুষের আগের চিন্তায় তৈরি করা প্রাসাদ। লিমিটেড এ্যাকোমোডেশন। এখানে নতুনভাবে কোন কিছু সংযোজন করা সহজ নয়। ইলেকট্রিক ওয়ারিং কোন কোন জায়গায় ড্রিল করে কোনভাবে করা হয়েছে। আর চারটি মুভিং ওলিভেটর তৈরিতে কিছু ভাংচুর করতে হয়েছে, কিন্তূ অসুবিধা হয়নি। এ্যাকোমোডেশনও ঠিক মত হয়েছে। তৃতীয় ও দ্বিতীয় তলায় রোবটদের জন্যে সারিবদ্ধ ক্যাপসুল গড়া হয়েছে। দুই ফ্লোরে ওদের এ্যাকোমোডেশন ও অন্য সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। নিচের তলায় তো কিছুই নেই। ওটা একটা টেস্টগ্রাউন্ড ও ল্যাবরেটরি। সব কাজেই আমি ছিলাম।
তা হলে তো তুমি অনেক বেতন পেতে? প্রথম লোকটি বলল।
বেতন আর কি। কাজটা হয়ে গেলেই হয়। আমরা সফল তো আমরাই দুনিয়ার বাদশাহ হবো। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
কেন? পাশেই তো আছে আমেরিকা, ওরা বসে থাকবে? বলল প্রথম লোকটি।
আমাদেরকে তারা তাদের লোকজনই ভাববে। মনে করবে আমরা তাদের কাজই করছি। কিন্তূ শত্রু বলে বুঝবে, তখন আর তাদের করার কিছু থাকবে না বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত সারেন্ডার করা ছাড়া। দ্বিতীয় লোক বলল।
হোটেল ‘লা ডাইমন্ড ড্রপ’ এর গেটে পৌছতেই ওদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নামার সময় ওদের একজন বলল, আহমদ মুসার রুম তো বন্ধ। ঘরের চাবি না পেলে তো আমাদের চলবে না। ঘর থেকে ওর পোষাক কিংবা ব্যবহার্য কিছু চাই। আমাদের কুকুর বাহিনীর জন্যে এটা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন টার্গেটেড হিউম্যান স্পেল ডিটেক্টর ( THSD) –এর জন্যে। মানুষের চোখ যেখানে যাবে না। সেখানেও কুকুর ও স্পেল ডিটেক্টরের চোখ যাবে। রক্ষা নেই আহমদ মুসার। দ্বিতীয় লোকটি বলল।
চিন্তা নেই ‘কী বোর্ড’ থেকে চুরি করব আমরা চাবিটি। আর তা পেতেই হবে, এটা আমাদের দাবী।
দু’জনেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তারা চলে গেল হোটেলের ভেতরে।
আমি তখন কোথায় আপনাকে পাব এই সন্ধানে ছুটলাম। শহরের সম্ভাব্য সব জায়গা খুঁজে তারপর গেলাম ম্যাডাম মারেভার ওখানে। উনি থাকছেন তার এক বান্ধবীর বাসায়। তিনি আমাকে বললেন, স্যার মাঝে মাঝে মি. দ্যাগলের কাছে যান। আর এই মুহূর্তে স্যার মি, দ্যাগলের সাথে যোগাযোগ রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। তুমি গিয়ে মি, দ্যাগলকে একটা জরুরি মেসেজ পৌছানোর চেষ্টা কর। মি, দ্যাগলের সাক্ষাৎ পেলে বলবে, আপনি দয়া করে স্যারের কাছে এই খবরগুলো পৌছানোর ব্যবস্থা করুন। উনি নিশ্চয় ব্যবস্থা করবেন। কিন্তূ মি, দ্যাগলের সাথে আর দেখা করতে হলো না। আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনাকেই পেয়ে গেলাম। সব কথা আপনাকেই বলতে পারলাম। খুব হালকা লাগছে এখন আমার।
আহমদ মুসা পিঠ চাপড়ালো তেপাও-এর। বলল, তেপাও, আমার ভাই, তুমি যে ইনফরমেশন আমাকে দিয়েছ, তার চেয়ে বড় ইনফরমেশন আমি তাহিতিতে এসে পাইনি। তোমাকে ধন্যবাদ! অনেক ধন্যবাদ।
আমি কিছু বুঝিনি স্যার। এটুকু বুঝেছিলাম এ কথাগুলো স্যারের উপকারে লাগবে। বলল তেপাও।
তুমি এত মূল্যবান কথা আমাকে বলেছ যা আমার সামনে এগোবার গাইড লাইন। আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বলল, তেপাও, গাড়ি ঘুরাও। স্বরাষ্ট্র সচিব মি. দ্যাগলের কাছে আবার ফিরে চল।
গাড়ি ঘুরাল তেপাও।
আহমদ মুসা কল করল স্বরাষ্ট্র সচিব মি. দ্যাগলকে। মি. দ্যাগল আহমদ মুসার গলা টেলিফোনে পেয়েই বলল, কোন খারাপ খবর নয় তো আহমদ মুসা?
না স্যার। একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আমি আসছি। আপনার অসুবিধা নেই তো স্যার? বলল আহমদ মুসা।
অবশ্যই না। এস। আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। স্বরাষ্ট্র সচিব মসিয়ে দ্যাগল বলল।
গাড়ি পৌছল মসিয়ে দ্যাগলের অফিসে।
মসিয়ে দ্যাগল বেরিয়ে এসেছে বারান্দায়।
আহমদ মুসা বারান্দায় উঠে এলে তারা ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে মি. মশিয়ে দ্যাগল বলল, কি ব্যাপার মি. আহমদ মুসা, জরুরি কিছু?
অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটেছে স্যার। বলল আহমদ মুসা।
কি সেটা? স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল বলল।
স্যার, আগামি সন্ধাতেই আমি ওদের হেড কোয়ার্টার অ্যাটলে ঢুকতে চাই।
কেন, এত তাড়াতাড়ি কেন? বলল স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল।
আমাদের তেপাও নিশ্চিত খবর জেনেছে, আমাকেসহ মারেভা ও মাহিনের সন্ধানের জন্য ওরা আগামী পরশু থেকে তাহিতি ও মুরিয়া দ্বীপে চিরুণী অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। অভিযান চলবে নিশ্চয় কয়েক দিন। তাদের এই চিরুণী অভিযানের বেল্ট পলিনেশীয়ার বাইরে থেকে। পলিনেশীয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি হেড কোয়ার্টারের দরকারী সব জনশক্তিকে তাহিতিতে আনা হবে। খোদ ওদের চীফ অপারেশন কমান্ডার জিজর ও ওদের গোয়েন্দাপ্রধান ডারথ ভাদের তাহিতিতে আসছে। আমি মনে করি এটা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ। কালকেই ওরা সদলবলে আসছে তাহিতি। আমি পরশু দিন রাতে ওদের হেড কোয়ার্টার অ্যাটলে ঢুকতেচাই স্যার। আমি এর মধ্যেই সব প্রস্তুতি সেরে ফেলতে চাই স্যার। বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে উত্তর দিল না স্বরাষ্ট্র সচিব মশিয়ে দ্যাগল। বলল, হ্যাঁ, মি. আহমদ মুসা, তোমার কৌশলটা ঠিক। তারা যখন তাদের হেড কোয়ার্টার অ্যাটল থেকে এখানে তাদের দরকারি লোকগুলো নিয়ে আসবে তখন তাদের হেড কোয়ার্টার প্রতিরক্ষা অবশ্যই দুর্বল হবে। এই সুযোগই আপনি নিতে যাচ্ছেন। চমৎকার সিদ্ধান্ত! চলুন, আমি আপনাকে নেভাল বেজে নিয়া যাব। ওখানে আপনাকে আন্ডারওয়াটার টিউব ভেহিকেল পরিচালনায় ট্রেনিং নিতে হবে। রাডার রেসিট্যান্ট পোষাক, ইলেক্ট্রনিক জ্যামিং মেশিন ও সাইলেন্সার লাগানো মিনি মেশিন রিভলবার ওখানেই পেয়ে যাবেন। আমি মনে করি, সেখানকার আমাদের নেভাল রেস্ট হাউজে কাল সন্ধ্যায় আপনি থাকবেন।
ধন্যবাদ স্যার। মারেভা, মাহিন ও তেপাও-এর নিরাপত্তাও দরকার। চিরুণী অভিজানের সময় তারা ধরা পড়ে যেতে পারে। আহমদ মুসা বলল।
আপনার চিন্তা নেই। ওদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি আগেই চিন্তা করেছি। বলল মশিয়ে দ্যাগল।
ধন্যবাদ স্যার। আহমদ মুসা বলল।
আসুন! বলে হাঁটতে লাগল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান মশিয়ে দ্যাগল।
তার সাথে হাঁটতে লাগল আহমদ মুসাও।
গাড়িতে আহমদ মুসাকে বসিয়ে গাড়ি ঘুরে নিজের সিটের পাশে যেতেই একজন গোয়েন্দা অফিসার এসে বলল, স্যার, বিভিন্ন ছদ্মবেশে একাধিক লোক আমাদের এই গেটের উপর নজর রেখেছে। আমরা এগোলেই তারা সরে যাচ্ছে, অন্য লোক আসছে তার জায়গায় অন্য ছদ্মবেশে।
ধন্যবাদ, বুঝেছি ব্যাপারটা।
বলে মশিয়ে দ্যাগল গাড়িতে উঠে বসল।
বলেই বলল, আশ্চর্য হচ্ছি মি. আহমদ মুসা! ওরা আমার গেটের উপরও চোখ রাখছে! আপনি এসেছেন নিশ্চয় ওরা তা জানতে পেরেছে।
তবে আমার এখান থেকে যাওয়া ও আসাটাকে তারা ফলো করতে পারেনি। আমার ধারনা, আজ থেকেই ওরা এখানে পাহারা বসিয়েছে। ওদের এটা জানার কথা নয় যে, আমি এখানে এসেছি এবং এসে থাকি। তবে তারা যে বিবেচনাতেই এসে থাকুক, তারা সফল।
মশিয়ে দ্যাগলের গাড়ি স্টার্ট নিল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
এই গেটের উপর চোখ রাখার তখন কেউ ছিল না।
আমাদের ফলো করা আমাদের জন্য ভাল হতো না।
স্বরাষ্ট্র সচিবালয় থেকে নৌঘাঁটি অনেকখানি পথ। পাপেতির সার্কুলারে রোডের যেখানে অ্যাভেনিউ ডু প্রিন্স হিন্দি এসে মিশেছে, সেখানেই স্বরাষ্ট্র সচিবালয় অবস্থিত। অ্যাভেনিউ ডু প্রিন্স হিন্দি সোজা পূর্ব দিকে প্রায় ১০ মাইল এগিয়ে মোয়েভা নদী অতিক্রম করে পূর্ব-দক্ষিন দিকে এগিয়েছে। মোয়েভা নদীর ঐ সংযোগ স্থল থেকে একটা পাথুরে প্রশস্ত রাস্তা মোয়েভা নদীর সমান্তরালে কোস্টাল লেগুনের প্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। এটা প্রধান নেভাল ঘাঁটি নয়, এটা নেভাল ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং কেন্দ্র। এই নেভাল ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং কেন্দ্রেই আন্ডারওয়াটার ক্যাপসুল ভেহিকেলের ওপর আহমদ মুসার ট্রেনিং হবে।
স্বরাষ্ট্র সচিবালয় থেকে অ্যাভেনিউ ডু প্রিন্স হিন্দি রোড ধরে কিছুটা এগোলেই পাপেতির বিখ্যাত পোরতু নদী। পোরতু নদীর ব্রীজে ওঠার সময় পাশ দিয়ে ফিরছিল গভর্নর সচিবালয়ের সেক্রেটারি হোয়ানু। সে গলা চড়িয়ে বলল, স্যার ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন, কখন ফিরবেন?
আমি মোয়েভা ডকে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি ফিরব। স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলকেও কথা অনেকটা গলা চড়িয়েই বলতে হলো। পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির দিকেই তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসা। একটা জীপও দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ির পাশে। আহমদ মুসাদের পরে জীপটি এসে দাঁড়ায়। জীপে চারজন আরহী।
নিবিষ্টভাবে ওদের দিকে তাকাতে গিয়ে হঠাৎ সে দেখল, তারা যেন গোগ্রাসে স্বরাষ্ট্র সচিব মি. দ্যাগলের কথা শুনছে! দ্যাগল তখন গলা চড়িয়ে মোয়েভা নেভাল ডকে যাওয়ার কথা বলছিল। গাড়ির অন্য সবারই মনোযোগ তখন ঐ গাড়ির দিকে।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। কিন্তু ভাবনার আর সময় হলো না, সবুজ সিগন্যালের সাথে সাথেই জীপটি হাওয়ার মতো ছুটল সামনে।
স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল তখনও কথা বলছিল গভর্নর সচিবালয়ের সচিব হোয়ানুর সাথে।
কথা শেষ হলে স্টার্ট নিল স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলের গাড়ি।
অ্যাভেনিউ ডু প্রিন্স হিন্দি সড়কটি তীরের মত সোজা পুব দিকে এগিয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলের সাথে টুকটাক কথা চলছে, কিন্তু আহমদ মুসার মনোযোগ বার বার ছেদ পড়ছিল। ঐ জীপটি ভুলতে পারছিল না আহমদ মুসা। ওরা মি. দ্যাগলের মোয়েভা নেভাল ডকে যাওয়ার কথা উদগ্রীব হয়ে শুনছিল কেন? আর ওদের সবার মনোযোগ তাদের প্রতি ছিল কেন? ওদের মধ্যে একজন ছাড়া কাউকেই তাহিতির লোক বলে মনে হয়নি। তাহলে কি ওরা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের লোক? মি. দ্যাগলের অফিস গেটের উপর তো তারাই চোখ রাখছিল। সন্দেহ নেই ওরাই আবার তাদের ফলো করছে। আহমদ মুসাকেও তারা চিনতে পেরেছে নিশ্চয়। তাহলে ওদের ছেড়ে ওরা চলে গেল কেন?
নানা কথা ও নানা চিন্তার মধ্যে দিয়ে গন্তব্যের শেষ প্রান্তে মোয়েভা নদীর কাছে তারা চলে গেল। মোয়েভা নদীতে ব্রীজ আছে। অ্যাভেনিউ ডু প্রিন্স হিন্দি সড়কটি মোয়েভা ব্রীজ হয়ে আরও পূর্ব-দক্ষিণে চলে গেছে।
ব্রীজ পাওয়ার একটু আগে একটা টিলার ধার ঘেঁষে প্রশস্ত পাথুরে রাস্তা চলে গেছে মোয়েভা নেভাল ডক ইয়ার্ড পর্যন্ত। রাস্তার শুরুটা প্রশস্ত হলেও পরবর্তী অংশ এক রকম নয়। কোথায় সংকীর্ণ, কোথাও প্রশস্ত। দু’এক জায়গায় পাহাড়ের মত উঁচু টিলার সারির বুক চিরে অতিক্রম করেছে সড়কটি। সেখানে সংকীর্ণ। দু’টো গাড়িও পাশাপাশি চলতে পারে না।
ব্রীজের গোড়ায় ছোট্ট একটা পুলিশ ফাঁড়ি।
পর্যায়ক্রমে দু’জন করে পুলিশ পাহারায় থাকে।
হঠাৎ আহমেদ মুসা দ্যাগলকে বলল, স্যার, এখানে গাড়িটা একটু দাঁড় করালে ভাল হয়। পুলিশের সাথে একটু কথা বলতে চাই।
গাড়ি নেভাল ডকের দিকে মোড় না নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি।
গাড়ি দাঁড়াতেই দু’জন পুলিশ ছুটে এল। স্বরাষ্ট্র সচিবকে দেখে চোখ তাদের ছানাবড়া হয়ে গেল। লম্বা স্যালুট করল তারা।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল। পুলিশ দু’জনকে কাছে ডেকে বলল আহমদ মুসা, তোমরা গত দশ মিনিটের মধ্যে কোন জীপ বা গাড়িকে মোয়েভা নেভাল ডক ইয়ার্ডের এই সড়ক ধরে যেতে দেখেছ?
দু’জন একটু ভাবল। একজন বলল, ইয়েস স্যার, সাত আট মিনিট আগে একটা জীপ নেভাল ডক ইয়ার্ডের দিকে গেছে।
পুলিশের উদ্দ্যেশ্যে ‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা স্বরাষ্ট্র সচিবকে বলল, স্যার আপনার গাড়িতে বিস্ফোরক ডিটেক্টর আছে?
না, মি. আহমদ মুসা গাড়িতে আলাদা কোন বিস্ফোরক ডিটেক্টর নেই। গাড়ির ইঞ্জিন কেবিনে ডিটেক্টর ফিট করা আছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সব ধরনের বিস্ফোরককে ডিটেক্ট করতে পারে।
ঠিক আছে স্যার। কত দূর থেকে পারে? আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
কমপক্ষে দশ গজ। বলল স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল।
গুড। তাহলে এদিকে আর কোন চিন্তা নেই স্যার। আহমদ মুসা বলল।
মি. আহমদ মুসা, এসব নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? আপনি সামনের পথটুকুতে কিছু আশংকা করছেন? জিজ্ঞাসা দ্যাগলের।
হ্যাঁ স্যার, আমাদের এখানে দশ মিনিট আগে যে জীপটা এই পথে নেভাল ইয়ার্ডের দিকে গেছে, সে জীপ্টাকে আমি সন্দেহ করছি। বলল আহমদ মুসা।
এরা কারা বলে মনে করছেন? দ্যাগল বলল।
আমি মনে করছি ওরা ব্লাক সান সিন্ডিকেটের লোক। বলল আহমদ মুসা।
ওরা দেখছি একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে! আমাদের ডক ইয়ার্ডকেও সাবধান করতে হবে। নাশকতামূলক কিছু ঘটাতে পারে ওরা। দ্যাগল বলল।
সাবধান থাকা ভাল স্যার। বলল আহমদ মুসা।
স্বরাষ্ট্র সচিবের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। চলছে গাড়ি মাঝারি গতিতে।
আহমদ মুসার মনে একটা অস্বস্তি। তেমন কিছু তো ঘটেনি! পাশে ব্যাগের দিকে তাকিয়ে ভাবল ব্যাগও তো এনেছে! অ্যাটল দ্বীপে তার অভিজান শুরু হবে এই নেভাল ইয়ার্ড থেকেই। মি. দ্যাগল তাকে এই কথায় বলেছে। ব্যাগ কাছে টেনে নিল আহমদ মুসা। একবার চেক করা দরকার সব উঠেছে কিনা। ব্যাগের প্রধান কেবিনে যা তুলেছিল সবই পেল। হঠাৎ তার খেয়াল হলো লেজারগান ও লেজার কাটার কোথায়? আজ সকালেই তো ব্যাগে তুলেছি! ব্যাগের অন্যান্য কেবিন খুঁজতে গিয়ে ব্যাগের বাইরের কেবিনে পেয়ে গেল অস্ত্র দু’টি। মনে পড়ল আহমদ মুসার, তার একটি অভ্যাস হলো অস্ত্র যত গুরুত্বপূর্ণ হয়, ততই সহজ ও নাগালের মধ্যে রাখে সে ঐ অস্ত্র।
বেশ জোরেই চলছিল গাড়ি। রাস্তার এই অংশটা সমতল। এর পরেই পাহাড়ের ছোট বড় টিলা। নেভাল ডকের সমতল পর্যন্ত নেমে গেছে।
গাড়ীটা কি সত্যিই ওদের ছিল মি. আহমদ মুসা? বলল স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল।
আমি তাই মনে করি স্যার? আহমদ মুসা বলল।
ওরা কি বোমা বা এ ধরনের কিছু বিস্ফোরক পাতবে বলে মনে করেন? বলল দ্যাগল।
স্যার, এটা আমার ধারণা। আহমদ মুসা বলল।
বোমা বা বিস্ফোরক পাতার উপযোগী স্থানগুলো আমরা পেরিয়ে এসেছি। বলল দ্যাগল।
আল হামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাদেরকে নিরাপদে পৌছাতে সাহায্য করুন। আহমদ মুসা বলল।
টিলাসংকুল পথে প্রবেশ করেছে গাড়ি।
রাস্তা আঁকাবাঁকা ও সংকীর্ণ।
দু’পাশে টিলা। সামনে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু একটা টিলা। টিলাকে পাশ কাটাবার জন্যে রাস্তা এখানে বাঁক নিয়েছে।
বাঁক নিতে গিয়ে গাড়ি ডেডস্টপ-এর মত হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল।
হঠাৎ এভাবে গাড়ি দাঁড়িয়ে যাওয়ায় সবাই ঝাঁকি খেল। ড্রাইভার পুলিশটি বলল, স্যার, গাড়ির স্টার্টার, চাবি, স্টিয়ারিং কিছুই নড়ছে না।
ড্রাইভার গাড়ির ইঞ্জিন দেখার জন্যে দরজা খুলতে গিয়ে পারল না। সে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, স্যার, গাড়ির দরজা আনলক হচ্ছে না।
আহমদ মুসাও দ্রুত তার পাশের দরজা খুলতে গেল, কিন্তু পারল না।
দ্রুত আহমদ মুসা ফিরল দ্যাগলের দিকে। বলল, স্যার, গোটা গাড়ি জ্যাম হয়ে গেছে। মেটাল জ্যামিং মেশিনের ম্যাগনেটিক স্প্রে আমাদের গোটা অচল করে দিয়েছে।
এটা কি সম্ভব? এমন অস্ত্রের কথা তো শুনিনি। বলল দ্যাগল।
মেটাল জ্যামিং ডিভাইস ওদের আছে স্যার। আহমদ মুসা বলল।
সাংঘাতিক! এখন করণীয়? বলল দ্যাগল। তার কন্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু বলার সুযোগ হলো না। প্রবল গুলিবৃষ্টি শুরু হলো গাড়ির উপর চারদিক থেকে।
পেছনের চারজন পুলিশ, তাদের রাইফেল, ড্রাইভার পুলিশ ও মি. দ্যাগল রিভালবার হাতে নিল।
আমাদের রাইফেল ও রিভলবার কোন কাজ দেবে না স্যার। ওগুলোও জ্যাম হয়ে গেছে। প্লিজ, আপনারা সিটের নিচে শুয়ে পড়ুন। দ্রুত কন্ঠে চিৎকার করে বলল আহমদ মুসা।
তবু দ্যাগল তার রিভলবার একবার পরীক্ষা করল। দেখল ট্রিগারকে সূঁচ পরিমাণ নড়ানো গেল না। চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেল তার অবাক বিস্ময়ে!
সেও সিটের নিচে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসা গাড়ির ফ্লোরে শুয়ে ব্যাগের বাইরের পকেট থেকে লেজারগান বের করল।
লেজারগানের বডি সর্বাধুনিক প্লাস্টিক মেটাল দিয়ে তৈরি। এই প্লাস্টিক মেটাল ইস্পাতের চেয়ে কয়েক গুণ শক্ত। ইস্পাতের অণুগুলোর মধ্যে ফাঁক থাকে, কিন্তু এই প্লাস্টিকের অণুগুলোর মধ্যে কোন ফাঁক থাকে না। মনে করা হয়, এই প্লাস্টিকের ব্যবহার দিয়ে ‘এ্যান্টিম্যাটার এজ’-এর শুরে হচ্ছে।
লেজারগানটি হাতে নিয়ে আহমদ মুসা মাথা তোলার চেষ্টা করল।
দেখল গাড়ির জানালায় কাচের কোন অস্তিত্ব নেই। গাড়ির বডিও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তবে ডাবল লেয়ারের স্টিল বডির জীপ বলে বুলেটের ঝাঁক ভেতরে লিচের অংশের খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি।
চারদিকের চারটা উৎস থেকে গুলি আসছে, এ সম্পর্কে আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়েছিল। তার মানে ঐ জীপের চারজন লোকই মাত্র এখানে আছে। আত্মরক্ষার জন্যে চারজনকে শামাল দিতে হবে। গুলি তখনও চলছে।
আহমদ মুসা গড়িয়ে সিটের পাশ ঘেঁষে গাড়ির পেছনের প্রান্তে চলে গেল যাতে তিনদিককে সামনে রাখা যায়। পেছনের গুলির রেঞ্জ দেখে বুঝল তারা দাঁড়িয়ে থেকে গুলি করছে।
আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে লেজারগান ডান হাতে নিয়ে ট্রিগারের বাটনে বুড়ো আঙুল রেখে হাতটা গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে যাওয়া উন্মুক্ত স্পেসের বটম লেভেলে রাখল। যে কোন মুহূর্তে হাতে গুলি খাওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু এই ঝুঁকি নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
আহমদ মুসা লেজারগানের ট্রিগারের বাটনে বুড়ো আঙুল চেপে গাড়ির গোটা পেছন দিকের উপর ঘুরিয়ে নিল।
লেজার গানের রেডিয়েশনের স্টিমুলেটেড বিচ্ছুরণ যে লেভেল দিয়ে ঘুরে এসেছে, সে লেভেলে কেউ যদি থাকে তাহলে চোখের পলকে সে দু’খন্ড হয়ে পড়বে।
ট্রিগার টেপার পর আহমদ মুসার শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পালা।
অপেক্ষার ফল তার সফল হলো, গাড়ির পেছন থেকে গুলি বন্ধ হয়ে গেল।
সংগে সংগে আহমদ মুসা গাড়ির সামনের দিকে ফিরে বসে এক পলকের জন্যে সিটের উপর মাথা তুলল। দেখল সামনের লোকটি তার মিনি মেশিনগান বাগিয়ে ছুটে এসে দাঁড়াল গাড়ির সামনে। তারপর সামনে ঝুঁকে পড়ে মিনি মেশিনগান ঘুরিয়ে নিচ্ছে গাড়ির ফ্রন্ট সিটের দিকে।
আহমদ মুসা বুঝল ড্রাইভার পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলের পিএ তার লক্ষ।
আহমদ মুসা দ্বিতীয়বার ট্রিগারের বাটন টিপল সামনের ঐ লোকটির লক্ষে।
লোকটির মাথার পেছনের অর্ধাংশ মুহূর্তেই কোথায় হারিয়ে গেল। লোকটি লাশ হয়ে পড়ে গেল গাড়ির উপর।
পর মুহূর্তে দু’পাশের জানালায় দু’জন লোক এসে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা আগেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
ওরা দু’জনেই আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েছে।
ওদের মিনি মেশিনগানের নল ঘুরে আসছে।
আহমদ মুসার লেজারগান ঘুরেছে বাঁ দিকের কাচের জানালায় দাঁড়ানো লোকটির লক্ষে। লেজারগানের ট্রিগার বাটনে বুড়ো আঙুল চেপেই ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়ির মেঝের উপর। দুই জানালা থেকেই গুলির ঝাঁক ছুটে এসেছিল আহমদ মুসা লক্ষে। বাম দিকের লোকটির গুলি গোটাটাই লক্ষভ্রষ্ট হয়ে গাড়ির ছাদকে আঘাত করেছিল। তাদের ট্রিগার টেপার আগ মুহূর্তেই লেজারগানের রেডিয়েশনের স্টিমুলেটেড বিচ্ছুরণ গিয়ে আঘাত করেছিল। কিন্তু ডানদিকের লোকটির গুলি করতে তাড়াহুড়া করতে হলেও সে নির্বিঘ্নে গুলি করতে পেরেছিল। লেজারগানের ট্রিগার বাটন চাপার সাথে সাথেই মেঝেয় আহমদ মুসা ঝাঁপিয়ে পড়তে না পারলে তার দেহটা ঝাঁঝরা হয়ে যেত। যে সিটের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সিটের একটা কংকালমাত্র আছে শুধু, সিট আর গাড়ির বডিও উধাও! আহমদ মুসার ঘাড়ের এক খাবলা গোশতও তুলে নিয়ে গেল একটা বুলেট।
আহমদ মুসা মেঝেয় শুয়ে পড়ে ডান দিকের লোকটির গুলির হাত থেকে বেঁচে লেজার গানের টার্গেট ডান দিকের লোকটির দিকে ঘুরিয়ে নেবার জন্যে চেষ্টা করছিল।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়েই তার পাশের সিটের সামনে দিয়ে সোজা পেয়ে গেল জানালায় দাঁড়ানো ডান দিকের লোককে। শুয়ে পড়ার সময়ই সে ঘুরিয়ে নিয়েছিল লেজারগান। লোকটিকে দেখার পর লেজারগানের ট্রিগার বাটনে বুড়ো আঙুল চেপে বসতে সময় লাগলো না। লোকটিও শুয়ে পড়া আহমদ মুসাকে খুঁজে পেয়েছিল। গুলি বর্ষণরত তার মিনি মেশিনগানের নল দ্রুত ঘুরে আসছিল আহমদ মুসার দিকে। ক্ষিপ্রতার প্রতিযোগিতায় জিতে গেছে আহমদ মুসা। তার লেজারগানের প্রাণঘাতী সব বাধা বিলোপকারী রেডিয়েশনের স্টিমুলেটেডের গতি বুলেটের চেয়ে বহু গুণ বেশি। জানালার ঝুঁকে পড়া লোকটার প্রাণহীন দেহ জানালার উপর ঝুলে পড়ল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলও।
সে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা! এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন আপনি! অস্ত্রগুলো অকেজো হবার পর বাঁচার বিন্দুমাত্র আশাও আমরা করিনি!
হঠাৎ বিস্ময় ফুটে উঠল দ্যাগলের চোখে-মুখে।
সে আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে আহমদ মুসার পেছন থেকে দু’হাত সরিয়ে সামনে নিয়ে এল। দেখল, রক্তাক্ত তার দুই হাত। বলল দ্যাগল উদ্বিগ্ন কন্ঠে, আপনি আহত মি. আহমদ মুসা? গুলি লেগেছে।
বলেই দ্যাগল আহমদ মুসার পেছনে গেল। দেখল, ঘাড়ের পাশে কাঁধের একটা অংশ থেকে জ্যাকেট উড়ে গেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। বলল দ্যাগল, মি.আহমদ মুসা আপনি সাংঘাতিক আহত। তবে রক্ত দেখে মনে হচ্ছে বুলেটটা হোরিজেন্টালি আঘাত করেছিল, ভার্টিকালি নয়। গুলিটা আহত করে বেরিয়ে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
একটু থেমেই দ্যাগল তার পিএ-কে লক্ষ করে বলল, তুমি ফাস্ট এইড বক্স থেকে ইলাস্টিক ব্যান্ডেজটা নিয়ে এস। তাড়াতাড়ি।
এসবের কিছু দরকার নেই স্যার। চলুন আমরা গাড়ি থেকে বের হই। বলল আহমদ মুসা।
পিএ রেডিমেড ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ নিয়ে এসেছে।
দ্যাগল কিছু না বলে ব্যান্ডেজটি আহমদ মুসার আহত জায়গার উপর সেট করে ব্যান্ডেজের ইলাস্টিক স্কচ টেপ চারদিকে লাগিয়ে দিল।
চলুন এবার। কাছেই আমাদের নেভাল ডক ইয়ার্ড। ওখানে ভাল হাসপাতাল আছে। সার্ভিসও ভাল পাওয়া যাবে। বলল দ্যাগল।
জানালা দিয়ে বের হওয়া অসুবিধাজনক। চলুন ভাঙা উইন্ডো স্ক্রীনের ওদিক দিয়ে বের হতে হবে। আহমদ মুসা বলল।
কেন এখন খুলবে না দরজা? বলল পুলিশ ড্রাইভার।
না, ম্যাগনেটিক এ্যাকশনের একটা মেয়াদ আছে, তার আগে দরজা খুলবে না। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা, এ মেটালিক জ্যামিং অস্ত্র কোত্থেকে এল? আমি তো এর নামও শুনিনি। এতো একটি সেনাবাহিনীর পুরোটাকেই অচল করে দিতে পারে। বলল দ্যাগল। তার কন্ঠে অপার বিস্ময়!
এটা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের নিজস্ব আবিষ্কার। আহমদ মুসা বলল।
সাংঘাতিক ব্যাপার। ওরা তো দেখছি আমাদের তাহিতিকেও দখল করে ফেলতে পারে। বলার সাথে সাথে চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেল মি. দ্যাগলের!
হ্যাঁ স্যার। ওরা তো তাই চায়। শক্তি দিয়ে ওরা দুনিয়ায় শয়তানের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। কিন্তু শয়তানী শক্তি চিরদিন পরাজিত হয়েছে। সব সময় পরাজিতই হবে। আহমদ মুসা বলল।
সবাই একে একে বের হয়ে এল গাড়ি থেকে।
স্বরাষ্ট্র সচিব টেলিফোন করল পুলিশকে। আর নেভাল ডক ইয়ার্ডকে বলল গাড়ি পাঠাতে।
নেভাল ডক ইয়ার্ডের গাড়ি ও পরে পুলিশ গাড়িও এসে পৌছল।
স্বরাষ্ট্র সচিব পুলিশকে তার কাজ বুঝিয়ে দিল।
নেভাল ডক ইয়ার্ডের সবাই উঠে বসেছে।
দ্যাগলও কথা শেষ করে আহমদ মুসার পাশে উঠে বসল।
আবার ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা আপনাকে। ধন্যবাদ, লেজারগান আপনার কাছে ছিল। আপনি কি সব সময় এভাবে সব অবস্থার জন্যে প্রস্তুত থাকেন? বলল দ্যাগল।
না, তা নয়। আমি নেভাল ডক ইয়ার্ডে আসছি তাহিতি থেকে যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়েই। এ কারণেই আমাকে যথাসম্ভব প্রস্তুত হয়েই আসতে হয়েছে।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! যা প্রয়োজন আপনি তাই করেছেন। তবে আমাদের জন্য আপনাকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হলো। যাক, মি. আহমদ মুসা, আপনাকে কয়েক দিন তো হাসপাতালে থাকতে হবে। তারপর আপনার সেই হাতে কলমের কাজ শেখানো হবে। বলল দ্যাগল।
না জনাব, যেজন্যে এখানে এসেছি, সেই কাজের ব্যবস্থাটা আজই করুন। হাসপাতালে ট্রিটমেন্ট নেয়ার পর আমি ঐ কাজগুলো দেখতে এবং করতেও পারবো। এই কাজে তো একদিন লেগেও যেতে পারে। সুতারাং আজই কাজ শুরু করতে চাই জনাব। বলল আহমদ মুসা।
দ্যাগল আহমদ মুসার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, বুঝেছি মি. আহমদ মুসা, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ভয়ংকর দ্বীপটা আপনাকে খুব টানছে।
না স্যার, ঠিক দ্বীপের টান নয়, ৭৬ জন বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞের মুক্তির আকুতি আমাকে অস্থির করে তুলেছে। দ্যাগলের কানে কানে বলল আহমদ মুসা।
দ্যাগলের মুখ গম্ভীর হলো। তার দৃষ্টিটা সামনের দিকে সম্প্রসারিত হলো। অনেকটা স্বগত উক্তির মতই সে বলল, আপনার কথা অনেক শুনেছিলাম, আজ দেখলাম, বুঝলাম, চিনলাম আপনাকে। আপনি সত্যিই শান্তির এক কপোত। যেখানেই মানুষ অশান্তি, সমস্যা, বিপদ, সেখানেই উড়ে যান আপনি।
কেউ উত্তর দিল না দ্যাগলের কথার। উত্তর তিনিও চাননি।
চলছে গাড়ি টিলাসংকুল বিপজ্জনক ঢালু পথে, নেভাল ডক ইয়ার্ডের দিকে।