৫২. ক্লোন ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

গৌরীর ডাইরীর পাতা উল্টিয়ে চলেছে আহমদ মুসা।
ডাইরির পাতার দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত লেখা।
বিস্মিত্ আহমদ মুসা! স্বগত কন্ঠে বলল, তবে যে গৌরী বলল সুড়ঙ্গে আমাকে প্রবেশ করতে দেখে সে ডাইরি লিখেছে, যা পড়ার জন্যে আমাকে বলেছে। কিন্তু পনের বিশ মিনিটে কি কেউ এতটা লিখতে পারে!
ডাইরির পাতা উল্টিয়েই চলল আহমদ মুসা।
ডাইরির পাতার দুই-তৃতীয়াংশের মত শেষ হলো।
শেষের কয়েকটা পাতা লাল কালিতে লেখা।
আহমদ মুসার বুঝার বাকি রইল না নিশ্চয় এই লাল কালির লেখাগুলোই গৌরী তার জন্যে লিখে গেছে।
পড়া শুরু করল আহমদ মুসা:
‘আমার নিজের কথা শেষ করতে পারলাম না। তোমাকে সুড়ঙ্গে দেখে…, মনে কিছু করো না ‘তুমি’ বলেই সম্বোধন করলাম। তোমাকে সেদিন হোটেলে দেখার পর থেকেই কেন জানি মনে হচ্ছে, শত বছরের চেনা তুমি আমার, যাকে ‘আপনি’ বলে দূরে ঠেলে দেয়া সম্ভব নয়। যে কথা বলছিলাম, তোমাকে সুড়ঙ্গে দেখার পরেই আমার মনে হলো আমার সময় শেষ। তোমাকে আমার সাহায্য করতেই হবে। সেটা শুধু তোমার জন্যে নয়, আমার জন্যেও। আমার কথা, যা এ পর্যন্ত লিখেছি, পড়লে দেখতে পাবে, আমি আমাকে, আমার পরিবারকে মুক্ত করার জন্যে ব্ল্যাক সানে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে সবই হারিয়েছি। তুমি আর কি কি করবে সব আমি জানি না, কিন্তু তুমি আমার সেভিয়ার তা নিশ্চিত। তোমার দ্বারা মুক্তি ঘটবে আমার আত্নার, এই অন্ধকার জীবন থেকে। আমি আনন্দিত। দু:খ আমার একটাই আমার পরিবারকে আমি রক্ষা করতে পারলাম না। এই রক্ষা করতে না পারার দু:খ আমার, সে কথা তোমাকে বলার জন্যেই আমার এই লেখা।
সেটা আমার পরিবারের চরম দুর্ভাগ্যের কাহিনী, আমার আতংকের কাহিনী।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের আতংক আমার মাকে নিয়ে। আমার ২২ বছর বয়স পর্যন্ত মাকে নিয়ে আমার এই আতংক মনে জাগেনি। আমার মা আমাদের পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা দু’বোন ও আমার বাবার প্রাণ যেমন আমাদের মা, তেমনি আমরাও তার প্রাণস্বরূপ। অত্যন্ত সুখী ছিল আমাদের পরিবার।
আমার নির্মেঘ এই সুখের আকাশে প্রথম কালো মেঘ মাথা তুলল, আমার ২২ বছর বয়সে, যা আগেই বলেছি। শিক্ষা জীবনের চৌকাঠ পেরিয়ে সবে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি একজন জুনিয়র অধ্যাপক হিসাবে। শুরুর দিকে বাড়ি থেকে গিয়েই ক্লাস নিতাম, রাইন হাইওয়ে ও রাইন রেল কমিউনিকেশন এত সুন্দর যে, আমাদের বাড়ি থেকে বনকে ‘নেক্সট ডোর’ বলে মনে হতো। এর ফলে বাড়িতে অনেক বেশি সময় দিতে পারতাম। প্রথম ঘটনাটা ঘটল এই সময়ের এক রোববারে। দিনটা ছিল মেঘলা-যে কোন সময় বৃষ্টি আসবে এরকম অবস্থা। দু’তলায় আমার শোবার রুম থেকে নামছিলাম, নামতে নামতে দেখলাম সিঁড়ির জানালা খোলা। এগিয়ে যেয়ে জানালা বন্ধ করলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির ধাপের দিকে আসছিলাম। দেখলাম আমার আম্মার শোবার ঘরের পাশে তার ড্রেসিং রুমের ছোট ভেন্টিলেশনটা খোলা, যা সব সময় ভিতর থেকে বন্ধ থাকে। বুঝলাম, সাপ্তাহিক ক্লিনিং-এর সময় নিশ্চয় ক্লিনার বেচারা ভেন্টিলেশনটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে।
আমি ভেন্টিলেটরের দিকে এগোলাম। ইচ্ছা ছিল, মাকে ডেকে দেখি, যদি তিনি ঘরে থাকেন, তাহলে ভেন্টিলেটর বন্ধ করতে বলব।
ছোট্ট জানালা দিয়ে আমি উঁকি দিলাম।
এ জানালা দিয়ে মা’র ড্রেসিং রুমটা দেখা যায়। এর পরেই মায়ের বেড রুম।
ভিতরে তাকিয়েই অপার বিস্ময় নামল আমার চোখে-মুখে! মায়ের মাথা ভরা কালো চুল খোলা, এলোমেলো। হেয়ার ড্রাইয়ে শুকাচ্ছেন। বিস্ময়ে আমার দুই চোখ ছানাবড়া- মায়ের মাথা থেকে সাদা চুল কোথায় গেল! তার মাথার সামনের দিকে অন্তত কয়েক গুচ্ছ চুল সাদা। তিনি চুলে কালার ব্যবহার কোন সময়ই করেন না। তাহলে সাদা চুল গেল কোথায়? কৌতুহল আমার তুংগে। জানালা থেকে সরে আসতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু হলো না আসা। মা ড্রেসিং টেবিলে বসে ছিলেন। দেখলাম, তিনি দ্রুত ড্রয়ারের লক খুলে ছোট একটা বক্স বের করলেন। বক্সটি দ্রুত খুললেন। সাদা কালারের মত কিছু বের করলেন। তারপর সাদা কলপটি তুলে নিয়ে খুব যত্নের সাথে নির্দিষ্ট কয়েকটা গুচ্ছের উপর সাদা রংয়ের স্প্রে শুরু করলেন। অবাক বিস্ময়ে আমি দেখলাম, তার মাথার সামনের নির্দিষ্ট কয়েক গুচ্ছ চুল সাদা হয়ে গেল, যেমনটা আমরা দেখে আসছি।
ডায়িংটা ধীরে ধীরে শেষ করার সংগে সংগেই মা ডায়িং উপকরণগুলো ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে দরজা খুলে ড্রেসিং রুমের বাইরে চলে গেলেন। কৌতুহল ও বিস্ময় আমাকে এতটাই বিব্রত করেছিল যে, আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমিও নেমে এলাম সিঁড়ি দিয়ে। ডাইনিং-এ মায়ের সাথে আমার দেখা হলো। বিষয়টা নিয়ে তাকে কিছু বলতে গিয়েও গলায় আটকে গেল। মন যেন কোন কারণে প্রবল বাধা দিল!
আরেক দিনের ঘটনা। আমি মায়ের স্টাডি রুমে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মায়ের একটা কথায় থমকে দাঁড়ালাম। তিনি বলছিলেন, ‘কি বলছ তুমি, আমি তো সবচেয়ে কষ্টে আছি! আত্নঘাতি অভিনয় করছি আমি। তাড়াতাড়ি শেষ করো।’
কথাগুলো আমার কানে পৌঁছার সাথে সাথে আমার গোটা দেহে দেহ অবশকারী এক ঠাণ্ডা স্রোত যেন বয়ে গেল!
আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম, মা টেলিফোনে কথা বলছেন স্টাডি টেবিলে বসে।
আর শোনার ধৈর্য আমার ছিল না।
আমি সরে এলাম।
আমি ভেবে কুল পেলাম না। মা কী কষ্টে আছেন? কি আত্নঘাতি অভিনয় করছেন মা? কার সাথে টেলিফোনে কথা বলছিলেন তিনি?
প্রশ্নের কোন শেষ নেই! উত্তর নেই একটারও। এই সময় একদিন রাইনের তীরে নিরিবিলি একটা বেঞ্চিতে বসেছিলাম। একটু নিচ দিয়েই বয়ে যাচ্ছিল রাইনের শান্ত স্রোত। ভাবছিলাম মাকে নিয়েই। যতই ভাবি ততই মায়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সেদিন মায়ের বাম হাতের বুড়ো আঙুলে একটা কাটা দাগ দেখলাম। দাগটা প্রথম দেখলাম। তার হাত নিয়ে কত খেলা করেছি এ দাগ কখনো দেখিনি! দাগটা কিন্তু পুরাতন। এত দিন চোখে পড়েনি কেন? অল্প সময়েই আরেকটা বিষয় আমার নজরে পড়েছে। সেটা হলো, মা এখন আমাদের অতীত জীবন মানে ছোটবেলা নিয়ে কোন সম্প্রীতির গল্প বলেন না। অথচ আমাদের পরিবারিক গল্পগুজবে ও আমাদের ব্যক্তি-সংশ্লিষ্ট কথাবার্তাতেও আমাদের ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা ও কথাবার্তা আগে বলতেন। এখন মাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে শুনি না।
এসব চিন্তার মধ্যে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এ সময় একটা কন্ঠ আমার কানে গেল, ‘মা, বসতে পারি?’
মাথা তুলে দেখলাম বাবা দাঁড়িয়ে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বাবাকে স্বাগত জানিয়ে বললাম, ‘বসুন বাবা।’
বাবা এ সময় রাইনের তীর ধরে নিয়মিত হাঁটেন। আজকেও হাঁটছিলেন। আমাকে দেখেই সম্ভবত থেমেছেন।
বাবার সাথে কথা শুরু হলো। আবহাওয়া নিয়ে, এলাকার অবস্থা নিয়ে, শেষে আমার চাকরি, আমার বোনের লেখাপড়া নিয়ে অনেক কথা হলো। শেষে আলোচনা আমাদের মা ও পরিবার বিষয়ে গড়াল। এক সময় বাবা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছে, বললেন, ‘তোমরা বোধ হয় খেয়াল করনি মা, তোমার মা’র সেই যে অসুখ হলো, হামবুর্গ হাসপাতালে থাকল, তারপর তার শরীর-স্বাস্থ্যের খুবই উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সে যেন বদলে গেছে মা।’
আমি চমকে উঠলাম। কিন্তু স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বললাম, ‘তাই মনে করেন বাবা?’
‘তাই তো মনে হয়। অতীত যেন তার কাছে মুছে গেছে, অথচ ব্রেনের স্ক্যান আমাদের মেডিকেল ফাইলে আছে। ওদিক দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ সে।’ বললেন বাবা।
‘তাহলে বাবা?’ আমি বাবার যুক্তিগুলো জানতে চাইলাম, যাতে আমার পাওয়া তথ্যের সাথে তা মেলানো যেতে পারে।
‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না মা। তবে আমি নিশ্চিত, তার দেহ, মন সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে।’ বলল বাবা।
আমি চমকে উঠলাম। বাবা কি বলছেন বুঝলাম না। তিনিই তো মায়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। সবই তিনি জানবেন। বাবার মুখের দিকে চাইতে পারলাম না। কিছু বলতেও পারলাম না আমি। বিস্ময়, বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেল।
বাবাই কথা বললেন, ‘থাক মা এসব কথা। তুমি আমার বড় সন্তান, তাই তোমাকে আমি একথা জানালাম। তুমি এ কথাগুলো তোমার মধ্যেই রাখবে।’
বাবা উঠলেন। বললেন, ‘চল মা, বাসায় ফিরি।’
আমাদের বাসা ব্রুমসারবার্গ দূর্গ থেকে কয়েকশ’ গজ উত্তরে রাইনের তীরেই। আমাদের বাড়িটাও ব্রুমসারবার্গ দুর্গেরই একটা অংশ। ব্রুমসারবার্গ দুর্গের মালিকানা আমাদেরই ছিল। আমার নানী তার দাদুর কাছে শোনা অনেক গল্প বলতেন। নবম শতকে স্যাক্সনদের প্রথম রাজা হেনরি ও স্যাক্সনদের প্রথম সম্রাট অটো দি গ্রেটরা আমাদের পূর্বপুরুষ। তাদের দুর্গ ও প্রাসাদ ছিল এই ব্রুমসারবার্গেই। শুরুতে এর নাম ছিল দি নিডারবার্গ। ঊনিশ শতক পর্যন্ত অধিকাংশ সময় এই দুর্গ এই অঞ্চলের বিশপের অধীন ছিল। বিভিন্ন সময় নাইটরা এখানে এসে বাস করতো। এক সময় এটা তাদের দখলে চলে যায়। তবে আমাদের পূর্বপুরুষের ব্রুমসারবার্গ দুর্গ তাদের দখলে গেলেও এ দুর্গের কিছু দূরের আরেকটি প্রাসাদ আমাদের পারিবারিক দখলে থেকে যায়। এ প্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল ১১৮০ খৃস্টাব্দে অটো দি গ্রেটের পৌত্র ডিউক হেনরি দি লায়নের জন্যে। হেনরি তার চাচাত ভাই সম্রাট ফ্রেডারিক রোমার আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন এবং স্যাক্সন-সম্রাট অটো দি গ্রেটের রাজা দুই ভাগ হয়ে যায় তাদের মধ্যে। সেই থেকে ডিউক হেনরির এই বাড়িটি নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে আমাদের পারিবারিক দখলে রয়ে গেছে। এছাড়াও রাইনের এপার-ওপারে দশ হাজার একরের একটা ফার্মল্যান্ড আছে আমাদের। অতীত সাম্রাজ্যের এই একটাই স্মৃতিচিহ্ন আমাদের।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়ি পৌঁছলাম।
ভিতরে ঢুকে অবাক হলাম। জিনিসপত্র সব লণ্ডভণ্ড।
প্যাকিং চলছে।
বাইরের ড্রয়িংই রুমেই আম্মা বসে আছেন।
আমরা ভিতরে ঢুকতেই আম্মা বসে থেকেই বলল বাবাকে লক্ষ্য করে, ‘তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারলে না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। কাল সকালেই আমরা বনে শিফট হচ্ছি।’
‘সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছ?’ বলে আর কিছু না বলে বাবা তার ঘরের দিকে চলে গেলেন। অনেক দিন থেকেই মা জেদ ধরেছেন সবাইকে নিয়ে বনে গিয়ে থাকবেন। খুব সাধারণ হলেও থাকার মত বাড়িও কিনেছেন। তার যুক্তি, ছোট মেয়ে বনে লেখাপড়া করে, বড় মেয়ে বনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে। সুতরাং বনে থাকাই ভালো। মা’র এ প্রস্তাবে আমরা কেউ রাজি হইনি। বাড়ি ও ফার্মল্যান্ড আমাদের প্রাণ। এসব ছেড়ে বনে গিয়ে থাকার কোন যুক্তি নেই। কিন্তু মা আমাদের কথা মেনে নেননি। অবশেষে তার জেদই তিনি রাখলেন।
‘হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কি ঠিক হলো মা? কোথাও থাকার বিষয়টা তো সকলের।’ বাবা চলে যেতেই বললাম আমি।
‘চুপ করো। এ নিয়ে আর কোন কথা বলব না আমি।’ বলল মা।
‘এ তোমার জেদ মা। এত বড় বাড়িটার কি হবে?’ বললাম আমি।
‘সে ব্যবস্থা আমি করেছি। ফার্মল্যান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাদের দিচ্ছি, তারাই থাকবে এ বাড়িতে। এর জন্যে আলাদা পয়সা পাওয়া যাবে।’ মা বলল।
‘ব্যবস্থা তুমি কবে করলে মা? বাবা জানেন?’ বললাম আমি।
‘আমি যখন ওদের সাথে কথা বলি, তখন উনি আমার সব কথাই শুনেছেন।’ মা বলল।
‘বাবা কিছু বলেনি?’ বললাম আমি।
‘তোমার বাবার জন্যে বলার তেমন কিছুই ছিল না।’ মা বলল।
মা’র কথা আমার কানে খুব বাজল। মনে হলো বাবার কোন অবস্থানই তাঁর কাছে নেই। আমি চমকে উঠলাম। মা তো এমন ছিলেন না! বাবার মত নেয়া ছাড়া মা পরিবারের ছোট-খাট সিদ্ধান্তও নিতেন না। আমি চমকে উঠলাম ভীষণভাবে। মা কি বদলে গেছেন, বাবা যেমন বললেন? কিন্তু মা কি এভাবে বদলাতে পারেন? না, পারেন না। তাহলে?
পরদিন সকালে ব্রুমসারবার্গের আমাদের বাড়ি থেকে যাবার মুহূর্ত। মালপত্র সব চলে গেছে।
আমরাও যাবার জন্যে প্রস্তুত। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তিনটি গাড়ি।
আমাদের দু’টি, অন্যটি অপরিচিত।
‘ঐ গাড়িটি কেন?’ আমি বললাম।
আমার পাশে বাবা দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, ‘আমি এনেছি।’
‘কেন? দু’টি গাড়িই তো আমাদের দরকার হয় না।’ আমি বললাম।
‘আমি হামবুর্গ যাচ্ছি মা, বন যাচ্ছি না।’ বলল বাবা।
হামবুর্গ আমার বাবার পৈত্রিক বাড়ি। উল্লেখ্য, ব্রুমসারবার্গ প্রাসাদ ও দশ হাজার একরের ফার্মল্যান্ড আমার মায়ের পৈত্রিক সম্পত্তি। এত বড় সম্পত্তি অরক্ষিত থাকবে এই কারণে মায়ের একান্ত অনুরোধ বিয়ের পর বাবা ব্রুমসারবার্গে এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন।
বাবার কথায় আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
আমি রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে মা’র দিকে তাকালাম। বললাম, ‘মা, বাবা হামবুর্গ যাচ্ছে? কেন?’
মা মুখ তুলল না। যেমন ছিল, তেমন থেকেই বলল, ‘আমি কিছু জানি না।’
বলে মা বাবার দিকে তাকাল। বলল, ‘সত্যি তুমি হামবুর্গ যাচ্ছ?’ মা’র নির্বিকার কন্ঠ। যেন কিছু্ই না বিষয়টা-এমন স্বাভাবিক মুখ তার!
‘হ্যাঁ যাচ্ছি।’ বলল বাবা খুব স্বাভাবিক কন্ঠে।
মা শুনল। কিছুই বলল না। আমার মনে হলো তার মুখে বিস্ময় ও বিব্রত হওয়ার চাইতে স্বস্থির একটা উজ্জ্বলতাই ফুটে উঠেছে।
বিস্ময় আমাকে অভিভূত করে তুলল। মায়ের হলো কি? আমার মা এমন করতে পারেন না। আমার মা এমন নন। আমি ছুটে গেলাম মায়ের কাছে। বললাম, ‘মা, বাবা কেন একা হামবুর্গ যাবেন? তাঁকে নিষেধ করছ না কেন?’
‘তোমার বাবা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি স্বাধীন। আমি কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করব না।’ বলল আমার মা।
আমার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। মনে হলো এটা আমার মায়ের কন্ঠ নয়।
কথা বলেই মা গাড়ির দিকে চলল।
আমি ছুটে গেলাম বাবার কাছে। বললাম, ‘বাবা তোমার হামবুর্গ যাওয়া হবে না, তুমি আমাদের সাথে বন যাবে।’
বাবা ম্লান হাসলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা তোমরা মন খারাপ করো না। হামবুর্গ তো বেশি দূর নয়। তোমরা মা’র সাথে বন যাও।’ বাবার শান্ত, স্থির কন্ঠস্বর।
‘আলিনা, তাড়াতাড়ি এস।’ ওদিক থেকে মা আমাকে ডাকল।
হঠাৎ আমার বুকে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। মা সুস্পষ্টভাবে বাবাকে এড়াতে চাইছেন। কেন?
আমি ছুটে পেলাম মায়ের কাছে। তার দু’হাত ধরে অনেকটা চিৎকার করে বললাম, ‘মা, তুমি এমন করছ কেন? কি হয়েছে তোমার?’
মা একটা হ্যাঁচকা টানে তার দুই হাত ছাড়িয়ে নিল। গাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘যাও গাড়িতে গিয়ে ওঠ।’
হাত টেনে নিতে গিয়ে মা’র আঙুল থেকে একটা আংটি খুলে পড়েছিল মাটিতে। সেটা তুলে নেবার মত মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। আমি মার দিকে এক ধাপ এগিয়ে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বললাম, ‘আমরা দু’বোন কি বাবার সংগে যাব?’
‘আমি কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করব না।’ তীব্র কন্ঠে মা বলল।
মার কথা তীরের মত গিয়ে বিদ্ধ হলো আমার বুকে। এবার কিন্তু ক্ষোভ নয়, জগৎ-জোড়া বিস্ময় নামল মনে! মা কি বাবার মত আমাদেরকেও এড়াতে চাচ্ছেন?
আমি পিছু হটলাম। মা’র গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি পেছনে হটে মা’র পড়ে যাওয়া আংটি মাটি থেকে তুলে নিলাম। এগোলাম আমাদের গাড়ির দিকে। গাড়ির পাশে আমার ছোট বোন ব্রুনা চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে পাথরের মত স্থির দাঁড়িয়েছিল! আমি তাকে নিয়ে গাড়িতে বসলাম।
মা’র গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। আমাদের গাড়িও স্টার্ট নিল। ড্রাইভ করছে ব্রুনা।
বাবার গাড়ি তখনও দাঁড়িয়ে।
আমি পেছনে তাকিয়ে বাবার দিকে হাত নাড়লাম।
বাবাও আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেও হাত নাড়ল।
আমাদের পরে বাবার গাড়িও স্টার্ট নিতে দেখলাম।
বন চলে এলাম। সেদিনেরই রাত।
ঘরটা গুছিয়ে নেবার পর বাড়িটা ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। যাচ্ছিলাম মায়ের বেড রুমের দরজার সামনে দিয়ে। মায়ের কন্ঠ পেলাম। কথা বলছেন কারও সাথে।
দরজায় দাঁড়ালাম। খোলা দরজা।
মা’র কন্ঠ ভেসে আসছে’.. পারব না কেন? আমি বিন্দী ব্রিজিটি। বুকে চেপে বসা বুড়ো শয়তানটাকে সরিয়েছি। বাকি থাকল অপগণ্ড দু’টি মেয়ে। ওদের মাইনাস করতে সময় লাগবে না।’
একটু নিরবতা। নিশ্চয় ফোনের অপর প্রান্ত কথা বলছে।
আবার কথা বলে উঠল মায়ের কন্ঠ: ‘ইয়ার্কি করছ? বুকে চেপে বসা নয়তো কি? নিজেকে তুলে দিয়েছি আরেকজনের হাতে। নেকড়েরা চিবিয়ে খেয়েছে আমাকে। বিষ পান করেছি দিনের পর দিন। তোমাদের স্বার্থে সব করেছি আমি। কিন্তু সে অনুভূতি তোমার নেই, তোমাদের নেই।’ শেষের দিকে অভিমানক্ষুদ্ধ মায়ের কন্ঠ।
গোটা শরীর আমার কাঁপছিল। মায়ের কথা আর শোনার প্রবৃত্তি হলো না। যা শুনেছি, তা গোটা শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। মা নিজের নাম ‘বিন্দা ব্রিজিটি’ বললেন কেন? বাবাকে কি ‘বুড়ো শয়তান’ বলা হলো! বাবা কি তার বুকে চেপে বসে ছিলেন। বাবা কি ‘আরেক জন’ হলেন! মা কার স্বার্থে কি করছেন? ‘তোমাদের’ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন?
আমি শিথিল পায়ে টলতে টলতে নিজের ঘরে চলে এলাম। মনে পড়ল মার কালো চুলে সাদা রং করার কথা। কিছুদিন আগে টেলিফোনে বলা মায়ের সেই কথাও। তিনি সবচেয়ে কষ্টে আছেন, আত্নঘাতি অভিনয় করছেন তিনি।
নিজের ঘরে ঢুকেই বেডের উপর নিজেকে ছুঁড়ে ছিলাম। শুয়েই দেখতে পেলাম আমার ছোট বোন ব্রুনা ব্রুনহিল্ড সোফার এক কোণে গুটি মেরে বসে আছে। চোখে-মুখে তার ক্ষোভের আগুন।
আমার ছোট বোন ব্রুনা ব্রুনহিল্ড বন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রী। খুব চঞ্চল, খুব মুখরা। সেই ব্রুনা যে ব্রুমসারবার্গের ঘটনা থেকে এ পর্যন্ত চুপ করে আছে, এটা বিস্ময়ের।
আমার মনের অবস্থা সামলে নিয়েছি। বললাম, ‘কিরে ব্রুনা, এখানে এসে চুপ করে বসে আছিস কেন?’
সে উঠে গটগট করে আমার বেডে আমার পাশে এসে বসে বলল, ‘আমি তোমার অপেক্ষা করছি।’
‘কেন? তোর ঘরের সব কিছু ঠিকঠাক করে নিয়েছিস?’ বললাম আমি।
‘না।’ বলল ব্রুনা।
‘তাহলে এখানে বসে কি করছিস? তোর জিনিসপত্র ঠিকঠাক রাখা হয়েছে কিনা দেখে নিবি না?’ আমি বললাম।
‘রাখ এসব। বল এসব কি হচ্ছে?’ বলল ব্রুনা। বিক্ষুদ্ধ কন্ঠ তার।
‘কিসের কথা বলছ তুমি?’ আমি বললাম।
‘মায়ের কি হয়েছে?’ মা এসব কি করছেন?’ বলল ব্রুনা তীব্র কন্ঠে।
‘আস্তে কথা বল ব্রুনা। নিজেকে সংযত কর।’ আমি বললাম।
‘না, আস্তে কথা বলব না। মা! আমাদের মা নেই। বদলে গেছেন। তিনি এখন অন্যের হাতে।’ বলল ব্রুনা। ক্ষোভ, আবেগ, উত্তেজনায় তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছিল।
আমি চমকে উঠেছিলাম তার শেষ কথায়! আমি উঠে বসে তাকে কোলে টেনে নিয়ে বললাম, ‘আস্তে আস্তে কথা বল! এটা তুমি কি বললে? মা অন্যের হাতে মানে?’
ঠিক তাই আপা। গতকাল যাদেরকে আমাদের বাড়ি ও ফার্মল্যান্ড দেখাশুনা করতে দেয়া হয়েছে তাদের একজন এসেছিল। তখন তুমি ও বাবা বাসায় ছিলে না। মা’র সাথে লোকটি নিরিবিলি কথা বলেছে। এসেই লোকটি মাকে যেভাবে সম্বোধন করেছে, তা আপত্তিকর। আমার কৌতুহল হওয়ায় আমি আড়ালে লুকিয়ে তাদের কথা শুনেছি…।’
ব্রুনার কথার মাঝখানেই আমি বলে উঠলাম, আপত্তিকর বিষয়টা কি ব্রুনা?’
‘লোকটি মাকে ডারলিং বলে সম্বোধন করেছে!’ বলল ব্রুনা।
বুকে প্রচণ্ড এক খোঁচা লাগল। এতদিনের সব বিষয় সব সত্য ওলট-পালট হয়ে গেল।
আমি কিছু বলার আগেই ব্রুনা আবার শুরু করল, ‘আপা, আমি শুধু শুনিনি, দেখেছিও। শুধু ডারলিং বলা নয়, লোকটি মা’র গায়ে হা্তও দিয়েছে। প্রতি ব্যাপারে মাকে সে কমান্ড করেছে। তাদের নির্দেশেই ব্রুমসারবার্গ ও ফার্মল্যান্ড থেকে মা আমাদের সরিয়ে দিলেন। কিন্তু মাকে সরিয়ে দেয়া হয়নি। লোকটি মাকে বলেছে জঞ্জাল থেকে মুক্ত হলেই তুমি ব্রুমসারবার্গে ফিরে আসবে।’
‘জঞ্জাল কি?’ আমি বললাম।
‘এটা বুঝলে না আপা, মা’র সাথে বাবা, আমি, তুমি যারা আছি, তারাই জঞ্জাল।’ বলল ব্রুনা।
আমি বুঝিনি তা নয়, কিন্তু স্বীকার করতে কষ্ট হচ্ছিল। যা স্বীকার করতে আমার কষ্ট হচ্ছিল, সেটা স্পষ্টবাদী ব্রুনা অবলীলাক্রমে বলে ফেলল। আরেকটা কথা এ সময় আমার কাছে খুব বড় হয়ে উঠল, আমরা যদি জঞ্জাল হই, তাহলে সে জঞ্জাল থেকে মা মুক্ত হবেন কি করে?
এ প্রশ্নের জবাবও কয়েক দিনের মধ্যেই মিলল।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সময় আমার সাথে ব্রুনাও যাচ্ছিল। আমরা ‘বন’-এর বিখ্যাত পার্কের মাঝের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। জনবিরল রাস্তা। এ্যাকসিডেন্টের শিকার হলাম। একটা হেভি জীপ ইচ্ছা করে রং সাইডে এসে আমাদের গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। আমি যদি শেষ মুহূর্তে গাড়িটা ঘুরিয়ে নিতে না পারতাম, তাহলে আমাদের গাড়ির মাথাটা গুড়ো হয়ে যেত, তার সাথে সামনে বসা আমরাও শেষ হয়ে যেতাম। কিন্তু আমরা দু’বোন আহত হবার মধ্যে দিয়ে বিরাট ফাঁড়া আমাদের কেটে গেল।
আমাদের দু’বোনকে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। পুলিশ সূত্রে জেনেছিলাম যে, গাড়িটা এ্যাকসিডেন্ট ঘটায় তার নাম্বারটা ভূয়া ছিল এবং গাড়িটাকে আর বনে পাওয়া যায়নি। তার মানে গাড়িটা পরিকল্পিতভাবেই এ্যাকসিডেন্ট ঘটায় এবং তার লক্ষ ছিল আমাদের মেরে ফেলা।
মা হাসপাতালে এসেছিলেন। আমাদের কিছু দেখাশুনাও করেছেন। কিন্তু সবই ছিল পোষাকি- তা বুঝতে আমাদের দু’বোনের কারোই কষ্ট হয়নি।
হাসপাতালের বেডে শুয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম, বন থেকে শুধু নয়, জার্মানি থেকেও পালাতে হবে। বাবাকেও সাবধান করে দিলাম। বললাম, নিশ্চয় মা কোন কারণে একদমই বদলে গেছেন । তিনি এখন আমাদের কারও জন্যেই নিরাপদ নন। বাবা বলেছিলেন, ফার্মল্যান্ডের ১০ হাজার একরের বিরাট সম্পদই সকল অনর্থের মূল। এ সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে তোমার মা’র। আমরা যদি না থাকি, তাহলে তোমার মা’র মাধ্যমে অন্য কেউ এ সম্পত্তির মালিক হতে পারে।’
বাবার এই কথায় সব কিছু আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরও আমার মনে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল, আমার মা’র এই পরিবর্তন কিছুতেই হতে পারে না। তার কি হলো? কি ঘটলো? সমগ্র হৃদয়ের এই আকুল প্রশ্নের সমাধান পাইনি। আমার বোন ব্রুনা ও বাবারও কথা হলো, ‘এই মা, আমাদের মা নয়’। তাহলে ইনি কে? আমার মা গেল কোথায়? দু’জনের একমাত্র বয়স ছাড়া একই চেহারা হলো কি করে? এসব জিজ্ঞাসা ও থ্রিলিং কিছু করার ইচ্ছাই আমাকে বাধ্য করেছিল ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটে যোগ দিতে। কিন্তু আমার সেই জিজ্ঞাসার পরিধি বেড়েছে বই কমেনি। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট আমাকে সাহায্য করেনি, বরং বলেছে যা গেছে ভুলে যাও, যা যায়নি তা রক্ষা কর। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করো না।’ তারা সাপের কথা বলায় আমার উদ্বেগ জিজ্ঞাসা আরও বেড়ে গেছে। তাহলে তো আমরা সাংঘাতিক এক ষড়যন্ত্রের শিকার। এই ষড়যন্ত্রের ছোবল থেকে আমার বোন, বাবা কি বাঁচবে? আমি তো পারলাম না, আমার সব প্রশ্ন, সব শংকা সামনে রেখে কেউ একজন কি সেই সাপের সন্ধানে এগোতে পারেন! এ ব্যাপারে প্রাথমিক সাহায্য করতে পারে আমার বোন ব্রুনা। তার ঠিকানা এই ডাইরির শেষ পাতায় থাকল।’
ডাইরি পড়া শেষ হলো আহমদ মুসার।
পাতা উল্টিয়ে সে শেষ পাতায় গেল।
শেষ পাতার দুই পৃষ্ঠায় কোন লেখা দেখল না আহমদ মুসা। মনে মনে হাসল আহমদ মুসা। এত সহজে ঠিকানাটা দেখা যাবে তা ভাবা ঠিক হয়নি। তার বোনের ঠিকানা তার বোনের মতই মূল্যবান। বোনকে যেমন সাপের ছোবল থেকে বাঁচাবার জন্যে লুকিয়ে রেখেছে, তেমনি ঠিকানা লুকাবারও তার দরকার পড়েছে। নিশ্চয় স্পাই ডাস্ট দিয়ে ঠিকানাটা পড়া যাবে।
আহমদ মুসা পাশ ফিরে ব্যাগ টেনে নিয়ে ইমারজেন্সি প্যাক থেকে একটা স্প্রে-টিউব বের করে প্রথমে উপরের পৃষ্ঠার উপর স্প্রে করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পৃষ্ঠার মাঝখানে লাল রংয়ের তিনটি লাইন ফুটে উঠল। গৌরীর ছোট বোন ব্রুনা ব্রুনহিল্ড-এর ঠিকানা। মনোযোগ দিয়ে ঠিকানাটা একবার পড়ে নিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ডাইরি বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেল।
গৌরীর পুরো নামটা তো জানা হলো না। তার ছোট বোন, মা, বাবার সবার নাম জানা হয়েছে, কিন্তু গৌরীর পুরো নাম জানা হয়নি। নিশ্চয় ডাইরির শুরুতে সে এটা বলেছে।
আহমদ মুসা ডাইরির পাতা উল্টিয়ে আবার তার শুরুতে চলে গেল।
শুরুতেই পেয়ে গেল গৌরীর নাম।
ডাইরি লেখা শুরুই করেছে এভাবে, ‘আমার নাম আনালিসা অ্যালিনা।’ খাস স্যাক্সন নাম। আমরা খাঁটি স্যাক্সন রাজপরিবারের উত্তরসূরী। আমার মা বলেছেন, স্যাক্সনদের প্রথম রাজা হেনরীর প্রথম মেয়ের নাম নাকি ছিল আনালিসা অ্যালিনা।’
গৌরীর নাম জানা হয়ে গেল। এখন আর অন্য কিছুর দরকার নেই। ডাইরি তো সাথেই থাকবে যা যখন প্রয়োজন দেখে নেবে।
ডাইরি বন্ধ করল আহমদ মুসা।
পা ছড়িয়ে ভালো করে শুয়ে পড়ল সে।
নৌবাহিনীর জাহাজটি চলছে দ্রুত তাহিতির উদেশ্যে।
মৃদু একটা কাঁপুনি জাহাজে।
আরামে শান্তির পরশে চোখ বুজল আহমদ মুসা।
চোখ বুজলেও মনের দরজা বন্ধ হলো না। নানা কথা, নানা চিন্তা ছুটে এল সেই দরজা পথে। এখন কি করণীয় আহমদ মুসার? গৌরীর মায়ের ঘটনা তাকেও স্বম্ভিত করে দিয়েছে। গৌরীর সব কথা থেকে একথা পরিষ্কার গৌরীর এ মা তার আসল মা হতে পারে না। কিন্তু এটাই বা সম্ভব হয় কি করে? মানুষের মত মানুষ হয়, কিন্তু দুই মানুষ এমনভাবে এক হতে পারে না। কিন্তু হলো কি করে? যা বুঝেছে আহমদ মুসা, তাতে দু’জনের মধ্যে বয়স ও আচরণের পার্থক্য ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই্। আচরণের পার্থক্য মৌলিক বিষয় নয়। কারণ আচরণ কৃত্রিম হতে পারে। মৌলিক বিষয় শুধু বয়সটাই যা আড়াল করার জন্যে গৌরীর এ মা কলপ দিয়ে পাকা চুল তৈরি করে থাকে।
ভেবেই চলল আহমদ মুসা।
তার মনের খোলা দরজাটা এক সময় ধুসর হয়ে অন্ধকারের একটা যবনিকা নেমে এল।
ঘুমিয়ে পড়ল আহমদ মুসা।

আহমদ মুসার সম্মানে একটা বিদায়ী ভোজের আয়োজন করেছিল তাহিতির ফরাসি গভর্ণর তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত জনদের নিয়ে। ভোজ শেষ হয়েছে।
অতিথিরা প্রায় সবাই চলে গেছে।
আহমদ মুসা বসেছিল ডিনার হলের পাশের লাউঞ্জে। তার দু’পাশে সোফায় বসেছিল তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান দ্যাগল।
অতিথিদের বিদায় দিয়ে তাহিতির গভর্ণর ফ্রাসোয়া বুরবন ফিরে এল। সে সামনে আসতেই উঠে দাঁড়াল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান দ্যাগল। গভর্নরের দিকে একটা বড় ইনভেলাপ তুলে ধরে বলল, ‘সব হয়ে গেছে স্যার।’
ইনভেলাপটি হাতে নিয়ে আহমদ মুসার পাশে বসল গভর্নর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডিনার ঠিক সময়ে শেষ হয়েছে আহমদ মুসা। তুমি ধীরে সুস্থে গিয়ে প্লেন ধরতে পারবে।’
বলে গভর্নর ফ্রাসোয়া বুরবন একটু থামল। হাতের ইনভেলাপের ভিতরটা একটু দেখে নিয়ে সেটা আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলল, ‘আহমদ মুসা, ইনভেলাপে তোমার পাসপোর্ট ও প্লেনের টিকিট আছে। তোমার মার্কিন পাসপোর্টে ইউরো ভিসা লাগানো হয়েছে। কুটনৈতিক সমমানের ভিআইপি ভিসা তোমাকে দেয়া হয়েছে। কুটনীতিকদের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা তুমি পাবে। ইনভেলাপের ভিতর আরেকটা ইনভেলাপ তোমার জন্যে ফরাসি প্রেসিডেন্টের লেটার অব থ্যাংকস রয়েছে। ফরাসিরা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অমূল্য সাহায্য দেয়ার জন্যে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট তোমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে গেস্ট অব অনার হিসাবে ফ্রান্সের আগামী জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্যে। আরেকটা কথা আহমদ মুসা, ফরাসি সরকার আমাদের অস্ট্রিয়া ও জার্মানিস্থ রাষ্ট্রদূতদের তোমার ব্যাপারে কমপ্লিট ব্রীফ করেছে। আর জার্মানির সাচেন প্রদেশের গোয়েন্দাপ্রধান আমার ক্লাসমেট। তোমার বন, ব্রুমসারবার্গ সবই তার এলাকায় পড়বে। সে তোমাকে সব রকম সাহায্য করবে।’
থামল গভর্নর, ফ্রাসোয়া বুরবন।
‘ধন্যবাদ স্যার্। আপনার সরকারকে অশেষ ধন্যবাদ। আমাকে এখন উঠতে হয় স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তুমি সোনার মানুষ আহমদ মুসা। কারণ কোন বিনিময় তুমি চাও না। আমার সরকার আর কি করল তোমার জন্যে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আহমদ মুসা।’
বলেই গভর্নর উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ও স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান দ্যাগলও উঠল।
গভর্নর ফ্রাসোয়া বুরবনই আবার কথা বলল, ‘জানি তুমি তেপাও-এর গাড়িতেই যাবে। মি. দ্যাগলও একটা পুলিশ ফোর্স নিয়ে তোমার সাথে থাকবে।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম। চল আহমদ মুসা।’ সবাই বেরিয়ে গভর্নর হাউজের গাড়ি বারান্দায় এল।
তেপাও-এর গাড়ির পাশে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে মারেভা ও মাহিন। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আচে ‘আরু’র রাজ উপাশনালয় প্রধান মা-কোহ।
আহমদ মুসা তাকে সালাম দিল। বলল, ‘স্যার, আপনি কষ্ট করে এসেছেন? দু:খিত, আমারই যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু আরেকটা প্রোগ্রামে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে।’
‘সে জানি বেটা, তোমাদের মত লোকদের আল্লাহ গণ্ডায় গণ্ডায় সৃষ্টি করেন না। মতুতুংগার ঘটনায় গোটা দুনিয়া স্তম্ভিত। তোমার জন্যে আমরা গর্বিত। কিন্তু একথা বলার জন্যে আমি আসিনি বেটা। বলল মাহকোহ।
‘আদেশ করুন স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আদেশ নয়, বলতে এসেছিলাম, এবার ‘আরু’তে গেলে তোমার ভালো লাগত। সেই রাজউপাশনালয় এখন রাজমসজিদ। তুমি আসার পর রাজ-উপাশনালয়ের চারদিকটা পরিষ্কার ও সমান করতে গিয়ে একটা শিলালিপি পাওয়া গেছে। আরবি ও তাহিতি ভাষায় লেখা। ওটা যে মসজিদ তা ওতেই লেখা আছে। সন, তারিখও শিলালিপিতে লেখা হয়েছে। পমেরী বংশের প্রথম অংশ আরি আবদুল্লাহ অ্যারিন্যু এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি ধন্য হবে তোমাকে পেলে।’ বলল মাহকোহ।
‘আলহামদুলিল্লাহ! খুব খুশি হলাম এই খবর শুনে। প্রার্থনা করি তাহিতির মাটিচাপা ইতিহাস এভাবেই বের হয়ে আসুক। মুহতারাম, এবার আমি এসেছিলাম বিশেষ কাজে, তবে এরপর আসব বেড়াতে। সেবার প্রথমেই আপনার অতিথি হবো ইনশায়াল্লাহ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম বেটা! আল্লাহ তোমাকে সে ধরনের সময় দিন।’ বলল মাহকোহ।
‘তাহলে স্যার, দোয়া করুন।’ বলে আহমদ মুসা একবার হাতঘড়ি দেখে তাকাল মাহিন ও মারেভার দিকে। বলল, ‘সবাই গাড়িতে ওঠ, হাতে সময় কিন্তু বেশি নেই।’
বলে আহমদ মুসা হাতের ব্যাগটা সামনের সিটে ঠেলে দিয়ে তাতে উঠে বসল।
সবাই গাড়িতে উঠেছে।
মাহিন, মারেভা ও মাহকোহ পেছনের সিটে বসলো। ড্রাইভিং সিটে তেপাও। তার পাশে আহমদ মুসা।
সামনে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান দ্যাগলের গাড়ি। পেছনেও আরও দুটি গাড়ি পুলিশের।
গাড়ি চলতে শুরু করল তাহিতি এয়ারপোর্টের দিকে।
আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘ম্যারেভা-মাহিন, তোমরা কথা বলছ না যে!’
কোন কথা এল না তাদের দিকে থেকে।
ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ পেল আহমদ মুসা। পেছন ফিরে দেখল, দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে মারেভা। কান্না চাপতে গিয়ে কাঁপছে সে।
ম্লান হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার মুখে।
একটা আবেগ এসে তাকেও স্পর্শ করল। এই যে দেখা হলো, পরিচয় হলো, মায়ার বাঁধন এসে বাঁধল। তারপর এই যে যাচ্ছে, আর কি দেখা হবে! সবাই আমরা বলি, আবার আসব। ক’জন ফিরে আসে! ফেরা কি যায়!
একটা শুকনো হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। বলল নরম কন্ঠে, ‘মারেভা, বোন, তোমাদের খুব বাস্তববাদী বলে আমি জানি। তোমাদের তাই আশ্বস্ত করার কোন দরকার নেই। মিলন ও বিচ্ছেদ দু’টোই জীবনের বাস্তবতা। এর চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দুনিয়ার জীবনটা এক গতিমান চলার পথ। আমরা সবাই এই গতির অধীন, আর গতির নিয়ন্ত্রক স্বয়ং আল্লাহ। গতিমান চলার পথ কাকে কোথায় নিয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। চলার পথ আমাকে নিয়ে এসেছিল স্বপ্নের তাহিতিতে, আজ আবার চলে যাচ্ছি সেই তাহিতি থেকে। এই অমোঘ বাস্তবতা আমাদের সবাইকে মানতে হবে বোন।’
থামল আহমদ মুসা।
থামল না মারেভা। তার কান্নাটা আরও বাড়ল। আহমদ মুসা দেখল চোখ মুছছে ড্রাইভার তেপাও।
নিরবতা ভাঙল মাহকোহ। বলল, ‘অংকের নিয়মে তোমার কথা ঠিক বেটা। কিন্তু হৃদয় এই অংক মানে না। মানুষের ইতিহাস যত পুরনো, মানুষের বেদনার অশ্রু, বিয়োগের অ্শ্রু, শোকের অশ্রুর ইতিহাস বোধ হয় ততটাই পুরনো। অশ্রু হলো ভালোবাসাসিক্ত হৃদয়ের স্বর্গীয় প্রস্রবণ। মারেভা কাঁদুক আহমদ মুসা। ওর অশ্রু শুধু ওর নয় সমগ্র তাহিতির অশ্রু।’
থেমে গেল মাহকোহর শান্ত কন্ঠ।
আহমদ মুসা কিছু বলল না, বলতে পারল না। বিদায়ের বেদনাসিক্ত যে আবেগকে সে দূরে সরিয়ে রাখছিল, সেটা এবার এসে তাকে ঘিরে ধরল। দুই চোখের কোণ তারও ভারি হয়ে উঠল। চোখ বুজল আহমদ মুসা।
এক সময় চোখ খুলে পকেটে হাত দিয়ে একটা ইনভেলাপ বের করল। পেছনে তাকিয়ে ইনভেলাপটা মাহিনের দিকে তুলে ধরে বলল, এতে কয়েক হাজার ডলার আছে মাহিন। এটা দিয়ে তেপাওকে একটা ভালো গাড়ি কিনে দিও। ও কিছুতেই টাকা নিত না। তাই এ দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে গেলাম।’
আগেই তেপাও-এর চোখে পানি গড়াচ্ছিল। এবার সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। কিছু বলল না। কান্নায় বাধাও দিল না।
চোখ দু’টি তার প্রসারিত হলো সামনে।
চোখে শূন্য দৃষ্টি।
তাতে যেন অচেনা ঠিকানার অজানা কাহিনীর অস্পষ্ট সব দৃশ্য!
চলছে গাড়ি।
চলছে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

‘বাবা, আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। দু’তিন দিন ধরে অ্যালিনা আপার ফোন বন্ধ।’ বলল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড। তার হাতে মোবাইল। কথা বলছে সে মোবাইলে তার বাবা আলদুনি সেনফ্রিডের সাথে।
‘হ্যাঁ, মা ব্রুনা। দিন পাঁচেক আমার সাথেও তার কোন কথা হয়নি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমাকে টেলিফোন করতে না করেছে সে। সেই প্রতি সানডে সকালে সে টেলিফোন করে। ৫ দিন আগে গত রোববারে তার সাথে কথা হয়েছে। তোমার সাথে শেষ কবে কথা হয়েছে?’ ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের বাবা আলদুনি সেনফ্রিড বলল। তার চোখে দুর্ভাবনার চিহ্ন।
‘তিন দিন আগে বেলা সাড়ে ৩টায় টেলিফোন করেছিল। তার মানে তার সময় রাত তিনটায় তার টেলিফোন পেয়েছিলাম। এমন ‘অড’ সময়ে আপা কোনদিন টেলিফোন করেননি। আর বাবা, সে কথাগুলোও বলেছিল সব অস্বাভাবিক…।’
কথা আটকে গেল ব্রুনার গলায়। কান্নায় ভেঙে পড়ল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড।
ওপার থেকে ব্রুনার বাবার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল। বলল, ‘ব্রুনা মা, প্লিজ কেঁদো না। তুমি তো খুব সাহসী মা। আমরা তো এমনিতেই সংকটে। সাহস ও ধৈর্য হারালে চলবে না আমাদের। অ্যালিনা অস্বাভাবিক কি বলেছিল মা?’
‘আমাকে অনেক উপদেশ দিয়েছিল বাবা। লেখাপড়ার ব্যাপারে, চলাফেরার ব্যাপারে, তোমাকে দেখাশুনার ব্যাপারে এবং সবশেষে বলেছিল, আমাদের ‘মা-রহস্য’ খুঁজে বের করতেই হবে। এটা সম্পত্তির জন্যে নয়, মা’র স্বার্থে। আপার এই ধরনের উপদেশ আমার তখনি ভালো লাগেনি। আমি বলেছিলাম, আপা, তুমি কি কোনো মহাযাত্রা করছ যে, এই ধরনের উপদেশ দিচ্ছ? তুমিই তো এসব করবে! আমি তোমার সাথে থাকব। আপা বলেছিল, মানুষের মহাযাত্রা প্রস্তুতি নিয়ে হয় না। এটা হঠাৎই হয়। যাক এসব কথা, তোমাকে বলার জন্যে মনে এই কথাগুলো এসে ভিড় করেছিল তাই বললাম। মন আল্লাহর আবাস, বিবেক আ্ল্লাহর কন্ঠ। এজন্যে মন ও বিবেকের কথা শুনতে হয়। আমি আপার মুখে আল্লাহ শব্দ শুনে বিস্মিত কন্ঠে বলেছিলাম, আমরা তো ‘গড’ বলি, হঠাৎ তুমি ‘আল্লাহ’ বলছ কেন আপা? অ্যালিনা আপা বলেছিল, স্রষ্টা, পালনকর্তা হিসাবে ‘গড’-এর যত নাম দুনিয়াতে আছে তার মধ্যে ‘আল্লাহ’ নামটাই সবচেয়ে মৌলিক ও যথার্থ। এজন্যে ‘আল্লাহ’কেই আমি গ্রহণ করেছি ব্রুনা। আমি আরও বিস্মিত হয়ে কথা বলতে যাচ্ছিলাম। আপা বাধা দিয়ে বলল, সময় নেই ব্রুনা শোন, ‘মা-রহস্যে’র সন্ধানে এতদিনেও আমি কিছুই করতে পারিনি। কিভাবে এই সংকটের সমাধান হবে আমি জানি না। তবে আমার মনে একটা আশা জেগেছে, একজন মহান মানুষ আমাদের এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। সংগে সংগে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে তিনি? আপা বলল, আমি নিশ্চিত নই ব্রুনা তিনি সাহায্য করবেন কিনা। তবে সাহায্য করতে পারেন তিনি এবং যে কোন সংকট সমাধানের সামর্থ্য তার আছে, এটা শুধু আমার বিশ্বাস নয়, এটাই সত্য। কে তিনি আপা, আবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম। আপা বললেন, তার নাম টেলিফোনে বলা যাবে না। তবে মনে রেখ স্বচ্ছ, সুন্দর, নিষ্পাপ চেহারার মানুষ তিনি। তাঁর নামের দুই অংশ। প্রথম অংশের প্রথম বর্ণ ‘এ’… এখানে এসে হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে যায় আপার। লাইনটা কেটে যাওয়ার আগে তার মোবাইলে ভেসে আসা অন্য কারো ক্রদ্ধ কন্ঠ শুনেছি।’
থামল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড। তার শুকনো, উদ্বিগ্ন কন্ঠ।
‘মা ব্রুনা, তুমি যা বললে তা সত্যিই উদ্বেগের মা। কিন্তু আমরা এখন কি করব?’ বলল ব্রুনার বাবা। তার কম্পিত কন্ঠস্বর।
‘অনেক ভেবেছি, কিছুই বুঝতে পারছি না বাবা। তার কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা আমাদের কাছে নেই। সর্বশেষ তিনি তাহিতিতে ছিলেন। তার টেলিফোন নিরব হয়ে যাবার ঘটনা আর কোন সময়ই ঘটেনি। এবার সব কিছুই অস্বাভাবিক ঘটেছে।’ ব্রুনা ব্রুনহিল্ড বলল।
‘আমরা কি তাহিতি যাবার চিন্তা করতে পারি? আমরা তো এভাবে বসে থাকতে পারি না।’ বলল ব্রুনার বাবা।
কলিংবেল বেজে উঠল।
ভ্রকুঞ্চিত হলো ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের। তার বাসায় তো আসার কেউ নেই! হোম সার্ভিসের কেউ কি হবে? ওরা মাঝে মাঝে আসে।
‘বাবা, কেউ এসেছে, পরে কথা বলব তাহলে।’ বলল ব্রুনা।
‘ঠিক আছে মা। তুমি সাবধানে থেকো। ওরা কিন্তু জার্মানি চষে ফিরছে।
‘জার্মানির বা্ইরেও তারা নজর দেবে।’ ব্রুনার বাবা বলল।
‘ধন্যবাদ বাবা।’ বলে মোবাইলের কল ক্লোজ করল ব্রুনা।
দরজা খোলার আগে ডোর ভিউ দিয়ে দেখল, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের ইউনিফরম পরা লোক।
দরজা খুলে দিন ব্রুনা। ভেবে পেল না, মিউনিসিপ্যালিটির লোক কেন এ সময়? ওদের কোন প্রোগাম চলছে বলে তো জানা নেই।
দরজা খুলে যেতেই ‘গুড মর্নিং ম্যাডাম’ বলে ছোট্ট একটা বাউ করল লোকটি।
‘গুড মর্নিং স্যার। আপনি নিশ্চয় মিউনিসিপ্যালিটি থেকে এসেছেন? কি করতে পারি আপনার জন্যে?’ বলল ব্রুনা।
‘এক্সকিউজ মি ম্যাডাম। নোটিশ ছাড়া এসেছি। আমি এসেছি আমাদের সালজবার্গ মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কমিউনিটি সার্ভিস থেকে।’ বলল আগন্তুক।
‘কমিউনিটি সার্ভিসের সেনসাস গ্রুপের লোকরা তো ক’দিন আগে এসেছিল।’ ব্রুনা বলল।
‘কিন্তু তারা কিছু ভুল করে গেছে। যেসব দরকারি তথ্য নেয়ার কথা ছিল নেয়নি, বিশেষ করে জার্মান ন্যাশনালদের কিছু তথ্য বাদ পড়েছে।’ বলল আগন্তুকটি।
‘যেমন? প্রোফরমা অনুসারে সব তথ্য তারা নিয়েছে।’ ব্রুনা বলল।
‘হোম টাউনের নাম, বার্থ সার্টিফিকেটের নাম্বার, তারিখ ইত্যাদি।’ বলল আগন্তুকটি।
চমকে উঠল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড! হোম টাউনের নাম ও বার্থ সার্টিফিকেটের নাম্বার, তারিখ প্রকাশ হয়ে পড়লে তার নাম-পরিচয় জানাজানি হয়ে যাবে। তার নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়ে পড়বে। নিরাপত্তার স্বার্থেই সে জার্মানি ছেড়েছে। অস্ট্রিয়ার ছোট্ট শহর সালজবার্গে এসে বাস করছে। অস্ট্রিয়ার সীমান্তে আল্পসের উত্তর দেয়ালে জার্মান সীমান্তের খুব কাছে এই সালজবার্গ শহর। সুন্দর এই পার্বত্য শহরটি পুরানো ও অভিজাত। অনেক ঐতিহ্যের স্মারক এখানকার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বসতি গড়ে ব্রুনা নিজের নিরাপত্তা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা উভয়ই রক্ষা করতে চাইছে। জার্মানির কোথাও সে নিরাপদ থাকতে পারেনি। দু’দিনেই শত্রুদের চোখে পড়ার উপক্রম হয়েছে, এতই শক্তিশালী মায়ের খুনি গ্যাংটি। ছদ্মনামে এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে ব্রুনা। বিশ্ববিদ্যালয় ও এই বাসা ছাড়া আর কোথাও যায় না ব্রুনা। একা এ বাসায় অনেকটা বন্দীর মত জীবন যাপন করছে সে। এখন যে পরিচয় গোপন রেখেছে, সে পরিচয় মিউনিসিপ্যালেটিতে দেবে কি করে! আরেকটা চিন্তা তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে। সেটা হলো, মাত্র কয়েকদিন আগে মিউনিসিপ্যালেটির কম্যুনিটি সার্ভিসের লোকরা ফরমের সব অপসন পুরোপুরি ফিল আপ করে নিয়ে গেছে। ফরমে যা নেই, এমন তথ্যের জন্যে এভাবে লোক পাঠানো কি স্বাভাবিক? কিছুতেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
হঠাৎ ব্রুনার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। বলল, ‘স্যরি স্যার, কম্যুনিটি সাভির্সের এসব তথ্য দরকার তা আমার জানা ছিল না। বার্থ সার্টিফিকেট তো আমার কাছে নেই। নাম্বার তারিখও আমার জানা নেই।’
আগন্তুকের মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল! ভাবল একটু। বলল, ‘ঠিক আছে তাহলে হোম টাউনের নামটা দিন।’
বলে সে তার ফাইলটা খুলল এবং কলমটা হাতে নিল।
দ্রুত ভাবছিল ব্রুনা। হোম টাউনের নাম দিলেই তার পরিচয় পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে। না, কিছুতেই সে তার হোম টাউনের নাম দেবে না। অন্য কোন জায়গার নাম বলবে। তাহলে ধরা পড়ার আপাতত ভয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ডকুমেন্ট তার হোম টাউনের নাম নেই। বার্লিনের রয়্যাল স্যাক্সন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে সে এখানে এসেছে
ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাস বিষয়ে পড়ার জন্যে। বার্থ সার্টিফিকেট বা তার নাম্বার না হলে হোম টাউনের অথেনটিসিটি যাচাই করার সহজ কোন উপায় নেই, বিশেষ করে হোম টাউন যদি বড় শহর হয়।
এসব চিন্তা করেই ব্রুনা বলল, ‘আমার হোম টাউন বার্লিন।’
‘বার্লিন? একদম রাজধানী শহর!’ বলল আগন্তুক।
‘হ্যাঁ, আমাদের কয়েক পুরুষের শহর।’ ব্রুনা বলল।
‘ধন্যবাদ!’ বলে আগন্তুক উঠে দাঁড়াল।
ব্রুনা তাকে বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল ঘরে। হাউজ ডকুমেন্ট ফাইল বের করে মিউনিসিপ্যালিটি কম্যুনিটি সার্ভিসের টেলিফোন নম্বর জেনে নিয়ে সেখানে টেলিফোন করল।
ওপার থেকে সাড়া পেতেই ব্রুনা ‘গুড় মর্নিং’ জানিয়ে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে জিজ্ঞাসা করল, ‘কম্যুনিটি সার্ভিস থেকে আপনারা কয়েক দিন আগে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন, আবারও কি আপনারা তেমন কোন লোক পাঠিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, আমরা একটা এনজিও-কে সহযোগিতা করছি। তারা একটা সমীক্ষার জন্যে কিছু তথ্য সংগ্রহ করছে জার্মান সেটলারস ও জার্মান প্রবাসীদের উপর। কোন সমস্যা? কেন জিজ্ঞাসা করছেন?’ বলল ওপার থেকে কম্যুনিটি সার্ভিসের লোকটি।
‘কিছু নয়, কৌতুহল থেকে জিজ্ঞাসা করছি। এনজিওটার নাম কি বলতে পারেন প্লিজ?’ বলল ব্রুনা।
‘এক মিনিট প্লিজ।’ ওপার থেকে কম্যুনিটি সার্ভিসের লোক বলল।
মিনিট খানেকের মধ্যেই তার কন্ঠ শোনা গেল। বলল, হ্যাঁ, এনজিওটা খুবই নামকরা, ‘উই আর ফর অল’।
‘ধন্যবাদ স্যার। বাই!’ বলে ব্রুনা তার কল অফ করে দিল।
ধপ করে বসে পড়ল সোফার উপর ব্রুনা। তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন।
তার নিশ্চিতই মনে হচ্ছে, এনজিও’র ছদ্মাবরণে তার মায়ের গ্যাংগটাই তার তালাশ করছে! তার মানে তারা জার্মানির বাইরেও নজর দিচ্ছে? কেন তারা এভাবে আমাদের পেছনে লেগেছে? আমরা তো চলে এসেছি সেখান থেকে!
এরপরও তারা আমাদের অস্তিত্ব কেন বরদাশত করতে পারছে না? কেন? কি চায় তারা?
এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় চোখ ধরে এসেছিল ব্রুনার।
আবার কলিং বেলের শব্দ।
তন্দ্রা ভেঙে গেল ব্রুনার।
‘আবার কে এল!’ মনে মনে বলে তাকাল দরজার দিকে। উঠে দাঁড়াল।
দরজার দিকে দু’ধাপ এগিয়েই আবার থমকে দাঁড়াল। ভয় এসে ঘিরে ধরল তাকে। যারা তাকে খৃঁজছে তাদের কেউ এসে গেল কি?
ধীরে ধীরে এগোলো ব্রুনা দরজার দিকে।
এক বুক শংকা নিয়ে ডোর ভিউ দিয়ে বাইরে তাকাল।
বাইরে দাঁড়ানো আগন্তুকের দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠল ব্রুনা ব্রনহিল্ড। সমগ্র মনটাই তার এক সাথে বলে উঠল অ্যালিনা আপার মহান মানুষটিকে সে দেখছে। সেই সুন্দর, স্বচ্ছ, নিষ্পাপ চেহারা। দেখেই ব্রুনার মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে একে সে চেনে।
আর ভাবতে পারল না ব্রুনা।
হাত তার আপনাতেই এগিয়ে এসে দরজার সেফটি চেইন খুলে লক ঘুরিয়ে দিল দরজার।
দরজা খুলে দিল ব্রুনা।
ব্রুনা ও আগন্তুক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
নির্বাক ব্রুনার দৃষ্টি আটকে গেছে আগন্তুকের মুখে।
আগন্তুকের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। তার চোখ দু’টিও যেন হাসছে। বলল আগন্তুক ব্রুনাকে লক্ষ করে, ‘গুড মর্নিং, আমি নিশ্চিত তুমি ব্রুনা ব্রুনহিল্ড, আনালিসা অ্যালিনার বোন।’
প্রায় সম্মোহিত ব্রুনা ব্রুনহিল্ডের জন্যে বিস্ময়ের পর বিস্ময়! আগন্তুক তার নাম জানে? আর অবলীলাক্রমে তার নামটা বলেও ফেলল এতটা নিশ্চিতভাবে! সেই সাথে একটা আনন্দও! অবশ্যই উনি আপার সেই মহান মানুষ। এক পশলা বৃষ্টির মত নিরাপত্তার একটা প্রশান্তিও নামল তার মনে।
অভিভূত ব্রুনার মুখ থেকে যেন আপনাতেই কথা বেরিয়ে এল, ‘গুড মর্নিং স্যার, আমি ব্রুনা ব্রুনহিল্ড, আনালিসা অ্যালিনার বোন।’
বলে ব্রুনা ব্রুনহিল্ড হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়াল আগন্তুকের দিকে।
তবে হাত এগিয়ে না দিয়ে আগন্তুক বলল, ‘এক্সকিউজ মি ব্রুনা, আমাদের সংস্কৃতি এ ধরনের হ্যান্ডশেকের অনুমতি দেয় না।’
ব্রুনা হাত টেনে নিল। বিব্রত ভাব তার চোখে-মুখে। তার দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের দিকে। এমনটা ব্রুনার জীবনে এই প্রথমবার ঘটল। অতিথি অভ্যাগতদের স্বাগত জানানোর সবচেয়ে অন্তরংগ প্রকাশই তো হলো হ্যান্ডশেক। হ্যান্ডশেক অস্বীকার করা অসৌজন্যমূলক, অপমানকরও। অ্যালিনা আপার ‘মহান মানুষের’ কাছ থেকে তো এমন প্রত্যাশা করা যায় না!
ব্রুনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ ওকে স্যার, ভিতরে আসুন প্লিজ।’
দরজা পুরোটা খুলে এক পাশে দাঁড়াল ব্রুনা।
ভিতরে প্রবেশ করল আগন্তুক।
ব্রুনা দরজা বন্ধ করে আগন্তুককে নিয়ে বসিয়ে তার পাশের সোফায় বসল সে। মুহুর্ত কয়েক নিরবতা।
‘আমি অনাহুত আগন্তুক। প্রয়োজনের কথাই আমার প্রথম বলা দরকার। বলল আগন্তুক।
কথা শেষ করেই আগন্তুক আবার বলার জন্যে মুখ খুলেছিল।
‘এক্সকিউজ মি স্যার, তার আগে আমার একটা প্রশ্ন আছে।’ ব্রুনা বলল।
‘প্রশ্ন? বল।’ আগন্তুক মুখ তুলে ব্রুনার দিকে চেয়ে বলল।
‘আপনার মূল নামের কয়টা অংশ?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
আগন্তুক আবার মুখ তুলে তাকাল ব্রুনার দিকে। ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছে তার।
যেন মুহুর্তকাল ভাবল সে। বলল, ‘অংশ দু’টি।’
‘প্রথম অংশের প্রথম ইংরেজি অক্ষরটা কি?’ আবার জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
ঠোঁটে ছোট্ট এক টুকরা হাসি ফুটে উঠল আগন্তুকের। বলল, ‘ইংরেজি ‘এ’ হলো সেই আদ্যাক্ষর।’
খুশিতে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ব্রুনার। বলল, ‘এবার বলুন স্যার।’
‘কিন্তু আগে বল, আমি পাস করতে পেরেছি কিনা?’ আগন্তুক বলল।
মুখে হাসি ফুটে উঠল ব্রুনার। বলল, ‘স্যার, প্রথম দর্শনেই আপনি পাস করেছেন।’
‘কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা আগন্তুকের।
‘আপা আপনার চেহারার যে বিশেষ গুণগুলো দিয়েছিলেন তার সাথে আপনি মিলে গেছেন।’ বলল ব্রুনা।
‘আমি তাহিতি থেকে আসছি। গৌরী মানে আপনার বোন আনালিসা অ্যালিনা শেষ পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। আর আমার নাম নিশ্চয় আপনার বোনের কাছে শুনেছেন।’ আগন্তুক বলল।
‘নাম বলেননি। নাম টেলিফোনে বলবেন না বলেই দুই অংশ নামের প্রথম অংশের আদ্যক্ষর বলার পর তাঁর টেলিফোন কেটে যায়। তারপর থেকেই আপার সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।’ বলল ব্রুনা। তার শেষ কথাগুলো কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছিল।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ব্রুনা সংগে সংগেই আবার বলে উঠল, ‘আপনি বললেন শেষ পর্যন্ত আপা ওখানে ছিলেন, ‘শেষ পর্যন্ত অর্থ…।’
কথা শেষ করতে পারল না ব্রুনা। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
আগন্তুক তাকাল ব্রুনার দিকে। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে নরম কন্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, ব্রুনা, আনালিসা অ্যালিনা নেই।’
ব্রুনা অস্ফুস্ট চিৎকার করে সোফার উপর আছড়ে পড়ল। এক বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
আগন্তুক মাথা তুলল না। তাকাতে পারল না ব্রুনার দিকে। মনে মনে বলল, ‘কাঁদুক ব্রুনা, তার কাঁদা উচিত।
অল্পক্ষণ পর মুখ তুলল ব্রুনা। অশ্রুধোয়া তার মুখ। বলল, ‘কি ঘটেছিল, কি হয়েছিল জানতে পারি কি মি.।’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠ তার।
‘আমার নাম আহমদ মুসা। আনালিসা অ্যালিনার মৃত্যুর ঘটনা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই ব্রুনা বলে উঠল, ‘আহমদ মুসা আপনার নাম? তাহিতির জিম্মি উদ্ধারের ঘটনায় আপনার কথা পত্রিকায় পড়েছি। বলা হয়েছে প্রায় পৌনে একশ বিজ্ঞানী-বুদ্ধিজীবি জিম্মী উদ্ধার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। বিস্ময়করভাবে আপনি সবাইকে মুক্ত করেছেন! বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সবাই আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। আরও অনেক কথা লিখেছে অনেক পত্রিকা। আপনি কিংবদন্তীর নায়ক। কিন্তু বুঝতে পারছি না, আমার আপার সাথে আপনার পরিচয় হলো কি করে?’
‘আমি সে কথাই বলছি।’ বলে আহমদ মুসা গৌরী ওরফে আনালিসা অ্যালিনার সাথে তার প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে সব কিছু সংক্ষেপে তুলে ধরে বলল, ‘আমাকে বাঁচাতে গিয়েই তাদের নেতার গুলিতে জীবন দিয়েছে ব্রুনা।’
‘আপা আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছিল, আমাদের ‘মা সমস্যা’র সমাধানে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। আমাদের সমস্যার কথা আপনি জানেন বলে তো বললেন না?’
‘অ্যালিনার মৃত্যুর আগে জানতাম না। গুলি লাগার পর সে মিনিট দেড়েক বেঁচেছিল। আমার হাতে সে একটা ডাইরি তুলে দিয়ে বলেছিল, ডাইরির শেষ কয়েক পাতায় আমার জন্যে কিছু লিখেছে। আমি যেন সেটা পড়ি। আর বলেছিল, আমার উপর সে কোন দায়িত্ব চাপাচ্ছে না, সব কিছু আমার ইচ্ছায় হবে। পরে ডাইরি আমি পড়েছি এবং সমস্যা সম্পর্কে জেনেছি। নিজের ইচ্ছাতেই আমি এসেছি ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার ঠিকানাও কি আপা দিয়েছে?’ বলল ব্রুনা।
‘হ্যাঁ। ডাইরিতেই সে লিখে রেখেছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম স্যার। আমরা সত্যিই অসহায় হয়ে পড়েছি। আপার অভাব আমাদের সব আশা-ভরসা চুরমার করে দিয়েছে। আব্বা আমাদের অভিভাবক হলেও আপাই আমাদের পরিচালনা করত। মা’র ঘটনায় বাবা একদমই ভেঙে পড়েছেন, মনের দিক দিয়েও শরীরের দিক দিয়েও।’ বলল ব্রুনা। ভারি কন্ঠ তার।
‘স্বাভাবিক।’ বলল আহমদ মুসা।
মুহুর্তকালের বিরতি নিয়ে আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘আচ্ছা বল তো ব্রুনা, তোমার কি মত, তোমার মা কি বদলে গেছেন, না উনি তোমার মা-ই নন?’
‘মা হবেন না কেন? বদলে গেছেন তিনি। অবশ্য বাবা বলেন, কোন প্রমাণ নেই এবং বিশ্বাস করাও যায় না, কিন্তু তাকে তোমার মা বলে বিশ্বাস করতে মন চায় না। আব্বার কথা আমি মানি না। ইনি আমার মা না হলে আমার মা কোথায়?’ বলল ব্রুনা।
‘আমি গৌরীর মানে অ্যালিনার ডাইরি গোটাটাই পড়েছি। অ্যালিনা কিছু তথ্য দিয়েছে তা কিন্তু নিশ্চিত করে উনি তোমাদের মা নন।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা বিস্ময় নিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, কি তথ্য বলা যাবে স্যার?’
‘অবশ্যই ব্রুনা। একদিন গোসলের পর তোমার মা তার ড্রেসিং রুমে বসে তার কালো চুল রং দিয়ে সাদা করছিলেন, এটা অ্যালিনা দেখেন। তোমার এ..।’
‘মা কালো চুল পাকা করছিলেন? তাহলে মায়ের পাকা চুলের গুচ্ছগুলো আসলে পাকা নয়। ও গড…।’
থামল ব্রুনা। তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কাঁপছে গোলাবের পাপড়ির মত তার নিরাভরণ ঠোঁট।
কয়েক মুহুর্ত, ব্রুনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল, ‘ডাইরিতে আর কি আছে স্যার?’
‘আরও আছে। ওটা আমি এনেছি। তুমিই রাখবে। পড়ে নিও তুমি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, স্যার। ও ডাইরির অধিকার একমাত্র আপনার। আপনাকেই আপা দিয়ে গেছেন।’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু ওটা তোমাদের পারিবারিক সম্পত্তি।’
আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি আপার কাছে পরিবারের চেয়েও বড়।’ বলল ব্রুনা।
‘কেন, কেমন করে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জানি না। তবে আপার সাথে কথা বলে আমি এটাই বুঝেছি যে, তার আস্থা, সম্মান, ভালোবাসা সব যেন আপনার জন্যেই ছিল!’ বলল ব্রুনা।
অজান্তেই মনটা আহমদ মুসার চমকে উঠল। মুমূর্ষু গৌরীর কথাগুলো তার মনে পড়ল: স্রষ্টার কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে কেন আপনার দেখা পেলাম? কেন আপনার দেখা আগে পাইনি?… আপনার উপর আমার আস্থা সীমাহীন।’ আরও মনে পড়ল তার শেষ কথাটা: ‘আপনার উপর সে অধিকারও নেই।’ অধিকার নেই, বলার মাধ্যমে সে তো এটাই বলতে চেয়েছে ‘সে অধিকার তার আছে।’
আনমনা হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা। এসব চিন্তার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল সে।
আহমদ মুসার এই ভাবান্তর চোখ এড়াল না ব্রুনার। তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাহলে তার বড় বোন তার মনটা অবশেষে একজনকে দিয়েছিল! বলল ব্রুনা, ‘স্যার, আমার মা খুবই কনজারভেটিভ। তার অনুকরণেই আমরা গড়ে উঠেছি। জানেন, বড় আপার কোন ছেলে বন্ধু ছিল না। আমার খুশি লাগছে যে, আপা শেষে একজনকে বন্ধু বানিয়েছিলেন।
শেষ কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল ব্রুনা।
আহমদ মুসা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তোমাকে খুব শক্ত হতে হবে ব্রুনা। আলিনা যে কাজ শেষ করতে পারেনি, তা তোমাকে শেষ করতে হবে।’
ব্রুনা চোখ মুছল। বলল, ‘সে শক্তি আমার নেই স্যার। আমি আপনার পাশে থাকতে চেষ্টা করব।’
কলিং বেল বেজে উঠল।
চমকে উঠল ব্রুনা!
ব্রুনার চমকে ওঠা আহমদ নজর এড়াল না।
বলল, ‘দরজায় কে তুমি কি জান ব্রুনা?’
‘না স্যার।’ বলল ব্রুনা।
‘তবে চমকে উঠলে যে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘কিছুক্ষণ আগে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কম্যুনিটি সার্ভিসের লোক এসেছিল কিছু ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে। কোন এনজিও’র অনুরোধে তারা নাকি এটা করছে। কিন্তু কেন জানি আমার সন্দেহ হয়েছে এর মধ্যে অন্য কোন ব্যাপার আছে। আমার মধ্যে সত্যিই একটা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে।’ বলল ব্রুনা।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজেছিল।
চোখ খুলে বলল, ‘আমি বুঝেছি ব্রুনা। দেখ কে, গেট খুলে দাও।’
মুখে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ডোর ভিউ দিয়ে বাইরে একবার তাকিয়ে পেছনে ফিরে আহমদ মুসার দিকে তিনটি আঙুল তুলল।
আহমদ মুসা বুঝল, বাইরে তিনজন লোক। দরজা খুলে দেবার জন্যে আহমদ মুসা ইংগিত করল।
ব্রুনা দরজা খুলে এক হাতে দরজা ধরে রেখে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘আপনারা কারা? কি চাই আপনাদের?’
‘আপনার কাছে এসেছি। আমরা করপোরেশনের সিকিউরিটির লোক। আপনাকে আমাদের সাথে আমাদের অফিসে যেতে হবে।’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
ওরা তিনজন একই বয়সের। সকলেরই পরনে সিকিউরিটির ইউনিফরম।
ব্রুনার মুখ শুকিয়ে গেছে।
সে দরজা থেকে সরে ফিরে আসতে চাইল আহমদ মুসার দিকে।
ওরা তিনজনই ছুটে এসে ধরে ফেলল ব্রুনাকে। চিৎকার করে উঠল ব্রুনা।
আহমদ মুসা বসে ছিল। বসে থেকেই বলল, ‘শোন তিন বীর পুরুষ। ছেড়ে দাও ব্রুনাকে। একজন তরুণীকে ধরতে তিন বীর পুরুষের দরকার হয় না।’
আহমদ মুসার কন্ঠ খুব ঠাণ্ডা কিন্তু শক্ত।
ওরা তিনজনই চমকে উঠে ছেড়ে দিল ব্রুনাকে। তারা আহমদ মুসাকে আগে দেখতে পায়নি। ব্রুনাকে ছেড়ে দিয়েই ওরা ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। ব্রুনা দৌড়ে এসে আহমদ মুসার পেছনে দাঁড়াল।
‘কে তুমি?’ আহমদ মুসার দিকে ঘুরে দাঁড়াবার পর ওদের একজন বলল।
‘আমার বন্ধু, আমার অভিভাবক।’ আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই বলে উঠল ব্রুনা।
ব্রুনার কথা তখন শেষ হয়ে সারেনি। ওদের তিনজনের একজনের হাত অকস্মাৎ উপরে উঠল।
একটা ছুরি ছুটে এল আহমদ মুসার লক্ষে।
আহমদ মুসা আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার পেছনে ব্রুনা।
ছুরির সামনে থেকে আহমদ মুসার সরার উপায় ছিল না। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল ব্রুনা। আহমদ মুসা সরলে ছুরি গিয়ে সরাসরি আঘাত করবে ব্রুনাকে।
সুতরাং আর কোন চিন্তা করার অবকাশ ছিল না। আহমদ মুসার বাম হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল ছুরিটাকে। ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা তার বাম হাতের তালুতে বিদ্ধ হলো।
আহমদ মুসা দেখল আরও একজনের হাত উপরে উঠেছে।
আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বা হাতের তালু থেকে ছুরিটা বের করতে করতে চিৎকার করে উঠল, ‘ব্রুনা, তুমি শুয়ে পড়।’
ব্রুনা আহমদ মুসার হাতে ছুরি বিদ্ধ হওয়া দেখেছে। ভয়ে কাঁপছিল সে। আহমদ মুসার নির্দেশের সাথে সাথে শুয়ে পড়ল ব্রুনা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আরেকটি ছুরি ছুটে এল আহমদ মুসার লক্ষে।
চোখের পলকে আহমদ মুসা হাঁটু গেড়ে বসে মাথার উপর ছুটে চলা ছুরির বাঁট ধরেই ছুঁড়ল তৃতীয় লোকটির ডান বাহু লক্ষে। তারও ডান হাত উপরে উঠছিল। তার সে হাতে চকচকে তৃতীয় আরেকটা ছুরি।
আহমদ মুসা ছুরিটা ছুঁড়েই বাম হাতের তালু থেকে খুলে নেয়া রক্তাক্ত ছুরিটা ওদের তিনজনের দিকে তাক করে বলল, ‘দেখ, আমার নিক্ষিপ্ত ছুরিটা লক্ষ ভ্রষ্ট হবে না। তার প্রমাণ দেখ তোমাদের তৃতীয় লোকটির বাহুতে গেঁথে যাওয়া আমার ছুরি। এখন বল, তোমাদের কে প্রথম মরতে চাও।’
আহমদ মুসার নিক্ষিপ্ত ছুরিটা তৃতীয় ব্যক্তির ডান বাহুর ভিতরের পাশ দিয়ে বাহুর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। লোকটি ককিয়ে উঠে বাম হাতে ডান বাহু চেপে ধরে বসে পড়েছিল।
ওরা দু’জন সাথী লোকটির বাহুতে বিদ্ধ ছুরিটার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফেরাল আহমদ মুসার দিকে। তারা আহমদ মুসার কথা অবিশ্বাস করল না। তারা দু’জন দু’হাত উপরে তুলে আত্নসমর্পণ করল।
উঠে দাঁড়িয়েছিল ব্রুনা।
আহমদ মুসা ছুরি নিয়ে এগিয়ে গেল ওদের তিনজনের সামনে।
আহমদ মুসার গা ঘেঁষে তার পেছন পেছন এগোলো ব্রুনা।
ছুরি ওদের দিকে তাক করে আহমদ মুসা বলল, ‘দেখ, এক আদেশ আমি দু’বার করি না। বাঁচতে চাইলে বল তোমরা কারা? কেন এসেছিল মেয়েটিকে কিডন্যাপ করতে?’ ঠাণ্ডা কিন্তু অত্যন্ত শক্ত কন্ঠস্বর আহমদ মুসার।
ওরা তিনজনেই আহমদ মুসার দিকে তাকাল।
আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে এবারও তারা আহমদ মুসার কথা অবিশ্বাস করল না। ওদের একজন বলল, ‘স্যার, আমরা এই এলাকার একটা শরীর চর্চা ক্লাবের সদস্য। দু’জন লোক এসে আমাদের বলে, এই ম্যাডাম তাদের আত্নীয়, রাগ করে পালিয়ে এসে এখানে রয়েছে। তারা এলে সে দরজা খুলবে না এবং আবার পালিয়ে যাবে। এই কারণে তারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাকে ধরে নিয়ে যেতে। আমাদের ক্লাবের পাশের পার্কে তারা অপেক্ষা করছে। ম্যাডামকে নিয়ে তাদের হাতে পৌঁছে দেয়াই আমাদের কাজ। আমরা প্রত্যেকে এজন্যে এক হাজার ডলার করে পাব।’
আহমদ মুসা তাকাল একবার ব্রুনার দিকে। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের নিয়ে ওখানে গেলে তো ওদের পাওয়া যাবে?’
‘পাওয়া যাবেই তো স্যার!’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
‘তাহলে চল।’
বলে পেছনে তাকাল। বলল ব্রুনাকে, ‘তুমি থাক, আমি আসছি।’
‘না স্যার, একা আমি বাসায় থাকতে পারবো না। প্লিজ, আমি আপনার সাথে যাব।’ বলল ব্রুনা তার মুখে ভয়ের চিহ্ন।
‘ঠিক আছে, এস।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, আপনার বাম হাত সাংঘাতিকভাবে আহত। রক্ত ঝরছে। এখনই ব্যান্ডেজ করিয়ে নেয়া দরকার।’ বলল ব্রুনা।
‘ঠিক বলেছ ব্রুনা। ওদেরও একজন আহত।’ বলে আহমদ মুসা ওদের আহত লোকটিকে ডাকল।
ব্রুনা ছুটে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এসে বলল আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, চিন্তা করবেন না। আমার ফার্স্ট এইড ট্রেনিং আছে। আমি খারাপ ব্যান্ডেজ করবো না।’
বড় গামলা নিয়ে এসে প্রথমে আহমদ মুসার হাত এ্যান্টিসেপটিক ফ্লুইড মেশানো পানি দিয়ে ধুয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। তারপর আহমদ মুসা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল ওদের আহত অন্য লোকটির হাতে।
সবাই বেরিয়ে এল ব্রুনার ফ্ল্যাট থেকে। সব শেষে বেরুল ব্রুনা ঘর লক করে।
ওদের তিনজনের দু’জন বসল ড্রাইভিং ও তার পাশের সিটে। আহত তৃতীয় জনের সাথে ব্রুনাকে বসাল পেছনে মাঝের সিটে। নিজেকে আড়ালে রাখার জন্যে পেছনের সিটে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহমদ মুসা।
গাড়িতে ওঠার সময় দৃষ্টির একটা পলক সামনের দিকে পড়তেই আহমদ মুসা দেখল অ্ল্প দূরে একজন লোক রাস্তার পাশে একটা গাছে ঠেস দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আহমদ মুসার চোখের সামনে পড়তেই লোকটা গাছের আড়ালে সরে গেল। পরক্ষণেই সে ওদিকে রাস্তার পাশের একটা ঝোপের দিকে দৌড়ে গেল। একটু পরেই ঝোপের আড়াল থেকে একটা গাড়ি বেরিয়ে ওদিকে চলে গেল।
লোকটির আচরণ আহমদ মুসার মধ্যে কিছু কৌতুহল সৃষ্টি করলেও এটা আহমদ মুসার মনে কোন ভাবনার সৃষ্টি করল না। উঠে বসল সে গাড়িতে।
গাড়ি দশ মিনিট চলার পর একটা পার্কে প্রবেশ করল। দাঁড়াল একটা ঝাউ গাছের পাশে।
নিরব পার্কটা। এ সময়ে পার্কে কেউ আসে না।
গাড়ির সামনের ওরা দু’জন লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
কিছুক্ষণ বাইরে পায়চারি করে তারা আহমদ মুসার কাছে এসে বলল, ‘স্যার, কাউকে দেখছি না। কিন্তু এই ঝাউ গাছের পাশেই তো আমাদের দাঁড়াবার কথা! ওরা এখানে থাকবে কথা ছিল।’
আহমদ মুসার মনে পড়ল ব্রুনার বাড়ির ওপাশে দেখা সেই লোকটির কথা। ও কি এদের লোক ছিল। হওয়াই সম্ভব। গুণ্ডাদের পাঠিয়ে তাদের উপর চোখ রেখেছিল নিশ্চয়। মুক্তভাবে ব্রুনাকে বের হতে দেখে এবং সাথে আমাকে দেখে ওদের সন্দেহ হয়েছে। নিশ্চয় তাদের ব্যাপারে পুলিশকে বলা হবে, এ সন্দেহও তারা করতে পারে। সন্দেহ করেই কি তাহলে ওরা সরে পড়েছে?’
‘ঠিক আছে, তোমরা আরেকটু দেখ।’
তারপর আহমদ মুসা ব্রুনাকে বলল, ‘তুমিও নামো। গাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াও।’
আরও কিছু সময় পার হলো।
ওরা তিনজন এসে আহমদ মুসার সামনে গাড়ির জানালায় এসে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, ওরা নিশ্চয় ভেগেছে আপনার আসা টের পেয়ে।’
‘লোক ওরা কয়জন ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘দুই গাড়িতে ওরা ছয়জন। সবাই গাড়ি থেকে নামেনি। দু’জন আমাদের সাথে কথা বলেছিল।’ বলল ওদের তিনজনের একজন।
‘আচ্ছা, ওদের মধ্যে কি নীল প্যান্ট ও সাদা টি-শার্ট পরা কেউ ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘হ্যাঁ স্যার ছিল। একজনের পরনে নীল প্যান্ট ও সাদা টি-শার্ট ছিল।’ বলল ওদের তিনজনের মধ্যে আহত লোকটি।
‘ব্রুনা যে বন্দী হয়ে এখানে আসছে না, তাদের কাছে এ ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গেছে। এখানে এলে তাদের বিপদ হবে। এসব বিষয় তারা জেনে ফেলেছে। নিশ্চয় পালিয়েছে ওরা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সত্যিই তারা জেনেছে? আপনি কি করে জানলেন স্যার?’ বলল ওদের একজন। তাদের চোখে-মুখে একটা ভীতি।
‘ব্রুনার বাড়ির বাইরে ওদের একজন পাহারায় ছিল। আমরা গাড়িতে ওঠার সময় সেও ওখান থেকে চলে এসেছে। আমি তাকে দেখেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা খুব জেঞ্জারাস লোক স্যার। আমাদের বিপদ হবে। আপাতত আমাদেরও পালাতে হবে দেখছি।’
বলল তিনজনের সেই আহত লোকটিই।
লোকটির কথা শেষ হতেই চোখের পলকে সব দিক থেকে চার থেকে পাঁচটা গাড়ি এসে আহমদ মুসার গাড়িকে ঘিরে দাঁড়াল। দশ বারোজন লোক নেমে এল সংগে সংগেই।
চারটি রিভলবার উদ্যত হলো চারদিক থেকে আহমদ মুসার গাড়ি লক্ষে। ঠিক এই সাথেই দু’জন এগিয়ে এসে যারা ব্রুনাকে কিডন্যাপ করতে গিয়েছিল এবং আহমদ মুসাদের সাথে এসেছে তাদের দু’জনকে আক্রমণ করল। কয়েকটি ঘুসি লাগিয়ে মাটিতে ফেলে দিল তাদের। ওদের আহত লোকটি চিৎকার করে বলল, ‘স্যার, আমাদের কোন দোষ নেই। গাড়ির মধ্যে বসে থাকা লোকটি আমাদের সবাইকে মেরেছে। ওই আমাদেরকে তার সাথে আসতে বাধ্য করেছে।’
রিভলবারধারী একজন গিয়ে গাড়ির দরজায় একটা লাথি মেরে বলল, ‘বেরিয়ে আয় শালা, দেখাচ্ছি মজা।’
আহমদ মুসা দরজা খুলে দু’হাত মাথার উপরে তুলে বের হয়ে এল গাড়ি থেকে।
রিভলবারধারীদের দু’জন গাড়ির এপাশে ছিল। গাড়ির ওপাশের দু’প্রান্তে দু’জন।
গাড়ি থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় চারদিকটা একবার তাকিয়ে দেখে নিল আহমদ মুসা।
সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রিভলবার তাক করে কাছের লোকটি তার দিকে এগিয়ে এল।
গাড়ির ওপাশ থেকে একজন চিৎকার করে উঠল, ‘শালাকে শেষ করে দাও। ব্রুনাকে আমরা গাড়িতে তুলছি।’
রিভলবারের একটা নল ধীরে ধীরে এসে আহমদ মুসার কপালে ঠেকল।
রিভলবারধারী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘একটুও শব্দ হবে না। পুলিশ যখন আমাদের সন্ধানে আসবে তখন আমরা অস্ট্রিয়া পার।’
লোকটির কথা শেষ হবার সাথে সাথেই গাড়ির পেছন দিক থেকে একটা ছুরি এসে রিভলবারধারীর বাহুতে বিদ্ধ হলো। লোকটি ককিয়ে উঠে তার ডান বাহু চেপে ধরে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা দ্রুত পেছন দিকে তাকাল। দেখল, গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে সেই তিনজনের আহত লোকটি। সন্দেহ নেই আহমদ মুসার, এই লোকটিই ছুরি ছুঁড়েছে আহমদ মুসাকে হত্যা করতে যাওয়া রিভলবারধারীকে।
লোকটির উপর চোখ পড়তেই আহমদ মুসা দেখল তার চোখ ঘুরে গাড়ির ওপাশের দিকে। তার চোখে-মুখে আতংক।
আহমদ মুসা দ্রুত তাকাল গাড়ির ওপাশে। দেখল, একটা রিভলবার উঠে আসছে ছুরি ছুঁড়ে মারা সেই আহত লোকটিকে লক্ষে।
আহমদ মুসার ডান হাতটা দ্রুত চলে গেল মাথার পেছনে জ্যাকেটের নিচে এবং বেরিয়ে এল ‘ব্ল্যাক কোবরা’ নামের ছোট কালো কুচকুচে বিপদজনক রিভলবার নিয়ে। পরমানু নিয়ন্ত্রিত এক ধরনের বিস্ফোরণ এর বুলেটকে পরিচালনা করে। এক কমপ্লিট রাউন্ডে এর ১২টি বুলেট থাকে। সাধারণ রিভলবারের চেয়ে অনেক দ্রুত, নি:শব্দ এর বুলেট এবং এটা অত্যন্ত ভয়ংকর। যে অংগকে এই বুলেট আঘাত করে তা বহু দিনের জন্যে ওজনহীন ও অবশ হয়ে যায়।
চোখের পলকে রিভলবার মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে এনে আহমদ মুসা ছুরিতে আহত লোকটিকে গুলি করতে উদ্যত হলো। নিমেষে লোকটির বাহু লক্ষে গুলি করল। গুলিটি ঠিক তার কনুইয়ের উপরের জায়গাটায় বিদ্ধ হলো। লোকটি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিল রিভলবারের। কিন্তু হলো না। খসে পড়ল তার হাত থেকে রিভলবার।
প্রথম গুলিটি করার পর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি আহমদ মুসা। আরও দু’জন রিভলবারধারী রয়ে গেছে।
আহমদ মুসার রিভলবার ঘুরে এল ওদিক দিয়ে। আহমদ মুসার প্রথম গুলি এতটাই দ্রুত ও আকস্মিক ছিল যে, ঐ দুই রিভলবারধারীর বিমূঢ়তা কাটতে তাদের অনেক সেকেন্ড নষ্ট হলো। এই নষ্ট সেকেন্ডগুলোই আহমদ মুসা ব্যবহার করল ওদের দু’জনকে গুলি করার কাজে। সম্বিত ফিরে ওরা যখন তাদের রিভলবার তোলার চিন্তা করল, তখনই গুলি বিদ্ধ হলো ওদের রিভলবার ধরা হাত।
তৃতীয় গুলিটা করেই আহমদ মুসা দাঁড়ানো অবশিষ্ট লোকদের লক্ষে রিভলবার তুলে বলল, ‘সবাই হাত তুলে দাঁড়াও, সামান্য বেয়াদবী করলে মাথার খুলি উড়ে যাবে। এক কথা আমি দু’বার বলি না।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা রিভলবার নামিয়ে নিয়ে ব্রুনাকে বলল, ‘তুমি পুলিশকে টেলিফোন কর। বল কিডন্যাপার ধরা পড়েছে। ওরা তিনজন তোমার সাক্ষী।’
আহমদ মুসা কথা বলার সময় কয়েক মুহুর্তের জন্যে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল ওদের দিক থেকে। এরই সুযোগ গ্রহণ করেছিল ওদের একজন। ছুঁড়েছিল আধুনিক বুমেরাং সুইচ নাইফ। নি:শব্দে ছুটে আসছিল নাইফটি।
চিৎকার করে উঠেছিল ব্রুনা। দেখতে পেয়েছিল সে বিপদজনক ছুরি নিক্ষেপের ঘটনা।
ঘটনার দিকে ঘুরে তাকাবার সময় নষ্ট না করে আহমদ মুসা নি:শব্দে বোঁটা থেকে ঝরে পড়া ফলের মত নিজেকে মাটির উপর ঠেলে দিয়েছিল।
মুহূর্তের ব্যবধানে বেঁচে গেল আহমদ মুসা। অবিশ্বাস্য তীক্ষ্ণ ধারের সুইচ বুমেরাংটি আহমদ মুসার মাথার সামনের চুলের কিয়দংশ ছেঁটে নিয়ে চলে গেল। বসে পড়তে এক মুহূর্ত দেরি হলে বুমেরাং নাইফটি দেহ থেকে মাথাকে আলাদা করে ফেলত।
আহমদ মুসা বসে পড়েই গুলি করল বুমেরাং নিক্ষেপকারীর মাথা লক্ষে। বুমেরাং নিক্ষেপকারী লোকটি তথন মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। সত্যিই আহমদ মুসার গুলি লোকটির কপাল দিয়ে ঢুকে তার মাথা উড়িয়ে দিল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
মোবাইলে কথা বলছিল ব্রুনা।
মোবাইল সে মুখের কাছ থেকে সরিয়ে বলল, ‘স্যার, আমি পুলিশকে জানিয়েছি। ওরা আসছে। কিন্তু স্যার, আপনার গুলি, আপনার রিভলবার…। কোন বিপদ হবে না তো? অস্ট্রিয়ার অস্ত্র আইন খু্বই কঠোর।’
আহমদ মুসা ব্রুনার উদ্বেগ বুঝল। বলল, ‘না ব্রুনা, ভয় নেই। আমার এ রিভলবারের ইউরোপীয় লাইসেন্স রয়েছে।’
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুলিশের দু’টি গাড়ি এসে পৌঁছে গেল।

গালে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় খেল ক্লারা লিসবেথ।
লিসবেথের পরনে নার্সের পোষাক। কিন্তু গায়ে ডাক্তারের এ্যাপ্রন। এ্যাপ্রনের সামনের বড় পকেট দু’টো ঝুলে আছে। সে দুই পকেটের একটিতে পাওয়া যাবে একটা রিভলবার ও ভয়ংকর একটা সুইচ নাইফ।
ক্লারা লিসবেথকে যে থাপ্পড় দিয়েছে সে গৌরীর মা কারিনা কারলিন।
বিধ্বস্ত তার চেহারা । উস্কু-খুসকু তার চুল। অবিন্যস্ত পোষাক। দু’চোখে তার উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি।
সুন্দর আঙ্গিকের একটা বেডে সে বসে।
বড় ঘর, কিন্তু একেবারেই নিরাভরণ। দেখতে মনে হয় কারাগারের মত। ঘরের ভিতরেই টয়লেট। পড়ার একটা ছোট্ট টেবিল ও একটি চেয়ার। তাতে বই-পত্র কিছু নেই। আছে একটা ট্রেতে খাবার সাজানো।
ক্লারা লিসবেথের গালে এক থাপ্পড় কষিয়েই বলল, ‘বলেছি তো আমি তোদের খাবার খাবো না! মরে যাবো।’
মুহুর্ত থামল। একটা দম দিযে আবার বলে উঠল, ‘আমার হাতঘড়ি কোথায়? দেয়ালে ক্যালেন্ডার নেই কেন?’
‘আমাকে মেরে না ফেলে মরার মত ফেলে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে কেন?’
বলেই কারিনা কারলিন বেড-সাইড থেকে একটা গ্লাস তুলে নিয়ে চোখের পলকে ছুঁড়ে মারল ক্লারা লিসবেথের দিকে।
ক্লারা লিসবেথ সাবধান হওয়ার সময় পায়নি। গ্লাসটা গিয়ে আঘাত করল তার কপালের বাম পাশটায়। জোরের সাথে ছোঁড়া গ্লাসের ভারি গোড়া কপালে লেগে একটা খাদ সৃষ্টি করে উঠিয়ে নিয়ে গেল একখণ্ড চামড়া।
ঝর ঝর করে রক্ত নেমে এসে মুখের উপর দিয়ে গড়াল।
ক্রোধে মুখও লাল হয়ে উঠল। এক টান দিয়ে এ্যাপ্রনের পকেট থেকে রিভলবার বের করে কারিনা কারলিনের কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, ইচ্ছা করলেই মাথাটা এখন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে পারি।’
‘ট্রিগারটা চাপ, আমি তো সেটাই চাই।’ বলল কারিনা কারলিন।
আর কোন কথা না বলে ক্লারা লিসবেথ রিভলবার পকেটে ফেলে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
বাড়ির ভিন্ন একটি অংশের লিফট ধরে উঠে গেল চারতলায়। চারতলার একটা দরজার সামনে দাঁড়াতেই দরজা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা একটা কন্ঠ কথা বলে উঠল, ‘ক্লারা, তুমি আহত আমি সেটা জানি। কি বলতে এসেছ, বল।’
‘এক্সিলেন্সি, ম্যাডাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সংজ্ঞায় আসার পরেই সে আনরুলি হয়ে উঠছেন। যে কোন সময় যে কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসতে পারেন।’ ক্লারা লিসবেথ বলল।
‘সব জানি আমি। তুমি যাও। আমি দেখছি।’ বলল দরজা ভেদ করে আসা সেই কণ্ঠ।
দরজায় গোপন মাইক্রোফোন আছে। সে মাইক্রোফোন থেকেই কথাগুলো আসছে।
ক্লারা লিসবেথ ফিরে গেল বাড়ির আগের অংশে তার কক্ষে।
খাটের পাশের দেয়ালটা ফুঁড়ে কালো ইউনিফরমে ঢাকা কালো মুখোশ পরা অনেক বার দেখা পরিচিত কালো মূর্তি সামনে এসে দাঁড়াতেই কারিনা কারলিন চিৎকার করে বলল, ‘শয়তানরা, তোমরা আমাকে আর কত নির্যাতন করবে? আমাকে মেরে ফেল। না হলে যাকে পাব তাকে আস্ত রাখবো না।’
যান্ত্রিক ধরনের হাসি ভেসে এল কালো মূর্তির দিক থেকে। কথা ভেসে এল অনেকটা যান্ত্রিক স্বরে। বলল, ‘হাজার বার শয়তান বল, তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমরা যা চাই, তা সম্পূর্ণ পাওয়ার পথে। যতই চাও তুমি মরবে না। তোমাকে আরও বাঁচতে হবে।’
‘কেন বাঁচতে হবে?’ বলল কারিনা কারলিন তীব্র কণ্ঠে।
‘কারণ তোমার মাল্টি বিলিয়ন ডলারের এস্টেট আমাদের হস্তগত হতে আরও কিছু সময় বাকি আছে। তোমার ডুপ্লিকেট যাকে আমরা বসিয়েছি তার সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু তার হস্তাক্ষর ও ফিংগার প্রিন্ট তোমার রেকর্ডেড হস্তাক্ষর ও ফিংগার প্রিন্টের সাথে মিলছে না। এগুলো ঠিক করতে সময় লাগছে। নিউ আরটিফিসিয়াল লেদার টেকনলজিতে তার ফিংগারের প্রিন্ট চেঞ্জ করা হচ্ছে। আর তোমার দুই মেয়ে আনালিসা অ্যালিনা, ব্রুনা ব্রুনহিল্ড ও আলদুনি সেনফ্রিডকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। তোমাকে মারার আগে তোমার দুই মেয়ে ও স্বামীকে আমরা হত্যা করব। তারা তোমার ডুপ্লিকেটকে পুরোপুরিই সন্দেহ করেছে। আমাদের হাত ফসকে তারা আত্নগোপন করেছে। তবে তাদের আমরা ধরবই। অতএব, চিন্তা করো না, তোমার মৃত্যুর দিন খুব দূরে নয়।’ কালো মূর্তিটি বলল।
পাগলের মত হো হো করে হেসে উঠল কারিনা কারলিন। বলল, ‘তোমাদের কোন উদ্দেশ্যই সফল হবে না শয়তান। আমার এস্টেটটা আমার পূর্বপুরুষের অনেক পূণ্যের অর্জন। এটা কোন শয়তানের হাতে পড়তে পারে না। ঈশ্বর এই সম্পদ রক্ষা করবেন। তোমরা আমাকে আটক করেছ আমার স্বামী-সন্তানদেরও শেষ করতে পারবে, তা ভেব না শয়তান। ঈশ্বর আছেন।’
হো হো করে আগের মতই হেসে উঠল সেই কালো মূর্তি। বলল, ‘এতক্ষণে তোমার ছোট মেয়ে আমাদের হাতে এসে গেছে। একজনকে পাওয়া গেছে, অন্য দু’জনকে শীঘ্রই পাওয়া যাবে। একজন কিশোরীর মুখ খুলাতে খুব বেশি সময় লাগবে না, এটা ম্যাডাম তুমিও জানো।’
‘আমার এখন যেমন কিছু করার শক্তি নেই, সুযোগ নেই, তেমনি তোমার এসব কথাকে আমি ভয়ও করছি না। আমার ভরসা এখন একমাত্র ঈশ্বর। আমার স্বামী-সন্তানদের তাঁর হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।’
‘কিছু করার যোগ্যতা যাদের থাকে না, তারাই এমন করে ধর্মের ভেক ধরে।’ সেই কালো মূর্তি বলল।
‘যারা শয়তান তারা এমন কথা বলতেই পারে। স্যাক্সনরা ধর্মের ভেক ধরে না। ধার্মিক স্যাক্সনরা বিভিন্ন রকম অধর্মের ভেকধারীদের মুখোশ খুলে দেয়, এ ইতিহাস একটু খুঁজলেই পাবে শয়তান।’ বলল কারিনা কারলিন।
কালো মূর্তির মুখ নড়ে উঠেছিল। কিন্তু তার কথা শুরুর আগেই মোবাইলের রিং বাজার শব্দ বেরুলো তার কালো ইউনিফরমের ভিতর থেকে। মুখ তার বন্ধ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে হাতটি তার পকেট থেকে মোবাইলে তুলে নিল।
‘হ্যাঁ, বল হেংগিস্ট, ওদের খবর কি?’ বলল কালো মূর্তি।
‘স্যার, খবর ভালো নয়। ওরা ব্রুনা ব্রুনহিল্ডকে হাতে পেয়েও রাখতে পারেনি। কেউ তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমাদের চারজন লোক আহত, এর মধ্যে তিনজন গুলি বিদ্ধ। আর…।’
ওপারের কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ ধমক দিয়ে বলে উঠল, ‘থাম, আমি তোমার কাছ থেকে ঘটনার রিপোর্ট চাইনি। বল, ব্রুনাকে কারা কেড়ে নিয়েছে? পুলিশ তো অবশ্যই নয়!’
‘না, পুলিশ নয়। একজন অপরিচিত লোক।’ ওপার থেকে বলল।
‘তোমরা গাঁজাখুরি গল্প সাজাচ্ছ? একজন অপরিচিত রাস্তার লোক দশ বারোজন সশস্ত্র লোকের কাছ থেকে ব্রুনাকে কেড়ে নিয়েছে? আসল ঘটনা কি বল।’ বলল কালো মূর্তি তীব্র ক্ষোভের সাথে।
‘স্যার, ঘটনাটা ঠিক স্যার। সালজবার্গের আমাদের আরও দু’টি সূত্র থেকেও আমাকে এই ঘটনাই জানানো হয়েছে।’ বলল হিংগিস্ট ওপার থেকে।
‘আমাদের ওরা কোথায়?’ বলল কালো মূর্তি।
‘ওরা নির্দেশের অপেক্ষা করছে।’ হিংগিস্ট বলল ওপার থেকে।
‘ওদের জন্যে আমার কি নির্দেশ জানো না তুমি? ওরা এখন শত্রুর সূত্র, শত্রুরা ওদের ফলো করবে। লায়েবিলিটি ওরা এখন।’ কালো মূর্তি বলল।
‘বুঝেছি স্যার, আগামী কালের সূর্যোদয় ওরা দেখতে পাবে না।’ বলল ওপার থেকে হিংগিস্ট।
এবার হো হো করে হেসে উঠেছে কারিনা কারলিন। বলল, ‘বললাম না শয়তান, ঈশ্বর আছেন। ঈশ্বর আমার স্বামী-সন্তানদের রক্ষা করবেন। দেখলে ব্রুনাকে হাতে আনার তোমাদের ষড়যন্ত্র ঈশ্বর সফল হেত দিলেন না।’
কালো মূর্তিটি ক্রোধের সাথে মাটিতে সজোরে একটা লাথি ঠুকে বলল, ‘চুপ ম্যাডাম! আমার লোকদের ভুলে একবার ছাড়া পেয়েছে তোমার মেয়ে। কিন্তু আমাদের জালে সে ধরা পড়বেই। নিশ্চিত থাক, তোমার সামনেই ওকে আমরা টুকরো টুকরো করব অথবা তার লাশ তোমার কাছে আসবে।’
‘আমাকে ভয় দেখিও না। মৃত্যু ভয় না থাকলে তার আর কোন কিছুর ভয় থাকে না। স্বামী-সন্তানদের আগেই আমি ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। তাদের কথা আমি ভাবিও না।’ বলল কারিনা কারলিন।
কারিনা কারলিনের কথা শেষ হতেই আবার মোবাইল বেজে উঠল সেই কালো মূর্তির।
মোবাইল ধরেই কালো মূর্তি বলল, ‘বল হিংগিস্ট, জরুরি কিছু?’
‘স্যার, যে লোকটি ব্রুনাকে কেড়ে নিয়েছে, তার সম্পর্কে কিছু জানা গেছে।
সে ইউরোপীয় নয়, এশিয়ার হতে পারে। আরও জানা গেছে সে আজ সকালে ব্রুনার সাথে সাক্ষাত করতে তার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। আজকের ঘটনার পর ব্রুনা ফ্ল্যাটে যায়নি। তাদের খোজা হচ্ছে।’ বলল হিংগিস্ট ওপার থেকে।
‘অবিশ্বাস্য! একজন এশিয়ান প্রায় ডজনের মত আমাদের লোকের কাছ থেকে ব্রুনাকে কেড়ে নিল। বলে দাও ওদের, যে কোন মূল্যে তাকে ও ব্রুনাকে আমি চাই। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ওরা জার্মানিতে আসবে। অস্ট্রিয়া থেকে যত রাস্তা জার্মানিতে প্রবেশ করেছে সবক’টির উপর চোখ রাখতে বল। আর ইমিগ্রেশন পোস্টগুলোতে আমরা যে বন্দোবস্ত করেছি, তাকে জোরদার করে তোল।’ বলল কালো মূর্তিটি।
কালো মূর্তির কথা সমস্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কারিনা কারলিন। সে থামতেই বলে উঠল, ‘শোন শয়তানরা, তোমাদের এক ডজন লোক একজন এশিয়ানের সাথে পারেনি, এটাই ঈশ্বরের মার। মনে রেখ ঈশ্বরের মার তোমাদের উপর শুরু হয়েছে।’
কালো মূর্তির ডান হাতটা পকেটের মধ্যে ছিল। রিভলবার সমেত বের হয়ে এল তার হাত। তার রিভলবার উঠল কারিনা কারলিনের মাথা লক্ষে। কিন্তু মুহুর্তেই আবার রিভলবারটা নামিয়ে নিল সে। বলল, ‘তোমার জীবনের আরও কয়দিন বাকি। মারব সেদিন রিভলবার দিয়ে নয়। মারব মৃত্যু যন্ত্রণা কি তা যাতে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পার, সেভাবে। মনে রেখ, তোমার মেয়ে দু’টি নিয়ে আসব তোমার কাছে। তাদের নরম দেহের উপর শকুন লেলিয়ে দিয়ে ভোজের মহোৎসব করব। তখন বড় বড় কথা তোমার কোথায় যায় দেখব। এই যন্ত্রণার পর তোমার আসল মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হবে। অপেক্ষা কর।’
‘শয়তানরা শোন, কথাগুলো বলছ নিজেকে ঈশ্বর সাজিয়ে। ঈশ্বরই এর জবাব দেবেন। অপেক্ষা কর।’ বলল কঠোর কণ্ঠে কারিনা কারলিন।
‘ম্যাডাম! তুমি সব হারিয়েছ, দেহ থেকে শুরু করে সম্পদ, স্বামী, সন্তান সব তোমার গেছে, তবে দম্ভ তোমার যায়নি।’ বলল কালো মূর্তি।
‘প্রাণ থাকা পর্যন্ত এ দম্ভ আমার যাবে না। এ দম্ভ বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। আমার সব তোমরা কেড়ে নিয়েছ, কিন্তু বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারনি শয়তানরা।’ সেই কঠোর কণ্ঠে বলল কারিনা কারলিন।
‘হ্যাঁ, রাস্তার কুকুরের কিছুই থাকে না, কিন্তু তাদের ঘেউ ঘেউয়ের অভ্যাস যায় না!’ বলে কালো মূর্তিটি তার বুকের কালো একটা বাটনে চাপ দিল। সংগে সংগে দেয়ালে একটা দরজা খুলে গেল। সেই দরজায় এক লাফে ঢুকে গেল কালো মূর্তিটি।

সারা দিন ধরে আহমদ মুসা গোটা সালজবার্গ ঘুরে বেড়িয়েছে। সাথে ছিল ব্রুনা ব্রুনহিল্ড।
জার্মানির প্রায় মাথার উপরে নয়নাভিরাম আল্পস-এর একটা সুন্দর খণ্ড অস্ট্রিয়ার এই ছোট্ট সালজবার্গ শহরটি মুগ্ধ করেছে আহমদ মুসাকে।
ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আহমদ মুসা বেভিয়ান আল্পস-এর সুন্দর পাহাড়শৃঙ্গ, উপত্যকা, অপরূপ দৃশ্যের কিংস লেক রিভার, হিটলারের অবকাশ কেন্দ্র ‘ঈগল নেসট’, অস্ট্রিয়ার ওয়ান্ডার ল্যান্ড সালজবার্গের গ্রামীণ উপকন্ঠ, সালজবার্গের ঐতিহাসিক বারুক টাওয়ার, বিশপ রুপার্ট ও বেভিরিয়ান ডিউকদের শাসনকেন্দ্র ঐতিহাসিক গীর্জাগুলো দেখেছে। সবশেষে ঐতিহাসিক বারুক টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসার সময় ব্রুনা বলল, ‘আপনাকে একজন সমঝদার ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আপনি সালজবার্গ দেখার জন্যেই এখানে এসেছেন। কেমন লাগছে স্যার, সালজবার্গকে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সালজবার্গের যেটুকু আল্লাহর তৈরি, ‘সেটুকু খুবই সুন্দর। কিন্তু যে অংশটা ‘ম্যান মেড’ মানে মানুষের তৈরি, সেটুকু অনেকটাই একঘেয়ে।’
‘যেমন?’ কিছুটা বিস্ময়ের সাথে বলল ব্রুনা।
‘সালজবার্গে কনসার্ট হল ও গীর্জার ছড়াছড়ি দেখছি। এই যে বারুক টাওয়ার থেকে বেরুলাম, সেটাও নাচ-গান জাতীয় শিল্পের জন্যে তৈরি। মনে হচ্ছে এদিকের মানুষের মন আছে, মাথা নেই। আবার দেখ, বড় বড় স্থাপনাগুলো গীর্জা। সেগুলোর আকৃতি যাই হোক, প্রকৃতিটা পোড়ো বাড়ির মত মানে মানুষের আত্না আছে কিন্তু মানুষের প্রাণস্পন্দন এখানে নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গীর্জাগুলো পুরানো, প্রাণহীন এটা বুঝলাম। কারণ খুব কম মানুষই গীর্জায় যায়। নতুন গীর্জাও তৈরি হচ্ছে না এ কারণেই। কিন্তু এখনকার মানুষের মাথা নেই, একথা বলছেন কেন?’ বলল ব্রুনা। তার মুখে হাসি।
‘নাচ-গান বা এ ধরনের কমর্কাণ্ড যাদের আনন্দের একমাত্র বা প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তাদের মাথা থাকে না। ধীরে ধীরে মহৎ কাজ, মহৎ চিন্তা ও মহৎ সৃষ্টির ক্ষমতা তাদের লোপ পায়। গ্রীক সভ্যতার শেষ দিকে এটাই ঘটেছিল এবং তার ধ্বংসও ত্বরান্বিত হয়েছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
গম্ভীর হয়ে উঠল ব্রুনার মুখ। বলল, ‘অনেক ভারি কথা বলেছেন স্যার। আমি এত কিছু জানি না। তবে নাচ-গান শিল্প-সংস্কৃতির অংগ। এটা ক্ষতিকর কেন হবে?’
‘ওষুধ মাত্রা ও সীমার মধ্যে না থাকলে বিষ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে উপাদেয় খাদ্যও ভয়ানক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ বলল গম্ভীর কন্ঠে আহমদ মুসা।
আনন্দ-বিস্ময় ব্রুনার চোখে-মুখে! বলল ‘স্যার, অ্যালিনা আপার কথা শুনে মনে হয়েছিল, আপনি একজন বড় গোয়েন্দা বা অস্ত্রধারী অ্যাক্টিভিস্ট। আজ নিজ চোখে যা দেখলাম তাতে সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি, আপনি একজন সমাজ সংস্কারক বা দার্শনিকের ভাষায় কথা বলছেন!’
‘একজন সৈনিক আদর্শ চর্চা, দর্শন চর্চা করতে পারে না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পারে হয়তো, জানি না আমি। আপনার মধ্যেই প্রথম দেখলাম তাই বলছিলাম।’ বলল ব্রুনা।
মুহূর্তের জন্যে থেমেছিল ব্রুনা। তারপরেই গাড়ির দরজা খুলে আহমদ মুসাকে বসার জন্যে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘স্যার, শহরের তেমন আর কিছু দেখার বাকি নেই। আপনার উৎসাহে স্যার শহরের অনেক কিছু আমারও দেখা হয়ে গেল। ধন্যবাদ, এমন উৎসাহ স্যার, জাত-ট্যুরিস্টদেরও থাকে না। এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি স্যার?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি সারা দিন ধরে শহর ঘুরলাম শহর দেখার জন্যে নয় ব্রুনা।’
‘তাহলে?’ চোখে-মুখে বিস্ময় ব্রুনার।
‘দুই কারণে আমি সারা দিন শহর ঘুরলাম। তার একটি হলো, আমি দেখতে চেয়েছিলাম শত্রুপক্ষের কেউ আমাদের অনুসরণ করে কিনা। আর দ্বিতীয় কারণ…।’
আহমদ মুসার কথার মধ্যখানে ব্রুনা বলে উঠল, ‘শত্রুরা আমাদের পিছে পিছে আছে?’ উদ্বেগ ফুটে উঠেছে ব্রুনার মুখে।
‘পিছু তো নেবার কথা। কিন্তু সারা দিনেও ওদের দেখা পাইনি। তার অর্থ হলো, আমরা ওদের নজরে নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে ব্রুনা বলল, ‘ভালো খবর স্যার।’
‘এই ভালো সব ভালো নাও হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আবার বলে উঠল, ‘তাহলে এবার চল।’
‘না স্যার, দ্বিতীয় কারণটা তো জানাই হলো না। বলুন স্যার, দ্বিতীয় কারণটা কি?’ ব্রুনা বলল।
‘হ্যাঁ, সেটা হলো সময় কিল করা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন? সময় কিল করা কেন?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
‘তোমার আব্বাকে এখানে আসার সময় দেবার জন্য’। বলল আহমদ মুসা।
আমার আব্বা এখানে আসবেন? কেন? তিনি তো বলেছেন আমরা ব্রুমসারবার্গে পৌঁছার পর তাঁকে জানালে তিনি সেখানে আসবেন।’ ব্রুনা বলল।
‘আমি তাঁকে সালজবার্গে আসতে বলেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি বাবাকে সালজবার্গে আসতে বলেছেন? কেন স্যার?’ ব্রুনা বলল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘আমাদের একজন তৃতীয় সাথী দরকার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তা না হলে আমাদের দু’জনের জন্যে এক সাথে চলা সম্ভব নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল ব্রুনার! বলল, ‘কেন দু’জন এক সাথে চলা সম্ভব নয়?’
একটা গাম্ভীর্য নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘তুমি নিশ্চয় জান না ব্রুনা, আমাদের ধর্ম ইসলামে পরস্পরের মধ্যে বিবাহ বৈধ এমন ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা, নির্জন কক্ষে থাকা বা সাক্ষাত ইত্যাদি ধরনের কাজ নিষিদ্ধ।’
‘হ্যাঁ, তাতে আমরা দু’জন এক সঙ্গে চলার পথে অসুবিধা কোথায়?’ জিজ্ঞাসা ব্রুনার।
‘অসুবিধার বিষয়টা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। এক কথায় উত্তর হলো, আমাদের ধর্মের যে জীবনাচরণ তাতে এই এক সংগে চলার কোন সুযোগ নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন?’ ব্রুনা বলল বিস্ময়ের সাথে!
‘যাদের সাথে অবাধে মেলামেশা করা যায় এমন ঘনিষ্ঠ আত্নীয় তুমি আমার নও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাতে কি? অনাত্নীয়ের সাথে কি পথ চলে না মানুষ?’ ব্রুনা বলল।
‘চলে। আমারও চলতে আপত্তি নেই। কিন্তু সাথে তোমার পিতা ধরনের কাউকে থাকতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু কেন, এই কথা আমি জানতে চাচ্ছি।’ ব্রুনা বলল।
‘দেখ ব্রুনা, বিষয়টি নর-নারীর অবৈধ সম্পর্ক ও অপরাধ বিস্তারের সাথে জড়িত। নর-নারীর বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক আমার ধর্ম ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। কারণ নর-নারীর অবাধ মেলামেশা থেকে এই অবৈধ সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। আমরা এক সাথে চলতে গেলে যে অবাধ মেলামেশা হবে, তা আমাদের ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনার মুখ লাল হয়ে উঠল। কিছুটা বিব্রত ভাবও ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘স্যার, আমাদের সম্পর্কেও কি এমন ভাবা যায়?’
‘এটা তোমার আমার কথা নয়। মানব প্রবণতাকে সামনে রেখে এটা মানুষের জন্যে তৈরি নৈতিক বিধান। এর অন্যথা হলে নারী-পুরুষের সম্পর্ক অবৈধ, এটা অপরাধের পর্যায়ে যে কোন সময় পৌঁছে যেতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এটা একটা আশংকার ব্যাপার।’ ব্রুনা বলল।
‘এটা আশংকার ব্যাপার নয় ব্রুনা। যা সমাজে ঘটে চলেছে তাকে আশংকা বলতে পার কেমন করে? বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি যে এলাকায় বাস কর সে এলাকা, তোমার স্কুল, তোমার কলেজ, তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একবার নজর দাও। দেখবে, ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা কত ধরনের ব্যক্তিগত সামাজিক সমস্যা, কত দু:খজনক ঘটনা ও সংঘাতের সৃষ্টি করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগেই উত্তর দিল না ব্রুনা। ভাবল কিছুক্ষণ সে। বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। আপনি ছেলেমেয়েদের বিশেষ দিকের প্রতি ইংগিত করেছেন। এটা ঠিক স্যার, এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা সাংঘাতিক বিশৃঙ্খলা সমাজে রয়েছে।’
‘তুমি কি মনে কর, এই বিশৃঙ্খলা কি সবাই চায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
ব্রুনা একটু ভেবে বলল, ‘স্যার, বিষয়টা কারও চাওয়া বা না চাওয়ার উপর নেই। পিতা-মাতা চাইলেও, প্রশাসন চাইলেও কারও কিছু করার নেই। বিষয়টা ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কার সাথে কতটুকু সম্পর্ক করবে, তা এখন ব্যক্তির একক অধিকার।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বিশৃঙ্খল ও অস্বাভাবিক সম্পর্কের সবটা কি ব্যক্তির ইচ্ছায় ঘটছে?’
মুহূর্তের জন্যে চুপ থেকে বলল, ‘ইচ্ছা-অনিচ্ছা দু’ভাবেই ঘটছে।’
‘জবরদস্তিমূলকভাবে ঘটছে না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাও ঘটছে।’ বলল ব্রুনা।
‘আচ্ছা বলত, ইচ্ছায় যা ঘটছে তার বড় একটা অংশ কি অবস্থাগত চাপে ঘটছে না?’ আহমদ মুসা বলল।
সংগে সংগেই উত্তর দিল না ব্রুনা। ভাবল। বলল, ‘ঠিক স্যার, অবস্থাগত চাপেই্ এটা বেশি ঘটছে। পরিবেশ, অবস্থা ছেলেমেয়েদের এমন অবস্থানে নিয়ে যায় যখন ইচ্ছা সৃষ্টি হয়ে যায়।’
‘এই ইচ্ছা স্বেচ্ছাগত নয়। অবস্থা, অস্বাভাবিক পরিবেশ, অন্যায় পথে সৃষ্টি করছে এই ইচ্ছা। যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করছে।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা কোন জবাব দিল না। তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। তার ভিতরে একটা প্রচণ্ড তোলপাড়। সে কোন দিন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এই দৃষ্টিতে দেখেনি। সমাজ চিত্রের একটা নতুন দিগন্ত তার সামনে খুলে গেল। ছেলেমেয়েদের অবাধ-মেশাই অবাঞ্ছিত অধিকাংশ ঘটনার জন্যে দায়ী, তাতো সে অস্বীকার করতে পারছে না। সে নিজের কথা ভাবল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বারবার কি এমন বিপদে পড়েনি? আজ যেন ভয় হচ্ছে পেছনের সে কথাগুলো ভাবতে। কিন্তু পরিবারও কি ধ্বংস হচ্ছে এ কারণে! প্রতিবেশী, আত্নীয়-স্বজনসহ চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরিবারের সাথে সে ঘনিষ্ঠ। এর মধ্যে তার ও আরেকটি পরিবার ছাড়া বিশ পঁচিশ বছর বিবাহ টিকেছে এমন দম্পতি নেই। অধিকাংশ বিয়েই চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পরিবার সিংগল, হয় মা ছাড়া না হয় পিতা ছাড়া। বিয়ে না করার হারও সাংঘাতিকভাবে বাড়ছে। তার ঘনিষ্ঠ চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরিবারের অর্ধেকের কোন বাচ্চা নেই। তাদের অনেকেই অনাথ শিশুর প্রতিষ্ঠান থেকে শিশু দত্তক নিয়েছে। সম্ভবত দশ বারটি পরিবারে ১টি করে শিশু আছে। মাত্র সাত আটটি পরিবারের আছে একাধিক সন্তান। এই শিশুগুলো আবার খুব অল্প সময়ই পরিবারের সাথে থাকে। সারা দিন চাইল্ডকেয়ার সেন্টারে কাটিয়ে তারা বাড়িতে আসে রাতে ঘুমাবার জন্যে। মনে পড়ে তার, তার স্কুলে প্রার্থনা দিবসের অনুষ্ঠনে আসা একজন ফাদার বলেছিলো, ‘খৃস্টীয় জ্ঞান ও শিক্ষার অভাবে খৃস্টীয় সমাজের পরিবারগুলো আজ ধ্বংসের মুখে। অনাচার আজ আচারকে গ্রাস করে ফেলেছে।’ এই কথাগুলোর অর্থ সেদিন বুঝেনি সে। আজ তার অর্থ তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের বিষয়ে ফাদারের কথাটা ঠিক। কিন্তু অবাধ মেলামেশাই কি এর কারণ?
মুখ তুলল ব্রুনা। বলল, ‘স্যার, ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষের মেলামেশাই কি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের এত বড় বিপর্যয় ঘটাচ্ছে?’
‘না ব্রুনা, এই সমাজ-পরিবেশের সৃষ্টি করেছে যে ধর্মনিরপেক্ষ, নীতি-বিমুখ জীবনদৃষ্টি, তাই এ অবাধ মেলামেশা যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের বিপর্যয়ের জন্যে দায়ী।’
‘তাহলে তো স্যার পশ্চিমা সভ্যতা-সমাজ এজন্য দায়ী হয়ে যায়!’ ব্রুনা বলল।
‘একটা বা কিছু কারণের জন্যে একটা সভ্যতা-সমাজকে দায়ী করা যায় না। একটা সভ্যতা অনেক বড়। তাতে অনেক কিছু খারাপ, অনেক কিছু ভালো থাকে। আবার অনেক খারাপ থাকলে তার মধ্যে কিছু ভালোও থাকে। পশ্চিমী জীবন ও সভ্যতার মধ্যে ভালোটাই বেশি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু স্যার, আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের এ্ই অবস্থার জন্যে আমাদের সভ্যতাই তো দায়ী, আমি এখন যা বুঝেছি।’ ব্রুনা বলল।
‘এটা সভ্যতার একটা দিক মাত্র। দিকটা ফিলোসফিক্যাল বা দর্শনগত। এদিকটা বাদ দিয়ে পশ্চিমী সভ্যতা মানুষের ব্যবহারিক জীবনের জন্যে হাজারো যন্ত্র ও ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। কোন কথাই এর প্রশংসার জন্যে যথেষ্ট নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সভ্যতার ফিলোসফিক্যাল দিকটা কি? সেখানে ক্রটিটা কি স্যার?’ ব্রুনা বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘অনেক বড় প্রশ্ন। এখন আলোচনার সময় নয় এটা ব্রুনা। তবে এটুকু বলা যায়, তোমাদের সভ্যতা মানুষকে দেহসর্বস্ব মনে করেছে। তারা কাজ করবে, খাবে, আনন্দ-ফুর্তি করবে এবং তারপর একদিন জীবনের ইতি ঘটে যাবে। মানুষের বিচার-বুদ্ধি আছে এবং তার একজন স্রষ্টা আছেন, মানব-জীবন বিষয়ে স্রষ্টার একটা উদ্দেশ্য আছে, এসব অস্বীকার করে তোমাদের সভ্যতা। মানুষের জীবনোত্তর কোন ভবিষ্যত যদি না থাকে, বাঁচার জন্যে খাওয়া আর বাঁচা যদি হয় যথেচ্ছ জীবন-উপভোগের জন্যে, তাহলে মানুষ সব ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় আইন চেষ্টা করে একে নিয়ন্ত্রিত করতে। কিন্তু মানুষের তৈরি, মানুষের দ্বারা বাস্তবায়িত আইন মানুষের জীবনের সবক্ষেত্রে পৌঁছতে পারে না। শুধু ভয় দেখিয়ে চাপ দিয়ে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ হয় না। তোমাদের সভ্যতা তা পারেনি ব্যবহারিক জীবনের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য সত্ত্বেও তোমাদের সভ্যতা এখানে এসে ব্যর্থ।’
‘স্যার, আপনি মরালিটি মানে নৈতিকতার কথা বলছেন যার কারণে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে অপরাধ থেকে দূরে থাকে। আমার একটা বিস্ময়, পশ্চিমী সভ্যতা মানুষের মধ্যে এই নৈতিকতা সৃষ্টি করতে পারলো না কেন!’ ব্রুনা বলল।
‘কারণ তোমাদের সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষ। নৈতিকতা আসে সার্বজনীন নীতিবোধ থেকে। সার্বজনীন নীতিবোধ আসে জগতসমূহের স্রষ্টার কাছ থেকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন ধর্ম, স্রষ্টা ছাড়া এই নীতিবোধ মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না?’ ব্রুনা বলল।
‘পারে না। তোমাদের সভ্যতা তার প্রমাণ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন পারে না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’ ব্রুনা বলল।
‘করতে পারে না নয় ব্রুনা, করতে পারে। কিন্তু সেটা মানব রচিত আইন হয়, স্রষ্টার দেয় নৈতিক আইন হয় না। মানুষের আইনের বাস্তবায়ন হয় মানুষের পুলিশ দ্বারা, কিন্তু স্রষ্টার আইনের বাস্তবায়ন করতে পুলিশের দরকার হয় না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি ব্রুনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করার জন্য মদ নিষিদ্ধ করে আইন তৈরি হয়। এই আইন তৈরির পর মদ তৈরির গোপন কারখানা সাংঘাতিকভাবে বেড়ে যায় এবং মদের বিস্তারও বেড়ে যায়। আইন ও পুলিশ তা রোধ করতে পারেনি। মার্কিন সরকার শেষে মদ নিষিদ্ধের আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। এর পাশাপাশি দেখ, স্রষ্টার বিধান হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে মদ নিষিদ্ধ। মুসলিম সমাজ দেখ সাধারণভাবে মদমুক্ত। ব্যতিক্রম হিসাবে মুসলিম সমাজে যারা মদ খায়, তারা অনেকটা গোপনে খায় এবং একে অপরাধ বলে মনে করে। দেখা যায় মদ্যপরাও এই কারণে মদ এক সময় ছেড়ে দেয়। স্রষ্টার এই বিধান বাস্তবায়নে কোন সময় পুলিশের দরকার হয়নি, এখনও হয় না এবং জেনে রেখ কখনই হবে না। স্রষ্টার দেয়া বিধানের এটাই শক্তি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু স্যার, খৃস্টান সমাজে তো এমন হয় না! খৃস্ট দর্শনেও তো ধর্ম, ঈশ্বরকে মানা হয়!’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু এখন খৃস্টান সমাজে ধর্ম ও ঈশ্বর তো শুধু গীর্জায়! গীর্জার বাইরে তোমরা সবাই ধর্মনিরপেক্ষ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম স্যার। কিন্তু আমাদের ধর্ম থেকে আপনার ধর্মের পার্থক্য কোথায়? আমি আমার আনালিসা আপার কথায় বুঝেছি তিনি আপনার ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আপনাদের ধর্মে কি আছে, আমাদের ধর্মে তা নেই কেন? গীর্জার বাইরে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গেলাম কি করে?’ বলল ব্রুনা।
‘এক কথায় এর উত্তর নেই ব্রুনা। সংক্ষেপে এটুকু জেনে রাখ, ঈশ্বর বা আল্লাহ তোমাদের ধর্মেও আছেন, আমাদের ধর্মেও আছেন, কিন্তু তোমাদের ধর্মগ্রন্থে জীবন ব্যবস্থা নেই, আমাদের ধর্মগ্রন্থ গোটাটাই মানুষের জীবন ব্যবস্থা। আমাদের ধর্মগ্রন্থের প্রথম বাক্যটাই হলো, ‘এই গ্রন্থ, যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, যারা স্রষ্টা বা আল্লাহকে ভয় করে এটা তাদের পথনির্দেশিকা।’ তোমাদের ও আমাদের ধর্মের মধ্যে এটাই পার্থক্য।’
‘তাহলে তো আমাদের ধর্মে ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই নেই, কিন্তু কেন…।’
কথা শেষ করতে পারলো না ব্রুনা।
একটা গাড়ি এসে আহমদ মুসাদের গাড়ির পাশে দাঁড়াল।
ব্রুনা কথা শেষ না করেই সেদিকে তাকাল।
গাড়ি থেকে নামল সুবেশধারী একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক।
ভদ্রলোককে দেখেই ব্রুনা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল, ‘বাবা তুমি? এখানে?’
বলে ছুটে গিয়ে ব্রুনা তার পিতার কাঁধ আঁকড়ে ধরে পাশে দাঁড়াল।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক ব্রুনার পিতা আলদুনি সেনফ্রিড।
আলদুনি সেনফ্রিড ‘ভালো আছ মা’ বলে মেয়ে ব্রুনার পিঠ চাপড়ে আহমদ মুসার দিকে এগোলো।
আহমদ মুসাও এগিয়ে আসছিল।
আহমদ মুসা ও আলদুনি সেনফ্রিড হ্যান্ডশেক করল। হ্যান্ডশেক করেই আলদুনি সেনফ্রিড বলে উঠল, ‘ওয়েলকাম মি. আহমদ, প্রথমে আমার কৃতজ্ঞতা আপনাকে জানাতে চাই, আমি ব্রুনার কাছে সব শুনেছি। মনে হচ্ছে, খোদ ঈশ্বর আপনাকে পাঠিয়েছেন।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আমরা আপনারই অপেক্ষা করছিলাম। ঠিক সময়ে এসেছেন আপনি।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা ছুটে এসে তার পিতা ও আহমদ মুসার সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘বাবা, এই সময় তোমার এখানে আসার কথা ছিল?’
বলেই ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, আমাকে তো কিছু বলেননি?’
‘একটু সারপ্রাইজ দেয়া আর কি!’ একটু হেসে আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু পথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা কেন? বাসায় করা যেত না?’ ব্রুনা বলল।
‘তোমার বাসার উপর যে শক্রর চোখ থাকবে, সেটা খুবই স্বাভাবিক।’ বলল আহমদ মুসা।
ব্রুনা মুহূর্ত কাল আহমদ মুসার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার, সত্যিই আপনি বিস্ময়। আপনি কিছুক্ষণ আগে ছিলেন সমাজ-দর্শন নিয়ে একজন ভাবুক মানুষ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনি একজন প্রফেশনাল গোয়েন্দা!’
একটু থামল। থেমেই তার পিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আব্বা, তুমি তো চিনেছই ইনি আহমদ মুসা। তুমি বলেছ, এঁকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন। কিন্তু সিলেকশন আমার বোনের। আব্বা, আমি আমার বোনের জন্যে গর্বিত যে, সে বিস্ময়কর এক মানুষকে সিলেক্ট করেছেন এবং রাজী করিয়েছেন আমাদের সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু আমি…।’
আহমদ মুসা ব্রুনাকে থামিয়ে দিয়ে একটু শক্ত কন্ঠে বলে উঠল, ‘ব্রুনা, এ ধরনের প্রশংসা ভালো জিনিস নয়। যেটুকু যার যোগ্যতা, সেটুকু তার আল্লাহর দেয়া। প্রশংসা করলে আল্লাহরই করা উচিত। যাক, আসল কথায়…।’
‘স্যরি স্যার। আমি…।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই কথা বলা শুরু করেছিল ব্রুনা।
‘প্লিজ ব্রুনা, আমি কথা বলতে শুরু করেছি।’ ব্রুনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার মুখে স্বচ্ছ হাসি।
আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ব্রুনা। তার চোখে-মুখে কিছুটা বিব্রত ভাব।
‘জনাব সেনফ্রিড, আপনাকে আমি বলেছি আজই আমরা ব্রুমসারবার্গ যাত্রা করব। যাবার পথ সম্পর্কে আপনার চিন্তা বলুন।’
‘কিন্তু আহমদ মুসা ব্রুমসারবার্গে যাওয়া কি আমাদের জন্যে ঠিক হবে? ওটা তো এখন শত্রুর গুহা!’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘যেখানে কাহিনীর শুরু সেখানে গিয়েই কাহিনীর জট খুলতে হয় মি. সেনফ্রিড।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কাহিনীর জটটা কি মি. আহমদ মুসা?’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘কারিনা কারলিন আপনার স্ত্রী, কেন কারিনা কারলিনের মত নয়? যদি উনি কারিনা কারলিন না হন, তাহলে তিনি কে? আসল কারিনা কারলিন মানে আপনার আসল স্ত্রী তাহলে কোথায়? হুবহু একই চেহারার! বয়সের কিছুটা পার্থক্য ছাড়া, দুই কারিনা কারলিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, এর রহস্যটা কি? ইত্যাদি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এসব কথা ব্রুনা ইতিমধ্যেই আপনাকে বলেছে?’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘না মি. সেনফ্রিড, গৌরী মানে আপনার মেয়ে আনালিসা অ্যালিনার ডাইরি থেকে আমি জেনেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডাইরি থেকে? সে কিছু বলেনি?’ জিজ্ঞাসা আলদুনি সেনফ্রিডের।
‘তার সাথে এ ধরনের কথা হওয়ার মত সম্পর্ক তার মৃত্যু পর্যন্ত হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
আলদুনি সেনফ্রিডের চোখে-মুখে বিস্ময় নামল! বলল, ‘তাহলে অ্যালিনা আপনাকে দায়িত্ব দিল কখন? কি দায়িত্ব তাহলে আপনি নিলেন?’
‘দায়িত্ব সে দেয়নি। দায়িত্ব তার কাছ থেকে আমি নেইনি।’ আহমদ মুসা বলল।
চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেল আলদুনি সেনফ্রিডের। বলল, ‘ব্রুনা তো এটাই বলল! আমিও তাই বুঝেছি। আর দায়িত্ব না দিলে, দায়িত্ব না পেলে আপনি এলেন কেন এখানে?’
‘মুমূর্ষ গৌরী মানে আনালিসা অ্যালিনা তার জ্যাকেটের পকেটে তার ডাইরির কথা আমাকে বলে সে ডাইরিটা আমাকে পড়তে অনুরোধ করেছিল। তার ডাইরি পড়েই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মানে আপনি নিজের থেকেই এই দায়িত্ব নিয়েছেন!’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘হ্যাঁ, আমি নিজের থেকেই নিয়েছি। তবে গৌরী আশা করেছিলেন, দায়িত্ব আমি নিই। তা না হলে ডাইরির শেষ কথাগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন কেন? আরেকটি বিষয়, আমি গৌরীর কাছে ঋণী। উনি আমার শত্রুপক্ষের একজন শীর্ষ ব্যক্তি হয়েও আমার কঠিন দু:সময়ে অযাচিতভাবে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন এবং সর্বশেষে নিজের জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন।’
আলদুনি সেনফ্রিডের চোখে-মুখে বিস্ময়! বলল, ‘কেন তা করেছে অ্যালিনা?’
‘হয়তো নীতিগত কারণে। আমার অবস্থানকে সে ঠিক মনে করেছে। এ নিয়ে কোন কথা বলার সুযোগ তার সাথে কখনও হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করে মুহূর্ত থেমেই আবার বলে উঠল আহমদ মুসা, ‘যাক, এসব মি. সেনফ্রিড, জরুরি কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।’
আবার একটু থামল আহমদ মুসা। বলল পরক্ষণেই, ‘আসুন, আমরা গাড়িতে বসে কথা বলি।’
আলদুনি সেনফ্রিড তার ভাড়া করা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল।
আহমদ মুসা এসে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল। আলদুনি সেনফ্রিড ও ব্রুনাকে বসতে বলল পেছনের সিটে।
আহমদ মুসা সামনের দুই সিটের ফাঁকে আলদুনি সেনফ্রিডদের দিকে ফিরে বসেছে। সেই কথা শুরু করল। বলল, ‘আমরা এখনি ব্রুমসারবার্গে যাত্রা করব। যাওয়ার রুট ও সমস্যা সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন।’
সালজবার্গ থেকে ব্রুমসারবার্গে যাওয়ার কয়েকটা রুটের বিবরণ দিয়ে আলদুনি সেনফ্রিড বলল, ‘যাওয়ার পথে এমনিতেই কোন সমস্যা দেখি না। আপনি কোন ধরনের সমস্যার কথা বলছেন?’
‘ইমিগ্রেশন চেক-পয়েন্টে কোন সমস্যার আশংকা আছে কিনা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওখানে ন্যাশনাল আইডি দেখানোই যথেষ্ট। আর কোন সমস্যা ওখানে নেই। আপনি কি অন্য কোন সমস্যার কথা বলছেন?’ বলল সেনফ্রিড।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেও কিছু না বলে চুপ করে গেল। বলল, ‘চলুন, এবার আমরা যাত্রা করতে পারি।’
‘মি. আহমদ মুসা গাড়িটা কার? ব্রুনার তো নয় নিশ্চয়!’ বলল আলদুনি সেনিফ্রিড।
‘গাড়িটা আমার। কিনেছি। একটা রেন্ট-এ-কার কোম্পানিতে রেজিস্টার্ড। আর আমার পরিচয় আমি এ গাড়ির কমার্শিয়াল ড্রাইভার। আপনারা আমার যাত্রী। ওকে?’ আহমদ মুসা বলল।
আলদুনি সেনফ্রিড ও ব্রুনার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে! আহমদ মুসার মত এত বড় মানুষ, তাদের পরিবারের আজকের আশা-ভরসারস্থল আহমদ মুসা তাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার হয়ে গেল। আর এসব সে করল কখন, ভেবেই পেল না তারা।
স্তম্ভিত সেনফ্রিড ও ব্রুনা কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলো না। নিরবতা ভেঙে কথা বলল সেনফ্রিড, ‘সত্যি অবাক হওয়ার মত কথা আপনি বললেন। কিন্তু কমার্শিয়াল ড্রাইভারের জন্যে কমার্শিয়াল লাইসেন্স দরকার। আপনি লাইসেন্স পাবেন কোথায়?’
‘আমি অস্ট্রিয়াতে এসেই কমার্শিয়াল ইউরো ড্রাইভিং লাইসেন্স করে নিয়েছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে সবই আপনার আগাম পরিকল্পনার ফল!’ চোখ কপালে উঠেছে আলদুনি সেনফ্রিডের।
ব্রুনার মুখে এবার বিস্ময় নয় আনন্দে উজ্জ্বল! তার মনে অনেক কথার আকুলি-বিকুলি, তার অ্যালিনা আপা অনেক বড় দিলের ছিল। অনেক বড় না হলে এত বড় মানুষকে কাছে টানলেন কি করে! ব্রুনার সৌভাগ্য এমন মানুষকে সে কাছে পেয়েছে।
আলদুনি সেনফ্রিড বিস্ময়জড়িত কন্ঠেই বলল, ‘কিন্তু আহমদ মুসা আপনার পাসপোর্টে পেশা হিসাবে কি লেখা আছে?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার পেশা আমার পাসপোর্টে লিখে নিয়েছি শখের গোয়েন্দাগিরি। গোয়েন্দারা তার প্রয়োজনে যে কোন ছদ্মবেশ নিতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গোয়ান্দারা নিজের দেশে ও বাইরেও পরিচয় গোপন করে কাজ করে। কিন্তু আপনি পাসপোর্টে যে পরিচয় লিখেছেন, সরকার অসুবিধা করবে না?’ বলল ব্রুনা। তার চোখে-মুখে কিছুটা উদ্বেগ।
‘সে অসুবিধা যাতে না হয়, এ জন্যে আমি ইউরো ভিসা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সত্যিই এক বিস্ময় আপনি! অদ্ভুত দূরদর্শিতা আপনার! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, আপনাকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি। সত্যি, যাদের কেউ থাকে না, ঈশ্বর তাদের এভাবেই সহায় হন। কৃতজ্ঞ আমরা আপনার কাছে।’ বলল আলদুনি সেনফ্রিড। তার কন্ঠ ভারি।
‘আপনি গৌরী ও ব্রুনার পিতা। আমারও পিতৃস্থানীয়। আমাকে দয়া করে ‘তুমি’ বলবেন।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। বিনয়ের দিক দিয়েও তুমি মনে হয় সবার সামনে থাকার মত। আসলে যে মানুষকে সম্মান দেয়, সে সকলের সম্মান পায়। বুঝতে পারছি পৃথিবীতে তোমার এত সম্মান কেন? জানি, আমি এখানে আসার আগে তোমার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। ইন্টারনেট সার্চ করে তোমার সম্পর্কে তথ্যের ভাণ্ডার পেয়েছি। তারপর থেকেই মনে একটা ভয়েরও সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্যে ঈশ্বর যখন তোমার মত একজন বিশ্বব্যক্তিত্বকে বাছাই করেছেন, আমাদের সমস্যাও তাহলে নিশ্চয় বিশ্বমাপের মত জটিল কিছু হবে! এরপর থেকেই আমার উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বেড়ে গেছে। এরপর আবার আমরা ব্রুমসারবার্গ যাচ্ছি। কিন্তু ওখানে গেলেই তো আমরা ওদের চোখে পড়ে যাব, ধরা পড়ে যাব!’ বলল সেনফ্রিড।
‘ঘটনার গোড়ায় পৌঁছার জন্যে ঘটনাস্থলে যেতে হবে জনাব। আমরা অবশ্যই সাবধান থাকবো। ব্রুমসারবার্গ দুর্গ এলাকাতেই আমরা বাসা ভাড়া নেব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ওখানে তো সবাই আমাদের চেনে?’ বলল সেনফ্রিড।
‘চেনা জায়গা ও লোকে চেনে বলেই আমাদের সাবধানতাটা ভালো হবে। চিন্তা নেই।’
বলেই ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। বলল, ‘আর দেরি নয়, যাত্রা শুরু করি এবার।’
চলতে শুরু করল গাড়ি।
গাড়ির লক্ষ সালজবার্গ-মিউনিখ হাইওয়ের বর্ডার চেকপোস্ট।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক ও বিদেশী পর্যটকদের চেকপোস্টে সামান্য কিছু ফর্মালিটি সারতে হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের আইডি দেখা হয় এবং বিদেশীদের দেখা হয় ইউরো ভিসা আছে কি না।
পুলিশের রুটিন ডিউটিও থাকে চেকপোস্টে।
শুরু থেকেই আহমদ মুসার মনে একটা স্থির বিশ্বাস ছিল যে, শত্রুরা চেকপোস্টে চোখ রাখবে। নিশ্চয় জার্মানি যাওয়ার সব চেকপোস্টেই ওরা চোখ রাখার ব্যবস্থা করেছে।
দেখা যাক তারা কোন পথে হাঁটে। চেকপোস্টে তাদের কোন উপস্থিতি টের পাওয়া যেতে পারে। চলছে গাড়ি।
অস্ট্রিয়ার বর্ডার ক্রস করে সালজবার্গ-মিউনিখ হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসার গাড়ি।
চেকপোস্টে কিছুই ঘটেনি।
কেউ তাদের উপর চোখ রেখেছে, কেউ তাদের দেখছে, এমনটাও মনে হয়নি।
কিন্তু আহমদ মুসার মনে অস্বস্তি। এমনটা হবার কথা নয়। শত্রুরা তাদের পিছু ছাড়বে তা হতেই পারে না। তাহলে গোটা দিন শহরেও তাদের কেউ ফলো করলো না, আবার চেকপোস্টেও তারা পাহারায় নেই কেন? ওরা আট-দশজন গ্রেপ্তার হবার পর ওদের লোক কি সালজবার্গে আর নেই? হতেও পারে। তবে এটা স্বাভাবিক নয়।
গাড়ি চলছিল সীমান্ত পার হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে।
সামনে বড় শহর মিউনিখ।
‘আমরা কি মিউনিখ, স্টুটগার্ট, হাইডলবার্গ হয়ে রাইনের দিকে যাচ্ছি?’ জিজ্ঞাসা করল আলদুনি সেনফ্রিড।
‘হ্যাঁ, এ রাস্তা হয়েও যাওয়া যায়। ওদিকে আমার একটা পরিচিত শহর আছে। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবও ওখানে আছে। তাই তো প্রায় ভুলেই ছিলাম ওদের কথা!’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোন শহর?’ জিজ্ঞাসা করল ব্রুনা।
‘স্ট্রাসবার্গ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্ট্রাসবার্গ? কবে এসেছিলেন ওখানে? বেড়াতে এসেছিলেন?’
‘দু’তিন বছর আগে এসেছিলাম। বেশ বেড়ানো হয়েছিল। তবে আসাটা বেড়ানোর জন্যে ছিল না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তোমার আসাটা বেড়ানোর জন্যে হতেই পারে না। কি জন্যে এসেছিলে?’ সেনফ্রিড বলল।
‘টুইন টাওয়ারের ধ্বংস বিষয়ে একটা খোঁজে।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা ও সেনফ্রিড দু’জনেই বিস্ময়ের দৃষ্টি তুলল আহমদ মুসার দিকে। ব্রুনাই আগে কথা বলল, ‘ও গড, ঠিকই তো! টুইন টাওয়ার রহস্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটনের সাথে আহমদ মুসার নাম পড়েছি! সেই কাহিনীর তো স্ট্রাসবার্গেই শুরু! ভুলেই গিয়েছিলাম এ কাহিনী। আমার মনে হয় স্যার, এই এক ঘটনাই আপনাকে অমর করে রাখবে।’ থামল ব্রুনা।
তার চোখে মুখে উপচে পড়া বিস্ময় ও আনন্দের ঝলক! আনন্দের আলোতে তার রক্তিম ঠোঁট আরও রক্তিম এবং নীল চোখ দু’টি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ব্রুনা থামলেই তার পিতা আলদুনি সেনফ্রিড বলল, ‘আমিও ইন্টারনেটে টুইন টাওয়ারের কাহিনী পড়েছি। টুইন টাওয়ারের ধ্বংস যেমন বিস্ময়কর, তোমার কাহিনীও তেমনি অবাক ও বিস্ময়ের। ধন্যবাদ আহমদ মুসা তোমাকে।’
‘স্বপ্নও বোধ হয় এত সুন্দর হয় না, সারা জীবন চাইলেও বাস্তবে পাওয়াটা এতটা অকল্পনীয় হয় না। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান বাবা।’ বলল ব্রুনা। আবেগজড়িত তার ভারি কন্ঠ।
এসব কোন কথাই আহমদ মুসার কানে প্রবেশ করেনি। তার সমস্ত মনোযোগ সামনের রাস্তা ও গাড়ির রিয়ারভিউয়ের দিকে। সে মিউনিখ ছাড়ার পর থেকেই লক্ষ করছে একটা সেভেনসিটার মার্ক পাজেরো তার পেছনে পেছনে আসছে। এটা দেখতে পাওয়ার পর থেকে লক্ষ করছে গাড়িটার গতির কোন পরিবর্তন নেই।
আহমদ মুসা রিমোর্ট ভিউ মাইক্রো গগলস (RVMG) পরে নিয়েছিল। সে পরিস্কার দেখছে গাড়িতে ছয়জন আরোহী। গাড়ির গতি ও আরোহীদের চেহারা দেখে সন্দেহ হয়েছিল আহমদ মুসার। সন্দেহ সত্য হলে ওদের মতলব কি? ওরা অত দূর থেকে ফলো করছে, কেন? ওদের টার্গেট কি তাহলে এটা দেখা যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোথায় উঠছি তা চিহ্নিত করা এবং হতে পারে তা পাহারায় রাখা। তার মানে আমাদের গন্তব্য পর্যন্ত ওরা আমাদের অনুসরণ করবে।
মনে মনে হাসল আহমদ মুসা। ভাবল, সামনে স্টুটগার্ট শহর বাইপাস নয়, শহরের ভিতর দিয়ে পার হতে হবে। এই শহরের মধ্যেই ওদের ধাঁধায় ফেলে পেছনে থেকে ওদের সরাতে হবে।
পেছনে সেনফ্রিডের লক্ষ করে বলল, ‘মি. সেনফ্রিড মনে হচ্ছে, আমাদের পেছনে ওরা লেগেছে। অনেকক্ষণ ধরে একটা গাড়ি আমাদের ফলো করছে।’
‘ওরা কি আমাদের সেই শত্রুরাই হবে?’
বলল আলদুনি সেনফ্রিড।
উদ্বেগে ছেয়ে গেছে সেনফ্রিড ও ব্রুনার মুখ।
‘আমি সে আশংকাই করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা কি করতে চায়? আমাদের এখন কি করনীয়? কি ভাবছেন আপনি স্যার?’ বলল ব্রুনা। ভীতি নেমে এসেছে তার চোখে-মুখে।
‘জানি না ওদের পরিকল্পনা কি ধরনের। আমি ভাবছি, স্টুটগার্ট শহর অতিক্রমের সময় ওদের বোকা বানিয়ে ভিন্ন রাস্তা ধরে চলে যেতে পারব।’ আহমদ মুসা বলল।
স্টুটগার্ট শহর সামনেই।
সামনে ছোট কয়েকটা পাহাড়। পরস্পর বিচ্ছিন্ন, একটু দূরে দূরে। এই পাহাড়গুলোর মাঝেই চার রাস্তার একটা গ্রন্থি আছে। এখান থেকে ডান দিকে একটা রাস্তা সোজা উত্তরে ব্যাভেরিয়ার উজবার্গের দিকে চলে গেছে। বাঁ দিকের রাস্তাটা দক্ষিণ দিকে কনস্ট্যান্স সীমান্ত শহর হয়ে সুইজারল্যান্ডে চলে গেছে। আর একটা সোজা রাস্তা পশ্চিমে এগিয়েছে। এ রাস্তা ধরে এগোলে সামনেই স্টুটগার্ট।
আহমদ মুসার দৃষ্টি সামনের পাহাড়গুলোর দিকেই নিবদ্ধ ছিল। দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে গাড়ির রিয়ার ভিউয়ের উপর চোখ ফেলেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল পেছনের সেই গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে আসছে প্রায় ডবল স্পীডে।
হঠাৎ স্পীড ওরা বাড়াল কেন?
আহমদ মুসাও তার গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল।
পাহাড় এলাকায় প্রবেশ করেছে গাড়ি। কখনও পাহাড়ের পাশ দিয়ে, কখনও পাহাড়ের দূর দিয়ে এগোচ্ছে।
ছোট একটা পাহাড়ের সারির গিরিপথ দিয়ে আড়াআড়ি পার হয়ে পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছতেই রাস্তার চৌমাথা নজরে এল।
চৌমাথার তিন পাশের রাস্তাও নজরে এল আহমদ মুসার। চমকে উঠল আহমদ মুসা। তিন রাস্তাতেই তিনটা মাইক্রো চৌমাথার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। চৌমাথা থেকে মাইক্রোগুলোর দূরত্ব একশ গজের বেশি হবে না।
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না, কেন পেছনের গাড়িটা এত দ্রুত এগিয়ে আসছে। পেছনের গাড়িটা সংকীর্ণ গিরিপথটা আটকে রাখার জন্যে এগিয়ে আসছে। এই চৌমাথায় ফাঁদে ফেলার সফল পরিকল্পনা তারা করেছে।
‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আমাদের ওরা ফাঁদে ফেলেছে। দেখুন তিনটা মাইক্রো তিন রাস্তায় আমাদের পথ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর পেছনে ফেরার পথ বন্ধ করে পেছন থেকে আরেকটা গাড়ি এগিয়ে আসছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সেনফ্রিড ও ব্রুনা আগেই লক্ষ করেছিল দাঁড়ানো তিন মাইক্রোকে। চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে এল ব্রুনা ও সেনফ্রিডের। উদ্বেগ-আতংকে বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছে তাদের চোখ। শুকনো ঠোঁট তাদের কাঁপতে শুরু করেছে। কথা বলার শক্তি যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। ওদের হাতে পড়ার অর্থ কি তারা জানে। সেনফ্রিড মৃত্যুকে ভয় করে না। তার চিন্তা ব্রুনাকে নিয়ে। আর ব্রুনার মনের মধ্যে তোলপাড়, এদের হাতে পড়ার চেয়ে মৃত্যু ভালো।
আহমদ মুসা কথা শেষ করেই ব্যাগ থেকে লেজারগান বের করে পাশে রাখল। রিভলবার আগেই বের করে রেখেছিল।
আহমদ মুসা গাড়ির স্পীড কোন পরিবর্তন আনেনি। সে বোঝাতে চায় মাইক্রোগুলোকে সে সন্দেহ করেনি।
আহমদ মুসা শক্ত হাতে ধরেছে স্টিয়ারিং হুইল। পেছনে না তাকিয়েও বলল আহমদ মুসা, ‘মি. সেনফ্রিড, ব্রুনা, সিটে শুয়ে পড়ুন।’ আহমদ মুসার কন্ঠ শক্ত, তাতে নির্দেশের সুর।
আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে মাইক্রোগুলো তাকে বুঝে ওঠার আগেই তাকে ওদের ফাঁদকে ভাঙতে হবে।
আহমদ মুসা তার গাড়ির ডানে ও বামে ঘোরার দুই ইন্ডিকেটরই জ্বালিয়ে দিয়েছে, যাতে ডান-বাম দুই দিকের মাইক্রোই এক সাথে বুঝে যে, আহমদ মুসার গাড়ি তার দিকেই টার্ন নিচ্ছে। এর ফলে ওরা সামনে এগোবার চেষ্টা না করে আক্রমণের প্রস্তুতি নেবে।
এভাবে আহমদ মুসা চৌরাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে চলল।
পশ্চিমের মাইক্রোটি চৌরাস্তার মোড় থেকে একশ গজের মত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে মোড় থেকে সামনে এগোবার সংগে সংগেই মাইক্রোগুলো আহমদ মুসার কৌশল ধরে ফেলে। ডান-বামের মাইক্রো দু’টো থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হয়েছে আহমদ মুসার গাড়ির লক্ষ্যে এবং সেই সাথে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে চলতেও শুরু করেছে। আর সামনের মাইক্রো স্থির দাঁড়িয়ে থেকেই গুলি বর্ষণ শুরু করেছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আহমদ মুসার গাড়ির উইন্ড শীল্ড, জানালার কাচ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
এখানে রিভলবার দিয়ে আহমদ মুসার করার কিছু নেই। আর তার লেজারগান ৩০ গজের বেশি দূরে তেমন কার্যকরি নয়। স্টিয়ারিং ধরা ডান হাতে ‘লেজারগান’ রেখে দূরত্ব কমার অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
বেপরোয়া গতিকে সবাই ভয় করে। আহমদ মুসার সামনের মাইক্রোর নাক বরাবর আহমদ মুসার গাড়ির পাগলের মত গতি দেখে মাইক্রোর সবাই তাড়াতাড়ি নেমে পড়ে এক পাশে নিরাপদে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে আহমদ মুসার গাড়ি লক্ষে গুলি করছিল।
মাইক্রোর আরোহীরা নেমেছিল রাস্তার দক্ষিণ পাশে মাইক্রোর আড়ালে। জায়গাটা রাস্তার দক্ষিণ প্রান্তেরও বাইরে।
আহমদ মুসা রাস্তা ও মাইক্রোর অবস্থানটা একবার দেখে নিয়ে মাথা স্টিয়ারিং হুইলের লেভেল থেকেও নিচে নামিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালাচ্ছিল। তার চোখ ডাইরেকশন ই্ন্ডিকেটরের দিকে। ইন্ডিকেটরের কাঁটারে সে অনড় রেখেছিল।
এই ইন্ডিকেটরই এখন তার জন্যে ফ্রন্ট ভিউ-এর কাজ করছে। আহমদ মুসার হিসাব, গাড়ির এই ডাইরেকশন ঠিক থাকলে তার গাড়ির সামনের গার্ডারের বাম প্রান্ত তীব্র গতিতে আঘাত করবে সামনের মাইক্রোর সামনের দিকের গার্ডারের বাম প্রান্তকে ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে। তার ফলে তার গাড়ি চাপা ধরনের একটা প্রবল ঝাঁকানি খেলেও আহত গার্ডার নিয়ে সামনে এগোবে। কিন্তু গোটা মাইক্রোটা এক পাক খেয়ে উল্টে গিয়ে পাশের লোকদের উপর পড়বে।
ঝড়ের বেগে গাড়ি চলছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা ১৬০ কি. মি. অতিক্রম করে থর থর করে কাঁপছে।
আহমদ মুসার মনোযোগ ছিল সামনে থেকে ছুটে আসা গুলির ডাইরেকশনের দিকেও। গাড়িতে গুলির আঘাতের শব্দ শুনে নিরূপণ করছিল আহমদ মুসা শত্রুপক্ষের অবস্থানের পরিবর্তন।
আহমদ মুসা শুনছে, সামনের গুলি ক্রমশই গাড়ির বাম পাশের দিকে সরছে। প্রথমে গাড়ির সামনে, তারপর গাড়ির সামনের বাম কোন অঞ্চল, পরে গাড়ির বাম জানালার সামনের দিকে সরে এল গুলির আঘাত।
সামনের গুলির আঘাত জানালার পেছন দিকে সরে আসতেই আহমদ মুসা বুঝল চরম মুহূর্ত উপস্থিত।
আহমদ মুসা ‘আল্লাহু খাইরুল হাফেজীন’ বলে স্পিড বাড়িয়ে মাথা তুলে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং হুইল চেপে ধরল।
আহমদ মুসার গাড়ির গার্ডারের বাম প্রান্ত প্রচণ্ড ছোবল মারল মাইক্রোর মাথার বাম পাশকে।
প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল আহমদ মুসার গাড়ি। কিন্তু প্রচণ্ড ধাক্কায় মাইক্রো সরে যাওয়ায় ধাক্কার প্রবল ‘পুশ’টা শতভাগ জেঁকে বসল মাইক্রোর উপর এবং তার ফলে খেলনার মত পাক খেয়ে উল্টে গেল গাড়ি।
আপনাতেই দু’চোখ বুজে গিয়েছিল। নিজের সব কাজ শেষ করে পরিণতির ভার সবটাই তুলে দিয়েছিল আল্লাহর হাতে।
আল্লাহ সাহায্য করেছেন। আহমদ মুসার গাড়ি থেমে যায়নি, বেঁকে যায়নি বা উল্টে যায়নি।
প্রচণ্ড ধাক্কায় আহমদ মুসা একবার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারপর পেছন দিকে ছিটকে সেঁটে গিয়েছিল সিটের সাথে। কিন্তু আহমদ মুসার দু’হাত কিন্তু গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ছাড়েনি, নড়াচড়া করতে দেয়নি স্টিয়ারিং হুইলকে।
তার দেহ স্থির হতেই আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ ও স্পিড কমিয়ে এনে গাড়িকে একিউট টার্ন করাল।
এবার আহমদ মুসার সামনে এল উল্টে যাওয়া মাইক্রো, তার লোকরা ও এদিকে ছুটে আসা অন্য দুই মাইক্রো।
উল্টে যাওয়া মাইক্রোর লোকেরা নিজেদের সামলে নিয়ে এদিকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। আহমদ মুসা নতুন করে ওদের গুলির মুখে পড়ার আগেই ওদের নিষ্ক্রিয় করে দিতে চাইল।
ডান হাতের লেজারগানটাকে আহমদ মুসা মাটির সমান্তরালে ওদের উপর দিকে ঘুরিয়ে নিল।
সংগে সংগেই ওদের ৬ জনের হাঁটুর নিচের অংশ খসে পড়ল। আর্তনাদ করে ওরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ছুটে আসা দুই মাইক্রোও এসে পড়েছিল একটার পেছনে আরেকটা। ওরা উল্টে যাওয়া ও আহত লোকগুলোর বরাবর এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। সম্ভবত মাইক্রোর লোকরা তাদের ছয়জন সাথীর অবস্থা দেখতে পেয়েছে।
আহমদ মুসা তার লেজারগান সামনে এসে দাঁড়ানো দুই মাইক্রোর সামনেরটার দিকে ঘুরিয়ে নিল। লেজারগান থেকে সামনের মাইক্রোর মাথা লক্ষে একবার হরিজন্টালি, একবার ভার্টিকালি ফায়ার করল। মাইক্রোর মাথা চারটা আলাদা খণ্ডে ভাগ হয়ে গেল।
মাইক্রোর ড্রাইভিং সিট ও তার পাশের সিটের লোকের কি অবস্থা হলো জানা গেল না। পেছনের সিটের লোকরা চিৎকার করে গুলি করতে করতে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।
আহমদ মুসা গুলির জবাব না দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ওদের দিকে চলতে শুরু করল। গুলি করতে করতেই ওরা ছুটে পালাল গাড়ির আড়ালে, গাড়ির পেছনে।
আহমদ মুসা এবার সামনের মাইক্রোটির পেছনের দক্ষিণ পাশের কোনার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খাড়াভাবে লেজারগানের ফায়ার করল।
খসে পড়ল গাড়ি থেকে কোনাটা।
মাইক্রোর পেছনে দাঁড়ানো আতংকিত লোকগুলো ছুটে গিয়ে পেছনের দ্বিতীয় মাইক্রোতে উঠল। ওরা ও দ্বিতীয় মাইক্রো আহমদ মুসার লেজারগানের রেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। আহমদ মুসা ইচ্ছা করলে পালানোরত লোকগুলো ও পেছনের দ্বিতীয় মাইক্রোকে তার লেজারগানের শিকার বানাতে পারতো। কিন্তু আহমদ মুসা মানুষ মারতে চায় না। ওদের ভয় দেখিয়ে পালাতে বাধ্য করে নিজেদের নিরাপদ করতে চায়।
পালানো পেছনের লোকরা দ্বিতীয় মাইক্রোতে গিয়ে ওঠার সংগে সংগেই মাইক্রোটি দ্রুত পেছনে হটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা সিটে সোজা হয়ে বসে পেছনে ব্রুনাদের দিকে চাইল। দেখল, তারা সিট আঁকড়ে সিটের উপর পড়ে আছে। ভাঙা কাচের অজস্র টুকরায় তাদের গা ভর্তি। গাড়ির গায়ে লেগে বা অন্য কোনভাবে সিটকে পড়া কিছু বুলেটও আহমদ মুসা গাড়ির ফ্লোরে এদিক-ওদিক পড়ে থাকতে দেখল। সিটে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ওরা।
‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আপনারা ঠিক আছেন তো? এবার উঠুন। আমরা আপাতত নিরাপদ।’ বলল আহমদ মুসা ওদের লক্ষ করে।
ব্রুনা, সেনফ্রিড উঠল।
তাদের গা থেকে ঝরে পড়ল কাচের টুকরাগুলো।
ভীত, বিপর্যস্ত তাদের চেহারা। তারা তাকাল চারদিকে। দেখল উল্টানো মাইক্রো, একটা গায়েব হওয়া আহতদেরও দেখতে পেল। দেখল মাথা কাটা মাইক্রো, একটা মাইক্রোর ব্যাক ড্রাইভ করে পালানোর দৃশ্যও দেখল।
তাদের চোখ ঘুরে এল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসার দৃষ্টি তখন পাজেরোর দিকে, যে গাড়িটা আহমদ মুসাদের পেছনে ছুটে আসছিল।
উপত্যকায় ঢুকেও গাড়িটা বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসছিল একাধিক স্টেনগান থেকে গুলি বৃষ্টির একটা দেয়াল সৃষ্টি করে। কিন্তু তাদের গুলি বৃষ্টির একটা অংশকে আড়াল করছিল পেছনে অগ্রসরমান মাইক্রোটি, অন্য আরেক অংশকে ব্লক করছিল রাস্তার পাশে উল্টে থাকা মাইক্রো। এই দুই মাইক্রোর ফাঁক গলিয়ে কিছু গুলি আসছে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসা ব্রুনা ও সেনফ্রিডকে মাথা নিচু করে সাবধান হতে নির্দেশ দিয়ে গাড়িটাকে উল্টে থাকা মাইক্রোর দিকে একটু সরিয়ে নিয়ে এল। তার গাড়ির পেছনটা মাইক্রোর আড়ালে চলে গেল। সামনেটা গুলির মুখে পড়লেও গোটা পাজেরো আহমদ মুসার নজরে এল।
ছুটে আসছে পাজেরো বেপরোয়া গতিতেই। তাদের সামনের মাইক্রো এবং তাদের কিছু সাথীর পরিণতি তারা জানতে পারেনি। পাজেরোটাকে বেপরোয়া গতিতে আসতে দেখে ব্যাক ড্রাইভ করা মাইক্রোটাও থেমে গিয়েছিল।
পাজেরোটার মতলব বুঝল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার দাঁড়ানো গাড়িকে তারা সরাসরি এসে আঘাত করতে চায়। আহমদ মুসার জাপানি টায়োটার চেয়ে ওদের জার্মান মার্ক পাজেরো অনেক বেশি শক্ত। ও পাজেরোর সামনের কাঠামো ও গার্ডার টয়োটার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি প্রেশার হজম করতে পারে।
ওদের পাজেরোটি পেছনের মাইক্রো অতিক্রম করে চলে এসেছে। গুলিও বেড়েছে। পাজেরোর দু’পাশের জানালা দিয়ে গুলি আসছে। আবার ভাঙা উইন্ডস্ক্রীনের পথেও গুলি আসছে। গুলি করার সহজ সুবিধার জন্যে উইন্ডস্ক্রীন ওরা ভেঙে ফেলেছে।
আহমদ মুসার গাড়ির দিকে গুলির তিনটা স্রোত আসছে। ডানে-বাঁয়ে সমান্তরালে দু’টি স্রোত এবং আরেকটি স্রোত আসছে গাড়ির জানালার বেজ বরাবর উপর দিয়ে। এ তিনের মাঝখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডের মত একটা নো-বুলেট জোন তৈরি হয়েছে। আহমদ মুসা সুযোগ গ্রহণ করল।
আহমদ মুসা গাড়ির সিট থেকে মাথাটা একটু তুলে নো-বুলেট জোনের ঠিক মাঝামাঝি স্থান দেখে লেজারগান দিয়ে শর্ট রেঞ্জের ফায়ার করে একটা হোল সৃষ্টি করল। সে হোলে লেজারগানের ব্যারেল সেট করে লং রেঞ্জের পূর্ণাংগ ফায়ার করল। তিন সেকেন্ড লেংথের একটা ফায়ার।
আহমদ মুসা অনুমান করল লেসার ফায়ারটি পাজেরোর গার্ডারের মধ্যভাগ দিয়ে ঢুকে ইঞ্জিনের মধ্যভাগ বরাবর গোটা চেসিস উড়িয়ে দেবে। তারপর প্রচণ্ড গতির কারণে বড় ধরনের এ্যাকসিডেন্ট ঘটাবে গাড়িটা।
তাই হলো। মুহুর্তে গাড়িটা দুই ভাগে ভেঙে পড়ে প্রচণ্ড এক ওলট-পালট ঘটে গেল। গুলিও বন্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে বসল। দেখল গাড়িটার দৃশ্য। বুঝতে পারল না গাড়ির লোকগুলো কতটা আহত কিংবা বেঁচে আছে কিনা।
ব্রুনা ও তার পিতা সেনফ্রিডও উঠে বসেছে গাড়ির সিটে। তাদেরও চোখে পড়ল দু’ভাগ হয়ে যাওয়া উল্টে-পাল্টে পড়ে থাকা পাজেরোর দৃশ্য। তাদের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়! তাদের মনে হচ্ছে, তারা যেন কোন স্বপ্নের দৃশ্য দেখছে! অথবা যেন ভয়াল-সংঘাতের কোন সিনেমার দৃশ্য। যার নায়ক তাদের সামনে বসে থাকা নিতান্ত এক ভদ্রলোক আহমদ মুসা। ইস্পাতের মত এক ঋজু শরীর ছাড়া সাধারণের চাইতে কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য তার নেই। কিন্তু তবু কী অসাধারণ তিনি! কী অসাধারণ তার আত্নরক্ষা ও প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কৌশল! নিরাশার বিরান ভূমিতে আশার মহীরুহ তৈরি করতে পারেন তিনি।
তাদের দৃষ্টি ঘুরে এসে নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসাও তাকিয়েছে তাদের দিকে।
আহমদ মুসা তাদের দিকে তাকিয়েই বলে উঠেছে, ‘চলুন, আমাদের নেমে পড়তে হবে। এ গাড়ি নিয়ে চলা যাবে না।’
শান্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা।’ বলল সেনফ্রিড।
‘ধন্যবাদ কি জন্য?’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে আহমদ মুসা বলল।
‘স্বপ্নের মত এক ঘটনা বাস্তবে নিয়ে আসার জন্যে।’ বলল সেনফ্রিড।
‘এজন্যে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, আপনারাও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘যখন দেখলাম আমরা বেঁচে আছি, তখন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি। কিন্তু আপনার প্রাপ্য আপনার পাওয়া দরকার।’ বলল সেনফ্রিড।
‘আবার আমি আপনার কাছে ‘আপনি’ হয়ে গেলাম?’ আহমদ মুসা বলল।
‘চেষ্টা করেছি তুমি বলতে। কিন্তু আর পারছি না। আপনি বয়সে আমার ছেলের বয়সের হলেও সম্মান ও মর্যাদায় আপনি অনেক বড়। তুমি বলা মানায় না।’
কথা শেষ করেই সেনফ্রিড বলে উঠল, ‘মি. আহমদ মুসা, ওই মাইক্রো কিন্তু পালিয়ে গেল।’
আহমদ মুসাও তাকাল পলায়নপর মাইক্রোর দিকে। দেখল, মাইক্রোটি চৌমাথা পর্যন্ত গিযে উত্তরের রাস্তা ধরে ছুটছে।
‘যাক। পালাক ওরা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন পালাতে দিলেন?’ বলল ব্রুনা। ভয় ও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার পর এই প্রথম কথা বলল ব্রুনা।
‘ওরা আক্রমণ করতে আসেনি। অস্ত্র সংবরণ করে পালিয়েছে। এ কারণেই ওদের যেতে দিলাম। আমাদের টার্গেট এখন আত্নরক্ষা। আত্নরক্ষার বাইরে কাউকে আক্রমণ করা নয়।’
আহমদ মুসা বলল।
‘পলায়নটা ওদের কৌশল। ওরা তো আক্রমণে আসবেই। কথায় আছে স্যার, শত্রুর শেষ রাখতে নেই।’ বলল ব্রুনা।
‘কিন্তু ব্রুনা, আমাদের ধর্ম ইসলাম শত্রুদেরকেও কতকগুলো অধিকার দিয়েছে সেই সপ্তম শতকে। সে অধিকারগুলোর একটি হলো, অস্ত্রত্যাগকারী, অস্ত্র সন্বরণকারী শত্রুকে আঘাত না করা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শত্রুকে অধিকার? আর কি অধিকার দিয়েছে?’ বলল ব্রুনা। বিস্ময় তার চোখে-মুখে!
‘সে অনেক কথা ব্রুনা। এতটুকু জেনে রাখো, বিচার ও সংগত কারণ ছাড়া শক্র ও তার সম্পদের ক্ষতি করাকে ইসলাম অপরাধ হিসাবে গণ্য করে। শক্র-মিত্র নির্বিশেষে সকল আহত ও অসুস্থের সমান চিকিৎসার নির্দেশ দেয় এবং যুদ্ধকালীন অবস্থাতেও শত্রুর ঋণ ও আমানতকে বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করে না।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা পকেট থেকে সেল ফোন বের করে একটা টেলিফোন করল। সংযোগ পেয়েই বলল, ‘স্যার, আমি তাহিতি থেকে আসা আহমদ…।’
‘আর বলতে হবে না। গলা ঠিক চিনেছি। সব খবর ভালো নিশ্চয় নয়?’ আহমদ মুসাকে শেষ করতে না দিয়ে ও প্রান্ত থেকে বলে উঠল।
‘ঠিক স্যার। বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। আমার গাড়ি তিন মাইক্রো ও একটা বড় পাজেরো টাইপ জীপ ঘেরাও করেছিল। এ নিয়ে ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন সাংঘাতিক আহত। আপনি…।’
‘হ্যাঁ, আমি ওদের চিকিৎসা ও কাস্টডিত নেয়ার ব্যবস্থা করছি। আপনি সুস্থ তো? আপনার সাথে কি ব্রুনার আছে?’ এবারও আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল ওপার থেকে।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি সুস্থ। ব্রুনা ও তার পিতা আমার সাথে আছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম। ওদের অবশিষ্টরা কি পালিয়েছে?’ ওপার থেকে বলল।
‘একটা মাইক্রো নিয়ে অবশিষ্টরা পালিয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি ভাগ্যবান মি. আহমদ। শত্রুর নাগাল আপনি পেয়ে গেছেন। আমি নিশ্চিত। আপনি সফল হবেন।’ ওপার থেকে বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গড ব্লেস ইউ। ওকে, বাই।’ বলে ওপার থেকে কল ক্লোজ করে দেয়া হলো।
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করতেই ব্রুনার পিতা সেনফ্রিড বলল, ‘কার সাথে কথা বললেন, মি. আহমদ মুসা?’
‘জার্মানির পুলিশ প্রধান বরডেন ব্লিস-এর সাথে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি তাঁকে চেনেন?’ জিজ্ঞাসা সেনফ্রিডের।
‘চিনি না, জানি। তিনিও আমাকে জানেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিভাবে? সবে তো আপনি জার্মানিতে প্রবেশ করলেন?’ বলল সেনফ্রিড। তার চোখে-মুখে বিস্ময়!
‘তাহিতির গভর্নর ফ্রান্সিস বুরবনের সাথে পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত তিনি। ফ্রান্সিস বুরবনই আমার ব্যাপারে তাঁকে ব্রিফ করেছেন। আর আপনাদের ‘রাইন ল্যান্ড’ স্টেটের গোয়েন্দাপ্রধান ‘এডমন্ড এড্রিস’ আমাকে জানেন। আমি এখানে আসার আগে তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান মি. দ্যাগল আমার ব্যাপারে তাকে সব বলেছেন। আমি অস্ট্রিয়ায় এসে তাঁর সাথে কথা বলেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা, আপনি জার্মানি আসার আগে অনেক কাজ সেরে এসেছেন। কিন্তু এই ঘটনার কথা আমরা পুলিশকে না জানালেও তো পারতাম।’ বলল সেনফ্রিড।
‘দেশের আইন-শৃঙ্খলার সাথে সংশ্লিষ্ট এটা একটা বড় ঘটনা। পুলিশ তার তদন্তে আমাদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাবেই। সুতরাং আমরা আগে না জানালে আমাদের কাজ অপরাধমূলক বিবেচিত হবে। নিজেদের তখন নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। আগেই বিষয়টা পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ফলে এই ঝামেলায় আমাদের পড়তে হবে না। আর আমি এখানে যে কাজ নিয়ে এসেছি সে সম্পর্কে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত রাখতে চাই। পুলিশপ্রধান বরডেন ব্লিস আমাকে বলেছেন, ‘পুলিশের কাজটাই আমি করছি। সুতরাং আমার কাজের গোপনীয়তা কিছু নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গড ব্লেস ইউ মি. আহমদ মুসা। আপনি আপনার কাজকে মানে আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছেন। আমাদের পরিবার রাহুমুক্ত হবার আশা আরও প্রবল হলো। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন!’ বলল সেনফ্রিড, ব্রুনার পিতা।
‘পুলিশ আসার আগেই আমরা এখান থেকে চলে যেতে চাই। আসুন আমরা উল্টে যাওয়া মাইক্রোটাকে সোজা করে চালু করতে পারি কিনা দেখি।’
বলে আহমদ মুসা গিয়ে মাইক্রোটাকে ধরল।
সেনফ্রিড ও ব্রুনাও দ্রুত গিয়ে মাইক্রো ধরল।
মাইক্রোটি সোজা করে আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে বসে পরীক্ষা করল সব ঠিক আছে।
স্টার্ট নিল মাইক্রোটি।
সেনফ্রিড ও ব্রুনা মাইক্রোতে উঠল।
চলতে শুরু করল মাইক্রোটি পশ্চিমের স্টুটগার্ট শহরের দিকে।

স্টুটগার্ট থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসার সেই মাইক্রো সোজা উত্তরে নেকার নদীর তীর বরাবর হাইওয়ে ধরে হেলব্রোন শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্টুটগার্ট থেকে বেরুবার আগেই আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমরা কি হেলব্রোন, না কারিসু’র পথে যাব।’
উত্তর দিয়েছিল ব্রুনা। বলেছিল, ‘আমরা যদি কারিসু দিয়ে যাই, তাহলে কিছু পাহাড়ী এলাকা পেরিয়ে কারিসু পার হলেই আমরা রাইনের তীরে গিয়ে পৌঁছব। তারপর রাইন তীরের হাইওয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে এগোলে আমরা ব্রুমসারবার্গে পৌঁছে যাব। আর যদি হেলব্রোন হয়ে যান স্যার, তাহলে খরস্রোতা, উচ্ছলা নেকার নদীর ছোঁয়া পাবেন, সেই সাথে পাবেন পর্বতভূমির পাদদেশের সবুজ, মনোহর ঘন বনাঞ্চল, তার ফাঁকে ফাঁকে দেখবেন জার্মানির শান্ত সুন্দর আদি গ্রামগুলো। আরো দেখবেন প্রাচীন জার্মানির একটা বিরান এলাকা। সেখানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষও দেখতে পাবেন। অতীতের স্মৃতিবাহী কিছু পরিবার সেখানে এখনো আছে, যারা জার্মানির সৌন্দর্য ও গৌরব। এখন স্যার, আপনিই পথ বেছে নিন।’
‘ব্রুনা, তোমার পথের বর্ণনাই বলে দিয়েছে কোন্ পথ আমি বেছে নেব। আমি হেলব্রোনের পথেই যাচ্ছি।’ আহমদ মুসা বলেছিল।
গাড়ি কখনো সবুজ ঘন বনাঞ্চল, কখনো ছবির মত সুন্দর গ্রামের স্নিগ্ধ পরশ নিয়ে এগিয়ে চলছিল সামনে। ব্রুনার বর্ণনার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দর এসব দৃশ্য।
প্রাচীন জার্মানির বিরান এলাকায় প্রবেশ করেছে আহমদ মুসার মাইক্রো। হাইওয়েটা ফিরে এসেছে নিকার নদীর তীর বরাবর।
অনেকক্ষণ ধরে আহমদ মুসার কান উৎকর্ণ হয়ে উঠেছিল। দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে। শব্দ আরও স্পষ্ট হলে বুঝতে পারল, শব্দটি হেলিকপ্টারের। কিছুক্ষণ ধরে শব্দের ডাইরেকশন অনুসরণ করে নিশ্চিত বুঝল, হেলিকপ্টারটি তাদের দিকেই আসছে।
আরও কিছু সময় পার হয়ে গেল।
গাড়ি তখন চলছিল এক ফালি ফাঁকা এলাকার উপর দিয়ে।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে দেখল, হেলিকপ্টার অনেকখানি নিচে নেমে এসেছে।
হেলিকপ্টারটি তাদের গাড়ির নাক বরাবর এগিয়ে আসছে। হেলিকপ্টারটি যেন তাদেরকেই টার্গেট করেছে।
হেলিকপ্টারের পরিচয় সম্পর্কে জানার জন্যে গভীরভাবে চাইতে গিয়ে নিচের দিকে উদ্যত মেশিনগানের নল দেখতে পেল। দূরবীনের চোখও নজরে পড়ল আহমদ মুসার।
চমকে উঠল আহমদ মুসা! তাহলে এটা একটা শত্রুপক্ষের হেলিকপ্টার? কিন্তু ওরা আহমদ মুসাদের সন্ধান পেল কি করে? উত্তরও সংগে সংগে পেয়ে গেল। আহমদ মুসারা তো ওদের মাইক্রো ব্যবহার করছে! এই মাইক্রোতে নিশ্চয় মাইক্রোর অবস্থান ও মাইক্রোর কথাবার্তা রিলে করার গোয়েন্দা ট্রান্সমিটার রয়েছে।
বিষয়টা আহমদ মুসার কাছে পরিস্কার হওয়ার সাথে সাথে সে গাড়ির স্পীড আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দিল। তার লক্ষ সামনের এক ফালি খালি জায়গা পার হয়েই ঘন গাছপালার মধ্যে প্রবেশ করা। সামনেই রাস্তার দু’পাশে ঘন গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে রাস্তা। সে রাস্তায় পৌঁছানোই আহমদ মুসার টার্গেট।
হেলিকপ্টারটিও সম্ভবত এটা বুঝতে পেরেছে। হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে দেখতে পাওয়া মেশিনগানের ব্যারেল নড়ে উঠল। নেমে এল এক পশলা গুলি।
আহমদ মুসার মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষ করেছিল ব্রুনা। গাড়ির স্পীড হঠাৎ সপ্তমে উঠায় উদ্বিগ্ন ব্রুনা প্রশ্ন করল, ‘কিছু কি ঘটেছে স্যার?’
‘হ্যাঁ, মাথার উপরে একটা হেলিকপ্টার আমাদের ফলো করছে। মনে হচ্ছে এটা ওদের নতুন আক্রমণ।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই উপর থেকে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হলো। কয়েকটি গুলি মাইক্রোর পেছনে আঘাত করল।
দু’পাশের গাছ মোটামুটি আড়াল সৃষ্টির জন্য ওদের টার্গেট ষোল আনা লক্ষ ভেদ হয়নি।
আহমদ মুসা ব্রুনাদেরকে গাড়ির সিটের নিচে শুয়ে পড়তে বলে গাড়ির জিগজ্যাগ গতি আরও বাড়িয়ে দিল।
‘মি. আহমদ মুসা, আমরা তো হেলিক্টারের সাথে পারবো না। ওরা সহজেই আমাদের টার্গেট করতে পারবে। উপর থেকে ওরা বোমাও ছুঁড়তে পারে।’ বলল সেনফ্রিড। উদ্বেগে তার কন্ঠ কাঁপছে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বিপদের সময় বেশি ভাবতে নেই। সব সময় বিপদের সাথে পরিত্রাণের একটা রাস্তা আল্লাহ রাখেন।’
গাড়ির তীব্র গতির সাথে আহমদ মুসা নদীর একটা খাড়া ও উন্মুক্ত ধরনের স্থান খুঁজছিল। এই সাথে আহমদ মুসা উপরের হেলিকপ্টারের গতি পথও মনিটর করছিল। প্রথমবার গুলি বর্ষণের পর তারা আর গুলিও করেনি। তারা নিশ্চয় একটা উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষা করছে যেখানে তারা সহজেই মাইক্রোটাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। তাছাড়া তাদের ভয়ও আছে গুলাগুলির ব্যাপারটা পুলিশের কানে গেলে তাদের বিপদ হবে। যা করার দ্রুত করে তাদের সরে পড়তে হবে।
যে ধরনের জায়গা খুঁজছিল আহমদ মুসা তা পেয়ে গেল। জায়গাটায় ছোট ছোট আগাছা ছাড়া বড় ধরনের গাছ নেই। নদী পাড়ের রেলিং সেখানে নেই। সম্ভবত ভেংগে যাওয়ার কারণে পুনঃনির্মাণের জন্যে খুলে ফেলা হয়েছে।
আহমদ মুসা জায়গাটা পার হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ব্রেক করে গাড়ি থামাল আহমদ মুসা। দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘ব্রুনা, মি. সেনফ্রিড, আপনারা তাড়াতাড়ি নেমে পেছনের ঝোপটায় লুকিয়ে পড়ুন। প্লিজ তাড়াতাড়ি করুন।’
ব্রুনা ও সেনফ্রিড গড়িয়েই গাড়ির দরজা পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছুটল ঝোপের দিকে। ব্রুনা একবার জিজ্ঞাসা করতে চাইল, স্যার আপনি আসবেন না। কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেল না!…
ব্রুনারা নেমে পড়তেই আহমদ মুসা গাড়ি ব্যাক ড্রাইভ করে সেই জায়গায় ফিরে এল। গাড়িটা নদীর পাড়ের প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল আহমদ মুসা। তারপর পেছন থেকে টেনে গাড়িটা নদীতে ফেলে দিয়ে একটু অপেক্ষা করে দেখল গাড়িটা পুরোপুরি নদীতে পড়ল কিনা।
নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা ছুটে এল সেই ঝোপে।
সেখানে পৌঁছেই আহমদ মুসা বলল, ‘মি. সেনফ্রিড, আমাদের আরও পেছনে সরে যেতে হবে। চলুন, পেছনের ঐ টিলায়। টিলায় যথেষ্ট ঝোপ-জংগল আছে আর ওটা বেশ উঁচুও। ওদের গতিবিধি ভালোভাবে দেখা যাবে।’
ছুটল ওরা কিছু দূরের টিলাটার দিকে।
ওদিকে হেলিকপ্টারটি অনেকখানি সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা খেয়াল করে দেখল নিচে রাস্তার উপর সেই গাড়িটা নেই। দ্রুত তারা ফিরে আসে। কিন্তু গাড়িটার দেখা তারা পায় না।
তাড়াতাড়ি হেলিকপ্টারটা হাইওয়ের সেখানকার ছোট সরু বাইলেনটাও চেক করে আসে। কিন্তু গাড়ির দেখা তারা পায় না।
পাগলের মত হেলিকপ্টার চারদিকে ঘুরতে থাকে। এক সময় হেলিকপ্টারটা নদীর উপর স্থির হয়ে দাঁড়ায়। তারপর হেলিকপ্টারটা ধীরে ধীরে ল্যান্ড করল নদীর পাড়ে।
‘ওরা এখন মনে করছে গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট করে আমরা নদীতে পড়ে গেছি। ওরা এখন নিশ্চিত হবার জন্যে নদীতে নেমে গাড়ি পরীক্ষা করবে এবং লাশগুলোকে হাত করতে চাইবে। আমাদের সরে পড়ার এটাই উপযুক্ত সময়।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ ব্রুনা বলল, ‘আপনি তাহলে এই উদ্দেশ্যেই মাইক্রোটিকে নদীতে ফেলে দিয়েছেন! ধন্যবাদ স্যার!’
আহমদ মুসা ব্রুনার কথার দিকে কর্ণপাত না করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আসুন, আমরা যাত্রা শুরু করি।’
টিলা থেকে তারা নেমে এল।
‘জংগলের মধ্যে দিয়েই আমরা প্রথমে পূর্ব দিকে যাব, তারপর আমরা নেকার নদীর সমান্তরালে উত্তর দিকে চলব।’
বলে চলতে শুরু করল আহমদ মুসা।
‘পাশে একটু দূরেই তো রাস্তা আছে। আমরা সে রাস্তায় উঠতে পারি। সেখানে গাড়িও মিলবে।’ বলল ব্রুনা।
‘সেটাই সুবিধাজনক। কিন্তু রাস্তায় ওঠা ঠিক হবে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা জানতে পারবে গাড়িতে আমরা নেই। তারপরেই ওরা হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করবে। চারপাশের পথ তারা চষে ফিরবে। রাস্তায় উঠলে ওদের হেলিকপ্টারের চোখ এড়ানো কঠিন হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার, ঠিক বলেছেন। কিন্তু স্যার, এরকম বিপদে আমাদের মাথা সব সময় গুলিয়ে যায়। কিন্তু আপনার মাথা কি করে ঠাণ্ডা থাকে?’ বলল ব্রুনা।
‘সবারই মাথা ঠাণ্ডা থাকতে পারে, যদি সবাই সব ব্যাপারে আল্লাহর উপর নির্ভর করতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি বুঝলাম না স্যার।’ বলল ব্রুনা।
‘মাথা গুলিয়ে যাবার যে কথা বললে সেটা ভয়ের কারণে হয়। মৃত্যু ভয় সবচেয়ে বড় ভয়। এই ভয় যদি জয় করা যায়, তাহলে কোন ভয়ই আর থাকে না। মৃত্যুভয় দূর হয় আল্লাহর উপর নির্ভরতা থেকে। এ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ যদি না চান দুনিয়ার কেউ মারতে পারবে না, আর আল্লাহ যদি চান, তাহলে দুনিয়ার সবাই মিলে চেষ্টা করেও কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। এই বিশ্বাস আল্লাহর উপর নির্ভরতা থেকেই আসে।’ আহমদ মুসা বলল।
চলতে শুরু করেছে তারা।
দ্রুত হাঁটছে তারা জংগল ঠেলে যতটা সম্ভব সামনে। মিনিট দশেক পার হয়ে গেল। তারা তখনও জংগলের পথেই চলছে।
হেলিকপ্টারের শব্দে তারা সকলেই পেছন দিকে ফিরে তাকাল। দেখল, পেছনের আকাশে সেই হেলিকপ্টারটি উড়ছে।
‘নদীতে পড়ে যাওয়া গাড়ি পরীক্ষা করে ওরা নিশ্চিত হয়েছে যে, ওদের বোকা বানানো হয়েছে। এখন ওরা পাগলের মত খুঁজছে আমাদের।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চরম এই সংকটকালে ওদের বোকা বানাবার বুদ্ধি আপনার মাথায় এল কি করে স্যার! এটা আমার কাছে এখনও বিস্ময়!’ বলল ব্রুনা।
‘সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্পর্কে আরও জান ব্রুনা। মানুষ যখন উপায়হীন হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ স্বয়ং উপায় বের করে দেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, আগে এই বিপদ থেকে বাঁচি তারপর আমি সব জানার চেষ্টা করব।’ বলল ব্রুনা।
‘ধন্যবাদ ব্রুনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না, আমরা যে ঐ মাইক্রোতে আছি, হেলিকপ্টার থেকে ওরা তা বুঝল কি করে?’
‘ও মাইক্রোটা তো ওদের। ওরা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই ব্রুনা বলে উঠল, ‘ঠিক স্যার। এ ধরনের মাইক্রো তো দেশে শত শত আছে। আর অত উপর থেকে গাছপালার মধ্য দিয়ে গাড়ির নাম্বার দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়।’
‘খুব সহজ ব্যবস্থা ওদের ছিল, যা তাড়াহুড়ার মধ্যে আগে আমার মনে পড়েনি। ওদের প্রতিটি গাড়িতে ট্রান্সমিটার সেট করা থাকে। এর মাধ্যমে ওরা গাড়ির ভিতরের কথোপকথন, গাড়ির অবস্থান মনিটর করে। আমাদের গাড়িতেও ট্রান্সমিটার সেট করা ছিল আর সেটাই তাদের খবর দিয়ে ডেকে এনেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
ব্রুনা ও সেনফ্রিড দু’জনেরই চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল! ভয়ে তাদের বুক কেঁপে গেল। শক্ররা এতটা সাবধান, এতটা ক্ষিপ্র! পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাদের হৃদয়টা নুয়ে গেল আহমদ মুসার জন্যে। অজানা, অনাত্নীয় এই বিস্ময়কর মানুষটি জীবন বাজী রেখে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বুদ্ধি ও শক্তি সব যুদ্ধেই সে অগ্রগামী।
আহমদ মুসা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ব্রুনারাও তার পেছনে পেছনে ছুটল।
‘এই এলাকাটা আমাদের তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। ওরা পাগল হয়ে গেছে। ওরা এলাকাটা চষে ফেলবে। সবাই দ্রুত পা চালান।’ আহমদ মুসা বলল।

ক্র্যডল থেকে টেলিফোন তুলতে তুলতে ভাবল, এ বার নিয়ে পাঁচ বার টেলিফোন তার বসের কাছ থেকে এসেছে। আজ পঁচিশ বছর সে তার বসের ব্যক্তিগত স্টাফ হিসাবে কাজ করছে। কিন্তু শান্ত, ঠাণ্ডা মানুষটিকে এতটা উদ্বিগ্ন সে কখনো দেখেনি। সে অর্থ-সম্পদ, মর্যাদা-প্রতিপত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে সব বাঁধাই নিষ্ঠুরভাবে দমন করেন। শত্রুর জীবনের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই তার কাছে। কিন্তু তার এই রূপটা কিন্তু বাইরে থেকে একটুও বুঝার উপায় নেই। যা করে সব ঠাণ্ডা মাথায় করে, হাসতে হাসতে করে। যেখানে তার উত্তেজিত হবার কথা, সেখানে সে বরফের মত ঠাণ্ডা থাকে। কিন্তু সেই লোকটাই আজ তার বিরক্তি, উদ্বেগ ও উত্তেজনা কিছুতেই আড়াল করতে পারছে না।
হিংগিস্ট টেলিফোনের স্পীকার মুখের কাছে নিয়ে এসে বলল, ‘ইয়েস স্যার। আমি হিংগিস্ট স্যার। আদেশ করুন স্যার।’
‘হিংগিস্ট, ডরিন ডুগান নতুন কি জানিয়েছে?’ বলল টেলিফোনের ওপারে হিংগিস্টের বস, ‘ব্ল্যাক লাইট’ সংগঠনের প্রধান।
‘নতুন কোন তথ্য দিতে পারেনি স্যার। হাইওয়েসহ এলাকার সব রাস্তায় তারা ওদের খুঁজেছে এবং খুঁজছে।’ বলল হিংগিস্ট।
‘ও গড, তিনজন লোক হাওয়া হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারছি না ডরিন ডুগানের মত লোক ওদের মত চুনোপুঁটির কাছে বুদ্ধির যুদ্ধে হেরে গেল!’ বলল হিংগিস্টের বস ওপার থেকে।
হিংগিস্ট কিছু বলার আগেই ওপার থেকে টেলিফোন সংযোগ কেটে গেল। তার বস ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিয়েছে।
বিব্রত, বিপর্যস্ত হিংগিস্ট তার টেলিফোনের রিসিভার রাখল।
হিংগিস্টের মনে নানা চিন্তা-দুশ্চিন্তার ঘুরপাক। বসের শেষ কথাটা তার ভালো লাগেনি। তার বসের মধ্যে এমন হতাশা দেখতে সে অভ্যস্ত নয়।
সে তার বসের সাথে আছে প্রায় পঁচিশ বছর। এই পঁচিশ বছরে কখনো কোন অবস্থায়ই তার বসকে সে হারতে দেখেনি, হতাশ হতে দেখেনি। সে যা চেয়েছে, তাই হয়েছে সব সময়।
পঁচিশ বছর আগে এক অভিজাত ক্যাসিনোর এক জুয়ার আসরে তার বসকে সে প্রথম দেখে। তখন হিংগিস্ট চাকরি খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে একদম হতাশ হয়ে একটা রিভলবার যোগাড় করে ছিনতাইয়ের কাজ শুরু করেছে। তার লক্ষ ছিল, সে এভাবে বড়লোকদের পকেট কেটে টাকা যোগাড় করে একটা বড় ব্যবসায় ফেঁদে নিজেই এমপ্লয়ার হয়ে বসবে।
এক ধনাঢ্য মার্চেন্টকে টার্গেট করে সেদিন সে ঐ ক্যাসিনোতে বসে ছিল। তার বস লোকটিও তার সামনের টেবিলে একাই সাথে বসে কফি খাচ্ছিল। লোকটিকে দেখে আপনাতেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। কারণ লোকটি দীর্ঘকায়, জার্মানদের এভারেজ হাইটের চেয়ে লম্বা এবং অ্যাক্রব্যাটদের মত সুগঠিত ও সর্পিল শরীর। আর চোখ ছুরির ফলার মত ধারালো।
ক্যাসিনোর সে রুমটাও ছিল জুয়াড়িদের। বড় ঘরটির এক পাশে চলছিল জুয়া খেলা একটা বড় টেবিলে। ক্যাসিনোর অনেক জুয়ার টেবিলের মধ্যে এই টেবিলকে বলা হয় কিং টেবিল। টাকার কিংরাই এ টেবিলের জুয়ার আড্ডায় বসে।
হঠাৎ গণ্ডগোল বেঁধে যায় জুয়ার টেবিলে।
একজন জুয়াড়ি অবিশ্বাস্য একটা বড় দান জিতে যায়। বিপরীত দিকের শক্তিশালী পক্ষ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আমার সামনের টেবিল থেকে লোকটি স্প্রিং-এর মত একটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছুটে গেল আক্রান্ত লোকটির কাছে। চিৎকার করে বলল, ‘এ আমার লোক, সকলে সরে দাঁড়াও।’
আমার বস লোকটির হাতে তখন দুই হাতে দুই রিভলবার।
তার কথা শেষ হবার আগেই পেছন থেকে দু’জন তার দু’হাতে আঘাত করল। রিভলবার পড়ে গেল তার দু’হাত থেকে।
আমিও উঠে দাঁড়িয়েছিলাম।
কি হয়ে গেল যেন আমার মধ্যে! আমি দ্রুত আমার পকেট থেকে রিভলবার বের করে ‘এদিকে বস’ বলে চিৎকার করে উঠে রিভলবার ছুঁড়ে দিলাম লোকটির দিকে।
আমার চিৎকারে সবাই তাকিয়েছিল এদিকে। বস লোকটিও।
আমার ছুঁড়ে দেয়া রিভলবার সে লুফে নিয়ে এক অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে রিভলবার খালি করে ফেলল। চোখের পলকে তার চারপাশে ছয়টা লাশ পড়ে গেল। এবার সে তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া দু’টি রিভলবার তুলে নিল অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে। তবে রিভলবার ব্যবহারের আর দরকার হলো না। প্রতিপক্ষ ৬টি লাশ ফেলে দ্রুত পালিয়েছে।
আমি আবার টেবিলে বসে পড়েছিলাম।
সব লোকটি তার সাথীকে নিয়ে আমার কাছে এল। আমাকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদসহ আমার রিভলবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘চলুন, বাইরে গিয়ে কথা বলি। এখানে থেকে পুলিশের ঝামেলায় পড়ে লাভ নেই।’
আমি তাদের গাড়িতে চড়ে আরেকটা ক্যাসিনোতে এসে বসলাম।
সব লোকটি আবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল, ‘এই সাহায্য আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আপনি কি আমাকে চেনেন?’
‘না।’ আমি বললাম।
কিন্তু সাহায্য করলেন যে?’ বলল সে।
‘কিছু ভেবে আমি এটা করিনি। হঠাৎ করে মনে হয়েছিল, আমার রিভলবারটা আপনাকে দেয়া উচিত। ব্যস, আমি দিয়ে দিলাম।’ আমি বললাম।
‘ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ। আপনি কি করেন?’ বলল বস লোকটি।
‘আগে চাকরি খুঁজতাম। এখন ছিনতাই করি। ঠিক করেছি, এভাবে টাকা জমিয়ে বড় কিছু একটা করে আমি মানুষকে চাকরি দেব।’ বললাম আমি।
‘ভালো চিন্তা। কিন্তু এটা অনিশ্চিতের পথ। আপনি আমাদের সাথে কাজ করবেন?’ বলল সে।
‘জুয়া খেলার কাজ?’ বললাম আমি।
বস লোকটি হাসল। বলল, ‘জুয়া খেলা আমাদের কাজ নয়। কাজের জন্যে টাকা যোগাড়ের একটা উপায় মাত্র।’ বলল সে।
‘তাহলে কাজটা কি?’ বললাম আমি।
‘অনেক বড় কাজ। কি কাজ সেটা অবশ্যই জানবেন, তবে এ পর্যায়ে নয়। এটুকু শুনে রাখুন, শুধু ধনাগার দখল নয়, এই ধনাগার আসে যা থেকে তাও আমরা দখল করতে চাই।’
বসকে আগেই পছন্দ হয়েছিল। তার এই কথাও পছন্দ হলো। শুধু বললাম, ‘ব্যাপারটা রাজ্য দখলের মত?’
‘রাজ্য দখল নয়, মানুষ দখল বলতে পারেন। রাজ্য তো হয় মানুষের। মানুষ দখল হয়ে গেলে রাজ্য তখন আপনাতেই দখল হয়ে যায়। রাজ্য তখন আর দখল করতে হয় না।’ বলল সে।
আমি সেই থেকে তাদের সাথে শামিল হয়েছি।
বস আমাকে তার পাশে রেখেছেন। পিএ, পিএস, সিকিউরিটি সবই আমি।
পরে অনেক কিছুই জেনেছি। সংগঠনের নাম ‘ব্ল্যাক লাইট’। নানা রংয়ের রে লাইটে’র মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে অন্ধকারে ব্ল্যাক লাইটই বেশি পাওয়ারফুল হয়। ব্ল্যাক লাইট সংগঠনও তাই। এদের শক্তি অস্ত্র নয়, বিজ্ঞানের অপব্যবহার। এই প্রকল্পের কালো থাবায় রয়েছে আপাতত উত্তর জার্মানির অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যগুলো।
আমার খুব ভালো লাগে এদের এই প্রকল্প। এর সাফল্য সম্পর্কেও আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু নতুন শত্রুর অভ্যুদয়, সালজবার্গের ব্যর্থতা, স্টুটগার্টের পার্বত্য উপত্যকায় আমাদের বিস্ময়কর পরাজয়, নিকার নদী এলাকায় ফাঁদ কেটে শত্রু বেরিয়ে যাওয়া এবং সর্বশেষ বসের হতাশাপূর্ণ উক্তি আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে।
হিংগিস্টের সামনে কফিটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ভালো লাগছে না তার কফি খেতেও।
চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে চিন্তা থেকে মুক্ত হতে চাইল সে।
হলো না নিরিবিলি থাকা। গেটের ইন্টারকম বেজে উঠল।
গেটের সিকিউরিটি অফিসারের কন্ঠ। বলল, ‘স্যার, মি. গেরারড গারভিন এসেছেন।’
‘হ্যাঁ, ওনার আসার কথা। উপরে নিয়ে এস।’ বলল হিংগিস্ট।
গেরারড গারভিন একজন ‘সিচুয়েশন অ্যানালিস্ট’। তিনি ‘ব্ল্যাক লাইট’ সংগঠনের প্রধান তার বসের এক উপদেষ্টা। যে কোন ঘোরালো পরিস্থিতিতে তার বস তাকে ডাকেন।
হিংগিস্ট কথা শেষ করেই বিশেষ ইন্টারকমে বলল তার বসকে, ‘স্যার, গেরারড গারভিন এসেছেন।’
‘তাকে নিয়ে এস।’ বলল ইন্টারকমের ওপার থেকে তার বস।
গেরারড এলে হিংগিস্ট বলল, ‘চলুন স্যার। স্যার আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
হিংগিস্ট আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল।
চলল তার অফিস কক্ষের বিপরীত দিকের দেয়ালের সাথে আটকে রাখা বড় স্টিলের আলমারির দিকে।
চাবি দিয়ে তালা খুলল আলমারির।
আলমারির দেয়ালে ছোট বড় অনেক শেলফ। সেলফে অফিসের ফাইল ও জিনিসপত্র। সেলফগুলো আলমারির মাঝ বরাবর এসেছে। আলমারিতে ঢুকল হিংগিস্ট ও গেরারড গারভিন। তারা প্রবেশ করল একদম আলমারির ভিতরে। সংগে সংগেই আলমারির দরজা আপনাতেই বন্ধ হয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই আলমারিতে আলো জ্বলে উঠল।
হিংগিস্ট আলমারির দেয়ালের গায়ে অদৃশ্য একটা টাস লকে সম্ভবত একটা কোড টাইপ করল। সাথে সাথেই আলমারির সেলফের আর্ধেকটা সরে এল। আর তখনই পেছনের একটা দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেল।
হিংগিস্ট গেরারড গারভিনকে নিয়ে দ্রুত সামনের দিকে এগোতে লাগলো।
পেছনে আলমারির সেলফের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
অল্পক্ষণ হাঁটার পরেই তারা একটা এসকালেটর সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। একসালেটরটা এসে দাঁড়াবার সাথে সাথেই সব আলো নিভে গেল এবং এসকালেটর চলতে শুরু করল।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে এসকালেটর কোনদিকে যাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে বুঝার কোন উপায় নেই।
এসকালেটরটি অনেকবার উপর-নিচ করে এক সময় স্থির দাঁড়িয়ে গেল।
এসকালেটরের যেখানে তারা দাঁড়িয়েছিল, তার সামনের একটা দরজা খুলে গেল।
‘আসুন স্যার!’ বলে হিংগিস্ট খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল।
হিংগিস্ট ও গেরারড গারভিন ভিতরে প্রবেশ করার পর পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এই দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বিপরীত দিকের দেয়ালে আরেকটা দরজা খুলে গেল। সেই সাথে একটা ভারি কন্ঠ ভেসে এল, ‘মি. গেরারড গারভিন, ওয়েল কাম। আসুন। হিংগিস্ট, তুমিও এস।’
খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল তারা।
ঘরের ভিতরে একটা বড় টেবিল। টেবিলের ওপাশে একটা রাজকীয় চেয়ার। টেবিলের এপাশে আরো দু’টি চেয়ার।
টেবিলের ওপাশে রাজকীয় চেয়ারে বসে আছে আপাদ-মস্তক কালো পোষাকে আবৃত একটা কালো মূর্তি। শুধু নাকের নিচ থেকে ঠোঁটের নিচ পর্যন্ত উন্মুক্ত। চেয়ারের উপর বসা লোকটির তীরের মত ঋজু শরীর।
তার নাকের নিচে ঠোঁটের উপর হিটলারী গোঁফ তার অবয়বে একটা হিংস্র রূপের সৃষ্টি করেছে। ঠোঁটে ভেসে ওঠা হাসি তা ঢাকতে পারেনি।
এই কালো মূর্তিই ‘ব্ল্যাক লাইট’ সংগঠনের প্রধান। ব্ল্যাক লাইটের লোকদের কাছে সে ব্ল্যাক বার্ড নামে পরিচিত। আসল নাম তার কি কেউ জানে না। বাড়ি তার কোথায় তাও কারো জানা নেই। তবে তার জার্মান উচ্চারণে পোলদের অ্যাকসেন্ট আছে।
চেয়ারে বসতেই ব্ল্যাক বার্ড গেরারড গারভিন ও হিংগিস্টকে বসতে বলল। বসল হিংগিস্টরা।
‘গারভিন, তোমাকে ডেকেছি একটা সমস্যায় পড়ে।’ বলল ব্ল্যাক বার্ড।
‘আমি কি করতে পারি স্যার? আদেশ করুন।’ বলল গেরারড গারভিন।
‘এক অজ্ঞাত এশিয়ান এসে দাঁড়িয়েছে সেনফিড ব্রুনাদের পাশে। গত দুই দিনে অন্তত চারবার তার কাছে আমাদের মারাত্নক পরাজয় ঘটেছে।’
বলে ব্ল্যাক বার্ড চারটি ঘটনাই তার কাছে বিস্তারিত তুলে ধরল।
গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল গেরারড গারভিন।
ব্ল্যাক বার্ড কথা শেষ করলেও গেরারড সংগে সংগে কথা বলল না। ভাবছিল সে।
এক সময় মাথা তুলল গেরারড গারভিন। বলল, ‘লোকটি অসাধারণ প্রফেশনাল। যে অস্ত্র ও কৌশল সে ব্যবহার করেছে তা বিশ্বমানের। আর তার সাহসের মাত্রা খুবই দুর্লভ ধরনের। যা শুনছিলাম তাতে আমি নিশ্চিত, তাকে সেনফ্রিড পরিবারের জন্যে এ্যাসাইনড করা হয়েছে। ঐ পরিবারের কোন বন্ধু সে নয়। বন্ধু হলে সে অনেক আগেই দৃশ্যপটে আসত। ব্রুনার কোন প্রেমিকও সে নয়। ঘটনার বিবরণ শুনে মনে হলো ঐ দিন সকালে ব্রুনার সাথে তার প্রথম সাক্ষাত।’
হঠাৎ থেমে গেল গেরারড গারভিন। তার চোখে-মুখে নতুন ভাবান্তর। বলল, ‘অ্যালিনা মানে ব্রুনার বড় বোন আনালিসা অ্যালিনা কোথায়? লোকটা তার কেউ নয় তো, মানে প্রেমিক বা এ ধরনের কেউ?’
সংগে সংগে উত্তর দিল না ব্ল্যাক বার্ড। সেও সম্ভবত ভাবছিল। বলল একটু সময় নিয়ে, ‘হ্যাঁ, অনেক দিন খোঁজ নেই অ্যালিনার। আমরা যতটা জেনেছি তাতে দেখা যাচ্ছে, অ্যালিনা আন্তর্জাতিক ধরনের একটা সংগঠনের চাকুরে। গোটা দুনিয়া তার ঘুরে বেড়াতে হয়। আমরা তাঁকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি।’
‘তাহলে সে তো এশিয়াসহ পৃথিবীর যে কোন দেশেই থাকতে পারে। অ্যালিনার পক্ষে এই এশিয়ানকে তার পরিবারের সাহায্যের জন্যে নিয়োগ করা স্বাভাবিক।’
‘এটাও হতে পারে। তবে লোকটির ব্যাপারে অস্ট্রিয়ার ইমিগ্রেশান, বিমান বন্দর, হোটেলে খোঁজ নিয়ে আমরা জেনেছি, সে মার্কিন নাগরিক। মার্কিন পাসপোর্ট নিয়ে সে এসেছে। ভিভি আইপি ইউরো ভিসা তার। ভিসা সে নিয়েছে তাহিতি থেকে। সুতরাং সে নিয়োগ দিলে বা অনুরোধ করে তাকে কাজে লাগালে লোকটির সাথে নিশ্চয় আনালিসা অ্যালিনাও আসতো। না আসাটা প্রমাণ করে লোকটির সাথে অ্যালিনার কোন সম্পর্ক নেই। সুতরাং সব দিকের বিচারে লোকটিকে অ্যালিনা নিয়োগ দেবে, এটা স্বাভাবিক মনে হয় না।’ বলল ব্ল্যাক বার্ড।
‘আপনার কথা ঠিক স্যার। তার নামটা কি স্যার?’ গেরারড গারভিন বলল।
‘আহমদ আবদুল্লাহ মুসা।’ বলল ব্ল্যাক বার্ড।
আহমদ মুসার পিতা-মাতার দেয়া নাম আহমদ আবদুল্লাহ মুসা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আহমদ মুসা নামে সে পরিচিত হয়ে আসছে। তার বিভিন্ন পাসপোর্ট ও আন্তর্জাতিক সব রেকর্ডেও সে আহমদ মুসা। কিন্তু মার্কিন সরকারের দেয়া নাগরিকত্ব ও পাসপোর্টে তাঁর পূর্ণ নাম আহমদ আবদুল্লাহ নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
‘আহমদ আবদুল্লাহ মুসা? আহমদ মুসা নয় তো?’ জিজ্ঞাসা গেরারড গারভিনের।
ব্ল্যাক বার্ড তাকাল গেরারড গারভিনের দিকে। বলল, ‘কোন আহমদ মুসার কথা বছছ? মতুতুংগা দ্বীপের বন্দীখানা থেকে এই সেদিন প্রায় যে আহমদ মুসা ৭০ জন বিজ্ঞানীকে উদ্ধার করার ঐতিহাসিক কাজ করেছে, যে আহমদ মুসার শত শত কীর্তিগাথা পত্র-পত্রিকা ও ইন্টারনেটে রয়েছে, সেই আহমদ মুসার কথা?’
‘জি আমি সেই আহমদ মুসার কথা বলছি।’ গেরারড গারভিন বলল।
হিটলারি গোঁফের নিচে ব্ল্যাক বার্ডের ঠোঁটে একখণ্ড অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘না গারভিন, আকাশ আর মাটি এক নয়। নামের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও সেই আহমদ মুসা ও এই আহমদ আব্দুল্লাহ মুসা এক অবশ্যই নয়। এই আহমদ আব্দুল্লাহ মুসা অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু ঐ আহমদ মুসা এক জীবন্ত কিংবদন্তী! যাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীরা সমীহ করে চলে। সুতরাং তুমি যে আশংকা করছ, তা ঠিক নয় গারভিন। তার মত লোক আপনা-আপনি এসে সেনফ্রিডদের মত পরিবারের পাশে দাঁড়াবে এটা অবিশ্বাস্য।’
‘আপনার কথাই হয়তো ঠিক। কিন্তু নামটা শুনে হঠাৎ আহমদ মুসার কথা আমার মনে হলো। আর এই লোকটার বৈশিষ্ট্য এমন যার সাথে আহমদ মুসার মিল আছে। অবশ্য দুই ব্যক্তি এক হওয়ার জন্যে এই মিলটুকু যথেষ্ট নয়। তাছাড়া আপনি যে কথা বলেছেন তা যৌক্তিক। আহমদ মুসার মত ব্যক্তিত্ব এমন কাজে এভাবে আসে না। সেনফ্রিডের যে সমস্যা তা তারা নিজেরাই জানে না। তারা নিজেরা যা জানে না, সে কাজের জন্যে কেউ আহমদ মুসাকে ডাকবে এবং সে আসবে তা বাস্তব নয়।’ বলল গেরারড গারভিন।
‘তাহলে বল, আমাদের সমস্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?’ বলল ব্ল্যাক বার্ড।
‘ব্রুনাদের সাথে আসা লোকটি আহমদ মুসা হোক বা না হোক, সে যে একজন বিপজ্জনক লোক এবং তার পথে দাঁড়ানো যে সহজ নয়, এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। বুঝা যাচ্ছে তারা ব্রুমসারবার্গে আসছে। তারা আসছে নিশ্চয় একটা প্রতিকারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তার মানে তারা এখন অ্যাগ্রেসিভ। লড়াইকেও তারা ভয় করছে না। এত সাহস তারা পেল কোথায়? নিশ্চয় ঐ লোকটিই তাদের সাহসের উৎস। সুতরাং স্যার, সব বাদ দিয়ে এই লোকটিই আপনাদের এক নম্বর টার্গেট হওয়া উচিত। একে সরিয়ে দেয়া ছাড়া আপনারা নিরাপদ নন।’ গেরারড গারভিন বলল।
ব্ল্যাক বার্ডের হিটলারি গোঁফের নিচে এক টুকরো ক্রূর হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ গারভিন, তুমি এ রকম একটা সুন্দর স্পষ্ট পরামর্শ দেবে সেটাই আমি আশা করেছিলাম। ধন্যবাদ তোমাকে।’
কথা শেষ করেই ব্ল্যাক বার্ড তাকাল হিংগিস্টের দিকে। বলল, হিংগিস্ট, পাশের ঘরে নাস্তা রেডি। গেরারড গারভিনকে নিয়ে যাও। ভালো করে নাস্তা করাও তাকে।’
হিংগিস্ট বুঝল এটাই বিদায়ের ইংগিত।
হিংগিস্ট উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল গেরারড গারভিনও।
গেরারড গারভিনকে ‘আসুন স্যার!’ বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল হিংগিস্ট।
তার পেছনে হাঁটতে শুরু করেছে হিংগিস্টও।

উত্তরমুখী রাস্তা ধরে হাঁটছিল আহমদ মুসা, সেনফ্রিড ও ব্রুনা।
রাস্তাটা ফাঁকা, তবে ফার্মল্যান্ডের রাস্তার মত প্রাইভেট মনে হচ্ছে। গাড়ি-ঘোড়া দেখা যাচ্ছে না।
পথের দু’ধারে ফসলের মাঠ, জংগল ও টিলার মত উচ্চ ভূমি।
এখনও কোন বড় লোকালয় চোখে পড়েনি।
রাস্তার আশেপাশে দু’একটা বাড়ি ও ফার্ম হাউজ দেখা যাচ্ছে। বাড়িগুলো পুরনো ও ওল্ড প্যাটার্নের।
‘এটাই বাদের ওয়াটলেসবার্গ এলাকা। জার্মানির প্রাচীনতম সভ্যতার ধ্বংসাবশিষ্ট এলাকা এটি। জার্মানির ওল্ড স্যাক্সনদের একটা বড় অংশ এখানে বাস করে। এরা তাদের আদি সংস্কার-সংস্কৃতি এখনও ধরে রেখেছে। জার্মানির প্রাচীন স্থাপনাগুলো এখানেই বেশি দেখা যায়। এদের দেখলে জার্মানির প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি দেখা হয়ে যায়। আমার খুব ভালো লাগে এদের।’ বলল সেনফ্রিড।
‘আসল কথাই বললেন না বাবা। জার্মানির মানে ইউরোপের আদি ডেমোক্র্যাসির কিছু এখনও এদের মধ্যে দেখা যায়।’ ব্রুনা বলল।
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছ ব্রুনা। এটা জার্মানির একটা গৌরবময় ঐতিহ্য।’ বলল সেনফ্রিড।
‘জার্মানি মানে ইউরোপের আদি ডেমোক্রাসি? সেটা কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেটা ওল্ড স্যাক্সনদের একটা সমাজ ব্যবস্থা। যা ছিল আদি গণতন্ত্র। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে রাইন নদীর অববাহিকায় স্যাক্সনদের সমাজে এটা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাস্তবে না দেখলে বিষয়টা বুঝা যাবে না স্যার। বলল ব্রুনা।
‘এই বাদেন এলাকায় কি শুধু ওল্ড স্যাক্সনরাই বাস করে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘অন্য কম্যুনিটির কিছু লোকও বাস করে এ এলাকায়। কিন্তু সেটা শহর এলাকায়। গ্রাম এলাকা শুধুই ওল্ড স্যাক্সনদের?’ বলল ব্রুনা।
‘এখানেই সমস্যা। ওল্ড স্যাক্সনরা সম্পদ লোভী ও কূটবুদ্ধির নয়, ওরা সরল-সহজ, অল্পে তৃপ্ত। সম্পদ অর্জন ও দখল নিয়ে কোন সংঘাত-সংঘর্ষে নামে না তারা। এই সুযোগে নন-স্যাক্সনরা দূর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের সাহায্যে এই বাদেন এলাকার ওল্ড স্যাক্সনদের বেশ জমি-জমা দখল করে নিয়েছে। এই বিষয়টা একট