৫২. ক্লোন ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

‘বাবা, আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। দু’তিন দিন ধরে অ্যালিনা আপার ফোন বন্ধ।’ বলল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড। তার হাতে মোবাইল। কথা বলছে সে মোবাইলে তার বাবা আলদুনি সেনফ্রিডের সাথে।
‘হ্যাঁ, মা ব্রুনা। দিন পাঁচেক আমার সাথেও তার কোন কথা হয়নি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমাকে টেলিফোন করতে না করেছে সে। সেই প্রতি সানডে সকালে সে টেলিফোন করে। ৫ দিন আগে গত রোববারে তার সাথে কথা হয়েছে। তোমার সাথে শেষ কবে কথা হয়েছে?’ ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের বাবা আলদুনি সেনফ্রিড বলল। তার চোখে দুর্ভাবনার চিহ্ন।
‘তিন দিন আগে বেলা সাড়ে ৩টায় টেলিফোন করেছিল। তার মানে তার সময় রাত তিনটায় তার টেলিফোন পেয়েছিলাম। এমন ‘অড’ সময়ে আপা কোনদিন টেলিফোন করেননি। আর বাবা, সে কথাগুলোও বলেছিল সব অস্বাভাবিক…।’
কথা আটকে গেল ব্রুনার গলায়। কান্নায় ভেঙে পড়ল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড।
ওপার থেকে ব্রুনার বাবার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল। বলল, ‘ব্রুনা মা, প্লিজ কেঁদো না। তুমি তো খুব সাহসী মা। আমরা তো এমনিতেই সংকটে। সাহস ও ধৈর্য হারালে চলবে না আমাদের। অ্যালিনা অস্বাভাবিক কি বলেছিল মা?’
‘আমাকে অনেক উপদেশ দিয়েছিল বাবা। লেখাপড়ার ব্যাপারে, চলাফেরার ব্যাপারে, তোমাকে দেখাশুনার ব্যাপারে এবং সবশেষে বলেছিল, আমাদের ‘মা-রহস্য’ খুঁজে বের করতেই হবে। এটা সম্পত্তির জন্যে নয়, মা’র স্বার্থে। আপার এই ধরনের উপদেশ আমার তখনি ভালো লাগেনি। আমি বলেছিলাম, আপা, তুমি কি কোনো মহাযাত্রা করছ যে, এই ধরনের উপদেশ দিচ্ছ? তুমিই তো এসব করবে! আমি তোমার সাথে থাকব। আপা বলেছিল, মানুষের মহাযাত্রা প্রস্তুতি নিয়ে হয় না। এটা হঠাৎই হয়। যাক এসব কথা, তোমাকে বলার জন্যে মনে এই কথাগুলো এসে ভিড় করেছিল তাই বললাম। মন আল্লাহর আবাস, বিবেক আ্ল্লাহর কন্ঠ। এজন্যে মন ও বিবেকের কথা শুনতে হয়। আমি আপার মুখে আল্লাহ শব্দ শুনে বিস্মিত কন্ঠে বলেছিলাম, আমরা তো ‘গড’ বলি, হঠাৎ তুমি ‘আল্লাহ’ বলছ কেন আপা? অ্যালিনা আপা বলেছিল, স্রষ্টা, পালনকর্তা হিসাবে ‘গড’-এর যত নাম দুনিয়াতে আছে তার মধ্যে ‘আল্লাহ’ নামটাই সবচেয়ে মৌলিক ও যথার্থ। এজন্যে ‘আল্লাহ’কেই আমি গ্রহণ করেছি ব্রুনা। আমি আরও বিস্মিত হয়ে কথা বলতে যাচ্ছিলাম। আপা বাধা দিয়ে বলল, সময় নেই ব্রুনা শোন, ‘মা-রহস্যে’র সন্ধানে এতদিনেও আমি কিছুই করতে পারিনি। কিভাবে এই সংকটের সমাধান হবে আমি জানি না। তবে আমার মনে একটা আশা জেগেছে, একজন মহান মানুষ আমাদের এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। সংগে সংগে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে তিনি? আপা বলল, আমি নিশ্চিত নই ব্রুনা তিনি সাহায্য করবেন কিনা। তবে সাহায্য করতে পারেন তিনি এবং যে কোন সংকট সমাধানের সামর্থ্য তার আছে, এটা শুধু আমার বিশ্বাস নয়, এটাই সত্য। কে তিনি আপা, আবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম। আপা বললেন, তার নাম টেলিফোনে বলা যাবে না। তবে মনে রেখ স্বচ্ছ, সুন্দর, নিষ্পাপ চেহারার মানুষ তিনি। তাঁর নামের দুই অংশ। প্রথম অংশের প্রথম বর্ণ ‘এ’… এখানে এসে হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে যায় আপার। লাইনটা কেটে যাওয়ার আগে তার মোবাইলে ভেসে আসা অন্য কারো ক্রদ্ধ কন্ঠ শুনেছি।’
থামল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড। তার শুকনো, উদ্বিগ্ন কন্ঠ।
‘মা ব্রুনা, তুমি যা বললে তা সত্যিই উদ্বেগের মা। কিন্তু আমরা এখন কি করব?’ বলল ব্রুনার বাবা। তার কম্পিত কন্ঠস্বর।
‘অনেক ভেবেছি, কিছুই বুঝতে পারছি না বাবা। তার কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা আমাদের কাছে নেই। সর্বশেষ তিনি তাহিতিতে ছিলেন। তার টেলিফোন নিরব হয়ে যাবার ঘটনা আর কোন সময়ই ঘটেনি। এবার সব কিছুই অস্বাভাবিক ঘটেছে।’ ব্রুনা ব্রুনহিল্ড বলল।
‘আমরা কি তাহিতি যাবার চিন্তা করতে পারি? আমরা তো এভাবে বসে থাকতে পারি না।’ বলল ব্রুনার বাবা।
কলিংবেল বেজে উঠল।
ভ্রকুঞ্চিত হলো ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের। তার বাসায় তো আসার কেউ নেই! হোম সার্ভিসের কেউ কি হবে? ওরা মাঝে মাঝে আসে।
‘বাবা, কেউ এসেছে, পরে কথা বলব তাহলে।’ বলল ব্রুনা।
‘ঠিক আছে মা। তুমি সাবধানে থেকো। ওরা কিন্তু জার্মানি চষে ফিরছে।
‘জার্মানির বা্ইরেও তারা নজর দেবে।’ ব্রুনার বাবা বলল।
‘ধন্যবাদ বাবা।’ বলে মোবাইলের কল ক্লোজ করল ব্রুনা।
দরজা খোলার আগে ডোর ভিউ দিয়ে দেখল, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের ইউনিফরম পরা লোক।
দরজা খুলে দিন ব্রুনা। ভেবে পেল না, মিউনিসিপ্যালিটির লোক কেন এ সময়? ওদের কোন প্রোগাম চলছে বলে তো জানা নেই।
দরজা খুলে যেতেই ‘গুড মর্নিং ম্যাডাম’ বলে ছোট্ট একটা বাউ করল লোকটি।
‘গুড মর্নিং স্যার। আপনি নিশ্চয় মিউনিসিপ্যালিটি থেকে এসেছেন? কি করতে পারি আপনার জন্যে?’ বলল ব্রুনা।
‘এক্সকিউজ মি ম্যাডাম। নোটিশ ছাড়া এসেছি। আমি এসেছি আমাদের সালজবার্গ মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কমিউনিটি সার্ভিস থেকে।’ বলল আগন্তুক।
‘কমিউনিটি সার্ভিসের সেনসাস গ্রুপের লোকরা তো ক’দিন আগে এসেছিল।’ ব্রুনা বলল।
‘কিন্তু তারা কিছু ভুল করে গেছে। যেসব দরকারি তথ্য নেয়ার কথা ছিল নেয়নি, বিশেষ করে জার্মান ন্যাশনালদের কিছু তথ্য বাদ পড়েছে।’ বলল আগন্তুকটি।
‘যেমন? প্রোফরমা অনুসারে সব তথ্য তারা নিয়েছে।’ ব্রুনা বলল।
‘হোম টাউনের নাম, বার্থ সার্টিফিকেটের নাম্বার, তারিখ ইত্যাদি।’ বলল আগন্তুকটি।
চমকে উঠল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড! হোম টাউনের নাম ও বার্থ সার্টিফিকেটের নাম্বার, তারিখ প্রকাশ হয়ে পড়লে তার নাম-পরিচয় জানাজানি হয়ে যাবে। তার নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়ে পড়বে। নিরাপত্তার স্বার্থেই সে জার্মানি ছেড়েছে। অস্ট্রিয়ার ছোট্ট শহর সালজবার্গে এসে বাস করছে। অস্ট্রিয়ার সীমান্তে আল্পসের উত্তর দেয়ালে জার্মান সীমান্তের খুব কাছে এই সালজবার্গ শহর। সুন্দর এই পার্বত্য শহরটি পুরানো ও অভিজাত। অনেক ঐতিহ্যের স্মারক এখানকার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বসতি গড়ে ব্রুনা নিজের নিরাপত্তা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা উভয়ই রক্ষা করতে চাইছে। জার্মানির কোথাও সে নিরাপদ থাকতে পারেনি। দু’দিনেই শত্রুদের চোখে পড়ার উপক্রম হয়েছে, এতই শক্তিশালী মায়ের খুনি গ্যাংটি। ছদ্মনামে এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে ব্রুনা। বিশ্ববিদ্যালয় ও এই বাসা ছাড়া আর কোথাও যায় না ব্রুনা। একা এ বাসায় অনেকটা বন্দীর মত জীবন যাপন করছে সে। এখন যে পরিচয় গোপন রেখেছে, সে পরিচয় মিউনিসিপ্যালেটিতে দেবে কি করে! আরেকটা চিন্তা তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে। সেটা হলো, মাত্র কয়েকদিন আগে মিউনিসিপ্যালেটির কম্যুনিটি সার্ভিসের লোকরা ফরমের সব অপসন পুরোপুরি ফিল আপ করে নিয়ে গেছে। ফরমে যা নেই, এমন তথ্যের জন্যে এভাবে লোক পাঠানো কি স্বাভাবিক? কিছুতেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
হঠাৎ ব্রুনার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। বলল, ‘স্যরি স্যার, কম্যুনিটি সাভির্সের এসব তথ্য দরকার তা আমার জানা ছিল না। বার্থ সার্টিফিকেট তো আমার কাছে নেই। নাম্বার তারিখও আমার জানা নেই।’
আগন্তুকের মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল! ভাবল একটু। বলল, ‘ঠিক আছে তাহলে হোম টাউনের নামটা দিন।’
বলে সে তার ফাইলটা খুলল এবং কলমটা হাতে নিল।
দ্রুত ভাবছিল ব্রুনা। হোম টাউনের নাম দিলেই তার পরিচয় পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে। না, কিছুতেই সে তার হোম টাউনের নাম দেবে না। অন্য কোন জায়গার নাম বলবে। তাহলে ধরা পড়ার আপাতত ভয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ডকুমেন্ট তার হোম টাউনের নাম নেই। বার্লিনের রয়্যাল স্যাক্সন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে সে এখানে এসেছে
ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাস বিষয়ে পড়ার জন্যে। বার্থ সার্টিফিকেট বা তার নাম্বার না হলে হোম টাউনের অথেনটিসিটি যাচাই করার সহজ কোন উপায় নেই, বিশেষ করে হোম টাউন যদি বড় শহর হয়।
এসব চিন্তা করেই ব্রুনা বলল, ‘আমার হোম টাউন বার্লিন।’
‘বার্লিন? একদম রাজধানী শহর!’ বলল আগন্তুক।
‘হ্যাঁ, আমাদের কয়েক পুরুষের শহর।’ ব্রুনা বলল।
‘ধন্যবাদ!’ বলে আগন্তুক উঠে দাঁড়াল।
ব্রুনা তাকে বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল ঘরে। হাউজ ডকুমেন্ট ফাইল বের করে মিউনিসিপ্যালিটি কম্যুনিটি সার্ভিসের টেলিফোন নম্বর জেনে নিয়ে সেখানে টেলিফোন করল।
ওপার থেকে সাড়া পেতেই ব্রুনা ‘গুড় মর্নিং’ জানিয়ে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে জিজ্ঞাসা করল, ‘কম্যুনিটি সার্ভিস থেকে আপনারা কয়েক দিন আগে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন, আবারও কি আপনারা তেমন কোন লোক পাঠিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, আমরা একটা এনজিও-কে সহযোগিতা করছি। তারা একটা সমীক্ষার জন্যে কিছু তথ্য সংগ্রহ করছে জার্মান সেটলারস ও জার্মান প্রবাসীদের উপর। কোন সমস্যা? কেন জিজ্ঞাসা করছেন?’ বলল ওপার থেকে কম্যুনিটি সার্ভিসের লোকটি।
‘কিছু নয়, কৌতুহল থেকে জিজ্ঞাসা করছি। এনজিওটার নাম কি বলতে পারেন প্লিজ?’ বলল ব্রুনা।
‘এক মিনিট প্লিজ।’ ওপার থেকে কম্যুনিটি সার্ভিসের লোক বলল।
মিনিট খানেকের মধ্যেই তার কন্ঠ শোনা গেল। বলল, হ্যাঁ, এনজিওটা খুবই নামকরা, ‘উই আর ফর অল’।
‘ধন্যবাদ স্যার। বাই!’ বলে ব্রুনা তার কল অফ করে দিল।
ধপ করে বসে পড়ল সোফার উপর ব্রুনা। তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন।
তার নিশ্চিতই মনে হচ্ছে, এনজিও’র ছদ্মাবরণে তার মায়ের গ্যাংগটাই তার তালাশ করছে! তার মানে তারা জার্মানির বাইরেও নজর দিচ্ছে? কেন তারা এভাবে আমাদের পেছনে লেগেছে? আমরা তো চলে এসেছি সেখান থেকে!
এরপরও তারা আমাদের অস্তিত্ব কেন বরদাশত করতে পারছে না? কেন? কি চায় তারা?
এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় চোখ ধরে এসেছিল ব্রুনার।
আবার কলিং বেলের শব্দ।
তন্দ্রা ভেঙে গেল ব্রুনার।
‘আবার কে এল!’ মনে মনে বলে তাকাল দরজার দিকে। উঠে দাঁড়াল।
দরজার দিকে দু’ধাপ এগিয়েই আবার থমকে দাঁড়াল। ভয় এসে ঘিরে ধরল তাকে। যারা তাকে খৃঁজছে তাদের কেউ এসে গেল কি?
ধীরে ধীরে এগোলো ব্রুনা দরজার দিকে।
এক বুক শংকা নিয়ে ডোর ভিউ দিয়ে বাইরে তাকাল।
বাইরে দাঁড়ানো আগন্তুকের দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠল ব্রুনা ব্রনহিল্ড। সমগ্র মনটাই তার এক সাথে বলে উঠল অ্যালিনা আপার মহান মানুষটিকে সে দেখছে। সেই সুন্দর, স্বচ্ছ, নিষ্পাপ চেহারা। দেখেই ব্রুনার মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে একে সে চেনে।
আর ভাবতে পারল না ব্রুনা।
হাত তার আপনাতেই এগিয়ে এসে দরজার সেফটি চেইন খুলে লক ঘুরিয়ে দিল দরজার।
দরজা খুলে দিল ব্রুনা।
ব্রুনা ও আগন্তুক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
নির্বাক ব্রুনার দৃষ্টি আটকে গেছে আগন্তুকের মুখে।
আগন্তুকের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। তার চোখ দু’টিও যেন হাসছে। বলল আগন্তুক ব্রুনাকে লক্ষ করে, ‘গুড মর্নিং, আমি নিশ্চিত তুমি ব্রুনা ব্রুনহিল্ড, আনালিসা অ্যালিনার বোন।’
প্রায় সম্মোহিত ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের জন্যে বিস্ময়ের পর বিস্ময়! আগন্তুক তার নাম জানে? আর অবলীলাক্রমে তার নামটা বলেও ফেলল এতটা নিশ্চিতভাবে! সেই সাথে একটা আনন্দও! অবশ্যই উনি আপার সেই মহান মানুষ। এক পশলা বৃষ্টির মত নিরাপত্তার একটা প্রশান্তিও নামল তার মনে।
অভিভূত ব্রুনার মুখ থেকে যেন আপনাতেই কথা বেরিয়ে এল, ‘গুড মর্নিং স্যার, আমি ব্রুনা ব্রুনহিল্ড, আনালিসা অ্যালিনার বোন।’
বলে ব্রুনা ব্রুনহিল্ড হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়াল আগন্তুকের দিকে।
তবে হাত এগিয়ে না দিয়ে আগন্তুক বলল, ‘এক্সকিউজ মি ব্রুনা, আমাদের সংস্কৃতি এ ধরনের হ্যান্ডশেকের অনুমতি দেয় না।’
ব্রুনা হাত টেনে নিল। বিব্রত ভাব তার চোখে-মুখে। তার দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের দিকে। এমনটা ব্রুনার জীবনে এই প্রথমবার ঘটল। অতিথি অভ্যাগতদের স্বাগত জানানোর সবচেয়ে অন্তরংগ প্রকাশই তো হলো হ্যান্ডশেক। হ্যান্ডশেক অস্বীকার করা অসৌজন্যমূলক, অপমানকরও। অ্যালিনা আপার ‘মহান মানুষের’ কাছ থেকে তো এমন প্রত্যাশা করা যায় না!
ব্রুনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ ওকে স্যার, ভিতরে আসুন প্লিজ।’
দরজা পুরোটা খুলে এক পাশে দাঁড়াল ব্রুনা।
ভিতরে প্রবেশ করল আগন্তুক।
ব্রুনা দরজা বন্ধ করে আগন্তুককে নিয়ে বসিয়ে তার পাশের সোফায় বসল সে। মুহুর্ত কয়েক নিরবতা।
‘আমি অনাহুত আগন্তুক। প্রয়োজনের কথাই আমার প্রথম বলা দরকার। বলল আগন্তুক।
কথা শেষ করেই আগন্তুক আবার বলার জন্যে মুখ খুলেছিল।
‘এক্সকিউজ মি স্যার, তার আগে আমার একটা প্রশ্ন আছে।’ ব্রুনা বলল।
‘প্রশ্ন? বল।’ আগন্তুক মুখ তুলে ব্রুনার দিকে চেয়ে বলল।
‘আপনার মূল নামের কয়টা অংশ?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
আগন্তুক আবার মুখ তুলে তাকাল ব্রুনার দিকে। ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছে তার।
যেন মুহুর্তকাল ভাবল সে। বলল, ‘অংশ দু’টি।’
‘প্রথম অংশের প্রথম ইংরেজি অক্ষরটা কি?’ আবার জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
ঠোঁটে ছোট্ট এক টুকরা হাসি ফুটে উঠল আগন্তুকের। বলল, ‘ইংরেজি ‘এ’ হলো সেই আদ্যাক্ষর।’
খুশিতে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ব্রুনার। বলল, ‘এবার বলুন স্যার।’
‘কিন্তু আগে বল, আমি পাস করতে পেরেছি কিনা?’ আগন্তুক বলল।
মুখে হাসি ফুটে উঠল ব্রুনার। বলল, ‘স্যার, প্রথম দর্শনেই আপনি পাস করেছেন।’
‘কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা আগন্তুকের।
‘আপা আপনার চেহারার যে বিশেষ গুণগুলো দিয়েছিলেন তার সাথে আপনি মিলে গেছেন।’ বলল ব্রুনা।
‘আমি তাহিতি থেকে আসছি। গৌরী মানে আপনার বোন আনালিসা অ্যালিনা শেষ পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। আর আমার নাম নিশ্চয় আপনার বোনের কাছে শুনেছেন।’ আগন্তুক বলল।
‘নাম বলেননি। নাম টেলিফোনে বলবেন না বলেই দুই অংশ নামের প্রথম অংশের আদ্যক্ষর বলার পর তাঁর টেলিফোন কেটে যায়। তারপর থেকেই আপার সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।’ বলল ব্রুনা। তার শেষ কথাগুলো কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছিল।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ব্রুনা সংগে সংগেই আবার বলে উঠল, ‘আপনি বললেন শেষ পর্যন্ত আপা ওখানে ছিলেন, ‘শেষ পর্যন্ত অর্থ…।’
কথা শেষ করতে পারল না ব্রুনা। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
আগন্তুক তাকাল ব্রুনার দিকে। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে নরম কন্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, ব্রুনা, আনালিসা অ্যালিনা নেই।’
ব্রুনা অস্ফুস্ট চিৎকার করে সোফার উপর আছড়ে পড়ল। এক বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
আগন্তুক মাথা তুলল না। তাকাতে পারল না ব্রুনার দিকে। মনে মনে বলল, ‘কাঁদুক ব্রুনা, তার কাঁদা উচিত।
অল্পক্ষণ পর মুখ তুলল ব্রুনা। অশ্রুধোয়া তার মুখ। বলল, ‘কি ঘটেছিল, কি হয়েছিল জানতে পারি কি মি.।’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠ তার।
‘আমার নাম আহমদ মুসা। আনালিসা অ্যালিনার মৃত্যুর ঘটনা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই ব্রুনা বলে উঠল, ‘আহমদ মুসা আপনার নাম? তাহিতির জিম্মি উদ্ধারের ঘটনায় আপনার কথা পত্রিকায় পড়েছি। বলা হয়েছে প্রায় পৌনে একশ বিজ্ঞানী-বুদ্ধিজীবি জিম্মী উদ্ধার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। বিস্ময়করভাবে আপনি সবাইকে মুক্ত করেছেন! বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সবাই আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। আরও অনেক কথা লিখেছে অনেক পত্রিকা। আপনি কিংবদন্তীর নায়ক। কিন্তু বুঝতে পারছি না, আমার আপার সাথে আপনার পরিচয় হলো কি করে?’
‘আমি সে কথাই বলছি।’ বলে আহমদ মুসা গৌরী ওরফে আনালিসা অ্যালিনার সাথে তার প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে সব কিছু সংক্ষেপে তুলে ধরে বলল, ‘আমাকে বাঁচাতে গিয়েই তাদের নেতার গুলিতে জীবন দিয়েছে ব্রুনা।’
‘আপা আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছিল, আমাদের ‘মা সমস্যা’র সমাধানে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। আমাদের সমস্যার কথা আপনি জানেন বলে তো বললেন না?’
‘অ্যালিনার মৃত্যুর আগে জানতাম না। গুলি লাগার পর সে মিনিট দেড়েক বেঁচেছিল। আমার হাতে সে একটা ডাইরি তুলে দিয়ে বলেছিল, ডাইরির শেষ কয়েক পাতায় আমার জন্যে কিছু লিখেছে। আমি যেন সেটা পড়ি। আর বলেছিল, আমার উপর সে কোন দায়িত্ব চাপাচ্ছে না, সব কিছু আমার ইচ্ছায় হবে। পরে ডাইরি আমি পড়েছি এবং সমস্যা সম্পর্কে জেনেছি। নিজের ইচ্ছাতেই আমি এসেছি ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার ঠিকানাও কি আপা দিয়েছে?’ বলল ব্রুনা।
‘হ্যাঁ। ডাইরিতেই সে লিখে রেখেছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম স্যার। আমরা সত্যিই অসহায় হয়ে পড়েছি। আপার অভাব আমাদের সব আশা-ভরসা চুরমার করে দিয়েছে। আব্বা আমাদের অভিভাবক হলেও আপাই আমাদের পরিচালনা করত। মা’র ঘটনায় বাবা একদমই ভেঙে পড়েছেন, মনের দিক দিয়েও শরীরের দিক দিয়েও।’ বলল ব্রুনা। ভারি কন্ঠ তার।
‘স্বাভাবিক।’ বলল আহমদ মুসা।
মুহুর্তকালের বিরতি নিয়ে আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘আচ্ছা বল তো ব্রুনা, তোমার কি মত, তোমার মা কি বদলে গেছেন, না উনি তোমার মা-ই নন?’
‘মা হবেন না কেন? বদলে গেছেন তিনি। অবশ্য বাবা বলেন, কোন প্রমাণ নেই এবং বিশ্বাস করাও যায় না, কিন্তু তাকে তোমার মা বলে বিশ্বাস করতে মন চায় না। আব্বার কথা আমি মানি না। ইনি আমার মা না হলে আমার মা কোথায়?’ বলল ব্রুনা।
‘আমি গৌরীর মানে অ্যালিনার ডাইরি গোটাটাই পড়েছি। অ্যালিনা কিছু তথ্য দিয়েছে তা কিন্তু নিশ্চিত করে উনি তোমাদের মা নন।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা বিস্ময় নিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, কি তথ্য বলা যাবে স্যার?’
‘অবশ্যই ব্রুনা। একদিন গোসলের পর তোমার মা তার ড্রেসিং রুমে বসে তার কালো চুল রং দিয়ে সাদা করছিলেন, এটা অ্যালিনা দেখেন। তোমার এ..।’
‘মা কালো চুল পাকা করছিলেন? তাহলে মায়ের পাকা চুলের গুচ্ছগুলো আসলে পাকা নয়। ও গড…।’
থামল ব্রুনা। তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কাঁপছে গোলাবের পাপড়ির মত তার নিরাভরণ ঠোঁট।
কয়েক মুহুর্ত, ব্রুনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল, ‘ডাইরিতে আর কি আছে স্যার?’
‘আরও আছে। ওটা আমি এনেছি। তুমিই রাখবে। পড়ে নিও তুমি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, স্যার। ও ডাইরির অধিকার একমাত্র আপনার। আপনাকেই আপা দিয়ে গেছেন।’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু ওটা তোমাদের পারিবারিক সম্পত্তি।’
আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি আপার কাছে পরিবারের চেয়েও বড়।’ বলল ব্রুনা।
‘কেন, কেমন করে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জানি না। তবে আপার সাথে কথা বলে আমি এটাই বুঝেছি যে, তার আস্থা, সম্মান, ভালোবাসা সব যেন আপনার জন্যেই ছিল!’ বলল ব্রুনা।
অজান্তেই মনটা আহমদ মুসার চমকে উঠল। মুমূর্ষু গৌরীর কথাগুলো তার মনে পড়ল: স্রষ্টার কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে কেন আপনার দেখা পেলাম? কেন আপনার দেখা আগে পাইনি?… আপনার উপর আমার আস্থা সীমাহীন।’ আরও মনে পড়ল তার শেষ কথাটা: ‘আপনার উপর সে অধিকারও নেই।’ অধিকার নেই, বলার মাধ্যমে সে তো এটাই বলতে চেয়েছে ‘সে অধিকার তার আছে।’
আনমনা হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। এসব চিন্তার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল সে।
আহমদ মুসার এই ভাবান্তর চোখ এড়াল না ব্রুনার। তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাহলে তার বড় বোন তার মনটা অবশেষে একজনকে দিয়েছিল! বলল ব্রুনা, ‘স্যার, আমার মা খুবই কনজারভেটিভ। তার অনুকরণেই আমরা গড়ে উঠেছি। জানেন, বড় আপার কোন ছেলে বন্ধু ছিল না। আমার খুশি লাগছে যে, আপা শেষে একজনকে বন্ধু বানিয়েছিলেন।
শেষ কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল ব্রুনা।
আহমদ মুসা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তোমাকে খুব শক্ত হতে হবে ব্রুনা। আলিনা যে কাজ শেষ করতে পারেনি, তা তোমাকে শেষ করতে হবে।’
ব্রুনা চোখ মুছল। বলল, ‘সে শক্তি আমার নেই স্যার। আমি আপনার পাশে থাকতে চেষ্টা করব।’
কলিং বেল বেজে উঠল।
চমকে উঠল ব্রুনা!
ব্রুনার চমকে ওঠা আহমদ নজর এড়াল না।
বলল, ‘দরজায় কে তুমি কি জান ব্রুনা?’
‘না স্যার।’ বলল ব্রুনা।
‘তবে চমকে উঠলে যে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘কিছুক্ষণ আগে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কম্যুনিটি সার্ভিসের লোক এসেছিল কিছু ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে। কোন এনজিও’র অনুরোধে তারা নাকি এটা করছে। কিন্তু কেন জানি আমার সন্দেহ হয়েছে এর মধ্যে অন্য কোন ব্যাপার আছে। আমার মধ্যে সত্যিই একটা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে।’ বলল ব্রুনা।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজেছিল।
চোখ খুলে বলল, ‘আমি বুঝেছি ব্রুনা। দেখ কে, গেট খুলে দাও।’
মুখে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ডোর ভিউ দিয়ে বাইরে একবার তাকিয়ে পেছনে ফিরে আহমদ মুসার দিকে তিনটি আঙুল তুলল।
আহমদ মুসা বুঝল, বাইরে তিনজন লোক। দরজা খুলে দেবার জন্যে আহমদ মুসা ইংগিত করল।
ব্রুনা দরজা খুলে এক হাতে দরজা ধরে রেখে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘আপনারা কারা? কি চাই আপনাদের?’
‘আপনার কাছে এসেছি। আমরা করপোরেশনের সিকিউরিটির লোক। আপনাকে আমাদের সাথে আমাদের অফিসে যেতে হবে।’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
ওরা তিনজন একই বয়সের। সকলেরই পরনে সিকিউরিটির ইউনিফরম।
ব্রুনার মুখ শুকিয়ে গেছে।
সে দরজা থেকে সরে ফিরে আসতে চাইল আহমদ মুসার দিকে।
ওরা তিনজনই ছুটে এসে ধরে ফেলল ব্রুনাকে। চিৎকার করে উঠল ব্রুনা।
আহমদ মুসা বসে ছিল। বসে থেকেই বলল, ‘শোন তিন বীর পুরুষ। ছেড়ে দাও ব্রুনাকে। একজন তরুণীকে ধরতে তিন বীর পুরুষের দরকার হয় না।’
আহমদ মুসার কন্ঠ খুব ঠাণ্ডা কিন্তু শক্ত।
ওরা তিনজনই চমকে উঠে ছেড়ে দিল ব্রুনাকে। তারা আহমদ মুসাকে আগে দেখতে পায়নি। ব্রুনাকে ছেড়ে দিয়েই ওরা ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। ব্রুনা দৌড়ে এসে আহমদ মুসার পেছনে দাঁড়াল।
‘কে তুমি?’ আহমদ মুসার দিকে ঘুরে দাঁড়াবার পর ওদের একজন বলল।
‘আমার বন্ধু, আমার অভিভাবক।’ আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই বলে উঠল ব্রুনা।
ব্রুনার কথা তখন শেষ হয়ে সারেনি। ওদের তিনজনের একজনের হাত অকস্মাৎ উপরে উঠল।
একটা ছুরি ছুটে এল আহমদ মুসার লক্ষে।
আহমদ মুসা আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার পেছনে ব্রুনা।
ছুরির সামনে থেকে আহমদ মুসার সরার উপায় ছিল না। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল ব্রুনা। আহমদ মুসা সরলে ছুরি গিয়ে সরাসরি আঘাত করবে ব্রুনাকে।
সুতরাং আর কোন চিন্তা করার অবকাশ ছিল না। আহমদ মুসার বাম হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল ছুরিটাকে। ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা তার বাম হাতের তালুতে বিদ্ধ হলো।
আহমদ মুসা দেখল আরও একজনের হাত উপরে উঠেছে।
আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বা হাতের তালু থেকে ছুরিটা বের করতে করতে চিৎকার করে উঠল, ‘ব্রুনা, তুমি শুয়ে পড়।’
ব্রুনা আহমদ মুসার হাতে ছুরি বিদ্ধ হওয়া দেখেছে। ভয়ে কাঁপছিল সে। আহমদ মুসার নির্দেশের সাথে সাথে শুয়ে পড়ল ব্রুনা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আরেকটি ছুরি ছুটে এল আহমদ মুসার লক্ষে।
চোখের পলকে আহমদ মুসা হাঁটু গেড়ে বসে মাথার উপর ছুটে চলা ছুরির বাঁট ধরেই ছুঁড়ল তৃতীয় লোকটির ডান বাহু লক্ষে। তারও ডান হাত উপরে উঠছিল। তার সে হাতে চকচকে তৃতীয় আরেকটা ছুরি।
আহমদ মুসা ছুরিটা ছুঁড়েই বাম হাতের তালু থেকে খুলে নেয়া রক্তাক্ত ছুরিটা ওদের তিনজনের দিকে তাক করে বলল, ‘দেখ, আমার নিক্ষিপ্ত ছুরিটা লক্ষ ভ্রষ্ট হবে না। তার প্রমাণ দেখ তোমাদের তৃতীয় লোকটির বাহুতে গেঁথে যাওয়া আমার ছুরি। এখন বল, তোমাদের কে প্রথম মরতে চাও।’
আহমদ মুসার নিক্ষিপ্ত ছুরিটা তৃতীয় ব্যক্তির ডান বাহুর ভিতরের পাশ দিয়ে বাহুর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। লোকটি ককিয়ে উঠে বাম হাতে ডান বাহু চেপে ধরে বসে পড়েছিল।
ওরা দু’জন সাথী লোকটির বাহুতে বিদ্ধ ছুরিটার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফেরাল আহমদ মুসার দিকে। তারা আহমদ মুসার কথা অবিশ্বাস করল না। তারা দু’জন দু’হাত উপরে তুলে আত্নসমর্পণ করল।
উঠে দাঁড়িয়েছিল ব্রুনা।
আহমদ মুসা ছুরি নিয়ে এগিয়ে গেল ওদের তিনজনের সামনে।
আহমদ মুসার গা ঘেঁষে তার পেছন পেছন এগোলো ব্রুনা।
ছুরি ওদের দিকে তাক করে আহমদ মুসা বলল, ‘দেখ, এক আদেশ আমি দু’বার করি না। বাঁচতে চাইলে বল তোমরা কারা? কেন এসেছিল মেয়েটিকে কিডন্যাপ করতে?’ ঠাণ্ডা কিন্তু অত্যন্ত শক্ত কন্ঠস্বর আহমদ মুসার।
ওরা তিনজনেই আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে এবারও তারা আহমদ মুসার কথা অবিশ্বাস করল না। ওদের একজন বলল, ‘স্যার, আমরা এই এলাকার একটা শরীর চর্চা ক্লাবের সদস্য। দু’জন লোক এসে আমাদের বলে, এই ম্যাডাম তাদের আত্নীয়, রাগ করে পালিয়ে এসে এখানে রয়েছে। তারা এলে সে দরজা খুলবে না এবং আবার পালিয়ে যাবে। এই কারণে তারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাকে ধরে নিয়ে যেতে। আমাদের ক্লাবের পাশের পার্কে তারা অপেক্ষা করছে। ম্যাডামকে নিয়ে তাদের হাতে পৌঁছে দেয়াই আমাদের কাজ। আমরা প্রত্যেকে এজন্যে এক হাজার ডলার করে পাব।’
আহমদ মুসা তাকাল একবার ব্রুনার দিকে। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের নিয়ে ওখানে গেলে তো ওদের পাওয়া যাবে?’
‘পাওয়া যাবেই তো স্যার!’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
‘তাহলে চল।’
বলে পেছনে তাকাল। বলল ব্রুনাকে, ‘তুমি থাক, আমি আসছি।’
‘না স্যার, একা আমি বাসায় থাকতে পারবো না। প্লিজ, আমি আপনার সাথে যাব।’ বলল ব্রুনা তার মুখে ভয়ের চিহ্ন।
‘ঠিক আছে, এস।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, আপনার বাম হাত সাংঘাতিকভাবে আহত। রক্ত ঝরছে। এখনই ব্যান্ডেজ করিয়ে নেয়া দরকার।’ বলল ব্রুনা।
‘ঠিক বলেছ ব্রুনা। ওদেরও একজন আহত।’ বলে আহমদ মুসা ওদের আহত লোকটিকে ডাকল।
ব্রুনা ছুটে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এসে বলল আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, চিন্তা করবেন না। আমার ফার্স্ট এইড ট্রেনিং আছে। আমি খারাপ ব্যান্ডেজ করবো না।’
বড় গামলা নিয়ে এসে প্রথমে আহমদ মুসার হাত এ্যান্টিসেপটিক ফ্লুইড মেশানো পানি দিয়ে ধুয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। তারপর আহমদ মুসা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল ওদের আহত অন্য লোকটির হাতে।
সবাই বেরিয়ে এল ব্রুনার ফ্ল্যাট থেকে। সব শেষে বেরুল ব্রুনা ঘর লক করে।
ওদের তিনজনের দু’জন বসল ড্রাইভিং ও তার পাশের সিটে। আহত তৃতীয় জনের সাথে ব্রুনাকে বসাল পেছনে মাঝের সিটে। নিজেকে আড়ালে রাখার জন্যে পেছনের সিটে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহমদ মুসা।
গাড়িতে ওঠার সময় দৃষ্টির একটা পলক সামনের দিকে পড়তেই আহমদ মুসা দেখল অ্ল্প দূরে একজন লোক রাস্তার পাশে একটা গাছে ঠেস দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আহমদ মুসার চোখের সামনে পড়তেই লোকটা গাছের আড়ালে সরে গেল। পরক্ষণেই সে ওদিকে রাস্তার পাশের একটা ঝোপের দিকে দৌড়ে গেল। একটু পরেই ঝোপের আড়াল থেকে একটা গাড়ি বেরিয়ে ওদিকে চলে গেল।
লোকটির আচরণ আহমদ মুসার মধ্যে কিছু কৌতুহল সৃষ্টি করলেও এটা আহমদ মুসার মনে কোন ভাবনার সৃষ্টি করল না। উঠে বসল সে গাড়িতে।
গাড়ি দশ মিনিট চলার পর একটা পার্কে প্রবেশ করল। দাঁড়াল একটা ঝাউ গাছের পাশে।
নিরব পার্কটা। এ সময়ে পার্কে কেউ আসে না।
গাড়ির সামনের ওরা দু’জন লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
কিছুক্ষণ বাইরে পায়চারি করে তারা আহমদ মুসার কাছে এসে বলল, ‘স্যার, কাউকে দেখছি না। কিন্তু এই ঝাউ গাছের পাশেই তো আমাদের দাঁড়াবার কথা! ওরা এখানে থাকবে কথা ছিল।’
আহমদ মুসার মনে পড়ল ব্রুনার বাড়ির ওপাশে দেখা সেই লোকটির কথা। ও কি এদের লোক ছিল। হওয়াই সম্ভব। গুণ্ডাদের পাঠিয়ে তাদের উপর চোখ রেখেছিল নিশ্চয়। মুক্তভাবে ব্রুনাকে বের হতে দেখে এবং সাথে আমাকে দেখে ওদের সন্দেহ হয়েছে। নিশ্চয় তাদের ব্যাপারে পুলিশকে বলা হবে, এ সন্দেহও তারা করতে পারে। সন্দেহ করেই কি তাহলে ওরা সরে পড়েছে?’
‘ঠিক আছে, তোমরা আরেকটু দেখ।’
তারপর আহমদ মুসা ব্রুনাকে বলল, ‘তুমিও নামো। গাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াও।’
আরও কিছু সময় পার হলো।
ওরা তিনজন এসে আহমদ মুসার সামনে গাড়ির জানালায় এসে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, ওরা নিশ্চয় ভেগেছে আপনার আসা টের পেয়ে।’
‘লোক ওরা কয়জন ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘দুই গাড়িতে ওরা ছয়জন। সবাই গাড়ি থেকে নামেনি। দু’জন আমাদের সাথে কথা বলেছিল।’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
‘আচ্ছা, ওদের মধ্যে কি নীল প্যান্ট ও সাদা টি-শার্ট পরা কেউ ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘হ্যাঁ স্যার ছিল। একজনের পরনে নীল প্যান্ট ও সাদা টি-শার্ট ছিল।’ বলল ওদের তিনজনের মধ্যে আহত লোকটি।
‘ব্রুনা যে বন্দী হয়ে এখানে আসছে না, তাদের কাছে এ ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গেছে। এখানে এলে তাদের বিপদ হবে। এসব বিষয় তারা জেনে ফেলেছে। নিশ্চয় পালিয়েছে ওরা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সত্যিই তারা জেনেছে? আপনি কি করে জানলেন স্যার?’ বলল ওদের একজন। তাদের চোখে-মুখে একটা ভীতি।
‘ব্রুনার বাড়ির বাইরে ওদের একজন পাহারায় ছিল। আমরা গাড়িতে ওঠার সময় সেও ওখান থেকে চলে এসেছে। আমি তাকে দেখেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা খুব জেঞ্জারাস লোক স্যার। আমাদের বিপদ হবে। আপাতত আমাদেরও পালাতে হবে দেখছি।’
বলল তিনজনের সেই আহত লোকটিই।
লোকটির কথা শেষ হতেই চোখের পলকে সব দিক থেকে চার থেকে পাঁচটা গাড়ি এসে আহমদ মুসার গাড়িকে ঘিরে দাঁড়াল। দশ বারোজন লোক নেমে এল সংগে সংগেই।
চারটি রিভলবার উদ্যত হলো চারদিক থেকে আহমদ মুসার গাড়ি লক্ষে। ঠিক এই সাথেই দু’জন এগিয়ে এসে যারা ব্রুনাকে কিডন্যাপ করতে গিয়েছিল এবং আহমদ মুসাদের সাথে এসেছে তাদের দু’জনকে আক্রমণ করল। কয়েকটি ঘুসি লাগিয়ে মাটিতে ফেলে দিল তাদের। ওদের আহত লোকটি চিৎকার করে বলল, ‘স্যার, আমাদের কোন দোষ নেই। গাড়ির মধ্যে বসে থাকা লোকটি আমাদের সবাইকে মেরেছে। ওই আমাদেরকে তার সাথে আসতে বাধ্য করেছে।’
রিভলবারধারী একজন গিয়ে গাড়ির দরজায় একটা লাথি মেরে বলল, ‘বেরিয়ে আয় শালা, দেখাচ্ছি মজা।’
আহমদ মুসা দরজা খুলে দু’হাত মাথার উপরে তুলে বের হয়ে এল গাড়ি থেকে।
রিভলবারধারীদের দু’জন গাড়ির এপাশে ছিল। গাড়ির ওপাশের দু’প্রান্তে দু’জন।
গাড়ি থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় চারদিকটা একবার তাকিয়ে দেখে নিল আহমদ মুসা।
সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রিভলবার তাক করে কাছের লোকটি তার দিকে এগিয়ে এল।
গাড়ির ওপাশ থেকে একজন চিৎকার করে উঠল, ‘শালাকে শেষ করে দাও। ব্রুনাকে আমরা গাড়িতে তুলছি।’
রিভলবারের একটা নল ধীরে ধীরে এসে আহমদ মুসার কপালে ঠেকল।
রিভলবারধারী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘একটুও শব্দ হবে না। পুলিশ যখন আমাদের সন্ধানে আসবে তখন আমরা অস্ট্রিয়া পার।’
লোকটির কথা শেষ হবার সাথে সাথেই গাড়ির পেছন দিক থেকে একটা ছুরি এসে রিভলবারধারীর বাহুতে বিদ্ধ হলো। লোকটি ককিয়ে উঠে তার ডান বাহু চেপে ধরে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা দ্রুত পেছন দিকে তাকাল। দেখল, গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে সেই তিনজনের আহত লোকটি। সন্দেহ নেই আহমদ মুসার, এই লোকটিই ছুরি ছুঁড়েছে আহমদ মুসাকে হত্যা করতে যাওয়া রিভলবারধারীকে।
লোকটির উপর চোখ পড়তেই আহমদ মুসা দেখল তার চোখ ঘুরে গাড়ির ওপাশের দিকে। তার চোখে-মুখে আতংক।
আহমদ মুসা দ্রুত তাকাল গাড়ির ওপাশে। দেখল, একটা রিভলবার উঠে আসছে ছুরি ছুঁড়ে মারা সেই আহত লোকটিকে লক্ষে।
আহমদ মুসার ডান হাতটা দ্রুত চলে গেল মাথার পেছনে জ্যাকেটের নিচে এবং বেরিয়ে এল ‘ব্ল্যাক কোবরা’ নামের ছোট কালো কুচকুচে বিপদজনক রিভলবার নিয়ে। পরমানু নিয়ন্ত্রিত এক ধরনের বিস্ফোরণ এর বুলেটকে পরিচালনা করে। এক কমপ্লিট রাউন্ডে এর ১২টি বুলেট থাকে। সাধারণ রিভলবারের চেয়ে অনেক দ্রুত, নি:শব্দ এর বুলেট এবং এটা অত্যন্ত ভয়ংকর। যে অংগকে এই বুলেট আঘাত করে তা বহু দিনের জন্যে ওজনহীন ও অবশ হয়ে যায়।
চোখের পলকে রিভলবার মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে এনে আহমদ মুসা ছুরিতে আহত লোকটিকে গুলি করতে উদ্যত হলো। নিমেষে লোকটির বাহু লক্ষে গুলি করল। গুলিটি ঠিক তার কনুইয়ের উপরের জায়গাটায় বিদ্ধ হলো। লোকটি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিল রিভলবারের। কিন্তু হলো না। খসে পড়ল তার হাত থেকে রিভলবার।
প্রথম গুলিটি করার পর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি আহমদ মুসা। আরও দু’জন রিভলবারধারী রয়ে গেছে।
আহমদ মুসার রিভলবার ঘুরে এল ওদিক দিয়ে। আহমদ মুসার প্রথম গুলি এতটাই দ্রুত ও আকস্মিক ছিল যে, ঐ দুই রিভলবারধারীর বিমূঢ়তা কাটতে তাদের অনেক সেকেন্ড নষ্ট হলো। এই নষ্ট সেকেন্ডগুলোই আহমদ মুসা ব্যবহার করল ওদের দু’জনকে গুলি করার কাজে। সম্বিত ফিরে ওরা যখন তাদের রিভলবার তোলার চিন্তা করল, তখনই গুলি বিদ্ধ হলো ওদের রিভলবার ধরা হাত।
তৃতীয় গুলিটা করেই আহমদ মুসা দাঁড়ানো অবশিষ্ট লোকদের লক্ষে রিভলবার তুলে বলল, ‘সবাই হাত তুলে দাঁড়াও, সামান্য বেয়াদবী করলে মাথার খুলি উড়ে যাবে। এক কথা আমি দু’বার বলি না।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা রিভলবার নামিয়ে নিয়ে ব্রুনাকে বলল, ‘তুমি পুলিশকে টেলিফোন কর। বল কিডন্যাপার ধরা পড়েছে। ওরা তিনজন তোমার সাক্ষী।’
আহমদ মুসা কথা বলার সময় কয়েক মুহুর্তের জন্যে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল ওদের দিক থেকে। এরই সুযোগ গ্রহণ করেছিল ওদের একজন। ছুঁড়েছিল আধুনিক বুমেরাং সুইচ নাইফ। নি:শব্দে ছুটে আসছিল নাইফটি।
চিৎকার করে উঠেছিল ব্রুনা। দেখতে পেয়েছিল সে বিপদজনক ছুরি নিক্ষেপের ঘটনা।
ঘটনার দিকে ঘুরে তাকাবার সময় নষ্ট না করে আহমদ মুসা নি:শব্দে বোঁটা থেকে ঝরে পড়া ফলের মত নিজেকে মাটির উপর ঠেলে দিয়েছিল।
মুহূর্তের ব্যবধানে বেঁচে গেল আহমদ মুসা। অবিশ্বাস্য তীক্ষ্ণ ধারের সুইচ বুমেরাংটি আহমদ মুসার মাথার সামনের চুলের কিয়দংশ ছেঁটে নিয়ে চলে গেল। বসে পড়তে এক মুহূর্ত দেরি হলে বুমেরাং নাইফটি দেহ থেকে মাথাকে আলাদা করে ফেলত।
আহমদ মুসা বসে পড়েই গুলি করল বুমেরাং নিক্ষেপকারীর মাথা লক্ষে। বুমেরাং নিক্ষেপকারী লোকটি তথন মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। সত্যিই আহমদ মুসার গুলি লোকটির কপাল দিয়ে ঢুকে তার মাথা উড়িয়ে দিল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
মোবাইলে কথা বলছিল ব্রুনা।
মোবাইল সে মুখের কাছ থেকে সরিয়ে বলল, ‘স্যার, আমি পুলিশকে জানিয়েছি। ওরা আসছে। কিন্তু স্যার, আপনার গুলি, আপনার রিভলবার…। কোন বিপদ হবে না তো? অস্ট্রিয়ার অস্ত্র আইন খু্বই কঠোর।’
আহমদ মুসা ব্রুনার উদ্বেগ বুঝল। বলল, ‘না ব্রুনা, ভয় নেই। আমার এ রিভলবারের ইউরোপীয় লাইসেন্স রয়েছে।’
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুলিশের দু’টি গাড়ি এসে পৌঁছে গেল।

গালে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় খেল ক্লারা লিসবেথ।
লিসবেথের পরনে নার্সের পোষাক। কিন্তু গায়ে ডাক্তারের এ্যাপ্রন। এ্যাপ্রনের সামনের বড় পকেট দু’টো ঝুলে আছে। সে দুই পকেটের একটিতে পাওয়া যাবে একটা রিভলবার ও ভয়ংকর একটা সুইচ নাইফ।
ক্লারা লিসবেথকে যে থাপ্পড় দিয়েছে সে গৌরীর মা কারিনা কারলিন।
বিধ্বস্ত তার চেহারা । উস্কু-খুসকু তার চুল। অবিন্যস্ত পোষাক। দু’চোখে তার উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি।
সুন্দর আঙ্গিকের একটা বেডে সে বসে।
বড় ঘর, কিন্তু একেবারেই নিরাভরণ। দেখতে মনে হয় কারাগারের মত। ঘরের ভিতরেই টয়লেট। পড়ার একটা ছোট্ট টেবিল ও একটি চেয়ার। তাতে বই-পত্র কিছু নেই। আছে একটা ট্রেতে খাবার সাজানো।
ক্লারা লিসবেথের গালে এক থাপ্পড় কষিয়েই বলল, ‘বলেছি তো আমি তোদের খাবার খাবো না! মরে যাবো।’
মুহুর্ত থামল। একটা দম দিযে আবার বলে উঠল, ‘আমার হাতঘড়ি কোথায়? দেয়ালে ক্যালেন্ডার নেই কেন?’
‘আমাকে মেরে না ফেলে মরার মত ফেলে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে কেন?’
বলেই কারিনা কারলিন বেড-সাইড থেকে একটা গ্লাস তুলে নিয়ে চোখের পলকে ছুঁড়ে মারল ক্লারা লিসবেথের দিকে।
ক্লারা লিসবেথ সাবধান হওয়ার সময় পায়নি। গ্লাসটা গিয়ে আঘাত করল তার কপালের বাম পাশটায়। জোরের সাথে ছোঁড়া গ্লাসের ভারি গোড়া কপালে লেগে একটা খাদ সৃষ্টি করে উঠিয়ে নিয়ে গেল একখণ্ড চামড়া।
ঝর ঝর করে রক্ত নেমে এসে মুখের উপর দিয়ে গড়াল।
ক্রোধে মুখও লাল হয়ে উঠল। এক টান দিয়ে এ্যাপ্রনের পকেট থেকে রিভলবার বের করে কারিনা কারলিনের কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, ইচ্ছা করলেই মাথাটা এখন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে পারি।’
‘ট্রিগারটা চাপ, আমি তো সেটাই চাই।’ বলল কারিনা কারলিন।
আর কোন কথা না বলে ক্লারা লিসবেথ রিভলবার পকেটে ফেলে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
বাড়ির ভিন্ন একটি অংশের লিফট ধরে উঠে গেল চারতলায়। চারতলার একটা দরজার সামনে দাঁড়াতেই দরজা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা একটা কন্ঠ কথা বলে উঠল, ‘ক্লারা, তুমি আহত আমি সেটা জানি। কি বলতে এসেছ, বল।’
‘এক্সিলেন্সি, ম্যাডাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সংজ্ঞায় আসার পরেই সে আনরুলি হয়ে উঠছেন। যে কোন সময় যে কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসতে পারেন।’ ক্লারা লিসবেথ বলল।
‘সব জানি আমি। তুমি যাও। আমি দেখছি।’ বলল দরজা ভেদ করে আসা সেই কণ্ঠ।
দরজায় গোপন মাইক্রোফোন আছে। সে মাইক্রোফোন থেকেই কথাগুলো আসছে।
ক্লারা লিসবেথ ফিরে গেল বাড়ির আগের অংশে তার কক্ষে।
খাটের পাশের দেয়ালটা ফুঁড়ে কালো ইউনিফরমে ঢাকা কালো মুখোশ পরা অনেক বার দেখা পরিচিত কালো মূর্তি সামনে এসে দাঁড়াতেই কারিনা কারলিন চিৎকার করে বলল, ‘শয়তানরা, তোমরা আমাকে আর কত নির্যাতন করবে? আমাকে মেরে ফেল। না হলে যাকে পাব তাকে আস্ত রাখবো না।’
যান্ত্রিক ধরনের হাসি ভেসে এল কালো মূর্তির দিক থেকে। কথা ভেসে এল অনেকটা যান্ত্রিক স্বরে। বলল, ‘হাজার বার শয়তান বল, তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমরা যা চাই, তা সম্পূর্ণ পাওয়ার পথে। যতই চাও তুমি মরবে না। তোমাকে আরও বাঁচতে হবে।’
‘কেন বাঁচতে হবে?’ বলল কারিনা কারলিন তীব্র কণ্ঠে।
‘কারণ তোমার মাল্টি বিলিয়ন ডলারের এস্টেট আমাদের হস্তগত হতে আরও কিছু সময় বাকি আছে। তোমার ডুপ্লিকেট যাকে আমরা বসিয়েছি তার সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু তার হস্তাক্ষর ও ফিংগার প্রিন্ট তোমার রেকর্ডেড হস্তাক্ষর ও ফিংগার প্রিন্টের সাথে মিলছে না। এগুলো ঠিক করতে সময় লাগছে। নিউ আরটিফিসিয়াল লেদার টেকনলজিতে তার ফিংগারের প্রিন্ট চেঞ্জ করা হচ্ছে। আর তোমার দুই মেয়ে আনালিসা অ্যালিনা, ব্রুনা ব্রুনহিল্ড ও আলদুনি সেনফ্রিডকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। তোমাকে মারার আগে তোমার দুই মেয়ে ও স্বামীকে আমরা হত্যা করব। তারা তোমার ডুপ্লিকেটকে পুরোপুরিই সন্দেহ করেছে। আমাদের হাত ফসকে তারা আত্নগোপন করেছে। তবে তাদের আমরা ধরবই। অতএব, চিন্তা করো না, তোমার মৃত্যুর দিন খুব দূরে নয়।’ কালো মূর্তিটি বলল।
পাগলের মত হো হো করে হেসে উঠল কারিনা কারলিন। বলল, ‘তোমাদের কোন উদ্দেশ্যই সফল হবে না শয়তান। আমার এস্টেটটা আমার পূর্বপুরুষের অনেক পূণ্যের অর্জন। এটা কোন শয়তানের হাতে পড়তে পারে না। ঈশ্বর এই সম্পদ রক্ষা করবেন। তোমরা আমাকে আটক করেছ আমার স্বামী-সন্তানদেরও শেষ করতে পারবে, তা ভেব না শয়তান। ঈশ্বর আছেন।’
হো হো করে আগের মতই হেসে উঠল সেই কালো মূর্তি। বলল, ‘এতক্ষণে তোমার ছোট মেয়ে আমাদের হাতে এসে গেছে। একজনকে পাওয়া গেছে, অন্য দু’জনকে শীঘ্রই পাওয়া যাবে। একজন কিশোরীর মুখ খুলাতে খুব বেশি সময় লাগবে না, এটা ম্যাডাম তুমিও জানো।’
‘আমার এখন যেমন কিছু করার শক্তি নেই, সুযোগ নেই, তেমনি তোমার এসব কথাকে আমি ভয়ও করছি না। আমার ভরসা এখন একমাত্র ঈশ্বর। আমার স্বামী-সন্তানদের তাঁর হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।’
‘কিছু করার যোগ্যতা যাদের থাকে না, তারাই এমন করে ধর্মের ভেক ধরে।’ সেই কালো মূর্তি বলল।
‘যারা শয়তান তারা এমন কথা বলতেই পারে। স্যাক্সনরা ধর্মের ভেক ধরে না। ধার্মিক স্যাক্সনরা বিভিন্ন রকম অধর্মের ভেকধারীদের মুখোশ খুলে দেয়, এ ইতিহাস একটু খুঁজলেই পাবে শয়তান।’ বলল কারিনা কারলিন।
কালো মূর্তির মুখ নড়ে উঠেছিল। কিন্তু তার কথা শুরুর আগেই মোবাইলের রিং বাজার শব্দ বেরুলো তার কালো ইউনিফরমের ভিতর থেকে। মুখ তার বন্ধ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে হাতটি তার পকেট থেকে মোবাইলে তুলে নিল।
‘হ্যাঁ, বল হেংগিস্ট, ওদের খবর কি?’ বলল কালো মূর্তি।
‘স্যার, খবর ভালো নয়। ওরা ব্রুনা ব্রুনহিল্ডকে হাতে পেয়েও রাখতে পারেনি। কেউ তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমাদের চারজন লোক আহত, এর মধ্যে তিনজন গুলি বিদ্ধ। আর…।’
ওপারের কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ ধমক দিয়ে বলে উঠল, ‘থাম, আমি তোমার কাছ থেকে ঘটনার রিপোর্ট চাইনি। বল, ব্রুনাকে কারা কেড়ে নিয়েছে? পুলিশ তো অবশ্যই নয়!’
‘না, পুলিশ নয়। একজন অপরিচিত লোক।’ ওপার থেকে বলল।
‘তোমরা গাঁজাখুরি গল্প সাজাচ্ছ? একজন অপরিচিত রাস্তার লোক দশ বারোজন সশস্ত্র লোকের কাছ থেকে ব্রুনাকে কেড়ে নিয়েছে? আসল ঘটনা কি বল।’ বলল কালো মূর্তি তীব্র ক্ষোভের সাথে।
‘স্যার, ঘটনাটা ঠিক স্যার। সালজবার্গের আমাদের আরও দু’টি সূত্র থেকেও আমাকে এই ঘটনাই জানানো হয়েছে।’ বলল হিংগিস্ট ওপার থেকে।
‘আমাদের ওরা কোথায়?’ বলল কালো মূর্তি।
‘ওরা নির্দেশের অপেক্ষা করছে।’ হিংগিস্ট বলল ওপার থেকে।
‘ওদের জন্যে আমার কি নির্দেশ জানো না তুমি? ওরা এখন শত্রুর সূত্র, শত্রুরা ওদের ফলো করবে। লায়েবিলিটি ওরা এখন।’ কালো মূর্তি বলল।
‘বুঝেছি স্যার, আগামী কালের সূর্যোদয় ওরা দেখতে পাবে না।’ বলল ওপার থেকে হিংগিস্ট।
এবার হো হো করে হেসে উঠেছে কারিনা কারলিন। বলল, ‘বললাম না শয়তান, ঈশ্বর আছেন। ঈশ্বর আমার স্বামী-সন্তানদের রক্ষা করবেন। দেখলে ব্রুনাকে হাতে আনার তোমাদের ষড়যন্ত্র ঈশ্বর সফল হেত দিলেন না।’
কালো মূর্তিটি ক্রোধের সাথে মাটিতে সজোরে একটা লাথি ঠুকে বলল, ‘চুপ ম্যাডাম! আমার লোকদের ভুলে একবার ছাড়া পেয়েছে তোমার মেয়ে। কিন্তু আমাদের জালে সে ধরা পড়বেই। নিশ্চিত থাক, তোমার সামনেই ওকে আমরা টুকরো টুকরো করব অথবা তার লাশ তোমার কাছে আসবে।’
‘আমাকে ভয় দেখিও না। মৃত্যু ভয় না থাকলে তার আর কোন কিছুর ভয় থাকে না। স্বামী-সন্তানদের আগেই আমি ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। তাদের কথা আমি ভাবিও না।’ বলল কারিনা কারলিন।
কারিনা কারলিনের কথা শেষ হতেই আবার মোবাইল বেজে উঠল সেই কালো মূর্তির।
মোবাইল ধরেই কালো মূর্তি বলল, ‘বল হিংগিস্ট, জরুরি কিছু?’
‘স্যার, যে লোকটি ব্রুনাকে কেড়ে নিয়েছে, তার সম্পর্কে কিছু জানা গেছে।
সে ইউরোপীয় নয়, এশিয়ার হতে পারে। আরও জানা গেছে সে আজ সকালে ব্রুনার সাথে সাক্ষাত করতে তার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। আজকের ঘটনার পর ব্রুনা ফ্ল্যাটে যায়নি। তাদের খোজা হচ্ছে।’ বলল হিংগিস্ট ওপার থেকে।
‘অবিশ্বাস্য! একজন এশিয়ান প্রায় ডজনের মত আমাদের লোকের কাছ থেকে ব্রুনাকে কেড়ে নিল। বলে দাও ওদের, যে কোন মূল্যে তাকে ও ব্রুনাকে আমি চাই। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ওরা জার্মানিতে আসবে। অস্ট্রিয়া থেকে যত রাস্তা জার্মানিতে প্রবেশ করেছে সবক’টির উপর চোখ রাখতে বল। আর ইমিগ্রেশন পোস্টগুলোতে আমরা যে বন্দোবস্ত করেছি, তাকে জোরদার করে তোল।’ বলল কালো মূর্তিটি।
কালো মূর্তির কথা সমস্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কারিনা কারলিন। সে থামতেই বলে উঠল, ‘শোন শয়তানরা, তোমাদের এক ডজন লোক একজন এশিয়ানের সাথে পারেনি, এটাই ঈশ্বরের মার। মনে রেখ ঈশ্বরের মার তোমাদের উপর শুরু হয়েছে।’
কালো মূর্তির ডান হাতটা পকেটের মধ্যে ছিল। রিভলবার সমেত বের হয়ে এল তার হাত। তার রিভলবার উঠল কারিনা কারলিনের মাথা লক্ষে। কিন্তু মুহুর্তেই আবার রিভলবারটা নামিয়ে নিল সে। বলল, ‘তোমার জীবনের আরও কয়দিন বাকি। মারব সেদিন রিভলবার দিয়ে নয়। মারব মৃত্যু যন্ত্রণা কি তা যাতে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পার, সেভাবে। মনে রেখ, তোমার মেয়ে দু’টি নিয়ে আসব তোমার কাছে। তাদের নরম দেহের উপর শকুন লেলিয়ে দিয়ে ভোজের মহোৎসব করব। তখন বড় বড় কথা তোমার কোথায় যায় দেখব। এই যন্ত্রণার পর তোমার আসল মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হবে। অপেক্ষা কর।’
‘শয়তানরা শোন, কথাগুলো বলছ নিজেকে ঈশ্বর সাজিয়ে। ঈশ্বরই এর জবাব দেবেন। অপেক্ষা কর।’ বলল কঠোর কণ্ঠে কারিনা কারলিন।
‘ম্যাডাম! তুমি সব হারিয়েছ, দেহ থেকে শুরু করে সম্পদ, স্বামী, সন্তান সব তোমার গেছে, তবে দম্ভ তোমার যায়নি।’ বলল কালো মূর্তি।
‘প্রাণ থাকা পর্যন্ত এ দম্ভ আমার যাবে না। এ দম্ভ বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। আমার সব তোমরা কেড়ে নিয়েছ, কিন্তু বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারনি শয়তানরা।’ সেই কঠোর কণ্ঠে বলল কারিনা কারলিন।
‘হ্যাঁ, রাস্তার কুকুরের কিছুই থাকে না, কিন্তু তাদের ঘেউ ঘেউয়ের অভ্যাস যায় না!’ বলে কালো মূর্তিটি তার বুকের কালো একটা বাটনে চাপ দিল। সংগে সংগে দেয়ালে একটা দরজা খুলে গেল। সেই দরজায় এক লাফে ঢুকে গেল কালো মূর্তিটি।