৫২. ক্লোন ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

সার্কুলার রোডের এপারে দাঁড়িয়েই আহমদ মুসা ঠিক করতে চাইল ওপারের বাড়িটায় প্রবেশ করবে কোন জায়গা দিয়ে।
গোটা বাড়িটাই প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীরের এদিকটা সাত আট ফুটের মত উঁচু।
রোডের পর ফুটপাত। পাথর বিছানো। তার পর ফাঁকা জায়গা কিছুটা, রাস্তার লম্বালম্বি বাড়িটার সীমা পর্যন্ত। ও জায়গা বাড়িটারই সম্পত্তি। এই ফাঁকা জায়গা ঘাসে আচ্ছাদিত। মাঝে মাঝে ফুলের গাছ ও আঙুরলতা। আঙুরলতাগুলো প্রাচীরের উপর পর্যন্ত উঠে গেছে।
আহমদ মুসা ভাবল, সার্কুলার রোড এখন প্রায় জনশূন্য হলেও প্রাচীর টপকে বাড়িতে প্রবেশ নিরাপদ নয়। পুলিশ কিংবা কারও চোখে হঠাৎ পড়েও যেতে পারে।
বাড়ির পূব দিকের সীমা পর্যন্ত গেল। সেখান থেকে প্রাচীরটা বাঁক নিয়ে উত্তর দিকে চলে গেছে। এই দেয়ালের পূব পাশ বরাবর প্রশস্ত ফাঁকা জায়গায় ফলের বাগান। তার মাঝে মাঝে আঙুরের ঝাড়ও। বাগানের পর ফসলের ক্ষেত ও নদীর তীর বরাবর গিয়ে পাড়ের ঢাল দিয়ে প্রায় পানির কাছ পর্যন্ত নেমে গেছে।
খুশি হলো আহমদ মুসা। প্রাচীরের এদিক দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ নিরাপদ হবে।
সার্কুলার রোড পার হয়ে আহমদ মুসা বাড়ির পূব পাশের প্রাচীরের গোড়ায় গিয়ে দাঁড়াল।
প্রাচীরের গোড়ায় একটা গাছের আড়ালে বসল আহমদ মুসা। বাড়িতে ঢোকার আগে গোটা বিষয়টা একবার ভেবে নেয়া দরকার। প্রথম কথা হলো, মি. আলদুনি সেনফ্রিড বাড়ির যে গোপন পথের বিবরণ দিয়েছেন, তার বাইরের এক্সিটটা বাড়ির দক্ষিণ পাশে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ পাশের কোথায় হতে পারে সেই এক্সিট? আপাতত শেষ প্রশ্নের সমাধানটাই প্রয়োজন।
ভাবল আহমদ মুসা, কিন্তু ফল হলো না। গোপন পথের এক্সিট নিশ্চয় ছোট বা বড় কোন ঘরে হবে। সেই ঘর খুঁজে পাওয়াটাই হবে প্রথম কাজ। অবশ্য কোন দেয়ালেও সেই এক্সিট দরজাটা থাকতে পারে, তবে তার সম্ভাবনা কম।
ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
রাত আড়াইটা বাজে।
তাকাল আহমদ মুসা প্রাচীরের মাথার দিকে।
এই প্রাচীর ডিঙানো তার জন্য কিছুই নয়, কিন্তু ওপারে কি আছে?
আহমদ মুসা লাফিয়ে উঠে নিজের দেহটাকে প্রাচীরের মাথায় শুইয়ে দিল। প্রাচীরের ওপারে তাকিয়ে তার মনে হলো ঘাসে ভরা উন্মুক্ত চত্বর। চত্বরের আলোটা বেশ দূরে। এদিকটা অনেকটায় আলো-অন্ধকার।
প্রাচীর থেকে ঝুলে পড়ে নি:শব্দে নিচে নামল আহমদ মুসা। তারপর ক্রলিং করে দ্রুত এগোলো বাড়ির দক্ষিণ পাশের দিকে। গিয়ে পৌঁছল দক্ষিণ পাশে। দক্ষিণের প্রাচীর থেকে বাড়ির ব্যবধান বেশ, প্রায় আট দশ গজের মত।
এই অংশটা মোটামুটি আলোকিত। রাস্তার আলোও কিছুটা পড়েছে এখানে। তাছাড়া বাড়ির নিজস্ব আলোও আছে দক্ষিণ পাশের দু’প্রান্তে দু’টো। রাতের কুয়াশার কারণে আলো ডিম লাইটের মত দেখাচ্ছে।
বাড়ির দক্ষিণ পাশটায় নজর বুলাল আহমদ মুসা।
বাড়ির এ দক্ষিণ পাশে কোন বারান্দা ও দরজা নেই। গোটা চারেক জানালা আছে। জানালাগুলো লোহার গরাদ দিয়ে বন্ধ, যা খুব স্বাভাবিক নয়। আহমদ মুসার মনে হলো গরাদের পর জানালায় লোহার গ্রীলও রয়েছে।
ঘরগুলোতে মানুষ থাকে কি? চাকর-বাকর থাকতেও পারে। আর এখন ব্ল্যাক লাইট তাদের কি পরিমাণ লোক এখানে রেখেছে, তা বলা মুশকিল। সুতরাং জানালার পথ নিরাপদ নয়। তার অভিযানটা গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্যে। সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে এই কাজ সহজে হবে না। তাই গোপন পথ ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই।
কিন্তু কোন্ ঘর কিংবা কোথায় পাওয়া যাবে সেই গোপন পথের মুখ?
বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তটা সরল রেখার মত নয়। পূর্ব প্রান্তে, মাঝখানে ও পশ্চিম প্রান্তে তিনটি ঘর সামনে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে আছে। মাঝের ঘরের দু’পাশে বর্গাকারের দু’টি চত্বরের সৃষ্টি হয়েছে যার দক্ষিণ প্রান্তই মাত্র খোলা।
সামনে বেড়ে যাওয়া তিনটি ঘরের দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে জানালা। চতুর্থ জানালাটি মাঝের ঘরের পূব পাশের বর্গাকৃতি চত্বরের উত্তর দেয়ালে। কিন্তু মাঝের ঘরের পশ্চিম পাশের চত্বরের উত্তর দেয়ালে এ ধরনের কোন জানালা নেই।
আহমদ মুসা বাড়ির দক্ষিণ পাশের গোটা্ অবস্থা পর্যালোচনা করে এই একটাই অসংগতি পেল। শুধু সংগতি বিধানের প্রয়োজনেও এই জানালার দরকার ছিল। কিন্তু জানালা রাখা হয়নি কেন? জানালার স্থানকে কি অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে!
এখানেই কি হতে পারে গোপন পথের এক্সিট ও এন্ট্রি?
দেয়ালটির দিকে এগোলো আহমদ মুসা।
পেন্সিল টর্চ ফেলল দেয়ালের উপর।
দেয়ালে খাড়া ও সমান্তরাল লাইন টানা। তার ফলে বর্গক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। দু’পাশে সামনে বেড়ে যাওয়া দুই ঘরের দেয়ালেও টর্চের আলো ফেলল সে। দেখল সব দেয়ালেই অনুরূপ বর্গক্ষেত্র।
দেয়ালের আরও ক্লোজ হলো আহমদ মুসা। পেন্সিল টর্চটাকে আরও ক্লোজ করল দেয়ালের উপর। আহমদ মুসা লক্ষ করল, দেয়ালের প্রতিটি বর্গক্ষেত্রে এক বা একাধিক জার্মান বর্ণ খোদাই করা।
দু’পাশের দুই কক্ষের দেয়ালেও এটাই দেখল সে।
আহমদ মুসার টর্চ ফিরে এল জানালাহীন দেয়ালটিতে আবার।
আহমদ মুসার দুই চোখ খুঁজছে গোপন পথের এক্সিট ও এন্ট্রি ডোর। আহমদ মুসার বিশ্বাস এই দেয়ালেই তা হবে।
আহমদ মুসা দেয়ালটির তিন ফুট থেকে পাঁচ ফুট উঁচু সমান্তরালের প্রতিটি বর্গক্ষেত্র এক এক করে পরীক্ষা করতে লাগল। কারণ সে নিশ্চিত যে, এ রকম কোন দরজা এই দেয়ালে থাকলে এই উচ্চতার মধ্যেই তা থাকবে।
দেয়ালের মাঝ বরাবর এসে ঠিক তিন ফুট উচ্চতার লেভেলে একটা বর্গক্ষেত্রের উপর আহমদ মুসার টর্চ থেমে গেল। ব্যস্ত হয়ে উঠল আহমদ মুসার দুই চোখ।
বর্গক্ষেত্রটিতে তিনটি জার্মান বর্ণ বড় বড় হরফে খোদাই করা। এর মাঝে আহমদ মুসা দেখল সবগুলো জার্মান বর্ণ একটা ছকের আকারে সাজানো। এ বর্ণগুলোর রং দেয়ালের রঙের সাথে মিলানো বর্গক্ষেত্রের অন্যান্য বর্ণের রং থেকে আলাদা। বর্গক্ষেত্রের বড় বর্ণগুলো গাঢ় গ্রীন রংয়ের, কিন্তু ছকের বর্ণগুলো দেয়ালের পাথরের মতই অফ হোয়াইট রঙের। টর্চের ফোকাস একটু দূরে সরিয়ে নিলে এগুলোকে আলাদা চেনা যায় না।
ছকের উপর পেন্সিল টর্চের আলো আরও ঘনিষ্ঠ করে দেখল গোটা ছক একটা ‘কী বোর্ড’-এর মত। আর প্রতিটি বর্ণ একটা করে ‘কী’!
চোখ দু’টি আনন্দে নেচে উঠল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা নিশ্চিত, গোপন পথে ঢোকার চাবিকাঠি পেয়ে গেছে সে। এখন কোড বা ধাঁধার সমাধার করার পালা।
মনে পড়ল আলদুনি সেনফ্রিডের কথা। এ অঞ্চলের জনপ্রিয় একটা নামকে কোড হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সে জনপ্রিয় নামটা কি হতে পারে?
আহমদ মুসা ব্রুমসারবার্গের বর্তমান ও অতীত ইতিহাসের দিকে তাকাল। ব্রুমসারবার্গের একটি প্রিয় নাম ‘স্যাক্সন’। এটা তাদের জাতিগত একটা নাম, গৌরবেরও নাম। কিন্তু স্যাক্সন নামে ছয়টি জার্মান বর্ণ আছে আর মি. সেনফ্রিড বলেছেন, কোডের নামটি হবে পাঁচ বর্ণের। স্যাক্সনদের প্রথম রাজা ছিল ‘হেনরিও’। এ নামও প্রিয় এ অঞ্চলের স্যাক্সনদের কাছে। তার নামেরও ছয়টি বর্ণ। ব্রুমসারবার্গের নামকরণ স্যাক্সনদের যে মহান বীরের নামে, তার নাম ‘ব্রুমসার’। এটা এ অঞ্চলের লোকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় নাম। তিনি ছিলেন ক্রুসেড ফেরত মহান বীর। কিন্তু তার নামেরও জার্মান বর্ণ ছয়। পাঁচ নয়। আবার ব্রুমরারের মেয়ে ‘মিসিলডিস’-এর নাম এ অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে। আত্নোৎসর্গকারী মিসিলডিস তাদের কিংবদন্তির নায়িকা। কিন্তু তার নামেও দশটি জার্মান বর্ণ রয়েছে।
তাহলে? তাহলে কি রাইনল্যান্ড হতে পারে। এতো এখানকার সবার প্রিয় জন্মভূমি। কিন্তু এতে তো নয়টি জার্মান বর্ণ।
ল্যান্ড বাদ দিলে থাকে রাইন। ‘রাইন’ নদী তো সকলের কাছে প্রিয় নাম! সংগে সংগেই আনন্দে নেচে উঠল আহমদ মুসার মন। হ্যাঁ, এতক্ষণ ‘রাইন’-এর নাম তার মনে পড়েনি কেন? এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি তো নদী ‘রাইন’-এর দান। ‘রাইন’ই তো এ অঞ্চলের মানুষের সর্বকালের সর্বপ্রিয় নাম! এই নামের বর্ণের সংখ্যাও তো পাঁচ।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা দেয়ালের বর্ণের ছকে রাইনের বর্ণগুলোর উপর ক্লিক করল।
ক্লিক করেই দু’পা পেছনে সরে এল।
অসীম আশা নিয়ে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ দেয়ালের এই স্থানটার উপর।
কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা।
তার পরেই দেখল দেয়াল থেকে তিন ফুটের মত প্রশস্ত ও পাঁচ ফুটের মত উচ্চতার একটা অংশ নি:শব্দে দেড় ফুটের মত ভেতরে ঢুকে গেল এবং একই রকম নি:শব্দে এক পাশে সরে গেল।
আহমদ মুসা পেন্সিল টর্চের আলো ওয়াইড অপশনে নিয়ে ফোকাসটা উন্মুক্ত দরজা দিয়ে ভেতরে ফেলল। দেখা গেল আলো গিয়ে পড়েছে একটা ঘরের মেঝেতে।
আহমদ মুসা মেঝের এদিক ওদিক আলোটা ঘুরিয়ে ঢুকে গেল ঘরের ভেতরে।
দরজাটা বন্ধ হলো না। তার মানে দরজা বন্ধ হবার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই।
দরজা থেকে সরে যাওয়া দেয়াল খণ্ডের উপর আলো ফেলল আহমদ মুসা।
অনুসন্ধান করল সেই বর্ণের ছক। যখন দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয় না, তখন দেয়ালের এপাশেও সেই বর্ণের ছক নিশ্চয় থাকবে।
ছকটা পেয়ে গেল আহমদ মুসা।
রাইনের বর্ণগুলো আবার টাইপ করল বর্ণের ছকের উপর্ দেয়াল খণ্ডটি একটু দরজার সামনে সরে এসে তারপর দেয়াল বরাবর পৌঁছেই সামনে সরে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
ঘরের চারদিকে আলো ফেলল আহমদ মুসা। ঘরটি স্টোর রুমের মত।
অনেক কনটেইনার বাক্স ঘরের চারদিকে সাজানো। একটা মাত্র বড় আলমারি উত্তর দেয়ালে।
ঘর চারদিক থেকে বন্ধ, দরজা জানালাহীন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
দেয়ালটা প্রথমে ভালোভাবে চেক করল আহমদ মুসা। দক্ষিণ দেয়ালের মত আর কোন দেয়ালে গোপন দরজা থাকার সংকেত পাওয়া যায় কিনা!
ইঞ্চি ইঞ্চি করে আহমদ মুসা দেয়ালের সকল সম্ভাব্য স্থান চেক করল। কিন্তু কোন সংকেতই মিলল না।
মনে পড়ল আলদুনি সেনফ্রিডের কাছ থেকে শোনা একটা কথা। আলমিরার ভেতর দিয়ে গোপন পথের দরজা রয়েছে।
আলমারির দিকে এগিয়ে গেল আহমদ মুসা।
আলমারির দরজা খুলল।
ছোট ছোট টিনের কনটেইনারে সাজানো আলমারির তাক। তাক ধরে টানাটানি করল আহমদ মুসা। কোন দিকে নড়াচড়া নেই, স্থির তাক। আলমারি বন্ধ করে আহমদ মুসা এগোলো বড় বড় বাক্সের দিকে।
দক্ষিণ দিক ছাড়া সব দেয়ালের পাশ দিয়ে সাজানো বাক্স। একটি একটি করে সব বাক্স খুলল আহমদ মুসা। নানা ধরনের কনটেইনারে সাজানো বাক্সগুলো। কনটেইনার সরিয়ে বাক্সগুলোর তলাও চেক করল আহমদ মুসা। তলাগুলো ফিক্সড।
তাহলে গোপন এন্ট্রি পথ বা দরজাটা কোথায়? সন্দেহ নেই, এই ঘরেই সেটা থাকবে।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা ঘরের চারদিকটা আবার ভালো করে দেখল। যুক্তির দাবী, ভাবল সে, গোপন প্রবেশ পথটা উত্তর দেয়ালেই থাকবে। উত্তর দেয়ালেই আছে বিশাল আলমারিটা।
আহমদ মুসা আবার গিয়ে আলমারিটা খুলল।
আবার টানাটানি, ঠেলাঠেলি করল তাক ধরে। কিন্তু একটুও নড়াচড়া করল না কোনও দিকে।
আলমিরার তাকটা দূর নিয়ন্ত্রিতও হতে পারে, ভাবল আহমদ মুসা।
এবার আহমদ মুসা আলমারির ভেতরের গায়ের বোতাম, সুইচ বা এ ধরনের কিছু খোঁজ করতে লাগল। কিন্তু আলমারির গা পরিস্কার, সন্দেহ করার মত কোথাও কিছু নেই।
কন্টেইনার তুলে তাকগুলো পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল আহমদ মুসা।
বাইরের দেয়ালে বেজমেন্ট থেকে তিন ফুট উপরে বর্ণের ছক পাওয়া গিয়েছিল। এবারও আহমদ মুসা তিন ফুট উপরের তাক থেকে অনুসন্ধান শুরু করল।
তাকের ডান দিক নয়, বাম প্রান্ত থেকে অনুসন্ধান শুরু করল। ইউরোপীয়রা সবাই কাঁটা চামচ দিয়ে খায়, এদের বাম হাত বেশি চলে। মুসলমানরা ডান দিককে প্রাধান্য দেয় বলে তারা ডান দিককে হয়তো বেশি পছন্দ করে। ক্রুসেডের সময় থেকে এ বিষয়টা আরও বেশি নজরে আসে।
বাম দিকের প্রথম কন্টেইনার তুলতেই আহমদ মুসা স্টিলের তাকে স্টিলের রঙেরই বোতাম আকৃতির একটা কিছু দেখতে পেল।
আহমদ মুসা কন্টেইনারটা পাশে রেখে ডান হাত দিয়ে বোতামটায় চাপ দিল। সাথে সাথেই মৃদু কেঁপে উঠল তাক।
পেছন দিকে সরতে লাগল তাকটা।
ওদিকটা দেখা যেতে লাগল।
দেখা গেল, ওদিকে আলমারির আরেকটা দেয়াল।
ধীরে ধীরৈ পেছনে সরে যাচ্ছিল তাকটা।
যাওয়ার মত স্পেস বের হতেই আহমদ মুসা দ্রুত ওপাশে গিয়ে আলমারির বন্ধ দরজার হাতল ধরে চাপ দিল। খুলে গেল আলমারির দরজা।
ঘরের দিকে নজর পড়তেই আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। বড়-সড় ঘর। অনেক বেড। ছয় জন লোক শুয়ে আছে, ঘুমুচ্ছে নিশ্চয় তারা। আরও ছয়টি বেড খালি। যারা শুয়ে আছে, তাদের প্রত্যেকের পাশেই মাইক্রো সাইজের মডার্ন স্টেনগান।
এরা নিশ্চয় বাড়ির প্রহরী হবে, ভাবল আহমদ মুসা। তাহলে যারা বেডে নেই তারাও প্রহরী, তাদের স্টেনগান নিয়ে তারা পাহারায় গেছে।
আহমদ মুসা ঘরের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তবে উত্তর প্রান্তে আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বিড়ালের মত নি:শব্দে এগোলো।
লোকগুলোকে দেখেই আহমদ মুসা মুখে মিনি সাইজের একটা গ্যাসমাস্ক পরে নিয়েছে। হাতে নিয়েছে ক্লোরোফরম গান। এই গান দিয়ে ৩০ গজ দূর পর্যন্ত মানুষকে সংজ্ঞাহীন করে ফেলা যায়।
আজ আহমদ মুসার নি:শব্দ অনুসন্ধানের দিন। আজ কোন সংঘর্ষে যাওয়া যাবে না। নিরপদ্রুপেই তাকে কাজ সারতে হবে।
ঘর থেকে বেরুবার সময় এদের ঘুম আরও গভীর করে দিয়ে যাবে, এই লক্ষেই ঘর থেকে বেরুবার জন্যে এগোলো আহমদ মুসা।
ঘরের মাঝখানে আসতেই আহমদ মুসা দরজার ওপাশে শব্দ শুনতে পেল। কেউ যেন দরজা খুলছে।
আহমদ মুসা দ্রুত একটা খাটের নিচে ঢুকে গেল।
দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল চারজন।
ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়ে ওরা চারজন এসে তাদের নিজ নিজ বিছানায় শুয়ে পড়ল।
‘এই যে আমরা প্রতিদিন রাতে বাইরোটেশনে ৪ জন করে ফাঁকি দিয়ে এসে শুয়ে কাটাচ্ছি, ধরা পড়লে কি হবে বলতো?’ বলল চারজনের একজন।
‘কি আর হবে, প্রাণ যাবে? কিন্তু ধরবে কে? রাত ১টা ২টা পর্যন্ত ফুর্তি করে এখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছে সবাই। তাছাড়া দু’জনতো পাহারায় আছেই। কেউ খোঁজ করলে আমরা জানতে পারব।’ বলল দ্বিতীয় এক জন।
‘শালা আমরা কাজের দায়ে ঘুমাতে পারি না, আর ওরা ফুর্তি করে ঘুমায় না। প্রতিদিন এটা ওরা কেমন করে পারে?’ বলল তৃতীয় আর এক জন।
‘পারবে না কেন, অর্ধেক দিন তো আবার ঘুমায়।’ বলল প্রথম জন।
‘রাখ এসব কথা, কাজের কত দূর বলত? আর কত দিন থাকতে হবে আমাদের এখানে?’ চতুর্থ জন বলল।
নিরব কিছুক্ষণ সবাই।
নিরবতা ভেঙে সেই প্রথম জন বলল, ‘একথা আমরা জানবো কি করে! তবে সেদিন রাতে আমি পাহারায় ছিলাম ম্যাডামের ঘরের সামনে। তিনি টেলিফোনে কাউকে বলছিলেন যে, ‘দস্তখতের সমস্যা ঠিক হয়ে গেছে। ফিংগার প্রিন্টটা ডেভলপ করছে, একটু সময় লাগবে। আমি মনে করছি, মাস খানেকের মধ্যেই স্যাক্সন স্টেটের হস্তান্তর হয়ে যাচ্ছে।’ ম্যাডামের কথা সত্য হলে মাস খানেকের মধ্যেই আমাদের এখানকার পার্ট চুকবে।’
আহমদ মুসা খাটের তলে গোগ্রাসে কথাগুলো গিলছিল।
প্রথম জনের কথা শেষ হতেই চতুর্থ জন বলে উঠল, ‘কিন্তু সেদিন কনরাড সাহেব ম্যাডামের সাথে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বলছিলেন, ‘সেনফ্রিড ও তার দুই মেয়েকে ধরে তারপর দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে না পারলে এখানকার কাজ আমাদের শেষ হবে না। স্টেটের হস্তান্তরও সম্ভব হবে না। কনরাড সাহেবের কথাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’
‘কিন্তু কয়েক বার ফাঁদে ফেলেও তো ওদের আটকাতে পারা গেল না। কবে আবার ওরা ধরা পড়বে?’ বলল দ্বিতীয় জন।
‘সেদিন এক সাহেব বললেন, এবারের মত জটিল অবস্থা নাকি অতীতের আর কোন প্রজেক্টে হয়নি।’ তৃতীয় জন বলল।
‘থাক এসব জটিলতা নিয়ে চিন্তা করে আমাদের লাভ নেই। কিছুই আমার মাথায় আসে না। ম্যাডাম তো এ সম্পত্তির মালিক। মালিক কোন কিছু হস্তান্তর করলে জটিলতার প্রশ্ন আসে কি করে?’ বলল প্রথম জন। তার কন্ঠে অধৈর্যের প্রকাশ।
‘সেটাই তো আমরা বুঝি না। ম্যাডামের আচরণ দেখলে তো বুঝা যায় না তিনি সম্পত্তির মালিক। তিনি তো দেখি সবাইকে ভয় করে চলেন।’ চতুর্থ জন বলল।
‘রাখ এসব কথা। ঘুমাবো। সাধারণভাবে যে বেতন হয়, তার চারগুণ বেতন পাচ্ছি। মরে গেলে পরিবার সারা জীবন চলার মত টাকা পাবে। আর কি চাই! এস ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলল তৃতীয় জন।
চতুর্থ জন বলল, ‘ঠিক বলেছে। কিন্তু আমার ওষুধ খাওয়া হয়নি। তোমাকে দিয়েছিলাম, আমার ওষুধটা দাও।’
‘সেটা আমার ব্যাগের মধ্যে আছে। খাটের তলে আছে, বের করে দিচ্ছি।’ বলে বিছানার উপর উঠে বসল তৃতীয় জন।
আহমদ মুসা যে খাটের তলায়, সে খাটটাই তৃতীয় জনের। সে ওষুধ নেবার জন্যে নামলেই তো ধরা পড়ে যাবে।
আহমদ মুসা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।
বাম হাতে মুখের গ্যাস মুখোশকে টাইট দিয়ে ডান হাত দিয়ে ক্লোরোফরম গানের ব্যারেল খাটের পাশ দিয়ে ঊর্ধমুখী করে ট্রিগার টিপল। অদৃশ্য এক পশলা গ্যাস বেরিয়ে গেল ক্লোরোফরম গান থেকে।
সংজ্ঞালোপকারী এই ক্লোরোফরম গ্যাস বাতাসের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটা ফায়ারে যে পরিমাণ কনসেন্ট্রেটেড ক্লোরোফরম গ্যাস বের হয়, তাতে তিরিশ বর্গফুট এলাকার সবাইকে মুহূর্তেই সংজ্ঞাহীন করে ফেলতে পারে।
তাই হলো। আহমদ মুসা ফায়ার করার পর মুহূর্তেই তার খাটের উপরের লোকটি জ্ঞান হারাল। সে উঠে বসেছিল বিছানায়। আবার ঢলে পড়ল বিছানার উপর। তারপর ঘরের সবাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল খাটের তলা থেকে।
সবার দিকে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বেরুবার জন্যে দরজার দিকে এগোলো আহমদ মুসা।
ঘর থেকে বেরিয়ে একটা করিডোরে পা রাখল সে। তাকাল এদিক-ওদিক। কোন্ দিকে ব্রুনার মা মানে এদের ম্যাডামের ঘর?
জ্যাকেটের পকেট থেকে আলদুনি সেনফ্রিডের এঁকে দেয়া বাড়ির ইনার স্কেচটি বের করে তার উপর চোখ বুলাল। বুঝল, তাকে বাম দিকে যেতে হবে। একটু এগোলেই আর একটা করিডোর পাওয়া যাবে। সে করিডোর ধরে পুব দিকে এগোলে আর একটা লাউঞ্জ পাওয়া যাবে। লাউঞ্জের পশ্চিম পাশে প্রশস্ত একটা স্পেস। সে স্পেসের পশ্চিম পাশে বড় একটা দরজা, বড় একটা ঘর। এ ঘরটাতেই থাকে ব্রুনার মা কারিনা কারলিন।
আহমদ মুসা ক্লোরোফরম গান বাগিয়ে ধরে করিডোর দিয়ে এগিয়ে চলল।
লাউঞ্জের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। নজর বুলাল ভেতরের দিকে।
সেই মুহূর্তে পেছনে পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা।
হাতের ক্লোরোফরম গানের ব্যারেল ঘুরাতে গিয়েছিল আহমদ মুসা। কিন্তু সেই সময়েই মাথায় স্টেনগানের নলের ভারি স্পর্শ অনুভব করল।
পেছন থেকে একটা কন্ঠ বলে উঠল, ‘বোয়ার, তাড়াতাড়ি শালার কাছ থেকে রিভলবারটা কেড়ে নাও।’
আহমদ মুসা বুঝেছিল অবশিষ্ট যে দু’জন পাহারায় ছিল, তারাই তাকে ধরে ফেলেছে।
পেছনের কন্ঠটির কথা শুনেই আহমদ মুসা বলল, ‘আচ্ছা, নিয়ে নাও রিভলবার।’ বলেই হাতটা নিচে নামিয়ে ক্লোরোফরম গানের নল পেছনে ওদের দিকে ঘুরিয়ে পেছনে ঠেলে দিচ্ছিল হাত।
বোয়ার নামের লোকটি একটু ঝুঁকে পড়ে রিভলবার আহমদ মুসার হাত থেকে নিতে যাচ্ছিল।
হাতটা পেছনে ঠেলে দিয়েই ট্রিগার টিপেছে আহমদ মুসা।
রিভলবারের মত এর ট্রিগারে কোন শব্দ হয় না, বোতাম টেপার মতই অনেকটা নি:শব্দ।
ট্রিগার টেপার পর কয়েক মুহূর্ত। আহমদ মুসার মাথা থেকে স্টেনগানের নল সরে গেল। মেঝেতে ভারি কিছু পতনের শব্দ হলো। পেছনে তাকাল আহমদ মুসা, দু’জনের সংজ্ঞাহীন দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তাদের স্টেনগান পড়ে আছে তাদের পাশে।
আহমদ মুসা দু’জনের সংজ্ঞাহীন দেহ এক এক করে নিয়ে তাদের ঘরে তাদের খাটে সাথীদের পাশে শুইয়ে রেখে এল। স্টেনগানও রাখল তাদের পাশে।
এবার আহমদ মুসা অনেকটাই নিশ্চিন্ত। প্রহরীরা সবাই ঘুমে। কমপক্ষে ছয় ঘন্টার আগে তাদের ঘুম ভাঙবে না। বাড়ির অন্য সদস্যেরাও ঘুমিয়ে আছে নিশ্চয়।
আহমদ মুসা ব্রুনার মা’র ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
দরজার উপর নি:শব্দে চাপ দিল।
দরজা বন্ধ।
দরজার লকের দিকে তাকাল আহমদ মুসা।
ডিজিটাল লক, যা শুনেছিল তাই।
দরজার উপর দরজার গায়ের সাথে মেশানো একটা ডিজিটাল-লক বোর্ড। শূণ্য থেকে নয় পর্যন্ত জার্মান সংখ্যায় সাজানো ডিজিটাল বোর্ডটা।
কারিনার শোবার ঘরের দরজার নতুন কোড সম্পর্কে আলদুনি সেনফ্রিড কিছু বলতে পারেনি। তার মানে কোড তাকেই ভাঙতে হবে। কি হবে সেই কোডের সংখ্যাগুলো, কত সংখ্যার সেই কোড?
দ্রুত ভাবল আহমদ মুসা।
সময় নষ্ট করা যাবে না। আসল কাজ শুরুই করা যায়নি।
কোন নামের বর্ণের সংখ্যা দিয়েই কোড তৈরি সবচেয়ে স্বাভাবিক। আগের সেই নামগুলো ছাড়াও যে নামগুলো হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ‘ব্রুমসারবার্গ ক্যাসল’ যা স্যাক্সনদের প্রিয় দুর্গের নাম? এদের মানে খৃস্টানদের প্রোফেট ‘ক্রাইস্ট’ সে নামও হতে পারে। প্রহরীদের কথাবার্তায় জানা গেল, ব্রুনাদের ‘এস্টেট’ (জমিদারি) দখলই ব্ল্যাক লাইটে’র লক্ষ। অতএব ব্রুমসার বা এ স্টেটের নামেও কোড হতে পারে। আবার ওদের সংগঠন ‘ব্ল্যাক লাইট’-
এর নামেও কোড হতে পারে। এই সব নাম নিয়ে আরেকবার ভাবল আহমদ মুসা। প্রহরী লোকদের কথা থেকে বুঝা গেল, ওরা এখানকার লোক নয়, স্টেটটা হস্তান্তর হলেই ওরা চলে যাবে। তাই যদি হয়, তাহলে ব্রুমসারবার্গ, ব্রুমসারবার্গ এস্টেট ইত্যাদি স্থানীয় কোন নাম, কোন হিরোর নাম ইত্যাদি কোড হিসাবে ব্যবহৃত হবার কথা নয়। ওদের সংগঠনের নাম ব্ল্যাক লাইট থেকে শুরু করতে চাইল আহমদ মুসা।
ডিজিটাল কী বোর্ডের দিকে হাত বাড়াল আহমদ মুসা।
কিন্তু প্রশ্ন জাগল মনে, ব্ল্যাক লাইটের ডিজিটাল কোডটা কি ধরনের হবে? ‘ব্ল্যাক লাইট’ শব্দ দু’টিতে ১০টি বর্ণ আছে। এই ‘১০’ ই কি হবে কোড নাম্বার? না, ১০টি বর্ণের প্রথম বর্ণ? প্রথম বর্ণটিকে এক ধরে পরবর্তী বর্ণগুলোর যে ক্রমিক মান দাঁড়ায়, সেগুলোর এক একটি নাম্বার কোডের ক্রমিক অংশ হবে? অথবা বর্ণগুলোর ক্রমিক নাম্বারের যোগ ফলটাও হতে পারে কোড নাম্বার। প্রথমটা ঠিক হলে ১০ হয় কোড নাম্বার। আর বিকল্প দ্বিতীয়টি কোড হলে কোড সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯ ও শূন্য। আর এ সংখ্যাগুলোর নিজস্ব মানের যোগফল ৪৫ হয় তৃতীয় কোড সংখ্যা।
কোনটা হবে সঠিক কোড নাম্বার?
ধাঁধা’র বিচারে প্রথম ও তৃতীয়টি অধিকতর সম্ভাবনাময় কোড, দ্বিতীয়টি খুবই সাধারণ। অবশ্য সাধারণ বিষয় অনেক সময় অসাধারণ কোড হয়ে থাকে।
আহমদ মুসা ভাবল, ‘কোড-নেম’ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যেমন সে তার মনে পড়া নামগুলোর শেষটাকে গ্রহণ করেছে, তেমনি কোড নাম্বারের ক্ষেত্রেও শেষ কোডটাকেই গ্রহণ করা উচিত।
তাই করল আহমদ মুসা। সংখ্যা ৪৫-কেই কোড হিসাবে গ্রহণ করল।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা তার শাহাদাত অঙ্গুলি দিয়ে ডিজিটাল কী বোর্ডের ৪ ও ৫-এর উপর চাপ দিল।
শেষ চাপটার সংগে সংগেই দরজা নড়ে উঠল। দরজার দুই পাল্লা দুই দিকে দেয়ালের ভেতর ঢুকে গেল।
উন্মুক্ত দরজা সামনে। বেশ বড় ঘর।
ঘরের মুখোমুখি দুই দেয়ালের খাঁজে ডিম লাইট, যা চোখে পড়ে না। তবে তা থেকে বিচ্ছুরিত ভোরের আলোর মত স্নিগ্ধ আলোতে ভরে গিয়েছে ঘর।
ঘরে নজর বুলাল আহমদ মুসা।
হাতে তার বাগিয়ে ধরা ক্লোরোফরম গান।
দরজা থেকে দেখল ঘরের বাম অংশের দিকে ডিভানে শুয়ে আছে কেউ। নিশ্চল দেহ। নিশ্চয় ঘুমে অচেতন।
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকল।
নি:শব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।
এগোলো ডিভানের দিকে।
ডিভানের উপর অঘোরে ঘুমাচ্ছে একটি মেয়ে। দেহের গ্রোথ দেখে মনে হচ্ছে পঁয়ত্রিশ প্লাস হবে বয়স। কিন্তু চেহারা বলছে বয়স খুব বেশি হলে বিশ-বাইশের বেশি হবে না।
এই মেয়েটিই ব্রুনার মা কারিনা কারলিন।
আহমদ মুসা ক্লোরোফরম গান তুলে কারিনা কারলিনকে তাক করে একটা ফায়ার করল।
বেরিয়ে গেল সেই এক পশলা কনসেনট্রেটেড ক্লোরোফরম গ্যাস।
এবার হালকা বোধ করল আহমদ মুসা।
ক্লোরোফরম গানটা পকেটে ফেলে আহমদ মুসা তাকাল ঘরের চারদিকে।
ঘরের পূর্ব-উত্তর কোণে কাঠের একটা সুশোভিত আলমিরা ছাড়া বড় ধরনের আর কোন আসবাব পত্র নেই।
মাথার দিকে ডিভানের পাশে লাইট-টপ টেবিল। টেবিলে একটা ড্রয়ারও দেখা যাচ্ছে।
ঘরের পশ্চিম দেয়ালের দু’প্রান্তে দু’টি দরজা।
দরজা দু’টো কিসের? একটা টয়লেট হতে পারে। আরেকটা? ওটা কি ড্রেসিংরুম হতে পারে? হবে হয়তো। অতএব তাকে প্রথমে ঢুকতে হবে টয়লেটে।
কোনটা টয়লেট?
মনে পড়ল গৌরীর ডাইরির কথা। সে লিখেছে, দোতলার ল্যান্ডিং থেকে ভেন্টিলেটরের মধ্যে দিয়ে টয়লেট দেখা যায়। নিশ্চয় তাহলে দক্ষিণ পাশেরটাই টয়লেট হবে।
টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, দরজার লকে চাবি। রাতে চাবি সরাবার প্রয়োজন মনে করেনি তাহলে, ভাবল আহমদ মুসা।
টয়লেটে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
বিরাট টয়লেট। তার এক পাশে ল্যাট্রিন। তার পাশে বাথটাব। অন্য পাশে লম্বাটে এ্যান্টিক ধরনের সুন্দর একটা টেবিল ও একটি চেয়ার। টয়লেট ও বাথ থেকে এই অংশটা সুন্দর পর্দা দিয়ে আলাদা করা।
টেবিলের উপর সব সময়ের ব্যবহার্য কিছু প্রসাধনী ছাড়া অন্য কিছু নেই।
টেবিলে দু’টি ড্রয়ার। দুই ড্রয়ারেই কী হোলে চাবি রয়েছে। তার মানে রাত বলেই হয়তো এখান থেকেও চাবি সরানো হয়নি।
খুশি হলো আহমদ মুসা। তার কাজ আল্লাহ অনেক সহজ করে দিয়েছেন।
চেয়ারে বসে প্রথম ড্রয়ারটা খুলল আহমদ মুসা।
ড্রয়ারেও নানা প্রসাধনী। তার সাথে চুলের হোয়াইট কালারের বিদেশি দামী বটল। একটা প্লাস্টিক কেইসে নতুন পুরাতন ক্ষুদ্র তুলি। এ টেবিলে আর তেমন কিছু নেই। কিছুটা হতাশ হলো আহমদ মুসা।
দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলল সে।
এ টেবিলেও নানা ধরনের শিশি, প্যাকেট, ট্যাবলেট ছড়িয়ে আছে।
ড্রয়ারটি পুরোপুরি খোলার পর চামড়ার সুদৃশ্য একটা নোট-কেইসের মত কিছু একটা দেখতে পেল।
কেইসটির মুখের দিকে খোলা। ভেতরে দেখতে পেল চামড়ার একটা ফোল্ডার।
আহমদ মুসা বের করল ফোল্ডার।
কভারে কিছুই লেখা নেই। খুলল ফোল্ডার।
ফোল্ডারের বাম অংশটার অর্ধেক পর্যন্ত একটা পকেট। পকেটে কাগজ দেখা যাচ্ছে। ডান অংশটা মানি ব্যাগের মত। কেবিন আছে, কার্ড পকেট আছে বেশ কয়েকটি।
ফোল্ডারের উপর চোখ বুলাতে গিয়ে বাম অংশের বটমে কালো গায়ের উপর কালো একটা মনোগ্রাম ও কিছু লেখার উপর নজর পড়ল।
ফোল্ডারের ভেতরটা নিকষ কালো চামড়ার ও ফোল্ডারের ব্যাকটা লাল চামড়ার। ফোল্ডারটা আর একটু সামনে এনে ভালো করে দেখল।
মনোগ্রামটা পরিচিত, ব্ল্যাক লাইটের। কিন্তু লেখাটা বুঝল না। মনোগ্রামের নিচে একটু স্পেস দিয়ে কালো চামড়ার উপর কালো হরফে লেখা ‘ক্লোন-৭’।
‘ক্লোন-৭’ বিষয়টা নিয়ে ভাবল আরও আহমদ মুসা। কিন্তু বুঝতে পারল না বিষয়টা কি। বিষয়টা চামড়ার সাথেও সংশ্লিষ্ট হতে পারে, ভাবল আহমদ মুসা।
এ চিন্তার মাঝেই আহমদ মুসা ফোল্ডারের পকেট থেকে কাগজ বের করল।
ভাঁজ খুলল কাগজটির আহমদ মুসা।
একটা প্রেসক্রিপশন।
লেটার হেডে ডাক্তারের নাম কারল হেইঞ্জ এমডি, বিশেষজ্ঞ ক্লোন মেডিসিন।
এটুকু পড়তেই ভ্রূকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। ক্লোন মেডিসিনের ডাক্তারের প্রেসিক্রিপশন কেন?
আরও পড়ল প্রেসক্রিপশনটি।
বিস্মিত হলো, যার জন্যে প্রেসক্রিপশন, তার নাম নেই। শুধু লেখা ‘ক্লোন-৭’।
বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল আহমদ মুসার! তাহলে ব্রুনার মা কারিনা কারলিন কি ‘ক্লোন-৭’! কেন? ক্লোনের সাথে তার সম্পর্ক কি? ‘৭’ শব্দটারই বা অর্থ কি? না, এটা ব্রুনার মা’র একটা সাংকেতিক নামমাত্র! এমনটা হতেও পারে।
আহমদ মুসা ড্রয়ারের ওষুধগুলোর দিকে নজর বুলাল। বিদঘুটে নামের সব ওষুধ! একটিও তার পরিচিত নয়। তবে ওষুধের প্যাকেটের পরিচয় পড়ে যা বুঝল তাতে এগুলো ক্লোন বিষয়ক কোন কিছুর ওষুধ। কিন্তু এ ওষুধগুলো ব্রুনার মা কারিনা কারলিনের ড্রয়ারে কেন? সে কি ওষুধগুলো ব্যবহার করে? কেন? ব্রুনার মায়ের জীবনের এই দিকটা সম্পর্কে তো আহমদ মুসাকে কিছুই বলা হয়নি। তার মায়ের জীবনের ছোটখাট বিষয় পর্যন্ত ব্রুনা ও তার বাবা আহমদ মুসাকে বলেছে, কিন্তু এই বিষয়টা তো বলেনি। তাহলে কি তারাও জানতো না?
আহমদ মুসার মনে হলো, এই রহস্যের সাথে ব্রুনার মায়ের আচরণের একটা ঘনিষ্ঠ যোগ থাকতে পারে। তার মায়ের এই দিকটার উন্মোচন হলে তাকে নিয়ে সমস্যা-সংকটের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ডাক্তারের চেম্বারের অ্যাড্রেসের দিকে তাকাল। স্ট্রিটের নাম ফ্রেড স্ট্রিট, আর শহরের নাম অ্যারেন্ডসী।
খুশি হলো আহমদ মুসা। ডাক্তারের কাছ থেকেই ক্লোন মেডিসিন সম্পর্কে জানা যাবে।
আহমদ মুসার মনে হলো, টয়লেটে তার কাজ শেষ।
বেরিয়ে এল আহমদ মুসা টয়লেট থেকে।
এগোলো বেড সাইডের শেড-লাইটের টেবিলের দিকে।
টেবিলের ড্রয়ারটি খুলল।
তার ভেতরে টুকিটাকি অনেক কিছু দেখল। ছোট একটা মানি ব্যাগও।
ম্যানি ব্যাগ খুঁজে টাকা ছাড়া আর কিছুই দেখল না। রেখে দিল সে ম্যানি ব্যাগ।
ড্রয়ার বন্ধ করল।
চারদিকে তাকাল। দেখল ব্রুনার মায়ের বালিশের পাশে তার ছোট হ্যান্ড ব্যাগটি। এটাই খুঁজছিল আহমদ মুসা। শুনেছিল ব্রুনার কাছে, তার মায়ের হ্যান্ড ব্যাগে কাউকে সে হাত দিতে দেয় না।
হ্যান্ড ব্যাগটি নিতে কাত হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে থাকা ব্রুনার মায়ের এদিকে প্রসারিত তার দুই হাতের দিকে নজর পড়ল আহমদ মুসার। দেখল তার দুই হাতের বুড়ো আঙুলে বিশেষ ধরনের প্লাস্টিক ব্যান্ডেজ, গার্ডারের মত ফাঁপা।
হ্যান্ড ব্যাগটি নিয়ে খুলল আহমদ মুসা। ছোট্ট হ্যান্ড ব্যাগে লিপস্টিক ধরনের মেয়েদের সব সময়ের ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র। তার সাথে দেখল চার ভাঁজ করা একটা কাগজ।
মাত্র কাগজটিই তুলে নিল আহমদ মুসা।
কাগজের ভাঁজ খুলে দেখল সেটাও একটা প্রেসক্রিপশন। ডাক্তারের নাম ‘হের হারম্যান’ প্লাস্টিক স্কিন স্পেশালিস্ট। ঠিকানা, মোবাইল ক্যাম্প, ফ্রেইড স্ট্রিট, অ্যারেন্ডসী।
আবার সেই অ্যারেন্ডসী! বিস্মিত হলো আহমদ মুসা।
আরও বিস্মিত হলো, এখানেও যার নামে প্রেসক্রিপশন, তার নামের জায়গায় লেখা হয়েছে, ‘ক্লোন-৭’।
তার মানে ব্রুনার মা নিশ্চিতভাবেই ‘ক্লোন-৭’! এর অর্থ তাহলে কি?
ব্রুনার মায়ের দুই হাতের দুই বুড়ো আঙুলে অদ্ভুত ধরনের ব্যান্ডেজ কেন?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল প্রহরীদের কথা, ‘দস্তখত ঠিক হয়ে গেছে, এখন ফিংগার প্রিন্ট ডেভলপ করছে।’ বুড়ো আঙুলের ফিংগার প্রিন্ট ডেভলপ করার জন্যেই কি ঐ ব্যান্ডেজ? ঠিক, প্রেসক্রিপশনও তো প্লাস্টিক স্কিন স্পেসালিস্ট ডাক্তারের! ফিংগার প্রিন্ট ঠিক করার জন্যে প্লাস্টিক স্কিন স্পেশালিস্ট দ্বারা বিশেষ ধরনের অপারেশন বা কোন কিছু করা হয়েছে? হতে পারে।
আহমদ মুসার মনে হলো, তার এখানে আর কোন কাজ নেই। যা জানার মত তা জেনে ফেলেছে। সে রহস্যগুলো সামনে এসেছে, তার সমাধানের পরই পরবর্তী কাজের প্রশ্ন আসবে।
আহমদ মুসা প্রেসক্রিপশন, ব্যাগ যেমন ছিল তেমনিভাবে রেখে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
বাইরে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলো না। বুঝা যাচ্ছে, ভেতরে আর কোন প্রহরী নেই। শুধু সম্মুখের গেটেই আছে প্রহরী।
আহমদ মুসা ফিরে এল প্রহরীদের সেই কক্ষে। সংজ্ঞাহীন সবাই বেঘোরে পড়ে আছে তাদের বিছানায়।
আহমদ মুসা যে গোপন পথ দিয়ে ঢুকেছিল, সেই পথেই বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
ফিরে এল নিজেদের বাড়িতে।
বাড়ির প্রধান ফটকের তালা খুলে বাড়িতে প্রবেশ করল।
ভেতরের চত্বরটা পেরিয়ে গাড়ি বারান্দা দিয়ে ওগুলো বাড়িতে প্রবেশের গেটের দিকে। দেখল দরজা খোলা, আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে কেউ দরজায়।
আহমদ মুসা বারান্দায় উঠতেই ছায়া মূর্তিটি নড়ে উঠল।
আহমদ মুসা দরজার কাছে যেতেই ছায়া মূর্তিটি এগিয়ে এল। দেখল সে ব্রুনা।
ব্রুনা আহমদ মুসার সামনে এসে লম্বা বাও করল। বলল, ‘ভাইয়া, আমাকে মাফ করুন। আমি বুঝতে পারিনি। আমাদের সমাজে তো দু’জন নারী-পুরুষ এমনভাবে যখন কাছাকাছি হয়, তখন তারা প্রেমিক-প্রেমিকা হয়, দৈহিক সম্পর্কই তাদের কাছে প্রধান হয়। তারা যে ভাইবোনও হতে পারে, এমন পবিত্র সম্পর্কের কথা আমাদের সমাজ ভুলেই গেছে। তাহলে আমি ভুল না করে পারি কি করে! আমাকে মাফ করুন ভাইয়া।’
ব্রুনার শেষের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল।
আহমদ মুসা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তুমি মহাঅন্যায় করনি যে মাফ চাইতে হবে। আর আমাকে ভাইয়া বলার পর মাফ চাওয়ার কিছু থাকে না। আমি খুশি যে, তুমি তোমার সমাজের উপরে উঠে চিন্তা করতে পেরেছ। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করুন।’
‘এই চিন্তা করার শক্তি আপনিই দিয়েছেন ভাইয়া।’ চোখ মুছতে মুছতে বলল ব্রুনা। তার কন্ঠ ভারি।
‘সব শক্তি আল্লাহর কাছ থেকে আসে ব্রুনা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, আপনি সব সময় সব প্রশংসা, সব কৃতিত্ব ও কর্তৃত্ব ঈশ্বর মানে আল্লাহকে দেন। মানুষের নিজস্ব কোন কৃতিত্ব, কর্তৃত্ব নেই? আপনি নিজের শক্তি, নিজের বুদ্ধিতে যা করেন, তার কৃতিত্ব কি আপনি পেতে পারেন না?’ ব্রুনা বলল ।
‘যাকে আমি আমার কাজ বলি, তাতো আমি করি না। আমার হাত যা করে তার কমান্ড পায় মাথা থেকে। মাথার কমান্ড-স্ট্রাকচার কে করেছেন আর তা কার নিয়ন্ত্রণে? আল্লাহর। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ সভ্যতার বিবেক বলে পরিচিত আর্নল্ড টয়েনবীও অবশেষে বলেছেন, মানুষের মাথা চিন্তার আকারে, ভাবনার আকারে কমান্ড পায় ঈশ্বরের কাছ থেকে। এজন্যেই সকল প্রশংসা, কৃতিত্ব আল্লাহর জন্যেই।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করে একটু থেমে আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু তা এখানে কি করছ? দাঁড়িয়ে কেন এখানে?’
‘ঘুমাতে গিয়েছিলাম ভাইয়া, কিন্তু ঘুমাতে পারিনি। আপনি ও বাড়িতে ঢুকে কি করছেন, কি হচ্ছে-এসব অস্থির ভাবনা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আপনার পথের দিকে তাকিয়ে আছি। আর কিছু করার তো উপযুক্ত আমরা নই!’ ব্রুনা বলল। তার শেষের কথাগুলো অভিমান-ক্ষুদ্ধ, ভারি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি তোমাকে সাথে নিইনি এ কারণে যে, এমনভাবে আমাদের এক সাথে যাওয়া উচিত নয় বলে। তোমরা উপযুক্ত নও একথা ঠিক নয়। নারী-পুরুষকে আল্লাহ সমান শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। দুই পুরুষের শক্তি যেমন সমান হয় না, তেমনি নারী-পুরুষের শক্তিও সমান হয় না, এটা হয়ে থাকে নানা কারণে। নারী পুরুষের প্রকৃতিগত পার্থক্য একটাই। সেটা হলো, নারী সৃষ্টিগতভাবে দৈহিক দিক দিয়ে রক্ষণাত্নক, আর দৈহিক দিক দিয়ে পুরুষেরা আক্রমনাত্নক। এই আক্রমণের সুযোগ যাতে পুরুষরা না পায়, নারীদেরকে আক্রান্ত যাতে না হতে হয়-এজন্যে নারীদেরকে একটু সাবধানে চলতে হয়। নিজেদের দেহ-সৌন্দর্যকে পুরুষের আক্রমণাত্নক চোখের একটু আড়ালে রাখতে হয়। নারীর প্রকৃতিগত এই বৈশিষ্ট তার যোগ্যতাকে বুদ্ধিকে অবশ্যই খাটো করেনি।’
মুগ্ধ, সম্মোহিত ব্রুনা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘চল, আর কোন কথা নয়। রাত শেষ হতে যাচ্ছে। ঘুমাতে হবে।’
বলে চলতে শুরু করল আহমদ মুসা।
ব্রুনাও।
চলতে চলতে ব্রুনা বলল, ‘ভাইয়া, ঘুমাবেন কি করে? আপনার তো নামাজের সময় হলো।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ধন্যবাদ তোমাকে। গোসল করে ফ্রেশ হতে হতে ফজর নামাজের সময় হবে। নামাজ পড়েই ঘুমাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, আপনাদের প্রার্থনা আমার খুব ভালো লাগে। সত্যিই জীবন্ত ধর্ম আপনাদের। আল্লাহর সাথে আপনাদের সম্পর্ক সার্বক্ষণিক। আমাদের ধর্ম আমাদেরকে কোন কাজ দেয়নি। তাই ঈশ্বরের সাথে আমাদের সম্পর্কও নেই।’ ব্রুনা বলল।
‘ধন্যবাদ। তুমি দেখছি অনেক কিছু ভাবছ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি আপনাদের ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি। ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল বুঝাবুঝি আছে আমাদের দেশে। আপনাকে দেখে, আপনার কথা শুনে ইসলামকে আমি নতুন করে বুঝছি। আপনি খুশি হবেন না ভাইয়া?’ ব্রুনা বলল।
‘আল্লাহ খুশি হবেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তিনি অনেক উপরে। আমি আপনার খুশির কথা বলছি।’ ব্রুনা বলল।
‘আল্লাহ যাতে খুশি হয়, বান্দাহ হিসাবে আমি তাতেই খুশি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার ঈশ্বর প্রেম বিস্ময়কর ভাইয়া! আর কেউ মানে আমি বা আমরা কি এটা পারব?’ ব্রুনা বলল।
‘তোমার মনে যে এ কথা জেগেছে, এসেছে, এটাই প্রমাণ করে তুমি পারবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। ভালো…।’
ব্রুনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আর কোন কথা নয়। তোমার পথ ওদিকে। যাও, এখন ঘুমাও।
‘কিন্তু ভাইয়া, ভুলেই গেছি। জিজ্ঞাসা করা হয়নি আপনার অভিযানের কথা। কি হলো, প্লিজ একটু বলুন।’
‘বলেছি কোন কথা নয়। এখন ঘুমাতে যাবে, ঘুমাবে। সব শুনবে সকালে।’
বলেই আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে তার কক্ষের দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। গুড নাইট!’ পেছনে থেকে একটু উঁচু কন্ঠে বলল ব্রুনা।
সেও তার কক্ষের দিকে হাঁটা শুরু করেছে।

সকালে নিচে নেমেই হৈ চৈ শুরু করেছে কনরাড।
কনরাডকে বাড়ির ম্যাডাম কারিনা কারলিনের প্রেমিক মনে করা হয়। তার আচার-আচরণে বাড়ির লোকেরা এটাই মনে করে। সে মাঝে মাঝে এ বাড়িতে আসে। আসলে থাকে দোতলায় ব্রুনা কিংবা আনালিসার ঘরে। তাছাড়া সারা দিনই থাকে কারিনা কারলিনের সাথে।
হৈ চৈয়ের কারণ হলো সে উপর থেকে নেমে প্রহরীদের কাউকে পায়নি। নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে ২৪ ঘন্টা পাহারার ব্যবস্থা। কিন্তু কনরাড এসে ম্যাডাম কারিনা কারলিনের ঘরের সামনেও কোন প্রহরী পায়নি। প্রহরীদের ঘরে গেছে। প্রহরীদের সবাইকে তাদের ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছে। ডাকাডাকি, চিৎকার-চেঁচামেচি করেও তাদের জাগাতে পারেনি।
অন্যদিকে ডাকাডাকি করেও কারিনা কারলিনের দরজা খোলানো যায়নি। অবশেষে ব্ল্যাক লাইট-এর মাস্টার কোড ব্যবহার করে তার ঘরে ঢুকেছে কনরাড। কারিনা কারলিনকেও ঘুমন্ত পেয়েছে কনরাড। ডাকাডাকি করে তাকেও তোলা যায়নি।
ইতিমধ্যে ব্ল্যাক লাইট কর্তৃপক্ষের যারা এ বাড়িতে ছিল, তারও এসে গেছে। ব্যাপার কি বুঝতে না পেরে ডাক্তার ডাকা হয়েছে।
ডাক্তার বলেছে, এক ধরনের ক্লোরোফরম গ্যাসের প্রভাবে তারা সবাই সংজ্ঞা হারিয়েছে। ডাক্তারের বিশেষ চেষ্টার পর তাদের সংজ্ঞা ফিরেছে। কিভাবে সংজ্ঞা হারায় তা দু’জন প্রহরী ছাড়া আর কেউ বলতে পারেনি। কারিনা কারলিনও নয়। দু’জনের জবান বন্দী থেকে কনরাডরা জানতে পেরেছে, কে একজন লোক বাড়িতে ঢুকেছিল। তারা তাকে পেছন থেকে জাপটেও ধরেছিল। কিন্তু কিভাবে যেন তারা দু’জনও সংজ্ঞা হারায়। লাউঞ্জের দরজায় তারা লোকটাকে জাপটে ধরেছিল। কিন্তু সেখানেই তারা সংজ্ঞা হারায়। কিভাবে তারা তাদের বিছানায় যায় তা তারা জানে না।
কারিনা কারলিন জ্ঞান ফিরে পেয়ে বলে যে, সে ঘুমিয়েছিল, সংজ্ঞা হারিয়েছিল কিনা সে জানে না। কিন্তু তার ঘরের বাতাস পরীক্ষা করে প্রমাণিত হয়েছে এক ধরনের ক্লোরোফরম গ্যাস ঘরের বাতাসে রয়েছে। ঘন্টা চারেক আগে এ গ্যাসের ঘনত্ব সংজ্ঞা লোপ করার মত অবশ্যই ছিল।
কিন্তু কেউ ভেবে পেল না মুক্ত বাতাস প্রবেশ করতে না পারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে কিভাবে এমন ধরনের গ্যাস প্রবেশ করতে পারে।
বিষয়টা নিয়েই আলোচনায় বসেছে কারলিন, কনরাডসহ ব্ল্যাক লাইটের উপস্থিত কর্তা ব্যক্তিরা।
কারিনা কারলিন বলছিল, ‘আমার ঘরসহ বাড়ির সব ঘর চেক করা হয়েছে, কিন্তু কোন জিনিস খোয়া যায়নি।’
‘কিন্তু লোক তো এসেছিল, এটা ঠিক, দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এটা। তারা জড়িয়েও ধরেছিল তাকে। এ ঘটনা মিথ্যা নয়।’ বলল কনরাড।
‘তাহলে কেন এসেছিল? এতগুলো লোককে সংজ্ঞাহীন করল কোন্ উদ্দেশ্যে? দু’জনে তাকে আগে দেখতে পাওয়ার পরও পেছন থেকে আক্রমণ করার পরও মাত্র একজনকে যখন আটকাতে পারেনি, তখন সেই লোকটি খুব সাধারণ নয়।’ বলল ব্ল্যাক লাইটের উপস্থিত একজন কর্মকর্তা।
‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু অসাধারণ এই লোকটি কে? কেন ঢুকেছিল এ বাড়িতে? কোন দিক দিয়ে ঢুকেছিল?’ বলল ব্ল্যাক লাইটের আর একজন।
‘ঠিক তো, সে কোন্ দিক দিয়ে ঢুকেছিল? সামনের গেট বন্ধ ছিল। গেট-বক্সে ছিল সিকুরিটির লোক। গোটা রাতে এ গেটে কেউ আসেনি। সেকেন্ড গেটেও সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল লোক। এ দু’গেটে ছাড়া বাড়ির ভেতরে ঢোকার, কোন ঘরে প্রবেশের দ্বিতীয় কোন পথ নেই। সারা রাতে এ দুই গেটে কেউ আসেনি। তাহলে এ লোক কোন দিক দিয়ে ঢুকল?’ বলল কনরাড।
‘এ বাড়িতে ঢোকার আর তো কোন পথ নেই। লোকটি তাহলে বাইরে থেকে আসেনি?’ কারিনা কারলিন বলল।
ভ্রূকুঞ্চিত করলো কনরাড। বলল, ‘ভেতর থেকে আবার কে হবে? প্রহরীদের কেউ? ওরা এই বিশেষ ধরনের ক্লোরোফরম পাবে কোথায়? আর তারাও তো সংজ্ঞাহীন ছিল।’
‘কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে যেই হোক, কিছু চুরি করেনি, কাউকে খুন করেনি, তাহলে সে ঢুকেছিল কেন?’
প্রশ্নটার জবাব দিল না কেউ।
নিরব সবাই।
বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ খুলল কনরাড। বলল, ‘বিষয়টি বস ব্ল্যাক বার্ডকে জানানো দরকার। যা ঘটেছে বিষয়টি ছোট নয়। শীর্ষ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
‘আমিও তাই মনে করি।’ বলল কারিনা কারলিন।
‘ঠিক আছে। এটাই এখন এই অবস্থায় করণীয়।’ বলল সবাই।
‘ঠিক আছে। ধন্যবাদ সবাইকে।’
বলে উঠে দাঁড়াল কারিনা কারলিন।
সবাই উঠল।

আহমদ মুসা এসে বসল সোফায়।
সামনের সোফায় ব্রুনা ও ব্রুনার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড আগেই এসে বসেছিল।
মাঝের টেবিলে তিনটি কাপ ও কফি পট ছিল।
আহমদ মুসা বসতেই ব্রুনা একটু সামনে ঝুঁকে পড়ে তিন কাপ কফি ঢেলে একটি আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলল, ‘ভাইয়া আপনি চা, কফি কিছুই খেতে চান না। সারা রাত পরিশ্রম করার পর গোসল করে ফ্রেশ হয়ে লম্বা ঘুম দিয়েছেন। এখন খাওয়া-দাওয়ার পর এই গরম কফি খুব ভালো লাগবে।’
পিতাকে কফির অন্য কাপটি দেয়ার পর নিজে একটি নিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসল ব্রুনা।
‘ধন্যবাদ ব্রুনা, সত্যি ইচ্ছা করছিল কফি খেতে।’ বলে আহমদ মুসা কফির কাপ তুলে নিল।
‘ভাইয়া, আপনার সম্পর্কে কিছুই জানি না। কিছু জানার কি চেষ্টা করতে পারি?’ বলল ব্রুনা।
‘না, ব্রুনা। এখন উনি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এ সময় ওকে বিরক্ত করো না।’
ব্রুনার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড বলল।
‘বাবা, ঐ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করলে কফি খাওয়া হবে না। ভাইয়াও তো বললেন কফি খেতে তারও ইচ্ছা করছে। কফি খাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা মানাবে ভালো।’ বলল ব্রুনা ।
‘ঠিক আছে। তুমি ভালো বলেছ ব্রুনা। কিন্তু ব্রুনা, হঠাৎ তুমি ওকে ‘ভাইয়া’ বলছ, অনুমতি নিয়েছ?’ ব্রুনার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড বলল।
‘মুসলমানদের মধ্যে কুলিন ও অকুলিন নেই। তারা একে অপরের ভাই, বোন। সুতরাং অনুমতির দরকার নেই। তবু তিনি তাঁকে ভাইয়া বলার অনুমতি দিয়ে আমাকে গৌরবান্বিত করেছেন বাবা।’ বলল ব্রুনা। তার কন্ঠ আবেগ-রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
‘ধন্যবাদ ব্রুনা। এবার তুমি প্রশ্ন করো।’ আলদুনি সেনফ্রিড বলল।
ব্রুনা নিজেকে সামলে নিয়েছে।
সংগে সংগে অবশ্য কথা বলল না।
ব্রুনা হেসে উঠে তার কফির কাপটা পিরিচে রাখতে রাখতে বলল, ‘ভাইয়া, আপনার কে কে আছে? কোথায় থাকেন, এসব বিষয় জানার আমার খুব কৌতুহল।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সেটা খুব ভালো খবর নয় ব্রুনা। রক্তের সম্পর্ক যাদের সাথে থাকে, তাদের যদি আত্নীয় বলা হয়, তাহলে সে ধরনের কোন আত্নীয় আমার নেই। আছে স্ত্রী, একটি লাভলী শিশুপুত্র। আমাদের একটি পবিত্র শহর মদিনায় তারা থাকে। এই হলো সংক্ষিপ্ত বিবরণ।’ থামল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া, কিন্তু সব কথা হয়নি।’
‘আমি জানি, এটুকু সব কথা নয়। বাকিটা ভবিষ্যতের জন্যে থাকল।’
বলেই আহমদ মুসা কফির কাপ পিরিচের উপর রেখে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘কফি খাওয়া প্রায় শেষ, এখন কাজের কথা আমরা শুরু করতে পারি।’
‘হ্যাঁ, মি. আহমদ মুসা, আমরা রাত থেকেই উদ্গ্রীব হয়ে আছি, আপনি ফেরার পর উদ্বেগ যদিও এখন নেই।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘হ্যাঁ, মি. সেনফ্রিড, আমিও উদ্গ্রীব কিছু জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়ার জন্যে। ও বাড়িতে ঢুকে জানার চেয়ে জিজ্ঞাসাই বেশি সৃষ্টি হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলুন মি. আহমদ মুসা।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘বাড়িতে ঢুকে প্রথমে আমাকে যে ঘরে পা রাখতে হলো, সেটা একটা হল ঘর। চৌদ্দটি বিছানা পাতা খাটে। সেখানে…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে ব্রুনা বলে উঠল, ‘আপনি কিভাবে ঢুকলেন সেটা তো বললেন না? কিভাবে ধাঁধা ভাঙলেন? এটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ও শিক্ষামূলক।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি কথা সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছিলাম। ঠিক আছে, সংক্ষেপে সব কথাই বলি।’
আহমদ মুসা একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘কোন ঘর বা কোন স্থান থেকে গোপন পথ শুরু হয়েছে, তা খুঁজে পেতে খুব বেশি দেরি হয়নি আমার। তারপর….।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে ব্রুনা আবার বলে উঠল, ‘কিভাবে পেলেন? কোন প্রকার চিহ্নের কথা তো বাবা বলেননি?’
‘বলেননি। ঘরগুলোর অবস্থান, জানালাগুলোর স্থান পর্যবেক্ষণ করে যে স্থানকে সন্দেহ করি, ঠিক সেখানেই খুঁজতে খুঁজতে ডিজিটাল লক পেয়ে যাই। কোড…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে আবার কথা বলে উঠল ব্রুনা। বলল, ‘স্যরি ভাইয়া! ঘরগুলো ও জানালাগুলো পর্যবেক্ষণ করে কিভাবে কোন স্থানটিকে সন্দেহে করলেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘গোয়েন্দা হতে চাও নাকি? ঠিক আছে। তোমাদের বাড়ির একতলার দক্ষিণ দিকে বেড়ে যাওয়া তিন ঘরের দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে ৩টি জানালা আছে। চতুর্থ জানালাটি আছে পুবের ও মাঝের ঘরের মধ্যবর্তী স্থানের দেয়ালে। কিন্তু পশ্চিম প্রান্তের ও মাঝের ঘরের মধ্যবর্তী অনুরূপ স্থানের দেয়ালে কোন জানালা নেই। এটা নির্মাণ সামঞ্জস্য বিধানের দিক থেকে একটা বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা। এই ভারসাম্যহীনতা কেন? এই উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হয়, এই দেয়ালকে অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকেই আমি মনে করেছি, এই দেয়ালেই গোপন পথের প্রবেশ পথ রয়েছে।’
আহমদ মুসা থামতেই আবার প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল ব্রুনা।
আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আর কোন প্রশ্ন নয় ব্রুনা। তুমি যা জানতে চাও সবই বলব।’
একটু থেমে শুরু করল আহমদ মুসা। বলল কি করে পাথরের দেয়ালে ডিজিটাল কী বোর্ড খুঁজে পেল, কিভাবে কয়েকবার ব্যর্থ হবার পর কোড-ধাঁধা ভাঙতে পারল, তার ঘরের ভেতরের আলমারির ধাঁধার কথা বলল। সেটার সমাধান করে কি করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল তা জানাল। তারপর প্রহরীদের সংজ্ঞাহীন করার কথা, দুই প্রহরী দ্বারা আক্রান্ত হবার কথা, ব্রুনার মায়ের ঘরে ঢোকার জন্যে কিভাবে তার দরজার ডিজিটাল লকের ধাঁধা ভাঙল। সব বলল আহমদ মুসা। ঘরে ঢুকে সন্ধানের সুবিধার জন্যে ব্রুনার মাকে ক্লোরোফরম ফায়ার করে সংজ্ঞাহীন করার কথা বলল। ঘরে সন্ধান করে কি পেয়েছে, কি দেখেছে তা বলে থামল আহমদ মুসা।
ব্রুনা ও তার বাবা অবাক বিস্ময়ের সাথে আহমদ মুসার কথা শুনছিল।
আহমদ মুসা থামতেই ব্রুনা অনেকটা সন্দেহের সুরে বলে উঠল, ‘দক্ষিণ দেয়াল ও মা’র ঘরের দরজার প্রকৃত কোড কিভাবে পেলেন? কোড দু’টি কি?’
‘কিভাবে পেলাম? চিন্তা করলে তুমিও পাবে। তোমার মায়ের দরজার কোডটা অংকের ধাঁধা, আর দক্ষিণ দেয়ালের কোডটা অক্ষরের ধাঁধা। কোড দু’টি কি তা এখন শুনতে চেয়ো না, তাহলে ও বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছা হয়ে যেতে পারে। সমস্যা কেটে গেলে কোড দু’টি জানিয়ে দেব। তোমাদের বাড়ির কোড তোমাদের না জানলে চলবে কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বলেছেন মি. আহমদ মুসা! ব্রুনা, তুমি ছোটবেলা থেকেই অ্যাডভেনচারাস। তোমার না জানাই ভালো এখন।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘ঠিক আছে বাবা। আমি বুঝেছি। কিন্তু আমার একটা বিস্ময় কাটছে না, তাড়াহুড়া ও টেনশনের মধ্যে কিভাবে সঠিক কোডটি আপনার মাথায় এল ভাইয়া?’ ব্রুনা বলল।
‘আল্লাহর সাহায্যে ব্রুনা। মানুষ যখন উপায়হীন অবস্থায় পৌঁছে, তখন আল্লাহ মানুষের সহায় হয়ে দাঁড়ান।’
‘সব সময়ই?’ ব্রুনার জিজ্ঞাসা।
‘সব সময়ই, যদি মানুষ চায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘না চাইলেও আল্লাহ এই সাহায্য দেন না?’ বলল ব্রুনা।
‘দেন, আবার না দিতেও পারেন। ‘আল্লাহ’ নাম ছাড়া আল্লাহর আরও অনেক নাম আছে। তার মধ্যে দু’টি নাম হলো ‘রাহমান’ ও ‘রাহীম’। দুই নামের অর্থ ‘দয়ালু’ ও ‘দাতা’। এই দুই নামের ফাংশন ভিন্ন। ‘রাহমান’ হিসাবে আল্লাহ মানুষসহ সব সৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। এই দয়া তার কাছে চাইতে হয় না। সূর্যের কিরণ, চাঁদের আলো, পানির যোগান, খাদ্যের উৎস, দেহের প্রকৃতিগত স্বয়ংক্রিয়তা, বাতাসের সরবরাহ প্রভৃতি সব কিছুই আল্লাহর এই দয়ার ফল। তাঁর সৃষ্টিসমূহ রক্ষার জন্যে আল্লাহ এই দয়া দিয়ে থাকেন। কিন্তু ‘রাহীম’ হিসাবে আল্লাহর যে দয়া তা তাঁর কাছে চাইতে হয়। তুমি বিপদে পড়েছ, তখন তোমাকে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। যেমন খাদ্য নেই, তাঁর সাহায্য চাইতে হবে। তুমি….।’
আহমদ মুসা থেমে গেল। তার কথার মাঝখানেই কথা বলে উঠেছে ব্রুনা। বলল সে, ‘না চাইলে সাহায্য এখানে তিনি কেন দেন না?’
‘কারণ মানুষ যেমন বিপদ সৃষ্টি করে, বিপদ চাপায়, তেমনি মানুষ বিপদ থেকে মুক্ত হবারও সামর্থ্য রাখে। সেই সামর্থ্য ব্যবহার করে বিপদ থেকে মুক্ত হতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু মানুষ যদি চেষ্টা করেও তার সামর্থ্য দিয়ে মুক্ত হতে না পারে, খাদ্য যোগাড় করতে না পারে, তাহলে?’ বলল ব্রুনা।
‘আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। এজন্যেই নির্দেশ হলো, সব সময় সব ক্ষেত্রে চেষ্টার সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্যেরও প্রত্যাশী হতে হবে। মানুষের সামর্থ্য যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর সাহায্য সেখানে শুরু হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আরেকটা কথা ভাইয়া, আপনি বললেন, রাহমান হিসাবে আল্লাহ না চাইতেই তাঁর সৃষ্টির জন্যে পানি, খাদ্যের সরবরাহ দেন। কিন্তু বাতাস, সূর্যের রোদ যেভাবে আমরা পাই, পানি, খাদ্য তো সেভাবে পাই না? পানি ও খাদ্যের সংকট সৃষ্টি হয় কেন?’ বলল ব্রুনা।
‘বাতাস, রোদ থেকে পানি ও খাদ্যের মত বস্তু কিছুটা ভিন্ন। সৃষ্টির জন্যে আল্লাহ পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা দুনিয়াতে করেছেন। কিন্তু সে পানি ও খাদ্য মানুষকে উৎপাদন বা সংগ্রহ করতে হয়। আজ দুনিয়াতে এই উৎপাদন ও সংগ্রহ অবাধ নয়। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি ও দেশগত বিভেদ সৃষ্টি করে এই উৎপাদন ও সংগ্রহের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। সংকট সৃষ্টি হওয়ার কারণ এখানেই। অংক কষে দেখতে পার, যে কোন যুগ বা কালের মানুষের সংখ্যা দিয়ে দুনিয়ার খাদ্যকে ভাগ করে দেখ খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে। তবু দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে অনেক মানুষ খাদ্য সংকটে পড়ে, পড়বে। এ সংকট মানুষের তৈরি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চমৎকার ভাইয়া! অপরূপ এক তথ্য দিলেন। ধন্যবাদ আপনাকে ভাইয়া। এখন বলুন, এর সমাধান কি?’ বলল ব্রুনা।
‘সমাধান এক কথায় বলা যাবে না। আমাদের ধর্মে মানে ইসলাম ধর্মে আল্লাহ এর সমাধান দিয়েছেন দু’ভাবে-নৈতিক ও আইনি। এটা জানার জন্যে তোমাকে অনেক পড়াশুনা করতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার পরেই একটা দুষ্টুমি জেগে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘তাহলে তো ভাইয়া মুসলমান হয়ে যেতে হবে।’
‘আমি তোমাকে মুসলমান হতে বলিনি। সমাধান খুঁজতে বলেছি।’ আহমদ মুসা বলল। তারও ঠোঁটে হাসি।
‘কেন বলবেন না মুসলমান হতে? আপনি তো মুসলমান।’ বলল ব্রুনা। তার কন্ঠ ভারি, অভিমানের সুর তাতে।
‘মুসলমান হওয়া না হওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন বড় ভাই ছোট বোনকে নির্দেশ দিতে পারে না?’ বলল ব্রুনা।
‘সব ব্যাপারে নয় ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘আর কোন কথা নয় ব্রুনা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের আলোচনা হতে হবে।’
‘ব্রুনা, অনেক সুন্দর ও ভারি বিষয় তুমি শুনেছ ওর কাছে। আমারও খুব ভালো লেগেছে। এস, সেগুলো আমরা হজম করি। ওকে কথা বলতে দাও।’ বলল ব্রুনার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড।
‘ঠিক বলেছেন বাবা।’ বলে চুপ করে গেল ব্রুনা। গা এলিয়ে দিল সোফায়।
আহমদ মুসা শুরু করল, ‘আমি ঐ বাড়ির যে বিবরণ আপনাদের দিয়েছি, যা আমি জেনেছি, তাতে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। যেমন, আপনাদের স্টেট হস্তান্তরিত হচ্ছে। তারপর ওরা সবাই এখান থেকে চলে যাবে। দ্বিতীয়ত, এই হস্তান্তরে সমস্যা দেখা দিয়েছে স্বাক্ষর ও বুড়ো আঙুলের টিপসহি নিয়ে। প্রশ্ন হলো, ব্রুনার মা তার স্টেট বিক্রি করছেন কেন? কোথায় যাচ্ছেন তিনি? আর স্বাক্ষর ও টিপসহি নিয়ে সমস্যা হবে কেন? তৃতীয়ত, ব্রুনার মায়ের ড্রয়ারে ক্লোন মেডিসিন পাওয়া গেছে। তার ওয়ালেট ফোল্ডারে, তার প্রেসক্রিপশনে তাকে ক্লোন-৭ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তার দুই হাতের বুড়ো আঙুলে অদ্ভুত ধরনের ব্যান্ডেজ এবং তার হ্যান্ড ব্যাগে পাওয়া গেছে প্লাস্টিক স্কিন বিশেষজ্ঞের একটা প্রেসক্রিপশন। তাতেও ব্রুনার মাকে ক্লোন-৭ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাকে ক্লোন-৭ বলা হচ্ছে কেন? ক্লোন মেডিসিন কেন তার টেবিলে? তার দুই বুড়ো আঙুলে কি হয়েছে? কেন তিনি প্লাস্টিক স্কিন বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা নিচ্ছেন?’
বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে ব্রুনা ও তার বাবার মুখ। তাদের স্টেট বিক্রি, স্বাক্ষর ও টিপসহি নিয়ে সমস্যা, ক্লোন-৭, ক্লোন চিকিৎসা-এ সব কিছুই তাদের হতবাক করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ তারা কথাই বলতে পারলো না।
অবশেষে কথা বলল আলদুনি সেনফ্রিড। বলল, ‘আমার স্ত্রী, ব্রুনার মা’র সাথে এসব কোন কিছুই মিলছে না মি. আহমদ মুসা। আপনি যে বললেন, টয়লেটের টেবিলের ড্রয়ারে ওষুধ পেয়েছেন। কিন্তু কারিনা কারলিন কোন দিন ওখানে ওষুধ রাখেননি। পারিবারিক স্টেট বিক্রির কোন প্রশ্নই ওঠে না। ব্রুনার মা এমন চিন্তা করতেই পারেন না। আর ব্রুনার মা যদি স্টেট হস্তান্তর করতেই চান, তাহলে স্বাক্ষর ও টিপসই প্রব্লেম হবার কথা নয়। শুধু সমস্যা হতে পারে আমাদের দুই সন্তান ও আমাকে নিয়ে। কারণ আমরা বেঁচে থাকা অবস্থায় তার স্টেট হস্তান্তর পূর্ণাংগ হবে না। পারিবারিক দলিলে আছে, যিনি স্টেটের মালিক হবেন, তিনি স্টেট হস্তান্তরের অধিকারী হলেও তার উত্তরাধিকারীদের সম্মতি না থাকলে স্টেট হস্তান্তর আইনসিদ্ধ হবে না।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
আহমদ মুসা উদ্গ্রীবভাবে কথাগুলো শুনছিল। তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বলল, ‘ধন্যবাদ মি. সেনফ্রিড, আমার চিন্তার সাথে আপনার কথাগুলো সংগতিপূর্ণ। তিনটি বড় বিষয় এখন আমাদের সামনে। এক, ব্রুনার মায়ের স্টেট বিক্রি করাসহ অদ্ভুত সব পরিবর্তন কেন? দুই, তার ক্লোন মেডিসিন নেয়া, প্লাস্টিক স্কিন বিশেষজ্ঞের প্রেসক্রিপশন গ্রহণ করা ও তার বুড়ো দুই আঙুলে প্লাস্টিক ব্যান্ডেজের রহস্য কি? আর তিন, স্টেট হস্তান্তরে স্বাক্ষর টিপসই নিয়ে যে সমস্যা হয়েছে, তার সাথে ব্রুনার মায়ের প্লাস্টিক স্কিন চিকিৎসা ও দুই বুড়ো আঙুলের ব্যান্ডেজের সম্পর্ক আছে কি না? আসলে এই তিনটি বিষয় মিলে একটাই মেগা সাবজেক্ট আমাদের কাছে, সেটা হলো ব্রুনার এই মা আসলে ব্রুনার মা কিনা? এই মহাপ্রশ্নের…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই আলদুনি সেনফ্রিড বলে উঠল, ‘স্যরি মি. আহমদ মুসা, ব্রুনার মায়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে ঠিক। কোন কারণ হয়তো এর জন্যে দায়ী। কিন্তু আপনি কি তাকে ব্রুনার মা নয় বলে সন্দেহ করেন?’
‘আমি নিশ্চিত নই এখনও মি. আলদুনি সেনফ্রিড, কিন্তু এই সন্দেহের পাল্লাই আমার কাছে ভারি বেশি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ভাইয়া, আমার মনেও অনেক সন্দেহ, এরপরও আমি মনে করি আমার মা ঠিক আছে। কিন্তু তার ভেতরে কিছু ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে। আর যে কোন কারণেই হোক একটা চক্রের দ্বারা ঘেরাও। এই চক্রের হাত থেকে মাকে উদ্ধার করতে পারলে এবং তার চিকিৎসা করালেই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন।’ বলল ব্রুনা।
‘আমিও তোমাদের মত করে ভেবে আসছিলাম। কিন্তু সেই ভাবনা রাখতে পারছি না। আমার নিশ্চিতই মনে হচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞানের এক অপব্যবহারের মাধ্যমে তোমার মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে এনে বসানো হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
আঁৎকে উঠে সোজা হয়েছে ব্রুনা ও তার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময়! বলল ব্রুনা, ‘মায়ের বদলে অন্য কাউকে? কিভাবে? বিজ্ঞানের অপব্যবহারটা কি?’
‘এখন পর্যন্ত আমার এটা নিছকই সন্দেহ যে, তোমার এই মা তোমার আসল মায়ের ক্লোন।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘মায়ের ক্লোন?’ বলে আর্ত চিৎকার করে উঠে দাঁড়িয়েছে ব্রুনা। পরক্ষণেই আবার ধপ করে বসে পড়েছে সোফায়।
আলদুনি সেনফ্রিডেরও দুই চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেছে।
দু’জনেরই কেউ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
আহমদ মুসাও কোন কথা বলল না। ওদেরকে বিস্ময়টা হজম করার সুযোগ দিল।
আলদুনি সেনফ্রিড নিরবতা ভেঙে এক সময় বলে উঠল, ‘এ কি সম্ভব মি. আহমদ মুসা?’
‘তাহলে আমার মা গেল কোথায়?’ কান্না জড়িত কন্ঠে বলল ব্রুনা।
‘ক্লোন সায়েন্স অনেক দূর এগিয়েছে। কোন বিজ্ঞানী বা কিছু বিজ্ঞানী গোপনে হয়তো একে আরও এগিয়ে নিয়েছে। তবে যা বলছি তা নিশ্চিত নয়। আরও সন্ধান করলেই তা বুঝা যাবে। কিন্তু বিরাট এক রহস্য যে ব্রুনার এই মাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে দু’টি প্রেসক্রিপশনের কথা বললাম, সে দুই ডাক্তারের নামও ভুয়া হতে পারে। আমি রাতে অভিযান থেকে ফিরেই ইন্টারনেটে ‘অ্যারেন্ডসী’ শহরের ডাক্তারের তালিকা বের করে দেখেছি, ঐ দুই নামে কোন ডাক্তার ‘অ্যারেন্ডসী’তে নেই। তবে ঐ বিষয়ের ডাক্তার আছে অ্যারেন্ডসীতে।’
‘তাহলে? ডাক্তারের মাধ্যমে সন্ধান নেবার পথও তাহলে থাকল না।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড হতাশ কন্ঠে।
‘সেপথ বন্ধ হলো বটে, অন্য পথ আল্লাহ খুলে দেবেন। আমাদের যেতে হবে অ্যারেন্ডসীতে। আমার মনে হচ্ছে, অ্যারেন্ডসীই হতে পারে কাহিনীর গোড়া।’
আলদুনি সেনফ্রিড ও ব্রুনা দু’জনেই নিরব। দু’জনেরই মুষড়ে পড়া ভাব।
আহমদ মুসাও ভাবছিল।
নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘মি. সেনফ্রিড, ব্রুনার মার সাথে যখন আপনার বিয়ে হয়, তখন তার বয়স কত ছিল?’
‘বিশ বছর। জার্মান স্টান্ডার্ডে আমাদের বিয়েটা বেশ আগেই হয় বলা যায়।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘বিয়ের পর কি তিনি এমন কোন বড় অসুখে পড়েছিলেন যখন তাকে দশ পনের দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘না, এমন কোন অসুখ হয়নি। হামবুর্গ হাসপাতালে তার ভর্তির বিষয়টা তো আমি আপনাকে বলেছি। এর আগে কখনো তাকে কোন হাসপাতালে থাকতে হয়নি।’ বলল সেনফ্রিড।
‘কিন্তু বাবা, বিয়ের আগে মা হাসপাতাল ছিলেন বেশ কিছুদিন।’ বলল ব্রুনা।
‘হতে পারে। বিয়ের পরের কথা আমি বললাম।’
‘হামবুর্গ হাসপাতালে মা যখন ছিলেন, তখন কথায় কথfয় একদিন বলেছিলেন যে, এই হাসপাতালে আমি আর এক বার ছিলাম বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সবে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। অনেক পুরানো এই হাসপাতাল।’ বলল ব্রুনা।
‘তখন বয়স কত ছিল?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘আঠার-ঊনিশ হবে।’ বলল ব্রুনা।
‘বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। কিন্তু হামবুর্গ হাসপাতালে কিভাবে এসেছিলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘মার কাছে শুনেছি, বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা এসেছিল হামবুর্গে শিক্ষা সফরে। মা হঠাৎ বিশেষ ধরনের নিউরালজিক পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার চিকিৎসায় হামবুর্গ জেনারেল হাসপাতাল ছিল স্পেশিয়ালাইজড।’ বলল ব্রুনা।
‘আর এবার তিনি কেন হামবুর্গ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হঠাৎ ঐ বিশেষ ধরনের নিউরালজিক পীড়ায় আক্রান্ত হলে তাকে হামবুর্গ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘এবং এই পীড়ার চিকিৎসায় হামবুর্গ জেনারেল হাসপাতাল স্পেশালাইজড।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক তাই।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘এই দু’বার ছাড়া কি আর কখনো তিনি এ পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আর কখনো তার ঐ রোগ হয়নি।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
ভ্রূকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। দু’বারই হামবুর্গে অবস্থানকালে তার এমন রোগ হয়েছে, যে রোগের জন্যে হামবুর্গ জেনারেল হাসপাতাল স্পেশালাইজড। এই দুই ঘটনা কি কাকতালীয়, না এর পেছনে কোন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র ছিল? ষড়যন্ত্র হলে কি ষড়যন্ত্র, কেন ষড়যন্ত্র? এর সাথে ক্লোনের কি কোন সম্পর্ক আছে? থাকলে সেটা কি, কিভাবে? হিউম্যান ক্লোনিং-এর বেশ কয়েকটি পদ্ধতি আছে। ক্লোন সম্পর্কিত তার সন্দেহ সত্য হলে সে ক্লোনটা কিভাবে হয়েছে। আহমদ মুসার মনের অদৃশ্য এক প্রান্ত থেকে একটা কথা ভেসে এল, ভেড়া ‘ডলি’ থেকে ক্লোন করে ১৯৯৬ সালে আরেকটা হুবহু ‘ডলি’ তৈরি হয়েছিল ‘নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার ক্লোন’ পদ্ধতিতে, সেই পদ্ধতিই কি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে?
আহমদ মুসার মনে হলো, হ্যাঁ, এই পদ্ধতির ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু এই বিষয় তদন্ত সাপেক্ষ। এমন দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র হলে তার পটভূমি কি ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তবে বড় একটা কিছু ঘটেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আহমদ মুসা গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল।
ব্রুনা অস্থির হয়ে কথা বলতে গিয়েছিল।
তার বাবা আলদুনি সেনফ্রিড ইংগিতে নিষেধ করেছে সংগে সংগেই। এ কয়েক দিনে আলদুনি সেনফ্রিড আহমদ মুসার এমন ভাবনায় ডুবে যাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছে। এই সময়টা আহমদ মুসার জন্যে মূল্যবান।
আহমদ মুসাই এক সময় চোখ তুলে তাকাল আলদুনি সেনফ্রিডের দিকে। বলল, ‘মি. সেনফ্রিড, ব্রুমসারবার্গের কাজ আপাতত আমাদের শেষ। আমাদের পরবর্তী কাজ ‘অ্যারেন্ডসী’তে। সেখান থেকে হামবুর্গেও মাঝে মাঝে যাওয়ার দরকার হবে। আজ রাতেই আমরা যাত্রা করব ‘অ্যারেন্ডসী’র উদ্দেশ্যে।’
‘ওখানে কি কাজ হবে আমাদের?’ আলদুনি সেনফ্রিড বলল।
‘ঐ দুই ডাক্তারের খোঁজ করা। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে রহস্যের জট ওখানেই থাকতে পারে! হামবুর্গ হাসপাতাল থেকেই যদি ঘটনার শুরু হয়ে থাকে তাহলে ঘটনার কেন্দ্র ওখানেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা কি এ বাড়ি ছেড়ে দেব?’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘না, আমাদেরই থাকবে। আগাম কয়েক মাসের ভাড়া ওদের দিয়ে দিন। ওদের বলুন, বাইরে একটু কাজ আছে। কাজ শেষে আমরা ফিরে আসব।’
‘ঠিক আছে মি. আহমদ মুসা। আমি সব ব্যবস্থা করছি।’ আলদুনি সেনফ্রিড বলল।
‘ঠিক আছে। আমি তাহলে উঠছি।’ বলে আহমদ মুসা উঠতে গেল। ব্রুনা বলে উঠল, ‘ভাইয়া, আমার আসল মা কি বেঁচে আছেন, যদি ইনি আমার মা না হন?’
আহমদ মুসা তাকাল ব্রুনার দিকে। ব্রুনার চোখ অশ্রুসজল। আহমদ মুসা বলল নরম কন্ঠে, ‘তুমি এসব চিন্তা করে মন খারাপ করো না। আমরা যেসব ভাবছি সবই ধারনার উপর। কোন কিছুই এখন নিশ্চিত নয়। আল্লাহ না করুন ইনি যদি তোমার মা না হন, তাহলে আমি বলছি, আমার মন বলছে, তোমাদের স্টেট হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন।
‘আর এর মধ্যে যদি স্টেট হস্তান্তর হয়ে যায়?’ বলল ব্রুনা।
আহমদ মুসা সংগে সংগে উত্তর দিল না। ভাবছিল সে। ব্রুনার প্রশ্নটায় যুক্তি আছে। অবশেষে আহমদ মুসা বলল, ‘আল্লাহ আমাদের সাহায্য করছেন। ভবিষ্যতেও তিনি আমাদের সাহায্য করবেন। আমরা তাঁর উপর ভরসা করছি ব্রুনা।’
‘কোন কিছু মানুষের যখন সাধ্যের মধ্যে না থাকে, তখনই তো তাঁর সাহায্য আসে, আপনি বলেছেন। নিশ্চয় তিনি আমাদের সাহায্য করবেন।’ বলল ব্রুনা অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে।
‘আমিন!’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ব্রুনা ও তার বাবাও উঠল।