২
আহমদ মুসা ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছল। সামনে আর ইঞ্চি পরিমাণ এগোবার উপায় নেই। ডেথ ভ্যালির পূর্ব পাশ, যেখানে একটা অংশে নূর ইউসুফদের বাসস্থান সেখান থেকে পাহাড়ের একটা দেয়াল উত্তর ও পূর্ব পাশের সন্ধিস্থল থেকে অনেকখানি উত্তরে বেড়ে গেছে। তার ফলে পূর্ব পাশ থেকে উত্তর পাশে যাবার কোন উপায় নেই, উত্তর পাশ থেকেও একই অবস্থা।
আহমদ মুসা ডেথ ভ্যালির চারদিক দেখে চমৎকৃত হলো। ডেথ ভ্যালির চারদিকে পাহাড়ের দেয়ালের প্রতিটা অংশ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করেছে সে। কোন স্থান দিয়েই খাড়া পাহাড় ডিঙিয়ে ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশ সম্ভব নয়। এক সময় যে গিরিপথ দিয়ে ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশ করা হতো, ভূমিকম্প তাকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে যে, তার কোন হদিস আহমদ মুসা খুঁজে পায়নি। সব দেখে আহমদ মুসার মনে হয়েছে, ডেথ ভ্যালি সত্যিই অভেদ্য এক প্রাকৃতিক কারাগার।
কিন্তু আহমদ মুসা কিছুতেই বুঝতে পারছে না, ডেথ ভ্যালিতে ওদের যে ঘাঁটি আছে তা সত্য। তাহলে ওরা ঘাঁটিতে যাতায়াত করে কোন্ পথে! কোনো লো-ফ্লাইং হেলিকপ্টারে? তা অসম্ভব! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের একটা অংশে, পেন্টাগন থেকে যার দূরত্ব তেমন একটা নয়, বলা যায় পাশাপাশি। যত লো-ফ্লাইংই হোক পেন্টাগনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখানে হেলিকপ্টার উঠানামা করা সম্ভব নয়। তাহলে?
এই তাহলের জবাব নেই আহমদ মুসার কাছে।
আহমদ মুসা একটা পাথরে বসে ছিল।
উঠে দাঁড়াল ডেথ ভ্যালির এই উত্তরের পাশটা আর একটু ভালো করে দেখার জন্যে। অন্য তিন পাশ থেকে এপাশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, রক ক্রিকের সংকীর্ণ নদীটা এ প্রান্তটার পা’ ধুইয়ে দিয়ে আরও সামনে মানে পশ্চিমে এগিয়ে গেছে। আর এ প্রান্তের পাহাড়ের দেয়ালটা অপেক্ষাকৃত কম খাড়া। অনেকটা ধাপে ধাপে উঠে গেছে। অবশ্য একটা পর্যায় পর্যন্ত উঠে খাড়া হয়ে উপরে উঠে গেছে। উত্তর প্রান্তটায় পাহাড়ের এক পর্যায় পর্যন্ত ওক গাছের সারি। এর পাথুরে জমিতে ঘাস ও লতা-পাতার খুব অভাব। এদিকে মেষপালকরা আসেই না।
সেই সাথে ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশটা ছোট-বড় আলগা পাথরে ভরা। পাথরগুলো অমসৃণ ও নড়বড়ে। একটু অসাবধান হয়ে কোন আলগা পাথরে পা ফেললেই পাথরের সাথে সাথে তাকেও গড়িয়ে পড়তে হবে নিচে ক্রিক নদীর প্রান্তে।
আহমদ মুসা ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশ ধরে পশ্চিম দিকে হাঁটতে শুরু করল আবার। চারদিকে তার সতর্ক দৃষ্টি কোন কু কোথাও পায় কি না। ডেথ ভ্যালিতে ঢোকার ওদের নিশ্চয় একটা কোন পথ আছে, সেটা খুঁজে বের করাই এখনকার প্রধান কাজ।
সন্তর্পণে হাঁটছে আহমদ মুসা।
চারদিকে নজর রাখছে, আবার দেখে দেখেও পা ফেলছে। আহমদ মুসা পৌঁছে গেছে ডেথ ভ্যালির প্রায় পশ্চিম প্রান্তের কাছাকাছি। আর কয়েক ধাপ গেলেই তাকে দক্ষিণ দিকে মোড় নিতে হবে।
আহমদ মুসা দু’ধাপ এগিয়ে ভোঁতা মাথার পিরামিড আকৃতির একটা পাথরের মাথায় বাম পা রেখে অন্য একটা বড় পাথরের উপর লাফ দিতে যাচ্ছিল। হঠাৎ বাম পায়ের নিচ থেকে পাথরটি পিছলে সরে গেল। সংগে সংগে আহমদ মুসা উল্টে পড়ে গেল ঢালুর দিকে। দেহটা কয়েকবার ওলট-পালট খেয়ে পনের-বিশ গজ নিচে একটা বড় পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়ে একটা গাছের গোড়ায় আটকে গেল। বুক, পিঠ ও মাথায় বেশ আঘাত পেয়েছে আহমদ মুসা। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল আহমদ মুসা।
এই ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে একটা উপত্যকা থেকে মেষের পাল দেখাশোনারত দুই যুবক ঘটনাটা দেখতে পেয়েছিল। তারা ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে।
একজন আহমদ মুসার পাশে বসে তাকে পরীক্ষা করল। বলল, ‘জনার্দন, লোকটি জ্ঞান হারিয়েছে।’
‘হ্যাঁ বরিস। লোকটা কিন্তু আমেরিকান নন। বিদেশী। পর্যটক হতে পারে।’
‘তাই মনে হচ্ছে। চল আমরা একে আমাদের বাসায় আপাতত নিয়ে যাই। দেখা যাচ্ছে, তার কোন আঘাতই তেমন গুরুতর নয়।’ বলল বরিস নামের লোকটি।
‘চল, ধরাধরি করে নিয়ে যেতে হবে।’ বরিস বলল।
বরিস ও জনার্দন দু’জন চাচাতো ভাই। এই এলাকার এক পাহাড়ি পরিবারের সন্তান।
তাদের পরিবারটি রেড ইন্ডিয়ান-আমেরিকান।
তারা আহমদ মুসাকে নিয়ে তুলল তাদের বাড়িতে। গ্রামটা ডেথ ভ্যালি থেকে মাইল তিনেক পশ্চিমে। নাম বুশ ভ্যালি। পাহাড় ঘেরা প্রশস্ত এক উপত্যকা ওটা। গোটা গ্রামটাই সবুজে ঢাকা।
গ্রামে ঢোকার মুখেই ঝরনার ধারে একটা বিরাট বাড়ি। গোটাটাই পাথরের তৈরি।
আহমদ মুসাকে ধরাধরি করে বাড়ির উঠানে প্রবেশ করতেই উঠানের একটা গাছের ছায়ায় বসা একজন প্রৌঢ় উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসাকে প্রৌঢ়ের সামনে নিয়ে রাখা হলো।
কে?’ প্রৌঢ়ের চোখে-মুখে উদ্বেগ। বলল, ‘তোমরা কিছু ঘটিয়েছ নাকি? এ
‘না বাবা, ইনি পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। সম্ভবত কোন পর্যটক হবেন।’ বলল বরিস
‘হ্যাঁ, তেমন কিছু হবে। লোকটা তো দেখছি বিদেশী। ক্রিমিনাল মনে হচ্ছে না। তাড়াতাড়ি ভেতরে নাও। প্রথমে জ্ঞান ফিরাতে হবে। সেই সাথে আপাতত তার ক্ষত থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষত থেকে এখনো রক্ত বেরুচ্ছে দেখছি।
‘ঠিক আছে বাবা!’ বলে বরিস ও জনার্দন দু’জনে ধরাধরি করে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
প্রৌঢ় ব্যক্তির নাম রবার্ট রবিনসন। বরিসের পিতা এবং জনার্দনের বড় চাচা। রবার্ট রবিনসন এই পরিবারের কর্তা। বুশ ভ্যালি গ্রামের গোত্রেরও প্রধান তিনি।
বরিস ও জনার্দন আহমদ মুসাকে নিয়ে যেতে শুরু করলে আরও তিনজন কিশোর, যুবক বেরিয়ে এল।
তারা সবাই মিলে ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে গেল আহমদ মুসাকে। নিয়ে তুলল তাকে একটা রুমে।
প্রৌঢ় রবার্ট রবিনসন সাথে সাথে এসেছিল। বলল, ‘সবাই এখানে ভিড় করো না। আমাদের এলিজা ও জুলিয়া দু’জনেরই নার্সিং ট্রেনিং আছে। ফার্স্ট এইড দেয়ার কাজ ওরাই করতে পারবে।’
এলিজা প্রৌঢ় ভদ্রলোক রবার্ট রবিনসনের মেয়ে, বরিসের বোন। আর জুলিয়া বরিসের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী।
‘বাবা, ওর জ্ঞান আগে ফেরানো দরকার।’ বলল জুলিয়া।
‘দুই কাজ এক সংগেই চলতে পারে। আমার ধারণা ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও ব্যান্ডেজ বাঁধার সময় শরীরে যে ব্যথা পাবে, তাতেই তার জ্ঞান ফিরে আসবে।’ বলে এলিজা ও জুলিয়া কাজে লেগে গেল।
তাই হলো। আহত স্থান পরিষ্কার করার শুরুতেই আহমদ মুসা সংজ্ঞা ফিরে পেল। কিন্তু সংগে সংগে চোখ খুলল না। সে কোথায়, কাদের হাতে সেটা তার জানা দরকার। তার মনে পড়ল, একটা পাথরে পা রাখার পর তা সরে যাওয়ায় সে নিচে পড়ে গিয়েছিল। বুক, কাঁধ ও মাথার সামনের আহত স্থানের যন্ত্রণা সে টের পাচ্ছে। কতক্ষণ সে সংজ্ঞা হারিয়ে ছিল। এরা কারা তাকে তুলে এনেছে। নরম বিছানা, সযত্ন শুশ্রূষা প্রমাণ করে কোন শত্রুপক্ষ এরা নয়। তাছাড়া শুশ্রূষার চারটি হাতও মেয়েলি, তাদের দু’একটা কথাও এর প্রমাণ।
এ সময় আহমদ মুসা শুনতে পেল ভারি মেয়েলি কণ্ঠ, ‘আহারে বাছা! জ্ঞান এখনও ফেরেনি! কোথাও কোন বড় ধরনের আঘাত নেই তো! দেখে মনে হচ্ছে খুব ভালো ছেলে। হাসপাতালে নেয়া যায় কি না?’ বলল রবার্ট রবিনসনের স্ত্রী, বরিস ও এলিজার মা।
হাসপাতালে নেয়ার কথায় আহমদ মুসা চমকে উঠল। কিছুতেই তার হাসপাতালে যাওয়া যাবে না। হাসপাতালে যাওয়া ঠেকাতে হলে তাকে সজ্ঞানে ফিরে আসতে হবে।
সজ্ঞানে আসার লক্ষণ হিসাবে পায়ের আঙুল, হাতের আঙুল নড়াল আহমদ মুসা।
এলিজা ও জুলিয়া একসংগে বলে উঠল। ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এর জ্ঞান ফিরে আসছে।’
ধীরে ধীরে চোখ খুলল আহমদ মুসা। তাকাল চারদিকে। বলল, ‘আমি কোথায়?’
‘আপনি একটা বাড়িতে। কোন চিন্তা করবেন না। পড়ে গিয়ে আপনার তিনটি ক্ষত হয়েছে। আমরা ঔষধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।
আপনার একটু কষ্ট হবে।’ বলল এলিজা।
‘আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ। আমি পাহাড়ে চলার সময় হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলাম।’ আহমদ মুসা বলল,
‘আমাদের বরিস ও জনার্দন আপনাকে দেখতে পেয়ে নিয়ে এসেছে।’ বলে এলিজা দেখিয়ে দিল পাশে দাঁড়ানো বরিস ও জনার্দনকে।
আহমদ মুসা সেদিকে তাকিয়ে তাদের ধন্যবাদ দিল। মেয়ে দু’টি তো বটেই, ছেলে দু’টিকে দেখে আহমদ মুসার মনে হলো, ওদের সহজ-সরল চোখে-মুখে অন্য কোন মতলব নেই।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আবার চোখ বুজল।
মাথার ক্ষতটা পরিষ্কার করছিল এলিজা। বলল, ‘ক্ষতের ভেতরে কিছু ক্ষুদ্র পাথরের টুকরো ঢুকেছে। ওগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কষ্ট হবে, ধৈর্য ধরতে হবে আপনাকে।’
‘ঠিক আছে। আপনাদের কাজ করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
মাথার ও ঘাড়ের আহত স্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে কেঁপে উঠেছিল এলিজা ও জুলিয়া দু’জনেই। কিন্তু আহমদ মুসার কোন ভাবান্তর নেই। নিরুদ্বেগে যেমন মানুষ ঘুমায়, তেমনি নির্বিকারভাবে সে শুয়ে আছে। কষ্টের সামান্য ছাপও পড়েনি মুখে। বিস্মিত হলো এলিজা ও জুলিয়া।
এলিজা ও জুলিয়া ফ্রেশ হবার জন্যে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
বরিস ও জনার্দন আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনাকে ভালো বেডে শিফট করা দরকার। আমরা আপনাকে অন্যত্র নিয়ে যেতে চাই।’
‘ধন্যবাদ। নিয়ে যেতে হবে না। আমি হাঁটতে পারব।’ বলে আহমদ মুসা উঠে বসল।
‘স্যার, আপনার জামা-কাপড় সবই রক্তে ভিজে গেছে। পাল্টানো দরকার। এই কাপড় আমরা এনেছি।’ বলল বরিস।
‘ধন্যবাদ, তোমার নাম বোধ হয় বরিস।’ আহমদ মুসা বলল।
‘জি স্যার। আমি বরিস বুবুকি।’ বলল বরিস।
‘আর জনার্দন কে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। বরিস দেখিয়ে দিল জনার্দনকে।
‘আমি কৃতজ্ঞ জনার্দন। ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা জনার্দনকে লক্ষ্য করে।
‘ওয়েলকাম স্যার।’ সলজ্জ কণ্ঠে বলল জনার্দন।
এলিজা ও জুলিয়া ফ্রেশ হয়ে এসে সকলের সাথে দাঁড়িয়েছিল।
বরিস সেখানে উপস্থিত বাবা-মাকে দেখিয়ে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। এলিজা ও জুলিয়ার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিল বরিস বুবুকি।
বরিস থামতেই বরিসের মা ইম্মা ইমেলি বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘বাছা! তোমার নাম কি? তুমি কোথায় থাক?’
প্রশ্নটি আহমদ মুসাকে বিব্রত করে তুলল। সত্যটা তো বলা যাবেই না। কিন্তু একজন মায়ের মত ব্যক্তির কাছে মিথ্যা কথা বলবে কেমন করে?
অবশেষে সত্যের স্বার্থে মিথ্যা বলতেই হলো। কিন্তু আহমদ মুসার মিথ্যা বলতে খারাপ লাগল। বলল, ‘মা, আমি যদি নামটা না বলি, তাহলে কি আপনারা খারাপ ভাববেন?’
‘তার মানে তুমি নাম বলতে চাও না, আবার মিথ্যা নামও বলতে চাও না। এটা তোমার সততারই লক্ষণ। মেনে নিচ্ছি আমরা নিশ্চয় এমন কোন কারণ আছে, যার জন্যে তুমি নাম বলতে চাও না। ঠিক আছে।’ বলল ইম্মা ইমেলি, বরিস ও এলিজার মা।
‘অনেক ধন্যবাদ মা। আমার সমস্যা আপনি বুঝেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা লাউঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটেই গেস্ট রুমে তার বেডে গেল।
হাঁটার সময় বরিস ও জনার্দন দু’জনেই তার দু’পাশে ছিল। আহমদ মুসা বেড রুম পর্যন্ত হেঁটে আসল বটে, কিন্তু অনুভব করল ব্যথায় মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ঘাড় ও বুকের আঘাতটাও তাকে অনেক দুর্বল করেছে।
বেডে শোবার পর তার ব্যাগটা চেয়ে নিয়ে নূর ইউসুফের কাছ থেকে নিয়ে আসা কয়েকটা ট্যাবলেট খেয়ে নিল।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়লে বরিস ও জনার্দন ঘরের দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেল।
ভেতরের লাউঞ্জটিতে তখনও বসে রবার্ট রবিনসন, ইম্মা ইমেলি, এলিজা, জুলিয়া এবং পরিবারের অন্যরা।
কথা বলছিল রবার্ট রবিনসন, ‘… কিন্তু নামটা বলল না কেন? দুই
কারণে মানুষ নাম গোপন রাখে। যদি কোন লোক পরিচিত ক্রিমিনাল হয় অথবা কোন লোক যদি তার নাম প্রকাশ হলে বিপদের আশংকা করে।
‘এই লোকটির ক্ষেত্রেও এ দু’টির কোন একটি সত্য হবে। যদি তাই হয়, তাহলে আহমদ মুসা সাধারণ ট্যুরিস্ট কেউ নয়।’
‘ছেলেটা কে আমি জানি না। কিন্তু সে ক্রিমিনাল নয় তা নিশ্চিত। কোন লোক ক্রাইম করলে তার চোখে-মুখে তার প্রকাশ থাকে, এই ছেলের চোখ-মুখ একেবারেই নিষ্পাপ’ বলল ইম্মা ইমেলি, বরিস-এলিজার মা।
‘লোকটাকে যে দেখবে তার এটাই মনে হবে মা। আর একটা কথা, লোকটা সাধারণ নার্ভের লোক নয়। আহত স্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তার শরীরে বেশ কাটা-ছেঁড়ার কাজ করতে হয়েছে। সাধারণ কোন লোক হলে তার চিৎকারে কানপাতা দায় হতো। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, অমন তীব্র যন্ত্রণায়ও তার মুখভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি। ঠোঁটে সামান্য কম্পনও দেখা যায়নি। এমন নার্ভের মানুষ দেখা যায় না বললেই চলে।’ বলল এলিজা।
‘ঠিক বলেছে এলিজা। আমিও এই কথাটাই বলব ভাবছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে লোকটার নার্ভ পাথরের মত শক্ত।’ জুলিয়া বলল।
‘আমি আরেকটা কথা ভাবছি, ডেথ ভ্যালির ঐ অঞ্চলে কোন দিন কোন পর্যটককে দেখিনি। আমরা খেয়াল করেছি সে ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশের পূর্বদিকে শেষ পর্যন্ত গিয়েছিল। ফিরে আসার পথে দুর্ঘটনা ঘটেছে।’ বলল বরিস বুবুকি।
‘কিছু খুঁজছে কি তাহলে সে?’ জনার্দন বলল।
‘কি খুঁজতে পারে? গুপ্তধনের রুট তো ওটা নয় আমি জানি।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আবার গুপ্তধনের কথা? ওটা কেন ভুলতে পারছ না? এ নিয়ে আমাদের কত বড় ক্ষতি হয়েছে! সংকট এখনও যায়নি। ওদের ধারণা গুপ্তধনের নকশা আমাদের কাছে আছে। এ নিয়ে বিপদের খড়গ ঝুলছে আমাদের মাথার উপর।’ বলল ইম্মা ইমেলি।
‘মনে না করলেই কি রক্ষা পাওয়া যাবে। আমরা এত বলছি, নকশা আমাদের কাছে নেই। চাচা ওটা সাথে করে নিয়ে গেছে, সে তো আর ফেরেনি। কিন্তু তারা বিশ্বাস করছে কই? বলছে, হয় আসলটা, নয় নকল কপি আমাদের কাছে আছেই। তাঁরা হুমকি দিয়েছে, স্বেচ্ছায় না দিলে তারা তা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। তার উপর আমার বিয়ের ঘটনা ওদের আরও উস্কে দিয়েছে।’ বলল বরিস বুবুকি।
‘থাক এসব কথা। মেহমানের কিন্তু খাওয়া হয়নি। তার খাবার
ব্যবস্থা কর।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে গেছে। পরদিন রাত তখন ৯টা। আহমদ মুসা খাবার পর বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে। আজ অনেকটাই সুস্থ আহমদ মুসা। রবার্ট রবিনসনসহ সবাই কেউ চেয়ারে কেউ সোফায় বসে। উদ্দেশ্যবিহীন বিভিন্ন কথা-বার্তা চলছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ আহমদ মুসা রবার্ট রবিনসনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘কিছু মনে না করলে আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি জনাব।’
‘অবশ্যই জিজ্ঞাসা করুন? উত্তর দিতে পারব কি না সেটা ভিন্ন কথা।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আপনারা, লাউঞ্জে যখন গল্প করছিলেন তখন গুপ্তধনের কথা উঠেছিল। বিষয়টা কি আমি জানতে পারি?’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার এই কথার সাথে সাথে রবার্ট রবিনসনসহ সবার মুখ মলিন হয়ে গেল। অজান্তেই তারা যেন একে অপরের দিকে তাকাল। কেউ কোন কথা বলল না। তাদের মনে একটা সন্দেহও দানা বেঁধে উঠল। তাহলে লোকটি কি গুপ্তধন সন্ধানী দলের লোক!
এসব নানা কথা নিয়ে তারা চিন্তিত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। তখন আহমদ মুসা বলল, ‘নিশ্চয় আপনারা ভাবছেন গুপ্তধনের সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে, কেন আমি এ বিষয় নিয়ে আপনাদের জিজ্ঞাসা করছি! আমার সব কথা শুনলে আপনাদের উদ্বেগ-দ্বিধা দূর হয়ে যাবে আশা করি।’
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর সংক্ষেপে তাদের সব জানালো।
সুড়ঙ্গে কিভাবে একজনের কংকাল দেখল, কিভাবে মুখের ভেতর থেকে একটা চামড়ার কাগজ বের করল, কাগজটি পরীক্ষা করে বুঝল এটা গুপ্তধনের স্থান ও রাস্তার নকশা ইত্যাদি বলে আহমদ মুসা থামল।
‘গুপ্তধনের নকশা কি আপনার কাছে আছে?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘হ্যাঁ, আমার কাছে আছে। আমি নকশাটা পাওয়ার পরই একটা কাজে এদিকে চলে এসেছি। গুপ্তধন যে দিকে সেদিকে যাবার সুযোগ হয়নি।’
‘কংকালটা কেমন দেখেছেন? তার সামনের একটা দাঁত কি ভাঙা?’
বলল দ্রুত কণ্ঠে রবার্ট রবিনসন।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, কংকালের সামনের ডান দিকের একটা দাঁত ভাঙা।’
শুনেই দু’হাতে মাথা চেপে ধরে মুখ নিচু করল রবিনসন। সে কান্না চাপার চেষ্টা করছে।
সবাই বেদনায় পাণ্ডুর। ছলছল করছে সবার চোখ।
কিছুক্ষণ পর মুখ তুলল রবার্ট রবিনসন। সে রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘ও আমার ছোট ভাই রবার্ট রমন। গুপ্তধনের নকশা পাবার পর থেকেই সে গুপ্তধন উদ্ধারে পাগল ছিল। শেষ পর্যন্ত এ কাজেই সে জীবন দিল।’
‘সে কিভাবে মারা গেছে, অনাহারে না কোন কিছুর আক্রমণে? তা কি কিছু বুঝতে পেরেছেন?’ বলল রবিনসন।
তাকে গুলি করে মারা হয়েছে। তার মাথার নিচে কপালে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কারা চাচাকে গুলি করে মেরেছে আন্দাজ করতে পারছ বাবা?’ রবার্ট রবিনসনকে উদ্দেশ্য করে বলল বরিস বুবুকি।
‘কারা তা বুঝাই যাচ্ছে। যশুয়া গোত্রের লোকরা নিশ্চয় তাকে ফলো করেছিল। তারাই তাকে হত্যা করেছে।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘কিন্তু তারা তাহলে গুপ্তধনের নকশা পেল না কেন? নকশা তো চাচার সাথেই ছিল।’ বরিস বুবুকি বলল।
‘উত্তরটা আমি দিচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা বলল, শত্রুপক্ষকে দেখেই সম্ভবত রবার্ট রমন বুঝতে পেরেছিল তারা কি চায়। সে গুপ্তধনের নকশাটা মুখে পুরে রেখেছিল। তাই হত্যার পর তাকে সার্চ করেও নকশাটা যশুয়া গোত্রের লোকরা পায়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু আপনি পেলেন কি করে?’ জিজ্ঞাসা এলিজার।
‘আমি কংকালটা পরীক্ষার সময় টর্চ জ্বেলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুখের ভেতরে কাগজ জাতীয় কিছু দেখতে পাই। তারপর মুখ থেকে সেটা বের করি আমি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি কি করে বুঝলেন যে ওটা গুপ্তধনের নকশা?’ বলল বরিস বুবুকি।
আহমদ হাসল। তারপর পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল।
‘আপনি সাংঘাতিক বুদ্ধিমান ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন! তাহলে আপনি তো গুপ্তধনের জায়গাটাও দেখেছেন?’ বলল এলিজা।
‘শুধু দেখেছি নয়, ওখানে কয়দিন ছিলাম মেহমান হয়ে। সেখানে একটি পরিবার বাস করে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে গুপ্তধন কি তাদের দখলে বাছা?’ বলল ইম্মা ইমেলি। এলিজা ও বরিসের মা।
‘না মা, গুপ্তধনের বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। তারা আমার কাছ থেকে মাত্র শুনেছে ঐখানে গুপ্তধন আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে তো ওরা গুপ্তধনের সন্ধান নিশ্চয় করবেন?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘না জনাব, গুপ্তধনের প্রতি তাদের কোন লোভ নেই। আমি ওখানে গেলেই মাত্র বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হবে।’
‘আপনি সুস্থ হলেই নিশ্চয় ওখানে যাবেন?’ জিজ্ঞাসা এলিজার।
‘না, তার চেয়েও বড় কাজ আমার আছে, সেটা না সারলে ওখানে যাবার আমার সুযোগ হবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘গুপ্তধন সন্ধানের চেয়েও বড় কাজ! সে কাজটা আবার কি বাছা?’
বর্ণল ইম্মা ইমেলি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমার নামের মত ওটাও এখন না জানা থাক মা। চিন্তা নেই। সবই আপনারা এক সময় জানতে পারবেন।
আহমদ মুসা হাসি মুখে কথা বললেও তা শান্ত অথচ শক্ত ছিল।
সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়ার মত।
‘তাহলে আপনার ব্যাপারে আমাদের কিছু জানাবেন না? আমরা বোধ হয় এতটা অবিশ্বস্ত নই। আমাদের পরিবার মিশ্র শ্বেত-রেড ইন্ডিয়ান হলেও রেড ইন্ডিয়ানদের আমানতদারী আমরা জীবন দিয়েও রক্ষা করি।’ বলল বরিস বুবুকি।
আহমদ মুসার মুখটা একটু মলিন হলো। বলল, ‘আমি দুঃখিত। প্রশ্নগুলোর উত্তর না দেয়া অস্বাভাবিক। তবুও আমি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি না, এ অবিশ্বাসের কারণে নয়। এমন কিছু সময় আসে, যখন এমন কিছু কথা থাকে যা এমনকি স্ত্রীকেও বলা যায় না, নিজের ভাই কিংবা ছেলেকেও বলা যায় না। তবে আপনারা অবশ্যই জানতে পারবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ বাছা! বুঝতে পেরেছি। তুমি বড় কোন ব্যাপার নিয়ে কাজ করছ। ঈশ্বর করুন তুমি সফল হও।’ বলল ইম্মা ইমেলি।
‘ধন্যবাদ মা।’ আহমদ মুসা বলল।
রাত সাড়ে ১২টায় ঘুম ভেঙে গেল আহমদ মুসার। বাড়ির ভেতরে হৈ চৈ, কান্নাকাটির শব্দ। আহমদ মুসা উঠে বসল।
বিড়ালের মত সন্তর্পণে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তার ডানে দু’গজ দূরে গেটের পর বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকার প্যাসেজ। আহমদ মুসা একটু এগিয়ে দেখল গেট খোলা। লক ভেঙে ফেলা হয়েছে অথবা দরজাই ভেঙে ফেলা হয়েছে।
লাউঞ্জের আরও ভেতরে এগিয়ে গেল আহমদ মুসা। এই লাউঞ্জটা বাড়ির কেন্দ্রবিন্দু। ঘরগুলো মোটামুটি এই লাউঞ্জকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। লাউঞ্জ থেকে চারটি করিডোর চার দিকে গেছে। তার একটার মুখে গেট।
আহমদ মুসা একটু এগিয়ে দেখল, রবার্ট রবিনসন, বরিস বুবুকি, জনার্দন সকলেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় লাউঞ্জের শেষ মাথার দিকে পড়ে আছে।
চারজন লোক এলিজা ও জুলিয়াকে দু’তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনছে। তারা ও সাথে তাদের মা ইম্মা ইমেলি চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে।
কথা বলছিল রবার্ট রবিনসন। বলছিল, ‘তোমাদের মেয়েকে তো আমরা ধরে আনিনি। স্বেচ্ছায় এসেছে। আইন অনুসারে তাদের বিয়েও হয়েছে। যেহেতু তার বয়স ১৮ বছরের বেশি। সেহেতু সে নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারে। আমরা তো কোন অন্যায় করিনি।’
‘ন্যায়-অন্যায় আমরা বুঝি না। আমাদের মেয়েকে তোরা নষ্ট করেছিস, তোদের মেয়েকেও আমরা নষ্ট করব। জুলিয়া ও এলিজা দু’জনকেই আমরা নিয়ে যাচ্ছি।’ বলল আক্রমণকারী আগন্তুকদের একজন।
‘দেখ, আমাদের মেয়ের কোন ক্ষতি হলে আমরাও কিন্তু ছাড়ব না, আজ চোরের মত এসে অপ্রস্তুত অবস্থায় যা করতে পারলে, ভবিষ্যতে তা আর পারবে না। আমাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, জনবল তোমাদের চেয়ে কম নয়। এটা মনে রেখ।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘সে দেখা যাবে। আমাদের যওয়া কবিলা তোদের টিকোমে কবিলাকে কোন দিনই ভয় করে না। আমরাই ন্যায়ের পথে আছি, আর তোরাই একের পর এক অন্যায় করছিস। তোরা আমাদের গুপ্তধনের নকশা চুরি করেছিস। আমাদের মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে চুরি করে নিয়ে এসেছিস। তোদের গোত্র ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না। গুপ্তধনের নকশা ফেরত দিলে তবেই তোরা রক্ষা পেতে পারিস।’
‘আর কতবার আমরা বলব যে গুপ্তধনের নকশা আমাদের কাছে নেই।’ বলল আর্তকণ্ঠে রবার্ট রবিনসন।
‘আর বলতে হবে না। বলার সুযোগই দেব না আর তোদের। আজ তোদের শেষ দিন।’ বলে হামলাকারী যশুয়া গোত্রের লোকটি যে এলিজা ও জুলিয়াকে ধরে এনেছিল, সে কঠোর কণ্ঠে বলল, ‘এ দু’জনকে নিয়ে তোমরা গাড়িতে তোল।’ এরপর আরেকজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জন জনসন, তুমি তোমার রিভলবারটা বুডির মানে ইম্মা ইমেলির হাতে দাও। সেই প্রথম গুলি করে মারবে তার স্বামী রবার্টসনকে, তার পর মারবে তার সন্তান বরিস বুবুকিকে। বুড়ি রাজী না হলে প্রথমে তাকেই গুলি করে মেরে ফেল। তারপর ওদুজনকে মারব।’ বলল যশুয়া গোত্রের সর্দার গোছের লোকটি।
নির্দেশ অনুসারে জন জনসন তার হাতের একটা রিভলবার ইম্মা ইমেলির হাতে গুঁজে দিল। ইম্মা ইমেলি তখন চিৎকার করে কাঁদছিল।
অন্যদিকে চারজন এলিজা ও জুলিয়াকে টেনে-হেঁচড়ে গেটের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
ওরা আরও কাছাকছি আসতেই আহমদ মুসা লাফ দিয়ে ওদের সামনে গিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা জোরের সাথে বলল, ‘ছেড়ে দাও ওদের। পুরুষের বাহাদুরিটা মেয়েদের সাথে মানায় না!’
চারজনের মধ্যে তিনজনেরই কোমরের খাপে ছোরা জাতীয় অস্ত্র রাখা। আর সামনে যে লোকটি এলিজাকে টেনে নিয়ে আসছিল তার ডান হাতেই রিভলবার।
আহমদ মুসা কথা কয়টি বলতেই সামনের লোকটি বলল, ‘তুই আবার কে, এখানে কেন মরতে এলি?’ কথার সাথে সাথেই সে রিভলবার তুলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
নিরস্ত্র আহমদ মুসার বাম পা চোখের পলকে উঠে এল। লোকটি বুঝে উঠার আগেই পা গিয়ে আঘাত করল লোকটির রিভলবার ধরা হাতের কজিতে। মুহূর্তেই রিভলবারটি লোকটির হাত থেকে পাক খেয়ে উপরে উঠে গেল। পাক খেয়েই রিভলবারটা আবার নিচে নেমে এল। লুফে নিল আহমদ মুসা রিভলবারটা। রিভলবার হাতে নিয়েই প্রথমে সামনের লোকটিকে গুলি করল, সংগে সংগেই পরপর আরও তিনটি গুলি করল এলিজা ও জুলিয়াকে ধরে আনা লোক তিনজনকে লক্ষ্য করে। লোক তিনজনকে গুলি করার পরপরই আহমদ মুসা রিভলবার তাক করল যশুয়া কবিলার পক্ষে যে কথা বলছি সরদার গোছের সেই লোককে। বলল, ‘তোমার লোকদের সবাইকে অস্ত্র ফেলে দিতে বল, না হলে তোমার মাথা উড়ে যাবে এখনি।’
লোকটি আহমদ মুসার কথা শুনল না। হুকুম দিল, ‘সবাই গুলি করে শয়তানটাকে ঝাঁঝরা করে দাও।’
সংগে সংগে আহমদ মুসা বলল, ‘এলিজা, জুলিয়া, তোমরা মাটিতে শুয়ে পড় এই মুহূর্তে।’ বলে আহমদ মুসা নিজেই ঐ চারটি লাশের আড়াল নিয়ে শুয়ে পড়ল। শুয়েই গুলি করল যশুয়া গোত্রের সরদার গোছের লোকটিকে। আহমদ মুসার গুলি সত্যিই লোকটির মাথা গুড়িয়ে দিল।
তখন বৃষ্টির মত গুলি আসছিল আহমদ মুসাদের দিকে। সবাই হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করছিল।
আহমদ মুসার রিভলবারে তখন হিসাব মত আর একটা গুলি আছে। জন জনসন নামের লোকটি যে ইম্মা ইমেলিকে রিভলবার তুলে দিয়েছিল রবার্ট রবিনসন ও বরিসকে মারার জন্যে, সেও হাঁটু গেড়ে বসে গুলি চালাচ্ছে। আহমদ মুসা একটা লাশের মাথার দিকে একটু গড়িয়ে গেল। তাঁর কাঁধের আড়ালে লুকিয়ে তার গলার উপর দিয়ে রিভলবারের নল সেট করে শেষ গুলিটা ছুঁড়ল জন জনসনের মাথা লক্ষ্যে। অব্যর্থ টারগেট। জন জনসন গুলি খেয়ে উল্টে পড়ে গেল।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা চিৎকার করে বলে উঠল, ‘যারা বেঁচে আছ, তারা যদি বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে অস্ত্র ফেলে দিয়ে মাথার উপর হাত তুলে দাঁড়াও। আমার গুলি কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না, তা তোমরা দেখেছ। আর শোন, এক আদেশ আমি দু’বার দেই না। আর নির্দেশ পালন করলে তোমাদের আমরা ছেড়ে দেব।’
ওদের গুলি বন্ধ হয়ে গেল। তাকাল ওরা একে অপরের দিকে। তারপর তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াল।
–
আহমদ মুসা গুলিশূন্য রিভলবার বাগিয়ে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রবার্ট রবিনসন, বরিস ও জনার্দনের বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, ‘হাত তুলে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলুন।’
সাত জনকেই ওরা বেঁধে ফেলল।
রবার্ট রবিনসন ছুটে এসে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে, আপনি আমাদের পরিবারকে বাঁচিয়েছেন, পরিবারের ইজ্জত-আবরু রক্ষা করেছেন। কোন কিছু দিয়েই এ ঋণের শোধ সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি এ মিরাকল ঘটালেন কি করে?’
‘এসব কথা থাক। আমি যা করেছি, তার কৃতিত্ব স্রষ্টার। এখন বলুন, লাশগুলো কি করবেন, বন্দীদের কি করবেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না। পুলিশকে জানালে ঝামেলায় জড়াতে হবে। আবার পুলিশকে না জানিয়ে কি করব বুঝতে পারছি না।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আমার মনে হয় কি পুলিশের ঝামেলায় না গিয়ে বন্দীদেরকে বলা হোক লাশগুলো তারা নিয়ে যাক। না হলে পুলিশে আমরা মামলা দায়ের করব যে, তারা আমাদের বাড়িতে লুটতরাজ ও আমাদের কিডন্যাপ করতে এসেছিল। সবগুলো অস্ত্রে তাদের হাতের ছাপ আছে। তাদের কোন উপায় নেই বাঁচার। লাশগুলো নিয়ে যদি তারা চলে যায় এবং আর এদিকে আসবে না অংগীকার করে, তাহলে তাদের ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদের নাম ছাড়া থানায় কেস করা হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
রবার্ট রবিনসন খুশি হয়ে সোৎসাহে বলে উঠল, ‘আপনি শক্তিতে যেমন, অস্ত্রবাজিতে যেমন, বুদ্ধিতেও তেমনি। ধন্যবাদ! আপনার পরামর্শ আমার পছন্দ হয়েছে। এছাড়া আর কোন পথ নেই।’
সলা-পরামর্শ শেষ হলে আহমদ মুসা রবার্ট রবিনসনকে কথাগুলো বন্দীদের বলার জন্যে অনুরোধ করল।
বন্দীদের একত্রিত করে রবার্ট রবিনসন আহমদ মুসার কথাগুলো বুঝিয়ে বলল। শেষে বলল, ‘এখন ঠিক কর, তোমরা মুক্ত মানুষ হিসেবে থাকবে, না জেলে যাবে?’
সাত জনের সবাই একবাক্যে বলল, ‘আমাদের মুক্তি দিন। আমরা জেলে যেতে চাই না। আপনারা যা বলবেন আমরা তাই করব। আমরা লাশ নিয়ে চলে যাচ্ছি। আর আমরা এ মুখো হবো না। আমাদের মুক্তি দিন।’
সাত জনের মধ্যে একজন কথা বলার সাথে সাথে আহমদ মুসার দিকে বার বার তাকাচ্ছিল। বিষয়টা আহমদ মুসার দৃষ্টি এড়াল না। ওদের কথা শেষ হলে আহমদ মুসা তাকে ডাকল। বলল, ‘তুমি কি আমাকে কিছু বলবে? বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন?’
লোকটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আমাকে মাফ করবেন স্যার। ফিল্মের হিরোর মত কাজ আপনি করলেন। তাই বিস্ময় নিয়ে বারবার আমি দেখছিলাম। এত ক্ষিপ্র, এমন অব্যর্থ টার্গেটের কথা আমি গল্পে পড়েছি, দেখিনি। তাই দেখছিলাম।’
আহমদ মুসা তার কথা শুনল এবং চলে যেতে বলল বটে, কিন্তু তার কথা বিশ্বাস হলো না। তার কথাগুলো তার মুখ-চোখের ভাষার সাথে মিলল না। আহমদ মুসার নিশ্চিত মনে হলো, এই লোক নিশ্চয় আমাকে চিনতে পেরেছে। এই চেনা কেমন চেনা! সেটাই সে বুঝতে পারছে না। এই লোক ‘এইচ থ্রি’ বা ‘ফোম’-এর কেউ হবে এটা স্বাভাবিক নয়। তাহলে? ‘ফোম’ ও এইচ থ্রি’র লোকরা গোপনে ঘরে ঘরে পোস্টার বিলি করেছে, তাতে কি তার ফটো দেয়া আছে? পুরস্কারের অংকও হয়তো বিরাট! এমন কোন পোস্টার কি লোকটা দেখেছে! এটা হতে পারে।
তাদের সাত জন লোককেই ছেড়ে দেয়া হলো। তারা সকলে চলে গেল।
যে লোকটা আহমদ মুসার দিকে তাকিয়েছিল কি এক গভীর ভাবনা তার চোখে-মুখে। তার চোখের চকচকে লোভাতুর দৃষ্টি আহমদ মুসার চোখ এড়ায়নি। বিশেষ করে যাবার সময়ের শেষ দৃষ্টিটা।
ওরা চলে গেলে আহমদ মুসা শোবার ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘প্লিজ, সবাই শুয়ে পড়ুন।’
আহমদ মুসা তার শোবার ঘরের দরজায় রবার্ট রবিনসনকে ঈশারায় ডাকল। বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই, ওরা এলিজা ও জুলিয়াকে কিডন্যাপ করার জন্যে আসবে না। আসতে পারে অন্য কাজে।’
‘কি কাজ?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ রবার্ট রবিনসনের।
‘কখন, কবে আসবে জানি না। আমার সন্ধানে ওরা বা অন্য কেউ আসতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার সন্ধানে আসবে কেন? আপনার হাতে ওরা ছয়জন খুন হয়েছে তাই?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘না, সে কারণে নয়, অন্য কারণে। থাক এ প্রসঙ্গ আজ এখানেই। সবই জানতে পারবেন। চিন্তার কিছু নেই। আমি শুয়ে পড়ছি। আপনারাও গিয়ে শুয়ে পড়ুন।’
‘গুড নাইট!’ বলে আহমদ মুসা তার ঘরে ঢুকে গেল। রবার্ট রবিনসনও চলা শুরু করল দোতলার সিঁড়ির দিকে।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে গিয়ে দেখল, দোতলার লাউঞ্জে সবাই বসে আলোচনা করছে। আলোচনার বিষয় আহমদ মুসা।
রবার্ট রবিনসনও গিয়ে বসল। বলল, ‘আর সময় নষ্ট নয়, চল সবাই শুতে যাই।’
‘কিন্তু বাবা, কি দেখলাম আমরা! সিনেমার দৃশ্যও এমন নিখুঁত হয় না। আমরা তো কিডন্যাপ হয়েই গিয়েছিলাম। মা, বাবা, ভাইয়া, ছোট ভাইয়াও তো মরেই গিয়েছিলেন। কিন্তু একজন আসলেন। অদ্ভুত সাহস, অপরিসীম ক্ষিপ্রতা, শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে শত্রুকে আঘাত করলেন। ৬ জনকে হত্যা, সাত জনকে বন্দী করলেন। বাবা, এমন লোক কি কোন সাধারণ কেউ হতে পারেন?’
‘ঠিক বলেছ মা, ইনি সাধারণ কেউ নন।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘তাহলে কে হতে পারে, বাবা? গোয়েন্দা? সেনাবাহিনীর অফিসার? পুলিশ অফিসার? কিংবা কোন প্রফেশনাল ক্রিমিনাল?’ বলল এলিজা।
‘প্রফেশনাল ক্রিমিনাল সে নয়, এটা নিশ্চিত। এই মাত্র আমার সাথে তার কথা হলো। উনি বললেন এলিজা ও জুলিয়াকে ধরে নিয়ে যাবার জন্যে কেউ আসবে না। আসতে পারে অন্য কাজে। আবার বললেন, তাঁকে খুঁজতেও আসতে পারে।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘অন্য কাজে আসবে? তার খোঁজে আসবে? তাঁর খোঁজে আসবে কেন? আর উনি এসব জানলেন কি করে?’ এলিজা বলল।
‘আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি আগের মতই জবাব দিয়ে বললেন, সবই জানবেন, তবে এখন নয়।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘ঠিকই বলেছ বাবা। ক্রিমিনালরা জীবনের ভয় করে। আর নিজের জীবন বিপন্ন করে তারা অন্যের জীবন, ইজ্জত-আবরু বাঁচাতে যায় না। তার উপর আহত, অসুস্থ। এই অবস্থায় একা খালি হাতে যখন এগারো জন দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে আমাদের বাঁচাবার জন্যে নেমে গেলেন, তখন নিশ্চয় তিনি জীবনের চিন্তা করেননি। এমন মানুষরা মানুষের আদর্শ, বাবা।’ এলিজা বলল।
‘সত্যি বলেছ মা। যে অসাধ্য সাধন সে করেছে তার জন্যে প্রশংসা শুনতেও সে রাজী হয়নি।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আবার হামলা হওয়ার যে কথা উনি বলেছেন, সে বিষয়ে কি ভাবছ বাবা? উনি আক্রান্ত হবেন কেন? আজকের ঘটনার প্রতিশোধ?’ বলল এলিজা।’
‘মেহমান ভদ্রলোক এ ব্যাপারে কিছুই জানাননি। বাই দি বাই বলেছেন, সম্ভবত তিনি চান না এ নিয়ে কোন আলোচনা বা কিছু করা হোক।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘অদ্ভুত মানুষ! এত বড় ঘটনা ঘটাল, কিন্তু এটা তার কাছে কিছুই নয়। সত্যিই এক ভিন্ন প্রকৃতির ভিন্ন মানুষ ইনি। চল, সবাই ঘুমাতে যাই।’ এলিজাই বলল।
রাত চারটা। আহমদ মুসার চোখে ঘুম নেই। তার মন বলছে, আজকে রাতেই তারা এখানে আসবে এবং ঘটনাটা ঘটাবে। তাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করছিল যে লোকটি তার কথাই ভাবছিল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, লোকটা তাকে চিনেছে। কিন্তু কেমন চেনা! তার চোখে লোভের চকচকে রং দেখা গেছে। লোভটা কেন? কিসের লোভ?
এই চিন্তার মধ্যেই আহমদ মুসার চোখ একটু ধরে এসেছিল।
দু’একটা ‘কট কট’ শব্দে আহমদ মুসার জড়তাটা কেটে গেল।
আহমদ মুসা মুহূর্তেই বুঝতে পারল, ওটা দরজা লুজ হওয়ার শব্দ।
তার মানে দরজা কেউ খুলেছে। বিকল্প চাবি বা অন্য কোন টেকনোলজিতে তারা দরজা খুলতে পারে।
দরজার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসা। আলোর ভ্যারিয়েশন দেখে বুঝতে পারল দরজার অনেকখানি খোলা হয়েছে। সেই খোলা পথ দিয়ে চারটি জমাট কালো অবয়ব ভেতরে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা এবার নিশ্চিত হলো ঘরে শত্রু প্রবেশ করেছে। সে সতর্ক হলো। রিভলবারটা বালিশের তলা থেকে বের করে ডান পাঁজরের তলায় রাখল।
চারটি জমাট অন্ধকার ছায়ামূর্তি আহমদ মুসাকে ঘিরে দাঁড়াল। একজন পায়ের কাছে, আরেকজন মাথার কাছে। আর দু’পাশে দুজন।
মাথার কাছের জন নিচু হলো। অন্ধকারে তার হাতের সাদা রুমালটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বুঝল তাকে ক্লোরোফরম করা হবে। আহমদ মুসার চিন্তার চেয়েও দ্রুত কাজ করল লোকটা।
বিদ্যুৎ বেগে তার রুমাল ধরা হাত নেমে এল এবং আহমদ মুসার নাকটার ওপর চেপে ধরল। আহমদ মুসা এর জন্যে প্রস্তুত ছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ করেছিল সে সংগে সংগেই। আহমদ মুসা মুখ এদিক ওদিক করে দু’হাত দিয়ে তার ক্লোরোফরমের রুমাল ধরা হাত সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু সফল হলো না। মিনিট দেড়েকের মধ্যে আহমদ মুসার হাত-পা দেহ নিঃসাড় হয়ে গেল।
‘শালাকে এত তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়াতে পারব তা ভাবিনি। শালা এবার আমাদের হাতের মুঠোয়, মানে ৫ লাখ ডলার আমরা সকালেই পেয়ে যাচ্ছি।’
একজন লোক সোৎসাহে এ কথাগুলো বলে নির্দেশ দিল, ‘হাত-পা এর বেঁধে ফেল। শালাকে বিশ্বাস নেই।’
আহমদ মুসা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এদের কেন, কারও হাতেই এ মুহূর্তে বন্দী হওয়া যাবে না। তার সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
একজন লোক যে পেছনে দাঁড়িয়েছিল সে আহমদ মুসার পা বাঁধার জন্য উবু হয়ে বসতে যাচ্ছিল। সংগে সংগে আহমদ মুসার ডান পা তীব্র বেগে উপরে উঠল। গিয়ে তা আঘাত করল লোকটির কণ্ঠনালিতে। লোকটির দেহ ঈষৎ শূন্যে ছিটকে উঠে গিয়ে আছড়ে পড়ল দরজার উপর।
পা দিয়ে লাথি মারার সাথে আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে পাঁজরের তলা থেকে রিভলবার বের করে নিয়েই পাশের দু’জনকে গুলি করল এবং তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। মাথার পেছনের লোকটি ক্লোরোফরমের রুমাল ফেলে দিয়ে পকেট থেকে রিভলবার বের করেছিল, ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় লোকটি আহমদ মুসাকে নতুনভাবে টার্গেট করার আগেই আহমদ মুসার গুলির শিকার হলো সে। ইতিপূর্বে দরজার সাথে ধাক্কা খেয়ে একজন পড়ে যাওয়ায় দরজা আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
দরজার বাইরে থেকে ধাক্কা দেয়ার শব্দ হলো। সেই সাথে রবার্ট রবিনসনের কণ্ঠ, ‘কি হচ্ছে ভেতরে? আমরা সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে।’
আহমদ মুসা গিয়ে দরজা খুলে দিয়েই, দরজায় পড়ে যাওয়া লোকটিকে টেনে তুলে তার মাথায় রিভলবার চেপে ধরে বলল, ‘কে তোমরা? কেন আমাকে আক্রমণ করতে এসেছ?’
ইতিমধ্যে রবার্ট রবিনসন ভেতরে ঢুকে ঘরের লাইট জ্বেলে দিয়েছে, ঘরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে অন্যরাও।
সবাই দেখল আহমদ মুসার বেড ঘিরে তিনটি লাশ পড়ে আছে। আর একজনের মাথায় রিভলবার ধরে আছে আহমদ মুসা।
‘কি ব্যাপার, কি ঘটেছে, জনাব? এসব কি দেখছি?’ বলল রবার্ট
রবিনসন।
‘এরা আমাকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল?’-
‘কেন?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সেটাই তো এই লোকটার কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছি, অন্যরা সবাই তো মারা গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
বলে আহমদ মুসা মনোযোগ দিল মাথায় রিভলবার চেপে রাখা লোকটির দিকে। বলল, ‘শোন, এক আদেশ আমি দু’বার দেই না।’
লোকটি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকল। কিছুই বলল না।
কঠোর হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। সে রিভলবারের ব্যারেলটা সরিয়ে নিল। তার তর্জনি ট্রিগারে চাপ দিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলি বেরুল তার রিভলবারের নল থেকে। একটা বুলেট ছুটে গিয়ে লোকটির বাম কানের একাংশ ছিড়ে নিয়ে চলে গেল। লোকটা আর্ত-চিৎকার করে উঠল।
আহমদ মুসা রিভলবার আবার মাথায় তাক করে বলল, ‘আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি। এবারের বুলেট কিন্তু তোমার মাথা গুড়ো করে দেবে। চিৎকার করার সময়ও পাবে না।’
‘স্যার, আমাদের কোন দোষ নেই। দশ হাজার ডলার করে দেবে বলে আমাদের নিয়ে এসেছে। আপনার মাথার কাছে যে দাঁড়িয়ে ছিল, যে আপনাকে ক্লোরোফরম করেছিল, সেই আসল লোক স্যার। সে ৫ লাখ ডলারের লোভে আপনাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল।’
‘পাঁচ লাখ তাকে কে দেবে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘আমি ঠিক জানি না স্যার। তবে আমি শুনেছিলাম, কারা গোপনে বাড়ি বাড়ি নাকি লিফলেট বিলি করেছে, তাতে আপনার ফটো আছে। তাতে বলা হয়েছে আপনি দেশের সাংঘাতিক শত্রু। আপনাকে একটা নির্দিষ্ট স্থানে পৌছে দিতে পারলে সংগে সংগে পাঁচ লাখ ডলার। আপনি কোথায় আছেন এ খোঁজ দিলেও এক লাখ ডলার বকশিশ দেয়া হবে স্যার।’ বলল লোকটি।
‘সে জায়গাটা কোথায় যেখানে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পৌছাতে বলেছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেটা আমি জানি না স্যার। শুধু ঐ লোকটাই তা জানত।’ বলল
লোকটি।
‘কেন তুমি পোস্টার বা লিফলেট পড়নি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পড়েছি স্যার। কিন্তু পোস্টারে সেটা লেখা নেই। ওকথাটা মুখে মুখে বলেছে।’
‘বুঝেছি। শোন, আমার কাজ যতদিন শেষ না হয় তোমাকে ততদিন বন্দী থাকতে হবে। যাতে আমার কথা কাউকে বলতে না পার, এজন্যে এই ব্যবস্থা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, আপনার কথা আমি কাউকে বলব না। আমায় ছেড়ে দিন স্যার।’ বলল লোকটি।
‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম, কিন্তু আমার আসল শত্রুকে তো বিশ্বাস করি না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওদের আমি চিনি না স্যার।’ বলল লোকটি।
‘তোমার চেনার দরকার নেই। আজকের এই ঘটনার পর তারাই তোমাকে চিনে নেবে। আমি কোথায় আছি না বললে তুমি মরবে তাদের হাতে।’ আহমদ মুসা বলল।
লোকটি চমকে উঠল। বলল, ‘তাহলে আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করেন স্যার।’
‘আচ্ছা বলত, আমাকে তোমার যে বন্ধু চিনেছে, সে এই কথা কি ওদেরকে জানিয়েছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘না জানায়নি স্যার, দু’টো কারণে। এক. খবর জানলে ওরা নিজেরা এসে ধরে নিয়ে যাবে, টাকা থেকে সে বঞ্চিত হবে। দুই. সে ওদেরকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল।’ বলল লোকটি।
‘ধন্যবাদ। তোমার এ খবরটি খুব মূল্যবান।’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটির সাথে কথা শেষ করে আহমদ মুসা ফিরল রবার্ট রবিনসনের দিকে।
ওরা সবাই আহমদ মুসা ও লোকটির কথা গোগ্রাসে গিলছিল। ভয় ও বিস্ময় উভয়ই তাদের চোখে মুখে।
‘জনাব, এই লোকটাকে দু’একদিন কোথায় আটকে রাখা যাবে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমাদের বাড়িতেই তো আমরা রাখতে পারি।’
সংগে সংগে কিছু বলল না আহমদ মুসা। একটু ভাবল। বলল, ‘আমি ভাবছি জনাব, এই বাসায় আপনাদের থাকা ঠিক হবে কি না। অন্তত কয়েকদিন।’
বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল রবার্ট রবিনসনের। অন্যরাও বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে।
‘কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। কেন আমাদের বাড়ি ছাড়তে হবে সাময়িকভাবে হলেও?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘এটা আমার একটা আশংকার ব্যাপার। সত্য নাও হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি আশংকা?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আমাকে যে লোকটি চিনেছিল, সে এই কথা কাউকে জানাতেও পারে, আবার মূল শত্রুপক্ষকেও জানাতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে আপনারা, আপনাদের বাড়ি ভয়ানক টার্গেটে পরিণত হবে। তাছাড়া জুলিয়া ও এলিজাকে নিয়ে যে রক্তারক্তি হয়ে গেল, তার প্রতিশোধ নিতে আবার তারা আসতেও পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি ঠিকই চিন্তা করেছেন। আমাদের সরে থাকা দরকার। কিন্তু কত দিন?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আমার মনে হয় বেশি দিন সরে থাকতে হবে না। সংকটের সমাধান খুব তাড়াতাড়ি হবার কথা আমি মনে করি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সংকটটা কি? সেটা কি আপনার নিজের, না আমাদের, না দেশের, না সরকারের?’ জিজ্ঞাসা রবার্ট রবিনসনের।
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘আপনাদের সব কথা বলতে পারলে আমার খুব ভালো লাগত। কিন্তু বিষয়টা খুবই গুরুতর। আমি বেঁচে আছি, শত্রুপক্ষ এটা জানা মানে দেশকে ভয়ংকর বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া।’
‘শত্রুপক্ষ কি আপনার শত্রু, না দেশের শত্রু?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘আসলে ওরা দেশের শত্রু, আবার আমারও শত্রু।’ আহমদ মুসা বলল।
‘দেশের শত্রু হলে দেশ তার মোকাবিলা করবে। আপনার বেঁচে থাকা না থাকার সাথে এর সম্পর্ক কি?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
আহমদ মুসা হাতজোড় করে বলল, ‘কথায় কথায় আপনারা অনেকখানি জেনে ফেলেছেন। আর নয়। যখন জানার তখন সবই জানতে পারবেন। আপনাদের কাছে একটা সাহায্য চাই আমি।’
‘কি সাহায্য?’ জিজ্ঞাসা রবার্ট রবিনসনের।
‘ডেথ ভ্যালি সম্পর্কে কিছু জানেন কি না? ডেথ ভ্যালির কাছাকাছি যেহেতু আপনারা থাকেন। ডেথ ভ্যালিতে কোন লোক থাকে কি না, কোন লোক এখানে আসে কি না? এমন কিছু আপনারা দেখেছেন কি না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডেথ ভ্যালিতে মানুষ যাওয়া বা থাকার প্রশ্নই উঠে না। আসলে ওটা ডেড উপত্যকা। সে উপত্যকায় একটাই পথ ছিল, সেটা ঈশ্বর ভূমিকম্পের মাধ্যমে বন্ধ করে দিয়েছেন। ঐ ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশের কোন স্থলপথ খোলা নেই। যেহেতু সরকারিভাবেই এটা নিষিদ্ধ এবং ডেড উপত্যকা হিসাবে ঘোষিত হয়েছে, তাই আকাশ বা অন্যপথে এতে প্রবেশ করার চেষ্টা করা যাবে না। তবে এর চারদিকে মানুষের আনাগোনা বন্ধ নেই। বিশেষ করে ক্রিকের জলপথে কখনও কখনও মানুষ আসতে দেখা গেছে।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘ক্রিকের জলপথে মানুষ আসতে দেখা গেছে!’ বিস্ময় ঝরে পড়ল আহমদ মুসার কণ্ঠে।
বিস্ময় প্রকাশের পরই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘জলপথে এসে তারা কি করত?’
‘তেমন কিছু করতে দেখা যায়নি। মনে হয় ওরা পর্যটক হতে পারে।
ওদেরকে ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
ভ্রু-কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘ওরা কোন্ সময়ে আসত?’
কথা বলল বরিস বুবুকি। বলল, ‘আমি কিছু দিন ক্রিক এলাকায় বিশেষ ধরনের পাথর সংগ্রহের কাজ করতাম। তখন অনেক সময় সন্ধ্যা হয়ে যেত। সে সময় পর্যটকদের নৌকা বিকেলে, অনেক সময় সন্ধ্যায়ও আসতে দেখতাম।’
‘নৌকায় কি থাকত?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
একটু চিন্তা করল বরিস বুবুকি। বলল, ‘নৌকায় লোহা-লক্কড়সহ নানা সামগ্রী থাকত। অনেক সময় বড় বাক্স-কার্টুন দেখেছি। তবে ওসবে কখনো তেমন মনোযোগ দেইনি।’
আহমদ মুসার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিশ্চয় ক্রিকের নদীপথেই ডেথ ভ্যালিতে সামরিক ঘাঁটি তৈরির সরঞ্জাম আনা হয়েছে এবং এটা নিশ্চিত যে, ডেথ ভ্যালিতেই এইচ থ্রি ও ফোম-এর সামরিক ঘাঁটি তৈরি হয়েছে।
আহমদ মুসা মনে মনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ে বলল, ‘ভোর হয়ে গেছে। আপনাদের সিদ্ধান্ত বলুন।’
‘ভার্জিনিয়াতে আমার ভাই থাকেন। আমরা কিছুদিন সেখানে গিয়ে থাকব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনি কি করবেন?’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘ধন্যবাদ জনাব। আমাকে রক ক্রিকেই থাকতে হবে। অসুবিধা হবে না। আপনারা অবশ্যই শীঘ্র চলে আসবেন। রক ক্রিকের কাজ আমার শেষ হলেই আপনাদেরকে গুপ্তধনের ওখানে নিয়ে যাব।’
‘আমরা যদি ভার্জিনিয়ায় এখন যাত্রা করি, তাহলে আপনি কোথায় যাবেন?’ জিজ্ঞাসা রবার্ট রবিনসনের।
‘আমি রক ক্রিকে ঘুরতে যাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘খাবেন কোথায়?’ বলল এলিজা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘খাওয়া মানে পেট ভরা। সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। পশু-পাখিদের দেখ না খাদ্যের কোন অভাব হয় না।’
‘স্যার, বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন। মানুষ তো পশু-পাখি নয়।’ বলল এলিজা।
‘তা ঠিক। তবে চিন্তা করো না বোন, খাওয়ার ব্যবস্থা আমি একটা করে নেব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার একটা প্রস্তাব জনাব।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
‘বলুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদের বাড়িটা বলা যায় রক ক্রিকেই। আপনার কাজও রক ক্রিকে। আমরা নিচের কিচেন, স্টোর, খাবার ঘরসহ কয়েকটা ঘরের চাবি আপনাকে দিয়ে যেতে চাই। আপনি প্রয়োজনে আসবেন, থাকবেন। অসুবিধা নেই। আমাদের পেছন দিকের আন্ডারগ্রাউন্ড এক্সিট ব্যবহার করবেন। বাইরের সব গেটই বন্ধ থাকবে, বাড়ি থেকে বেরুবার অন্যান্য দরজাও বন্ধ থাকবে। কেউ এলে দেখবে বাড়ি আমাদের খালি এবং বন্ধ।’
‘ঠি আছে। এই ব্যবস্থা আপনারা করতে পারেন। আন্ডারগ্রাউন্ড এক্সিট থাকলে অসুবিধা নেই। প্রয়োজন যদি হয়, তাহলে ব্যবহার করা যাবে। ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আন্ডারগ্রাউন্ড প্যাসেজসহ আপনাকে সব দেখিয়ে দিতে চাই। আসুন।’
‘চলুন।’ বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘আমিও যাব, বাবা। দু’একবার মাত্র তো দেখেছি।’ বলল এলিজা।
‘ঠিক আছে এস।’ বলল রবার্ট রবিনসন।
সবাই উঠল।
