৫২. ক্লোন ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

সারা দিন ধরে আহমদ মুসা গোটা সালজবার্গ ঘুরে বেড়িয়েছে। সাথে ছিল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড।
জার্মানির প্রায় মাথার উপরে নয়নাভিরাম আল্পস-এর একটা সুন্দর খণ্ড অস্ট্রিয়ার এই ছোট্ট সালজবার্গ শহরটি মুগ্ধ করেছে আহমদ মুসাকে।
ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আহমদ মুসা বেভিয়ান আল্পস-এর সুন্দর পাহাড়শৃঙ্গ, উপত্যকা, অপরূপ দৃশ্যের কিংস লেক রিভার, হিটলারের অবকাশ কেন্দ্র ‘ঈগল নেসট’, অস্ট্রিয়ার ওয়ান্ডার ল্যান্ড সালজবার্গের গ্রামীণ উপকন্ঠ, সালজবার্গের ঐতিহাসিক বারুক টাওয়ার, বিশপ রুপার্ট ও বেভিরিয়ান ডিউকদের শাসনকেন্দ্র ঐতিহাসিক গীর্জাগুলো দেখেছে। সবশেষে ঐতিহাসিক বারুক টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসার সময় ব্রুনা বলল, ‘আপনাকে একজন সমঝদার ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আপনি সালজবার্গ দেখার জন্যেই এখানে এসেছেন। কেমন লাগছে স্যার, সালজবার্গকে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সালজবার্গের যেটুকু আল্লাহর তৈরি, ‘সেটুকু খুবই সুন্দর। কিন্তু যে অংশটা ‘ম্যান মেড’ মানে মানুষের তৈরি, সেটুকু অনেকটাই একঘেয়ে।’
‘যেমন?’ কিছুটা বিস্ময়ের সাথে বলল ব্রুনা।
‘সালজবার্গে কনসার্ট হল ও গীর্জার ছড়াছড়ি দেখছি। এই যে বারুক টাওয়ার থেকে বেরুলাম, সেটাও নাচ-গান জাতীয় শিল্পের জন্যে তৈরি। মনে হচ্ছে এদিকের মানুষের মন আছে, মাথা নেই। আবার দেখ, বড় বড় স্থাপনাগুলো গীর্জা। সেগুলোর আকৃতি যাই হোক, প্রকৃতিটা পোড়ো বাড়ির মত মানে মানুষের আত্না আছে কিন্তু মানুষের প্রাণস্পন্দন এখানে নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গীর্জাগুলো পুরানো, প্রাণহীন এটা বুঝলাম। কারণ খুব কম মানুষই গীর্জায় যায়। নতুন গীর্জাও তৈরি হচ্ছে না এ কারণেই। কিন্তু এখনকার মানুষের মাথা নেই, একথা বলছেন কেন?’ বলল ব্রুনা। তার মুখে হাসি।
‘নাচ-গান বা এ ধরনের কমর্কাণ্ড যাদের আনন্দের একমাত্র বা প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তাদের মাথা থাকে না। ধীরে ধীরে মহৎ কাজ, মহৎ চিন্তা ও মহৎ সৃষ্টির ক্ষমতা তাদের লোপ পায়। গ্রীক সভ্যতার শেষ দিকে এটাই ঘটেছিল এবং তার ধ্বংসও ত্বরান্বিত হয়েছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
গম্ভীর হয়ে উঠল ব্রুনার মুখ। বলল, ‘অনেক ভারি কথা বলেছেন স্যার। আমি এত কিছু জানি না। তবে নাচ-গান শিল্প-সংস্কৃতির অংগ। এটা ক্ষতিকর কেন হবে?’
‘ওষুধ মাত্রা ও সীমার মধ্যে না থাকলে বিষ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে উপাদেয় খাদ্যও ভয়ানক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ বলল গম্ভীর কন্ঠে আহমদ মুসা।
আনন্দ-বিস্ময় ব্রুনার চোখে-মুখে! বলল ‘স্যার, অ্যালিনা আপার কথা শুনে মনে হয়েছিল, আপনি একজন বড় গোয়েন্দা বা অস্ত্রধারী অ্যাক্টিভিস্ট। আজ নিজ চোখে যা দেখলাম তাতে সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি, আপনি একজন সমাজ সংস্কারক বা দার্শনিকের ভাষায় কথা বলছেন!’
‘একজন সৈনিক আদর্শ চর্চা, দর্শন চর্চা করতে পারে না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পারে হয়তো, জানি না আমি। আপনার মধ্যেই প্রথম দেখলাম তাই বলছিলাম।’ বলল ব্রুনা।
মুহূর্তের জন্যে থেমেছিল ব্রুনা। তারপরেই গাড়ির দরজা খুলে আহমদ মুসাকে বসার জন্যে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘স্যার, শহরের তেমন আর কিছু দেখার বাকি নেই। আপনার উৎসাহে স্যার শহরের অনেক কিছু আমারও দেখা হয়ে গেল। ধন্যবাদ, এমন উৎসাহ স্যার, জাত-ট্যুরিস্টদেরও থাকে না। এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি স্যার?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি সারা দিন ধরে শহর ঘুরলাম শহর দেখার জন্যে নয় ব্রুনা।’
‘তাহলে?’ চোখে-মুখে বিস্ময় ব্রুনার।
‘দুই কারণে আমি সারা দিন শহর ঘুরলাম। তার একটি হলো, আমি দেখতে চেয়েছিলাম শত্রুপক্ষের কেউ আমাদের অনুসরণ করে কিনা। আর দ্বিতীয় কারণ…।’
আহমদ মুসার কথার মধ্যখানে ব্রুনা বলে উঠল, ‘শত্রুরা আমাদের পিছে পিছে আছে?’ উদ্বেগ ফুটে উঠেছে ব্রুনার মুখে।
‘পিছু তো নেবার কথা। কিন্তু সারা দিনেও ওদের দেখা পাইনি। তার অর্থ হলো, আমরা ওদের নজরে নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে ব্রুনা বলল, ‘ভালো খবর স্যার।’
‘এই ভালো সব ভালো নাও হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আবার বলে উঠল, ‘তাহলে এবার চল।’
‘না স্যার, দ্বিতীয় কারণটা তো জানাই হলো না। বলুন স্যার, দ্বিতীয় কারণটা কি?’ ব্রুনা বলল।
‘হ্যাঁ, সেটা হলো সময় কিল করা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন? সময় কিল করা কেন?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
‘তোমার আব্বাকে এখানে আসার সময় দেবার জন্য’। বলল আহমদ মুসা।
আমার আব্বা এখানে আসবেন? কেন? তিনি তো বলেছেন আমরা ব্রুমসারবার্গে পৌঁছার পর তাঁকে জানালে তিনি সেখানে আসবেন।’ ব্রুনা বলল।
‘আমি তাঁকে সালজবার্গে আসতে বলেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি বাবাকে সালজবার্গে আসতে বলেছেন? কেন স্যার?’ ব্রুনা বলল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘আমাদের একজন তৃতীয় সাথী দরকার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তা না হলে আমাদের দু’জনের জন্যে এক সাথে চলা সম্ভব নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল ব্রুনার! বলল, ‘কেন দু’জন এক সাথে চলা সম্ভব নয়?’
একটা গাম্ভীর্য নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘তুমি নিশ্চয় জান না ব্রুনা, আমাদের ধর্ম ইসলামে পরস্পরের মধ্যে বিবাহ বৈধ এমন ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা, নির্জন কক্ষে থাকা বা সাক্ষাত ইত্যাদি ধরনের কাজ নিষিদ্ধ।’
‘হ্যাঁ, তাতে আমরা দু’জন এক সঙ্গে চলার পথে অসুবিধা কোথায়?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
‘অসুবিধার বিষয়টা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। এক কথায় উত্তর হলো, আমাদের ধর্মের যে জীবনাচরণ তাতে এই এক সংগে চলার কোন সুযোগ নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন?’ ব্রুনা বলল বিস্ময়ের সাথে!
‘যাদের সাথে অবাধে মেলামেশা করা যায় এমন ঘনিষ্ঠ আত্নীয় তুমি আমার নও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাতে কি? অনাত্নীয়ের সাথে কি পথ চলে না মানুষ?’ ব্রুনা বলল।
‘চলে। আমারও চলতে আপত্তি নেই। কিন্তু সাথে তোমার পিতা ধরনের কাউকে থাকতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু কেন, এই কথা আমি জানতে চাচ্ছি।’ ব্রুনা বলল।
‘দেখ ব্রুনা, বিষয়টি নর-নারীর অবৈধ সম্পর্ক ও অপরাধ বিস্তারের সাথে জড়িত। নর-নারীর বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক আমার ধর্ম ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। কারণ নর-নারীর অবাধ মেলামেশা থেকে এই অবৈধ সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। আমরা এক সাথে চলতে গেলে যে অবাধ মেলামেশা হবে, তা আমাদের ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনার মুখ লাল হয়ে উঠল। কিছুটা বিব্রত ভাবও ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘স্যার, আমাদের সম্পর্কেও কি এমন ভাবা যায়?’
‘এটা তোমার আমার কথা নয়। মানব প্রবণতাকে সামনে রেখে এটা মানুষের জন্যে তৈরি নৈতিক বিধান। এর অন্যথা হলে নারী-পুরুষের সম্পর্ক অবৈধ, এটা অপরাধের পর্যায়ে যে কোন সময় পৌঁছে যেতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এটা একটা আশংকার ব্যাপার।’ ব্রুনা বলল।
‘এটা আশংকার ব্যাপার নয় ব্রুনা। যা সমাজে ঘটে চলেছে তাকে আশংকা বলতে পার কেমন করে? বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি যে এলাকায় বাস কর সে এলাকা, তোমার স্কুল, তোমার কলেজ, তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একবার নজর দাও। দেখবে, ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা কত ধরনের ব্যক্তিগত সামাজিক সমস্যা, কত দু:খজনক ঘটনা ও সংঘাতের সৃষ্টি করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগেই উত্তর দিল না ব্রুনা। ভাবল কিছুক্ষণ সে। বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। আপনি ছেলেমেয়েদের বিশেষ দিকের প্রতি ইংগিত করেছেন। এটা ঠিক স্যার, এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা সাংঘাতিক বিশৃঙ্খলা সমাজে রয়েছে।’
‘তুমি কি মনে কর, এই বিশৃঙ্খলা কি সবাই চায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
ব্রুনা একটু ভেবে বলল, ‘স্যার, বিষয়টা কারও চাওয়া বা না চাওয়ার উপর নেই। পিতা-মাতা চাইলেও, প্রশাসন চাইলেও কারও কিছু করার নেই। বিষয়টা ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কার সাথে কতটুকু সম্পর্ক করবে, তা এখন ব্যক্তির একক অধিকার।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বিশৃঙ্খল ও অস্বাভাবিক সম্পর্কের সবটা কি ব্যক্তির ইচ্ছায় ঘটছে?’
মুহূর্তের জন্যে চুপ থেকে বলল, ‘ইচ্ছা-অনিচ্ছা দু’ভাবেই ঘটছে।’
‘জবরদস্তিমূলকভাবে ঘটছে না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাও ঘটছে।’ বলল ব্রুনা।
‘আচ্ছা বলত, ইচ্ছায় যা ঘটছে তার বড় একটা অংশ কি অবস্থাগত চাপে ঘটছে না?’ আহমদ মুসা বলল।
সংগে সংগেই উত্তর দিল না ব্রুনা। ভাবল। বলল, ‘ঠিক স্যার, অবস্থাগত চাপেই্ এটা বেশি ঘটছে। পরিবেশ, অবস্থা ছেলেমেয়েদের এমন অবস্থানে নিয়ে যায় যখন ইচ্ছা সৃষ্টি হয়ে যায়।’
‘এই ইচ্ছা স্বেচ্ছাগত নয়। অবস্থা, অস্বাভাবিক পরিবেশ, অন্যায় পথে সৃষ্টি করছে এই ইচ্ছা। যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করছে।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা কোন জবাব দিল না। তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। তার ভিতরে একটা প্রচণ্ড তোলপাড়। সে কোন দিন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এই দৃষ্টিতে দেখেনি। সমাজ চিত্রের একটা নতুন দিগন্ত তার সামনে খুলে গেল। ছেলেমেয়েদের অবাধ-মেশাই অবাঞ্ছিত অধিকাংশ ঘটনার জন্যে দায়ী, তাতো সে অস্বীকার করতে পারছে না। সে নিজের কথা ভাবল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বারবার কি এমন বিপদে পড়েনি? আজ যেন ভয় হচ্ছে পেছনের সে কথাগুলো ভাবতে। কিন্তু পরিবারও কি ধ্বংস হচ্ছে এ কারণে! প্রতিবেশী, আত্নীয়-স্বজনসহ চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরিবারের সাথে সে ঘনিষ্ঠ। এর মধ্যে তার ও আরেকটি পরিবার ছাড়া বিশ পঁচিশ বছর বিবাহ টিকেছে এমন দম্পতি নেই। অধিকাংশ বিয়েই চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পরিবার সিংগল, হয় মা ছাড়া না হয় পিতা ছাড়া। বিয়ে না করার হারও সাংঘাতিকভাবে বাড়ছে। তার ঘনিষ্ঠ চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরিবারের অর্ধেকের কোন বাচ্চা নেই। তাদের অনেকেই অনাথ শিশুর প্রতিষ্ঠান থেকে শিশু দত্তক নিয়েছে। সম্ভবত দশ বারটি পরিবারে ১টি করে শিশু আছে। মাত্র সাত আটটি পরিবারের আছে একাধিক সন্তান। এই শিশুগুলো আবার খুব অল্প সময়ই পরিবারের সাথে থাকে। সারা দিন চাইল্ডকেয়ার সেন্টারে কাটিয়ে তারা বাড়িতে আসে রাতে ঘুমাবার জন্যে। মনে পড়ে তার, তার স্কুলে প্রার্থনা দিবসের অনুষ্ঠনে আসা একজন ফাদার বলেছিলো, ‘খৃস্টীয় জ্ঞান ও শিক্ষার অভাবে খৃস্টীয় সমাজের পরিবারগুলো আজ ধ্বংসের মুখে। অনাচার আজ আচারকে গ্রাস করে ফেলেছে।’ এই কথাগুলোর অর্থ সেদিন বুঝেনি সে। আজ তার অর্থ তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের বিষয়ে ফাদারের কথাটা ঠিক। কিন্তু অবাধ মেলামেশাই কি এর কারণ?
মুখ তুলল ব্রুনা। বলল, ‘স্যার, ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষের মেলামেশাই কি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের এত বড় বিপর্যয় ঘটাচ্ছে?’
‘না ব্রুনা, এই সমাজ-পরিবেশের সৃষ্টি করেছে যে ধর্মনিরপেক্ষ, নীতি-বিমুখ জীবনদৃষ্টি, তাই এ অবাধ মেলামেশা যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের বিপর্যয়ের জন্যে দায়ী।’
‘তাহলে তো স্যার পশ্চিমা সভ্যতা-সমাজ এজন্য দায়ী হয়ে যায়!’ ব্রুনা বলল।
‘একটা বা কিছু কারণের জন্যে একটা সভ্যতা-সমাজকে দায়ী করা যায় না। একটা সভ্যতা অনেক বড়। তাতে অনেক কিছু খারাপ, অনেক কিছু ভালো থাকে। আবার অনেক খারাপ থাকলে তার মধ্যে কিছু ভালোও থাকে। পশ্চিমী জীবন ও সভ্যতার মধ্যে ভালোটাই বেশি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু স্যার, আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের এ্ই অবস্থার জন্যে আমাদের সভ্যতাই তো দায়ী, আমি এখন যা বুঝেছি।’ ব্রুনা বলল।
‘এটা সভ্যতার একটা দিক মাত্র। দিকটা ফিলোসফিক্যাল বা দর্শনগত। এদিকটা বাদ দিয়ে পশ্চিমী সভ্যতা মানুষের ব্যবহারিক জীবনের জন্যে হাজারো যন্ত্র ও ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। কোন কথাই এর প্রশংসার জন্যে যথেষ্ট নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সভ্যতার ফিলোসফিক্যাল দিকটা কি? সেখানে ক্রটিটা কি স্যার?’ ব্রুনা বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘অনেক বড় প্রশ্ন। এখন আলোচনার সময় নয় এটা ব্রুনা। তবে এটুকু বলা যায়, তোমাদের সভ্যতা মানুষকে দেহসর্বস্ব মনে করেছে। তারা কাজ করবে, খাবে, আনন্দ-ফুর্তি করবে এবং তারপর একদিন জীবনের ইতি ঘটে যাবে। মানুষের বিচার-বুদ্ধি আছে এবং তার একজন স্রষ্টা আছেন, মানব-জীবন বিষয়ে স্রষ্টার একটা উদ্দেশ্য আছে, এসব অস্বীকার করে তোমাদের সভ্যতা। মানুষের জীবনোত্তর কোন ভবিষ্যত যদি না থাকে, বাঁচার জন্যে খাওয়া আর বাঁচা যদি হয় যথেচ্ছ জীবন-উপভোগের জন্যে, তাহলে মানুষ সব ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় আইন চেষ্টা করে একে নিয়ন্ত্রিত করতে। কিন্তু মানুষের তৈরি, মানুষের দ্বারা বাস্তবায়িত আইন মানুষের জীবনের সবক্ষেত্রে পৌঁছতে পারে না। শুধু ভয় দেখিয়ে চাপ দিয়ে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ হয় না। তোমাদের সভ্যতা তা পারেনি ব্যবহারিক জীবনের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য সত্ত্বেও তোমাদের সভ্যতা এখানে এসে ব্যর্থ।’
‘স্যার, আপনি মরালিটি মানে নৈতিকতার কথা বলছেন যার কারণে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে অপরাধ থেকে দূরে থাকে। আমার একটা বিস্ময়, পশ্চিমী সভ্যতা মানুষের মধ্যে এই নৈতিকতা সৃষ্টি করতে পারলো না কেন!’ ব্রুনা বলল।
‘কারণ তোমাদের সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষ। নৈতিকতা আসে সার্বজনীন নীতিবোধ থেকে। সার্বজনীন নীতিবোধ আসে জগতসমূহের স্রষ্টার কাছ থেকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন ধর্ম, স্রষ্টা ছাড়া এই নীতিবোধ মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না?’ ব্রুনা বলল।
‘পারে না। তোমাদের সভ্যতা তার প্রমাণ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন পারে না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’ ব্রুনা বলল।
‘করতে পারে না নয় ব্রুনা, করতে পারে। কিন্তু সেটা মানব রচিত আইন হয়, স্রষ্টার দেয় নৈতিক আইন হয় না। মানুষের আইনের বাস্তবায়ন হয় মানুষের পুলিশ দ্বারা, কিন্তু স্রষ্টার আইনের বাস্তবায়ন করতে পুলিশের দরকার হয় না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি ব্রুনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করার জন্য মদ নিষিদ্ধ করে আইন তৈরি হয়। এই আইন তৈরির পর মদ তৈরির গোপন কারখানা সাংঘাতিকভাবে বেড়ে যায় এবং মদের বিস্তারও বেড়ে যায়। আইন ও পুলিশ তা রোধ করতে পারেনি। মার্কিন সরকার শেষে মদ নিষিদ্ধের আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। এর পাশাপাশি দেখ, স্রষ্টার বিধান হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে মদ নিষিদ্ধ। মুসলিম সমাজ দেখ সাধারণভাবে মদমুক্ত। ব্যতিক্রম হিসাবে মুসলিম সমাজে যারা মদ খায়, তারা অনেকটা গোপনে খায় এবং একে অপরাধ বলে মনে করে। দেখা যায় মদ্যপরাও এই কারণে মদ এক সময় ছেড়ে দেয়। স্রষ্টার এই বিধান বাস্তবায়নে কোন সময় পুলিশের দরকার হয়নি, এখনও হয় না এবং জেনে রেখ কখনই হবে না। স্রষ্টার দেয়া বিধানের এটাই শক্তি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু স্যার, খৃস্টান সমাজে তো এমন হয় না! খৃস্ট দর্শনেও তো ধর্ম, ঈশ্বরকে মানা হয়!’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু এখন খৃস্টান সমাজে ধর্ম ও ঈশ্বর তো শুধু গীর্জায়! গীর্জার বাইরে তোমরা সবাই ধর্মনিরপেক্ষ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম স্যার। কিন্তু আমাদের ধর্ম থেকে আপনার ধর্মের পার্থক্য কোথায়? আমি আমার আনালিসা আপার কথায় বুঝেছি তিনি আপনার ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আপনাদের ধর্মে কি আছে, আমাদের ধর্মে তা নেই কেন? গীর্জার বাইরে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গেলাম কি করে?’ বলল ব্রুনা।
‘এক কথায় এর উত্তর নেই ব্রুনা। সংক্ষেপে এটুকু জেনে রাখ, ঈশ্বর বা আল্লাহ তোমাদের ধর্মেও আছেন, আমাদের ধর্মেও আছেন, কিন্তু তোমাদের ধর্মগ্রন্থে জীবন ব্যবস্থা নেই, আমাদের ধর্মগ্রন্থ গোটাটাই মানুষের জীবন ব্যবস্থা। আমাদের ধর্মগ্রন্থের প্রথম বাক্যটাই হলো, ‘এই গ্রন্থ, যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, যারা স্রষ্টা বা আল্লাহকে ভয় করে এটা তাদের পথনির্দেশিকা।’ তোমাদের ও আমাদের ধর্মের মধ্যে এটাই পার্থক্য।’
‘তাহলে তো আমাদের ধর্মে ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই নেই, কিন্তু কেন…।’
কথা শেষ করতে পারলো না ব্রুনা।
একটা গাড়ি এসে আহমদ মুসাদের গাড়ির পাশে দাঁড়াল।
ব্রুনা কথা শেষ না করেই সেদিকে তাকাল।
গাড়ি থেকে নামল সুবেশধারী একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক।
ভদ্রলোককে দেখেই ব্রুনা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল, ‘বাবা তুমি? এখানে?’
বলে ছুটে গিয়ে ব্রুনা তার পিতার কাঁধ আঁকড়ে ধরে পাশে দাঁড়াল।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক ব্রুনার পিতা আলদুনি সেনফ্রিড।
আলদুনি সেনফ্রিড ‘ভালো আছ মা’ বলে মেয়ে ব্রুনার পিঠ চাপড়ে আহমদ মুসার দিকে এগোলো।
আহমদ মুসাও এগিয়ে আসছিল।
আহমদ মুসা ও আলদুনি সেনফ্রিড হ্যান্ডশেক করল। হ্যান্ডশেক করেই আলদুনি সেনফ্রিড বলে উঠল, ‘ওয়েলকাম মি. আহমদ, প্রথমে আমার কৃতজ্ঞতা আপনাকে জানাতে চাই, আমি ব্রুনার কাছে সব শুনেছি। মনে হচ্ছে, খোদ ঈশ্বর আপনাকে পাঠিয়েছেন।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আমরা আপনারই অপেক্ষা করছিলাম। ঠিক সময়ে এসেছেন আপনি।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা ছুটে এসে তার পিতা ও আহমদ মুসার সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘বাবা, এই সময় তোমার এখানে আসার কথা ছিল?’
বলেই ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, আমাকে তো কিছু বলেননি?’
‘একটু সারপ্রাইজ দেয়া আর কি!’ একটু হেসে আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু পথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা কেন? বাসায় করা যেত না?’ ব্রুনা বলল।
‘তোমার বাসার উপর যে শক্রর চোখ থাকবে, সেটা খুবই স্বাভাবিক।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা মুহূর্ত কাল আহমদ মুসার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার, সত্যিই আপনি বিস্ময়। আপনি কিছুক্ষণ আগে ছিলেন সমাজ-দর্শন নিয়ে একজন ভাবুক মানুষ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনি একজন প্রফেশনাল গোয়েন্দা!’
একটু থামল। থেমেই তার পিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আব্বা, তুমি তো চিনেছই ইনি আহমদ মুসা। তুমি বলেছ, এঁকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন। কিন্তু সিলেকশন আমার বোনের। আব্বা, আমি আমার বোনের জন্যে গর্বিত যে, সে বিস্ময়কর এক মানুষকে সিলেক্ট করেছেন এবং রাজী করিয়েছেন আমাদের সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু আমি…।’
আহমদ মুসা ব্রুনাকে থামিয়ে দিয়ে একটু শক্ত কন্ঠে বলে উঠল, ‘ব্রুনা, এ ধরনের প্রশংসা ভালো জিনিস নয়। যেটুকু যার যোগ্যতা, সেটুকু তার আল্লাহর দেয়া। প্রশংসা করলে আল্লাহরই করা উচিত। যাক, আসল কথায়…।’
‘স্যরি স্যার। আমি…।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই কথা বলা শুরু করেছিল ব্রুনা।
‘প্লিজ ব্রুনা, আমি কথা বলতে শুরু করেছি।’ ব্রুনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার মুখে স্বচ্ছ হাসি।
আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ব্রুনা। তার চোখে-মুখে কিছুটা বিব্রত ভাব।
‘জনাব সেনফ্রিড, আপনাকে আমি বলেছি আজই আমরা ব্রুমসারবার্গ যাত্রা করব। যাবার পথ সম্পর্কে আপনার চিন্তা বলুন।’
‘কিন্তু আহমদ মুসা ব্রুমসারবার্গে যাওয়া কি আমাদের জন্যে ঠিক হবে? ওটা তো এখন শত্রুর গুহা!’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘যেখানে কাহিনীর শুরু সেখানে গিয়েই কাহিনীর জট খুলতে হয় মি. সেনফ্রিড।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কাহিনীর জটটা কি মি. আহমদ মুসা?’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘কারিনা কারলিন আপনার স্ত্রী, কেন কারিনা কারলিনের মত নয়? যদি উনি কারিনা কারলিন না হন, তাহলে তিনি কে? আসল কারিনা কারলিন মানে আপনার আসল স্ত্রী তাহলে কোথায়? হুবহু একই চেহারার! বয়সের কিছুটা পার্থক্য ছাড়া, দুই কারিনা কারলিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, এর রহস্যটা কি? ইত্যাদি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এসব কথা ব্রুনা ইতিমধ্যেই আপনাকে বলেছে?’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘না মি. সেনফ্রিড, গৌরী মানে আপনার মেয়ে আনালিসা অ্যালিনার ডাইরি থেকে আমি জেনেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডাইরি থেকে? সে কিছু বলেনি?’ জিজ্ঞাসা আলদুনি সেনফ্রিডের।
‘তার সাথে এ ধরনের কথা হওয়ার মত সম্পর্ক তার মৃত্যু পর্যন্ত হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
আলদুনি সেনফ্রিডের চোখে-মুখে বিস্ময় নামল! বলল, ‘তাহলে অ্যালিনা আপনাকে দায়িত্ব দিল কখন? কি দায়িত্ব তাহলে আপনি নিলেন?’
‘দায়িত্ব সে দেয়নি। দায়িত্ব তার কাছ থেকে আমি নেইনি।’ আহমদ মুসা বলল।
চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেল আলদুনি সেনফ্রিডের। বলল, ‘ব্রুনা তো এটাই বলল! আমিও তাই বুঝেছি। আর দায়িত্ব না দিলে, দায়িত্ব না পেলে আপনি এলেন কেন এখানে?’
‘মুমূর্ষ গৌরী মানে আনালিসা অ্যালিনা তার জ্যাকেটের পকেটে তার ডাইরির কথা আমাকে বলে সে ডাইরিটা আমাকে পড়তে অনুরোধ করেছিল। তার ডাইরি পড়েই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মানে আপনি নিজের থেকেই এই দায়িত্ব নিয়েছেন!’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘হ্যাঁ, আমি নিজের থেকেই নিয়েছি। তবে গৌরী আশা করেছিলেন, দায়িত্ব আমি নিই। তা না হলে ডাইরির শেষ কথাগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন কেন? আরেকটি বিষয়, আমি গৌরীর কাছে ঋণী। উনি আমার শত্রুপক্ষের একজন শীর্ষ ব্যক্তি হয়েও আমার কঠিন দু:সময়ে অযাচিতভাবে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন এবং সর্বশেষে নিজের জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন।’
আলদুনি সেনফ্রিডের চোখে-মুখে বিস্ময়! বলল, ‘কেন তা করেছে অ্যালিনা?’
‘হয়তো নীতিগত কারণে। আমার অবস্থানকে সে ঠিক মনে করেছে। এ নিয়ে কোন কথা বলার সুযোগ তার সাথে কখনও হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করে মুহূর্ত থেমেই আবার বলে উঠল আহমদ মুসা, ‘যাক, এসব মি. সেনফ্রিড, জরুরি কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।’
আবার একটু থামল আহমদ মুসা। বলল পরক্ষণেই, ‘আসুন, আমরা গাড়িতে বসে কথা বলি।’
আলদুনি সেনফ্রিড তার ভাড়া করা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল।
আহমদ মুসা এসে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল। আলদুনি সেনফ্রিড ও ব্রুনাকে বসতে বলল পেছনের সিটে।
আহমদ মুসা সামনের দুই সিটের ফাঁকে আলদুনি সেনফ্রিডদের দিকে ফিরে বসেছে। সেই কথা শুরু করল। বলল, ‘আমরা এখনি ব্রুমসারবার্গে যাত্রা করব। যাওয়ার রুট ও সমস্যা সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন।’
সালজবার্গ থেকে ব্রুমসারবার্গে যাওয়ার কয়েকটা রুটের বিবরণ দিয়ে আলদুনি সেনফ্রিড বলল, ‘যাওয়ার পথে এমনিতেই কোন সমস্যা দেখি না। আপনি কোন ধরনের সমস্যার কথা বলছেন?’
‘ইমিগ্রেশন চেক-পয়েন্টে কোন সমস্যার আশংকা আছে কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওখানে ন্যাশনাল আইডি দেখানোই যথেষ্ট। আর কোন সমস্যা ওখানে নেই। আপনি কি অন্য কোন সমস্যার কথা বলছেন?’ বলল সেনফ্রিড।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেও কিছু না বলে চুপ করে গেল। বলল, ‘চলুন, এবার আমরা যাত্রা করতে পারি।’
‘মি. আহমদ মুসা গাড়িটা কার? ব্রুনার তো নয় নিশ্চয়!’ বলল আলদুনি সেনিফ্রিড।
‘গাড়িটা আমার। কিনেছি। একটা রেন্ট-এ-কার কোম্পানিতে রেজিস্টার্ড। আর আমার পরিচয় আমি এ গাড়ির কমার্শিয়াল ড্রাইভার। আপনারা আমার যাত্রী। ওকে?’ আহমদ মুসা বলল।
আলদুনি সেনফ্রিড ও ব্রুনার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে! আহমদ মুসার মত এত বড় মানুষ, তাদের পরিবারের আজকের আশা-ভরসারস্থল আহমদ মুসা তাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার হয়ে গেল। আর এসব সে করল কখন, ভেবেই পেল না তারা।
স্তম্ভিত সেনফ্রিড ও ব্রুনা কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলো না। নিরবতা ভেঙে কথা বলল সেনফ্রিড, ‘সত্যি অবাক হওয়ার মত কথা আপনি বললেন। কিন্তু কমার্শিয়াল ড্রাইভারের জন্যে কমার্শিয়াল লাইসেন্স দরকার। আপনি লাইসেন্স পাবেন কোথায়?’
‘আমি অস্ট্রিয়াতে এসেই কমার্শিয়াল ইউরো ড্রাইভিং লাইসেন্স করে নিয়েছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে সবই আপনার আগাম পরিকল্পনার ফল!’ চোখ কপালে উঠেছে আলদুনি সেনফ্রিডের।
ব্রুনার মুখে এবার বিস্ময় নয় আনন্দে উজ্জ্বল! তার মনে অনেক কথার আকুলি-বিকুলি, তার অ্যালিনা আপা অনেক বড় দিলের ছিল। অনেক বড় না হলে এত বড় মানুষকে কাছে টানলেন কি করে! ব্রুনার সৌভাগ্য এমন মানুষকে সে কাছে পেয়েছে।
আলদুনি সেনফ্রিড বিস্ময়জড়িত কন্ঠেই বলল, ‘কিন্তু আহমদ মুসা আপনার পাসপোর্টে পেশা হিসাবে কি লেখা আছে?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার পেশা আমার পাসপোর্টে লিখে নিয়েছি শখের গোয়েন্দাগিরি। গোয়েন্দারা তার প্রয়োজনে যে কোন ছদ্মবেশ নিতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গোয়ান্দারা নিজের দেশে ও বাইরেও পরিচয় গোপন করে কাজ করে। কিন্তু আপনি পাসপোর্টে যে পরিচয় লিখেছেন, সরকার অসুবিধা করবে না?’ বলল ব্রুনা। তার চোখে-মুখে কিছুটা উদ্বেগ।
‘সে অসুবিধা যাতে না হয়, এ জন্যে আমি ইউরো ভিসা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সত্যিই এক বিস্ময় আপনি! অদ্ভুত দূরদর্শিতা আপনার! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, আপনাকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি। সত্যি, যাদের কেউ থাকে না, ঈশ্বর তাদের এভাবেই সহায় হন। কৃতজ্ঞ আমরা আপনার কাছে।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড। তার কন্ঠ ভারি।
‘আপনি গৌরী ও ব্রুনার পিতা। আমারও পিতৃস্থানীয়। আমাকে দয়া করে ‘তুমি’ বলবেন।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। বিনয়ের দিক দিয়েও তুমি মনে হয় সবার সামনে থাকার মত। আসলে যে মানুষকে সম্মান দেয়, সে সকলের সম্মান পায়। বুঝতে পারছি পৃথিবীতে তোমার এত সম্মান কেন? জানি, আমি এখানে আসার আগে তোমার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। ইন্টারনেট সার্চ করে তোমার সম্পর্কে তথ্যের ভাণ্ডার পেয়েছি। তারপর থেকেই মনে একটা ভয়েরও সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্যে ঈশ্বর যখন তোমার মত একজন বিশ্বব্যক্তিত্বকে বাছাই করেছেন, আমাদের সমস্যাও তাহলে নিশ্চয় বিশ্বমাপের মত জটিল কিছু হবে! এরপর থেকেই আমার উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বেড়ে গেছে। এরপর আবার আমরা ব্রুমসারবার্গ যাচ্ছি। কিন্তু ওখানে গেলেই তো আমরা ওদের চোখে পড়ে যাব, ধরা পড়ে যাব!’ বলল সেনফ্রিড।
‘ঘটনার গোড়ায় পৌঁছার জন্যে ঘটনাস্থলে যেতে হবে জনাব। আমরা অবশ্যই সাবধান থাকবো। ব্রুমসারবার্গ দুর্গ এলাকাতেই আমরা বাসা ভাড়া নেব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ওখানে তো সবাই আমাদের চেনে?’ বলল সেনফ্রিড।
‘চেনা জায়গা ও লোকে চেনে বলেই আমাদের সাবধানতাটা ভালো হবে। চিন্তা নেই।’
বলেই ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। বলল, ‘আর দেরি নয়, যাত্রা শুরু করি এবার।’
চলতে শুরু করল গাড়ি।
গাড়ির লক্ষ সালজবার্গ-মিউনিখ হাইওয়ের বর্ডার চেকপোস্ট।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক ও বিদেশী পর্যটকদের চেকপোস্টে সামান্য কিছু ফর্মালিটি সারতে হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের আইডি দেখা হয় এবং বিদেশীদের দেখা হয় ইউরো ভিসা আছে কি না।
পুলিশের রুটিন ডিউটিও থাকে চেকপোস্টে।
শুরু থেকেই আহমদ মুসার মনে একটা স্থির বিশ্বাস ছিল যে, শত্রুরা চেকপোস্টে চোখ রাখবে। নিশ্চয় জার্মানি যাওয়ার সব চেকপোস্টেই ওরা চোখ রাখার ব্যবস্থা করেছে।
দেখা যাক তারা কোন পথে হাঁটে। চেকপোস্টে তাদের কোন উপস্থিতি টের পাওয়া যেতে পারে। চলছে গাড়ি।
অস্ট্রিয়ার বর্ডার ক্রস করে সালজবার্গ-মিউনিখ হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসার গাড়ি।
চেকপোস্টে কিছুই ঘটেনি।
কেউ তাদের উপর চোখ রেখেছে, কেউ তাদের দেখছে, এমনটাও মনে হয়নি।
কিন্তু আহমদ মুসার মনে অস্বস্তি। এমনটা হবার কথা নয়। শত্রুরা তাদের পিছু ছাড়বে তা হতেই পারে না। তাহলে গোটা দিন শহরেও তাদের কেউ ফলো করলো না, আবার চেকপোস্টেও তারা পাহারায় নেই কেন? ওরা আট-দশজন গ্রেপ্তার হবার পর ওদের লোক কি সালজবার্গে আর নেই? হতেও পারে। তবে এটা স্বাভাবিক নয়।
গাড়ি চলছিল সীমান্ত পার হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে।
সামনে বড় শহর মিউনিখ।
‘আমরা কি মিউনিখ, স্টুটগার্ট, হাইডলবার্গ হয়ে রাইনের দিকে যাচ্ছি?’ জিজ্ঞাসা করল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘হ্যাঁ, এ রাস্তা হয়েও যাওয়া যায়। ওদিকে আমার একটা পরিচিত শহর আছে। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবও ওখানে আছে। তাই তো প্রায় ভুলেই ছিলাম ওদের কথা!’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোন শহর?’ জিজ্ঞাসা করল ব্রুনা।
‘স্ট্রাসবার্গ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্ট্রাসবার্গ? কবে এসেছিলেন ওখানে? বেড়াতে এসেছিলেন?’
‘দু’তিন বছর আগে এসেছিলাম। বেশ বেড়ানো হয়েছিল। তবে আসাটা বেড়ানোর জন্যে ছিল না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তোমার আসাটা বেড়ানোর জন্যে হতেই পারে না। কি জন্যে এসেছিলে?’ সেনফ্রিড বলল।
‘টুইন টাওয়ারের ধ্বংস বিষয়ে একটা খোঁজে।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা ও সেনফ্রিড দু’জনেই বিস্ময়ের দৃষ্টি তুলল আহমদ মুসার দিকে। ব্রুনাই আগে কথা বলল, ‘ও গড, ঠিকই তো! টুইন টাওয়ার রহস্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটনের সাথে আহমদ মুসার নাম পড়েছি! সেই কাহিনীর তো স্ট্রাসবার্গেই শুরু! ভুলেই গিয়েছিলাম এ কাহিনী। আমার মনে হয় স্যার, এই এক ঘটনাই আপনাকে অমর করে রাখবে।’ থামল ব্রুনা।
তার চোখে মুখে উপচে পড়া বিস্ময় ও আনন্দের ঝলক! আনন্দের আলোতে তার রক্তিম ঠোঁট আরও রক্তিম এবং নীল চোখ দু’টি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ব্রুনা থামলেই তার পিতা আলদুনি সেনফ্রিড বলল, ‘আমিও ইন্টারনেটে টুইন টাওয়ারের কাহিনী পড়েছি। টুইন টাওয়ারের ধ্বংস যেমন বিস্ময়কর, তোমার কাহিনীও তেমনি অবাক ও বিস্ময়ের। ধন্যবাদ আহমদ মুসা তোমাকে।’
‘স্বপ্নও বোধ হয় এত সুন্দর হয় না, সারা জীবন চাইলেও বাস্তবে পাওয়াটা এতটা অকল্পনীয় হয় না। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান বাবা।’ বলল ব্রুনা। আবেগজড়িত তার ভারি কন্ঠ।
এসব কোন কথাই আহমদ মুসার কানে প্রবেশ করেনি। তার সমস্ত মনোযোগ সামনের রাস্তা ও গাড়ির রিয়ারভিউয়ের দিকে। সে মিউনিখ ছাড়ার পর থেকেই লক্ষ করছে একটা সেভেনসিটার মার্ক পাজেরো তার পেছনে পেছনে আসছে। এটা দেখতে পাওয়ার পর থেকে লক্ষ করছে গাড়িটার গতির কোন পরিবর্তন নেই।
আহমদ মুসা রিমোর্ট ভিউ মাইক্রো গগলস (RVMG) পরে নিয়েছিল। সে পরিস্কার দেখছে গাড়িতে ছয়জন আরোহী। গাড়ির গতি ও আরোহীদের চেহারা দেখে সন্দেহ হয়েছিল আহমদ মুসার। সন্দেহ সত্য হলে ওদের মতলব কি? ওরা অত দূর থেকে ফলো করছে, কেন? ওদের টার্গেট কি তাহলে এটা দেখা যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোথায় উঠছি তা চিহ্নিত করা এবং হতে পারে তা পাহারায় রাখা। তার মানে আমাদের গন্তব্য পর্যন্ত ওরা আমাদের অনুসরণ করবে।
মনে মনে হাসল আহমদ মুসা। ভাবল, সামনে স্টুটগার্ট শহর বাইপাস নয়, শহরের ভিতর দিয়ে পার হতে হবে। এই শহরের মধ্যেই ওদের ধাঁধায় ফেলে পেছনে থেকে ওদের সরাতে হবে।
পেছনে সেনফ্রিডের লক্ষ করে বলল, ‘মি. সেনফ্রিড মনে হচ্ছে, আমাদের পেছনে ওরা লেগেছে। অনেকক্ষণ ধরে একটা গাড়ি আমাদের ফলো করছে।’
‘ওরা কি আমাদের সেই শত্রুরাই হবে?’
বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
উদ্বেগে ছেয়ে গেছে সেনফ্রিড ও ব্রুনার মুখ।
‘আমি সে আশংকাই করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা কি করতে চায়? আমাদের এখন কি করনীয়? কি ভাবছেন আপনি স্যার?’ বলল ব্রুনা। ভীতি নেমে এসেছে তার চোখে-মুখে।
‘জানি না ওদের পরিকল্পনা কি ধরনের। আমি ভাবছি, স্টুটগার্ট শহর অতিক্রমের সময় ওদের বোকা বানিয়ে ভিন্ন রাস্তা ধরে চলে যেতে পারব।’ আহমদ মুসা বলল।
স্টুটগার্ট শহর সামনেই।
সামনে ছোট কয়েকটা পাহাড়। পরস্পর বিচ্ছিন্ন, একটু দূরে দূরে। এই পাহাড়গুলোর মাঝেই চার রাস্তার একটা গ্রন্থি আছে। এখান থেকে ডান দিকে একটা রাস্তা সোজা উত্তরে ব্যাভেরিয়ার উজবার্গের দিকে চলে গেছে। বাঁ দিকের রাস্তাটা দক্ষিণ দিকে কনস্ট্যান্স সীমান্ত শহর হয়ে সুইজারল্যান্ডে চলে গেছে। আর একটা সোজা রাস্তা পশ্চিমে এগিয়েছে। এ রাস্তা ধরে এগোলে সামনেই স্টুটগার্ট।
আহমদ মুসার দৃষ্টি সামনের পাহাড়গুলোর দিকেই নিবদ্ধ ছিল। দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে গাড়ির রিয়ার ভিউয়ের উপর চোখ ফেলেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল পেছনের সেই গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে আসছে প্রায় ডবল স্পীডে।
হঠাৎ স্পীড ওরা বাড়াল কেন?
আহমদ মুসাও তার গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল।
পাহাড় এলাকায় প্রবেশ করেছে গাড়ি। কখনও পাহাড়ের পাশ দিয়ে, কখনও পাহাড়ের দূর দিয়ে এগোচ্ছে।
ছোট একটা পাহাড়ের সারির গিরিপথ দিয়ে আড়াআড়ি পার হয়ে পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছতেই রাস্তার চৌমাথা নজরে এল।
চৌমাথার তিন পাশের রাস্তাও নজরে এল আহমদ মুসার। চমকে উঠল আহমদ মুসা। তিন রাস্তাতেই তিনটা মাইক্রো চৌমাথার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। চৌমাথা থেকে মাইক্রোগুলোর দূরত্ব একশ গজের বেশি হবে না।
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না, কেন পেছনের গাড়িটা এত দ্রুত এগিয়ে আসছে। পেছনের গাড়িটা সংকীর্ণ গিরিপথটা আটকে রাখার জন্যে এগিয়ে আসছে। এই চৌমাথায় ফাঁদে ফেলার সফল পরিকল্পনা তারা করেছে।
‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আমাদের ওরা ফাঁদে ফেলেছে। দেখুন তিনটা মাইক্রো তিন রাস্তায় আমাদের পথ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর পেছনে ফেরার পথ বন্ধ করে পেছন থেকে আরেকটা গাড়ি এগিয়ে আসছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সেনফ্রিড ও ব্রুনা আগেই লক্ষ করেছিল দাঁড়ানো তিন মাইক্রোকে। চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে এল ব্রুনা ও সেনফ্রিডের। উদ্বেগ-আতংকে বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছে তাদের চোখ। শুকনো ঠোঁট তাদের কাঁপতে শুরু করেছে। কথা বলার শক্তি যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। ওদের হাতে পড়ার অর্থ কি তারা জানে। সেনফ্রিড মৃত্যুকে ভয় করে না। তার চিন্তা ব্রুনাকে নিয়ে। আর ব্রুনার মনের মধ্যে তোলপাড়, এদের হাতে পড়ার চেয়ে মৃত্যু ভালো।
আহমদ মুসা কথা শেষ করেই ব্যাগ থেকে লেজারগান বের করে পাশে রাখল। রিভলবার আগেই বের করে রেখেছিল।
আহমদ মুসা গাড়ির স্পীড কোন পরিবর্তন আনেনি। সে বোঝাতে চায় মাইক্রোগুলোকে সে সন্দেহ করেনি।
আহমদ মুসা শক্ত হাতে ধরেছে স্টিয়ারিং হুইল। পেছনে না তাকিয়েও বলল আহমদ মুসা, ‘মি. সেনফ্রিড, ব্রুনা, সিটে শুয়ে পড়ুন।’ আহমদ মুসার কন্ঠ শক্ত, তাতে নির্দেশের সুর।
আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে মাইক্রোগুলো তাকে বুঝে ওঠার আগেই তাকে ওদের ফাঁদকে ভাঙতে হবে।
আহমদ মুসা তার গাড়ির ডানে ও বামে ঘোরার দুই ইন্ডিকেটরই জ্বালিয়ে দিয়েছে, যাতে ডান-বাম দুই দিকের মাইক্রোই এক সাথে বুঝে যে, আহমদ মুসার গাড়ি তার দিকেই টার্ন নিচ্ছে। এর ফলে ওরা সামনে এগোবার চেষ্টা না করে আক্রমণের প্রস্তুতি নেবে।
এভাবে আহমদ মুসা চৌরাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে চলল।
পশ্চিমের মাইক্রোটি চৌরাস্তার মোড় থেকে একশ গজের মত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে মোড় থেকে সামনে এগোবার সংগে সংগেই মাইক্রোগুলো আহমদ মুসার কৌশল ধরে ফেলে। ডান-বামের মাইক্রো দু’টো থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হয়েছে আহমদ মুসার গাড়ির লক্ষ্যে এবং সেই সাথে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে চলতেও শুরু করেছে। আর সামনের মাইক্রো স্থির দাঁড়িয়ে থেকেই গুলি বর্ষণ শুরু করেছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আহমদ মুসার গাড়ির উইন্ড শীল্ড, জানালার কাচ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
এখানে রিভলবার দিয়ে আহমদ মুসার করার কিছু নেই। আর তার লেজারগান ৩০ গজের বেশি দূরে তেমন কার্যকরি নয়। স্টিয়ারিং ধরা ডান হাতে ‘লেজারগান’ রেখে দূরত্ব কমার অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
বেপরোয়া গতিকে সবাই ভয় করে। আহমদ মুসার সামনের মাইক্রোর নাক বরাবর আহমদ মুসার গাড়ির পাগলের মত গতি দেখে মাইক্রোর সবাই তাড়াতাড়ি নেমে পড়ে এক পাশে নিরাপদে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে আহমদ মুসার গাড়ি লক্ষে গুলি করছিল।
মাইক্রোর আরোহীরা নেমেছিল রাস্তার দক্ষিণ পাশে মাইক্রোর আড়ালে। জায়গাটা রাস্তার দক্ষিণ প্রান্তেরও বাইরে।
আহমদ মুসা রাস্তা ও মাইক্রোর অবস্থানটা একবার দেখে নিয়ে মাথা স্টিয়ারিং হুইলের লেভেল থেকেও নিচে নামিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালাচ্ছিল। তার চোখ ডাইরেকশন ই্ন্ডিকেটরের দিকে। ইন্ডিকেটরের কাঁটারে সে অনড় রেখেছিল।
এই ইন্ডিকেটরই এখন তার জন্যে ফ্রন্ট ভিউ-এর কাজ করছে। আহমদ মুসার হিসাব, গাড়ির এই ডাইরেকশন ঠিক থাকলে তার গাড়ির সামনের গার্ডারের বাম প্রান্ত তীব্র গতিতে আঘাত করবে সামনের মাইক্রোর সামনের দিকের গার্ডারের বাম প্রান্তকে ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে। তার ফলে তার গাড়ি চাপা ধরনের একটা প্রবল ঝাঁকানি খেলেও আহত গার্ডার নিয়ে সামনে এগোবে। কিন্তু গোটা মাইক্রোটা এক পাক খেয়ে উল্টে গিয়ে পাশের লোকদের উপর পড়বে।
ঝড়ের বেগে গাড়ি চলছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা ১৬০ কি. মি. অতিক্রম করে থর থর করে কাঁপছে।
আহমদ মুসার মনোযোগ ছিল সামনে থেকে ছুটে আসা গুলির ডাইরেকশনের দিকেও। গাড়িতে গুলির আঘাতের শব্দ শুনে নিরূপণ করছিল আহমদ মুসা শত্রুপক্ষের অবস্থানের পরিবর্তন।
আহমদ মুসা শুনছে, সামনের গুলি ক্রমশই গাড়ির বাম পাশের দিকে সরছে। প্রথমে গাড়ির সামনে, তারপর গাড়ির সামনের বাম কোন অঞ্চল, পরে গাড়ির বাম জানালার সামনের দিকে সরে এল গুলির আঘাত।
সামনের গুলির আঘাত জানালার পেছন দিকে সরে আসতেই আহমদ মুসা বুঝল চরম মুহূর্ত উপস্থিত।
আহমদ মুসা ‘আল্লাহু খাইরুল হাফেজীন’ বলে স্পিড বাড়িয়ে মাথা তুলে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং হুইল চেপে ধরল।
আহমদ মুসার গাড়ির গার্ডারের বাম প্রান্ত প্রচণ্ড ছোবল মারল মাইক্রোর মাথার বাম পাশকে।
প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল আহমদ মুসার গাড়ি। কিন্তু প্রচণ্ড ধাক্কায় মাইক্রো সরে যাওয়ায় ধাক্কার প্রবল ‘পুশ’টা শতভাগ জেঁকে বসল মাইক্রোর উপর এবং তার ফলে খেলনার মত পাক খেয়ে উল্টে গেল গাড়ি।
আপনাতেই দু’চোখ বুজে গিয়েছিল। নিজের সব কাজ শেষ করে পরিণতির ভার সবটাই তুলে দিয়েছিল আল্লাহর হাতে।
আল্লাহ সাহায্য করেছেন। আহমদ মুসার গাড়ি থেমে যায়নি, বেঁকে যায়নি বা উল্টে যায়নি।
প্রচণ্ড ধাক্কায় আহমদ মুসা একবার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারপর পেছন দিকে ছিটকে সেঁটে গিয়েছিল সিটের সাথে। কিন্তু আহমদ মুসার দু’হাত কিন্তু গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ছাড়েনি, নড়াচড়া করতে দেয়নি স্টিয়ারিং হুইলকে।
তার দেহ স্থির হতেই আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ ও স্পিড কমিয়ে এনে গাড়িকে একিউট টার্ন করাল।
এবার আহমদ মুসার সামনে এল উল্টে যাওয়া মাইক্রো, তার লোকরা ও এদিকে ছুটে আসা অন্য দুই মাইক্রো।
উল্টে যাওয়া মাইক্রোর লোকেরা নিজেদের সামলে নিয়ে এদিকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। আহমদ মুসা নতুন করে ওদের গুলির মুখে পড়ার আগেই ওদের নিষ্ক্রিয় করে দিতে চাইল।
ডান হাতের লেজারগানটাকে আহমদ মুসা মাটির সমান্তরালে ওদের উপর দিকে ঘুরিয়ে নিল।
সংগে সংগেই ওদের ৬ জনের হাঁটুর নিচের অংশ খসে পড়ল। আর্তনাদ করে ওরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ছুটে আসা দুই মাইক্রোও এসে পড়েছিল একটার পেছনে আরেকটা। ওরা উল্টে যাওয়া ও আহত লোকগুলোর বরাবর এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। সম্ভবত মাইক্রোর লোকরা তাদের ছয়জন সাথীর অবস্থা দেখতে পেয়েছে।
আহমদ মুসা তার লেজারগান সামনে এসে দাঁড়ানো দুই মাইক্রোর সামনেরটার দিকে ঘুরিয়ে নিল। লেজারগান থেকে সামনের মাইক্রোর মাথা লক্ষে একবার হরিজন্টালি, একবার ভার্টিকালি ফায়ার করল। মাইক্রোর মাথা চারটা আলাদা খণ্ডে ভাগ হয়ে গেল।
মাইক্রোর ড্রাইভিং সিট ও তার পাশের সিটের লোকের কি অবস্থা হলো জানা গেল না। পেছনের সিটের লোকরা চিৎকার করে গুলি করতে করতে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।
আহমদ মুসা গুলির জবাব না দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ওদের দিকে চলতে শুরু করল। গুলি করতে করতেই ওরা ছুটে পালাল গাড়ির আড়ালে, গাড়ির পেছনে।
আহমদ মুসা এবার সামনের মাইক্রোটির পেছনের দক্ষিণ পাশের কোনার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খাড়াভাবে লেজারগানের ফায়ার করল।
খসে পড়ল গাড়ি থেকে কোনাটা।
মাইক্রোর পেছনে দাঁড়ানো আতংকিত লোকগুলো ছুটে গিয়ে পেছনের দ্বিতীয় মাইক্রোতে উঠল। ওরা ও দ্বিতীয় মাইক্রো আহমদ মুসার লেজারগানের রেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। আহমদ মুসা ইচ্ছা করলে পালানোরত লোকগুলো ও পেছনের দ্বিতীয় মাইক্রোকে তার লেজারগানের শিকার বানাতে পারতো। কিন্তু আহমদ মুসা মানুষ মারতে চায় না। ওদের ভয় দেখিয়ে পালাতে বাধ্য করে নিজেদের নিরাপদ করতে চায়।
পালানো পেছনের লোকরা দ্বিতীয় মাইক্রোতে গিয়ে ওঠার সংগে সংগেই মাইক্রোটি দ্রুত পেছনে হটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা সিটে সোজা হয়ে বসে পেছনে ব্রুনাদের দিকে চাইল। দেখল, তারা সিট আঁকড়ে সিটের উপর পড়ে আছে। ভাঙা কাচের অজস্র টুকরায় তাদের গা ভর্তি। গাড়ির গায়ে লেগে বা অন্য কোনভাবে সিটকে পড়া কিছু বুলেটও আহমদ মুসা গাড়ির ফ্লোরে এদিক-ওদিক পড়ে থাকতে দেখল। সিটে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ওরা।
‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আপনারা ঠিক আছেন তো? এবার উঠুন। আমরা আপাতত নিরাপদ।’ বলল আহমদ মুসা ওদের লক্ষ করে।
ব্রুনা, সেনফ্রিড উঠল।
তাদের গা থেকে ঝরে পড়ল কাচের টুকরাগুলো।
ভীত, বিপর্যস্ত তাদের চেহারা। তারা তাকাল চারদিকে। দেখল উল্টানো মাইক্রো, একটা গায়েব হওয়া আহতদেরও দেখতে পেল। দেখল মাথা কাটা মাইক্রো, একটা মাইক্রোর ব্যাক ড্রাইভ করে পালানোর দৃশ্যও দেখল।
তাদের চোখ ঘুরে এল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসার দৃষ্টি তখন পাজেরোর দিকে, যে গাড়িটা আহমদ মুসাদের পেছনে ছুটে আসছিল।
উপত্যকায় ঢুকেও গাড়িটা বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসছিল একাধিক স্টেনগান থেকে গুলি বৃষ্টির একটা দেয়াল সৃষ্টি করে। কিন্তু তাদের গুলি বৃষ্টির একটা অংশকে আড়াল করছিল পেছনে অগ্রসরমান মাইক্রোটি, অন্য আরেক অংশকে ব্লক করছিল রাস্তার পাশে উল্টে থাকা মাইক্রো। এই দুই মাইক্রোর ফাঁক গলিয়ে কিছু গুলি আসছে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসা ব্রুনা ও সেনফ্রিডকে মাথা নিচু করে সাবধান হতে নির্দেশ দিয়ে গাড়িটাকে উল্টে থাকা মাইক্রোর দিকে একটু সরিয়ে নিয়ে এল। তার গাড়ির পেছনটা মাইক্রোর আড়ালে চলে গেল। সামনেটা গুলির মুখে পড়লেও গোটা পাজেরো আহমদ মুসার নজরে এল।
ছুটে আসছে পাজেরো বেপরোয়া গতিতেই। তাদের সামনের মাইক্রো এবং তাদের কিছু সাথীর পরিণতি তারা জানতে পারেনি। পাজেরোটাকে বেপরোয়া গতিতে আসতে দেখে ব্যাক ড্রাইভ করা মাইক্রোটাও থেমে গিয়েছিল।
পাজেরোটার মতলব বুঝল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার দাঁড়ানো গাড়িকে তারা সরাসরি এসে আঘাত করতে চায়। আহমদ মুসার জাপানি টায়োটার চেয়ে ওদের জার্মান মার্ক পাজেরো অনেক বেশি শক্ত। ও পাজেরোর সামনের কাঠামো ও গার্ডার টয়োটার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি প্রেশার হজম করতে পারে।
ওদের পাজেরোটি পেছনের মাইক্রো অতিক্রম করে চলে এসেছে। গুলিও বেড়েছে। পাজেরোর দু’পাশের জানালা দিয়ে গুলি আসছে। আবার ভাঙা উইন্ডস্ক্রীনের পথেও গুলি আসছে। গুলি করার সহজ সুবিধার জন্যে উইন্ডস্ক্রীন ওরা ভেঙে ফেলেছে।
আহমদ মুসার গাড়ির দিকে গুলির তিনটা স্রোত আসছে। ডানে-বাঁয়ে সমান্তরালে দু’টি স্রোত এবং আরেকটি স্রোত আসছে গাড়ির জানালার বেজ বরাবর উপর দিয়ে। এ তিনের মাঝখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডের মত একটা নো-বুলেট জোন তৈরি হয়েছে। আহমদ মুসা সুযোগ গ্রহণ করল।
আহমদ মুসা গাড়ির সিট থেকে মাথাটা একটু তুলে নো-বুলেট জোনের ঠিক মাঝামাঝি স্থান দেখে লেজারগান দিয়ে শর্ট রেঞ্জের ফায়ার করে একটা হোল সৃষ্টি করল। সে হোলে লেজারগানের ব্যারেল সেট করে লং রেঞ্জের পূর্ণাংগ ফায়ার করল। তিন সেকেন্ড লেংথের একটা ফায়ার।
আহমদ মুসা অনুমান করল লেসার ফায়ারটি পাজেরোর গার্ডারের মধ্যভাগ দিয়ে ঢুকে ইঞ্জিনের মধ্যভাগ বরাবর গোটা চেসিস উড়িয়ে দেবে। তারপর প্রচণ্ড গতির কারণে বড় ধরনের এ্যাকসিডেন্ট ঘটাবে গাড়িটা।
তাই হলো। মুহুর্তে গাড়িটা দুই ভাগে ভেঙে পড়ে প্রচণ্ড এক ওলট-পালট ঘটে গেল। গুলিও বন্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে বসল। দেখল গাড়িটার দৃশ্য। বুঝতে পারল না গাড়ির লোকগুলো কতটা আহত কিংবা বেঁচে আছে কিনা।
ব্রুনা ও তার পিতা সেনফ্রিডও উঠে বসেছে গাড়ির সিটে। তাদেরও চোখে পড়ল দু’ভাগ হয়ে যাওয়া উল্টে-পাল্টে পড়ে থাকা পাজেরোর দৃশ্য। তাদের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়! তাদের মনে হচ্ছে, তারা যেন কোন স্বপ্নের দৃশ্য দেখছে! অথবা যেন ভয়াল-সংঘাতের কোন সিনেমার দৃশ্য। যার নায়ক তাদের সামনে বসে থাকা নিতান্ত এক ভদ্রলোক আহমদ মুসা। ইস্পাতের মত এক ঋজু শরীর ছাড়া সাধারণের চাইতে কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য তার নেই। কিন্তু তবু কী অসাধারণ তিনি! কী অসাধারণ তার আত্নরক্ষা ও প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কৌশল! নিরাশার বিরান ভূমিতে আশার মহীরুহ তৈরি করতে পারেন তিনি।
তাদের দৃষ্টি ঘুরে এসে নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসাও তাকিয়েছে তাদের দিকে।
আহমদ মুসা তাদের দিকে তাকিয়েই বলে উঠেছে, ‘চলুন, আমাদের নেমে পড়তে হবে। এ গাড়ি নিয়ে চলা যাবে না।’
শান্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা।’ বলল সেনফ্রিড।
‘ধন্যবাদ কি জন্য?’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে আহমদ মুসা বলল।
‘স্বপ্নের মত এক ঘটনা বাস্তবে নিয়ে আসার জন্যে।’ বলল সেনফ্রিড।
‘এজন্যে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, আপনারাও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘যখন দেখলাম আমরা বেঁচে আছি, তখন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি। কিন্তু আপনার প্রাপ্য আপনার পাওয়া দরকার।’ বলল সেনফ্রিড।
‘আবার আমি আপনার কাছে ‘আপনি’ হয়ে গেলাম?’ আহমদ মুসা বলল।
‘চেষ্টা করেছি তুমি বলতে। কিন্তু আর পারছি না। আপনি বয়সে আমার ছেলের বয়সের হলেও সম্মান ও মর্যাদায় আপনি অনেক বড়। তুমি বলা মানায় না।’
কথা শেষ করেই সেনফ্রিড বলে উঠল, ‘মি. আহমদ মুসা, ওই মাইক্রো কিন্তু পালিয়ে গেল।’
আহমদ মুসাও তাকাল পলায়নপর মাইক্রোর দিকে। দেখল, মাইক্রোটি চৌমাথা পর্যন্ত গিযে উত্তরের রাস্তা ধরে ছুটছে।
‘যাক। পালাক ওরা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন পালাতে দিলেন?’ বলল ব্রুনা। ভয় ও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার পর এই প্রথম কথা বলল ব্রুনা।
‘ওরা আক্রমণ করতে আসেনি। অস্ত্র সংবরণ করে পালিয়েছে। এ কারণেই ওদের যেতে দিলাম। আমাদের টার্গেট এখন আত্নরক্ষা। আত্নরক্ষার বাইরে কাউকে আক্রমণ করা নয়।’
আহমদ মুসা বলল।
‘পলায়নটা ওদের কৌশল। ওরা তো আক্রমণে আসবেই। কথায় আছে স্যার, শত্রুর শেষ রাখতে নেই।’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু ব্রুনা, আমাদের ধর্ম ইসলাম শত্রুদেরকেও কতকগুলো অধিকার দিয়েছে সেই সপ্তম শতকে। সে অধিকারগুলোর একটি হলো, অস্ত্রত্যাগকারী, অস্ত্র সন্বরণকারী শত্রুকে আঘাত না করা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শত্রুকে অধিকার? আর কি অধিকার দিয়েছে?’ বলল ব্রুনা। বিস্ময় তার চোখে-মুখে!
‘সে অনেক কথা ব্রুনা। এতটুকু জেনে রাখো, বিচার ও সংগত কারণ ছাড়া শক্র ও তার সম্পদের ক্ষতি করাকে ইসলাম অপরাধ হিসাবে গণ্য করে। শক্র-মিত্র নির্বিশেষে সকল আহত ও অসুস্থের সমান চিকিৎসার নির্দেশ দেয় এবং যুদ্ধকালীন অবস্থাতেও শত্রুর ঋণ ও আমানতকে বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা পকেট থেকে সেল ফোন বের করে একটা টেলিফোন করল। সংযোগ পেয়েই বলল, ‘স্যার, আমি তাহিতি থেকে আসা আহমদ…।’
‘আর বলতে হবে না। গলা ঠিক চিনেছি। সব খবর ভালো নিশ্চয় নয়?’ আহমদ মুসাকে শেষ করতে না দিয়ে ও প্রান্ত থেকে বলে উঠল।
‘ঠিক স্যার। বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। আমার গাড়ি তিন মাইক্রো ও একটা বড় পাজেরো টাইপ জীপ ঘেরাও করেছিল। এ নিয়ে ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন সাংঘাতিক আহত। আপনি…।’
‘হ্যাঁ, আমি ওদের চিকিৎসা ও কাস্টডিত নেয়ার ব্যবস্থা করছি। আপনি সুস্থ তো? আপনার সাথে কি ব্রুনার আছে?’ এবারও আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল ওপার থেকে।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি সুস্থ। ব্রুনা ও তার পিতা আমার সাথে আছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম। ওদের অবশিষ্টরা কি পালিয়েছে?’ ওপার থেকে বলল।
‘একটা মাইক্রো নিয়ে অবশিষ্টরা পালিয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি ভাগ্যবান মি. আহমদ। শত্রুর নাগাল আপনি পেয়ে গেছেন। আমি নিশ্চিত। আপনি সফল হবেন।’ ওপার থেকে বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গড ব্লেস ইউ। ওকে, বাই।’ বলে ওপার থেকে কল ক্লোজ করে দেয়া হলো।
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করতেই ব্রুনার পিতা সেনফ্রিড বলল, ‘কার সাথে কথা বললেন, মি. আহমদ মুসা?’
‘জার্মানির পুলিশ প্রধান বরডেন ব্লিস-এর সাথে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি তাঁকে চেনেন?’ জিজ্ঞাসা সেনফ্রিডের।
‘চিনি না, জানি। তিনিও আমাকে জানেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিভাবে? সবে তো আপনি জার্মানিতে প্রবেশ করলেন?’ বলল সেনফ্রিড। তার চোখে-মুখে বিস্ময়!
‘তাহিতির গভর্নর ফ্রান্সিস বুরবনের সাথে পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত তিনি। ফ্রান্সিস বুরবনই আমার ব্যাপারে তাঁকে ব্রিফ করেছেন। আর আপনাদের ‘রাইন ল্যান্ড’ স্টেটের গোয়েন্দাপ্রধান ‘এডমন্ড এড্রিস’ আমাকে জানেন। আমি এখানে আসার আগে তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান মি. দ্যাগল আমার ব্যাপারে তাকে সব বলেছেন। আমি অস্ট্রিয়ায় এসে তাঁর সাথে কথা বলেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা, আপনি জার্মানি আসার আগে অনেক কাজ সেরে এসেছেন। কিন্তু এই ঘটনার কথা আমরা পুলিশকে না জানালেও তো পারতাম।’ বলল সেনফ্রিড।
‘দেশের আইন-শৃঙ্খলার সাথে সংশ্লিষ্ট এটা একটা বড় ঘটনা। পুলিশ তার তদন্তে আমাদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাবেই। সুতরাং আমরা আগে না জানালে আমাদের কাজ অপরাধমূলক বিবেচিত হবে। নিজেদের তখন নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। আগেই বিষয়টা পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ফলে এই ঝামেলায় আমাদের পড়তে হবে না। আর আমি এখানে যে কাজ নিয়ে এসেছি সে সম্পর্কে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত রাখতে চাই। পুলিশপ্রধান বরডেন ব্লিস আমাকে বলেছেন, ‘পুলিশের কাজটাই আমি করছি। সুতরাং আমার কাজের গোপনীয়তা কিছু নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গড ব্লেস ইউ মি. আহমদ মুসা। আপনি আপনার কাজকে মানে আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছেন। আমাদের পরিবার রাহুমুক্ত হবার আশা আরও প্রবল হলো। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন!’ বলল সেনফ্রিড, ব্রুনার পিতা।
‘পুলিশ আসার আগেই আমরা এখান থেকে চলে যেতে চাই। আসুন আমরা উল্টে যাওয়া মাইক্রোটাকে সোজা করে চালু করতে পারি কিনা দেখি।’
বলে আহমদ মুসা গিয়ে মাইক্রোটাকে ধরল।
সেনফ্রিড ও ব্রুনাও দ্রুত গিয়ে মাইক্রো ধরল।
মাইক্রোটি সোজা করে আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে বসে পরীক্ষা করল সব ঠিক আছে।
স্টার্ট নিল মাইক্রোটি।
সেনফ্রিড ও ব্রুনা মাইক্রোতে উঠল।
চলতে শুরু করল মাইক্রোটি পশ্চিমের স্টুটগার্ট শহরের দিকে।

স্টুটগার্ট থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসার সেই মাইক্রো সোজা উত্তরে নেকার নদীর তীর বরাবর হাইওয়ে ধরে হেলব্রোন শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্টুটগার্ট থেকে বেরুবার আগেই আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমরা কি হেলব্রোন, না কারিসু’র পথে যাব।’
উত্তর দিয়েছিল ব্রুনা। বলেছিল, ‘আমরা যদি কারিসু দিয়ে যাই, তাহলে কিছু পাহাড়ী এলাকা পেরিয়ে কারিসু পার হলেই আমরা রাইনের তীরে গিয়ে পৌঁছব। তারপর রাইন তীরের হাইওয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে এগোলে আমরা ব্রুমসারবার্গে পৌঁছে যাব। আর যদি হেলব্রোন হয়ে যান স্যার, তাহলে খরস্রোতা, উচ্ছলা নেকার নদীর ছোঁয়া পাবেন, সেই সাথে পাবেন পর্বতভূমির পাদদেশের সবুজ, মনোহর ঘন বনাঞ্চল, তার ফাঁকে ফাঁকে দেখবেন জার্মানির শান্ত সুন্দর আদি গ্রামগুলো। আরো দেখবেন প্রাচীন জার্মানির একটা বিরান এলাকা। সেখানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষও দেখতে পাবেন। অতীতের স্মৃতিবাহী কিছু পরিবার সেখানে এখনো আছে, যারা জার্মানির সৌন্দর্য ও গৌরব। এখন স্যার, আপনিই পথ বেছে নিন।’
‘ব্রুনা, তোমার পথের বর্ণনাই বলে দিয়েছে কোন্ পথ আমি বেছে নেব। আমি হেলব্রোনের পথেই যাচ্ছি।’ আহমদ মুসা বলেছিল।
গাড়ি কখনো সবুজ ঘন বনাঞ্চল, কখনো ছবির মত সুন্দর গ্রামের স্নিগ্ধ পরশ নিয়ে এগিয়ে চলছিল সামনে। ব্রুনার বর্ণনার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দর এসব দৃশ্য।
প্রাচীন জার্মানির বিরান এলাকায় প্রবেশ করেছে আহমদ মুসার মাইক্রো। হাইওয়েটা ফিরে এসেছে নিকার নদীর তীর বরাবর।
অনেকক্ষণ ধরে আহমদ মুসার কান উৎকর্ণ হয়ে উঠেছিল। দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে। শব্দ আরও স্পষ্ট হলে বুঝতে পারল, শব্দটি হেলিকপ্টারের। কিছুক্ষণ ধরে শব্দের ডাইরেকশন অনুসরণ করে নিশ্চিত বুঝল, হেলিকপ্টারটি তাদের দিকেই আসছে।
আরও কিছু সময় পার হয়ে গেল।
গাড়ি তখন চলছিল এক ফালি ফাঁকা এলাকার উপর দিয়ে।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে দেখল, হেলিকপ্টার অনেকখানি নিচে নেমে এসেছে।
হেলিকপ্টারটি তাদের গাড়ির নাক বরাবর এগিয়ে আসছে। হেলিকপ্টারটি যেন তাদেরকেই টার্গেট করেছে।
হেলিকপ্টারের পরিচয় সম্পর্কে জানার জন্যে গভীরভাবে চাইতে গিয়ে নিচের দিকে উদ্যত মেশিনগানের নল দেখতে পেল। দূরবীনের চোখও নজরে পড়ল আহমদ মুসার।
চমকে উঠল আহমদ মুসা! তাহলে এটা একটা শত্রুপক্ষের হেলিকপ্টার? কিন্তু ওরা আহমদ মুসাদের সন্ধান পেল কি করে? উত্তরও সংগে সংগে পেয়ে গেল। আহমদ মুসারা তো ওদের মাইক্রো ব্যবহার করছে! এই মাইক্রোতে নিশ্চয় মাইক্রোর অবস্থান ও মাইক্রোর কথাবার্তা রিলে করার গোয়েন্দা ট্রান্সমিটার রয়েছে।
বিষয়টা আহমদ মুসার কাছে পরিস্কার হওয়ার সাথে সাথে সে গাড়ির স্পীড আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দিল। তার লক্ষ সামনের এক ফালি খালি জায়গা পার হয়েই ঘন গাছপালার মধ্যে প্রবেশ করা। সামনেই রাস্তার দু’পাশে ঘন গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে রাস্তা। সে রাস্তায় পৌঁছানোই আহমদ মুসার টার্গেট।
হেলিকপ্টারটিও সম্ভবত এটা বুঝতে পেরেছে। হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে দেখতে পাওয়া মেশিনগানের ব্যারেল নড়ে উঠল। নেমে এল এক পশলা গুলি।
আহমদ মুসার মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষ করেছিল ব্রুনা। গাড়ির স্পীড হঠাৎ সপ্তমে উঠায় উদ্বিগ্ন ব্রুনা প্রশ্ন করল, ‘কিছু কি ঘটেছে স্যার?’
‘হ্যাঁ, মাথার উপরে একটা হেলিকপ্টার আমাদের ফলো করছে। মনে হচ্ছে এটা ওদের নতুন আক্রমণ।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই উপর থেকে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হলো। কয়েকটি গুলি মাইক্রোর পেছনে আঘাত করল।
দু’পাশের গাছ মোটামুটি আড়াল সৃষ্টির জন্য ওদের টার্গেট ষোল আনা লক্ষ ভেদ হয়নি।
আহমদ মুসা ব্রুনাদেরকে গাড়ির সিটের নিচে শুয়ে পড়তে বলে গাড়ির জিগজ্যাগ গতি আরও বাড়িয়ে দিল।
‘মি. আহমদ মুসা, আমরা তো হেলিক্টারের সাথে পারবো না। ওরা সহজেই আমাদের টার্গেট করতে পারবে। উপর থেকে ওরা বোমাও ছুঁড়তে পারে।’ বলল সেনফ্রিড। উদ্বেগে তার কন্ঠ কাঁপছে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বিপদের সময় বেশি ভাবতে নেই। সব সময় বিপদের সাথে পরিত্রাণের একটা রাস্তা আল্লাহ রাখেন।’
গাড়ির তীব্র গতির সাথে আহমদ মুসা নদীর একটা খাড়া ও উন্মুক্ত ধরনের স্থান খুঁজছিল। এই সাথে আহমদ মুসা উপরের হেলিকপ্টারের গতি পথও মনিটর করছিল। প্রথমবার গুলি বর্ষণের পর তারা আর গুলিও করেনি। তারা নিশ্চয় একটা উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষা করছে যেখানে তারা সহজেই মাইক্রোটাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। তাছাড়া তাদের ভয়ও আছে গুলাগুলির ব্যাপারটা পুলিশের কানে গেলে তাদের বিপদ হবে। যা করার দ্রুত করে তাদের সরে পড়তে হবে।
যে ধরনের জায়গা খুঁজছিল আহমদ মুসা তা পেয়ে গেল। জায়গাটায় ছোট ছোট আগাছা ছাড়া বড় ধরনের গাছ নেই। নদী পাড়ের রেলিং সেখানে নেই। সম্ভবত ভেংগে যাওয়ার কারণে পুনঃনির্মাণের জন্যে খুলে ফেলা হয়েছে।
আহমদ মুসা জায়গাটা পার হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ব্রেক করে গাড়ি থামাল আহমদ মুসা। দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আপনারা তাড়াতাড়ি নেমে পেছনের ঝোপটায় লুকিয়ে পড়ুন। প্লিজ তাড়াতাড়ি করুন।’
ব্রুনা ও সেনফ্রিড গড়িয়েই গাড়ির দরজা পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছুটল ঝোপের দিকে। ব্রুনা একবার জিজ্ঞাসা করতে চাইল, স্যার আপনি আসবেন না। কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেল না!…
ব্রুনারা নেমে পড়তেই আহমদ মুসা গাড়ি ব্যাক ড্রাইভ করে সেই জায়গায় ফিরে এল। গাড়িটা নদীর পাড়ের প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল আহমদ মুসা। তারপর পেছন থেকে টেনে গাড়িটা নদীতে ফেলে দিয়ে একটু অপেক্ষা করে দেখল গাড়িটা পুরোপুরি নদীতে পড়ল কিনা।
নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা ছুটে এল সেই ঝোপে।
সেখানে পৌঁছেই আহমদ মুসা বলল, ‘মি. সেনফ্রিড, আমাদের আরও পেছনে সরে যেতে হবে। চলুন, পেছনের ঐ টিলায়। টিলায় যথেষ্ট ঝোপ-জংগল আছে আর ওটা বেশ উঁচুও। ওদের গতিবিধি ভালোভাবে দেখা যাবে।’
ছুটল ওরা কিছু দূরের টিলাটার দিকে।
ওদিকে হেলিকপ্টারটি অনেকখানি সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা খেয়াল করে দেখল নিচে রাস্তার উপর সেই গাড়িটা নেই। দ্রুত তারা ফিরে আসে। কিন্তু গাড়িটার দেখা তারা পায় না।
তাড়াতাড়ি হেলিকপ্টারটা হাইওয়ের সেখানকার ছোট সরু বাইলেনটাও চেক করে আসে। কিন্তু গাড়ির দেখা তারা পায় না।
পাগলের মত হেলিকপ্টার চারদিকে ঘুরতে থাকে। এক সময় হেলিকপ্টারটা নদীর উপর স্থির হয়ে দাঁড়ায়। তারপর হেলিকপ্টারটা ধীরে ধীরে ল্যান্ড করল নদীর পাড়ে।
‘ওরা এখন মনে করছে গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট করে আমরা নদীতে পড়ে গেছি। ওরা এখন নিশ্চিত হবার জন্যে নদীতে নেমে গাড়ি পরীক্ষা করবে এবং লাশগুলোকে হাত করতে চাইবে। আমাদের সরে পড়ার এটাই উপযুক্ত সময়।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ ব্রুনা বলল, ‘আপনি তাহলে এই উদ্দেশ্যেই মাইক্রোটিকে নদীতে ফেলে দিয়েছেন! ধন্যবাদ স্যার!’
আহমদ মুসা ব্রুনার কথার দিকে কর্ণপাত না করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আসুন, আমরা যাত্রা শুরু করি।’
টিলা থেকে তারা নেমে এল।
‘জংগলের মধ্যে দিয়েই আমরা প্রথমে পূর্ব দিকে যাব, তারপর আমরা নেকার নদীর সমান্তরালে উত্তর দিকে চলব।’
বলে চলতে শুরু করল আহমদ মুসা।
‘পাশে একটু দূরেই তো রাস্তা আছে। আমরা সে রাস্তায় উঠতে পারি। সেখানে গাড়িও মিলবে।’ বলল ব্রুনা।
‘সেটাই সুবিধাজনক। কিন্তু রাস্তায় ওঠা ঠিক হবে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা জানতে পারবে গাড়িতে আমরা নেই। তারপরেই ওরা হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করবে। চারপাশের পথ তারা চষে ফিরবে। রাস্তায় উঠলে ওদের হেলিকপ্টারের চোখ এড়ানো কঠিন হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার, ঠিক বলেছেন। কিন্তু স্যার, এরকম বিপদে আমাদের মাথা সব সময় গুলিয়ে যায়। কিন্তু আপনার মাথা কি করে ঠাণ্ডা থাকে?’ বলল ব্রুনা।
‘সবারই মাথা ঠাণ্ডা থাকতে পারে, যদি সবাই সব ব্যাপারে আল্লাহর উপর নির্ভর করতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি বুঝলাম না স্যার।’ বলল ব্রুনা।
‘মাথা গুলিয়ে যাবার যে কথা বললে সেটা ভয়ের কারণে হয়। মৃত্যু ভয় সবচেয়ে বড় ভয়। এই ভয় যদি জয় করা যায়, তাহলে কোন ভয়ই আর থাকে না। মৃত্যুভয় দূর হয় আল্লাহর উপর নির্ভরতা থেকে। এ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ যদি না চান দুনিয়ার কেউ মারতে পারবে না, আর আল্লাহ যদি চান, তাহলে দুনিয়ার সবাই মিলে চেষ্টা করেও কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। এই বিশ্বাস আল্লাহর উপর নির্ভরতা থেকেই আসে।’ আহমদ মুসা বলল।
চলতে শুরু করেছে তারা।
দ্রুত হাঁটছে তারা জংগল ঠেলে যতটা সম্ভব সামনে। মিনিট দশেক পার হয়ে গেল। তারা তখনও জংগলের পথেই চলছে।
হেলিকপ্টারের শব্দে তারা সকলেই পেছন দিকে ফিরে তাকাল। দেখল, পেছনের আকাশে সেই হেলিকপ্টারটি উড়ছে।
‘নদীতে পড়ে যাওয়া গাড়ি পরীক্ষা করে ওরা নিশ্চিত হয়েছে যে, ওদের বোকা বানানো হয়েছে। এখন ওরা পাগলের মত খুঁজছে আমাদের।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চরম এই সংকটকালে ওদের বোকা বানাবার বুদ্ধি আপনার মাথায় এল কি করে স্যার! এটা আমার কাছে এখনও বিস্ময়!’ বলল ব্রুনা।
‘সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্পর্কে আরও জান ব্রুনা। মানুষ যখন উপায়হীন হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ স্বয়ং উপায় বের করে দেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, আগে এই বিপদ থেকে বাঁচি তারপর আমি সব জানার চেষ্টা করব।’ বলল ব্রুনা।
‘ধন্যবাদ ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না, আমরা যে ঐ মাইক্রোতে আছি, হেলিকপ্টার থেকে ওরা তা বুঝল কি করে?’
‘ও মাইক্রোটা তো ওদের। ওরা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই ব্রুনা বলে উঠল, ‘ঠিক স্যার। এ ধরনের মাইক্রো তো দেশে শত শত আছে। আর অত উপর থেকে গাছপালার মধ্য দিয়ে গাড়ির নাম্বার দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়।’
‘খুব সহজ ব্যবস্থা ওদের ছিল, যা তাড়াহুড়ার মধ্যে আগে আমার মনে পড়েনি। ওদের প্রতিটি গাড়িতে ট্রান্সমিটার সেট করা থাকে। এর মাধ্যমে ওরা গাড়ির ভিতরের কথোপকথন, গাড়ির অবস্থান মনিটর করে। আমাদের গাড়িতেও ট্রান্সমিটার সেট করা ছিল আর সেটাই তাদের খবর দিয়ে ডেকে এনেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা ও সেনফ্রিড দু’জনেরই চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল! ভয়ে তাদের বুক কেঁপে গেল। শক্ররা এতটা সাবধান, এতটা ক্ষিপ্র! পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাদের হৃদয়টা নুয়ে গেল আহমদ মুসার জন্যে। অজানা, অনাত্নীয় এই বিস্ময়কর মানুষটি জীবন বাজী রেখে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বুদ্ধি ও শক্তি সব যুদ্ধেই সে অগ্রগামী।
আহমদ মুসা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ব্রুনারাও তার পেছনে পেছনে ছুটল।
‘এই এলাকাটা আমাদের তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। ওরা পাগল হয়ে গেছে। ওরা এলাকাটা চষে ফেলবে। সবাই দ্রুত পা চালান।’ আহমদ মুসা বলল।